Sunday, February 2, 2020

দ্বিজেন শর্মা : চিরতরুণ অমেয় মানুষ by হাসান আজিজুল হক

https://www.rokomari.com/book/author/1742/%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE
দ্বিজেন শর্মার জীবন ও কর্ম নিয়ে বিসত্মারিত বর্ণনা বা বিবরণ হাজির করার জন্য আমি উপযুক্ত মানুষ নই। তেমন উপযুক্ত দু-একজন মানুষ যে আছেন তা আমি জানি। হয়তো তাঁদেরই কেউ এই অতি গুরম্নত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করবেন নিকট ভবিষ্যতে। আমি তাঁর সঙ্গ পেয়েছি নিতামত্ম স্বল্পকালের জন্য; কিন্তু তাতেই তিনি আমার ঘনিষ্ঠতম দু-চারজন মানুষের মধ্যে একজন হয়ে গেছেন। এটা কিন্তু সম্পূর্ণ আমার দিক থেকে – হতে পারে তাঁর দিক থেকে নয়। তবে ভালোই জানি যে হৃদয় নামক অবস্ত্তক মহাবস্ত্তটির পরিসরের কোথাও কোনো সীমানা টানা নেই। আর সেজন্যেই তাঁর ধারণক্ষমতারও সীমা নেই। হৃদয়ের বেলায় পূর্ণ আর শূন্য একসঙ্গেই চলে। হাতে কিছু রাখার দরকার হয় না। দ্বিজেন শর্মার কথা মনে এলে এ রকমই মনে হয়।

একটু আগেই বলেছি, যে কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করার সংকল্প নিয়ে প্রথম যৌবনেই তিনি বাংলাদেশের উন্মুক্ত প্রকৃতির কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তারপর থেকে কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ কখনই পরিত্যাগ করেননি আর দিগমেত্মরই দিকে এগুলে যেমন তা ক্রমাগত পিছিয়ে যেতেই থাকে আর শেষ পর্যমত্ম অধরাই থেকে যায়, তাঁকে জিগ্গেস করতে ইচ্ছে হয়, মীনচক্ষু কি ভেদ করতে পেরেছিলেন? প্রায় শতবর্ষব্যাপী অনুসন্ধানের ফলে যে ঐশ্বর্য লাভ করেছিলেন, তাতে কি তৃপ্ত হতে পেরেছিলেন? বেশিরভাগ পিপাসার অমত্ম মেলে, কেবল জ্ঞানপিপাসারই অমত্ম মেলে না। কিন্তু আমরা কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে, যা পেয়েছি তাতেই আমাদের প্রত্যাশার ঘট পূর্ণ হয়েছে। আপনার হাতের প্রজ্বলমত্ম মশালটি নিয়ে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাবে আপনার পরের প্রজন্মের তরম্নণরা।

ওই মশাল হাতে নেওয়ার সাধ্য আমার নেই। আমি অতি অল্পকালের জন্য মানুষটির ঘনিষ্ঠসঙ্গ লাভ করেছিলাম মাত্র। এইটুকুই  আমার সম্বল – যেটুকু লিখছি তার সবটাই ওই জমা পুঁজিটুকু ঘিরে। এই লেখা কাজেই হয়ে যাবে ওই সামান্য সঞ্চয়নির্ভর। স্মৃতি মন্থনের মতোই।

প্রথম পরিচয় কবে? সেই স্মৃতিকথা দিয়েই তাহলে শুরম্ন করি।

বাসার দোতলার চৌকাঠটি পার হতেই আপনার কণ্ঠ। পরিচয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো, কতদিনের সুহৃদের সঙ্গে কথা বলছি। একবারও, একটুও আড়ষ্টতা আসেনি। মনে হয়নি, এইমাত্র আপনি, আপনার পরিবারের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। এমনি করেই কাছে টেনে নিয়েছিলেন আপনি। যেমন অনেককেই নেন, তেমনি আমাকেও। মানুষ নয়, আপনি বুকে টেনে নেন সমগ্র বিশ্বকে। আপনার মধ্যে গভীর মায়া। গাছপালা, নদী, পুকুর, পাখি, সবুজ বনানী সবই আপনাকে চিরকাল মুগ্ধ করে এসেছে। বোটানির অধ্যাপক ছিলেন, পরে সেটাই আপনার এক রকম নেশা হয়ে উঠেছিল।

তখন আপনি কাজ করছিলেন বাংলাদেশে বৃক্ষ, লতা, গুল্ম কত রকম আছে, কোথায় আছে, সেসব নিয়ে। গিয়েছিলেন একবার খুলনাতে। সকালবেলা উঠে আমরা দুজনে চলে যেতাম রূপসা নদীর ওপারে, বিলের ধারে। কাদা, জল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আপনি নেমে পড়তেন। ‘কারা’ না কী সব সংগ্রহ করতেন সেটা আমি জানি না। এসব সংগ্রহ করতে করতে কত কথা! প্রকৃতি, আগেকার বাংলাদেশ।

বাগেরহাটে যাবার পথে হঠাৎ মাঠের মাঝখানে খুব নির্জন জায়গায় বিশাল একটা দিঘি দেখা গেল। তার বাঁধানো ঘাটটা তখনও অটুট। হঠাৎ এখানে এই নির্জন জায়গায় কারা তৈরি করে দিয়েছিল এই বাঁধাঘাট, কারা এখানে এসেছিল – কত কথা! আমিও বলতাম, আপনিও বলতেন। আপনার কথা শুনতে আমার ভালো লাগত। আপনার সেই উচ্চকণ্ঠে হাসি এবং কথা।

একবার রিকশায় চড়ে নদীর দিকে যাচ্ছি। আমি যখন ভাড়া দিতে যাচ্ছি – তখন আপনার সেই একই কণ্ঠ : ডোন্ট ট্রাই টু স্পেন্ড মানি। কী জানি, ধমক দিয়ে অত ভালোবাসার সঙ্গে আমাকে কেউ কখনও ওভাবে কোনো কথা বলেছে কি না।

একবার আমরা ডেমরা চলে গেলাম। সেখানে একটা নৌকো নেওয়া হলো। তখন যন্ত্রচালিত ছোট ছোট নৌকো পাওয়া যেত। তেমন একটা নৌকোয় উঠে আমরা শীতলক্ষ্যা উজিয়ে প্রায় ছয় মাইল দূরে এক জায়গায় নামলাম। জায়গাটার নাম মুগদাপাড়া। খুব পুরনো, পরিত্যক্ত, নির্জন, খাঁখাঁ করা রাজপুরী। আপনি বললেন, আমরা বেরিয়েছি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। সেই যে দুই খ– তাঁর উপন্যাস। পরবর্তীকালে আপনি বলেছিলেন, কেবলই প্রকৃতির বর্ণনা, এখন ক্লামিত্ম লাগে গো। তখন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে আমরা দুজনেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। মনপুরায় নামলাম। রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ নির্জন কক্ষগুলোতে ঘুরে বেড়ালাম। দরদালানে গেলাম। অতীতের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। কালকে আমরা নিরবধি বলি, সেটাই ঠিক। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ – আমরাই বসে বসে ভাগ করি, হিসেব করি। কিন্তু এটা তো আমাদের করা, সময় তো অফুরান। সে তো টানা বয়ে চলেছে, বয়ে যাওয়াটাই তো সময়। আমরা আছি তাই সময়ও আছে। আমরা মনে রাখি, তাই ভুলে যাই।

সেই মুগদাপাড়া, অতীতের গন্ধমাখা, ভেঙেপড়া রাজবাড়ি! তা থেকে আমার অনেক গল্পের পরিবেশ আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি এরকমই এক বাড়ির ভেতরে স্থাপন করেছিলাম এ-দেশের আটকেপড়া এক হিন্দু পরিবার। নাম দিয়েছিলাম ‘খাঁচা’। ‘খাঁচা’ এখন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রূপামত্মরিত হয়েছে। কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় নাকি ওই বাড়ির জামাই ছিলেন।

আপনার সঙ্গে যখন গিয়েছিলাম মনে করলে দেখি – প্রথমে একটা দিঘি, অজস্র বড় বড় গাছ। তারপরে ভাঙা ঘরগুলো, সাপখোপে ভরা। প্রাণভরে আমরা ঘুরে বেড়ালাম নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। মনে হলো না যে, ওখানে কোনো জনবসতি আছে। পেটে কিছু পড়লও না, সঙ্গে বিস্কুটমতো কিছু ছিল। তারপরে ডেমরায় ফিরে এলাম। আপনি বললেন, হাসান, এখনও তো অনেকটা সময় আছে। বাড়ি যাবে? আমি বললাম, আমার তো তেমন ইচ্ছে নেই। যদি মনে করেন তো যাব। আর যদি বলেন অন্য কোথাও যাওয়া যাক তাহলে তাই হবে। আপনি বললেন, তো চলো কমলাপুর স্টেশনে। এ যে এক অদ্ভুত সময় নষ্ট করা বা সময়কে সত্যিকার ব্যবহার করা! তারপর আমরা চলে গেলাম পুবাইলে, নাগরীতে। আপনি যে কলেজে পড়াতেন, নটর ডেম কলেজ, সেখানের নিম্ন শ্রেণির সবার সঙ্গে আপনার ছিল গলায় গলায় ভাব। তাঁরা অনেকে খ্রিষ্টান হয়েছিলেন।

আমরা পুবাইল স্টেশনে নামলাম। একটু এগিয়ে এসে একটি ঘাট থেকে নৌকায় চড়লাম। এক-দুই ঘণ্টা পরে আমরা আর একটি ঘাটে পৌঁছলাম। সেখান থেকে হেঁটে নাগরী। তারা শুয়োরও পোষে। শুয়োরগুলো সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবুও আপনার কোনো বিকার ছিল না, আমারও ছিল না। সেখানে অন্ন গ্রহণ করতে আপনার বাধেনি, আমারও বাধেনি। তারা আমাদের কী খেতে দিয়েছে আপনিও জিজ্ঞাসা করেননি, আমিও জিজ্ঞাসা করিনি।

আপনারা নাকি একাত্তর সালে ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাই কিছু পুরনো পরিচিত মানুষ আপনার ছিল। তেমন দু-চারটে বাড়িতে গেলেন। তাদের সঙ্গে গল্প করলেন, কুশল জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। সেখান থেকে আমরা গেলাম বিশাল একটি গির্জায়। সারাদিন কাটালাম। মনে হয়, সন্ধ্যার দিকে চলে এলাম। এ অবিস্মরণীয়, ভুলতে পারব না কখনও। আর এরকম করতে করতে মানুষ হিসেবে আমি বদলাচ্ছি, গ্রহণেচ্ছু মানুষে পরিণত হচ্ছি। আমার অতীত, আমার বাল্যকাল সেও তো এরকমই বিশাল গ্রামবাংলার সঙ্গে মিশে রয়েছে। অখ- বাংলা আমরা আর অর্জন করতে পারিনি।

নাগরীতে গিয়ে অনুভব করেছি, মানুষ মানুষের কতটা কাছে আসতে পারে। আপনি শিখিয়েছেন, কী করে অতিক্রম করতে হয় সমসত্ম প্রাচীর এবং দেয়াল। শিখেছি, দ্বিজেনদা, আপনার কাছ থেকে শিখেছি। কিছুটা তো শিখেছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এখন মনে হয়, এমন মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় তো ঘটেছিল। এখন আর কাছে যেতে পারি না, কাছে আসতে পারি না। প্রকৃতির নিয়ম কাজ করছে নির্মমভাবে। আপনার ওপরে কাজ করছে, আমার ওপরেও কাজ করছে। জীবন যথেষ্ট দীর্ঘ নয়, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। তারাশঙ্করের সেই উক্তি মনে পড়ে, জীবন এত ছোট কেনে? নববই-তিরানববই বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। শেষের দিকে একটা ইজি চেয়ার চওড়া বারান্দায় পেতে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে উনি চুপ করে বসে থাকতেন। আমরা দৈনন্দিন জীবনযাপন করছি, ছুটছি, বাবা খুব কম কথা বলতেন। মেজাজি মানুষ ছিলেন। একদিন কানে এলো, তিনি আপন মনেই বলছেন, কত ছোট এই জীবন! তখন আমরা তো যৌবনের উত্তাপে মাতোয়ারা। কথার কোনো অর্থই আমরা বুঝিনি। কথা আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝি বলি বটে, কিন্তু সত্যি সত্যি বুঝি না। একে বোঝা বলে না। তারাশঙ্করও এভাবে বলেছিল – হায়, জীবন এত ছোট কেনে?

আলো ক্রমে কমিতেছে। কমলকুমার মজুমদার লিখেছেন না – আলো ক্রমে কমিয়া আসিতেছে। আমাদেরও তাই। আমাদেরও এখন অপরাহ্ণ, গড়িয়ে পড়েছে সূর্য। আপনার বয়স আমার চেয়ে বেশি। তবু এখনও আপনি আছেন। তখনও এখনও মনে হয় তুমি আছ, আমি আছি। স্বর্গ খেলনা তো এ ধরণীতে গড়া উচিত নয়, সুখে-দুঃখে, প্রহারে জর্জরিত হতে হতে জীবন কাটাতে হয়। তবু মনে হয়, এর চাইতে আর বেশি চাইবার কী আছে? এর পেছনটা অন্ধকার, সামনেও অন্ধকার। এইটুকুই হাতে আছে, এই আলো-অন্ধকারে ভরা জীবন। কথার শেষ হবে না দ্বিজেনদা।

সেই সময়ে আপনি আমার কাছে চিঠি লিখেছিলেন। কেন জানি না, সেই চিঠিটা আমার পুরনো একটা ডায়েরির ভেতরে খামখোলা অবস্থায় রয়েছে। তারিখও দেওয়া আছে, দেখলেই মনে পড়বে। এই চিঠিতে আপনি ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ পড়ে ভালোলাগার কথা জানিয়েছেন। তবে সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের কথা বলেছিলেন, কারো কারো লেখা পড়া যায় না। কোথাও বলেছিলেন, হাসান, সাহিত্যের নামে এরা জোচ্চুরি করে। সেই চিঠির শেষে লেখা আছে – চিরদিনের দ্বিজেনদা।

আমি স্মৃতি নিয়ে বসলে তার অমত্ম থাকবে না। একটা জায়গায় থামতেই হবে। এবং সেটা যে কোনো জায়গায়। তখন আপনি প্রায় ৮৬-তে পা দিয়েছেন। শরীর দুর্বল, বেরোন না, টেলিফোন রিসিভ করে কথা বললে হাঁপিয়ে ওঠেন। মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। এই যে ঢাকায় এলে আপনার বাসায় যেতাম না, এটা তো কল্পনা করতে পারতাম না। তখন কেবল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনিও কিসের আকর্ষণে যেতেন। আর আমি রাত ১১টা কি ১২টার সময় গুণের সঙ্গে বের হয়ে সমসত্ম রাসত্মা কেবল হেঁটে বেড়াতাম। হাঁটা ছাড়া আমাদের আর কাজ ছিল না। তখন ফিরে গেলে বৌদি বলতেন, খাওয়া তো হয়নি। তখন নির্মলেন্দু বলতেন, না, এখানে আমার আর আসা হবে না। আসলে আপনার সঙ্গে আমার হাঁটা হবেই হবে। আর না খেয়ে ওখানে গেলে বৌদি ভাববে – এখান থেকে খেতে এসেছে। শুনে বৌদি তো হেসেই কুটি কুটি। এত হাসি। তিনি আবার দর্শন পড়ান। এত হাসেন কীভাবে? দর্শনের গাম্ভীর্যভরা কান্ট-হেগেল নিশ্চয়ই পড়াতেন। এমনি আরো কত স্মৃতি। কখনও কখনও জ্যোতিপ্রকাশ থাকত। আমাদের তো আড্ডাই হয়ে যেত। আমি ঢাকায় গেলে আর কোথাও যেতাম না। কিন্তু আপনার ওখানে যেতে লজ্জা করতাম না, সংকোচ করতাম না।

আপনি আমাকে বলেছিলেন, আমাকে যদি নিয়ে যায় তাহলে রাজশাহী ভার্সিটির প্রাকৃতিক পস্ন্যানটা আমি তৈরি করে দিতে পারি। আমি ওদের বলেছিলাম, কারো কোনো আগ্রহ দেখিনি। আপনাকে কত কী ব্যবহার করল দেশ, আমি জানি না। একটা সময় চলে গেলেন রাশিয়া। ভালোই হয়েছিল ব্যক্তিগত জীবনে। সেখানে গিয়ে প্রচুর কাজ করলেন, অনুবাদ করলেন। হার্টের ওপর লেখা একটা বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন, এখনো মনে আছে। আরো বই আমাকে দিয়েছিলেন, মৌমাছি পালনের ওপরে। দিয়েছিলেন লেপার্ড, ইতালিয়ান এক লেখকের উপন্যাস। এলোমেলো কত কথা মনে পড়ছে দ্বিজেনদা।

‘চলো আমরা এক সঙ্গে থাকা শুরু করি’ -‘প্রিয়তির আয়না’ বই থেকে

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তী। বাংলাদেশী মেয়ে। বড় হয়েছেন ঢাকায়। পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। পড়াশোনার সঙ্গে জড়ান মডেলিং-এ। নিজের চেষ্টা আর সাধনায় অর্জন করেন মিস আয়ারল্যান্ড হওয়ার গৌরব। নিজের চেষ্টায়ই বিমান চালনা শিখেছেন। ঘর সংসার পেতেছেন আয়ারল্যান্ডেই।
নানা উত্থান পতন আর ঝড় বয়ে গেছে। নিজের বেড়ে উঠা, প্রেম, বিবাহ বিচ্ছেদ, মডেলিং, ক্যারিয়ার, প্রতারণা সব মিলিয়ে টালমাটাল এক পথ। প্রিয়তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার নানা বিষয় নিয়ে প্রকাশ করেছেন আত্মজীবনী-‘প্রিয়তীর আয়না’। বইটিতে খোলামেলাভাবে নিজের বেড়ে ওঠা আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নানা দিক তুলে ধরেছেন। এ বইয়ের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো মানবজমিন এর সৌজন্যে। দ্বিতীয় পর্ব-
আয়ারল্যান্ডে আমার প্রথম চাকরি ছিল মাইক্রোসফট কোম্পানি। সবাই নিশ্চয় চেনেন এই প্রতিষ্ঠানকে। সত্যিকার অর্থে ওটা আমার জন্য একটা দারুণ চাকরি ছিল। আসলে চাকরির কল্যাণেই বলি আর যে কারণেই বলি ওই সময়টাতে আমার জীবনটা একটু স্থির হয়েছিল। তুমুল ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে হঠাৎ কিছুদিনের জন্য গভীর সমুদ্র যেমন শান্ত হয় অনেকটা সে রকম শান্ত হয়েছিল আমার চারপাশ। এই শান্ত থাকার কারণেই আমি আরেকটা চাকরি করার সুযোগ পাই। সুযোগ বলা যাবে না, বরং বলতে হবে সময়টুকু পাই। সপ্তাহের একদিন মানে রোববার কাজ করতাম ডাবলিংয়ের একটা রেস্তোরাঁয়। ওইদিন একটু কষ্ট হতো। কিন্তু বাকি ছয় দিনই ভালো যেত। সঙ্গে চলত পড়াশোনা। আসলে বিদেশের মাটিতে পড়াশোনা করা কতটা কঠিন ও ঝক্কির সেটা দেশ থেকে মানুষ আন্দাজ করতে পারে না। এখানে তেজপাতার মতো টাকা খরচ করতে হয়। দেশে পড়ে থাকা মা সেই খরচের কতটাই বা বহন করতে পারবে বা পারত তার খবর একটু রাখার সুযোগ পেতাম না। ছুটির দিনে কাজ করলে যা হয়, নিজেকে সময় দেওয়া যায় না। মোটকথা ব্যস্ততা আমাকে দেয় না অবসর।
এই ব্যস্ততার মধ্যেই একজন অবশ্য রয়ে যায় আমার জন্য। যার জন্য তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও আমাকে একটু ফুরসত বের করতে হয়। আমি বিবেকের কথা বলছি। আমাদের দেখা একটু কম হলেও সপ্তাহে একদিন ঠিকই দেখা হয়।
বুঝতে পারি দিন দিন বিবেকের দাবি তৈরি হচ্ছে আমার ওপর। দিনে দিনে সেই দাবি বড়ও হচ্ছে। অধিকার জন্ম নিচ্ছে। আমি টের পাই। অনেক কিছু না বুঝেও এরকমটা মনে হয়। অথবা আমিই সম্ভবত চাইছিলাম আমাকে কেউ অধিকার করুক। কেউ একজন আমার ভেতরটা পড়–ক। সেই অধিকারের জোরে আমার সকল কাজের সাক্ষী হয়ে উঠছে ও। আমার মনে হচ্ছে একজন নির্ভরতার মানুষ পেলাম। যাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে হয়তো। অথবা নাও যাওয়া যেতে পারে। সেই বাসা বদলের সাক্ষী হয়ে থাকল একমাত্র বিবেক। সাক্ষী না শুধু, আমার যাবতীয় কিছু নিয়ে নতুন বাসা অবধি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল সে। দায়িত্ব ঠিকঠাক পালনও করেছে। একটুও অবহেলা করেনি। শুধু তাই নয়, সময়ের আগেই আমাকে পৌঁছে দিয়েছে জায়গা মতো। আর বেচারা শুধু পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি। আমাকে গুছিয়েও দিয়ে গিয়েছে।
