Thursday, March 20, 2025

ঠিক-বেঠিক কে ঠিক করবে by হাসান ফেরদৌস

আমার এক ফেসবুক বন্ধু একটি ভিডিও পাঠিয়েছেন। তাতে দেখছি, ভারিক্কি চেহারার এক ভদ্রলোক বাজারে রমজানের মধ্যে কে কে রোজা রাখার বদলে ধূমপান করছে, তার হিসাব নিচ্ছেন। কাউকে পাওয়া গেলে সবার সামনে কানে হাত দিয়ে ওঠবস করাচ্ছেন।

এটি হয়তো বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা, এর ভিত্তিতে মৌলবাদ আসছে বলে পাগলা ঘণ্টি বাজানো আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে এ ঘটনার যে ধরন রয়েছে, সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক—কারও কারও মনে তার একটি পূর্বনির্ধারিত ধারণা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এ পূর্বধারণার উৎস ধর্মীয় বিশ্বাস। তাঁদের পূর্বনির্ধারিত ধারণার ব্যতিক্রম দেখলে কেউ কেউ নিজেই বিচারের দায়িত্ব তুলে নিচ্ছেন।

যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী তার চোখে যথেষ্ট শালীন পোশাক না পরায় তাঁকে হেনস্তা করেছে। ব্যাপারটা এখানেই থেমে থাকেনি; আদালত পর্যন্ত গড়ায়। জামিন পেয়ে মুক্ত হলে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে কর্মচারীটি বলে, ‘আমি এমন কী বলেছি!’

উদাহরণ আরও আছে। ঠিক-বেঠিকের পূর্বধারণা প্রয়োগ করে সারা দেশে ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। বাউলের আখড়ায় হামলা হয়েছে। হামলা হচ্ছে মাজারে। এমনকি ক্লাসে বিজ্ঞান পড়াতে গিয়েও ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে পড়ে জেলে যেতে হয়েছে হাইস্কুলের শিক্ষককে। ফেসবুকে মন্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার হয়েছেন কবি, সাইবার মামলায় পড়েছেন আন্দোলনকর্মী। সবার দাবি, ধর্মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে তাঁরা এসব পদক্ষেপ নিয়েছেন।

ভয়টা এখানেই। আজকের বাংলাদেশে ধর্মের নামে অন্যের ব্যক্তিগত অধিকারের ওপর এমন আক্রমণের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এসব ঘটনার কোনোটির সঙ্গেই ধর্ম বা ধর্মাচারের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক রয়েছে মৌলবাদের, যার উৎস ধর্মীয় অনুশাসনের আক্ষরিক ব্যাখ্যার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যে। কাজটা ধর্মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ভেবে যাঁরা অন্যের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করেন, তাঁরা সবাই যে নিজ ধর্ম বিষয়ে খুব সুপণ্ডিত, এ কথা বলা যাবে না। অথবা নিয়মিত ধর্ম পালন করেন, তা–ও নয়। কিন্তু তাঁদের মাথায় ‘ঠিক-বেঠিকের’ একটা সুনির্দিষ্ট ধারণা অনেক আগে থেকেই গাঁথা রয়েছে।

বার্ট্রান্ড রাসেলের ভাষায়, এসবই শৈশবের শিক্ষা। আপাতত সে তর্কে নাহয় না–ই গেলাম। ব্যক্তিগত আচার-আচরণের মধ্যে তাঁদের এই বিশ্বাস সীমিত হলে এতে ভয়ের কিছু নেই। সমস্যা দেখা দেয় যখন কেউ একক বা দলগতভাবে তাঁদের সেই বিশ্বাস বা ধ্যানধারণা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিপদটা আরও বাড়ে, যখন এ প্রবণতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

মৌলবাদ যে শুধু আমাদের অঞ্চলে অথবা আমাদের ধর্মের মধ্যে বিস্তৃত, তা মোটেই নয়। বস্তুত মৌলবাদ বা ফান্ডামেন্টালিজম কথাটা আমরা পেয়েছি আমেরিকা থেকে, সেখানে গত শতকের গোড়ার দিকে প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানরা বাইবেলে আদিষ্ট ধর্মের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে নিজেদের ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ হিসেবে ঘোষণা করেন। গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে খ্রিষ্টধর্ম পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে আমেরিকায় যে ‘মোরাল মেজরিটি’ আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার সমর্থকেরাও নিজেদের ফান্ডামেন্টালিস্ট হিসেবেই পরিচিত করাতেন।

আজকের আমেরিকায় মোর‍াল মেজরিটির গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে বটে, কিন্তু ভিন্ন মোড়কে রিপাবলিকান রক্ষণশীল রাজনীতিক ও ধর্মগুরুদের হাতে তা নতুনভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতকায় ভোটারদের প্রায় ২৫ শতাংশ নিজেদের ‘ইভানজেলিক্যাল’—অন্য কথায় মৌলবাদী বলে পরিচয় করাতে ভালোবাসেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে ধর্মাচারী হিসেবে পরিচিত না হলেও এই খ্রিষ্টীয় মৌলবাদীদের সমর্থনেই তিনি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন।

আগে বলেছি, ব্যক্তিগত জীবনে আপনি যেমন ইচ্ছা ধর্ম পালন করুন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আপনার ধর্মবিশ্বাস যখন রাজনৈতিকভাবে একটি দলীয় বা সম্প্রদায়গত ধর্মবিশ্বাস হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই ধর্মবিশ্বাসের বাইরের মানুষের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা দেখা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরুন। সারা দেশে ইভানজেলিক্যালদের নেতৃত্বে স্কুল ও লাইব্রেরি থেকে খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়—এমন পুস্তক সরানোর প্রতিযোগিতা চলছে। স্কুলে ডারউইনিজম বা বিবর্তনবাদ বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে। ধর্মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়—এ যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে লিঙ্গান্তরিত ব্যক্তিদের অধিকার এখন উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শুধু পুরুষ ও নারী—এ দুই লিঙ্গকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। লিঙ্গান্তরিত মানুষদের কোনো স্বীকৃতি থাকবে না। লিঙ্গান্তর বিষয়ে স্কুলে কোনো পাঠদানও অনুমোদন পাবে না।

মজার কথা হলো মার্কিন কংগ্রেসে এই মুহূর্তে একজন ডেমোক্রেটিক সদস্য রয়েছেন, যিনি ‘ট্রান্সজেন্ডার’। ট্রাম্পের অতি বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ইলন মাস্কের রয়েছে একটি লিঙ্গান্তরিত সন্তান।

খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের দাবি মেনেই নারীর গর্ভপাতের অধিকার রদ বা সংকুচিত করা হয়েছে। এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ বিতরণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ বিতরণ করায় ইউএসএআইডির বিশব্যাপী কার্যক্রম বাতিল করা হচ্ছে।

ধর্মের নামে বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের ওপর এখনো কোনো নিয়ন্ত্রণ আসেনি, কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গ, ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকারের ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি গোষ্ঠীর চাপেই পাঠ্যসূচি থেকে ট্রান্সজেন্ডার–বিষয়ক আলোচনা বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের দাবিতে স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে কিছু রচনা বাদ দেওয়া হয়।

মেয়েদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। নারীরা কী করতে পারেন আর কী করতে পারেন না, তা নির্দেশ করে তারা সম্প্রতি একটি আইন পাস করেছে। এতে মেয়েদের গৃহের বাইরে শুধু কাজ করাই যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা–ই নয়, প্রাথমিক পর্যায়ের পর স্কুল-কলেজে পড়াশোনাও নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি জনসমক্ষে উঁচু গলায় কথা বলাতেও বারণ, এমনকি তা যদি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ হয়, তাতেও। এ ছাড়া পা থেকে মাথা পর্যন্ত আবৃত রাখার কড়া নির্দেশ তো আগে থেকেই বলবৎ ছিল।

নারীর ব্যাপারে কট্টরপন্থী পুরুষদের এমন গাত্রদাহের কারণ কী? মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন—এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ পুরুষ নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা (ইনসিকিউরিটি) ঢাকতেই মেয়েদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে আসেন। নামজাদা মনোবিদ ক্যারেন হরনি, যিনি ‘গর্ভ ঈর্ষা’ (উম্ব এনভি) নামক তত্ত্বের প্রণেতা। তিনি বলেছেন, মেয়েরা জন্মদানে সক্ষম—এটি পুরুষদের মধ্যে গভীর ঈর্ষার জন্ম দেয়। এ থেকে যে হীনম্মন্যতার উদ্রেক হয়, তা ঢাকতেই পুরুষদের প্রয়োজন পড়ে মেয়েদের ওপর অধিকার ফলাতে। তাঁদের অনেকেই নিজেদের দাবির পক্ষে উকিল হিসেবে ধর্মগ্রন্থের একপেশে ব্যবহার করতে ভালোবাসেন।

এ অবস্থা বদলাব কীভাবে। পৃথিবীর সর্বত্র নাগরিক অধিকারের সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে। আর সে আন্দোলনের প্রথম পাঠ ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রতিবাদে। বাংলাদেশে একটি চমৎকার স্লোগান রয়েছে—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। এ কথার অর্থ ধর্ম ও রাষ্ট্রকে বিযুক্ত করতে হবে। আমাদের দেশে এই বিযুক্তির বদলে সরকারের হাত ধরে ধর্ম রাষ্ট্রের ঘাড়ে চড়ে বসছে। ধর্মের নামে সরকার যখন একের পর এক ছাড় দিতে থাকে (যেমন পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন, অথবা হুমকির মুখে ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে ফেলা), তাতে মৌলবাদের হাতকে আরও শক্তিশালী করা হয়।

যাঁরা ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে সামাজিক নৈতিকতা আরোপ করতে চান, তাঁদের সে চেষ্টার প্রতিবাদ করুন। এ কাজে প্রধান ভূমিকা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের, বিশেষত মেয়েদের নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে যুবক একটি মেয়েকে শালীনতার সবক দিতে এসেছিল, প্রতিবাদের মুখেই তাকে আটক করা হয়েছিল।

এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ, সবার হাতে হাতে মুঠোফোন। ভারিক্কি চেহারার লোকটির মতো যাঁরা অন্যের পাপ-পুণ্যের অডিট করতে চান, তাঁদের নাম–পরিচয় জানার চেষ্টা করুন। বাউলদের আখড়ায় যারা হামলা করে, সেসব হামলার সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার সাক্ষ্য–প্রমাণ সংগ্রহ করুন। তাদের সামাজিকভাবে বর্জনের আহ্বান জানান। আমাদের নীতিজ্ঞান শেখানোর দায়িত্ব তাদের কারও ওপর ছেড়ে দিইনি, সে কথাটা জানিয়ে দিন।

* হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

ইজরায়েলি হামলায় গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় নিহত ৯৭০

ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর বোমা হামলায় ৪৮ ঘণ্টায় গাজায় ৯৭০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আজ এ তথ্য জানায় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইজরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছে ৪৯ হাজার ৫৪৭ জন। এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা এএফপি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ১৯ জানুয়ারি হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে মঙ্গলবার ভোররাতে হামলা শুরু হওয়ার পর এখনো পর্যন্ত নিহতের মধ্যে ১৮৩ জনই শিশু। যদিও এটি হামলার পর প্রথমদিনের হিসাব।

ইজরায়েলি হামলায় জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ‘ফ্রান্স ২৪’। এ ঘটনায় ৫ জনের গুরুতর আহতের খবর জানানো হয়েছে।

গাজায় জাতিসংঘের ভবনে এই হামলা করা হয়। যদিও ইজরায়েলি সেনাবাহিনী এ হামলার কথা অস্বীকার করেছে।



বাহাত্তরে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ঘিরে যে বিতর্ক রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছিল by তারেকুজ্জামান শিমুল

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার তিন মাসের মাথায় ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। স্বাধীন বাংলাদেশে এটাই ছিল অন্য কোনো দেশের সরকার প্রধানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর।

ব্যাপক আয়োজনে তখন মিসেস গান্ধীকে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে স্বপরিবারে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। ঘোষণা করা হয়েছিল একদিনের সরকারি ছুটি।

তিন দিনের সফরকালে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে শেখ মুজিব একটি চুক্তি সই করেন, ১৯৭২ সালের ১৯শে মার্চ স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে 'ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি' নামে পরিচিত।

২৫ বছর মেয়াদী এই চুক্তিটি ঘিরে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক জন্ম নিতে দেখা গিয়েছিল। বিরোধীরা একে 'গোলামী চুক্তি' বলেও আখ্যায়িত করেছিলেন।

কিন্তু কী ছিল সেই চুক্তিতে? কেনই-বা চুক্তিটিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল? এই প্রতিবেদনে সেসবই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

চুক্তির প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালে ইন্দিরা গান্ধী যখন ঢাকার মাটিতে পা রাখেন, তার ঠিক এক বছর আগে 'অপারেশন সার্চ লাইট' নামে এক সেনা অভিযানের মাধ্যমে এখানে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার।

২৫শে মার্চের ওই হত্যাযজ্ঞের পর স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলাদেশ। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ।

সেই যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। তাদের ভারতের মাটিতে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র জোগাড়েও সহায়তা করে তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার।

এমনকি, এক পর্যায়ে ভারত নিজেও সেই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানি সৈন্যরা। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ইন্দিরা গান্ধী যেভাবে পাশে ছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন করার পর অনেকটা সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই তাকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানান শেখ মুজিবুর রহমান।

আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ ঢাকা আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেদিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে তাকে বহনকারী 'রাজহংস' নামের বিশেষ উড়োজাহাজটি তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

ঢাকায় পা রাখার পর শেখ মুজিব নিজে উপস্থিত থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাগত জানান। মিসেস গান্ধীর সম্মানে সেদিন সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়।

ওইদিন অবশ্য শেখ মুজিবের জন্মদিনও ছিল। ফলে ছুটির কারণ নিয়ে অনেকের মধ্যেই এক ধরনের বিভ্রান্তি কাজ করছিল।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারপ্রধান নিজের ভাষণে স্পষ্ট করে দেন যে, ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা আগমন উপলক্ষ্যে।

"ভবিষ্যতে তাঁহার জন্মদিন আর সরকারী ছুটির দিন হিসাবে উদযাপিত হইবে না। এই দিনটি কঠোর শ্রম ও বৃহত্তর কল্যাণে আত্মনিয়োগের দিন হিসাবে পালিত হইবে," শেখ মুজিবের বক্তব্যের বরাত দিয়ে ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ খবর প্রকাশ হয় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায়।

নৈশভোজে ভাষণ

তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে নবগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে চড়ে সরাসরি বঙ্গভবনে যান ইন্দিরা গান্ধী। সফরের তিনদিন সেখানেই তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

