Sunday, March 16, 2025

বিএনপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি : ফরহাদ মজহার

বিএনপির ‘দ্রুত নির্বাচন’ দাবির সমালোচনা করে বিশিষ্ট দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, দলটির অনেক নেতা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। তারা নিশ্চিতভাবে বঙ্গোপসাগরে ডুববে। তবে খালেদা জিয়ার আপসহীন মনোভাবের প্রশংসা করে বলেন, তার অবস্থান অভ্যুত্থানকারীদের শক্তি জুগিয়েছে, তাই বিজয়ের পরপরই তাকে মুক্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১৫ মার্চ) যশোর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আয়োজিত আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন।

এসময় তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে ‘নির্বাচিত সরকার’ হিসেবে গণ্য করা উচিত। তার মতে, শুধু ভোটের মাধ্যমেই সরকার নির্বাচিত হয় এই ধারণা ভুল। গণঅভ্যুত্থানই প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রতিফলন এবং জনগণের অভিপ্রায়েই এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, চব্বিশ সালে ছাত্র-জনতা-সৈনিকদের গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল। কিন্তু ‘ফ্যাসিবাদী সংবিধান’ বহাল থাকায় প্রতিবিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে। সংবিধান না থাকলেও ফরমান দিয়ে দেশ চালানো সম্ভব। তবে অভ্যুত্থানকারীরা একের পর এক ভুল করে চলেছে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল চুপ্পুর কাছে শপথ নেওয়া। এখন তারা মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করছে, যা আরও একটি ভুল।

মধ্যপন্থাকে ‘সুবিধাবাদ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তরুণদের দল হতে হবে সব ধরনের ফ্যাসিবাদবিরোধী। কেবল বাঙালি জাতিবাদের বিরোধিতা করলেই চলবে না, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদসহ সব রূপের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।

ভারত ক্রমাগত উসকানি দিচ্ছে বলে সতর্ক করে ফরহাদ মজহার বলেন, ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতি আসছে। নিজেদের মধ্যে সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াই বন্ধ না করলে পরাজিত ফ্যাসিবাদীরা দিল্লির সহায়তায় ফিরে আসতে পারে। ইতোমধ্যে আছিয়া ধর্ষণ ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তারা ইউনূস সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের বিশাল অংশগ্রহণের প্রশংসা করে বলেন, তারা আজ কোথায়? কেন আমরা তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি? কেন তারা রাজনীতির সামনের কাতারে আসতে পারছে না? মুহাম্মদ (স.) -এর সময় নারীরা মসজিদে যেত, যুদ্ধ করত। তাহলে আজ কেন তাদের ঘরে বন্দি রাখতে চাই?

বিদ্যমান সংবিধানকে ‘বাংলাদেশের নয়’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সত্তরের নির্বাচন হয়েছিল পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য। স্বাধীনতার পর যে সংবিধান রচিত হয়েছে, তার জন্য জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না। এটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিপরীত।

সভায় আরও বক্তব্য দেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট বেনজীন খান, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ, মোহাম্মদ রোমেল প্রমুখ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোরের আহ্বায়ক রাশেদ খান সভাটি পরিচালনা করেন।

এর আগে, শুক্রবার বিকেলে ফরহাদ মজহার ‘প্রাচ্যসংঘ’ -এর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ফকিরদের আস্তানায় হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ভারত এ সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করবে যে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, যা দেশকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। 
যশোরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ফরহাদ মজহার। ছবি : কালবেলা
যশোরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ফরহাদ মজহার। ছবি : কালবেলা

ফিলিস্তিনি পুনর্বাসন: গাজা প্রস্তাব নিয়ে আফ্রিকার ৩ দেশেও ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে এর দখল নিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্পের এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে আফ্রিকার কয়েকটি দেশকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের পক্ষ থেকে থেকে বলা হয়েছে, তারা এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পায়নি। দেশ দুটির পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগে আরব দেশগুলোকে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের ওই প্রস্তাবের বিকল্প হিসেবে আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে মিসরের একটি প্রস্তাবে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। মিসরের প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার পরিবর্তে গাজার পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্পের প্রস্তাবের পরিবর্তে আরব নেতাদের পরিকল্পনায় গাজায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকার সুদান, সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জায়গা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

সুদানের কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ড এ ধরনের প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

সোমালিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি বলেন, তাঁর দেশ কোনো পক্ষের যেকোনো প্রস্তাব বা উদ্যোগ, যা ফিলিস্তিনি জনগণের পৈতৃক ভূমিতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে, তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসারয়েলের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি। জেনেভায় জাতিসংঘের মুখপাত্র মিশেল জ্যাকিও বলেন, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করে এমন যেকোনো পরিকল্পনা বা যেকোনো ধরনের জাতিগত নির্মূলের দিকে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে থাকব। কারণ, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।’

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা তাহের আল-নোনো রয়টার্সকে বলেছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের আফ্রিকায় পুনর্বাসনের প্রস্তাব বোকামি। ফিলিস্তিন ও আরব নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিরা তাঁদের ভূমি ছাড়বে না।’

ইসরায়েলি জিম্মি মুক্তিতে রাজি হামাস

হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের পরোক্ষ যুদ্ধবিরতি আলোচনা আবার শুরু হয়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার হামাস বলেছে, তারা একজন ইসরায়েলি-আমেরিকান জিম্মিকে মুক্তি এবং আরও চারজনের মরদেহ ফিরিয়ে দেবে।

ইসরায়েল বলেছে, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের প্রস্তাবে হামাস সাড়া দিচ্ছে না। হোয়াইট হাউস বলছে, হামাস যেসব দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব।

উইটকফের কার্যালয় ও মার্কিন নিরাপত্তা পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ সময়ে হামাস যেসব দাবি করছে, তা ঠিক নয়। হামাস চুক্তির সময়সীমা সম্পর্কে অবগত। সময় পেরিয়ে গেলে আমরা সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাব।’

১৫ মাসের বেশি লড়াইয়ের পর হামাস ও ইসরায়েল প্রথম ধাপে ৪৩ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ১ মার্চ প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি শেষ হয়েছে। পরবর্তী ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। গত মঙ্গলবার হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী কাতারের দোহায় আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে ইসরায়েলের কর্মকর্তারাও যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত শুক্রবার হামাস মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে একটি প্রস্তাব পেয়েছে। এতে মার্কিন নাগরিকত্ব থাকা ইসরায়েলি সেনা এডান আলেকসান্দারকে মুক্তি ও দুই দেশের নাগরিকত্ব থাকা চারজনের মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে।

গত শুক্রবার কানাডায় জি৭ গ্রুপের বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, শুধু মার্কিন জিম্মিকেই নয়, সব জিম্মিকে মুক্ত করার বিষয়টি তাঁদের অগ্রাধিকার।

ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, উইটকফ প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু হামাস চাইছে দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর করতে। দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতিতে হামাস একসঙ্গে সব জিম্মিকে মুক্তি দিতে চায়। এ ছাড়া তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, গাজা থেকে ইসরায়েলের সব সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বলেছেন, উইটকফের প্রস্তাব ইসরায়েল গ্রহণ করলেও হামাস তাদের জায়গা থেকে একটুও নড়েনি।

যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে হামাস ৩৩ জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে। ইসরায়েল প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে। হামাসের একটি সূত্র বলেছে, প্রস্তাবে নতুন শ্রেণি যুক্ত করা হয়েছে। এতে ইসরায়েলে আরও বেশি ফিলিস্তিনিদের মুক্তি দেবে।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় আরও বলেছে, মন্ত্রিসভার বৈঠকে দোহার আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরা হবে। এরপর জিম্মি মুক্তি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গতকালই ইসরায়েলের নতুন সিদ্ধান্ত আসার কথা।

প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও ওখনো ওই নীতি মেনে চলা হচ্ছে। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোথাও কোথাও হামলা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৩ দিন ধরে গাজায় ত্রাণসহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। সেখানের বিদ্যুৎও বন্ধ। এতে ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছেন সেখানকার লোকজন।

জি৭ গ্রুপের পক্ষ থেকে গাজায় নিরবচ্ছিন্ন ত্রাণ সরবরাহ চালু রাখতে আহ্বান জানানো হয়েছে। একে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার হামাসের পক্ষ গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। হামাসের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে ১ হাজার ২১৮ জন নিহত হয়। এরপর থেকে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে ৪৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন এবং অবিলম্বে গাজায় অবরোধ প্রত্যাহার ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে বিক্ষোভ। গতকাল যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে
ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন এবং অবিলম্বে গাজায় অবরোধ প্রত্যাহার ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে বিক্ষোভ। গতকাল যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে। ছবি: এএফপি

৯৭১ কোটি টাকার সম্পত্তি কে পাবেন

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নিউ মেক্সিকোর নিজ বাড়ি থেকে অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যান ও তাঁর স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পর থেকেই তাঁদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত চলছিল। গত সপ্তাহেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যু হয়েছে তাঁদের। জিন হ্যাকম্যান ৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ৯৭১ কোটি টাকার সম্পত্তি রেখে গেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কে হবেন এই সম্পত্তির উত্তরাধিকার?

বিনোদনবিষয়ক মার্কিন গণমাধ্যম পেজ সিক্স জানিয়েছে, হ্যাকম্যান তাঁর ইচ্ছাপত্রে লিখে গেছেন, তাঁর এই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন দ্বিতীয় স্ত্রী আরাকাওয়াই। ২০০৫ সালের পর এই ইচ্ছাপত্রে আর কোনো বদল করা হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে।

এদিকে হ্যাকম্যানের প্রথম স্ত্রী ফায়ে মালটেসের সঙ্গে তাঁর তিন সন্তান—ক্রিস্টোফার, লেসলি এবং এলিজ়াবেথ; সবারই বয়স এখন ৫৮ থেকে ৬৫-এর মধ্যে। আরাকাওয়ার কোনো সন্তান ছিল না। এখনো জানা যায়নি, হ্যাকম্যানের এই তিন সন্তানের কারও নাম সম্পত্তি প্রাপক হিসেবে উল্লেখ করা ছিল কি না! ফলে এই মুহূর্তে যেকোনো আইনি লড়াই শুরু হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর তেমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, হ্যাকম্যানের বড় ছেলে ৬৫ বছরের ক্রিস্টোফার ইতিমধ্যেই এক আইনজীবীর দ্বারস্থ হয়েছেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, তাঁর বোনেরাও যে জমি ছেড়ে দেবেন, এমন সম্ভাবনা কম। এরই পাশাপাশি আরাকাওয়া আবার এক ইচ্ছাপত্রে তাঁর সব সম্পত্তি এক অছির হাতে ন্যস্ত করার কথা লিখে রেখে গেছেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী, চিকিৎসাসংক্রান্ত সব খরচ মেটানোর পর সব সম্পত্তি দাতব্য করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া একটি শর্ত তিনি দিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, যদি তাঁর স্বামী তাঁর মৃত্যুর পর ৯০ দিন পর্যন্ত বাঁচেন, তাহলে সব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন হ্যাকম্যানই। কিন্তু এই শর্ত ইতিমধ্যেই মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।

হ্যাকম্যানের পেসমেকার থেকে জানা যায়, তাঁর মৃত্যু হয়েছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। শৌচাগার থেকে পাওয়া যায় আরাকাওয়ার দেহ। পুলিশের দাবি, তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে আরও সপ্তাহখানেক আগেই। সম্ভবত ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হন তিনি।
হ্যাকম্যানকে গত শতকের সেরা অভিনেতাদের একজন মনে করা হয়। রবার্ট ডি নিরো, আল পাচিনো, ডাস্টিন হফম্যানের সঙ্গে তিনি হলিউডের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া তারকার একজন ছিলেন।

হ্যাকম্যান ১৯৩০ সালের ৩০ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্দিনো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ওয়ারেন বেটির ‘লিলিথ’। ১৯৬৭ সালে আর্থার পেনের ‘বনি অ্যান ক্লাইড’ দিয়ে পার্শ্বচরিত্রে প্রথমবার অস্কার মনোনয়ন পান। ১৯৭০ সালে ‘আই নেভার স্যাং ফর মাই ফাদার’ চলচ্চিত্রের জন্য পার্শ্ব–অভিনেতা হিসেবে দ্বিতীয়বার অস্কার মনোনয়ন পান। এরপরই আসে সেই বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য ফ্রেঞ্চ কানেকশন’। ১৯৭১ সালে মুক্তি পাওয়া জিমি পপাই ডয়েল চরিত্রে অভিনয় করে দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি পান। উইলিয়াম ফ্রিডকিনের সিনেমাটির জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে অস্কার পান।

হ্যাকম্যান ১৯৯২ সালে ক্লিন্ট ইস্টউডের ‘আনফরগিভেন’ চলচ্চিত্রে শেরিফ লিটল বিল ড্যাগেট চরিত্রে অভিনয় করেন। এ সিনেমার জন্য পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেতা হিসেবে আবার অস্কার পান।

জিন হ্যাকম্যান। এএফপি ফাইল ছবি

আফগানিস্তান, ভুটানসহ ৪৩টি দেশের নাগরিকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বিশ্বের ৪৩টি দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবছে। নতুন এ নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার তুলনায় বেশি বিস্তৃত হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এ তৎপরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ–সংক্রান্ত একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছেন। চূড়ান্ত প্রস্তাবে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

খসড়া প্রস্তাবে যে দেশগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো আফগানিস্তান, ভুটান, কিউবা, ইরান, লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন, বেলারুশ, ইরিত্রিয়া, হাইতি, লাওস, মিয়ানমার, পাকিস্তান, রাশিয়া, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান, তুর্কমেনিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, চাদ, রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডমিনিকা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, গাম্বিয়া, লাইবেরিয়া, মালাউই, মালি, মৌরিতানিয়া, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সাও তোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে, ভানুয়াতু ও জিম্বাবুয়ে।

এর মধ্যে ১১টি দেশকে ‘লাল’ তালিকায় রাখা হয়েছে। লাল তালিকার মানে হলো এসব দেশে সব ধরনের ভ্রমণ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ এসব দেশের নাগরিকেরা কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারবেন না। এই দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, ভুটান, কিউবা, ইরান, লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ইয়েমেন।

খসড়া প্রস্তাবে ১০টি দেশকে ‘কমলা’ তালিকায় রাখা হয়েছে। কমলা তালিকার মানে হলো, এসব দেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকবে, তবে ভিসা একেবারে বন্ধ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে ধনী ব্যবসায়ীদের ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। কিন্তু অভিবাসী বা পর্যটন ভিসায় কাউকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হবে না। সেই তালিকায় থাকা নাগরিকদের ভিসা পেতে বাধ্যতামূলকভাবে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে হবে।

কমলা তালিকায় থাকা এই ১০টি দেশ হলো বেলারুশ, ইরিত্রিয়া, হাইতি, লাওস, মিয়ানমার, পাকিস্তান, রাশিয়া, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান ও তুর্কমেনিস্তান।

