Wednesday, August 7, 2024

‘আমাদের ঘাড়ে এক মাথাই ছিল’—শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে ব্যবসায়ী নেতা

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যবসায়ীরা চাপের মধ্যে থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সদ্য বিদায়ী শেখ হাসিনা সরকারকে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের ‘ঘাড়ে যদি দুইটা করে মাথা থাকত, তাহলে হয়তো সেই চাপ উপেক্ষা করতে পারতেন’।

আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন মাহবুবুর রহমান। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য জানাতে সব ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আইসিসিবি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আইসিসিবি সহসভাপতি এ কে আজাদ ও নাসের এজাজ বিজয়; আইসিসিবি বোর্ড সদস্য তপন চৌধুরী, কুতুবউদ্দিন আহমেদ, আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, সিমিন রহমান, আব্দুল হাই সরকার ও মোহাম্মদ হাতেম; রহিম টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ মতিন চৌধুরী; ডিবিএল গ্রুপের এমডি এম এ জব্বার; এফবিসিসিআই জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. আমিন হেলালী, বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম; ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান এবং আইসিসিবি মহাসচিব আতাউর রহমান।

ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। এ ছাড়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন করবেন বলে জানান তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের পক্ষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আইসিসিবি সভাপতি। ১৬ বছর ধরে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীদের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। তিনি বলেন, ‘আপনারা (ব্যবসায়ীরা) এখন বলছেন যে দেশের ছাত্ররা অনেক বড় কাজ করেছে। আর আপনারা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে সমর্থন দেবেন। আপনারা এসব কথা বলার নৈতিক অধিকার রাখেন কি না?’

এ প্রশ্নের জবাবে আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গত বছর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) ব্যবসায়ী সম্মেলন করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, “শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার।” তো সেভাবে শেখ হাসিনার সরকার এসেছে। এখন যদি আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় যে আপনি সরকারপ্রধানের সঙ্গে সভা করবেন, আর আপনি ঘরে বসে থাকলেন। আপনার এক ঘাড়ে যদি দুই মাথা থাকে, তাহলে আপনি তা উপেক্ষা করতে পারবেন। আমাদের ঘাড়ে দুই মাথা ছিল না, এক মাথাই ছিল।’

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের যখন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, আমরা তা ফিরিয়ে দিতে পারিনি; আমাকে যেতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে কেউ যেকোনো দলকে সমর্থন করতে পারেন। এটা নিয়ে ভুল–বোঝাবুঝির কারণ নেই। আমরা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

গত বছরের জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) ব্যবসায়ী সম্মেলন আয়োজন করে এফবিসিসিআই। সেখানে সব মিলিয়ে ৩১ ব্যবসায়ী বক্তব্য দেন। তাঁদের বেশির ভাগ সরাসরি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে আবারও চান তাঁরা। কয়েকজন স্লোগানে স্লোগানে একই দাবি জানান। স্লোগানটি ছিল, ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার।’

আজকের সংবাদ সম্মেলনে আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ব্যবসায়ীরা কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার তথা শেখ হাসিনা সরকারের চাপের মধ্যে ছিলেন কি না। এর জবাবে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আপনি যে চাপের কথা বলেছেন, সাংবাদিক হিসেবে আপনিও এত দিন সেই চাপের মধ্যে ছিলেন। যারাই তাদের (আওয়ামী লীগ সরকার) সমর্থন করেনি, তাদের ওপরেই তারা খড়্গহস্ত হয়েছিল। এ রকম যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আমরা তখন চাপের মধ্যে ছিলাম।’

আরেকটি প্রশ্ন ছিল, গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ব্যাপক রাজনীতিকরণ হয়েছে এবং সরকারের সঙ্গে মিলে গেছে—ব্যবসায়ীদের এই নৈতিক পতন কেন হয়েছে? এর জবাবে মাহবুবুর রহমান বলেন, এই সংস্কৃতি বহু পুরোনো। স্বাধীনতার আগে থেকেই তা চলে আসছে। পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কিছু ব্যবসায়ী তখন সব সুবিধা নিতেন। এ বঞ্চনার কারণেই আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম। এখন ৫০ বছর পর আবার নতুন করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ এসেছে।

যেসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দুর্নীতি ও পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের এখন ব্যবসায়ী কমিউনিটিতে ‘নো’ বলবেন কি না, এমন প্রশ্ন করেন আরেক সাংবাদিক। এর জবাবে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের নো বা ইয়েসের জন্য তারা অপেক্ষা করে না। যখন যে সরকার থাকে, তারা তার পক্ষেই স্লোগান দেয়। এভাবে রং পরিবর্তন ও ভোল পাল্টায় ওই সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা।’

নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বেসরকারি খাত থেকে কোনো প্রতিনিধি থাকার প্রত্যাশা করেন কি না, তা জানতে চান আরেক সাংবাদিক। এর জবাবে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা কখনোই এ ধরনের দাবি করিনি। আমাদের কাজ হলো ব্যবসা করা। সরকারের কাছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা চাইব; সরকার তা পূরণ করবে। তাহলেই ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে।’

বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ: ইতিহাসের বদলার মুখে শেখ হাসিনা

সরকার পতনের পর বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির খবর তৃতীয় দিনের মতো আজ বুধবারও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি এসেছে। এ ছাড়া শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগমুহূর্তেও কীভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, তার বিবরণ এসেছে। কেন তাঁর এমন পরিণতি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, সেই কারণও খোঁজার চেষ্টা করেছে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম।

‘ইতিহাসের বদলার মুখে বাংলাদেশের হাসিনা’ শিরোনামে আজ ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা যেভাবে স্বৈরশাসক হয়ে উঠেছিলেন, তাতে তাঁর এমন পতন ছিল অনিবার্য। স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধীদের দমন, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কণ্ঠরোধ এবং বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষুব্ধ জনতার গণভবনমুখী মিছিলের ঠিক আগমুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের আহ্বানে দেশ ছেড়ে পালান শেখ হাসিনা। তাতে বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের নির্বিচার হত্যা নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ শুরু করলেও শেখ হাসিনা জোরপূর্বক ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক নেতৃত্বে তাকে বোঝায়, এটা করলে রক্তপাত আরও বাড়বে। কিন্তু তিনি তা মানতে চাচ্ছিলেন না।

দ্য ডন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা নির্দেশ দিলেও বিক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী। আর এর মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সংবাদমাধ্যমটি বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানায়, বিক্ষোভ দমনে গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দিন আগেই নিয়েছিল সেনাবাহিনী। এরপর সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করার বিষয়ে পরামর্শ দেন ও পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেন। এতেও শেখ হাসিনা রাজি না হয়ে বলপ্রয়োগেই জোর দেন। শেষে পরিবারের সদস্যদের আহ্বানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান হাসিনা।

‘ঘৃণিত একজন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিদায়ের শেষ কয়েক ঘণ্টা’ শিরোনামে গতকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি।

তরুণ প্রজন্ম কীভাবে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করল, সেই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা। তাতে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন কীভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমনের সর্বাত্মক চেষ্টা শেখ হাসিনার সরকার করেছে, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চাওয়া অনুযায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সরকার গঠনের ঘোষণা এসেছে। বৃহস্পতিবার (আজ) দেশে ফিরবেন তিনি।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে বলা হয়, পদত্যাগের পর পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিনল্যান্ড সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন। তাতে আরও বলা হয়, এর আগে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন শেখ হাসিনা।

‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবেন ইউনূস: সেনাপ্রধান’ শিরোনামে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জানিয়েছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৃহস্পতিবার দেশে ফিরলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাল ধরবেন। সংবাদমাধ্যমটির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এক দিন আগে ড. ইউনূসের সাজা বাতিল করেছেন আদালত।

‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন নেতা কে এই মুহাম্মদ ইউনূস’ শিরোনামে আজ গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের একজন সমালোচক ও ‘গরিবদের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশটিতে নতুন একটি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

‘বৃহস্পতিবারই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, রাতে শপথ নেবেন ইউনূস, জানালেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান’ শিরোনামে আজ বুধবার এক প্রতিবেদনে আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের পর দুই দিন পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যে সরকার গঠন করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সেনাপ্রধান।

বাবাকে এখনো আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি: ইলিয়াসপুত্র আবরার by কাজী সুমন

সিলেট বিভাগীয় বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীকে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে খুঁজে বেড়াচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পুত্র ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলিয়াস আলী ফিরে আসার খবরকে ‘গুজব’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বুধবার মানবজমিনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব তথ্য জানান। ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের তিন আমলে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। সোমবার ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুম হওয়া  কয়েকজনকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বন্দিশালা ‘আয়নাঘরে’ বন্দি ছিলেন। এ ঘটনার পর আমরাও আশাবাদী হয়েছি- আমার বাবাকে ফিরে পাবো। আমরা এখনো আমার বাবাকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলিয়াস আলী ফিরে আসার খবর বিষয়ে জানতে চাইলে আবরার বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমি নতুন সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি- তারা যেন আমার বাবাকে খুঁজে বের করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। এ ঘটনাটি জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

যেভাবে নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী
২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল। রাত তখন ১২টা। বনানী থানা থেকে একটি ফোন আসে জ্যেষ্ঠপুত্র আবরার ইলিয়াসের মোবাইলে। দৌড়ে মা তাহসিনা রুশদীর লুনার রুমে যান আবরার। কাঁচা ঘুমে আচ্ছন্ন মাকে ডেকে তোলেন। বলেন, পুলিশ জানিয়েছে আমাদের গাড়ি নাকি বনানী থানায়। তখনও স্বামী এম ইলিয়াস আলীর বিপদ আঁচ করতে পারেননি লুনা। অনেকটা স্বাভাবিক চিন্তা নিয়ে পুত্রকে বলেন, আমাদের ড্রাইভার আনসারকে ফোন দাও। পুত্র জানান, আনসারকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন লুনা বলেন, তাহলে তোমার বাবাকে ফোন দাও। উদ্বিগ্ন পুত্র জানান, বাবার ফোনও বন্ধ। পুত্রের জবাব পেয়ে দিশাহারা হয়ে যান লুনা। দু’জনের ফোন একসঙ্গে বন্ধ কেন? তখন থেকে নানা দুশ্চিন্তা তার মাথায় আসতে থাকে। লুনা বলেন, সঙ্গে সঙ্গেই বনানী থানার ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করি। জিজ্ঞাসা করি, গাড়ি থানায় গেল কীভাবে? তখন ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, টহল পুলিশ আমাদের জানিয়েছে, বনানীর ২ নম্বর সড়কের সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে একটি গাড়ি পড়ে আছে। পরে আমরা গাড়ি থানায় নিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পরই স্থানীয় একজন ছাত্রদল নেতা আসেন বাসায়। তিনি জানান, রাত পৌনে ১২টার দিকে গাড়িচালক আনসার আলী তাকে ফোন করে বলেন, তার মোবাইলে ব্যালেন্স নেই। দ্রুত কিছু টাকা পাঠানোর আকুতি জানান। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই লাইনটি কেটে যায়।
এদিকে ঘটনার চারদিন পর র‌্যাব সদর দপ্তরের মোশতাক নামে এক কর্মকর্তা যোগাযোগ করেন স্ত্রী লুনার সঙ্গে। ফোন করে শোনান আশার বাণী। ওই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে, উনাকে (ইলিয়াস আলী) পাওয়া যেতে পারে, আপনারা প্রিপারেশন রাখেন। এরপর ওই র‌্যাব কর্মকর্তা আরও একদিন ফোন করে একই কথা শোনান। এর কিছুদিন পর ইলিয়াস আলীকে পাওয়ার আশার বেলুন ফুটো করে দেন ওই র‌্যাব কর্মকর্তা। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আমাদের কাছে যে ইনফেরমেশনটা ছিল সেটা এখন আর নেই। এই বিষয়ে আমরা আর কিছু বলতে পারছি না।  কয়েকদিন পর আমাকে জনৈক এক ব্যক্তি ফোন করে বলেন, ইলিয়াস আলী জীবিত আছেন। আপনি ইচ্ছে করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। কীভাবে সাক্ষাৎ করা যায় সেটাও তিনি বলে দিলেন।

স্বামীর সন্ধান পেতে পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে আবেদন করেন তিনি। দুই পুত্র ও শিশুকন্যাকে নিয়ে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় ইলিয়াসপত্নীকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপেক্ষা করো, ধৈর্য ধরো, বিষয়টি দেখছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কিছুদিন পর গাজীপুরের পূবাইল থেকে লুনার মোবাইলে একটি ফোন আসে। এক নারী ফোন করে জানান, ইলিয়াস আলীকে পাওয়া যেতে পারে, দ্রুত পূবাইলে আসেন। বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা ও র‌্যাব কর্মকর্তা মোশতাকসহ দ্রুত যান পূবাইলে। সেখানে যাওয়ার পর স্থানীয়রা জানান, একজন লোককে মাইক্রোবাসে করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে ইলিয়াস আলীর সন্ধান আর পাননি।

ঘটনার সময় পাশের পার্কের বেঞ্চে ঘুমিয়ে ছিলেন ডাব বিক্রেতা সোহেল। চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর তিনি দেখেন, একটি লোককে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে চার ব্যক্তি। গাড়িতে উঠতে না চাওয়ায় ওই ব্যক্তিকে কিলঘুষি মারা হচ্ছিল। দীর্ঘ সময় ধস্তাধস্তির পর জোর করে তাকে গাড়িতে তোলা হয়। এ সময় ওই ব্যক্তি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল। পরদিন সকালে জানতে পারি, বনানীর পার্কের পাশের সড়ক থেকে যে ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তিনিই বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। গাড়িতে উঠিয়ে বনানী এক নম্বরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই সময় ঘটনাস্থলের পাশের ভবনের একজন নির্মাণ শ্রমিক পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, ইলিয়াস আলীর গাড়ির পেছন দিকে কালো রঙের মাইক্রোটি ধাক্কা মারায় চালক ক্ষিপ্ত হয়ে নেমে যান এবং মাইক্রো চালকের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় মাইক্রো থেকে আরও ৪-৫ জন নেমে গিয়ে ইলিয়াস আলীর গাড়ির চালককে জোর করে ধরে মাইক্রোতে তুলে নিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরক্ষণেই ৩-৪ জন নেমে গিয়ে প্রাইভেটকারে বসে থাকা ইলিয়াস আলীকেও ধরে গাড়িতে তোলার সময় ধস্তাধস্তির সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে ইলিয়াস আলীর আর খোঁজ মেলেনি।

সেনাবাহিনীর যে বার্তায় ভাগ্য নির্ধারণ হয় শেখ হাসিনার -রয়টার্সের প্রতিবেদন

গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর একটি বার্তায় তার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। বুধবার (০৭ আগস্ট) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ ছাড়ার আগের রাতে জেনারেলদের নিয়ে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এ বৈঠকে কারফিউ বলবৎ রাখতে সেনারা বেসামরিক লোকদের ওপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। বৈঠকের সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

ভারতীয় এক কর্মকতার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, রাতে বৈঠকের পর সকালে শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে যান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি শেখ হাসিনাকে জানান, দেশজুড়ে জারি করা কারফিউ বাস্তবায়নে সেনারা অপারগতা প্রকাশ করেছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, সেনাপ্রধানের বার্তায় সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে শেখ হাসিনার প্রতি আর সেনাবাহিনীর সমর্থন নেই। শেখ হাসিনার কাছে দেওয়া বার্তা এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যকার অনলাইন বৈঠকের বিস্তারিত আগে প্রকাশিত হয়নি। তবে ওই বৈঠকের বার্তায় সেনাবাহিনী সমর্থন হারানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

ঘটনার এ বিবরণ থেকে জানা বোঝা যায়, গত ১৫ বছরের শাসনামলে ভিন্নমত খুব কমই সহ্য করেছেন শেখ হাসিনা। সোমবার তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তার বিশৃঙ্খল শাসনকাল আকস্মিকভাবে শেষ হয়ে যায়।

গত রোববার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেশব্যাপী সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৯১ জন নিহত এবং শতাধিক লোক আহত হন। এ ঘটনার পর দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করা হয়। গত জুলাই মাসে শুরু হওয়া বিক্ষোভের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন ছিল এটি।

রোববার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি এ বৈঠককে হালনাগাদ তথ্য নিতে যে কোনো বিশৃঙ্খলার পর নিয়মিত বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত সিয়ে আরও প্রশ্ন করা হলে তার বিস্তারিত তিনি জানাননি।

মঙ্গলবার ডয়চে ভেলেতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয় বলেন, এক দিন আগে শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমরা কয়েকজন শুধু জানতাম। তিনি পদত্যাগ করার ঘোষণা দেবেন এবং সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরিকল্পনা করেছিলেন। জনগণ গণভবনের দিকে অগ্রসর হলে আমরা ভয়ে বললাম আর সময় নেই। তোমাকে এখনই বের হয়ে যেতে হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত সপ্তাহের ঘটনাবলির বিষয়ে অবগত এমন চারজন সেনা কর্মকর্তা এবং এসব ঘটনা কাছ থেকে দেখেছেন দুটি সূত্রসহ ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। শেষ ৪৮ ঘণ্টার বিষয়ে জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সংবাদমাধ্যমটি। তাদের অনেকে নাম প্রকাশ না করা শর্তে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।

শেখ হাসিনার গত ৩০ বছরের মধ্যে ২০ বছর বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় ছিলেন। গত জানুয়ারিতে হাজারো বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের পর চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হন। যদিও বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জন করেছিল।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ইস্যুতে এ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এরপর এ আন্দোলনে দ্রুত হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের মধ্যে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেননি সেনাপ্রধান। সেনাবাহিনীর তিনজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, বিক্ষোভের মাত্রা এবং কমপক্ষে ২৪১ জন নিহত হওয়ার কারণে যে কোনো মূল্যে হাসিনাকে সমর্থন করা যায় না।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সেনাদের মধ্যে অনেক অস্বস্তি ছিল। হয়তো এ বিষয়টি সেনাপ্রধানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। কেননা সেনারা বাইরে ছিল। তারা কী ঘটনা ঘটেছে তা দেখছেন।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বৈবাহিক সূত্রে হাসিনার আত্মীয়। গত শনিবার শেখ হাসিনার প্রতি তার সমর্থন নড়বড়ে হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। সেদিন তিনি একটি অলংকৃত কাঠের চেয়ারে বসেছিলেন। এ সময় শতাধিক উর্দিধারী সেনা কর্মকর্তার মতবিনিময় সভায় বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। সেনাবাহিনী পরে এই আলোচনার কিছু বিবরণ প্রকাশ্যে আনে।

সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, সেনাপ্রধান জীবন রক্ষা করার ঘোষণা দেন। তিনি কর্মকর্তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। এটিই সেনাবাহিনী জোরপূর্বক সহিংস বিক্ষোভ দমন না করার প্রথম ইঙ্গিত ছিল। এ বিষয়টি যা হাসিনাকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে।

এরপর গত সোমবার কারফিউ অমান্য করে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা রাস্তায় নেমেছিলেন। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহেদুল আনাম খানও ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের বাধা দেয়নি। তিনি যা অঙ্গীকার করেছিলেন, সেনাবাহিনী তা করেছে।’

‘স্বল্প সময়ের সিদ্ধান্ত’

দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের কারফিউর ঘোষণার প্রথম দিন গত সোমবার গণভবনের ভেতরে ছিলেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত এ প্রাসাদটি রাজধানী অন্যতম সুরক্ষিত কমপ্লেক্স। আন্দোলনের সময় রাজপথে হাজার হাজার লোকজন জড়ো হয়েছিলেন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আন্দোলনের সাড়া দিয়ে লাখো মানুষ শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে যাত্রা শুরু করেন।

ভারতীয় কর্মকর্তা ও এ বিষয়ে অবগত দুজন বাংলাদেশি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সোমবার সকালে দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন শেখ হাসিনা।

দেশীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বোন (শেখ রেহানা) তখন ঢাকায় ছিলেন। তারা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে একসঙ্গে দেশ ছাড়েন। স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে তারা ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।

মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দেশটির সংসদে বলেছেন, যোগাযোগ থাকা বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই মাসজুড়ে পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আহ্বান জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু কারফিউ উপেক্ষা করে সোমবার ঢাকায় জনতা জড়ো হওয়ায় হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। খুব সংক্ষিপ্ত নোটিশে তিনি তখনকার মতো ভারতে আসার জন্য অনুমোদন চেয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি।

ভারতের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার পরবর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় ‘কূটনৈতিকভাবে’ শেখ হাসিনার অবস্থান সাময়িক হতে হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এরপর সোমবার বিকেলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিমান ভারতের হিন্ডন বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করে। সেখানে ভারতের ক্ষমতাধর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয় তখনও শেখ হাসিনা কয়েক বছর ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ সময়ে ভারতের রাজনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। বাংলাদেশে ফিরে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন।

শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহেদুল আনাম খান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তাকে নিরাপদে চলে যেতে দেওয়া উচিত ছিল না। এটা একটা বোকামি ছিল।’

যেখানে খুশি যান, ভারতে না-এলেই হলো! -বিবিসি

বহু বছর ধরে ভারতের সবচেয়ে প্রিয় বিদেশি অতিথিদের অন্যতম হলেন শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই থাকুন বা বিরোধী নেত্রী, কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে চরম বিপদের মুহুর্তে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী – বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে দিল্লির দরজা তার জন্য সব সময় অবারিত থেকেছে। সেটা ইন্দিরা গান্ধীর জমানাতে যেমন, তেমনি বাজপেয়ী-মনমোহন সিং বা নরেন্দ্র মোদীর আমলেও।

কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের একটি সামরিক বিমান দিল্লির উপকণ্ঠে অবতরণ করার পর যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য দিল্লি একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।

বস্তুত এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি ভারত সরকারকে এতটাই অপ্রস্তুত ও হতচকিত করেছে যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক একটি বিবৃতি দিতেও তারা চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়েছে। অথচ এই সময় পার্লামেন্টের অধিবেশন চলছিল, যেখানে সরকার প্রতিটি ছোটবড় ঘটনা নিয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।

সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে ক্যাবিনেটের নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করতে জরুরি বৈঠকেও বসেছিল - সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন-সহ সিনিয়র কর্মকর্তারা সবাই উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ নিয়ে ভারত ঠিক কী করবে, ওই বৈঠকে সে ব্যাপারেও কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি।

এমন কী বিবিসি জানতে পেরেছে, শেখ হাসিনা যতটুকু সময়ই দিল্লিতে থাকুন – প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার সঙ্গে প্রকাশ্যে সাক্ষাৎ করবেন কি না অথবা করলেও সেই বৈঠকের কথা প্রকাশ করা হবে কি না, সে ব্যাপারেও এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা যায়নি। অথচ শেখ হাসিনা নিজে এই দেখা করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

দিল্লিতে একাধিক পর্যবেক্ষক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, সামগ্রিকভাবে এই পরিস্থিতি ভারত সরকারকে একটা ‘ক্যাচ টোয়েন্টি টু সিচুয়েশন’ বা চরম উভয় সংকটে ফেলে দিয়েছে, এ কথা মনে করার যথেষ্ঠ কারণ আছে।

আর এই বিপদটা আসছে দু’দিক থেকে – এক, ব্যক্তি শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে দিল্লি কী পদক্ষেপ নেবে আর দুই, বাংলাদেশের ভেতরে যা ঘটছে সেটাকেই বা দিল্লি কীভাবে অ্যাড্রেস করবে।

যেমন, শেখ হাসিনাকে দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়াটা ভারতের উচিত হবে কি না, তা নিয়েও ভারতে দুরকম মতামত শোনা যাচ্ছে। অনেকে যেমন এর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, আবার এর বিপক্ষেও মত দিচ্ছেন কেউ কেউ।

আবার বাংলাদেশের ভেতরে এই মুহূর্তে যে ধরনের পরিস্থিতির খবর আসছে, সেখানে দিল্লির কী করণীয় আছে তা নিয়েও পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে স্পষ্ট দ্বিমত আছে।

একদল মনে করেন, বাংলাদেশে এখন যে ধরনের ভারত-বিরোধিতার ঝড় দেখা যাচ্ছে তাতে ভারত অতি-সক্রিয়তা দেখাতে গেলে পরিস্থিতি আরও বিগড়ে যাবে। সে দেশে ভারতীয় স্থাপনা, ভারতের শিল্প বা ভারতীয় নাগরিকদের আরও বড় বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে এবং ভারত-বিরোধিতা আরও বেশি ইন্ধন পাবে বলে তাদের যুক্তি।

দিল্লিতে বর্তমানে অন্য আর একটি মতবাদ হল, ভারত যদি বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি দেখেও চুপচাপ হাত গুটিয়ে থাকে তাহলে ঘরের পাশে আর একটি মৌলবাদী শক্তির উত্থান অবধারিত, এমন কী লক্ষ লক্ষ হিন্দু শরণার্থীর ধাক্কা সামলানোর জন্যও ভারতকে প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। সরকারিভাবে ভারত অবশ্য এখনও ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ – অর্থাৎ পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখার কৌশল নিয়েই এগোচ্ছে, কিন্তু এই পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্কগুলো ভারতকে যে প্রবল দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলেছে তাতে কোনও সংশয় নেই।

শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে এই যুক্তিগুলো কী, এই প্রতিবেদনে সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া উচিত হবে?
সোমবার বিকেলে যখন শেখ হাসিনার গতিবিধি নিয়ে তখনও চরম অনিশ্চয়তা, ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার ছিলেন এমন একজন সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদকে মেসেজ করেছিলাম, “শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে ঢাকা ছেড়েছেন জানতে পারছি, আপনি কিছু শুনেছেন?”

সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংক্ষিপ্ত জবাব দেন, “যেখানে খুশি যান, ভারতে না-এলেই হল!”

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের জেরে শেখ হাসিনাকে ভারতে পালিয়ে আসতে হলে সেটা নিয়ে যে দিল্লিতেই একটা প্রবল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করবে, তা তার ওই মন্তব্যেই স্পষ্ট ছিল।

দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্ক আইডিএসএ-র সিনিয়র ফেলো তথা বাংলাদেশ গবেষক ম্ম্রুতি পট্টনায়ক এই কথাটাই আবার বলছেন একদম চাঁছাছোলা ভঙ্গীতে।

“আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শেখ হাসিনা যদি ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চান, তাহলেও ভারতের উচিত হবে না সেটা মঞ্জুর করা”, এদিন একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন।

ড: পট্টনায়ক যুক্তি দিচ্ছেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি সরকারের বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলন হয়েছে তার একটা স্পষ্ট মাত্রা ছিল ভারত বিরোধিতা।

ভারতকে যেহেতু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে দেখা হত, তাই হাসিনা বিরোধিতার আন্দোলনে স্বভাবতই মিশে ছিল ভারত-বিরোধিতার উপাদান।

“এই পটভূমিতে ভারত যদি তাকে এখন রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়, সেটা একটা ভুল বার্তা দেবে এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারত বিরোধিতাকে আরও উসকে দেবে”, জানাচ্ছেন স্ম্রুতি পট্টনায়ক।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আবার যুক্তি দিচ্ছেন, ১৯৭৫-এ যে পটভূমিতে শেখ হাসিনাকে ইন্দিরা গান্ধী সরকার ভারতে আশ্রয় দিয়েছিল তার চেয়ে এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।

“তখন যেটা সম্ভব ছিল, এখন সেটা সম্ভব নয়। সে সময়কার মতো শেখ হাসিনাকে তো আর পান্ডারা রোডের একটা ফ্ল্যাটে কার্যত কোনও নিরাপত্তা ছাড়াই রাখা যাবে না, এখন সম্পূর্ণ অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।”

“আর শেখ হাসিনা তসলিমা নাসরিনও নন যে দিল্লি পুলিশের পাহারায় শহরের কোনও ফ্ল্যাটে তাকে রাখা যাবে। আর এই সিদ্ধান্তের ‘জিওপলিটিক্যাল রিস্ক’-টাও অনেক বেশি, সেটাও মাথায় রাখতে হবে”, বিবিসিকে বলছিলেন তিনি।

এই পর্যবেক্ষকরা দীর্ঘমেয়াদে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধে যুক্তি দিলেও সম্পূর্ণ অন্য কথা বলেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।

“তিনি যদি কোনও কারণে ভারতে থাকতে চান, তার মর্যাদা ও সম্মান অনুযায়ী যথাযথ পর্যায়ে (অ্যাপ্রোপ্রিয়েট লেভেল) তার সঙ্গে আমাদের এনগেজ করতে হবে। এখানে দ্বিতীয় কোনও ভাবনার অবকাশ নেই”, বলছেন মি শ্রিংলা।

সোজা কথায়, পুরনো ইতিহাস ও এতদিনের সম্পর্ককে মাথায় রেখে তার ইচ্ছাকে ভারতের সম্মান দিতে হবে – এটাই তার যুক্তি।


ভারতে শাসক দল বিজেপির ঘনিষ্ঠ ও পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ শুভ্রকমল দত্ত আবার মনে করেন, এখনই স্থায়ীভাবে না-হলেও শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারত তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না।

“যতদিন না তৃতীয় কোনও দেশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে তিনি আশ্রয়ের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন, ততদিন পর্যন্ত ভারতের উচিত হবে তাকে সসম্মানে ভারতেই রাখা”, বিবিসিকে বলছিলেন ড: দত্ত।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে ভারতের কী করণীয়?
বাংলাদেশে বিশেষ করে গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যে ধরনের অরাজকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বা সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবর আসছে - তাতে ভারতের এখন ঠিক কী করা উচিত তা নিয়েও দেশের ভেতরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারে বিএনপি বা জামাত ই ইসলামীর ঘনিষ্ঠরা প্রাধান্য পেতে পারেন, এই ধরনের ইঙ্গিতও দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে উদ্বেগের বাতাবরণ তৈরি করেছে।

হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মনে করেন, “বাংলাদেশে ভারত একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও স্থিতিশীল সরকার চায়, এর মধ্যে কোনও ভুল নেই। আর কোনও দেশই চায় না তার ঘরের দোরগোড়ায় একটি শত্রুভাবাপূর্ণ সরকার থাকুক।”

সুতরাং বাংলাদেশে পরবর্তী সরকার যাতে ভারতের প্রতি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ থাকে, তার জন্য যা যা করা উচিত সেটা করা দরকার বলেই মনে করেন তিনি।

কংগ্রেস নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুরও বলেছেন, “জামাতের যে ভারত-বিরোধিতার ইতিহাস, তাতে নতুন সরকারে তাদের প্রভাব কতটা হবে সে ব্যাপারে ভারতকে আগেভাগেই সতর্ক থাকতে হবে।”

এমন কী, ওই সরকারের ওপর চীন বা পাকিস্তানের মতো শক্তিগুলো কলকাঠি নাড়াতে চাইবে বলেও মনে করেন মি থারুর। কিন্তু জামাতের এই তথাকথিত ‘প্রভাব’ ঠেকানোর জন্য ভারত ঠিক কী করতে পারে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট দিশা দেখাতে পারেননি তারা কেউই।


শ্রীরাধা দত্ত অবশ্য বলছিলেন, “আমার মতে প্রথমে কমিউনিকেশনের চ্যানেলগুলো খুলতে হবে। ওপেন আপ করতে হবে।”

“বাংলাদেশে কারা এই মুহুর্তে শেষ কথা বলছেন বা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটা আমরা জানি না। তাদেরকে ভাল করে চিনিও না। আমরা যদি তাদের সঙ্গে একটা সুস্থ ও স্বাভাবিক ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ চাই, তাহলে সবার আগে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে”, জানাচ্ছেন তিনি।

এদিকে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির ভেতর থেকেই কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ‘সফট ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাপ্রোচে’র বদলে ‘কঠোর দৃষ্টিভঙ্গী’ নেওয়ার দাবি উঠছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শীর্ষ নেতা শুভেন্দু অধিকারী যেমন প্রকাশ্যেই বলেছেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের ওপর এখনই চাপ প্রয়োগ করা দরকার – নইলে সে দেশ থেকে অন্তত এক কোটি হিন্দু পালিয়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হবেন।

শুভ্রকমল দত্তও বলছেন, “একাত্তরের যুদ্ধও কিন্তু শুরু হয়েছিল শরণার্থী সমস্যা দিয়ে। আমি মনে করি বাংলাদেশের বর্তমান সংকটে ভারতের অনেক আগেই সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল, তখন সেটা না-হলেও এখন কিন্তু করতেই হবে।”

‘হস্তক্ষেপ’ মানে অবশ্য কেউ বাংলাদেশে সেনা পাঠানোর কথা বলছেন না, তবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক যত ধরনের চাপ প্রয়োগ সম্ভব – সে দিকেই ইঙ্গিত করছেন।


বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কিমশনার ভিনা সিক্রি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো থেকে শুরু করে অজস্র সেক্টরে ভারত শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে, এটা ভুললে চলবে না।”

সেই বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখার জন্য একটা ‘স্টেবল নেবারহুড’ বা স্থিতিশীল প্রতিবেশ চাই – আর তার জন্য যা করা দরকার, ভারতকে তা করতে হবে বলেও যুক্তি দিচ্ছেন তিনি।

ভারত এখন ঠিক কী করছে?
মঙ্গলবার বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পার্লামেন্টে বাংলাদেশ নিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

প্রথমত, তার আগের গত চব্বিশ ঘণ্টায় ঢাকায় ‘কর্তৃপক্ষে’র সঙ্গে ভারত নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তবে এই কর্তৃপক্ষ বলতে সেনাবাহিনী না কি প্রশাসনিক বিভাগ, সেটা তিনি কিছু ভেঙে বলেননি।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকানপাট বা ব্যবসা এবং মন্দিরে হামলার বহু ঘটনা ঘটেছে বলে খবর আসছে। এই পরিস্থিতির ওপর ভারত সতর্ক নজর রাখছে।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু সংগঠন সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে ও নানা পদক্ষেপও নিয়েছে, ভারত তা স্বাগত জানায়। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যত উন্নতি না-হওয়া পর্যন্ত ভারত অবশ্যই এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকবে। সীমান্তে বিএসএফ-কেও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, ভারত মনে করছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনও খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে (‘ইভলভিং’)। ইতোমধ্যে সে দেশে থাকা প্রায় ১৯ হাজার ভারতীয় নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবে এই ১৯ হাজারের মধ্যে প্রায় ৯০০০ই ছাত্রছাত্রী, যাদের অধিকাংশই গত মাসেই ভারতে ফিরে এসেছেন।


মি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ভারত সরকার বাংলাদেশের বর্তমান ‘নীতি-নির্ধারক’দের সঙ্গে একটা যোগাযোগের চ্যানেল স্থাপন করে ফেলেছেন, দু’পক্ষের মধ্যে কথাবার্তাও হচ্ছে।

তবে ভারতেই বহু পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক মনে করেন, এটুকুই হয়তো যথেষ্ঠ নয় – নিজেদের স্বার্থরক্ষা করতে হলে ভারতকে আরও অতি-সক্রিয় (প্রোঅ্যাক্টিভ) ও দরকারে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

এর আগে সকালের সর্বদলীয় বৈঠকেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনাকে তার ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ স্থির করার জন্য ভারত সময় দিতে চায়।

বৈঠকে উপস্থিত একজন বিরোধী দলীয় এমপি বিবিসিকে বলেছেন, “আমার মনে হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারত ছাড়ার জন্য কোনও তাড়া দেওয়ার প্রশ্ন নেই, বরং তিনি যতদিন খুশি থাকতে পারেন – এটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।”

এদিকে আজ (বুধবার) ভারতের ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিওরিটি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আবারও বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনায় বসবে বলে বিবিসি জানতে পেরেছে। দেড় দিনের মধ্যে সেটা হবে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক।

কিন্তু গত চব্বিশ ঘণ্টায় ভারতের সার্বিক ভূমিকা থেকে এটা স্পষ্ট – তাদের কাছে সম্পূর্ণ অভাবিত ও অপ্রত্যাশিত এই সংকটকে ঠিক কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেই পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ দিল্লি এখনও চূড়ান্ত করে ফেলতে পারেনি।

সেনাবাহিনীর যে বার্তায় পালিয়ে যান শেখ হাসিনা -রয়টার্সের রিপোর্ট

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়ে দেয় তারা প্রতিবাদ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আর দমনপীড়ন চালাতে পারবে না। এতেই শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ছেড়ে পালানোর আগের রাতে সেনাপ্রধান তার জেনারেলদের নিয়ে একটি মিটিং করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, কারফিউ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর সেনারা আর গুলি ছুড়বে না। ওই মিটিংয়ের বিষয়ে জানেন এমন দু’জন সেনা কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে। এতে বলা হয়, এরপরই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ছুটে যান গণভবনে। তিনি শেখ হাসিনাকে এই বার্তা দেন যে, তিনি যে লকডাউন আহ্বান করেছেন তা বাস্তবায়নে অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন তার সেনারা। ভারতীয় একজন কর্মকর্তাও এ তথ্য জানিয়েছেন। এতে ম্যাসেজ ক্লিয়ার হয়ে যায়। তা হলো: হাসিনার পক্ষে সেনাবাহিনীর আর কোনো সমর্থন নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে।

এতে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদের কর্মকর্তাদের অনলাইন মিটিং এবং তারপর শেখ হাসিনাকে যে বার্তা দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এর আগে আর কোনো রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। শেখ হাসিনা ১৫ বছর যেভাবে শাসন করেছেন তাও উঠে আসে। তিনি বিন্দুমাত্র ভিন্নমত পোষাণ করেন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। এসবের কারণে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আর আকস্মিকভাবে সোমবার তার ইতি ঘটে। তিনি পালিয়ে চলে যান ভারতে।

এর আগে দেশজুড়ে কারফিউ দেয়া হয়। তাতে রোববার কমপক্ষে ৯১ জন নিহত ও কয়েক শত মানুষ আহত হন। জুলাইয়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরুর পর এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণহানির দিন। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন রোববার সন্ধ্যার আলোচনার বিষয়। তিনি বলেছেন, এটা ছিল নিয়মিত মিটিং। সেখানে আপডেট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে বাড়তি প্রশ্ন করা হলে তিনি বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

রয়টার্স এসব নিয়ে ১০ জন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা বিষয়টি সম্পর্কে জানেন। এর মধ্যে আছেন চারজন সেনা কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের অন্য দু’জন সূত্র। তারা বিষয়টি স্পর্শকাতর বলে নাম প্রকাশ করতে চাননি। গত ৩০ বছরের মধ্যে ২০ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন শেখ হাসিনা। জানুয়ারিতে তিনি টানা চতুর্থ দফায় নির্বাচিত হন। এর আগে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেন। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে। তিনি কঠোর হস্তে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতের এক রায়কে কেন্দ্র করে তার সেই ক্ষমতা চ্যালেঞ্জে পড়ে। ছাত্রদের আন্দোলনে সেই রায় পরে সংশোধন করা হয়। কিন্তু প্রতিবাদ বিক্ষোভ রূপ নেয় শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে।

শেখ হাসিনার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানাননি সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান। কিন্তু প্রতিবাদ বিক্ষোভের আকার এবং কমপক্ষে ২৪১ জনের মৃত্যু শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে অসম্ভব করে তোলে। এমনটা বলেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক তিনজন সিনিয়র কর্মকর্তা। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম শাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সেনাদের ভিতর ব্যাপক পরিমাণে অস্বস্তি ছিল।  সম্ভবত এজন্যই চিফ অব আর্মি স্টাফের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, সেনারা ব্যারাকের বাইরে এবং তারা দেখতে পাচ্ছিলেন কি ঘটছে।  সামি উদ দৌলা চৌধুরী বলেন, এতে জীবন রক্ষার কথা ঘোষণা দেয়া হয়। কর্মকর্তাদেরকে ধৈর্য প্রদর্শন করতে বলা হয়। এতে প্রথমেই যে ইঙ্গিত মেলে তা হলো সেনাবাহিনী সহিংস প্রতিবাদ বিক্ষোভ দমনে শক্তিপ্রয়োগ করবে না। ফলে শেখ হাসিনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েন। সোমবার কারফিউ অমান্য করে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহেদুল আনাম খানের মতো সিনিয়র অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রাজপথে নেমে পড়েন। তিনি বলেন, আমাদেরকে থামায়নি সেনাবাহিনী। আমরা যেটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেনাবাহিনী সেটাই করেছে।

অনির্দিষ্টকালের দেশজুড়ে কারফিউয়ের প্রথম দিন সোমবার শেখ হাসিনা গণভবনের ভিতরে অবস্থান করেন। এটি রাজধানী ঢাকায় ভারি নিরাপত্তা প্রহরী বেষ্টিত প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। এর বাইরে রাস্তায় রাস্তায় জনতার ঢল নামে। লাখ লাখ মানুষ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নেমে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। ভারতীয় কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের দু’জন ব্যক্তি- যারা এ বিষয়ে জানেন, তারা বলেন- এমন অবস্থায় দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন ৭৬ বছর বয়সী এই নেত্রী।

বাংলাদেশের একটি সূত্র বলেছেন, শেখ হাসিনা এবং তার ছোটবোন শেখ রেহানা এ সময় একসঙ্গে ছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন পালিয়ে যাবেন। দুপুরের দিকে তারা ভারতের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। মঙ্গলবার পার্লামেন্টে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, জুলাই মাসজুড়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল নয়া দিল্লি।

এই সংকট উত্তরণ এবং সরকার গঠনে অনেকগুলো বৈধ পথ খোলা রয়েছে by সালেহ উদ্দিন

এই সংকট উত্তরণে এবং নতুন সরকার গঠনে অনেকগুলো বৈধপথ খোলা রয়েছে। সংবিধান বহাল রেখে কিংবা বাতিল করে এই সংকট উত্তরণ করা সম্ভব। এ বিষয়ে অতীতের অনেক নজির রয়েছে। যে সব পদ্ধতি এই সংকট সমাধান করা যায় তা হলো-

(এক) সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্সের মাধ্যমে; (দুই) জাতীয় সরকার গঠন করে সংবিধান বাতিল এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে; (তিন)  পতিত সরকারের নিজেদের মতো বানানো সংবিধানের অধীনে; (৪) সংবিধানের বাইরে গিয়ে  ক্রান্তিকালীন বিধিমালা অনুয়ায়ী।

অতীতে ১৯৯০ এবং ২০০৭ সালে এ পদ্ধতিতেই সংকটের সমাধান করা হয়েছিল। এই ক্রান্তিকালীন বিধানের আলোকে জাতীয় সরকার গঠন এবং এর সকল কার্যক্রমের বৈধতা পরবর্তীতে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ দিবে। এছাড়া এসব ক্রান্তিকালীন বিধানাবলী পরবর্তীতে সংবিধানের অংশ করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ডামি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন) পদত্যাগ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে তার মন্ত্রিসভার সকল সদস্য পদত্যাগ করেছেন বলে ধরে নিতে হয়।  সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন অন্য কোনো সংসদ সদস্যকে না পেলে সংসদ ভেঙে  দেবেন। রাষ্ট্রপতির কাছে শুধু প্রতীয়মান হতে হবে এই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন  আর কোনো সদস্য নেই।

সংসদ বাতিল সংক্রান্ত আদেশনামায় তিনি শুধু এই কারণই উল্লেখ করবেন। উল্লেখ্য যে, সংবিধান এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দিয়েছে। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে রাষ্ট্র্রপতির এ কার্য সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর সংসদ বাতিল করার সম্পূর্ণ এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। তিনি তার বাতিল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে শুধু লিখবেন, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন অন্য কোনো সদস্য না পাওয়ায় সংসদ বাতিল করা হলো। তবে এখানেও একটি সংকট রয়েছে। আওয়ামী লীগ  ১৪তম সংবিধান সংশোধনের সময় এই পথটিও কঠিন করে গেছে। সংবিধানে উল্লেখ আছে, সংসদ বাতিলের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা এই সংসদের ভিতর থেকে করতে হবে। নতুন সরকার এবং সংসদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সরকার এবং বর্তমান সংসদ বহাল আছে বলে ধরে নিতে হবে। এই সাংবিধানিক সংকট নিরসনে রাষ্ট্র্রপতি  সুপ্রিম কোর্টে একটি রেফারেন্স পাঠাতে পারেন। রেফারেন্সে রাষ্ট্রপতি লিখবেন, দেশে ছাত্র-জনতার গণঅভূত্থান সংঘটিত  হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ,  দেশত্যাগ করেছেন এবং সংসদের অন্যান্য সদস্যদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারবিহীন থাকতে পারে না। সেহেতু জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী এবং দেশের সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী এবং গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অভিপ্রায় অনুযায়ী জনস্বার্থ এবং জনশৃঙ্খলার  স্বার্থে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের আদেশ, নির্দেশ, রায় ও নির্দেশনা সংবিধানের অংশ। সেহেতু দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনস্বার্থে এই কার্যক্রমের অনুমোদনের প্রয়োজন। নতুবা দেশ এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পতিত হবে। সুতরাং  দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই রেফারেন্স অনুমোদন করা একান্ত আব্যশক। সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পাওয়া গেলে সংবিধানের এই সংক্রান্ত সকল জটিলতার অবসান ঘটবে এবং জাতীয় সরকার গঠনে এবং তার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো সাংবিধানিক সংকট বা বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপিত হবে না। দ্বিতীয়ত, যে পথটি আছে তা সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থার আলোকে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার পর সংবিধানের আলোকে বর্তমান সংসদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত একটি সরকারকে অব্যাহত রাখা। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার এবং বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। ছাত্র-জনতা কোনেভাবেই সংবিধানের এই পথটি গ্রহণ করবে না। বিশেষত:  বর্তমানে যে সংসদ রয়েছে, তা একটি ধোঁকাবাজির সংসদ। ডামি নির্বাচনে গঠিত সংসদ হিসেবে জাতীয়ভাবে পরিচিতি রয়েছে। এই নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থীই ছিলেন শেখ হাসিনার অনুগত এবং অনুকম্পা প্রার্থী। নির্বাচনে জনগণের উপস্থিতিও ছিল না। কোনো বিরোধী দলও অংশ নেয়নি। প্রকৃতপক্ষে শতকরা ৫ জন লোক ভোট প্রদান করেছেন। ফলে জনগণের সঙ্গে  প্রতারণার মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। সুতরাং প্রতারণার মাধ্যমে গঠিত সংসদের এই অস্বিত্ব কেউ মেনে  নিবে  না।

তৃতীয়তঃ যে ব্যবস্থা রয়েছে তা হলো জনস্বার্থ এবং জনশৃঙ্খলার স্বার্থে ক্রান্তিকালীন বিধান অনুযায়ী ‘একটি জাতীয় সরকার গঠন করা। সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর পূর্বে সংবিধানে ক্রান্তিকালীন ব্যবস্থা ছিল। এই ক্রান্তিকালীন ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯০ সালে প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে একটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন  সরকার গঠিত হয়েছিল। শাহাবুদ্দীন আহমেদ সে সময় ছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি। তাকে যখন দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছিল তখন তিনি প্রধান বিচারপতির পদ ছেড়ে যেতে রাজি ছিলেন না। আবার তৎকালীন সংবিধান অনুযায়ী তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হওয়া এবং পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতির পদে ফেরত যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় দেশ ও জাতীর বৃহত্তর স্বার্থে ক্রান্তিকালীন বিধান অনুযায়ী তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি প্রধান বিচারপতি পদে ফেরত যাবেন। তার ফেরত যাওয়া এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধয়ক সরকারের সকল কার্যক্রম পরবর্তীতে বৈধতা দেয়া হবে। সে আলোকে পরবর্তীতে সংবিধানের ১১তম সংশোধনীর মাধ্যমে অস্থায়ী সরকারের সকল কার্যক্রমের বৈধতা এবং প্রধান বিচারপতি পদে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং অতীতের রেফারেন্স অনুযায়ী এখন একটি জাতীয় সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে ওই সরকারের সকল কার্যক্রমের বৈধতা দেয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমাঝেতামূলক একটি জাতীয় ঘোষণা স্বাক্ষরিত হওয়া প্রয়োজন। এই ঘোষণায় সকল রাজনৈতিক দল এই মর্মে একমত হবে যে ’জাতীয় সরকার এবং এর সমস্ত কার্যক্রমের বৈধতা পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে অনুমোদন করা হবে। এই কাজকে আরও মজবুত এবং সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে হলে সুপ্রিম কোর্টে একটি রেফারেন্স পাঠিয়ে অথবা রিভিউ পিটিশনের মাধ্যমে ১৪তম সংশোধনীর পূর্বে যে ক্রান্তিকালীন বিধানাবলী ছিল তা পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, জাতীয় সরকার যতদিন খুশী ততদিন ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারে শুধু পরবর্তীতে সংসদ তার সকল কার্যক্রমের বৈধতা দিবে। জাতীয় সরকারের সকল কার্যক্রম ‘ক্রান্তিকালীন বিধিমালা’ হিসাব জারী হবে। যেমন সামরিক আইনের সময় ‘মার্শল প্রক্লেমেশন’ হিসাবে এবং ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়কের সরকারের সময় ‘জরুরি বিধিমালা’ হিসাবে জারি হয়েছিল। এইসব প্রক্লেমেশন এবং বিধিমালা পরবর্তী অনুমোদন কিছু সংবিধানের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ঠিক তেমনিভাবে’ জাতীয় সরকারের ‘সকল কার্যক্রম পরবর্তীতে সংসদ অনুমোদন করবে এবং যেসব কার্যক্রম সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয় সেগুলো  সংবিধানের অংশ হিসাবে পরবর্তীতে সেসব সংবিধানের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।’

এই সংকট সাংবিধানিকভাবে উত্তরণের আরেকটি পথ খোলা আছে আর তা হলো রিভিউ পিটিশনের মাধ্যমে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ফেরত আনা। ত্রয়োদশ সংশোধনী ফেরত আনার এখনো সুযোগ রয়েছে। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলার (বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মামলার পক্ষ হিসাবে আছেন) কোনো  একটি পক্ষ অথবা সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ পিটিশন করবেন। আপিল বিভাগ যদি রিভিউ পিটিশন মনজুর করে তাহলে পুরনো তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফেরত যাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির জায়গায় একটি বিকল্প রাখতে হবে। যেমন রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ক্রমে ‘সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অথবা সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত কোনো বিচারপতি অথবা সকলের কাছে আস্থাভাজন একজন দল নিরপেক্ষ সুনাগরিককে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দিবেন।’

এই সংকটের সমাধান সংবিধানের বাহিরে গিয়ে করা সম্ভব। যদি সরকারকে বিপ্লবী সরকার অথবা জাতীয় সরকার হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সে ক্ষেত্রে বর্তমান সংবিধানকে বাতিল করতে হবে এবং একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার। বিদ্যমান সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে  জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন। সুতরাং জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী বর্তমান  সংবিধান বাতিল এবং নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার কোনো সংবিধানের আওতায় হয়নি। ওই সরকার গঠিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী এবং পরবর্তী স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র সংবিধানের অংশ করা হয়। বর্তমানে যে সংবিধান তাও স্বাধীন দেশের জনপ্রতিনিধিরা গঠন করেননি। ওই সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্যরা। যারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিশ্বাসী হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পৃথিবীর অসংখ্য নজির  রয়েছে বিপ্লবের পর নতুন করে সংবিধান রচিত হয়েছে। জুলাই-আগস্টের এই গণঅভূত্থান একটি জাতীয় বিপ্লব। এই বিপ্লব দেশের আপামর জনগণ এবং ছাত্রসমাজ সংগঠিত করেছে। ফলে বিপ্লবত্তোর দেশে বিপ্লবীরা যেভাবে চাইবে সেভাবে ঘোষণা দিয়ে (যা বিধিমালা হিসাবে গণ্য হবে) সরকার পরিচালনা করতে পারবে। এই ঘোষণাগুলোর জারি হতে  পারে ‘জাতীয় ঘোষণা অথবা জাতীয় সনদ হিসাবে। জাতীয় সরকার সাধারণ সকল রাজনৈতিক দল(পতিত স্বৈরাচারী দল এবং তার দোসর বাদে) এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং অভ্যুত্থানকারী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে  গঠিত হতে পারে। এই গণঅভ্যুত্থানের সরকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার এবং স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন এক সংবিধান প্রণয়ন করবে। এই সংবিধানের আলোকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের পর সংসদ নির্বাচন দিয়ে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তার আগে দেশের মানুষের আস্থা অর্জনে এবং গণতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক বিশ্বকে অভিহিত করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নির্বাচনের পর এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকালের ঘোষণা থাকা উচিত হবে।

২৪ ঘণ্টার বেশি সরকারহীন বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নতুন সরকার গঠিত না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। সরকারি কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় খুললে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা অফিসে গিয়েছেন। সরকারি অনেক অফিসে কর্মকর্তাদের বাড়িতে চলে যেতে বলা বা তালাবদ্ধ করে রাখার তথ্যও পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যেসব মন্ত্রী ছিলেন, তাদের কারো কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের অনেকের সরকারি বাসভবনে হামলা হয়েছে, তারা কোথায় রয়েছেন, কেউ জানে না।

অন্যদিকে সোমবার বিকেল থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশে থানাগুলোতে হামলা ও কোথাও কোথাও অস্ত্র লুটের ঘটনায় কিছু পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর পর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই কার্যত অচল হয়ে গেছে পুলিশ প্রশাসন। দেশের বেশিভাগ জেলা ও থানায় পুলিশ সদস্যদের কোনো তৎপরতা নেই।

বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে জানা যাচ্ছে, সেখানকার স্থানীয় প্রশাসনও কাজ করছে না। অনেক স্থানে ডিসি, ইউএনও, ভূমি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে জুলাই মাস থেকে যে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল দেশে, তাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মানুষের মৃ্ত্যু হয়েছে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে সোমবার পদত্যাগের পর দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের সব নেতা ও মন্ত্রী আত্মগোপনে চলে যান। অবশ্য তাদের অনেকে আগেভাগে দেশের বাইরে চলে গেছেন বলে জানা যাচ্ছে।

সরকারহীন ২৪ ঘণ্টা

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।

শেখ হাসিনা সোমবার দুপুরে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর বেলা ৪টার দিকে প্রেস ব্রিফিং-এ সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে দ্রুতই রাষ্ট্রপতির সাথে পরামর্শ করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন।

পরে রাতে বঙ্গভবনে গিয়ে সেনাপ্রধান, জামায়াত ও বিএনপিসহ কয়েকটি দলের নেতারা রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের সাথে বৈঠক করেন।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এর মধ্যে সোমবার রাত ৮টার দিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আটজন সমন্বয়ক জানান যে সেনা-সমর্থিত কোনো সরকার তারা মানবেন না এবং তারা নিজেরাই সরকার গঠনের একটি রূপরেখা দিয়ে সেই সরকারে কারা থাকবেন তাদের নাম প্রকাশ করবেন।

মঙ্গলবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

যদিও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন না করলে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিতে পারে।

ড. ইউনূসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা আছে। তবে সর্বদলীয় ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দিতে হবে।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দেখতে চেয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের প্রস্তাবকে তার দল শ্রদ্ধার চোখে দেখে।

এর মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরেই সংসদ ভেঙে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। ফলে এ মুহূর্তে সংসদ, মন্ত্রীসভা ও সরকার- এই তিনটির কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই।

ফলে প্রশাসন, সরকারের বিভাগের মধ্যে এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে না। সারাদেশে অনেক সহিংসতা ও হামলার ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

পুলিশ ও প্রশাসন অচল
সোমবার দুপুরের পর থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে বহু থানায় হামলা হয়। ঢাকায় পুলিশ সদর দফতর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা হয়।

বাংলাদেশের কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের সংগঠন পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা করেছে, পুলিশ সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মবিরতি পালন করবে। ফলে কার্যত সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে পুলিশের কোনো তৎপরতা চলমান নেই।

এমনকি মঙ্গলবার ঢাকার কোথাও ট্রাফিক পুলিশ দেখা যায়নি এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দফতর বন্ধ ছিল। ওই কার্যালয়ের সামনে দুপুর ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দলকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় অনেক স্থানে শিক্ষার্থীদের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে।

রাজধানীর বেশিভাগই থানাতেই হামলার পর অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে সোমবার বিকেলে। কিছু থানা থেকে অস্ত্র লুট করা হয়েছে। বেশ কিছু পুলিশ সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন। ফলে এসব থানার কোনো কার্যক্রমই এখন আর চলছে না।

ঢাকায় যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় থানায় হামলার পর পুলিশ সদস্যরা গুলি ছুড়লে তা নিয়েও অনেক সহিংসতা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সুপার ও থানাগুলোতে নিরাপত্তাহীন পরিবেশ বিরাজ করায় কেউই অফিস করছে না।

সোমবারই পুলিশ সদর দফতরের হামলা এবং রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলার পর পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন কর্মবিরতি ঘোষণা দিয়েছে।

তবে পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এক ভিডিও বার্তায় পুলিশ ও পুলিশের স্থাপনার নিরাপত্তায় রাজনৈতিক নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের আহ্বান জানানোর জন্য অনুরোধ জানান। তিনি শিগগিরই পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

পুলিশের অনুপস্থিতিতে থানা, ট্রাফিক ও বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে।

অন্যদিকে সরকারি কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় খুললে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা অফিসে গিয়েছেন।

তবে সচিবালয়ের কাছেই একাধিক ভবনে হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ১২টার দিকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবালয় থেকে বেরিয়ে আসেন।

এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার বা নির্দেশনা দেয়ার মতো বর্তমানে কেউ নেই। যেসব মন্ত্রীরা দায়িত্বে ছিলেন, সরকার পতন হওয়ায় কার্যত তারা আর দায়িত্বে নেই। তাদের অনেকে আগেই দেশের বাইরে পালিয়ে চলে গেছেন, অনেকের আপাতত কোনো সন্ধান মিলছে না।

ড. হাছান মাহমুদ ও জুনাইদ আহমদ পলকের মতো কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন।

ঢাকার বাইরে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজ নিজ স্টেশনে উপস্থিত আছেন বলে জানা গেছে। তবে অনেকেই নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অফিস করেননি।

একজন জেলা প্রশাসক বলেন, নৌবাহিনী জেলায় আসার পর থেকে তিনি অফিস করা শুরু করেছেন।

অর্থাৎ জেলা উপজেলা পর্যায়ে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন শুরু হয়েছে। সেটি হলে জেলা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পুরো দমে অফিস শুরু করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে।

তবে কয়েকটি জেলা থেকে খবর পাওয়া গেছে, সেখানে ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ডদের তাদের কার্যালয় ও বাসায় পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কর্মকাণ্ডেও তাদের কোনো তৎপরতা বা নির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না।

একজন কর্মকর্তা জানান, তার উপজেলায় সরকারি স্থাপনাতেও অনেকগুলো হামলা হওয়ায় তিনি নিরাপদ অবস্থানে রয়েছেন। সরকারি দায়িত্ব পালন করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারছেন না, এমনকি সহকর্মী অন্যরাও কার্যালয়ে আসতে সাহস পাচ্ছেন না।

‘নিরাপত্তার অভাব’ দেখিয়ে সরকারি অনেক অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসায় চলে যেতে বলা হয়েছে। সরকারি অনেক অফিসের প্রধান ফটক ও বিভিন্ন কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

এমনকি অনেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক হাসপাতালেও চিকিৎসকরা আসেনি, তাদের চেম্বার তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানান, বন্দরের কার্যক্রম তারা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘জাহাজ থেকে পণ্য ওঠা-নামা চলছে। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু কম ডেলিভারি হচ্ছে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকার কারণে। আশা করি দ্রুতই সব স্বাভাবিক হবে।’

তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর একটি দল কাস্টমস হাউজ পরিদর্শন করেছেন বলে একজন কর্মকর্তা জানান।

মঙ্গলবার সব কিছু খোলার তথ্য জানানো হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খোলেনি।

বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলছেন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার তারা কারখানাগুলো খুলে দেবেন।

তিনি বলেন, ‘তবে বাস্তবতা হলো পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় জনমনে ভীতি আছে। আমরা মনে করি সেনাবাহিনী যেহেতু মোতায়েন আছে তাদের টহল দৃশ্যমান হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।’
সূত্র : বিবিসি