Wednesday, June 6, 2018

অবশেষে ইসরাইলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ বাতিল করল আর্জেন্টিনা

ইহুদিবাদি ইসরাইলের সঙ্গে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে (জেরুজালেম) পূর্বনির্ধারিত প্রীতি ম্যাচটি বাতিল করেছে আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দল। বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা ও ফিলিস্তিনি ফুটবল ফেডারেশনের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হল।
আর্জেন্টিনার ক্রীড়াবিষয়ক ওয়েবসাইট মিনুতুনো জানিয়েছে, সহিংসতা বৃদ্ধির আশঙ্কা, হুমকি ও সমালোচনার মুখে লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনার ফুটবল দল ইসরাইলের সঙ্গে ৯ জুনের প্রস্তুতি ম্যাচটি বাতিল করেছে। এমন সিদ্ধান্তের পর ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এমনকি গাজায় এ নিয়ে উল্লাস করেছেন ফিলিস্তিনিরা।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল ডিরেক্টর সুসান শালাবি বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি ম্যাচটি বাতিল হয়েছে, তবে অফিসিয়ালি আমরা এখনও নিশ্চিত হইনি। যদি নিশ্চয়তা পাই তবে, আর্জেন্টিনা দলকে আমি অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই, যে তারা রাজনীতির বাজে অংশ হচ্ছে না।’
ম্যাচটি বাতিল প্রসঙ্গে আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়েইন স্বস্তি প্রকাশ করেই বলেছেন, ‘আমি মনে করি সঠিক সিদ্ধান্তটিই নেয়া হয়েছে। এটা এখন আমাদের অতীত। অবশ্যই আমাদের স্বাস্থ্য ও সাধারণ বিষয়গুলো সবার আগে প্রাধান্য পাবে। সেখানে না যাওয়াটাই আমাদের জন্য শ্রেয়।’
প্রথমে ইসরাইলের হাইফাতে এই ম্যাচটি হওয়ার কথা থাকলেও পরে ভেন্যু বদলে তা পশ্চিম বায়তুল মুকাদ্দাসের টেডি স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে এই স্টেডিয়ামটি বানিয়েছিল ইহুদিবাদি ইসরাইল। এছাড়া, এই স্টেডিয়ামটি ফিলিস্তিনিদের গুপ্তহত্যায় ব্যবহার করা হতো।
এ কারণে ফিলিস্তিনিরা এ শুরু থেকেই এ ম্যাচটির বিরোধিতা করে আসছিলেন। তারা মনে করেন, বায়তুল মুকাদ্দাসে লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনার খেলতে আসার অর্থ ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনের পরোক্ষ স্বীকৃতি দেয়া। এ প্রেক্ষিতে ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জিবরিল রাজুব আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) প্রধান ক্লদিও তাপিয়াকে লেখা এক চিঠিতে ম্যাচটি বাতিলের আহ্বান জানান।
তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইল খেলাকেও রাজনীতিকীকরণ করছে। তারা এমন একটি মাঠে খেলা আয়োজন করেছে, যেটা ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে বানানো। ১৯৪৮ সালে ইসরাইলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের গ্রাম ধ্বংস করে অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে টেডি স্টেডিয়াম বানিয়েছিল।
জিবরিল বলেন, ইসরাইল হচ্ছে একটা দখলদার ও বর্ণবাদী বাহিনী। তারা সবসময় বৈশ্বিক মূল্যবোধ ও নীতিলঙ্ঘন করে আসছে। আর সেই মূল্যবোধ লঙ্ঘন করেই তারা এই প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করেছে।
ফিলিস্তিনি ফুটবল ফেডারেশনের অনুরোধ সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় জিবরিল আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির প্রতি আহ্বান জানান, ‘মেসি তুমি ইসরাইলে খেলতে এসো না। ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যে জাতি বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়েছে ইসরাইলে খেলতে এসে তার বৈধতা তুমি দিও না—এটা আমাদের অনুরোধ!’
জিবলি আরও বলেন, ‘মেসি আমাদের কথা না শুনলে মুসলিম বিশ্বের সব তরুণদের বলব, তাঁর ছবি ও জার্সি পুড়িয়ে ফেলতে। মেসিকে বর্জন করতে।’
মূলত ফিলিস্তিনিদের অনুরোধ, হুঁশিয়ারি ও বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে অবৈধ ইসরাইলি রাষ্ট্রের ৭০ বছর পূর্তির অংশ হিসেবে বিশ্বকাপের আগে পূর্বনির্ধারিত প্রস্তুতি ম্যাচটি বাতিল হল।

