Tuesday, June 16, 2015

মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন খালেদা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মিথ্যাচার করেছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আজ মঙ্গলবার সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। খবর বাসস ও ইউএনবির।
নয়াদিল্লিভিত্তিক রোববারের পত্রিকা দ্য সানডে গার্ডিয়ানের এক সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশ সফরকালে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তিনি যাতে বৈঠক করতে না পারেন সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল। দ্য সানডে গার্ডিয়ানের এক সাংবাদিক সৌরভ সান্নালকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক, ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখ্যার্জির সঙ্গে দেখা না করা, জামায়াতে ইসলামী, নির্বাচন নিয়ে খালেদা জিয়া খোলামেলা কথা বলেন।
৬ ও ৭ জুন দুদিনের ঢাকা সফরে আসা মোদির সঙ্গে ৭ জুন খালেদা জিয়ার বৈঠক হয়।
আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘গত ১৩ জুন ভারতের দ্য সানডে গার্ডিয়ান পত্রিকায় খালেদা জিয়ার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি (খালেদা) অভিযোগ করেছেন, আমি নাকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলাম। তার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের আমি নিন্দা জানাই।’
মন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া বরাবরই ‘নাৎসি’ কায়দায় মিথ্যাচারের একনিষ্ঠ অনুসারী। তিনি মনে করেন একটি মিথ্যাকে বারবার বললেই সত্য হয়ে যায়।
দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গত ৫ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে মোদির সাক্ষাৎ হবে কি না? উত্তরে আমি বলেছিলাম, এ প্রশ্নের আলোচনার সুযোগ এখানে আছে বলে মনে হয় না। আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকে প্রতিবেদন আকারে ছাপা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।’
আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, এরপর ৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে ইত্তেফাকের কূটনৈতিক প্রতিবেদককে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তখন তিনি জবাবে বলেন, ‘আমি এটা করিনি, আমার বিএনপি বিটের এক কলিগ করেছেন।’ তিনি বলেন, এরপর ৮ জুন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে মন্ত্রিসভা। ৯ জুন ওই প্রতিবেদকের আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হচ্ছে—এ কথা বলায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
মন্ত্রী সংসদে বলেন, মূলত মন্ত্রিসভার বৈঠকে মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে এর প্রতিবাদ পাঠানো হয়। প্রতিবাদটিও আংশিকভাবে ছাপানো হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভারতের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কবিষয়ক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, ২০১৩ সালের বিজয় দিবসের আগে ১৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া তার বাণীতে বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালে দেশ শত্রু মুক্ত হলেও, অপশক্তির নীল নকশা বাস্তবায়নে শত্রুদের চক্রান্ত আজও বিদ্যমান। আধিপত্যবাদী শক্তি আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব শক্তিকে গ্রাস করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত।’ এ কথা বলার পরই মন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ আধিপত্যবাদী শক্তির নাম কী? আর কথিত শত্রু কারা? হায় খালেদা জিয়া, হায় বিএনপি, আর কত মিথ্যাচার করবেন, লজ্জা লজ্জা! ’

নারী নির্যাতন রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘একরকম ব্যর্থ’: আনিসুজ্জামান

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
পাশে অন্য বক্তারা। ছবি: ফোকাস বাংলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনার বিচারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘একরকম ব্যর্থ’ হয়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনা সরকারের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত জাতীয় সংলাপ শেষে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। আয়োজকেরা বলেন, এই কমিটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে একটি সুপারিশমালা তৈরি করবে। সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে শিগগিরই একটি জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হবে। সংলাপে আয়োজকেরা নারী নির্যাতন রোধে রাজনৈতিক দলগুলোকে জোরালোভাবে এগিয়ে আসার কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘পয়লা বৈশাখের পর দুই মাস কেটে গেল। প্রতিকার পাইনি। কেউ আইনের আওতায় আসেনি। একুশের বইমেলায় অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের কেউ ধরা পড়েনি। ওয়াশিকুরের হত্যাকারীদের পুলিশ ধরেনি। এটা এক ধরনের ব্যর্থতা। এসব বিষয় সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানাই। গুরুত্বের ঘাটতি আছে।’
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর নারী নির্যাতন বন্ধে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রসারের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজগুলো না করে কথা বলছি অনেক বেশি। শিশুরা যান্ত্রিকভাবে বড় হচ্ছে। তারা সবাই নৈতিকতার শিক্ষা পাচ্ছে না। আমি আমার এলাকায় একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন করেছি। তাদের দায়িত্ব দিয়েছি প্রতিটি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় সংস্কৃতি চর্চার। আমি বলব প্রতিটি সংগঠন নিজ নিজ এলাকায় এক একটি স্কুলের দায়িত্ব নিক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শুধু ক্লাসরুমের শিক্ষা দিয়ে নারী নির্যাতন বন্ধ হবে না। এ জন্য পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা দরকার।
অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ পয়লা বৈশাখে যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের সক্রিয়ভাবে যুক্ত না হওয়ার পক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘একটি অংশ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য নিজেদের ব্যানার পরিবর্তন করে অন্য ব্যানার নিয়ে নেমেছিল। এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চেয়েছিল। আসুন রাজনৈতিক হীন স্বার্থের জন্য একজন একজনকে দোষারোপ না করি।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সারওযার আলী, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, আইনজীবী তানিয়া আমির, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, হাসান আরিফ, নাট্যকার মান্নান হীরা প্রমুখ।

ফুটবলে তীরে এসে তরি ডোবার আখ্যান by নাইর ইকবাল

তাজিকিস্তানের বিপক্ষে এভাবে অধিকাংশ সময় বল
বাংলাদেশের পায়ে থাকলেও ফলাফল ১-১ সমতা।
চিত্রনাট্যের পুরোটাই ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। পুরো খেলায় বাংলাদেশের আধিপত্য। খেলায় গোল করে এগিয়ে বাংলাদেশ, প্রতিপক্ষ দশজনের দলের পরিণত হওয়া, তবুও এই ম্যাচের বিজয়ী দল বাংলাদেশ নয়। সেই ডেড বল, সেই সেট পিস। সর্বোপরি সেই রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে চাপ নিজেদের ওপর নিয়ে নেওয়া। আজ মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার দশেক দর্শক অবাক হয়ে দেখল, কীভাবে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল একটা নিশ্চিত জেতা ম্যাচ প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দিতে পারে। খেলাটা ১-১ গোলে ড্র হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ড্র তো বাংলাদেশের জন্য হারের শামিলই।
এই ম্যাচটা পুরোটাই ছিল বাংলাদেশের। বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ঘরের মাঠে আগের ম্যাচেই কিরগিজস্তানের বিপক্ষে হারের পর তাজিকিস্তানের বিপক্ষে এই ম্যাচটি বাঁচা-মরার লড়াই হিসেবেই নিয়েছিল মামুনুল বাহিনী। প্রথম থেকে শরীরী ভাষায় মরিয়া ভাবটা ছিল দারুণভাবেই। খেলার ২৫ মিনিট পর্যন্ত তো তাজিক ফুটবলারদের পায়ে বলই দেখা যায়নি। অসম্ভব আক্রমণাত্মক হয়েও ভালো ফিনিশারের অভাবে কাজের কাজটা করতে পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু গোল করার প্রচেষ্টার কিন্তু কোনো কমতি ছিল না। বাম প্রান্তে দুর্দান্ত খেলছিলেন তরুণ-তুর্কি জুয়েল রানা। হেমন্তও ছিলেন আজ স্বরূপে উজ্জ্বল। অধিনায়ক মামুনুল একের পর এক বল বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন আক্রমণভাগের দিকে। কিন্তু কাজের কাজটা হচ্ছিল না। সবকিছু আটকে যাচ্ছিল মূলত একটা জায়গায় গিয়ে। জাহিদ হাসান এমিলিকে দেশের ‘সেরা’ স্ট্রাইকার বলা হয়। কিন্তু প্রথমার্ধে বাংলাদেশের আক্রমণগুলো আটকে যাচ্ছিল তাঁর কাছে গিয়েই।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫০ মিনিটেই গোল করে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। প্রথম থেকে দর্শকদের বিরক্তি উদ্রেক করেও গোলদাতা কিন্তু ওই এমিলিই। বক্সের বাম প্রান্তে পাওয়া মামুনুলের ফ্রি-কিকটিতে হেমন্ত¯হেড নিলেও গোল লাইন অতিক্রম করতে ‘সহায়তা’ করার জন্যই স্কোরশিটে নাম এমিলির। গোল করে উজ্জীবিত হওয়াটাই কাম্য ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের খেলায় নেতিবাচক ব্যাপারটি ক্রমেই ফুটে ওঠে। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে হেমন্তকে মারাত্মক ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন তাজিকিস্তানের আসরভ। প্রতিপক্ষের দশজনের দলে পরিণত হলেও বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কোনো কিছুই দেখা যায়নি বাংলাদেশের খেলায়। উল্টো সব খেলোয়াড় নিচে নেমে এসে প্রতিপক্ষকে আক্রমণে ওঠার সুযোগ করে দিতে থাকেন বারবার। এই সুযোগে তাজিকিস্তানও চড়াও হয় বাংলাদেশের ওপর। তৈরি করতে থাকে একাধিক সুযোগ। গোলরক্ষক রাসেল মাহমুদ অবশ্য এ সময় ছিলেন অবিচল। তিনি বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বাঁচান।
ম্যাচের ৮০ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর খেলাটা পুরোপুরিই তাজিকদের হাতে তুলে দেয় বাংলাদেশ। ৮৬ মিনিটে বক্সের বাইরে অযথা একটা ফাউল করে তাদের ফ্রি-কিকের সুযোগ করে দেন এমিলি। সেই ফ্রি-কিক থেকেই কপাল পোড়ে বাংলাদেশের। ফাতুলোয়েভ ফাতুল্লের দর্শনীয় ফ্রি-কিকটি কোনো সুযোগ দেয়নি গোলরক্ষক রাসেল মাহমুদকে। পোস্টের বাম দিক দিয়ে সরাসরি আশ্রয় নেয় জালে।
পুরো স্টেডিয়ামে তখন আক্ষেপ। তীরে এসে তরি ডোবানোর এই আক্ষেপ বোধ হয় শুধু স্টেডিয়ামেই নয় দেশের ক্রীড়ামোদীদেরও।

এরশাদের অব্যাহতি চান ফিরোজ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত পদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন তার দলেরই প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। জাতীয় পার্টি সত্যিকারের বিরোধী দল কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। স্পিকারের উদ্দেশে ফিরোজ রশিদ বলেন, আমরা কি সত্যিকারের বিরোধী দল? মানুষ প্রশ্ন করে আমাদের কাছে। মঙ্গলবার সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি জানান। ফিরোজ রশিদ বলেন, আমার দলের চেয়ারম্যান, তিনি আবার মন্ত্রী মর্যাদায় রয়েছেন। এটা থেকে রেহাই চাই। জাতীয় পার্টি একটি বড় দল। আমাদের দলটাকে বাঁচতে দেন। স্পিকারের উদ্দেশ্য প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, একসময় বেশি টকশোতে যেতাম।  এখন কম যাই। মানুষ বলে তোমরা কেমন বিরোধী দল। লাউয়ের আগাও খাবা, গোড়াও খাবা। আমি  আপনার কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাই। কি করলে আমরা সত্যিকারের বিরোধী দল হব। এসময় বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ অধিবেশন কক্ষে ছিলেন না। তার পাশের আসনে ছিলেন দলের সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। এমপিদের মধ্যে যাদের ঢাকায় বাড়ি নেই তাদের জন্য প্লট দাবি করে ফিরোজ রশিদ বলেন, আপনি এমপিদের ন্যাম ফ্লাটে থাকতে দিয়েছেন। তারা ছেলে মেয়েদেরকে নিয়ে সেখানে আছেন। ছেলে মেয়েরা অনেকে এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। যখন এমপি থাকবেন না, তখন পরিবার নিয়ে তিনি কি সদরঘাট দিয়ে বাড়ি চলে যাবেন? তিনি বলেন, যারা অতীতে ঢাকা শহরে প্ল¬ট নেননি তাদের সবাইকে ঢাকা শহরে একটি করে প্লট দেয়া হোক। উত্তরায় ৫ কাঠার জায়গা দেয়া হোক।

