Thursday, September 5, 2024

'যখন আমার মেয়ের দেহ ঘরে শায়িত ছিল, তখন টাকা দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ' by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে তরুণী চিকিত্‍সককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা তোলপাড় গোটা পশ্চিমবঙ্গ । প্রতিদিনই কোনও না কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে রাজ্য়ের বিভিন্ন প্রান্তে।  সন্তান হারানোর ক্ষত এখনও দগদগে। মেয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সঞ্জয় রায় ছাড়া এখনও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। এবার আরজিকর কাণ্ড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন  নির্যাতিতার  বাবা-মা। তাঁরা বলেন, 'যখন আমার মেয়ের দেহ ঘরে শায়িত ছিল, তখন ডিসি নর্থ আমাদের  টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।  আমরা দেহটা রেখে দিতে চেয়েছিলাম।  কিন্তু এত চাপ তৈরি করা হয়েছিল সেসময়ে। আর কিছু করার ছিল না। দেহ দাহ করতে বাধ্য হই।

'নির্যাতিতার বাবা বললেন, 'ওরা কিন্তু আমার মেয়ের কোনও শরীরিক পরীক্ষা করেনি। যেটা প্রথম কাজ ছিল, সেটা কিন্তু করেনি। বেলা এগারোটার সময়ে জানানো হয়, আমাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। কোনও মেডিক্যাল টেস্ট হল না, আগে তারা বলে দিল আত্মহত্যা করেছে। কেন করেছে এটা, সেটা তারা জানে।'

কন্যাহারা বাবার প্রশ্ন, 'ময়নাতদন্ত করতে এত দেরি করল কেন?  আমি ৬.৩০ থেকে ৭টার মধ্যে এফআইআর  করলাম, রেজিস্টার হল ১১.৪৫ মিনিটে। এত ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও, পুলিশ একটা অস্বাভাবিক মামলা রুজু করল। কী কারণে?'  ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বার বার মিথ্যা কথা বলছেন বলেও অভিযোগ তাঁর। শুধু বাবা-মা-ই নন। নির্যাতিতার কাকিমাও ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি জানান, “ওইদিন (৯ আগস্ট) সকাল ১০ টা ৫৫ মিনিট নাগাদ খবর পাই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে গাড়ি নিয়ে আমরা আসি। চারজন একসঙ্গে এসেছিলাম। দেহ দাহ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ ঘিরে রেখেছিল আমাদের। অন্তত তিন থেকে চারশো পুলিশ আমাদের পরিবারকে আটকে রেখেছিল।”

সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি ছিল। তার আগের রাতে এক ঘণ্টা আলো নিভিয়ে অভিনব প্রতিবাদের ডাক দেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে এদিন রাত ৯টায় আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় রাজভবনে। আঁধারে ঢাকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বর-সহ শহরের প্রায় বিভিন্ন প্রান্ত।সুপ্রিম কোর্টে শুনানি পিছিয়ে যাওয়ায় বাড়ছে হতাশা। এই পরিস্থিতিতে সুবিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি নির্যাতিতার বাবা-মায়ের। সন্তানহারা মায়ের ভেজা চোখে একটাই আর্জি, “আমি চাই, অপরাধীরাও আমার মতো ঘুমহারা হোক।”

‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীন নির্বাচনের পরামর্শ দিয়ে পদত্যাগ করলেন হাবিবুল আউয়াল

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) আজ বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছে। পদত্যাগ ঘোষণার আগে ‘বিদায়ী ব্রিফিং’–এ ভবিষ্যতের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠানের পরামর্শ দিয়েছেন হাবিবুল আউয়াল। তাঁর আরও পরামর্শ, এ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে হবে বিরতি দিয়ে।


হাবিবুল আউয়ালের ব্রিফিংয়ে পড়া লিখিত ভাষণের শব্দসংখ্যা ছিল সাত শতাধিক। লিখিত ভাষণের শেষে ‘নিজের অভিজ্ঞতার নিরিখে’ তিনি কিছু প্রস্তাবনা দেন। হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘বর্তমান ও অতীত থেকে আহৃত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও উপলব্ধি থেকে ভবিষ্যতের জন্য কিছু প্রস্তাবনা সরকারের সদয় বিবেচনার জন্য রেখে যাওয়া কর্তব্য মনে করছি। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সমরূপতার কারণে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (দলীয়–ভিত্তিক) নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ আদর্শ ক্ষেত্র হতে পারে। সেই সঙ্গে নির্বাচন চার বা আটটি পর্বে, প্রতিটি পর্বের মাঝে তিন থেকে পাঁচ দিনের বিরতি রেখে, অনুষ্ঠান করা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সহজ ও সহায়ক হতে পারে। আমাদের প্রবর্তিত অনলাইনে নমিনেশন দাখিল অব্যাহত রেখে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার অপটিমাইজ করতে পারলে উত্তম হবে। প্রতিটি সাধারণ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হলে উদ্দেশ্য অর্জন আরও সুনিশ্চিত হতে পারে।’

ভাষণে দেশের প্রতিটি নির্বাচনের ইতিহাস তুলে ধরেন হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, দেশের প্রথম সাংবিধানিক সাধারণ নির্বাচন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক ছিল। ১৯৭৯ ও ১৯৮৭ সালের সাধারণ নির্বাচন সামরিক শাসনামলে হয়েছে। ফলাফল নিয়ে বিতর্ক ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচন রাজনৈতিক রূপরেখার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন হয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন সাংবিধানিক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন, সূক্ষ্ম বা স্থূল কারচুপির সীমিত সমালোচনা সত্ত্বেও সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।

হাবিবুল আউয়াল আরও বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই নির্বাচনে বিএনপি সংসদে মাত্র ২৭টি এবং আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়েছিল। নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। নিরাপদ প্রস্থান বিষয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সেনাসমর্থিত অসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দর–কষাকষির বিষয়টি প্রকাশ্য ছিল। সে প্রশ্নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থানও গোপন ছিল না। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন সংবিধানমতে দলীয় সরকারের অধীন হয়েছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ অনেক দলই অংশগ্রহণ করেনি উল্লেখ করে হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘ফলে সেই নির্বাচনও ২০২৪ সালের অনুরূপ অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে। আসন পেয়েছিল মাত্র ৬টি। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৫৮টি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে বর্তমান কমিশনের অধীন। ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। কমিশন বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য একাধিকবার আহ্বান করা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না–করার বিষয়টি দলের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।’

হাবিবুল আউয়াল বলেন, নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়ার মতো কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। সে কারণে অনেকেই কমিশনকে দোষারোপ করছেন। নির্বাচন কখন, কী কারণে, কত দিনের জন্য স্থগিত করা যাবে, তা–ও সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। অতীতে কখনোই কোনো কমিশন নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে পদত্যাগ করেননি। সম্প্রতি ভেঙে দেওয়া সংসদের ২৯৯টি আসনে নির্বাচন প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হয়েছে; দলের মধ্যে নয়। ২৯৯ আসনে ১ হাজার ৯৬৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

পদত্যাগী সিইসির কথা, ‘নির্বাচন নিষ্পন্ন করা অতিশয় কঠিন একটি কর্মযজ্ঞ। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হওয়ার সব দোষ বা দায়দায়িত্ব সব সময় কেবল নির্বাচন কমিশনের ওপর এককভাবে আরোপ করা হয়ে থাকে। একটি কমিশন না হয় অসৎ বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে; কিন্তু সব সময় সব কমিশনই অসৎ বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে না। কমিশন বিভিন্ন কারণে নির্ভেজাল গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে অক্ষম বা অসমর্থ হতে পারে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় আমাদের বিশ্বাস, কেবল কমিশনের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অবাধ, নিরপেক্ষ, কালোটাকা ও পেশিশক্তি-বিবর্জিত এবং প্রশাসন-পুলিশের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে না। নির্বাচনী পদ্ধতিতে দুর্ভেদ্য মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণে এবং বিশেষত প্রার্থীদের আচরণে পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।’

হাবিবুল আউয়াল বলেন, ১৯৭৩ সাল থেকে হওয়া অতীতের অন্যান্য নির্বাচন ছাড়াও ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের বিতর্কিত বা সন্দিগ্ধ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কমিশন পরবর্তী সব নির্বাচন সতর্কতার সঙ্গে আয়োজনের চেষ্টা করেছে। জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে দিনের বেলায় ব্যালট পেপার প্রেরণ, কিছু উপনির্বাচনে ভিডিও পর্যবেক্ষণ, ইভিএম ব্যবহার, দেশের সব জেলায় একই দিনে তবে প্রতিটি জেলার প্রশাসনিক সীমানার মাঝে তিন থেকে পাঁচ দিন বিরতি দিয়ে পাঁচ থেকে ছয়টি ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপকভাবে রদবদল ইত্যাদি গৃহীত ব্যবস্থা নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুশৃঙ্খল করতে অনেকটাই সহায়ক হয়েছিল। নির্বাচন মূলত একদলীয় হওয়ার কারণে কারচুপি বা সরকারিভাবে প্রভাবিত করার প্রয়োজনও ছিল না। নির্বাচন দলের ভেতরেই হয়েছে; মধ্যে হয়নি। উইথইন হয়েছে, নট বিটুইন।

নিজেদের কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে হাবিবুল আউয়াল বলেন, কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুই বছর সময়ে ইউনিয়ন পরিষদের ৯৯২টি, উপজেলা পরিষদের ৪৯৬টি, জেলা পরিষদের ৭১টি, পৌরসভার ৯০টি এবং সিটি করপোরেশনের ১৬টি নির্বাচন করেছে। নির্বাচনগুলোর সততা, সিদ্ধতা, নিরপেক্ষতা অবাধ হওয়া নিয়ে অতীতের মতো ব্যাপক বিতর্ক বা সমালোচনা হয়নি। উপনির্বাচনসহ জাতীয় সংসদের মোট ৩১৮টি আসনে কমিশন নির্বাচন করেছে। দলীয়ভাবে ইনক্লুসিভ না হওয়ার কারণে নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। এটি সঠিক ও যৌক্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে কোনো নির্বাচন কমিশন সংবিধান উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে পদত্যাগ করেছে এবং সেই কারণে নির্বাচন হয়নি—এমন উদাহরণ নেই। সরকার বারবার বলছে, ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নির্বাচন বারবার ব্যর্থ হওয়ার প্রকৃত সত্য ও কারণ এ কথার মধ্যেই নিহিত।

হাবিবুল আউয়াল আরও বলেন, ‘কমিশনের সদস্যরা সংবিধান মেনে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আমাদের কর্মকালে আমরা গণমাধ্যম, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনীসহ আবশ্যক সবার সহযোগিতা পেয়েছি। কৃতজ্ঞচিত্তে তা স্মরণ করছি।’

বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীর লাশ কবর থেকে তুলে ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ

বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীর লাশ কবর থেকে তুলে ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বুধবার বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি মাহবুবুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। হারিছ চৌধুরীর মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা তানজিম চৌধুরীর রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মাহদীন চৌধুরী।

পরে হারিছ চৌধুরীর মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা তানজিম চৌধুরী বলেন, ‘বাবা ১/১১ পর দেশেই ছিলেন, পান্থপথের একটা বাসায় থাকতেন। আমি চাইনা আমার বাবার মৃত্যু নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন উঠুক।’

তিনি বলেন, ‘বাবার মৃত্যু নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয়, যা অত্যন্ত বেদনার। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক। তাকে যথাযথ সম্মান দেয়া হয়নি। আমরা চাই লাশের ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ধোঁয়াশা যেন দূর হয়।’

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৫ই জানুয়ারি মানবজমিনের খবরে বলা হয়, হারিছ চৌধুরী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মারা গেছেন। হারিছের বিলেত প্রবাসী মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা চৌধুরী এটা নিশ্চিত করেন। বলেন, তার বাবা হারিছ চৌধুরী ২০২১ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা গেছেন।

যদিও তার চাচা আশিক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হারিছ ঢাকায় নয়, লন্ডনে মারা গেছেন। এই খবর প্রকাশের পর অনেকেই বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে উড়িয়ে দেন। গোয়েন্দারাও একাধিকবার মানবজমিন-এ ফোন করে সত্যটা জানতে চান। এরপর থেকে মানবজমিন অনুসন্ধান চালাতে থাকে। অনুসন্ধানে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। হারিছ নয়, মাহমুদুর রহমান মারা গেছেন শিরোনামে মানবজমিনে প্রকাশিত অনুসন্ধানী রিপোর্টটি দেশ-বিদেশে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী আসলে মারা যাননি। মারা গেছেন মাহমুদুর রহমান। হারিছ চৌধুরী দীর্ঘ ১৪ বছর গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি ভারত কিংবা লন্ডনেও যাননি। বাংলাদেশের ভেতরেই ছিলেন এবং ঢাকাতেই বেশিরভাগ সময় কাটান। ওয়ান ইলেভেনের পরপরই কিছুদিন সিলেটে অবস্থান করেন। ঢাকায় আসার পর তিনি নাম বদল করেন। নাম রাখেন মাহমুদুর রহমান। দীর্ঘ ১৪ বছর এই নামেই পরিচিত ছিলেন। পরিচয় দিতেন একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে। ঢাকার পান্থপথে প্রায় ১১ বছর কাটিয়ে দেন এই পরিচয়ে। এই সময় তিনি মাহমুদুর রহমান নামে একটি পাসপোর্টও নেন। পাসপোর্ট নম্বর BW0952982। এতে ঠিকানা দেন শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। বাবার নাম আবদুল হাফিজ। ২০১৮ সনের ৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে এই পাসপোর্ট ইস্যু হয়। পাসপোর্টে দেয়া ছবিতে দেখা যায় এ সময় তার চেহারায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। সাদা লম্বা দাড়ি। চুলের রঙ একদম সাদা। বয়সের ছাপ পরেছে। শুধু পাসপোর্ট নয় জাতীয় পরিচয় পত্রও পেয়ে যান মাহমুদুর রহমান নামে। তার এনআইডি নম্বর হচ্ছে ১৯৫৮৩৩৯৫০৭। পাসপোর্ট ও এনআইডি‘র সূত্র ধরে মানবজমিন অনুসন্ধান চালাতে থাকে। প্রায় দু’মাস অনুসন্ধানের পর মানবজমিন জানতে পারে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আলোচিত রাজনৈতিক নেতা হারিছ চৌধুরী।

-------------------------

হারিছ নয়, মাহমুদুর রহমান মারা গেছেন

মতিউর রহমান চৌধুরী

২০২২-০৩-০৬

হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন। মারা যাননি। এ নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল। রয়েছে বিতর্ক। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন সত্যি হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন। অনেকের মতে হারিছ গোয়েন্দাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই মৃত্যুর খবর প্রচার করেছেন। বাস্তবে কি? কোনটা সত্য। মানবজমিন-এর অনুসন্ধান কি বলছে। গত ১৫ই জানুয়ারি মানবজমিন খবর দেয় হারিছ চৌধুরী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মারা গেছেন। হারিছের বিলেত প্রবাসী মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা চৌধুরী  এটা নিশ্চিত করেন। বলেন, তার বাবা হারিছ চৌধুরী গত বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা গেছেন। যদিও তার চাচা আশিক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হারিছ ঢাকায় নয়, লন্ডনে মারা গেছেন। এই খবর প্রকাশের পর অনেকেই বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে উড়িয়ে দেন। গোয়েন্দারাও একাধিকবার মানবজমিন-এ ফোন করে সত্যটা জানতে চান। এরপর থেকে মানবজমিন অনুসন্ধান চালাতে থাকে। অনুসন্ধানে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী আসলে মারা যাননি। মারা গেছেন মাহমুদুর রহমান। হারিছ চৌধুরী দীর্ঘ ১৪ বছর গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি ভারত কিংবা লন্ডনেও যাননি। বাংলাদেশের ভেতরেই ছিলেন এবং ঢাকাতেই বেশিরভাগ সময় কাটান। ওয়ান ইলেভেনের পরপরই কিছুদিন সিলেটে অবস্থান করেন। ঢাকায় আসার পর তিনি নাম বদল করেন। নাম রাখেন মাহমুদুর রহমান। দীর্ঘ ১৪ বছর এই নামেই পরিচিত ছিলেন। পরিচয় দিতেন একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে। ঢাকার পান্থপথে প্রায় ১১ বছর কাটিয়ে দেন এই পরিচয়ে। এই সময় তিনি মাহমুদুর রহমান নামে একটি পাসপোর্টও নেন। পাসপোর্ট নম্বর BW0952982। এতে ঠিকানা দেন শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। বাবার নাম আবদুল হাফিজ। ২০১৮ সনের ৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে এই পাসপোর্ট ইস্যু হয়। পাসপোর্টে দেয়া ছবিতে দেখা যায় এ সময় তার চেহারায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। সাদা লম্বা দাড়ি। চুলের রঙ একদম সাদা। বয়সের ছাপ পরেছে। শুধু পাসপোর্ট নয় জাতীয় পরিচয় পত্রও পেয়ে যান মাহমুদুর রহমান নামে। তার এনআইডি নম্বর হচ্ছে ১৯৫৮৩৩৯৫০৭। পাসপোর্ট  ও এনআইডি‘র সূত্র ধরে  মানবজমিন অনুসন্ধান চালাতে থাকে। প্রায় দু’মাস অনুসন্ধানের পর মানবজমিন জানতে পারে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আলোচিত রাজনৈতিক নেতা হারিছ চৌধুরী। ঢাকায় কিভাবে ছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ আমরা পেয়েছি। ঢাকার পান্থপথে একটি ভাড়া করা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকতেন। বাসা থেকে খুব একটা বের হতেন না। একজন কাজের বুয়া ও একটি ছেলে থাকতো তার সঙ্গে। বই পড়ে সময় কাটাতেন। নামাজ আদায় করতেন নিয়মিত। নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেছেন, আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করি। তার সম্পর্কে  ব্যক্তিগত তথ্য খুব একটা জানতাম না। শুনেছি তার স্ত্রী ও সন্তানরা থাকেন লন্ডনে। কেউ কোন দিন আসেনি। আসা যাওয়ার সময় সালাম দিতাম। তিনি হাসি মুখে সালাম নিতেন। তাকে সবাই প্রফেসর সাহেব বলেই জানতো। নিঃসঙ্গ এই মানুষটির মৃত্যুও হয় নিঃসঙ্গতায়। সাইফুল জানান, একদিন ভোর রাতে কেউ একজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। শুনেছি হাসপাতালে থাকার পর তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর তার মেয়েকে দেখি। প্রথমে আমাদেরকে জানাতেও চাননি স্যার মারা গেছেন। মারা যাবার পর দুই মাস এই বাড়িতেই ছিলেন জামাইসহ। গত জানুয়ারিতে তারা বাসা ছেড়ে দেন। হারিছ চৌধুরী খুব একটা বের হতেন না। কথাও বলতেন না। এই বাসার সামনের একটি ফার্মেসী  থেকে ওষুধ কিনতেন। সেই ফার্মেসী সূত্রে জানা যায়, তিনি উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিক ও হৃদরোগের ওষুধ কিনতেন। ফার্মেসীর মালিক সুমন খন্দকার বলেন, স্যার খুব ভাল মানুষ ছিলেন। কখনো বাকিতে ওষুধ নিতেন না। পাশেই একটি মুদি দোকান। এই দোকান থেকেই জিনিষপত্র কিনতেন। দোকানের মালিক মোহাম্মদ সুজন বলেন, তিনি তো খুব ভাল মানুষ ছিলেন। সব সময় আমার দোকান থেকে চাল, ডাল, তেল এসব প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেন। ফ্ল্যাট মালিক জানান, তার মৃত্যু সম্পর্কে কিছুই জানেন না। প্রফেসর সাহেব নিয়মিত ভাড়া দিতেন। ভাল মানুষ ছিলেন। 
 
কিভাবে মারা গেলেন এবং কোথায় দাফন হলো
মাহমুদুর রহমান নামেই হাসপাতালে ভর্তি হন। দাফনও হয় এই নামে। মানবজমিন এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছর ২৬শে আগস্ট করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। এর আগে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মারা যান ৩রা সেপ্টেম্বর। ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়েছে তিনি Covid with Septic Shock এ মারা গেছেন। তিনি প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব নূরের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর সার্টিফিকেট ইস্যু করেন সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আ, ক, ম, নূর।

তার মৃতদেহ গ্রহণ করেন মেয়ে সামিরা চৌধুরী। এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে গোসলের জন্য মোহাম্মদপুর নিয়ে যান। কাফনের কাপড় কেনেন মোহাম্মদপুরের মাইকআউস স্টোর থেকে। আমাদের কথা হয় সামিরা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জানান, প্রথমে কেউই করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ গোসল করাতে রাজি হয়নি। পরে যাই হোক রাজি হওয়ার পর গোসল সম্পন্ন হয়। তিনি জানান দাফন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। কোথায় দাফন হবে। এরপর আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে সাভারে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। লাশ নিয়ে যাওয়া হয় সাভারের লালাবাদ কমলাপুরে। জামিয়ার কর্ণধার শাইখুল হাদিস আশিকুর রহমান কাশেমী সাহেব সম্মত হন। এরপর তাকে জামিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই দাফন করা হয়। কেন এই গোপনীয়তা এবং লুকোচুরি জানতে চাইলে সামিরা চৌধুরী বলেন, ১৪ বছর যে মানুষটি আত্মগোপনে ছিলেন তার খবর প্রকাশ করা সহজ ছিল না। নানা ভয় আর আতঙ্ক কাজ করেছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আমার বাবা হারিছ চৌধুরী। ডিএনএ টেস্ট করলেই এটা খোলাসা হয়ে যাবে। জীবিত থাকা অবস্থায় আমি লন্ডন থেকে টেলিফোনে উনার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি। আমার স্বামীও চার বছর আগে একবার ঢাকায় তার সঙ্গে দেখা করে। সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত আমার ভাই নায়েম শাফি চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সে এখন সুইজারল্যান্ডে সিনিয়র এনার্জি এনালিস্ট হিসেবে কর্মরত রয়েছে। সেলিম চাচাও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। যিনি সম্প্রতি মারা গেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, হারিছ চৌধুরী দু’বার আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পরামর্শকরা এতে সায় দেননি।

উল্লেখ করা যায় যে, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় হারিছ চৌধুরীর যাবজ্জীবন সাজা হয়। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ, এম, এস, কিবরিয়া হত্যা ও বিস্ফোরক মামলারও আসামি ছিলেন হারিছ চৌধুরী। বিগত ১৪ বছর গোয়েন্দারা তাকে হন্য হয়ে খুঁজেছেন। কিন্তু তার সন্ধান পাননি। হারিছ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম, এ ডিগ্রি নেন।

ছোট ব্যবসার জন্য ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি কমালা হ্যারিসের

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে নতুন ছোট ব্যবসার জন্য ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত কর কর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমালা হ্যারিস। যা বিদ্যমান  ছাড়ের  চেয়ে দশগুণ বেশি। নিউ হ্যাম্পশায়ার প্রদেশের পোর্টসমাউথ শহরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জনসভায় কমালা জানান, প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলে তিনি ছোট ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করবেন। ওই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর ছাড়ের সীমা ৫,০০০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার ডলার করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্যেই কমালার এই ঘোষণা। হ্যারিস তার প্রতিপক্ষ, রিপাবলিকান ডনাল্ড ট্রাম্পের থেকে ভিন্ন অর্থনৈতিক কৌশল তুলে ধরতে চাইছেন, বিশেষ করে শুল্ক এবং করের বিষয়ে একটি বৈসাদৃশ্য টানার লক্ষ্য রাখছেন। তার প্রগতিশীল অর্থনৈতিক এজেন্ডায়  ধনী ব্যক্তি এবং কোম্পানির উপর আরো কর আরোপ করার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং কর্মরত পিতামাতার কথা মাথায় রেখে শিশু  যত্ন ও  অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচির জন্য ফেডারেল তহবিল বৃদ্ধি করা।

আমেরিকায় ছোট ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ৩৩ লক্ষ। বেসরকারি ক্ষেত্রে যত মানুষ যুক্ত, তাদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের কর্মচারী। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এ বার সেই ভোটব্যাংকেই ‘নজর’ কমালার। তার এই প্রস্তাবনা সারা দেশে ব্যবসায়ীদের পেশাগত লাইসেন্স পাবার কাজটি  সহজ করে দেবে এবং কমিউনিটি ব্যাংকগুলোকে সুদের খরচ মেটাতে সক্ষম করার জন্য  তহবিল অন্তর্ভুক্ত করবে। ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট  মনোনীত প্রার্থী হিসাবে তার প্রথম প্রধান অর্থনীতি-কেন্দ্রিক বক্তৃতার সময়, হ্যারিস গত মাসে বেশিরভাগ আমেরিকানদের জন্য কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মুদি ব্যবসায়ীদের  ‘দাম বৃদ্ধি’ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি  আরও সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদিও ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট এবং স্টিফেন মুর এর আগে যুক্তি দিয়েছিলেন যে হ্যারিসের প্রস্তাবগুলি মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে তুলবে এবং অর্থনীতির ক্ষতি করবে।

সূত্র : রয়টার্স

আদানিদের বিপুল ঋণ মওকুফ করে প্রশ্নের মুখে মোদি সরকার

আদানি প্রীতির জন্য আবারো বিরোধীদের তোপের মুখে মোদি সরকার ! এবার  কংগ্রেসের দাবি, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদির সরকার দেউলিয়া আইনের অপব্যবহার করে আদানি গোষ্ঠীর অধীনস্থ ১০টি ধুঁকতে থাকা সংস্থার প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ( ভারতীয় মুদ্রায় ) ঋণ মওকুফ করেছে ।কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ এক্স হ্যান্ডেলে দাবি করেছেন, অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন, সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ ডেটার মাধ্যমে প্রকাশ করেছে যে, কীভাবে সরকারী খাতের ব্যাংকগুলি ১০ টি আর্থিকভাবে চাপে থাকা সংস্থাগুলির কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির সহজ ভাষায় যাকে বলা হয় ৭৪ শতাংশ 'হেয়ারকাট'। প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় পাত্র আদানি ওই সব সংস্থাকে হাতে নেওয়ায় ব্যাঙ্কগুলিকে অত কম টাকা নিতে বাধ্য করা হয়েছে।অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, টাকা দিতে না পারায় দেউলিয়া আদালতে থাকা ১০টি সংস্থার ৬১,৮৩২ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ মাত্র ১৫,৯৭৭ কোটিতে রফা করেছে ঋণদাতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি। অর্থাৎ মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে ৪৫৮৫৫ কোটি টাকা। সবটাই করা হয়েছে আদানি গোষ্ঠী এই সংস্থাগুলি অধিগ্রহণ করার পর। ওই ব্যাঙ্ক কর্মীদের সংগঠনটির দাবি, ওই ১০টি সংস্থা ঋণে ৪২ শতাংশ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পেয়েছে।ব্যাংক কর্মচারি সংগঠনের সভাপতি রাজেন নাগরের অভিযোগ, মোদি সরকার সম্ভাব্য সব উপায়ে আদানিদের সাহায্য করছে। সেজন্য দেউলিয়া আইনকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। লোকসান সহ্য করতে বাধ্য করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে। নাগর বলেন, “অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম টাকা না থাকলে মানুষকে জরিমানা করতে ছাড়ে না ব্যাঙ্কগুলি। এ ভাবে পাঁচ বছরে ৮৫০০ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে। দেখে মনে হচ্ছে, গরিবদের লুঠ করে ধনীদের বিলিয়ে দেওয়ার নীতিই অবলম্বন করেছে মোদি  সরকার।’’


সূত্র : ইকোনোমিক টাইমস

শেখ হাসিনাকে ফেরানোর অনুরোধ না জানানো পর্যন্ত তাঁকে চুপ থাকতে হবে: ড. ইউনূস

ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সে দেশে আশ্রয়লাভের চেষ্টা করছেন।

ভারতের সংবাদমাধ্যম পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ড. ইউনূস। আজ বৃহস্পতিবার পিটিআই নিউজের ওয়েবসাইটে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয়।

শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলাদেশ ফেরত না চাওয়া পর্যন্ত ভারতে অবস্থানকালে সাবেক ওই প্রধানমন্ত্রীর চুপ থাকা উচিত।’

শেখ হাসিনা বিভিন্ন রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক ইউনূস এ মন্তব্য করলেন। এসব বিবৃতিকে ‘অবন্ধুসুলভ’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, ‘ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানে কেউ স্বস্তিতে নেই। কেননা, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে আমরা তাঁকে দেশে ফেরত আনতে চাই। তিনি ভারতে থাকছেন এবং একই সময় কথা বলছেন; যা সমস্যা তৈরি করছে। তিনি যদি চুপ থাকতেন, তাহলে আমরা (বিষয়টি) ভুলে যেতাম; লোকজনও ভুলে যেতেন; কারণ তিনি নিজের জগতে থাকতেন। কিন্তু ভারতে বসে তিনি কথাবার্তা বলছেন ও নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন। কেউ এটা পছন্দ করছেন না।’

‘সবাই এটি বোঝেন। আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, তাঁর চুপ থাকা উচিত। এটি (তাঁর কথাবার্তা ও নির্দেশনা) আমাদের প্রতি অবন্ধুসুলভ আচরণ। তাঁকে সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং তিনি সেখানে থেকে প্রচার চালাচ্ছেন। বিষয়টি এমন নয় যে সেখানে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গেছেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থান ও জনরোষের মুখে তিনি পালিয়েছেন,’ বলেন মুহাম্মদ ইউনূস।

গত ১৩ আগস্ট হাসিনার এক বিবৃতি প্রসঙ্গে ড. ইউনূস এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে শেখ হাসিনা ‘ন্যায়বিচার’ দাবি করে বলেন, সাম্প্রতিক ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপ’, হত্যাকাণ্ড ও লুটপাটে জড়িতদের অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে চিহ্নিত করতে ও সাজা দিতে হবে।

ড. ইউনূস বলেন, শেখ হাসিনা ছাড়া সবাইকে ‘ইসলামপন্থী’ বলে আখ্যা দেওয়ার বয়ান থেকে ভারতের সরে আসা দরকার। বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত আনবে, কেননা জনগণ এটাই চায়।

‘হ্যাঁ, তাঁকে ফেরত আনতে হবে, নইলে বাংলাদেশের জনগণ শান্তিতে থাকবেন না। যে ধরনের নিষ্ঠুরতা তিনি দেখিয়েছেন, তাতে এখানে প্রত্যেকের সামনে তাঁর বিচার করা দরকার,’ বলেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. ইউনূস।

ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ড. ইউনূস ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, শুধু শেখ হাসিনার নেতৃত্বই বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে—নয়াদিল্লিকে এমন বয়ান অবশ্যই বাদ দিতে হবে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘সামনে এগোতে ভারতের জন্য ওই বয়ান থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। এ বয়ান হলো, প্রত্যেকে ইসলামপন্থী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ইসলামপন্থী, বাকি সবাই ইসলামপন্থী আর তাঁরা সবাই এ দেশকে আফগানিস্তানে পরিণত করবেন এবং বাংলাদেশ শুধু শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ। ভারত এমন বয়ানে বিমোহিত। এ বয়ান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে ভারতকে। বাংলাদেশ অন্য যেকোনো দেশের মতোই আরেকটি প্রতিবেশী।’

বাংলাদেশে সম্প্রতি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার অভিযোগ এবং এ ঘটনায় ভারতের উদ্বেগ প্রকাশ সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, ‘এটি শুধুই একটি অজুহাত।’ এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থাকে এভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরার চেষ্টার বিষয়টি একটা অজুহাত।’

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে যান শেখ হাসিনা। তখন থেকেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এদিকে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জোরদার হচ্ছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করেছে। এ অবস্থায় তিনি আর ভারতে থাকতে পারবেন কি না এবং তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ক্ষমতাচ্যুত এ প্রধানমন্ত্রীকে স্বল্প সময়ের নোটিশে ভারতে আসার অনুমতি দেওয়া হয়।

‘বেপরোয়া’ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে এবার আইনি পথে হাঁটছে বিএনপি

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে কোনো মূল্যে দেশে সম্প্রীতি রক্ষা, লুটপাট, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বন্ধসহ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে বিএনপি। শুরু থেকেই অপকর্ম-নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে অবলম্বন করে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’। দল কিংবা দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে সারা দেশে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের সাড়ে তিন শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার, পদ স্থগিত কিংবা এ ধরনের কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনেককে শোকজ করা হয়েছে। এই তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতারাও রয়েছেন। এর ফলে পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়েছে বলে দাবি বিএনপির। তবে হাইকমান্ডের শতভাগ আন্তরিকতা এবং দলের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও কিছু নেতাকর্মীর নেতিবাচক অপকর্ম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ কারণে ‘উচ্ছৃঙ্খল’ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এবার সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। অপকর্মে জড়িত থাকার দায়ে ইতোমধ্যে এক নেতার বিরুদ্ধে থানায় এজাহারও দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া যুবদলের পক্ষ থেকে আরেকজনের নামে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

জানা গেছে, দল কিংবা দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি-দখলদারিসহ নানা অপকর্মে জড়িতদের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে বিশেষ সেল গঠন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তদন্ত সাপেক্ষে সেলের সদস্যদের রিপোর্টের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন তিনি। বিএনপির হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সারা দেশের নেতাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শিগগির ‘উচ্ছৃঙ্খল’ নেতাদের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স কালবেলাকে বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছু ব্যক্তি বিএনপির নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কাজে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ দলীয় নেতৃত্ব এ বিষয়ে সবাইকে বারবার সতর্ক করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, দলের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে এখন শুধু সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নেতাকর্মীদের ১৫ বছরের আত্মত্যাগ এবং কমিটমেন্ট কিছু ব্যক্তির অপকর্মের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। তাদের দায় দল নেবে না।’

প্রিন্স আরও বলেন, ‘যারা এতদিন দলের সঙ্গে থেকে প্রভাব, সুনাম কিংবা পরিচিতি অর্জন করে এখন আবার নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত হয়ে দলকে বিপদের মধ্যে ফেলবেন, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করবেন—আমরা তাদের এভাবে ছেড়ে দেব না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ দলের হাইকমান্ড এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছেন।’

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জমি দখল, দোকান ও মার্কেটে চাঁদাবাজি এবং প্রতিপক্ষের ওপর হামলাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ আসছে। কেন্দ্রীয় কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ উঠেছে। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তাদের মধ্যে পদধারী নেতা খুবই কম। বেশিরভাগই হাইব্রিড এবং দলে অনুপ্রবেশকারী। যারা এতদিন দলের দুর্দিনে পাশে ছিল না, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারাই রাতারাতি দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্মে জড়িয়ে বিএনপির ভাবমূর্তি-সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। এসব ব্যাপারে সারা দেশে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কেউ যদি কোথাও দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করে, তাকে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের জানাতে বলা হয়েছে।

দলটির নেতারা বলছেন, নৈরাজ্য-অপকর্ম বন্ধে বিএনপির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শোকজসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এবং একজন যুগ্ম মহাসচিবকে শোকজ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর পদাবনতি ঘটিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। দলের বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, ফরিদপুর (সাংগঠনিক) বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এবং জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলের পদ স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মো. এনামুল হক এনাম ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এসএম মামুন মিয়ার প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করা হয়েছে। আলোচিত এস আলম গ্রুপের ১৪টি বিলাসবহুল গাড়ি সরিয়ে নিতে সহযোগিতার অভিযোগে কপাল পুড়েছে চট্টগ্রামের এসব নেতার।

এদিকে অপকর্মে জড়িত থাকার দায়ে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে সম্প্রতি ময়মনসিংহে বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিএনপির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভালুকা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে প্রথমে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর গত সোমবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে দলের পক্ষে যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ভালুকা থানায় বাচ্চুসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ থেকে ২০ জনের বিরুদ্ধে লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নসহ তিন নেতার নাম ব্যবহার করে কাওসার শিকদার মনির নামে একজন মতিঝিল এলাকায় এনসিসি ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি করছে বলে অভিযোগ পায় সংগঠনটি। এরপর যুবদলের পক্ষে গত সোমবার সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান পল্টন মডেল থাকায় মনিরের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যার নং ১৫২।

যুবদলের কোনো নেতাকর্মীর কোনো নৈরাজ্য-অপকর্ম বরদাশত করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না। তিনি বলেন, ‘যারাই দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করবে কিংবা নৈরাজ্য-অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তিনি যেই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে; সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে।’

জানা গেছে, নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত যুবদলের পঞ্চাশের অধিক নেতা, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রায় অর্ধশত নেতা এবং ছাত্রদলের ৬০-৬৫ জনের মতো নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া এই তিন সংগঠনের আরও শতাধিক নেতাকে শোকজ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যে কোনো নৈরাজ্য বন্ধ এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছে। কারও বিরুদ্ধে সামান্য অভিযোগ পেলেও সঙ্গে সঙ্গেই তা তদন্ত করা হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা এমনকি আরও কম সময়ের মধ্যেও অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানিয়েছেন, বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার দায়ে এখন পর্যন্ত দলের দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে অপকর্মে জড়িতদের কাছ থেকে বন্যার্তদের সহায়তায় ত্রাণসামগ্রীও নিচ্ছে না বিএনপি। সম্প্রতি বন্যার্তদের জন্য নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের ‘বহিষ্কৃত’ সদস্য ও সাবেক এমপি সৈয়দ একে একরামুজ্জামানের ১০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। অনুরূপ পদক্ষেপ নেওয়া হয় ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির ‘বহিষ্কৃত’ যুগ্ম আহ্বায়ক ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর ক্ষেত্রেও। দলের ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া তার ১০ লাখ টাকাও ফেরত দেয় বিএনপির কেন্দ্রীয় ত্রাণ সংগ্রহ কমিটি।

আমরা তোমাদের ভুলবো না by সাজেদুল হক

ছেলেটি হাসপাতালের বেডে বসে আছে। মুখে হাসি। এক ফোঁটা দুঃখও নেই কোথাও। কে বলবে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার একটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে তার কথা, ‘আঙ্কেল লাগলে আবার যামু, দরকার হলে আরেকটা হাত দিমু।’ মুহূর্তে মনে হানা দেয় হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্প। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। যুদ্ধে পা হারায় ছেলেটি। ক্র্যাচে ভর দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখে প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেছে। এটা তার জীবনে তেমন কোনো ছাপ ফেলে না। সে ভাবে ‘একটি স্বাধীনতার কাছে এ ক্ষতি সামান্য।’ যদিও মা রহিমা তেমনটা ভাবতে পারেন না। জীবন তার সুবিশাল বাহু তার দিকে প্রসারিত করেনি। রাতে তার ঘুম হয় না।

জিহাদ হাসান মাহিম। আমাদের কলিগ পিন্টু আনোয়ারের আত্মীয়। ১৯শে জুলাই একবার গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। বাবা-মা সতর্ক করেছিল তাকে। বাবা আর যাইস না। সে বলেছিল, আমরা না গেলে দেশ পরিষ্কার হবে কীভাবে! ৫ই আগস্ট সকাল থেকেই উত্তেজনা। মাকে ফাঁকি দেয়ার জন্য মাহিম বলেছিল, ডিম সিদ্ধ বসাও। মা যেন বুঝতে না পারে মোবাইলটাও বাসায় রেখে বের হয়ে যায়। সেই ডিম নিয়ে মায়ের অপেক্ষা শেষ হয়নি। মাহিম তার ঘরে ফিরতে পারেনি। কোনোদিন পারবেও না।

আবু সাঈদ, মুগ্ধদের নাম আমরা জানি। অসংখ্য শহীদের নাম আমরা কেউ জানি না। বাংলা মায়ের মাটিতে কোথাও কি তাদের কবর হয়েছে? নাকি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাদের? ভ্যানগাড়িতে ময়লার মতো লাশ ফেলা হচ্ছে। এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ক’দিন আগে। আরও ভিডিও সামনে আসছে। আসছে লোমহর্ষক সব ছবি।

৫ই আগস্ট থেকে ৫ই সেপ্টেম্বর। একদা অসম্ভব মনে হওয়া হাসিনার পতনের এক মাস হলো। রাষ্ট্র এখনো পুরোপুরি স্থির হয়নি। একের পর এক চ্যালেঞ্জ আসছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে। কেউ কেউ বলছেন, ষড়যন্ত্র। ভিনদেশি শেয়ারহোল্ডাররা চেষ্টা করছেন সবকিছু অচল করার। রাজনৈতিক দলগুলোও যথাযথ ভূমিকা রাখছে কি-না সে প্রশ্নও উঠছে।

রক্ত নদী পেরিয়ে আসা বিজয়ের পর প্রধান কর্তব্য কী? আমরা মনে করি এ নিয়ে কোনো দ্বিধা-সংশয় থাকা উচিত নয়। শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান দিতে হবে। সরকার, সমন্বয়ক, রাজনীতিবিদ, মিডিয়া সবাইকেই এটা করতে হবে। যারা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তাদের বর্তমানকে বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের যেন আমরা কোনোদিনও ভুলে না যাই। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, দিনমজুর যারাই নিহত হয়েছেন তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে হবে। অনতিবিলম্বে তাদের পরিবারকে একটি প্রাথমিক অর্থ সম্মানী দিতে হবে। গুরুতর আহত, পঙ্গু হওয়াদের পাশেও রাষ্ট্র, সমাজকে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে। ভিডিওগুলো পুরোটা দেখতে পারি না। কারও হাত কেটে ফেলতে হয়েছে, কারও পা। চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছেন অনেকে। সরকার তাদের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে গুরুতর আহতদেরও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিতে হবে। নিহতদের পরিবার এবং আহতদের পাশে রাষ্ট্রকে সারা জীবন থাকতে হবে। এ ব্যাপারে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ফাউন্ডেশন সম্ভাব্য সবকিছু করবে বলেই প্রত্যাশা আমাদের। শহীদদের বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ে উঠেছে মূলত জুলাই ‘গণহত্যার’ বিচারের দাবিতে। এরইমধ্যে জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এ ঘটনার তদন্তে। যেটি নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সারা দেশে নিহতের ঘটনায় বেশ কিছু মামলাও করা হয়েছে। অনেকে বলছেন, এসব মামলা বিশৃঙ্খল। আইন উপদেষ্টা এরইমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আইনবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য এ আইনে কিছু সংশোধনী আনতে হবে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

জুলাই-আগস্টের শহীদদের প্রতি সমাজ, মিডিয়া, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবক্ষেত্র থেকেই যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।  ঢাকার মিডিয়ায় এখন পর্যন্ত শহীদদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসেনি। এটা অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামর্থ্যেরও ঘাটতি। গান, সিনেমা, নাটকে, পাঠ্যপুস্তকে শহীদদের অবদান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের আন্দোলনের যে মূল চেতনা বৈষম্যমুক্ত সমাজ এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কী করে শেখ হাসিনার পতন সম্ভব হলো তা নিয়ে এখনো নানা গবেষণা চলছে। চারদিকে এখনো বিস্ময়! মানুষ তো দূরের কথা অনেক রাষ্ট্রই এখনো এটা বিশ্বাস করতে পারছে না। যার গায়ে গুলি লাগে শুধু সেই সরে আর কেউ কেন সরে না- এটা আসলে বুঝা কঠিন, দুঃসাধ্য। সাদা চোখে যা বুঝা যায় আওয়ামী লীগ ও কিছু সহযোগী ছাড়া বাংলাদেশের সব মানুষকে এ আন্দোলন একই ছাতার নিচে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ আন্দোলনে অংশ নেয়া নারী শিক্ষার্থীদের পোশাকের বৈচিত্র্য প্রমাণ করে তা কতো বিস্তৃত ছিল। আন্দোলনে নিহতদের তালিকায় রয়েছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।  এ ভূমির মানুষ ইতিহাস তৈরি করেছে। যার নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্ররা। যারা জীবন দিয়েছে তাদের চেয়ে বড় ত্যাগ আর কারোরই নেই। তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’। 

৩ শতাধিক প্রভাবশালী দুদকের নজরে by মারুফ কিবরিয়া

৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে অনেকটা নীরব ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে সরকারের পালাবদলে রাতারাতি পাল্টে যায় সংস্থাটির কার্যক্রম। গত মাস থেকেই একের পর এক প্রভাবশালী ব্যক্তি যারা দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে গত ১৬ বছরে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এরই মধ্যে তিন শ’ জনের তালিকা ধরে এগুতে শুরু করেছে মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন আবদুল্লাহ কমিশন। দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে ৭০ জনের বেশি সংখ্যক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও পুলিশের কর্মকর্তাসহ সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ- ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, ব্যাংক ও শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি ও বেসরকারি জমি-সম্পত্তি দখল, লুটপাটসহ নানা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

সূত্রে জানা যায়, অনুসন্ধান শুরুর আগেই সংস্থাটির পক্ষ থেকে ১২টির বেশি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। সংস্থাটির গোয়েন্দা ইউনিটের তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায় থেকে অভিযোগ গ্রহণ করে ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো যাচাই বাছাই করে তাৎক্ষণিকভাবে কমিশন থেকে অনুসন্ধানের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, কমিশনের বর্তমান তৎপরতার ধারাবাহিকতায় গত দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী অর্ধশত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে ২৬ জন সাবেক এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। টানা তিন মেয়াদে বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ব্যাংক, বীমা, শেয়ারবাজার, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, তৎকালীন সরকারের মেগা প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট, দুর্নীতি ও পাচারের ঘটনা ঘটে। যদিও এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময় দুদকের কাছে এলেও সংস্থাটির চেয়ারম্যান/কমিশনাররা তাদের ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেননি।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সরকারি দল ক্ষমতায় থাকার কারণে নানা সময়ে দুদকে অভিযোগ আসলেও তা আমলে নিয়ে কাজ করতে পারেনি দুদক। তবে এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকায় কোনো চাপ নেই। যেকোনো দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে পারছে দুদক।

এদিকে, দুদক কেবল জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে জানা গেছে। দেশের যেসব ব্যাংক থেকে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা প্রভাব খাটিয়ে নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঋণ নিয়েছে, পরবর্তীতে সেসব ঋণ পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে; এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুদকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দ্বারা আলাদা টিম করে অনুসন্ধান করা হবে।      

৭০ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু: হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানসহ ৭০ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। এর মধ্যে গত ১৭ই আগস্ট সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ চার এমপি ও ১৮ই আগস্ট সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুদক। এর বাইরে ১৯শে আগস্ট সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশীসহ ৪১ জন মন্ত্রী-এমপি’র বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হয়। ২০শে আগস্ট সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানসহ পাঁচ এমপি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী (পিয়ন) মো. জাহাঙ্গীর আলম, ২৫শে আগস্ট সাবেক পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীসহ চার এমপি ও একজন সাবেক আমলা, ২৭শে আগস্ট সাবেক দুই এমপি, ২৮শে আগস্ট সাবেক মৎস্যমন্ত্রীসহ চার এমপি ও ২৯ষে আগস্ট সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমসহ দুই এমপি’র দুর্নীতি অনুসন্ধানে নামে সংস্থাটি।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, মুস্তফা কামালসহ চারজন এমপি’র নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা অপর সদস্যরা হলেন- সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও বেনজীর আহমেদ। মাত্র দেড় বছরে তাদের মালিকানাধীন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার লাখ শ্রমিক পাঠিয়ে ওই অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্যে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ গড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ফ্ল্যাট রয়েছে। সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে গোলাম দস্তগীর গাজী নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

তালিকায় আরও যারা রয়েছেন তারা হলেন- সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, সাবেক এমপি অসীম কুমার উকিল ও তার স্ত্রী যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি অপু উকিল। তালিকায় আছেন সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপ-প্রেসসচিব আশরাফুল আলম খোকন, সাবেক সহকারী (পিয়ন) ৪০০ কোটি টাকার মালিক মো. জাহাঙ্গীর, সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এবং সাবেক এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। এ ছাড়া সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, বরিশাল-২ আসনের সাবেক এমপি শাহ আলম তালুকদার, বরগুনা-১ আসনের সাবেক এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু ও তার ছেলে সুনাম দেবনাথ, গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মনসুর রহমান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান। দুদকের তালিকায় আছেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার, দিনাজপুর-৩ আসনের সাবেক এমপি ইকবালুর রহিম, মাগুরা-১ আসনের এমপি সাইফুজ্জামান শেখর, সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শফিকুল ইসলাম শফিক রয়েছেন।

এর বাইরে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। সাবেক মন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, খালিদ মাহমুদ, চৌধুরী ফরিদুল হক, ইমরান আহমদ, জাকির হোসেন, কামাল আহমেদ মজুমদার, জাহিদ আহসান রাসেল, নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, শাজাহান খান, হাছান মাহমুদ, কামরুল ইসলাম, হাসানুল হক ইনুর নামও রয়েছে দুদকের এই অনুসন্ধানের তালিকায়।

অন্যদিকে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব শাহ কামাল, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার প্রধান হারুন অর রশীদ, বিএসএমএমইউ’র সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব আরজিনা খাতুনের ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এ ছাড়া নতুন করে মঙ্গলবার বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়সহ তিন জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।

দুর্জয় ছাড়া বাকিরা হলেন- রাজশাহী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এনামুল হক ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তমাল মুনসুর। দুদকের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, প্রকল্পে অনিয়মসহ দেশে-বিদেশে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য আমলে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বুধবার সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানেও নেমেছে দুদক।

দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন বলেন, দুদকে অভিযোগ আনার পর দুর্নীতি দমন কমিশনে পদ্ধতিগত একটা সিস্টেম রয়েছে, যেভাবে কার্যক্রম চলছে। আমাদের একটা গোয়েন্দা উইং রয়েছে, সেখানে এগুলোর কার্যক্রম চলছিল। এটা চলমান ছিল, তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

২৬ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা:
অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন, এমন প্রভাবশালী ২৬ জনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুদক। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ যাওয়া রহিত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পুলিশের বিশেষ শাখাকে (ইমিগ্রেশন) নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আস সামছ জগলুল হোসেনের আদালত দুদকের পৃথক দুই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।

যাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, সাবেক প্রবাসী ও কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুল হক, সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, সাবেক ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী ফরিদুল হক খান, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মহিববুর রহমান, সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

শুধু তাই নয়, সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ, কাজী নাবিল আহমেদ ও শহিদুল ইসলাম বকুল, এ কে এম সরওয়ার জাহান, শেখ আফিল উদ্দিন, মেহের আফরোজ, আবু সাঈদ আল মাহমুদ ও শেখ হেলাল উদ্দিনকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এদিন দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম সাবেক ১০ মন্ত্রী ও তিন সংসদ সদস্যের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। এ সময় দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।

সাক্ষাৎকারে ক্রীড়া উপদেষ্টা: স্বপ্ন নয় দায়িত্ব by ইশতিয়াক পারভেজ

বয়সটা মাত্র ২৬ ছুঁয়েছে। এই বয়সে একজন তরুণ কী হওয়ার স্বপ্ন অন্তরে ধারণ করে? কেউ বড় কোনো চাকরির, কেউবা বিদেশে গিয়ে উন্নত জীবনের। আবার কারও স্বপ্ন ফুটবলার কিংবা ক্রিকেটার হওয়ার। ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা তারুণ্যের মনে দোলা দেয়। কিন্তু একেবারে নতুন বাংলাদেশের জন্য আন্দোলন করে সরকারের পরিবর্তন। সেখান থেকে মন্ত্রীর মর্যাদায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা হয়ে যাওয়া তো স্বপ্নের মতোই! হ্যাঁ, বলছিলাম আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কথা! কোটা সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। সচিবালয়ের চেয়ারে তাকে দেখে একটিবারও মনে হয়নি তিনি বিচলিত। তার কথাতেই স্পষ্ট ছাব্বিশেই তিনি স্বপ্নকে কবর দিয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছেন। ছোটবেলায় ফুটবল খেলার জন্য বাবা-মায়ের কাছে পিটুনি খাওয়া আসিফ অকপটে বলে দিলেন তার এই যাত্রা ‘স্বপ্ন নয়, দায়িত্ব’।  ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর শচীন টেন্ডুলকারভক্ত ক্রীড়া উপদেষ্টা জানালেন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা।

দৈনিক মানবজমিন-এর সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে সেই কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-

ছোটবেলায় কোন খেলাটাকে বেশি প্রধান্য দিয়েছেন?
আসিফ মাহমুদ: আমি ফুটবলই বেশি খেলেছি। ক্রিকেট খুব একটা খেলতাম না। তবে দর্শক হিসেবে ক্রিকেটটাই বেশি দেখেছি।

ফুটবলে কোন প্লেয়ারের ভক্ত আপনি?
আসিফ মাহমুদ: অবশ্যই আমার প্রিয় ফুটবলার রোনালদো (ক্রিস্টিয়ানো)। আমার প্রোফাইলে গেলেই দেখবেন আমি তার কত বড় ভক্ত।

খেলতে যাওয়ার জন্য মার খেয়েছেন বা পরিবারের বাধার মুখে পড়েছেন- এমন কোনো স্মৃতি আছে?
আসিফ মাহমুদ: এটাতো ছোটবেলায় সবারই সঙ্গে হয়, আমার সঙ্গে মনে হয় একটু বেশিই হয়েছে। আমি একটু পড়াশোনার চেয়ে খেলার দিকেই মনোযোগ দিতাম আর ভীষণ দুরন্ত ছিলাম। এই কারণেই মারও খেয়েছি অনেক। একটি নির্দিষ্ট দিন আমার সঙ্গে এমন হয়েছে তা নয়, এটি আমার জীবনের নিত্যদিনের ঘটনাই ছিল।

হঠাৎ করেই বদলে গেল অনেক কিছু। বলতে পারেন অনেকটা স্বপ্নের মতোই, একেবারে ছাত্র থেকে ক্রীড়া উপদেষ্টা... বিষয়টা কতটা গর্বের?
আসিফ মাহমুদ: না, স্বপ্নের মতো নয়, আবার গর্বও করবো না। এটি এখন আমার কাছে দায়িত্ব। এটি একটি বড় দায়িত্বের বিষয়। কারণ দেশের মানুষ আমাদের ওপর ভরসা করেছে। একটি সফল অভ্যুত্থান করার পর সরকার পরিচালনার জন্য তারা আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছে, ভরসা করেছে আমরা সেটি বাস্তবায়নে যতটা কাজ করতে পারি- সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবে দেশের ফুটবল শুধু পিছিয়েছে। ক্রিকেট এগিয়ে গেলেও সঠিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ফুটবল খেলাকে আবারো আগের জায়গাতে ফেরাতে আপনার পদক্ষেপ কী হবে?
আসিফ মাহমুদ: পূর্বের জায়গা নয়, কারণ সেটি বেঞ্চমার্ক হতে পারে না। ফুটবল হোক আর ক্রিকেট আমরা আগের জায়গা থেকে ভালোর দিকে  যেতে চাই। এইজন্য আমাদের কাঠামোগত সংস্কারগুলো করতে হবে। যেভাবে ক্রীড়াঙ্গনে নানা অনিয়ম চলে এসেছে এটি শুধু ১৬ বছর নয়, ৫০ বছর ধরে আমি মনে করি এখন প্রতিটি স্থানেই সংস্কার প্রয়োজন। শুধুমাত্র সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এমন নয়, বাইরে সভা-সেমিনারে বলা হচ্ছে সংবিধান পরিবর্তনের কথা। সংবিধান নিয়ে আলোচনাটা বেশি হচ্ছে। কিন্তু কাজ করতে এসে দেখছি যে, একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে একটি উপজেলার মাঠ থেকে শুরু করে আমার মন্ত্রণালয় পর্যন্ত প্রতিটি জায়গাতে কাঠামোগত এবং একই সঙ্গে ব্যক্তির পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিটি জায়গাতেই আমরা কাজ করবো।

সংস্কারে কি কি কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে?
আসিফ মাহমুদ: এরই মধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আমরা সার্চ কমিটি গঠন করে দিয়েছি ফেডারেশনগুলোকে সংস্কারের প্রস্তাবনা দেয়ার জন্য। এ ছাড়াও একটি স্পোর্টস ইনিস্টিটিউট গঠনের প্রক্রিয়া আমরা শুরু করেছি যেন আমরা পিক পারফরম্যান্স ডেভেলপ করার জন্য যেন প্লেয়ারদের সহযোগিতা করতে পারি। আমরা ফেডারেশনগুলোকে নিয়ে কাজ করছি,  দেখতে পাচ্ছেন যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেও (বিসিবি) পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আরও হবে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের পরিবর্তন নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করছি।

ফুটবল ও ক্রিকেটে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্লাবের সংখ্যা অনেক। অভিযোগ রয়েছে বিশেষ করে ক্রিকেটে এক ব্যক্তির অধীনেই রয়েছে ৪০টির মতো ক্লাব। তারা এখন নেই, সেখান থেকে এই ক্লাব ও ক্রিকেটারদের অভিষ্যৎ কী হবে?
আসিফ মাহমুদ: বিসিবি’র যারা নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের সঙ্গে আমার প্রথম কথাই ছিল যে, গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা। আর গঠনতন্ত্র অনুসারে একটি গাইডলাইন তৈরি করে দেয়া যেন একক কোনো ব্যক্তি এখানে কর্তৃত্ব করতে না পারে। আমার কাজের জন্যই বিসিবি’র গঠনতন্ত্র পড়তে হয়েছে। দেখেছি সেখানে কীভাবে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা অনিয়ম করা হয়েছে। ভোটের ক্ষেত্রে তো কিছু ক্লাবকে দু’টি করে ভোট দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যে কারণে গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন এনে গাইডলাইনও দিতে হবে যেন অন্য কোনো ব্যক্তি এসে এমন অনিয়ম করতে না পারে। কারও একক ক্ষমতা সেখানে না চলে। আর এমন নিয়ম করা হোক যেন বিসিবিতে কেউ দুইবারের বেশি সভাপতি হতে না পারেন।

বিসিবিতে দুর্নীতির বিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?
আসিফ মাহমুদ: আমি বিসিবি’র সভাপতি ফারুক আহমেদকে বলেছি যেখানে যেখানে দুর্নীতি হয়েছে তা খুঁজে বের করতে। বিশেষ করে বিসিবিতে আমরা বিভিন্ন সময় নানারকম দুর্নীতির কথা শুনি সেগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। ইতিমধ্যেই বিসিবি’র সভাপতি এ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে কোথায় কোথায় সংস্কার প্রয়োজন?
আসিফ মাহমুদ: সব জায়গাতে সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে সবার আগে গঠনতন্ত্রে বড় পরিবর্তনটাই আনা দরকার।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের কোন জয়টি স্মৃতিতে আছে?
আসিফ মাহমুদ: জয়ের চেয়ে একটি পরাজয়ই আমার স্মৃতিতে বেশি গেঁথে আছে। ২০১৫তে যে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপে হেরে গেলাম সেই ম্যাচটা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। আর দারুণ জয়তো গতকালই (পাকিস্তানের বিপক্ষে) আরও একটি পেলো।

আসামে বিদেশী চিহ্নিত করে বন্দী শিবিরে পাঠানো হলো ৪০ মুসলমানকে

নয়া দিগন্তঃ ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ৪০ জন বাংলাভাষী মুসলমানকে ‘বিদেশী’ বলে চিহ্নিত করে বন্দী শিবিরে পাঠানো হয়েছে। গত প্রায় এক মাসে, তিন দফায় বরপেটা জেলার ওই বাসিন্দাদের বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করেছে ওই রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল।

এদের মধ্যে নয়জন নারী আছেন। এর একজনের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি বাংলা, যার পরিবার দাবি করছে যে তার নাম জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ তিনি যে ভারতেরই নাগরিক, তা এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পরে ভারত সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছে।

অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, আগস্টের ৮, ৯ তারিখে ২২ জনকে আর ২ সেপ্টেম্বর আরো ২৮ জনকে এভাবে থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে হেফাজতে নেয়া হয়েছে। বিদেশী চিহ্নিতকরণের যে ট্রাইব্যুনাল আছে আসামে, সেখানে হাজির করানোর পরে তাদের সবাইকে গোয়ালপাড়ার মাতিয়ায় চিহ্নিত হওয়া বিদেশীদের জন্য যে ট্রানজিট ক্যাম্প আছে, সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ওই ট্রানজিট ক্যাম্পটি ভারতের সবথেকে বড় ডিটেনশান সেন্টার, যদিও এটির নাম পরিবর্তন করে এখন ট্রানজিট ক্যাম্প রাখা হয়েছে।

শিবিরে পথে বাসে কান্নাকাটি নারী-পুরুষদের
বরপেটার পুলিশ সুপারের অফিস থেকে ওই নারী-পুরুষদের একটি বাসে কড়া নিরাপত্তা দিয়ে গোয়ালপাড়ার ট্রানজিট ক্যাম্পে যখন নিয়ে যাওয়া হয়, ওই সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

সেটিতে দেখা যাচ্ছে, চিহ্নিত হওয়া ‘বিদেশী’দের পরিবার-পরিজন যেমন কান্নাকাটি করছেন, তেমনই বাসের ভেতরে বসা চিহ্নিত হওয়া ‘বিদেশী’রাও চিৎকার করে কাঁদছেন। আত্মীয় পরিজনদের কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে পড়েও কান্নাকাটি করছেন, এমনটাও দেখা গেছে ওই ভিডিওতে।

বরপেটার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট বিদ্যুৎ বিকাশ বরা ভুইঞা বার্তাসংস্থা এএনআইকে জানান, ‘জেলার সীমান্ত পুলিশ সোমবার বরপেটার বিভিন্ন থানায় বসবাসকারী ২৮ জন চিহ্নিত বিদেশীকে আটক করেছে। বিদেশী ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে বিদেশী বলে চিহ্নিত হওয়ার পরেই এদের গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে নয়জন নারী ও ১৯ জন পুরুষ আছেন। সব আনুষ্ঠানিকতার শেষে এদের গোয়ালপাড়ার শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গত মাসেও একইভাবে ২২ জন চিহ্নিত হওয়া বিদেশীকে আটক করা হয়েছিল।’

সই করতে ডাকা হয়
বরপেটা জেলার কলগাছিয়া থানা এলাকার ডিমাপুর গ্রামের বাসিন্দা নুরজাহান খাতুনের স্বামী জাহেদুল ইসলামকে পুলিশ থানায় দেখা করতে বলেছিল কিছু সই-সাবুদ করার জন্য।

নুরজাহান খাতুন বলেন, ‘থানা থেকে বলেছিল যে কিছু কাগজপত্র নিয়ে দেখা করতে, সই করতে হবে। সেই মোতাবেক আমার স্বামী থানায় যায়। কিন্তু সেখান থেকে পুলিশ সুপারের অফিসে পাঠানো হয়, আর তারপরেই গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।’

ওই নারীর সাথে যে অ্যাক্টিভিস্টের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া গেছে, সেই ফারুক খান বলছিলেন, ‘আমরা কাগজপত্র সব পরীক্ষা করে দেখতে পাই যে ২০০৪ সালে থানা থেকে একটি রিপোর্ট দেয়া হয় যে জাহেদুল ইসলাম নাকি বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। এর ভিত্তিতে তার ট্রাইব্যুনালে গিয়ে মামলা লড়া দরকার ছিল কিন্তু তার যুক্তি ছিল যে মিথ্যা অভিযোগের মামলা কেন লড়ব, কেন ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও সেটা প্রমাণ করতে হবে! তবে জাহেদুল ইসলাম ছাড়া বাকিরা কিন্তু ট্রাইব্যুনালে গিয়েছিলেন। তাদেরও একই পরিণতি হয়েছে।’

জাহেদুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান খাতুনের কথায়, ‘আমার স্বামীর এনআরসি-তে নাম আছে, তার নাম ডি-ভোটার তালিকাতেও ছিল না। সে জন্যই নিশ্চিন্ত ছিলাম আমরা। তবে সেই পুরনো রিপোর্টের ভিত্তিতে এখন তাকে বিদেশী বলে দেয়া হলো।’

তার দাবির সমর্থনে বেশ কিছু নথি বিবিসি বাংলাকে পাঠিয়েছেন নুরজাহান খাতুন।

ডি-ভোটার, বিদেশী ট্রাইব্যুনাল
আসামে ডি-ভোটার অথবা ডাউটফুল, অর্থাৎ সন্দেহজনক ভোটারদের চিহ্নিত করার নিয়ম চালু হয় ৯০ দশকের শেষ দিক থেকে। এর উদ্দেশ্য ছিল কথিত বাংলাদেশীদের ভোটার তালিকায় চিহ্নিত করে তাদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা।

প্রথমের দিকে কয়েক লাখ ডি-ভোটারকে চিহ্নিত করা হলেও পরে ধীরে ধীরে সই সংখ্যা কমতে থাকে। সম্প্রতি আসাম সরকার রাজ্য বিধানসভায় জানিয়েছে, এই মুহূর্তে সেখানে এক লাখ ১৯ হাজার ৫৭০ জন ডি-ভোটার আছেন।

অন্যদিকে ডি-ভোটার বলে চিহ্নিত করার পরে এক ব্যক্তিকে বিদেশী ট্রাইব্যুনালে যেতে হয় নিজেকে ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে।

এই ট্রাইব্যুনালগুলো আধা-বিচারালয় এবং এখানে বিচারকাজ পরিচালনা করেন যে ট্রাইব্যুনাল সদস্যরা, তারা আদতে বিচারক নন। আসাম সরকার এদের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ করে।

প্রায় ১০০টি এমন ট্রাইব্যুনাল আসামে কাজ করে।

ওই ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলা লড়েন যেসব উকিল, তারাও মক্কেলদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ নিয়েও যথার্থভাবে মামলা উপস্থাপন করেন না বলে অভিযোগ ওঠে। নানা সময়ে মক্কেলদের সঠিক শুনানির তারিখ বা ট্রাইব্যুনালের নির্দেশও পাঠান না, এমন অভিযোগও শোনা গেছে।

ট্রাইব্যুনালে বিদেশী বলে চিহ্নিত হলে গুয়াহাটি হাইকোর্টে আবেদন করা যায়। হাইকোর্ট আর সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করে বহু চিহ্নিত হওয়া ‘বিদেশী’ ছাড় পেয়েছেন।

একই গ্রামের তিন নারী আটক
বরপেটা জেলার অন্তর্গত হাওলি থানার কালাজার গ্রামের তিন নারীকে ২ সেপ্টেম্বর একইভাবে আটক করা হয়।

বুধবার ওই গ্রামে গিয়েছিলেন আসামের রাজ্যভিত্তিক দল, ‘রাইজর দল’-এর সম্পাদক ও অ্যাক্টিভিস্ট মনিরুজ্জামান।

সেখানে তাদের পরিবারের সাথে কথা বলেন তিনি।

মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখানে জবেদা খাতুন, সুফিয়া খাতুন ও রায়জান বেগম নামের তিন নারীকে আটক করে ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। তাদের নথিপত্র সব আমি দেখলাম। এদের মধ্যে জবেদা খাতুনের ব্যাপারটা হলো ২০১৬-১৭ সালে মামলা দেয়া হয়েছিল তার নামে। ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত নথি দিতে পারেননি বলে বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে যান তিনি। সেটা ২০১৯ সালের ঘটনা। তবে তার উকিল সেই নির্দেশের কথা জানাননি জবেদা খাতুনকে। ওই নির্দেশের ব্যাপারে সময়মতো জানা গেলে গুয়াহাটি হাইকোর্টে যাওয়া যেত। অন্যদের ক্ষেত্রেও দেখতে পাচ্ছি ট্রাইব্যুনালের উকিলদের একই রকম খামখেয়ালিপনা ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এমন অনেক ঘটনাই সামনে আসে, যেখানে উকিলরা অর্থ নিয়েও মক্কেলদের সঠিক পরামর্শ বা শুনানির দিন সম্বন্ধে জানান না। যার ফলে একতরফা অর্ডার দিয়ে দেয় ট্রাইব্যুনাল। ভুগতে হয় এমন সাধারণ গরীব মানুষকে।’
সূত্র : বিবিসি

ভারতে গরুর গোশত নিয়ে সন্দেহে মুসলিম যুবককে হত্যার বিষয়ে যা জানা যাচ্ছে

নয়া দিগন্তঃ ভারতের দিল্লি থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে হরিয়ানার চরখি দাদরির বাধরা এলাকায় এক মুসলিম যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে গো-রক্ষক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

নিহত ব্যক্তির নাম সাবির মালিক। তিনি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বাসিন্দা। ওই ব্যক্তি পরিবারের সাথে চরখি দাদরির একটি বস্তিতে থাকতেন। পেশায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ২৭ আগস্টের। গো-রক্ষক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা একটি পাত্রে এক টুকরো গোশত দেখতে পায়। তাদের সন্দেহ ছিল ওই টুকরোটি গরুর গোশত।

এর জেরে ওই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় গত ২৯ আগস্ট পুলিশ সাতজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এদের মধ্যে দু’জন নাবালক রয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট এক ব্যক্তিকে লাঠি দিয়ে পেটানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

সেখানে যে যুবককে মারধর করা হচ্ছিল তিনি ২৪ বছরের সাবির। তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায় একদল ব্যক্তিকে।

ওই ঘটনায় যুবকের মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে এলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পক্ষ থেকে সাবির মালিকের পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি এবং তাদের আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়াব সিং সাইনি এই ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যদিও তার মতে, একে ‘গণপিটুনির ঘটনা’ বলা ঠিক নয়।

ঘটনার নিন্দা রাজনীতিবিদদের
এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হরিয়ানার নুহ শহরের কংগ্রেস বিধায়ক আফতাব আহমেদ। ওই রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন তিনি।

আফতাব আহমেদ বলেন, ‘হরিয়ানায় আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। একজন দরিদ্র পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে টার্গেট করা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। তিন-চার দিন আগে এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি জানতে এত সময় লাগল কেন?’

উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীও এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, গরুর গোশত খাচ্ছে এই সন্দেহে চরখি দাদরিতে এক দরিদ্র যুবককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে মারার ঘটনাটি মানবতার জন্য লজ্জাজনক এবং এটি আইনের শাসনকে উন্মোচিত করে।

প্রসঙ্গত, মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকেও সম্প্রতি একই ধরনের একটি অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে।

ইগতপুরীর কাছে একটি এক্সপ্রেস ট্রেনে গরুর গোশত সাথে নিয়ে যাচ্ছেন সন্দেহে সত্তোর্ধ এক মুসলিম ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন যাত্রীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ২৮ আগস্টের।

এই দুই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তীব্র নিন্দায় সরব হয়েছেন অনেকেই।

লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও চরখি দাদরিতে যুবককে হত্যা এবং নাসিকে গরুর গোশত নিয়ে যাচ্ছেন এই সন্দেহে এক বৃদ্ধকে মারধরের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন।

এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধী লেখেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ঘৃণ্য উপাদানগুলো আইনের শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রকাশ্যে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। সংখ্যালঘুরা, বিশেষত মুসলমানদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং রাষ্ট্র নীরব দর্শকের মতো সব দেখছে।’

গরুর গোশত কেন্দ্র করে মারধর ও হত্যার যে ঘটনা দুটি প্রকাশ্যে এসেছে সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘এ ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা উচিত।’

ঘটনা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
এখন পর্যন্ত যে তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে সেখান থেকে জানা গেছে, চখরি দাদরি অঞ্চলের বাধরা বাসস্ট্যান্ডের সামনে এক মুসলিম বস্তি রয়েছে, যেখানকার বাসিন্দারা গরুর গোশত খাচ্ছেন বলে গো-রক্ষা দলের ব্যক্তিদের সন্দেহ হয়।

গত ২৭ আগস্ট ‘গো-রক্ষা’ দলের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা ওই বস্তির লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তারা একটি পাত্রে এক টুকরো গোশত দেখতে পান, যা গরুর গোশত বলে সন্দেহ করেন তারা।

এ সময় তারা ওই বস্তিতে বসবাসকারী শবরুদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যিনি নিহত সাবিরের আত্মীয় হন। জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনার ভিডিও করা হয়।

এফআইআর অনুযায়ী, পাত্রে থাকা গোশত গরুর কিনা জানতে চাইলে তিনি ওই গোশত মহিষের এ কথা জানিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন।

কিন্তু গো-রক্ষক দলের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা তাকে আবার ধরে আনে এবং ক্যামেরার সামনে স্বীকার করায় যে পাত্রে রাখা টুকরোটি গরুর গোশত।

এরপর গো-রক্ষকরা বাধরা পুলিশকেও এই বিষয়ে জানায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গোশতের টুকরোসহ কয়েকজনকে থানায় নিয়ে যায়।

এদিকে, সাবির মালিকের হত্যার ঘটনায় যিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি নিহত যুবকের শ্যালক সাজাউদ্দিন সর্দার।

অভিযোগকারী জানান, ‘২৭ আগস্ট কিছু লোক এসেছিল। ওরা আমাকে এবং আমার সাথে যারা আবর্জনা সংগ্রহ করছিল তাদের বলতে শুরু করে যে তোমরা এখনো মঙ্গলবারে গোশত খাও বা হতে পারে এটাই (পাত্রে থাকা গোশতের টুকরোকে ইঙ্গিত করে) গরুর গোশত। এরপর আমাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকজন আবার আমার ভগ্নিপতি সাবির মালিককে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যায়।’

ঘটনার দিনের বিবরণ দিতে গিয়ে সাজাউদ্দিন সর্দার যোগ করেন, ‘ওকে কিছু আবর্জনা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই কথা বলেই বাসস্ট্যান্ডে ভগ্নিপতিকে (সাবির মালিক) ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর, আসিরুদ্দিন নাম আরেকজনকেও ডেকে আনা হয়। সেখানে ওদের দু’জনকে চার-পাঁচজন ছেলে মিলে মারধর করে। আমার ভগ্নিপতি ও আসিরুদ্দিনকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। ভাইরাল ভিডিওটি আমিও দেখেছি।’

আসিরুদ্দিন জানান, গো-রক্ষকরা পুলিশের সাথে থানায় গিয়েছিলেন। তারা বস্তির লোকেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য চাপও দেয়।

আসিরউদ্দিনের অভিযোগ, তাকে এবং সাবির মালিককে বাধরা বাসস্ট্যান্ডের কাছে ডেকে নিয়ে লাঠি দিয়ে মারধর হয়।

তিনি জানান, স্থানীয়রা হস্তক্ষেপ করায় গো-রক্ষক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা সাবির মালিককে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়।

এফআইআর অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট রাতে ভান্ডওয়া গ্রামের কাছে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। পরে সেটি সাবির মালিকের লাশ বলে শনাক্ত করা হয়।

নিহতের শ্যালক সাজাউদ্দিন সর্দারের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৮ আগস্ট বাধরা থানার পুলিশ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে দু’জন নাবালকও রয়েছে।

এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ
গরুর গোশত নিয়ে কথা বলতে রাজি নয় নিহত যুবকের বাড়ির কেউই। তার পরিবারের সদস্যরা ৩০ আগস্ট চরখি দাদরি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যায়।

ওই সময় পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল।

বস্তির বাসিন্দারা জানায়, এই ঘটনার পরে তারা আতঙ্কে রয়েছেন এবং ওই এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছেন।

পুলিশ কী বলছে?
চরখি দাদরির বাধরা জেলার ডিএসপি ভূষণ জানান, ঘটনার ঠিক পরদিনই পুলিশ একটি মামলা দায়ের করে এই ঘটনায় অভিযুক্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে।

অভিযুক্ত দুই নাবালক ছাড়া সকলেই পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন। বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

হরিয়ানা পুলিশের কর্মকর্তা ধীরজ কুমার জানান, এলাকায় উত্তেজনা এড়াতে ফ্ল্যাগ মার্চ করছে পুলিশ। বর্তমানে সেখানে শান্তি বজায় রয়েছে।

তিনি জানান, এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত অন্য কোনো অভিযুক্তের নাম উঠে এলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সূত্র : বিবিসি

শুরা কাউন্সিলে ১৯ নারীকে নিয়োগ দিল সৌদি আরব

সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিল ১৯ জন নারীকে নিয়োগ দিয়েছে। দেশটির এমন পদক্ষেপকে সৌদির আইনি কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আরও এক ধাপ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সোমবার এক রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে তাদের চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনতে শুরা কাউন্সিলের ১৫০ আসনের মধ্যে ২০ শতাংশ নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখার বিধান করা হয়। এরই অংশ হিসেবে এই নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন কাউন্সিলের শুরা কাউন্সিলের স্পিকার শেখ ড. আব্দুল্লাহ আল শেখ।

নতুন নিয়োগ পাওয়া নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- ড. আরওয়া আল রাশিদ, ড. ইশরাক রাফি, ড. আমাল কাতান, ড. আমাল আল-হাজানি, ড. বুশরা আল-হামিদ এবং ড. তাকওয়া ওমর। এর আগে ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো শুরা কাউন্সিলে ৩০ জন নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোড়ন তৈরি করে।

শুরা কাউন্সিল মূলত উপদেষ্টা পরিষদ। তারা সৌদি সরকারকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। সৌদি আরবে ক্ষমতার দৃশ্যপটে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আবির্ভাবের পর থেকেই, দেশটিতে নারীর ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে।

এদিকে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে নিযুক্ত করেছে ইরান। ইরান সরকারের মুখপাত্র হিসেবে নিযুক্ত হওয়া ওই নারীর নাম ফাতেমেহ মোহাজেরানি। মন্ত্রিসভার বৈঠকের সময় তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানানো হয়। গত বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) পৃথক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানায় সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমস ও এনডিটিভি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান সরকারের নতুন মুখপাত্র হিসেবে ফাতেমেহ মোহাজেরানিকে নিযুক্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

পানি বাঁচাতে ৭শ’র বেশি বন্যপ্রাণী হত্যার পরিকল্পনা

কয়েক দশকের সবচেয়ে খারাপ খরা মোকাবেলা করছে আফ্রিকার দেশ নামিবিয়া। দেখা দিয়েছে পানি ও খাদ্যের তীব্র অভাব। এমন পরিস্থিতিতে খাবার পানি বাঁচাতে এবং হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা নিবারনের জন্য ৭শ’র বেশি বন্যপ্রাণী হত্যার পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার।

ইতোমধ্যে ১৬০টি প্রাণীকে হত্যা করা হয়েছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রাণীর মাংস ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে সরবরাহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে এ কথা জানানো হয়।

এর আগে দেশটির পরিবেশ, বন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ৮৩টি হাতি, ৩০টি জলহস্তী, ৬০টি মহিষ, ৫০টি ইমপালা, ১০০টি নীল বন্য প্রাণী এবং ১০০টি জেব্রাকে হত্যা করা হবে। প্রাণীগুলোকে জাতীয় উদ্যান এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে আনা হবে এবং পেশাদার শিকারীদের দ্বারা হত্যা করা হবে বলেও জানানো হয়েছিল বিজ্ঞপ্তিতে।

মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, এই কর্মসূচির লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার দেশটিতে চলমান খাদ্যের অভাব কমাতে সাহায্য করা। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা পানির পরিমাণের তূলনায় অনেক বেশি। এ অবস্থায় প্রাণীগুলো খাদ্য এবং পানির সন্ধান লোকালয়ে চলে আসতে পারে।

মন্ত্রণালয় থেকে আরও বলা হয়, বন্যপ্রাণী হত্যার এই পরিকল্পনা হাতি এবং মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা হ্রাস করার ক্ষেত্রেও সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নামিবিয়া হল দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলির মধ্যে একটি যেগুলি এল নিনোর দ্বারা চালিত বিধ্বংসী খরার সাথে লড়াই করছে। ঝলসে যাওয়া তাপমাত্রার সাথে বৃষ্টির অভাব এই অঞ্চলের কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য ফসলের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে এবং ক্ষুধার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, খরার প্রভাব খারাপ হওয়ায় নামিবিয়া মে মাসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল। তখন আনুমানিক ১.৪ মিলিয়ন লোক, নামিবিয়ার প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা উচ্চ মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

কেজিপ্রতি ৬ টাকা বেড়েছে চালের দাম

কোনো সংকট না থাকলেও আবারও বাড়ল চালের দাম। ১০ দিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির প্রতি বস্তায় চালের দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এরমধ্যে বন্যায় ত্রাণ হিসেবে চাহিদা বাড়ায় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটা চালের দাম। একইসঙ্গে দেশের উত্তর এবং দক্ষিণাঞ্চলের মোকামগুলোতে ধান ও চালের মজুত গড়ে তুলে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় বেশকিছু ধানের মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকদিন পর ধান ঘরে তোলার কথা ছিল কৃষকদের, কিন্তু আউশ ধান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর তাতে দাম বেড়েছে ধানের। এর প্রভাব পড়েছে চালেও। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আউশ ধান খুব বেশি চাষ হয় না, তাও আউশ ধান ঘরে তোলার কথা মাস খানেক পর, তাই এখনই ধান নষ্টের প্রভাব চালের দামে পড়ার কথা না।

ভোক্তাদের দাবি, চট্টগ্রাম ও আশপাশে বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ হিসেবে বিতরণের কারণে মোটা চালের চাহিদা বেড়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মোটা চালসহ প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে চার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) নগরীর চাক্তাই চালপট্টি ও পাহাড়তলীতে পাইকারি চালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, চট্টগ্রামে চালের কোনো মোকাম না থাকলেও নগরীর পাহাড়তলী বাজারের ২০০ গুদামে প্রতিদিন ১০০ ট্রাকবোঝাই দেড় হাজার টন এবং চাক্তাই বাজারের ১০০ গুদামে ১ হাজার ৩০০ টন চাল আসছে।

দেশে বন্যা দেখা দেওয়ার আগে, অর্থাৎ গত ২০ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামের বাজারে সাধারণ মানের মোটা সিদ্ধ ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চাল বিক্রি হয়েছে ২ হাজার টাকা দরে। কিন্তু এখন সেই চালের দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। একইভাবে ২ হাজার ২০০ টাকার গুটি স্বর্ণা ২ হাজার ৬০০ টাকা, ২ হাজার ৫০০ টাকার নূরজাহান স্বর্ণা ২ হাজার ৮০০ এবং ৩ হাজার ২৫০ টাকার ঝিরাশাইল ৩ হাজার ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সব ধরনের চালের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।

এদিকে, সিদ্ধ চালের মতো অবস্থা আতপ চালের বাজারেও। ১ হাজার ৯০০ টাকার ইরি আতপ ২ হাজার ৪০০ টাকা, ২ হাজার ৫০০ টাকার বেথি ২ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৩ হাজার ২০০ টাকার কাটারী ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম পাহাড়তলী ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. জাফর আলম বলেন, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে এলসি খুলে রাখা যেতে পারে। এতে করে দেশে চালের সংকট দেখা দিলে বা দাম বেড়ে গেলে বাইরে থেকে সহজেই চাল আমদানি করা যাবে। পাশাপাশি বাড়াতে হবে মনিটরিং। তা না হলে লাগামহীন হয়ে পড়তে পারে চালের বাজার।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর মেসার্স আজমীর স্টোরের মালিক এস এম নিজাম উদ্দিন জানান, বন্যার কারণে আড়তগুলোতে চাল আমদানি কম হয়েছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চাল মজুদ করায় দাম বাড়ছে।

তবে এখনই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ধানের প্রভাব বাজারে পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুচ ছোবহান। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে আউশ-আমন মিলে বীজতলাসহ রোপা ধান ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ২৮৭ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে ১৫ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর ১৫ হাজার ৫১৮ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আউশ ধান দেশে বেশি চাষ হয় না। আর আমন ধান ঘরে আসার কথা ডিসেম্বরে। ধানের ক্ষতির প্রভাব এখনই বাজারে পড়ার সম্ভাবনা নেই। আর যেসব কৃষকের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমরা অন্যান্য এলাকার সঙ্গে সমন্বয় করে সেটা ঠিক করার চেষ্টা করছি।

ধর্ষণ-হত্যা: মোমবাতি জ্বালিয়ে ওই নারী চিকিৎসককে স্মরণ, কলকাতার রাজপথে রাতেও প্রতিবাদ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদে এখনো উত্তাল রয়েছে পুরো রাজ্য। বুধবার রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে আলো নিভিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে মোমবাতি ও প্রদীপ জ্বালিয়ে ওই নারী চিকিৎসককে স্মরণ করেছে মানুষ। রাজ্যের জুনিয়র চিকিৎসকেরা এই কর্মসূচি ডেকেছিলেন।

নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় বিচারের দাবিতে আজ রাতভর কলকাতার রাজপথে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এর আগে ১৪ আগস্ট রাতে একইভাবে রাজপথে আন্দোলন করেন নারীরা। আন্দোলনে সামিল হওয়া ব্যক্তিদের দাবি, হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

বুধবার বিকেল থেকেই বাম ছাত্র ও যুব সংগঠন এসএফআই ও ডিওয়াইএফআই শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে আসছে। প্রকৃত খুনী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ চাওয়া হয়েছে।

বালিগঞ্জ এলাকার সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা বিকেলে পথে নামেন। গড়িয়াহাটার মোড়ে মানববন্ধন করেন তারা। দাবি তোলেন, অবিলম্বে নিহত চিকিৎসকের হত্যাকারীদের শনাক্ত করে শাস্তি দিতে হবে। জাতীয় কংগ্রেসও কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিল করেছে।

বিজেপি আজও জেলায় জেলায় বিডিও অফিস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি পালন করেছে। ওন্দা, বাঁকুরা, পাশকুড়ায় পুলিশের সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে আরজি করে নারী চিকিৎসকের হত্যাকান্ড নিয়ে যখন চলমান আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো ভারতে ছড়াতে শুরু করেছে; তখন সোনারপুর দক্ষিণের তৃণমূল বিধায়ক অভিনেত্রী লাভলি মৈত্রের মন্তব্য আগুনে ঘি ঢেলেছে। তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা বদল চেয়েছি কিন্তু বদলা নেই। এবার বদলা নেব।’

লাভলী মৈত্র আন্দোলনরত চিকিৎসকদেরওষোদাগার করেছেন। তাঁর মন্তব্যের বিরুদ্ধে বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়েছে। আগামী শুক্রবার বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের এজলাসে শুনানি হতে পারে।

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আরজি কর হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মুখ খুলেছেন ওই চিকিৎসকের মা–বাবা আর স্বজনেরা। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওই চিকিৎসকের মা–বাবা অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন তাদের মেয়েকে দেখতে দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অধ্যক্ষের রুমে নিয়ে গিয়ে পুলিশের মাধ্যমে সাদা কাগজে সই নিতে চেয়েছিল।

তারা বলেন, ওই দিন টাকা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করতে চাওয়া হয়েছিল। এমনকি তাদের টালা থানায় বসিয়ে রেখে মৃতদেহের সৎকার করা হয়েছে। তাই তাদের প্রশ্ন, কারা দিয়েছিল সৎকারের টাকা?

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও প্রশ্ন উঠেছে, হত্যাকান্ড নিয়ে পুলিশ কেন এত সক্রিয়তা দেখিয়েছিল? কী তারা লুকাতে চেয়েছিল? কার নির্দেশে এসব ঘটনা ঘটেছে? এর পেছনে কি রহস্য ছিল?

জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী দল এএফডির উত্থানে চিন্তিত ব্যবসায়ী মহল

জার্মানির থুরিঙ্গিয়া রাজ্যের প্রাদেশিক নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। সাক্সনিতে ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক পার্টি (সিডিইউ) সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও দ্বিতীয় অবস্থানে আছে এএফডি। সিডিইউ থেকে তাদের ভোটের ব্যবধান খুবই কম। একসময় কমিউনিস্ট–শাসিত পূর্ব জার্মানিতে ডানপন্থীদের দিকে এ রাজনৈতিক ঝোঁকের ফল নিয়ে চিন্তিত অনেকেই, বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহল।

এই দুই রাজ্যের ফলাফল প্রকাশের পর এএফডি নেতারা বলেছেন, তাঁরা আঞ্চলিক সরকারে আসতে চান। তাঁদের দাবি, মানুষ তাঁদের ও সিডিইউর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে সিডিইউ নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এএফডির সঙ্গে হাত মেলাবেন না।

নির্বাচনের আগে শ্রম ইউনিয়ন ও শিল্প-বাণিজ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, এএফডি জিতলে তার প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। তখন বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যেতে পারেন। তাঁদের আশঙ্কা, সে ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে, যা তাঁরা চান না।
শিল্পপতি ওলাফ শাখার্ট সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন, কোনো অঞ্চল তাঁদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নয়, তাহলে তাঁরা সেখানে যাবেন না। এএফডির প্রতি সমর্থন বেড়ে যাওয়ার পর সাক্সনি ও থুরিঙ্গিয়াতে বিনিয়োগ করার আগে তাঁরা দুবার ভাববেন।

বিজনেস লবি গ্রুপ ও অর্থনীতিবিদেরা চিন্তিত

এই দুই রাজ্যে ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর জার্মান এমপ্লয়িস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএ) প্রেসিডেন্ট সুস্থির রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতির বাড়বাড়ন্তের মধ্যে সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এএফডির উত্থান থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, জার্মানি এখন দিশায় চলেছে, তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন ও তাদের আস্থা কমছে। তিনি ডানপন্থীদের প্রতি মানুষের ঝোঁকের জন্য আংশিকভাবে চ্যান্সেলর শলৎজের নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, শলৎজের নেতৃত্বাধীন তিন দলের জোটকে তাদের নীতি বদলাতে হবে।

বিডিএ প্রেসিডেন্ট বার্তা সংস্থা ডিপিএকে বলেছেন, এই দুই রাজ্যে নির্বাচনের ফলাফল জোট সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা। সরকারকে চাকরি ও সামাজিক সংহতির বিষয়টি সব সময় মাথায় রাখতে হবে।

নির্বাচনের পর কিছু অর্থনীতিবিদ বলেছেন, পূর্ব জার্মানিতে দক্ষ শ্রমিকদের বিপুল অভাব রয়েছে। তার ওপর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক কোম্পানি সেখান থেকে চলে যেতে পারে।

জার্মান কাউন্সিল অব ইকোনমিক এক্সপার্টের চেয়ারম্যান মনিকা স্নিৎজার বলেছেন, থুরিঙ্গিয়া ও সাক্সনিভিত্তিক সংস্থাগুলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক না পেয়ে অসুবিধায় পড়তে পারে। সরকারি সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনই কর্মী–সংকটে ভুগছে। এটা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে দক্ষ শ্রমিক নিয়ে এএফডির অবস্থানের পর।

জার্মান ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিসার্চের প্রেসিডেন্ট মার্সেল ফ্রাটশারও বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি চিন্তিত। তিনি বলেছেন, এএফডি বাণিজ্যিক সুরক্ষা, অভিবাসন কমানোর নীতি নিয়ে চলতে চায়। এতে অনেক কোম্পানি চলে যেতে পারে। দক্ষ শ্রমিকেরা পূর্ব জার্মানির প্রতি উৎসাহ হারাতে পারেন। এর প্রভাব ওখানকার অর্থনীতিতে পড়বে। তরুণ ও দক্ষ নাগরিকেরা ওই দুই রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারেন, যেখানে তাঁদের কদর বেশি হবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘সৌজন্য বিনিময়ে’ আসছে ইসি

সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘সৌজন্য বিনিময়’ করবে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করবেন নির্বাচন কমিশনাররা। এই সৌজন্য বিনিময়ে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের ঘোষণা আসতে পারে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন পর্যন্ত চুপচাপ আছে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় নিয়ে দোটানায় পড়েছে তারা। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বার্তা পায়নি ইসি। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনাররা নিয়মিত অফিস করছেন।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরদিনই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা শপথ নেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।

ইসি সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর নির্বাচন কমিশনাররা ধরে নিয়েছেন, তাঁদেরও পদত্যাগ করতে হবে। এ জন্য তাঁরা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। তবে তাঁরা নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন, নাকি এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্য কোনো চিন্তা আছে, তা বোঝার চেষ্টায় ছিল ইসি। এ বিষয়ে পরামর্শের জন্য তাঁরা রাষ্ট্রপতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন; কিন্তু তাতে সফল হননি।

এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ে আসছেন সিইসি ও অন্য কমিশনাররা। নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. শরিফুল আলম জানান, আগামীকাল দুপুর ১২টায় নির্বাচন ভবনের সম্মেলনকক্ষে নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করবে। এই সৌজন্য বিনিময়ে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের ঘোষণা আসতে পারে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি বলেন, কখন নির্বাচন হবে, সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারের নয়। তবে নির্বাচন কমিশনকে সংস্কার করে যেকোনো সময় আদর্শ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানায়, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন করার কথা বলা আছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব নয়, তা পরিষ্কার; কিন্তু সংবিধান স্থগিত করা হয়নি বা সরকার পতনের পরে কোনো ফরমানও জারি করা হয়নি। ফলে নির্বাচন করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়ে গেছে। এই কমিশন যদি আরও এক-দুই মাস দায়িত্বে থাকে, তাহলে এ বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে। কারণ, নির্বাচন আয়োজন করার সাংবিধানিক দায়িত্ব ইসির। আইনি ফাঁকফোকর রেখে যদি নির্বাচন পেছানো হয়, তাহলে কোনো একসময় ইসিকে সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। এ ছাড়া যেভাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি সংবিধান মেনে হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে।

সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল ২৪ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বিপ্লব ও ফরমান: সরকার ও সংবিধান’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন সংবিধান ও সফল বিপ্লবোত্তর সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে সংকটে রয়েছে।’

সিইসি তাঁর কলামে আরও লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণ যখনই হোক না কেন, রাষ্ট্র ও সরকারের আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি মজবুত করতে হলে সফল বিপ্লবোত্তর উদ্ভূত এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে একটি অসামরিক ফরমান জারি করে প্রচলিত সংবিধান স্থগিত বা পাশাপাশি বহাল রেখে অসামরিক ফরমানকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে অবস্থান প্রদান করে সাংবিধানিক বা আইনগত সংকট পরিহার করা প্রয়োজন।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এই কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর। এর আগের কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশনের মতো হাবিবুল আউয়াল কমিশন নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ছিল। প্রথমবারের মতো একটি আইনের মাধ্যমে এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তবে ২০২২ সালে প্রণয়ন করা ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন’ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

দেশের অন্যতম প্রধান বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ ইসিতে নিবন্ধিত বেশির ভাগ দল হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে মেনে নেয়নি। ইসির সংলাপের আহ্বানও প্রত্যাখ্যান করেছিল বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল ও জোট। এই কমিশনের আমলে গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বর্জন করে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। শুধু আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলো ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। জাতীয় নির্বাচনের আগে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়া, বিতর্কিত বিভিন্ন সংস্থাকে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে অনুমোদন দেওয়া, আইনে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করার প্রস্তাব দেওয়া, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মত পাল্টানোসহ কমিশনের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ছিল।

‘জাতীয় সরকার’ ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিকল্পনা জানালেন তারেক রহমান

জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি ভবিষ্যতে ‘জাতীয় সরকারের’ মাধ্যমে দেশ পরিচালনা চায় বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পর একটা জাতীয় সরকারের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসায় দেশ প্রথম দিন থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে একটা বিরাট অংশ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশ গঠনে কোনো অবদান রাখতে পারেনি। স্বাধীনতার পরপর জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে ব্যবহার না করে সেদিন যে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, আগামী দিনে আমরা তার পুনরাবৃত্তি চাই না।’

তারেক রহমান আরও বলেন, এ দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁরা আগামী দিনে দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণ করবেন। যাতে দেশ তাঁদের অবদানের সুফল থেকে বঞ্চিত না হয়।

আজ বুধবার বিএনপির ঢাকা বিভাগের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ কথাগুলো বলেন। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় উপস্থিত ছিলেন।

দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরিকল্পনার কথা দেশবাসীকে জানানো প্রয়োজন মনে করছি। দেশে প্রথাগত রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, কিন্তু দেশ গঠন, উন্নয়ন ও পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে চান, এমন অসংখ্য জ্ঞানী, গুণী শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী রয়েছেন; কিন্তু বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে তাঁদের পক্ষে সংসদে সদস্য হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ নেই। তাঁদের সেবা আর অবদান দেশের কাজে লাগাতে বিএনপি উচ্চ কক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত দেখতে চায়।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বিনয়ের সঙ্গে শুধু আমাদের আগামী দিনের পরিকল্পনা আর সদিচ্ছার কথা জানাতে পারি। কারণ, আমরা জানি, দেশের মানুষের সমর্থনই কেবল আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে।’

জাতীয় সরকারে কারা থাকবেন, তার ইঙ্গিত দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণ নিশ্চয়ই সেসব দল বা ব্যক্তিকে জাতীয় সরকারে শামিল দেখতে চাইবেন না, যারা পুরো দেশটাকে একটা দল আর পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। যারা তথাকথিত উন্নয়নের নামে আমাদের প্রত্যেকের কাঁধে দেড় লাখ টাকার ঋণের বোঝা চাপিয়ে হাজার হাজার, লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। গুম-খুন, হামলা-মামলা নির্যাতনে দেশের মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেছে। আইন, বিচার, নির্বাহী বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব কটি স্তম্ভ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি পালিয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তেও শত শত নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত করেছে রাজধানীসহ সারা দেশ। জনগণ নিশ্চয়ই সেই জালিমদের জাতীয় সরকারে অন্তর্ভুক্ত দেখতে চাইবেন না।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের আশা ও ভাষার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য নেতা-কর্মীদের পরামর্শ দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। সেই সঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক সময়ের গজিয়ে ওঠা ‘অদৃশ্য প্রতিপক্ষ’ মোকাবিলায় নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর কৌশল প্রয়োগের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘আপনার আত্মত্যাগ আর অবদান মুষ্টিমেয় হঠকারীর অপকর্মে ক্ষতিগ্রস্ত হতে কেন দেবেন? সতর্ক থাকুন, সচেতন হোন, প্রতিরোধ করুন।’

সিলেটে বিরোধী দমনে গুলিতে পারদর্শী দস্তগীর by ওয়েছ খছরু

১৯শে জুলাই। শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষ হতেই বিএনপি’র মিছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিল। অনেক সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত। এডিসি (ক্রাইম) সাদেক কাউসার দস্তগীরের নেতৃত্বে পুলিশের শতাধিক সদস্য সেখানে অবস্থানে ছিলেন। ফটোসাংবাদিক এটিএম তুরাব সড়কের রেলিং এক হাত দিয়ে ধরে অন্য হাতে ক্যামেরা চালাচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ ‘বিগড়ে’ গেলেন এডিসি (ক্রাইম) দস্তগীর। কনস্টেবলের হাত থেকে একটি বন্দুক নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া শুরু করলেন। তার দেখাদেখি অন্য পুলিশ সদস্যরাও বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ে।

এদিন পুলিশের গুলিতে রক্ত ঝরে নগরের কোর্ট পয়েন্টে। উপস্থিত সাংবাদিকরা জানান- পুলিশের গোলাগুলির ফাঁকেই তাদের নজরে পড়েন নিহত হওয়া সাংবাদিক এটিএম তুরাব। রক্তাক্ত অবস্থায় বসে আছেন সড়কে। শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে গুলি লাগেনি। পরে হাসপাতালে নেয়া হলে তুরাব মারা যান। কিন্তু ওইদিনের ঘটনা ভুলতে পারছেন না সিলেটের মাঠের সাংবাদিকরা। তারা জানিয়েছেন- পুলিশ কর্মকর্তা দস্তগীর অতি উৎসাহী হয়ে গুলি না ছুড়লে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু তার গুলিই গোটা পরিস্থিতি বদলে দেয়। রক্তাক্ত হয় কোর্ট পয়েন্ট। প্রথমেই আক্রান্ত হন সাংবাদিক তুরাব। যেহেতু তিনি রেলিংয়ের কাছে ছিলেন, পেছনে যাওয়ার জায়গা ছিল না সে কারণে বুলেটের পর বুলেটে বিদ্ধ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু ঘটে। এমন ঘটনা সিলেটের রাজপথে কখনোই ঘটেনি। সরাসরি আক্রান্ত হননি সাংবাদিকরা। কিন্তু সিলেটের এই পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বেপরোয়া। তার বেপরোয়া আচরণের কারণেই ওইদিন রক্তাক্ত হয় নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। ১৯শে জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট সিলেটের রাজপথে দাপট দেখিয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এই কর্মকর্তা। ছিলেন ছাত্র-জনতার আতঙ্ক। হাজারে হাজার গুলি বর্ষিত হয়েছে তার হাত ধরে। ঘটনা প্রবাহের সময় নগরের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ফটক, মদিনা মার্কেট, আখালিয়া সুরমা আবাসিক এলাকার গলির মুখে অ্যাকশন কর্মকর্তা হিসেবে তাকেই দেখা গেছে অগ্রভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন- সে শুধু গুলিবর্ষণই করেনি, শিক্ষার্থী ও জনতাকে অকথ্য গালিগালাজ করেছে। তার সঙ্গে পুলিশের ডিসি আজবাহার ও সিআরটি প্রধান মামুন ছিলেন বেপরোয়া। তবে দস্তগীরের আচরণেই সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয় শিক্ষার্থীরা। সে শিক্ষার্থী দেখলেই গুলিবর্ষণ করতো। ৫ই আগস্ট দুপুর পর্যন্ত প্রাণপণে সিলেটের ছাত্র আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করেন দস্তগীর। বিএনপি’র নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন; ৫ই আগস্ট নগরের কোর্ট পয়েন্টে বিজয় মিছিলের আগে দস্তগীরের নেতৃত্বে পুলিশ দল অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। এরপর কোর্ট পয়েন্ট ও দরগাহ’র প্রধান ফটক পর্যন্ত গুলিবর্ষণ করে ছাত্র-জনতাকে পিছু হটানোর চেষ্টা করে। পরে অবশ্য ছাত্র-জনতা দরগাহের ভেতরে ঢুকে রক্ষা পান। পট-পরিবর্তনে সিলেটে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন দস্তগীর। তাকে ঘিরে সব ক্ষোভ ছিল ছাত্র-জনতার। এ কারণে সাংবাদিক আবু তুরাব হত্যা মামলায় তাকে উপরের সারিতে আসামি করা হয়েছে। এ মামলার বাদী তুরাবের ভাই আবুল হাসান মো. আজরফ জানিয়েছেন- তুরাব মামলা নিয়ে পুলিশ অনেক নাটক করেছে। ৫ই আগস্টের আগে আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। পরে অবশ্য মূল অভিযুক্তদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আশা করছি তদন্তে সত্যতা মিলবে। এদিকে- পট-পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান পুলিশ কর্মকর্তা দস্তগীর। তার বিরুদ্ধে সিলেটে দুটি হত্যা মামলা ছাড়া অন্তত ১০টি মামলা করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরাই আসামি করে তার বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে যখনই সিলেটে ক্ষোভ, তখন প্রথমে তাকে পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছিলো। পরে তারা শেরপুরে পুলিশ ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়। সিলেটের প্রতাবশালী এ পুলিশ কর্মকর্তা বসবাস করতেন নগরের শিবগঞ্জের সাইফা সামিট টাওয়ারে। ওই বাসা ছেড়ে গোপনে তিনি সিলেট ছেড়েছেন বাসিন্দারা। তারা জানান- ৫ই আগস্টের পর থেকে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কখনোই প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমনকি তার পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন আত্মগোপনে। তবে; সিলেট বিএনপি’র একাধিক নেতা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কোতোয়ালি থানার এসি থাকাকালে দস্তগীর ওই সময় বিএনপিসহ বিরোধীদের দেখলেই গুলি করতেন। এমনকি প্রকাশ্যে রাজপথে কর্মসূচি পালনের সময় অকথ্য গালিগালাজ ও অসভ্য আচরণ করতেন। তারা বলেন- সিলেটে সমালোচিত এ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সে যেখানেই থাকুক সিলেটে আসতে হবে। অপরাধের জন্য তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও তার নেই। সাংবাদিকরা জানিয়েছেন- কয়েক বছর আগে সিলেটের আলোচিত সাবেক পুলিশ কমিশনার (বর্তমানে কারাবন্দি) মিজানুর রহমানের অন্যতম সহযোগী ছিল এই দস্তগীর। তখন তার নেতৃত্বেই সিলেটের এক সিনিয়র সাংবাদিককে হেনস্তা করা হয়েছিলো। ওই সময় আলোচিত হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেল্টারে সিলেটে বহাল তবিয়তে ছিল এ পুলিশ কর্মকর্তা।   

শতকোটি টাকার মালিক কামাল by কামরুল ইসলাম

কামাল হোসেন। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার সাবেকমন্ত্রী তাজুল ইসলামের উন্নয়ন সমন্বয়কারী। একসময় কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসের দালাল ছিলেন। এরপর জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। সাবেক মন্ত্রীর আশীর্বাদে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগের সদস্য হন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গত ১১ বছরে বনে যান শতকোটি টাকার মালিক। তার বিরুদ্ধে কুমিল্লা দুদকে মামলা হলেও মন্ত্রী তাজুল ও কুমিল্লার সংসদ সদস্য বাহারের হুমকিতে হয়নি তদন্ত।

সরজমিন জানা যায়, মনোহরগঞ্জ উপজেলা লক্ষণপুর গ্রামে নূর মোহাম্মদের পুত্র কামাল হোসেন। লেখাপড়ার গণ্ডি খুব বেশি এগোয়নি। তার পিতা কৃষিকাজের পাশাপাশি লক্ষণপুর বাজারে কাঁচা তরকারি বিক্রি করতেন।

অভাবের সংসারে হাল ধরতে তিনি কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসে এক দালালের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৯৬ সালে এমপি তাজুলের হাত ধরে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে যুবলীগের সদস্য হন। তাজুল ইসলাম স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর ভাগ্যের চাকা খুলতে থাকে কামালের। মন্ত্রীর উন্নয়ন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেয়া হয়। কুমিল্লা এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড় বড় কাজের ঠিকাদারি করার পাশাপাশি বড় বড় কাজগুলোর টেন্ডার তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ ঠিকাদারদের দেয়া হতো না। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব কাজ করতেন। চট্টগ্রাম বিভাগের এলজিইডি প্রকল্পে তার নির্দেশ ছাড়া কোনো ঠিকাদারদের কাজ দেয়া হতো না। এ ছাড়া উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বদলির কাজ করতেন।

কামাল কুমিল্লায় বসবাস করতেন। তাজুল ইসলামের উন্নয়ন সমন্বয়কারী হওয়ায় বাহারের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। রাতারাতি ভাগ্যের চাকা খুলতে থাকে তার। নিজ এলাকা লক্ষণপুর বাজারে বিশাল একটি মার্কেট নির্মাণ করেন। গত সংসদ নির্বাচনে বাহারের দায়িত্বে ছিলেন কামাল। কয়েক মাস পরপর গাড়ি পরিবর্তন করতেন। সর্বশেষ ২০২২ সালে কামাল টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িতে করে চলাফেরা করতেন। তখনই আলোচনায় আসেন। কুমিল্লা এলজিইডি পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি মন্ত্রীর কমিশন বাণিজ্যে ও দুর্নীতির মাধ্যমে শ’ শ’ কোটি টাকার মলিক হন। মাস্টার এন্টারপ্রাইজ নামে লাকসাম, কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় কাজ তার লাইসেন্সে করা হতো। কুমিল্লা আদর্শ উপজেলায় তার নামে ১০তলায় ২টি ফ্লোর, কুমিল্লা সদরের বিভিন্ন স্থানে ৫০০ শতাংশ জমি রয়েছে। এ ছাড়াও কুমিল্লা হাউজিং এস্টেটের এলাকায় বিভিন্ন বাড়ি, ঢাকায় একাধিক বাড়ি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ রোডে বিগ বাজার নামে একটি সুপার শপ রয়েছে। সেখানে ৫০ জন কর্মচারী কাজ করেন। কিছুদিন পূর্বে তার এক ভাইয়ের নামে লাকসাম জংশন এলাকায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ৬ তলা ভবন ক্রয় করেন।

জান যায়, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন কুমিল্লা ২০২৩ সালে ২৩শে নভেম্বর সহকারী পরিচালক পাপন কুমার সাহা বাদী হয়ে ৯ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন। দুদক অনুসন্ধানে তার নিজের নামে স্থাবর-অবস্থার মিলিয়ে ১৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৫ টাকার সম্পদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার প্রেক্ষিতে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও কুমিল্লা সংসদ সদস্য বাহারের হুমকিতে দুর্নীতি দমন কমিশন উক্ত মামলার তদন্ত করতে সাহস পায়নি। গত ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে চান কামাল। এসব বিষয়ে জানতে কামালের নাম্বারে ফোন দেয়া হলেও বন্ধ পাওয়ার কারণে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

শাকিলের মৃত্যু: শেষ একটি পরিবারের স্বপ্ন by ফাহিমা আক্তার সুমি

সন্তান হারানোর এই যন্ত্রণা কীভাবে কমবে? আমার সন্তান যে বিছানায় ঘুমাতো সেই বিছানায় এখন আমি ঘুমাই। যে টেবিল-চেয়ারে বসে পড়াশোনা করতো ওইখানে আমি বসি। দরজায় কলিংবেল বাজলে মনে হয় দরজা খুললে ‘আব্বু’ বলে শাকিল জড়িয়ে ধরবে। সবসময় মনে হয় ‘আব্বু আব্বু’ বলে আমার সন্তান ডাকছে। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন বুনেছিলাম। ওরা আমার বুকের মানিককে কেড়ে নিলো। ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার ইচ্ছা ছিল শাকিলের। পড়াশোনা শেষে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবে। বাবা-মাকে অনেক যত্নে রাখবে। একমাত্র সন্তানকে হারানোর ব্যথা বুকে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন শাকিলের বাবা-মা।

গত ১৮ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হন মো. শাকিল হোসেন। তিনি মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী ছিলেন।

নিহত শাকিলের বাবা বেলায়েত হোসেন মানবজমিনকে বলেন, পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমার পরিবারের আলো ছিল শাকিল। তার পড়াশোনা শেষের দিকে ছিল। আমার ইচ্ছা ছিল শাকিলের একটা ভালো চাকরি হবে, আগামী বছর তাকে বিয়ে দিবো। একসময় গ্রামে একটা বাড়ি করবো। ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর বাকি জীবনযাপন সেখানে কাটাবো। এখন আমাদের কে দেখবে? ১৯৭১ সালের যুদ্ধে আমার মা শহীদ হয়েছেন। ২০২৪ সালে আমার সন্তান শহীদ হয়েছে। আমি একজন শহীদের পিতা এবং একজন শহীদ মায়ের সন্তান। এইরকম ভাগ্য সবার হয় না। আমার সন্তান দেশের জন্য জীবন দিয়েছে নিজের জন্য নয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বেলায়েত হোসেন বলেন, শাকিল আমার একমাত্র হিরার টুকরো ছিল। তিন মেয়ের পরে সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। আমার সন্তান এমন ছিল কারও বিপদ দেখলে আগে দৌড়ে এগিয়ে যেতো। সে এই বয়সে অনেক সুনাম অর্জন করেছে। হাজার হাজার মানুষ তার জানাজায় অংশ নিয়েছে, কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল আমার সন্তানের মৃত্যুতে। ওর মা পারভীন আক্তার দীর্ঘ আট বছর ধরে শয্যাশায়ী। দুইবার স্ট্রোক করে প্যারালাইসেস হয়ে গেছে। এখন সন্তানের শোকে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ৩৬ বছর ধরে পরিবার নিয়ে টঙ্গীতে ভাড়া থাকি। সেখানে ছোট একটা ব্যবসা করি। সন্তানদের নিয়ে ছিল আমার বসবাস। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। সব বাবা-মায়ের একটা স্বপ্ন থাকে সন্তানদের নিয়ে। ওর স্বপ্ন ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। আমার সন্তান কতো রক্ত যে দিয়েছে মানুষের জীবন বাঁচাতে। সব সময় এসকল মানবিক কাজে আমি তাকে উৎসাহ দিতাম। সে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শুরু থেকেই মাঠে অনড় ছিল।

শহীদ সন্তানের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, আমার বুকে যে একটা যন্ত্রণা আছে সেটি কীভাবে মুছে ফেলবে। কীভাবে কমবে আমার বুকের যন্ত্রণা। তার পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বইগুলো ছুঁয়ে দেখি । তার জামা-কাপড়গুলো সাজিয়ে রেখেছি সুন্দর করে। ওর সাজানো সবকিছুর দিকে তাকালে মনে হয় আমার শাকিল আছে, ঘোরাঘুরি করছে। বাজারের দিকে গেলে অনেক লোকজন দেখলে মনে হয় আমার শাকিলও দাঁড়িয়ে আছে। মোবাইলে কোনো কল আসলে মনে হয় আমার শাকিল কল দিয়েছে কিছু বলার জন্য। এই অনুভবগুলো রাত-দিন আমার সঙ্গে ঘুরছে। কখনো মনে হচ্ছে না আমার সন্তান মারা গিয়েছে।

বেলায়েত হোসেন বলেন, গত ১৮ই জুলাই বিকাল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশের গুলিতে উত্তরা আজমপুর থানার সামনে শহীদ হয়েছে আমার সন্তান। তখন আমি লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে তাকে গুলি করে। ঘটনার দিন আছরের নামাজ শেষ করে বের হই তখনই আমার মোবাইলে কল আসে। কল দিয়ে পরিচিত একজন বলে আঙ্কেল আপনি দ্রুত উত্তরা মেডিকেলে আসেন। তখন আমি জানতে চাই কেন কি হয়েছে? এ সময় তারা বলে আমাদের বন্ধু শাকিল অসুস্থ গুলিবিদ্ধ হয়েছে আপনি দ্রুত আসেন। তখন আমি বলি, দেখো আমার শাকিল যদি অসুস্থ হতো তাহলে এভাবে আমাকে বলতো না। আমার শাকিলের কি হয়েছে সেটি বলো। তখনই তার মৃত্যুর কথা আর আড়াল না করে ওরা আমাকে সত্যিটা বলে। ওর বন্ধুরা ও মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শাকিলকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা জানায় শাকিল আর বেঁচে নেই। পরে তারা আমার অনুমতি নিয়ে সব প্রস্তুতি শেষে জানাজা করিয়েছিল। এরপর টঙ্গী নিয়ে এসে আবার জানাজা হয়। এরপর দীঘির পাড়ে আরেকটি জানাজা হয়। গাজীপুর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় আগে পড়াশোনা করতো শাকিল। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আমার সন্তানের মরদেহ নিয়ে আরেকবার জানাজার আয়োজন করেন। তখন রাত ১২টা বাজে। আমি গ্রামের বাড়িতে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে যোগাযোগ ছিল। ওই রাতেই আমার সন্তানের মরদেহ নিয়ে ছাত্র-শিক্ষকরা আমার গ্রামের বাড়িতে রওনা দেন। সন্তানের অপেক্ষায় আমি গৌরিপুর ব্রিজের নিচে এসে দাঁড়াই। পরের দিন শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় গিয়ে লক্ষ্মীপুরে পৌঁছায়। আমি বাবা কীভাবে সহ্য করবো আমার সন্তানের এই মর্মান্তিক মৃত্যু। একটা গুলি আমার সন্তানের বুকে লেগে পেছন থেকে বেরিয়ে যায়। আর মুখমণ্ডলসহ সারা শরীরে ছিল ছররা গুলির চিহ্ন।

বিএনপি জাতীয় সরকার ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনা করতে চায়

জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি আগামীতে জাতীয় সরকার ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনা  ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট সংবিধানে সংযুক্ত দেখতে চায় বলে জানিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল ঢাকা বিভাগীয় বিএনপি’র তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের পূর্বসূরিরা রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে একটা স্বাধীন দেশ আমাদের দিয়েছেন। এই যুদ্ধ জয়ের মূল শক্তি ছিল- প্রশ্নহীন জাতীয় ঐক্য। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, স্বাধীনতার পর আমরা সেই ঐক্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারিনি। অত্যাবশ্যকীয় একটা জাতীয় সরকারের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসায় দেশ বিভক্ত হয়ে পড়েছে প্রথম দিন থেকেই। ফলে একটা বিরাট অংশ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশ গঠনে কোনো অবদান রাখতে পারেনি।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরপর জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে ব্যবহার না করে যে সুযোগ সেদিন হাতছাড়া করা হয়েছে, আগামী দিনে আমরা সেটার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি আগামীতে জাতীয় সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা দেখতে চায়। এদেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, তারা সকলে আগামীতে দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণ করবেন, যাতে দেশ তাদের অবদানের সুফল থেকে বঞ্চিত না হয়।

তারেক রহমান বলেন, আমাদের আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পরিকল্পনার কথা দেশবাসীকে জানানো প্রয়োজন মনে করছি। দেশে প্রথাগত রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন কিন্তু দেশ গঠন, উন্নয়ন ও পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে চান- এমন অসংখ্য জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, চিকিৎসক, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, মানবতাকর্মী রয়েছেন, কিন্তু বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে তাদের পক্ষে সংসদে সদস্য হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ নেই। তাদের সেবা আর অবদান দেশের কাজে লাগাতে বিএনপি পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও উচ্চ কক্ষসহ দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত দেখতে চায়।

তিনি বলেন, আমি বিনয়ের সঙ্গে শুধু আমাদের আগামীর পরিকল্পনা আর সদিচ্ছার কথা জানাতে পারি, কারণ আমরা জানি- দেশের মানুষের সমর্থনই কেবলমাত্র আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে।

আশাকরি জনগণ নিশ্চয়ই সেই সব দল বা ব্যক্তিকে জাতীয় সরকারে শামিল দেখতে চাইবে না, যারা পুরো দেশটাকে একটা দল আর পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। যারা তথাকথিত উন্নয়নের নামে আমাদের প্রত্যেকের কাঁধে দেড় লাখ টাকার ঋণের বোঝা চাপিয়ে হাজার হাজার লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। দেশে গড়েছে সম্পদের পাহাড়।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, গুম-খুন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনে দেশের মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, চাল, ডাল, লবণ, তেল ও ওষুধের দাম মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেছে। আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগসহ রাষ্ট্রের সবগুলো স্তম্ভ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি পালিয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তেও শত শত নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত করেছে বাংলাদেশের রাজধানী থেকে প্রতিটি জেলা ও উপজেলার জনগণ নিশ্চয়ই সেই জালেমদের জাতীয় সরকারে অন্তর্ভুক্ত দেখতে চাইবে না।

তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরের বিরামহীন আন্দোলনে বিএনপি’র সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীর অংশগ্রহণ ও দলের প্রতি তাদের অবিচল আস্থার জন্য সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আপনার আত্মত্যাগ আর অবদান মুষ্টিমেয় হঠকারীর অপকর্মে ক্ষতিগ্রস্ত হতে কেন দেবেন? সতর্ক থাকুন, সচেতন হোন, প্রতিরোধ করুন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের পরিবর্তিত আশা আর ভাষার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের উপযুক্ত হতে হবে। সাম্প্রতিককালে গজিয়ে ওঠা অদৃশ্য প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর কৌশল প্রয়োগের নির্দেশ দেন।

তারেক রহমান বলেন, দলের সকল সংকটকালে তৃণমূলই বিএনপিকে বার বার রক্ষা করেছে। এমপি ও মন্ত্রী পদ-পদবির প্রত্যাশা না করা নিবেদিত প্রাণ কর্মীদল যারা শহীদ জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর বিএনপি’র আদর্শের প্রতি যে অবিচল আস্থা বরাবর রেখেছেন সেটা অব্যাহত থাকলে দল হিসেবে বিএনপি’র সফলতা আর অগ্রযাত্রা কখনোই ব্যাহত হবে না। এ সময় বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুর-আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ

বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল দিনভর গাজীপুর ও আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ করে  বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। এতে সকাল থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও শিল্প পুলিশ সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করেন। আশুলিয়ার ছোট-বড় অন্তত ৬০টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার, সাভার থেকে জানান, আশুলিয়ায় বিভিন্ন দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে  পোশাক শ্রমিকরা। শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে প্রায় অর্ধশতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও শিল্প পুলিশ সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করেছেন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের বাইপাইল থেকে জিরাবো পর্যন্ত সড়কের উভয়পাশে অবস্থিত এসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

শিল্প পুলিশ জানায়, সকালে যথানিয়মে কারখানায় যায় শ্রমিকরা। কিন্তু কাজ না করে বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিক্ষোভ শুরু করলে কর্তৃপক্ষ একের পর এক কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। পরে শ্রমিকরা বেরিয়ে চালু কারখানাগুলোর সামনে গিয়ে বিক্ষোভ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে সেসব কারখানাতেও ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ।

সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত অন্তত শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার ছোট-বড় অন্তত ৬০টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। জিরাবো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হলেও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন শ্রমিকরা। এতে করে সড়কটিতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে শিল্প পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা। শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মো. সারোয়ার আলম বলেন, শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের জিরাবো এলাকা পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে হামীম, শারমীনসহ অন্তত ৬০টি কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শ্রমিকরা উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পরে কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক কারখানার চাকরিচ্যুত ও চাকরি প্রত্যাশীরা। এতে ঘণ্টাখানেকের জন্য ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। সকালে গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস ও সদর উপজেলার বাঘের বাজার এলাকায় কয়েকটি গার্মেন্টসের চাকরিচ্যুত শ্রমিক ও বেকার যুবকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। ভোগড়া বাইপাস এলাকায় সড়ক অবরোধ ও আন্দোলনের জের ধরে আশপাশের কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। অপরদিকে গাজীপুরের রাজন্দ্রেপুর এলাকায় ইউনি হেলথ্‌ ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধ উৎপানদকারী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা ২১ দফা দাবিতে আন্দোলন করেছেন। এ সময় তারা বেতন বৈষম্য দূর করাসহ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে জানায়।

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিক্ষোভ করেছেন আরএকে সিরামিক কারখানার শ্রমিকরা। বুধবার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়নপুর বাজার এলাকায় এ বিক্ষোভ করেন তারা। প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট প্রদান ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে সকাল ৬টায় শ্রীপুর উপজেলার ধনুয়া এলাকায় আন্দোলন শুরু হয়। পরে সকাল ৭টায় তারা কারখানার সামনে  মহাসড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনরত শ্রমিক ও কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দাবি পূরণে আশ্বস্ত করলে বেলা ১১টায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার সকাল থেকে শ্রীপুর উপজেলার ধনুয়া এলাকায় আরএকে সিরামিক বিডি লিমিটেডের শ্রমিকরা ১১টি দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের অপসারণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক কর্মচারী নিয়োগ, প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট নিশ্চিত করাসহ ১১টি দাবি জানানো হয়েছে।

শ্রমিকরা জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে একাধিকবার কোম্পানি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সমাধানে আসেননি। গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২ এর শ্রীপুর ক্যাম্পের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম আজিজুল হক জানান, বুধবার সকাল থেকেই কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন করছিল শ্রমিকরা। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলে তারা মহাসড়ক ছেড়ে চলে যান।

টাকা ছাড়া কাজ করতেন না মন্ত্রীর পিএ বাবু by জাবেদ রহিম বিজন

আলাউদ্দিন বাবু। এই নামেই মুখর ছিল গত ক’বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়া উপজেলা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল বাবু-বন্ধনা। তাকে তুষ্ট করাই যেন ছিল সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্বাচনী এলাকার এই দুই উপজেলার সুযোগ-সুবিধাকাঙ্ক্ষী মানুষের কাজ। চাকরি, বদলি, দলের পদ-পদবি, মামলা-মোকদ্দমার তদবির, এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা, পাহাড় কাটা-সব কিছুতেই বাবুর নাম। সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রারের পোস্টিংয়ের অগ্রনায়কও সে। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট (পিএ) বাবু গত কয়েক বছরে অসীম ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন। টাকার বান্ডিল ছাড়া কোনো কাজ করেননি। এই ক’বছরে প্রায় শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। জায়গা-সম্পত্তিও হয়েছে তার অঢেল।

মন্ত্রীর গুলশান অফিসে যাওয়া-আসা ছিল এমন সূত্রগুলো জানায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ওই অফিসে যারা গিয়েছেন তাদের চা পরিবেশন করতেন বাবু। ২০১৮ সালে পিএ নিয়োগ হওয়ার পর বাবুর অন্যরূপ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। কর্কশ আচরণের কারণে তার কাছে মান-সম্মান হারানোর ভয়ে মন্ত্রীর গুলশানের অফিসে যাওয়া ছেড়ে দেন সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকে। কথা আছে মন্ত্রণালয়ের সচিবও একসময় ওই গৃহভৃত্যের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। সম্মান হারানোর ভয়ে গুলশান অফিসে যাওয়া বাদ দেন। সেখানে এলাকার লোকজনের সঙ্গেও তার দুর্ব্যবহার ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার।

স্থানীয় সূত্র জানায়, একাধিকবারে এসএসসি পাস করা বাবু জীবিকার জন্য ২০১৩ সালে বাহরাইনে পাড়ি জমান। আনিসুল হক প্রথম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি এবং মন্ত্রী হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসেন। এরপর মন্ত্রীর বাসায় কাজে যোগ দেন। মন্ত্রীর সাবেক এপিএস রাশেদুল কাওসার ভূঁইয়া জীবন কসবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে এলাকায় চলে আসার পর বাবু হয়ে উঠেন সবকিছুর হর্তাকর্তা। মন্ত্রীর পিএসসহ অন্য স্টাফরা হয়ে পড়েন ঠুঁটো জগন্নাথ। তাদের কথায় কোনো কাজ হতো না। পিএ হওয়ার পরই আলাদীনের চেরাগ হাতে পান বাবু। সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়ার দোকান খুলে বসেন। কামাই করতে শুরু করেন কোটি কোটি টাকা। সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়।  জেনে যাওয়ার ভয়ে এসব পদে কর্মরত এলাকার  লোকদের দূরে সরিয়ে রাখেন। বরং তাদের সঙ্গে চাকরের মতো আচরণ করতে শুরু করেন।

সূত্র জানায়, পিএ হওয়ার আগে ৫শ’-১ হাজার টাকাতেই তার হাসিমুখ দেখা গেছে। কিন্তু পরে আর বান্ডিল ছাড়া তুষ্ট করা যায়নি তাকে। সাব-রেজিস্ট্রার বদলির শতকরা ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে বাবু আর আরেক পিএ সফিকুল ইসলাম সোহাগের মাধ্যমে। স্থান ভেদে ৩০ লাখ থেকে শুরু করে ৫০-৬০ লাখ, এমনকি দুই/আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত নেয়া হয় সাব- রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে দরকষাকষি করে টাকা নেয়া হতো। যে বেশি টাকা দিতো তাকেই ভালো জায়গায় পোস্টিং দেয়া হতো। টাকা কম দিলে বেশি টাকা দেয়ার লোক আছে বলে টাকার অঙ্ক বাড়ানো হতো। তেজগাঁও রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সে খিলগাঁও, উত্তরা, বাড্ডা, পল্লবী, গুলশান, শ্যামপুর, মিরপুর, সাভার, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ এসব স্থানে বদলির জন্য একেকজন সাব-রেজিস্ট্রারকে ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার ছাড়াও বিচারাঙ্গনের লোকজনও ভালো পোস্টিংয়ের জন্য ধরনা দিয়েছেন বাবুর কাছে।

বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেটে পিএ আলাউদ্দিন বাবু ও শফিকুল ইসলাম সোহাগ ছাড়াও মন্ত্রীর বান্ধবী তৌফিকা করিম এবং এক যুগ্ম সচিব ও জেলা রেজিস্ট্রারের নাম আলোচিত। সূত্র আরও জানিয়েছে, টাকা না দেয়ায় বদলি-পদায়ন আটকে গেছে অনেকেরই। সাব-রেজিস্ট্রার মাহফুজ রানা মেহেরপুরের গাংনীতে দীর্ঘদিন থাকার পরও কোনো পোস্টিং পাননি। জেলা রেজিস্ট্রার অনেকের পদায়নের আদেশ হলেও তাদের আগের কর্মস্থলেই রাখা হয়। এমন কয়েকজন ঝালকাঠির আবদুল বারী, হবিগঞ্জের মো. মিজানুর রহমান, মেহেরপুরের সাইফুল ইসলাম, সিলেট মৌলভীবাজারের সোহেল রানা মিলন, সুনামগঞ্জের মফিজুল ইসলাম,  নেত্রকোনার আবদুল খালেক, জামালপুরের জহিরুল ইসলাম। অথচ টাকার জোরে একই সময়ে পদায়ন হওয়া এক জেলা রেজিস্ট্রার হবিগঞ্জ থেকে গাজীপুর, এরপর ঢাকায় সুবিধাজনক স্থানে বদলি হন। অভিযোগ রয়েছে বদলি সিন্ডিকেটে থাকা প্রভাবশালী এক জেলা রেজিস্ট্রার তার ’৯৪ ব্যাচের নিজস্ব লোকজনকে সুবিধা দিয়েছেন।  ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর এমন ভালো ভালো জেলায় পোস্টিং করিয়েছেন তাদের। ওই জেলা রেজিস্ট্রার নিজে ২০১৮ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও গাজীপুরে চাকরি করে আসছেন।
পিএ হলেও এপিএসের চেয়ারেই বসতেন আলাউদ্দিন বাবু। তার জন্য গুলশান অফিসে এসি রুম এবং একটি জীপ বরাদ্দ ছিল।

স্থানীয়ভাবে চাকরি বাণিজ্যে জড়িত ছিল তার বাবা ইদ্রিস মিয়া, শ্বশুর ফরিদ মুহুরী, ভগ্নিপতি আমজাদ হোসেন। তাদের মাধ্যমেই চুক্তি হতো টাকার। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই চাকরির জন্য টাকা নেয়া হতো। টাকা নেয়ার সময় কারও কাছে বলবে না বলে কোরআন শরীফ ছোঁয়ানো হতো। চাকরি প্রার্থীকে বলা হতো ৮/১০ জায়গায় আবেদন করতে। এরমধ্যে একটিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেয়া হতো। চাকরি ভেদে সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২৫/৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। বাবুর পিতা ইদ্রিস মিয়া মন্ত্রীর গ্রামের বাড়ির কেয়ারটেকার।

ঢাকার গুলশানে আমেরিকান অ্যাম্বাসির পাশে বাবুর রয়েছে কয়েকটি ফ্ল্যাট। এ ছাড়া কসবা পৌর এলাকার কদমতলা এলাকায় কোটি টাকায় দোকান ভিটি ক্রয় করেন। গোপীনাথপুরের ধ্বজনগরে রয়েছে ১২/১৫ কানি জমির ওপর মাল্টা বাগান। সেখানে যাওয়ার জন্য করা হয়েছে পাকা রাস্তা। এ ছাড়াও আরও অনেক জমি রয়েছে এলাকায়।  ৫ই আগস্টের পর আত্মগোপনে বাবু। অনেকে বলছেন বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।