সেসময় বঙ্গভবনে বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহবুব তালুকদার, জীবদ্দশায় যিনি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কমিশনারও হয়েছিলেন।

'বঙ্গভবনে পাঁচ বছর' নামের গ্রন্থে মি. তালুকদার উল্লেখ করেছেন যে, মিসেস গান্ধীর আগমন উপলক্ষ্যে সেদিন বঙ্গভবনকে বিশেষ সাজে সজ্জিত করা হয়েছিল।

"অভ্যন্তরীণ সাজ-সজ্জার জন্য কলকাতা থেকে মিসেস বসন্ত চৌধুরীকে কমিশন করে আনা হয়েছিল। বসন্ত চৌধুরী স্বনামখ্যাত চিত্রনায়ক ও নাট্যাভিনেতা। তার স্ত্রী স্বনামখ্যাত ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর। ভদ্রমহিলা দিন রাত পরিশ্রম করে বঙ্গভবনকে সাজিয়ে দিলেন," লিখেছেন মি. তালুকদার।

সফরের প্রথমদিন বিকেলে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি জনসভায় অংশ নেন মিজ গান্ধী।

জনসভা উপলক্ষ্যে মাঠটির এক পাশে নৌকার আকারে বিশাল একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়। মাহবুব তালুকদার তার গ্রন্থে লিখেছেন যে, মঞ্চটির নাম দেয়া হয় "ইন্দিরা মঞ্চ"।

সফরের দ্বিতীয় দিন নাগরিক সংবর্ধনার পাশাপাশি বঙ্গভবনে আয়োজিত নৈশভোজেও অংশ নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

সেখানে তিনি বলেন, "ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিরাজমান বন্ধুত্বমূলক পরিবেশকে দূষিত করার জন্য ভিতরের ও বাহিরের বিরুদ্ধ মহল চেষ্টা করিবে।"

তার এই বক্তব্য তুলে ধরে ইত্তেফাক পত্রিকায় পরদিন এটাও লেখা হয়, "কিন্তু তিনি দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন যে, উভয় দেশের মৈত্রী সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে অধিকতর শক্তিশালী ও সফল হইবে।"

মৈত্রী চুক্তি সই

ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ২৫ বছর মেয়াদী একটি মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

সফরের তৃতীয় দিনে চুক্তিটিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী।

যদিও সফরকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনকারী মিসেস গান্ধীর চিফ অব প্রোটোকল বা রাষ্ট্রাচার বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা ফারুক চৌধুরীর ভাষ্য, মৈত্রী চুক্তি সই হয়েছিল ১৮ই মার্চ, অর্থাৎ সফরের দ্বিতীয় দিনে।

মৃত্যুর কয়েক বছর আগে মি. চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর সফরের দ্বিতীয় দিন শীতলক্ষ্যা নদীতে এক নৌবিহারে।

"চুক্তিটি সই হয়েছিল স্থলে নয়, জলে," বলেছিলেন মি. চৌধুরী।

তবে ১৯শে মার্চ তৎকালীন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত 'মুজিব-ইন্দিরা সফল আলোচনা' শিরোনামের খবর থেকে জানা যায় যে, ১৮ই মার্চ শীতলক্ষ্যার নৌবিহারটি হয়েছিল ঠিকই, তবে সেই নৌবিহারে শুধু দুই নেতার মধ্যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

আর চুক্তি সই হয়েছিল মিসেস গান্ধীর সফরের শেষ দিন, অর্থাৎ ১৯শে মার্চ।

দৈনিক ইত্তেফাক ২০শে মার্চ তাদের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম লেখে, "বন্ধুত্ব সহযোগিতা শান্তি" এবং তাতে পত্রিকাটি উল্লেখ করে - ইন্দিরা গান্ধীর সফর শেষে ঢাকা ত্যাগের আগে বঙ্গভবনে দুই নেতা ১২ দফাবিশিষ্ট চুক্তিটিতে সই করেন।

কী ছিল চুক্তিতে?

'ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি' নামে পরিচিত ওই চুক্তিটিতে মোট ১২টি ধারা রাখা হয়েছিল।

সেখানে লেখা ছিল যে, দুই দেশ একে অন্যের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিষয়ে সম্মান প্রদর্শন করবে এবং কেউই একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।

কোনো পক্ষ স্বাক্ষরকারী অপর পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো সামরিক জোটে অংশ নেবে না।

পরস্পর পরস্পরের প্রতি কোনো আক্রমণ করবে না এবং অপর পক্ষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো কাজে নিজের ভূমি ব্যবহার করতে দেবে না।

এছাড়া শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক আরও ধারা ছিল চুক্তিতে। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, খেলাধুলা, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহায়তার উল্লেখও ছিল চুক্তিতে।

গবেষকদের মতে, চুক্তিটি করা হয়েছিল অনেকটা ১৯৭১ সালের ভারত-সোভিয়েত চুক্তির আদলে।

কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে দুটি চুক্তিই ছিল হুবহু এক। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তিটির মেয়াদ ছিল ২০ বছর, আর বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিটির মেয়াদ ২৫ বছর।

২০১১ সালে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফারুক চৌধুরী বলেন, এই চুক্তির মধ্যে নতুন কোনো 'এলিমেন্ট' ছিল না।

"ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে চুক্তিটি হয়েছিল ওইটারই একটা অনুলিপি ছিল এটা," বলেছিলেন মি. চৌধুরী।

তবে মি. চৌধুরীর চোখে চুক্তিটি ছিল তৎকালীন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং সার্বভৈামত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার একটি বিশেষ পদক্ষেপ।

"আমরা ভেবেছি আমাদের নিরাপত্তা বাড়বে এতে। তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের উদ্দেশ্য কী তা তো আমরা জানি না। কী হবে না হবে! অতএব একটা দেশের সাথে একটা সমতার ভিত্তিতে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে আমরা আরো পাকাপোক্ত করলাম," বিবিসি'র সাক্ষাৎকারে বলেন মি. চৌধুরী।

সেসময় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন অরুন্ধতী ঘোষ। তার চোখে এই চুক্তিটি ছিল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটি 'গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী বিষয়'।

২০১১ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "আমার যেটা মনে হয়, আমাদের যে নতুন বন্ধুত্বটা গড়ার দরকার ছিল সেটাকে একটা প্রুফ দেয়া, যে আমাদের এই বন্ধুত্বটা থাকবে"।

অবশ্য এই চুক্তিটি ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা সফরের সময়ে হলেও চুক্তির ব্যাপারে ঐকমত্য তার আগের মাসে শেখ মুজিব তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে যখন ভারত গিয়েছিলেন, তখনই হয়ে গিয়েছিল বলে কয়েকজন ইতিহাসবিদের বিবরণে উঠে আসে।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা হিসেবে প্রথম সরকারি সফরে শেখ মুজিবুর রহমান দু'দিনের সফরে কলকাতা গিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে।

তার সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি থেকে কলকাতা উড়ে এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।

এসময় কলকাতার রাজভবনে দুজনের যে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেখানেই মিসেস গান্ধীকে ফিরতি সফরের দাওয়াত দিয়েছিলেন শেখ মুজিব।

একই সফরে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্যদের প্রত্যাহারের ব্যাপারেও জোর দিয়েছিলেন শেখ মুজিব।

ফারুক চৌধুরী তার জীবনীগ্রন্থ 'জীবনের বালুকাবেলায়' লিখেছেন, "মাত্র দুই দিনের অবস্থানের মধ্যেও কলকাতায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে ছিলেন সক্রিয়"।

শেখ মুজিবের সেই সফরের দ্বিতীয় দিনে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার পর যুক্ত ইশতেহারে ঘোষণা করা হয় যে, '২৫শে মার্চ ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার সমাপ্ত করা হবে'।

তবে বাস্তবে এই সৈন্য প্রত্যাহার শেষ হয়েছিল তারও দু'সপ্তাহ আগে।

'গোলামী চুক্তি'

ফারুক চৌধুরীর ভাষায়, চুক্তিটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো 'দ্বিমত' ছিল না। কিন্তু চুক্তিটি হয়ে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে এর তুমুল সমালোচনা তৈরি হয়।

কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও তাদের মুখপত্র বলে পরিচিত দৈনিক পত্রিকাগুলো এই চুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সমালোচনায় যোগ দেয়।

সেগুলোর মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর 'হক কথা', ফেরদৌস আহমদ কোরেশী সম্পাদিত 'দেশবাংলা', জাসদের মুখপত্র হিসেবে নতুন প্রকাশিত 'দৈনিক গণকণ্ঠের' মতো পত্রিকাও ছিল।

পত্রিকাগুলোর খবরে, ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিকে 'গোলামী চুক্তি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান তখন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় কাজ করতেন।

২০২২ সালের এক সাক্ষাৎকারে মি. খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, তখন "সমালোচনার পয়েন্ট ছিল একটাই। এই চুক্তি হওয়া মানে বাংলাদেশটাকে শেখ মুজিব ভারতের হাতে লিজ দিয়ে দিয়েছেন"।

তখনকার বিরোধী "পার্টিগুলো ক্রমাগত কিন্তু মুজিববিরোধী এবং চুক্তিবিরোধী কথাবার্তা বলেছে এবং সেটাকে বলেছে গোলামী চুক্তি"।

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর এই অবস্থান ছিল স্রেফ 'বিরোধিতার কারণে', এমন মত লেখক ও রাজনীতি বিষয়ক গবেষক মহিউদ্দীন আহমদের।

ইন্দিরা-মুজিব মৈত্রী চুক্তিটি ছিল ১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির হুবহু প্রতিরূপ, কিন্তু এটা নিয়ে ভারতে কোনো বিরোধিতা হয়নি উল্লেখ করে মি. আহমদ বলেন, "আমাদের এখানে হয়েছে, কারণ আমাদের এখানে সরকার যেটাই করবে কিছু লোক তার বিরোধিতা করবে, সবসময়ই"।

তবে এ নিয়ে তখন কোনো রাজনৈতিক দল হরতাল ডেকেছে বলেও মনে করতে পারেন না সেসময়ের গণকণ্ঠ পত্রিকার সাংবাদিক মি. আহমদ, যদিও সেসময় রাজনৈতিক দলগুলো মি. আহমদের ভাষায় "কথায় কথায় হরতাল ডাকতো"।

"কিন্তু যারা বিরোধিতা করেছে, এটা বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করেছে। তারা যখন ক্ষমতায় গেছে তারা এই চুক্তি বাতিল করে নাই," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমদ।

ফারুক চৌধুরীর চোখে এটি ছিল একটি 'হার্মলেস' (নির্বিষ) কিন্তু 'প্রয়োজনীয়' চুক্তি।

কিন্তু "১৯৯৭ সালের যে পৃথিবী সেটা ১৯৭২ সাল থেকে কমপ্লিটলি (সম্পূর্ণরূপে) ভিন্ন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই। রাশিয়া হয়ে গেছে। টাইম মেড ইট ইররেলেভেন্ট (সময় এটাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে)। এই চুক্তির মৃত্যু তো দেখেছি। একটা হচ্ছে এটার তো কোনো প্রয়োজন নেই। লেট ইট ডাই এ ন্যাচারাল ডেথ (এটাকে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতে দেয়া হোক)", ২০১১ সালে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন মি. চৌধুরী।

"যারা আশঙ্কা করেছিলেন যে চুক্তি নবায়ন হবে, তাদের আশঙ্কা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। আমি মনে করি সেটা সময়ের প্রয়োজনে হয়েছিল। সেটা সে সময়ে আমাদের সাহস যুগিয়েছিল। শক্তি দিয়েছিল । আমাদের সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করেছিল। এটার মনস্তাত্ত্বিক একটা সিগনিফিকেন্স (গুরুত্ব) ছিল", বলেছিলেন মি. চৌধুরী।

কতটা কাজে লেগেছিল?

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তিটি কতটা কার্যকর হয়েছে বা আদৌ কাজে লেগেছিল কি-না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

"বাস্তবতা হচ্ছে, কোনোপক্ষই চুক্তির শর্তগুলো কাজে লাগানোর জন্য অনুরোধ করেনি বা বাস্তবায়নের দিকে যায়নি," বিবিসি বাংলাকে বলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।

২০১৫ সালে প্রকাশিত জীবনীগ্রন্থ 'বিপুলা পৃথিবী'তে ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, "যত সমালোচনা হয়েছিল, চুক্তি তার সামান্য ভাগও কার্যকর হয়নি"।

আর এই কার্যকর না হওয়ার পেছনে ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনও একটা বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি অরুন্ধতী ঘোষ।

"শেখ সাহেব মারা যাওয়ার পরে কিছুদিন অনেকগুলো মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং (ভুল বোঝাবুঝি) এসেছিল", ২০১১ সালে বিবিসিকে বলেছিলেন মিজ ঘোষ।

তিনি বলেন, চুক্তির উদ্দেশ্যটা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে আমি মনে করি।

"আমি যতদিন ছিলাম বন্ধুত্বটা গড়ছিল। কিন্তু অনেকগুলো মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং-ও (ভুল বোঝাবুঝি) শুরু হয়েছিল আমাদের সাইড (পক্ষ) থেকে," বিবিসিকে বলেছিলেন মিজ ঘোষ।

১৯৯৭ সালের ১৯শে মার্চ যখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়, তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।

কিন্তু তারপরও ভারত কিংবা বাংলাদেশ কেউই এই চুক্তি আর নবায়নে আগ্রহ দেখায়নি।

১৯৭২ সালে মৈত্রী চুক্তি সই করেন ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমান
ছবির ক্যাপশান, ১৯৭২ সালে মৈত্রী চুক্তি সই করেন ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমান

আমি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বন্দী: ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে গ্রেপ্তার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল নিজেকে একজন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে দাবি করেছেন। অভিবাসীদের এভাবে আটকে রাখার প্রক্রিয়াকে ইসরায়েলের বিচারবহির্ভূত আটকব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন এই ফিলিস্তিনি যুবক।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার আটককেন্দ্র থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথাগুলো বলেন মাহমুদ খলিল। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রকাশ্যে দেওয়া এটিই প্রথম কোনো বিবৃতি।

গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবন থেকে খলিলকে গ্রেপ্তার করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) কর্মকর্তারা।

বিবৃতিতে খলিল বলেন, ‘আমি একজন রাজনৈতিক বন্দী। লুইজিয়ানার শীতের সকালে ঘুম ভাঙার পর এখানে আটক মানুষদের দেখে আমার দিন কাটে, যাঁরা আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।’

মাহমুদ খলিল বর্তমানে লুইজিয়ানার জেনা শহরে একটি অভিবাসী আটককেন্দ্রে রয়েছেন। সেখানেই তিনি বিচারের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাঁকে এভাবে আটকে রাখার ঘটনাকে তিনি ইসরায়েলের কারাগারে বিনা বিচারের বছরের পর বছর ফিলিস্তিনিদের আটকে রেখে নির্যাতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনের ভূমি থেকে দূরে থাকলেও ভাগ্য সেই সীমানা অতিক্রম করে ফেলেছে। নিজেদের অধিকারের জন্য তাঁদের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।’

বিনা অপরাধে ও বিচারে তাঁদের (ফিলিস্তিনিদের) আটক থাকতে হয়, তিনিও (খলিল) এর বাইরে নন বলে মন্তব্য করেন বিবৃতিতে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিবাসনকেন্দ্রে কেউই নিজের অধিকার পেতে পারেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে ফিরেই অঙ্গীকার করেছিলেন, গত বছর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনিপন্থী আন্দোলনে জড়িত কিছু বিদেশি শিক্ষার্থীকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেবেন। এ আন্দোলনকে তিনি ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে অভিহিত করেন।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাম্পের তথাকথিত ইহুদিবিদ্বেষী বিক্ষোভ বন্ধের অভিযানের প্রথম শিকার ৩০ বছর বয়সী এই ফিলিস্তিনি যুবক। মাহমুদ খলিল বিশ্ববিদ্যালয়টির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের শিক্ষার্থী। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের গ্রিনকার্ড রয়েছে তাঁর। কিন্তু তাঁর গ্রিনকার্ড বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। আপাতত তাঁকে নিবার্সিত করার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছেন একজন ফেডারেল জজ।

নিজের বন্ধু ও পরিবারের মাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে আটককেন্দ্রে অভিবাসীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ করেছেন মাহমুদ খলিল। গাজায় আবার ইসরায়েলের হামলা শুরু করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে নতজানু হয়ে নিজেদের শিক্ষার্থীকে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়ায় কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনাও করেছেন তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, খলিলকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ইহুদি শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করায় অভিযুক্ত বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযানের শুরু হয়েছে।

তবে ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় আঘাত ও ফিলিস্তিনপন্থী মতামত দমনের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন অনেক মানবাধিকারকর্মী ও খলিলের আইনজীবীরা।

বিবৃতিতে খলিলও বলেছেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের ঘটনা সরাসরি বাক্‌স্বাধীনতা লঙ্ঘন। তিনি কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন না। ‘আমি শুধু চেয়েছিলাম ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ হোক। সে জন্য আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো’ বলেন তিনি।

খলিল জানান, তাঁর আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নূর আবদাল্লার সামনে থেকে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে। এমনকি কোনো পরোয়ানাও দেখানো হয়নি, নাম-প্রতীকহীন একটি গাড়িতে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন।

ফিলিস্তিনি এই যুবক বলেন, গত বসন্তে তাঁরা গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে যে আন্দোলন করেছেন, তা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন নসাৎ করে দিয়েছে। এখন নতুন করে বর্বরতা শুরু করেছে ইসরায়েল।

ফিলিস্তিনিদের আবারও সীমাহীন দুর্ভোগ ও স্বজন হারানোর বেদনা সইতে হবে বলে দুঃখ প্রকাশ করেন খলিল। এদিকে তাঁকে আটক সংবিধানের পুরোপুরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন তাঁর আইনজীবীরা। গত সপ্তাহে এ লক্ষ্যে একটি সংশোধিত পিটিশন করেছেন তাঁরা। খলিলকে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়নি, তিনি কোনো আইন অমান্য করেননি বলে উল্লেখ করেন তাঁরা।

ট্রাম্প প্রশাসন অন্যায়ভাবে খলিলের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন আইনজীবীরা। সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটসের সদস্য ও খলিলের আইনজীবী বলেন, ‘খলিলকে দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এ তথাকথিত ইহুদিবিদ্বেষী অভিযানের শুরু মাত্র। ভবিষ্যতে আরও অনেকে এ সমস্যায় পড়বেন। তবে শুরুতেই তাঁরা একজন নির্ভীক ও নীতিনিষ্ঠ সংগঠককে আটক করেছে, যিনি কিনা নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পাত্র।’

মাহমুদ খলিলের মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্কে বিক্ষোভ। ১২ মার্চ ২০২৫
মাহমুদ খলিলের মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্কে বিক্ষোভ। ১২ মার্চ ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের শুল্কনীতি কি ভারতের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে by শশী থারুর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর পাল্টা শুল্ক আগামী ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, এতে তাঁরা ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

ট্রাম্পের অস্থির নীতির কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। যদিও তিনি সম্প্রতি মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক এক মাসের জন্য স্থগিত করেছেন এই যুক্তিতে যে এতে মার্কিন গাড়ি প্রস্তুতকারকেরা স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সময় পাবেন; ভারতও একই ধরনের ছাড় পাবে বলে আশা করা নিতান্তই কল্পনাপ্রসূত।

গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। ওই সফরের মধ্য দিয়ে একটি নতুন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ৯ মাসব্যাপী আলোচনা শুরু হয়, যা শরৎকালে শেষ হওয়ার কথা। তবে এই আলোচনা ট্রাম্পের আগামী মাসে কার্যকর হতে যাওয়া পাল্টা শুল্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

৪ মার্চ স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ভারতকে প্রধান শুল্ক অপব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকায় এই নতুন শুল্কনীতির অর্থনৈতিক প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০২৪ সালে ভারত ৭৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির কারণে ভারত প্রতিবছর প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে মার্কিন পণ্যের ওপর গড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর মাত্র ৩ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে।

ট্রাম্প যদি সত্যিই পুরোপুরি পাল্টা শুল্কনীতি অনুসরণ করেন, তাহলে এই ব্যবধান মুছে যাবে এবং ভারতীয় রপ্তানিকারকদের যে ব্যয়সুবিধা রয়েছে, তা বিলীন হয়ে যাবে। এতে ভারতীয় পণ্যগুলোর প্রতিযোগিতামূলক মূল্য কমে যাবে, রপ্তানি আয় হ্রাস পাবে এবং শ্রমনির্ভর শিল্পগুলোতে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে।

বিশেষত রাসায়নিক, ধাতব, গয়না, গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ, টেক্সটাইল, ওষুধশিল্প এবং খাদ্যপণ্য—এই খাতগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ভারতকে হয় শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে, নয়তো দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে।

ট্রাম্পের ঘোষিত ২৫ শতাংশ শুল্কহার ভারতীয় গাড়ির যন্ত্রাংশশিল্পের জন্য বড় ধাক্কা হবে। কারণ, ভারত এই খাতে একটি প্রধান উৎপাদক দেশ। তবে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা মেক্সিকো ও চীনের ব্যবসায়ীদের তুলনায় বেশি ঝুঁকির মধ্যে নেই। যদি এই শুল্কনীতি সব দেশের জন্য কার্যকর হয়, তাহলে সবার জন্যই খরচ বাড়বে এবং প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে মার্কিন গাড়িশিল্পের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনে। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্প বর্তমানে আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

যদি ট্রাম্পের শুল্কনীতি দেশীয় উৎপাদনকে উজ্জীবিত করে এবং আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়, তাহলে ভারতীয় সরবরাহকারীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি হবে না; কারণ, মজুরি ব্যবধানের কারণে মার্কিন উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ভারতীয় পণ্যের তুলনায় এখনো ব্যয়বহুল থাকার সম্ভাবনা বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি কমে গেলে ভারতের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মোদির সরকার ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার জন্য কিছু আগাম ছাড় দিয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের ইউনিয়ন বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা বোরবন (হুইস্কিবিশেষ), ওয়াইন ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এমনকি হার্লে-ডেভিডসন মোটরসাইকেলের দামও ভারতে কমানো হয়েছে, যা অতীতে ট্রাম্পের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল।

প্রশ্ন থেকে যায়, এই ছাড় কি ট্রাম্পকে শান্ত করতে যথেষ্ট হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ভারত থেকে আমদানি করা ওষুধের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসায়, তাহলে ভারতীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে যাবে। বর্তমানে ভারতীয় ওষুধ কম দামে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা সম্ভব হয়; কারণ, উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম; কিন্তু শুল্ক বসানো হলে এই খরচ বাড়বে। ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মূল্যের সুবিধা কমে যাবে।

এটি ভারতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে যেসব পণ্য ভারতে রপ্তানি করে, তার প্রায় ৩১ শতাংশই ওষুধশিল্প থেকে আসে। অর্থাৎ ভারতের মোট রপ্তানির একটি বিশাল অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মেসিগুলোতে বিক্রীত সাধারণ ওষুধের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। যদি ট্রাম্পের শুল্কনীতি ভোক্তাদের জন্য ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেয়, তাহলে মার্কিন কোম্পানিগুলো নিজ দেশে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন শুরু করতে পারে। এতে ভারতের সবচেয়ে লাভজনক রপ্তানি খাত ক্ষতির মুখে পড়বে।

আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কি ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য দেশের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ করবে। যদি ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা মার্কিন বাজার হারান, তাহলে তঁারা কি বিকল্প ক্রেতা খুঁজে পাবেন?

* শশী থারুর ভারতের কংগ্রেস পার্টির এমপি। তিনি টানা চতুর্থবারের মতো লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন

* স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক
ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক। ছবি: রয়টার্স

চার্চিলের নাতি ব্রিটিশ সরকারকে বলেছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে

উইনস্টন চার্চিলের নাতি লর্ড নিকোলাস সোয়েমস ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রিটেনের রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গ নিয়ে চলমান বিতর্কে তাঁর এই আহ্বানকে গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাবেক কনজারভেটিভ এমপি লর্ড নিকোলাস সোয়েমস ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের সরকারে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত শুক্রবার দেশটির আইনসভার উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ব্রিটিশ স্বীকৃতি সমর্থন করে তোলা একটি বিলের পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি।

এ সময় লর্ড নিকোলাস বলেন, ইসরায়েল অবৈধভাবে যে ভূখণ্ড দখল করেছে, সেখানে ১৯৬৭ সালের সীমান্তরেখা অনুযায়ী ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এটা করলে ব্রিটিশ সরকার আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের ন্যায্য প্রতিশ্রুতি, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রতি প্রতিশ্রুতি এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরতে পারবে।

৭৭ বছর বয়সী নিকোলাসের নিজ দল কনজারভেটিভ পার্টি ইসরায়েলের প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তিনি দলের বিপরীতে গিয়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।

একতরফাভাবে নয়, বরং ‘সঠিক সময়ে’ একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করে ব্রিটেনের লেবার পার্টির সরকার।

লর্ড নিকোলাসের কথার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কেবল রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণেই নয়, বরং পারিবারিক ইতিহাসের কারণেও তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিতে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁর দাদা উইনস্টন চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের বিরুদ্ধে দেশকে বিজয় এনে দিয়েছিলেন। চার্চিল সম্ভবত ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দ্য ব্রিটেন প্যালেস্টাইন প্রকল্পের সংসদীয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে লর্ড নিকোলাস ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়াকে ‘দৃঢ়ভাবে জাতীয় স্বার্থে এবং নৈতিকভাবে সঠিক’ বলে বর্ণনা করেন। দ্য ব্রিটেন প্যালেস্টাইন প্রকল্পের আগের নাম ছিল বেলফোর প্রকল্প। লর্ড নিকোলাস এই প্রকল্পের একজন পৃষ্ঠপোষক।

লর্ড নিকোলাসের মতে, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান প্রায় অসম্ভব। শান্তি আলোচনাও ঝিমিয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে তা কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এ ধরনের পদক্ষেপ সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এটা সুস্পষ্ট বার্তা দেবে যে বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটেনকে তার কূটনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এই রাজনীতিক বলেন, জাতিসংঘ সদস্যপদের জন্য ফিলিস্তিনের দাবিকে সমর্থন করতে যুক্তরাজ্যের ব্যর্থতা নীতিগতভাবে ভুল। সেটা ওই অঞ্চলে ব্রিটেনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি ওই অঞ্চলে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে ব্রিটেনের ওপর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

লর্ড নিকোলাস যুক্তরাজ্যকে ‘ইসরায়েলের জন্মের সময় ধাত্রী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর জারি করা বেলফোর ঘোষণাপত্রে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি দেশ প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ওই দেশে যাঁরা ইহুদি নন, তাঁদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষার কথাও বলা হয়েছিল ওই ঘোষণাপত্রে।

ঔপনিবেশিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯২১ সালে উইনস্টন চার্চিলের বিরুদ্ধে বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়নের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরে যুদ্ধের সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইসরায়েল সৃষ্টির পক্ষে ছিলেন। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসার পর তিনি দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলপন্থী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন।

চার্চিলের নাতি লর্ড নিকোলাস গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, বেলফোর ঘোষণায় বর্ণিত ফিলিস্তিনের অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের অধিকার স্পষ্টতই সমুন্নত রাখা হয়নি। এটি একটি ঐতিহাসিক অবিচার, যার ভার ব্রিটেনের ওপর এসে পড়বে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাজ্যকে দ্বিমুখী নয়; বরং সমান অবস্থান বজায় রাখতে হবে। আমরা ফিলিস্তিনিদের একই অধিকার অস্বীকার করে ইউক্রেনের জনগণের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষা করতে পারি না।’

উইনস্টন চার্চিলের নাতি লর্ড নিকোলাস সোয়েমস
উইনস্টন চার্চিলের নাতি লর্ড নিকোলাস সোয়েমস। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার বাসিন্দাদের অনেকে তখন গভীর ঘুমে। কেউ কেউ সাহ্‌রির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। এমন সময় শুরু হয় একের পর এক বোমা হামলা। ইসরায়েলি বাহিনীর সেই হামলায় হতাহত হতে থাকেন নারী-শিশুসহ সব বয়সী ফিলিস্তিনি। রাতের অন্ধকারে চলতে থাকে আহত রক্তাক্ত মানুষের আর্তচিৎকার আর আতঙ্কিত মানুষের দিগ্‌বিদিক ছোটাছুটি। যুদ্ধবিরতির মধ্যে আবার দুঃস্বপ্নের রাত ফিরে এল ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ এ উপত্যকায়।

১৫ মাস ধরে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ৪৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর গাজাবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছিল যুদ্ধবিরতি। ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শ করে নতুন করে গাজায় হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার। গত সোমবার মধ্যরাতের পরে ঘুমন্ত গাজাবাসীর ওপর এই হামলায় অন্তত ৪০৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গাজার দক্ষিণের খান ইউনিস ও রাফা, উত্তরের গাজা নগর এবং মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহসহ গাজার প্রায় সব জায়গায় যুদ্ধবিমান ও ড্রোন থেকে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ৫৬২ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতম এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে গাজার সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠন হামাস। সংগঠনটি বলেছে, এই হামলার মধ্য দিয়ে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে ইসরায়েল। নৃশংস এ হামলার প্রতিবাদ জানাতে আরব ও ইসলামিক দেশগুলোসহ ‘মুক্ত বিশ্বের মানুষদের’ সড়কে নেমে প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে হামাস।

ইসরায়েল দাবি করেছে, হামাস জিম্মিদের মুক্তি না দেওয়ায় এই হামলা চালানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, ইসরায়েল এখন থেকে আরও বেশি সামরিক শক্তি নিয়ে হামাসের ওপর হামলা চালাবে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গাজায় এ হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করে ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতির মধ্যে গাজায় হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ইসরায়েলের হামলা ফিলিস্তিনিদের জীবন অসহনীয় দুর্দশা বয়ে এনেছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। দ্বিতীয়ত, গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া যাবে না এবং তৃতীয়ত, নিঃশর্তে জিম্মিদের মুক্তি দিতে হবে।’

গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম ধাপে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর মেয়াদ শেষ হয় ২ মার্চ। যুদ্ধবিরতির মূল চুক্তিতে বলা ছিল, প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি চলাকালে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা হবে। যদি এর মধ্যেও দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে সমঝোতা না হয়, তাহলে প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি চলবে।

এ ছাড়া প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর ২ মার্চ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ সাময়িকভাবে বাড়ানোর বিষয়ে অনুমোদন দেয় ইসরায়েলের সরকার। পবিত্র রমজান ও ইহুদিদের পাসওভার উৎসব এই মেয়াদকালের আওতায় পড়েছে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে সোমবার রাতে আবারও গাজায় নির্বিচার হামলা চালাল ইসরায়েল।

‘হাতে হাতে শিশুর ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ’

ঘড়িতে তখন রাত ২টা ১০ মিনিট। মেয়ে বানিয়াসকে নিয়ে গভীর ঘুমে মারাম হুমাইদ দম্পতি। আচমকা যুদ্ধবিমান থেকে একের পর এক বোমা হামলার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় বানিয়াসের। শিশুটির চোখেমুখে আতঙ্ক। চিৎকার করে কাঁদছিল আর বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করছিল, ‘বাবা! মা! কী হচ্ছে বাইরে?’

মারাম হুমাইদ বলেন, ‘মেয়ে শুয়ে ছিল আমার পাশে। তাকে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।’

দেইর আল-বালাহর বাসিন্দা মারার হুমাইদ বলেন, ‘এ অবস্থায় মেয়েকে কোলে জড়িয়ে ধরে তার বাবা। হামলার তীব্রতা আরও বাড়তে থাকে। বুঝতে পারছিলাম আবার ইসরায়েল হামলা শুরু করেছে।’

চারপাশে ইসরায়েলের নির্বিচার বোমা হামলার শব্দে ঘুম ভাঙে আহমেদ আবু রিজক ও তাঁর পরিবারের। গাজার এই স্কুলশিক্ষক বলেন, ‘আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। শিশুরাও ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন সড়ক থেকে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স আসতে শুরু করে। দেখলাম লোকজন তাঁদের হাতে করে সন্তানদের ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ নিয়ে আশপাশের হাসপাতালের দিকে ছুটে যাচ্ছে।’

মোমেন কোরেইকেহ নামে গাজার এক বাসিন্দা বলেন, সোমবার মধ্যরাতে ইসরায়েলের এই হামলায় নবজাতক, নারী-শিশুসহ পরিবারের ২৬ জন সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি।

গাজায় আল-জাজিরার প্রতিনিধি তারেক আবু আজৌম জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, অস্থায়ী হাসপাতাল, আবাসিক ভবন—সর্বত্র বিমান থেকে বোমা হামলা চলছিল। হামলায় হামাসের কিছু শীর্ষ নেতাও নিহত হয়েছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিমান ও ড্রোন থেকে চালানো হামলার পর নবজাতক, শিশু, নারী ও প্রবীণ মানুষের অসাড় দেহ যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়।’

‘হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী’

হামাস বলেছে, ইসরায়েল এই নৃশংস হামলার মধ্য দিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করেছে। ইসরায়েলির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর চরমপন্থী সরকার যুদ্ধবিরতি চুক্তি উল্টে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গাজায় থাকা (ইসরায়েলি) বন্দীদের জীবনও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে তারা।

গাজার আরেক সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠন ইসলামিক জিহাদ বলেছে, যুদ্ধবিরতির সব প্রচেষ্টা ভূলুণ্ঠিত করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে এ হামলা করেছে দখলদার ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলের হামলা শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করেছে ইরান। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দায়ী।’

ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডান। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতা করে আসা কাতার বলেছে, ইসরায়েলের এ হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্তির ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর বলেছে, ইসরায়েলের এই হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।

ইসরায়েলের হামলায় চীন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এমন পদক্ষেপ না নিতে দুই পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। রুশ সরকারের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’

গতকাল হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট ফক্স নিউজকে বলেন, ‘গাজায় আজ (সোমবার) রাতের হামলার বিষয়ে আগেই ট্রাম্প প্রশাসন ও হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আলোচনা করেছে ইসরায়েল।’ তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হামাস, হুতি, ইরানসহ যারা শুধু ইসরায়েল নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও ভীতি ছড়াতে চায়, তাদের এর মূল্য চুকাতে হবে। নরকের সব দরজা খুলে যাবে।’

যুদ্ধবিরতির আলোচনা বন্ধ

কয়েক মাসের আলোচনার পর মিসর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এ চুক্তির আওতায় ৩৮ জিম্মিকে মুক্তি দেয় হামাস। বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় ২ হাজার বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রাথমিক এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষে দ্বিতীয় ধাপে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কাতারের দোহায় বিবদমান পক্ষের সঙ্গে কাতার ও মিসরের আলোচনা চলছিল। সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার রাতের হামলার পর যুদ্ধবিরতির আলোচনা বন্ধ হয়ে গেছে।

দেড় মাস ধরে আলোচনা চললেও যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও গাজা থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইসরায়েল রাজি হচ্ছিল না। ইসরায়েল ও তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল, প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে গাজায় থাকা অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হোক।

কিন্তু হামাস বলে আসছিল, মূল চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করতে হবে। এর আওতায় ইসরায়েলি সব সেনাকে গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। এর পরই বাকি জিম্মিদের ছেড়ে দেবে তারা।

হামাস এখনো মূল যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলতে চায় বলে গতকাল জানিয়েছেন সংগঠনটির মুখপাত্র আবদেল লতিফ। তিনি রয়টার্সকে বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে এখনো তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে। এখনো তাঁরা মূল চুক্তি পুরোপুরি কার্যকরের পক্ষে।

এদিকে গাজায় হামলার পর ইসরায়েল নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে তারা। যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন ইউরোপের ২৭টি দেশের এই জোটের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় হামলা বন্ধ ও ত্রাণসহায়তা প্রবেশ করতে দিতে হবে।

ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ দাফনের জন্য হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গতকাল গাজার আল–আহিল আরব হাসপাতালের সামনে
ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ দাফনের জন্য হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গতকাল গাজার আল–আহিল আরব হাসপাতালের সামনে। ছবি: এএফপি

মানসিক ক্ষত ফিলিস্তিনি শিশুদের: আতঙ্কে যাদের জীবন কাটে

ইসরাইলের বর্বর যুদ্ধে ফিলিস্তিনে বেড়ে উঠছে মানসিক মারাত্মক ক্ষত নিয়ে একটি প্রজন্ম। স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে গেছে তাদের কাছ থেকে। ঘুমাতে যেতে হয় গগনবিদারী বোমা হামলার আতঙ্ক বুকে নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে দেখে তার চারপাশে ধ্বংসস্তূপ অথবা কোনো কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে আছে। যার সঙ্গে খেলা করতো, সেই সব বন্ধুবান্ধবীদের মাথা থেঁতলে গেছে। রক্তের নদীতে যেন গোসল করেছে সে। অথবা যে পিতামাতার আদরে বড় হচ্ছিল তারা কেউ বেঁচে নেই। এসব দেখতে দেখতে এখন জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ গাজা, পশ্চিমতীরের শিশুরা। বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছে তাদের জীবন। তাই এখন আর বাঁচতে চায় না তারা। তারা মৃত্যুকে কাছে ডাকে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক এজেন্সি ইউনিসেফের গত জুনের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১২ লাখ শিশুর সবারই মানসিক সাপোর্ট প্রয়োজন। বারংবার মানসিক ক্ষতে তারা জীবনের বোধ হারিয়ে ফেলেছে। জানুয়ারিতে ইসরাইল ও হামাস যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক সপ্তাহ পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, মানসিক ক্ষত নিয়ে বড় হচ্ছে একটি প্রজন্ম।

তিনি বলেন, শিশুদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। তারা অনাহারে থাকতে থাকতে একসময় ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। অনেক শিশু আছে, তারা জন্মের পর প্রথম নিঃশ্বাস নেয়ার আগেই মারা যাচ্ছে। মায়েরা তাদের জন্ম দেয়ার আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে মা ও গর্ভস্থ শিশুকে। জানুয়ারিতে প্রথম দফা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সোমবার রাতভর আবার ভয়াবহ বর্বর হামলা শুরু করেছে গাজায়। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের পর যে বাছবিচারহীন হামলা চালিয়েছে ইসরাইল, তাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তার বেশির ভাগই নারী ও শিশু। হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র কিছুই বাদ যায়নি ইসরাইলের শ্যেন দৃষ্টি থেকে। জন্ম নিয়েই যে শিশু এমন পরিণতি দেখছে, তার কাছে জীবন হয়ে উঠেছে অর্থহীন। এ জন্য তারা এখন আর বাঁচতে চায় না। এই হায়েনার হামলার মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে তারা এখন মৃত্যুকে কামনা করে। এমনই এক শিশু সামা তুবাইল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল নিজের চেহারা দেখে। তার হাতে চিরুনি। মাথা আঁচড়াতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছে যুদ্ধের আগের আয়না। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করতে গিয়ে কেঁদে উঠছে সামা।  তার বয়স আট বছর। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের আগে তার জীবন যেমন ছিল, তা কল্পনা করে। তখন ছিল তার লম্বা চুল। বন্ধুদের সঙ্গে গাজার জাবালিয়ায় খেলাধুলায় সময় কাটতো। কিন্তু গাজা থেকে যে ১৯ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছে তাদের মধ্যে সামা ও তার পরিবার অন্যতম। ইসরাইলি সেনাদের নির্দেশে তারা প্রথমে দক্ষিণের রাফা অঞ্চলে চলে যায়। সেখানেও যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ সময় সামা ও তার পরিবার গাজার মধ্যাঞ্চল খান ইউনিসে শরণার্থী শিবিরে চলে যায়।

গত বছর চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখতে পান সামার মাথার সব চুল পড়ে গেছে। ‘নার্ভাস শক’-এর কারণে এমনটা হয়েছে। গত আগস্টে ইসরাইল বিমান থেকে রাফায় সামাদের প্রতিবেশীদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। এ সময়ই সে মানসিক ক্ষতে আক্রান্ত হয়। একে বলা হয় ‘অ্যালোপেসিয়া’। গত বছর ওয়ার চাইল্ড অ্যালায়েন্স এবং গাজাভিত্তিক কমিউনিটি ট্রেইনিং সেন্টার ফর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট এক রিপোর্টে বলে যে, গাজায় ইসরাইলের চলমান হত্যাযজ্ঞে শিশুদের মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষত করছে। বিপন্ন শিশুদের কমপক্ষে ৫০০ শিশুকে দেখাশোনা করে যারা তাদের ওপর একটি জরিপের রিপোর্টে দেখা যায়, ওই পরিস্থিতির শিকার এমন শতকরা ৯৬ ভাগ শিশু মনে করে তাদের সামনে মৃত্যু অত্যাসন্ন। প্রায় অর্ধেক শিশু বা শতকরা ৪৯ ভাগ শিশু ইসরাইলের এই নিষ্পেষণ থেকে রক্ষা পেতে মৃত্যুকে বেছে নিতে পছন্দ করে। মাথা থেকে চুল পড়ে যাওয়ার জন্য সামাকে অন্য শিশুরা ক্ষেপায়। এ জন্য সামার মানসিক ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। এমন আচরণ থেকে রক্ষা পেতে সে ঘরের ভেতরে থাকে। কখনো ঘরের বাইরে গেলে মাথায় পরে একটি গোলাপি মাথা বন্ধনী। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সিএনএনের সাংবাদিক। এ সময় তার মা ওম মোহাম্মদের কাছে সামা আর্তি জানায়- ‘মা আমি খুবই ক্লান্ত। আমি মরে যেতে চাই। আমার মাথায় চুল নেই কেন? আমি মরে যেতে চাই। আল্লাহর ইচ্ছায় বেহেশতে আমার মাথায় আবার চুল থাকবে।’ ফেব্রুয়ারিতে সে আবার একই সাংবাদিককে বলে, আমাদের বাড়িতে বোমা হামলা করা হয়েছে।

এর ভেতরে আমার ছবি, সনদপত্র সহ দরকারি অনেক জিনিস ছিল। আমার পোশাক ছিল। ছিল অনেক জিনিসপত্র। কিন্তু বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপর থেকে আমি আর এ বাড়িটি দেখতে পাই না। পরিবহন খরচ অনেক বেশি। যদি আমরা বাড়িতে ফিরে যাই তাহলে কোনো পানি পাবো না। কোথায় থাকবো তাও জানি না।

গাজায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়াও সব সময় একটি চ্যালেঞ্জ। গাজা কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. ইয়াসের আবু জামেই বলেন, ইসরাইলের ১৫ মাসের নৃশংস যুদ্ধে তার স্টাফদেরও মানসিক মারাত্মক ক্ষত হয়েছে। ফলে তারা যে অন্যদের চিকিৎসা দেবে তাও জটিল হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ স্টাফই কাজ করছেন বাস্তুচ্যুত অবস্থায়। তাদের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগেরও কমের আছে বাড়িঘর। তবু তারা এখনো কিছু আশা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবারগুলোকে তারা সমর্থন দিচ্ছেন। শিশুরা বলে, আমার বন্ধুরা বেহেশতে চলে গেছে। কিন্তু তাদের একজনকে স্টাফরা দেখতে পায়, তার মাথা নেই। একটি শিশু তা দেখে চিৎকার করতে থাকে। বলতে থাকে, তার তো মাথা নেই। তাহলে কীভাবে সে বেহেশতে যাবে?