সুষমার পদত্যাগ দাবিতে বিরোধীরা সোচ্চার

বৈদেশিক মুদ্রা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ভারত ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেয়া আইপিএলের সাবেক কমিশনার ললিত মোদিকে সাহায্য করার দায়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের পদত্যাগ দাবিতে ভারতের বিরোধী সব রাজনৈতিক দল সোচ্চার হয়েছে। গত রোববারই এ সংক্রান্ত সংবাদ ফাঁসের প্রেক্ষিতে সুষমা তার টুইটারে সহায়তা দেবার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, মানবিকতার খাতিরেই তিনি বৃটিশ হাইকমিশনারকে অনুরোধ করেছিলেন মোদিকে লন্ডন থেকে পর্তুগালে যাবার অনুমতি দিতে। ললিত মোদির ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর অপারেশনের জন্য ললিত মোদি পর্তুগালে যাওয়ার দরবার করেছিলেন। সুষমা জানিয়েছেন, ললিত পর্তুগাল থেকে বৃটেনে ফিরেও এসেছেন। তবে এই নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সুষমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগও তোলা হয়েছে যে, তার এক আত্মীয়কে বৃটেনে ভর্তির জন্য তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ এমপি কিথ ভাজের সাহায্য নিয়েছিলেন। এই কিথ ভাজও ললিত মোদির জন্য ধারাবাহিকভাবে দরবার করেছেন এবং প্রভাব ঘাটিয়েছেন।  যদিও দল হিসেবে বিজেপি সুষমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেন নি। আর এখানেই বিরোধীরা চেপে ধরতে চাইছে প্রধানমন্ত্রীকে। নরেন্দ্র মোদির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম উয়েচুরি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী দায়বদ্ধতা ও দুর্নীতিহীনতা নিয়ে এত কথা বলেন, অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিশ্চুপ। বলিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিংও মোদির নীরবতা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ললিত মোদিকে সাহায্য করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তার মত প্রকাশ্যে জানান। কংগ্রেস নেতা কটাক্ষ করে বলেন, মোদিজি এখন মৌন মোদিজি হয়েছেন কেন ? তিনি কি কেবল যোগ নিয়েই বলবেন? পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছে কংগ্রেস। তবে সুষমা বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপি সভাপতির সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।

গ্রেপ্তার এড়িয়ে দেশে সুদানি নেতা বশির

ওমর আল বশির
সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির গতকাল সোমবার দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে নিজ দেশে ফিরেছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বশিরকে দক্ষিণ আফ্রিকা না ছাড়তে স্থানীয় এক আদালত আদেশ দিয়েছিলেন। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।
এর আগে সুদানের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইউসুফ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, বশিরকে বহনকারী উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে সুদানের রাজধানী খার্তুমে পৌঁছাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। একাধিক বার্তা সংস্থা বশিরের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমেও বশিরের দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগের খবর প্রচারিত হয়। স্থানীয় ইএনসিএ টেলিভিশনের প্রতিবেদক বলছেন, তিনি প্রিটোরিয়ার ওয়াটার্কলুফ বিমানবন্দর থেকে বশিরকে উড়োজাহাজে করে চলে যেতে দেখেছেন। স্থানীয় সময় বেলা ১০টায় বশির দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন বশির। তবে আফ্রিকার সরকারপ্রধানদের এই সম্মেলনের খবর চাপা পড়ে যায় দারফুর সংঘাতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বশিরকে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) আহ্বানে। আইসিসি দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বশিরকে অভিযুক্ত করে সমন জারি করেছিল।
আইসিসির আহ্বানের পর প্রিটোরিয়ার হাইকোর্টের বিচারক হ্যান্স ফেব্রিসিয়াস গত রোববার বশিরের দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় আবার আদালত বসে। সরকারি আইনজীবী সুদানি নেতার দেশত্যাগের বিষয়টি আদালতকে জানান। এ সময় আদালতের পাবলিক গ্যালারি থেকে চাপা হাসি শোনা যায়। কীভাবে বশির দেশত্যাগ করতে পারলেন, আদালত সে বিষয়ে সরকারকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
অবশ্য আদালত বসার আগেই বশির দেশ ছেড়ে চলে যান। আদালতের আদেশের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বশিরের একজন সফরসঙ্গী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বশির, আজই চলে যাবেন।’
দ্য সাউথ আফ্রিকান লিটিগেশন সেন্টার নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন বশিরকে গ্রেপ্তার করতে আবেদন জানায় প্রিটোরিয়া হাইকোর্টে। দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিসির সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। তাই যুদ্ধাপরাধের দায়ে কোনো ব্যক্তি দেশটিতে প্রবেশ করা মাত্র তাঁকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য সরকার।
এদিকে গতকাল জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেন, আইসিসির সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে জারি করা সমন মেনে অবশ্যই তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
দুই দিনের এইউ সম্মেলন শেষ হয় গতকাল। রোববার উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট বশির দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা, জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের প্রধানদের সঙ্গে ছবি তোলেন। ৫৪ দেশের প্রতিষ্ঠান এইউর চেয়ারপারসন রবার্ট মুগাবে।
তবে প্রিটোরিয়ার আদালতের সিদ্ধান্তের পর তীব্র ক্ষোভ জানায় দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্ষমতাসীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)। তারা হেগভিত্তিক আইসিসিকে কেবল আফ্রিকার নেতাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ করেন। এএনসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যে উদ্দেশ্য নিয়ে আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখান থেকে তারা দূরে সরে এসেছে। আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ওপরই কেবল আইসিসির সিদ্ধান্তের খড়্গ চাপানো হয়।’
২০০৩ সালে শুরু দারফুর সংঘাতে জড়িত থাকার দায়ে বশিরের বিরুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনে আইসিসি। ২০০৯ থেকে ২০১০ সালে বশিরের বিরুদ্ধে আইসিসি সমন জারি করে। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে, দারফুর সংঘাতে তিন লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। সে সময় অন্তত ২০ লাখ মানুষ ঘর ছাড়ে।
আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এর আগে আইসিসিকে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। আইসিসির বর্ণবাদী আচরণ এবং আফ্রিকার দেশগুলোর নেতাদের প্রতি বৈরী আচরণের অভিযোগ এনে এ সিদ্ধান্ত নেয় তারা। গতকাল বশিরের দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগের পেছনে এইউ নেতাদের সমর্থন ছিল বলে মনে করা হয়।

যে কারণে হিমশিম খাচ্ছে আইসিসি -ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে নাজুক আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক আছে। সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে দক্ষিণ আফ্রিকা না ছাড়তে স্থানীয় একটি আদালতের আদেশ সেই বিতর্ককেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।
পশ্চিম সুদানের দারফুর সংঘাতে মদদ দেওয়ার অভিযোগে সাত বছর আগে বশিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। সেই পরোয়ানার জের ধরেই বশিরের দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগের ওপর ওই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা। তিনি আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) যে সম্মেলনে অংশ নিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন, এ ঘটনায় সেই সম্মেলনও সংকটে পড়েছে। এতে বিব্রত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাও। এর চেয়েও বড় কথা, রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে হেগভিত্তিক আদালত আইসিসিকে যে হিমশিম খেতে হয়, তা আবার স্পষ্ট হয়েছে।
রুয়ান্ডায় গণহত্যা ও বলকান এলাকায় জাতিগত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হয় আইসিসি। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধী সরকারগুলোকে বিচারের মুখোমুখি করার সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা এটি। তবে এই ১৩ বছরে আইসিসি তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নানা সংকটে পড়েছে। অংশত এর কারণ হচ্ছে, আইসিসির সদস্যরাষ্ট্র-নির্ভরতা। এসব সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো খুব সামান্যই সহায়তা করে আইসিসিকে।
আইসিসির দুটি যুগান্তকারী মামলা (সুদান ও কেনিয়ার নেতাদের বিরুদ্ধে) এমন সংকটে পড়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বিশ্বশক্তিগুলো এখন পর্যন্ত আইসিসিতে নাম লেখাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। আফ্রিকার দেশগুলোও আইসিসিকে নব্য ঔপনিবেশিক হাতিয়ার হিসেবে দেখে থাকে।
বশিরের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা না ছাড়ার আদেশটি অস্থায়ী। প্রিটোরিয়ার উচ্চ আদালতের বিচারক একটি মানবাধিকার গ্রুপের আবেদনে সাড়া দিয়ে ওই আদেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি রুলিং না দেওয়া পর্যন্ত ওই আদেশ বলবৎ থাকবে।
বশির এর আগে দেশের বাইরে গিয়েছেন। সুদানের এই প্রেসিডেন্ট মাঝেমধ্যেই ওই অঞ্চলে নিজের মিত্র দেশগুলোতে সফরে যান। এর মধ্যে রয়েছে মিসর, নাইজেরিয়া, লিবিয়া, চাদ ও কাতার। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আইসিসির পদক্ষেপের কারণে বশিরের সফর সীমিত হয়েছে। তিনি সফরকালে বেশ কয়েকবার সাময়িক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হয়েছেন। এরপর তাঁর উড়োজাহাজকে দ্রুততার সঙ্গে গন্তব্যপথ বদলাতে হয়েছে। এমনকি সংক্ষিপ্ত নোটিশে তাঁকে দেশ ছাড়তেও হয়েছে।
আইসিসির অস্তিত্ব প্রশ্নে এ ঘটনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিসি কতটা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে, এ ঘটনা আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কাউকে গ্রেপ্তার করা প্রশ্নে আইসিসি ততটাই শক্তিশালী, যতটা তার সদস্যরাষ্ট্রগুলো এতে ভূমিকা রাখার ইচ্ছা দেখায়। কারণ, আইসিসির নিজস্ব পুলিশ বাহিনী নেই।
আইসিসির সীমাবদ্ধ বোঝা গেছে গত এক বছরে দুটি যুগান্তকারী মামলা দেখে। গত ডিসেম্বরে আইসিসি তথ্য-প্রমাণের অভাবে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিজ উদ্যোগেই প্রত্যাহার করে নেয়। এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক বিচারের ক্ষেত্রে একটি ‘অন্ধকার দিবস’ আখ্যা দিয়েছিলেন আইসিসির কৌঁসুলি ফাতৌ বেনসৌদা। তিনিই কয়েক দিন পর দারফুর সংঘাতের তদন্ত স্থগিতের ঘোষণা দেন।
সামনে আরেকটি পরীক্ষার মুখোমুখি আইসিসি। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করা। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আইসিসিতে যোগ দিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের পাশাপাশি গাজাভিত্তিক সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরুর পথ প্রশস্ত হয়েছে।

কলেজে আসনসংখ্যা নির্ধারণ by মো. শরীফুর রহমান

উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির জন্য সরকার এবার দুটি পদ্ধতির কথা বলেছে। এর প্রথমটি হলো কলেজগুলোতে নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ। আর দ্বিতীয়টি হলো অনলাইনে একসঙ্গে পাঁচটি কলেজে ভর্তির আবেদন করার সুযোগ।
তবে এ রকম সুযোগ পাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের কষ্ট, সময় এবং অর্থ বাঁচানো সম্ভব হলেও বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। প্রথমত, এমন অনেক কলেজ আছে, যেগুলোর বয়স সবে এক বা দুই বছর। সেখানে নেই অবকাঠামো, নেই দক্ষ শিক্ষক বা কলেজের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। সদ্য অনুমোদন পাওয়া এবং অপ্রতিষ্ঠিত ও প্রতিষ্ঠিত কলেজে সমপরিমাণ শিক্ষার্থী ভর্তির নির্দেশনা দেওয়া কীভাবে সম্ভব? এই সুযোগে বিভিন্ন নামহীন কলেজ কূটকৌশল করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির চেষ্টা করছে।
এমন অনেক কলেজ আছে, যেগুলোর বয়স সাত-আট বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো এমপিও পায়নি। অথবা তাদের কলেজ থেকে কেউ এখনো এ+ পায়নি। অনলাইনে শিক্ষার্থীরা পাঁচটি কলেজ নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু যদি সে ওই পাঁচটি কলেজের একটিতেও ভর্তি হতে না পারে, তবে তার ভর্তির বিষয়টি থাকবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এতে শিক্ষার্থীকে নানা সমস্যায় পড়তে হতে পারে। উপর্যুক্ত সমস্যাসমূহ সমাধানের কতগুলো পথ রয়েছে, যেমন-
১. শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের কলেজের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবে।
২. আবেদন করার সময় জন্মতারিখ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। ভর্তির জন্য আবেদন ফরমে পেশকৃত তথ্য বোর্ডে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মেলানোর ব্যবস্থা করা।
৩. আবেদনের পরবর্তী কালে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্পাদনা করার ব্যবস্থা রাখা।
৪. নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করার সময় সিরিয়াল-ভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন না করে এলোমেলোভাবে করতে হবে। এতে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের না জানিয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তা রোধ করা যাবে।
আর কোটা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত আর সদ্য প্রতিষ্ঠিত কলেজ, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকের মান, ভৌত অবকাঠামো, কলেজ প্রতিষ্ঠার সময়, জনসংখ্যা, শিক্ষার্থী, যোগাযোগব্যবস্থা, জনমত প্রভৃতি বিবেচনা করা উচিত।
লেখক: শিক্ষক, ফেনী।

বোঝা গেল বিএনপি ভারতবিরোধী নয়? by আব্দুল কাইয়ুম

রাজনীতির ব্যাকরণ কি বদলাতে শুরু করেছে?
এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর তাঁর নিজের দেশে এবং আমাদের দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণে কিছুটা হলেও পরিবর্তনের সূচনা করল। ধরুন বাংলাদেশে বিএনপির এত দিনের অবস্থানের কথা। তারা সাধারণভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কথা বললেও কার্যত তাদের ভারতবিরোধী ভাবমূর্তিটিই ছিল প্রধান। কিছু একটা হলেই ‘গেল গেল, সব ভারত নিয়ে গেল’ ধরনের কথা তাদের নেতাদের মুখে শোনা যেত। কিন্তু এবার মোদির সফরের কিছুদিন আগে থেকে বিএনপির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে একটা কথা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন যে তাঁরা মোটেও ভারতবিরোধী নন, ভারতের সঙ্গে তাঁরা সব সময় সম্পর্কের উন্নয়ন চেয়েছেন।
বিএনপি যে সত্যিই প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব চায়, সেটা এবার নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে না এলে বোঝাই যেত না। কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, কী এমন ঘটে গেল যে বিএনপিকে উঠেপড়ে লাগতে হলো ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রমাণের জন্য? এটাই আসল কথা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, যত দিন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল, তত দিন বিএনপির ভারতবিদ্বেষ বেশি সোচ্চার ছিল। ইদানীং জামায়াত বিএনপি থেকে একটু দূরে। সেটা যে কারণেই হোক। এর ফলে বিএনপির পক্ষে গতানুগতিক ভারতবিদ্বেষ থেকে কিছুটা সরে আসা সম্ভব হয়েছে।
ভুলে যাওয়া যায় না যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ও ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধে তাঁর জন্য নির্ধারিত সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ভারতের সঙ্গে মৈত্রীকে বিএনপির খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু পঁচাত্তর-উত্তর পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের বাইরের সব শক্তিকে টেনে আনার প্রক্রিয়ায় জামায়াত-মুসলিম লীগ চক্র সুযোগ পায়। আজ অবধি সেই রাজনৈতিক সমীকরণ ভাঙাচোরা অবস্থায় হলেও চলছে।
এবারই প্রথম দেখা গেল জামায়াতে ইসলামী মোদির সফরে জনগণ হতাশ হয়েছে দাবি করে একটি বিবৃতি দিয়েছে মাত্র, বিক্ষোভ মিছিল করল না বা কিছু করার সুযোগ পেল না। আমাদের দেশের রাজনীতিতে এটা এক বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন। এবং এই পরিবর্তন এসেছে নরেন্দ্র মোদির সফরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে।
ভারতের চলতি রাজনৈতিক সমীকরণেও কিছু ওলট-পালট দেখা গেছে। আগে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত এলেনই না। অথচ সবাই ভাবছিলাম তিনি আসবেন, তিস্তা চুক্তি হবে। হয়নি। এবারও হলো না। কিন্তু মোদির সফরের সময় মমতা আলাদাভাবে হলেও এলেন। ঢাকায় তিনি বৈঠক করলেন তাঁদের দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে। কী বোঝা গেল?
ভারতের লোকসভায় মোদির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, কিন্তু রাজ্যসভায় নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের জন্য সেখানে মোদির মিত্র দরকার। আজ মোদির সফরের সময় মমতার বাংলাদেশে আসার মধ্য দিয়ে তিনি রাজ্যসভায় বিরোধীদলীয় জোটের অন্যান্য দলের চেয়ে একটু তফাতে গেছেন। এতে মোদির লাভ। কিন্তু বাংলাদেশের লাভ আরও বেশি। কারণ, তিস্তা চুক্তির জন্য তাঁর আসার খুব দরকার ছিল। তিনি এসেছেন। হয়তো এ জন্য ভারতে কংগ্রেস, সিপিএমসহ অন্যান্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল কিছুটা অখুশি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে মমতার আসার তাৎপর্য অনেক বেশি।
মোদির বাংলাদেশ সফরের ফলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় একধরনের নতুন মাত্রার সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যেমন ভারত-নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশ যোগাযোগ, বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি। এটা ভবিষ্যতে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তার মানে, কানেক্টিভিটির এক নতুন দিগন্ত খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে মোদির এই সফর স্বয়ং মোদিকেও বদলে দিয়েছে। গত বছর তিনি যখন ভারতের লোকসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হন, তখন অনেকে ভেবেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বোধ হয় চুলায় উঠবে। না, তা হলো না। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত জনভাষণে তিনি যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন দুই দেশের তরুণ সমাজকে, তা সত্যিই উদ্দীপনামূলক। দুই দিনের সফরে মোদি শুধু দুই দেশের মৈত্রীর বন্ধনে নতুন মাত্রা যোগ করেননি, তিনি নিজ অতীতের ভাবমূর্তিকেও নতুন ছাঁচে গড়েছেন। আজকের মোদি যে গতকালের মোদিকে এত দূরে ফেলে এসেছেন, তা হয়তো বাংলাদেশ এত সহজে বুঝতে পারত না, যদি–না তাঁর বাংলাদেশ সফর এত সুন্দর হতো।
এখন কী? মোদি তো পথ দেখিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের এখন কী করার আছে? ভারত ২০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়ে তাঁর দেশে ৫০ হাজার তরুণের নতুন চাকরির সংস্থান করবে। বাংলাদেশ কী করবে? এখনই হিসাব-নিকাশ করে সব ঠিক করা দরকার। যদি রাস্তাঘাট, গ্যাস-বিদ্যুতের সুব্যবস্থা হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। চাকরি পাবেন দেশের বেকার তরুণেরা। উন্নয়ন হবে।
এখানে কয়েকটা বড় সমস্যা রয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন তো রয়েছেই। সবার অংশগ্রহণ কবে হবে, কীভাবে হবে, সেসব অবশ্যই ঠিক করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ভাবে বিএনপি আসলে আসবে, না হলে নাই, তাহলে বিরাট রাজনৈতিক ভুল করবে। কোনো দেশেই কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। কবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে কীভাবে কী হয়েছিল, সেখানে কত বড় ভিশনারি নেতা ছিলেন, সেসব অনুকরণ করে আমাদের দেশে কিছু করতে যাওয়া হবে মারাত্মক ভুল।
বিশেষভাবে আওয়ামী লীগ ৬০ বছরের একটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ধারণ করছে। কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া দেশ শাসনের কথা তাদের চিন্তায় আনাই ভুল। তা ছাড়া এ রকম এক বিরোধী দলশূন্য পরিস্থিতিতে দেশ শাসনের কোনো অতীত অভিজ্ঞতাও তাদের নেই। এমনকি পঁচাত্তরের বাকশালের মধ্যেও ছিল ন্যাপ-সিপিবি এবং অন্যান্য দল ও ব্যক্তি। তাই সেটা ছিল ভিন্ন একটি অধ্যায়। তারপরও সেটা যে ভুল ছিল, সে কথা আওয়ামী লীগ নিজেও মূল্যায়ন করেছে।
বর্তমান অবস্থা বাকশাল নয়, বিএনপি যতই বলার চেষ্টা করুক। কিন্তু কার্যকর বিরোধী দল যে নেই এবং এ অবস্থা জোর করে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা যে আওয়ামী লীগ করছে, তাতে সন্দেহ নেই। এই পথটি আওয়ামী লীগের অপরিচিত। এই অচেনা পথে যাওয়ার আগে আওয়ামী লীগকে দুবার ভাবতে হবে।
তার চেয়ে বরং সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দিয়ে দেশে প্রাণবন্ত সংসদ চালু করার একটি উদ্যোগ এখন জরুরি। বিশেষভাবে মোদির সফরের পর এই এজেন্ডা আওয়ামী লীগের সামনে এসেছে।
আর তা ছাড়া মোদির সফরের সুফল ধরে রাখতে হলে এখন আরেকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের মত ও পথ ভাবতে হবে। অনেক বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে পারে। বিদেশি সহায়তা আসবে। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারলে সব পানিতে যাবে। অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে ৭ শতাংশে এনেছেন। কিন্তু তিনি তো জানেন, শুধু ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ২ থেকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এটা অনুমানের বিষয় নয়। গত রোববার ‘২০১৫ মার্কিন বিনিয়োগ পরিস্থিতি প্রতিবেদন’-এর বাংলাদেশ অধ্যায়ে এ কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের প্রত্যয় থাকলেও বাস্তবায়নে অসংগতি রয়েছে বলে সেখানে দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে দেড় শ কোটি মার্কিন ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে। এর আগের বছর ছিল ৯৯০ মিলিয়ন ডলার। এ বছর হয়তো আরও বাড়বে। কারণ, ভারত পাশে দাঁড়িয়েছে। চীন তো আছেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোদির সাম্প্রতিক সফরকে স্বাগত জানিয়েছে।
এখন সরকারের উচিত দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তাহলে ৭ কেন, ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়তো অনায়াসে আসবে।
মোদির সফরের পর সরকারের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল। পালন করতে পারবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

সচিব–জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক একই গ্রেডে by শরিফুজ্জামান