গাজীপুরে ফুলরূপী কাঁঠাল নিয়ে কৌতূহল by ইকবাল আহমদ সরকার

গাজীপুরের একটি গাছের কাঁঠাল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে কৌতূহল। এক ধরনের ফুলের রূপ নিয়েছে ওই গাছের সব কাঁঠাল । শুরুতে ওই গাছের কাঁঠাল খেতে সুস্বাদু হলেও এখন কাঁঠাল বড় হয়ে কোষগুলো বাইরে বেরিয়ে যায়। দেখতে থোঁকা থোঁকা ফুল মনে হওয়ায় সেসব ছবি ইতিমধ্যে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যতিক্রমী এই বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রতিদিন শ’ শ’ লোকজন ভিড় করছেন ওই কাঁঠাল গাছের নিচে। তবে কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীনগত কারণে অথবা রোগজনিত কারণে এমনটি হতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে এবং সমাধান দেয়া যাবে।
গাজীপুর মহানগরের উত্তর সালনা এলাকার কৃষক রমিজ উদ্দিনের বাড়ির গাছের কাঁঠাল বড় হলে গত কয়েক বছর ধরে সেটির কোষ আর ভেতরে আবদ্ধ থাকছে না। যদিও শুরুতে এই গাছের কাঁঠাল খেতেও বেশ সুস্বাদু ছিল। কোষগুলো বাইরে বেরিয়ে গিয়ে থোকায় থোকা ফুলের মতো ঝুলে থাকে। কাঁঠাল নতুন ধরনের ফুলে রূপ নেয়ার এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে গেলে তা দেখতে গাছের নিচে প্রতিদিনই ভিড় জামাচ্ছেন শ’ শ’ মানুষ। অনেকে ব্যতিক্রমী এ কাঁঠালের ছবি তুলে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কৃষক রমিজ উদ্দিন জানান, গাছে যথারীতি মুচি হয় এবং বড় হয়। কিন্তু পাঁকার আগে কাঁঠাল ফেটে গিয়ে এর কোষগুলো বাইরে বেরিয়ে যায়। এ অবস্থায় কাঁঠালগুলো আর খাওয়ার উপযোগী থাকছে না। এলাকাবাসি বলছেন, এই প্রথমবার তারা এমন ব্যতিক্রমধর্মী কাঁঠাল দেখছেন। তাই লোকজনের মুখে শুনে এখানে দেখতে এসেছেন। অনেকে ব্যতিক্রমী এ কাঁঠালের ছবি তুলে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আর তাতে করে আরো বেশি সংখ্যক নানা বয়সী নারী-পুরুষ বিশেষ করে তরুণদের ভিড় জমে উঠছে। অনেকে বিষয়টিকে অলৌকিক ঘটনা বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জিল্লুর রহমান জানান, ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের এই কাঁঠাল নিয়ে আগ্রহ রয়েছে কৃষি বিজ্ঞানীদেরও। তারা বলছেন, কাঁঠালের স্বাভাবিক যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা থেকে এই গাছের কাঁঠাল আলাদা। এছাড়া বিভিন্ন জাতের সমস্যাও রয়েছে। তবে এই প্রথম সালনা এলাকায় যে কাঁঠাল গাছটি দেখা গেছে সেটির কাঁঠাল বড় হয়ে পাকার উপযোগী হলে এর কোষগুলো ফেটে বাইরে বেরিয়ে আসছে। এটি শারীরতাত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে হতে পারে। এছাড়া গাছের জিনগত অথবা রোগাক্রান্ত হয়ে এমনটি হতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এর সমস্যা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন এই কৃষি বিজ্ঞানী।
প্রায় ১৬ বছর আগে কাঁঠাল গাছটির চারা রোপণ করা হয়। কয়েক বছর পর সেই গাছে কাঁঠাল ধরতে শুরু করে এবং শুরুতে এই কাঁঠাল খেতেও বেশ সুস্বাদু ছিল। কিন্তু বর্তমানে কাঁঠালের এই গাছটি আরো অন্য কোনো গাছের জন্য বা মানুষের জন্য কতটুকু উপকারী, না ক্ষতিকর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এখানকার স্থানীয়রা।

মরুতে বাঙালি নারীর কান্না by সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

