Showing posts with label গল্পালোচনা. Show all posts
Showing posts with label গল্পালোচনা. Show all posts

Friday, April 3, 2026

‘মশা মারতে কামান দাগা’ কথাটি যেভাবে এল by মাহবুব আলম

সে অনেক আগের ঘটনা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর ইংরেজরা লর্ড ক্লাইভকে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনে যান। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী একবার তাঁরা কলকাতা পরিদর্শনে আসেন। লর্ডের আগমন উপলক্ষে আলাদা প্যান্ডেল বানানোর পাশাপাশি উঁচু সিংহাসনের মতো কিছু চেয়ারও বসানো হয়। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে লর্ড ক্লাইভ যখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখনই হামলা শুরু হয় তাঁর ওপর।

না! মানে বাংলার কেউ হামলা করেনি; করেছে মশা! একটি নয়, দুটি নয়, হাজার হাজার মশার অতর্কিতে আক্রমণ। এমন আক্রমণে দিশাহারা হয়ে স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে কথা বলতে শুরু করেন লর্ড ক্লাইভ।

‘আই উইল ডেস্ট্রয় বেঙ্গল, সরি, প্রোটেক্ট বেঙ্গল অ্যাট অ্যানি কস্ট। ফর গডস সেক, সামওয়ান প্লিজ ব্রিং সাম গানস অ্যান্ড শুট দিস মসকিউটোস।’

অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজরা ওখানেই অনুষ্ঠান শেষ করেন। তবে ঘটনাস্থল থেকে লর্ড ক্লাইভসহ অন্যদের ওপর আক্রমণকারী তিনটি মশাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান তাঁরা।

ইংরেজ শাসকদের কামড়ানোর অপরাধে বন্দী করা হয় এই তিন মশাকে। পরদিন তাদের আদালতে উপস্থিত করা হলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে কী হয়, এ নিয়ে মশা তিনটির কোনো ধারণাই ছিল না। কারণ, এর আগে কামড়ানোর অপরাধে মানুষের চড়থাপ্পড় খেলেও কখনো রিমান্ডের খপ্পরে তারা পড়েনি। ছিদ্রহীন নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় একটা ছোট রুমে রাখা হলো তাদের।

‘দোস্ত, আমরা কাকে কামড়ালাম যে আমাদের এভাবে ধরে নিয়ে এল?’ প্রথম মশা বলল।

‘মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিকে কামড়েছি। দেখিসনি, রক্তটা একটু ভিন্ন স্বাদের ছিল।’ দ্বিতীয় মশার জবাব।

‘ওটা রক্ত ছিল? ধুর শ্লা, আমি আরও ভাবছিলাম বাঙ্গির জুস খাচ্ছি। একদমই পানসে।’ তৃতীয় মশার গলায় হতাশার সুর।

পরদিন মস্ত বড় গোঁফ নিয়ে ইংরেজ জেলার আসেন মশাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে।

‘ইউ টাইনি ব্লাড সাকারস, হাউ ডেয়ার ইউ বাইট আওয়ার লর্ড?’দাঁত কটমট করে জানতে চাইলেন জেলার।

‘দুঃখিত মশাই, আমরা সবাই বাংলা মিডিয়ামের মশা। ইংরেজি বুঝি না। বাংলার ব্যবস্থা করেন।’

মশাদের উত্তর বুঝতে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলা অনুবাদক হিসেবে ইংরেজদের প্রিয় ব্যক্তি মীর জাফরকে নিয়ে আসা হলো। মীর জাফরের মাধ্যমেই চলল জিজ্ঞাসাবাদ।

‘লর্ড ক্লাইভকে কামড়ানোর দায়ে যে তোদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা ফাঁসি হতে পারে, সেটা তোরা জানিস?’ জানতে চাইলেন জেলার।

‘খাওয়ার মধ্যে তো শুধু একটু রক্তই খাই। আপনাদের মতো তো আর যা পাই তা-ই চিবাই না। সেই সামান্য খাবারের দায়েও ফাঁসি? এ তো দেখছি রীতিমতো অন্নপাপ! বাপরে বাপ!’ সমস্বরে দুই মশা বলে উঠল।

‘চুপ করো। তোমরা স্যারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়েছ। এর জন্য শাস্তি অবধারিত।’

‘আপনারা যে কয়েল জ্বালিয়ে, স্প্রে ছিটিয়ে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটান, সেটার দায়ে আমরা কখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেছি? এই তো সেদিন আমার গার্লফ্রেন্ড এডিসকে নিয়ে নর্দমায় বসে একটু একান্তে সময় কাটাচ্ছিলাম। কোথা থেকে কে যেন এসে স্প্রে মেরে দিল। স্প্রের আঘাতে আমার গার্লফ্রেন্ডের একটা ডানা গেল ভেঙে। কী দরকার ছিল আপনাদের ওকে ডানাকাটা পরি বানিয়ে দেওয়ার? কই, এর জন্য তো আমি আপনাদের কাউকে গ্রেপ্তার করিনি, কারও বিরুদ্ধে মামলাও করিনি।’ প্রথম মশা জবাব দিল।

‘যত বড় হুল নয় তত বড় কথা! চুপ থাকো, বেয়াদব কোথাকার।’ রেগে গেলেন জেলার।

‘শাস্তি যদি দিতেই হয়, তাহলে আমরা যা করেছি, সেই একই কাজ লর্ডকেও করতে বলুন। বলুন আমাদের কামড় দিতে। তাহলেই সমান সমান হয়ে যায়।’ দ্বিতীয় মশা প্রস্তাব দিল।

এমন সময় লর্ড ক্লাইভের আগমন ঘটল।

‘বাহ্, এমন প্রস্তাবের তারিফ না করে আর পারছি না। সেনাপতি, এদের নিয়ে আর নাটক করা লাগবে না। এখনই আমার ছেলের কাছ থেকে স্টিলের রুলারটা নিয়ে আসো। রুলার দিয়ে চটাস করে বাড়ি দিয়ে ওদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করো। এক্ষুনি!’ আদেশ দিলেন ক্লাইভ।

‘স্যার, এত চুপচাপ, বিনে পয়সায় মশা মেরে ফেললে চলবে?’ কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন সেনাপতি। ‘এসব কাজে বড়সড় একটা প্রকল্প হাতে না নিলে হয়? প্রকল্প হবে, কথাবার্তা হবে, হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা খরচ হবে…মোট কথা আওয়াজ হতে হবে। তবেই না লোকজন জানবে, লর্ড একটা কিছু করছেন…।’

সেনাপতির কথা শুনে লর্ড ক্লাইভের বুদ্ধির বাতি জ্বলে উঠল। তুড়ি দিয়ে তিনি বললেন, ‘স্পিকিং অব আওয়াজ…আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। মশাগুলোর ওপর কামানের গোলা ছুড়লে কেমন হয়? মশা মরবে। আবার আওয়াজও হবে।’

পরদিন ঢাকঢোল পিটিয়ে কামানের মাথায় মশা দুটিকে বেঁধে কয়েক রাউন্ড গোলা ফুটিয়ে দেওয়া হলো। আশ্চর্য! একটা মশাও মরল না। বরং কামানের গোলায় বসে কোনো প্রকার ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই মশাগুলো আছড়ে পড়ল এসে বাংলাদেশে!

