Saturday, August 17, 2024

বিচারপতি খায়রুল কেন শঠতার আশ্রয় নিয়েছিলেন? by ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

জাতীয়ভাবে আমাদের সাধারণ একটা অভ্যাস বা প্রবণতা হচ্ছে আমরা কোনো সমস্যা বা সংকটের গভীরে যাই না। আমরা যা চোখে দেখি তা নিয়েই মাতা-মাতি, তর্কা-তর্কি ও গালা-গালি করি। এ যেন কঠিন এক রোগের কারণ ও উপসর্গ নির্ণয় না করে সাধারণ প্যারাসিটামল দিয়ে তার প্রতিকারের চেষ্টা করা। এতে হিতে-বিপরীত হয়। কঠিন রোগটি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন আর কারো তেমন কিছুই করার থাকে না। তাই রোগ বা সংকটের মূল কারণে বা গভীরে না গিয়ে যদি ভাসাভাসা (superficially) সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয় তাতে সমস্যা না কমে বরং তা প্রকট আকার ধারণ করে। এক সময় তা সমাধান ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। গত দেড় দশকে তো আমরা তাই দেখে আসলাম। দেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছিল যা থেকে উদ্ধার হয়েছে ছাত্র-জনতার সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

আর এই সংকটের একেবারে গোড়ায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়। এই রায়ের প্রধান কারিগর হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। এই নিবন্ধে খুঁজবো দেশকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলা সেই রায়ের আইনি, নৈতিক, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। দেখবো কীভাবে এই রায় শঠতা ও গোঁজামিলে ভরপুর!

২০১১ সালের ১০ মে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় সর্বসম্মত ছিল না। বরং এটি ছিল গভীরভাবে (অনেকটা সমান সমানভাবে) বিভক্ত রায়। রায় দেয়ার সময় প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। রায় প্রদানকারী বাকি ৬ জন বিচারপতির মধ্যে ৩ জন (যথাক্রমে বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এস কে সিনহা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে রায় দেন। আবার ৩ জন (যথাক্রমে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মো. ইমান আলী) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে রায় দেন। বিচারপতি মো. ইমান আলীর রায়টি একটু ভিন্ন ধাঁচের হলেও তাঁর রায় স্পষ্টত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার পক্ষে ছিল। একেবারে সমানভাবে বিভক্ত রায় বিচারপতি খায়রুল হকের কাস্টিং ভোট তথা রায় বাতিলের পক্ষে চার-তিনে মেজরিটি হয়ে এই রায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের রায় হয়।

৪:৩-এর সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়েও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আওতায় পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে মত দেয়া হয়। ওই সময় সংক্ষিপ্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেন, বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বাদ রেখে সংসদ এ সরকার পদ্ধতি সংস্কার করতে পারে। ওই সংক্ষিপ্ত রায়ের উপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ রায় বের হবার আগেই তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে তৎকালীন মহাজোট সরকার। অথচ পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে যে গুরুত্বপূর্ণ মত সর্বোচ্চ আদালত থেকে দেয়া হয় তা আমলেই নেয়নি সরকার। এত তড়িঘড়ি করার কি দরকার ছিল? পূর্ণাঙ্গ রায় বের হলে পুরো রায়ের ব্যাখ্যা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকতো, থাকতো সর্বোচ্চ আদালতে পুনর্বিবেচনা করার আবেদনের অধিকার। যেহেতু ৩:৩ এ সমানভাবে বিভক্ত রায় বিচারপতি খায়রুল হকের কাস্টিং ভোট তথা রায়ে মেজরিটি হয়েছিল এবং বিচারপতি খায়রুল হক যেহেতু সংক্ষিপ্ত আদেশের পরপরই অবসরে গিয়েছিলেন, সেহেতু সমূহ সম্ভাবনা ছিল পুনর্বিবেচনায় রায় পাল্টে যাবার! সংক্ষিপ্ত রায়ের উপর ভিত্তি করে তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করার কারণে সর্বশেষ এই পুনর্বিবেচনা করার আবেদনের সুযোগ ও অধিকারটিও থাকলো না।

এই রায়কে ঘিরে পর্দার আড়ালে কী যে হয়েছে তার কিছুটা আন্দাজ মিলে কয়েকটি তথ্য ও প্রমাণ থেকে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ওপেন কোর্টে তাঁর সংক্ষিপ্ত আদেশে পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে মত দেন। কিন্তু সরকার সংক্ষিপ্ত আদেশের উপর ভর করে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর যখন বিচারপতি খায়রুল হক পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করলেন তখন পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে যে মত দিয়েছিলেন তা আর রাখেন নি! কোনো অধিকতর বা পরবর্তী (More or further) শুনানি ছাড়া এভাবে রায় পরিবর্তন করা যায় না। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠে-কেউ কি তাঁকে চাপ দিয়েছিল? বা কারো সাথে কোনো যোগসাজশে তেমনটি করা হয়েছিল? শোনা গেছে বিচারপতি খায়রুল হক অবসরের পর রায় লিখে জমা দেয়ার পর আবার নিয়ে সংশোধন করে লিখে আবার জমা দিয়েছিলেন। এমনটি কি তিনি করতে পারেন? উন্নত বিশ্বে এভাবে রায় পরিবর্তন করাকে সিরিয়াস জুডিসিয়াল মিসকন্ডাক্ট বা বিচারসম্পর্কিত গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে দেখা হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো-বিচারপতি খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণের অব্যবহিত পূর্বে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলার আপিল শুনানি করেন এবং একটি সংক্ষিপ্ত বিভক্ত আদেশ দেন। এর পরপরই তিনি অবসরে যান এবং ৭৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় লিখেন ও সাক্ষর করেন অবসরে যাবার প্রায় ১৬ মাস পরে! এখন প্রশ্ন হচ্ছে তিনি যখন খুব শিগগিরই অবসরে যাবেন এবং এর ভেতরে পূর্ণাঙ্গ রায় লিখা অসম্ভব তাহলে কেনইবা এই আপিল মামলায় নিজেকে জড়ালেন? তিনি নিজেকে সরিয়ে নিতে পারতেন। সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি এই মামলার আপিল শুনানিতে এত অতিউৎসাহী ছিলেন কেন? ত্রয়োদশ সংশোধনীকে হাইকোর্টের তিনজন সিনিয়র বিচারপতি সর্বসম্মতভাব বৈধ বলে ঘোষণার পর আপিল পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে থাকলেও বিচারপতি খায়রুল হক তা হঠাৎ করে অবসরে যাবার ঠিক আগে শুনানি করার উদ্যোগ নেয়ার হেতু কি? তাও ক্ষমতাসীন দল সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণের পর! বিষয়গুলো কেবল কাকতালীয় নয়।

অবসরে যাবার পর একজন বিচারপতি আর শপথের আওতায় থাকেন না। এমনকি একজন বিচারপতি অবসরে যাবার এক বছরের মধ্যে তাঁকে রাষ্ট্রের দেয়া বাড়ি, গাড়ি ও স্টাফ ছাড়তে হয়। বস্তত: উনি হয়ে পড়েন একজন সাধারণ নাগরিক। এমতাবস্থায় কিভাবে বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাবার প্রায় ১৬ মাস পর অত্যন্ত স্পর্শকাতর পুরো জাতিকে নাড়া দেয়া সাংবিধানিক মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় দেন এবং তাতে সাক্ষর করেন। এটা দুনিয়ার সভ্য দেশের ইতিহাসে বিরল। বিচারপতি খায়রুল হকের উত্তরসূরি সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা (যিনি স্বয়ং বিচারপতি খায়রুল হকের সাথে একমত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন) অবসর গ্রহণের পর রায় লেখা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী বলে ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন। এর আলোকে বিচারপতি খায়রুল হকের অবসরের প্রায় ১৬ মাস পরে লেখা ও সাক্ষর করা ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় কি সংবিধান পরিপন্থী হয় না?

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে তিন জন বিচারপতি আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বানানো হয়েছিল। শুধু তাই নয় এই মামলা শুরুর কিছুদিন আগে বিচারপতি খায়রুল হককে দুইজন সিনিয়র ও দক্ষ বিচারপতিকে (বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান ও বিচারপতি আব্দুল মতিন) ডিঙ্গিয়ে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যে তিনজন বিচারপতি আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন তাঁদের সবদিক দিয়ে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সিনিয়রিটি থাকার পরও তাঁদেরকে প্রধান বিচারপতি বানানো হয়নি। বিচারপতিদের রায়ের উপর খুশি বা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদেরকে এভাবে পুরস্কৃত বা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের ৮ জন সিনিয়র আইনজীবীকে এ্যমিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু তথা আইনি সহায়তাকারী) নিযুক্ত করা হয়। এরা হলেন-সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, সাবেক এ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, সাবেক এ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. এম জহির, অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসি। একমাত্র ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসি ছাড়া অন্য সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন।

উল্লেখ্য, এই সাতজন এ্যমিকাস কিউরি যেই সেই আইনজীবী নন। উনারা দেশসেরা ও প্রতিথযশা আইনজীবী। তাদের অনেকের ডাইরেক্ট জুনিয়ররা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতি হয়ে অবসরে গিয়েছেন বা এখনও কর্মরত আছেন। আইন ও সংবিধানের এমন অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের মূল্যবান মতামতকে যদি পাত্তাই দিলেন না তাহলে তাদেরকে কেনইবা এ্যমিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল?

