Saturday, September 26, 2009

এদেশেরই এক বিপ্লবী: বীরকন্যা প্রীতিলতা -চারদিক by জিন্নাত-উল-ফেরদৌস

বয়স কত? একুশ। পরনে মালকোঁচা ধুতি। মাথায় গৈরিক পাগড়ি, গায়ে লাল ব্যাজ লাগানো শার্ট। ইনিই দলনেতা। এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে হাতবোমা। দলের সদস্যসংখ্যা সাত। সবার পরনে রাবার সোলের কাপড়ের জুতো। সবাই প্রস্তুত। দলনেতার মুখে ‘চার্জ’ শুনতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুর ওপর। তারা তখন ক্লাবে মত্ত নাচ-গানে। পিকরিক অ্যাসিডে তৈরি বোমাটি বর্জ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ল; হলঘরে তখন শুধু ধোঁয়া। দলনেতাই এগিয়ে গেল সবার আগে। অথচ এটাই তার প্রথম অভিযান। বোমার বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, শত্রুর মরণ চিত্কার—সব মিলে এলাকাটা যেন পরিণত হলো এক দক্ষযজ্ঞে!
এটা কোনো অ্যাডভেঞ্চার ফিল্মের দৃশ্য নয়। এটি ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা। আমরা আরও রোমাঞ্চিত হই—যখন জানি, ২১ বছরের সেই দলনেতা পুরুষ বেশে একজন নারী! বাংলাদেশেরই নারী! নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
১৯৩২ সাল। আজ থেকে প্রায় ৭৭ বছর আগে। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই বাঙালি নারী। তত্কালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ‘প্রীতিলতা’। আত্মদান করে প্রমাণ করেছেন, মেয়েরাও পারে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উত্সর্গ করতে।
১৯১১ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার প্রীতিলতার জন্ম। মা প্রতিভা দেবী। বাবার নাম জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি মিউনিসিপ্যালিটির হেড ক্লার্ক। ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন প্রীতিলতা। মা আদর করে ডাকতেন রানী বলে। ছাত্রী হিসেবে ঝলমলে সব রেকর্ড। ১৯২৭ সালে চট্টগ্রামের খাস্তগীর উচ্চবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন এবং ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। পরে কলকাতায় গিয়ে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামে ফিরে নন্দনকানন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পদ গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় যখন দাদা পূর্ণেন্দুর দেওয়া বইয়ে ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসির’ কথা পড়তেন, তখন ভাবতেন এও কি সম্ভব! মনে তাঁর প্রশ্ন জাগে, আমরা মেয়েরা কি এঁদের মতো হতে পারি না?
বেথুন কলেজে পড়ার সময় ‘দিপালী সংঘের’ সঙ্গে পরিচয়। সংঘের দিদিদের দেওয়া বইয়ের প্রচ্ছদে ছিন্ন লালপাড়ের শাড়ি পরা এক শৃঙ্খলিত নারীর ছবি। নিচে লেখা ‘ভাঙ্গনের পালা শুরু হল আজি, ভাঙ্গ ভাঙ্গ শৃঙ্খল।’ এ বই পড়েই উত্তেজিত প্রীতিলতা। তিনিও ভাঙতে চান ব্রিটিশদের শৃঙ্খল। কিন্তু পথ খুঁজে পান না। একদিন পত্রিকায় খবর হয়, ‘চাঁদপুর স্টেশনের ইন্সপেক্টরের’ হত্যাকারী দুই বাঙালি যুবক গ্রেপ্তার। তাঁদের নাম রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালিপদ চক্রবর্তী। প্রীতিলতার সঙ্গে রামকৃষ্ণের পরিচয় ছিল না। নিজেকে বোন পরিচয় দিয়ে জেলের ভেতর ৪০ বারের মতো রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন প্রীতিলতা। তাঁর মুখেই শোনেন সূর্য সেনের দৃঢ়চরিত্র ও বীরত্বের কথা। দাদা রামকৃষ্ণের কাছেও প্রীতির একই প্রশ্ন, ‘আমরা মেয়েরা কি তোমাদের মতো হতে পারি না, দাদা?’
১৯৩২ সালের মে মাসে রানীর জীবনে এল সেই স্মরণীয় দিন। জীর্ণ এক ঘরের কোনায় জ্বলছিল একটি প্রদীপ। ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ‘মাস্টারদা’। সেই প্রথম দেখা মাস্টারদার সঙ্গে। এমন সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় দুই দিক থেকে গুলি চালাচালি। সে যুদ্ধে প্রাণ দেন বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্য সেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর মাস্টারদা বলেন, ‘প্রীতি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্কুলের কাজে যোগ দেবে, তাহলে গত রাতের ঘটনায় কেউ তোমাকে সন্দেহ করবে না।’ ধলঘাটের সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামারুনও নিহত হন।
মাস্টারদা উপলব্ধি করতে লাগলেন মেয়েরাও দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারে। এর আগে সশস্ত্র সংগ্রামে গুটিকয় মেয়ে কর্মী ছিল। কিন্তু এদের কাজ ছিল বিপ্লবীদের খবর আদান-প্রদান, অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখা, চাঁদা তোলা এবং বিপ্লবীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। সামনাসামনি অস্ত্র হাতে শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করেনি। সূর্য সেন সিদ্ধান্ত নেন ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে ‘প্রীতিলতা’।
শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। সাতজনের দলে দলনেতা প্রীতিলতা ছাড়াও ছিলেন—বিপ্লবী কালীকিংকর, শান্তি, সুশীল, মহেন্দ্র, বীরেশ্বর, প্রফুল্ল ও পান্না। অভিযানের আগে পড়া হলো ইশতেহার। মাস্টারদা বললেন, ‘জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তঋণ, ওদের রক্ত দিয়েই আজ শোধ করতে হবে। এ দায়িত্ব তোমাদের। সবাই দেখবে অপমানে জবাব দিতে আমরা আর পিছিয়ে থাকব না।’
১৯৩২ সাল। ২৪ সেপ্টেম্বর। ইউরোপীয় ক্লাব থেকে বিপ্লবীদের সংকেত পাওয়ার পর, প্রীতিলতার নেতৃত্বে সাতজন তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইংরেজদের ওপর। সফল(!) হলো বিপ্লবীদের অভিযান। সকলেই নিরাপদে ফিরে এলেন, ফিরে এলেন না দলনেতা প্রীতিলতা। ধরা পড়ার অপমানের ঠেকাতে ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ খেয়ে আত্মদান করলেন। পরের দিন যখন পুলিশ ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশকে পুরুষ ভেবেছিল। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চুল দেখে শুধু ব্রিটিশ পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকারই নড়েচড়ে উঠল। আলোড়িত হলো গোটা ভারতবাসী।
যাওয়ার আগে মায়ের কাছে চিঠি লেখেন প্রীতি, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা!
তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উত্সর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’
গতকাল ছিল প্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবস। আমরা কয়জন ভারতবর্ষে প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতার কথা জানি? এমনকি এ বিপ্লবীর স্মৃতিচিহ্নটুকু রক্ষারও কোনো আয়োজন আজ নেই। সরকার অন্তত প্রীতিলতার আত্মাহুতির স্থান চট্টগ্রাম পাহাড়তলীর সেই ইউরোপীয় ক্লাবের সামনে প্রীতিলতার একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পারে। এমনকি যে খাস্তগীর স্কুলে প্রীতিলতা পড়াশোনা করেছেন সে স্কুলের ছাত্রীরাও প্রীতিলতার নাম জানে না। জানে না তাঁর বীরত্বের কথা। আমরা কি আমাদের এ বীরদের যথার্থ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না?
lipi_jinnat@yahoo.com

জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে কিছু কথা -শিক্ষাব্যবস্থা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

