Tuesday, March 27, 2018

দু’বছরে পদ্মার গর্ভে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি: পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি by মো. তারেক রহমান

চাঁপাই নবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গায় পদ্মার ভাঙনে হুমকির মুখে তিনটি বিজিবি ক্যাম্পসহ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় গত ২ বছেরও সম্ভব হয়নি ডিপিপি প্রণয়নের কাজ। শুষ্ক মৌসুমেও ভাঙন অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের ঘরবাড়ি। দীর্ঘ দু’বছরে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসহযোগিতাকেই দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। পদ্মার ভাঙনে বিলীনের প্রতীক্ষায় বিজিবির চরবাগডাঙ্গা বিওপি। ছয় মাস আগেও চরবাগডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্প থেকে পদ্মা নদীর দূরত্ব ছিল ৮০০ গজ দূরে। ভাঙন অব্যহত থাকায় বর্তমানে নদীর অবস্থান এসে ঠেকেছে মাত্র ২৫০ গজে। ইতোমধ্যে নদীতে তলিয়ে গেছে ৩টি আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার। ডিপিপি থেকে একনেক সভা তারপর বাজেটে অর্থ প্রাপ্তির প্রতীক্ষা। স্থানীয়দের অভিযোগ জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রাক্ষুসে পদ্মা গিলে খাবে চরবাগডাঙ্গা। শুধু তাই নয় হুমকির মুখে পড়বে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি ইউনিয়নসহ চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলা শহর। এছাড়া ভাঙনের ফলে স্থলসীমা ভেঙে বাড়বে জলসীমা, ফলে ভূখণ্ড হারাবে বাংলাদেশ।
চাঁপাই নবাবগঞ্জস্থ ৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আবুল এহসান জানান, গত এক বছর ধরে এখানে যেভাবে ভাঙন চলমান রয়েছে তাতে আমাদের চরবাগডাঙ্গা বিওপিটি অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত বড় ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সামনের বর্ষা মৌসুমে এটি তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি আমরা আমাদের সদর দপ্তরকে অবগত করেছি। এবং জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিজিবি সদর দপ্তর ২০১৭ সালের ১২ই মে মহাপরিচালক পাউবোর কাছে পত্র প্রেরণ করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের পার্শ্ববর্তী কাইড়াপাড়া গত ৩ মাসের মধ্যে তলিয়ে গেছে নদীতে। বিজিবির চরবাগডাঙ্গা বিওপিটি থেকে মাত্র ২৫০ গজ দূর দিয়ে বইছে প্রমত্তা পদ্মা। বিওপির বিজিবি সদস্যরা জানান ইতোমধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার নদীগর্ভে নেমে গেছে। এসময় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা কাউয়ুম আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, ভাঙতে ভাঙতে নদী এখন ক্যাম্পের কাছে চলে এসেছে। তিন মাস আগেও এখানে আমাদের বাড়ি ছিল, এখন পদ্মা নদীর মাঝখানে। ওই যে চরটি দেখতে পাচ্ছেন সেখানেই আমাদের বাড়ি ছিল।
চাঁপাই নবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চরবাগডাঙ্গা বিওপির কাছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। উজানে ফারাক্কার প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানি না থাকায় বেশ কিছু চর জেগে উঠেছে। ফলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে চরবাগডাঙ্গার দিকে ধেয়ে আসছে। মূলত এই কারণে চরবাগডাঙ্গা এলাকায় শুষ্ক মৌসুমেও ব্যাপক ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
আলমগীর হোসেন নামে স্থানীয় অধিবাসী জানান, গত দু’বছরে প্রায় ছয়টি গ্রাম নদীতে তলিয়ে গেছে। এখন গোয়ালডুবি এলাকা থেকে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে পদ্মার ভাঙ্গন। ইতোমধ্যে কয়েকটি গ্রামের প্রায় সহস্রাধিক বাড়িঘর, বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও আম বাগান পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদী তীরবর্তী লোকজন আতঙ্কে তাদের বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। হুমকির মধ্যে আছে বিজিবির চরবাগডাঙ্গা বিওপি, ফরিদপুর বিওপি, বাখের আলী কোম্পানি ক্যাম্প, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ভূমি অফিস, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, দাখিল মাদরাসা ও স্থানীয় একাট হাট।
এ বিষয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ জানান, চরাঞ্চলের মানুষের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে দুঃখে আমাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এসব কাজ করতে কি পরিমাণ ঝামেলা আর হয়রানির শিকার হতে হয় তারা বিষয়টি জানেন না। সরাসরি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, পাউবোর কিছু অসহযোগিতাকারী কর্মকর্তা সরকারের তথা আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য যে কাজগুলো সহজেই করা সম্ভব সেগুলো না করে ইচ্ছাকৃতভাবে অসহযোগিতা করছে। তিনি আরো জানান, ইতোমধ্যে আমরা চরাঞ্চলে প্রায় ১৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছি। প্রায় আড়াই কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ বাকি রয়েছে। এই কাজটুকু না করলে পুরো কাজই ভেস্তে যাবে। চরবাগডাঙ্গা এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ না করা গেলে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলা শহরও হুমকির মধ্যে পড়বে বলে জানান তিনি। চাঁপাই নবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম গত ২ বছর থেকে নদী ভাঙনের কথা স্বীকার করে জানান, নদীর ২-১ মিটার মাটি বাকিটা বালি। ফলে বাতাসেই সেগুলো ঝরে পড়ে। সাইনবোর্ড বাজার থেকে ইন্দোবাংলা বর্ডার পর্যন্ত দুই দশমিক ছয় কিলোমিটার নদী প্রতিরক্ষার ডিপিপি তৈরি করেছি। দু-একদিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবো। বিগত দুই বছরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে সিস্টেমটাই এরকম। বছর খানেক থেকে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, কয়েকবার ডিপিপি তৈরি করে পাঠিয়েছি কিন্তু বারবার ফেতর আসায় আবারো নতুন করে ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে। ডিপিপি থেকে মন্ত্রণালয় তারপর একনেক সভায় যাবে। এরপর অর্থ বরাদ্দের বিষয় আছে। তাছাড়া সামনে বর্ষা মৌসুম সুতরাং কাজটি শুরু হতে সময় লাগবে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

ফ্ল্যাটমুখী ডেটিংয়ে আগ্রহ, হাসি-কান্না by শুভ্র দেব

হ্যালো ভাই, আসা যাবে। কবে আসবেন। কালকে সকালে। কোনো অসুবিধা হবে না তো। আরে না রে ভাই। ট্যাকেল দেয়ার জন্য মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করি। আর অ্যাপার্টমেন্ট বাসা। এখানে বেশি টাকা ভাড়া দিয়ে কাজ করি। গেস্ট হিসাবে আসবেন। কে কি বলবে। নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আমাদের। এভাবেই কথা হয় সুবিধাভোগী আর ফ্ল্যাট ডেটিংয়ের সার্ভিসম্যানের এক সদস্যের। দরকষাকষি করে একপর্যায়ে নিশ্চিত হয়ে যায় অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর ব্যবস্থা। হালে পাল্টেছে ডেটিংয়ের ধরন। এক সময় পার্কে জমতো ডেটিং। বাদাম, বুট, ঝাল মুড়ি খেয়েই সময় পার করত প্রেমিক জুটি। ইদানীং অনেক প্রেমিক জুটির ফ্ল্যাটমুখী ডেটিংয়ে আগ্রহ বেড়েছে। বিনোদন স্পট বা ডেটিং স্পটগুলোতে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে। নিরাপত্তাকর্মীদের হয়রানি ও লোকলজ্জা থেকে আড়াল থাকতে এমনটাই করছে বলে জানিয়েছে অনেক প্রেমিক জুটি। তবে সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেছেন অন্যকথা, সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে ইন্টারনেটের ভয়াবহতা ও মাদকের ভয়াল ছোবলেই তরুণ-তরুণীরা বেছে নিয়েছে এমন পথ।
রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী অনুফা ও রিয়াদ (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম বছর থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। দু’জনই অভিজাত ঘরের সন্তান। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘুরে বেড়াতেন পার্কে, রিসোর্টে ও রেস্তরাঁয়। তাদের বন্ধুরাও অনেকেই বান্ধবীর সঙ্গে আড্ডা দিত। তাদেরই এক বন্ধু তার বান্ধবীকে নিয়ে প্রায়ই উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে আসা যাওয়া করত। কাটাতো বেশ অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। সে তার অন্য বন্ধুদের খুব মজা করে এসব কথা শেয়ার করতো। তাই রিয়াদেরও ইচ্ছে হয় অনুফাকে নিয়ে ফ্ল্যাট ডেটিংয়ের। বন্ধুর সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে রিয়াদ তখন অনুফাকে রাজি করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। অনেকটা জোর করেই তাকে রাজি করায় রিয়াদ। বন্ধুর সেই চেনা ফ্ল্যাটে একদিন হয়ে যায় রিয়াদ আর অনুফার ডেটিং। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই যাওয়া হয় তাদের। শুধু অনুফা, রিয়াদ আর তার বান্ধবী নয় ফ্ল্যাটমুখী ডেটিংয়ে ঝুঁকছে আরো অনেকেই। আর এই প্রেমিক জুটিদের অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে অনেকেই কামাচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর অনেক এলাকাতেই এখন ফ্ল্যাটকেন্দ্রিক ডেটিং হয়। ঘণ্টা অথবা দিন চুক্তিতে এসব ফ্ল্যাটের কক্ষ ভাড়া পাওয়া যায়। রাজধানীর শাহজাহানপুর, বাসাবো, মালিবাগ, বনশ্রী, রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা, শেওড়া, কাজিপাড়া, সেগুনবাগিচা, পান্থপথ, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, রাজাবাজার, তেজকুনিপাড়া, মগবাজার, কালশি, গুলশান-বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে এ ধরনের ডেটিং। বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন এলাকার এসব ফ্ল্যাটে একজন নিয়ন্ত্রণকারী থাকেন। তার আবার শহরের বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা নেটওয়ার্ক থাকে। বিভিন্ন মার্কেট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তারা একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে মোবাইল নম্বর প্রচার করে। উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের একটি ভাড়া ফ্ল্যাটের প্রচারণা ও গেস্ট সংগ্রহের কাজ করে মামুন হোসাইন। মামুন বলে, আমরা মূলত দুই ধরনের ব্যবসা করে থাকি। প্রথমত, যারা বান্ধবী নিয়ে ডেটিং করার স্থান খোঁজে পায় না তাদেরকে আমরা টাকার বিনিময়ে সার্ভিস দিয়ে থাকি। এর বাইরে আমাদের কাছে কিছু নারী আছে। কেউ চাইলে সে ব্যবস্থাও আমরা করে দিই। মামুন বলেন, শুধু ফ্ল্যাট ডেটিং করতে হলে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। পুরো দিন থাকলে ২ হাজার আর ঘণ্টা হিসাবে থাকলে ৫০০ টাকা করে লাগে। নিয়মিত যারা আসে তাদের বেলায় কিছুটা ছাড় দেয়া হয়।
ফ্ল্যাটমুখী ডেটিংয়ের খারাপ প্রভাবও কম নয়। বিশেষ করে তরুণীদের ঝুঁকি বেশি। কারণ, অনেক সময় প্রেমিকের কথা রাখার জন্য ফ্ল্যাট ডেটিংয়ে রাজি হয় অনেক তরুণী। তার শেষটা অনেক সময় সুখকর হয় না। প্রেমিকের প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক তরুণী সর্বস্ব খোয়াচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। বড় ভাইয়ের বন্ধুর সঙ্গে প্রেমে মজেছিলেন শান্তনা (ছদ্মনাম) নামের এক শিক্ষার্থী। বেশ ভালোই কেটেছিল কয়েক বছর। কিন্তু হঠাৎ করেই তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। এই চার বছরে দু’জন আলাদা থাকলেও পরিচিত অনেক ফ্ল্যাটে গিয়ে অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছেন একাধিকবার। শান্তনার পরিবার থেকে বিয়ের কথা উঠলে সে চাপ দিতে থাকে সোহানকে। কিন্তু সোহান বিষয়টি আমলে না নিয়ে শান্তনার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। একসময় শান্তনার সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। উপায়ান্তর না পেয়ে শান্তনা তার পরিবারকে জানায়। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে সোহানের সঙ্গে আলোচনা করলে সে শান্তনাকে বিয়ে করতে অপারগতা দেখায়।

আমাকে গ্রেপ্তার কারা করিয়েছিল জানি, ওই হিসাব পরে নেবো -প্রধানমন্ত্রী

এক এগারোর সরকারের সময় গ্রেপ্তারের পেছনে কারা ছিল সেই তথ্য জানা গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তাদের বিষয়ে হিসাব পরে নেয়া হবে। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত সভায় তিনি স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের বিষয় উল্লেখ করে এক এগারোর সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা, স্বাধীনতার চেতনা নষ্ট করা আর ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছিলো বিএনপি। বাংলাদেশকে একটা সন্ত্রাসের দেশ হিসেবে পরিনত করেছিলো। ক্ষমতায় থেকে তখন অত্যাচার নির্যাতন করেছে বিএনপি সরকার। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর প্রথম গ্রেপ্তার করা হলো আমাকে। আমি তো তখন ক্ষমতায় ছিলাম না। কারা করিয়েছে সেটা আমরা অন্তত এখন জানি। ওই হিসাব পরে নেবো আমরা।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ভদ্রলোক, বিশ্বে অনেক নাম করেও তার মন ভরে নাই। একটি ক্ষুদ্র ব্যাংকের এমডি পদ ছাড়ার লোভ সামাল দিতে পারেনি। সেই এমডি পদের লোভে পড়ে পদ্মা সেতু বন্ধ করার জন্য আমেরিকায় লবিং করে। পরে সেতুর টাকা দেয়া ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বন্ধ করে দেয়। জাতির পিতা তো বলেছেন, কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা বাঙ্গালী আর আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। কাজেই আমি সেটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। দুর্নীতির অভিযোগ আনতে চেয়েছিলো। বহু চেষ্টা করেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে বিশেষ এজেন্সি হায়ার করে আমার বিরুদ্ধে, আমার বোনের বিরুদ্ধে, আমার ছেলে-মেয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি পায় কি না। পায়নি। আবার সেই এমডি সাহেবও আমেরিকাকে দিয়ে তদন্ত করিয়েছেন। না পেরে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকা বন্ধ করে আমাকে দোষারোপ করতে চেষ্টা করেছিলেন। চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম প্রমাণ করো। প্রমাণ করতে পারেনি। আমেরিকার ফেডারেল কোর্টে মামলা হয়েছিলো। তারা বলে দিয়েছিলো সমস্ত অভিযোগ ভূয়া। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, একটা জিনিস মনে রাখবেন,বিএনপি ক্ষমতায় এসে বাংলাদেমকে ৫বার দুর্ণীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে। আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে দেখিয়েছে আমরা যে দুর্নীতি করি নাই তা আজ শুধু মুখে বলার না, তা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আজ বাংলাদেশের মানুষের মুখ উজ্জল হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ উন্নত জীবন পাক সেটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। আমরা বলেছি, স্বাধনিতার সুফল আমরা বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেব।
তিনি বলেন, অর্থ-সম্পদ চিরদিন থাকে না। অর্থ-সম্পদ কেউ কখনও কবরে নিয়েও যেতে পারে না। সম্পদের জন্য মারামারি-কাটাকাটি করে। মরে গেলে সব রেখেই কবরে যেতে হয়। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া একজন রাজনীতিবিদের সেটাই কর্তব্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেটাই করে গেছেন। তার কণ্যা হিসেবে সেটাই আমার দায়িত্ব মনে করি। আমাদের লক্ষ্য তৃণমুল থেকে জনগণের উন্নয়ন করা। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়ন করলেও ষড়যন্ত্রের কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০১ সালে ষড়যন্ত্র হলো। ভোট বেশি পেয়েও ক্ষমতায় আসতে পারিনি। ওই সময় বিএনপি-জামায়ত জোট ক্ষমতায় এসে শুরু করলো জুলুম-অত্যাচার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো তারা গ্রামের পর গ্রাম নির্যাতন চালিয়েছে। মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, মানুষের চোখ তুলে নিয়েছে, হাত-পা ভেঙে দিয়েছে, ক্ষেতের ফসল নষ্ট করেছে, ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, পুকুর কেটে দিয়েছে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মেরেছে। ভোট দেয়ার অপরাধে এমন কোনও অত্যাচার নেই, তারা করেনি। ছয় বছরের শিশুকে পর্যন্ত ধর্ষণ করেছে। প্রতিহিংসার বশে তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসব করেছে। পাঁচ পাঁচটি বছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে বাংলাদেশকে। বিএনপি-জামায়াত জোটের সময়ের বিবরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা বাংলা ভাই সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের দেশে পরিণত করেছে। গ্রেনেড হামলা তো আছেই। এইভাবে অত্যাচার করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চেষ্টা করেছে তারা, ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও যেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসতে পারে, তার জন্যও ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। তিনি বলেন,আমরা সরকার গঠন করলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তুলব। যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করলেন, তারা ভিক্ষা করবে বা রিকশা চালাবে, এটা অপমানজনক। তাদের সন্তানেরা পড়ালেখার সুযোগ পাবে না, সেটা হতে পারে না। তাই আমরা ক্ষমতায় এসে তাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করলাম। আমরা চেষ্টা করছি, সবার মধ্যে ইতিহাসকে ছড়িয়ে দেয়ার। তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে উজ্জীবিত হচ্ছে, তারা সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। অথচ ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা জানে না, ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু গ্রামের মানুষদের পছন্দ করতেন। তাদের কথা বলতে গিয়েই তো তিনি জীবনটা পর্যন্ত দিয়ে গেছেন। প্রতি ঘরকে আমরা আলোকিত করবো। সেই লক্ষ্য নিয়ে দেশ পরিচালনা করছি বলে আজ দেশের উন্নতি হচ্ছে। নইলে ৭৫ এর পর যারা ক্ষমতায় ছিলো তারা তো নিজেদের খুব উচ্চ পর্যায়ের মনে করতো। কিন্তু দেশের মানুষ কি পেয়েছিলো? তাদের খাতা সবই শূণ্য। মুষ্টিমেয় লোক সম্পদশালি হয়েছে। সেই জিয়ার আমল থেকেই খেলাপি ঋণের কালচার। জিয়ার আমল থেকেই এই করাপশন। যার ধারাবাহিক ভাবে জিয়া, এরশাদ,খালেদা জিয়া যখনই যে ক্ষমতায় এসেছে,দুর্নীতি করেছে, সম্পদশালি হয়েছে। নিজেদের সাজুগুজু,নিজেদের ভোগবিলাস এই নিয়ে ব্যস্ত। দেশের মানুষ না খেয়ে থাকলে তাদের কি হলো? আমাদের চিন্তাটা সম্পুর্ন ভিন্ন। কারণ আমার বাবা শিক্ষা দিয়ে গেছেন। দামি শাড়ি,গহনা পরতে গেলে তিনি আমাদের বলতেন, মা কাকে দেখাবে। যে দেশের মানুষ একবেলা খাবার পায় না। এটাই আমাদের শিক্ষা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০০৮ সালে সরকার গঠন করেছি। এরপর ২০১৩ সালে তারা এক দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করে। সেই অবস্থা আমরা সামাল দিয়েছি। ২০১৪ সালে আবার নির্বাচন হয়, মানুষের ভোটে ক্ষমতায় আসি। কিন্তু তারা ২০১৫ সালে অগ্নিসন্ত্রাস করে। সাড়ে ৩ হাজার মানুষ পুড়িয়েছে। হাজার হাজার গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। সরকারি অফিসে আগুন দিয়েছে। কেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো এটাই তাদের অন্তর্জ্বালা। তারা তো ক্ষমতায় থেকে ভোগ-বিলাস করেছে, মানি লন্ডারিং করে ধরা পড়েছে। এতিম খানার টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করেছে। সবকিছু ধরা পড়েছে। এতে আমাদের কোনও হাত নেই। কিন্তু আদালত তাদের সাজা দিলে তারা মানে না। তারা কিছুই মানে না। তারা ক্ষমতায় থেকে মানুষকে হত্যা করেছে, এখনও তাই করতে চায়। দেশের কোনও উন্নয়ন তারা চোক্ষেই দেখে না।
আলোচনা সভায় দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাংগনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর হারুন উর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদেকা হালিম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

যেভাবে ডায়রিয়াকে পরাভূত করেছে বাংলাদেশ by মাহমুদ ফেরদৌস

ত্রিশালের একটি বিদ্যালয়ে ২৭ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ ইকবাল বাহার। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় নিজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন তিনি। ক্ষেত-খামারে পিতামাতাকে সাহায্য করতে গিয়ে ছেলে-মেয়ে উভয়েই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু আগের চেয়ে অসুস্থতাজনিত কারণে অনুপস্থিতর হার এখন অনেক কম। গত ১০ বছরে কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়েছে বলে মনে করতে পারেন না তিনি। আরেকটি পরিবর্তনের ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন, তবে তার ধারণা এখনকার শিক্ষার্থীরা আগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় লম্বা।
ইকবাল বাহারের পর্যবেক্ষণ সত্য হয়ে থাকলে, তা হয়তো হয়েছে কারণ আগের চেয়ে এখন শিশুরা স্বাস্থ্যবান হয় বেশি। ১৯৯৩-৯৪ সালে, বাংলাদেশের ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী ১৪ শতাংশ শিশুই দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর একবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতো। ওই বয়স একটি শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাকস্থলির জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তখন থাকে বেশি। ২০০৪ সালের দিকে আক্রান্ত শিশুর পরিমাণ কমে ১২ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৪ সালে তা নেমে আসে ৭ শতাংশে। বয়সের তুলনায় শরীরের আকার কম হওয়ার হারও কমেছে আনুপাতিক হারে। টাইফয়েড হ্রাস পাওয়া ও স্যালাইন ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে বেঁচেছে অনেক প্রাণ।
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি নিয়ে লন্ডনের ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের ২২শে মার্চ ইস্যুতে দুইটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। ‘হাউ বাংলাদেশ ভ্যাংকুইশড ডায়রিয়া’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে এসব বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের মতলব উপজেলার বাসিন্দাদের নিয়ে ভালো স্বাস্থ্য উপাত্ত রয়েছে। সেখানে ডায়রিয়া ও আমাশয় থেকে মৃত্যুর হার নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে। এখান থেকেই বোঝা সম্ভব কীভাবে বাংলাদেশ এই বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এখনও এশিয়ার দরিদ্র্যতম দেশগুলোর একটি। ভারতের চেয়ে এখানে মাথাপিছু আয় অর্ধেক। তবুও বাংলাদেশের শিশুমৃত্যুর হার ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে কম। আর বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে কম তো বটেই।
বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা হলো ত্রিশালের মতো গ্রামে গ্রামে পাকা পায়খানার বিস্তার। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে, ব্র্যাকের পরিচালিত স্যানিটেশন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৫০ লাখেরও বেশি ঘরে টয়লেট স্থাপিত হয়েছে। প্রথমে ব্র্যাকের মতো দাতব্য সংস্থা চালু করলেও, স্থানীয়রা তার বিস্তার ঘটিয়েছেন। ত্রিশালের একদল নারী ব্যাখ্যা করেছেন যে, ঘরে টয়লেট থাকা এখন মান-সম্মানের বিষয়। টয়লেট না থাকা নিয়ে বিয়ের কথা পাকা থাকলেও তা ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ব্র্যাকের কর্মকান্ড আছে এমন জেলাতেও ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালে যত পায়খানা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই বানিয়েছেন জনসাধারণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মানুষজন টয়লেট বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, ঠিকঠাক তা ব্যবহারও করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে এমন পরিবারের সংখ্যা বাংলাদেশে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এটা হয়তো বাড়িয়ে বলা কোনো তথ্য। অন্যান্য গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে, ৫ শতাংশ পরিবার এখনও খোলা জায়গায় অথবা খাল বা নদীর ওপর নির্মিত ভাসমান টয়লেটে মলত্যাগ করে। কিন্তু বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই অন্যান্য দরিদ্র্য দেশের চেয়ে এই ক্ষেত্রে ভালো করেছে। যেমন, ডব্লিউএইচও’র মতে, ৪০ শতাংশ ভারতীয়ই খোলা স্থানে মলত্যাগ করে। ভারতের সরকার অবশ্য এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে। বর্তমানে প্রকাশ্যে মলত্যাগের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাচ্ছে সরকার। তাদের দাবি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে খোলা স্থানে মলত্যাগকারীদের সংখ্যা ২০১৪ সালে ৫৫ কোটি ছিল। এখন তা ২৫ কোটি। যে-ই দাবিই সত্য ধরা হোক, তা বাংলাদেশের চেয়ে বহু পিছিয়ে।
ব্র্যাকের স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ জনির আহমেদ বলেন, গ্রামবাসীরা প্রথম প্রথম পাকা পায়খানা ব্যবহারে অনিচ্ছুক ছিল। তারা গন্ধ ও বদ্ধ পরিবেশ নিয়ে অনুযোগ করতো। কিন্তু ব্র্যাক বুঝতে পারে যে, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র্যতম জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি বিশেষজ্ঞদের কথা শোনেন। ব্র্যাক প্রথমে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য ল্যাট্রিন নির্মান করে। এরপর একটু বিত্তশালী বাসিন্দারা লজ্জায় পড়ে নিজেরাই টয়লেট নির্মান করতে শুরু করেন।
আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মুশফিক মোবারক স্যানিটেশন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, সচ্ছল লোকজনই দরিদ্র্যদের অনুকরণ করেন। উল্টোটা ঘটে কম। কোনো ধনী ব্যক্তির যদি কিছু থেকে থাকে, নিজের কাছে তা না থাকায় আপনি লজ্জা বোধ করবেন না। কিন্তু দরিদ্র্যদের কাছে আছে, এমন কিছু যদি বিত্তশালীর কাছে না থাকে, তাহলে তারা লজ্জাবোধ করবেন।
ত্রিশাল গ্রামের আরেকটি দারুণ বিষয় হলো এখানে খাবার পানির কোনো স্বল্পতা নেই। ২৭০ পরিবারের এই গ্রামে ৩৩টি পানির পাম্প আছে। পাকা পায়খানার মতো, এই পানির পাম্পও বেশিরভাগ পরিবারই বসিয়েছে নিজ খরচায়। তবে বেশিরভাগ ওয়াটার পাম্পই বসানো হয়েছে পাকা পায়খানার নিকটে। তবে এতে কোনো সমস্যা নেই বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশের ইন্টারনেশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিসিজ রিসার্চের (আইসিডিডিআর) গবেষক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। ল্যাট্রিনের চারপাশের ভূগর্ভস্থ পানি পরীক্ষা করে তিনি দেখেছেন যে, মাটির নিচে জীবানু ২ মিটারের বেশি দূরে যেতে পারে না।
সিরাজুল ইসলাম আরেক জিনিসও আবিষ্কার করেছেন। তিনি দেখেছেন যে, ভূগর্ভস্থ পানি বেশ পরিষ্কার হলেও, পাম্পের মাধ্যমে যেই পানি উঠে আসে, তা পরিষ্কার নয়। এছাড়া ঘরে সংরক্ষিত পানিও প্রায়ই নোংরা থাকে। যেমনটা থাকে বাচ্চাদেরকে খাওয়ানোর জন্য মায়ের আলাদা করে রাখা খাবার। বাংলাদেশীদেরকে যদি পানির পাম্প, থালা-বাসন ও হাত পরিষ্কার রাখা ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার গরম করে খাওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা যায়, অন্ত্র-সংক্রান্ত রোগের হার আরও কমবে। যেই ডায়রিয়া রোগে আগে গণহারে মানুষ মারা যেত, সেই রোগ এখন মাঝারি মানের ঝুঁকি। সেখান থেকে এই রোগকে স্রেফ অনিয়মিত উৎপাতের মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

যেভাবে ইয়াবা নেশায় বুঁদ শিক্ষার্থীরা by সুদীপ অধিকারী

ইয়াবার থাবা কোথায় পড়েনি? কারখানা থেকে গোডাউন। এরপর আস্তানা। থেমে নেই সেখানেও। পাড়া, মহল্লা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি রাজপথেও প্রকাশ্যে বিচরণ ইয়াবা ‘বাবা’র। বাজারের পণ্যের মতো চলছে বিক্রি। ভয়াবহ তথ্য হলো- ইয়াবা এখন তৈরি হচ্ছে রাজধানী ঢাকার আশপাশে। সূত্রমতে, পুরান ঢাকার লালবাগ, উত্তরা, শ্যামপুর, সূত্রাপুর এলাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে, সোয়ারীঘাট, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও ফতুল্লায় রয়েছে কমপক্ষে ২০টি কারখানা। আর এসব কারখানার তৈরি ইয়াবা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর অলি-গলিতে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ক’দিন আগে নারায়ণগঞ্জের হরিপুরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে আবিষ্কার করে একটি ইয়াবা কারখানার। যেখান থেকে উদ্ধার করে ইয়াবা তৈরির সরঞ্জাম। আটক করা হয় লাকী আক্তার নামে এক ইয়াবা কারবারীকে। সে সময় মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, অ্যামফিটাসিনযুক্ত গোলাপী পাউডারের সঙ্গে জন্ম নিরোধক ও ব্যথানাশক ট্যাবলেট গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় ইয়াবা। মেশানো হয় এক ধরনের ফ্লেবারযুক্ত মেডিসিনও। যৌন উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য আরও মেশানো হয় ভায়াগ্রা জাতীয় ওষুধ। প্রচলিত আছে ইয়াবা খেলে শরীরে শক্তি বাড়ে। যৌন উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়। এই প্রচারণা থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকছে ইয়াবা নেশায়। কখনো বন্ধুর পাল্লায় পড়ে, কখনো সহপাঠীর পাল্লায় পড়ে ইয়াবা ধরলেও আস্তে আস্তে আসক্ত হয়ে পড়ে। এক সময় সেখান থেকে আর ফিরে আসতে পারে না। এমনই একজন সাব্বীর আহমেদ মিলন। ছোট থেকে তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ার। লেখা-পড়ায় ভাল হওয়ায় উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরিয়েই দেশের নামকরা মেডিকল কলেজে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর সারাদিন ক্লাস, ল্যাবসহ নানা কারণে ঠিকমতো পড়ার টেবিলে মন বসাতে পারতো না মিলন। নতুন বন্ধু আশিকের কাছে সমস্যার কথা খুলে বলে। চটজলদি সমাধানও পেয়ে যায়। আশিক বলেন, রাতের বেলাটাই হচ্ছে বই পড়ার উপযুক্ত সময়। এজন্যে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হলে রাত জেগে পড়তে হবে। কিন্তু চা-কফিতে রাতের ঘুম যাবে না। এই ঘুম শুধু মাত্র ‘ইয়াবা’ই তাড়াতে পারবে। কিন্তু এটাতো নেশার ওষুধ? মিলনের এমন প্রশ্নে আশিক বলেন, চম্পা (ছোট ইয়াবা) খেলে মানুষের ক্ষতি হয়, সেভেন (বড় ইয়াবা) খেলে ক্ষতি হয় না কারোর। শুধু রাতের ঘুমটা নিজের কন্ট্রোলে থাকে। এমনই প্রলোভনে পা দিয়ে প্রথমে বন্ধুর সাথে, পরে নিজেই টাকা খরচ করে গোপনে ইয়াবা সেবন শুরু করেন মিলন। পড়া-লেখার চাপ থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে এখন সে নিয়মিত একজন ইয়াবা সেবনকারী হয়ে ওঠেছেন। মিলনের মতো আশিকেরও ইয়াবা সেবনের সূচনা হয় পরিচিত এক বড় ভাইয়ের হাত ধরে। পুরাতন এক মেছ বাসায় থাকাকালীন শুরু হয় তার এই মাদক গ্রহণ। অন্যদিকে এক বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্র জহিরুল হক মিল্লাদ বলেন, গ্রামে থাকাকালে ইয়াবা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিন্তু ঢাকা আসার পর ধীরে ধীরে এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। এখন বুঝেও কিছু করতে পারছি না। তিনি বলেন, এটা না খেলে এখন পড়া-লেখা মনই বসাতে পারি না। আর পরীক্ষা আসলে তার ইয়াবা সেবনের মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তার মতো অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থীই প্রতিনিয়ত ইয়াবা সেবন করে। কোথা থেকে ইয়াবা কিনে আনে। মিল্লাদ বলেন, ইয়াবা কিনতে কোথাও যাওয়া লাগে না। ফোন করলেই কলেজ ক্যাম্পাস, বাসা, হেস্টেল যেখানে খুশি সেখানেই পৌঁছে দিয়ে যায়। এজন্যে বেশি টাকাও দেয়া লাগে না। দেখা হয় মিল্লাদের ভ্রাম্যমাণ ইয়াবা বিক্রেতা শামীমের সঙ্গে। খালি চোখে দেখলে পেশায় একজন রিকশাচালক। কিন্তু রিকশার আড়ালে চলে তার ভ্রাম্যমাণ ইয়াবা ব্যবসা। শামীমের মোবাইল নম্বরে কল ঢোকা মানেই তার ইয়াবার দোকান খোলা। ফোন পেলেই সে কিছু সময়ের মধ্যে হাজির হয়ে যায় স্পটে। সাংকেতিক কথোপকথনের মাধ্যমেই চিনে নেয় একে-অপরকে। তারপর খালি রিকশায় যাত্রী সেজে উঠে পড়ে ক্রেতা। চলন্ত রিকশা কিছুদূর যেতেই লেন-দেন সেরে আবার নেমে যান যাত্রীরূপী ক্রেতা। ইয়াবায় বেশি লাভ হওয়াই নিম্নবিত্ত মানুষের পাশাপাশি এ ব্যবসায় এখন ঝুঁকছেন অনেক উচ্চবিত্তও। এমনকি বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আড়ালেও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা। কিছুদিন আগেই ধানমন্ডির মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদক উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খ্যাত ধানমন্ডি এলাকাতে রয়েছে প্রচুর শিক্ষার্থীর বাস। আর এই উচ্চ-মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছে বিশাল ইয়াবা চক্র। সূত্রমতে, লাখ লাখ টাকার ইয়াবা লেন-দেনের এই চক্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন পশ্চিম ধানমন্ডির ইমন, রিপন, মিজান, মোহাম্মদপুর ক্যাম্পের বাজারের শরীফ, জাহিদসহ বেশ ক’জন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা জানায়, নির্বিঘ্ন্নে তাদের এই ব্যবসা পরিচালনার জন্য উপার্জনের একটা বড় অংশ তুলে দিতে হয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এর সত্যতা মেলে জেনেভা ক্যাম্প বাজারের দুই পাশের প্রবেশ দ্বারেই রয়েছে পোশাকি পুলিশের অবস্থান। আর সেই পুলিশি প্রহরার অদূরে বাজারে পণ্যের মতো চলছে ইয়াবার দর কষাকষি। মাঝে-মধ্যে বাজারের আশপাশের রাস্তায় তল্লাশি চালিয়ে কিছু ক্রেতা বা সেবনকারীকে লোক দেখানো আটক কিংবা জরিমানা করা হয়। বিক্রেতারা জানান, ইয়াবা এখন আর মিয়ানমার বা চট্টগ্রাম থেকে আসে না। এখন খোদ ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাতেও তৈরি হচ্ছে। দেশের বাইরে থেকে আসা ইয়াবার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে তৈরিকৃত প্রয়োজনাধিক ইয়াবার কারণেই এই নেশা অল্প সময়ের মধ্যেই সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, ডিএমপি’র বিভাগ অনুযায়ী রমনায় ৫৩টি, লালবাগে ৫৭টি, ওয়ারীতে ৭৭টি, মিরপুরে ৫৬টি, গুলশানে ২৫টি, উত্তরায় ৪০টি, মতিঝিলে ২২টি, তেজগাঁওয়ে ২৫টি চিহ্নিত মাদক স্পট রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্পটগুলো হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর, টিএসসি, ঢাকা মেডিকেল কলেজের আশপাশ, বুয়েট স্টাফ কোয়ার্টারের পেছনে, তিন নেতার মাজার, সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান, কাঁটাবন এলাকা, ফুলবাড়ীয়া, আজিমপুর কবরস্থানের আশপাশ, আজিমপুর মেটার্নিটি হাসপাতাল-সংলগ্ন এলাকা, ঢাকেশ্বরী মন্দির-সংলগ্ন পিয়ারী বেগমের বাড়ি, দিলু রোডের পশ্চিম মাথা, মগবাজার রেলক্রসিং-সংলগ্ন কাঁচাবাজার, আমবাগানের চল্লিশঘর বস্তি, পেয়ারাবাগ বস্তি, মধুবাগ ঝিলপাড়, মালিবাগ রেলক্রসিং থেকে মগবাজার রেলক্রসিং পর্যন্ত এলাকা, সেক্রেটারিয়েট রোডের আনন্দবাজার বস্তি, ওসমানী উদ্যান, লালবাগের শহীদনগর ১ থেকে ৬ নং গলি, বালুরঘাট বেড়িবাঁধ, শহীদনগর পাইপ কারখানা, নবাবগঞ্জ পার্ক, রসূলবাগ পার্ক, কোতোয়ালি থানা এলাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে এবং কর্মচারীদের স্টাফ কোয়ার্টারের আশপাশের এলাকা, সামসাবাদ এলাকার জুম্মন কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশ, কসাইটুলী কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশ, বাবুবাজার ব্রিজের ঢালে, বুড়ির বাগান, স্টার সিনেমা হলের সামনে, নয়াবাজার ব্রিজের ঢালে, নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেট, চানখাঁরপুল ট্রাকস্ট্যান্ড, নিমতলী মোড়, কামরাঙ্গীরচর থানা এলাকার ট্যানারি পুকুরপাড়, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগার অফিসের পশ্চিম পাশে, কাপ্তানবাজার মুরগিপট্টি, ধূপখোলা মাঠ, মুন্সীরটেক কবরস্থান, যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার ধলপুর সিটি পল্লী, আইডিয়াল স্কুল গলিসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বেচা-কেনা হয় ইয়াবা। সরজমিন জানা যায়, প্রতিটি এলাকাতেই রয়েছে নির্দিষ্ট মাদক বিক্রেতা। তারাই ইয়াবা নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাদের এই ভ্রাম্যমাণ মাদক ব্যবসায় মোবাইল ফোনের পাশাপাশি ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তাই সাধারণ মানুষের ধারণা, শিক্ষাকেন্দ্রের আশপাশসহ হাতের নাগালে এমন ইয়াবা পেয়ে খুব সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ছে কোমলমতি কিশোর-তরুণী শিক্ষর্থীরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. মোস্তফা রাসেল বলেন, ইয়াবা সেবন করলে অন্যান্য নেশার মতো চোখ লাল বা শরীরে মাতাল মাতাল ভাব হয় না। এজন্যে প্রথম প্রথম ইয়াবা সেবনকারীদের চলাফেরা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে, তারা কোনো নেশায় আসক্ত। এরই সুযোগ নিয়ে লেখা-পড়াসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে নেয়া টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের বেশির ভাগ সময়ই বুঁদ হয়ে থাকছেন ইয়াবা সেবনে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া প্রেমের সম্পর্কের উত্থান-পতনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী বেছে নিয়েছেন ইয়াবাকে। মনের সাময়িক দুঃখ ভুলে থাকতে গিয়ে তারা ডুবে যাচ্ছেন ইয়াবার নেশায়। রাজধানীতে পড়তে এসে তৈরি হওয়া নতুন বন্ধু-বান্ধবীর সামনে মডার্ন হতে গিয়েও অনেকে আসক্ত হয়ে পড়ছেন এই নেশায়। ক্ষমতা পিপাসু ছাত্ররা রাজনীতিতে পা দিয়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়েও করছেন ইয়াবা সেবন। ইয়াবা সেবনকারীদের এই তালিকায় বর্তমানে পুরুষের পাশাপাশি রয়েছে নারীদের নামও। এইসব শিক্ষার্থীর ইয়াবা সেবনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর যে অর্থ ব্যয় করে তার থেকে বেশি টাকার ইয়াবা এদেশে বেচা-কেনা হয়। আর স্বার্থ লাভের জন্য এই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মূল টার্গেট থাকে আবেগে ভরা তরুণ শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, মূলত আগের তুলনায় আমাদের বর্তমান তরুণ সমাজ তাদের বেশির ভাগ সময়ই পার করেন ফোন বা কম্পিউটারে মুখ গুঁজে। অভিবাবকেরাও তেমন একটা খেয়াল রাখেন না তাদের সন্তানের দিকে। আর এ থেকেই এই শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সৃষ্টি হয় একাকিত্বতা ও হীনম্মন্যতা। এ থেকেই তারা ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছেন মরণ নেশা ইয়াবার প্রতি। যদি ইয়াবা ব্যবসার গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় এবং সামাজিক সকল স্তর থেকে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, তাহলেই ইয়াবার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে জানান এই অপরাধ বিজ্ঞানী।

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বিরাট চ্যালেঞ্জ by কাজল ঘোষ

আমাদের রাজনীতির মূল সমস্যা ‘Winner takes all’। এখানে নির্বাচনে যে দল হারছে তারা প্রায় সর্বহারা হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিযোগিতা প্রচণ্ড সংঘাতের রাজনীতি সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে আমাদের নির্বাচিত রাজনৈতিক শাসকগণ সামরিক শাসকদের অনেকে অগণতান্ত্রিক চর্চা পরিত্যাগ তো করেইনি বরং এগুলোকে তারা লালন করে নিয়মে পরিণত করেছেন। সংসদে একটি কার্যকর বিরোধী পক্ষের অভাবে আমরা সরকার প্রক্রিয়ার ভেতর কোনোরকম ‘ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ’ (Check and balance) পদ্ধতির প্রচলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছি। যা গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি টিকিয়ে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আগামীর বাংলাদেশ আর আমাদের চলমান সংকটের নেপথ্যে কি? এমন নানা প্রশ্নে খোলামেলা কথা বলেছেন অধ্যাপক রওনক জাহান। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিডিপি)-এর সম্মানীয় ফেলো রওনক জাহান ১৯৭০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে অতিথি অধ্যাপক ছিলেন। বাংলাদেশের উইমেন ফর উইমেন-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এশিয়া, নিউ ইয়র্ক এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া প্রোগ্রামের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য রওনক জাহান আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বেশকিছু গ্রন্থ ও প্রবন্ধের লেখকও।
অধ্যাপক রওনক জাহান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও রাজনীতিকে দেখেছেন খুব কাছে থেকে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সংকট ও এর সমাধান নিয়ে খোলামেলা সাক্ষাৎকার পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো-
আমাদের রাজনীতির মূল সমস্যা কোথায়?
১৯৯১ এর পর থেকে আমরা নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার চেষ্টা করছি। নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তর। নির্বাচনে এক দল হারবে, এক দল জিতবে। যারা একবার হারল তারা এর পরের বার আবার জিততেও পারে। নির্বাচনী গণতন্ত্রে বিভিন্ন দলের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হতে পারে, তবে সেই প্রতিযোগিতা কখনো সংঘাতে পরিণত হওয়া উচিত নয়। আমাদের রাজনীতির মূল সমস্যা হলো আমাদের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা একটা প্রচণ্ড সংঘাতের রাজনীতি সৃষ্টি করেছে। যারা নির্বাচনে জিতছেন তারা যারা হারছেন তাদের প্রতি অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক আচরণ করছেন। বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মী জেলে যাচ্ছেন, কিংবা মামলায় পড়ছেন। আমাদের এই Winner takes all রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে দল হারছে তারা প্রায় সর্বহারা হয়ে যাচ্ছে। সংঘাতের রাজনীতির ফলে দুই প্রধান দলের মধ্যে বাদানুবাদ কখনই রাজনৈতিক সংলাপের মধ্যে দিয়ে সমাধান করা যাচ্ছে না। রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু একটা ব্যবস্থা সকল দলকেই মানতে হবে যার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এই সব মতভেদ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে এবং সমাধানের বিভিন্ন পথ খুঁজে বের করা যায়। আমাদের দেশের রাজনীতির মূল সমস্যা হলো সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি যার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক বিভেদগুলোর সমাধান করতে পারা যায় এবং শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায়।
আমাদের এখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী না হওয়ার পেছনে প্রতিবন্ধকতাগুলো কোথায়?
গত ৪৭ বছর ধরে আমরা রাজনীতি চর্চা এবং শাসনপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এমন কিছু রীতিকে নিয়মে পরিণত করেছি যেগুলো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধক। এর মধ্যে কিছু রীতি সামরিক শাসন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি; দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের নির্বাচিত রাজনৈতিক শাসকগণ সামরিক শাসকদের অনেক অগণতান্ত্রিক চর্চা পরিত্যাগ তো করেইনি, বরং এগুলোকে তারা লালন করে নিয়মে পরিণত করেছেন।
রাষ্ট্রপুষ্ট দল গঠন করা সামরিক শাসনের একটি বৈশিষ্ট্য। যখন কোনো সামরিক শাসক নিজেদেরকে বেসামরিক করে তোলার চিন্তা করে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করে। জিয়াউর রহমান গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আর এরশাদ গঠন করেছিলেন জাতীয় পার্টি। দুঃখের বিষয় সামরিক শাসনের অধীনে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবহার করে জনসমর্থন ধরে রাখার সংস্কৃতিটি সামরিক শাসন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে ক্রমশ দলীয়করণ করার মাধ্যমে এবং বিজয়ী রাজনৈতিক দল বা জোট সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ফলে ১৯৯১ এর পর থেকে নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রে এই চর্চা আরো শোচনীয় অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারগুলো জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং নিম্ন আদালতসমূহকে রাজনীতিকরণের প্রয়াস চালিয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দল বা দলগুলোর সমর্থকদের পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং যাদেরকে বিদায়ী সরকারের অনুগত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে বা বর্তমান সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করছে বলে মনে করা হয়েছে তাদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে। আইন প্রয়োগ ব্যবস্থাকেও দলীয় করার চেষ্টা হয়েছে।
বর্তমান সংসদের আগ পর্যন্ত সংসদীয় বিরোধীপক্ষ সবসময় দাবি করে এসেছে যে, সংসদে তাদের কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয় না, ফলে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সংসদ অধিবেশন বর্জন করেছে এবং এর পরিবর্তে রাজপথে নির্বাচিত সরকারের পদত্যাগ বা নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিয়েছে। সংসদে একটি কার্যকরী বিরোধীপক্ষের অভাবে আমরা সরকার প্রক্রিয়ার ভেতরে কোনো রকম ‘ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ’ (পযবপশ ধহফ নধষধহপব) পদ্ধতির প্রচলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছি, যা গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি টিকিয়ে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম খুঁটিয়ে দেখা এবং এটিকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠান হলো জাতীয় সংসদ। সংসদীয় তদারকির অভাবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাহী বিভাগ উত্তরোত্তর ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। প্রশাসন, পুলিশ ও নিম্ন আদালতসমূহ প্রতিনিয়ত দলীয় রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়, ফলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রাজনীতি আবারো সংকটে- বারবার দেশ একইরকম পরিস্থিতির দিকে কেন ফিরছে?
আমি আগেই বলেছি যতদিন পর্যন্ত না সব রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের মধ্যে মতভেদ এবং শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে একটি ব্যবস্থা সম্পর্কে ঐকমত্যে না পৌঁছাতে পারবে ততদিন পর্যন্ত আমরা বারে বারে এই সংকটে পড়বো।
অনেকেই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের কথা বলে থাকেন- আপনি কি এতে কোনো সমাধান দেখেন?
না আমি এতে কোনো সমাধান দেখি না। আমাদের বিরোধী দলের সাংসদরা ১৯৯৪ সালের পর থেকে ২০১৪ প্রায় বিশ বছর, পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম- চার চারটি সংসদে ক্রমাগত একই ব্যবহার করেছেন। তারা নির্বাচিত হয়েও সংসদ বর্জন করেছেন এবং সংসদকে কার্যকর করার চেষ্টা করেননি। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে একপক্ষ বিশিষ্ট সংসদ কার্যকরী হতো। দ্বিকক্ষ হলেই যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। উপরন্তু আর একটি কক্ষের সাংসদরাও নিজেদের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। তাতে আমাদের রাজনীতির গুণগত কোনো পরিবর্তন হবে না।
উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে- এ কথাটি নানাভাবে আলোচনায়। আপনার কি মনে হয়?
এই আলোচনা একেবারেই অবান্তর এবং যুক্তিহীন। দুটোই একে অপরের সম্পূরক। দুটোই জনগণ চায় এবং এক সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
দেশ আবারো একদলীয় শাসনের দিকে এগুচ্ছে বলে আপনি বলেছেন- কেন এমনটা মনে হচ্ছে?
দেশ একদলীয় শাসনের দিকে এগুচ্ছে এমন কথা আমি বলিনি। আমি বলেছি স্বাধীনতা পরবর্তী সময় আমাদের দেশে বহুদলের মধ্যে একটি মাত্র দল (আওয়ামী লীগ) প্রধান ছিল যেমন ভারতে স্বাধীনতার পর বহু বছর কংগ্রেস এরকম অবস্থায় ছিল। ১৯৯১ এর পর থেকে আমরা দেখেছি আমাদের দেশে দু’টি প্রধান দল (আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি) পালা বদল করে ক্ষমতায় এসেছে। তখন মনে হচ্ছিল আমরা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দুই প্রধান দল বিশিষ্ট দলীয় ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ২০০৮ এর পর থেকে বিএনপি আর ক্ষমতায় আসেনি। বর্তমানে তাদেরকে অনেক দুর্বল মনে হয় এবং দেশে এখন আবার বহুদলের মধ্যে একটি দল (আওয়ামী লীগ) প্রধান হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। একদলীয় শাসন এবং বহুদলের মধ্যে একটি প্রধান দলের শাসন দুটি দুই রকম দলীয় ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি যেদিকে এগুচ্ছে তাতে ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন?
স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমান্বয়ে আমাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতি যথেষ্ট হয়েছে এবং ভবিষতেও ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এখনো আমাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ।

মন ছুঁয়ে যায় সোনালী চেলার মোহনায় by মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী

সোনালী চেলা নদীর মোহনা। বর্ষায় উত্তাল তরঙ্গ আর শুষ্ক মৌসুমে চারদিকে বিশাল চর। এ যেন নদী নয় ধু-ধু মরুভূমি। উত্তরে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের সুউচ্চ কালো পাহাড়। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ওই নদী দোয়ারাবাজার উপজেলার বুক চিরে ছাতক উপজেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। পড়ন্ত বিকালে সোনালী চেলার মোহনার নয়নাভিরাম দৃশ্য পর্যটকদের আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। জমিদার আমলে ওই নদীর তীরে ছোট-বড় টিলায় প্রচুর কমলা লেবু চাষাবাদ হতো। কালের বিবর্তনে কমলা লেবুর চাষ ও বাগানের বিলুপ্তি ঘটে। শীত মৌসুমে বালির চরে গজে উঠে কাশফুলের বাগান। উত্তরের পাহাড়ি উত্তাল হাওয়ায় কাশফুলের দোলনায় মন ছুঁইয়ে যায় এখানে আসা পর্যকদের।
ভোরে দুই দেশের সীমান্ত ওই এলাকায় পাহাড়ি পাখ-পাখালির কিচির মিচির শব্দ আর বারকী নৌকার লগি-বৈঠার আওয়াজে এখানকার বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে। সারি সারি বারকী নৌকার যাওয়া-আসার দৃশ্য পর্যটকদের নজর কাড়ে। প্রতিনিয়ত ওই নদী দিয়ে শত শত বারকী নৌকায় করে ভারত থেকে আনা হয় চুনা পাথর। আমদানীকৃত চুনাপাথর দিয়ে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এর সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ওই সব চুনাপাথর দিয়ে ছাতকের বিভিন্ন চুল্লিতে (কোম্পানি) উৎপাদিত হয় চুন। সোনানী চেলায় বারকী নৌকা চলাচল শুরু হয় সম্ভবত ব্রিটিশ আমলে। বারক লি নামক জনৈক ইংরেজ ব্যক্তি এখানকার প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ী সর্বপ্রথম ভারতের পাহাড় থেকে চুনাপাথর এনে সুরমা নদীর পাড়ে সিমেন্ট তৈরিসহ একাধিক চুল্লি প্রতিষ্ঠিত করে চুন তৈরি করতেন। সেই থেকে আজ অবধি ওই নদী দিয়ে বারকী নৌকায় পরিবহন করা হয় চুনাপাথর।
সোনালী চেলায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে গেলে স্থানীয়রা নুড়ি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া ভোর হতে মধ্যরাত পর্যন্ত নদীতে শখের বশে মাছ আহরণ করেন স্থানীয়রা। বর্ষায় প্রচণ্ড শ্রোত প্রবহমান থাকে সোনালী চেলায়। উভয় তীরে নদী ভাঙন ও শুষ্ক মৌসুমে বালি ও পলিমাটি ভরাট হয়ে চর গজে উঠায় নাব্য সংকটে রয়েছে ওই নদী।
সোনালী চেলার উভয় তীরে নদী ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ ও খনন করা হলে দু’দেশের একেবারে জিরো পয়েন্টের সোনালী চেলার মোহনা হয়ে উঠবে উপজেলার অন্যতম একটি আকর্ষণীয় ও নান্দনিক দর্শনীয় স্থান।

অভিনব অপরাধ: খুনের ভুয়া ভিডিওতে তোলপাড়

খুন হওয়ার নাটক করে তার ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে অভিনব অপরাধের জন্ম দিয়েছে আদল নামের এক তরুণ। ক্রিকেট খেলায় ধরা জুয়ায় হেরে তার টাকা পরিশোধ না করতে পেরে খুন হয়েছে- এমন এক নাটক সাজায় আদল। শুধু তাই নয়, সেটার ভিডিও প্রচার করে পরিবার ও স্বজনদের হয়রানি করেছে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও কোন ধরনের মামলা দেয়া হবে তা নিয়েও চিন্তিত পুলিশ। জানা গেছে, শ্রীলঙ্কায় সদ্য শেষ হওয়া নিদাহাস ট্রফির ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে জুয়া ধরেছিল আদল। এজন্য প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো ঋণ করতে  হয়েছে তাকে। টাকা পরিশোধ যাতে না করতে হয় সেজন্য তাকে খুন করার নাটক সাজাতে বলে বন্ধুদের। বন্ধুরা তার কথামতো ওই তরুণের হাত পা বেঁধে গলায় ছুরি চালায়। রক্ত বের হয়। তরুণটি মারা যায় (অভিনয়)। আর সেই ‘খুনের’ দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে অপর একটি মোবাইল থেকে পাওনাদারের মোবাইলে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এমনকি নিজের পরিবারের কাছেও সে ওই ভিডিওটি পাঠায়। জানানো হয়, চট্টগ্রামে নিহত তরুণের লাশ। বন্ধ পাওয়া যায় আদলের মোবাইল নম্বর। সন্তানের নৃশংস খুনের ঘটনা ভিডিওতে দেখে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন তার বাবা-মা। খুনিদের ধরতে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই ভিডিওটি ছাড়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এরপর মুহূর্তেই সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। একই সঙ্গে আদলের লাশ ও খুনিদের গ্রেপ্তারে নেমে পড়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এসআই তৌহিদ জানান, আদলের মোবাইল নম্বর ট্রাক করে তার এক বন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভিডিওর সঙ্গে তার চেহারা মিলিয়ে দেখা যায় সে-ই তরুণটির গলায় ছুরি চালিয়েছিল। তার নাম ইমরান। এফডিসিতে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করে। তার কাছে পুলিশ নিহত তরুণের লাশ কোথায় তা জানতে চায়। তখন ইমরান জানায়, এটি তারা শুটিং করেছে। দুই হাজার টাকার বিনিময়ে সে এই শুটিংয়ে অংশ নেয়। ইমরানের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে যে আদলকে নিয়ে এত কিছু, সে পালিয়ে ফরিদপুরে তার গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। সেখান থেকে তার স্বজনরা পুলিশকে জানায়, আদল বাড়িতে আছে। একইসঙ্গে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশও খবর পায় ওই তরুণ বাড়িতে গেছে। এরপর তার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আদল জানিয়েছে, নিদাহাস ট্রফিতে সে পুরান ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে জুয়া খেলতো। প্রথম সে ৪০ হাজার টাকা জিতে। সিরিজের ফাইনাল ম্যাচে সে দেড়লাখ টাকা হেরে যায়। এক ব্যবসায়ী তার কাছে ওই টাকা পাবে। সে টাকা না দিতে পেরে ওই নাটক সাজায়। তাকে হত্যা করার ভিডিওটি ওই ব্যবসায়ীকে পাঠিয়ে দেয়। এটি আদলেরই পরিকল্পনা ছিল। এদিকে আদল ও তার সহযোগীদের থানা পুলিশ হেফাজতে রাখা হলেও এখনো তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন এসআই তৌহিদ। তিনি জানান, ছেলেটি যে অপরাধ করেছে তাতে পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাই এ ব্যাপারে কি ধরনের মামলা হবে তা নিয়ে চিন্তিত আমরা।

জীবনের গল্পটা অল্পই! by রফিকুজজামান রুমান

শাওন ও শশী। এই দম্পতি বিয়ের সপ্তম বার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছিলেন নেপালে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্লেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকে শশীর স্ট্যাটাস- “এবং যাত্রা হলো শুরু!” সৌন্দর্যের শিহরণ ছড়ানো নেপালে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শুরু হলো ভিন্ন এক ‘যাত্রা।’ কী রঙিন স্বপ্ন এঁকে জীবনের গল্পগুলো সাজাতে চেয়েছিলেন শাওন ও শশী! অথচ মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে আজীবনের জন্য জীবনকে বিদায় জানালেন শশী! মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন- জীবনের গল্পটা কত সামান্য!
যশোরের সাবেরুল হকের গল্পটাই বা কেমন। ছোট্ট নাতি অনিরুদ্ধ হক বাবা মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছিল নেপালে। যাওয়ার তিন দিন আগে নানার সঙ্গে কথা হয় নাতির। বলেছিল, নেপাল থেকে ফিরে নানা-বাড়ি বেড়াতে যাবে। বাবা-মা সহ তিনজনেরই মৃত্যু হয় নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। নানার কাছে ফেরা হলো না অনিরুদ্ধের। বাবার কাছে ফেরা হলো না মা সানজিদা হকের। বাবা রফিকুজজামানও পাড়ি জমালেন এমন এক জগতে যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। অনিরুদ্ধের কাছে জীবন মানে কী? জীবন শুরু করার আগেই তার জীবনের গল্পটা শেষ!
কিংবা দুর্ঘটনায় নিহত কো-পাইলট পৃথুলার গল্পটাও কেমন অবেলায় সমাপ্ত হলো! বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। স্বপ্ন আর সম্ভাবনার কোনো আকুতির কাছেই হার মানতে চায়নি ভাগ্যের নির্মমতা। গল্পের ডালপালাগুলো ফুলে ফলে সুশোভিত হওয়ার আগেই লিখে ফেলা হলো চীর পরিসমাপ্তি।
এমন আরো অর্ধশতাধিক জীবনের গল্প থেমে গেল নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। যেহেতু বিমান বিধ্বস্তের ঘটনাটি একটি দুর্ঘটনা। কারো না কারো দায় কিংবা অবহেলা নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তা বের হয়ে এলেও জীবনগুলো আর ফিরে আসবে না। দোষীদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে হয়ত রচিত হবে অন্য কোনো গল্প। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া গল্পকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। এই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। নেপালে বিমান ধ্বংসের ঘটনা সেই চীর সত্য’রই এক টুকরো বয়ান। এই সত্য কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এই গল্পের চিত্রনাট্য বড় অনিশ্চয়তায় ভরপুর!
কিংবদন্তি শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। ২০১৪ সালের ৩০শে নভেম্বর বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সংগীতের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ডায়াসে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “আমার একটি কথা বলার...।” আর বলতে পারলেন না। যে কথাটি বলার ছিল, সেটি বলা হলো না। বলা গেল না। মৃত্যু এসে কী নিদারুণভাবে থামিয়ে দিয়ে গেল সবকিছু! কথা ফুরালো। জীবন ফুরালো। ফুরিয়ে গেল জীবনের গল্পটাও। অথচ আরো কতকিছু দেয়ার ছিল তাঁর। এই দেশকে নিয়ে, দেশের শিল্পচর্চা নিয়ে কত ভাবনা ছিল। সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায় ঐ মৃত্যুর কাছে। গল্পটা হঠাৎ করেই থেমে যায়। মহাকালের হিসেবে সেই গল্পটা কত অল্প!
মনে পড়ে যায় জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী ফিরোজ সাঁই এর কথা। ১৯৯৫ সালের ১২ই জানুয়ারি শিল্পকলা একাডেমিতে চলছিল গানের উৎসব। ফিরোজ সাঁই এর গানে মাতোয়ারা হাজার হাজার দর্শক। একপর্যায়ে গাওয়া শুরু করলেন, “এক সেকেন্ডের নাই ভরসা/বন্ধ হইবে রঙ তামাশা।” গান শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল জীবন, জীবনের সমস্ত ‘তামাশা।’ “এক সেকেন্ডের নাই ভরসা” গেয়ে মঞ্চ মাতানো শিল্পীই প্রমাণ করলেন এই কথা কী ভয়ানক রকমের সত্যি! গান গাইতে গাইতেই চলে গেলেন। গল্পটা নিজের মতো করে লেখা হলো না; কারোরই হয় না।
তবু আমাদের কতো অহংকার! অবিরাম স্বার্থের পেছনে ছুটে চলা। যুদ্ধ বিগ্রহ, হানাহানি, ক্ষমতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, মিথ্যা, কলুষতা- এসব নিয়েই আমাদের দিনযাপন। আরো চাই, আরো চাই। আমাদের প্রয়োজন শেষ হয়, চাওয়া শেষ হয় না। বিত্ত-বৈভব আর ক্ষমতার লোভে ভুলে যেতে বসেছি জীবনের সবচেয়ে বড় অনিবার্যতা। আজ এই মুহূর্তে যে জন্ম গ্রহণ করেছে, সবকিছুকে বাদ দিয়ে অন্তত একটি সত্যকে সঙ্গী করে সে এসেছে যে, তাকে মরে যেতে হবে। এবং সেটি যে কোনো সময়! তাহলে কেন এই দাম্ভিকতা? কেন স্বার্থপর বেঁচে থাকা? পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিও মরবে, মরে যাবে সবচেয়ে বেশি বিত্ত-বৈভবের অধিকারী লোকটিও। কোনো কিছুর বিনিময়েই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। শত দম্ভ, অহংকার, অট্টালিকা নিমিষেই শেষ!
বিমানের যাত্রীদের কেউ হয়ত ভাবেননি তারা আর ফিরে আসবেন না। কাইয়ুম চৌধুরী হয়ত কল্পনাও করেননি এটাই তাঁর শেষ বক্তব্য। ফিরোজ সাঁই হয়ত সাজিয়ে নিয়েছিলেন আরো আরো কত পরিকল্পনা! সবকিছুই হার মানে মৃত্যু নামক ঐ অনিবার্য বাস্তবতার কাছে। এই লেখাটি ছাপা হবে, আমি সেটি দেখব- এই নিশ্চয়তাই বা আমাকে কে দিতে পারে? জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের একটি গান আছে- ‘জীবনের গল্প, আছে বাকি অল্প। যা কিছু দেখার নাও দেখে নাও, যা কিছু বলার যাও বলে যাও, পাবে না সময় আর হয়ত।’ কী নির্মম সত্য এই গানের কথায় ফুটে উঠেছে! সত্যিই তো আমাদের কারোর সময় নেই! এই ফুরলো বুঝি জীবনের গল্প! ‘যাচ্ছি’- এই কথাটি বলে যাওয়ার সময়ও হয়ত আমরা পাব না। জীবনের গল্পটা অল্পই! শেষ হয়ে যাওয়ার আগে তাই বিনয়ী হই, নিরহংকার হই, নির্লোভ হই। পরের জন্য কিছু করি। ভালো কিছু করি। চারদিকে এত মৃত্যু; তবু সেই মৃত্যুর কথা কীভাবে ভুলে যাই! নেপালের ঐ উড়োজাহাজে আমি থাকলে আমার গল্পটাও এতক্ষণে পুরনো হয়ে যেত!

অনিরাপদ সমপর্ক হুমকি

পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সঙ্গে প্রথম রাতেই অনিরাপদ যৌন সমপর্ক স্থাপন করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রামপ। এমনকি ড্যানিয়েলসকে নিজের কন্যা ইভানকা ট্রামেপর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এসবের পাশাপাশি, ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া যৌন সম্পর্ক নিয়ে এতদিন চুপ থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলস। তিনি বলেছেন, নিজের ও নিজের ছোট মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। সেই শঙ্কা থেকেই ২০১৬ সালের শেষের দিকে এ ব্যাপারে চুপ থাকার বিনিময়ে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের একটি চুক্তির প্রস্তাব এলে রাজি হতে দ্বিধা করেননি। সিবিএস চ্যানেলের ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম ‘৬০ মিনিটস’-এ প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বলেন।
স্টর্মি ড্যানিয়েলস আরো বলেন, ২০১১ সালের দিকে বাউয়ার পাবলিশিং-এর কাছে ১৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে এই যৌন সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে সাক্ষাৎকার দেন তিনি। এর পরই এক ব্যক্তি তাকে প্রচ্ছন্ন কিন্তু স্পষ্ট হুমকি দিয়ে যায়। উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুর দিকে ইন টাচ্‌ ম্যাগাজিন সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে। এতদিন ধরে প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে ম্যাগাজিনটি জানায়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেন তখন মামলা দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এ কারণেই আইনি জটিলতায় পড়ার ভয়ে তখন সাক্ষাৎকারটি ছাপানো হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করে, ট্রাম্পের আইনজীবী স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ১,৩০,০০০ ডলার পরিশোধ করেছেন চুপ থাকার জন্য। এ খবর প্রকাশের পরই ইন টাচ্‌ ম্যাগাজিন ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে দেয়। হুমকি পাওয়ার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ড্যানিয়েলস বলেন, ‘আমি পার্কিং লটে ছিলাম। আমার দুধের শিশু মেয়েটাকে নিয়ে ফিটনেস ক্লাসে যাচ্ছিলাম। তখনই এক ব্যক্তি আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং আমাকে বলে, ‘ট্রাম্পকে একা থাকতে দাও। ওই স্টোরির কথা ভুলে যাও।’ এরপরই ওই লোক আমার মেয়ের দিকে আগায়। তারপর বলে, ‘ফুটফুটে ছোট্ট একটা মেয়ে! মেয়েটার মার যদি কিছু হয়, ব্যাপারটা লজ্জার হবে।’
এই হুমকি পাওয়ার পর ড্যানিয়েলস পুলিশের কাছে যান নি। কিন্তু কয়েক বছর পর এক আইনজীবী তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তখন ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারাভিযান একেবারে শেষের দিকে। এ সময়ই ট্রাম্পের আইনজীবী কোহেন একটি প্রস্তাব দেন। স্টর্মি ড্যানিয়েলস বলেন, আমি ওই প্রস্তাব লুফে নিই। কারণ আমি আমার পরিবার ও আমার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ‘৬০ মিনিটস’-এর এই পর্বে স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সাক্ষাৎকার প্রকাশের কথা থাকায়, এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে প্রতীক্ষিত একটি পর্ব। এ যেন একটি জাতীয় অনুষ্ঠান। দেশজুড়ে বহু মানুষ এটি দেখেছেন। এমনকি কিছু বারে এই অনুষ্ঠান চলাকালে ‘ডার্ক অ্যান্ড স্টর্মি’ ককটেল পার্টি আয়োজন করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেনের জন্য এই সাক্ষাৎকারের সম্ভাব্য আইনি তাৎপর্যও রয়েছে। রোববারে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারের আগে স্টর্মি ড্যানিয়েলস দেশজুড়ে বিভিন্ন ‘স্ট্রিপ’ ক্লাবে উপস্থিত হয়েছেন। একে তিনি নাম দিয়েছেন ‘মেইক আমেরিকা হর্নি অ্যাগেইন’ ট্যুর। কিন্তু সিএনএন’র উপস্থাপক ও সিবিএস’-এর ‘৬০ মিনিটস’-এর অন্যতম প্রতিনিধি অ্যান্ডারসন কুপার্সকে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে ড্যানিয়েলসের পোশাকে ছিল পেশাদারিত্বের ছাপ। বোঝাই যায়, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন তিনি।
ড্যানিয়েলস ছাড়াও আরেকজন নারী সম্প্রতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু না বলতে উভয় নারীর সঙ্গেই চুক্তি করেছেন তার আইনজীবী। কিন্তু ওই নারীরা এখন সেই চুক্তির বাইরে এসে ওই সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে চান। তারা বলছেন, ওই সম্পর্কের ব্যাপারে কথা বলার অধিকার তাদের রয়েছে। অন্য নারী হলেন প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজিন প্লেবয়ের সাবেক মডেল ক্যারেন ম্যাকডগাল।
ড্যানিয়েলসের মতো ম্যাকডগালও তার কাহিনী ন্যাশনাল এসকয়ার নামে এক ম্যাগাজিনের কাছে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু ন্যাশনাল এসকয়ার শেষ অবধি ওই কাহিনী ছাপেনি। বৃহস্পতিবার
সিএনএন-এ অ্যান্ডারসন কুপারকে ম্যাকডগালও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
এই নারীদের দাবি অস্বীকার করেছেন ট্রাম্পের মুখপাত্ররা। কিন্তু উভয় মামলাই ট্রাম্পের জন্য আইনি চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে যে, দুই নারীকে ট্রাম্প যেই অর্থ দিয়েছেন তা অবৈধভাবে নির্বাচনী অর্থ ব্যায়ের শামিল। সেই অভিযোগেরই যেন ভিত্তি প্রস্তুত করছে দুই নারীর বক্তব্য।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ৬০ মিনিটসের মতো বড় টিভি অনুষ্ঠানে স্টর্মি ড্যানিয়েলসের উপস্থিত হওয়া থেকে বোঝা যায়, জনসম্মুখে কথা বলা থেকে তাকে বিরত রাখার চেষ্টা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্পের আইনজীবী কোহেন সম্প্রতি বলেছেন, চুক্তি ভঙ্গ করে এ নিয়ে কথা বলায় কয়েক লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করবেন তিনি। কিন্তু তা-ও ড্যানিয়েলসকে দমায়নি। আমেরিকায় টিভি নিউজে প্রায়ই সবচেয়ে বেশি দেখা অনুষ্ঠানগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকে ৬০ মিনিটস অনুষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠান সম্প্রচারের কিছুক্ষণ পর মাইকেল কোহেনের আইনজীবী ব্রান্ট এইচ. ব্লাকি একটি চিঠি পাঠান ড্যানিয়েলসের নতুন আইনজীবী মাইকেল আভেনাতির কাছে। ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, যে হুমকির কথা ড্যানিয়েলস উল্লেখ করেছেন, তার মাধ্যমে তিনি মাইকেল কোহেনের মানহানি করেছেন। চিঠিতে স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলা হয়।
সাক্ষাৎকারে অ্যান্ডারসন কুপার স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি আইনগত ঝুঁকির কথা মাথায় নিয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া সম্পর্কের বিষয়ে এখন সরব হচ্ছেন? ‘তিনি বলেন, আমি যতদিন চুপ ছিলাম, আমার কোনো সমস্যাই ছিল না। কিন্তু যখনই আমাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হলো, তখন আমি তা মানতে পারিনি।’

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের আশ্রয় নিয়ে সন্ত্রাসীর বিচার বৃটেনে

লন্ডনের টিউব হামলাকারী আহমেদ হাসানকে সাজা দেওয়ার রায়ে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছেন বিচারপতি হ্যাডন-কেইভ। উদ্ধৃত করেছেন মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থকেও। বলেছেন, অপরাধী শুধু বৃটিশ আইনই লঙ্ঘণ করেন নি। ইসলামি বিধানও লঙ্ঘণ করেছেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে মধ্য লন্ডনের একটি টিউব ট্রেনে হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় দোষী সাব্যস্ত হন আহমেদ হাসান। শুক্রবার তাকে ৩৪ বছরের সাজা দেওয়া হয়।
তার তৈরি করা বিস্ফোরক সম্পূর্ণভাবে বিস্ফোরিত হয়নি। ফলে কেউ মারা যায়নি। কিন্তু আহত হয় কমপক্ষে ৩০ জন। ১৮ বছর বয়সী হামলাকারী আহমেদ হাসান জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
তাকে সাজা দিতে গিয়ে বিচারপতি চার্লস হ্যাডন কেইভ হামলাকারী আহমেদ হাসানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি হিরাবা (সন্ত্রাসকর্ম) সংঘটন করেছেন। এ সময় মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, আপনি দুনিয়ার বুকে অবক্ষয় সৃষ্টি করেছেন।
খবরে বলা হয়, বিচারক যে দু’টি শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা দিয়ে ইসলামি বিধানে ‘বিদ্রোহ’কে বোঝানো হয়। তবে ইসলামি তাত্ত্বিকরা আধুনিক প্রকরণে সন্ত্রাসবাদ বোঝাতে এই শব্দ দু’টি ব্যবহার করেন।
বিচারপতি হ্যাডন কেইভ আরও বলেন, ‘আগামী বছরগুলোতে আপনি কারাগারে বসে ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করার অশেষ সময় পাবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামে যেকোনো চরম কিছু নিষিদ্ধ। এর মধ্যে ধর্মীয় চরমপন্থাও অন্তর্ভূক্ত। যেই স্থানের বাসিন্দা ও অতিথি আপনি, সেই স্থানের আইন লঙ্ঘণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। ইসলামে সন্ত্রাসবাদ নিষিদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী বিধানে বলা আছে যে, জমিনে ফিৎনা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড চালানো ইসলামী বিধান অনুযায়ী সবচেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধের একটি। বৃটিশ আইনেও তা-ই।’
১৬ বছর বয়সে, অর্থাৎ হামলা চালানোর ৩ বছর আগে, শরণার্থী হিসেবে ইরাক থেকে বৃটেনে আসেন আহমেদ হাসান। হামলার আগে নিজেকে অনাথ দাবি করে আশ্রয় চান তিনি। তার দাবি ছিল, ইরাক থেকে আসার আগে তাকে অপহরণ করে আইএস।

সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ওপর ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছিলেন ব্লেয়ার

সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরাক যুদ্ধ করেছিলেন বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এমন তথ্য তিনি বৃটিশ পার্লামেন্টে উত্থাপন করেছিলেন পার্লামেন্টের স্বীকৃতি আদায়ে। তিনি বলেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের হাতে যে রাসায়নিক অস্ত্র আছে তা মাত্র ৪৫ মিনিটেই বৃটেনের মূল ভূখন্ডে আঘাত করতে সক্ষম। কিন্তু টনি ব্লেয়ার এক্ষেত্রে যে তথ্যপ্রমাণ দিয়েছিলেন তা ছিল ভুয়া। ‘৪৫ মিনিটস ফ্রড ডুম’ নামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ হাজির করেছিলেন তিনি পার্লামেন্টে। ৫০ পৃষ্ঠার ওই গোপন তথ্যের সূত্র ছিল ইরাকের একজন ট্যাক্সি চালক। তার দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছিল ওই তথ্যপ্রমাণ। শুধু তা-ই নয়। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়া একজন ছাত্রের ডক্টরাল থিসিস পেপার থেকেও তথ্য নিয়ে ওই ডকুমেন্ট সাজানো হয়েছিল। এ জন্য ২০০৩ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ডাউনিং স্ট্রিট স্বীকার করে তাদের ভুল। তারা ক্ষমা চায়। বলা হয়, ওই ডকুমেন্টের বেশির ভাগই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের লেখা থেকে নেয়া হয়েছে। পরে দেখা যায় এ কাজটি করেছিলেন টনি ব্লেয়ারের যোগাযোগ বিষয়ক প্রধান অ্যালেস্টার ক্যাম্পবেলের ডাউনিং স্ট্রিট অফিসের কিছু মধ্যম সারির কর্মকর্তা। অথচ ওই তথ্যকেই অকাট্য প্রমাণ হিসেবে হাউজ অব কমন্সে উত্থাপন করেন টনি ব্লেয়ার। তিনি পার্লামেন্টকে আস্থায় আনেন যে, ইরাক আগ্রাসন করতেই হবে। এ সময় টাইমস অব লন্ডন সংবাদ শিরোনাম করে ‘মিসাইলস ফ্লাই ইন ৪৫ মিনিটস’। দ্য সানের শিরোনাম ‘বৃটেন ৪৫ মিনিটস ফ্রম ডুম’। এসব শিরোনামে চমকে ওঠে বৃটেন। মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে বৃটেন! এই যে ডকুমেন্ট এই ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করেই টনি ব্লেয়ার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকে আগ্রাসন চালান। পরে যখন বিষয়টি প্রকাশ পায়, তখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন ব্লেয়ার। তার বিরুদ্ধে ঘৃণা উপচে পড়তে থাকে। প্রথমে ওই কূটনৈতিক ডকুমেন্টের যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন বৃটিশ জীবাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড কেলি। এক পর্যায়ে ডা. ডেভিড কেলি আত্মহত্যা করেন বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই আত্মহত্যার যথার্থতা প্রথম চ্যালেঞ্জ করেন বিবিসির শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা। ফলে যা হয় তাহলো, বিবিসির ওইসব কর্মকর্তারা অনেকে পদত্যাগ করেন। টনি ব্লেয়ার যে ডকুমেন্ট হাজির করেছিলেন তা নিয়ে লন্ডনের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান লিখেছিল এরকমÑ উচ্চ মাত্রার গোয়েন্দা বিশ্লেষণের পরিবর্তে ওই কূটনৈতিক ডকুমেন্ট বা ডোজিয়ের ছিল মিডিয়ায় প্রচলিত শব্দ কাট-এন্ড-পেস্ট। ফলে ঘটনাটি সারা বিশ্বের মিডিয়া লুফে নেয়। তখন ২০০৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরাক আগ্রাসনের সমর্থনে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল। তার বক্তব্যের মূলে উঠে আসে ইরাক আগ্রাসন ও ওই ডকুমেন্টের কথা। এই ডকুমেন্টের বিশ্লেষণ ও এর উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে প্রকাশ পেয়েছে কিভাবে গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে পাওয়া সতর্কতাকে অবজ্ঞা করেছে বৃটিশ গোয়েন্দারা। তা ছাড়া যেসব তথ্য তারা পেয়েছিলেন তা বেং তার উৎস চেক করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তারা। তবে সবচেয়ে লজ্জার কথা হলো, এইসব ডকুমেন্ট বা ডোজিয়েরকে যথার্থতা দিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিস ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে এটাকে ‘সেক্সড আপ’ করা হয়েছিল। তাতে জড়িত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার নিজে, জ্যাক স্ট্র ও অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল।

খাল খনন থেকে সরে এলো চসিক

চট্টগ্রামের দুঃখ ৫৭ খাল। জলাবদ্ধতার জন্য মূলত দায়ী এসব খাল। তবে দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘবে এবার বর্ষার আগেই এসব খাল খনন শুরু করেছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কিন্তু দু’মাস না যেতেই হঠাৎ খাল খনন কিংবা খালের আবর্জনা-মাটি উত্তোলন থেকে সরে এলো চসিক। ফলে আগামী বর্ষায় চট্টগ্রামে আবারও উঁকি মারছে জলাবদ্ধতা। এমন শঙ্কা নগরবাসীর। নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সভাপতি জিয়াউদ্দিন বলেন, খাল খনন শুরু করায় নগরীর মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তির আশা করেছিল। কিন্তু হঠাৎ খাল খনন বন্ধ করায় এখন সেই আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ায় চসিক তাদের নির্ধারিত এই কাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। তাই একই কাজ কর্পোরেশনের করার কোনো সুযোগ নেই। যদি কাজ করে তখন নিরীক্ষা আপত্তি আসতে পারে। তাই খাল খনন থেকে সরে এলো চসিক। এদিকে খাল খনন থেকে সরে আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)-এর প্রধান প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, খাল ও ড্রেন পরিষ্কার রাখা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত কাজের অংশ। চসিকের খাল ও ড্রেন পরিষ্কার খাতে সিডিএর প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ সম্পর্কিত নয়। তবুও এ প্রকল্পে সিটি কর্পোরেশনকে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন তা না মেনে খাল খনন বন্ধ করে দেয়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন অন্য কথা। তিনি বলেন, খাল খনন কার্যক্রম চলমান রাখলে সিডিএর প্রকল্পের আওতায় তার ব্যয় পরিশোধ করা হবে কি না জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তারা বলেছে প্রকল্পের ডিপিপিতে কোনো টাকা বরাদ্দ নেই। কিন্তু আমাদের কাছে যে বই আছে সেখানে দেখেছি ১০০ কোটি বরাদ্দ আছে। তিনি বলেন, খাল খননের বরাদ্দ পেয়েছে সিডিএ। তাই খাল খনন করবে তারা। আমরা শহরের মধ্যে যেসব ড্রেন আছে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করব। শতভাগ ক্লিয়ার করব। ড্রেনগুলো পরিষ্কার না থাকলে তো পানি যাবে না। রাস্তায় পানি উঠে যাবে। তাই আমরা নাগরিকদের সুবিধার্থে ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখবো। তিনি বলেন, মুষলধারে বৃষ্টি হলে পাহাড় থেকে বালি এসে ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে যায়। ওই ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা যাতে বৃষ্টির মধ্যেও ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখতে পারে সেজন্য তাদের রেইনকোট দিব। এ ব্যাপারে চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, গৃহীত মেগাপ্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই সেনাবাহিনীর সঙ্গে এমওইউ করা হবে। এরপর ৫৭ খালের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগামী বর্ষার আগেই ৩৬ খালের খনন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
সিডিএর মেগা প্রকল্পে যা আছে : গত ৬ই মার্চ সিডিএর গৃহীত মেগা প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন বা জিও দেয় একনেক। জিও-তে বলা হয়েছে, ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায় প্রকল্পটি সমপূর্ণ জিওবি (বাংলাদেশ সরকারের ফান্ড) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের মেয়াদকাল হচ্ছে ২০১৭ সালের ১লা জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় খালের পাড়ে ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা ভূমি অধিগ্রহণ, খাল থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার কাদা অপসারণ, ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি খনন, ১ লাখ ৭৬ হাজার মিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, বন্যার পানি সংরক্ষণে ৩টি জলাধার, ৬টি আরসিসি কালভার্ট, ১২টি পামপ, ৪২টি সিল্ট ট্রাপ স্থাপন। এছাড়া টাইডাল রেগুলেটর ও ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে প্রকল্পটির আওতায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দে সম্মতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে খাল খননে বরাদ্দ রয়েছে ১০০ কোটি টাকা।

চালু হলো বিমানের সিলেট-দুবাই ফ্লাইট by ওয়েছ খছরু

সিলেটে ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ বিমান। আন্তর্জাতিক রুটে বাড়াচ্ছে উড়োজাহাজ। এতে করে নতুন নতুন রুটও চালু হচ্ছে সিলেট থেকে। গতকাল স্বাধীনতা দিবসে সিলেট থেকে দুবাই সরাসরি ফ্লাইট সার্ভিস চালু করা হয়েছে। যাত্রীচাপ বিবেচনা করে বিমানের পক্ষ থেকেই নতুন করে এই ফ্লাইট চালু করা হলো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মাস্কাট সহ আরো কয়েকটি রুটে ফ্লাইট চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি যাতায়াতের জন্য বিমানের কোনো ফ্লাইট ছিলো না। লন্ডন সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফ্লাইট এলেও যাত্রীদের যেতো হতো ঢাকা হয়ে। এতে বাংলাদেশ বিমানের বহির্বিশ্বের যাত্রীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হতো। দাবি রয়েছে- সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা। তবে বছর খানেক আগে থেকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছিল ফ্লাই দুবাই। বিদেশি এই উড়োজাহাজ সংস্থাটি সপ্তাহে দুবাই সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৫টি ফ্লাইট সিলেটে অপারেট করে থাকে। সরাসরি ফ্লাইট চালু করায় ফ্লাই দুবাই এতোদিন একাই সিলেটের যাত্রীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছিল। গতকাল থেকে এই সেবা চালু করলো
বাংলাদেশ বিমানও। সন্ধ্যায় সাড়ে ৬ টার দিকে ১৫৬ জন যাত্রী নিয়ে সিলেট থেকে দুবাইয়ের পথে উড়াল দিয়েছে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট। এর আগে দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে এই ফ্লাইটের উদ্বোধনও করা হয়। এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এবং হজ্ব এজেন্সিস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর প্রতিনিধিসহ বিমান ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন। বিমানের সিলেট অফিসের রিজার্ভেশন অ্যান্ড সেলস ইনচার্জ শাহনেওয়াজ মজুমদার গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- বাংলাদেশ বিমান দুবাইয়ে সরাসরি ফ্লাইট চালু করলো। ভবিষ্যতে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানববন্দর থেকে আরো নতুন নতুন রুটে ফ্লাইট চালু করা হবে। তিনি বলেন- প্রাথমিকভাবে তারা সপ্তাহে দুই দিন ওইরুটে সিলেট থেকে দুবাই পর্যন্ত ফ্লাইট চালু করেছেন। পরে ফ্লাইট সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আরো কয়েকটি রুটেও তারা খুব শিগগিরই ফ্লাইট অপারেট করতে যাচ্ছেন। সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল জানিয়েছেন- ‘বিমানের ফ্লাইট চালু হওয়ায় আমরা দারুণ খুশি। এই রুটের প্রায় সব যাত্রীরাই সিলেটি। সুতরাং নিজ দেশের বিমানে কেউ যাতায়াত করবে- এটা এতোদিন স্বপ্ন ছিল। এখন সেটি বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। আমরা আশা করি অচিরেই বিমান আরো নতুন নতুন রুটেও তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু করবে।’ তিনি দাবি জানিয়ে বলেন- ‘সিলেটবাসীর প্রধান দাবি সিলেট থেকে হিথ্রো পর্যন্ত রুট চালু হওয়া। আমরা বিমানের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছি। বিমান কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছেন তারাও এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। সিলেট থেকে লন্ডন ফ্লাইট চালু করে কাঙ্ক্ষিত একটি দাবির সুরাহা হবে বলে জানান তিনি।’ বিমানের সিলেট অফিসের ভারপ্রাপ্ত জেলা ব্যবস্থাপক মো. আলী আকবর হাওলাদার প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যাত্রী সাধারণের সুবিধা বিবেচনায় সিলেট-দুবাই রুটে দু’টি সরাসরি ফ্লাইট চালু করা হচ্ছে। সপ্তাহের প্রতি সোমবার এবং শুক্রবার সিলেট থেকে দু’টি ফ্লাইট দুবাই’র উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিমান অপারেটর ফ্লাই দুবাই সিলেট থেকে দুবাইয়ে সপ্তাহে ৫টি ফ্লাইট অপারেট করছে। ১৯৯৮ সালে ওসমানী বিমাবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর সিলেট থেকে লন্ডনসহ আরো কয়েকটি রুটে বিমানের ফ্লাইট চালু ছিল। পরবর্তীতে নানা অজুহাতে ওই ফ্লাইটগুলো গুটিয়ে নেয়া হয়েছিল। এদিকে- সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: যে নিবন্ধ পাল্টে দিয়েছিল ইতিহাস

''আবদুল বারীর ভাগ্য ফুরিয়ে আসছিল। পূর্ব বঙ্গের আরও হাজারো মানুষের মতো তিনিও বড় একটি ভুল করেছেন - তিনি পালাচ্ছেন, কিন্তু পালাচ্ছেন পাকিস্তানী পেট্টোলের সামনে দিয়ে। তার বয়স ২৪, সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি কাঁপছেন, কারণ তিনি এখনই গুলির শিকার হতে যাচ্ছেন।'' এভাবেই শুরু করা হয়েছিল গত অর্ধ-শতকের দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী নিবন্ধগুলোর একটি। লিখেছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, একজন পাকিস্তানী সাংবাদিক, যার প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায়। এই নিবন্ধের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো দেশটির পূর্ব অংশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন আর নিষ্ঠুরতার বিষয়টি বিশ্বের সামনে উঠে আসে। বিবিসি'র মার্ক ডামেট লিখেছেন, এই প্রতিবেদন সারা বিশ্বকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ক্ষুব্ধ আর ভারতকে শক্ত ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করেছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্সকে বলেছিলেন, লেখাটি তাকে এত গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল যে এটি তাকে ইউরোপীয় রাজধানীগুলো আর মস্কোয় ব্যক্তিগতভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ দেয়, যাতে ভারত এক্ষেত্রে সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস এসব উদ্দেশ্য নিয়ে রিপোর্ট করেননি। যেমনটা তার এডিটর হ্যারল্ড ইভান্স লিখেছেন, ''তিনি খুব ভালো একজন প্রতিবেদক, যিনি তার কাজটা সৎভাবে করছেন।'' তিনি ছিলেন খুব সাহসীও। তিনি জানতেন এই সংবাদ প্রকাশের আগেই তৎকালীন সেনা-শাসিত পাকিস্তান থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে তাকে বেরিয়ে যেতে হবে - যা ওই সময়ে খুব সহজ কাজ ছিল না। ''তার মা তাকে সব সময়েই বলতেন যেন তিনি সত্যের পক্ষে থাকেন,'' বলছেন মাসকারেনহাসের বিধবা পত্নী ইভোন। "তিনি বলতেন, 'আমার সামনে একটি পাহাড়ও যদি রাখো, আমি সেটি টপকে যাবো। তিনি কখনো হতোদ্যম হতেন না'।" ১৯৭১ সালের মার্চে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়, মি. মাসকারেনহাস তখন করাচির একজন নামী সাংবাদিক। স্থানীয় গোয়ান-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তিনি একজন সদস্য। তার এবং ইভোন-এর পাঁচটি সন্তান রয়েছে। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী, হিন্দু সম্প্রদায় আর সাধারণ বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে পূর্ব পরিকল্পিত অভিযান শুরু করে। আরো অনেক যুদ্ধাপরাধের মতো সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করে, ছাত্র-শিক্ষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারে। ঢাকা থেকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে গ্রামগুলোতেও। তাদের এই পরিকল্পনা কিছুটা সাফল্য পাওয়ার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কয়েকজন সাংবাদিককে এনে ঘুরিয়ে দেখানো হবে যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা কতটা সফলতা পেয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলায় যে তাদের ভাষায় সব কিছুই স্বাভাবিক সেটি তুলে ধরা। ঢাকায় অবস্থান করা বিদেশী সাংবাদিকদের অবশ্য এর আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। এরপর আট জন সাংবাদিককে দশ দিনের একটি সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাসও। যখন তারা আবার পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান, তখন তাদের মধ্যে সাতজন সাংবাদিক পাকিস্তানী সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট করেন। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক এবং ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ক্ষেত্রে। ইভোন মাসকারেনহাস স্মৃতিচারণা করছেন, "আমি কখনোই আমার স্বামীর এ রকম চেহারা দেখিনি আগে। তিনি ছিলেন খু্বই ক্ষুব্ধ, চিন্তিত, বিষণ্ণ আর আবেগী।" তিনি বলেন, "আমি যা দেখেছি, সেটা যদি আমি লিখতে না পারি, তাহলে আমি আর কখনোই অন্য কোন কিছু লিখতে পারবো না।" তবে পাকিস্তানে সেটা লেখা সম্ভব নয়। কারণ গণমাধ্যমের সব প্রতিবেদনই সেখানে সেন্সর করা হয়। এবং তিনি যদি সেই চেষ্টা করেন, তাকে হয়তো গুলি করেই মারা হবে। অসুস্থ বোনকে দেখার নাম করে মাসকারেনহাস তখন লন্ডনে চলে যান। এরপর সরাসরি লন্ডন টাইমসের সম্পাদকের দপ্তরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন।   তিনি তাকে বলেন, ''আমি পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং আর্মি অফিসারদের বলতে শুনেছি যে এটাই একমাত্র সমাধান।'' হ্যারল্ড ইভান্স প্রতিবেদনটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু বলেন যে তার আগে করাচি থেকে ইভোন আর তার সন্তানদের বের করে আনতে হবে। তারা সিদ্ধান্ত নেন তাদের প্রস্তুত করতে একটি সংকেতমূলক টেলিগ্রাম পাঠানো হবে, যেখানে লেখা হবে, "অ্যানের অপারেশন সফল হয়েছে।" ইভোন মাসকারেনহাস বলছেন, ''পরদিন ভোর তিনটায় আমি টেলিগ্রামটি পাই। তখন আমার মনে হয়েছিল, ও ঈশ্বর, এখন আমাদের লন্ডন যেতে হবে। আমাকে সবকিছু এখানে ফেলে রেখে যেতে হবে। এটা যেন শেষকৃত্যের মতো একটা ব্যাপার ছিল।'' সন্দেহ এড়াতে পরিবার রওনা হবার আগেই অ্যান্থনি মাসকারেনহাস আবার পাকিস্তানে ফিরে যান। কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী, পাকিস্তানী নাগরিকরা বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। তাই পরিবার চলে যাওয়ার পর তিনি সড়ক পথে গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে আফগানিস্তানে ঢুকে পড়েন। যেদিন লন্ডনে পুরো পরিবার আবার একত্রিত হয়, তার পরের দিন সানডে টাইমস পত্রিকায় ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল,'গণহত্যা'।   'প্রতারণা' এটি খুবই শক্তিশালী একটি প্রতিবেদন ছিল, কারণ মি. মাসকারেনহাস পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন। সামরিক ইউনিটগুলোর হত্যা আর আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার অভিযান আমি নিজে দেখেছি। বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দেয়ার পর শহর আর গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দেখেছি। আমি দেখেছি, পুরো গ্রামের ওপর শাস্তিমূলক অভিযান চালাতে। অফিসার্স মেসে রাতের বেলায় কর্মকর্তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে তারা কতটা সাহস দেখিয়ে সারাদিন ধরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। আপনি কতজনকে মেরেছেন? তাদের উত্তর আমার এখনও মনে আছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশকে পাকিস্তান প্রতারণা হিসাবে দেখেছে এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে শত্রু এজেন্ট হিসাবে গণ্য করেছে। তার এই প্রতিবেদনের তথ্যকে তারা অস্বীকার করে একে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা হিসাবে দাবি করেছে। এরপর থেকে লন্ডনেই বাস করেন মি. মাসকারেনহাস ও তার পরিবার। তবে তারপরেও সবসময়েই পাকিস্তানে যোগাযোগ রক্ষা করে এসেছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ১৯৭৯ সালে তিনিই প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যে পাকিস্তান পারমানবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ১৯৮৬ সালে তিনি লন্ডনে মারা যান। বাংলাদেশে তাকে এখনো স্মরণ করা হয় এবং তার এই নিবন্ধটি দেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।   সূত্র: বিবিসি

অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় কমেছে চায়ের রপ্তানি

এক কাপ চা দিয়ে সকাল শুরু করেন এমন লোকের সংখ্যা দেশে কম নয়। আবার সারা দিনে এক কাপ চা পান করেন না এমন লোকও পাওয়া দুষ্কর। দিন দিন চা পানের পরিমাণ বাড়ছে। উৎপাদনের চেয়ে এই চাহিদা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চাহিদার তুলনায় কতটুকু চা উৎপাদিত হয়েছে, তা হিসাব করে প্রতিবছরই কম-বেশি পরিমাণ চা আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় চায়ের রপ্তানি কমেছে।
বিগত ১০ বছরের উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই সময়ের ব্যবধানে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে দুই কোটি কেজি। অর্থাৎ বছরে গড়ে উৎপাদন বাড়ছে সাড়ে ৩ শতাংশ হারে। একই সময়ে চায়ের চাহিদা বেড়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ কেজি। যা বছরে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়ছে।
চায়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০১০ সাল থেকে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হয়। তখন থেকেই আমদানি শুরু হয়। গত আট বছরে দেশে মোট চা আমদানি হয় ৫ কোটি ৯৫ লাখ কেজি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছিল ২০১৫ সালে, মোট ১ কোটি ৫৮ লাখ কেজি। ২০১৬ সালে ৮৭ লাখ কেজি এবং ২০১৭ সালে ৬২ লাখ কেজি চা আমদানি হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, নব্বইয়ের দশকে বিশ্বে চা রপ্তানির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ চা রপ্তানি হয় সেই সময়। ১৯৮২ সালে চা রপ্তানি হয় ৩ কোটি ৪৪ লাখ কেজি। সবচেয়ে কম রপ্তানি হয় ২০১৬ সালে, ৪ লাখ ৭০ হাজার কেজি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় রপ্তানিও কমে গেছে। ২০১৬ সালের চা রপ্তানিতে বাংলাদেশ ছিল ৭৭তম।
চা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, গত ১০ বছরে দেশে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে ২ কোটি কেজি। আর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ কেজি। এ অবস্থায় উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদা মেটানো ও রপ্তানি বাড়াতে ১৫ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশে ২০১৬ সালে সাড়ে ৮ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। রেকর্ড পরিমাণ এই উৎপাদনের পরের বছরই উৎপাদন ৬১ লাখ কেজি কমে যায়। সব মিলিয়ে গত বছর উৎপাদন দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮৯ লাখ কেজি। চা চাষের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন।  গত দুই বছর রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের কারণে চা আমদানি কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি রপ্তানিও বেড়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিসংখ্যান থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, ২০১৬ সালে চায়ের উদ্বৃত্ত ছিল ৮৮ লাখ কেজি। এজন্য গত বছর চা আমদানি হয়েছে ৬২ লাখ কেজি, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আবার রপ্তানি বেড়েছেও আগের তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত বছর ২৫ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়।
চা বোর্ডের হিসাব মতে, আমদানি ও উৎপাদন মিলে ২০১৬ সালে দেশের বাজারে চায়ের সরবরাহ ছিল সবচেয়ে বেশি, ৯ কোটি ৩৮ লাখ কেজি। ওই বছর দেশের মানুষ ৮ কোটি ১৬ লাখ কেজি চা পান করেছে। তবে ব্যবসায়ীরা জানান, মানুষ পান করেছে ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজি চা।
চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের ভাইস চেয়ারম্যান এম শাহ আলম বলেন, বাগানের পুরনো চারা উঠিয়ে নতুন চারা লাগানো হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে সংস্কার কার্যক্রম চলছে। ফলে আগামী দিনে চা উৎপাদন বাড়বে। সে ক্ষেত্রে আমদানি কমে আসবে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে গত বছর চায়ের উৎপাদন কম হয়। তারপরও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে।

খুলনায় ১৪শ’ ফুট নিচেও পাওয়া যাচ্ছে না পানি by রাশিদুল ইসলাম

গ্রীষ্মের শুরুতে খুলনা নগরীর পাশাপাশি গ্রামীণ জনজীবনেও পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জেলার নয় উপজেলার পাঁচটিতেই এ সংকট তীব্র। পানি সংকট মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সেগুলো কাজে আসছে না। এ সমস্যা সমাধানে নতুন করে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। গরম পড়তে না পড়তেই নগরী বিভিন্ন এলাকার নলকূপে পানি উঠছে না। গভীর রাতে মটরের সাহায্যে পানি তুলতে হচ্ছে নগরবাসীর।
ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে পানির স্তর নেমেছে দুই থেকে চার ফুট নিচে। ফলে অনেক এলাকায় নলকূপ ও পাম্পে পানি উঠছে না আগের মতো। সমস্যার কথা স্বীকার করে আগের তুলনায় বেশি সময় পাম্প চালানো এবং নতুন চারটি পাম্প বসানোর কথা জানিয়েছেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ পিইঞ্জ। খুলনা ওয়াসার পাম্প রয়েছে ৮৫টি এবং পানি সরবরাহ পাইপ লাইন ২৯০ কিলোমিটার। আর নলকূপ রয়েছে প্রায় নয় হাজার।
খুলনা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার নয় উপজেলার মধ্যে কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা ও তেরখাদা উপজেলায় সংকট বেশি। শুকনো মওসুমে এসব এলাকার জনগণের পানযোগ্য পানির একমাত্র উৎস পুকুর। লবণাক্ততার প্রবণতা বেশি থাকায় এসব এলাকায় গভীর নলকূপের পানিও অনুপযোগী। সর্বশেষ গেল বছর সেপ্টেম্বর মাসে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে খুলনার সবগুলো উপজেলায় জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপে দেখা যায়, ১২শ’ ফুটের মধ্যে পান করার উপযোগী কোনো পানির স্তর নেই। ১৪শ’ ফুট নিচেও পাওয়া যাচ্ছে না পানি। ফলে ওই সব এলাকায় ১৫শ’ ফিট গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি এ দপ্তরটি। এ লক্ষ্যে প্রায় ১৩০টি গভীর নলকূপ বসানোর জন্য একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলে তবেই এ উদ্যোগ সফল করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির স্তর পাওয়া একটু কঠিন। এজন্য আমরা ১৫শ’ ফিট গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি পান উপযোগী ভালো পানি পাওয়া যাবে। দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা এবং রূপসা উপজেলায় জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিচেনায় এনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিভিন্ন এনজিও ও সংগঠন এসব এলাকার পুকুরের পানিতে ফিল্টারিং-এর ব্যবস্থা করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব পদ্ধতির বেশিরভাগই অকেজো হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়রা উপজেলার ৫৩টি, বটিয়াঘাটার সুরখালী ইউনিয়নে ১৪টি, দাকোপ উপজেলার ১১৯টি পুকুরে পানি ফিল্টারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এরমধ্যে বর্তমানে ৫০টির মতো পুকুরে ফিল্টারিং ব্যবস্থা সচল আছে। এদিকে শুষ্ক মওসুমে উপকূলে সুপেয় পানির সকল উৎস ক্রমেই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং ভূ-উপরিস্থিত পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। আর্সেনিকের প্রভাব ও লবণাক্ততা পুকুর এবং টিউবওয়েলের পানিতে। এরপর রয়েছে ফ্লোরাইডের হাতছানি। উপকূলের বিশেষ করে বাগেরহাটের মংলা, খুলনার দাকোপ, কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মানুষ বছরে অন্তত ৬ মাস তীব্র সংকটকাল অতিবাহিত করে। এ সময় ৪-৫ বা ৮-১০ কিলোমিটার দূর থেকেও পানি সংগ্রহ করতে হয়। এক কলস খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিদিন এক ঘণ্টা বা তার চেয়েও বেশি সময় তাদের ব্যয় করতে হয়।
এসব এলাকায় যেসব টিউবওয়েল রয়েছে সেগুলোও শুষ্ক মওসুমে পানি স্বাভাবিক লেয়ারের নিচে নেমে যায়। যে কারণে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। ফলে স্বাভাবিক অবস্থা বিবেচনায় এনে ও দাতা সংস্থা ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকার খুলনার চার উপজেলাসহ সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে মোট ৯৪টি অ্যাকুইফার রিজার্ভ পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. জাহিদ পারভেজ বলেন, খুলনায় ২৬টি অ্যাকুইফার রিজার্ভ পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর সুফল পাচ্ছে স্থানীয় লোকজন। এছাড়াও ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও পিএসএফগুলোও সচল করার চেষ্টা চলছে। দাকোপ ও কয়রাসহ অন্যান্য উপজেলায় সাড়ে ১২শ’ রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং চালু রয়েছে। পানি সংকটের বিষয়ে দাকোপ উপজেলার নলিয়ান গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল কালাম বলেন, পৌষের মাঝামাঝি সময় থেকেই এলাকার অধিকাংশ পুকুরের পানি শুকিয়ে গেছে। নলকূপেও পানি উঠছে না। তিনি জানান, খাবার পানি আনার জন্য এখানকার নারীদের পায়ে হেঁটে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে যেতে হচ্ছে।  কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের হাফিজুল সানা জানান, তাদের এলাকায় কিছু এনজিও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করলেও তা অনেকের ভাগ্যেই জোটে না। এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রশান্ত কুমার পাল বলেন, উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় খাবার পানির সমস্যা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহযোগিতায় কয়েকটি পুকুর সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু এলাকায় টিউবওয়েলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো ব্যবস্থা করা হবে।

ইটভাটায় ফসলি জমির মাটি by খালিদ হোসেন সুমন

নবাবগঞ্জ উপজেলায় ইটভাটাগুলোর পরিবেশ আইন মানা হচ্ছে না। সরকারি আইনকে তোয়াক্কা না করে এসব ইটভাটায় আবাদি জমির উপরি ভাগের (টপ সয়েল) মাটি সংগ্রহ করছে। শুষ্ক মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে ইটভাটায় ইট বানানোর কার্যক্রম। নবাবগঞ্জ উপজেলার ইটভাটাগুলো সরকারি নিয়ম ও আইন অমান্য করে সাধারণ কৃষককে নগদ টাকার লোভ দেখিয়ে সংগ্রহ করছে আবাদি জমির উপরি ভাগ (টপ সয়েল) মাটি। নগদ টাকা হাতে পাওয়া ছাড়াও অনেকটা বাধ্য হয়ে কৃষক তাদের আবাদি জমির মাটি তুলে দিচ্ছে ইটভাটা মালিকের কাছে। এতে করে শত শত হেক্টর আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে আবাদি জমির পরিমাণও দিন দিন কমে যাচ্ছে। হুমকির মুখে পরছে আবাদি জমি। একের পর এক হারাচ্ছে আবাদি কৃষি জমি। সরজমিনে দেখা গেছে ভূমি খেকোদের ক্ষমতার কাছে অনেকেই জিম্মি। তাদের ক্ষমতার কারণে বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক তাদের কৃষি জমির মাটি বিক্রি করছে। উপজেলার চালনাই বিলে ইরি প্রজেক্টের মাঝখান থেকে প্রতিদিন ভ্যেকু দিয়ে শত শত ট্রাক মাটি বিক্রি করছে। আবাদি ইরি প্রজেক্টের ব্যাপক ক্ষতি হলেও ক্ষমতার প্রভাবের কাছে মুখ খুলতে পারছে না সাধারণ কৃষক। টাকা আর ক্ষমতার প্রভাবে তোয়াক্কা করছে না কারো কথা। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হলেও টনক নরেনি কারো। পরিত্যক্ত অনাবাদি জমির মাটি ইটভাটায় ব্যবহার করার কথা থাকলেও তারা সহজ লভ্যে হাতের কাছে কম টাকায় পাওয়ায় সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। ইটভাটার মালিকদের দাবি প্রসাশন যদি আবাদি জমির মাটি কাটা বন্ধ করে দেয় তাহলে আমরা বাধ্য হয়ে অন্য জায়গা থেকে মাটি সংগ্রহ করবো। এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা ইউনিয়নের চালনাই এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ইটভাটা। সেই ভাটার ইট তৈরিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। মাটি কাটার কোনো অনুমতি নেই। উপজেলার বেশ কয়েকটি ইটভাটার নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই নিত্য নতুন ইটভাটা তৈরির কাজ চলছে। একদিকে ভাটার কালো ধোঁয়ায় যেমন পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তেমনি করে ক্ষতি হচ্ছে ক্ষেতের ফসল ও বিভিন্ন ফলদ এবং বনজ বৃক্ষ। এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো ভূমিকা নেই বলে জানান স্থানীয়রা।
বুধবার সরেজমিনে চালনাই ইটভাটা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বান্দুরা ইউনিয়নের মহব্বতপুর মৌজায় চালনাই চক এলাকায় প্রবাসী আলমগীরের ধানের ফসলি জমি থেকে ভেক্যু দিয়ে মাটি খনন করছে। সেখানকার শ্রমিক ও ভেক্যু চালককে জিজ্ঞেস করলে বলেন স্থানীয় মাঝির কান্দা গ্রামের আজাদ খান আমাদের জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় নিতে বলছে তাই আমরা মাটি কাটতিছি। চিত্র দেখে মনে হয়েছে প্রশাসন যেন এসবের খবরই রাখছে না। এ বিষয়ে চালনাই চকে বান্দুরা, হাসনাবাদ, মহব্বতপুর কৃষি সমবায় সমিতির ইরি প্রজেক্টের ম্যানেজার জুয়েল খান ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ক্ষমতার জোরে ভাটার মালিকরা সবাইকেই ম্যানেজ করে অবৈধ পন্থায় ব্যবসা করে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ নসিমন-মাহেন্দ্রার ধোঁয়া ও বিকট শব্দে পরিবেশে দূষণ ঘটছে। এতে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাসহ স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে বিজিব ইট কোম্পানির মালিক নাসির উদ্দিন বলেন আমাদের গ্রামাঞ্চলে ইটভাটার প্রধান বাহনই হচ্ছে নসিমন মাহেন্দ্রা। প্রশাসন যদি এসব বাহন বন্ধ করে দেয় আমরা অন্য ব্যবস্থা করব। জমির মাটি কাটার জবাবে বলেন আমরা মাটি কিনে ইট তৈরি করি। মাটি কোথায় থেকে আসে কিংবা কে দেয় সেটা দেখার বিষয় নয়। এ ব্যাপারে আমাদের বিরুদ্ধে নিউজ করলে কিছু যায় আসে না।
এবিসি কোম্পানির ভাটার আরেক মালিক তাজুল ইসলাম বলেন আমাদের পরিবেশ ছাড়পত্রে লেখা আছে কোন ফসলি জমির মাটি দিয়ে ইট বানানো যাবেনা। আমরা আজাদ খানের কাছ থেকে মাটি কিনে নিচ্ছি এখন যদি প্রশাসন মনে করে যে ফসলি জমির মাটি কাটার অনুমতি আজাদ পায়নি তাহলে আমরা আর ওই জামির মাটি কিনবো না । মাটি কাটার অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন আমি কাউকে মাটি কাটার অনুমতি দিইনি তবে এর আগে বিষয়টি আমি জেনে তাৎক্ষনিকভাবে মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরেও যদি মাটি কাটা শুরু করে থাকে খোঁজ নিয়ে তা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

তাইজুদ্দিনের মানবেতর জীবন by মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হেলালী

১৯৭১ সালে দীর্ঘ সাড়ে চার মাস মরণপণ যুদ্ধ করেও তাইজুদ্দিনের স্বীকৃতি মিলেনি আজো। তিনি দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের পালইছড়া গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে দেশ-মাতৃকার উদ্ধারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ১লা সেপ্টেম্বর ভারতের আগরতলায় যমুনা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পরবর্তীতে সেখান থেকে দেশে ফিরে অক্টোবর মাসে ৩০৩ রাইফেল পরিচালনায় দক্ষ প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করেন। তৎকালে ১১ নং সেক্টরের অধীনে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী থানার চতুল এলাকায় গ্রুপ কমান্ডার রিয়াজ উদ্দিন ভুঁইয়ার নেতৃত্বাধীন কোম্পানিতে মরণপণ যুদ্ধ করেন। স্বাধীনতার পর রিয়াজ উদ্দিন ভুঁইয়া আমেরিকা চলে যাওয়ায় তার হাতে কোনো কাগজপত্র ছিল না। এছাড়া যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কটিয়াদী এলাকা হতে তিনি সপরিবারে দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজারে চলে আসায় ওইসব কাগজপত্রের আর কোনো সন্ধানও পাননি তিনি। দীর্ঘ কয়েক বছর পর সুদূর আমেরিকা হতে মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রুপ কমান্ডার রিয়াজ উদ্দিন ভুঁইয়া সেখান থেকে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে তার যুদ্ধকালীন বিবরণ সংবলিত একটি ইংরেজিতে লেখা সনদপত্র প্রদান করলেও অদ্যাবধি অন্যান্য তালিকার কোনো হদিস পাননি তিনি। আজ তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। যুদ্ধ করেও স্বীকৃতি না পেয়ে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই এখন তার।
মুক্তিযোদ্ধা তাইজউদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, একাত্তরের অক্টোবর মাসে সকাল ৮টায় স্থানীয় চাঁদপুর গ্রামে আগুন দেয় পাক সেনারা। তৎক্ষণাত এন ইসলামসহ সঙ্গীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিরোধ করতে যাই। নিজের পরিবার পরিজন ছেড়ে জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি মুক্তিযুদ্ধে। এভাবে দীর্ঘ সাড়ে চার মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাইনি। আমি ভাতার জন্য নয় মৃত্যুর আগে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেখে মরতে চাই।

আপসের কথা জানালেন রাকায়েত

নির্মাতা ও ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি গাজী রাকায়েত এক তরুণীকে মেসেঞ্জারে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন- এমন অভিযোগে গত কিছুদিন ধরেই তোলপাড় চলছে। বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়। তবে অবশেষে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজী রাকায়েত নিজেই। মেসেঞ্জারে প্রস্তাব পাওয়া ওই তরুণী, তার বান্ধবী সংগীতা এবং গাজী রাকায়েতের মাঝে আপস হয়েছে। বিষয়টি মানবজমিনকে জানিয়ে গাজী রাকায়েত বলেন, আমার আইডি কে বা কারা হ্যাক করেছে। এখনো সেটা জানি না। তবে হ্যাক হয়েছে এমনটা প্রমাণ পাওয়ায় ওই মেয়েটি ও তার বান্ধবী সংগীতার সঙ্গে মামলা প্রত্যাহারের ব্যাপারে একটি সমঝোতা হয়েছে।
এই আপসে গাজী রাকায়েত আদাবর থানায় দায়ের করা ৫৭ ধারার মামলা এবং ভুক্তভোগী তরুণীর শ্যামপুর থানায় দায়ের করা পর্নোগ্রাফি আইনের মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। সমপ্রতি এক তরুণী ফেসবুক মেসেঞ্জারে গাজী রাকায়েতের সঙ্গে তার এক বান্ধবীর কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। যেখানে দেখা যায়, গাজী রাকায়েত ওই তরুণীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এই আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ১৬ই মার্চ রাজধানীর আদাবর থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় একটি মামলা (নং ১৮) দায়ের করেন গাজী রাকায়েত। এ নিয়ে আরো বেশি আলোচনা-সমালোচনা শুরু হওয়ায় ওই তরুণী গত ২১শে মার্চ শ্যামপুর থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে গাজী রাকায়েতের বিরুদ্ধেও মামলা (নং ২৬) দায়ের করেন।
জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের হওয়ার পর উভয়পক্ষের শুভাকাঙ্ক্ষীরা সমাধানের জন্য আলোচনা শুরু করেন। পরে গাজী রাকায়েত এবং ওই দুই নারী একসঙ্গে বসে একটি যৌথ ঘোষণার স্ট্যাম্পে সই করেন। গাজী রাকায়েত ঘোষণায় আরো বলেন, ‘আমার অভিযুক্ত ফেসবুক আইডি থেকে আমি কাউকে কোনো অনৈতিক প্রস্তাব পাঠাইনি। কে বা কারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তা হ্যাক করে আমার সম্মানহানির উদ্দেশ্যে এ ধরনের আপত্তিকর মেসেজ পাঠিয়েছে। এরপরও যেহেতু আমার আইডি থেকেই এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে তার জন্য আমি তরুণীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করছি। তবে মামলা দুটি তদন্তের জন্য এখনো সাইবার ক্রাইম ইউনিটে রয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইউনিটের কোনো কর্মকর্তা মামলা প্রত্যাহার করার বিষয়টি অবগত হননি বলে জানিয়েছেন সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধান আলিমুজ্জামান। তিনি বলেন, আমারা তো মামলা দুটি তদন্ত করে দেখছি। এখনো তাদের দিক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার কোনো তথ্য পাইনি।

কুশিয়ারার বুকে গোচারণ ভূমি by এম আর চৌধুরী মাছুম

এক কালের খরস্রোতা কুশিয়ারা এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে শাখা নদীগুলোও। সিলেটের বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে বড় বড় চর ও অসংখ্য ছোট ছোট ডুবোচর জেগে উঠেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মিঠা পানির প্রায় ৬৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে। নৌপথে পণ্য পরিবহন খরছ কম হওয়া সত্ত্বেও নাব্য না থাকায় নৌপরিবহন ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। একদিকে নদী খননের অভাবে বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর। অন্যদিকে হুমকির মুখে রয়েছে সিলেট বিভাগের বৃহত্তর হাওর হাকালুকিসহ বিভিন্ন ছোট-বড় হাওর ও জলাশয়গুলো। তাছাড়া কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে যুক্ত নদীগুলো পরিণত হয়েছে ‘মরা খালে’। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাওর এলাকার মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জেনারেল আতাউল গনী ওসমানী মন্ত্রী থাকাবস্থায় বালাগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় নদীর কিছু অংশে ড্রেজিং করেছিলেন। এতে সুফলও পাওয়া গিয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কুশিয়ারা নদীর বর্তমান চিত্র এতই করুণ মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে ছোট দ্বীপের অবয়ব নিয়ে কোনো রকম যেন জেগে আছে তার শূন্য বুক।
কুশিয়ারা নদী একদিন আপন ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল। ছোট-বড় ডলফিন, শুশুক ইলিশসহ বহু প্রজাতির মাছ যেখানে খেলা করতো। উত্তাল স্রোতে চলতো পালতোলা নৌকা। লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজ চলতো সারা বছর। ঘাটে ঘাটে ছিল নৌকার ভিড়। ছিল কুলি-শ্রমিকদের কোলাহল। কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে বালাগঞ্জ বাজার, শেরপুর ঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্চ বাজার ছিল সদা কর্মতৎপর সচল নৌবন্দর। বিস্তীর্ণ জনপদে কুশিয়ারা নদীর সেচের পানিতে হতো চাষাবাদ। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল এই কুশিয়ারা। কিন্তু এখন নদীর দিকে তাকানো যায় না। দিন দিন যেন সংকীর্ণ হয়ে আসছে তার গতিপথ। অথৈ জলের পরিবর্তে কেবল কান্নার সুরই যেন ভেসে আসে কুশিয়ারার বুক থেকে। তাইতো বছরের অধিকাংশ সময় স্রোতহীন অবস্থায় থাকছে কুশিয়ারা। তাছাড়া বিগত কয়েক বছর ধরে নদীতে চর জেগে ওঠায় প্রভাবশালী মহল বালু ব্যবসায় মেতে উঠে। আর অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে নদী পাড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।
সূত্র মতে, ১৮২২ সালে আসামে চা-শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে চালু করা হয় আসাম-কলিকাতা নৌরুট। কলিকাতা-করিমগঞ্জ ভায়া প্রায় ১২৮৫ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত কুশিয়ারা নৌপথে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে স্টিমার ও জাহাজ নোঙর করত। এর মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জ স্টিমার ঘাটে যাত্রা বিরতি ছিল অধিকতরও বেশি। তৎকালীন সময়ে কুশিয়ারা নদী দিয়ে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিস পারচালিত হতো। সেগুলো হলো ফেঞ্চুগঞ্চ-করিমগঞ্জ ডেইলি ফিডার সার্ভিস, ফেঞ্চুগঞ্জ-মৌলভীবাজার ভায়া মনু মুখ ফিডার সার্ভিস ও ফেঞ্চুগঞ্জ-মার্কুলী ফিডার সার্ভিস। এছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন লঞ্চ ও নৌ সার্ভিসতো ছিলই। যা ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়া পর্যন্ত তা চালু ছিল। কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের বরাক নদীর একটি শাখা নদী হচ্ছে কুশিয়ারা। দীর্ঘ দিন ধরে কোনো প্রকার ড্রেজিং না হওয়ায় নদী নাব্য হারাচ্ছে। কুশিয়ারার এই করুণ অবস্থায় নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অচল হয়ে পড়েছে অনেক ঘাট। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নৌপরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত সময়ে নদী ড্রেজিং করা হলে প্রতি বছর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এভাবে নদী শুকিয়ে যেত না। কুশিয়ারা-সুরমাসহ সিলেট বিভাগের সব নদ-নদীকে নৌপরিবহন চলাচলের উপযোগী করতে অবিলম্বে খননের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে সচেতন মহল দাবি জানিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল লতিফ বলেন, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় কুশিয়ারা নদীর খননের কোনো পরিকল্পনা এখনো শুরু করা হয়নি। তবে কুশিয়ারা নদীর ভাটি এলাকায় খনন প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।