এমনকি শুনানিকালে সরকারের প্রধান তৎকালীন আইন কর্মকর্তা এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন। সরকার সম্পর্কিত যেকোনো মামলায় সরকার তথা রাষ্ট্র হচ্ছে প্রধান ও শক্তিশালী পক্ষ। সরকার বা রাষ্ট্রকে রিপ্রেজেন্ট করেন রাষ্ট্রের এ্যাটর্নি জেনারেল। আর সেই প্রধান আইন কর্মকর্তা এ্যাটর্নি জেনারেল যদি একমত হোন এবং সংশ্লিষ্ট মামলায় ছাড় দেন (Concede করেন) তাহলে বিচারপতিদের ভিন্ন পথ ধরার হেতু বা যৌক্তিকতা কি? আটজনের মধ্যে সাত জন দেশ সেরা আইনজীবী তথা এমিকাস কিউরি এবং মামলার শক্তিশালী পক্ষ রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ্যাটর্নি জেনারেলের মতামতকে অগ্রাহ্য করে দেয়া রায়ের নৈতিক ভিত্তিইবা কতটুকু? এভাবে প্রায় সব এ্যমিকাস কিউরিদের মতামতকে ছুঁড়ে ফেলে এবং রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার ছাড় (Concede) দেয়াকে আমলে না নিয়ে অনেকটা ইউটার্ন নিয়ে রায় দেয়া জুরিস্প্রোডেন্সিয়াল হিস্ট্রিতে এক অভিনব ঘটনা।

উল্লেখ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্বলিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জনৈক আইনজীবী ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট করলে তাতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার এর প্রশ্ন জড়িত থাকায় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের তিনজন সিনিয়র বিচারপতির সমন্বয়ে একটি বিশেষ ও বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিশেষ ও বৃহত্তর বেঞ্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত’[৫৭ ডিএলআর (২০০৫)]।

বৃটেনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আদালত কোর্ট অব আপিলে সাধারণত তিনজন বিচারপতিকে নিয়ে বেঞ্চ গঠন হয়। তিনজন বিচারপতি সর্বসম্মত রায় না হয়ে যদি ২:১ সংখ্যা গরিষ্ঠতার রায় হয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে অনেকটা রুটিনলী আপিলের পারমিশন দেয়া হয় বা আবেদন করলেই পাওয়া যায়, কেননা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারপতির ডিসেন্টিং জাজমেন্ট হলেও তা সর্বোচ্চ আদালত যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার করে। উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতির প্রজ্ঞা ও বিবেচনার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। অনেক সময় মাইনোরিটি একজন বিচারপতির ডিসেন্টিং জাজমেন্টই সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে টিকে যায় (prevail করে)।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। সাংবিধানিকভাবে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ-এ দুটি বিভাগ নিয়েই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট গঠিত। সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের গার্ডিয়ান বলা হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আছে সহজাত (inherent) ক্ষমতা ও মূল/আদি (original) জুরিসডিকশন। এবার যদি আমরা সুপ্রিম কোর্টকে মাথায় রেখে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব এই মামলায় উচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে। মোট ছয় জন বিচারপতি ছিলেন পক্ষে (হাইকোর্টের তিন জন আর আপীল বিভাগের তিন জন) আর বিপক্ষে ছিলে চার জন বিচারপতি (আপিল বিভাগের চার জন বিচারপতি খায়রুল হকসহ)। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি এবং এ্যামিকাস কিউরিদের ৮ জনের মধ্যে ৭ জন এবং রাষ্ট্রের এ্যাটর্নি জেনারেল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেয়া একটি রায়কে অজুহাত হিসেবে বলে ও ভিত্তি করে সংবিধান পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলেন। তাও তড়িগড়ি করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে! এর নৈতিক ও আইনি ভিত্তি কতটুকু? সংকট তো সৃষ্টি হয়েছিল তখনই।

উল্লেখ্য ত্রয়োদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে এই মামলা ছাড়া অতীতে আরও একটি মামলা হয়েছিল। সাঈদ মশিউর রহমান বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে বিচারপতি মোজাম্মেল হক ও বিচারপতি এম এ মতিনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বৈধ বলে ঘোষণা দেন [১৭ বিএলডি (এইচসিডি) (১৯৯৭)]। সুতরাং এই দুই জন বিচারপতিদের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে বলা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের মোট ১২ জন বিচারপতি রায় দিয়েছেন। এর মধ্যে ৮ জন (দুই-তৃতীয়াংশ) বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে (হাইকোর্টের পাঁচ জন আর আপিল বিভাগের তিন জন) আর বিপক্ষে ছিলেন চার জন বিচারপতি (আপিল বিভাগের চার জন বিচারপতি খায়রুল হকসহ)।

উপরের আইনি দিকগুলো ছাড়াও, রাজনৈতিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের নৈতিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হলেও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কোনো প্রস্তাব ছিল না। ফলে তা ছিল জনগণের ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত রায়ের উপর ভিত্তি করে সম্পাদিত কাজ। স্মরণ করা যেতে পারে যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন সংসদ উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরী ও সুরঞ্চিত সেনগুপ্তের যৌথ নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যাতে বিএনপি অংশ নেয়নি। কমিটি তিনজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, ১১ জন শীর্ষ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, ১৮ জন বুদ্ধিজীবী, ১৮টি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক বা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতাদের মতামত নেয়। বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রায় সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কেউই এর বিরোধিতা করেননি। এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও দল হিসেবে কমিটির কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ করেনি। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও সংশোধিত আকারে এর পক্ষে বক্তব্য দেন। কিন্তু ২০১১ সালের ৩০ মে কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে সবকিছু উল্টে যায়, সবকিছু বদলে যায়! ২০ জুন কমিটি অন্য সবার মতামত উপেক্ষা করত। একেবারে ৩৬০ ডিগ্রি ইউটার্ন দিয়ে নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ করে! পায়ে কুড়াল তো তখনই মারলেন।

দেশকে গভীর সংকটে ফেলার প্রধান কারণ হচ্ছে আদালতে সংক্ষিপ্ত রায়ের দোহাই দিয়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী তড়িঘড়ি করে বাতিল করত: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা। যে রায়ের দোহাই দেয়া হয়েছিল তার প্রেক্ষাপট ও ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়ের আইনি, নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি খুবই দুর্বল ও গলদপূর্ণ ছিল। নৈতিকভাবে সেই রায় ও তার উপর ভিত্তি করে সংবিধান সংশোধন অনেক শঠতা, ধূর্ততা, অতিউৎসাহ ও গোঁজামিলে ভরপুর।

এই শঠতাপূর্ণ রায়ই পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলে কেটালিস্ট হিসেবে কাজ করেছে, তাকে দানবে পরিণত করতে সহায়তা করেছে। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হয়তো ক্ষমতায় আসতে পারতো না, তবে ২০১৮ সালে তাদের ক্ষমতা আসার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। শেখ হাসিনা ও তার দলের বর্তমান অবস্থা হতো না। দেশের অপরিসীম ক্ষতি তো বটেই, শেখ হাসিনা ও তার দলের বর্তমান অবস্থার জন্যও বিচারপতি খায়রুল হক সরাসরি দায়ী। তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার দেশ ও জাতির স্বার্থে যাতে করে এমন বিচারিক নৈরাজ্য ভবিষ্যতে কেউ করতে না পারে।

মিডিয়ায় দেখলাম প্রধান বিচারপতি স্ট্যাটাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আঁকড়ে থাকা আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে বিচারপতি খায়রুল হক পদত্যাগ করেছেন। কেবল পদত্যাগেই সব শেষ? তাকে বরং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে এটা ভবিষ্যৎ জাতির অপূরণীয় ক্ষতি করা ব্যক্তিদের জন্য deterrence হিসেবে কাজ কররে। বর্তমান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল মহোদয়কে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বহুবার বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের তীব্র সমালোচনা করতে দেখেছি। তার বিচারও দাবি করছেন তিনি অনেকবার। সেটা বাস্তবায়নের সুযোগ এখন তাঁর হাতের মুঠোয়।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্র চিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

আদানি গ্রুপকে ভারতের ভিতরে বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমতি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর

বাংলাদেশে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ভারত মোট কমপক্ষে ১১০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তার মধ্যে বিতর্কিত আদানি গ্রুপ সরবরাহ দিয়েছে সবচেয়ে বেশি টাকার বিদ্যুৎ। মোট রপ্তানির মধ্যে এর পরিমাণ শতকরা ৯.৩ ভাগ। যার মূল্য কমপক্ষে ১০০ কোটি ডলার। ভারতের এই একটিমাত্র বিদ্যুৎ কোম্পানিকে তার পুরোটা বিদ্যুৎ বাংলাদেশের কাছে রপ্তানি করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন রেজুলেশন সংশোধন করার ফলে ভারতের ভিতরেও বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে আদানি গ্রুপ। উল্লেখ্য, দুই বছর আগের তুলনায় এ সময়ে বিদ্যুৎ বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৩ ভাগের কিছুটা ওপরে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালানোর পর নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু নয়া দিল্লি বিদ্যুৎ রপ্তানির রেজুলেশন সংশোধন করে একমাত্র এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে ঝুঁকিমুক্ত করেছে। বর্তমানে কোম্পানিটি ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের পুরোটা বাংলাদেশের কাছে রপ্তানি করতে চুক্তিবদ্ধ।

কলকাতাভিত্তিক ইস্টার্ন রিজিওনাল পাওয়ার কমিটির (ইআরপিসি) প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী এজেপিএল’স গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে কমপক্ষে ৭৫০ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে।

এই পরিমাণ মোট রপ্তানি করা ১১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ইউনিটের শতকরা ৬৩ ভাগ। ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে নয়া দিল্লি যাওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ১২ই আগস্টের এক স্বারকের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুত আমদানি/রপ্তানি বিষয়ক ২০১৮ সালের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি রেজুলেশন সংশোধন করার উদ্যোগ নেয় নয়া দিল্লি। সংশোধিত রেজুলেশনটি ‘একচেটিয়াভাবে প্রতিবেশী দেশে’ বিদ্যুত সরবরাহ করা বিদ্যুৎ বিষয়ক ইউটিলিটিগুলোর সার্থে সম্পর্কিত এবং এই পরিবর্তনটি মূলত ঝাড়খন্ডের গোড্ডা জেলায় আদানি ইউনিটের মতো প্লান্টগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার লক্ষ্যে। এতে বলা হয়, ভারতে যদি পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক সক্ষমতা থাকে তাহলে এমন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ভারতের ভিতরে বিদ্যুৎ বিক্রি করার জন্য ভারতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার জন্য অনুমতি দিতে পারে ভারত সরকার।  

তবে আদানি পাওয়ার বৃহস্পতিবার বলেছে যে, তারা বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্প্রতি ভারত সরকার বিদ্যুৎ রপ্তানির নিয়মে যে সংশোধন এনেছে তাতে বিদ্যমান চুক্তিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। বাংলাদেশে বর্তমানে ভারতীয় চারটি কোম্পানি বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে। তারা হলো- দুটি বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভাইপার নিগাম লিমিটেড (এনভিভিএন) ও পিটিসি ইন্ডিয়া লিমিটেড। দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট সেম্বকরপ এনার্জি ইন্ডিয়া লিমিটেড এবং আদানি পাওয়ার। এসব বিদ্যুৎ রপ্তানির শতকরা কমপক্ষে ৯০ ভাগ আসে একটিমাত্র কেন্দ্র থেকে। তা হলো ঝাড়খন্ডের গোড্ডা জেলার মোতিয়া গ্রামে অবস্থিত কয়লাচালিত আদানি পাওয়ার (ঝাড়খন্ড) লিমিটেড (এজেপিএল)। এজেপিএলের গোড্ডা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ১০০ ভাগ কিনে নেয়ার চুক্তি আছে বাংলাদেশের। ২০১৯ সালের মার্চে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার স্পেশাল ইকোনমিক জোনের এক ঘোষণায় একথা বলেছে। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শতভাগ কয়লা আমদানি করা হয়।

ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের প্রাপ্ত বাণিজ্যিক ডাটা অনুযায়ী ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিবেশী বাংলাদেশে ১১৯৩৩.৮৩ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে। এর মূল্য ১.০৩ বিলিয়ন ডলার। এই দেশে ভারতের মোট রপ্তানি হয়েছে ১১.০৬ বিলিয়ন ডলার। তার মধ্যে এই বিদ্যুৎ থেকেই এসেছে শতকরা ৯.৩ ভাগ। এর আগের অর্থবছরে রপ্তানি থেকে দ্বিতীয় আয় এসেছে ডিজেল থেকে। এর পরিমাণ ৮২৯.৫৯ মিলিয়ন ডলার ( মোট রপ্তানির শতকরা ৭.৫ ভাগ)। অন্যদিকে কটন রপ্তানি হয়েছে ৫৯৫.৮১ মিলিয়ন ডলারের। মোট রপ্তানির শতকরা ৫.৩৮ ভাগ কটন রপ্তানি করে তা রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে।

২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারত মোট ১২.২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তার মধ্যে বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিমাণ ১.০৭৫ বিলিয়ন ডলার (মোট রপ্তানির শতকরা ৮.৮ ভাগ)। এ সময়ে কটন রপ্তানি হয়েছে ৪৯৫.৯৭ মিলিয়ন ডলারের (শতকরা ৪ ভাগ)। ডিজেল রপ্তানি হয়েছে ৪২৩.০৩ মিলিয়ন ডলারের (শতকরা ৩.৪৬ ভাগ)।

এর আগের অর্থ বছরের হিসাবে কটন রপ্তানি ছিল শীর্ষে। এ সময়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কটন রপ্তানি হয়েছে। এর পরিমাণ ১.৫৮ বিলিয়ন ডলার। এ অর্থবছরে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৬.১৫ বিলিয়ন ডলার। তার মধ্যে কটন রপ্তানি হয়েছে শতকরা ১০ ভাগ। এর পরে রয়েছে গম। তা রপ্তানি হয়েছে ১.১৮ বিলিয়ন ডলারের (শতকরা ৭.৩৬ ভাগ)। ৬ষ্ঠ অবস্থানে ছিল বিদ্যুৎ রপ্তানি। এ সময়ে বিদ্যুৎ রপ্তানি হয়েছে ৪৯৮.২৫ মিলিয়ন ডলারের।

আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র দুই বছর আগে তাদের অপারেশন শুরু করে। গত বছরের জুনে পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শুরু করে। ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে যেটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে তার সবটাই বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহের মাসিক শেয়ার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইআরপিসির ডাটা অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে  এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি দেয়া হয়েছে বাংলাদেশকে। মার্চে এর পরিমাণ ছিল শতকরা ৭৫ ভাগ।

স্বাধীনতা কী? by ফাহাম আব্দুস সালাম

২২/২৩ বছর পর গতকাল জুম্মার নামাজ পড়লাম উত্তরার মাটির মসজিদে। নাইন্টিজে এখানেই নামাজ পড়তাম।  আমি যদি জওন এলিয়ার মতো কবিতা লিখতে পারতাম হয়তো আপনাকে জানাতে পারতাম স্মৃতির টান ঠিক কতোটা অসহায় করে মানুষকে।

জানি না ইমাম সাহেব কে কিন্তু তিনি তার বাংলা খুৎবার পার্টে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রয়োজনয়ীতা তুলে ধরেন। কোন সমাজে তারা বাস করতেন - সেই বিভীষিকা বর্ণনা করলেন।

এখানে মসজিদের মধ্যেও ‘আমিত্ব’ ঢোকানো হয়েছিলো (আমাকে একজন জানালেন জানাজার নামাজের আগেও নাকি লোকাল আওয়ামীরা বক্তৃতা দিতো - বাংলাদেশে) তিনি এই অসুখ সারানোর কথা বললেন। সমাজের প্রতিটি জায়গায় একটা হাতা-কাটা কোট পরলে অযোগ্য মানুষদের সব ধরনের সুবিধা দেয়া হোতো। তিনি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আহবান জানালেন। কোনো রাজনীতিবিদ না - বরং একজন শিক্ষকের মতো করেই জানালেন যে বাংলাদেশের যেই অবস্থা ছিলো ২ সপ্তাহ আগে সেই পরিস্থিতিতে আপনি ঠিক কীভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন।

আমি আশ্চর্য হয়েছি তার বাগ্মিতায়। সত্যিই একজন মনস্তাত্ত্বিকের মতো কথা বললেন তিনি। তার আগ্রহ ব্যক্তির কী সর্বনাশ হয়েছে একটা করাপ্ট সিস্টেমের কারণে। তার বক্তব্য এতোটাই জীবন ঘনিষ্ঠ ও সার্বজনীন যে এই খুৎবা যদি চার্চ কিংবা মন্দিরে দেয়া হোতো - একটা মানুষও  আপত্তি করতো না।

আমি সত্যিই ইম্প্রেসড। আমি আমার জীবনে সারা দুনিয়ায় এর চেয়ে সুন্দর খুৎবা খুব বেশী শুনি নাই।