সড়ক দুর্ঘটনা, মাদকবিরোধী যুদ্ধ আর নানা ধরনের খবরের মাঝে বড় আলোড়ন তুলতে পারেনি নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে ফেরা নারী গৃহশ্রমিকরা। এরা দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে ফিরেছে, এরা ট্রমায় আছে, এদের স্বজনরা বিমানবন্দরে কাঁদছেন।
কিন্তু আমরা কী দেখলাম? বিপন্ন এসব নারীর প্রতি কোনও সহানুভূতি তো নেই, নিজের দেশের মর্যাদা নিয়েও এরা ভাবে না বলেই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব নিজে নারী হয়েও বলতে পেরেছেন এসব নারী গল্প ফাঁদছে। কতটা অসংবেদনশীল হলে আমলা হওয়া যায়, সেটা হয়তো ভাবনার আরেকটি বিষয়।
এই নারীদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের অনেকেই তিন মাস পর্যন্ত সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমে ছিলেন। ফেরার অপেক্ষায় আছে আরও অসংখ্য নারী।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহ খাতে কর্মী নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। অবশ্য যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রেখেছে। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি বলেছে, সৌদি আরবে নারী শ্রমিকরা যে ধরনের পরিস্থিতিতে থাকে, তা আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানায়।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেওয়া তথ্য বলছে, গত বছর ১৮টি দেশে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ছিল এক লাখের বেশি। এরমধ্যে শুধু সৌদি আরবে যান ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন।
নারী শ্রমিকদের প্রায় সবাই যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সৌদি আরবে। এরা ঠিকমতো খাবার পায় না। শারীরিক নির্যাতনও খুব স্বাভাবিক সৌদিদের কাছে।  ফেরত আসা একাধিক নারী বলেছে, বাসার মালিক সুযোগ পেলেই যৌন সহিংসতা করে। মালিকের স্ত্রীদের জানালে তারাও পেটাতে শুরু করে। এটাই সৌদিদের সংস্কৃতি।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়াই উত্তম। জীবিকার তাগিদে বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে শোষণের পাশাপাশি যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া, এমনকি জীবন হারানোর ঘটনাও যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
সৌদি আরবে আমাদের নারী গৃহকর্মীদের ন্যায্য বেতন থেকে বঞ্চিত করা ও শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ অতি পুরনো। দালালদের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত নারীদের বন্দিদশা, প্রাণ হাতে করে পালিয়ে স্বদেশে ফেরা ইত্যাদি অভিযোগেরও প্রতিকার হয়নি। শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের যৌন নিপীড়নের ঘটনাও প্রতিকারহীনভাবে বেড়ে চলেছে। সৌদি আরবে কর্মরত আমাদের নারী গৃহকর্মীদের মধ্যে ধর্ষণের ঝুঁকি প্রকট, তাদের মধ্যে ধর্ষণ-আতঙ্ক একটা সাধারণ বিষয়। এভাবে অন্তত ২২ জন নারী গৃহকর্মী মারা গেছে। অনেকে অপমান-নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরে আসতে পেরেছে অনেকে, অনেকে পারছেন না। পারিবারিক ও সামাজিক দিক থেকে তারা এক দুর্বিষহ জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন।
নারী গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনসহ নানা ধরনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবের সঙ্গে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি করেছে এবং তারপর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ নারী গৃহকর্মী সৌদি আরবে গেছেন।
সৌদি আরবের নারী শ্রমিক পাঠাতে যে চুক্তি করা হয়েছে, তাতে নারী গৃহকর্মীদের অধিকারের বিষয়গুলোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি। কেউ কেউ বলেন, চুক্তিটি তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে।
নির্যাতন বন্ধে সরকারের বড় ভূমিকা আছে। তবে জানা গেলো যে আমাদের নারী গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়া হয়নি। দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কারিগরি কমিটিতে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করার কথা।
কিন্তু এখনও তা করা হয়নি। দেড় লাখ নারীর জন্য অত্যন্ত বিরূপ ও সব বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ একটা কর্মপরিবেশে তাঁদের স্বাভাবিক মানবিক ও শ্রমিক অধিকারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে সৌদি আরবে থাকা বিদেশি নারী শ্রমিকরা। “As If I Am Not Human” শীর্ষক সেই প্রতিবেদনে বলা হয়– বেশিরভাগ গৃহকর্মীকে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা বিরামহীন কাজ করতে হয়। অসুস্থ হলেও কাজ করতে হয়, এবং এদের জন্য কোনও চিকিৎসার দায়িত্ব আর নেয় না সৌদি পরিবারগুলো।
রিপোর্টের একটি অংশ এমন – ‘Examples of abuse included beatings, deliberate burnings with hot irons, threats, insults, and forms of humiliation such as shaving a domestic worker’s head. We interviewed women who reported rape, attempted rape, and sexual harassment, typically by male employers and their sons…’
আমরা এসব জানি, তবুও কেন নারী শ্রমিক পাঠাই সেখানে? বেশ কিছু এনজিও,  আদম ব্যবসায়ীও সরকারের লোকজন বলছেন, নারী গৃহকর্মীদের ওপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন রোধে সৌদি আরবে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের বাসায় না রেখে বিভিন্ন হোস্টেলে রাখা হবে। সেখান থেকে তারা কাজে যাতায়াত করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সভ্যতার বাইরে থাকা সৌদিরা এর কোনও তোয়াক্কা করবে না। ভালো সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক না পাঠানো। শ্রীলংকা, ফিলিপাইনসহ অনেকেই এর মধ্যে তা বন্ধ করেছে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি by শুভ্র দেব

