Showing posts with label অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক. Show all posts
Showing posts with label অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক. Show all posts

Tuesday, September 24, 2024

অসন্তোষ কাটছেই না পোশাক শিল্পে

শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বেতন বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি পালন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। এতে আশুলিয়ায় অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পোশাক কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত  পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওদিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে চার দফা দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন সিজন ড্রেসেস লিমিটেড নামের একটি কারখানার শ্রমিকরা। এতে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজট দেখা দেয়। পরে বিকাল ৫টার দিকে অবরোধকারীরা মহাসড়ক থেকে চলে যান।

এদিকে রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ ভবনে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি সাধারণ সভা শেষে বিজিএমইএ সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
এখন বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় কীভাবে শিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়; আর ক্রেতাদের দেয়া কথা রেখে কীভাবে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যায়; এই দুই বিষয়কে সামনে রেখেই আলোচনা করেন পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা।
বৈঠকে পোশাক শিল্পখাতে বিদ্যমান অস্থিরতা ও সমস্যা নিরসনে সরকারের কাছে ১৮টি দাবি উত্থাপন করেছে শ্রমিক পক্ষ। এদের মধ্যে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে মজুরি পুনঃনির্ধারণ ও বাৎসরিক ন্যূনতম ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের (বেতন বৃদ্ধি) দাবি ছিল।
তবে সেই দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মালিকপক্ষ বিজিএমইএ। কারণ হিসেবে তারা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পের অক্ষমতা এবং উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছে। এর আগে দুপুরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ১৮টি দাবি উত্থাপন করে শ্রমিক পক্ষ। এতে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
শ্রমিকদের বাকি দাবিগুলো হলো- যেসব কারখানায় ২০২৩ সালে সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, শ্রম আইন সংশোধন করতে হবে, কোনো শ্রমিকের চাকরি ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর চাকরি থেকে অব্যাহতি দিলে/চাকরিচ্যুত হলে একটি বেসিকের সমান অর্থ প্রদান করতে হবে, এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক শ্রম আইনের ২৭ ধারাসহ অন্য ধারাসমূহ সংশোধন করতে হবে, সব প্রকার বকেয়া মজুরি অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে, হাজিরা বোনাস (২২৫ টাকা), টিফিন বিল (৫০ টাকা), নাইট বিল (১০০ টাকা) সব কারখানায় সমান হারে বাড়াতে হবে, সব কারখানায় প্রভিডেন্ড ফান্ড ব্যবস্থা চালু করতে হবে, বেতনের বিপরীতে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ন্যূনতম ১০ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে, শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, বিজিএমইএ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বায়োমেট্রিক ব্ল্যাকলিস্টিং করা যাবে না; বায়োমেট্রিক তালিকা সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, সব প্রকার হয়রানিমূলক এবং রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, ঝুট ব্যবসার আধিপত্য বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, কলকারখানায় বৈষম্যবিহীন নিয়োগ প্রদান করতে হবে, জুলাই বিপ্লবে শহীদ এবং আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে, রানা প্লাজা এবং তাজরীন ফ্যাশনস দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যাণে তদন্তান্তে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, শ্রম আইন অনুযায়ী সব কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করতে হবে, অন্যায্যভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে ও নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ১২০ দিন নির্ধারণ করতে হবে।
জানা গেছে, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে সৃষ্ট অস্থিরতা কাটিয়ে ঢাকার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি গত সপ্তাহ থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেও ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা আবারো আন্দোলন শুরু করেন। শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম সর্বমোট ৫১ কারখানা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুলিশ-শ্রমিক ও কারখানা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুলিয়া-ডিইপিজেড-নবীনগর মহাসড়কের নরসিংহপুর এলাকায় ‘জেনারেশন নেক্সট’ নামে একটি পোশাক কারখানার সামনে কয়েক শতাধিক শ্রমিক সড়ক অবরোধ করেন।
শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে, এমএএম গার্মেন্টস লিমিটেড, নাসা গ্রুপ, নিউএইজ গ্রুপ, অনন্ত গ্রুপ, স্টারলিং স্টাইল, স্টারলিং ক্রিয়েশন, স্টারলিং অ্যাপারেলস, ব্যান্ডো ডিজাইন, এনভয় গ্রুপ, ভিনটেজ, জেনারেশন নেক্সটসহ ২৭টি কারখানা।
স্ববেতনে ছুটি আছে বা কাজ বন্ধ আছে কিংবা শ্রমিকরা চলে গেছে এমন কারখানার মধ্যে রয়েছে, আল মুসলিম অ্যাপারেলস, ট্রাউজার লাইন লিমিটেড, ফ্যাশন ফোরাম লিমিটেড, সাফা সোয়েটার, দ্য রোজ ড্রেসেস, প্রীতি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, এফএনএফ ট্রেন্ড ফ্যাশনসহ ১২টি কারখানা।
সূত্রটি জানায়, আশুলিয়া এলাকায় গতকাল মোট চালু কারখানার সংখ্যা ২৭২টি, আগস্ট মাসের বেতন পরিশোধ করেছে ২৬৭টি কারখানা এবং আগস্ট মাসের বেতন দিতে পারেনি ৫টি কারখানা।
বিজিএমইএ জানায়, সোমবার সাভার, আশুলিয়া ও জিরানি এলাকায় তাদের মোট চালু কারখানার সংখ্যা ৪০৭, বন্ধ রয়েছে ৩৯টি, গাজীপুরে খোলা রয়েছে ৮৭৬টি কারখানা বন্ধ রয়েছে ১০টি।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ২০৯টি, ডিএমপি এলাকায় ৩০২টি এবং চট্টগ্রামে ৩৫০টি কারখানা চালু রয়েছে। যদিও এসব এলাকায় কোনো কারখানা বন্ধ নেই বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। আশুলিয়ার ডিইপিজেড, কাঠগড়াসহ অন্যান্য এলাকায় অবস্থিত কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে, শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মো. সারোয়ার আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আশুলিয়া এলাকায় মোট ৫২টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি কারখানা শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় এবং ৯টিতে সাধারণ ছুটি রয়েছে।
শিল্প পুলিশের ভাষ্যমতে, শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা নতুন করে ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করাসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে রোববারই শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে বেশ কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। অনেক কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান।
সাভারের স্টাফ রিপোর্টার জানান: সাভারের আশুলিয়ায় বকেয়া বেতন পরিশোধ ও বন্ধ কারখানা চালু করার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর এলাকায় এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে জেনারেশন নেক্সট গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা। এক ঘণ্টা পর সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেন। সম্প্রতি টানা দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষ কাটিয়ে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানাগুলো সচল হয়েছিল।  বেশ কয়েকদিন শান্ত থাকার পর ফের শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায়।
এর আগে রোববার আশুলিয়ার বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা, হাজিরা, টিফিন, নাইট বিল বৃদ্ধির বাস্তবায়ন ও কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘোষণাসহ নানা দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এ ঘটনার পর সোমবার শ্রম আইন-২০০৬ এর ১৩(১) ধারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ৪৩টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছেন মালিকপক্ষ এবং ৯টি কারখানায় সাধারণ ছুটি রয়েছে। শিল্প পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর এলাকার জেনারেশন নেক্সট কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় সড়কের দুই পাশের বেশির ভাগ কারখানার উৎপাদন বন্ধ ছিল। এর আগের অসস্তোষ কাটিয়ে শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর গত শনি ও রোববার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এর জের ধরেই সোমবার অর্ধশতাধিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেনারেশন নেক্সট গার্মেন্টসের শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, তাদের গত দুই মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুরের তিনটি কারখানায় বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবরোধ করলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। খবর পেয়ে যৌথবাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
গতকাল সকালে গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজার এলাকায় গোল্ডেন রিফিট গার্মেন্টস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে হাজিরা বোনাস বৃদ্ধির দাবিসহ ১২ দফা দাবি জানিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করে। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের হাজিরা বোনাস, টিফিন বিল, নাইট বিলসহ ৮টি দাবি মেনে নেন।
গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের বাঘের বাজার জোনের পরিদর্শক সুমন মিয়া জানান, শ্রমিকরা মহাসড়কে সড়ক অবরোধ করলে যানজটের সৃষ্টি হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া কালিয়াকৈর উপজেলার সকালে মৌচাকে কোকোলা ফুড প্রোডাক্টস নামে একটি খাদ্য উৎপাদন তৈরি কারখানার শ্রমিকরা কারখানার সামনে অবস্থান শুরু করে। গাজীপুরের মৌচাকে কোকোলা ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেড কারখানার শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস, বাৎসরিক ছুটিসহ ১২ দফা দাবির প্রেক্ষিতে কারখানা কর্তৃপক্ষ গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করেন।
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার পরও সকালে শ্রমিকরা কারখানার সামনে অবস্থান করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কিছু সময় অবরোধ সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে যৌথবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের ধাওয়া করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে তিনজনকে আটক করে তারা।
অন্যদিকে, গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীতে বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় টঙ্গীর খাঁপাড়া এলাকায় সিজন্স ড্রেসেস লিমিটেড-এর শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে।
এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সকাল ৯টা থেকে অদ্যাবধি বন্ধ রয়েছে।