এই যে পাবলিক প্লেসে এরকম অকপট সত্য বলা - বাংলাদেশে সেটা অসম্ভব ছিলো। একজন ড্রাইভার আমাকে বললেন -“ কী যে ভালো লাগতেছে ভাইয়া বলতে পারবো না। কথা বলতে পারতেছি”। প্রতিটা মানুষ আমাকে বলেছেন এই যে সে নির্ভয়ে কথা বলতে পারছে - এই আনন্দের কোনো তুলনা নাই। চিন্তা করেন যে একজন ড্রাইভার মনে করছিলো যে তাকে গুম করা হবে য়ুটিউবের  ভিডিয়ো শেয়ার করলে। তাকে হয়তো গুম করা হোতো না। কিন্তু ভয়টা কোন লেভেলে গিয়েছিলো একবার সেটা ভাবেন। এখনো কয়েকজনকে দেখলাম হাসিনার সমালোচনা করতে গিয়ে অভ্যাসবশত গলার স্বর নামিয়ে ফেললেন।

কিন্তু প্রত্যেকের মতে - আমার মনে হোলো যে এই কথা বলার স্বাধীনতা ফিরে পাওয়াটা জুলাই বিপ্লবের প্রধান অর্জন।

যেই লাউ সেই কদু যে বলে - সত্যিই মনে হয় যে কিছু মানুষ আসলে চটকানা ডিজার্ভ করে।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেওয়া)

আমাদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের স্থান দিতে হবে -ভয়েস অব গ্লোবাল সাউথ সামিটে ড. ইউনূস

গ্লোবাল সাউথের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ ও শিক্ষার্থীদের অবশ্যই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার তৃতীয় 'ভয়েস অব গ্লোবাল সাউথ সামিট'-এর উদ্বোধনী 'লিডার্স সেশন'-এ ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে এ আহ্বান জানান তিনি।

তরুণরা সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ। এরা সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর অংশ। তারা আলাদা। তারা একটি নতুন বিশ্ব গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তরুণ ও শিক্ষার্থীরা সক্ষম এবং প্রযুক্তিগতভাবে তারা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক এগিয়ে।’

নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ড. ইউনূস বলেন, ‘তারা সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তারা উদ্যোক্তা। তারা যে কাজ চায়, তা উপভোগ করার কারণে নয়, বরং অন্য কিছু পাওয়া যায় না। কারণ আমাদের সব দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের চাকরির জন্য প্রস্তুত করে।’

তরুণরা সৃজনশীল সক্ষমতা ভুলে গেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘তারপরও সব মানুষই সৃজনশীল জীব হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। তারা স্বভাবজাত উদ্যোক্তা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র চাকরিপ্রার্থী তৈরি ও তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য।’

তিনি বলেন, আমাদেরকে ব্যবস্থাটি পুনরায় সাজাতে হবে। তিনি আশা করেন যে, তারা গ্লোবাল সাউথে একসঙ্গে এটি করতে পারে। এটি দারুণভাবে সৃজনশীল তরুণ জনগোষ্ঠী সমৃদ্ধ।

ইতিহাসকে উদ্বৃত করে তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশি ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছিল। এটি সারা বিশ্বে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য সংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রায় সাত দশক পরে আমাদের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় বিপ্লব গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মর্যাদা, সমতা এবং অংশীদারিত্বমূলক সমৃদ্ধির জন্য তাদের কণ্ঠস্বর উত্থাপন করতে গ্লোবাল সাউথ জুড়ে যুবকদের অনুপ্রাণিত করছে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমি সবচেয়ে বয়স্ক 'তরুণ' হিসেবে এই বিপ্লবে অংশ নিতে পেরে এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। তাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি।’

তিনি বলেন, 'আমাদের সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর নিশ্চিত করতে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এখন তাদের কাজ হচ্ছে নির্বাচনি ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, অর্থনীতি ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করা।’

তিনি বলেন, 'আমি আপনাদেরকে শিগগিরই ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। অন্যথায় আপনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস করতে পারেন। ঢাকার বেশিরভাগ অংশ বিশ্বের গ্রাফিতির রাজধানীতে পরিণত হয়েছে। ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী তরুণ শিক্ষার্থী এবং শিশুরা ৪০০ বছরের পুরনো এই শহরের দেয়ালে 'নতুন গণতান্ত্রিক' পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশের চিত্র দিয়ে রাঙিয়ে তুলছে।

এর আগে ড. ইউনূসকে সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এটাই ছিল অধ্যাপক ইউনূসের প্রথম বৈশ্বিক অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঞ্চালনায় রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান পর্যায়ের উদ্বোধনী অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।

‘ওই রাতে আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাই’

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। যদিও তার আগে জুলাইজুড়ে আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক ছাত্র ও সাধারণ মানুষ পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় অনেক তারকা, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সারও ছিলেন চাপের মুখে। তাদের মধ্যে অন্যতম সংগীতশিল্পী তাসরিফ খান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তাসরিফের গাওয়া ‘রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম’ শীর্ষক গানটি ভাইরাল হয়। তাছাড়া আন্দোলনের পক্ষেও নানা ধরনের পোস্ট দিয়েছিলেন এ শিল্পী। ছিলেন মাঠের আন্দোলনেও আর তার জন্য তাকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট দিয়ে তারই বর্ণনা দিয়েছেন এ গায়ক। ফেসবুক ভেরিফায়েড পেজে ‘কিছু নির্মম ইতিহাস টাইমলাইনে থাকুক’ শিরোনাম দিয়ে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা উল্লেখ করে তাসরিফ লিখেছেন, ২৩ জুলাই রাত ১টার কথা বলছি। একজন সিনিয়র ইনফ্লুয়েন্সার কল দিয়ে বললেন, তাসরিফ, তোর বাসার নিচে নাম, চা খাইতে আসতেছি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে।

৫ জুলাই থেকে ছাত্রদের পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট করা, কবিতা লিখতে থাকা এবং “রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম” গানটা ফেসবুকে চলতে থাকায় সরকারি গুন্ডা বাহিনীর থ্রেটে আমি তখন বাসার বাইরে অবস্থান করছিলাম। ওই সিনিয়র ইনফ্লুয়েন্সারের কথায় বিশ্বাস করে আমি তখন বাসার সামনে আসি। গাড়ি থেকে ৬-৭ জনের মতো নেমে আসে। ইনফ্লুয়েন্সার সাহেব আমাকে একটু সাইডে নিয়ে আস্তে করে বুঝিয়ে বলে, সঙ্গে যারা আছে তারা একটা এজেন্সির লোক এবং আইন প্রয়োগ সংস্থার বাহিনীর কয়েকজনও আছে এখানে। আমি তখন উনার কাছে জানতে চাই যে উনারা কেন এসেছেন এবং কি চাচ্ছেন মূলত। উনি তখন বলেন, সরকারি একটা কাজ আছে, এই সরকার আরও ৭-৮ বছর ক্ষমতায় থাকবে। আমরা ঠিকমত বাঁচতে চাইলে সরকারের পক্ষে কাজ করতে হইব, এর বাইরে কোনো রাস্তা নাই। এই কথা বলে উনি আবার আমাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়। সেই ৬-৭ জনের মধ্য থেকে একজন আমাকে বলেন, তাসরিফ, তোমাকে আমরা চিনি। আমরা তোমাকে একটা স্ক্রিপ্ট দিচ্ছি, ছোট্ট একটা ভিডিও করতে হবে। এই ভিডিওটা আমাদের কালকের মধ্যে লাগবে। পরশু সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এই ভিডিওটা দেখবেন এবং তারপর তুমি আপলোড করবা। সেই ইনফ্লুয়েন্সার তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাকে বলেন, দেখ তাসরিফ, পিএম’র চোখে পড়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ, ভিডিওটা ভালো করে কর, সরকার যতদিন আছে সুবিধা পাবি। কথা শেষ করার আগেই উনি পকেট থেকে এক লাখ টাকার তিনটি বান্ডেল, মোট তিন লাখ টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন এইটা সামান্য ছোট একটা গিফট। টাকা যত চাস, তত দেয়া হবে, ভিডিওটা সুন্দর কইরা কর।

