Wednesday, April 29, 2015

সিটি নির্বাচনে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ
খোকন বুধবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা
করতে যান। এ সময় তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঢাকা উত্তরের নবনির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক ও ঢাকা দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র সাঈদ খোকন আজ বুধবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পর সেখানে প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। কারচুপি হলে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট কীভাবে পেলেন এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম ও ব্যালটে ক্ষমতাসীনদের অবাধে সিল মারা নিয়ে গণমাধ্যমে যেসব সমালোচনা হয়েছে তার পাল্টা সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, একটি মহল সরকারের কাজকে বিতর্কিত করে ক্ষমতায় যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। অসাংবিধানিক কেউ আসলে তারা পতাকা পাবে। কিন্তু সেই ‘শিকে আর ছিড়বে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ নির্বাচনে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। এ রায় জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাস ও নাশকতার বিরুদ্ধে গণরায়।’
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দেশের গণমাধ্যমের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আপনারা শান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে থাকবেন। ঘাতক, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিপক্ষে লিখবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন কিছু ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু হয়েছে। মিথ্যা অজুহাত দিয়ে তারা (বিএনপি) বর্জন করেছে। তিনি বলেন, ‘ফেসবুক, ফোনালাপ ধরে যেটুকু জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো তাদের পূর্ব পরিকল্পনায় ছিল। গণতন্ত্রের ধারা শক্তিশালী করতেই এ নির্বাচন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো কারণ নাই।’
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে কোনো কোনো পত্রিকা নির্বাচন নিয়ে বড় বড় নিউজ করেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে আমাদের নেতাদের ধরে ধরে যখন আটকে রেখে নির্বাচন করা হয়েছিল তখন তারা কোথায় ছিলেন?
২০০১ সালের নির্বাচনে বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় একটি ভোট কেন্দ্রে মোট ১২০০ ভোটার ছিল। কিন্তু ভোট পড়েছে ২৮০০। ফলে হেরে গিয়েছিলেন মতিয়া চৌধুরী। এখন সে ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
যাঁরা এই তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট নিয়ে সমালোচনা করছেন তাঁদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারচুপি হলে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট পেলেন কীভাবে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরুর আড়াই ঘণ্টার মধ্যে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করল। এ কথা বলার পরই পাশ থেকে কেউ একজন বলেন, আড়াই ঘণ্টা নয়, চার ঘণ্টা পর নির্বাচন বর্জন করেছে। এ কথায় প্রধানমন্ত্রীকে কিছুটা বিব্রত হতে দেখা যায়। এরপর ঢাকার দুই সিটির বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থীদের ভোটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি কারচুপি হয়ে থাকে এত অল্প সময়ের মধ্যে তারা এত ভোট পেল কীভাবে? ’
বিএনপি জোটের ৯২ দিন ধরে চলা অবরোধে পেট্রলবোমায় মানুষ মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি মানুষ পুড়িয়ে মারলে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। এই কথা কেউ বলে না। যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে তাদের মানুষ এত ভোট দেয় কীভাবে? মির্জা আব্বাস মানুষ পোড়ানোর সঙ্গে জড়িত, তাবিথের বাবা এতে অর্থ দিয়েছে। তাদের মানুষ ভোট দেয় কীভাবে?
এ সময় গণভবনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের আওয়ামী লীগ দলীয় কাউন্সিলর, সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলররাও ছিলেন। তবে চট্টগ্রামের নির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির আগামী দু-এক দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতে পারেন বলে জানা গেছে।

মোবাইল ফোনে সারচার্জ নয়, সম্পদ কর বসাতে হবে by প্রতীক বর্ধন

মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর সরকার ১ শতাংশ সারচার্জ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই উন্নয়ন সারচার্জ ও লেভি আরোপ আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মুঠোফোন ব্যবহারের বিলের ওপর ১ শতাংশ সারচার্জ যুক্ত হবে। এতে সরকার বার্ষিক প্রায় ১৪০ কোটি টাকা আয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংসদ বসলে আইনটি হয়তো পাসও হয়ে যাবে। কিন্তু কথা হচ্ছে দেশে যেখানে আয়কর ফাঁকির প্রবণতা চরম আকার ধারণ করেছে, তখন তা রোধ না করে সরকারের এই সারচার্জ আরোপের সিদ্ধান্ত কি গণতান্ত্রিক? প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২-১৩ করবর্ষে বার্ষিক আয় বিবরণীতে মাত্র ৫ হাজার ৬৬২ জন তাঁদের সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি টাকার ওপরে দেখিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোটি টাকার ওপরে সম্পদ থাকলে করের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয়। সে কারণে বিত্তশালীরা কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য নানা রকম ফন্দিফিকির করেন।
অন্যদিকে রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে করযোগ্য মানুষের সংখ্যা ৬০ লাখের মতো, কিন্তু কর দিচ্ছেন মোট ১৮ লাখের মতো। করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখি না। ঢাকা নগরে বাড়িওয়ালাদের অধিকাংশেরই করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) পর্যন্ত নেই। এ নিয়ে কিছুদিন বেশ শোরগোলও হলো। তারপর যেই লাউ সেই কদু। চিকিৎসকদের মধ্যেও অনেকে কর ফাঁকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুসারে, আমাদের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে, আর বাকি ৩০ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে। তার মানে দেখা যাচ্ছে, করের সিংহভাগই জোগান দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ কর বেশি হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এই রাষ্ট্রে যাঁদের আয় বেশি, তাঁরা কর দেন কম। আর যাঁদের আয় কম, তাঁরাই বেশি কর দেন। এটা কোনো গণতান্ত্রিক রীতি হতে পারে না। প্রগ্রেসিভ করব্যবস্থায় যাঁদের আয় বেশি, তাঁদের ওপর ক্রমবর্ধমান হারে করারোপ করা হয়। নাগরিকদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য কমিয়ে আনতে এটা করা হয়। প্রগ্রেসিভ করব্যবস্থায় একটি দেশে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ মোট আদায়কৃত করের প্রায় ৫০ শতাংশ হওয়া উচিত। খোদ রাজস্ব বোর্ডই এ কথা বলে।
কিন্তু মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিলের ওপর সারচার্জ বসিয়ে কী লাভ হবে, তা বোধগম্য নয়। সরকারের হিসাব অনুসারে এ খাত থেকে ১৪০ কোটি টাকা আসবে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে। আমাদের বাজেটের অনুপাতে এ সংখ্যাটা একেবারেই নগণ্য। আবার এই টাকাও যে যথাযথভাবে ব্যয় হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। প্রথম আলোয় খবরটি প্রকাশিত হলে পত্রিকাটির অনলাইনে একজন পাঠকের মন্তব্য এ রকম:
‘আদায়কৃত কর যদি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে জনগণ কর দিতে আপত্তি করবে না। কিন্তু বাস্তবে আদায়কৃত কর সরকারি দল, মন্ত্রী, আমলা ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আদায়কৃত করের অর্থ দিয়ে এমন সব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, যাতে মন্ত্রী, আমলা ও সরকারি দলের নেতা-নেত্রীরা লাভবান হয়।’ সমস্যাটা সেখানেই।
আবার দেশে যাঁরা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাঁরাও যে রাষ্ট্রের কাছ থেকে যথাযথ সেবা পাচ্ছেন, তা-ও নয়। বাণিজ্যের করালগ্রাসে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্র—অর্থাৎ সব মৌলিক অধিকারই এখন আমজনতাকে আলাদা খরচ করে পেতে হচ্ছে। কর দিয়েও এসব মিলছে না। এ দায়িত্ব নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রের। তাকেই নিশ্চিত করতে হবে যে মানুষ কর দিলে প্রাপ্য অধিকার পাবে।
কথা হচ্ছে দুনিয়াজুড়েই মানুষের আয়ের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। কিছুদিন আগের এক সংবাদ অনুযায়ী, বিশ্বে যত সম্পদ আছে, তার প্রায় অর্ধেক এখন ধনকুবের ১ শতাংশ মানুষের হাতে। বাকি প্রায় অর্ধেক ৯৯ শতাংশ লোকের হাতে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ১ শতাংশের বিপরীতে ৯৯ শতাংশের আন্দোলনও আমরা দেখেছি: অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট। ২০১৬ সালের মধ্যে ধনীদের হাতে সম্পদের পরিমাণ অর্ধেক ছাড়িয়ে যাবে। টমাস পিকেটি তাঁর সাড়া জাগানো ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্রন্থে অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু মৌলিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সম্পদ উৎপাদনের অনুপাত ব্যাপক হারে বেড়েছে। অর্থনীতির সাধারণ সূত্রে এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে মুনাফার পরিমাণ কমে আসে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পুঁজি বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট মুনাফার পরিমাণ না কমে উল্টো মজুরির পরিমাণ কমেছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে চার দশক আগের তুলনায় বর্তমানে গড় মজুরির পরিমাণ ৭ শতাংশ কম।
তবে এটা অলঙ্ঘনীয় নয়। এরও প্রতিকার আছে, পিকেটি যে কথা বলেছেন: সম্পদ করারোপ, উত্তরাধিকার কর প্রবর্তন, শিক্ষার আওতা বাড়াতে ব্যয় বৃদ্ধি, করপোরেট পরিচালনা বিধি সংস্কার, কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, ব্যাংকের শোষণ বন্ধে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণারোপ প্রভৃতি। আমাদের দেশে যাদের সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি টাকার ওপরে, তাদের ওপর ইতিমধ্যে সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু ভিত্তিমূল্যের মানদণ্ডে সম্পদের মূল্যায়ন করা হয় বলে সেটা তেমন কার্যকর হয়নি। গত করবর্ষে এ খাত থেকে মাত্র ১৩১ কোটি এসেছে, এ পরিসংখ্যানই এর অসাড়তার প্রমাণ। এই ফাঁক রোধ করা গেলে সারচার্জ বাবদ আমাদের প্রচুর কর আহরণ করা সম্ভব। শুধু চোখ খুলে আশপাশে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এদিকে আমাদের দেশে এখনো সম্পদ কর প্রবর্তন করা হয়নি। যদিও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেই সম্পদ করের বিধান আছে। অলস ও অনুৎপাদনশীল সম্পদ নিরুৎসাহিত করতে সাধারণত সম্পদ কর আরোপ করা হয়। এর মাধ্যমে অর্জিত কর সুনির্দিষ্টভাবে সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ব্যবহার করা যায়।
অনেকে বলছেন, আমাদের দেশের মানুষ মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত কথা বলে। সে কারণে এই করারোপ করা যেতেই পারে। কিন্তু এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। মানুষের যা প্রয়োজন, তারা সেটাই করবে। দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ এই ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। ফলে এই সারচার্জের সিংহভাগই আসবে তাদের কাছ থেকে। পরিসংখ্যানের হিসাবে ১ শতাংশ তেমন বড় কিছু না হলেও নীতিগতভাবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। এর মাধ্যমে সমাজের বিত্তশালীদের আবারও রেহাই দেওয়া হবে। যাঁদের আয় বেশি, তাঁদের কাছ থেকেই রাজস্বের সিংহভাগ আদায় করতে হবে। এটাই সরকারের নীতি হওয়া উচিত। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, সুস্থ ও সচ্ছলভাবে বাঁচার অধিকারও- অন্যান্য আরও অনেক কিছুর সঙ্গে।
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com

পরিচালকদের পদ শূন্যের চিঠি নিয়ে রুল

গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচিত নয়জন পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া চিঠি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ১০ দিনের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আজ বুধবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেন। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া গত ৩০ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয় গ্রামীণ ব্যাংকের নয়জন নির্বাচিত পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করে চিঠি দেয়। ওই চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ব্যাংকের পরিচালক তাহসিনা খাতুন। আদালতে ওই আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান ও তানিম হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করীম। শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল দেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি ১২ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে ঋণগ্রহীতা সাধারণ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন নয়জন পরিচালক। এ ছাড়া বাকি তিনজনকে সরকার নিয়োগ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন চেয়ারম্যান হন। রিট আবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক (পরিচালক নির্বাচন) বিধিমালা অনুসারে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নির্বাচিত পরিচালকেরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচনের জন্য কমিশন গঠন করা হয়নি। তাই তাঁদের পদ খালি করে চিঠি দেওয়া অবৈধ।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘গ্রামীণ ব্যাংক পর্ষদ নিয়ে নতুন সংকট ও বিভ্রান্তি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোতে ছাপা হয়। ওই সময় ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, পরবর্তী পর্ষদ গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই নয় পরিচালকের মেয়াদ থাকবে।

৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে টানা পঞ্চম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান

কাজাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ‘ভূমিধস বিজয়’ অর্জন করেছেন দেশটির ৭৪ বছর বয়সী ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান নাজারবায়েভ। এবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন। কাজাকিস্তানের সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৯৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এদিকে বিপুল পরিমাণ ভোটে জয়ের ফলে একটানা পঞ্চমবারের মতো ৫ বছর মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন নূরসুলতান নাজারবায়েভ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। আগাম এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল আনুষ্ঠানিকতামাত্র। মধ্য-এশিয়ার তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রে ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও তা আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নূলসুলতান। এদিকে নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীকে সরকার পক্ষের হিসেবেই গণ্য করা হয়। সে অর্থে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনেই একক আধিপত্য বজায় রাখলেন তিনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পদ্ধতিগতভাবেই বিরোধী পক্ষকে দমিয়ে রেখেছে সরকার। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ১ বছর আগেই নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন নূরসুলতান। আর সেটা তিনি করেছেন সম্ভাব্য কোন উত্তরসূরিকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার কৌশল হিসেবেই। এমনটা ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তার এ পদক্ষেপের কারণে সম্ভাব্য উত্তরসূরিকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কোন সুযোগও পায়নি দেশটির গণমাধ্যম। ১৯৯১ সালে কাজাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগেই প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নূরসুলতান নাজারবায়েভ। আয়তনের দিক থেকে বিশাল এ দেশটির প্রায় ৯৫ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে দেশটির ব্যাপক বিস্তৃত সীমান্ত-এলাকা রয়েছে।

‘নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে’

ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। টিআইবির এক বিবৃতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কেন্দ্রে গোলযোগ ও সহিংসতা, ভোট প্রদানে বাধা প্রদান, দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে অনৈতিক প্রতিবন্ধকতা প্রতিহত করে  সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রনির্ভর নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা-বাহিনীর ব্যর্থতায় গভীর হতাশা ও উদ্বেগ ব্যক্ত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। অন্যদিকে বিতর্কিতভাবে মাঝপথে নির্বাচন বর্জন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ প্রতিষ্ঠার পথে নতুন করে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায়  সকল রাজনৈতিক দলকে সংযত, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
বিবৃতিতে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান  বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও পেশী-শক্তির প্রয়োগে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হওয়ায় সদ্য-সমাপ্ত তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের মত সাংবিধানিক একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী আইন-প্রয়োগসহ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ব্যাপক কারচুপির নির্ভরযোগ্য তথ্য আর প্রমাণ থাকার পরেও কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে অস্বীকৃতি, মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বিব্রত করেছে। যথাযথ দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন শুধু যে ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, বরং কমিশন ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ করায় সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও জন-আস্থা ধুলিসাৎ হয়েছে।
ড. জামান আরো বলেন, পেশী শক্তি দমনসহ আইনের লঙ্ঘন প্রতিহত করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে নির্বাচনের জন্য সুস্থ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে ভোট প্রদানে নাগরিকদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করার জন্য অর্পিত দায়িত্ব পালনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা-বাহিনী একদিকে নিরব দর্শক ও অন্যদিকে পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা পালন করে শুধু ব্যর্থই হয়েছে তাই নয়, বরং ক্ষেত্র-বিশেষে রাজনৈতিক শিখন্ডি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। উপরমহলের নির্দেশের অজুহাত দেখিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দেশী-বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধিদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা প্রদানে ব্যর্থ হয়ে এই বাহিনী তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এরূপ ব্যর্থতা মানুষের ভোটের অধিকার ব্যাপকভাবে খর্ব করেছে এবং একইসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানই নিজেদেরকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রত করেছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মাঝপথে নির্দলীয় এই নির্বাচন বিতর্কিতভাবে বর্জন করে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ পুন:প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নতুন করে ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতি থেকে উত্তরণে যে ইতিবাচক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছিল, মঙ্গলবারের তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনই সামগ্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঝুঁকি পুনরায় সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জন-জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সকল দলসমূহকে রাজনৈতিক সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক চর্চার ধারা অনুশীলন ও তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আটকা পড়লেন ভোটকেন্দ্রে by কাজী আনিছ

কবি নজরুল কলেজ কেন্দ্রে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত
ইয়োহান ফ্রিসেল l ছবি: প্রথম আলো
বাইরে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে চলছিল সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। বোমার বিস্ফোরণও ঘটে। সংঘর্ষের পর কেন্দ্রের ভোটকক্ষে চলে জাল ভোট দেওয়া। সংঘর্ষ ও হামলায় আহত হন এক কাউন্সিলর প্রার্থী, সাংবাদিকসহ কয়েকজন। সংঘর্ষের কারণে কেন্দ্রে আটকা পড়েন পরিদর্শনে আসা সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ইয়োহান ফ্রিসেল।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজ কেন্দ্রের পরিস্থিতি ছিল এমনই। এই কলেজে ছিল তিনটি কেন্দ্র। তৃতীয় তলা ও দোতলায় ছিল বেশ কয়েকটি ভোটকক্ষ। সকাল থেকেই অবস্থান নেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের গলায় ঝোলানো ছিল আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকনের ব্যাজ। ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী এয়ার মোহাম্মদ এয়ারুর (প্রতীক ঘুড়ি) পক্ষেও ছিলেন তাঁরা। বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কোনো পোলিং এজেন্ট সেখানে দেখা যায়নি।
দুপুর ১২টার দিকে সমর্থকদের নিয়ে ওই কেন্দ্রের ভোটকক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেন স্বতন্ত্র কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম (প্রতীক টিফিন ক্যারিয়ার)। তাঁদের সঙ্গে এয়ারুর সমর্থকদের প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা, পরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। দুই পক্ষেই লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল ব্যবহার করে। হামলা ও ইটের আঘাতে কাউন্সিলর প্রার্থী সেলিম, ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর ফটোসাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ কুমার ঘোষসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ও লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তখন কলেজের ভেতরে মহড়া দিতে থাকেন। অবস্থান নেন প্রধান ফটকে। কিছুক্ষণ পর কলেজের মাঠে বিকট শব্দে দুটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। আবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভয়ে কেন্দ্রে আসা ভোটাররা দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে দৌড়ে যান একটি বাড়ির দিকে। তাঁদের অভিযোগ, ওই বাড়ি থেকেই বোমা মারা হয়েছে। ঘটনাস্থলে দুই গাড়ি বিজিবির সদস্য এলে পরিস্থিতি আবার শান্ত হয়।
ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ও ভোটাররা আটকা পড়েন সংঘর্ষের সময়। পরিস্থিতি শান্ত হলে রাষ্ট্রদূত বের হয়ে চলে যান।
সংঘর্ষের পর বেলা দুইটার দিকে কলেজের একটি কেন্দ্রের দোতলার একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, ১০-১২ জন ব্যালট পেপারে সমানে সিল মারছেন। মেয়রের ব্যালটে ইলিশ ও সাধারণ কাউন্সিলরের ব্যালটে ঘুড়ি প্রতীকে সিল পড়ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্রতিবেদকের গলায় ঝোলানো কার্ড দেখার পর একজন বললেন, ‘ও, সাংবাদিক। শুধু দেখেন, ছবি তুইলেন না।’ ওই যুবক নিজেকে মামুন উর রশিদ ও কবি নজরুল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বলে পরিচয় দেন। বলেন, ‘আমার নাম পেপারে লেখেন। সমস্যা নাই।’
ওই কক্ষের কয়েকটি কক্ষ পরে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের কক্ষ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তাঁকে ঘিরে আছেন বেশ কয়েকজন। নিজেদের পরিচয় দিলেন পোলিং এজেন্ট বলে। তবে কার, তা বললেন না। তাঁদের একজন হাসতে হাসতে বলেন, ‘সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। এবার টাকাটা দিলেই চলে যাব।’
সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।’ পাশের কক্ষে গিয়ে জাল ভোট দেখার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আমার অনেক কাজ আছে।’
কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিমের বাসা কলেজের কাছেই। বাঁ হাতের আঙুলে ব্যান্ডেজ নিয়ে বাসার সামনে বসে ছিলেন তিনি। হাতটি ঝোলা ব্যাগে রাখা। তাঁকে ঘিরে শতাধিক সমর্থক। সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাল ভোটের কথা শুনে আমরা কলেজে গিয়েছিলাম। দেখেন, আমার হাতের অবস্থা। দেশটা শ্যাষ হইয়া গেছে।’
যোগাযোগের চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী এয়ার মোহাম্মদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর সমর্থক ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার দাবি, সেলিম ও তাঁর সমর্থকেরাই কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছেন। কোনো জাল ভোট হচ্ছে না।

উত্তরে ছিল আ.লীগের নিয়ন্ত্রণ

কাফরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের
দুই পক্ষের সংঘর্ষে ভেঙে যাওয়া ব্যালট বাক্স l ছবি: প্রথম আলো
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রায় সব কেন্দ্রই ছিল সরকারি দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা বেলা ১১টার পর থেকেই কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে নিজ দলীয় প্রার্থীর প্রতীকে গণহারে সিল মেরে বাক্সভর্তি করতে শুরু করেন। দুপুরে বিএনপির ভোট বর্জনের ঘোষণার পর তা অনেকটা প্রকাশ্য রূপ নেয়। এতে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কেউ-ই বাধা দেননি। বরং অনেকে সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন। এ সময় কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে ও ছবি তুলতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা বাধার মুখে পড়েন।
সকাল আটটায় ভোট গ্রহণের শুরুতে সংখ্যায় কম হলেও কেন্দ্রে সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি দেখা গেছে। কিন্তু কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আক্রমণাত্মক উপস্থিতির মুখে উপস্থিতি কমতে থাকে। তাঁদের গলায় ছিল আনিসুল হক ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের দল-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর ছবিসংবলিত কার্ড। একপর্যায়ে এই কার্ডধারীরাই কেন্দ্রের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। তাঁদের ঘুরেফিরে ভোট দিতে এবং দুপুরের পর গণহারে ব্যালটে সিল মারতে দেখা গেছে।
ঢাকা উত্তরের মিরপুর এলাকায় কয়েকটি কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে, তবে তা ছিল সরকার দল-সমর্থিত ও ‘বিদ্রোহী’ কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরের পরিবেশই ছিল একই রকম, যা দেখে মনে হয়েছে—ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে একমাত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আনিসুল হক। আর সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীও যেন শুধু সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া প্রার্থী, আর কেউ নেই।
প্রথম আলোর ১৯ জন প্রতিবেদক ও আলোকচিত্রী উত্তর সিটি করপোরেশনের দেড় শতাধিক কেন্দ্র ঘুরে ভোটের এমন চিত্র দেখতে পান।

জালিয়াতি ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে : মার্কিন দূতাবাস

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার ঘটনায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন কূটনীতিকেরা। তবে এ নির্বাচন থেকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা সরে আসায় দেশে আবারো সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে না বলে তারা আশা করেছেন।
মার্কিন দূতাবাস থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আজ বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ব্যাপক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন বয়কটের যে সিদ্ধান্ত বিএনপি নিয়েছে তাতে আমরা হতাশ। যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে তার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। আইনের আওতায় থেকে কাজ করার জন্য এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা এড়ানোর জন্য আমরা সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ধরনের সহিংসতার আশ্রয় নেয়াকে আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।’
ব্রিটিশ হাইকমিশন থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে মাঝপথে বিএনপির সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে এ সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আজ রাতে (মঙ্গলবার) এবং আগামী কয়েক দিন সংহিসতা বা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী কোনো ঘটনা ঘটবে না।
বিবৃতিতে গিবসন বলেছেন, ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সব রাজনৈতিক দলকে আজকের ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত। অনিয়মের সব অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি। সব রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্ব শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা, যা ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার। যারা নির্বাচনে জিতবেন তাদের নিজ নিজ শহরের অধিবাসীদের প্রয়োজন ও ইচ্ছানুযায়ী সেবা দেয়ার দিকে লক্ষ রাখা উচিত।’
এ দিকে সকালে বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল ও কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট বিভিন্ন কেন্দ্রে সহিংসতার খবরে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ভোটে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে মাঝপথে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সরকার একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং জনগণও তা প্রত্যাশা করে। রাষ্ট্রদূত বলেন, নির্বাচন অর্থবহ হতে হলে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার থাকতে হবে।
নির্বাচনের পর সহিংসতা আবারো ফিরে আসতে পারে কি না জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি আশা করি মানুষ সহিংসতায় লিপ্ত হবে না। এটি গণতন্ত্র ও জনগণের গণতান্ত্রিক সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বার্নিকাট বলেন, এটি নির্বাচন কমিশনের দেখার বিষয়।

জিতল আ.লীগ, হারল গণতন্ত্র

মির্জা আব্বাস মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি বুথ। বেলা দেড়টা।
ভোটারের অপেক্ষায় দুই নির্বাচনী কর্মকর্তা (ডানে) ও ক্ষমতাসীন
দল-সমর্থিত প্রার্থীর প্রতিনিধি (বায়ে) l ছবি: আবদুস সালাম
তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই সত্যি হলো। প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হলেও গণতন্ত্রের পরাজয় হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় তোলা এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের খেলায় গণতন্ত্র হেরেছে। সরকার-সমর্থকেরা বিরোধীদের বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রের কাছেই যেতে দেননি। অনেকটা ফাঁকা মাঠে পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় উন্মুক্ত কারচুপি করেছেন তাঁরা। আর বিরোধী দল বিএনপি-সমর্থক প্রার্থীরা ভোট শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। চট্টগ্রামে মনজুর আলম বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার ঘণ্টা খানেক পরই ঢাকায় একই ঘোষণা দেন মির্জা আব্বাসের পক্ষে তাঁর স্ত্রী আফরোজা আব্বাস এবং তাবিথ আউয়াল।
প্রথম আলোর ২৭ জন প্রতিবেদক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২৩টি ও ঢাকা দক্ষিণের ৮৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৫৬টি কেন্দ্র ঘুরে এই চিত্র পেয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৭১৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২৭টি কেন্দ্র ঘুরেছেন প্রথম আলোর ১২ জন প্রতিবেদক। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাকি কেন্দ্রগুলোতে কোথাও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, কোথাও সামান্য বা বড় কারচুপি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ, দক্ষিণে ১৮ লাখ ৭০ হাজার এবং চট্টগ্রামে ১৮ লাখ ১৩ হাজার ভোটার ছিলেন। এর মধ্যে কত শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, সে তথ্য নির্বাচন কমিশন আজ বুধবার জানাবে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনটি সিটি করপোরেশনেই এগিয়ে আছেন সরকার-সমর্থক মেয়র প্রার্থীরা। তাঁরা হলেন ঢাকা উত্তরে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন এবং চট্টগ্রামে আ জ ম নাছির উদ্দিন। তিন সিটি করপোরেশনে এগিয়ে থাকা কাউন্সিলর প্রার্থীদের বেশির ভাগই সরকারি দল-সমর্থক।
এ পরিস্থিতির মধ্যেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ দাবি করেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। ব্যাপক ভোটার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মিডিয়া সেন্টারে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে সিইসি বলেন, কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শনকালে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে কোনো সমস্যা হওয়া বা ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয়ভীতি দেখানোর কথা তাঁকে বলেননি।
৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর গতকালের এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে শঙ্কাই সত্য হয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। পরাজয়ের আশঙ্কায় বিএনপি ভোট বর্জন করেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিএনপি কিংবা তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা গতকালের পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, কোনো প্রতিবাদও করেননি। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারদলীয় কর্মী-সমর্থক ও পুলিশের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁরা ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন। এ কারণে বেশির ভাগ কেন্দ্রেই বিএনপি-সমর্থক প্রার্থীদের এজেন্ট ছিলেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে দলটির তিন মেয়র প্রার্থী মাঝপথে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এর আগে আন্দোলনের মাঠ থেকে সম্পূর্ণ অগোছালো অবস্থায় নির্বাচনের মাঠে এসে দলটি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে ফাঁকা মাঠে সরকার-সমর্থক ও দলের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা কারচুপির প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অনেকগুলো কেন্দ্রে নিজেদের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি করেন। ঢাকা দক্ষিণে কবি নজরুল কলেজ কেন্দ্রে এমনই এক সংঘর্ষের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত। পরে বিজিবি গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর রাষ্ট্রদূত সেখান থেকে বের হন।
এ ছাড়া একাধিক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ঢাকা উত্তরে কাফরুল উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাহমুদা আক্তার ও বিদ্রোহী প্রার্থী মতি মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুরান ঢাকায় বাংলাদেশ ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে ভোটারদের ওপর এক সাংসদের গানম্যানের গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার তথ্য ও চিত্র সংগ্রহ করতে গণমাধ্যমকর্মীদের বাধা দিয়েছেন সরকারি দল-সমর্থক কিছু কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোনো কোনো কেন্দ্রে তাঁদের মারধর করা হয়েছে।
গতকাল চট্টগ্রামে কয়েকটি কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ঢাকায় তিনটি কেন্দ্রে নির্বাচন বাতিল করা হয়। এগুলো হচ্ছে সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়, শেরেবাংলা উচ্চবিদ্যালয়, কমলাপুর এবং আশরাফ মাস্টার আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়। চট্টগ্রামের একাধিক কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ সাময়িক স্থগিত রেখে পরে চালু করা হয়।
ভোট গ্রহণের মাঝখানে নির্বাচন বর্জন করেন বিরোধী দল-সমর্থক মেয়র প্রার্থীরা। বেলা সোয়া ১১টায় চট্টগ্রামের বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। দলীয় নেতাদের উপস্থিতিতে এ সময় তিনি রাজনীতি থেকে অবসরের কথাও জানান দেন।
দুপুর ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকায় বিএনপি-সমর্থিত দুই মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তাবিথ আউয়ালের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ।
জবরদস্তি ও কারচুপির পর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন আক্ষরিক অর্থেই একতরফা হয়ে পড়ে। তার পরও সরকার-সমর্থকেরা বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরেন। এ পর্যায়ে কাউন্সিলর প্রার্থীরা বেশি তৎপর ছিলেন।
সরকারি দলের কৌশল: আগের রাতেই প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের আশপাশে সরকারি দল তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পোস্টার ঝুলিয়ে ও বসার জায়গা সাজিয়ে দখল করে। রাতে অনেক কর্মী সেখানেই অবস্থান করেন। সকাল থেকে তাঁরা তৎপরতা শুরু করেন।
এ অবস্থায় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রের আশপাশে যাওয়া কিংবা অবস্থান করার সুযোগই পাননি। এর পরও যাঁরা সেখানে যাওয়ার ও ভোটকেন্দ্রে অবস্থানের চেষ্টা করেছেন, তাঁরা হামলার শিকার হয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে যাঁদের বুথগুলোতে থাকার কথা ছিল, তাঁদের প্রায় সবাইকেই আগেভাগে এই দায়িত্ব পালন করতে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়।
এভাবে প্রথমে প্রায় সব ভোটকেন্দ্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থক ও এজেন্টমুক্ত করা হয়। এরপর টার্গেট করা হয় গণমাধ্যমকর্মীদের। সকাল থেকেই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে তাঁদের বাধা দেওয়া হতে থাকে। পরে তা মারধর করে আহত করা থেকে জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া পর্যন্ত গড়ায়। এভাবে গণমাধ্যমকেও কোণঠাসা করে সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে অবাধে কারচুপি করা হয়।
অবশ্য এ অবস্থার মধ্যেও অনেক কেন্দ্রে ভোটাররা গিয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। সকাল থেকে দুপুর প্রায় ১২টা পর্যন্ত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব কেন্দ্রেই ভোটাররা গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন। পরে অনেক কেন্দ্রেই ভোটারদের বের করে দিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়।
ভোটারদের আক্ষেপ: ঢাকার অনেক কেন্দ্রে অসংখ্য ভোটার ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। এ ধরনের সব ভোটারই ভোট দিতে না পেরে হতাশ হয়েছেন, আক্ষেপ করেছেন।
এমনই একজন ভোটার তাসলিমা বেগম। তাঁর স্বজনেরা প্রথম আলোকে বলেন, বয়োজ্যেষ্ঠ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ এই নারী কয়েক দিন আগেও হাসপাতালে ছিলেন। ভোট দেওয়ার জন্যই তিনি তাড়াহুড়ো করে হাসপাতাল ছেড়েছেন। অথচ কাল বাসাবো বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে দেখেন, তাঁর ভোট দেওয়া হয়ে গেছে।
দক্ষিণের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী এস এম নাজিমউদ্দিনকে ভোট দেওয়ার জন্য সুরিটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও ভাবি আসিয়া সুলতানা। গিয়ে দেখেন, তাঁদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছেন। এরপর তাঁরা বুথের বাইরে বের হয়ে চিৎকার করে এর প্রতিবাদ জানান। এর ফলে জাল ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনায় ওই কেন্দ্রে ভোট বাতিল করা হয়।
অন্য প্রার্থীদের ভোট বর্জন: উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অন্য মেয়র প্রার্থীরাও দুপুরের আগে ও পরে ভোট বর্জন করেন। সকাল সোয়া ১০টায় পুরান ঢাকার আমলীগোলা এএমসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর নির্বাচন বর্জনের কথা বলেন জাতীয় পার্টি-সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদপ্রার্থী সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সব কেন্দ্র সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে। ব্যালট বাক্স আগে থেকেই ভরে রাখা হয়েছে।
ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী জোনায়েদ সাকি বেলা দুইটায় সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ অনাস্থা ঘোষণা করেন।
একই সময়ে পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন-সমর্থিত দুই প্রার্থী ফজলে বারী মাসউদ ও আবদুর রহমান। এ ছাড়া চট্টগ্রামের তিন প্রার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মতিন, ইসলামী আন্দোলনের মো. ওয়ারেছ হোসেন ভূঁইয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও এই নির্বাচনকে তামাশা আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিরোধী দলকে কৌশলে বয়কট করিয়ে বিজয় ছিনিয়ে নেয় সরকার। আর এবার তা ছিনিয়ে নিল ভোট ডাকাতি করে। এতে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও প্রশাসন সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। নির্বাচনের নামে তামাশার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়েছে।’

রাহুল গান্ধী গরুর মাংস খাওয়ায় নেপালে ভূমিকম্প!

ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে ভূমিকম্পের জন্য কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীকে দায়ী করলেন বিজেপি এমপি সাক্ষী মহারাজ। বিতর্কিত এই বিজেপি এমপির দাবি, ‘গরুর মাংস খেয়ে নিজেকে শুদ্ধ না করেই পবিত্র কেদারনাথে যাত্রা করেছিলেন রাহুল গান্ধী। তারই ফলে নেপালে ভূমিকম্প হয়েছে!’ ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ ঘটনায় এ ধরনের উদ্ভট মন্তব্য করায় রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের মতো মানবিক বিপর্যয় নিয়ে সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক রঙ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কংগ্রেসের মুখপাত্র সুস্মিতা দেব সোমবার জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহের কতিপয় সাথী অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবং সংকীর্ণ মনোভাব নিয়ে একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কে সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক রঙ দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ রকম মন্তব্য করে তিনি শুধু কেদারনাথের ওপর বিশ্বাস রাখা মানুষদেরই অপমান করেননি বরং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে বিপর্যস্তদের প্রতিও উপহাস করেছেন।’ গত সপ্তাহেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী কেদারনাথ মন্দির দর্শনে যান। সেখানে পুজো দেয়ার পর তিনি মন্দিরের আশপাশে ঘুরে দেখেন এবং মাটিতে শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামও করেন। ডিএনএ, হিন্দুস্তান টাইমস।

বিধ্বস্ত নেপাল যেন শ্মশান

যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই আগুন- কুণ্ডলী পাকানো গুমোট ধোঁয়ায় পোড়া মাংসের গন্ধ। সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে সারি সারি চিতা। কুড়িয়ে পাওয়া কাঠ-খড়ের আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে প্রিয়জনের লাশ- পাশে অসহায় প্রলাপ বকছেন ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া শোকার্ত স্বজন। প্রায় ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানির পর বিধ্বস্ত নেপাল এখন শ্মশানভূমি। মাঠে কিংবা ঘাটে যেনতেন করে লাশটা দাহ করতে পারলেই হয়। চারদিকে চিতার আগুন। স্থানীয় হিন্দু গণসৎকারে উঠেছে শোকের মাতম। তবু সবাই কি আর পারছেন? অনেকেই তো স্বজনের লাশটাই উদ্ধার করতে পারেননি। আবার পেলেও ধর্মীয় মতে সৎকারের যে উপকরণ লাগে তা পাবেন কোথায়?
একটা কাপড় মুড়ে কিছু টাকা ফেলে বিদায় জানাচ্ছেন তারা। মঙ্গলবার ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের বাগমাতি নদীর তীরে গণসৎকারের আয়োজন করা হয়েছে। কাঠের ওপর লাশ সাজিয়ে সাদা কাপড় পরিয়ে অগ্নিদাহ করা হচ্ছে। রাজধানী কাঠমান্ডুকে বিভক্তকারী ওই নদী তীর এখন চিতার আগুনে পরিপূর্ণ। মঙ্গলবার সকালে অন্তত কয়েকশ’ লাশ পুড়িয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ সময় স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল ওঠে। নিজেদের মতো করে প্রার্থনা করেছেন ভালো থাকুক প্রিয়জনের আত্মা। প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানান, একটি লাশ দাহ করার জন্য ২৫০ কেজি কাঠের প্রয়োজন। কিন্তু এখন কোথায় পাবে ওই সব? এদিকে পোড়ানোর মতো সুবিধামতো জায়গাও নেই। এত লাশ। যে যেভাবে পারছেন সেখানে জায়গা করে শেষকৃত্য করছে। জায়গা নিয়ে দুই লাশের স্বজনদের মধ্যে মৃদু ঝগড়াও হচ্ছে। রাস্তার পাশে, বিধ্বস্ত ঘরের আনাচে, পাহাড়ের পাদদেশে চারিদিকে জ্বলছে চিতার আগুন। প্রত্যক্ষদর্শী জানান, লোকজন তাদের প্রিয়জনের শেষকৃত্যানুষ্ঠান পরিপূর্ণ রীতিতে শেষ করতে পারছে না।

ওবামাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান দাদির

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তার দাদি সারা ওমর (৯০)। সৌদি আরবের পত্রিকা আল ওয়াতানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ওবামাকে মুসলমান হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। সারা ওমর বলেন, ওমরায় আমি ওবামার জন্য দোয়া করেছি, সে যেন মুসলমান হয়।
২২ এপ্রিল সারা ওমর পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরব গমন করেন। তিনি তার ছেলে সাঈদ ওবামা এবং নাতি মুসা ওবামাকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় যান। সারা ওমর বারাক ওবামার দাদা হোসাইন ওনিয়াঙ্গো ওবামার তৃতীয় স্ত্রী। তিনি একজন কেনিয়ান মুসলিম। বারাক ওবামা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই গুঞ্জন শুরু হয় তিনি মুসলিম। তার নাম অনেক মিডিয়া বারাক হোসেন ওবামা হিসেবেও লেখে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলিম নন বলে নিজেই স্বীকার করেন।

ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যালট বাক্স ভাঙচুর by শুভংকর কর্মকার ও মুসা আহমেদ

ভোট শুরুর আগেই ব্যালট পেপার ছিনতাই। পরে ভোট গ্রহণ শুরু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অপর এক কেন্দ্রে হামলা চালান। ব্যালট বাক্স ভাঙচুর করেন। ফলে ঘণ্টা দুইয়েক তিন কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ। পরে এক কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত। এমনকি ক্ষুব্ধ ভোটারদের শান্ত করতে পুলিশ লাঠিপেটা পর্যন্ত করে।
এভাবেই পুরান ঢাকার সুরিটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সারা দিনই ছিল উত্তেজনা। অবশ্য এর মধ্যেই ঢাকা মহানগর মেট্রোপলিটন কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সেখানে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভোট শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হচ্ছে।’ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি যখন এ কথা বলছিলেন, তখন হামলা ও জাল ভোটের কারণে সেখানকার দুই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি ভোটকেন্দ্র (৫৬৪, ৫৬৫ ও ৫৬৬) এই সুরিটোলা বিদ্যালয়ে। ভোটারসংখ্যা ৫ হাজার ৩২০। অনিয়মের কারণে ৫৬৫ নম্বর কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ কার্যক্রম স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই সুরিটোলা বিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ৫৬৫ নম্বর কেন্দ্র দখল করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শওকত আলী নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখেন। এখানে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ২২৮।
পরে এই কেন্দ্রে ভোট শুরু না হওয়ায় সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা ওই ভবনের নিচতলায় ৫৬৪ নম্বর কেন্দ্রের ১ নম্বর বুথে হামলা চালান। ব্যালট বাক্স ভাঙচুর করেন। এতে করে এই কেন্দ্রসহ পাশের ভবনের আরেকটি কেন্দ্রে (৫৬৬) ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। নয়টার দিকে এ ঘটনার পর বেলা ১১টার দিকে পুলিশের সহায়তায় আবার ভোট শুরু হয় বাকি দুই কেন্দ্রে। তখনো ৫৬৫ নম্বর কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৫০-৬০ জন।
বেলা ১১টা ২০ মিনিটে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটকেন্দ্রটি স্থগিত করা হয়েছে। আপনারা বাড়ি চলে যান।’ এরপর ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে থাকলে পুলিশ তাঁদের লাঠিপেটা করে বের করে দেয়।
জানতে চাইলে স্থগিত হওয়া কেন্দ্র নিয়ে কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আহাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে ভোটকেন্দ্রে লোকজন উল্টাপাল্টা করছিল। তাই প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সেটি বন্ধ করে দিয়েছেন।’ এ বিষয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা স্বীকার করে গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু ব্যালট পেপার মিসিং ছিল। তাই ভোট নেওয়া যায়নি।’

ভোট কারচুপির অভিযোগে তদন্ত চায় জাতিসংঘ

জাতিসংঘের নিয়মিত প্রেস-ব্রিফিংয়ে গতকাল বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন প্রসঙ্গে জাতিসংঘের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রশ্নকর্তা সাংবাদিকের প্রশ্নে উঠে আসে সাংবাদিকদের মারধর ও মিডিয়াকে বাধা দেয়া প্রসঙ্গও। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের মুখপাত্র ফারহান হক বলেছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি’র ভোট বর্জনের বিষয়ে অবগত রয়েছেন মহাসচিব। ভোট জালিয়াতির বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ঘটনা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গণতান্ত্রিক পন্থায় বিরোধী দলকে তাদের অসন্তোষ ও উদ্বেগ এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব পক্ষকে তাদের মতপ্রকাশের আহ্বান জানান মুখপাত্র। সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি বর্তমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করারও আহ্বান জানান বান কি-মুনের মুখপাত্র ফারহান হক। জাতিসংঘের প্রেস-ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ অংশটুকু এখানে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ, ফারহান। জাতিসংঘ অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু, গতকাল আমরা নির্বাচনে তেমনটা দেখিনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সময় বিকাল ৪টার দিকে শেষ হয়েছে। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আগেই ভোটপূর্ণ ভোটকেন্দ্র পাওয়া গেছে। এমনকি সাংবাদিকদেরও মারধর করা হয়েছে এবং নির্বাচনী ফলাফলের বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গণমাধ্যমকে বাধা দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন এরই মধ্যে এ ধরনের ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতার বিষয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়গুলোতে আপনার মন্তব্য কি?
মুখপাত্র: নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বর্জনের বিষয়টি সম্পর্কে মহাসচিব (বান কি-মুন) অবগত রয়েছেন। তিনি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে সব অভিযোগ তদন্ত করতে এবং বিরোধী দলকে তাদের উদ্বেগ প্রকাশে গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ব্যবহারের আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি সব পক্ষকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশের আনুরোধ জানিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান গুরুত্ব সহকারে পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

‘তামাশা’র নির্বাচন বাতিল ও ইসির পদত্যাগ দাবি

সিটি নির্বাচনকে তামাশার নির্বাচন আখ্যায়িত করে তা বাতিল ও পুরো নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পদত্যাগ দাবি করেছে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন। আজ বুধবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সদস্যসচিব শওকত মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশা করেছিলাম তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে গণতন্ত্র, আইনের শাসন তুলে ধরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা হিলাময়চুম্বী, ক্ষমার অযোগ্য।’ সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, তিনি ১৯৪৬ সাল থেকে সব নির্বাচন দেখেছেন। কিন্তু কোনো নির্বাচনই গতকালের ​নির্বাচনের সঙ্গে তুল্য নয়। এ নির্বাচন আবর্জনাতুল্য। যেভাবে নির্বাচন হয়েছে, এভাবে নির্বাচন হয় না। তিনি বলেন, হরতাল হচ্ছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল—এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়টি বিএনপিকে প্রস্তাব করেছিলেন। নির্বাচন হলে এক ধনের সংলাপ হবে, এটা ভেবে।
এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য যোগ করেন, এক অর্থে সংলাপ হয়েছে। ভোটারেরা ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছেন, প্রার্থীরা প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, বিভিন্ন পর্যায় থেকে আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তাঁরা ভেবেছিলেন, এটিকে বৃহত্তর পর্যায়ে নিয়ে গেলে রাজনৈতিক সংলাপের রূপ আসবে। কিন্তু তা হয়নি। তিনি জাতীয় স্বার্থে ইসির পদত্যাগ দাবি করে বলেন, নির্বাচন কমিশন যা করেছে, প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রদের বসিয়ে দিলেও এমন হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের সদস্যসচিব শওকত বলেন, আদর্শ ঢাকা আন্দোলন একটি নাগরিক সংগঠন। এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তাই এই নির্বাচন বিষয়ে কোনো কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা তাদের নেই।
বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও বিএনপি নেতা শিমুল বিশ্বাসের কথোপকথনে বিএনপির নির্বাচন বর্জন পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শওকত মাহমুদ বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। এটা ভিত্তিহীন। খালেদা জিয়া সিরিয়াসলি নির্বাচন নিয়ে কাজ করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। পরিকল্পিত হলে তা করতেন না।’ ভোটের দিন সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রের পরিস্থিতি দেখে তারা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ভোটকেন্দ্র হাজি সেলিম, গোলাগুলি–সংঘর্ষ by গোলাম মর্তুজা

বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্র থেকে হাজি সেলিমকে
সরিয়ে নিচ্ছেন তাঁর লোকজন। তিনি কেন্দ্রে ঢোকার
পর আ.লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর
মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় l ছবি: সুমন ইউসুফ
পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটের (৩৭ নম্বর ওয়ার্ড) বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজনের সংঘর্ষে একজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভোট চলাকালে স্থানীয় সাংসদ হাজি সেলিম সেই কেন্দ্রে ঢুকলে এই সংঘর্ষ বাধে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আবদুর রহমান মিয়াজী (ঘুড়ি মার্কা) ও মো. শাহাবুদ্দীনের (ঠেলাগাড়ি মার্কা) লোকজনের মধ্যে সকাল থেকেই উত্তেজনা চলছিল। এই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরে পোগোজ স্কুল কেন্দ্রে সকালে ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়েও এই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্র নিয়ে সোমবার রাত থেকেই উত্তেজনা চলছিল। ঘুড়ি মার্কার প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে সাংসদ হাজি সেলিম সোমবার রাতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে এলে সেখানে হইচই হয়। সাংসদ কেন্দ্রে না ঢুকেই ফিরে যান।
এরপর গতকাল বেলা পৌনে দুইটার দিকে দুই পক্ষের উত্তেজনার মধ্যেই হাজি সেলিম লোকজন নিয়ে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে ঢোকেন। এ সময়ই কেন্দ্রে বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপরই বিদ্রোহী প্রার্থী শাহাবুদ্দীনের লোকজন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে অভিযোগ করেন, হাজি সেলিম তাঁদের বের করে দিয়ে ঘুড়ি মার্কার পক্ষে জাল ভোট দেওয়াচ্ছেন। শাহাবুদ্দীনের কর্মী নার্গিস আক্তার, মেরি ও সাজু বেগম অভিযোগ করেন, হাজি সেলিম তাঁদের মারধর করেছেন।
কেন্দ্রসংলগ্ন রাস্তায় দুই পক্ষের প্রার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আগ্নেয়াস্ত্র কোমরে গুঁজে একদল তরুণকে দৌড়াতে দেখা যায়। এদের কয়েকজন গুলিও ছোড়ে। এদের গোলাগুলির সময় লিটন নামের এক ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
পরে পুলিশ এসে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশেরও একটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে বিবদমান কর্মীরা।
এদিকে এ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ছবি তুলতে গেলে একটি অনলাইন গণমাধ্যমের ফটো সাংবাদিককে এক পুলিশ কর্মকর্তা অস্ত্র উঁচিয়ে বলেন, ‘ছবি তুললে গুলি করব।’
বেলা দুইটার দিকে হাজি সেলিম কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। এর পরও উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চলতে থাকে। কেন্দ্রে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আড়াইটার পরে কেন্দ্রে ভোট দিতে আসার জন্য প্রার্থীদের লোকজন ডাকাডাকি শুরু করেন। তবে এরপর কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
কেন্দ্রে ঢুকে মারধর ও জাল ভোটের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাজি সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কিছু দেখিনি। আমি জানি না।’

‘একটি কুৎসিত দলকে মানুষ এত ভোট দেয় কি করে’ -শেখ হাসিনা

বিএনপিকে একটি ‘কুৎসিত দল’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দলটিকে মানুষ এত ভোট দেয় কি করে? প্রধানমন্ত্রী ভোট কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কারচুপি হলে তাদের মেয়র প্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট পেলেন কী করে? বুধবার তার নিজ কার্যালয়ে হরতাল অবরোধে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক হস্তান্তরের সময় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, কারচুপি করে কারও ভোট কেড়ে নেয়া হয়নি। আমরা জানি না কি কারণে বিএনপি প্রত্যাহার করে নিল। তাদের মেয়র প্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট পেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের দুঃখ আমি বুঝি। কারো বাবা, কারো স্বামী, কারো সন্তান, কারো মা হারিয়ে গেছে। তাদের আর ফিরিয়ে দিতে পারবো না। তিনি বলেন, আমি সাধ্যমত আপনাদের সহযোগিতা করলাম। আমি জানি এটা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। তারপরেও আপনার দোয়া করবেন যেনো এভাবে আপনাদের সহযোগিতা করে যেতে পারি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়কদের আইনের হাতে সোপর্দ করুন

বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের শাস্তি লঘু আর বাইরে হলে গুরু, এই প্রশ্নই তুলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পয়লা বৈশাখ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এক আদিবাসী ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করেন ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা-কর্মী। নিপীড়নের শিকার ছাত্রীটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে ছাত্রলীগ থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হলেও একাডেমিক ও আইনি কোনো ব্যবস্থাই এ অবধি নেওয়া হয়নি। অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে তাঁদের আইনানুগ শাস্তি হওয়া দরকার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বিহিতের ব্যবস্থা হিসেবে জাবিতে একটি যৌন নিপীড়নবিরোধী অভিযোগ সেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনাও খুবই কার্যকর হয়। কিন্তু পয়লা বৈশাখের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চের ব্যানার থেকে বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের বদলে নিপীড়িতকেই বরং হয়রানি করা হচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগের।
দ্বিতীয়ত, দেখা যায় ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কারও বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ উঠলে বড়জোর তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। যেখানে সাধারণ আদালতেই যৌন নিপীড়কের গুরুতর শাস্তি দেওয়া হয়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে নিপীড়কেরা প্রায়ই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় পার পেয়ে যান। এ পরিপ্রেক্ষিতে বারবারই মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে নাগরিক ও বিদ্যায়তনিক মহল থেকে দাবি উঠেছে যে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে অপরাধীর
বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেই মামলা পরিচালনা করা হোক। দ্বিতীয়ত, যতক্ষণ না নির্দোষ প্রমাণিত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্তকে একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে রাখা হোক।
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্বিবদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শৃঙ্খলা ও পরিবেশ সুষ্ঠু রাখায় নিয়োজিত প্রক্টররা নিদারুণভাবে দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। তাঁদের ব্যাপারেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। যৌন নিপীড়ন যেভাবে সর্বক্ষেত্রে ভয়াবহ আকার নিয়ে ফেলেছে, নারীর নিরাপত্তার স্বার্থেই তাই আইনের কঠোর প্রয়োগ করার বিকল্প নেই। আর শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে উপাচার্য বা প্রক্টর যদি দায়িত্বে অবহেলা করেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

যে কোন উপায়ে জয় আদৌ জয় নয় -মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, যে কোন উপায়ে জয় আদৌ কোন জয় নয়। বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে গতকাল এক টুইট বার্তায় তিনি একথা বলেন। এদিকে বিকালে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তার ব্যাপক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। ওই বিবৃতিতে বিএনপির নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের হতাশার কথাও উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। আইনের আওতায় থেকে কাজ করার জন্য এবং যে কোন ধরনের সহিংসতা এড়ানোর জন্য সকল পক্ষের প্রতি আহ্বানও জানানো হয় দূতাবাসের বিবৃতিতে। সেখানে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোন ধরনের সহিংসতার আশ্রয় গ্রহণের তীব্র নিন্দা জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিক্যাট আজ বনানী
বিদ্যানিকেতন স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ছবি: ফোকাস বাংলা
রাষ্ট্রদূতের ভোট পর্যবেক্ষণ: এদিকে গতকাল দুপুরে রাজধানীর একটি কেন্দ্রে ভোট পর্যবেক্ষণ করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। ওই সব ঘটনাকে দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সকাল সাড়ে ১১টার অল্প আগে রাষ্ট্রদূত বানানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে যান। সেখানে প্রায় ৪০মিনিট অবস্থান করেন তিনি। এ সময় কেন্দ্র-১ এর প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে আলাপ ছাড়াও পুরুষ ও মহিলা দুটি বুথ পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রদূত। ওই দুই বুথে প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করে ২ জন করে চার জন প্রার্থীর ভোট প্রদান প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন তিনি। রাষ্ট্রদূত বুথ দুটির নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়াও বিভিন্ন প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের (বাস প্রতীক) কোন এজেন্টের দেখা পাননি তিনি। বুথ পরিদর্শন শেষে বিদ্যালয়ের আঙিনায় রাষ্ট্রদূত যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি সেই সময়ই খবর আসে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে চট্টগ্রামের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন। একই অভিযোগে ঢাকার দুই সিটির বিরোধী প্র্রার্থীরাও নিজের প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা বিষয়টি রাষ্ট্রদূতের নজরে এনে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চান। জবাবে বার্নিকাট বলেন, আবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জনগণও তাই চাইছে। যারা ভোট দিতে বেরিয়েছে তাদের নির্বিঘ্ন ভোট প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। আমি খুশি যে অনেকে ভোট দিতে এসেছে। আমি আশা করবো অর্থপূর্ণ একটি নির্বাচনের ওই সব ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা সচেষ্ট হবেন। এ সময় রাষ্ট্রদূত তার দেশের প্রসঙ্গ তুলে জানতে চান- যুক্তরাষ্ট্রে কোন নির্বাচনে ভোটাররা ভোট প্রদানে বাধা প্রাপ্ত হলে তারা পরবর্তীতে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান, বাংলাদেশে এমনটি হয় কি-না? ‘না’ সূচক উত্তর পেলে রাষ্ট্রদূত বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত। বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ফলে রাজনীতিতে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি আশা করি কেউ সহিংসতার পথে যাবে না। এখানে গণতন্ত্র আছে। গণতন্ত্রে ভিন্ন মত প্রকাশের সুযোগও রয়েছে। আশা করি সবাই সেটির সদ্ব্যবহার করবেন। এর আগে সোমবার এক টুইট বার্তায় বার্নিকাট একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। আশা করি এই চেতনার একটি নমুনা হবে মঙ্গলবারের নির্বাচন।
অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান বৃটেনের: এদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের সকল অভিযোগ দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট ডব্লিউ গিবসন। এ ছাড়া নির্বাচন থেকে মাঝ পথে বিএনপির সরে দাঁড়ানোয় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে সহিংসতা বা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী কোন ঘটনা ঘটবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এ কূটনীতিক। বিএনপির ভোট বর্জনের পরপরই ঢাকার বৃটিশ হাইকমিশন থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত। বৃটেন মনে করে সকল ভোটারের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট প্রদান নিশ্চিত করা সব রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমূহের দায়িত্ব। যারা নির্বাচনে জিতবেন তাদের স্ব-স্ব শহরের অধিবাসীদের প্রয়োজন এবং ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের সেবা প্রদানের দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করা হয় হাই কমিশনের ওই বিবৃতিতে।
হাই কমিশনারের ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন: এর আগে গতকাল সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি বয়েজ স্কুল কেন্দ্রে ভোট পর্যবেক্ষণ করেন ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসন। সেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখেন তিনি। বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ হচ্ছে। আমি প্রিজাইডিং আফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন কোন গোলযোগ ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিরোধী প্রার্থীর পালিং এজেন্টদের না থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন এটি প্রার্থীদের বিষয়। তারা ঠিক করবে কোথায় কাকে পোলিং এজেন্ট দেবে। আমি এর আগে তিনটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি এবং কিছু পোলিং এজেন্ট দেখেছি। উল্লেখ্য, কেবল যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যই নয়, ঢাকাস্থ বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত সরাসরি কিংবা প্রতিনিধি মারফত সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা নিজ নিজ দেশে রিপোর্টও পাঠাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সংকটের আশঙ্কা বিদেশি গণমাধ্যমের

বাংলাদেশে গতকাল মঙ্গলবার তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের খবর বিদেশি গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। ভোট চুরির অভিযোগ এনে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তারা এ ঘটনাকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছে।
এসব গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও মতামতে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের পর গতকাল প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে নামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। কিন্তু গতকাল যা হয়েছে, এতে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আবার অনিশ্চয়তার মেঘ জমল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংকট কিছুটা দূর হবে বলে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, এতে ভাটা পড়ল। দুই নেত্রীর লড়াই আরও দীর্ঘস্থায়ী হলো।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ভোটচুরির অভিযোগ এনে বিএনপি গতকাল দেশের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করেছে। এতে বাংলাদেশে আবার রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিটি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটবে বলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। এতে ভাটা পড়েছে। রাজনীতির আকাশে আবার অনিশ্চয়তার মেঘ জমেছে।
এএফপির খবরে বলা হয়, ভোট চুরির অভিযোগ এনে বিএনপি সিটি নির্বাচন বর্জন করায় রাজনৈতিক সংকটের পথ আরও দীর্ঘ হলো। এতে জিয়া ও হাসিনার পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হলো। গতকালের নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে যে শিগগিরই দেশে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হওয়া সম্ভব না। নির্বাচনকে ঘিরে এটা বোঝা যায় যে দুই নেত্রীর লড়াই চলতেই থাকবে।
ব্লুমবার্গ বিজনেসের খবরেও একই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। খবরটি শুরুই হয়েছে এভাবে—যখনই ভাবা হয়েছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ প্রশস্ত হচ্ছে বা অচলাবস্থার অবসান হচ্ছে, তখনই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থা ফিরে এল। বিএনপির নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে বিরোধের আরেকটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলাও। তাদের শিরোনাম ছিল—নতুন অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের রাজনীতি?
খবরে বলা হয়, গত বছর ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জন এবং এ বছর টানা কয়েক মাস ধরে সহিংস আন্দোলনে ক্ষান্ত দিয়ে বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়। অনেকে মনে করছিলেন যে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হয়তো রাজনৈতিক অচলাবস্থার বরফ গলার একটা সুযোগ তৈরি হলো।
কিন্তু আজ বিরোধীদের ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন করে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল, এতে সন্দেহ নেই।

বর্ষপূর্তিতে চার্জশিট নিয়ে বিভক্তি

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের এক বছর পূর্তিতে নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের স্মরণ সভা করেছে জেলা আইনজীবী সমিতি। সভায় আদালতে দাখিল করা চার্জশিট নিয়ে এক পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও অপর পক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। গতকাল নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির বার ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় সভাপতিত্ব করেন সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
স্মরণ সভায় মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী এপিপি কে এম ফজলুর রহমান চার্জশিটে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে সাত খুনের মামলার বেশি জানার সুযোগ হয়েছে আমার। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুরো টিম আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই চার্জশিট প্রদান করেছেন। সাত খুনের পর প্রধানমন্ত্রী কারও রাজনৈতিক বক্তব্য ও কারও রাজনীতির দিকে না তাকানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি এসপি, ডিসিকে বদলি করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার কারণে সেনাবাহিনীর তিন জন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা মন্ত্রীসভার অনেকের আত্মীয়স্বজন। তারপরও এক বছরের মধ্যেই চার্জশিট দাখিল করতে পেরেছে তদন্তকারী সংস্থা।
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস জুয়েল বলেন, এক বছর পূর্বে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর কিছু বিপদগামী কর্মকর্তা চন্দন সরকারসহ সাত জনকে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে। নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির একজন আইনজীবীও যতদিন বেঁচে থাকবে এ সাত খুনের বিচার দাবি করে আসবে। আমরা বুঝিয়ে দিতে চাই, কালো কোটের উপর হাত তুললে পরিস্থিতি ভাল হবে না। কালো কোটের উপর হাত তুললে যে এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে সেটা বুঝাতেই আমরা প্রতিবাদ করে আসছি। সে যত বড় বা যত প্রভাবশালীই হোক নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির আইনজীবীদের কালো কোটের উপর হাত তুললে ছেড়ে দেয়া হবে না। সরকারের সদিচ্ছায় এ মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা সম্ভব হয়েছে। জবানবন্দি না থাকলে কঠিন হতো। সুবিচার আছে বলেই ২২ জন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাত খুনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এ বিচার কার্যক্রম শুরু  করার দাবি জানাচ্ছি। সেই ট্রাইব্যুনাল নারায়ণগঞ্জেই গঠন করা হোক। আর আমরা অনেক আগেই বলেছিলাম, আমার ভাইয়ের রক্ত-মাংসের টাকা খাব না। সেজন্য নারায়ণগঞ্জের কোন আইনজীবী আসামীদের পক্ষে ওকালতনামা দেয়নি। আসামীরাও ন্যায়বিচার পাচ্ছে। তারা হাইকোর্টেও জামিন আবেদন করেছিলেন। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করব।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দুটি মামলার একটির এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে একজনকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যারা র‌্যাবকে ভাড়া করেছিল, টাকা দিয়েছিল তাদের মধ্যে শুধু নূর হোসেনকে অভিযুক্ত করা হলো, বাকিদের কেন বাদ দেয়া হলো? যে কারণে চার্জশিট নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। যাদের এজাহারে নাম ছিল তাদের চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হলে, তারা যদি নির্দোষ হয় তাহলে সাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত থেকে ছাড়া পেত। কিন্তু সেটা না করে চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হলো। নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী চার্জশিটের নকল তোলার আবেদন করেছেন। নকল তুলে আলোচনার মাধ্যমে আগামী ১১ তারিখে নারাজি দিবেন।
স্মরণ সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সমিতির যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট মহসিন মিয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন, অ্যাডভোকেট নবী হোসেন, অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন, এপিপি অ্যাডভোকেট সাকের খান, অ্যাডভোকেট আকরব আলী, অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক, অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ভূঁইয়া, অ্যাডভোকেট তপন কুমার পাল, অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান, অ্যাডভোকেট মাসুদুর রউফ, অ্যাডভোকেট নাসিমা হাসানাত প্রমুখ।
উল্লেখ্য ১১ মাস ৯ দিনের মাথায় গত ৮ই এপ্রিল ৭ খুনের দুটি মামলায় র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা ও নূর হোসেনসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে ডিবি পুলিশ। এরমধ্যে র‌্যাবের ২৫ সদস্য ও নূর হোসেনসহ ১০ জন। গত বছরের ২৭শে এপ্রিল নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ৭ জনকে নারায়ণগঞ্জের লিংকরোড থেকে অপহরণ করে র‌্যাব। তিনদিন পর শীতলক্ষ্যায় তাদের প্রত্যেকের লাশ ভেসে উঠে।

মানবজমিনকে মনজুর- ৫০ বছরে এমন ন্যক্কারজনক ভোট দেখিনি by মহিউদ্দীন জুয়েল

এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। জোর করে জনগণের ভোট কেড়ে নেয়া হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এই লজ্জার চিত্র দেখেছে। তারপরও আমি কিভাবে রাজনীতি করবো। যে নির্বাচন কমিশন মানুষের ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে না সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশার কিছু নেই।
গতকাল দুপুরে নিজ বাসভবনে মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম। ভোট কারচুপির চিত্র দেখে শুধু নির্বাচন বর্জন নয়, রাজনীতি ছাড়তেও ঘোষণা দেন সাবেক এই মেয়র।
মানবজমিন: আজ (গতকাল) যে ভোট হলো সেই ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
মনজুর: দুঃখজনক। আমি বিস্মিত। হতভম্ব। ৭১৯ ভোট কেন্দ্রের ৬৪০টির বেশিতে সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজন হামলা চালিয়ে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়েছে। অনেক জায়গায় জালভোটের মহোৎসব দেখা গেছে। আপনাদের মিডিয়াতে এসব চিত্র দেখেছে পুরো দেশের জনগণ। কিভাবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা যায় তা দেখা গেলো আজ।
মানবজমিন: এমনটা কেন মনে হচ্ছে? নাছির তো বলেছেন আপনি নিশ্চিত হার মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাড়াঁনোর ঘোষণা দিয়েছেন।
মনজুর: আমার ৫০ বছরের রাজনীতির জীবনে এমন ন্যক্কারজনক ভোট আগে কখনও দেখিনি। ৫ই জানুয়ারির ভোটের পর ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কজনক অধ্যায় সূচিত হলো। সকাল ৮টা থেকে আমার মোবাইলে ফোন আসতে শুরু করে। এজেন্টরা জানায় তাদেরকে বের করে দিচ্ছে। আমি ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখি সেখানে মানুষ ভোট দিতে পারছে না। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের সম্মান রক্ষার্থে আমি নির্বাচন বয়কট করেছি।
মানবজমিন: নির্বাচন বয়কটের ঘোষণায় আপনি বলেছেন রাজনীতি করবেন না। এমন ঘোষণা কেন দিলেন?
মনজুর: যখন শুনতে শুরু করলাম ৮০ শতাংশ কেন্দ্র দখল হয়ে গেছে, বোমাবাজি হচ্ছে, এজেন্টদের বের করে দেয়া হচ্ছে তখন আমি বিষয়টি নোমান ভাইকে (ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান) বললাম। এই সময় তিনি বললেন, অনেক কেন্দ্রে লোকজনকে মারধর করা হচ্ছে। তাদের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেয়া হচ্ছে না। তারপর তার সঙ্গে কথা বলে নির্বাচন থেকে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কলুষিত এই রাজনীতিতে গণতন্ত্রের চর্চা বৃথা। সকাল বেলায় ভোট দিতে যাওয়ার আগেই শুনলাম অনেক জায়গায় পিস্তল ঠেকিয়ে ভোট কেড়ে নেয়া হচ্ছে।
মানবজমিন: গত নির্বাচনে আপনি ৯৫,০০০ ভোটের ব্যবধানে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়েছিলেন। এবার নির্বাচন বয়কট ঘোষণার মধ্য দিয়ে ফলাফল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। দুটি ঘটনাকে কিভাবে দেখছেন?
মনজুর: ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়েছিল। এবার সেই রকম কিছু হলে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জিততাম। কিন্তু ভোট শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়ে গেছে। তাহলে এখানে সুষ্ঠু ভোট কিভাবে হলো। এবারের নির্বাচন হচ্ছে গায়ের জোরের ভোট। অস্ত্রের ভোট। ডাকাতির ভোট।
মানবজমিন: নির্বাচন কমিশনকে আপনি পরিস্থিতির বিষয়ে অবহিত করেছেন?
মনজুর: অবশ্যই। যখন শুনলাম পাহাড়তলী, পতেঙ্গা এলাকায় জাল ভোট পড়ছে তখন রিটার্নিং অফিসারকে বিষয়টি জানাই। ওই সময় তিনি বলেন, আমি ঘটনার সত্যতা খতিয়ে দেখছি। আপনি টেনশন করবেন না। এরপর বেলা ১২টা বাজতেই ৮০ ভাগ কেন্দ্রে ভোট দখল হয়ে সিল মারা শেষ।
মানবজমিন: তার মানে আপনি বলেছেন কমিশন কোন ব্যবস্থা নেয়নি?
মনজুর: অবশ্যই না। কেবল নির্বাচন কমিশন কেন, নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তারাও কোন কোন কেন্দ্রে নীরব ভূমিকা পালন করেছে। আবার তারাও জাল ভোটদানে সহযোগিতা করেছে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় জাল ভোট হয়েছে।
মানবজমিন: নির্বাচনের আগে ৫৯১টি ভোটকেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছিল। এসব কেন্দ্রে পুলিশ প্রশাসন বলেছিল নজরদারি বাড়ানো হবে। তখন কেন নির্বাচন বয়কট ঘোষণার দাবি আসেনি আপনাদের কাছ থেকে?
মনজুর: দেখুন এই সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারে না। তার সর্বশেষ নজির এই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আমরা জনগণের দাবির মুখেই নির্বাচনে গিয়েছিলাম। ৫ই জানুয়ারিতে ভোট দিতে না পেরে তাদের মধ্যে ক্ষোভ কাজ করছিল। এবার সেই ভোট কেড়ে নেয়ায় ক্ষোভ আর বাড়লো। কিন্তু এই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলে হয়তো সরকারের অস্তিত্ব থাকবে না।
মানবজমিন: আ জ ম নাছির বলেছেন, তিনি মেয়র হলে আপনার সব কাজের হিসাব প্রকাশ করবেন। আপনি কি বলবেন?
মনজুর: করপোরেশনে থাকার সময় আমি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। সরকারের অসহযোগিতার পরও অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মধ্যে মানুষের সেবা করার চেষ্টা করেছি। যেদিন দায়িত্ব থেকে বিদায় নেবো সেদিনও সহকর্মী ও লোকজনেরা কান্না করেছে। নগরবাসীর উন্নয়ন করেছি বলে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে বুদ্ধি পরামর্শ পেয়েছি।

ডিজিটাল জমানায় এনালগ কারচুপি

এ এক নয়া মডেলের নির্বাচন। উৎসব তো বটেই। দখলের উৎসব। একেবারেই খোলামেলা। কোন রাখডাক নেই। সকাল সকাল প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র থেকেই হাওয়া বিএনপি সমর্থক এজেন্টরা। কেউ ঢুকতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। তবে থাকতে পারেননি কেউই। হুমকি, মারধর, হামলা আর গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন তারা। কাউকে কাউকে আটকে রাখা হয় আগেই। রক্তাক্ত এজেন্ট যেন একটি নির্বাচনেরই প্রতিচ্ছবি। আভাস পাওয়া গিয়েছিল আগের রাতেই। খবর আসছিলো, ব্যালট পেপারে সিল মারার। যদিও তার সংখ্যা ছিল কম। তবে গতকাল দিনের শুরুতেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রথম বাধার শিকার গণমাধ্যম। বেশির ভাগ কেন্দ্রেই ক্যামেরা নিতে মানা। দিনভর টার্গেট সাংবাদিকরা। কেন্দ্র বিরোধী এজেন্টমুক্ত করার পর বিরোধী ভোটারমুক্তও করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল তাদের শতভাগ সহযোগী। কোথাও কোথাও অগ্রণী ভূমিকায়। কেন্দ্রের সামনে বিরোধীরা যেন আসতে না পারেন তা নিশ্চিত করা হয় শতভাগ। এরইমধ্যে চলে গায়েবি ভোট। প্রকাশ্যে ব্যালটে সিলমারা। ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরাই শুধু নয় এমনকি কোথাও কোথাও নির্বাচনী কর্মকর্তাদেরও দেখা গেছে ব্যালটে সিল মারতে। কোথাও কোথাও ভোটাররা ভোট দিতে গেলে বলা হয়, দেরি করে ফেলেছেন। অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কয়েকটি কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বলাবাহুল্য, এ সংঘর্ষ হয়েছে সরকারি দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেই। সার্বিক পরিস্থিতিতে দুপুরেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রফেসর নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, একশ’ ভাগ ভোট পড়লেও অবাক হবো না। তবে এতো কিছুর পরও সেনা সদস্যরা অবশ্য মোতায়েন ছিলেন সেনানিবাসেই। কোথাও তাদের ডাকার প্রয়োজন মনে করেনি নির্বাচন কমিশন। সারাদিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ যেন জোর যার, ভোট তার। কেউ কেউ বলছেন, ডিজিটাল জমানায় এনালগ কারচুপি।
ভোটের শুরুতেই নানা কেন্দ্র থেকে খবর আসতে থাকে বিএনপির নেতৃত্বের কাছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে ঘুরে হতাশাজনক চিত্র দেখেন প্রার্থীরা। দ্রুতই এগুতে থাকেন নির্বাচন বর্জনের দিকে। প্রথম ঘোষণা আসে অবশ্য চট্টগ্রাম থেকে। বেলা ১২টার আগেই কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে যান মনজুর আলম। একইসঙ্গে রাজনীতি থেকেও অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পর ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন- উত্তরের মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। মওদুদ আহমদ বলেন, র‌্যাব-পুলিশ এবং সরকারি দলের লোকজন আমাদের সব এজেন্টকে বের করে দিয়েছে। এটা কোন নির্বাচন হয়নি। এটা একটি ভোটবিহীন প্রহসনের নির্বাচন। এ নির্বাচনকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। তবে শুধু বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীই নয়, আলোচিত বেশির ভাগ মেয়রপ্রার্থীই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টি, সিপিবি সমর্থিত প্রার্থীরা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন জোনায়েদ সাকী, গোলাম মাওলা রনির মতো প্রার্থীরা। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগ। যদিও দিনভর জালভোটের উৎসব আর বিএনপির বর্জনের পর এ নির্বাচনে কারা জয়ী হচ্ছেন তা নিয়ে অবশ্য কারো কোন আগ্রহ ছিল না। তিন ক্ষমতাসীন সমর্থিত প্রার্থীর নাম- ঢাকা উত্তরে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন, চট্টগ্রামে আ.জ.ম নাছির উদ্দিন।
কলঙ্কজনক ভোট বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে সবকিছু এত খোলামেলা হওয়ার ঘটনা সম্ভবত এবারই প্রথম। একদিনের বাদশারা তাদের রায় দিতে পারবেন কি-না তা নিয়ে আগেই শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, নজিরবিহীন ভোটের। ভোট নজিরবিহীনই হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, মঙ্গলবার কোন মঙ্গল বয়ে আনেনি। গায়েবি ভোটের উৎসবে ম্লান হয়েছে গণতন্ত্র। বেশির ভাগ মানুষই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ নিয়ে বেশি বলাও অবশ্য মুশকিল। কিছু কিছু পত্রিকা বলেছিল, এ নির্বাচন হবে গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে বলা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আরও একবার পরাজিত হয়েছে।
নির্বাচন বর্জন করলেন যারা-
২০দলীয় জোট ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন, স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি, জোনায়েদ সাকীও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলও ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া, জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত মেয়রপ্রার্থীরা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাপক কারচুপি ও সরকারসমর্থিত প্রার্থীদের ভোটকেন্দ্র দখলের প্রতিবাদে এই ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গতকাল দুপুরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই বর্জনের ঘোষণা দেন মেয়রপ্রার্থীরা। এসময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়রপ্রার্থী মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়রপ্রার্থী আলহাজ আব্দুর রহমান, সংগঠনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমদ, রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, মাওলানা ইমতিয়াজ আলম, কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলম, মাওলানা আহমদ আব্দুল কাইয়ুম, কেএম আতিকুর রহমান প্রমুখ। প্রার্থীরা বলেন, ভোটগ্রহণ শুরুর পর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়া, জালভোট প্রদান ও ভোটকেন্দ্র দখল করে সরকারদলীয় প্রার্থীদের ভোট প্রদানসহ নানা অনিয়মের খবর পাওয়া  গেছে। এহেন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে গেছে বলে আমরা মনে করছি। এ প্রহসনের নির্বাচনকে আমরা মেনে নিতে পারি না। তাই আমরা এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছি। চট্টগ্রাম থেকেও আমাদের মেয়র প্রার্থী ওয়ায়েজ হোসেন ভূঁইয়া নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমদ বলেন, নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী না নামিয়ে সরকারসমর্থিত প্রার্থীদের ভোট ডাকাতির সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা এ নির্বাচন বর্জন করছি এবং এ নির্বাচন বাতিল করার আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিকে বিরোধী জোটের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা আসার পর ঢাকা উত্তরের মেয়রপ্রার্থী জোনায়েদ সাকীও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল দুপুরে নিজ নির্বাচনী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ  ঘোষণা দেন। সাকী বলেন, যেভাবে  কেন্দ্র দখল করা হয়েছে, ব্যালট ছিনতাই করা হয়েছে তাতে এই ভোট ও ফল  মেনে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। এ কারণে আমি নির্বাচন ও ফল প্রত্যাখ্যান করছি। এছাড়া ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি। বিকাল তিনটার দিকে তিনি নির্বাচন বর্জনের এ  ঘোষণা দেন। তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এক স্ট্যাটাসে রনি লেখেন, ‘অন্যসব প্রতিযোগীর মতো আমিও এই নির্বাচন বর্জন করলাম। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন টিভিতে দেখছিলাম, আর ২৮শে এপ্রিলের নির্বাচন চর্ম চোক্ষে দেখলাম। এও কি সম্ভব! ইয়েস, ‘রংগে ভরা বঙ্গে সবই সম্ভব’। এর আগে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ঢাকার দুই সিটি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মেয়র প্রার্থী আবদুল্লাহ ক্বাফী এবং দক্ষিণে বজলুর রশীদ ফিরোজ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ভোটকেন্দ্র সরকারি দলের নেতাকর্মীরা দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ জাতীয় পার্টি সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। সকাল ৯টায় লালবাগের আমলীগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান শেষে তিনি এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারেনি।

ভোট জালিয়াতির মহোৎসব

রাজধানীর খিলগাঁও মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রকাশ্যে সিল মারছেন
যুবলীগের দুই নেতা। কমলাপুর স্কুলে জাল ভোয়ার ট দেসময়
সাংবাদিকরা কক্ষে প্রবেশ করলে এভাবেই সিলমারা ব্যালট পেপার
ফেলে বেরিয়ে যায় ভোট জালিয়াতরা (ইনসেটে)
কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, জাল ভোটের মহোৎসব এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন। দল সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে দিনের প্রথম ভাগেই তিন সিটির অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনেই তারা ছিনিয়ে নেয় ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স। অস্ত্রের মহড়ার পাশাপাশি জোর করে বের করে দেয় বিএনপিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের এজেন্টদের। চলে প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিলমারাসহ জাল ভোটের মহোৎসব ও নজিরবিহীন কারচুপি। কোথাও কোথাও প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারকেও ভোট দখল প্রক্রিয়ায় সরাসরি যোগ দিতে দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা করতে দেখা গেছে, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করতে প্রায় পাঁচশ’ ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিলেন নিষ্ক্রিয়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ও নিরীহ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই সামান্য। এ অবস্থায় বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এছাড়া ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে হামলা ও সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আর চট্টগ্রামে সংঘর্ষে আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সঙ্গে দল সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যেই বেশির ভাগ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন কেন্দ্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বহু এলাকায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস সেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ ও গুলি করেছে। সকাল ৮টা থেকে ভোট শুরু হওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বেশির ভাগ কেন্দ্র দখল করে নেয় সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। অনেক কেন্দ্রে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের ঢুকতেই দেয়া হয়নি। যারা ঢুকতে পেরেছেন তাদেরও মারধর ও হুমকি দিয়ে বের করে দেয়া হয় বেলা ১১টার মধ্যেই। প্রতিপক্ষের এজেন্টকে দিগম্বর করার ঘটনাও ঘটেছে তেজগাঁওয়ের একটি কেন্দ্রে। দুপুরে তেজকুনিপাড়ায় ২০ দলীয় জোট প্রার্থীর ব্যাজ পরে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করায় কয়েক যুবককে মারধরের পর তাদের কাপড় খুলে নেয়া হয়। এমনকি নারী পোলিং এজেন্টও রক্ষা পাননি সরকারদলীয় সমর্থকদের তাণ্ডবের হাত থেকে।
ঢাকা উত্তরের লালকুঠি এলাকায় সরকারদলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় আহত হন ইসমাত আরা জাহান ওরফে নিলা নামে সংরক্ষিত আসনের এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলাকারীরা এ সময় তার কাছে হাতব্যাগে থাকা ৮৫ হাজার টাকা ও সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হামলা থেকে রেহাই পাননি সাংবাদিকরাও। তাদের ক্যামেরা ভাংচুর করা, কেড়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাধায় বহু কেন্দ্রে সংবাদকর্মীরাও প্রবেশ করতে পারেননি। জাল ভোট, অনিয়ম ও সংঘর্ষের তথ্য সংগ্রহ এবং ছবি তুলতে গিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধসহ অন্তত আটজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ সময় সবুজবাগে রাইজিং বিডির সাংবাদিক ইয়াসিন রাব্বী গুলিবিদ্ধ হন। মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও মানিকনগরের তিনটি কেন্দ্রে সরকার সমর্থকরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন ২০ দলীয় জোট প্রার্থীর সমর্থকদের। আর এসব কিছুই হয় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সামনেই।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনকালে নানা অনিয়ম, জাল ভোট ও কেন্দ্র দখলের দৃশ্য দেখা গেছে। বেশির ভাগ কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার তথ্য দিতেও রাজি ছিলেন না। কয়েকটি কেন্দ্রে খোদ প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারের বিরুদ্ধেও জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ ওঠে। রাজধানীজুড়ে যে ক’টি কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে তা ছিল সরকার সমর্থক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। সবুজবাগের কমলাপুর হাইস্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে না পেরে পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। মানিকনগর মডেল হাইস্কুলে কেন্দ্র দখলে বাধা দেয়ায় পুলিশের ওপর বৃষ্টিও মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ভাংচুর করা হয় পুলিশের কয়েকটি গাড়ি। এ সময় বিজিবি ও র‌্যাবের শতাধিক সদস্য পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। এ সময় পুলিশের গুলি ও লাঠিচার্জে শিশুসহ পাঁচজন আহত হন।
ভোট গ্রহণ শেষে বিকালে সূত্রাপুরের লালকুঠি মঈনউদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল হল ভোট কেন্দ্রের সামনে দু’পক্ষের গোলাগুলিতে আহত হন পোলিং অফিসার জজ মিয়া ও ভোটার লিয়াকত শিকদার রাব্বি। তাদের দু’জনকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুরান ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে লাঞ্ছিত হন সংসদ সদস্য হাজী সেলিম। এ সময় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে আহত হন লিটন নামে এক ব্যক্তি। ঢাকা কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বের হলে পরিবারের সদস্যদের সামনেই লাঞ্ছিত হন আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের আহ্বায়ক সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের ব্যানারেই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।
এতকিছু ঘটলেও পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসারসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন নির্বিকার। দাঁড়িয়ে থেকে শুধু দর্শকের ভূমিকাই পালন করতে দেখা গেছে তাদের। শুধু পুরান ঢাকার কবি নজরুল ইসলাম কলেজ কেন্দ্রে সরকারদলীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী মোহাম্মদ সেলিম ও স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী ইয়ার মোহাম্মদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এখানে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। জাল ভোট দিতে বহিরাগতদেরও দেখা গেছে বিভিন্ন কেন্দ্রে। প্রাণহানির কোনো ঘটনা না ঘটলেও নির্বাচনের দিন বেশ কিছু কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নিজেই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় দুপুরের আগেই ভোট বর্জন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান বিএনপি সমর্থিত মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীরা। দুপুর গড়াতেই তাদের অনুসরণ করে ভোট বর্জনের খাতায় নাম লেখান আরও বেশ কয়েকজন মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থী। অনেকে নির্বাচন প্রত্যাখ্যানও করেন। বিদেশী কূটনীতিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরাও এই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে নির্বাচন নিয়ে খুশি নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগ।
জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীরাও প্রশ্ন তুলেছে এই নির্বাচন নিয়ে। তাদের সমর্থিত মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা না দিলেও তারা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে কারচুপির নজিরবিহীন চিত্র দেখার পর বেলা ১১টায় জাতীয় পার্টি সমর্থিত দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগে কিছু কিছু জায়গায় ভোট কেন্দ্র দখল হতো। কিছু ক্ষেত্রে ভোট চুরি হতো, ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই হতো। আড়ালে আবডালে কারচুপি করা হতো। এবার পুরো নির্বাচনটাই আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে দখল করে নিয়েছে। ভোট দেয়ার আগেই ভোট শেষ হয়ে গেছে।’
জাতীয় পার্টি সমর্থিত উত্তরের মেয়র প্রার্থী বাহাউদ্দিন বাবুল সকালে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, নির্বাচনের নামে প্রহসন চলছে। একতরফা ভোট হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিরাসহ শাসক দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা খুশি এই নির্বাচন নিয়ে।
বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ প্রেস ব্রিফিংয়ে, নির্বাচন সুন্দর ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করে বলেন, মানুষ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিয়েছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পুরো নির্বাচন সুন্দর ও সুষ্ঠু হয়েছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করে বলেছেন, কোনো অভিযোগ ছাড়াই আন্দোলনের ইস্যু তৈরি করতেই বিএনপি ভোট বর্জন করেছে।
এর আগে সকালে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের দেয়া প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে। বিএনপি মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সেই অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় আরও বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, তারা তা মেনে নেবেন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য ১৮ এপ্রিল তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৬০ লাখের বেশি ভোটার অধ্যুষিত তিন সিটিতে রেকর্ড সংখ্যক এক হাজার ১৮৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৪৮ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮৯১ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৪৯ জন প্রার্থী হন। ৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়। ২০ দিন টানা প্রচারের পর মঙ্গলবার ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে তিন ব্যাটালিয়ন সেনা সদস্যসহ প্রায় ৮০ হাজার আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এছাড়া প্রায় পাঁচশ’ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। যদিও আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ছাড়া বাকি সবার অভিযোগ- আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অধিকাংশ জায়গায় সরকার সমর্থকদের সঙ্গে মিলেমিশে ভোট দখলের উৎসবে মেতে ছিল। কোথাও কোথাও আবার তাদের নীরব দর্শকের ভূমিকায়ও দেখা গেছে।
ঢাকা উত্তরে ১৬ জন মেয়র প্রার্থীসহ মোট ৩৮৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ সিটিতে সাধারণ ৩৬ ওয়ার্ডে ২৮৩ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১২টি ওয়ার্ডে ৯০ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী হন। ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে ২০ জন, সাধারণ ৫৭টি ওয়ার্ডে ৩৯১ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১৯টি ওয়ার্ডে ৯৭ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আর চট্টগ্রামে মেয়র পদে ১২ জন, ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৬২ জন ও ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ২১৭ জন কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে আলোচনায় ছিলেন ছয় মেয়র প্রার্থী। তারা হলেন- উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক ও বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়াল। দক্ষিণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাঈদ খোকন ও বিএনপি সমর্থিত মির্জা আব্বাস। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আ জ ম নাছির উদ্দিন ও বিএনপি সমর্থিত এম মনজুর আলম। এদের মধ্যে এম মনজুর আলম নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি রাজনীতি থেকেও অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রায় সব ভোট কেন্দ্র দখল ও কারচুপির অভিযোগ এনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ও বর্জন করে বিএনপি। মঙ্গলবার ভোট শুরুর চার ঘণ্টার মাথায় দুপুর ১২টার কিছু পর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ঢাকার দুই সিটির ভোট বর্জনের এই ঘোষণা দেন। রাজধানীর নয়াপল্টনে উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে পাশে বসিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘোষণা দেন তিনি। এ সময় ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’র নেতারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ব্যানারেই ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম এর ঘণ্টাখানেক আগেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে মওদুদ আহমদ বলেন, এটা কোনো নির্বাচন হয়নি। এটাকে নির্বাচন বলা যায় না। ভোটবিহীন এ নির্বাচনকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এ নির্বাচন আমরা বর্জন করি। এতে গণতন্ত্রের প্রহসন করা হয়েছে। এ প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বড় পরাজয় হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের প্রায় কেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রায় সব কেন্দ্রে আমাদের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। কিছু কেন্দ্রে যেসব এজেন্ট ঢুকেছিল, তাদের সাড়ে ৮টার মধ্যেই বের করে দেয়া হয়েছে। অনেক এজেন্টকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। এ নির্বাচনের শতকরা ৫ ভাগ মানুষও ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন মওদুদ।
সংবাদ সম্মেলনে আফরোজা আব্বাস বলেন, ঢাকা দক্ষিণে আমার কোনো এজেন্টকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ফকিরেরপুলে একটি কেন্দ্রে আমি গেলে সেখানে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাকেসহ গণমাধ্যমকর্মীদের লাঞ্ছিত করে। প্রতিটি গলি তারা দখল করে রেখেছিল। বিভিন্ন কেন্দ্রে আমাদের নারী ভোটারদের অপমানিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভোট কেন্দ্র দখল করে তারাই সিল মেরেছে, ভোট ডাকাতি করেছে। সাধারণ ভোটারদের কাউকেই কেন্দ্রের কাছে তারা (ক্ষমতাসীন) ভিড়তে দেয়নি। আফরোজা আব্বাস বলেন, আমি দেখেছি, ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে যেতে। অনেকে ভোট দিতে গেলে তাদের বলা হয়েছে, ভোট হয়ে গেছে। এটা ভোট ডাকাতি হয়েছে। মানুষের ভোটকে তারা (ক্ষমতাসীন) ছিনতাই করেছে।
অন্যদিকে তাবিথ আউয়াল প্রশ্ন রেখে বলেন, সরকারের কী উদ্দেশ্য ছিল, এরকম তামাশা করার। তিনি বলেন, আমি যেসব কেন্দ্রে ঘুরেছি, কোথাও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত প্রার্থী ও তাদের কাউন্সিলরদের এজেন্ট ছাড়া অন্যদের দেখতে পাইনি। আমাদের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। পরিদর্শন করা কেন্দ্রে এজেন্ট না দেখে অভিযোগ দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তেজগাঁও কলেজ কেন্দ্রের সামনে আমাদের এজেন্টের ছিঁড়া ব্যাচ দেখতে পেয়েছি। ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেও কোনো জবাব পাইনি। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পাশাপাশি ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন সিপিবি ও বাসদ সমর্থিত দুই প্রার্থী। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি।
তবে নির্বাচন শেষে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় আনিসুল হক বলেন, খেলতে গেলে ফাউল হয়। এটা মেজর না মাইনর, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে ছোটখাটো কিছু ত্র“টির কথা স্বীকার করেন তিনি। বিভিন্ন কেন্দ্রে জাল ভোট ও মারামারি প্রসঙ্গে এই মেয়র প্রার্থী বলেন, যে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে, তা আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী ও বিএনপির দুই প্রার্থীর মধ্যে। এটা অনেকটা ভাইয়ে ভাইয়ে গণ্ডগোলের মতো। বিএনপির ভোট বর্জন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৬ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দু-একজন ভোট বর্জন করেছেন, যা সংখ্যার দিক থেকে খুব সামান্য। বেশির ভাগ প্রার্থী নির্বাচনে ছিলেন। বেশির ভাগ কেন্দ্রেই ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন।
বিকালে সাঈদ খোকন বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ঢাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ নির্বাচনে তাদের অধিকার প্রয়োগ করেছেন। সাধারণ ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রগুলোতে গিয়েছেন। ভয়ভীতি প্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ছিল না।
সরেজমিন দেখা গেছে, জাল ভোটের ব্যাপকতা এত বেশি ছিল যে, ভোট প্রদানকারীরা ব্যালট পেপারের উল্টোপিঠে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়াই ভোট দিয়ে ব্যালটবাক্স ভর্তি করেছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যালট পেপারে ইসির সিল দেয়া হয়নি। বেশ কয়েকজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জানান, জোরপূর্বক ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে জাল ভোট দেয়ায় অনেক ব্যালট পেপারে একজন ব্যক্তির হাতের আঙুলের ছাপ রয়েছে।
সকাল ৮টায় শুরু হওয়া ভোট গ্রহণের দুই ঘণ্টা পরই কেন্দ্র দখলে মরিয়া হয়ে উঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনেই বহিরাগতদের নিয়ে জাল ভোট দেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের জাল ভোটে সহযোগিতা করতে বাধ্য করেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। বেশ কয়েকজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেয়ার সময় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের ডাকা হলেও তারা সহযোগিতা করেনি। উল্টো আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্র দখলকারীদের সহযোগিতা করেন। ওই অবস্থায় পরিস্থিতি জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে করণীয় জানতে চাইলে তারাও হাওয়া বুঝে চলার নির্দেশ দেন। ওই সময়ে ক্ষমতাসীনদের ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা অসহায় আত্মসমর্পণ করেন বলেও জানান তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিটি কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা বিপুলসংখ্যক বহিরাগতদের নিয়ে সকাল থেকেই কেন্দ্রের আশপাশে অবস্থান নেন। ভোট গ্রহণের দিন নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর পুলিশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও তা উপেক্ষা করে জাল ভোট দেয়ার উৎসবে মেতে ওঠে বহিরাগতরা। জানা গেছে, নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত ঢাকায় জড়ো করেন ওইসব এলাকার বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য।
মানিকনগর মডেল হাইস্কুলে সংঘর্ষ : বেলা সোয়া ১১টায় ঢাকা দক্ষিণের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মানিকনগর মডেল হাইস্কুলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল বাসিত খান বাচ্চু ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোস্তফা বাদশার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয়। ভাংচুর করা হয় পুলিশের দুটি মাইক্রোবাস, একটি পিকআপ ও একটি ভ্যান। এ সময় পুলিশ কয়েক দফা ধাওয়া দেয় এবং গুলি ছোড়ে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। সেখানে পুলিশের গুলিতে কালু শীল নামে এক ব্যক্তি আহত হন। পরে বিজিবি সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যান।
কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. শাহজাহান জানান ২০-২৫ জন যুবক এসে প্রত্যেকটি পোলিং বুথে প্রবেশ করে ব্যালট বই ছিনিয়ে নেয়। তারা সিল মারার চেষ্টা করে। এ সময় অপর গ্র“প এসে বাধা দেয়। এতে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। একটি বুথের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার সাইদুর রহমান জানান, সামনে যেক’টি ব্যালট পেপার পেয়েছে সব তারা ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারা শুরু করে। সেটা শেষ হওয়ার পর আবার ব্যালট চাইলে প্রিসাইডিং অফিসার ব্যালট দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বাধ্য হয়ে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখেন। কেন্দ্রের বাইরে প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে উত্তেজনা চলতে থাকে। এই কেন্দ্রের কোথাও বিএনপি সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্টদের দেখা যায়নি। বুথের পোলিং অফিসার ফারজানা আক্তার জানান, সবক’টি ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে ইলিশ মাছ ও রেডিও মার্কায় সিল মেরে বাক্সে ভরা হয়।
যাত্রাবাড়ী পঞ্চায়েত কমিউনিটি সেন্টারে অস্ত্রের মহড়া : ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের এই কেন্দ্রটি স্থানীয়ভাবে ধলপুর কমিউনিটি সেন্টার নামে পরিচিত। সকাল ৯টার সময় ইলিশ মাছ মার্কার সমর্থক ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা কেন্দ্রটি দখল করে সিল মারা শুরু করে। এ সময় সরকারদলীয় তিন ক্যাডার অস্ত্র হাতে পুলিশ ও র‌্যাবের সামনেই অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধাওয়া করে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রাইসেল হাসান হবির সমর্থকরা বাধা দিলে তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। এ অবস্থায় পরে প্রিসাইডিং অফিসার ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখেন। এই কেন্দ্রে দোতলা ও তৃতীয় তলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে নামের ব্যাচ খুলে ইলিশ মাছের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য প্রার্থীদের প্ররোচনা দিতে দেখা যায়। এ সময় ফটো সাংবাদিক রফিকুল্লাহ তাদের ছবি তুললে তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন পুলিশ সদস্যরা। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শহীদুর রহমান জানান, কেন্দ্র দখল করে সিল মারা শুরু করলে আমরা বাধা দেই। তারা পোলিং বুথ থেকে ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে যায়। কিছু সিল মারলেও সেগুলো বাক্সে ঢুকাতে পারেনি বলে দাবি করেন প্রিসাইডিং অফিসার।
হবির বোন দাবি করে সখিনা ইয়াসমিন নামে এক নারী বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের লোকজন কেন্দ্র দখল করে। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মারধর করেছে এবং এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। এ সময় রোকেয়া নামে এক নারী অভিযোগ করেন তিনি ভোট দিতে পারেননি।
কবি নজরুল সরকারি কলেজে সংঘর্ষ : দুপুর ১২টায় ঢাকা দক্ষিণের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ইয়ার মোহাম্মদ ইয়ারু (ঘুড়ি) ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হাজী সেলিমের (টিফিন কেরিয়ার) প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ইয়ারুর পক্ষে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রলীগ ও হাজী সেলিমের পক্ষে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ব্যাপক ইটপাটকেলে কবি নজরুল কলেজ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শটগানের গুলি, টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। পরে র‌্যাব-বিজিবি ধাওয়া করে ঘটনাস্থল থেকে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় কেন্দ্রের ভেতর আরও পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। এ সময়ের মধ্যেও ছাত্রলীগের কর্মীরা ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারতে থাকে। এ অবস্থায় কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তার কেন্দ্রে ৩ হাজার ভোটের মধ্যে ৯২৮ ভোট কাস্ট হয়েছে।
বদরুন্নেসা মহিলা কলেজে হামলা লাঠিচার্জ : ঢাকা দক্ষিণের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্র বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে দুপুর ১টার দিকে বকশীবাজারে বদরুন্নেসা সরকারি কলেজে হাজী মোহাম্মদ আলীর সমর্থক ও জিন্নাত আলী জিন্নুর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পুলিশ উপস্থিত লোকজনকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে। পুলিশ কেন্দ্রের ফটক বন্ধ করে আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রার্থীকে সিল মারার সুযোগ করে করে দেয় বলে অভিযোগ করেন মোহাম্মদ আলী ও তার সমর্থকরা। এ সময় তারা জিন্নুর সমর্থকরা ভোটচোর, আওয়ামী লীগ ভোটচোর বলে মিছিল করতে থাকে। এ কেন্দ্রে মগ মার্কা বা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কোনো এজেন্ট দেখা যায়নি।
আলী আহাম্মেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া : দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা দক্ষিণের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আলী আহাম্মেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ব্যাপক জাল ভোট দিতে শুরু করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আনিসুর রহমান আনিসের লোকজন। সকালেই বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হাবীবা চৌধুরী ও মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সমর্থকদের বের করে দেয়া হয়। এ কেন্দ্রের হাসিনা নামে এক নারী ভোটারকে ধরা হয়। হাসিনা জানান, তার বাসা কাঁচপুরে। তিনি একটি গার্মেন্টের কর্মী। তাকে এক হাজার টাকা দিয়ে ভোট দিতে আনা হয়। ছবি ও ভোটার নম্বর মিল না থাকায় তাকে আটক করা হয়।
বান্ডেল ধরে জাল ভোট : রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের বান্ডেল নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর মার্কায় সিল দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের অপর এক কাউন্সিলর প্রার্থী ভোট স্থগিত রাখার আবেদন করেন। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শেখ মো. আরিফুল ইসলাম অবৈধভাবে সিল মারার এই ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, সকাল থেকে ছিলাম। মাঝে একটু ঝামেলা হয়েছিল। এখন ঠিক হয়ে গেছে। কিছু ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। আমি আমার ঊর্ধ্বতনদের বিষয়টি জানিয়েছি।’ ওই কেন্দ্র থেকে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। আফরোজা আব্বাস বলেন, ব্যাপক কারচুপি হচ্ছে। আমি বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়েছি। একই অবস্থা দেখেছি। সরকারি দলের লোকজন কেন্দ্র দখল নিয়ে তাদের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার দুই কাউন্সিলর প্রার্থীকে দেখিয়ে আফরোজা বলেন, এই দু’জন কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন, তারা নিজের ভোট নিজে দিতে পারেননি। প্রত্যেকটা কেন্দ্রেই তারা এ রকম করছে।’
এই কেন্দ্রে ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছেন সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী শম্পা বসুও। পাশের লুৎফা একাডেমি থেকে তার এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাজী সেলিম লাঞ্ছিত, নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে আহত ১ : ঢাকা দক্ষিণের ৩৭নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী সাহাবউদ্দিন জনির সমর্থকদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন দলটির নেতা ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম। এ সময় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে লিটন নামে এক ব্যক্তি আহত হন।
মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার পর পুরান ঢাকার ৩৭নং ওয়ার্ডের বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ভোট কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। আহত লিটনকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে হাজী সেলিম আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুর রহমান নিয়াজীর সমর্থকদের নিয়ে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ভোট কেন্দ্রে যান। এ সময় কাউন্সিলর পদে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সাহাবউদ্দিন জনির সমর্থকরা হাজী সেলিমের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করে। হাজী সেলিমকে হামলার কবল থেকে রক্ষা করতে এ সময় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী গুলি চালালে লিটনের পায়ে বিদ্ধ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। কেতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) মো. পারভেজ বলেন, ভোট কেন্দ্রের সামনে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ : ঢাকা দক্ষিণের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও গুলি করেছে। পুলিশের গুলি ও লাঠিচার্জে কমপক্ষে ৫ জন আহত হয়েছেন। ১ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কেন্দ্র দখল ও পাল্টা দখল নিয়ে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
সুরিটোলা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বংশালের সুরিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনার পর ওই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। বেলা পৌনে ১২টার দিকে সিনিয়র বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসেন কেন্দ্রের বাইরে ইসির এ নির্দেশনা জানিয়ে বলেন, স্কুলে তিনটি কেন্দ্র। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ৫৬৫ নম্বর কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হল। তবে এ স্কুলে ৫৬৪ ও ৫৬৬ নম্বর কেন্দ্রে ভোট চলবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, কেন্দ্রের ভেতর দুটি ব্যালট বাক্স ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল। এ সময় বাইরে বিপুলসংখ্যক লোকজন বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডা করতে দেখা গেছে। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার নিতেশ কুমার সাহা বলেন, বাইরে থেকে লোক এসে হামলা চালিয়েছে। একই স্কুলের অপর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার লুৎফুর রহমান বলেন, আমরা ভোট নেয়া বন্ধ করিনি। তবে গোলযোগের কারণে হয় তো ভোটাররা আসছেন না। ভোটাররা এলেই ভোট নেব। নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে নির্বাচন কমিশনারও বিষয়টি স্বীকার করেন।
খিলগাঁওয়ে ব্যালট ছিনতাই : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের দুটি বুথের ব্যালট পেপার নিয়ে গেছে সরকারদলীয় সমর্থকরা। ভোট শুরুর আধা ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যালয়টির ৫ ও ৬ নম্বর বুথে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ও ভোটার তালিকা ছিনিয়ে নেয়া হয়। এ সময় ৩ নম্বর বুথে একাধিক ব্যক্তিকে জাল ভোট দিতে দেখা গেছে। বুথের একাধিক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার জানান, ‘ভাই জীবনের মায়া কার নেই। আমাদের কিছুই করার ছিল না। এ সময় প্রায় ১ ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।
কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘর্ষ : দক্ষিণের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে ভোটগ্রহণ স্থগিত ছিল। জাল ভোট ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের অভিযোগে কেন্দ্রটিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়। এই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী ইসমাইল সর্দার অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আশরাফুজ্জামান ফরিদের (রেডিও) সমর্থকরা কেন্দ্রে ঢুকে জাল ভোট দিয়েছে ও ৩-৪শ’টি ব্যালট পেপার ছিনতাই করেছে। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. শরীফ ব্যালট পেপার ছিনতাই ও ভোটগ্রহণ স্থগিতের কথা জানান। ব্যাটল ছিনতাইয়ের প্রতিবাদে কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন এক প্রার্থীর সমর্থকরা।
৪১ নম্বর ওয়ার্ডের ৯ কেন্দ্র দখল : ঢাকা দক্ষিণের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের ৯টি কেন্দ্রে হাজী ফরহাদ হোসেন মুকুলের (র‌্যাকেট প্রতীক) পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন প্রার্থী নিজেই। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি। হাজী ফরহাদ হোসেন জানান, তার পোলিং এজেন্টদের ৯টি কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এসব কেন্দ্র দখল করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর সমর্থকরা ব্যালটে সিল মারছে। এই ওয়ার্ডের সিলভারডেল প্রিপারেটরি অ্যান্ড গার্লস হাই স্কুল কেন্দ্র নম্বর ১ ও ২, নিটল স্কলার টিউটোরিয়াল অ্যান্ড হাই স্কুল, ওয়ারী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, ওয়ারী আবদুর রহিম কমিউনিটি সেন্টার কেন্দ্র ১ ও ২, ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়, ফকির চাঁন সর্দার কমিউনিটি সেন্টার, নারিন্দা সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৯টি কেন্দ্র দখল করে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোট জালিয়াতিতে খোদ প্রিসাইডিং অফিসার : ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হয়েও ঢাকা দক্ষিণের নারিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারকে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর প্রতীকে সিল মারতে দেখেছেন সাংবাদিকরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রিসাইডিং অফিসার ওবায়দুল ইসলামকে ব্যালট পেপারে সিল মারতে থাকেন।
শাঁখারি বাজারে মারামারি : ভোট ছিনতাইকে কেন্দ্র করে শাঁখারি বাজারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩ জন আহত হয়েছেন। শাঁখারি বাজারের পগোজ স্কুলের ৫৮৬নং কেন্দ্রে (ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৭নং ওয়ার্ড) কিছু সময় ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে। সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী শাহাবুদ্দিন জনির সমর্থকরা কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ঢুকাতে থাকে। এ সময় তারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করে। ঘটনা জানাজানি হলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুর রহমান মিয়াজী তার সমর্থকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। এতে দু’পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, সংঘর্ষ হয়। এতে মিয়াজীর সমর্থক বাদল চন্দ্র ঘোষসহ কমপক্ষে তিনজন আহত হন।
টিকাটুলীতে সংঘর্ষ : টিকাটুলী এলাকার মিতালী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১০ জন আহত হন। মিতালী স্কুল কেন্দ্রের সামনে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ সময় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী সাইদুলের সমর্থকরা কেন্দ্রে ঢুকতে চাইলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আসাদ ও বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাবেক কমিশনার টিপুর সমর্থকরা বাধা দেয়। এতে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেধে যায়।
হাজারীবাগে সংঘর্ষ : ঢাকা দক্ষিণের হাজারীবাগের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে জরিনা শিকদার স্কুলে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. সেলিম ও বিদ্রোহী প্রার্থী ইলিয়াস রহমানের সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। হাজারীবাগ থানার ওসি মঈনুল ইসলাম জানান, টিয়ার শেল ছেড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এদিকে কেন্দ্রে বহু ভোটার ভোট দিতে পারেননি।
শুরুতেই সিল : ঢাকা উত্তরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উষা বিদ্যা নিকেতন নামে ওই ভোট কেন্দ্রে দেখা গেছে সকাল সাড়ে ৮টার সময় প্রিসাইডিং অফিসারের উপস্থিতিতে চলছে সিল মারার কাজ। সংবাদ কর্মীদের দেখে দ্রুত তারা সটকে পড়ে। একই ওয়ার্ডের ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট মাদ্রাসা কেন্দ্রের একটি বুথে প্রিসাইডিং অফিসারের সামনে চারজনকে নির্ভয়ে সিল মারতে দেখা যায়। ওই বুথের পাশেরটিতেই প্রিসাইডিং অফিসার প্রবীর কুমার চক্রবর্তীর কক্ষ। হঠাৎ ওই বুথে সাংবাদিকরা প্রবেশ করলে দুই যুবক বের হয়ে যায়। এ সময় বেঞ্চের ওপর সিল দেয়া ব্যালট পেপারের বই দেখা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিসাইডিং অফিসার কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
রায়ের বাজারে গোলাগুলি : রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন রায়েরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে গোলাগুলির ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
মোহাম্মদপুরে পিসি কালচার হাউজিং কেন্দ্রে সংঘর্ষ : মহানগর উত্তরের ৩০নং ওয়ার্ডের আদাবর এলাকার পিসি কালচার হাউজিং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আরিফুর রহমান তুহিন ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক কমিশনার আবুল হাশেম হাসুর কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ ও র‌্যাবকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও লাঠিচার্জ করতে দেখা গেছে।
ক্যান্টনমেন্টেই থাকল সেনাবাহিনী : সিটি নির্বাচনে রিজার্ভ অবস্থায় সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে থাকলেও তাদের মাঠে নামানো হয়নি। নির্বাচন চলাকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট দখল, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ হলেও সেনাবাহিনীকে মাঠে নামাতে নির্দেশ দেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর আগে সিইসি বলেছিলেন, কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে মুভ করবে সেনাবাহিনী। তবে মঙ্গলবার সেনা নামানোর বিষয়ে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আগে থেকেই সেনাবাহিনী রিজার্ভ ছিল। তবে মাঠে সেনা নামানোর মতো কোনো পরিস্থিতি হয়নি। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।