সারা দেশে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। গ্রাম থেকে শহরের অলিগলি প্রায়শই হচ্ছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। গুলি করে চুরি, ছিনতাই হচ্ছে অহরহ। পাড়া-মহল্লার ঝগড়া বিবাদের সূত্র করে ঘটছে গুলির ঘটনা। কিশোর গ্যাংদের হাতে মিলছে অস্ত্র। মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের নেটওয়ার্ক ঠিক রাখতে ব্যবহার করছে অস্ত্র। সন্ত্রাসী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাতে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি তো পুরনো বিষয়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশে যখন অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি থাকে তখন গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তখন তুচ্ছ কারণেই অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়। সূত্র বলছে, নানা কারণে দেশে এখন অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বেড়ে গেছে অপরাধ প্রবণতা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে দেশে। আবার কখনো সীমান্তে কর্মরত বেশকিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়ে আসা হয় অস্ত্র। সীমান্ত পার হলেই এসব মারণাস্ত্র চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, জঙ্গি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, চরমপন্থিদের হাতে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা দিয়ে ঢুকছে অহরহ আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। ছোটখাটো অপরাধী থেকে শুরু করে শীর্ষ সন্ত্রাসী-গডফাদাররা মজুত করছে অস্ত্রের ভাণ্ডার। আবার লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেভাবে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে আগামীতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি আরো জোরালো ভূমিকা না রাখে তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হবে। এছাড়া অস্ত্রের চালান দেশে প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে আরো বেশি নজরদারি বাড়াতে হবে।
অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, অপরাধীরা সব সময়ই অস্ত্রের মজুত রাখে। শুধু তারা সময়-সুযোগ মতো জানান দেয়ার অপেক্ষায় থাকে। তাই অপরাধী যেই হোক না কেন মূল বিষয়টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। দেখতে হবে তারা কতটুকু তৎপর। কারণ সিন্ডিকেটরাই দেশে অস্ত্রের চালান নিয়ে আসছে। আর এই সিন্ডিকেটদের সহযোগিতা করছে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটা স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে তাদের আয়ত্তের বাইরে কি পরিমাণ অস্ত্র আছে। এসব উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভীতিকর অবস্থা তৈরি হবে। তিনি বলেন, প্রকাশ্য গুলাগুলির ঘটনাই ভীতির কারণ তৈরি করে দিচ্ছে। আর এসব আগ্নেয়াস্ত্র যদি অপরাধীর কাছে মজুদ থাকে তবে সমাজের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও বেগ পেতে হবে। কারণ যতগুলো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সামাল দিতে হবে। তিনি বলেন, অতীতে জাতীয় নির্বাচনে অস্ত্রের মহড়া, গুলাগুলির ঘটনা ঘটেছে অহরহ। এ ধরনের ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
পুলিশের সাবেক আইজি নুর মোহাম্মদ মানবজমিনকে বলেন, গুলাগুলির ঘটনা দেশে সব সময়ই থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তি দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে এসব হয়ে থাকে। তবে নির্বাচনী বছর আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা একটু বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখন বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। তিনি বলেন, দেশে যে পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করে তার ১০ শতাংশ আটক করা সম্ভব হয়। বাকি অস্ত্র কোনো না কোনোভাবে প্রবেশ করে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সমুদ্রপথে বিভিন্ন মালবাহী জাহাজের আড়ালে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র চলে আসে। সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবির পক্ষে সব সময় নজর রাখা সম্ভব হয় না।
গত ১০ই মে রাজধানীর দক্ষিণ বাড্ডার জাগরণী ক্লাবের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলেন ৩০ বছর বয়সী আবদুর রাজ্জাক বাবু ওরফে ডিশ বাবু। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা তিন যুবক বাবুকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যান বাবু। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাড্ডার বেরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই কামরুজ্জামান দুখুকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাগ্নে ফারুক আহমেদের গ্রুপ প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় গুলিবদ্ধ হয়ে আরো ৫ জন আহত হয়েছিলেন। ২৫শে ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা প্রকাশ্য মহাখালিতে কলেরা হাসপাতালের পেছনে নাসির কাজী নামে ৪৫ বছর বয়সী এক ঠিকাদারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৩রা মে উপজেলা সদরে নিজ কার্যালয়ের সামনে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে। এ সময় তাকে বহনকারী মোটরসাইকেল চালক রূপম চাকমাও গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরের দিন ৪ঠা মে সন্ত্রাসীরা ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে চারজনকে। ২৮শে মে সোমবার সকাল ৭টার দিকে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসী দলের হামলায় একটি বাড়িতে অবস্থানরত ইউপিডিএফ সদস্যদের ওপর অতর্কিতে ব্রাশ ফায়ার করে। এতে ঘটনাস্থলেই স্মৃতি চাকমা (৫০), অতল চাকমা (৩০) ও সঞ্জীব চাকমা (৩০) নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সঞ্জীব চাকমা গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সদস্য। এই ঘটনায় কানন চাকমা নামে আরো এক ইউপিডিএফকর্মী আহত হয়েছেন। ২৯শে মে পুরান ঢাকার বংশালের সিদ্দিক বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর বকশিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে গুলি করে আহত করে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন।
সূত্র বলছে, বছরের শেষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রতিটা জাতীয় নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের নানামুখী ব্যবহার থাকে। পেশিশক্তির প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার থেকে শুরু করে ভোট কেন্দ্র দখল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হয় আগ্নেয়াস্ত্র। অনেক সময় গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি বেশি হলে তখন অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ৩ হাজার ১৫০টি। মামলা করা হয়েছে ২ হাজার ৮১টি। ২০১৬ সালে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ৫ হাজার ৭০০টি। মামলা করা হয়েছে ৬২২টি। ২০১৭ সালে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ৫ হাজার ৭৫৫টি। মামলা করা হয়েছে ২ হাজার ২০৮টি। ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ২ হাজার। মামলা করা হয়েছে ৬৯৩টি। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে অস্ত্র মামলা হয়েছে ১৬০টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৫৯টি, মার্চ মাসে ১৮০টি ও এপ্রিল মাসে ১৯৪টি। এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপির) তথ্য অনুযায়ী তাদের নিয়মিত অভিযানে ২০১৭ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৭৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৫২ জনকে এবং বিভিন্ন থানায় মামলা করা হয়েছে ২৬৫টি। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করে মামলা করা হয়েছে ২৩টি। ফেব্রুয়ারি মাসে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ১৮টি, ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করে মামলা হয়েছে ২২টি। মার্চ মাসে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২১টি, গ্রেপ্তার ৭৭ জন ও মামলা হয়েছে ৩২টি। এপ্রিল মাসে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ১৮টি। গ্রেপ্তার ৪২ জন ও মামলা করা হয়েছে ২১টি। মে মাসে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ১১টি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪১ জনকে ও মামলা করা হয়েছে ২১টি। জুন মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করে করা হয়েছে ১৪টি মামলা। জুলাই মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করে করা হয়েছে ১৯টি মামলা। আগষ্ট মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৪০জনকে গ্রেপ্তার করে করা হয়েছে ২৪টি মামলা। সেপ্টেম্বর মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ২টি আগ্নেয়াস্ত্র। ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করে করা হয়েছে ১০ মামলা। অক্টোবর মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ৩১টি মামলা করা হয়েছে। নভেম্বর মাসে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ২১টি মামলা করা হয়েছে।
একই বছরের ডিসেম্বরে উদ্ধার করা হয়েছে ২১টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করে ২৭টি মামলা করা হয়েছে। চলতি বছরে জানুয়ারী মাসে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা ২১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ১৫টি। ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ১৫টি মামলা করা হয়েছে। মার্চ মাসে ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করে ১৯টি মামলা করা হয়েছে। এবং এপ্রিল মাসে ১০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করে ১৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিএমপির উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ২৬টি রিভলবার, ৯৭টি বিদেশি পিস্ত, ২৭টি দেশি পিস্তল, ১টি এসএমজি, ৪টি পাইপগান, ১৭টি শাটারগান, ৬টি দেশি রিভলবারসহ অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শুধু ঢাকার বিভিন্ন জজ আদালতে ৫ হাজার ৩৫৬টি অস্ত্র মামলা বিচারাধীন রয়েছে। রয়েছে ৫৫টি তদন্তাধীন মামলা। আর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টার (বিডিপিসি) বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায় দেশে ৪ লাখের মতো অবৈধ অস্ত্র মজুত আছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সহেলী ফেরদৌস মানবজমিনকে বলেন, অস্ত্র উদ্ধারে সারা দেশে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যর ভিত্তিতে পুলিশ এসব অস্ত্র উদ্ধার করে। এর বাইরে যদি কারো কাছে অবৈধ অস্ত্র থেকে থাকে তবে তাদেরকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