ঠিক এই সময় আমার ফোনে আমার ব্যান্ডের ড্রামার শান্তর নম্বর থেকে একটা ফোন আসে। ফোন রিসিভ করতেই শান্ত আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বলে, তাসরিফ, পাঁচ-ছয় জন পুলিশ এবং সিভিল ড্রেসের কয়েকজন মিলে আমাকে রোল দিয়া সারা শরীরে মারছে। শান্তর কথা শুনে আমার হাত-পা একরকম কাঁপতে থাকে। আমি বোঝার চেষ্টা করি, এই মাইর খাওয়াটা কি আমাকে এদিকে রাজি করানোর জন্য, ভয় দেখানো? নাকি কেবলমাত্র একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? শান্তর লাইন কেটে যায়। আমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয় দেয়া তাদেরকে বলি, ভাই, এইমাত্র কয়েকজন মিলে আমার ভাই, আমার ব্যান্ডের ড্রামার শান্তকে প্রচুর মারছে। ওরা জাস্ট আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আরেহ, দেশের যে অবস্থা, এটা এখন কিছু করা যাবে না। ওরে বলো বাসায় চলে যাইতে। আমার তখন মাথায় আসে, এখন যদি আমি ওদেরকে টাকা ফেরাই দেই অথবা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাই, তবে তারা আমাকে চাইলেই গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে ভিডিও করে জোরপূর্বক আপলোড করাতে পারে। আমি তাই মাথা ঠান্ডা করে ওদেরকে বলি ঠিক আছে, আমি দেখতেছি কি করতে পারি, কালকের মধ্যে জানাচ্ছি। ওরা আমাকে তখনও একরকম থ্রেট দিয়ে বলে, ভাই জানাচ্ছির সুযোগ নাই। সিচুয়েশন তো বুঝেনই। ভিডিও কালকেই লাগবে। ওদের সঙ্গে কথা শেষ করে আমি বাসায় ফেরত যাই। তাসরিফ বলেন, বাসায় সবাইকে সব সিচুয়েশন জানিয়ে আমি আমার ম্যানেজার আয়মান সাবিতকে ফোন দিয়ে বলি, আয়মান, আমি বাসা ছেড়ে দিচ্ছি, এই এই ঘটনা ঘটছে। আমি তোকে নম্বর দিচ্ছি, তুই ওই এজেন্সিকে আমার বাসা থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে ওদেরকে দিয়ে দিবি কালকেই। আমি আপাতত বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কারণ আমি বাসায় থাকলে ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। সবশেষ তাসরিফ খান লিখেছেন, ওই রাতে আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাই। আমি জানি কয়েকটা পোস্ট, কবিতা লেখা আর “রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম”-এর মতো কিছু গান করা ছাড়া দেশের জন্য তেমন কিছুই করতে পারি নাই। তবে, আল্লাহ জানেন আর আমি জানি, আমি টাকার কাছে বিক্রি হই নাই, আর দেশের সঙ্গে বেঈমানি করি নাই।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান রিমান্ডে: নজরদারির হোতা গুম-খুনের বিস্তর অভিযোগ

গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিস্তর অভিযোগে অভিযুক্ত  সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত মহাপরিচালক। গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করে  বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নিউমার্কেট এলাকায় হকার শাহজাহান হত্যার ঘটনায় নিউমার্কেট থানার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তার ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই মামলায় এর আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে। তারা ১০ দিনের রিমান্ডে আছেন।

জিয়াউল আহসানের কর্মজীবন: প্রায় ১৫ বছর ধরে আলোচিত-সমালোচিত জিয়াউল আহসান ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। তিনি সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। এছাড়া দীর্ঘদিন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র‌্যাব) চাকরি করেছেন। ২০০৯ সালের ৫ই মার্চ তিনি উপ-অধিনায়ক হিসেবে র‌্যাবে যোগ দেন।

একই বছর ২৭শে আগস্ট লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হন। ২০১৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর থেকে তিনি র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকার সময় তাকে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সে (ডিজিএফআই) বদলি করা হয়। ২০১৬ সালের ২৮শে এপ্রিল তাকে সেখান থেকে এনএসআই’র পরিচালক হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালে এনটিএমসি’র পরিচালক হন। ২০২২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক আদেশে এনটিএমসি’র মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরদিন ৬ই আগস্ট জিয়াউল আহসানকে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

গুম-খুনের অভিযোগ: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অসংখ্য ব্যক্তিকে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। মূলত ব্যাপক পরিসরে গুমের ঘটনা শুরু হয় তার হাত ধরে। সেটি শুরু হয়েছিল ১/১১-এর পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী, বিরোধী ঘরানার রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সরকারবিরোধী সমালোচকসহ অসংখ্য ব্যক্তি গুমের শিকার হন। তখন দেশের গণমাধ্যমগুলোতে প্রায়ই বিভিন্ন ব্যক্তি গুম হয়েছেন বলে খবর ছাপা হতো। ভুক্তভোগীর পরিবারগুলো থানা থেকে শুরু করে ডিবি, র‌্যাব কার্যালয়ে ধরনা দিয়ে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ পেতো না। অভিযোগ রয়েছে এসবের নেপথ্যে ছিলেন জিয়াউল আহসান। সূত্রগুলো বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে যে কয়টি গুম খুনের ঘটনা ঘটেছে তার প্রত্যেকটির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী থেকে শুরু করে চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমন,  আদনান চৌধুরী, কাওসার আহমেদ, ইফতেখার আহমেদ দিনার, জুনায়েদসহ আরও অসংখ্য বিএনপিপন্থি ও সরকারবিরোধী আলোচনা-সমালোচনার সঙ্গে যুক্তদের গুম হতে হয়েছে। তাদের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি।  তবে বছরের পর বছর ধরে এত অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে ছিলেন জিয়াউল আহসান। আওয়ামী লীগ সরকারের আশির্বাদপুষ্ট হওয়াতে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পেতেন না। আওয়ামী লীগ সরকার যেমন তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে ঠিক তেমনি তিনিও দাপটের সঙ্গে চাকরি করছিলেন। তিনি এতটাই সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে সরকারের  পোস্ট দিয়েছেন। তিনি তার পোস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রেখে ঘরে ফেরার কথাও বলছিলেন। এরকম অনেক পোস্ট তিনি দিয়েছিলেন। যদিও সরকার পতনের পর সেগুলো তিনি ডিলিট করে দেন।

আয়না ঘরের জনক: কথিত আয়না ঘর (গোপন বন্দিশালা) তৈরি ভিন্ন মতালম্বীদের তুলে নিয়ে বছরের পর বছর আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকার নিয়ে যারাই নেতিবাচক সমালোচনা ও সরকারের জন্য যেসব ব্যক্তির মন্তব্য এবং কর্মকাণ্ড হুমকিস্বরূপ ছিল তাদের তুলে নিয়ে আয়না ঘরে বন্দি করে রাখা হতো। অমানবিক নির্যাতন করা হতো। বছর দুয়েক ধরে একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে আয়না ঘরের বিষয়টি জানাজানি হয়। সেখান থেকে মুক্ত হওয়া এক ব্যক্তি বিদেশি গণমাধ্যমে তার বর্ণনা তুলে ধরেন। এরপর থেকে দেশে নিখোঁজ ও গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নজর ওই আয়না ঘর বা গোপন বন্দিশালার দিকে যায়। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর অনেক স্বজনের আন্দোলনের মুখে তিনজন বন্দিকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতা মাইকেল চাকমা। তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৯ই এপ্রিল। ৭ই আগস্ট তিনি ছাড়া পান। এর আগে মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বরখাস্ত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। ২০১৬ সালের ৯ই আগস্ট আহমদ বিন কাসেমকে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে এবং এর কয়েক দিন পর ২৩শে আগস্ট আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে গুম করা হয়েছিল। আয়না ঘর থেকে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হলেও গুম হওয়া অন্যান্য ব্যক্তিদের পরিবার এখনো পথ চেয়ে বসে আছেন। কবে নিখোঁজ ও গুম হওয়া স্বজনরা ফিরে আসবেন। আবার অনেকেই ফেরার আশা ছেড়ে দিয়ে এখন বিচারের অপেক্ষায় আছেন। তারা ধরেই নিয়েছেন গুম হওয়া স্বজনরা আর বেঁচে নাই। তাদেরকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

নিজেই আয়না ঘরে ছিলেন: গতকাল জিয়াউল আহসানকে আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন করে পুলিশ। অন্যদিকে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত জিয়াউল আহসানকে ৮ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন। শুনানিতে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজমুন নাহার আদালতকে বলেন, আমার মক্কেল কখনো ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন না। তিনি ‘আয়নাঘর’ (গোপন বন্দিশালা) বানাননি। ফেসবুকে তাকে নিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করা হচ্ছে। গত ৭ই আগস্ট বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় জিয়াউল আহসান আদালতকে বলেন, আমাকে ৭ই আগস্ট বাসা থেকে নিয়ে গেছে। আমি ৮ দিন আয়নাঘরে ছিলাম। আমি কোনো আয়নাঘর বানাইনি। আমার হার্টের ৭০ ভাগ ব্লক্‌ড। আমাকে স্বেচ্ছায় অবসর দেয়া হয়েছে। আমি কখনো ধানমণ্ডিতে যাইনি। এনটিএমসি কেবল ডিজিটালি গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে। আমার নামে আগে কখনো মামলা হয়নি। শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ উল্লাহ খান আদালতকে বলেন, জিয়াউল আহসান গুম-খুনের নায়ক। তিনি ‘জেনোসাইড’-এর সঙ্গে যুক্ত। ‘আয়নাঘর’-এর জনকও তিনি। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার ক্রীড়নক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত। সদ্য সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ২০১২ সালের পর থেকে একযুগ ধরে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে অপহরণ ও গুমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কমিশন গঠন করে বিচারের দাবি: ২০০৯ সাল থেকে শত শত পরিবারের সদস্যরা বলপূর্বক গুমের শিকার হন। পরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এককাতারে এসে তাদের প্রিয়জনের ভাগ্যের পরিণতি জানার জন্য ‘মায়ের ডাক’ নামে প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। ‘মায়ের ডাক’ এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তারের পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দেশে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময় গুম হওয়াদের সন্ধান ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে আমরা তাকে (জিয়াউল আহসান) গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিলাম। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, বিচার-তদন্ত ছাড়া শত শত গুম-খুনে তার মতো জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার ও কমিশন গঠন করে বিচার করতে হবে। তবে শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতসহ প্রত্যেকটা গুম-খুনের গ্রহণযোগ্য তদন্ত করতে হবে। সানজিদা বলেন, গুমে জড়িত জিয়াউল আহসানসহ জড়িত সবার বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করা হবে। আমরা অনেকবার গুম হওয়াদের সন্ধানের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছি। দ্বিতীয়বার দেশ স্বাধীনের পর গত কয়েকদিনে মাত্র তিনজন গুম হওয়া মানুষ বের হয়ে এসেছেন। কিন্তু আমরা বাকি ভাইদের ফেরত পাইনি। আমরা জানতে চাই আমাদের ভাইদের কি হয়েছে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যারা উপদেষ্টা রয়েছেন তাদের কাছে দাবি, জিয়াউল আহসানের মতো যারা গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হোক। যারা আয়নাঘরের মতো বিভিন্ন জায়গায় এখনো বন্দি রয়েছেন তাদের মুক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। প্রত্যেকটা গুমের ঘটনাকে আলাদা করে বিচার করা হোক। তিনি বলেন, আমাদের দাবি, জাতিসংঘের অধীনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে মানবতাবিরোধী, বিচারহীনভাবে গুম-খুনে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হোক। এটা নিশ্চিত করা হোক, আর নতুন করে কেউ যেন গুম খুনের শিকার না হন। এমন দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হোক, যাতে নতুন করে কেউ যেন জিয়াউল আহসান হওয়ার সাহস না পায়।

ফোনে আড়ি পাততেন জিয়াউল: সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ২০২২ সাল থেকে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এনটিএমসির দায়িত্বে থাকাকালীন একের পর এক কল রেকর্ড ফাঁস করেন তিনি। রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য হুমকি এমন সব ব্যক্তির স্পর্শকাতর কল রেকর্ড তার নির্দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেয়া হতো। তিনি এমটিএমসি’র দায়িত্বে থাকাকালীন সরকারের এই সংস্থাটির আড়িপাতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। এই সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তার নির্দেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মোবাইল ফোনে আড়িপাতা হতো। এরপর ওইসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কল রেকর্ড সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হতো। এসব কল রেকর্ডের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে অনেক সুশীল সমাজের লোকজনকে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হতো। গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, এনটিএমসি মোবাইল ফোনের ভয়েস ও এসএমএস, ল্যান্ডফোন ভয়েস এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আড়ি পাততে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে ফেসবুক, টুইটার, টেলিগ্রাম, ভাইবার, ইমো, স্কাইপি অ্যাপেও আড়ি পাততে পারে এনটিএমসি। অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে ওয়েবসাইট ব্লগ, ই-মেইলেও শতভাগ আড়িপাতার সক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির।  এসব সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দিনের পর দিন অন্যায়ভাবে মানুষের কল রেকর্ড ফাঁস করা হয়েছে।

আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধের অভিযোগ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যতবার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল সেটিও জিয়াউল আহসানের নির্দেশে হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। ১৭ই জুলাই থেকে ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনাগুলো মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সংস্থা এনটিএমসি থেকেই আসতে থাকে। তার নির্দেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলার সময় গত ১৭ই জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ও ১৮ই জুলাই রাত ৯টার দিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। টানা পাঁচদিন সব ধরনের ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ ছিল ১০ দিন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের মতো সেবা বন্ধ ছিল ১৩ দিন।

যে মামলায় গ্রেপ্তার হলেন জিয়াউল: গত ১৬ই জুলাই কোটা বিরোধী আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় পাপোশের দোকানের কর্মচারী শাহজাহান আলীকে হত্যার অভিযোগে তার মা আয়শা বেগম (৪৫) একটি মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামাদের। এ মামলার অভিযোগে আয়শা বেগম বলেন, আমার ছেলে শাহজাহান আলী নিউমার্কেট থানার মিরপুর রোডের বলাকা সিনেমা হলের গলির মুখে পাপোশের দোকানে কাজ করতো। প্রতিদিনের মতো ১৬ই জুলাই সকাল ৯টার দিকে দোকানে কাজ করার জন্য যায়। ওইদিন সন্ধ্যায় অজ্ঞাত পরিচয় একজন ব্যক্তি ছেলের মোবাইল ফোন নম্বর থেকে আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করে জানায়, শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ধানমণ্ডি পপুলার হাসপাতালে ভর্তি। আমি সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক পপুলার হাসপাতালে যাই এবং জানতে পারি, আমার ছেলেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমি তাৎক্ষণিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই এবং মর্গে গিয়ে ছেলের মরদেহ শনাক্ত করি। তখন বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে জানতে পারি, গত ১৬ই জুলাই আমার ছেলে অজ্ঞাত পরিচয় কোটা বিরোধীদের কর্তৃক গুরুতর রক্তাক্ত জখমপ্রাপ্ত হয়ে নিউমার্কেট থানাধীন মিরপুর রোডের টিটি কলেজের বিপরীত পাশে কাদের আর্কেড মার্কেটের সামনে পাকা রাস্তার ওপর পড়ে ছিল। মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, অজ্ঞাত পরিচয় আসামিরা আমার ছেলের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করে; ফলে আমার ছেলে রক্তাক্ত জখমপ্রাপ্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। উপস্থিত পথচারীরা তাকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত ধানমণ্ডির পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ছেলের অবস্থা খারাপ দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার ছেলেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গত ১৬ই জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৫ মিনিটের দিকে মৃত ঘোষণা করেন।

নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা তরুণদের: রয়টার্সের প্রতিবেদন

 সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে  ক্ষমতাচ্যুত করার পর শিক্ষার্থীরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা বিবেচনা করছে। এক্ষেত্রে তারা বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের দ্রুত নির্বাচনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান চার সমন্বয়কের সঙ্গে কথা বলে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, গত ১৫ বছরে দেশে যেই কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল তা যেন পুনরায় ফিরে না আসে সেই লক্ষ্যে তারা সোচ্চার ভূমিকা পালনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেছেন, হাসিনা ১৭ কোটি জনতার ওপর কঠোর নীতি অবলম্বন করে দেশ শাসন করেছেন।

জুন মাসে কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু করে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যা জুলাই থেকে জোরালো হয়। কোটার নামে হাসিনা সরকার তার নিজ দলের লোকজনের জন্য সরকারি চাকরিতে সুযোগ তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ সমন্বয়কদের। এর মাধ্যমে সমাজে চরম বৈষম্য বেড়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। মূলত এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সড়কে আন্দোলনে নামেন দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পরে এই আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।

আন্দোলন দমনে হাসিনা কঠোর নীতি অবলম্বন করেন। হাসিনার এই কঠিন নীতিই তার জন্য বুমেরাং হয়েছে। ছাত্রদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দমন-পীড়নের ফলে  দেশের মানুষের যে ক্ষোভ তৈরি হয় তাতে একপ্রকার ভেসে গেছে হাসিনার মসনদ। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে একক বৃহত্তম সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে হাসিনা যেখানে তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন মূলত তরুণদের প্রতিনিধিত্ব প্রমাণ করেছে। আন্দোলনটিকে ‘জেনারেল জেড’ (জেন জেড) বিপ্লব নামে অনেকেই প্রশংসা করেছে। হাসিনা তার আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বললেও কার্যত দেশে বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছিল। যার ফলে ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে শরিক হয়েছে বলে সমন্বয়কেরা জানিয়েছেন।
জনরোষে দেশ থেকে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছে শান্তিতে নোবেল পাওয়া বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। অন্তর্বর্তী সরকারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়কও রয়েছেন। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশকে শাসন করেছে হাসিনার আওয়ামী লীগ বা তার শক্ত প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এদের দুজনের বয়সই ৭০-এর উপরে। ছাত্রনেতারা এই পুরাতন প্রথার অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে আলোচনা করছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান মাহফুজ আলম বলেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে জাতির সামনে একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এক্ষেত্রে সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাবির ওই তরুণ ছাত্রনেতা। সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যতের জন্য ছাত্রদের পরিকল্পনার বিশদ বিবরণ আগে জানানো হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সামনে থেকে রয়টার্সকে ওই তরুণ জানিয়েছেন, দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষ সত্যিই খুব ক্লান্ত। তরুণদের ওপর জনগণের আস্থা রয়েছে।

এই আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক তাহমিদ চৌধুরী বলেছেন, তাদের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা এখনো দলের কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন। এই রাজনৈতিক দল ধর্মনিরপেক্ষ এবং দেশের জনগণের বাকস্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হবে বলে জানিয়েছে ওই তরুণ। পুনরায় যেন দেশে আবার স্বৈরশাসনের আগমন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই দল গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ছাত্রনেতারা।

‘বাইরের রাষ্ট্রের মদতে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে’