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের হুমকির মুখে সচিব, সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক ও মেজর জেনারেলদের বেতনকাঠামো এক নম্বর গ্রেডে রাখা হচ্ছে। তাঁদের সবার মূল বেতন হবে ৭৫ হাজার টাকা। তবে এটা করা হলেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা। আবার সচিবদের মধ্যেও নতুন করে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী উচ্চতর বেতনকাঠামো চান। এর আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকেরা (জ্যেষ্ঠ) সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিবের মতো এবং অন্য শিক্ষকেরা ঠিক আগের মতোই সম্মান ও মর্যাদাক্রম চান।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ক্ষোভ ও বৈষম্যের অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেড-১ নড়চড় করা হচ্ছে না। সপ্তম বেতন স্কেলে সচিব, সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক ও মেজর জেনারেল এক নম্বর গ্রেডেই ছিলেন।
বেতন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই স্তরে সৃষ্টি হওয়া ঝামেলা অন্য স্তরকেও প্রভাবিত করে এবং সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও অধ্যাপকদের মর্যাদাক্রম আগের তুলনায় তিন থেকে চার ধাপ নেমে যায়। এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হলে সচিব কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটি তাদের নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে কিছু ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। আগে এক নম্বর গ্রেডে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সেখানেই থাকবেন। আর গ্রেডের বাইরে আগে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও সেখানে থাকবেন।
তবে সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপকদের আগের অবস্থানে নেওয়া হলেও তাতে খুশি নয় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এস এম মাকসুদ কামাল প্রথম আলোকে জানান, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁরা দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন।
মাকসুদ কামাল বলেন, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো আছে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে এই অঙ্গীকার করলেও তা হবে, হচ্ছে বলে সময় পার করছে।
‘দিনবদলের সনদ’ নামে ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ মানব উন্নয়নবিষয়ক অঙ্গীকারে (১০.১) শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর বেতনকাঠামো করার কথা বলেছিল।
আজ সোমবার ফেডারেশনের নেতারা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেবেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এটা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। আলাপ-আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
এদিকে সচিবেরা একই গ্রেডে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের না রাখার পক্ষে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সচিব প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের হুমকিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এতে সচিবদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
বেতনকাঠামোয় পরিবর্তন আসছে: মন্ত্রিপরিষদ, মুখ্য ও জ্যেষ্ঠ সচিব এবং তিন বাহিনীর প্রধান গ্রেডের ঊর্ধ্বে দৃষ্টান্ত হিসেবে একজন সচিব বলেন, শিক্ষাসচিব এবং শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এক নম্বর গ্রেডে বেতন পাওয়ায় সচিবের কর্তৃত্ব বা নির্দেশ মানতে তিনি বাধ্য না-ও হতে পারেন। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যেও এমন ঝামেলা তৈরি হতে পারে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছি যে সিভিলিয়ান রুলে আধিপত্যের ব্যাপারটা থেকেই যাচ্ছে।’ তিনি অধ্যাপক ও সচিবদের গ্রেড-১ দিয়ে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, জ্যেষ্ঠ সচিব ও তিন বাহিনী প্রধানের সমান বেতন বা মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এখন ৩৭টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন প্রায় ১৫ হাজার। এর মধ্যে অধ্যাপক পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের ২৫ শতাংশ সিলেকশন গ্রেড পান, এই হিসাবে তাঁদের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২৫০।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন ও চাকরি কমিশন গঠন করে সরকার। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ওই কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা কমিটি গত ১৩ মে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
সপ্তম বেতন স্কেলে একজন অধ্যাপকের মূল বেতন ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশে তা দ্বিগুণের একটু বেশি করে ৭০ হাজার টাকা করা হয়। সচিব কমিটি এটা ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই অধ্যাপকেরা গ্রেড-২ অনুয়ায়ী এই বেতন পাবেন।
অধ্যাপকের ওপরে আছেন সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপক, যাঁদের মূল বেতন কমিশন ৮০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে। সচিব কমিটি এটা ৭৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করেছে। সপ্তম বেতন স্কেল অনুযায়ী, সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সচিব উভয়েই ৪০ হাজার টাকা মূল বেতন পান। এখন তাঁরা এক নম্বর গ্রেডে একই বেতন পাবেন।
বেতন কমিশন অবশ্য সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। আর তা করলে অধ্যাপকদের নেমে আসতে হবে গ্রেড-২ থেকে কয়েক ধাপ নিচে।
গ্রেড-১ এর ওপরে প্রথম ধাপে ৯০ হাজার টাকা মূল বেতন পাবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও তিন বাহিনী প্রধান। বর্তমানে তাঁদের মূল বেতন ৪৫ হাজার টাকা। বেতন কমিশন এক লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছিল।
আর দ্বিতীয় ধাপে ৮৪ হাজার টাকা পাবেন জ্যেষ্ঠ সচিবেরা, বেতন কমিশন সুপারিশ করেছিল ৮৮ হাজার টাকা। বর্তমানে তাঁরা ৪২ হাজার মূল বেতন পান।
ঠিক সময়ে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হয় না বলে আর্থিক সুবিধা হিসেবে সিলেকশন গ্রেড দেওয়া হয়। আবার চাকরির একটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দেওয়া হয় টাইমস্কেল। কিন্তু বেতন কমিশন ও পর্যালোচনা কমিটি এই সুবিধা বাদ দেওয়ার পক্ষে। এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ভাতার ওপর আয়কর আরোপ করায় এই ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
সচিবালয়ে উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, সন্তানের শিক্ষা ভাতা হিসেবে ২০০ টাকা পান। এর ১০ শতাংশ কর দিতে হলে ১৮০ টাকা পাবেন। বিষয়টি কতটা হাস্যকর তা ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানান তিনি।

সরকারের আর্থিক অস্বচ্ছতা উদ্বেগজনক -যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন

রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতার ন্যূনতম শর্ত পূরণেও ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ—মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থের প্রতিফলন থাকবে। কিন্তু রাজস্ব আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা সম্পর্কে যে মূল্যায়ন তারা করেছে, তা আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। এ কারণেই এটা উদ্বেগের বিষয়।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব খাতে ন্যূনতম স্বচ্ছতার শর্ত পূরণে ব্যর্থ ৬০টি দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার অপর দুটি দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা অন্তত শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা নির্ণয়ের এই সূচকের ওপর বাজেট বরাদ্দ ও তার ব্যয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আয়, সরকারের বিভিন্ন বিভাগ চালানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক জবাবদিহির বিষয়টি নির্ভরশীল। এ ছাড়া শক্তিশালী রাজস্ব খাতের বিকাশ অর্থনীতির স্বাবলম্বী হওয়ারও শর্ত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে সার্বিক অনিয়মের প্রতিফলন ঘটছে রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাবের অস্বচ্ছতায়।
সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব সময়মতো না হওয়াকে আর্থিক অস্বচ্ছতার অন্যতম কারণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওই প্রতিবেদনে। এই দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সময়মতো নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে না। এটা তাদের নিরীক্ষা কাজের দুর্বলতারই পরিচয় বহন করে। যদি সরকারের বিভিন্ন বিভাগ তাদের বাজেট বরাদ্দ নিয়ম সংগতভাবে খরচ না করে, তার হিসাবে যদি নয়–ছয় থাকে, তাহলে হিসাব নিরীক্ষকের পক্ষে যথাযথ হিসাব উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। আর্থিক খাতের এই অস্বচ্ছতা দুর্নীতির সহযোগী।
শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে রাজস্ব আয় ও তার বিলিবণ্টনের সুচারু পরিকল্পনাই বাজেটের মাধ্যমে হাজির করা হয়। মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে হিসাব নিরীক্ষণ ও দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণকে এক সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করতে হবে।

বেতন কাঠামো- বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতাকে কেন এই অবমূল্যায়ন? by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের প্রতিবেদন সচিব কমিটির পর্যালোচনার স্তর পেরিয়ে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে মর্মে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়। অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, আগামী জুলাই থেকে নতুন বেতন স্কেলের বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে শুরু হবে। কিন্তু মূল প্রতিবেদনের সুপারিশে, নাকি সচিবদের পর্যালোচনার কারসাজিতে অবিশ্বাস্যভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্বোচ্চ বেতনকে চতুর্থ সর্বোচ্চ গ্রেডে নির্ধারণ করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে সরকার জেনেশুনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এহেন অপমানজনক মর্যাদাহানির ব্যবস্থা করেছে। কারণ, এটা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে খাপ খায় না। সামরিক বাহিনী ও সিভিল আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ তিনটি স্কেলকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নাগালের বাইরে রেখে দিয়ে মন্ত্রিসভা জাতিকে কী সিগন্যাল দিতে চাইছে, বুঝতে পারলাম না। সামরিক বাহিনীর জেনারেল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং মেজর জেনারেল অথবা সিভিল আমলাতন্ত্রের মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংস্থাপনসচিব, সিনিয়র সচিব ও সচিবেরা কোন যুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের চেয়ে বেশি বেতন পাবেন, সেটা সরকারকে জাতির কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে।
এটা বোঝা কঠিন নয় যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মহাজোট সরকার যেহেতু জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন হয়নি, তাই সামরিক বাহিনী, সিভিল আমলাতন্ত্র ও পুলিশ-র্যাব-বিডিআরের ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। সে জন্য এসব গোষ্ঠীকে বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিয়ে খুশি রাখার চেষ্টা সরকারের থাকতেই পারে। ক্ষমতার বাইরে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আওয়ামী লীগের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু এখন মোটেও প্রয়োজন নেই। যেসব আমলা অতীতে নিজেদের ক্যারিয়ার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা ছেড়ে এলিট আমলাতন্ত্রের (সিএসপি এবং বিসিএস) ক্যাডারের পদকে বেছে নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ব্যাপারে একটা অদ্ভুত এলার্জি কাজ করে থাকে, সেটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। এবারের এই অবমাননাকর বেতন স্কেল নির্ধারণেও এসব ফ্যাক্টর কাজ করেছে বলে সন্দেহ করার কারণ রয়েছে। এ ধরনের একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ক্ষমতার জোরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবমূল্যায়িত করার এ ধরনের অন্যায় সিদ্ধান্ত নিতেই পারে, কিন্তু এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অপমান করার খেসারত একদিন তাদের দিতে হতে পারে। অতীতে বিপদের দিনে আওয়ামী লীগ যে বারবার এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বৃহদংশকে পাশে পেয়েছে, সেটা এখন হয়তো তারা ভুলে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীকে এবং সিভিল আমলাতন্ত্রকে তোয়াজ করার বিশেষ প্রয়োজন সরকার উপলব্ধি করতে পারে, কিন্তু অন্য পেশাজীবীদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদার যে ভারসাম্য বহুদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত, তা তছনছ করার অধিকার তাদের নেই।
এ পর্যায়ে ১৯৮৬ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল থাকার সময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা আলাদা বেতন স্কেলের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম, সে সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ, ওই সময়ে সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে তিনি আমাদের দাবির সপক্ষে অবস্থান নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন। ফেডারেশনের একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, আমাদের দাবিটি তিনি সংসদে উপস্থাপন করবেন। ওই আন্দোলনের সময় আমরা ৪২ দিন শিক্ষক ধর্মঘট চালাই এবং তদানীন্তন এরশাদ সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাঁচটি সভায় আলাপ-আলোচনা করি। ফেডারেশনের একটি প্রতিনিধিদল খোদ রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গেও বৈঠকে মিলিত হয়েছিল। এরশাদ নীতিগতভাবে আলাদা বেতন স্কেল দিতে তাঁর আপত্তি নেই বলে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, সিভিল আমলাতন্ত্রের আপত্তি রয়েছে আলাদা স্কেলের ব্যাপারে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আলাদা বেতন স্কেল দেওয়া হলে চাকরির প্রারম্ভিক স্তরে তুলনামূলকভাবে একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধার অধিকারী সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা নাকি নিজেদের বঞ্চিত মনে করবেন।
আমাদের সঙ্গে আলোচনায় সরকারের প্রতিনিধিদলে যে চারজন জাঁদরেল আমলা নেতৃত্ব দিতেন, তাঁরা হলেন তদানীন্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুবুজ্জামান, অর্থসচিব সাইদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্রসচিব শামসুল হক চিশতি ও শিক্ষাসচিব আজহার আলী। ওই আলোচনায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল থাকার বিষয়টি নজির হিসেবে আমরা নথিপত্রসহ উপস্থাপন করেছিলাম, যেখানে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ আমাদের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার ভালো যুক্তি রয়েছে। এই দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য যে আলাদা বেতন স্কেল রয়েছে, সেগুলোর প্রারম্ভিক স্কেল সিভিল আমলাতন্ত্রের প্রারম্ভিক পদের পর দুটো প্রমোশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তুলনীয়, এবং জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপকদের সর্বোচ্চ বেতন সরকারের সচিবদের বেতনের প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে, শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা সবচেয়ে বেশি মর্যাদাপ্রাপ্ত। ভারতে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসরের সর্বোচ্চ বেতন দুই লাখ ভারতীয় রুপিরও বেশি। দেশের সর্বোচ্চ মেধাকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা এবং জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয় আকর্ষণ করার যুক্তি এসব দেশে স্বীকৃত হলেও আমরা উল্লিখিত ওই চারজন তদানীন্তন প্রবল শক্তিধর উচ্চতম পদাধিকারী আমলাকে আলাদা বেতন স্কেল প্রদানের প্রস্তাবে রাজি করাতে পারিনি। তবে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চাকরির বয়সসীমা ৬৫ বছরে বৃদ্ধির দাবিটি মেনে নিয়েছিলেন এবং আরও কয়েকটি নতুন সুযোগ-সুবিধা চালু করতে সম্মত হয়েছিলেন। তাঁরা আরও আশ্বস্ত করেছিলেন যে জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ গ্রেডে প্রফেসরদের সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণের বিষয়টি প্রতিবারই অনুসৃত হবে।
এরশাদ সরকার যেহেতু অনির্বাচিত সামরিক সরকার ছিল, তাই সিভিল আমলাতন্ত্রকে খেপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেশি সুবিধা দেওয়ার কোনো তাগিদ এরশাদের না থাকারই কথা! ওই সময় এরশাদ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের একটা সরল স্বীকারোক্তি এখনো আমার কানে বাজে। আমরা তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছে এ ব্যাপারে গেলে কোনো সহায়তা পাব কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘যেতে পারেন, তবে তাঁর চাইতে আমি পাওয়ারফুল। আমার সাথে তিন শব্দের পদবি আছে, কিন্তু ওনার পদবি দুই শব্দের। বরং পারলে আপনারা ডিজিএফআই চিফের কাছে যান। এই চারজন সচিবের সিদ্ধান্ত পাল্টাবার ক্ষমতা রাখেন একমাত্র তিনি।’
আমরা যা বোঝার বুঝে ফেলেছিলাম, ওখানে আর যাইনি। একটা আংশিক বিজয়/আংশিক পরাজয় নিয়ে আমরা ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতির বিবেচনায় ৪২ দিনের আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে ক্লাসে ফিরে গিয়েছিলাম। আলাদা বেতন স্কেলের ন্যায্য দাবিটা ওই সময়ের পরে আর জোরগলায় উচ্চারিত হয়নি, যদিও ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন এ সম্পর্কে আশার বাণী উচ্চারিত হয়েছিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যে। পরে আবারও আমলাতন্ত্রের বিরোধিতার কারণে সব প্রয়াস ঝিমিয়ে পড়তে দেরি হয়নি। এরপরের সব নতুন স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ গ্রেডে রাখা হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে বেতন কমিশনের সুপারিশের অপেক্ষা না করেই হঠাৎ সিনিয়র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে উচ্চতর বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। আবার, সশস্ত্র বাহিনীর বেতন স্কেলকেও জাতীয় বেতন স্কেল থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের নামিয়ে দেওয়া হলো চতুর্থ সর্বোচ্চ বেতনের গ্রেডে।
এ পর্যায়ে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রয়োজন। উচ্চতর শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ব্যাপারে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকদের জাতক্রোধ ছিল। কারণ, সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট ও সিভিল আমলাতন্ত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা হাইজ্যাক করার পর জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদানের দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরাই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ‘প্রতিপক্ষ’ বানানোর অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাকিস্তানের শাসক মহল, সিভিল প্রশাসনের আমলা ও সামরিক অফিসারদের মধ্যে দৃঢ়মূল ছিল বরাবরই। এই অসুস্থ রাজনৈতিক কালচারের কারণেই হয়তো সামরিক জান্তা ও আমলাতন্ত্র-নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে সিএসপি ক্যাডারে এবং সামরিক বাহিনীতে সর্বোচ্চ মেধাকে জড়ো করার ভ্রান্ত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে ১৯৪৮ সাল থেকে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের আইসিএসের আদলে সে জন্য সুপেরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো ফলাফল করা প্রার্থীদের সিএসপি ক্যাডারের লোভনীয় চাকরিতে আকর্ষণ করা হয়েছে, এবং সামরিক বাহিনীতে ভালো ছাত্রদের আকর্ষণ করার জন্য পরবর্তী সময়ে ক্যাডেট কলেজগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সরকার কর্তৃক গঠিত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে ক্যাডেট কলেজগুলোকে মূলধারার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত করে একক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সরকার ওই রিপোর্টের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে বরং আরও নতুন নতুন ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করেছে। পরবর্তী সময়ে এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারের সময় আরও কয়েকটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়েছে এ দেশে। ধনাঢ্য পিতা-মাতার সন্তানদের জন্য ক্যাডেট কলেজ ও ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল-কলেজ এবং নিম্নবিত্ত পিতা-মাতার সন্তানদের জন্য মাদ্রাসাশিক্ষাকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের এই নীতি যে অনৈতিক ও অসাংবিধানিক, সেটা আমাদের শাসক মহলকে বোঝাতে পারছি না। বরং, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ১৯৯২ সালে এ দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেসক্রিপশন মোতাবেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক শুরু হয়েছে শিক্ষার বাজারীকরণের দর্শন অনুসারীদের অত্যুৎসাহে। ফলে এখন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দিন দিন মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে ওই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চতর বেতন-ভাতার কারণে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেলে যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আরও বেতনবৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার করা হয়, তাহলে বর্তমান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিকল্পিতভাবে মেধাশূন্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক তাঁর প্রারম্ভিক বেতন-ভাতা দিয়ে মাসের অর্ধেক সময়ও সম্মানজনকভাবে সংসারের খরচ মেটাতে পারছেন না। (তাঁর তো ঘুষ খাওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না)। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতাকে কেন এই অবমূল্যায়ন?
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নারীদের একটি নীরব নির্বাচন by তোফায়েল আহমেদ

সারা দেশে উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। চলছে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড, কিন্তু খুব নীরবে। এ নীরবতার নানা কারণ—প্রথমত, নির্বাচনটি শুধু নারীদের, তাই নড়াচড়া কম। দ্বিতীয়ত, বহুবিলম্বিত এ নির্বাচন। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সময়ের মধ্যে পরপর আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে জাতীয় নির্বাচনের সব বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে দু-দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হলেও পরোক্ষ নির্বাচনের বিধানের অধীনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনটি সম্পন্ন করার বিষয়টি বারবার আড়ালে থেকে যায়। দেশে নারী অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক অনেক সংস্থা ও সংগঠন কাজ করলেও কেউই এ বিষয়টিতে মনোযোগী বা সোচ্চার ছিল না। স্থানীয় সরকার বিভাগ এ নির্বাচনটির বিষয়ে বরাবরই আগ্রহ দেখিয়েছে। নির্বাচন কমিশন অজানা কারণে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখে। অবশেষে দুই পরিষদেরও ছয় বছর গত হতে চলল, এবার নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হয়েছে গত ২১ মে এবং নির্বাচন হতে যাচ্ছে ১৫ জুন।
এ নির্বাচন নিয়ে নারী-পুরুষ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, এমনকি নারী সংগঠন—কারও কোনো প্রতিক্রিয়া, সরবতা নেই। নীরবে, নিভৃতে এ নির্বাচনের তিনটি পর্ব মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং প্রতীক বরাদ্দের কাজ সম্পন্ন হলো। জানা গেছে, ৩ হাজার ১১৫ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় আছেন ২ হাজার ৮৬৬ জন। খুব সম্ভবত কমবেশি ১ হাজার ৮০০ নারী উপজেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে সংরক্ষিত মহিলা আসনে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্বশীলতা বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে।
নির্বাচনটি নীরবে হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিষদের নিয়মিত সভা, স্থায়ী কমিটিগুলোর পুনর্গঠন এবং সভা অনুষ্ঠানে এ নির্বাচনের একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদগুলোর কিছু আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণে আবারও কালক্ষেপণ কাম্য নয়। অবশ্য ইতিমধ্যে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ আসন্ন রমজানের পরপরই নবনির্বাচিতদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে রেখেছে। সেটি খুবই আশার কথা। আশা করা যায়, নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজ নিজ ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার দায়িত্বের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের স্থায়ী কমিটি, পরিকল্পনা ও বাজেট প্রভৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোয় সংরক্ষিত আসনে নারীদের নির্বাচনের ব্যবস্থাটি কার্যকর রয়েছে। প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা তাঁদের উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারেন না। উপজেলা পরিষদেও নবনির্বাচিতরা নির্বিঘ্নতার সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবেন না, তা নয়। তবে সব পক্ষ থেকে এখানে সহযোগিতা ও সক্ষমতার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। উপজেলা পরিষদ শুরু থেকেই নানা রকমের সাংগঠনিক, প্রশাসনিক, আইনগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় আড়ষ্ট। নবনির্বাচিত নারী প্রতিনিধিকেও সে সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির সুবিধা-অসুবিধাগুলো বুঝতে হবে। সে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকারিতার পথে ধাবিত করার ক্ষেত্রে অন্যান্য জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রধানদের তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়ররা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী হলেও তাঁরা উপজেলা পরিষদের সদস্যমাত্র। এ ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদের নারী সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়ররা সমমর্যাদায় সদস্য—এ বিষয়টিকে সসম্মানে মেনে নিতে হবে। এ জন্য সম্মানিত সদস্য হিসেবে পরিষদে বিভিন্ন সভা ও ফোরামে অবদান রাখার জন্য সমান সক্ষমতা নারীদেরও অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিষদকে নবাগত সদস্যদের জন্য কাজ করার পরিসর বিশেষ করে, প্রাথমিক অবস্থায় তাঁদের উপজেলা পরিষদে যাতায়াত ও অবস্থানকালীন আর্থিক সহায়তার স্পষ্ট বিধান করে নিতে হবে। আর্থিক বছরের শুরুতে এই নির্বাচনটি হওয়ার কারণে নবনির্বাচিত সদস্যরা উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নবিষয়ক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। এ সুযোগটি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশিক্ষণটি বিশেষভাবে কাজে লাগতে পারে। তবে এখানে একটি সীমাবদ্ধতার কথাও বলে রাখা ভালো, এ সদস্যদের কার্যকাল আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কারণ, বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার বেশির ভাগের কার্যকাল বা মেয়াদ ২০১৬ সালে প্রথমার্ধের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ২০১৬ সালে আবারও নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন পড়বে।
সে জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে পরবর্তী ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের প্রথম তিন মাসের মধ্যেই পুনরায় উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এটিও হয়তো সময়ের কাজ সময়ে না করার খেসারত। দেশে অন্তত বিলম্ব হলেও চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নারী সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গতা পেতে যাচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ উপজেলা পরিষদের এ নবযাত্রা শুভ হোক।
ড. তোফায়েল আহমেদ: পরিচালক-গভর্ন্যান্স, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং বিশেষ ফেলো, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