খান ইউনিসের আল মাওয়াসি শরণার্থী শিবিরে দাদী ওম-আলাবেদের সঙ্গে বসবাস করে সাত বছর বয়সী আনাস আবু ইশ এবং তার বোন ডোয়া (৮)। ইসরাইলের হামলায় পিতামাতাকে হারিয়েছে তারা। আনাস বলে, আমি বল নিয়ে খেলছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে দেখি আমার পিতা ও মাতা রাস্তায় অবস্থান করছেন। একটি ড্রোন এলো এবং তাদের ওপর বোমা হামলা করলো। পিতামাতাকে কি মিস করো? এ প্রশ্নে নীরব নিথর আনাস। তার দু’গণ্ড গড়িয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে অশ্রু। তার মুখে কোনো কথা থাকে না। তার দাদী ওম-আলাবেদ বলেন, যে ঘটনা ঘটে গেছে তাতে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত এই শিশুরা। অন্য অনেক শিশু তাদের মায়েদের হারিয়েছে। তাদের বেদনার সঙ্গে মিশে গেছে আনাসের কষ্ট। আনাস শুধু তার পিতামাতাকে হারিয়েছে এমন নয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, আদর থেকে বঞ্চিত। সিএনএনের সাংবাদিক ডোয়ার কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সে শুধু নিজের আঙ্গুলের নখ খোঁচাতে থাকে। এর কয়েক সেকেন্ড পরেই কান্না শুরু করে। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভ্যানিয়ার ইসরাইলি মনোবিজ্ঞানী ও প্রফেসর এডনা ফোয়া আশাবাদী যে, এসব শিশুরা মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠবে। আমি এসব শিশুকে দেখেছি। তারা শুধু আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। কিছুই বলবে না। আবার তাদের চোখে কান্নাও নেই। শুধু তাদের চারপাশে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। এসব শিশুকে নিয়ে আমি অধিক পরিমাণে উদ্বিগ্ন।

বাস্তুচ্যুতদের একই শিবিরে অবস্থান ৬ বছর বয়সী মানাল জোউদা’র। যে রাতে তার বাড়ি উড়িয়ে দেয় ইসরাইল সে রাতের কথা বেশ ভালোভাবে মনে আছে তার। ওই হামলায় নিহত হন তার পিতামাতা। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মানাল। সে অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করা হবে এ আশায় অপেক্ষা করতে থাকে। মানাল বলে- আমার মুখের ভেতর ছিল বালুতে ভর্তি। তবু আর্তনাদ করছিলাম। একটি শাবল দিয়ে কেউ একজন ধ্বংসস্তূপ খনন করছিলেন। একজন প্রতিবেশী বলছিলেন, এর ভেতরে মানাল আছে। এই যে, মানালকে পেয়েছি। এ সময়ই আমি সচেতন হই। ধ্বংসস্তূপের নিচে চোখ খুলি। আমার মুখ ছিল খোলা। ফলে আরও বালু এসে মুখ ভরে যাচ্ছে।

mzamin

কেন ড. ইউনূসের জন্য লাল গালিচা নিয়ে অপেক্ষায় চীন?

আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে যাবেন। তার এ সফরে চীন লাল গালিচা বিছিয়ে  উষ্ণ অভ্যর্থনার আয়োজন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিবেশী ভারতের সাথে উত্তেজনার মধ্যে চীনের সাথে কূটনৈতিক স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা খুঁজছে।  ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেল শান্তি বিজয়ী ইউনূস গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা জানিয়েছে, ইউনূস ২৭ মার্চ চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ প্রদেশ হাইনানে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। তিনি পরের দিন বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট  শি জিনপিংয়ের সাথে সাক্ষাত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে এবং পরে খ্যাতনামা পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করবেন, সেখানে  তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হবে। ড. ইউনূসের প্রথম চীন সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। কারণ সরকার পতনের পর নয়াদিল্লি হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের আশ্রয় দিয়েছে। জানুয়ারিতে ভারত বাংলাদেশের সাথে ভাগ করা তাদের প্রায় ৪১০০ কিলোমিটার  সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ পুনরায় শুরু করে।  সীমান্তে তিন দিকেই কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হয়। এ ঘটনায় ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১২ জানুয়ারি ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।  মন্ত্রণালয় জানায়, এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ভারত পরের দিনই দাবি করে যে, বেড়া নির্মাণে সব প্রোটোকল এবং চুক্তি অনুসরণ করা হয়েছে। উত্তেজনার সর্বশেষ উৎস মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডের একটি মন্তব্য। যিনি  বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের বিষয়ে ভারতের সুরে  সুর মিলিয়েছেন। সোমবার নয়াদিল্লিতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে গ্যাবার্ড বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, হত্যা  মার্কিন সরকারের জন্য উদ্বেগের একটি প্রধান ক্ষেত্র। ইউনূসের কার্যালয় তার মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে গ্যাবার্ড  কোন প্রমাণ বা নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই মন্তব্য করেননি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বেইজিংয়ের সমর্থন ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ় করতে ফলপ্রসূ হবে।  কারণ তিনি ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের আগে বড় শক্তির কাছ থেকে বৈধতা পেতে চান। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেয়ারব্যাঙ্ক সেন্টার ফর চাইনিজ স্টাডিজের অনাবাসিক সহযোগী আনু আনোয়ার বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে তাদের অবশ্যই বেইজিংকে বোঝানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে যে, তারা একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক অংশীদার। আনোয়ার যোগ করেছেন যে, প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রাখতে পারে চীন । এক্ষেত্রে বেইজিং সতর্ক পদক্ষেপ  নিতে পারে। র শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করার সময় চীনা বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও ইউনূসের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।  

২০০৬ সালে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যায়। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য গত বছর ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ২২.৮৮বিলিয়ন মার্কিন ডলার চীনা রপ্তানি থেকে এসেছে। ২০১৬ সালে, বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এ যোগদানকারী প্রথম দক্ষিণ এশীয় দেশ হয়ে উঠেছে।  গ্লোবাল কানেক্টিভিটি প্রোগ্রামের অধীনে চীনা বিনিয়োগের একটি প্রধান প্রাপক বাংলাদেশ, যা গ্লোবাল সাউথের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বেইজিংয়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে জড়িত রয়েছে, বিশেষ করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেল।

ঢাকা এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মংলা বন্দরের সম্প্রসারণের জন্য চীনের কাছ থেকে ঋণ চাইছে।গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চীন বাংলাদেশে তার বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বকেয়া ঋণ রয়েছে। আনোয়ার বলেন, ইউনূস বেইজিংকে আশ্বস্ত করতে চাইবেন যে অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কৌশলগত সম্পৃক্ততা সুরক্ষিত রয়েছে। চীনের ফুদান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ডেপুটি ডিরেক্টর লিন মিনওয়াং বলেছেন, ইউনূস  বেইজিং সফরের সময় হাসিনার স্বাক্ষরিত কিছু চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। হাসিনা গত বছরের জুলাইয়ে চীন সফরের সময় উভয় পক্ষ ২০টিরও বেশি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেখানে বেইজিং ১ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লিন বলেছেন -'পরিকল্পিত সহযোগিতার অনেকগুলো তখন থেকে আটকে গেছে, এবং আমি মনে করি চুক্তির বাস্তবায়ন আবার শুরু করার সময় এসেছে। 'হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বেইজিং ঢাকার সাথে তার সম্পৃক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি করেছে ।

 বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন অক্টোবরে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।   এরপর থেকে ইউনূস সহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সদস্যদের পাশাপাশি সামরিক ও প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথেও তিনি দেখা করেছেন। গত সপ্তাহে, বাংলাদেশের একটি মেডিকেল প্রতিনিধি দল দক্ষিণ-পশ্চিম চীনা শহর কুনমিং পরিদর্শন করেছে। কারণ ভারত বাংলাদেশি রোগীদের জন্য তার দরজা বন্ধ করার পর দেশটি  চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে  বিকল্প অনুসন্ধান করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ইউনূসের সফরে তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

বাংলাদেশ এবং ভারত ৫৪টি নদী ভাগ করে নেয়, যার বেশিরভাগেরই উৎসস্থল  ভারত।  তাই   প্রতিবেশীদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনায় নয়াদিল্লি কিছুটা সুবিধাজনক  অবস্থানে রয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চতুর্থ দীর্ঘতম তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ঋণের জন্য চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা পরবর্তীতে নয়াদিল্লির সতর্ক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর থেকে তিস্তা প্রকল্পে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। যদিও বেইজিং বারবার এই প্রকল্পে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। পরে ভারত এই প্রকল্পটি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে। প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের মধ্যে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদাহরণ, উভয় দেশই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ইয়াসমিন বলেন, 'তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুধু কারিগরি ও আর্থিক বিষয় নয়, রাজনৈতিকভাবে  তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারত-চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি প্রধান বিরোধের  বিষয়। সুতরাং, এই বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে, এ অঞ্চলে তার কৌশলগত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন হবে।'

সূত্র: সাউথ  চায়না মর্নিং পোস্ট
mzamin

বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে উভয় সংকটে ভারত: নিক্কেই এশিয়ার রিপোর্ট

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অচলাবস্থা ভাঙতে শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিক তৎপরতা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি এর ভালো উদাহরণ হচ্ছে ইউক্রেন ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতি। হোয়াইট হাউসের অভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ক্ষোভপ্রকাশ এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ক্রমবর্ধমান সমঝোতামূলক অবস্থান। এতে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো ও নিজেদের পুনরায় সমরাস্ত্রে সজ্জিত করার পরিকল্পনা গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ হয়েছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন।

এ খবর দিয়ে নিক্কেই এশিয়া বলছে, যদিও আকারে অনেক ছোট তবু ঐতিহ্যগতভাবে বৈরী সম্পর্ক থাকা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সংলাপ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—যা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এর দুই মাস পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান প্রথমবারের মতো নিয়মিত কার্গো শিপিং রুট চালু করেছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে একটি মাইলফলক। ডিসেম্বরে সাত বছরের বিরতির পর দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। নতুন বছরেও সম্পর্কোন্নয়নের এই গতি অব্যাহত আছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফর করেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধিদল। ঢাকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে যৌথ পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার। যার প্রধান অংশ ছিল তুলা ও পাট। অর্থাৎ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে তুলা এবং বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পাট রপ্তানি করা হতো।

ফেব্রুয়ারিতে জাপান সফরের সময় দুই দেশের সহযোগিতায় অন্যান্য সম্ভাবনার ওপর জোর দেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বিশেষ করে চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন তিনি। চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে বিশাল রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কারখানার কাঠামো রয়েছে। তবুও আমাদের চিনি আমদানি করতে হয়। কারণ আমাদের নিজস্ব উৎপাদন যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানের বিনিয়োগ আমাদের বিদ্যমান কারখানাগুলোকে আধুনিকীকরণ করতে এবং বাংলাদেশের বাজারে চাহিদা মেটাতে সাহায্য করতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা অবশ্যই সেই খাতগুলোকে কাজে লাগাতে পারি, যেখানে পাকিস্তান অত্যন্ত দক্ষ।

শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন নয় বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক সামরিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফর করেন। যৌথ সামরিক মহড়া ও অস্ত্র স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা করেন তারা। একই সঙ্গে পারস্পরিক বৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থী বিনিময় এবং ঢাকায় পাকিস্তানের একজন খ্যাতনামা শিল্পীর পরিবেশনা দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।

এসকল কিছুর পরেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘ ও জটিল ঐতিহাসিক পটভূমিতে আবদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় বৃটিশ শাসিত ভারত। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নাম হয় ভারত আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পাকিস্তান নামে গঠিত হয়। নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রটি ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত ছিল। যার একাংশের নাম হয় পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান)। আর অন্য অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। এ  ‍দুই অংশকে বিভক্ত করে ভারত। পাকিস্তান সরকার যখন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রচলিত উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, তখন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। প্রধানত বাংলা ভাষাভাষীদের অঞ্চল হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। যা পরবর্তী স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যেখানে ভারত গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন প্রদান করে। তবে, পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষের গণহত্যা বাংলাদেশের মননে গভীর ক্ষোভ ও ক্ষত সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় এসে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচারের অঙ্গীকার করেন। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদানকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের ক্ষোভ থেকে উদ্ভূত গণবিক্ষোভের পর গত আগস্টে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৫ বছরের শাসনকালে তার কর্তৃত্ববাদী নীতির কারণে জনগণের ক্ষোভ ভারতের দিকেও প্রসারিত হয়, কারণ ভারত ছিল তার প্রধান সমর্থক।

ভারতের বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের জানা উচিত এমন ১০টি বিষয়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে ভারতের মনোভাবের কড়া সমালোচনা করে বলা হয়, সবচেয়ে বিরক্তিকর হলো 'তোমরা আমাদের কারণেই স্বাধীন হয়েছ' এই পুরনো বুলি। ১৯৭১ সালে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তবে এ নিয়ে অহংকার করার সময় শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি।

বাংলাদেশকে স্থিতিশীল করার দায়িত্বে রয়েছে অন্তর্বর্তী ড. ইউনূস প্রশাসন। আর তাদের সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন ভারতে পালিয়ে থাকা হাসিনা। তার সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ ইস্যু নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না করলেও, ইউনূস গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠক করেন। মিশরে অনুষ্ঠিত ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে হওয়া ওই বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সত্যিই আমাদের ভ্রাতৃপ্রতীম দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চাই। জবাবে, ড. ইউনূস সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা এবং ঢাকায় এর শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দেন।

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্ক একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। আটটি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে এটি গঠিত। যদিও সার্কভুক্ত দেশগুলো একত্রে বিশ্ব জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ অবদান রাখে। তারা বিশ্ব জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় সংস্থাটি কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। এখন বড় একটি প্রশ্ন হচ্ছে- ড. ইউনূস কেন এই মুহূর্তে ‘অচল’ প্রায় সংস্থাটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছেন। তা বুঝতে আমাদের ৪০ বছর আগে এর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেক্ষাপটে ফিরে যেতে হবে।

সার্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হচ্ছে- ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন। যদিও ভারত ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যা কার্যত একটি সামরিক জোটে রূপ নেয়। সেসময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তেমন কোনো নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছিল না। ওই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ১৯৮০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

ভারত শুরুতে এই প্রস্তাবকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসেবে ভারত বহুপাক্ষিক আলোচনার পরিবর্তে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিত। কেননা ভারত মনে করত সম্মিলিত পদক্ষেপ এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত ভারত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সোভিয়েত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। নিজের ঘোষিত নিরপেক্ষ নীতির পরেও সোভিয়েত ঘনিষ্ঠতার ছাপ এড়াতে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে সার্কে যোগ দিতে রাজি হয় ভারত। তবে সকল সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হবে এবং দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলো আলোচনার বাইরে রাখার শর্ত দেয় ভারত।

সার্কের প্রতিষ্ঠা সম্ভবত ১৯৬৭ সালে গঠিত আসিয়ান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। মূলত চীনা কমিউনিজমের প্রভাব কমাতে প্রতিরোধক শক্তি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল আসিয়ান। সেখানে সার্ককে প্রতিটি সিদ্ধান্তে ভারতের আধিপত্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সার্কের প্রতিষ্ঠাতারা সোভিয়েত হুমকি কাজে লাগিয়ে  অন্তর্ভুক্ত করলেও এতে ভারতের প্রভাব কমেনি।

সার্ক শুরু থেকেই আসিয়ানের তুলনায় এগিয়ে ছিল; এটি দ্রুত একটি চার্টার গ্রহণ করে, যা মূলত একটি আঞ্চলিক সংবিধান এবং বার্ষিক সম্মেলনকে নিয়মিত চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৫ সালে সার্ক আফগানিস্তানকে তার অষ্টম সদস্য হিসেবে যুক্ত করে এবং জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশ ও সংস্থাগুলোকে পর্যবেক্ষক হিসেবে স্বাগত জানায়।

তবে সার্ক সম্মেলনগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের কারণে ব্যাহত হয়েছে। পরিবর্তন আসে ২০১৬ সালে, যখন পাকিস্তানভিত্তিক ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষুব্ধ হয়ে মোদি পাকিস্তানে নির্ধারিত সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হাসিনাও একই সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে, সম্মেলন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয় এবং তারপর থেকে এটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

পরবর্তী সময়ে মোদি ও হাসিনা তাদের দৃষ্টি পশ্চিম থেকে পূর্বে সরিয়ে নেন এবং অন্য একটি আঞ্চলিক সংস্থা গঠনের উদ্যেগ নেন। তারা বঙ্গোপসাগর বহুমুখী প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমসটেক)-কে অগ্রাধিকার দেন। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ঢাকায় সদর দফতর থাকা বিমসটেকে দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি দেশ, পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পাকিস্তানকে এতে রাখা হয়নি।

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকোনমিজ-এর  নির্বাহী সহ-সভাপতি মায়ুমি মুরায়ামা বলেন, গত এক দশক ধরে ভারত ও বাংলাদেশ এমনভাবে তাদের সম্পর্ক পরিচালনা করেছে যেন দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের কোনো অস্তিত্বই নেই।  তিনি মনে করেন, ইউনূসের সার্ক পুনর্জাগরণের পরিকল্পনা পাকিস্তানকে আবার দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থাকে হাসিনা-পূর্ব যুগে ফিরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন ইউনূসের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, এটি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসারে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূমিকার পুনরুজ্জীবনকে প্রতিফলিত করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেকে এমন একটি শক্তি হিসেবে পুনর্গঠন করছে যা সব দেশের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। বিপরীতে নির্দিষ্ট শক্তির (ভারতের) সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতিকে সম্পৃক্ত করতে চায় না।

তবে, নয়াদিল্লির সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেসের জ্যেষ্ঠ গবেষক কনস্টান্টিনো জেভিয়ার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভারত সার্কের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হবে না, যতক্ষণ না এটি পাকিস্তানের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এটি গত প্রায় ১০ বছর ধরে ভারতের নীতি এবং এটি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা কম, যদিও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই বিষয়ে আশা ও আবেদন জানাচ্ছে।

সার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে ইউনূসের প্রচেষ্টা বিস্ময়কর, কারণ বাংলাদেশই বিমসটেকের সদর দফতরের স্বাগতিক দেশ, যা একটি বিকল্প আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা এবং যা বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত বলে মনে করেন জেভিয়ার। বলেন, তাই সার্কের ওপর এই নতুন মনোযোগ হয়তো কেবল তার আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরনো ধারণার প্রতিফলন, অথবা এটি একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা যা হাসিনার বিমসটেক-কেন্দ্রিক নীতির বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং ভারতকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল হতে পারে।

তবুও, আঞ্চলিক ব্লকগুলোর গুরুত্ব সম্ভবত বৃদ্ধি পাবে কারণ বৈশ্বিক গতিশীলতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বিশ্ব ‘ট্রাম্প ২.০’ এর অনিশ্চিত যুগে প্রবেশ করছে।

সম্প্রতি, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে জড়িয়েছে কলম্বিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত কলম্বিয়ানদের বহনকারী দুটি সামরিক বিমান অবতরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দুই দেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে ‍উঠেছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, আঞ্চলিক ব্লক, কমিউনিটি অব ল্যাটিন আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস, এই পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে আলোচনার জন্য জরুরি সম্মেলন আহ্বানের কথা বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়।

একইভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের ঐক্য পুনর্ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে আসিয়ান ছয়টি উপসাগরীয় রাজতন্ত্র দ্বারা গঠিত একটি আঞ্চলিক সংস্থা, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এই পদক্ষেপগুলো সম্মিলিত আত্মরক্ষার দিকে বৈশ্বিক প্রবণতাকে প্রতিনিধিত্ব করে।

কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও একই অঞ্চলের দেশগুলো বহিরাগত চাপের মুখে প্রায়শই একই ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধান শক্তি হওয়া সত্ত্বেও, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ লাঘব করতে বা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মোকাবিলায় সার্ককে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত অপেক্ষা করছে। যদি সবকিছু প্রত্যাশা অনুযায়ী চলে তাহলে আগামী এপ্রিলে থাইল্যান্ডে নির্ধারিত বিমসটেক সম্মেলন হবে ইউনূস এবং মোদির মধ্যে প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। তবে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে- ইউনূসের সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাবে মোদি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখান। এছাড়া মোদির ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির ভবিষ্যৎ এর ওপর নির্ভর করছে।

mzamin

যুক্তরাষ্ট্র সুপ্রিম কোর্টের বিরল বিবৃতি

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বিরল একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসী প্রত্যর্পণ বিষয়ে তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন একজন বিচারক। সেই বিচারককে অভিশংসনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর জবাবে ওই বিরল বিবৃতি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। ওদিকে সম্প্রতি ফেডারেল সরকারে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ২৫ হাজার কর্মীকে বরখাস্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন। তারা সে কথা প্রথমবার স্বীকার করেছে। তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা অবৈধ হয়ে থাকতে পারে বলে একজন বিচারক আদেশ দেন। এরপর তাদের সবাইকে চাকরিতে ফেরানোর কাজ করছে প্রশাসন।  ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে যেসব নথিপত্র দাখিল করেছে তাতে এসব কথা বলা হয়েছে। 

মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর ফেডারেল আদালতে সোমবার দাখিল করা হয় এসব ডকুমেন্ট। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, এক বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেছেন, কমপক্ষে দুই শতাব্দী ধরে এটা প্রতিষ্ঠিত নিয়ম যে, বিচারিক সিদ্ধান্তে অমত থাকায় এর বিরুদ্ধে অভিশংসন উপযুক্ত জবাব না। এর জন্য স্বাভাবিক আপিলেট রিভিউ প্রক্রিয়া বিদ্যমান আছে। উল্লেখ্য, এল সালভাদরের গ্যাং দলের সদস্যদের প্রত্যাবর্তন করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ জেমস বেয়েসবার্গ সেই নির্দেশকে সমস্যাবহুল এবং ক্ষোভের বলে অভিহিত করে তা আটকে দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে আছেন বিচারপতি রবার্টস। তিনি রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দেয়ার ঘটনা বিরল। গত বছর ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল দায়মুক্তির বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত দিয়েছিলেন রক্ষণশীল জুরিরা। কিন্তু ফেডারেল বিচারকদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আক্রমণ যখন তীব্র হয়েছে তখনই প্রধান বিচারপতি ওই বিবৃতি দিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মঙ্গলবার ট্রাম্প পোস্ট দিয়ে বিচারক বোয়েসবার্গকে আক্রমণ করেছেন। বলেছেন, তাকে অভিশংসিত করা উচিত। তিনি কিছুই জয় করতে পারেননি। ভোটাররা যা চান আমি শুধু তাই করার চেষ্টা করছি।

উল্লেখ্য, অভিশংসন প্রক্রিয়ায় ফেডারেল কোনো বিচারককে সরাতে হলে দরকার হবে অভিশংসন বিষয়ক প্রস্তাবে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ভোট। মার্কিন সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ যদি এই ভোটকে অভিযোগের পক্ষে আমলে নিয়ে ভোট দেন তাহলে তা অনুমোদিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৫ জন বিচারককে অভিশংসনের জন্য বিবেচনায় নিয়েছে মার্কিন সিনেট। এর মধ্যে আছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিও। এর মধ্যে সিনেটের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন আটজন। উল্লেখ্য,  ভেনেজুয়েলার কমপক্ষে ২০০ গ্যাং সদস্যকে হোয়াইট হাউস এল সালভাদরের হাতে তুলে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে স্থগিত করতে আদেশ দেন বিচারপতি বোয়েসবার্গ। বিচারককে আইনজীবীরা জানান যে, ওইসব মানুষকে নিয়ে বিমান উড্ডয়ন করেছে। তখন বিচারক মৌখিক নির্দেশ দেন, অবিলম্বে ফ্লাইটটিকে ফিরিয়ে আনতে। যদিও পরে লিখিত রায়ে এই নির্দেশনার কথা নেই। এমন অবস্থায় বিচারক বোয়েসবার্গ সোমবার বাড়তি একটি শুনানি আহ্বান করেন। তাতে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীদের কাছে জানতে চাওয়া হবে কেন যুক্তরাষ্ট্র ওই ফ্লাইটগুলোকে ফিরিয়ে নেয়নি। ওদিকে সরকারের আইনজীবীরা জানান, প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া মুলতবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন কোর্টের কাছে এই ঘটনার শুনানি থেকে বিচারক বোয়েসবার্গকে সরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার আগে তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল এবং সিভিল মামলা দেখাশোনা করছিলেন যেসব বিচারক, তাদেরকে অতীতে টার্গেট করেছেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি অনেক বিচারকের সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ওইসব বিচারক, যারা তার প্রশাসনিক পলিসি আটকে দিয়েছেন এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক মিত্রদের, যেমন ইলন মাস্কের বিরুদ্ধে অভিশংসনকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। আবার যেসব বিচারক তার পক্ষে কাজ করছেন বলে মনে হচ্ছে তিনি তাদের প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিয়েছেন ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ আইলিন ক্যানন। তার প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প।

mzamin

‘সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্র’ প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ by ইমরান মাহফুজ

১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার পর আবুল মনসুর ‘সংবিধানের বিধানিক ত্রুটি’ প্রসঙ্গে অসাধারণ একটি বিষয় হাজির করেছেন। তিনি লিখছেন- ডেমোক্রেসি, সোশ্যালিজম, ন্যাশনালিজম ও সেক্যুলারিজম- এই চারটিকে আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি করা হয়েছে। এর সবক’টির আমি ঘোরতর সমর্থক। কিন্তু আমার মত এই যে, এর কোনোটাই সংবিধানে মূলনীতিরূপে উল্লিখিত হওয়ার বিষয় নয়। গণতন্ত্র ছাড়া আর বাকি সবক’টিই সরকারি নীতি-রাষ্ট্রীয় নীতি নয়। দেশে ঠিকমতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই আর সব ভালো কাজ নিশ্চিত হওয়া যায়। জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সবই জনগণের জন্য, সুতরাং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য, কল্যাণকর। নিরংকুশ গণতন্ত্রই সে কল্যাণের গ্যারান্টি। গণতন্ত্র নিরাপদ না হলে এর একটাও নিরাপদ নয়। বাস্তবেও তাই। গণতন্ত্র যথাযথ চর্চা হয়নি বলে বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাদের। রাজনৈতিক দলেও গণতন্ত্রহীনতা, দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা, কখনো কখনো সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সরকারের একক কর্তৃত্ব। সংবিধান সংশোধন হয়েছে নিজেদের স্বার্থে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পতনের পর সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্র- এই ৩টি বিষয়ের আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। কারণ, বিদ্যমান সংবিধান ইচ্ছামতো ব্যবহারে স্বৈরাচার তার বৈধতা তৈরি করেছিল। এর মাঝে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থেকে ‘সংবিধান সংস্কার’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
এ প্রসঙ্গে সামনে এসেছে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও  রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে যারা রাজনীতিকে উপজীব্য করে ইতিহাস রচনা করেছেন, আবুল মনসুর তাদের প্রথম সারির একজন। তার বহুল পঠিত রচনা ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ে বাংলাদেশের ‘সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্র’ বিষয়ে অনেক অমীমাংসিত বিষয়ে মীমাংসার ইঙ্গিত রয়েছে। যা ৫৪ বছরেও সমাধান হয়নি বলে বারবার সামনে আসছে। আর সাধারণ মানুষ ‘বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নে’ রক্ত দিয়ে যাচ্ছেন।

১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার পর আবুল মনসুর ‘সংবিধানের বিধানিক ত্রুটি’ প্রসঙ্গে অসাধারণ একটি বিষয় হাজির করেছেন। তিনি লিখছেন- ডেমোক্রেসি, সোশ্যালিজম, ন্যাশনালিজম ও সেক্যুলারিজম- এই চারটিকে আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি করা হয়েছে। এর সবক’টির আমি ঘোরতর সমর্থক। কিন্তু আমার মত এই যে, এর কোনোটাই সংবিধানে মূলনীতিরূপে উল্লিখিত হওয়ার বিষয় নয়। গণতন্ত্র ছাড়া আর বাকি সবক’টিই সরকারি নীতি-রাষ্ট্রীয় নীতি নয়। দেশে ঠিকমতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই আর সব ভালো কাজ নিশ্চিত হওয়া যায়। জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সবই জনগণের জন্য, সুতরাং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য, কল্যাণকর। নিরংকুশ গণতন্ত্রই সে কল্যাণের গ্যারান্টি। গণতন্ত্র নিরাপদ না হলে এর একটাও নিরাপদ নয়।

বাস্তবেও তাই। গণতন্ত্র যথাযথ চর্চা হয়নি বলে বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাদের। রাজনৈতিক দলেও গণতন্ত্রহীনতা, দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা, কখনো কখনো সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সরকারের একক কর্তৃত্ব। সংবিধান সংশোধন হয়েছে নিজেদের স্বার্থে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচন এবং ভেঙে পড়েছে সংবিধান, বছরের পর বছর আশাহত গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা। যেন কেউ দেখার নেই!

রাজনৈতিক নেতারা স্বপ্ন দেখিয়ে কেবল ধোঁকা দিয়েছে। আর সেটার শুরু স্বাধীনতার পর থেকেই। আবুল মনসুর আহমদের কলমে উঠে এসেছে সে নির্মম সত্য। তিনি লিখছেন- ‘১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও কয়েকটি আসনে নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আবুল মনসুর আহমদের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘তিনশ’ পনের সদস্যের পার্লামেন্টে জনা-পঁচিশেক অপজিশন মেম্বার থাকলে সরকারি দলের কোনোই অসুবিধা হতো না। বরঞ্চ ওইসব পার্লামেন্টারিয়ান অপজিশনে থাকলে পার্লামেন্টের সৌষ্ঠব ও সজীবতা বৃদ্ধি  পেতো।...বাংলাদেশের পার্লামেন্ট পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের একটা ট্রেনিং কলেজ হয়ে উঠতো। আর এসব শুভ পরিণামের সমস্ত প্রশংসা পেতেন শেখ মুজিব।’

অনেক আশার নেতা কাজ করলেন হতাশার। অথচ গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম উপাদান পার্লামেন্ট নির্বাচন। আর সেটা নিয়েই বানচাল। তারা ভুলে গেছে গণতন্ত্র কেবল সংবিধানে রাখার বিষয় নয়, চর্চার বিষয়। আবুল মনসুর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন- ‘নির্বাচন জনগণের রাজনৈতিক বিদ্যালয়। নেতারা ও নির্বাচন প্রার্থী সে বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তারা ছাত্রদের সুশিক্ষার বদলে কুশিক্ষা দিবেন না। যা নিজেরা বুঝেন না, ছাত্রদের তা বোঝাবার চেষ্টা করবেন না। নিজেরা যাতে বিশ্বাস করেন না, ছাত্রদের তা বিশ্বাস করতে বলবেন না। যদি করেন, তবে তার কুফল শুধু ছাত্ররাই ভুগবে না, শিক্ষকদেরও ভুগতে হবে।’

আমাদের সর্বনাশ সেই থেকে শুরু। বিশ্বাসের ঘরেই চুরি। আর সুন্দরের চর্চা বাদ দিয়ে সংকটের রাজনীতি চর্চা করেই যাচ্ছেন নেতারা। আর যখনই প্রয়োজন হয়েছে নির্দ্বিধায় আবুল মনসুর সত্য উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদকে। তিনি প্রায় দেড় দশক আগে লিখেছিলেন- দেশের হতভাগ্য মানুষ প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে গণতন্ত্রের পাঠ নিচ্ছে বিভিন্ন গণতন্ত্রের গুরু ও ওস্তাদদের কাছ থেকে। পাঠ তারা নিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু পাস করতে পারেনি। আদু ভাইয়ের মতো একই ক্লাসে পড়ে রয়েছে। তবে অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে গণতন্ত্রের বাঙালি তালবেলামদের পার্থক্য এখানে যে স্কুল-মাদ্রাসায় ছাত্ররাই পাস বা ফেল করে, এ ক্ষেত্রে ফেল করছেন শিক্ষকেরাই বেশি (প্রথম আলো, ২রা সেপ্টেম্বর ২০১০)।
আসলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা ফেল করে; লেখক বলছেন রাজনীতির পাঠশালায় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ফেল করেছে। আবুল মনসুর আহমদের কলামে শেখ মুজিবের ফেলের নমুনা পেলাম। এই সত্য জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনার। এমন অনেক ঐতিহাসিক চিত্র পাবো তার রচনায়। বইটি ১৯২০ সাল থেকে ১৯৭০ দশকের মধ্যবর্তী সময়ের অসামান্য দলিল বলা যায়।
আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতির যাত্রা আরও অনেকের মতো শুরু হয়েছিল কৃষক-প্রজা সম্মেলনে অংশ নেয়ার মধ্যদিয়ে। পরে তারা সবাই মুসলিম লীগের রাজনীতিতে এগিয়েছেন। তবে তারা যে পাকিস্তান চেয়েছিলেন, বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মোহমুক্তি ঘটতে বেশি দেরি হলো না। আবারও সংগ্রাম লড়াইয়ের গল্প। পাওয়া না পাওয়ার রাজনীতি। কিন্তু থেমে থাকেননি আবুল মনসুর। কথা বলেছেন, লিখেছেন, সুযোগমতো প্রয়োগ করেছেন- কখনো আইনজীবী, কখনো সাহিত্যিক বা সাংবাদিক হিসেবে, আবার কখনো রাজনৈতিক হিসেবে।

যেমন রাজনীতির অভিভাবক হিসেবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেছেন। যদিও এখনো ধর্মের ব্যবহার যাচ্ছেতাইভাবে হচ্ছে। ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ শিরোনামের একটি বইয়ের পর্ব ‘ধর্ম শাসিত রাষ্ট্র, না রাষ্ট্র শাসিত ধর্ম’। সেখানে তিনি নির্মহ সত্য বলছেন। ‘যারা ধর্মের দ্বারা রাষ্ট্র শাসন করিতে গিয়াছেন, পরিণামে তাঁরা ধর্মকেই রাষ্ট্রের দ্বারা শাসন করাইয়াছেন। ধর্ম-শাসিত রাষ্ট্র সম্ভব হইলে ভালোই হইতো। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, তা সম্ভব নয়। ইতিহাসের এ শিক্ষা অগ্রাহ্য করিয়া যারা রাজনীতিতে ধর্মকে টানিয়া আনিতে চান, তারা ধর্ম ও রাজনীতি উভয়কেই অনিষ্ট করিতেছেন।’
এর কারণ কি? ব্যাখ্যা পরের অংশে দিচ্ছেন নিজেই এইভাবে- ‘ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে অনেকগুলো মৌলিক পার্থক্য আছে। তার মধ্যে প্রধান পার্থক্যটি এই যে, রাষ্ট্র চলে শক্তিতে, ধর্ম চলে ঈমানে। অর্থের সঙ্গে পরমার্থের, দেহের সাথে আত্মার, শক্তির সঙ্গে নীতির যা সম্পর্ক, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কও তাই। কাজেই যারা রাষ্ট্রের ও ধর্মের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘটাইতেই চান, তারা আসলে পাহলোয়ানের সঙ্গে ঋষি দরবেশকে পাঞ্জা লড়িতে বলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে মোহাম্মদ আলী ক্লের সঙ্গে বক্সিং লড়িতে বলেন। এমন প্রতিযোগিতা স্পষ্টতই অসঙ্গত।’

আবুল মনসুর আহমদ এ ধরনের অনেক রূঢ় সত্য উচ্চারণ করেছেন বহু প্রসঙ্গে। সমাজের বৈষম্য নিরসনে বাহাত্তরের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তার ব্যবহার যথাযথ হয়নি বলে আমাদের বঞ্চনা। কথা ছিল আইনের চোখে সবার সমতা নিশ্চিত হবে। বাস্তবে তা ঘটেনি। আর তা ঘটেনি বলে বাংলাদেশের ‘ভোটবঞ্চিত তারুণ্য’ অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেললো ৩৬ জুলাই। আষাঢ়-শ্রাবণে এমন প্লাবন দেশে আর হয়নি। এ যেন নজরুলের উষার দুয়ারে আঘাত হেনে রাঙা প্রভাত আনার ছন্দময় বিপ্লব। এইভাবে পাল্টে যায় চেনা দুনিয়া। যার পূর্বাভাস পাঠ্য বইয়ে থাকে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠশালায় থাকে না বিপ্লব। তবে ইতিহাসের পাঠ ভুলে গেলে পদে পদে হোঁচট খায় জনতা। তবে সমাজ জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে-  রাজনীতি। ব্যক্তি রাজনীতিতে যুক্ত থাকুন আর না-ই থাকুন, রাজনীতি তার পিছু ছাড়ে না।
এই প্রেক্ষাপটে চেনা রাজনীতির বাইরেও ভবিষ্যতের শাসন ও প্রশাসনব্যবস্থা নিয়ে অনেক কিছু আলোচিত হচ্ছে। কখনো গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে কখনো পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম সংবিধান পেতে সময় লাগে নয় বছর। কার্যকর ছিল মাত্র দুই বছর।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দ্রুত সময়ে সংবিধান পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালের ১০ই এপ্রিল গণপরিষদের যাত্রা। বিল গৃহীত হয়েছিল ৪ঠা নভেম্বর। কার্যকর হয়েছিল ওই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে। দুই একটি বিতর্কছাড়া গত ৫২ বছরে এই সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে ১৭ বার অনাদরে (পড়ুন নিজেদের স্বার্থে)। আবারো সংস্কার/পরিবর্তনের দাবি উঠেছে শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশক এই সংবিধানের। যে শাসন করবে, সেই শাসিত হয়েছে। এর কারণ- এই সংবিধানের অস্পষ্টতা ও পরস্পর সাংঘর্ষিক ধারা-উপধারায়।
এ প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদের বই থেকে উদ্ধৃত করে আকবর আলি খান বলেছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদের চূড়ান্ত সমাধান হলো সংবিধান গণতান্ত্রিক হতে হবে। তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনার সময়েও আমি বলিয়াছিলাম, পাকিস্তানে ইসলাম রক্ষা না করিয়া গণতন্ত্র রক্ষার ব্যবস্থা করুন। গণতন্ত্রই ধর্মের গ্যারান্টি। বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় আমি বলিয়াছিলাম, বাংলাদেশের সমাজবাদের কোনো বিপদ নাই। যত বিপদ গণতন্ত্রের, গণতন্ত্রকে রোগমুক্ত করুন, সমাজবাদ অবশ্যই সুস্থ হইয়া যাইবে।’

‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ লেখার সঙ্গে একমত পোষণ করে খান আরও বলেন, ‘আমি একটু বিস্মিত হয়ে গেছি, বেশ কিছু দিন ধরেই এ কথাগুলো বলে আসছি। আমি মনে করেছি, এগুলো আমার বক্তব্য। দেখলাম, আমি আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্যই প্রচার করছি। আমাদের সংবিধানে চারটি স্তম্ভ আছে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমার বক্তব্য হলো, যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সে দেশে টেকসইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করা সম্ভব নয়।’
এইভাবে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা আড়ালে থেকে গেছে। আলাপ হয়েছে ‘ফরজ’র পরিবর্তে ‘নফল’ নিয়ে। সংশোধনী ও তার বাতিলকরণে উচ্চ আদালত ও জাতীয় সংসদ মুখোমুখি অবস্থানে গেছে অনেকবার এবং এতে স্পষ্ট হয়েছে রাজনৈতিক বিভক্তি। বলা যায়- অমীমাংসিত রক্তের সংবিধান। আমরা যেন কয়েকটা বিষয় নিয়ে দশকের পর দশক ঘুরপাক খাচ্ছি। বেরোনোর পথ পাচ্ছি না। দুলছি সরল দোলকের নামে জটিল দোলকে।

যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের সময়েও আবুল মনসুর সংবিধান নিয়ে যথাযথ ভুল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। যার অধিকাংশ আজও অমীমাংসিত। আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বা গ্রন্থাগারে হয়নি। হয়েছিল মাঠে-ঘাটে, সংবাদপত্রের টেবিলে ও মানুষ পাঠে। বছরের পর বছর লেগে থেকে অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে।
‘কালচার’ সূত্রে আবুল মনসুর আহমদ নিজের মতো করে সমাজ রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছেন। চিন্তা করেছেন ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য সব কিছু নিয়ে এবং ওই সময়কার পরিস্থিতি বদলাতে হবে, সে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। এইভাবে ইতিহাসে স্বতন্ত্র ভাবনায় অবদান রেখে গেছেন এই রাষ্ট্রচিন্তক। আমরা আমাদের প্রয়োজনে তার চিন্তা ব্যবহার করে সংকট কাটাতে পারি। পারি তার চিন্তা চর্চায় নিজেদের ‘বেশি দামে কেনা’র সমাজ কাঠামো বদলাতে। না হলে গণতন্ত্রহীনতায় আমাদের আবারো রক্ত দিতে হবে।

mzamin

ভালবাসা, পরকীয়া ও নৃশংসতার কাহিনী

স্ত্রীর পরকিয়া প্রেমের বলি হয়েছেন ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাতের এক নৌ কর্মকর্তা। তার নাম সৌরভ রাজপুত। স্ত্রী মুসকান রাস্তোগি ও তার প্রেমিক সাহিল শুক্লা মিলে তাকে হত্যা করেন। হত্যার পর  তার মৃতদেহ ১৫ খণ্ডে খণ্ডিত করা হয়। এরপর মৃতদেহটি একটি ড্রামে রেখে সিমেন্ট দিয়ে ড্রামের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। পুলিশের তদন্তে সামনে এসেছে ভালোবাসা, প্রতারণা ও নৃশংসতার ওই গল্প।

২০১৬ সালে ভালোবেসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সৌরভ ও মুসকান। স্ত্রীর সঙ্গে বেশি করে সময় কাটানোর জন্য সৌরভ তার নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেন। তবে বিয়ে ও চাকরি ছেড়ে দেয়ার মতো আকস্মিক সিদ্ধান্ত তার পরিবার ভালোভাবে নেয়নি। এ নিয়ে বাড়িতে কলহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলশ্রুতিতে সৌরভ বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে চলে যান। ২০১৯ সালে তার স্ত্রী এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। স্ত্রী-কন্যা নিয়ে বেশ আনন্দেই কাটছিলো তাদের দিন। তবে ওই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সৌরভ জানতে পারেন মুসকান তারই বন্ধুর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিবাদ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে পৌঁছান তারা। তবে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন সৌরভ। তিনি পুনরায় নৌবাহিনীতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

২০২৩ সালে তিনি কাজের খাতির দেশের বাইরে যান। ২৮শে ফেব্রুয়ারি তাদের মেয়ের বয়স হয় ছয় বছর। মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে ২৪শে ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরেন সৌরভ। এতদিনে মুসকান ও সাহিল তাকে হত্যার  পরিকল্পনা করে। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪ঠা মার্চ মুসকান তার স্বামীর খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন। সৌরভ ঘুমিয়ে পড়লে সাহিল ও মুসকান মিলে তাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। এরপর মৃতদেহটি কয়েক টুকরো করা হয়। পরে তা ড্রামে ভরে সিমেন্ট দিয়ে মুখ এঁটে দেয়া হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো মৃতদেহটি গুম করা। প্রতিবেশীরা যখন সৌরভের বিষয়ে জানতে চান তখন মুসকান তাদের বলেন, সে পাহাড়ে গেছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ও সন্দেহ এড়াতে সৌরভের ফোন নিয়ে মুসকান ও তার প্রেমিক মানালিতে চলে যান। সেখান গিয়ে সৌরভের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ছবি আপলোড দিতে থাকেন। তবে কয়েকদিন ফোন না ধরায় তার পরিবারের সন্দেহ হয়। তারা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগ দায়ের করার পর পুলিশ মুসকান ও সাহিলকে কাস্টডিতে নেন। জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা ভেঙ্গে পড়েন এবং নিজেদের দোষ স্বীকার করেন।

mzamin

বিএনপি’র ইফতারে রাজনৈতিক দলের মিলনমেলা

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে ইফতার মাহফিল করেছে বিএনপি। গতকাল রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইফতার আয়োজনে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, নাগরিক মঞ্চ, বিএনপি’র সমমনা দল ও জোটের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।

ইফতার পূর্ব আলোচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা এবং চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠী এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তি দেশে পুনরায় গণতন্ত্রের কবর রচনা করবে। অপরদিকে গণতান্ত্রিক বিশ্বে ইমেজ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। দেশের অসম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চরিত্র সমুন্নত রাখতে চরমপন্থা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী অপশক্তিতে প্রতিহত করার পাশাপাশি গণহত্যাকারী পলাতক মাফিয়া চক্রকে যেকোনো মূল্যে বিচারের সম্মুখীন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হবে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির আগামী দিনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।

রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের সকলের চিন্তা, ভাবনা হয়তো এক নয়। আমাদের মধ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা রয়েছে, ভিন্ন দল-মত-দর্শন রয়েছে। তবে মতে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু সবাই একসঙ্গে বসেছি। এটাই আমাদের বাংলাদেশ। এটি আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতিফলন। তবে দুঃখজনকভাবে গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে দেশের শুধুমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি এসব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে নষ্ট করে দিয়েছে।  

তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাই আগস্টে বীর জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে মাফিয়া সরকার পালিয়েছে। মাফিয়া সরকারের পতনের পর সাত মাস পার হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক মাফিয়া শাসন শোষণে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য হয়তো এটা খুব বেশি সময় নয়। তবে আগামী দিনগুলোতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম কিংবা কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা জনগণের সামনে আরও স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট হলে জনমনে থাকা সকল সন্দেহের অবসান হতো।

তারেক রহমান বলেন, শুধুমাত্র একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই মাফিয়া সরকারের পতন ঘটেনি-এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও আরও চরম সত্য হয়তো একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন না করার জন্যই মাফিয়া সরকারের নির্মম পতন হয়েছিল। সুতরাং একটি নির্বাচনকে শুধুমাত্র কোনো একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করার অবকাশ নেই। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণ যার যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার সুযোগ পান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ এবং সরকার গঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সর্বোপরি, প্রতিটি সফল ও কার্যত নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চুক্তি, নবায়িত রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের মালিকানা সম্পর্ক গভীরতর হয়। রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সোচ্চার।
তিনি বলেন, বিএনপিসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দল মনে করে, সংস্কার এবং নির্বাচন উভয়টি প্রয়োজন। সুতরাং সংস্কার এবং নির্বাচনকে মুখোমুখি দাঁড় করার কোনোই প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী এবং কার্যকর করার উপায় শুধুমাত্র সংস্কারের উপরে নির্ভর করে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয় প্রতিদিনের গণতান্ত্রিক চর্চার উপরে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদরাই রাষ্ট্র এবং সরকার পরিচালনা করেন। জনগণের বিচার বুদ্ধির ওপরে আস্থাহীনতার প্রয়াস শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থাকে দুর্বল এবং প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিভিন্ন খাতের সংস্কার প্রস্তাবগুলো ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৌঁছে গেছে। আমি অনুরোধ করবো এগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মতামত দেয়ার। যাতে সবাইকে নিয়ে সামনের পথ এগোতে পারি। তিনি বলেন, আজকে আমরা অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করছি। ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশ পেলেও এখনো গণতন্ত্রের দিশা খুঁজে পাচ্ছি না। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের মূল আকাঙ্ক্ষা। ঐক্যে জোর দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এই মুহূর্তে ঐক্য অত্যন্ত প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো নিরসন করা। বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে দলের ৩১ দফা বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। গণতন্ত্রের পথে যাওয়ার বিকল্প নেই বিএনপি মহাসচিব বলেন, দ্রুত নির্বাচনের কথা পরিষ্কারভাবে বলছি কারণ জনগণের নির্বাচিত সরকার গঠন করা যায়। নির্বাচিত সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এখনো ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তার দোসররা বিভিন্ন জায়গায় রয়ে গিয়েছে। আমরা যেটা বলেছি, ফ্যাসিবাদী সিস্টেমটা পাল্টাতে হবে। বাংলাদেশের নেতৃত্ব আগামীতে যার হাতেই যাক না কেন, একটি পরিবর্তিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একটি কথা বলা হচ্ছে যে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন (ইনক্লুসিভ ইলেকশন), আমি মনে করি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার মতো, দেশের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো রাজনৈতিক দল বা পক্ষ বাংলাদেশে রয়েছে। ৫ই আগস্ট যে শক্তিকে বাংলাদেশের মানুষ পরাজিত করেছে, মুজিববাদ ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে বিতাড়িত করেছে, আগামীতে  বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি ও নির্বাচনে সেই মুজিববাদী রাজনীতির কোনো স্থান হবে না। এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, একটি বিচার প্রক্রিয়া চলমান আছে, সেই বিচারের আগে  রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রশ্নই উঠে না। আমি রাজনৈতিক দলের প্রতি এই আহ্বানটাও রাখবো যেন এই বিষয়ে আমরা একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যে আসতে পারি। আমরা সবসময় এমন এক বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছি, যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, নীতিগত পার্থক্য, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সবাই একসঙ্গে বসতে পারবো, আলোচনা করতে পারবো দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে। নাহিদ ইসলাম বলেন, যখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বসার মতো অবস্থা থাকে না, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরে যদি অনৈক্য তৈরি হয় সেখানে অরাজনৈতিক শক্তিগুলো সুযোগ সন্ধানী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, এটা হয়েছে। আমরা মনে করি এখন যে পরিবেশ, পরিস্থিতি রয়েছে সেখানে রাজনৈতিক ঐক্যটা থাকবে।

জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, আজকে বাংলাদেশ একটা পরীক্ষার মাঝে অগ্রসর হচ্ছে। ৫ই আগস্টে আমরা একটি বিশাল সফলতা পেয়েছিলাম। তার মূল ছিল সকল শ্রেণির মানুষের ঐক্য। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে একটি সুন্দর সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ার জন্য এখনো জাতীয় ঐক্যই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এই ঐক্য রেখেই যার যার জায়গা থেকে যেটি প্রয়োজন, সেটি অবশ্যই আমরা এখানে ইমপ্লিমেন্ট করার চেষ্টা করবো। জামায়াতের পক্ষ থেকে চারটি পয়েন্টে জাতীয় ঐক্যের জন্য আমি সকলের কাছে অনুরোধ জানাই। এক. বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, এখানে কোনো আপস হবে না, দুই. একটি টেকসই গণতন্ত্র, তিন. একটি ফেয়ার নির্বাচন,  চার. দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু’র সঞ্চালনায় ইফতার মাহফিলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বক্তব্য রাখেন। দোয়া পরিচালনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক।
ইফতার মাহফিলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী, জেএসডির সিনিয়র সহ সভাপতি তানিয়া রব, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান আব্দুর রকিব, বিএলডিপি’র সভাপতি  শাহদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনপিপি’র চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া যুগপৎ আন্দোলনের জোট এবং দলগুলোর নেতারাও ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি’র নেতাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিতাই রায় চৌধুরী,  শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী  শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীসহ দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা ইফতারে উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

বরিশালে তরুণকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, ৫দিনেও হয়নি কোনো মামলা

শনিবার বরিশাল নগরীর এক যুবককে ধর্ষক আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। যদিও জোর গুঞ্জন উঠেছে মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্বে পিটিয়ে হত্যা করা হয় যুবককে। লোমহর্ষক এ ঘটনার পাঁচদিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত থানায় এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। বরং একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায়। তবে নিহতের বাবা মনির হাওলাদার বলেছেন, ঘটনার দিনই থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন তিনি। এদিকে, গাছে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার পাঁচদিনেও পুলিশ মামলা না নেয়ার সুযোগে জড়িত ব্যক্তিরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত শনিবার নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের জিয়ানগরে এ ঘটনা ঘটে। দিনদুপুরে পিটিয়ে হত্যার এ ঘটনার সময় যুবক সুজনকে ধর্ষক আখ্যা দেয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের পর চার বছরের শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে থানায় একটি এজাহারও হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত দাবি করে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয় হত্যাকারীরা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তারা সুজনকে দিয়ে মাদক বিক্রির চেষ্টা করে। সুজন রাজি না হওয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার নাটক সাজানো হয়। এ ঘটনার সঙ্গে সাবেক এক কাউন্সিলর ও তার পুত্রের জড়িত থাকারও অভিযোগ ওঠে। অপরদিকে, পাঁচদিনের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে থানায় কোনো মামলা না হওয়াতে সন্দেহের বিষয়টি ক্রমশই দৃঢ় হচ্ছে। অভিযুক্তরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় খুনের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার গুঞ্জন উঠেছে।

ভিডিওতে যে চার যুবককে লাঠি হাতে সুজনকে বেধড়ক পেটানোর ছবি ছিল, ঘটনার পরপরই তারা গা ঢাকা দিয়েছে। অপরদিকে, ধর্ষণের অভিযোগকারীর ঘরেও তালা। শিশুটির মেডিকেল টেস্ট সম্পন্ন করে ২২ ধারা গ্রহণ শেষে হাসপাতাল থেকে বিদায় দেয়া হয়েছে। জানতে চাইলে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী আজাদ রহমান বলেন, ‘কাউকে পিটিয়ে হত্যার নিয়ম নেই, অপরাধ করলে আদালত বিচার করবেন। সুজনকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় পুলিশ হত্যা মামলা করে আইনি ব্যবস্থা নেবে, এখানে অপমৃত্যুর মামলা হওয়ার সুযোগই নেই। কেননা, কারা হত্যা করলো তা তো সবাই দেখেছেন।’ পুলিশ দায়িত্ব এড়ানোর জন্য হত্যা মামলার পরিবর্তে অপমৃত্যুর মামলা নিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করেন আইনজীবী আজাদ। নিহত সুজনের বাবা মনির হাওলাদার বলেন, ঘটনার রাতেই তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু ওসি বলেছেন, দাফন শেষে আসার জন্য। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে কারা পিটিয়ে মেরেছে, তা তো আপনারা দেখেছেন। ওরা প্রভাবশালী হওয়ায় আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার না পাওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আমি পুত্র হত্যার বিচার চাই।’

এ ব্যাপারে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, সুজনের মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। লাশের ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিহতের পরিবার এখনো মামলা দেয়নি। ওসি দাবি করেন, স্বজন মারা গেছে, এজন্য হয়তো বিলম্ব হচ্ছে।

mzamin

ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুর ডিপ্লোমা ডিগ্রি বাতিল

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় মেয়র একরেম ইমামোগলুর ডিপ্লোমা ডিগ্রি বাতিল করেছে। উচ্চশিক্ষা কাউন্সিলের নিয়মকানুনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে দেশটির প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) এই নেতার ডিগ্রি বাতিল করা হয়েছে। ডিগ্রি না থাকায় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা হুমকিতে পড়েছে।

মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়টি জানিয়েছে, ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুসহ ৩৮ জন ব্যবস্থাপনা অনুষদের ইংরেজি-ভাষা প্রোগ্রামে অনিয়মিতভাবে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে এই ঘটনা ঘটেছিল।

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ১০ জনের ‘স্থানান্তর’ বাতিল করা হয়েছে। আর ইমামোগলুসহ ২৮ জনের ডিপ্লোমা ডিগ্রি ‘স্পষ্ট ভুলের কারণে প্রত্যাহার এবং বাতিল করা হবে’।

ইমামোগলু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে ‘বেআইনি’ বলে নিন্দা প্রকাশ করেছেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।

ইমামোগলু বলেছেন,  ‘তারা [বিশ্ববিদ্যালয়] এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। এই ধরনের ক্ষমতা রয়েছে কেবল ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের পরিচালনা পর্ষদের হাতে।

‘যারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ইতিহাস ও বিচারের সামনে তাদের জবাবদিহি করা হবে। ন্যায়বিচার, আইন এবং গণতন্ত্রের জন্য আমাদের জাতির মধ্যে যে পিপাসা দেখা দিয়েছে সেটার অগ্রযাত্রাকে থামানো যাবে না।’

ইমামোগলুর ডিগ্রি বাতিলের সিদ্ধান্তকে নিজেদের ‘গণতন্ত্রের ওপর এক বিরাট আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছেন রিপাবলিকান পিপলস পার্টির আইনপ্রণেতা মুরাত আমির।

বিরোধী দল গুড পার্টির চেয়ারম্যান মুসাভাত দারভিসোগলু বলেছেন, ডিগ্রি বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রভাব ‘একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করার আওতা ছাড়িয়ে যায়’।

২০২৮ সালের নির্বাচন

তুরস্কের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন ইমামোগলু। আশা করা হচ্ছিল, তাঁকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রিপাবলিকান পিপলস পার্টির ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।

তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের অবশ্যই উচ্চতর শিক্ষার ডিগ্রি থাকতে হবে।

ইমামোগলু এবার নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ইস্তাম্বুলের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অনেকগুলো তদন্ত ও মামলা চলছে।

ইস্তাম্বুল শহরের কৌঁসুলির সমালোচনা করায় ইমামোগলুর বিরুদ্ধে একটি উন্মুক্ত তদন্ত চলছে। গত জানুয়ারিতে এই তদন্তের প্রশ্নের জবাব দিতে ইস্তাম্বুলের আদালতে গিয়েছিলেন তিনি। তখন নিজের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তকে ‘হয়রানি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন ইমামোগলু।

তুরস্কের উচ্চ নির্বাচন পরিষদের সদস্যদের ‘অপমান’ করার অভিযোগে ইমামোগলুকে ২০২২ সালে দুই বছর সাত মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অবশ্য এই সাজার বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছিলেন।

mzamin