Tuesday, November 26, 2024

উত্তর প্রদেশের সম্ভলে কেন রক্তক্ষয়ী সংঘাত

মিষ্টির দোকানি ৩৫ বছর বয়সের নাঈম আহমদ গত রোববার সকালে ভোজ্যতেল কিনতে বের হয়েছিলেন। তাঁর বাড়ি থেকে বের হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ছোট ভাই তাসলিমের মুঠোফোনে একটি কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন নাঈম।

তাসলিম বলেন, ‘আমি কখনো ওই ফোনের কথা ভুলতে পারব না। পুলিশ দিনদুপুরে আমার ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।’

গত রোববার সকালে ভারতের উত্তর প্রদেশের শহর সম্ভলে রক্তক্ষয়ী এক সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল।

মোগল সম্রাট বাবরের আমলে নির্মিত শাহি জামা মসজিদ ঘিরে ওই সংঘাত হয়েছে। একটি পিটিশনের ভিত্তিতে সম্প্রতি স্থানীয় একটি আদালত ১৫২৯ সালে তৈরি ওই মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ অনুসারে সরকারি কর্মকর্তারা গত রোববার সকালে শাহি জামা মসজিদে সমীক্ষা করতে এসেছিলেন। স্থানীয় লোকজন এ কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘাত শুরু হয়।

সংঘাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহতদের পরিবার এবং অন্য বিক্ষোভকারীদের দাবি, পুলিশের গুলিতেই তাঁরা সবাই নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘দুর্বৃত্তরা’ গুলি ছুড়েছে। কোথা থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, সেটা তাঁরা ‘তদন্ত’ করে দেখছেন।

গত রোববারের ওই ভয়াবহ সংঘাতের পর জেলা কর্তৃপক্ষ শহরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সব স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং বাইরে থেকে কাউকে শহরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। নির্দেশ না থাকলেও আতঙ্কে স্থানীয় লোকজন দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন। পুলিশ ধরপাকড় চালাচ্ছে। সেখানে কারফিউর মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।

ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশে রক্তক্ষয়ী এই বিক্ষোভের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে আল–জাজিরা।
কেন সম্ভলে বিক্ষোভ?

তিন বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নানা দল এবং তাদের কর্মীরা আদালতে একের পর এক পিটিশন করে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, ভারতে হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস করে মুসলিমদের মসজিদসহ নানা ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ে তোলা হয়েছে।

গত ১৯ নভেম্বর সম্ভলের স্থানীয় একটি আদালত এমন একটি পিটিশনের শুনানি করেন। পিটিশনে দাবি করা হয়, একটি হরিহর মন্দির ভেঙে সেই স্থানে ১৫২৯ সালে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁরা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) ওই স্থান ‘ব্যবস্থাপনা করার’ এবং ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার’ নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করেন।

আদালত সেদিনই মসজিদ প্রাঙ্গণে সমীক্ষার নির্দেশ দেন। সমীক্ষা দল ১৯ নভেম্বর সমীক্ষার জন্য যায়, কিন্তু সেদিন কাজ শেষ করতে পারেনি। গত রোববার সকালে দলটি তাদের বাকি কাজ শেষ করতে আবার মসজিদ প্রাঙ্গণে যায়।

কিন্তু সেদিনের সমীক্ষা নিয়ে ‘শহরে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে পড়ে’ বলে জানান সমীক্ষা দলের উপদেষ্টা মাসুদ আলী ফারুকী।

মাসুদ বলেন, ‘সমীক্ষা দল মসজিদের ভেতরে খোঁড়াখুঁড়ি করবে, এমন গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর মানুষ মসজিদের চারপাশে জড়ো হন।’

সেখানে সমীক্ষা দল প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপনের মতো কিছু খুঁজে পায়নি বলেও জানান মাসুদ।

কিন্তু সমীক্ষা দলের সঙ্গে থাকা হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর কয়েকজন সদস্য তাদের পক্ষে স্লোগান দিতে শুরু করেন। মাসুদ আলী বলেন, ‘তাদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।’

শাহি জামা মসজিদ ‘সুরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ’। ফলে এ মসজিদের আইনি সুরক্ষা আছে। তারও আগে ভারত সরকার এই মসজিদকে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ’ বলে ঘোষণা করেছে।
শাহি জামা মসজিদে সমীক্ষা কি বৈধ?

১৯৯১ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে ‘দ্য প্লেস অব অরশিপ অ্যাক্ট’ (প্রার্থনার স্থান আইন) পাস হয়। প্রাথমিকভাবে ওই আইনে বলা হয়েছিল, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতে ধর্মীয় উপাসনার স্থানগুলো যেমন ছিল, সেগুলো তেমনই থাকবে। স্বাধীন ভারতে সেগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না।

সে সময় ভারতীয় জনতা দল (বিজেপি) উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তাদের দাবি ছিল, মোগল আমলে একটি মন্দির ভেঙে সেই জায়গায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বিজেপির ওই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন।

ওই বিক্ষোভের জেরেই ‘দ্য প্লেস অব অরশিপ অ্যাক্ট’ পাস হয়। কিন্তু ওই আইন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভাঙা আটকাতে পারেনি।

সম্ভলের মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরও তাঁদের মসজিদ ভেঙে ফেলা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন নাদিম খান। তিনি অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) জাতীয় সম্পাদক। সম্ভলে ঠিক কী ঘটেছে, তা অনুসন্ধান করছে সংগঠনটি।

নাদিম বলেন, ‘সমীক্ষার পর তাদেরকে মসজিদ হারাতে হবে। সেখানকার মুসলিমদের মধ্যে এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল।’

এদিকে সম্ভলে নিজেদের ছোট্ট বাড়িতে বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে শোক পালন করছেন তাসলিম। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই বিক্ষোভ করতে যাননি। তিনি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ছিলেন না। তারপরও পুলিশ তাঁকে হত্যা করেছে। এখন আমরা কার কাছে বিচার চাইব?’

