Monday, April 4, 2011

তিনি আর ফিরবেন না মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান

মনে পড়ছে ২০০৯ সালের ১৪ মার্চ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার বড় ভাই ড. মো. মোজাহারুল ইসলাম বাংলাদেশে এসেছিলেন মা ও ভাই-বোনদের দেখতে। কটা দিন আপনজনদের মাঝে কাটিয়ে আবার ফিরে গিয়েছিলেন কেমব্রিজে। ২৮ মার্চ গভীর রাতে আমি ও ইফতেখার হোসেন (তৎকালীন পিইও) তাঁকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম। বিমানবন্দরে পৌঁছে নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে যাওয়ার জন্য তাঁকে যখন বিদায় দিলাম, তখন রাত দুইটা বেজে গেছে। আমরা কেন জানি ফিরতে পারলাম না। মনে হলো ফিরে যাওয়ার আগে আর একবার ভাইয়ের্রসঙ্গে দেখা করে যাই। তাই বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আবার বিমানবন্দরের ভেতরে গিয়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের লাউঞ্জে ভাইয়ের কাছে গেলাম। আমাদের দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন আবার খুশিও হলেন। তখন তিনি বলছিলেন যে ‘ভাবছি, এরপর তো আর ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ঢাকায় আসবে না,’ অর্থাৎ ২০০৯ সালের ২৮ মার্চ ভোররাতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের যে ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে হিথ্রো বিমানবন্দরে গিয়েছিল, সেটিই ছিল ঢাকা-লন্ডন শেষ ফ্লাইট। তাই তো তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এরপর কীভাবে আসব?’ কেননা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে লন্ডন থেকে সরাসরি ঢাকায় আসতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয়, সুশৃঙ্খল মানুষ। তাই তিনি সহজ ও সোজা পথ পছন্দ করতেন। কে জানত যে এ মানুষটির ঢাকা-লন্ডন-কেমব্রিজ পথে এটাই শেষ যাত্রা? হয়তো আবার কখনো ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ লন্ডন থেকে ঢাকা আসবে, আবার ঢাকা থেকে লন্ডনের পথে যাত্রাও করবে। কিন্তু ড. ইসলাম আর কোনো দিন যেমন আসবেন না, তেমনি বিদায় নিয়েও যাবেন না।
ঠিক এক সপ্তাহ পর, ৩ এপ্রিল ২০০৯ শুক্রবার রাত আটটায় বাড়ির টেলিফোনটি বেজে উঠল। ও প্রান্ত থেকে একজন বললেন, ‘আমি কেমব্রিজ থেকে ড. শেখ আবদুল মাবুদ বলছি। আপনার বড় ভাই ড. মো. মোজাহারুল ইসলাম আজ সকালে ইন্তেকাল করেছেন।’ আমি কোনোভাবেই তখন এ কথা মেনে নিতে পারছিলাম না। এরপর আমি আমার বাল্যবন্ধু হাজরা আওয়াল, যিনি কেমব্রিজে দীর্ঘদিন ধরে থাকেন, তাঁকে টেলিফোন করে সব বললাম। তিনি খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত আমাকে ভাইয়ের মৃত্যুর খবর সঠিক বলে জানান।
তারপর ১০ এপ্রিল ২০০৯ শুক্রবার দুপুরে খুলনার কৃতী সন্তান ড. ইসলামের লাশ ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছাল। ১১ এপ্রিল খুলনা মহানগরের টুটপাড়া গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হলো। কিছুদিন পর আমি কেমব্রিজে গিয়েছিলাম এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে যা জেনেছিলাম—৩ এপ্রিল ২০০৯ শুক্রবার সকালে ভাই তাঁর স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য যাচ্ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পৌঁছে যখন সেন্ট জনস্ কলেজের সামনে পৌঁছেছিলেন, ঠিক তখন হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, তারপর সামান্য দু-তিন পা পেছনের দিকে যেতে গিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে যান এবং সামনের কফি-স্টল থেকে কয়েকজন ছুটে এসে তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁকে নির্বাক, নিশ্চুপ দেখে তারা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স এনে তাঁকে কেমব্রিজ এডেনব্রুক হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে পরীক্ষা করে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাৎক্ষণিভাবে তাঁরা এক সভায় মিলিত হয়ে সবাই অনেকভাবে তাঁর প্রশংসা করেন।
মো. মোজাহারুল ইসলাম ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম শাহ্ মোহাম্মদ ও মাতা উন্মেহানি খাতুনের তিনি ছিলেন প্রথম সন্তান। খুলনার সেন্ট যোসেফ হাইস্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করে দৌলতপুর ব্রজলাল কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬১ সালে গণিতে বিএসসি (অনার্স) (দুই বছরের) সমাপ্ত করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকা আণবিক কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন এবং সেখান থেকে স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করার জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। যেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি লন্ডন কুইন মেরি কলেজে ও লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে সেখানেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ২২ বছরেরও বেশি কাজ করেছেন।
মো. মোজাহারুল ইসলাম ১৯৮৪ সালে কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের সুইনি পরিবারের শার্লি সুইনিকে বিবাহ করেন। তাঁর পারিবারিক জীবন ছিল সুখের। শার্লি ইসলাম দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৩ সালের ২ নভেম্বর কেমব্রিজেই ইন্তেকাল করেন। স্ত্রী শার্লির মৃত্যুর পর ২০০৪ সালে দেশে এসে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আবদুল কাদির ভূঁইয়ার কাছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শার্লি ইসলামের নামে একটি লাইব্রেরি নির্মাণের জন্য আর্থিক অনুদান প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালের ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪তম সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শার্লি ইসলাম লাইব্রেরি’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
তিনি লাইব্রেরি নির্মাণ করতে প্রায় কোটি টাকা প্রদান করেছিলেন এবং বিলম্বে হলেও এখন লাইব্রেরি ভবনটি নির্মিত হয়েছে। তবে কেন জানি না আজও তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম প্রসারে একজন শিক্ষক ড. ইসলাম তাঁর সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে অর্থ দান করে যে অবদান রেখেছেন, তা সত্যিই স্মরণীয়।
এই লাইব্রেরির পঠন-পাঠন কার্যক্রমের উদ্বোধনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন—আজ মো. মোজাহারুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকীতে এ প্রত্যাশাই করি এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

ফাটকাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে যা প্রয়োজন by মসিহ্ মালিক চৌধুরী



পুঁজিবাজারনির্ভর উন্নয়নের জন্য বা শিল্পায়নের জন্য বেশ কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন-অন্বেষণের অভিযাত্রায় চলমান থাকার যোগ্যতা, সততা ও বিনিয়োগবান্ধব অভিজ্ঞতা সর্বাগ্রে চলে আসে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারের শেয়ার ট্রেডিং লাভকে কর অব্যাহতি দিয়ে তাদের উন্নয়ন-অর্থায়নের অভিযাত্রা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। বর্তমানে তারা ঋণ প্রদানের ওপর সুদ আয়সহ অপারেশনাল আয়ের ওপর ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ কর দিয়ে থাকে। অন্যদিকে পুঁজিবাজার থেকে লব্ধ আয়ের ওপর প্রায় শূন্য শতাংশ কর পরিশোধ্য।
বেশ কিছুদিন আগে শেয়ারবাজার সর্বোচ্চ সূচকে পৌঁছে গিয়েছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক পৌঁছেছিল আট হাজার ৯১৮ দশমিক ৫১তে। পরবর্তী সময়ে বাজারের যতটা না চাহিদা, তার চেয়ে বেশি শেয়ার বিক্রি হয়। বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং হঠাৎ সূচক পতন হতে শুরু করে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, বাজার বাড়তেই থাকবে। বিনিয়োগকারীরা লোভে পড়ে যান। এটা যে শেয়ারবাজারের অন্তর্নিহিত নিয়মেই চলছে, তা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সম্ভবত অনুধাবন করেননি। শেয়ারের দাম বাড়ার কারণগুলোকে চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক, অতিরিক্ত স্পেকুলেশন, শেয়ার জুয়াড়িদের মেনিপুলেশন, বুক বিল্ডিং ও ডাইরেক্ট লিস্টিং করে এসইসির বাজার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালনের শোচনীয় ব্যর্থতা শেয়ারবাজারকে এই অনিবার্য পতনের দিকে ধাবিত করেছে। পতন বা উল্লম্ফনের মুখ্য দায়ভার তাই এসইসির। সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শোডাউন ও আন্দোলন করে মাঠে নেমেছিলেন। এতে এসইসির টনক নড়ে।
আমাদের শেয়ারবাজারের সাম্প্র্রতিক পতন বা উল্লম্ফনে নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরের নিষ্ক্রিয়তা বা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা না করে শুধুই জোড়াতালি নীতি গ্রহণ করে তারা জ্বলন্ত আগুনে তেল ঢেলেছে। একটা কথা সত্যি, পতনোন্মুখ শেয়ারবাজারে শেয়ার ক্রয়ের চাপ তৈরি করার জন্য কোনো মধ্য বা স্বল্পমেয়াদি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ তারা নেয়নি। অথচ তাঁদের নামেই তদন্ত কমিশনের তদন্তের আওতা ও পরিধি স্বাক্ষরিত হলো। শুধু এক নির্বাহী পরিচালককে ওএসডি করা হলো। অথচ তদন্তের বিষয়বস্তুর মধ্যে এই কমিশন নিজেই একটি অংশ।
তদন্ত কমিশনের সদস্যরা সবাই ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ও বিদগ্ধজন। তাঁদের শেয়ারবাজারের তাত্ত্বিক জ্ঞান রয়েছে। তবে শেয়ার স্ক্যাম তাত্ত্বিক নিয়মে নয়, প্রায়োগিক বিষয় থেকে উৎসারিত হয়। তাই কমিটির মূল্য পতনের শিকার এবং এর ফলে সবচেয়ে লাভবান যাঁরা, তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞাসা করে অনেক কিছু জানতে হবে। লুজার বা গেইনারদের জনা কয়েককে জেরা করলে ভালো তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে আমরা মনে করি। তার আগে বাজারের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক যাত্রা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিতে হবে। সিডিবিএল তাঁদের জন্য শেয়ার ট্রেডিংয়ের তথ্যভান্ডার হিসেবে কাজ করতে পারে। বিভিন্ন শেয়ারের ট্রেডিং ভলিউম ও মূল্য সংবেদনশীল তথ্যসহ মৌলিক উপাদান, যার জন্য দর পরিবর্তন হতে পারে তা জানতে হবে, নিরীক্ষা করতে হবে। কমিটির তদন্তের জন্য সময় অনেক কম দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে একজন আইনজ্ঞ দেওয়া হয়েছে বিলম্বে।
পতনোন্মুখ শেয়ারবাজারে হঠাৎ ট্রেড বন্ধ করে এসইসি ঠিক করেছে কি না, সময়ই তা বলবে। অথচ মার্কেট ফোর্সেস নিজেই ট্রেডকে সচল রেখে সঠিক জায়গায় ইনডেক্স নিয়ে যেত। এ রকম হস্তক্ষেপ চাহিদা ও সরবরাহের চলমান গতিকে বিপথে নিয়ে যায়। কমিশন এটা না করলেই ভালো হতো। বরং তখন সরকারকে বা ব্যাংকগুলোকে শেয়ার কিনতে বললে বাজারের গতিপথ ভাটির দিকে চলত। রেগুলেটর সব সময় ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় চিন্তার মধ্যে কাজ করবে, এটাই সময়ের প্রত্যাশা। তবে ৫০ হাজার বা ৩০ হাজার কোটি টাকা চলে গেছে—এসব ইউটোপিয়ান হিসাব বলেই মনে হয়।
শেয়ার মূল্যের উল্লম্ফনের কারণগুলোকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা বা শ্রেণীভূত করা যেতে পারে। চাহিদা ও সরবরাহের আন্তপ্রক্রিয়ায় শেয়ারের দর নির্ধারিত হওয়ার কথা। তবে আমাদের শেয়ারবাজারে হঠাৎ উল্লম্ফনের ফলে সরবরাহের চেইন অব ব্যালান্স রক্ষা করতে পারেনি। অন্যান্য কারণের মধ্যে মূল কারণ তাই চাহিদা ও সরবরাহের বিস্তর ফারাক।
আবার ব্যাংকগুলো বছর শেষে লাভ আদায় করার জন্য শেয়ার বিক্রি করে তার সব সিআরআর, এসআরআর ইত্যাদি ঠিক রেখেছে অন্তত ৩১ ডিসেম্বর তারিখে। সব ব্যাংক পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি করে বিক্রির চাপ সৃষ্টি করেছে। তারা অন্যদিকে মূল কার্যক্রম-উন্নয়ন অর্থায়নে নজর দেয়নি। আবার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রচুর পরিমাণ উদ্দীপনা পান বলে লাভ হিসেবে যত বেশি অর্জন করতে পারেন, তা-ই করেন। দেখা যায়, ছয় থেকে ১২ মাসের মূল বেতন ইনসেনটিভ হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতার বাজারে নিজের নিয়োগদাতা ব্যাংকে সবাই নিজেকে সর্বোত্তম অবস্থানে দেখতে চান। তাই ব্যাংকগুলোকে শেয়ার ব্যবসার (ট্রেডিং) লাভে কর অব্যাহতি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বরং ব্যাংকগুলো যদি পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ শুধু মধ্যমেয়াদি (তিন বছর) বিনিয়োগ করে, তাহলে লাভের কর হারের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্ধেক করা যেতে পারে। ফলে শেয়ার মূল্যেও উল্লম্ফন বন্ধ থাকবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডিপোজিটের ১০ শতাংশ কোনো ব্যাংক শেয়ারবাজারে খাটাতে পারে। ব্যাংকগুলো আলাদা, মার্চেন্ট ব্যাংক শাখা আলাদা কোম্পানি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কোনো ব্যাংক যখন ডিপোজিটের ১০ শতাংশ নিজস্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে, তখন কিন্তু ১০ শতাংশ সীমাবদ্ধতা কোনো কাজে আসে না। কারণ মার্চেন্ট ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন যদি ২০ কোটি টাকা হয়, তাহলে ওই ব্যাংকের ডিপোজিটের ১০ শতাংশ হতে পারে ৫০০ কোটি টাকা বা আরও বেশি। এতে শেয়ারবাজারের নিয়ম ও পেশাদারিতে তাঁদেরই নিয়ামক ভূমিকা থাকছে। শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর ভূমিকা কত ব্যাপক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানেই অতি মূল্যায়নের কারণ অন্তর্নিহিত।
উপরন্তু মার্চেন্ট ব্যাংক পোর্টফোলিও বিনিয়োগের জন্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিয়ে ব্যাংকের উচ্চমূল্য ধরে রেখেছে। একদিকে তাদের সুদের আয় হচ্ছে। আবার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য উচ্চমূল্যে শেয়ার ক্রয়ে তারা ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তাদের নিয়ন্ত্রক কোম্পানি ব্যাংকের জন্য লাভ অর্জন করতে সম্পূর্ণ পেশাদারিতে বিনিয়োগ করছে। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে তাদের ইন্ধন জোগানো স্বচ্ছ থাকছে না। আবার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুদে ধার দিচ্ছে বিনিয়োগ করার জন্য। নিজেদের ঋণগ্রহীতাদের তারা ঋণের গোলকধাঁধায় ফেলছে, আবার নিজেদের বিনিয়োগকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
অনেক কোম্পানির শেয়ার সিএসই ও ডিএসই লিস্টিং করার ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে এসইসি কিন্তু এই শেয়ার লিস্টিং করতে এগিয়ে আসে। অন্যদিকে লিস্টিংয়ের ব্যাপারে সৃষ্ট কমিটিতে যাঁরা ডিলার, ব্রোকার, ইস্যুয়ার বা আইপিও ম্যানেজার, তাঁদের থাকার যৌক্তিকতা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সবকিছু নিয়ে আমরা যত শিগগির সিদ্ধান্ত নেব, ততই মঙ্গল।
মসিহ্ মালিক চৌধুরী: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কোষাধ্যক্ষ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

কালোবাজারে গরিবের চাল-গম

চালের দাম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকায় সরকার এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে তারা কম দামে চাল ও গম পেতে পারে। সরকারের এই উদ্যোগ সব মহলে প্রশংসা পেয়েছে এবং দরিদ্র জনগণ এতে উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগে যেসব দুর্বলতা থাকে, তার কিছু নজির পাওয়া গেছে। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল, মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ায় গরিবের জন্য বরাদ্দ করা চাল-গম কালোবাজারে বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে যে উদ্দেশ্যে সরকার কাজটি করছে, তা ব্যাহত হবে।
গরিবদের জন্য কম দামে চাল-গম বিক্রির অর্থ হচ্ছে, সরকার তাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। সেই চাল-গম কালোবাজারে বিক্রির অর্থ হচ্ছে সরকারের ভর্তুকির অর্থ গরিবের লাভে না এসে ডিলার বা ব্যবসায়ীদের পেটে যাওয়া। কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজার বা কুলাউড়ায় এমন ঘটনাই ঘটেছে। আশার কথা, গরিবের চাল-গম কালোবাজারে বিক্রির এই ঘটনাগুলো উদ্ঘাটিত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দায়ী ডিলারদের জেল-জরিমানা করা হয়েছে, ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে, দোকান সিলগালা করা হয়েছে, মামলাও দায়ের হয়েছে। গরিবদের কাছে কম দামে চাল-গম পৌঁছানোর এই কার্যক্রম যেহেতু দেশজুড়ে বিস্তৃত, তাই আরও অনেক স্থানে এ ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে।
এই ঘটনাগুলো এ ব্যাপারে সতর্কতা ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছে। যেসব স্থানে গরিবদের জন্য খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) বা হতদরিদ্রদের জন্য ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে চাল-গম বিক্রির কার্যক্রম চলছে, এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। আর কোথাও কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের প্রবণতা কমে আসবে।
প্রসঙ্গক্রমে আরও একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন মনে করছি। সরকার হতদরিদ্রদের কাছে কম মূল্যে চাল-গম বিক্রির জন্য যে ফেয়ার প্রাইস কার্ড বিতরণ করছে, তাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় কার্ড বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। হতদরিদ্রদের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবণতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

মিয়ানমারে নতুন সরকারি পত্রিকা চালু

মিয়ানমার মিয়াওয়াড্ডি নামে একটি নতুন পত্রিকা চালু করেছে। এ নিয়ে দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকার সংখ্যা দাঁড়াল ৪-এ। গতকাল শনিবার চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
মিয়ানমারের নতুন রাজধানী নেপিডোভিত্তিক এ পত্রিকাটি গত শুক্রবার থেকে ছাপানো শুরু হয়। গতকাল শনিবার ইয়াঙ্গুনের সর্বত্র পত্রিকাটি পাওয়া গেছে।
গত বুধবার মিয়ানমারের নবনির্বাচিত বেসামরিক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার দুই দিন পর ১৬ পৃষ্ঠার এ পত্রিকাটি চালু করা হয়। দেশটির অন্য রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলো হলো কিয়ায়মন, মিয়ানমা আহলিন ও ইংরেজি ভাষার নিউ লাইট অব মিয়ানমার।

ভিআইপি, সাধারণ মানুষ ও রিকশাচালকেরা

এ মাসের শুরু থেকেই ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি জায়গায় বিনা নোটিশে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ বিভাগ। যদিও রাস্তায় রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার আগে কখনো কোনো ধরনের নোটিশ দিয়েছে পুলিশ বিভাগ—এ রকম নজির নেই। এরই অংশ হিসেবে সোমবার নয়টার পর কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে মালিবাগ-মৌচাক হয়ে মগবাজার ও রামপুরা পর্যন্ত রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে রিকশাচালকেরা বিক্ষোভ, গাড়ি ভাঙচুর করেন (প্রথম আলোয় ২৯ মার্চ) কয়েকটি রাস্তাকে ভিআইপি রোড ঘোষণা এবং কয়েকটি রাস্তাকে যানজটমুক্ত করার জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ডিএমপি জানিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যাঁরা রিকশায় চলাফেরা করেন, তাঁদের কী হবে?
সপ্তাহ খানেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে রিকশা বন্ধ করে দেওয়া হয় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি থেকে বিডিআর গেট পর্যন্ত, যেখানে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি শিক্ষার্থী নিবাস (দুটি ছাত্রী হল ও একটি ছাত্রাবাস), আছে একটি ইনস্টিটিউট। যেদিন রিকশা বন্ধ হলো, সেই এলাকায় ভুক্তভোগী ছাত্রী হলের মেয়েরা মিছিল করেছে, হলে বিক্ষোভ করেছে। পরের দিন বিষয়টির আপাতসুরাহা হয়েছে। বলা হয়েছে, আইডিকার্ড সঙ্গে থাকলে রিকশা ছেড়ে দেওয়া হবে বেলা দুইটা পর্যন্ত। সেখানে অবস্থিত ছাত্রী হলগুলোর হাউস টিউটরের দায়িত্ব পালন করতে যাওয়ার সময়ও আমাদের অনেককে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে রিকশা থেকে। কারণ, আমরা আইডি কার্ড দেখাতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার হাজারের মতো শিক্ষার্থী যে রাস্তা ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, বিশেষ করে কার্জন হলে যায় ক্লাস করতে, এর জন্য প্রতিদিন কয়েকবার করে পুলিশকে কার্ড দেখিয়ে চলাফেরা কতটা যৌক্তিক? আর যেসব শিক্ষার্থী নিজের গাড়ি করে বা সিএনজিতে যাবে, তাদের আইডি কার্ড দেখাতে হবে না। কী চমৎকার নিয়ম এ দেশে!
আর কারও যদি পরীক্ষা থাকে, তাহলে কথাই নেই। অনেক শিক্ষার্থী যেখানে পরীক্ষার টেনশনে নিজের প্রবেশপত্র পর্যন্ত আনতে ভুলে যায়, সেখানে আইডি কার্ড নিয়ে পুলিশি জেরার মুখে পড়া পরীক্ষার আগে মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটা চাপ তৈরি করবে। ওই হলগুলোর জন্য বাসট্রিপ আছে। কিন্তু ক্লাসের বাইরেও নানা কাজে শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানল না, হলগুলোর কিংবা ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ জানল না, তাহলে কীভাবে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলো?
পরের ঘটনা আরও কষ্টের। নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ডিউটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে গেলে নয়টার অনেক পরে পৌঁছাতে হয়। সকাল সাড়ে সাতটায় বের হয়ে কোনো রিকশা বা সিএনজির হদিস পাওয়া গেল না। একজন রিকশাচালককে রাজি করানো হলো ৬০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে। কিন্তু নয়াটোলা থেকে মগবাজার মোড়মুখী হওয়ার পথে মগবাজার রেললাইনের কাছে যাওয়ার পরই ট্রাফিক রিকশা আটকে বললেন, ‘এই রাস্তায় রিকশা বন্ধ।’ তাহলে উপায়? ট্রাফিককে অনেক অনুরোধ করে সেই যাত্রা বেঁচে গিয়ে পরীবাগে এসে দ্বিতীয় ঝামেলায়। ১০ মিনিট রাস্তা বন্ধ। দ্বিতীয় দফা অনুরোধ। সেখানেই শেষ নয়, তৃতীয়বার রিকশা থামানো হলো শাহবাগের কাছাকাছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানো গেল নয়টা ১০ মিনিটে। এর পরের দিন বন্ধ করা হলো কাকরাইল, মগবাজার, মৌচাক আর রামপুরা সড়ক।
রাস্তায় রিকশা বন্ধ হতেই পারে। কিন্তু এর বিকল্প ব্যবস্থা করে বন্ধ করতে হবে। নইলে এসব এলাকার মানুষ কীভাবে চলাচল করবে? ঢাকা শহরে বসবাস করা এক কোটি মানুষের মধ্যে গাড়ি আছে খুব কম লোকের। বিআরটিসি বাসের অনেকগুলোই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিসকে ভাড়া দেওয়া। সব জায়গায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা ট্যাক্সিক্যাব পাওয়া যায় না এবং পাওয়া গেলেও বেশি ভাড়া দাবি করা হয়। ঢাকা শহরে যাঁদের গাড়ি নেই, তাঁরা চলে যাবেন শহর ছেড়ে? নাকি পরোক্ষভাবে বলে দেওয়া হলো, গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই যাঁদের, তাঁরা থাকতে পারবেন না এই ‘ভিআইপি’দের শহর ঢাকায়? আর রিকশাচালকদের রুটিরুজির পথ বন্ধ হলে তাঁরা কোথায় যাবেন?
আরেকটি উপায় আছে, তা হলো হাঁটা। ঢাকা শহরে হাঁটার রাস্তা কই? রাস্তার ওপর দোকানপাট। কোনো কোনো জ্যামে ফুটপাত দিয়ে চলে মোটরসাইকেল ও সিএনজি। বাসগুলো পুরো না থামিয়েই যাত্রী নামায়। আর সেই যাত্রীরা লাফ দিয়ে নামে গাড়ি থেকে। ধাক্কা খায় অন্য পথচারী। এই যখন রাস্তার চিত্র, তখন বিকল্প উপায় না সৃষ্টি করে, জনগণকে জানতে না দিয়ে কীভাবে একের পর এক রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ডিএমপি। কাদের স্বার্থ তারা দেখছে, তা স্পষ্টই বোঝা যায়। রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করার আগে সেসব রাস্তায় দ্বিগুণ বাস দিয়ে, জনগণকে জানিয়ে এবং তাদের যেন অসুবিধা না হয়, তা নিশ্চিত করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে সাধারণ মানুষের কথা ভুলে যায়। তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবে না। রাস্তায় বের হলেই শুনতে হয়, রাস্তায় রিকশা বন্ধ। রিকশায় গেলে চলতে হবে আইডি কার্ড নিয়ে। তবে নিজের গাড়ি থাকলে আর আইডি কার্ড নিয়ে ঘুরতে হবে না। কারণ গাড়িই তো ডিএমপির কাছে বড় আইডি কার্ড। আর সরকারকে ভাবতে হবে, ভোটে গাড়িওয়ালা ও রিকশাযাত্রী—সবার ভোটই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ ও রিকশাচালক সবাইকে দরকার গণতন্ত্রে। হুট করে কারও কারও সুবিধার জন্য সাধারণ মানুষের অসুবিধা করাটা কতটা যৌক্তিক ও মানবিক?
২৯ মার্চ ২০১১
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবে জারদারির সম্মতি

পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ডের রায়টি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। গত শুক্রবার তিনি দেশটির সংবিধানের ১৮৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ওই প্রস্তাবে সই করেন।
প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র ফারহাতুল্লাহ বাবর জানান, প্রস্তাবটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো হবে।
জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন দেশটির প্রথম নির্বাচিত সরকারের প্রধান এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৭৭ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দায়ে ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল স্বৈরশাসক জিয়াউল হক সরকার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
কয়েক বছর আগে ওই রায়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হলে হাইকোর্ট তা নাকচ করে দেন। পিপিপি ওই মৃত্যুদণ্ডকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করে আসছে।

ওয়ারসিকে বরখাস্ত করা হতে পারে

যুক্তরাজ্যের কেবিনেট মন্ত্রী ও কনজারভেটিভ পার্টির কো-চেয়ারম্যান ব্যারোনেস সৈয়দা হুসেইন ওয়ারসিকে বরখাস্ত করা হতে পারে। আগামী গ্রীষ্মে দেশটির মন্ত্রিপরিষদে রদবদল করা হবে। তখন তাঁকে বরখাস্ত করা হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের একজন জ্যেষ্ঠ এমপির বরাত দিয়ে গতকাল শনিবার ডেইলি মিরর-এ প্রকাশিত খবরে এ কথা জানানো হয়।
এর আগে যুক্তরাজ্যে ইসলাম-ভীতি, বিকল্প ভোট পদ্ধতি (এভি) পরিবর্তনের বিষয়ে মন্তব্য করে দলের নেতাদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন ওয়ারসি। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের পরিবারগুলোতে ইসলাম-ভীতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া এভি নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তনের দাবি করে তিনি তাঁর লিবারেল ডেমোক্রেটস দলের সহকর্মীদের বিরাগভাজন হবেন।
প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পছন্দের ব্যক্তি গৃহায়ণমন্ত্রী গ্র্যান্ট শ্যাপস হুসেইন ওয়ারসির স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করারা শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ এমপি জানান, আগামী জুনে কিংবা জুলাইয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল করার পরিকল্পনা রয়েছে ক্যামেরনের। তখনই ওয়ারসিকে বরখাস্ত করা হতে পারে।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্যারোনেস ওয়ারসি যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম মন্ত্রী।

একটি কুকুরকে বাঁচানোর জন্য...

জাপানের উপকূলরক্ষীরা সুনামিবিধ্বস্ত দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সমুদ্র উপকূল থেকে একটি কুকুরকে উদ্ধার করেছেন। কুকুরটি সমুদ্রে একটি ঘরের চালা আঁকড়ে ভাসছিল। একজন কর্মকর্তা গতকাল শনিবার এ কথা জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, একজন হেলিকপ্টার ক্রু গত শুক্রবার কুকুরটির অবস্থান শনাক্ত করেন। লম্বা কান ও উজ্জ্বল বাদামি বর্ণের কুকুরটিকে তিনি কিসিনুমা থেকে দুই কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে ভাসতে দেখেন। গত ১১ মার্চের ভূমিকম্প ও সুনামিতে এই বন্দরনগর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এর পরই বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একদল উদ্ধারকর্মী সেখানে পাঠানো হয়। কুকুরটিকে সমুদ্র থেকে উদ্ধারের জন্য সেখানে তাঁদের নামানো হয়। কিন্তু হেলিকপ্টারের শব্দে কুকুরটি ভয় পেয়ে যায় এবং লাফ দিয়ে বিধ্বস্ত ঘরের চালার অন্য পাশে চলে য়ায়। তবে সমুদ্রের বানর (সি মাঙ্কি) নামে পরিচিত ওই উদ্ধারকর্মীরা শেষ পর্যন্ত কুকুরটিকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
উপকূল রক্ষা বাহিনীর ওই কর্মকর্তা জানান, মাঝারি আকৃতির কুকুরটির গলায় কলার পরানো ছিল। এতে মনে হচ্ছে কুকুরটি গৃহপালিত। এর আচরণ ও চাহনি খুবই বন্ু্লসুলভ। এটি বিস্কুট ও সস খাচ্ছে। তবে এর মালিকানা এখনো কেউ দাবি করেনি।
জাপানে সুনামি আঘাত হানে তিন সপ্তাহ আগে। এই তিন সপ্তাহ কুকুরটি সমুদ্রে ভাসমান ছিল কি না, সেটাও জানা যায়নি।

একই গাছে লেবু ও কমলা

বাগানের টবে লাগানো কমলাগাছ থেকে কয়েক বছর ধরে সপরিবারে মিষ্টি কমলা খাচ্ছিলেন জুলিয়েট নিসবেট (৪৮)। একদিন হঠাৎ লক্ষ করলেন, গাছটির ডালে স্বাভাবিক কমলার পাশাপাশি কয়েকটি ফল হলুদ ও লম্বাটে দেখাচ্ছে। কমলা না বলে ফলগুলোকে লেবু বললেই যেন ঠিক হয়। নিসবেট ভাবলেন, আকার যা-ই হোক, পাকলে ঠিকই আসল কমলার রং ধারণ করবে ফলগুলো। কিছুদিন পর ফলগুলো আরও উজ্জ্বল ও লম্বাটে হলো। ফল খেয়ে দেখা গেল, স্বাদও ঠিক লেবুর মতো।
সেই থেকে নিসবেটের ওই গাছে একসঙ্গে কমলা ও লেবু ফলছে। স্কটল্যান্ডের ইস্ট লোদিয়ানের বাসিন্দা নিসবেট। নয় বছর আগে ১৫ পাউন্ড দিয়ে গাছটি কিনেছিলেন তিনি। এখন তিন ফুট উঁচু গাছটিতে প্রায় ২৫টি কমলা ও চারটি লেবু রয়েছে।
নিসবেট জানান, তাঁর এই গাছ দেখতে প্রতিদিন অনেক লোক আসে। একই গাছে কমলা ও লেবু দেখে অবাক হয় তারা।
স্থানীয় ডবিজ গার্ডেন সেন্টার থেকে গাছটি কেনেন নিসবেট। ওই উদ্যানের প্রধান নিল ফিশলক বলেন, এটি একটি কলম করা গাছ। গাছটি রোপণের সময় লেবুর গাছের অঙ্কুর কোনোভাবে এর সঙ্গে মিশে যাওয়ায় গাছটিতে কমলা ও লেবু দুটিই ফলছে। এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ধীরে ধীরে ওই গাছে লেবুর রাজত্ব বেড়ে কমলা বিলুপ্ত হতে পারে।

এ রাজাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

ভারতের সাবেক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এ রাজাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় প্রজন্মের মোবাইল ফোনের লাইসেন্স বরাদ্দে (দ্বিতীয় প্রজন্মের ফোন) দুর্নীতির মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে সে দেশের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই)। সংস্থাটি গতকাল শনিবার দিল্লির পাটিয়ালা কোর্ট হাউসে ৮০ হাজার পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রটি দাখিল করে।
এ রাজা ছাড়াও অভিযোগপত্রে সাবেক টেলিকমসচিব সিদ্ধার্থ বেহুরা, এ রাজার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী আর কে চান্ডোলিয়া, টেলিকম প্রমোটার শহীদ বালওয়া, গৌতম দোশি, সৌরভ পাপাড়িয়া, হরি নায়ার, সঞ্জয় চন্দ্রের নাম রয়েছে। এ ছাড়া ইউনিটেক, রিলায়েন্স কমিউনিকেসন্স ও সোয়ান টেলিকম কোম্পানির বিরুদ্ধে সুবিধাভোগের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ রাজার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র, প্রতারণাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এ রাজা ২০০৮ সালে অনিয়ম করে কয়েকটি কোম্পানির কাছে দ্বিতীয় প্রজন্মের মোবাইল ফোনের লাইসেন্স বরাদ্দ করেন। এ কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে বিরোধীদের তোপের মুখে পড়তে হয়। বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলে। এ ছাড়া দেশটিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিব্রত বোধ করেন।

মার্কিন বিমানের ছাদে আকস্মিক ছিদ্র জরুরি অবতরণ

যুক্তরাষ্ট্রে একটি যাত্রীবাহী বিমান গত শুক্রবার উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়েছে। আকস্মিকভাবে বিমানটির ছাদে বিশাল ছিদ্র তৈরি হওয়ায় পাইলট জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হন। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।
স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্স স্কাই হারবার ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর থেকে ১১৮ জন যাত্রী নিয়ে সাউথইস্ট এয়ারলাইনসের বোয়িং-৭৩৭ বিমানটি ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী স্যাক্রামেন্টোর উদ্দেশে যাত্রা করে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই বিমানটির ছাদে হঠাৎ করে বিরাট গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে অ্যারিজোনার একটি সামরিক ঘাঁটিতে বিমানটি জরুরি অবতরণ করে।
বিমানের একজন যাত্রী বলেন, ‘বিমান আকাশে ওড়ার পরই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই গোলা বিস্ফোরণের মতো প্রচণ্ড শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তাকিয়ে দেখি বিমানের ছাদে বিশাল এক গর্ত। এ সময় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই দেখি বিমানটি জরুরি অবতরণ করেছে।’
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, মাটি থেকে বিমানটি যখন ৩৬ হাজার ফুট ওপরে ছিল, তখন এ ঘটনা ঘটে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এমনটি ঘটেছে। এর সঙ্গে সন্ত্রাসী তৎপরতার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

আইভরি কোস্টে জাতিগত সহিংসতায় নিহত ৮০০

আইভরি কোস্টের ডুয়েকোয়ে শহরে জাতিগত সংঘর্ষে অন্তত ৮০০ জন নিহত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রসের (আইসিআরসি) বরাত দিয়ে গতকাল শনিবার বিসিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আলাসেন ওয়াতারার অনুগত বাহিনী দেশটির উত্তরাঞ্চল থেকে এখন রাজধানী দখলের জন্য লড়াই করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট লরা বাগবোর বাহিনীর সঙ্গে আবিদজান শহরে ওয়াতারার সমর্থকদের লড়াই অব্যাহত রয়েছে। লড়াই চলছে রাজধানীতে, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরেও।
এদিকে বাগবোর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই লরা বাগবোর।
আইভরি কোস্টে নিযুক্ত আইসিআরসির প্রধান ডোমিনিক লিয়েংমি এক বিবৃতিতে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, আদিবাসীদের মধ্যে গোষ্ঠীগত এই সহিংসতার ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক।
আইসিআরসি জানায়, গত সোমবার থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এই সময়ের মধ্যে নারী, শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ দুয়েকোয়ে শহর থেকে পালিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ের সহিংস ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার আইসিআরসির প্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ওই শহর পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিক তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের কারণেই এত বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত মঙ্গলবার সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। শহরটি এখন ওয়াতারার অনুগত বাহিনীর দখলে রয়েছে।
আইসিআরসির মুখপাত্র ডরোথিয়া ক্রিমিতস্যাস এএফপিকে জানান, ‘এই শহরে বড় ধরনের কিছু একটা ঘটেছে, তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের প্রতিনিধিরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা শহরের বিভিন্ন স্থানে অনেক মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। ইতিমধ্যে অন্তত ২৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছেন তাঁরা।’
দ্য ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) জানিয়েছে, প্রাণভয়ে হাজার হাজার বাসিন্দা দুয়েকোয়ে শহর থেকে পালিয়ে পাশের গুইগলো শহরের দিকে যাচ্ছে।
লরা বাগবোকে উৎখাতের লক্ষ্যে গত সোমবার থেকে ওয়াতারার সমর্থিত বাহিনী উত্তরাঞ্চল থেকে রাজধানী ইয়ামাউসোক্রো ও বন্দর শহর সান পেদ্রো দখলে নেওয়ার জন্য লড়াই করছে।
আবিদজান শহরেও দুই পক্ষের তুমুল লড়াই অব্যাহত রয়েছে। প্লাতিয়ু আগবান এলাকায়ও লড়াই চলছে। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ ও সরকারি টেলিভিশনের প্রধান সদর দপ্তরের বাইরে ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছে। দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের খবর নিশ্চিত করে জানা যায়নি। তবে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, গত দুই দিনে তাঁরা অন্তত ৮০ জন আহতকে চিকিৎসা দিয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ ও গুলিবিদ্ধ।
গত বছরের নভেম্বরের নির্বাচনে ওয়াতারা বিজয়ী হন। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাঁকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু বাগবো দাবি করেন, নির্বাচনে তাঁরই জয় হয়েছে। তিনিই দেশটির বৈধ প্রেসিডেন্ট।

পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে সরকার বদল হচ্ছে

এবার পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালায় বামপন্থীরা ক্ষমতা হারাতে চলেছে। অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে ক্ষমতা হারাচ্ছে ডিএমকে-কংগ্রেসের জোট সরকার। তবে আসামে কোনো রকমে টিকে থাকতে পারে কংগ্রেস। ভারতের ইংরেজি ভাষার সাময়িকীইন্ডিয়া টুডে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা এবং তামিলনাড়ুু বিধানসভার প্রাক-নির্বাচনী এক সমীক্ষায় এ কথা বলেছে।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট ১০১টি আসনে জিততে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট পেতে পারে ১৮২টি আসন। আর অন্যান্য দল পাবে ১১টি। নির্বাচনে বামফ্রন্ট পাবে ৪৩ শতাংশ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল-কংগ্রেস জোট পাবে ৪৪ শতাংশ ভোট।
কেরালা বিধানসভার ১৪০টি আসনে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোট বা এলডিএফ পাবে মাত্র ৪১টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত গণতান্ত্রিক জোট বা ইউডিএফ পাবে ৯৬টি। আসামে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস এবার টেনেটুনে জোট করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে। এবার তাদের আসনসংখ্যা কমবে। এখানকার ১২৬ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেসের আসনসংখ্যা কমে এবার ৪৬-এ এসে দাঁড়াতে পারে। গত বছর কংগ্রেস পেয়েছিল ৫৩টি আসন।
তামিলনাড়ু ক্ষমতাসীন ডিএমকে-কংগ্রেস জোটের শোচনীয় পরাজয় হবে। ক্ষমতায় আসছে এআইএডিএমকে প্রধান জয় ললিতা। এখানকার ২৩৪ আসনের বিধানসভায় ১৬৪ আসনে জয় ললিতার দল জিততে পারে। করুণানিধির ডিএমকে এবং কংগ্রেস জোট পাবে মাত্র ৬৮টি আসন।
সমীক্ষায় আরও জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে চায় ২০ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার। আর মমতাকে চায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আবার পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে ৫৩ শতাংশ। অষ্টমবারের মতো বামফ্রন্ট সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার।

ফুকুশিমায় পরমাণুকেন্দ্রের ফাটল দিয়ে নামছে তেজস্ক্রিয় পানি

জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ফাটল দিয়ে তেজস্ক্রিয় পানি নামছে সাগরে। গতকাল শনিবার কেন্দ্রটির পরিচালনা প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির (টেপকো) কর্মকর্তারা এ কথা জানান। কর্মকর্তারা বলেন, কেন্দ্রের দ্বিতীয় চুল্লির নিচে দেখা দেওয়া এই ফাটল উপকূলীয় পানিতে সাম্প্রতিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর কারণ হতে পারে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান গতকাল জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
গত শুক্রবার একজন রুশ বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন, জাপানে পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি চেরনোবিল দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতিকে ছাড়িয়েযেতে পারে। এটি হতে পারে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বোঝানোর আন্তর্জাতিক মাপকাঠি।
টেপকোর কর্মকর্তারা জানান, দ্বিতীয় চুল্লির নিচে তেজস্ক্রিয় তরল পদার্থের যে ধারক রয়েছে, এতে ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) দীর্ঘ ফাটল দেখা দিয়েছে। তাঁরা ওই গর্তে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে ফাটল বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জাপানের নিউক্লিয়ার অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি এজেন্সির উপমহাপরিচালক হিদেহিকো নিশিইয়ামা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘পরমাণুকেন্দ্রটির কাছাকাছি সমুদ্রের পানিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তীব্র। এর কারণ নিশ্চিত হতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা ওই চুল্লির গর্তের পানি ও পরমাণুকেন্দ্রের কাছাকাছি সাগরের পানির নমুনা পরীক্ষা করছি। ফলাফল না জানা পর্যন্ত আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।’
গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর করেন নাওতো কান। এর আগে তিনি বিমানে করে দুর্গত এলাকা পর্যবেক্ষণ করলেও সশরীরে যাওয়া এই প্রথম।
রিকুজেনতাকাতা এলাকা পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাদের পুনর্বাসনে সব ধরনের সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।
রাশিয়ার শীর্ষপর্যায়ের পরমাণুবিরোধী কর্মী তাপগতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ নাতালিয়া মিরোনোভা বলেন, চেরনোবিলে পারমাণবিক দুর্ঘটনায় যে দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল, ফুকুশিমার ঘটনা তা ছাড়িয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে জানমাল ও আর্থিক দিক দিয়ে অনেক বেশি মাশুল গুনতে হবে।

আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার তাগিদ

আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের দায়-ব্যবস্থাপনা আরও সুদৃঢ় করা এবং বিনিয়োগে অর্থের পর্যাপ্ততা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। আহ্বান জানানো হয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ বিভাগের কাজের মধ্যে সমন্বয় আনতে।
গতকাল শনিবার মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক মুদ্রাবাজার পরিস্থিতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব সুপারিশ করেন।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সালাউদ্দিন আহমেদ, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, এমসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, কার্যকরী সদস্য কামরান টি রহমান প্রমুখ। সভাটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট ব্যাংকার মামুন রশীদ।
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়ানো দরকার। সরবরাহ ও চাহিদার উভয় দিকেই কিছুটা চাপ রয়েছে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, হয়তো শেয়ারবাজার কিংবা আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘জেগে’ উঠেছে। অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। বিপুল পরিমাণ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হলেও কোনটা মূলধনি যন্ত্রপাতি হিসেবে কাজে লাগছে, সেটাও তদারকি করতে হবে।
অর্থনীতির এমন প্রেক্ষাপটে সরকার হয়তো কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার নাও পেতে পারে বলে মন্তব্য করেন মির্জ্জা আজিজ।
সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, দেশে আগ্রাসী বিনিয়োগ পরিস্থিতি নেই। ভালো উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহ দেখান না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬-৭ শতাংশ অর্জন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন, কৃষি, প্রবাসী আয়— কোনো খাতেই প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। শুধু রপ্তানি খাত দিয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কতটা সম্ভব?
সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, এখনো মুদ্রাবাজারে তারল্য সংকট রয়েছে। বন্ড মার্কেট থেকে টাকা আসতে পারে, কিন্তু তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন দরকার বলে তিনি মত দেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগেই বেশি উৎসাহী ছিল। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করায় শেয়ারবাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্গাচাষিদের ঋণ দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ নয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধরনের কার্যক্রমেই বেশি উৎসাহী।
আনিস এ খান বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণে টাকা দরকার। কিন্ত সুদের হার বেশি থাকায় ঋণের অর্থের মূল্য বেড়ে যায়। এটা শিল্পায়নে বাঁধা।
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, গত এক বছরে শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। এই বাড়তি দাম মিটিয়ে পরিচালনা তহবিল কীভাবে সম্ভব?
ব্যাংক, এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও টাকা দেয় না—এমন তথ্য উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে এত বিরাট রিজার্ভ রেখে লাভ কী?

সুদের হার বেড়ে চলায় এফবিসিসিআই উদ্বিগ্ন



ব্যাংকঋণের ওপর আরোপিত সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা ১৩ শতাংশ প্রত্যাহার করায় আকস্মিকভাবে সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগদ অর্থ প্রবাহে টান পড়ায় উচ্চ মার্জিনে ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট।
এই ত্রিমুখী সংকটের প্রভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা বিনিয়োগ পরিবেশ ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কায় প্রকাশ করেছে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)।
এফবিসিসিআই মনে করে, ব্যাংকঋণের ওপর আরোপিত সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা প্রত্যাহার করায় আমদানি ও রপ্তানি ব্যয় বাড়বে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ সব ধরনের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে বলে সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করছে।
একই সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বণিজ্যের স্বার্থে এফবিসিসিআই আগামীকাল সোমবারের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল প্রত্যাহারের জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এফবিসিসিআই এসব দাবি জানিয়েছে।
এফবিসিসিআই বলছে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ ধার্য করা হয়েছিল। কিন্ত গত ৯ মার্চ ২০১১ তারিখে এ সীমা প্রত্যাহার করায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকঋণ প্রদানের জন্য সুদের হার ১৬ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটি আরও বলেছে, সুদের হার বৃদ্ধি, অপ্রতুল মুদ্রা সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রাসংকটজনিত সমস্যা জরুরি ভিত্তিতে নিরসন করা না হলে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় গৃহীত বিনিয়োগ ও বাড়তি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। এ ছাড়া আমদানি ও রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটাবে।
এফবিসিসিআই অনতিবিলম্বে আগের মতো ব্যাংকঋণের সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা আরোপ এবং শিল্প তথা উৎপাদনশীল খাতে ব্যাংকঋণের হার প্রতিযোগী দেশসমূহে বিদ্যমান সুদের হারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনার প্রস্তাব করছে।
হরতাল প্রত্যাহার করুন: দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যবসা-বণিজ্যের স্বার্থে এফবিসিসিআই আগামীকালের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি নারী নীতির বিরুদ্ধে এই হরতাল ডেকেছে।
এফবিসিসিআই মনে করে, সরকার প্রস্তাবিত নারীনীতিতে একজন নাগরিক হিসেবে সংবিধানে বর্ণিত নারীর যে অধিকার সংরক্ষিত আছে তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবিত নারীনীতিতে নারীর সম্পদ অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নাগরিক হিসেবে তার অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আবার সরকারের দিক থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোরআন-সুন্নাহিবরোধী কোনো আইন সরকার প্রণয়ন করেনি এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না। প্রকৃত অর্থে নারীনীতি একটি লিখিত নীতিমালা, যা কোনো আইন নয়, বরং সংবিধানে প্রদত্ত নারীর মর্যাদায় দিকনির্দেশনার প্রকাশমাত্র।
এফবিসিসিআই আরও বলেছে, যেহেতু বিষয়টি সম্পর্কে অস্বচ্ছতার কিছুই নেই এবং সর্বমহলে সরকারের ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে, সেহেতু এ ইস্যুতে হরতাল আহ্বান অযৌক্তিক। এ ছাড়া দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সব সময় হরতাল ও নৈরাজ্যের বিরোধী। এফবিসিসিআই মনে করে, জাতীয় অর্থনীতি এবং দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ব্যবসায়ী সমপ্রদায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সবার মতৈক্য কামনা করে।

আইএমএফের শর্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বর্ধিত ঋণসুবিধা (ইসিএফ) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ সরকার ১০০ কোটি ডলার ঋণ গ্রহণের জন্য আলোচনা করছে। তবে এই ঋণ পেতে হলে কতগুলো শর্ত পরিপালন করতে হবে।
কিন্তু এসব শর্ত পরিপালনের ফলে মূল্যস্ফীতি, লেনদেনের ভারসাম্য, বিনিয়োগ, সঞ্চয়, সর্বোপরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ।
সংস্থাটির মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে আইএমএফের শর্ত মেনে ঋণের সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ায় সুদের হার বাড়তে থাকবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে।
এতে বলা হয়, ২০০৬ সালে ঋণের সুদের হার ছিল ১১ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বিনিয়োগের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০০৮ সালে ঋণের সুদের হার বেড়ে ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ হওয়ায় জিডিপিতে বিনিয়োগের হার কমে ২৪ দশমিক ২১ শতাংশ হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে সুদের হার বাড়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ সীমা (১৩ শতাংশ) আরোপ করার কারণে মোট জিডিপিতে বিনিয়োগের শতকরা হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এমতাবস্থায় সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ার নীতি দেশের মোট জিডিপিতে বিনিয়োগের হার কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছে উন্নয়ন অন্বেষণ।

পর্যটনের নামে বিনা শুল্কে আসছে দামি গাড়ি

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন ব্রিটিশ নাগরিক এ দেশে বেড়াতে আসেন। পর্যটক হিসেবে বাংলাদেশের নানা প্রান্ত ঘোরার জন্য সঙ্গে আনেন বিলাসবহুল টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার স্টেশনওয়াগন ভিএক্স মডেলের একটি গাড়ি।
পর্যটক বিমানযোগে এলেও গাড়ি আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৬ লাখ টাকা। পর্যটক হিসেবে তিনি ‘কারনেট দ্য পেসেজ’ সুবিধা নিয়ে বিনা শুল্কে গাড়িটি খালাস করেন। এই সুবিধা না নিলে গাড়িটির জন্য শুল্ক দিতে হতো প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা।
কিন্তু বাংলাদেশে প্রবেশের পর এই গাড়ির আর কোনো হদিস মেলেনি। পর্যটনের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলার রাস্তায়ও দেখা যায়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি এনে ওই পর্যটক গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন বা হাতবদল করেছেন, যা পুরোপুরি বেআইনি।
জানা গেছে, এভাবে পর্যটকদের জন্য বিনা শুল্কে বিলাসবহুল গাড়ি আনার সুবিধার ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে। পর্যটনের নামে চলছে জমজমাট গাড়ি ব্যবসা, চলছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি।
এই সুবিধার সুযোগ নিতে সম্প্রতি বেড়ে গেছে মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, টয়োটা ব্র্যান্ডের মতো বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি। আর এই বিলাসবহুল গাড়িগুলো বাংলাদেশে আসার পর কোনো হদিস থাকে না। অর্থাৎ এই সুবিধার নিয়ম অনুসারে নির্ধারিত সময় পরে গাড়িগুলো আবার দেশের বাইরে ফেরত যায় না।
পর্যটকেরা গাড়ি নিয়ে যেকোনো দেশে প্রবেশের জন্য দ্য কাস্টমস কনভেনশন অন দ্য টেম্পোরারি ইমপোর্টেশন অব প্রাইভেট ভেহিক্যালস (১৯৫৪) অ্যান্ড কমার্শিয়াল রোড ভেহিক্যালস (১৯৫৬) নামে একটি আন্তর্জাতিক আইন আছে। এটি ‘কারনেট দ্য পেসেজ’ নামে সারা বিশ্বের বহুল পরিচিত। বিশ্বের সব দেশ তা অনুসরণ করতে বাধ্য।
এই সুবিধার আওতায় কোনো পর্যটক চাইলে তাঁর নিজের গাড়ি নিয়ে বিনা শুল্কেই যেকোনো দেশে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে ফিরে যাওয়ার সময় তা ফেরত নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত এক বছরের জন্য এই সুবিধা বহাল থাকে।
এই সুবিধার আওতায় বাংলাদেশে সিংগভাগ গাড়ি এনেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকেরা, যাঁদের আদি নিবাস সিলেট জেলায়। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কারনেট সুবিধায় আসা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর মধ্যে মাত্র ১৩টি ফেরত গেছে বলে জানা যায়।
এনবিআরের শুল্ক বিভাগ এখন এসব গাড়ির খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। ইতিমধ্যে শুল্ক বিভাগ থেকে সব কাস্টমস কমিশনারকে কারনেট সুবিধায় আসা গাড়িগুলোর ইঞ্জিন, চেসিস নম্বরসহ যাবতীয় তথ্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরও গাড়িগুলো খুঁজছে।
যেভাবে আসে: একশ্রেণীর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক এ দেশে বেড়াতে আসার সময় জাহাজে করে একটি বিলাসবহুল গাড়ি পাঠিয়ে দেন। ওই ব্রিটিশ নাগরিক চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কারনেট সুবিধার আওতায় বিনা শুল্কে গাড়িটি খালাস করেন।
কারনেট সুবিধা নিতে পর্যটকদের জন্য ‘রয়েল অটোমোবাইল ক্লাব অব ইউকে’তে নিবন্ধন নিতে এবং গাড়ির মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ জামানত হিসেবে জমা রাখতে হয়। আবার প্রায় প্রতিটি দেশেই পর্যটকদের জন্য রয়েল অটোমোবাইল ক্লাবের শাখা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পর্যটকের গাড়িতে তাঁর রয়েল অটোমোবাইল ক্লাবের দেওয়া নম্বরপ্লেট লাগিয়ে বাংলাদেশে চলাচল করার কথা।
বাংলাদেশে নিয়ে আসা গাড়ি খালাস করার পর তা বিক্রি করে দেওয়া হয় কিংবা হাতবদল হয় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। কিন্তু ব্যক্তি বা পর্যটক দেশে ফিরে যাওয়ার আগে গাড়ি হারিয়ে গেছে বা চুরি গেছে বলে থানায় ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ব্রিটেনে পৌঁছে সেই জিডির অনুলিপি দেখিয়ে জামানতের অর্থ তুলে নেন।
হঠাৎ আমদানি বৃদ্ধি: ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশে কারনেট সুবিধার আওতায় মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএডব্লিউ, টয়োটা ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল জিপ বাংলাদেশে প্রবেশ বেড়েছে। এ বছর ৪৯টি গাড়ি এই সুবিধার আওতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এর আগে ২০০৯ সালে ১৩টি, ২০০৮ সালে ছয়টি ও ২০০৭ সালে পাঁচটি গাড়ির মালিক কারনেট সুবিধা নিয়েছেন। এই গাড়িগুলোরও খোঁজ জানে না শুল্ক কর্মকর্তারা। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ফিরে গেছে মাত্র ১৩টি গাড়ি।
এনবিআর সূত্রে আরও জানা গেছে, কারনেট সুবিধায় চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) ৪৬টি গাড়ি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়েছে। হঠাৎ করে এ ধরনের গাড়ি আমদানি বৃদ্ধির বিষয়টি খোঁজ নেওয়া শুরু হওয়ায় আরও ৩০টি গাড়ি খালাসের প্রক্রিয়া বন্ধ রেখেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ (আমদানি) শাখা।
এনবিআরের সদস্য (শুল্ক) শাহ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারনেট সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়িগুলো এনে বিক্রি করে দেয় একটি চক্র। আমরা কমিশনারেটগুলোর কাছে এই সুবিধায় আসা গাড়িগুলোর যাবতীয় তথ্য চেয়েছি। তথ্য পেলেই বাংলাদেশ বিআরটিএকে জানাব, যেন তারা এ ধরনের কোনো গাড়ির নিবন্ধন না দেয়।’
তবে বারভিডার সভাপতি আবদুল মান্নান চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, বাংলাদেশে ঘুষ দিলে যেকোনো গাড়ির নিবন্ধন পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে কারনেট সুবিধায় আসা কোটি টাকা দামের গাড়ির ক্রেতারা ঘুষ দিয়ে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নিয়ে নিচ্ছেন। আর ভুয়া নম্বরপ্লেট লাগানো থাকলেও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা এসব দামি গাড়ির মালিকদের ধরতে সাহস পান না। ফলে একটি চক্র বিনা শুল্কে দামি ও বিলাসবহুল গাড়ি এনে বিক্রি করছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে আসা দুই হাজার থেকে চার হাজার সিসির বিএমডব্লিউ, লেক্সাস ব্র্যান্ডের বিভিন্ন মডেলের জিপের দাম পড়ে ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্কসহ মোট শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয় ৮০৫ শতাংশ হারে। এসব মিলিয়ে গাড়ির মোট দাম পড়ে প্রায় দুই থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা টাকা।

পাঁচ প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ঘোষণা



প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড ২০ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ, বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড ২০ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ, ইউনাইটেড ইনস্যুরেন্স ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ, ইউনাইটেড লিজিং ৭.৫ শতাংশ নগদ ও ৭৫ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ এবং ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ১৬ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আজ রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ২৬ মে বেলা ১১টায় ঢাকার গুলশানে স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ১৩ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ৩১.৫৩ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ১৫১.০১ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৬৩.৭০ টাকা।
বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ৩১ মে বেলা ১১টায় চট্টগ্রামে এসএস খালেদ রোডের চট্টগ্রাম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ১৩ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে কর-পরবর্তী মোট মুনাফা ৯৬,৪৮,৯০,০০০ টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় ৫৩.১২ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ৭৮.৭১ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৩৮.২৬ টাকা।
ইউনাইটেড ইনস্যুরেন্স: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ২ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ২০ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে কর-পরবর্তী মোট মুনাফা ১৫,০০,৩০,০০০ টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় ৫০.০১ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ২৪১ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ১.৫২ টাকা।
ইউনাইটেড লিজিং: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ৯ জুন বেলা ১১টায় ঢাকার আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ২৮ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে কর-পরবর্তী মোট মুনাফা ৩৭,৮২,৮০,০০০ টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় ৭১.৬৪ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ৩০৭ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৫৪.০৮ টাকা।
ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ১২ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ২০.৯১ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ১৫৬.৫৯ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ১৭ টাকা।

ডিএসইর নোটিশের জবাব ছয় প্রতিষ্ঠানের

অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নোটিশের জবাব দিয়েছে ডিএসইর তালিকাভুক্ত ছয় প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ইসলামী ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড, এসিআই, অ্যাটলাস বাংলাদেশ, আরামিট, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও আনোয়ার গ্যালভানাইজিং।
প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে মূল্যসংবেদনশীল কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

রোমাঞ্চের নগর মুম্বাই

মুম্বাই বিশ্বব্যাপী খ্যাত বাণিজ্যনগর হিসেবে। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী। কাল হয়তো সেরা বাণিজ্যটাই দেখল এই নগর। তবে তা কোনো পণ্য বেচাকেনার বাণিজ্য নয়, ক্রিকেটীয় বাণিজ্য। অন্যকিছুই নয়, সবার মুখে ছিল একটাই কথা, ‘জয় হো ইন্ডিয়া।’
রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল দেখার জন্য আগেই সরকারি অফিসগুলোয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ছুটি ঘোষণা করা না হলেও দুপুরের আগেই প্রায় শূন্য হয়ে যায়। দু-চারজন যাঁরাও বা ছিলেন, মন ছিল ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে, টেলিভিশনের পর্দায়। হেডফোন ছিল দুই কানে।
রোমাঞ্চিত সমর্থকদের কেউ কেউ খেলা শুরুর আগেই ভারতের পক্ষে ফল দেখে ফেলেছিলেন। কেউ কেউ তো ঘোষণা দিয়েই রেখেছেন, লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার এই ম্যাচেই কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরিটি করবেন। ‘আমরা সবাই চাই, শচীন তাঁর শততম সেঞ্চুরিটি করুক এবং ম্যাচটি একপেশে করে জিতিয়ে দিক’—বললেন সুনীল ভাবে নামের একজন অপেশাদার ক্রিকেটার। শচীনের এটা শেষ বিশ্বকাপ বলেই ট্রফিটা তাঁর পাওয়া উচিত, মুম্বাইয়ের এই যুবক তা মনে করলেও তাঁর দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়, ‘প্রায়ই দেখা যায়, শচীন সেঞ্চুরি করেছে কিন্তু দল হেরেছে। তাই শচীন ৯৯ রানে আউট হওয়ার পরও ভারত যদি শ্রীলঙ্কাকে হারায়, তাতে আমি কিছুই মনে করব না।’
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিতিন নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেই পারেন। ফাইনালে স্টেডিয়ামের হসপিটালিটি অংশে দায়িত্ব পেয়ে পুলকিত তিনি, ‘আমার বন্ধুরা হিংসায় পুড়ছে। শচীনকে দেখার সুযোগ পেয়েই আমি খুশি। আমি অবশ্যই চাইব ভারত জিতুক। তবে তারা হেরে গেলেও আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না।’
নিতিনের মনে ভারতের জয় নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও পানবিক্রেতা কানাইয়ালাল তিওয়ারি কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত, ‘অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানকে হারানোর পর ভারতের কাছে শ্রীলঙ্কার পাত্তাই পাওয়া উচিত নয়। বীরেন্দর শেবাগ ২০ ওভার পর্যন্ত ব্যাট করতে পারলে শ্রীলঙ্কা জেতার কথাই ভুলে যাবে।’ ফাইনালকে সামনে রেখে বিহার থেকে ব্যবসা করতে এসেছেন তিওয়ারি। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যবসা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কিত, ‘অনেক লোক আসছে। ব্যবসা ভালো হওয়ারই কথা। কিন্তু পুলিশ সম্ভবত স্টেডিয়ামে আশপাশে আমাদের ভিড়তে দেবে না।’ ভারত জিতলে ব্যবসায় ক্ষতি হলেও খুশি তিওয়ারি, ‘ভারত জিতলে এই ক্ষতিতে আমার কিছুই আসে-যায় না।’
মুম্বাই বিশ্বখ্যাত তার চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য, যেটির নাম বলিউড। আর বলিউডের চিত্রনায়ক আমির খান ছিলেন ওয়াংখেড়ের ৩৩ হাজার দর্শকের একজন। অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত লগান ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ভুবনের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এই ভুবনই একটি ক্রিকেট ম্যাচে তাঁর দলকে জিতিয়েছিলেন ইংরেজদের বিপক্ষে। কাল কি ভারতের জয় দেখেছেন আমির খান? ওয়েবসাইট।

ক্লার্ককে ওয়ার্নের পরামর্শ

মাইকেল ক্লার্কের মধ্যে তারুণ্যের মার্ক টেলরকে দেখতে পান শেন ওয়ার্ন। যে মার্ক টেলর ওয়ার্নের দেখা ‘সেরা অধিনায়ক’। তাহলে কি অস্ট্রেলিয়ার নতুন অধিনায়ক ক্লার্কের মধ্যেও সে রকম নেতৃত্বগুণ দেখতে পাচ্ছেন কিংবদন্তি লেগ স্পিনার?
প্রতিটি বলের পরই টেলর বোলারের পেছন পেছন ছুটতেন না। ভাবটা ছিল এমন—আমার দিকে তাকাও, আমিই অধিনায়ক। অধিনায়কের এই ব্যক্তিত্বটা পছন্দ ওয়ার্নের। অস্ট্রেলিয়ার ৪৩তম টেস্ট অধিনায়ক ক্লার্কের মধ্যেও ব্যাপারটা আছে বলে মনে করেন ওয়ার্ন। অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এ লেখা নিজের কলামে ক্লার্কের একটা দুর্বলতাও তুলে ধরেছেন। ওয়ার্নের পরামর্শ, খেলোয়াড়দের সামলাতে হলে আরও বেশি বিনয়ী ও আন্তরিক হতে হবে নতুন অধিনায়ককে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন ওয়ানডের সিরিজ দিয়েই শুরু হবে ক্লার্কের অধিনায়কত্বের ইনিংস। তার আগে ওয়ার্নের কলামটা পড়ে নিলে খারাপ হবে না তাঁর। ‘একজন অধিনায়ক হিসেবে মাইকেলের (ক্লার্ক) আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে। ওর মধ্যে আয়েশি একটা ব্যাপার আছে, মজা করে খুব। তবে অধিনায়ক হিসেবে তাকে সবকিছুতেই আরও কেতাদুরস্ত হতে হবে, আরও বিনয়ী হতে হবে’—বলেছেন ওয়ার্ন। খেলোয়াড় হিসেবে দলের সবাই ক্লার্ককে শ্রদ্ধাই করে। এবার অধিনায়ক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও সেই শ্রদ্ধাটুকু আদায় করে নিতে হবে তাঁকে, এমনটাই মনে করেন ওয়ার্ন।

আফ্রিদিদের প্রশংসা করলেন ইন্তিখাব

সাফল্য কী আছে তা বিবেচ্য নয়, বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলের ম্যানেজার ইন্তিখাব আলমের কাছে বড় ব্যাপার হচ্ছে দলের একতা। পুরো বিশ্বকাপে দল যেভাবে একসূত্রে গাঁথা ছিল, দেশে ফিরে সেটারই প্রশংসা করেছেন তিনি।
পাকিস্তানের ক্রিকেট মানেই যেন বিতর্ক, এই বিশ্বকাপে দেখা গেছে এর উল্টোটাই। স্পট ফিক্সিং বিতর্ক মাথায় নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে নামা পাকিস্তান নতুন করে আর কোনো বিতর্কের জন্ম দেয়নি। বিশ্বকাপ থেকে ফিরে ইন্তিখাব বলেছেন, ‘আমার প্রধান কাজ ছিল দলে ঐক্য বজায় রাখা। আমার মনে হয়, এটা আমরা করতে পেরেছি। এটাই আমার সন্তুষ্টির জায়গা।’ ওয়েবসাইট।
সামনেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাচ্ছে পাকিস্তান। এই সফরে দল ভালো করবে বলে বিশ্বাস ইন্তিখাবের। আর পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী তিনি, ‘এই দলটির সামর্থ্য অনেক এবং ভবিষ্যতে অনেক ভালো করবে।’

পাঁচ ভাগে আসছে অস্ট্রেলিয়া দল

১৪ জনের দল। সঙ্গে কোচ-নির্বাচক মিলে টিম অফিশিয়াল ১৩ জন। ২৭ জনের বহর হলে যা হওয়ার কথা, তা-ই হয়েছে অস্ট্রেলিয়া দলের। বাংলাদেশে আসার জন্য এক বিমানে পাওয়া যায়নি এত আসন। আগামীকাল ৪ এপ্রিল থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিনে অস্ট্রেলিয়া দলটা ঢাকা আসছে পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে!
ক্যাথে প্যাসিফিকে আগামীকাল রাত আটটা পাঁচ মিনিটে সিকিউরিটি ম্যানেজার ফ্রাঙ্ক ডিমাইসির সঙ্গে ঢাকা পৌঁছাবেন চার ক্রিকেটার শেন ওয়াটসন, ব্রেট লি, ব্র্যাড হাডিন ও স্টিভেন স্মিথ। কালই রাত ১০টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আসবে খেলোয়াড়-কর্মকর্তাসহ আরও ১৯ জনের বহর। এই ২৪ জন এসে যাওয়ার পরও বাকি থেকে যাবে তিনজন। ৫ এপ্রিল ভোর পাঁচটায় আসবেন একজন, সকাল আটটায় আরেকজন। পরদিন ৬ এপ্রিল সর্বশেষ ঢাকায় পৌঁছাবেন নির্বাচক অ্যান্ড্রু হিলডিচ।
অস্ট্রেলিয়া দল ঢাকায় আসার আগের দিন অর্থাৎ আজ সন্ধ্যা সাতটায় দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বে বাংলাদেশ ‘এ’ দল। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ‘এ’ দল দুটি চার দিনের ম্যাচ ছাড়াও খেলবে পাঁচটি একদিনের ম্যাচ। পচেফস্ট্রুমে প্রথমে চার দিনের ম্যাচ দিয়ে সিরিজ শুরু হবে ৭ এপ্রিল।

ফাইনালের ট্রফি আটক!

বিমানে করে কলম্বো থেকে বিশ্বকাপ ট্রফি মুম্বাই নিয়ে আসছিলেন আইসিসির একজন প্রতিনিধি। কিন্তু বিমানবন্দরে নামতেই বেঁকে বসলেন মুম্বাইয়ের শুল্ক কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রফিটির মূল্য ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এর জন্য কমপক্ষে ৫০ হাজার ডলার শুল্ক দিতে হবে। তা না হলে ট্রফি নিয়ে বের হওয়ার ছাড়পত্র দেবেন না তাঁরা। কিন্তু ট্রফিটি তো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে না। তাহলে শুল্ক কেন? ওয়েবসাইট।
কারণটা পরে বুঝতে পেরেছেন আইসিসির প্রতিনিধি। শুল্ক নেওয়ার অজুহাতে তাঁকে আটকে ঘুষ হিসেবে ফাইনালের টিকিট চাওয়ার ফন্দি এঁটেছিলেন শুল্ক কর্মকর্তারা। ট্রফিটা বিমানবন্দরেই রেখে দিতে বলেন আইসিসির প্রতিনিধি। বলেন, আইসিসির প্রধান কার্যালয় দুবাইয়ে যাওয়ার সময় নিয়ে যাবেন ট্রফিটা। শুনে আক্কেলগুড়ুম হয়ে গিয়েছিল শুল্ক কর্মকর্তাদের। তাঁরা জানতেন না, এটা বিশ্বকাপ ট্রফির রেপ্লিকা! আসল ট্রফি তো আগেই মুম্বাই গিয়ে বসে আছে! আইসিসি প্রতিনিধিকে হেনস্থা করতে গিয়ে জব্দ হয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারাই।

গম্ভীর’ এক ইনিংস দেখলাম

আগের নয়টি বিশ্বকাপ ফাইনালে সেঞ্চুরি ছিল মাত্র পাঁচটি। কাল একই ফাইনালে আমরা একটি সেঞ্চুরি দেখলাম, দুটি ‘প্রায় সেঞ্চুরি’। জয়াবর্ধনে আর গম্ভীর দুটো ক্লাসিক ইনিংস খেলল। দুটো ইনিংসও এল এমন দুজনের কাছ থেকে, ফাইনালের আগে সম্ভাব্য নায়ক হিসেবে আসলে যাদের কথা বেশির ভাগ লোকই বলেনি। এবার বিশ্বকাপে এর আগে একটি সেঞ্চুরি করলেও মাহেলা জয়াবর্ধনের সময়টা আসলেই ভালো যাচ্ছিল না। জয়াবর্ধনের কারণে মিডল অর্ডারও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। আর গম্ভীর টুকটাক রান করে গেলেও আলোটা একদমই তার ওপর ছিল না।
ছায়ার আড়ালে থাকা দুই ব্যাটসম্যানই সঠিক সময়েই মঞ্চের আলোটা নিয়ে এল নিজেদের ওপর। দুটো ইনিংসই পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ৮৮ বলে খেলা জয়াবর্ধনের ১০৩ রানের অপরাজিত ইনিংসটা মেরুদণ্ড হয়ে থাকল শ্রীলঙ্কার। তার চেয়েও বড় কথা, জয়াবর্ধনে কিন্তু ষষ্ঠ আর সপ্তম উইকেট দুটো দুর্দান্ত জুটি গড়ে তুলল। সঙ্গী হিসেবে এমন দুজন ব্যাটসম্যানকে জয়াবর্ধনে পেয়েছিল, যাদের ব্যাটিং গড় ১৫-এর মতো।
মনে হচ্ছিল জয়াবর্ধনেই তার এই সেঞ্চুরির জন্য ম্যাচের নায়ক হয়ে যাবে। বিশ্বকাপের মতো বড় ম্যাচে ২৭৪ রান মানে অনেক বড় স্কোর। যে চাপ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাতে মূল স্কোরের সঙ্গে ২৫ যোগ করে নিতে পারে। ভারতের মাথার ওপর আসলে ছিল ৩০০ রান তাড়া করে জেতার লক্ষ্য।
সেই অবস্থায় দুই ব্যাটিং-ভরসা শেবাগ-টেন্ডুলকারকে হারিয়ে ফেলা মাত্র ৩১ রানের মধ্যে! এ কারণেই গম্ভীরের ইনিংসটার মাহাত্ম্য বহু গুণে বেড়ে যাচ্ছে। টেন্ডুলকার যেভাবে শুরু করেছিল, মনে হচ্ছিল ক্রিকেট-বিধাতা বুঝি চিত্রনাট্য মিলিয়ে নাটক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আসল ‘ক্লাইম্যাক্স’ যে লুকিয়ে অন্য জায়গায়, কেই-বা জানত!
সেই ক্লাইম্যাক্স হিসেবে আবির্ভূত হলো গম্ভীর। কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনাল দুটো ম্যাচেই আসলে যে আউট হয়েছে চাপের মুখে পড়ে। সেই গম্ভীর ভারতের নড়বড়ে শুরুর পর আরও বহু গুণ বেড়ে যাওয়া চাপটা নিয়ে কী ইনিংসটাই না খেলল! বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে চাপের মুখে কীভাবে ব্যাটিং করতে হয়, সেটারই প্রামাণ্যচিত্র হয়ে থাকবে ইনিংসটা। ধোনিও শেখাল, অধিনায়ককে কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়। কাল কিন্তু ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে ওপরেও নিয়ে এসেছিল ধোনি। চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিল। যেটি ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের মধ্যে অন্য রকম আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।
তিনজনের তিনটি ইনিংসই দুর্দান্ত। তবে আমি বেশি নম্বর দেব গম্ভীরকেই।

রসে টসটসে টস

গত বিশ্বকাপ বেশ কিছু নাটকের জন্ম দিয়েছিল। যেগুলোকে আসলে নাটকের চেয়ে প্রহসন বলাই ভালো। সবচেয়ে বড় প্রহসনের জন্ম তো হলো ফাইনালেই। আলোকস্বল্পতার কারণে ম্যাচের শেষ ঘোষণা করেছিলেন আম্পায়াররা, জয়োৎসবে মেতে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু পরে আবার শুরু করা হয় খেলা। প্রায় অন্ধকারে ব্যাট করতে হয় শ্রীলঙ্কাকে। গতবারের যে প্রহসনটি ‘কমেডি অব এরর’ নামে পরিচিত।
গতকালও এমন একটা কমেডি জমে গিয়েছিল প্রায়। ফাইনালের টসটা যে হলো দুবার!
স্বাগতিক অধিনায়ক হিসেবে কয়েন শূন্যে ছোড়েন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ‘কল’ ছিল কুমার সাঙ্গাকারার। দর্শকের প্রচণ্ড শোরগোলের কারণে টিভিতে প্রথমে ভালোভাবে শোনা যায়নি সাঙ্গাকারা ‘হেড’ চেয়েছেন নাকি ‘টেল’। কিন্তু টস শেষে দেখা গেল, দুই অধিনায়কই দাবি করছেন, তাঁরা টস জিতেছেন! ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো নিজেও ধন্দে। কী আর করা, টস হলো আবারও। এবার বেশ জোরালো কণ্ঠে ‘হেড’ চাইলেন সাঙ্গাকারা। হেডই হলো। এবার জিতলেন সাঙ্গাকারা। নিলেন ব্যাটিং।
প্রশ্ন হলো, প্রথমবার টসে কী হয়েছিল? ভুলটা সাঙ্গাকারা নাকি ধোনির? পরে রিপ্লেতে দেখা গেছে, ভুলটা আসলে ধোনিই করেছেন। প্রথমবারও সাঙ্গাকারা ‘হেড’ চেয়েছিলেন। কিন্তু ধোনি ভুল করে শুনেছেন ‘টেল’। এ কারণে প্রথমবার টস শেষে সাঙ্গাকারার বদলে ধোনিই প্রথম উপস্থাপক রবি শাস্ত্রীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমরা ব্যাটিং নেব।’
এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, কাল দুই দলই ব্যাটিংই নিতে চেয়েছিল প্রথমে। ফাইনালের মতো মহা ম্যাচে রান তাড়া করা বাড়তি চাপ তো অবশ্যই। রেকর্ডও বলছে, বিশ্বকাপে আগের নয়টি ফাইনালে সাতবারই প্রথমে ব্যাটিং করা দলই ম্যাচ জিতেছে!
সে যা-ই হোক...শুরুতে একটা বিনোদন উপহার দিল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে। ক্রিকইনফোর এক পাঠকও যেমন রসিকতা করে মন্তব্য করেছেন, ধোনির উচিত ছিল প্রথমবার টস হওয়ার পরই রেফারেল চাওয়া। আরেকজনের সরস মন্তব্য, সব দোষ জেফ ক্রোর। চার বছর আগের ফাইনালটিরও ম্যাচ রেফারি যে ছিলেন তিনিই!

এবার অন্তত এক ইনিংসের ফাইনাল নয়

এমন নাটকীয়ভাবে কোনো বিশ্বকাপ ফাইনাল শুরু হয়নি কোনো দিন।
জহির খানের প্রথম বলে রান নেই। প্রথম ওভারটিই মেডেন। এটা আবার নাটকীয় শুরু হয় কীভাবে?
নাটকীয় যে শুরুর কথা বলা হচ্ছে, সেটি ম্যাচ শুরুরও আধঘণ্টা আগে। যখন ম্যাচ রেফারি কুমার সাঙ্গাকারার ‘কল’ শুনতে পাননি বলে দ্বিতীয়বার টস করতে হলো। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম।
ম্যাচ রেফারির নাম জেফ ক্রো। মার্টিন ক্রোর অগ্রজ সাবেক নিউজিল্যান্ড অধিনায়কের টানা দ্বিতীয় ফাইনাল। এমনিতে বেশির ভাগ ম্যাচে ম্যাচ রেফারির নাম-টাম জানার প্রয়োজন পড়ে না। জেফ ক্রো দুবারই তাঁর নাম জানতে বাধ্য করলেন।
২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় উদ্যাপন করে ফেলার পর প্রায়ান্ধকারে আবারও দুই দলকে মাঠে নামিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কান ইনিংসের ২০ ওভার হয়ে যাওয়াই যে ম্যাচের রেজাল্ট হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট, বিস্ময়করভাবে এটি ভুলে গিয়ে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে এমন ভুল নিয়ে যতটা হইচই হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। কারণ ম্যাচের ফল তো এর আগেই সবার জানা হয়ে গিয়েছিল। ভুল করে আবার খেলা শুরুটা ছিল নিছকই আনুষ্ঠানিকতা। অস্ট্রেলিয়া তাতে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক শিরোপা উদ্যাপন করার সুযোগ পেয়েছিল এই যা!
এবারেরটা জেফ ক্রোর ভুল বলা ঠিক হবে না। হয়তো সাঙ্গাকারা এমন মৃদু স্বরে বলেছিলেন যে, দর্শকদের চেঁচামেচিতে তা হারিয়ে গেছে। বিতর্ক যদি হয়, এই কারণেই হবে যে, বিশ্বকাপ ফাইনালে টস জেতাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সাঙ্গাকারা প্রথমবার জিতেছিলেন কি না কে জানে!
আগের দিন ধোনি বলছিলেন, এমনিতে আগে-পরে ব্যাট করায় কিছু আসে-যায় না। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে পরে ব্যাট করলে চাপটা অনেক বেড়ে যায়। এ কারণেই বিশ্বকাপ ফাইনালে টস জিতলে ব্যাটিং করাটাই নিয়ম। প্রথম সেই নিয়মের বাইরে হেঁটেছিল শ্রীলঙ্কা। আগের পাঁচটি ফাইনালে আগে ব্যাটিং করা দলই জিতেছে জেনেও রানাতুঙ্গা ১৯৯৬ ফাইনালে টসে জিতে অস্ট্রেলিয়ার হাতে ব্যাট তুলে দেন। সাত ব্যাটসম্যানের দল শ্রীলঙ্কা রান তাড়া করায় খুব ভালো। তবে আসল কারণ ছিল অন্য। ফাইনালের আগের দিন দুপুরে দুই দল অনুশীলন করার পর রাতে কোচ ডেভ হোয়াটমোর ও অর্জুনা রানাতুঙ্গা আবার গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। শিশিরের ব্যাপারটা তখনই টের পান তাঁরা। এবারের বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে শিশিরভেজা বল পাগল করে দিয়েছিল গ্রায়েম সোয়ানের জীবন। সোনালি চুলের এক লেগ স্পিনারের একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৯৯৬ বিশ্বকাপের ওই ফাইনালে। নাম বললে আপনি অবশ্যই চিনবেন। শেন ওয়ার্ন।
ওয়ান্ডারার্সে ২০০৩ বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীও রানাতুঙ্গার পথে হেঁটেছিলেন। রানাতুঙ্গার সিদ্ধান্ত বিচক্ষণতার উদাহরণ আর সৌরভেরটা ঐতিহাসিক ভুলের। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, উইকেটে সেটির ছায়া দেখে সৌরভ ভেবেছিলেন পেসাররা সাহায্য পাবে। শুরুতে হেইডেন আর গিলক্রিস্ট, পরে পন্টিং আর মার্টিন এমন মার শুরু করেন যে, পেসাররা কোনো সাহায্য পাচ্ছেন কি পাচ্ছেন না, তা বোঝার আর কোনো উপায় থাকেনি। জহির খানের প্রথম ওভারেই ১৫ রান। হেইডেনের সঙ্গে তর্কাতর্কি করে লাইন-লেংথের কথা ভুলে যান। ৩ ওভারে ২৮ রান দিয়ে দেওয়ার পর তাঁকে তাই সরিয়ে নিতে বাধ্য হন সৌরভ।
বিশ্বকাপ ফাইনালে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার ঘটনা ৫টি, তবে এই দুটিই বেশি বিখ্যাত হয়ে আছে। পরে ব্যাটিং করে জয়ের ঘটনাও দুটি। পরপর দুবার—১৯৯৬ ও ১৯৯৯। তবে ’৯৯-এ যারা পরে ব্যাটিং করেছিল, সেটি নিজেদের পছন্দে করেনি। ওয়াসিম আকরাম টসে জিতে ঐতিহ্য অনুযায়ী ব্যাটিং নিয়েছিলেন। পাকিস্তানিরা এমনই ব্যাটিং করল যে, এক ইনিংস শেষ হওয়ার পরই ম্যাচ রিপোর্ট লেখা শুরু করে দিতে পেরেছিলেন সাংবাদিকেরা! ১৩২ রানেই অলআউট, ইতিহাসের সবচেয়ে একতরফা বিশ্বকাপ ফাইনালের বন্দোবস্ত তাতেই হয়ে যায়।
এর আগের নয়টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ৭টিতেই প্রথমে ব্যাটিং করা দল জিতেছে—সাঙ্গাকারাও তাই ব্যাটিংই করলেন। ধোনি জিতলে তিনিও তা-ই করতেন। বাতিল হওয়া প্রথম টসে জিতেছেন ভেবে ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রীকে ‘আমরা ব্যাটিং করব’ বলেও ফেলেছিলেন।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম ইনিংস শেষেই যেমন ম্যাচের মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল, পরের দুটি বিশ্বকাপেও তা-ই। ২০০৩-এ অস্ট্রেলিয়ার ২ উইকেটে ৩৫৯ রানের পর প্রশ্নটা ছিল, ভারত কত রানে হারবে? হেরেছিল ১২৫ রানে। রানের হিসাবে ফাইনালে সবচেয়ে বড় ব্যবধান।
সেবার রিকি পন্টিং যা করেছিলেন, ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালে আরও রুদ্র রূপে তা করলেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ব্যাট ধরতে সুবিধা হবে বলে গ্লাভসে স্কোয়াশ বল রেখে ১০৪ বলে ১৪৯, যাতে ১৩টি চার ও ৮টি ছয়। বৃষ্টির কারণে ৩৮ ওভারে কমে আসা ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেটে ২৮১ করার পরই আসলে ম্যাচ শেষ!
এবারের আগে টানা তিনটি ফাইনাল কার্যত এক ইনিংসের খেলা হয়ে গিয়েছিল, তিনটিই অস্ট্রেলিয়ার কীর্তি। সেই ১৯৯৬ বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে নেই। শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের ব্যবধান যা-ই হোক, এবার অন্তত প্রথম ইনিংস শেষেই জয়ীর নাম বলে দেওয়া সম্ভব ছিল না।
ফাইনালে ২৭৪ অনেক রান। তবে ভারতীয় জবাব শুরু হওয়ার আগেই কেউ শ্রীলঙ্কাকে বিশ্বকাপ দিয়ে দেয়নি। আগের তিনবার যেমন দিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে।

জহির সেই বৃত্তেই

কাল মাঠে নামার সময় তাঁর ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানে ছিল অদ্ভুত এক ঘটনাচক্র। টেস্টে জহির খানের উইকেটসংখ্যা ২৭১, ওয়ানডেতেও তা-ই। এই তথ্য জহির কি জানতেন? না জানা থাকলেও তাঁর মাথায় নিশ্চয়ই ছিল ২০০৩ বিশ্বকাপের সেই দুঃস্মৃতি। যেদিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাঁর করা প্রথম ওভারটি অনেকেরই মতে ভাগ্য গড়ে দিয়েছিল ম্যাচের।
‘নার্ভাস’ জহিরের প্রথম বলটাই ছিল ‘নো’। পরেরটি ডট। পরের বলটি আবারও নো! সেটা থেকে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট নিলেন ২ রান। পরের বলে এক। তৃতীয়, চতুর্থ বৈধ ডেলিভারি দুটো ডট। ভালো দুটি বলের পর বিশাল এক ওয়াইড, উইকেটরক্ষক রাহুল দ্রাবিড়ের পক্ষে সম্ভব হলো না বলটি ধরা। গড়িয়ে গড়িয়ে সীমানা পার। ওয়াইড আর চার মিলিয়ে ৫ রান। পরের বলে হেইডেনের ব্যাট থেকে চার। পরের বলটি আবার ওয়াইড। শেষ বলটি ডট। প্রথম ওভারেই আটটি অতিরিক্ত রান!
নড়বড়ে সেই শুরুর ধাক্কা ভারত সামলে উঠতে পারেনি। প্রথমে ব্যাট করে ২ উইকেটে ৩৫৯ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেদিনের ফাইনালে ৭ ওভারে ৬৭ রান দিয়ে উইকেটশূন্য ছিলেন জহির।
কাল শুরু থেকেই মনে হলো, সেই স্মৃতি জহিরের গলায় অদৃশ্য তাবিজ হয়ে ঝুলছে। জহির যেন প্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন সেই ম্যাচ থেকেই। প্রথম যে তিনটি ওভার জহির করলেন, তিনটিই মেডেন! ২০০৩ বিশ্বকাপে প্রথম তিন ওভারে জহির দিয়েছিলেন ২৮ রান!
চমকের শেষ সেখানেই নয়। নিজের ১৯তম বলে জহির তুলে নিলেন উপুল থারাঙ্গাকে। প্রথম রানটি দিলেন ২০তম বলে। ওই ওভারে আর একটি রান। প্রথম স্পেলে নিজের শেষ ওভারটাই হলো সবচেয়ে ‘খারাপ’। দিলেন ৪ রান। সব মিলে প্রথম স্পেলে জহিরের বোলিং বিশ্লেষণ: ৫-৩-৬-১। ইকোনমি রেট ১.২০!
২০০৩ জোহানেসবার্গ-দুঃস্বপ্নের কবর জহির দিতে চলেছেন বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু না, জহির শেষ পর্যন্ত সেই বৃত্তেই আটকে গেলেন। প্রথম ৫ ওভারে মাত্র ৬ রান দেওয়া বোলারটি শেষ ৫ ওভারে দিলেন ৫৪! এর মধ্যে তাঁর করা ইনিংসের ৪৮ ও ৫০তম ওভার দুটোতেই এল ৩৫ রান। শেষ পর্যন্ত ১০ ওভারে ৬০ রান, মাথা নিচু করেই ফিরলেন জহির খান!

সমালোচনার জবাব দিলেন ধোনি

দুর্মুখদের মুখে কুলুপ এঁটে দিলেন ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। পুরো বিশ্বকাপে প্রতিটি পদক্ষেপে দারুণ সমালোচিত ধোনি কাল অপরাজিত ৯১ রানের এক অধিনায়কোচিত ইনিংস খেলে ভারতকে বিশ্বকাপ এনে দিলেন। সেই সঙ্গে তাঁর সব সমালোচনাকে করে দিলেন স্তব্ধ।
বিশ্বকাপ জয়ের বাঁধভাঙা আনন্দের মধ্যেই তিনি বলতে ভোলেননি, বিশ্বকাপ জিততে না পারলে শনিবারের ফাইনালের দল নিয়ে নেওয়া তাঁর অন্তত দুটি সিদ্ধান্ত সমালোচনার তোপের মধ্যে পড়ত।
‘আজ ফাইনালে খেলতে নামার আগে আমি অন্তত দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার কারণে নিশ্চিতভাবেই আমার দিকে তোপ দাগতেন সমালোচকেরা।’ বলেছেন ধোনি।
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল প্রথম একাদশে শ্রীশান্তকে নেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাটিংয়ের সময় যুবরাজকে আগে না পাঠিয়ে আমি একটু আগে ব্যাট করতে নেমেছিলাম। যুবরাজ পুরো বিশ্বকাপেই দারুণ ফর্মে ছিল। তাই আমি ওর আগে ব্যাটিংয়ে নেমে যদি ব্যর্থ হতাম, তাহলে অবশ্যই আমাকে সমালোচিত হতে হতো।’
ধোনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরো বিশ্বকাপেই বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে আমাকে সমালোচনার তীর বিদ্ধ করেছে। বিশ্বকাপ জিতে সেই সমালোচনাগুলোর জবাব আমি ভালোমতোই দিতে পেরেছি।’
‘আমি সব সময়ই চেয়েছি তুলনামূলক তরুণদের ব্যাটিংয়ে আগে পাঠাতে, যেন অভিজ্ঞরা পরের দিকে সব চাপ নিজেদের কাঁধে নিয়ে নিতে পারে। কালকের ফাইনালে কোহলির আউটের পর আমার মনে হয়েছে, সময় এসেছে দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার। ওটা ছিল, নিজের কাছেই নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা।’ ফাইনালে নিজের যুবরাজের আগে নামা প্রসঙ্গে এ কথাই বলেছেন ধোনি।
তিনি বলেন, ‘আমার ফাইনালের পারফরম্যান্সকে সব সমালোচকদের মুখের ওপর “শাট আপ” জাতীয় কোনো কথা ভাবলেও ভাবতে পারেন, তবে ভারতে এভাবে জবাব দেওয়াটা গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি নয়।’
তিনি ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ গ্যারি কারস্টেন ও সব জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘সত্যিই গ্যারি, শচীন, শেবাগ, হরভজন ও জহিরদের মতো জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়েরা আমাকে পুরো বিশ্বকাপেই দারুণ সহায়তা করেছেন। আমি তাঁদের প্রতি দারুণ কৃতজ্ঞ।’
বিশ্বকাপে ভারত একটি ইউনিট হিসেবে খেলে সাফল্য পেয়েছে বলে মনে করেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। তিনি বলেন, ‘গত ৩০-৩৫ দিন আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। আমরা সবাই একসঙ্গে থেকেছি, খেলেছি। সবাই একমন হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের কথা ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হয়েছি।’

ধিশালের জন্যই জয়াবর্ধনে আরেকবার!

মুত্তিয়া মুরালিধরনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বিশ্বকাপে শেষ ম্যাচ শচীন টেন্ডুলকারের। এই দুই ডামাডোলে কারও মনে রাখারই অবকাশ হয়নি, আরেক কীর্তিমানেরও বিশ্বকাপে শেষ ম্যাচ এই ফাইনাল।
শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানের স্বীকৃতিটা তিনিই পান। অথচ ফাইনালের আগে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং নিয়ে আলোচনায় কোথায় তিনি! কুমার সাঙ্গাকারা, তিলকরত্নে দিলশান, এমনকি উপুল থারাঙ্গাকে নিয়েও যত কথা হয়েছে, তাঁকে নিয়ে এর অর্ধেকও নয়। কে জানত, এই বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার প্রথম তিনের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়া মাহেলা জয়াবর্ধনে মনে মনে বিশ্বকাপে তাঁর শেষ ম্যাচটা রাঙিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছেন!
বিশ্বকাপ জয়াবর্ধনের কাছে নানা রং নিয়েই এসেছে। কখনো সাদা-কালো, কখনো বা রঙিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ৭ ইনিংসে ২১ রান করার পর দল থেকেই বাদ পড়েছিলেন। এর চার বছর আগে প্রথম বিশ্বকাপও মনে রাখার মতো কিছু ছিল না। পাঁচ ইনিংসে মাত্র ১০২ রান। ২০০৭ বিশ্বকাপে অধিনায়ক। মাহেলা জয়াবর্ধনের ব্যাটের ঝলকও সেই বিশ্বকাপেই প্রথম। ফাইনালের আগেই করে ফেলেছিলেন ৫২৯ রান। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৫ রানের ইনিংসটি মায়াঞ্জন বুলিয়ে দিয়েছিল সবার চোখে। সবাইকে মানতে হয়েছিল, ওয়ানডেতেও শুদ্ধ ও শিল্পিত ব্যাটিংয়ের জায়গা আছে।
শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছিল সেই ইনিংসে ভর করেই। ফাইনালে গিলক্রিস্টের সঙ্গে পেরে ওঠেননি। নিজেও করতে পেরেছিলেন মাত্র ১৯ রান। বারবাডোজের দুঃখ ভোলার সুযোগ হয়ে এল মুম্বাই। ফাইনালের আগে কত রকম সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হলো। জয়াবর্ধনের কথা যেন কারও মনেই পড়ল না। অথচ এবারও শুরুটা সেঞ্চুরি দিয়ে। কিন্তু পরের ৫ ইনিংসে ২, ২৩, ৯, ৬৬ ও ১। মোট রান ২০১। কিন্তু কানাডার বিপক্ষে সেঞ্চুরির চেয়ে পরের ৫ ইনিংসে ১০১ রানই তো বেশি চোখে পড়বে।
ফাইনালে প্রথম তিনের বিদায়ের পর শ্রীলঙ্কা যখন শুধুই তাঁর দিকে তাকিয়ে, তখনই দেখা দিলেন জয়াবর্ধনীয় রূপে। সেই রূপ স্নিগ্ধতায় ভরা। জয়াবর্ধনের পেলব কবজির মোচড় হাতের ব্যাটকে সব সময়ই তুলি বলে ভুল করিয়ে এসেছে। কাল বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো চাপ-চাপ আর চাপের ম্যাচেও জয়াবর্ধনে চোখের জন্য একই রকম প্রশান্তি। তার পরও ৪৯ বলে প্রথম ফিফটি। দ্বিতীয় ফিফটি মাত্র ৩৫ বলে। প্রথম ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রানের সূচনা থেকে শ্রীলঙ্কা যে শেষ পর্যন্ত ২৭৪, সেটি তো ৮৮ বলে জয়াবর্ধনের ১০৩ রানের সৌজন্যেই। এমনই সেঞ্চুরি যে, ৯০ শতাংশ ভারতীয় সাংবাদিক-অধ্যুষিত প্রেসবক্সও তুমুল করতালিতে অভিনন্দন না জানিয়ে পারলেন না।
জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরিটা করেই শূন্যে লাফ দিয়েছেন। মুখ তুলে তাকিয়েছেন আকাশের দিকে। সবাই জানেন, টেন্ডুলকার এমন করে মেঘের মধ্যে বাবাকে খোঁজেন। মাহেলা জয়াবর্ধনে? জয়াবর্ধনে কাকে খোঁজেন?
খোঁজেন ছোট ভাই ধিশালকে। দুই ভাই যখন একসঙ্গে খেলতেন, অনেকেই বলতেন ‘ধিশালটা মাহেলার চেয়েও ভালো।’ সেই ধিশালকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তুলে নিয়ে গেছে ক্যানসার। এই শোকে ক্রিকেটই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন মাহেলা। শুভানুধ্যায়ীরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফিরিয়ে আনেন তাঁকে। আসলে ফেরেন অন্য কারণে। যে জগতেই থাকুন, ধিশালও এটাই চাইছেন ভেবে। ধিশালের বড় একটা ছবি সব সময় সঙ্গে থাকে। সেঞ্চুরি-টেঞ্চুরি করলে প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে ধিশালের মুখ। বছর কয়েক আগে এটা জানিয়ে যোগ করেছিলেন, ‘শুধু সেঞ্চুরি করার পর কেন, প্রতিটি মুহূর্তেই আমার ধিশালকে মনে পড়ে। আমি কোনো দিন ওর সমাধিতে যাইনি। মনে হয়, ও আমার সঙ্গেই আছে।’
একান্তই ব্যক্তিগত ব্যথা বলে ধিশালকে নিয়ে বেশি কথাও বলেন না। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালে সেঞ্চুরির ষষ্ঠ কীর্তির পর মনে মনে হয়তো ঠিকই বলেছেন, ‘ধিশাল, এটা তোর জন্য!’
ধীশালকে যে বিশ্বকাপটা উপহার দিতে পারলেন না, এই দুঃখ তো আছেই। চিরদিনই থাকবে।

বিশ্বকাপ ফাইনালে সেঞ্চুরি
১০২ ক্লাইভ লয়েড ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়া লর্ডস ১৯৭৫
১৩৮* ভিভ রিচার্ডস ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড লর্ডস ১৯৭৯
১০৭* অরবিন্দ ডি সিলভা শ্রীলঙ্কা-অস্ট্রেলিয়া লাহোর ১৯৯৬
১৪০* রিকি পন্টিং অস্ট্রেলিয়া-ভারত জোহানেসবার্গ ২০০৩
১৪৯ অ্যাডাম গিলক্রিস্ট অস্ট্রেলিয়া-শ্রীলঙ্কা ব্রিজটাউন ২০০৭
১০৩* মাহেলা জয়াবর্ধনে শ্রীলঙ্কা-ভারত মুম্বাই ২০১১

‘পরম পাওয়া এই বিশ্বকাপ

শনিবার মুম্বাইয়ের ফাইনালে শচীন টেন্ডুলকারের ব্যাট হাসেনি। কিন্তু ম্যাচ শেষে তিনি ঠিকই হেসেছেন। কারণ, তাঁর দেশ ভারত যে জিতে নিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের সেরা দলের সম্মান—বিশ্বকাপ। শচীনের ২২ বছরের ক্রিকেট জীবনের সব কৃতিত্ব এক করলেও যে আনন্দ ছাপিয়ে যায়, সব অর্জনকে। পুরো ক্রিকেট জীবনে যে সাফল্য অধরা রয়ে গিয়েছিল টেন্ডুলকারের, সেই সাফল্যই কাল ঘরের মাঠে ক্রিকেটের বরপুত্রের পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়ল।
শচীন তো এই আনন্দে আপ্লুত হবেনই। যে আনন্দের সাক্ষী হয়ে ওঠার জন্য এত কষ্ট, এত ত্যাগ, এত পরিশ্রম। কাল সেই বিশ্বকাপ জয়ের আবেগের কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন ক্রিকেটের সর্বকালের এই সেরা ক্রিকেটার।
‘এই আনন্দে চোখ দিয়ে কিছুটা জল তো বেরিয়ে এসেছেই। সেই জল, আনন্দের। উত্সবের।’ ম্যাচ শেষে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এমন কথাই বলেছেন শচীন টেন্ডুলকার।
ছয়টি বিশ্বকাপ খেলে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে দেখা পেলেন বিশ্ব জয়ের গৌরব। কিন্তু শচীনের দৃষ্টিতে ব্যাপারটি ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ ধরনেরই। চিরদিন অধরা থেকে যাওয়ার চেয়ে দেরিতে এর দেখা পাওয়াও ভালো। দেরিতে হলেও শচীন বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখলেন। শচীন এখন বিশ্বজয়ী—এটিই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।
২৮ বছর ভারতের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় ছিল গ্রেট টেন্ডুলকারের জন্য ভারতীয় ক্রিকেটারদের এক মহার্ঘ। এই মহার্ঘ পেয়ে গর্বিত টেন্ডুলকার ধন্যবাদ জানিয়েছেন সবাইকে। বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ জয়ই আমার ক্রিকেট জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।