এভাবেই এই ‘অর্ধেক পাখি, অর্ধেক পোকা’ প্রাণীটির আগমন ঘটে ঢাকায়। সেই থেকে শুরু করে আজ ২৬৭ বছর পর এক বিশাল রাজ্যের অধিকারী এরা। কামড়ানোর দায়ে একসময় যাদের জেলে পাঠানো হতো, তারাই এখন মানুষকে কামড়িয়ে হাসপাতালে পাঠায়!

‘মশা মারতে কামান দাগা’ কথাটি যেভাবে এল

Thursday, April 24, 2025

রম্যকথন: আওয়াম থেকে আম, আ–আমের দলবাজি by সারফুদ্দিন আহমেদ

নামে কী যায় আসে—সব জায়গায় এই কথা চলে না। রাজনীতিতে তো চলেই না। রাজনীতিতে নামে যায় আসে। কারণ ‘নামের আমি নামের তুমি নাম দিয়ে যায় চেনা’। রাজনীতিতে নামের যে কত দাম, তা আমের মৌসুম শুরুর আগেই ‘আম’ নিয়ে ‘আমজনতার দল’ আর ‘আ-আমজনতা পার্টি’র ঝগড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে।

নুরুল হকের ‘গণ অধিকার পরিষদ’ থেকে বেরিয়ে মিয়া মশিউজ্জামান আর মো. তারেক রহমান যে নতুন পার্টি খুলেছেন, তার নাম ‘আমজনতার দল’। এর মধ্যে টাকা পাচার আর ট্রি প্লান্টেশন দুর্নীতি মামলায় জেলে খেটে বের হওয়া ডেসটিনি গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ‘আমজনতা’র আগে ‘আ’ জুড়ে দিয়ে ‘বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি’ খুলেছেন।

এতে ‘অরিজিনাল’ আমজনতা পার্টি ডার্টি পলিটিকসের গন্ধ পেয়ে নির্বাচন কমিশনের সালিসে নালিশ করেছে। তারা বলছে, ‘আম’ আর ‘আ-আম’ লিখলে আলাদা দেখায়, কিন্তু বললে শোনায় একই রকম। সুতরাং রফিকুল আমীনের দলকে যেন এই নামে নিবন্ধন দেওয়া না হয়। তাদের দাবি, যেহেতু তারা ‘আমজনতার দল’ নামটি আগেই ছালাবন্দী করেছে, সেহেতু আম এবং ছালা দুটোই তাদের।

৫ আগস্টের ঝড়ে যেহেতু বহু বক পড়েছে, সেহেতু কিছু ফকিরের কেরামতি বাড়ারই কথা। অভ্যুত্থানের ঝড়ের তোড়ে আদি ও আসল ‘আম’ ওরফে ‘আওয়াম’ ওরফে ‘আওয়ামী’ বৃক্ষ উড়ে গেছে। সেই বৃক্ষের ছায়াপুষ্ট গাছপালারও ডালপালা ভেঙেছে। কিন্তু মাটির সাথে ঘাপটি মারা ঘাসপাতার কিছু হয়নি।

৫ আগস্টের ঝড়ে শুধু বাতাস ছিল না; বৃষ্টিও ছিল। সেই বৃষ্টিতে দেড় যুগের খরাপীড়িত রাজনীতির খটখটে মাঠে জো এসেছে। ভেজা মাঠে এখন রাজনৈতিক দলরূপী নতুন নতুন ঘাসপাতা ও গাছগাছড়া গজাতে শুরু করেছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শর্ত সহজ করার সুপারিশ করেছে। ইসি হয়তো ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ নীতির পথে হাঁটতে চায়। আর তাই দেখে নতুন নতুন ফুল গাছের চারা মাথা উঁচু করছে। তবে চারাগুলোর নামের মধ্যেই যে ভাব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, এসব ফুলের মধ্যে ধুতরা-আকন্দের বাড়বাড়ন্ত বেশি। চামেলি, গোলাপের আলাপ প্রলাপের মতো মনে হচ্ছে।

এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল আছে ৫০টি। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫টি দল নিবন্ধন পাওয়ার আরজি জানিয়েছে। এর বাইরে আরও ৪৬টি দল নিবন্ধনের আবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। মানে, দেড় শতাধিক দল আমজনতার সেবায় দাঁড়িয়েছে। আর এই দলগুলোর ৯৯ শতাংশের মোটের ওপর যা আছে, তা হলো একটি নাম। নামসর্বস্ব এই দলগুলোর নেতা কারা, কেন তঁারা রাজনীতিতে আসতে চান, সে এক বিরাট প্রশ্ন।

নিবন্ধিত হতে চাওয়া একটি দলের নাম দেখা যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ সংসারবন্দি পার্টি’। রাজনীতির সংসারে এই ধরনের ‘সঙ’-সারসম্পন্ন পলিটিক্যাল পার্টির নাম শুনতে হবে, তা কে কবে ভেবেছে? একইভাবে নিবন্ধন চেয়েছে ‘বাংলাদেশ শান্তির দল’, ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন’, ‘জাতীয় ভূমিহীন পার্টি’, ‘বাংলাদেশ বেকার সমাজ’, ‘বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি’, ‘জনতার কথা বলে’।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবি যখন কোনো কোনো মহল থেকে তোলা হচ্ছে, সেই সময়ে ‘আওয়ামী লিগ’ নামে নিবন্ধন চেয়ে উজ্জ্বল রায় নামের এক লোক আবেদন করে বসেছেন। তবে সে নামটি শেষ পর্যন্ত তালিকায় রাখা হয়নি। এর বাইরে বাংলাদেশ সংরক্ষণশীল দল (বিসিপি), জনতা কংগ্রেস দল, বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণময় পার্টি, বাংলাদেশ মুক্তি ঐক্যদল, বাংলাদেশ জনশক্তি পার্টি—এ ধরনের বহু বাহারি নামের দল আছে।

নিবন্ধন চাওয়া কোনো কোনো দলের নেতা সম্ভবত পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে যাত্রা পার্টির মিল পেয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভেবেছেন, একটা পলিটিক্যাল পার্টি মানে একটা দল; একটা যাত্রা পার্টি মানেও একটা দল। দুই কিসিমের দলেই নানান কিসিমের জনবল থাকে।

যাত্রা পার্টিতে একজন অধিকারী থাকেন। তিনিই কলাকৌশল করে দল চালান। যাত্রা পার্টির কুশীলবদের অভিনয় করতে হয়। পলিটিক্যাল পার্টিতেও একজন বড় নেতা থাকেন। তঁার নিচে মেজ-সেজ-নেতা থাকেন। তাঁদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিনয় করে পাবলিকের মন জয় করতে হয়। অ্যাকটিংয়ের পাশাপাশি পিকেটিং করতে হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, যে পার্টিতে নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, সে পার্টির সঙ্গে কি যাত্রা পার্টির তুলনা চলে?  

ডেসটিনির রফিকুল সাহেব বিবিসি বাংলাকে সরল সোজা মনে বলেছেন, তিনি জেলখানায় ছিলেন। ৫ আগস্টের পর দেখলেন, জেলখানা থেকে অনেক রাজনীতিককে বিনা জামিনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জেলারকে বললেন, ‘আমি তো বহুদিন জেলে, আমাকে ছাড়েন না কেন?’ জেলার তখন তাঁকে বললেন, ‘আপনি তো রাজনীতিক না, আপনি যদি রাজনীতিক হতেন, তাহলে ছেড়ে দিতাম। আপনি যদি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের লোক হতেন, তাহলেও ছেড়ে দিতাম।’

জেলারের এই বাণীই কি রফিকুল আমীন সাহেবকে রাজনৈতিক দল খুলতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে? রফিকুলের মতো অনেকেই জানেন, একটি রাজনৈতিক দল মানে একটি ঢাল। সে নামসর্বস্ব হোক আর কামসর্বস্ব হোক।

নিবন্ধন দেওয়ার সময় ইসিকে এই সত্য বুঝতে হবে।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

sarfuddin2003@gmail.com

আওয়াম থেকে আম, আ–আমের দলবাজি

Thursday, February 8, 2024

আহমদ ছফার অপ্রকাশিত গল্প- ঝরনায় আত্মপ্রতিকৃতি অবলোকন

আমি একটি গল্প বলব। নিজে বানাইনি। অন্যের মুখ থেকে শোনা। অপরের মাল নিজের নামে চালাচ্ছি, সে জন্য আমার এতটুকুও ভয় নেই। যাঁর কাছে গল্পটি শুনেছিলাম, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়েছেন। আমি মোনাজাত করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।

যাঁর কাছ থেকে শুনেছি, ভদ্রলোক বেঁচে থাকলে এমন অবলীলায় গল্পটি বিবৃত করার দুঃসাহস আমার কস্মিনকালেও হতো না। নিশ্চয়ই তিনি আমাকে তঞ্চকতার দায়ে অভিযুক্ত করতেন। আর তিনি ছিলেন এমন এক জাঁদরেল ব্যক্তিত্ব, তাঁর মুখনিঃসৃত সামান্যতম অপবাদও আমার মতো একজন লেখক যশঃপ্রার্থীর সমস্ত সুনাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

ভদ্রলোক আমার গুরুস্থানীয় ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে আমি জীবনে অনেক কিছু শিখেছি। অন্য অনেক কিছুর মধ্যে তিনি আমাকে গুরুমারা বিদ্যেটিও ভালোভাবে শিখিয়েছিলেন। হয়তো এ বিদ্যেটি তিনিও তাঁর গুরুর কাছ থেকে শিখেছিলেন। তিনি যে এই নশ্বর দুনিয়াতে দেহ ধারণ করছেন না, এই কথাটি চিন্তা করে আমি অন্তরে একটা নির্মল আনন্দ অনুভব করছি। তিনি বেঁচে থাকলে এমন নিঃসংকোচে আমি গল্পটি প্রকাশ করতে পারতাম না। মনের কোণে একটা খুঁতখুঁতানি লেগে থাকত।

তিনি যখন বেঁচে নেই, গল্পটি যদি আমার বলে দাবি করি, কেউ আপত্তি উত্থাপন করবে, এমন মনে করিনে। গল্প যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বর্ণনা করতে পারে, লোকে তাকেই গল্পকার ধরে নেয়। সুতরাং ভাষা ও কল্পনাশক্তি প্রয়োগ করে গল্পটি নতুন করে বলার কষ্ট যেহেতু আমি স্বীকার করেছি, সুতরাং গল্পটি আঁশে-শাঁসে আমার হয়ে গিয়েছে। একটা কথা তো সত্যি, জগতে গল্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়। মানুষ নতুন রঙে রাঙিয়ে নতুন করে বলে সংখ্যা বাড়ায় মাত্র।

তবু আমার মনে একটুখানি সংকোচ ছিল। যদি আমার গুরুস্থানীয় ব্যক্তির কলত্র-পুত্রেরাগল্পের মালিকানা নিয়ে আমার সঙ্গে কোনো ধরনের বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হতেন, আমার কিছুটা অসুবিধে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে আশঙ্কার বিন্দুমাত্র কারণও নেই। ভদ্রলোকের পুত্র, কলত্র এবং দুহিতাদের আমি বিলক্ষণ চিনি। তাঁদের সঙ্গে সপ্তাহে অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরা গল্পের মালিকানা নিয়ে কোনো কথা তুলবেন, আমার আদৌ মনে হয় না।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়ের সংখ্যা অনেক। স্ত্রীটিরও যথেষ্ট সামাজিক দুর্নাম আছে। আর ভদ্রলোক আল্লাহ গাফুরুর রাহিমের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাওয়ার সময় অনেক বিষয়-সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন। নিষ্কর্মা পুত্রের বাথানে দুশ্চরিত্রা কন্যার দল এবং খাণ্ডারনি পত্নী সম্পত্তির অধিকার নিয়ে এত মশগুল হয়ে পড়েছেন যে পিতা বা স্বামীর বায়বীয় বস্তুর মালিকানা দাবি করার মতো শিক্ষা, রুচি কিংবা সময় কোনোটাই তাঁদের নেই। এই লেখাটি লেখার সময় বুকের মধ্যে একটা দীর্ঘনিশ্বাস চাপা দিলাম। আমার গুরুস্থানীয় ব্যক্তিটির মধ্যে যত খারাপ জিনিস ছিল, সব পুত্র-কন্যার আবদারে নির্গত হয়ে আমাদের পাড়াটির শান্তি নাশ করছে। আর ভালো জিনিসগুলো এই ধরনের গল্প উপাখ্যানের আবদার নিয়ে নতুন নতুন গল্প বানিয়েদের হাতে পড়ে তাঁর জীবনের অমর অংশের জয়বার্তা ঘোষণা করছে। তবু আমার একটা সান্ত্বনা আছে। সেটা এই রকম: এই হারামজাদা-হারামজাদিরা হাজার রকম অপচেষ্টা করেও আমার গুরুস্থানীয় ব্যক্তিটির মানবিক মহিমার সবটুকু ধ্বংস করতে পারবে না। অতএব, গুরুর স্বর্গ কামনা করে কাহিনিটি নিজের মুখে বলতে আরম্ভ করি। স্বর্গ কামনা ছাড়া অন্য কোনো জিনিস স্বার্থ ত্যাগ করে যদি সম্প্রদান করতে হতো, আমার বুক বলার জন্য চনমন করলেও গল্প বলার আকাঙ্ক্ষাটি দমিয়ে রাখতাম। স্বর্গ কামনা করতে কোনো পয়সাকড়ি লাগে না, তাই করলাম। এখন আপনারা সসংকোচে গল্পটি শ্রবণ করুন।

একবার এক পশুরাজ সিংহ অপরাহ্ণবেলায় বনপথে ভ্রমণ করছিলেন। আপনাদের মধ্যে যাঁরা এই জঙ্গলসম্রাটের সবিশেষ খবর রাখেন না, তাঁদের একটা প্রয়োজনীয় সংবাদ জানানো উচিত মনে করছি। নইলে আমার গল্পটি বিবৃত করার উদ্দেশ্য মাঠে মারা যাবে। ভরপেটে থাকলে সিংহ কখনো অন্য প্রাণীর ওপর হামলা চালায় না। রুচির এই পরিচ্ছন্নতার জন্য সিংহ পশুদের রাজা। পাঠক ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়বৃন্দ, আপনাদের কাছে আমি রাজা হওয়ার একটি প্রকৃত লক্ষণ তুলে ধরলাম। রাজকীয় রুচি না থাকলে শুধু শক্তি দিয়ে পশুসমাজে রাজা হওয়া চলে না। বাঘের শক্তি সিংহের চেয়ে কম নয়। কিন্তু বাঘের রয়েছে ত্যাঁদড় স্বভাব। সে অপ্রয়োজনে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না এবং চোরাকারবারিদের মতো খাবার মজুতও করে রাখে।

স্বভাবের এই ত্যাঁদড়ামির জন্য বাঘের পশুদের রাজা হওয়া সম্ভব হয়নি। সিংহের স্বভাবে বৈরাগ্য আছে, নির্লিপ্ততা আছে, সেটিই সিংহকে রাজা করেছে। পশুসমাজের এই নিয়ম কিন্তু মনুষ্যসমাজে খাটে না। মনুষ্যসমাজে যারা রাজা হয়ে থাকে, তাদের ত্যাঁদড়-ধূর্ত ইত্যাদি না হলে চলে না।

ধীমান পাঠক-পাঠিকা, এভাবে লক্ষণ বিচার করতে থাকলে আমার পক্ষে গল্পটি বলা সম্ভব হবে না। সুতরাং আমরা সোজাসুজি পশুরাজের সে অপরাহ্ণ-ভ্রমণে চলে আসি।

------দুই.-----

সিংহমশায় আনন্দিত অন্তরে তাঁর রাজ্যপাট পরিদর্শন করে ফিরছিলেন। তখন সূর্য পাটে বসতে যাচ্ছে। এই ধরনের পরিবেশে নিজের প্রসারিত অধিকারের কথা চিন্তা করতে কার না ভালো লাগে। তাই সিংহের মেজাজ শরিফও অত্যন্ত প্রসন্ন ছিল।

বনের উঁচু-নিচু বঙ্কিম-শঙ্কিল পথে যেতে যেতে এক জায়গায় এসে সিংহের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সিংহমশায় দেখেন, অনেক শেয়ালশিশু পাহাড়ের ঢালুতে খেলা করছে। শেয়াল জাতটাকে সিংহমশায় এতই ঘৃণা ও অবজ্ঞা করেন যে আহার্য হিসেবেও তিনি তাদের রসনার অনুপযুক্ত মনে করেন। কিন্তু এই শেয়ালশিশুদের দেখে তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। কেন? আগেই তো বলেছি, সিংহমশায়ের পেটে ক্ষুধা ছিল না। সুতরাং এই কচি বাচ্চাদের শিকার হিসেবে বধ করায় আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনে জাগবে, এটাও অস্বাভাবিক। বিশেষত পেটভরা ক্ষুধার সময়ও সিংহমশায় শেয়াল বধ করতে একধরনের ঘৃণা বোধ করেন। সিংহ যে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন, তার একটি কারণ নিশ্চয়ই আছে। সেটি আমাদের বর্ণনার বিষয়। সিংহমশায় দেখলেন, অগুনতি শেয়ালশিশুর মধ্যে একটি সিংহশিশুও মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সিংহের মনে একটা ধান্ধা লেগে গেল। এটা কেমন করে সম্ভব? শেয়ালশিশুদের ভেতর একটি সিংহের বাচ্চা কেমন করে জুটল, হেতু জানার জন্য সিংহের মন চঞ্চল ও উতলা হয়ে উঠল। তারপর যা ঘটল, একটু কবিতা করে বলি:

‘ইতিউতি চারিদিকে নজর করি চাইল

শেয়ালের পালের মধ্যে সিংহ সান্ধাইল।’

সিংহমশায় যেভাবে কাজটি সারবেন ভেবেছিলেন, সেভাবে হলো না। তাঁকে হুংকার ছাড়তে হলো। মেজাজ তাতাতে হলো। মনে মনে সিংহ তাঁর এই স্বভাবটির জন্য অপ্রস্তুত হলো। তবু আত্মপ্রসাদ পেলে রাজার খাসলত আর গুপ্তচরের খাসলত এক নয়।

যা হোক, সিংহ যখন শেয়ালশিশুর পালের মধ্যে ছুটে এলেন, তার আগেই হুংকার শুনে শেয়ালশিশুরা গর্তের মধ্যে একেবারে সেঁধিয়ে ভয়ে চুপটি মেরে বসে আছে। কেবল সিংহশিশুটি পালাতে না পেরে ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিংহ মনে মনে খুব সন্তুষ্ট হলেন। এত সব শেয়ালছানার মধ্যে বাস করেও সিংহছানাটি শেয়ালশাবকদের ধূর্ত পলায়নপর স্বভাব রপ্ত করতে পারেনি।

সিংহমশায় ঝটিতি সিংহশিশুর কাছে গিয়ে রোষ-কশায়িত নয়নে তাকিয়ে কৈফিয়ত দাবি করে বসলেন, এই বেটা, তুই এখানে শেয়ালছানাদের মাঝখানে কেন? সিংহশিশুটি ভয়ে ভয়ে বলল, রাজামশায়, এই শেয়ালছানারা আমার ভাইবোন। শেয়ালমশায় আমার বাবা, শেয়ালনি আমার মাতৃদেবী। আমি ভাইবোনদের মতো হুক্কাহুয়া ডাক ডাকি। ওই গুহার ভেতর আমার বাড়ি। আমি কোথায় যাব?

সিংহমশায় জবাব শুনে আরও চটে গেলেন। মুখ ভেংচে বললেন, শেয়ালমশায় আমার বাবা, শেয়ালনি আমার মাতৃদেবী, আমি ভাইবোনদের সঙ্গে মিলেমিশে হুক্কাহুয়া ডাক ডাকি। এতগুলো মিছে কথা এত বাচ্চা বয়সে কেমন করে শিখলি?

তখন সিংহশিশুটি আরও ভয় পেয়ে বলল, রাজামশায়, আমার আর বলার কিছু নেই। বাকিটা আপনি বলুন।

সিংহ বললেন, তুই বেটা সিংহশিশু, তোর নখ-দাঁত-কেশর সব আছে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, তুই এই নচ্ছার শেয়ালদের সঙ্গে কী করে জুটলি।

তখন সিংহশিশুটি আরও বিনয় মিশিয়ে বলল, মহারাজ, কাটুন, মারুন, ভক্ষণ করুন, যা ইচ্ছে করুন, আমি শেয়ালছানা বই আর কিছু নই।

সেদিন সিংহমশায়ের আপরাহ্ণিক ভ্রমণটা মাটি হয়ে গেল। তিনি খুব চিন্তিত মনে ডেরায় ফিরে এলেন। তাঁর রাজমস্তকে অস্থিরতাটা একটা বিশেষ কারণে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেটা এই, একটা সিংহশিশু কীভাবে নিজের আত্মপরিচয় বেমালুম ভুলে গিয়ে শেয়ালদের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এই বিষয়টা ভাবতে সিংহটা এত বেশি লজ্জিত ও দুঃখিত বোধ করছিল, জগতের বুক থেকে সমস্ত সিংহ জাতি ধ্বংস হয়ে গেলেও সে পরিমাণ ব্যথা তাঁর জন্মাত না। সে রাতটি পুরো সিংহমশায়ের নির্ঘুম কেটেছে। তাঁর স্বজাতির একটি শিশুর এই বিকৃত স্বভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়া—তার কী দাওয়াই থাকতে পারে? সারা রাত মাথা খেলিয়ে খেলিয়ে সিংহমশাই একটা বুদ্ধি বের করলেন। কদিন পর সিংহমশায় হুংকার-টুংকার না করে শেয়ালছানাদের পাশে চুপি চুপি প্রবেশ করে সিংহশিশুটিকে একেবারে টপ করে মুখে পুরে ছুটতে আরম্ভ করলেন। সংকীর্ণ গিরিখাত পার হয়ে, গর্জনবন পেছনে ফেলে বুনো ঝোপঝাড় বাঁ দিকে রেখে ছুটতে ছুটতে এমন এক জায়গায় চলে এলেন, যেখানে স্বচ্ছ জলের একটা ঝরনা নির্জন গতিতে আপন মনে বয়ে চলেছে। জলে কোনো তরঙ্গ নেই, কুঞ্চন নেই, সমস্ত ঝরনাটা একটা স্বচ্ছ আরশির মতো। সিংহমশায় শেয়ালবাথান থেকে ধরে আনা শিশুটিকে ঝরনার পাড়ে রেখে বললেন, এই ব্যাটা, চোখ খোল এবং ঝরনার দিকে তাকা। ভয়ে ভয়ে সিংহশিশুটি পিটপিটে চোখ মেলে অবাক হয়ে ঝরনার দিকে তাকিয়ে থাকল—যেখানে দুজনের ছায়া প্রতিফলিত হয়েছে।

সিংহটি জিজ্ঞেস করলেন, এই বদমাশ, বল, তোর চোখ, নাক, আকার, আকৃতি, কেশর কার মতো?

শিশুটি ভয়ে ভয়ে বলল, সব তো দেখছি মহারাজ আপনার মতো। তবে আমি খুবই ছোট।

আমিও একদিন ছোট ছিলাম। তবে তুই বললি যে তুই শেয়াল, শেয়ালনি তোর মা, শেয়াল তোর বাপ। কথাটি কি সত্যি?

শিশুটি বলল, একটুখানি গোলে পড়ে গেলাম, মহারাজ। আমার সবটাই দেখছি আপনার মতো। তবু আমি শেয়ালদের মধ্যে ছিলাম। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, এর কারণ কী?

সিংহমশায় খুশি হয়ে বললেন, ব্যাটা, কারণ খুঁজে লাভ নেই। দেখি, আমার সঙ্গে হুংকার ছাড়। তারপর বাচ্চা এবং বুড়ো উভয় সিংহের হুংকারে সমস্ত বনভূমি কেঁপে উঠতে থাকল।

------তিন.-----

নানা রং চড়িয়ে গল্পটি এত দূর বলেও আমার মনের দ্বিধাটি কাটেনি। গল্পটা সম্পূর্ণ আমার হয়ে ওঠেনি। অপরের জিনিস কখনো নিজের হয় না। চৌর্যবৃত্তির অপরাধ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য গল্পটির একটি মানবিক ব্যাখ্যা আমি দাঁড় করিয়েছি। তবে ব্যাখ্যাটি পশুসমূহের ওপর প্রযোজ্য হবে না। মানুষ যদি মানুষ হতে চায়, তাকে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করতে হবে। সংস্কৃতি হলো জাতিগুলোর, গোষ্ঠীগুলোর সেই অচঞ্চল দর্পণ, যাতে নিজের পুরো ছবিটা দেখা যায়। আপনারা যদি আমার ব্যাখ্যাটা গ্রহণ করেন, আমি চৌর্যবৃত্তির দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাই।

১৩ অক্টাবর ১৯৯১, ১৮ পরীবাগ, ঢাকা।
আহমদ ছফা। ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম
  • সংগ্রহ ও ভূমিকা: আয়েশা পারুল
  • আহমদ ছফার সঙ্গে আমার পরিচয় ও সখ্য ১৯৮১ সালের গোড়ার দিকে, আমার স্বামী মহিউদ্দিন বুলবুলের মাধ্যমে। বাংলা একাডেমি তাঁর লেখা বাঙালি মুসলমানের মন বইটি ছাপছে। এর একটি প্রবন্ধ ছিল শিল্পী সুলতানকে নিয়ে—বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা। এর অফ প্রিন্ট নিয়ে বের হলো আড়াই ফর্মার একটি চটি বই। পেপারব্যাক, দাম পাঁচ টাকা। আমি হলাম এর প্রকাশক।
  • ব্যাংককভিত্তিক আঞ্চলিক সংস্থা এশিয়ান কালচারাল ফোরাম অন ডেভেলপমেন্টের (অ্যাকফোড) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলাম আমি। ১৯৯১ সালে এদের জন্য একটা স্যুভেনির বের করার উদ্যোগ নিই। ‘ঝরনায় আত্মপ্রতিকৃতি অবলোকন’ শিরোনামে ছফা ভাই একটা গল্প লিখে দিলেন। মাশুক চৌধুরী আর সোহরাব হাসানও লেখা দিয়েছিলেন। শিবনারায়ণ দাস দিলেন প্রচ্ছদ এঁকে। কিন্তু সেই স্যুভেনিরটি আর বের করা হয়নি। ১৯৯১ সালের ১৩ অক্টোবর লেখা ছফা ভাইয়ের অপ্রকাশিত এই গল্পটি এত দিন সযত্নে আগলে রেখেছিলাম। এখন তা অবমুক্ত হলো। দীর্ঘদিন পর গল্পটি পড়তে গিয়ে মনে হলো, এই সময়ের বাস্তবতায়ও এটি দারুণ প্রাসঙ্গিক।

Monday, January 1, 2024

রম্যকথন: কিছুটা বিলিতিয়ানা, কিছুটা বাঙালিয়ানা by সারফুদ্দিন আহমেদ

বাঙালির বড় কপাল। ফি বছরে তারা দুইবার নববর্ষ পায়। পয়লা বৈশাখে ‘এসো হে বৈশাখ’ আর পয়লা জানুয়ারিতে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’।

আদতে বাঙাল-ঘরের খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্‌যাপনে বাঙালিয়ানার মিশেল আছে। তাই এই উদ্‌যাপন এখনো ঠিক ‘সায়েবি’ হয়ে ওঠেনি।

নিউ ইয়ারে মাই ডিয়ার টাইপের বন্ধু-ইয়ার নিয়ে বিয়ারে বুঁদ হওয়া পশ্চিমের পুরোনো রেওয়াজ। সেই ব্রিটিশ আমলে আমাদের এই অঞ্চলে সাদা সাহেবরা একত্রিংশ রজনী ওরফে থার্টি ফাস্ট নাইটে নাচগানের পার্টিতে মিলিত হতেন। তাঁদের সঙ্গে বাঙালি ‘এলিট’ নরনারীও জুড়তেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ‘ইংরাজি নববর্ষ’ কবিতায় সেই রকমের একটি থার্টি ফার্স্ট নাইট পার্টির বর্ণনা দিয়েছেন: ‘নববর্ষ মহাহর্ষ ইংরাজটোলায়/ দেখে আসি ওরে মন, আয় আয় আয়/ সাহেবের ঘরে ঘরে কারিগুরি নানা।/ ধরিয়াছে টেবিলেতে অপরূপ খানা/ বেরিবেষ্ট সেরিটেষ্ট মেরিরেষ্ট যাতে/ আগে ভাগে দেন গিয়া শ্রীমতীর হাতে।’

সেই পার্টিতে বাঙালি পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি ফুট কেটেছেন: ‘শাড়ী পরা এলোচুল আমাদের মেম/ বেলাক নেটিভ লেডি সেম্, সেম্, সেম্.../ হিপ হিপ হুররে ডাকে হোল ক্লাস/ ডিয়ার ম্যাডাম ইউ টেক দিস গ্লাস/ সুখের সখে খানা হলে সমাধান/ তারা রারা রারা সুমধুর গান।...শেরি চেরি বীর ব্রান্ডি ওই দেখ ভরা/ এক বিন্দু পেটে গেলে ধরা দেখি সরা।’

রবীন্দ্রনাথ ঋষি মানুষ। তিনি পয়লা বৈশাখের সুবহে সাদিকে লিখেছিলেন, ‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন বর্ষ হয় গত!.../ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’

খ্রিষ্টীয় নববর্ষকেও রবি ঠাকুর ঋষিসুলভ চোখে দেখেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো মৌজমাস্তির বর্ণনায় তিনি যাননি। ইংরেজিতে লেখা ‘দ্য নিউ ইয়ার’ কবিতায় নতুন বছরকে উতল হাওয়ার ঝাপটায় বৃন্তচ্যুত ফলের সঙ্গে তুলনা করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘লাইক ফ্রুট, শেকন ফ্রি বাই অ্যান ইমপেশেন্ট উইন্ড/ ফ্রম দ্য ভেল অব ইটস মাদার ফ্লাওয়ার,/ দাউ কামস্ট, নিউ ইয়ার।’

দিন বদলেছে। এই সময়ের নাগরিক পরিসরে, বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের ব্যবহারিক সংজ্ঞা ভিন্ন। হাসপাতাল চত্বরে পর্যন্ত বাজি-পটকার ঠুসঠাস, মহল্লার মোড়ে মোড়ে ধুমধাড়াক্কা মিউজিক, বাইক নিয়ে ভোঁ ভোঁ শব্দে এক শ কিলোমিটার গতিতে দশ-বারোজনের উদ্দাম রেস, ছাদে ছাদে ‘ধুম্মা চালে ধুম্মা চালে ধুম’—এসবই এখানকার নিউ ইয়ারের পিয়ারের অনুষঙ্গ।

এখানে ফি বছর পটকা-বাজি ফুটানোয় পুলিশের যত মানা আসে, তত বেশি বাজি-বোমাবাজির শব্দে নতুন বছরকে ‘বুকে আয় ভাই’ বলে স্বাগত জানায়। এখানে খ্রিষ্টীয় বর্ষের একত্রিংশ রজনীর বাস্তবিক ব্যবহারিক সংজ্ঞা হলো: ‘যে দিবাগত মধ্য রজনীতে বোমাসদৃশ কালীপটকার ব্রহ্মাণ্ডবিদারী নিনাদ ও অযুত আতশবাজির উল্লাসমুখর আলোকোজ্জ্বল আয়োজনে সদ্যাগত খ্রিষ্টীয় বর্ষকে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” ওঙ্কারধ্বনি সহযোগে স্বাগত জানানো হয়, উহাকে থার্টি ফার্স্ট নাইট বলা হইয়া থাকে।’

এসব দেখে এখানকার খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্‌যাপনকে না ‘সাহেবি উৎসব’ বলার জো আছে, না তাকে বাঙালির উৎসব বলা যায়। কিছুটা বিলিতিয়ানা আর কিছুটা বাঙালিয়ানার মিশেলে আমাদের একটি নিজস্ব ঘরানার দো-আঁশলা কায়দায় আমরা নতুন বছরকে বরণ করি।

প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের তরুণ বয়সীদের অনেকে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ কথাটার আক্ষরিক বাংলা মানে না জানলেও জিনিসটা যে কী, তা ভালোই বোঝে।

রাত ১২টা ১ মিনিট হলেই পরস্পরের মধ্যে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলাবলি শুরু হয়। ফেসবুকের পাতা কিংবা টুইটার হ্যান্ডেলে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’খচিত ডিজিটাল স্টিকার সেঁটে দেওয়া হয়। টাইপ করে ভুলভাল বানানে লেখার ঝক্কি এড়াতে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ সংলাপধারী ভার্চ্যুয়াল কার্ড চালাচালি হয়।

তার মানে, এত হইহুল্লোড় ও পটকাবাজির বাইরেও নতুন বছর হাসিখুশিতে কাটানোর একটা প্রত্যাশা ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর মধ্যে গাঢ়ভাবেই মেশানো থাকে। একটা সর্বজনীন শুভ-ইচ্ছার দ্যোতনা তাতে মেশানো থাকে।

সামনের বছর কেমন যাবে, আমরা জানি না। ভোটপরবর্তী জোটনিরপেক্ষ বাংলাদেশ কত দূর এগোবে; মরিচের কেজি আগের বছরের মতো এক হাজার টাকায় উঠবে কি না; ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির মতো স্কুল-কলেজের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কালোবাজারে বিক্রি হবে কি না; আগের বছরের মতো টাকা পাচার হবে কি না—আমরা জানি না। এসব শঙ্কা আছে। ভালো কিছুর সম্ভাবনাও আছে।

নতুন বছরে আমরা সেই শঙ্কা আর সম্ভাবনার দোলাচলে। এর মধ্যেই বলছি, ‘পরানের দোস্ত ইয়ার, হ্যাপি নিউ ইয়ার’।

সারফুদ্দিন আহমেদ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

অলংকরণ: আরাফাত করিম
অলংকরণ: আরাফাত করিম

Friday, April 6, 2012

‘কোপা ওসি’ এবং মুলোর গল্প by মাহবুব মিঠু

কাদেরকে কোপানো ‘কোপা ওসি’ হেলাল উদ্দিনকে জেল হাজতে পাঠাতে দেখে অল্পেতুষ্ট অনেক বাংলাদেশি আনন্দে গদগদ। সাদা চোখে নিরীহ জনগণ ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুলোর ঝাঁঝ একটুও টের পেল না। যে দেশে প্রতিদিন অগণিত অপরাধ সংঘটিত হয় আইন-শৃংখলা বাহিনী হাতে, সেখানে এক ওসিকে জেলে পুরলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ কতোটুকু এগুবে কে জানে!

Tuesday, December 6, 2011

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদঃ ব্ল্যাক ফ্রাইডে by হুমায়ূন আহমেদ

শুক্রবার মুসলমানদের জন্য পবিত্র একটি দিন। খ্রিষ্টানদের রোববার, ইহুদিদের শনিবার। সপ্তাহের তিন দিন, তিন ধর্মাবলম্বীরা নিয়ে বসে আছে। শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলেই কি আমেরিকানরা ‘কালো শুক্রবার’ আবিষ্কার করল? থ্যাংকস গিভিংয়ের রাত থেকেই শুরু এই কালো শুক্রবার।

Thursday, December 1, 2011

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদঃ উবাস্তে ইয়ামা by হুমায়ূন আহমেদ

‘উবাস্তে’র অর্থ ময়লা, ইংরেজিতে গারবেজ। ‘ইয়ামা’ শব্দের অর্থ পর্বত। জাপানি এই শব্দ দুটির অর্থ—যে পর্বতে ময়লা ফেলা হয়। প্রাচীন জাপানের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে লালন-পালন করার সামর্থ্য ছিল না। একটা পর্যায়ে তারা পিঠে করে বাবা-মাকে নিয়ে পর্বতের খাদে ফেলে দিয়ে আসত। সবার কাছে এটাই ছিল স্বাভাবিক। পিঠে চড়া বৃদ্ধ পিতা-মাতার হাতে গাছের একটি ছোট্ট ডাল থাকত। এই ডাল দিয়ে তারা পুত্রের গায়ে আস্তে আস্তে বাড়ি দিত। এই কাজটা তারা কেন করত, তা পরিষ্কার নয়।

Sunday, November 27, 2011

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদঃ তিন ডব্লিউ by হুমায়ূন আহমেদ

কোনো নিউইয়র্কবাসীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আবহাওয়া আজ কেমন যাবে?
সে হতাশ ভঙ্গি করে বলে, তিন ডব্লিউ! তিন ডব্লিউর বিষয়ে কিছু বলা ঈশ্বরের পক্ষেও সম্ভব না।
তিন ডব্লিউ হচ্ছে—

Sunday, November 20, 2011

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদঃ কচ্ছপকাহিনি by হুমায়ূন আহমেদ

প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক গ্রামের দৃশ্যচিত্র। আসরের নামাজ শেষ করে মাদ্রাসার একজন হতদরিদ্র শিক্ষক তাঁর বড় দুই পুত্রকে ডেকে পাঠালেন। তাদের বললেন, আমি হতদরিদ্র, নাদান একজন মানুষ। তোমাদের দুজনকে পড়াশোনা করানোর সাধ্য আমার নাই। আমি একজনকে পড়াশোনা করাব। অন্যজন গৃহস্থি (খেতের কাজ) করবে। তোমরা দুই ভাই আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসো, কে পড়াশোনা করবে, আর কে গৃহস্থি করবে।

Thursday, November 17, 2011

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদঃ বালিশ by হুমায়ূন আহমেদ

মার জন্ম-জেলা নেত্রকোনায় ‘বালিশ’ নামের একধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়। আকৃতি বালিশের মতোই। এক বালিশ সাত-আটজনে মিলে খেতে হয়। নেত্রকোনা শহরের এক মিষ্টির দোকানে বসে আছি। ময়রা থালায় করে বালিশ এনে আমার সামনে রাখল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, একটু মুখে দেন, স্যার। আমি বললাম, যে মিষ্টির নাম বালিশ, সেই মিষ্টি আমি খাই না। আমি লেখক মানুষ। আমার মধ্যে রুচিবোধ আছে।

Sunday, November 13, 2011

হুমায়ূন আহমেদ সুইট সিক্সটি থ্রি by হাসান হাফিজ

বাংলা সাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক কথাকারের কথা বলছি। কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব তিনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান। রসায়নশাস্ত্রে অধ্যাপনা, এন্তার স্বর্ণপ্রসূ লেখালেখি, নাটক-চলচ্চিত্র পরিচালনা, ভেষজ উদ্ভিদ বাগানের উদ্যোক্তা, জাদুশিল্প, দুর্দান্ত আড্ডাবাজি- কতই না বিচিত্র পথের পথিক ৬৩ বছরেরএই তরুণ।

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদঃ বন্ধুবিদায় by হুমায়ূন আহমেদ

৭ বছরের পুরোনো বন্ধু, সুখ ও দুঃখদিনের সঙ্গীকে বিদায় জানিয়েছি। আমাদের বন্ধুত্বকে কেউ সহজভাবে নেয়নি। পারিবারিকভাবে তাকে কুৎসিত অপমান করা হয়েছে। তার পরও বন্ধু আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমেরিকায় এসে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে হলো। হায় রে আমেরিকা! বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, আমি সিগারেট-বন্ধুর কথা বলছি। ৩৭ বছরের সম্পর্ক এক কথায় কীভাবে বাতিল হলো, তা বলার আগে জীবনের প্রথম সিগারেট টানার গল্পটা করা যেতে পারে।

৩৬(!)তম জন্মদিনঃ হ্যাপি বার্থ ডে টু হুমায়ূন ভাই by সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

জ ১৩ নভেম্বর, আজ কাজল ওরফে বাচ্চু’র জন্মদিন। বাবার স্নেহের কাজল আর মায়ের আদরের বাচ্চু আমাদের নেত্রকোনার প্রিয় হুমায়ূন ভাই, যিনি বাংলা ভাষার জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ। আজ তাঁর ৬৩তম জন্মদিন। জন্মদিনে তিনি দেশে নেই,  নিউইয়র্কে। তাই আজ নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝলমলে রোদ। শুধু রোদই নয়, আজ রাতে আমেরিকার আকাশ আলোকিত করবে ফুটফুটে জোছনা।

Tuesday, November 8, 2011

পরী, হুমায়ূন আহমেদ ও ঝরা পালকের স্মৃতি by ইকবাল হাসান

প্রিয় পাঠক, প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি একজন বড় লেখকের কথা বলতে গিয়ে নিজের গল্প দিয়ে শুরু করার জন্যে। গল্পের নাম, দুঃখ কষ্টের গল্প। বাবাকে নিয়ে। মনে পড়ে, সারারাত জেগে, বলা যায়, একটানে গল্পটি লিখেছিলাম, আর লিখেই পরদিন দুপুরে দৈনিক বাংলায় কবি-সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আহসান হাবীবের টেবলের সামনে হাজির।

Saturday, November 5, 2011

নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদ 'কেয়ারগিভার' by হুমায়ূন আহমেদ

‘কেয়ারগিভার’ শব্দটির বাংলা—যে সেবা দান করে। স্লোয়ান-কেটারিংয়ে চিকিৎসা নিতে এসে কেয়ারগিভার শব্দের অর্থ নতুন করে জানলাম। হাসপাতালের কাছে রোগী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার কেয়ারগিভার সে রকমই গুরুত্বপূর্ণ। কেয়ারগিভারের নাম হাসপাতালে তালিকাভুক্ত করা হলো—মেহের আফরোজ শাওন। রোগীর স্ত্রী। চিকিৎসকেরা কেয়ারগিভার ছাড়া আর কারও সঙ্গেই রোগ নিয়ে বা চিকিৎসা নিয়ে কোনো কথা বলবেন না।

Wednesday, November 2, 2011

নো ফ্রি লাঞ্চ by হুমায়ূন আহমেদ

‘নো ফ্রি লাঞ্চ’—একটি আমেরিকান বাক্য। এই বাক্যটা বলে তারা এক ধরনের শ্লাঘা অনুভব করে। তারা সবাইকে জানাতে পছন্দ করে যে তারা কাজের বিনিময়ে খাদ্যে বিশ্বাসী। এই ধরনের বাক্য বাংলা ভাষাতেও আছে—‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’। গায়ে তেল মাখতে হলে কড়ি ফেলতে হবে। আরামের বিনিময়মূল্য লাগবে। যা-ই হোক, ফ্রি লাঞ্চে ফিরে যাই। নো ফ্রি লাঞ্চের দেশে চিকিৎসা করতে ব্যাগ ভর্তি ডলার নিয়ে যেতে হবে, এই তথ্য আমি জানি।

Wednesday, October 26, 2011

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ by হুমায়ূন আহমেদ

পূর্ণেন্দু পত্রীর একটি কবিতার শিরোনাম— ‘ক্রেমলিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’। আমি যেখানে আছি, সেই রেস্টহাউসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার লাইন মনে এল। ঝকঝক করছে রোদ। আকাশ ঘন নীল। জানালার পাশে অচেনা এক বৃক্ষের পাতায়ও রোদের রং লেগেছে। রোদ আমাকে কখনো অভিভূত করে না, আমি বৃষ্টিরাশির জাতক, কিন্তু আজ আকর্ষণ করল। আমি অভিভূত গলায় উচ্চারণ করলাম, নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ!

Sunday, October 2, 2011

পতৌদির নবাবের সঙ্গে কয়েক দিন by ফারুক মঈনউদ্দীন

ট্টগ্রাম বিমানবন্দরে প্লেনের সিঁড়ি দিয়ে যখন নেমে আসছিলেন পতৌদির নবাব, বহু দূর থেকেই আলাদা করা যাচ্ছিল তাঁর নবাবি চেহারা। সাধে কি তাঁর নাম হয়েছে ‘টাইগার পতৌদি’! টারমাকে রিসিভ করে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি নবাবি কেতায় করমর্দন করে ধীর পায়ে সম্ভ্রান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গেলে একটা গাড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে পাকড়াও করে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক লোক। আমার কোষ্ঠি ঠিকুজি টুকে নেওয়ার পর প্রায় ফিসফিস করে অতিথির পরিচয় জানতে চেয়ে ছোট নোটবুকটা বাগিয়ে ধরেন তিনি। এসব জায়গায় নাকি বেশি কথা বলতে নেই, তাই কেবল অতিথির নাম বললে তিনি তাঁর কাছে হিব্রু ভাষার মতো অপরিচিত নামটা যেভাবে উচ্চারণ করলেন, সেটা এখানে উল্লেখ করলে নবাবের বিদেহী আত্মা কষ্ট পেতে পারে।

Tuesday, August 16, 2011

যেভাবে মায়ের মন জয় করল বাবা by গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

মার মা ডাঙ্গর হয়েছে নিরানন্দ দুর্দশার মধ্যে। ওর শৈশব ছিল ম্যালেরিয়া জ্বরের উপদ্রবে দিশেহারা। অবশ্য একবার রেহাই পাওয়ার পর সে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। ওর স্বাস্থ্য কংক্রিট-ঢালাই হয়ে গেল এরপর। নিজের ৯৫তম জন্মদিন যখন সে উদ্যাপন করছে, ওর সঙ্গে তখন নিজের এগারোটি সন্তান, স্বামীর পক্ষের আরও চারজন, নাতি একুনে ৬৬ জন, পুতি ৭৩ জন, পুতির ঘরের ছানা সবে পাঁচ। যাদের কথা কেউ জানে না তাদের হিসাবে ধরা হয়নি। আমার মার নাম ছিল লুইসা সান্তিয়াগো। কলোনেল নিকোলাস মার্কেস ও তার স্ত্রী ইগুআরন কোটসের তৃতীয় কন্যা। ইগুআরনকে আমরা ডাকতাম মিনা। ১৯০৫ সালের ২৫ জুলাই মার জন্ম হলো রানশেরফা নদীর ধারে, কলাম্বিয়ার বারানকাস শহরে। তখন সবে গৃহযুদ্ধের দাপুনি নিভে আসছে।

Saturday, May 14, 2011

গল্প- মাঠরঙ্গ by হুমায়ূন আহমেদ

গুপ্তধন পাওয়ার মতো ব্যাপার ঘটেছে। আমার হাতে বিশ্বকাপের দুটো টিকিট। বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ডের খেলা মাঠে বসে দেখতে পারব। টিকিট দুটি এমপি হিসেবে শাওনের মা পেয়েছেন। তাঁর হাত থেকে ছিনতাই করে নিয়ে নিয়েছে তাঁর ছোট দুই মেয়ে। শাওন দুই বোনের হাত থেকে গোপনে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। চোরের ওপর বাটপারি একেই বলে। আড়াইটার সময় খেলা শুরু হবে, আমরা সাড়ে ১২টার সময় ঘর থেকে বের হলাম। স্টেডিয়ামে ঢুকতে হলে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে, নিরাপত্তা চেকিং, আগেভাগে যাওয়াই ভালো।