খসড়া প্রস্তাবটিতে ২২টি দেশকে ‘হলুদ’ তালিকায় রাখা হয়েছে। এ তালিকায় থাকা দেশগুলোকে তাদের ত্রুটি সংশোধনের জন্য ৬০ দিন সময় দেওয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে তারা যদি ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে তাদের লাল বা কমলা তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হবে।

এ তালিকায় আছে অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, চাদ, রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডমিনিকা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, গাম্বিয়া, লাইবেরিয়া, মালাউই, মালি, মৌরিতানিয়া, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সাও তোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে, ভানুয়াতু ও জিম্বাবুয়ে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রথমে দুটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাইলে আদালত তাতে বাধা দেয়। তবে পরে সুপ্রিম কোর্ট একটি পুনর্লিখিত নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে অনুমতি দিয়েছিল। আটটি দেশের ওপর ওই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছয়টি দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। পরে তালিকাটি আরও বিস্তৃত হয়।

২০২১ সালে জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্পের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করেন।

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বলেন, মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থে তিনি নিষেধাজ্ঞাগুলো নতুন করে আরোপ করবেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের এ তৎপরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে পররাষ্ট্র দপ্তরের উদ্যোগে তালিকা তৈরি করা হয়। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পর এতে পরিবর্তন আসতে পারে।

বিভিন্ন দূতাবাস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আঞ্চলিক ব্যুরোর কর্মকর্তা এবং অন্য বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা খসড়া প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন। উল্লিখিত দেশগুলোর যে ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক কি না বা এর পেছনে নীতিগত কারণ আছে কি না, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করবেন তাঁরা।

গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সেখানে পররাষ্ট্র দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে তারা যেন সেসব দেশকে চিহ্নিত করে, যেসব দেশের যাচাই-বাছাই ও স্ক্রিনিং তথ্যগুলো ত্রুটিপূর্ণ। যেন এসব দেশের নাগরিকদের প্রবেশের ওপর আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়।

ট্রাম্প পররাষ্ট্র দপ্তরকে ৬০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে তালিকাটি হোয়াইট হাউসে জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। আগামী সপ্তাহে এ সময়সীমা শেষ হচ্ছে।

ট্রাম্পের আদেশ অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যুরো অব কনস্যুলার অ্যাফেয়ার্সকে এ কাজে নেতৃত্ব দিতে বলা হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয়কে এ কাজে সহযোগিতা করতে বলা হয়।

বেশ কয়েকটি সংস্থার মুখপাত্র এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন কিংবা মন্তব্য জানতে চাওয়ার পর জবাব দেননি।

তবে এর আগে পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছিল, তারা ট্রাম্পের আদেশ অনুযায়ী কাজ করছে। তারা আরও বলেছিল, ‘আমরা আমাদের ভিসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে আমাদের দেশ ও এর নাগরিকদের রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

চলতি মাসে নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো আভাস দিয়েছিল, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকলেও এবারের নিষেধাজ্ঞায় আফগানিস্তান থাকতে পারে। এ দেশটি এখন তালেবানের দখলে আছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র দেশটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। তবে তালিকায় অন্য দেশগুলোকে কেন অন্তর্ভুক্ত করা হলো, না তা জানা যায়নি।

যেসব মানুষ ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেয়ে গেছেন, তাঁরা এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবেন কি না, নাকি তাঁদের ভিসা বাতিল করা হবে, তা জানা যায়নি। এসব দেশের যাঁরা ইতিমধ্যে গ্রিনকার্ডের আওতায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেয়ে গেছেন, তাঁদের ট্রাম্প প্রশাসন অব্যাহতি দেবে কি না, জানা যায়নি।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এবং সিরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী কলাম্বিয়ার শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিলের গ্রিনকার্ড বাতিল করেছে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

খসড়া প্রস্তাবে লাল ও কমলা তালিকায় থাকা কিছু দেশের ওপর ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদেই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তবে তালিকায় নাম থাকা অনেকগুলো দেশই নতুন। তাদের কারও কারও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আগের তালিকায় নাম থাকা দেশগুলোর মিল রয়েছে। এগুলো সাধারণত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ অথবা অশ্বেতাঙ্গ, দরিদ্র। এসব দেশের সরকার দুর্বল অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত।

তবে এমন কিছু দেশ আছে, যাদের কেন খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা বোঝা যাচ্ছে না। যেমন ভুটানের ওপর পুরোপুরিভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে। ছোট এ দেশটির অবস্থান চীন ও ভারতের মধ্যে। তবে তালিকায় চীন ও ভারতের নাম নেই।

আবার রাশিয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এ দেশটির ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা হলেও ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে কড়াকড়ির কথা বলা হয়েছে। রাশিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে অনেক বেশি করে রাশিয়াবান্ধব করতে চাইছেন।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছিল। তবে দেশটিকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের কারণে সে সম্পর্ক ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করার প্রচেষ্টার জন্য কার্যকরী হতো।

এদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ওই খসড়া তালিকায় ৪১টি দেশের নাম রয়েছে। এগুলো হলো আফগানিস্তান, কিউবা, ইরান, লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া, হাইতি, লাওস, মিয়ানমার, দক্ষিণ সুদান, অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, বেলারুশ, বেনিন, ভুটান, বুরকিনা ফাসো, কেপ ভার্দে, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, চাদ, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো, ডমিনিকা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, গাম্বিয়া, লাইবেরিয়া, মালাউই, মৌরিতানিয়া, পাকিস্তান, রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সাও তোমো প্রিন্সিপে, সিয়েরা লিওন, পূর্ব তিমুর, তুর্কমেনিস্তান ও ভানুয়াতু।

রয়টার্সের তালিকায় মালি ও জিম্বাবুয়ের নাম নেই, যা নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় আছে।

তালিকায় থাকা দেশগুলোকে তিনটি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, কিউবা ও উত্তর কোরিয়াসহ ১০টি দেশের ভিসা পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়েছে পাঁচটি দেশকে। এগুলো হলো ইরিত্রিয়া, হাইতি, লাওস, মিয়ানমার ও দক্ষিণ সুদান। এসব দেশের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পর্যটক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা আংশিকভাবে স্থগিত থাকবে।

তৃতীয় শ্রেণিটিতে বেলারুশ, পাকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানসহ ২৬টি দেশকে রাখা হয়েছে। এ দেশগুলোকে তাদের ভুল শুধরে ওঠার জন্য ৬০ দিন সময় দেওয়া হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স। এ সময়ের মধ্যে উন্নতি করতে না পারলে তাদের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আংশিকভাবে স্থগিত হতে পারে।

ট্রাম্পের প্রশাসন বিশ্বের ৪৩টি দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবছে
ট্রাম্পের প্রশাসন বিশ্বের ৪৩টি দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবছে

দুগিনের দুনিয়ায় ‘থাকা’, ‘না থাকা’ by সারফুদ্দিন আহমেদ

শেক্‌সপিয়ারের রাজকুমার হ্যামলেট সংশয়বাদী। সেই কারণে সে বলেছে, ‘টু বি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন।’ ‘টু বি’ মানে ‘বেঁচে থাকা’ আর ‘নট টু বি’ মানে ‘মৃত্যু’। কোনটা সে বেছে নেবে, সেটিই তার সামনে বিরাট প্রশ্ন।

যেহেতু মৃত্যুই শেষ পরিণতি, তাই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাস্তবতা মেনে নিয়ে মৃত্যুর কাছে সঁপে দেওয়াই ঠিক হবে; নাকি যেকোনো উপায়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে, তা হ্যামলেট ঠিক করে উঠতে পারেনি। তার মনে দ্বিধা থেকে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মাফিয়া সর্দারের মতো করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউসে ডেকে নিয়ে ক্যামেরার সামনে যাচ্ছেতাই অপমান করে তাঁকে প্রকারান্তরে ‘বাড়ি থেকে বের করে’ দিয়েছেন।

এরপর জেলেনস্কি সম্ভবত হ্যামলেটের ‘টু বি অর নট টু বি’ দশায় পড়েছেন।

ট্রাম্প ইউক্রেনকে অস্ত্রপাতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে সরাসরি পুতিনের পক্ষ নিয়েছেন। এখন জেলেনস্কির সামনে দুটি পথ, তাঁকে একটি বেছে নিতে হবে।

পয়লা নম্বর পথ হলো ‘টু বি’র পথ। অর্থাৎ ট্রাম্প ও পুতিনের চাপিয়ে দেওয়া সব শর্ত মেনে নিয়ে শান্তিচুক্তি নামক দাসখতে সই করে ইউক্রেনের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা।

দ্বিতীয় পথ হলো ‘নট টু বি’র পথ। অর্থাৎ কিনা, ‘জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে, যে ডরে ভীরু সে মূঢ়, শত ধিক্ তারে!’ টাইপের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে লড়তে লড়তে মর্যাদাকর মৃত্যুকে বেছে নেওয়া। অর্থাৎ প্রায় অবধারিতভাবে এই যুদ্ধে হেরে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা।

জেলেনস্কি অবশেষে ট্রাম্প ও পুতিনের শর্তানুসারে যুদ্ধবিরতির দিকেই হাঁটলেন। অর্থাৎ এক প্রকার বাধ্য হলেন।

ইউক্রেনের সামনে ঢাল হিসেবে যে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন ছিল, সেই ঢাল ট্রাম্প সরিয়ে নিয়েছেন।

ইউরোপ যদিও বলছে, তারা দ্রুত সাহায্য বাড়িয়ে সেই ঢাল সরবরাহ করবে; কিন্তু তাদের আশ্বাসের ওপর ভরসা কম।

তাই ঢালবিহীন নিধিরাম সর্দার জেলেনস্কির পক্ষে সুপার পাওয়ার রাশিয়ার বিরুদ্ধে কতক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব, ‘দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন’।

দুগিনের ‘টু বি অর নট টু বি’

মোটাদাগে বোঝা যাচ্ছে, ইউক্রেন তথা ইউরোপ এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। রাশিয়া এরই মধ্যে ইউক্রেনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখল করে নিয়েছে।

এখন ট্রাম্পের চাপে পড়ে জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তি করলেন। সামনে হয়তো দেখা যাবে, এই বিশাল এলাকা স্থায়ীভাবে রাশিয়াকে লিখে–পড়ে দিতে হবে।

কিন্তু ইউক্রেনের ভূখণ্ড হাতিয়ে নিতে পারলে কি রাশিয়া এখানেই থেমে যাবে? পুতিন কি এখানেই যুদ্ধ শেষ করবেন? নিজের দেহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ কেটে রাশিয়াকে দিয়েও কি ইউক্রেন নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে?

মনে হয় না। কারণ, যে ব্যক্তিকে কেউ বলেন, ‘পুতিনের মগজ’, কেউ বলেন, ‘পুতিনের রাসপুটিন’; সেই রুশ রাজনৈতিক দার্শনিক আলেকসান্দর দুগিনের দর্শন পুরোপুরি যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে নয়।

দুগিন বলেছেন, ‘কে থাকবে, আর কে নাই হয়ে যাবে, তার একমাত্র ফয়সালাকারী হলো যুদ্ধ।...যুদ্ধ এমন এক মেটাফিজিক্যাল বিষয়, যা কোনো কিছুকে নাই করতে দিতে পারে; আবার নাই হয়ে থাকা কোনো কিছুকে নতুন করে অস্তিত্ব দিতে পারে।’

গত বছরের আগস্টে জিওপলিটিকা ডট আরইউ ওয়েবসাইটে দুগিন ‘ওয়ার অ্যাফেক্টস দ্য ভেরি নেচার অব এক্সিস্ট্যান্স-ইট ইজ ওয়ার দ্যাট ডিসাইডস হোয়াট এক্সিস্টস অ্যান্ড হোয়াট ডাজ নট’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে এসব কথা লিখেছেন।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাসের উক্তি সামনে এনে দুগিন বলেছেন, ‘যুদ্ধ একজনকে প্রভু বানায়, আরেকজনকে দাসে পরিণত করে।...বিজয়ীদের বিচার করা হয় না, বিচার হয় পরাজিতদের। বিজয়ী প্রভু হয়ে যায় এবং তাই তার অস্তিত্ব থাকে। পরাজিত হয় অস্তিত্বহীন হয়ে যায়, নয়তো দাসে পরিণত হয়; আর দাসত্ব নাই হয়ে যাওয়া বা অস্তিত্বহীনতার চেয়েও নিকৃষ্ট।’

ওই নিবন্ধে দুগিন লিখেছেন, ‘আজকের জার্মানি বা জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, ফলে এখন তারা পশ্চিমাদের দাস। কার্যত তাদের এখন কোনো অস্তিত্ব নেই।’

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রসঙ্গ টেনে দুগিন লিখেছেন, ‘শীতল যুদ্ধের পর গর্বাচেভ, ইয়েলেৎসিন ও উদারপন্থী সংস্কারকদের কারণে রাশিয়া পরাজিতদের দলে পড়ে। যাঁরা এই বিশ্বাসঘাতকদের সমর্থন করেছিলেন এবং ম্যাকডোনাল্ডসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরাও সোভিয়েত ভাঙার জন্য সমান দায়ী।’

দুগিন তাঁর লেখায় বলছেন, ‘অস্তিত্ব অতীত দ্বারা প্রমাণিত হয় না; এটি বর্তমানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নির্মাণের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়।’

খটোমটো এই বক্তব্যের মানে যা দাঁড়ায় তা হলো, শুধু ইতিহাসে কোনো ভূখণ্ড বা জাতির উপস্থিতি থাকলেই সেটিকে চূড়ান্তভাবে ‘টু বি’ বা ‘থাকা’ বলা যায় না। বরং বর্তমানে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে ভবিষ্যৎ গড়তে পারলে সেটিই হবে প্রকৃতপক্ষে ‘থাকা’।

দুগিন বোঝাতে চান, রাশিয়া যদি চলমান এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে হারিয়ে দেয়, তাহলে রাশিয়ার পক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব হবে, ইউক্রেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কোনো দিনই অস্তিত্বশীল ছিল না।

ওই লেখায় দুগিন সরাসরি বলেছেন, তিনি চান না, ইউক্রেনের অস্তিত্ব থাকুক। এটি শুধু দুগিনের ব্যক্তিগত চাওয়া নয়; এটি রাশিয়ার জিওপলিটিক্যাল দৃষ্টিকোণেরও প্রতিফলন, যেখানে ইউক্রেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করা হয় না।

দুগিনের দাবি, ইউক্রেন কখনোই প্রকৃতপক্ষে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ছিল না, এটি ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার অংশ ছিল এবং রাশিয়ার অংশ হিসেবেই দেশটিকে গণ্য করা উচিত।

সুতরাং দুগিনের আলাপকে পুতিন যদি আমলে নেন, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, যুদ্ধ আপাতত থামলেও শেষ পর্যন্ত তা থামবে না।

কারণ, দুগিন মনে করেন, স্নায়ুযুদ্ধে হেরে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া বিশ্ব-আসন থেকে নাই হয়ে গেছে, অর্থাৎ রাশিয়া তার ‘অস্তিত্ব’ হারিয়েছে।

