Showing posts with label ভাষা. Show all posts
Showing posts with label ভাষা. Show all posts
Thursday, May 20, 2010
৫০ বছরে আসামের ভাষা আন্দোলন by অমর সাহা
আসামের কাছাড় জেলা শহরের গান্ধীবাগে রয়েছে আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ স্মৃতিসৌধ। কলকাতা থেকে কাছাড়ে গিয়েছিলাম এই শহীদ স্মৃতিসৌধ দেখার জন্য। গান্ধীবাগ সেদিন ছিল বন্ধ। সাধারণত বিকেলে দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয় এই গান্ধীবাগ। কিন্তু বিকেলে শিলচর থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতায় ফিরতে হবে, এ কারণেই সকালের দিকে শহীদ স্মৃতিসৌধ দেখার উদ্যোগ নিই। শিলচরের আনন্দবাজার পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি উত্তম সাহা সকালেই শিলচর পৌরসভার চেয়ারম্যান সুস্মিতা দেবকে ফোন করে আমাদের শহীদ স্মৃতিসৌধ দেখানোর ব্যবস্থা করেন। আমরা বেলা ১১টার দিকে সোজা চলে যাই গান্ধীবাগে। সুদৃশ্য শিশুপার্ক। এই পার্কের পেছনের দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত শহীদ স্মৃতিসৌধ। আমরা ঢুকলাম। শহীদ স্মৃতিসৌধের ভেতরে। এই শহীদ মিনার গড়া হয়েছে একটি মন্দিরের আদলে। ভেতরে মেঝের ওপর ১১টি কৌটায় রাখা হয়েছে ১১ শহীদের চিতাভস্ম। মাঝে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে একটি বড় পদ্মফুল। আমরা ওই চিতাভস্মের সামনে মোম জ্বালালাম। ছড়িয়ে দিলাম ফুল। শ্রদ্ধা জানালাম শহীদদের প্রতি অবনত মস্তকে।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই পথ ধরে আসামের এই বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিল নয় বছর পর ১৯৬১ সালের ১৯ মে। আসামের রাজ্য ভাষা হিসেবে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে। সেই ভাষা আন্দোলনে আসামে শহীদ হয়েছিলেন ১১ জন। আজ সেই ভাষা আন্দোলন ৫০ বছরে পা দিচ্ছে। সেদিনের সেই ভাষা আন্দোলনের ফসল তুলে নিয়েছে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। আসামের দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হয়েছে বাংলা। আর বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা হয়েছে বাংলা।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাজ্য আসাম। আসামকে ভাগ করা হয়েছে দুটি উপত্যকায়। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা। বরাক উপত্যকায় রয়েছে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। কাছাড় জেলার জেলা সদর শিলচর। এখানের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই বাঙালি বা বাংলায় কথা বলেন।
১৯৫১ সালে আদমশুমারিতে দেখা গেছে, বরাকে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আসাম রাজ্যের একটি অংশে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এটাই মেনে নিতে পারছিল না সেদিন অসমিয়া নেতারা। ফলে ভারত বিভাগের পর বাঙালিদের সঙ্গে অসমিয়াদের একটা ঠান্ডাযুদ্ধ লেগেই ছিল। আর এর জেরে সংখ্যালঘু অসমিয়ারা বাঙালিদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালিয়ে আসত সরকারি মদদে। কারণ রাজ্য সরকারকে তখন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে আসছে অসমিয়ারাই। শুধু তা-ই নয়, যেসব খাস জমি বাঙালিরা যুগ যুগ ধরে আবাদ করে উর্বর করে তুলেছে, সেই সব জমিও সরকার বাঙালিদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে দিয়ে দেয় অসমিয়া, খাসি ও গারোদের। ফলে এই নিয়ে বাঙালি-অসমিয়া বিরোধ শুরু হয়। বাঙালিদের মধ্যে বাড়তে থাকে ক্ষোভ ।
১৯৬০ সালের ২৮ অক্টোবর। আসাম বিধানসভায় পাস হওয়া আইনে বলা হয়, আসামের সরকারি ভাষা হবে অসমিয়া। বাঙালিসহ সবাইকে পড়তে হবে অসমিয়া ভাষায়। এই ঘোষণাকে সেদিন মেনে নিতে পারেননি বরাকের বাঙালিরা। তারা গর্জে ওঠে এর প্রতিবাদে। বেরিয়ে পড়েন রাজপথে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। সভাপতি হন আবদুর রহমান চৌধুরী আর সাধারণ সম্পাদক হন পরিতোষ পাল চৌধুরী। এই সংগ্রাম পরিষদকে ঘিরে বরাক উপত্যকার হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে যায় ভাষার প্রশ্নে। শুরু করে আন্দোলন। দাবি ওঠে, ‘জান দেব তবু ভাষা দেব না। চাই বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, রাজ্যস্তরে সরকারি ভাষা হিসেবে।’
শুরু হয় বরাকজুড়ে বাংলা ভাষার আন্দোলন। তখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের বিমলা প্রসাদ চালিহা। ইনিই আবার নির্বাচনে নিজের কেন্দ্রে পরাজিত হয়ে শিলচরে এসে সেই বাঙালিদের আশার বাণী শুনিয়ে তাদের ভোটে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী চালিহাই ঘোষণা দেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষার মাধ্যম হবে অসমিয়া। এই ঘোষণার পর তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বাঙালিদের মাঝে। শুরু হয় বরাক উপত্যকাজুড়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলন। এই আন্দোলন দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও কাছাড়ে। এরই মধ্যে শাসক দল কংগ্রেস থেকে ফতোয়া দেওয়া হয়, কোনো কংগ্রেস কর্মী ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। স্কুল-কলেজে সরকারি নির্দেশ পৌঁছে গেল, কেউ যদি ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয় তবে তাদের পেতে হবে শাস্তি।
এরপর ঘটল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা।
১৯৬১ সালের ১৯ মে। সব বাধা ভেঙে আসামে শুরু হলো বাংলা ভাষার দাবিতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সেদিন আন্দোলনে শরিক হতে শিলচর স্টেশনে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে। চলছে অবস্থান ধর্মঘট। মানুষের মুখে মুখে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে নানা স্লোগান। বিকেল চারটার মধ্যে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিকেল দুইটা ৩৫ মিনিটে বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো শিলচর স্টেশনে। ভারতের আধাসামরিক বাহিনী অতর্কিতে গুলি শুরু করে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর। এতে এখানে শহীদ হন আন্দোলনে যোগ দেওয়া ১১ তরুণ-তরুণী।
শহীদ হলেন কমলা ভট্টাচার্য, কুমুদ দাস, শচীন পাল, সুনীল সরকার, কানাইলাল নিয়োগী, সুকমল পুরকায়স্থ, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরুণী দেবনাথ, বীরেন্দ্র সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস এবং সত্যেন্দ্র দেব। সবারই বয়স ছিল ২৫-এর মধ্যে। কমলা ভট্টাচার্য এবং শচীন পালের বয়স ১৮ পার হয়নি। শহীদ হওয়ার আগের দিন এ দুজন স্কুলে দিয়েছিলেন জীবনের শেষ পরীক্ষা।
এই ঘটনার খবর ২০ মে ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ হলে দেশজুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। দাবি ওঠে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। ৪০ হাজার মানুষের শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয় শিলচরে। তার পরই ১১ শহীদের শেষকৃত্য হয় শিলচর শ্মশানে। আজও সেই শ্মশানে এই ১১ শহীদের ১১টি স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে নামফলক রয়েছে শহীদদের। শুধু তা-ই নয়, শিলচর স্টেশনের সামনে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল এই ১১ তরুণ-তরুণীকে, সেখানেও তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। ১১ শহীদের নামে ১১টি স্তম্ভ।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই পথ ধরে আসামের এই বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিল নয় বছর পর ১৯৬১ সালের ১৯ মে। আসামের রাজ্য ভাষা হিসেবে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে। সেই ভাষা আন্দোলনে আসামে শহীদ হয়েছিলেন ১১ জন। আজ সেই ভাষা আন্দোলন ৫০ বছরে পা দিচ্ছে। সেদিনের সেই ভাষা আন্দোলনের ফসল তুলে নিয়েছে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। আসামের দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হয়েছে বাংলা। আর বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা হয়েছে বাংলা।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাজ্য আসাম। আসামকে ভাগ করা হয়েছে দুটি উপত্যকায়। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা। বরাক উপত্যকায় রয়েছে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। কাছাড় জেলার জেলা সদর শিলচর। এখানের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই বাঙালি বা বাংলায় কথা বলেন।
১৯৫১ সালে আদমশুমারিতে দেখা গেছে, বরাকে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আসাম রাজ্যের একটি অংশে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এটাই মেনে নিতে পারছিল না সেদিন অসমিয়া নেতারা। ফলে ভারত বিভাগের পর বাঙালিদের সঙ্গে অসমিয়াদের একটা ঠান্ডাযুদ্ধ লেগেই ছিল। আর এর জেরে সংখ্যালঘু অসমিয়ারা বাঙালিদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালিয়ে আসত সরকারি মদদে। কারণ রাজ্য সরকারকে তখন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে আসছে অসমিয়ারাই। শুধু তা-ই নয়, যেসব খাস জমি বাঙালিরা যুগ যুগ ধরে আবাদ করে উর্বর করে তুলেছে, সেই সব জমিও সরকার বাঙালিদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে দিয়ে দেয় অসমিয়া, খাসি ও গারোদের। ফলে এই নিয়ে বাঙালি-অসমিয়া বিরোধ শুরু হয়। বাঙালিদের মধ্যে বাড়তে থাকে ক্ষোভ ।
১৯৬০ সালের ২৮ অক্টোবর। আসাম বিধানসভায় পাস হওয়া আইনে বলা হয়, আসামের সরকারি ভাষা হবে অসমিয়া। বাঙালিসহ সবাইকে পড়তে হবে অসমিয়া ভাষায়। এই ঘোষণাকে সেদিন মেনে নিতে পারেননি বরাকের বাঙালিরা। তারা গর্জে ওঠে এর প্রতিবাদে। বেরিয়ে পড়েন রাজপথে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। সভাপতি হন আবদুর রহমান চৌধুরী আর সাধারণ সম্পাদক হন পরিতোষ পাল চৌধুরী। এই সংগ্রাম পরিষদকে ঘিরে বরাক উপত্যকার হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে যায় ভাষার প্রশ্নে। শুরু করে আন্দোলন। দাবি ওঠে, ‘জান দেব তবু ভাষা দেব না। চাই বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, রাজ্যস্তরে সরকারি ভাষা হিসেবে।’
শুরু হয় বরাকজুড়ে বাংলা ভাষার আন্দোলন। তখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের বিমলা প্রসাদ চালিহা। ইনিই আবার নির্বাচনে নিজের কেন্দ্রে পরাজিত হয়ে শিলচরে এসে সেই বাঙালিদের আশার বাণী শুনিয়ে তাদের ভোটে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী চালিহাই ঘোষণা দেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষার মাধ্যম হবে অসমিয়া। এই ঘোষণার পর তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বাঙালিদের মাঝে। শুরু হয় বরাক উপত্যকাজুড়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলন। এই আন্দোলন দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও কাছাড়ে। এরই মধ্যে শাসক দল কংগ্রেস থেকে ফতোয়া দেওয়া হয়, কোনো কংগ্রেস কর্মী ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। স্কুল-কলেজে সরকারি নির্দেশ পৌঁছে গেল, কেউ যদি ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয় তবে তাদের পেতে হবে শাস্তি।
এরপর ঘটল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা।
১৯৬১ সালের ১৯ মে। সব বাধা ভেঙে আসামে শুরু হলো বাংলা ভাষার দাবিতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সেদিন আন্দোলনে শরিক হতে শিলচর স্টেশনে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে। চলছে অবস্থান ধর্মঘট। মানুষের মুখে মুখে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে নানা স্লোগান। বিকেল চারটার মধ্যে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিকেল দুইটা ৩৫ মিনিটে বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো শিলচর স্টেশনে। ভারতের আধাসামরিক বাহিনী অতর্কিতে গুলি শুরু করে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর। এতে এখানে শহীদ হন আন্দোলনে যোগ দেওয়া ১১ তরুণ-তরুণী।
শহীদ হলেন কমলা ভট্টাচার্য, কুমুদ দাস, শচীন পাল, সুনীল সরকার, কানাইলাল নিয়োগী, সুকমল পুরকায়স্থ, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরুণী দেবনাথ, বীরেন্দ্র সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস এবং সত্যেন্দ্র দেব। সবারই বয়স ছিল ২৫-এর মধ্যে। কমলা ভট্টাচার্য এবং শচীন পালের বয়স ১৮ পার হয়নি। শহীদ হওয়ার আগের দিন এ দুজন স্কুলে দিয়েছিলেন জীবনের শেষ পরীক্ষা।
এই ঘটনার খবর ২০ মে ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ হলে দেশজুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। দাবি ওঠে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। ৪০ হাজার মানুষের শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয় শিলচরে। তার পরই ১১ শহীদের শেষকৃত্য হয় শিলচর শ্মশানে। আজও সেই শ্মশানে এই ১১ শহীদের ১১টি স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে নামফলক রয়েছে শহীদদের। শুধু তা-ই নয়, শিলচর স্টেশনের সামনে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল এই ১১ তরুণ-তরুণীকে, সেখানেও তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। ১১ শহীদের নামে ১১টি স্তম্ভ।
Sunday, February 21, 2010
প্রান্তিক ভাষা বাংলা ও মাতৃভাষার অধিকার by আনু মুহাম্মদ
একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তত দিনে বাজার অর্থনীতির চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যে বাংলাদেশেই বাংলা ভাষার বাজারদর একদম নিচের দিকে। অতএব যে বাংলা ভাষার জন্য লড়াইকে কেন্দ্র করে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ দিন হয়ে উঠল সেই ভাষা মোটামুটি পরিত্যক্ত পর্যায়ে আসার সময়েই দিনটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। যথার্থই একটি আনন্দের বিষয়, আবার একটি পরিহাসের বিষয়ও বটে।
এটা বলা অনাবশ্যক দেশে দেশে জনগণের যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, এর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা থাকেই। প্রতিটি দেশে মানুষ লড়াই করেন তার নিজে দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে। প্রতিটি দেশের মানুষ লড়াই করেন নিজের ভূমিতে তার জায়গা তৈরির জন্য। কিন্তু এসব লড়াই ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে কখনো সঙ্গে সঙ্গে, কখনো একটু বিলম্বে। প্রতিটি দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক লড়াই অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে শক্তি জোগায়। এক দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অন্য দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
আমরা সবাই জানি যে একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জনগণের লড়াইয়ের দিবস। কিন্তু এটি শুধু বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না। এটি ছিল সব জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় কথা বলা, লেখা ও ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও। সে জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে প্রথম থেকেই একটি আন্তর্জাতিক বহুজাতিক দিবস। এই অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশই ঘটল এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে। এটা এমন এক সময় যখন মাতৃভাষায় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও ভাব প্রকাশের অধিকার বিশ্বের অনেক মানুষই কার্যকর করতে পারছেন না। অধিকাংশ ভাষাই এখন হুমকির সম্মুখীন। অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই বর্তমানে পরাজিত, বিপর্যস্ত অবস্থায় প্রাণপণে চেষ্টা করছেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁদের সে চেষ্টাতেই একটি প্রতীকী অবলম্বন।
বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে এ রকম প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রধান উন্নয়ন ধারার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। এই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে গেলে আমরা এটাও উপলব্ধি করব যে যাকে আমরা বিশ্ব্বায়ন বলে জানি তা আসলে একচেটিয়াকরণ। কেননা বিশ্বের সব অঞ্চলের সব মানুষের জায়গা করে দিয়ে এই বিশ্বায়ন ঘটছে না। বর্তমান ধারার বিশ্বায়ন বস্তুত সব অঞ্চলের মানুষকে শৃঙ্খলিত করে ক্ষুদ্র অংশের একক ভাষা, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, রুচি এবং একচেটিয়া মালিকানা সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেক নাম।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি, পুরো বিশ্বকে কতিপয় বহুজাতিক সংস্থার করতলগত করার মধ্যে; মতাদর্শিক ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি শ্রেণী, লিঙ্গ, জাতিগত, বর্ণগত নিপীড়ন ও মতাদর্শের স্পষ্ট-অস্পষ্ট একটি কাঠামোর আধিপত্য সৃষ্টির মধ্যে এবং আমরা এর প্রকাশ দেখি অন্য সব ভাষার ওপর কয়েকটি ভাষার বিশেষত একটি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উপনিবেশ-উত্তর দেশে ঔপনিবেশিক ভাষার যে আধিপত্য দেখা যায় তা এক ঐতিহাসিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে ফরাসি বা স্প্যানিশ ভাষাও প্রধান ভাষা হয়ে উঠতে পারত যদি এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স বা স্পেন ইত্যাদি হতো। ইংরেজি এ অঞ্চলে এখন প্রভুভাষা কারণ ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক প্রভু ছিল। ইংরেজি এখন সারা বিশ্বের প্রভুভাষা কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এখন কেন্দ্রীয় ও প্রধান শক্তি ইংরেজিভাষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে মার্কিন ইংরেজিতে স্থানান্তরের পেছনেও বিশ্ব ক্ষমতার বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস সম্পর্কিত।
