Saturday, August 31, 2013

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ by জসীম চৌধুরী সবুজ

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। এভাবে বয়ে চলে সময়। প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত ভরা গভীর শূন্যতায়। হৃদয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ নিয়ে যাপিত এ জীবনের করুণগাথা লিখে কী শেষ করা যায়? নাকি প্রকাশ করা যায়! জীবন স্রোতের কঠিন ভেলায় তবু ভেসে চলেছি। ভেসেই চলেছি। বুকের ভেতর প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ নিয়ে। দেখতে দেখতে দুটি বছর পার হয়ে গেল। এসে গেল ৩১ আগস্ট। আমার ও আমার পরিবারের জন্য চরম দুঃস্বপ্নের একটি দিন। আমার বুকের ধন সোনা মানিককে হারানোর সেই কালো দিন। চৌধুরী তাহমিদ জসীম আপন। আমার সোনামণি, আমার আদরের ধন। আমার সব স্বপ্ন, সব আশা-আকাক্সক্ষাকে ভেঙেচুরে দিয়ে এই দিনে সে চলে গেছে না ফেরার দেশে। তার শারীরিক উপস্থিতি নেই। কিন্তু রাত বা দিন প্রতিটি সেকেন্ড সে আছে আমার হৃদয়জুড়ে, আমার মনের মণিকোঠায়। সময় কাটাই সেই মধুর দিনগুলোর স্মৃতি নিয়ে। আমৃত্যু এই স্মৃতি বয়ে বেড়ানো ছাড়া আমার আর কিই বা করার আছে! সমবেদনা, সহমর্মিতা নিয়ে যারা আমাদের পাশে ছিলেন এবং আছেন তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলতে চাই, সব দুঃখ সব কষ্ট কী ভোলা যায়। এ কষ্ট ও দুঃখ থাকল আমার একান্ত হয়ে।
দুই.
স্ত্রী রুমার জ্বর ক’দিন ধরেই কমে না। টেস্টে ধরা পড়ল টাইফয়েড। হাই ডোজের ওষুধ খেয়েই সারল রোগ। ঠিক সে মাসেই কনসিভ করল সে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পেয়ে বসল আমাদের। হাই ডোজের ওষুধ নতুন আগন্তুকের কোনো ক্ষতি করবে না তো! গাইনির এক মহিলা ডাক্তারকে দেখালাম। ভদ্রমহিলা সিটি কর্পোরেশনের মেমন হাসপাতালে কর্মরত। তিনি আমাদের ভয় পাইয়ে দিলেন। বললেন, বয়স তো এখনও অনেক। ঝুঁকি নেয়ার দরকারটা কী। এমআর করে ফেলুন। এ কাজ তিনি নিজে করেন। বললেন তার প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে। দেখি বলে বিদায় নিলাম। গেলাম চমেক হাসপাতালে। পরিচিত চিকিৎসক ডাকলেন আরও অনেককে। মত দিলেন টেনশনের কোনো কারণই নেই। অনাগত শিশুর কোনো ক্ষতিই হবে না। মায়ের জঠরে দিনে দিনে বাড়ছে ভ্রƒণ। টেনশনও আমাদের বাড়ছে। অবশেষে এলো সেই দিন। আমি থাকতাম অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিক সুখেন্দু ভট্টাচার্যের পাশের বাসায়। ভাবী চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক আলো মল্লিক। ৩ জুলাই, ১৯৯৬ সাল। রাতে ভাবীসহ রুমাকে নিয়ে ভর্তি করালাম রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদনে। ঘড়ির কাঁটা ১২টা পেরিয়ে রাত দেড়টা। তারিখ ৪ জুলাই। রুমাকে লেবার রুমে ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষায় সুখেন্দু ভাবী। আমি গেটের বাইরে। সিঁড়ি বেয়ে একদম ওপরে উঠে সেজদায় পড়ে আছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, হে প্রভু আমাকে সুস্থ সবল সন্তান দাও। রাত আড়াইটায় ডাক দিলেন ভাবী। দৌড়ে গেলাম। বললেন পুত্র সন্তান হয়েছে। নার্সরা এনে প্রথমে তার কোলে দিলেন। তিনি দিলেন আমাকে। কী সুন্দর ফুটফুটে ছেলে, চোখ দুটো তার কত আকর্ষণীয় মায়াময়। হাজারও শুকরিয়া জানালাম সৃষ্টিকর্তার কাছে।
তিন.
এক মেয়ে এক ছেলে নিয়ে আমার সুখী সংসার। অর্থবিত্তের বৈভব না থাকলেও পৃথিবীতে আমার চেয়ে সুখী মানুষ যেন আর দ্বিতীয়টি ছিল না। সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বলতাম, হে আল্লাহ তোমার কাছে আমার অর্থবিত্ত কিছুই চাওয়ার নেই। যা আমায় দিয়েছ তাতেই আমি সন্তুষ্ট। একটা জিনিস শুধু চেয়েছি আমার ছেলেমেয়ে দুটোর সুস্থ সুন্দর জীবন ও তাদের বিদ্যাবুদ্ধিতে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তৌফিক যেন দান করেন তিনি।
জানি না আমার সেই ফরিয়াদ সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছেছে কিনা। পৌঁছলেও তা যে কবুল হয়নি তা আমার চেয়ে কে আর বেশি বোঝে। এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে দুঃখী মানুষ এখন আর কেউ নেই। ২০১১ সালের ৩১ আগস্ট ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। এই খুশির দিনেই আমার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। আপন সোনা আমার চিরদিনের মতো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে সবকিছুকে পেছনে ফেলে। বাড়ির সামনে মসজিদের মিম্বরের পাশে শুয়ে আছে আমার আদরের ধন। মাঝে মধ্যেই ছুটে গিয়ে দাঁড়াই তার কবরের পাশে। বুক ফেটে আসা অশ্র“ধারা শত চেষ্টায়ও পারি না সংবরণ করতে। আমি কথা বলি আমার সোনাবাবুর সঙ্গে। আমি শুনতে পাই সে যেন আমায় বলছে, ‘এমন করিও না তো আব্বু’। মনে হয় এই বুঝি আমার ছেলে উঠে এসে বলবে, ‘সরি আব্বু, তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি, চলো এবার বাড়ি যাই।’ দুটি বছর পার হয়ে গেছে। ছেলে আমার আর আসে না। বাসায় কারও পায়ের শব্দ শুনলেই মনে হয় এই বুঝি এলো আপন সোনা। পথ চলতে গিয়ে স্কুলব্যাগ কাঁধে ছেলেদের দেখলে মনে হয় আমার আপন সোনা বুঝি চলে গেল সামনে দিয়ে। থমকে দাঁড়াই। খুঁজতে থাকি ছেলেকে। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই। সামলে নিই নিজেকে। বাসা থেকে বের হলেই পাড়ার ছেলেদের খেলতে দেখি। আমার আপন ছিল যাদের খেলার সঙ্গী। এখন সে আর তাদের খেলার সঙ্গে নেই। বুকের কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে নীরবে সরে যাই। এই কষ্টের বোঝা আমি বয়ে চলেছি। বয়ে চলব আমৃত্যু। চলতে চলতেই পৌঁছে যাব আমার ছেলের পাশে। এখন শুধু এটুকুই প্রার্থনা। দীর্ঘ জীবন নয়, সৃষ্টিকর্তা আমায় যেন তাড়াতাড়ি নিয়ে যান আমার আপন সোনার কাছে।
জসীম চৌধুরী সবুজ : সাংবাদিক

সিরিয়ায় সীমিত আক্রমণ ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি by তারেক শামসুর রেহমান

সিরিয়ায় ‘সীমিত’ আক্রমণের বিষয়টি এখন বোধকরি একরকম নিশ্চিত। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের পর মার্কিন মিডিয়ায় এখন দিনক্ষণ গোনা শুরু হয়ে গেছে কখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ক্রুস মিসাইল নিক্ষেপ করে এ আক্রমণ চালানো হবে। এরই মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে চারটি মার্কিন ডেসট্রয়ার এবং সাইপ্রাসের এক্রোটিরি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে বেশ কিছু ব্রিটিশ বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিমান আক্রমণ পরিচালনার জন্য। বলা ভালো, সাইপ্রাসের এ বিমানঘাঁটি থেকে সিরিয়ার দূরত্ব মাত্র ১৫০ মাইল। সিরিয়ার বিরুদ্ধে সর্বশেষ যে অভিযোগটি উঠেছে তা হচ্ছে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার। অভিযোগ উঠেছে, সিরিয়ার সৈন্যরা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। এ অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর ঘটনাটি সত্য এবং জাতিসংঘের তদন্তকারী দল এর সত্যতা খুঁজে পেলেও তদন্তকারী দল বলেনি এ ঘটনাটি সিরিয়ার সৈন্যরাই করেছে। যদিও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘটনায় সিরিয়ার সেনাবাহিনীর জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে স্পষ্টতই এ হত্যাকাণ্ড বহির্বিশ্বে সিরিয়ার ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট করেছে। শুধু পশ্চিমা বিশ্বই নয়, বরং সৌদি আরব, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এবং তুরস্কও আজ সিরিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া এখন অনেকটা একা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ২৯ মাস ধরে চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এখন এক নতুন দিকে টার্ন নিয়েছে। সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি হল এমন একটা সময়, যখন মিসরে সেনাবাহিনী নির্বাচিত ইসলামপন্থী একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। এমনকি তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও ইরাকের পরিস্থিতিও টলটলায়মান। ‘আরব বসন্ত’ যে ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছিল, সেই প্রত্যাশা এখন ফিকে হয়ে আসছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এ অঞ্চলে বৃহৎ শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এর আগে তিন-তিনবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এ অঞ্চলে সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক বাহিনী কুয়েতকে ইরাকি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করেছিল। ২০০৩ সালে ইরাকের কাছে মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র রয়েছে এ অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বাগদাদে মিসাইল হামলা চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করেছিল। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল ২০১১ সালে লিবিয়ায়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘মানবতা রক্ষায়’ হস্তক্ষেপ করেছিল এবং গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এ ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালে কুয়েতকে ইরাকি দখলমুক্ত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের সাহায্য নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০০৩ ও ২০১১ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরাক ও লিবিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালাতে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এবারও তেমনটি হতে যাচ্ছে।
লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে উৎখাতের ব্যাপারে ব্যবহৃত হয়েছিল ‘হিউম্যানিটারিয়ান ইন্টারভেনশনে’র তত্ত্বটি। আর এবার ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে ‘রেসপনসিবিলিটি টু প্রোটেক্ট’ তত্ত্ব। এর মূল কথা হচ্ছে, মানবতা রক্ষায় বিশ্বশক্তির দায়িত্ব। যেহেতু সিরিয়ায় সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে(?), সেহেতু সাধারণ মানুষকে রক্ষায় পশ্চিমা শক্তি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই এ সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে! এখানে বলা ভালো, সিরিয়ার ঘটনাবলী সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। জাতিসংঘ সনদে উল্লেখ আছে, একটি দেশ অপর একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। যদি এমন কোনো ঘটনার জন্ম হয় যে, সেখানে স্থিতিশীলতা ও গণহত্যা রোধে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে কাজটি করতে হবে নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। ইরাকের (২০০৩) ক্ষেত্রে কিংবা লিবিয়ার ক্ষেত্রে (২০১১) এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়নি নিরাপত্তা পরিষদ। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা পরিষদ এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে এটা সত্য, আন্তর্জাতিক একটি সম্মেলনে ‘রেসপনসিবিলিটি টু প্রোটেক্টে’র একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। তবে এ ব্যাপারে কোনো চুক্তি হয়নি এবং এটা কোনো আন্তর্জাতিক আইনও নয়। এর অর্থ হচ্ছে, সিরিয়ায় সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইন অনুমোদন করে না। যুদ্ধ, সামরিক হস্তক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে অধ্যাপক গ্লেননের একটি বই রয়েছে- ‘লিমিটস অব ল’, প্রিরোগেটিভ্স অব পাওয়ার’। এ গ্রন্থে গ্লেনন উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
বিশ্বশক্তি বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তার স্বার্থ রয়েছে, সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ‘মানবিক কারণে হস্তক্ষেপ’ কিংবা ‘মানবতা রক্ষায় দায়িত্বশীলতা’র যে যুক্তি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপট তৈরি করে, আফ্রিকার বরুন্ডি-রুয়ান্ডায় গণহত্যা বন্ধে কিংবা কসোভোতে গণহত্যা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডা-বরুন্ডিতে হুতু-তুতসি দ্বন্দ্ব ও গণহত্যায় কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। কসোভোতে ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের একপর্যায়ে, শেষের দিকে, ন্যাটোর বিমানবহর সার্বিয়ার সেনা ঘাঁটির ওপর বিমান হামলা চালালেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এ সংকটে হস্তক্ষেপ করেনি। আজ সিরিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তা করতে যাচ্ছে। কারণ এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা ওয়াশিংটনে অবস্থিত একটি গবেষণা সংস্থা দ্য প্রোজেক্ট ফর দ্য নিউ অ্যামেরিকান সেঞ্চুরি কর্তৃক (১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত) প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ ‘গ্লোবাল ইউএস এম্পায়ার : রিবিল্ডিং অ্যামেরিকা’স ডিফেন্সেস- স্ট্রাটেজি, ফোর্সেস অ্যান্ড রিসোর্সেস ফর এ নিউ সেঞ্চুরি’ পড়ে দেখতে পারেন।
সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিমান হামলা ‘সীমিত’ সময়ের জন্য পরিচালিত হবে বলে বলা হচ্ছে। এ বিমান হামলা পরিচালিত হবে সিরিয়ার সেনাঘাঁটিকে কেন্দ্র করে এবং তা সীমাবদ্ধ থাকবে কয়েক দিন মাত্র। এ হামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে সিরিয়ার সরকারকে বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ‘শাস্তি’ দেয়া। এতে করে বাশার কতটুকু ‘শাস্তি’ পাবেন, তা এক ভিন্ন প্রশ্ন। এ হামলা নিঃসন্দেহে বিদ্রোহী সেনাবাহিনীকে উৎসাহ জোগাবে। এমনকি এ বিমান হামলা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট বাশারের ক্ষমতাচ্যুতিও বিচিত্র কিছু নয়। তবে এ হামলা সিরিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যে নানা জটিলতা ও সংকট তৈরি করতে পারে। প্রথমত, এ যুদ্ধ শুধু যে সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা নয়। বরং এ যুদ্ধে লেবানন ও তুরস্ক জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে সিরিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার শরণার্থীদের মাঝে। বর্তমানে শরণার্থীর যে সংখ্যা পাওয়া গেছে, তা অনেকটা এ রকম : তুরস্কে ৪ লাখ, লেবাননে ৭ লাখ, বেক্কা উপত্যকায় ২ লাখ ৪০ হাজার, বৈরুতে ১ লাখ ৬০ হাজার, ইরাকে ১ লাখ ৫০ হাজার, জর্দানে ৫ লাখ, মিসরে ১ লাখ ১০ হাজার। এ শরণার্থীরা একটা বড় সমস্যা তৈরি করবে আগামীতে। দ্বিতীয়ত, সিরিয়া জাতিগতভাবে ভাগ হয়ে যেতে পারে। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার মতো পরিস্থিতি বরণ করতে পারে সিরিয়া। তৃতীয়ত, সিরিয়ায় আক্রমণ আগামীতে ইরানে সম্ভাব্য হামলায় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের উৎসাহ জোগাতে পারে। চতুর্থত, এ ধরনের একটি হামলায় ইসরাইল খুশি হবে সবচেয়ে বেশি। ইসরাইলের স্বার্থ এতে করে রক্ষিত হবে। বলা ভালো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে ইসরাইল আতংকিত। একই সঙ্গে সিরিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো নয় ইসরাইলের। পঞ্চমত, এ হামলার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। ষষ্ঠত, বাশারের অবর্তমানে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়বে বিদ্রোহীরা। আর তাতে করে সুবিধা নেবে আল-কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল নুসরা ফ্রন্ট ও ইসলামিক স্টেট অব ইরাক সংগঠন দুটি। এরা এরই মধ্যে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এই হামলা এ দুটি সংগঠনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া ও সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাকে এ রকমটি আমরা লক্ষ্য করেছি।
সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসন সিরিয়া সমস্যার আদৌ কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। প্রেসিডেন্ট ওবামা শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের একটি সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবেন। এ সিদ্ধান্তটি তিনি হয়তো পাবেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ‘যুদ্ধ’ বিশ্বে বিশেষ করে আরব বিশ্বে তার অবস্থানকে দুর্বল করবে। এক ধরনের ‘আমেরিকা বিদ্বেষে’র জš§ হবে এ অঞ্চলে। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। ‘আরব বসন্ত’ যে সম্ভাবনার জš§ দিয়েছিল, তার মৃত্যু ঘটবে। ‘যুদ্ধ’ সিরিয়া সমস্যার কোনো সমাধান নয়।
অস্টিন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সত্যিকারের নায়ক by শাহনেওয়াজ বিপ্লব

জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম দেশ। ভাষার দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে পঞ্চম স্থানের অধিকারী। কিন্তু আধুনিক অগ্রযাত্রায় শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি অথবা মৌলিক গবেষণায় বাংলাদেশীদের অবদান বিবেচনা করলে পৃথিবীর ক্রম-আধুনিকতার পথে আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান নেই বললেই চলে। একমাত্র যে নোবেল পুরস্কারটি বাংলাদেশ অর্জন করেছে তা-ও মৌলিক কোনো গবেষণায় নয়, বরং শান্তিতে। পৃথিবীর অগ্রযাত্রায় আমাদের অবদান শেষ পর্যন্ত তাই কেবল শ্রমিকের ওপরই বর্তায়। ১৬ কোটি মানুষের দেশ হয়েও, সব সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা কেন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি অথবা গবেষণায় নায়ক হয়ে উঠতে পারে না, সেটি এক প্রশ্ন বটে। আর এ প্রশ্নের উত্তরও নিহিত আছে আমাদের রাজনৈতিক সমস্যা ও সংস্কৃতির মধ্যে। বিএনপির আমলে যে ছেলে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গিয়েছে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে; উচ্চশিক্ষা অর্জন শেষে দেশে ফিরে এসে দেখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সে বিমানবন্দরের নাম পাল্টে রেখেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আওয়ামী লীগ পাঠ্যপুস্তকে এমএ হান্নানকে স্বাধীনতার ঘোষক লিখেছে, আর বিএনপি ক্ষমতায় এসে সে পাঠ্যপুস্তক রদবদল করে দিয়ে লিখেছে মেজর জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক। এরকম পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক বিদ্বেষ আর ঘৃণার ভেতর বড় হয়ে ওঠে আমাদের শিশু-কিশোররা। রাজনীতির স্বার্থে পাঠ্যপুস্তক আর ইতিহাস পাল্টে দেয়ার ফলে আমাদের ইতিহাসের প্রকৃত নায়কদের খুঁজে পাওয়া হয়ে ওঠে না ছাত্রছাত্রীদের। তারা পাঠ্যপুস্তকে যা পড়ে, সেসব আর বিশ্বাসও করে উঠতে পারে না। সেজন্য দেখা যায়, সদা সত্য কথা বলবে, মিথ্যা বলা মহাপাপ- এসব সদুপদেশ কোনো আলোড়ন জাগায় না আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মনে, কেননা তারা দেখে দেশের অনেক মন্ত্রী থেকে শুরু করে উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, পুলিশ- এরা নিজেরাও সেসব আপ্তবাক্য মানেন না।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা অর্জন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক হওয়ার জন্য চাকরিপ্রার্থীর উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার চেয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে সে আওয়ামী লীগ না বিএনপির সমর্থক সেই পরিচয়। আর এর ফলে হতোদ্যম হয়ে পড়ে আমাদের গবেষক, আমাদের বিজ্ঞানীরা। তারপর কেউ আবার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেও সাদা দল, নীল দল, গোলাপি দল অথবা ডাক্তার হলে ড্যাব অথবা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ। রাজনীতির এসব টালবাহানা সামলাতে সামলাতে নতুন চিন্তা অথবা গবেষণার কাজে আর মনোযোগ দেয়া হয়ে ওঠে না অনেকের পক্ষেই। এ সংস্কৃতির পৃথিবীর অগ্রযাত্রায় অবদান রাখার জন্য কারণেই আমাদের দেশে কোনো নায়কের প্জন্ম হয় না, বরং খলনায়কেরাই আমাদের দিনযাপনের অংশ হয়ে থাকে। দেশের প্রধান দৈনিকগুলো খুললে তাই দেখা যায় প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো খলনায়কের ছবি। মন্ত্রীর বাসায় ৭০ লাখ টাকা পৌঁছে দিতে গিয়ে কেউ ধরা পড়ছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই হলমার্ক কেলেংকারি, ডেসটিনি কেলেংকারি। এসব চলতে চলতে মন্ত্রী হয়তো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে টেলিভিশনের টকশোতে ডাকছেন ‘বেয়াদবের হাড্ডি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশে যে যত ইতর সে তত বড় নায়ক! আর এসব নায়কের ইন্টারভিউ ও ছবি নেয়ার জন্য সাংবাদিকদের ক্যামেরা আর কলম নিয়ে নিত্য চলছে দৌড়ঝাঁপ। আমার আপত্তিটা এখানেই। পত্রিকার প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে দিতে হবে এসব খলনায়কের চেহারা ও খবর। আর এসব জায়গায় নিয়ে আসতে হবে মাকসুদুল আলমের মতো আমাদের সত্যিকারের নায়কদের ছবি। আমাদের জাতির সত্যিকারের নায়ক মাকসুদুল আলম পাট গাছের ক্ষতিকর ছত্রাকের প্রাণভোমরা চিহ্নিত করেছেন। তার এ গবেষণা, আমাদের কৃষকদের জন্য এক নতুন শুভবার্তা। তার গবেষণা ও যুগান্তকারী এ আবিষ্কার বদলে দেবে আমাদের ফসল উৎপাদনের আগামী ইতিহাসও।
তাই মাকসুদুল আলমের মতো বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ আর গবেষকদের আমাদের পাঠ্যপুস্তকে আরও বেশি করে নিয়ে আসতে হবে। পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় ও পাঠ্যপুস্তকে শিশুদের আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে বিজ্ঞানী, গবেষক আর সৎ মানুষদের ছবি। উপদেষ্টা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ, আমলা- যারা দুর্নীতি অথবা অসভ্য আচরণের সঙ্গে জড়িত, তাদের ছবি আর খবরগুলো স্থানান্তরিত করে দিতে হবে তৃতীয়, চতুর্থ অথবা পত্রিকার ভেতরের পৃষ্ঠাগুলোয়, যাতে করে প্রতিদিন সকালে আমাদের শিশুরা নাস্তার টেবিলে বসে এসব কুৎসিত মুখ দেখতে না পায়। যদি এটা করা হয়, গত ৪০ বছরে আমাদের বাংলাদেশ তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন করতে পারেনি তো কী হয়েছে- আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ঠিকই একদিন বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে আসবে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর তালিকায়। আর এ স্বপ্নের বীজ তাদের বুকে এখনই বুনে দিয়ে যেতে হবে আমাদের।
শাহনেওয়াজ বিপ্লব : গল্পকার, ভিয়েনা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত

সিরিয়ার জটিল অংক by ফরহাদ মজহার

বারাক ওবামা যা আশা করেছিলেন সেটা হয়নি। বিলাতের পার্লামেন্ট সিরিয়ায় সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেনি। ৩০ আগস্ট বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে তর্ক হয়েছে পার্লামেন্টে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ব্রিটেন যুদ্ধে জড়াবে না। ওবামার প্ল্যান এতে কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ কারণে একা হয়ে যাবে সেটা ভাবার অবশ্য কোনো কারণ নাই। এরপরও সিরিয়ার হামলায় অনেক দেশের সমর্থন পাওয়া যাবে। তবুও, মানতে হবে, ওবামার সামরিক বাসনা এতে কিছুটা দমিত হতে পারে। সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর যুক্তি খাড়া করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে। বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তার কোনো সুস্পষ্ট বা অকাট্য প্রমাণ দিতে পারছে না কেউই। বরং উল্টা অভিযোগ উঠেছে, সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভয়াবহ ও বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছে বিদ্রোহীরাই। প্রশ্ন উঠেছে, ওবামা কি যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন চাইবেন? তার সম্ভাবনা খুবই কম। কংগ্রেস এখন অধিবেশনে নাই। সেটা একটা কারণ। তবে গৌণ। মূল কারণ হচ্ছে, চাইতে গেলে বিলাতের পার্লামেন্টের মতো সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত যুদ্ধের বিপক্ষেই যাবে। ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো হয়েছিল সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে। আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও নীতি-নৈতিকতা লংঘন করে। সে যুদ্ধ পাশ্চাত্য সভ্যতার(?) ‘ঘোর কেলেংকারি’ হিসেবে এতই প্রতিষ্ঠিত যে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে মত তৈরি করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। ওবামাকে একটু থ মারতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার-শুক্রবারের দিকে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার আগাম হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছিল। সেখানে খানিক দম পড়েছে। রাশিয়া ও চীনের পাল্টা হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন শক্তির যে সমীকরণ বর্তমান, সেসব বিচার করে অনেকে দাবি করছেন, সিরিয়ার নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য হামলার অর্থ কার্যত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া। বিশ্ব পরিস্থিতি এতটাই গরম হয়ে আছে।
আসলে সিরিয়ার পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল। সবকিছু সাদাকালো নয়। বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে যারা মাঠে লড়ছে, তাদের মধ্যে আল কায়দা আছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তারা লাভবান ও শক্তিশালী হয়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক বেশ শ্লেষের সঙ্গেই বলেছেন, মার্কিনিরা যদি সিরিয়ায় হামলা চালায়, তাহলে সেটা হল আল কায়দার পক্ষে সহায়তা। অর্থাৎ আল কায়দার হয়ে সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের যুদ্ধ হবে সেটা। যে মানুষগুলো ৯/১১-র সময় অগুনতি নিরীহ মার্কিন মেরে নিউইয়র্ক সাফা করে দিয়েছিল, তারা বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেই দেশের সহায়তা পেতে যাচ্ছে। এ এক পরাবাস্তব পরিস্থিতি। ওবামা, ক্যামেরন আর ওলাঁদের জন্য এ এক জব্বর কাজ হল বটে। রবার্ট ফিস্ক অভিজ্ঞ সাংবাদিক, তিনি সরলীকরণের জন্য কথাটা বলেননি, মার্কিন যুদ্ধবাজ নীতির বিরোধিতা করার জন্যই বোঝাতে চেয়েছেন, মার্কিনিরা একদিকে আল কায়দার বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের কথা বলে, আর অন্যদিকে তাদের অপছন্দের বাশার আল আসাদকে শায়েস্তা করার জন্য আল কায়দাকেই সহায়তা করতে আপত্তি করে না।
তবে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি এত সোজাসাপ্টা নয়। সিরিয়ায় যে গৃহযুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা শুরু করেছে, তার কারণে লাখ খানেকের বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছে। সে যে পক্ষেরই হোক না কেন। দেশটি ছত্রখান হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের দিক থেকে দেখলে এটা বনে বাঘ জলে কুমিরের দশা। একদিকে একনায়কতান্ত্রিক শাসক বাশার আল আসাদের অত্যাচার ও দমনপীড়ন, আর অন্যদিকে পরদেশী হস্তক্ষেপ। বিদ্রোহীদের শক্তি পুরোটা তাদের নিজেদের নয়, বাইরের। জনগণের সমর্থন তাদের পেছনে আসলে ঠিক কতটা সেটাও অস্পষ্ট। কিন্তু দেশটি ইতিমধ্যেই যেখানে গিয়ে পৌঁছেছে সেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব। এমনকি এমন কোনো জায়গায় দাঁড়ানোর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না যেখানে সিরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সব পক্ষের একটা সাধারণ স্বার্থ অন্বেষণ করা সম্ভব হয় এবং সেই স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আত্মঘাতী যুদ্ধ থামানোর কিছু সূত্র পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষকে আরও অনেক রক্ত দিতে হবে। অথচ যে পক্ষই টিকে থাকুক বা জিতুক, তার ফল কী দাঁড়াবে সেটা খুবই অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে।
ইরান ও হিজবুল্লাহ প্রাণপণ বাশার আল আসাদের সরকার ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিস্তর হুমকি এর আগে আমরা শুনেছি। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপোড়েনের কারণে যে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা আমরা দেখেছি সেটা এখন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্তিমিত হয়ে এসেছে, মনে হচ্ছে। ইরানিরা পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে জবাবি প্রচারের চেয়ে নিঃশব্দ কূটনীতির পথই বেছে নিয়েছে। আহমেদিনেজাদ যেভাবে কথা বলে আর জোরে জবাব দিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতেন, নতুন প্রেসিডেন্ট ‘মধ্যপন্থী’ বলে সেই গরম কূটনীতির পথ ধরবেন না। সেটা নিশ্চিত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় ইরানের শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে ইরান তার সমস্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এতে সন্দেহ নাই। আর সেদিক থেকে আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা ইরানের জন্য জরুরি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সে অঞ্চলে ক্ষমতার সমীকরণ শিয়াদের পক্ষে চলে গিয়েছে, এ বাস্তবতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পাশ্চাত্য মিত্রেরা যেমন তাদের স্বার্থের অনুকূল হিসেবে দেখছে না, ঠিক তেমনি সুন্নি মুসলমানদের জন্যও এ একটা অসহনীয় পরিস্থিতি। বাশার আল আসাদ যদি টিকে যান, তার মানে সিরিয়ায় ইরানেরই বিজয় হল। বিদ্রোহীদের কবল থেকে বাশারের সৈন্যরা যখন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর আবার দখল করে নিল, তাতে দূর থেকে মনে হচ্ছে বাশার এই যুদ্ধে টিকে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পাশ্চাত্য মিত্রদের পক্ষে এটা মেনে নেয়া কঠিন। ঠিক যেমন কঠিন সৌদি আরব, ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-রাজড়াদের জন্য। মাঠে আল কায়দার জন্যও সেটা মেনে নেয়া কঠিন। ফলে মার্কিনিরা আল কায়দার পক্ষেই বুঝি লড়তে যাচ্ছে- কথাটা সরল অর্থে বললেও পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি জটিল ও ঘোলাটে।
সিরিয়ার যুদ্ধ বোঝার প্রাথমিক দিক হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। একে একটা সুদূরপ্রসারী সামরিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত গণ্য করাই সঠিক। এই অর্থে যে, এই যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইসরাইলি সামরিক শক্তির অভিযান শুধু নয়। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে অভিযান। রাশিয়া ও চীন সেভাবেই ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে একে দেখছে এবং সেই বিবেচনাতেই তাদের অবস্থান নিয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি সম্পদের পরিস্থিতির দিক থেকে দেখলে মধ্যপ্রাচ্য-মধ্য এশিয়ার তেলের মজুদের ওপর আধিপত্য ও দখলদারি বজায় রাখা এই যুদ্ধের আশু উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত তেলের পাইপলাইনগুলো রক্ষা করা এবং নিজেদের অধীনস্থ রাখার প্রতিযোগিতা ও লড়াই। এই দিকগুলো কমবেশি স্পষ্ট।
বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ শুধু দৃশ্যমান সামরিক রূপ নিয়ে জারি নেই, তার রাজনৈতিক প্রকাশও আছে। সেটা আমরা দেখি নতুনভাবে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের পক্ষে সাজানোর লড়াই হিসেবে। সিরিয়ার যুদ্ধ এই সামগ্রিক সামরিক-রাজনৈতিক যুদ্ধ পরিকল্পনা থেকে আলাদা কিছু নয়। যারা সিরিয়ার যুদ্ধের খবর অনেক ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখেন, তারা দাবি করছেন সিরিয়ার ‘শাসক বদল’ (ৎবমরসব পযধহমব) করার কাজে ২০১১ সাল থেকে আল কায়দার সক্রিয়তার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রণোদনা বা সমর্থন রয়েছে। কিন্তু সে চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। যার কারণে এখন সরাসরি সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে। আল কায়দা ছাড়াও বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ায় জনগণের ন্যায়সঙ্গত বিক্ষোভকে উসকে দিয়ে ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়ে উৎখাতের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। বাশার আল আসাদকে এখনও উৎখাত করা যায়নি। উপায়ন্তর না দেখে এখন বোমারু বিমানের হামলা এবং দরকার হলে সিরিয়ার মাটিতে বিদেশী সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। বিদ্রোহীদের দিয়ে সরকার উৎখাতের কাজ হচ্ছে না এবং বিদ্রোহীরা পরাজিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইরানের বিজয়। এটা হতে দেয়া যায় না। যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতেই হচ্ছে।
গত ১৫ বছরের হিসাব নিলে আরব বা মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের সামরিক অভিযান ঘটেছে নয়বার। সুদান, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, মালি এবং ঘাতক ড্রোনের হামলা চলছে ইয়ামেন, সোমালিয়া ও পাকিস্তানে। এই বাস্তবতা সব সময়ই চোখের সামনে হাজির রাখা দরকার।
মুশকিল হচ্ছে, এই যুদ্ধকে কিভাবে ‘ন্যায়সঙ্গত’ যুদ্ধ বলে হাজির করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র? যেহেতু সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক সেই সময়ই গ্যাসে প্রায় ৩৫৫ জন নিরীহ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। এখন সিরিয়ার ওপর মিসাইল আক্রমণের যে প্রস্তুতি চলছে সেখানেও সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ থাকার কথা বলা হচ্ছে। আসলে সিরিয়ার আদৌ রাসায়নিক অস্ত্র আছে কি-না এবং ২১ আগস্ট যে গ্যাসের হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে সেই গ্যাস আসলে কী, তা তদন্তের জন্য জাতিসংঘের রাসায়নিক অস্ত্র পরিদর্শক দল কাজ করছে। তাদের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা ঘোষণা দিয়েছে যে সিরিয়া রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে- সে তথ্যের পক্ষে তাদের কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে। জাতিসংঘের তদন্ত কিন্তু শেষ হয়নি, জাতিসংঘের সেক্রেটারির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া অনেক পরের কথা। কিন্তু যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি নেয়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা জরুরি মনে করছে না।
ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ইরাকে হামলার সময় বলা হয়েছিল ইরাক গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র মজুদ করে রেখেছে। গোয়েন্দাদের এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া মনে আছে নিশ্চয়ই যে, গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে বিল ক্লিনটন এক ওষুধের কারখানায় হামলা চালাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আল কায়দার বোমা হামলার প্রত্যুত্তর দিয়ে বীরত্ব দেখানো কর্তব্য মনে করেছিলেন। ওটা নাকি রাসায়নিক অস্ত্র বানানোর কারখানা ছিল। কিন্তু পরে পাহাড় কাঁপিয়ে পাহাড়ের গোড়ার গর্ত থেকে একটি ইঁদুর বের হয়ে এসেছিল : পর্বতের মূষিক প্রসব! আসলে ওটা রাসায়নিক অস্ত্র বানানোর কারখানা ছিল না, ছিল ওষুধের কারখানা। তবে দামেস্কের শহরতলীতে যে হামলায় বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছে সেটা ভয়ঙ্কর। এটা ভয়াবহ অপরাধ। এভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা ও আহত করার বিহিত অবশ্যই হওয়া উচিত।
এই পরিস্থিতিতে সিরিয়ার যুদ্ধে নীতিগত জায়গা থেকে বিবদমান দুই পক্ষের কোনো একটির পক্ষে দাঁড়ানো কঠিন। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরোধিতা করা একটি সাধারণ নীতি, কিন্তু সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাটিকে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শনাক্ত করা কঠিন। সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং সিরিয়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল অংক সরল সমীকরণ নয়। কিন্তু কিছু দিক পরিষ্কার।
রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য বাশার আল আসাদ দায়ী থাকুন বা না থাকুন, সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক হামলা সাধারণ মানুষের জীবন আরও বিপন্ন করে তুলবে। একে ছুতা হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা গ্রহণ করতে চাইছে। এটা প্রহসন যে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মার্কিন মিত্র হচ্ছে সৌদি আরব। সিরিয়ার জনগণের দুর্দশা ও দুর্ভোগকে আশ্রয় করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই ধোঁয়াশা পরিস্থিতিতে আমাদের কাজ হচ্ছে সিরিয়ার জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো। আশা করা যায় যে, প্রায় অসাধ্য হলেও তারা তাদের সংকট নিজেরাই সমাধান করতে সক্ষম হবে। যুদ্ধ কী ভয়ানক প্রাণঘাতী হতে পারে সে অভিজ্ঞতা সবারই আছে।
সিরিয়াকে কেন্দ্র করে যখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলা হয়, তখন তার সম্ভাব্য ভয়াবহতা সম্পর্কে সারা দুনিয়ার মানুষকেই সচেতন হয়ে ওঠা দরকার। রাশিয়া ও চীনের অবস্থানের কারণে হামলার পরিণতি সেদিকে গড়াবে বলে অনেকে আন্দাজ করেন। আর, তার সঙ্গে যুক্ত মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার উত্তপ্ত পরিস্থিতি। বারাক ওবামা পরিষ্কারই বলেছেন, সিরিয়ার হামলার উদ্দেশ্য বাশার আল আসাদকে অপসারণ নয়। তাহলে সেটা কী? সেটা হচ্ছে বিদ্রোহীদের সহায়তা করা। এর ফলে সিরিয়ায় যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলতে থাকবে, এর নিরসন হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে দাঙ্গা ও হত্যার রাজনীতির বিস্তার ঘটিয়ে ঘোলা পরিস্থিতিতে সুবিধা আদায় করাই মার্কিন নীতি। বড় কোনো যুদ্ধে জড়ানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এখন অসম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দুর্বল জায়গাটা তার পতনকেও ত্বরান্বিত করতে পারে। আমাদের জীবদ্দশায় সেটা দেখে গেলে অবাক হবো না।

মাদকের উত্তেজনায় নষ্ট হচ্ছে তারুন্য - বাড়ছে মাদকাসক্ত শিশু-কিশোর ও নারীর সংখ্যা

সারাদেশে মাদকের ভয়াবহ উত্তেজনায় নষ্ট হচ্ছে তারুন্য। অনেকে কিশোর-কিশোরী ও নারী-পুরুষ হারিয়ে ফেলছেন যৌনতা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। মাদক সেবন ও ক্রয়-বিক্রয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শৈশব ও কৈশোর। ফলে দেশে মাদকাসক্ত শিশু-কিশোরদের ও নারীর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, প্রতিনিয়তই বাড়ছে শিশু-কিশোর মাদকাসক্তদের সংখ্যা। এছাড়া চরম অশান্ত পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক শৈশব ও কৈশোর হারিয়ে ফেলেছে প্রায় ১৪ লাখ শিশু-কিশোর। যারা পথশিশু হিসেবে পরিচিত। বন্ধ হয়ে গেছে তাদের লেখাপড়া-স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলো। এমনকি মাদকদ্রব্য কেনা-বেচায় শিশু-কিশোর ও নারীদের যোগদান করার সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে।

মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খন্দকার হাসান মাহমুদ বলেন, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী কিংবা নারীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন এটা দেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি। অল্প বয়সী কিংবা তরুণ-তরুণীদের এমন ভয়াবহ মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হল তার পরিবার, তাই মাদকমুক্ত হতে হলে পরিবারকে সচেতন হতে হবে।

ডিএমপি সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, নারী-শিশু তথা শিশু-কিশোরদের একটি অংশ মাদক কেনা-বেচায় জড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোররা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। খাবারের অভাব, চরম অপুষ্টি এবং ক্রমাগত অসুখে ভোগার কারণেই বাড়ছে শিশু-কিশোর মৃত্যু। শুধু তাই নয়, যৌন আকাক্সক্ষা চরিতার্থ করতে জোর করে উত্তেজনা নেশাদ্রব্য খাওয়ানো হচ্ছে অল্প বয়েসীদের।

অপরাজেয় বাংলাদেশ সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ১৪ লাখ পথশিশু রয়েছে, তাদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো মাদক সেবনে জড়িত। এসব শিশু-কিশোর টানা মাদকাসক্তের কারণে ঘর ছেড়ে পার্কে, খামারে, রাস্তাঘাটে, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বাবুর কথায়, মাদকের ভয়াবহতায় নিষ্পাপ শৈশব-কৈশোর হিংস্র বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে হাজার হাজার ঐশীর। মাদকাসক্তদের হাতে আপনজন খুন হলেই দেশে হইচই পড়ে যায়। প্রতিবারই এ ঘটনা ঘটে। ব্যতিক্রম নয় এবারও। এবার মাদকাসক্ত মেয়ে ‘ঐশী’র হাতে মা-বাবা খুন হওয়ার পরই শিশু-কিশোর, নারীসহ সব মাদকাসক্ত এবং মাদক কেনা-বেচা এবং সেবনের বিরুদ্ধে সোচ্চার দেশবাসী। কিন্তু আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার পর কিছুদিন যেতেই সব কিছু আগের মতো হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, ফুটপাত থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল পর্যন্ত মাদকের থাবা বিস্তৃত। শিশু-কিশোর ও নারী মাদকাসক্তরা নিষ্ঠুর আর নিয়ন্ত্রণহীন হয় বেশি। ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন করায় সন্তানরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা স্বাভাবিক জীবনের বাইরে গিয়ে মাদকাসক্ত এমনকি যৌন আসক্ত হয়ে উঠে।

ইউএনডিপির দেয়া এক তথ্যে জানা যায়, পৃথিবীতে মাদকাসক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ২ ভাগ। এ হিসাবে বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা এ সংখ্যা কমবেশি ৬০ লাখ ধরেই তৎসংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকার মাদকসেবীদের প্রায় সবাই বেকার, টোকাই, রিকশা-ভ্যানচালক, ছোটখাট চোর-বাটপারসহ সমাজের নিু আয়ের মানুষ। অভিজাত এলাকায় প্রকাশ্যে নেশাদ্রব্য বেচাকেনা বা গ্রহণ খুব কম নয়। অভিজাত পোশাক-আশাক পরে মাদক সেবন করায় তাদের চোখে পড়ে খুব কম। তবে দীর্ঘদিন ধরে সিসা বা হুক্কা নামের এক ধরনের নেশা অভিজাত এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সঙ্গে বিদেশী মদ, ইয়াবা হোরাইন তো রয়েছেই। এ সব আসরে বসে মূলত অভিজাতপাড়ার শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারীরা। যাদের পিতা-মাতার সমাজে নাম-ডাক রয়েছে। রয়েছে ক্ষমতাও। এ নেশাসক্তদের বেশির ভাগই নগরীর বিভিন্ন নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এবং অভিজাতপাড়ার ধনী পরিবারের ছেলেমেয়ে।

ঢাবির ক্যাম্পাসে অবাধে মাদক বিক্রি- গভীর রাত পর্যন্ত মেয়েদের মাদক সেবন- মেয়ে মাদকসেবীদের মধ্যে বেশিরভাগ চারুকলার ছাত্রী

প্রশাসনের সীমাহীন অবহেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলছে অবাধে মাদকদ্রব্য বিক্রি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে মাদক সরবরাহকারী একটি চক্র। রাজনৈতিক নেতাদের চাঁদা দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি এ স্থানটিকে করে নিয়েছেন মাদক বিক্রির নিরাপদ জোন। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, প্যাথেডিনসহ রকমারি মাদকে ছেয়ে গেছে ক্যাম্পাসের অলিগলি। রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা ও চা বিক্রেতা ছদ্মবেশে চালানো হচ্ছে এ কার্যক্রম। আর এসব মাদক দ্রব্যের বেশিরভাগ ক্রেতাই হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশ পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ভাসমান বিক্রেতাদের দফায় দফায় ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যসহ ধরা হলেও একটুও কমছে না মাদক বিক্রি। অভিযোগ রয়েছে, মাদক বিক্রির সঙ্গে সরকারদলীয় ছাত্র নেতাদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার কারণেই মাদক ব্যবসায়ী চক্রটি শক্ত করে এ এলাকায় খুঁটি গেড়ে বসেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসনের নির্লিপ্ত আচরণের কারণেও এর মূলোৎপাটন সম্ভব হয়ে উঠছে না। ফলে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এ প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের পাশাপাশি নানা অপরাধ বেড়েই চলছে। জানা জানায়, মাদক বিক্রি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিত্যকার ঘটনা হলেও প্রশাসনের উদাসীনতায় এ অপরাধ চাপা পড়ে যাচ্ছে। কদাচিৎ ঘটছে মাদক বিক্রেতাদের ধর পাকড়ের ঘটনা। এ বছর দুই দফায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের মাঠ থেকে ইয়াবাসহ ধরা হয় ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের। প্রথমবার ১০০ টি ও দ্বিতীয়বার ২৫টি ইয়াবা উদ্ধার করেন গোয়েন্দারা। এছাড়া কিছুদিন আগে ফজলুল মুসলিম হলের পাশ থেকে ফেন্সিডিল ভর্তি একটি গাড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। গত বছর সাভার থেকে মুহসীন হল ছাত্রলীগের গত কমিটির এক সহ-সম্পাদককে ইয়াবাসহ আটক করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, বঙ্গবন্ধু হলে ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা রুমে নিয়মিত মাদক সেবনের আসর বসান। তার বিরুদ্ধে এর আগে হলের রুমে মেয়ে এনে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সবগুলো হলেই চলে কম বেশি মাদক সেবন। তবে ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে বহিরাগতদের সমন্বয়ে জগন্নাথ হলের ভবনগুলোতে হরহামেশাই মাদক সেবন। আর এসবের নেতৃত্বে থাকেন হলের ছাত্রনেতারা।
সূত্র জানায়, ঢাকার বাইরে টেনকনাফসহ অন্যান্য এলাকা থেকে মাদকদ্রব্য আসে পুরান ঢাকার লালবাগ, চানখাঁরপুল এবং নীলক্ষেত এলাকায়। সেখান থেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বকশীবাজার মোড়, মুহসীন হল মাঠ, পলাশী, আজিমপুর মেটার্নিটি হাসপাতাল, মল চত্বর, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ গেট, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং টিএসসিতে বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে মাদক। রিকশাচালক, চা বিক্রেতা এবং বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে বিক্রি হচ্ছে এগুলো। রিকশার সিটের ভেতরে রেখে বিক্রি হয় গাঁজা। সহজেই পাওয়া যায় হেরোইনের পুরিয়া আর ইয়াবা ট্যাবলেট। বুয়েটের পেছনের গেট বলে পরিচিত কাবুল শাহ মাজার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অঘোষিত মাদক স্পট। এখানে সবসময় দাঁড়ানো থাকে ২০/২৫টি রিকশা। প্রত্যেকটি রিকশার সিটের নিচে থাকে মাদকদ্রব্য। এরা মূলত গাঁজার পুরিয়া ও ফেনসিডিল বিক্রি করে। ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ ও ১০০ টাকার পোটলা পাওয়া যায় তাদের কাছে। তাদের বেশিরভাগ ক্রেতাই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মাদক বিক্রি ও সেবনের তীর্থস্থান বলে পরিচিত চারুকলার বিপরীত দিকের ছবির হাট। ছবির হাট থেকে শিখা চিরন্তন এলাকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদক সেবন ও বিক্রি হয়। চারুকলার কয়েকজন সরকারদলীয় ছাত্রনেতা এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্কুল-কলেজের পোশাক পরা শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত এখানে প্রকাশ্যই মাদক সেবন করেন। অথচ এর মাত্র কয়েকশ গজের মধ্যেই শাহবাগ থানা।

অভিযোগ রয়েছে, থানা-পুলিশকে ম্যানেজ করেই চলছে এ রমরমা মাদক ব্যবসা। উদ্যানের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় সুমী নামের এক মহিলার কথা উঠে এলেও তাকে অদৃশ্য কারণে কখনও আটক করা হয়নি। সোমবার রাত ১১টায় মাদকসেবী পরিচয়ে এক মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, আগে কাওরানবাজার রেললাইনের পাশে ও যাত্রবাড়ির ধলপুরে মাদক ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র থাকলেও সেখানে পুলিশি ঝামেলায় এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলে এসেছে। এখানে দৈনিক ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। ক্যাম্পাসে মেয়ে মাদকসেবীদের মধ্যে বেশিরভাগ চারুকলার ছাত্রী। তারা প্রকাশ্যে চারুকলার সামনে মাদক সেবন করে থাকেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপদে মাদক সেবনের জন্য ক্যাম্পাসকে বেছে নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলো রাত সাড়ে ৯টায় বন্ধ হলেও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে গভীর রাত পর্যন্ত মেয়েদের মাদক সেবন করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কখনও ব্যবস্থা নেয়নি। চারুকলার গেটের ভেতরে এবং বাইরে বসে সিগারেট, গাঁজা ও ফেনসিডিল সেবন করতে দেখা যায় অনেক মেয়েকে। এছাড়া সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট আইডি কার্ডধারীরা চারুকলার ভেতরে প্রবেশ করে, মাদক সেবন ছাড়াও নিভৃতে চলে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। বিভিন্ন হলে ছাত্রীদের মাদক সেবন থেকে বিরত রাখতে হলের ছাদে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। টিএসসির বিভিন্ন রুম ও বাথরুমে ফেনসিডিলের বোতল এবং গাঁজার পোটলা পাওয়া যায় অহরহ। বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরান ঢাকার একটি সিন্ডিকেট পার্শ্ববর্তী ইডেন মহিলা কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ও বদরুন্নেছা কলেজে মাদকদ্রব্য বিক্রি করে। তাদের সহযোগিতা করে হলগুলোর একাধিক মহিলা কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউমার্কেট এলাকার দুটি ছাত্রী হল কুয়েত-মৈত্রী ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে মাদকদ্রব্য বিক্রির সঙ্গে কুয়েত মৈত্রী হলের দুই কর্মচারী জড়িত বলে জানা গেছে। এছাড়া ছেলেদের হলে প্রকাশ্যই রাতে ছাদের ওপর বসে মাদক সেবনের আখড়া। অনেক উঠতি ছাত্রনেতা তাদের রুমে বসেই মাদক ব্যবসা ও সেবনের কাজ করে থাকেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আমজাদ আলী বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক মাদকের উৎপাত খুব বেশি। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে বারবার এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ক্যাম্পাসেও টহল বাড়ানো হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে উদ্যানে অভিযান পরিচালনা করি। আজও একজনকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে।

সিরিয়া- কার পক্ষে লড়ছেন ওবামা! by রবার্ট ফিস্ক

বারাক ওবামা যদি সিরিয়ার আসাদ সরকারের ওপর আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তাহলে আমেরিকার অবস্থান চলে যাবে আল-কায়েদার পক্ষে।

খোলা চোখে- খারাপ, তবে এতটা খারাপ? by হাসান ফেরদৌস

ছবিটা আপনাদের খুবই চেনা, তবু আলোচনার সুবিধার্থে তা আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। বলছি দুটি রাজনৈতিক দলের কথা,

সাদাসিধে কথা- এই লজ্জা কোথায় রাখি by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

কাক কাকের গোশত খায় না- কিন্তু এবারে মনে হয় একটু খেতেই হবে। আমি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

সিরিয়া ইস্যুতে পিছু হটেছে বৃটেন

মিত্রদের সমর্থন ছাড়া এখন যুক্তরাষ্ট্র একাই সিরিয়ায় হামলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। বৃটিশ পার্লামেন্টে সিরিয়া ইস্যুতে ভোটাভুটিতে ওবামা মিত্র প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পরাজিত হওয়ার পর এ ধরনের চিন্তা করা হচ্ছে বলে হোয়াইট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে।

ইসলামপন্থিদের হুমকির মুখে সুন্দরী প্রতিযোগিতা

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ বা বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা৷

একজন প্রকাশ চন্দ্র পাল

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত মাটির তৈজসপত্র তৈরীর ব্যবসার ৫০ বছর পার করছেন প্রকাশ চন্দ্র পাল। শত মন্দার মধ্যেও হাসি-খুশি প্রকাশ জানালেন তার পারিবারিক সমৃদ্ধির কথা।

আহ! মুক্তাগাছার মণ্ডা by তানিম কবির

সে প্রায় ২শ বছর আগের কথা--- ব্রিটিশ শাসিত পূর্ববঙ্গের মুক্তাগাছায় স্বর্গীয় গোপাল পাল মহাশয় স্বপ্নে দেখলেন দস্তুরমতো এক সন্ন্যাসী তাকে মানবজাতির মুখ মিষ্টি করবার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করছেন! প্রথমে পাত্তা দেননি।

চলচ্চিত্রে অনুদান- নেই মানসম্মত ছবি বাড়ছে অপচয় by গোলাম রাব্বানী

প্রতিবছরই চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুদান দিচ্ছে সরকার। কিন্তু অনুদানের অর্থে তৈরি হচ্ছে না মানসম্মত চলচ্চিত্র।

জোটবদ্ধ হচ্ছে ইসলামী দলগুলো

নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ইসলামিক দলগুলো ধীরে ধীরে কাতারবদ্ধ হচ্ছে।

সিরিয়ার খবরের প্রধান উৎস সোশ্যাল মিডিয়া

যুদ্ধ সাংবাদিকতার সঙ্গে সাংবাদিকতার যে টার্মটি বেশি পরিচিত তা হচ্ছে ‘এমবেডেড জার্নালিজম’। বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় সরকারি বাহিনীর সঙ্গে থাকেন সংবাদকর্মীরা।

Friday, August 30, 2013

শান্তিতে থাকতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শান্তিতে থাকতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে। যদি দেশের উন্নয়ন চান তাহলে এখনই ভোটের সিদ্ধান্ত নিন। শেখ হাসিনা গতকাল সকালে এক সফরে চট্টগ্রাম আসেন।

আক্রান্ত হলে জবাব দেবে সিরিয়া - সিরিয়া পরিস্থিতি: সর্বশেষ

সিরিয়ায় আগ্রাসী হামলা চালানো হলে তার যথোপযুক্ত জবাব দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডন থেকে পাওয়া সব তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সিরিয়ায় সামরিক হামলা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

‘যার পুরোটাই নকল তারই উড়ে যাওয়ার ভয়’ - শেখ হাসিনা

আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আবারও নৌকা মার্কায় ভোট চাইলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু) মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেভাবে জীবন দিয়েছেন ঠিক সেভাবে আমাকে যদি বুকের রক্ত দিতে হয় তাহলেও পিছপা হব না।

শিগগিরই শেখ হাসিনার গণেশ উল্টে যাবে- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, জনগণ রাস্তায় নামলে শিগগিরই শেখ হাসিনার গণেশ উল্টে যাবে। এমনকি সংসদে নাম লেখানোর মতো কেউ না-ও থাকতে পারে।

সিরিয়া: একটি সংকট ফিরিস্তি by কামরুল হাসান কাইউম

২১ আগস্ট ২০১৩ সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের উপকন্ঠে রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটে বলে দাবি করে বসে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বিরোধীরা।

সিরিয়ার সেনা সামর্থ্য

পশ্চিমাদের হামলা প্রতিহত করার ঘোষণা দৃঢ়ভাবেই দিয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেমও বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চমকে দেওয়ার মতো।’

প্রাপ্তবয়স্ক কমেডিতে মুগ্ধ জেনেলিয়া!

আগামী মাসেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে রিতেশ দেশমুখ, বিবের ওবেরয় এবং আফতাব অভিনীত ছবি ‘গ্র্যান্ড মাস্তি’। এটি মূলত ‘মাস্তি’ ছবির সিক্যুয়াল। এ তিন অভিনেতা অভিনীত কমেডি ছবি ‘মাস্তি’ ছিল সুপারহিট।

৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রের হাত ধরে পালালো ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী, অতঃপর বিয়ে

গোপালপুরে ডুবাইল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র নুর আলম (১২)-এর হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় ডুবাইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজা আক্তার।

পররাষ্ট্রনীতি ও দেশের ভাবমূর্তি by মুহাম্মদ রুহুল আমীন

অদক্ষ জনবল, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, ভ্রান্ত কূটনীতি, অপর্যাপ্ত গবেষণা, লক্ষ্যহীন প্রাধিকার, সর্বোপরি বিপর্যস্ত ভাবমূর্তি ইত্যাদি নানা কারণে বাংলাদেশে বৈদেশিক সম্পর্কের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠতে পারেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর প্রায় অর্ধশতাব্দী হতে চললেও এখনও আমরা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ও ক্রিয়াশীল উপাদানগুলোকে (ধপঃড়ৎং) যেমন চিহ্নিত করতে পারিনি, তেমনি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নির্ধারণ করতেও ব্যর্থ হয়েছি। কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি বা বৈদেশিক সম্পর্কের মূল লক্ষ্য হল, দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো দেশ তার রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ অর্জনের জন্য বজ্র পররাষ্ট্রনীতি (হার্ড ফরেন পলিসি) গ্রহণ করে থাকে। আবার অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ অর্জনের জন্য ওই দেশই নম্র পররাষ্ট্রনীতি (সফ্ট ফরেন পলিসি) অনুসরণ করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নম্র বিষয়গুলো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ নম্র পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জিত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বজ্র পররাষ্ট্রনীতি অর্জিত হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের ওপর সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পররাষ্ট্রনীতি প্রণীত হয়। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক দৈন্যের কারণে সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক উৎস থেকে প্রত্যাশিত ও প্রতিশ্র“ত সাহায্য প্রাপ্তিতে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এমন এক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী, মুসলিম বিশ্বসহ অন্যান্য বৈদেশিক উৎস থেকে সাহায্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
সামরিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের যুগসন্ধিক্ষণে সরকার ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি রক্ষণশীলতার পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতির বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়া প্রণয়ন করেন। সমাজতান্ত্রিক সূত্রসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দাতা দেশ থেকে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। ফলে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের অন্তর্মুখী দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা নিয়ে এসেছিল, তা বিদূরিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ বহির্মুখী উন্নয়নকেন্দ্রিক শিল্পায়নের পথে অগ্রসর হয়। জিয়ার বৈশ্বিক অন্তর্দর্শন পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় জিয়া উপলব্ধি করেন, নিছক স্নায়ুযুদ্ধকালীন সামরিক-রাজনৈতিক শত্র“তার উপলব্ধি থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের খণ্ডিত কোনো অংশের সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে শক্তিশালী করা দুরূহ হবে। সেজন্য তিনি উদীয়মান বৈশ্বিকতার (এমার্জিং গ্লোবালিটি) প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্নিহিত কাঠামোতে তা অন্তর্ভুক্তির কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রগতিমুখী ধারা প্রবর্তন করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এরপর আর বৈদেশিক সাহায্যের ওপর স্থবির হয়ে পড়ে না থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে থাকে। শিল্প-কারখানা ব্যাপকভাবে বিরাষ্ট্রীয়করণ করে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তিনি উন্মুক্ত কূটনীতি শুরু করেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে যে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়, তা জিয়ার বহুমুখীকরণ নীতির কারণে দূর হতে থাকে। ধীরে ধীরে বিদেশে দেশের সুউচ্চ ভাবমূর্তি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করে। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে আমাদের নব-অর্জিত মর্যাদা সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক কূটনীতির নবদিগন্তের সূচনা করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরলস পরিশ্রম করে এমনভাবে বৈদেশিক শ্রমবাজারের সম্ভাবনা জাগরিত করে, যা পরে বাংলাদেশের জিডিপির সিংহভাগ দখল করে নেয়।
জিয়া-পরবর্তী শাসনকালে আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারা চালু রাখার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভিন্ন কারণে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদার হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি বারবার সামনে চলে এসেছে। আশির দশকের সামরিক শাসনের পর নব্বইয়ের দশক থেকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নবতর যাত্রা শুরু হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন গতিময়তা পরিলক্ষিত হয়নি। রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক আদর্শের মতভিন্নতা আমাদের জাতীয় ঐক্যকে ঠুনকো ও নড়বড়ে করে দেয়, যে কারণে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঐক্য ধরে রাখতে আমরা ব্যর্থ হই। পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ঐক্য ও অবিভাজনের ধারণা ও প্রত্যয়ের প্রয়োজন ছিল, তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নিপুণতার চেয়ে দলীয় বিবেচনার অগ্রাধিকারই লক্ষ্য করা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোও হীন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। ফলে পররাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলাদলি পররাষ্ট্রনীতিকে গ্রাস করার ফলে বিদেশে এক ধরনের নেতিবাচক ভাবমূর্তির সৃষ্টি হয়। তাছাড়া গণতন্ত্রায়ন, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু প্রভৃতি ইস্যুতে আমাদের ক্রমক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ ও হঠকারী নীতি বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে মারাত্মকভাবে। আমাদের ভাবমূর্তি বিপর্যয়ে পড়ার নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতি-ষড়যন্ত্র, শেয়ারবাজার ও ব্যাংক কেলেংকারি, তাজরিন গার্মেন্ট ও রানা প্লাজার ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি বাতিল, রাজনৈতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বিচারবহির্ভূত খুন-গুম, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক দলন-পীড়ন প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ ইস্যু আন্তর্জাতিক বলয়ে আলোড়িত-আন্দোলিত হয়ে বাংলাদেশের এমন এক ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের বৈদেশিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে পুনঃশক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আমাদের বৈদেশিক ইস্যু এবং পররাষ্ট্র সম্পর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলোর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হল, আমাদের বিপর্যস্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। সব ধরনের দলাদলি ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা সময়ের দাবি। পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিনিয়ত গবেষণা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক, অধ্যাপক, পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সংঘ (অ্যাডভাইজারি সেল) গঠন করা যেতে পারে। পররাষ্ট্রিক ইস্যুগুলোতে প্রতিনিয়ত সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে আলোচনা-পর্যালোচনা করে যোগ্য, ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত রাখা উচিত। বিশ্বায়নের এ যুগে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার অবারিত সম্ভাবনা জাগরিত রাখতে প্রত্যেক নাগরিক বিশেষ করে বৈদেশিক বলয়ের সবাইকেই শুভেচ্ছাদূতের ভূমিকায় সর্বদা তৈরি থাকতে হবে। আমাদের সঙ্গীতশিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সর্বোপরি সব নাগরিককে নিজ নিজ স্থানে থেকে এমন শুভেচ্ছাদূতের ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে আমরা ভাবমূর্তি বিপর্যয় কাটিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিনিয়ত সাফল্য অর্জন করতে পারি।
মুহাম্মদ রুহুল আমীন : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সিরিয়ায় যুদ্ধের ভেতর যুদ্ধ by মিজান মল্লিক

সিরিয়ার সরকারবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) অন্যতম শীর্ষ নেতা কামাল হামামিকে সম্প্রতি হত্যা করেছে জিহাদিরা।

গৃহযুদ্ধের পথে যাচ্ছে মিসর? by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

তাহলে কি সত্যিই আরব বসন্তের কবর রচিত হলো মিসরে? মাত্র বছর দুয়েক আগে গণবিক্ষোভের মুখে পতন হয়েছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের।

সোনারামের ঢোল by জাহেদ মোতালেব

সোনারাম ঢোল বাজায়। আঙুল দিয়ে সুর তোলে। ঢোলের চামড়ায় তার দুঃখগুলো মিশিয়ে দেয়: ‘টাগ ডুমা ডুম ডুম/চোখজুড়ে আয় ঘুম।’

নজরুলের বিচার আমাদের ভ্রান্তি by কুদরত-ই-হুদা

বাংলাভাষী মানুষ কবি নজরুল বলতে যে নজরুলকে সাধারণভাবে বুঝে থাকেন, সেই নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২২ সালে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।

সাক্ষাৎকার- আমার কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হলো সবার ওপরে ভারত: নরেন্দ্র মোদি

আগামী বছর অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দলীয় প্রচারাভিযানের প্রধান করেছে বিতর্কিত নেতা নরেন্দ্র মোদিকে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন আলোচনা- সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখা? by আশিস আচার্য

ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক বৈঠকের শুরুতে ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রী সিপি লিভনি বলেছিলেন, ‘আসুন, আমরা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় না, এমন মানুষে পরিণত হই।’

টুটুলের অ্যাংরি বার্ডস by মাহফুজ রহমান

টুটুলের বড় আপুর নাম শিলা। টুটুল ডাকে চিলা! ‘চিল’-এর সঙ্গে ‘আ’-কার যোগ করে চিলা। শিলা যখন সামনে থাকে না, টুটুল তখন ওকে ডাকে চিলাপু বলে।

সিরিয়া সংকট- চ্যালেঞ্জের নাম রাসায়নিক অস্ত্র by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাষায়, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছেন।

সিরিয়া অভিযানে ক্যামেরনকে বিমুখ করলেন এমপিরা

সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের প্রস্তাবে সায় দেয়নি দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স।

কেন সিরিয়ার পক্ষে রাশিয়া, চীন by শরিফুল ইসলাম

সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে স্নায়ু যুদ্ধের কবর রচিত হলেও আসলে স্নায়ু যুদ্ধের আসল মৃত্যু ঘটেনি।

রতিসুখসারলীলা

বয়ঃসন্ধি কালে ছেলেরা কি শুধু শরীর দিয়ে, মন দিয়ে সন্ধিমুহূর্তের কথাই ভাবে? তখন কি বয়সে বড় রমণীদের সঙ্গেও চলে তাদের আদরসুখ-উদযাপন?

ম্যারাডোনার ‘অতিরিক্ত’ নারী প্রীতিতে বিরক্ত দুবাইবাসী

অতিরিক্ত নারী প্রীতির কারণে দুবাইবাসীদের নিকট সমালোচিত হচ্ছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ডিয়াগো ম্যারাডোনা।

ক্যাটের জন্মদিনে রণবীরের নিবেদন!

রণবীর ও ক্যাটরিনার প্রেমের খবর বলিউড পাড়ার সর্বশেষ আলোচিত গুঞ্জণ। আর সম্প্রতি ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমের খবরে সবাই নড়েচড়ে বসেছেন।

কে জানাবে সিরিয়ার প্রকৃত চিত্র?

ইরাক-আফগানিস্তানের মতো সম্ভবত আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। বরাবরের মতো এবারও আলোচনায় মিডিয়া।

নজরুলের বিচার আমাদের ভ্রান্তি by কুদরত-ই-হু

নজরুল
বাংলাভাষী মানুষ কবি নজরুল বলতে যে নজরুলকে সাধারণভাবে বুঝে থাকেন, সেই নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২২ সালে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। তখন তাঁর বয়স তেইশ বছর। তেইশ বছর বয়সী এই কবির আবির্ভাব বাংলা কাব্যজগতে বেশ একটা অস্বস্তি তৈরি করে। এই অস্বস্তির কারণ কেবল তাঁর কবিতা নয়, স্বয়ং তাঁর কবিতার নন্দনতত্ত্ব। এতকাল বাঙালি কাব্যপাঠক কবিতা বলতে যা বুঝতেন, সেই ধারণার সঙ্গে নজরুলের কবিতা ঠিক খাপ খাচ্ছিল না—না বিষয়গত দিক থেকে, না প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে। ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নজরুলের কবিতা রক্ষা করেনি। নজরুলের যে কাব্যসাধনা, তা নিঃসন্দেহে দাবি করে এক নতুন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনা। কিন্তু নজরুলের সমকালীন এবং পরকালীন অধিকাংশ সমালোচকই নতুন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনায় যাননি। তাঁরা অধিকাংশ সময় নজরুলকে প্রথাগত নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠিতে মেপে হয় তাঁকে খাটো করেছেন, নয়তো বলেছেন, নজরুল বাংলা কাব্যে এক নতুন সুর ও স্বরের বার্তা ধ্বনিত করেছেন। নজরুল-মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রায় সব সমালোচকই ‘আধুনিক’ বাংলা কাব্য-বিবেচনার যে মাপকাঠি বা নন্দনতত্ত্ব তাকেই প্রয়োগ করেছেন।
এই ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের ধারণা উপনিবেশের হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ‘পশ্চিমি আধুনিক’ সাহিত্যের রুচি ও চেতনা নিয়ে বাংলা সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ফলে এর নন্দনতত্ত্বও ইউরোপ থেকে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এই নন্দনতত্ত্বের প্রধান শর্তই হচ্ছে সাহিত্যকে বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা। শৈল্পিক সুষমা তৈরি, মানসিক আনন্দ প্রদান আর মহৎ মনের প্রতিফলন ঘটানোই সাহিত্য-বিবেচনার এবং সাহিত্য রচনার মূল উদ্দেশ্য। বুর্জোয়া জীবনের ফিটফাট ‘আধুনিক’ বুর্জোয়া সাহিত্যের শর্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের এই ধারণার মধ্য দিয়েই উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ের বাংলা সাহিত্য এবং সাহিত্য-সমালোচনা বেড়ে উঠেছে। ফলে, এই প্রথাগত ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠি যখনই নজরুলের মূলধারার কাব্য-কবিতার মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন, তখনই তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন যে, নজরুলের কাব্য-সাহিত্য সেই মানদণ্ডের একদম নিচে পড়ে থাকে। এ রকম কাজ অনেকেই করেছেন। কাজী আবদুল ওদুদ, বুদ্ধদেব বসু, এমনকি হালের হুমায়ুন আজাদ। ওদুদ ১৯৪১-এ লিখিত তাঁর ‘নজরুল ইসলাম’ শিরোনামের প্রবন্ধে বললেন, ‘নজরুলের কবিতায় যে তারুণ্য রূপ পেয়েছে তার সাহিত্যিক মর্যাদা কেমন, সেটিও একটি বড় অনুধাবনের বিষয়। একটু মনোযোগী হলেই চোখে পড়ে, নজরুলের রচনা, বিশেষ করে তাঁর বিদ্রোহী যুগের রচনা অনবদ্য নয়। শ্রেষ্ঠ কবিদের বিশেষ বিশেষ কবিতায় কবি-কল্পনার যে পূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ পায়, নজরুলের রচনায় সেটির অভাব মাঝে মাঝে প্রায় বেদনাদায়ক হয়েছে।’
নজরুলের মধ্যে ওদুদ ‘বুর্জোয়া ফিটফাট’-এর খোঁজ করেছেন। নজরুলবিষয়ক তাঁর লেখা তিনটি প্রবন্ধেই তিনি মহৎ কবির উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ। বারবার তিনি নজরুলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। অনেকে এ জন্য ওদুদকে দোষারোপ করেন। যেমন, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর নজরুল: কালজ কালোত্তর গ্রন্থে ওদুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এটি ওদুদের সমস্যা নয়। এটি মূলত নন্দনতত্ত্বের সমস্যা। ওদুদ-ঘরানা ছাড়াও নজরুলের আরও একধরনের মূল্যায়ন চালু আছে। সেটিকে আমরা বলতে পারি দায়হীন মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন নজরুলের নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়নের দায়িত্ব নেয় না; বরং নজরুলের স্বর ও সুরের ভিন্নতা বিষয়ে উচ্ছ্বসিত হয়, কিন্তু সেই ভিন্নতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্মাণ করে না। নজরুলের জন্য যে ভিন্ন কাব্যপাঠ-ব্যাকরণের প্রয়োজন, সেই ব্যাকরণিক সূত্র নির্দেশ করে না। অথচ ভিন্ন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনা ছাড়া নজরুলকে সম্যকভাবে পাঠ সম্ভব নয়। সেই নন্দনতত্ত্বটি কী—কবির নিজের ভাষ্য এবং তাঁর কাব্যপ্রবণতা পর্যালোচনা করে তার একটি রূপরেখা হাজির করা যেতে পারে। নজরুল সাহিত্যকে নিছক আনন্দ আর সৌন্দর্য সৃষ্টির ক্ষেত্র মনে করতেন না। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব হয়েছে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল’ বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে। নজরুলের আগের প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর কাব্য তার মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর মর্মে পশ্চিম থেকে আগত রোমান্টিক আনন্দ-বেদনা আবিষ্কারের ও প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিল। ওই কবিতা তার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর গ্লানিময় ইতিহাসকে, অবমাননাকে রুখে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়নি।
দায়িত্ব নিয়েছিল ইউরোপীয় নতুন ভাব-কল্পনাকে ভাষা দেওয়ার। এ কারণে এসব কবিকে আবিষ্কার করতে হয়েছিল বাংলা শব্দের ছদ্মাবরণে ইউরোপীয় অর্থে মার্জিত ভাষাকাঠামো। কিন্তু নজরুল তো সে পথের পথিক ছিলেন না। দীর্ঘকাল থেকে জমে ওঠা জঞ্জাল সাফ করতে যেমন বহু মানুষের সমবায়ী প্রচেষ্টা দরকার হয়, তিনিও তেমনি বহু মানুষের মুখের ভাষাকে আশ্রয় করে কোলাহল-মুখরিত এক কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতা মানেই বহু মানুষের শোরগোল, অসভ্য-অমার্জিত অট্টহাস্য, ধসে পড়ার শব্দ, আসুরিক চিৎকার। সর্বৈব ধ্বংস আর সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃজনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি কাব্যরচনা করেছেন। তাঁর কাব্যবিচারের নন্দনতত্ত্ব সৌন্দর্য ও আনন্দ-সৃজননির্ভর ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা ভাষা যে এত ধারালো, তা তো নজরুলই আবিষ্কার করলেন। সাহিত্য যে প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণও প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। নজরুলের স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টি এবং জীবনবোধের তীব্রতাই তাঁকে স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্বের অনুসন্ধানী করেছে। ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া/ ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া’—এই বাকভঙ্গি এবং শব্দচয়নকে তো বাংলা গদ্য এবং কবিতা ঊনবিংশ শতাব্দীতেই কবর দিয়েছে। বাংলায় ‘আধুনিকতা’ যেমন এর জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক যাপনের ধারাবাহিকতায় দেখা দেয়নি, তেমনি বাংলা কাব্য-সাহিত্যও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে গড়াপেটা করা একটা চাপানো ভাষার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে।
নজরুল সেই কাব্য এবং ভাষার মহান আদর্শকে হেঁচকা টানে সদর রাস্তায় নিয়ে এলেন। তিনি কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দের বহুল প্রয়োগ করেছেন—এটি তাঁর ভাষাবিচারের ক্ষেত্রে আক্ষরিক কথা। কিন্তু ভাবার্থের কথা হচ্ছে, নজরুল ভাষাকে উদার, মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক করে দিলেন; জনবিচ্ছিন্নতার কেটে যাওয়া সূত্র লাগিয়ে জনসম্পৃক্ত করলেন। আহমদ ছফা তাঁর ভাষার মধ্যে এই জনসম্পৃক্তি লক্ষ করেই বলেছেন, ‘নজরুল তার কাব্যভাষা নির্মাণে চলতি ভাষারীতির...দ্বারস্থ হয়েছেন।’ আর ভাষায় গণতান্ত্রিকতার বিষয়ে বলেছেন, ‘নজরুলের কাছে সমগ্র বাঙালী সমাজের ঋণ এই যে, নজরুল বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে বাঙলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে নব বিকাশধারায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে অনেক দূর পর্যন্ত গাঁথুনি নির্মাণ করেছিলেন।’ এর মানে এই নয় যে, নজরুল সংস্কৃত শব্দকে তাঁর কাব্যভাষা থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। তাঁর কাব্যভাষায় প্রচুর সংস্কৃত শব্দ ব্যবহূত হয়েছে, কিন্তু ভাষার ভেতরের আকাশটাকে উদারীকরণ করে, যে-সে-শব্দের প্রবেশ অনুমোদন দিয়ে এবং মৌখিক বাকভঙ্গি ব্যবহার করে তিনি বাংলা কবিতা থেকে চোখ ও কানের দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক সাহিত্য কবিতাকে দৃষ্টি-ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। কবিতাকে শ্রুতির সম্পর্ক থেকে বিচ্যুত করেছিল। নজরুল সেই শ্রুতি-ইন্দ্রিয়কে বাংলা কবিতায় ফিরিয়ে আনলেন। এ কারণে নজরুলের অনেক কবিতা পড়ার সময় সংস্কৃত শব্দের প্রচুরতা একধরনের কাঠিন্য তৈরি করলেও সেই কবিতা যখন কানের কাছে আসে, তখন তা বেশি বোধগম্য ও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে ছন্দও এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে তাঁর কবিতায়। দেখা যাবে, তাঁর মূলধারার অধিকাংশ কবিতা স্বরবৃত্ত অথবা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। এই ছন্দ গ্রহণের ক্ষেত্রে নজরুলের সঙ্গে আরেক গণসম্পৃক্ত কবি জসীমউদ্দীনের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
কবিতাকে সহজ ও গণগ্রাহ্য করে তোলার জন্য জসীমউদ্দীনও এই সহজবোধ্য ও আরামপাঠ্য স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের পিঠে সওয়ার হয়েছিলেন। যদিও নজরুলের কাব্যে বিষয়ের ও ভাবের ওচড়-মোচড়ের কারণেই স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্য ও নিরীক্ষা অনেক বেশি, যা জসীমউদ্দীন-এ নেই। তবু অক্ষরবৃত্তের নানা নিরীক্ষা এবং তার প্রয়োগ উপেক্ষা করে নজরুল মধ্যযুগের পয়ারের মতোই বোধগম্য ও জনসম্পৃক্ত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। নজরুল স্পষ্ট কথা বলার পক্ষের লোক। তিনি মনে করেন, ‘স্পষ্ট কথা বলায় একটি অবিনয় নিশ্চয় থাকে; কিন্তু তাতে কষ্ট পাওয়াটা দুর্বলতা।’ বেশি বিনয় ‘মানুষকে ক্রমেই ছোট করে ফেলে, মাথা নীচু করে আনে’—নজরুল এই বিনয়ের বিপক্ষের লোক ছিলেন। তিনি মনে করতেন ‘দেশের যারা শত্রু, দেশের যা-কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি তা সব দূর করতে হবে।’ এই কাজ কবির, এই কাজ নজরুলের। জীবনে এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি ‘মেকি’র বিরুদ্ধে। তাঁর নিজের লেখার ভেতরবাড়ির স্বরূপ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার লেখায় ফুটে উঠেছে সত্য, তেজ আর প্রাণ।’ নিজেকে তিনি মনে করতেন ‘সত্য প্রকাশের যন্ত্র’। ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’ই নজরুল-নন্দনতত্ত্বের অন্যতম নিয়ামক। এ ছাড়া ‘যে ভাষা-শৃঙ্খলে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তাতেই আছে অসংখ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো—জ্ঞানের, শৃঙ্খলার, সংযমের, সভ্যতার। এগুলোই আমাদের সংকোচে বিহ্বল করে রাখে। আমরা এগুলোকেই নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ করতে থাকি, কদাচ ভেঙে তৈরি করি নতুন কাঠামো।
জন্মসূত্রে, শিক্ষাসূত্রে, জীবনযাপনসূত্রে, আর মনের বিশিষ্ট গড়নের কারণে নজরুল নিয়ন্ত্রক-কাঠামোগুলোর বাইরে থেকেছেন।’ (মোহম্মদ আজম, সাহিত্য পত্রিকা, বাংলা বিভাগ, ঢা.বি, বর্ষ-৫০, সংখ্যা-২-৩) উপর্যুক্ত জীবনচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, বেড়ে ওঠা, ঘোষণা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলা কবিতায় আর কেউ আবির্ভূত হননি। এসব কারণে নজরুলের নন্দনতত্ত্বের মধ্যে বহু মানুষের সমাগম এবং তাদের কল্যাণের মতো মাপকাঠি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিগত ভোগ-উপভোগের যে সাহিত্যতত্ত্ব, তার বদলে নজরুলে প্রযুক্ত হয়েছে সম্মিলিত ভোগ-উপভোগ এবং জাগরণের তত্ত্ব। ভাবে-ভাষায়-প্রকাশে এই নন্দনতত্ত্ব অকৃত্রিমতার পক্ষপাতী। বুর্জোয়া-জীবনের মতো সাহিত্যে ‘বুর্জোয়া ফিটফাট’ তাঁর নন্দনতত্ত্বের আওতায় সম্পূর্ণভাবে আঁটে না। এ কারণেই নজরুলের কাব্যপ্রবাহ তৈরি করেছে উপনিবেশবিরোধী এক নতুন নন্দনতত্ত্ব। নন্দনতত্ত্বের এই ভিন্নতা লক্ষ করে আল মাহমুদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘র্যাঁবো যেমন গল জাতির কাব্যবিচার ও সৌন্দর্যতত্ত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি নজরুলও বাংলা ভাষাভাষী দ্রাবিড় ভেড্ডিড রক্তমিশ্রিত একটি বিরাট মানবগোষ্ঠীর প্রচলিত উপমা পদ্ধতির শৃঙ্খলাকে তোলপাড় করে দিয়েছিলেন।’ আল মাহমুদ কথিত ‘প্রচলিত উপমা পদ্ধতি’-ই হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে আসা ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্ব। নজরুল এই ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের বাইরে গিয়ে ‘দ্রাবিড় ভেড্ডিড রক্তমিশ্রিত একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর’ জন্য তার নিজস্ব একটি নন্দনতত্ত্ব হাজির করেছেন, যার নামকরণ করা যায় বাঙালিয়ানা নন্দনতত্ত্ব।

চির উন্নত শির তুর্কি দৃষ্টান্ত by শান্তনু কায়সার

নজরুলকে যদি একক কোনো অভিধায় চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁকে বলতে হবে ‘উন্নত, চির উন্নত শির’। ‘বিদ্রোহী’র শুরুতেই কবি বলছেন: ‘বল বীর—/বল উন্নত মম শির!’ নতজানু না হওয়ার অনমনীয় দৃঢ়তার নামই কাজী নজরুল ইসলাম। ঔপনিবেশিক ভারত ও বাংলায় যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে যাঁর আবির্ভাব ও বিকাশ, তিনি সেই বাস্তবতাকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন যে তা তাঁকে একই সঙ্গে স্বদেশের মৃত্তিকায় গভীরভাবে প্রোথিত ও আন্তর্জাতিক চেতনায় ঋদ্ধ করেছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক, তার প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর এবং কামাল পাশা—এই ত্রয়ী উপাদান কবির কাব্য ও সাহিত্যরচনা, তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা এবং উপলব্ধিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি যেমন ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার’-এর মতো কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ‘কামাল’-এর মতো প্রবন্ধ। লিখেছেন ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা।’পৌরুষ ও দার্ঢ্যের যোগফল কামাল পাশাকে কবির কাছে মনে হয়েছে ‘একটা ছেলের মতো বেটাছেলে।’ কাপুরুষতা ও ভিরুতা দিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শৃঙ্খলমুক্ত করা যে সম্ভব নয়, সেটা কবি ভালোভাবেই জানতেন। বিশ্বের যেদিকেই তাকান ‘মাদিই দেখি’ বাস্তবতায় ‘মদ্দা পুরুষ’ কামাল যখন তাঁর ‘বিশ্বত্রাস মহা তরবারি’ নিয়ে সামাল সামাল করে ‘রোজ কেয়ামতের ঝঙ্কার, রুদ্রের মহারোষের মত’ এসে হাজির হন, নজরুলের তখন তাঁকে স্বাগত না জানিয়ে উপায় থাকে না।
বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শুরুতে নজরুল যেমন ‘বিদ্রোহী’ লিখে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা করেন, তেমনি কামাল পাশাও তুরস্কে তাঁর ঝড়ের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে নিজের দেশের বাস্তব ও মনোজাগতিক পরিবর্তনে এক প্রবল অভিঘাতের সৃষ্টি করেন। নজরুলের মনে হয়, এ হচ্ছে বাপের সেই সুপুত্তুর ছেলে, ইংরেজের অধীনে নির্যাতিত ভারতবর্ষের জন্য যে খুবই প্রাসঙ্গিক: ‘ইচ্ছে করছে খুশির চোটে তার পায়ের কাছে বসে পড়ে নিজের বুকে নিজেই খঞ্জর বসিয়ে দিই।’ ‘আল্লার আরশ কাঁপাতে হলে হাইদরি হাঁক চাই, মারের চোটে স্রষ্টারও পিলে চমকিয়ে দেওয়া চাই,’—‘ইসলামের বিশেষত্ব তলোয়ার।’ কবির মনে হয়, স্কন্ধে হল নিয়ে বলরাম বেরিয়ে পড়েছেন। কামাল যেন ‘বিদ্রোহী’তে উল্লিখিত সেই ভৃগু—যে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতেও দ্বিধা করে না। ফলে তুরস্কে কামালের আবির্ভাব ভারতবর্ষকেও আন্দোলিত করে, যার প্রধান নকিব অথবা তূর্যবাদক হয়ে ওঠেন নজরুল। সে কারণে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণায় ‘বিদ্রোহী’র সঙ্গে ‘কামাল পাশা’ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবিতা হয়ে ওঠে। ‘কামাল পাশা’য় কবি বলেন: ‘সাব্বাস ভাই! সাব্বাস দিই, সাব্বাস তোর সমসেরে।/পাঠিয়ে দিলে দুশমন সব যম-ঘর একদম সে রে।/বল দেখি ভাই, বল হ্যাঁরে/দুনিয়ায় কে ডর করে না তুর্কির তেজ তলোয়ারে!’ কিন্তু এর অধিকতর তাৎপর্য অন্যত্র, যেখানে ঔপনিবেশিক স্বদেশে তার বিরুদ্ধে লড়ার অন্যতম প্রধান প্রেরণা তুর্কি পরিবর্তন ও তার নেতা। কবিতার দুটি অংশে তা খুবই সোচ্চার ও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক: ‘পরের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত তারা ডাকাত।/তাদের তরে বরাদ্দ ভাই, আঘাত শুধু আঘাত।/আজাদ মুলুক বন্দী করে, অধীন করে স্বাধীন দেশ,/কুল মুলুকের কুষ্টি করে জোর দেখালে কদিন বেশ/মোদের হাতে তুর্কি নাচন নাচলে তাধিন তাধিন শেষ!’ 
সত্যবাণী’ প্রবন্ধে তিনি যেমন ‘নব্য তুর্কি তরুণদের দেখে’ তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার কথা বলেছেন, বলেছেন ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’-এর দীক্ষা নিতে, সেই প্রেরণাই যেন তাঁর কবিতায় ভাষা পেয়েছে, ‘থাকলে স্বাধীন সবাই আছি, নেই তো নাই, নেই তো নাই।/এই তো চাই!!’ তাই তিনি এ প্রবন্ধে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘যদিও তুমি সর্বস্বহারা হও, কোথাও তোমার মাথা গুঁজিবার ঠাঁই না থাকে, কুছ পরোয়া নেই, তোমার মাথা নত করিও না।’ দেশ যখন স্বাধীন নয়, অত্যাচারীর হাতে বন্দী; তখন ‘ধূমকেতু’তে কবি যেমন বলেছেন, নরককে ফুঁ দিয়ে নেভাতে ও মৃত্যুর মুখে থুতু দিতে হবে—তেমনি বিধি ও বিধানে লাথি মেরে বিধাতার বুকে হাতুড়ি চালাতেও বাধা নেই। পরাধীনতার জ্বালায় সত্য কবির পক্ষেই তাই বলা সম্ভব: ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু—ওই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’ তুর্কি বিপ্লব ও কামালের মধ্যে নজরুল সেই উদাহরণ খুঁজে পেয়েছিলেন। সে কারণে ‘ভাববার কথা’য় তিনি মায়ের ‘ভুবনেশ্বরী মূর্তি’ নয়, তার ‘মৃত্যুরূপা কালী’ রূপ দর্শন করেছেন। এ জন্য ‘ধূমকেতুর আদি-উদয় স্মৃতি’তে তিনি এর অকল্যাণকেই প্রধান করে তুলেছেন, “ধূমকেতু” তাহাদের বাণী লইয়া আসিয়াছিল—যাহাদের গৃহী আশ্রয় দিতে ভয় পায়, গ্রহণ বলে ব্যাঘ্র যাহাদের পথ দেখায়, ফণি তাহার মণি জ্বালাইয়া যাহাদের পথের দিশারী হয়, পিতামাতার স্নেহ যাহাদের দেখিয়া ভয়ে তুহিন-শীতল হইয়া যায়।’ স্বাধীন হওয়ার জন্য কঠিনের এই সাধনা ছাড়া কোনো পথ নেই। আর যিনি নিজে স্বাধীন নন, তার পক্ষে অন্যকে কিংবা জাতিকে স্বাধীন করা সম্ভব নয়। ঔপনিবেশিক দেশে তো নয়ই, ‘স্বাধীন’ দেশেও নয়, যেখানে উপনিবেশের নানা শৃঙ্খল অথবা লক্ষণ সক্রিয় অথবা প্রচ্ছন্ন রয়েছে।
২. কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুর পর ১৩৪৫-এর ৬ অগ্রহায়ণ আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর চরিত্রবৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ওই নামাঙ্কিত প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তাতে কামালের ভূমিকার অন্য অনন্যবৈশিষ্ট্যটি বোঝা যায়: ‘তুর্কিকে তিনি যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেইটেই সবচেয়ে বড় কথা নয়, তিনি তুর্কিকে তার অন্তর্নিহিত বিপন্নতা থেকে মুক্ত করেছেন। মুসলমান ধর্মের প্রচণ্ড আবেগের আবর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে ধর্মের অন্ধতাকে প্রবলভাবে তিনি অস্বীকার করেছেন। যে অন্ধতা ধর্মেরই সবচেয়ে বড় শত্রু, তাকে পরাভূত করে তিনি কী করে অক্ষত ছিলেন, আমরা আশ্চর্য হয়ে তাই ভাবি। তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, সে বীরত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্লভ। বুদ্ধির গৌরবে অন্ধতাকে দমন করা তাঁর সবচাইতে বড় মহত্ত্ব, বড় দৃষ্টান্ত।’ তিনি কখনো তাঁর ‘সংকল্পকে বিচলিত হতে দেন না।’ আমাদের ক্ষেত্রে তাঁর প্রাসঙ্গিকতাকে উল্লেখ করে কবি লিখেছেন, ‘তিনি যে কেবল তুর্কিকে শক্তি দিয়েছেন তা তো নয়, সেই শক্তিরথের চক্রঘর্ঘর ভারতবর্ষের ভূমিকেও কাঁপিয়ে তুলছেন।’ নজরুল যে বলেছেন ‘কামাল! তুনে কামাল কিয়া ভাই’ তা তিনি শুধু বাস্তবেই করেননি, বৌদ্ধিক ও মনোজগতেও কামাল করে দেখিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। তুরস্কে একবার একটি ভজনালয় নিয়ে সেটি গির্জা না মসজিদ, সে বিতর্ক দেখা দিলে কামাল আতাতুর্ক তাকে জাদুঘরে পরিণত করেন। রামমন্দির-বাবরি মসজিদকে রাজনৈতিক বা অন্যভাবে ব্যবহারের ভুল দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, কামাল পাশা কতটা বাস্তবতাবোধসম্পন্ন পরিচ্ছন্ন দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন।  এর মর্ম অনুসরণে নজরুল ‘উমর ফারুক’ কবিতায় যা লেখেন, তা থেকে বোঝা যায়, সামন্ত মানসিকতার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে কবি এ ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন: ‘সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি শত্রু-গির্জা ঘরে/বলিলে, “বাহিরে যাইতে হইবে, এবার নামাজ তরে।”/কহে পুরোহিত, “আমাদের এই আঙিনায় গির্জায়/পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায়?”/ হাসিয়া বলিলে, “তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ/নামাজ আদায় করি তবে কাল অন্ধ লোক-সমাজ/ ভাবিবে,—খলিফা করেছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি/আজ হতে যেন এই গির্জারে মোরা মসজিদ করি। ইসলামের এ নহেক ধর্ম, নহে খোদার বিধান/কারু মন্দির-গির্জারে করে মজিদ মুসলমান।”’
৩. রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে আরও বলেছিলেন, ‘এশিয়ার পাশ্চাত্যতম ভূখণ্ডে দেখলুম তুর্কি—যাকে য়ূরোপে Sick-man of Europe বলে অবজ্ঞা করত, সে কীরকম প্রবল শক্তিতে অসম্মানের বাঁধন ছিন্ন করে ফেলল।’ কিন্তু এ তো সহজে হওয়ার কথা নয়। ক্রুসেডের তিক্ত স্মৃতি ইউরোপ অথবা খ্রিষ্টান জগৎ খুব সহজে মেনে নেয়নি অথবা ভুলতে পারেনি। সে কারণে শেকসিপয়ার কিংবা আমাদের শওকত আলীর নাট্য অথবা উপন্যাসে এর স্বাক্ষর রয়েছে। শেকসিপয়ার ও শওকত আলী উভয়ই নেতিবাচক দিক থেকে নয়, বাস্তবতা হিসেবেই বিষয়টির উল্লেখ ও তার ব্যবহার করেছেন। তবু সত্য, পাশ্চাত্য দৃষ্টি ও তার উপনিবেশ। শেকসিপয়ারের ওথেলোয় ইয়াগো যে বলে—‘বিলিভ ইট, অর এলস আই অ্যাম এ টার্ক’ অথবা হ্যামলেট যে বলে—‘ইফ মাই ফরচুনস টার্ন টার্ক’—এই দুই দৃষ্টান্ত এবং শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর চরিত্র যে বলে—‘এরা হচ্ছে তুর্ক, কখন যে তোমার বউটিকে তুলে নিয়ে যাবে, টেরও পাবে না’—তা থেকে ওই দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর নজরুল-বিদ্বেষ তাঁর গুরু মোহিতলাল মজুমদারের সূত্রে ছিল যথেষ্ট দৃঢ়। কিন্তু তিনি যখন তাঁর বই দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক! ইন্ডিয়া ১৯২১-১৯৫২-এর বর্ণনানুসারে কলকাতায় তাঁর ৪৯ নম্বর মির্জাপুর স্ট্রিটের বাসায় বসে কিছু লোকের কণ্ঠে ‘কামাল পাশা’ শুনে বিরক্ত বোধ করেন, তখন সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর দাস্য মনোভাবের সঙ্গে উপনিবেশের মোহ ও তার প্রতি তাঁর অতিভক্তিও টের পাওয়া যায়। এই মনোভাব তাঁকে যেমন ১৯৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের তোষামোদ করতে প্ররোচিত করেছে, তেমনি বিপরীতভাবে নিজে মূক হলেও নজরুলের রচনা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমাদের ন্যায়ের যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মূঢ়তা থেকে মুক্তির মন্ত্রে যে কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুতে ছিল সমগ্র এশিয়ার শোক, বাংলাদেশের জন্মের চার দশক এবং নজরুলের মৃত্যুর তিন দশকের পর বেশ সময় পেরিয়ে আমরা কোথায় এসে পৌঁছেছি? এই জিজ্ঞাসার সৎ ও সঠিক জবাব দিতে না পারলে কোনো কবিই কি আমাদের ক্ষমা করবেন?

Thursday, August 29, 2013

ফ্রেশ গার্ল প্রিয়াঙ্কা চোপড়া

এক মাস মার্কিন মুল্লুকে থেকে মাত্রই মুম্বাই ফিরলেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউ দিল্লি হয়ে মুম্বাইয়ের মাটিতে নেমেছেন ১৯ আগস্ট ভোররাতে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল থেকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কয়েকটি প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে।

লম্বা সময় বিমান ভ্রমণ করলে, বিশেষ করে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করলে এমনিতেই জেট ল্যাগের কবলে পড়তে হয়। কিন্তু প্রায় এক দিন টানা ভ্রমণের পরও প্রিয়াঙ্কা ছিলেন একেবারে ফ্রেশ। এ বিষয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে পিসি বলেন, 'এখন আর জেট ল্যাগ হয় না। আসলে জেট ল্যাগের মতো সময় আমার নেইও। সকাল থেকে এটা আমার তৃতীয় অনুষ্ঠান। জেট ল্যাগ নিয়ে ভাবার মতো সময় নেই।' উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে নিজের নতুন গান 'এক্সোটিক' নিয়ে প্রচারণায় অংশ নেন তিনি। এ ছাড়া ডিজনির নতুন অ্যানিমেশন 'প্লেনস'-এ ইশানি চরিত্রেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিরতায় শিক্ষক রাজনীতি by একেএম শাহনাওয়াজ

জাতি হিসেবে বড় দুর্ভাগ্য বহন করছি আমরা। যখন একান্তে ভাবি কী হতে পারত এ দেশটি আর কী হচ্ছে, তখন বিমর্ষ হয়ে যাই। এগিয়ে চলার সূচক হতে পারত ঊর্ধ্বমুখী, অথচ তা ঘুরে এখন নিুগামী। অপার সম্ভাবনার দেশ আমাদের। প্রজন্মকে প্রণোদনা দেয়ার জন্য যখন ঐতিহ্যের সৌন্দর্য ও শক্তিকে সামনে আনা জরুরি তখন ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রাণান্ত প্রয়াস দায়িত্বশীলদের। শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রে যেখানে উজ্জ্বল ঐতিহ্যের ঠাস বুনন রয়েছে- এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়- সেখানে প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেয়ার কাজটুকু কি আমরা করতে পারছি? এক্ষেত্রে বড় দাগে দায়িত্ব নেয়ার কথা রাজনীতিক ও সমাজবিদদের। কিন্তু এসব কাঠামোতে কঠিন দলতান্ত্রিক ও স্বার্থবাদী রাজনীতি আসুরিক শক্তি নিয়ে সব সম্ভাবনাকে দলিত-মথিত করে দিচ্ছে। এমন সংকটে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটি বড় ভূমিকা থাকে। ইউরোপে রেনেসাঁস সৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত বিবেক একটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। আমাদের দেশে একসময় সমাজ ও রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আইয়ুব আমলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে উত্তাল আন্দোলনের নেতৃত্ব এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। এ পর্বগুলোতে অধিকাংশ শিক্ষক একটি মহৎ আদর্শ ধারণ করে শিক্ষকতায় আসতেন। জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃজনে ছিলেন নিবেদিত। ছাত্রছাত্রীর আদর্শ ছিলেন তারা। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় রাজনীতির দুষ্কৃতি অনুপ্রবেশ করতে থাকে। ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের অপব্যাখ্যা বা অপব্যবহার হতে থাকে। স্বায়ত্তশাসনের অধিকার অনেক সময় স্বেচ্ছাচারে পরিণত হয়। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হবেন সব ঘরানার মানুষের গাইড ও ফিলোসফার, সেখানে নষ্ট রাজনীতির অক্টোপাস আটকে ধরে তাদের। জাতীয় রাজনীতির অনুসারী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বহুধাবিভক্ত হতে থাকেন। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের গাইড হওয়ার বদলে আজ্ঞাবহ লেজুড়ে পরিণত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিকরণ এতটা স্থূলভাবে হতে থাকে যে, সেখানে জ্ঞানচর্চার বদলে পদ-পদবি এবং দল ভারি করার লোভটাই বড় হতে থাকে।
১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ গণতন্ত্র যেমন দিয়েছে, তেমনি শিক্ষকদের ফেরেশতাতুল্য মনে করার যথেষ্ট স্বাধীনতাও দিয়েছে। এ স্বাধীনতার অপব্যবহারে আমাদের রাজনীতির শিক্ষকরা সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় বেতন-ভাতা নিয়ে যৌক্তিক ও অযৌক্তিক কারণেও কর্তব্যভ্রস্ট হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাগাড়ে পরিণত করছেন। অনেক সময় তারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থসিদ্ধির জন্য আইন-কানুন, মানবিকতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ- কোনো কিছুকে আমলে না নিয়ে দানবীয় আচরণ করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ের সঙ্গে তেমন মেলানো যায় না। শিক্ষকতা পেশার ভেতর এমন স্থূলতা অনেক আগে থেকেই অনুপ্রবেশ করেছে। এখন এর বাড়বাড়ন্ত দশা। এই অসুস্থতার প্রধান কারণ শিক্ষক রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির বৃত্তে বন্দি হয়ে যাওয়া। একজন শিক্ষকের কাছে প্রত্যাশিত বিবেক সেখানে আর কাজ করে না। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বা আশপাশে ঘুরঘুরে স্বভাব যাদের, তাদের মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। আবার কোনো কোনো রাজনীতির ঘরানা আছে, যেখানকার শিক্ষকরা একটি আদর্শিক জায়গা থেকে নিজেদের সংগঠিত রাখেন। ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে দূরে থাকেন বলে সুবিধাবাদী অনাচারে তারা তেমন যুক্ত থাকেন না। যদি অনাচার সৃষ্টিকারী দলগুলোর ‘আন্দোলনে’র মাঠ দাবড়ে বেড়ানো শিক্ষকদের একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক বৃত্তান্তের ওপর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তবে অনেক প্রশ্নের হয়তো উত্তর পাওয়া যাবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ভিসিবিরোধী দুটি শিক্ষক গ্র“পের আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে অনেক শিক্ষক এ আন্দোলন নিয়ে জাতীয় দৈনিকে লেখালেখি করেছেন। এছাড়াও অনেক কলামিস্ট কলাম লিখেছেন। সম্পাদকীয়ও প্রকাশিত হয়েছে অনেক কাগজে। এসবের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে যে মেসেজটি পৌঁছে গেছে তা হচ্ছে- কিছুসংখ্যক শিক্ষক পরিচয়ের ঈর্ষাকাতর মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে একটি অস্থিতিশীলতা চাপিয়ে দিয়েছেন। যে কারণে আন্দোলনকারী দুই গ্র“পের শিক্ষকদের কিছু অংশ ছাড়া অন্যসব দলীয় ও নির্দলীয় শিক্ষকের এতে কোনো সমর্থন নেই। অন্তত তিনটি শিক্ষক গ্র“পের শিক্ষক নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। এর বাইরে শিক্ষার্থীদের কোনো খণ্ডিত অংশেরও সমর্থন-সহানুভূতি পাননি আন্দোলনকারী শিক্ষকরা। বরঞ্চ শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার জন্য শিক্ষার্থীরা মিছিল পর্যন্ত করেছে।
এমন দুর্বল অবস্থানে থেকে অত্যন্ত বিতর্কিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে খেলো কয়েকটি দাবি নিয়ে একজন নির্বাচিত ভিসিকে উৎখাতের আন্দোলন কখনও সাফল্য বয়ে আনতে পারে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আন্দোলনে এখনও যেহেতু দুই ভিন্নমতের পক্ষের মধ্যে মারামারি-হাতাহাতির সংস্কৃতি চালু হয়নি, তাই সংখ্যায় যতজনই হোন, মাঠ প্রতিরোধহীন থাকায় দাপট দেখাতেই পারেন। এ কারণে একজন নির্বাচিত ভিসি, পাশাপাশি একজন শিক্ষক ও আন্দোলনকারীদের সহকর্মী ড. আনোয়ার হোসেনকে বিনা নোটিশে অশিক্ষকসুলভ আচরণে ৮৪ ঘণ্টা বন্দি করে রাখতে পারেন তার অফিস কক্ষে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র এখন কাবুলে জাতিসংঘের অফিস কর্মকর্তা। আমাকে টেলিফোনে দুঃখ করে বললেন, চমৎকার একটি ইমেজ তৈরি করেছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, তোমাদের এই শিক্ষক আন্দোলন সবই বিসর্জন দিল। এখন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে হয়। ঠিক একইভাবে সেদিন একজন প্রবীণ অধ্যাপিকা বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস মিস করলে মাঝে মাঝে বাইরের পরিবহনে ঢাকা থেকে আসি। এখন বাসযাত্রী কারও কারও মন্তব্যে কান রাখা যায় না।
২৭ আগস্ট বাংলা একাডেমি গিয়েছিলাম। আমার ছাত্র উপপরিচালক ড. মিজানের চেম্বারে বসেছিলাম। আরেক সহপরিচালক সায়রাও এলো। জাহাঙ্গীরনগরের এই দুই সাবেক শিক্ষার্থী একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করছিল। এরই মধ্যে এলেন একজন গুণী মানুষ। লে. কর্নেল (অব.) সাজ্জাদ আলী। এই মুক্তিযোদ্ধা গবেষণা করেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর। ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর শনাক্ত করার কৃতিত্ব রয়েছে তার। এখন বাংলা একাডেমি তার লেখা বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী সিরিজ প্রকাশ করছে। সাজ্জাদ আলী সাহেব একজন বড় ব্যবসায়ী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলনে তিনি মহাবিরক্ত। ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, ২০-২২ লাখ টাকা প্রতিবছর ট্যাক্স দেন। আর সেই টাকার বেতন-ভাতা নিয়ে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্ছন্নে দিচ্ছেন! বললেন, এখন তো দু’মাস পরপর ভিসি তাড়ানো আপনাদের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। তার ক্ষুব্ধ প্রস্তাব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে সেখানে একটি আনসার একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হোক। তাতে জাতি কিছুটা উপকার পাবে। জাহাঙ্গীরনগর-সংশ্লিষ্ট আমাদের অবশ্য এমন প্রতিক্রিয়া শুনতে ভালো লাগছিল না। কিন্তু জনপ্রতিক্রিয়া ঠেকাব কিভাবে!
আন্দোলনের জটিলতা থেকে আপাতত বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হল শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বানে। গত ২৪ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী বৈঠক করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সঙ্গে। এর আগের রাতে আমি টকশোতে অংশ নেয়ার জন্য একটি টিভি চ্যানেলে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার সহ-আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সময়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক নেতা এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি আমার কাছে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলেন। আমি জানালাম, আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সঙ্গে আগামীকাল শিক্ষামন্ত্রী বৈঠক করবেন। শুনে আমার সহকর্মী তার রাজনৈতিক মেধা থেকে বললেন, আন্দোলনকারীরা নিশ্চয় বেরিয়ে আসার সম্মানজনক পথ খুঁজছেন। কারণ তাদের ভিসি বিতাড়নের এক দফা আদায়ে শিক্ষামন্ত্রী কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। অটল থাকলে আন্দোলনকারীদের উচিত ছিল চ্যান্সেলর বা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করা। আগামীকালের আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি ফর্মুলা বের করে আন্দোলন স্থগিত করে দেয়া হবে।
শেষ পর্যন্ত তাই হল। ১৫ দিনের জন্য স্থগিত হল আন্দোলন। এখন পুরো বিষয় তদন্ত করে দেখা হবে। উল্লেখ্য, এতদিন এ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন ভিসি মহোদয়। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, তদন্তের ফলাফল তিনি মেনে নেবেন। আন্দোলনকারীরা তদন্তের রায় তাদের বিরুদ্ধে গেলে তা মানবেন কি-না তা এখনও জানাননি। এতসব কিছুর পরও ক্যাম্পাসবাসী মনে করছে না অস্থিরতা কেটেছে। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার পর এখন ক্যাম্পাসে সবকিছু স্বাভাবিক চলার কথা। কিন্তু পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বন্ধ হয়নি। এ মুহূর্তে জরুরি কাজ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া। শোনা গেল, ২৬ আগস্ট ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিসভা আহ্বান করেও আন্দোলনকারী শিক্ষকদের অসহযোগিতার কারণে সভা স্থগিত করতে হয়েছে।
ঘটনা সত্য হলে একে আমরা আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতাদের অবিবেচনাপ্রসূত হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করব। সাধারণ শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করার এখতিয়ার কারও নেই। আমরা মনে করি, এ ধরনের শক্তি প্রদর্শনকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবারই এগিয়ে আসা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশের ক্ষতিসাধন এবং প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি নষ্ট হোক তা কেউ চাইবে না। যেহেতু শিক্ষক দলগুলো রাজনীতি আশ্রিত, তাই যে কোনো পক্ষের বিভ্রান্ত আচরণের দায় সংশ্লিষ্ট দলগুলোকেও বহন করতে হবে। আন্দোলনে যুক্ত আছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শধারী বলে প্রচারিত একটি দল আর তাদের সহযোগী জাতীয়তাবাদী আদর্শধারী বিএনপি গ্র“প। এখন নিজেদের কাদামুক্ত রাখতে উভয় দলের নেতাদের উচিত তাদের অনুসারী শিক্ষকদের সংযত করা। মনে রাখতে হবে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সভ্যতার আলোবঞ্চিত ৭২০ একরের বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ নয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক রয়েছে সমগ্র দেশবাসীর। সুতরাং সব অনাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যখন প্রশ্ন উত্থাপন করবে, তখন কিন্তু এর দায় রাজনৈতিক দলগুলো এড়াতে পারবে না।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকদের জন্য প্রতিশ্র“তির মুলা আর কতদিন? by মোঃ সিদ্দিকুর রহমান

স্বাধীনতার আগে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ননম্যাট্রিক, ম্যাট্রিক পাস শিক্ষকদের দিয়ে পূর্ণ ছিল, আজ সেখানে স্থান করে নিয়েছে টগবগে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা। কিন্তু শিক্ষক সমাজ আজ হতাশ। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে বারবার প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করা হচ্ছে। নানা অজুহাতের মাধ্যমে অহেতুক সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। ৩০ বছর আগে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা উন্নীত হবে। পাশাপাশি অন্য পেশার মতো বেতন-ভাতা দেয়া হবে। অথচ আমরা আজ হতাশ। নার্স, কৃষি সহকারী, সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক, মেডিকেল সহকারী, পুলিশ সদস্যদের মর্যাদা ও বেতনস্কেল আপগ্রেড করা হয়েছে, অথচ প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে শুধুই সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালের ১৬ জুলাই সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তার মধ্যে ছিল- ১. সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদটিকে প্রথম শ্রেণীর পদে উন্নীতকরণের জন্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ২. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষকের পদটি দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীতকরণের বিষয়ে সভা নীতিগতভাবে ঐকমত্য পোষণ করে এবং প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীতকরণের জন্য সর্বসম্মত সুপারিশ প্রদান করে। তবে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণের আগে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব বিধিমালা ও আর্থিক সংশ্লেষ বিষয়ে একটি রিপোর্ট কমিটি সভায় পেশ করবে। ৩. সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ২০ ভাগ কোটার স্থলে ৩০ ভাগ কোটা নির্ধারণের জন্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে ইত্যাদি।
বর্তমান সরকার আসার পর বিগত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতাকে আমলে নেয়নি। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির দাবি সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদায় উন্নীতকরণসহ শিক্ষকদের বেতন স্কেল আপগ্রেড করেনি। দীর্ঘ ৪ বছর ৮ মাস আশ্বাসের মুলা ঝুলিয়ে সময়ক্ষেপণ করেছে। গত ২৪ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নিুরূপ-
১. প্রস্তাবিত পদসমূহের পদমর্যাদা ও বেতনস্কেল উন্নীতকরণের বিষয়ে জানানো হয়, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পঞ্চম থেকে বৃদ্ধি করে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত সম্প্রসারণ হবে। ২০১৩ সালে সারাদেশের প্রত্যেক উপজেলা/থানায় ১টি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণী খোলা হয়েছে। ৬ষ্ঠ শ্রেণী চালুকৃত প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে ২ জন করে স্নাতক/স্নাতকোত্তরসহ বি-এড/ডিপ.ইন.এড পাস শিক্ষক সংযুক্তি/বদলির কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে চলছে। যেহেতু সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, সেহেতু নিুমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রচলিত গ্রেডের মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল হওয়া প্রয়োজন।
২. শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালার কতিপয় বিধান সংশোধনের প্রয়োজন অনুভূত হওয়ায় বর্তমানে প্রস্তাবিত নিয়োগবিধি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের সুপারিশ, প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশ সাপেক্ষে চূড়ান্তকরণের উদ্দেশ্যে পিএসসির মতামত গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে মর্মে জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের যোগ্যতা হল পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণী সমমানের জিপিএসহ স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি এবং মহিলা প্রার্থীদের ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ/সমমানের জিপিএসহ উত্তীর্ণ অথবা স্নাতক বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এছাড়া প্রধান শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণী/সমমানের জিপিএসহ স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকার শর্ত প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩. বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৭,৬৭২। কর্মরত প্রধান শিক্ষক সংখ্যা ৩৭,৬৭২। তাদের বেতনস্কেল ১৩তম থেকে ১০ম ও ১৪তম থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করা হলে ভাতাদিসহ ১১৯ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। সহকারী শিক্ষক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বর্তমানে কর্মরত ১,৬৭,৬৭২ জন এবং প্রশিক্ষণবিহীন ২০,০০০ জন। বেতনস্কেল উন্নীত করা হলে ভাতাদিসহ ১৯৭ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। সর্বমোট আর্থিক সংশ্লেষ (১১৯+১৯৭) = ৩১৬ কোটি টাকা মর্মে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি দেশের সব বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২৬,০০০ জাতীয়করণের পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এবং বিদ্যালয়হীন গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ১৫০০ প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে সর্বমোট আর্থিক সংশ্লেষ প্রতিবছর কী হতে পারে, তা প্রস্তাবে উল্লেখ নেই।
৪. প্রস্তাব অনুযায়ী বেতনস্কেল উন্নীত করা হলে পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও উন্নত বেতনস্কেল অনুযায়ী হবে। সেক্ষেত্রে প্রকৃত আর্থিক সংশ্লেষ অনেক বাড়বে। অর্থবিভাগের প্রতিনিধি জানান, যেহেতু এক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে, সেহেতু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অর্থ বিভাগের মতামত নেয়া প্রয়োজন।
৫. প্রস্তাবে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই ধরনের প্রধান শিক্ষক পদ রয়েছে। একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, যাদের বেতনস্কেল ১৩ নম্বর গ্রেড থেকে ১০ নম্বর গ্রেডে উন্নীতকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অপরটি প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষক, যাদের বেতনস্কেল ১৪ নম্বর থেকে ১১ নম্বর গ্রেডে উন্নীতকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই পদবির ২টি ভিন্ন স্কেলের পদকে ২য় শ্রেণীর পদে উন্নীতকরণের প্রস্তাবটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৬. প্রধান শিক্ষকদের পদ ২য় শ্রেণীতে উন্নীত করা হলে ওই পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক ২য় শ্রেণী হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে যারা এসএসসি পাসসহ প্রধান শিক্ষক রয়েছেন এবং যাদের স্নাতক ডিগ্রি নেই তাদের কীভাবে ২য় শ্রেণীর পদে পদায়ন করা হবে? বিষয়টি সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের মতামতও প্রয়োজন।
৭. বর্তমানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বেশ কয়েকটি বিভাগে ১৩-১৬ নম্বর গ্রেডের কর্মচারীরা কর্মরত রয়েছেন, যাদের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকদের বেতনস্কেল আপগ্রেড করা হলে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য বিভাগের কর্মচারীদের কাছ থেকেও বেতনস্কেল উন্নীতকরণের দাবি আসবে। সুতরাং শিক্ষকদের বেতনস্কেল উন্নীতকরণের আগে এ বিষয়টিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
৮. বর্তমানে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের (এটিও) বেতনস্কেল ৮০০০-১৬৫৪০ টাকা। তারা বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্য সহকারী শিক্ষকদের কার্যক্রম মনিটর করে থাকেন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করেন। প্রধান শিক্ষকদের বেতনস্কেল ৮০০০-১৬৫৪০ টাকায় উন্নীত করা হলে তাদের বেতনস্কেল সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের সমান হবে। সেক্ষেত্রে মনিটরিং কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের কাছ থেকে বেতনস্কেল উন্নীতকরণের দাবি আসতে পারে। ফলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও তদূর্ধ্ব পদোন্নতির পদগুলোর বেতনস্কেল পর্যায়ক্রমে উন্নীতকরণের দাবিও আসতে পারে, যা পর্যালোচনাযোগ্য।
৯. বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৭,৬৭২। সম্প্রতি প্রায় ২৬,০০০ বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং বিদ্যালয়হীন গ্রামে আরও ১৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে উপরোক্ত সরকারি প্রাথমিক স্কুলের জন্য বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন হবে। এসব পদকে ২য় শ্রেণীর পদমর্যাদায় উন্নীত করা হলে পদসমূহের নিয়োগ, পদোন্নতি, শৃংখলাজনিত কাজ বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের আওতাভুক্ত হবে। ফলে কর্মকমিশনের কাজের ব্যাপকতা বাড়বে। সুতরাং প্রস্তাবটি বিবেচনার আগে এ বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্ণিত ৬ নম্বর ক্রমিকে এসএসসি পাস প্রধান শিক্ষকদের কথা বলা হলেও বাস্তবে ৩০ বছর ধরে কোনো এসএসসি পাস প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি।
শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে অর্থ সংকটের চিরাচরিত দোহাই দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতনস্কেল বিবেচনা করার আগে সর্বাগ্রে তাদের কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করা উচিত। প্রাথমিক শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর। শিক্ষকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা চাইলে শুরু হয় সরকারের আর্থিক টানাপোড়ন। অথচ রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি অনেকের কাছে সামান্য বলে মনে হয়! মনে রাখতে হবে, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় অপচয় নয় বরং তা দেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ। শিক্ষকদের মর্যাদা ও আপগ্রেড বেতনস্কেল শিগগির বাস্তবায়ন হবে- এ প্রত্যাশাই করছি।
মোঃ সিদ্দিকুর রহমান : প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক গবেষক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি

মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বচন সমাচার by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

কতিপয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশের মন্ত্রী মহোদয়রা কোনো সরকারের আমলেই তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে সুরুচি, শালীনতা, যৌক্তিকতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় রাখতে পারেননি। সাবেক বিএনপি শাসনামলে জামায়াতের একজন মন্ত্রী জঙ্গিনেতা সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইকে ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’ বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। ওই সময় বিএনপির আরও অনেক মন্ত্রী এ ব্যাপারে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন। বিশেষ করে চারদলীয় জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এবং তার ইংরেজি ব্যবহার প্রায়শই নাগরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি করত। একবার তার ব্যবহৃত একটি বাক্য ‘উই আর লুকিং ফর শত্র“জ’ মন্ত্রীদের বেফাঁস কথাবার্তার আলোচনায় প্রসিদ্ধি পেয়েছিল। তবে বর্তমান মহাজোট সরকার আমলে মন্ত্রীদের হাস্যকর, বেফাঁস ও অপেশাদার কথাবার্তা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। ওই বক্তব্যে বিরোধী দলগুলোর হরতালের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ‘আর বসে থাকার সময় নেই। আর কেউ হরতাল করলে তাদের বাড়িতে ঢুকে হত্যা করতে হবে।’ স্বদলীয় নেতাকর্মীদের সহিংস হতে উস্কানি দিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত হরতাল করে। আর রাস্তায় শুধু পুলিশ থাকে। আমাদের নেতাকর্মীরা নেতার হুকুমের অপেক্ষায় বসে থাকে। সবকিছুর জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ লাগবে কেন? যখন গাড়ি-বাড়ি করেন তখন কোথায় থাকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ।’ সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ‘হরতাল’ পালনকারীদের ঘরে ঢুকে হত্যা করার কথা বলে মন্ত্রী সবাইকে অবাক করে দেন। অনেকে প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগ যখন ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল, তখন ওই দলের হরতাল পালনকারী নেতাদের ঘরে ঘরে ঢুকে হত্যা করলে কি আজ তারা মন্ত্রিত্ব করতে পারতেন? মন্ত্রীর আলোচ্য বক্তব্য সর্বমহলে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়।
মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের অশোভন বক্তব্য দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। প্রথমত, মন্ত্রিসভা গঠনকালে দলীয় সিনিয়র নেতাদের মন্ত্রিসভার বাইরে রেখে কেবিনেটে অনেক অনভিজ্ঞ নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত করে একে ‘চমক সৃষ্টিকারী মন্ত্রিসভা’ আখ্যা দেয়া হয়। রাজনৈতিক দূরদর্শীরা তখনই ভেবেছিলেন, গুরুদের বাদ দিয়ে শিষ্যদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা কাজকর্ম ও কথাবার্তায় প্রত্যাশিত পেশাদারিত্ব দেখাতে পারবে না। পরবর্তী সময়ে তাদের এ ভাবনা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, এ সরকারের মন্ত্রীদের প্রায় সবাই প্রথম থেকেই অযাচিত ও বেফাঁস কথাবার্তা বলে সমালোচিত হয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় পাটমন্ত্রী সংবিধানে প্রদত্ত অধিকার ‘হরতাল’ পালনকারীদের ঘরে ঢুকে হত্যা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে চমক সৃষ্টি করেন। এই মন্ত্রী এর আগেও একাধিকবার এ ধরনের বেফাঁস উক্তি করেছেন। উল্লেখ্য, সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রথম বছরেই ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তিবাণিজ্য ও অন্যান্য অপকর্মে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতারাসহ অন্য সবাই যখন অতিষ্ঠ সে সময়, ২০১০ সালের ১০ জুলাই, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আওয়ামী সাংস্কৃতিক ফোরাম আয়োজিত ‘যুদ্ধাপরাধীদের অতি দ্রুত বিচার ও জাতীয় উন্নয়নে বিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে এই মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বিগত ৭ বছর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মার খেয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, চক্রান্তকারীরা সংগঠনে ঢুকে নাশকতা চালাচ্ছে। ছাত্রলীগের মতো একটি আদর্শিক সংগঠনের কর্মীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে পারে না।’ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসে উস্কানি দিয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি কর। এটা না করে ওদের (যুদ্ধাপরাধীদের) মারতে পার না?’ মন্ত্রী ওয়ান-ইলেভেনের সময় সাংবাদিকদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ঘটনার হোতাদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে সাংবাদিকরা ওয়ান-ইলেভেনকে আশীর্বাদ জানিয়েছিল।’ বরেণ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হকের সমালোচনা করতেও মন্ত্রী কুণ্ঠাবোধ না করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি সবার কাছ থেকেই তিনি সুবিধা ভোগ করেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াত নেতাদের আইনি সহায়তা দিতেও ব্যারিস্টার রফিক উল হক কুণ্ঠাবোধ করবেন না।’ এ মন্ত্রীর আরও অনেক বেফাঁস বক্তব্য আছে যার উল্লেখ আপাতত স্থগিত রেখে ‘চমক সৃষ্টিকারী মন্ত্রিসভা’র অন্য ক’জন সদস্যের বক্তব্য তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক হবে।
খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক সেনাসমর্থিত অসাংবিধানিক ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন জরুরি সরকারের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বিতর্কিত হন। সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনের ভালো-মন্দের জন্য প্রশংসা বা নিন্দা করা উচিত নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু এই মন্ত্রী নবম সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে জেনারেল মইন ও সেনাবাহিনীকে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনেক ভুলভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও জেনারেল মইন উ আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী দেশে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিয়ে বিরল কাজ সম্পন্ন করেছে।’ খাদ্যমন্ত্রী ২০০৯ সালের ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এই উচ্চাভিলাষী জেনারেলকে ‘যুগে যুগে আবির্ভূত মহামানবদের একজন’ বলে অভিহিত করে তাকে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে তুলনা করেন।
পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের বেফাঁস বক্তব্যে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ নেই। বেশ অবলীলায় তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্য কথাগুলো সবার সামনে বলে দেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ তৈরির উদ্যোগ যখন সর্বমহলে নিন্দিত ও সমালোচিত হয় তখন, ২০০৯ সালের ২৯ এপ্রিল, এ মন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে খুশি করে বলেন, ‘ভারত আগে টিপাইমুখ ড্যাম চালু করুক। ড্যামের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে কী ধরনের ও কী পরিমাণের ক্ষয়ক্ষতি হয়-সেসব দেখার পর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে, ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানানো হবে কি-না।’ বিশেষজ্ঞসহ সবাই যখন আলোচ্য বাঁধ হলে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে মনে করেন, এ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যখন পুলিশের আক্রমণে ছাত্রদের মাথা ফাটে, তখন এ মন্ত্রী এ বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ না হয়েও ৬ জুলাই, ডাচ পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ভাইস মিনিস্টারের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, ‘পৃথিবীর সব বাঁধই যে ক্ষতিকর তা ঠিক নয়, টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশের উপকারেও আসতে পারে।’ লোক নিয়োগের ব্যাপারে সরকারি অস্বচ্ছতাও মন্ত্রীর অকপট স্বীকৃতিতে স্পষ্ট হয়। ২০১০ সালের ১২ মে ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে অকপট সত্য উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগে দলীয় লোকজন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পুলিশ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য দলীয় ছেলেমেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের ব্যাপারে আইন প্রতিমন্ত্রী মহোদয় কিছুটা আক্রমণাত্মক। রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতাদের হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করলেও বিরোধী দলের একই চরিত্রসম্পন্ন একটি মামলাও কেন প্রত্যাহার করা হল না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের মামলা প্রত্যাহার করতে আমরা চেয়ারে বসেছি নাকি? বিরোধী দলের নেতাদের মামলা বাতিলের জন্য এ কমিটি করা হয়নি। ২০১০ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের চর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জিয়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না।’ তার এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব স্বাক্ষরিত প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জিয়াউর রহমান চর হলে পাকিস্তানের কাছে আÍসমর্পণ করে শেখ মুজিবুর রহমান কোন দেশের চর বলে বিবেচিত হবেন?’ প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য সরকারি দলেরও অনেকে সমালোচনা করলেও মন্ত্রী তার অবস্থানে অনড় থেকে আবার একই বছর ১২ আগস্ট বিলিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় একই সুরে বলেন, ‘জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু খুনের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি বাঙালিদের মাঝে পাকিস্তানের চর হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।’
মৎস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রীর বক্তব্যে মহাজোট সরকারের নিয়োগের ব্যাপারে অন্ধ দলীয়করণ নীতি অনুসরণের ব্যাপারটি ধরা পড়ে। মন্ত্রী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় দারিদ্র্য বিমোচন প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সে মৎস্য ও পানিসম্পদ তথ্যসেবা জোরদারকরণ কর্মসূচির উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াতের কোনো লোককে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা করা যাবে না। যে কর্মকর্তারা বিএনপি ও জামায়াতের লোককে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেবে তাদের লাল নোটিশ দিয়ে বিদায় করা হবে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অত্যাচার-নির্যাতন করে বাড়িঘর ছাড়া করেছিল। আমার মন্ত্রণালয় থেকে অত্যাচারী-নির্যাতনকারীদের সহায়তা করা চলবে না।’
সিনিয়র মন্ত্রীদের মধ্যে কথায় কথায় ‘স্টুপিড’, ‘বোগাস’ ও ‘রাবিশ’ উচ্চারণে অভ্যস্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতেরও অনেক অনভিপ্রেত বক্তব্য রয়েছে। শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অর্থ লুটপাটকারীদের তদন্ত কমিটি করে চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও তাদের শাস্তির ব্যবস্থা না করে মন্ত্রী শেয়ারবাজারকে কখনও ‘দুষ্ট বাজার’, কখনও ‘ফটকা বাজার’ বলে অভিহিত করেন। এ সরকারের আমলে ব্যাংকিং সেক্টরের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেংকারিতে শুধু সোনালী ব্যাংক থেকেই চার সহস্রাধিক কোটি টাকা লুটপাট হলে অর্থমন্ত্রী বিষয়টিকে হালকা করে বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেই। অথচ মাত্র চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি নিয়ে যা প্রচার হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, পুরো ব্যাংকিং খাতেই ধস নেমেছে। এই প্রচারণা ব্যাংকিং খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের বিরোধীদলীয় দাবি যখন দেশের অধিকাংশ মানুষ সমর্থন করছেন তেমন সময়ে, গত ২১ আগস্ট, এ মন্ত্রী সিলেটে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে বলেন, ‘বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি খামোখা।’
সরকারের উপদেষ্টারাও যে বক্তব্য-বচনে খুব একটা শালীন তা নয়। বেশি উদাহরণ না দিয়ে এখানে অর্থবিষয়ক উপদেষ্টার ‘ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে বিনিময়ে ফি চাইলে অসভ্যতা হবে’ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টার ‘কমিউনিটি ক্লিনিকে ১৩ হাজার ৩৫০ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হবে। দলের পরীক্ষিত কর্মী ছাড়া বাইরের কাউকে এ চাকরি দেয়া হবে না।’ এ দুটি উদাহরণই উপদেষ্টাদের বক্তব্যের শালীনতা উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট। অন্যান্য মন্ত্রী-উপদেষ্টার বেফাঁস বক্তব্যের উল্লেখ করে প্রবন্ধের কলেবর বাড়াব না।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি নির্মাণে ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের কাজকর্ম ও কথাবার্তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সরকারের পলিসি এবং তাদের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে সতর্কতার সঙ্গে কথা বলতে হয়। একটি গণতান্ত্রিক সরকার এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে মন্ত্রিসভার সব সদস্যকে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করে এসব বিষয়ে অধিকতর পেশাদার কাউকে সরকারি দলের মুখপাত্র নিয়োগ করে তাকে দিয়ে বক্তব্য প্রদান করিয়ে থাকে। তবে মহাজোট সরকার এক্ষেত্রে ন্যূনতম শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। কে যে এ সরকারের মুখপাত্র আর কে যে মুখপাত্র নন, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে এ সরকারের মন্ত্রীরা তাদের ইচ্ছামতো ঢালাওভাবে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার সঙ্গে অনেকক্ষেত্রেই জনস্বার্থ ও সরকারি নীতির সাদৃশ্য নেই। এ সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামার পেছনে যেসব কারণ সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে এবং করছে, তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের সরকারি নীতিবিরোধী, জনস্বার্থবিরোধী, খেয়ালখুশিমতো বেফাঁস ও অযাচিত বক্তব্য প্রদানকে একটি অন্যতম কারণ বিবেচনা করা যায়।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়