দুই বছরেও মেলেনি মিতু হত্যার রহস্য

২০১৬ সালের ৫ই জুন প্রায় জনশূন্য সকালে দুুর্বৃত্তের গুলি ও উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন চাকরিচ্যুত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। মঙ্গলবার এই ঘটনার দুই বছর পার হলেও পুলিশ উন্মোচন করতে পারেনি এই হত্যা মামলার রহস্য।
বরং পুলিশের তদন্ত কার্যক্রমই এ হত্যাকাণ্ডকে ক্রমেই রহস্যাবৃত করে তুলেছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এ ঘটনাকে জঙ্গি সংঠন জেএমবি নাশকতা বলে আশঙ্কা করেছিল। এ কারণে হাটহাজারী উপজেলার একটি মাজারের ফকিরকেও (খাদেম) গ্রেপ্তার করে।
যা বিতর্কের ঝড় তুলে। অভিযোগ ওঠে মাজার নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ওই খাদেমকে আটক করে মিতু হত্যা মামলায় জড়িত করার চেষ্টা করছে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে বিতর্ক থামাতে পরিবর্তন করা হয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। মামলার তদন্ত এসে পড়ে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. কামরুজ্জামানের কাঁধে। এরপর মামলা তদন্ত করতে গিয়ে গত দুই বছর অনেক হাঁকডাক ছেড়েছেন তিনিও। এই সময়ে উঠে এসেছে মিতু হত্যার পেছনে দুর্বৃত্তরা আর কেউ নন, খোদ বাবুল আকতারের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সোর্স মো. কামরুল সিকদার মুছা ও তার সহযোগীরা।
এরপর শ্বশুর বাড়ির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় বাবুল আক্তারই মিতুকে হত্যা করিয়েছে। এর পেছনে বাবুল আক্তারের পরকীয়ার কথাও উঠে আসে। বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগেরই প্রমাণ পাননি বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান। ফলে রহস্যই রয়ে গেল মিতু হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
কামরুজ্জামানও বলছেন, বাবুল আক্তারের সোর্স মুছা ও কালু ধরা পড়লে হয়তো বের হতো মিতু হত্যার মূল রহস্য। কিন্তু তারা পলাতক। অনেক খুঁজেও তাদের পাওয়া যায়নি। এদিকে মুছার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, ঘটনার পর দিন রাতের আঁধারে নগরীর বন্দর থানার তৎকালীন ওসি মুছাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে তার কোনো হদিস নেই। তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার আশঙ্কা করে একাধিক সংবাদ সম্মেলন করেন স্ত্রী পান্না আক্তার। 
এদিকে ঘটনার পর বাবুল আক্তারকে ঢাকা গোয়েন্দা কার্যালয়ে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর মিতুর বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন এ হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তার জড়িত নয় বলে দাবি করেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে সোর্স মুছার সংশ্লিষ্টতার প্রকাশের পর গণমাধ্যমে যখন বাবুল আক্তারের দিকে আঙুল ওঠে, ঠিক তখন মিতু হত্যার জন্য বাবুল আক্তারকে দায়ি করতে শুরু করেন তিনি। তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, দুই বছর ধরে মামলা তদন্ত করেছি। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অভিযোগপত্রও চূড়ান্ত করা হয়েছে। যেকোনো সময় আমরা অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করতে পারি।
প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তদন্তে মিতু হত্যায় বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে মামলার বাদী হিসেবে অভিযোগপত্রে বাবুল আক্তার সাক্ষীই থাকছেন। তবে কেন বা কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাবুল আক্তারের সোর্স মুছা ও তার সহযোগীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত মুছার যে কজন সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছে তারাও মিতু হত্যার মূল নায়ক মুছা বলে জানিয়েছে। তবে মুছাকে পাওয়া না যাওয়ায় কেন বা কে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা রহস্যই রয়ে গেছে। মুছাকে পাওয়া গেলে হয়তো রহস্য উন্মোচন সম্ভব হতো।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মিতুর বাবা মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বাবুল আক্তারের সহকর্মী। তারা একসঙ্গে একই জোনে চাকরি করেছেন। ফলে তিনি বাবুল আক্তারকে বাঁচানোর তদন্তই করেছেন। তথ্য-প্রমাণ দিলেও তিনি আমাদের কোনো অভিযোগে কান দেননি।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ই জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওআর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
হত্যা মামলায় জঙ্গি সংগঠনের নাশকতা সন্দেহে ওই বছরের ৮ই জুন ও ১১ই জুন নগর গোয়েন্দা পুলিশ হাটহাজারী উপজেলা থেকে মুসাবিয়া মাজারের খাদেম আবু নসুর গুন্নু ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার শীতল ঝর্ণা থেকে শাহ জামান ওরফে রবিন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিতু হত্যায় তাদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবু দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তারা জামিনে মুক্তি পান।
ওই বছরের ২৪শে জুন রাতে ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আক্তারকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর ফলে সন্দেহের তীর যায় বাবুলের দিকে। হত্যায় বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার তথ্য নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে।
২০১৬ সালের ৯ই আগস্ট পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন বাবুল আক্তার। নানা নাটকীয়তা শেষে ৬ই সেপ্টেম্বর বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২৬শে জুন মো. আনোয়ার ও মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তারা জানায়, মিতু হত্যায় ব্যবহৃত ৩২ বোরের পিস্তলটি তাদের দিয়েছিলেন এহেতাশামুল হক ভোলা। এর পরপরই পুলিশ গ্রেপ্তার করে ভোলাকে। জিজ্ঞাসাবাদে ভোলা জানান, বাবুল আক্তারের বিশ্বস্ত সোর্স কামরুল সিকদার মুছার নেতৃত্বে মিতু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশ বলছে, মুছা পলাতক রয়েছে। তার স্ত্রী পান্না আক্তার বলছেন, মুছাকে তুলে নিয়ে গুম বা ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়েছে। আর এখানেই থেমে আছে মিতু হত্যার রহস্য।
পুলিশের পক্ষ থেকে ভোলা ও মনিরকে আসামি করে একটি অস্ত্র মামলা দায়ের করা হলেও তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