এ যাবত্ আমাদের দেশে ছয়টি শিক্ষা কমিশন/কমিটি গঠিত হলেও কোনো শিক্ষানীতিই যে কার্যকর হয়নি তা থেকে বলা যায় যে শিক্ষা কোনো আমলেই আমাদের দেশে অগ্রাধিকার পায়নি। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ কথাটি আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কখনো বিশ্বাস করে না। কখনো কমিটি হয়েছে, কালক্ষেপণ হয়েছে কিন্তু নীতি হয়নি, কখনো নীতি হয়েছে কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এবার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার।
বর্তমান শিক্ষা কমিশন ৩ মে থেকে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৩টি সভা করেছে, ৫৬টি সংস্থা ও সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। এর মধ্যে চূড়ান্ত খসড়া সরকারের কাছে জমাও দেওয়া হয়েছে। সরকার তার প্রথম বছরও শেষ করেনি, সুতরাং এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য হাতে চার বছর সময় রয়েছে। শিক্ষানীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদ ও অন্য সবাইকে অভিনন্দন জানাই। শিক্ষানীতি একটি দেশের জনসাধারণের আত্মিক, মানসিক এবং জীবনের উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক বিষয়। অতি অল্প সময়ে এ রকম একটি পূর্ণাঙ্গ দলিলের খসড়া তৈরি নিঃসন্দেহে একটি দুরূহ কাজ। এই নীতি প্রণয়নে যাঁরা আন্তরিকভাবে, অঙ্গীকার নিয়ে, দেশপ্রেম নিয়ে, সাধারণ মানুষের জন্য ভালোবাসা নিয়ে মেধা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।
৯০ পৃষ্ঠার খসড়ায় সাধারণ মানুষের জীবিকার কথা বলা হয়েছে, ঝরে পড়া ছাত্রদের জীবিকার কথা বলা হয়েছে, উত্কর্ষ অর্জন সাপেক্ষে সাধারণ ছাত্রদের উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্তির পথের কথা বলা হয়েছে, যাতে যোগ্য কারও অগ্রগতির পথ বন্ধ হয়ে না যায়। শিক্ষার কোনো ক্ষেত্রের কথা বাদ যায়নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, প্রকৌশল, চিকিত্সা, বৃত্তিমূলক, কারিগরি, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায়, কৃষি, আইন, নারী, ললিতকলা, ধর্ম, ক্রীড়া কিছুই নজর এড়ায়নি। গ্রন্থাগার, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ্য হলে তার বিধান, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষাপ্রশাসন, অর্থায়ন কোনো কিছু বাদ যায়নি।
তবে সুপ্তভাবে এই শিক্ষানীতিতে নিশ্চয়তার সঙ্গে যা ধরে নেওয়া হয়েছে, তাহলো রাষ্ট্র ও প্রশাসনযন্ত্র এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য উঠে-পড়ে লাগবে। তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। সরকার বদলেছে ঠিক কিন্তু একই মানসম্পন্ন দেশপ্রেমবিবর্জিত সমাজপতিরা, কর্মকর্তারা নানা পর্যায়ের নেতারা যদি এর বাস্তবায়নে থাকে তাহলে আমরা তিমিরেই থেকে যাব। এর যথার্থ বাস্তবায়নের জন্য সংস্থাগুলো সম্পর্কেও নির্দেশনা বা গাইডলাইন দিতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে কিছু প্রস্তাব নিচে দেওয়া হলো:
১. দীর্ঘদিন ধরে আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলে আসছি যা তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে নিশ্চিত করা খুবই সহজ। যে কমিটি জাতীয় শিক্ষানীতির এত সুন্দর খসড়া চূড়ান্ত করেছে সন্দেহাতীতভাবে তার সদস্যরা আমাদের সমাজের অগ্রপথিক, নিবেদিতপ্রাণ জ্ঞান তাপস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের বেশির ভাগের ওয়েব উপস্থিতি না থাকার ফলে এই নীতির প্রতি সাধারণ মানুষ যথাযথ আস্থা স্থাপনে ব্যর্থ হবে। অথচ তাদের ওয়েব উপস্থিতি থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শুধু আপ্তবাক্য হিসেবে উচ্চারিত হতো না, তা অনুশীলিতও হতো। জাতীয় পর্যায়ে যেকোনো রকম কমিটি কিংবা বিশেষজ্ঞ নির্বাচনে ওয়েব উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করলে স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত হবে, ঠিক তেমনি তাদের কর্মবৃত্তান্তে সাধারণ মানুষ উজ্জীবিত বোধ করবে।
২. আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কীভাবে আমাদের জীবনধারাকে উন্নত করতে পারে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশবাসী কীভাবে মুক্তি পেতে পারে, পৃথিবীতে আমরা একটি গর্বিত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারব তা এই দলিলের একাধিক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা যে দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে মানবতার, সভ্যতার, সমাজের বিকাশে ভূমিকা রাখবে, জ্ঞান সৃষ্টি এবং সত্যানুসন্ধানে মানুষকে উত্সাহিত করবে তা পরিষ্কারভাবে কোথায়ও উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবদের শিক্ষানীতিতে এসব কথা থাকতেই হবে, আমরা যতই সমস্যাজর্জরিত থাকি না কেন।
৩. ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকারকে জাতীয় উত্পাদনের ছয় শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে, যেখানে বর্তমানে আছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এমতাবস্থায় ব্যয়সাশ্রয়ীভাবে শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তির মতো সর্বজনীন প্রযুক্তির দেশব্যাপী কার্যকর ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই নীতি বাস্তবায়নে যত প্রশিক্ষিত, অভিজ্ঞ শিক্ষক আমাদের দরকার, তা এ মূহূর্তে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যোগ্য, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে প্রতি শ্রেণীর প্রতি বিষয়ের ওপর কম্পিউটার এইডেড লার্নিং প্যাকেজ করে তা একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে রুটিনমাফিক প্রচার করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের জন্য সমসুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রতি স্কুলের একটি শ্রেণীকক্ষে একটি টিভি স্থাপন করলে ছাত্র ও শিক্ষক উভয়েই উপকৃত হতে পারে।
৪. স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগে সরকারি কর্মকমিশনের অনুরূপ একটি কমিশন গঠন করার প্রস্তাবটি চমত্কার। গ্রামের স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অশিক্ষিত ক্ষমতাধর মানুষেরা দখল করেন, যাঁরা শিক্ষার উত্কর্ষ অর্জনে শিক্ষকদের কোনো রকম পরামর্শদানের যোগ্যতা রাখে না। নিয়োগবাণিজ্য এবং অর্থ আত্মসাতেই তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ। এর ফলে প্রায় ক্ষেত্রেই যোগ্য প্রার্থীরা শিক্ষকতার চাকরি পান না। এ কাজগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে কিংবা আঞ্চলিকভাবে করতে পারলে ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যাপক দুর্নীতিকে রোধ করা সম্ভব হবে। অবশ্য এ কথাও মনে রাখতে হবে যে শিক্ষাসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি অতিসমপ্রতি অভিমত প্রকাশ করেছে যে এই খাতটি অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত।
৫. নানা বিষয়েই, নানা ক্ষেত্রেই আমাদের নীতির অভাব নেই। তবুও কোনো ক্ষেত্রেই আমরা উত্কর্ষ অর্জন করছি না, দুর্নীতির রাহুগ্রাসে দেশটির ললাটে জুটেছে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লজ্জা। এমতাবস্থায় শুধু নীতি প্রণয়নে যে কাজ হবে না তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষার নেতৃত্বে যোগ্য নিবেদিতপ্রাণ লোকদের আনতে হবে, যাতে নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়। ঠিক একইভাবে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কমিটির সদস্য হিসেবে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সদস্য হতে দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতকোত্তর পাস হতে হবে। একই ব্যক্তিকে কোনো অবস্থাতেই মাত্রাতিরিক্তসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে দেওয়া যাবে না।
৬. শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এবং মর্যাদা নির্ধারণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা যেতে পারে।
৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় উত্কর্ষ অর্জন করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে র্যাংকিং প্রথা চালু করার কথা বলা হয়েছে। এ ধারণাকে সমপ্রসারিত করে স্কুল-কলেজগুলোকে র্যাংক ও পুরস্কৃত করতে হবে।
৮. অধ্যায় ২১এ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে আমাদের দেশে শুধুই মুখস্থ করে যে ভালো করা যায় তা আমরা জানি। পক্ষান্তরে স্যাট পরীক্ষাগুলোর কার্যকারিতাও আমরা জানি। লাখ লাখ ছাত্র যে প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে. তার আয়োজনে আমাদের বিনিয়োগ আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত। কেবল মানসম্পন্ন, সৃজনশীলতা উদ্বুদ্ধকারী প্রশ্নপত্রই আমাদের মুখস্থ নামের বিষবৃক্ষকে অপসারণ করতে পারে।
৯. স্কুল-কলেজগুলোর মধ্যে উত্কর্ষ অর্জনের সুস্থ প্রতিযোগিতাকে বেগবান করতে নানা রকম র্যাংকিং প্রথা ছাড়া সকল শ্রেণীতে সকল বিষয়ে উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ঘটা করে অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতা আয়োজন করা উচিত। শুধু তা-ই নয়, আমাদের শিক্ষা বিশ্বমানের হচ্ছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য সকল আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
১০. ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চারটি এবং সমপ্রতি ভারতে একটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অত্যুত্সাহী হয়ে যাবে। বরং চা, চামড়া, পাট কিংবা পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতিতে অধিকতর অবদান রাখা সম্ভব।
১১. শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম বিকশিত হবে এ কথাটি শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে যথার্থভাবেই উচ্চারিত হয়েছে। তবে প্রেম-ভালোবাসা এমনিতেই পল্লবিত হয় না এর পেছনে বেদনা, কষ্ট ত্যাগ থাকতে হয়। কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক বাহিনীতে চাকরি করা বাধ্যতামূলক। আমরা অন্তত আমাদের তরুণদের পাবলিক পরীক্ষার পর ফাঁকা সময়টিতে বয়স্ক শিক্ষার মতো কার্যক্রমে নিয়োজিত করতে পারি।
১২. কোরিয়া কাইস্ট নিয়ে গর্বিত, ইসরায়েল টেকনিয়ন নিয়ে, ইংল্যান্ড অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ নিয়ে, ভারত আইআইটি নিয়ে। আমরা একসময় আদমজী জুট মল নিয়ে গর্ব করতাম। এখন কী নিয়ে করব, যা আমাদের উত্সাহিত করবে, দেশ গঠনে আত্মবিশ্বাসী করে তু্লবে? আমাদের দেশে নানা সমস্যায় আমরা আক্রান্ত, তাও আবার চক্রাকারে নিয়মিতভাবে। যানজট, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খাদ্যাভাব আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমতাবস্থায় একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠা করা দরকার, যা নানা জাতীয় সমস্যা সমাধানে সরকারের থিংকট্যাংক হিসেবে কাজ করবে।
আমি আশা করি, সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষানীতিটিকে দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা -ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলাম কন্যাশিশুকে সৌভাগ্যের প্রতীকরূপে ঘোষণা করেছে এবং যাবতীয় বৈষম্যমূলক অশোভনীয় আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিটি শিশুসন্তান পৃথিবীতে বেঁচে থাকার ও বিকশিত হওয়ার অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পুত্রসন্তানের মতো কন্যাশিশুরাও এ অধিকারের সমান দাবিদার। প্রাক-ইসলামী অন্ধকার যুগের হীন মনোবৃত্তির কথা আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে। সে ভাবে হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে তা কতই না নিকৃষ্ট।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫৮-৫৯)
ইসলাম মানুষকে এ ধারণায় দীক্ষিত করেছে যে পুত্র-কন্যা দুই ধরনের সন্তানই মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর বিশেষ উপহার। সন্তানকে চোখ জুড়ানো সম্পদ বিবেচনা করে পুত্র বা কন্যা হোক আচরণের ক্ষেত্রে এ দুইয়ের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য করা ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু বর্তমানে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সাধারণত পুত্রসন্তানের প্রতি যে অধিক যত্ন নেওয়া হয়, কন্যাশিশুর প্রতি তা করা হয় না। বৃহত্তর সমাজ তো দূরের কথা, পরিবারেই কন্যাশিশুটি সবচেয়ে বেশি অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়। এটি আমাদের জরাজীর্ণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থার মারাত্মক ত্রুটি। ইসলামের সুমহান বাণী তাদের বোধে-বিশ্বাসে সুদৃঢ়ভাবে অবস্থান করে নিতে পারেনি। অথচ মহানবী (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের মধ্যে কন্যাই উত্তম।’ (মুসলিম)
দরিদ্র পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে কন্যার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে ছেলের লেখাপড়া কষ্টে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ কিশোরীটিও যে পরিবারে শ্রম ও মেধা দিয়ে সাহায্য করে, তার হিসাব কেউ রাখে না। তারা মেধাবী নয়, সৃষ্টিশীল নয়, এমন অজুহাতে অনেক সময়ই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পরিবার তাদের প্রাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। কন্যাশিশুকে তার সমবয়সী একজন পুত্রসন্তানের মতো একইভাবে আদর-যত্ন দিয়ে লালন-পালনের প্রতি সব মা-বাবারই আরও সচেষ্ট ও সচেতন হতে হবে; তা না হলে এর প্রভাব ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ওপর পড়বে। তাই কন্যাশিশুর প্রতি কোনো রকম তাচ্ছিল্য প্রদর্শন, পুত্র ও কন্যার মধ্যে পার্থক্য বিধান এবং মেয়েদের ওপর ছেলেদের অহেতুক প্রাধান্য দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন নবী করিম (সা.)।
কন্যাশিশু ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য বেহেশতের শুভবার্তা বয়ে আনে এবং সংসারজীবনকে স্নিগ্ধ মায়া-মমতায় ভরে রাখে। তাই এরা ঘরের প্রাণময় সৌন্দর্য; কিন্তু বর্তমান সমাজে অনেকেই কন্যাসন্তান জন্ম নিলে খুবই বিব্রতবোধ করেন। একাধিক কন্যা হলে অত্যন্ত হতাশ ও বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কন্যাশিশু জন্ম দেওয়ার অপরাধে স্ত্রীকে বিভিন্ন রকম অমানুষিক নির্যাতন করে থাকে। এমনকি তালাক দেওয়ার মতো নির্মম ও অত্যন্ত জঘন্য পাপের পথেও পা বাড়ায়। নানাভাবে কন্যা জন্মদাত্রীকে নিগৃহীত করা হয়। নির্মম ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বিশ্বব্যবস্থায় বিরাজমান বাস্তবতা কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষার পক্ষে মোটেই অনুকূলে নয়। অথচ কন্যাসন্তান প্রতিপালনের অতুলনীয় মর্যাদার কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষকে উদাত্তকণ্ঠে জানিয়েছেন। অসংখ্য হাদিসে কন্যাশিশু প্রতিপালনের মর্যাদা ও অশেষ পুণ্যের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) পিতার অন্তরে কন্যা সন্তানের প্রতি গভীর মমত্ববোধ জাগ্রত করার উদ্দেশে উপদেশবাণী ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুটি কন্যাসন্তানকে বয়োপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন আমি ও সে এরূপ কাছাকাছি থাকব বলে তিনি তার আঙুলগুলো মিলিয়ে দেখালেন।’ (মুসলিম)
সমাজব্যবস্থায় মনে করা হয়, বিয়েই হচ্ছে কন্যাশিশুদের একমাত্র গন্তব্যস্থল। তাই প্রয়োজনে শিক্ষাকে ব্যাহত করেও নির্দিষ্ট বয়সের আগেই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। এখনো কন্যাশিশুর শিক্ষা অর্জনের পথে পরিবারের যথেষ্ট উদার মানসিকতার পরিচয় মেলে না। আর্থিক কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হলে কন্যাশিশুর ভাগ্যেই তা জোটে। এখনো অনেক পরিবারে কন্যাশিশুকে প্রয়োজনীয় খাবার খেতে দেওয়া হয় না। কন্যাশিশুর অসুস্থতাকেও অনেক পরিবারে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পরিবারে কন্যাশিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টি চাহিদা পূরণের সুযোগ নেই। একই জায়গায় পুত্রসন্তানের জন্য খাবারের উত্কৃষ্ট অংশ যেখানে বরাদ্দ রাখা হয়, সেখানে কন্যাশিশুকে বঞ্চিত করা হয়। কিশোরীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে সঠিক ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রয়োজন। খাবারদাবার সম্পর্কিত কুসংস্কার দূর করা প্রয়োজন। সমাজে প্রচলিত নীতিকথা আর চিন্তাচেতনা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি অনেকেই। অথচ নবী করিম (সা.) ইরশাদ ফরমান, ‘যার দুটি বা তিনটি কন্যাসন্তান আছে এবং তাদের উত্তম শিক্ষায় সুশিক্ষিত ও প্রতিপালিত করে সত্ পাত্রস্থ করবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে অবস্থান করবে।’ (মুসলিম)
নবী করিম (সা.) তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমা আয-যাহরা (রা.)-এর সঙ্গে যে ধরনের উঁচুমানের ব্যবহার করতেন, তা ছিল তত্কালীন সমাজের নিয়মকানুনবহির্ভূত। তিনি কন্যাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, যেখানেই যেতেন শিশু ফাতেমাকে সঙ্গে নিয়ে বলতেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার প্রথম সন্তান মেয়ে।’
নবী করিম (সা.) কন্যাশিশু তথা নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে হজরত ফাতেমা (রা.)-এর মাধ্যমে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন এবং একই সঙ্গে তাঁকেও একজন আদর্শ রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলে বলেন, ‘কন্যাসন্তান সুগন্ধি ফুল, আমি তার সুগন্ধি গ্রহণ করি আর তার রিযিক তো আল্লাহর হাতে।’
আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের একজন নারী, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের নিয়ামক শক্তি। অথচ বঞ্চনার কারণে কন্যাশিশুরা পরিণত বয়সে ছেলেদের মতো মানবসম্পদ হয়ে উঠতে পারছে না। এভাবে কন্যাশিশুকে অধিকারবঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে যে বৈষম্যের সূত্রপাত হয়। তার খেসারত শুধু কন্যাশিশু আর নারী নয়, গোটা জাতিকে দিতে হয়। এ কঠিন বাস্ততায় ইসলামে কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা ও বিকাশের বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার কাজ করতে হবে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে কন্যাশিশুর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য, অবহেলা, নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এখনই। কন্যাশিশুর রিযিক আল্লাহ তাআলা দান করেন, তার জীবন-জীবিকা ও উপযুক্ত সময়ে পরিণয়বন্ধনের দায়ভারও মহান আল্লাহ গ্রহণ করেন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

বিকল্প ব্যবস্থা রেখে পর্যাপ্ত চিকিত্সাসেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে -ঈদে চিকিত্সক-সেবিকাশূন্য হাসপাতাল

এবারের ঈদ উত্সবের ছুটিতে বহুসংখ্যক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন অনেকে। ঢাকার বাইরে যাওয়ার সময়ের মতোই ফিরতি যাত্রায়ও তাঁদের জীবন একই রকম ঝুঁকিতে আছে। দুর্ঘটনা ছাড়াও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়েছেন অনেকে। কিন্তু ওই সময় হাসপাতালগুলোর চিত্র ছিল রীতিমতো উদ্বেগজনক। ঈদের ছুটির তিন দিনে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো প্রায় চিকিত্সক ও সেবিকাশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগী ও দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিদের নিদারুণ ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর পঙ্গু ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটির ওই দিনগুলোতে চিকিত্সক-সেবিকার দেখা মেলা ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। বেশির ভাগ চিকিত্সক-সেবিকা গেছেন উত্সবের ছুটিতে। যাঁরা আছেন, তাঁরাও কাগজে-কলমে উপস্থিত মাত্র। অনেকের চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হয়েছে, হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না অনেক রোগীর। চিকিত্সক-স্বল্পতায় জরুরি চিকিত্সাসেবাসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীদের ভোগান্তি চরমে ওঠে। জরুরি বিভাগে সীমিতসংখ্যক চিকিত্সক ও সেবিকা দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ কেউ এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে গেছেন, সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। সারা দেশের পরিস্থিতিও যে এর ব্যতিক্রম নয়, তা সহজেই অনুমেয়।
চিকিত্সক ও সেবিকাদের কর্তব্যে অবহেলা বা গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। তাঁদের দায়িত্বশীল হতে হবে, তাঁদের পেশাগত দায়বোধ থেকে তাঁরা এ বিষয়ে আরও সংবেদনশীল ভূমিকা রাখবেন, এ আমাদের প্রত্যাশা। উত্সবের সময়ে হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সক ও সেবিকার বিশেষ দল গঠন করে পর্যাপ্ত চিকিত্সাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চিকিত্সকের সংখ্যা নির্ধারণে গত কয়েক বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। জরুরি এ সেবা মানুষ সময়মতো পাচ্ছে কি না তা তদারক করা দরকার।

