Sunday, July 10, 2016

বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন ব্লেয়ার

সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে ইরাকে হামলার যৌক্তিকতা ও ফলাফল নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। ইরাক যুদ্ধে হতাহত ব্রিটিশ সৈন্যদের পরিবার ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ব্লেয়ার যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে না পারেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য থাকতে না পারেন, সে জন্য আইনি নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিও উঠেছে। ‘চিলকট রিপোর্ট’ নামে ঐতিহাসিক এই তদন্ত প্রতিবেদন গত বুধবার প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মিলে ইরাকে যে হামলা চালিয়েছে, তা কোনো যৌক্তিক বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল না। দেশটিকে নিরস্ত্র করার শান্তিপূর্ণ উপায়গুলো পাশ কাটিয়ে ওই হামলা চালানো হয়।
ভবিষ্যতে কোনো দেশে হস্তক্ষেপ কিংবা হামলা চালানোর আগে এই প্রতিবেদনের শিক্ষাগুলো মাথায় রাখতে যুক্তরাজ্য সরকারকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ইরাকে হামলায় যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা অনুসন্ধান এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সরকারের ভূমিকা তদন্তে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা স্যার জন চিলকটকে প্রধান করে ২০০৯ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটি দীর্ঘ সাত বছর পর তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করল। স্যার জন চিলকটের নাম অনুসারে এ প্রতিবেদনকে ‘চিলকট রিপোর্ট’ বলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই তদন্তের প্রক্রিয়া বিভিন্নভাবে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাই প্রতিবেদনটি প্রকাশে অস্বাভাবিক সময় লেগে গেল। স্যার জন চিলকট বলেন, বিচার কিংবা রায় দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের নয়। তাঁরা কেবল ইরাক যুদ্ধের যৌক্তিকতা ও প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে কাজ করেছেন। তবে যেখানে প্রত্যাশিত মানদণ্ড লঙ্ঘিত হয়েছে, সেখানে কাঙ্ক্ষিত সমালোচনা করেছেন তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ইরাকের তৎকালীন স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, তিনি (সাদ্দাম হোসেন) বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। কারণ তিনি গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইরাকে হামলার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও একই দোহাই দিয়ে ইরাকে হামলা চালাতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনুমোদন নেন। শুরু থেকেই এ হামলার বিরোধিতায় ফুঁসে উঠেছিল যুক্তরাজ্যের মানুষ। ইরাক যুদ্ধে ১৭৯ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হন। সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড। যুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ ইরাকি নিহত হয় এবং ১০ লাখের বেশি বাস্তুহারা হয়। প্রায় ২৬ লাখ শব্দের চিলকট রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত রয়েছে—এমন তথ্য ছিল ভিত্তিহীন। মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলার পুরো পরিকল্পনা করা হয়।
ব্রিটিশ সৈন্যদের ইরাকে হামলায় অংশ নেওয়ার আইনি ভিত্তি কোনোভাবেই সন্তোষজনক ছিল না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বেশির ভাগ সদস্য চেয়েছিল হামলা না চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনের প্রতি চাপ অব্যাহত রাখতে। কিন্তু মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে হামলার প্রস্তাব পার্লামেন্টে পাস করিয়ে নেন টনি ব্লেয়ার। তদন্তে উঠে আসা টনি ব্লেয়ার ও জর্জ বুশের বার্তা আদান-প্রদানে দেখা যায়, ব্লেয়ার যেন ইরাকে হামলার পণ করেছিলেন। এক তার বার্তায় ব্লেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের কাছে লেখেন, ‘যা-ই ঘটুক, আমি আপনার সঙ্গে থাকব।’ ব্লেয়ারের বিচারের দাবিতে, ‘স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন’ লন্ডনে বড় ধরনের বিক্ষোভ করে। আন্দোলনের সাফল্য দাবি করে বক্তারা বলেন, এই প্রতিবেদনই শেষ নয়, এটা ব্লেয়ারের বিচারের শুরু মাত্র।

উত্তাল কাশ্মীরে নিহত ১১ বিক্ষোভকারী

কাশ্মীর উপত্যকা ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত কাশ্মীরি জঙ্গিদের ‘পোস্টার বয়’ বুরহান মুজাফফর ওয়ানির দাফনকে কেন্দ্র করে অশান্ত উপত্যকায় গতকাল শনিবার এগারো জনের মৃত্যু হয়। একজন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। উত্তেজিত জনতা তিনটি থানায় আগুনও লাগিয়ে দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, গোটা উপত্যকায় কারফিউ জারি থাকবে। বছর দুয়েক ধরে বুরহান ওয়ানি কাশ্মীরি জঙ্গিদের মুখচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দক্ষিণ কাশ্মীরের ট্রাল এলাকার ২২ বছরের এই সুদর্শন যুবক হয়ে ওঠেন হিজবুল মুজাহিদীনের স্বঘোষিত কমান্ডার। শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দক্ষিণ কাশ্মীরের কোকরনাগ এলাকায় হানা দেয়। দুই সঙ্গীসহ বুরহান এই হানায় নিহত হন। গতকাল বুরহান ও তাঁর সঙ্গীদের দাফন সম্পন্ন হয়।
গোলমালের আশঙ্কায় রাজ্য প্রশাসন আগে থেকেই উপত্যকায় কারফিউ জারি করেছিল। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের অমরনাথ যাত্রাও স্থগিত রাখা হয়। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল বুরহানের নিজস্ব এলাকা ট্রালে বিপুল জনসমাগম হয়। সেখানে কিছু না হলেও দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগামসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজিত ও মারমুখী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি চালালে দুজনের মৃত্যু হয়। অন্য একজনের মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। পুলিশ বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর একটি শিবিরে স্থানীয় ব্যক্তিরা আক্রমণ করলে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে বাধ্য হয়ে পুলিশকে গুলি চালাতে হয়। কাশ্মীরে জঙ্গিদের দাফনকে ঘিরে সব সময়ই অশান্তি মাথাচাড়া দেয়। কখনো কখনো পুলিশ নিহতের দেহ আত্মীয়দের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেরাই দাফন সম্পন্ন করে। বুরহানের ক্ষেত্রে কিন্তু প্রশাসন তা করেনি। কেন করেনি, সে বিষয়ে সরকার বা নিরাপত্তারক্ষীদের কেউ কিছু জানায়নি।

সমাজের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন

পবিত্র রমজান মাসের বিদায়ী শুক্রবার (১ জুলাই) দেশি-বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজানের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জের কাটতে না কাটতেই পবিত্র ঈদের দিনে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জামাত শুরু হওয়ার পূর্বমুহূর্তে এক হামলার ঘটনা ঘটল। ধারণা করা যায়, হয়তো ঈদগাহ ছিল আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু, পুলিশের আত্মত্যাগ ও কর্তব্যপরায়ণতার কারণে হয়তো বড় ধরনের ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া গেছে। পূর্ণ তদন্তের পরই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। এর মধ্যে হামলাকারীদের মধ্যে নিহত একজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যা পুলিশের ভাষ্য থেকে জানা যায়। ওই হামলাকারী তরুণ আবিরও একজন হারিয়ে যাওয়া সন্তান, যাঁর বাবা ওই হামলার এক দিন আগে ভাটারা থানায় জিডি করেন বলে প্রকাশ (প্রথম আলো, জুলাই ৯, ২০১৬ ইন্টারনেট সংস্করণ)।
এই দুই হামলার মধ্যে তেমন মিল নেই, তবে গুলশানের হামলা ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসী সন্ত্রাসী হামলা। পারিপার্শ্বিকতা, ধরন ও উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং যাদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে, এর সব কটিতেই ছিল ইসলামিক স্টেট বা আইএসের তাত্ত্বিক ছাপ। অবশ্য পরে হামলাকারীদের ও রেস্তোরাঁর মধ্যে হত্যাযজ্ঞের যে ছবি এবং নিহতের সংখ্যা দেশের মানুষ জানার আগেই বিশ্বে আইএসের মুখপত্র ‘আমাক’-এর মাধ্যমে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাইট’ নামক সংস্থা দিয়ে ছড়িয়েছে, তাতে ওই হামলার সঙ্গে যে আইএসের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ধরে নিয়েছে। আমরা যতই বিষয়টিকে হোমগ্রোন বলি না কেন, এই হোমগ্রোনদের সঙ্গে অন্তত তাত্ত্বিকভাবে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এসব দাবি হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
এ হামলাকারীদের, বিশেষ করে গুলশানের হামলাকারীদের বয়স এবং পরিচয় পেয়ে দেশবাসী হতভম্ব হয়েছে, হওয়ারই কথা। এই দুই জায়গার হামলাকারীদের বয়স ১৮-২৬ বছরের মধ্যে এবং এঁদের বেশির ভাগ সেকু্যলার স্কুল-কলেজ বলে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, উচ্চশিক্ষিত আধুনিক, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবক। এঁদের পারিবারিক পরিচয় উদ্ঘাটিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে এই তরুণেরা কেন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে এ ধরনের এমন আত্মঘাতী পথ বেছে নিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর তেমন সহজ নয়। বিশ্বব্যাপী প্রচুর গবেষণা চলমান, জানার চেষ্টা হচ্ছে কেন এসব তরুণ এ ধরনের পথ বেছে নিয়েছেন, যা উদ্দেশ্যবিহীন সহিংস অমানবিক পথ। ইরাক যুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে তথাকথিত আরব বসন্তের জের হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার মধ্য দিয়ে বিগত শতাব্দীর আশির দশকে আফগান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সংগঠিত মৃতপ্রায় আল-কায়েদার নবজন্ম ঘটে। এবং তারই জন্ম দেওয়া আইএসের উত্থান ঘটে বিস্ময়করভাবে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাদের তৎপরতা যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা থেকে আমাদের এ ভূখণ্ডও বাদ যায়নি। বিগত দুই বছরে বাংলাদেশেও পুনঃজাগরণ হয়েছে ধর্মীয় আধারে পরিচালিত সন্ত্রাসী বলে পরিচিত বেশ কিছু সংগঠনের। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির জের যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশ বাংলাদেশে পড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বর্তমানে দুটি প্রধান গোষ্ঠীর দাবিকৃত কার্যকলাপই লক্ষণীয়। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলাম এবং অপরটি জেএমবি। এই সংগঠন দুটি যথাক্রমে আল-কায়েদা (যার উপমহাদেশীয় শাখার নাম আল-কায়েদা ইন হিন্দ) ও আইএসের তাত্ত্বিক ও কৌশলের অনুসারী।
এবং এমন ধারণার বহু কারণ রয়েছে। আমাদের দেশে গত দুই বছরে ঘটে যাওয়া টার্গেট কিলিং এবং হালের ঘটনাগুলোর ধরন দেখলেই এ বিষয়ে অনেকটা পরিষ্কার চিত্র ফুটে ওঠে। এসব কর্মকাণ্ডের শ্রেণিবিন্যাস ও বিশ্লেষণ করলে এই দুই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের কৌশল ও তাত্ত্বিক ধারণার রেশ সহজেই চোখে পড়ে। এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর যে বৈশিষ্ট্যগুলো বৃহত্তর দুই সন্ত্রাসী সংগঠনের তত্ত্ব ও কৌশলের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে তা হলো, প্রথমত, টার্গেট নির্ধারণ, দ্বিতীয়ত, আক্রমণের ধরন, তৃতীয়ত, আক্রমণকারীদের বয়স এবং পরিচয়, চতুর্থত, আলোচিত দুই সংগঠনের তাত্ত্বিক ভিত্তিতে টার্গেট নির্ধারণ এবং টার্গেট ব্যক্তির বিভিন্ন মতবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। লক্ষণীয় যে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার তিন-চতুর্থাংশের দায় নিয়েছে আইএস, যার মধ্যে গুলশানের হামলা অন্তর্ভুক্ত, এবং এক-তৃতীয়াংশের দায়দায়িত্ব নিয়েছে ‘আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (একিউআইএস) এবং স্থানীয় সংগঠন যথাক্রমে জেএমবি এবং আনসার আল ইসলাম (পূর্বতন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম)। এসব দাবিদাওয়া যদিও আমাদের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দৃশ্যত নাকচ করেছে প্রতিটি ঘটনার পরপর। তাদের ভাষ্যমতে, এগুলোই ছিল স্থানীয় সন্ত্রাসীদের কাজ। সে ধারণা গুলশানে হামলার পর হয়তো অনেকটা বদলাতে শুরু করেছে বলে মনে হয়, কারণ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে সহযোগিতার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলে স্থানীয় জঙ্গিদের ওপর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহে আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীই যথেষ্ট হওয়ার কথা।
লক্ষণীয় যে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়াতে আল-কায়েদা, আইএসের যে প্রতিযোগিতা রয়েছে, তা গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন (প্রথম আলো, মে ৯, ২০১৬-এর প্রবন্ধ। ‘আল-কায়েদা-আইএস—কতখানি ঝুঁকিতে আমরা)। ওপরে বর্ণিত দায় স্বীকারের পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলেও আমাদের এই অঞ্চলে এ ধরনের প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে উঠবে। যদিও এই দুই সংগঠনের তত্ত্বের মধ্যে তেমন তফাত নেই, তবে কৌশলে যে তফাত রয়েছে বিশেষ করে টার্গেট নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, সেটাও গবেষণায় উঠে এসেছে। আল-কায়েদা ২০০৬ সাল থেকে তাদের কৌশল পরিবর্তন শুরু করলেও তা বেগবান হয় ২০১১ সাল থেকে, ওসামা–উত্তর সময় থেকে। অপরদিকে আইএস তার আগ্রাসী কৌশল নিয়েই ‘খেলাফত ঘোষণা’ দেয় জুন ২৯, ২০১৪ সালে। এক বছরের মধ্যেই ‘আগ্রাসী কৌশলে আইএস, আল-কায়েদাকে ছড়িয়ে যায় তাদের কৌশলে। দুটি সংগঠনই ব্যাপকভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তবে আইএস এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে এবং সে কারণে তাদের সদস্যদের সিংহভাগ আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। এদের পক্ষে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞান এবং ব্যবহার করা অত্যন্ত সহজতর হয়, যা হয়তো গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং অনেক সুবিধাবঞ্চিত মাদ্রাসার ছাত্রদের পক্ষে সম্ভব হয় না। যারা গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা ও জঘন্য হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা তথাকথিত জিহাদি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘থ্রিমা অ্যাপ’-মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করেছিল বলে তথ্যে প্রকাশ। এই পদ্ধতিতে মেসেজ অ্যাপ্লিকেশন সার্ভার থেকে মুছে ফেলা যায়।
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে আইএস আল-কায়েদা থেকে বহুদূর এগিয়ে। কিংস কলেজ লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব র্যাডিক্যালিজম (আইসিএসআর)–এর তথ্য অনুযায়ী ৯০টি দেশের প্রায় ২০ হাজার সদস্য বর্তমানে ‘আইএস জিহাদি’ হিসেবে রয়েছে। এর মধ্যে ব্রিটেন থেকে ছয়-সাত শ বিভিন্ন স্কুলের ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। গুলশানের রেস্তোরাঁয় হামলার সঙ্গে জড়িত নিহত পাঁচ হামলাকারী জঙ্গির পরিচয় পাওয়ার পর বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, এমন হারিয়ে যাওয়া তরুণদের সংখ্যা কত? তার তেমন পরিসংখ্যান নেই। এঁদের অনেকের পরিবার থেকে পুলিশে জিডি করলেও এঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বা সঠিক তদন্ত করার বিষয়টি হয়তো তেমন গুরুত্বসহকারে দেখা হয়নি। ছোট ছোট শহর ও প্রান্তিক অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাওয়া অথবা কথিত গুম হয়ে যাওয়ার বিষয় পুলিশের কাছে তেমন গুরুত্ব পায়নি বলে বহু পত্রপত্রিকায় অভিযোগ ছিল। আবার অনেক পরিবার হয়তো সামাজিক এবং অন্যভাবে হয়রানির আশঙ্কায় পুলিশে অভিযোগ করা থেকে বিরত রয়েছিল। হালে প্রায় ১০ জনের মতো হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খোঁজে ছবি দিয়ে গণমাধ্যমের সহায়তায় আবেদন জানানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও এ ধরনের তথ্য প্রদানের জন্য অনুরোধ করেছেন। কাজেই পুলিশের কর্তব্য হবে এঁদের খুঁজে বের করা এবং পরিবারকে, তারা সমাজের যে স্তরেরই হোক না কেন, তাদের সহায়তা নিতে আশ্বস্ত করা এবং অত্যন্ত ধৈর্য ও সহানুভূতির সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখা। এসব হারিয়ে যাওয়া তরুণ যদি ইতিমধ্যেই ‘জঙ্গি’ সদস্য হয়ে থাকেন, তাহলে অনুমান করা যায় তাঁরা প্রত্যেকেই দারুণ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন। ফিরে আসার ইচ্ছা থাকলেও হয়তো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। বিষয়টি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি। ইদানীং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে নিয়েছে এমন এবং পরবর্তী সময়ে খোঁজ না পাওয়ার খবরাখবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আবার প্রকাশিত হয়নি এমন অনেক ঘটনাও রয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
যাঁরা পরিবার থেকে বা অন্য কোথাও থেকে হারিয়ে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হয়েছেন বা হওয়ার পথে রয়েছেন, তাঁদের ফিরে আসতে যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা উচিত। যাঁরা এখনো অভিযুক্ত হননি, তাঁদের কীভাবে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে ডিরেডিক্যালাইজশনের মাধ্যমে সমাজে রিহ্যাবিলিটেশন করা যায়, তা সরকারের ভেবে দেখা উচিত। এতে শতভাগ কাজ না হলেও এসব তরুণের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করা যেতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন বিষয় নয়, অতীতেও এ ধরনের পদক্ষেপের নজির রয়েছে। দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে তা হচ্ছে, কেন উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যম থেকে উচ্চশিক্ষিত যুবকেরা এ পথের পথিক হচ্ছেন? এ বিষয়ে আমাদের দেশে তেমন গবেষণা হয়েছে বলে মনে হয় না। এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিত, কারণ আমরা একটা সংকটে পতিত হয়েছি, এ অবস্থা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়, তার জন্য সামাজিক অঙ্গনের প্রত্যেককেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের। আমরা যে সংকটে পতিত হয়েছি সে সংকট শুধু আমাদের দেশেই হয়েছে, তেমন নয়। সারা বিশ্বই এখন এই সংকটের মোকাবিলা করার পথ খুঁজছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সরকারি বা শুধু রাজনৈতিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, সমাজের প্রত্যেককেই যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। অন্যথায় যে ধরনের ক্ষতি হবে সেখান থেকে উত্তরণ ঘটানো দারুণ কঠিন হবে। এ যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

একটু সচেতন হলেই অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো যায়

ঈদ উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি যাওয়া-আসার পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এই বাস্তবতা মনে রেখে সংবাদমাধ্যম এ সম্পর্কে আগাম সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়ে থাকে। এ বছরও আমরা ঈদের আগে তা করেছি। কিন্তু দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি, বেশ কিছু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁদের স্বজনদের ঈদের আনন্দকে মাতমে পরিণত করেছে। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, রাজশাহীর চারঘাট, বরিশালের গৌরনদী, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও নেত্রকোনায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ১১ জন নিহত হয়েছেন ঈদের ঠিক আগের দু-তিন দিনে। এ ছাড়া ঈদের দিন ঢাকার অদূরে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষের ফলে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আর ঈদের পরদিন বিকেলে রংপুরের তারাগঞ্জে এক মিনিবাস একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দিলে অটোরিকশার চালকসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পাঁচজন একই পরিবারের সদস্য। একই দিনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় যাত্রীসহ এক ভটভটি রাস্তার পাশে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ভটভটির যাত্রী তিন কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে।
লক্ষণীয় বিষয়, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটেছে ভটভটি, সিএনজিচালিত কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ইত্যাদি ছোট মোটরযানের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে। কোথাও এগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছে ধাক্কা খেয়েছে, কোথাও খাদে পড়েছে, কোথাও বাস বা অন্য কোনো বড় মোটরযানের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। এই সব ছোট যানবাহন মহাসড়কে চলাচলের ফলে বড় যানবাহন যথা বাস ও ট্রাকের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষত ভটভটি, নছিমন-করিমন, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মতো অনুমোদনহীন মোটরযানগুলো ঈদের সময় মহাসড়কগুলোতে বাড়তি ঝুঁকির কারণ হয়। মহাসড়কগুলোতে এগুলোর চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত। প্রতিবছরই ঈদের পরে লাশ গুনতে হয়—এ বড় মর্মান্তিক এক বাস্তবতা। কিন্তু আমরা একটু সচেতন হলেই অনেক দুর্ঘটনা এড়াতে পারি।