Sunday, July 25, 2010

একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রশ্ন by মাহফুজ রহমান

মহাখালীর মুক্তিযোদ্ধা কলোনির সামনে ব্যাপক হট্টগোল! ওদিকে চায়ের দোকানে ধুমসে বাংলা সিনেমার গান বাজছে। মাথার ওপর মধ্যদুপুরের গনগনে সূর্যের চনমনে রোদ। হট্টগোল উপলক্ষে চায়ের দোকানের বিক্রিবাট্টাও হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। আর চেঁচামেচির সঙ্গে সঙ্গে চায়ের কাপের টুংটাং শব্দও বেড়ে চলেছে সমানতালে। উৎসাহী লোকজন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে, হট্টগোলের উপলক্ষ কী, তা আবিষ্কার করতে।
সেখান থেকে খানিক দূরে একজন মধ্যবয়সী দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর কাছে আশ্রাব আলী জমাদ্দারের ঠিকানা জানতে চাই, কোথায় থাকেন তিনি? প্রশ্ন শুনে আপাদমস্তক নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেন মধ্যবয়সী সেই ভদ্রলোক,‘আশ্রাব ভাইয়ের কাছে আসছেন? আরে সে তো আমার খুব কাছের মানুষ! আসেন আসেন বলে কলোনির ভেতরে নিয়ে যান তিনি। ঘিঞ্জি কলোনির টিনের ছাপরামতো ঘরগুলোর মধ্যে সংকীর্ণ একটা গলি। তার মাঝেই ঘর-গেরস্থালি। বাচ্চাদের খেলাধুলা। এখানে-সেখানে বেড়ে উঠেছে পুঁইয়ের ডগা। দুটো বাঁক নিতেই প্রথম ঘরটার সামনে গিয়ে ভদ্রলোক থেমে যান, বলেন, ‘এই হইল আশ্রাব ভাইয়ের ঘর, চলেন ভেতরে যাই।’
১০ ফুট বাই ১২ ফুটের মতো ছোট্ট একটা ঘর। একটা চৌকি আর টেবিল ঘরটার পুরোটা দখল করে আছে। মাথার ওপর একটা ফ্যান হেলিকপ্টারের মতো বোঁ বোঁ করে যত না ঘুরছিল, তার থেকে শব্দই করছিল বেশি। একটা জানালা, তার ওপরে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো, ষাট পাওয়ারের একটা বাল্বের আলোতেও ছবিটা বেশ জ্বলজ্বল করছিল। ঘরের জীর্ণতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর ছবিটার মতোই জানালার পাশে বালিশে ঠেস দিয়ে বসে থাকা একজন দীর্ঘদেহী বৃদ্ধকেও বেশ উজ্জ্বল লাগছিল। বোঝাই যায়, তিনিই আশ্রাব আলী জমাদ্দার। একজন মুক্তিযোদ্ধা।
‘গ্রামের সবচেয়ে দুরন্ত মানুষ ছিলাম। খেলাধুলা বলেন, হইচই বলেন, কোথায় ছিলাম না! আর ছিলাম গিয়া পালাগানের আসরে। এই ঘাড় পর্যন্ত বাবরি চুল ছিল। দিন-রাত পালাগানের আসর জমায়া রাখতাম গান গাইয়া।’ বলে খানিক বিশ্রাম নেন আশ্রাব আলী জমাদ্দার। দুই-দুবার স্ট্রোক হয়েছিল তাঁর, টানা কথা বা কোনো রকমের ভারী কাজ করতে পারেন না এখন। তবে মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলেই সবকিছু ভুলে যান। যেন রক্তে ঢেউ জাগে তাঁর। উত্তাল সেই দিনগুলোর কথাই বলেন তিনি, ‘২৫ মার্চের রাতের ঘটনার পর আমাদের গ্রামে, তখনকার বৃহত্তর বরিশাল আর এখনকার বরগুনার বেতাগী উপজেলার সোপখালী গ্রামেও উত্তেজনা ছড়ায়া পড়ছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনছি সবাই। একসময় শোনা গেল, বরিশালে মিলিটারি আইসা পড়ছে। গ্রামেও আসি আসি করে। এর মধ্যেই রাজাকারেরাও শান্তি কমিটি বানাইল। মিলিটারি ঢুইকা পড়ল গ্রামে। স্কুলঘরে বানাইল ক্যাম্প। আমরা তো বইসা থাকতে পারি না। ক্যাপ্টেন আলতাফ হায়দারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল গঠন করলাম আমরা। গ্রামের সাধারণ জনগণই এই দলের সদস্য, কোনো ট্রেনিং নাই, অস্ত্র বলতে লাঠি-সড়কি।’ টানা দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন আশ্রাব আলী, ঢক ঢক করে গ্লাসের পুরো পানি গিলে ফের শুরু করেন তাঁর কথা, ‘এরপর আমাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা হইল, ভারতে গিয়া মোটামুটি পোক্ত হইল আমাদের হাত-পাও। পরিশ্রম তো করতে পারত সবাই, কিন্তু সামরিক বিদ্যাটা তো ছিল না। সেই বিদ্যা আয়ত্ত হওয়ার পর দরকার অস্ত্রের। সেটারও ব্যবস্থা হইল ধীরে ধীরে। অনেক নতুন লোকজনও দলে যোগ দিল। ৫ জুন তারিখে সর্বপ্রথম খুব বড় একটা অপারেশনে নামলাম আমরা। মির্জাগঞ্জের দেউলিগ্রামে। ১১ জন পাকিস্তানি আর্মি মারা পড়ছিল সেই অপারেশনে। এরপর আবারও নতুন অপারেশনের অপেক্ষায় রইলাম আমরা। এর মধ্যে গোয়েন্দার ভূমিকায় নামছি আমি। গ্রামে সবাই আমারে পালাগানের শিল্পী বইলা চেনে। ধারণাও করতে পারে নাই, আমার উদ্দেশ্য কী। একদিন বাজারে ঘুইরা খবর পাইলাম কুখ্যাত রাজাকার মহারাজ মিয়া জইশার বাজারে কার্তিক কর্মকারের দোকান লুটপাট করছে। এরপর যাইতাছে দোকলাখালীতে ঘরামী বাড়ি লুট করতে। সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠাইলাম আমাদের দলের কাছে। সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়া জায়গামতো ওত পাইতা থাকলাম। নদী পার হইয়া দোকলাখালীতে আসতে হইত, রাজাকারেরাও নৌকায় কইরা আসতে লাগল। পারে নৌকা ভিড়তে না ভিড়তেই আমরা আক্রমণ করলাম। সবার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলেও লাঠি-সড়কি, বৈঠা নিয়াই ঝাঁপায়া পড়লাম কোনো রকম তোয়াক্কা না করে। রাজাকারেরাও গোলাগুলি শুরু করল, গুলিতে ওরাই মারা পড়ল, লাঠির আঘাতেও কয়েকজন কুপোকাত হইছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ আমার মাথায় একটা লাঠির আঘাত লাগে। সাথে সাথে জ্ঞান হারাই ফালাই।’ এতটুকু বলে মাথা নিচু করে সেই দিনের আঘাতের চিহ্নটা দেখান তিনি। গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন। এখনো মাঝে মাঝে সেই আঘাতের ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বলে জানালেন আশ্রাব আলী। দেখালেন আরেকটা ক্ষতচিহ্ন, পায়ের গোড়ালিতে, গুলি লেগেছিল সেখানে। ‘সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের কথা সেটা, বাবনা গ্রামে একটা সম্মুখযুদ্ধে গুলিটা লাগছিল। এরপর দীর্ঘদিন ঘরে পইড়া থাকছি। এখন হাঁটতে কষ্ট হয়, ভর দিয়া হাঁটাহাঁটি করি। এরপর কাইটা গেছে সময়, আরও কতগুলো দুর্ধর্ষ যুদ্ধ শেষে আমাদের এলাকায় ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আসে স্বাধীনতা।
মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করছিলাম আমরা। মনে আছে, বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত রাইখা বলছিলেন,“শাবাশ! তোমরা দুরন্ত-বীর।” এরপর কাজ দেওয়ার আশ্বাসও পাইছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তা হইল না। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে ঢাকায় চইলা আসি কাজের খোঁজে। মেকানিকের কাজ শুরু করি। ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার যাচাই-বাছাই শুরু হয়। আমার নামও তালিকাভুক্ত হয়। এরপর ভাতাও পাইছিলাম, কিন্তু ২০০২ সাল থেকে সেই ভাতাটা বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে আমার নামটা তুলে দেওয়া হয়। নিজে এখন কাজ করতে পারি না। ঘরে তিন ছেলে, তাদের কোনো কর্মসংস্থানও করে দেয় নাই সরকার। কলোনিতে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছি। তবে অনেক চেষ্টা করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রমাণপত্রসহ আবারও নামটা তালিকায় ওঠানোর চেষ্টা করেছিল আমার ছেলেরা। নাম উঠলেও এখনো ভাতা পাই নাই। সরকার কি এই দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধার দিকে একবারও তাকাবে না?’ মুক্তিযোদ্ধা আশ্রাব আলী জমাদ্দারের এই প্রশ্ন আমাদেরও, আমাদের আশা, আশ্রাব আলীর প্রশ্নের যথাযথ উত্তর মিলবে শিগগিরই।