বর্গাচাষিদের ঋণ: একটি প্রয়োগ-পূর্ব পর্যালোচনা -কৃষি by সাজ্জাদ জহির

বাংলাদেশের কৃষিকে সঞ্চালিত করার উদ্দেশে কার্যকরী যে কোনো উদ্যোগকে স্বাগত জানানো প্রয়োজন। সহজ সুদে বর্গাচাষিদের ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে সেভাবেই বিবেচনা করা উচিত। তবে শুরুতেই এর কয়েকটি দিক সতর্কভাবে দেখা প্রয়োজন।
পুনঃঅর্থায়নের ভিত্তিতে ব্র্যাকের মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে বর্গাচাষিদের ঋণ বিতরণ করা হবে, যা ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতে সরকারি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ শতাংশেরও কম। কেবল ৩৫টি জেলার ১৫০টি উপজেলায় এই ঋণ বিতরণ করা হবে এবং একে ক্ষুদ্রঋণ না বলে আভাসে ইঙ্গিতে ‘ব্যাংক ঋণ’ বলা হচ্ছে। ব্র্যাক বার্ষিক ভিত্তিতে পাঁচ শতাংশ সুদ বাংলাদেশ ব্যাংককে দেবে এবং ১০ শতাংশ সুদে বর্গাচাষিদের ঋণ দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। ফসল ওঠার আগে আদায়যোগ্য ঋণের ৩০ শতাংশ মাসিক কিস্তিতে এবং বাকি ৭০ শতাংশ ফসল ওঠার পর সমান দুটো মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে।
সমস্যা হলো, বর্গাচাষির কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি বা পল্লীঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচিতে (সার্কুলার নং-৪) উল্লেখ রয়েছে, ‘ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক (যাদের জমির পরিমাণ ০.৪৯৪ একর থেকে ২.৪৭ একর) তথা বর্গাচাষিদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ আরও উল্লেখ রয়েছে, বর্গাচাষি একজন প্রকৃত কৃষক, যিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন এবং তা যাচাইয়ের দুটো সম্ভাব্য পথ হলো: জমির মালিকের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্র অথবা স্থানীয় এলাকার দায়িত্বশীল ও গণ্যমান্য ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত প্রত্যয়নপত্র।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নীতিপর্যায়ে ‘বর্গাচাষি’ যেভাবে স্বীকৃত, বাংলাদেশে তেমনটি ঘটেনি। নীলচাষি ও আধিয়ারদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে যেমন বর্গাচাষির ব্যানারে কোনো সমাজগোষ্ঠী একতাবদ্ধ হয়নি, একইভাবে জোত বিভাজনের প্রক্রিয়া ও কৃষিতে প্রতিবন্ধী রূপ বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সমস্বার্থের অধিকারী ‘বর্গাচাষি’ নামের একক কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক শ্রেণী এ দেশে দানা বাঁধতে পারেনি। তবে পরিসংখ্যানে এর উপস্থিতি যত্রতত্র। ২০০৮ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী গ্রামীণ সব পরিবারের মাত্র ৫৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ কৃষি খামার, যাদের ৫৫ শতাংশ বর্গা চাষ করে। এসব বর্গাচাষির অধিকাংশই নিজেদের জমিও চাষ করেন।
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি) পরিচালিত ২০০০ সালের দেশব্যাপী এক জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ জরিপ করা গ্রামে বর্গা চাষের প্রাধান্য রয়েছে। এদের এক-তৃতীয়াংশে বছরব্যাপী সব মৌসুমি ফসলের ক্ষেত্রে বর্গা চাষ চালু আছে; প্রায় ৪২ শতাংশ গ্রামে শুধু ইরি বা বোরো ধানের সময় তা চালু আছে। কেবল ভাগ চাষে নয়, অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে নগদ খাজনায় জমি বর্গা নেওয়া হয়। ইআরজির ওই জরিপের ফলাফল থেকে আরও জানা যায়, যেসব এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কৃষি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, সেসব এলাকায় ভাগ চাষে জমি বর্গা নেওয়ার প্রথা বিলুপ্ত প্রায় এবং নগদ খাজনার ভিত্তিতে জমির ব্যবহার স্বত্বের লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব এলাকায় অনেক সময় তাই বন্ধকি ব্যবস্থা থেকে নগদ খাজনার পার্থক্য টানা দুরূহ। বাংলাদেশের চিংড়ি চাষাধীন দক্ষিণাঞ্চল ও আলু চাষাধীন এলাকায় (যেমন মুন্সিগঞ্জ) এমন নগদভিত্তিক লেনদেনের মাত্রার অধিক্য দেখা যায়।
বর্গাকেন্দ্রিক চুক্তি নিবন্ধীকরণের ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই এবং এর বাস্তবসম্মত কারণও রয়েছে। এ অবস্থায় কে ঋণ পাওয়ার যোগ্য, তা কাগজে-কলমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। স্থানীয় এলাকার দায়িত্বশীল ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রত্যয়নপত্র গ্রহণের সুযোগ অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
পত্রিকা মাধ্যমে আমরা জেনেছি, পরিবারপ্রধান এসএসসি পাস না হলেই কেবল ঋণ পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন। দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করতে বহু ক্ষেত্রে এ জাতীয় তথ্য ব্যবহার হয়। কিন্তু ইআরজির জরিপ থেকে জানা যায়, বর্গাচাষিদের মধ্যে এসএসসি পাসের হার যেখানে চার শতাংশ, অন্য গোষ্ঠীর (বর্গা নেন না) ক্ষেত্রে তা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এ দুটোর ব্যবধান উল্লেখজনক নয়। তাই ‘এসএসসি পাস’ জাতীয় তথ্যের ভিত্তিতে যোগ্য ঋণগ্রহীতা বাছাই নির্ভরযোগ্য নয়, বরং এ জাতীয় মাপকাঠির ব্যবহার ভ্রান্তিকর। এসএসসি পাস করে যেন একজন বর্গাচাষি পাপ করে বসেছেন এবং তাই তাঁকে ঋণ দেওয়া হবে না! অথচ একজন শিক্ষিত কৃষক চাষের সঙ্গে জড়িত হলে অধিক দক্ষতার সঙ্গে ঋণের ব্যবহার করতে সক্ষম।
বর্গা চাষের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ পেলেও চাষিরা উত্পাদন বাড়াতে যথেষ্ট প্রণোদিত নাও হতে পারে। অতীতের মাঠ জরিপ থেকে আমরা জানি, সীমিত জমির লেনদেনের বাজারে অধিক ঋণ সরবরাহ ও চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে জমির মালিকের প্রাপ্তি (খাজনা) বৃদ্ধি করে।
এটা অনস্বীকার্য, শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক ব্যাংকঋণ যে সুদে বিতরণ সম্ভব, তার চেয়ে অধিক হারে ক্ষুদ্রঋণের সুদ ধার্য করা আবশ্যিক। তবে সুদের হার প্রকাশে অনেক অস্বচ্ছতা দূর করা প্রয়োজন। ব্র্যাকের মাধ্যমে দেয় ঋণের সুদের হার নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। যদি ফ্ল্যাট রেটে ৫০ (বা ১০০) টাকা সুদ ধরে ছয় মাসে সুদ ও আসল আদায় হয়, সে ক্ষেত্রে কার্যকরী বাত্সরিক সুদের হার ১৬ শতাংশ (৩১ শতাংশ) হবে। এখনো পরিষ্কার নয়, কোন পথ ব্র্যাক নেবে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্গাচাষিদের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন এমন একটি সংগঠন, যার দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক রয়েছে। নিঃসন্দেহে অন্য পাঁচটি সংগঠনের তুলনায় ব্র্যাকের কিছু বাড়তি যোগ্যতা রয়েছে, এটি ৩০ বছরের অধিককাল সেবাধর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং দেশব্যপী ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহ করে। নতুন ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে ব্র্যাকের সংশ্লিষ্টতার বড় সনদ সম্ভবত কৃষি সম্প্রসারণে ও কৃষিপণ্য বিপণনে এর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। ব্র্যাক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাইব্রিড বীজ বিপণন করে এবং আন্তর্জাতিক বীজ কোম্পানির সহায়তায় দেশে-বিদেশে কৃষকদের সংগঠিত করে বিভিন্ন ফসল চাষে উন্নত মানের বীজ ব্যবহার সম্প্রসারণ করছে। এবং এই কাজে অনেক সময় ঋণ কর্মসূচিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা তহবিল জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে এবং বিগত বছরগুলোতে ‘দান’-এর পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় তাদের তহবিল সংগ্রহের খরচ বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সঞ্চয় সংগ্রহ আইনানুগ না করায় এসব সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চসুদে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এ অবস্থায় পাঁচ শতাংশ হারে ব্র্যাকের তহবিল প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে নেবে। এই তহবিল তৈরির ফলে তাদের (বর্গাচাষি) সদস্যরা অধিকতর ঋণ পাওয়ার বা ঋণ পুনর্তফসিল করার সুযোগ পাবে, যা অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে দেবে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য পিকেএসএফ পরিচালিত ঋণ কর্মসূচিও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হবে। নতুন ঋণের সম্ভাব্য সুদের হার অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণের সুদের হারের চেয়ে কিছুটা কম। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুদের হারের চেয়ে বেশি। যদি অর্থের বিনিময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের কাছ থেকে গ্যারান্টি নেওয়া হয়, যা লভ্যাংশ থেকে সমন্বয় করা হবে, সমগ্র বিনিময়প্রক্রিয়ায় বর্তমান সংকটকালে ব্র্যাক পরিবার কিছুটা স্বস্তি পাবে।
উল্লেখ্য, ক্ষুদ্রঋণের বড় অংশ বহুদিন ধরে বর্গা-বাজারে ব্যবহূত হয়ে আসছে। তাই সহজ সুদে বর্গাচাষিদের ঋণ দিয়ে কৃষি উত্পাদনে বড় কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। এমনকি সুষম বণ্টন অর্জনে তা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই তুলনায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র সব চাষির কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়া অধিকতর মঙ্গল আনার সম্ভাবনা রাখে। সংগত কারণেই নতুন ঋণ কর্মসূচির কার্যকারিতার ভিন্ন মাত্রা প্রয়োজন।
ক্ষুদ্রঋণকে বাদ দিলে বাংলাদেশের (সম্ভবত) সব বিশেষ ঋণ কর্মসূচি কোনো না কোনো প্রযুক্তি বিপণন প্রসারে সম্পূরক ভূমিকা রেখেছে। আশির দশকে টিউবওয়েল বসিয়ে সেচের দ্বারা উফশী ধানের আবাদ প্রসার থেকে শুরু করে বর্তমানে সৌর প্যানেল বিপণনে বিশেষ ঋণ কর্মসূচির ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকল্প প্রণয়নে দুর্বলতার কারণে নব্বইয়ের দশকে সরকারি ব্যাংকের ঋণের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সম্প্রসারণের অন্বয়-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি বিশাল অঙ্কের প্রাথমিক তহবিলের মালিকানা অনেক ক্ষেত্রে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতার আলোকে ঋণ বিতরণের দ্বারা এক বা একাধিক কৃষিপ্রযুক্তি প্রসার এবং ঝুঁকি হ্রাসকারী পণ্য বিপণনকে অন্বয়ের লক্ষ্যে ব্র্যাককে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। এমনকি হতদরিদ্রদের বর্গা চাষে সম্পৃক্ত করে তাদের জীবন-জীবিকা উন্নত করার লক্ষ্যে এই ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করলেও অবাক হওয়ার ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কর্মসূচি থেকে সুফল পাওয়ার জন্য আশু ভিত্তিতে কিছু কৃষিপ্রযুক্তি চিহ্নিত করে তার প্রসারে সম্পূরক ভূমিকায় এই ঋণকে দেখা প্রয়োজন। সম্ভব হলে এই কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ‘মালিক চাষি’দেরও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে বর্গাচাষি বাছাইয়ে অর্থ ও সময় অপচয় না করে নির্দিষ্ট প্রযুক্তির প্রসার অবলোকনের মাধ্যমে সফলতা নিশ্চিত করায় মনোনিবেশ করা যাবে। ঋণগ্রহীতা ও বিনিয়োগ খাত নির্বাচন যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষমতার প্রভাবে দুষ্ট না হয়। নিঃসন্দেহে সহজ মূল্যে এই তহবিল প্রাপ্তি ব্র্যাককে বিভিন্নভাবে উপকৃত করবে। এর বিনিময়ে ব্র্যাকের কাছ থেকে পাওনাগুলো সুনিশ্চিত করা জরুরি।
(মূল নিবন্ধটি www.ergonline.org তে পাওয়া যাবে।)
সাজ্জাদ জহির: পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ।
sajjadzohir@yahoo.com

ছুটি কী, কেন ও কাদের জন্য -জীবনযাপন by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