mzamin

Monday, September 23, 2024

কিছু কারখানার কারণে অশান্ত পুরো পোশাক খাত

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার নামে পোশাক খাতে সৃষ্ট অস্থিরতা দূর করতে সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। টানা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শ্রমিক অসন্তোষ চলে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েও আসে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধিসহ নতুন নতুন দাবিতে আবারো বিক্ষোভ করছেন পোশাক খাতের শ্রমিকরা। রোববার সকাল থেকে আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের জিরাবো এলাকা পর্যন্ত সড়কের উভয়পাশে অবস্থিত বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেন তারা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকার সাভার-আশুলিয়া এলাকার কিছু চিহ্নিত কারখানার কারণেই বার বার অশান্ত হচ্ছে পুরো পোশাকশিল্প। ফলে কারখানা মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিল্পমালিকরা জানান, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে কারখানা বন্ধ থাকায় বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করা যায়নি। আবার যারা করেছে, তারা শিপমেন্ট করতে পারেনি। অস্থিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার নিতে পারেনি। ফলে অনেক অর্ডার হাতছাড়া হয়ে গেছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার-আশুলিয়ায় দীর্ঘদিন পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় শুধু ওই অঞ্চলের কারখানা মালিকদের ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি হয়েছে পুরো পোশাকশিল্পে। এর জের টানতে হচ্ছে এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক খবর গেছে। ক্রেতারা অর্ডার কমিয়েছে। অনেক অর্ডার অন্যত্র চলে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কারখানার অভ্যন্তরে জড়ো হয়ে পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ‘পঁচিশ’ ‘পঁচিশ’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। সকাল থেকে আশুলিয়া এলাকার নিট এশিয়া, ডেকো, এনভয়, ভিনটেজ, নাসা, সেতারাসহ বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানা ছুটি ঘোষণা করেন।
যেসব কারখানায় অসন্তোষ বেশি:   
নাসা গ্রুপের পাঁচটি কারখানা, নিউ এইজ গার্মেন্টস লিমিটেডের চারটি কারখানা, অনন্ত গার্মেন্টসের দুটি কারখানা, ডেকো ডিজাইন ও ডেকো ওয়াস লিমিটেড, মেডলার গার্মেন্টস, নিট শিয়া লিমিটেড, ভিনটেস গার্মেন্টস, চিনশিন অ্যাপারেলস, বান্দ ডিজাইন, টেক ম্যাক্স গার্মেন্টস লিমিটেড, স্টারলিং স্টাইল লিমিটেড, স্টারলিং ক্রিয়েশন লিমিটেড, সেতারা গ্রুপ, মুন রেডি অয়ার, ইয়াগি বাংলাদেশ গার্মেন্টস লিমিটেড, এনভয় গ্রুপের তিনটি কারখানা,  হলিউড অ্যাপারেলস লিমিটেড, স্টারলিং অ্যাপারেলস লিমিটেড, ভার্চ্যুয়াল বটমস, সিএস লি টওয়ের লিমিটেড, ইসলাম গ্রুপের তিনটি কারখানা, শারমিন গ্রুপের ৪টি ফ্যাক্টরি, হামিম গ্রুপের ৫টি ফ্যাক্টরি ও শুশুকা নিটওয়্যার লিমিটেড, জেনারেশন নেক্সট লিমিটেড। এই কারখানাগুলোতে প্রায় ২ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। এগুলো সবই  আশুলিয়ায় অবস্থিত। শিল্প পুলিশের একটি সূত্র জানায়, শ্রমিক অসন্তোষ শেষে গত সপ্তাহে এবং চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন, অর্থাৎ শনিবার পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও রোববার সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।
ডেকো গ্রুপের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে শ্রমিকদের যেসব দাবি ছিল, সেগুলো আমরা প্রথম দফাতেই মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন শ্রমিকরা নতুন দাবি নিয়ে এসেছেন, বিশেষ করে ২৫ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তারা সিদ্ধান্ত চান। এর আগে সকালে শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকেই বের হয়ে যান। এরপর গ্রাউন্ডে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বেশ কয়েকজন স্টাফ-কর্মকর্তাকেও তারা অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাদের একটি অংশ দাবি করছেন, এখনই তাদের ২৫ হাজার টাকা মজুরির দাবি মেনে নিতে হবে। আবার কেউ বলছেন, টিফিনের টাকা বাড়িয়ে যেটি ৪০ টাকা করা হয়েছে, সেটি এবার ৫০ টাকা করতে হবে। কেউ আবার হাজিরা বোনাস আরও বৃদ্ধি করতে বলছেন, যেটি ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে ইতিমধ্যেই।
পুলিশ জানায়, কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা সকালে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলেও পুলিশ ও যৌথ বাহিনী তাদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে দেয়। সূত্র জানায়, ডেকোসহ বেশ কয়েকটি কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচেষ্ট ছিলেন।
শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম গণমাধ্যমকে বলেন, আগের দিন নাসায় সামান্য ঝামেলা হওয়ার পর নাসা বন্ধ ছিল। আজকে (রোববার) কিছু কারখানার শ্রমিকরা কোথা থেকে কী তথ্য পেয়ে বিক্ষোভ করছে, এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। মূলত ২৫ হাজার টাকা বিষয় না; তাদের দাবি মেনে নেয়া হলেও মালিক নিজে গিয়ে তাদের আশ্বস্ত করুক- এটা তারা চায়। আবার ভিনটেজের শ্রমিকদের দাবি, তাদের কারখানা খুলে দেয়া হোক। তাদের দাবি মেনে নেয়ার পরও এখন আবার নতুন দাবি সামনে আনছে। তিনি জানান, শিল্পাঞ্চলে রোববার বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩(১) ধারায় ১৫টি এবং ৪টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ছিল।
এদিকে বিজিএমইএ বলছে, রোববার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে মোট ২৭টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরমধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩(১) ধারার (নো ওয়ার্ক, নো পে) ভিত্তিতে ১৩টি এবং কারখানা খোলা রাখার পর কাজ বন্ধ আছে কিংবা স্ববেতনে ছুটি আছে এমন কারখানার সংখ্যা ১৪টি।
শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে ছিল- কমফিট কম্পোজিট লিমিটেড, নাসা সুপার কমপ্লেক্স লিমিটেড, সেতারা গ্রুপ, শিনশিন অ্যাপারেলস লিমিটেড, জেনারেশন নেক্সট, ভিনটেজ গার্মেন্টস লিমিটেড ও আঞ্জুমান ডিজাইনার্স লিমিটেড। এছাড়া স্ববেতনে ছুটি ছিল, কাজ বন্ধ আছে কিংবা শ্রমিকরা চলে গেছে এমন কারখানাগুলোর মধ্যে ছিল- এএম ডিজাইন লিমিটেড, ডেকো গ্রুপ, ব্যান্ডো ডিজাইন লিমিটেড, এনভয় গ্রুপ, অনন্ত গ্রুপ, নিউএইজ গ্রুপ, স্টারলিং ক্রিয়েশন, স্টারলিং অ্যাপারেলস, ইয়াগি বাংলাদেশ, দ্য রোজ গার্মেন্টস, টেক ম্যাক্সসহ মোট ১৪টি কারখানা।
বিজিএমইএ জানায়, আশুলিয়া অঞ্চলে রোববার তাদের ২৪৫টি কারখানা চালু ছিল। এ ছাড়া আগস্ট মাসের বেতন পরিশোধ করেছে ২৬৬টি কারখানা এবং আগস্ট মাসের বেতন এখনো দিতে পারেনি ৬টি কারখানা।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, রোববার গাজীপুর এলাকায় তাদের কারখানা চালু ছিল ৮৭৬টি, বিপরীতে বন্ধ ছিল ৬টি কারখানা। সাভার আশুলিয়া এবং জিরানি এলাকায় চালু ছিল ৪০৭টি এবং বন্ধ ছিল ২৭টি কারখানা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ২০৯টি কারখানা, ডিএমপি এলাকায় ৩০২টি এবং চট্টগ্রামে ৩৫০টি কারখানা চালু ছিল।
এসব এলাকায় কোনো কারখানা বন্ধ ছিল না।
বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের বিক্ষোভের প্রথম চার দিন কোনো দাবি-দাওয়ার কথাও আসেনি। এরপর একে একে শ্রমিকদের যে দাবি-দাওয়া আসতে থাকে এগুলো শ্রম আইনের কোনো জায়গায়ই নেই। তাদের কেউ বলে টিফিন বিল বাড়াতে হবে, কেউ বলে ছুটি দিতে হবে। কেউ বলে ৪ ঘণ্টার বেশি কাজ করবে না।
শ্রম সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, দেশের পোশাক শিল্প সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের অপচেষ্টা করা হয়েছে। যাতে বৈদেশিক রপ্তানি সংকুচিত হয়। এ ছাড়া ভুল তথ্য ছড়িয়ে একটি মহল শিল্প এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার পেছনে বিদেশি ইন্ধন রয়েছে। তবে সরকারের যথাযথ উদ্যোগে অসন্তোষ অনেকাংশে দূর হয়েছে।

Sunday, September 13, 2009

প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা কি তাহলে অকার্যকর -দেশে ব্যবসা করা কঠিন হচ্ছে

পর পর দুই দিন দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দুটিই বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে দেশগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করেছে; তৈরি করেছে অবস্থান সূচক। উভয় সূচকেই বাংলাদেশের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়; বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সহজে ব্যবসা করার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় এবার চার ধাপ পিছিয়ে গেছে। এর বিপরীতে অবশ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশ্ব প্রতিযোগিতা-সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান আগেরবারের তুলনায় পাঁচ ধাপ অগ্রসর হয়েছে। আপাতদৃষ্টে এই দুটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান পরস্পরবিরোধী বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এর পেছনে অবশ্য জরিপ পরিচালনার সময়গত ব্যবধানকে দায়ী করা যেতে পারে।
তা ছাড়া একটু নিবিড় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, উভয় প্রতিবেদনেই বাংলাদেশে ব্যবসার উপযোগী পরিবেশের প্রধান অন্তরায় হিসেবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সুশাসনের অভাবের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বিশ্ব প্রতিযোগিতা-সক্ষমতার প্রতিবেদন অনুসারে, যেখানে ২০০৭ সালে দুর্নীতিকে ব্যবসার এক নম্বর অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে ২০০৮ সালে অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততা উঠে এসেছে এই স্থানে। আর এটি বাস্তবতার সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দেশে বিনিয়োগ এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। উদ্যোক্তারা শিল্প-কারখানা চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। রেল, সড়ক ও নৌযোগাযোগের দুরবস্থা বাড়াচ্ছে ব্যবসার খরচ। আর তাই দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবসা শুরু করতে গড়ে যেখানে ২৮ দিন ব্যয় হয়, সেখানে বাংলাদেশে ব্যয় হয় ৪৪ দিন—বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এই তথ্য অবিশ্বাস করার কোনোই কারণ নেই। একইভাবে কর প্রদান-প্রক্রিয়া ও করবিধির জটিলতা ব্যবসার অগ্রগতির বাধা হচ্ছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেই বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার তালিকায় ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২০তম স্থানে রয়েছে।
এসব বিবেচনায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্যের দিকটি বাংলাদেশের একেবারেই দুর্বল নয়; বরং প্রয়োজনীয় ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো থেকে ইতিবাচক সহায়তা ও সমর্থন পেলে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা কার্যকর ও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। বছরের পর বছর এ বিষয়গুলো উপেক্ষিত হওয়ায় সমস্যা এখন জটিলতর রূপ ধারণ করেছে। দুর্নীতির কালো থাবায় জ্বালানি ও যোগাযোগ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার মূল্য গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষকে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শুধুই হয়রানি বাড়াচ্ছে।
এই প্রতিবেদনগুলোয় যা বলা হয়েছে, সেগুলো আসলে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতারই সুসংহত রূপ, কোনো বায়বীয় আবিষ্কার নয়। তাই সরকারের উচিত হবে প্রতিবেদন দুটির সার বক্তব্য গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা এবং এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এ জন্য ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং যেসব দেশ এগিয়ে আছে, তাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা অপসারণের কোনো বিকল্প নেই।