ব্যাংকের জন্য করের টাকা অযৌক্তিক

একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের কারণে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে ফের সাধারণ মানুষের করের ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার কথা বিবেচনা করছে সরকার। আসন্ন বাজেটে এই বরাদ্দ থাকছে বলে সোমবার সচিবালয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ অবস্থায় জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সরবরাহের সরকারি নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এভাবে অর্থ দিলে ব্যাংকিং খাত নিয়ে গ্রাহকদের অনাস্থা আরো চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। এ ছাড়া এসব ব্যাংকের উন্নতির পরিবর্তে সরকারের প্রতি নির্ভরতাও বেড়ে যাবে। আর সেটাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতির বোঝাও এখন সরকারকে বইতে হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান রাজস্ব আয় থেকে সরকার গড়ে ১০.৮ শতাংশ অর্থ দিয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে বারবার জনগণের টাকা দেয়া মানে হলো লুটপাটকে সমর্থন দেয়া। যেটা অযৌক্তিক। আর এতে দুর্নীতি আরো উৎসাহিত হয়। তিনি বলেন, ব্যাংকের মূল কাজ জনগণ থেকে আমানত নিয়ে উৎপাদনশীল শিল্পে বিতরণ করা। সেটা তারা করছে না। এছাড়া ব্যাংক খাত তদারক ও নিয়ন্ত্রণ করতে  পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সচেতন থাকলে এরকম পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলকে সরকার মূলধন সহায়তা হিসেবে ১০,২৭২ কোটি টাকা দিয়েছে।
জানা গেছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ১৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলোকে দেয়ার জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যদিও তা এখনো ছাড় হয়নি। ছাড় হবে ৭ই জুন বাজেট ঘোষণার পর।
গত বাজেট বিবৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতি বছর মূলধন বাবদ ব্যাংকগুলোকে টাকা দিতে হয়েছে। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ৮ বছরে দেয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও তা ছাড় করা হয়নি। পরের অর্থ বছর ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও দেয়া হয় ৫৪১ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪২০ কোটি টাকা। কিন্তু ওই বছর ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। পরের ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকার নিজেই পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে, কিন্তু ওই টাকায়ও কুলোয়নি। ওই বছর ব্যাংকগুলোকে দিতে হয় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এভাবে বছরের পর বছর অর্থ দেয়ার পরও গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট দাঁড়ায় প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা। এর এক বছর আগে মূলধন সংকটের পরিমাণ ছিল ১৩,৮১৯ কোটি টাকা। সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, ব্যাংকগুলোর জন্য আগামী অর্থবছরেও বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। তবে কত রাখা হয়েছে তা তিনি উল্লেখ করেননি।
উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সোনালী ব্যাংকে হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে ২,৬০০ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ৪,৫০০ কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিতে ১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
সিপিডির গবেষণা মতে, সম্পদ ঘাটতির বাংলাদেশে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে যেভাবে টাকা দেয়া হচ্ছে, তা দেয়া না হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা সামাজিক খাতে টাকাগুলো খরচ করা যেত। এতে দেশও অনেক বেশি উপকৃত হতো।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ঋণ দেয়ায় অনিয়ম হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে। ফলে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যাংকগুলোকে প্রতিবছর টাকা দিতে হচ্ছে। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপিঋণও অতিমাত্রায় রয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকিং খাতে সাধারণ জনগণের অনাস্থা তৈরি হবে।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা দেয়ার সময় প্রতিবারই বলে দিচ্ছে যে খেলাপি ঋণ আদায়ে তাদের মনোযোগী হতে হবে। বাস্তবে খেলাপি ঋণ আরো বাড়ছে। এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে আর শোধ করছেন না। আর এ বড় ঋণখেলাপির কারণে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। গত এক দশকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ চার গুণ বেড়েছে। আর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, সোনালী, জনতা, রূপালী, বেসিক, কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। অথচ তার আগের তিন মাস আগে অর্থাৎ গত সেপ্টেম্বরেই এই ঘাটতি ছিল ১৫ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। তিন মাসে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে ১ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় না আনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনার করণে ঋণখেলাপি বেড়েছে। ফলে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংকসহ বড় বড় ঋণকেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঋণ আর পরিশোধ না করায় তা খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।
এদিকে সম্প্রতি রিহ্যাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানান, ব্যাংক খাত নিয়ে আমাদের আরো  সতর্ক ও যত্নবান হতে হবে। ব্যাংকে টাকা জমা রেখে চেক দিয়ে যদি টাকা তুলতে সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে হবে না। ইসলামী ব্যাংক নামকরা ব্যাংক ছিল। কিন্তু অল্প টাকা আনতে গেলেও কষ্ট হয়। সব ব্যাংক নয়, অল্প কিছু ব্যাংকে সমস্যা। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত একটি স্পর্শকাতর জায়গা। এখানে যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দেশে যতই উন্নয়নের কথা বলি না, আমাদের ক্ষতি হবে।

১৫ কিলোমিটার হাঁটলে খাবার জোটে সবজি চাচার!

মাঠে চাষাবাদের কোনও জমি নেই। ভারি কাজও করতে পারেন না। বেঁচে থাকার তাগিদে কলার মোচাসহ নানা সবজি বিক্রি করেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ঈশ্বরবা গ্রামের তাহাজ মণ্ডল (৬৫)। কালীগঞ্জ শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কলার মোচা, কলাগাছের ভেতরের নরম শাঁস, বিভিন্ন প্রকারের সবজি বিক্রি করেন তিনি।  সবজি বিক্রি করতে গড়ে প্রতিদিন তাকে ১০/১৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। এখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে ৫ সদস্যের সংসার চালান তিনি। তবে যেদিন কাজে যেতে পারেন না সেদিন পাতে খাবার জোটে না।
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সবজি বিক্রি করায় তাহাজ মণ্ডল শহরের অনেকের কাছে সবজি চাচা হিসেবে পরিচিত। শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় রোজগারের জন্য পাড়ায় পাড়ায় হেঁটে সবজি বিক্রি করেন তিনি। তাহাজ উদ্দিনের ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে তোফাজ্জেল মণ্ডল (৩৮) গ্যাংরিন রোগে আক্রান্ত । বাকি ৩ ছেলে ওবাইদুল (৩২), শহিদুল (৩০) ও মোত্তাকিন (১৮) পরের জমিতে কাজ করে। ওবাইদুল ও শহিদুল আলাদা থাকেন। তোফাজ্জেল ও মোত্তাকিন বাবা-মার সঙ্গে থাকেন।
তাহাজ মণ্ডল জানান, তিনি যা আয় করেন তাতে সংসারই চলে না, তার ওপর অসুস্থ ছেলের ওষুধ খরচের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়। তাই এ বয়সেও কাজ করেন তিনি। কলার মোচাসহ বিভিন্ন সবজি দুটি ঝুড়িতে সাজিয়ে ঘাড়ে করে শহরের ১০/১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়িতে সবজি বিক্রি করেন। ৩০/৪০টি মোচা বিক্রি করতে তাকে অন্তত একশ বাড়িতে ঘুরতে হয়। একইসঙ্গে তিনি কলাগাছের ভেতরের নরম অংশসহ বিভিন্ন সবজিও বিক্রি করেন। তবে প্রত্যেক দিন সব সবজি বিক্রি হয় না তার। যেদিন সবজি বিক্রি কম হয় সেদিন তিন বেলা খাবার জোটে না।
তিনি জানান, কলার মোচা সংগ্রহ করতে তাকে বিভিন্ন গ্রামের কলাচাষিদের কাছে ধরনা দিতে হয়। চাষিরা মোচা বাবদ কোনও টাকা-পয়সা নেন না। মোচা কাটার সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত থেকে তিনি বিনামূল্যে এগুলো সংগ্রহ করেন। কিন্তু সব সময় কলার মোচা পাওয়া যায় না। এজন্য বর্ষার মৌসুমে কলমিশাক, হেলেঞ্চা শাক ও শাপলা বিক্রি করেন।
সদা হাস্যোজ্জ্বল সবজি চাচা বলেন, ‘জীবনের বাকি সময়টুকু সুস্থ শরীরে এভাবেই কাটাতে চাই। তবে বেশি দিন হয়তো আর এভাবে ঘুরতে পারবো না। তাই স্থায়ী কোনও ব্যবসার ব্যবস্থা যদি কেউ করে দিতো তাহলে হয়তো অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে বাকি জীবন নিশ্চিন্তে কাটাতে পারতাম।’

ট্রেনের টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ি

কমলাপুর রেলস্টেশনে টিকিটের জন্য ভিড় ছবি: নাসির উদ্দিন
আজ ৬ই জুন ঈদ উপলক্ষে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির শেষ দিন। দেয়া হবে ১৫ই জুনের টিকিট। গতকাল কমলাপুর রেল স্টেশনে ঘরমুখী মানুষের জন্য ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির পঞ্চম দিন ছিল। বিক্রি হয়েছিল ১৪ই জুনের টিকিট। গত কয়েকদিনের তুলনায় এদিন টিকিট প্রত্যাশী বেড়েছিল কয়েকগুণ। দুপুর গড়িয়ে বিকালেও কমেনি যাত্রীদের চাপ। গভীর রাত থেকে শুরু করে কাউন্টারের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়েছেন টিকিট-প্রত্যাশীরা। ঘরমুখো মানুষের ভিড় সামলাতে গিয়ে অনেকটাই হিমশিম খেতে হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে। সকাল ৮টা থেকে স্টেশনের ২৬টি কাউন্টার থেকে একযোগে ১৪ই জুনের টিকিট বিক্রি শুরু হয়। গভীর রাত থেকে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে যখন টিকিট নামক সোনার ‘হরিণ’টি হাতে পাচ্ছিলেন, তখন অনেকেই আনন্দে চিৎকার করে উঠছেন। আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্তিও প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। এদিকে কাউন্টারের সামনে প্রথম দিকে দাঁড়িয়েও এসি কেবিনের টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকেই। লালমনিরহাটগামী লালমনী এক্সপ্রেসের টিকিট-প্রত্যাশী রবিউল বলেন, রাত ১১টার দিকে এসে কাউন্টারের প্রথম সিরিয়াল ধরি। সারারাত শুধু ঘড়ির কাঁটা দেখতে থাকি কখন সকাল ৮টা বাজবে। যথাসময়ে কাউন্টার খোলা হলো। এসি টিকিট চেয়ে ছিলাম। পেলাম না। কাউন্টার থেকে জানানো হয় এসি টিকিট নেই। পরে বাধ্য হয়েই এসি চেয়ারের টিকিট নিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, অন্যদিনের তুলনায় গতকাল যাত্রীদের চাপ অনেক বেশি ছিল। আমরা কোনো টিকিট আটকে রাখি না। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি টিকিট আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যাত্রীরা টিকিট পাবেন। ঈদের সময় সবার চাহিদা থাকে এসি টিকিটের। কিন্তু আমাদের তো সম্পদ সীমিত, এর মধ্যে সবাইকে খুশি করা সম্ভব না। তিনি আরো বলেন, কাউন্টারে টিকিট বিক্রির শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ২৫ শতাংশ অনলাইনে, ৫ শতাংশ ভিআইপি, ৫ শতাংশ স্টাফ কোটায় চলে গেছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট রুটের নির্দিষ্ট কাউন্টার ছাড়া নারী ও বিশেষ কাউন্টারসহ মোট তিনটি কাউন্টারে একইসঙ্গে বিক্রি শুরু হয়েছে। আর একজন ৪টি করে টিকিট নিতে পারছেন। তাহলে আর অবশিষ্ট কয়টি টিকিট থাকে? এমনিতেই তো এসি টিকিটের সংখ্যা কম। উল্লেখ্য, কমলাপুর রেলস্টেশনে এবার শুরু থেকেই টিকিট কাউন্টারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৬টি করা হয়েছে। গত ১লা জুন থেকে শুরু হওয়া ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি আজ বুধবার শেষ হচ্ছে। যারা ১লা জুন টিকিট সংগ্রহ করেছেন তারা ঈদ যাত্রা শুরু করবেন ১০ই জুন। প্রতিদিন সকাল  ৮টা থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। একজন যাত্রী একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারটি টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন। প্রতিদিন দেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ৫১৪টি টিকিট। এ ছাড়া, ঈদফেরত যাত্রীদের ভ্রমণের জন্য অগ্রিম টিকিট রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট স্টেশন থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সকাল ৮টা থেকে বিক্রি করা হবে। এসব স্টেশনে ১০ই জুন পাওয়া যাবে ১৯ জুনের টিকিট। এরপর ১১ই জুন থেকে ১৫ই জুন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে ২০ থেকে ২৪ শে জুনের টিকিট মিলবে বলে জানিয়েছেন স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী।