Wednesday, January 20, 2016

জাপার ঝড়ে নতুন মোড়- রওশনকে বশে রেখেই দলে নিয়ন্ত্রণ চান এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ
গতকাল রাজধানীর বনানীতে দলের কার্যালয়ে
সংবাদ সম্মেলনে এ বি এম রুহুল আমিন
হাওলাদারকে (বাঁয়ে) দলের নতুন মহাসচিব
ঘোষণা করেন l ছবি: প্রথম আলো
পাল্টাপাল্টি ঘোষণায় জাতীয় পার্টিতে (জাপা) সৃষ্ট ঝড় নতুন মোড় নিয়েছে। স্ত্রী রওশনকে বশে রেখেই দলের নিয়ন্ত্রণ নিজের কবজায় রাখতে চাইছেন দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। একই সঙ্গে তিনি এখনই সরকারকে না চটানোর কৌশলও নিয়েছেন। জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন।
রংপুরে দুই দিনের অবস্থান শেষে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকায় ফিরেই দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে অব্যাহতি দিয়েছেন এরশাদ। একই সঙ্গে এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে আবার দলের মহাসচিব নিযুক্ত করেছেন। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বনানীতে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে এ ঘোষণা দেন এরশাদ। একই সঙ্গে ভাই জি এম কাদেরকে জাপার কো-চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্তও আবার জানান তিনি।
এরশাদ ও রওশনপন্থী তিনজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, জি এম কাদেরকে এরশাদের উত্তরসূরি ও দলের কো-চেয়ারম্যান করার ঘোষণার বিষয়ে রওশন এখন পর্যন্ত নিজে থেকে কোনো কথা বলেননি। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কিছুটা ‘কৌশলী’ বলে মনে করছেন নেতারা। কারণ, এরশাদ দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এসব ঘোষণা দেওয়ার পর বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে স্ত্রী রওশনের সভাপতিত্বে জাপার সংসদীয় দলের বৈঠকেও অংশ নেন।
সংসদীয় দলের বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এরশাদ বলেন, ‘আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাতে অটল আছি। মরার আগ পর্যন্ত অটল থাকব।’
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বৈঠকের শুরুতেই এরশাদের কাছে রওশন জানতে চান, এতগুলো সিদ্ধান্ত তিনি একা নিলেন কেন? আলোচনা করে নিলেই ভালো হতো।
জবাবে এরশাদ বলেন, অতীতেও তিনি মহাসচিব পদে পরিবর্তন করেছেন। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছিলেন, হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন তো গঠনতন্ত্রের কথা আসেনি। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সে ক্ষমতা আছে।
এ সময় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এরপরও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। জবাবে এরশাদ বলেন, দলকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাঁরা সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকের একপর্যায়ে রুহুল আমিন হাওলাদারসহ বেরিয়ে সংসদে নিজ কার্যালয়ে যান এরশাদ। এরপর জিয়াউদ্দিন বাবলুকে উদ্দেশ করে রওশন জানতে চান, সাংবাদিকদের ডেকে তাঁকে (রওশন) কেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলো? জবাবে বাবলু বলেন, আসলে মিডিয়া রং লাগিয়ে প্রচার করেছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অব্যাহতি পাওয়া মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ, মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক ও মসিউর রহমান, সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ এ বলয়ের নেতারা এরশাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা এরশাদের সিদ্ধান্ত ঠেকাতে চেষ্টা-তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাতে অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে জিয়াউদ্দিন বাবলু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আই এম ওয়ার্কিং (আমি কাজ করছি)। আজকেও আমি কাকরাইলে অফিস করেছি। সাড়ে ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত ছিলাম।’
গতকাল সংসদীয় দলের বৈঠকের পর জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা, মহাসচিব পদে নতুন একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। প্রেসিডিয়াম ও সংসদীয় দলের বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। চেয়ারম্যান আমাদের প্রস্তাব নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছেন।’ এ সময় জিয়াউদ্দিন বাবুল, মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জাপা নেতা প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হকসহ কয়েকজন সাংসদ তাজুল ইসলামের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা জাপার সাংসদ শওকত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠকে যা আলোচনা হয়েছে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের তার উল্টো বলেছেন।
সন্ধ্যায় এরশাদসহ দলের প্রায় সব নেতা একসঙ্গে সংসদ ভবন থেকে বের হন। এ সময় সংসদের প্রধান ফটকে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকেরা তাজুল ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরে এরশাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। এরশাদ কিছু বলার আগেই পাশে দাঁড়ানো তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মিডিয়ায় আমার বক্তব্য ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমি বলেছি, স্যারের (এরশাদ) সঙ্গে সংসদীয় দল একমত হয় নাই। স্যার ও ম্যাডাম (রওশন) পরবর্তীতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রত্যাখ্যানের কথা বলিনি।’
দুপুরে বনানীতে সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছিলেন জিয়াউদ্দিন বাবলুর বিরুদ্ধে। তিনি বলেছিলেন, প্রায় দুই বছর জিয়াউদ্দিন বাবলু মহাসচিব ছিলেন। একটি বর্ধিত সভা, প্রেসিডিয়ামের সভা করতে পারেননি। ৪০টি কাউন্সিল মিটিং হয়েছে, একা করতে পারেননি, এই বয়সে সবখানে তাঁকে যেতে হয়েছে।
এরশাদ বলেন, ‘সর্বশেষ আমার ঘোষণার পর আমার নির্দেশ অমান্য করে পার্টিতে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বাবলু। দলের শৃঙ্খলার স্বার্থে তাঁকে মহাসচিবের পদ থেকে অব্যাহতি দিলাম। আজ থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন রুহুল আমিন হাওলাদার।’
এক প্রশ্নের জবাবে এরশাদ বলেন, ‘রওশন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হননি, হতে পারেন না। বাবলু ঘোষণা দিয়েছে। বাবলু কে ঘোষণা দেওয়ার?’ তিনি দাবি করেন, ‘আমার স্ত্রী প্রেসিডিয়ামের কোনো বৈঠক ডাকেননি। সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ওনাকে দিয়ে তারা স্টেটমেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তিনি দেননি। আমি একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। দুজন নেতা সেটা নিয়ে বিভেদ-বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।’
জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করার ঘোষণা রংপুরে দেওয়ার কারণ কী, জানতে চাইলে এরশাদ বলেন, রংপুর জাতীয় পার্টির দুর্গ। সেখানে নেতা-কর্মীদের মতামত নিয়েছি।’
জাপা ভাঙছে কি না, জানতে চাইলে এরশাদ বলেন, ‘অসম্ভব। নো বডি ক্যান ব্রেক ইট (কেউ একে ভাঙতে পারবে না)। যে দুজন (আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু) দলে বিভ্রান্তির চেষ্টা করছেন, তাঁদের সঙ্গে ১০ জন লোকও নেই।’
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ ছাড়ছেন কি না— সংবাদ সম্মেলনে এ প্রশ্নের জবাবে এরশাদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে সম্মান দেখিয়েছেন। পার্টির প্রয়োজনে আমি ওনাকে অনুরোধ করব, আমাকে ছেড়ে দিন। সারা দেশ ঘুরে পার্টিকে অর্গানাইজ (সংগঠিত) করি। বিরোধের প্রয়োজন নেই।’
জাপায় ভাঙন
১৯৮৬ সাল
১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টির (জাপা) আত্মপ্রকাশ। দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ এবং মহাসচিব এম এ মতিন।
১৯৯৬ সাল
সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের সময় জাপা প্রথমে তাদের সমর্থন দিলেও পরে চারদলীয় জোটে চলে যায়। সে সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টি (জেপি) নামে নতুন দল গঠন করেন।
২০০১ সাল
নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে দল গঠন করেন এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে যান।
২০১৩ সাল
জাতীয় নির্বাচনের আগে কাজী জাফর আহমদ আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করে যোগ দেন বিএনপি-জোটে। তিনি এরশাদকে বহিষ্কারেরও ঘোষণা দেন।

পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ২১

পাকিস্তানের পেশোয়ারের বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ বুধবার সকালে সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিষিদ্ধ তেহেরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি টেনেছে দেশটির সেনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খবর এএফপি, রয়টার্স ও ডন অনলাইনের।
আঞ্চলিক পুলিশ প্রধান সায়েদ ওয়াজির এএফপিকে জানিয়েছেন, সন্ত্রাসী হামলায় ২১ জন নিহত হয়েছে।
বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়টি পেশোয়ার থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে চরসাদ্দা এলাকায় অবস্থিত। যার নামে এই বিশ্ববিদ্যালয় সেই বাচা খানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ক্যাম্পাসে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সকালের দিকে একে একে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে থাকেন। তখনো তাঁরা জানতেন না, কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তাঁরা।
হঠাৎ​ করেই বন্দুকধারীরা অনুষ্ঠানস্থলে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকেছিল তারা। এ সময় বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দ্রুতই বন্দুকধারীদের হটাতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আরশাদ আলী বলেন, বন্দুকধারীরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে। চরসাদ্দা থেকে নির্বাচিত আইনপ্রণেতার দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় সেনাসদস্যরাও।
বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফজল রহিম মারওয়াত বলেন, বন্দুকধারীরা দক্ষিণ দিক থেকে হামলা চালাতে শুরু করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী-পুরুষ শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তবে কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তিন হাজারের মতো শিক্ষার্থী আছে। হামলার খবরে এসব শিক্ষার্থীর উদ্বিগ্ন স্বজনেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে জড়ো হন। তবে অভিযান পরিচালনাকারীদের পক্ষ থেকে সাংবাদিক ও অন্যদের ঘটনাস্থলের দূরে থাকতে বারবার সতর্ক করে দেওয়া হয়।
বেসরকারি সংস্থা ইদি ফাউন্ডেশনের এক স্বেচ্ছাসেবক প্রাথমিক পর্যায়ে দাবি করেন, তিনি নিজে অন্তত ১৫টি মরদেহ দেখেছেন। হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন অধ্যাপকও আছেন। উদ্ধারকারীরা বলছেন, অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করার পর ২০টির মতো অ্যাম্বুলেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে।
অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করে সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লে. জেনারেল অসিম বাজওয়া বলেন, চার হামলাকারী নিহত হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীরা ভেতরে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। চার হামলাকারীর শরীরে আত্মঘাতী বিস্ফোরকবাহী কোমড়বন্ধনী ছিল। তবে ​সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানোর আগেই নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে চার হামলাকারী নিহত হয়।
এদিকে প্রাদেশিক মন্ত্রী শাহ ফারমান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভেতরে ৫৪ জন নিরাপত্তাকর্মী অবস্থান নিয়েছে। প্রায় ২০০ জনকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কক্ষে রাখা হয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী সময়মতো উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করায় ব্যাপক প্রাণহানি এড়ানো গেছে।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পেশোয়ারে সামরিক বাহিনীর বিদ্যালয়ে হামলায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীসহ ১৪০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নিষিদ্ধ টিটিপি নেতা ওমর মনসুর তাঁর ফেসবুক পেজে এই হামলার দায় স্বীকার করেন। বলেছেন, ওই হামলায় অংশ নেওয়ার জন্য চারজনকে পাঠানো হয়েছে।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রগুলো বলছে, আট থেকে ১০ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালায়। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তারা সাধারণ পোশাকে ছিল, তবে মুখ ঢাকা ছিল। বেঁচে ফিরে আসা ঘটনার বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী বলেছেন, হামলাকারীদের বয়স তাদের মতোই ছিল।

বর্ষার আগেই জাতীয় নির্বাচন! by মাসুদ মজুমদার

অধিকার, সিপিডি, আইন সালিশ কেন্দ্র ও টিআইবি’র মতো সংগঠনগুলোর সংযমী বক্তব্য এবং তথ্যনির্ভর গবেষণাও সরকার সহ্য করতে নারাজ। কোনো কোনোটির পুরো বক্তব্য, তথ্য-উপাত্ত এবং মন্তব্য জনগণকে খুশি করলেও সরকারকে বিব্রত করছে। অধিকার থেকে টিআইবি’র কর্মকর্তারা সবাই হেনস্তা হলেন। সরকারের চোখ রাঙানি আমলে নিচ্ছেন না, এমন ভাব দেখালেও বাস্তবে তারা অবদমিত হয়েই কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণটা স্পষ্ট। সরকারের ভেতর এমন একটি সুবিধাভোগী অসহিষ্ণু গোষ্ঠী রয়েছে যারা সমালোচনা যে ভাষায় হোক, সহ্য করতে নারাজ। তাদের টলারেন্স-পাওয়ার বা সহ্যশক্তি জিরোতে এসে ঠেকেছে। বিরোধী দল সংসদে ও বাইরে কার্যকর গণতন্ত্রচর্চার সুযোগ পেলে মানবাধিকার সংগঠন-সংস্থা, দাতাগোষ্ঠীর সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোর এত দায় নেয়ার গরজ পড়ত না। সরকার বিরোধী দল ঠেকাতে গিয়ে এ ধরনের সংগঠন-সংস্থাকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। এটাও সহ্য করতে না পারলে তার দায় না নিয়ে উপায় থাকবে না। সত্য আড়াল করলে স্বভাবত মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। একটা মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত করতে হাজারো মিথ্যা বলতে হয়। একটা নগদ উপমা নিন, সৈয়দ আশরাফ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ। এবার এলাকায় গিয়ে যত বক্তব্য দিয়েছেন, সব ক’টি স্ববিরোধী। এক দিকে বলেন- সাত বছরে কোনো জাল ভোট হয়নি। সত্যিই তো, যে ভোট গোনা হয় তা আবার জাল কী, ডাকাতির টাকাও তো টাকা। অন্য দিকে বাজিতপুর গিয়ে নিজেই অনিয়মের অভিযোগ তুললেন।
সুশীল বা বুদ্ধিজীবী সমাজ এখন আর ‘সাহস’ দেখান না। বুদ্ধির সতীত্ব দেখানোর সুযোগ এখন আর নেই। কারণটা অজ্ঞাত নয়। বুদ্ধিজীবীদের জানা রয়েছে- এ সরকারের মধ্যে এমন কিছু উচ্ছিষ্টভোগী ও কায়েমি স্বার্থবাদী মানুষ রয়েছেন, যারা শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার সেজে বসেছেন। তারা একটি সহজ সত্য বুঝে নিয়েছেন, ক্ষমতার লক্ষ্মী যত দিন থাকবে তত দিন তাদের রাজনীতি থাকবে। চাঁদাবাজি থাকবে। সুযোগ সুবিধা থাকবে। তাই গণতন্ত্র-পণতন্ত্র, উন্নয়ন-তুন্নয়ন তাদের বিবেচনার বিষয় নয়। তাদের মূল কর্তব্য নিজেদের স্বার্থে সরকারকে টিকিয়ে রাখা। নিজের স্বার্থ নাকি পাগলও বোঝে। সুবিধাভোগীরা বুঝবে না তা কি হয়!
গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার অনুযায়ী প্রতিবাদী রাজনীতি না থাকলে জনগণই শুধু বঞ্চিত হয় না, কোনো মানবাধিকার কর্মী ও বুদ্ধিজীবীসমাজও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে না। একইভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সংবিধান মেনে কাজ করতে পারে না। বুদ্ধিজীবীসমাজও পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে লড়ে যাওয়ার কথা ভাবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ শিক্ষক, যার জীবনের অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। নিজের সন্তান হারিয়েও বিচার চাননি। জানেন ন্যায়সঙ্গত বিচার তিনি পাবেন না। আইন-বিচার ও নির্বাহী বিভাগের প্রতি কতটা ক্ষোভ থাকলে এমন বক্তব্য দেয়া যায়, মগজে কী পরিমাণ অনাস্থা ভর করে তা সহজেই বোধগম্য। একই শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন- বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক তার দৃষ্টিতে আত্মমর্যাদাহীন। এটা তো জানা কথা, রং ও দলবাজ শিক্ষক আর যাই হোন, শক্ত মেরুদণ্ডের মানুষ হন না। একটি সমাজে যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রচর্চার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হতে বাধ্য। বাস্তবে হয়েছেও তাই। মাছের ‘রাজা’ ইলিশ যেমন মিথ্যা নয়, তেমনি বাগাড়ম্বর থাকলেও দেশের ‘রাজা’ কার্যত পুলিশ, এটা বলতে দোষ কী? পুলিশ সভা করার অনুমতি দেয়। রাজনীতি ও গণতন্ত্রচর্চার জন্য দরখাস্ত করতে হয় পুলিশের কাছে। সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা পূরণ করে পুলিশ। প্রতিপক্ষ ঠেঙাতে লাগে পুলিশ। নিজেদের সহায়সম্পদ, স্ফীত মেদ পাহারা দিতে লাগে পুলিশ। মামলাবাজির জন্য চাই পুলিশ। দল ভাঙার জন্য চাই পুলিশ। চার্যশিট দেয় পুলিশ। বিরোধী দলকে হামলে পড়ে দমন করতে, অফিসে তালা ঝুলাতে, মিটিং বানচাল করতে, গৃহপালিত বা অনুগত বিরোধী দল খাড়া করতে পুলিশ চাই। দখল প্রতিষ্ঠা করতে ও টেন্ডার হাইজ্যাক করতেও পুলিশের সাহায্য জরুরি। প্রতিবাদের কণ্ঠ দমন করার জন্য পুলিশ যথেষ্ট। সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর লাঠি ও অস্ত্রবাজ ক্যাডারদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় পুলিশ। পুলিশ এ সুযোগগুলো নিজের স্বার্থেও কাজে লাগায়। পুলিশ নিজেকে জড়িয়ে নেয় সব অপরাধের সাথে। গ্রেফতারবাণিজ্য ও চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের অবস্থান বিবেচনা করে অবশ্যই বলতে হবে, দেশের রাজা পুলিশ। পুলিশ সিটি করপোরেশন কর্মচারী পিটিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারীকে লাঞ্ছিত করেছে- এ জন্য এখন যারা পেরেশান, তারা জয়নাল আবদিন ফারুককে দাবড়ানো থেকে সালাহউদ্দিন পাচার, চৌধুরী আলম-ইলিয়াস আলী থেকে শিশু গুম পর্যন্ত কোনো টুঁ-শব্দ করেননি। বিরোধী দলের অফিসে হামলা থেকে একজন নেত্রীর বাসভবনের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি পর্যন্ত কোন কাজটি পুলিশ করেনি কিংবা পুলিশ দিয়ে করানো হয়নি। সরকার কোন মন্দ কাজে পুলিশ ব্যবহার করেনি! এর কোনোটির বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নেননি বুদ্ধিজীবী-সুশীলসমাজ। আজ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মর্যাদার লড়াই করছেন, আমলাদের বিরুদ্ধে আঙুল তুলছেন। এটা শ্রেণিস্বার্থের বোঝাপড়া হলেও আমরা শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত রাখার পক্ষে। কিন্তু জাতির এই মেরুদণ্ড ও বিবেকখ্যাতরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে কোনো উৎসাহ দেখাননি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারেও তারা মুখ খোলেননি। টকশোতে কিছু শিক্ষককে দেখেছি মুখরা রমণীর মতো গণতন্ত্র মুলতবি রেখে উন্নয়নের ডুগডুগি বাজাতে উৎসাহী হতে। আইয়ুবি গণতন্ত্রের সবক শোনাতে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক যেভাবে কোমর বেঁধে নেমেছেন, চেতনার বৈরাগী সেজেছেন; তাতে লজ্জাও লজ্জা পেয়েছে। তারা ভুলে গেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা ছিলেন ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনের কাতারে। আইয়ুবের বিরুদ্ধে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ দলবাজ শিক্ষকেরা শ্রেণী যুদ্ধে নেমে পড়েছেন, নিজেদের প্রমোশন আর একটু সুযোগ হাতিয়ে নিতে তারা বিবেক বন্ধক রাখতে কার্পণ্য করেননি। তারা এটাও ভুলে গেছেন, কার্যকর গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান মুক্ত না হলে কোনো শ্রেণিসংগ্রাম ও পেশাজীবী আন্দোলন সফল পরিণতি পায় না। যদি পেত তাহলে প্রধানমন্ত্রীর চায়ের দাওয়াতে তাদের ‘অভিমান’ ভাঙত না। ধনুকভাঙা পণ টুটে যেত না।
জনগণ দেখতে পাচ্ছে সরকার পুলিশ-নির্ভর হয়ে আছে। এই নির্ভরতার সাথে জনগণের স্বার্থ খুব একটা জড়িত নেই। দেশের ও জনগণের বৃহত্তম স্বার্থ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পররাষ্ট্রনীতি কখনো ক্ষমতা ও দলীয় রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়। সময় পাল্টালে পুলিশ যেমন পাল্টে যায়, তেমনি কূটনীতিও ধরন-ধারণ পাল্টায়। অথচ পুলিশের দৌরাত্ম্য মহল্লার মসজিদের ইমামের খুতবা ও কমিটির শ্রেণিচরিত্র থেকে রাজনীতির সদর-অন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। একইভাবে পররাষ্ট্রনীতি চর্চিত হচ্ছে দলীয় ক্ষমতার স্বার্থে; দেশের জনগণ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে নয়।
এত কিছুর পরও শোনা যাচ্ছে, সরকার বর্ষা আসার আগেই একটি জাতীয় নির্বাচন করে বৈধতা আদায় করে নিতে আগ্রহী। এর আগে ক্ষমতার পাটাতন শক্ত ও মজবুত করার জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায়। মাঠ প্রশাসন ঢেলে সাজাতে চায়। জাতীয় পার্টি আগে থেকেই ‘আমাকে ব্যবহার করুন’ লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। ইসলামী ঐক্য জোট ভাঙা, ‘আসল’ বিএনপির নামে নতুন সাইনবোর্ড ঝুলানো, ব্যারিস্টার হুদাকে কাজে লাগানো, জামায়াত নিষিদ্ধকরণ, জাতীয় পার্টির একটি অংশকে হিজড়া দলে পরিণত করে অপর অনুগত গ্রুপকে পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনসহ একগুচ্ছ রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের হাতে। তাই দল ভাঙাভাঙি কোনো রোগ বা নেপথ্য কারণ নয়, উপসর্গ এবং কিছু একটা ঘটার প্রসব বেদনা। জামায়াত নিষিদ্ধ হলে তাদের ভোটের পুঁজি যাতে এক বাক্সে না রাখতে পারে, সেজন্যও সরকার কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং করে রাখতে চায়। ইতোমধ্যে সেভাবে মেরুকরণের প্রক্রিয়া যে শুরু হয়েছে, তার কিছু আভাসও মিলছে।
একটি জাতীয় নির্বাচনের জন্য বিরোধী জোট তো বটেই, জনগণও মুখিয়ে আছে। সরকার এই আশার ভেতর ছাই না ছিটিয়ে এই আশাকে পুরোটা নিজেদের পরিকল্পনামতো কাজে লাগাতে চায়। যদ্দুর তথ্য মিলছে, তাতে প্রভাবক বিদেশীরাও নির্বাচনের বিষয়টি ইতিবাচক এবং সরকারের সহনীয় ও পরিমার্জিত রাজনীতি হিসেবে দেখছে। নিকটতম প্রতিবেশী দেশের নীতিনির্ধারকেরাও মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিএনপির তুলনায় তাদের জন্য মন্দের ভালো হলেও একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়ে যাক- নিজ দেশের ইমেজ সঙ্কট কাটাতে তারাও এমনটা ভেবে রাখতে চায়। বৈধতার দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ একটি সরকারকে আরো বেশি দিন সমর্থন জোগালে তাদের ইমেজ সঙ্কট যে বাড়বে সেটা এবার আর এড়াতে চাইছে না। অন্তত তাদের জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় এমন ভাবনা অর্থহীন নয়।
সীমান্তচুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, সমুদ্রসঙ্কটের ‘উইন উইন’ নিষ্পত্তির বিষয়গুলো উভয় দেশ তাদের জনগণের সামনে তুলে ধরার বিষয় মনে করেন। পানিচুক্তির জন্য একটা দীর্ঘমেয়াদি মুলাও ঝুলবে। অনুপচেটিয়া ও সাত খুনের খুনি হিসেবে অভিযুক্ত নূর হোসেন বিনিময়ও সাফল্যের খাতায় তুলতে দুই সরকারই আগ্রহী। সরকার মনে করে তাদের কিছু কসমেটিক-উন্নয়ন জনগণকে প্রবোধ দেবে। তাই ভাসমান ভোট টানার সাথে সাথে স্থানীয় নির্বাচনে যাদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে, তারাও স্থানীয়ভাবে ভোট টানতে ভূমিকা রাখবেন।
বিএনপি জোটও এখন নির্বাচন নিয়ে ভাবতে বাধ্য। এ মুহূর্তে আন্দোলনবিমুখ কিন্তু প্রত্যয়ী বিএনপি বিশ্বাস করে, মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তাদের অনুকূলে যাবে। এমন উইন উইন ভাবনা থেকে মে মাস পর্যন্ত একটি জাতীয় নির্বাচন হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপি জোট মনে করছে, নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে সরকারকে ছাড় দিতেই হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের প্রশ্ন এড়ানো সম্ভব হবে না। দলনিরপেক্ষ নির্বাচনী সরকার-ধারণা ষোলোআনা বর্জন করা সম্ভব হবে না; তাই নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতেই হবে। নেতৃবৃন্দের মুক্তি নিয়েও ছাড় দেয়ার প্রশ্ন উঠবে। আওয়ামী লীগের দৃঢ়বিশ্বাস, এবার অনেক সহজশর্তে কম বার্গেনিংয়ে বিএনপি জোটকে নির্বাচনে টানা যাবে। ক্ষমতার সুযোগ ব্যবহার করে কোনোমতে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়ে যাওয়া এখন আর কঠিন হবে না। বিএনপি জোট জামায়াত-ঐক্যজোট ছাড়া জোয়ার তুলতে পারবে না বলেই সরকার মনে করে। তাই উল্লেখযোগ্য আসন পেয়ে বিএনপি সংসদে ফিরে গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচন হোক আর নতুন জাতীয় নির্বাচন হোক, কারো অর্জনের খাতা শূন্য থাকবে না। দুই পক্ষের জিতে যাওয়ার ভাবনাই নির্বাচন হয়ে যাওয়ার কার্যকর লক্ষণ। বিএনপি ধরেই নিয়েছে, মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত হলে পরিবর্তনকামী মানুষের ভোট নীরব বিপ্লব ঘটাবে। এ ধরনের কিছু সরকার ভাবছে না। আমলেও নিতে চায় না। তবে নিজেদের বিজয়ের নিশ্চয়তা পেতে সব কাজই করতে কার্পণ্য করবে না।
masud2151@gmail.com

অ্যালার্জিজনিত হাঁপানি by অধ্যাপক ডা: জি এম ফারুক

অ্যালার্জিজনিত হাঁপানি সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। এ ধরনের হাঁপানি শ্বাস পথের শ্লেষ্মা ঝিল্লির অতি সংবেদনশীলতার জন্য হতে পারে। শ্লেষ্মা ঝিল্লির উত্তেজনা ঘটতে পারে নানাভাবে নানা দিক থেকে। যেমন- পরাগরেণু, নানা জাতের ছত্রাক ও ছাতাপড়া জিনিস, ঘরের ভেতরের ধূলিকণা, কয়েক প্রকার খাবার, পোকামাকড়ের হুলের বিষ বা তাদের শরীরের কোনো অংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণেও হাঁপানির আক্রমণ হতে দেখা যায়। অ্যালার্জির কারণে হাঁপানির আক্রমণ সাধারণত শৈশবকালে ঘটে। এ ধরনের হাঁপানি স্থায়ী হতে পারে এবং তা বংশানুক্রমে চলতে থাকে। তবে কৈশোরের দিকে তা উপশমও করা যায়। এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে নাসিকা প্রদাহ (সর্দি) এবং অ্যাকজিমা হতে দেখা যায় পরিবারে। অন্য সদস্যদের মধ্যেও তা দেখা যায়।
যেসব জিনিসের অ্যালার্জিতে হাঁপানি হতে পারে
ক. পরাগরেণু
ফুলের বা ঘাসের পরাগরেণু। পরাগরেণু থেকে হাঁপানি হতে পারে এ তথ্য স্বীকৃতি পেয়েছে ১৯২০ সালে। তবে সব জাতের পরাগরেণুতে অ্যালার্জি বা হাঁপানি দেখা দেয় না। সেই রেণুতে অ্যালার্জি সৃষ্টি করার উপাদান থাকা চাই। তা ছাড়া রেণু খুব হালকা হওয়া চাই, যা বাতাস সহজে বহন করতে পারে এবং পরিমাণে যথেষ্ট থাকা দরকার। কারণ বাতাসে ছড়িয়ে যাওয়ার পর যদি যথেষ্ট মাত্রার রেণু শ্বাসপথে না যায়, তাহলে অ্যালার্জি বা হাঁপানি হবে না। বিভিন্ন হাঁপানি রোগীর বিশেষ বিশেষ রেণু দ্বারা হাঁপানি হয়ে থাকে। যে পরাগরেণু একজনের হাঁপানি সৃষ্টি করে, তা অন্যের কোনো ক্ষতি নাও করতে পারে। রেণুর উৎস নানা সূত্র থেকে যেমন- গাছ, গুল্ম ঘাস, ফুল প্রভৃতি। ফুলের রেণুতে যাদের অ্যালার্জি থাকে, তারা সাধারণত বিশেষ কোনো ঋতুতে অ্যাজমাতে আক্রান্ত হয়। কারণ এক এক ফুল এক এক ঋতুতে পরাগরেণু ছড়ায়।
খ. খাদ্য
খাদ্য থেকে যে অ্যালার্জি ও হাঁপানি হয় এ তথ্য বহুকাল আগে থেকেই জানা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিরোক্রেটাসও খাদ্য থেকে অ্যালার্জির কথা বলে গেছেন। কী কী খাদ্য থেকে অ্যালার্জি বা হাঁপানি হতে পারে তার তালিকা হবে অতি দীর্ঘ। যেমনÑ ডিম, চিংড়ি মাছ ও গরুর গোশত থেকে অ্যালার্জি বা হাঁপানি হতে পারে, এ তথ্য বহুল প্রচারিত। এ ছাড়া আরো যেসব খাদ্যে অ্যালার্জি হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে- ইলিশ মাছ, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, কলা, পুঁইশাক, ডাল, গমের তৈরি খাদ্য, চাল, কমলালেবু, আপেল, আঙুর, তরমুজ, শসা, কাজুবাদাম, চিনাবাদাম, সজিনা ডাটা, মুলা, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা, ওলকপি, চকলেট, গুড়, মধু, দুধ ও দুধ থেকে তৈরি খাবার প্রভৃতি।
এখানে মনে রাখা দরকার, সব খাদ্য থেকে সবার অ্যালার্জি নাও হতে পারে। ব্যক্তি ভিন্নতায় বিভিন্ন খাদ্যে বিভিন্নজনের অ্যালার্জি হতে পারে। একই ধরনের খাবারে যে সবারই অ্যালার্জি হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য রঙিন করার যেসব রাসায়নিক বস্তু ব্যবহার করা হয় তার দ্বারা অনেকেরই অ্যালার্জি হতে পারে। বর্তমানে দেশে অ্যালার্জি শনাক্তকরণের ব্যবস্থা রয়েছে, যার দ্বারা ইচ্ছা করলে সবাই অ্যালার্জিকারক খাদ্য শনাক্ত করে নিতে পারে। তবে কেবল খাদ্যের জন্য অ্যালার্জিজনিত হাঁপানি রোগীর সংখ্যা খুবই কম।
গ. ধূলিকণা
বাড়ির ধূলিকণা নাকে ঢুকলে হাঁপানি হতে পারে। ঘরবাড়ির ধুলোতে বিশেষ করে কার্পেট, তোশক, লেপ, কম্বল, বালিশ, পাপোস প্রভৃতিতে এক প্রকার ‘মাইট’ (Mite) জাতীয় জীবাণু থাকে। এরা ঘরের ধূলিকণাতে মিশে থাকে। কোনো প্রকারে শ্বাসপথে এই মাইট মিশ্রিত ধূলিকণার প্রবেশ ঘটলে শরীরে অ্যালার্জি জাতীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তার ফলে হাঁচি, নাক দিয়ে প্রচুর পানি পড়া বা হাঁপানি রোগ হতে পারে।
ঘ. পতঙ্গজনিত অ্যালার্জি
কোনো পোকা বা পতঙ্গ কামড়ালে আমরা ব্যথা পাই এবং সেই কামড়ানোর জায়গা ফুলে ওঠে। প্রায় সব প্রকার পতঙ্গের হুলে বিষ থাকে, তা কোনো ক্ষেত্রে বেশি আবার কোথাও বা কম। এ ধরনের বিষ মানুষের শরীরে অ্যালার্জিজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ প্রকার অ্যালার্জেনের দ্বারা ক্ষেত্রবিশেষে হাঁপানি হতে পারে। যেসব পতঙ্গ থেকে মানুষের হাঁপানি হতে পারে তাদের সংখ্যা ও শ্রেণীর তালিকা খুবই দীর্ঘ। সাধারণত ঘরের আরশোলা, মাঠের ফড়িং, প্রজাপতি, মথ, পঙ্গপাল এমনকি মশা পর্যন্ত এ তালিকায় আসতে পারে।
ঙ. ছত্রাকজনিত অ্যালার্জি
বর্ষার সময় অব্যবহৃত জুতা, ভিজে ছাতা, এমনকি ভিজে পোশাক ঠিকমতো না শুকিয়ে ফেলে রাখলে এক ধরনের হালকা ধূসর সবুজ দাগ হয়। এটিকে ছত্রাক বলে। এ ছত্রাক দ্বারা কোনো ব্যক্তি হাঁপানিতে আক্রান্ত হতে পারে। ছত্রাকের জন্ম বিভিন্ন খাবারেও হতে পারে। যেমনÑ পাউরুটি, বাসিরুটি, কেক, আলু, পেঁয়াজ প্রভৃতি। এ ছাড়া ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র, কার্পেট, ঘরের কোণে জমা করা ময়লা কাপড়ে ছত্রাক জন্মায়। বাড়ির বাইরে বাগানে বা ছাদের টবে গাছের জন্য যে জৈবসার ব্যবহৃত হয় তাতে প্রায় সব ক্ষেত্রেই নানা জাতের ছত্রাক পাওয়া যায়। গ্রামে গোয়ালঘরের পাশে অহরহ ছত্রাক জন্মায়। অনেক সময় বাগানের গাছে বা ফুলে ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে। সেই ফুল ফুলদানিতে রাখলে মাুনষের দেহে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
লক্ষণ প্রকাশের ধরন
বেশির ভাগ হাঁপানি রোগীর শ্বাসকষ্ট হঠাৎ শুরু হয়; সাথে থাকে শুকনো কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে শাঁ শাঁ শব্দ (Wheeze)। অল্প পরে শ্বাসের কষ্ট আরো বেড়ে যায় এবং বুুকের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়। প্রশ্বাসের সময় শ্বাসনালীর ব্যাস আরো সরু হয়ে যায় এবং সেই সরু নালীল মধ্যে বাতাস চলাচলের সময় বাঁশির মতো আওয়াজ শোনা যায়। এ ধরনের শ্বাসকষ্ট সাধারণত হয় রাতে এবং তখন রোগী উঠে বসে থাকে। বেশির ভাগ রোগীর শ্বাসকষ্ট শেষ রাতে বাড়তে দেখা যায়।
হাঁপানিকারক কারণ
১. অ্যালার্জিকারক (ঘরের ধুলো, পরাগরেণু, পোষা প্রাণীর পশম বা পালকের আঁশ, ত্বকের মামড়ি প্রভৃতি)।
২. জ্বালাকারক বা উত্তেজক (ধোঁয়া, তীব্র গন্ধ, বিভিন্ন বস্তুর বাষ্প)।
৩. জীবাণু সংক্রমণ (নাক, গলা ও বুকে ভাইরাস সংক্রমণ)।
৪. ব্যায়াম, অতিপরিশ্রম।
৫. শীতল বায়ু, আবহাওয়ার পরিবর্তন।
৬. মানসিক চাপ ও অবসাদ।
৭. পেশাগত সংস্পর্শ (রাসায়নিক সামগ্রী, রঞ্জক, ডিটারজেন্ট প্রভৃতি)।
৮. ওষুধ (বিটা প্রতিবন্ধক, যেমন- প্রপ্রানল জাতীয় ওষুধ, ব্যথা প্রশমক, যেমন- অ্যাসপিরিন প্রভৃতি)।
৯. খাদ্যের সংরক্ষণ বা গুণগত সমৃদ্ধকারী বস্তু (মেটাবাইসালফেট)।
১০. রঙ করা খাদ্য (মেযন- হলুদ রঙের জন্য টারটারাজিন।
চ. আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত অ্যালার্জি
আবহাওয়া পরিবর্তনকালে অনেকের হাঁপানি আক্রমণ হতে দেখা যায়। কারো কারো ঠাণ্ডা বাতাস লাগলে হাঁচি হয়, নাক দিয়ে পানি পড়ে, আবার কখনো কখনো হাঁপানি দেখা দেয়। ঠাণ্ডা পানি পান করলে, ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করলে কারো কারো হাঁপানির আক্রমণ হয়ে থাকে। ঋতু পরিবর্তনের সময় ঠাণ্ডা-গরমের তারতম্যের কারণেও কারো কারো হাঁপানির আক্রমণ প্রকট হতে পারে। শিশুদের মধ্যে শীতকালেই হাঁপানি হতে বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশে শীতের শুরুতে, শীতের শেষ এবং অতিরিক্ত গরমে অ্যাজমার প্রকোপ বেশি হতে দেখা যায়।
ছ. ওষুধজনিত অ্যালার্জি
কোনো কোনো রোগের চিকিৎসায় অ্যালোপ্যাথিক কিছু ওষুধ শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। যেমন অ্যাড্রিনার্জিক, যা স্নায়ু শ্বাসনালীকে প্রসারিত করে। বিটাব্লকার বিশেষত প্রপ্রানল জাতীয় ওষুধ অ্যাড্রিনার্জিক স্নায়ুর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে এ জাতীয় ওষুধ খেলে অ্যাজমা রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে। অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধও শ্বাসকষ্ট বাড়াতে পারে। বিভিন্ন প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন- টেট্রাসাইক্লিন) ও কেমোথেরাপিউটিক ওষুধ ব্যবহারে অ্যালার্জিঘটিত প্রতিক্রিয়া হতে দেখা যায়। ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, আইএইচএমআর
মোবা : ০১৭১২৮১৭১৪৪

আরব বসন্তের ৫ বছর- তুলনামূলক সফল তিউনিসিয়া by সুমাইয়া ঘানুশি

পিতা রশিদ ঘানুশির সাথে সুমাইয়া
আরব বসন্ত একেবারে ব্যর্থ হয়েছে, এমনটি বলার সময় এখনো আসেনি। বরং আরব বসন্তের সূচনাক্ষেত্রটির দিকে আমরা যদি তাকাই দেখতে পাব স্বল্প হলেও ফুল ফুটেছে। মধ্য তিউনিসিয়ার ধূলিধূসর শহর সিদি বৌজিদে যে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল সেটাই ছড়িয়ে পড়ে একের পর এক আরব দেশে। ধারণা তৈরি হয়, আরবরা হয়তো শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অন্ধকার এক টানেল থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছে।
মুক্তি, উন্নতি আর আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন নিয়েই এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা। আরবদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল মুক্তির। কিন্তু তার পরিবর্তে এই আন্দোলন তাদের দিয়েছে নৈরাজ্য, গৃহযুদ্ধ আর আরো নৃশংস সামরিক স্বৈরাচার। আন্দোলন শুরুর পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে ‘আরব বসন্তের’ অর্থ কী?
মিসরে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে সেনাপ্রধান শক্তহাতে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে। তাদের পাশের বাড়ি লিবিয়ায় একই সাথে দু’টি সরকার দেশ চালাচ্ছে। একটি ত্রিপোলিতে আরেকটি তবরুকে। পুরো রাষ্ট্র কাঠামোই ভেঙে পড়ার জোগাড়!
সিরিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। বিদেশী হস্তক্ষেপ, জাতিগোষ্ঠীগত সঙ্কট কী নেই সেখানে? ইয়েমেনের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। সেখানে আলি আবদুল্লাহ সালেহর হুথি গ্রুপ এবং সৌদি আরব সমর্থিত হাদি সরকারের মধ্যে সঙ্ঘাত চলছে।
আরব বসন্তের ক্ষীণ আলো এখনো জ্বলছে শুধু তিউনিসিয়াতেই। তারা ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রগতিশীল সংবিধান তৈরি করেছে। ২০১৪ সালে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করতেও সক্ষম হয়েছে তারা। বর্তমানে চার দলের জোট সরকার তিউনিসিয়া চালাচ্ছে। তবে এরপরও তিউনিসিয়াকে পুরোপুরি সফল বলার অবকাশ খুব বেশি নেই। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী লিবিয়ার সঙ্কট তিউনিসিয়াকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া অতীতের প্রশাসনের পক্ষে বর্তমান নিডা টোনস নামে পরিচিত বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতেও সঙ্কটে পড়ছে। বর্তমানের জোট সরকারে সাবেক স্বৈরশাসক বেন আলির লোকজনও রয়েছে।
বহু বিপ্লবী গ্রুপ এই সমঝোতাকে পছন্দ না করলেও রাজনৈতিক মানচিত্রে এর কারণেই তিউনিসিয়া সোজা হয়ে দাঁড়াতে পেরেছে। তারপরও এই দেশটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বিপ্লবের সময় মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উচ্চাশা জেগেছিল তার সাথেও বর্তমান পরিস্থিতির কোনো সমন্বয় নেই। পাশাপাশি সন্ত্রাসী হামলার হুমকি তো রয়েছেই।
আরব বসন্তের চাপে তৈরি নৈরাজ্যের মধ্যেও তিউনিসিয়া দেশটিকে মোটামুটি স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর প্রধান কারণ তাদের সমন্বিত সমাজ। এখানে ধর্মীয়, জাতিগত বা বর্ণ-গোষ্ঠী অথবা রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্য নেই। যেমনটি ইরাক, সিরিয়া বা লেবাননে দেখা যায়। দেশটির রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাসও নেই। তিউনিসিয়ার স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হাবিব বরগৌবা সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। মিসরে গামাল আবদেল নাসের এবং সিরিয়া ও ইরাকে বাথ পার্টির নেতৃত্বে দফায় দফায় অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে।
তবে তিউনিসীয় সেনাবাহিনী বরাবরই দেশের রাজনীতিতে অংশ নেয়ার চেয়ে সীমান্ত সুরক্ষার ব্যাপারেই অধিক মনোযোগী। বরগৌবার কর্তৃত্বপূর্ণ শাসন সেনাবাহিনীকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়নি। একই কথা বেন আলির শাসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বেন আলির তিউনিসিয়াকে অবশ্য পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করাই বেশি সহজ।
তবে এর মধ্যে দেশটি মূলত রাজনীতিকদের হাতেই ছিল। সেখানে সামরিক উপস্থিতি দেখা যায়নি। সামরিক বাহিনীর ছায়া ছাড়াই বিপ্লব-পরবর্তী অনিশ্চিত সময়ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিস্তৃত হয়েছে। শক্তিশালী সুশীলসমাজের ছত্রছায়ায় দেশটির বৈরী রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের মধ্যকার বিভেদ দূরে ঠেলে গণতন্ত্রের সুরক্ষায় সক্ষম হয়েছে।
তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র টিকে থাকার অন্যতম কারণ সম্ভবত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। তারা রাজনীতিকে ঠেলে এর চরম সীমাবদ্ধতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে বাস্তবমুখী যৌক্তিকতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। দুই স্বনামধন্য রাজনীতিকের হত্যাকাণ্ডের পর সঙ্কটে পড়ে ক্ষমতাসীন আন নাহদা পার্টি। তবে পরিস্থিতি সাফল্যের সাথে সামাল দেয় তারা। আরব রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়ে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও জোট করে তারা। ফলে কয়েক মাস ধরে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটে। তাদের সংবিধান প্রণয়নের পথও সহজ হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলের এই ছাড় দেয়ার মানসিকতাই দেশটিকে ব্যর্থ হওয়ার থেকে বাঁচিয়ে দেয়। প্রতিবেশী লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো তারা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি। মিসরের মতো কর্তৃত্বপরায়ণদের হাতে পড়েনি।
এই প্রক্রিয়ার অন্যতম সুবিধা হলো সাবেক আমলের রাজনীতিবিদেরাও এর মধ্যে দিয়ে আবারো রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পান। আন নাহদা পার্টি ক্ষমতায় গিয়ে বিতর্কিত ‘বিপ্লব সুরক্ষা’ আইনও বাতিল করে দেয়। এই আইনের কারণেই সাবেক ক্ষমতাসীন দল আরসিডির রাজনীতি করার অধিকার রদ করা হয়েছিল। এ ধরনের আইন অবশ্য এখনো ইরাক বা লিবিয়ায় প্রচলিত রয়েছে। এই রাজনৈতিক হিসাবের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, আজকের তিউনিসিয়ায় ক্ষমতার একটা ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। অতীত বা বর্তমানে ক্ষমতাসীনেরা কেউ কাউকে নাকচ করে দিতে পারছে না। অতীতের ক্ষমতাসীনেরা এখনো দেশটির প্রধান প্রধান প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ প্রশাসন, অর্থ, গণমাধ্যমে প্রাধান্য বিস্তার করছে। আর বিপ্লবের পর বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা অনেক বেশি শক্তিশালী।
নানা কারণেই প্রথম দফার আরব বসন্ত ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে নতুন শক্তিগুলোর ব্যর্থতাও আছে। যেমন মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড। তারা তরুণদের সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর জোট গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের জোট তৈরি করতে পারলে তা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারত। সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা পালন করেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষমতাসীনেরা। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আরব জনগণের যতই সদিচ্ছা থাকুক না কেন পাশের দেশগুলোর সরকারপ্রধানেরাও এ ব্যাপারে আগ্রহী নন।
কাজেই আজ ‘আরব বসন্তের’ অর্থ কী? বাস্তবতা হলো এর যেটুকু সাফল্য তা শুধু তিউনিসিয়াতেই দেখা যায়। তবে দৃশ্যমান সাফল্য বাদ দিলে আরব বসন্তকে একেবারে বাতিল করে দেয়া যায়Ñ বিষয়টি এমনও নয়। এর প্রথম ঢেউটি হয়তো ব্যর্থ হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যে মুক্তি, সম্মান, ন্যায়বিচারের আকাক্সক্ষা নিয়ে প্রথম ঢেউটি আরব অঞ্চলে আছড়ে পড়েছিল তেমন বহু ঢেউ আবারো একই অঞ্চলে আছড়ে পড়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
[সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিউনিসিয়ার আন নাহদা প্রধান ড. রশিদ ঘানুশির মেয়ে। মিডল ইস্ট আই-এ থেকে এই নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন তানজিলা কাওকাব]

ইসরাইলে দুই ধর্মের মানুষ দুই রকম আইন : মার্কিন রাষ্ট্রদূত

তেল আবিবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো বলেছেন, ইসরাইলে যে কোনো অপরাধে ফিলিস্তিনিদের জন্য কঠোর ব্যবস্থা ও ইসরাইলিদের প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখে মনে হয় দুই ধর্মের মানুষের জন্য দুই রকম আইন আছে দেশটিতে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউরোপে আসা ইসরাইলি পণ্যে পরিষ্কারভাবে লেখা থাকতে হবে তা অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে উৎপাদিত কিনা। এসবের মধ্যে ইসরাইলের পশ্চিম তীরে এক নারীকে ছুরিকাঘাতের দায়ে এক ফিলিস্তিনিকে গুলি করেছে পুলিশ। অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে ইসরাইলের দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের কারণে যেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ফিলিস্তিনিদের। ধরা পড়লে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও ইসরাইলিদের ওপর ছুরিকাঘাত করছে তারা। এ যেন এক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সবশেষ সোমবার এক নারীকে ছুরিকাঘাতের পর নিরাপত্তাবাহিনী গুলি করে এক ফিলিস্তিনি যুবককে।
গত অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ২৭ জন ইসরাইলি ফিলিস্তিনিদের হাতে ছুরিকাঘাত অথবা গুলিতে মারা গেছে। অন্যদিকে একই সময়ে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৫৫ জন ফিলিস্তিনি। এ অবস্থায় দুই ধর্মের মানুষের জন্য দুই রকম নীতির সমালোচনা করেছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর দমন-পীড়নের সমালোচনা করে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাবিষয়ক এক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তিনি। ড্যানিয়েল বলেন, ‘পশ্চিম তীরের পুলিশ বাহিনী দুই নীতি মেনে চলে বলে মনে হয় আমার কাছে। ইসরাইলিদের জন্য এক রকম, ফিলিস্তিনিদের জন্য আরেক রকম। ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমাগত হামলার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয় না।’ অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে রোববার ঘরে ঢুকে যে নারীকে হত্যা করা হয়েছিল তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সোমবার। অপরাধীকে আটক করার অঙ্গীকার করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

আক্রমণাত্মক হিলারি-স্যান্ডার্স

সাউথ ক্যারোলাইনার বিতর্কে হিলারি
ক্লিনটন ও বার্নি স্যান্ডার্স। এএফপি
১ ফেব্রুয়ারি আইওয়াতে প্রথম প্রাক্-নির্বাচনী ভোট। তার ১৫ দিন আগে, রোববার সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লসটনে অনুষ্ঠিত হলো ডেমোক্রেটিক পার্টির চতুর্থ বিতর্ক। প্রচারণায় এই পর্যন্ত দলের দুই প্রধান প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও বার্নি স্যান্ডার্স পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ থেকে বিরত থেকেছেন। কিন্তু চতুর্থ বিতর্কে এসে তাঁদের বক্তব্যের সুর বদলে গেছে, তাঁরা একে অন্যকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। হিলারি অভিযোগ করেন, ভারমন্ট থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি, যিনি নিজেকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত করাতে ভালোবাসেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘গান লবি’র সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাতা ও বিক্রেতাদের পক্ষে ও ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের সমর্থনে বহুবার আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। হিলারি দর্শকদের মনে করিয়ে দেন, বার্নি স্যান্ডার্স রেলগাড়িতে ও জাতীয় পার্কে অস্ত্র বহনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। হিলারি বলেন, ‘আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না আমাদের দেশে এখনো প্রতিদিন ৯০ জন মানুষ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে নিহত হয়।’ অতিসম্প্রতি স্যান্ডার্স অস্ত্র নির্মাতাদের খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে তাঁর আগের অবস্থান বদল করেছেন। হিলারি অবশ্য সে জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান। সে সমালোচনার জবাবে বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, হিলারি ক্লিনটন খুব ভালো করেই জানেন তিনি সত্য কথা বলছেন না। বার্নি আরও বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশ্নে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ‘ডি’ নম্বর (অর্থাৎ ফেল) দিয়েছে। বিতর্কের তৃতীয় সদস্য,
মেরিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর রবার্ট ও’ম্যালে প্রতিবাদ করে বলেন, হিলারি ও স্যান্ডার্স উভয়েরই আগ্নেয়াস্ত্র প্রশ্নে অবস্থান অসমান্তরাল। তিনি আরও বলেন, তিনিই একমাত্র প্রার্থী, যিনি অর্থপূর্ণ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করতে সমর্থ হয়েছেন। ও’ম্যালে বর্তমানে মাত্র ২ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে নামমাত্র অর্থে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকে আছেন। হিলারি ও স্যান্ডার্সের বাদ-প্রতিবাদের অন্য প্রধান বিষয় ছিল স্বাস্থ্যবিমা-ব্যবস্থা। চার্লসটনে বিতর্ক শুরুর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে স্যান্ডার্স একটি নতুন স্বাস্থ্যবিমা আইন প্রস্তাব করেন। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ নামের এই প্রস্তাবিত বিমা-ব্যবস্থায় খরচ পড়বে ১ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা সংগ্রহ করা হবে বিমা ব্যবহারকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। স্যান্ডার্স স্বীকার করেন, তাঁর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় মধ্যবিত্তের জন্য মাথাপিছু ব্যয় কিছুটা বাড়বে। হিলারি তাঁর এই প্রস্তাবের তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফলে ওবামা প্রশাসন অবশেষে সবার জন্য উপযোগী একটি স্বাস্থ্যবিমা-ব্যবস্থা আইনে পরিণত করেছে। ‘আমি চাই না স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে নতুন এক প্রস্তাব এনে আমরা পুরোনো বিতর্ক উসকে দিই।’ বিতর্কের বিভিন্ন পর্যায়ে হিলারি প্রেসিডেন্ট ওবামার নীতির প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেন। বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য তিনি ওবামাকে ধন্যবাদ দেন। ইরানের সঙ্গে আণবিক চুক্তি সম্পাদন ও সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের জন্যও তিনি ওবামার প্রশংসা করেন।

বুগতি হত্যা মামলা থেকে খালাস মোশাররফ

পারভেজ মোশাররফ
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের প্রভাবশালী উপজাতীয় নেতা নওয়াব আকবর বুগতি হত্যা মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন দেশটির সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। গতকাল সোমবার সে দেশের এক আদালত ২০০৬ সালে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলা থেকে তাঁকে খালাস দেন। খবর এএফপির। বিদেশে স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন কাটিয়ে পাকিস্তানে ফেরার পর মোশাররফের বিরুদ্ধে যে তিনটি ফৌজদারি মামলা হয় এটি সেগুলোর অন্যতম।
পাকিস্তানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আফতাব শেরপাও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় নগর কোয়েটায় সংবাদকর্মীদের বলেন, ‘মামলাটিতে পারভেজ মোশাররফসহ সব আসামির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগই নাকচ করে দিয়েছেন আদালত।’ আফতাব নিজেও এই মামলার একজন আসামি ছিলেন। এ বিষয়ে বুগতি পরিবারের আইনজীবী সুয়াহেল রাজপুত বলেন, ‘এই রায় অবিচারমূলক এবং একটি তামাশা।’

ফের এরশাদের ‘ঘর’ ভাঙছে? by সোহরাব হাসান

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কতটা গণতন্ত্রী, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন দলটির সদ্য পদচ্যুত মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। দলের চেয়ারম্যান গতকাল মঙ্গলবার তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে মহাসচিব পদ থেকে পত্রপাঠ বিদায় করে দিয়েছেন। এত দিন সভা-সেমিনার, টক শোতে জিয়াউদ্দিন তাঁর নেতা কতটা ‘গণতন্ত্রী’ তা প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
এর আগে এরশাদ সাহেব মাহবুবুর রহমান, খালেদুর রহমান টিটো, আবদুল মতিন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও নাজিউর রহমানকেও একই কায়দায় বিদায় দিয়েছেন। এমনকি ২০১৪ সালের এপ্রিলে তিনি যখন রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মহাসচিব করেন, তখনো একই স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেবার এরশাদ রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনেছিলেন, এবার জিয়াউদ্দিনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনলেন। সেই সঙ্গে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়েও তাঁকে অভিযুক্ত করলেন। কিন্তু তিনি যে দলের কারও সঙ্গে আলাপ না করে একা এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, তাতে কি শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়নি? কেবল এরশাদ নন, বাংলাদেশে সব দলের প্রধানের জন্য সাত খুন মাফ। তিনি যা করবেন, সেটাই আইন, তিনি যা বলবেন, সেটাই গঠনতন্ত্র। জিয়াউদ্দিনকে সরানোর সময় এরশাদও গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়েছেন।
জাতীয় পার্টিকে ঘিরে গত ৭২ ঘণ্টায় অনেক ‘নাটক’ মঞ্চস্থ হয়েছে ঢাকা ও রংপুরে। তবে শেষ দৃশ্যের ছবিটা কেমন হবে, এখনই তা বলা যাচ্ছে না। কেননা, রাজনৈতিক মহলে এরশাদ বরাবরই ‘আনপ্রেডিকটেবল’ বলে পরিচিত। গত রোববার তিনি রংপুরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেন। একই সঙ্গে তাঁর অবর্তমানে জি এম কাদেরই দল চালাবেন বলে জানিয়ে দেন এরশাদ। এটি অনেকটা উত্তরাধিকার নির্বাচনের মতো। জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে কো-চেয়ারম্যান বলে কোনো পদ নেই। এরশাদ বলেছেন, আগামী কাউন্সিলে সেই পদ সৃষ্টি করা হবে। উত্তরাধিকারের রাজনীতি কেবল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেই ভর করেনি, এরশাদের জাতীয় পার্টিও এই রোগে আক্রান্ত হলো।
এরশাদ যখন দলের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্যসচিব পদে রুহুল আমিন হাওলাদারকে নিয়ে আসেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে জিয়াউদ্দিনের কপাল পুড়ল। গতকাল এরশাদ সে কথাটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিলেন মাত্র। রাজনীতিকদের শরমটরম কম বলেই তাঁরা যে অন্যায়ই করুন না কেন, গঠনতন্ত্রের দোহাই দেন। আর সামরিক শাসকেরা ক্ষমতায় এসে যেসব দল করেন, তার গঠনতন্ত্র এমনভাবে তৈরি যে দলীয় চেয়ারম্যানই সবকিছুর নিয়ন্তা। কথাটি বিশ্বাস না হলে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির গঠনতন্ত্র দুটি পড়ে দেখুন। দলের বা সহযোগী যেকোনো সংগঠনের যেকোনো পদে যে কাউকে তিনি যেমন পদায়িত করতে পারেন, তেমনি পরিত্যাজ্যও ঘোষণাও করতে পারেন। এবং দলীয় প্রধান যাঁকে খুশি ওপরে তোলেন, যাঁকে খুশি নিচে নামান। কারও কিছু বলার নেই।
যেকোনো গণতান্ত্রিক দল পরিচালিত হয় নীতি, আদর্শ ও গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই নীতি ও আদর্শকে পাশ কাটিয়ে যখন দলটি সুবিধাবাদের চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে, তখন তা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে তিনটি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা বিশেষ দূতের পদই ভাগিয়ে নেয়নি, বেসরকারি ব্যাংক-বিশ্ববিদ্যালয়ও হাতিয়ে নিয়েছে।
জাতীয় পার্টির বর্তমান সংকটের মূলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। সেই নির্বাচনে যাঁরা এরশাদের হুকুম মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছিলেন, তাঁরা সংসদে যাওয়ার অধিকার হারিয়েছেন। আর যাঁরা তাঁর নির্দেশ না মেনে মনোনয়নপত্র বহাল রেখেছিলেন, তাঁরাই মন্ত্রী-সাংসদ হয়েছেন। সেই সময় সাবেক মন্ত্রী জি এম কাদেরও এরশাদের কথামতো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি নিজের ভাইসহ অনেককে পথে বসিয়েছেন। দুই বছর ধরেই জাতীয় পার্টিতে যে চাপান–উতর চলছিল, তার বিস্ফোরণ দেখা গেল চলতি সপ্তাহে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত রকম কৌতুক আছে, সবচেয়ে বড় কৌতুকের নাম এরশাদ। তিনি সকালে এক কথা বলেন, বিকেলে সেটি অবলীলায় উল্টে দেন। ক্ষমতায় থাকতে তাঁর এসব কাণ্ডকারখানা দেখে দুর্জনেরা সিএমএলএকে (চিফ মার্শল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর) ঠাট্টা করে বলতেন, ‘ক্যানসেল মাই লাস্ট অ্যানাউন্সমেন্ট।’ আমরা এখনো জানি না, গতকাল এরশাদ সাহেব যেসব ঘোষণা দিয়েছেন, সেগুলো ভবিষ্যতে বাতিল করবেন কি না।
অনেকের মতে, এরশাদ এসব করছেন সরকারকে এই বার্তা দিতে যে তিনিই জাতীয় পার্টি। অন্য সব ফক্কিকার। এখনো এরশাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা আছে। সেই মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য মাঝেমধ্যেই তিনি গর্জন করে ওঠেন। এবারের নাটকও সেই গর্জনের অংশ কি না, তা কে বলতে পারে?
এরশাদের তুঘলকি আচরণ গত ২৫ বছরে এতটুকু বদলেছে বলে মনে হয় না। নাহলে দলের কারও সঙ্গে কথা না বলে তিনি রংপুরে গিয়ে তাঁর ছোট ভাই জি এম কাদেরকে কেন দলের কো-চেয়ারম্যান করবেন? দলের চেয়ারম্যান হিসেবে সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। এরশাদ আজ যেভাবে জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একই কায়দায় আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছিলেন। কিন্তু তাতে দলীয় কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসেনি। কেননা, তিনি চেয়ারম্যানের পদটি ছাড়েনইনি, তাহলে ভারপ্রাপ্তের প্রশ্ন আসবে কীভাবে? দেখা যাক, এবার কী করেন।
জাতীয় পার্টিতে যে নাটক চলছে, সেটি অভিনব নয়। এ ধরনের নাটক দলটির শুরু থেকে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে, যার সাক্ষী অনেক প্রয়াত ও জীবিত নেতা। তিনি কনিষ্ঠকে উচ্চ পদে বসিয়ে জ্যেষ্ঠকে কীভাবে অপমান করতেন, তার কিছু বিবরণ পাওয়া যায় তাঁরই সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ও মিজানুর রহমান চৌধুরীর বইয়ে।
বর্তমানে জাতীয় পার্টি বা এরশাদের অবস্থান কী, সেটা তিনি কখনোই পরিষ্কার করেননি। তিনি দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলেন, কিন্তু মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিজে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত পদে বহাল আছেন। কথায় বলে আপনি আচরি ধর্ম। দলের নেতাদের মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বলার আগে তাঁর উচিত ছিল বিশেষ দূতের পদটি ছাড়া।
এবার জাতীয় পার্টিতে যে ঘূর্ণিঝড় দেখা গেল, তা শিগগির বন্ধ হবে, না ক্ষমতার রাজনীতিতে ওলটপালট ঘটাবে, সেটি দেখার জন্য আমাদের অারও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এরশাদ দলের ভেতরের বিদ্রোহ অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছেন।
ক্ষমতায় থাকতে এরশাদ সারাক্ষণ চেষ্টা করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে এবং তিনি কিছুটা সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু যখন দল দুটি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করল, তখনই তিনি পদত্যাগে বাধ্য হলেন। ক্ষমতা ত্যাগের পরও এরশাদ এই চাণক্য নীতি বর্জন না করে দলের ভেতরে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। এ পর্যন্ত যতবার জাতীয় পার্টি ভেঙেছে, ক্ষমতার হিস্যা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণেই। এরশাদ কারারুদ্ধ থাকতে ১৯৯১ সালে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করেন দ্বাদশ সংশোধনী পাসের সময়। এরপর দলের ভাঙন দেখা দেয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সরকারে যোগদান প্রশ্নে। তখনো এরশাদ দুদিকে খেলতে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাঁর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে চাইছিল। কিন্তু এরশাদ বিএনপিকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কেননা, বিএনপির শাসনামলে পুরো সময়টাই তাঁকে কারাভোগ করতে হয়। তিনি আওয়ামী লীগের প্রস্তাবে সাড়া দেন এবং তাঁর সমর্থন নিয়েই আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মন্ত্রী হন। এতে দলের বিএনপিপন্থী অংশ ক্ষুব্ধ হয়। আওয়ামী লীগ আমলেই ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে এরশাদ শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে চারদলীয় জোট করে মাঠ গরম করেন। জেলের ভয়ে আবার সেই জোট থেকে একসময় বেরিয়েও আসেন। কিন্তু তাঁর এককালীন ঘনিষ্ঠ সহযোগী মতিন ও নাজিউর থেকে যান চারদলেই। ফলে ২০০১ সালে জাতীয় পার্টিকে এককভাবে নির্বাচন করে ১৪টি আসন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপির কেউ টুঁ শব্দ করলেই তার ভেতর ষড়যন্ত্র খোঁজেন। কিন্তু পৌর নির্বাচনের আগে ও পরে এরশাদের মন্তব্যগুলো তাঁরা একবার মিলিয়ে নিতে পারেন। ২০১৫ সালের অক্টোবরে দলীয় অফিসের সামনে এক সমাবেশে এই স্বৈরশাসক বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র এখন কবরে। নির্বাচন কমিশনেরও কবর হয়ে গেছে (যুগান্তর, ২৪ অক্টোবর ২০১৫)।’ সেই কবর হওয়া গণতন্ত্রেই এরশাদ সাংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত পদে বহাল আছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পুতুল সরকারের একজন প্রতিনিধি যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনামের কাছে হেরে যাওয়ার পর বলেছিলেন, আমেরিকা যার বন্ধু তার আর শত্রুর দরকার হয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেকেই বলে থাকেন, এরশাদ যার বন্ধু তার আর শত্রুর প্রয়োজন হবে না।
এবার জাতীয় পার্টিতে যে ঘূর্ণিঝড় দেখা গেল, তা শিগগির বন্ধ হবে, না ক্ষমতার রাজনীতিতে ওলটপালট ঘটাবে, সেটি দেখার জন্য আমাদের অারও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এরশাদ দলের ভেতরের বিদ্রোহ অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছেন। ‘বিদ্রোহী’রা প্রথমে তাঁর সিদ্ধান্ত ‘মানি না’ ‘মানব না’ বলে আওয়াজ তুললেও পরে সুর নরম করেছেন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত ‘ঘর’ টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিদ্রোহীরা মহাসচিব পদে রদবদল কিংবা জি এম কাদেরকে কো–চেয়ারম্যান মেনে নিলেও মন্ত্রিত্ব যে ছাড়বেন না, তা তাঁদের হাবভাবেই স্পষ্ট। এরশাদ জানেন যে জাতীয় পার্টিতে তাঁর প্রতিপক্ষ গ্রুপ যতই লম্ফঝম্ফ করুক না কেন, কেউ তাঁর অবাধ্য হতে পারবেন না। ‘অনুগত বিরোধী দলটির’ নেতা তাঁর দলের সবাইকে অনুগতই রাখতেই পছন্দ করেন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

আমরা অনড় নই , সুষ্ঠু নির্বাচনের গ্যারান্টি চাই -একান্ত সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। জন্ম ঠাকুরগাঁওয়ে। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি। অর্থনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেন। রাজনীতি শুরু ষাটের দশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। সক্রিয়ভাবে অংশ নেন মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর তিনি শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন। ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবেও তিনি কাজ করেন। সরকারি চাকরি করেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। সরকারি চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে মির্জা ফখরুল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের কৃষি ও বিমান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। কারাবরণ করেছেন অনেকবার।
নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নয়া দিগন্তের সহকারী সম্পাদক আলফাজ আনাম ও সিনিয়র রিপোর্টার মঈন উদ্দিন খান
নয়া দিগন্ত : দীর্ঘ দিন পর ৫ জানুয়ারির বর্ষপূর্তিতে আপনারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করলেন। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কি অবসান ঘটতে যাচ্ছে?
মির্জা ফখরুল : এটা বলা খুব মুশকিল। কারণ বর্তমান সরকারের আচরণ কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বলা যায় না। এ কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কখনো তারা গণতান্ত্রিক কার্যক্রমে কিছুটা ছাড় দেয় আবার কখনো শক্ত অবস্থানে থাকে। একদমই কোনো সুযোগ থাকে না। কিছু দিন আগে পর্যন্ত আমাদের ঘরোয়া কর্মসূচি পালন করতে পারতাম না। এখন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর থেকে এই সুযোগ কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে। তাও এটি কতদিন থাকবে তা আমরা জানি না।
নয়া দিগন্ত : পৌরসভা নির্বাচন থেকে তাহলে বিএনপির কী অর্জন হলো?
মির্জা ফখরুল : পৌরসভা নির্বাচন থেকে আমাদের অর্জন হলো, আমরা জনগণের কাছে যেতে পারছি। কিছুটা সুযোগ পাচ্ছি। যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল আমরা কোথাও যেতে পারছিলাম না, আমাদের নেতাকর্মীরা বেরুতে পারছিল না, সে জায়গায় এরা প্রকাশ্য এসে রাজনীতির কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : সরকার তো বলছে পৌরসভা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলকও হয়েছে।
মির্জা ফখরুল : সরকারের কথায় তো আমরা সঠিক বিচার করতে পারব না। কারণ, এই সরকারের চরিত্র আমরা জানি। এটি পুরোপুরিভাবে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার এবং যে নির্বাচনের মাধ্যমে এরা ক্ষমতায় আছে সে নির্বাচনের কোনো নৈতিক বৈধতা নেই। এ কারণে এরা সবসময় অস্থিরতায় থাকে এবং আস্থাহীনতায় ভোগে। যে কারণে বিরোধী দলের ওপর তারা বেশি করে চড়াও হয়। সে কারণে এরা বলে নির্বাচন ভালো হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু সুন্দর হবে এটা আমরা আশা করিনি। আমরা বলেছিলাম, নির্বাচনে যাচ্ছি আন্দোলনের অংশ হিসেবে। অর্থাৎ এটাকে নিয়ে আমরা জনগণের কাছে যাবো এবং তাদের সামনে আমাদের কথাগুলো বলব। সে ক্ষেত্রে আরেকবার আমাদের লাভ হয়েছে, আমরা বাইরে আসতে পেরেছি, আবারো জনগণের সামনে প্রমাণ করতে পেরেছি এদের সময় নির্বাচন কিভাবে হচ্ছে। আমাদের যে দাবি নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার দরকার, তা আবারো প্রতিষ্ঠিত হলো। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দরকার। আমাদের তো ইংল্যান্ড আমেরিকা দিয়ে চিন্তা করলে চলবে না। এমনকি ভারত দিয়ে তুলনা করলে চলবে না। এই নির্বাচনে প্রমাণ হলো নিরপেক্ষ সরকার না থাকলে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হবে না।
নয়া দিগন্ত : বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তো মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে কী আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না?
মির্জা ফখরুল : বিষয়টাকে আমরা অনড়ভাবে দেখতে চাই না। আমরা বলছি নির্বাচনের সময়ে একটি নিরপেক্ষ সরকার থাকতে হবে। অর্থাৎ সেই সরকার সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। নির্বাচন কমিশন কিন্তু এখন পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের বাজেট, অর্থ সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওপর নির্ভর করে। যেহেতু তাদের লোকবল কম, তাদের প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। যখন একটি সরকার থাকে তখন প্রশাসন সে সরকারের অনুগত থাকে। এটাই প্রশাসনের চরিত্র। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দলীয় সরকারের অধীনে যেহেতু প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকতে পারে না, সে কারণে কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এসেছে।
নয়া দিগন্ত : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে তাহলে কী আপনার এখনো অনড়?
মির্জা ফখরুল : না, কথাগুলো এভাবে বললে হবে না। প্রথমে বলেছি আমরা অনড় নই। ধরে নিই, যদি এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সরকার নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য। এক্ষেত্রে আলোচনা, সমঝোতা এবং সংবিধানের ব্যাপার রয়েছে। এ কারণে আমরা বলছি, এ নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। সব রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপ-আলোচনা করে আমরা একটা জায়গায় আসতে পারি কি না, যেখান থেকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আমরা পাবো। মূল কথা হলো নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : সেই সংলাপের সম্ভাবনা কতটুকু?
মির্জা ফখরুল : আমরা তো বারবার বলছি। সরকারপক্ষ তো সারা দিচ্ছে না। কত ধরনের শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। এসব শর্ত দিয়ে তো সংলাপ হবে না। সংলাপ করতে হলে খোলামনে আসতে হবে।
নয়া দিগন্ত : যদি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাব আসে, সে ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কী হবে।
মির্জা ফখরুল : যদির ভিত্তিতে কোনো রাজনীতিবিদ বক্তব্য দিতে পারে না। কারণ এতে অনেক ভুল বোঝাবুঝি বা সমস্যা হতে পারে। আমরা বলতে চাই, নির্বাচনের জন্য যদি একটি অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে, তাহলে আমরা যেকোনো বিষয়ে কথা বলতে রাজি আছি। শর্ত হচ্ছে নিরপেক্ষ এবং যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হতে হবে।
নয়া দিগন্ত : সংলাপও হচ্ছে না আবার কিছুটা পরিবেশ ফিরে পাচ্ছেন, এখন কি বিএনপি দল পুনর্গঠনের দিকে যাবে?
মির্জা ফখরুল : দল পুনর্গঠনের চিন্তাভাবনা আমরা প্রথম থেকেই করছি, কিন্তু সরকারের আচরণের কারণে তা আমরা ফলপ্রসূ করতে পারিনি। ভয়ভীতি, দমন, পীড়নের কারণে সভা সমাবেশ আমরা করতে পারিনি। এখন আমরা সাংগঠনিক কাজ শুরু করেছি। দ্রুত এসব প্রক্রিয়া শেষ করে কাউন্সিল করতে চাই।
নয়া দিগন্ত : সাংগঠনিক কার্যক্রমের অভাবে তৃণমূলে এক ধরনের হতাশা আছে বলে মনে করা হয়।
মির্জা ফখরুল : দেখুন, আমি খোলামেলাভাবে বলতে চাই সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের আচরণের ওপর। আজকে যদি আমার থানার প্রেসিডেন্ট বা জেলার প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি জেলে থাকেন তাহলে তো সাংগঠনিক কার্যক্রম থমকে যাবে। আমরা কর্মসূচি দেয়ার পর দফায় দফায় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনো বহু নেতাকর্মী জেলে রয়েছে। প্রায় ছয় হাজারের মতো নেতাকর্মী জেলে রয়েছে। এটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। মুক্ত পরিবেশ ছাড়া আমরা কোনোভাবেই সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারব না।
নয়া দিগন্ত : জোটের মধ্যে কিন্তু বিরোধ দেখা যাচ্ছে। ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ জোট থেকে বের হয়ে গেছে।
মির্জা ফখরুল : দেখুন, বাংলাদেশে এ ধরনের রাজনীতি নতুন নয়। বহু আগে থেকেই এমন জোট গঠন হয়, জোট ভাঙে। জোট থেকে বেরিয়ে যায়, আবার জোটে আসে। সংসদীয় গণতন্ত্র আছে এমন রাজনীতিতে এটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। ভারতে রাজ্য সরকারে যে জোট থাকে, জাতীয় নির্বাচনে আবার সে জোট থাকছে না, ভেঙে যাচ্ছে। এটা হতেই পারে। জোট গঠন বা ভেঙে যাওয়া সংসদীয় রাজনীতির একটা বৈশিষ্ট্য।
নয়া দিগন্ত : ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন বিএনপি ভাঙনের দিকে যেতে পারে। সেরকম শঙ্কা আছে কি?
মির্জা ফখরুল : এগুলো কথার কথা। আমরা যারা রাজনীতি করি তারা বহু কথা বলি, যা আমরা নিজেরাও মনে করি না। যার পেছনে কোনো অর্থ থাকে না। রাজনীতির কারণে বলতে হয়, তাই বলা। এ ছাড়া বিএনপি ভাঙার চেষ্টা সবসময় হয়ে এসেছে। আগেও হয়েছে এখনো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকার খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। এমনকি জোট ভাঙার জন্য চেষ্টা করে তারা সফল হয়নি। আমরা ক্ষমতা থেকে প্রায় আট বছর বাইরে। বিএনপির প্রথমসারির বা পরিচিত মুখ কাউকে দল থেকে বের করতে পারেনি। আবার ২০ দলের যারা প্রধান শক্তি তাদেরও জোট থেকে বের করতে পারেনি। আবার যারা বেরিয়ে গেছে তাদের একটা গ্রুপ কিন্তু জোটে থেকে যাচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : জোটের প্রসঙ্গে আরেকটি দিক সামনে চলে এসেছে জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীকে সরকার নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কী।
মির্জা ফখরুল : যদি রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করি তাহলে আমি মনে করি, জামায়াত নিষিদ্ধ করা আওয়ামী লীগের জন্য লাভ হবে না। এ কারণে লাভ হবে না, জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করা রাজনৈতিক দল। দলটি পাকিস্তান আমল থেকে রাজনীতি করে আসছে। দলটি সাংবিধানিক রাজনীতি করে। এই দলকে যদি আপনি নিষিদ্ধ করে দেন; এই দলের আদর্শভিত্তিক একটি বড় কর্মীবাহিনী আছে। এই কর্মীবাহিনী কোথায় যাবে? এই কর্মীবাহিনী হয় আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যাবে অথবা তারা অন্য দলের সাথে যুক্ত হবে। তাতে তো আওয়ামী লীগের লাভ হবে না। কারণ আওয়ামী লীগের রাজনীতি আর জামায়াতের রাজনীতি এক নয়। এমনকি কাছাকাছিও নয়। সুতরাং এতে আওয়ামী লীগের লাভ হবে বলে মনে হয় না। যে কারণে আমার মনে হয় মুখে তারা যাই বলুক নিষিদ্ধ করব; আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবে বলে আমার মনে হয় না। সংসদীয় রাজনীতিতে অনেক যোগ বিয়োগ আছে। কোন দল থাকলে লাভ হবে কোন দল থাকলে হবে না। আসলে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিএনপি -জামায়াতের জোটকে ভেঙে ফেলা। এই জোট ভোটের রাজনীতির যোগ বিয়োগে তাদের জন্য ক্ষতিকর। এটাই তাদের আসল সমস্যা। এ কারণে তারা চায় এই জোট ভাঙতে।
নয়া দিগন্ত : বিএনপি জাতীয়তাবাদী ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসের রাজনীতি করছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রবাহে বিএনপি কি নতুন বিন্যাসের চিন্তা করছে?
মির্জা ফখরুল : বিএনপির নতুন বিন্যাসের প্রয়োজন নেই। আপনি যদি বিএনপির ঘোষণাপত্র, মেনিফেস্টো দেখেন- বিএনপির খুব স্পষ্ট কথাবার্তা বলা আছে। বিএনপি ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসের রাজনীতি করে, ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসে রাজনীতি করে, উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতি করে। এই দিকটি খুব স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এ ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনীতিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয় যদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি থাকে।
নয়া দিগন্ত : আপনি নিজেও বিএনপির রাজনীতিতে পরিবর্তনের কথা বলেছেন সেটি কেমন?
মির্জা ফখরুল : আমি পরিবর্তনের কথা বলেছি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে। আমরা যে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিই এবং যেভাবে প্রচার করি, তা এখন প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া উচিত। কারণ দুনিয়া বদলে গেছে। প্রযুক্তি এমন জায়গায় গেছে, এখন আর জনসভা করার দরকার হয় না। ধরুন ম্যাডামের বক্তব্যের জন্য টেলিভিশনে যদি আমরা আধা ঘণ্টার সময় পাই। সবগুলো চ্যানেলে তার বক্তব্য প্রচার করা হয়, তাহলে তো জনসভার কাজ হয়ে যায়। তাহলে তো লোক জরো করে এনে বক্তব্য দেয়ার দরকার হয় না। এই দিকগুলোর কথা আমি বলছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখন পুরনো চিন্তার মধ্যে আছি। এখন যদি ম্যাডামের টুইটার বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আমরা প্রচার চালাতে পারি। এখন তো গ্রামের নারীদের হাতে টেলিফোন আছে। এ ধরনের প্রচারণায় সুবিধা হবে বেশি ফল পাওয়া যাবে, খরচ কম হবে। বেশি লোকের কাছে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু এসব জায়গায় এখন পর্যন্ত আমরা যেতে পারছি না। আবার নানারকম আইনি বিধি-নিষেধও আছে, সেগুলোয় মাথায় রাখতে হচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় জঙ্গিবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিএনপি পৃষ্ঠপোষকতা করে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী।
মির্জা ফখরুল : এই ইস্যুটাই একটি নোংরা রাজনীতি। বিএনপি কোনো মতেই, কোনো দিনেই এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সাথে ছিল না এবং বিশ্বাসও করে না। বিএনপি একটি সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এ দলের তো কোনো গুপ্তহত্যায় জড়ানোর প্রয়োজন নেই। এটাই হচ্ছে মূল কথা। এসব হচ্ছে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অংশ। যারা করছে তারা বাংলাদেশে উগ্রবাদ তৈরি হচ্ছে, জঙ্গিবাদ তৈরি হচ্ছে- এ ধরনের কথাবার্তা বলে। এখানে আইএস আছে, জঙ্গিবাদ আছে- এসব বলে লাভ কার ক্ষতি কার? সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের। যদি সত্যিই এ ধরনের জঙ্গিবাদ এ দেশে আনা হয়, তাহলে সবচেয়ে ক্ষতি হবে বাংলাদেশের মানুষের।
বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ। এ দেশের মানুষ শান্তিতে সবাইকে নিয়ে বাস করতে চায়। এখানে সব ধর্মের মানুষ এক সাথে থাকে। এখানে যেমন ব্লগাররা আছে, তেমনি কট্টর ধর্মবিশ্বাসী লোকজনও আছে। আগে তো কখনো শুনিনি এদের মারামারি করতে হবে। কিছু স্বার্থান্বেষী লোক এগুলো করাচ্ছে, বাংলাদেশকে উগ্রবাদী ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করার জন্য। আমরা কখনো এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারি না। আমরা বারবার বলেছি, যখন গণতন্ত্রকে সঙ্কোচন করবেন, মুখ বন্ধ করবেন তার সুযোগ উগ্রবাদীরা নেবে।
নয়া দিগন্ত : জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে বিএনপি কী ভুমিকা রাখতে চায়?
মির্জা ফখরুল : বিএনপি একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধ করতে একটি জাতীয় ঐকমত্য দরকার। সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বসতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝতে হবে। এ দেশে আলেম-ওলামাদের সমাজে বড় ধরনের ভূমিকা আছে। তাদের সাথে বসেন, কথা বলেন। মানুষের কাছে কথা চলে যাক সন্ত্রাসের এই পথ সঠিক পথ নয়। এই পথ ইসলামের নয়। যারা ইসলামের কথা বলে ভুল দিকে পরিচালিত করতে চায় তাদের পথ ইসলামের পথ নয়। এই কথাটা সবাইকে একসাথে বলতে হবে। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে এই প্রবণতাকে বন্ধ করা যেতে পারে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কেন তরুণেরা আইএসে যোগ দিচ্ছে তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ তাদের সামনে বিকল্প কোনো দর্শন নেই। বিকল্প রাজনীতি নেই। তারা ও দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। এত অন্যায় অবিচার দেখে তারা হতাশা থেকে ওদিকে ঝুঁকছে। আপনি যদি গণতন্ত্রকে সামনে আনতে পারেন, তাহলে কোনো দিন এরা ও দিকে যাবে না। গণতান্ত্রিক পরিবেশ দিন। কথা বলতে দিন। মতামতকে গুরুত্ব দিন। সুন্দর নির্বাচন দিন। যদি কেউ জানে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে তার পক্ষে এনে সরকার গঠন করতে পারব, তখন কেন সে অন্য দিকে যাবে।
নয়া দিগন্ত : আপনি জাতীয় ঐক্যের কথা বললেন। কিন্তু ক্ষমাতসীন দলের নেতারা বলছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বিএনপির বর্তমান অবস্থান জাতীয় ঐক্যের পথে অন্তরায়- আপনার বক্তব্য কী?
মির্জা ফখরুল : ওরা এ কথা আজীবন বলে আসছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে আর কেউ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। ওরা ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি? আসলে এটা তাদের মাইন্ডসেট। মনের মধ্যে ঢুকে আছে। ওরাই প্রভু, ওরাই জমিদার, ওরাই তালুকদার, ওরাই সব। বাকি আর কেউ কিছু না। আমি একজন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। আমি বিএনপি করি কেন? জিয়াউর রহমান কী ছিলেন? রণাঙ্গনে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধা বিএনপিতে বেশি আছে। তারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। এ ধরনের কথা বলার অর্থ হচ্ছে মূল ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়া।
নয়া দিগন্ত : মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের কথা বললেন কিন্তু তাকে তো পাকিস্তানের গুপ্তচর বলা হচ্ছে। এমনকি তার কবর সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানা যাচ্ছে। বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
মির্জা ফখরুল : সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত হবে আত্মহত্যার শামিল। আমি মনে করি, তাদের যদি এ ধরনের দুরভিসন্ধি থাকে, বাংলাদেশের মানুষ কখনো এটা মেনে নেবে না।
নয়া দিগন্ত : আমরা দেখছি সরকার উন্নয়নের কথা বলছে। এমনও বলা হচ্ছে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আরো কয়েক টার্ম সরকারের ক্ষমতায় থাকা দরকার।
মির্জা ফখরুল : আসলে সরকার তাদের পুরনো আশা দেখছে। ১৯৭৫ সালে যখন তারা একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করে, তখন তাদের কথা এরকমই ছিল। তারা গণতন্ত্রের বদলে একটি রেজিমেন্টেড পলিটিকস দরকার বলে মনে করেছিল। গণতন্ত্র নয় উন্নয়ন দিয়ে জনগণের সমস্যা সমাধান করতে চায়। বাস্তবতা হচ্ছে, যে রাজনৈতিক দর্শন এখন পৃথিবী থেকে বাদ হয়ে গেছে সমাজতন্ত্র বা একদলীয় শাসন, আওয়ামী লীগ সেটি ধরে রাখতে চায়। আমাদের দেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে গণতন্ত্রমনা। এমন দেশে এ ধরনের রাজনীতি হবে আত্মহত্যার রাজনীতি। এগুলো বলে সরকার আরো জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। যদি সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে তা প্রমাণ হবে।
আর উন্নয়ন তো গণতন্ত্র ছাড়া সম্ভব নয়। সরকারের মধ্যে যদি জনগণের মতের প্রতিফলন না থাকে তা হলে তো উন্নয়ন হবে না। এখন যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তা কোন ধরনের উন্নয়ন। আমরা দেখছি ঢাকা শহরের মধ্যে দৃশ্যমান কয়েকটি ওভারব্রিজ , মেট্রোরেলের কাজ শুরু করা হচ্ছে। এগুলোর সাথে সাধারণ জনগণের সম্পর্ক খুব কম। গোটা বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের বেহাল দশা কিন্তু ঢাকায় একটি ফ্লাইওভার হলে কি উন্নয়ন হবে? রেলওয়ে একেবারে ডুবতে বসেছে। শিক্ষা এখন সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে গেছে। সাধারণ মানুষ কোনো স্বাস্থ্যসেবা পায় না। তা হলে কোথায় উন্নয়ন হচ্ছে। দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিদেশীরা চলে যাচ্ছে। দেশী বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশে বিনিয়োগ করছে । এমন হাজার দিক আছে। সিপিডি কয়েক দিন আগে বলেছে, বাংলাদেশ শান্ত অবস্থায় থাকলেও অর্থনীতির গতি নেই। শুধু কথা বলে বা নানা ধরনের তথ্য দিয়ে উন্নয়ন হয় না।
নয়া দিগন্ত : প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি কি কোনো মূল্যায়ন করছে?
মির্জা ফখরুল : আমাদের কাছে মনে হয় শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা পৃথিবীতে ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। সে পরিবর্তনের কারণে নানা ধরনের আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরব সম্প্রতি একটি জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এর লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। ইরান ও ইয়েমেনে দেশটির সাথে বিরোধ চলছে। সিরিয়া নিয়ে নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থির। একইভাবে বাংলাদেশে ভূ-রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীন ও ভারত এখন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আবার রাশিয়ার তৎপরতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্র্যাগমেটিক চিন্তাভাবনা খুব জরুরি। সেদিক থেকে বিএনপি চিন্তা করছে। আপনি তুরস্কের কথা বলতে পারেন। তুরস্ক কিন্তু আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। কারণ তুরস্কে গণতন্ত্র আছে। নিয়মিত সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হচ্ছে। আবার ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলো পারমাণবিক চুক্তি করেছে, যা এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। আবার পাকিস্তান পশ্চিম এবং চীনের সাথে এমনকি ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির দিকে এখন আমাদের দৃষ্টি দেয়া দরকার। পররাষ্ট্রনীতিতে নিজ দেশের স্বার্থ বড় কথা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিজের স্বার্থ দেখা হচ্ছে ভালো রাজনীতি। আমরা সে চেষ্টা করছি।
নয়া দিগন্ত : বিএনপি চেয়ারপারসন সম্প্রতি জনসভায় সুশাসন নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের কারোর ওপর কোনো ক্ষোভ নেই। এর মাধ্যমে তিনি কী বার্তা দিতে চান?
মির্জা ফখরুল : তিনি সঠিক কথাই বলেছেন। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দেয়ার কথা বলেছেন। দেশ আজ নানাভাবে বিভক্ত। মানুষের মধ্যে বিভেদ বিভাজন থাকলে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। এই বিভক্তি মানুষের কর্মস্পৃহা নষ্ট করেছে। এ কারণে তিনি রিকনসিলিয়েশেনের কথা বলছেন। বিএনপি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দল। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনে বিশ্বাসী দল। কোনো বিপ্লবী দল নয়।

চীনা উদ্যোগের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ by মিংকাং লিউ ও ওয়েনঝি লু

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন ২০১৩ সালে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তখনই সেটা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এটা সেই প্রাচীন সমুদ্র ও সড়কপথের সিল্ক রোড পুনরুদ্ধারের প্রয়াস, যে রাস্তা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল। প্রায় ৬০টি দেশ ও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, ফলে সংগত কারণেই এই প্রকল্প অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করবে, একই সঙ্গে তা চ্যালেঞ্জেরও বটে।
মূল সিল্ক রোডের অস্তিত্ব ছিল আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে, এটা ছিল বাণিজ্যের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এর মধ্য দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিনিময় হয়েছে। চীনের নতুন ‘সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’ ও ‘টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোডও’ একই কাজ করবে। নতুন নতুন ও উন্নততর অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি ও চিন্তার প্রসার হবে, ফলে সবারই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে।
চীনের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এই কৌশল গ্রহণের যুক্তিটা খুব পরিষ্কার। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বাড়ার হার ও সুযোগ কমে যাওয়ায় চীনকে এখন নিজের অর্থনীতি উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এই বাজার খুলে দেওয়ার মধ্যে আছে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করা, যার মধ্য দিয়ে উভয়েরই লাভ হবে। চীনের প্রতিবেশী দেশগুলো তার নিম্নহারের মূল্য সংযোজনকারী কাজগুলোর ঠিকাদারি পেয়ে লাভবান হতে পারে। এতে করে সেই দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যেমন বাড়বে, তেমনি চীনও মূল্য শৃঙ্খলে আরেকটু ওপরে উঠতে পারবে, যেখানে উৎপাদনশীলতা ও মজুরি উভয়ই বেশি—এ দুটোই কিন্তু ভোগের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
চীন এই সম্পর্ক স্থাপনের মূল কাজ ইতিমধ্যে করে ফেলেছে, তারা এই ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডের’ আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়ার জন্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যেমন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক।
বিশ্বের আর্থিক খাতের একটি কেন্দ্র হচ্ছে হংকং, আবার সাংহাইও আর্থিক খাতের আরেকটি আঞ্চলিক কেন্দ্র। ফলে চীন একটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়ে যাওয়ায় তার নেতৃস্থানীয় ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তার সঙ্গে আছে দ্রুত বর্ধনশীল ও উদ্ভাবনমুখী কোম্পানি যেমন হুয়াওয়ে, আলিবাবা ও ওয়ান্দা। ফলে, শি জিনপিং নিজের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়ন করার মতো জায়গায় আছেন।
কিন্তু তাঁর যাত্রাটা খুব মসৃণ হবে না। যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মতো ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞ কূটনীতির প্রয়োজন হবে, কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তার জন্য সতর্ক পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
এই ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডের’ আশপাশের দেশগুলো ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের এক বিরল যুগলবন্দীর সম্মুখীন হয়েছে। এই ঝুঁকির মধ্যে যেমন সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যাপার আছে, তেমনি ব্যাষ্টিক অর্থনীতিরও ব্যাপার আছে। সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে বিনিময় মূল্যের ওঠানামা, বড় ঋণের ভার, বৈচিত্র্যহীন ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো, আর ব্যাষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি হচ্ছে দুর্বল ব্যাংকিং খাত।
‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা জন্য যা যা দরকার, চীনের কাছে তার সবই আছে। এখন কথা হচ্ছে, চীন যত দিন তা স্বচ্ছ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যবহার করবে, তত দিন চীন ও তার প্রতিবেশীরা লাভবান হবে।
সুশাসনের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার মধ্যে আছে দুর্নীতি থেকে সংস্কার প্রক্রিয়ার অদক্ষ বাস্তবায়ন। একই ভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনাও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ (কোথাও কোথাও তো সন্ত্রাসবাদের হুমকিও আছে)। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকির কথাও তো ভুলে যাওয়া যায় না, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
এরপর আছে বিভিন্ন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যবিষয়ক হরেক রকম আইন। যদিও চীনা উদ্যোক্তাদের পক্ষে কোনো দেশে ঢোকার আগে এটা বোঝা সম্ভব নয়, সে দেশের আইন কেমন। কিন্তু এই আইন লঙ্ঘন করা হলে একটি কোম্পানির কার্যক্রম ও বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে যেতে পারে।
এখন কথা হচ্ছে, চ্যালেঞ্জ অনেক জটিল হলেও তা দূর করার তরিকা কিন্তু বেশ সহজ-সরল। প্রথম ও প্রধান কথা হচ্ছে, দুর্নীতি পরিহার করতে হবে। কারণ, দুর্নীতি থাকলে শুধু ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগ ব্যাহতই হবে না, ভবিষ্যতে চীনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগও হুমকির মুখে পড়বে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আর্থিক প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে এর ব্যয়, সুবিধা, বাস্তুতান্ত্রিক প্রভাব যেমন বায়ুদূষণ, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের আশঙ্কা খতিয়ে দেখতে হবে।
এই মনোভঙ্গিটি আরও দৃঢ় করতে হলে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের অর্থায়নের ব্যাপারটাকে বাজারের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। অধিকাংশ বিনিয়োগের পরিধি ও অর্থায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুবই কার্যকর হবে, ঠিক যেমন ঝুঁকি ভাগাভাগির প্রক্রিয়াও হিতকর প্রমাণিত হবে। এই অর্থায়নের ভিত্তি হচ্ছে সম্ভাব্য ক্যাশ ফ্লো, স্পনসরদের ব্যালান্স শিট নয়।
তা ছাড়া, বিনিয়োগকারীদের স্রেফ প্রকল্পের নির্মাণের দিকেই নজর দিলে চলবে না, তাদের আরও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের দিকে নজর দিতে হবে, যেমন মুনাফা নিশ্চিত করা, স্থানীয় লোকালয় ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলা প্রভৃতি। পরামর্শক, আইনজীবী, নিরীক্ষক, এনজিওসহ অন্যান্য সংস্থাকে এসব কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
আরও কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। যেমন বলা যায় নতুন ও অপরিচিত পরিবেশে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অনেক সমস্যায় পড়তে হতে পারে, ফলে কোনো দেশে যাওয়ার আগে তাঁরা আগেভাগেই সেখানকার স্থানীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আর ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগের নেতা হিসেবে চীনকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ হবে, প্রাদেশিক সরকারকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, আবার তাকে বাজারের গঠনমূলক ও ন্যায্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চীনকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করতে হবে, যাতে সরকারের সব স্তরের কর্মী ও উদ্যোক্তারা বাইরে কাজ করার মৌলিক তথ্যগুলো জানতে পারে। আর এই উদ্যোগে হংকংকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে, কাজটা চীনকেই করতে হবে। কারণ অর্থায়ন, রসদ সরবরাহ, তথ্যপ্রাপ্তি, মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া, আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা—এসব কাজে হংকংয়ের অভিজ্ঞতা অনেক। আর কথাটা শেষে বললেও তা মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, কথাটা হলো সংকট ব্যবস্থাপনা আরও সংহত করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্যোগ এবং বের হয়ে আসার কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
এই ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করাটা খুব সুখকর হবে না। কিন্তু সফল হওয়ার জন্য যা যা দরকার, চীনের কাছে তার সবই আছে। এখন কথা হচ্ছে, চীন যত দিন তা স্বচ্ছ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যবহার করবে, তত দিন চীন ও তার প্রতিবেশীরা ব্যাপক লাভবান হবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
মিংকাং লিউ: চায়না ব্যাংকিং রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান।
ওয়েনঝি লু: হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষণা ফেলো।

‘ট্রাম্প বর্ণবাদী, ভাঁড় ও মূর্খ’ -ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিতর্ক

ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার আহ্বান-সংবলিত একটি প্রস্তাব তোলা হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। এর ওপর বিতর্কে অংশ নিয়েছেন এমপিরা। এ সময় ট্রাম্পকে একজন বর্ণবাদী নেতা, ভাঁড় ও মূর্খ বলে অভিহিত করা হয়।
তিন ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত বিতর্কে কোনো কোনো এমপি মতামত দেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ঘৃণা বা বিদ্বেষমূলক অপরাধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প একজন ‘সাংঘাতিক ও ক্ষত সৃষ্টিকারী’ ব্যক্তি। তাই যুক্তরাজ্যে তাঁকে ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়।
এ বিতর্ক নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এর খবরে বলা হয়, মুসলিম, নারী, প্রতিবন্ধী, বৈশ্বিক উষ্ণতাসহ অন্যান্য ইস্যুতে বেশ কয়েকজন এমপি ট্রাম্পকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাবটি তোলা হলেও আলোচনায় বাম ও ডান উভয় ধারার অধিকাংশ এমপি নিষিদ্ধ করার ধারণা নাকচ করে দেন। এঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও একজন। তাঁদের যুক্তি, ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করা হলে এটা কেবল তাঁর পক্ষেই প্রচার বাড়াবে।
বিতর্কে ৫০ জনের মতো এমপি অংশ নেন। ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে একটি আবেদনে যুক্তরাজ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই পার্লামেন্টে ওই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
জঙ্গিবাদী হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত—সম্প্রতি এ বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।
বিতর্কে ট্রাম্পকে যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মতামত দেওয়া এমপিদের অধিকাংশ স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) সদস্য। এ ধারণার বিপক্ষে ছিলেন রক্ষণশীল ও লেবার দলীয় অধিকাংশ এমপি।
লেবার দলীয় এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী বলেন, একজন সাংঘাতিক ও ক্ষত সৃষ্টিকারী ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নাগরিকেরা অনুভব করেন। টিউলিপ ট্রাম্পকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষ ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইতিপূর্বে যদি বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে এ দেশে অন্যদের ঢুকতে দেওয়া না হয়, তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত।

গোলাম হোসেন স্যারের চেয়ার by মলয় ভৌমিক

ঘর্মাক্ত শরীরে হাঁপাতে হাঁপাতে একপায়া ভাঙা ইটের ঠেকনা দেওয়া একটা চেয়ারে এসে তিনি বসতেন। হাঁটু পর্যন্ত কাদা। খালি গা। কাঁধে একটা ছিন্ন মলিন গামছা। পাঁজরের হাড়গুলো গোনা যেত। এই গণনাও আমরা তাঁর কাছেই শিখেছিলাম। তিনি গোলাম হোসেন স্যার। আমাদের অঙ্কের শিক্ষক। যদিও নিজের সংসারের অঙ্কের হিসাব তিনি মেলাতে পারতেন না। ১৯৬৩-৬৪ সালের কথা। সরকারের দেওয়া অতি নগণ্য ভাতার টাকা কালেভদ্রে স্যারের হাতে পৌঁছাত। এতে সংসারের দশ ভাগের এক ভাগ ব্যয়েরও সংকুলান হতো না। নিজের অতি সামান্য জমি আর ভাগচাষের জমিতে উদয়-অস্ত পরিশ্রম। এরই এক ফাঁকে ক্লাসে এসে বসতেন আমাদের কানসোনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম হোসেন স্যার। নানা দুশ্চিন্তায় মেজাজ খিটখিটে থাকত। কানে কম শুনতেন। ফলে মাঝেমধ্যেই অকারণ গালমন্দ জুটত আমাদের কপালে।
এই গোলাম হোসেন স্যারের ছাত্র আমি এখন দেশের এক সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়াই। অবসরের কাছাকাছি সময়ে চলে এসেছি। গড় আয়ু বৃদ্ধির সুবাদে স্যারের চেয়ে বেশি দিনই বেঁচে আছি। আমার স্যারদের কথা মনে হলে প্রথমে গোলাম হোসেন স্যারের কথাই মনে পড়ে। গর্ব অনুভব করি। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। আমাদের আজকের দেশ-সমাজ-সংসার এঁরাই নির্মাণ করেছেন। সমাজ তাঁদের অন্য কিছু দিতে না পারলেও অন্তত শিক্ষকের মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত ছিল না।
আমার বাবাও শিক্ষক ছিলেন। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার জন্য তাঁকে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে বেড়াতে হতো। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে স্কুল খোলার চাপ আসতে থাকে। পরিস্থিত সামাল দেওয়ার জন্য বাবা স্কুল থেকে দূরের এক গ্রামে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের নিয়ে সভা করে তাঁরই ছাত্র সহকারী প্রধান শিক্ষক আবদুর রশীদ সাহেবকে প্রধান শিক্ষকের পদে বসিয়ে নিজে সরে দাঁড়ান।
স্বাধীনতার পর বাহাত্তর থেকে চুয়াত্তর সাল পর্যন্ত অন্য অনেকের মতো আমাদের পরিবারের সদস্যদেরও পেট চলেছে কখনো এক বেলা কখনো বা দুই বেলা সেদ্ধ আলু আর চীনার চালের ভাত বা যুক্তরাষ্ট্রের দয়ায় পাওয়া সাদা মোটা আতপচালের ভাত খেয়ে। এই অবস্থার মধ্যেও বাবা কখনো তাঁর ছাত্র আবদুর রশীদের কাছ থেকে নিজের পদটি ফিরে পাওয়ার দাবি করেননি। এ ব্যাপারে অনেকে জোর করলে তিনি বলেছেন: ও আমার ছাত্র। আমিই তাকে ওই পদে বসিয়েছি, এটা আমার জন্য গৌরবের।
বাবার ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কৃতবিদ্য। তাঁদেরই একজন সরকারি প্রশাসনের উঁচু পদের এক কর্মকর্তা বাবাকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাবনার কাশিনাথপুর কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কখনো গুরু-দক্ষিণা চাননি বাবা। কিন্তু শিষ্যের স্বপ্রণোদিত ওই আহ্বানে সাড়া না দিয়েও পারেননি। নতুন বেসরকারি কলেজ। কোনো মাসে সামান্য বেতন পাওয়া যেত, কোনো মাসে নয়। তবু তো বড় মর্যাদা। এদিকে সংসারের অবস্থা পূর্ববৎ। এরপর অন্য ছাত্রদের আমন্ত্রণে আরও দুটি কলেজের অধ্যক্ষ। এবং সব শেষে সেনাবাহিনীর উঁচু পদে কর্মরত বাবার আর এক ছাত্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে যোগদান।
এ দেশে এই তো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শিক্ষক কখনো ছাত্রের পাশে, কখনো ছাত্র শিক্ষকের। এটাই দীর্ঘদিনের পরম্পরা। শিক্ষকের ছাত্র আমলা, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সেনানায়ক, এমনকি শিক্ষকও। তাঁদের ছাত্ররাই তো ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা। কবি, গায়ক, শিল্পী, সাংসদ, মন্ত্রী—এমন সব কৃতী তো শিক্ষকেরই ছাত্র। অন্যভাবে দেখলে যেকোনো মানুষের মধ্যে আজীবন দুটি সত্তা বর্তমান, এমনকি শিক্ষকেরও। সে সারা জীবন শেখে, সারা জীবন শেখায়—কৃষিজীবী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী, প্রজা থেকে রাজাধিরাজ। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক তাই নিজের সঙ্গে নিজেরই সম্পর্কের মতো, নিজের এক সত্তার সঙ্গে অন্য সত্তার সম্পর্ক। যেহেতু সবাই ছাত্র এবং সবাই শিক্ষক, সেহেতু শিক্ষকতা পেশা ও এর মর্যাদা পৃথিবীব্যাপী সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অনন্য এক মাত্রায় স্বীকৃত। শিক্ষককে সম্মান জানানোর অর্থ নিজেকেই সম্মানিত করা। আবার শিক্ষককে আহত করার অর্থ নিজের গায়েই আাঁচড় কাটা। এ নতুন কোনো কথা নয়।
এভাবেই তো চলে এসেছে। কখনো এ নিয়ে তর্ক ওঠেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কী এমন ঘটে গেল? আমরা এখন নিজের সঙ্গেই যেন নিজে তর্কে লিপ্ত হয়েছি। শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষকতা নিয়ে নানা অনভিপ্রেত কথাবার্তা শুরু হয়েছে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। অতীতে অনেক দুঃসময়ে, এমনকি সামরিক শাসনকালেও এসব বিষয়ে তর্ক উঠতে দেখা যায়নি। শিক্ষকদের আন্দোলন-সংগ্রাম, বেতনকাঠামো—এসব নিয়ে নানা কথা উঠতেই পারে। কিন্তু এই এখন, এই ‘সুসময়ে’ তর্কটা কি সেখানেই আটকে আছে? সমাজ কি এতটাই বদলেছে? প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সমস্যার আপাত একটা সমাধান হয়তো হয়েই যাবে। কিন্তু সব শিক্ষকের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের আসল দাবিটা কি চাপা পড়ে গেল না?
আমার বাবার বন্ধু ছিলেন গৌরলাল পাল। তিনি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় আমাদের পাশের গ্রাম ঘাটিনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তখন পাকিস্তান আমল। বেতন বা সম্মানী নয়, ওই যে শিক্ষকের জন্য সামান্য ভাতা, তা দেওয়া হতো পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ছমাস-নমাস পরপর। কৃষকগঞ্জ বাজারের পোস্ট অফিসে গৌরলাল স্যারকে দিনের পর দিন ধরনা দিতে দেখেছি। তিনি শুধু আসতেন আর মলিন মুখে ফিরে যেতেন। ভাতা আর আসত না। শিক্ষা আর শিক্ষকের প্রতি রাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয় স্বাধীনতার পর। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। বেতন তেমন বেশি নয়, তবু মাস গেলে একটা নিশ্চয়তা। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব এক পরিবর্তন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এই পরিবর্তিত অগ্রযাত্রায় অনেকটাই ভাটা পড়ে। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে আবার শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। এরপর এখন তো শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিনা মূল্যে বই বিতরণ, বিনা বেতনে পাঠদানসহ নানা আয়োজনের সমারোহ। এর মধ্যেই আবার শিক্ষকদের অনাকর্ষণীয় বেতন ও শিক্ষার মান নিয়ে নানা বিতর্ক বর্তমান।
আওয়ামী লীগের রূপকল্প ২০২১-এর মধ্যে শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব প্রদান এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও উচ্চতর বেতনকাঠামোর অঙ্গীকার মেলে। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনকাঠামোসহ একই অঙ্গীকার লক্ষ করা যায় ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে। দীর্ঘদিন পর গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতিতেও এসব অঙ্গীকারের উচ্চকণ্ঠ প্রতিফলন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কণ্ঠে শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামোর কথা একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে। এ ব্যাপারে তখন বরং শিক্ষক সমিতিগুলোই প্রায় নীরব ছিল।
এখনো একই সরকার ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর পদেও আছেন একই ব্যক্তিরা। তাহলে অষ্টম বেতনকাঠামোয় আগের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন নেই কেন? স্বতন্ত্র বেতনকাঠামোর কী হলো? পাওয়ার কথা ছিল স্বতন্ত্র মর্যাদা; কিন্তু তা তো নেই-ই, আগে যা ছিল সেখান থেকেও অবনমন ঘটল মর্যাদার। শুধু তা-ই নয়, কীভাবে যেন শিক্ষক আর আমলা মুখোমুখি হলেন। শিক্ষকদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে অনেক অশোভন কথাও এখন আসছে নানা পর্যায় থেকে। মানলাম, অনেক শিক্ষক খারাপ, কিন্তু সবাই কি? এমন ঢালাও মন্তব্য কি মাথার ওপরে থুতু ছিটানোর মতো নয়? আমরা দেখছি শতকরা হারে শিক্ষা-বাজেট এখন নিম্নমুখী। শিক্ষানীতির অঙ্গীকারের তাহলে কী হবে? হঠাৎ করে কী ঘটছে এসব? কারা এর পেছনে?
গত জুনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বেড়াতে গিয়ে সেখানকার জাতিসংঘ দপ্তরের মূল ফটকের সামনে দেখেছিলাম একটা কাঠের ভাস্কর্য: ৩৯ ফুট উঁচু এক চেয়ার, যার একটা পায়া ভাঙা। ভূমি-মাইন ও ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের বিরুদ্ধে এক স্থাপত্যশিল্পীর প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা ওই চেয়ারটি দেখে সে সময় আমার শিক্ষক গোলাম হোসেন স্যারের তিনপায়া চেয়ারের কথা মনে আসেনি। কিন্তু আজ শিক্ষানীতির অঙ্গীকার আর শিক্ষক আন্দোলনের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে গোলাম হোসেন স্যারের একপায়া ভাঙা চেয়ারটির কথা মনে পড়ছে। পাশাপাশি মনে পড়ছে আমার স্যারের পিতৃপ্রদত্ত ‘গোলাম হোসেন’ নামটি।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নাট্যকার।

ইরানের অবরোধমুক্তি- সংঘাতের বিপরীতে শান্তি ও কূটনীতির জয়

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলোর পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির শর্ত পূরণ হওয়ায় দেশটির বিরুদ্ধে এক যুগব্যাপী চলা অর্থনৈতিক অবরোধ উঠে গেল ১৬ জানুয়ারি। ইরান পেল অর্থনৈতিক বিকাশের সম্পূর্ণ সুযোগ আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পেল ইরানের দিক থেকে শান্তির আশ্বাস। মধ্যপ্রাচ্যের একদিকে যখন যুদ্ধ, তখন অন্যদিকে শান্তির এই বিজয় বিশ্বকে কিছুটা নিরাপদই করল। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত পৃথিবী গড়ার যে সার্বজনীন দাবি, ইরানের অনুকরণে সেই দাবি ক্রমেই অন্যান্য দেশের বেলাতেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
গত বছরের জুলাই মাসে ইরানের সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি হয়। এ সপ্তাহে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বিশ্বকে জানায় যে ইরান সেই চুক্তির সব শর্ত পূরণ করেছে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইরানের সংসদে জানান, এখন বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসবে, তেলের বিক্রি দ্বিগুণ হবে এবং ইরান সমৃদ্ধ হতে থাকবে। এই সুবাদে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে আটক থাকা ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদও ধীরে ধীরে ফিরে আসবে।
সংঘাতের বিরুদ্ধে ধৈর্যশীল কূটনীতির জয় হিসেবে ইরানের অবরোধমুক্তিকে স্বাগত জানাতেই হয়। কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের মিসাইল কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে বৈরিতার এই নতুন খাতটি যাতে প্রশস্ত না হয়, তা দেখার দায়িত্ব জাতিসংঘেরও।
আশির দশকে সাদ্দামের আক্রমণের মুখে ইরানের বিপ্লবী সরকার শাহের আমলের পারমাণবিক কর্মসূচি আবার চালু করেছিল। এখন সেই ইরাক ইরানের ওপরই অনেকটা নির্ভরশীল। এখন পারমাণবিক উচ্চাশার বদলে অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষই ইরানের জন্য যুক্তিযুক্ত। এখন পশ্চিমাদের উচিত ইরানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা রাখার নীতি একেবারেই পরিত্যাগ করা। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্যই এটা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রও যে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের আপত্তি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রচনা করল, তাও মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা বদলের ইঙ্গিত।

শহীদ আসাদের অমরতা by হায়দার আকবর খান রনো

আসাদুজ্জামান আসাদ
আজ থেকে ৪৭ বছর আগে এমনই একদিনে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ আইয়ুব সরকারের পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনা দাবানলের সৃষ্টি করেছিল, যার পরিণতিতে ঘটে গেল ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান, আইয়ুব খানের পতন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ অন্য আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তিলাভ। এই অভ্যুত্থান শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যেও বিপুলভাবে জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতাতেই এসেছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই আসাদের শাহাদতবরণ ইতিহাসের কালপঞ্জিতে এক বিশেষ ঘটনা। রক্তাক্ষরে লেখা এক বিশেষ দিন ২০ জানুয়ারি।
১৯৬৮ সালের শেষ দিক থেকেই অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্ব চলছিল। ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পল্টনে জনসভা শেষে মাওলানা ভাসানী গভর্নর ভবন ঘেরাও করেন। বর্তমানে যেটা বঙ্গভবন, তখন সেটাই ছিল গভর্নর মোনায়েম খানের সরকারি বাসভবন। ঘেরাও শেষে তিনি পরদিন হরতালের ডাক দেন। অভূতপূর্বভাবে হরতাল সফল হয়েছিল। জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ চলেছিল। তার পরদিন ৮ ডিসেম্বর আবারও হরতাল। মাওলানা ভাসানী এবার হুমকি দিলেন ‘শেখ মুজিবকে মুক্তি না দিলে বাস্তিল দুর্গের মতো ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে মুজিবকে মুক্ত করব।’ একই সঙ্গে তিনি গ্রামাঞ্চলে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হাট হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। ২৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন জায়গায় হাট হরতাল হয়েছিল। নড়াইলে এবং নরসিংদীর মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে পুলিশ গুলি করে মানুষ হত্যা করেছিল।
ছাত্রনেতা আসাদ একই সঙ্গে কৃষক আন্দোলনও করতেন। হাতিরদিয়া বাজারে হাট হরতাল করতে গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছিলেন। মাথা ফেটে গিয়েছিল। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না। গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে ফোনেরও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু হাতিরদিয়ায় পুলিশের গুলি এবং কয়েকজনের শহীদ হওয়ার খবরটি দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানো দরকার। আসাদ আহতাবস্থায় মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেই কিছুটা সাইকেলে করে, পরে ট্রেনে করে ঢাকায় পৌঁছান হাতিরদিয়ার গুলির খবর দিতে। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় নিজে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছিলেন। তার মাত্র কয়েক দিন পর যখন আসাদ নিজেই ঢাকার রাস্তায় শহীদ হলেন, তখন দৈনিক পাকিস্তান-এ কর্মরত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেন লিখেছিলেন, ‘সেদিন আসাদ এসেছিল খবর দিতে, আজ এল খবর হয়ে।’
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে দুই ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ ও এনএসএফ-এর একাংশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই ১১ দফা সারা দেশে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিল। এই কর্মসূচিকে ব্যাপক প্রচারে নেওয়ার জন্য ১৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশ এবং ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করা হয়েছিল। ১৮ তারিখ পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল। ১৯ তারিখ গুলি করেছিল পুলিশ। সেদিন আসাদুল হক নামে একজন (তিনি শহীদ আসাদ নন) গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে মিছিলটি বের হয়েছিল, তার প্রথম সারিতে ছিলেন আসাদুজ্জামান আসাদ। চানখাঁরপুল মোড় থেকে পুলিশের জিপ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছোড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আসাদের রক্তমাখা প্রাণহীন দেহ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে।
আসাদের মৃত্যুতে সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। আসাদ সাধারণ পথচারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সচেতন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) অন্যতম নেতা ছিলেন। একই সঙ্গে কৃষক আন্দোলনের সংগঠক (প্রধানত শিবপুর এলাকায়) এবং গোপন কমিউনিস্ট পার্টির একাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
আসাদের মৃত্যুর পর সারা দেশে স্লোগান উঠেছিল ‘আসাদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না’।
বৃথা যায়নি। আসাদের রক্ত বেয়ে এবং তার সঙ্গে লাখ লাখ শহীদের রক্ত যুক্ত হয়ে অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
আসাদ, তোমাকে বাংলাদেশ কোনো দিন ভুলবে না। তোমার মৃত্যু মৃত্যুকেই অস্বীকার করে তোমাকেই অমর করে রেখেছে ইতিহাসের পাতায়।
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।