Tuesday, February 7, 2017

মনের আলোয় পাহাড় ডিঙিয়ে চিঠি বিলান তিনি

চিঠি বিলির জন্য জেগে ওঠেন সাতসকালেই। গায়ে জড়িয়ে নেন উষ্ণ সোয়েটার বা শাল। এরপরই তিনি লাঠি হাতে বেরিয়ে পড়েন। গ্রামের শেষ বাড়িটিতে পৌঁছে দেন চিঠি। এ জন্য তাঁকে পাহাড় ডিঙিয়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। আর এ কাজটি অন্ধ একজন মানুষ করছেন ৪৪ বছর ধরেই। ওই ডাকপিয়নের নাম মুহাম্মেদ আনোয়ার।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের হরিপুর জেলার দূরবর্তী একটি গ্রামের আনোয়ারকে এলাকার লোক হাফিজ সাহেব বলে ডাকেন। তাঁর কাহিনি বর্ণনা হয়েছে দেশটির ডন পত্রিকায়। তারিক হাবিবের ওই প্রতিবেদন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো: আনোয়ার সতর্কতার সঙ্গে নুড়ি পাথরের পথ অতিক্রম করে চলেন। চলার পথটি তাঁর ভালোমতো চেনা। গ্রামের মানুষও তাঁর চলার পথের সঙ্গী হন। কেউ কেউ হাত ধরে আন্তরিকভাবে কথা বলেন। কুশলাদি জানতে চান। শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় কণ্ঠস্বর শুনেই বলে দিতে পারেন তাঁর নাম-পরিচয়। আনোয়ার জন্মান্ধ। তাঁর মা ও ভাইবোন অন্ধ। বাবার মৃত্যুর পরই পরিবারের হাল ধরতে হয় আনোয়ারকে। জীবনের শুরুর দিকের কথা স্মরণ করে আনোয়ার বলেন, ‘আমার মা, ভাই, বোন, আমিসহ পরিবারের চারজন অন্ধ ছিলাম। খুব ছোটবেলায় কাজের খোঁজে বের হতে হয় আমাকে। ছোটবেলায় আমি আংশিকভাবে অন্ধ ছিলাম। একপর্যায়ে আর কিছু দেখতেই পাই না।’ নিজের বিয়ের কথা উল্লেখ করে আনোয়ার বলেন, ‘আমার স্ত্রী অন্ধ ছিলেন না। আল্লাহ আমাদের চারটি সন্তান দিয়েছেন, তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ডাকপিয়নের এই চাকরি আমার জন্য আশীর্বাদ ছিল, কারণ আমি এতে আমার সংসার চালাতে পারছি।’
আনোয়ারের ভাই মারা গেছেন। ভাইয়ের সন্তানদেরও দেখতে হয় তাঁকে। আনোয়ার ওই এলাকায় দুটি ডাকঘরের কাজ করেন। তিনি অন্ধ হয়েও এ কাজ অনায়াসে করেন। চিঠি বিলির পর গ্রামবাসী প্রায়ই আনোয়ারকে চা খাওয়ার জন্য দাওয়াত দেন। পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকার এই ডাকপিয়ন বলেন, ‘১৯৭৩ সালে মাসে ৫৫ রুপি বেতনে ডাকপিয়নের এই কাজ পেয়েছিলাম। এ অর্থে ওই সময় আমার পরিবারের সদস্যদের দৈনিক খাদ্য জোগাড় হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘৪৪ বছর ধরে আমি ওই এলাকার ডাক অফিসের অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কাজ করছি। আমার কাজ হলো মানুষের কাছে চিঠি ও অন্যান্য কাগজপত্র পৌঁছে দেওয়া এবং এক ডাক অফিস থেকে অন্য ডাক অফিসে চিঠি পৌঁছে দেওয়া। এখন প্রতি মাসে আমি বেতন হিসেবে পাই ১ হাজার ৪০ রুপি। এই এলাকায় অতীতে রাস্তা বা গাড়ি ছিল না। এমনকি এখনো নেই। আমি এখনো হেঁটেই চিঠিপত্র বিলির কাজ করি।’ সব সময় সৎভাবে কাজ করার কথা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন আনোয়ার, ‘আমি অনেক ওজনদার প্যাকেট এবং বড় অঙ্কের মানি অর্ডার মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আমি বুড়ো হয়ে গেছি।
এখন বিশ্রাম নিতে চাই কিন্তু আমার গ্রামের মানুষ এখনো আমাকে ভালোবাসেন। তাঁরা আমাকে অবসরে যেতে দিতে চান না।’ আনোয়ার বলেন, ‘প্রতি পাঁচ বছরে একবার বাড়ে আমার বেতন। আমার অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বেতন বাড়ার ব্যাপারে আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু বেতন আর বাড়ে না। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি যেন পোস্ট অফিসে আমার ভাগনের একটি স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এটা হলে আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’ এত বছর ধরে নিয়মিত নিজের কাজটি করে গেলেও চাকরি স্থায়ী হয়নি তাঁর। আর চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় আনোয়ার পাবেন না পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা। কাজের প্রতি অবিচল আনোয়ার তাঁর এলাকার মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। কাজ দিয়েই তিনি মানুষ ও ডাক অফিসের লোকজনের কাছ থেকে সম্মান ও শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন। হরিপুরের কাকত্রি পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা ডনকে বলেন, ‘হাফিজ সাহেবের কাজ দৃষ্টান্তমূলক। তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে কাজ করেন। বিপৎ​সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে তিনি প্রায়ই মাথায় করে পোস্ট অফিসের কাগজপত্র চিঠি আনা-নেওয়া করেন। কিন্তু কোনো দিনই তিনি ব্যর্থ হননি।’

বিধানসভা ভোটে তাঁরা কি এবার মোদিকে ছাড়ছেন?

কপালজোর একেই বলে। আবার একেই বলে এক ঢিলে তিন পাখি মারা। কপালজোর না হলে উত্তর প্রদেশের ভোটযুদ্ধ দেখতে বেরিয়ে এভাবে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দেখা মেলে না। উত্তর প্রদেশের পশ্চিম প্রান্ত, যা কিনা রাজ্যের ‘সুগার বেল্ট’ ও ‘জাঠভূমি’ বলে পরিচিত, এ মাসের ১১ ও ১৫ তারিখ যেখানকার ২৬টা জেলার ১৪০টা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট, সেখানকার প্রধান শহর মিরাট থেকেই নরেন্দ্র মোদি শুরু করলেন তাঁর আরও এক মরণ-বাঁচন লড়াই। আর চরতে বেরিয়ে আমিও তাঁর সাক্ষী থেকে গেলাম! ভোটের বাজারে কপালজোর ছাড়া একে আর কীই-বা বলা যেতে পারে? কী ভেবে নরেন্দ্র মোদি গত শনিবার মিরাট থেকেই উত্তর প্রদেশ অভিযান শুরু করলেন জানি না। তিনি হাঁক দিয়েছেন কংগ্রেসমুক্ত ভারত এবং অপরাধ ও অপশাসনমুক্ত উত্তর প্রদেশের! সিপাহি বিদ্রোহের আঁতুড়ঘর মিরাটকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার সেটাই হয়তো কারণ। প্রধানমন্ত্রীর জনসভা শতাব্দী নগরে। মূল শহরের উপান্তে নতুন জনপদ গড়ে উঠছে। সেখানে বিস্তীর্ণ ফাঁকা এলাকায় বাঁধা পেল্লাই মঞ্চ।
বেলা সাড়ে বারোটাতেই উপচে পড়েছে ময়দান। কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব। মঞ্চ থেকে প্রদেশের নেতারা পাখি-পড়া পড়াচ্ছেন, ‘মোদিজি আসামাত্র আপনারা তালে তালে মো-ও-দি, মো-ও দি বলা শুরু করবেন। ভাষণ শুরু করার আগে আবার দুই মিনিট ধরে ওইভাবে মো-ও দি, মো-ও দি চলবে। তারপর মোদিজি যা যা বলবেন তাতে প্রাণ খুলে সাড়া দেবেন। মনে রাখবেন, এই লড়াইয়ে আমাদের হারলে চলবে না।’ মোদি ভাষণ শুরু করলেন এবং তাঁর স্টাইলে জানিয়ে দিলেন, ইংরেজি শব্দ ‘স্ক্যাম’, যার অর্থ আর্থিক কেলেঙ্কারি বা দুর্নীতি, তার বানানের মধ্যেই রয়েছে দুর্নীতিগ্রস্তদের পরিচয়! কী রকম? মোদি বললেন, ‘‘‘স্ক্যাম’-এর প্রথম বর্ণ বা আদ্যাক্ষর হলো ‘এস’। এই ‘এস’ হচ্ছে সমাজবাদী পার্টি। দ্বিতীয় বর্ণ ‘সি’। তারা দুর্নীতির উৎসমুখ কংগ্রেস। তৃতীয় বর্ণ ‘এ’। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব। আর চতুর্থ বর্ণ ‘এম’ হলেন মায়াবতী। এঁদের হাত থেকে উত্তর প্রদেশকে উদ্ধার করাই আমার ব্রত।’ এ কথা শুনে জনতা উদ্বেল হলো। মোদি বললেন, ‘উত্তর প্রদেশ আমাকে প্রধানমন্ত্রী করেছে। এই দুষ্টত্রয়ীর হাত থেকে রাজ্যকে মুক্ত করাই হবে আমার ঋণশোধ।’ এক ঢিলে তিন পাখি মারা তো একেই বলে! এই আশা নরেন্দ্র মোদি অবশ্য করতেই পারেন। কেননা, এই রাজ্যই ২০১৪ সালে তাঁর ঝুলি উপচে দিয়েছিল! লোকসভার ৮০টি আসনের মধ্যে ৭১টির ভোটার তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েই বিজেপির পদ্মে ছাপ দিয়েছিলেন! বিজেপির সহযোগী আপনা দলকে জিতিয়েছিল ২টি আসনে। সব মিলিয়ে ৮০-এর মধ্যে ৭৩, যা রাজ্যের ইতিহাসে কোনো দিন হয়নি! তিন বছরের মাথায় তা হলে ওই রকম আশাবাদী হওয়াটা কি অন্যায়?
অন্যায় নয়। কিন্তু জট পাকিয়ে দিয়েছে অখিলেশ যাদবের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মেলানোর ঘটনাটা। প্রথমে লক্ষ্ণৌ, পরে এই সেদিন আগ্রায় এই দুজনের রোড শোতে মানুষের বান ডেকেছিল। নরসিংহ রাওয়ের কংগ্রেস নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি যখন বহুজন সমাজবাদী পার্টির স্রষ্টা কাঁসিরামের হাত ধরেছিলেন, তখন এই জনপ্লাবন দেখা যায়নি। তা ছাড়া সেটা ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী হতশ্রী ও ছন্নছাড়া কংগ্রেস। দুই দশকেরও বেশি সময় পর রাহুল-অখিলেশের যুগলবন্দী রাজ্যজুড়ে মায়াবী সুরের অন্য এক মূর্ছনা তৈরি করেছে। এই দোস্তি বিজেপির স্নায়ুকে টানটান করে রেখেছে। বিজেপির তূণের সিংহভাগ তিরেই তাই অখিলেশ ও রাহুলের নাম লেখা। মোদি ও বিজেপির নেতারা আশ্রয় খুঁজছেন নখদন্তহীন অসহায় মুলায়ম সিং যাদবের মধ্যেও। যেমন মোদি বললেন, ‘আমার খারাপ লাগছে মুলায়মজিকে দেখে। বন্দী ও বৃদ্ধ শাজাহানের মতো এখন তিনি নিভৃতে অশ্রু বিসর্জন করছেন। আজীবন কংগ্রেসের বিরোধিতা করে যে দলটা তিনি নিজের হাতে করে গড়ে তুলেছিলেন, তা এখন চরিত্রভ্রষ্ট! রাজ্যবাসী এই অন্যায়কে নিশ্চয় প্রশ্রয় দেবে না।’ ন্যায়-অন্যায়ের এই উত্তরটারই খোঁজ চলেছে পশ্চিম-উত্তর প্রদেশে। ২০১৩ সালে যাঁর আমলে মুজফফরনগরের দাঙ্গা, সেই অখিলেশকেই কি পশ্চিম-উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা দ্বিতীয়বারের জন্য কোল পেতে দেবে?
প্রশ্নটা যেমন বিজেপির, তেমনই মায়াবতীরও। রাজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ মুসলমানের মন জিততে মায়াবতী এবার ৯৯ জন মুসলমান প্রার্থী দিয়েছেন। সমাজবাদী গৃহযুদ্ধের ফায়দা লুটতে মুসলমান প্রার্থীরা এবার তাঁর তুরুপের তাস। বিজেপির নজরও ওই দিকে। তারা ভাবছে, মুসলমান ভোট বাটোয়ারা হলে মরণ-বাঁচনের এই লড়াই শেষে নরেন্দ্র মোদি হাসতে হাসতে ঠিক বেরিয়ে আসতে পারবেন। ভাবছেন বটে। কিন্তু এবারের ভোটের অঙ্ক নিছকই পাটিগণিত নয়। কিছুটা রসায়নেরও। পশ্চিম-উত্তর প্রদেশের আদিগন্ত জাঠভূমি বলে পরিচিত। চাষের জমির সিংহভাগ জাঠদেরই। কেন্দ্রীয় সরকার আখের ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্য বাড়ায়নি। চিনিকলেরও বকেয়া আছে। চাষির কৃষিঋণ শোধ হচ্ছে না। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো পেকে উঠেছে নোটবন্দির মার। ফলে জাঠনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সব খাপ পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত, বিজেপিকে এবার ভোট নয়। মুরাদনগর, বাগপত, মিরাটের জাঠেরা এক অদ্ভুত অভিমানে টসটস করছে। অথচ তিন বছর আগে তারাই নরেন্দ্র মোদিকে বরণ করে নিয়েছিল! সেই অভিমানে ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন রাষ্ট্রীয় লোকদলের অজিত সিং ও তাঁর পুত্র জয়ন্ত। ঘোলা জলে মাছ ধরার আশায় এবার তাঁরা ভোটের আগে কারও দিকে হাত বাড়াননি।

শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ইরাকি ফুয়াদ শারেফ

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পেরেছেন ইরাকের ফুয়াদ শারেফ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। নানা বাধা-বিপত্তির কারণে যাত্রা শুরুর এক সপ্তাহের বেশি সময় পর তাঁরা টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিল শহরে পৌঁছান। প্রথমে প্রায় এক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার পর কায়রোতে আটকে দেওয়া হয় শারেফ ও তাঁর পরিবারকে। সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ জারি করাই এর কারণ। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের একজন বিচারক ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দিলে শারেফের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। এই সুযোগে আরও অনেকের মতো তিনিও দেরি না করে যুক্তরাষ্ট্র রওয়ানা হন। এবার কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই ঢুকে পড়েন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে গত রোববার নিউইয়র্কে অবতরণ করেন। মার্কিন আন্তর্জাতিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা ইউএসএআইডির সাবেক সাবকন্ট্রাক্টর শারেফের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘপ্রতীক্ষিত নতুন জীবন শুরুর চেষ্টা করছে।
ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দা তারা। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে শারেফ গত এক সপ্তাহের দুর্ভোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। শিখেছি যে অধিকার থাকলে কখনোই হাল ছাড়তে নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসা পেতে শারেফ পরিবারের দুই বছর সময় লেগেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ও ইরাকের সরকারি সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি বিশেষ কর্মসূচির আওতায় অভিবাসন ভিসা দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর জন্য তিনি ঘরবাড়িসহ সব বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সিরীয় শরণার্থী নায়েল জাইনো তুরস্কে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থায় কাজ করতেন। জাইনো গত শনিবার বোস্টনে পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হতে পেরেছেন। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী সব শরণার্থী গ্রহণের ওপর ১২০ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। আর সিরীয় শরণার্থী হলে তা থাকবে অনির্দিষ্টকাল। জাইনো গত ২৭ জানুয়ারি ভিসা পান। সেদিনই ট্রাম্প ওই বিতর্কিত নির্বাহী আদেশে সই করেন।

ভারতের সঙ্গে একীভূত হতে গণভোট দিন

পাকিস্তানকে ব্যঙ্গ করে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, পাকিস্তানের জনগণ তাদের দেশে থাকতে চায়, না কি ভারতের সঙ্গে একীভূত হতে চায় সে বিষয়টি যাচাই করে দেখতে দেশটিতে গণভোট আয়োজন করা উচিত। গত রোববার ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের তীর্থ নগর হরিদ্বারে এক নির্বাচনী জনসভায় এ মন্তব্য করেন রাজনাথ সিং।
এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘কাশ্মীর সব সময় ভারতেরই ছিল এবং ভবিষ্যতেও ভারতের অংশ থাকবে।’ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এখন পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে গণভোট চায়। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে ছিল ও ভবিষ্যতেও থাকবে এবং কোনো শক্তিই এটা পাল্টাতে পারবে না। তাই কাশ্মীর দাবি করার বদলে পাকিস্তানের উচিত তাদের জনগণ সেদেশেই থাকতে চায়, না কি ভারতের সঙ্গে মিশে যেতে চায় তা নিয়ে গণভোটের আয়োজন করা।’ দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকার জন্য রাজনাথ ইসলামাবাদকে দায়ী করে বলেন, ‘আমি পাকিস্তানকে বলতে চাই, ভারত সব সময় শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চায়। কিন্তু ইসলামাবাদই তা নষ্টের চেষ্টা করেছে।
“এই সন্ত্রাসী” ও যাঁরা কাশ্মীর নিয়ে গণভোটের দাবি করছেন তাঁদের থামানো দরকার।’ রাজনাথ অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাইলেও বারবার ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে তা নষ্ট করার জন্য তারাই দায়ী। বিশ্ব এখন আর ভারতকে দুর্বল রাষ্ট্র বলে মনে করে না। পাকিস্তানের ভেতর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, আমরা কঠিন পদক্ষেপ নিতে জানি। ভারত শান্তিকামী হতে পারে কিন্তু কখনোই দুর্বল নয়।’ পাকিস্তানের প্রত্যাশা এদিকে পাকিস্তানের পরিকল্পনা ও উন্নয়নমন্ত্রী আহসান ইকবাল আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ভারতে শুরু হওয়া রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন শেষ হলে দেশটির সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরুর অধিকতর ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে। ভয়েস অব আমেরিকার (ভোয়া) সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন। ভোয়ার এক প্রশ্নের জবাবে পাকিস্তানি মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান পাল্টাতে পারব না। আমাদের চিন্তাভাবনা অবশ্যই শান্তির আলোকে করতে হবে।’

জয়ললিতা বলেছিলেন ‘আমিই দায়িত্বে’

তামিলনাড়ুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার শেষ চিকিৎসা হয়েছিল চেন্নাইয়ের যে হাসপাতালে, সেখানকার হাসপাতালের চিকিৎসকেরা গতকাল সোমবার বলেছেন,
জয়ললিতা বড় ধরনের হার্টঅ্যাটাক হওয়ার আগ পর্যন্ত ‘কথা বলছিলেন’। জয়ললিতার মৃত্যু নিয়ে ছড়ানো নানা গুজব দূর করতে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন চিকিৎসকেরা। চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেন, ‘এই মৃত্যু নিয়ে রহস্যের কিছু নেই। বিষক্রিয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।...ওনার হার্টঅ্যাটাক কার্যত সবার সামনেই ঘটে।’ প্রায় তিন মাস হাসপাতালে কাটিয়ে জয়ললিতা গত ৫ ডিসেম্বর মারা যান। জয়ললিতার শেষ মুহূর্তে তাঁকে চিকিৎসা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক ফুসফুস বিশেষজ্ঞ রিচার্ড বেল।
তিনি বলেছেন, অসুস্থ মুখ্যমন্ত্রীকে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘চিকিৎসার দায়িত্বে আমি রয়েছি।’ তখন মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জয়ললিতা বলেছিলেন, ‘না, আমিই দায়িত্বে।’ রিচার্ড বেল বলেছেন, জয়ললিতার ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ হয়েছিল, যা তাঁর মৃত্যু ডেকে আনে। এদিকে জয়ললিতার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শশীকলা নটরাজন তামিলনাড়ুর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত হওয়ার পরদিনই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, শশীকলার দুর্নীতি মামলার রায় খুব সম্ভবত আগামী সপ্তাহের মধ্যেই দেওয়া হবে।

এবার রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নীলকান্ত জয়ন্তী

যুক্তরাজ্যের সিংহাসনে প্রথম ‘নীলকান্ত জয়ন্তী’ পূর্ণ করলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সিংহাসনে আরোহণের ৬৫ বছর পূর্ণ করেছেন তিনি। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী তোপধ্বনি দিয়ে দিনটি উদ্‌যাপন করে। ‘নীলকান্ত জয়ন্তী’ উপলক্ষে ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার ডেভিড বেইলির তোলা রানির একটি ছবি নতুন করে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছবিতে রানির পরিহিত নীলকান্তমণির অলংকারগুলো রাজা ষষ্ঠ জর্জ ১৯৪৭ সালে রানি এলিজাবেথের বিয়েতে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। রানির কার্যালয়ে তোলা ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, ১৬টি আয়তাকার হীরাবেষ্টিত নীলকান্তমণির হার এবং একই রঙের কানের দুল পরে আছেন রানি এলিজাবেথ।
২০১৪ সালে রানির ৮৮তম জন্মদিনে যেসব ছবি তুলেছিলেন বেইলি, সেগুলোরই একটি এটি। ২০১৫ সালেই ৮৯ বছর বয়সে দ্বিতীয় এলিজাবেথ যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিদিন রাজত্ব করার গৌরব অর্জন করেন। ‘নীলকান্ত জয়ন্তী’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে গতকাল বেলা ১টায় লন্ডনের গ্রিন পার্কে ৪১ বার এবং টাওয়ার অব লন্ডনে ৬২ বার তোপধ্বনি করে রানিকে রাজকীয় অভিবাদন জানানো হয়। ২০২২ সালে ‘প্লাটিনাম জুবিলি’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে আরও বড় ধরনের আয়োজনের আশা করা হচ্ছে। তখন রানির সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর পূর্তি হবে।

উড়োজাহাজের দীর্ঘতম যাত্রা

কোনো বিরতি ছাড়াই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কাতার থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ নিউজিল্যান্ডে উড়ে গিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম ফ্লাইটের রেকর্ড গড়ল কাতার এয়ারওয়েজ। কাতারের দোহা থেকে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড যাওয়ার পথে বোয়িং ৭৭৭-২০০ এলআর সিরিজের উড়োজাহাজটি বিরতিহীনভাবে পাড়ি দিয়েছে ১৪ হাজার ৫৩৫ কিলোমিটার (৯ হাজার ৩২ মাইল) দূরত্ব। সময় লেগেছে ১৬ ঘণ্টা ২৩ মিনিট। এক টুইট বার্তায় কাতার এয়ারওয়েজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে অকল্যান্ডে অবতরণ করেছি।’ কাতারের রাষ্ট্রীয় বিমান চলাচল সংস্থাটি জানিয়েছে, কিউআর-৯২০ ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ের ৫ মিনিট আগে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ৪ পাইলট। তাঁদের সহযোগিতা আর যাত্রীদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন ১৫ জন ক্রু সদস্য। দীর্ঘ এ যাত্রায় তাঁরা যাত্রীদের মোট ১ হাজার ৩৬ বার খাবার,
২ হাজার বার ঠান্ডা পানীয় এবং ১ হাজার ১০০ কাপ চা ও কফি পরিবেশন করেছেন। অকল্যান্ডে পৌঁছানোর পরপরই উড়োজাহাজটিকে জলকামান দিয়ে পানি ছুড়ে স্বাগত জানায় অকল্যান্ড বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। নতুন কোনো আন্তর্জাতিক রুটে প্রথম ফ্লাইটকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এভাবে জলকামানের মাধ্যমে স্বাগত জানানো এয়ারলাইনগুলোর ঐতিহ্য। তবে ভারতের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার দাবি, রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো যেতে তাঁদের উড়োজাহাজকে পাড়ি দিতে হয় ১৫ হাজার ১২৭ কিলোমিটার। কাজেই দূরত্বের দিক থেকে তাদের রুটই বিশ্বের দীর্ঘতম। বিশ্বের দীর্ঘতম বাণিজ্যিক ফ্লাইটের রেকর্ডটি এর আগে ছিল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ঝুলিতে। সিঙ্গাপুর থেকে ১৯ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির নেওয়ার্ক পর্যন্ত ১৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হতো ফ্লাইটটিকে। কিন্তু ২০১৩ সালে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে মুখর লোপেন

বিশ্বায়ন ও ইসলামি উগ্রবাদের বিরুদ্ধে চড়াও হওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলেন ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন লো পেন।
ন্যাশনাল ফ্রন্টের এই প্রার্থী গত রোববার পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিওঁতে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্বায়ন ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে গ্রাস করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী ২৩ এপ্রিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট নেওয়া হবে। ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়ছেন না।

রাজধানীর ফুটপাতের হকার সমাচার

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অনেক বছর আগে থেকেই এবং অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে পেরুর সাহিত্যিক মারিও বার্গাস ইয়োসা বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। শুধু সৃষ্টিশীল সাহিত্য নয়, তিনি গুরুত্ব পেয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী রচনার জন্যও। বস্তুত তিনি স্প্যানিশ আমেরিকার শত শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে নিপীড়িত মানুষের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক অবস্থার একজন বস্তুনিষ্ঠ ভাষ্যকার।
আশির দশকের শেষের দিকে আমি তাঁর নন-ফরমাল ইকোনমির ওপর একটি দীর্ঘ লেখা পাই। সৃষ্টিশীল লেখক ছাড়া পেশাদার লেখকের পক্ষে অত প্রাঞ্জল রচনা সম্ভব নয়। ওই প্রবন্ধে তিনি বড় নগরীর ফুটপাতের হকারদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপি বাড়াতে তাঁদের যে অবদান, তা তুলে ধরেন। পৃথিবীতে সম্ভবত এমন কোনো মহানগরী নেই, যেখানে ফুটপাতে হকার নেই। তবে সেখানে খেয়ালখুশিমতো নয়, নগর কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষেই তাঁরা বিক্রিবাট্টা করেন। ফুটপাতের পাশে দোকানদারিও হয়, অন্যদিকে মানুষ হাঁটতেও পারে, কেনাকাটাও করে। কেউ কারও বিঘ্ন ঘটায় না। বছর দুই আগে একদিন দেখি একদল হকার তাঁদের জিনিসপত্র কাঁধে পুলিশের তাড়া খেয়ে ফুটপাত দিয়ে ঊর্ধ্বাকাশে দৌড়াচ্ছেন। সবার পেছনে যাঁরা, তাঁদের পিঠে পড়ছে লাঠির বাড়ি। এক বৃদ্ধ চাদরে বাঁধা তাঁর বোঝা নিয়ে দৌড়াতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে কংক্রিটের ফুটপাতে পড়ে গেলেন। বোঝার চাপে পিঠে কতটা ব্যথা পেয়েছিলেন তা বলা যায় না, কিন্তু হাঁটুর চোট ছিল প্রচণ্ড। উঠে তাঁর পক্ষে আর হাঁটাই সম্ভব হচ্ছিল না। ফুটপাতের হকারদের পুঁজির পরিমাণ কারও কারও একটু বেশি হতে পারে, কিন্তু অধিকাংশেরই পুঁজিপাট্টা অতি অল্প। প্রতিদিনের বিক্রির থেকে যে লভ্যাংশ, তা দিয়ে কোনোমতে তাঁদের সংসার চলে।বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যত রকম অব্যবস্থা রয়েছে,
তার সবগুলোর সুবিধাভোগী প্রশাসনের কর্মকর্তা, সরকারি দলের ক্যাডার-মাস্তান, কিছুটা বড় বিরোধী দলের লোকেরাও এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানুষ। দেখা যায়, দুই দিন আগেই একদল পুলিশ ও তাদের সহযোগী কয়েকজন ছাত্রনেতা নামধারী এসে টিকিট বিক্রি করে বসিয়ে গেছেন। বলে গেছেন, বইসা যাইয়েন, কে ওঠায় দেইখ্যা দিমু। দুই দিন পরে আরেক দল এসে বলে, এহানে বসতে কইছে কে? হে গো যা দিছ তার ডবল না দিলে রাস্তা ছাড়ো। দ্বিগুণ দিয়ে রাস্তা ছাড়া থেকে আপাতত বাঁচা যায়, কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হয় না। ফুটপাতের হকার ছাড়া বড় মহানগরীর জীবন অচল। কারা করেন ফুটপাতের হকারের ব্যবসা? যাঁরা প্রধানত শহরের এবং গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ। যাঁদের সেলামি দিয়ে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করার সামর্থ্য নেই। অত পুঁজি তাঁদের নেই। এই হকারদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ, অল্পশিক্ষিত বেকার চাকরিবাকরি না পেয়ে ধারদেনা করে কিছু মূলধন জোগাড় করে ছোট ব্যবসায় নেমেছেন। বসে পড়েছেন ফুটপাতের এক প্রান্তে। দিনে দিনে বিক্রি করে যা রোজগার হয়, তাতে কোনোমতে চলে সংসার। ফুটপাতের পণ্যের ক্রেতা কারা? তাঁদের ক্রেতার ৯০ শতাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ, সাধারণ পথচারী ও গৃহবধূ। আজ মধ্যশ্রেণির নারী পেশাজীবী। জীবিকার প্রয়োজনে, বিভিন্ন কাজে যাতায়াতের সময় তাঁরা পথ চলতে প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কেনাকাটা করেন। কাপড়চোপড় থেকে জুতা-স্যান্ডেল, প্রসাধন সামগ্রী, লেস ফিতা,
চুলের ফিতা, রাবার ব্যান্ড, বাচ্চাদের কাপড়চোপড়, গামছা, তোয়ালে, খেলনা, ঘরের টুকিটাকি জিনিসপত্র, ইলেকট্রনিক খুচরা যন্ত্রাংশ, হাঁড়ি-পাতিল, বাসনকোসন, গামলা-বালতি যাবতীয় জিনিস ফুটপাতে পাওয়া যায়। দেশে আধুনিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। সেগুলোর উৎপাদিত পণ্য দেশের মানুষ ব্যবহার করছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। বিদেশেও আমাদের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে তা বড় ভূমিকা রাখছে। আমাদের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদেরা জিডিপির পরিমাপ করে দেশবাসীকে অবগত করেন। জিএসপি পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে সুবিধা-অসুবিধার কথা আলোচনা হয়; কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কমবেশি তিন ভাগের দুই ভাগ মানুষ পরোক্ষ অথবা প্রত্যক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান বিরাট। ঢাকার রাস্তায় হকাররা যে কৃষি-অর্থনীতিতে কত বড় অবদান রাখছেন, তা চোখ থাকতেও আমরা দেখতে পাই না। ঢাকার রাস্তায় শত শত বা হাজার হাজার দরিদ্র কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী শসা, গাজর, আমড়া, পেয়ারা, কামরাঙা, আনারস, বাতাবি, পেঁপে প্রভৃতি কেটে ঝাল-মসলা দিয়ে বিক্রি করে। ওভাবে কেনা না গেলে অল্প আয়ের মানুষ বাজার থেকে আস্ত কিনে খেতে পারত না।
অন্যদিকে গ্রামীণ কৃষিপণ্য এসব হকার বিক্রি না করলে চাষি ন্যায্যমূল্য পেতেন না এবং বহু ফলমূল নষ্ট হয়ে যেত। যা শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, জাতীয় ক্ষতি। নিরক্ষর দরিদ্র হকার উচ্চতর অর্থনীতির তত্ত্ব বোঝে না, জিডিপির অর্থ জানে না, কিন্তু কিছুই না জেনে জাতীয় অর্থনীতিতে যে অবদান রেখে যাচ্ছে, তা পরিমাপের অবসর আমাদের নেই। প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় কোটি কোটি টাকার পতনশীল পণ্য ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে রাজপথের হকারদের কল্যাণে। এভাবে হকাররা শিল্প-কলকারখানার উপকার করছে, অন্যদিকে কৃষিরও উপকার করছে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়েছে: ‘আইনের ধারা আরোপিত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে কোনো পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের কিংবা কারবার বা ব্যবসায়-পরিচালনার জন্য...প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো আইনসম্মত পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের এবং যেকোনো আইনসংগত কারবার বা ব্যবসায়-পরিচালনার অধিকার থাকিবে।’ সুতরাং সৎ ও স্বাধীন উপায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে। তাতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। তবে এ কথাও সত্য যে রাষ্ট্র জনস্বার্থে কখনো বাধানিষেধ আরোপ করতে পারে।
জনশৃঙ্খলা কিংবা জনস্বাস্থ্য অথবা নৈতিকতার স্বার্থে বাধানিষেধ আরোপ করা যায়। কেউ মাদক ব্যবসা করবে, কেউ ইয়াবা ব্যবসা করবে, কেউ সীমান্তে চোরাচালান করবে—রাষ্ট্র তা করতে দিতে পারে না। সংবিধানে যা-ই লেখা থাকুক, বর্তমানকালের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আর্থসামাজিক ব্যবস্থা গরিবের অনুকূলে নয়। বর্তমান অবস্থায় উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের স্বার্থই রাষ্ট্রের কাছে বড়। তাদের জীবিকার স্বাধীনতার মূল্য আর গরিবের জীবিকার স্বাধীনতার মূল্য সমান নয়। ধনীর জীবিকার স্বাধীনতার অধিকার আগে, তারপরে গরিবের অধিকার। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গীকার ও দর্শন নেই। রাষ্ট্রের মূলনীতির একটি ‘সমাজতন্ত্র’। শব্দটি সংবিধানে লেখা আছে, কিন্তু তা কোনো অর্থ বহন করে না। আমাদের রাষ্ট্র মানুষের পক্ষে সমস্যার সমাধান করতে চায়—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং রাষ্ট্র শাসকশ্রেণির স্বার্থে নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করে। এবং তা থেকে প্রশাসন ও শাসক দলের ক্যাডাররা ব্যাপক সুবিধা আদায় করে। কিছুদিন আগে গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের তৎপরতা চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
‘উচ্ছেদ’ শব্দটি ঘোরতর সংবিধানবিরোধী। পুনর্বাসন এক জিনিস, উচ্ছেদ আর এক জিনিস। পথচারীর জন্য ফুটপাত পরিষ্কার করা আবশ্যক। একটির সঙ্গে আর একটির স্বতঃসিদ্ধভাবে সম্পর্ক রয়েছে। পিটিয়ে হকারদের বিতাড়িত বা উচ্ছেদ করা অসাংবিধানিক ও অমানবিক। উচ্ছেদ অভিযানের সময় পুলিশের মারধর খেয়ে বহু হকার আহত হন। তখন হকার নেতারা আমার কাছে আসেন। তাঁরা আমাকে অনুরোধ করেন দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না। আমি যোগাযোগ করতেই মাননীয় মেয়র আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তাঁর অফিসে আমার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক হয়। হকারদের পুনর্বাসনে তিনি আন্তরিক। তবে গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকার ফুটপাত পরিষ্কার রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি বললেন, বঙ্গভবনে ভিভিআইপিদের যাতায়াতের দুই পাশে হকারদের বসতে দেওয়া যাবে না। আমি তাঁকে বললাম, তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অমানবিক হবে। তিনি বললেন, আড়াই হাজারের মতো হকারের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি যদি কেউ পেশা পরিবর্তন করতে চান, তাহলে তাঁদের সামান্য সুদে ঋণ দেওয়া হবে।
তা ছাড়া, সাঈদ খোকন বললেন, যদি কেউ মালয়েশিয়ায় চাকরি নিয়ে যেতে চান, তাঁদের সে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তা ছাড়া, মালয়েশিয়ায় যাতায়াত খরচও সরকার ধার হিসেবে দিতে সম্মত। মেয়রের সঙ্গে কথা বলে হকার নেতাদের সঙ্গে সিপিবি অফিসে আলোচনা হয়। তাঁরা পুনর্বাসন চান। এমন প্রস্তাবও তাঁরা দিয়েছেন যে যদি রাস্তার এক পাশে তাঁরা বসবার অনুমতি পান, তাতেও তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারেন। তা যদি না হয় তাহলে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা বিপন্ন হবে। ফুটপাতের হকারদের ব্যবসা বড়ই কষ্টের। কনকনে শীত, আগুনের মতো রোদ, প্রবল বর্ষণ—কোনো কিছুই তাঁদের জন্য বাধা নয়। ঈদের চাঁদরাতে শেষরাত পর্যন্ত তাঁরা ফুটপাতে বসে থাকেন। প্রিয়জনকে নিয়ে ঈদের আনন্দ, পূজার আনন্দ তাঁরা খুব কমই উপভোগ করতে পারেন। তাঁদের জীবনের বেদনা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা সংবেদনশীলতার সঙ্গে উপলব্ধি করবেন, লাখ লাখ মানুষ অর্ধাহার–অনাহার থেকে বাঁচবে, তেমন উদ্যোগ নেবেন—এই প্রত্যাশা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

বাজেটে নতুন কিছু নেই

অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সদ্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরের যে বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন, তা আসলে স্থিতাবস্থা টিকিয়ে রাখতে উৎসাহিত করবে। এই বাজেটে নেই কোনো নতুন প্রস্তাব বা কীভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করা হবে—সে ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। পরোক্ষ কর আরোপ এবং ভর্তুকি কাটছাঁটই এখন ভরসা। এ ধরনের প্রস্তাব করাটা ভুল না হলেও এটা যে সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা সুস্পষ্ট।
আজকের ভারত চাকরির জন্য কাঁদছে। হাজার হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারীর চাকরি নেই। বেসরকারি খাতের যথেষ্ট প্রসার না ঘটায় তাঁদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশ হলেও স্নাতকধারীরা প্রশাসনিক চাকরি চান; এমনকি বেতন কম হলেও। অরুণ জেটলি স্বীকার করেছেন, বাজেট নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না। তবে তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কলেজ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন—এমন শিক্ষার্থীদের জন্য এটা সান্ত্বনা নয় যে খুব শিগগির কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু প্রণোদনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যদিও তা এই খাতকে চাঙা করার জন্য যথেষ্ট নয়। শিল্পোদ্যোক্তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ অর্থের অভাবে তাঁরা নিজেরাই রুগ্ণ হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, এই বাজেটে পরিকল্পনা নেই। যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করলেন, তখন তিনি কোনো পরিকল্পনায় বিশ্বাস করতেন না এবং মনে করতেন, যেখানে যা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী টাকা খরচ করলেই কাজ হয়ে যাবে। সরকার প্রয়োজন মনে করেছে আর খরচ করার দায়িত্ব দিয়েছে মন্ত্রণালয়কে। ফলে ব্যয় হয়েছে যেনতেনভাবে। এখনো আমাদের একটি ধারণা আছে যে, অর্থনৈতিক ঘাটতি দূর করা উচিত। যখন মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে,
তখন বেশি খরচে ক্ষতি নেই। তখন এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে। শুধু খরচ করে দেশটি সরকারি ও বেসরকারিভাবে নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের সময় শুধু দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য ও ব্যবস্থাপনার কথাই ভেবেছেন, রাজনৈতিক বিষয়গুলো ভাবেননি। ফলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মতো দল বাজেটের সমালোচনা করেছে। দলটি বলেছে, এতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই বাজেট পেশ করে অরুণ জেটলি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদেরও বিরক্ত করার ঝুঁকি নিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া চাঁদার পরিমাণ ২০ হাজার থেকে দুই হাজার রুপিতে নামিয়ে এনে তিনি বাম দলগুলোসহ সব রাজনৈতিক দলকে বিরক্ত করার ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সামনে তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র উপস্থাপন করেছেন। তবে এই বাজেট মধ্যবিত্তদের সামান্য হলেও স্বস্তি দিয়েছে। যাঁদের বার্ষিক আয় আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ রুপি, তাঁদের আয়কর অর্ধেক করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে করদাতার সংখ্যা বাড়বে। সাধারণ ও রেলওয়ের বাজেটকে যৌথভাবে উপস্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্তটি বহু বছরের চর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়া। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে,
স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো যৌথ বাজেট সংসদে উত্থাপিত হলো। আর কিছু না ঘটলেও এটা রেলওয়েকে রাজনীতির বাইরে রাখবে। কোনো কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার ৫০ কোটি রুপির বেশি হলে সেই কোম্পানির করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে বাজেটে। এতে করে ৯৬ শতাংশ কোম্পানি লাভবান হবে। নির্বাচনী বন্ড চালু করার ভাবনাটা অবশ্য একটি ভালো ভাবনা এবং সম্ভবত বিশ্বে এটা প্রথম। এটা নির্বাচনী তহবিল গঠনে গতি ও স্বচ্ছতা আনবে। মোদির সরকার নির্বাচন থেকে অর্ধেক দূরত্বে রয়েছে। সন্দেহ নেই, নরেন্দ্র মোদি আরেক মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হতে চাইবেন। তাঁর কাজ আরও সহজ হবে, কারণ কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী এখন আর তাঁর দুর্ধর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী নন। কিন্তু এখন দৃশ্যমান না হলেও এই বাজেট আগামী নির্বাচনের ফলাফলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, মোদি পুনর্নির্বাচিত হলে হিন্দুত্ববাদীরা আরও শক্তিশালী হবে। যাঁরা নাগপুর থেকে (আরএসএসের সদর দপ্তর) আদেশ পাবেন, তাঁরা দেশের সেবা করতে পারবেন না, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে মূল বৈশিষ্ট্য। ভারতের সংবিধান হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান সবাইকে সমান অধিকার দিয়েছে। বিজেপি সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারবে না। কারণ, সম্প্রতি দেশটির সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজে ধর্ম বা গোত্রকে ব্যবহার করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
অনুবাদ: রোকেয়া রহমান।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

অনুসন্ধান কমিটি, নির্বাচন কমিশন, অতঃকিম

এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছাপিয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রধান আলোচ্য বিষয় নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন। রাষ্ট্রপতিই এটি গঠন করবেন, যদিও আমরা জানি রাজনৈতিকভাবে এবং সাংবিধানিক নিয়মে তাঁর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিমত উপেক্ষা করা কঠিন। রাষ্ট্রপতি যদিও আর কোনো দলের সদস্য নন, তবু তিনি তো আদতে সর্বতোভাবে এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি আজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিশ্বস্ত থেকেছেন। তবে বিশ্বস্ত থেকেও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিকতার কারণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।
এমন একজন নেতাকে রাষ্ট্রপতির পদের উপযুক্ত ভাবাই স্বাভাবিক। তিনিও সেই জনমতের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পূর্বসূরির মনোনীত নির্বাচন কমিশন তার পূর্বসূরি কমিশনের মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেনি, তাতে বিরোধী দল ও সচেতন নাগরিকেরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও হতাশ হয়েছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগের ধারা অনুসরণ করে অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের একটি ধাপ তৈরি করে দিয়েছেন। আশার কথা, প্রথম পর্যায়ে এটি নিয়ে কিছু কথাবার্তা উঠলেও কমিটি এ পর্যন্ত ভালোভাবেই কাজ এগিয়ে নিয়েছে। অনুসন্ধান কমিটি ১০ জনের তালিকা রাষ্ট্রপতিকে সময়সীমার মধ্যেই দিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি অবশ্য তাঁদের তালিকা মানতে বাধ্য নন, তবু সচেতন মানুষের আস্থা এবং প্রধান বিরোধী দলের অনুমোদন পাওয়া একটি কমিটির সুপারিশ রক্ষার একটা চাপ তাঁর ওপর থাকবে বৈকি। সবচেয়ে ফাঁপরে আছে বিএনপি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন তাদের সামনে নির্বাচনই অবশিষ্ট আছে সরকারের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। তারা এই প্রক্রিয়াটার পথ বন্ধ করতে চায় না, আবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর সম্পূর্ণ আস্থাও রাখতে পারছে না। তাই মহাসচিব মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে এক পক্ষ অনুসন্ধান কমিটি নিয়ে দলের সংশয় প্রকাশ করে রাখলেও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আশাবাদ জিইয়ে রাখেন। বিএনপি এবং জাতির জন্য নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে উত্কণ্ঠার অবশ্য শেষ হবে শিগগিরই। রাষ্ট্রপতি কমিশনের চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে কিছুটা সময় নিলেও নিতে পারেন। সাংবিধানিক নিয়মে তাঁর পরামর্শ নেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা পরিহার করাই হবে শ্রেয়, যদিও প্রধানমন্ত্রীর অভিমত পরোক্ষ এবং নানা উপায়েও তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারে এবং তা–ই স্বাভাবিক।
২. গণমাধ্যম এবং সক্রিয় নাগরিক গোষ্ঠীগুলো জনমতকে প্রায় একটি নিরপেক্ষ আস্থাভাজন কমিশন গঠন এবং ২০১৯ সালে একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে আনতে পেরেছে—যদিও সমাজে পরমতসহিষ্ণু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার পরিপন্থী নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তত কার্যকর ভূমিকা নিতে তাঁদের দেখা যাচ্ছে না। এদিকে সবাই স্বীকার করবেন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে দেশে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের সংকট তীব্র হয়েছে। এটাও অস্পষ্ট নয় যে এদের পেছনে ইসলামের নাম ব্যবহার করে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক দল ও সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এ কাজে সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত নতুন নতুন উৎসের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় যখন নাগরিক সমাজ সুষ্ঠু নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাজ প্রগতির প্রশ্নকে গৌণ করে রাখে, তখন আওয়ামী লীগও নির্বাচনের হিসাব মাথায় নিয়ে এগোবে, এটাই স্বাভাবিক। এদিকে সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল ধারার অবক্ষয় ঘটেই চলেছে। সে কারণেই কি আওয়ামী লীগ ধর্মবাদী শক্তির সঙ্গে সমঝোতার পথ ধরছে? বোঝা যাচ্ছে আগামী নির্বাচনকে মাথায় রেখেই আওয়ামী লীগ জামায়াতবিরোধী হেফাজতে ইসলামকে পাশে রাখতে চাইছে। তাদের সঙ্গে পাঠ্যবই নিয়ে যে সমঝোতা হয়েছে,
তার সর্বনাশা দিকটা নাগরিক সমাজের ক্ষুদ্র অংশের বাইরে তেমনভাবে আলোচিত হচ্ছে না। অথচ এর সঙ্গে ভবিষ্যতের নাগরিকদের যথার্থ বাঙালি এবং আদর্শ মুসলমান হওয়ার সংকট গভীরভাবে সম্পর্কিত। কেননা, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা বাঙালি ঐতিহ্য এবং ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শুধু এমন সর্বনাশ ঘটবে তা নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো—যারা হয় পশ্চিমের লেজুড়বৃত্তি করে, নয়তো স্বৈরাচারী শাসনের জাঁতাকলে থাকে—আমাদের দেশও গণতান্ত্রিক অমানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকবে। আমরা এখনো আশা করতে পারি না যে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকারের এ আপসকামিতার বিরোধিতা করবে, কারণ তারা তো জামায়াতেরই বিরোধিতা করে না, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধেও কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয় না। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসের কোনো বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্তও রাখে না। বিএনপির আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি আওয়ামী লীগের চেয়ে চিন্তা-চেতনায় এগিয়ে থাকার রাজনীতি না হয়ে দুর্ভাগ্যবশত পিছিয়ে থাকা স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তানি ধারার মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতি (মনে রাখতে হবে, গয়েশ্বর চন্দ্রের পক্ষেও নির্বাচনে দলের কাছ থেকে তাঁর কিংবা মেয়ের জন্য মনোনয়ন আদায় সম্ভব হয়নি।)।
৩. ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে র্যাব-পুলিশের অভিযান বর্তমানে জোরালোভাবেই চলছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো হত্যা, জখম, আক্রমণ ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরই কাজ করতে পারে। তার আগে তো প্রয়োজন এমন অপরাধের মনোবৃত্তি সমাজে যাতে তৈরি না হয়, সে কাজ করা। সরকার নানাভাবে সে কাজ করার চেষ্টা করছে। ইমামদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদবিরোধী সভা হচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষাধিক আলেমের জঙ্গিবাদবিরোধী ফতোয়াটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া র্যাব-পুলিশকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ ও সজাগ রাখার কাজও চলছে। কিন্তু লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, এসব সত্ত্বেও সমাজে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বাড়ছে, রাজনীতি ক্রমেই ধর্মীয় সংস্কৃতি ধারণ করছে, যা প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজে উগ্রবাদী ধর্মীয় প্রচারণা এবং বাজার অর্থনীতির প্রভাবে স্বাভাবিক সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার ধারা ক্ষীয়মাণ। বস্তুতপক্ষে রাজধানীর বাইরে সারা দেশের শহরে-গ্রামে সর্বত্র আজ সংস্কৃতির ধারা ম্রিয়মাণ, নিষ্প্রাণ ও সহিষ্ণু। আর শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষার জাঁতাকল সৃষ্টি করে শৈশব থেকেই জাতির সংস্কৃতিচর্চার সক্ষমতা ছেঁটে দিচ্ছে। দেশপ্রেমিক রাজনীতি বোধ তৈরিতে সংস্কৃতি-চেতনা বিশেষ ভূমিকা রাখে। এখন তরুণেরা আত্মকেন্দ্রিক, দেশ ও মানববিচ্ছিন্ন হচ্ছে, ভোগবাদ ও অন্ধবিশ্বাসের খপ্পরে পড়ছে, 
তাশা ও মাদকের দিকে ঝুঁকছে। এ বাস্তবতায় সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতি কীভাবে বিকশিত হবে? আমরা বরং দেখছি দিনে দিনে দেশে মুক্তচিন্তার সংকট বাড়ছে, প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি সংকুচিত হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নেহাত মুখের বুলিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। সাধারণের রাজনৈতিক চেতনার স্তর যদি এ পর্যায়ে থাকে, তাহলে ভোটের ফলাফলে তার প্রভাব তো পড়বেই। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, এমনকি সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধীরাও ক্ষমতায় এসেছে, ক্ষমতার প্রশ্রয় পেয়েছে। আমরা কি সেই ন্যাড়া যে বেলতলায় আবার যেতে চাইব? নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দল নিশ্চয়ই শক্তিশালী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন কমিশন চাইবে, তার জন্য গঠিত অনুসন্ধান কমিটি এবং চূড়ান্ত রূপ প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকেও একই রকম প্রত্যাশা করতেই পারে। কিন্তু সমাজকে প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত করার বিষয়টিকেও তো একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচন নিয়ে সচেতনতার পাশাপাশি এর পরিণতির দিকটির ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। গত শতকের পাঁচ ও ছয়ের দশকে জাতি ও দেশ যেমন এক মহৎ সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, তেমনি গত দীর্ঘ চার দশকে এবং বিশেষভাবে গত পঁচিশ বছরে ধীরে ধীরে দেশ ও জাতি গভীর সংকটের দিকে এগিয়েছে। স্থাপনাগত দৃশ্যমান উন্নয়ন কিংবা সামাজিক সূচকসমূহে চমকপ্রদ অগ্রগতি সত্ত্বেও বলব মানবিক অবক্ষয়ের কথা। এতে সমাজে গণতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধের চর্চা ব্যাহত হয়। এই উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা বেড়েছে, সর্বস্তরে শিক্ষার মান কমছে,
সংস্কৃতিচর্চায় ভাটা চলছে, সমাজে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সংকট বাড়ছে, আইন ভাঙার ও অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে, নিষ্ঠুরতা ও নারী নির্যাতন বেড়ে চলেছে, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমকে ছাপিয়ে উঠেছে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা। দলাদলি, হানাহানি তথা হিংসা ছাপিয়ে যাচ্ছে প্রীতি, বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতাকে। সমাজের এই রূপান্তরের সামনে দাঁড়িয়ে কী প্রত্যাশা করব? সৎ ও নিরপেক্ষ দক্ষ নির্বাচন কমিশন কোন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে? হ্যাঁ, পরিবর্তনের সুযোগ তারা তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু তাতেই যে দেশেরও মঙ্গল নিহিত, এমনকি তাতে যে দেশ ও মানুষের জন্য চরম কোনো অমঙ্গল বয়ে আসবে না, তারই বা কী গ্যারান্টি? নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ হতে হবে, এটা তার ধর্ম। কিন্তু সমাজকে তো অন্ধ শক্তির বিকারের বিরুদ্ধে চেতনার সলতে জ্বালিয়ে আলোর পথ রচনা করতে হবে। তাকে তো অন্ধকার ও আলোর মধ্যে ভাগ করতে হবে, আলোকেই—বাস্তবতার নিরিখে স্বল্পালোককেও—অন্ধকার বা প্রায়ান্ধকার থেকে পুরস্কার বাছাই করে নিতে হবে। তার একটা পক্ষপাত থাকতেই হবে। সমাজের পাশে রাষ্ট্রযন্ত্র থাকলে তবেই রূপান্তর সহজতর হয়, নয়তো কোনো দেশে অন্ধকার যুগ নেমেও আসতে পারে, ঘটতে পারে ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের দিশাহীন দীর্ঘ রক্তপাত, যা পরিণামে অন্ধকারকেই অনিবার্য করে তোলে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

ইসরায়েলের জেরুজালেম গ্রাসের পাঁয়তারা

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়াতে উদ্বিগ্ন হয়নি এমন দেশ পৃথিবীজুড়ে দু–একটি আছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসরায়েল। কিন্তু আমেরিকায় প্রচারণা আছে যে ট্রাম্প ইহুদিবিদ্বেষী। তিনি হোয়াইট হাউসের প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে যে ব্যক্তিকে নিযুক্ত করেছেন, সেই স্টিফেন ব্যানন শুধু শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীই নন, প্রচণ্ড ইহুদিবিদ্বেষীও বটেন।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারাভিযান দলের নেতৃত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যানন ‘ব্রেইটবার্ট নিউজ’ নামে যে অনলাইন পোর্টাল পরিচালনা করতেন, সেখানে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয় বলে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে। তাই ট্রাম্প যখন তাঁকে হোয়াইট হাউসের প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে নিযুক্ত করেন, তখন আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো ইহুদি সংগঠনগুলোর অন্যতম অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ তার প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিল। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ফলে আমেরিকার ইহুদিবিরোধী সংগঠন ও গোষ্ঠীগুলো ভীষণ উৎসাহিত হয়েছে—এমন খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু একটা ধন্দ সৃষ্টি হয়েছে এ কারণে যে ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে যাবেন। এই প্রতিশ্রুতির মানে, ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেম নগরকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মেনে নেবেন। এটা আসলে ইসরায়েলের সরকারের আকাঙ্ক্ষা; দেশটির ইহুদিবাদী দল, সংগঠন ও ব্যক্তিরাও এই স্বপ্ন দেখেন। কারণ, তাঁদের বিশ্বাস, প্রাচীন ফিলিস্তিনের যে ভূখণ্ডে তাঁরা একটা রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন, সেই ভূমি তাঁদের দান করেছেন স্বয়ং ঈশ্বর। জেরুজালেম তাঁদের পবিত্রতম নগর এবং ওই নগরটিই হবে তাঁদের রাষ্ট্রের ‘শাশ্বত ও অবিভক্ত রাজধানী’ (এটারনাল অ্যান্ড আনডিভাইডেড ক্যাপিটাল)। কিন্তু জেরুজালেম শুধু ইহুদিদের নয়, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদেরও। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস, জেরুজালেমেই যিশুর প্রয়াণ ও পুনরুত্থান ঘটেছিল।
ওই নগরের বিভিন্ন স্থানে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেসব স্থান খ্রিষ্টানদের কাছে অতি পবিত্র বলে বিবেচিত। জেরুজালেমে খ্রিষ্টানরা অনেক গির্জা নির্মাণ করেছেন, সেগুলোর অন্যতম হলো দ্য চার্চ অব রেজারেকশন। মুসলমানদের কাছে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের স্থান পবিত্র কাবা শরিফের পরেই। আল-আকসাই ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। সংক্ষেপে, ইহুদিধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম—এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই জেরুজালেম নগরের পবিত্রতা ও গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এই জেরুজালেমকে যখন ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী করতে চাওয়া হয়, তখন এর ওপর খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ঐতিহাসিক ও ধর্মবিশ্বাসগত অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়। ইহুদি ধর্মবিশ্বাসের দাবিকেই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এই চেষ্টা এ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ, এর প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের সমর্থন নেই। পৃথিবীর বড় ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েল রাষ্ট্রের অনেক অন্যায়-অবিচার দেখেও না দেখার ভান করে চলেছে বটে, কিন্তু জেরুজালেমকে রাজধানী করার মধ্য দিয়ে ওই নগরের ওপর ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যায্য আকাঙ্ক্ষার প্রতি তাদের সমর্থন নেই। যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশের দূতাবাস ইসরায়েলের আছে, সেগুলোর সবই রাজধানী তেল আবিবে অবস্থিত। ট্রাম্পের আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁদের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের কথা বলেননি। নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এই প্রতিশ্রুতি উচ্চারণের পেছনে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিদের খুশি করার চেষ্টা। দেশটির ইহুদিবাদী সংগঠনগুলোর কোনো কোনো ভাষ্যকার লিখেছেন, ট্রাম্প আসলে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইহুদিবিরোধী। কিন্তু এটা তিনি লুকাতে চান ইসরায়েল রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাগুলোর প্রতি সমর্থন জানানোর মধ্য দিয়ে।
এই ভাষ্যকারেরা মনে করেন, ইসরায়েলের রাজনীতির প্রতি সমর্থন জানালেই ট্রাম্পের ইহুদিবিদ্বেষ ক্ষমা পেতে পারে না। তাঁর নীতি ও পদক্ষেপগুলোর ইসরায়েলের পক্ষে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু আমেরিকায় বসবাসরত ইহুদিদের জন্য তিনি ক্ষতিকর। ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ইসরায়েলে দূতাবাস স্থানান্তরের প্রসঙ্গ তোলেননি। সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, বিষয়টা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের এক দিন পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানান। সে সময় নেতানিয়াহু ইসলামি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো ও ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন, কিন্তু দূতাবাস স্থানান্তরের বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে এ মাসে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। টেলিফোনে ট্রাম্প দূতাবাস স্থানান্তরের বিষয়টি উত্থাপন করেননি বলে নেতানিয়াহু সম্ভবত হতাশ হয়েছেন। তারপর তিনি আগবাড়িয়ে একটা উসকানিমূলক কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের প্রসঙ্গটির প্রতি ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু টুইটারে লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সঠিক। আমি ইসরায়েলের দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে একটা প্রাচীর তুলেছি। তারপর সব অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়ে গেছে। বিরাট সাফল্য। দারুণ ভাবনা।’
নেতানিয়াহু সম্ভবত ভেবেছিলেন, তাঁর এই উসকানিতে উৎসাহিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠবেন, ‘আমরা শিগগিরই আমাদের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নিচ্ছি।’ কিন্তু না। সে রকম কিছু ঘটেনি। বরং নেতানিয়াহু নিজেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। মেক্সিকোর সরকার ভীষণ খেপে গিয়ে ইসরায়েলকে দুঃখ প্রকাশ করতে বললে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট দুঃখ প্রকাশ করেন। ট্রাম্পকে বলা হচ্ছে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ প্রেসিডেন্ট—কখন কী বলবেন বা করবেন, তার ঠিক নেই। জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট জেনারেলের কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা আছে। কোনো কোনো পত্রিকা লিখেছে, জেরুজালেম থেকে দূতাবাস ওইখানে স্থানান্তর করার প্রস্তুতি চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেভিড ফ্রিডম্যান নামের যে ব্যক্তিকে ইসরায়েলে নতুন রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করেছেন, তিনি একজন আমেরিকান ইহুদি, জেরুজালেম নগরে তাঁর বাসা আছে এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করার পর তিনি জেরুজালেমের ওই বাসাতেই বাস করবেন। শেষমেশ ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস যদি জেরুজালেমেই স্থানান্তর করা হয়, তাহলে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ও মুসলিম জাহানের ‘শক্তিধর’ সরকারগুলো কী করবে? নেতানিয়াহু যেদিন ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন, সেদিনই জর্ডানের রাজধানী আম্মানে বাদশা আবদুল্লাহর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলছিলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের প্রসঙ্গই ছিল তাঁদের প্রধান আলোচ্য। বাদশা আবদুল্লাহ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মাহমুদ আব্বাসকে বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে নেয়,
তাহলে জর্ডান সরকার কয়েকটা গুরুতর পদক্ষেপ নেবে। পদক্ষেপগুলো কী, সংবাদমাধ্যম তা জানতে পারেনি। তবে বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, জর্ডান ইসরায়েল থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেবে, ১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে জর্ডানের যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটা স্থগিত করে নিরাপত্তা-সহযোগিতা বন্ধ করে দেবে। ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী বৃহৎ দেশ মিসরও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের পরিকল্পনার খবরে ভীষণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মিসরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেদ শুকরি এটাকে ‘ভেরি ইনফ্লেইমেবল ইস্যু’ বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এতে করে মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলে উঠতে পারে। উল্লেখ করা দরকার, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শুধু জর্ডান আর মিসরের সঙ্গেই ইসরায়েলের শান্তিচুক্তি আছে। দুটি দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের সীমান্ত আছে এবং এ দুই দেশের সরকার, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্তসীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। জর্ডান ও মিসর যুক্তরাষ্ট্রেরও ঘনিষ্ঠ মিত্র। আবার দুনিয়ায় যত সহিংসতাই ঘটুক না কেন, ইসরায়েলের ভেতরে যে মোটামুটি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় আছে, সেখানে যে আইএস, আল-কায়েদা ও অন্য সশস্ত্র মুসলিম গোষ্ঠীগুলো হামলা চালাতে পারে না, তার পেছনে জর্ডান ও মিসরের অবদান কম নয়।
এখন যদি ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে জর্ডান ও মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি ও নিরাপত্তা-সহযোগিতার ব্যবস্থাগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে ওই অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়বে। কিন্তু তার চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরিত হলে ওই নগরকে ইসরায়েলের রাজধানী করার ইসরায়েলি দাবির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের যে ‘প্রকাশ্য’ সমর্থন ব্যক্ত হবে, তার ফলে জেরুজালেমের ওপর ফিলিস্তিনিদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন, এমনকি অসম্ভবও হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এটাই ফিলিস্তিনিদের শেষ দাবি এবং এটা ঐতিহাসিক কারণে অত্যন্ত ন্যায্য দাবি। তারা দশকের পর দশক ধরে জমি হারাচ্ছে। তাদের পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলিদের বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইসরায়েল সরকার ঘোষণা করেছে, পূর্ব জেরুজালেমে তারা আরও ৬০০ বসতি স্থাপন করবে। ইসরায়েলের জেরুজালেম গ্রাস করার এই পাঁয়তারা এবং তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের ইন্ধন প্রতিহত করা দরকার। কিন্তু কী উপায়ে তা করা যেতে পারে, জানি না। বিভক্ত ও পরস্পরের প্রতি শত্রুমনোভাবাপন্ন, ষড়যন্ত্রপ্রবণ আরব রাষ্ট্রগুলো কি এবার একজোট হবে? সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত কি ইরানকে সঙ্গে নিয়ে এককাট্টা হয়ে এবার প্রতিবাদে সোচ্চার হবে? রাশিয়া, চীন, ভারত—এই বৃহৎ শক্তিগুলোরও কি কোনো কর্তব্য নেই?
মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
mashiul.alam@gmail.com