প্রথম প্রশ্নটারই জবাব দেওয়া যাক—ছুটি কী। নিয়মিত কাজ থেকে অব্যাহতি পেয়ে বা অব্যাহতি নিয়ে, নিয়মিত কাজের জায়গা থেকে অন্য কোথাও কটি দিন কাটানো, সহজভাবে ছুটি বলতে আমরা এ-ই বুঝি। এ দিক দিয়ে, স্থান পরিবর্তন ছুটির একটা শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
গত তিন দিনের ঈদের ছুটি সে জন্য আমার কাছে ছুটি ছিল না, যেহেতু আমি ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাইনি। ইচ্ছে ছিল না, বলা যাবে না, তবে যাওয়া হয়নি। এর একটা কারণ, আমার প্রবাসী এক ছেলে নিজেই ছুটি কাটাতে এসেছিল ঢাকায় তার পিত্রালয়ে। ওদের ছুটি আমার ছুটিকে কেড়ে নিয়েছে তা-ও বলতে চাই না। ওদের ছুটির মধ্য দিয়ে আমি এভাবে ছুটির স্বাদ গ্রহণ করেছি। তবে ছুটির সঙ্গে স্থান পরিবর্তন যে কতটা অবিচ্ছেদ্য, তার প্রমাণ, কয়েক লাখ বঙ্গসন্তানের পড়ি কি মরি করে ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে ট্রেনের ছাদে চেপে হলেও বেরিয়ে যাওয়া।
কয়েক লাখ ঢাকাবাসীর এই গ্রামযাত্রা তবু নির্ভেজাল ছুটির নাম দাবি করতে পারে না। এই গ্রামযাত্রার প্রধান লক্ষ্য পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া। নির্ভেজাল ছুটির পেছনে এ ধরনের কোনো লক্ষ্য থাকে না। একটাই লক্ষ্য থাকে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলিত হওয়া। সে জন্যই কক্সবাজার, সে জন্যই বান্দরবান, সে জন্যই কুয়াকাটা এবং অবশ্যই সুন্দরবন। অনেক কিছুই নেই আমাদের বাংলাদেশে, আবার আছেও। এই মাত্র যে নামগুলো করলাম, এর প্রতিটি প্রকৃতির এক বিশেষ রূপ নিয়ে মানুষকে টানছে। লাখ লাখ না হলেও হাজার হাজার বঙ্গসন্তান এই ঈদের অবকাশে ছুটে গিয়েছে কক্সবাজারে, বান্দরবানে, কুয়াকাটায় ও সুন্দরবনে। সংবাদপত্র জানাচ্ছে, কক্সবাজারের কোনো হোটেল-মোটেলে একটি শয্যাও খালি ছিল না ঈদের ছুটিতে, সব আগে থেকেই ‘বুক’ হয়ে গিয়েছিল। এ থেকে পরিষ্কার হচ্ছে একটা বিষয়, বাংলাদেশের বাঙালিও এখন ছুটির মর্ম বুঝে নিয়েছে। ওপার বাংলার বাঙালিদের খ্যাতি আছে, ছুটি উপভোগের বেলায় ওরা আছে সবার আগে, আমরা, বাংলাদেশে, পিছিয়ে ছিলাম। পাহাড়-বন-সমুদ্র-উপকূল সবই ছিল, তবে পর্যটনের সুযোগ-সুবিধা বলতে যা বোঝায়, যাতায়াত-ব্যবস্থা, থাকা-খাওয়ার সুবিধা—এ সবের ঘাটতি ছিল। এ ক্ষেত্রে প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। পর্যটন করপোরেশন যা করেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগের ফসল—হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ। কক্সবাজারকে যদি ধরা হয় পর্যটনের জন্য বাংলাদেশের সর্বপ্রথম-সর্বপ্রধান আকর্ষণ, সেখানে সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক সম্প্রসারণের পরও, চাহিদা মেটানোর মতো সেটা হয়নি। অর্থাত্ অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে যে বিকাশ ঘটেছে, তা এককথায় বিস্ময়কর। শ্রেণী, পরিবার, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তেরও বিকাশ ঘটেছে, কারণ পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে আর্থিক সংগতির।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নটিতে—ছুটি কেন? যে কারণে দিনের বিশ্রাম, রাতের নিদ্রা, সেই একই কারণে সপ্তাহের পাঁচ বা ছয় দিনের শেষে সাপ্তাহিক ছুটি। বাইবেলে আছে, সৃষ্টিকর্তা ছয় দিনে তাঁর সৃষ্টির শেষে সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিলেন। সে জন্য খ্রিষ্টান-জগতে রোববারের ছুটি স্যাবাটিক্যাল—অবশ্য পালনীয়। এ দেশে আমরাও শত বছরের অধিক কাল রোববারের ছুটিতে অভ্যস্ত ছিলাম। রোববারের জায়গা নিয়েছে শুক্রবার, বেশি দিনের কথা নয়। এখনো ছুটির দিন হিসেবে রোববারের দাবি ঘুরে ঘুরে আসছে। সরকার আছে দোটানায়, ইচ্ছে থাকলেও এগোতে পারছে না—পাছে ওরা কিছু বলে।
যারা যত বেশি কাজ করে, ছুটির প্রয়োজন তাদের তত বেশি। ছুটি শুধু বড়লোকের চিত্তবিনোদন নয়, ছুটি কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষেরও ন্যায্য অধিকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই সত্যটাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন—কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী ছুটি কাটানোর জায়গাগুলোয় সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের সবার জন্য এই ভাবনা এ মুহূর্তে এক অবাস্তব স্বপ্নবিলাস মনে হতে পারে। তবে সীমিত পর্যায়ে আমরা এখন থেকেই কাজটা কেন শুরু করতে পারব না? আমাদের পর্যটন করপোরেশনকে এ জন্য ভেঙে গড়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এ সংস্থা এ পর্যন্ত যা করেছে ও যাদের জন্য করেছে, সেটা এখন আর জরুরি কাজ নয়। বেসরকারি পর্যায়ে সে কাজের দায়িত্ব হয়তো অনেক বেশি যোগ্যতার সঙ্গে সম্পাদন করছে অন্যরা। যাদের জন্য প্রাইভেট সেক্টর কিছু করে না, তাদের জন্য কাজটি করবে সরকার। সরকারও করবে না, যত দিন না সরকারের বর্তমান ধনীবান্ধব চেহারা বদলাচ্ছে। দরিদ্রবান্ধব সরকার পেতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে একজন বারাক ওবামার। বারাক ওবামা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সংকল্প গ্রহণ করেছেন। এই সংকল্প বাস্তবায়নে তিনি প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু সংকল্পে অটল আছেন এখন পর্যন্ত। এ দেশে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার যে ব্যবস্থা, সেটা এখনো ব্যবস্থা-পদবাচ্য হয়ে ওঠেনি। স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক দাবি পূরণেই যখন আমরা এত পিছিয়ে আছি, তখন সবার জন্য ছুটির বিনোদন-ব্যবস্থার কথা বলাও এক ধরনের বাতুলতা। তবু বলতে হবে।
ছুটি কেন-র কথা বলতে গিয়ে ছুটি কাদের জন্য—প্রসঙ্গটিও কীভাবে যেন এসে গিয়েছে। আবার ছুটি কেনর প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
সরকারি কর্মসপ্তাহ কদিনের জন্য হবে, পাঁচ দিনের, সাড়ে পাঁচ দিনের, না ছয় দিনের—এই প্রশ্নে আমরা এ দেশে আজ পর্যন্ত এক দোলাচলের মধ্যে রয়েছি। দীর্ঘকাল আমরা অভ্যস্ত ছিলাম সাড়ে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহে। শনিবারে অর্ধ দিবস, রোববারে পূর্ণ দিবস। কিছুদিন থেকে এ দেশে চালু রয়েছে শুক্রবার-শনিবার নিয়ে দুদিনের পূর্ণ দিবস ছুটি। বিশেষত ব্যবসায়ী মহলে এ নিয়ে রীতিমতো আপত্তি রয়েছে বলে আমার ধারণা। ব্যাংকিং মহলেও একই আপত্তি। সরকার একটি বিশেষ মহলের আপত্তিকে বরাবর প্রয়োজনের অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যে কারণে শত বছরের পরীক্ষিত ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারছে না। পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহের পেছনে যত যুক্তিই থাক না কেন, একটি অনুন্নত দেশে এ এক বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। সমাজতন্ত্রী চীনে ওরা কিছুদিন আগেও ছয় দিনে সপ্তাহ ও সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম চালু রেখেছিল। অবশ্য বিগত বছরগুলোতে চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখে সে ব্যবস্থার ইতি ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই।
একদিকে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহ, অন্যদিকে সরকারি ছুটির এক দীর্ঘ তালিকা, যা কোনো উন্নত দেশের তালিকার সঙ্গে মেলে না। দিনবদলের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে, সবকিছুই আগের মতো চলার এই ধারা মেলে না। আমাদের কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া দিনবদলের লাখো কথায় এক ছটাক লাভ হবে না।
আমার তৃতীয় প্রশ্ন—ছুটি কাদের জন্য, এর আংশিক উত্তর দেওয়া হয়ে গেছে। পল্লীসমাজে গৃহবধূরা বছরের একটা সময়ে ‘নাইওরে’ যেত—পিতৃগৃহে যেত। গৃহবধূদের জন্য এ ছিল ছুটির এক ধরনের সামাজিক এবং মানবিক ব্যবস্থা। শ্বশুরালয়ে গৃহবধূদের জন্য বরাদ্দ থাকে একটা ব্যস্ত জীবন, সেই জীবনে কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। থাকলে ভালো হতো। যা-ই হোক, বছরে একবার, এক মাসের ছুটি নিয়ে পিতৃগৃহে বাসকে প্রকৃত অর্থে ছুটি বলা যায় কি না আমি নিশ্চিত নই। পিতৃগৃহ কক্সবাজার, বান্দরবান, কুয়াকাটা নয় আমরা জানি। তবু পিতৃগৃহ যদি অবকাশ দেয়, আনন্দ দেয়, স্বস্তি দেয়, একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেয়, তাহলে নাইওরের এক মাস কেন ছুটি হবে না! ছেলেবেলায় দেখেছি, আমার মা প্রতি বর্ষাকালে এক মাসের জন্য নানিবাড়িতে যেতেন। নাইওর শব্দটি বোধহয় শ্রেণিগন্ধযুক্ত, কেবল কৃষকসমাজের ব্যাপার। মায়ের এই এক মাসকে কখনো নাইওর বলা হয়নি। তবে সাংসারিক দায়িত্ব পালন থেকে এক মাসের মুক্তি যে তিনি মনে-প্রাণে চাইতেন, আমার বালক বয়সেও আমি সেটা জানতাম।
সবারই ছুটি আছে, শুধু কৃষকের ছুটি নেই, তা-ই বা বলি কেমন করে। যখন মাঠের কাজ থাকে না, তখন যে কর্মবিরতি, প্রকৃতির নিয়মে, ঋতুর নিয়মে, সেটাই কৃষকের ছুটি। তবে সেটা আনন্দদায়ক ছুটি না-ও হতে পারে। সবই নির্ভর করে ফসলের প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির ওপর। হেমন্তে আমন ধানের ফলন ভালো হলে বাংলাদেশের গ্রামেও একটা ছুটির হাওয়া বয়ে যেত। যাত্রা, পালাগানের মৌসুম শুরু হতো। দেশের একেক অঞ্চল একেক চেহারা নিত এই ফসল ঘরে তোলার ঋতু। ধানের দেশ হিসেবে খ্যাত বরিশালে এ সময় কৃষকের মুখে যে হাসি দেখা গিয়েছে, বরিশালবাসী সে কথা কখনো ভোলে না।
লং ভেকেশন। লম্বা ছুটির ব্যবস্থা বলবত্ ছিল দুটি জায়গায়—এক. উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে, দুই. উচ্চ আদালতে। অধ্যাপকেরা, বিচারপতিরা এই লম্বা ছুটিতে কী করেন, অন্যদের এ বিষয়ে কৌতূহল আছে। তাঁরা কি ঘুমান, না বই পড়েন, না বই লেখেন, না কেবলই মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেন, অতিরিক্ত পরিশ্রমের পর?
তাঁরা যা-ই করুন না কেন, তাঁদের জন্য একটা লম্বা ছুটির প্রয়োজন নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। সাংসদেরাও বছরে কয়েকবার লম্বা ছুটিতে যান। তবে তাঁদের এ ছুটি যে আসলে ছুটি নয়, আমাকে আশ্বস্ত করেছেন একজন সাংসদ। উমেদারদের জন্য তাঁদের দরজা খোলা রাখতে হয় মধ্যরাত পর্যন্ত, এটা জানার পর আশা করি কেউ ঈর্ষাবোধ করবেন না তাঁদের ঈর্ষণীয় সৌভাগ্য নিয়ে।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী: শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সেমিফাইনালের আশা বেঁচে থাকল স্মিথদের

সেই একই উইকেট। দিনদুয়েক আগে এখানেই ব্যাট হাতে ঝড় তুলেছিলেন দিলশান-জয়াবর্ধনেরা। সেই উইকেটকেই কাল চরিত্র বদলে দেখা গেল ভিন্ন রূপে। শুরুতে বাড়তি গতি ও বাউন্স পেলেন পেসাররা। পুরোনো বলে স্পিনাররা পেলেন বাড়তি টার্ন ও বাউন্স। উইকেটের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নিউজিল্যান্ডকে ২১৪ রানেই বেঁধে ফেলল দক্ষিণ আফ্রিকা। এর পর ব্যাটসম্যানদের সাবধানী ব্যাটিংয়ে বাঁচা-মরার লড়াইটা ৫ উইকেটে জিতে স্বাগতিকেরা বাঁচিয়ে রাখতে পারল সেমিফাইনালের আশা।
উইকেট সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু সেটিকে কাজে লাগানোর পুরো কৃতিত্ব প্রোটিয়া বোলারদের। প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের কাছে নাস্তানাবুদ হওয়া বোলাররা কাল দারুণভাবে ফিরে এসেছেন। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের সর্বকনিষ্ঠ ও অনভিজ্ঞ ওয়েইন পারনেল। জেসি রাইডার ও মার্টিন গাপটিলের প্রথম দুটি উইকেটই নিয়েছিলেন এই বাঁহাতি পেসার। এর পর ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে ৩ উইকেট নিয়ে কিউইদের ইনিংস থামিয়ে দিয়েছেন প্রত্যাশারও আগে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই পেয়েছিলেন ৪ উইকেট, ২০ বছর বয়সী পেসার ৫ উইকেটের দেখা পেলেন ষষ্ঠ ম্যাচেই।
৪৫তম ওভারে ৫ উইকেটে ২০৩, নিউজিল্যান্ডের দৃষ্টি আড়াই শর দিকেই থাকার কথা। কিন্তু ১৮ বলের এক ঝড়ে কিউই ইনিংসটাকে টালমাটাল করে দেন স্টেইন-পারনেল জুটি। দুজন পাঁচ উইকেট ভাগাভাগি করে নেওয়ায় ১৩ বল আগেই অলআউট নিউজিল্যান্ড। কিউই ইনিংসের একমাত্র হাফ সেঞ্চুরি রস টেলরের (৭২)। এমনিতে আক্রমণাত্মক টেলর কাল ৫০ পূর্ণ করতে বল খেলেছেন ৯০টি। এর পর অবশ্য হাত খুলে খেলতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু পারনেলে কাটা পড়ে ইনিংসটাকে পূর্ণতা দিতে পারেননি।
গ্রান্ট এলিয়টকে নিয়ে কিউই ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিও গড়েছিলেন টেলর। ৭১ রানের জুটিটি ভাঙেন রোয়েলফ ফন ডার মারউই। স্কোরকার্ড বলছে প্রোটিয়াদের সেরা বোলার পারনেল, কিন্তু ম্যাচ যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন, সেরা বোলার আসলে ছিলেন ফন ডার মারউই। টানা দুই ওভারে ইলিয়ট ও ব্রুমকে আউট করেছেন বলেই নয়, এই বাঁহাতি স্পিনারের টার্ন ও বাউন্সে অনেকবারই নাকাল হতে হয়েছে রস টেলরদের।
২২ রানে গ্রায়েম স্মিথকে (৭) হারালেও দ্বিতীয় উইকেটে ৫২ রানের জুটি গড়ে স্বাগতিকদের এগিয়ে নিয়ে যান আমলা ও ক্যালিস। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়েছে প্রোটিয়াদেরও, তবে ছোট অথচ কার্যকর কয়েকটি জুটিতে কখনোই মনে হয়নি ম্যাচ হারতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকা। ওয়ানডেতে ১৯তম হাফ সেঞ্চুরি করে ৫৩ বল আগেই দলকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেন এবি ডি ভিলিয়ার্স (৭০)।

মাওবাদীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাতে পারে ভারত

সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ মাওবাদী নেতা কোপাদ গান্ধীকে গ্রেপ্তারের পর ভারতজুড়ে মাওবাদী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরুর বিষয়টি বিবেচনা করছে মনমোহন সরকার।
ভারতীয় সরকারের একটি সূত্র জানায়, মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযানে বিশেষ বাহিনী ব্যবহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে এ ধরনের কৌশলের কারণে নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে কি না, সে বিষয়টি মূল্যায়ন করে দেখছে সরকার। সূত্র বলেছে, যদি এ কৌশলের কারণে সাধারণ আদিবাসীরা মারা যায়, তাহলে সমস্যা হবে।
সম্প্রতি আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল স্ট্যানলি এ ম্যাকক্রিস্টালের দেওয়া প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে ওই সূত্র। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেসামরিক লোকের হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, মার্কিন ও জোট বাহিনীর বিমানশক্তি ব্যবহার।
সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করে সূত্রটি বলেছে, মাওবাদী সহিংসতার প্রতি গুরুত্ব দিতে ইচ্ছুক নয় সংবাদমাধ্যমগুলো। সূত্রের দাবি, ‘মাওবাদীরা ভয়াবহ সহিংসতা চালালেও তার বিরুদ্ধে খুব সামান্যই প্রতিবাদ জানানো হয়। যখন কোপাদ গান্ধীকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন বুদ্ধিজীবীরা তার পক্ষ নিলেন। কিন্তু মাওবাদীদের হাতে যখন আদিবাসীরা মারা যায়, তখন বুদ্ধিজীবী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিশ্চুপ থাকে।’
মাওবাদীদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সূত্রটি বলেছে, ‘মাওবাদীদের পক্ষ থেকে আলোচনার কোনো প্রস্তাব নেই। এবং আমরা নিশ্চিত নই, সংলাপ কোনো কাজে লাগবে কি না।’
মাওবাদীদের দমনে ছত্তিশগড় রাজ্য সরকারের নেওয়া ‘সালওয়া জুদুম’ নামের একটি বাহিনীর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ওই সূত্র। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য এ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আদিবাসীদের। কিন্তু এ বাহিনীর হামলার কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজার হাজার আদিবাসী। সালওয়া জুদুমের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সুপ্রিম কোর্টেও। তবে সূত্রটি বলেছে, ‘আমরা মনে করছি, সালওয়া জুদুম একটি সত্যিকারের গণআন্দোলন। তাদের কারণে মাওবাদীরা ভীত।’

ভারতের পরমাণু পরীক্ষা ছিল পুরোপুরি সফল

ভারতের ১৯৯৮ সালের পরমাণু পরীক্ষার সফলতা নিয়ে সন্দেহ নাকচ করে দিয়েছেন ভারতের প্রধান সামরিক বিজ্ঞানী রাজাগোপালা চিদাম্বরম। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ওই পরীক্ষা ছিল পুরোপুরি সফল এবং পরীক্ষার মাধ্যমে সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে।
রাজাগোপালা চিদাম্বরম মুম্বাইতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাবেক সহকর্মীদের অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে আমি হতাশ।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক থেকে ১৯৯৮ সালের মে মাসের পরীক্ষা ছিল পুরোপুরি সফল।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভারতের শীর্ষস্থানীয় পরমাণুবিজ্ঞানী এস সান্থানাম বলেছেন, ওই পরমাণু পরীক্ষা ছিল আংশিক সফল। ১৯৯৮ সালের পরমাণু পরীক্ষার সাইট প্রিপারেশন পরিচালক ছিলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ওই সময় পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে যে দাবি করা হয়েছিল, তা ছিল ওই দাবির চেয়ে অনেক দুর্বল।

মন্দার কারণে মা হতে চাইছেন না মার্কিন নারীরা

অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেক মার্কিন নারী মা হতে চাইছেন না। সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া বাদ দিয়েছেন অনেক মার্কিন নারী। এমনকি অর্থ বাঁচানোর জন্য কম খরচের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির দিকেও ঝুঁকছেন অনেকে। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
যৌন ও প্রজননসম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যালান গুটমাচ এ জরিপ চালায়। গত বুধবার জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। গত জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রায় এক হাজার নারীর ওপর এ জরিপ চালানো হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক মার্কিন নারীই জানান, তাঁরা দেরিতে সন্তান নিতে চান, অথবা সন্তানসংখ্যা বর্তমানে যা আছে, সেটাতে সীমাবদ্ধ রাখতে চান।
বিশ্বমন্দার ধাক্কা লেগেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পছন্দের ক্ষেত্রেও। অর্থ বাঁচানোর জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে পরিবর্তন আনছেন অনেক মার্কিন নারী। তুলনামূলক কম ব্যয়ের পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন তাঁরা।
জরিপে দেখা যায়, অর্থ বাঁচানোর জন্য গত বছর প্রতি চারজনের মধ্যে একজন নারী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া বাদ দিয়েছেন। প্রতি চারজনের মধ্যে একজন জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী কিনতে আগের তুলনায় হিমশিম খাচ্ছেন।

হন্ডুরাসে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার

দেশব্যাপী জারি করা সান্ধ্য আইন (কারফিউ) গতকাল বৃহস্পতিবার প্রত্যাহার করেছে হন্ডুরাসের অন্তর্বর্তী সরকার। তবে রাজধানী তেগুচিগালপায় ব্রাজিলের দূতাবাস এখনো ঘিরে রেখেছে সেনাবাহিনী। গত সোমবার আকস্মিকভাবে দেশে ফিরে ওই দূতাবাসেই আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়া। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দেশব্যাপী সান্ধ্য আইন জারি করে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত সোমবার থেকে অব্যাহত বিক্ষোভে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছে। গত বুধবার রাতেও ব্রাজিলের ওই দূতাবাসের কাছে জেলায়ার সমর্থকেরা বিক্ষোভ করে। নিরাপত্তাকর্মীরা কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ছয়টা থেকেই সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকার জনগণকে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচার করা হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা ও পুলিশ তত্পর থাকবে।
গত ২৮ জুন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেলায়াকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠায় দেশটির সামরিক বাহিনী। এর পর থেকে দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট চলছে।
এদিকে জেলায়া বলেছেন, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান রবার্তো মিশেলেত্তির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে আগ্রহী। মিশেলেত্তি এর আগে জানান, জেলায়ার সঙ্গে তিনি আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে জেলায়াকে আসন্ন নির্বাচনের স্বীকৃতি দিতে হবে।

এক পাউন্ডের এত দাম

স্কটল্যান্ডের একটি পুরোনো নোট বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। উনিশ শতকের এক পাউন্ডের ওই নোটটি রেকর্ড পরিমাণ মূল্যে বিক্রি হয়েছে। স্কটল্যান্ডের ক্লাইডেসডেল ব্যাংকের ডাকা এক নিলামে নোটটির সর্বোচ্চ দাম উঠেছে নয় হাজার পাউন্ড। এর আগে ২০০১ সালে সাত হাজার পাউন্ডে একটি নোট বিক্রি হয়।
১৮৩৬ সালে নর্থ অব স্কটল্যান্ড ব্যাংক এক পাউন্ডের ওই নোটটি বাজারে ছাড়ে। ১৯৫১ সালে এ ব্যাংক ক্লাইডেসডেল ব্যাংকের অঙ্গীভূত হয়।
ক্লাইডেসডেল ব্যাংক সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সংগৃহীত এবং আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক নোট নিলামে ওঠায়। নিলামে মোট ১১২,৮৩০ পাউন্ডের পুরোনো ও ঐতিহাসিক নোট বিক্রি হয়। নিলাম থেকে পাওয়া এ অর্থ স্কটল্যান্ডের ৭০টি দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ক্লাইডেসডেল ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিন পিকক বলেন, কয়েক ঘণ্টার নিলামে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে নোট বিক্রি দারুণ ব্যাপার। তিনি বলেন, বর্তমান সময়টা দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য ভালো যাচ্ছে না। এমন সময়ে নিলাম থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাওয়াটা সত্যিই আনন্দের ব্যাপার। এ অর্থ স্কটল্যান্ডের দাতব্য সংস্থাগুলোর উপকারে আসবে।
এদিকে ক্লাইডেসডেল ব্যাংকের ছাপানো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের ছবিসংবলিত বিশেষ নোট আগামী মাসেই বাজারে আসছে। এতে স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ব্যক্তি এবং ইউনেসকো স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ছবি রয়েছে।
এ মাসের শেষ দিকে লন্ডনে ঐতিহাসিক নোটের দ্বিতীয় নিলাম ডাকবে ক্লাইডেসডেল ব্যাংক। এ নিলাম থেকেও প্রচুর পরিমাণে অর্থ আয়ের আশা করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং এ অর্থও তারা দাতব্য সংস্থাগুলোর হাতে তুলে দেবে।

ভূমি জরিপ ঘোষণা সমস্যাকে আরও জটিল করবে -পার্বত্য চট্টগ্রাম by মঙ্গল কুমার চাকমা

৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন যে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ভূমি জরিপের পন্থা-পদ্ধতি ঠিক করা হবে এবং ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু করে আগামী বছরের ১৫ মার্চের মধ্যে ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা হবে (দ্য ডেইলি স্টার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯)।
উল্লেখ্য, গত ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগলাভের পর আজ অবধি তিনি ভূমি কমিশনের আনুষ্ঠানিক সভা আহ্বান করেননি। ইতিমধ্যে তিনি গত ৩-৫ আগস্ট তিন পার্বত্য জেলা সফর করেন এবং জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে আহূত মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সফরকালে কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই একতরফাভাবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের ঘোষণা দেন। গত ৭-৮ সেপ্টেম্বর তিনি আবারও রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সফর করেন এবং দুই জেলায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের একদিনের নোটিশে আহূত যৌথ সভায় তিনি মতবিনিময় করেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে মতবিনিময় সভায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা ও সার্কেল চিফগণ উপস্থিত ছিলেন না। অথচ ভূমি কমিশনের কোনো আনুষ্ঠানিক সভার আয়োজন না করে কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের সময়সূচি আবারও ঘোষণা দেন। প্রাসঙ্গিকভাবেই ভূমি কমিশন চেয়ারম্যানের এই একতরফা ঘোষণা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা জাতীয় পর্যায়ে অভিজ্ঞ মহলের নানা সন্দেহ ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
১৯৯৭ এর পার্বত্য চুুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ২ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে ‘সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে যথাশিগগির পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপকাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিকরত উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চূড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভুক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।’
পার্বত্য চুুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় কোন উদ্দেশ্যে একতরফাভাবে ভূমি জরিপের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন তা স্পষ্ট নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার অন্যতম একটি প্রধান দিক ভূমি সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এমনিতেই অত্যন্ত কম। চাষযোগ্য ধান্য জমির (‘এ’ শ্রেণীভুক্ত) পরিমাণ মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা ৭৬ হাজার ৪৬৬ একর মাত্র। অধিকন্তু ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হওয়ার ফলে ‘এ’ শ্রেণীভুক্ত আবাদি জমির ৪০ শতাংশ (৫৪ হাজার একর জমি) এই বাঁধের পানিতে তলিয়ে যায়। আবাদি জমির স্বল্পতার কারণে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি কাপ্তাই বাঁধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজ করছে হাজারো ভূমিহীন পরিবার। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে— সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রতারণামূলক অজুহাত দেখিয়ে ১৯৭৯ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছরে দেশের সমতলে বিভিন্ন জেলা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয় চার লক্ষাধিক বহিরাগত লোক এবং বলপূর্বক তাদের বসতি দেওয়া হয় পাহাড়িদের ভোগ-দখলীয় ও রেকর্ডীয় জমির ওপর। এই সব বাঙালি সেটেলাররা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে তাদের অনেক জমি বেদখল করে নেয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড।
২০০১ সালে জুনে তত্কালীন আওয়ামী লীগের সরকার (১৯৯৬-২০০১) ক্ষমতা হস্তান্তরের একদিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ জাতীয় সংসদে পাস করে। ওই আইন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে বিরোধাত্মক ১৯টি বিষয় রয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভূমি কমিশন আইন সংশোধনকল্পে গত ২৬ আগস্ট আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরার সভাপতিত্বে ভূমি মন্ত্রণালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় অনেকটা বিধি-বহির্ভূতভাবে তিন পার্বত্য জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদেরও ডাকা হয়। ওই সভায় আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক উত্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবের অনুকূলে মত দিলেও রাঙামাটি জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসব সংশোধনীর চরম বিরোধিতা করতে থাকে। এক পর্যায়ে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা স্থগিত করা হয়। উল্লেখ্য, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের কর্তকর্তাদের এ রকম মতামত নেওয়ার নজির অভূতপূর্ব। অধিকন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হয়ে যাওয়ার পর এ রকম নতুন করে মতামত নেওয়াও যুক্তিসংগত ও সদিচ্ছাপ্রসূত হতে পারে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আশু করণীয় হচ্ছে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক ২০০১ সালের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন করা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারও এ বিষয়ে অনুকূল মত প্রকাশ করেন। বলাবাহুল্য, আইনের বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধন না করে ভূমি কমিশনের কাজ শুরু করলে ভূমি সমস্যা আরও জটিল থেকে জটিলতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া এখনো ভূমি কমিশনের বিধিমালা প্রণীত হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিসম্পদসংবলিত কমিশনের কার্যালয় স্থাপিত হয়নি। অনেক দিন ধরে কমিশনের সচিবের পদ খালি রয়েছে। ২০০৬ সালে কমিশনের কর্মচারী নিয়োগের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও তা পরে বাতিল করা হয়। কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পরিসম্পদ বরাদ্দ এবং কমিশনের জন্য কার্যালয় স্থাপন করা ইত্যাদি বিষয় এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। এসব জরুরি বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ না নিয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘন করে কেন ভূমি জরিপের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা বোধগম্য নয়।
পার্বত্য অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা বরাবরই দেশের অপরাপর সমতল অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা থেকে পৃথক। অনুরূপভাবে এ অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনাও সমতল জেলাগুলো থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। পার্বত্য চট্টগ্রামে মূলত তিন ধরনের ভূমি রয়েছে। প্রথমত, বন্দোবস্তকৃত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ভূমি, যা বেশির ভাগই ধান্য জমি। দ্বিতীয়ত, ভোগ-দখলীয় জমি, যা বেশির ভাগই বাস্তুভিটা, বাগান-বাগিচা ইত্যাদির ভূমি। তৃতীয়ত, রেকর্ডীয় বা ভোগ-দখলীয় কোনোটাই নয় এমন ভূমি, যা জুমভূমি নামে খ্যাত ও প্রথাগতভাবে সংশ্লিষ্ট মৌজা অধিবাসীদের সমষ্টিগত মালিকানাধীন। অর্থাত্ মৌজা এলাকায় অবস্থিত ভূমির মধ্যে ব্যক্তি নামে বন্দোবস্তকৃত বা ভোগ-দখলীয় ভূমি ব্যতীত অন্য সব ভূমিই মৌজাবাসীর। রাজা-হেডম্যান-কার্বারির নিয়ে গঠিত প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে এসেছে বিশেষ আইনের আওতায়। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সংবিধানের আওতায় ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসন কাঠামো এবং আলাদা ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তিত হয়েছে। এ শাসন কাঠামোতে সংশ্লিষ্ট আইন বা বিধানাবলি অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অঞ্চল পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলায় তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের ওপর ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা কার্যাবলি অর্পণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ তা তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা মূলত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯৯৮ সালের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (সংশোধন), ১৯৯৮ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৩৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার ফান্ড বিধিমালা প্রভৃতি বিশেষ আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। অধিকন্তু এই অঞ্চলে রয়েছে রাজা-হেডম্যান-কার্বারিদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনব্যবস্থা, যাঁরা সরাসরি ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত।
ভূমি কমিশন চেয়ারম্যান মহোদয় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কীভাবে এবং কোন আইন বা বিধিমালা বলে ভূমি জরিপ করবেন? মনে রাখতে হবে যে দেশের সমতল জেলাগুলোতে বিদ্যমান সার্ভে আইন পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য নয়। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত ১৮৭৫ সালের সার্ভে আইনও সে সময় ‘শাসনবহির্ভূত এলাকা’য় প্রয়োগ করা হয়নি। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসনবহির্ভূত এলাকার মর্যাদা না থাকলেও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি এখনো বলবত্ রয়েছে এবং আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসংবলিত বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
সরকার ১৯৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি খতিয়ান অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বিধায় কার্যকর হতে পারেনি। মূলত সমতল অঞ্চলে প্রচলিত আইন অনুসারে এটা প্রণীত হয়েছে। এতে রাজা-হেডম্যান-কার্বারিসংবলিত প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রাখা ছিল না।
দেশের সমতল অঞ্চলে বন্দোবস্ত নয় এমন সব জমিই জেলা প্রশাসকের ১ নম্বর খতিয়ান বইয়ে ‘খাস’ জমি হিসেবে নিবন্ধিত থাকে, যার মালিক রাষ্ট্র। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এ রকম খাসজমির কোনো অস্তিত্বই নেই।
সমতল অঞ্চলে যেসব জমি ‘খাসজমি’ হিসেবে বিবেচিত, সেসব জমি পার্বত্য চট্টগ্রামে হয় ব্যক্তির অধীন ভোগ-দখলীয় জমি নতুবা মৌজাবাসীর সমষ্টিগত মালিকানাধীন জুমভূমি হিসেবে বিবেচিত। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত এসব আইন, রীতি ও পদ্ধতিগুলো সক্রিয় ও কার্যকরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে এবং এসব আইন, রীতি ও পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য হয় দেশে প্রচলিত বিদ্যমান সার্ভে আইন সংশোধন করতে হবে, নতুবা পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য নতুন সার্ভে আইন প্রণয়ন করতে হবে। কিন্তু ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় যেভাবে তড়িঘড়ি করে একতরফা ঘোষণা দিয়েছেন তাতে এসব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, আইন, রীতি ও পদ্ধতি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয় না। স্বাভাবিকভাবে এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা আরও জটিলতর হয়ে উঠবে।
ভূমি জরিপের অনেক উদ্দেশের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ভূমির ম্যাপিংসহ ভূমির মালিকানা ঠিক করা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক আগে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না করে এবং অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থীদের তাদের জমি প্রত্যর্পণ না করে, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক জায়গা-জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও ভূমির মালিকানা চূড়ান্তকরণের মাধ্যমে পাহাড়ি জনগণের ভূমি রেকর্ডভুক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত না করে কীভাবে ভূমি জরিপের মাধ্যমে ভূমির মালিকানা ঠিক করা হবে তা বোধগম্য নয়। ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় ‘গাড়ির আগে ঘোড়া’ জুড়ে না দিয়ে কার্যত ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি’ জুড়ে দিতে যাচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
এমতাবস্থায় পার্বত্যবাসী আশা করে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রস্তাব অনুসারে প্রথমেই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধন করা হোক। একই সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দার মধ্য থেকে কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগদান ও কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত পরিসম্পদ বরাদ্দ করে কমিশনের কার্যালয় শক্তিশালী ও সক্রিয় করা হোক। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক আগে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি এবং পাহাড়ি শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপকাজ শুরু করা হোক। এ লক্ষ্যে অচিরেই পাঁচ সদস্যকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের আনুষ্ঠানিক সভা আহ্বান করে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক পদ্ধতিগতভাবেই প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ হোক, এটাই পার্বত্যবাসী আশা করে।
মঙ্গল কুমার চাকমা: তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

বাংলাদেশকে ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলাদেশে -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

সম্প্রতি জনপ্রিয় লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ঢাকা মহানগরের এক দুর্যোগময় করুণ চিত্র তুলে ধরে কলাম লিখেছিলেন প্রথম আলোয়। লেখাটি কাল্পনিক হলেও ঢাকাবাসী এবং ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন যে এ শোচনীয় বাস্তবতা অত্যাসন্ন, ক্ষেত্র বিশেষে তা এখনই সত্য। জাফর ইকবাল ছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিতই ঢাকা মহানগরের বর্তমান দুর্দশা এবং অদূর ভবিষ্যতের বিপর্যয় সম্পর্কে নানা রকম লেখা প্রকাশিত হচ্ছে।
ঢাকার দুর্দশা এবং সম্ভাব্য ভয়ানক পরিণতি নিয়ে তেমন দ্বিমত শোনা যায় না। সব সরকারই ঢাকাবাসী ও দেশবাসীকে আশ্বাস দেয়, আশার বাণী শোনায়। কিন্তু ঢাকার অগস্ত্যযাত্রা অব্যাহত থাকে, শেষের সে ভয়ঙ্কর দিন যেন কেবল কাছিয়েই আসছে।
আমি ঢাকাবাসী নই। নগর পরিকল্পনাবিদও নই। সে অর্থে এ নিয়ে বলার বোনাফাইড অধিকারী নই। কিন্তু রোগীর যখন নাভিশ্বাস ওঠে, তখন শুধু ডাক্তার-বদ্যিতে চলে না, এর-ওর কথাও কিছু শুনতে হয়। সেভাবেই দেশের একজন উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে কিছু বলা।
আমিও রাজধানী শহরের দুর্দশায় ভুক্তভোগী বইকি। তা ছাড়া রাজধানীই তো সারা দেশের সব নগরের প্রবণতা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অথচ ঢাকার দৃষ্টান্ত কোনো নগরের জন্যই তো মঙ্গলজনক হবে না। তাই রাজধানী ঢাকা মহানগরকে বাঁচানো সবার স্বার্থেই প্রয়োজন।
মহানগর ঢাকার সংকট দ্রুত গভীর থেকে গভীরতর হওয়ার কারণ, এর অতিবিস্তার (overgrowth) ঠেকানো যাচ্ছে না। অতিবিস্তারের মূল কারণ, সারা দেশ থেকে অবিরত মানুষ ঢাকা নগরে ছুটে আসছে, আস্তানা গাড়ছে। নিজের গ্রাম, শহর, চাকরিস্থল ফেলে কেন মানুষ এভাবে ঢাকামুখী হয়ে পড়েছে, তারও আবার একটা মূল কারণ আছে। সারা দেশে কর্মসংস্থান ও জীবন বিকাশের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মানুষ দেশের সম্পদ ও ক্ষমতার মূল কেন্দ্র রাজধানীতে ভিড় করছে।
সরকার রাজধানীতে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে সব সরকারি সিদ্ধান্ত যদি ঢাকায়ই নেওয়া হয় কিংবা সব সিদ্ধান্তের জন্য যদি ঢাকার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়, তাহলে ঢাকায় না থেকে মানুষের উপায় কী?
আমরা গণতন্ত্রের জন্য অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছি। কিন্তু ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন করা সম্ভব হয়নি, সরকারের কর্তৃত্ব দিন দিন বরং একজায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বিনিয়োগের সূত্রেই চাকরির সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিনিয়োগ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংকিং, বিপণন ও আনুষঙ্গিক সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের মালিকেরা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে সব উদ্যোক্তাকে ঢাকায় অফিস রাখতে হয় এবং বারবার ছোটাছুটির ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে অনেকেই শেষ পর্যন্ত অফিস, ব্যবসা এমনকি কল-কারখানা পর্যন্ত ঢাকায় স্থানান্তর করেছেন। চাকরিপ্রত্যাশীরাও জানেন, সম্ভাবনা যেটুকু আছে তা ঢাকায়ই। অতএব, তাঁদেরও ভিড় করতে হয় ঢাকায়।
সরকার, সম্পদ, ক্ষমতাকে ঘিরে তৈরি হয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা, ব্যবসা, প্রশাসন, পেশা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যদি উন্নতি করতে চান, তাহলে কপাল ঠুকে ঢাকায় এসে ভাগ্যান্বেষণই শ্রেয়। অন্যত্র এ সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। প্রায় নেই বললেই চলে।
সবকিছু, বিশেষত সম্পদ ও ক্ষমতা, একজায়গায় কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে একদিকে ভাগ্যান্বেষী মানুষ দলে দলে ঢাকায় ভিড় করছে, অন্যদিকে ঢাকায় থেকে যাঁরা ভাগ্যবান ভাবছেন নিজেদের, তাঁরা কিছুতেই ঢাকা ছাড়তে রাজি নন।
দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকে আইন ছিল, শুনেছি আইনটি এখনো আছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতে হবে। এভাবে শিক্ষিত অফিসারদের পরিবারের প্রভাবে অতীতে অনেক ছোট ছোট মহকুমা শহরকেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখা গেছে। কিন্তু আজকের দিনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তো বটেই, এমনকি অনেক নিম্নপর্যায়ের কর্মীও পরিবারকে ঢাকায় রাখে। মূল অজুহাত, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, বুড়ো মা-বাবার চিকিত্সা। হায়! অতীতে এঁরাই পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে একেকটি অঞ্চলে সেরা সেরা স্কুল গড়ে তুলেছেন। কোথাও গান-বাজনার স্কুল গড়েছেন, কোথাও নাট্যশালা, কোথাও বা আস্ত স্টেডিয়াম এবং নিয়মিত খেলাধুলার চর্চা চালিয়ে গেছেন।
বিকেন্দ্রীকরণের রাজনীতি আর চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার ধুয়া তোলার পর পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু শুনেছি, চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা দাপ্তরিক কাজের অজুহাতে মাসের চার সপ্তাহের তিন সপ্তাহই ঢাকায় কাটান।
এভাবে প্রবাসী নিঃসঙ্গ অফিসার সপ্তাহান্তে ঢাকায় গিয়ে পরিবারের সান্নিধ্যের আর সুযোগ পেলে ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের তদবির করার জন্য কর্মস্থলে আকুলতায় কাটান সপ্তাহের কটি দিন। পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা, একজন মানুষের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ছাড়াও নানা আর্থিক ও নৈতিক দুর্নীতিরও জন্ম দেয়। কিন্তু এ বিষয়গুলো ভাবার মতো কেউ নেই বলেই মনে হয়। দেশের দ্বিতীয় নগর চট্টগ্রামেই যখন এ অবস্থা, তখন অন্যান্য জেলা শহর ও উপজেলা শহরের কী অবস্থা, তা সহজেই অনুমেয়। এভাবে ঢাকাবাসের সুযোগ একবার যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা আর ঢাকা ছাড়ছেন না।
এদিকে বিভিন্ন ছোট-বড় শহরে যেসব কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী বড় হওয়ার ও সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তারাও জানে যেকোনোভাবে তাদের ঢাকায় এসে ঠাঁই করে নিতে হবে। নয়তো স্বপ্ন সফল হবে না। আবার এসব ছোট-বড় শহরে যারা প্রতিভার ঝলক দেখাচ্ছে, সেই প্রতিভা ও সাফল্যই তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঢাকায়।
আজ হয়তো কৃতী খেলোয়াড় সাকিব বা মাশরাফিরা সুযোগ পেলেই নিজের ডেরা মাগুরা বা নড়াইলে ছুটে যান, কিন্তু বলে দেওয়া যায়, ইতিহাস তাঁদের স্থায়ী আবাস হিসেবে ঢাকাকেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। এভাবে জাহিদ হাসান, আইয়ুব বাচ্চু, কবরীরা স্থায়ীভাবে ঢাকার বাসিন্দা হয়ে গেছেন।
অতীতে মানুষ অবসর নেওয়ার পর কিংবা বৃদ্ধ বয়সে নিজের পৈতৃক বাসভবন বা নিজের শহরে ফিরে আসতেন। এখন সন্তান কিংবা নাতি-নাতনির শিক্ষা আর নিজেদের চিকিত্সার দোহাই দিয়ে কেউই ঢাকা ছাড়তে নারাজ।
এভাবে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার, অধিকতর সুযোগ ও লাভপ্রত্যাশী ব্যবসায়ী, চাকরিতে উন্নতিপ্রত্যাশী তদবিরকারী চাকুরে, সম্ভাবনাময় অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা, নৃত্যশিল্পী, উচ্চাভিলাষী রাজনীতিবিদ, মামলার জট থেকে মুক্তিকামী মাস্তান—সবাই মহানগরে আশ্রয় নিতে ছুটে আসছেন। একদিকে ছুটে আসা, আরেক দিকে ছাড়তে না চাওয়া নাছোড়বান্দা মানুষের ভিড়ে ঢাকা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লাফিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। বাড়তে বাড়তে এখন ঢাকা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ জন-অধ্যুষিত মেগাসিটি। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে বাড়ি, গাড়ি ও বস্তি। নদী, খাল, নালা ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যেটুকু থাকছে তা মারাত্মক দূষণের শিকার। মাঠ, উঠান, খালি জায়গা থাকছে না। সর্বত্র হয় বাড়ি, নয়তো দোকান বা মল উঠছে। বাতাসে শিসা, কার্বন বেড়ে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে। ঢাকায় একটু জমি, একটি ফ্ল্যাট, মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পাওয়ার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে রাস্তায় যানজট অসহনীয়। নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো মুক্ত জায়গা নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। জলাবদ্ধতার সংকট বাড়ছে। শৈশব ও কৈশোর কাটছে বস্তুত কারাগারে, দূষিত আবহাওয়ায়, অপুষ্টিতে, অস্বাভাবিক বাস্তবতায়।
অথচ একটু সচেতন ও আন্তরিক হলে এ রকম ভয়াবহ পরিণতি হওয়ার কথা নয় ঢাকার। অন্য অনেক দেশের চেয়ে কৌশলগতভাবে খুবই সুবিধাজনক রাজধানী ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান। ঢাকা প্রায় দেশের মাঝখানে অবস্থিত। কেবল দ্রুতগামী রেলব্যবস্থা চালু করে ঢাকা থেকে দেশের ৬৪টি জেলা শহরের মধ্যে অন্তত ৪০টির সঙ্গে দুই ঘণ্টার কম সময়ে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব। আর ঢাকার আশপাশে অনেক টাউনশিপ গড়ে তোলা যায়। তাতে অযথা ঢাকার ওপর জনবসতির চাপ কমবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে মহানগরের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফলে গত নির্বাচনে কলকাতায় লোকসভা ও বিধানসভার আসন কমানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, একইভাবে এই ছোট্ট দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে ঢাকার সঙ্গে দুই ঘণ্টা দূরত্বের অনেক শহরে সরকারের অনেক মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর স্থানান্তর করা যায়।
তৃতীয়ত, কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে সপরিবারে বসবাসের আইন বা নিয়মটি অবশ্যই প্রয়োগ করা দরকার। তাতে আবার দ্বিমুখী কাজ হবে—শিক্ষিত পদস্থ ক্ষমতাবান পরিবারের অবস্থান ঘটবে আবার তাঁদের সান্নিধ্য-সহযোগিতা পেয়ে স্থানীয় মেধাবী, প্রতিভাবান, সম্ভাবনাময় ব্যক্তি ও তরুণেরা নিজ নিজ শহরে থাকতে উত্সাহিত হবেন।
চতুর্থত, সরকার, ক্ষমতা, সম্পদ ও বিত্ত যদি দেশের বিভিন্ন শহরে বিকেন্দ্রিত হয়, তাহলে মানুষের অবস্থানও বিকেন্দ্রিত হবে। অর্থাত্ এভাবে সারা দেশে অনেক উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত, সজীব, সৃষ্টিশীল নগরের উদ্ভব ঘটবে।
আজকে ঢাকা ক্ষমতা-সম্পদ ও তার পিছু নেওয়া মানুষের চাপে মুমূর্ষু অন্য শহরগুলো ক্ষমতা-সম্পদের ও সম্পন্ন মানুষের অভাবে শ্রীহীন ও মৃত্যুপথযাত্রী।
এককালের প্রাণবন্ত নগর-গঞ্জ-গাঁয়ে গিয়ে আপনি বুঝবেন, বাস্তবে বাংলাদেশের কী করুণ দশা চলছে।
ঢাকা একভাবে মরছে, সারা দেশ অন্যভাবে। বিজ্ঞাপনে শুনি, বাঁচতে হলে জানতে হবে। বটেই। জানতে তো হবেই। ঢাকার মরণ কামড় থেকে বাংলাদেশকে—তার সরকার, ক্ষমতা ও সম্পদ এবং পাগলপারা জনতাকে—বাঁচাতে হবে।
তারপর বাংলাদেশকে ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলাদেশে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