শিক্ষায় বৈষম্য রেখে পরীক্ষায় সাম্য by আবুল মোমেন

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের আনন্দোজ্জ্বল ছবি ছাপানো হয় সব কাগজে। পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদকেরা যথেষ্ট পরিশ্রম করে বিত্তহীন পরিবারের জপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকেন। এদের নামকরণ হয়েছে অদম্য প্রতিভা বা অদম্য মেধাবী। ফলাফল নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেও অলিখিত প্রতিযোগিতা আছে।
একসময় এসএসসির সমমানের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষাকে বাংলায় বলা হতো প্রবেশিকা পরীক্ষা। এ নামকরণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। সেকালের প্রবেশিকা বা আজকের এসএসসি পরীক্ষা হলো জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা, যেটা পাস করলে অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সনদ পাওয়া যায়। এর একটা স্বীকৃতি সমাজে এবং নানা কর্তৃপক্ষের কাছে মেলে। ফলে এটার জোরে জীবনে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে যায়, অতীতে ভালো চাকরিও জুটে যেত, আজকের দিনেও চাকরির বাজারে অন্যান্য সনদের মধ্যেও এটির রয়েছে স্বতন্ত্র গুরুত্ব।
আজকের এসএসসি ও এইচএসসি—এ উভয় পরীক্ষারই ভূমিকা বস্তুত প্রবেশিকা পরীক্ষার মতো, যদি আমরা এ নামকরণের মূল তাৎপর্য অনুধাবন করি। একজন মানুষের পরিণত জীবনের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে এ দুটি পরীক্ষা। এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করা যায় মূল জীবনে। বস্তুত, একজন মানুষের আসল পরীক্ষা শুরু হয় তার পর থেকে।
মানুষের আসল পরীক্ষা তো অঙ্কে-ইংরেজিতে, ভূগোলে-ইতিহাসে, সমাজে-ধর্মে কত নম্বর পেল তা নয়। মানুষের আসল পরীক্ষা হলো তার বিবেচনাশক্তি, ন্যায়-অন্যায় বোধ, বিচক্ষণতা, সম্প্রীতিবোধ, কর্মদক্ষতা, সংবেদনশীলতা ইত্যাদি মানবিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কতটা সে জীবনে ধারণ করে, লালন করে, পালন করে তার ওপর। স্কুলে-কলেজে পড়াশোনা-পরীক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এসব গুণ বিকাশের মাধ্যমে তাদের একেকজন যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠার কথা। আমাদের শিক্ষা কি সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে? যদি তাই হতো তাহলে এ দেশে মানুষের এমন আকাল হতো না। দুঃখ করে বলতে হতো না যে এ দেশে অনেক ভালো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-আমলা-শিক্ষক-রাজনীতিক আছেন বটে, কিন্তু ভালো মানুষের বড়ই অভাব।
এ দুটি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে যখন দেশজুড়ে এবং পত্রপত্রিকায় হইচই চলতে থাকে, তখন আমার মনে পড়ে যায় ইতালির এক স্কুলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখা একটি বইয়ের কথা। বইটির ইংরেজি নাম লেটার টু এ টিচার আর বাংলা নাম আপনাকে বলছি, স্যার...। ইতালির পাহাড়ি খনি অঞ্চলে অবস্থিত এ স্কুলের বেশির ভাগ ছাত্রই গরিব, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এবং অনেকেই শেষ পর্যন্ত পড়া চালিয়ে যেতে পারেনি, স্কুলে ও পরিবারে সর্বত্র গঞ্জনা আর লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। ওদের এই বঞ্চনা-গঞ্জনার জায়গা থেকে এই স্কুলের আটজন ছাত্র চিঠি লিখেছে শিক্ষকদের কাছে, যাঁরা কিনা ওদের প্রতি প্রয়োজনীয় সহানুভূতি ও ধৈর্য দেখাননি। এক জায়গায় ওরা বলছে, ‘পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার অজুহাতে মেধাহীন ছাত্র হিসেবে আমাদের স্কুল থেকে তাড়িয়ে দাও তোমরা। স্কুলে থাকবে শুধু যারা পড়া পারে, ভালো পারে তারা। ভাবো একবার, হাসপাতালগুলো বলছে যে “আমরা রোগী রাখব না, সুস্থ মানুষদেরই রাখব”।’
আমাদের অনেক বিখ্যাত স্কুল—বলা যায় প্রায় সব বিখ্যাত স্কুল—পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে অন্যদের টেক্কা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে নিম্নশ্রেণী থেকেই দুর্বল ছাত্রদের ছাঁটাই-প্রক্রিয়া চালিয়ে ক্রমান্বয়ে সুস্থ রোগীদের হাসপাতাল বা সবল ছাত্রদের স্কুলে পরিণত হয়। সুস্থ মানুষের হাসপাতাল যেমন হাস্যকর এবং অমানবিক ব্যাপার—এ ধরনের স্কুলগুলোও তো তাই।
আমাদের সংবিধান শিক্ষাকে সব শিশুর অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেই শিক্ষার মধ্যে কোনো বৈষম্য রাখার অবকাশ নেই। সবার জন্য একই শিক্ষা, অন্তত প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত, থাকার কথা। শিক্ষা যদি শিশুর অধিকার হয়ে থাকে এবং সেই শিক্ষা যদি সবার জন্য প্রাথমিক পর্যন্ত একই মানের হওয়ার কথা হয়—তাহলে গুরুতর কতকগুলো অসংগতি শিক্ষার গোড়া থেকেই কি তৈরি হচ্ছে না?
আমরা জানি, স্কুলের ভৌত কাঠামো, সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকের মান, ছাত্রবেতন ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে কত রকমের স্তর বিদ্যমান আমাদের শিক্ষাঙ্গনে। বরং বলা যায়, দেশের কোনো দুটি স্কুলের মধ্যে এই বুনিয়াদি বিষয়ে সমতা নেই। তারপর, বা তার ওপর, রয়েছে বাবা-মা ও পরিবারের আর্থিক ও ভৌত অসম বাস্তবতা। ফলে এ অসম বাস্তবতার ফলাফল তো অসম হতে বাধ্য। আমরা জানি, কোনো ধরনের প্রতিযোগিতার আগে সব প্রতিযোগীর জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়। আমাদের দুই রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে প্রায়ই আমরা লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড অর্থাৎ প্রতিযোগিতার ময়দানে সমতা রক্ষার দাবি উঠতে দেখি। অসম বাস্তবতার এ পাবলিক পরীক্ষা বস্তুত অন্যায় নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ক্যাডেট কলেজের একজন ছাত্রের জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৭৪ হাজার টাকা আর সরকারি হাইস্কুলের ছাত্রের জন্য সরকার ব্যয় করে দুই হাজার টাকা, বেসরকারি স্কুলে তা আরও কম। এই সামান্য তথ্যটি বিবেচনায় নিলে ক্যাডেট কলেজের জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রটির বিবেক কী বলবে? তার ফলাফল নিশ্চয় গৌরবের, কিন্তু যে বৈষম্যের ভিত্তির ওপর এ গৌরব রচিত হয়েছে তা কি লজ্জাজনক নয়? ক্যাডেট কলেজগুলোতে এবং ভিকারুন নিসা বা ইস্পাহানীর মতো ‘সবল’ স্কুলগুলোতে প্রতি শ্রেণীতে ক্রমান্বয়ে স্ক্রিনিং করেই কেবল সুস্থ মানুষদের অর্থাৎ ‘সবল ছাত্রদের’ সেবা দেওয়া হয়। স্কুলের জন্য এটা কতটা গৌরবের আর কতটা লজ্জার তা কি একবার ভাবব না?
‘সবার জন্য শিক্ষা’ স্লোগানটি বেশ পুরোনো, কিন্তু বারবার সময় পিছিয়েও তা অধরাই থেকে গেছে। বর্তমানে স্লোগানটি ঈষৎ পরিবর্তিত হয়ে ‘সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা’ হয়েছে। মানের তারতম্য কতটা তা স্কুলগুলোর সুযোগ-সুবিধা, স্কুলভিত্তিক ছাত্রপিছু বার্ষিক সরকারি বরাদ্দ এবং সর্বোপরি এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরিষ্কার বোঝা যায়। সুযোগ-সুবিধার অসমতা, বরাদ্দের অসাম্য, ফলাফলের বৈষম্য এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার বৈষম্য এর মূলে কাজ করছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা আমরা রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারব না, এমনকি বর্তমান ধারার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলতে থাকলে অদূরভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় না। পরিবারের এ অসম বাস্তবতার কারণে সবার জন্য সমান সুযোগ তথা প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষার জন্য লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড তৈরির দায়িত্ব তো সরকারকেই নিতে হবে। তবে সরকার সে দায়িত্ব নিতে এবং পালন করতে পারবে যদি সমাজের সচেতন অংশ থেকে এ ব্যাপারে চাপ তৈরি হয়। সমাজের সচেতন মানুষেরা যদি নিজেরাই এই অসম ব্যবস্থার বিষম ফল নিয়ে মেতে ওঠে তবে সরকার বাস্তবতার পরিবর্তনে কাজ করার প্রণোদনাও পাবে না, চাপও অনুভব করবে না।
এখানে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাইব যে, এসএসসি ও এইচএসসি বাস্তবেই আধুনিক মানবজীবনের প্রবেশিকা পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই জীবনের মূল পর্বে প্রবেশ করা যাবে, যেখানে প্রতিটি মানুষকে জীবনযাপনের সূত্রে নানা রকমের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। সেসব পরীক্ষায় পাস করার ওপর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে। এখন দেখা যাচ্ছে, কিশোর বয়সী ছাত্র সফল, বড় হয়ে পেশাগত বা বস্তুগত মানদণ্ডে ব্যক্তি হিসেবে তার সাফল্যও কম নয়, কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র কেবলই ব্যর্থ হচ্ছে, অবক্ষয় ঠেকানো যাচ্ছে না। দুর্নীতি, অপরাধ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে, এমনকি বিভিন্ন পেশাগত দায়িত্বেও দেখা যাচ্ছে, মানের অবনতি ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নত বিশ্বের সঙ্গে মানের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে শিক্ষকের মানের অধোগতি বুঝতে অসুবিধা হয় না। স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের মান নেমে গেছে, শিক্ষকতার মান নেমেছে। এই যদি বাস্তবতা হয় তাহলে শিক্ষায় অগ্রগতি কীভাবে ঘটবে? পরিসংখ্যানে সংখ্যাগত যে উন্নয়ন আমরা দেখি তাতে শিক্ষার ব্যবহারিক ও আদর্শিক মান যাচাই হয় না সব সময়। এসব বিষয়ে অসচেতন থেকে সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিছক একটি বুলিতেই পরিণত হবে।
এ অবস্থায় আমাদের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? বর্তমান এ অসাম্যের বাস্তবতায় গা না ভাসিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। এখনই আমরা সব স্কুলকে একই মানে আনতে পারব না। প্রথম ধাপটি হবে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। এ জন্য ভবন, মানে ও সংখ্যায় শিক্ষক এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পরিকল্পিতভাবে আদর্শ অবস্থায় নিতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগগুলোকেও ন্যূনতম একই চাহিদা পূরণ করতে হবে।
প্রাক-প্রাথমিকসহ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকছে নয়টি শ্রেণী। এ ধরনের একটি আদর্শ স্কুলে শ্রেণীপ্রতি কত ছাত্র, স্কুলের সর্বমোট কত ছাত্র, ৩০ জন ছাত্রপিছু একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকমণ্ডলী, মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার মতো বেতন-ভাতা, গ্রন্থাগার, উন্নত ও সুমুদ্রিত পাঠ্যবই, বিজ্ঞানকিট, মাঠ (কয়েকটি স্কুল মিলে হতে পারে), দারোয়ান-মালি-আয়াসহ সহযোগী কর্মী ইত্যাদি এবং ক্লাসসংখ্যা, পরীক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ বছরের একটি কর্মপরিকল্পনার ছক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া থাকবে। এভাবে সরকারও স্কুল চালাবে আর বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও ন্যূনতম এ শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।
এভাবেই হয়তো আমরা শিক্ষার এক নতুন যুগে পদার্পণ করতে পারব।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

৫০ বছর পর আবার কেন গোল্ডেন রাইস by পাভেল পার্থ

বাংলাদেশসহ দুনিয়ার নানা প্রান্তে চরম ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, খাদ্যহীনতা আর খাদ্যসংকটের ভেতর আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইরি) নির্লজ্জভাবে পাড়ি দিচ্ছে ‘সাফল্যময় ৫০ বছর’। আর এই সময়টাতে ক্ষুধার বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘শান্তির যুদ্ধ’ দেখতে দেখতে দুনিয়া কাহিল। এসব বিপ্লব আর শান্তির মানে বুঝতে অসুবিধা হয় না। এ কেবল দখল, বাণিজ্য বিস্তার আর ক্ষমতার ইতিহাস। ইরির মহাপরিচালক রবার্ট এস জিগলার প্রতিষ্ঠানটির ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশে ইরির আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা ও অতীতের অর্জন নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। ১৬ জুলাই প্রকাশিত জিগলারের আলোচনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা জরুরি মনে করছি। কেননা, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত বাংলাদেশের কৃষি ও জুম পরিসরের জীবন-মরণের গতি ও ঠিকানা।
পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ইরির তথাকথিত উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানজাত প্রকল্পগুলোর প্রসঙ্গ টেনেছেন জিগলার। কিন্তু চরম খাদ্যসংকটে টালমাটাল পৃথিবীর খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কোনোভাবেই উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার, বিষ ও সেচ গ্রহণশীল উফশী ধানের ফলন বৃদ্ধি যে সমাধান নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের বাংলাদেশেই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের থেকে চলতি সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু ধান উৎপাদন বেড়েছে আড়াই গুণ। তবু কেন বাংলাদেশে খাদ্যসংকট? ‘খাদ্য’ আপাদমস্তক এক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপার। খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই খাদ্যসংকট কমে না বা খাদ্যের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উৎপাদন-সম্পর্ক, নিয়ন্ত্রণ, বাজার এবং বণ্টন ব্যবস্থাপনার রাজনীতি। ইরির মতো আন্তর্জাতিক কৃষিবিষয়ক গবেষণা এজেন্সিগুলো গড়ে তোলার পেছনে আছে ক্ষমতাধর বিশ্ব-রাজনীতি, যা বরাবর ক্ষুধার বিরুদ্ধে সবুজ বিপ্লব আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির যুদ্ধের কথা বলে নিপীড়িত দুনিয়ায় নানা সময়ে নানা কৃষি-প্রকল্প নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ইরির পরামর্শ ও সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লবের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাস ও কৃষি-মনস্তত্ত্ব বদলে যেতে বাধ্য হয়েছে। খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থাপনার সব রাজনীতিকে আড়াল করে কেবল ‘অধিক ফসল’ ফলানোর নাম করে দেশের ভিন্ন ভিন্ন কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলের জলবায়ুসহিষ্ণু ধানজাতের বৈচিত্র্যকে হত্যা করা হয়েছে। উফশী ফসল চাষের নামে বাংলাদেশের মাটিতেও টেনে আনা হয়েছে করপোরেট সার-বিষ আর পানির অনিবার্য বাণিজ্য। আজ বাংলাদেশের কৃষক কেবল ধানই ফলাচ্ছেন না, তাঁর রক্ত-ঘামেই টিকে আছে সিনজেন্টা, মনসান্টো, ডুপন্ট, কারগিল, বায়ার ক্রপ সায়েন্সের মতো করপোরেট কোম্পানির মুনাফার মেদ। কৃষক-জুমিয়া উদ্ভাবিত ও নিরন্তর বিকাশমান জাতগুলোর ভেতর কিছু ‘অদলবদল’ ঘটিয়ে ইরি-প্রবর্তিত ধানগুলোকেই ‘আধুনিক’ নাম দেওয়া হয়েছে। ইরির কৃষিবিষয়ক গবেষণা ও বাণিজ্যে রাষ্ট্রীয় ও জনবরাদ্দ কমে যাওয়ায় ইরি দিনে দিনে করপোরেট কোম্পানি-নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। ২০০৭ সালে ইরি ‘হাইব্রিড ধান গবেষণা কনসোর্টিয়াম’ গঠন করে এবং বার্ষিক ফির মাধ্যমে ইরিতে সংরক্ষিত জাতগুলোকে করপোরেট কোম্পানির গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।
ইরি পরিচালিত তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের ফলেই বাংলাদেশসহ এশিয়ায় বাদামি ঘাসফড়িংসহ ধানের নিত্যনতুন রোগবালাই দেখা দিয়েছে। সবুজ বিপ্লব ধানসহ শস্য ফসলের বৈচিত্র্য কমিয়ে দেশের কৃষি ও জুম-জীবনকে ঠেলে দিয়েছে বৈচিত্র্যহীন ‘একক চাষের’ দিকে। ইরির গরিষ্ঠভাগ গবেষণাই বিজ্ঞানীকেন্দ্রিক এবং যেখানে মূলত ব্যবহূত হয়েছে হাজার বছর ধরে কৃষক-জুমিয়া উদ্ভাবিত স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ধানের এক বিশাল ভান্ডার। ইরি এখনো পর্যন্ত কৃষিকে কৃষকের ঐতিহাসিক বিজ্ঞান ও যাপিত জীবনের ইতিহাস থেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেনি।
জিগলার তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) জিনব্যাংকে রক্ষিত দেশীয় ধানজাতের ‘জিন মানচিত্র’ বের করে তা নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণে ইরির সহযোগিতার কথা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এখানেই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে দেশের জিনসম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল ও রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। এভাবে নানা অছিলায় গবেষণা আর কৃষি উন্নয়নের নামেই আমরা যথেষ্ট পরিমাণে জাত ও জাতের ওপর কৃষকের অধিকার হারিয়েছি।
বাংলাদেশে ‘গোল্ডেন রাইস’ নিয়ে আসাকেই ইরির সামনের দিনের বড় পরিকল্পনা বলে উল্লেখ করেছেন জিগলার। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের গরিব মানুষের ভিটামিন-এর চাহিদা পূরণের জন্যই গোল্ডেন রাইস নিয়ে আসা হবে। কিন্তু ৫০ বছর ধরে উফশী ও হাইব্রিড বীজের মাধ্যমে দেশের কৃষিকে জখম করে কেন আবার গোল্ডেন রাইসের মতো ‘জেনিটিক্যালি ইনজিনিয়ার্ড’ ধানজাত আনতে হবে ইরিকে?
প্রকৃতিতে ও কৃষকের চাষের ভেতর দিয়ে প্রতিটি ধানজাতেরই নিরন্তর পরিবর্তন, বিকাশ ও নিজস্ব কায়দায় রূপান্তর ঘটে চলেছে। প্রতিটি ধানেরই একটি নিজস্ব জিন-স্বরলিপি আছে, প্রতিটি জাতই তার চারপাশের বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে গড়ে তুলেছে এক জটিল প্রতিবেশীয় মিতালি। যখন সে রকম একটি জাতে জোর করে একটি ভিন্ন জিন ঢুকিয়ে গোল্ডেন রাইস নামে তাকে প্রাকৃতিক কৃষি-বাস্তুসংস্থানে ছাড়া হবে তখন সেই জাত স্থানীয় বাস্তুসংস্থানে ‘জৈব-বিশৃঙ্খলা’ তৈরি করবে। গোল্ডেন রাইসের জিন-স্বরলিপি পাঠ করার জন্য বাংলাদেশের ত্রিশটি কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল প্রস্তুত নয়। আমরা গোল্ডেন রাইস চাই না। কারণ জেনিটিক্যালি ইনজিনিয়ার্ড ফসলের স্বাস্থ্য, প্রতিবেশ ও কৃষি-অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব তৈরির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গোল্ডেন রাইস চাষের জন্য আবারও প্রয়োজন হবে কৃত্রিম সেচ, রাসায়নিক সার ও নিত্যনতুন বিষ। এটি আমাদের মাটি ও পানিকে আবারও রাসায়নিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করবে।
২০০০ সাল থেকে ইরি দুনিয়ার বড় বড় করপোরেট কোম্পানির সঙ্গে মিলে জেনিটিক্যালি ইনজিনিয়ার্ড (জিই) বা জিনপ্রযুক্তিতে বিকৃত জাত গবেষণা নিয়ে নয়া বীজ-রাজনীতি শুরু করেছে। বাংলাদেশে ব্রি-ধান ২৯ নিয়ে গোল্ডেন রাইসের ওপর গবেষণা করছে ব্রি। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সবুজ বিপ্লবের ধাক্কা প্রথম দিকে ধরতে না পারলেও, বাংলাদেশের জনগণ এতটা ‘দিন বা রাতকানা’ নয় যে গোল্ডেন রাইসের মাধ্যমে করপোরেট বীজ-বাণিজ্য বিস্তারকে ধরতে পারবে না। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে কেবল কুড়িয়ে পাওয়া শাকের মাধ্যমেই ঐতিহাসিকভাবে ভিটামিন এ-এর চাহিদা পূরণ করে গ্রামীণ জনগণ। জিগলার যদি বাংলাদেশের জমিগুলোতে সিনজেন্টা, মনসান্টো ও বায়ারের মতো করপোরেট কোম্পানির ‘ঘাস মারার বিষ (হার্বিসাইড)’ বাণিজ্যকে বন্ধ করতে পারেন, তবে গ্রামীণ জনগণ নিজেরাই নিজেদের ভিটামিন ঘাটতি পূরণ করতে পারবে।
জিগলার জিই, জিএমও এবং হাইব্রিডকে পরিবেশবান্ধব বলেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে, কৃষক ও জুমিয়ারাই ভিন্ন জলবায়ু ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে বৈচিত্র্যময় শস্য ফসলের বীজকে আবাদি জাতে পরিণত করেছিলেন। আসুন, কৃষক-জুমিয়ার সেই জিনসম্পদকে আপন শক্তি ও মহিমায় বিকশিত হতে সবাই সহযোগিতা করি।
পঞ্চাশ বছর যথেষ্ট সময়। উফশী ও হাইব্রিডের পর আর কোনো ভোগান্তি বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণ ইরির কাছ থেকে প্রত্যাশা করে না। বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের লড়াকু ইতিহাস নিজেদের ‘অনুন্নত’ বীজবৈচিত্র্য দিয়েই তথাকথিত ‘আধুনিক’ গোল্ডেন রাইসের নয়া বীজ উপনিবেশ রুখতে প্রস্তুত।
পাভেল পার্থ: প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক।
animistbangla@yahoo.com

উপেক্ষিত কাশ্মীর by তারিক আলি

এক কাশ্মীরি উকিল সেদিন উত্তেজিত হয়ে আমাকে ফোন করে বললেন, কাশ্মীরের সাম্প্রতিক দুঃখজনক ঘটনাগুলো আমি জানি কি না। আমি জানতাম না। তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যমে গত তিন সপ্তাহে এ নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। একমাত্র খবরটি প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান। ভারতের এক এক মডেলের আত্মহত্যা নিয়ে অর্ধপৃষ্ঠাজুড়ে খবর। অথচ সেই সময়েই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী ১১ জন কাশ্মীরি তরুণ নিহত হয়েছে। গত ২৮ জুন নিউইয়র্ক টাইমস-এ ছোট্ট একটি সংবাদ প্রকাশিত হলেও তার কোনো ফলোআপ পরে আর দেখিনি। মনে হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপরাধকে পশ্চিমারা ততটা গুরুত্ব দেয় না। ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে যদিও কিছু ছাপা হয়, তাও আরেকটি ‘মুসলিম ঝামেলা’ বলে গণ্য হয়। আর ভারতীয় বাহিনীগুলোর অপকর্মকে দেখা হয় দায়িত্ব পালন হিসেবে। পশ্চিমা গণমাধ্যমে কাশ্মীরের এতগুলো মৃত্যুর উপেক্ষা থেকে মনে হয়, এ ঘটনা তিব্বত বা তেহরানে ঘটলে দুনিয়াব্যাপী হুলুস্থূল লেগে যেত।
কাশ্মীরিদের ওপর নৃশংস দমন-পীড়নের সংবাদ ভারতীয় গণমাধ্যমেও তেমন একটা আসে না। অথচ এ মুহূর্তে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরসহ কয়েকটি শহরে কঠোর সেনা কারফিউ চলছে। অল্প সময়ের জন্য তা শিথিল হওয়ামাত্রই দলে দলে তরুণ রাস্তায় নেমে টিয়ারগ্যাস মোকাবিলা করেন। তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়জুড়ে কাশ্মীরের বেশির ভাগ এলাকায় সর্বাত্মক ধর্মঘট চলছে।
ভারতে সহিংসতার সঙ্গী হলো জঘন্য মুসলিম-বিদ্বেষ। টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর মুসলমানদের গালি দেওয়া যেন জায়েজ হয়ে গেছে। কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এখন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নিশানার অধীন। এরই অংশ হিসেবে ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তারা কাশ্মীরে ভারতীয় সেনা ঘাঁটি পরিদর্শন করে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যকলাপের শিক্ষা দিয়ে আসছেন। ইন্ডিয়া ডিফেন্স ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে, ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল আভি মিজরাহি অনির্ধারিত সফরে কাশ্মীরের ভারতীয় সেনাবাহিনীকে হাতে-কলমে ইসলামী বিদ্রোহ দমনের কলাকৌশল বিষয়ে ধারণা দেন। ভারতে থাকার তিন দিন সময়ে মিজরাহি ঊর্ধ্বতন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দ্বারা ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী কমান্ডোদের প্রশিক্ষণের খসড়া নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের সোজাসাপটা পরামর্শ হলো, আমরা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যা করছি, তোমরাও কাশ্মীরিদের সঙ্গে সেটাই করো। ২০০২-০৮ পর্যন্ত ইসরায়েলের কাছ থেকে ভারত পাঁচ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে।
এ বছরের জুন মাসে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের হাতে তিন কাশ্মীরি নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হলে সেখানকার ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। তারা প্রথমে দাবি করেছিল, নিহত ব্যক্তিরা সবাই জঙ্গি। কিন্তু পরে স্থানীয় পুলিশের ভাষ্যে এই দাবি বানোয়াট বলে প্রমাণিত হয়।
২০০৮ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়ে বলেছিল, ১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে দমন-পীড়ন, হত্যা, অপহরণের ঘটনা ঘটলেও কেউ নজর দিচ্ছে না। তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত করার আহ্বান জানায়। বেআইনিভাবে হত্যার শিকারদের দেহাবশেষ পাওয়া যাচ্ছে গণকবরগুলোতে। কেবল উরি জেলার ১৮টি গ্রামের গণকবরে ৯৪০ ব্যক্তির দেহাবশেষ মিলেছে। আইপিটিকে নামের এক স্থানীয় এনজিও জানিয়েছে, কাশ্মীরে প্রতিদিনই বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তাহলেও পাশ্চাত্যের সংস্থাগুলো নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ভয়ে এ নিয়ে টুঁ শব্দটিও করছে না। আইপিটিকের দেওয়া পরিসংখ্যান দেখলে হতভম্ব হয়ে যেতে হয়। তাদের দাবি, ১৯৮৯-২০০৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলদারিত্বের ফসল হলো ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু। এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দখল কায়েম রাখার প্রক্রিয়ারই অংশ। সেনাবাহিনীর ভেতরে এসব হত্যাকাণ্ডকে ‘কর্তব্য পালন’ বলে বিবেচনা করা হয় এবং এ ধরনের হত্যকাণ্ডের জন্য তাদের আর্থিক পুরস্কার ও পদোন্নতির বিধানও রয়েছে। কাশ্মীরে এখন প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় সেনাসদস্য নিয়োজিত আছেন। ইরাক ও আফগানিস্তান মিলিয়েও এত ন্যাটো সেনা সদস্যের উপস্থিতি নেই। আন্দোলন দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই সেনা সদস্যদের কোনো কাজের জন্য কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। তাঁরা পরিপূর্ণ দায়মুক্তি উপভোগ করছেন।
ভারতের জনমতও এ বিষয়ে নির্বাক। বামপন্থীরাও তাঁদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেন না। কাশ্মীর হলো এক নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান, কার সঙ্গে থাকবে—সে বিষয়ে গণভোট হতে দেওয়া হয়নি। ১৯৮৪ সালে আমি তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময়কার সুবর্ণ সুযোগ (যখন কাশ্মীরিরা দেখছিল কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে তাদের ধর্মেরই লোকদের সঙ্গে কী নৃশংসতা চালাচ্ছে) তিনি কেন কাজে লাগাননি? সে সময় গণভোট হলে তো কাশ্মীরিরা পাকিস্তানের বিপক্ষেই ভোট দিত। ইন্দিরা এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না। আমি বললাম, এমনকি কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহও মনে করতেন, তাতে ভারতই জয়ী হতো। এ কথায় তাঁর মুখ কালো হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘আমি তাঁকে একদম বিশ্বাস করি না।’ ইন্দিরা তাঁর পিতা জওহরলাল নেহরুর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কাশ্মীরিদের তাদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ না দেওয়ার ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন।
আবদুল্লাহ পরিবারই রাজতান্ত্রিক কায়দায় কাশ্মীরের ক্ষমতায় বসে দিল্লির দালালি করে লাভবান হচ্ছে। কাশ্মীরের এক সাংবাদিক বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সম্পর্কে বলেন, ‘দুর্নীতির বিচারে তিনি হলেন আমাদের জারদারি (পাকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট)। ছেলেকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে তিনি এখন তাঁর বিভিন্ন রকম ব্যবসা দেখাশোনায় ব্যস্ত। ওদিকে বিরোধী দলের প্রধান নেতা একসঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের হয়ে কাজ করে আখের গোছাচ্ছেন। তিনি হলেন কাশ্মীরের স্বঘোষিত আধ্যাত্মিক নেতা। ভারতের দেওয়া প্রহরীরা তাঁর বাড়ি পাহারা দেয়। কোনো রোজগার না থাকলেও তাঁর পরিবার বিলাসিতার মধ্যে দিন কাটায়। গোপনে তিনি ভারতের সঙ্গে আলাপ চালান এবং প্রায়ই সেই সংবাদ ফাঁস হয়ে যায়। আবার প্রতিবছর একবার ধর্মীয় সফরে পাকিস্তানে গিয়ে সেদিকের লাইনঘাটও ঠিক রাখেন। ভারত তাই আমাদের আন্দোলনকে ভয় পায় না। কারণ তারা জানে, আমাদের নেতারা বেঈমান। এটাই হলো ভারতের সুবিধা।’
জারদারির সরকারও কাশ্মীর নিয়ে চুপচাপ। পাকিস্তানের গণমাধ্যমও সাম্প্রতিক হত্যকাণ্ডগুলো নিয়ে তেমন সোচ্চার নয়। পাকিস্তানের শাসকশ্রেণীর কাছে কাশ্মীর হলো ভারতের সঙ্গে দরকষাকষির বিষয়। তাদের মনোভাব এমন: ‘আমাদের আফগানিস্তান দাও, তোমরা কাশ্মীর নাও’। জারদারি হলেন একমাত্র পাকিস্তানি নেতা, ভারতীয় কাশ্মীরে যাঁর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে। পাকিস্তানি নেতৃত্ব ও মন্ত্রীদের কাশ্মীরের মুক্তির থেকে বেশি আগ্রহ ব্যবসায়িক লেনাদেনায়। এ অবস্থা ওয়াশিংটনেরও মনঃপুত। ভারত এখন তাদের প্রধানতম মিত্র। কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অনীহায় প্রমাণ হয়, কাশ্মীরের বর্তমান অসন্তোষের পেছনে পাকিস্তানের হাত থাকার অভিযোগ ভিত্তিহীন। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পরে পাকিস্তান কাশ্মীরে যে জেহাদি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, ৯/১১ ঘটনার পরপর তা ভেঙে দেওয়া হয়। কাবুলে বিজয়লাভের সুবাদে পাকিস্তান ভেবেছিল, একই কৌশলে তারা কাশ্মীরেও জয়ী হবে। কিন্তু তাদের পাঠানো জঙ্গি তৎপরতা বরং কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষতিই করেছে। অন্যদিকে, নেতৃত্বের আপসকামিতায় হতাশ কিছু যুবকও চরমপন্থার আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের পথ ছিল ভুল।
২০০৮ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় রাজনীতিবিদেরা যখন দিল্লির লাল কিল্লায় স্বাধীনতা দিবস পালন করছিলেন, সে সময় কাশ্মীরে গণঅসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। লাখো মানুষ সেদিন শান্তিপূর্ণভাবে শ্রীনগরের জাতিসংঘের দপ্তরের দিকে মিছিল করে যায়। তারা কুশপুত্তলিকা পোড়াতে পোড়াতে স্লোগান দেয়, ‘আজাদি, আজাদি’। তাদের দাবি, ভারত কাশ্মীর ছেড়ে যাক। সেই আন্দোলন দমন না করে বরং উপেক্ষা করা হয়েছিল। এখন তরুণ প্রজন্ম আবার আজাদির দাবিতে মিছিল করছে। তারা লড়াই করছে ফিলিস্তিনি তরুণদের মতো হাতে পাথর নিয়ে। অনেকেই মৃত্যুর ভয় অতিক্রম করেছে এবং তারা আত্মসমর্পণও করবে না। স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা তাদের উপেক্ষা করছেন, পাকিস্তান তাদের ত্যাগ করেছে। কিন্তু ভারতীয় সেনা সদস্যরা যতই শ্রীনগরের রাস্তায় অস্ত্র হাতে কুচকাওয়াজ করুন না কেন, এই চেতনা তাদের নিজস্ব এবং শিগগিরই তা স্তিমিত হবে না।
লন্ডন রিভিউ অব বুকস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ।
তারিক আলি: পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক ও বুদ্ধিজীবী।

১৯৭২-এর মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া কেন প্রয়োজন by সৈয়দ বদরুল আহ্সান

বাংলাদেশের মানুষের যথেষ্ট নৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার জন্য। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং জাতিকে আশ্বাস দিয়েছে যে রাষ্ট্র কীভাবে আবার মূল সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হতে পারে এবং সে ব্যাপারে কাজ চলছে। এতে আমরা সবাই আশান্বিত হয়েছি এবং আমাদের ভাবার সময় এসেছে যে যেসব কারণ এবং যুক্তির ওপর ভিত্তির ওপর নির্ভর করে আমরা ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাচ্ছি, সেসব কারণ ও যুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। মোট কথা, ক্ষমতাসীন দল এবং আপামর সিভিল সমাজের ওপর আজ এই দায়িত্ব বর্তায় যে তারা যেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কথা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরে। এই কাজটি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে এ কারণে যে ১৯৭২-এর বিরোধীরা ইতিমধ্যে তাদের সেই পুরোনো খেলায় মেতে উঠেছে। দেশে ইসলামের অবস্থান কী হবে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে কি থাকবে না ইত্যাদি বিষয়ে এই শ্রেণীর দল ও ব্যক্তি যে বড় ক্ষতি সাধন করতে পারে এবং আমাদের আবার অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে, সেই বিষয়ে বোধকরি আমাদের কারোর কোনো সন্দেহ নেই।
আমরা কেন ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তর একটিই এবং অতি সহজ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা সবাই সংগ্রাম করেছি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে হলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জাতির জন্য এটা অত্যন্ত পীড়াদায়ক ব্যাপার যে সেই ১৯৭০-এর দশকের গোড়াতেই আমরা ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার ওপর আঘাত এনেছিলাম। সংবিধানের লক্ষ্য ছিল দেশে পুরোপুরিভাবে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের প্রথম সাড়ে তিন বছর অতিবাহিত হয়। হ্যাঁ, দেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি স্থানে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি জাতি স্বাধীন হলে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সেই ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের বাঙালিদের জীবনে আমরা অর্জন করেছি। কিন্তু আমাদের আনন্দের এবং আশার বিষয় ছিল যে আমরা এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছিলাম ১৯৭২-এর সংবিধানের দ্বারা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সঙ্গে যাঁরা এই সংবিধান রচনা করেন এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা যে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেন, তাতে করে আমাদের রাজনীতি পূর্ণতা লাভ করেছিল। আজ এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পর আমাদের সবার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন—আমরা কোথায় ভুল করেছিলাম? ভুল যে আমরা করেছিলাম সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল না করলে কি আজ যে নতুন সংগ্রামে আমরা জাতিগতভাবে লিপ্ত, সেই সংগ্রামের প্রয়োজন হতো? এবং সর্বপ্রথম যে ভুলটা আমরা করেছি সেটা ছিল সংবিধানে ১৯৭৫ সালের গোড়াতে চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে আসা। আমরা যতভাবেই আজ ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি না কেন, তখনকার পরিস্থিতিতে ওই পদক্ষেপের খুবই প্রয়োজন ছিল কি? এই সত্য কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই চতুর্থ সংশোধনী ১৯৭২-এর সংবিধানের ওপর একটি অতর্কিত আঘাত ছিল এবং সেই আঘাতের সদ্ব্যবহার করেছেন ওই সব সামরিক ও বেসামরিক শাসক, যাঁরা বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছেন সেই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে। জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু চতুর্থ সংশোধনীর দিকে অগ্রসর না হলে আমাদের সবারই মঙ্গল হতো।
সংবিধানের পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সবারই জানা আছে। সেই ইতিহাস আবার তুলে ধরার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবে আমাদের এই সত্যটি মনে রাখতে হবে যে যদিও চতুর্থ সংশোধনী একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল, তার পর যে আক্রমণগুলো সংবিধানের ওপর করা হয়েছে সেগুলো ছিল আমাদের মূল চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত। আজ জেনারেল জিয়াউর রহমানের পক্ষের লোকেরা তাঁর সমর্থনে অনেক কথাই বলে থাকেন, যে কথার কোনো অর্থ হয় না। এবং হয় না এ কারণে যে সামরিক শাসকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তিনিই সর্বপ্রথম মূল সংবিধানের চেতনার ওপর আঘাত করেন। এই কাজটি তাঁর এখতিয়ারের বাইরে ছিল। তিনি যেভাবে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে কলমের খোঁচায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন, তা ছিল গর্হিত অপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। আমাদের বাংলাদেশের সমাজ যদি সভ্য সমাজ হতো, সচেতন সমাজ হতো, তাহলে এই সংবিধানবিরোধী কাজের জন্য জিয়া এবং ওই সব রাজনীতিবিদ যাঁরা তাঁর এই কার্যকলাপগুলো সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাত। আমাদের সবাইকে লজ্জিত হতে হয় যখন শুনি যে এখনো একশ্রেণীর রাজনীতিক দেশে আছেন, যাঁরা পঞ্চম সংশোধনীর পক্ষে কথা বলেন। যেখানে তাঁদের অনুতপ্ত হওয়ার কথা সেই সংশোধনী সমর্থন করার জন্য সেখানে তাঁরা সেই অগণতান্ত্রিক কাজটির পক্ষে এখনো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।
সংবিধানবিরোধী কাজ শুধু জিয়াই করেননি। আমাদের ভুলতে অসুবিধা হয় যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কত সহজভাবে গোটা জাতির ওপর ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বলে চাপিয়ে দিলেন। যে দেশের মানুষ বেশির ভাগই মুসলমান এবং যুগ যুগ ধরে ইসলামী বিধান পালন করে এসেছে, সেই মানুষকে এরশাদ তাঁর সংকীর্ণ স্বার্থে বলার চেষ্টা করলেন রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম থাকলে তাঁরা আরও ভালো মুসলমান হবেন। এর ফলে যা হয়েছে তা ১৯৭১ সালে আমাদের কাম্য ছিল না। যদি আপনি একযোগে জিয়া, এরশাদ ও বাংলাদেশ জাতীয়দাবাদী দলের রাজনীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন, তাহলে আপনার বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না যে এই সব কিছুর মূলে ছিল বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা, যে রাষ্ট্রে কেবল মুসলমান সম্প্রদায়ই প্রাধান্য লাভ করবে। ওই যে তথাকথিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিষয়টি রয়েছে, সেটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেই ১৯৪০-এর মুসলিম লীগ প্রবর্তিত দ্বিজাতির তত্ত্বের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। যে ১৯৭২-এর সংবিধানে আমরা যথার্থ কারণেই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছিলাম, সেই সত্যের বিরুদ্ধে একটি বড় মিথ্যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের দুঃখ একটাই—আমরা বাঙালি ১৯৭১-এ পাকিস্তান এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছি। কিন্তু এত বিশাল একটি বিজয় আমাদের হাতছাড়া হলো এবং এই বাংলাদেশটাকে একটি ছোট পাকিস্তানে পরিণত করা হলো। জিয়া-এরশাদ-বেগম জিয়া অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে থাকেন। তাঁদের অথবা তাঁদের সমর্থকদের কি একবারও মনে থাকে না সেই ‘জয়বাংলা’র কথা? দেশটা যে সব বাঙালির জন্য এবং এই দেশে যে সব সম্প্রদায়ের মানুষ, সব গোত্রের মানুষ বসবাস করে—এই কথা তাঁদের মেনে নিতে এত কষ্ট কেন হয়?
১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাসকে পুনরায় ফিরে পাওয়া। কেবল ১৯৭২-এর মূল সংবিধানের মধ্য দিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনর্জাগ্রত করতে পারব, আমাদের মনের মধ্যে আমাদের প্রাণের গভীরে। এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে আমাদের শেকড়ে ফিরে যাওয়া এবং সেটা সম্ভব ওই ১৯৭২-এর সংবিধানকে পুনর্বহালের মধ্য দিয়েই। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার। ১৯৭২-এর সংবিধানে এই দেশে যেসব অবাঙালি জাতি ও গোত্র বসবাস করে—যেমন চাকমা, ম্রো, মারমা, সাঁওতাল ইত্যাদি; তাদের কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সেই ভুলটি সংশোধন করা আমাদের সবার দায়িত্ব—আদিবাসী জনগণ তাদের সংস্কৃতি, তাদের ভাষা, তাদের ঐতিহ্য তাদের নিজ আবাসভূমিতে সাংবিধানিকভাবে বজায় রাখবে, তুলে ধরবে—এই বিষয়টি সংবিধানে নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আমরা যেন বাঙালির চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলতে গিয়ে আদিবাসী জনগণকে আবার অবহেলা না করি, আবার ভুলে না যাই।
ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে হবে। ১৯৭২-এর মূল সংবিধান সেই ইতিহাসের কথাই বলে।
সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক।

রাজনৈতিক কর্মসূচি - সবার কাছে সংযত আচরণই কাম্য

সরকার ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে আস্থার অভাবটি সাম্প্রতিক কালে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। প্রায় সব বিষয়ে উভয় পক্ষের অবস্থান বিপরীতমুখী। সরকারের যেকোনো উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখে বিরোধী দল, আবার বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত করছে সরকার। সরকারের অনুমতি পাওয়া যায়নি—এই অজুহাতে ২৫ জুলাই পল্টন ময়দানে আহূত গণ-অনশন কর্মসূচি স্থগিত করেছে বিএনপি। এর পরিবর্তে দলটি ওই দিন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও তাদের মনোভাব ইতিবাচক নয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনজীবনের শান্তিশৃঙ্খলা ব্যাহত করে না এমন কর্মসূচি পালনে বাধা থাকা উচিত নয়। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেসব কারণ দেখিয়ে বিরোধী দলের কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে দেখা যায়।
আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কারও রাজপথ দখলে রাখার মানসিকতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। জাতীয় সংসদই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। বিরোধী দল যে কথাগুলো সংবাদ সম্মেলন কিংবা সমাবেশ করে জনগণকে জানাতে চায়, সে কথাগুলো সংসদে গিয়ে বলতে আপত্তি কোথায়? বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেছেন, তাঁদের সংসদে নিতে স্পিকার বা সরকারি দলের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিরোধী দলকে সংসদে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে নিতে হবে কেন? সংসদে যাওয়ার জন্যই জনগণ ভোট দিয়ে তাদের সংসদে পাঠিয়েছে। সরকারি দল কথা বলতে না দিলে তার প্রতিবাদও জানাতে হবে সংসদে। আবার সংসদে গেলে তারা বাইরে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না, তাও ঠিক নয়। নিয়মতান্ত্রিক যেকোনো কর্মসূচি পালনের অধিকার বিরোধী দলের আছে।
অতএব, বিএনপির পরিবর্তিত কর্মসূচিতে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দেবে না বলেই প্রত্যাশিত। কোনো কর্মসূচি নির্বিঘ্নে পালিত হলে নতুন কর্মসূচি পালনের যুক্তি থাকে না, কিন্তু তাতে বাধা এলে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়। একই সঙ্গে কর্মসূচি পালনের নামে দলীয় কর্মীরা যাতে কোনো রকম উচ্ছৃঙ্খল আচরণ না করেন, সে নিশ্চয়তাও বিএনপির নেতৃত্বকে দিতে হবে। অতীতে এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ কম হয়নি। কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উসকানি, কখনো দলীয় কর্মীদের বাড়াবাড়ি পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। ভবিষ্যতে উভয় পক্ষ সংযত ও সহিষ্ণু আচরণ করবে বলেই প্রত্যাশা।

মূল্যস্ফীতি প্রশমনে মুদ্রানীতি - সরবরাহের দিকে সরকারের মনোযোগ জরুরি

বাজারে অর্থের জোগান কমিয়ে মূল্যস্ফীতিতে লাগাম টেনে ধরতে হবে—মোটা দাগে অর্থনীতির পরিভাষায় এটাই মুদ্রানীতির করণীয়। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি সপ্তাহে যে ষাণ্মাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তাতেও এই করণীয় দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অর্থের জোগান তথা ঋণের প্রবাহ কমানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে অনুৎপাদনশীল ও ফাটকাবাজিমূলক কারবারে যেন অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাদের সে চেষ্টাই থাকবে। বিষয়টি এভাবেও দেখা যেতে পারে যে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য অর্থের যেন কমতি না হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটাও নিশ্চিত করতে চায়। বিভিন্ন ধরনের ভোগব্যয় ও শেয়ারবাজারে নির্বিচারে বিনিয়োগের সাম্প্রতিক প্রবণতা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। এ ধরনের ব্যয় ও বিনিয়োগ মূল্যস্তরকে বাড়িয়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে মূল্যস্ফীতি ঘটায়।
আবার দেশি ও বিদেশি একাধিক ঘটনাপ্রবাহ আগামী দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত, আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদর বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভোগব্যয় বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসারে এপ্রিল মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক অনুসারে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮ শতাংশের সামান্য ওপরে, যেখানে খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কের ঘরে উপনীত হয়েছে। এটা নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি প্রশমনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা কতখানি অর্থবহ হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করছে সরকারের অন্যান্য নীতি, পদক্ষেপ ও ব্যবস্থাপনার ওপর।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষিঋণ সরবরাহ বৃদ্ধি ও খোদ কৃষকের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে এ পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে, যা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে যেখানে মুদ্রাবাজার যথেষ্ট সুগঠিত নয়, সেখানে শুধু অর্থের জোগান সীমিত করে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। আর বাংলাদেশে এখন যেখানে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প খাতের উৎপাদন-কর্মকাণ্ডে গতিমন্থরতা দেখা দিয়েছে, সেখানে এসব গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ তথা বিনিয়োগ বাড়ানোও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট নিরসনে যেমন সরকারকে অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি নিত্যপণ্যের বাজারে পরিকল্পিত নজরদারি ও সরবরাহ-প্রক্রিয়া গতিশীল রাখার অর্থবহ পদক্ষেপ থাকতে হবে। আবার অনুৎপাদনশীল ও ফাটকা কারবারের দিকে অর্থের প্রবাহ শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে ঠেকানো যাবে না। কারণ, উৎপাদনশীল খাতে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন যেখানে অর্থ খাটালে প্রাপ্তির সম্ভাবনা বেশি, সেদিকেই অর্থ ধাবিত হয়। বাংলাদেশে জমিজমা ও শেয়ারবাজারে সে জন্যই অর্থপ্রবাহ বাড়ছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে রাজস্বনীতিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যা সময়সাপেক্ষ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অবশ্য সীমিত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এসব খাতে সীমিত পরিসরে কর আরোপ করে। সর্বোপরি সরকারের ঘাটতি অর্থায়ন পরিকল্পনাও মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।

বন্যার্তদের উদ্ধারের জন্য বিমান পাঠালেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম

চলতি সপ্তাহে প্রবল বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় আটকে পড়া কয়েক ডজন লোককে উদ্ধারে বিমান পাঠালেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং ইল। দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে গতকাল শুক্রবার এ কথা জানানো হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রীয় টেলিভিশনের খবর পর্যবেক্ষণ করে দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়নহ্যাপ জানিয়েছে, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আনসান এলাকায় গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ২৮ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে পানিবন্দীহয়ে পড়ে অনেক নারী-পুরুষ ও শিশু।

যুক্তরাষ্ট্রে দুর্ঘটনায় নিহত ৬

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গত বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে নয়জন। ক্যালিফোর্নিয়ার মহাসড়ক টহল বিভাগের একজন মুখপাত্র এ কথা জানান।
জানা গেছে, একটি গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য বাসের চালক আকস্মিক দিক পরিবর্তন করলে বাসটি অন্য একটি গাড়িকে আঘাত করে। এতে চালকসহ ছয়জন নিহত হয়।

মুখোমুখি বুদ্ধদেব-মমতা

পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী অধ্যুষিত পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ে গত বছরের জুন থেকে মাওবাদী দমনের জন্য চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান। অভিযান শুরুর পর থেকে মাওবাদীদের হামলার আশঙ্কায় সেখানে রাজ্য সরকার কোনো দলকেই জনসভা করার অনুমতি দেয়নি।
গত বুধবার শহীদ দিবস উপলক্ষে কলকাতায় এক বিরাট সমাবেশে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দেন, তাঁর দল ৯ আগস্ট লালগড়ে জনসভা করবে। এই ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার রাজ্যের বিধানসভায় কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা ও রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি বিধায়ক মানস ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জানিয়ে দেন, প্রশাসন জঙ্গল মহলে কাউকেই জনসভা করার অনুমতি দিচ্ছে না। তবে মিছিল করায় বাধা নেই। নিরাপত্তার দিক খতিয়ে দেখেই প্রশাসন কোনো দলকেই জনসভা করার অনুমতি দিচ্ছে না।
এই খবর মমতার কানে পৌঁছানোর পরই মমতা এদিন বিকেলে তাঁর কালীঘাটের অফিসে সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, ‘তিনি ৯ আগস্ট লালগড়ে যাবেন।

বিধানসভায় ছবি তুলে বিপাকে পুলিশের ডিজি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজি) ভূপিন্দর সিং গত বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশন চলাকালে মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন। কারণ বিধানসভার অধিবেশন চলাকালে ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ জন্য তাঁকে জরিমানা করা হয়েছে এক হাজার রুপি।
বিধানসভায় ওই দিন রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বাজেটের ওপর আলোচনা চলছিল। এ সময় ডিজি ভূপিন্দর সিং আলোচনা শোনার জন্য সাদা পোশাকে বসে ছিলেন দর্শকের আসনে। আলোচনার একপর্যায়ে বামফ্রন্টের বিধায়কদের সঙ্গে বিরোধী দলের বাদানুবাদ হয়। এ সময় ডিজি তাঁর হাতে থাকা মোবাইল ফোন দিয়ে একটি ছবি তোলেন। সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি তোলেন কংগ্রেসের বিধায়কেরা। নালিশ চলে যায় স্পিকার হাসিম আবদুল হালিমের কাছে। কংগ্রেস ডিজির বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ আনে।
এ সময় ডিজির মোবাইল ফোন জব্দ করার জন্য পরিষদীয় মন্ত্রী শৈলেন সরকারকে নির্দেশ দেন স্পিকার। গতকাল শুক্রবার সেই অভিযোগের রায় দেন স্পিকার। তিনি ডিজিকে এক হাজার রুপি জরিমানা করেন। জরিমানার অর্থ জমা হবে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে।

তদন্ত চালিয়ে যেতে পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান

মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যেতে ও দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, গোটা অঞ্চলের কল্যাণেই পাকিস্তানকে এ কাজ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পি জে ক্রাউলি গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০০৮ সালের নভেম্বরে ওই হামলার ঘটনায় তদন্তের ব্যাপারে আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাব। এই সন্ত্রাসী হামলায় ১৬৬ জন নিহত হন।’
ক্রাউলি বলেন, পাকিস্তানকে এই হামলার তদন্ত অব্যাহত রাখতে হবে এবং যারা মুম্বাই হামলার জন্য দায়ী তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

সুদানের প্রেসিডেন্ট বশিরকে সমর্থন দিয়েছে শাদ

সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে প্রতিবেশী দেশ শাদ। একই সঙ্গে দারফুর সংকট নিরসনেও প্রেসিডেন্ট বশিরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
গত বৃহস্পতিবার শাদে এক আঞ্চলিক সম্মেলনে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দিবাই এ আহ্বান জানান।
আফ্রিকার অন্যতম আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংগঠন কমিউনিটি অব সাহেল-সাহারানের (সিইএন-এসএডি) সম্মেলনে যোগ দিতে সুদানের প্রেসিডেন্ট গত বুধবার শাদে যান। সম্মেলনে আরও ১৩টি দেশের প্রধান যোগ দিয়েছেন।
দারফুরে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সুদানের প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আইসিসির যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। শাদ বলেছে, তারা বশিরকে গ্রেপ্তার করবে না।
শাদের প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দিবাই আফ্রিকার অন্য দেশগুলোকে সুদানের প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দারফুরের সংকট উদ্বেগজনক। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘সুদানের জনগণের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি রয়েছে।’

ক্যানসারের গুজব উড়িয়ে দিয়ে টিভিতে ভাষণ দিলেন মুবারক

ক্যানসারের গুজব উড়িয়ে দিয়ে গত বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক। কায়রো থেকে বিবিসির সাংবাদিক জানান, মিসরের প্রেসিডেন্ট ১০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। এ সময় তাঁকে খানিকটা ক্ষীণকায় দেখালেও সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।
৮২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট মুবারকের গলব্লাডারে গত মার্চে জার্মানিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। এর পর থেকে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শোনা যায়। কিছুদিন আগে একটি মার্কিন দৈনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুবারক দুরারোগ্য ক্যানসারে ভুগছেন। তিনি আর বড়জোর এক বছর বাঁচবেন। মিসরীয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এ খবরকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে।
ওয়াশিংটন টাইমস গত রোববার জানায়, পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ধারণা, মিসরের প্রেসিডেন্ট পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে ভুগছেন। গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি বৈঠক স্থগিত করেন মুবারক। এতে তাঁর সুস্থ থাকার বিষয়ে আবারও বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

কলম্বিয়ার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন

ভেনেজুয়েলা প্রতিবেশী কলম্বিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে। আগামীকাল রোববারের মধ্যে কলম্বিয়ার সব কূটনীতিককে ভেনেজুয়েলা ছাড়তে বলা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কলম্বিয়ার বাম গেরিলাদের আশ্রয় দেয়ার আনুষ্ঠানিক অভিয়োগ আনার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ গত বৃহস্পতিবার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আনুষ্ঠানিক এ ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারার অভিযোগ করেন এবং ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীকে সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেন।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের বৈঠকে কলম্বিয়া তার দেশের বাম গেরিলাদের আশ্রয় দেওয়াসহ নানাভাবে সহায়তার অভিযোগ উত্থাপন করে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে। কলম্বিয়ার পক্ষ থেকে ছবি এবং ভিডিওচিত্রসহ বিভিন্ন প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়। এর ঠিক ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ হাজির হন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত ব্যথিত মনে কলম্বিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিচ্ছি। ভেনেজুয়েলা গেরিলাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে—কলম্বিয়ার এ ঘোষণার পর দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ নেই।’
শাভেজ বলেন, আগামী মাসে ক্ষমতা ছাড়ার আগে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলভারো ইউরিব তাঁর দেশের সঙ্গে একটা যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা করছেন। যুদ্ধ লাগানোর জন্য ইউরিব কলম্বিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে ভেনেজুয়েলার একটি বনে ভুয়া গেরিলা ক্যাম্প তৈরি করেছেন। সেখান থেকে বোমা নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণসহ সাজানো হামলার নানা ব্যবস্থা করেছেন। ভেনেজুয়েলা কলম্বিয়ার বাম গেলািদের কোনো ধরনের আশ্রয়-প্রশয় দেয় না বলেও তিনি জানান।
টেলিভিশনে ভাষণ দেওয়ার পরপরই শাভেজ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। তিনি সেনাবাহিনীকে সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেন এবং সীমান্তে সেনা মোতায়েন করতে বলেন। তার এ নির্দেশের পর ভেনেজুয়েলা গতকাল শুক্রবার কলম্বিয়া সীমান্তের কাছে সেনা মোতায়েন করে।
এদিকে তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাস মাদুরো জানিয়েছেন, তাঁরা কলম্বিয়ার সঙ্গে বিমান যোগাযোগ ও বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিতের বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন।

অভিযুক্তদের তালিকায় হিযবুল্লাহ সদস্য

লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় সে দেশের সশস্ত্র সংগঠন হিযবুল্লাহর কয়েকজন সদস্যের নামও থাকছে। হিযবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসারাল্লাহ বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।
২০০৫ সালে রাজধানী বৈরুতে এক গাড়ি বোমা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরিসহ আরও ২২ জন নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসান নাসারাল্লাহ বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
নাসারাল্লাহ বলেন, রফিক হারিরির ছেলে ও লেবাননের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর কথা হয়েছে। সাদ তাঁকে জানিয়েছেন, আসামির তালিকায় হিযবুল্লাহর যেসব সদস্যের নাম আসছে তাঁদের হিযবুল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে যতটা না বিবেচনা করা হবে তার চেয়ে ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবেই তাঁদের বেশি বিবেচনা করা হবে।
নাসারাল্লাহ বলেন, নিজেদের ইচ্ছেকে এ অঞ্চলের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একাট্টা হয়ে এ মামলা সাজাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালত হিযবুল্লাহকে ‘চরম স্পর্শকাতর পর্যায়ে’ নিয়ে গেছে। তবে এ অবস্থা কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় হিযবুল্লাহ তা ভালো করে জানে। তিনি বলেন, রফিক হারিরি নিহত হওয়ার পরপরই এর পেছনে সিরিয়ার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। অথচ এখন আসামির যে তালিকা হচ্ছে তাতে সিরিয়ার একজন নাগরিকেরও নাম রাখা হচ্ছে না।
নাসারাল্লাহ এ বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যায়িত করে বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে সরকারের অবস্থান পুনরায় পর্যালোচনা করতে বলেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরে হিযবুল্লাহ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে।

ভোট শুরুর আগে বিভিন্ন দলের সঙ্গে মাওবাদী ও কংগ্রেসের বৈঠক

নেপালের গণপরিষদে গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গণপরিষদ ভবনে দুপুর একটায় ভোট গ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে বৈঠকের কারণে তা শুরু হতে দেরি হয়। মাওবাদী দল ও নেপালি কংগ্রেস অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পেতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। গতকাল নির্বাচন না হলে নির্বাচনের নতুন তারিখ নিয়েও এসব বৈঠকে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল পদত্যাগ করেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দুটি সময়সীমা পার হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয়নি। মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দহল ওরফে প্রচণ্ড এবং নেপালি কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পৌদেল ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (সিপিএন-ইউএমএল) প্রধান ঝালা নাথ প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মাওবাদীরা ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক মাধেসি ফ্রন্টের (ইউডিএমএফ) সঙ্গে বৈঠক করে। নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএল বিভিন্ন দলের সঙ্গে বৈঠক করে।
প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার গত ৩০ জুন পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে জাতীয় ঐকমত্যের একটি সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আলোচনা শুরু করে। কিন্তু দেশটির প্রেসিডেন্ট রাম বরণ যাদবের বেঁধে দেওয়া সময় ৭ জুলাইয়ের মধ্যে দলগুলো প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়। তাই গণপরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট। পরে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২১ জুলাই। সেদিনও নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি দেশটির নেতারা। পরে এই নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় গতকাল শুক্রবার। মাধব কুমার অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দশ বছর সশস্ত্র সংগ্রামের পর ২০০৬ সালে ক্ষমতাসীন দলগুলোর সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে মাওবাদীরা। ২০০৮ সালের ১০ এপ্রিল নেপালে সংবিধান রচনার জন্য দুই বছর মেয়াদের গণপরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুই বছরেও সংবিধান প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয় গণপরিষদ। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গত মে মাসের শেষ দিকে গণপরিষদের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। এই এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন করছে নেপাল।
দেশটির ৬০১ আসনের গণপরিষদে মাওবাদীদের ২২৯, নেপালি কংগ্রেসের ১১৫ ও সিপিএন-ইউএমএলের ১০৮টি আসন রয়েছে।

সিন্দুকে রাখা কাফকার পাণ্ডুলিপি, আঁকা ছবি খুলবে সুইস ব্যাংক

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লেখক ফ্রাঞ্জ কাফকার আঁকা ছবি ও বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি সিন্দুক থেকে খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এসব ছবি ও পাণ্ডুলিপি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সিন্দুকে সংরক্ষণ করা আছে। ছবি ও পাণ্ডুলিপিগুলোর মালিকানা নিয়ে কাফকার সন্তান ও ইসরায়েল সরকারের মধ্যে আইনি লড়াই চলাকালে তা উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। খবর বিবিসির।
ফ্রাঞ্জ কাফকার দুই মেয়ে বলেছেন, মায়ের কাছ থেকে তাঁরা এসব পাণ্ডুলিপি ও ছবি পেয়েছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার এসব ছবি ও পাণ্ডুলিপির মালিক তাঁরাই। তবে ইসরায়েল সরকার বলছে, কাফকা ইহুদি হওয়ায় এগুলো ইসরায়েলের ঐতিহ্য।
সুইস ব্যাংকে সংরক্ষণ করা কাফকার লেখা ও ছবি একজন বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করবেন। পরে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মামলা পরিচালনাকারী বিচারকের কাছে পেশ করা হবে।
১৯২৪ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফ্রাঞ্জ কাফকা। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর বন্ধু ও লেখক ম্যাক্স ব্রডকে বলেছিলেন, তাঁর লেখা যেন প্রকাশ করা না হয়। কিন্তু ব্রড কথা না রেখে কাফকার উপন্যাসগুলো প্রকাশ করে দেন। এর মধ্যে ছিল দ্য ট্রায়াল ও দ্য ক্যাসল-এর মতো বিখ্যাত উপন্যাস।
কাফকার লেখা অপ্রকাশিত চিঠি ও পাণ্ডুলিপি তাঁর সহকারী এসথার হোফির কাছে দিয়েছিলেন ম্যাক্স ব্রড। পরে এই লেখা ও চিঠি কাফকার মেয়েদের কাছে ফিরিয়ে দেন হোফি। পঞ্চাশের দশকে এসব চিঠি ও লেখা তেলআবিব ও জুরিখে সুইস ব্যাংকের ভল্টে রাখা হয়।
ফ্রাঞ্জ কাফকার ষাটোর্ধ্ব মেয়েরা বাবার চিঠি ও লেখাগুলো বিক্রি করে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এর বিরোধিতা করেছে ইসরায়েল সরকার। তাঁরা বলেছে, ফ্রাঞ্জ কাফকা ইহুদি হওয়ায় এসব লেখা ও ছবির মালিক এখন ইসরায়েল।

আল-কায়েদার বিরুদ্ধে মৌরিতানিয়ায় অভিযান চালিয়েছিল ফ্রান্স

মৌরিতানিয়ায় আল-কায়েদার বিরুদ্ধে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিল ফ্রান্স। গতকাল শুক্রবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ। ওই দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তারাও ছিল। অভিযানে তারা প্রযুক্তিগত ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে। গত এপ্রিলে অপহূত এক ফরাসি নাগরিককে উদ্ধারে ওই অভিযান চালানো হয়।
ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মৌরিতানিয়ায় সম্ভাব্য একটি হামলা ঠেকাতে অভিযান চালানো হয়। তবে স্পেনের সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়, আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম) নামের ওই জঙ্গি গোষ্ঠী মাইকেল জার্মানিউ নামের এক ফরাসি নাগরিককে অপহরণ করে। তাঁকে উদ্ধারে ওই অভিযান চালানো হয়, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।
কোথায় অভিযান চালানো হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। অভিযানে বেশ কয়েকজন জঙ্গি নিহত হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।
একিউআইএম সদস্যদের মোকাবিলা করতে পশ্চিমা দেশগুলো উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সেনাসদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মৌরিতানিয়া, মালি ও নাইজারে একাধিক অপহরণ ঘটনায় জড়িত একিউআইএম।
গত বছর এডইউন ডায়ের নামের এক ব্রিটিশ নাগরিককে হত্যা করার কথা স্বীকার করে তারা।
১৯৯০-এর দশকে একটি আলজেরীয় জঙ্গি গোষ্ঠী ভেঙে একিউআইএম গঠিত হয়।

ধেয়ে আসছে ঝড় ‘বনি’

মেক্সিকো উপসাগরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের (বিপি) দুর্ঘটনাকবলিত তেলক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ‘বনি’। ওই এলাকায় অবস্থানরত নৌযানগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় হারিকেন কেন্দ্র জানায়, ঝড়টি ঘণ্টায় ৪০ মাইল বেগে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ শনিবার এটি দুর্ঘটনাকবলিত তেলক্ষেত্র এলাকা অতিক্রম করতে পারে।
তেলক্ষেত্রে দুর্ঘটনা মোকাবিলা কার্যক্রম দেখভালের ব্যাপারে মার্কিন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল থাড অ্যালেন জানান, ঝড়ের সময় তেলক্ষেত্রের ছিদ্রের ছিপি আটকানো থাকবে। তেল নিঃসরণ বন্ধে একটি বিকল্প কূপ খননের কাজ দুই সপ্তাহ স্থগিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় হারিকেন কেন্দ্রের মিয়ামি শাখার কর্মকর্তারা জানান, গতকাল টার্কস ও ক্যাইকোস দ্বীপে এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বজ্রপাত হয়েছে। এর প্রভাবে হাইতি, পুয়ের্তোরিকো ও ডোমিনিকান রিপাবলিকে বন্যা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ঝড়টি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
থাড অ্যালেন জানান, সাগরে তেল অপসারণের কাজে নিয়োজিত নৌযানগুলো গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে শুরু করেছে।

যৌথ সামরিক মহড়ার ‘পাল্টা জবাব’ দেবে উত্তর কোরিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার পাল্টা জবাব দেবে উত্তর কোরিয়া। গতকাল শুক্রবার ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামের (এআরএফ) বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধিদলের মুখপাত্র রি তং ইল একথা বলে সতর্ক করে দেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া কাল রোববার থেকে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করছে। ওয়াশিংটন ও সিউল জানায়, উত্তর কোরিয়ার হামলা ঠেকাতে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন, অন্য ২০টি রণতরী ও ডুবোজাহাজ, ১০০টি বিমান ও আট হাজার সেনা এ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।
রি তং ইল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এটি ঊনবিংশ শতাব্দী নয়। এশিয়ার দেশগুলো এখন শান্তি চায়, উন্নয়ন চায়। উত্তর কোরিয়াও সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
রি তং ইল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়া কোনো প্রতিরক্ষা মহড়া নয়। তিনি আশঙ্কা করেন, এই মহড়ায় দেশ দুটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করবে, যা শুধু উত্তর কোরিয়ার জন্য নয়, এশিয়ার এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের হুমকি। তাই উত্তর কোরিয়ার অবস্থান স্পষ্ট তা হলো, মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের হুমকি এলে উত্তর কোরিয়া এর কঠোর জবাব দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়ার পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে চীন। তাদের মতে, এই যৌথ মহড়া এ অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়াবে। দেশটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়। এদিকে যৌথ মহড়া পর্যবেক্ষণ করতে জাপান চার সদস্যের প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে। এই দলটি জাপান সাগরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনে থেকে মহড়া পর্যবেক্ষণ করবে। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন গতকাল অভিযোগ করেন, উত্তর কোরিয়া উসকানিমূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়া তার আচরণ থেকে সরে এলে ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এর আগে গত বুধবার তিনি উত্তর কোরিয়াকে অস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে তাদের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হবে বলে ঘোষণা দেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া চায়, এআরএফের বৈঠক থেকে দেশগুলো চেওনান ডুবির ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেবে।
গত ২৬ মার্চ পীত সাগরে দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজ চেওনান ডুবে যায়। এতে ৪৬ জন নাবিকের মৃত্যু হয়। ২০ মে পাঁচ জাতির সমন্বয়ে গঠিত একটি তদন্ত দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার টর্পেডোর আঘাতে ওই যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়। উত্তর কোরিয়া অবশ্য বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ওয়ার্ন নয় মুরালি

মুরালি না শেন ওয়ার্ন—মাঠে কার মুখোমুখি হওয়া বেশি কঠিন ছিল? মাঠে ব্যাট হাতে যাঁরা মুরালি-ওয়ার্ন দুজনের মুখোমুখিই হয়েছেন, তাঁদের একজন সৌরভ গাঙ্গুলী বলছেন মুরালির কথা। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পরদিন থেকেই নানাজনের প্রশংসায় ভাসছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। প্রশংসায় ভিজছেন গত পরশু গল টেস্ট জয়ের মধ্য দিয়ে পুরোদস্তুর ‘সাবেক’ হয়ে যাওয়ার পরও।
ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভের মুখেও প্রশংসাটা তিনি শুনলেন ‘সাবেক’ সেজেই। মুরালি-ওয়ার্ন, দীর্ঘ সময় ধরে স্পিন-রাজ্য দখলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন দুজনে। এ সম্পর্কে গতকাল কলকাতায় বসে পিটিআইকে সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছেন, ‘আমি তুলনায় যেতে চাই না। তবে আমি মাঠে ওয়ার্নকেই পছন্দ করতাম।’ শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে অবসর নিয়েছেন আগেই। এবার নিলেন মুরালিধরনও। সৌরভ মনে করেন, এতে স্পিনের একটা যুগই শেষ হয়ে গেল।
পরশু গল টেস্টের দুই ইনিংস মিলিয়ে ৮ উইকেট নিয়ে ৮০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়ে শেষ করেছেন মুরালি। সৌরভের বিশ্বাস, মুরালির এই রেকর্ড ভাঙাটা কঠিন হবে, ‘তার (মুরালির) রেকর্ড ভাঙাটা কঠিনই হবে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরেই সে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের এক বড় অধ্যায়। অন্যদের সঙ্গে তাকে তুলনা করাটা কঠিন।

স্পেন হতে চায় দক্ষিণ কোরিয়া

দল হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো তুলনা চলে? এখন না চলতে পারে। কিন্তু বছর চারেক পর তুলনা ঠিকই চলবে! দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন কোচ চো কাওয়াং-রে কিন্তু সেটাই বলতে চাইছেন। দায়িত্ব পেয়েই বলেছেন, তিনি চান তাঁর দলও ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে স্পেনের মতো ফুটবল খেলবে।
স্পেনের মতো মানে স্পেন যেমন ছোট ছোট পাসে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে, তিনি চান দক্ষিণ কোরিয়াও ছোট ছোট পাসেই খেলবে, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলের (খেলোয়াড়দের) উচিত, দ্রুত দৌড়ে ছোট ছোট পাসে জায়গা ছোট করে বিশ্বমানের দল হওয়া। আমি চাই স্পেনকেও ছাড়িয়ে যেতে। আমি চাই গতিশীল এবং আরও কার্যকর ফুটবল খেলতে। কোচ হিসেবে এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ চেষ্টাই করব আমি।’

আর্জেন্টিনা ব্যর্থ নয়

আর্জেন্টিনা নাকি বিশ্বকাপে মোটেও ব্যর্থ হয়নি। কোনো ফুটবল বিশ্লেষকের মত নয়। আর্জেন্টিনারই খেলোয়াড় ও ডিয়েগো ম্যারাডোনার জামাই সার্জিও আগুয়েরো বলেছেন, তাঁদের বিশ্বকাপ অভিযানকে ব্যর্থ বলা যাবে না।
বিশ্বকাপ শেষ করে এখনো স্পেনে ফেরেননি, যোগ দেননি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের অনুশীলনে। তার আগে আর্জেন্টাইন দৈনিক ওলেকে আগুয়েরো বললেন, ‘দল বিশ্বকাপে যা করেছে, তাতে আমি খুশি। আমরা ইতালি ও ইংল্যান্ডের চেয়ে তো অনেক ভালো করেছি; দুটো দলই খুব ভালো ছিল, ওদের অনেক ভালো খেলোয়াড়ও ছিল। তার পরও আমাদের ব্যর্থতা নিয়ে কেন কথা হবে, এটা বুঝি না।’
ব্যর্থ বলা হবে কারণ, দলটায় কথিত বিশ্বসেরা আক্রমণ ভাগ ছিল। যে দলে দুর্দান্ত ক্লাব ক্যারিয়ার নিয়েও সেরা একাদশে জায়গা হয় না খোদ আগুয়েরোরই। জায়গা ছাড়তে হয় মেসি, তেভেজ, হিগুয়েইনের জন্য। প্রায় পুরোটা বিশ্বকাপই ডিয়েগো মিলিতোর সঙ্গে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে আগুয়েরোকে।
তবে এই বসে থাকা নিয়ে আগুয়েরোর কোনো আক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। তিনি বরং বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা নিয়েই আনন্দিত, ‘২২ বছর বয়সে আমি প্রথম বিশ্বকাপ খেলে ফিরলাম। শেষ পর্যন্ত আমাদের ফলাফল যা-ই হোক, এই অভিজ্ঞতা আমাকে খুব সাহায্য করবে।’
অভিজ্ঞতাটা আর্জেন্টিনা দলের জন্য কতটা কাজে লাগবে, সেটা বোঝা যাবে ভবিষ্যতে তিনি কেমন সুযোগ পান, তার ওপর। নিন্দুকেরা বলে, এবার বিশ্বকাপ দলেই তাঁর জায়গা হতো না। যদিও স্প্যানিশ লিগে গত মৌসুমের আগের দুটি মৌসুম অসাধারণ কাটিয়েছেন। তার পরও সমালোচনা, স্রেফ ম্যারাডোনার জামাই বলেই দলে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
সমালোচনার জবাব অনেকবার দিয়েছেন। আরেকবার দিলেন, ‘ক্লাবে আমার দুর্দান্ত একটা মৌসুম কেটেছে। উয়েফা কাপ জিতেছি, কোপা দেল রে-এর ফাইনালে খেলেছি। আমাকে দলে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ দেখি না। ম্যারাডোনার জামাই হওয়ার অনেক আগেই আমি কুন আগুয়েরো হয়ে গেছি। লোকে এসব জানে। কিন্তু তারা ম্যারাডোনাকে উত্ত্যক্ত করতে চায় বলে আমাকে উত্ত্যক্ত করে।’
তাহলে ম্যারাডোনা না থাকলে তো আর আগুয়েরোকে যন্ত্রণা সইতে হয় না! না, কোনো কারণেই তিনি চান না ম্যারাডোনা সরে যান। মেসিদের মতোই তিনিও বললেন, ‘ওনার উপস্থিতিই আমাদের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। উনি আমাদের ভেতর এই অনুভূতিটা তৈরি করে দিতেন, আমাদের সেরাটা খেলতে হবে। হ্যাঁ, আর্জেন্টিনা দলের দায়িত্বে তিনি থাকুন অথবা অন্য কেউ, খেলোয়াড়দের সেরাটাই দিতে হয়। কিন্তু ডিয়েগোর মধ্যে যেন অন্য কী একটা আছে।’

কঠিন সময় যাচ্ছে রিবেরির

অদ্ভুত এক সময়ের হাতে বন্দী ফ্রাঙ্ক রিবেরি। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ভরাডুবি, দেশবাসীর চক্ষুশূল হয়ে থাকা, এরই মধ্যে অপ্রাপ্ত বয়স্ক এক পতিতার সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে শাস্তির মুখোমুখি। দুঃসময় যখন আসে, চারদিক দিয়েই আসে!
রিবেরি আর তাঁর ফ্রান্স সতীর্থ করিম বেনজামাও একই অপরাধে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। গত মঙ্গলবার সাত ঘণ্টা ধরে প্যারিসে তাঁদের জেরা করেছে পুলিশ। ১৮ বছরের নিচে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ালে ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী তিন বছরের সাজা হতে পারে। জার্মানির নিয়মে শাস্তিটা আরও বড়। জেল হতে পারে ৫ বছর পর্যন্ত!
জাহিয়া দেহার নামের ওই তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছেন রিবেরি। এও বলেছেন, এই তরুণীর বয়স যে ১৮ বছরের নিচে, সেটি জানতেন না। বায়ার্ন মিউনিখ মিডফিল্ডার স্বীকার করেছেন, কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে তাঁকে, ‘জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন প্রচণ্ড চাপ আর হতাশার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। সেই সময়টাই যাচ্ছে এখন আমার। এই নাজুক সময়টা আমাকে পার করতেই হবে, যেটা আমার জন্য সহজও নয়। এখন সাধারণ মানুষের চোখ আমার ওপর। এটা মেনে নিতেই হবে। কিন্তু এই চাপ সব সময় সামলানোও সহজ নয়।’
তবে কি নিজের ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি? ২৭ বছর বয়সী ফরাসি তারকা জানালেন, ‘আমি ভবিষ্যৎ কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নই।’ রিবেরি উদ্বিগ্ন নন আরেকটি কারণে। মানুষের মনে নিজের হারানো জায়গা তিনি উদ্ধার করতে পারবেন বলে আশাবাদী, ‘আমি আত্মবিশ্বাসী। আমাকে নিয়ে যারা সংশয় প্রকাশ করছে, তাদের বিশ্বাস আবার ফিরিয়ে আনব। আমি তাদের মধ্যে আবারও আনন্দ ফিরিয়ে আনব আমার দুর্দান্ত ড্রিবলিং দিয়ে, ইতিবাচক খেলে, গোলের পর গোল করে।’
অবশ্য রিবেরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, সেই ক্লাবের সমর্থন তিনি পাচ্ছেন। বায়ার্নের চেয়ারম্যান কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে তো এমনও দাবি করলেন, ‘বিশ্বকাপ ব্যর্থতার বলি বানানোর জন্যই রিবেরিকে নিয়ে এসব ছড়ানো হচ্ছে।’ বেনজেমার পাশেও দাঁড়িয়েছে তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ।

তাঁরাও দেখবেন ম্যাচটা

‘এই ম্যাচ দেখা খুবই কষ্টের হবে। তবু দেখতে যাব’—শহিদুল্লাহ টিটু।
‘এই ম্যাচ’ মানে আবাহনী-মোহামেডান লড়াই। হকি লিগে দুই প্রধানের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ দেখতে যাবেন আরেক বড় দল ঊষার খেলোয়াড়েরা, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এই দেখায় মিশে থাকবে তাঁদের কষ্ট, হতাশা, হাহাকার। গত তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ঊষা যে এবারের হকি লিগে খেললই না!
ঊষার খেলোয়াড়দের চোখে-মুখে বিষণ্নতা। কথা বললেই যেন দীর্ঘশ্বাস বেরোচ্ছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দলটির জার্সি গায়ে এবার খেলার কথা ছিল জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গোলরক্ষক রাসেল খান বাপ্পির। বললেন, ‘জীবন থেকে একটা বছর হারিয়ে গেল!’ একই দলের রাজীবের কথায়, ‘ম্যাচ দেখতে আসব, কিন্তু যা হলো হকির জন্য তা খুবই খারাপ।’
তা হোক, আজ আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে নির্ধারিত হবে দুই বছর পর মাঠে ফেরা প্রিমিয়ার হকি লিগের শিরোপা। মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে বিকেল চারটায় শুরু ম্যাচে ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন ১২ ম্যাচে ৩৬ পয়েন্ট পাওয়া মোহামেডান। সমান ম্যাচে ৩৩ পয়েন্ট আবাহনীর। আকাশি-নীলেরা জিতলে প্লে-অফে।
এই শিরোপার জন্য মোহামেডানের অপেক্ষা ২০০২ সালের পর থেকে। ওই বছর টানা চারবার শিরোপা জিতে রেকর্ড গড়া সাদা-কালোরা সেই যে আবাহনী-ঊষার দাপটের কাছে মার খেতে শুরু করল, ৮ বছর থাকল শিরোপাহীন। আজ আবার লিগের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ঘরে ফেরার উপলক্ষ তাদের সামনে।
আবাহনীকে অত পেছনে তাকাতে হচ্ছে না। মোহামেডান সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গত চারটি লিগের দুটির শিরোপা জিতেছে দলটি। গত লিগের আগেরবার ঊষার সঙ্গে যৌথভাবে এসেছে শেষ শিরোপা। গতবার হ্যাটট্রিক শিরোপাজয়ী ঊষার সামনে মোহামেডানকে ছোঁয়ার সুযোগ ছিল এবার। কিন্তু সেই সুযোগ তারা নিজেরাই নিল না!
ঊষার কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতার ফল এটা। গত ক্লাব কাপের বিতর্কিত ফাইনালে ঊষার বিপক্ষে মোহামেডানের জয় বাতিল করার প্রতিশ্রুতি ফেডারেশন এড়িয়ে যাওয়ায় লিগের প্রথম ম্যাচে মাঠেই আসেনি ঊষা। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম বিভাগে নেমে যাওয়ার কথা তাদের। ঊষা অবশ্য নিজেদের যুক্তি নিয়ে আদালতে গিয়েছে। ওদিকে সমস্যার সমাধানে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হকি ফেডারেশন। তারই জেরে আগের চেয়েও লিগটা অনেক বেশি নিরুত্তাপ হলো এবার।
আবাহনীতে খেলতে আসা সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলের মালিক পাকিস্তানি তারকা সোহেল আব্বাসের কাছে লিগটাকে খুব ম্যাড়মেড়ে মনে হয়েছে, ‘এই লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতার খুব অভাব। ঊষা থাকলে তাও আরেকটু প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো।’ মোহামেডানের পাকিস্তানি খেলোয়াড় পাকিস্তান জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ সাকলায়েনের মুখেও একই কথা, ‘ঊষা না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাই তো কমে গেছে এই লিগে।’
এই লিগে খেলে আনন্দ পেলেন না খেলোয়াড়েরা। আবাহনী অধিনায়ক ফারুক আহমেদ কাল ক্লাবের বারান্দায় বসে বললেন, ‘এমন লিগ আগে কখনো খেলিনি। ঊষার না থাকা সত্যিই বেদনাদায়ক। খেলে আনন্দ পেলাম না।’ মোহামেডান স্ট্রাইকার জিমিও কথা বললেন একই স্বরে, ‘ঊষা থাকলে লিগটা জমত আরও বেশি।’
ঊষা নেই, কিন্তু আবাহনী-মোহামেডান তো আছে! পুরোনো শত্রুকে হারানোর সেই প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতির এতটুকু কমতি নেই। তারুণ্যনির্ভর আবাহনী ৫ জন পাকিস্তানিকে এনেছে অনেক আগেই। কাগজ-কলমে সেরা দল মোহামেডান তিন পাকিস্তানিকে এনেও যথেষ্ট মনে করল না। এই ম্যাচের জন্য কাল সাদা-কালোরা উড়িয়ে নিয়েছে মালয়েশিয়ার জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড সেই চুয়া বুনকে। ক্লাব কাপের ফাইনালে যাকে নিয়েই গন্ডগোলের সূত্রপাত।
প্রথম পর্বে আবাহনীকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল মোহামেডান। সেদিন আবাহনীর পেনাল্টি কর্নার বিশেষজ্ঞ সোহেল আব্বাসকে ঠেকিয়ে দিয়েছিল সাদা-কালোরা। আজও কি...?
ঊষার খেলোয়াড়দের মনটা বিষাদেই ভরে যাবে এসব দেখে!

ব্রাজিলের কোচ হচ্ছেন রামালহো

সম্ভাব্য তালিকায় ছিলেন সাত-আটজন—লুই ফেলিপে স্কলারি, ভ্যান্ডারলি লুক্সেমবার্গো, রিকার্ডো গোমেজ, লিওনার্দো, রামালহো মুরিসি...। এঁদের মধ্যে নাকি বেশি এগিয়ে ছিলেন ২০০২-এ ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতানো স্কলারিই। তবে ব্রাজিলের কোচ হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটা তিনি পাননি, পেয়েছেন ফ্লুমিনেসের কোচ রামালহো।
গতকাল ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) পক্ষ থেকে জানানো হয় এ খবর। খবরটির সঙ্গে একটি পাদটীকাও জুড়ে দিয়েছে সিবিএফ—রামালহো তাঁর সিদ্ধান্ত জানাননি। কালই সিবিএফ সভাপতি রিকার্ডো টিসেইরার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে রামালহোর।
বৈঠক শেষে সাও পাওলোকে টানা তিনবার (২০০৬ থেকে ২০০৮) ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানো কোচ রামালহো বলেছেন, ‘কিছুই ঠিক হয়নি, কারণ আমার সঙ্গে ফ্লুমিনেসের এখনো চুক্তি আছে।’ এই বিষয়গুলো রামালহোকেই চুকেবুকে দিয়ে আসতে হবে জানিয়ে টিসেইরা বলেন, ‘বিষয়গুলো তাঁকেই সমাধা করতে হবে।’
২০০৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ব্যর্থতার পর সিবিএফ দলের দায়িত্ব দিয়েছিল অনভিজ্ঞ কার্লোস দুঙ্গাকে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে আরেকটি ব্যর্থতার পর দুঙ্গাকে বরখাস্ত করে সিবিএফ। যে চারটি বছর ব্রাজিল দলে দায়িত্বে ছিলেন দুঙ্গা, সুনামের চেয়ে বদনামই বেশি কুড়িয়েছেন। ব্রাজিলকে কোপা আমেরিকা আর কনফেডারেশন কাপ জেতালেও ‘সুন্দর ফুটবল’ উপহার দিতে না পারার ‘দোষে দুষ্ট’ ছিলেন চুরানব্বই বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান অধিনায়ক।
তবে দুঙ্গার বিকল্প হিসেবে যাঁকে ব্রাজিলের কোচের দায়িত্ব দিতে চাইছে সিবিএফ, ৫৪ বছর বয়সী সেই রামালহোরও রক্ষণাত্মক শরীরনির্ভর ফুটবল খেলানোর বদনাম আছে ব্রাজিলে। তাঁর সাও পাওলো দল শরীরনির্ভর আর রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেছে বলেই প্রচলিত আছে।
ব্রাজিলের মানুষ ‘সুন্দর ফুটবল চাই’ বলে মাথা ঠুকছে জেনেও আবারও এমন একজন কোচের হাতেই কেন দলকে তুলে দিচ্ছে সিবিএফ? হয়তো দেশের (২০১৪ বিশ্বকাপ হচ্ছে ব্রাজিলে) বিশ্বকাপে শিরোপাটা ব্রাজিল চায় বলেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না তারা! রয়টার্স

বিশ্বকাপে প্রবৃদ্ধি

সেই ২০০৬ সালে যখন আয়োজন-স্বত্ব পায়, তখন থেকেই আলোচনা, দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুই হাত ভরিয়ে দেবে বিশ্বকাপ। দিয়েছেও তাই। স্টেডিয়াম, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিসহ অবকাঠামোগত উন্নতি তো আছেই। দেশটির অর্থমন্ত্রী প্রাভিন গর্ধান বলেছেন, বিশ্বকাপ এই বছরে দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রায় এক শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারিতেই গর্ধান জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের জন্য প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। পরশু বললেন, বিশ্বকাপ জাতীয় অর্থনীতিতে দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আনছে। বিশ্বকাপের পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৩০ লাখ র‌্যান্ড বা ৪৪ লাখ ডলার!

বিশ্বকাপ দলের সবাই ব্রাত্য ব্লাঁর কাছে

থিয়েরি অঁরি তো অবসরই নিয়ে নিয়েছেন। তাঁর নাম না থাকারই কথা। কিন্তু একি! ফ্রাঙ্ক রিবেরির নাম কোথায়? কোথায়ই বা গেল প্যাট্রিস এভরার নাম। আগামী মাসে নরওয়ের বিপক্ষে ফ্রান্সের প্রীতি ম্যাচের দলে আসলে নাম নেই দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে খেলা সে দেশের ২৩ খেলোয়াড়ের কারোরই। বিশ্বকাপ কেলেঙ্কারির শাস্তি এভরা-রিবেরি-আনেলকাদের এভাবেই দিলেন ফ্রান্সের নতুন কোচ লরাঁ ব্লাঁ।
কোচ রেমন্ড ডমেনেখের সঙ্গে নিকোলাস আনেলকার বেধে যাওয়া, খেলোয়াড়দের অনুশীলন বয়কট এবং সর্বোপরি প্রথম রাউন্ডে একটিও ম্যাচ জিততে না পারা—দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফ্রান্স দলের এর চেয়ে বাজে আর কী হতে পারত! অথচ দায়িত্ব নেওয়ার সময় ‘এসব নিয়ে কিছু ভাবছেন না’ বলেছিলেন ৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের সদস্য ব্লাঁ। আর এভরা-রিবেরিদের বাদ দেওয়ায় তাঁর এখনকার কথা, ‘আমি এমনভাবে কাজ করতে পারি না যে বিশ্বকাপে যেন কিছু ঘটেইনি!’

নিষিদ্ধ মায়োর্

টেনিসের নাম্বার ওয়ান রাফায়েল নাদালের ফুটবলপ্রেম এবারের বিশ্বকাপেই টের পাওয়া গেছে। কিন্তু ফুটবল-ভক্ত রাফার সত্যিকারের পরিচয়টা বোধ করি অজানাই ছিল। স্প্যানিশ লা লিগার দল রিয়াল মায়োর্কার মালিকদের একজন এই নাদাল! তাই বলে ভাবার কারণ নেই, রিয়াল মায়োর্কারও বুঝি নাদালের মতোই অগাধ টাকা-পয়সা। বরং দেনার দায়ে জর্জরিত ক্লাবটি। গত মে মাসে স্ব-উদ্যোগী হয়ে ক্লাবটি জানিয়ে দিয়েছে, ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ইউরো দেনা তাদের। মালিকদের একজন হিসেবে করুণ এক সংবাদই শুনতে হয়েছে রাফাকে, রিয়াল মায়োর্কাকে এবার ইউরোপা লিগে নিষিদ্ধ করেছে উয়েফা। সপ্তম স্থানে থেকে লা লিগা শেষ করায় ইউরোপা লিগে খেলার যোগ্যতা ছিল। কিন্তু আর্থিক নীতিমালা ভঙ্গের দায়ে সেই অধিকার কেড়ে ২০১০-১১ মৌসুমে ইউরোপা লিগে মায়োর্কাকে নিষিদ্ধ করেছে উয়েফা।

আদ্রিয়ানো এবার রোমার সম্রাট

ইতালি তাঁর জীবন, আবার ইতালিই তাঁর মরণ! বছর দেড়েক আগে আদ্রিয়ানো নিজেই বলেছিলেন, ইতালি তাঁর কাছে বিষের মতো লাগছে। কিছুতেই মন বসছে না। ইন্টার মিলান ছেড়ে স্বদেশ-যাত্রা করলেন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার। আবার ফিরে এলেন ইতালিতে। ইন্টার মিলানে নয়, ফিরলেন এএস রোমার হয়ে।
বিশ্বকাপের মাঝে অনেকটা নীরবে-নিভৃতেই গত মাসে চুক্তি সই করেছেন রোমার সঙ্গে। আদ্রিয়ানো ইতালিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই পড়ে যায় হইচই। প্রায় আট বছর ইতালিতে ছিলেন, ইন্টার মিলানের সমর্থকেরা একসময় ভালোবেসে তাঁকে সম্রাট ডাকত। সম্রাটের প্রত্যাবর্তনে হইচই পড়তেই পারে। তবে আদ্রিয়ানোকে নিয়ে হইচই এবার অন্য কারণে। এ কোন আদ্রিয়ানো ফিরে এলেন? চারদিকে উড়ছে এই প্রশ্নটাই। ১০০ কেজির ওপরে ওজন, যেন মোটা এক ঢোল। যে ওজন থাকার কথা তার চেয়ে প্রায় ২৫ কেজি বেশি যেটা। এই আদ্রিয়ানো আসলে কী করতে পারবেন?
পারবেন, আদ্রিয়ানো বললেন, তিনি পারবেন। রোমা অধিনায়ক ফ্রান্সেসকো টট্টি আর স্ট্রাইকার মির্কো ভুচিনিচ মিলে দারুণ এক ত্রয়ী গড়ে তুলতে পারবেন বলেই তাঁর বিশ্বাস। রোমার প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতিতে অংশ নেওয়া আদ্রিয়ানো সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘ত্রয়ী ধারণাটা আমার পছন্দ। আমাদের কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের একসঙ্গে খেলাটা খুবই সম্ভব। টট্টি মাঝখানে এবং আমি আর মির্কো (ভুচিনিচ) দুই পাশে। সময়ের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়াটা ভালো হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে কথা উঠেছে আদ্রিয়ানোর ওজন নিয়ে। এই ওজন তিনি কী করে কমাবেন, বা ওজনটা কত কেজি কমাতে হবে বলে মনে করেন? ব্রাজিলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ২৭ গোল করা আদ্রিয়ানো অবশ্য বাড়তি ওজন নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাইলেন না, ‘ওজনের ব্যাপারে কত কেজি-টেজির ব্যাপারটা নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না। তবে এটা বলতে পারি, এক মাসের মধ্যে আমি শারীরিকভাবে পুরো ফিট হয়ে উঠব।’
বছর দেড়েক আগে ইতালি থেকে যে কারণে আদ্রিয়ানো চলে গেলেন, কথা হলো তা নিয়েও। ব্রাজিলের ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোর যুবদল দিয়েই তাঁর ফুটবল-যাত্রা শুরু। ২০০০ থেকে ২০০১—এক বছর ফ্ল্যামেঙ্গোর মূল দলে খেলেই নজর কাড়েন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর। ২০০১ সালে ইন্টার মিলান নিয়ে নেয় তাঁকে। ২০০৯ পর্যন্ত ইন্টার মিলানে ছিলেন। এর মাঝে ধারে খেলেছেন ফিওরেন্টিনা, পার্মা আর সাও পাওলোতে।
সবকিছু ঠিকঠাকভাবেই চলছিল। তবে ২০০৮-এ আদ্রিয়ানোর বাবা মারা যান। এর পর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় বান্ধবী মাচেদার সঙ্গে। পরপর দুটি ধাক্কা সহ্য করতে পারেননি আদ্রিয়ানো। শোক সামলে উঠতে নাকি অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন। তীব্র হতাশাও ঘিরে ধরে তাঁকে। পরে আদ্রিয়ানো নিজেই সিদ্ধান্ত নেন দেশে ফিরে যাওয়ার। গত বছর যোগ দেন নিজের পুরোনো ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে। গত মৌসুমটা সেখানে ভালো কাটানোর পরই ডাক পান রোমা থেকে।
ওই সময়টায় নিজের চারদিকে একটি ধোঁয়াশাই তৈরি করে রেখেছিলেন আদ্রিয়ানো। আসলে কী ঘটেছিল, সেটা অনেকের পক্ষেই জানা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হয়েছে তাঁকে। আদ্রিয়ানো বললেন, ‘আসলে আমি অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়িনি। আমি হতাশায় ভুগছিলাম। নিজেকে খুবই বিষণ্ন এবং একা মনে হতো। এ কারণেই ব্রাজিলে চলে গিয়েছিলাম। আমার পরিবার আর বন্ধুরা সব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আমাকে সাহায্য করেছে। এখন ভালো আছি।’