১৫ই আগস্ট ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে কান ধরে ওঠবস করানো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন সমন্বয়ক সারজিস আলম। শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে সমসাময়িক ইস্যুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ দাবি করেন। সারজিস বলেন, ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ পুলিশের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময় কান ধরে ওঠবস করানোর সংস্কৃতি শুরু করেছিল। তবে গতকাল ১৫ই আগস্ট কান ধরে ওঠবস করানো ও মোবাইল চেক করাসহ ঘটে যাওয়া কিছু কাজ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ১৫ই আগস্ট ধানমণ্ডিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ যদি ১৫ই আগস্ট ধানমণ্ডিতে ফুল দিতে চায় তাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাধা দিতে পারে না। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর গাড়িতে হামলার অধিকার কারও নেই। তাই এসবের সঙ্গে সমন্বয়ক বা অন্য কেউ জড়িত থাকলে বহিষ্কার এবং ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাইরের রাষ্ট্রের মদদে প্রতিবিপ্লবের নামে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন সারজিস আলম।

তিনি মনে করেন, ১৫ই আগস্ট ঘিরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ছদ্মবেশে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রীয় আয়োজনে শোক দিবস পালনের পক্ষে না। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে শোক প্রকাশ করতে চাইলে তাকে সম্মান জানাতে হবে। রাজনীতিতে আসা নিয়ে জানতে চাইলে সারজিস বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফরম কতোদিন থাকবে অথবা নতুন দল করা হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী শিক্ষার্থীদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। তিনি বলেন, দেশকে স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে আনতে হলে যার যে জায়গায় দায়িত্ব তার সেখানে ফিরে যাওয়া উচিত। ধীরে ধীরে পুলিশ তাদের দায়িত্বে ফিরে আসছে।

ছাত্রসমাজের প্রতি আমাদের সরাসরি আহ্বান যেখানে যখন পুলিশের একটি টিম বা ট্রাফিকের একটি টিম আসবে তাদেরকে তাদের দায়িত্বটি বুঝিয়ে দিয়ে ছাত্রসমাজকে সেখান থেকে সরে যেতে হবে। আপনারা যে দায়িত্বটি পালন করেছেন সেটার জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু এটি আপনাদের দায়িত্ব না। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, আওয়ামী লীগ অফিস, স্থাপনা ও ভাস্কর্য ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের খবর আসে। পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে থানা ও ঢাকার সড়ক। এমন পরিস্থিতিতে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করে আসছে শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে পুলিশ কর্মস্থলে ফিরে আসলেও শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যাচ্ছে এখনো। সার্জিস আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের অনুরোধ, আর রাস্তায় নামার প্রয়োজন নেই। আমরা পুলিশের জায়গা থেকে, বিভিন্ন জায়গা থেকে এ কথাগুলো শুনছি পুলিশের কিছু সদস্য হয়তো তাদের জায়গা থেকে আনকমফোর্টেবল সিচ্যুয়েশনে রয়েছে। তারা যদি তাদের জায়গাটিতে আসে, স্টুডেন্টরা জানি না কি করে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: জাতিসংঘের প্রাথমিক রিপোর্ট বাংলাদেশে সংঘাতে নিহত ৬৫০

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যে সহিংসতা হয় তাতে ছয় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘ। আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলেও অভিযোগ করেছে সংস্থাটি। ১৬ই আগস্ট জেনেভা থেকে প্রকাশিত জাতিসংঘের ১০ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি ছাত্রদের আন্দোলনকে ঘিরে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে গোটা জুলাই মাস উত্তপ্ত পরিস্থিতি পার করেছে। এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল জুনের মাঝামাঝি সময়। আন্দোলন দমন করতে বিচার-বহির্ভূত হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সহ শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।

জাতিসংঘের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ই জুলাই থেকে ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে নিহত হয়েছেন  মোট ৪০০ মানুষ। আর ৫ থেকে ৬ই আগস্ট প্রাণ হারিয়েছে ২৫০ জন। অর্থাৎ জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী আন্দোলনে ১৬ই জুলাই থেকে ৬ই আগস্ট পর্যন্ত মোট নিহত হয়েছেন ৬৫০ জন। নিহতদের মধ্যে ৩২ জন শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাংবাদিক, পুলিশ, পথচারীর মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

জাতিসংঘ আরও বলেছে, সদ্য ক্ষমতা হারানো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের দমন করার চেষ্টা করে গেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, সরকার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নির্বিচারে বল প্রয়োগে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড এবং প্রাণঘাতী গোলাবারুদসহ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। গত ১৬ই জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নামের এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সারা দেশের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংসতা পায় বলেও উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। সেদিন সারা দেশে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের গুলিতে ছয়জন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান।

ইউনূস-মোদি ফোনালাপ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, নরেন্দ্র মোদি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা মোদিকে ধন্যবাদ জানান। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতীয় নেতা এবং জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইউনূস।

   

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নতুন সরকারের প্রতি শুভকামনা ব্যক্ত করেন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করার কথা জানান। তিনি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন। ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল জয়ী ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে মোদি বলেছেন, তিনি তাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। মোদি বলেছেন, অধ্যাপক ইউনূসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। ইউনূস মোদিকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবেদন অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। ইউনূস ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মীদের বাংলাদেশে এসে সংখ্যালঘু ইস্যুতে প্রতিবেদন তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।

মোদি অধ্যাপক ইউনূসকে ১৭ই আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয় ভয়েস অব গ্লোবাল সাউথ সামিটে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ইউনূস ওই সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন বলে তার প্রেস উইং জানিয়েছে। ছাত্র আন্দোলনকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিপ্লব উল্লেখ করে ইউনূস মোদিকে বলেছেন, ছাত্র আন্দোলনের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন তিনি। ছাত্র ও জনতার গণতান্ত্রিক ইচ্ছা পূরণই এই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। ইউনূস আরও বলেন, তার সরকার সকল রাষ্ট্রযন্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করতে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের টেলিফোন কল রিসিভ করেছি। বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। তিনি (ইউনূস) বাংলাদেশের হিন্দু ও সকল সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন।

বাবা মুক্তিযোদ্ধা না হলেও ডিবি হারুনের চাকরি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় by আশরাফুল ইসলাম

ডিএমপি’র সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ভাগিয়ে নেন তিনি। ভুয়া এই সনদ ব্যবহার করে হারুন ২০তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি নেন। কেবল হারুন নয় তার অপর ছোট তিন ভাইও মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়েছেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যে ও তৃতীয় জিল্লুর রহমান পুলিশে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন। এ ছাড়া সবার ছোট এবিএম শাহরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। বর্তমানে জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যের এসআই ও জিল্লুর রহমান পুলিশের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ডা. এবিএম শাহরিয়ার বড় ভাই হারুনের প্রতিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরে হারুনের টাকায় একটি হাসপাতালের অংশীদার হিসেবে সেটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদের প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় জায়গা পান হারুনের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ফজলুল হক চাপে পড়ে আবুল হাশেম হাসিদকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন দেন। তখন তৎকালীন মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড থেকে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জামুকাতে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিবাদ ও অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি।

মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার কোরবান আলী বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ ঘাগড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পক্ষে বা বিপক্ষে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি। সে সময় গ্রামের খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন আবুল হাশেম হাসিদ। তার গোষ্ঠীর লোকজন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় ভূমিকা রেখেছিলেন। এগুলো এলাকার সবাই জানে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার থাকার সময়ে আবুল হাশেম হাসিদকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। ঘাগড়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ফজলুল হক চাপে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবুল হাশেম হাসিদকে প্রত্যয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। তৎকালীন মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এডভোকেট রফিকুল আলম রতন এবং আমি জামুকাতে লিখিতভাবে অভিযোগও করেছিলাম। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবের কারণে আমাদের সেই অভিযোগের ফাইলই খুঁজে পাইনি। তবে আমরা যেটি সত্য, সেটি সব সময় বলে এসেছি। আবুল হাশেম হাসিদ মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় যখন দাফন করা হয়, তখন আমরা অনেকেই সে সময় যাইনি। অনেকে আবার চাপে পড়ে গিয়েছেন। জানা গেছে, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকার সময় হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ ২০১৬ সালের ৭ই এপ্রিল মারা যান। পরদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন কিশোরগঞ্জের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলে থাকতেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের স্নেহভাজন হওয়ার কারণে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০০ সালে হারুন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি নেন। তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের সুপারিশে তিনি ভাইভাতে শতভাগ নাম্বার পান। এ নিয়ে সে সময় পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়।


‘শেখ হাসিনা দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন’

ভারতে বসে শেখ হাসিনা দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় বিএনপি’র উদ্যোগে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে এক দোয়া মাহফিলপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি এ অভিযোগ করেন। এই মিলাদ মাহফিলে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি ও আশু সুস্থতা কামনা এবং চলমান আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়াও অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং দোয়া পরিচালনা করেন মাওলানা শাহ মোহাম্মদ নেসারুল হক। বিকালে চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা ছাড়াও সারা দেশে গতকাল মহানগর-জেলা-উপজেলায় এই দোয়া মাহফিল হয়।  
ওদিকে বিকালে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিএনপি মহাসচিব। এরমধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্তের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এই সভায় অংশ নেন।

দোয়া মাহফিলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা দীর্ঘ লড়াই করেছি, তারপরে যদি মনে করেন যে, আমাদের লড়াই শেষ হয়ে গেছে তাহলে ভুল করবেন। এখন অত্যন্ত একটা ভাসমান অবস্থায় আছে। যেকোনো মুহূর্তে ভারতে বসে আছেন শেখ হাসিনা, তিনি তার সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। ইতিমধ্যে চক্রান্ত শুরু করেছেন, সেই চক্রান্ত প্রতিরোধ করাই আমাদের কাজ।

তিনি বলেন, আজকে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনে আসুন আমরা সবাই সেই প্রতিজ্ঞাই আল্লাহ‘তালার কাছে করি, তিনি যেন আমাদের বিএনপি’র যে ভাবমূর্তি যেটা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তৈরি করেছেন, বেগম খালেদা জিয়া তৈরি করেছেন, তারেক রহমান সাহেব তৈরি করেছেন- সেই ভাবমূর্তিকে সবাই অক্ষুণ্ন্ন রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।

মির্জা ফখরুল বলেন, এই যে সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার এসব কথা বলছেন না, এটা একটা চক্রান্ত। এই কথা বলে ধুয়া তুলে তারা (আওয়ামী লীগ) আরেকটা ঝগড়া করতে চায়। আপনাদের দায়িত্ব নিজ নিজ এলাকায় প্রত্যেক এলাকায় নিজরা নিয়ে শান্তি বিগ্রেড তৈরি করেন, শান্তি বিগ্রেড তৈরি করে পাহারা দেবেন। সমস্ত সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়, মন্দির, গীর্জা- এ সমস্ত পাহারা দেবেন, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, তাদের জান-মালের দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের।

তিনি বলেন, আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়াতে, পত্র-পত্রিকায় যে বিরূপ খবর দেখি-তখন কিন্তু আমরা আতঙ্কিত হই। আবার কোনো নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হচ্ছে যে, জনগণের ভোটকে এবং জনগণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবার জন্য আবার কোনো নব্য ফ্যাসিবাদ এসে উপস্থিত হচ্ছে কিনা। এদিক থেকে সজাগ থাকতে হবে। অর্থাৎ ঐক্য, ঐক্য, ঐক্য এবং ধৈর্যশীল অবস্থা, সহনশীল অবস্থা, ডিসিপ্লিনের মধ্যে আমাদেরকে চলতে হবে। এই কথা বলছি এজন্য যে, আজকে ম্যাডামের জন্মদিনের অনুষ্ঠান না? ক’জন এসেছেন? বৃহস্পতিবার আপনাদের প্রোগ্রাম ছিল না? ক’জন এসেছিলেন। সেভাবে আসে নাই, অনেক কম, আজকেও কম। কি জন্য? জয় হয়ে গেছে? না এই যুদ্ধকে জারি রাখতে হবে, এই সংগ্রামকে চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে আমরা কিন্তু অনেক বিপদে পড়ে যাবো। এক ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছি আমরা। নব্য ফ্যাসিবাদ যেন না আসতে পারে তার জন্য আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সরকার একেবারে নরম সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এটা মনে রাখতে হবে। তার দায়িত্ব একটা নির্বাচন করে দিয়ে যাবে তাই না। জঞ্জাল জমা হয়েছে তো। এই জঞ্জাল তো সাফ করতে হবে। এজন্য তাদেরকে কিছু সময় তো দিতে হবে। সেইভাবে কাজ করে আমাদের সংগ্রামকে জারি রাখতে হবে। ম্যাডামের যে আদর্শ তাকে অনুসরণ করতে হবে, ম্যাডামের যে বক্তব্য তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। কোনো প্রতিহিংসা নয়, কোনো প্রতিশোধ নয়।

১০ বছর পর বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে কাশ্মীরে

জম্মু- কাশ্মীর বিধানসভা নির্বাচনের জন্য  নিঘণ্ট প্রকাশ করলো ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ২০১৪ সালের পরে ২০২৪। ঠিক এক দশক পরে বিধানসভা ভোট হতে চলেছে জম্মু ও কাশ্মীরে।  মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার আজ ঘোষণা করলেন, এবার কাশ্মীরে ভোট হবে ৩ দফায়। ভোটগ্রহণ ১৮ সেপ্টেম্বর, ২৫ সেপ্টেম্বর এবং ১ অক্টোবর। ১৯ আগস্ট শেষ হচ্ছে অমরনাথ যাত্রা। ২০ তারিখেই ঘোষিত হবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। ভোটের ফল ঘোষণা হবে ৪ অক্টোবর। পুনর্বিন্যাসের পরে মোট ৯০টি বিধানসভা কেন্দ্র আছে। তফসিলি উপজাতিভুক্ত কেন্দ্রের সংখ্যা নয়।

আর তফসিলি জাতিভুক্ত কেন্দ্রের সংখ্যা সাত। মোট ভোটারের সংখ্যা হল ৮৭.০৯ লাখ। পুরুষ এবং মহিলা ভোটারের সংখ্যা মোটামুটি সমান। প্রথমবারের ভোটদাতা হলেন ৩.৭১ লাখ। আর যুব সম্প্রদায়ের ভোটার ২০ লাখের মতো নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। এক দশকের ব্যবধানে  পূর্ণ রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে কাশ্মীর। নরেন্দ্র মোদি  সরকার ২০১৯ সালের ৫ অগস্ট কেন্দ্র সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা লোপ করেছিল। সাবেক জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে ভাগ করা হয়েছিল।  তিন বছর আগেই অবশ্য রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বিধানসভা। ২০১৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে শেষ বার বিধানসভা ভোট হয়েছিল অবিভক্ত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে। এ বার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরে বিধানসভা ভোট করানোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র এবং কমিশনকে। জম্মু-কাশ্মীরে মোট আসন সংখ্যা ১১৪টি হলেও ভোট গ্রহণ করা হবে ৯০টিতে। বাকি ২৪টি আসন রয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে।  লোকসভা ভোটে জম্মু উপত্যকার জম্মু ও উধমপুরে বিজেপি জিতেছে। শ্রীনগর এবং বারামুলায় কংগ্রেসের সহযোগী ন্যাশনাল কনফারেন্স। অনন্তনাগ-রাজৌরি কেন্দ্রে নির্দল প্রার্থী।

সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস

কোটা আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সুমনকে বাঁচাতে পরিবারের আকুতি

গত ২০শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় সুমন রহমান অনিক (২১) নামে এক শিক্ষার্থী। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিইউতে চিৎিসাধীন রয়েছেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনবার অস্ত্রোপচার হলেও এখনো তিনি আশঙ্কামুক্ত নন বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসক। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে তার পরিবার। তাকে বাঁচাতে সাহায্যের জন্য আকুতি জানিয়েছেন পরিবারের লোকজন। আহত সুমন নরসিংদীর মাধবদী পৌর শহরের সিদ্দিকনগর মহল্লার মৃত হাসেন আলীর ছেলে।

সুমনের বড়ভাই জুলহাস জানান, ৬ ভাই, ৩ বোনের সংসারে সুমন সবার ছোট। সে স্থানীয় জালপট্টি জামেয়া-ই-এমদাদিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা। পরিবারের হাল ধরতে পড়াশোনার পাশপাশি ভাইদের সঙ্গে সে স্থানীয় বাজারে কাঁচা তরকারি বিক্রি করতো। গত ২০শে জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে সরকারের জারিকৃত কারফিউয়ের প্রথমদিনে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মাধবদী পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়। একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করলে  সে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

গুলিটি তার পেটে ঢুকে পাকস্থলী ছিদ্র হয়ে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় ও পরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ পর্যন্ত তিনবার তার পেটে অস্ত্রোপচার হয়েছে। সম্প্রতি তার পেটে ইনফেকশন হয়ে যাওয়ায় আবারো অস্ত্রোপচার করতে হবে বলে জানিয়েছেন তার চিচিৎসক। পাশাপাশি উন্নত চিচিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সুমনের মা আমিরুন বেগম জানান, ছেলেদের কাঁচা তরকারি বিক্রির স্বল্প আয়ে চলে তাদের সংসার। অভাবের তাড়নায় অল্পবয়সে পড়াশোনার পাশাপাশি সুমনকেও কাজে লাগাতে হয়েছে ছেলেদের সঙ্গে। সেই ছেলেটি আজ ২৭ দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছে। তার চিকিৎসায় অপারেশনসহ হাসপাতাল খরচ সরকারিভাবে বহন করলেও প্রতিদিন বেশ টাকার ওষুধের যোগান দিতে হচ্ছে নিজেদের। এতে হিমশিম  খেতে হচ্ছে তার পরিবারের। তার উপর দেশের বাইরে নিয়ে  ছেলের চিকিৎসা করানো দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ অবস্থায় ছেলেকে বাঁচাতে তিনি বিত্তবানদেরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়ানোর আকুতি জানিয়েছেন।