একটা কথা বলা হয়নি, যেদিন বিবেক প্রথম শোনে আমি বাসা বদল করছি সেদিন সে কি তার কান্না! একটা ছেলে এই ভাবে কাঁদতে পারে আমার জানা ছিল না। ছোটবেলা থেকে শুধু ছেলেদের পৌরুষত্ব আর হুঙ্কার দেখে এসেছি। সেটা যেমন আমার ভাইদের দেখেছি তেমনি বাইরের ছেলেদেরও। কিন্তু! কান্না আজ অবধি দেখা হয়নি। তাই আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। নিজেও কখন ওর কান্নার সঙ্গে মিশে গিয়েছি বুঝতেই পারিনি। যখন পেরেছি তখন আমার চোখ ভিজে গিয়েছে। হৃদয় ভিজে গিয়েছে। প্রশ্ন করতে পারেন ওই ছেলেটি কেন কাঁদল কিংবা আমি? আমি তো আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিংয়েই আছি। একই শহরে আছি। বিচ্ছেদ তো হয়নি, শুধু বাসাটাই বদল করছি।
কান্না থামার পর বুঝতে পারলাম আসল রহস্য। আগে বিবেক আর আমার বাসা ছিল হাঁটা পথের দূরত্ব। কিন্তু এখন হয়ে যাচ্ছে অনেক দূর। বাংলাদেশের হিসাবে ফার্মগেট থেকে উত্তরা। এই দূরত্বটুকু সে মেনে নিতে পারছে না। আগে চাইলে হুট করে দেখা করতে পারত। কিন্তু এখন চাইলে সেটা সম্ভব না। এখন চাইলেই এই একটু বের হও তো কফি খাই, বলা যাবে না। অল্প সময়ের ব্যবধানেই দুজন একে অপরকে দেখতে পেতাম। কাজ শেষ করে এসেই দাঁড়িয়ে থাকা যেত। কিন্তু এখন তো সেটা হবে না। হয়তো সপ্তাহের ছুটির দিনে দেখা করা যাবে। সে দেখায় কি আমাদের মনের তেষ্টা মিটবে। কিসের সেই বাঁধন? মায়ার, নাকি অন্য কিছু?
দ্বিতীয় দফায় বিবেক আবারো কাঁদল, কান্নাকাটি শেষ করে ওই আমাকে নতুন বাসায় তুলে দিল। কিন্তু নতুন বাসায় উঠে বুঝলাম কি ঘটনাটাই না ঘটতে যাচ্ছে আমার জীবনে। অনেক দিন কারও সঙ্গে আমার ঘর বা বিছানা শেয়ার করা হয়নি। কিন্তু এখন থেকে করতে হবে। এটা ভাবতেই কেমন অদ্ভুত অনুভূতি শুরু হলো। কিন্তু কিছু করার নেই। শুরু করলাম যৌথবাস। তাও বাঙালি কারও সঙ্গে না, একেবারে মালয়েশিয়ান একটা মেয়ের সঙ্গে।
মেয়েটি ভালো। এক জায়গায় কাজ (রেস্তোরাঁ) করার কারণে সম্পর্কটাও সহজ। কিন্তু ভয়ঙ্কর রকমের নাক ডাকার অভ্যাস আছে। প্রতি রাতে আমার ঘুমের ১২টা বাজিয়ে দিয়ে সে ঠিকই দিব্যি ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু আমি পারি না। সারারাত জেগে থাকি। মাঝ রাতে একটু ঘুম হলেও সেটা পরিপূর্ণ হয় না। মেয়েটি একদিন আমাকে বলল, ‘তুমি যে ঘুমাতে পারো না নাক ডাকার কারণে, তাহলে বিয়ের পর কি করবে স্বামী যদি নাক ডাকে, বিয়ে করো না সারাজীবন তাহলে, হা হা হা।’ ঝুঁকে এসে আমি তাকে বললাম, ‘স্বামী আর ওই মালয়েশিয়ান মেয়ে কি এক জিনিস হলো।’ ও হেসে মাথা কাত করে বলল, তা ঠিক, তা ঠিক!
এই বাড়িতে আরও একটা ঝামেলা বুঝতে পারলাম ওঠার কয়েক দিনের মধ্যেই। আমার কলিগের মানে যে মেয়েটার সঙ্গে উঠেছি তার বড় বোন ও দুলাইভাই আমাদের সঙ্গেই থাকেন। দুলাভাইটা আবার বাংলাদেশি। অনেক বছর আগে এ দেশে এসে মালয়েশিয়ান মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছে। দুলাভাই ও তাঁর স্ত্রী খুবই পরহেজগার। নামাজ, রোজা এমনকি যাবতীয় ধর্মীয় আচার-আচরণে তারা সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সমস্যা একটাই। দুলাভাই প্রায় রাতেই তাঁর স্ত্রীকে মারধর করেন। ছোটখাটো ভুল হলেই দুলাভাইয়ের হাত আর বোনের পিঠ এক জায়গায় হয়ে যায়। কঠিন অবস্থা। এটা প্রতিদিন সহ্য করা যায় না। দু’একদিন হলে মেনে নেওয়া যেত সম্ভবত। আমিও নিতে পারি না। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো হাজার মার খেয়েও স্ত্রী কোনো প্রতিবাদ করে না। আমি যে মেয়েটির সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাই সেও দেখি নীরব। কি তাজ্জব ব্যাপার। এত পতিভক্ত নারী আমি আগে দেখিনি। ব্যাপারটা এমন, বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে বউ পেটানোর একটা লাইসেন্স পেয়েছে ভদ্রলোক। তাই যখন খুশি তখন পেটানো যায়। আমার খুব অস্বস্তি লাগে। কি করা যায় ভাবতে থাকি।
একদিন বিবেকের সঙ্গে আলাপ করি এসব নিয়ে।
এখানে মনে হয় বেশিদিন থাকতে পারব না?
কেন?
ও খুবই চিন্তাযুক্ত চোখে তাকায়।
একটা মানুষ এত বউ পেটাতে পারে যে, ওই বাসায় না থাকলে জানতাম না। মানে কি?
ভদ্রলোক প্রতিদিন বউকে মারে। সেই মার আর বউয়ের চিৎকার কোনোটাই আমি নিতে পারব না। খুব কষ্ট হয় আমার। কিছু বলতেও পারি না। সহ্যও করতে পারি না। কিন্তু ওই মারধর যে আমাকে আমার পুরনো প্রেমিকের কথা মনে করিয়ে দেয় তাও মুখ ফুটে বলতে পারছি না।
সে উল্টো জানতে চায়, আমি কিছু বলি কিনা। তার দাবি ওই ভদ্রলোকও তো বাংলাদেশি।
আমি বলেছিলাম। ওই ভদ্রলোক উত্তর দিয়েছে, আমার বউ আমি পেটাই তাতে কার কী! অন্য কারও বউ তো আর পেটাই না। আপনি আপনার নিজের কাজ করেন। তাই তো! কি করবে এখন? উত্তর দেয় ও।
বুঝতে পারছি না। মাত্র উঠলাম। এখনই ছেড়ে দেওয়াটা কেমন দেখায়।
-সেটাও তো ঠিক। কি করব বুঝতে পারছি না। নতুন বাসা দেখব?
-দেখ, বাট বাসা পাওয়া তো কঠিন। আশপাশে হলে ভালো হয়।
-আমি বলি কি...। না থাক।
-কি বলুন। শুনি। (আমি তখনও বিবেককে আপনি করে সম্বোধন করি)
-না থাক আরেক দিন বলব। আজ যাই দেখ আর দু’একদিন। বেশি সমস্যা হলে থাকার দরকার নাই।
-কি যেন বলতে চাইলেন, বলুন।
আজ না কাল বলব।
বিবেক উঠে চলে যায়। ও একটু এরকমই, সেটা আমি জানি। হুট করে কিছু বলতে চেয়ে বলবে না। আবার মনে করে পরদিন ঠিকই বলবে। এ কারণে বিবেকের ওপর অত জোর খাটাই না। আমি জানি যে ও বলবেই। বিবেককে বিদায় দিয়ে আমি বাসায় আসি। এসে দেখি একই অবস্থা। সেদিন কোনো রকম খেয়ে শুয়ে পড়ি। আজি আগেই শুয়ে পড়লাম। না মানে, শুয়ে পড়ার ভান ধরলাম।
আমার ছুটির দিন, বিবেকের সাথে দেখা করার কথা, সমুদ্র দেখতে যাব এক সাথে। ওইদিন আমার প্রথম সমুদ্র দেখা। কী অদ্ভুত, শহরের এত কাছে সমুদ্র। কিন্তু এতদিন আসা হয়নি। নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগে আমার। বিবেক আমার হাত ধরে। দুজন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়াই। কী যে ভালো লাগে। মনে হয় আমাদের কোনো দুঃখ নেই, কোনো কষ্ট নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। আমরা যুগ যুগ ধরে এই সাগরের পাড়ে বসে আছি। আছি তো আছিই। মনে হয় আমরা দু’জন আমাদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট ফেলে দিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের অতল জলে। মিশে যাচ্ছে সাগরের নোনা জলের সঙ্গে। অনেকক্ষণ হাত ধরে বসে থাকি দু’জন। এর মধ্যে সমুদ্রে ডুবে যায় লাল সূর্য।
ফিরতে হবে আমাদের। ফেরার আগে বিবেক আমার সঙ্গে বাসার বিষয়টি নিয়ে কথা বলে।
আচ্ছা, কিছু ভাবলে?
কিসের?
বাড়ি ছাড়ার।
ছেড়ে দিয়ে কোথায় উঠব। এখনও তো কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।
একটা কাজ করলে কেমন হয়?
কি?
চলো আমরা দু’জন এক সঙ্গে থাকা শুরু করি। এখানে তো অনেকেই থাকে।
ওর কথা শুনে থমকে যাই। এক সঙ্গে! ও আর আমি! সম্ভব?
কি উত্তর দেব? কি বলব। ওর সঙ্গে থাকলে তো ভালোই হয়। আমি আমাকে কেয়ার করার মতো কাউকে পেতাম। আমাকে ভালোবাসার মানুষটা সারাক্ষণ পেলাম। আমি হ্যাঁ-না কিছুই বলি না। আমার নীরবতা দেখে ও চুপচাপ হয়ে যায়। এই প্রস্তাবের পর এবং সারা বিকেল আমাদের খুব বেশি কথা হয় না। বাসায় চলে আসি।
সেই রাতে সারা রাত আমার ঘুম হয় না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করি। দুই চোখের পাতা এক করতে পারি না। আমার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়। সারারাত আমার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খায়। সম্ভব? কোনো ঝামেলা হবে না তো? ততক্ষণে আমার ছোট মাথাটা একটু কুয়ো হয়ে যায়। সেই কুয়োর মধ্যে বালতি ফেলে দেওয়ার মতো চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছেও। আমরা কি একসঙ্গে থাকব তাহলে? কি হবে থাকলে? আমাকে যতটা কেয়ার করে প্রতিদিন সেটা করবে তো সকাল সন্ধ্যা? সব ভালোবাসা এক জায়গায় বন্দি করে আমার সামনে মেলে ধরবে তো? এসব ভাবতে ভাবতে মধ্যরাতের দিকে আমি ঘুড়িয়ে পড়ি।
আমি ঘুম থেকে উঠেই মেয়েটিকে জানিয়ে দেই যে, আমি আর আগামী মাস থেকে এখানে কন্টিনিউ করব না। নতুন বাসায় উঠব। আই অ্যাম ভেরি সরি।
আরে, সরি বলার কিছু নেই। না থাকলে সমস্যা নেই। একটা কথা বলি?
আমি খুব উৎসুক চোখে তাকাই। বলো,
তুমি খুবভালো একটা মেয়ে। খুব ভালো। তোমাদের দেশের সবাই যদি এমন হতো?
আমি কি বলব বুঝতে পারি না। কিছু একটা বলা উচিত। থ্যাংকু বা এই জাতীয় কিছু।
কিন্তু আমার বলা হয় না। এই ক’দিনে এত সমস্যার মধ্যেও মেয়েটিকে আমার ভালো লেগেছে। গত কয়েক মাস ধরে বিছানা শেয়ার করার কারণেই আরও বেশি ভালো লেগেছে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে এ ক’দিনে কথা বলেছে। গল্প করেছে। এই মেয়েটিকে ছেড়ে যেতেও আমার খারাপ লাগছে। আর এত সুন্দর করে কেউ কখনও আমাকে বলেনি, তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে। মা বলেছিল বোধ হয় দু’একবার। তবে সেটা মেয়ে ভোলানো ছিল কি না জানি না। কিন্তু আজ এই অনাত্মীয় মেয়েটি কী অসাধারণ করে বলল, তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে।
প্রশংসা শুনতে সবারই ভালো লাগে। আমি মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরি। মনে হয়, বহুদিন পর আমার বোনকে জড়িয়ে ধরেছি। আমি বলি, তুমিও অনেক ভালো ও লক্ষ্মী একটা মেয়ে।
পরের সপ্তাহে বিবেকের সাথে দেখা হয়। বিবেককে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাই। আগামী মাস থেকে আপনার সঙ্গে উঠব। ও একটা লাফ দেয় খুশিতে। ওর খুশি খুশি মুখটা দেখে ভালো লাগে। তখনই অনলাইনে ও বাসা খোঁজা শুরু করে। আমি শুধু বলি, যেখানে বাংলাদেশিরা নেই এমন জায়গায় থাকতে চাই। যেখানে আমাদের কেউ চিনবে না। জানবে না এক জোড়া কবুতর বাসা বেঁধেছে। এই দেশে মানুষদের আমার ভয় নেই। ভয় ওই বাংলাদেশিদের। তারা যদি কোনো কারণে জানতে পারে আমরা একসঙ্গে আছি তাহলে সেটা বাংলাদেশ অবধি পৌঁছাতে এক ঘণ্টাও সময় লাগবে না। বিবেক একমত হয় আমার সঙ্গে। বলে, অবশ্যই। আমরা শহরের এক প্রান্তে বাসা নেব তাহলে। আমি হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দেই, তথাস্তু।
আমার বারবারই মনে হয়, আচ্ছা এই ছেলেটাকে কি আমি ভালোবাসি? বাসলে সেটা কতটা? নাকি এটা শুধুই মায়া। আমি ঠিক জানি না। আমি ভাবনার অতলে ডুবতে থাকি।
কিন্তু আদৌ কি বুঝতে পারব আমি তাঁকে ভালোবাসি কি না? নাকি এই মায়ার নামই ভালোবাসা। আরও একটা প্রশ্ন মনে আসে, আচ্ছা বিবেক কি আমাকে ভালোবাসে? আমরা তো কখনই একে অপরকে বলিনি আমরা ভালোবাসি। বৃষ্টিধারার মতো শুধু আমাদের আবেগটাই ঝরে গেছে। আমরা সেই আবেগে ভিজেছি মাত্র। ঠিক জানিও না ভালোবাসলে একে অপরকে বলতে হয় কিনা। নাকি শুধুই বুঝে নিতে হয়। আমার মাথাটা এলোমেলো হয়ে যায়। শুধু এতটুকু বুঝি, আমার একটা নির্ভরতা লাগবে। একটা আশ্রয় খুব জরুরি। সঙ্গে নিরাপত্তা। সব মিলিয়ে মনে হয়, এই ছেলেটি আমার জন্য পারফেক্ট। যাকে আসলে বিশ্বাস করা যায়। নির্ভর করা যায়। বিবেক আস্তে আস্তে আমার জীবনটা বদলে দিতে শুরু করেছে। যেভাবে একটা সাপ ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
এক সঙ্গে থাকা শুরু করছি। হয়তো বাকি জীবনটা কাটাব। এরই মাঝে পড়াশোনা শুরু করেছি অনার্স বিজনেস ম্যানেজমেন্টে। ভালো রেজাল্ট এবং ভালো জায়গায় পড়াশোনা করার কারণে পড়াশোনা করা অবস্থায়ই আমি একটি মাল্টিন্যাশনাল স্টক ব্রকিং কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যাই।
চলতে থাকে আমাদের জীবন। সেটা অন্যরকম অনুভূতি। নিজেকে বদলানোর অনুভূতি।
‘প্রিয়তির আয়না’ বই থেকে নেয়া