পারিবারিক নির্যাতনের অচেনা দিক -নারী অধিকার by জোবাইদা নাসরীন

প্রথম আলোয় ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি রিপোর্ট আমাদের আতঙ্কগ্রস্ত করেছে, শঙ্কিত করেছে। পারিবারিক নির্যাতন বন্ধ এবং এর বিপরীতে লিঙ্গীয় সমতা রক্ষার জন্য সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগকে রীতিমতো ব্যঙ্গ করেছে রিপোর্টটি। এই রিপোর্টের তথ্য আমাদের আলোর বিপরীতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, আশার আলো নিভিয়ে দেয়। আমরা ঘরের দিকে ফিরে তাকাই, নির্যাতনের চিত্র দেখি, ভয়াবহতা দেখি, নারীর অবস্থা বিবেচনা করি।
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টটিতে প্রধান যে বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে তা হলো বাংলাদেশে বিবাহিত পুরুষদের ৬০ শতাংশই দাম্পত্য জীবনে কোনো না কোনো সময় স্ত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন। আমরা ধরেই নিতে পারি, এর সংখ্যা আরও বেশি। কেননা এ দেশে খুব কম নারীই স্বামীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাইরে করও কাছে বলেন। ‘ঘর-বাহির’-এর রাজনৈতিক দূরত্ব তাঁদের এই নির্যাতনের পরিসীমাকেও খণ্ডিত করে। তাই এর বিরুদ্ধে আইন-বিচারের জায়গাও হয়ে পড়ে খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত। যার কারণে নারী ছিটকে পড়ছে আরও দূরে, কেননা কোনো নির্যাতনের জন্য কেথায় গিয়ে বিচার চাইতে হবে, সেটি হয়ে পড়ে তার কাছে অস্পষ্ট। ফলে আরও বেশি নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই চোখ বন্ধ করে বলা যায়, এই ৬০ শতাংশ হলেন তাঁরাই যাঁরা কিছুটা বলতে পেরেছেন কিংবা সমাজের হাজারো চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে বলার মতো শক্তি অর্জন করেছেন, কিংবা যারা স্বামীর নির্যাতনের কারণেই ভয়কে জয় করতে পেরেছেন।
তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, এখানেই শেষ হয়ে যায়নি এই তথ্যের জৌলুস। গবেষণা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা রিপোর্টটি আরও জানায়, পরিবার-কাঠামোতে ৫৪ শতাংশ স্বামীর মতে, স্ত্রীকে নির্যাতন করা স্বামী-স্ত্রীর একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। ৩৯ শতাংশ মনে করেন, স্ত্রীকে মারধর করার অধিকার স্বামীর আছে। এটি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, এটি একবারেই পুরুষতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়। ‘ব্যক্তিগত’-র আবরণ দিয়ে এটিকে জায়েজ করা হয়, বৈধ করার চেষ্টা হয় কিংবা অপরাধ জেনেও আড়াল করার অবিরাম চেষ্টা চলে। তাই এই প্রবণতাকে মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে। আর শুধু স্ত্রী কেন যে-কাউকেই শারীরিকভাবে আঘাত করা অপরাধ, নির্যাতন। সেটি কারও অধিকার হতে পারে না।
বাংলাদেশে পরিচালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ মতে, ১৫ বছরের বেশি বয়সী গ্রামের নারীদের ৪২ শতাংশ এবং শহরের নারীদের ৪০ শতাংশ কাছের মানুষের মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এর সঙ্গে আরও তথ্য জানা যায়, আইসিডিডিআরবি এবং নারীপক্ষ পরিচালিত জরিপ থেকে, যেখানে দেখা গেছে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী নারীদের ৪৮ শতাংশই এ নির্যাতনের শিকার (প্রথম আলো, ১২ সেপ্টম্বর ২০০৯)। এই বিষয়ে বেশ কটি গবেষণা-রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশে পাঁচ থেকে নয় বছর বয়সী মেয়েশিশুরা প্রথম যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয় খুব কাছের আত্মীয়-পরিজনদের মাধ্যমে, আদর-স্নেহের আবরণে কিংবা অতি ভালোবাসার প্রলেপে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একজন মেয়েশিশুর বয়স এতই কম থাকে, সে বুঝতেই পারে না যে এটি নির্যাতন। পরবর্তী সময়ে বুঝতে পারলেও, সামাজিক চাপ ও পুরুষতন্ত্রের অনিঃশেষ তাপে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই বিষয়ে খুব বেশি আগানো সম্ভব হয় না।
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ ‘হেলথ সার্ভে ২০০৭’ শীর্ষক এক জরিপে স্ত্রী-নির্যাতনের পেছনে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে স্বামীর আদেশ অমান্য করা, স্বামীর যৌন আগ্রহে সাড়া না দেওয়া, যথাসময়ে ঘরের কাজ শেষ না করা, সন্তানদের যত্ন না নেওয়া, স্বামীকে না বলে বাইরে যাওয়া, ধর্মীয় আচার না মানা এবং স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করা। এই সব অজুহাত নির্যাতনের কারণ হিসেবে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নারীর এই ধরনের আচরণের সামাজিক চাহিদায় ‘সামাজিক নারী’র একটি কল্পিত রূপ আমাদের সামনে হাজির করে। পারিবারিক এই নির্যাতন সয়ে যাওয়া, দেনদরবার করা, প্রতিবাদ করা কিংবা এটিকে অনিবার্য বলে মনে করে নারী ‘বিয়ে’ নামক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আসলে একটি ব্যবস্থার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আপসরফার চেষ্টা করে মাত্র। কখনো কখনো সেটি ঘটে তার জীবনের বিনিময়েও। কিন্তু এটি হওয়া ঠিক নয়, এই ধরনের প্রবণতার মাধ্যমে নারী নির্যাতন আরও বাড়ে, কোনোভাবেই কমে না।
এখানে কিছু বিষয় খোলাসা করা প্রয়োজন। প্রথমত, নারীর প্রতি শারীরিক নির্যাতনের ধরন বলতে বলা হয় কিংবা বোঝানো হয় শারীরিকভাবে মারধর করাকেই। কিন্তু এই নির্যাতনের অন্যতম ধরন হলো ‘ম্যারিটাল রেপ’ অর্থাত্ বিয়ে সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ, যেটিকে বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই বিবেচনার মধ্যে নেওয়া হয় না। দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণের অস্তিত্ব এবং এর মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি নির্যাতনের বিষয়টিও পারিবারিক কাঠামোতে নারীর প্রতি নির্যাতনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ধরন; কিন্তু এটিকে সামনে আনা হয় না, গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয় না, বরং দাম্পত্য সম্পর্কের অনিবার্য শর্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ম্যারিটাল রেপকে যদি নির্যাতন হিসেবে দেখা হতো, তাহলে নির্যাতনের পরিমাণ নিশ্চিতভাবেই ৬০ শতাংশের বেশি হতো। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র নেপালেই ম্যারিটাল রেপের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। ওখানে বলা হয়েছে, ধর্ষণ হলো ধর্ষণই, সেটি যার মাধ্যমে যেভাবেই সংগঠিত হোক না কেন। আমেরিকার একটি গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, বিয়ে সম্পর্কের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যা কখনো পারিবারিক নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। পারিবারিক নির্যাতনের একটি বড় জায়গা হিসেবে বাংলাদেশে অচিরেই ম্যারিটাল রেপের মতো বিষয়কে সামনে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি হলো পারিবারিক নির্যাতনকে ব্যক্তিগতভাবে দেখা। পরিবার একটি সামাজিক স্তম্ভ। কিন্তু কী কারণে পারিবারিক সম্পর্ককে ব্যক্তিগত বলা হয় কিংবা ব্যক্তিগত হিসেবে দেখা হয় তা বোঝা মুশকিল। ব্যক্তিমাত্রই রাজনৈতিক, এখানে কোনো কিছুকে ব্যক্তিগতর মোড়কে দেখার সুযোগ নেই, এবং সম্পর্ক কখনো ব্যক্তিগত হতে পারে না। বিশেষ করে, লিঙ্গীয় সম্পর্ক বিশ্লেষণে বলা যায়, এই সম্পর্কে যে রাজনৈতিক লেনদেন থাকে, শাসন-শোষণের বিষয় থাকে, ঔপনিবেশিকতা-অধীনতার ধরন থাকে, এটি কখনো ব্যক্তিগত হতে পারে না। পারিবারিক নির্যাতন অবশ্যই একটি রাজনৈতিক বিষয়— এটি অপরাধ, এটি বন্ধ হওয়া উচিত।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaida_76@yahoo.com

বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা ও আমাদের করণীয় -দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা by ধরিত্রী সরকার

