Monday, July 14, 2025
সোহাগ কিলিং মিশন: রজনী বোস লেনে হত্যা, হাসপাতালের সামনে নিয়ে চলে বর্বরতা ভিডিও by শুভ্র দেব ও আফজাল হোসেন
ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তব্ধ পুরো দেশ। নিন্দা প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন সর্বত্র। রাজনৈতিক দলও এ নিয়ে সরব হয়েছে। সব দলের তরফে বিবৃতি, মন্তব্য করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে। রজনী বোস লেনে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চিত করেছেন সোহাগকে ‘ধর ধর’ বলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মব সৃষ্টি করে তাকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে কেন নির্মমতা চালানো হয়েছে তার সঠিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভাষ্যমতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে সোহাগকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পরিবার বলছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদা না দিয়ে প্রতিবাদ করায় সোহাগের ওপর এত নৃশংসতা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বলছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যেভাবে তার ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে সেটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে করা হয়েছে। না হলে মরদেহের উপর কেউ এভাবে পাশবিকতা চালাতে পারে না। শুধুমাত্র চাঁদাবাজি, দোকান দখল বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জন্য এভাবে কারও ওপর নৃশংসতা চালানো যায় না। এদিকে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের যে স্থানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তার কয়েকহাত দূরে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ক্যাম্প। ঘটনার সময় অনেক আনসার সদস্য ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পাশাপাশি ওইদিন ঘটনাস্থলের আশেপাশে বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে নির্মমতা দেখেছে। কিন্তু তারাও কেউ আসেনি। এই সুযোগে সোহাগের মৃতদেহের ওপর বিভিন্নভাবে নৃশংসতা করেছে। নৃশংসতার ভিডিও দেখে আঁতকে উঠেছে মানুষ। তবে ঘটনার দুইদিন পর্যন্ত এই নির্মমতা জানতে পারেনি কেউ। দু’দিন পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আসল চিত্র সামনে আসে।
সরজমিন দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের মিটফোর্ড সড়কটি ডান দিকে ইসলামপুর, সদরঘাটের দিকে চলে গেছে। সামনের দিকের সড়কটি আরমানিটোলা ও বামপাশের সড়কটি লালবাগ মিটফোর্ড সড়ক নামে পরিচিত। এদিকেই রজনী বোস লেন। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। চোখের সামনে নির্মমতার পর কেন কোনো আনসার সদস্য এগিয়ে আসেনি এনিয়ে কথা হয় একাধিক আনসার সদস্যদের সঙ্গে। কিন্তু আনসার সদস্যরা জানিয়েছেন, ওই সময় এদিকে কারও ডিউটি ছিল না। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কিছু প্রত্যক্ষদর্শীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যারা সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারা এই এলাকার পরিচিত মুখ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নাই। কারণ ওই সময় কেউ এগিয়ে গিয়ে বাধা দিতে গেলে তার ওপরও নির্যাতন চালাতো খুনিরা।
নিহত সোহাগকে নিয়েও নানা সমালোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন সোহাগ আওয়ামী লীগের আমলে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাবেক এমপি হাজী সেলিমের চাঁদা তুলতেন তিনি। বেশ কিছু ছবিতে হাজী সেলিমের সঙ্গেও তাকে দেখা গেছে। এ ছাড়া মিটফোর্ড এলাকার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বলেছেন, পট পরিবর্তনের পরেও সোহাগ যুবদলের হয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। সোহাগ মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙাড়ি ব্যবসার সঙ্গে পুরনো বৈদ্যুতিক সাদা তার কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। সোহানা মেটাল নামে মিটফোর্ড এলাকার চায়নাপট্টি ও রজনী বোস লেনে তার দুটি দোকান রয়েছে। সোহাগ এবং মহিন পূর্বপরিচিত ছিলেন। ওই এলাকায় বিদ্যুতের তামার তার ও সাদা তারের ব্যবসার একটা সিন্ডিকেট রয়েছে। তামার তার ও সাদা তারের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিল মহিন, অপু, টিটু, যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টুসহ মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি চক্র। তারা অবৈধ বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল। তা না হলে নিয়মিত মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার দাবি জানিয়েছিল তারা। এই দ্বন্দ্বের জেরে সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলিও করে দুর্বৃত্তরা। এরপরে তিনদিন সোহাগ দোকান খুলেনি। পাশাপাশি সোহাগ হত্যায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার নেতৃত্বদানকারী যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা মাহমুদুল হাসান মহিন এবং একই থানা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতা অপু দাসের ছত্রছায়ায় মিটফোর্ড এলাকায় চাঁদাবাজির ভয়ঙ্কর এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী, ফুটপাথ, সব জায়গায় চাঁদাবাজি চলতো। তারা দু’জনের নেতৃত্বে ৫ই আগস্টের পর থেকে মিটফোর্ড ও পাশের এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করতো।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল আসামিদের অদ্যাবধি গ্রেপ্তার না করা এবং মামলার এজাহার থেকে মূল তিন আসামিকে বাদ দেয়া রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না। বলেছেন, এই ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত যাদের সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে আশ্বর্যজনক তাদের মামলার প্রধান আসামি করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাতগুলো করেছে তারা অদ্যাবধি গ্রেপ্তারও হয়নি। এর কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার এজাহারে খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিন খুনিকে পুলিশ কৌশলে বাদ দিয়ে নিরপরাধ তিনজনকে আসামি করেছে।
নিহত সোহাগের মেয়ে মিম বলেন, এজাহার লেখার সময় পুলিশ তিনজন প্রকৃত আসামির (১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর) নাম বাদ দেয়। মামলার খসড়া দেখার সুযোগ পেলে তিনি ছবিও তুলে রাখেন এবং অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তিনি পুলিশকে প্রশ্ন করেন, সোহাগকে যেহেতু অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটি কেন এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশ তখন তাকে আশ্বস্ত করে, সংশোধন করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বাদীর অজান্তেই পূর্বে ঠিক থাকা খসড়া বাদ দিয়ে একটি নতুন নথিতে স্বাক্ষর নেয়া হয়, যেখানে প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ দেয়া হয়। মিমের দাবি, পরে তার মাকে (মামলার বাদী) একা রেখে ওসি মনিরুজ্জামান মনির ও অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কক্ষে কথা বলেন এবং মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে অন্য একটি নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ভাই মারা যাওয়ার কারণে আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিলাম। আমার মেয়েকে দেখিয়ে কপি চেক করিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যেটায় দেখেছি, সেটাতেই সই করছি। কিন্তু পরে বুঝি, অন্য কাগজে সই করানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এতে রাজনীতি হয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। পুলিশ বলেছে, বিষয়টি তারা ঠিক করে দেবে। আমি ঢাকা গিয়েও সরাসরি কথা বলে এসেছি। স্বজনদের অভিযোগ, মামলাটিকে ‘হালকা’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং শুরুতে পুলিশ মামলাও নিতে চাইছিল না। এজাহারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তন এনে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা ও নির্দোষদের জড়ানো হয়েছে বলে তাদের দাবি। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘এজাহার তো তারা দিয়েছে, এজাহার কি আমরা করছি? এজাহার চেঞ্জ করার কোনো সুযোগই নেই। তারা যেটা এজাহার দিয়েছে, আমরা সেটাই মামলায় রেকর্ড করেছি। তারা কি অশিক্ষিত? তারা কি মুর্খ? কিছুই নয়। আন্দাজে একটা কথা বলে। তারা শিক্ষিত, তারা ১০ জন, ২০ জন আসে একসঙ্গে দেখতে। এখন এটা বললে হবে? এমনতো নয় যে, তারা অশিক্ষিত মানুষ, পড়েনি, দেখেনি। তারা পড়ছে, দেখছে, সব জেনেশুনে তাদের বক্তব্য মতো সেটা এজাহার করছে। এখানে আমাদের কিছু বলার নাই।
এদিকে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কমেনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। সে বীভৎস ঘটনার ট্রমা থেকে তারা এখনো বের হতে পারেনি। হামলার ভয় আতঙ্কে কেউ মুখ খুলছেন না। অনেকে বলতে চাইলেও পরিবারের কথা বিবেচনা করে তথ্য দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। গতকাল পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কথা জানানো হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা মানতে নারাজ। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। তাদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কেউ এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলছেন না। ওইদিন ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতাল ভবন থেকে অনেকে ভিডিও করলেও ভয়ে এ নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন এ ঘটনা ঠিক আনসার ক্যম্পের সঙ্গে হলেও আনসার সদস্যরা এগিয়ে আসেননি। গতকাল সকাল ১১টার দিকে পুলিশ এসে মিটফোর্ড এলাকায় রাস্তা দখল করে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনে ভাঙাড়ি ব্যবসার কেন্দ্র। সারা দেশ থেকে প্লাস্টিক, তামা, দস্তার পণ্য আসে এখানে। এ ছাড়া রয়েছে অবৈধ চোরাই তারের ব্যবসা। এ চোরাই তারের ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই সোহাগকে হত্যা করা হয়। একজন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী বলেন, এ হত্যাকাণ্ড সবার সামনেই ঘটেছে। যারা ঘটিয়েছে সবাই সবাইকে চিনে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কেউ মুখ খুলবে না। আমরা ব্যবসা করি, এখানে পুরো ঢাকা শহর থেকে ভাঙাড়ি মাল আসে আবার অন্য জায়গায় আমরা বিক্রি করে দেই। লাশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছি। দেশের পরিস্থিতি এখনো ভালো হয়নি আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। আরেক ব্যবসায়ী জানান, অস্ত্রসহ ২০-২৫ জনের একটি দল তাকে রজনী বোস লেন থেকে মারতে মারতে নিয়ে যায়। এখানে অনেক বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সেগুলোর ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করুন। এখানে যারা জড়িত সবাইকেই এলাকাবাসী চিনে কিন্তু কেউ বলবে না, কারণ সবারই জীবনের মায়া আছে।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বুধবার বিকাল বেলায় চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি সোহাগকে কয়েকজন বেধড়ক মারধর করছে। সবার চোখের সামনেই নৃশংসভাবে তারা নরপিশাচের মতো হত্যা করে। এখন শুনেছি তারা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত এবং সবাই সোহাগের পূর্বপরিচিত। শুনেছি এখানে রাস্তার উপর থাকা প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। প্রশাসন এর সবই জানে এতদিন ধরে এগুলো চলে আসছে তারা চুপ ছিল কেন এতদিন? হঠাৎ আজকে কেন উচ্ছেদ অভিযান চালালো। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কি এসব দোকান বসে? কেউ প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দিবে না কারণ প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সাংবাদিক, প্রশাসনকে দু’দিন পর এ এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না কিন্তু আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন জানান, এরা সবাই প্রভাবশালী তাই কারও সাহস হয়নি এগিয়ে আসার। আমরা এ এলাকার বাসিন্দা আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে। প্রশাসন সবকিছুই জানে কে বা কারা এ সকল ঘটনায় জড়িত। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অবুঝ শিশুও এ কথা বিশ্বাস করবে না। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে যদি এটি হতো তাহলে এত মানুষ কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়।
এদিকে, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বেলা ২টার দিকে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রতিবাদ জানান। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শুরু থেকেই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতো তাহলে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতো না। অপরাধী যেই হোক তার পরিচয় সে অপরাধীই, দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হওয়ার জরুরি। আমরা দেখতে পেয়েছি অপরাধী যদি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধের ব্যবস্থা নিতে চায় না ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তৃণমূল পর্যায়ে যারা রাজনীতি করেন তারা বহিষ্কারকে ভয় পায় না। সাংগঠনিক অ্যাকশন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এ আশায় থাকেন যে যখন তারা ক্ষমতায় আসবেন তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিবে। এ ধরনের মনমানসিকতা ঢালাওভাবে চর্চা হয়েছে বিধায় আজকে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটছে।

Sunday, July 13, 2025
পুরান ঢাকায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড: বিএনপির ১৬ বছরের ‘ত্যাগ’ কি ধুলায় মিশছে by সেলিম জাহিদ
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা, খুন, দখল, অর্থ দাবি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, দলীয় পদপদবি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় এমনিতেই বিব্রত দলটির নেতারা।
এরই মধ্যে গত বুধবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, জুলাই ঘোষণাপত্রসহ কয়েকটি বিষয়ে যখন অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির মতবিরোধ চলছিল; সে সময়ে পুরান ঢাকার এ হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বেশ বেকায়দায় ফেলেছে। এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলনের ছাত্র ও যুব সংগঠন রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দল ও সংগঠন।
বিএনপি নিজেও এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছে। শুক্রবার রাতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতিতে বলেছেন, জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এই নির্মম ঘটনাটি (লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ড) দেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।
দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের দায় দল নেবে না—বিএনপির নেতারা আগে এ কথা বলে এলেও একশ্রেণির নেতা–কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দলটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যার কারণে লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ–বিক্ষোভ ও নিন্দা–প্রতিবাদ বাড়ছে। এর আগে ৩ জুলাই আসামি ছিনিয়ে নিতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় হামলা চালান বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পুলিশের আটজন আহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
৭ হাজার নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তবু থামছে না
এত বহিষ্কার, অব্যাহতি, পদাবনতি ও কমিটি বাতিল করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও কেন নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বিএনপি—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, হয়তো অনেক অপরাধী, সন্ত্রাসী নানা ছিদ্রপথে সংগঠনে ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু তাদের দুষ্কর্মের দায় তো বিএনপি নেবে না। বরং এ ব্যাপারে দল খড়্গহস্ত। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জেলা, মহানগর, থানা এবং কেন্দ্র মিলে প্রায় সাত হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিএনপি শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। অপরাধ যে-ই করবে, তাঁকে চরম শাস্তি দিতে দল বদ্ধপরিকর।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল দল বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়েছে। যেসব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অতীতে খারাপ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে বা যাঁদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি তো দায় এড়াচ্ছে না; বরং দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ পাওয়ামাত্র বহিষ্কার করছে, প্রশাসনকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করছে। এরপরও বিভিন্ন মহল এটা নিয়ে হীন রাজনীতির চেষ্টা করছে। তা না হলে তারেক রহমান জবাব দাও, এই মিছিল কেন। তারেক রহমান কি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন? বিএনপি যদি অপরাধীদের রক্ষা করার চেষ্টা করত, সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিত, তাহলে দোষ দিতে পারত।’
চাঁদাবাজির আরেক ধরন
বিএনপির নেতারা বলছেন, আল ইবাদত নামের এক ব্যক্তি ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ব্যবসায়ী দল’ নামের একটি ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে তোলেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে হোটেল ভিক্টোরিতে তিনি কার্যালয় খোলেন। বিএনপির অঙ্গসংগঠন পরিচয় দিয়ে এই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াসহ চাঁদা দাবি করেন। এ খবর জানতে পেরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (দপ্তরে সংযুক্ত) আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী গতকাল শনিবার পল্টন থানায় মামলা করেন।
জানা গেছে, এ ব্যাপারে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর দলীয় প্যাডে একটি চিঠিও দেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে আল ইবাদতকে গ্রেপ্তার করে।
নেতা-কর্মীরা কেন এত বেপরোয়া
একশ্রেণির নেতা-কর্মী বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়ে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত দলের বড় একটি অংশ রাতারাতি টাকা বানানোর ধান্দায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে অনেকে উৎসাহী। তাই যার যেখানে প্রভাব আছে, সে সেখানে অবৈধ অর্থের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এ জন্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ—এমন কর্মকাণ্ড চলছে। যেখানেই এসব কাজে বাধা আসছে, সেখানেই অঘটন ঘটছে এবং ঘটনাক্রমে কিছু কিছু প্রকাশ পাচ্ছে।
এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দীর্ঘ অপশাসন ও দুর্বৃত্তায়ন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এগুলোর রেশ এখনো কাটছে না। এর জন্য মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম এবং শুদ্ধি অভিযানের বিকল্প নেই।’
তবে বিএনপির নেতাদের কারও কারও অভিমত হচ্ছে, যেসব এলাকায় দলের ভালো নেতৃত্ব নেই, বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অস্পষ্টতা আছে, সেসব এলাকায় নেতা-কর্মীরা বেশি বেপরোয়া। কারণ, ওই সব এলাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাঁরা দল ভারী করতে যাচাই–বাছাই না করে অনেককে দলে ভেড়াচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা বিএনপির নামে নানা অপরাধ করছেন, তাঁরা দলের উল্লেখযোগ্য কেউ নন। হয়তো কোনো একটা কমিটিতে কোনো পদে আছেন বা ছিলেন। কিন্তু তাঁদের দায় পুরো দলকে নিতে হচ্ছে। তাঁদের কারণে বিএনপির ১৬ বছরের ত্যাগ, লড়াই–সংগ্রাম সবকিছু ধুলায় মিশে যাচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।’
Saturday, July 12, 2025
এটা কি পরিকল্পিত নৃশংসতা?
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, ওই হত্যাকাণ্ডে যাদের অংশ নিতে দেখা গেছে, এবং নেপথ্যে যাদের নাম আসছে, তারা সবাই পূর্ব পরিচিত। একসময় তাদের কয়েকজন সোহাগের ব্যবসার সহযোগী ছিলেন। ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধে এমন ভয়ঙ্করভাবে কাউকে হত্যা করা হতে পারে, তা পরিচিতজনদের ধারনার বাহিরে।
ওই এলাকার একজন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবসায়ী বলছেন, পুরনো তারের ব্যবসার একটি বড় সিন্ডিকেট সেখানে রয়েছে, যার নিয়ন্ত্রণ করতেন সোহাগ। গ্রেপ্তার মহিন তার দলবল নিয়ে ওই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই চেষ্টায় তারা সোহাগের গোডাউনে তালা মেরে দেয়। তাদের মধ্যে এটা নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়। জড়িতদের কয়েকজন স্থানীয় যুবদলের রাজনীতিতে জড়িত। সোহাগও এক সময় যুবদল করতেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার ১৯ আসামির মধ্যে দুজন যুবদলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরে নেতা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এখনো কনক্লুসিভলি বলার মত তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা শুধু জানি যে সেখানে নৃশংস একটা ঘটনা ঘটেছে। অনেকের কাছে ভিডিওটা আছে। আমরা জানার চেষ্টা করছি এই হত্যার মোটিভটা কী, কেন এভাবে হত্যা করা হল। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিহত সোহাগের বড় বোন কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসি টিভি ভিডিও সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত আসামি মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১) এবং তারেক রহমান রবিনকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে।
রবিনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাব আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব এবং পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে এবং ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচজন বহিষ্কার: ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের যাঁদের দেখা গেছে, তাদের এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের সংগঠন থেকেও আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল পুরান ঢাকার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচজনকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের কথা জানিয়েছে। তারা হলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক রজ্জব আলী (পিন্টু) ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবাহ করিম (লাকি), চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব অপু দাস, মাহমুদুল হাসান মাহিন ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু।
জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, বহিষ্কৃত নেতাদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায়দায়িত্ব সংগঠন নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বহিষ্কৃত নেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত নেতা অপু দাসের বিষয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন।এছাড়া মাহমুদুল হাসান মাহিন ২০১৮ সালের পূর্বে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কোন কার্যক্রমে জড়িত নেই। মাহিনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
সোহাগ হত্যাকাণ্ডকে রোমহর্ষক ও নৃশংসতম বলে মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কোনো দুষ্কৃতকারীর অপরাধের দায় দল নেবে না। আমি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের যাদের দেখা গেছে, তাদের এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের নিন্দা: ব্যবসায়ী যুবককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা, প্রতিবাদ ও শোক জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এই ঘটনাটির অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করুন এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। আমি নিহত ব্যক্তির রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তার পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। শুক্রবার রাতে এক নিন্দা, প্রতিবাদ ও শোক বিবৃতিতে তিনি এ সব কথা বলেন।
পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে মাথায় পাথর মেরে শত শত মানুষের সামনে এই হত্যার ঘটনা আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছে। এই নির্মম দৃশ্য জাহেলিয়াতের লোমহর্ষক নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতাকেই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশবিক এই হত্যার ঘটনায় মানুষ বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এভাবে পাশবিক কায়দায় মানুষ হত্যা সভ্য সমাজে বিরল।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘৯ জুলাই বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে মো. সোহাগ নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে মাথায় পাথর মেরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হত্যা করে তারা শুধু সোহাগকে উলঙ্গই করেনি, তাঁর লাশের ওপর নৃত্য করে আনন্দ উল্লাসও করেছে।’
পুরান ঢাকায় সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণসংহতি আন্দোলন। শুক্রবার দল দুটি বলেছে, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই নৃশংসতার রাজনীতি আর চলতে পারে না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল এক বিবৃতিতে বলেন, গত বুধবার বিকেলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. সোহাগকে যেভাবে পাথর দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নির্মম ও ভয়ংকর। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে মন্তব্য করে এ দুই নেতা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই নৃশংসতার রাজনীতি আর চলতে পারে না। বাংলাদেশ থেকে চিরতরে এই আতঙ্ক তৈরির রাজনীতি বন্ধ করার জন্য এই নৃশংস ঘটনার অবিলম্বে বিচার প্রয়োজন।
এদিকে শুক্রবার বিকেলে দলীয় কার্যালয়ে এক যৌথ সভায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ ইমতিয়াজ আলম বলেন, সোহাগ হত্যার ভিডিও কতটা ভয়াবহ, নির্মম ও নিষ্ঠুর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। এই নেতাকে উদ্ধৃত করে ইসলামী আন্দোলনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষমতায় গিয়ে কী করবে, ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে। ইমতিয়াজ আলম বলেন, পুরান ঢাকার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কর্তৃক সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বিএনপি যদি তাদের সন্ত্রাসীদের থামাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর পরিণাম শুভ হবে না।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ: মিটফোর্ডে হত্যাকান্ডকে নৃশংস এবং বর্বরোচিত হত্যাকান্ড বিবেচনা করে রাজধানীসহ দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল পাড়ায় এক বিক্ষোভ মিছিল করে ঢাবি শিক্ষার্থীরা। যা ভিসি চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। একই সময় বিক্ষোভ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা চত্বরে এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রাত ৮টায় চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড় থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এ কেমন হত্যাকাণ্ড? এ কেমন বীভৎসতা? by রাফসান গালিব
রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় এক ভাঙারি ব্যবসায়ীতে চাঁদার দাবিতে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যার দিকের ঘটনা। ‘স্বাভাবিক চাঁদাবাজির ঘটনায় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও হয়েছে। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই দিন পর আজকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর কারও অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটি কোনো ‘স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড’ ছিল না। এটা ভয়ংকর এক মৃত্যু। বর্বরোচিত এক হত্যাকাণ্ড।
ঢাকার জনবহুল একটা এলাকায় এক রকম উল্লাস করে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে ওই ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। পিটিয়ে, কুপিয়ে, নির্যাতন করে পরনের কাপড় খুলে ফেলে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় ওই ব্যবসায়ীকে। এরপর বড় একটা পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে মাথা থেঁতলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতক। এই দৃশ্য কি কোনোভাবে নেওয়া যায়? এ কেমন নৃশংসতা? এ কেমন বীভৎসতা?
এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, লাল চাঁদ মিয়া ওরফে ওরফে মো. সোহাগ নামে ওই ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে রজনী ঘোষ লেনে ভাঙারি ব্যবসা করতেন। ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে পুরোনো বৈদ্যুতিক কেবল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন তিনি। ওই তার বেচাকেনার সিন্ডিকেট নিয়ে বিরোধ এবং চাঁদার দাবি জানিয়ে আরেকটা গ্রুপ কয়েক মাস ধরে সোহাগকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। এর প্রেক্ষিতে বুধবার সন্ধ্যায় সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সোহাগ ও তাঁকে হত্যাকারী পক্ষ সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
হত্যাকারীদের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসান মহিন সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, তিনি যুবদলের চকবাজার থানার সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে মিটফোর্ড হাসপাতালের ফুটপাত ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হাসপাতালের কর্মচারী নিয়োগেও মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাব্বিও স্বীকার করেছেন, তিনি মহিনকে চিনেন। মঈন যুবদলের সক্রিয় কর্মী। (দৈনিক যুগান্তর)
সোহাগকে শুধু হত্যা করেই থেমে থাকেনি সন্ত্রাসীরা। সোহাগের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও লাশের ওপর চলতে থাকে নৃশংসতা। রক্তাক্ত নিথর দেহটি রাস্তার মাঝখানে ফেলে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে চলে ভয়াবহ উন্মত্ত উল্লাস।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে অসংখ্য মানুষ ছিল। এত মানুষের সামনে পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে সোহাগকে। তাঁকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। স্থানীয়রা বলছেন, মঈন যুবদল নেতা। এলাকায় সে প্রভাবশালী। তাঁর ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। যদিও হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত মঈনসহ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যেভাবে মানুষ বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বৈরাচারের সশস্ত্র গুন্ডা বাহিনীর বিরুদ্ধে, গুলির মুখে দাঁড়িয়ে যেতে ভয় করেনি; এক বছর পর সেই মানুষই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড ‘উপভোগ’ করল! জুলাই নাকি মানুষকে সাহসী করেছে, মানুষকে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে, অপশক্তির সামনে মাথা না করতে শিখিয়েছে—এটিই কি তার নমুনা!
এ রকম ভয়ংকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের পুরান ঢাকার দরজি বিশ্বজিতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা কীভাবে তাঁকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল, সেই দৃশ্য এখনো আমরা ভুলতে পারি না। যুবদলের এই সন্ত্রাসী চাঁদাবাজের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার সোহাগের কথাও কি আমরা কখনো ভুলতে পারব?
জুলাই গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে সেই ট্রমাই মানুষ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে এমন হত্যাকাণ্ড আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? এই মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে এই জাতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
খুলনার দৌলতপুরে আজকে শুক্রবার আরেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেখানে থানা যুবদলের সাবেক এক নেতাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত সাবেক যুবদল নেতা কয়েক মাস আগে নিজেই রামদা হাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সেই সংঘর্ষের ঘটনার পর যুবদল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আজকে তিনি নিজেই খুন হলেন। স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিকভাবে বলছে, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা চলছে।
আজকে আরেকটি হত্যাকাণ্ড আমাদের হতবাক করে দেয়। চাঁদপুরে জুমার নামাজের পর এক ইমাম ও খতিবকে মসজিদের ভেতরেই কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছেন এক ব্যক্তি। খতিব সাহেব স্থানীয়ভাবে স্বনামধন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ওই ঘাতক ব্যক্তির নাকি ইমাম সাহেবের জুমার খুতবা পছন্দ না। এ জন্য আজকে আগ থেকে খতিব সাহেবকে হত্যার উদ্দেশে চাপাতি নিয়ে মসজিদে ঢুকেছিলেন ওই ব্যক্তি। তাঁর দাবি, ইমাম সাহেব ইসলামের নবী (সা.)-কে অবহেলা করে কথা বলেছেন।
কাউকে ‘শাতিম’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের আহ্বান আমরা কয়েক মাস আগে দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের আইন ও বিচারকে তোয়াক্কাই করা হয়নি। তার জ্বলন্ত নমুনা আজকে চাঁদপুরে দেখা গেল। যত্রতত্র যেভাবে শাতিম আখ্যা দিয়ে মানুষকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, মানুষের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে, তা আমাদের ধর্মীয় সমাজের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্নই করছে না, ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপজ্জনক পরিস্থিতিও কি ডেকে আনছে না? সরকার কি এসব ব্যাপারে চুপই থাকবে?
একটার পর একটা নৃশংস ঘটনা ঘটছে। বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ উঠছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার কী করছে? কোনো ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক ছুটে যেতে প্রশাসন কোথায়? থানা-পুলিশ কোথায়? সরকারের ব্যক্তিবর্গ কোথায়? এক বছরেও কেন দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা? পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি কেন সবচেয়ে ‘গুরুত্বহীন’ করে ফেলা হলো? দেশের মানুষকে এইভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য ছেড়ে দিয়ে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তারা? রাজধানীতে বসে শুধু ‘হুঁশিয়ারি বার্তা’ দিয়ে কি প্রশাসন চালানো যায়?
বিএনপিই কেন বা শুধু বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নিজের সাংগঠনিক দায়িত্ব শেষ করছে? দলীয় বিরোধে চট্টগ্রামের শুধু এক থানায় রাউজানেই ১৫ জনের বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেছে। উপজেলাটিতে ঢাকা থেকে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি দল গিয়েছিল কি?
কতভাবেই দলীয় শৃঙ্খলার পদক্ষেপ নেওয়া যায়। শুধু দূর থেকে সতর্কবাণী দিয়ে বা বহিষ্কার করে কি দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব? সাংগঠনিক দক্ষতা বলতে যে একটি বিষয় আছে, সেটি যে একেবারেই দলটির নেতৃত্ববৃন্দের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না, তা কি তারা নিজেরা বুঝতে পারছেন?
দেশজুড়ে দলটির অপকর্মের শেষ নেই। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আগামী নির্বাচনে বিএনপিই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বলে অধিকাংশ মানুষ মনে করে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগেই এও আশঙ্কা করছে এক ফ্যাসিবাদী শাসনের পর আরেক ফ্যাসিবাদী শাসনের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছে কি দেশ? এমন আশঙ্কা কীভাবে দূর করবে বিএনপি? জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা কি অধরাই থেকে যাবে?
* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
![]() |
| গত বুধবার বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া |
Thursday, June 12, 2025
শাশুড়ি ও দুই শ্যালককে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে রবিন
গ্রেপ্তারকৃত রবিন ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। তাকে গত ৫ই জুন আদালতে পাঠালে শাশুড়ি ও দুই শ্যালককে হত্যার কথা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এরপর আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। নিহতরা হলেন- গাংগুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামের মৃত রাজা মিয়ার স্ত্রী নারগিস বেগম (৪০), তার দুই ছেলে শামীম হোসেন (১৭) ও সোলায়মান (৬)। বড় ছেলে শামীম ভেকু মেশিনের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন ও ছোট ছেলে সোলায়মান রক্ষিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্লে শ্রেণির ছাত্র ছিল। সূত্র মতে, রক্ষিত গ্রামের রাজা মিয়া ডেকোরেটরের ব্যবসা করতেন। বছরখানেক আগে তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে মারা যান। মেয়ে নাসরিন আক্তারের আড়াই বছর আগে রবিন হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। রাজা মারা যাওয়ার পর তার ডেকোরেটরের ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন রবিন ও নারগিস বেগম। নেশায় আসক্ত রবিন ব্যবসার অধিকাংশ টাকা ব্যয় করে ফেলেন। এ কারণে আড়াই মাস আগে ওই ডেকোরেটরের ব্যবসাও ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন নারগিস বেগম। এ নিয়েই কিছুদিন ধরে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়।
পিবিআই পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা জানান, ডেকোরেটরের ব্যবসা বিক্রির জেরেই রবিন ১লা জুন রাতে কামারপাড়া গ্রামে তার স্ত্রী নাসরিন আক্তারকে নিজ বাড়িতে ঘুমের ঘরে রেখেই ৬ কিলোমিটার দূরে রক্ষিত গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে আসে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সে প্রথমে কৌশলে টিনের বেড়া খুলে তার বড় শ্যালক শামীম হোসেনের ঘরে ঢুকে। এরপর ঘুমন্ত শ্যালককে বালিশচাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। পাশের কক্ষে তার শাশুড়ি নারগিস ও ছোট শ্যালক সোলায়মানকেও একই কায়দায় বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে। পরে দরজা লাগিয়ে রাতেই নিজ বাড়িতে চলে যায় রবিন। পরদিন রবিনের স্ত্রী নাসরিন তার মাকে ১০-১২ বার ফোন করেও না পেয়ে দুপুর ২টার দিকে মায়ের বাড়িতে যান। এ সময় ঘরের দরজা বন্ধ দেখতে পান। এরপর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দরজা ভেঙে একই খাটে তার মা ও দুই ভাইয়ের লাশ দেখতে পান। পরে থানা পুলিশ তিনটি লাশই উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। পরদিন সন্ধ্যায় তিনজনের জানাজায়ও অংশ নেয় ঘাতক রবিন।
রবিনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার জানান, আমার স্বামী আমাকে ঘুমে রেখে মা ও দুই ভাইকে হত্যা করেছে তা বুঝতেই পারিনি। আমার পরিবারের আমি আর আমার ৬ মাসের মেয়ে ছাড়া এখন আর কেউ রইলো না। আমি রবিনের কঠোর বিচার চাই। পিবিআই জানায়, রবিন তার শাশুড়ি ও দুই শ্যালককে হত্যার পর দু’দিন ভাত খায়নি। সে আত্মহত্যা করার পরিকল্পনাও করেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। ধামরাই থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, তিন লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে নিহত নারগিস বেগমের ভাই আব্দুর রশিদ অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে রবিন হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করার পর ধামরাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে রবিন জেলহাজতে রয়েছে।

রেইনকোট, খুকরি আর রক্তমাখা ষড়যন্ত্র
প্রমাণের পাহাড়
তদন্তে যে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ও ডিজিটাল প্রমাণ মিলেছে, তা হলো- অভিযুক্ত আকাশের একটি রক্তমাখা শার্ট, ফরেনসিকে নিশ্চিত হয়েছে তাতে যে রক্ত লেগে আছে তা রাজার। সোনমের রেইনকোটেও মিলেছে রক্তের দাগ। হত্যায় ব্যবহৃত ‘খুকরি’ নামের বাঁকা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্ত আনন্দের পরনে থাকা রক্তমাখা জামাকাপড়। হত্যাযন্ত্র এবং রাজার ব্যবহৃত জিনিসে অভিযুক্তদের আঙুলের ছাপ। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস। মোট ৪২টি লোকেশনের সিসিটিভি ফুটেজ, যাতে অভিযুক্তদের গতিবিধি ধরা পড়েছে। হোটেল মালিকদের বক্তব্য, যেখানে অভিযুক্তরা নিজেদের আসল নামেই বুকিং দিয়েছিল। স্কুটার ভাড়ার কাগজ, যেখানে নবদম্পতির সই রয়েছে। খুকরি বিক্রেতার সাক্ষ্য। আধার কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্রের ফটোকপি, যা অভিযুক্তরা লজে জমা দিয়েছিল। ট্রেন ও ফ্লাইট টিকিট, যা অভিযুক্তদের যাত্রাপথের সঙ্গে মিলে যায়। কল ডিটেইল রেকর্ড: সোনম, রাজ এবং তিন খুনির সক্রিয় যোগাযোগ। মোবাইল লোকেশন ডেটা: হত্যার দিন, ২৩ মে, সকলেই ঘটনাস্থলের আশপাশে। তিন অভিযুক্তের প্রাথমিক স্বীকারোক্তি। অনেক ডিজিটাল প্রমাণ ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে।
যেসব প্রমাণ এখনো অধরা
তদন্তকারীরা এখনো খুঁজে পাননি সোনমের মোবাইল ফোন। তাতে থাকতে পারে ফাঁস হওয়ার মতো চ্যাট, ছবি বা কল লগ। একইসঙ্গে অন্য অভিযুক্তদের মোবাইল ও ঘটনার সময়কার পোশাকও এখনো উদ্ধার হয়নি। আরো একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে রুপির লেনদেন ঘিরে। পুলিশ বলছে, ২০ লক্ষ রুপির বিনিময়ে এই খুন করা হয়েছে। কিন্তু সেই রুপির উৎস ও লেনদেনের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
ঘটনার কালানুক্রম
মে ১১: রাজা ও সোনমের বিয়ে হয় ইন্দোরে।
মে ২১: তাদের শিলং আগমন, বালাজি গেস্ট হাউজে থাকা।
মে ২২: স্কুটার ভাড়া নিয়ে চেরাপুঞ্জির উদ্দেশে রওনা।
মে ২৩: ‘হানিমুন ট্রেক’ শুরু, রাজাকে খুন করা হয়।
মে ২৪: ফেলে যাওয়া স্কুটার উদ্ধার, সোহরারিম এলাকা।
জুন ২: রাজার দেহ উদ্ধার।
জুন ৭: অভিযুক্ত তিন খুনি গ্রেফতার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ থেকে।
জুন ৮: সোনম আত্মসমর্পণ করেন উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের নন্দগঞ্জ থানায়।
খুনের ছক ও ঘটনার পুনর্গঠন
সোনম ও রাজের সম্পর্ক: রাজা কিছুই জানতেন না। রাজ ছিলেন সোনমের পারিবারিক ব্যবসায় কর্মরত। তিন খুনি (আকাশ, আনন্দ, বিকাশ) ইন্দোর থেকে শিলং পৌঁছান বিভিন্ন যানবাহনে চেপে, যাতে কারো নজরে না আসেন।
মে ২৩: চেরাপুঞ্জির কম চেনা মাওলিংখিয়াত ট্রেইল দিয়ে ট্রেক শুরু করেন পাঁচজন।
১০টা নাগাদ: স্থানীয় গাইড আলবার্ট দেখেন যে তারা গাইড নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ট্রেইলে একান্তে যাওয়ার পর: সোনম পিছিয়ে পড়েন এবং চিৎকার করেন ‘মেরে দো!’
তারপর: বিকাশ প্রথম আঘাত করে, বাকিরা মিলে রাজাকে মাথা ও বুকে কোপায়।
দেহ গিরিখাতে ফেলে দেওয়া হয়: যেখানে সোনম নিজেও সহায়তা করেন বলে অভিযোগ।
পলায়নের রাস্তায়
খুনের পর সোনম মাওকাডক থেকে ট্যাক্সিতে শিলং যান। এরপর গুয়াহাটি হয়ে ট্রেনে ইন্দোর ফেরেন বলে অনুমান। তিন খুনি আলাদা আলাদা ট্রেনে করে গিয়েছেন মধ্যপ্রদেশ।
কীভাবে ফাঁস হলো ষড়যন্ত্র
প্রথমে সোনম নিজেকে নিখোঁজ দেখানোর চেষ্টা করেন, যেন মনে হয় তিনিও অপহৃত। কিন্তু পরবর্তীতে ৮ জুন গাজিপুরে আত্মসমর্পণ করেন। তদন্তে নেতৃত্ব দেন মেঘালয় পুলিশের এসপি বিবেক সিয়েম। তার ভাষায়, উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল, ফরেনসিক ও সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে সোনম ও রাজ কুশওহার বিরুদ্ধে।

হানিমুনে স্বামী হত্যা, ২০ লাখ রুপির চুক্তি, হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন সোনম
২৪ বছর বয়সী সোনম ও ২৯ বছর বয়সী রাজা ১১ই মে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে হানিমুনের জন্য সোনম মেঘালয় ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। তারা ২১শে মে শিলং পৌঁছান। এরপর তারা পূর্ব খাসি হিল জেলার চেরাপুঞ্জি বা সোহরা অঞ্চলে যান। কিন্তু রাজার পরিবার জানত না যে, সোনম প্রেমে পড়েছেন তাদের পারিবারিক ব্যবসায় কাজ করা ২১ বছর বয়সী কর্মচারী রাজ কুশওয়াহার সঙ্গে। অভিযোগ আছে, কুশওয়াহা তার তিন বন্ধুকে রাজাকে হত্যা করার জন্য নিয়োগ দেন এবং সোনম তাদের ২০ লাখ রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২৩শে মে সোনম ও রাজা জলপ্রপাত দেখতে একটি পাহাড়ের চূড়ায় ট্রেকিংয়ে যান। সেই সময়ই হত্যাকারীরা তাদের পিছু নেয় এবং নির্জন স্থানে পৌঁছালে সোনমই রাজাকে হত্যার নির্দেশ দেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোনম এরপর নিজেই তার স্বামীর দেহ গিরিখাদে ফেলে দিতে সাহায্য করেন।
পূর্ব খাসি হিল জেলার পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম জানান, হত্যার পর সোনম প্রথমে মাওকাদক থেকে ট্যাক্সিতে শিলং যান। সেখান থেকে গৌহাটি পৌঁছান একটি পর্যটক ট্যাক্সিতে। এরপর গৌহাটি থেকে একটি ট্রেনে চেপে পালিয়ে যান। তার দাবি অনুযায়ী, তিনি ইন্দোরে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য অভিযুক্তদের জবানবন্দি পাওয়ার পরই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপরদিকে তিন হত্যাকারী সোহরা থেকে ট্যাক্সিতে গৌহাটি যায় এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে ইন্দোরে ফিরে যায়। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, তাদের আলাদা ও সমন্বিত পালানোর পদ্ধতি দেখে বোঝা যায়, হত্যার পর পালানোর পরিকল্পনাও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদেহ উদ্ধারের সাত দিনের মধ্যেই তারা সোনমের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তাকে গ্রেফতার করে। যদিও সোনমের মোবাইল এখনও উদ্ধার হয়নি, তবে পুলিশ নিশ্চিত যে হত্যার দিন সে কুশওয়াহার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং কুশওয়াহা আবার তার ঘাতক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তবে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি সোনম আগে কখনও মেঘালয়ে এসেছিলেন কিনা অথবা হত্যার নির্দিষ্ট স্থানটি তিনি আগে থেকেই ঠিক করেছিলেন কিনা।
এসপি বিবেক সিয়েম বলেন, তিনি হয়তো গুগল সার্স করে নির্জন জায়গা খুঁজে বের করেছিলেন। এখানে প্রচুর বন আছে। হয়তো সুযোগ বুঝে এটাই করেছে। এটা অন্য যেকোনো জায়গায়ও হতে পারত। আমরা নিশ্চিত নই। কারণ তিনি বলছেন আগে কখনও শিলং আসেননি।
সোনম মঙ্গলবার রাতে শিলং পৌঁছানোর কথা। কুশওয়াহা ও বাকি তিন ঘাতক বুধবার সকালে পৌঁছানোর কথা। পুলিশ সুপার বলেন, আমরা তাদের আদালতে হাজির করবো এবং এরপর পুলিশ রিমান্ডে নেব। তখনই ঠিক করবো কবে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ডের পুনর্গঠন করা হবে। তিনি আরও বলেন, তারা একসঙ্গে উপরে উঠেছিল। তারা একটি দর্শনীয় স্থানে মিলিত হয় এবং সেখান থেকে হেঁটে যায়। তাদের স্কুটারগুলো নিচে ছিল। ঘাতকদের মতে, সোনমই তাদের ‘ওয়েই সাওডং’ ঝরনায় নিয়ে যায় এবং সেখানেই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এই ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সদ্য বিবাহিত এক নারী কীভাবে এমন নির্মম পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়লেন, তা নিয়ে সমাজে বিস্তর প্রশ্ন উঠছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে পুলিশ জানতে পারবে হত্যার পুরো পরিকল্পনা কার মাথা থেকে এসেছিল এবং আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।

Wednesday, June 11, 2025
মাথায় কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন খুনি by নজরুল ইসলাম
ওই নারীর নাম নবিরন খাতুন (৫২)। বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চেংটিমারী পূর্ব এলাকায়। পেশায় পোশাকশ্রমিক এই নারী থাকতেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায়।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত জামালপুরের পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার দুই সন্ত্রাসীকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করে নবিরনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন তাঁর জামাতা আবু তালেব মণ্ডল (৪৭)। লাশ যাতে চেনা না যায়, সে জন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় লাশটি পাওয়া যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ৪ জুন রাতে ঢাকার সাভারের একটি এলাকা থেকে আবু তালেবকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জামালপুরের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানায়।
কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে যেভাবে পরিচয় শনাক্ত
পাটখেত থেকে উদ্ধার নবিরনের লাশটির মুখ, গলা ও বুক পোড়া ছিল। ওই ঘটনায় বকশীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আনিছুর রহমান বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ১৫ মে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীরা পূর্বশত্রুতার জের ধরে ওই নারীকে হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করেছেন।
মামলার তদন্ত তদারকের সঙ্গে যুক্ত জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আঙুলের ছাপ মিলিয়েও নিহত নারীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। হত্যাকাণ্ডের তেমন কোনো সূত্র ছিল না পুলিশের কাছে।
তদন্তের এক পর্যায়ে স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক পুলিশকে জানান, গত মে দিবসের দিন এক নারীর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন আবু তালেব। আর পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, নিহত নারীর মাথায় ছয় ইঞ্চি গভীর কাটা চিহ্ন রয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওই নারী বকশীগঞ্জের একটি ওষুধের দোকান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু আবু তালেবকে এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর ছেলের কাছ থেকে আবু তালেবের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশ অনুসন্ধান করে জানতে পারে, নবিরনের একমাত্র মেয়ে বিলকিস বেগম রাজধানীর খিলগাঁওয়ে থাকেন। তাঁর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করে পুলিশ জানতে পারে, অনেক দিন ধরে তাঁর মা নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে তাঁর মায়ের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিলেন আবু তালেব। তখন পুলিশের কাছে বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তখন বিলকিসের কাছ থেকে আবু তালেবের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যায় অংশ নেওয়া অপর দুজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যাওয়ায় হত্যার পরিকল্পনা
জিজ্ঞাসাবাদে নবিরনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার কথা স্বীকার করে আবু তালেব পুলিশকে বলেন, এ জন্য তিনি ঢাকা থেকে দুজন সন্ত্রাসী ভাড়া করেন। ভাড়া করা দুজনসহ মিলে তাঁরা নবিরনকে ছুরিকাঘাত হত্যা করেন। লাশ যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি সাভারে গিয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। কিন্তু সেটি কাউকে জানাতেন না।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আবু তালেব বলেন, ‘আমার স্ত্রী বিলকিসকে নিয়ে যাতে সংসার করতে না পারি, সে জন্য যা যা করার দরকার, সবই শাশুড়ি (নবিরন) করতেন। আর আমার স্ত্রীও তাঁর মায়ের কথা শুনতেন। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে আমার সন্তানদেরও আমার শাশুড়ি ঢাকায় নিয়ে যান। এতে আমি ক্ষুব্ধ হয়ে অমার শাশুড়িকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিই। আমার শাশুড়িকে মেরে ফেলার জন্য ঢাকায় দু্ই সন্ত্রাসীকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করি।’
আবু তালেব আদালতকে বলেন, ‘গত ১৫ মে আমার শাশুড়ি ঢাকা থেকে জামালপুর আসেন। এই খবর পেয়ে ভাড়া করা দুই সন্ত্রাসীও জামালপুরে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমার শাশুড়ি স্থানীয় বাজারে মুঠোফোন কিনতে যাচ্ছিলেন। তখন আমি তাঁকে বলি, চলেন আমি আপনাকে সোজা পথে নিয়ে যাব। এ কথা বলে ভাড়া করা দুই সন্ত্রাসীসহ আমি এবং আমার শাশুড়ি একটি রিকশায় (রিকশাভ্যান) উঠি। কিছু দূর যাওয়ার পর ভ্যান থেকে নেমে পড়ি এবং চালককে ভ্যান নিয়ে চলে যেতে বলি।’
আবু তালেব জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘এরপর তাঁকে (শাশুড়ি) একটি প্লটে নিয়ে যাই। তখন আমরা তাঁকে ঘিরে ধরি। তখন শাশুড়ি বলেন, তাঁর কাছে টাকা ও চেক আছে। এগুলো নিয়ে যেতে অনুরোধ করে বলা হয়, তাঁকে যেন মেরে না ফেলা হয়। তখন দুই সন্ত্রাসী আমার শাশুড়ির গলায় ওড়না লাগিয়ে পেঁচিয়ে ধরেন। এঁদের একজন মাথা, হাত ও পায়ে ছুরিকাঘাত করেন। তাঁরা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। তখন আমার শাশুড়ির মুখ চেপে ধরি আমি।’
আবু তালেব আরও বলেন, ‘এ সময় আমি দুজনকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দিই। বাকি টাকা পরে দিতে চাই। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ পাটখেতে নিয়ে আগুন ধরিয়ে আমরা চলে যাই।’
তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নবিরনকে ধর্ষণের আলামতও পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বকশীগঞ্জের কামালের বাত্তি তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নবিরনকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
![]() |
| প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি |
Thursday, December 12, 2024
মালিককে মেঝেতে পুঁতে কর্মচারীদের নির্বিকার বসবাস
নিহত নূর-এ-আলমের জামাতা আতাউল্লাহ খান সজীব বলেন, কামরাঙ্গীরচরের হাসান নগরে এক বছর আগে একটি কাপড়ের কারখানা স্থাপন করেন তার শ্বশুর নূর আলম। সেখানেই তিনি থাকতেন। গত শুক্রবার তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই বৃহস্পতিবার ভোররাত ৪টা ৩৫ মিনিটে আলমের ফোন থেকে তার স্ত্রীর ফোনে একটি কল আসে। কল রিসিভ করার পর আলম কোনো কথা না বললেও তার আশপাশে চিল্লাচিল্লির শব্দ শোনা যায়। এরপর থেকেই তার ব্যবহৃত ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরের দিন বাড়িতে না ফেরায় আমরা ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করি। কিন্তু কোনোভাবেই তার সন্ধান পাইনি। কারখানায় গিয়ে কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তারা কিছুই জানে না বলে জানায়। উপায় না পেয়ে আমি একপর্যায়ে কামরাঙ্গীরচর থানায় যোগাযোগ করি। পরে ফোনকল এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পুলিশ মঙ্গলবার ওই কারখানা থেকে প্রথমে নূর-এ-আলমের কর্মচারী মিরাজ মিয়াকে (২০) আটক করে। তার মাধ্যমে কামরাঙ্গীরচরের ঝাউরাহাটি থেকে মো. রিফাত (১৯) ও কোতোয়ালি থানার সদরঘাট থেকে মো. শিপন ওরফে সম্রাটকে (২৫) আটক করা হয়।
এদিকে গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরে ডিএমপি’র লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নূর-এ-আলমকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, বৃহস্পতিবার ভোররাতে শিপন, মিরাজ, রিফাত ও জিহাদসহ আরও ২ থেকে ৩ জন মিলে কারখানার মধ্যে জুয়া খেলছিল। তখন কারখানার মালিক নূর-এ-আলম টের পেয়ে তাদের বকাঝকা করেন ও কারখানার মধ্যে জুয়া খেলতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে নূর আলম ফোন দিয়ে তার পরিবারকে জানায় তিনি বাড়ি যাবেন। জুয়া খেলার কথা বাইরে বলে দেয়ার ভয়ে তারা নূর আলমের মাথায় পেছন থেকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। আরেকজন তার বুকে, গলায়সহ শরীরের বিভিন্নস্থানে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই নূর-এ-আলমের মৃত্যু হয়। তখন লাশ কারখানার ভিতরের বাথরুমে নিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে দু’টি পলিথিন ও কাপড় দিয়ে আলাদা আলাদা করে পেঁচিয়ে একটি বস্তায় ভরে কারখানার ভেতরে টেবিলের নিচের মেঝে ভেঙে মাটিতে দুই ফুট গর্ত করে চাপা দিয়ে দেয় তারা। কেউ যেন বুঝতে না পারে এজন্য খনন করা জায়গাটি বালু ও সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে বুধবার কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, নূর-এ-আলম কারখানার মালিক। ওই কারখানার এক কর্মচারী মিরাজ। সে ওই কারখানায় থাকে। মিরাজ গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আরও তিনজন বহিরাগতকে নিয়ে কারখানায় জুয়া খেলছিল। পাশের কক্ষ থেকে মালিক নূর-এ-আলম টের পেয়ে তাদের বকাঝকা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে একজন আলমকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং আরেকজন তার বুকে ছুরিকাঘাত করে। ঘটনাস্থলেই নূর-এ-আলমের মৃত্যু হয়। এরপর হত্যাকারীরা মরদেহ টুকরো টুকরো করে ফ্যাক্টরির মাটির নিচে গভীর গর্ত খুঁড়ে তা পুঁতে রাখে এবং সিমেন্ট দিয়ে সেই স্থান ঢেকে দেয়। এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যার কাজে ব্যবহৃত একটি হাতুড়ি, একটি কাঁচি ও দু’টি চাকু উদ্ধারসহ অন্যান্য আলামত পুলিশ উদ্ধার করেছে। তদন্তের জন্য লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের জামাতা আতাউল্লাহ খান সজীবের দায়ের করা হত্যা মামলায় আসামিদের চালান করা হয়েছে। আমরা তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিলাম আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরকেও গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
Monday, December 9, 2024
১৮ বছর পর সন্তান হলেও বাবা ডাক শোনা হলো না মিছরাফের by আব্দুর রহমান সোহেল
সরজমিন মিছরাফ খাঁ’র বাড়িতে গিয়ে দেখ যায় করুণ দৃশ্য। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মিছরাফ খাঁর মা ও স্ত্রী জেসমিন বেগম। কথা বলতে না পারা ছেলেটা লোকজনের ভিড় দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে চারিদিকে। হয়তো মানুষের ভিড়ে খুঁজছে তার বাবা মিছরাফ খাঁ’কে। অবুঝ শিশুটি কীভাবে বুঝবে তার বাবা আর নেই। ঘাতকের এক আঘাতেই চলে গেছেন না ফেরা দেশে। গ্রামের খাঁ ও সৈয়দ গোষ্ঠীর বিরোধে নিভে গেল মিছরাফ খাঁ’র জীবন প্রদীপ।
স্থানীয়রা জানান, বেশ কিছুদিন থেকে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল সুনাটিকি গ্রামের খাঁ ও সৈয়দ গোষ্ঠীর মাঝে। গত বৃহস্পতিবার এনিয়ে সালিশ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতিতে তা হয়নি। গত ৬ই ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর বিরোধপূর্ণ জমির ডোবায় মাছ ধরতে যান সৈয়দ জুয়েল আলী ও তার লোকজন। সালিশ বৈঠকে যেহেতু সমাধান হবে তাই মাছ না ধরার জন্য আপত্তি জানান খাঁ গোষ্ঠীর নূরুল আমিন খাঁ। কিন্তু সৈয়দ গোষ্ঠীর লোকজন আপত্তি আমলে না নিয়ে মাছ ধরতে থাকে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে দুই গোষ্ঠীর লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। উভয় পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই সৈয়দ মহরম খাঁ’র ছেলে মিছরাফ খাঁ (৪৫) প্রতিপক্ষের দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। সন্ধ্যার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। এ সময় অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহত মিছরাফ খাঁ’র লাশ মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত পরবর্তী গত শনিবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। দাফন শেষে ওইদিন রাতেই ইউপি সদস্য নূরুল আমিন বাদী হয়ে ৪৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ৫০/৬ কে আসামি করে মামলা করেন। এই মামলায় আটককৃতরা হলো- সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলী, সৈয়দ মনসুর আলী, সৈয়দ লিয়াকত আলী, সৈয়দ আবদার আলী।
রাজনগর থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) শাহ মোবাশ্বীর হোসেন বলেন, সৈয়দ গোষ্ঠী ও খাঁ গোষ্ঠী একে অপরের আত্মীয়। বিরোধপূর্ণ ডোবাতে মাছ ধরতে গিয়ে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনার স্থলে মিছরাফ খাঁ নিহত হয়েছেন। মামলা হয়েছে, পুলিশ ৪ জনকে আকট করেছে।

Wednesday, December 4, 2024
লুট করা অস্ত্রে প্রেমিকাকে হত্যা
নিহত শাহিদা ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার বেগুনবাড়ির বরিবয়ান এলাকার প্রয়াত আবদুল মোতালেবের মেয়ে। তিনি ঢাকার ওয়ারী থানার যুগীনগর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। গ্রেপ্তার প্রেমিক তৌহিদ শেখ তন্ময় রাজধানী ঢাকার ওয়ারীর বনগ্রাম এলাকার প্রয়াত শফিক শাহ’র ছেলে। মঙ্গলবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জে ক্লুলেস হত্যা মামলা নিয়ে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, শাহিদাকে গুলি করে হত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে তৌহিদ শেখ। আমরা তাকে (তৌহিদকে) হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তৌহিদ আমাদের জানিয়েছে, তার সঙ্গে শাহিদার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তৌহিদ তার পরিবারের পছন্দের অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রেমের সম্পর্কের পর তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্কও ছিল। শাহিদা তৌহিদকে বলেছিল সে আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তবে সামপ্রতিক সময়ে শাহিদাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল সে। এবিষয়টি শাহিদা বুঝতে পেরে তৌহিদকে বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গত শুক্রবার রাতে শাহিদাকে মুঠোফোনে ওয়ারীর বাড়ি থেকে মাওয়ায় ইলিশ খাওয়ার কথা বলে ডেকে আনে তৌহিদ। শাহিদাকে নিয়ে খাওয়া- দাওয়া শেষে রাতভর মাওয়া এলাকায় ঘোরাঘুরি করে। শনিবার ভোরে শ্রীনগর দোগাছি এলাকার এক্সপ্রেসওয়েতে শাহিদাকে নিয়ে আসে তৌহিদ। সেখানেই তার সঙ্গে থাকা ওয়ারী থানা থেকে লুট করা পিস্তল দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করে।
হত্যার পর তৌহিদ দোগাছি এলাকা থেকে ঢাকায় পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার আগে পিস্তলটি কেরানীগঞ্জের বটতলী বেইলি সেতুর নিচে ফেলে যায়। রোববার তৌহিদ আত্মগোপনে ছিল।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, তৌহিদ তার পরিবারের লোকজনের সহযোগিতায় সোমবার রাতে ঢাকা থেকে লঞ্চে করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ব্যাপক তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা বিষয়টি জানতে পারি। পরবর্তীতে ভোলার ইলিশাঘাট এলাকায় লঞ্চের কেবিনের ভেতরে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এর আগে গত শনিবার দুপুরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সমসপুর এলাকার দোগাছি সার্ভিস সড়ক থেকে শাহিদা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের পাশে কয়েকটি গুলির খোসা পড়ে ছিল। তার শরীরে আটটি গুলির ছিদ্র ছিল।
সেদিন দুপুর ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করে শ্রীনগর থানায় নিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সেখান থেকে শাহিদার মুঠোফোনে থাকা নম্বরের মাধ্যমে তার মায়ের নম্বর পাওয়া যায়। বিকালে জরিনা বেগম এসে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর নিহত তরুণীর মা জরিনা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি করেন। পরে রোববার সকালে ওই মামলায় একমাত্র নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয় তৌহিদকে। রোববার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে শাহিদার লাশ ময়মনসিংহের বরিবয়ান গ্রামে দাফন করা হয়।
নিহতের মা জরিনা বেগম বলেন, তিন মাস আগে শাহিদা ও তৌহিদ সবার অজান্তে চাঁদপুরে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে তৌহিদ আমার মেয়েকে মারধর করে। পরে পুলিশ এসে দু’জনকে ধরে নিয়ে যায়। তখন তাদের মধ্যে প্রেমের বিষয়টি আমি জানতে পারি। পরে তৌহিদের বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিই। জানতে পারি, তৌহিদ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ছেলে হিসেবেও ভালো না। আমার মেয়েকে ওই ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তৌহিদ বিভিন্ন সময় আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যেত। আমার মেয়েটাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।
অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি সঠিক কিনা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিতভাবে জানার কথা বলেন পুলিশ সুপার। তবে শাহিদা অন্তঃসত্ত্বা ছিল কিনা এমনটা জানে না তার মা জরিনা বেগম।
মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ইশতিয়াক রাসেল বলেন, আসামি তৌহিদকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে সে ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

Tuesday, December 3, 2024
বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় প্রেমিকাকে গুলি করে হত্যা
তন্ময় রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রাম এলাকার প্রয়াত শফিক শাহর ছেলে। শনিবার রাত ১২টার পর নিহতের মা জরিনা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি করেন। রোববার সকালে সে মামলায় একমাত্র নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়। নিহতের শরীরে আটটি গুলির ছিদ্র ছিল। সে সময় লাশের পাশে কয়েকটি গুলির খোসাও পড়ে ছিল। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মো. আজাদ বলেন, শাহিদাকে হত্যার পর থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে তৌহিদকে গ্রেপ্তারের জন্য আমাদের একাধিক দল কাজ করছিল। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি তৌহিদ ভোলা রয়েছে। রোববার রাতে আমাদের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে তৌহিদকে গ্রেপ্তার করে। পরে তৌহিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে যে অস্ত্র দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সেটি কেরানীগঞ্জের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
হত্যার ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, তৌহিদ আমাদের জানিয়েছে, শাহিদার সঙ্গে তৌহিদের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্ক থেকে তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এর মধ্যে তৌহিদ অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিষয়টি শাহিদা জানতে পারে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়াঝাঁটি হয়। তাদের সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তবে গত শুক্রবার রাতে তৌহিদ শাহিদাকে মুঠোফোনের মাধ্যমে ওয়ারীর বাড়ি থেকে মাওয়ায় ইলিশ খাওয়ার কথা বলে ডেকে আনে। তারা সারারাত এক্সপ্রেসওয়েতে ঘোরাঘুরি করে। শনিবার ভোরে তারা শ্রীনগর দোগাছী এলাকায় হাঁটাহাঁটি করছিল। এ সময় শাহিদা বিয়ের জন্য চাপ দেন। তৌহিদ বিয়ে করতে অস্বীকার করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তৌহিদের সঙ্গে থাকা পিস্তল দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করে। যে পিস্তলটি দিয়ে শাহিদাকে হত্যা করা হয়েছে এটি গত ৫ আগস্ট ওয়ারী থানা থেকে লুট করেছিল তৌহিদ।
নিহত শাহিদা ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার বেগুনবাড়ীর বরিবয়ান এলাকার প্রয়াত আবদুল মোতালেবের মেয়ে। তিনি ঢাকার ওয়ারী এলাকায় ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। গত শনিবার ভোরে শাহিদা ও তৌহিদকে সার্ভিস লেনে হাঁটতে দেখেছেন পথচারীরা। কিছুক্ষণ পর অন্য পথচারীরা শাহিদার রক্তাক্ত লাশ সড়কে পড়ে থাকতে দেখেন। তার পিঠে একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল। পরে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান। শাহিদার মা জরিনা বেগম বলেন, ৬ বছর ধরে তার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছিল তৌহিদ। বিষয়টি তৌহিদের পরিবারের লোকজন জানত। তিন মাস আগে শহিদা ও তৌহিদা সবার অজান্তে চাঁদপুরে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে তৌহিদ আমার মেয়েকে মারধর করে। পরে পুলিশ এসে দু’জনকে ধরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে তৌহিদের পরিবারের লোকজন। তখন থেকে প্রেমের বিষয়টি আমি জানতে পারি। এরপর তৌহিদের বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ-খবর নেই। জানতে পারি তৌহিদ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ছেলে হিসেবেও ভালো না। পরে আমরা মেয়েকে ওই ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করি। তৌহিদ বিভিন্ন সময় আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যেত। প্রেমের অপরাধে তৌহিদের মা আমার মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। আমি মেয়েকে বাড়ি থেকে বের হতে দিতাম না। শুক্রবার শাহিদাকে ফুসলিয়ে ফোনের মাধ্যমে বাড়ি থেকে বের করে নেয়। শেষপর্যন্ত আমার মেয়েটাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।

Wednesday, November 27, 2024
চট্টগ্রামে আদালত চত্বরে সংঘাত আইনজীবীকে কুপিয়ে হত্যা
নিহত সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় চুনতি ইউনিয়নের জামাল হোসেনের পুত্র। তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী প্রসিকিউটর ছিলেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ৩০ জন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভরত সনাতনীরা আদালত চত্বরে প্রায় তিন ঘণ্টা পুলিশের প্রিজন ভ্যান আটকে রাখেন। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে। এরপর চিন্ময় সমর্থকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে রঙ্গম কনভেনশন হলের সামনে অবস্থান নেন। এর মধ্যে আদালত প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে স্থানীয় ও আইনজীবীদের সঙ্গে তাদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে হত্যা করে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি ফজলুল কাদের বলেন, বিকাল পৌনে ৪টার দিকে কোর্ট হিলে সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র চন্দন কুমার ধর ওরফে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আদালত কারাগারে প্রেরণ করার আদেশ প্রদান করেন। এসময় ইসকনের লোকজন আসামি বহনকারী প্রিজন ভ্যান অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিরে দেয়ার সময় মোটরসাইকেল, গাড়ি ভাঙচুর ও মসজিদ ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে তারা আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে নিয়ে নিকটস্থ রঙ্গম টাওয়ারের সামনে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, চিন্ময়ের অনুসারীদের যারা আদালতে বিক্ষোভ করেছেন তারাই সাইফুলকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। সাইফুল হত্যার প্রতিবাদে আজ আদালতের কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা করেছেন আইনজীবীরা। সকাল ১১টায় জমি’আতুল ফালাহ মাঠে নিহত আইনজীবীর জানাজা হবে। বিকালে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নগরীতে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময়ও নিউমার্কেট মোড়ে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছিলেন ছাত্র-জনতা।
জানা যায়, জামিন শুনানির পর বেলা ১২টা ২০ মিনিটে চিন্ময়কে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। তখন তার সমর্থকরা প্রিজন ভ্যানটি ঘেরাও করে ও আটকে রাখে। আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সড়কটিতে পুরাতন পিকআপ ভ্যান দিয়ে পথ রোধ করা হয়। পুলিশ তাদের অনুরোধ করে ও বুঝিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলেও তারা পথ অবরোধ করে রাখেন। পুলিশের প্রিজন ভ্যানটির চাকা পাংচার করে দেয়া হয়। এরপর বেলা ২টা ৫০ মিনিটে সাউন্ড গ্রেনেড ফাটিয়ে এবং লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। পরে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে পুলিশের একটি পিকআপে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, এপিবিএনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সনাতনী ইসকন সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দিলে আদালত এলাকা ত্যাগ করার সময় তারা মোটরসাইকেল, গাড়ি ও আদালত মসজিদ মার্কেটের নিচতলা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েন। তাদের ইটপাটকেলের আঘাতে কয়েক জন আহত হয়েছেন। লালদীঘি চত্বরের নাসির উদ্দিন নামে একজন পিঠা ব্যবসায়ীর মাথা ফেটে যায়। এসময় ইসকন সমর্থকদের হাতে রাম-দা ও লাঠিসোটা ছিল। ইসকন কর্মীরা এসময় চট্টগ্রাম আদালত মসজিদেও ভাঙচুর চালায়। এই ঘটনার জেরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আইনজীবী ও স্থানীয়রা।
জানা যায়, সংঘর্ষের ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও আহত হয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন। তবে এই ১৯ জনের সকলেই আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল মন্নান। তিনি বলেন, ‘কেউ মাথায় আঘাত পেয়েছেন, কেউ হাতে, কেউ শরীরের অন্যান্য জায়গায় আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। তাদেরকে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।’
এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে চিন্ময়কে কঠোর নিরাপত্তার সঙ্গে আদালতে আনা হয়। এরপর বেলা পৌনে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম ৬ষ্ঠ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক কাজী শরীফুল ইসলাম জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদেশের পরপরই এজলাসের বাইরে বিক্ষোভ শুরু করেন চিন্ময় সমর্থকরা।
বেলা সোয়া ১২টার দিকে প্রিজন ভ্যানের ভেতর থেকেই চিন্ময় কৃষ্ণ তার ভক্ত-অনুসারীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। হ্যান্ডমাইকে তিনি বলেন, আমরা রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে নই। ৫ই আগস্ট অভ্যুত্থানে যে রাষ্ট্র নির্মাণের আশা করা হয়েছে আমরা সনাতনীরা তার অংশীদার। সুতরাং রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয় এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নষ্ট হয় আমরা এমন কিছু করবো না। আবেগকে সংযত করে শক্তিতে পরিণত করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করবেন।
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ৮ দফা দাবি মৌলিক দাবি। এটা অযৌক্তিক দাবি নয়। এটা পরিপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আপনারা আন্দোলন চালাবেন। কিন্তু দয়া করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং পরস্পর সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করবেন। এটা আমি আপনাদের কাছে আশা করছি।
প্রসঙ্গত, গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আট দফা দাবিতে সনাতনী সমপ্রদায়ের মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ। গত ২৫শে অক্টোবর চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে জনসভার পর ৩০শে অক্টোবর রাতে তাকেসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। এই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ঢাকায় লংমার্চের ঘোষণাও দিয়েছিল সনাতনী জাগরণ মঞ্চ। পরে সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। সর্বশেষ গতকাল বিকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার সময় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করেন।

Monday, November 25, 2024
একটি কনসার্ট খুন এবং যৌন হয়রানি দায় কার? by প্রতীক ওমর
বাসদের বগুড়া জেলা শাখার সদস্য সচিব দিলরুবা নূরী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘২৬ নভেম্বর বিকাল থেকে কলেজ ক্যাম্পাসের দিকে ছিল তরুণ-তরুণীদের ঢল। রাত সোয়া ১০টায় যখন সাতমাথা হয়ে বাসা ফিরছিলাম তখন দেখলাম তরুণদের পদচারণায় শহরের প্রত্যেক পথ গিজ গিজ করছে। গাড়ি, সিএনজি, রিকশা শহরে তখন নাই বললেই চলে। সব পায়ে হাঁটছে গন্তব্যের দিকে। তাদের মধ্যে একটা গ্রুপকে দেখলাম একটি ছেলে খালি গায়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, বুঝলাম সে এত বেশি মদ খেয়েছে যে মাতাল হয়ে গেছে।
তার আগে একবার নেটে ঢুকে দেখি কনসার্ট দেখাকে কেন্দ্র করে মেহেদি নামে এক যুবক ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছে। পরে বাসায় ফিরে এসে এক মেয়েকে লাঞ্ছিত করার ভিডিও দেখলাম’। ‘সবমিলে একটি কলেজের একটি ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে এরকম একটি আয়োজন কেন দরকার পড়লো দেশের এরকম একটি সময়ে। যখন কিনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসন এখনো শিক্ষার পরিবেশই ফেরাতে পারেনি। যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো সচল হয়নি। যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়।’
সাংবাদিক অরূপ রতন তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া এটা মোটেও কোনো বাহাদুরি কাজ নয়। এরমধ্যে আপনারা ঘটা করে আবার ঘোষণাও দিয়েছিলেন রাত ৮টায় জনপ্রিয় অ্যাশেজ ব্যান্ড দল মঞ্চে উঠবে। এজন্য সেখানে জনস্রোত তো হবেই। তবে এই জনস্রোতে কি কি ঘটতে পারে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকবে কিনা তা দশবার ভাবা দরকার ছিল। যার ফলাফলে আমরা দেখলাম একটা যুবকের খুন, অনেক নারীর শ্লীলতাহানি, ছোট ছোট মারামারি, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আহত একজন আর মাদকের অবাধ সেবন।
একজন শিক্ষক লিখেছেন, ফৌজিয়া বীথি, ‘শনিবার রাতে উত্তরবঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কনসার্টে মেয়েদের হেনস্তা, শ্লীলতাহানি নিয়ে একটা ভিডিও ফেসবুকে ঘোরাফেরা করছে।
একটা স্বনামধন্য বিদ্যাপিঠে এমনটা আমাদের কারোই কাম্য নয়’।
আব্দুস ছালাম নামের একজন লিখেছেন, ‘বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসে নামাজের সময় বন্ধ করা হয়নি কনসার্ট।
ওদিকে, বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে কনসার্ট চলাকালে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে মেহেদী হাসান (২৬) নামের এক যুবকের মৃতু্য হয়েছে। নিহত মেহেদী শহরের মালগ্রাম চাপড়পাড়া এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি পেশায় একজন থাই মিস্ত্রি ছিলেন। এ ছাড়াও ছাত্রীদের যৌন হামলার ঘটনাগুলো ফেসবুক জুড়ে ট্রল হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কলেজ প্রশাসনকে দোষ দিচ্ছেন। এমন জঘন্য ঘটনার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি তোলা হয়েছে।
বিষয়গুলো নিয়ে বগুড়া পুলিশ সুপার জেদান আল মুসার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি বরাবরের মতোই ফোন রিসিভ করেননি। পরে বগুড়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন রঞ্জন সরকার মানবজমিনকে বলেন, পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ধরতে এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। নিহতের মা সুখী বেগম বাদী হয়ে তিন জনকে আসামি করে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, আয়োজক কমিটি বলেছিল অনুষ্ঠান ছোট হবে। এত বেশি মানুষের উপস্থিতি হবে না। কিন্তু বাস্তবে ছিল তার উল্টো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ যথাযথভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছে।

Tuesday, September 24, 2024
যেভাবে খুন করা হয় নটর ডেমের লিপিকাকে
সাইদুর রহমান বলেন, জুয়েল রানা আগে নজরুলদের বাসায় মেসে খেতো। সেখান থেকেই তাদের পরিচয়। জুয়েল রানা নজরুলকে জানায় তার পাশের বিল্ডিং এর চতুর্থতলায় একজন মহিলা একা থাকে। তার কোনো স্বামী ও সন্তান নেই। তার বাসায় চুরি করলে অনেক টাকা-পয়সা পাওয়া যাবে। পরিকল্পনা মোতাবেক জুয়েল রানা তার স্ত্রীকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে ১০ই সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাসায় আসে। রাত ১টার দিকে নজরুল লিপিকার বাসার ছাদের উপর দিয়ে এসে রশির সাহায্যে ঝুলে ভিকটিমের বাসার পেছনের ভেন্টিলেটর ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দরজা খুলে দেয়। জুয়েল সেই দরজা দিয়ে চুপিসারে লিপিকার বাসায় ঢোকে। তারা দু’জনে বাসায় চুরি করার সময় শব্দ শুনে লিপিকা ঘুম থেকে উঠে পরে। তখন নজরুল একটি লোহার পাইপ দিয়ে লিপিকার মাথায় আঘাত করে আর জুয়েল বালিশ দিয়ে মুখ চেপে ধরলে লিপিকার মৃত্যু হয়। এরপর তারা দু’জনে ওই বাসা থেকে লিপিকার দুটি মোবাইল ও হাত ব্যাগে থাকা টাকা, গয়না নিয়ে দরজা বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে বাসায় চলে যায়। পরে ব্যাগে থাকা টাকা, ফোন ও মালামাল দু’জনে ভাগ করে নেয়। সেই ফোনের একটি ফোন জুয়েল বিক্রি করে রিভার ভিউ রেস্টুরেন্টের স্টাফ নাজিমুদ্দিনের কাছে। সেই ফোনের সূত্র ধরেই জুয়েল ও নজরুলকে আটক করে পুুলিশ। আটকের পর তারা এই হত্যাকাণ্ডের পুরোটাই স্বীকার করেছে পিবিআইয়ের কাছে। তাদের কাছ থেকে লিপিকার বাসা থেকে খোয়া যাওয়া টাকা ও মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নিহত লিপিকা গোমেজের ছোট ভাই বারমুডা প্রবাসী অসিম গোমেজ বলেন, আমরা তিন ভাই বোন। বাবা-নেই। বড় বোন অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। আমি দেশের বাইরে থাকি। আমার পরিবারের সদস্যরা ফার্মগেটে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। আর লিপিকা সূত্রাপুরে বাসা নিয়ে একাই থাকতো। প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে আমাদের কথা হতো। ঘটনার দিন রাতে আমার মেয়ের কাছ থেকে আমি জানতে পারি এই হত্যাকাণ্ডের কথা। ওইদিন আমি ফ্লাইটের টিকিট পাইনি। পরের দিনই আমি দেশে ফিরে আসি। অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করে আসছি। কখনো কারোর সঙ্গে কোনো ঝামেলা হয়নি। কারোর সঙ্গে তেমন কোনো শত্রুতাও নেই। এরপরও আমার বোনকে তার ঘরের মধ্যে হত্যা করা হলো। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই।

Monday, September 23, 2024
ফ্রিজ খুলতেই মিললো ৩০ টুকরো করে কাটা তরুণীর দেহ
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, 'ও বেশি কথা বলত না। এখানে একাই থাকত। সকালে বেরিয়ে সেই রাতে বাড়ি ফিরত। কিছুদিন ওর দাদা এখানে এসে ছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর ওর মা ও বোন আসেন। সেই সময় তারা দুর্গন্ধ পেয়ে ফ্রিজ খুলে দেখে এই অবস্থা।"কে বা কারা তরুণীকে খুন করেছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা। প্রশ্ন উঠছে জীবিত অবস্থায় তার দেহ টুকরো করা হয়েছে না কি খুনের পর এই নৃশংস কাণ্ড? তরুণীর ফ্ল্যাটে কারা কারা আসতেন সব দিক খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। বেঙ্গালুরুর এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে দিল্লির শ্রদ্ধার ঘটনা। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর কিছু দিন নিখোঁজ থাকার পর দিল্লির ছতরপুরের নিকটবর্তী একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছিল শ্রদ্ধার দেহ। তার দেহের ৩৫ টুকরো করার অভিযোগ ওঠে সঙ্গী আফতাব আমিনের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয় সেই দেহাংশ একএক করে দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় ফেলে আসে সে ।
সূত্র : livemint

Sunday, September 22, 2024
আধিপত্য বিস্তারের জেরেই মোহাম্মদপুরে জোড়া খুন
প্রত্যক্ষদর্শী ও হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. শাওন বলেন, আমি পেশায় একজন মোবাইল মেকানিক। রায়ের বাজার এলাকায় আমার দোকান রয়েছে। নিহত নাসির ও আমার বাসা একই এলাকাতে। শুক্রবার সন্ধ্যার পর আমি বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হওয়ার সময় নাসিরের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে হঠাৎ আমার মোটরসাইকেলের পেছনে ওঠে বলে- ‘আমাকে তোর সঙ্গে নিয়ে যা। তুই যেদিকে যাবি আমিও সেদিকে যাবো।’ এরপর দু’জনে রওনা হই। পথে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে সাদেক খান কৃষি মার্কেটের সামনে পৌঁছালে দেখি অস্ত্রধারী দুইদলের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে। একদল লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাদেক খান কৃষি মার্কেটের দোকানের ভেতর অবস্থান করছে, আরেক দল বাইরে। দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তখন রাস্তায়ও অনেক যানজট বেঁধে যায়। আমরা তখনো মোটরসাইকেলের উপর বসে ছিলাম। এরই মধ্যে অস্ত্র হাতে দোকানের বাইরে থাকা লোকজনের মধ্যে কয়েকজন আমার পেছনে বসে থাকা নাসিরকে দেখিয়ে ‘ওই যে একটাকে পাইছি রে’-বলেই কোপাতে থাকে। কয়েকটি কোপ দেয়ার পর নাসির জীবন বাঁচাতে মোটরসাইকেল থেকে নেমে দৌড় দেয়। তারপরও তারা নাসিরকে কোপাতে থাকে। নাসিরকে কেন মারছেন- বলে আমি তাদের ঠেকাতে গেলে আমাকেও মারধর করে তারা। এর একপর্যায়ে আশপাশের লোকের সহায়তায় নাসিরকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় শিকদার মেডিকেল নিয়ে যাই। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। পরে নাসিরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত পৌনে ৮টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত নাসিরের বড় ভাই ইসলাম বিশ্বাস বলেন, মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার বালিগ্রামের বাড়ি হলেও আমরা দীর্ঘদিন ধরে রায়ের বাজার বারৈইখালী এলাকায় বসবাস করি। পাঁচ ভাই, দুই বোনের মধ্যে নাসির ছিল চতুর্থ। তিনি বলেন, নাসির মূলত দিনমজুরির ভিত্তিতে রাজমিস্ত্রির কাজ করতো। সম্প্রতি সে নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিকদের সর্দার বা সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিল। শুক্রবার বিকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর খবর পাই ১০/১৫ জন সন্ত্রাসী তাকে কুপাইছে। পরে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে ওর লাশ পাই। তিনি বলেন, আমার ভাই কোনো দল করতো না। ওর বন্ধুবান্ধবের ভেতর কেউ কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিল। আর এই কারণেই আমার ভাইকে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে একই ঘটনায় মুন্না নামে আরও একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে স্থানীয়রা মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে বুদ্ধিজীবী এলাকা থেকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারও মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ওসি বলেন, বিগত সরকারের নেতাকর্মীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে নাসির মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগ এলাকায় আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে পরিচিত। নাসিরের পেশা রাজমিস্ত্রি হলেও মুন্নার কোনো পেশা নেই। তারা দু’জনে একই গ্রুপের লোক ছিল। তাদের দু’জনের মধ্যে মুন্নার বিরুদ্ধে মাদক, নাশকতার অন্তত ৮টি এবং নাসিরের বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলা রয়েছে। তবে প্রতিপক্ষ গ্রুপে কে রয়েছে, সে বিষয়ে এখনো তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আমরা তদন্ত করছি। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ও মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়ে গ্রীন ভিউ হাউজিং এলাকার বাসায় ঢুকে শাহাদাত হোসেন (২০) নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

Friday, September 20, 2024
ক্যাম্পাসে নৃশংসতায় কারা? সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ ৪ জন আটক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হলটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃবিভাগ খেলা চলছিল। বুধবার ক্রিকেট খেলার সময় একটি ব্যাগে থাকা ৬টি মোবাইল হারিয়ে যায়। এ নিয়ে দিনভর উত্তপ্ত ছিল হলের পরিবেশ। হলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সতর্ক করে দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর রাত ৮টার দিকে ফুটবল খেলা চলছিল। সে সময় বহিরাগত তোফাজ্জল হলের ভেতরে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ দেখে শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হয়। তিনি বিভিন্ন জায়গায় হাঁটাচলা করতে থাকেন। তার বেশভূষা দেখে সন্দেহ হয় প্রথম বর্ষের কিছু শিক্ষার্থীর। তারা একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা রুমে নিয়ে ফোনের বিষয়ে জানতে চাই, সার্চ করি। কিজন্য এসেছে এখানে সেটাও জানতে চাই। তিনি অযাচিত কথা বলছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম নেশাগ্রস্ত। তাকে হালকা চড় থাপ্পড় দেয়া হয়। তাকে মারলেও খুব একটা রিঅ্যাকশন দেখাতো না। নাম্বার চাইলে পরিবারের কয়েকজনের নাম্বার মুখস্ত বলেন তিনি। সেই নম্বরে কল দিয়ে জানতে পারি মানসিক ভারসাম্যহীন। একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, একটা পর্যায়ে তোফাজ্জল বলতে শুরু করেন খিদা লাগছে ভাত খাবো। তখন তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়।
ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছিলেন আসিফ হাসান। তিনি বলেন, ক্যান্টিনে নিয়ে তাকে খেতে দিতে বলি। এরপর মুরগি ও সবজি দিতে বলি। তিনি এমনভাবে খাচ্ছিলেন দেখে মনে হচ্ছিল না খুব একটা ক্ষুধার্থ। এরপর নিজের থেকে মাছ খেতে চায়। তার জন্য শোল মাছ অর্ডার করা হয়। খাওয়ার সময় খুব নিশ্চিত মনে কথা না বলে খাচ্ছিলেন। তাকে যে চুরির দায় দেয়া হচ্ছে এনিয়ে কোনো চিন্তাই যেন নেই তার। সুন্দরমতো ভাত খেলেন।
প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, খাওয়া শেষে চুপ করে চেয়েছিলেন তোফাজ্জল। এই খাওয়ার সময়েই হলের নিজস্ব গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে মোবাইল চোর ধরা পড়েছে। ততক্ষণে ক্যান্টিনে বড় ভাইয়েরা চলে আসে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হলের আরেকটি কক্ষে। এরপর সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। আর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা রুমের বাইরে ছিলেন। মারার সময় খুব বারবার চুরি করেনি বলে মাপ চেয়েছিল। আর নির্যাতন করার সময় খুব একটা চিৎকার, কান্না না করায় আরও বেশি মারা হয়েছে। তিনি বলেন, একপর্যায়ে তার হাতের উপর লাঠি রেখে দুপাশে কয়েকজন করে দাঁড়িয়ে নির্যাতন করে। হাতের ও পায়ের আঙ্গুলগুলো থেতলে যেতে থাকে। বারবার বলা হচ্ছিল- বল তুই চুরি করেছিস? ফোনগুলো কোথায়? তিনি বারবার বলছিলেন- আমি মোবাইল চুরি করি নাই।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, মারধরের সময় পরিবারের বেশ কয়েকজনের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। ধারাবাহিক নির্যাতনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত শিক্ষার্থীরা কথা বলেন তার মামার সঙ্গে। তার মাধ্যমে মানসিক ভারসাম্যহীন জানার পরেও তাকে ছাড়েননি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম, সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, তোফাজ্জলকে সবচেয়ে বেশি মারধর করেছেন ছাত্রলীগের সদ্য পদত্যাগ করা উপ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদ, মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সুমন, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ফিরোজ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের আব্দুস সামাদ, ফার্মেসি বিভাগের মোহাম্মদ ইয়ামুজ জামান এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনিস্টিউটের মোত্তাকিন সাকিন। নির্যাতন করা শিক্ষার্থীদের সবাই ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থী।
প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতান প্রথমে চোর সন্দেহে তাকে ধরে গেস্টরুমে নিয়ে আসেন। সূত্রটির তথ্যমতে, মারধরে জড়িত ছিলেন- মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের রাশেদ কামাল অনিক, গণিত বিভাগের রাব্বি এবং সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের ওয়াজিবুল। তারা সবাই ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
হলের প্রত্যক্ষদর্শী একজন শিক্ষার্থী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি হল গ্রুপে ৮টার সময় দেখি হলে চোর ধরা পড়েছে। হলের গেস্ট রুমে, গিয়ে দেখি চোর বসা। রুমে তখন প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। গেস্টরুমে তাকে বেশি মারা হয়নি। ওখানে হালকা মারার পরে ক্যান্টিনে নিয়ে আসে খাওয়ানোর জন্য। তারপর শুনি তাকে এক্সটেনশন বিল্ডিং’র গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তখন ওখানে গিয়ে দেখি ২০-২১, ২১-২২ ও ২২-২৩ সেশনের ব্যাচ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছিল, ওরা মারে নাই। ২০-২১ আর ২১-২২ সেশনের ওরা খুব বেশি মেরেছে। নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মামাকে ফোন দিয়ে জানানো হয় ৩৫ হাজার টাকা পাঠাতে। তার মামা অপারগতা শিকার করলে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পেটানোর নেতৃত্ব দেয়া তিন চারজন। তারা বলেন, ও নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন। তাহলে এতগুলো নম্বর মুখস্ত থাকে কীভাবে। আবার আরেকটি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শোনা যায় দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, দুই-তিনজন মিলেই ওরে ওখানে মেরে ফেলছে। এরা হলেন- মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ২০-২১ সেশনের মোহাম্মদ সুমন, ওয়াজিবুল, ফিরোজ ও জালাল। এদের মধ্যে সুমন, ফিরোজ এবং জালাল সবচেয়ে বেশি মেরেছে। গেস্টরুমে হাত বেঁধেছে জালাল। সুমন চোখ বন্ধ করে মেরেছে, মারতে মারতে পড়ে যায়। এরপরে পানি এনে তাকে পানি খাওয়ানো হলে সে উঠে বসে। এরপর আবার শুরু হয় পেটানো। এই দফায়ও সবচেয়ে বেশি মেরেছে ফিরোজ। পরে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের জালাল আসে। জালাল এসে আরও মারতে উৎসাহ দেয়। বলে ‘মার, ইচ্ছামতো মার; মাইরা ফেলিস না একবারে’। এ সময় গ্যাস লাইট দিয়ে পায়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। পরে সুমন এসে তোফাজ্জলের ভ্রু ও চুল কেটে দেয়।
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, পরে ওখানে স্যার (হলের আবাসিক শিক্ষক) আসেন। আমি ওদেরকে অনেক ফেরানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওরা মানেনি। এক্সটেনশন বিল্ডিং এর গেস্টরুম থেকে যখন তাকে বের করা হয় তখন স্যার এসে পড়েছেন। মারধরে তোফাজ্জলের ডান হাত এবং বাম পায়ের মাংসের কিছুটা অংশ খুলে পড়ে যায়। অনেকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। আমি বলি কাপড় আনো, ওর পা বেঁধে দেই। কারণ ব্লিডিং হইলে তো সেন্সলেস হয়ে যাবে। পরে কাপড় এনে একটা জুনিয়র পা বেঁধে দেয়।
একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শিক্ষার্থীরাই ঢাকা মেডিকেলে কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর পরপরই লাশ রেখে শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল থেকে যে যার মতো চলে যান।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জালাল অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমি স্যারের সঙ্গে ছিলাম। প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মে পেটানোর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তৃতীয় টার্মে যখন যাই একটা স্টাম্প টেনে নেই। কিন্তু ভিডিওতে মনে হচ্ছে আমি পিটাইছি। আমি যদি পেটাতাম তাহলে আমি পালিয়ে যেতাম, ইন্টারভিউও দিতাম না।
জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেন, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারিয়েছেন আট বছর আগে। পরে প্রেমসংক্রান্ত বিষয়ে আঘাত পেয়ে হয়ে পড়েছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। পুরো ঘটনা কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চললেও ঘটনাস্থলে যাননি হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ মাসুম। তাকে বারবার ফোন দিয়েও ঘটনার সময় পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও প্রভোস্টকে ফোনে পাননি। যদিও রাতে ‘ঘুমিয়েছিলেন’ বলে সকালে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান। সদ্য নিয়োগ পাওয়া প্রভোস্টের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। তিনি প্রথমেই শক্তভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেতো বলে তাদের অভিমত।
এই ঘটনায় মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঘটনার বিচার চেয়ে মিছিল, প্রতিবাদ ও স্লোগান ও সমাবেশে গতকাল সারা দিন উত্তাল ছিল ঢাবি। এ ঘটনায় গতকাল সকাল থেকে তৎপর ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- মো. জালাল মিয়া, সুমন মিয়া, মো. মোত্তাকিন সাকিন, আল হুসাইন সাজ্জাদ ও আহসানউল্লাহ। জালাল মিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপ-সম্পাদক। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।
ঢাবি প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করে ঢাবি প্রশাসন। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি শাহাবুদ্দিন শাহীন মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ আটক ও মামলার বিষয় নিশ্চিত করে বলেন, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
যা ঘটেছিল জাহাঙ্গীরনগরে: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই জুলাই রাতে ভিসি’র বাসভবনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গণধোলাইয়ের পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয় শিক্ষার্থীরা। সেখানে তালা ভেঙে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট সংলগ্ন একটি দোকানে অবস্থান করছিলেন শামীম মোল্লা। তার অবস্থানের খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে তাকে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় তাকে নিরাপত্তা শাখায় নিয়ে আসা হয়। সেখানেও ছাত্রদলের একটি টিম কেচিগেইটের তালা ভেঙে তাকে বেধড়ক মারধর করে। ফলে শামীম মোল্লা মারা যেতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় একটি ভিডিও থেকে প্রাথমিকভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন- সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া, রাজু আহমেদ এবং রাজন হাসান, হামিদুল্লাহ সালমান এবং এমএন সোহাগ, ইংরেজি বিভাগের ৫০ ব্যাচের মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের ৪২ ব্যাচের জোবায়ের।
তবে প্রান্তিক গেইটের ঘটনায় আহসান লাবিব ও আতিক নামে দু’জন জড়িত। তবে তারা নিরাপত্তা শাখায় শামীম মোল্লাকে তুলে দেয়। পরে একদল ছাত্রদলকর্মী তালা ভেঙে তাকে মারধর করেন। সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া ৩৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া রাজু আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও রাজন হাসান ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী, হামিদুল্লাহ সালমান ইংরেজি ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও এমএন সোহাগ কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। নিরাপত্তা কার্যালয়ের ভেতরে চেক শার্ট পরিহিত অবস্থায় শামীমকে পেটায় আরেকজন। এ সময় তার হাতে গাছের ডাল দেখা গেছে। এ দিয়েই পিটিয়েছেন তিনি। তাকে রাজু আহমেদ বলে শনাক্ত করা গেছে।
মারধরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সাঈদ বলেন, কেউই হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে মারধর করেনি। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। আর একজন মানুষ যিনি হেঁটে পুলিশের গাড়িতে গেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেছেন এর রহস্য উদ্ঘাটন করা জরুরি।
এ বিষয়ে রাজু আহমেদ বলেন, আমি সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে শোনার পর সেখানে গেছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি শামীমকে ধমক দিই, তাকে মারধর করিনি। রাজন হাসান বলেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম কিন্তু মারার জন্য সেখানে যায়নি। যারা তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল তাদের আমি নিষেধ করেছিলাম। হামিদুল্লাহ সালমান বলেন, আমি সন্ধ্যায় হলে ছিলাম। পরে খবর পেয়ে প্রক্টর অফিসে যাই কিন্তু শামীম মোল্লাকে মারধর করিনি। সোহাগ বলেন, আমি টিউশন থেকে ফেরার পথে হইচই দেখে সেখানে গিয়েছিলাম কিন্তু মারধর করিনি।
শিক্ষার্থীরা জানায়, শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের জুয়েল-চঞ্চল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। শামীম বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশেপাশের এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, জমিদখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। গত ১৫ই জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় সে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
এ ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল টিমের খবরে আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি দল নিরাপত্তা শাখায় আসে। এ সময় পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিম শামীমকে ১৫ই জুলাই রাতে ভিসি’র বাসভবনে হামলার ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় শামীম মোল্লা হামলার ঘটনায় নিজের অংশগ্রহণ ও ঘটনাস্থলে হামলাকারীদের সঙ্গে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক মেহেদী ইকবাল উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে।
শামীম মোল্লা জানান, ১৫ই জুলাই রাতে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে হামলা করতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারেক ও মিজান নামে সাবেক দুই ছাত্রলীগ নেতা তাকে বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি সোহেলের নেতৃত্বে পেট্রোল বোমা তৈরি করা হচ্ছিল এবং হামলার জন্য দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রস্তুত করা হচ্ছিল। প্রস্তুতি শেষে ভিসি’র বাসভবনে হামলা করতে যাওয়া হয়। হামলার সময় তারেক এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে জানায়।
এদিকে, সন্ধ্যা ৭টায় প্রক্টর অফিসে আসেন ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তিনি উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, ১৫ই জুলাই ভিসি’র বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে শিক্ষার্থীরা আটক করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয়। আমরা আশুলিয়া থানায় অবহিত করলে পুলিশের একটি টিম আসে। ওই ছাত্রলীগ নেতার নামে আগেও বেশ কয়েকটি মামলা আছে। তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তবে তিনি গণধোলাইয়ে মৃত্যুর বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বলেন, তাকে শিক্ষার্থীরা আটকের পর মারধর করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয়। পরে আমরা আশুলিয়া থানায় অবহিত করলে পুলিশের একটি টিম এসে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর পুলিশে সোপর্দ করলে তিনি নিজে হেঁটে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন। তখন তাকে দেখে আশঙ্কাজনক মনে হয়নি। পরবর্তীতে পুলিশের গাড়িতে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিষয়টি ভালোভাবে না জেনে মন্তব্য করতে পারছি না।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই -ঢাবি-জাবিতে হত্যা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, এটি কীভাবে রোধ করা যায়—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। কাল দেখলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যা হয়েছে। তারা তো সবচেয়ে শিক্ষিত, তাদের সচেতনতা আসতে হবে। একজন অন্যায় করলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।’
মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘একজন অন্যায় করলে আইনের হাতে তাকে তুলে দেন। নিরপরাধ লোক যেন কোনো অবস্থায় হেনস্তা না হয় জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।’
এছাড়া, শুধুমাত্র ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম মামলায় দেয়ার অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ শুধু যারা দোষী তাদের নাম দেন। অন্যদের নাম দিয়েন না। অন্যদের নাম দিলে তদন্ত করতে সময় বেশি যাচ্ছে এবং অনেক সময় নিরীহ লোকও যেন হেনস্তা না হয় এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দায়ের করা মামলাগুলোয় বিপুল সংখ্যক আসামি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘এখন পুলিশ মামলা করছে না, করছে সাধারণ জনগণ।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে পুলিশ মামলা দিতো, এই সময়ে কোনো পুলিশ একটা মামলা দিয়েছে? আগে পুলিশ ১০ জনের নাম দিয়ে ১০০ জনের নাম দিতো অজ্ঞাত। আজ পর্যন্ত কিন্তু পুলিশ (মামলা) দিচ্ছে না। এটা কিন্তু সাধারণ পাবলিকরা দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মিডিয়াতেও বলছি, পেপারে দিয়েছি যে সাধারণ লোক যেন হেনস্তা না হয়। তদন্ত ছাড়া কাউকে এরেস্ট করা হবে না। ডিবিকে আজকেই নির্দেশনা দিয়েছি। পরিচয় তারা নিজেরা দেবে, তারপর ধরবে। এখানে ধরার কথা শুধু অপরাধীদের সাধারণ মানুষদেরকে তো ধরবে না।’

Friday, August 30, 2024
চট্টগ্রামে গুলি করে হত্যা: বৈঠকের কথা বলে সকালে বের হন, রাতে এল মৃত্যুর খবর by ফাহিম আল সামাদ
গতকাল সন্ধ্যার দিকে চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আনিসকে। একই সঙ্গে গুলিতে খুন হন আনিসের সব সময়ের সহচর মাসুদ কায়সারও (৩২)।
আনিসের স্ত্রী এনি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বৈঠকে গেছে, এটা জানতাম। সঙ্গে মাসুদও ছিল। কিন্তু কার সঙ্গে বৈঠক, কারা ছিল সেই বৈঠকে, এসবের কিছুই আমরা জানি না। আমার স্বামীর সঙ্গে এলাকার কোনো বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল বলে আমাদের জানা নেই। কেন আমার স্বামীকে এভাবে মারল? আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।’ আজ শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের সীমান্তবর্তী হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কুয়াইশ এলাকায় আনিসের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে।
পেশায় বালু ও পোলট্রি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আনিস পশ্চিম কুয়াইশ এলাকার ওসমান আলী মেম্বারের বাড়ির মৃত মো. ইসহাকের ছেলে। সেখানে দেখা যায় আনিসের মা সায়রা বেগম বাড়ির সামনে পেতে রাখা সোফায় বসে বিলাপ করছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সায়রা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে মেরে ফেলেছে। দোসরেরা আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।’ তবে কে বা কারা তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি পরিবার।
দাদির পাশেই বসা ছিল নিহত আনিসের দুই সন্তান মোহাম্মদ আনাস (৪) ও হুমাইরা আক্তার (৮)। সবার চোখে কান্না দেখে তাদের চেহারায়ও মলিন ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘বাবা আর নেই’—এটুকু বুঝে থেমে থেমে কান্নায় ভেঙে পড়ছে দুজন।
আনিসের সঙ্গে একইভাবে খুন হন একই এলাকার বিল্লাবাড়ির বাসিন্দা মাসুদ কায়সার। তাঁর গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলায় বলে জানা গেছে। তিনি তাঁর নানাবাড়িতে থেকে পড়ালেখা করেছেন এবং সেখানেই থাকতেন। আনিস ও মাসুদ সব সময় একসঙ্গে থাকতেন বলে জানা গেছে। দুজনই স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।
মাসুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে পুরো বাড়িতে। মাটিতে বসে কান্নায় বিলাপ করেছিলেন তাঁর খালা ইয়াসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার বোনের ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো, আমি এর বিচার চাই। সে রাজনীতি করত, এটা অপরাধ? এর জন্য তাকে মেরে ফেলতে হবে?’—প্রশ্ন ইয়াসমিন আক্তারের।
স্থানীয়রা বলছেন, আনিস ও মাসুদ স্থানীয় রাজনীতিতে হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস গণি চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তাঁরা। তবে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তাঁরা জানেন না। এলাকায় সবার সঙ্গে তাঁদের সখ্য ছিল।
কেন এই হত্যাকাণ্ড—জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আগের বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি না, তা জানতে স্থানীয় অন্তত পাঁচজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, এলাকায় দুটি পক্ষ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল দুই পক্ষের। এর একটি পক্ষে ছিলেন আনিস ও মাসুদ।
আনিস ও মাসুদকে যে স্থানে গুলি করা হয় সেটি নগরের পাঁচলাইশ ওয়ার্ড ও হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা। এটি নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানার আওতাধীন। নগরের অনন্যা আবাসিক হয়ে কুয়াইশ সড়কের শেষ প্রান্তে এটি। সড়কের এক পাশে নাহার গার্ডেন রেস্তোরাঁ। অপর পাশে কিছু দূরে চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতাল।
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের ভাষ্য, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন আনিস ও মাসুদ। নাহার গার্ডেন রেস্তোরাঁ এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দুর্বৃত্তরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ দুজনকে উদ্ধার করেন। আনিস ঘটনাস্থলে ও মাসুদকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বায়েজীদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনজয় কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

