Thursday, December 26, 2013

আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতার কিছু কথা by আবুল কালাম আজাদ পাটওয়ারী

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির অহংকার এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা সবাই গর্বিত। তাই ১৯৭১-এর আবেগ দমিয়ে রাখতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু লেখার কথা অনেকে বলেন। কিন্তু লিখতে পারিনি বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, শিষ্টাচার-বর্জিত আচরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠীর অসহিষ্ণু মনোভাবের কারণে। সত্য কথা লেখা যে কত কঠিন, তার সাক্ষী তো আমি নিজেই। মুক্তিযোদ্ধারা নানাভাবে বিভক্ত থাকায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আজ বিকৃত করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখতে হলে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের সত্য কথা লিখতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নয়। আমরা বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজব্যবস্থার জন্য। ষাটের দশকে বাংলা ও বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নির্ভীক, প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্র“য়ারি লাহোরে সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের গোলটেবিল বৈঠকে তিনি উপস্থাপন করেছিলেন বলেই ১৯৬৬, ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১ সালে বাঙালিরা ধাপে ধাপে স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশের সাহস অর্জন করেছিল।
আজ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। বাঙালি জাতি তার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরব জাগানিয়া ইতিহাস নিয়ে বিশ্বে বীরের জাতি হিসেবে সুপরিচিত। পৃথিবীতে যত দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিরই নেতৃত্বে ছিলেন এক বা একাধিক দেশপ্রেমিক অবিসংবাদিত নেতা। জর্জ ওয়াশিংটন, লেনিন, আব্রাহাম লিঙ্কন, মাও সেতুং, উইনস্টন চার্চিল, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পেট্রিক হেনরি, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ড. সুকর্ন, হো চি মিন, আলেন্দে, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের জন্য, জাতির জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়ে, আÍবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশ ও জাতির চিন্তা করেছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণ করেছেন। এর ফলেই তারা জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। বিশ্বে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র কয়েকজনই হয়েছেন এ রকম বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, যাদের গুণে তাদের নিজ নিজ দেশকে সমগ্র পৃথিবী চেনে, জানে ও সম্মান করে।
২.
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেরণা থেকেই আমাদের ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ২ নম্বর ব্যাটালিয়নের (সে সময় গাজীপুরে অবস্থিত) সৈনিকরা তৎকালীন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর কেএম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিল ১৯ মার্চ, ১৯৭১-এ জয়দেবপুরে। অবশেষে ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটের আগেই বাঙালি জাতি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হলে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। ১৯৭১-এর ৪ এপ্রিল ভারতে ইন্দিরা-তাজউদ্দীন বৈঠক, ৭, ৮ ও ৯ এপ্রিল ১৯৭১-এ আগরতলার ধোবাউড়াতে বাঙালি এমএনএ ও এমপিএদের সমন্বয়ে বৈঠক হয়। ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয় আগরতলায়। ১৭ এপ্রিল সেই সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করে।
আমি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের আহ্বানেই মুজিবনগর সরকারের অধীনে কে ফোর্সের ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে চাঁদপুর মহকুমার (চাঁদপুর জেলা) এফএফ বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে রণাঙ্গনে দায়িত্ব নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা বেশকিছু সম্মুখযুদ্ধ করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের তখন থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও মেঘনা পাড়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা। আবার কিছু লোক পাকিস্তানিদের দালাল হয়ে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, রাহাজানিতে ব্যস্ত ছিল। সব বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমরা পাকিস্তানের এ অঞ্চলের অধিনায়ক মেজর জেনারেল আবদুর রহিমের সেনাবাহিনীকে ‘হিট অ্যান্ড রান পলিসি’, রেইড, অ্যাম্বুশ ও ফ্রন্টফাইটের মাধ্যমে সর্বদা ব্যস্ত রেখেছিলাম। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে ৩৮-৩৯টির মতো। যেসব জায়গায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি, তার কয়েকটির মাত্র নাম এখানে উল্লেখ করছি- চাষী আলীর যুদ্ধ, পাইকপাড়ার যুদ্ধ, কালির বাজারের যুদ্ধ, রঘুনাথপুর বাজারের যুদ্ধ, লাকমারার যুদ্ধ, বলাখালের যুদ্ধ, মহামায়া বাজারের পূর্বদিকের জমজমিয়া ব্রিজ ডেমোলেশান অ্যান্ড ফায়ারের যুদ্ধ, ঘোগরার যুদ্ধ, ফুলচোঁয়ার যুদ্ধ, কালিয়াতলার যুদ্ধ, মেহার কালীবাড়ীর যুদ্ধ, উঘারিয়ার যুদ্ধ, সূচিপাড়ার যুদ্ধ, ঠাকুর বাজারের যুদ্ধ, পানিয়ালার যুদ্ধ, গোয়ালমারীর যুদ্ধ, মুকুন্দসারের যুদ্ধ, নাগদার যুদ্ধ, চেঙ্গাচরের যুদ্ধ, কচুয়া থানা আক্রমণের যুদ্ধ, মোহনপুরের যুদ্ধ, গজারিয়া মতলবের মাঝামাঝি মধ্যনদীতে যুদ্ধ, চরাচ্ছরের যুদ্ধ, গন্ধরপুরের যুদ্ধ, বাবুরহাটের যুদ্ধ, পুরান বাজারের যুদ্ধ ইত্যাদি।
১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল আবদুর রহিম তার কিছু বেঁচে যাওয়া সৈন্যককে নিয়ে ঢাকা অভিমুখে জলপথে পালিয়ে যায়। চাঁদপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পতন ঘটে ৭ ডিসেম্বর ভোররাতে, অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর সূর্য উদয়ের আগেই। এখানে একটি কথা অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন- আমাদের চাঁদপুরের মেঘনা পাড়ের সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এখানে হাজার হাজার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, সম্পদ লুটপাট করেছে, হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করেছে এবং প্রায় ৭০-৮০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। এর জন্য দায়ী যেমন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তেমনি কিছু বাঙালি রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ ও শান্তি কমিটির লোক।
আমরা ৯ মাস ১১ দিনের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজিকে ৯৩ হাজার সৈনিক ও অস্ত্রধারী সহযোগী বাহিনীসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করি।
এখানে মনে রাখা দরকার, কাপুরুষের মৃত্যু হয় বারবার, কিন্তু বীরের মৃত্যু হয় একবারই। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের জাতীয় বীর। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই বাংলাদেশ। সুতরাং তারা কারও করুণার পাত্র

এরপর কী হতে পারে by আবদুল লতিফ মণ্ডল

বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট আগামী ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট প্রার্থীরা সরাসরি নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সংসদের মোট ৩০০ আসনের অর্ধেকের বেশি আসনে অর্থাৎ ১৫৪টি আসনে ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নজিরবিহীনভাবে জয়লাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য হল- ‘নির্বাচনে বিরোধী দল আসেনি। আমরা জানতাম, তারা আসবে। তাই আমরা আসন ভাগাভাগি করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। বিরোধী দল নির্বাচনে থাকলে এমনটা হতো না। বিরোধী দল নির্বাচনে এলো না কেন? এটা তো আমাদের দোষ নয়। মাঠে গোলরক্ষক না থাকলে তো গোল হবেই।’ তবে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সমালোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ‘সমঝোতার মাধ্যমে যে সংসদ তৈরি হচ্ছে, সেখানে যাকে খুশি ভোট দেয়ার অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে?’ তাছাড়া প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও দেশের সব উল্লেখযোগ্য বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জন করায় অবশিষ্ট ১৪৬ আসনে ভোটাররা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। অবশিষ্ট এসব আসনের ফলাফল সহজেই অনুমেয়। ধরে নেয়া যায়, আওয়ামী লীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনেই শুধু বিজয়ী হবে না, এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনও পাবে। সংসদ গঠিত হবে আওয়ামী লীগ ও তার শরিকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিমধ্যে ‘একতরফা’, ‘পাতানো’, ‘ভোটারবিহীন’ প্রভৃতি বিশেষণে ভূষিত হয়েছে। এ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে; প্রকাশিত হয়েছে উদ্বেগ। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও মিডিয়া দেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও আইন-শৃংখলা নিয়ে উৎকণ্ঠিত। তাদের অনেকে মনে করেন, ‘ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন রাজনৈতিক সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি অন্ধকারে ঠেলে দেবে।’ আবার কারও কারও মতে, ‘দেশ এক অনিশ্চিত পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই অনিশ্চিত যাত্রায় রক্তপাত অনিবার্য।’
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করা হয়েছে বলে ১৭ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। একতরফা নির্বাচন বাতিলের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশীদের জীবন রক্ষার্থে জাতিসংঘের এখনই কিছু করা উচিত বলে ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের মহাসচিবকে এক খোলা চিঠিতে আহ্বান জানিয়েছে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন।
বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট কমিটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির টেলিফোন এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর উদ্যোগের পরও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি না হওয়ায় সিনেট কমিটির বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ১৯ ডিসেম্বর প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা দি ইকোনমিস্টের অনলাইন সংস্করণের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জিতলেও হারবে দেশ। ২২ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বিরোধী দলসহ বেশির ভাগ দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে সরকার পক্ষ। বাকিগুলো জেতার পুরো সম্ভাবনাই তাদের পক্ষে। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার ‘অজনপ্রিয় সরকার’ ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু এ জয়ের কোনো বৈধতা নেই।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিস্থিতি না থাকায় ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া চীন, জাপান ও কানাডাসহ অনেক দেশ চিঠি না দিলেও কোনো ধরনের পর্যবেক্ষক না পাঠানোর কথা মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়।
গত ১৯ ডিসেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চলছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও আলোচনা চলবে। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে দশম সংসদ ভেঙে প্রয়োজনে আবার নির্বাচন দেয়া হবে। তবে এর আগে বিএনপিকে অবশ্যই হরতাল-অবরোধ, মানুষ হত্যা বন্ধ এবং জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অনেক পূর্বশর্ত, যদিও প্রয়োজনের উল্লেখ থেকে স্পষ্টই বলে দেয়া যায়, এটা চলমান আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী জনগণকে বিভ্রান্ত এবং ভোটারবিহীন ভোটরঙ্গ মনোনীত সংসদ ও সরকারকে স্থায়ী করার এক অপচেষ্টা মাত্র। তাদের এই পাতানো ফাঁদে জনগণ পা দেবে না’ (যুগান্তর, ২২ ডিসেম্বর)। প্রধানমন্ত্রী দশম সংসদ নির্বাচনের পর সংলাপের যে কথা বলেছেন তা নাকচ করে দিয়ে তিনি আরও বলেছেন, একাদশ কিংবা পরবর্তী কোনো সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার অবকাশ কিংবা আগ্রহ বিএনপির কোনোদিন ছিল না, এখনও নেই।
আগামী ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর কঠোর অবস্থানে যাওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে ক্ষমতাসীন জোট। এমনকি ৫ জানুয়ারির পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ না ছাড়লে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে মর্মে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের কোনো কোনো নেতা ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে হুমকি দিয়েছেন বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘সিলেকশন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ‘এ নির্বাচন প্রতিহত করতে ভোটকেন্দ্রিক সংগ্রাম কমিটির পাশাপাশি জেলা ও উপজেলায় সবাইকে নিয়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা কমিটি’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অবশ্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের তফসিল বাতিল করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন। নির্দলীয় সরকারের অধীনে অর্থবহ নির্বাচনের দাবিতে এবং ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনকে ‘না’ বলতে, গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে তিনি আগামী ২৯ ডিসেম্বর রোববার সারা দেশ থেকে ঢাকা অভিমুখে যাত্রার ডাক দিয়েছেন। এ অভিযাত্রার নাম দেয়া হয়েছে ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এরপর কী হতে পারে?
নির্বাচন যেভাবে হচ্ছে তাতে এ নির্বাচন নিয়ে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই। এ ছাড়া, অবশিষ্ট ১৪৬টি আসনের অনেক আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপরীতে মনোনয়ন জমাদানকারী বেশকিছু প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার চেষ্টা করেও সফল হননি বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রার্থীর কোনো রকম নির্বাচনী কার্যক্রম নেই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা যাতে আর বেড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন দলের এ কারসাজি। ভোটারের সংখ্যা যত কমই হোক, তাতে নির্বাচনের ফল প্রকাশ আটকাবে না। কাজেই বিএনপির নির্বাচন ‘প্রতিহত’ করার কর্মসূচি সফল হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পর শর্ত সাপেক্ষে দশম সংসদ ভেঙে দেয়ার ইঙ্গিত দিলেও কাজটি তার পক্ষে সহজ হবে না। নির্বাচিত এমপিদের প্রবল চাপ থাকবে সংসদ ভেঙে না দেয়ার জন্য। তাছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হওয়ায় কিছু ভালো কাজ করার উদ্যোগ নিয়ে আস্থা ফিরে পেতে সচেষ্ট হবে নতুন সরকার।
তবে একতরফা নির্বাচন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশ। সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব মাহমুদ হাসানের মতে, একতরফা নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যার ফল হতে পারে- এক. নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দুই. কমনওয়েলথ বাংলাদেশের সদস্যপদ স্থগিত করতে পারে। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কারচুপি, সহিংসতা ও মানবাধিকার লংঘনের জন্য সংস্থাটি জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করেছিল।
তিন. নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে দায়ী করতে পারে। ২০০৭ সালের নির্বাচনে মানবাধিকার লংঘনের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কেনিয়ার নেতাদের অভিযুক্ত করেছিল। চার. যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়াও আরও অনেকে বাংলাদেশে আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাদি স্থগিত করতে পারে। এরূপ কিছু ঘটলে তা বাংলাদেশের জন্য চরম সংকট সৃষ্টি করবে।
তাই এখনও সময় আছে, সরকার ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিক। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দেয়া প্রতিশ্র“তি মোতাবেক নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিয়ে দেশকে সংকট থেকে রক্ষা করতে পারেন। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন যা প্রয়োজন তা হল অবিলম্বে সংসদ ভেঙে দেয়া। এটা করা হলে পুনঃতফসিলিকরণের বাধা দূর হবে এবং ২০১৪ সালের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় পাওয়া যাবে। বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ ছাড়া এবং সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না, যা সরকারি দলেরও অনেকে স্বীকার করেন। অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত এ সত্যটি অকপটে স্বীকার করেছেন। গত ২২ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, ‘ভোটার ছাড়া এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ পঞ্চাশ শতাংশের বেশি আসনে গ্রার্থী নির্বাচন হয়ে গেছে। বড় দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এটা কোনো নির্বাচনই নয়।’
আবদুল লতিফ মণ্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

দেশে এখন উদারনৈতিক রাজনীতির বড়ই প্রয়োজন by কাজী সাইফুল ইসলাম

উদার রাজনীতি আর পরিশীলিত গণতন্ত্রে নাগরিকের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটে অতি দ্রুত। উদার গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়েই গোটা জাতি এগিয়ে চলে সামনের পথে। শিক্ষা, কর্মমুখিতা, সংস্কৃতি আর ধর্মকে মেনে নিয়ে গড়ে ওঠে একটি সুন্দর সভ্য জাতি এবং পরিণত হয় সফল রাষ্ট্রে। অন্যদিকে অনুদার রাজনীতি বা যেমনিভাবে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে, ঠিক তেমনি এর অভাব একটি রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশ এখন সেই ব্যর্থ আর অকার্যকর একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্যই দিন গুনছে। যদি রাজনীতির এই অচল অবস্থাটা দূর না হয়, তাহলে দেশের সব নাগরিককে নির্বিকার হয়ে দেখতে হবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রেষারেষিতে দেশটা কিভাবে অকার্যকর একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরিই দুটি ভাগে বিভক্ত। এটাই হচ্ছে মহাশঙ্কার কথা। আওয়ামী লীগের জোটে থাকা দলগুলো বিএনপি এবং বিএনপির জোটে থাকা দলগুলোকে সব সময়ই বলছে- জঙ্গিবাদী। এর কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দাঁড় করিয়েছে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সব বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে এবং তারা রক্ষণশীল, উদার নীতিতে বিশ্বাস করে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ম পালন করলেই কি মানুষ জঙ্গি হয়ে যাবে? শুধু কি মুসলমানরাই ধর্ম পালন করছে এ দেশে? হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানরা কি ধর্ম পালন করেন না? তারা কি ধার্মিক নন?
ঠিক একইভাবে বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলো মনে করে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ধর্মে বিশ্বাস করে না। এদের হাতে দেশের শাসনভার মানেই ধার্মিকদের অসুবিধায় পড়তে হয়। এখন প্রশ্ন হল, উদার ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মনিরপেক্ষতার মানেই কি ধর্মহীনতা?
সত্যি কথা হচ্ছে, এসব কথাবার্তা দু’দলেরই অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়। সবই হচ্ছে রাজনৈতিক চালবাজি। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়া আর প্রতিশোধের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। দল দুটি একই নীতিতে বিশ্বাস করে। একই আদর্শের মধ্যেই নিজেদের ধরে রেখেছে এখন পর্যন্ত। একদল ডান রাজনীতির ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের দল ভারি করছে। অপর দলটি বাম রাজনীতির ছোট দলগুলোকে নিজেদের বগলদাবা করে রাখতে মহাব্যস্ত। এর বাইরে আর কিছুই নয়।
এর বড় উদাহরণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির বিপক্ষে রাজপথে আন্দোলন করেছিল। কেন করেছে? রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য। ঠিক এই সময়ে হেফাজতে ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের চোখে বিশাল জঙ্গি আর যুদ্ধাপরাধী। ঠিক কালকেই যদি জামায়াতে ইসলামী আর হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো রকম কোয়ালিশন হয়েই যায়, আর বাম ঘরানার দলগুলো যদি আওয়ামী লীগকে ত্যাগ করে, তাহলে বিএনপি কি বাম দলগুলোকে সঙ্গে না নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতের জন্য শোক পালন করবে? কখনোই নয়। আওয়ামী লীগও ঠিক তাই করবে। আজ যদি বাম দলগুলো তাকে ত্যাগ করে, কালকেই সে ডান দলগুলোকে সঙ্গে নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগবে। তখন স্বৈরাচার আর যুদ্ধাপরাধী বলে কিছুই থাকবে না।
আওয়ামী লীগ দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও একটি মুখস্থ বুলি চালু রয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের দল, উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে। এই বুলিটা যদি সত্যি হতো তাহলে দেশের জন্য এর চেয়ে ভালো আর কিছুই হতো না। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? দলটি যখন ক্ষমতায় যায় তখন কি সত্যিই উদার রাজনীতির চর্চা হয় এদেশে? না, হয় না। কোনো দিন হবে কিনা তাও বলতে পারবে না কেউ। তবে বর্তমান সময়ে যে নোংরা রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে আছে দলগুলো, তা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষ এখন আর দলগুলোর মিথ্যা প্রতিশ্র“তিতে বিশ্বাস করছে না। বরং বিরক্ত হচ্ছে। এদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের পিঠ দেয়ালের সঙ্গে ঠেকে আছে। যে মানুষটি দল করছে সেও যেমন ক্ষেপে আছে এই পরিবারতন্ত্রের ওপর, যে মানুষটি দলের সাথেপিছে নেই সেও চরমভাবে ক্ষিপ্ত।
একটি কথা সবারই মনে রাখা দরকার। নাগরিকের ওপর শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে কোনো দলই টিকে থাকতে পারে না। যদি টিকেই থাকা যেত, তাহলে সারা জীবন ধরে পৃথিবীর শাসনকর্তা হয়ে থাকত হিটলার। আর সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টিও চিরদিন ইরাক শাসন করত। ইহুদিদের ওপর হিটলারের নির্মমতার বর্ণনা দেয়া প্রায় অসম্ভব। হিটলার ইহুদিদের নিজের শত্র“ মনে করত। অথচ ইহুদিরা জার্মানিরই নাগরিক ছিল। একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন জাতি আর বিভিন্ন ধর্মের নাগরিক থাকবে এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই বলে মুসলিম শাসক যদি হিন্দু বা বৌদ্ধ নাগরিকের ওপর অন্যায়ভাবে অত্যাচার চালিয়ে তাদের একেবারেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, তাহলে সেটা কতটুকু সভ্যতার স্বাক্ষর বহন করবে? বা তার পরিণামই বা কি হতে পারে?
আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে কতগুলো মুখস্থ শব্দের চালবাজি রয়েছে। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, বিপক্ষের শক্তি, নাস্তিক, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ইত্যাদি। সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে এসব শব্দগুলো কতটা জরুরি, আমি বুঝি না। কে দেশপ্রেমিক আর কে দেশদ্রোহী, কে রাজাকার আর কে মুক্তিযোদ্ধা এ খবর দেশের দশ বছর বয়সী নাগরিকের কাছেও রয়েছে। এসব অতিকথনের কারণে বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে উন্নত রাষ্ট্রনীতি বা সঠিক পরিকল্পনা কখনোই করতে পারেনি আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি। একবার ক্ষমতায় গেলে জোর করে টিকে থাকার মানসিকতা এই আধুনিক যুগেও তারা ধরে রেখেছে অসভ্য প্রাগৈতিহাসিক যুগের মতো। বাংলাদেশের নাগরিক মোটেও পিছিয়ে নেই, বিশ্বের ধনিক দেশগুলোর নাগরিকদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই তাল মিলিয়ে চলছে তারা। কিন্তু শুধু উদার রাজনীতি আর পরিশীলিত গণতন্ত্রের অভাবের কারণেই এগিয়ে যাচ্ছে না বাংলাদেশ।
বর্তমানে একটি কথা খুবই উচ্চারিত হচ্ছে। সেটি হচ্ছে কন্সার্ন (Concern)- উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা। সত্যি বলতে কী, গোটা জাতিই আজ উৎকণ্ঠিত। রাজনৈতিক এই অচল অবস্থা থেকে মুক্তি চায় জাতি। কিভাবে এই সমস্যার নিরসন হবে হয়তো অনেকেই বুঝতে পারে না। কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক তারা চায় বড় দল দুটির মধ্যে সমঝোতা। আরেকটি বিষয় নিয়েও জাতি উৎকণ্ঠিত। যদি দল দুটির মধ্যে সমঝোতা না হয়ে সংঘর্ষ বেধে বসে, তাহলে সুবিধাবাদীদেরই লাভ হবে সব থেকে বেশি। কেউ কেউ দেশটা লুটে নিতে পারবে নির্দ্বিধায়। কেউ আবার গদি দখলে ব্যস্ত হবে। কেউ কেউ আবার ধর্মের নামে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র রচনার মহা-উদ্যোগ নেবে। ইতিহাস তাই বলে।
আর এসব হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের নাগরিক। তারপর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যদি বিএনপির মতোই একতরফা নির্বাচনে যায়, তাহলে তারা দুটি ক্ষতির মধ্যে পড়বে। এক, তারা যে উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তার কোনো মূল্য থাকবে না। অন্যটি, তারা যদি নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারে তাহলে বিএনপির মতোই ভরাডুবি হবে তাদের। সেটা দেশের জন্যও ভালো হবে না।
আওয়ামী লীগ যদি মনে করে, তারা উদার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে এবং দেশের মঙ্গলের জন্য যে কোনো ত্যাগ তারা স্বীকার করতে পারে, তাহলে এখনই বিরোধী জোটের সঙ্গে তাদের একটা সমঝোতায় আসা উচিত। তাহলে দেশের জনগণ তাদের এই সুচিন্তিত ত্যাগকে অবশ্যই বিবেচনায় নেবে। এটা ইতিহাসও হয়ে থাকবে। কারণ, গত নির্বাচনে সম্পূর্ণ একগুঁয়েমি করেছিল বিএনপি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ যদি দেশকে একটা নির্বাচন উপহার দিতে পারে (যে নির্বাচন হবে সর্বদলের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ), তাহলে দেশের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা অনেক গুণ বেড়ে যাবে। হতে পারে, এবার তারা সরকারে যেতে পারছে না, তাতে কী। এদেশে আওয়ামী লীগ দলটি যেসব নীতির কথা বলে, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার হবে। আর দেশের স্বার্থও বিশালভাবে রক্ষা হবে।
কাজী সাইফুল ইসলাম : কলাম লেখক

বাংলাদেশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রচার কাদের স্বার্থে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক ‘দি নিউইয়র্ক টাইমস’ গত ২০ নভেম্বর (২০১৩) বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে চারদিকে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। নিবন্ধটির শিরোনাম ‘পলিটিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ লেখাটিতে যেভাবে হাসিনা সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশনস (অর্থনৈতিক) আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে দেশটির অনেকে শংকিত হয়ে ভাবছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে আমেরিকা আবার তার একাত্তরের বিদেশনীতিতে ফিরে যাচ্ছে কিনা? বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার রিপাবলিকান নিক্সন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের হানাদারদের পক্ষাবলম্বন করেছিল এবং মার্কিন মদদে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বাংলাদেশে গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় উৎসাহিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যাতে সফল না হয় সেজন্য আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরও পাঠাতে চেয়েছিল। এ সময় ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন (সাবেক) এবং পূর্ব ইউরোপীয় তখনকার সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না দাঁড়ালে বাংলাদেশ সহসা স্বাধীনতা অর্জন করত কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষা পেত কিনা সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। এ সময়ে ‘দি নিউইয়র্ক টাইমস’-এর ভূমিকা ছিল নিক্সন প্রশাসনের বাংলাদেশবিরোধী নীতির পক্ষে।
তারপর দীর্ঘ চার দশকের বেশি কেটে গেছে। বাংলাদেশে আবার নতুন করে যে রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটেছে, তা গত শতকের সত্তরের দশকের অনুরূপ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে একটা বড় রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটেছে। একাত্তরে যে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তারা এখন আবার বিএনপির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ। তারা ক্ষমতায় আসীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক সরকারকে যে কোনোভাবে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদে বদ্ধপরিকর। সেজন্য আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী জামায়াতের সহায়তায় দেশে নানা রকম ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তা আন্দোলন নয়, তা নিষ্ঠুর সন্ত্রাস।
এখন আমেরিকায় ডেমোক্র্যাট ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায়। তারা নিক্সন আমলের কিসিঞ্জার-ডকট্রিন দ্বারা প্রভাবিত নয় বলেই অনেকের ধারণা। তাছাড়া আমেরিকা এখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ওয়ার এগেইনস্ট টেরোরিজম বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। এই সন্ত্রাস ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী সন্ত্রাস। বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এই মৌলবাদী সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়ার জন্য আমেরিকা কর্তৃক সমালোচিত হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাস দমনে সাফল্য দেখানোর পর মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রশাসন কর্তৃক একাধিকবার প্রশংসিত হয়েছে।
এখন হঠাৎ সেই আমেরিকাই একটি বিশ্বময় পঠিত ও প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা বিএনপির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ উগ্র মৌলবাদী শক্তির পাশে অবস্থান গ্রহণ করে ক্ষমতাসীন গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে অপপ্রচারে অংশ নেয় তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। এ জন্যই অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে কিসিঞ্জার ডকট্রিনের প্রেতাত্মা কি এখনও প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে এবং ওবামার ডেমোক্র্যাট প্রশাসনও কি বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের সত্তরের ব্যর্থ ও পরিত্যক্ত নীতিতে ফিরে যেতে চাইছে? গত ২০ নভেম্বর দি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধটি কি তারই আভাস বহন করছে?
দি নিউইয়র্ক টাইমসের ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট’ শীর্ষক নিবন্ধটি পাঠ করে বিস্মিত হয়ে ভাবতে হয়, বিশ্বের একটি বহুল প্রচারিত প্রথম শ্রেণীর ইংরেজি দৈনিকে তৃতীয় বিশ্বের কোনো তৃতীয় শ্রেণীর কাগজের মতো এত অসত্য ও দায়িত্বহীন কথা কী করে বলা হতে পারে? নিউইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য যদি সত্য ও সঠিক বলে মানতে হয় তাহলে মানতে হবে বর্তমান হাসিনা সরকার আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাবেক কোনো স্বৈরতন্ত্রের মতো একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার। বিরোধী দল, মানবাধিকার কর্মীদের এই সরকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করছে। আদালত বিচার ব্যবস্থায় ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ডও বজায় রাখছে না।
পত্রিকাটির মতে, এই সংকটের জন্য শেখ হাসিনাই একমাত্র দায়ী। তিনি ক্ষমতায় ঝুলে থাকার জন্য সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধানটি মুছে ফেলেছেন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও আসলে হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনের একটা হাতিয়ার। জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে বস্তুত তাদের রাস্তার আন্দোলনে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে তারা রাস্তায় নেমেছে। সিরিজ অব হরতালে দেশটিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘর্ষে শত শত লোক মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং এসব অবস্থার প্রতিকার ও হাসিনা সরকারকে স্বৈরতন্ত্রের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশনসসহ বিভিন্ন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে এই মার্কিন দৈনিকটি সুপারিশ করেছে।
এই ‘ইনফরমেশন এজের’ একটি আন্তর্জাতিক দৈনিক হয়ে মার্কিন এই পত্রিকাটি কী করে বাংলাদেশ সম্পর্কে এত অসত্য ও মনগড়া কথা ছড়াল, তা ভেবে বিস্মিত হই। যে ‘মরাল হাই গ্রাউন্ড’ মেনে আমেরিকার প্রশাসন ও মিডিয়া কথা বলে তার সঙ্গে এই প্রচারণার কোনো মিল আছে কি? এটা বাংলাদেশের বিএনপির হ্যান্ডবিলে যেসব কথা বলা হয় তার পুনরুক্তি মাত্র। প্রথম কথা, হাসিনা সরকার বিপুল ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার। বিএনপির মতো স্বৈরশাসন, অপশাসন ও নির্বাচন-জালিয়াতির কোনো রেকর্ড তার নেই। দেশকে সুশাসন দিতে তার অনেক ব্যর্থতা আছে, ভুলত্র“টি আছে। কিন্তু এই সরকার মূলত অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক। একে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বলা সত্যের ডাহা অপলাপ। দেশকে সুশাসন উপহার দিতে ব্যর্থ হওয়ার নজির মার্কিন প্রশাসনেরও রয়েছে।
হাসিনা সরকার জনগণকে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ যেসব নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন করে চলেছে। নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করা কি স্বৈরতান্ত্রিক কাজ? এক সময় সংবিধান পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। এখন সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে আবার পুরনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়েছে। তাও সংসদে বিতর্ক ও আলোচনার পর। বিএনপি এই বিতর্কে সংসদে আসেনি। সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে, তাও সুপ্রিমকোর্টের রায় মেনে। এখানে শেখ হাসিনা স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় কোথায় সংবিধান ছিঁড়ে-খুঁড়ে (ঝপৎধঢ়ঢ়বফ) ফেললেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তো কংগ্রেসে বা সিনেটে বাধা পেলেও নিজের ডিসক্রেশনারি ক্ষমতার জোরে অনেক বিল পাস করেন। তা কি সংবিধান লংঘন? শেখ হাসিনা তো তাও করেননি।
নিউইয়র্ক টাইমস কোথায় পেল বাংলাদেশের আদালতগুলো বিচার ব্যবস্থায় নিুতম নিয়মকানুন ও মান বজায় না রেখে অভিযুক্তদের দণ্ড দেন? তাহলে একটি বড় ধরনের দুর্নীতির মামলায় তারেক রহমানের সহযোগী দণ্ডিত হন এবং তারেক রহমান কী করে খালাস পান? আমেরিকায় যেখানে রাশিয়ার কাছে আণবিক গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে (সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়) বিখ্যাত বিজ্ঞানী রোজেনবার্গ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, বিশ্ববাসীর প্রাণ ভিক্ষাদানের আবেদনে পর্যন্ত কর্ণপাত করা হয়নি, সেখানে বাংলাদেশে ’৭১-এর বর্বর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে শুধু মানবতা বোধ থেকে বয়সের বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, তা কি দেশটির বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, মান ও সুবিবেচনার পরিচয় বহন করে না?
আমেরিকা তার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও কোলাবরেটরদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। অনেককে বিনা বিচারে হত্যা করেছে। সেই দেশটির একটি পত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং ঘাতক ও দালালদের বিচার সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না বলে মায়াকান্না জুড়েছে এবং এই ঘাতক ও দালালদের হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (চড়ষরঃরপধষ ঙঢ়ঢ়ড়হবহঃং) হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের আপামর মানুষের দাবি। এটা হাসিনা সরকারের নির্বাচনী কমিটমেন্ট। এ কমিটমেন্ট থেকে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার সরে আসে কী করে? তাছাড়া ২০০৯ সালে গঠিত বিশেষ আদালত যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও দণ্ড দিয়েছেন তারা ৪০ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক ও দালাল হিসেবে সর্বত্র পরিচিত। হঠাৎ দি নিউইয়র্ক টাইমস আবিষ্কার করল, এই দণ্ডিত ও বিচারাধীন ব্যক্তিরা আসলে যুদ্ধাপরাধী নয়, তারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং আওয়ামী লীগ সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য এই বিচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এত বড় মিথ্যাচার দি নিউইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকা কীভাবে করে এবং কী উদ্দেশ্যে? তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নাৎসি ঘাতক হিটলার, মুসোলিনী কি যুদ্ধাপরাধী ছিল না? ছিল কেবল চার্চিল ও রুজভেল্টের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ? এবং এই প্রতিপক্ষকে দমনের জন্যই কি তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে? নিউইয়র্ক টাইমসের অদ্ভুত যুক্তি, জামায়াতের মতো সন্ত্রাসী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে রাস্তায় আন্দোলন সৃষ্টি করার জন্য ঠেলে দেয়া হয়েছে। জামায়াতকে শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেয়া নয়, দলটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি সারা দেশের। আওয়ামী লীগ সরকার এই দেশব্যাপী দাবির মুখেও জমায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। দলটির সন্ত্রাসী চরিত্রের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাতিল করে দিয়েছে। এটা যদি অন্যায় হয়, তাহলে আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশে মহাযুদ্ধের ৬৮ বছর পরও নাৎসি পার্টি নিষিদ্ধ কেন?
আমেরিকায় ঢুকতে হলে ভিসা পেতে যে ফরম পূরণ করতে হয় তাতে লেখা আছে আপনি নাৎসি পার্টির সমর্থক হলে অথবা ওই পার্টির সঙ্গে অতীতে কোনো যোগাযোগ থাকলে আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি পাবেন না। তাহলে বাংলাদেশের নব্য নাৎসিদের প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এত অনুকম্পা কেন? জার্মানির নাৎসি পার্টি এবং ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি যেমন সঠিক অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, তেমনি বাংলাদেশের জামায়াতও কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। এটি দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসী দল। কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ ধরনের সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি দেয়া হয় না।
বিএনপি এই সন্ত্রাসীদের সাহায্যে বাংলাদেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে এটা কি বাস্তব সত্য? আর রাজনৈতিক দল-উপদলগুলোর সংঘর্ষে মানুষ মারা যাচ্ছে, এটাও নিউইয়র্ক টাইমসের আবিষ্কার। বাংলাদেশে জনসমর্থনপুষ্ট কোনো গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে না পারায় জামায়াতের সশস্ত্র ক্যাডারদের সহায়তায় বিএনপি রাজপথে আকস্মিক হামলা চালিয়ে গাড়ি-বাড়ি পুড়িয়ে, ঘুমন্ত বাসযাত্রী হত্যা করে দেশে ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তার বাইরে তারা কিছু করেনি। তাও পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে।
অন্যদিকে জামায়াত-শিবির ও তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের অতর্কিত হামলায় গাড়িতে অগ্নিসংযোগের দরুন অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে। এমনকি জামায়াতের ক্যাডারদের হামলায় নিহত পুলিশের সংখ্যাও কম নয়। এগুলোকে মার্কিন পত্রিকাটি রাজনৈতিক দল-উপদলের সংঘর্ষে নিহত বলে চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার যে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করেছে, তাদের একজন আদালত কর্তৃক ‘হঠাৎ সম্পাদক’ হিসেবে বর্ণিত এবং তার মিথ্যা প্রচার সাংবাদিকতার সব মানকে অতিক্রম করেছিল। আর মানবাধিকার দলটি ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে পুলিশ অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে বলে নিহতদের যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে দেখা গেছে এই নামে কেউ নেই। সবটাই দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণা। আমেরিকায় মার্কিন স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের বানানো অভিযোগে হাওয়ার্ড ফাস্ট, চার্লি চ্যাপলিনের মতো বিখ্যাত মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন। সেই দেশের একটি কাগজ বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক দলনের নামে মায়াকান্না জুড়েছে, তা আর বিচিত্র কী?
উন্নয়নশীল বিশ্বের যেসব দেশে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে, সেসব দেশে গণতন্ত্রের বিকাশে বাধাদানে এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার কাজে অপপ্রচারে দি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার কোনো জুড়ি নেই। একটি উদাহরণ দিই। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক ও গণবিরোধী মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে প্রদেশে নতুন সরকার গঠন করে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে এই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ আমেরিকা তার স্বার্থের অনুকূল মনে করেনি। ফলে শুরু হয় হক সাহেবের বিরুদ্ধে চক্রান্ত।
ফজলুল হক বয়োবৃদ্ধ ছিলেন। তিনি তার এক পুরনো রোগের চিকিৎসার জন্য এ সময় কলকাতায় যান। সেখানে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। যে কলকাতায় বসে ছয় বছর তিনি অবিভক্ত বাংলার সরকার পরিচালনা করেছেন, দেশভাগের পর সেই কলকাতায় এসে বিপুল সংবর্ধনা পেয়ে তিনি অভিভূত হন এবং সংবর্ধনার জবাবে বলেন, ‘আমি দেশের রাজনৈতিক বিভাজনে কোনো গুরুত্ব দেই না।’ হক সাহেবের এই সংবর্ধনার সময় দি নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক ক্যালাহান তার কাগজে রিপোর্ট পাঠান- হক সাহেব কলকাতায় বলেছেন, ‘আমি দেশ ভাগ মানি না।’
মার্কিন পত্রিকার রিপোর্টার কর্তৃক ফজলুল হকের মুখে পুরে দেয়া এই বক্তব্য ঢাকায় ও করাচিতে মুসলিম লীগপন্থী কাগজগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হয়। ফজলুল হক ঢাকায় ফিরে এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ক্যালাহান সাহেবের এই রিপোর্টকে ভিত্তি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে এবং মুখ্যমন্ত্রী হক সাহেবকে গৃহবন্দি করে। তাকে বলা হয়, ‘হিন্দুর দালাল, ভারতের চর’। আজ থেকে ৫৯ বছর আগেও এটাই ছিল দি নিউইয়র্ক টাইমসের সৎ সাংবাদিকতার নমুনা।
৫৯ বছর পর দি নিউইয়র্ক টাইমস একই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে এবং দেশটির সাম্প্রদায়িক ও উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসী শিবিরের সমর্থক সেজেছে। হাসিনা সরকারকে শায়েস্তা করার জন্য আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশনস আরোপেরও সুপারিশ করেছে। এই স্যাংশনস আমেরিকা সাধারণত আরোপ করে তার শত্র“ দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও কি তাহলে এখন আমেরিকার শত্র“ দেশ? দি নিউইয়র্ক টাইমস এ স্যাংশনস আরোপের জন্য যতই উস্কানি দিক, ওবামা প্রশাসন তাতে কান দেবে অথবা সুপারিশটিকে গুরুত্ব দেবে তা মনে হয় না। সত্তরের দশকের ব্যর্থ বিদেশনীতিতে আমেরিকা ফিরে যেতে চাইবে তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ এখনও ঘটেনি।

আমরা কবে পৌঁছাব গণতন্ত্রের অভীষ্ট লক্ষ্যে? by কারার মাহমুদুল হাসান

গত ১৮ নভেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকালীন রুটিন কাজ পরিচালনার লক্ষ্যে ৮ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। এ ৮ জনের মধ্যে ৫ জনই এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। দু’জন আওয়ামী লীগের, যারা গত পাঁচ বছর দৃশ্যমানভাবে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কমবেশি অবহেলা-অনাদরে দিন কাটিয়েছেন এবং অন্যজন ওয়ার্কার্স পার্টির। ইতিমধ্যে এ মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হয়েছে। তাদের সবাইকে নিয়েই এ আপৎকালীন মন্ত্রিসভা। এ মন্ত্রিসভাকে বর্তমান সরকারি মহল অন্তবর্তীকালীন মন্ত্রিসভা নামে অভিহিত করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। আর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ নতুন মন্ত্রিসভাকে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার না বলে একে সদ্য বিদায়ী মহাজোট সরকারেরই নতুন সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিগত কয়েকটি সাধারণ নির্বাচনের ভোটচিত্র দেখা যেতে পারে। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রার্থীদের দলগত অবস্থান ছিল এরকম : ক. আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৩০০ প্রার্থীর মধ্যে ২ জন, খ. বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ২৫২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭ জন, গ. আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি’র ১৪০ জনের মধ্যে ১৩৬ জন, ঘ. জামায়াতে ইসলামীর ৩১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪ জন, ঙ. ওয়ার্কার্স পার্টির ৩২ জনের মধ্যে ৩২ জনই, চ. গণফোরামের ১৭ জনের মধ্যে ১৭ জনই এবং ছ. বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের ত্রিধা বিভক্ত বিভিন্ন ‘ফেরকা’র মোট ৪৬ জন প্রার্থীর সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। অন্য আরও প্রায় চার ডজন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ (স্বতন্ত্র ৪৮৬ জন প্রার্থীসহ) করেছিল এবং সেসব দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৯৫ থেকে ১০০ ভাগ প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে এরশাদ সাহেবের দল (জাপা) অংশ নিলেও দলগতভাবে দেয় ভোটের ১.১২ ভাগ ভোট লাভ করেছিল এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপির প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ০.৪৪ ভাগ। ওই নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়।
৭ম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১২ জুন ১৯৯৬ সালে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট দেয় ভোটের ৩৭.৪৪ ভাগ ভোট পেয়ে ১৪৬টি সদস্যপদে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। এ নির্বাচনে (যা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়) বিএনপি মোট দেয় ভোটের ৩৩.৬০ ভাগ (১১৬ সংসদ সদস্যপদে জয়ী), জাতীয় পার্টি মোট দেয় ভোটের ১৬.৪০ ভাগ (প্রাপ্ত সংসদ সদস্যপদ ৩২), জামায়াতে ইসলামী মোট দেয় ভোটের ৮.৬১ ভাগ (প্রাপ্ত সংসদ সদস্যপদ ৩টি) ভোট লাভ করে। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৩০০ আসনের মধ্যে ২ জন, বিএনপির ৩৬ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির ৩৪ জনের মধ্যে ৩৩ জন, জাসদের (ইনু) ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জন এবং বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের ৪ জনের সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় অতিশয় নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীনে। সে নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ১৪০টি সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয় এবং বিএনপির মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ৫৪৯, যা মোট দেয় ভোটের ৩০.৮১ ভাগ। দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে মোট ২৬৪টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৮৮টি আসনে বিজয়ী হয় এবং দলটির মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৬, যা মোট দেয় ভোটের ৩০.০৮ ভাগ। এছাড়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের (তিনি তখন কারাগারে অন্তরীণ) জাতীয় পার্টি ২৭২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৩৭ ভোট পায় (শতকরা হারে প্রাপ্ত ভোট ১১.৯২ ভাগ) এবং ৩৫টি আসন লাভে সক্ষম হয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ২২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ দলের মোট প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬১। দলটি জাতীয় পার্টি থেকে বেশি ভোট পেয়েও (শতকরা হারে প্রাপ্ত ভোট ১২.১৩ ভাগ) মাত্র ১৮টি আসন লাভে সক্ষম হয়।
ওই নির্বাচনে বিগত মহাজোটের অংশীদার জাসদ (ইনু) ৬৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ভোট পেয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ১১টি। তবে কোনো আসন লাভ করতে পারেনি। বিগত মহাজোটের আরেক অংশীদার ওয়ার্কার্স পার্টি (তখন দলটি ভাগ হয়নি) ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ভোট পেয়েছিল ৬৩ হাজার ৪৩৪টি, যদিও ওই নির্বাচনে তারা একটি আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে জোটের অংশ বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল মোট ৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ১১ হাজার ২৭৫টি ভোট লাভ করেছিল। সে দলের এক কাণ্ডারি দিলীপ বড়–য়া ছিলেন সদ্য বিদায়ী মহাজোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী। ওই নির্বাচনে সিপিবিও অংশ নিয়েছিল জোটের দল হিসেবে। তাদের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ৫১৫ এবং প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল পাঁচ। এখানে উল্লেখ করার বিষয় হল, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শতকরা হারে বিএনপির প্রায় সমান ভোট লাভ করলেও বিএনপির তুলনায় অর্ধশতাধিক আসন কম পায়। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট গবেষক ও চিন্তাবিদরা কোনো গবেষণা করেছেন কি-না জানা নেই।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সেনা সমর্থিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা করতে চাই। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়, ‘ঘরে ঘরে চাকরি’ প্রদানের ঘোষণাসহ বড় বড় ওয়াদা। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোটের অংশ হিসেবে জাসদ (ইনু) হাসানুল হক ইনুসহ ৩টি আসনে এবং ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন) সাকুল্যে ২টি আসনে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। দল দুটি এ নির্বাচনে সাকুল্যে ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫৩৭টি ভোট লাভ করেছিল। দিলীপ বড়–য়ার সাম্যবাদী দল পেয়েছিল ২৯৭ ভোট।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত ওয়াদাগুলোর কতভাগ গত পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বড় বড় বিলবোর্ডে দৃষ্টিনন্দন অক্ষরে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে শেয়ার মার্কেট, হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ্ গ্র“প, রেলওয়ের কালো বিড়াল এবং পদ্মা সেতু সংশ্লিষ্ট কথিত দুর্নীতি ইত্যাদি ঘটনা মহাজোট সরকারকে জনসমর্থনে এগিয়ে নিতে পারেনি, যার আলামত পাওয়া গেছে সদ্য সমাপ্ত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ২২ বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা বাংলাদেশের জনগণ অতি আশা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা শুরু করেছিলাম। এ দুই দশকে এবং তার আগের দশকেও দেশে অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, সন্দেহ নেই। তবে ‘গণতন্ত্রে’র ধারণা আমাদের রাজনীতিকদের কাছে একটি নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং কমবেশি পাঁচ বছর পরপর এ কাজটি সম্পন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। দেশের জনগণ পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের সবকিছুর ‘মালিক’ মনে করে উৎফুল্ল ও আনন্দবোধ করেন। নির্বাচনের পর তাদের কথা ভাবার সময় পান না ক্ষমতাসীনরা। সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য, সরকারি দলের নব্য ও পুরনো সমর্থকরা তখন নির্বাচন-পরবর্তী সব ভাবনা, সময় ও শক্তি নিয়োজিত করেন নতুন টেলিভিশনের লাইসেন্স, রাজউকের প্লট বরাদ্দ, নতুন ব্যাংক-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ খোলার ও সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার ক্রয়ের পারমিট, সেই সঙ্গে ক্ষেত্র বিশেষে বিদেশে লোক পাঠানো ও দেশে চাকরি প্রদানের নামে মাথাপিছু ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা ডাউন পেমেন্ট নেয়ার কাজগুলো সূচারুভাবে সম্পন্ন করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে। এ অবস্থায় তাদের আমজনতার কথা ভাবার ফুরসত কোথায়! উদ্বেগের সঙ্গে অনুমান করা যায়, নাদান দেশবাসী আরও কয়েক বছর এভাবেই ‘গণতন্ত্র’ বিষয়ে ধাক্কাধাক্কির সুমহান কাজগুলো সহিসালামতে সম্পন্ন করে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভীষ্ট লক্ষ্যে তথা মনজিল মক্সুদে একদিন না একদিন পৌঁছে যেতেও পারে।
কারার মাহমুুদুল হাসান : সাবেক সচিব; ’৬২-এর শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা কলেজ থেকে রাস্টিকেটকৃত ১১ জনের একজন

দেবযানীতে জাতিসংঘের আপত্তি নেই

নানা নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের সদস্য হিসেবে দেবযানীর জায়গা হল। এর আগে নিউইয়র্কে ভারতের ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানীকে জাতিসংঘে বদলি করে সংস্থাটিতে ভারতের স্থায়ী মিশনের সদস্যের ছাড়পত্র দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল ভারত। নিউইয়র্কে নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়েকে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনে নিয়োগে অনাপত্তি জানিয়েছে জাতিসংঘ। সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।
গৃহকর্মীর ভিসা ঘোষণায় মিথ্যা তথ্য দেয়া ও তাকে কম পারিশ্রমিক দেয়ার অভিযোগে ১২ ডিসেম্বর দেবযানীকে গ্রেফতার করেছিল নিউইয়র্ক পুলিশ। রাস্তা থেকে গ্রেফতারের সময় প্রকাশ্যে হাতকড়া পরানো, ধরে নিয়ে বিবস্ত্র করে দেহ তল্লাশি ও অপরাধীদের সঙ্গে হাজতে রাখার বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক কূটনীতিক টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই নিউইয়র্কে ভারতের ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানীকে জাতিসংঘে বদলি করে সংস্থাটিতে ভারতের স্থায়ী মিশনের সদস্যের ছাড়পত্র দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল ভারত। ভারতের সেই অনুরোধে সাড়া দিল জাতিসংঘ। এতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে কূটনীতিক ছাড় পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে গেলেন দেবযানী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতিসংঘের এক সূত্র বলেছে, ‘জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের একজন সদস্য হিসেবে খোবরাগাড়েকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ পূরণ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আসবে।’ জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে নিযুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিচয়পত্র পাবেন দেবযানী। এই পরিচয়পত্র পেলেই কূটনীতিক ছাড় পাওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো ধারণা করছে, দেবযানীর নতুন কূটনীতিক অবস্থান ব্যবহার বিচারের মুখোমুখি না করেই নয়াদিল্লি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগটি ব্যবহার করবে।
নিউইয়র্কের আদালতে হাজিরা থেকে অব্যাহতি : নিউইয়র্কের আদালতে হাজিরা থেকে অব্যাহতি পেলেন ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে। ব্যক্তিগত ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে। যার ফলে মার্কিন-ভারতীয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ব্যাপক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। ’৯৯ ব্যাচের আইএসএস কর্মকর্তা দেবযানী খোবরাগাড়ে (৩৯) নিউইয়র্কে ডেপুটি কনস–্যল জেনারেল হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ১২ ডিসেম্বর মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দেয়ার সময় ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আড়াই লাখ ডলারের বন্ডের বিনিময়ে মুক্তি পান দেবযানী। নিউইয়র্কের আদালত দেবযানীকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

মারণাস্ত্র একে-৪৭ এর উদ্ভাবকের মৃত্যু

আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে যেটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যর কারণ হিসেবে দেখা হয়, সেই একে-৪৭ এর উদ্ভাবক মিখাইল কালাশনিকভ মারা গেছেন। রাশিয়ার ইউরাল পর্বতমালার কাছে নিজের শহর ইজভেস্কের একটি হাসপাতালে সোমবার তার মৃত্যু হয় রুশ কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে। ৯৪ বছর বয়সে মারা যাওয়া কালাশনিকভ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই মাত্র ২০ বছর বয়সে একে-৪৭ রাইফেলের নকশা তৈরি করেন,
যদিও জীবনে কখনও স্কুলে পা রাখা হয়নি তার। চরম বিরূপ পরিবেশেও ঠিকমতো গুলি বের হওয়ার বিষয়ে অদ্বিতীয় এই রাইফেল খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গেরিলা যোদ্ধাদের কাছে। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত সামরিক সেনাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে অ্যাসল্ট রাইফেল অন্তর্ভুক্ত হয়। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ এই অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে।

ব্যারন ইম্পেইন প্যালেস

দেবীদের আসন, অসুর, সাপ, নৃত্যরত নারীদের প্রতিমূর্তি, অলংকৃত স্তম্ভ, বিস্তৃত বারান্দা ঘেরা প্রাসাদগুলো দেখলে মনে হবে মুঘল সাম্রাজ্যের কোনো স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন এগুলো। তবে বাস্তবতা হল ‘ব্যারন ইম্পেইন প্যালেস’ বা ‘কাসার আল ব্যারন’ নামের এই প্রাসাদটি ১৯১১ সালে নির্মাণ করা হয়। মিসরের হেলিপলিসের মরুভূমির মতো জায়গায় কারুকার্যময় প্রাসাদোপম অট্টালিকাটি তৈরি করেন ব্যারন ইম্পেইন নামের এক ধনবান ব্যক্তি। তিনি ফ্রান্সের নাগরিক। রেলওয়ে প্রকৌশলী হিসেবে অনেক দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে মিসরে গিয়ে তিনি একই সঙ্গে প্রেমে পড়ে যান মরুভূমি ও ইয়েভেত্তি ভোগদাদি নামের এক নারীর।
সেই প্রেমে মশগুল হয়ে ১৯০৬ সালের দিকে মরুভূমির মধ্যে ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গা তিনি মিসরের সরকারের কাছ থেকে কিনে নেন। উড়িষ্যার এক মন্দিরের আদলে সেখানে গড়ে তোলেন কাসার আল ব্যারন নামের এই সুরম্য অট্টালিকা। এটির কাজ শেষ হয় ১৯১১ সালে। প্রাসাদের ডিজাইন করেন প্রকৌশলী গিওগেস লুইস ক্লদ ও আলেকজান্দ্রা মার্সেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একজন জেনারেলের দায়িত্ব পালনের আগপর্যন্ত এখানেই ছিলেন তিনি। যুদ্ধে বেলজিয়ামে মারা যান ইম্পেইন। সেখানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। এরপর প্রাসাদটির মালিকানা চলে যায় মিসর সরকারের হাতে। তথ্যসূত্র : ডেইলি মেইল।

ইরাক থেকে গোপনে তেল এনেছেন বাশার

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ গত নয় মাসে মিসরের সহায়তায় ইরাক থেকে প্রচুর পরিমাণে অপরিশোধিত তেল নিয়ে এসেছেন। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে জানা গেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নজরদারি এড়িয়ে সিরিয়ান এই প্রেসিডেন্ট তার সামরিক বাহিনী দিয়ে এই কাজ করে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এই খবর জানায় রয়টার্স। সিরিয়ায় প্রায় আড়াই বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তার কৌশলগত মিত্র ইরানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন।
কারণ সিরিয়ায় আসা অপরিশোধিত তেলের মূল উৎস হল ইরান। অথচ ইরান নিজেও পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত কারণে পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। ফলে সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকারও পশ্চিমা বিশ্বের কালো তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। সিরিয়ার তেল ক্রয়সংক্রান্ত বিভিন্ন অপ্রকাশিত বাণিজ্যিক দলিলপত্র থেকে জানা যায় ইরান এখন আর একা কোনো কাজ করছে না। পণ্য পরিবহন এবং মূল্য পরিশোধসংক্রান্ত প্রায় ডজনখানেক নথিপত্রে দেখা গেছে ইরানের জাহাজে করে ইরাক থেকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকারকে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাঠানো হয়েছে। আর এ কাজে সহায়তা করেছে বিভিন্ন লেবানিজ এবং মিসরীয় বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো একথা অস্বীকার করলেও তারা যে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সিরিয়ায় তেল পরিবহনের বিনিময়ে স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশি অর্থ আদায় করে বেশ মোটা অংকের লাভ করেছে, রয়টার্সের তদন্তে তা বের হয়ে এসেছে। এমনকি বাশার আল আসাদ সরকারের প্রতি মিসর, ইরাক এবং লেবাননের বেশ কিছু অপ্রকাশিত সহায়তার দিকেও আলোকপাত করেছে বার্তা সংস্থাটি। উল্লেখ্য, এই দেশগুলোর ওপরেও পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান সিট্রল এবং ইরানের তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানি (এনআইটিসি) উভয় প্রতিষ্ঠানেরই যাবতীয় সম্পদ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ফলে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই বাণিজ্যিক সম্পর্কে যেতে পারবে না সংস্থা দুইটি।