Wednesday, August 21, 2024

অসমাপ্ত বিপ্লব: দুর্নীতি ও বৈষম্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে

৫ আগস্ট একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটায়। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তার সরকারের আকস্মিক পতন বাংলাদেশে একটি নতুন যুগের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গণতন্ত্রপন্থীরা নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, কিন্তু অস্থিতিশীলতা এবং সহিংসতা আগামী দিনে বৃদ্ধি পেতে পারে। যার জেরে ব্যাহত হতে পারে দেশের  অগ্রগতি। বাংলাদেশের বিপ্লব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। শুধুমাত্র একটি  টেকসই এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই ছাত্ররা যে বিপ্লব শুরু করেছিল তার সমাপ্তি ঘটতে পারে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতে সহায়ক ভূমিকা নিতে  পারে।

হাসিনার অধীনে বাংলাদেশের অগ্রগতি যেভাবে এগিয়েছে পরবর্তী সরকারকে  তা ধরে রাখতে হবে। ২০১৬ সালে প্রাণঘাতী হলি আর্টিজান সন্ত্রাসী হামলার পর, তার সরকার ইসলামিক চরমপন্থাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছিল  এবং দেশের ধর্মীয় বহুত্ববাদের  উপর জোর দিয়েছিল। পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি প্রায়শই আঞ্চলিক প্রতিযোগী ভারত ও চীনের সাথে বাংলাদেশের কঠিন ভারসাম্য রক্ষার কাজটিও পরিচালনা করে এসেছেন।

তবুও এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিকষ অন্ধকার, যা বাস্তবতাকে আড়াল করে। দুর্নীতি ও বৈষম্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। শ্রম সুরক্ষা নীতিকে  দুর্বল করেছে ।  

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়াতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রায়শই ইসলামপন্থী দলগুলোকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢুকে পড়েছে রাজনীতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্র ক্রমবর্ধমানভাবে অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে- বিরোধপূর্ণ নির্বাচন,  বিরোধীদের ওপর সরকারের  হয়রানি, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।

নোবেল বিজয়ী তথা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা  মুহাম্মদ ইউনূস নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসাবে বাংলাদেশের বিপ্লবকে পথ দেখাবেন। তার দায়িত্ব দেশের ইতিবাচক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি  গণতন্ত্রকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। গত ১৫ বছরে অপব্যবহার এবং দুর্নীতির জন্য জবাবদিহিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যা  দীর্ঘকাল ধরে শূন্য-সমষ্টির রাজনীতি দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়ে এসেছে , তাকে সমঝোতা এবং ঐকমত্যের নিয়মে আবদ্ধ করতে  হবে। রাজনৈতিক ইস্যুগুলির বাইরে, দেশের  দুর্বল অর্থনীতিরও সংস্কার প্রয়োজন।

এই  কাজ  সহজ হবে না। দেশের মাটিতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা বিশাল কাজ, বিশেষ করে একটি অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে।   যে প্রতিবাদ আন্দোলন হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তাতে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাইরেও ঐক্যবদ্ধ উদ্দেশ্যের অভাব ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র, বিরোধী দল এবং  আমলাতান্ত্রিক নেতাদের  চাপের সম্মুখীন হবে, যাদের সকলের আলাদা আলাদা এজেন্ডা রয়েছে।

তবে স্বার্থান্বেষীরা  সংস্কারে বাধা দিলে বাংলাদেশ আবারো  অস্থিতিশীল ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে পারে। বৈধ শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন কিন্তু  যদি সময়ের আগে সেটি অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীকে আবদ্ধ করতে পারে যাদের   পরিবর্তনের প্রতি আগ্রহ কম । যদি বাংলাদেশের তরুণ  বিক্ষোভকারীরা একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যানারে স্থিতাবস্থা অনুভব না করে  তাহলে আবারো  দেখা দিতে পারে অস্থিরতা। পরবর্তী সরকারের ওপর সেই ক্ষোভ গিয়ে পড়তে পারে। হাসিনার পতনের পর  রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর  আক্রমণগুলি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলতে থাকলে সেগুলি বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়রা এই পরিস্থিতিতে কি ভূমিকা নেয় তা দেখার বিষয় । ভারত তাদের দীর্ঘ পারস্পরিক সীমান্তে দিল্লির নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে আওয়ামী লীগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে। বিনিময়ে, ভারত বিতর্কিত নির্বাচন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের মধ্যে  হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিল। যা তাকে রাজনৈতিক উদারীকরণের অভ্যন্তরীণ আহ্বানের প্রতি কম প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলেছিল এবং ফলস্বরূপ দানা বেঁধেছিলো বিদ্রোহ।  যার পরিণতিতে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালান সাবেক প্রধানমন্ত্রী। চীনও তার অর্থনৈতিক স্বার্থে হাসিনাকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে সমর্থন করেছে। ভারত বা চীন  কোন দেশই সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র চায় না এবং উভয়ই এখন সতর্কতার সাথে রাজনৈতিক বিরোধীদের উত্থান প্রত্যক্ষ করতে চাইছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়, কিন্তু তার স্বার্থও এখন গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এবং দেশের সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের মূল উৎস।এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তার জন্য প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। হাসিনার অধীনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের রেকর্ড খারাপ হওয়া সত্ত্বেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রাক্তন সরকারের সাথে শক্তিশালী নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছিল এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান কৌশলগত অংশীদার হিসাবে দেখেছিল।

বাংলাদেশের উত্তরণের পথে এই  অস্থিতিশীলতা স্বল্পমেয়াদে চীন বা ভারতের স্বার্থগুলিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তবে আমেরিকার কাছে  একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কাম্য। সুষ্ঠু নির্বাচন সহ একটি স্থিতিশীল, বহুদলীয় গণতন্ত্র জবাবদিহিতার পথ প্রশস্ত করবে, দুর্নীতি ও সরকারি অপব্যবহারে রাশ টেনে  রাজনীতিকে স্থিতিশীল করবে। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজও চীনের দ্বারা প্রভাবিত। বাংলাদেশের পূর্ববর্তী বিরোধীরা প্রায়শই উদার সংস্কার এবং পশ্চিমের সাথে বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ককে সমর্থন করে এসেছে। শেষে বলতে হয়, বাংলাদেশিরা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র  রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সংলাপ এবং সমঝোতাকে উত্সাহিত করতে পারে, গণতান্ত্রিক সংস্কারে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে পারে, যুবদের ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ করতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে বাংলাদেশের সংস্কারকদের হাত শক্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনের পথটি বিপদসংকুল, কিন্তু গণতন্ত্রের শক্তিগুলো- বিশেষ করে এর তরুণরা - চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে  প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, দেশের মাটিতে জেগে ওঠা  বিপ্লব এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বছরের পর বছর সুপ্ত থাকার পর নাগরিকদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা প্রকাশ পেয়েছে। যদি এটি দমন করা হয়, তাহলে সেই ক্ষোভ আরো হিংস্রতার সাথে  ফেটে  পড়তে পারে। রাজনৈতিক ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতিগত পুনরুদ্ধারের মধ্যে জনগণের দাবিগুলিকে গুরুত্ব দেয়া  দেশকে স্থিতিশীলতা এবং  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও  এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে ।

সূত্র : ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অফ পিস

বাংলাদেশের অস্থিরতা গ্লোবাল সাউথের জন্য উদ্বেগজনক ঝড়োবাতাসের সংকেত -সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন

এ বছরের জানুয়ারিতে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় এসেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ক্রমবর্ধমান সরকার বিরোধী বিক্ষোভের তোপে গত ৫ই আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তা দক্ষিণ এশিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর প্রবণতার আশ্রয়স্থল হিসাবেও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে ২১ আগস্ট ‘বাংলাদেশ আনরেস্ট সিগনালস ট্রাবেলিং হেডউইন্ডস ফর গ্লোবাল সাউথ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চীনভিত্তিক জাতীয় দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের সাথে এক ভয়ঙ্কর সাদৃশ্য বহন করে। মাত্র দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কায় সরকার বিরোধী যে বিক্ষোভ হয়েছিল তাতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলাদেশে গত ৫ই আগস্ট সরকারের বাসভবনে বিক্ষোভকারীদের যে চিত্র দেখা গিয়েছিল ঠিক একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায়। কলম্বোর জনতা যেভাবে গণভবন এবং সংসদ দখল করে নিয়েছিলেন এ বছর ঢাকায় যেন তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

২০২৩ সালে পাকিস্তানেও একই রকম দৃশ্য দেখা গিয়েছিল উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, তখন সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীরা একটি সেনা গ্যারিসন এবং কর্পস কমান্ডারের বাসভবনে হামলা করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর তাকে গ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল পাকিস্তান।

এসব আন্দোলনের নেপথ্যে একটি সাধারণ বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক দুর্দশা। কেননা দেশগুলোতে প্রবল উন্নয়নের ঢেউ তুললেও বাস্তবে এসব উন্নয়নের পেছনে লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ ঋণের বোঝা। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান সবাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেলআউটের মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তান সম্প্রতি তার ২৪ তম আইএমএফ বেলআউটের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছে। শ্রীলঙ্কা তার ২০২২ সালের অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বেলআউটের মধ্যে রয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনৈতিক এমন দুর্দশার জন্য পশ্চিমারা চীনের অস্বচ্ছ ঋণদান এবং জোরপূর্বক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দায়ী করে থাকে। পাকিস্তানের বৈদেশিক দ্বিপাক্ষিক ঋণের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি, মালদ্বীপের ৬০ শতাংশের বেশি, শ্রীলঙ্কার ৫০ শতাংশের বেশি এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি চীন থেকে নেয়া। বেইজিং প্রকল্পের জন্য ৯৯ বছরের ইজারা পাওয়ার পর শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর প্রকল্পটি চীনের কথিত ঋণ-ফাঁদ কূটনীতির বর্ণনার সমর্থক হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা না করেই সরকারগুলো চীনের কাছ থেকে এভাবে ঋণ নিতে থাকে। রাজাপাকসের অধীনে শ্রীলঙ্কা, হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ এবং একদল সামরিক নেতার অধীনে পাকিস্তান তাদের তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জনগোষ্ঠীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না করে একের পর এক ঋণে জর্জড়িত করে দেশের জনগণকে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি সার্বিক দিক থেকে ভয়াবহ রকমের ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানের বেশ কিছু দেশ বৈদেশিক রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরশীল। ২০২২ সালে নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং ২০২১ সালে পাকিস্তানের প্রায় ১০ শতাংশ প্রবাসী আয় থেকে অর্জন করেছিল। অর্থনীতি প্রধানত শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হলেও পর্যটন খাত থেকেও কিছু আয় করে শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীনরা। তারা এর জনমতের ওপর নির্ভর করে। যদিও ভারতের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভূমিধস জয় পাবে বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। যাইহোক, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আন্দোলনের ইন্ধনদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ৫ কোটির বেশি সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী রয়েছে যা মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। এছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী প্রায় ২ কোটি। বিশাল এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সম্ভবত বাংলাদেশের সরকারের ক্ষমতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ফলত তারা আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছিল।

দিক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ তরুণরা, যাদের বেশির ভাগই বেকার। বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১৮ মিলিয়ন তরুণ কোন কাজ করছে না। অন্যদিকে লেখা পড়া শেষ করে ৪ লাখের বেশি নাগরিক সরকারি চাকরিতে মাত্র ৩ হাজার পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই পরিসংখ্যানের ওপর নজর দিলেই অবাক হতে হবে না যে, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থাই হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে অপসারণে বাধ্য করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন তরুণদের নিয়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এখানের দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশই ১৮ বছর বয়সী তরুণ। কার্যত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় একটি প্রচ্ছন্ন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দেশগুলো। এমনকি ভারতেও একই অবস্থা। যদিও দেশটিকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতির দেশ হিসেবে চিন্তা করা হয়। ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনের বিস্ময়কর ফলাফল দেশের তরুণদের উচ্চ বেকারত্ব ক্রমবর্ধমান বৈষম্য তৈরি করছে। তরুণদের এভাবে বেকার রেখে ক্ষমতা টিকে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ রকমের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

যুদ্ধবিরতিতে ফের শর্ত জুড়ে দিলেন নেতানিয়াহু, সমালোচনা মার্কিন কর্মকর্তার

মানবজমিনঃ গাজায় যুদ্ধবিরতিতে আবারও শর্ত দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই শর্তের সমালোচনা করেছেন উচ্চপদস্থ মার্কিন এক কর্মকর্তা। তিনি নেতানিয়াহুর শর্তকে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের জন্য গঠনমূলক নয় বলে উল্লেখ করেছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর সাথে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে এক বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন। বৈঠকে নেতানিয়াহু গাজায় তার সেনা বহালের শর্ত দিয়েছেন। সোমবার ব্লিঙ্কেনের সাথে যুদ্ধবিরতির বৈঠকের পর জিম্মিদের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎকালে এমন শর্তের কথা উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু। স্থানীয় গণমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, নেতানিয়াহুর এমন শর্তের ফলে এর আগে বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিরতির আলোচনা পিছিয়ে যায়। কেননা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনের প্রস্তাব হচ্ছে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।

গত দশ মাসের বেশি সময় ধরে গাজায় যে নৃশংসতা চালাচ্ছে ইসরাইল তা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ক্রমাগত চাপ অব্যাহত রেখেছে মধ্যস্থতাকারী দেশ মিশর এবং কাতার। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত সোমবার নেতানিয়াহুর সাথে জেরুজালেমে তিন ঘণ্টা ব্যাপী একটি বৈঠক করেছেন। ব্লিঙ্কেন বলেছিলেন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে হামাস এবং ইসরাইল যুদ্ধবিরতির কাছাকাছি অবস্থান করছে। কিন্তু ইসরাইলের মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী পরে জিম্মি পরিবারের একটি বৈঠকে বলেছিলেন যে তিনি ব্লিঙ্কেনকে অবগত করেছেন যে এই চুক্তিতে অবশ্যই ইসরায়েলি সৈন্যদের গাজায় থাকতে দিতে হবে। নেতানিয়াহু ‘সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল’ হিসাবে তার এ সিদ্ধান্তের কথা বর্ণনা করেছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় মিডিয়া।

বিবিসি বলছে নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য মার্কিন প্রশাসনকে বিরক্ত করেছে বলে মনে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য দেখেছি। বিশেষ করে তিনি যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে যে শর্ত দিয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত আছি। এ বিষয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা। তবে তিনি বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এবং যুক্তরাষ্ট্র যে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তা হল গাজায় তাদের চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে একমত হতে হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, এক্ষেত্রে হামাস যদি নতুন এই প্রস্তাবে রাজি হয়, তাহলে আমরা আশা করি আলোচনা সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া যাবে। আমি মনে করি নেতানিয়াহু যে মন্তব্য করেছেন তাতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবনা জোরালো হবে না। কেবলমাত্র তখনই এই আলোচনা অগ্রসর হবে যখন উভয় পক্ষই আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হবে।

বাবার সই জাল করে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন সৌদির যুবরাজ, প্রকাশ্যে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে।  সম্প্রতি সৌদির প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সাদ আল-জাবরি দাবি করেছেন যে, মোহাম্মদ বিন সালমান তার বাবা বাদশাহ সালমানের স্বাক্ষর জাল করে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। মোহাম্মদ বিন সালমান এখন সৌদি আরবের শাসক। তিনি তার ৮৮ বছর বয়সী পিতার পরিবর্তে এখন বিশ্বব্যাপী নেতাদের সাথে দেখা করেন। এদিকে, এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন যুবরাজ মোহাম্মদের অবস্থান সৌদি আরবে শক্তিশালী হলেও তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্ন এবং অভিযোগগুলি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু দাবি তোলা হচ্ছে যে, ক্রাউন প্রিন্স তার বাবার স্বাক্ষর জাল করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এমতাবস্থায়, এই বিষয়টি সৌদি আরবের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। সম্প্রতি এনিয়ে একটি ডকুমেন্টারির থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে বিবিসি। তাদের রিপোর্টে বলা হয়, এই অভিযোগ করেছেন সৌদির আরেক যুবরাজ মোহাম্মদ  বিন নায়েফের (এমবিএন)তৎকালীন উপদেষ্টা সাদ আল-জাবরি। এই সাদ আল-জাবরি একসময় সৌদি সরকারের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। প্রাক্তন উপদেষ্টা সাদ আল-জাবরি বলেন, ওই সময় সৌদি প্রশাসনের প্রতিরক্ষা বিভাগের দায়িত্ব ছিল মোহাম্মদ বিন সলমানের (এমবিএস) হাতে।

ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের দমাতে আমেরিকার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সেনা পাঠিয়েছিল সৌদি আরবও। আর সেটার অনুমোদন আসে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে। তাতে জালিয়াতি করেন বিন সলমান। ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ হুথি  বিদ্রোহীদের হামলার মুখে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর আল হাদি ক্ষমতা ছেড়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। তখন ক্ষমতাচ্যুত এই প্রেসিডেন্টকে সামরিক সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে সেই লড়াইয়ে মোট ৪ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। ঘরছাড়া হন ৪৫ লক্ষ। এর মধ্যেই ২০১৭ সালে সৌদি আরব থেকে পালিয়ে কানাডা চলে যান সাদ আল-জাবরি।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

৯১ বছর বয়সে ষষ্ঠ বিয়ের দুই মাস পরেই মারা গেলেন, কে এই বিলিয়নিয়ার

কনে ৪২ বছর বয়সী সিমোন রাইল্যান্ডার, বর ৯১ বছর বয়সী অস্ট্রীয় ধনকুবের রিচার্ড রিচার্ড লুগনার। ১ জুন ভিয়েনা সিটি হলে এই জুটি সারলেন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। সেটা ছিল লুগনারের ষষ্ঠ বিয়ে। সেদিনই লুগনার সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, এটিই তাঁর শেষ বিয়ে। এর মাত্র দুই মাস পর আগস্টের ১২ তারিখে মারা যান তিনি। রিচার্ড লুগনার মারা যাওয়ার পর স্ত্রী সিমোন তাঁর স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে লেখেন, ‘তুমি ছিলে আমার জীবনের স্বপ্ন। আর যখন আমি তোমার চোখের মাঝে নিজের প্রতিবিম্ব দেখেছি, তখনই বুঝেছিলাম যে আমি তোমার হয়ে গেছি।’

কিমের সঙ্গে ৫ কোটি টাকায় এক সন্ধ্যা

মৃত্যুর পরে নতুন করে আলোচনায় এই ধনকুবের। আলোচনার বিষয়, তারকা নারীদের সঙ্গে তাঁর বর্ণময় জীবন। রিচার্ড লুগনার প্রায়ই ভিয়েনা স্টেট অপেরা হাউসে পছন্দের নারীদের সঙ্গে সন্ধ্যা উপভোগ করতে পছন্দ করতেন। বছরে অন্তত একবার নামীদামি তারকাকে ডেকে আনতেন। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রচারণাও হয়ে যেত। একটা সন্ধ্যা কাটাতে যদি খরচ হয় ৫ লাখ ডলার বা ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, সেটা কি একটু বেশি বেশি মনে হয়? লুগনারের কাছে অবশ্য তা মনে হতো না।

২০১৪ সালে তিনি মার্কিন মডেল কিম কার্ডাশিয়ানের সঙ্গে এক সন্ধ্যা উপভোগ করেন। কিম লুগনারের ভালোবাসার কথা শোনেন। নাশতা করেন। একসঙ্গে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে পোজও দেন। তবে লুগনারের ইচ্ছা ছিল কিমের সঙ্গে নাচবেন। সেটা আর হয়নি। পরে কিমের সঙ্গে সান্ধ্য–আড্ডার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘নাচ হলো না। কিম বিরক্তিকর।’

কিম কার্ডাশিয়ান, পামেলা অ্যান্ডারসনসহ জোয়ান কলিন্স, জেন ফন্ডা, প্যারিস হিলটনকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা গেছে লুগনারের সঙ্গে। ফেব্রুয়ারিতেও ভিয়েনা অপেরায় এলভিস প্রেসলির সাবেক স্ত্রী প্রিসিলা প্রেসলির সঙ্গে বল নাচে অংশ নিতে দেখা গিয়েছিল রিচার্ড লুগনারকে। সেই সময়ও তাঁর শরীরের অবস্থা বিশেষ ভালো ছিল না। কয়েকটি অস্ত্রোপচারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল তার কয়েক দিন আগে।

কীভাবে এত ধনী হয়ে উঠেছিলেন লুগনার

রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মধ্য নিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছেন লুগনার। ১৯৭৫ সালে লুগনার তাঁর প্রথম বড় প্রকল্প ‘ভিয়েনা ইসলামিক সেন্টার’ নির্মাণের কাজে হাত দেন। আইনি বাধা পেরিয়ে ১৯৭৭ সালের ১ জুলাই নির্মাণকাজ শুরু করেন লুগনার। ১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর কাজ শেষ হয়। অস্ট্রিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মসজিদটির উদ্বোধন করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি লুগনারকে।

ধীরে ধীরে তাঁর নামের আগে যুক্ত হয় ‘কনস্ট্রাকশন টাইকুন’। লুগনারের সবচেয়ে দামি সম্পত্তির মধ্যে একটি হলো ভিয়েনার ‘আইকনিক লুগনার সিটি শপিং সেন্টার’। ১৯৯০ সালে তিনি এটি তৈরি করেছিলেন।

বিবাহিত জীবন কেটেছে অস্থিরতায়

লুগনার তাঁর জীবনে ছয়বার বিয়ে করেছিলেন। তবে লুগনারের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কসহ নানা কারণে দাম্পত্য কলহ ছিল তাঁর সংসারের সব সময়ের সঙ্গী। আর এসব সম্পর্ক নিয়ে লুগনার নিজেই কথা বলেছেন গণমাধ্যমের সঙ্গে। অবশ্য এর ফলে ‘নেগেটিভ পাবলিসিটি’ বা দুর্নামের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রচারও হয়েছে দেদার।

১৯৬১ সালে ক্রিস্টিন জিমিনারকে বিয়ে করেন লুগনার। প্রথম বিয়ে টিকেছিল ১৭ বছর। ১৯৭৮ সালে বিচ্ছেদ হয় ক্রিস্টিনের সঙ্গে। পরের বছর ১৯৭৯ সালে কর্নেলিয়া লাফার্সওয়েলারকে বিয়ে করেন লুগনার। এই বিয়ে টিকেছিল মাত্র চার বছর। দ্বিতীয় বিবাহবিচ্ছেদের এক বছর পেরোতে না পেরোতেই ১৯৮৪ সালে সুজান ডিট্রিচের সঙ্গে বিয়ে হয় এই ধনকুবেরের। পাঁচ বছর পর ১৯৮৯ সালে এই দম্পতি আলাদা হয়ে যান।

লুগনার তাঁর চতুর্থ স্ত্রী ক্রিস্টিনা লুগনারের সঙ্গে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১৭ বছর সংসার করেন। ২০১৪ সালে তিনি পঞ্চমবার গাঁটছড়া বাঁধেন মডেল ও অভিনেত্রী ক্যাথি স্মিতজের সঙ্গে। লুগনার ও ক্যাথির বয়সের পার্থক্য ছিল ৫৭ বছর। এই দম্পতি মাত্র ২ বছর পরেই ২০১৬ সালে বিবাহবিচ্ছেদ করেন।

২০২১ সালে সিমোন রাইল্যান্ডারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেন রিচার্ড লুগনার। ২০২৩ সালে তাঁরা বাগদানের আনুষ্ঠানিকতা সারেন। মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে সিমোনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। এই সিমোনই এখন রিচার্ডের সিংহভাগ সম্পদের মালিক।

লুগনারের সম্পদ এখন কারা ভোগ করছেন

২০২২ সালের হিসাব অনুসারে, রিচার্ড লুগনার ২০০ মিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকার মালিক। লুগনার বেঁচে থাকতে তাঁর সবচেয়ে দামি ভবন ‘আইকনিক লুগনার সিটি শপিং সেন্টার’–এর মালিকানা ষষ্ঠ স্ত্রী সিমোন রাইল্যান্ডারের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন। মৃত্যুর পর আইন অনুসারে স্ত্রীই এখন এই শপিং সেন্টারের একক মালিক। এ ছাড়া লুগনার চার সন্তানের পিতা। এঁরা হলেন আলেকজান্ডার, আন্দ্রেয়াস, নাদিন জেনিন ও জ্যাকলিন লুগনার। লুগনার এর আগে দ্য ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই সন্তানদের জন্যও তিনি পর্যাপ্ত সম্পদ রেখে গেছেন। লুগনার বলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর যা থাকবে, তা সবার জন্য যথেষ্ট। এমনকি যথেষ্ট থেকেও বেশি।’

আহনাফদের রক্তে নবযাত্রা, ব্যর্থতার সুযোগ নেই by সাজেদুল হক

পুরনো মানচিত্র। নতুন ছবি। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি। বহুত্ববাদ আর সাম্যের গান। মুক্তির আনন্দ, হারানোর হাহাকার। নতুন শুরুর স্বপ্ন। যেন ঠিক মুক্তিযুদ্ধের পরের দিনগুলোর গল্প। আমার মতো অনেকের ট্রমা অবশ্য এখনো কাটেনি। ক’দিন ধরেই লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না।

রোববারের কথাই যেমন বলি। মাথায় পুরো লেখা গুছিয়ে এনেছি। এমন সময় হানা দিলো একটি ছবি। বিএএফ শাহীন কলেজের কক্ষ। পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। একটি টেবিলে কিছু ফুল। কাগজে লেখা- শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফ। এখানে ১৭ বছরের এই তরুণের থাকার কথা ছিল। কিন্তু থাকতে পারেনি। ৪ঠা আগস্ট মিরপুর-১০ নাম্বারে গুলিতে নিহত হয় আহনাফ। তার মতো এমন অনেকেই আর শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি। তারা আর কোনো দিন পারবেনও না। তাদের সংখ্যা কতো আমরা নিশ্চিত করে জানি না। এই শহীদদের ছবি দেখে, এদের গল্প পড়ে ঠিক থাকা যায় না। কিংবা সে ছবিটার কথা। একটি ছেলের গুলিবিদ্ধ হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। কিন্তু তার চোখে-মুখে হাসি। বলছে, ‘লাগলে আবার যামু। দরকার হলে আরেকটা হাত হারামু।’ চোখের পানিতে লেখা এগোতে চায় না।

১৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট। অপরিসীম আত্মত্যাগের এক ইতিহাস তৈরি করেছে বাংলার তরুণেরা। মুক্তিযুদ্ধের পর যা আগে কখনো ঘটেনি। ছাত্র-জনতার বলিদান একদিকে তৈরি করেছে বেদনার পাহাড়। অন্যদিকে, নতুন এক দেশের স্বপ্ন। এমনই এক পটভূমিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুরুতে তিনি রাজি ছিলেন না। শিক্ষার্থীদের বারবার অনুরোধে সায় দেন। শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্যও তৈরি হয়েছে। কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে আপত্তি জানানো হয়নি।

এটা সারা দুনিয়াতেই ঘটেছে। বিপ্লবের পর এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি আর অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টা ভিনদেশি কূটনীতিকদের কাছে দেয়া বক্তব্যে তার সরকারের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট করেছেন। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন যে সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে সেটা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সংস্কারের পর একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কিছু সুপারিশ রাখতে চাই সব মহলের প্রতি।

আগেই বলেছি, অপরিসীম ত্যাগ আর তিতিক্ষার বিনিময়ে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। কতো ছাত্র-জনতা এ সংগ্রামে নিহত হয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শহীদদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়নে সরকারকে কাজ করতে হবে। তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। বহু মানুষ চোখ হারিয়েছেন। আহতদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। অবশ্য  এরইমধ্যে এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় কখনো কখনো হয়তো কিছুটা কঠোরতারও প্রয়োজন হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পটভূমিতে কেউ কেউ সুযোগ নেয়ার চেষ্টাও করছেন, বিশেষত সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা। কারিগরি ত্রুটি না থাকলেও কর্মচারীদের ধর্মঘটের কারণে মেট্রোরেল এ লেখার সময় পর্যন্ত চালু করা যায়নি। এমন অনেকেই দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে যৌক্তিক হলে মেনে নেয়া এবং অযৌক্তিক হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

সরকারের এখন প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানো। অর্থ, পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে দেশসেরা মানুষরা কাজ শুরু করেছেন। যদিও তারা অর্থনীতিকে খুবই বাজে অবস্থায় পেয়েছেন। ব্যাংকগুলো ভেঙে পড়েছে। এস আলম গ্রুপ একাই প্রায় পুরো ব্যাংক খাত খেয়ে ফেলেছে। এ গ্রুপ তাদের নিয়ন্ত্রিত ছয়টি ব্যাংক থেকেই ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এরসঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটিও খেয়াল রাখতে হবে নতুন কোনো এস আলমের যেন জন্ম না হয়। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এরইমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর  পদক্ষেপ নিতে হবে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ফেরাতে হবে। পুলিশে দুর্নীতি যেন কিছুতেই না ফেরে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান সরকারের প্রধানতম ম্যান্ডেট হচ্ছে জুলাই-আগস্ট হত্যাসহ গুম-খুনে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা। সরকারকে সে কাজ করতে হবে আইনের যথাযথ অনুসরণে। জুলাইয়ে কী হয়েছে তা একেবারেই স্পষ্ট। ভিডিও প্রমাণ করে কীভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমালোচিত বা বিতর্কিত আইনে বিচারের ক্ষেত্রে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করাই উত্তম। যেন কেউ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। গণহারে মামলা না করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা হওয়া উচিত। জুলাই-আগস্ট হত্যা, গুমে যারা স্ট্রাকচারে জড়িত ছিলেন তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে বন্দিদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। গল্প না সাজিয়ে সত্য তথ্য প্রচার করতে হবে। অভিযুক্তরা যেন আইনজীবী নিয়োগসহ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান তা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে তার কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে।

প্রধান উপদেষ্টা নিজেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। স্বৈরশাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। বিশেষত নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে সৎ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এমন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে হবে যাতে অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পথ কেউ বন্ধ না করতে পারে। বিচারবিভাগে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের স্থান দিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর করতে হবে।

ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। শুধু অতীতের দুর্নীতির বিচার করলেই চলবে না। এখনো কারও বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত বিচার করতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, রাস্তায় কাউকে ঘুষ নিতে দেখা যাচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টা মিডিয়াতেও সংস্কারের কথা বলেছেন। এটি কীভাবে সম্ভব সে ব্যাপারে তিনি নিরপেক্ষ, সৎ সাংবাদিকদের পরামর্শ নিতে পারেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাধা দেয়া কালাকানুন বাতিল করতে হবে। মুক্ত সাংবাদিকতার বিকল্প কিছু নেই। সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তার গ্যারান্টি দিতে হবে।

আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই যোগ দিয়েছে। কিন্তু এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সমন্বয়করা এ আন্দোলনের মুখ। ইতিমধ্যে তারা ইতিহাস তৈরি করেছেন। তবে বিপ্লব শেষ হয়ে যায়নি। বিপ্লব পূর্ণ করার জন্য তাদের সামনে আরও অনেক পথ রয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধেও যদি কোনো অভিযোগ আসে তাদের তা শুনতে হবে। অভিযোগের সুরাহা করতে হবে দ্রুত।

এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা ঘটা উচিত হয়নি।  যেমন: সমন্বয়করাই এটা নিশ্চিত করেছেন যে, কারও মোবাইল চেক করা, ব্যাগ চেক করার অধিকার অন্যদের নেই। আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন, বই পোড়ানোর মাঝে, ভাঙচুরের মাঝে কল্যাণ নেই। প্রয়োজন নতুন সৃষ্টির।
রাজনীতিবিদের বুঝতে হবে, তরুণরা কী চায়। নিজ নিজ দলে সংস্কার আনতে হবে তাদের। দলের নামে যারা অপরাধে জড়িয়েছে, জড়াচ্ছে তাদের বাদ দিতে হবে।

শেষ কথা: এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর নবযাত্রা শুরু করেছে দেশ। এই যাত্রায় ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। নতুন দেশ, নতুন রাষ্ট্রের বিনির্মাণ চান সবাই। বিপ্লব যেন আর কোনো দিন বেহাত না হয়। শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার হোক নয়া বাংলাদেশের ভিত্তি।

কার দায় কতো? by মো. আল-আমিন

দেশের ইতিহাসে একতরফা নির্বাচনের যেসব নজির রয়েছে তার মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অন্যতম। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই বিতর্কিত নির্বাচনের আয়োজন করে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে হওয়া ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। ওই সংসদের মেয়াদ পূর্তির পর ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। এ নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নির্ধারিতসংখ্যক ভোট কেটে নেয়ায় ওই নির্বাচন আখ্যা পায় রাতের ভোট হিসেবে। রাতে ভোটে গঠিত সংসদ ও নির্বিঘ্নে ৫ বছর পার করে। ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন। এই নির্বাচন বয়কট করে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় থেকে নিজেদের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর বাইরে দলের নেতাদেরই ডামি প্রার্থী করে প্রায় সব আসনে। নিজের দলের নেতাদের মাঝেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় নির্বাচনে।

এ কারণে এই নির্বাচন পরিচিত হয় ডামি নির্বাচন হিসেবে। বলা হয়ে থাকে দশম সংসদ নির্বাচন এক তরফা ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আয়োজন করে রকিব কমিশন আওয়ামী লীগকে বিনা ভোটে দেশ চালানোর লাইসেন্স দেয়। এরপর থেকেই দলটি বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওই নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় পরের দুই নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন একতরফা ও একপেশে হয়ে পড়ে। একে একে ভেঙে পড়ে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়েন ভোটাররা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মত স্বাধীন কমিশন হয়েও সরকারি দলের আজ্ঞাবহ এবং তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করে পর পর তিনটি নির্বাচন কমিশন দেশকে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে নিপতিত করে। দেশকে এই অবস্থায় নেয়ার পেছনে তিনটি কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই দায়ী। নির্বাচন কমিশন সঠিক ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর এখন যেসব ঘটনার বিচারের দাবি উঠছে তিনটি নির্বাচন কমিশনে থাকা সবার দায় নিরুপণ করে বিচারও জরুরি।

বিনা ভোটের নির্বাচন
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বিরোধী দলবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল, তা এই কমিশন ধ্বংস করে দেয়। নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ না থাকলেও বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে রকিবউদ্দীন কমিশন। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট ও তাদের শরিক দলের প্রার্থীরা ভোটের আগেই ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এতে ভোটের আগেই সরকার গঠনের আসন পেয়ে যায় আওয়ামী লীগ। এছাড়া এতে পাঁচ কোটির বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারায়। এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়। আর জাতীয় পার্টি ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি, জাসদ (ইনু) ৫টি, তরীকত ফেডারেশন ২টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ২টি, বিএনএফ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসনে জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে (১৪৭টি আসনে) ভোট প্রদানের হার দেখানো হয় ৪০ দশমিক ০৪ ভাগ। নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৃতীয় দফা সরকার গঠিত হয়। এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে সংসদে বিরোধী দল বানানো হয়। একই সঙ্গে দলটি থেকে মন্ত্রীও করা হয় এবং এরশাদকে বানানো হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। জাতীয় পার্টি আসলে সরকারের অংশ নাকি বিরোধী দল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে এই কমিশনের দায় সবচেয়ে বেশি।

রাতের ভোট
২০১৪ সালের মতো ২০১৮ সালেও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ-সংশয় ছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র সঙ্গে আরও কিছু দল যুক্ত হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ আরও কিছু দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপ করেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এমন প্রেক্ষাপটে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৫৮টি আসন পায়। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো ৮টি আসনে জয়ী হয়। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি পায় মাত্র ৬টি আসন। এছাড়া গণফোরাম ২টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসনে জয়ী হন। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয় ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় মোট ভোটের ৭৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিএনপি পায় মাত্র ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট। একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ এবং ১ হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে ৯৬ শতাংশের ওপর ভোট পড়ে। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৫টি আসনের ৫৮৬টি কেন্দ্রে যতগুলো বৈধ ভোট পড়ে তার সবগুলোই পেয়েছে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। এসব কেন্দ্রে ধানের শীষ কিংবা অন্য প্রার্থী কোনো ভোটই পাননি।

এ নির্বাচনে ভোটের পরিস্থিতি ও ফলাফল যে স্বাভাবিক ছিল না, তা হুদা কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদার তার নির্বাচননামা বইয়ে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, জনগণের কাছে একাদশ সংসদ নির্বাচন রাতের নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল রাতের ভোট। বিএনপি এবং তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক প্রার্থী ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্র নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ ছিল, রাতেই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরেন। আগের রাতে সিল মারার সত্যতা গণমাধ্যমেও উঠে আসে।

ডামি নির্বাচন
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে একটি ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনও ছিল বিতর্কিত। এমন বাস্তবতায় ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি একতরফাভাবে এই নির্বাচন আয়োজন করে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।  সাড়ে ৭ মাস আগে আয়োজিত এই নির্বাচনও বয়কট করে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে বিভিন্ন আসনে বিরোধী প্রার্থী হিসেবে ডামি প্রার্থী (নকল) দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

এই নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পর্যাবেক্ষক সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) তাদের প্রতিবেদনে বলে, বিরোধীদের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে আগের তুলনায় সহিংসতা কম হলেও মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। অন্যদিকে এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আরেকটি বিতর্কিত বিষয় ছিল ভোটের অস্বাভাবিক হার। নির্বাচনের দিন সকাল থেকে প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও ৪১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের দিন ৩ দফা ভোটের শতকরা হার ঘোষণা করে ইসি। সেই হিসাব অনুযায়ী দুপুর ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত গড়ে সাড়ে ১৮ শতাংশ ভোট পড়ে। এরপর বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানানো হয়। অর্থাৎ প্রায় ৩ ঘণ্টায় ভোট বাড়ে ৮ শতাংশ। সে হিসাবে ঘণ্টায় ভোট প্রদানের হার ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সকাল ৮টায় শুরু হওয়া ভোটে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে এসে কমিশন জানায়, ভোট পড়েছে ১৮ শতাংশ। সে হিসাবে ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পড়ে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট প্রদানের হার সবচেয়ে বেশি থাকে। তারপর এই হার কমতে থাকে। বিশেষ করে বিকাল ৩টার পর হাতেগোনা ভোটার ভোট দিতে আসেন। নির্বাচন কমিশনের দেয়া হিসাবেও দেখা গেছে দুপুর ১২টার পর থেকে ৩টা পর্যন্ত ঘণ্টায় ভোট প্রদানের হার ছিল ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কিন্তু শুধু শেষ এক ঘণ্টায় ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। অর্থাৎ ১ কোটি ৭৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮৮ জন ভোটার ভোট শেষ হওয়ার পূর্বের এক ঘণ্টায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনোই দেখা যায়নি। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এ নির্বাচনে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়তে পারে। মানুষ ভোট দিতে যায়নি।

কার কতো দায়?
দেশের চলমান সংকটের জন্য গত তিনটি নির্বাচন কমিশনকেই দায় দিচ্ছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই তিন কমিশনের কারণেই এতো মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সংকটে পড়তে হয়েছে। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন যদি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের (আওয়ামী লীগের) মধ্যে ধারণা তৈরি হলো যে, তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এবং পারবে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন রাতের ভোট আয়োজন করে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করেন। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এই তিন কমিশনই দায়ী। তারা বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে যেকোনো নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনটা যদি না হতো তাহলে আজকের ঘটনা ঘটতো না। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করার দায়ে এই তিন কমিশনেরই বিচার হওয়া উচিত।

সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান এ বিষয়ে বলেন, শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সদিচ্ছা প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন সরকার চাইলেই কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। নির্বাচন কমিশন যতগুলো ভালো নির্বাচন করেছে, সেগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের ব্যর্থতা আছে। আমরা বলতে পারি তারা পদত্যাগ করলো না কেন? তবে সেটাও চিন্তা করতে হবে যে, তখন পদত্যাগ করার মতো পরিস্থিতি থাকে কিনা। আমি পদত্যাগ করার পর যদি আয়নাঘরে যেতে হয়, নিপীড়নের স্বীকার হতে হয়। এগুলোও বিবেচনা করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, সংকটের জন্য কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের দায় সবচেয়ে বেশি। তারা যদি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত করতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

শেখ হাসিনা কেন বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবেন না by ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা সংক্রান্ত আইন পরিচালিত হয় প্রধানত: জাতিসংঘের একটি রিফিউজি বিষয়ক সনদ দ্বারা। আর সেই সনদটি হলো Convention relating to the Status of Refugees 1951. এই সনদ হচ্ছে আশ্রয় প্রার্থনা করা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন। বৃটেন এই সনদের দস্তখতি দেশ (signatory country)। আর সে হিসেবে বৃটেনের এসাইলাম সম্পর্কিত আইন ঐ সনদ থেকে অনুসৃত। আন্তর্জাতিক এই সনদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে (In harmony with) বৃটেনে অভ্যন্তরীণভাবে কিছু আইন করা হয়েছে। তাছাড়া উচ্চ আদালতে বিভিন্ন মামলায় দেয়া রায় থেকে কেইস ল' তথা precedent (নজীর) ডেভেলাপ করেছে। এগুলোই হলো বৃটেনে আশ্রয় প্রার্থনা সংক্রান্ত আইনের মূল ভিত্তি।

মোট পাঁচটি কারণে কোনো ব্যক্তি তার নিজ দেশে নিরাপদ না থাকলে দেশ থেকে বের হয়ে অন্য নিরাপদ দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারেন। পাঁচটি কারণের মধ্যে একটি হলো Seeking asylum based on political opinion (রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে আশ্রয় চাওয়া) বা সহজ কথায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা।

বাংলাদেশে সফল গণ-অভ্যূত্থানের পর ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে তার চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায় হবে, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পরিষ্কারভাবেই জানিয়েছেন যে, শেখ হাসিনার জন্য ভারত শেষ গন্তব্য নয়।

তাহলে কোথায় যাবেন শেখ হাসিনা? অনেকে জল্পনা-কল্পনা করছেন যে, তিনি হয়তো বৃটেনে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। এই জল্পনা-কল্পনার কারণ হলো শেখ হাসিনার ছোটবোন ও বোনের মেয়ে বৃটেন থাকেন।

আসলে কি শেখ হাসিনা বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করবেন? করতে পারবেন? করলে পাবেন? অনেকে না বুঝেই বলেন যে, শেখ হাসিনা হয়তো এসাইলাম ভিসা নিয়ে বৃটেনে আসতে পারেন। এসাইলাম ভিসা নিয়ে বৃটেনে আসার কোনো নিয়ম বা আইন নেই। অথবা এসাইলাম ক্লেইম করার জন্য আগাম জানিয়ে কোনো ভিসায় আসারও আইন নেই।

জাতিসংঘের সনদ ও বৃটেনের অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থী তার নিজ দেশ থেকে সরাসরি বৃটেনে এসে বৃটেনের পোর্ট বা এয়ারপোর্টে তাৎক্ষণিকভাবে অথবা বৃটেনে ঢুকে প্রথম সুযোগেই (at earliest opportunity) রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করতে হয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করেছেন। ভারত তার জন্য একটি নিরাপদ দেশ। সেখান থেকে বৃটেনে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সনদ, বৃটেনের অভ্যন্তরীণ আইন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বলা যায় যে, চারটি কারণে শেখ হাসিনা বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবেন না বা আবেদন করলেও তা মঞ্জুর হবার সম্ভাবনা নেই। চলুন কারণগুলো দেখি:

প্রথমত: জাতিসংঘের রিফিউজি সনদ ও বৃটেনের আইন অনুযায়ী কোনো আশ্রয়প্রার্থী (asylum seeker) তার নিজের দেশ থেকে বের হয়েই যে নিরাপদ দেশে যাবেন তাকে সেখানেই আশ্রয় চাইতে হবে। এটাকে বলে Safe Third Country (নিরাপদ তৃতীয় দেশ)। ঐ নিরাপদ তৃতীয় দেশ হয়ে বা ঐ দেশ থেকে এসে বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে তা নাকচ করে ঐ নিরাপদ তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। শেখ হাসিনার জন্য Safe Third Country হচ্ছে ভারত এবং তিনি সে দেশে গিয়েই উঠেছেন বা আশ্রয় নিয়েছেন। সুতরাং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিৎ। ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা না করে বৃটেনে এসে করতে চাইলে আইন অনুযায়ী তা নাকচ করা হবে অথবা ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হবে অথবা ভারত থেকে বৃটেনে ঢুকতে বা আবেদন করতেই দেয়া হবে না। Safe Third Country - এ ব্যাপারে বৃটেনে settled law আছে। এ ব্যাপারে Section 80B and 80C of the Nationality, Immigration and Asylum Act 2002 and Paragraph 327F of the Immigration Rules -এ বিস্তারিতভাবে বলা আছে। এ ছাড়া Safe Third Country সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে উচ্চ আদালতের বহু নজির (Precedent) ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত: উপরের আইন বা নিয়মের বাইরে গিয়েও যদি বৃটিশ সরকার কোনো কিছু করতে চায় তাতেও সমস্যা আছে। এখানে national interest (জাতীয় স্বার্থ) বা public interest (জনস্বার্থ) সম্পর্কিত বিষয় আছে যা বৃটিশ সরকারকে তাদের বিবেচনায় নিতে হবে। শেখ হাসিনাকে বৃটেনে আশ্রয় দিলে তাকে নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা (security and protection) দিতে বৃটিশ সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে। বৃটেনে অর্ধ মিলিয়ন থেকে এক মিলিয়ন বাংলাদেশির বসবাস। গত ১৫-১৬ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভিকটিম হচ্ছেন বৃটেন প্রবাসী অনেকেই। গত দেড় দশকে বিশেষ করে ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বৃটেন প্রবাসী অনেকের আত্মীয় স্বজন নিহত, আহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত দেড় যুগে দেখা গেছে বাংলাদেশের বাইরে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রতিবাদ হয়েছে লন্ডনে। শেখ হাসিনা স্বয়ং লন্ডনে আসলে কেবল বিএনপির মারমুখী প্রতিবাদে অস্বস্তি অনুভব করেছেন একাধিকবার। পুলিশকে অনেক সময় এ সব মিটিং-মিছিল নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়।

এমতাবস্থায় শেখ হাসিনাকে বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিবাদের মাত্রা আরও বাড়বে নি:সন্দেহে। সম্প্রতি ছাত্র বিক্ষোভে বৃটেনে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি সমর্থন যেমন দিয়েছেন, তেমনি শেখ হাসিনার বিচারের দাবিতেও তারা সোচ্চার হয়েছেন। সুতরাং এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বৃটেনে শেখ হাসিনার উপস্থিতি পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত আলতাব আলী পার্ক, সেন্ট্রাল লন্ডনের হাইড পার্ক কর্নার, বৃটিশ পার্লামেন্ট স্কোয়ার ও ডাউনিং স্ট্রিটে (বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) প্রতিবাদের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়বে। অবনতি হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। পুলিশকে অনেক রিসোর্স ডাইভার্ট করতে হবে এগুলো সামাল দিতে। সব মিলিয়ে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে হবে বৃটিশ সরকারকে। আর এ পাউন্ডগুলো আসবে জনগণের পকেট (public purse) থেকে। ফলে সৃষ্টি হবে গণ-হৈচৈ (public outcry)। তাই জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বৃটিশ সরকার এসাইলাম আইনের বাইরে গিয়ে শেখ হাসিনার জন্য কিছু করবে বলে মনে হয় না।

তৃতীয়ত: ছাত্র বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী যে শক্তি প্রয়োগ করেছে সেটির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল পশ্চিমা বিশ্ব, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মারাত্মক গণহত্যার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ শিশু হত্যার নাম, তালিকা ও বিবরণসহ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইতিমধ্যে ICC (International Criminal Court - আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) - এ গণহত্যার অভিযোগ গিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যদি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিষয়গুলো তদন্ত করে এবং কোনো বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় সেটি এক ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করবে। এমন ব্যক্তিকে বৃটেন আশ্রয় দিলে বৃটেনকে আন্তর্জাতিকভাবে মারাত্মক বিব্রতকর (embarrassing) অবস্থায় পড়তে হবে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সদ্য প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার তথা ৫৯ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে শেখ হাসিনা আত্মসাৎ করেন। এটি মারাত্মক ধরনের একটি অভিযোগ। কপালে চোখ উঠা এমন বিশাল দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে বৃটিশ সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে মারাত্মক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না।

চতুর্থত: ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে, শেখ হাসিনা অতীতে কদাচিৎ পশ্চিমাদের পছন্দের তালিকায় যেতে পেরেছেন, কিন্তু কখনও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে উঠতে পারেননি। এমতাবস্থায় শেখ হাসিনার প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে বলে মনে হয় না। তার ঘনিষ্ঠতা ছিল বরং পশ্চিমাদের মিত্র নয় (ক্ষেত্র বিশেষ প্রধান শত্রু) এমন দেশগুলোর সাথে, যেমন রাশিয়া। তার দীর্ঘ শাসন আমলে সকল কূটনৈতিক নিয়ম (diplomatic norms) ভঙ্গ করে অত্যন্ত বিশ্রী ও কঠোর ভাষায় পশ্চিমাদের বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ও পরীক্ষিত মিত্র দেশ হচ্ছে বৃটেন। আর সেই বৃটেন আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার বলয়ের বাইরে গিয়ে তাকে আশ্রয় দিবে বলে মনে হয় না। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে শেখ হাসিনার ভিসা বাতিল করেছে।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যে, অতীতে বিভিন্ন সময় পতিত স্বৈরাচাররা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছে ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো ব্যতিক্রম হবে কেন? তবে ঐসব ঘটনা ঘটেছে অনেক আগে স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War) ঠিক পরবর্তী অবস্থায়। আধুনিক প্রযুক্তি ঐ সময় ছিল না। স্বৈরাচাররা অনেক কুকর্ম করে লুকিয়ে পার পেয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা হয়েছে সেটি সবাই দেখেছে। যদিও হাসিনা রেজিম ইন্টারনেট ব্লাকআইট করত: বিশ্ব থেকে বাংলাদেশকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে অনেক কিছু লুকাবার চেষ্টা করেছে। এতে হিতে বিপরীত (counter productive) হয়েছে। অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার পর প্রচুর ভিডিও-ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে। বিশ-ত্রিশ বছর আগে বিষয়গুলো এতো দ্রুত বিশ্বে ছড়াতো না। যে পরিমাণ রক্তপাত হয়েছে এবং শেখ হাসিনার প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি (perception) আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি হয়েছে সেটি অবজ্ঞা করে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে বৃটেন তাকে আশ্রয় দেবে বলে মনে হয় না।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখলাম শেখ হাসিনা বেলারুশে যেতে পারেন। মুলত: শেখ হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিশ্বের যেসব দেশ মাথা ঘামায় না অথবা যে সব দেশ তাদের নিজ দেশের বাইরের ব্যাপার নিয়ে তেমন আগ্রহী নয় সে সব দেশ হয়তো তাকে আশ্রয় দিতে পারে, করতে পারে সাদরে গ্রহণ। সবকিছুর বিবেচনায়, ভারত বা ভারতের বাইরে বেলারুশ, রাশিয়া, বুলগেরিয়া বা এ ধরনের দেশই হবে সম্ভবত: শেখ হাসিনার নিরাপদ ঠিকানা।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

কে হচ্ছেন পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব? সেগুনবাগিচায় অন্যরকম অস্থিরতা by মিজানুর রহমান

অন্যরকম অস্থিরতা চলছে সেগুনবাগিচায়। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পলায়নের পর থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বঞ্চিত কর্মকর্তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তারা নানাভাবে তাদের বঞ্চনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ফরেন সার্ভিস এসোসিয়েশনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রীতিমতো ঝড় বইছে। দাবি উঠেছে ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের সুবিধাভোগীদের কবল থেকে ফরেন সার্ভিসকে মুক্ত করার। বিশেষত ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে ‘জামায়াত-বিএনপির যড়যন্ত্র’ বলে ট্যাগ দেয়া, গণহত্যার পক্ষে সাফাই এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলির বিষয়টি অস্বীকার করে যারা মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নগ্নভাবে বিদায়ী সরকারকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন সেইসব অতি উৎসাহীদের এখনই বিদায় এবং আইনের আওতায় আনার দাবি করছেন পেশাদাররা। তারা ট্রান্সফার-পোস্টিং নিয়েও কথা বলছেন। পেশাদারিত্বের বদলে চাটুকারিতা, পদস্থ ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের পদলেহন, প্রভাবশালী দুষ্টুচক্রের অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় যেসব পোস্টিং হয়েছে তা বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ফরেন সার্ভিস এসোসিয়েশনের জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাইব্রিড ফর্মেটে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠক চলছিল।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, পটপরিবর্তনের পর থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ দিনের চাপা ক্ষোভের যে বিস্ফোরণ ঘটেছে সে বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকরা অবহিত। এটি নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনতিবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার আদেশ জারি হয়েছে। অন্য ক্যাডার থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কার্যক্রমে স্বাতন্ত্র্যতা থাকায় কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হতে সময় লাগছে জানিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল এক প্রতিনিধি অনানুষ্ঠানিক আলাপে গত সপ্তাহে মানবজমিনকে বলেন, পররাষ্ট্র সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তার বিদায় সময়ের ব্যাপার মাত্র। রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে কিছু অর্ডার ইস্যু হয়েছে, বাকিটা হচ্ছে। সেই সঙ্গে সম্ভাব্য শূন্য পদগুলোর বেটার রিপ্লেসমেন্ট নিয়েও সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হচ্ছে। সরকারের ওই প্রতিনিধি বলেন, ফরেন সার্ভিসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পররাষ্ট্র সচিব পদে একজন কম্পিটেন্ট অফিসার পাওয়া। বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে পররাষ্ট্র সচিবের ভূমিকা বিশেষত তার একটি বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। তবে তার ‘পেশাদারিত্ব’ নিয়ে আগে তেমন প্রশ্ন ছিল না। সার্বিক দিক বিবেচনায় ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসুদ বিন মোমেনকে সরকার রাখবে কিনা? তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। একটি সূত্র অবশ্য বলছে, বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব বিদায়ের প্রস্তুতিতেই রয়েছেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ সকলের কাছে তিনি ‘সম্মানজনক বিদায়’ চেয়েছেন।

চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতকে ঢাকায় ফেরার জরুরি আদেশ, পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগের গুঞ্জন: চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জসিম উদ্দিনকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় ফেরার আদেশ জারি হয়েছে। গত ১৭ই আগস্ট আদেশটি জারি হয়। জসিম উদ্দিনের উদ্দেশ্যে জারি হওয়া আদেশে বলা হয়, ‘আপনাকে সদর দপ্তর ঢাকায় বদলির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অতএব বাংলাদেশ দূতাবাস বেইজিংয়ে আপনার বর্তমান দায়িত্বভার ত্যাগ করে অবিলম্বে সদর দপ্তর ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।’ সচিব পদমর্যাদায় চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দু’বছরের কম সময় দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রদূত জসিম উদ্দিনকে চটজলদি ঢাকায় ফেরার আদেশ জারির প্রেক্ষাপটে এই গুঞ্জন উঠেছে যে, পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তিনি নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৩তম ব্যাচের ওই কর্মকর্তাই হবেন হেডকোয়ার্টারে সচিব পদমর্যাদার একমাত্র কর্মকর্তা। অবশ্য পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার দৌড়ে মো. জসিম উদ্দিনের সিনিয়র এবং জুনিয়র ব্যাচের আরও দু’জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে তাদের দু’জনের কেউই সচিব পদে কাক্সিক্ষত পদোন্নতি পাননি। ১০তম ব্যাচের কর্মকর্তা সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ খন্দকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বাণী সংক্রান্ত জটিলতায় বিভাগীয় মামলা থাকায় তার পদোন্নতি আটকে গেছে। এখন এটি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছেন তিনি। তাছাড়া ১৫তম ব্যাচের ফার্স্ট রিয়াজ হামিদুল্লাকে ঢাকায় ফেরানো হয়েছে গত মাসে। গত জুন থেকে তার ব্যাচের (পররাষ্ট্র ক্যাডার) সচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তাব ঝুলে আছে। ওই দুই কর্মকর্তার মধ্য থেকে কাউকে পররাষ্ট্র সচিব পদে পদায়ন করতে হলে সবার আগে তাদের সচিব পদে পদোন্নতি পেতে হবে। স্মরণ করা যায়, পররাষ্ট্র সচিবের মতো অতিব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ যেকোনো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তেই হয়।

কাদের মির্জার যত অনিয়ম দুর্নীতি by মারুফ কিবরিয়া

আব্দুল কাদের মির্জা। বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। কেউ বলেন- অত্যাচারী ফেরাউন, কেউ বলেন পাগলা মির্জা, কেউবা বলেন চাঁদাবাজ। তবে ১৫ বছরের শাসনামলে এই কাদের মির্জা হয়ে ওঠেন কোম্পানীগঞ্জের ডন। স্থানীয়দের ভাষ্যে, পৌরসভার মেয়র থাকাকালীন তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারতেন না। তার সব অপকর্মের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন স্ত্রী আকতার জাহান বকুল।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নিজ নির্বাচনী উপজেলা এটি। কাদের মির্জা তারই আপন ছোট ভাই। ১৫ বছর তিনি এখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন সবই ছিল তার কাছে তুচ্ছ। স্থানীয়রা দাবি করেন, ওবায়দুল কাদের এলাকায় খুব একটা যাতায়াত না করলেও ভাইয়ের মন্ত্রিত্ব ও দলীয় সর্বোচ্চ পদ থাকায় বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন কাদের মির্জা। 

সরজমিন জানা গেছে, বসুরহাটের সাবেক এই পৌর মেয়র ও তার পরিবারের লোকজনের কাছে পুরো কোম্পানীগঞ্জবাসীই ছিলেন জিম্মি। কেউ তার বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারতেন না। চাঁদাবাজি, ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মত দমন, নিয়োগ বাণিজ্য- কী করেননি তিনি? অত্যাচার চালিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপরও।

কাদের মির্জার যত অনিয়ম, দুর্নীতি: কোম্পানীগঞ্জের টেন্ডারবাজি, দখল, চাঁদাবাজি, মন্ত্রী কোটার টিআর, কাবিখা, সরকারি অফিস-আদালত সবই কাদের মির্জার নিয়ন্ত্রণে চলতো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত মির্জার ইশারা ছাড়া কিছুই হতো না। স্থানীয় প্রশাসনও কখনো মির্জার ইচ্ছার বাইরে যাননি। বসুরহাট বড় মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদের ইমাম কে হবেন তাও ঠিক করতেন কাদের মির্জা। বড় ভাই ওবায়দুল কাদেরের প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশের সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের সকল অফিস থেকে চাঁদা আদায় করতেন তিনি। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয় দেখাতো ফেসবুক লাইভে এসে সব বলে দেয়ার। নিজের দলের নেতাকর্মী, সমর্থকদের থেকেও বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা আদায় করতেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক চরকাঁকড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খালের পাশে হওয়ায় খালের ওপর কালভার্ট করায় কয়েক ধাপে ৩ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন কাদের মির্জা। বসুরহাট বাজারের প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ীর থেকে তিনি বিভিন্ন দিবসসহ দল চালানোর কথা বলে বছরে ৫ কোটি টাকার উপরে চাঁদা আদায় করতেন। তার এসব চাঁদা সংগ্রহ করতেন বসুরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা করিমুল হক সাথী। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বসুরহাট বাজারের বেশ কয়েকটি স্থান থেকে টোল আদায় করতেন কাদের মির্জা। মির্জার নির্দেশে বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার টোল আদায় করতেন তার অনুসারী শ্রমিক লীগ নেতা ওয়াসিম। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে বসুরহাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মতিন লিটন মানবজমিনকে বলেন, একজন স্বৈরাচার ছিলেন মির্জা কাদের। মানুষকে অত্যাচার নির্যাতন করেছেন ক্ষমতায় থাকাকালীন। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে চাঁদা আদায় করতেন। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। ব্যবসা বন্ধের হুমকি দিতেন। তবে ৫ই আগস্ট ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর কোম্পানীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে রয়েছেন বলেও জানান লিটন।

মির্জার টর্চার সেল: কাদের মির্জা শুধু মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন না, ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষকে কখনো কখনো নিয়ে যেতেন পৌরসভার তিনতলায়। সেখানে তিনি গড়ে তুলেন একটি আধুনিক টর্চার সেল। ওই টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় ৫০ জন ব্যবসায়ী, শতাধিক আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। টর্চার সেলে ছিল অস্ত্র ভাণ্ডার। এ ছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়েও ছিল একটি টর্চার সেল। সোমবার সরজমিন দেখা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি ভেঙে দেয়া হয়েছে। ৫ই আগস্ট কাদের মির্জা এলাকা থেকে পালিয়ে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা অগ্নিসংযোগ করে।

ভূমি দখলের সর্দার মির্জা কাদের: উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের মুছাপুর ক্লোজারে কাদের মির্জা ৬০০ একর খাস জায়গা দখল করেন। এরপর ভুয়া ভূমিহীন সাজিয়ে ৪ কোটি টাকার ভিটি বিক্রি করেন। ক্লোজার সংলগ্ন নদী থেকে গত ৩ বছর অবাধে বালু উত্তোলন শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ২০ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করেন কাদের মির্জা। তার এই অবৈধ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন মুছাপুরের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব আলী ওরফে টাকলা আলী। বসুরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর বাবুলের বসুরহাট বাজারের রূপালী চত্বর সংলগ্ন বহুতল ভবন কৌশলে দখল করে নেন কাদের মির্জা। উপজেলা ভূমি অফিসের খাস জায়গা দখল করে বাবার নামে মোশারেফ হোসেন ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণ করেন।  

কাদের মির্জার হেলমেট বাহিনী: কাদের মির্জার ছিল সশস্ত্র হেলমেট বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল শতাধিক। কোম্পানীগঞ্জের মানুষ ছিল তাদের কাছে জিম্মি। এ বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরনবী চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খিজির হায়াত খান, উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান রিপনসহ প্রায় ২ শতাধিক মানুষ। যুবদল নেতা রাজন ও ফয়সালের বাড়িতে হামলা চালায় এ বাহিনীর সদস্যরা। হেলমেট বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল কাদের মির্জার ছেলে তাশিক মির্জা কাদের, আর্থিক ও প্রশাসনিক শেল্টারে ছিল মির্জা ও তার স্ত্রী বকুল। হেলমেট বাহিনীর সেকেন্ড কমান্ড ছিল বসুরহাট পৌরসভার কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা রাসেল, হামিদ ওরফে কালা হামিদ, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মারুফ, সাধারণ সম্পাদক তন্ময়, বসুরহাট পৌরসভা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জিসান, কেচ্ছা রাসেল, বাংলা বাজারের পিচ্ছি মাসুদ ওরফে ডাকাত মাসুদ, রাস্তার মাথার শিপন, বসুরহাট পৌরসভার কর্মচারী পিচ্ছি স্বপন, শুঁটকি কামাল, মাছ সবুজ, ঠোঁট কাটা শিবু, পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হোনারি বাড়ির ছায়েদ ও মাছ ব্যবসায় শামীম। এ বাহিনীর সকল সদস্য ছিল আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রধারী। তারা সব সময় কোমরে অস্ত্র নিয়ে চলতে। ২০২২ সালের ১৩ই মে বসুরহাট পৌরসভার করালিয়া এলাকায় মিজানুরের অনুসারীদের ওপর প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে আনোয়ার হোসেনের ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ছাড়া ২০২১ সালের ২১শে নভেম্বর রাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খানের বাড়িতে সশস্ত্র হামলাকালে অস্ত্র হাতে আনোয়ার হোসেনকে গুলি করার দৃশ্য সিসিটিভির ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ১৩ই মে’র ভাইরাল ভিডিওতে কেচ্ছা রাসেলের সঙ্গে ছিলেন আরেক অস্ত্রধারী সহিদ উল্যাহ। পিচ্ছি মাসুদের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ থানায় খুন, ডাকাতি, মাদক, পুলিশের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২১টি মামলা রয়েছে।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদল মানবজমিনকে বলেন, কাদের মির্জা ছিলেন একজন মাফিয়া ডন। তার শাসনামল ছিল বিভীষিকাময়। এলাকায় কোনো স্বাধীনতা ছিল না। উপজেলা আওয়ামী লীগের এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যে, কাদের মির্জার হাতে নির্যাতিত হননি। আমি অনেকবার মারধরের শিকার হয়েছি।

মির্জার দোসর কামাল কোম্পানী অঢেল সম্পদের মালিক: কামাল কোম্পানী কবিরহাটের ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবার ও মির্জার ঘনিষ্ঠ অনুসারী হওয়ার সুবাধে গত ১৩ বছরে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। মির্জার ঘনিষ্ঠ অনুসারী চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকের যোগসাজশে কোম্পানীগঞ্জের চরএলাহী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরএলাহীর তিন মৌজার ১২ একর খাস জায়গা ও সরকারি খালসহ নামমাত্র মূল্যে দখল করে নেন কামাল কোম্পানী। এরপর চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের এক মৎস্য ব্যবসায়ীর কাছে ৭ কোটি টাকা জামানত নিয়ে ভাড়া দেয়। ১২০০ একর জায়গার ভাড়া বছর একর প্রতি ৫০ হাজার টাকা। গত জুলাই মাসে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াখালী সুবর্ণচরে প্রায় ৭০০ একর খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠে ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল কোম্পানী ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে তারা উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরলক্ষ্মী, উড়িরচর ও চরনোমান মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ওই জমির ফসল নষ্ট করে অর্ধশতাধিক পুকুর খননকাজ চালাচ্ছেন। গত ১০ বছরে নোয়াখালী এলজিআরডি’র অধীনে নোয়াখালীর কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২ শতাধিক সড়ক নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি করে কামাল কোম্পানীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তার গত ১ বছরের কাজ পরিদর্শন করে দেখে যার সত্যতা মিলবে। নিজের ইউনিয়নে প্রতি বছর মেলার নামে নগ্ন নৃত্যের আসর, জুয়া ও অসামাজিক কার্যকলাপ চালান।

মির্জার অবৈধ অস্ত্রের যোগানদাতা আইয়ুব আলী চেয়ারম্যান:
২১ মামলার আসামি পিচ্ছি মাসুদ মুছাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রক ছিল আইয়ুব আলী। কাদের মির্জার হাতে পিচ্ছি মাসুদকে তুলে দেন আলী। এই পিচ্ছি মাসুদ ও আলীর হাত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য আসতো মির্জার হেলমেট বাহিনীর হাতে। মুছাপুরের চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাধে মির্জার নির্দেশে মুছাপুর ক্লোজারের ৬০০ একর খাস জায়গা দখল করে আইয়ুব আলী। আলী গত ৪ বছরে মুছাপুর ক্লোজার সংলগ্ন নদী থেকে অন্তত ২০ কোটি টাকার অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে। মির্জার হাত মাথায় থাকায় স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন তাদের কিছুই করতে পারেনি। উল্টো ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ জায়গা দখল ও বালু উত্তোলন বন্ধ করতে গেলে মির্জার নির্দেশে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী জাহাঙ্গীর ও তার ভাই হামলা চালায়।

পুলিশ পেটানোর অভিযোগ মির্জাপুত্রের বিরুদ্ধে: করোনাকালীন সময়ে পুলিশ চেকপোস্টে কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ কনস্টেবল হুমায়ুনকে মারধর করেন কাদের মির্জার ছেলে তাশিক মির্জা। মির্জার বাড়ির সামনের সড়কে এই মারধরের ঘটনা ঘটে। তৎকালীন কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন মো. আরিফুল ইসলাম। পরে তিনি তৎকালীন এসপি’র নির্দেশে ঘটনা ধামাচাপা দেন। নির্যাতনের শিকার পুলিশ কনস্টেবল হুমায়ুন বর্তমানে নোয়াখালীর একটি থানায় কর্মরত আছেন। একাধিক সূত্র দাবি করে, হুমায়ুন বর্তমানে কবিরহাট থানায় কর্মরত আছেন।

মির্জার ছেলের যত অপকর্ম:
কোম্পানীগঞ্জের কিশোর গ্যাংয়ের লিডার ছিল মির্জার ছেলে তাশিক মির্জা। বিএনপি-জামায়াত পরিবারের অনেক ছেলেকে ছাত্রলীগে প্রতিষ্ঠিত করেন তাশিক। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের থেকে চাঁদাবাজি করতেন তিনি। ২০১৮ পরবর্তী কোম্পানীগঞ্জে বেপরোয়া মাদক সিন্ডিকেট ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল তাশিক মির্জার হাতে। কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের সময় বাবার আগ্নেয়াস্ত্র ভাণ্ডার ছিল তার হাতে। চলতি বছরে উপজেলা নির্বাচনের দিন তার গাড়ি করে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সকাল ৮টার মধ্যে উপজেলার ভোট কেন্দ্র দখল করেন। তাদের প্রার্থী গোলাম শরীফ চৌধুরী পিপুলের থেকে নেন এক কোটি টাকা। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে সোনাপুর টু বসুরহাট সড়ক প্রশস্তকরণ কাজে ঠিকাদার ছিদ্দিক উল্যাহ ভুট্টুর থেকে ৬ কোটি টাকা কমিশন নেন তাশিক মির্জা ও কাদের মির্জা। মুছাপুরের খাস জায়গা, বালু উত্তোলন, চর এলাহী ইউনিয়নের খাস জায়গা বিক্রির ভাগ কমিশন পেতেন তাশিক মির্জা।

কাদের মির্জা পত্নীর যত অনিয়ম: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কবিরহাটের বাটইয়া ইউনিয়নের আমেরিকা প্রবাসী বিএনপি’র নেতা ওমর ফারুকের বাসভবনে বকুল মির্জার নির্দেশে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। হামলার নেতৃত্ব দেয় তার বোনের ছেলে হিমেল। এ ঘটনায় কবিরহাট থানায় মামলা করতে গিয়ে মামলা করতে পারেননি ড. ফারুক। হিমেলের সন্ত্রাসী বাহিনী ভাঙচুর করে সাউন্ড সিস্টেম সহ অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। পরে কৌশলে ঢাকা থেকে আমেরিকা চলে যান ফারুক। স্থানীয়দের অভিযোগ মতে, মির্জা ফেরাউন হলে তার স্ত্রী লেডি ফেরাউন। উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বকুল মির্জা।

কাদের পরিবারের আরেক ত্রাস শাহাদাত: কাদের মির্জার ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন। তিনিও এক নীরব কিলার। ২০২৩ সালের জুলাই মাসের ঘটনা। অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে বাধা দেয়ায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে মারধর ও তার মাথা ন্যাড়া করে দেয় সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন ও তার অনুসারী যুবলীগ নেতা শিপন। দুই দফায় ওই প্রকৌশলীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন নির্বাহী প্রধানের থেকে আদায় করতেন কোটি টাকার কমিশন। চরএলাহী ইউনিয়নে নয়ছয় করে খাস জায়গা দখল করেন ১৮৫ একর। যার বাজার মূল্য রয়েছে কোটি টাকার উপরে। শাহাদাতের এক সময় সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা ছিল না। ভাই মন্ত্রী হওয়ার পর তার ভাগ্য সহজে ঘুরে যায়। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় ভাইয়ের পরিচয়ে বিভিন্ন দপ্তরে, প্রতিষ্ঠানে দালালি, চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য। এতেই বনে যান হাজার কোটি টাকার মালিক।    

সদরেও কাদের মির্জার সিন্ডিকেট: নোয়াখালী সদর হাসপাতালের ১২ কোটি টাকার এমএসআর টেন্ডার  (পথ্য মালামাল, ওষুধ ক্রয়) শিডিউল নিয়ন্ত্রণ করে কোনো সাধারণ ঠিকাদারকে শিডিউল নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়নি কাদের মির্জার একটি সিন্ডিকেট। এর নেপথ্যে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হেলাল উদ্দিন, আরএমও ডা. আজীম, কেরানী মাসুদ, প্রধান সহকারী সুরুজ নিয়মবহির্ভূতভাবে ফাহিম টেইলার্সের মালিক শাহজাহান শাহীনকে কাজ পাইয়ে দেন। এই কাজ বাগিয়ে নিতে নোয়াখালী-৪ আসনের এমপিপুত্র সাবাব চৌধুরীকে নগদ দশ লাখ ও চেকের মাধ্যমে নব্বই লাখ টাকা দেয়া হয়। এই সিন্ডিকেটের আরেক অন্যতম দোসর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম শাসমুদ্দিন জেহান ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মোমিন বিএসসি। গত ১০ বছরে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এই সিন্ডিকেট থেকে কমিশন পেতেন একরামুল করিম, কাদের মির্জা ও ওবায়দুল কাদের।

কাদের মির্জার সাংবাদিক নির্যাতনের কাহিনী: ২০১৯ সালে স্থানীয় সাংবাদিক এইচ এম মান্নান মুন্নার ছোট ভাইকে জোর করে মুজিব কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত করে। হেলমেট বাহিনীর সংবাদ প্রকাশের জের ধরে দৈনিক মানবজমিনের কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি নাজিম উদ্দিন খোকনের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতন শেষে তাকে মাদক দিয়ে থানায় সোপর্দ করে। দৈনিক আমার সংবাদের প্রতিনিধি আরমানকে বেধড়ক মারধর করে মির্জার হেলমেট বাহিনী। স্থানীয় সাংবাদিক সুভাষের বসতঘরে হামলা করে হেলমেট বাহিনী। মির্জার নির্দেশে সুভাষকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিনিধি জাফর উল্যাহ পলাশকে লাঞ্ছিত করে মির্জা। দৈনিক নয়াদিগন্ত প্রতিনিধি রাসেদকে প্রেস ক্লাবে কার্ড খেলার সময় আটকে ফেসবুকে লাইভে নিয়ে হেনস্তা করে। দৈনিক সকালের সময় প্রতিনিধি আমির হোসেনকে হেনস্তা করতে তার সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দেয়।  

মির্জার দুর্নীতি-অনিয়মে সমর্থন ছিল সেতুমন্ত্রী কাদেরের: একাধিক সূত্রে জানা যায় সাবেক সেতুমন্ত্রীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে কাদের মির্জা বেপরোয়া হয়ে উঠে। মন্ত্রী কোটার টিআর, কাবিখা ও অন্যান্য বরাদ্দ নামমাত্র পেতো দলীয় লোকজন। মন্ত্রীর বরাদ্দে ৮৫ ভাগ মির্জা আত্মসাৎ করতেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, উপজেলার উন্নয়নকাজে দশ শতাংশ কমিশন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা, চাঁদাবাজির কথা জানতেন ওবায়দুল কাদের। সাবেক সেতুমন্ত্রী কাদের নিজেও অনেক বড় বড় কাজ থেকে ভাইদের কোটি কোটি টাকা কমিশন নিয়ে দিয়েছেন এটি তার নিজ উপজেলার মানুষের কাছে ওপেন সিক্রেট।

মির্জার ৫ই আগস্ট: শেখ হাসিনা সরকার পতনের খবরের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার একটু পরই তার বাড়িতে হামলা হয়। তখন তারা বাড়ির পাশের এক মেম্বারের ঘরে আশ্রয় নেন। এর একদিন পর সেখান থেকে বৃষ্টির মধ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গাঢাকা দেয়। তবে তাদের বর্তমান অবস্থান অজানা। জনশ্রুতি রয়েছে, হামলাকারীরা ওই দিন মির্জার ঘর থেকে ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ৪০০ ভরি সোনা ও তার ছোট ভাই শাহাদাতের ঘর থেকে ১০ কোটি টাকা লুট করে নেয়। হামলার সময় শাহাদাতের স্ত্রী পুকুরে ২ ঘণ্টা লুকিয়ে থাকে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, কাদের মির্জার বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করার সাহস পেতেন না। প্রশাসনও তার কাছে জিম্মি ছিলেন। অনেকটা  স্বেচ্ছাচারিতার মনোভাব ছিল তার। তিনি আরও বলেন, কাদের মির্জার শাস্তি হওয়া উচিত।

সিলেটে যে কারণে ‘ব্যতিক্রম’ আরিফ by ওয়েছ খছরু

সম্প্রীতির সিলেটে মাইক হাতে নিয়ে ট্রাকে করে বেরিয়ে পড়েছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেটের সাবেক মেয়র তিনি। চারদিকে ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা ও ভাঙচুর। হচ্ছে লুটপাটও। আগুন জ্বলছে অনেক জায়গায়। তখন কেউ একজনকে খুঁজছিলেন সিলেটের মানুষ। যিনি এগিয়ে আসবেন। ধরবেন হাল। দেবেন সান্ত্বনা। কিন্তু কার এত সাধ্য ক্ষোভের জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দেয়ার। এমনই একজন সিলেটের সাবেক মেয়র ও বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। নির্বাচন হলেও দায়িত্ব হস্তান্তর না করায় গেল বছরের এই দিনেও ছিলেন মেয়র। নির্বাচন না করে মেয়রের চেয়ার ছেড়েছেন ৯ মাস আগে। কিন্তু নগরের মানুষকে ভুলেননি তিনি। ৫ই আগস্ট। সিলেটের রাজপথ লাখো জনতার দখলে। পুলিশ নেই। কোনো কন্ট্রোল নেই। বিজয়ী জনতার দীর্ঘ ক্ষোভের ঢেউয়ে চারদিক একাকার। তখন নিজ বাসাতেই ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। বসে থাকলেন না। সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে শরিক হলেন বিজয় মিছিলে। দিলেন নেতৃত্বও। নগরের কোর্ট পয়েন্টে সিলেট বিএনপি’র নেতাকর্মীদের যে সমাবেশ হয়েছিল সেখানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল। মধ্যমণি ছিলেন সাবেক এই মেয়র। নগরের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর দেখে সমাবেশেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত থাকার নির্দেশনা দিলেন। কাজও হলো। ঘরে ফিরতে শুরু করলেন মানুষ। কিন্তু দুর্বৃত্তরা দমে যায়নি। নগর জুড়ে শুরু করে লুটপাট। অরাজকতা শুরু করে সরকারি স্থাপনায়ও। সবেমাত্র কোর্ট পয়েন্টের সমাবেশ শেষ করে বাসায় ফিরেন আরিফ। এমন সময় আসতে থাকে লুটপাট ও অরাজকতার খবর। বসে থাকেননি। বাসায় থাকা বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে খোলা ট্রাকে মাইক হাতে বেরিয়ে পড়েন। লুটপাটকারীদের সরাসরি দুর্বৃত্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে নগরবাসীকে আহ্বান করেন। তার ডাকে সাড়া দেন অনেকেই। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে শান্ত করতে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক সহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বেরিয়ে আসেন। জেলা ও নগর বিএনপি’র নেতাকর্মীরাও যে যার মতো ট্রাকে, অটোরিকশা, রিকশাযোগে দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে নামেন। সরকারি সম্পদ ঠেকাতে প্রতিরোধের দেয়াল গড়েন। এতে হয়েছে কাজও। কারণ; যেভাবে সিলেট নগরে লুটপাট শুরু হয়েছিল আরিফুল হক চৌধুরী সহ বিএনপি নেতারা মাঠে না নামলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। নগরের বৃহত্তর কুয়ারপাড় এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন; রাতে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সহ বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা এসেছিলেন। তখন ওই এলাকার মানুষের মধ্যে বিরাজ করছিল ভয় ও আতঙ্ক। তিনি এসে সবাইকে ডাকেন। বলেন; পুলিশ মাঠে নেই। নিজেরা দলে দলে এলাকায় পাহারা দেন। কেউ যেনো লুটপাট ও অরাজকতা চালাতে না পারে সেদিকে নজর রাখার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের দিকে নজর রাখার তাগিদ দেন। শুধু কুয়ারপাড় নয়, ওই দিন মধ্যরাত পর্যন্ত নগরের অন্তত ২০টি এলাকায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন সাবেক এই মেয়র। ওই দিন তার সঙ্গে থাকা এসিড সন্ত্রাস নির্মূল কমিটি-এসনিকের সাধারণ সম্পাদক জুরেজ আব্দুল্লাহ গুলজার জানান- টানা দু’দিন আরিফুল হক চৌধুরী গোটা নগর চষে বেরিয়েছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের মধ্যে আস্থা ফিরে আনতে তিনি পাড়ায় পাড়ায় যান। তখন সংখ্যালঘুদের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। সাবেক এই মেয়রকে কাছে পেয়ে তাদের শঙ্কা কাটে। জুরেজ জানান; সরকার পতনের পর অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছিল। গোটা নগর জুড়ে ছিল ময়লার ভাগাড়। নগর ভবনে আসতে ভয় পাচ্ছিলেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ দৃশ্য দেখে আরিফুল হক চৌধুরী চলে যান নগর ভবনের সামনে। সেখানে বিএনপি’র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি আবর্জনা অবসারণের কাজ শুরু করেন। আহ্বান জানান; কাউন্সিলরদের মাঠে নামার। তার আহ্বানে আশ্বস্ত হন কাউন্সিলর, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা। দুপুরের পরপরই তারা কাজে ফিরেন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে নাগরিক সেবা শুরু হয়। পুলিশের কার্যক্রম নেই। থানা খালি। আরিফুল হক চৌধুরী সেখানেও রাখলেন ভূমিকা। বিশেষ করে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। নানা ভাবে সহায়তা, আশ্বাস দিলেন। নিজেও পরিদর্শন করলেন জ্বালিয়ে দেয়া কয়েকটি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি। ভড়কে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের আশ্বাস দিলেন। জনগণের পাশে থাকার কথাও বলেছেন। সিলেটের সম্প্রীতিময় রাজনীতিতে এক সময় সবার আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ছিলেন সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। নগরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সুদিন, দুর্দিনের বন্ধু। সেই ধারাবাহিকতা এবার সিলেটের সম্প্রীতির রাজনীতিতে উদাহরণ হলেন সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। মানবজমিনকে জানিয়েছেন- এই সিলেট আমাদের সবার। এখানে দলমত সবাই আছে। কিন্তু সিলেটের ধর্মীয়, রাজনৈতিক সম্প্রীতি দেশের অন্য এলাকার চেয়ে ভিন্ন। আমাদের পূর্ব পুরুষ এই সম্প্রীতি রক্ষা করে গেছেন। এখন আমাদের কর্তব্য সম্প্রীতির পাশাপাশি মানুষের জানমাল রক্ষা করা। সেটি আমরা দায়িত্ব থেকে করেছি। এতে বাহবা কুড়ানোর কিছুই নেই। জুলাই শেষার্ধ থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সিলেটে যে জানমালের ক্ষতি হয়েছে সেটি আমরা রক্ষা করতে পারিনি। বিশেষ করে সিলেটের রাজপথে এবার ক্যাডারদের অস্ত্রবাজি নগরবাসীর মনে দাগ কেটেছে।  সেটির চেষ্টা করলে আমরা রাজনীতিবিদরা এড়িয়ে যেতে পারতাম। এরপরও বলবো; এই সিলেট আধ্যাত্মিক শহর। সিলেটের মানুষ কারও চোখ রাঙানির কাছে মাথা নত করে না, সেটি এবারো তারা দেখিয়ে দিয়েছেন।

যেভাবে লাকসামের ত্রাস হয়ে ওঠেন মহব্বত

মহব্বত আলী। সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর শ্যালক। লাকসাম উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ হতো না। প্রশাসন থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দল গঠন, সাংবাদিকদের নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর কমমূল্যে ক্রয় করে তাদেরকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সবকিছু চলতো তার কথামতো। গত ১৬ বছরে শত কোটি টাকা কামিয়েছে। গত ১৬ বছর বিএনপি- জামায়াত রাজনীতিতে সবকিছু লাকসাম নিষিদ্ধ ছিল। নেতাকর্মীরা এলাকাছাড়া ছিল। জামায়াত-শিবির গত ২ বছর পূর্বে লাকসাম পৌর এলাকায় মিছিল করলে, তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর করে তার সন্ত্রাসী বাহিনী।


এমনকি জামায়াতের নেতাকর্মীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করে ক্যাশ থেকে লাখ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। বিএনপি সারা দেশে বিভাগীয় সমাবেশ ঘোষণা দেয়। নোয়াখালীতে ওই সমাবেশে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের। সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য কুমিল্লা উত্তর জেলার দলীয় নেতাকর্মীরা ট্রাক, বাস করে নোয়াখালী যাওয়ার পথে রওয়ানা দিলে লাকসামে মহব্বত আলীর নির্দেশে তার সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে। এতে ৫০টি গাড়ি ভাঙচুর করে। কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে আহত করে। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালামের তার গ্রামের বাড়ি পাশাপুরে বিএনপি’র কর্মী সম্মেলন আয়োজন করে। ওই সম্মেলনে মনোহরগঞ্জ লাকসাম থেকে নেতাকর্মীরা যাতে না যেতে পারে তার জন্য বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসীরা পাহারা দেয়। যারা ওই পথে রওয়ানা দেয় তাদেরকে পিটিয়ে আহত করে। থানা পুলিশের নিকট তাদেরকে সোপর্দ করে। এক সময় মহব্বত আলী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তার ভগ্নিপতি তাজুল ইসলাম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তী পর্যায়ে দ্বিতীয়বার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার এপিএস রতনকে সরিয়ে দিয়ে মহব্বতকে ওই দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্ব দেয়ার পরেও ভেসপা মোটরসাইকেল চালাতেন। এরপর রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। চলাচল করতেন মারসিটিজসহ ৩টি গাড়িতে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ চলতে থাকে লাকসামে। প্রতিটি কাজের কোনো টেন্ডার হতো না। প্রত্যেকটি কাজ ৫% লেসের স্থলে ২০ থেকে ৩০% এভাবে হতো। এসব কাজের ঠিকাদার তার মন মতো ব্যক্তিদের লাইসেন্সে কাজ করতো। এভাবে পুরো টাকা মহব্বতকে দিতে হতো। এ ছাড়া প্রতি কাজের বিপরীতে ১৫% টাকা নিতো। বড় বড় মেগা প্রকল্পের কাজ কোনোটির টেন্ডার হলে যারা কাজ পেতো, তাদেরকে দেয়া হতো না। যেসব প্রকল্পের কাজ লাকসাম উপজেলায় বাস্তবায়ন হয়েছে প্রত্যেকটি কাজের গুণগতমান খুব খারাপ। এ ছাড়াও ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থী হলে প্রত্যেক চেয়ারম্যানের নিকট থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ও মেম্বারগণের নিকট থেকে ৩ লাখ টাকা করে নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যারা টাকা দিতেন তাদেরকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতেন। গত ১৫ বছর পৌরসভা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোটারবিহীন নির্বাচন হতো। শেখ হাসিনা পদত্যাগের দিনও গত ৫ই আগস্ট দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রত্যেকদিন তার সন্ত্রাসী দল সশস্ত্র অবস্থায় প্রতিটি রাস্তার মোড়ে পাহারায় থাকতো। যাতে বিএনপি ও জামায়াতের কোনো মিছিল বের করতে না পারে।

কে এই মহব্বত
সাবেক স্থানীয় সরকারের মন্ত্রী তাজুল ইসলামের শ্যালক। তার বাবার নাম আব্দুল আজিজ, তাদের বাড়ি এক সময় হাজীগঞ্জ এলাকায় ছিল। তার বাবায় লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারে বিচানাপট্টিতে একটি ট্রাঙ্ক তৈরির দোকান ছিল। সে সুবাদে তৎকালীন থ্রি-এ সিগারেট ফ্যাক্টরির পাশে নবাব কলোনিতে থাকতেন। পরবর্তী পর্যায়ে পাইকপাড়া ডুরিয়া বিষ্ণুপুর এলাকায় জায়গা ক্রয় করে এবং একটি বাড়ি নির্মাণ করে। নবাব কলোনিতে থাকা অবস্থায় তাজুল ইসলামের বোনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মহব্বত আলী টানা ৩ বার বিনা ভোটে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

সাংবাদিকদের নির্যাতন
কোনো সাংবাদিক আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে, তাকে নির্যাতন করতো মহব্বতের সন্ত্রাসী বাহিনী। গত সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ থেকে একজন প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা ও প্রচারণা চালায় এবং গণসংযোগ করেন। ওই গণসংযোগের সংবাদ প্রকাশ করলে স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুল জলিলকে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে পঙ্গু করে দেয় মহব্বত। দীর্ঘ এক বছর চিকিৎসার পরও এখনো সুস্থ হয়নি। শুধু জলিল নয়। দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক মশিউর রহমান সেলিমকে নির্যাতন করে দীর্ঘদিন এলাকাছাড়া করে।

সিএনজি, বাস ও অটো স্ট্যান্ড থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়
লাকসাম পৌর এলাকায় ৫টি সিএনজি ও ১০টি অটো ও একটি বাসস্ট্যান্ড রয়েছে। এসব স্ট্যান্ড থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হতো। প্রতিটি সিএনজি ও বাসস্ট্যান্ডের জন্য আলাদা আলাদা লোক নিয়োজিত ছিল। টোকেনের মাধ্যমে টাকা আদায় করতো। তিশা বাস কাউন্টারে আলাদা লোক ছিল। এসব চাঁদা প্রতিদিন যমুনা ব্যাংকে তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা দেয়া হতো।

পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র থেমে নেই

ক্ষমতার পরিবর্তন মানে শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতার হাতবদল নয় বরং রাষ্ট্র এবং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার লন্ডন থেকে এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও লক্ষ্য সুসংহত করতে হলে বিতাড়িত গণবিরোধী শক্তিকে আইনের মুখোমুখি করার পাশাপাশি জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের ভোট প্রয়োগের অধিকার নিশ্চিত করা। আর ক্ষমতার পরিবর্তন মানে শুধুই রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদল নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন মানে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা না গেলে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি বলেন, গণহত্যাকারী হাসিনার পলায়নের মধ্যদিয়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। তাই, দেশে জবাবদিহিতামূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এখনই সময়। লাঞ্ছিত বঞ্চিত অধিকারহারা মানুষ  একটি স্বাধীন, নিরাপদ এবং মর্যাদাকর জীবনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে রয়েছেন। জনপ্রত্যাশা পূরণের জন্য একটি নিরাপদ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার এখনই সময়। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গত ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রকামী মানুষ আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল। আন্দোলন করতে গিয়ে এসময়ে অসংখ্য মানুষ গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন, অপহৃত হয়েছেন। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন। আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যাকারী হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য ও উদ্দেশ্য নস্যাৎ করে দিতে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত হামলার ছক তৈরি করে দেশে একটি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে হাসিনা পতন আন্দোলনের পক্ষের শক্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে বিতাড়িত অপশক্তি পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র কিন্তু এখনো থেমে নেই। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও লক্ষ্য সুসংহত করাই এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশের পক্ষের শক্তির কাছে, গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে বিনীত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা পরাজিত অপশক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবেন না। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত সফলতায় নিতে হলে কেউ দখলদারিত্বে লিপ্ত হবেন না, দখলদারিত্বে সহায়তা করবেন না। কেউ দুর্বলের উপর আঘাত হানবেন না। কেউ আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবেন না। প্রতিশোধ প্রতিহিংসা নয় আসুন কার্যকর রাষ্ট্র সংস্কার নিশ্চিত করতে তারুণ্যের কাঙ্ক্ষিত একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে আমরা প্রত্যেকেই যিনি যার অবস্থান থেকে আরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেই।  

তারেক রহমান বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ আবু সাইয়িদ, মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম, মাদ্রাসাছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্কুলছাত্র রিফাত হোসেন, ৬০ বছর বয়েসী একজন মা মায়া ইসলাম, ৬ বছর বয়েসী শিশু রিয়া গোপ, কিশোরী ছাত্রী নাঈমা সুলতানা, কুমিল্লার আইনজীবী আবুল কালাম, চুয়াডাঙ্গার রাজমিস্ত্রি উজ্জ্বল হোসেন, নোয়াখালীর দোকান কর্মচারী আসিফ, বরগুনার ওষুধ কোম্পানির সেলস ম্যান আল আমিনের মতো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছেন। অসংখ্য মানুষ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তিনি বলেন, পাবনার গাড়িচালক আরাফাত হোসেন, মিরপুরে গুলিবিদ্ধ ২২ বছর বয়েসী মুস্তাকিম, দোকান কর্মচারী আতিকুল, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিমের মতো অনেকের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। শত শত মানুষ চোখ হারিয়েছেন, চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন। অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে ৫ই আগস্ট অর্জিত স্বাধীনতায় গণতন্ত্রকামী মানুষ আরও একবার স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করলেও হাসিনা পতন আন্দোলনে যেসব পরিবার তাদের সন্তান- স্বজন হারিয়েছেন কিংবা আহতদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে যেসব পরিবারে অবর্ণনীয় দুর্দশা নেমে এসেছে সেই সব বীর সন্তানদের ঘরে স্বাধীনতার স্বাদের ছোঁয়া লাগেনি।  

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যারা হতাহত হয়েছেন তাদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে গণঅভ্যুত্থানে যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে রাষ্ট্রীয় আয়োজনে সংবর্ধনা দেয়া হলে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানালে কিছু সময়ের জন্য হলেও হতাহতদের পরিবারগুলো হয়তো একটু মানসিক সান্ত্বনা পাবেন। এ ধরনের উদ্যোগ গণঅভ্যুত্থানের চেতনা আরও শানিত করবে বলেও আমার বিশ্বাস। প্রতি বছর ৫ই আগস্টকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জাতীয় জীবনের একটি বিশেষ দিবস হিসেবে সাড়ম্বরে পালন করার বিষয়টিও  বিবেচনা করা দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন,  ২০১৮ সালেও  সারা দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়েছিল। সেই সময় আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রীয় প্রতারণার শিকার হয়েছিল। গণহত্যাকারী হাসিনা আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে দমন করেছিল। এমনকি জালিম হাসিনা সেই সময় আহতদেরকে চিকিৎসার সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি। সুতরাং দেরিতে হলেও ২০১৮ সালের হতাহত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদেরকে বর্তমানে রাষ্ট্র কীভাবে সহায়তা করতে পারে সেটিও বিবেচনায় নেয়া দরকার বলে আমি মনে করি। আমি বিশ্বাস করি তারুণ্যের শক্তি তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে কখনোই একটি রাষ্ট্র ও সরকার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না।

দেশের প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সংশ্লিষ্টদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারেক রহমান বলেন, গণহত্যাকারী হাসিনা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণকারী হাসিনা পালিয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা আপনারা আপনাদের যার যার সংবাদপত্রে নির্ভয়ে এই শব্দটি লিখবেন ‘হাসিনা পালিয়েছে’। ‘হাসিনা পালিয়েছে’  শব্দটির পরিবর্তে কোনো গণমাধ্যম যদি ভিন্ন শব্দ প্রয়োগের অপকৌশল নেন সেটি জনগণের কাছে আপনাদের বিবেকের স্বাধীনতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আপনাদের প্রতি আহ্বান গত ১৫ বছরে যারা গুম, খুন ও অপহরণের শিকার হয়েছেন, ছাত্র-জনতার বিপ্লবে হাজারো মানুষ যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন তাদের এবং তাদের পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করুন।

তিনি বলেন, সাগর-রুনির হত্যা মামলার তদন্ত এক যুগেও কেন শেষ হলো না সেই প্রশ্ন তুলুন। জনগণ আপনাদের কাছ থেকে ‘আয়না ঘর’ নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট দেখতে চায়। হাসিনা দেশকে লুটেরা রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন, জনগণ দুর্নীতির সেসব চিত্র প্রতিদিন সংবাদপত্রে দেখতে চায়। গণহত্যাকারী হাসিনা প্রতিবার কীভাবে জনগণের ভোট ডাকাতি করেছিলেন, গণমাধ্যমে প্রতিদিন সেসব চিত্র তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের আহ্বান জানাই। গণমাধ্যমে হাসিনার অপকর্ম ফ্রেমবন্দি থাকলে ভবিষ্যতে আর কেউ হাসিনার মতো ভোট ডাকাতি গণহত্যায় লিপ্ত হতে সাহস করবে না, যা গণতন্ত্রের ভিতকে মজবুত করবে এবং ক্ষমতাসীনদেরকে স্বৈরাচারী আচরণ থেকে বিরত থাকতেও বাধ্য করবে।

সারা দেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী সমর্থক শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের পথ ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে। সেই নির্বাচনে জনগণের রায় পেতে জনগণের মন জয় করুন।  জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসা অর্জন করুন। জনগণের সুখে-দুঃখে জনগণের সঙ্গে থাকুন। জনগণকে সঙ্গে রাখুন। ধর্ম, বর্ণ পরিচয়ের কারণে কেউ যাতে অনিরাপদ বোধ না করেন দায়িত্বশীল এবং জনপ্রিয় দল বিএনপি’র একজন নেতাকর্মী সমর্থক হিসেবে সেটি নিশ্চিত করুন।  

হাসিনা পতনের আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণহত্যাকারী হাসিনা পতনের আন্দোলনে দেশে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিশেষ অবদান রেখেছেন। দেশে যখন মত প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল প্রবাসীদের মধ্যে একদল সাহসী মুখ প্রবাস থেকেই জনগণের সামনে হাসিনার দুঃশাসনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে গণআন্দোলনে শামিল থেকেছেন। প্রবাসে থেকেই হাসিনা পতনের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে গিয়ে কোনো কোনো প্রবাসী বাংলাদেশিকে প্রবাসে জেল-জুলুম সইতে হয়েছে, হচ্ছে। ছাত্র-জনতার কাঙ্ক্ষিত একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে সাধ্যমতো প্রবাসীদেরকে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।

কেমন আছেন জাবি’র আহত সাংবাদিকরা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) কর্মরত সাংবাদিকরা। গত ১৫ই জুলাই দিবাগত রাতে ছাত্রলীগের বর্বরোচিত আক্রমণ এবং পুলিশি হামলায় আহত হয় প্রায় কয়েকজন সাংবাদিক। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন চারজন। এ ছাড়াও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে ৬ জন সাংবাদিক আহত হন। তাদের মোবাইল, সাইকেল, মানিব্যাগ নিয়ে যান বহিরাগতরা। গুলিবিদ্ধরা ছাড়া বাকিরা চিকিৎসা গ্রহণ করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলেও এখনো হাসপাতালে নিয়মিত চেকআপ করতে হচ্ছে গুলিবিদ্ধদের।

আহত সাংবাদিকরা হলেন- দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল, মানবজমিনের প্রতিনিধি মো. ইমরান হোসাইন, বণিক বার্তার প্রতিনিধি মেহেদী মামুন, দৈনিক বাংলার প্রতিনিধি আব্দুর রহমান সার্জিল, প্রথম আলোর প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুন, বিডিএন৭১ এর প্রতিনিধি রবিউল হাসান, ডিবিসি নিউজের প্রতিনিধি জোবায়ের আহমেদ, দ্য সাউথ এশিয়ানের প্রতিনিধি সাকিব আহমেদ, দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি মোসাদ্দেকুর রহমান,বাংলা ট্রিবিউনের এস এম তাওহীদ, শেয়ার বিজের ওসমান সরদার, দৈনিক জনকণ্ঠের ওয়াজহাতুল ইসলাম, আমাদের সময়ের নোমান বিন হারুন, সময়ের আলোর প্রতিনিধি মুশফিকুর রিজন।
গুলিবিদ্ধ দৈনিক বাংলার প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ছাত্র আব্দুর রহমান খান সার্জিল বলেন, আমরা সাংবাদিকরা সবাই একদিকে ছিলাম। আমাদের লক্ষ্য করে পুলিশ ছররা গুলি ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে আমি আহত হয়ে নিচে বসে পড়ি। পরবর্তীতে আমাদের উদ্ধার করে এনাম মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই আমরা চিকিৎসা নিতে থাকি।

আমার পায়ে এখনো প্রায় ৭০ টির মতো ছররা গুলি রয়েছে। মাঝে মাঝে তীব্র ব্যথা করে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো চিকিৎসা চলছে। হাঁটাচলায় কষ্ট হচ্ছে। গুলিবিদ্ধ বণিক বার্তার প্রতিনিধি সাংবাদিক মেহেদী মামুন জানায়, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ আমার ওপর সরাসরি গুলি চালায়। আমি বার বার সাংবাদিকতার কার্ড দেখালেও তারা বিরত থাকেনি। আমার শরীরে ৩০টার ওপরে ছররা গুলি লেগেছিল, এরমধ্যে ১৭টি বের করতে পেরেছি। বাকিগুলো শরীরে রয়ে গেছে। ডাক্তারের নিয়মিত চেকআপে রয়েছি।
মানবজমিনের প্রতিনিধি মো. ইমরান হোসাইন বলেন, ওইদিন পুলিশ ও ছাত্রলীগ ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছিলো। তখন ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের দ্বারা আক্রমণের শিকার হই। আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যায়। আমি এখন সুস্থ আছি। আহত সাকিব আহমেদ সেই রাতে দুর্বিষহ স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ওইদিন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। ছাত্রলীগের কিছু ভাড়া করা সন্ত্রাসী সাবেক প্রক্টর আ.স.ম ফিরোজ-উল হক ও পুলিশের সামনেই আমাকেও লাঠি দিয়ে আঘাত করলে আমার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। আমার মাথায় ৮টি সেলাইয়ের প্রয়োজন হয়। এখন আমি শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ। তবে এখনো সেই রাতের দুর্বিষহ স্মৃতি মনে পড়লে হাত-পা কেঁপে ওঠে।



বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করবে জাতিসংঘ

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এক চিঠিতে তার সরকারের প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ১৬ই আগস্ট এক চিঠিতে জাতিসংঘের মহাসচিব গণতন্ত্রের দিক উন্মোচনে ড. ইউনূসকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। সোমবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং চিঠিটি প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশের জনগণের সুবিধার জন্য আবাসিক সমন্বয়কারী এবং জাতিসংঘের কান্ট্রি টিমের মাধ্যমে যেকোনো অনুরোধ পেলে জাতিসংঘ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জাতিসংঘ প্রধান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাকে শুভেচ্ছা জানান। গুতেরাঁ বলেছেন, বাংলাদেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টাকে আমি স্বাগত জানাই। তিনি আরও বলেছেন, এই ক্রান্তিকালীন সময়ে সহিংসতার অবসান ঘটাতে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথ নির্ধারণে ড. ইউনূসের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ড. ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে মহাসচিব বলেন, আমি আশাবাদী যে, আপনার (ইউনূসের) সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পন্থা গ্রহণ করবে যার মাধ্যমে যুবক ও নারীদের পাশাপাশি সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাকস্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হবে। দেশের সকল নাগরিক, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপর নির্ভর করছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব।
ড. ইউনূসকে পাঠানো চিঠিতে গুতেরাঁ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। মহাসচিব বলেছেন,  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মঙ্গল নিশ্চিত করতে আমি আপনাকে (ইউনূসকে) জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। রিপাবলিক অব দ্য ইউনিয়ন অব মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনা করে গুতেরাঁ ড. ইউনূসকে এই আহ্বান জানান। চিঠিতে সর্বশেষ গুতেরাঁ বলেছেন, বাংলাদেশ এখন তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।