রাশিয়ার সেই অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ হলো যুদ্ধ। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাশিয়া যদি গোটা পশ্চিমের সঙ্গে লড়ে ইউক্রেনকে দখল করে নিতে পারে, শুধু তাহলেই রাশিয়া নিজের ‘অস্তিত্ব’ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

দুগিন বলছেন, যদি কেউ অতীত–সম্পর্কিত প্রচলিত ভাষ্য পাল্টে ফেলতে চায়, তাহলে তাকে ক্ষমতা দখল করতে হবে; অর্থাৎ বিজয়ী হতে হবে।

কারণ, ক্ষমতার সঙ্গে ইতিহাসের সম্পর্ক আছে। অস্তিত্বের সঙ্গে বিজয়ের সংযোগ আছে।

দুগিন তাঁর লেখায় বলেছেন, খ্রিষ্টান চার্চ অতীতে কিছু বিষয়কে ‘ঘটেনি’ বলে ঘোষণা করেছে। তাদের এই ঘোষণাটি অস্তিত্বের, অর্থাৎ কোনো কিছুর থাকা বা না থাকার একটি দার্শনিক সিদ্ধান্ত।

তাঁর মতে, অতীতে চার্চ যে ঘটনাকে ‘ঘটেনি’ বলে চূড়ান্ত রায় দিয়েছে, হয়তো সেই ঘটনার অস্তিত্ব কোনো না কোনোভাবে ছিল, কিন্তু ক্ষমতাধরেরা সে অস্তিত্বকে শূন্যের কাতারে নামিয়ে দিয়েছেন।

জর্জ অরওয়েল তাঁর ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে বলেছেন, ‘যে বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে, সে অতীতকেও নিয়ন্ত্রণ করে।’ অরওয়েল এটিকে ‘টোটালিটারিয়ান’ বা একনায়কতান্ত্রিক বিষয় বলেছেন।

আর দুগিন মনে করেন, এটি শুধু একনায়কতন্ত্রের ব্যাপার নয়, বরং এটিই চিরকালীন সত্য। তিনি বলছেন, ক্ষমতাধরেরা অতীতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যাখ্যা করে। কেউ যদি সেই ব্যাখ্যা বদলাতে চায়, তাহলে তাকে ক্ষমতা দখল করতে হবে।

দুগিন বলছেন, পুতিন ‘অস্তিত্বহীন’ রাশিয়াকে বিশ্বমঞ্চে পুনরুজ্জীবিত করার লড়াই চালাচ্ছেন এবং রাশিয়া কেবল তখনই সত্যিকারের অস্তিত্ব লাভ করবে, যখন সে জয়ী হবে। কারণ, অস্তিত্ব আর বিজয় একই জিনিস। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া হলো তা-ই, যা আসতে চলেছে।’

এই যুদ্ধ ইউক্রেনের জন্য যেমন ‘টু বি’ বা ‘থাকা’ তথা অস্তিত্ব টেকানোর লড়াই; তেমনি রাশিয়ার জন্যও এটি ‘টু বি’র লড়াই।

ধরা যাক, একটা শোল মাছ একটা পুঁটি মাছকে ধাওয়াচ্ছে। পুঁটি ছুটছে। পুঁটি ধরা পড়লেই তাকে মরতে হবে, তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে। আর শোল যদি তাকে ধরতে না পারে, তাহলে না খেতে পেয়ে শোলের মৃত্যু হবে এবং তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে।

তার মানে হানাদার আর হানার শিকার—দুজনই অস্তিত্ব টেকাতে হানাহানি করছে।

দ্য ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি

‘অস্তিত্বহীন’ রাশিয়াকে ‘অস্তিত্বশীল’ করার জন্য দুগিন ‘ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি’ বা ‘চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব’ নামের একটি তত্ত্ব প্রচার করে যাচ্ছেন।

‘দ্য ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি’ শিরোনামে তাঁর লেখা বইয়ে তিনি এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। বইটি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অবশ্যপাঠ্য। দুগিন তাঁর এই বইয়ের ভূমিকার শিরোনামও দিয়েছেন ‘টু বি অর নট টু বি?’

এই বইয়ে দুগিন বলছেন, বিশ শতকে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক তত্ত্ব ছিল:

প্রথম রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো উদারবাদ, দ্বিতীয় রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো সমাজতন্ত্র এবং তৃতীয় রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো ফ্যাসিবাদ।

এর মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে উদারবাদ বিংশ শতক থেকে বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করছে।

দুগিনের মতে, রাশিয়াকে ‘অস্তিত্বহীন’ থেকে ‘অস্তিত্বশীল’ করতে হলে এই তিন তত্ত্বের বাইরে গিয়ে ‘চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব’ গ্রহণ করতে হবে।

এই তত্ত্ব নিয়ে দুগিন বিশদে যত কথা বলেছেন, তার চুম্বক কথা হলো শাসন, আইন, মানবাধিকার—এগুলো স্থানীয় সংস্কৃতির বিষয়।

এই থিওরি অনুসারে রাশিয়াই ঠিক করবে কোনটি মানবাধিকারের মধ্যে পড়বে, আর কোনটি পড়বে না। যুক্তরাষ্ট্রে বা পশ্চিমি সমাজে যেটিকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, রাশিয়ায় সেটিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হতে পারে।

পশ্চিম যে উদারবাদ তথা পুঁজিবাদের অনুসরণ করে, সেখানে ব্যক্তি সত্তার স্বাধীনতাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়। পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যক্তি কীভাবে জীবন চালাবে, তা নিয়ে রাষ্ট্র মাথা ঘামায় না।

কিন্তু দুগিনের প্রচারিত ‘চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব’ সমাজের মৌলিক নিয়মনীতি বা ঐতিহ্যকে ব্যক্তিরও ওপরে গুরুত্ব দেয়।

দুগিনের প্রচারিত এই তত্ত্ব মূলত অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটিকে দারুণভাবে ধারণ করে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাভিত্তিক পশ্চিমা সংস্কৃতিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

যেমন লিঙ্গ ইস্যুতে পশ্চিমা উদারবাদ যে ব্যক্তিস্বাধীনতা অনুমোদন করে, চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব তা রাশিয়ায় অনুমোদন করে না।

এই বইয়ের ভূমিকায় দুগিন বলছেন, ‘রাশিয়ার জন্য উদারবাদ উপযোগী নয়। আবার কমিউনিজম বা ফ্যাসিবাদও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমাদের চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রয়োজন। কারও কাছে এটি হয়তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক ইচ্ছার বিষয় হতে পারে; কেউ এটিকে সমর্থন করতে পারেন, কেউ বিরোধিতা করতে পারেন। কিন্তু রাশিয়ার জন্য এটি বাঁচা–মরার প্রশ্ন; “টু বি অর নট টু বি”র প্রশ্ন। রাশিয়ার জন্য এটি হ্যামলেটের সেই চিরন্তন দ্বিধাসূচক প্রশ্ন “বাঁচব নাকি মারা যাব?”’

সাবেক সোভিয়েতভুক্ত ভূখণ্ডের অধিবাসী হওয়ার সুবাদে ইউক্রেনবাসীর একটি বড় অংশ জাতিগতভাবে রুশ। রাশিয়ার মানুষের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা আছে। তাঁরা ক্যাথলিক নন, অর্থোডক্স খ্রিষ্টান।

ফলে ইউরোপীয় ক্যাথলিকদের সঙ্গে ইউক্রেনের অর্থোডক্স রুশদের সাংস্কৃতিক ভিন্নতা রয়েছে।

কিন্তু ইউক্রেন ইউরোপের সংস্পর্শে আসার কারণে সেখানে পশ্চিমা সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছে। সেখানে ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসির আউটলেটে ইউক্রেনীয় রুশরা লাইন লাগাচ্ছেন। ঐতিহ্যবাহী রুশ অর্থোডক্স রক্ষণশীলতা থেকে সরে যাচ্ছেন।

রাশিয়া যেহেতু ইউক্রেনকে তার লাগোয়া বারান্দা মনে করে, সেহেতু সেখানে পশ্চিমা উদারবাদী সংস্কৃতির আবাদকে চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্বে বিশ্বাসীরা রাশিয়ার রক্ষণশীল সমাজের জন্য হুমকি মনে করেন।

এই চিন্তা থেকেই দুগিন তাঁর ১৯৯৭ সালে লেখা ‘ফাউন্ডেশনস অব জিওপলিটিকস: দ্য জিওপলিটিক্যাল ফিউচার অব রাশিয়া’ বইটিতে ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক কৌশলের একটি প্রধান অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ওই বইতে তিনি যুক্তি দেন, রাশিয়ার উচিত ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে একটি শক্তিশালী ইউরেশীয় সাম্রাজ্য গঠন করা। এটিই এখনকার বহুল আলোচিত ‘ইউরেশিয়ানিজম’।

এই মতবাদে তিনি যে ‘ইউরেশিয়ান ইউনিয়ন’-এর ধারণা দিয়েছেন, তা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোকে রাশিয়ার নেতৃত্বে একীভূত করার পরিকল্পনা আছে।

এই ধারণাকে পরে পুতিন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ওই বইয়ে দুগিন বলেন, ‘ইউক্রেনের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কোনো তাৎপর্য নেই এবং এটি রাশিয়ার অংশ হওয়া উচিত।’

২৪০ পৃষ্ঠার লেকচার আর ৭৬ পৃষ্ঠার শিক্ষা পরিকল্পনা এবং দুগিনের ‘জনসমর্থিত গণতন্ত্র’

তবে রাতারাতি চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব রাশিয়ায় যে দাঁড় করানো যাবে না, সেটি দুগিন ও প্রেসিডেন্ট পুতিন দুজনেই জানেন। তাঁরা বোঝেন, এর জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নতুন প্রজন্মের রাশিয়ান নাগরিকদের তৈরি করতে হবে। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক জ্ঞানের কাঠামোকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে।

সে লক্ষ্যেই দুগিন রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতিবিজ্ঞান শেখানোর পদ্ধতিকেই বদলে ফেলতে চাইছেন।

রাশিয়ার বেশ কয়েকজন নামকরা সাংবাদিক পুতিনের দমন–পীড়ন থেকে বাঁচতে লাটভিয়ার রিগায় গিয়ে মেদুজা নামের একটি অনলাইন পোর্টাল চালাচ্ছেন।

সেই মেদুজা একটি প্রতিবেদনে বলেছে, দুগিন চান, রাশিয়ার উচ্চশিক্ষার মানবিক বিভাগগুলোতে রাজনীতিবিজ্ঞান শেখানোর পদ্ধতি বদলে দেওয়া হোক।

মেদুজার কাছে একটি ২৪০ পৃষ্ঠার লেকচার সিরিজ ও ৭৬ পৃষ্ঠার শিক্ষা পরিকল্পনা এবং রাশিয়ার বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনার (প্রেজেন্টেশন) নথি এসেছে।

এগুলো দুগিনের দল তৈরি করেছে। এই কাজগুলো করা হয়েছে রাশিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি ফর দ্য হিউম্যানিটিজের ইভান ইলিন হায়ার পলিটিক্যাল স্কুল থেকে।

দুগিন ও তাঁর সহযোগীরা পুতিনকে সতর্ক করে দিয়েছেন, রাশিয়ার রাজনীতিবিজ্ঞানে বর্তমানে ‘আমেরিকাকেন্দ্রিকতা’ (আমেরিকাসেন্ট্রিজম) বিরাজ করছে এবং এটি ‘দমন’ করা দরকার।

দুগিনের মতে, রাশিয়ার রাজনীতিবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রাশিয়ায় নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম বাড়ানো এবং রাষ্ট্র ও সমাজের স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

তিনি ‘নাগরিক সচেতনতা’ বলতে রাষ্ট্রীয় বিধান ও সমাজের কল্যাণকে ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়াকে বোঝান।

তাঁর মতে, পশ্চিমা ধারণা (যেমন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা বিশ্বনাগরিকতা) রাশিয়ার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর।

দুগিনের প্রস্তাবিত পাঠ্যক্রমে শিক্ষকদের রাশিয়ার ইতিহাসের তিনটি মূল ধারণা শেখাতে বলা হয়েছে:

১. অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম

২. স্বৈরতন্ত্র

৩. জাতীয়তাবাদ।

দুগিনের প্রস্তাবিত শিক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের বলা হবে রাশিয়ার জারতন্ত্র প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী।

১৬ শতকের একটি তত্ত্ব ব্যবহার করে দুগিন চান নব্য উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

এই তত্ত্ব অতীতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ১৭ শতকে রোমান জারদের পোলিশ-লিথুয়ানীয় ও অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় এই তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়েছিল।

দুগিনের মতে, রাশিয়ার শিক্ষার্থীদের শেখানো উচিত মস্কো হলো ‘তৃতীয় রোম’। অর্থাৎ রোম ও কনস্টান্টিনোপলের পর রাশিয়াই সভ্যতার নতুন কেন্দ্র।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার দুর্বলতাকে দুগিনের পাঠ্যক্রমে খারাপ হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর পুতিনের ক্ষমতায় আসাকে রাশিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এখানে বলা হয়েছে, পুতিন দেশটির সার্বভৌমত্ব ও শক্তি ফিরিয়ে এনেছেন। বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে এই পাঠ্যক্রমে রাশিয়ার ‘আদর্শিক স্বাধীনতা’ অর্জনের শেষ ধাপ হিসেবে বলা হয়েছে।

দুগিন চান, রুশ শিক্ষার্থীরা মনে করুক রাশিয়ার বর্তমান শাসনব্যবস্থাই সবচেয়ে ভালো। এই ব্যবস্থায় একজন শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট জনগণের ভোটে ক্ষমতায় থাকেন।

দুগিন এটিকে ‘জনসমর্থিত গণতন্ত্র’ বলেন। তাঁর মতে, ক্ষমতা ভাগ করা বা নেতা বদলের ব্যবস্থা বিপজ্জনক, কারণ এতে অদক্ষ আমলারা ক্ষমতা দখল করেন। তিনি সমাজে শান্তি বজায় রাখা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পবিত্র ও ঐতিহ্যবাহী বলে মনে করেন।

দুগিনের পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় দর্শনের প্রভাব বেশি। যেমন এই পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে, রাষ্ট্র হলো একধরনের ‘রক্ষাকারী শক্তি’, যা বিশ্বকে অরাজকতা থেকে বাঁচায়।

প্রাচীন রোমান সম্রাট বা রাশিয়ার জারদের মতো বর্তমান রাশিয়ার সরকারকেও এই ভূমিকায় দেখতে হবে।

দুই সভ্যতার চিরন্তন যুদ্ধ

দুগিন বিশ্বাস করেন, ইতিহাসজুড়ে ‘স্থলভিত্তিক’ ও ‘সমুদ্রভিত্তিক’ সভ্যতার লড়াই চলেছে।

রাশিয়া হলো স্থলভিত্তিক সভ্যতা, যার মূলনীতি স্থিতিশীলতা, রক্ষণশীলতা ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী।

পশ্চিমা দেশগুলো হলো সমুদ্রভিত্তিক সভ্যতা, যারা বাণিজ্য, নৌশক্তি ও তথ্য দিয়ে ক্ষমতা বাড়ায়।

দুগিনের ভাষায়, ইউক্রেন যুদ্ধকে এই দুই সভ্যতার লড়াইয়ের অংশ বলা হয় এবং ২০১৪ সালে ইউক্রেনে পশ্চিমা প্রভাব বাড়াকে রাশিয়ার জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো হয়।

মার্ক্সবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করলেও দুগিনের পাঠ্যক্রমে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সম্মান দেওয়া হয়। চীনের রাজনীতিতে কনফুসিয়াসের শিক্ষা এবং উত্তর কোরিয়ার জুচে মতবাদকে ঐতিহ্যবাহী দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

তো, দুগিন মনে করেন, ‘টু বি অর নট টু বি’র সন্ধিক্ষণে অস্তিত্ব হারানো রাশিয়াকে অস্তিত্বশীল করতে পারেন একজন ‘জার’। সেই জার হলেন ভ্লাদিমির পুতিন।

গত বছরের ৭ অক্টোবর পুতিনকে তাঁর ৭২তম জন্মদিনে ‘ঈশ্বর জারকে রক্ষা করুন’ বলে নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন দুগিন।

টেলিগ্রামে তাঁর ৭১ হাজারের বেশি অনুসারীর উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় দুগিন কামনা করেন, ‘দেবদূতেরা’ যেন ‘সম্রাট’ পুতিনের মাথায় ‘সোনার মুকুট’ পরিয়ে দেন। একই সঙ্গে তিনি ৭২ বছর বয়সকে পুতিনের ‘দ্বিতীয় যৌবন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পুতিন এযাবৎকাল দুগিনের তত্ত্ব মেনে ক্রিমিয়া দখল থেকে শুরু করে ইউক্রেন অভিযানের মতো কাজ একে একে করে এসেছেন। একের পর এক দুগিনের তত্ত্ব বাস্তবায়ন করে এসেছেন।

এখন যেহেতু ‘রাসপুটিন’ দুগিন বলছেন, রাশিয়ার ‘অস্তিত্ব’ ফিরিয়ে আনার একমাত্র পন্থা যুদ্ধ করে ইউক্রেনকে সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার দখলে নিয়ে নেওয়া; সেহেতু ‘জার’ পুতিন ইউক্রেন দখলের অভিলাষ থেকে ফিরে আসবেন, তা মনে করা কঠিন।

* সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
    ই–মেইল: sarfuddin2003@gmail.com

যে ব্যক্তিকে কেউ বলেন, ‘পুতিনের মগজ’, কেউ বলেন, ‘পুতিনের রাসপুটিন’; সেই রুশ রাজনৈতিক দার্শনিক আলেকসান্দর দুগিনের দর্শন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে নয়।
যে ব্যক্তিকে কেউ বলেন, ‘পুতিনের মগজ’, কেউ বলেন, ‘পুতিনের রাসপুটিন’; সেই রুশ রাজনৈতিক দার্শনিক আলেকসান্দর দুগিনের দর্শন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে নয়। ছবি: এএফপি

ঢাকায় গুতেরাঁর ব্যস্ত দিন: সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যে জোর

বিচার, সংস্কার, গণতন্ত্র, নির্বাচন ও পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।  বিএনপিসহ ৭টি রাজনৈতিক দল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের দুই উপদেষ্টাকে নিয়ে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় জাতিসংঘ শান্তি, জাতীয় সংলাপ, আস্থা ও পুনঃনির্মাণের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। তিনি বলেন, আপনারা জাতিসংঘকে একটি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে গণ্য করতে পারেন। বাংলাদেশের জনগণের পাশে থেকে জাতিসংঘ সকলের জন্য টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করবে। গুতেরাঁ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানানো। আমি বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যৎ বৃহত্তর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশাকে স্বীকৃতি দিচ্ছি।

ওদিকে জাতিসংঘ ঢাকা অফিসের আয়োজনে হওয়া বৈঠকে দলগুলোর নেতারাও ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছেন। বৈঠক নিয়ে বিএনপি নেতাদের মাঝে কিছুটা বিরক্তিভাবও দেখা গেছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলটেবিল বৈঠকের বিষয়ে তিনি ঠিক বুঝেননি বলে উল্লেখ করেন। গোলটেবিল  বৈঠকে বিএনপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচন কেন্দ্রিক সংস্কারগুলো দ্রুত শেষ করে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়। জামায়াত সংস্কার, সুষ্ঠু নির্বাচন, টেকসই গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। নতুন দল এনসিপি বিচার ও সংস্কারে জোর দিয়েছে। এ ছাড়াও গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছে। এ ছাড়া বৈঠকে পাঁচটি সংস্কার কমিশনের প্রধান সংস্কার নিয়ে কমিশনের বক্তব্য তুলে ধরেন। বৈঠকে অংশ নেয়া সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ মহাসচিব গোলটেবিল বৈঠকে মূলত সংস্কার প্রক্রিয়া বুঝতে চেয়েছেন। বৃহত্তর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থার ওপর জোর দিয়েছেন। আর বাংলাদেশের আগামীর নির্বাচন যেন বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয় সে বিষয়েও কথা হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যতা থাকলেও গণতন্ত্র অটুট রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে সরকারের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা প্রফেসর আসিফ নজরুল, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। এ ছাড়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশন থেকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. আলী রীয়াজ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার বিষয়ক কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এর সঙ্গে যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও রূপান্তরের মধ্যদিয়ে যাওয়ার সময় জাতিসংঘ শান্তি, জাতীয় সংলাপ, আস্থা ও পুনর্মিলনের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। তিনি বলেন, আপনারা জাতিসংঘকে একটি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে গণ্য করতে পারেন। বাংলাদেশের জনগণের পাশে থেকে জাতিসংঘ সকলের জন্য টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করবে। গুতেরাঁ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানানো। তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি বাংলাদেশে আসতে পেরে আনন্দিত যে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। আমি বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যৎ বৃহত্তর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশাকে স্বীকৃতি দিচ্ছি। গুতেরাঁ বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আর একটি ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, রমজান সকলকে মানবতার সংযোগকারী সর্বজনীন মূল্যবোধ: সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও উদারতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশ তার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার মূল্যবোধের জীবন্ত প্রতীক। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষার অন্যতম বৃহত্তম অবদানকারী দেশ উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব বিশ্বে সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন ও সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে ইফতার করার কথাও উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও তাদের আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশিদের প্রতি তার সংহতি প্রকাশ করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরে মানবিক বিপর্যয় এড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আরও সহায়তা দেয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই, যাতে আমরা এই মানবিক বিপর্যয় এড়াতে পারি।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব সংস্কারের ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি বলেন, মূলত এখানে সংস্কারে যে কমিশনগুলো করা হয়েছে, সে বিষয়গুলো জাতিসংঘ মহাসচিবকে অবহিত করা হয়েছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। আমরা আমাদের বক্তব্যের মধ্যে যে কথাগুলো বলে আসছি, সেই একই কথা বলেছি। ফখরুল বলেন, সংস্কার অবশ্যই করতে হবে, সেই সংস্কারের কথা সবার আগে বলেছে বিএনপি। কিন্তু সংস্কারটা যেন দ্রুত করা যায়। আমরা যেটা বলেছি, মূলত নির্বাচন কেন্দ্রিক বিষয়গুলো সংস্কারগুলো করে ফেলা, তারপর দ্রুত নির্বাচন করা, এরপর একটি সংসদের মাধ্যমে বাড়তি সংস্কারগুলো করা। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, এটাই আমরা বলেছি। জাতিসংঘের মহাসচিব কিছু বলেছেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি’র মহাসচিব বলেন, তিনি কোনো কমেন্ট (মন্তব্য) করেননি। এ সময় মির্জা ফখরুল বলেন, আসলে এই গোলটেবিলটা... আমি ঠিক বোঝেননি আর কি..।
নির্বাচন নিয়ে কোনো টাইম ফ্রেমের কথা বলেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কোনো টাইম ফ্রেমের কথা বলার প্রয়োজন নেই। সংস্কার আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমরা সংস্কার কমিশনগুলোর সঙ্গে কথা বলছি, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। তারা যা চাইছে আমরা সব দিয়ে দিচ্ছি। ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে একটা বৈঠক হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবকে আমরা আমাদের টাইম ফ্রেমটা দিতে যাবো কেন? নির্বাচন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বৈঠকে উপস্থিত থাকা দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতিসংঘের তরফ থেকে বলা হয়েছে, এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনারা বসে রিফর্মস কী নেবেন, সেটা ঠিক করেন। উনি বাংলাদেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। পৃথিবীর মধ্যে একটা নজির সৃষ্টি করবে আগামী নির্বাচন, এমনটা উনি আশা করেছেন। অন্যদিকে বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংস্কার, সুষ্ঠু নির্বাচন, টেকসই গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বৈঠক শেষে দলটির নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, আমরা সংস্কারের ব্যাপারে কথা বলেছি। একটা ফেয়ার নির্বাচনের বিষয়ে বলেছি, টেকসই গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে কথা বলেছি। জাতিসংঘের মহাসচিব আমাদের অধিকাংশ বক্তব্য সমর্থন করে বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তিনি আশাবাদী। আর নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিচার ও সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বৈঠকে বক্তব্য রেখেছে। এ ছাড়া, জুলাই সনদ, গণপরিষদ নির্বাচন ও নতুন সংবিধানের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠক শেষে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে একটি সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে সেটাতেই আলোকপাত করা হয়েছে। সংস্কার কমিশনের প্রধানরা তাদের স্ব স্ব সংস্কার রিপোর্টের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা তাদের দলীয় অবস্থান তুলে ধরেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে আমরা মনে করি, বিচার ও সংস্কার জনগণের কাছে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের অন্যতম কমিটমেন্ট। তিনি বলেন, মৌলিক সংস্কারের ভিত এই সরকারের সময়েই রচনা করতে হবে। এ ছাড়া জুলাই সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল মিলে ঐকমত্য পোষণ করতে হবে। জনগণের কাছে আমাদের সংস্কারের যে কমিটমেন্ট, সংস্কারের যে ধারাবাহিকতা সেটা বাস্তবায়নের জন্য জুলাই সনদের দ্রুত বাস্তবায়নের কথা বলেছি। সংবিধান সংস্কার নিয়ে এনসিপির অবস্থান তুলে ধরেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার গণপরিষদের মাধ্যমেই করতে হবে। সংসদে সংবিধান সংস্কার টেকসই হবে না, বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেও এটাই দেখতে পাই। আমরা আমাদের এই দলীয় অবস্থান সংক্ষেপে বলেছি। জাতিসংঘ মহাসচিবও তার জায়গা থেকে বলেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যেন সমঝোতায় আসে, একটা ঐকমত্যে আসে সেটা চেয়েছেন। গণতন্ত্রের ট্রু এসেন্স সেটাকে মাথায় রেখেই যেন আমরা একসঙ্গে কাজ করি, একটি ঐক্যে আসতে পারি সেটাই তিনি তার জায়গা থেকে বলেছেন। এনসিপি’র শীর্ষ এই নেতা বলেন, আমরা মনে করি, নির্বাচনকে আমরা একটি সংস্কারের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি, সংস্কারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখি। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কোনো কাজে দেবে না। অন্য সব রাজনৈতিক দলও এই কথার সঙ্গে একমত পোষণ করে। এখানে মতপার্থক্য হচ্ছে কোন সংস্কারটা কখন হবে, নির্বাচনের আগে কতোটুকু হবে, নির্বাচনের পরে কতোটুকু হবে। আমরা মনে করি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে, মতপার্থক্যগুলা কেটে যাবে। আমরা ঐকমত্যে আসতে পারবো। তিনি বলেন, আমরা জাতিসংঘের কাছে বিচার ও সংস্কার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছি, ধন্যবাদ জানিয়েছি। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, আমরা যেন নিজেরা এক হতে পারি। আমরা যদি নিজেরা ঐকমত্যে আসতে পারি তারা তাদের জায়গা থেকে সহযোগিতা করবেন।
ওদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে তরুণদের সঙ্গেও গোলটেবিল বৈঠক করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। বৈঠকে তিনি জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও নতুন বাংলাদেশ নিয়ে তরুণদের ভাবনা জানতে চান। বৈঠক শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, আমাদের একেকজন একেক বিষয়ে অভিজ্ঞ। কেউ আইনের বিষয়ে, কেউ অর্থনীতির বিষয়ে বলেছে। ইয়ুথদের পক্ষ থেকে আমরা জাতিসংঘ মহাসচিবকে বলেছি। আন্দোলনে বাংলাদেশের রাস্তা ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে একটি রিপোর্ট করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক জানিয়েছেন, সাইকেল অব রিভেঞ্জ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগের বিচার হওয়া প্রয়োজন। নির্দিষ্ট করে আমরা প্রথমত বলেছি, আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের বিচার আন্তর্জাতিক  ট্রাইব্যুনালে নেয়া যায় কিনা। দ্বিতীয়ত, ছাত্রদের পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়ে। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বর্তমানে ডব্লিউএইচও-এর সাউথ ইস্ট রিজিয়নের হেড হিসেবে আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেব্রিকেট করে তাকে বসিয়েছেন। পুতুলের আপয়েন্টটা (নিয়োগ) রিভিউ করার বিষয়ে। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়াতে বর্তমানে ভয়াবহ পরিমাণে ফেইক নিউজ, মিস ইনফরমেশনসহ নানাভাবে বুলিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে। এটা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা মব ভায়োলেন্স হয়েছে বাংলাদেশে। মব জাস্টিস করে তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলছেন। এই বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। নারীর নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায় নিয়ে মহাসচিবকে অবহিত করা হয়েছে। অ্যান্তনিও গুতেরাঁ আমাদের বলেছেন শেখ হাসিনার বিষয়ে অন্যান্য দেশের মতামত ও রিভিউ করলে হয়তো বিচার করা সম্ভব আন্তর্জাতিক আদালতে। বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার কথা ভারতের। তারপরও এটা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়। রুপাইয়া বলেন, আন্দোলনের পর আদিবাসীদের ওপর হামলার বিষয়ে আমরা অ্যান্তনিও গুতেরাঁ স্যারের কাছে বিষয়টা তুলে ধরেছি। অনলাইনে সাইবার বুলিং, আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত। আদিবাসীদের বৈশাবী সংক্রান্ত ছুটির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে মহাসচিব যাতে উৎসাহিত করেন সে বিষয়ে জানিয়েছি।
এদিকে সকালে গুলশানে জাতিসংঘের নতুন ভবনে মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। বলেন, তারা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গুতেরাঁ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করেন। এদিন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখতে এবং জাতিসংঘের পতাকা উত্তোলন করতে গুলশানে জাতিসংঘের নতুন ভবন পরিদর্শনে যান তিনি। বাংলাদেশে জাতিসংঘের কান্ট্রি টিমের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের শেষে তিনি ভবন পরিদর্শন করেন। গুতেরাঁ এবং শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিষয়ক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান যৌথভাবে গুলশানে ‘ইউএন হাউস ইন বাংলাদেশ’ উদ্বোধন করেন। এ সময় সেখানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গুয়েন লুইস। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা ও সংস্কার প্রচেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানাই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ। বাংলাদেশের এ সংকটময় পরিস্থিতিতে পাশে থাকবে জাতিসংঘ। বাংলাদেশ যে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেজন্য বাংলাদেশের জনগণের উদারতার প্রশংসা করি। ঢাকার জাতিসংঘের কর্মীদের উদ্দেশ্যে গুতেরাঁ বলেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই। বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণকে সহযোগিতা করাই আমাদের এজেন্ডা।

mzamin
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপি নেতারা (বামে), জাতিসংঘ মহাসচিবের বিফ্রিং

পুতিনকে স্টারমার- গেম খেলবেন না

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন- ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে গেম খেলবেন না। অন্যদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের ওপর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। এ আলোচনাকে চমৎকার এবং ফলপ্রসূ বলে আখ্যায়িত করেছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার রাতে  মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ। এরপরই ওই মন্তব্য করা হয়। ক্রেমলিন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে তারাও সেটা চায়। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে বলেছেন, এই আলোচনা এই ভয়াবহ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর একটি ভালো সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে যুদ্ধকে প্রলম্বিত করার জন্য আলোচনা টেনে আনার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে সতর্ক করেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। তিনি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে গেম খেলতে দেয়া হবে না পুতিনকে।

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে রাজি হয় ইউক্রেন। কিন্তু রাশিয়া তাতে সম্মতি দেয়নি। বৃহস্পতিবার পুতিন বলেছেন, যুদ্ধবিরতির ধারণা ঠিক আছে এবং আমরা এটা সমর্থন করি। কিন্তু এতে বাজে কিছু বিষয় আছে। এরপরই তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় বেশ কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেন। জেলেনস্কি এর আগে পুতিনের বিরুদ্ধে চুক্তি নিয়ে জালিয়াতি করার অভিযোগ করেছিলেন। তার জবাবে এমন অবস্থান নেন পুতিন। ফলে এক্সে শুক্রবার ধারাবাহিকভাবে পুতিনের সমালোচনা করে পোস্ট দিতে থাকেন। একটিতে লিখেছেন, পুতিন এই যুদ্ধ থেকে কখনো বেরিয়ে যেতে পারবে না। কারণ, এটা ত্যাগ করলে তিনি শূন্যহাত হয়ে যাবেন। এজন্যই তিনি কূটনীতিতে স্যাবোটাজ করার যেকোনো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ জন্য চরম কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরুর আগেই তিনি অগ্রহণযোগ্য শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এজন্যই পুতিন সবাইকে একটি অমীমাংসিত ও প্রলম্বিত আলোচনায় টেনে নেয়ার চেষ্টা  করছেন। তিনি দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ও মাসের পর মাস অর্থহীন আলোচনা টেনে নিতে চাইছেন। আর এই ফাঁকে মানুষ হত্যা করবেন। পুতিন যেসব শর্ত দিয়েছেন তার সবটাই যেকোনো কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টির উদ্যোগ। রাশিয়া এভাবেই কাজ করে। আমরা এ সম্পর্কেই সতর্ক করি। পুতিনের সমালোচনা করেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারও।

তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রতি পুরোপুরি অসম্মান দেখাচ্ছে ক্রেমলিন। এর মধ্য দিয়ে দেখানো হচ্ছে যে, শান্তির বিষয়ে পুতিন খুব সিরিয়াস নন। রাশিয়া যদি শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে আসে, তাহলে আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে যে, একটি যুদ্ধবিরতি কতটা সিরিয়াস এবং কতটা টেকসই হয়। যদি তারা এতে রাজি না হয়, তাহলে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে রাশিয়াকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলতে হবে। ওদিকে  এ মাসের শুরুর দিকে লন্ডনে ইউক্রেনে শান্তি বিষয়ে একটি শান্তিরক্ষী মিশনের বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। তা নিয়ে আজ শনিবার কমপক্ষে ২৫ জন নেতার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার কথা কিয়ের স্টারমারের। একে তিনি নাম দিয়েছেন ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’। স্টারমার এতে আহ্বান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব যদি কার্যকর হয়, তবে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ আগ্রাসন দমন করতে হবে। ওদিকে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া পোস্টে জেলেনস্কি রাশিয়াকে প্রভাবিত করতে পারেন এমন যে কাউকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে, শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। কারণ, পুতিন তার নিজে থেকে কখনোই যুদ্ধ বন্ধ করবে না।

তিনি বলেন, পুতিন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত অবস্থা, হতাহতের বিষয়ে মিথ্যা বলছেন। তার দেশের সত্যিকার অর্থনীতি সম্পর্কে মিথ্যা বলছেন। কূটনীতিকে ব্যর্থ করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করছেন পুতিন।  কিন্তু আশাবাদী হোয়াইট হাউস। তারা বলেছে, উভয় পক্ষ শান্তির জন্য এত কাছাকাছি কখনোই আসেনি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, বৃহস্পতিবার মস্কোতে পুতিন এবং উইটকফের মধ্যকার আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুতিন ও রাশিয়ানদের সঠিক কাজটি করার জন্য অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুতিনকে ইউক্রেনের সেনাদের জীবন রক্ষা করার জন্য পুতিনের প্রতি দৃঢ় আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের ওইসব সেনাকে ঘিরে রেখেছে রাশিয়ার সেনারা। সেখানে এমন এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ঘটতে পারে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনো দেখা যায়নি। এর আগে বৃহস্পতিবার পুতিন বলেন, কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের সেনাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এরপরই ওই মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে শুক্রবার ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এমন ঘটনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, এ খবর মিথ্যা ও বানোয়াট।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, অপারেশন চলমান। ইউক্রেনের সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। সফলভাবে তাদেরকে পুনর্গঠিত করে প্রতিরোধ অবস্থানে পাঠানো হয়েছে। ফলে তাদেরকে  ঘিরে রাখার কোনো ঘটনা নেই। তবে আন্তর্জাতিক আইন এবং রাশিয়া ফেডারেশনের আইনের অধীনে আটক সেনাদের সম্মানের সঙ্গে তাদের সঙ্গে আচরণ করতে পুতিনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন ট্রাম্প। বলেছেন, যদি তারা অস্ত্র সমর্পণ করেন এবং আত্মসমর্পণ করেন তাহলে তাদেরকে সুরক্ষা দিতে হবে। অন্যদিকে কানাডার কুইবেকে বৈঠক করছিলেন জি৭ নেতারা। সেখানে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানি জোলি বলেন, ইউক্রেনিয়ানদের প্রতি সমর্থন আছে এমন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত তাদের সব সদস্য। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, শর্তহীন একটি যুদ্ধবিরতির আহ্বানে সকল সদস্য ঐকবদ্ধ।

যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই যুদ্ধ

যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে যখন জোর আলোচনা চলছে, তখন তার চেয়েও বেশি জোরে যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি রাশিয়া ও ইউক্রেনের সেনারা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নিজের শহর ক্রিভয়ি রিহ’তে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। তাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে দুই দেশের সেনারা যখন মুখোমুখি লড়াই করছেন, তখন ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলের আরও দু’টি বসতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার দাবি করছে রাশিয়ার সেনারা। সেখানে ইউক্রেনের সেনাদেরকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি তা না হয় তাহলে ইউক্রেনের সেনাদের হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, উভয়পক্ষের মধ্যে আকাশপথে তীব্র লড়াই চলছিল। উভয়পক্ষ একে-অন্যের ওপর কমপক্ষে ১০০ ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। এমন অবস্থায় ইউরোপিয়ান নেতাদের সঙ্গে শনিবার এক বৈঠকে বসার কথা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। ইউক্রেনে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্য দিয়ে দেশটিকে রক্ষার জন্য একটি জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা করার কথা। তার অভিযোগ শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মোটেও সিরিয়াস নন পুতিন। ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা বলেছে, রাশিয়ার বিমান হামলায় দনিপ্রোপেট্রোভস্ক এবং ওডেসা অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিষয়ক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনলাইন আল-জাজিরা বলেছে, শুক্রবার ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় শহরে একটি আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কমপক্ষে তিন বছর ধরে চালানো আগ্রাসনের সময়ে নিয়মিতভাবে এই অঞ্চলকে টার্গেট করছে রাশিয়া। টেলিগ্রামে দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের প্রধান সের্গেই লাইসাক বলেছেন, শুক্রবারের হামলায় ১৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দু’টি শিশু আছে। তাদের একজনের বয়স দু’বছর। অন্যজন ১৫।  লাইসাক বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বিশাল এপার্টমেন্ট এলাকার এক ডজনের বেশি ভবন ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি বেসরকারি। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ বিষয়ক কোম্পানি ডিটিইকে বলেছে, শুক্রবার দিবাগত রাতে দনিপ্রো এবং ওডেসায় বিদ্যুৎ বিষয়ক তাদের স্থাপনায় বড় আকারে হামলা করেছে রাশিয়া। এতে বড় মাপের ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে উভয় অঞ্চলেই মারাত্মক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। কোম্পানি আরও বলেছে, তারা অধিবাসীদের বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়ার জন্য কঠোর কাজ করছে। সামরিক অস্ত্র উৎপাদন এবং দেশটির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করার জন্য তিন বছরের যুদ্ধের সময় ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার টার্গেট নিয়েছে মস্কো। 

এ অবস্থায় পুতিনের ওপর আরও চাপ বাড়াতে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। তিনি বলেছেন, সহসা বা পরে, কখনোই আলোচনার টেবিলে আসবেন না রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। তিনি আরও বলেন, যদি শান্তির বিষয়ে পুতিন সিরিয়াস হতেন তাহলে বিষয়টি খুবই সাধারণ হয়ে যেতো। তাকে ইউক্রেনে বর্বর হামলা বন্ধ করতে হবে এবং যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হতে হবে। স্টারমার আরও বলেন, তাকে সামনে আরও চাপে রাখতে হবে আমাদের। শান্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। স্টারমারের শনিবারের বৈঠকটি ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে হয়। এতে ইউরোপিয়ান অংশীদার ও ইউক্রেনের নেতারা সহ ২৫টি দেশের যুক্ত হওয়ার কথা। এর মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নির্বাহীরা। 

mzamin

দুতের্তে’র গ্রেপ্তারের বৈশ্বিক গুরুত্ব

১১ই মার্চ আটক করা হয় ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে’কে। রাজধানী ম্যানিলাতে তাকে যখন বিমান থেকে নামানো হয় তখন শত শত সমর্থক বিমান ঘাঁটির বাইরে আন্দোলন করেন। ওই সমর্থকরা অভিযোগ করেন দুতের্তে যথাযথ প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দুতের্তের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থাকাকালীন হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বলছে, ওই সংখ্যা ১০ হাজারের মতো। ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে দুতের্তে  বলেন, তিনি এত মানুষকে হত্যা করবেন যে, ম্যানিলা উপসাগরে থাকা মাছগুলো তা খেয়ে মোটা হয়ে যাবে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সিনেট কমিটির সামনে স্বীকার করেন যে, তিনি ওই হত্যার আদেশ দিয়েছেন। এর জন্য অবশ্য তিনি ক্ষমা চাননি। দুতের্তে দাবি করেন, তার সৈন্যরা শুধু মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এদিকে এখনো যথাযথ বিচার হয়নি ওই হত্যার। সন্দেহের বশে অবশ্য অনেককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে আটক করে ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা। দুতের্তের আইনজীবীরা জানান, ১১ই মার্চ তাকে জোর করে নেদারল্যান্ডের উদ্দেশে যাওয়া একটি ফ্লাইটে উঠানো হয়। এদিকে দুতের্তের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচারের শক্তি ও দুর্বলতার দিকের ওপর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। একজন নেতার আদেশে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হয়তোবা তাকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে।

দুতের্তের শাস্তির দৃষ্টান্ত থেকে অনেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কাজ করার আগে দু’বার ভাববেন। অন্যদিকে ফিলিপাইনের রাজনৈতিক হাওয়া বদলের কারণেই এই মামলায় অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফিলিপাইনের রাজনৈতিক আবহ দুতের্তে’র অনুকূলে থাকলে হয়তবা এই বিচার হতো না। ২০২২ সালে ক্ষমতার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তার স্থলাভিষিক্ত হন সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসের ছেলে মার্কোস জুনিয়র। দুতের্তের কন্যা সারা দুতের্তে ও মার্কোস জুনিয়র পৃথকভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রাজনীতির দুই উত্তরাধিকার মার্কোস ও সারা জুটি যে জোট গঠন করেছিলেন তা দুতের্তেকে কিছুদিন স্বস্তিতে রাখে। কারণ দুতের্তের বিষয়ে আইসিসিকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান প্রেসিডেন্ট মার্কোস। কিন্তু এরপর দুই পরিবারের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। মার্কোসের পররাষ্ট্র নীতি  অনেকের কাছে এক প্রকার চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তার পররাষ্ট্রনীতি দুতের্তের নীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুতের্তে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রেখে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন। এর বিপরীত ঘটে মার্কোসের ক্ষেত্রে। দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের জাহাজকে হুমকি দেয় চীন। এর প্রতিবাদ করেন মার্কোস। ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন সারা দুতের্তে। এদিকে প্রসঙ্গ যখন আসে আইসিসির উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলার তখন এটি বলা যায় যে, আইসিসি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে চলে। এটি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ইত্যাদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করে। তবে রাজনীতির কারণে তা জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বাধাগ্রস্ত হয়।

যেসব দেশ আইসিসির সদস্য নয় সেসব দেশের ওপর এর বিচার করার কোনো এখতিয়ার নেই। দুতের্তে ২০২২ সালে আইসিসি থেকে তার দেশকে প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে তিনি বলতে পারেন, মাদকের বিরুদ্ধে যে অপরাধ হয়েছে তা এর পরের ঘটনা। এর বিচার করার এখতিয়ার আইসিসির নেই। কিন্তু এরই মধ্যে আইসিসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ফিলিপাইনকে তিনি আইসিসি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার আগেও একই অপরাধ করেছেন। সেসব অপরাধের বিচার করবে আইসিসি। আইসিসি শিনজিয়ান প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনের নির্যাতনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার মাঝামাঝি আদালতের ওপর ভিত্তি করে আইসিসির চুক্তি থেকে সরে এসেছেন দুতের্তে। এ কারণে তার করা কোনো অপরাধের বিচার করতে পারবে না আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। উল্লেখ্য, আইসিসির বল প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা নেই। অপরাধী যে দেশে আছে সেই দেশের সহযোগিতা ছাড়া ওই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে না আন্তর্জাতিক ওই অপরাধ আদালত।

এখন পর্যন্ত আফ্রিকানদের বিরুদ্ধে আইসিসির করা মামলাগুলো বেশি সফল হয়েছে। এটি যদিও বিশ্বের অন্য প্রান্তে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে তা করা এতটাও সহজ নয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ওই আদালতে হারপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হুমকি দেন তার এক সমর্থক। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আইসিসির প্রতি বেশি বিদ্বেষী হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি কখনো আইসিসিতে স্বাক্ষর করেনি বা এর সদস্য হয়নি। আইসিসির সঙ্গে বিদ্বেষের বিষয়ে ট্রাম্প অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টদের ছাড়িয়ে গেছেন। ৬ই ফেব্রুয়ারি আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন- করিম খান অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র ইসরাইলকে টার্গেট করছেন। উল্লেখ্য, ইসরাইলি হত্যার দায়ে হামাসের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান করিম খান। এছাড়া গাজায় অপরাধের জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টকে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান। 

mzamin

প্রতারণার নয়া ফাঁদ by শুভ্র দেব ও পিয়াস সরকার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রাহি। থাকেন রাজশাহীতে। তার বাবা থাকেন কুড়িগ্রামে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্ত। হঠাৎ একটা ফোনকল আসে রাহির বাবার কাছে। রাহির বড় ভাই আহসান হাবিব রাভি বলেন, আব্বু চিৎকার করে উঠলো- তোমার কাছে মাদক মানে! আব্বুর কাছে গেলাম। আব্বু ফোনে কথা বলছে। ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হচ্ছে, রাহিকে ছাড়াতে হলে ২২ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে এখনই। রাভি বলেন, আমি ফোনটা নিলাম। অপরপ্রান্তে পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ওয়াকিটকির শব্দ আর ব্যস্ত পুলিশ স্টেশনের আবহ। রাহি কাঁদছে। একদম রাহির কণ্ঠ। মনে হলো- অনেক মার খেয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে- পুলিশ ধরেছে। মাদক পেয়েছে। আমাকে ছাড়াও। শব্দ শুনে মনে হলো, ফোনটা কেড়ে নিলো। এখন কয়েকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াকিটকির শব্দ আসছে। একজন বলছে, কোন ধারায় মামলা দেবো? আলোচনা চলছে। মাদকের কঠিন মামলা হবে। হঠাৎ একজন ফোনটা নিলেন। ভরাট গলা। বললো- আমি এসআই শফিক। ডিবি থেকে রাহিকে ধরেছি। ওর সঙ্গের দু’জনের শরীর থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। ওর কাছে পাওয়া যায়নি। মামলা হবে। রাহি হবে ৩ নম্বর আসামি। আমি বললাম, কোন থানায় আছে এখন? এবার ও পাশ থেকে সাড়া নেই। তারা আলোচনা করছেন। ৭২ ধারায় মামলা দেন। এসপি স্যারের রুমে যান। স্যারকে জানান। আবার ওয়াকিটকির শব্দ। খানিক বাদে আর একজন ফোন নিলেন। সে জানালো রাহি এখন রাজশাহী ডিবিতে আছে। মামলা হচ্ছে। কোর্টে তোলা হবে।

রাহির বড় ভাই বলেন, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা কেটে গেল। আমরা নির্বাক। আব্বু চিন্তাগ্রস্ত। আমার স্ত্রী জানতে চাইলে বলি, রাহির কাছে মাদক পাওয়া যায়নি তবে ছাড়াতে হলে টাকা দিতে হবে। বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে। আমার স্ত্রী বলে, পুলিশকে চার্জ দিতে হবে মানে? চার্জ নাকি ঘুষ চায়। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা চেনা পরিচিতদের ফোন করা শুরু করি। এরপর কোনো উপায়ান্তর পাই না। আমার স্ত্রী বললো, রাহিকে ফোন দাও। আমি আর আব্বু বললাম, রাহির সঙ্গের দুজনেরই কথা হয়েছে এসআই এর ফোন থেকে। তবুও আরেকবার ফোন দিলাম। রাহির একটা নম্বর ব্যস্ত পাওয়া গেল। এবার আব্বুর ফোনে রাহির ফোন এসেছে। আমরা সবাই আরও তটস্ত হলাম। কিছু হলো নাকি। আব্বু কথা বলছে। বুঝলাম রাহি। নিরাপদেই আছে। আব্বুর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ফোন নিলাম। ও নিশ্চিত করলো ও রুমে আছে। ‘এসআই শফিকে’র নম্বরে ফোন দিলাম। নম্বর বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। এসআই পরিচয় দেয়া শফিকের নম্বর বন্ধ। রাহির কাছে ফোন এসেছিল ০১৪০২৫০৩৪০৮ নম্বর থেকে।

একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সুলতানা মাহির সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায়। তারা দু’জনই চাকরিজীবী। ছুটির দিন শুক্রবার তার স্বামী সজীব বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের জন্য ধানমণ্ডি যায়। মাহিও যায় ইফতারে ভার্সিটির এলামনাইদের একটি ফোরাম ইফতারে, লালমাটিয়ায়। একসঙ্গেই মোটারসাইকেলে আসে তারা। লালমাটিয়ায় মাহিকে নামিয়ে দিয়ে সজীব যায় ধানমণ্ডিতে। ইফতারের ঠিক আগ মূহূর্তে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। মাহিকে বলা হয়, সজীব একটি বাচ্চাকে মোটরসাইকেল দিয়ে হিট করেছে। বাচ্চার অবস্থা অশঙ্কাজনক। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন বাঁচাতে চাইলে জরুরি ২০ হাজার টাকা পাঠালে ছেড়ে দেবে। এরপর সজীবের সঙ্গে কথা বলায় দেয়। সজীব জানায় বিকাশে যা আছে আপাতত দিয়ে দাও। আর টাকার ব্যবস্থা করো। ওয়াকিটকির একটি শব্দ ধীর থেকে প্রবল হলো। কেটো গেল ফোন। মাহি বলেন, আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কিছু না ভেবেই বিকাশে টাকা রিচার্জ করতে যাচ্ছিলাম। তখন বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বন্ধু সজীবকে ফোন দিতে বলে। ইফতারের আগে ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরছিল না। আমি তার এক বন্ধুকে ফোন দেই জানতে পারি যা ফোনে বলা হয়েছিল সব ভুয়া। তিনি বলেন, আমার কাছে যা টাকা ছিল আমি সব দেবার জন্যই দোকানে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছে যে, বিশ্বাস করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, সজীবের সঙ্গে প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হলো আমার। তাকেও ০১৪০২৫০৩৪০৮ এই নম্বর থেকেই ফোন দেয়া হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন রোবোকল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ০১৮৯৮৯১৬২০৩ নম্বরসহ আরও কয়েকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। যারা কল দিয়ে কথা বলেন না তারা চান যাকে কল দেয়া হয়েছে তিনি কথা বলেন। কথা বললেই সেটি রেকর্ড করে রাখবেন। পরে প্রযুক্তির কেরামতিতে কণ্ঠটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন ধরনের পোস্ট থেকে জানা যায় অনেককেই ফোন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। আবার কয়েকজনকে একই নম্বর থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। একেক পরিবারের একেক ধরনের সমস্যার কথা বলা হয়। যারা এই কাজ করছেন তারা বিষয়টি এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন বিশ্বাস না করার উপায় থাকে না। কাউকে বলা হয়েছে চাকরির কথা, রং নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট, অগ্রীম ঈদের শুভেচ্ছ, বিপণিবিতানের অফার এসব উল্লেখযোগ্য।

সাইবার সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, এটি প্রতারণার নতুন এক কৌশল। আগে বিভিন্ন মানুষকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তার কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা হয়। প্রতারকরা ফোন দিয়ে অনেক সময় কথা বলে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে কথা বলে। মূল উদ্দেশ্য হলো কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা। পরে সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে বিভিন্ন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কথা বলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের স্বজনের বিপদের কথা তার নিজের মুখে শুনে অনেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আবার অনেকেই টাকা পাঠানোর আগে একটু কৌশলী হয়ে সত্যতা জানতে পারেন। টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা মোবাইল বন্ধ করে রাখে।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মূলত এআই ব্যবহার করে এসব কাজ করছে কিছু চক্র। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ছড়িয়ে দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে প্রতারণা করাই তাদের কাজ। এটি প্রতারকদের নতুন কৌশল। তবে যাদের কাছেই ফোন যাবে তারা সতর্ক থাকবে। যার কথা বলে ফোন দেয়া হবে তার নিজের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু কোনো ভুক্তভোগী  থানায় মামলা বা জিডি করছেন না। যদি থানায় অভিযোগ আসে তবে আমরা অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। তবে আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছি। মানুষকে সচেতন হতে হবে। না বুঝে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। প্রয়োজনে অবশ্যই পুলিশের সাহায্য নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। একেক সময় একেক ধরনের ফাঁদ পাতে তারা। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। মানুষকে সচেতনতার জন্য বলছি।

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রবিহীন এশিয়ার নিরাপত্তা কতোটা বিপজ্জনক হবে?

২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় রাশিয়া। এরপর জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী কিশিদা ফুমিও বার বার একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজকের ইউক্রেন হবে আগামী দিনের পূর্ব-এশিয়া’। তিনি হয় তো বুঝাতে চেয়েছেন দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে দখল করতে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে চীন। কিন্তু ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ইউক্রেনের দিকে ঘুরে গেছেন, তখন এই বাক্যটি অন্যভাবে দেখা যেতে পারে। তা হলো যদি যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় তার বন্ধু ও মিত্রদের ত্যাগ করে তাতে কী রকম ঝুঁকি সৃষ্টি হবে? এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইকোনমিস্ট।  ইউরোপিয়ানরা এরই মধ্যে সবাই এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাৎপদসরণের ঝুঁকি আরও বেশি মনে হচ্ছে। চীনকে যদি যুক্তরাষ্ট্র একটি হুমকি হিসেবে দেখে, তাহলে এশিয়ার অংশীদারদের বিচ্ছিন্ন করার সামর্থ্য তার থাকবে না। এ মাসের শুরুর দিকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক ত্যাগ করবে না যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি বৈদেশিক যে সহায়তা বাতিল করে সেক্ষেত্রে তাইওয়ান এবং ফিলিপাইন ছিল আলাদা। অর্থাৎ তাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সহায়তা বাতিল করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত সাসাই কেনিচিরো বলেন, ইউরোপের চেয়ে এখানে পরিস্থিতি জটিল। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বড় রকমের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে চীন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি জোটের কাঠামো ভেঙে ফেলতে চান তাহলে তার জন্য প্রয়োজন হবে কংগ্রেসের অনুমোদন। কিন্তু সেটা আদায় করা কঠিন হতে পারে। এশিয়ার বন্ধু দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন ঘাঁটি আছে। তাতে অবস্থান করছে প্রায় ৯০ হাজার সেনা। ইউরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প অপ্রচলিত কূটনীতি অবলম্বন করেছেন। তা সত্ত্বেও, এশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপদস্ত করার দু’দিন পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বহনকারী একটি ক্যারিয়ার দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরে পূর্বনির্ধারিত উপস্থিতি জানান দেয়।

তা সত্ত্বেও ট্রাম্পিয়ান আমেরিকার সঙ্গে এশিয়ার একটি নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হচ্ছে। জেলেনস্কি এবং ট্রাম্পের মধ্যে যে অবস্থা দেখা গেছে ওভাল অফিসে তাতে দেখা যায় যে, দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো সময় আপস হতে পারে। এমনটা মনে করেন দক্ষিণ কোারিয়ার রক্ষণশীল ক্ষমতাসীন দলের একজন এমপি আহন চিওল-সু। অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে উদগ্রিব ট্রাম্প। এর ফলে এই ধারণা আসতে পারে যে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অথবা উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে একই রকম সমঝোতায় আসতে পারেন ট্রাম্প। তার এই যে লেনাদেনা এ থেকে এশিয়ার মিত্ররাও রেহাই পাবেন বলে মনে হয় না। এ মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার শুল্ক বাধার বিরুদ্ধে র‌্যালিতে অংশ নেন তিনি। অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের জোট অন্যায্য। ইউনিভার্সিটি অব টোকিও’র ফুজিওয়ারা কিচি বলেন, শুধু ইউরোপিয়ান দেশগুলোই নয়। জাপানও একটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হবে, যখন তারা দেখবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর নির্ভর করা যাচ্ছে না।

এক্ষেত্রে এশিয়ার মিত্ররা কী করতে পারেন? একটি জবাব হতে পারে ডনাল্ড ট্রাম্পের সুদৃষ্টিতে থাকা। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগ করার মধ্য দিয়ে সমঝোতা হতে পারে। ট্রাম্প চাইছেন আলাস্কা থেকে বড় আকারের নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস  নেয়া শুরু করুক জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। জাহাজ তৈরি থেকে অর্ধপরিবাহীর কারখানা হিসেবে এশিয়ার মিত্রদের বেশ কিছু সুবিধা আছে। তারাও বৈচিত্র্যকরণের ঝুঁকি শুরু করতে পারে।

কিন্তু ইউরোপের চেয়ে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কঠিন হবে। টোকিওর গাকুশুইন ইউনিভার্সিটির হিকোতানি তাকাকো বলেন, আমরা যদি নিজেরা আরও অনেক কিছু করি, তার মানে এই নয় যে, আমরা নিজেরা ঠিক থাকবো। যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ রাখলে ন্যাটোর বাকি মিত্রদের প্রতিরক্ষা খরচ হবে রাশিয়ার তিনগুণ। অন্যদিকে এশিয়ায় (অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় চীনের প্রায় অর্ধেক।

mzamin

মুরাদনগরে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন মোহাম্মদ আলী

আওয়ামী লীগের ১৫ বছর সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, সংখ্যালঘুসহ অসহায় পরিবারের জমি দখল, স্কুল-মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ, হত্যা, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন গডফাদার মোহাম্মদ আলী।

আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় পদ না থাকলেও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের শেল্টারে এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরতেন। অসংখ্য মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি-নির্যাতন করেছেন। এলাকায় গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী। ১৫ বছর তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে না পারলেও এখন বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন এলাকাবাসী। সাবেক সংসদ সদস্য ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত উপজেলা ২নং আকাবপুর ইউনিয়নের গ্রামের মোহাম্মদ আলী। তিনি পেশায় একজন বিতর্কিত কেমিক্যাল ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ঝর্ণাপাড়া এলাকায় ব্যবসা করতেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজ এলাকা মুরাদনগরের বাঙ্গরায় আস্তানা গাড়েন। নানা অপকর্ম করে একপর্যায়ে ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠজন হয়ে ওঠেন। উত্তর মুরাদনগরে গড়ে তোলেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী। এতে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয় গোটা উত্তর মুরাদনগর। ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলী তথা তার ক্যাডার বাহিনী। তার অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে এলাকার অনেক ভুক্তভোগী কান্নায় বুক ভাসান। কেউ কেউ আল্লাহ্‌র দরবারে বিচার চান। এমপি’র ক্ষমতাবলে আকাবপুর ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং আকাবপুর ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া দাখিল মাদ্রাসার সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন।

মুখ খুললেই মামলা দিয়ে হয়রানি:
মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা ছিল তার প্রধান হাতিয়ার। তার অপকর্ম নিয়ে কেউ মুখ খুললেই দেয়া হতো মিথ্যা মামলা। এলাকার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় ২২টি মামলা দিয়েছেন তিনি। পুলিশ জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, ভূমিদখল, চেক জালিয়াতিসহ বহু মামলার আসামি মোহাম্মদ আলী। সমপ্রতি তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নির্যাতন-জমিদখল ছিল নেশা: উপজেলার আকাবপুর এলাকার বাসিন্দা সুধীর চন্দ্র বণিক বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি, জোর করে জমিদখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা-নির্যাতন করা ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। সে জোরপূর্বক আমার ৬ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে। আমাকে ও আমার পরিবারকে অনেক নির্যাতন করেছে।

একই এলাকার দেবু মালাকার বলেন, আমি স্বপন মালাকারের কাছে ৩৯ শতাংশ জায়গা বিক্রি করেছি। কিন্তু আমার স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে মোহাম্মদ আলী ওই জায়গা দখল করে নিয়েছে। ক্ষমতার বলে তার নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছে। পাঁচ বছর ধরে জায়গাটি তার দখলে আছে। তার অত্যাচারে ১৫ বছর আমাদের এলাকার সংখ্যালঘুরা ছিল অতিষ্ঠ।

একই এলাকার প্রদীপ কুমার সূত্রধর বলেন, মোহাম্মদ আলী তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমার বাড়ি দখল করেছে। আমার স্ত্রী-মাসহ পরিবারের সবাইকে একাধিকবার মারধর-নির্যাতন করে আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে।

ত্রাসের রাজত্ব কায়েম:
এলাকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, মোহাম্মদ আলী সাবেক এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠজন ছিল। ওই এমপি’র ছত্রছায়ায় সে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল। আমাকে এবং আমার ভাইকে মামলা দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে। এলাকার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ও মাসুদুল ইসলাম বলেন, মামলার ভয় দেখিয়ে আমাদের দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে। শুধু আমরা নই, এলাকার অসংখ্য মানুষ জিম্মি হয়ে তাকে চাঁদা দিয়েছে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। আমাদের বাজারের ৫ শতাংশ জায়গা এবং ৪টি দোকান দখল করে নিয়েছে। আমার মা, বোন এবং স্ত্রীকে মারধর করেছে। ১৫ বছর ধরে আমাদের এসব সম্পদ এই সন্ত্রাসী দখল করে রেখেছে। চাঁদা নেয়ার পরও ১০টি মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করেছে। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি মাহফুজুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসী মোহাম্মদ আলী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একাধিক ছাত্র হত্যায় জড়িত। একটি মামলায় বর্তমানে সে দুইদিনের রিমান্ডে আছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আরও কোন কোন ঘটনায় জড়িত রয়েছে সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে বাঙ্গরা বাজার থানাসহ বিভিন্ন থানায় ৮-৯টি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে এলাকায় বহু অপকর্মের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা মামলা কিংবা অভিযোগ দিলে তার প্রতিটি অপরাধ খতিয়ে দেখা হবে এবং যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

mzamin

বিচারহীনতার বৃত্তে ঘুরছে নিষ্ঠুরতার গল্প by মরিয়ম মীম

মাগুরার সেই শিশুটির মুখটা কি ভুলতে পারছেন? না, পারছেন না। পারছেন না কারণ এই নিষ্পাপ শিশুটিকে যে পাশবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, তা কোনো সুস্থ মানুষের কল্পনারও বাইরে। এই নির্মমতার পরিণতি- অকাল মৃত্যু।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মৃত্যু কি শুধুই ওই নিষ্ঠুর নরপশুদের হাতে হয়েছে? নাকি পুরো সমাজের নীরবতা, বিচার ব্যবস্থার ঢিলেমি, রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই এই মৃত্যু আরও নিশ্চিত করেছে?
প্রতিবারই আমরা চমকে উঠি, কয়েকদিন আলোচনা করি, তারপর ভুলে যাই। ঠিক যেমন ভুলে গেছি তনু হত্যা (২০১৬- কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এখনো এই মামলার বিচার হয়নি)। নুসরাত জাহান রাফি হত্যা (২০১৯- ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়)। তেমনই একদিন ভুলে যাবো এই শিশুর কথাও। কিন্তু এর মাঝেই আমাদের আশপাশের কোনো এক বাড়িতে হয়তো আরেকটি আছিয়া জন্ম নিচ্ছে, যে হয়তো তার পরিবারেরই কোনো সদস্যের হাতে প্রথম হেনস্তার শিকার হবে।

নারী নির্যাতনের শিকার হওয়া মানেই কি ভুল তার?
যখন কোনো নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তখন সমাজের একটা বড় অংশ প্রথমেই প্রশ্ন তোলে- সে গায়ে কী পরেছিল? সে রাতে কেন বের হয়েছিল? তার চরিত্র কেমন ছিল?
কিন্তু এই শিশু? সে তো সেই রাতে ঘর থেকে বাহিরেও যায়নি, সে তো কোনো “ভুল” করেনি, তাহলে কেন তাকে এমন নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় লুকিয়ে আছে। নারী এবং শিশুকে কখনোই এই সমাজ কোনোদিন স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখায়নি। তাই তার ওপর অত্যাচার হলেও দোষ তাকেই দিতে শিখেছি আমরা।

সংখ্যা যে ভয়ানক বাস্তবতা দেখায়
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের ৭০% নারী তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু এই ঘটনার কয়টি আমাদের সামনে আসে?
সমীক্ষা বলছে, মাত্র ৫% নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আনতে পারেন। বাকিরা চুপ করে থাকেন। কেন? কারণ সমাজ নির্যাতিতাকেই দোষী বানায়, কারণ বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা তাদের আরও ভীত করে তোলে, কারণ রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের আরও নির্লজ্জ করে তোলে।
কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সংখ্যা শুধু বাড়তেই থাকবে।

পারিবারিক শিক্ষা- যেখানে প্রথম হেনস্তার শুরু হয়
আমরা প্রায়ই বলি, “নারীদের বাইরে যেতে সাবধান হতে হবে”, “বাচ্চাদের অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে।” কিন্তু আমরা কি জানি, বেশির ভাগ নির্যাতনের ঘটনা পরিবারের মধ্যেই ঘটে?
আমাদের পরিবারগুলোতে শিশুদের কণ্ঠরোধ করাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। “বড়দের কথা মানতে হয়”, “এটা বাড়ির ব্যাপার”, “এ নিয়ে কথা বললে সম্মান যাবে”- এসব মানসিকতা শিশুদের কণ্ঠরোধ করে।
তাই, শিশুদের নিরাপত্তার জন্য পরিবারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি- সমস্যার গভীরে লুকিয়ে থাকা পুরুষতন্ত্র
আমাদের সমাজে এখনো “নারী মানেই দুর্বল”, “নারীর কাজ সংসার সামলানো”, “নারী বেশি কথা বললে সমস্যা বাড়ে”-এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা বয়ে বেড়ানো হয়।

এর ফলাফল?

নারীর প্রতি সহিংসতাকে গা সওয়া মনে করা হয়।
শিশুর প্রতি নির্যাতনকে পারিবারিক বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ধর্ষক বা নির্যাতকের বিচার চাইতে গেলে সমাজের লোকরাই উল্টো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে।
যদি এই মানসিকতা না বদলায়, তাহলে আইন যতই কঠোর হোক, নারীরা নিরাপদ থাকবেন না।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা-বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও অপরাধীর ক্ষমতা
দেশে ধর্ষণের মামলাগুলোর কতো শতাংশ শেষ পর্যন্ত দোষীদের সাজা দিতে পারে জানেন? মাত্র ৩-৪%।
বাকি ৯৬% মামলাগুলো হয় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, নয়তো প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে উঠে যায়। ফলে অপরাধীরা জানে, তারা যা খুশি করতে পারবে- তাদের কিছুই হবে না।
বিচার ব্যবস্থা ধীরগতির হওয়ায় নির্যাতিতার পরিবার একসময় হাল ছেড়ে দেয়। কারণ বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তাই, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ধর্ষণের মামলার রায় সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে দিতে হবে। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বাধাহীন কথা বলার অধিকার দরকার
* যতক্ষণ পর্যন্ত নারীরা ও শিশুরা তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ঘটনা বলতে ভয় পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে।
* পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র- সব জায়গায় তাদের কথা বলার অধিকার দিতে হবে।
* রাষ্ট্রকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
* নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতাকে দমনের জন্য একটি বিশেষ আইন প্রয়োগকারী বাহিনী গঠন করতে হবে।

অতীতের ভয়াবহ কিছু ঘটনা- যেগুলো আমরা ভুলে গেছি
১. তনু হত্যা (২০১৬): কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এখনো এই মামলার বিচার হয়নি।
২. নুসরাত জাহান রাফি (২০১৯): ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
৩. রিশা হত্যা (২০১৬): স্কুলছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়, কারণ সে উত্ত্যক্তকারীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
৪. মেধাবী ছাত্রী আফসানা কবীর শুভ্রা (২০০১): ঢাকার নটরডেম কলেজের ছাত্রী শুভ্রাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
৫. ফাতেমা তুজ জিনিয়া (২০১৪): রাজধানীতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিনিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
৬. গারো তরুণী ধর্ষণ (২০১৫): ঢাকার মহাখালীতে বাস থেকে নামার পর এক গারো তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়, যা তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
৭. সাভার গণধর্ষণ (২০১৩): পোশাক শ্রমিক এক নারীকে সাভারের আশুলিয়ায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
৮. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণ (২০২০): এক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের কাছেই তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়, যা দেশ জুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
৯. সিলেট এমসি কলেজ গণধর্ষণ (২০২০): কলেজ হোস্টেলে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়।
১০. গণধর্ষণের শিকার এক তরুণী, নোয়াখালী (২০২০):  কোম্পানীগঞ্জে এক নারীকে বর্বরভাবে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়, যা দেশ জুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দেয়।
এ ছাড়া আরও বহু ঘটনা আছে, যা বিচারহীনতার কারণে বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই ঘটনাগুলো শুধু নির্যাতিত নারীদের জীবনে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি তৈরি করেনি, বরং এ দেশের বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছে।
তনু হত্যা থেকে শুরু করে সিলেট এমসি কলেজ গণধর্ষণ আমরা ভুলে গেলেও, এই ঘটনাগুলোর যন্ত্রণা সেই পরিবারগুলোর জন্য এখনো প্রতিদিনের দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে।
প্রতিরোধের উপায়- আরও দেরি করার সময় নেই
১. পরিবারকে সচেতন হতে হবে: সন্তানদের শেখাতে হবে, “যদি কেউ তোমাকে অস্বস্তিকর কিছু বলে বা স্পর্শ করে, সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।”
২. স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে: যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হটলাইন ও মনিটরিং টিম থাকতে হবে।
৩. কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার: ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং দোষীদের দ্রুত সাজা দিতে হবে।
৪. সামাজিক সচেতনতা: নারীদের দোষী বানানোর মানসিকতা দূর করতে হবে।

মাগুরার শিশুটির মৃত্যু আমাদের কাঁদিয়েছে। কিন্তু আমরা কি এর বিচার নিশ্চিত করতে পারবো? নাকি আরও কিছুদিন পর নতুন কোনো ঘটনার জন্য আমাদের মনোযোগ সরে যাবে?
যদি আমরা এখনই ব্যবস্থা না নিই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এমন নির্মমতার শিকার হতে হবে।
তাই, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার- সবার একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার সময় এখনই। আরও দেরি করার সুযোগ নেই।
প্রতি বছর অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, কিন্তু আমরা কেবল ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে যাই।
২০২৪ সালে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের পর ভারত জেগে উঠেছিল। বাংলাদেশ কি সেই পথ নেবে?
আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে পারি, যেখানে মা-বাবা তাদের কন্যা সন্তানকে রাতে বের হতে দিতে ভয় পাবেন না? যেখানে কোনো শিশুর সঙ্গে পাশবিক আচরণ করার সাহস কেউ দেখাবে না?
এই পরিবর্তন এখনই আনতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে, রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে এবং পরিবারকে নৈতিক শিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তবেই হয়তো আগামী দিনে আর কোনো মাগুরার শিশুকে আমাদের হারাতে হবে না, আর কোনো আছিয়াকে নিজের পরিচিতজনের লালসার শিকার হতে হবে না।

মরিয়ম মীম, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী
mariummarium790@gmail.com

mzamin

দুই দেশের মাঝখানে বসবাসের অভিজ্ঞতা কেমন

হায়রো গিবানিৎসা সাসটাভসিতে থাকেন। এই এলাকার একাংশ সার্বিয়ার, আরেক অংশ বসনিয়া-হার্জেগোভিনার অংশ। সাসটাভসির একাংশকে বসনিয়ায় সার্বিয়ার ছিটমহল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আবার সার্বিয়ার অংশের ছিটমহলকে বসনিয়ার বলে বিবেচনা করা হয়।

হায়রো সাসটাভসি পৌরসভার বসনিয়া অংশের বাসিন্দা। সার্বিয়ার শহর প্রিবয়ের সঙ্গে যুক্ত এটি। বসতিটির প্রধান সড়ক দুই দেশের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে প্রিবয় পৌঁছাতে প্রতিবার হায়রোকে দুটি সীমান্তচৌকি পার হতে হয়৷

হায়রো বলেন, ‘এক সীমান্তে ১০ মিনিট, অন্যটিতেও ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। এভাবে দিনে ২০ মিনিট করে ৪০ মিনিট চলে যায় আমার। অথচ ওটা ২০ মিনিটের দূরত্ব।’

হায়রো মূলত অবসর জীবন যাপন করছেন৷ তবে এখনো মাঝেমধ্যে কারিগরের কাজ করেন। মাঝেমধ্যে তাঁকে দিনে তিনবার সীমান্ত পাড়ি দিতে হয়।

হায়রো গিবানিৎসা বলেন, ‘চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, ফার্মেসি থেকে ওষুধ আনতে হয়। স্ত্রীর পেনশনের জন্য পোস্ট অফিসে যেতে হয়। সব কাজই প্রিবয়ে, শুধু ঘুমাই এখানে।’

সাসটাভসির অন্য ৭০০ বাসিন্দার মতো হায়রোরও বসনিয়া এবং সার্বিয়ার নাগরিকত্ব রয়েছে। পৌরসভার মাঝখানে একটি রাস্তা রয়েছে, যার একদিক সার্বিয়ায়, অন্যদিক বসনিয়ায় শেষ হয়েছে।

সাসটাভসির মেয়র সৎয়েটো ভিলটিক একটি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে বলেন, ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যে সীমান্ত এই সেতুও। যুগোস্লাভিয়ার যুগে এটা একটা দেশ ছিল। ফলে এখনকার মতো সমস্যা ছিল না। এখন আমরা সার্বিয়ায়, কিন্তু আমাদের পেছনে সেতুর অন্য অংশ বসনিয়ায়।’

সীমান্তসমস্যা কীভাবে সাসটাভসির বাসিন্দাদের ভোগাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করেছেন ভিলটিক। এখানকার অধিকাংশ মানুষ পশুপালক এবং আশপাশের বাজারে তাঁরা পণ্য বিক্রি করেন। কিন্তু সীমান্তের কারণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক।

ভিলটিক বলেন, ‘আমরা চাইলেই যেকোনো কিছু প্রিবয়ের বাজারে নিতে পারি না। সবকিছুর জন্য অনুমতি নিতে হয়। যেমন আমি এক ব্যক্তিকে পনির প্রিবয়ে নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছি, যাতে তিনি তা সেখানে বিক্রি করতে পারেন। মানুষ এসবে বিরক্ত। আমরা আশা করি শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান হবে। আমরা কারা এবং কী করতে পারি, তা পুরোপুরি স্বচ্ছ হওয়া উচিত।

সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সৎয়েটো ভিলটিককে সার্বিয়াতেই বসবাস করতে হবে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বসনিয়ার ক্যাফেতে যেতে হবে। হায়রো গিবানিৎসারও প্রতিদিন সীমান্ত পার হতে হবে। অনেক বছর ধরে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন তাঁদের, তারপরও একদিন স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরির আকাঙ্ক্ষা তাঁদের শেষ হয়ে যায়নি।

সাসটাভসির একাংশকে বসনিয়ায় সার্বিয়ার এক্সক্লেভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অন্য অংশকে সেই এক্সক্লেভে বসনিয়ার এনক্লেভ বিবেচনা করা হয়
সাসটাভসির একাংশকে বসনিয়ায় সার্বিয়ার এক্সক্লেভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অন্য অংশকে সেই এক্সক্লেভে বসনিয়ার এনক্লেভ বিবেচনা করা হয়। ছবি: ডয়চে ভেলে

শপথগ্রহণে স্পষ্ট করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি: কানাডা কোনোদিন আমেরিকার অংশ হবে না

কানাডার নয়া প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে হুঙ্কার দিলেন মার্ক কার্নি। মসনদে বসে প্রথম দিনই সাফ জানিয়ে দিলেন, কানাডা কোনওদিন আমেরিকার অংশ হবে না। কানাডার ২৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেয়ার পরপরই ২০১৫ সাল থেকে অফিসে থাকা জাস্টিন ট্রুডোর স্থলাভিষিক্ত কার্নি বলেছেন যে, ট্রাম্পের শুল্কের মোকাবিলা করা তার কাছে শীর্ষ অগ্রাধিকার। সেইসঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, উভয় দেশের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তিনি ওয়াশিংটনের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে কখনও, কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হবে না কানাডা। কর্মকর্তারা বলেছেন যে, তারা আগামী দিনে ট্রাম্প এবং কার্নির মধ্যে একটি সংলাপ আয়োজনের চেষ্টা করছেন।

জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে অটোয়া আন্তঃসীমান্ত সম্পর্কের পতনের কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। দু দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে বাণিজ্য যুদ্ধ। কানাডাকে ৫১তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বাধীনতা আত্মসমর্পণের দাবি করেছেন। অটোয়া ট্রাম্পের শুল্কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কানাডিয়ান জনগণ ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন যখন ট্রাম্প কানাডাকে আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত করার জিগির তোলেন। কার্নি ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এবং কানাডিয়ান পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ককে  অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন।

ট্রুডোর স্থলাভিষিক্ত নেতা হিসেবে লিবারেল পার্টির ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর কার্নি প্রধানমন্ত্রী হন। তবে ৬০ বছর বয়সী এই সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, একজন রাজনৈতিক নবাগত যিনি কখনও কোনো পাবলিক অফিসে নির্বাচিত হননি। কার্নির প্রচারাভিযানের দক্ষতা শীঘ্রই পরীক্ষার মুখ পড়তে পারে। সরকারি সূত্র এএফপি-কে বলেছে যে, কানাডা শীঘ্রই একটি সাধারণ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্মোচনের সাথে সাথে বিদেশে কানাডার জোটকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কার্নি পরের সপ্তাহে প্যারিস এবং লন্ডনে রওনা দেবেন। ওই আলোচনায় বাণিজ্য ও নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ স্কোলজ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেয়েন- যিনি বলেছিলেন কানাডা-ইইউ সম্পর্ক এখন ‘আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’ কার্নিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কার্নিকে।

কার্নি ২০০৮-০৯ সালে আর্থিক সঙ্কটের সময় ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর হিসাবে কাজ করার আগে গোল্ডম্যান শ্যাক্সের একজন বিনিয়োগ ব্যাংকার ছিলেন। ব্রেক্সিট ভোটকে ঘিরে অশান্তির সময় ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘একসময় কানাডার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল আমেরিকা। কিন্তু এখন  আর কানাডা তাকে বিশ্বাস করতে পারে না।’

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

বাংলাদেশের মাধ্যমে টেলিফোন কল মনিটরিংয়ের প্রস্তাব ভারতীয় গোয়েন্দাদের, হাসিনা সবুজ সংকেত দিলেও কার্যসিদ্ধি হয়নি

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় বলপূর্বক গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার জন্য সমালোচিত হয়ে ওঠে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স বা ডিজিএফআই। গোপন কারাগার (আয়নাঘর নামে পরিচিত) পরিচালনায় তাদের ভূমিকা, ডিজিএফআই-এর খ্যাতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জনগণের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, বিশেষ করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসিনার শাসনের পতনের পর। জনসাধারণের ম্যান্ডেট ছাড়াই হাসিনা নিজের শাসনকে টিকিয়ে রাখতে তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে ডিজিএফআইকে দমন-পীড়নের একটি হাতিয়ারে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এমন উদাহরণও রয়েছে যেখানে ডিজিএফআই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে সম্মত হয়নি। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালের সমালোচিত মধ্যরাতের নির্বাচনের ঠিক আগে ও পরে।

যখন ডিজিএফআই দৃঢ়ভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের SS7 মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে লিংক করার জন্য ভারতের বহিরাগত গোয়েন্দা পরিষেবার (ইন্ডিয়ান এক্সটার্নাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস) একটি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। নির্বাচনের আগে ঢাকায় স্টেশন প্রধানের পক্ষ থেকে প্রথম এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানানো হয়। পরপর দুবার তৎকালীন সংস্থার প্রধান এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন।

সিগন্যালিং সিস্টেম নং ৭ (SS7) হলো ১৯৭০ এর দশকে তৈরি করা টেলিফোনি সিগন্যালিং প্রোটোকলের একটি সেট, যা বিশ্বের বেশিরভাগ পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (PSTN) মারফত টেলিফোন কল সেটআপ এবং বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই সিস্টেমের মাধ্যমে সংখ্যা অনুবাদ, স্থানীয় নম্বরের অ্যাক্সেস, প্রিপেইড বিলিং, শর্ট মেসেজ সার্ভিস (এসএমএস) এবং অন্যান্য পরিষেবাগুলোর মতো ফাংশনগুলোও পরিচালনা করা হয়। সহজ কথায় SS7 লিংক মারফত ভারতের বহিরাগত গোয়েন্দা পরিষেবা বাংলাদেশের মধ্যে করা ‘যে কোনও ভয়েস কল’ এর ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারত। একবার লিংকটি পেয়ে গেলে ভারতের গোয়েন্দারা বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের যে রোমিং চুক্তি রয়েছে সেই মোতাবেক ইনকামিং এবং আউটগোয়িং উভয় ভয়েস কলের তথ্য সংগ্রহ করতে পারত।

ডিজিএফআই পরিকল্পনায় বাধা দিল কেন?

বাংলা আউটলুকের কাছে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে রোমিং চুক্তি না থাকার কারণে ভারত এই লিংকটি চেয়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কিত ভয়েস কল ডেটা সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশের SS7 নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ভারতের গোয়েন্দারা। উচ্চ পর্যায়ের সূত্র মারফত জানা গেছে, SS7 লিংকের মাধ্যমে ভারত প্রেরক ও প্রাপকের ফোন নম্বর, সময়, তাদের অবস্থান, কলের সময়কাল এবং অন্যান্য মেটাডেটার মতো  বিবরণ সংগ্রহ করতে পারত। ইন্ডিয়ান এক্সটার্নাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বাংলাদেশে একটি সাবমেরিন ক্যাবল ইন্টারসেপশন সিস্টেম স্থাপনের প্রস্তাব করেছিল।

একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল রুট SMW-4 এবং SMW-5 এর অংশ যেখানে এই ধরনের একটি ইন্টারসেপশন সিস্টেম স্থাপন করা যেতে পারে।প্রাপ্ত নথিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত ইনস্টলেশনের জন্য দুটি বিকল্প উপস্থাপন করেছিল; হয় তারা সরাসরি প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে আসবে অথবা বাংলাদেশের একটি দল বিষয়টি প্রদর্শনের জন্য ভারতে যেতে পারে। যদি এই সিস্টেমটি ইনস্টল করা হত, তাহলে ভারত বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে যে কোনও ইনকামিং বা আউটগোয়িং ভয়েস কলের পাশাপাশি বাংলাদেশের মধ্যে যে কোনও ভয়েস কলের ডেটা সংগ্রহ করতে সক্ষম হত।

সূত্র মারফত জানা গেছে যে, মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিকী জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) এর তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল টিএম জোবায়েরের সঙ্গে ডিজিএফআইকে চাপ দিয়েছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দাদের দ্বারা প্রস্তাবিত সিস্টেমটি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার জন্য। এটি লক্ষণীয় যে, এনএসআই প্রধান জোবায়ের তৎকালীন ‘র’ (RAW) প্রধান সামন্ত কুমার গোয়েলের সঙ্গে একই সময়ে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। সূত্রগুলো থেকে জানা যায় যে, মেজর জেনারেল জোবায়ের গোয়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যিনি পরবর্তীতে তার নিজের সুবিধার্থে এই সম্পর্কটি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। ডিজিএফআই-তে কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘SS7 নেটওয়ার্কে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ, যা সরাসরি জাতীয় স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাই আমরা এটি বন্ধ করে দেই।’

ডিজিএফআই-এর একাধিক সূত্র প্রকাশ করেছে যে, কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ভারতীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করার জন্য কড়া প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পদোন্নতি আটকে দেয়া এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বদলি।

সূত্র: বাংলা আউটলুক

mzamin

বিএলএর নয়া বিবৃতি: 'পাকিস্তানের হঠকারিতার কারণে ২১৪ জন পণবন্দি সেনাকে খুন করা হয়েছে'

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দাবি প্রত্যাখ্যান করে জাফার এক্সপ্রেস হাইজ্যাকের নেপথ্যে থাকা বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নতুন বিবৃতি পেশ করেছে। তারা জানিয়েছে, বেলুচ রাজনৈতিক বন্দীদের বিনিময়ের জন্য ৪৮ ঘন্টার সময়সীমা শুক্রবার শেষ হওয়ার পরে তারা ২১৪ জন পণবন্দি সেনাকে খুন করেছে। বেলুচ লিবারেশন আর্মি বলেছে যে, পাক সরকার ‘হঠকারিতা’ দেখিয়ে তাদের আল্টিমেটাম না মানায় পণবন্দিদের হত্যা করতে তারা বাধ্য হয়েছে।

এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ‘বেলুচ লিবারেশন আর্মি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে যুদ্ধবন্দীদের বিনিময়ের জন্য ৪৮ ঘন্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল, যা পণবন্দি সেনাদের জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ ছিল। পাকিস্তান তার চিরাচরিত হঠকারিতা এবং সামরিক ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে শুধুমাত্র গুরুতর আলোচনাই এড়ায়নি বরং বাস্তবতার প্রতিও চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এই হঠকারিতার ফলস্বরূপ, ২১৪ জন জিম্মিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’

বিদ্রোহী গোষ্ঠী দাবি করেছে যে তারা সর্বদা আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করেছে, কিন্তু পাকিস্তানের আলোচনায় অস্বীকৃতি তাদের এই কাজ করতে বাধ্য করেছে। জঙ্গিরা গত মঙ্গলবার বেলুচিস্তানের একটি দূরবর্তী পর্বত গিরিপথে জাফর এক্সপ্রেস হাইজ্যাক করে, রেললাইন উড়িয়ে দেয় এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে যাত্রীদের পণবন্দি করে।

সেনা মুখপাত্র আহমেদ শরীফ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, পাক সৈন্যরা ৩৩ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে, ৩৫৪ জন পণবন্দিকে উদ্ধার করেছে। তিনি আরও বলেছিলেন যে, বিএলএ অতিরিক্ত কাউকে পণবন্দি করে রেখেছে এমন কোনও প্রমাণ নেই। সেদিনের ঘটনায়  তিন রেল কর্মকর্তা, পাঁচ যাত্রী-সহ ২৩ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। সেনাবাহিনীর বিবৃতির পরেই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছে যে তারা তাদের হেফাজতে থাকা সমস্ত পণবন্দিদেরই  হত্যা করেছে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বিএলএর বিরুদ্ধে অতীতেও অতিরঞ্জিত করে বিবৃতি পেশ করার অভিযোগ তুলেছে। বিএলএ হলো সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী বেলুচ বিদ্রোহী গোষ্ঠী, বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কয়েক দশক ধরে লড়াই করছে তারা। প্রদেশটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এখানে চীনের একাধিক প্রকল্প রয়েছে, যার মধ্যে একটি বন্দর এবং স্বর্ণ ও তামার খনি রয়েছে। বেলুচিস্তান প্রদেশটি সবচেয়ে অনুন্নত এবং দারিদ্র্যপীড়িত। বেলুচরা অভিযোগ করেছে, যে তাদের সম্পদ পাঞ্জাব এবং সিন্ধুর ধনী রাজ্যগুলোতে উন্নয়নকে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইসলামাবাদ বেলুচিস্তানের উন্নয়নকে অবহেলা করছে।

সূত্র : ফার্স্টপোস্ট

mzamin

বিগত সরকারের সময় অর্থনৈতিক তথ্য ছিল গোঁজামিল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত -ড. ফাহমিদা খাতুন

বিগত সরকারের সময় যে অর্থনৈতিক তথ্য দেয়া হয়েছিল, তা গোঁজামিল নির্ভর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক ডাটা কীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায় বাংলাদেশ ছিল তার মধ্যে একটা অগ্রগণ্য দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) নির্দেশদানের মাধ্যমে তারা মনমতো ডাটা ব্যবহার করতো।’

শনিবার রাজধানীর এফডিসিতে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন তিনি। সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমাদের ব্যবসায়ীরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়। গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে শুল্ক সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বছরে ৮ বিলিয়ন ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উন্নয়ন সহযোগিতা হ্রাস পাবে।’

তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে বাংলাদেশকে কমার্শিয়াল রেটে ঋণ নিতে হবে। যা পরিশোধ করা ও ঋণের শর্তপূরণ করা কঠিন। চীনের ঋণের ব্যাপারে সবসময় একটা সংশয় থাকে। অন্যান্য দেশের ঋণের ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স স্পষ্ট থাকলেও চীনের ক্ষেত্রে তা থাকে না। কোনভাবেই আমাদের ঋণের ফাঁদে পা দেয়া যাবে না।’

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘অন্তর্বতী সরকার এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেও প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী সরকারের আমলের ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হতে যাচ্ছি কিনা? বিগত সরকারের আমলের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হতো। ভুল, মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে উন্নয়নের মিথ্যা গল্প শোনানো হতো।’

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র আয়োজনে ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার সঠিক পথে আছে’ শীর্ষক ছায়া সংসদে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের পরাজিত করে এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়।

mzamin