মোটরযান চলাচলে ৪ দেশের চুক্তি সই

বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে সড়ক পথে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের রূপরেখা চুক্তি সই হয়েছে। গতকাল ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে চার দেশের পরিবহনমন্ত্রীরা এই চুক্তিতে সই করেন। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর চার দেশের যে কোন ধরনের মোটরযান অবাধ যাতায়াত করতে পারবে। চুক্তিটি সইয়ের পর লন্ডন থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোন করে চার দেশের পরিবহনমন্ত্রীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। রূপরেখা চুক্তির পর কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে চলতি বছরের শেষের দিকে মূল চুক্তি এবং এটি বাস্তবায়নে পৃথক একটি প্রটোকল সই হবে। সম্ভাব্য রুটগুলোতে আগামী অক্টোবর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে যান চলাচল শুরু হবে। তার আগে চলাচল পথের সমীক্ষা, পরীক্ষামূলক চলাচল ও অভিবাসন সুবিধা পর্যালোচনা করা হবে। আগামী বছরের শুরুতে চার দেশের মধ্যে পুরোপুরি যান চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তির অধীনে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি চলতে পারবে। শুল্ক ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে নিজ নিজ দেশের আইনে। তবে  ট্রানজিট ও চলাচলের অনুমতি সংক্রান্ত ফি নির্ধারণ আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে। জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক (সাসেক) কৌশলগত বাণিজ্য সম্প্রসারণ রূপরেখার ওপর ভিত্তি করেই এ চুক্তি সই হয়েছে। সাসেক রূপরেখা ২০১৪ সালের মার্চে এই চার দেশ অনুমোদন করে। এদিকে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে ভারত অনুরূপ মোটরযান চলাচল চুক্তি করতে চলেছে। ভারতের সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রী নীতিন গড়গড়ি এ সংবাদ জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে এশীয় অঞ্চলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিগন্ত উন্মোচিত হবে। চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক জানিয়েছেন, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে যেমন, তেমনি ভারত, নেপাল বা ভুটানেরও কোন পর্যটক তাদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ে বা বাসে চড়ে বাংলাদেশে বেড়াতে আসতে পারবেন। অবশ্য এ জন্য একটি রুট পারমিট দরকার হবে। প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে ভ্রমণের আগে রুট পারমিট নিতে হবে, আর নিয়মিত যাতায়াত করবে এমন বাস বা পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ মেয়াদে জন্য রুট পারমিট পাওয়া যাবে।
সচিব পর্যায়ের সিরিজ আলোচনা, মন্ত্রীদের সই: একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে গত রোববার থেকে থিম্পুতে সিরিজ আলোচনা হয়েছে চার দেশের সচিবদের মধ্যে। গতকাল দুপুরের আগ পর্যন্ত ওই আলোচনা চলে। অতঃপর বেলা ১২টার দিকে থিম্পুর লা  মেরিডিয়ান হোটেলে প্রতিবেশী চার দেশে মধ্যে সড়ক পরিবহনের রূপরেখা চুক্তি সই হয়। যেখানে বাংলাদেশের পক্ষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সই করেন। চুক্তিতে ভুটানের তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী লিনোপো ডি এন ধুঙ্গিয়েল, ভারতের সড়ক পরিবহন, মহাসড়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রী নীতিন গড়গড়ি এবং নেপালের ভৌত অবকাঠামো ও পরিবহনমন্ত্রী বিমলেন্দ্র নিধি নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝ্যাং অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি অনুষ্ঠানের উদ্বোধনীতে দেয়া বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের বলেন, আজ আমরা আঞ্চলিক সংযোগের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে একত্রিত হয়েছি।
সইয়ের পর যৌথ বিবৃতি: এদিকে চুক্তি সইয়ের পর চার দেশের মন্ত্রীরা একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়, চার দেশের মধ্যে মোটরযান চলাচলের এই চুক্তিটি বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে কার্যকর সব পরিবহন চুক্তি ও ব্যবস্থাগুলোর সম্পূরক হবে, যেগুলো চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সব পক্ষ মেনে চলবে। এই চুক্তি বাস্তবায়নে কোন জটিলতা দেখা দিলে ‘বিবিআইএন মোটরযান চলাচল চুক্তি’র বিধান অনুযায়ী তা নিষ্পত্তি করা হবে। অক্টোবরের মধ্যে চুক্তির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন এবং আগস্টের মধ্যে প্রটোকলসহ চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে চূড়ান্ত বাস্তবায়নে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাইয়ের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দ্বিপক্ষীয় (ত্রিপক্ষীয়/চতুর্পক্ষীয়) চুক্তি/প্রটোকলের প্রস্তুতি, সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব চুক্তি/প্রটোকল নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে অনুমোদিত চুক্তিগুলোর জন্য পূর্বশর্ত (তথ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থা, অবকাঠামো, ট্র্যাকিং, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) স্থাপন করা হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, চার দেশের মধ্যে এ উদ্যোগের অধীনে উপ-আঞ্চলিক সংযোগ এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্র ও সুবিধাগুলো তুলে ধরতে অক্টোবরে বিবিআইএন ফ্রেন্ডশিপ মোটর র‌্যালি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ কর্মপরিকল্পনা পর্যবেক্ষণে জাতীয় স্থল পরিবহন ত্বরান্বিতকরণ কমিটিগুলোর (নোডাল) কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং এর বাস্তবায়নের গতিতে কোন সমস্যা উদ্ভূত হলে তা দ্রুত নজরে আনতে বলা হয়েছে। চার দেশের মধ্যে আন্তঃসংযোগ ত্বরান্বিত করতে দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক (সাসেক) কর্মসূচি বাস্তবায়নে এডিবির সহায়তা করছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। গত ৮ই জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে যানবাহন চলাচলে ‘বিবিআইএন মোটর ভেহিকেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এমভিএ)’ সইয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, চলাচলে রুট পারমিট বাধ্যতামূলক। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার সময় মাঝপথে কোন যাত্রী বা মালামাল তোলা যাবে না। যে দেশের ওপর দিয়ে যানবাহন যাবে, সেই দেশের কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে তা ‘সার্চ’ ও ‘ইন্সপেকশন’ করতে পারবে। কোন দেশে নিষিদ্ধ থাকা পণ্য সে দেশের ওপর দিয়ে পরিবহন করা যাবে না। চুক্তির আওতায় যান চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশ নিজেদের নির্ধারিত হারে ‘ট্রানজিট ফি’ আদায় করবে। রূপরেখা চুক্তি অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে চারটি দেশে পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রীবাহী পরিবহন চলবে। এজন্য যানবাহনের নিজ নিজ দেশের ফিটনেস সনদ এবং যানবাহনের বৈধ মালিকানার দলিল থাকতে হবে। গাড়ির চালকের নিজ নিজ দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে এবং যাত্রীদের ভ্রমণ দলিল বা পাসপোর্ট ও যে দেশে যাবেন সে দেশের ভিসার প্রয়োজন হবে। ওই চুক্তির পর নতুন কোন চুক্তি হলে এক দেশ অন্য দেশের ভূমি ব্যবহার করে তৃতীয় দেশেও যেতে পারবে। অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে চুক্তিটা করা হয়েছে।
চলাচলের পথ: বাংলাদেশে এখন ২০টি স্থলবন্দর রয়েছে। এর ১৯টিই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। টেকনাফ বন্দরটি মিয়ানমারের সঙ্গে। বিদ্যমান সব বন্দর দিয়েই বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে। তবে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে যাওয়া-আসার জন্য প্রাথমিকভাবে দুটি করে চারটি পথ ঠিক করা হয়েছে। নেপালে যেতে ঢাকা-বাংলাবান্ধা-জলপাইগুড়ি-কাকরভিটা এবং ঢাকা-বুড়িমারী চেংরাবান্দা এ দুটি পথ ব্যবহার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আর ভুটানের পথ দুটি হচ্ছে ঢাকা-বুড়িমারী-চেংরাবান্দা এবং অন্যটি ঢাকা-সিলেট-শিলং-গুয়াহাটি। সমপ্রতি ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি পথে যে বাস চালু করা হয়েছে, সেটি দিয়ে ইতিমধ্যে কয়েকজন ভুটানি ভ্রমণ করেছেন।
যান চলবে যেভাবে: ব্যক্তিগত গাড়ি অনিয়মিত যান হিসেবে বিবেচিত হবে। পর্যটন, তীর্থযাত্রা, বিয়ে অনুষ্ঠান, চিকিৎসা, শিক্ষা সফর, রেলস্টেশনে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতে আগ্রহীরা সর্বোচ্চ ৩০ দিনের ভ্রমণ-অনুমতি পাবেন। এ ধরনের যাত্রীদের যাত্রাকালে জ্বালানি ভরে যেতে হবে। কোন শুল্ক না দিয়েই নিতে পারবেন প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ। পথে জ্বালানির দরকার হলে ভর্তুকিবিহীন দামে জ্বালানি নিতে হবে। দুর্ঘটনায় পড়লে নিজ নিজ দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। গাড়ি নিয়ে যতবার ভ্রমণ ততবার নতুন করে অনুমোদন নিতে হবে। যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনগুলো রঙ হবে সাদা রঙের। দুই পাশে হলুদ রঙ দিয়ে ইংরেজি এবং নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিবহনের নাম, দেশের নাম, যাত্রা শুরু ও শেষের স্থানের নাম এবং পথের বর্ণনা লিখতে হবে।
এ প্রক্রিয়ায় অন্য দেশও যুক্ত হতে পারবে: খসড়া রূপরেখা চুক্তিতে বলা হয়েছে, উল্লেখিত চার দেশের বাইরে অন্য কোন দেশ চাইলে এ অবাধ যান চলাচল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে। তবে চার দেশের কেউ দ্বিমত করলে অন্তর্ভুক্তি আটকে যাবে। চুক্তিতে সই করা কোন দেশ এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে অন্যদের লিখিতভাবে জানাতে হবে। এরপর চার দেশের পরিবহন সচিবরা ৩০ দিনের মধ্যে আলোচনায় বসে পরবর্তী করণীয় ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবেন। চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার লিখিত আবেদন বাকি তিন দেশের হাতে পৌঁছানোর দিন থেকে পরবর্তী ছয় মাস পর তা কার্যকর হবে।

বীথির কষ্টকথা by মিজানুর রহমান মিন্টু

কুড়িগ্রাম পৌর এলাকার নাজিরা কামারপাড়ার বাস শ্রমিক সিদ্দিকুর রহমানের কন্যা সুমাইয়া আক্তার বীথি এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ক্ষুধা আর দরিদ্রতাকে জয় করে বীথি গৌরবময় সাফল্য অর্জন করে কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে। সে একজন প্রকৌশলী হবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এ স্বপ্নের মাঝে প্রধান বাধা দরিদ্রতা। এ কারণে বীথির দুচোখে এখন শুধুই অন্ধকার। কিভাবে চলবে আগামী দিনের লেখাপড়া? এ ভাবনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। পাঁচ জনের সংসারের যাঁতাকল টানতে মা ফাতেমা বেগম বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালছে। তারপরও নুন আনতে পান্থা ফুরার অবস্থা। সুমাইয়া আক্তার বীথি জানায়, ছিল না ভাল পোশাক, ছিল না পুষ্টিকর খাবার। দিনের পর দিন না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়া হয়নি।একটা কোচিংয়ে অল্প কিছুদিন পড়েছে সে। এসএসসির ফরম ফিলাপের টাকা ছিল না। স্কুলের দরিদ্র তহবিল থেকে সহায়তা নিয়ে ফরম ফিলাপ করে।
কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রোখসানা পারভীন জানান, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং বীথির নিবিড় চেষ্টা আর অদম্য শক্তির জোরে এ অভাবনীয় সাফল্য আসে। অনেক সুবিধাভোগী মেয়ে ভাল ফলাফল করতে পারেনি। সেখানে বীথির আলোকিত সাফল্য আমাদের গর্বিত করেছে। বীথির আগামী দিনের স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন হৃদয়বান ব্যক্তিদের সহযোগিতা।

লোকালয়ে গুল তৈরির কারখানা, ধুঁকছে সবাই

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচার দক্ষিণ
বালাপাড়া গ্রামের বাদশা গুল ফ্যাক্টরিতে তামাকের গুঁড়া
কৌটায় ভরছেন দুজন নারী শ্রমিক। ছবি -প্রথম আলো
বাতাসে তামাক পোড়ার তীব্র গন্ধ। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ অবস্থান করলেই বমি বমি ভাব আসে। ৭ জুন বেলা একটার দিকে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা বাজারের একটি চায়ের দোকানে গেলে তামাক পোড়ার ওই কটু গন্ধ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় সে দোকানটিতে বেশিক্ষণ বসে থাকা যায়নি।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, বাজারের কাছেই দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামে একটি গুল তৈরির কারখানা আছে। এই গন্ধের উৎস সে কারখানাটিই। নাম ‘বাদশা গুল ফ্যাক্টরি’। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়েই লোকালয়ে কারখানা স্থাপন করেছেন স্থানীয় রহমত আলী। কারখানা থেকে আসা তামাকপাতা গুঁড়ো করার যন্ত্রের শব্দ আর দুর্গন্ধে স্থানীয় লোকজন চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় ওই এলাকার মহিষখোঁচা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের।
লালমনিরহাট সিভিল সার্জন আ স ম আবদুছ ছামাদ বলেন, তামাকজাত গুল, জর্দাসহ অন্যান্য নেশাদ্রব্য ব্যবহারে মুখ ও ফুসফুসের ক্যানসার, পাকস্থলীতে পানি জমা হওয়া, ক্ষুধা মন্দাসহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুজন শ্রমিক তামাকের পাতা ও ডাটা একটি যন্ত্র দিয়ে গুঁড়ো করার কাজে ব্যস্ত। তামাক গুঁড়া হওয়ার পর তা দু-তিনটি বড় পাত্রে মেঝেতে রাখা হচ্ছে। আরেক পাশে একটি খোলা টিনের চালার নিচে গুঁড়ো করা তামাক ছোট ছোট কৌটায় ভরছেন চার নারী শ্রমিক। তাঁরা কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
কারখানা-সংলগ্ন মহিষখোঁচা বাজার এলাকা এবং আশপাশের ডাওয়াইটারি ও রসুলপাড়া গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, গুল তৈরির সময় বিশেষ করে যখন বাতাসের খুব জোর থাকে তখন তামাকের তীব্র গন্ধে বাড়িতে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। ছোট ছেলেমেয়েদের হাঁচি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
কারখানার পাশের মহিষখোঁচা বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম বলেন, ‘তিন-চার মাস আগে স্কুল শাখার বাংলা শিক্ষক নূর আলম সেফাউলসহ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী তামাক পোড়ার গন্ধে বিদ্যালয়েই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিষয়টি আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলাম।’
কারখানার মালিক রহমত আলী ও তাঁর ছেলে বাদশা আলম জানান, তাঁরা মহিষখোঁচা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ১০ বছর আগে এই গুল তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা স্বীকার করেন, কারখানা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র বা অনুমতি নেননি। মহিষখোঁচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘ওদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছি। গুল তৈরির কারখানার স্থাপনের কারণে পরিবেশ দূষণের দিকটি দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় বগুড়ার পরিচালক এ কে এম মাসুদুজ্জামান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা অনুমোদন না নিয়ে বাদশা গুল ফ্যাক্টরিটি বেআইনিভাবে চালু রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় খুব দ্রুত কারখানাটি পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উত্তরের পাঁচ জেলায় বন্যা, ভাঙন

যমুনার পানির তোড়ে চৌহালীর উত্তর খাসকাউলিয়া গ্রামে এই
সেতুর দুই পাশের সড়ক নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ছবি -প্রথম আলো
টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কারণে উত্তরের পাঁচ জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। যমুনা, তিস্তাসহ কয়েকটি নদ-নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। কুড়িগ্রামের ছয় উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে। বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উঁচু সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় ব্রহ্মপুত্রে ও সিরাজগঞ্জে যমুনায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রামে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যায় তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমারের তীরবর্তী তিন শতাধিক গ্রাম ও চরের প্রায় ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গতকাল রোববার দুধকুমার নদের পানির তোড়ে সোনাহাট সেতুর পশ্চিম প্রান্তের সংযোগ সড়কের ৫০ মিটার এলাকায় ধস দেখা দেওয়ায় এই পথে ভারী যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাফুজার রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রে ২ সেন্টিমিটার, তিস্তায় ১৪ সেন্টিমিটার ও দুধকুমারে ৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। ধরলায় ৬ সেন্টিমিটার পানি কমলেও তা বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। কুড়িগ্রাম সদরসহ ছয় উপজেলার ৪২টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নদ-নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। টানা পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দী থাকায় দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। অনেকেই ঘরের ভেতর উঁচু মাচায় আশ্রয় নিলেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি ও খাবারের সংকট।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ঘাট থেকে নৌকায় পোড়ার চরে গিয়ে দেখা যায়, ২০টি বাড়িতে পানি উঠেছে। স্থানীয় দিনমজুর হাফিজুর রহমান একটি খড়ির বোঝা নিয়ে যাত্রাপুর হাটে যাচ্ছেন। কী করবেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিক্রি কইরা চাউল আনুম। বন্যার মধ্যে কোনো কাম নাই। এক সপ্তাহ থাইকা বইসা। কী যে হইব, জানি না।’ যাত্রাপুর ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল গফুর জানান, তাঁর ইউনিয়নে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত। এর মধ্যে আড়াই হাজার বাড়ির মানুষ পানিবন্দী। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো বরাদ্দ পাননি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল মোত্তালেব মোল্লা জানান, উপজেলা থেকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা পেলেই ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হবে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক এ বি এম আজাদ জানান, ত্রাণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও পাঁচ লাখ টাকা চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফ্যাক্সবার্তা পাঠানো হয়েছে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। পানির তোড়ে বিকল্প বাঁধ ভেঙে উপজেলার দুটি ইউনিয়নে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেকে টিনের চালা ও বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। এলাকায় খাদ্য ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা পুলিশের উদ্যোগে ৫০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ ছাড়া গতকাল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। এদিকে দুর্গত এলাকার ২০টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পাউবো বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন জানান, যমুনায় বিপৎসীমার দশমিক ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নির্মাণাধীন বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সারিয়াকান্দির কামালপুর ও চন্দনবাইশা এবং ধুনটের চিকাশী ও গোসাইবাড়ী ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিয়েছে।
রোহদহ বাঁধে আশ্রয় নেওয়া আচিরন বেওয়া (৭০) বলেন, ‘তিন দিন আগে বাঁধত আসি উঠিচি। না খ্যায়া দিন যাচ্চে।’
বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের পূর্ব পাশে অন্তত ১০ গ্রামের তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলো বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, অসময়ে বন্যার পানি ওঠায় প্রায় দুই হাজার একর জমির বিভিন্ন ধরনের ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভান্ডারবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান আতিকুল করিম জানান, তাঁর এলাকায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার প্রায় ২৫টি গ্রামের ১০ সহস্রাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। ডিমলার পূর্ব ছাতনাই ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ খান জানান, তিস্তার পানি গতকালও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গত শনিবার শুরু হওয়া বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ইউনিয়নের তিস্তাবেষ্টিত ঝাড়সিংহেরশ্বর ও পূর্ব ছাতনাই গ্রামের পাঁচ শতাধিক বাড়িতে পানি উঠেছে। মানুষজন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
গাইবান্ধায় গত ২৪ ঘণ্টায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা, কাপাসিয়া, সদর উপজেলার কামারজানি ও সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হলো। এসব ইউনিয়নে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেকে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন সরকারি জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল মিয়া জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুলছড়ি উপজেলার সিংড়িয়া, রতনপুর, কালাসোনা, কামারপাড়া, জিয়াডাঙ্গা, রসুলপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। গত তিন দিনে এসব গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর ও অসংখ্য গাছপালা বিলীন হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে তিন দিন ধরে যমুনায় অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির কারণে সদর, কাজীপুর ও চৌহালী উপজেলায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলায় পাউবোর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার এলাকা ধসে গেছে।
কাজীপুর উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামান জানান, মেঘাই ১ নম্বর স্পারে পানি বাধা পেয়ে ভাটিতে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়ে ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
এদিকে চৌহালী উপজেলার যমুনা নদীর পূর্ব তীর এলাকার বোয়ালকান্দি থেকে চৌদ্দরশি পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এবং খাসপুকুরিয়া থেকে মেটুয়ানী পর্যন্ত চার কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। গত তিন দিনে প্রায় সাড়ে পাঁচ শ বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। মেটুয়ানী গ্রামের শিক্ষক মাজেদুল ইসলাম বলেন, ভাঙন যেভাবে চলছে, তাতে চৌহালীর মূল ভূখণ্ড আর থাকবে না।
চৌহালীর উত্তর খাসকাউলিয়া গ্রামে গতকাল বেলা তিনটার দিকে যমুনার পানির তোড়ে একটি সেতুর দুই পাশের সড়ক ধসে গেছে। ফলে ওই সড়কের দুই পাশের মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি গতকাল বেলা তিনটায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই দিন সকাল ছয়টায় বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার এবং দুপুর ১২টায় ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে তিস্তার পানি প্রবাহিত হচ্ছিল।
ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি পরিমাপক গেজ লিডার নুরুল ইসলাম জানান, নতুন করে বৃষ্টি না হলে বা আবার ভারত থেকে পাহাড়ি ঢল না এলে রোববার (গতকাল) রাতের মধ্যেই তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকবে।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কুড়িগ্রাম অফিস, বগুড়া, লালমনিরহাট, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা ও ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি}

বাল্যবিবাহমুক্ত গ্রামের প্রত্যয় by আব্দুল আজিজ

বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন রোধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রামের
কিশোরীদের নিয়ে উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
সম্প্রতি জামালপুর সদর উপজেলার কানিল গ্রাম থেকে তোলা ছবি
গ্রামের কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পেলেই ছুটে যাচ্ছেন তাঁরা। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করছেন কিশোরীদের। ঘুরে ঘুরে সচেতন করার চেষ্টা করছেন সবাইকে। এভাবে জামালপুরে সাতটি উপজেলার সাতটি গ্রামকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছেন সেখানকার গ্রাম্য দূতেরা।
গত তিন মাসে তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রায় ১৫ জন কিশোরী বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পেয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাম্য দূতেরা নারী নির্যাতন রোধেও কাজ করছেন।
সদ্য বদলি হওয়া জামালপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) নজরুল ইসলামের উদ্যোগে গত বছর গ্রাম্য দূতদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার কানিল, মেলান্দহের বীর ঘোষেরপাড়া, ইসলামপুরের কুড়িপাড়া, দেওয়ানগঞ্জের দফরপাড়া, বকশীগঞ্জের বাঙালপাড়া, মাদারগঞ্জের বাকুরচর এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার শিবপুর গ্রামকে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ওই সাতটি গ্রামের লোকজনের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন রোধে গ্রাম্য দূত হিসেবে একজন করে নারী দায়িত্ব পান।
সাতটি উপজেলার গ্রাম্য দূতেরা গ্রামের প্রতিটি পরিবারের সদস্য ও কিশোরীদের নিয়ে মাসে একবার করে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের তালিকা তৈরি, গ্রামের সচেতন নাগরিক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তাঁদের সঙ্গে সাতটি গ্রামে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা ২৩০ জন কিশোরী যোগ দিয়েছে।
বকশীগঞ্জ উপজেলার বাঙালপাড়া গ্রামের গ্রাম্য দূত কাজলরেখা জানান, তিনি প্রতি মাসে তাঁর বাড়িতে প্রায় ১০০ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উঠান বৈঠক করেন। সেখানে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দিলে অপুষ্ট মায়ের অপুষ্ট শিশু ছাড়াও সন্তান দুর্বল, এমনকি বিকলাঙ্গও হতে পারে।
সম্প্রতি তাঁরা সবাই ওই গ্রামের পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া এক ছাত্রীকে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এ ছাড়া গত মাসে নির্যাতিত এক নারীকে এসপির কাছে নিয়ে আইনি সহায়তা পাইয়ে দিয়েছেন।
মাদারগঞ্জ উপজেলার বাকুরচরের গ্রাম্য দূত রিনা আক্তার বলেন, বাল্যবিবাহ সম্পর্কে প্রথম দিকে গ্রামে সচেতনতা সৃষ্টিতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। এখন তাঁর সঙ্গে আরও ২৬ জন কিশোরী আছে, যারা এ ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে।
গ্রামের ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে কোনো মেয়ের বিয়ের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ওই বাড়ির লোকজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের কার্যক্রম বন্ধ করেন। গত চার মাসে এমন পাঁচটি বিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ করা হয়েছে।
সদর উপজেলায় কানিল গ্রামের এক স্কুলছাত্রীর বাবা জানান, সম্প্রতি তাঁর মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বিয়ের কয়েক দিন আগে তাঁদের গ্রাম্য দূত হাছনা খানের নেতৃত্বে প্রায় ১৫ থেকে ২০ নারী দুই দিন ধরে তাঁদের বুঝিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দেন। এরপর তাঁর মেয়ে আবার বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করেছে।
গ্রাম্য দূতদের বাল্যবিবাহ সম্পর্কে জানানো ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের জেন্ডারবিষয়ক জামালপুরের কর্মকর্তা আকলিমা জেসমিন। এখানে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের অংশগ্রহণও জরুরি।
নজরুল ইসলাম বলেন, জেলার সব গ্রামে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন বন্ধ করা অল্প সময়ে সম্ভব নয়। তাই প্রথম ধাপে এভাবে কাজ শুরু করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি শুধু ধনবানদের জন্য নয় -নিউইয়র্কে নির্বাচনী প্রচারণায় হিলারি by হাসান ফেরদৌস

ম্যানহাটন ও কুইন্সের মাঝখানে ক্ষুদ্র একখণ্ড দ্বীপ রুজভেল্ট আইল্যান্ড। দড়িপথে ম্যানহাটনে পৌঁছাতে বড়জোর ১০ মিনিট। ইস্ট রিভারের পাড়ে এই দ্বীপটির ওপর চার একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘ফোর ফ্রিডমস পার্ক’, যা যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত। শনিবার এখানেই তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম উল্লেখযোগ্য ভাষণটি দিলেন হিলারি ক্লিনটন। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রার্থিতা ঘোষণার পর প্রায় দুই মাস হয়ে গেলেও এর আগ পর্যন্ত হিলারি ক্লিনটন কোনো বড় ধরনের নির্বাচনী সভা করেননি। বিভিন্ন শহরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুষ্ঠান করেছেন মার্কিন নাগরিকদের কথা শুনতে। বাকি সময় কাটিয়েছেন নির্বাচনী তহবিলের জন্য চাঁদা সংগ্রহে।
শনিবারের বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনী সভায় হিলারি অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন তিনি কেন প্রেসিডেন্ট হতে চান, সে কথার ব্যাখ্যায়। হিলারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর এই লড়াই। যারা ওপরে উঠতে চেয়ে বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, অথচ নুয়ে পড়েনি, তিনি তাদের জন্য লড়বেন।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি শুধু করপোরেশনগুলোর প্রধান নির্বাহীদের ও হেজ ফান্ড ম্যানেজারদের জন্য হতে পারে না। গণতন্ত্র শুধু বিলিয়নিয়ার ও করপোরেশনগুলোর জন্য হতে পারে না। সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রে সবার সমান অধিকার রয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা থেকে আপনারাই এ দেশকে ফিরিয়ে এনেছেন। এখন আপনাদের সময় এসেছে সেই সমৃদ্ধির ভাগ নেওয়ার এবং সামনে এগিয়ে চলার।’
হিলারি তাঁর ভাষণের একটি বড় অংশ ব্যয় করেন নিজের মায়ের পরিচয় তুলে ধরতে। অতিদারিদ্র্যের ভেতরে তাঁর শৈশব কেটেছে, অন্যের মহানুভবতায় তিনি লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন এবং অবশেষে জীবনে সাফল্য পেয়েছেন। ‘মা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন আমাদের কেন লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত, এমনকি যখন পথ বন্ধুর ও প্রতিপক্ষ প্রবল।’
হিলারির ভাষণের সময় তাঁর স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তাঁদের একমাত্র কন্যা চেলসি ক্লিনটন উপস্থিত ছিলেন, তবে তাঁরা কোনো বক্তব্য দেননি।
নিউইয়র্কের এই নির্বাচনী সভার মাধ্যমে হিলারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তাঁর প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনব্যবস্থায় দলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করতে এক দীর্ঘ ‘প্রাইমারি’ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি রাজ্যে প্রধান দুই দল ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি তাদের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী নির্বাচন করতে ‘প্রাথমিক ভোট’-এর ব্যবস্থা করে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলের সবচেয়ে অনুগত সদস্যরাই এই প্রাথমিক ভোটে অংশ নিয়ে থাকেন। সে কথা মাথায় রেখে প্রত্যেক প্রার্থী এই প্রাক্-নির্বাচনী পর্বে দলের কট্টর সমর্থকেরা খুশি হন, এমন বক্তব্যই দিয়ে থাকেন।
হিলারিও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিলেন না। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশ ইতিমধ্যে তাঁকে ওয়ালস্ট্রিট তথা ধনিক গোষ্ঠীর নিকট মিত্র হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ‘ক্লিনটন ফাউন্ডেশন’ ওয়ালস্ট্রিট ও বিভিন্ন বিদেশি দাতার কাছ থেকে মোটা চাঁদা নিয়েছে, এমন অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। নিউইয়র্কের বাম-ঘেঁষা মেয়র বিল ডি ব্লাজিও সরাসরি বলেছেন, অর্থনৈতিক সমতা প্রশ্নে সুস্পষ্ট কর্মসূচি না দেওয়া পর্যন্ত তিনি হিলারিকে সমর্থন জানাবেন না। ইতিমধ্যে আরও দুজন রাজনীতিক ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থিপদ ঘোষণা করেছেন। তাঁরা হলেন ভারমন্ট থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও ম্যারিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর মার্টিন ও’ম্যালে। তাঁরা উভয়েই ক্লিনটনের তুলনায় অধিকাংশ প্রশ্নে বেশি বামপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
এসব কথা মাথায় রেখেই হিলারি তাঁর ভাষণে ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যদের কাছে জনপ্রিয় হবে এমন বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, সমতা অর্জনের লক্ষ্যে সবার জন্য প্রাক্-স্কুলব্যবস্থা সমর্থন করবেন। কলেজ শিক্ষা যাতে নিম্নবিত্তদের সাধ্যের ভেতরে থাকে, সে উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ নেবেন এবং অবকাঠামো খাতে অধিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করবেন। হিলারি প্রেসিডেন্ট ওবামার স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানান এবং অভিবাসন প্রশ্নে রিপাবলিকান দলের কট্টর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশ্নেও তিনি নিজের স্পষ্ট সমর্থন ব্যক্ত করেন।
তিনি প্রার্থী হিসেবে বয়স্ক—রিপাবলিকান দলের এই সমালোচনার জবাবে হিলারি বলেন, ‘এ কথা ঠিক, চলতি প্রচারণায় আমি সবচেয়ে নবীন প্রার্থী নই। কিন্তু নির্বাচিত হলে আমি হব যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম নারী প্রেসিডেন্ট।’
শনিবার দুপুরে নিউইয়র্কের অনুষ্ঠান শেষেই আইওয়া অঙ্গরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন হিলারি ক্লিনটন। ২০০৮ সালে প্রার্থিতার দৌড়ে এই আইওয়াতেই তিনি বারাক ওবামার কাছে প্রায় ৮ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন।

যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কনসার্ট, তবে শুধু গান নয় by আসিফুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু স্মারক ভাস্কর্যের পাদদেশে গতকাল যৌন
নিপীড়নবিরোধী কনসার্টে গান করেন শিল্পী শায়ান l ছবি: প্রথম আলো
কনসার্ট। তবে এ শুধুই গানের অনুষ্ঠান নয়। প্রতিটি গান যেন একেকটি প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ। নিপীড়কদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রত্যয়। নারীদের সম্মান জানানোর আহ্বান।
গতকাল রোববার এ আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজু স্মারক ভাস্কর্যের পাদদেশে বিশাল প্যান্ডেল। বিকেল থেকেই সংগীতাঙ্গনের জনপ্রিয় শিল্পীদের পদচারণ । তাঁরা গান গেয়ে মাতিয়ে রাখলেন সারাক্ষণ। তবে গানের ফাঁকে ফাঁকে বার্তা দিয়ে গেলেন, নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তাহসানের কথাই ধরা যাক। মোট তিনটি গান করেন। ‘তুমি ছুঁয়ে দিলে মন, আমি উড়ব আজীবন’ আর ‘আলো আলো তুমি কখনো খুঁজে পাবে না’-এর মতো জনপ্রিয় গান শেষে তাহসান প্রশ্ন রাখলেন, ‘আপনারা কি প্রকৃত পুরুষ?’ অপর পাশ থেকে হ্যাঁ-বোধক সাড়া পেয়ে আরেক প্রশ্ন, ‘যাঁরা প্রকৃত মানুষ, তাঁরা নারীদের কোন চোখে দেখেন?’ উত্তরও নিজেই দিলেন, মা-বোন কিংবা ভালোবাসার মানুষ আর বন্ধু—যে সম্পর্কই থাকুক না কেন, সবার চেয়ে বড় নারীদের সম্মান করা।
কনসার্টের একপর্যায়ে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক লুবনা জেবিন। কদিন আগেই তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নিপীড়ককে কলার ধরে প্রশাসনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিচার চেয়েছেন আইনি প্রক্রিয়ায়ও। সাহসী সেই নারী জানালেন, তাঁর একজন ২০ বছর বয়সী ছাত্রী নিপীড়িত হলে তাঁকে যেসব সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও তাঁকে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
লুবনা জেবিন দর্শকদের কাছে জানতে চান, তাঁরা কি কেবলই গান শুনতে এসেছেন? নাকি যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতন হতে? তিনি বলেন, ‘পারিবারিকভাবেই আমাদের শেখানো হয়, কেউ নিপীড়িত হলে সেটা প্রকাশ করা যাবে না। নিপীড়কের পরিবার থেকেও তাঁর পক্ষে সাফাই গাওয়ার যথেষ্ট যুক্তি খুঁজে বের করা হয়। এসব কারণেই এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়ছে।’
‘যৌন নিপীড়নবিরোধী কনসার্ট আয়োজক কমিটি’র এই কনসার্টে দর্শক মাতোয়ারা হলেও সামান্য খুঁত যেন রয়েই গেল। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ব্যস্ততম রাস্তাটি ধরে প্রতিনিয়ত তিনটি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করে। পাশেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম। কনসার্টের কারণে এক পাশের রাস্তা বন্ধ থাকায় বিকেল থেকে বেশ কিছু অ্যাম্বুলেন্সকে দীর্ঘ সময় যানজটে পড়ে থাকতে হয়েছে। তা ছাড়া যৌন নিপীড়নবিরোধী কনসার্ট হলেও সেখানে নারীদের উপস্থিতি ছিল খুবই সামান্য।
কনসার্ট মাতিয়েছেন শিল্পী শায়ান। কৃষ্ণকলি গেয়েছেন ইচ্ছে মতন ইচ্ছেগুলি করছে উড়াউড়ি, ব্যান্ড দল দ্যা আরমিন মুসা উপস্থাপন করেছে ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া, ওল্ড স্কুল গেয়েছে জানি না কেন এমন হয়। এ ছাড়া শিরোনামহীন, মাদল, জলের গান, গানের দল গায়েন, জাগরণ, সহজিয়ার মতো ব্যান্ডগুলোর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

ময়লা পানি মাড়িয়ে চলাই নিয়তি by সামছুর রহমান

নাম প্যারিস রোড। মিরপুর ১০ নম্বরের সিটি করপোরেশন মার্কেটের
সামনের এই সড়কটির এমন বেহাল। ছবি -সাবিনা ​ইয়াসমিন
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে নির্মাণাধীন ঢাকা সিটি করপোরেশন মার্কেটের সামনের সড়ক এবং আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হাসপাতালের সামনের সড়ক দুটি স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধ হয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বহুবার জানানোর পরও সমস্যার সমাধান হয়নি।
সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়ক দুটিতে জমে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি আশপাশের সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রবীণ হাসপাতালের সামনের সড়কটি প্রায় দুই বছর ধরে স্থায়ী জলাবদ্ধ। ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হাসপাতালে আসা রোগী, তাঁদের স্বজন এবং চিকিৎসক-কর্মচারীরা।
গতকাল রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটি খানাখন্দে ভরা। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা মিশে দুর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের ফুটপাতে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখায় পথচারীদের ময়লা পানি মাড়িয়ে চলতে হচ্ছে।
প্রবীণ হাসপাতালের কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টি হলে দুর্ভোগ বাড়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে এমন ভোগান্তি। কয়েকবার সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত বিভাগকে জানালেও কোনো কাজ হয়নি। দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের এসব পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে হাসপাতালে আসতে হয়।’
এই সড়কটির আশপাশের সড়কে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি, কোস্টগার্ড সদর দপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান অবস্থিত। এই সড়কগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়।
আগারগাঁও এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই সড়কগুলো গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) অধীনে। ডিএনসিসির একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পিডব্লিউডি সড়কগুলো সিটি করপোরেশনকে এখনো বুঝিয়ে দেয়নি। তাই সিটি করপোরেশন চাইলেও কিছু করতে পারছে না।’
২৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. ফোরকান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সড়কগুলোর বিষয়ে পিডব্লিউডি, সিটি করপোরেশন সবার সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলেছে, খুব শিগগিরই এই সড়কের পানি নিষ্কাশনের জন্য তাঁরা ড্রেনেজব্যবস্থা করে দেবে। আশা করছি আগামী কিছুদিনের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে।’
জলাবদ্ধ সিটি করপোরেশন মার্কেটের সামনের সড়ক: মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে নির্মাণাধীন সিটি করপোরেশন মার্কেটের সামনে চার সড়কের সংযোগস্থল। সংযোগস্থলটি ও সড়কগুলোর কিছু অংশ দুই বছর ধরে দুর্গন্ধময় আবর্জনা ও পানিতে ডুবে আছে। আশপাশের এলাকা থেকে মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বরে যাতায়াতের প্রধান এই পথটি এভাবে বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
দেখা যায়, প্যারিস রোড, লেন ১৭, লেন ১৫ ও মিরপুর ১১ নম্বর থেকে চারটি সড়ক মার্কেটের সামনে এসে মিশেছে। জায়গাটিতে আবর্জনা ও ময়লা পানি জমে আছে। ময়লা পানি সংযোগস্থল ছাড়িয়ে ১৭ নম্বর লেনের মুসলিম ক্যাম্প, লেন ১৫ ও মিরপুর ১১ নম্বর বাজার সড়কে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসীকে ময়লা পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কোথাও ইট ফেলে পানির ওপর দিয়ে হাঁটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ এলাকার জনগণকে অনেকটা ঘুরে মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বর যেতে হচ্ছে। সড়কে জমে থাকা পানির নিচে আছে ছোট-বড় গর্ত। হঠাৎ দু-একটা রিকশা জমে থাকা পানি পার হওয়ার চেষ্টা করলে আটকা পড়ছে গর্তে।
এই সড়কটি ডিএনসিসির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কটি ঠিক করা আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। সড়কটির জন্য দরপত্র হয়েছিল, কিন্তু তাতে ত্রুটি থাকায় আগামী ১০ দিনের মধ্যে পুনঃদরপত্রের নোটিশ দেওয়া হবে। দরপত্র হলেই সংস্কারের কাজ শুরু হবে।’