উত্তর প্রদেশের সম্ভলে গত রোববার সংঘাতের পর শাহি জামা মসজিদের সামনে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২৫ নভেম্বর, ২০২৪
উত্তর প্রদেশের সম্ভলে গত রোববার সংঘাতের পর শাহি জামা মসজিদের সামনে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২৫ নভেম্বর, ২০২৪ ছবি: এএফপি

মৃত্যুর পর ১৫ হাজার কোটি ডলারের সম্পদের কী হবে, জানিয়েছেন ওয়ারেন বাফেট

মৃত্যুর পর তাঁর বিপুল সম্পদের কী হবে, তা নিয়ে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ওয়ারেন বাফেট। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছেন যে তিনি অর্থ দান অব্যাহত রাখবেন। ১৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদের মালিক বাফেট ফোর্বসের ধনীর তালিকায় এখন ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছেন।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়ারেন বাফেট গতকাল সোমবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে একটি চিঠি লিখেছেন। মৃত্যু নিয়ে তাঁর ভাবনা, তাঁর একসময়ের প্রত্যাশা যে প্রয়াত প্রথম স্ত্রী তাঁর চেয়েও বেশি দিন বাঁচবেন এবং কীভাবে তাঁর বিপুল সম্পদের ভাগ–বাঁটোয়ারা করা হবে, চিঠিতে তিনি এসব সম্পর্কে লিখেছেন।

সিএনএন জানিয়েছে, বাফেটের বয়স এখন ৯৪। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘দিন শেষ সময় জয়ী হয়। কিন্তু সময় চঞ্চলও হতে পারে। কখনো কখনো তা অন্যায্য ও নিষ্ঠুর। জীবনকে কখনো কখনো জন্মেই শেষ করে দেয় কিংবা কিছুদিন পরই। আবার কখনো কখনো শত বছর বা তার চেয়েও বেশি দিন অপেক্ষা করে। আজ পর্যন্ত আমি ভাগ্যবান। কিন্তু বেশি দিন নেই, সে চলে আসবে।’

প্রায় ১৩০০ শব্দের চিঠিতে ওয়ারেন বাফেট লিখেছেন যে তিনি আশা করছেন, তাঁর তিন সন্তান লম্বা সময় ধরে বেঁচে থাকবেন এবং সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁদের পিতার সম্পদ আর কোন কোন মানবহিতৈষী কাজে ব্যবহার করা যায়। তাঁর তিন সন্তান হলেন সুজি, হাওয়ার্ড ও পিটার—এরই মধ্যে ষাটের কোটা ছাড়িয়েছেন। কারও কারও বয়স ৭০ ছাড়িয়ে গেছে।

ওয়ারেন বাফেটের যখন মৃত্যু ঘটবে, তখন তাঁর তিন সন্তান সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে তাঁদের পিতার সম্পদ দান করা হবে। কিন্তু তাঁর সন্তানেরা যদি সম্পদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে কী হবে, সে সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছেন ওয়ারেন বাফেট। সেক্ষেত্রে তিনটি ট্রাস্টি তাঁর সম্পদের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হবে। তবে এগুলোর নাম তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেননি।

ওয়ারেন বাফেট লিখেছেন, ‘২০০৬ সালে সম্পদ দান করার অঙ্গীকার করার পর আমার সন্তানদের প্রত্যাশিত জীবনকাল আরও হ্রাস পেয়েছে। আমি কখনোই একটি বংশধারা তৈরি করতে চাইনি কিংবা এমন কোনো পরিকল্পনা করিনি, যা আমার সন্তানদের জীবনকালকে অতিক্রম করে যাবে।’

চিঠিতে মার্কিন এই ধনী ঘোষণা করেছেন যে তিনি তাঁর কোম্পানির ১ হাজার ৬০০ ‘ক্লাস এ’ শেয়ার ২৪ লাখ ‘ক্লাস বি’ শেয়ারে রূপান্তরিত করছেন। পরিবর্তিত এই শেয়ারের বিপরীতে ভোট কম দেওয়ার অধিকার থাকবে।

রূপান্তরিত এসব শেয়ারের মধ্যে ১৫ লাখ শেয়ার সুজান টমসন বাফেট ফাউন্ডেশনে যাবে। প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছে বাফেটের প্রয়াত প্রথম স্ত্রীর নামে। এ ছাড়া তিন লাখ শেয়ার দেওয়া হবে তিনটি অন্য ফাউন্ডেশনে। এই ফাউন্ডেশনগুলোর নেতৃত্বে আছেন বাফেটের সন্তানেরা। এসব শেয়ারের মোট মূল্য ১২০ কোটি ডলার।

ওয়ারেন বাফেট প্রতিবছর তাঁর চারটি পারিবারিক ফাউন্ডেশনে দান করে থাকেন। এর পাশাপাশি তাঁর অর্থ যায় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনে। ২০০৬ সালে তিনি অঙ্গীকার করেন যে ধীরে ধীরে তিনি তাঁর সম্পদ দান করে দেবেন। ব্লুমবার্গের হিসাবে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ অন্তত ১৫ হাজার কোটি ডলার।

এই আইকনিক বিনিয়োগকারী একসময় বলেছিলেন যে তিনি জীবিত অবস্থায় যতটা সম্ভব দান করছেন, বাকি অর্থ বিতরণ করা হবে তাঁর মৃত্যুর পর।

যেসব পিতা-মাতার বিপুল সম্পত্তি রয়েছে, কিন্তু তাঁরা পরে মারা যাবেন, তাঁদের জন্যও কিছু উপদেশ দিয়েছেন ওয়ারেন বাফেট। তিনি লিখেছেন, ‘আপনার সন্তানেরা যখন বড় হবেন, তাঁদেরকে আপনার উইল পড়তে দিন এবং তারপর তাতে সই করুন। নিশ্চিত হন যে তাঁরা যেন আপনার যুক্তি এবং আপনার মৃত্যুর পর তাঁদের ঘাড়ে যে দায়িত্ব পড়বে, এই দুটি বিষয়ই বুঝতে পারেন।’

ওয়ারেন বাফেট
ওয়ারেন বাফেট। ছবি: রয়টার্স

উত্তাল পাকিস্তান, বিক্ষোভ দমনে রাজধানীতে সেনা মোতায়েন, নিহত ৪

আবারও উত্তাল পাকিস্তান। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ পার্টির প্রধান ইমরান খানের ডাকে ইসলামাবাদ অভিমুখি বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছে দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীরা। তাদের দমনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এছাড়া মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সেনা মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার। এতে ইমরান সমর্থকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে বলে জানিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। এসব সহিংসতায় এখন পর্যন্ত চার জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

জিও নিউজ বলছে, সংবিধানের ২৪৫ নং ধারার দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে- দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং দুর্বৃত্তদের সঙ্গে লৌহহস্তে মোকাবিলা করতে পুলিশকে সহায়তা করবে সেনা সদস্যরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী কারফিউ জারি করতে পারবে বলেও ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে সেনাবাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানেরও অনুমতি দিয়েছে সরকার। সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, অরাজকতা সৃষ্টিকারী ও চরমপন্থীদের দমনে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যারা বিশৃঙ্খলা করছে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।  
শ্রীনগর হাইওয়েতে একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেখানে কিছু ‘দুষ্কৃতকারী’ রেঞ্জার্স কর্মীদের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দিলে ঘটনাস্থলেই চার জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে প্যারাট্রুপার ও এক বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও পাঁচ প্যারাট্রুপার ও দুই পুলিশ সদস্য।

ইমরান সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দাবি পূরণ না হলে রাজধানী অভিমুখে যাত্রায় বিরত না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পিটিআই সমর্থকরা। ইমরান খানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন তারা। গত রোববার থেকে ইসলামাবাদের ডি-চকে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করছেন পিটিআই নেতাকর্মীরা।