ইংরেজি ভাষা এখন শুধু একটি ভাষাই নয়, এটি একটি ক্ষমতার প্রতীকও। ইংরেজি ভাষা জানা মানে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া, এই ভাষা জানা মানে অনেক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া, এই ভাষা জানা মানে হীন দীন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ শক্তিধর অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা জানলে শুধু ক্ষমতার স্বাদই পাওয়া যায় তা নয়, কর্মসংস্থান ও উপার্জনের বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গেও তার যোগ প্রত্যক্ষ। ইংরেজি ভাষা জানা না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ, বিশ্বের খবরাখবর, এমনকি শিল্প সাহিত্য চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলা ভাষায় এগুলোর স্বচ্ছন্দ রূপান্তরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি।
বাংলা ভাষার তাহলে সমস্যা কী? বাংলা ভাষায় এই কাজগুলো হয় না কেন? এটা কি ভাষার গাঠনিক সমস্যা না এই ভাষা যে সমাজের, তার অবস্থান ও গতিপ্রকৃতির প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অন্যান্য ভাষার এবং অন্য ভাষাভাষীদের অবস্থাও আমাদের দেখতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দি ভাষার কি একই অবস্থা? না। হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অধিপতি ভাষা। বিশ্বেও তার প্রভাব বাড়ছে। হিন্দি ভাষাতে বিভিন্ন ভাষা থেকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং শক্তিশালী থাকায় কেউ শুধু হিন্দি ভাষাভাষী হলেও তার বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই। ইংরেজির দাপট সেখানেও আছে কিন্তু হিন্দি পাল্টা দাপটের জায়গাও তৈরি করেছে। পাশাপাশি হিন্দি ভাষা ভারতের মধ্যেও অন্যান্য ভাষার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ হিন্দিভাষী একচেটিয়া মালিকদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়ছে।
আরবি ভাষাভাষীদের অবস্থাও অতটা করুণ নয়। এই ভাষাটিও সচল, সক্রিয় এবং বিশ্বের গতিধারাকে ধারণ করার মতো গতিশীলতা সেখানে আমরা দেখি। চীনা ও জাপানি ভাষা এখন বিশ্ব পরিসরে পাল্টা ক্ষমতার জায়গা তৈরি করছে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত সর্বত্র এই চেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। এ ছাড়া কোরিয়া বা থাইল্যান্ডও ইংরেজি দিয়ে ভেসে যায়নি। এসব দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে যুদ্ধ করে টিকে থাকছে, বিকশিত হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশ, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে কাঠামোতেই হোক না কেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বা করছে অথচ সে দেশের জনগণের ভাষা পরিত্যক্ত হয়েছে। চীন, জাপান তো বটেই এমনকি দুর্বলতর কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা লাতিন আমেরিকা সর্বত্রই আমরা দেখি জোরদারভাবে তাদের জনগণের ভাষা যথেষ্ট গুরুত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে টিকে আছে। আর সেসব দেশেই ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার দাপট একচেটিয়া, যেসব দেশে উন্নয়নের কোনো শেকড় তৈরি হয়নি। যে দেশে শাসক শ্রেণী পরগাছার মতো ঝুলে থাকে, সে দেশে শাসক শ্রেণীর পরজীবী লুণ্ঠন/পাচারপ্রক্রিয়ায় মাতৃভাষা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এই ঘটনাই দেখি।
বাংলাদেশে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা যে রীতিমতো প্রান্তিক বা অপাঙেক্তয় ভাষায় পরিণত হয়েছে তার অনেকখানি ব্যাখ্যা তাই এ দেশের শাসকশ্রেণীর অবস্থান ও ঐতিহাসিক ধারা থেকে পাওয়া যাবে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তিক এবং এই প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে ও টিকে থাকছে এ দেশের পরজীবী শাসকশ্রেণীর কারণে। এই শ্রেণী তার গঠনপ্রকৃতি ও বিকাশধারার কারণে দেশে উত্পাদনশীল ভিত্তি নির্মাণ করার চেয়ে দ্রুত লুণ্ঠন, দখল ও দুর্নীতি করে সম্পদ গঠন ও পাচারেই বেশি আগ্রহী।
উত্পাদনশীল ভিত্তি যে দেশে টেকসইভাবে নির্মিত হতে পারে না সে দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সাধারণ ভিত্তি নির্মাণের তাগিদও তৈরি হয় না। তৈরি হয় না দেশীয় কর্মসংস্থানের ভিত্তি। তৈরি হয় না জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সুতা দিয়ে ঝুলে থাকা শাসকশ্রেণী এ দেশে প্রতিনিধিত্ব করে বাইরের ক্ষমতার, এই ক্ষমতাই দেশের ভেতরে তার দাপট নিশ্চিত করে। নিজস্ব পরিচয়, নিজস্ব সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়ানোয় তার ক্ষমতা নেই, ভরসা নেই। মধ্যবিত্তের আত্মবিনাশী হীনম্মন্যতাবোধ এর সঙ্গে যোগ হয়ে এই শেকড়বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি করে। সে জন্য তাদের আধিপত্য থাকা অবস্থায় সামগ্রিকভাবে যে নৈরাজিক ধ্বংসাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে দেশীয় ভাষা বা ভাষাসমূহ বাদ যায় না।
ক্ষমতার চর্চা হয় তার পরও। প্রান্তিক অবস্থানে কোণঠাসা বাংলা ভাষা দিয়ে আবার ক্ষমতার চর্চা হয় দুর্বলতর জাতিগোষ্ঠীর ওপর। মাতৃভাষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষাকে শাসকশ্রেণী অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার খর্ব করার কাজে লাগায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সাংবিধানিক অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনো নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ এখনো যথাযথভাবে সমর্থিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সামনে অনেক প্রশ্ন হাজির করে। অনেক বিষয়কে সামনে আনে। শুধু উত্সব আর সংবর্ধনা দিয়ে এই প্রশ্নগুলো ঢাকা যায় না যে:
কেন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষ এখনো নিজের মাতৃভাষার বর্ণমালা চেনেন না বা তার কার্যকর ব্যবহার করতে সক্ষম নন?
কেন এ দেশের মানুষ মাতৃভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করতে পারেন না?
কেন এ দেশে বাংলা ভাষা নিজেই একটি প্রান্তিক, কোণঠাসা এবং অবিরাম অপমানের ভাষা হিসেবে পরিগণিত?
বাংলা ভাষা কোনটি? তার অস্তিত্ব কোন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য?
কেন এ দেশে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতি ও ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার আইনগতভাবেও স্বীকৃত নয়?
তরল আবেগ, প্রতারণা আর প্রহসনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি ঠিকমতো উপলব্ধি করতে চাইলে এই প্রশ্নগুলোর জবাব সন্ধান করেই আমাদের এগোতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এটা বলা অনাবশ্যক দেশে দেশে জনগণের যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, এর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা থাকেই। প্রতিটি দেশে মানুষ লড়াই করেন তার নিজে দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে। প্রতিটি দেশের মানুষ লড়াই করেন নিজের ভূমিতে তার জায়গা তৈরির জন্য। কিন্তু এসব লড়াই ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে কখনো সঙ্গে সঙ্গে, কখনো একটু বিলম্বে। প্রতিটি দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক লড়াই অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে শক্তি জোগায়। এক দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অন্য দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
আমরা সবাই জানি যে একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জনগণের লড়াইয়ের দিবস। কিন্তু এটি শুধু বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না। এটি ছিল সব জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় কথা বলা, লেখা ও ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও। সে জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে প্রথম থেকেই একটি আন্তর্জাতিক বহুজাতিক দিবস। এই অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশই ঘটল এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে। এটা এমন এক সময় যখন মাতৃভাষায় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও ভাব প্রকাশের অধিকার বিশ্বের অনেক মানুষই কার্যকর করতে পারছেন না। অধিকাংশ ভাষাই এখন হুমকির সম্মুখীন। অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই বর্তমানে পরাজিত, বিপর্যস্ত অবস্থায় প্রাণপণে চেষ্টা করছেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁদের সে চেষ্টাতেই একটি প্রতীকী অবলম্বন।
বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে এ রকম প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রধান উন্নয়ন ধারার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। এই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে গেলে আমরা এটাও উপলব্ধি করব যে যাকে আমরা বিশ্ব্বায়ন বলে জানি তা আসলে একচেটিয়াকরণ। কেননা বিশ্বের সব অঞ্চলের সব মানুষের জায়গা করে দিয়ে এই বিশ্বায়ন ঘটছে না। বর্তমান ধারার বিশ্বায়ন বস্তুত সব অঞ্চলের মানুষকে শৃঙ্খলিত করে ক্ষুদ্র অংশের একক ভাষা, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, রুচি এবং একচেটিয়া মালিকানা সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেক নাম।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি, পুরো বিশ্বকে কতিপয় বহুজাতিক সংস্থার করতলগত করার মধ্যে; মতাদর্শিক ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি শ্রেণী, লিঙ্গ, জাতিগত, বর্ণগত নিপীড়ন ও মতাদর্শের স্পষ্ট-অস্পষ্ট একটি কাঠামোর আধিপত্য সৃষ্টির মধ্যে এবং আমরা এর প্রকাশ দেখি অন্য সব ভাষার ওপর কয়েকটি ভাষার বিশেষত একটি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উপনিবেশ-উত্তর দেশে ঔপনিবেশিক ভাষার যে আধিপত্য দেখা যায় তা এক ঐতিহাসিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে ফরাসি বা স্প্যানিশ ভাষাও প্রধান ভাষা হয়ে উঠতে পারত যদি এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স বা স্পেন ইত্যাদি হতো। ইংরেজি এ অঞ্চলে এখন প্রভুভাষা কারণ ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক প্রভু ছিল। ইংরেজি এখন সারা বিশ্বের প্রভুভাষা কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এখন কেন্দ্রীয় ও প্রধান শক্তি ইংরেজিভাষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে মার্কিন ইংরেজিতে স্থানান্তরের পেছনেও বিশ্ব ক্ষমতার বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস সম্পর্কিত।
ইংরেজি ভাষা এখন শুধু একটি ভাষাই নয়, এটি একটি ক্ষমতার প্রতীকও। ইংরেজি ভাষা জানা মানে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া, এই ভাষা জানা মানে অনেক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া, এই ভাষা জানা মানে হীন দীন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ শক্তিধর অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা জানলে শুধু ক্ষমতার স্বাদই পাওয়া যায় তা নয়, কর্মসংস্থান ও উপার্জনের বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গেও তার যোগ প্রত্যক্ষ। ইংরেজি ভাষা জানা না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ, বিশ্বের খবরাখবর, এমনকি শিল্প সাহিত্য চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলা ভাষায় এগুলোর স্বচ্ছন্দ রূপান্তরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি।
বাংলা ভাষার তাহলে সমস্যা কী? বাংলা ভাষায় এই কাজগুলো হয় না কেন? এটা কি ভাষার গাঠনিক সমস্যা না এই ভাষা যে সমাজের, তার অবস্থান ও গতিপ্রকৃতির প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অন্যান্য ভাষার এবং অন্য ভাষাভাষীদের অবস্থাও আমাদের দেখতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দি ভাষার কি একই অবস্থা? না। হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অধিপতি ভাষা। বিশ্বেও তার প্রভাব বাড়ছে। হিন্দি ভাষাতে বিভিন্ন ভাষা থেকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং শক্তিশালী থাকায় কেউ শুধু হিন্দি ভাষাভাষী হলেও তার বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই। ইংরেজির দাপট সেখানেও আছে কিন্তু হিন্দি পাল্টা দাপটের জায়গাও তৈরি করেছে। পাশাপাশি হিন্দি ভাষা ভারতের মধ্যেও অন্যান্য ভাষার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ হিন্দিভাষী একচেটিয়া মালিকদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়ছে।
আরবি ভাষাভাষীদের অবস্থাও অতটা করুণ নয়। এই ভাষাটিও সচল, সক্রিয় এবং বিশ্বের গতিধারাকে ধারণ করার মতো গতিশীলতা সেখানে আমরা দেখি। চীনা ও জাপানি ভাষা এখন বিশ্ব পরিসরে পাল্টা ক্ষমতার জায়গা তৈরি করছে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত সর্বত্র এই চেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। এ ছাড়া কোরিয়া বা থাইল্যান্ডও ইংরেজি দিয়ে ভেসে যায়নি। এসব দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে যুদ্ধ করে টিকে থাকছে, বিকশিত হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশ, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে কাঠামোতেই হোক না কেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বা করছে অথচ সে দেশের জনগণের ভাষা পরিত্যক্ত হয়েছে। চীন, জাপান তো বটেই এমনকি দুর্বলতর কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা লাতিন আমেরিকা সর্বত্রই আমরা দেখি জোরদারভাবে তাদের জনগণের ভাষা যথেষ্ট গুরুত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে টিকে আছে। আর সেসব দেশেই ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার দাপট একচেটিয়া, যেসব দেশে উন্নয়নের কোনো শেকড় তৈরি হয়নি। যে দেশে শাসক শ্রেণী পরগাছার মতো ঝুলে থাকে, সে দেশে শাসক শ্রেণীর পরজীবী লুণ্ঠন/পাচারপ্রক্রিয়ায় মাতৃভাষা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এই ঘটনাই দেখি।
বাংলাদেশে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা যে রীতিমতো প্রান্তিক বা অপাঙেক্তয় ভাষায় পরিণত হয়েছে তার অনেকখানি ব্যাখ্যা তাই এ দেশের শাসকশ্রেণীর অবস্থান ও ঐতিহাসিক ধারা থেকে পাওয়া যাবে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তিক এবং এই প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে ও টিকে থাকছে এ দেশের পরজীবী শাসকশ্রেণীর কারণে। এই শ্রেণী তার গঠনপ্রকৃতি ও বিকাশধারার কারণে দেশে উত্পাদনশীল ভিত্তি নির্মাণ করার চেয়ে দ্রুত লুণ্ঠন, দখল ও দুর্নীতি করে সম্পদ গঠন ও পাচারেই বেশি আগ্রহী।
উত্পাদনশীল ভিত্তি যে দেশে টেকসইভাবে নির্মিত হতে পারে না সে দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সাধারণ ভিত্তি নির্মাণের তাগিদও তৈরি হয় না। তৈরি হয় না দেশীয় কর্মসংস্থানের ভিত্তি। তৈরি হয় না জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সুতা দিয়ে ঝুলে থাকা শাসকশ্রেণী এ দেশে প্রতিনিধিত্ব করে বাইরের ক্ষমতার, এই ক্ষমতাই দেশের ভেতরে তার দাপট নিশ্চিত করে। নিজস্ব পরিচয়, নিজস্ব সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়ানোয় তার ক্ষমতা নেই, ভরসা নেই। মধ্যবিত্তের আত্মবিনাশী হীনম্মন্যতাবোধ এর সঙ্গে যোগ হয়ে এই শেকড়বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি করে। সে জন্য তাদের আধিপত্য থাকা অবস্থায় সামগ্রিকভাবে যে নৈরাজিক ধ্বংসাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে দেশীয় ভাষা বা ভাষাসমূহ বাদ যায় না।
ক্ষমতার চর্চা হয় তার পরও। প্রান্তিক অবস্থানে কোণঠাসা বাংলা ভাষা দিয়ে আবার ক্ষমতার চর্চা হয় দুর্বলতর জাতিগোষ্ঠীর ওপর। মাতৃভাষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষাকে শাসকশ্রেণী অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার খর্ব করার কাজে লাগায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সাংবিধানিক অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনো নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ এখনো যথাযথভাবে সমর্থিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সামনে অনেক প্রশ্ন হাজির করে। অনেক বিষয়কে সামনে আনে। শুধু উত্সব আর সংবর্ধনা দিয়ে এই প্রশ্নগুলো ঢাকা যায় না যে:
কেন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষ এখনো নিজের মাতৃভাষার বর্ণমালা চেনেন না বা তার কার্যকর ব্যবহার করতে সক্ষম নন?
কেন এ দেশের মানুষ মাতৃভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করতে পারেন না?
কেন এ দেশে বাংলা ভাষা নিজেই একটি প্রান্তিক, কোণঠাসা এবং অবিরাম অপমানের ভাষা হিসেবে পরিগণিত?
বাংলা ভাষা কোনটি? তার অস্তিত্ব কোন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য?
কেন এ দেশে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতি ও ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার আইনগতভাবেও স্বীকৃত নয়?
তরল আবেগ, প্রতারণা আর প্রহসনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি ঠিকমতো উপলব্ধি করতে চাইলে এই প্রশ্নগুলোর জবাব সন্ধান করেই আমাদের এগোতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ভাষার রাজনীতি, রাজনীতির ভাষা by সৌরভ সিকদার
সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় মানুষ রাজনৈতিক চরিত্র ও পরিচয় অর্জন করেছে। মানুষের সামাজিক সখ্য এবং রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ভাষার অবদান। তাই ভাষা যেমন রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, তেমনি রাজনৈতিক ভাষাও মানুষের মধ্যে নতুন স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। এ কারণে প্রায় সব দেশেই জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করে, সেখানে ভাষা বা শব্দ প্রয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় নির্বাচনের ফলাফলকে এটি প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শব্দটি সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মনস্তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানের বিশ্লেষণের বিষয়বস্তু হতে পারে। আমরা একটু অতীতে ফিরে তাকাতে পারি। ১৯৩৩ সালে হিটলার যখন জার্মানির রাষ্ট্রনায়ক হলো, সে সময় রাইখ সংস্কৃতি সংসদ গড়ে উঠেছিল গোয়েবলসের নেতৃত্বে। সমগ্র জাতির চিন্তাধারা রাইখ নেতৃত্বের অনুগামী করতে শিল্প-সাহিত্য, সংবাদপত্র, বেতার, থিয়েটার সবকিছুতেই প্রচারণার কাজ করে তারা। এক জার্মান এক সংস্কৃতিপন্থী—এই ভাবনা সবাই মেনে না নিলেও শেষ পর্যন্ত ভাষিক অহংকার ও জাত্যাভিমানে ভয়ে ভক্তিতে শ্রদ্ধায় এক জার্মান হয়ে ওঠে। হিটলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যে অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল তার নাম ভাষা, রাজনৈতিক ভাষা। এ প্রসঙ্গে তার বক্তৃতা এবং জীবনীগ্রন্থ মাইন ক্যাম্প-এর কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। আমরা আমাদের বাংলাদেশের কথা যদি অলোচনা করি তবে দেখব, শুধু ভাষার রাজনীতি অনুধাবন করতে না পেরে পাকিস্তানি শাসকেরা অনেক সংগ্রাম করেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিয়ে বাংলাদেশ নামের নতুন মানচিত্র জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিল। একইভাবে বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের যে ভাষণ, সেটিও ছিল বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির আত্মচেতনা এবং ঐক্য প্রয়াসের অন্যতম ভিত্তি। ভাষা দিয়ে, শব্দ দিয়ে মানুষকে মুক্তির মিছিলে দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছিল। তাই ভাষার রাজনীতি না বুঝে পাকিস্তান ভেঙে গেল (আরও অনেক কারণও ছিল), পক্ষান্তরে রাজনীতির ভাষা দিয়ে মাতৃভাষা তথা মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্য তৈরির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো সেদিন এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে। ইতিহাসে আমরা ভিন্নচিত্রও দেখি, জনমানুষের ভাষা ও ভাব না বুঝে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিণতিতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। আমাদের দেশে মাঝেমধ্যেই রাজনীতিবিদেরা যথার্থ ভাষা ব্যবহার না করার পরিণতি তাঁদের দিতে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
ভাষা যে কত বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার তার প্রমাণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তাদের সাদা চামড়ার প্রশাসনিক ব্যক্তিরা এ দেশের ভাষা শেখার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেছিলেন বাংলা শেখার জন্য। ‘নেটিভ’দের ভাষা না জানলে শাসন-শোষণ করা যায় না—তাই এ প্রচেষ্টা। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে তাই শোষিত শ্রেণীর ভাষা জানা আবশ্যক। ইংরেজরা সেটা জানত বলেই রাজনীতিতে কাজে লাগিয়েছে ভাষাকে। পাকিস্তানি শাসকেরা ভাষা ভুলে ধর্মের রাজনীতিতে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ভাষার নিজস্ব শক্তি আছে। একে কাজে লাগাতে পারলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়। আবার জনগণের সঙ্গে ভাষিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করলে বৈরিতা তৈরি হয়। ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের দ্বন্দ্ব মূলত ভাষাকে কেন্দ্র করে, যা পরবর্তী কালে রাজনৈতিক সমস্যায় পর্যবসিত হয়। মুহাম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন, ‘ভাষা ব্যবহারে মানুষের যথেচ্ছ অধিকার থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রশ্নে মানুষকে এমনিভাবে সংকুচিত হয়ে যেতে হয়, মনের কথা মুখ পর্যন্ত এসে আটকে যায়। নিছক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে সহজভাবে নিজের ভাষার ওপরেও সে তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আর রাষ্ট্র! তার অনুসৃত আদর্শ প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রচার বিভাগের মারফত ভাষা ব্যবহারের সব রকম মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে স্বদেশে ও বিদেশে তার মত বিস্তার করে দিতে মোটেও কুণ্ঠিত হয় না।’
কখনো কখনো রাজনীতিবিদ তথা রাজনৈতিক সরকার ভাষাকে ব্যবহার করে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে যেতে চায় নিজের শাসন ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করার জন্য। কিন্তু একসময় আসল ঘটনা বেরিয়ে পড়লে বিপরীত ফলই ঘটে। ভাষা নিয়ে রাজনীতি করলে তার পরিণতি যে কী হয়, তা পাকিস্তান ছাড়া আর কে ভালো জানে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের এক কৃতী ব্যক্তিত্ব আহমদ রফিক এ বিষয়ে আমাদের বলেন, ‘আমাদের বাংলা ভাষা রাজনৈতিক কারণেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। ওরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণা দিয়ে নিজেদের অদূরদর্শিতার পরিচয়ই প্রকাশ করেছিল। সে আমলে এ নিয়ে ইত্তেহাদ এবং আজাদ-এ অনেক লেখালেখিও হয়েছে। মুহম্মদ এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন তাঁদের লেখায় সতর্ক করে দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ল রাজনীতির বৃত্তের মধ্যে এবং এর পরিণতি আমাদের ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জন্ম। এ কারণেই আমি বলি, ভাষা থেকে আমরা নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে গেছি। ভাষা আন্দোলন তাই শুধু ভাষারই আন্দোলন নয়, এটি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনও।’
ভাষার ওপর মানুষের যেমন জন্মগত অধিকার, তেমনি দেশের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুসারেও তার ভাষা নিয়ন্ত্রিত অথবা বাধার সম্মুখীন হয়। রাজনীতির শক্তি তার ভাষার স্বাধীনতার সামনে দেয়াল তুলে দেয়। আবার অন্যভাবে মানুষের ভাষার স্বাধীনতা খর্ব হলে, ভাষা প্রতিরোধ করা হলে, তখন ভাষা ও রাজনীতি পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আর এ যুদ্ধে ভাষার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কেননা ভাষার সঙ্গে মানুষের আবেগ এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত।
ভাষার শক্তি মূলত তার সৌজন্য এবং নমনীয়তার মধ্যে। গত নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দৃষ্টান্ত দিয়ে, এ বিষয়ের ইতি টানতে চাই। ওবামা তাঁর ভাষণে মানুষকে হতাশা থেকে স্বপ্নের জগতে টেনে আনেন, ভুল স্বীকার করতে ভালোবাসেন, বিরোধী পক্ষের প্রশংসা করতে চেষ্টা করেন, সবশেষে ‘আমিত্ব’ বর্জন করে একাকার হয়ে যান সাধারণ মানুষের মধ্যে। এখানেই তাঁর ভাষার শক্তি। ওবামার ভাষণগুলো পড়লে আমাদের রাজনীতিবিদেরা উপকৃত হবেন। তাঁরা আরও বেশি মানুষের কাছে আসতে পারবেন। আর যে যত সহজে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে আসতে পারে, সে তত আপন হয়ে ওঠে। এখন আর আমাদের ভাষা নিয়ে রাজনীতি করার অবকাশ নেই এই বাংলা ভাষা প্রধান রাষ্ট্রে। কিন্তু রাজনীতির ভাষা পরিবর্তন করার অবকাশ রয়ে গেছে। সরকার এবং বিরোধী দল ভেবে দেখলে একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহ্যময় এ দেশে শুধু ভাষা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হতে পারে। অন্তত বাংলাদেশের জনগণ তাই প্রত্যাশা করে। সে ভাষা কি আপনারা পড়তে পারেন?
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ভাষা যে কত বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার তার প্রমাণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তাদের সাদা চামড়ার প্রশাসনিক ব্যক্তিরা এ দেশের ভাষা শেখার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেছিলেন বাংলা শেখার জন্য। ‘নেটিভ’দের ভাষা না জানলে শাসন-শোষণ করা যায় না—তাই এ প্রচেষ্টা। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে তাই শোষিত শ্রেণীর ভাষা জানা আবশ্যক। ইংরেজরা সেটা জানত বলেই রাজনীতিতে কাজে লাগিয়েছে ভাষাকে। পাকিস্তানি শাসকেরা ভাষা ভুলে ধর্মের রাজনীতিতে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ভাষার নিজস্ব শক্তি আছে। একে কাজে লাগাতে পারলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়। আবার জনগণের সঙ্গে ভাষিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করলে বৈরিতা তৈরি হয়। ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের দ্বন্দ্ব মূলত ভাষাকে কেন্দ্র করে, যা পরবর্তী কালে রাজনৈতিক সমস্যায় পর্যবসিত হয়। মুহাম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন, ‘ভাষা ব্যবহারে মানুষের যথেচ্ছ অধিকার থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রশ্নে মানুষকে এমনিভাবে সংকুচিত হয়ে যেতে হয়, মনের কথা মুখ পর্যন্ত এসে আটকে যায়। নিছক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে সহজভাবে নিজের ভাষার ওপরেও সে তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আর রাষ্ট্র! তার অনুসৃত আদর্শ প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রচার বিভাগের মারফত ভাষা ব্যবহারের সব রকম মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে স্বদেশে ও বিদেশে তার মত বিস্তার করে দিতে মোটেও কুণ্ঠিত হয় না।’
কখনো কখনো রাজনীতিবিদ তথা রাজনৈতিক সরকার ভাষাকে ব্যবহার করে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে যেতে চায় নিজের শাসন ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করার জন্য। কিন্তু একসময় আসল ঘটনা বেরিয়ে পড়লে বিপরীত ফলই ঘটে। ভাষা নিয়ে রাজনীতি করলে তার পরিণতি যে কী হয়, তা পাকিস্তান ছাড়া আর কে ভালো জানে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের এক কৃতী ব্যক্তিত্ব আহমদ রফিক এ বিষয়ে আমাদের বলেন, ‘আমাদের বাংলা ভাষা রাজনৈতিক কারণেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। ওরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণা দিয়ে নিজেদের অদূরদর্শিতার পরিচয়ই প্রকাশ করেছিল। সে আমলে এ নিয়ে ইত্তেহাদ এবং আজাদ-এ অনেক লেখালেখিও হয়েছে। মুহম্মদ এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন তাঁদের লেখায় সতর্ক করে দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ল রাজনীতির বৃত্তের মধ্যে এবং এর পরিণতি আমাদের ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জন্ম। এ কারণেই আমি বলি, ভাষা থেকে আমরা নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে গেছি। ভাষা আন্দোলন তাই শুধু ভাষারই আন্দোলন নয়, এটি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনও।’
ভাষার ওপর মানুষের যেমন জন্মগত অধিকার, তেমনি দেশের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুসারেও তার ভাষা নিয়ন্ত্রিত অথবা বাধার সম্মুখীন হয়। রাজনীতির শক্তি তার ভাষার স্বাধীনতার সামনে দেয়াল তুলে দেয়। আবার অন্যভাবে মানুষের ভাষার স্বাধীনতা খর্ব হলে, ভাষা প্রতিরোধ করা হলে, তখন ভাষা ও রাজনীতি পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আর এ যুদ্ধে ভাষার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কেননা ভাষার সঙ্গে মানুষের আবেগ এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত।
ভাষার শক্তি মূলত তার সৌজন্য এবং নমনীয়তার মধ্যে। গত নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দৃষ্টান্ত দিয়ে, এ বিষয়ের ইতি টানতে চাই। ওবামা তাঁর ভাষণে মানুষকে হতাশা থেকে স্বপ্নের জগতে টেনে আনেন, ভুল স্বীকার করতে ভালোবাসেন, বিরোধী পক্ষের প্রশংসা করতে চেষ্টা করেন, সবশেষে ‘আমিত্ব’ বর্জন করে একাকার হয়ে যান সাধারণ মানুষের মধ্যে। এখানেই তাঁর ভাষার শক্তি। ওবামার ভাষণগুলো পড়লে আমাদের রাজনীতিবিদেরা উপকৃত হবেন। তাঁরা আরও বেশি মানুষের কাছে আসতে পারবেন। আর যে যত সহজে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে আসতে পারে, সে তত আপন হয়ে ওঠে। এখন আর আমাদের ভাষা নিয়ে রাজনীতি করার অবকাশ নেই এই বাংলা ভাষা প্রধান রাষ্ট্রে। কিন্তু রাজনীতির ভাষা পরিবর্তন করার অবকাশ রয়ে গেছে। সরকার এবং বিরোধী দল ভেবে দেখলে একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহ্যময় এ দেশে শুধু ভাষা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হতে পারে। অন্তত বাংলাদেশের জনগণ তাই প্রত্যাশা করে। সে ভাষা কি আপনারা পড়তে পারেন?
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Saturday, February 20, 2010
আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার by সৌরভ সিকদার
বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ধর্ম এবং বহু ভাষার দেশ। এ দেশে প্রধান ভাষা বাংলা হলেও শতকরা দুই ভাগেরও অধিক ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাস করে। এদের মধ্যে উর্দুভাষী বিহারি, তেলেগুসহ ৩০ লাখ বা তারও বেশি আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী বাস করে। যদিও সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা এর অর্ধেক। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও প্রায় ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসীদের ভাষা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে পৃথিবীর চারটি প্রধান ভাষা-পরিবারের প্রায় ৩০টি ভাষা তারা ব্যবহার করে। এর মধ্যে কিছু ভাষা পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হলেও অনেক ভাষাই পরস্পর এতটা ঘনিষ্ঠ যে এগুলোকে উপভাষাই বলা যায়। যেমন তনচঙ্গা মূলত চাকমা ভাষার উপভাষা। অনুরূপভাবে রাখাইন মারমা ভাষার, লালং বা পাত্র গারো ভাষার এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ও হাজং বাংলার উপভাষা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষার সংখ্যা ২৬-৩০টি। যদিও একটি ওয়েবসাইটে (Ethnologue, Languages of Bangladesh) বাংলাদেশে বাংলাসহ মোট ৩৭টি ভাষার উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে ওই ওয়েবসাইটে আসামিজ, বার্মিজ, চিটাগোনিয়ান, হাকা-চীন, রিয়াং, সিলেটি প্রভৃতিকে পৃথক ভাষা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জর্জ গ্রিয়ারসনের ‘ভারতীয় ভাষাসমূহের জরিপ’ প্রকাশিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এ অঞ্চলের আদিবাসী ভাষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। ফলে ভাষাগুলোর শ্রেণীকরণসহ ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং তুলনামূলক কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ গত প্রায় এক শ বছরে ভাষাগুলোতে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলাসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ, সিলেট বিভাগের চা-বাগানসহ নানা উপজেলা, ময়মনসিংহের শেরপুর, মধুপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনাসহ গারো পাহাড়সংলগ্ন এলাকা এবং কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলায় বসবাস করে এরা। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তুলনায় এরা রয়েছে নানা দিক থেকে পিছিয়ে। বিশেষ করে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ যেকোনো শিশুরই মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের মৌলিক অধিকার রয়েছে। স্কুলে যেতে পারে কিংবা স্কুলে যাচ্ছে এরূপ চার থেকে দশ বছর বয়সের আদিবাসী শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। ইউনেসকো ২০০৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাদের মাতৃভাষা জাতীয় বা স্থানীয় ভাষা থেকে ভিন্ন তারা শিক্ষাব্যবস্থায় অনেকটা সুবিধাবঞ্চিত থাকে। বাংলাদেশের আদিবাসী শিশুর ক্ষেত্রে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ বিষয়ে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশে আদিবাসী ও তাদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়েই এমন সব কৌশল, পরিকল্পনা, কাঠামো ও চুক্তি বিদ্যমান যা দেশের আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষী শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য অনুকূল’ (প্রথমে মাতৃভাষা, ২০০৭; সেভ দ্য চিলড্রেন)। তবে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার আজ পর্যন্ত এসব কৌশল, পরিকল্পনা এবং চুক্তির বাস্তবায়ন করেনি। বাংলাদেশের সব শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে এসবের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ধারায় ধর্ম, বর্ণ, জন্মস্থানভেদে কোনো ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৫ ও ১৭ ধারায় অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, গণভিত্তিক সার্বজনীন শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এদিক দিয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পাওয়ার দাবিদার। ১৯৯৭ সালের পাবর্ত্য শান্তি চুক্তির ৩৩/খ-২ ধারায়ও মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুকে এই শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় বিগত দুই দশকে শিক্ষার হার বাড়তে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে শিক্ষার হারও বেড়েছে। কিন্তু আদিবাসী শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে তেমন কোনো পরিকল্পনা অদ্যাবধি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নেওয়া হয়নি, যা হয়েছে তা বেসরকারি উদ্যোগে। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসীদের শিক্ষার্থীর জন্য কোনো পৃথক ব্যবস্থা বা অর্থ বরাদ্দ নেই। কাজেই আদিবাসী শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে মূলত উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যালয়সমূহ। দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (সরকারি) আমাদের প্রচলিত জাতীয় শিক্ষাক্রমের একই পাঠ্যবই অনুসরণ করা হয় এবং এগুলোর ভাষা সংগত কারণেই বাংলা। এসব পাঠ্যপুস্তক মূলত বাংলাভাষী বাঙালি শিশুর পাঠ, বোধগম্যতা এবং মানস-বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে। এগুলো মোটেও আদিবাসী শিশুর শিক্ষাগ্রহণের জন্য বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক এবং পাঠ্যপুস্তকজনিত সমস্যার কারণে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।
শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। আর এই ভাষা যদি শিশুর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটে না। যেহেতু আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা বাংলা নয় এবং বিদ্যালয়ে যে বই পড়তে হয় তার ভাষা এবং বিষয় তার পরিচিত পরিমণ্ডলের নয়, এমনকি যে শিক্ষক পড়ান তাঁর সঙ্গেও তার রয়েছে ভাষিক দূরত্ব (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) কাজেই এতগুলো প্রতিকূলতা পেরিয়ে আদিবাসী শিশুর শিক্ষার বিস্তার ঘটবে তা প্রত্যাশা করা যায় না। আর সম্ভবত এখানেই প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসী শিশুর ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনক। কাজেই অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসী শিশুরা শিক্ষক বা অন্যান্য সহপাঠীর সঙ্গে যথার্থ ভাষিক যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, যা তাদের মনোবল ও উত্সাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পৃথিবীর যেকোনো জাতির রয়েছে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার। কেননা শিশুর দৈহিক, মানসিক ও মানবিক বিকাশের স্বার্থে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতিসংঘ সনদে প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় প্রথমিক শিক্ষার সুযোগ দানের কথা বলা হয়েছে (১২০.১৯৫৭, ১০৭/৩১-১)
শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীদের ধারণা, মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ না থাকায় আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে না। তা ছাডা বাংলাদেশের আদিবাসী এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে শিশুরা যা পড়ছে তা কোনোক্রমেই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ফলে শিশুরা পাঠের উত্সাহ হারিয়ে ফেলে। কাজেই তাদের জন্য পৃথক পাঠক্রম তৈরি করা জরুরি।
আদিবাসী গবেষক মিথু শিলাক মুরমু লিখেছেন,
‘রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা যেন আদিবাসীদের ভাষা উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা না হয়ে ভাষার নির্দেশিকা দুটোর প্রতিটি বর্ণ যেন একটি উজ্জ্বল তারকা হয়ে জ্বলতে পারে। সরকারকে ভাষা রক্ষার জন্য রেডিও-টেলিভিশনে সংশ্লিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর জন্য অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানে উত্সাহী করে। আদিবাসী একাডেমিগুলো থেকে যেন মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশনা, পাশাপাশি রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যসূচি হিসেবে মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্তিকরণ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ভাষাগুলোকে উন্নয়ন প্রচলন ও সংরক্ষণের জন্য গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে’।
এ দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব। কিন্তু এ দেশেরই সংখ্যালঘু মানুষ তথা আদিবাসীদের ভাষা বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে তাদের ভাষাগুলো বিপন্নপ্রায়। বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে আমাদের এখন নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে সংখ্যালঘুদের ভাষার অধিকার ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভাষা-পরিকল্পনা এবং ভাষিক সমমর্মিতা। বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা। পৃথিবী নামক গ্রহের বাংলাদেশ নামক দেশে যতগুলো ভাষা রয়েছে তাদের মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
জর্জ গ্রিয়ারসনের ‘ভারতীয় ভাষাসমূহের জরিপ’ প্রকাশিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এ অঞ্চলের আদিবাসী ভাষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। ফলে ভাষাগুলোর শ্রেণীকরণসহ ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং তুলনামূলক কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ গত প্রায় এক শ বছরে ভাষাগুলোতে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলাসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ, সিলেট বিভাগের চা-বাগানসহ নানা উপজেলা, ময়মনসিংহের শেরপুর, মধুপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনাসহ গারো পাহাড়সংলগ্ন এলাকা এবং কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলায় বসবাস করে এরা। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তুলনায় এরা রয়েছে নানা দিক থেকে পিছিয়ে। বিশেষ করে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ যেকোনো শিশুরই মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের মৌলিক অধিকার রয়েছে। স্কুলে যেতে পারে কিংবা স্কুলে যাচ্ছে এরূপ চার থেকে দশ বছর বয়সের আদিবাসী শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। ইউনেসকো ২০০৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাদের মাতৃভাষা জাতীয় বা স্থানীয় ভাষা থেকে ভিন্ন তারা শিক্ষাব্যবস্থায় অনেকটা সুবিধাবঞ্চিত থাকে। বাংলাদেশের আদিবাসী শিশুর ক্ষেত্রে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ বিষয়ে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশে আদিবাসী ও তাদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়েই এমন সব কৌশল, পরিকল্পনা, কাঠামো ও চুক্তি বিদ্যমান যা দেশের আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষী শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য অনুকূল’ (প্রথমে মাতৃভাষা, ২০০৭; সেভ দ্য চিলড্রেন)। তবে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার আজ পর্যন্ত এসব কৌশল, পরিকল্পনা এবং চুক্তির বাস্তবায়ন করেনি। বাংলাদেশের সব শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে এসবের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ধারায় ধর্ম, বর্ণ, জন্মস্থানভেদে কোনো ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৫ ও ১৭ ধারায় অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, গণভিত্তিক সার্বজনীন শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এদিক দিয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পাওয়ার দাবিদার। ১৯৯৭ সালের পাবর্ত্য শান্তি চুক্তির ৩৩/খ-২ ধারায়ও মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুকে এই শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় বিগত দুই দশকে শিক্ষার হার বাড়তে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে শিক্ষার হারও বেড়েছে। কিন্তু আদিবাসী শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে তেমন কোনো পরিকল্পনা অদ্যাবধি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নেওয়া হয়নি, যা হয়েছে তা বেসরকারি উদ্যোগে। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসীদের শিক্ষার্থীর জন্য কোনো পৃথক ব্যবস্থা বা অর্থ বরাদ্দ নেই। কাজেই আদিবাসী শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে মূলত উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যালয়সমূহ। দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (সরকারি) আমাদের প্রচলিত জাতীয় শিক্ষাক্রমের একই পাঠ্যবই অনুসরণ করা হয় এবং এগুলোর ভাষা সংগত কারণেই বাংলা। এসব পাঠ্যপুস্তক মূলত বাংলাভাষী বাঙালি শিশুর পাঠ, বোধগম্যতা এবং মানস-বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে। এগুলো মোটেও আদিবাসী শিশুর শিক্ষাগ্রহণের জন্য বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক এবং পাঠ্যপুস্তকজনিত সমস্যার কারণে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।
শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। আর এই ভাষা যদি শিশুর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটে না। যেহেতু আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা বাংলা নয় এবং বিদ্যালয়ে যে বই পড়তে হয় তার ভাষা এবং বিষয় তার পরিচিত পরিমণ্ডলের নয়, এমনকি যে শিক্ষক পড়ান তাঁর সঙ্গেও তার রয়েছে ভাষিক দূরত্ব (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) কাজেই এতগুলো প্রতিকূলতা পেরিয়ে আদিবাসী শিশুর শিক্ষার বিস্তার ঘটবে তা প্রত্যাশা করা যায় না। আর সম্ভবত এখানেই প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসী শিশুর ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনক। কাজেই অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসী শিশুরা শিক্ষক বা অন্যান্য সহপাঠীর সঙ্গে যথার্থ ভাষিক যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, যা তাদের মনোবল ও উত্সাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পৃথিবীর যেকোনো জাতির রয়েছে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার। কেননা শিশুর দৈহিক, মানসিক ও মানবিক বিকাশের স্বার্থে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতিসংঘ সনদে প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় প্রথমিক শিক্ষার সুযোগ দানের কথা বলা হয়েছে (১২০.১৯৫৭, ১০৭/৩১-১)
শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীদের ধারণা, মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ না থাকায় আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে না। তা ছাডা বাংলাদেশের আদিবাসী এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে শিশুরা যা পড়ছে তা কোনোক্রমেই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ফলে শিশুরা পাঠের উত্সাহ হারিয়ে ফেলে। কাজেই তাদের জন্য পৃথক পাঠক্রম তৈরি করা জরুরি।
আদিবাসী গবেষক মিথু শিলাক মুরমু লিখেছেন,
‘রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা যেন আদিবাসীদের ভাষা উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা না হয়ে ভাষার নির্দেশিকা দুটোর প্রতিটি বর্ণ যেন একটি উজ্জ্বল তারকা হয়ে জ্বলতে পারে। সরকারকে ভাষা রক্ষার জন্য রেডিও-টেলিভিশনে সংশ্লিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর জন্য অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানে উত্সাহী করে। আদিবাসী একাডেমিগুলো থেকে যেন মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশনা, পাশাপাশি রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যসূচি হিসেবে মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্তিকরণ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ভাষাগুলোকে উন্নয়ন প্রচলন ও সংরক্ষণের জন্য গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে’।
এ দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব। কিন্তু এ দেশেরই সংখ্যালঘু মানুষ তথা আদিবাসীদের ভাষা বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে তাদের ভাষাগুলো বিপন্নপ্রায়। বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে আমাদের এখন নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে সংখ্যালঘুদের ভাষার অধিকার ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভাষা-পরিকল্পনা এবং ভাষিক সমমর্মিতা। বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা। পৃথিবী নামক গ্রহের বাংলাদেশ নামক দেশে যতগুলো ভাষা রয়েছে তাদের মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ভাষাশহীদ সালামের কথা by দীপংকর চন্দ
‘আমার জন্ম ১৯৪৭ সালের সংশয়াকীর্ণ সময়ে। আসন্ন দেশভাগ নিয়ে তখন উৎকণ্ঠিত অবিভক্ত বাংলার মানুষ। আমার কৃষিজীবী বাবা মো. ফাজিল মিয়াও অন্য সবার মতোই আসন্ন দেশভাগের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে হিসাব কষছিলেন। ঠিক ওই সময়ই আমার মা দৌলতুন্নেসা জন্ম দিলেন আমাকে।’ বলতে বলতে একটু থামলেন ষাটোর্ধ্ব আবদুল করিম, তারপর কথা শুরু করলেন আবার।
‘ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম লক্ষ্মণপুরে থাকি আমরা। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তান আমি। স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে এই সব রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচের বিন্দুবিসর্গ বোঝা সম্ভব ছিল না তখন। আমাদের সংসারে বাবা ছাড়া দেশ ও দশের খবরে উত্সাহী ছিলেন আমার বড় ভাই আবদুস সালাম। হ্যাঁ, বায়ান্নর ভাষাশহীদ আবদুস সালামের কথাই বলছি আমি। নানা সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে আমার অকৃতদার বড় ভাইয়ের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর দাগনভূঞা উপজেলার বেকের বাজার সংলগ্ন লক্ষ্মণপুর গ্রামেই।
‘আমার বাবা কৃষিজীবী হলেও প্রকৃতই বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি আমার বড় ভাই আবদুস সালামকে লক্ষ্মণপুর থেকে মাইল দেড়েক দূরে অবস্থিত কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পর আবদুস সালাম ভর্তি হন মাতুভূঞা করিমউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে। বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরের এই বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী অবধি শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। তারপর আবদুস সালাম বিদ্যালয় পরিবর্তন করেন। প্রায় তিন মাইল দূরের উপজেলা সদরে অবস্থিত দাগনভূঞা কামাল আতাতুর্ক উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। এই বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিলেও কেবল সাংসারিক অসচ্ছলতার কারণেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে ব্যর্থ হন আবদুস সালাম। এরপর বেশ কিছুদিন গ্রামের কর্মহীন পরিবেশে জীবন অতিবাহিত হয় তাঁর। কিন্তু এই কর্মহীন জীবন যাপন নিরর্থক মনে হয় সালামের কাছে। জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতেই একদিন তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে ভাগ্যান্বেষণের একপর্যায়ে শিল্প দপ্তরে রেকর্ড-কিপার হিসেবে চাকরিও জুটে যায় তাঁর। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বিনষ্ট করে কলকাতায় সালামের চাকরির ভবিষ্যৎ। ভাগ্যবিড়ম্বিত সালাম শূন্য হাতে ফিরে আসেন গ্রামে। তারপর অন্তরে অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন একদিন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল আবদুস সালামের। অল্প দিনের চেষ্টায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ডাইরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজে রেকর্ড-কিপার হিসেবেই চাকরি পেলেন আবার। দিলকুশায় অফিস ভবনে আবার শুরু হলো তাঁর কর্মব্যস্ত জীবন। চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকায় নির্দিষ্ট বাসস্থান ছিল না আবদুস সালামের। এবার তিনি বাসস্থান অনুসন্ধানে সচেষ্ট হলেন। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আবদুস সালাম নীলক্ষেতে অবস্থিত সরকারি ব্যারাকে একটি ব্যাচেলর সিট পেলেন। ১৯৪৮ সালের প্রথম পাদে নীলক্ষেত সরকারি ব্যারাকে উঠে এলেন আবদুস সালাম এবং এ বছরের সূচনালগ্নেই ঢাকায় শুরু হলো রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে তীব্র আন্দোলন।
‘আমার বড় ভাই আবদুস সালাম ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি-সচেতন। কিন্তু কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে জড়ানোর প্রত্যক্ষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি কোনোকালেই। চাকরিসূত্রে ঢাকায় বসবাস এবার সে সুযোগ সৃষ্টি করল সালামের জীবনে। তিনি দেখলেন, ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে জোয়ার তৈরি হলো বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার প্রেক্ষাপটে, পরবর্তী বছরগুলোতেও কী দারুণভাবে তা সক্রিয় রইল!
‘এভাবেই ১৯৫২ সাল এল। ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল সেদিন। কিন্তু পূর্বঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছাত্ররাও জড়ো হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। আমতলায় ছাত্রসভা শুরু হলো বেলা ১১টায়। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে দলে দলে ছাত্ররা এগিয়ে গেল ১৪৪ ধারা ভাঙতে। পুলিশ বাধা দিল, গ্রেপ্তার করল অনেককে। কিন্তু এতেও যখন নিবৃত্ত করা গেল না ছাত্রদের, তখন তারা লাঠিচার্জ করল, নিক্ষেপ করল কাঁদানে গ্যাস। ছাত্রদের প্রতি পুলিশের এই অন্যায় আচরণ ব্যথিত করল উপস্থিত জনতাকে। আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করল তারা। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হলো। অপরাহ্নে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিল মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনে।
‘আবদুস সালাম সেদিন কর্মস্থল থেকে নীলক্ষেতের সরকারি ব্যারাকে ফিরেছিলেন তাড়াতাড়িই। ফিরেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত ছুটে গিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাক প্রাঙ্গণে। সেখানে পৌঁছে তিনি শাসকগোষ্ঠীর বিরূপ আচরণে ব্যথিত হলেন। সালামের সেই ব্যথা একসময় পরিণত হলো বিক্ষুব্ধতায়। বিক্ষুব্ধ সালাম রাজপথ বিদীর্ণ করা চিত্কার করতে করতে আন্দেলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে অজান্তেই মিশে গেলেন। পুলিশ সচেতনভাবেই গুলি ছুড়ল ছাত্র-জনতার মিছিলে। সেই মিছিলের অবিভাজ্য অংশ আবদুস সালাম গুলিবিদ্ধ হলেন নৃশংসভাবে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হলো তাঁকে। চিকিৎসাও দেওয়া হলো যথোপযুক্ত। কিন্তু প্রায় দেড় মাস যমে-মানুষে টানাটানির পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন আমার বড় ভাই। যত দূর মনে পড়ে, সেই দিনটি ছিল বায়ান্নর ৭ এপ্রিল।’ বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে আবদুল করিমের কণ্ঠস্বর।
‘ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম লক্ষ্মণপুরে থাকি আমরা। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তান আমি। স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে এই সব রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচের বিন্দুবিসর্গ বোঝা সম্ভব ছিল না তখন। আমাদের সংসারে বাবা ছাড়া দেশ ও দশের খবরে উত্সাহী ছিলেন আমার বড় ভাই আবদুস সালাম। হ্যাঁ, বায়ান্নর ভাষাশহীদ আবদুস সালামের কথাই বলছি আমি। নানা সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে আমার অকৃতদার বড় ভাইয়ের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর দাগনভূঞা উপজেলার বেকের বাজার সংলগ্ন লক্ষ্মণপুর গ্রামেই।
‘আমার বাবা কৃষিজীবী হলেও প্রকৃতই বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি আমার বড় ভাই আবদুস সালামকে লক্ষ্মণপুর থেকে মাইল দেড়েক দূরে অবস্থিত কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পর আবদুস সালাম ভর্তি হন মাতুভূঞা করিমউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে। বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরের এই বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী অবধি শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। তারপর আবদুস সালাম বিদ্যালয় পরিবর্তন করেন। প্রায় তিন মাইল দূরের উপজেলা সদরে অবস্থিত দাগনভূঞা কামাল আতাতুর্ক উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। এই বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিলেও কেবল সাংসারিক অসচ্ছলতার কারণেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে ব্যর্থ হন আবদুস সালাম। এরপর বেশ কিছুদিন গ্রামের কর্মহীন পরিবেশে জীবন অতিবাহিত হয় তাঁর। কিন্তু এই কর্মহীন জীবন যাপন নিরর্থক মনে হয় সালামের কাছে। জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতেই একদিন তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে ভাগ্যান্বেষণের একপর্যায়ে শিল্প দপ্তরে রেকর্ড-কিপার হিসেবে চাকরিও জুটে যায় তাঁর। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বিনষ্ট করে কলকাতায় সালামের চাকরির ভবিষ্যৎ। ভাগ্যবিড়ম্বিত সালাম শূন্য হাতে ফিরে আসেন গ্রামে। তারপর অন্তরে অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন একদিন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল আবদুস সালামের। অল্প দিনের চেষ্টায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ডাইরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজে রেকর্ড-কিপার হিসেবেই চাকরি পেলেন আবার। দিলকুশায় অফিস ভবনে আবার শুরু হলো তাঁর কর্মব্যস্ত জীবন। চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকায় নির্দিষ্ট বাসস্থান ছিল না আবদুস সালামের। এবার তিনি বাসস্থান অনুসন্ধানে সচেষ্ট হলেন। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আবদুস সালাম নীলক্ষেতে অবস্থিত সরকারি ব্যারাকে একটি ব্যাচেলর সিট পেলেন। ১৯৪৮ সালের প্রথম পাদে নীলক্ষেত সরকারি ব্যারাকে উঠে এলেন আবদুস সালাম এবং এ বছরের সূচনালগ্নেই ঢাকায় শুরু হলো রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে তীব্র আন্দোলন।
‘আমার বড় ভাই আবদুস সালাম ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি-সচেতন। কিন্তু কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে জড়ানোর প্রত্যক্ষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি কোনোকালেই। চাকরিসূত্রে ঢাকায় বসবাস এবার সে সুযোগ সৃষ্টি করল সালামের জীবনে। তিনি দেখলেন, ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে জোয়ার তৈরি হলো বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার প্রেক্ষাপটে, পরবর্তী বছরগুলোতেও কী দারুণভাবে তা সক্রিয় রইল!
‘এভাবেই ১৯৫২ সাল এল। ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল সেদিন। কিন্তু পূর্বঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছাত্ররাও জড়ো হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। আমতলায় ছাত্রসভা শুরু হলো বেলা ১১টায়। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে দলে দলে ছাত্ররা এগিয়ে গেল ১৪৪ ধারা ভাঙতে। পুলিশ বাধা দিল, গ্রেপ্তার করল অনেককে। কিন্তু এতেও যখন নিবৃত্ত করা গেল না ছাত্রদের, তখন তারা লাঠিচার্জ করল, নিক্ষেপ করল কাঁদানে গ্যাস। ছাত্রদের প্রতি পুলিশের এই অন্যায় আচরণ ব্যথিত করল উপস্থিত জনতাকে। আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করল তারা। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হলো। অপরাহ্নে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিল মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনে।
‘আবদুস সালাম সেদিন কর্মস্থল থেকে নীলক্ষেতের সরকারি ব্যারাকে ফিরেছিলেন তাড়াতাড়িই। ফিরেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত ছুটে গিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাক প্রাঙ্গণে। সেখানে পৌঁছে তিনি শাসকগোষ্ঠীর বিরূপ আচরণে ব্যথিত হলেন। সালামের সেই ব্যথা একসময় পরিণত হলো বিক্ষুব্ধতায়। বিক্ষুব্ধ সালাম রাজপথ বিদীর্ণ করা চিত্কার করতে করতে আন্দেলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে অজান্তেই মিশে গেলেন। পুলিশ সচেতনভাবেই গুলি ছুড়ল ছাত্র-জনতার মিছিলে। সেই মিছিলের অবিভাজ্য অংশ আবদুস সালাম গুলিবিদ্ধ হলেন নৃশংসভাবে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হলো তাঁকে। চিকিৎসাও দেওয়া হলো যথোপযুক্ত। কিন্তু প্রায় দেড় মাস যমে-মানুষে টানাটানির পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন আমার বড় ভাই। যত দূর মনে পড়ে, সেই দিনটি ছিল বায়ান্নর ৭ এপ্রিল।’ বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে আবদুল করিমের কণ্ঠস্বর।
Wednesday, February 17, 2010
ভাষাশহীদ বরকতের কথা -একুশে by দীপংকর চন্দ
জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে সদর অভিমুখী পথে খানিকক্ষণ হেঁটেই নলজানি পৌঁছলাম। হাতের বাঁ দিকে একতলা মার্কেটের সামনে চারপাশ ঘেরা একটি কবর। একটি সাইনবোর্ড সেই কবরের কাছেই। পরিচিতি-জ্ঞাপক কালো সাইনবোর্ডটির ওপর সাদা হরফে লেখা হাজি হাসিনা বিবির নাম। হ্যাঁ, হাজি হাসিনা বিবি ভাষাশহীদ আবুল বরকতের গর্ভধারিণী। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী আবুল বরকতের মা হাসিনা বিবি মারা যান ১৯৮২ সালের ২১ এপ্রিল। ‘তবে তাঁদের উত্তরসূরিরা এখনো বসবাস করেন বরকত মঞ্জিল নামের ওই বাড়িটিতে।’ আঙুল তুলে নির্মাণাধীন একটি বহুতল বাড়ি দেখাতে দেখাতে জানালেন জয়দেবপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম।
বরকত মঞ্জিলে বর্তমানে বসবাস করেন ভাষাশহীদ আবুল বরকতের ছোট ভাই মরহুম আবুল হাসনাতের সন্তান-সন্ততিরা। মনোরম এক ছায়াঘেরা বিকেলে কথা হলো মরহুম আবুল হাসনাতের বড় ছেলে সঙ্গে। না, অকৃতদার বড় চাচার প্রত্যক্ষ কোনো স্মৃতি নেই তাঁর কাছে। তাঁর জন্ম বড় চাচা শহীদ হওয়ার আট বছর পর, অর্থাৎ ১৯৬০ সালে। তবে জন্মের পর থেকেই দাদিসহ সংসারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে চাচা আবুল বরকতের স্মৃতিবিজড়িত নানা কথা শুনেছেন তিনি। দেখেছেন বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বেশ কিছু স্মৃতিস্মারকও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বড় চাচা আবুল বরকত সম্পর্কে এক ধরনের পরোক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আলাউদ্দিন বরকত। আমরা তাঁর অভিজ্ঞতার অংশ হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। আমাদের আন্তরিক অভিপ্রায় আলাউদ্দিন বরকতকে উদ্বুদ্ধ করে ভাষাশহীদ আবুল বরকতের জীবনচরিত বর্ণনায়।
‘ভাষাশহীদ আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ জুন। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম মৌলভি শামসুজ্জোহা ওরফে ভুলু মিয়া। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে আবুল বরকতের স্থান চতুর্থ।’
‘আবুল বরকতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় বাবলা বহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন তালিবপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের এই বিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করেন তিনি। শিক্ষা গ্রহণের পরবর্তী ধাপে পা রাখতে বহরমপুর চলে যান আবুল বরকত। ভর্তি হন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে। এই কলেজ থেকেই ১৯৪৭ সালে আইএ পাস করেন তিনি। সে বছরের আগস্ট মাসেই ভাগ হয় দেশ। আকস্মিক দেশভাগ কিছুটা হলেও দ্বিধায় ফেলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উন্মুখ আবুল বরকতকে। উচ্চশিক্ষার্থে কোথায় যাবেন তিনি? কলকাতায়, না ঢাকায়? সব দ্বিধার অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এলেন আবুল বরকত। ঢাকায় পুরানা পল্টন লেনের বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে তখন বসবাস করতেন তাঁর মামা আবদুল মালেক। তিনি চাকরি করতেন ওয়াপদায়, বেশ উঁচু পদে। ঢাকায় এসে মামা আবদুল মালেকের বাসায় উঠলেন আবুল বরকত। কয়েক দিনের মধ্যেই ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। লেখাপড়া শুরু হলো। অতিক্রান্ত হলো বেশ কিছু বছর। সম্মান চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান অর্জন করলেন আমার বড় চাচা।’ দীর্ঘ বক্তব্যের এ পর্যায়ে খানিকটা বিরতি নিলেন আলাউদ্দিন বরকত। চোখ বুজে স্মৃতির পাতা ওল্টালেন মনে মনে। এরপর কথা শুরু করলেন আবার। ‘১৯৫২ সালে আমার চাচা আবুল বরকত ছিলেন এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র। তখন তিনি লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে অল্পবিস্তর রাজনীতি করছেন। ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই তিনি নিশ্চিত করছেন তাঁর সংযুক্তি।’
‘একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা জারি ছিল ঢাকায়। বেলা ১১টার দিকে মধুর ক্যান্টিনের সামনে অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদলবলে পথে নেমে এল ছাত্ররা। ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শুরু হলো স্লোগান। শুরু হলো ছাত্র-জনতার সম্মিলিত মিছিল। শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নির্দেশে পুলিশ পিছু হটল না মোটেই। কিছু ছাত্রকে গ্রেপ্তার তো করলই তারা, এগিয়ে এসে লাঠিচার্জ করল, নিক্ষেপ করল কাঁদানে গ্যাস। ছাত্র-জনতা ছত্রভঙ্গ হলো। কিন্তু তা অল্প সময়ের জন্য। আবার তারা সংগঠিত হলো দ্রুত মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনে। দুপুরের পরপরই তীব্র হলো আন্দোলন। তীব্র হলো পুলিশের সহিংস মনোভাবও। বেলা তিনটার দিকে ছাত্র-জনতার সমাবেশ লক্ষ্য করে গুলি চালাল পুলিশ। সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হলেন রফিক উদ্দিন আহমদ। গুলি লাগল গফরগাঁওয়ের আবদুল জব্বার, দাগনভূঞার আবদুস সালাম এবং আমার বড় চাচা আবুল বরকতের শরীরেও।’
