Monday, July 29, 2013

অস্ট্রেলিয়ার মেধাবী বাঙালিরা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিদ্যাশিক্ষা উপলক্ষে সেই ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম। তারপর নানা দেশে ভ্রমণের সুযোগ এলেও এই দ্বীপ মহাদেশে আসার সুযোগ হয়নি, যতক্ষণ না আমাদের সুযোগ্য ছাত্র সহকর্মী এবং সে সময় মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিপসল্যান্ড ক্যাম্পাসের কম্পিউটার বিভাগের প্রধান ড. মঞ্জুর মুর্শেদ সুযোগ সৃষ্টি করল। যা হোক, এবার আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে অনুষ্ঠিত হবে বিধায় আবার সুযোগ হল। কুয়ালালামপুর থেকে উঠেছি ঘণ্টা সাতেকের পথ। সাধারণত খাবার যা দেয়া হয়, তা খেতে না পারলেও ফেলে দিই না।
ব্রিসবেন পৌঁছার পর কাস্টম ডিক্লারেশনের যে ফরম দেয়া হয়, তাতে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর বুঝে না বুঝে লিখতে হয়। আমিও তাই করলাম। তারপর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর যেহেতু মালামাল সবই আমার সঙ্গে নেয়া ৬ কিলোগ্রাম ওজনের ব্যাগে, সেহেতু কাস্টমসে দৈব চয়নে আমাকে যে পরীক্ষা করা হবে, তা ধরেই নিয়েছিলাম। যেহেতু কোনো ফটকেই আমার ভাগ্য নেই। অতি সম্প্রতি আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য নামকরা একটি হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। কত মানুষ প্রবেশ করছে, কিন্তু আমার আর প্রবেশ করা হয় না। পরিশেষে দীর্ঘক্ষণ আমার এতিম অবস্থা দেখে আমাকে একজন পাহারাদার দয়াপরবশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। যা হোক, এত বড় বড় মালামাল রেখে শিকারি ক্ষুদ্র কুকুরটি যখন আমার ব্যাগের কাছে বসে পড়ল, আমি তখনও বুঝতে পারিনি যে, শক্ত কাগজের মোড়কের ভেতরে বিমানবালা আমাকে যে খাবারটি দিয়েছিল, তার মধ্যে এক খণ্ড মাংসও ছিল। যা হোক, ওই মাংসের টুকরা রেখে তার পরিবর্তে আমাকে একটি রিসিপ্ট ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের সময় কোনো রকম প্রাণিজাত কিংবা উদ্ভিদজাত খাবার নেয়া যাবে না- এরকম একটি লিফলেট দিয়ে আমাকে বিদায় করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ছাত্র ও সহকর্মী ড. নিউটন এসে গেল। নাম দেখে তাকে বিদেশী ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের বাংলাদেশেরই সন্তান। নিউটনের বিচক্ষণ পিতা তার ছেলেমেয়েদের নাম রেখেছে নিউটন, মিল্টন ও লিঙ্কন। সন্তানেরা কিছুটা হলেও নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে। নামের জন্য কোনো না কোনো সময়ে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়নি তা বলা যাবে না, তবে সুস্থির যুক্তিবাদী নিউটন যে যথেষ্ট সফলতার সঙ্গেই তার মোকাবেলা করেছে, এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বগুড়ার ছেলে নিউটন কোনোদিন ক্ষুদ্র চিন্তা করেনি। পিএইচডি করে ফিরে যখন বিভাগে যোগদান করল, তখন আমরা বিভাগে কোনো একটি বাইরের কাজ করছিলাম। যেখানে ছোটখাটো নানা কাজ আমরা বড় বড় অধ্যাপক ঠাণ্ডা মাথায় বসে করছিলাম, নিউটন তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এই বলে যে, যথেষ্ট বুদ্ধির কাজ না হলে সে করবে না।
নিউটনের ছাত্রজীবনে নানা সময়ে আমি গবেষণা প্রবন্ধ এবং তার সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতাম, যা নিউটন কখনও পাত্তা দেয়নি। এবার দেশে এসে খুঁজে দেখলাম অত্যন্ত হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নাল বিএমসি বায়োইনফরমেটিক্সের ভলিউম ১৪তে এ বছর তার দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য, নিউটনের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ Wizard ও Kangaroo ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানী মহলের নজর কেড়েছে। নিউটনের পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুপারভাইজার অধ্যাপক সাত্তার নিউটনের কাজ, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। ৬০ বছর বয়সী যশস্বী অধ্যাপক যখন অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী গবেষকের সঙ্গে আলাপে অনেক কিছু শেখা যায় বলে মন্তব্য করেন, তখন উভয়েই যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষক হিসেবে নিউটনের নজর কাড়তে না পারলেও তার অর্জন আমাকে রীতিমতো গর্বিত করে তুলল। অধ্যাপক সাত্তার আমাদের একাধিক ছাত্রের মেন্টর হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশে আয়োজিত সবচেয়ে নিয়মিত কনফারেন্স আইসিসিআইটিতে মূলবক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করে আমাদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় আমার উভয় ভ্রমণে আতিথ্যকর্তা হিসেবে অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার দেয়ার পর একটি তুর্কি রেস্টুরেন্টে অধ্যাপক সাত্তারের দেয়া সান্ধ্যভোজ ও আলাপচারিতা অত্যন্ত সুখকর ছিল। এরপর অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পুরনো সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্কুলের তরুণ পরিচালক বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করার সম্ভাবনা এবং তাতে তার সহায়তার কথা আন্তরিকভাবে জানালেন। আমাদের স্নাতক এবং সেখানে ফ্যাকাল্টি ড. শাহাদাত উদ্দিন একটি সেমিনারের আয়োজন করল এবং তার বাসার আতিথেয়তাও উপভোগ করলাম। আমার সহপাঠী- এক সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামাল ভাই- সারাদিন সিডনির একাংশ পরিভ্রমণ করে দেখালেন। পরিশেষে অস্ট্রেলিয়ার আরেক রাজ্যের রাজধানী পার্থের উদ্দেশে রওনা হলাম। ৫ ঘণ্টার বিমানপথ। ৭ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ঘোষণা শুনে জেগে উঠলাম। বিরূপ আবহাওয়ার জন্য পার্থে নামা সম্ভব হয়নি বলে মেলবোর্নে অবতরণ করতে হয়েছে। যা হোক, পরিশেষে আরেকটি বিমানযোগে পার্থ পৌঁছানো সম্ভব হল।
বিমানবন্দরের বাইরে এসে ব্যাগটি নামিয়ে দু’একটি ছবি তুলছি। এরই মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী এসে আমার ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাগটি যে আমারই তা বুঝতে পেরে তার সুপারভাইজারকে ওয়াকিটকি ব্যবহার করে আসতে বলল। কোনো মালামাল অরক্ষিত রাখা যাবে না। যা হোক, সুপারভাইজার এসে আমাকে গোবেচারা ভেবে ব্যাগটি দিয়ে দিল। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষক ড. ফেরদৌস সোহেলের আতিথেয়তায় আমাদের স্নাতক ও অন্যান্য বাংলাদেশীর প্রশংসনীয় আন্তরিকতায় সিক্ত হয়ে আরেকখানি সেমিনারে বক্তব্য রেখে দেশের পথে পা বাড়ালাম।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদের পর মাঠের রাজনীতি কতটা তপ্ত হবে? by বিভুরঞ্জন সরকার

ঈদের পর রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপি ঈদের পর মাঠে নামার ঘোষণা রোজার আগেই দিয়ে রেখেছে। এখন প্রতিদিনের ইফতার পার্টিতে এ ঘোষণার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম ঈদের পর মাঠে নামবে বলে জানিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিও ঈদের পর মহাজোটে থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত ঈদের পর জানাবে বলে এরশাদ সাহেব তার একাধিক বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। জোট-মহাজোটের পরিধি বাড়ানোর রাজনৈতিক উদ্যোগ-প্রচেষ্টাও ঈদের পর বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ঈদের পর মাঠে নামবে জনমত নিজেদের অনুকূলে এনে হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে যেসব ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে ‘উপযুক্ত’ জবাব দেয়ার প্রস্তুতি সরকারি দল নিচ্ছে বলে শোনা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এখন দেশে আছেন। তিনি নির্বাচন পর্যন্ত দেশে থেকেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় সাহায্য-সহযোগিতা করবেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি যুবলীগের এক ইফতার পার্টিতে জয় বলেছেন, তার কাছে তথ্য আছে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় আসবে। তার কাছে এ সংক্রান্ত কী তথ্য আসলে আছে, সেটা তিনি বিস্তারিত বলেননি। তবে তার এই আশাবাদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তেমন চাঞ্চল্য দেখা যায়নি।
অন্যদিকে বিএনপির মাঠে নামার লক্ষ্য হচ্ছে, আন্দোলন জোরদার করে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা। বিএনপি ১৮ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়েই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে। তবে এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ১৮ দলভুক্ত অন্য দলগুলোর পক্ষে আন্দোলনে বাড়তি শক্তি জোগানোর ক্ষমতা নেই। তারা কেবল জোটের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখছে। তবে বিএনপি নতুন মিত্র হিসেবে সঙ্গে পাবে হেফাজতে ইসলামকে। হেফাজতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারাও ঈদের পর আবার মাঠে নামবে এবং ১৩ দফা দাবি মানতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ৫ মে শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর হেফাজত আবার সংগঠিত হয়ে তাদের শক্তি দেখাতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।
মাঠে নামার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গী-সাথী আছে বলে মনে হচ্ছে না। ১৪ দলকে সক্রিয় করা এবং তাদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৪ দলভুক্ত একটি ছোট দলের একজন নেতা জানিয়েছেন, ১৪ দলের ঐক্য সুসংহত ও তা সারাদেশে সম্প্রসারণের ব্যাপারে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। আওয়ামী লীগ যখন মনে করে, কেবল তখনই ১৪ দলের বৈঠক আহ্বান করা হয়। তবে ১৪ দলীয় জোটকে সম্প্রসারিত করার জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। গত ২৪ জুলাই ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপির নেতৃত্বে তাদের একটি প্রতিনিধি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করে জোট সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। ১৪ দলের বাইরে থাকা বাম বলয়ের দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য-আলোচনা শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ফলাফল কী দাঁড়াবে সেটা এখনই বলা যায় না। আবার জাতীয় পার্টি এখন মহাজোটে আছে নামেমাত্র। এ দলের কাছ থেকে আওয়ামী লীগের আর সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বেশ কিছুদিন ধরেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রকাশ্য সভা-সমাবেশে মহাজোট ছাড়ার কথা বলে আসছেন। ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ের পর এরশাদ মহাজোট ছাড়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত করেছেন বলেই মনে হয়। ঈদের পর এবং এ সরকারের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগেই এরশাদ মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি এটাও বলেছেন, জাতীয় পার্টি ১৮ দলীয় জোটে যোগ দেবে না। আগামী সংসদ নির্বাচনে এককভাবেই অংশ নেবে জাতীয় পার্টি। অবশ্য মহাজোটে থাকা না থাকা নিয়ে জাতীয় পার্টির মধ্যেও মতভিন্নতা আছে। দলের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশই মহাজোট ছাড়ার পক্ষে হলেও মহাজোটের সঙ্গে থাকার পক্ষেও প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা আছেন। মহাজোটে থাকা না থাকার ইস্যুতে জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন দেখা দিতে পারে বলেও কোনো কোনো পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই খবরের সূত্র ধরে এরশাদ বলেছেন, কারও যদি ‘রাজনৈতিক এতিম’ হওয়ার বাসনা থাকে তাহলে জাতীয় পার্টি ত্যাগ করতে পারেন। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, ঈদের পর মাঠে নামলে আওয়ামী লীগ যে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে পাবে না এটা প্রায় নিশ্চিত। তাহলে এটা বলা যায়, ঈদের পর বিরোধী দলের যে আন্দোলন পরিকল্পনা তা মোকাবেলা করতে হবে আওয়ামী লীগকে একাই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ঈদের পর সত্যি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কি-না? দেশের মানুষ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত আছে কি-না? এখন আন্দোলনের নামে যে ধরনের সহিংসতা চলে, মানুষ তা পছন্দ করে না। গত কমপক্ষে দুটি ঈদের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঈদের পর সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ঈদের পর ‘সর্বশক্তি’ নিয়ে মাঠে নামার কথা গত দুই ঈদের আগেও বিএনপি বলেছিল। সরকারকে তার মেয়াদ পূর্ণ করতে না দেয়ার ঘোষণাও বিএনপি দিয়েছিল। কিন্তু ঈদের পর বিএনপি আন্দোলনের এমন কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি যার জন্য সরকার চাপের মুখে পড়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই এটা মনে করছেন যে, এবারও ঈদের পর সরকারবিরোধী আন্দোলন জমাতে পারবে না বিএনপি। সরকারের মেয়াদ শেষে এসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের আগ্রহী হয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত কারণ দেখা যায় না।
এসব কিছু বিবেচনায় রেখেই ‘নির্দলীয়’ সরকারের দাবি অব্যাহত রেখে বিএনপি বর্তমান সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল নিলেও তারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতিও পুরোপুরিভাবেই রাখছে। আন্দোলন করে যদি নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করা যায় তো ভালো, আর যদি তা শেষ পর্যন্ত না-ই হয়, তাহলেও তারা নির্বাচনের মাঠ আওয়ামী লীগকে ফাঁকা ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ তথা সরকার বিএনপির দাবি মেনে নির্দলীয় কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করবে না- আওয়ামী লীগের বক্তৃতা-বিবৃতি পর্যালোচনা করলে সেটাই মনে হয়। বিএনপি যদিও বলছে, তাদের দাবি না মানলে তারা নির্বাচনে যাবে না, তবে তাদের কথার মধ্যে এখন যথেষ্ট ফাঁক থাকছে বলে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই মনে করছেন। গত ২২ জুলাই এক ইফতার পার্টিতে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার অধীনে নয়।’ স্পষ্টতই বোঝা যায়, বিএনপি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে। এখন তারা নির্দলীয় সরকার নিয়েই দরকষাকষি চালাবে। এই নির্দলীয় সরকার বলতে বিএনপি প্রকৃতপক্ষে কী বোঝাচ্ছে, কিভাবে এই সরকার গঠিত হবে, নির্দলীয় ব্যক্তিদের কোন মাপকাঠিতে এবং কিভাবে চিহ্নিত করা হবে- এসব কিছু পরিষ্কারভাবে জাতির কাছে বিএনপিকেই তুলে ধরতে হবে।
আওয়ামী লীগ যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছে, স্বাভাবিকভাবেই সে সরকারের প্রধান থাকবেন শেখ হাসিনা। কিন্তু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে বিএনপির প্রবল আপত্তি। তাহলে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আর কোনো উপায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হতে পারে কি-না, সেটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছানোর তাগিদ বিভিন্ন মহল থেকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আগে বিএনপিকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তাদের ঝেড়ে কাশতে হবে। কারণ কেউ কেউ এমনও মনে করছেন যে, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা যাই হোক না কেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বিশেষ করে ৫ সিটি নির্বাচনে জয়ের পর নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির মধ্যে যে দোদুল্যমানতা ছিল, এখন তা অনেকটাই দূর হয়েছে। তাদের এখন আস্থা ফিরে এসেছে। বিএনপি গত ৪ বছর সরকারবিরোধী আন্দোলন করে বস্তুত কিছুই অর্জন করতে পারেনি। অথচ ৫ সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং জয়লাভ করে তারা যে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করেছে, তা এককথায় তুলনাহীন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এখন এটা মনে করছেন যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক গত ২২ জুলাই এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, নিজেদের সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে হারবে। এটা যদি তার কথার কথা না হয়, তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হারবে জেনে বিএনপি সে নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে কেন? আর বিএনপি যদি দূরেই থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগ হারবে কার কাছে?
নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রাজপথে থাকার কৌশল বিএনপি সম্ভবত এই কারণেই নিচ্ছে যে, যদি তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে আসে, তাহলে সরকার হয়তো দাবি মানতে বাধ্য হলেও হতে পারে। সরকার আন্দোলনের মুখে দাবি মেনে নিলে বিএনপি নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক খেলায় জিতে যাবে। আর মানুষ যদি বিএনপির আন্দোলনের ডাকে সেভাবে সাড়া না দেয়, তাহলেও বিএনপির কোনো ক্ষতি নেই। আন্দোলনের নামে একের পর এক হরতালের কর্মসূচি দিয়ে তারা জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। এতে মানুষ সরকারের ওপরই ক্ষিপ্ত হবে। সরকার জনপ্রিয়তা হারাবে। ঈদের পর বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন কতটুকু জোরালো করে তুলতে পারবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, আন্দোলন-সংগ্রামে দেশের মানুষের আগ্রহ কম। তাছাড়া আন্দোলনের কোনো অটোসিস্টেম নেই। সুইচ টিপে দিলেই আন্দোলন হয় না। দেশের মানুষের মধ্যে যে আন্দোলনের মনোভাব তীব্র হয়ে উঠেছে, কোনো কিছু থেকেই তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আন্দোলন মানেই এখন ধ্বংস, মৃত্যু, রক্তপাত, সংঘাত, হানাহানি। মানুষ এসব চায় না। মানুষ শান্তি চায়। আর সে জন্যই ভোট দিয়ে তারা সরকার পরিবর্তন করতে চায়। সরকারের প্রতি মানুষের অনাস্থা থাকলেও বিরোধী দলের প্রতি আস্থা আছে- বিষয়টি তেমনও নয়। তারপরও মানুষ নিরুপায় হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলকে ভোট দিয়ে থাকেন। এটা বিরোধী দলের সাফল্য নয়, সরকারের ব্যর্থতা। তবে এবার ঈদের পর আন্দোলনে নামলে বিএনপির জন্য কিছু বোনাস পরিস্থিতি থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক দিনে একাধিকবার বলেছেন, এ সরকারের মেয়াদকালেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কয়েকটি রায় কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে বর্তমান সরকার যাতে কোনো রায় কার্যকর করতে না পারে সে জন্য তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করবে জামায়াত-শিবির। জামায়াত-শিবিরের প্রতিরোধ কতটা হিংস্র ও ভয়াবহ হয়, সেটা গত কয়েক মাসে দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। জামায়াত-শিবিরের প্রস্তুতির পাশাপাশি ঈদের পর মাঠে নামার কথা জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতের আমীর মাওলানা শাহ আহমদ শফী বলেছেন, ‘দেশের আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার যে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে, যে রক্ত ঝরানো হয়েছে, ঈদের পর এর জবাব দেয়া হবে।’ তাদের এই জবাবদান প্রক্রিয়া ৫ মে’র সহিংসতাকে ছাড়িয়ে যাবে কি-না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে আসছে।
দেশের পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে সরকার কী করবে, কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, সেটা নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারের মেয়াদ শেষে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রক্তপাত ঘটালে সেটাও সরকারের জন্য সুখকর হবে না। তবে আওয়ামী লীগ একটি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল। অনেক চড়াই-উতরাই, পতন-অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ বর্তমান অবস্থায় এসেছে। এই দলে এখনও অসংখ্য পোড় খাওয়া নেতাকর্মী আছেন, যারা বিপদ-আপদে দলের জন্য বুক পেতে দেবেন, কিন্তু পিঠ দেখাবেন না। সিটি নির্বাচনের পরাজয়ের গ্লানিতে ধুঁকছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগে আন্দোলনের মুখে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হলে ভোটের আগেই তাদের আরেকটি পরাজয় ঘটবে। সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ ও সরকার ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে কী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে, দেশের মানুষ এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায়।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক

আলোচনা-সমালোচনায় তারেক রহমান by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

মানুষের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। সমালোচনার ঊর্ধ্বে কোনো মানুষ নেই। যে যত বড় মানুষ, তার তত বেশি সমালোচনা। সমালোচনা মানুষকে আরও বিখ্যাত করে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে, বর্তমানে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অতীতেও হয়েছে, বর্তমানেও থেমে নেই। চারদলীয় জোট সরকারের একেবারে শেষের দিকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা হয়েছে। এ সমালোচনায় সত্য-মিথ্যার কোনো বালাই ছিল না, যে যেভাবে পারে সেভাবেই তার সমালোচনা করেছে। একটি সমালোচনার ধরন আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই, ‘চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে তারেক রহমান নাকি শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই ২০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন। অথচ বাস্তবতা হল, বিদ্যুৎ খাতে জোট সরকারের পাঁচ বছরে সর্বমোট বরাদ্দই ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা।’
বিদ্যুতের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে এ সমালোচনাটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় তার প্রতিপক্ষ এবং মানুষ তা বিশ্বাসও করে। কেননা এ সমালোচনার বিপরীতে কোনো প্রতিবাদ তখন ছিল না। কার্যত এ সমালোচনাটির মাধ্যমেই তারেক রহমান জনগণ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এ অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করে মইন-ফখরুদ্দীনের জরুরি সরকার। তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় প্রায় ১৫টি দুর্নীতি মামলা, যার একটিরও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা সম্ভব হয়নি। গ্রেফতার করে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন; এমনকি নির্যাতন চালিয়ে তার মেরুদণ্ডের হাড় পর্যন্ত ভেঙে দেয়া হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি লন্ডনে যান চিকিৎসা নিতে। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন।
তার বিরুদ্ধে সমালোচনা থেমে নেই; চলছে সমান তালে, বিশেষ করে ওই সময়ের ‘হাওয়া ভবন’ নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি করছে তার প্রতিপক্ষ। দীর্ঘ সাত বছরেও যার বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা প্রমাণ তো দূরের কথা অভিযোগ পর্যন্ত গঠন করা সম্ভব হয়নি, তার বিরুদ্ধে নতুন করে সমালোচার কী যুক্তি থাকতে পারে, তা বোধগম্য নয়। এমন সমালোচনা করে কোনো লাভ নেই, যা হিতে বিপরীত হয়। সুতরাং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নতুন করে সমালোচনা তাকে আরও অধিকতর বিখ্যাতই করবে।
যে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির কল্পকাহিনী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল- মানুষ দেখছে সে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চিত্র। লোভশেডিং তো বন্ধ হয়ইনি, তা আরও বেড়েছে। গ্রাহকদের ওই সময়ের চেয়ে আরও চার-পাঁচগুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। এ বর্ধিত বিল দিতে গিয়ে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মানুষ অবলীলায় বলছে, আমরা ওই আমলেই ভালো ছিলাম।
তারেক রহমান একজন আপাদমস্তক রাজনীতিক। তিনি একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় সংগঠক। এটি তিনি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তৃণমূলের মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। তিনি তাদের অতি কাছে গিয়েছেন। তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, যা একজন রাজনীতিবিদের জন্য অপরিহার্য। তিনি যে দল করেন, সে দলের রয়েছে স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস। বাংলাদেশে এ দলটি পাঁচবার সরকার পরিচালনা করেছে। বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো কাজ এ দলটির মাধ্যমেই হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু করা, মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা, এনজিও’র কর্মকাণ্ড তৃণমূলে বিস্তৃত করা, নারীর ক্ষমতায়ন ও হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল পালনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন ও টু-স্ট্রোকচালিত যানবাহন বন্ধ করা ইত্যাদি। এসব যুগান্তকারী কাজের মাধ্যমে তৃণমূলে বিএনপির রয়েছে শক্তিশালী ভিত্তি, যা তারেক রহমানের রাজনীতির জন্য তৈরি করেছে অবারিত সুযোগ। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি তার এ সম্ভাবনা ধূলিসাৎ করারও আশংকা রয়েছে। সার্বক্ষণিক নেতৃত্বে আসার আগে তাকে এসব অপরিহার্য দিক বিচার-বিশ্লেষণ অবশ্যই করতে হবে। কেননা নেতৃত্ব একটি অত্যন্ত কঠিন জিনিস। নেতৃত্বের সম্ভাবনা যার মধ্যে বিদ্যমান, তার সঙ্গে স্রষ্টার নৈকট্য আছে। ভুল-ত্র“টি এক সময় মানুষের হয়, এ ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই মানুষ পরিশুদ্ধ হয়। নিজের ভেতরে থাকা নেতিবাচক দিকগুলো যিনি চিহ্নিত করতে পারেন- বিখ্যাত মানুষ হতে তার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় না।
ন্যায় ও সত্যের পথ অনুসরণ করতে জনগণকে উৎসাহ প্রদান এবং পরিবর্তন আনয়নে অনুঘটক হওয়ার ক্ষমতাই হচ্ছে সত্যিকারের নেতৃত্ব। কাজেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃতি হতে হবে উদারনৈতিক, সংকীর্ণমনা নয়। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিত্ব হতে হবে সৃজনমুখী; হতে হবে সংবেদনশীল, কঠোরমনা নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে জনগণের আমানত হিসেবে গণ্য করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের প্রভাব, বৈভব বা প্রতিপত্তি অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না।
নেতৃত্বের বিভাজন প্রত্যেক দেশেই আছে, আছে আদর্শগত বিরোধও। তাই বলে কি অহেতুক সমালোচনা করে একে অপরকে ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠতে হবে? নেতৃত্বকে কলুষিত করা মানে রাষ্ট্রকে বিপন্ন করা। কেননা নেতৃত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ওতপ্রোত। অহেতুক সমালোচনার প্রভাবে গোটা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় । কাজেই অহেতুক সমালোচনার আÍঘাতী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনীতিকে তার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিতে হবে।
যারা বাংলাদেশ শাসন করার ইচ্ছা রাখেন তাদের একটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে; ‘স্ট্র্যাটেজিক’ কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন অপরিসীম। কেননা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ২৫০ কোটি মানুষের বসবাস। আগামী দিনের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ঘিরে। আর বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ রয়েছে। তাই শিল্পোন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ; এখানে একটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নিরন্তন প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে পক্ষে রাখতে না পারলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে যে পিছিয়ে পড়তে হবে, এটি উন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অনুধাবন করতে পেরেছে। তাই বাংলাদেশে তাদের ব্যাপক তৎপরতার দিকটি প্রতীয়মান হচ্ছে। সমালোচনার মাধ্যমে নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে তৎপর। কাজেই অহেতুক সমালোচনা করে প্রতিহিংসার জন্ম দেয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমীচীন নয়। তাতে অবধারিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও জনগণ। কাজেই এখন ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা রাজনীতিকদের জন্য অপরিহার্য।
আমরা প্রায়ই শুনি, ক্ষমতা দূষিত করে। একথা সত্য নয়, ক্ষমতা তাদেরই দূষিত করতে পারে, যারা দূষণযোগ্য। সৎ লোকের হাতে ক্ষমতা আশীর্বাদস্বরূপ, আর অধার্মিকের হাতে তা অভিশাপ। বিশ্বাসঘাতক, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ এবং প্রতারক লোকেরাই দুর্নীতি ডেকে আনে। সুতরাং নেতৃত্বের সংস্পর্শে যাতে এসব দোষী মানুষ ঘোরাঘুরি করতে না পারে সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য। কিছু খারাপ মানুষের জন্য তারেক রহমান ও বিএনপিকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারলেই এই চড়া মূল্য দেয়ার সার্থকতা থাকবে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

টিকফা প্রসঙ্গে কিছু কথা by তারেক শামসুর রেহমান

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মজিনা বলেছেন, আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে টিকফা স্বাক্ষরিত হবে। টিকফা বা Trade and Investment Co-operation Frame work Agreement (TICFA) নিয়ে বাংলাদেশে নানা মত আছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে যেমনি একটি মত আছে, ঠিক তেমনি একটি বিপক্ষ মতও আছে। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা এরই মধ্যে চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। তবে মজার কথা, টিকফার বিষয়বস্তু এখন অব্দি উপস্থাপন করা হয়নি, এমনকি সংসদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়বে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদেরও টিকফার ব্যাপারে আশাবাদী। সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশাও ব্যক্ত করা হয়েছে, টিকফা স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবে। বলা ভালো যুক্তরাষ্ট্র অতিসম্প্রতি কিছু পণ্যের যে শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি) বাংলাদেশকে দিত, তা স্থগিত করেছে। স্থগিত হওয়ার পেছনে মূল কারণটি ছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমমান নিশ্চিত করার ব্যর্থতা। এমনকি আশুলিয়ায় শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারা, তৈরি পোশাক শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা না করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট ছিল। ফলে একপর্যায়ে কংগ্রেস সদস্যদের চাপের মুখে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে যায়। এখন বাংলাদেশ সরকারের একটা উদ্দেশ্য হতে পারে, টিকফা স্বাক্ষর করলে হয়তো বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবে। প্রকৃতপক্ষে এর সঙ্গে টিকফার কোনো যোগসূত্র নেই।
দ্বিতীয় আরেকটি যে বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেলেও তাতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি বাড়বে না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা চেয়ে আসছিল। কিন্তু তৈরি পোশাকে আমাদের কোনো জিএসপি সুবিধা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার হচ্ছে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মাঝে মাত্র ০.৫ ভাগ পণ্য এ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। এর পরিমাণ মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার কর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখনও তার পণ্য নিয়ে টিকে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় যেসব বাংলাদেশী পণ্যে, তার মাঝে রয়েছে- তামাক, সিরামিক, ফার্নিচার, প্লাস্টিক, খেলনা ইত্যাদি। এর খুব কম পণ্যই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে। গার্মেন্ট বা তৈরি পোশাকে বাংলাদেশী রফতানিকারকরা শতকরা ১৫ ভাগ হারে শুল্ক পরিশোধ করে বাজার ধরে রেখেছে। অথচ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা চুক্তি অনুযায়ী একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে তার পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা দিচ্ছে না। এ সুবিধা উন্নত রাষ্ট্রগুলো পায়। তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দোহা চুক্তি লংঘন করেছে। সুতরাং তৈরি পোশাকে আমরা যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা না পাই, তাহলে এ জিএসপি সুবিধা রফতানির ক্ষেত্রে কোনো বড় অবদান রাখতে পারবে না। আজ যদি জিএসপি সুবিধার আশ্বাসে আমরা টিকফা স্বাক্ষর করি, তাতে আমাদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। টিকফার সঙ্গে তাই জিএসপি সুবিধাকে মেলানো যাবে না। জিএসপি সুবিধা একটি ভিন্ন বিষয়।
এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে টিকফা করে আমরা কতটুকু উপকৃত হব। টিকফা স্বাক্ষরিত হলে দেশে মার্কিনি বিনিয়োগ বাড়বে, এটা সত্য কথা। এতে করে আমাদের বাজার, সেবা খাত উন্মুক্ত হয়ে যাবে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য। ব্যাপক প্রাইভেটাইজেশন ঘটবে, তাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যক্তিগত খাত। টিকফার (প্রস্তাবিত) ৫ ও ১৯ ধারা মতে উভয় দেশ (বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র) বাণিজ্যে বেশ নমনীয় নীতি গ্রহণ বাড়াবে এবং ব্যাপক বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে। ৮নং ধারায় ব্যাপক ব্যক্তিগত খাত প্রসারের কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কমিশন গঠন করার কথাও আছে। এদের কাজ হবে ব্যক্তিগত খাত কীভাবে আরও বিকশিত করা যায়, সে ব্যাপারে উভয় সরকারকে উপদেশ দেয়া। ৯নং ধারায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে। কিন্তু উৎপাদন খাতে জড়াবে না। অর্থাৎ কোনো পণ্য উৎপাদন করবে না। এখানে সমস্যা হবে অনেক। এক. যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে (বিশেষ করে সেবা খাতে) এবং এসব কোম্পানিকে ট্যাক্স সুবিধা দিতে হবে। আইনে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশকে সেই আইন সংশোধন করতে হবে। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা মার খাবে। তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। দুই. চুক্তির ফলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য থাকবে। জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর ব্যবহার, টেলিকমিউনিকেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিল্প খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে, শিক্ষা খাত পণ্যে পরিণত হবে। বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। উচ্চশিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এতে করে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। যারা ধনী, তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে, আর যারা গরিব তারা শিক্ষা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।
একই কথা প্রযোজ্য স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্য খাতে খরচ বেড়ে যাবে। এসব সেবামূলক খাত থেকে সাধারণ মানুষ যে ‘সেবা’ পেত, তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসবে। সেবার জন্য সাধারণ মানুষকে তখন বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ গ্রাহককে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস কিনতে হবে। সরকারি ভর্তুকির কোনো সুযোগ থাকবে না। তিন. সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকবে কৃষি ও আইটি সেক্টর। কৃষিতে যে সরকার ভর্তুকি দেয়, তা আর দিতে পারবে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা চুক্তিতে বলা হয়েছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলো কৃষিতে ৫ ভাগের বেশি ভর্তুকি দিতে পারবে না। টিকফার ১৮নং ধারায় বলা হয়েছে, কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে হবে। মজার ব্যাপার যুক্তরাষ্ট্র নিজে কৃষিতে ভর্তুকি দেয় ৯ ভাগ। এখন বাংলাদেশে কৃষি সেক্টরে ভর্তুকি কমানো হলে কৃষিতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। ফলে কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে চাল উৎপাদন হ্রাস পাবে। বাংলাদেশকে এসব চাল আমদানি করতে হয় না। কিন্তু উৎপাদন হ্রাস পেলে মার্কিন কৃষি পণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে বাংলাদেশে। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা গম ও চাল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, তাদের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে বাংলাদেশে। চার. বলা হচ্ছে টিকফা হলে বাংলাদেশের রফতানি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রফতানি বৃদ্ধি পাওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা অত্যন্ত উচ্চ কর দিয়ে (১৫ দশমিক ৩ ভাগ) বাংলাদেশ তার রফতানি বাজার সম্প্রসারিত করেছে। অথচ চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের চেয়ে কম কর দেয়, মাত্র শতকরা ৩ ভাগ। অথচ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো টিকফা নেই। পাঁচ. বাংলাদেশ বড় সমস্যায় পড়বে মেধাস্বত্ব আইন নিয়ে। টিকফা চুক্তি কার্যকর হলে এ মেধাস্বত্ব আইনের শক্ত প্রয়োগে হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর, ওষুধ শিল্প ও কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা। কৃষক আর বীজ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বীজ কিনতে বাধ্য করা হবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এক সময় জিম্মি করে ফেলবে আমাদের কৃষি সেক্টরকে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প উন্নয়নশীল দেশে নাম করলেও টিকফার পর এ শিল্প এক ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে। কেননা ওষুধ কোম্পানিগুলো প্যাটোট কিনে কাঁচামাল আমদানি করে সস্তায় ওষুধ তৈরি করে। বিশ্বের ৬০টি দেশে এ ওষুধ রফতানি হয়। এখন এ টিকফার ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্যাটোট ক্রয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য এ সুযোগটি রয়েছে। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে মার্কিন কোম্পানির লাইসেন্স কিনতে হবে। এ লাইসেন্স দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে হবে। ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ওষুধ ক্রয় করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের কম্পিউটার সফটওয়্যার শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কেননা এখন স্বল্পমূল্যে খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে কম্পিউটার এ দেশেই সংযোজিত হয়। ফলে কম্পিউটারের দাম একটা ক্রয় সীমার মধ্যে আছে। কিন্তু টিকফার বাধ্যবাধকতার কারণে এ ‘ক্লোন কম্পিউটার’ আমদানি বা সংযোজন বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশকে তখন ব্র্যান্ড কম্পিউটার আমদানি করতে হবে, যার মূল্য গিয়ে দাঁড়াবে অনেক। সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে তা চলে যাবে। বাংলাদেশ যে ‘ডিজিটাল যুগের’ কথা বলছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে তখন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে টিকফা করে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলো এলে তাতে বাংলাদেশে ‘সেবার’ মান বাড়বে। সেবা সেক্টরে নিয়ম শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় তাতে সেবার মান বাড়বে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু এ ‘সেবার’ জন্য অনেক অর্থ ব্যয় হবে। শিক্ষা খাতে মার্কিনি পুঁজি বিনিয়োগ হলে শিক্ষার মান উন্নত হবে। যারা সার্টিফিকেট বিক্রি করে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারব। ক্ষতি হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এখানে সরকারের বিনিয়োগ কমবে। এ ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়িয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য হয়তো হবে না। কিন্তু মেধাবী ছাত্রদের জন্য তা সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। তাদের বৃত্তির সংখ্যা বাড়বে। মেধার মূল্য হবে। এখন যেভাবে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হয়, তখন তা আর থাকবে না।
টিকফা স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র গত এক যুগ আগেই বাংলাদেশকে এ চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এটা সত্য যে বাংলাদেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র টিকফা করছে না, পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টিকফা রয়েছে। ভারত, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার মতো উঠতি অর্থনৈতিক শক্তির দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের চুক্তি রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের আগে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে কতটুকু শক্তিশালী করতে পেরেছে আমরা তা জানি না। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাংলাদেশ ‘নেগোসিয়েশনস’-এ কখনও সাফল্য দেখাতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে টিকফা নিয়ে আলোচনায় বিভিন্ন প্রশ্নে বাংলাদেশ তার স্বার্থ কতটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে, আমরা তা জানি না। আগামী দিনগুলোই এর প্রমাণ করবে। তবে একটা জিনিস নিশ্চিত করেই বলা যায় আর তা হচ্ছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ যদি এ চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে করে সম্পর্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষীণ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে দেখে। এজন্য জিএসপি সুবিধা প্রাপ্তি কিংবা গার্মেন্ট শিল্পের পরিস্থিতির সঙ্গে টিকফাকে মেলানো যাবে না। এটা একটি ভিন্ন ইস্যু।
টিকফার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, বিনিয়োগের গ্যারান্টি ও নিরাপত্তা, মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ, শ্রমমান বাড়ানোর প্রশ্ন। এ চুক্তিতে জিএসপি সুবিধার প্রশ্নটি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্লাটা এতে ভারি। বাংলাদেশের প্রাপ্তি এতে কম। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় প্রতিটি দেশের সঙ্গেই এ ধরনের চুক্তি করেছে। এখন বাংলাদেশের সঙ্গেও করল।
নিউইয়র্ক, ২৪ জুলাই, ২০১৩
ড. তারেক শামসুর রেহমান :
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়