এর আগে কারাবন্দি ইমরান তার দলের নেতাকর্মীদের চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দেন। যার প্রেক্ষিতে রাজধানী অভিমুখে রওয়ানা হয়েছে দলটির সমর্থকরা। ইসলামাবাদে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বড় বড় ট্রাক দিয়ে অবরোধ করা সত্ত্বেও রাজধানীর উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে নেতাকর্মীদের গাড়িবহর। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় তাদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভ ঠেকাতে পিটিআইয়ের পাঁচ পার্লামেন্ট সদস্য ও প্রায় চার হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

mzamin

গর্ভধারণের নামে ভয়ঙ্কর প্রতারণার খেলা

‘অলৌকিক’ গর্ভধারণের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে ভয়ঙ্কর প্রতারক চক্র। মূলত সন্তান ধারণে ব্যর্থ নারীদের অসহায়ত্বকে টার্গেট করে তারা। চিকিৎসকের বেশে তারা ভুয়া ওষুধ ও ইনজেকশন দিয়ে নারীদের মধ্যে গর্ভধারণের অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে। এরপর দাবি করে, ভ্রূণটি জরায়ুর বাইরে বেড়ে উঠছে।

প্রতারক চক্রের ভুয়া চিকিৎসকরা নারীদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা ‘অলৌকিক চিকিৎসার’ মাধ্যমে গর্ভধারণ করাতে সক্ষম। যেসব নারী তাদের প্রচারকে বিশ্বাস করে চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের সঙ্গে খেলা হয় ভয়ঙ্কর প্রতারণার খেলা।

প্রথম পর্যায়ে নারীদের যৌনাঙ্গে ইনজেকশন ও ওষুধ দিয়ে শরীরে গর্ভবতী হওয়ার উপসর্গ তৈরি করা হয়। এ সময় পেট খানিকটা ফুলে ওঠে, যেন মনে হয় জরায়ুতে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে একটি শিশু। এ সময় তাদেরকে কোনো হাসপাতাল এবং চিকিৎসকের কাছে না যেতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এটাও বলে দেওয়া হয় যেন তারা আল্ট্রাসোনোগ্রাম না করান।

ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় নারীরা গর্ভধারণের অনুভূতি অনুভব করেন। প্রকৃতপক্ষে তাদের গর্ভে সন্তান নেই কিন্তু তাদের শরীরে কিছু মিথ্যা উপসর্গ তৈরি করা হয়েছে। প্রথমবার চিকিৎসার নেওয়ার সময় একটি বড় অঙ্কের ফি দিতে হয়। এরপর গর্ভধারণের প্রতিটি ধাপ দেখতে হলে নিয়মিত ফি দিয়ে তাদের কাছে যেতে হবে।

এভাবে কারো ক্ষেত্রে ১৫ মাস, আবার কারো ক্ষেত্রে দুই বছর গর্ভধারণের মিথ্যা অনুভূতি দিয়ে প্রতারণা চালিয়ে যাওয়া হয়। এর জন্য নিয়মিত নারীদের বিভিন্ন ওষুধও সেবন করানো হয় যাতে উপসর্গগুলো বজায় থাকে।

যখন প্রসবের সময় হয়, তখন বিশেষ ওষুধ দেওয়ার নামে আরও বেশি অর্থ দাবি করে প্রতারক চক্র। এই ভুয়া প্রসবের সময় নারীদের অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে অজ্ঞান করে সেখানে সংগৃহীত একটি নবজাতককে এনে দেওয়া হয়, যাকে ঐ নারীর গর্ভজাত সন্তান বলে বিশ্বাস করানো হয়।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির আফ্রিকা আই টিম এ ভয়ঙ্কর প্রতারণা নিয়ে তাদের অনুসন্ধান চালিয়েছে। বিবিসি বলছে, এমন সব ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটছে আফ্রিকা মহাদেশের নাইজেরিয়ার আনামব্রা রাজ্যে। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় একই ধরনের বহু প্রতারক চক্র।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নাইজেরিয়ার আনামব্রা রাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমন একটি অবৈধ ক্লিনিকে অভিযান চালায়। সেখানে বেশ কয়েকজন গর্ভবতী নারীকে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয় এবং তাদের সদ্যজাত শিশুকে এই চক্র ওই সব নিঃসন্তান দম্পতির কাছে দিয়ে দেয়। প্রসবের সময় যখন গর্ভধারণের মিথ্যা অনুভূতি দেওয়া নারীদের অজ্ঞান করা হয় তখন এসব থেকেই একটি শিশুকে এনে ওই নারীর জন্ম দেওয়া সন্তান হিসেবে রাখা হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযানে উদ্ধারকৃত নারীদের মধ্যে অনেকে আর্থিক চাপে পড়ে বা ভয় পেয়ে এই চক্রে যুক্ত হন বলে জানান। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের প্রতি সামাজিক চাপ, বন্ধ্যাত্বের প্রতি কুসংস্কার এবং প্রজনন অধিকার নিয়ে সঠিক ধারণার অভাব এসব প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

এ ধরনের ঘটনা রোধে নারীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। তারা জানান, এ ধরনের প্রতারণা শুধু সামাজিক চাপে থাকা নারীদের দুঃখকেই বাড়িয়ে তোলে না, বরং মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধের পথও বিস্তৃত করে।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত



দ্বিতীয় দিনেও অস্থিরতা: ৩ কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট, বিজিবি মোতায়েন

রাজধানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা থামছেই না। রোববার পুরান ঢাকায় হামলা, সংঘর্ষের পর গতকালও ব্যাপক সংঘাত হয়েছে যাত্রাবাড়ী এলাকায়। আগের দিনের ঘটনার সূত্র ধরে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এসময় তিনটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা  ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী চেষ্টা চালালে অবস্থা স্বাভাবিক হয়। হামলা ও ভাঙচুরের কারণে মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর মতো অবস্থা নেই। হামলায় অর্ধ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গত রোববার ঢাকা জেলার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘সুপার সানডে’ ঘোষণা দিয়ে যৌথভাবে হামলা চালায় সোহরাওয়ার্দী, কবি নজরুল ও ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল ‘মেগা মানডে’ ঘোষণা দিয়ে হামলা চালানো হয় মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে। এই কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন সংবাদ সম্মেলন করে ৫০/৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন। ওদিকে গুলিভর্তি ম্যাগাজিন চুরির অভিযোগে আট হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যাত্রাবাড়ী এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। এর আগে রোববার রাতে তেজগাঁও এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলের (বুটেক্স) শিক্ষার্থীরা। রাতে ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

গতকাল সকালে ছোট ছোট দলে সরকারি সেহরাওয়ার্দী কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকেন কবি কাজী নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজসহ অধিভুক্ত ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সকাল ১১টার দিকে সোহরাওয়ার্দী কলেজের সামনে আসেন নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ। উত্তেজিত শিক্ষার্থীদেরকে শান্ত করার চেষ্টা করেন তারা। ঝামেলায় না যাওয়ার জন্য তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে অধ্যক্ষদের বাধা উপেক্ষা করে সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজের সামনে জড়ো হওয়া প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার শিক্ষার্থী পুরান ঢাকা থেকে হেঁটে যাত্রাবাড়ী হয়ে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ডেমরা এলাকার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের সামনে পৌঁছান। তাদের অনেকের হাতে ছিল লাঠি। এদিকে নিজেদের কলেজকে রক্ষার জন্য আগে থেকেই ওই কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েকশ’ শিক্ষার্থী। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এসময় মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন এলাকাটির বাসিন্দারাও। প্রায় ঘণ্টা তিনেক ধরে এলাকাটিতে সংঘর্ষ চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। এসময় রাস্তায় যাকে পেয়েছে তাকেই বেধড়ক পিটিয়েছেন সোহ্‌রাওয়ার্দী-নজরুলের শিক্ষার্থীরা। আহত অনেককে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয় বাসিন্দারা। কয়েকজন রক্তাক্ত আহত হয়ে আশ্রয় নেন কলেজের ভেতর। এসময় রাস্তায় পার্ক করে রাখা নাহিদ হাসান নামে এক সংবাদকর্মীর মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়। আতঙ্কে পুরো এলাকার যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সংখ্যায় কম হওয়ায় এক পর্যায়ে মূল গেটে তালা দিয়ে কলেজ ছেড়ে চলে যান ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এরপর কলেজটিতে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট করে  সোহ্‌রাওয়ার্দী ও কবি নজরুল কলেজ আরও কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের ১০ তলা দু’টি ভবনের পুরোটা জুড়েই ভাঙচুর চালানো হয়। প্রিন্সিপালের রুম থেকে শুরু করে সকল রুম তছনছ করা হয়। কলেজের লিফট থেকে শুরু করে ল্যাব রুম কিছুই রেহাই পায়নি। বেলা ৩টার পর সেখানে আসেন সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা। তখনো ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের দখলে ছিল মোল্লা কলেজ। পরে সেনাসদস্যরা মাইকিং করে তাদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ করেন। ফিরে যেতে বলেন। এক পর্যায়ে বিকাল চারটার পর সেখান থেকে ফিরে যান তারা। শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে পুলিশ কোনো ধরনের টিয়ার গ্যাস বা গুলি না ছুড়লেও মোহাম্মদ নাফী নামে মাহবুবুর রহমান কলেজের একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী পেটে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি ডেমরার বামৈল বাজার এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে। তার  মাথায়ও ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। আহত কলেজ শিক্ষার্থীর খালু মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, সকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মারামারির খবর শুনে বাসা থেকে বের হয় নাফী। একটু পরেই সে গুলিবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ডেমরার রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যান। আমরা খবর পেয়ে তাকে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। কারা গুলি করেছে আমরা জানতে পারিনি। রাফীর বড় ভাই নিলয় বলেন, আমার ভাই মারামারি দেখতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সে যখন গুলিবিদ্ধ হয় সেই সময় স্পটে কোনো পুলিশ ছিল না। ছাত্রদের মধ্যে থেকেই কেউ না কেউ গুলি করেছে।

মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাতুল সরকার বলেন, আজকে আমাদের কলেজে হামলা করার জন্য তারা আগে থেকেই ‘মেগা মানডে’ কর্মসূচি ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছিল। এটা সবাই জানে। আমরা একাধিকবার পুলিশকে জানিয়েছি। আজকে তারা হামলা করলে আমরা পুলিশকে আসতে বলি ৯৯৯ এ কল দিয়ে। কিন্তু পুলিশ এসেছে অনেক পরে। মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল হাই শিকদার বলেন, হামলা করতে আসারা তো অনেক বড়। কারও কারও আইডি কার্ড ছিল গলায়। বাকিদের ছিল না।

সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী তুহিন বলেন, মোল্লা কলেজের নেতৃত্বে ঢাকার বেশ কয়েকটি কলেজ একত্রিত হয়ে কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। আমরা রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রশাসনকে সময় দিয়েছিলাম এ ঘটনার সুষ্ঠু একটা সমাধান করার জন্য। কিন্তু আমাদের দেয়া সময়ের ভেতর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা। তাই সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আমরা দুইটি কলেজের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে সেখানে গেলে তারা আমাদের ওপর হামলা চালায়। তুহিনের ভাষ্য, আমাদের কিছু শিক্ষার্থী তাদের ধাওয়া করে মোল্লা কলেজের দ্বিতীয় তলায় উঠলে তারা আমাদের অনেক শিক্ষার্থীকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

গত ১৬ই নভেম্বর মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী অভিজিৎ হাওলাদার ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হয়। ১৮ই নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। ওইদিন রাতে তার পরিবার ও কলেজের কিছু শিক্ষার্থী ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ করে হাসপাতালে ভাঙচুর চালায়। ২০শে নভেম্বর পুনরায় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের ৫০০/৬০০ শিক্ষার্থী ওই হাসপাতালে এসে ভাঙচুর চালায়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ সময় প্রতিবাদকারীদের চাপে হাসপাতালের পরিচালক ৪ জন ডাক্তার ও ২ জন শিক্ষার্থীসহ অভিজিতের চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু ওই সময় হাসপাতাল চত্বরে অবস্থানরত ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে। সন্ধ্যার পর স্থানীয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে আসে। এ সময় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা সমঝোতা না মানায় উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

২৪শে নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পুনরায় ভাঙচুর চালায়। একপর্যায়ে তারা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এরপর প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ৩৫টি বিভিন্ন কলেজ শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ইউনাইটেড কলেজ অব বাংলাদেশ (ইউসিবি) নামে একটি ফোরাম গঠিত হয়।

সংঘর্ষের পর ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার কথা বলা হয়। তবে এর কোনো সত্যতা মেলেনি। গতকাল সন্ধ্যায় মোল্লা কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কলেজে হামলার ঘটনায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় একশোরও বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট নষ্ট করে দিয়েছে, টাকা পয়সা নিয়ে গেছে। তিন হাজার ফ্যান নষ্ট করেছে, ২০-৩০টা ল্যাপটপ নিয়ে গেছে, ৩০০ এর ওপর সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করা হয়েছে, ৫টা লিফট নষ্ট করা হয়েছে, ১২ তলা ভবনের একটা কাঁচও অবশিষ্ট নেই। আইসিটি ল্যাবের ১০০টির মতো কম্পিউটার নিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আজকের এই ক্ষতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমি চাই না কোনো শিক্ষার্থীর মাধ্যমে দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি একটি কলেজের সঙ্গে আরেকটি কলেজের মারামারি ঘটছে। সরকারের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে শিক্ষার্থীদের কলেজমুখী করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা দ্রুতই নেয়া হোক। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন কুচক্রী মহল জড়িত রয়েছে।

এদিকে মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হামলার ঘটনায় সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের অধ্যক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন কলেজে হামলা করতে বের হওয়ারা আমাদের কোনো শিক্ষার্থী নয়। সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাকলি মুখোপাধ্যায় বলেন, যারা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করবে, লুটপাট করবে, সন্ত্রাসী হামলা চালাবে তারা আমাদের ছাত্র হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, সোমবার ও মঙ্গলবার কলেজের ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয়েছে মঙ্গলবারের অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষাও স্থগিত থাকবে।

কবি নজরুল কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, যারা সন্ত্রাসী হামলা, লুটপাট-ভাঙচুর করবে তারা আমাদের ছাত্র হতে পারে না। কবি নজরুলের যারা মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা করবে তাদের দায় কলেজ প্রশাসন নেবে না। ডিএমপি সংঘর্ষের ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি বলে জানায়।

ওদিকে পরিস্থিতির কারণে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের মঙ্গলবারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানানো হয়।

ভাঙচুর ও গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন চুরির অভিযোগে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের আট হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। রোববার রাতে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) এ কে এম হাসান মাহমুদুল কবীর বাদী হয়ে রাজধানীর সূত্রাপুর থানায় এ মামলা করেন।

mzamin
যাত্রাবাড়ীতে মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে তাণ্ডব। ছবি: জীবন আহমেদ

সংবাদ সম্মেলনে দুই উপদেষ্টা: পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে

দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। সেটি না হলে একদিনে এতগুলো ঘটনা কোনোভাবেই কাকতালীয় নয় বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের দুর্বলতা স্বীকার করে সকলকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বর্জন করে সভা-সমাবেশের আহ্বান জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানান নাহিদ।  বলেন, অনেকগুলো ঘটনা আজ ঘটেছে। এর মধ্যে দেখা গেছে- ভোররাত থেকে ঢাকায় বাস, মাইক্রোবাসে করে কিছু সাধারণ মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছে ঋণ দেয়ার নাম করে। অহিংস গণঅভ্যুত্থানের নামে একটি প্ল্যাটফরম পুরো মিথ্যা প্রচারণা করে মানুষকে নিয়ে এসেছে। ওই প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বড় কোনো পরিকল্পনা না থাকলে একদিনে এতগুলো ঘটনা কাকতালীয় না। আমরা মনে করছি, এখানে নানা পক্ষের পরিকল্পনা আছে। সরকার সফলভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম করুক, এটা হয়তো অনেকেই চাইছে না। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

উপদেষ্টা নাহিদ বলেন, পুলিশে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রশাসনে স্থবিরতা কাটানোর জন্য আমরা একটা বড় পরিকল্পনা করছি। এগুলো নস্যাৎ করতে আমাদের এসব ঘটনায় ব্যস্ত রাখতে অ্যাটেনশন এদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা এটা আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। আমরা এটা ইনভেস্টিগেট করছি, এই ঘটনার সঙ্গে দেশে কিংবা দেশের বাইরে কারা জড়িত।

রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু একটা অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আমরা আছি। সকলের ভেতরে একটা বিপ্লবী চেতনা আছে, সেটা যেন আমরা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করি। আমরা যেন সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করি। এখানে রাজনৈতিক দলগুলো সবার ভূমিকা নেয়ার আছে। আমরা মনে করি, গণঅভ্যুত্থানে আমাদের মধ্যে যেরকম ঐক্য ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের অংশীদারিত্ব সবারই আছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দুর্বলতা স্বীকার করে উপদেষ্টা নাহিদ বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পুলিশের দুর্বলতা ছিল। দুর্বলতা ছিল বলেই এটি সংঘর্ষের দিকে গেছে, এটা আমরা স্বীকার করছি। কিন্তু পুলিশ  তো একটা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। যেখানে এত শিক্ষার্থী যখন নেমে এসেছে, তাদের মুখোমুখি হলে অবস্থা আরও খারাপের দিকে যেত। প্রাথমিকভাবে পুলিশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু তারা শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়নি। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের দুর্বলতা থাকলে সেটা আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছি। পুলিশকে আরও বেশি সক্রিয় করার জন্য একটা বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। এটা চলমান থাকবে। যারা যেসব জায়গায় ব্যর্থ হচ্ছে তাদের আমরা পরিবর্তন করবো।
উপদেষ্টা নাহিদ বলেন, প্রথম আলো নিয়ে একটি উত্তেজনা দেখতে পাচ্ছি কয়েকদিন ধরে। গতকালও এ রকম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল অফিসের সামনে। রাজশাহীতে তাদের অফিসে ভাঙচুর হয়েছে এবং চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে। কোনো গণমাধ্যম বা পত্রিকার বিরুদ্ধে যদি জনগণের কোনো অংশের অভিযোগ থাকে, ক্ষোভ থাকে, তারা সেটি প্রকাশ করতে পারে। তবে সেটি অবশ্যই শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে। কোনো পত্রিকা অফিসে ভাঙচুর করা, পত্রিকা বন্ধের জন্য চাপ প্রয়োগ করা- আমরা সমর্থন করি না। এই ধরনের ঘটনা পরে ঘটলে টলারেট করা হবে না। তিনি আন্দোলনকারীদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষোভ থাকলে শান্তিপূর্ণভাবে তা প্রকাশ করেন। মানুষের সভা-সমাবেশ করার অধিকার রয়েছে। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তারা আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে। আমরা আহ্বান জানাবো, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে যেন জনগণ অংশ না নেয়। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, এমন কাজ থেকে যেন আমরা বিরত থাকি।

পুলিশের বাধা টপকে হামলা হয়েছে: উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ
পুলিশের বাধা টপকে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাত্রাবাড়ী অংশে তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বাধা টপকে তারা চলে যায়। আমাদের জানানো হয়েছে, শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনা দমানোর চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হতাহতের বিষয়ে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলমান আছে। এই ধরনের ঘটনাকে অবশ্যই টলারেট করা হবে না। সংঘর্ষ এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। সংঘর্ষ এড়াতে গতকাল থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তবুও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা দেখেছি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ৭ জন এবং মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের ৩ জন নিহতের খবর রটেছিল। তবে এখন পর্যন্ত কারও নিহত হওয়ার কোনো সংবাদ আমরা পাইনি। অনেকেই আহত হয়েছে, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনেক কিছু শোনা যাচ্ছে, তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

আরেক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা আসিফ বলেন, পুলিশের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান আছে। প্রায় ১৩শ’ থেকে ১৪শ’ এসআই এবং সাড়ে ৪ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান আছে।

সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিটা সেক্টরে সংস্কারের জন্য সময় দিতে হবে। সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান থাকবে। আপনারা জানেন, সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে যে মতামত চাওয়া হয়েছে, সেখানে যার যার মতামত দিবেন। ডেস্ট্রাকটিভ ওয়েতে না গিয়ে কনস্ট্রাকটিভ ওয়েতে আমরা কীভাবে দেশ গড়তে পারি সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম ও ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি অপূর্ব জাহাঙ্গীর।

mzamin


সরকারে মালিকানা নিশ্চিতে কিছু বাম ডান উন্মত্ত হয়ে গেছে

অনেক মিত্রই আজ হঠকারীর ভূমিকায় মন্তব্য করে উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, আমরা আমাদের ব্যর্থতা স্বীকার করি। আমরা শিখেছি এবং ব্যর্থতা কাটানোর চেষ্টাও করছি। তিনি বলেন, বাম ও ডান মানসিকতার কতিপয় নেতৃত্ব বা ব্যক্তি অভ্যুত্থানে এবং পরবর্তী সময়ে সরকারে নিজেদের শরিকানা নিশ্চিত না করতে পেরে উন্মত্ত হয়ে গেছেন। তাদের উন্মত্ততা, বিপ্লবী জোশ ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড দেশটাকে অস্থির করে রেখেছে। সোমবার সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে ছাত্র আন্দোলনের এ নেতা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরের দশ-পনেরো বছরের ইতিহাস  মুক্তিযোদ্ধাদের একে অপরকে হত্যার ইতিহাস। যারা চায়নি বাংলাদেশ শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াক, তারা  মুক্তিযোদ্ধাদের একে অপরকে দিয়ে হত্যা করিয়েছে। তাদের নিজেদের ভুল ছিল না তা নয়, কিন্তু আমাদের মুক্তিযোদ্ধাগণের একের পর এক হত্যা বাংলাদেশকে কীভাবে পিছিয়ে দিলো, তা ইতিহাস একদিন বলবে। এবারের আন্দোলন সাহসী ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে জনগণের আন্দোলন। কিন্তু একটি দল এবং দেশি-বিদেশি সুযোগ সন্ধানী এস্টাবলিশমেন্ট গত ৩ মাসে ছাত্রদের ভিলিফাই করেছে,  বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন দিয়ে ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ ঘটিয়েছে, অন্য একটি তরুণ দলকে লেলিয়ে দিয়েছে ছাত্রদের বিরুদ্ধে, তদুপরি ছাত্রদের সঙ্গে সম্মানজনক ভাবে ডিল তো করেইনি বরং ছাত্রদের তারা শত্রু গণ্য করেছে। তার পরিণতি কি ভালো হচ্ছে, বা হবে? তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে, বিদেশি শক্তির কোনো সাধ্য নাই এ দেশের মানুষকে পদানত করার। কিন্তু গোলামির মানসিকতার কিছু গাদ্দার আর হঠকারীর এ শক্তি আছে। তারা গত তিন মাসে তা দেখালো। ছাত্রদের আজ সংঘাতের মুখে ঠেলে দিয়ে হত্যার মাধ্যমে ছাত্রদের বৈধতার সংকট হলে যারা যারা লাভবান হবে, তারা সবাই এ উস্কানি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত। ধীরে ধীরে আমরা সবই বলবো। অথবা আপনারা চোখ খুললেই দেখতে পাবেন।

মাহফুজ বলেন, আমরা আরও চেষ্টা করবো সবাইকে নিয়ে এগোনোর। কিন্তু হঠকারীতা এবং ছাত্রদের অন্যায্যতার চেষ্টা এ জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। হঠকারীতা, উস্কানি, ছাত্র-তরুণদের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ তৈরি, অভ্যুত্থানের শক্তিকে প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলার অপচেষ্টা- সবই ব্যর্থ করে দেয়া হবে, ইনশাআল্লাহ্‌। আমরা ৫ই আগস্টের সকালের মতন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এবারের সাংগঠনিকভাবে গড়ে ওঠা ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী মুক্তির সুযোগ তৈরি করবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

mzamin

সংস্কার নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিএনপি’র বিরোধ নেই

সংস্কার আগে না নির্বাচন আগে, এই ধরনের প্রশ্ন তুলে জনমনে বিভ্রান্তি   সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে মন্তব্য করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে বিএনপি’র কোনো বিরোধ নেই। সংস্কার আগে না নির্বাচন আগে, যারা এই ধরনের প্রশ্ন তুলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। বিএনপি মনে করে সংস্কার কার্যক্রম এটি কোনো শেষ হওয়ার বিষয় নয়। একজন সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলে আরেকজন প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নিয়ে যায়। কারণ সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। লন্ডন থেকে তারেক রহমান ভার্র্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, সরকারে কিংবা সরকারের বাইরে আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা দরকার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত উত্তরণ ছাড়া পুঁথিগত সংস্কার অনেকটা অকার্যকর। সংস্কার কার্যক্রমকে কার্যকর করতে চাইলে সবার আগে জনগণের নিত্যদিনের দুর্দশা লাঘবের ব্যবস্থা করা দরকার, জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সংস্কার কার্যক্রমের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, বিতাড়িত স্বৈরাচারের পলায়নের পর গণতন্ত্রকামী জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক বিশাল দায়িত্ব নিয়ে আজকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। তবে গণতন্ত্রের পক্ষের সকল শক্তি ও সাংবাদিক সমাজকে সতর্ক থাকা দরকার। আমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে চলমান যাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে কিন্তু এরই ভেতরে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আজকের সভায় অনেক বক্তা তাদের বক্তব্যে তা তুলে ধরেছেন। বিতাড়িত স্বৈরাচার ও তাদের দোসরচক্র নানা কৌশলে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অপচেষ্টা শুরু করেছে। অপশক্তি দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে বাংলাদেশের পক্ষের শক্তির মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টির পাঁয়তারায় লিপ্ত। তবে সবাই যদি সতর্ক থাকি বাংলাদেশের পক্ষের শক্তির মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

বিএনপিসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপরে গুম-হত্যা-নির্যাতনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা একটি গণতান্ত্রিক মানবিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করা আমাদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে পলাতক স্বৈরাচার ও তার দোসররা যাতে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করাও কিন্তু আমাদের কর্তব্য। এজন্য যথাযথ আইনগত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। পলাতক মাফিয়াদের পুনর্বাসন ঠেকাতে তাদেরকে একদিকে আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। অপরদিকে তাদেরকে অবশ্যই জনগণের রাজনৈতিক বিচারের প্রত্যাখাত হওয়ার পরিস্থিতিতে ফেলতে হবে। যদি এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারি আমরা- আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, গণবিরোধী বিতাড়িত অপশক্তি বাংলাদেশে রাজনীতিতে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না।

তিনি বলেন, খুনি, লুটেরা, মাফিয়া এবং স্বৈরাচারী রাজনৈতিক অপশক্তিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে হলে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। ভোটের অধিকারের সুযোগ পেলে জনগণ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে গণহত্যাকারী, খুনি, লুটেরা, পলাতক স্বৈরাচার এবং তাদের দোসরদেরকে রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় করে দিতে সক্ষম হবে। বিএনপি মনে করে সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান অবশ্যই প্রয়োজন।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের আগের স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ কিংবা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের আগে দেড় দশকের বাংলাদেশ বর্তমান প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতা এক সঙ্গে যায় না। আওয়ামী লীগ আর গণতন্ত্র একে অপরের শত্রু। অপরদিকে বিএনপি’র কাছে গণতন্ত্র বা ব্যক্তি স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিরাপদ।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি বিদ্যমান অবস্থা-ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২২ সালে বিএনপি প্রথম ২৭ দফা সংস্কার উপস্থাপন করেছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় শেষে ২০২৩ সালে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে বিএনপি। বিএনপি’র উপস্থাপিত সংস্কার প্রস্তাবে গণমাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি অভিজ্ঞ মিডিয়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মিডিয়া কমিশনের কথা বলা হয়েছে। আপনারা দেখেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে কাজ করছি, সেখানে সাগর-রুনির বিচারের ব্যাপারে রাষ্ট্র উদাসীন থাকবে না, নিশ্চিত থাকবে মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা। এই লক্ষ্য অর্জনে আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই।

সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা প্রয়োজন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আমরা দেখেছি, ফ্যাসিবাদের আমলে গণমাধ্যমের প্রতিটি শাখায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা যেকোনো মানুষের মধ্যেই যেকোনো বিষয়ে যেকোনো ইস্যুতে দ্বিমত ভিন্নমত থাকবে, থাকতেই পারে। এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সৌন্দর্য। ভিন্নমত অথবা দ্বিমতকে শত্রুতা কিংবা নির্লজ্জ দলাদলিতে পরিণত করলে কী পরিণতি হতে পারে গত দেড় দশকে দেশের জনগণ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। পলাতক স্বৈরাচারের সঙ্গে তার অবৈধ মন্ত্রী, এমপি, বুদ্ধিজীবী বা বিচারপতি, বায়তুল মোকাররমের খতিব, প্রেস ক্লাবের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কিংবা কতিপয় সাংবাদিকের পলায়নের মধ্যদিয়ে আবারো প্রমাণিত হয়েছে অবৈধ রাষ্ট্র শক্তি নয়, বরং শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই কিন্তু চূড়ান্ত।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরে ‘স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে’ সম্মেলন অনুষ্ঠান হচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রয়াত সভাপতি রুহুল আমিন গাজীসহ অভ্যুত্থানে নিহতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। ফ্যাসিবাদী আমলে চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

সভায় সার্চ কমিটি গঠনের সমালোচনা করে বাংলাদেশ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা মনে করি এই অন্তর্বর্তী সরকারের সকল সিদ্ধান্ত, সকল নীতি, সকল ভূমিকার মধ্যে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকা উচিত। কিন্তু তিন মাস অতিবাহিত হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি-দুর্ভাগ্যজনক হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো নীতি, কোনো কোনো সিদ্ধান্ত গণআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলছে না। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।  

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা সংস্কারে অনেকগুলো কমিটি গঠন করেছেন, অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। সেগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। আপনারা তখন সংস্কার বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু হঠাৎ করে সার্চ কমিটি গঠন করা হলো। সেখানে কি জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়েছে? নির্বাচন সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট আসার আগেই একটি সার্চ কমিটি গঠন করলেন। আমরা সেটাকেও ইতিবাচকভাবে দেখছি। কিন্তু আপনারা তো আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া পদ্ধতি দিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করলেন।
বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ফ্যাসিবাদ-নাৎসিবাদের প্রথম টার্গেট হচ্ছে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিক। ডিক্টেটররা কখনো এই চতুর্থ স্তম্ভ মেনে নিতে পারে না বলেই প্রথমে এখানেই ধাক্কা দেয়। অনেক সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করেছে। অনেক পত্রিকা-টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছে। আর এগুলো বন্ধ করেছে, যাতে তারা (আওয়ামী লীগ) অন্যায়-অবিচার-দুর্নীতি-বিদেশে টাকা পাচার করলে তাদের তথ্য ফাঁস না হয়।

ডিইউজে’র সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ খানের সঞ্চালনায় সভায় বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল, বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, বর্তমান মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, ডিইউজে’র সাবেক সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার, এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাকের হোসাইন, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম সহ সভাপতি রাশেদুল হক বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

mzamin


বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে কারা?

আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলন। দফায় দফায় নতুন কর্মসূচি নিয়ে হাজির বিভিন্ন গোষ্ঠী। দাবি আদায়ে দখলে রাখছে রাজপথ। বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে যান চলাচল। ভাঙচুর করা  হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে সম্পদের। ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। বিশৃঙ্খলা চারদিকে। রাজধানীসহ সারা দেশে ক্ষুদ্র ইস্যুতে বড় বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে- বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে কারা। কারা নাড়ছেন কলকাঠি, উস্কে দিচ্ছে আন্দোলনকারীদের। আর এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সহিংসতা থামাতে কেন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না। গতকালও ‘মেগা মানডে’ ঘোষণা দিয়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে। দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে কলেজটি। আগের দিনও ‘সুপার সানডে’ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে তাণ্ডব চালানো হয় সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজসহ তিনটি কলেজে। আহত অসংখ্য। সরকারের উপদেষ্টা ও ছাত্র আন্দোলনের নেতারা এসব ঘটনার পেছনে অন্য কেউ ইন্ধন দিচ্ছে বলে মনে করছে। এ ছাড়াও পতিত শেখ হাসিনা সরকারের কেউ কেউ এসব আন্দোলনে রসদ যোগাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আছে দেশ-বিদেশি ষড়যন্ত্র। একের পর এক বিশৃঙ্খল ঘটনার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানাভাবে আন্দোলনকারীদের উস্কানি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এ ছাড়াও ভারতীয় মিডিয়ায় গত কয়েকদিন ধরে সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উস্কে দেয়া হচ্ছে। অপপ্রচার চালানো হচ্ছে আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজ থেকেও। কোনো কোনো কর্মসূচিতে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের অনুসারীদের সরাসরি ইন্ধনের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়াও বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে রাজপথে থাকা মিত্রদের কেউ কেউও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অতি বিপ্লবী কর্মসূচি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। এমনকি সরকারে জায়গা না পাওয়া অনেকেও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে দাবি করছেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বড় কোনো পরিকল্পনা না থাকলে একদিনে এতগুলো ঘটনা কাকতালীয় না। আমরা মনে করছি, এখানে নানা পক্ষের পরিকল্পনা আছে। সরকার সফলভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম করুক, এটা হয়তো অনেকেই চাচ্ছে না। আমাদের যে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

আমরা মনে করি, পুলিশে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রশাসনে স্থবিরতা কাটানোর জন্য আমরা একটা বড় পরিকল্পনা করছি। এগুলো নস্যাৎ করতে আমাদেরকে এসব ঘটনায় ব্যস্ত রাখতে এটেনশন এদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা এটা আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। আমরা এটার ইনভেস্টিগেট করছি যে এই ঘটনার সঙ্গে দেশে কিংবা দেশের বাইরে কারা জড়িত। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দুর্বলতা ছিল। দুর্বলতা ছিল বলেই এটি সংঘর্ষের দিকে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অস্থিরতা নিরসনে গতকাল রাতে রাজধানীর রূপায়ণ টাওয়ারে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর জরুরি বৈঠক হয়। যেখানে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন সকলে। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও পার্শ্ববর্তী দেশের ষড়যন্ত্র থেকে সচেতন থাকার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বলা হয়, কোনোভাবেই তাদের উস্কানিতে কেউ যেন পা না দেয়। এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শান্ত রাখতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

গত দুইদিন ধরে রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসকের গাফিলতিতে ড. মাহাবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে একাধিক কলেজে। গত রোববার রাজধানীর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও সরকারি কবি নজরুল কলেজে সম্মিলিত তাণ্ডব চালায় বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। অনলাইনে সুপার সানডে ঘোষণা দিয়ে চালানো হয় এ তাণ্ডব। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় সোহরাওয়ার্দী কলেজ। এর পাল্টা দিতে গতকাল ‘মেগা মানডে’ ঘোষণা ওই দুই কলেজের শিক্ষার্থী। ঘোষণা অনুযায়ী মাতুয়াইলে গিয়ে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে তাণ্ডব চালায় তারা। সংঘর্ষে পুরো কলেজ পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। এ ছাড়াও রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরি কলেজেও হামলা চালানো হয়। ওদিকে গত রোববার রাতে ঢাকা পলিটেকনিক ও বুটেক্সের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এদিকে গতকাল শাহবাগে লাখো মানুষের জনসমাগম ঘটানোর পূর্বপরিকল্পনা ভেস্তে গেছে অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের। বিনা সুদে ঋণ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সারা দেশ থেকে গাড়িতে করে লোক নিয়ে আসে সংগঠনটি। এ জন্য প্রত্যেককে দেয়া হয় এক হাজার টাকা। এ ছাড়া ঢাকায় আসার দায়িত্বও নেয়া হয়। বিনিময়ে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচির কথা বলা হয় তাদের। কিন্তু শাহবাগে জড়ো হতে ভোরে আসা শুরু করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাধাগ্রস্ত হয় তারা।

শিক্ষার্থীদের জেরার মুখে নিজেদের পরিকল্পনার কথা বলতে বাধ্য হন তারা। পরে তাদের স্ব স্ব এলাকায় ফেরত পাঠানো হয়। আটক করা হয় ৪ জনকে। এ ছাড়াও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় তাদের আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জানা গেছে, শাহবাগে বসে পড়ে অস্থিতরা তৈরি করা ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আটক করা হয়েছে ওই কর্মসূচির মূলহোতাকে। অন্যদিকে দু’টি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে বয়কট করে এ প্রতিষ্ঠান দু’টির প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে একদল লোক। তারা পত্রিকা দু’টিকে ইসলামের শত্রু ও ভারতের দালাল বলে দাবি করছে। শুক্রবার ডেইলি স্টারের সামনে জুমার নামাজ আদায় করেন তারা। গত রোববার প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে তারা নামাজ আদায় ও ভোজের কর্মসূচি দেয়। পরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আটক করা হয় ৪ জনকে। গতকালও পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয় কাওরান বাজারে বিক্ষোভ করেছে ওই গ্রুপটি। এ ছাড়া রাজশাহীতে প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা চালায় একদল লোক। এ ছাড়াও বিগত কয়েকদিন ধরে রাজধানীতে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। প্রায় প্রতিদিনই তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করছেন। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। এ আন্দোলনেও আওয়ামী লীগসহ সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বুধবার তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা সিটি কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয় অনেকে। তার আগে ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিল করে সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। কয়েক দফায় সড়ক অবরোধ করে চলা এ কর্মসূচিতে তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে। অন্যদিকে সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের জন্য পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে কয়েকদিন সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এদিকে বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলিগ জামায়াতের দুই পক্ষের কর্মসূচি পাল্টা কর্মসূচি পালিত হয়। অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেশের বিভিন্নস্থানে বিভিন্ন ইস্যুতে নানা কর্মসূচি পালন করছে। এদের ক্ষেত্রেও বিশেষ গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে ডিবি পুলিশ। পরে সংগঠনটির অনুসারীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। এর আগে ডিবি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় তারা। পরবর্তীতে শাহবাগ থেকে ইসকন সদস্যদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয় একদল লোক।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, অনেক মিত্রই আজ হঠকারীর ভূমিকায়। আমরা আমাদের ব্যর্থতা স্বীকার করি। আমরা শিখছি এবং ব্যর্থতা কাটানোর চেষ্টাও করছি। তিনি বলেন, বাম ও ডান মানসিকতার কতিপয় নেতৃত্ব বা ব্যক্তি অভ্যুত্থানে এবং পরবর্তী সময়ে সরকারে নিজেদের শরিকানা নিশ্চিত না করতে পেরে উন্মত্ত হয়ে গেছেন। তাদের উন্মত্ততা, বিপ্লবী জোশ ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড দেশটাকে অস্থির করে রেখেছে। অন্যদিকে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সারজিস আলম এক স্ট্যাটাসে বলেন, সবার আগে দেশ, দেশের মানুষ, জনগণের সম্পদ। যদি কেউ বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, সে যে পরিচয়েরই হোক না কেন তবে দেশের স্বার্থে তাদের প্রতিহত করে জনমানুষের নিরাপত্তা প্রদান করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান কাজ। আরেক স্ট্যাটাসে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, শত চেষ্টার পরেও বসে সমাধান করার আহ্বান জানানোর পরেও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়ানো থেকে আটকানো গেল না। এগ্রেসিভনেস ও প্রস্তুতি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও স্ট্রিক্ট অ্যাকশনে যায়নি। কোনো প্রকার অ্যাকশনে গেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তপাত হতো। সকল পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছি। একত্রে দেশ গড়ার সময়ে সংঘর্ষের মতো নিন্দনীয় কাজে জড়ানো দুঃখজনক। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, এসব হামলা-সংঘর্ষের পেছনে কারও ইন্ধন থাকলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

mzamin
ছবি: জীবন আহমেদ