২১ সেপ্টেম্বর রাতে কেঁপে উঠেছিল রাজধানী ঢাকার সব উঁচু ইমারত। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ওই দিনই বিকেলে আরেকটি মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী রাতের ভূমিকম্পটি ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৪ মাত্রার এবং যার উত্পত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৫৫২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মিয়ানমায়ের কোনো এলাকায়। ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে চীন-ভুটান সীমান্তে আঘাত হানা ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.৪। ওই ভূমিকম্পে ভুটানে কমপক্ষে ১১ জনের মুত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে গত মাসে ১০ আগস্ট রাতেও বাংলাদেশে মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে সে ভূমিকম্পে ঢাকা ও চট্টগ্রামে কম্পনের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ ও ৪।
বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের দেখা মেলে। পর পর দুই মাসে তিনটি ভূমিকম্প কি আমাদের সেই কথায় মনে করিয়ে দিচ্ছে?
এবারের ভূমিকম্পের পর ঢাকাবাসী কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে যে আমরা বড় একটা ঝুঁকির মধ্যে আছি। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে আমরা যতটা ভীত হয়েছি, তাতে বড় ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি হলে ঢাকায় বিপর্যয়ের পরিমাণ কতটা হবে তা নিয়ে অনেকেই আতঙ্কিত হয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি নগণ্য, জনসচেতনতাও প্রায় নেই বললেই চলে। এ কথা সত্য, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় রয়েছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পে বাংলাদেশের কোনো অঞ্চল বিধ্বস্ত হতে পারে। আমরা যদি এখন থেকে সতর্কতা অবলম্বন না করি বা সুউচ্চ ভবন সঠিক কারিগরি নিয়ম মেনে নির্মাণ না করি, তাহলে যেকোনো দিন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণত রিখটার স্কেলে ৫ থেকে ৫ দশমিক ৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বলা হয়। ৬ থেকে ৬ দশমিক ৯৯ মাত্রাকে তীব্র, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৯৯ মাত্রাকে ভয়াবহ এবং এর ওপরের মাত্রাকে অতি ভয়াবহ ভূমিকম্প বলা হয়। সে হিসাবে ঢাকা মহানগরে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর জন্য একটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পই যথেষ্ট। কারণ, এযাবত্ রাজউক থেকে যেসব বাড়ির নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, তার প্রায় সবই রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রার কিছু বেশি ভূকম্পন সহ্য করতে পারে। উপরন্তু কোনো কোনো বাড়ির মালিক নির্ধারিত মাত্রার ভূকম্পন প্রতিরোধক বাড়ির নকশা পাস করিয়ে বাড়ি নির্মাণের সময় তা আর মানেননি। ৭ মাত্রার রিখটার স্কেল বজায় রাখা হয়েছে—এমন নমুনা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি হয়েছিল ১৮৯৭ সালে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও আসাম এলাকায় সংঘটিত এ ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ১। সে ভূমিকম্পে ময়মনসিংহ, রংপুর, ঢাকাসহ অনেক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ঢাকায় সে সময়ের ইটের তৈরি প্রায় সব ভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, এ ধরনের বড় ভূমিকম্প ১০০ থেকে ১৩০ বছরে একই এলাকায় আবার আঘাত হানতে পারে। সে হিসাবে নিকট-ভবিষ্যতে ঢাকায় একটি বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অতীতে সংঘটিত ভূমিকম্পগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৯৭ সালের ৮ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পটি ঘটেছিল ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুরসহ দেশের অনেক অঞ্চলে, যার উত্পত্তি হয়েছিল সিলেটের ডাউকি ফল্ট থেকে। ১৯১৮ সালে সিলেটের শাহজিবাজার ফল্ট সিস্টেম থেকে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উত্পত্তি হয়ে আঘাত হেনেছিল শাহজিবাজারসহ সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরও কিছু ঝুঁকিপ্রবণ ভূমিকম্পের উত্পত্তি-এলাকা বা ফল্ট সিস্টেম সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ছয়টি এলাকায় মাটির নিচে বড় ধরনের ফাটল বা চ্যুতি রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকার ডাউকি নদীর পাশে সিলেট ও মেঘালয় এলাকার মাটির নিচের ফাটলটি সবচেয়ে বড়। প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ফাটলের কারণে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার এলাকা ঝুঁকির মধ্যে আছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় একটি ফাটল বা ফল্ট সিস্টেম রয়েছে, যার কারণে ঢাকা বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ফল্ট সিস্টেম, টেকনাফ ফল্ট সিস্টেম, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ফল্ট সিস্টেম এবং রাজশাহীর তানোর ফল্ট সিস্টেম থেকে যেকোনো সময় মাঝারি বা বড় আকারের ভূমিকম্প উত্পত্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকেই। উত্পত্তিস্থলের কাছাকাছি ক্ষতির আশঙ্কা সব সময় বেশি হলেও সেটি কত দূর ছড়াবে, তা কম্পনের তীব্রতা ও মাটির গঠনের ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশের অবস্থান একটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় হওয়ায় আমরা সব সময় সে ঝুঁকির মধ্যেই আছি। তবে গ্রামীণ এলাকায় বহুতল ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো কম হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কম। কিন্তু ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ক্ষতির আশঙ্কা খুবই বেশি। ঢাকায় অসংখ্য ভবন তৈরি হয়েছে কোনো ধরনের ভূমিকম্প-প্রতিরোধক ডিজাইন ছাড়াই। অধিকসংখ্যক মানুষের বসবাসের জায়গা তৈরি করতে গিয়ে খাল, বিল, নালাসহ নিচু ভূমি ভরাট করা, মাটিকে কোনো রকম জমাট বাঁধার সময় না দিয়ে যেসব ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলো ভূমিকম্পের আঘাতে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা খুবই বেশি। দুর্বল ভিত্তি ভূমির মধ্য দিয়ে ভূমিকম্পের তীব্রতা পরিবাহিত হয় খুব তাড়াতাড়ি। এসব জানা সত্ত্বেও খোদ রাজউকই পূর্বাচল ও উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পে জনগণের জন্য প্লট তৈরি করছে নিচু ভূমি ভরাট করে। মাত্রাতিরিক্ত নগরায়ণ-প্রবণতার কারণে অনেক নিচু জমিতে বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে সঠিক পাইলিং ছাড়াই, যা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে থাকবে সব সময়।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড তৈরি হয়েছে, যা অনুসরণ করে ইমারত নির্মাণ হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকা শহরের নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রেই যে তা মানা হয়নি, তা অনেক কর্তৃপক্ষেরই জানা। ফলে এসব বিল্ডিং ভূমিকম্পে ধসে অজস্র মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকছেই।
ভূমিকম্প আঘাত হানলে পানি, বিদ্যুত্, গ্যাসের মতো অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন থেকে অনক ক্ষেত্রেই আগুন ধরে, যা অনেক ক্ষতির কারণ হয়। পানি ও পয়োলাইনগুলো বিধ্বস্ত হয়ে অপরিষ্কার পানির আগ্রাসনে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ ধরনের হুমকির মুখে আমাদের প্রস্তুতি কী? বলতে গেলে তেমন কিছুই নেই। মনে রাখা দরকার, যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার চেয়ে দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতি অনেক বেশি কার্যকর। তবে মনে রাখা দরকার, অন্যান্য দুর্যোগের মতো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস আগে পাওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। জানা যেতে পারে মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট খানেক আগে। সে কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকির প্রাকপ্রস্তুতিও নিতে হয় অনেক আগে থেকেই।
আমাদের প্রধান ঝুঁকি হলো রাজধানী ঢাকা। মানুষ বাড়ছে হু হু করে। ঢাকা শহরে এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে অনেক বহুতল ভবন রয়েছে। কিন্তু সেখানে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার ব্যবস্থাও নেই। জলাভূমি, খাল, নদী-নালা, ডোবা ভরাট করে বাড়িঘর বানানো হয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরের ৬০ শতাংশ বাড়িই দুর্বল মাটির ওপর তৈরি। হাউজিং কোম্পানিগুলো কোনোরকমে নিচু ভূমি ভরাট করে প্লট বিক্রি করছে বা বহুতল ভবন তৈরি করে ফেলছে। মাটিতে ঠিকমতো গাঁথুনি দেওয়া হচ্ছে না, ঠিকমতো পাইলিংও করা হচ্ছে না। নরম মাটির মধ্য দিয়ে ভূকম্পনের অগ্রসর হওয়ার তীব্রতা অনেক বেশি। বিল্ডিং কোড মেনে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী করে তৈরি করা না হলে, ঢাকার ভবনগুলো ভূমিকম্প-ঝুঁকির মধ্যে ডুবে থাকবে সব সময়।
ঢাকা ও অন্যান্য শহরে জরাজীর্ণ ও পুরোনো বাড়ির সংখ্যা অনেক হওয়ায় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নীতিমালা মেনে না চলায় বড় ধরনের ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হতে পারে। উদ্ধারকাজের মেশিন ও যন্ত্রপাতির তেমন মজুদ নেই। অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্প হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে জনসচেতনতাও নেই। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মোকাবিলায় সচেতনতা একটি বড় বিষয়। বলা যায়, একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে গেলে আমাদের প্রায় শুরু থেকে শুরু করতে হবে। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না, তা মানুষকে জানাতে হবে। বাংলাদেশে এখন সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে। ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সংখ্যাও বেড়েছে। দুর্যোগ-পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করতে গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের মধ্যে এতটুকু চিন্তা ঢোকাতে হবে যে তার সারা জীবনের সঞ্চয়ে গড়ে তোলা বাড়ি ও জীবন এক মুহূর্তের একটি ভূমিকম্পে নষ্ট হয়ে যেতে পারে সামান্য নিয়ম না জানা, কার্পণ্য ও অসচেতনতার ফলে।
ভূমিকম্পসহনশীল ভবন নির্মাণ করলে সে ভবনে বসে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু থাকে না। তবে ভূমিকম্প-ঝুঁকির কথা চিন্তা না করে দেশে যে শত-সহস্র ভবন নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর ঝুঁকি মারাত্মক। সে কারণে, ভূমিকম্পের সময়ে জীবন রক্ষার জন্য অর্থাত্ নিজেকে বাঁচানোর জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সাধারণত মানুষকে জানানো বা তাদের সচেতন করে তোলা খুবই জরুরি। সরকার ও গণমাধ্যমগুলো জনগণকে সচেতন করার সে দায়িত্বটুকু কাঁধে নিলে মানুষ অনেক উপকৃত হবে।
ধরিত্রী সরকার: বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ের লেখক।

আরও সেনা চাই! -আফগানিস্তান by রবার্ট ফিস্ক

অবশেষে ওবামা ও ওসামা একই আখ্যানে অংশ নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির সমালোচকেরা, বিশেষত আফগানিস্তানে পশ্চিমা সামরিক দখলদারির ঘোর বিরোধীরা, কথা বলতে শুরু করেছেন ওবামার (এবং তাদেরও) সবচেয়ে বড় শত্রুর ভাষাতেই।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস ও জেনারেল ডেভিড পেট্রোস মিলে ওবামাকে আফগানিস্তানের অতল অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছেন, আমেরিকায় এমন সন্দেহ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।
এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে মার্কিনিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ওসামা গত সপ্তাহকে বেছে নিয়েছেন। নয়-এগারোর অষ্টম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বেতারবার্তায় ওসামা বলেন, ‘তোমরা এক নৈরাশ্যজনক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছ, এতে তোমাদের পরাজয় ঘটবেই। সময় এসেছে আতঙ্ক থেকে, নব্য রক্ষণশীল ও ইসরায়েলি লবির মতাদর্শিক সন্ত্রাস থেকে নিজেদের মুক্ত করার।’ ওসামার মতে, ওবামার ‘দুর্বলতা’ তাঁকে আফগানিস্তান ও ইরাকযুদ্ধ থেকে সরে আসতে দেয়নি। আফগানিস্তানে মুসলমান যোদ্ধারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে পর্যুদস্ত করবে, ‘যেমন তারা ১০ বছর ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিঃশেষিত করেছে, অবশেষে ধসে যাওয়া পর্যন্ত।’ মজার বিষয়, নয়-এগারোর চার বছর আগে এবং ২০০১ সালে আমু দরিয়া নদীর দক্ষিণে মার্কিন অভিযানের শুরুতে ঠিক এ কথাটাই আফগানিস্তানে বিন লাদেন আমাকে বলেছিলেন।
প্রায় দল বেঁধেই অনেক মার্কিনি সুর মেলাল ওবামার সঙ্গে। সর্বদাই তারা ‘অশুভ’ ইরানের বিপক্ষে এবং ইরাক আক্রমণে উল্লসিত উস্কানিদাতা ইসরায়েলকে প্রশ্ন করার সাহস তারা রাখে না। ‘আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে পারব বলে মনে হয় না’, বলেন সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির সভাপতি ক্যালিফোর্নাির ডেমোক্র্যাট ডিয়ানি ফেইনস্টেইন। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি মনে করেন না যে ‘আফগানিস্তানে আরও সেনা পাঠানোর পক্ষে খুব বেশি জনসমর্থন আছে।’
কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক কমিটির সভাপতি কলিন কেনি বলেন, ‘আফগানিস্তানে আমরা দ্রুতবেগে ধাবিত হচ্ছি ভিয়েতনামের মতো পরিণতি বরণের দিকে।’
আপনার চোখ বন্ধ করুন আর ভাবুন, শেষের কথাগুলো আল-কায়েদার গুহা থেকে উত্সারিত হয়েছে বলে মনে হয় না? বিশ্বাস করা কঠিন, তাই না? শুধু ওবামার কাছে যেন এ বার্তা পৌঁছে না। তাঁর কাছে, এখনো এ ‘যুদ্ধ অপরিহার্য’। তাঁর জেনারেলরা আরও সেনা পাঠানোর আবেদন জানাচ্ছে। আর এই অর্থহীন যুক্তির অনুসরণই আমাদের দেখে যেতে হবে। তালেবানরা হেরেছে ২০০১ সালে। তারপর থেকে তারা জিততে শুরু করেছে। তারপর আমরা আফগান গণতন্ত্র রক্ষায় নামলাম। দ্বিতীয় দফার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পাহারা দিতে হয়েছে আমাদের সেনাদের, তা করতে গিয়ে তারা জীবন দিয়েছে। একটি জোচ্চুরির নির্বাচনের জন্য তারা প্রাণ দিচ্ছে। ওবামা আমাদের আশ্বস্ত করছেন যে আফগানিস্তান ভিয়েতনাম নয়। আর তখনই এক জার্মান বাহিনী বিমান হামলা শুরু করলো—এবং আরও অনেক আফগান বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হলেন।
এবার কানাডীয় সেনাবাহিনীর দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। আফগানিস্তানে কানাডার সেনাসংখ্যা ব্রিটিশদের থেকে কম, কিন্তু তারাও ভয়ংকর আঘাতের মোকাবিলা করেছে। গত সপ্তাহে কান্দাহারের কাছে তাদের ১৩০তম সেনাটি মারা গেছে। প্রতি তিন মাস অন্তর কানাডীয় কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তানে তাদের সামরিক অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করে। এই দলিল পেন্টাগন বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দলিল থেকে অনেক বেশি সত্ ও বিস্তারিত। এই তথ্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, এই অভিযানের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। আফগানিস্তানে কানাডার সামরিক অগ্রগতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, কান্দাহার প্রদেশ আরও সহিংস, অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ হয়ে উঠছে—এবং ২০০১ সালে তালেবানের পতনের পর যেকোনো সময়ের থেকে সারা দেশে হামলার ঘটনা বেড়েছে। ২০০৮ সালের তুলনায় এবার গ্রীষ্মে আক্রমণের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি।
রাস্তার পাশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। আফগানরা বলছে, তারা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এই অসন্তুটির কারণ মূলত দুর্বল নিরাপত্তা বা নিরাপত্তাহীনতা। কানাডা এখন এই প্রদেশ নিয়ন্ত্রণের সত্যিকারের কোনো চেষ্টা বাদ দিয়ে শুধু কান্দাহার শহরের নিরাপত্তার দিকে মনোনিবেশ করেছে।
কানাডার সেনাবাহিনী আফগানিস্তান ছাড়বে ২০১১ সালে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের ৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র পাঁচটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর মাত্র ২৮টি ‘নির্মাণাধীন’। অথচ কান্দাহার প্রদেশের ৩৬৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮০টি বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। কান্দাহারের ‘গণতান্ত্রিক সুশাসন’ বিষয়ে অগ্রগতি প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামর্থ্যের দিক দিয়ে আফগান সরকার ‘ভীষণ র্দুবল এবং সর্বব্যাপ্ত দুর্নীতি তাকে আরও দুর্বল করছে।’
পোলিও নির্মূলের মতো প্রাথমিক লক্ষ্যেও পৌঁছানো যায়নি। আফগানিস্তানে অটোয়ার সবচেয়ে পছন্দের বেসামরিক প্রকল্পের এই পরিণতি স্বীকার করার ক্ষেত্রেও চলেছে ব্লেয়ার (বা ব্রাউনের) মতো রাখঢাকের খেলা। টরন্টো স্টার তা প্রকাশ করার পর জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ প্রকল্পে পোলিও নির্মূলের স্থলে নীরবে চলে আসে পোলিও ‘সংক্রমণ প্রতিরোধ’। পোলিও থেকে কত শিশু নিরাপদ তা গণনার পরিবর্তে লক্ষ্য পরিবর্তন করে কতজন শিশু টিকা নিয়েছে তা উল্লেখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হলো।
বিন লাদেনের সর্বশেষ এই নসিহত যাদের উদ্দেশে আমেরিকার সেই রিপাবলিকান যুদ্ধবাজ নেতারা আফগানিস্তানের এই বিপর্যয়ে কী বলেন? ‘আরও সেনা আফগানিস্তানে সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না,’ হেরে যাওয়া রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন এ কথা বলেছেন গত সপ্তাহে। ‘কিন্তু সেনা পাঠাতে না পারা আমাদের ব্যর্থতাকে নিশ্চিত করবে।’ এমন উদ্ভট ঘোষণা যখন আল-কায়েদার অন্ধকার গুহার চারপাশে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, ওসামা নিশ্চয়ই মুখ টিপে হেসেছেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
রবার্ট ফিস্ক: দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদদাতা।