Friday, July 25, 2025

তীব্র ক্ষুধায় জ্ঞান হারাচ্ছেন গাজার ত্রাণকর্মীরা, থমকে আছে যুদ্ধবিরতি আলোচনা

ফিলিস্তিনের গাজায় ক্ষুধা এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে জাতিসংঘের ত্রাণ  কর্মীরাও অনাহারে জ্ঞান হারাচ্ছেন। একদিকে ক্ষুধার যন্ত্রণায় প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিন সহায়তা সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ- এর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বৃহস্পতিবার বলেন, এই সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও খেতে না পেরে লুটিয়ে পড়ছে। ত্রাণ ব্যবস্থা ধসে পড়ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান।

এতে বলা হয়, গত চারদিনে অনাহারে অন্তত ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য ত্রাণ সংস্থা এই সংকটের জন্য মূলত ইসরাইলি অবরোধকেই দায়ী করছে। দেশটি গাজায় ত্রাণ প্রবেশ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।

লাজারিনি আরও বলেন, তার এক সহকর্মী গাজা থেকে তাকে বলেছেন, গাজার মানুষ জীবিতও নয়, মৃতও নয়- তারা জীবন্ত লাশ মাত্র। ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, জর্ডান ও মিশর সীমান্তে প্রায় ৬ হাজার ট্রাক সমপরিমাণ ত্রাণ ও ওষুধ গাজায় প্রবেশের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। লাজারিনি ইসরাইলকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ত্রাণ সহায়তা নিরবচ্ছিন্ন ও অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। সম্প্রতি এমন সব মর্মান্তিক ছবি প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে অনাহারে জীর্ন দেহ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। উপত্যকাটির চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার অনাহারে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা অসুস্থ ছিলেন এবং কয়েকদিন ধরে একদম কিছুই খেতে পায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বড় ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে তার দেশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তির পক্ষে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অবিচল থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেব।

এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র দোহায় চলমান শান্তি আলোচনা থেকে প্রতিনিধি দল ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয়। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, হামাস আলোচনায় সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না, তাই আলোচক দলকে পরামর্শের জন্য ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিকল্প উপায় বিবেচনা করছে যাতে জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজায় একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়-যদিও সে বিকল্প কী, তা তিনি খোলাসা করেননি।

এর আগে হামাস নতুন একটি প্রস্তাব পাঠায়, যা নিয়ে আশার সুর শোনা যাচ্ছিল। এমনকি বার্তা সংস্থা এপি’র এক খবরে বলা হয়, ইসরাইলের এক কর্মকর্তা ওই প্রস্তাবকে কার্যকরযোগ্য বলেও অভিহিত করেছিলেন। হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের নতুন প্রস্তাবে বন্দী বিনিময়ের সংখ্যা, গাজায় কোন সংস্থা ত্রাণ বিতরণ করবে এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। রয়টার্সকে হামাসের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবটি সহনশীল, ইতিবাচক এবং গাজার মানুষদের দুর্ভোগ হ্রাসের বিবেচনায় প্রস্তুত করা হয়েছে।

ইসরাইলে জিম্মিদের পরিবারের সংগঠন হোস্টেজ ফ্যামিলিজ ফোরাম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, প্রতিদিন দেরি হওয়া মানেই জিম্মিদের জীবন আরও বিপন্ন হওয়া। তাদের অবস্থান জানার বা উদ্ধার করার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান আলোচনার ভিত্তিতে যেই যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্ভাবনা ছিল, তাতে ৬০ দিন যুদ্ধবিরতি থাকবে এবং এর মধ্যে হামাস ১০ জন জীবিত জিম্মি এবং ১৮ জনের মৃতদেহ ফিরিয়ে দেবে। এর বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে।

বর্তমানে গাজায় ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে আছে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)- এটি একটি মার্কিন বেসরকারি সংস্থা। কিন্তু মাত্র চারটি বিতরণ কেন্দ্রে অস্ত্রধারী নিরাপত্তার মধ্যে তারা ত্রাণ বিতরণ করছে, যেটিকে মানবিক সংগঠনগুলো মৃত্যুকূপ বলে অভিহিত করছে। এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে হাজারের বেশি ত্রাণপ্রার্থী ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

ইসরাইল মার্চ থেকে জাতিসংঘের ত্রাণ প্রবেশ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, জাতিসংঘের ত্রাণ চুরি করেছে হামাস। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এখন হামাসের মূল দাবি হচ্ছে, জাতিসংঘের ত্রাণ ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে একে অন্তর্ভুক্ত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস গাজার দুর্ভিক্ষকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বলে অভিহিত করেছেন।

গাজায় অনাহারে শিশুদেরে মৃত্যুর ছবি হাতে নিয়ে বুধবার হাজারো ইসরাইলি রাজধানী তেলআবিবে বিক্ষোভ করেছে। তারা গাজা অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। হামাস চায় চূড়ান্ত চুক্তিতে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা হোক, কিন্তু ইসরাইল তাতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারে কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং যুদ্ধবিরতির পর আবার হামলা শুরুর পথ খোলা রাখতেই চাইছে।

mzamin

আলহামরা: স্পেনে মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন by মো. রাশেদুল আলম

স্পেনের গ্রানাডা প্রভিন্সে মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন ঐতিহাসিক আলহামরার আয়তন ৩৫ একর। বিশাল এই কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হয় ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ শতকে। আরবি শব্দ আল-কালাত-আল-হামরা থেকে আলহামরা নামটি এসেছে, যার অর্থ লাল দুর্গ।

ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক কথা—

গ্রানাডা শহর থেকে দূরে একটি মালভূমিতে নির্মিত আলহামরা তখন গ্রানাডার গভর্নর মুহাম্মেদ ইবনে আল আহমার, তিনিই আলহামরা নির্মাণের প্রদর্শক ও নাসরিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। প্রধানত ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ সালের মধ্যে, ইবনে আল-আহমার ও তাঁর উত্তরসূরিদের শাসনামলে নির্মিত হয় আলহামরা। অভ্যন্তরের চমৎকার অলংকরণগুলো নির্মাণ করেন প্রথম ইউসুফ (মৃত্যু ১৩৫৪)। ১৪৯২ সালে মুরদের পরাজয়ের পর, অভ্যন্তরটির বেশির ভাগ অংশ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং মূল্যবান আসবাব ধ্বংস বা অপসারণ করা হয়। স্পেনের শাসক চার্লস পঞ্চম (১৫১৬-৫৬) একটি ইতালীয় প্রাসাদ নির্মাণের জন্য আলহামরার কিছু অংশ খুলে নিয়ে যান। ১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ১৮২১ সালের ভূমিকম্পে কমপ্লেক্সের আরও ক্ষতি সাধিত হয়।

আলহামরা বিরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আলয়ে অবস্থিত। যে মালভূমিতে এটি নির্মিত, সেটি গ্রানাডার মুরিশ মুসলিমদের পুরোনো শহর। মালভূমির গোড়ায় দারো নদী উত্তরে গভীর খাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রাসাদের বাইরের উদ্যানটি মুররা গোলাপ, কমলা ও চিরহরিৎ বৃক্ষ রোপণ করে সাজিয়েছিল। উদ্যানের নিচের প্রবেশদ্বার, বাংলায় বলা যায় ডালিমের গেট, ১৬ শতকে তৈরি বিশাল বিজয়ের খিলান। ১৫৫৪ সালে তৈরি করা হয়েছিল, আলহামরার প্রধান প্রবেশদ্বার। আরও একটি বর্গাকার টাওয়ার ঘোড়ার নালের মতো খিলানপথ, যা মুররা বিচারের স্থান বা আদালত হিসেবে ব্যবহার করত।

অভ্যন্তরে সিংহাসন কক্ষ বা ‘হল অব দ্য অ্যাম্বাসেডরস’ আলহামরার বৃহত্তম কক্ষ। কক্ষটি ৩৭ ফুট এবং শীর্ষে একটি গম্বুজ, যার কেন্দ্র ৭৫ ফুট উচ্চ। বিশাল অভ্যর্থনাকক্ষ এবং সুলতানের সিংহাসনটি প্রবেশদ্বারের বিপরীতে স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রানাডার শেষ সুলতান বোবদিল এই কক্ষে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রিত অতিথিদের গণহারে হত্যা করেছিলেন। সিলিংটি নীল, বাদামি, লাল এবং সোনায় চমৎকারভাবে সজ্জিত। হলের মাঝখানে একটি ফোয়ারা এবং পুরো কক্ষটি উপদেশমূলক বাক্য ও কোরআনের সুরায় উৎকীর্ণ মুরিশ স্ট্যালাকটাইটের কাজের একটি অসামান্য উদাহরণ। এ ছাড়া আলহামরায় রয়েছে তিনটি প্যালেস, প্যালেস অব লায়ন্স, পোর্টাল প্যালেস ও কোমারেস প্যালেস। রয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা, হল অব দ্য কিংস, কোর্ট অব লং পন্ডস, কোর্ট অব মিরলেস ইত্যাদি।

স্পেনে মুসলিম সভ্যতা ও স্থাপনাগুলো দেখার ইচ্ছা ছিলো স্কুলজীবন থেকেই। বিশেষ করে আলহামরা। বছর কয়েক আগে মুসলিম সভ্যতায় উদ্ভাসিত ঐতিহাসিক টলেডো দেখে এসেছি। টলেডোকে বলা হয় ‘স্পেনের আত্মা’। পবিত্র জেরুজালেম নগরীর পরই টলেডোর স্থান, যেখানে খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করে টলেডোকে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে গেছেন। ভোর ছয়টায় স্টকহোম থেকে উড়াল দিয়ে আন্দালুসিয়ার প্রধানতম বিমানবন্দর মালাগায় এসে যখন নামলাম, তখন সকাল সাড়ে ১০টা বেজে গেছে। সঙ্গে খুব একটা লাগেজ নেই, শুধু দুজনার দুটি ব্যাগ। দ্রুত ইমিগ্রেশন পার হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেই আমাদের গাইডের সঙ্গে দেখা হলো। ৪০–৪২ বছর বয়েসের সুঠাম দেহি এক নারী আনিকা এলওইং। আনিকা জন্মগতভাবে সুইডিশ তবে ২৩ বছর ধরে স্পেনেই বসবাস, তাই সুইডিশ ও স্প্যানিশ—দুটি ভাষাতেই দক্ষ। স্পেনে ভাষাগত অসুবিধে ব্যাপক। স্প্যানিশরা স্প্যানিশ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় বলে না বোঝেও না, ইংরেজি তো নয়ই। স্কুল–কলেজে সরকারিভাবে স্প্যানিশ ভাষাটিই শিক্ষা দেওয়া হয়, ইংরেজি নয়। ইংরেজি শিখতে হলে প্রাইভেট ‍শিখতে হয় আর তা ব্যয়বহুল বলে স্প্যানিশরা এড়িয়ে গেছে। রাস্তাঘাটের দিকনির্দেশনাগুলোও স্প্যানিশ ভাষায়, বোঝার উপায় নেই তাই আনিকাই আমাদের ভরসা।

মালাগা থেকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা ট্যুরিস্ট বাস যাত্রার পর এলাম ঐতিহাসিক গ্রানাডায় আমাদের নির্ধারিত হোটেলে। ঝকঝক তকতকে বিশাল কামরা। উষ্ণ সাওয়ার নিতে নিতেই আলহামরা দেখার সময় হয়ে এল। দীর্ঘ প্লেন–যাত্রার জন্যই হোক বা অন্য উপসর্গ হোক ডান দিকের পায়ে পেইন অনুভব করছিলাম। হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। শুনেই আনিকা ছুটে এলেন। ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে গেলাম ফার্মাসিস্টের কাছে। আনিকা স্প্যানিশ ভাষায় সব বুঝিয়ে বলার পর ফার্মাসিস্ট একটি ইলাস্টিক ব্যান্ড ও মাসল রিল্যাক্সের ট্যাবলেট দিলেন। এখানেও ইংরেজি কোনো কাজে এল না, স্প্যানিশ ছাড়া। মাসল রিল্যাক্সের যে প্যাকেট পেলাম, সেখানে সবই স্প্যানিশে নির্দেশনা দেওয়া,কী বিপদ! হোটেলের কাছেই আলহামরা, ১০–১৫ মিনিটের হাঁটা রাস্তা। ঠিক হলো, সবাই আনিকার সঙ্গে পায়ে হেঁটে চলে যাবে আর আমি একা ট্যাক্সি নিয়ে যাব। ট্যাক্সি ভাড়া খুবই কম, মাত্র পাঁচ ইউরো, সুইডেনের কোথাও পাঁচ ইউরোতে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না।

নির্ধারিত সময়ে হোটেল থেকে ট্যাক্সি নিয়ে আলহামরায় চলে এলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার নির্ধারিত স্থানে নামিয়ে সামনে একটি পথ দেখিয়ে দিলেন। বাঁধানো চত্বরটি পেরিয়ে গাছের নিচে বেদির কাছে এসে দাঁড়ালাম। বিভিন্ন দেশের প্রচুর ট্যুরিস্ট আলহামরা দর্শনে এসেছেন। বেশ গরম তবে হাওয়া ঝিরঝিরে। ভিড়ের মধ্যে সবুজ মার্জিত পোশাকে এক স্প্যানিশ মেয়ে দাঁড়িয়ে। ভিড়ের মধ্যেও সতন্ত্র সে। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে মনে হলো, সে ট্যুরিস্ট নয় বা কারও জন্য অপেক্ষা করছে না, মেয়েটি পেছনে ফিরতেই দেখা গেল পেছনে ইংরেজি অক্ষরের ‘আই’ সিম্বলটি, অর্থ্যাৎ ইনফরমেশন। গাছের নিচে বেদিতে বসে আনিকা ও অনান্যদের অপেক্ষা করছিলাম।

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে আলহামরার আর্কশনে আরেকজন এসেছিলেন তবে ট্যাক্সিতে নয়, খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে। সালটা ১৮২৯ এর বসন্ত। আমেরিকান লেখক ওয়াসিংটন আরভিং, স্পেনের মুসলিম অতীত ইতিহাসে আগ্রহ জাগাতে যাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মুরদের তৈরি সাজানো উদ্যান ডালিম গেটের ঠিক ভেতরে ‘টেলাস অব আলহামরা‘ লেখকের একটি মূর্তি রয়েছে। লেখক সেভিলা থেকে পাহাড়ি পথ পারি দিয়ে খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে গ্রানাডায় পৌঁছান। লেখক লিখেছেন সে সময়কার কথা, ‘স্পেনের বৃহত্তর অংশ কঠোর, বিষণ্ন। রুক্ষ পাহাড় ও দীর্ঘ বিস্তৃত সমভূমি, গাছপালাশূন্য এবং অবর্ণনীয়ভাবে নীরব ও একাকী। শকুন ও ঈগলকে পাহাড়ের চালে ঘুরে বেড়াতে ও সমভূমির ওপর উড়তে দেখা যায়, প্রকৃতি যেন আফ্রিকার বর্বর ও নির্জন চরিত্রের অংশীদার।

‘স্প্যানিশ খচ্চরচালকের কাছে গান ও ব্যালাডের এক অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে, যা দিয়ে তারা ভ্রমণের ক্লান্তিকে বিভ্রান্ত করে। খচ্চরচালকেরা উচ্চস্বরে এবং দীর্ঘ টান টান তালে গানগুলো উচ্চারণ করে আর খচ্চরের ওপর বসে অসীম গুরুত্বের সঙ্গে সময়কে তার গতিতে সুরের সঙ্গে ধরে রাখে। এই গানগুলো প্রায়ই মুরদের সম্পর্কে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী রোমান্স অথবা কোনো সাধুর কিংবদন্তি অথবা কোনো প্রেমের কবিতা অথবা একজন সাহসী চোরাচালানকারী অথবা কঠোর ব্যান্ডোলেরো সম্পর্কে কিছু ব্যালাড। কারণ, চোরাচালানকারী ও ডাকাত স্পেনের সাধারণ মানুষের কাব্যিক নায়ক। প্রায়ই খচ্চরওয়ালাদের গান মুহূর্তের মধ্যে রচিত হয় এবং স্থানীয় দৃশ্য বা যাত্রার কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। গান গাওয়া ও ইম্প্রোভাইজ করার এই প্রতিভা স্পেনে প্রায়ই দেখা যায় এবং বলা হয় যে তারা মুরদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তারা যে অভদ্র এবং একাকী দৃশ্যগুলো চিত্রিত করে তার মধ্যে এই গানগুলো শোনার এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি আছে; যেমনটি হয় মাঝেমধ্যে খচ্চরের ঘণ্টার ঝনঝন শব্দও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। খচ্চরগুলো সারিবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে খাড়া খাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসে।

প্রাচীন গ্রানাডা রাজ্য, যেখানে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম, স্পেনের সবচেয়ে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি। বিশাল সিয়েরা বা পাহাড়ের শৃঙ্খল, ঝোপঝাড় বা গাছবিহীন এবং বিভিন্ন মার্বেল এবং গ্রানাইট দিয়ে সজ্জিত, তাদের রোদে পোড়া চূড়াগুলোকে গভীর নীল আকাশের বিরুদ্ধে উঁচু করে তোলে; তবুও তাদের রুক্ষ বুকে সবুজ এবং উর্বর উপত্যকা, যেখানে মরুভূমি ও বাগান লড়াই করে ডুমুর, কমলা ও লেবু উৎপাদন করতে এবং গোলাপ ফুল ফোটাতে বাধ্য হয়।

এই পাহাড়ের জঙ্গলে পাহাড়ের মাঝখানে ঈগলের বাসার মতো নির্মিত প্রাচীর ঘেরা শহর ও গ্রাম, মুরিশ যুদ্ধক্ষেত্র অথবা উঁচু চূড়ায় স্থাপিত ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রহরী টাওয়ারের দৃশ্য, মনকে খ্রিষ্টীয় ও মুসলিম যুদ্ধের শৌর্যের দিনগুলোতে এবং গ্রানাডা বিজয়ের রোমান্টিক সংগ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই উঁচু সিয়েরা অতিক্রম করার সময় ভ্রমণকারীকে প্রায়ই নেমে যেতে হয় এবং তার খচ্চর বা ঘোড়াটিকে খাড়া খাড়া আরোহণ এবং অবতরণ বরাবর ওপরে ও নিচে নিয়ে যেতে হয়, যা সিঁড়ির ভাঙা ধাপের মতো। কখনো কখনো রাস্তাটি মাথা ঘোরানো খাড়া খাড়া, অন্ধকার ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নেমে যায়। কখনো কখনো পথটি জলের স্রোত দ্বারা পরিপূর্ণ, চোরাচালানকারীদের অস্পষ্ট পথের মধ্য দিয়ে সংগ্রাম করে; রাস্তার কোনো এক নির্জন অংশে পাথরের ঢিবির ওপর নির্মিত ডাকাতি ও খুনের স্মৃতিস্তম্ভ, অশুভ ক্রুশ ভ্রমণকারীকে সতর্ক করে যে সে ডাকাতদের আড্ডার মধ্যে আছে, সম্ভবত সেই মুহূর্তেই কোনো ব্যান্ডোলেরোর চোখের সামনে চলে আসবে। কখনো কখনো সরু উপত্যকা দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় সে একটি কর্কশ চিৎকারে চমকে ওঠে এবং তার ওপরে পাহাড়ের কোনো সবুজ ভাঁজে হিংস্র আন্দালুসীয় ষাঁড়ের একটি পাল দেখতে পায়। এই সবে আমি ভয়াবহতা অনুভব করেছি।

স্প্যানিশ ও ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি আরভিংয়ের আগ্রহ, অতীতের প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণের পাশাপাশি তিনি গ্রানাডা ভ্রমণে আসেন। তিনি বিশেষ করে আলহামরা এবং এর গল্প, কিংবদন্তি ও ইতিহাসের প্রতি আকৃষ্ট হন। গ্রানাডা ও আলহামরায় তাঁর সময়কাল তাঁর লেখায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, যার ফলে‘টেলস অব দ্য আলহামরার’ সৃষ্টি, যা প্রাসাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনা, পৌরাণিক কাহিনি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে উদ্ভাসিত করে। 

১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়
১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ছবি: লেখকের পাঠানো

বেলুচিস্তানে সশস্ত্র আন্দোলন গোপনে কারা, কেন উসকে দিচ্ছে by রহিম নাসার

ভূরাজনীতির মঞ্চে ছায়া আর নীরবতা দিন দিন প্রধান বিষয় হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে চলমান সশস্ত্র লড়াই প্রক্সি যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে সামনে নিয়ে আসছে। ১৫ জুলাই ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রায়ান বারলেটিক নতুন এক বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন। তাঁর অভিযোগ হলো ওয়াশিংটন সম্ভবত নীরবে বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা দিচ্ছে। নির্দিষ্ট করে চীনা প্রকৌশলী ও পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করতে এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

যদিও তাঁর এই দাবির সত্যতা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। তার পরও তথ্য–প্রমাণ থেকে এই বাস্তবতা দৃশ্যমান হচ্ছে যে বেলুচ সশস্ত্র সংগ্রাম এখন আর নিখাদ অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম নেই। এটি এখন দুই পরাশক্তির কৌশলগত টানাপোড়েনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বেলুচিস্তানে অন্তত এক ডজন সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুজন পদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছেন।

বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ভিন্নমত ও বিদ্রোহের একটি কেন্দ্র। এখন এটি বৃহত্তর বৈশ্বিক সংঘাতের একটি বিভেদক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বেলুচিস্তান ইরান ও আফগানিস্তানের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদার বন্দর এখানে রয়েছে।, বেলুচিস্তান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি ভারকেন্দ্র।

গোয়াদার বন্দরের সঙ্গে সংযুক্তির কারণে বেইজিংয়ের পক্ষে মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে বাণিজ্য করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা ওয়াশিংটন ও এর মিত্রদের কৌশলগত হিসাবনিকাশকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, চীনা স্বার্থ লক্ষ্য করে ঘটানো প্রতিটি হামলা শুধু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের প্রতিফলন নয়, এটা বৈশ্বিক উদ্বেগেরও প্রতিধ্বনি।

যদিও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু পরিস্থিতিগত বাস্তবতা বলছে, এটাকে অস্বীকার করা কঠিন।

ইউএস পিস ইনস্টিটিউট, ফরেন পলিসি ও রেডিও ফ্রি ইউরোপের মতো সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে তড়িঘড়ি করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র এখন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ও তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-সহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে। এ ধরনের মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের বিস্তার (এমনকি তা অনিচ্ছাকৃত হোক না কেন) এ অঞ্চলে (বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে) সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত বাস্তবতা হিসেবে কাজ করেছে।

বালুচ বিদ্রোহ, জিহাদি আন্দোলন নয়। সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক অধিকার, জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের মতো পরিভাষা ব্যবহার করার কারণে বেলুচ বিদ্রোহ খুব স্বাচ্ছন্দ্যে পশ্চিমা উদারপন্থী মূল্যবোধের সঙ্গে মিলে যায়। এ আদর্শগত সাযুজ্যের কারণে বালুচদের প্রবাসী সংগঠনগুলো ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসে প্রভাব তৈরির সুযোগ পাচ্ছে। তারা প্রকাশ্যেই মার্কিন কংগ্রেসের হস্তক্ষেপ এবং পাকিস্তানের বিদ্রোহ দমন নীতির উপর বৈশ্বিক নজরদারির দাবি তুলছেন।

যদিও এ ধরনের প্রকাশ্য তদবির গোপন পৃষ্ঠপোষকতার সমান নয়; কিন্তু এখান থেকে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যে বেলুচ লিবারেশন আর্মি সম্প্রতি চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে, তাদের নিয়েই পশ্চিমা রাজধানীগুলিতে আলোচনা চলছে, বিবৃতি আসছে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র বেলুচ লিবারেশন আর্মিকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও সেটি অনেকটাই আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। সংগঠনটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গঠন, অর্থ সংগ্রহ ও প্রচারণা—এ সব কর্মকাণ্ড রোধে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নীতি নতুন নয়। লাতিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য—প্রকাশ্যে কূটনৈতিক অবস্থান নিলেও, গোপনে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্থিরতা সৃষ্টির কাজে সহায়তা দিয়েছে, এই ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের।

উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার কথা বলা যায়। সেখানে জিহাদি সহিংসতার বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রকাশ্য নিন্দা জানালেও আসাদবিরোধী এই শক্তিগুলোকে গোপনে সমর্থন জানিয়ে গেছে। বিদ্রোহে বিপর্যস্ত বেলুচিস্তানে কৌশলগত যুক্তি খুব একটি ভিন্ন নয়। বেলুচ বিদ্রোহীরা চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সেবা করে।

ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই যুক্তি খাটে। ইরানে জাতিগত বালুচ অধ্যুষিত অঞ্চল সিস্তান ও বেলুচিস্তান বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তেহরান বারবার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তারা ‘জায়েশ আল-আদল’ নামের সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছে। এই গোষ্ঠী ইরানের নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর হামলার জন্য দায়ী। এ অভিযোগ সত্য হোক আর মিথ্যা হোক, সীমান্ত অঞ্চলে স্থায়ী অস্থিরতা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করতে চাওয়া শক্তিগুলোর পক্ষেই যায়।

ভারতের ভূমিকা এখানকার সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। চীন-পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে শঙ্কিত নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের অভিযোগ হলো, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ জোগাচ্ছে ভারত। তালেবান এখন ক্ষমতায় এবং আঞ্চলিক জোটগুলোর পুনর্গঠন চলছে—এই প্রেক্ষাপটে কে বা কারা বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে সহায়তা করে চলেছে, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

এসব বাস্তবতায় পাকিস্তানের নীরব প্রতিক্রিয়া অনেক কথায় বলে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ও পাকিস্তানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের ওপর একের পর এক হামলা হওয়া সত্ত্বেও ইসলামাবাদ কখনোই এই বিদ্রোহের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উচ্চারণ করেনি। এর বদলে পাকিস্তান মূলত ভারতের দিকে অভিযোগের তির ছোড়ে কিংবা ‘শত্রু দেশের গোয়েন্দা সংস্থা’র কাজ বলে বিবৃতি দেয়। এই কূটনৈতিক সংযমের পেছনে যুক্তি আছে।

পাকিস্তানের অর্থনীতি খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দেশটিকে বারবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো কঠিন।

* রহিম নাসার, পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

গত দুই সপ্তাহে বেলুচিস্তানে অন্তত এক ডজন সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
গত দুই সপ্তাহে বেলুচিস্তানে অন্তত এক ডজন সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ফাইল ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের সিরিয়া আক্রমণ যেভাবে বুমেরাং হচ্ছে by এরসিন আকসয়

সুয়েইদা অঞ্চলের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং এরপর সেখানে ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপ আবারও সিরিয়াকে আঞ্চলিক রাজনীতির পাদপ্রদীপে নিয়ে এল।

গত বছরের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের পতনের পর থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, সিরিয়ার নতুন সরকার কি দেশজুড়ে বিদ্যমান গভীর আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও নিজেদের ভিত্তি সংহত করতে পারবে?

সিরিয়ার চলমান রাজনৈতিক রূপান্তরকে বোঝার জন্য সুয়েইদা অঞ্চল ঘিরে চলা সংঘাত ও তাতে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা দেশটির নতুন সরকারের সমর্থক–ভিত্তির ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি।

দক্ষিণ সিরিয়ায় সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরু হয়েছিল দ্রুজ ও বেদুইন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। সিরিয়ার সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত তাতে হস্তক্ষেপ করে। এরপর ইসরায়েল দামেস্কে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এমনকি সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছেও বোমা হামলার খবর পাওয়া যায়।

সুয়েইদা থেকে সিরীয় বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর দ্রুজ ও বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। অঞ্চলটিতে বিভাজন আরও ঘনীভূত করে এবং সাধারণ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম হয়।

দ্য নিউ সিরিয়ান আর্মি এবং এর প্রধান মিত্র তুরস্ক কয়েক বছরের সংঘাতের মধ্য দিয়ে লড়াইয়ের বিশাল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আসাদ সরকারের পতন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব কমাতে তারা যৌথভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে গণহত্যা চালিয়ে যাওয়া ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্রগতি খুব নিবিড়ভাবে নজর রাখছিল। দ্রুজ সম্প্রদায়ের নেতাদের ব্যবহার করে সিরিয়াকে আরও অস্থিতিশীল করতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হলো সিরিয়ার নতুন প্রশাসন যাতে নিজেদের সংহত করতে না পারে, সেটা ঠেকানো। এটাকে ইসরায়েল হুমকি হিসেবে দেখে। বিশেষ করে যখন সিরিয়ার সরকার তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।

ইসরায়েলের দামেস্কে বিমান হামলার প্রতিক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের নিরিখে দেশটির জনজাতিগুলো কার্যত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রশাসনের সামনের সারির মুখ হিসেবে আবির্ভূত হলো। এই জনজাতিগুলো অভিনব কৌশল প্রয়োগ করছে। নগর এলাকায় আশ্রয় নেওয়া এবং আকাশ থেকে নজরদারি এড়াতে টায়ার পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করার মতো কৌশল নিচ্ছে তারা। এর ফলে তারা সুয়েইদা শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।

ইসরায়েল এখনো তাদের ওপর কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ চালাতে পারেনি। কারণ, পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করা জনজাতিগুলোর ওপর বিমান হামলা চালানো কার্যকর কোনো পদ্ধতি নয়।

নিজেদের সমর্থকদের ভেতরকার বৈচিত্র্যময় বিভক্তি নিরসন করে কীভাবে একটি রাজনৈতিক সংহতি অর্জন করা সম্ভব, সেই প্রশ্নে সিরিয়ার নতুন প্রশাসনকে জর্জরিত হতে হচ্ছে।

এই চ্যালেঞ্জ এখন কুর্দিদের দ্য ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি এবং সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস এবং দ্রুজ গোষ্টীগুলোকে একত্র করার কাজের বাইরের বিষয়। সিরিয়ার নতুন সরকারে অনেকগুলো মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত। সেটা রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই সম্পৃক্ত।

ইসরায়েলের দামেস্ক লক্ষ্য করে চালানো হামলা সিরিয়ার নতুন সরকারেরর সব সমর্থক–গোষ্ঠীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনজাতিগুলোর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরালো হয়েছে। এটা বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক অভিযানে পরিলক্ষিত হয়েছে। এটি বর্তমান শাসকদের সমর্থকদের অভ্যন্তরীণ সংহতি অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

দ্রুজ সম্প্রদায়ের অনেক গোষ্ঠী দামেস্কের সঙ্গে মধ্যস্থতার পথ খুঁজছে। তাদের কিছু নেতা অস্ত্র সংবরণ ও সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির আলোকে দেখা যাচ্ছে, এসব নেতা ইসরায়েল–ঘনিষ্ঠ নেতাদের, (যেমন হিকমাত আল-হাজরি) ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছেন। দ্রুজরা যদি সফলভাবে একীভূত হতে পারে, তাহলে কুর্দি বাহিনীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াতে তা গভীর প্রভাব ফেলবে।

দামেস্কে ইসরায়েলের হামলার ফলে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের বহু সমর্থক এখন বাইরের হুমকি মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দ্রুজ গোষ্ঠীগুলো যদি শারা প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে সিরিয়ার জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী হবে। সিরিয়ার সামগ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে ভূমিকা রাখবে।

* এরসিন আকসয়, সিরিয়ার ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে গবেষক
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সিরিয়ার বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংহতি বাড়ছে
সিরিয়ার বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংহতি বাড়ছে। ছবি : এএফপি

কঙ্কালসার শিশুতে ভরা গাজার হাসপাতাল অনাহারে মৃত্যু, মহামারি

সাত মাসের মোহাম্মদের হাড্ডিসার হাত দুটোতে একটি রম্পারের হাতা ঝুলে আছে। রম্পারের বুকে হাসিমুখ ইমোজি আর লেখা: ‘স্মাইলি বয়’। গাজার হাসপাতালে দাঁড়িয়ে এই লেখা পড়া এক নির্মম রসিকতা ছাড়া কিছু নয়। মোহাম্মদ দিনের বেশির ভাগ সময় কান্নায় কাটায়, না হয় নিজের ক্ষয়ে যাওয়া আঙ্গুল কামড়ায়। মাত্র ৪ কেজি (৯ পাউন্ড) ওজন তার। জন্মের সময় সুস্থ থাকলেও মায়ের অপুষ্টির কারণে বুকের দুধ পান করতে পারেনি। জন্মের পর থেকে পরিবার মাত্র দু’টি টিন ফর্মুলা দুধ সংগ্রহ করতে পেরেছে। হাসপাতালের ওয়ার্ডে আরও কঙ্কালসার শিশু ভর্তি। ১২টি বেডে একাধিক শিশু শুয়ে আছে। গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি এভাবেই তুলে ধরেছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। শিশু মোহাম্মদের দাদি ফায়েজা আবদুল রহমান বলেন, সবচেয়ে বড় ভয় এখন নাতিকে অপুষ্টিতে হারানোর। আমি নিজেই সারাক্ষণ মাথা ঘোরায় ভুগছি। আগের দিন সারা দিনে এক টুকরো পিঠা রুটি (দাম ১৫ শেকেল বা প্রায় ৩ পাউন্ড) ছাড়া কিছু খায়নি। তার ভাইবোনেরাও তীব্র ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে। কিছু দিন ধরে তারা অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। গাজা সিটির মাত্র দু’টি শিশু বিভাগ চালু আছে। প্রতিদিন ২০০ পর্যন্ত শিশু চিকিৎসা নিতে যায় সেখানে। ডা. মুসাব ফারওয়ানা সারা দিন চেষ্টা করেন শিশুদের বাঁচাতে। কিন্তু প্রায়ই ব্যর্থ হন। নিজের সন্তানরাও দ্রুত ওজন হারাচ্ছে। কারণ তার বেতন দিয়ে চাহিদার সবকিছু কেনা যায় না। তিনি গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ সংগ্রহেও যান না। কারণ সহকর্মী ডা. রমজি হজাজ সেখানেই খাবার নিতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।

গাজায় নজিরবিহীন দুর্ভিক্ষ
দুই বছরের যুদ্ধে একাধিকবার দুর্ভিক্ষের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে গাজায়। তবু এ সপ্তাহেই মাত্র তিনদিনে ৪৩ জন ক্ষুধায় মারা গেছেন। এর আগে মোট মৃত্যু ছিল ৬৮। ফায়েজা বলেন, গত বছর উত্তর গাজায় খাদ্য অবরোধের সময়ও পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল না। এবার যেন ভয়ঙ্করতম সময়। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা ও ইসরাইলি সরকারি তথ্য মিলিয়ে দেখা যাচ্ছেÑ খাদ্য মজুত প্রায় শেষ, ময়দার দাম বছরের শুরুর তুলনায় ৩০ গুণ বেশি। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এনজিও কর্মীরাও না খেয়ে কঙ্কালসার হয়ে যাচ্ছেন। এ তথ্য জানিয়েছে শতাধিক ত্রাণ সংস্থার যৌথ বিবৃতি। যার মধ্যে আছে মেডিসিন উইদাউট বর্ডার্স, সেভ দ্য চিলড্রেন, অক্সফ্যামও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম ঘেব্রিয়েসাস বলেন, গাজার বেশির ভাগ মানুষ অনাহারে। এটাকে আর কী বলা যায়? এটা মানবসৃষ্ট গণ-অনাহার।

ইসরাইলি অবরোধ ও ‘মৃত্যু ফাঁদ’ ত্রাণকেন্দ্র
২রা মার্চ থেকে ইসরাইল গাজায় সম্পূর্ণ অবরোধ চালু করে। ১৯শে মে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবরোধ তুলে নেন। তবে এরপরও ত্রাণ সীমিতভাবে ঢুকতে দেয়া হয়, যাতে দুর্ভিক্ষ ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী হয়। সব ত্রাণকে এখন একটি মার্কিন-সমর্থিত গোপন সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে, যারা চারটি সামরিকায়িত কেন্দ্রের মাধ্যমে খাবার বিতরণ করে। ফিলিস্তিনিরা এই কেন্দ্রগুলোকে বলেন ‘মৃত্যু ফাঁদ’। খাবারের জন্য ভিড় করতে গিয়ে সেখানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। ২২শে জুলাই পর্যন্ত জিএইচএফ ৫৮ দিন ধরে চালু থাকলেও তারা যে খাবার এনেছে, তা সমানভাবে বণ্টন হলেও গাজার জনসংখ্যাকে দুই সপ্তাহও টিকিয়ে রাখতে পারতো না।

ক্ষুধায় বিধ্বস্ত খালিদি পরিবার
উম্মে ইউসুফ আল-খালিদি প্রথমবারের মতো জিএইচএফ কেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার স্বামী পক্ষাঘাতগ্রস্ত, ছোট সন্তান মাত্র দুই বছর বয়সী। তিনি বলেন, আমরা শুধু পানি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছি। নিজের জন্য ভয় কম, পরিবারের জন্য ভয় বেশি। চারদিন কিছু খাইনি। পরে এক ব্যাগ চাল ও দুইটি আলু পেয়েছি। যা একজন অপরিচিত পথচারী দিয়ে গিয়েছেন। একসময়ের মেধাবী সন্তানরা, যারা বৃত্তি পেতো, এখন ভাঙা মসজিদের সামনে রাস্তার ধারে পুঁতির ব্রেসলেট বিক্রি করে। তবে বিক্রি হয় খুবই কম। খালিদি বলেন, আমার সন্তানরা কঙ্কালসার, হাড় আর চামড়া ছাড়া শরীরে কিছু নেই। সামান্য কাজেই মাথা ঘোরায়। তারা শুধু খাবার চায়, আর আমার কিছু দেয়ার নেই। খালিদি অবশেষে স্থির করলেন, খাবার পাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা পরিবারের একমাত্র প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যুর ঝুঁকির চেয়ে বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে ও দৌড়ে ত্রাণ আনার চেষ্টা করতে হবে। আর পরিবার শুধু অপেক্ষা করবে, ফিরে আসা না আসার অনিশ্চয়তায়।

গাজার সাংবাদিকদের রক্ষায় বিবিসিসহ তিন সংবাদমাধ্যমের বিবৃতি

গাজার সাংবাদিকদের নিয়ে এবার গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বিবিসি নিউজসহ আরও তিনটি সংবাদমাধ্যম। উপত্যকাটিতে নিজের এবং পরিবারের জন্য খাদ্য সংগ্রহে অক্ষম হয়ে পড়েছেন সাংবাদিকরা। গাজা সংঘাত শুরুর পর থেকেই প্রতিবেদন করে যাচ্ছেন তারা। বর্তমানে তারা অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েচে বিবিসি নিউজ, এজেন্সি ফ্রান্স-প্রেস (এএফপি), অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি) এবং রয়টার্স।  

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বহু মাস ধরে গাজা থেকে বিশ্ববাসীর কান ও চোখ হিসেবে কাজ করছে সেখানের সাংবাদিকরা। বিবিসিসহ কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি ইসরাইলি। তাই স্থানীয় এসব সাংবাদিকদের ওপরই নির্ভর করেছে বিশ্ব মিডিয়া। সম্প্রতি গাজায় তীব্র দুর্ভীক্ষের বিষয়ে সতর্ক করেছে শতাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও এনজিও।

গণমাধ্যমগুলোর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজায় আমাদের সাংবাদিকদের জন্য আমরা খুব উদ্বিগ্ন। যারা নিজের এবং পরিবারের খাদ্য জোগাতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। বহু মাস ধরে বিশ্ববাসীর চোখ ও কান হিসেবে কাজ করছে উপত্যকার এই স্বাধীন সাংবাদিকেরা। এতদিন তারা যে পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছে এখন তারাই সে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।  
বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকরা অনেক বঞ্চনা এবং কষ্ট সহ্য করেন। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, এখন অনাহারের মুখোমুখি হয়েছেন তারা। আমরা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানাই তারা যেন সাংবাদিকদের সেখান থেকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য পৌঁছানো অপরিহার্য।

mzamin

অধিকৃত পশ্চিম তীর ও জর্ডান উপত্যকা সংযুক্ত করতে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে গতকাল বুধবার জর্ডান উপত্যকাসহ পুরো অধিকৃত পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। এতে করে বিষয়টি আলোচনার জন্য পার্লামেন্টের এজেন্ডায় যুক্ত হলো। প্রস্তাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা নেসেটের ‘আলোচ্যসূচি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে’।

ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওত আহারোনোতের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২০ আসনের নেটেসে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট পড়েছে ৭১টি। বিপক্ষে পড়েছে ১৩টি। কাহোল লাভান এবং ইয়েশ আতিদ পার্টি প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল।

আহারোনোতের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ এটা বাস্তবে কোনো আইন বা নিয়ম হিসেবে কার্যকর হবে না। তবে নেসেটের ঘোষণা হিসেবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীর ‘ইহুদি জনগণের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মাতৃভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ’। প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, হেবরন ও নাবলুসের মতো ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত শহর এবং শিলোহ ও বাইত এলের মতো অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলো ‘ইসরায়েলের ভূমিতে ইহুদি উপস্থিতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা’র ইঙ্গিত দেয়।

প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের আন্তসীমান্ত হামলা প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে এবং তাতে করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও বিপন্ন হবে।

নেসেট ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, পশ্চিম তীর ও জর্ডান উপত্যকায় অবস্থিত সব ইহুদি বসতিতে কালবিলম্ব না করে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব, তথা ইসরায়েলের আইন, বিচার ও প্রশাসন সম্প্রসারিত করতে হবে। যাতে করে ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা মজবুত হয় এবং ইহুদি জনগণের মাতৃভূমিতে শান্তি ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়।

১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকা দখল করে নিয়েছিল ইসরায়েল। ৩৮ বছর পর ২০০৫ সালে গাজা থেকে সেনা ও বসতি প্রত্যাহার করেছিল দেশটি। কিন্তু এখন আবার গাজা দখলের পাঁয়তারা করছে।

জর্ডান উপত্যকা অধিকৃত পশ্চিম তীরের পূর্ব অংশে অবস্থিত, যা জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে প্রসারিত একটি উর্বর ও কৌশলগত অঞ্চল। এটি প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এবং ফিলিস্তিনি কৃষি, জীবনযাপন ও ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল থেকে এই অঞ্চলটিও দখলে রেখেছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শুধু পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও অবৈধ বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় প্রায় ১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে সাত হাজারের বেশি।

গত জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক মতামতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল অবৈধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের সব বসতি খালি করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।

একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতির পেছনে একজন ফিলিস্তিনি বেদুইনকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায়  
একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতির পেছনে একজন ফিলিস্তিনি বেদুইনকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায় ফাইল। ছবি: রয়টার্স