তারপর? ঘটনা বর্ণনার এ পর্যায়ে কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারি না আমরা। জানতে চাই বহুবর্ণিত ঘটনাই রুদ্ধশ্বাসে আবার। আলাউদ্দিন বরকত একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ধীরে ধীরে বলেন, ‘তারপর আর কী! জব্বার, সালাম আর বরকতকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আটটার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন আমার বড় চাচা।’
বরকত মঞ্জিলে বর্তমানে বসবাস করেন ভাষাশহীদ আবুল বরকতের ছোট ভাই মরহুম আবুল হাসনাতের সন্তান-সন্ততিরা। মনোরম এক ছায়াঘেরা বিকেলে কথা হলো মরহুম আবুল হাসনাতের বড় ছেলে সঙ্গে। না, অকৃতদার বড় চাচার প্রত্যক্ষ কোনো স্মৃতি নেই তাঁর কাছে। তাঁর জন্ম বড় চাচা শহীদ হওয়ার আট বছর পর, অর্থাৎ ১৯৬০ সালে। তবে জন্মের পর থেকেই দাদিসহ সংসারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে চাচা আবুল বরকতের স্মৃতিবিজড়িত নানা কথা শুনেছেন তিনি। দেখেছেন বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বেশ কিছু স্মৃতিস্মারকও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বড় চাচা আবুল বরকত সম্পর্কে এক ধরনের পরোক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আলাউদ্দিন বরকত। আমরা তাঁর অভিজ্ঞতার অংশ হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। আমাদের আন্তরিক অভিপ্রায় আলাউদ্দিন বরকতকে উদ্বুদ্ধ করে ভাষাশহীদ আবুল বরকতের জীবনচরিত বর্ণনায়।
‘ভাষাশহীদ আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ জুন। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম মৌলভি শামসুজ্জোহা ওরফে ভুলু মিয়া। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে আবুল বরকতের স্থান চতুর্থ।’
‘আবুল বরকতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় বাবলা বহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন তালিবপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের এই বিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করেন তিনি। শিক্ষা গ্রহণের পরবর্তী ধাপে পা রাখতে বহরমপুর চলে যান আবুল বরকত। ভর্তি হন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে। এই কলেজ থেকেই ১৯৪৭ সালে আইএ পাস করেন তিনি। সে বছরের আগস্ট মাসেই ভাগ হয় দেশ। আকস্মিক দেশভাগ কিছুটা হলেও দ্বিধায় ফেলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উন্মুখ আবুল বরকতকে। উচ্চশিক্ষার্থে কোথায় যাবেন তিনি? কলকাতায়, না ঢাকায়? সব দ্বিধার অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এলেন আবুল বরকত। ঢাকায় পুরানা পল্টন লেনের বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে তখন বসবাস করতেন তাঁর মামা আবদুল মালেক। তিনি চাকরি করতেন ওয়াপদায়, বেশ উঁচু পদে। ঢাকায় এসে মামা আবদুল মালেকের বাসায় উঠলেন আবুল বরকত। কয়েক দিনের মধ্যেই ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। লেখাপড়া শুরু হলো। অতিক্রান্ত হলো বেশ কিছু বছর। সম্মান চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান অর্জন করলেন আমার বড় চাচা।’ দীর্ঘ বক্তব্যের এ পর্যায়ে খানিকটা বিরতি নিলেন আলাউদ্দিন বরকত। চোখ বুজে স্মৃতির পাতা ওল্টালেন মনে মনে। এরপর কথা শুরু করলেন আবার। ‘১৯৫২ সালে আমার চাচা আবুল বরকত ছিলেন এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র। তখন তিনি লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে অল্পবিস্তর রাজনীতি করছেন। ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই তিনি নিশ্চিত করছেন তাঁর সংযুক্তি।’
‘একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা জারি ছিল ঢাকায়। বেলা ১১টার দিকে মধুর ক্যান্টিনের সামনে অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদলবলে পথে নেমে এল ছাত্ররা। ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শুরু হলো স্লোগান। শুরু হলো ছাত্র-জনতার সম্মিলিত মিছিল। শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নির্দেশে পুলিশ পিছু হটল না মোটেই। কিছু ছাত্রকে গ্রেপ্তার তো করলই তারা, এগিয়ে এসে লাঠিচার্জ করল, নিক্ষেপ করল কাঁদানে গ্যাস। ছাত্র-জনতা ছত্রভঙ্গ হলো। কিন্তু তা অল্প সময়ের জন্য। আবার তারা সংগঠিত হলো দ্রুত মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনে। দুপুরের পরপরই তীব্র হলো আন্দোলন। তীব্র হলো পুলিশের সহিংস মনোভাবও। বেলা তিনটার দিকে ছাত্র-জনতার সমাবেশ লক্ষ্য করে গুলি চালাল পুলিশ। সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হলেন রফিক উদ্দিন আহমদ। গুলি লাগল গফরগাঁওয়ের আবদুল জব্বার, দাগনভূঞার আবদুস সালাম এবং আমার বড় চাচা আবুল বরকতের শরীরেও।’
তারপর? ঘটনা বর্ণনার এ পর্যায়ে কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারি না আমরা। জানতে চাই বহুবর্ণিত ঘটনাই রুদ্ধশ্বাসে আবার। আলাউদ্দিন বরকত একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ধীরে ধীরে বলেন, ‘তারপর আর কী! জব্বার, সালাম আর বরকতকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আটটার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন আমার বড় চাচা।’
Sunday, February 14, 2010
সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন: বাধা কোথায় -আমার ভাষা আমার একুশ by সৌরভ সিকদা
একসময় স্লোগান উঠেছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। অনেক ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে আমরা শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলাই পাইনি, বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য পৃথিবী নামের গ্রহে ‘বাংলাদেশ’ নামে মানচিত্রও পেয়েছি আমরা। এরপর পার হয়েছে প্রায় চার দশক। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে—‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ (১ম ভাগ, অনুচ্ছেদ-৩)। এ দেশের ৯৫ ভাগ মানুষের ভাষা বাংলা। তার পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। রাষ্ট্রীয় আইন করেও সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রথম ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ তত্কালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক সরকারি আদেশে বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস-আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে।...এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উচ্ছৃঙ্খলতা চলতে দেওয়া যেতে পারে না। এ আদেশ জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আধাসরকারি অফিসসমূহে কেবল বাংলার মাধ্যমে নথিপত্র ও চিঠিপত্র লেখা হবে। এ বিষয়ে কোনো অন্যথা হলে ওই বিধি লঙ্ঘনকারীকে আইনানুগ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’ এরপর তিন যুগ চলে গেল, এখনো সরকারি কাজে শতভাগ বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া সর্বত্র বাংলায় চিঠিপত্র ও নোট আদান-প্রদান চলছে। এ প্রসঙ্গে আরও একটি সরকারি আদেশের কথা না উল্লেখ করলেই নয়। ১৯৭৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদের যে সভা অনুষ্ঠিত হয় বাংলা ব্যাপকতর ব্যবহারের উদ্দেশে, সেই সভায় সর্বস্তরে বাংলা প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি ইংরেজিতে লেখা হয়। কাজেই এ থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আন্তরিকতার স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়।
সরকারি কাজকর্মে বাংলা ভাষার ব্যবহার আশানুরূপ হলেও পরিভাষাগত কিছু সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নামকরণ এখনো ইংরেজিতে—ডিআইটি যদি রাজউক, রেডিও যদি বেতার হতে পারে, তবে টিসিবি, হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন, ঢাকা সিটি করপোরেশন, বিপিসি, এগুলো কেন বাংলায় করা যায় না? আসলে মানসিকতার সমস্যা। সরকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিলে অবশ্যই সম্ভব।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, ‘সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘকাল আগে নেওয়া হয়েছে এবং অনেক স্তরে বাংলা এখন ব্যবহূত হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে একমাত্র বাংলাই প্রয়োগ হবে, এটা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য স্তরেও বাংলা ব্যবহূত হচ্ছে। তবে যেসব ক্ষেত্রে জনসাধারণের সম্পৃক্তি খুব ঘনিষ্ঠ যেমন চিকিত্সা ব্যবস্থাপত্র, আইন, দোকানপাটের নামফলক, ব্যাংকের কাগজ প্রভৃতি, সেখানে বাংলা হওয়া জরুরি। সরকারি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বাংলা প্রচলন হচ্ছে, পরিভাষার সমস্যা এখন নেই বললেই চলে। তবে বাংলার প্রচলন আরও ভালো করার ক্ষেত্রে আন্তরিক সদিচ্ছা থাকা দরকার সবার। এটি থাকলে যা কিছু ঘাটতি রয়েছে, তা সহজেই পূর্ণ হবে। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যাম বেতার-টিভি যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারত, তা করছে না। আশা করব, তারা এ বিষয়ে মনোযোগী হবে।’
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ ইংরেজি জানে না। অথচ কোনো চিকিত্সক বাংলায় ব্যবস্থাপত্র লিখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এমনকি ইংরেজিতে সব ওষুধের নাম। এমন একটা অতি প্রয়োজনীয় এবং সাধারণ মানুষ-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োগ কবে হবে? বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন—‘স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলা প্রচলনে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। ছাত্ররা ভেবেছিল বাংলা শিখলে চাকরির রুদ্ধদ্বার খুলবে। নিম্নপদস্থ ব্যক্তিরা ভেবেছিলেন যুক্তাক্ষরগুলোকে বশ করতে পারলে উন্নতি হবে; পাওয়া যাবে সামাজিক অর্থনৈতিক স্বীকৃতি। তাই বাংলা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল চতুর্দিকে। কিন্তু পঁচাত্তরের পর স্রোত বিপরীতমুখী হয়ে ওঠে—উগ্র হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীলতা—বাংলাদেশ বেতার, চালনা বন্দর, পৌরসভা, রাষ্ট্রপতি প্রভৃতি রেডিও বাংলাদেশ, পোর্ট অব চালনা, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন, প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠতে থাকে। বাংলার মর্যাদা হ্রাস পায়, তার অর্থমূল্য ক্রমেই কমতে থাকে। এবং উত্সাহীরাও পুনরায় ইংরেজিমুখী হয়ে ওঠেন। এই অকারণ ইংরেজি উত্সাহীরা ক্রমেই বাড়ছে, তাদের ইংরেজির মান বাড়ছে না।’
১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন—‘লেখাপড়ার কথা দূরে থাক, এখন নব্য সমপ্রদায়ের মধ্যে কোনো কাজই বাংলায় হয় না...ইহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। ইংরেজি এক রাজভাষা তাহাতে অর্থ উপার্জনের ভাষা।’ বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার দেড় শ বছর পর আজ ইংরেজ রাজা নেই কিন্তু ঔপনিবেশিক দাসত্ববোধের দায় রয়ে গেছে। আর তথ্যপ্রযুক্তি-বহুজাতিক বাণিজ্য কোম্পানির লোভনীয় চাকরিতে অধিক উপার্জনের আকাঙ্ক্ষায় একালেও অধিকাংশ শিক্ষিত ব্যক্তি ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। শুদ্ধ করে মায়ের ভাষা জানার চেয়ে বিশ্বায়নের বিশ্বগ্রাসী ইংরেজি ভাষার উচ্চারণভঙ্গি আয়ত্ত করার প্রতি আগ্রহ বেশি। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেতে উঠেছে তড়িত্ গণমাধ্যমগুলো। তাই জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা তো পায়নি বরং পত্রিকার পাতায় আফসোসের বিজ্ঞাপন পড়ি, ‘ইংরেজিটা আরেকটু ভালো জানলে বেশি উপার্জন করতে পারতাম।’ দেশের রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় ভাষা বাংলা, অথচ সেই দেশের রাস্তা বা সড়ক দিয়ে আপনি হাঁটতে পারবেন না। আপনাকে রোড অথবা এভিনিউ দিয়ে যেতে হবে। সড়কের পাশে আপনি কোনো ‘দোকান’ পাবেন না, ‘শপ’ বা ‘শপিং সেন্টার’ পাবেন অনেক। দোকানপাট, অফিস-আদালতের নামফলকে রোমান হরফের বাড়াবাড়ি দেখে ভুল হতে পারে, এটা লন্ডন বা নিউইয়র্কের কোনো স্ট্রিট, বাংলাদেশের সড়ক নয়। এ দেশের ৯৮ ভাগ মানুষ বাংলা বলে ও বোঝে, অথচ তারা দেশে উত্পাদিত এমন অনেক পণ্য ব্যবহার করে সেগুলোর অধিকাংশের নামকরণ ইংরেজিতে, শুধু আলুভর্তা আর ডালভাত ছাড়া আর সবই ইংরেজিতে খাই। অথচ এসব পণ্য উত্পাদিত হয় বাংলাদেশেই। শুধু কি খাবার? আপনি চুল-দাড়ি কাটাতে গেলে নরসুন্দর খুঁজে পাবেন না, হেয়ার ড্রেসার অথবা সেলুনে যেতে হবে। জায়গা কিনবেন, মডেল টাউন কিংবা রিভারভিউ খুঁজতে হবে। পড়তে যাবেন, ৯০ ভাগ বেসরকারি বিদ্যালয়ের নামকরণ ইংরেজিতে, ৯৫ ভাগ কলেজের নাম ইংরেজিতে, আর প্রায় ১০০ ভাগ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইংরেজিতে এবং বিশুদ্ধ রোমান হরফে লেখা। আমাদের প্রিয় দুঃখিনী বর্ণমালার কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। এমনকি আমাদের পেশার ক্ষেত্রে থেকেও বাংলা বিতাড়িত—অ্যাডভোকেট, মার্কেটিং ম্যানেজার, ট্রাফিক, টিচার, ওয়েটার, নাইটগার্ড, কোস্টগার্ড, বাসড্রাইভার, স্ক্রিপ্ট রাইটার—সবই ইংরেজি। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এবং তাদের অনুষ্ঠানের নামকরণের দিকে তাকাই—টক শো, মিউজিক শো, মেগাসিরিয়াল, নিউজ আপডেট, হেলথ লাইন কি ইংরেজি ছাড়া? এই হচ্ছে স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের অবস্থা।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সরকারি কাজকর্মে বাংলা ভাষার ব্যবহার আশানুরূপ হলেও পরিভাষাগত কিছু সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নামকরণ এখনো ইংরেজিতে—ডিআইটি যদি রাজউক, রেডিও যদি বেতার হতে পারে, তবে টিসিবি, হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন, ঢাকা সিটি করপোরেশন, বিপিসি, এগুলো কেন বাংলায় করা যায় না? আসলে মানসিকতার সমস্যা। সরকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিলে অবশ্যই সম্ভব।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, ‘সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘকাল আগে নেওয়া হয়েছে এবং অনেক স্তরে বাংলা এখন ব্যবহূত হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে একমাত্র বাংলাই প্রয়োগ হবে, এটা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য স্তরেও বাংলা ব্যবহূত হচ্ছে। তবে যেসব ক্ষেত্রে জনসাধারণের সম্পৃক্তি খুব ঘনিষ্ঠ যেমন চিকিত্সা ব্যবস্থাপত্র, আইন, দোকানপাটের নামফলক, ব্যাংকের কাগজ প্রভৃতি, সেখানে বাংলা হওয়া জরুরি। সরকারি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বাংলা প্রচলন হচ্ছে, পরিভাষার সমস্যা এখন নেই বললেই চলে। তবে বাংলার প্রচলন আরও ভালো করার ক্ষেত্রে আন্তরিক সদিচ্ছা থাকা দরকার সবার। এটি থাকলে যা কিছু ঘাটতি রয়েছে, তা সহজেই পূর্ণ হবে। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যাম বেতার-টিভি যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারত, তা করছে না। আশা করব, তারা এ বিষয়ে মনোযোগী হবে।’
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ ইংরেজি জানে না। অথচ কোনো চিকিত্সক বাংলায় ব্যবস্থাপত্র লিখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এমনকি ইংরেজিতে সব ওষুধের নাম। এমন একটা অতি প্রয়োজনীয় এবং সাধারণ মানুষ-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োগ কবে হবে? বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন—‘স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলা প্রচলনে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। ছাত্ররা ভেবেছিল বাংলা শিখলে চাকরির রুদ্ধদ্বার খুলবে। নিম্নপদস্থ ব্যক্তিরা ভেবেছিলেন যুক্তাক্ষরগুলোকে বশ করতে পারলে উন্নতি হবে; পাওয়া যাবে সামাজিক অর্থনৈতিক স্বীকৃতি। তাই বাংলা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল চতুর্দিকে। কিন্তু পঁচাত্তরের পর স্রোত বিপরীতমুখী হয়ে ওঠে—উগ্র হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীলতা—বাংলাদেশ বেতার, চালনা বন্দর, পৌরসভা, রাষ্ট্রপতি প্রভৃতি রেডিও বাংলাদেশ, পোর্ট অব চালনা, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন, প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠতে থাকে। বাংলার মর্যাদা হ্রাস পায়, তার অর্থমূল্য ক্রমেই কমতে থাকে। এবং উত্সাহীরাও পুনরায় ইংরেজিমুখী হয়ে ওঠেন। এই অকারণ ইংরেজি উত্সাহীরা ক্রমেই বাড়ছে, তাদের ইংরেজির মান বাড়ছে না।’
১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন—‘লেখাপড়ার কথা দূরে থাক, এখন নব্য সমপ্রদায়ের মধ্যে কোনো কাজই বাংলায় হয় না...ইহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। ইংরেজি এক রাজভাষা তাহাতে অর্থ উপার্জনের ভাষা।’ বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার দেড় শ বছর পর আজ ইংরেজ রাজা নেই কিন্তু ঔপনিবেশিক দাসত্ববোধের দায় রয়ে গেছে। আর তথ্যপ্রযুক্তি-বহুজাতিক বাণিজ্য কোম্পানির লোভনীয় চাকরিতে অধিক উপার্জনের আকাঙ্ক্ষায় একালেও অধিকাংশ শিক্ষিত ব্যক্তি ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। শুদ্ধ করে মায়ের ভাষা জানার চেয়ে বিশ্বায়নের বিশ্বগ্রাসী ইংরেজি ভাষার উচ্চারণভঙ্গি আয়ত্ত করার প্রতি আগ্রহ বেশি। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেতে উঠেছে তড়িত্ গণমাধ্যমগুলো। তাই জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা তো পায়নি বরং পত্রিকার পাতায় আফসোসের বিজ্ঞাপন পড়ি, ‘ইংরেজিটা আরেকটু ভালো জানলে বেশি উপার্জন করতে পারতাম।’ দেশের রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় ভাষা বাংলা, অথচ সেই দেশের রাস্তা বা সড়ক দিয়ে আপনি হাঁটতে পারবেন না। আপনাকে রোড অথবা এভিনিউ দিয়ে যেতে হবে। সড়কের পাশে আপনি কোনো ‘দোকান’ পাবেন না, ‘শপ’ বা ‘শপিং সেন্টার’ পাবেন অনেক। দোকানপাট, অফিস-আদালতের নামফলকে রোমান হরফের বাড়াবাড়ি দেখে ভুল হতে পারে, এটা লন্ডন বা নিউইয়র্কের কোনো স্ট্রিট, বাংলাদেশের সড়ক নয়। এ দেশের ৯৮ ভাগ মানুষ বাংলা বলে ও বোঝে, অথচ তারা দেশে উত্পাদিত এমন অনেক পণ্য ব্যবহার করে সেগুলোর অধিকাংশের নামকরণ ইংরেজিতে, শুধু আলুভর্তা আর ডালভাত ছাড়া আর সবই ইংরেজিতে খাই। অথচ এসব পণ্য উত্পাদিত হয় বাংলাদেশেই। শুধু কি খাবার? আপনি চুল-দাড়ি কাটাতে গেলে নরসুন্দর খুঁজে পাবেন না, হেয়ার ড্রেসার অথবা সেলুনে যেতে হবে। জায়গা কিনবেন, মডেল টাউন কিংবা রিভারভিউ খুঁজতে হবে। পড়তে যাবেন, ৯০ ভাগ বেসরকারি বিদ্যালয়ের নামকরণ ইংরেজিতে, ৯৫ ভাগ কলেজের নাম ইংরেজিতে, আর প্রায় ১০০ ভাগ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইংরেজিতে এবং বিশুদ্ধ রোমান হরফে লেখা। আমাদের প্রিয় দুঃখিনী বর্ণমালার কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। এমনকি আমাদের পেশার ক্ষেত্রে থেকেও বাংলা বিতাড়িত—অ্যাডভোকেট, মার্কেটিং ম্যানেজার, ট্রাফিক, টিচার, ওয়েটার, নাইটগার্ড, কোস্টগার্ড, বাসড্রাইভার, স্ক্রিপ্ট রাইটার—সবই ইংরেজি। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এবং তাদের অনুষ্ঠানের নামকরণের দিকে তাকাই—টক শো, মিউজিক শো, মেগাসিরিয়াল, নিউজ আপডেট, হেলথ লাইন কি ইংরেজি ছাড়া? এই হচ্ছে স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের অবস্থা।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Thursday, February 4, 2010
বাংলা পরিভাষা: নতুন কোনো নির্মাণ নেই -আমার ভাষা আমার একুশ by সৌরভ সিকদার
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের কৃষিকাজের জন্য ‘গভীর নলকূপ’ ব্যবহার করে। এই গভীর নলকূপটি যে ইংরেজি ‘ডিপটিউবওয়েল’ থেকে এসেছে, পরিভাষা হিসেবে তা তারা জানে না। বাংলা ভাষার ভান্ডারে নতুন শব্দ এল, বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তা গ্রহণও করল। এভাবে পরিভাষা তৈরি হয়, ভাষা সমৃদ্ধ হয়। একসময় বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র কম ছিল, তাই জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র ছাড়া পরিভাষা তৈরির প্রয়োজন ও সুযোগ ছিল না। একালে বিশ্বায়নের (গ্লোবালাইজেশনের পরিভাষা) ফলে পৃথিবীর তাবত্ প্রযুক্তি, জ্ঞানশাখা, ভোগ্যপণ্য রাতারাতি চলে আসছে আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু ভাষার ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে এবং বাংলাভাষী সাধারণ মানুষের মাঝে তা বোধগম্য করে ছাড়িয়ে দিতে যথেষ্ঠ পরিভাষা তৈরি হচ্ছে না। অথচ আমরা চাই আমাদের মাতৃভাষা জ্ঞানবিজ্ঞানের নতুন নতুন বই থেকে শুরু করে প্রযুুক্তির ব্যবহার, কথাবার্তায় এমনকি দৈনন্দিন কাজকর্মে সর্বস্তরে প্রসারিত হোক। ১৯৩৩ সালে রাজশেখর বসু বলেছিলেন, ‘পরিভাষার একমাত্র উদ্দেশ্য বিভিন্ন বিদ্যার চর্চা এবং শিক্ষার বিস্তারের জন্য ভাষার প্রকাশশক্তি বর্ধন। পরিভাষা যাতে অল্পায়াসে বোধগম্য হয়, তাও দেখতে হবে।’
আমাদের অফিসে অফিসে ফাইলের সঙ্গে ‘নথি’ চলে কিন্তু নোটের সঙ্গে কী চলবে? কেউ লিখছেন ‘টোকা’, কেউ বা ‘চোথা’। উপযুক্ত শব্দ বা পরিভাষার অভাবে থমকে যেতে হচ্ছে। পরিভাষা যথাযথ না হলে যেমন বিভ্রান্তির শিকার হতে হয়, তেমনি সাধারণ মানুষ তা ব্যবহারও করে না। যেমন উনিশ শতকে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের পরিভাষা করা হয়েছিল অম্লজান ও উদ্জান—ওগুলো চলেনি। তেমনি পাকিস্তান আমলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ইংরেজ চিকিত্সক বার্নাড প্রথম সফলভাবে ‘হার্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’ করলে তখনকার দৈনিক পাকিস্তান-এর প্রথম পৃষ্ঠায় বড় হরফে খবরটি লেখা হয়েছিল ‘হূদয়-বদল’ শিরোনামে। সংবাদপত্রে এমন একটি যুগান্তকারী সংবাদ বা বৈজ্ঞানিক সাফল্য শুধু লাগসই পরিভাষার অভাবে প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে রূপান্তরিত হয়েছে।
কাজেই উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অভাবে বাংলায় যে সবকিছু স্পষ্ট করা যাচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। আমাদের বাংলা সাহিত্য অর্থাত্ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক হয়তো পরিভাষার মুখাপেক্ষী নয় (অবশ্য অনুবাদ সাহিত্যের প্রয়োজন আছে)। কিন্তু বিজ্ঞান, বাণিজ্য, দর্শন, চিকিত্সা, প্রকৌশল বিদ্যা, আইন শাস্ত্র তথা বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত এবং সংবাদমাধ্যমগুলোতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ করতে গেলে পরিভাষার সমস্যা আসবেই। সে কারণেই প্রয়োজন উপযুক্ত পরিভাষা। প্রয়োজনটা যাদের, তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। যদিও পরিভাষা তৈরিতে সাধারণ মানুষ অনেক আগেই অবদান রেখেছে। ভাষা বিশারদ মুহাম্মদ এনামুল হক এ প্রসঙ্গে তিন যুগ আগে লিখেছেন—‘দেশের গণমানব বাংলা মুদ্রাক্ষর যন্ত্রের খবর রাখে না, বাংলা পরিভাষা তৈরিরও তোয়াক্কা করে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই বাংলা ভাষার মূল ধারক ও বাহক। তাদের কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় পরিভাষা তারা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছে ও নিচ্ছে’ (মনীষা-মঞ্জুষা; ১৯৭৬) তিনি এগুলোকে লৌকিক পারিভাষিক শব্দ উল্লেখ করে কিছু দৃষ্টান্তও দিয়েছেন: অ্যারোপ্লেন>উড়োজাহাজ, রেডিও>বেতার, কন্ট্রাক্টর>ঠিকাদার, বোম্ব>বোমা, ইঞ্জিন>ইঞ্জিল, ভোটিং>ভোটাভুটি, জেনারেল>জাঁদরেল প্রভৃতি। মুহাম্মদ এনামুল হক পরিভাষা নিয়ে তেমনি অভিযোগও করেছেন, ‘আর শিক্ষিত লোকেরা কোনো বিদেশি বৈজ্ঞানিক শব্দের কোনো বাংলা শব্দ তৈরি না করে শুধু ইংরেজি তথা বিদেশি ভাষাকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেছেন।’ প্রয়াত ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ একে অন্যভাবে বলেছেন, ‘কত টাকা জমলে বাংলাকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয়।’ বাংলাদেশে পরিভাষা নিয়ে কাজ করেছেন ভাষাবিজ্ঞানী মনসুর মুসা। তিনি বাংলায় পরিভাষার সমস্যা ও করণীয় বিষয়ে জানান, ‘বাংলা পরিভাষা পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয় সম্বন্ধে বলতে গেলে তিনটি পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। একটি হচ্ছে পরিভাষা বা পরিশব্দ সৃষ্টি পরিস্থিতি, দ্বিতীয়টি হলো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পরিশব্দ প্রচার-পরিস্থিতি, তৃতীয়তটি হলো পরিভাষা ব্যবহারকারীর আগ্রহ।
প্রথমত. বাংলা একাডেমী, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যা পরিভাষা বা পরিশব্দ সৃষ্টি করেছে তা জ্ঞানচর্চার জন্য যথেষ্ট নয়। সব শব্দ এক দিনে সৃষ্টি করা যায় না। কিন্তু যা সৃষ্টি হয়েছে তার যথাযথ বিতরণ ও ব্যবহারও হচ্ছে না। ফলে পরিভাষা পরিস্থিতি যতটা স্বভাবমুখী হওয়া উচিত ছিল, ততটা স্বভাবমুখী না হয়ে বিভাষামুখী হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিভাষা কমিটিগুলোতে আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব কিংবা অংশীদারি নেই। এমনকি ভাষিক এলাকা হিসেবে উপমহাদেশের পরিভাষা পরিস্থিতি খুব সন্তোষজনক নয়। সার্ক অঞ্চলে একটি পরিভাষা সমতা কমিটি গঠন একান্ত প্রয়োজন।
উনিশ ও বিশ শতকে পরিভাষা প্রণয়নে ব্যক্তিপর্যায়ে অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ এরং প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সাহিত্য পরিষত্ পত্রিকা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমী প্রভৃতির অবদান অস্বীকার্য। বিশেষ করে—সাহিত্য পরিষত্ পত্রিকা। এই পত্রিকায় ১৯০১ সাল থেকে প্রায় ত্রিশ বছরে ৬৭টি পরিভাষা বিষয়ক লেখা এবং নানা জ্ঞানশাখার পরিভাষা প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ একুশ শতকে এসে আমাদের পরিভাষা প্রণয়ন প্রচেষ্টা থমকে গেছে যেন।
একুশের চেতনাকে সমুন্নত করে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করতে হলে আমাদের পরিভাষা তৈরির বিকল্প নেই। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যেমন বাংলা একাডেমী নিতে পারে, তেমনি যাঁরা যে শাস্ত্রের বা জ্ঞানশাখায় পণ্ডিত, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। আসতে হবে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, গবেষকদেরও। আর এ ক্ষেত্রে ভাষিক সৌন্দর্য ও শুদ্ধাশুদ্ধির জন্য সহায়তা প্রয়োজন হবে ভাষাবিজ্ঞানীদের। নতুন পরিভাষা না হলে ভাষা সমৃদ্ধ হবে না। জ্ঞান শাখার বিস্তার ঘটবে না। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। ভাষার প্রতি দায়িত্ব পালন না করে কেবল ফেব্রুয়ারি এলে, ‘মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা’ আউড়ে কী লাভ?
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আমাদের অফিসে অফিসে ফাইলের সঙ্গে ‘নথি’ চলে কিন্তু নোটের সঙ্গে কী চলবে? কেউ লিখছেন ‘টোকা’, কেউ বা ‘চোথা’। উপযুক্ত শব্দ বা পরিভাষার অভাবে থমকে যেতে হচ্ছে। পরিভাষা যথাযথ না হলে যেমন বিভ্রান্তির শিকার হতে হয়, তেমনি সাধারণ মানুষ তা ব্যবহারও করে না। যেমন উনিশ শতকে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের পরিভাষা করা হয়েছিল অম্লজান ও উদ্জান—ওগুলো চলেনি। তেমনি পাকিস্তান আমলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ইংরেজ চিকিত্সক বার্নাড প্রথম সফলভাবে ‘হার্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’ করলে তখনকার দৈনিক পাকিস্তান-এর প্রথম পৃষ্ঠায় বড় হরফে খবরটি লেখা হয়েছিল ‘হূদয়-বদল’ শিরোনামে। সংবাদপত্রে এমন একটি যুগান্তকারী সংবাদ বা বৈজ্ঞানিক সাফল্য শুধু লাগসই পরিভাষার অভাবে প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে রূপান্তরিত হয়েছে।
কাজেই উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অভাবে বাংলায় যে সবকিছু স্পষ্ট করা যাচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। আমাদের বাংলা সাহিত্য অর্থাত্ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক হয়তো পরিভাষার মুখাপেক্ষী নয় (অবশ্য অনুবাদ সাহিত্যের প্রয়োজন আছে)। কিন্তু বিজ্ঞান, বাণিজ্য, দর্শন, চিকিত্সা, প্রকৌশল বিদ্যা, আইন শাস্ত্র তথা বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত এবং সংবাদমাধ্যমগুলোতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ করতে গেলে পরিভাষার সমস্যা আসবেই। সে কারণেই প্রয়োজন উপযুক্ত পরিভাষা। প্রয়োজনটা যাদের, তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। যদিও পরিভাষা তৈরিতে সাধারণ মানুষ অনেক আগেই অবদান রেখেছে। ভাষা বিশারদ মুহাম্মদ এনামুল হক এ প্রসঙ্গে তিন যুগ আগে লিখেছেন—‘দেশের গণমানব বাংলা মুদ্রাক্ষর যন্ত্রের খবর রাখে না, বাংলা পরিভাষা তৈরিরও তোয়াক্কা করে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই বাংলা ভাষার মূল ধারক ও বাহক। তাদের কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় পরিভাষা তারা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছে ও নিচ্ছে’ (মনীষা-মঞ্জুষা; ১৯৭৬) তিনি এগুলোকে লৌকিক পারিভাষিক শব্দ উল্লেখ করে কিছু দৃষ্টান্তও দিয়েছেন: অ্যারোপ্লেন>উড়োজাহাজ, রেডিও>বেতার, কন্ট্রাক্টর>ঠিকাদার, বোম্ব>বোমা, ইঞ্জিন>ইঞ্জিল, ভোটিং>ভোটাভুটি, জেনারেল>জাঁদরেল প্রভৃতি। মুহাম্মদ এনামুল হক পরিভাষা নিয়ে তেমনি অভিযোগও করেছেন, ‘আর শিক্ষিত লোকেরা কোনো বিদেশি বৈজ্ঞানিক শব্দের কোনো বাংলা শব্দ তৈরি না করে শুধু ইংরেজি তথা বিদেশি ভাষাকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেছেন।’ প্রয়াত ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ একে অন্যভাবে বলেছেন, ‘কত টাকা জমলে বাংলাকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয়।’ বাংলাদেশে পরিভাষা নিয়ে কাজ করেছেন ভাষাবিজ্ঞানী মনসুর মুসা। তিনি বাংলায় পরিভাষার সমস্যা ও করণীয় বিষয়ে জানান, ‘বাংলা পরিভাষা পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয় সম্বন্ধে বলতে গেলে তিনটি পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। একটি হচ্ছে পরিভাষা বা পরিশব্দ সৃষ্টি পরিস্থিতি, দ্বিতীয়টি হলো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পরিশব্দ প্রচার-পরিস্থিতি, তৃতীয়তটি হলো পরিভাষা ব্যবহারকারীর আগ্রহ।
প্রথমত. বাংলা একাডেমী, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যা পরিভাষা বা পরিশব্দ সৃষ্টি করেছে তা জ্ঞানচর্চার জন্য যথেষ্ট নয়। সব শব্দ এক দিনে সৃষ্টি করা যায় না। কিন্তু যা সৃষ্টি হয়েছে তার যথাযথ বিতরণ ও ব্যবহারও হচ্ছে না। ফলে পরিভাষা পরিস্থিতি যতটা স্বভাবমুখী হওয়া উচিত ছিল, ততটা স্বভাবমুখী না হয়ে বিভাষামুখী হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিভাষা কমিটিগুলোতে আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব কিংবা অংশীদারি নেই। এমনকি ভাষিক এলাকা হিসেবে উপমহাদেশের পরিভাষা পরিস্থিতি খুব সন্তোষজনক নয়। সার্ক অঞ্চলে একটি পরিভাষা সমতা কমিটি গঠন একান্ত প্রয়োজন।
উনিশ ও বিশ শতকে পরিভাষা প্রণয়নে ব্যক্তিপর্যায়ে অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ এরং প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সাহিত্য পরিষত্ পত্রিকা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমী প্রভৃতির অবদান অস্বীকার্য। বিশেষ করে—সাহিত্য পরিষত্ পত্রিকা। এই পত্রিকায় ১৯০১ সাল থেকে প্রায় ত্রিশ বছরে ৬৭টি পরিভাষা বিষয়ক লেখা এবং নানা জ্ঞানশাখার পরিভাষা প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ একুশ শতকে এসে আমাদের পরিভাষা প্রণয়ন প্রচেষ্টা থমকে গেছে যেন।
একুশের চেতনাকে সমুন্নত করে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করতে হলে আমাদের পরিভাষা তৈরির বিকল্প নেই। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যেমন বাংলা একাডেমী নিতে পারে, তেমনি যাঁরা যে শাস্ত্রের বা জ্ঞানশাখায় পণ্ডিত, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। আসতে হবে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, গবেষকদেরও। আর এ ক্ষেত্রে ভাষিক সৌন্দর্য ও শুদ্ধাশুদ্ধির জন্য সহায়তা প্রয়োজন হবে ভাষাবিজ্ঞানীদের। নতুন পরিভাষা না হলে ভাষা সমৃদ্ধ হবে না। জ্ঞান শাখার বিস্তার ঘটবে না। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। ভাষার প্রতি দায়িত্ব পালন না করে কেবল ফেব্রুয়ারি এলে, ‘মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা’ আউড়ে কী লাভ?
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Wednesday, February 3, 2010
বাংলা ভাষার ব্যাকরণ তৈরি হবে কবে -আমার ভাষা আমার একুশ by সৌরভ সিকদার
বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে হাজার বছরেরও আগে এটা যেমন সত্য, তেমনি অবিশ্বাস্য আরেকটি সত্য হচ্ছে, বাংলা ভাষার নিজস্ব কোনো ব্যাকরণ নেই। সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের ক্রাচে ভর দিয়েই আমরা এতটা পথ পার হয়ে এসেছি। অথচ আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যাকরণের সংজ্ঞা শিখেছে, ‘যে বিদ্যা পাঠ করিলে ভাষা শুদ্ধ করে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায় তাকে ব্যাকরণ বলে।’ প্রকৃতপক্ষে, আমাদের শিক্ষার্থীরা এসব ব্যাকরণ পাঠ করে ভাষা শুদ্ধভাবে শেখে না, তারা অধিকাংশ আঞ্চলিক উচ্চারণে কথা বলে এবং বানান শুদ্ধ লিখতে পারে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষার প্রভাবে শিশুপাঠ্য ব্যাকরণগুলোও স্বাবলম্বী হতে পারেনি; এমনকি সেখানে ভাষার প্রমিত রূপ বিষয়ে ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক কোনো জ্ঞান লাভের সুযোগ নেই। ব্যাকরণবিদ জ্যোতিভূষণ চাকী লিখেছেন, ‘এত দিন গ্রামার বলতে শুধু লেখার ব্যাপারটাই বোঝাত, এখন নব্য-ব্যাকরণ বলতে মুখের ভাষার ব্যাকরণই বোঝায়।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এখনো পর্যন্ত চলিত বাংলায় বা মুখের ভাষার উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যাকরণ রচিত হয়নি। প্রচলিত ব্যাকরণ বাংলা ভাষায় কোন কোন ধ্বনি আছে তা উল্লেখ করলেও ‘এ’ ধ্বনি কখন ‘এ্যা’ উচ্চারিত হবে তা শেখায় না, আমাদের প্রতিদিনের ভাষায় ক্রিয়াপদ বা বাক্যের যে রূপান্তর ঘটছে তার বিশ্লেষণ নেই।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ ও অভিধান রচনা শুরু হয় ইউরোপীয় ধর্মযাজক, বণিক ও আগন্তুকদের হাতে প্রথমে ইংরেজিতে, পরে বাংলায়। ১৭৪৩ সালে পর্তুগিজ ফাদার মনোএল দা আস্সুম্পসাঁও রোমান হরফে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনার সূচনা করলেও প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনা করেন ১৭৭৮ সালে হ্যালহেড। উনিশ শতকের শুরু থেকে ধরলে ২০০ বছরেরও অধিক কাল ধরে উইলিয়াম কেরি বা মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের ‘ভাষাকথাক্রম’ (১৮১০)-এর পর কম করে হলেও কয়েক হাজার ব্যাকরণগ্রন্থ রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে। কিন্তু সেগুলো বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য যতটা না ধারণ করেছে, তার চেয়ে বেশি সংস্কৃত কারক-বিভক্তি-সন্ধিতে বন্দী হয়েছে।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ বিষয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষার আঞ্চলিক ও প্রমিত রূপ থাকে। শিক্ষক প্রমিত রূপ ব্যবহার করেন এবং শেখান। আমাদের বাংলায় প্রমিত রূপ আছে; কিন্তু দুর্ভাগ্য, ক্লাসে শিক্ষক আঞ্চলিক ভাষায় পড়ান, এমনকি বাংলা ব্যাকরণও। ফলে শিক্ষার্থীর ভাষাজ্ঞান প্রমিত হয় না। স্বাধীনতার আগে শহীদ মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীরা মোটামুটি ভালো একটি ব্যাকরণ তৈরি করেছিলেন। টেক্সট বুক বোর্ডের এই ব্যাকরণ পরে অন্যরা নষ্ট করেছে। সত্যি বলতে কি, বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি হয়নি, শিশুপাঠ্য তো নয়ই। আমাদের ধ্বনি, ধ্বনির উচ্চারণ, ধ্বনি ও লিপির সম্পর্ক, প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার পার্থক্য, উচ্চারণ, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি শেখার উপযোগী ব্যবহারিক ব্যাকরণ রচনা খুবই জরুরি। বাংলা ব্যাকরণ হবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানসম্মত। ভাষার প্রমিত রূপটি শিক্ষার্থীদের শেখার উপযোগী। অনেক পরে হলেও বাংলা একাডেমী কাজটি শুরু করেছে। আর এ পর্যন্ত রচিত ব্যাকরণের মধ্যে আমি সুনীতি কুমারের ‘ভাষা-প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ’কে সেরা মনে করি।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলা ব্যাকরণ একটি নিরস ও ভীতিপ্রদ বিষয়। সে কারণে তারা ব্যাকরণ পড়ে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শেখে না, শূন্য বিভক্তি প্রয়োগের দৃষ্টান্তের জন্য মুখস্থ করে ‘পাগুটাদীপতি’। টেক্সট বুক বোর্ড বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে সে প্রমাণ এখনো আমরা পাইনি।
অনেক দেরিতে হলেও ২০০৯ সালে এসে বাংলা একাডেমী ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ তৈরিতে হাত দিয়েছে দুই বাংলার গবেষক-ভাষাবিদদের নিয়ে। এবার হয়তো আমরা সংস্কৃত ব্যাকরণের আঁচল ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। শহীদ মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষার অস্তিত্ব প্রকৃতিবাদ অভিধানের ভেতর নয়, বাঙালির মুখে।’ সেই মুখের ভাষার ব্যাকরণ এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ব্যাকরণের আনন্দপাঠ এ মুহূর্তে বাংলা ভাষায় খুব জরুরি।
সেই ১৮৮৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই।...বাংলা ব্যাকরণের অভাব আছে, ইহা পূরণ করিবার জন্য ভাষাতত্ত্বানুরাগী লোকের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।’ ১০০ বছরেরও অধিক সময় পার হলেও আমরা এখনো বাংলা ব্যাকরণ রচনা করতে পারিনি। আশা করি, বাংলা একাডেমী এই লজ্জা থেকে বাংলাভাষীদের এবার মুক্তি দেবে।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ ও অভিধান রচনা শুরু হয় ইউরোপীয় ধর্মযাজক, বণিক ও আগন্তুকদের হাতে প্রথমে ইংরেজিতে, পরে বাংলায়। ১৭৪৩ সালে পর্তুগিজ ফাদার মনোএল দা আস্সুম্পসাঁও রোমান হরফে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনার সূচনা করলেও প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনা করেন ১৭৭৮ সালে হ্যালহেড। উনিশ শতকের শুরু থেকে ধরলে ২০০ বছরেরও অধিক কাল ধরে উইলিয়াম কেরি বা মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের ‘ভাষাকথাক্রম’ (১৮১০)-এর পর কম করে হলেও কয়েক হাজার ব্যাকরণগ্রন্থ রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে। কিন্তু সেগুলো বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য যতটা না ধারণ করেছে, তার চেয়ে বেশি সংস্কৃত কারক-বিভক্তি-সন্ধিতে বন্দী হয়েছে।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ বিষয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষার আঞ্চলিক ও প্রমিত রূপ থাকে। শিক্ষক প্রমিত রূপ ব্যবহার করেন এবং শেখান। আমাদের বাংলায় প্রমিত রূপ আছে; কিন্তু দুর্ভাগ্য, ক্লাসে শিক্ষক আঞ্চলিক ভাষায় পড়ান, এমনকি বাংলা ব্যাকরণও। ফলে শিক্ষার্থীর ভাষাজ্ঞান প্রমিত হয় না। স্বাধীনতার আগে শহীদ মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীরা মোটামুটি ভালো একটি ব্যাকরণ তৈরি করেছিলেন। টেক্সট বুক বোর্ডের এই ব্যাকরণ পরে অন্যরা নষ্ট করেছে। সত্যি বলতে কি, বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি হয়নি, শিশুপাঠ্য তো নয়ই। আমাদের ধ্বনি, ধ্বনির উচ্চারণ, ধ্বনি ও লিপির সম্পর্ক, প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার পার্থক্য, উচ্চারণ, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি শেখার উপযোগী ব্যবহারিক ব্যাকরণ রচনা খুবই জরুরি। বাংলা ব্যাকরণ হবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানসম্মত। ভাষার প্রমিত রূপটি শিক্ষার্থীদের শেখার উপযোগী। অনেক পরে হলেও বাংলা একাডেমী কাজটি শুরু করেছে। আর এ পর্যন্ত রচিত ব্যাকরণের মধ্যে আমি সুনীতি কুমারের ‘ভাষা-প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ’কে সেরা মনে করি।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলা ব্যাকরণ একটি নিরস ও ভীতিপ্রদ বিষয়। সে কারণে তারা ব্যাকরণ পড়ে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শেখে না, শূন্য বিভক্তি প্রয়োগের দৃষ্টান্তের জন্য মুখস্থ করে ‘পাগুটাদীপতি’। টেক্সট বুক বোর্ড বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে সে প্রমাণ এখনো আমরা পাইনি।
অনেক দেরিতে হলেও ২০০৯ সালে এসে বাংলা একাডেমী ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ তৈরিতে হাত দিয়েছে দুই বাংলার গবেষক-ভাষাবিদদের নিয়ে। এবার হয়তো আমরা সংস্কৃত ব্যাকরণের আঁচল ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। শহীদ মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষার অস্তিত্ব প্রকৃতিবাদ অভিধানের ভেতর নয়, বাঙালির মুখে।’ সেই মুখের ভাষার ব্যাকরণ এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ব্যাকরণের আনন্দপাঠ এ মুহূর্তে বাংলা ভাষায় খুব জরুরি।
সেই ১৮৮৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই।...বাংলা ব্যাকরণের অভাব আছে, ইহা পূরণ করিবার জন্য ভাষাতত্ত্বানুরাগী লোকের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।’ ১০০ বছরেরও অধিক সময় পার হলেও আমরা এখনো বাংলা ব্যাকরণ রচনা করতে পারিনি। আশা করি, বাংলা একাডেমী এই লজ্জা থেকে বাংলাভাষীদের এবার মুক্তি দেবে।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1846)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
যুক্তরাষ্ট্র
দেশে দেশে
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
আমার দেশ
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
ইরান
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
কালবেলা
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
মুসলিম
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
জাতিসংঘ
রাশিয়া
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ইউরোপ
ছাত্রলীগ
ইতিহাস
প্রতিবেদন
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
সৌদি আরব
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
বিজ্ঞান ও গবেষণা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
আফ্রিকা
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
সংখ্যালঘু
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
তুরস্ক
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
আফগানিস্তান
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
ইউক্রেন
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
হিন্দু
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
স্বাস্থ্য
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
মিসর
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
লেবানন
জাপান
জীবনযাপন
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
শিল্প
কুমিল্লা
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
Exclusive
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
চিকিৎসা
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
তথ্য প্রযুক্তি
বরগুনা
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
ব্রাজিল
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
ইয়েমেন
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
মসজিদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
তুহিন ওয়াদুদ
উত্তর কোরিয়া
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
কালি ও কলম
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
নিবন্ধ
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
জনস্বাস্থ্য
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
প্রযুক্তি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
কাতার
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
লাতিন আমেরিকা
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আরব আমিরাত বা দুবাই
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
লিবিয়া
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
দক্ষিণ কোরিয়া
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
ইসলাম
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
জোহরান মামদানি
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মহাকাশচারী
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
ইহুদি
কিশোর আলো
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
গণমাধ্যম
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
সোমালিয়া
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কুয়েত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
ওমান
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট