Showing posts with label সুদান. Show all posts
Showing posts with label সুদান. Show all posts

Tuesday, June 23, 2026

সুদানের যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে কারা by নাসরিন মালিক

৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ ১৮ মাস ধরে সবার চোখের সামনে সবকিছু ঘটে যাচ্ছে। সুদানের দারফুর অঞ্চলের আল ফাশের শহর মিলিশিয়া বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) অনেক দিন ঘেরাও করে রেখেছিল। গত সপ্তাহে শহরটিতে এই বাহিনী ঢুকে পড়ে এবং তারপর যা ঘটেছে, তাকে এককথায় বলা যায় মহাবিপর্যয়।

সেখানে নির্বিচার গণহত্যা চলছে। একটি হাসপাতালেই প্রায় ৫০০ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রোগী ও তাদের পরিবারের লোকজনও আছে। যাঁরা পালাতে পেরেছেন তাঁরা জানিয়েছেন, সেখানে একেবারে সাধারণ নাগরিকদের বাছবিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।

আরএসএফ এত নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে যে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকেও জমিতে জমে থাকা রক্ত দেখা গেছে। আল ফাশের পতনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার গণহত্যার গতি ও তীব্রতাকে রুয়ান্ডার গণহত্যার প্রথম ২৪ ঘণ্টার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

আল ফাশের ছিল সুদানের সেনাবাহিনীর দারফুর শেষ শক্তিকেন্দ্র। আর গত সপ্তাহটি সুদান যুদ্ধে একটি গুরুতর পরিবর্তনের সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখন এই যুদ্ধে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এসএএফ এবং মিলিশিয়া বাহিনী আরএসএফ দেশের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিষ্ঠুর ও অবিরাম লড়াই চালাচ্ছে।

এই দুই পক্ষ আগে একসঙ্গে সরকারে অংশীদার ছিল। ২০১৯ সালে এক জনপ্রিয় বিপ্লবের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা বেসামরিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে এক অস্বস্তিকর জোট সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু পরে তারা প্রথমে বেসামরিকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় এবং এরপর একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।

এই দুই গ্রুপে যে সংঘাত শুরু হয়, তা ছিল ভয়াবহ। এই সংঘাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বশিরের গড়ে তোলা আরএসএফ বাহিনী (বশিরকে রক্ষা করা ও দারফুর তাঁর হয়ে লড়ার জন্য মূলত জানজাউইদ যোদ্ধাদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল) গোপনে কতটা শক্তি ও সম্পদ সংগ্রহ করে ফেলেছিল।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেটি কেবল সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনো ছোটখাটো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ছিল না। এটি ছিল দুই পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধ। কারণ, উভয় পক্ষের হাতেই অস্ত্রভান্ডার, অর্থের উৎস, হাজার হাজার সেনা এবং বিদেশি জোগানদাতাদের সহায়তা—সবকিছু ছিল।

এর পর থেকে সেখানে কয়েক কোটি মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছে এবং আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সেখানে এখন তিন কোটির বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। কিন্তু এই ভয়াবহ সংখ্যাগুলোও সুদানের আসল দুর্দশার পুরোটা চিত্র দেয় না।

দেশটা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ছে। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর দারফুর আরএসএফ যে ভয়ংকরভাবে মানুষ হত্যা করেছে, তা এসব পরিসংখ্যানের বাইরের টাটকা নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

প্রকাশ্যে আসা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় মানুষ মিলিশিয়াদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছেন। এক ব্যক্তিকে একজন কমান্ডার বলছিলেন, ‘কেউ বাঁচবে না।’ এরপর তাঁকে গুলি করা হয়। কমান্ডার বলছিলেন, ‘আমি তোমাদের প্রতি কোনো দয়া দেখাব না। আমাদের কাজ শুধুই হত্যা করা।’

সবকিছুই আগে থেকে অনুমান করা গিয়েছিল। কোনো কিছু একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল না। মাসের পর মাস ধরে গণহত্যা ও নৃশংসতার আশঙ্কা নিয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল। প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত দারফুরবাসী (যাঁরা অন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন) আল ফাশের শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধ বাড়তে থাকায় কেউ কেউ সেখান থেকে আবার পালিয়ে যান। অনেকেই শহরটিতে আটকা পড়ে যান।

এই দৃশ্য শুধু ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার প্রথম দিকের দিনগুলোকেই মনে করিয়ে দেয় না; বরং ২০ বছর আগের দারফুরের সেই ভয়ংকর গণহত্যাকেও আবার জীবন্ত করে তোলে। তবে এবার তা ফিরে এসেছে আরও ভয়াবহ ও ঘনীভূত আকারে।

আজকের আরএসএফ আসলে সেই পুরোনো জানজাওয়িদেরই নতুন রূপ। তবে এবার তারা আরও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, শক্তিশালী বিদেশি মিত্রদের সমর্থনপুষ্ট এবং আবারও তারা অনারব জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে এগোচ্ছে। এখন তারা উট বা ঘোড়ায় চড়ে আসে না। তারা আসে চার চাকার ‘টেকনিক্যাল’ গাড়িতে। সেই গাড়িতে মেশিনগান বসানো থাকে। তাদের সঙ্গে আরও থাকে ভয়ংকর শক্তিশালী ড্রোন।

দারফুর ও আল ফাশের অঞ্চলে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলছে, তার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বড় ভূমিকা রাখছে। ইউএই অনেক দিন ধরেই আরএসএফ-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র। আরএসএফ মিলিশিয়াদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ইউএই এর আগে ইয়েমেনের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল। এখন তারা আরএসএফের হাতে প্রচুর টাকা ও অস্ত্র দিচ্ছে। এর ফলে সুদানের যুদ্ধ আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়েছে।

ভূরি ভূরি প্রমাণ থাকার পরও ইউএই এখনো দারফুরে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করে যাচ্ছে। বিনিময়ে তারা সুদানের মতো বড়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এ ছাড়া আরএসএফের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর খনি থেকে তোলা সোনার বেশির ভাগ অংশও ইউএই পাচ্ছে।

এদিকে আরও কিছু দেশ ও গোষ্ঠী এই সংঘাতে নিজেদের স্বার্থে জড়িয়েছে। ফলে যুদ্ধটি এখন একধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বা পরোক্ষ শক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর ফল এক ভয়াবহ অচলাবস্থা, রক্তক্ষয় ও এমন এক পরিস্থিতি, যার ইতি টানা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, অথচ সবকিছুই সবার চোখের সামনে ঘটছে।

সুদানের যুদ্ধকে অনেকে ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটি বিশ্বশক্তিগুলোর চুপ থাকা ও অবহেলার ফসল। কারণ, সুদানের ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া মানে হচ্ছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির ভণ্ডামির মুখোমুখি হওয়া।

নাসরিন মালিক, দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন সুদানের সেনাবাহিনীর সদস্য। পেছনে জ্বলছে তেল পরিশোধনাগার। সুদানের উত্তর বাহরি প্রদেশ। জানুয়ারি, ২০২৫
গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন সুদানের সেনাবাহিনীর সদস্য। পেছনে জ্বলছে তেল পরিশোধনাগার। সুদানের উত্তর বাহরি প্রদেশ। জানুয়ারি, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Thursday, June 11, 2026

যুদ্ধক্ষেত্র পালানো নারীর ডায়েরি: ‘প্রার্থনা করেছিলাম, পেটের সন্তান যেন এই পৃথিবীতে না আসে’

বিবিসিঃ আমিরা (ছদ্মনাম) সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ অবস্থায় অজানা এক যাত্রা শুরু করেছিলেন সুদানের এই নারী। চারপাশে যুদ্ধ। শহরে অবশিষ্ট নেই কোনো হাসপাতাল, ওষুধের দোকান। আছে শুধু গুলির শব্দে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।

সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দখল করে নিয়েছে আমিরাদের শহর পশ্চিম কোরদোফান রাজ্যের এন নাহুদ। তাঁর সামনে একমাত্র পথ—শহর ছেড়ে পালানো। এ পরিস্থিতিতে অন্তঃসত্ত্বা হয়েও আমিরা প্রার্থনা করেছিলেন, ‘এই সময় যেন আমার সন্তান পৃথিবীতে না আসে।’

গত মে মাসে আমিরা সুদানের অন্যতম সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র পেরোনোর সময় এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই কথা রেকর্ড করা অডিও ডায়েরিতে বলেছেন তিনি।

ওই সময় আরএসএফ এন নাহুদ দখল করে নেওয়ায় শহরটি থেকে বেরোনোর রাস্তা ছিল বিপৎসংকুল। তবু নিজে বাঁচতে, অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের যুদ্ধ দুই বছরের বেশি সময় ধরে সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখন কোরদোফানের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উঠেছে সম্মুখসমর। সেই পথ দিয়েই পালিয়ে যান আমিরা।

পালানোর সময় আমিরা একটি অডিও ডায়েরি রেকর্ড করেন। এই ডায়েরি গ্লোবাল ক্যাম্পেইন গ্রুপ আভাজ (এভিএএজেড) বিবিসির কাছে সরবরাহ করেছে। পরে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় ফোনে তাঁর সঙ্গে বিবিসির কথা হয়। সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

পালানোর পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে আমিরা বলেন, ‘শহরে আর কোনো হাসপাতাল নেই, নেই কোনো ফার্মেসি। আমার ভয় হচ্ছিল, যদি আরও দেরি করি, তাহলে হয়তো কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে না। যানবাহন চলাচল তখন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যেটুকু ছিল, তা–ও অবিশ্বাস্য রকম কঠিন আর ভীষণ ব্যয়বহুল।’

বন্দুকের মুখে যাত্রা শুরু

যাত্রার শুরু থেকেই ঝামেলা হচ্ছিল আমিরার। বলেন, যাতায়াতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিল আরএসএফ ও তাদের সহযোগীরা।

এন নাহুদ থেকে পালানোর জন্য আমিরার স্বামী কোনো রকমে একটি ট্রাক ভাড়া করেছিলেন। সেই ট্রাকে চড়তেই বিপত্তি শুরু। চালক ছিলেন আরএসএফের সদস্য। তিনি ট্রাকটি আরেক তরুণের কাছে একই সময়ে ভাড়া দিয়েছিলেন। এ নিয়ে চালক ও ওই তরুণের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়।

আমিরা বলেন, ‘চালক সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক বের করে ওই তরুণকে গুলি করার হুমকি দিলেন। সবাই তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন, এমনকি তাঁর সঙ্গে থাকা আরএসএফের সঙ্গীও। তরুণের দাদি আর মা কাঁদতে কাঁদতে চালকের পা ধরে গুলি না করার অনুরোধ করেছিলেন। আমরা যাত্রীরা ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিলাম।’

আমিরা আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, যদি তিনি গুলি চালান তবে একজনকে নয়, অনেককেই মেরে ফেলবেন। কারণ, তিনি গাঁজা খাচ্ছিলেন, মাতাল ছিলেন।’

শেষমেষ চালক বন্দুক সরিয়ে রাখলেও ওই তরুণকে পরিবারসহ এন নাহুদেই নামিয়ে দেন। তাঁদের রেখেই আমিরাদের যাত্রা শুরু হলো। এরপরও যাত্রা ছিল শঙ্কায় পূর্ণ। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, ট্রাকভর্তি লাগেজ আর গাদাগাদি করা ৭০ থেকে ৮০ জন, বারবার ছোট ছোট ঝিরি পেরোনোর ঝক্কি আর মাথার ওপর প্রখর রোদ্র—সব মিলিয়ে অস্থির যাত্রা। মায়েরা এক হাতে আঁকড়ে ধরছেন গাড়ি, আরেক হাতে আগলে রাখছেন সন্তান।

আমিরা বলেন, ‘যাত্রার পুরোটা সময় ভয়ে ছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম, যেন পেটের সন্তান এ সময় পৃথিবীতে না আসে। শুধু চেয়েছিলাম, সব ঠিকঠাক হয়ে যাক।’

ভয়ের শেষ নেই

অবশেষে আমিরারা পশ্চিম কোরদোফানের রাজধানী এল-ফুলায় গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু এ শহরেও ঢুকে পড়ছেন সেনারা। এ কারণে আমিরা সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে চাননি।

অডিও ডায়েরিতে আমিরা রেকর্ড করেছিলেন, ‘সেনারা এল-ফুলায় ঢুকলে কী হবে, আমি জানতাম না। কারণ, সেনারা, বিশেষ করে বাগারা, রিজেইগাতসহ কিছু নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীর লোকদের নিশানা বানানো শুরু করেছেন। সেনাদের ধারণা ছিল, এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা আরএসএফের সঙ্গে যুক্ত।’

অডিও ডায়েরিতে আমিরা বলেন, তাঁর স্বামী এমন সম্প্রদায়ের একজন। যদিও আরএসএফের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি সরকারি চাকরি করেন, আইন পড়েছেন। কিন্তু এখন কিছুই আর বিবেচনা করা হচ্ছে না। শুধু জাতিগত কারণেই মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ বলেছে, সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে বন্দী বেসামরিক লোকদের বিচারবহির্ভূত হত্যা করার মতো অভিযোগগুলো বিশ্বাসযোগ্য। সেনাবাহিনী এসবকে কিছু সদস্যের ‘ব্যক্তিগত’ অপরাধ বলে দায় এড়ায়। চলতি বছরের শুরুর দিকে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছেন।

চেকপোস্ট, ঘুষ আর ভাঙা গাড়ি

তিনটি রাজ্য নিয়ে গঠিত কোরদোফান এখন প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সুদানের যুদ্ধের জন্য এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র ও প্রধান পরিবহন রুটের এক কৌশলগত কেন্দ্র।

আরএসএফের পাশাপাশি অন্যান্য মিলিশিয়াদের সম্পৃক্ততা, বিশেষ করে শক্তিশালী এসপিএলএম-এন সহিংসতাকে তীব্র করে তুলেছে। এতে গুরুতর মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে সহায়তাদানকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে ত্রাণ সরবরাহ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এল-ফুলা থেকে দক্ষিণ সুদান সীমান্তে পৌঁছাতে আমিরার তিন দিন লেগেছিল। এ সময়ে তাঁদের একাধিকবার গাড়ি পাল্টাতে হয়েছে। আর পথে পথে ছিল বাধা।

আমিরা বলেন, ‘আরএসএফের চালকেরা নিজের ইচ্ছেমতো ঠিক করতেন কে যাবেন, কোথায় বসবেন, কত ভাড়া দেবেন। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। আর তাঁরা সবাই ছিলেন সশস্ত্র।’

আমিরা বলেন, পথে প্রতি ২০ মিনিট পরপর তল্লাশিচৌকি। প্রতি চৌকিতে বাধ্যতামূলক ঘুষ দিতে হতো। অথচ তাঁরা আগে থেকেই আরএসএফের সদস্যদের অর্থ দিয়ে সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলেন।

সেখানে খাবারের দাম ছিল অনেক বেশি। ছিল পানির সংকট। এল-হুজাইরতা নামের একটি গ্রামে তাঁরা আরএসএফের স্টারলিংক ডিভাইস ব্যবহার করে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পেরেছিলেন, কিন্তু তা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

আমিরা বলেছেন, ‘অনলাইনে ফিরলেই সতর্ক থাকতে হয়। যদি আরএসএফের সদস্যরা শুনতে পান আপনি সেনাবাহিনীর কোনো ভিডিও দেখছেন, কোনো গান বাজাচ্ছেন, এমনকি শুধু কথায় আরএসএফকে উল্লেখ করেছেন, তাহলেই আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’

আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। গাড়ি বারবার বিকল হয়ে যাচ্ছিল। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়ে যায়। একবার জঙ্গলের ভেতর গাড়ির চাকা ফেটে যায়। সে সময় সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনিতেই পানি নেই। এর ওপর আশপাশের কেউ সাহায্য করতেও রাজি নন।

আমিরা বলেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, আর কোনো দিন কোথাও পৌঁছাতে পারব না। এখানেই মরে যাব। হাল ছেড়ে দিলাম। শুধু একটা কম্বল ছিল, সেটি মাটিতে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল, এটাই আমার শেষ।’

কিন্তু শেষ হয়নি। একটি সবজিবোঝাই পিকআপে চড়ে অবশেষে সামনে এগোতে থাকেন আমিরা ও তাঁর স্বামী।

সীমান্ত পেরোনোর সংগ্রাম

অবশেষে পরদিন আমিরারা পৌঁছালেন দক্ষিণ সুদানের সীমান্ত আবেইতে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাদায় ভরে গেছে পথ। তাঁরা তখন তেলের ব্যারেলবোঝাই গাড়িতে। গাড়ি বারবার কাদায় ডুবে যাচ্ছিল।

বৃষ্টি আর কাদায় যাত্রা থমকে যায় বারবার। ব্যারেলবোঝাই গাড়ি কাদায় আটকে যায়। জামাকাপড় ভিজে একাকার। ব্যাগ ধুলো আর গরমে আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এবার পুরো ভিজে গেছে। ঠান্ডায় কাঁপছিলেন আমিরারা। প্রার্থনা করেছিলেন, যেন নিরাপদে পৌঁছাতে পারেন।

শেষমেশ আমিরা ও তাঁর স্বামী এন নাহুদ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় পৌঁছালেন। সেখান থেকে বাসে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা। হাজার মাইলের দুঃসহ যাত্রা শেষে সাময়িক আশ্রয় পান তাঁরা।

আশ্রয় উগান্ডায়, মন সুদানে

আমিরার স্বজনেরা এখনো সুদানে। সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। পাশাপাশি তিনি প্রথমবার মা হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন।

আমিরা বলেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়ার বিষয়টা নিয়ে আমি খুব ভয় পাচ্ছি। কারণ, এটাই প্রথমবার, আর আমার মা পাশে থাকবেন না। শুধু স্বামী আর এক বান্ধবী থাকবে। সবকিছু এত অগোছালো, এত বিশৃঙ্খল—আমি সামলাতে পারছি না।’

আমিরা একজন নারী অধিকারকর্মী ও গণতন্ত্রপন্থী কর্মী। যুদ্ধের সময় তিনি জরুরি সহায়তা দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেনারা তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখতেন, কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

আমিরা বলেন, ‘সেনাদের ভয় পেতাম। কারণ, তাঁরা তরুণদের ধরে নিয়ে যেতেন। আরএসএফ এসেও পরিস্থিতি ভালো হয়নি। তারা লুট করে, ধর্ষণ করে। সেনারা যা করে, এরাও কম কিছু নয়। দুই পক্ষই একই রকম।’

আরএসএফ অবশ্য বলেছে, তারা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে না। জাতিগত নিধনের অভিযোগ তারা অস্বীকার করে বলেছে, এগুলো গোষ্ঠীগত সংঘাতমাত্র। দুই পক্ষই (সরকারি সেনা ও আরএসএফ) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আমিরার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর আনন্দ হলো—মা হওয়া। কিন্তু তিনি কি সন্তানকে নিয়ে আবার কখনো সুদানে ফিরতে পারবেন?

আমিরা বলেন, ‘আশা করি, একদিন সুদানের যুদ্ধ থামবে, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে আগের মতো সব হবে না। কিন্তু অন্তত এভাবে মানুষ অকাতরে মরবে না।’
আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়
আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়। ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

Wednesday, January 28, 2026

‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতার শিকার সুদানের নারীরা

সুদানের যুদ্ধ ভোগাচ্ছে নারীদের, তাঁরা শিকার হচ্ছেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের, যা ঘটছে দায়মুক্তি নিয়ে। একসময়কার মানবাধিকারকর্মী ও বর্তমানে সেনাবাহিনী-সমর্থিত সুদান সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ কথা বলেছেন।

সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ। ব্যাপক যৌন সহিংসতা ঘটছে এই সংঘাতের মধ্যে।

সেনা-সমর্থিত সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সুলাইমা ইশহাক আল-খলিফা বলেন, লুটপাট ও হামলার সঙ্গে নারী নির্যাতন ঘটছে অহরহ। ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রায়ই ‘পরিবারের সামনেই’ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

‘বয়সের কোনো বাছ–বিচার হচ্ছে না। ৮৫ বছর বয়সী একজন নারীও ধর্ষিত হতে পারেন, এক বছরের শিশুও ধর্ষিত হতে পারে,’ বলেন তিনি।

পেশায় মনোবিদ এই নারী পোর্ট সুদানে তাঁর বাসভবনে এএফপির সঙ্গে কথা বলেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে সরব সুলাইমা ইশহাক সম্প্রতি সরকারে যুক্ত হয়েছেন।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, নারীদের যৌনদাসী বানানো হচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া লজ্জা এড়াতে তাঁদের জোর করে বিয়েও দেওয়া হচ্ছে।

যুদ্ধরত দুই পক্ষ থেকেই নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানান সুলাইমা ইশহাক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আরএসএফ এটি ‘পরিকল্পিতভাবে’ করছে। তাঁর দাবি, আরএসএফ জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে একে ব্যবহার করছে।

তাঁর মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ১ হাজার ৮০০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এই পরিসংখ্যানে পশ্চিম দারফুর ও পার্শ্ববর্তী কর্দোফান অঞ্চলে অক্টোবরের শেষভাগ থেকে নথিভুক্ত হওয়া নৃশংসতার ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো... মানুষকে অপমানিত করা, তাদের ঘরবাড়ি, এলাকা ও শহর ছাড়তে বাধ্য করা। এবং একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি... ভেঙে দেওয়া।’

‘যখন আপনি যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তার মানে আপনি... যুদ্ধকে চিরস্থায়ী করতে চান,’ বলেন তিনি।

‘যুদ্ধাপরাধ’

হর্ন অব আফ্রিকায় নারীদের ওপর নির্যাতন পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থা এসআইএইচএ নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার নথিভুক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ধর্ষণের, যার ৮৭ শতাংশের জন্য দায়ী আরএসএফ।

সুদানের দারফুরে অনারব সম্প্রদায়গুলোর ওপর পরিকল্পিত হামলা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত ‘যুদ্ধাপরাধের’ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।

আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান জানুয়ারির মাঝামাঝিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, তদন্তকারীরা দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি এল-ফাশেরে একটি ‘সংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযানের’ প্রমাণ পেয়েছেন, যা অক্টোবরের শেষে আরএসএফ দখল করে নেয়।

তিনি বলেন, এই অভিযানের মধ্যে ছিল ‘ব্যাপক হারে’ গণধর্ষণ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, যা অপরাধীরা কখনো কখনো ‘ভিডিও ধারণ করে উদ্‌যাপন করেছে’ এবং ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তির বোধ থেকে’ এসব কাজ করতে উৎসাহিত হয়েছে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে দারফুরে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলেছিল। সম্প্রতি জানজাওয়িদ মিলিশিয়ার (যেটি পরে আরএসএফে রূপান্তরিত হয়) একজন সাবেক কমান্ডারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ধর্ষণসহ একাধিক যুদ্ধাপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এখন যা ঘটছে, তা আরও অনেক বেশি কুৎসিত। কারণ, এখন গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং তা নথিভুক্তও হচ্ছে।’
এই নারী আরও বলেন, হামলাকারী আরএসএফ যোদ্ধারা ‘এসব কাজ খুব গর্বভরে করে এবং তারা এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখে না।’

‘আপনার মনে হবে, তাদের যেন যা খুশি করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
দারফুরে বেঁচে ফেরা বেশ কয়েকজন নারী বলেছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা তাদের নিচু জাতের মানুষের তকমা দিয়ে ‘দাস’ বলে সম্বোধন করত এবং বলত, আমি যখন তোমাকে আক্রমণ করছি, যৌন নির্যাতন করছি, তখন আমি আসলে তোমাকে ‘সম্মানিত’ করছি, কারণ আমি তোমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত বা তোমার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী।’

‘নির্যাতন অভিযান’

খার্তুম ও দারফুরের (এল-ফাশেরসহ) নারীরা বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, এদের মধ্যে ছিল পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসিভাষী ভাড়াটে সেনারা, যাদের মধ্যে মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, শাদ, কলম্বিয়া ও লিবিয়ার নাগরিকেরা ছিল, যারা আরএসএফের পক্ষে লড়াই করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই নারী বলেন, নির্যাতিতদের একটি অংশকে অপহরণ করে যৌনদাসী হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে, আবার অন্যদের সুদানের অরক্ষিত সীমান্তজুড়ে সক্রিয় পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়ার কারণে এসব ঘটনার বেশির ভাগই নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রক্ষণশীল সমাজে কলঙ্কের ভয়ের কারণেও প্রকৃত চিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রীর মতে, ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটলে পরিবারগুলো প্রায়ই তা চাপা দিতে নির্যাতিতকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘আমরা একে টর্চার অপারেশন (নির্যাতন অভিযান) বলি।’ তিনি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরীদের জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্য করার ঘটনাগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-25%2F0c6wdm2o%2FSudan-Sexual-Violence.jpg?rect=129%2C0%2C864%2C576&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুদানের গেদারেফ প্রদেশের আবু আল-নাগা আশ্রয়শিবিরে ত্রাণের অপেক্ষায় বাস্তুচ্যুত নারীরা। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। ছবি: এএফপি

Wednesday, December 17, 2025

ট্রাম্পের এজেন্ডায় সুদানের গৃহযুদ্ধ, কী ঘটতে যাচ্ছে by ওসামা আবুজাইদ

প্রকাশ ২৮ নভেম্বর ২০২৫ঃ সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সুদানের যুদ্ধের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।

হোয়াইট হাউস আগে থেকেই সুদানের জটিল পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যকার চলমান যুদ্ধ নিয়ে। তবে সৌদি যুবরাজের সফরের পর হোয়াইট হাউসের সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে মনে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লোহিত সাগরে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সন্ত্রাসবাদ দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়ার কারণে তাদের অগ্রাধিকারও সেভাবেই নির্ধারিত হচ্ছে।

আগেও হোয়াইট হাউস সতর্ক করে বলেছিল, সুদানের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। শান্তির পথ তৈরি করতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে একাধিকবার আলোচনাও হয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তথাকথিত ‘কোয়াড’ বা যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমন্বিত মঞ্চযুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, সুদানের যুদ্ধ আগে তার ‘এজেন্ডায় ছিল না’ এবং বিষয়টি তিনি যুবরাজের অনুরোধের পর গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্পের এ বক্তব্য কোনো বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না; বরং একে সৌদি যুবরাজের প্রতি সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ বলেই ধরা যেতে পারে।

এটি মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য বিশ্বাসযোগ্য আঞ্চলিক নেতা ও শান্তি উদ্যোগের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আসার সুযোগ, যার ওপর ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে নির্ভর করতে পারে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প আঞ্চলিক কূটনীতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন ভূমিকার প্রতি তার সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার আগ্রহের প্রতিফলন দেখিয়েছেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর সুদান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতাও বেড়েছে। শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন, যা সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং ‘কোয়াড’ অংশীদারদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।

তবে নতুন করে সক্রিয় হওয়া এই উদ্যোগ এসেছে অত্যন্ত দেরিতে, এক সংকটময় সময়ে। জাতিসংঘ বারবার বলেছে, সুদান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটির মুখে রয়েছে। আগেভাগে হস্তক্ষেপ করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত। যেমন সম্প্রতি এল-ফাশির শহরটি আরএসএফ বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ার ঘটনা ঠেকানো গেলে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক নৃশংসতা রোধ করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে মানবিক বিপর্যয়ও কিছুটা কমানো যেত। দেশটিতে এখন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট, জরুরি অবকাঠামোর ধ্বংস এবং ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুতিও এই মানবিক বিপর্যয়ের অন্তর্ভুক্ত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুদানের পরিস্থিতিকে প্রায়ই ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলা হয়। কারণ, বড় বড় বৈশ্বিক শক্তি একে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নিচের দিকে রাখে। শান্তিপ্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের যুক্ত হওয়া হয়তো সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ফিরিয়ে আনবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মনোযোগ আবারও মলিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সুদানের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বে দেশটির রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব কাউন্সিল সবার আগে সৌদি আরবের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিও তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

এর আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা কোয়াডের মানবিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পরোক্ষভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। এ অবস্থান পরিবর্তনের কারণ হতে পারে ট্রাম্পের সরাসরি তত্ত্বাবধানে শান্তিপ্রক্রিয়াটি নতুনভাবে গুরুত্ব পাওয়া। কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা মানতে গিয়ে দেশের ভেতরে যে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বুরহানকে দেওয়া কোনো আশ্বাস।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়ে বুরহানের এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টের পর দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কিছুটা কমে আসে। সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) সমর্থকেরা ও সুদানের ইসলামিক মুভমেন্টের মহাসচিব আলী কার্তিও নতুন করে স্থিতিশীলতার আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে আরএসএফ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানালেও ‘যারা সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে’ তাদের ‘শান্তির পথে বাধা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে তারা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান এবং একটি ‘নতুন সুদান’ গড়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরে।

এরপর কী ঘটবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সৌদি-ট্রাম্প সমঝোতা যে কোয়াডের জন্য হোয়াইট হাউসের পরিকল্পিত ও সমর্থিত রূপরেখাকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে—এমনটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। তবে ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা কোনো পক্ষকে বাড়তি সুবিধা না দিলেও বা নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ না করলেও সমঝোতা বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে পারে।

সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সমাধান ছাড়াও সুদানে শান্তির পথে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে। যেসব পক্ষ যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে, তারা হয়তো শান্তি উদ্যোগের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে। শান্তি রক্ষা করা সহজ হবে না। যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবে এটি মানবিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। মধ্যস্থতাকারী গোষ্ঠী যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কাছ থেকে অর্থবহ ছাড় বা সমঝোতা বের করতে সম্মিলিত চাপ প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু মূল ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন না–ও আসতে পারে। যুদ্ধবিরতি কেবল সাময়িক হতে পারে এবং রাজনৈতিক আলোচনার শুরুতে তা ভেঙেও যেতে পারে।

ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা দুটি দিকই বহন করে। একদিকে দেশটির বাস্তবতায় এটা রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাবকে দৃঢ় করতে পারে, আবার সুদানের ভবিষ্যৎকে দেনদরবারের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িয়ে দিতে পারে।

বুরহানের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া শান্তির ক্ষেত্রে একটি অর্থবহ সুযোগের ইঙ্গিত হলেও সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের প্রয়োগ, সুদানিদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপান্তর ও নিশ্চয়তা।

মুহূর্তটি সঠিকভাবে কাজে লাগালে সুদান সম্ভবত শেষ পর্যন্ত নাগরিক নেতৃত্বাধীন ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে। তা না হলে সুযোগটি আবারও ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে পারে।

* ওসামা আবুজাইদ, গবেষক, গ্রাসরুটস ও মানবিক নিরাপত্তা প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং ‘কোয়াড’ অংশীদারদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং ‘কোয়াড’ অংশীদারদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়। ছবি: এএফপি

সুদানে গৃহযুদ্ধের আড়ালে আসলে কী হচ্ছে, কেনই-বা এ রক্তক্ষয়ী সংঘাত

সুদানের কোরদোফান অঞ্চলের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের হামলায় বাংলাদেশের ছয় সেনাসদস্য নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। প্রায় আড়াই বছর ধরে সুদানে চলা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় লক্ষাধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও লাখ লাখ। প্রায় দুই কোটি মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। এর মধ্যে ৬০ লাখের মতো মানুষ দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিতে রয়েছেন।

আফ্রিকার সোনা ও জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ সুদানে ২০২৩ সালে নতুন করে এ গৃহযুদ্ধের শুরু। সরকারি বাহিনী সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ) ও বিদ্রোহী আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়েই মূলত এ যুদ্ধ।

আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যা, জাতিগত হত্যা এবং নারী ও শিশুদের ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। আরএসএফ ও এসএএফের পক্ষে-বিপক্ষে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা দেশ। জাতিসংঘ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সুদানে এ মুহূর্তে বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় চলছে।

কেন এ গৃহযুদ্ধ

সুদানে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সংঘাতের শুরুটা সেই ২০১৯ সালে। তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতন হয়। তবে এ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকে বশিরের প্রায় তিন দশকের শাসন অবসানের দাবিতে সুদানে বিক্ষোভ হচ্ছিল। বশিরের পতনের পরও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সুদানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ চলতে থাকে।

বশিরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এসএএফপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফের প্রধান জেনারেল হামদান দাগালো, যিনি ‘হেমেদতি’ নামে বেশি পরিচিত। সফল সামরিক অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারে প্রেসিডেন্ট হন বুরহান। হেমেদতি হন বুরহানের ডেপুটি।

বুরহান ও হেমেদতির মধ্যে বিরোধ

একটা সময় পর দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে বুরহান ও হেমেদতির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বলা হয়ে থাকে, হেমেদতির দাবি ছিল, আরএসএফের এক লাখ সদস্যকে সেনাবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করতে হবে। এরপর নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব থাকবে তাঁর হাতে।

কিন্তু হেমেদতির এ প্রস্তাব নিয়ে বুরহানের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। তাঁর আশঙ্কা হয়, হেমেদতি তাঁকে কৌশলে সরিয়ে দিতে চাইছেন। এ পরিস্থিতিতে দুজনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

সাম্প্রতিকতম গৃহযুদ্ধের শুরু

এমন একটি উত্তপ্ত সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরএসএফ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনী এটিকে হুমকি হিসেবে দেখে। প্রতিক্রিয়ায় এসএএফ সদস্যদের রাজধানী খার্তুমের রাস্তায় নামানো হয়। কয়েক দিনের উত্তেজনা শেষে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল খার্তুমে টানা অনেকগুলো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। শুরু হয় তীব্র বন্দুকযুদ্ধ।

কোন পক্ষে আগে বন্দুক চালিয়েছে, তা নিয়ে এসএএফ ও আরএসএফ সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে।

আরএসএফ যোদ্ধা কারা

আরএসএফ গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে। মূলত জানজাবিদ মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এটি গঠন করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বশিরই তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের পরাস্ত করতে বশির সরকারের পক্ষে তারা দারফুরে দীর্ঘদিন লড়াই করে। তাদের বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান ও অ-আরব জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত হত্যা চালানোর অভিযোগ ওঠে।

একপর্যায়ে হেমেদতির আরএসএফ বাহিনী ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরে তারা ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতেও অংশ নেয়। বলা হয়ে থাকে, ওই সময় থেকে হেমেদতি সুদানের কিছু সোনার খনি নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং আহরণ করা সোনা সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাচার করতেন।

ইউএইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশটি আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহ করে। দেশটির ড্রোন নিয়েই তারা সম্প্রতি সুদানে সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু ইউএই আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আরএসএফের সাফল্য

গত জুনে আরএসএফ লিবিয়া ও মিসর সীমান্তে সুদানের বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। গত অক্টোবরের শেষ দিকে গুরুত্বপূর্ণ আল-ফাশের এলাকা দখল করে তারা। আল–ফাশের ছিল সুদানের সরকারি সেনাদের সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটি। আল–ফাশেরের মধ্য দিয়ে প্রায় পুরো দারফুর অঞ্চল আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।

বর্তমানে দারফুরের পার্শ্ববর্তী কোরদোফায় মনোযোগ দিয়েছে আরএসএফ। দক্ষিণ সুদানের সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলেই এখন ব্যাপক ড্রোন হামলা চালাচ্ছে আরএফএফ।

সম্প্রতি বুরহান সরকারের সমান্তরাল বিদ্রোহী সরকার ঘোষণা করেছেন হেমেদতি। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০১১ সালের পর সুদান হয়তো দ্বিতীয়বারের মতো ভাগ হতে যাচ্ছে।

বুরহান সরকারের নিয়ন্ত্রণ

বুরহানের নেতৃত্বাধীন এসএএফ উত্তর ও পূর্ব সুদানের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। মিসরই তাদের প্রধান সমর্থক। নীল নদের পানির ভাগাভাগি নিয়ে মিসর তাদের ওপর নির্ভরশীল।

লোহিত সাগরের তীরবর্তী পোর্ট সুদানে নিজের সদর দপ্তর চালু করেছেন বুরহান। তাঁর সরকারকে সুদানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।

কিন্তু পোর্ট সুদান কত দিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, গত মার্চে সেখানে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছিল আরএসএফ। এ হামলার পেছনে কারণ, ওই মাসে রাজধানী খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তারা। সুদানের প্রেসিডেন্টের ভবন রিপাবলিকান প্যালেসও এসএফের দখলে চলে গিয়েছিল। সাম্প্রতিকতম গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে এটি আরএসএফ দখল করেছিল।

খার্তুম দখলের ক্ষেত্রে এসএএফ ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার করেছে। বলা হয়, এসব ড্রোন ইরান থেকে গেছে।

[তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান ও গ্লোবাল কনফ্লিক্ট ট্র্যাকার]

আরএসএফের হামলার মুখে বাস্তুচ্যুত মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। উত্তর দারফুরের তাওয়িলা শহর, ১৫ এপ্রিল ২০২৫
আরএসএফের হামলার মুখে বাস্তুচ্যুত মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। উত্তর দারফুরের তাওয়িলা শহর, ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

সোনা, চোরাচালান ও ক্ষুধা: সুদানে যেভাবে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ by ওসামা আবুজায়েদ

৮ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দেশটির সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্র হেগলিগ দখল করে। এর ফলে দক্ষিণ সুদানের তেল রপ্তানির প্রধান প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এই তেল রপ্তানি থেকেই দেশটির প্রায় সব রাজস্ব আসে। তেলক্ষেত্রটি সুদানের দক্ষিণ সীমান্তের কাছে পশ্চিম কোরদোফান এলাকায় অবস্থিত, যেখানে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীগুলো প্রায়ই সংঘর্ষে জড়ায়। এর আগে আরএসএফের বিরুদ্ধে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ওই স্থাপনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে। ওই ড্রোন হামলার কারণে গত আগস্ট মাসেও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক উত্তর কোরদোফানের হামরাত আল শেখ এলাকায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির একটি ট্রাকে হামলার নিন্দা জানান। ট্রাকটি উত্তর দারফুরের তাওইলায় বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া একটি বহরের অংশ ছিল। বাস্তুচ্যুত মানুষেরা মূলত এল ফাশের ও আশপাশের এলাকায় সংঘাতের কারণে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল।

ওই হামলায় আটজন নিহত হয় এবং অনেক আহত হয়। গত এক বছরে সুদানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মী, স্থাপনা বা সম্পদের ওপর এটি ছিল ষষ্ঠ বড় ধরনের হামলা।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এমন এক যুদ্ধের বহিঃপ্রকাশ, যা নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে চলছে। হেগলিগের মতো রাজস্ব আয়ের অবকাঠামো দখল করা এবং মানবিক সহায়তার পথগুলোয় হামলা চালানো একই সংঘাত-যন্ত্রের দুটি চালিকা শক্তি। একদিকে এগুলো যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাড় করে, অন্যদিকে অভাব ও সংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে এবং প্রতিরোধের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

সুদানের সংঘাত যখন চতুর্থ বছরে পা দিতে যাচ্ছে, তখন বিশ্বের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে গেছে নানা দিকে। কিন্তু ১ কোটি ২৪ লাখ বাস্তুচ্যুত সুদানির জন্য এ যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সংকটের কারণে। সেটি হলো দেশের অর্থনীতিকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া।

আকাশপথে হামলা ও ব্যাপক সহিংসতা সংবাদ শিরোনামে থাকলেও এর পাশাপাশি আরেকটি নীরব যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ চালানো হচ্ছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সম্পদ লুট এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করার মাধ্যমে।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সুদানি পাউন্ডের মূল্য অন্তত ২৩৩ শতাংশ কমে গেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়ে গেছে ১১৩ শতাংশ। বর্তমানে ২ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে, যা বিশ্বে এখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বোচ্চ সংখ্যা!

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একটি হিসাবি বাস্তবতা। সুদানের যুদ্ধকে শুধু সামরিক বিশ্লেষণ দিয়ে বোঝা যায় না।

দেশটিতে স্পষ্টভাবে একটি মুদ্রাযুদ্ধ চলছে এবং মূল্যস্ফীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি ইচ্ছাকৃত কৌশল।

সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোয় ব্যাংকব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ব্যাংকের শাখা লুট হয়েছে, ভল্ট খালি করে নেওয়া হয়েছে। দারফুরের কিছু এলাকায় মানুষ খাবারের বিনিময়ে নিজেদের ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম সোনার ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও সুদানের এ সম্পদই এখন যুদ্ধের অর্থের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর উৎপাদিত সোনার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ প্রতিবেশী দেশ হয়ে পাচার করা হয়। শুধু ২০২৪ সালেই এর মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার আয় হয়েছে।

দারফুরের ক্ষুদ্র সোনার খনির ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে আরএসএফ। অন্যদিকে সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রীয় খনি আয়ের পয়সা অস্ত্র কেনার কাজে ব্যবহার করছে।

আরএসএফ তাদের যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাড় করতে সুদানের গাম অ্যারাবিক বাণিজ্যকেও অস্ত্রে পরিণত করেছে। গাম অ্যারাবিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পণ্য, যা কোকাকোলার মতো পণ্যে ব্যবহৃত হয়। কোরদোফান ও দারফুরের প্রধান উৎপাদন অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোষ্ঠীটি অনানুষ্ঠানিক কর আরোপ করেছে, গুদাম লুট করেছে এবং সীমান্ত পেরিয়ে রজন পাচার করেছে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে মাত্র ছয় মাসে লুট করা গাম অ্যারাবিক বিক্রি করে পাওয়া ১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আরএসএফের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সহায়তা লুট এবং টিকে থাকার নামে কর আদায়ের মাধ্যমে লুটতরাজভিত্তিক একটি অর্থনীতি গড়ে তুলেছে আরএসএফ।
খাদ্যসহায়তার বহর জব্দ করে সেগুলো আরএসএফ পরিচালিত বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হয়। ত্রাণকর্মীরা আরএসএফ–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধেও তুলেছেন।

এত কিছুর পরও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। ২০২৫ সালের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা আহ্বানের মাত্র ২১ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। বড় দাতারা ২০২৪ সালের তুলনায় সহায়তা বাজেট ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

নিজস্ব আয়ের উৎসে ভর করে চলা এই যুদ্ধ শুধু যুদ্ধবিরতিতে থামবে না। সহিংসতাকে বারবার নতুন করে জিইয়ে রাখে যে আর্থিক কাঠামো, তা ভেঙে না ফেললে কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই অর্থবহ হতে পারে না।

কাগজে লেখা কূটনৈতিক সমঝোতায় সুদানের যুদ্ধের অবসান হবে না। এর অবসান ঘটবে তখনই, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশেষে সেই অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কগুলোর মুখোমুখি হবে, যেগুলো এই যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছে। বার্তাটি স্পষ্ট। ছায়া অর্থনীতির এই যুগে টেকসই শান্তি চাইলে অবশ্যই একটি কঠোর অর্থনৈতিক জবাবদিহির পথে যেতে হবে।

ওসামা আবুজায়েদ, খার্তুমভিত্তিক উন্নয়ন ও সুশাসনবিষয়ক গবেষক
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সুদানে রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে
সুদানে রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। ছবি: রয়টার্স

Sunday, December 7, 2025

সুদানে কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা, ৪৬ শিশুসহ নিহত ১১৪

আফ্রিকার দেশ সুদানে একটি কিন্ডারগার্টেনসহ একাধিক স্থানে আধা সামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) হামলায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১১৪ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬টি শিশু। স্থানীয় কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ হামলার ঘটনা ঘটে সাউথ করদোফান রাজ্যের কালোগিতে, গত বৃহস্পতিবার। কালোগির নির্বাহী পরিচালক গতকাল শনিবার আল–জাজিরাকে অন্তত ৭১ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিলেন।

এর আগে গত শুক্রবার দিনের শেষে সুদানের চিকিৎসকদের জোট সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে জানায়, ঘটনাস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা হয়েছে।

সুদানের সরকার–সমর্থিত সুদানিজ আর্মড ফোর্সেসের (এসএএফ) দুটি সূত্র আল–জাজিরাকে জানায়, বৃহস্পতিবার ওই কিন্ডারগার্টেনে আরএসএফ প্রথমবার হামলা চালায়। পর উদ্ধারকাজে সেখানে জড়ো হওয়া বেসামরিক মানুষদের ওপর আরেক দফায় হামলা চালানো হয়।

এ ছাড়া শহরের হাসপাতাল ও একটি সরকারি ভবনে বোমা হামলা চালানো হয়েছে বলে জানায় একটি সূত্র।

সুদানে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন উয়েত শুক্রবার বলেন, নিজের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিশুদের হত্যা করা শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিবদমান সব পক্ষের প্রতি অবিলম্বে এমন সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শিশুদের কখনোই সংঘাতের মূল্য চোকানো উচিত নয়।

সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক বলেছে, বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় একের পর এক হামলার ধারাবাহিকতায় চালানো এবারের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

রাজধানী খার্তুম থেকে আল–জাজিরার হিবা মরগান জানান, প্রাথমিক প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, হতাহত মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। নিহত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কেননা, হামলায় আহত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

২০২৩ সাল থেকে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরএসএফের লড়াই চলছে। দেশের কেন্দ্র ও পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে সেনাবাহিনী। আর আরএসএফ পশ্চিমাঞ্চলের, বিশেষ করে উত্তর করদোফান ও দারফুর অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব জোরদার করতে চাইছে। এসব সংঘাতে দরিদ্র দেশটির লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-07%2Fh0t1lryc%2FDeadly-attack.webp?rect=81%2C0%2C863%2C575&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুদানে চলমান সংঘাতে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফাইল ছবি: এএফপি

Wednesday, November 5, 2025

সুদানে কারা গণহত্যা চালাচ্ছে, আরব আমিরাতের ভূমিকা কী by নাতাশা বুতি ও ফারুক চোথিয়া

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদান এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিতে দেশটির সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী আধা সামরিক গোষ্ঠী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে শুরু হওয়া তীব্র লড়াই থেকে এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয় এবং সেখানে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগও ওঠে।

সম্প্রতি আরএসএফ এল-ফাশের শহরটি দখল করার পর এর বাসিন্দাদের নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত সারা দেশে দেড় লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। জাতিসংঘ এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট বলে অভিহিত করেছে।

পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান ও সংঘাতের শুরু

১৯৮৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই দফায় দফায় যে উত্তেজনা চলছিল, তার সর্বশেষ পরিস্থিতি হচ্ছে বর্তমান গৃহযুদ্ধ।

বশিরের প্রায় তিন দশকের শাসনের অবসানের দাবিতে বিশাল জনবিক্ষোভ হয়েছিল। তারই প্রেক্ষিতে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। কিন্তু দেশটির মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে একটি যৌথ সামরিক-বেসামরিক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে আরও একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারটিকে উৎখাত করা হয়। এই অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও দেশটির কার্যত প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং তাঁর ডেপুটি ও আরএসএফ নেতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো।

এই দুই জেনারেল দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ ও বেসামরিক শাসনে ফিরে যাওয়া নিয়ে প্রস্তাবিত পদক্ষেপে একমত হতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে মূল বিরোধের বিষয় ছিল প্রায় এক লাখ সদস্যের আরএসএফ-কে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা এবং নতুন এই যৌথ বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে। ধারণা করা হয়, দুজন জেনারেলই তাঁদের ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

আরএসএফ সদস্যদের দেশের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হলে সেনাবাহিনী বিষয়টিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। সেই লড়াই দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে এবং আরএসএফ খার্তুমের বেশির ভাগ অংশ দখল করে নেয়। যদিও প্রায় দুই বছর পর সেনাবাহিনী খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।

আরএসএফ, গণহত্যার অভিযোগ ও আরব আমিরাতের ভূমিকা

আরএসএফ গঠিত হয় ২০১৩ সালে। যে কুখ্যাত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দারফুরে নৃশংস গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্য থেকে আরএসএফ বাহিনী গড়ে ওঠে।

জেনারেল দাগালো আরএসএফকে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। এ বাহিনীর মাধ্যমে তিনি সুদানের কিছু সোনার খনিরও নিয়ন্ত্রণ করেন। অভিযোগ রয়েছে যে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ সোনা পাচার করেন।

সুদানের সেনাবাহিনী আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে সমর্থন দেওয়া ও ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে। যদিও উপসাগরীয় দেশটি তা অস্বীকার করেছে।

আরএসএফ এখন প্রায় পুরো দারফুর এবং পাশের কর্দোফান প্রদেশের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। সেখানে আরএসএফ একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার গঠন করায়, সুদান সম্ভবত দ্বিতীয়বারের মতো বিভক্ত হতে চলেছে। ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে।

দারফুরের অনেক বাসিন্দা মনে করেন, আরএসএফ ও সহযোগী মিলিশিয়ারা জাতিগতভাবে মিশ্র জনগোষ্ঠীর অঞ্চলটিকে আরব-শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আরএসএফ মাসালিত ও অন্যান্য অ-আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। তারা এটিকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও সমর্থন

সামরিক বাহিনী দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলো মিসর, যার সঙ্গে সুদানের অভিন্ন সীমান্ত ও নীল নদের পানি ভাগাভাগির সম্পর্ক রয়েছে।

জেনারেল বুরহান লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট সুদানকে তাঁর সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকারের কেন্দ্র বানিয়েছেন। আরএসএফ সেখানে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। আরএসএফ চলে যাওয়ার সময় রাজধানী খার্তুম ছিল এক ধ্বংসস্তূপ। সেখানে হাসপাতাল, ক্লিনিক, সরকারি ভবনগুলো বিমান হামলা ও কামানের গোলায় ধ্বংস হয়েছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল আরএসএফ ও সহযোগী মিলিশিয়ারা গণহত্যা করেছে। তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছিলেন, আরএসএফ জাতিগত সহিংসতার ভিত্তিতে পুরুষ, বালক ও শিশুদের পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করেছে এবং নারীদের ওপর জঘন্য যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে জেনারেল দাগালো এবং পরে জেনারেল বুরহানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা যদিও সেখানে গণহত্যা ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি; তবে তঁারা নিশ্চিত করেন যে আরএসএফ ও সেনাবাহিনী উভয়ই যুদ্ধাপরাধ করেছে।

শান্তি প্রচেষ্টা

সৌদি আরব ও বাহরাইনে বেশ কয়েক দফা শান্তি আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। উভয় পক্ষ, বিশেষ করে সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতিতে অনিচ্ছা দেখিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস আক্ষেপ করে বলেছেন যে বিশ্বের অন্যান্য সংকটের তুলনায় সুদানের এই সংঘাতের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ কম। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে সুদান নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া একেবারেই কম। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, সুদানের ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন। এসব কারণে সুদানের সংঘাত আজ বিশ্বের ‘বিস্মৃত যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

* নাতাশা বুতি ও ফারুক চোথিয়া, বিবিসির সাংবাদিক
- বিবিসি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ

গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে সুদানের রাজধানী খার্তুম।
গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে সুদানের রাজধানী খার্তুম। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, November 3, 2025

মানবতার সবচেয়ে অন্ধকারে ডুবে আছে সুদান

মানবতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ে ডুবে আছে সুদান। ৪৮ ঘণ্টায় সেখানে হত্যা করা হয়েছে ২০০০ বেসামরিক নাগরিককে। প্রসূতি হাসপাতালে ৪৬০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। স্বামীদের বাধ্য করা হয়েছে স্ত্রীর ধর্ষণের শব্দ শুনতে। সব দেখে মনে হচ্ছে দেশটিতে নরক নেমে এসেছে। জাতিসংঘ একে ‘অত্যাচারের যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবুও সুদানের গৃহযুদ্ধের নৃশংসতা প্রায় ভুলে গিয়েছে বিশ্ব। কিন্তু এখন আবার সেই ভয়ঙ্কর বাস্তবতা সামনে এসেছে। এ সপ্তাহে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় দুই হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

দেশজুড়ে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। পুরুষ ও শিশুদের বাধ্য করা হয়েছে তাদের স্ত্রী, মা ও কন্যাদের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ ধর্ষণ প্রত্যক্ষ করতে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।  উত্তর দারফুরের রাজধানী এল ফাশের সোমবার ১৮ মাসের অবরোধের পর র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) নামে এক আধাসামরিক বাহিনীর হাতে পড়ে। এই বাহিনী নিজস্ব সমান্তরাল সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। সুদানি সেনাবাহিনীর শেষ অবস্থানগুলো ধসে পড়েছে। সাহায্য সংস্থা ও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গণহত্যা, ঘরে ঘরে হত্যা ও রক্তে ভেসে থাকা রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহের দৃশ্য সর্বত্র। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে গণকবর ও গণহত্যার চিহ্ন। বিশ্লেষকদের মতে- রক্তের দাগে ঢাকা মাটি। বেঁচে যাওয়া লোকজন জানিয়েছেন, শিশুদের বিছানায় গুলি করা হয়েছে, আর হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীদের হত্যা করা হয়েছে। বুধবার জানা যায়, একটি প্রসূতি হাসপাতালে ৪৬০ জনের বেশি মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সুদান নেটওয়ার্ক ডক্টরস এক বিবৃতিতে জানায়, র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস ঠাণ্ডা মাথায় সৌদি হাসপাতালের ভেতরে যাদের পেয়েছে সবাইকে হত্যা করেছে। নার্স নাওয়াল খলিল বলেন, ছয়জন আহত মানুষকে বিছানায় হত্যা করেছে আরএসএফ। তাদের মধ্যে নারীও ছিলেন। আমি পালিয়ে বাঁচি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, নিরস্ত্র মানুষদের এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। কিছু ভিডিওতে আল-ফাতেহ আবদুল্লাহ ইদরিস নামে এক ব্যক্তি নিজেই মানুষ হত্যার ভিডিও করেছে। পরে দাবি করে, সে নিজেই হয়তো দুই হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। দেশটির এই গৃহযুদ্ধে যৌন সহিংসতা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণ, যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার এবং জাতিগত পরিচয় বা আনুগত্যের কারণে ধর্ষণ- এসব এখন নিয়মিত ঘটনা।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশ করে ‘দে রেপড অল অব আস’ শিরোনামে এক তদন্ত প্রতিবেদন। সেখানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আরএসএফ সদস্যদের হাতে নারীদের দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। ৩০ বছর বয়সী হামিদা বলেন, তারা আমার হাত বেঁধে তিনজন মিলে ধর্ষণ করে। এ সময় সে দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা হয় আমার মেয়েকে। আমি হাসপাতালে যাইনি, কারণ কেউ যেন বিষয়টি না জানে। আমি ভেঙে পড়েছি। ছয় সন্তানের মা আমিনা বলেন, আমার ১১ বছর বয়সী ছেলে চিৎকার করছিল। বলছিল-  আমার মাকে ছেড়ে দাও। ওরা আমার ছেলেকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে মারে। এতে তার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। ১৭ দিন পর সে মারা যায়। অবশেষে তিনি ধর্ষকের সন্তান জন্ম দেন। কোনো চিকিৎসা পাননি। হুসেইন নামের ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, ওরা আমার স্ত্রীকে আমার সামনে ধর্ষণ করে হত্যা করে। তারপর আমাকে প্রহার করে অচেতন করে ফেলে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা যায়, এক বছর বয়সী শিশুদেরও ধর্ষণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে কমপক্ষে ২০০ শিশুর ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪ জন এক বছরের শিশু এবং ১৬ জন পাঁচ বছরের নিচে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ছাড়াও আরএসএফ সদস্যরা নারীদের গরম তরল ঢেলে, ব্লেড দিয়ে কেটে নির্যাতন করেছে। এসব ঘটনার অপরাধী কখনও শাস্তি পায়নি।

বিশ্লেষকরা নিশ্চিত করেছেন এ সপ্তাহে আরএসএফ দারফুরের এল-শাফির শহর দখল করেছে। এটি ছিল সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি। তা দখল করে নেয়া যুদ্ধের নতুন এক ভয়াবহ মোড়। জাতিসংঘ মাসের পর মাস হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল। কিন্তু বিশ্ব উদাসীন। পাঁচ সন্তানের এক মা বললেন, ওরা আমার বাড়িতে ঢুকে আমার ১৬ বছরের ছেলেকে হত্যা করে। অন্যরা জানিয়েছেন, আরএসএফ সদস্যরা বন্দিদের শিরচ্ছেদ করার হুমকি দিচ্ছিল। বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের মাইলের পর মাইল হেঁটে টুয়িলার দিকে পালাতে হয়েছে। পথে মৃতদেহের সারি দেখা গেছে। হাজারের মধ্যে মাত্র কিছুজনই জীবিত পৌঁছেছেন।

এক মানবাধিকার কর্মী বলেন, পুরুষরা পৌঁছাতে পারছেন না। হয় তারা নিহত, নিখোঁজ বা বন্দি।
উল্লেখ্য, সুদানের অস্থিরতার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিতে ২০টি অভ্যুত্থান, তিনটি গৃহযুদ্ধ, প্রায় চার মিলিয়ন মৃত্যু হয়েছে। বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে, যখন দুই সামরিক নেতা পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। তাদের একজন আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। অপরজন মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেদতি)। আরএসএফ আসলে ২০০০ সালের গোড়ার জানজাউইদ মিলিশিয়া থেকে গড়ে উঠেছে। তারা দারফুরে জাতিগত নিধনের অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০২৪ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম দারফুরে জাতিগত নির্মূল, ধর্ষণ, গণহত্যা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের জুনে এল জেনিনায় ১৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হয় বলে জাতিসংঘ জানায়।

mzamin

Sunday, November 2, 2025

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা: সুদানে ‘গণহত্যা’ হয়েছে

সুদানের এল-ফাশের শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চলছে। কৃত্রিম ভূ–উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন দাবি করেছেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেশটির আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সসের (আরএসএফ) লড়াই চলছে। গত রোববার তারা এল-ফাশের দখল করে। এর মাধ্যমে প্রায় দেড় বছরের দীর্ঘ অবরোধের পর পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটিটিও ছিনিয়ে নেয় তারা।

শহরটি পতনের পর থেকে সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যা, যৌন সহিংসতা, ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা, লুটপাট এবং অপহরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেখানকার যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

এল-ফাশের থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী তাওইলা শহরে জীবিত বেঁচে ফেরা কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে এএফপির সাংবাদিক কথা বলেছেন। সেখানে গণহত্যা হয়েছে জানিয়ে তাঁরা বলেন, শহরটিতে মা-বাবার সামনেই শিশুদের গুলি করা হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় সাধারণ মানুষকে মারধর করে তাঁদের মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়েছে।

পাঁচ সন্তানের মা হায়াত শহর থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে থাকা তরুণদের আসার পথেই আধা সামরিক বাহিনী থামিয়ে দেয়। আমরা জানি না, তাদের কী হয়েছে।’

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাব বলেছে, গত শুক্রবার পাওয়া কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে ‘বড় ধরনের কোনো জমায়েত চোখে পড়েনি।’ এ কারণে মনে করা হচ্ছে, সেখানকার জনগণের বড় একটি অংশ হয় ‘মারা গেছে, বন্দী হয়েছে কিংবা লুকিয়ে আছে।’ সেখানে গণহত্যা অব্যাহত থাকার বিভিন্ন ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আল-ফাশের থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়েছে। এখনো কয়েক হাজার মানুষ শহরটিতে আটকা পড়েছে। আরএসএফের সর্বশেষ হামলার আগে সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বসবাস করত।

শনিবার বাহরাইনে এক সম্মেলনে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল বলেন, সুদান একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। আরএসএফ নাগরিকদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তাদের এই কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-01%2Fc9npn6vk%2F2025-10-31T122958Z2112661870RC2ZMHAKCGN1RTRMADP3SUDAN-POLITICS-MISSING.JPG.JPG?rect=236%2C0%2C2526%2C1684&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুদানে চলমান সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ অস্থায়ী তাবুতে বসবাস করছে। ছবি: এএফপি

Thursday, June 5, 2025

সুদানে গৃহযুদ্ধের প্রকোপে দেশ ছেড়েছেন ৪০ লাখের বেশি মানুষ: জাতিসংঘ

সুদানে গৃহযুদ্ধের প্রকোপে দেশ ছেড়েছেন ৪০ লাখের বেশি মানুষ। তারা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। মঙ্গলবার জেনেভায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় এ তথ্য জানিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক মুখপাত্র ইউজিন বায়ুন। বলেছেন, দেশটিতে তহবিলের ঘাটতি থাকায় বেঁচে থাকা মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউজিনকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সুদানের গৃহযুদ্ধ এখন তৃতীয় বছর পার করছে। দেশটিতে চল্লিশ লাখের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটের একটি। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও হাজার হাজার মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

ইউজিন বলেছেন, সুদানের সংঘাত যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আরও হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। আট লাখের বেশি সুদানি পার্শ্ববর্তী দেশ চাদে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে সেখানে শরণার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন তারা।  প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের এপ্রিলে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সুদান। এরপর থেকে দেশটির সঙ্গে সীমান্ত থাকা দেশগুলোতে পালাতে শুরু করে সেদেশের মানুষ। যা বর্তমানে চল্লিশ লাখ ছাড়িয়েছে। সুদানের সীমান্তবর্তী দেশগুলো হলো- চাদ, দক্ষিণ সুদান, মিশর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং লিবিয়া।

mzamin

Saturday, March 22, 2025

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নিল সুদানের সেনাবাহিনী

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে সুদানের সেনাবাহিনী। তারা জানিয়েছে, শুক্রবার (২১ মার্চ) সেনাবাহিনী খার্তুমের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশকে বিভক্ত করার হুমকি দেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দুই বছরের পুরোনো সংঘাতের সবচেয়ে প্রতীকী সাফল্যের মধ্যে এটি একটি। দেশটিতে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ব্যাকফুটে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তারা অগ্রগতি অর্জন করছে এবং আধা-সামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) কাছ থেকে দেশের কেন্দ্রস্থলের অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেছে।

এদিকে আরএসএফ পশ্চিমে নিয়ন্ত্রণ একীভূত করেছে, যুদ্ধক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং দেশকে কার্যত বিভক্তির দিকে নিয়ে গেছে। গোষ্ঠীটি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় একটি সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। যদিও এটি ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে না।

সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা মধ্য খার্তুমের মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোর নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে। সামরিক সূত্র জানিয়েছে, আরএসএফ যোদ্ধারা প্রায় ৪০০ মিটার দূরে সরে গেছে।

২০২৩ সালের এপ্রিলে সশস্ত্র বাহিনীতে আধা-সামরিক বাহিনীর একীভূতকরণ নিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, আরএসএফ দ্রুত খার্তুমের প্রাসাদটি এবং শহরের বাকি অংশ দখল করে নেয়।

সেনাবাহিনী প্রাসাদে সৈন্যদের উল্লাসের ভিডিও শেয়ার করেছে। এতে দেখা গেছে, কাচের জানালা ভেঙে গেছে এবং দেয়ালে গুলির চিহ্ন রয়েছে। তবে প্রাসাদ পুনরুদ্ধার এবং খার্তুমে সেনাবাহিনীর অগ্রগতি সম্পর্কে আরএসএফ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা দেশের পশ্চিমে অবস্থিত উত্তর দারফুরে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি দখল করেছে। অনেক সুদানি সেনাবাহিনী প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবরকে স্বাগত জানিয়েছে।

৫৫ বছর বয়সী খার্তুমের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রাসাদের মুক্তি আমার শোনা সেরা খবর। কারণ এর অর্থ হলো খার্তুমের বাকি অংশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসার শুরু। আমরা আবার নিরাপদে থাকতে চাই এবং ভয় বা ক্ষুধা ছাড়াই বাঁচতে চাই।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই সংঘাত বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকটের দিকে পরিচালিত করেছে, বিভিন্ন স্থানে দুর্ভিক্ষ এবং ৫ কোটি মানুষের দেশজুড়ে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

সংঘাতে উভয়পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, অন্যদিকে আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে উভয় পক্ষই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে সেনাবাহিনী। ছবি : সংগৃহীত
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে সেনাবাহিনী। ছবি : সংগৃহীত



Wednesday, May 3, 2023

সুদান থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছেন এক লাখ মানুষ: জাতিসংঘ

সুদানে বেড়েছে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ। এরপরও রাজধানী খার্তুম থেকে দফায় দফায় ভেসে আসছে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে সেখানে মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের এই সময়ে দেশটি থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এক লাখ মানুষ।


সুদান ছেড়ে যাওয়া এসব মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সংকট ডেকে আনতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। নড়বড়ে অর্থনীতি সুদানেরও। আগে থেকেই দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে যুদ্ধের কারণে সেখানে বিভিন্ন সহায়তা পণ্য সরবরাহে বাধা পড়ছে।

সুদানের এই পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত প্রতিবেশী মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। আজ মঙ্গলবার জাপানের একটি দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে। যুদ্ধ থামাতে সুদানের দুই বাহিনীকে আলোচনায় বাসানোর বিষয়েও আগ্রহও দেখিয়েছেন তিনি।

সুদানে এই যুদ্ধের শুরু গত ১৫ এপ্রিল, ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব থেকে। একদিকে সেনাবাহিনী, অন্যদিকে আধা সামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)। একসময় মিত্র ছিল দুই বাহিনী। ২০২১ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুদানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তারা। কিন্তু আরএসএফকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে।

তুমুল যুদ্ধের মধ্যে আজ সুদান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণসহায়তা প্রধান মার্টিন গ্রিফিথসের। আর জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গতকাল সোমবার জানিয়েছে, সুদানের তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চলগুলোতে আবার কাজ শুরু করছে তারা। সংঘাতের কারণে কিছুদিন সহায়তা কর্ম বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাদের।

সুদানের চলমান যুদ্ধে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুদ্ধ ঘিরে মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসির মতো একই শঙ্কা ডব্লিউএফপির পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক মাইকেল ডানফোর্ডের। তাঁর ভাষায়, ‘ঝুঁকির বিষয়টা হলো, এই যুদ্ধ শুধু সুদানকে একটা সংকটে ফেলতে যাচ্ছে না। এটি একটি আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হতে যাচ্ছে।’

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার দেওয়া হিসাব বলছে, ১ লাখ মানুষ সুদান ছাড়ার পাশাপাশি, দেশটির অভ্যন্তরে আরও ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাড়ি জমিয়েছে। এখনো অনেকে দেশ ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। গতকাল জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, শেষ পর্যন্ত ৮ লাখ মানুষ সুদান ছাড়তে পারে।

প্রাণ বাঁচাতে সুদান ছাড়তে চাওয়া এমনই একজন আয়শা ইব্রাহিম দাউদ। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে একটি ভাড়ার গাড়িতে করে খার্তুম থেকে উত্তরাঞ্চলের ওয়াদি হালফা শহরে পৌঁছেছেন তিনি। সেখানে অন্য নারী ও শিশুদের সঙ্গে গাদাগাদি করে একটি ট্রাকে করে পৌঁছেছেন মিসর সীমান্তে।

আয়শা বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই জটিল। মিসরে ঢুকতে অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। আমাদের দুর্ভোগ নজিরবিহীন। তবে দেশ ছাড়তে আমরা গুলির শব্দ, গরমের মধ্যে ট্রাকের পেছনে গাদাগাদি করে থাকা—সবকিছুই সহ্য করতে পারব।’


Friday, October 25, 2019

ওমর বশির: যেভাবে সুদানের ৩০ বছরের শাসকের উত্থান ও পতন

লাস্ট আপডেট- ১১ এপ্রিল ২০১৯: সুদানে যেভাবে ওমর আল-বশিরের শাসনামল শুরু হয়েছিল, সেভাবেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হলো।
টেলিভিশন ঘোষণায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আওয়াদ ইবনে ওউফ নিশ্চিত করেছেন যে, আল-বশিরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক কাউন্সিল দুই বছরের জন্য দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। একটি নির্বাচন আয়োজন করা হবে তাদের দায়িত্ব।
তিনমাসের জন্য দেশটিতে জরুরি অবস্থা এবং একমাসের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে।
তিনি আরো জানিয়েছেন, ওমর আল-বশিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একটি নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে।

কয়েক দশকের যুদ্ধ

আল-বশিরের রাজনৈতিক জীবনকে যুদ্ধ দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায়।
১৯৮৯ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন এবং শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করেছেন। ২০১১ সালে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ সুদানের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত এই দেশটি ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে বড় দেশ।
যখন তিনি ক্ষমতা দখল করেন, সুদান তখন উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে ২১ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে।
মি. বশির শক্ত হাতে জবাব দিতে শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে দমন পীড়ন এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।
তার বিরুদ্ধে ২০০৯ ও ২০১০ সালে দুইটি আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করা হয়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুইটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। তার সর্বশেষ নির্বাচন বিরোধীরা বর্জন করে।
৩০ বছর ধরে সুদানের ক্ষমতায় ছিলেন ওমর আল-বশির
এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে তার ওপর আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়। তারপরেও মি. বশির মিশর, সৌদি আরব আর দক্ষিণ আফ্রিকায় ভ্রমণ করেন।
২০১৫ সালের জুনে তিনি অনেকটা বিব্রতকর ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন, কারণ দেশটির একটি আদালত বিবেচনা করছিল যে, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি কার্যকর করা হবে কিনা।
ক্ষমতা গ্রহণের আগে সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন মি. বশির। তিনি বিদ্রোহী নেতা জন গ্যারাঙ্গের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ অভিযান পরিচালনা করেন।
যখন তিনি সুদানিজ পিপলস লিবারেশন মুভমেন্টের পক্ষে গ্যারাঙ্গের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন যাতে চুক্তিটি পরাজয় বলে মনে না হয়।
তিনি বলেছিলেন,'' আমরা অসহায় হয়ে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি, বরং আমরা যখন বিজয়ের শীর্ষে ছিলাম, তখনি তাতে স্বাক্ষর করেছি।''
তার সবসময়েই লক্ষ্য ছিল একটি একীভূত সুদান রক্ষা করা, কিন্তু শান্তি চুক্তির অংশ হিসাবে দক্ষিণ সুদানের বিষয়ে একটি গণভোট আয়োজন করতে বাধ্য হন।
২০১১ সালের জানুয়ারির গণভোটে ৯৯ শতাংশ দক্ষিণ সুদানিজ ভোটার আলাদা হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ছয় মাস পরে স্বাধীন দক্ষিণ সুদান ঘোষিত হয়।
দারফুরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে মি. বশিরের বিরুদ্ধে
যখন তিনি দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার পক্ষে সম্মত হন, তখনো দারফুরের প্রতি তার মনোভাব ছিল আগ্রাসী।
কিন্তু কৃষ্ণাজ্ঞদের ওপর নির্যাতনের কারণে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত আরব জানহাওয়েড মিলিশিয়াদের তিনি সমর্থন করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেসব অভিযোগ করেছে, তা তিনি বরাবরই অস্বীকার করে গেছেন।
ওমর আল-বশিরের বিরুদ্ধে আইসিসির যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে আছে গণহত্যা, হত্যা, জোর করে বাস্তুচ্যুত করা, ধর্ষণ, নির্যাতন, দারফুরে বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা, গ্রাম ও শহরে লুটতরাজ করা।
সামরিক মনোভাব
মি. বশিরের জন্ম হয় ১৯৪৪ সালে উত্তর সুদানের একটি খামারি পরিবারে। সে সময় সেই এলাকাটি ছিল মিশরীয় রাজত্বের অংশ। তিনি একটি বেদুইন গোত্রের সদস্য ছিলেন।
তরুণ বয়সে তিনি মিশরীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলে বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর কর্মকর্তা পদে উন্নীত হন।
তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কমই জানা যায়। তার কোন সন্তান নেই এবং ৫০ বছর বয়সের দিকে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন।
তিনি সুদানের উত্তরের যুদ্ধ বীর হিসাবে পরিচিত ইব্রাহিম শামস আল-দ্বীনের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেন।

সংকট ও বিক্ষোভ

সম্প্রতি দেশটিতে রাজনৈতিক বিক্ষোভ জোরালো হয়ে ওঠে।
সরকার তেল ও রুটির দাম বাড়ানোর পর তার ৩০ বছরব্যাপী শাসনামলের মধ্যে গত ডিসেম্বরে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হয়।
গত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে সংকটে ভুগছে সুদান, বিশেষ করে দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর। কারণ দেশের মোট উত্তোলিত তেলের চারভাগের তিনভাগই রয়েছে দক্ষিণ সুদানে।
২০০৯ সালে উত্তর দারফুরে একটি অনুষ্ঠানে মি.বশির
মুদ্রামান করে যাওয়া ও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে দেশের মানুষজন।
মি. বশিরের শাসনামলে দেশটি ২০১৮ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭২ নম্বরে রয়েছে।

সর্বশেষ প্রতিরোধ

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি এক বছর মেয়াদি জরুরি অবস্থা জারি করেন মি. বশির। তার মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন এবং দেশের সব স্টেট সরকারের গভর্নরদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেন।
কোন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবিও নাকচ করে দেন। তার দাবি, বিক্ষোভকারীরা ২০২০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দিতে পারবে।
বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে।
কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, গত ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৩৮জন মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি।
জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, তারা সকল রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে যাচ্ছে।
কিন্তু এটা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয় যে, সামরিক বাহিনী সুদানের স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চাইবে কিনা।
বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তারা চান না, একজন কর্তৃত্ববাদী শাসকের বদলে আরেকজন সেইরকম শাসক ক্ষমতায় আসুক।
সুতরাং যখন মি. বশিরের পতনে আনন্দ করছে সুদানের লোকজন, তখন ভবিষ্যতে কোন শাসক আসছে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।
এ বছরের জানুয়ারিতে খার্তুমে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ

Thursday, September 26, 2019

যে কারণে সরে যেতে হলো আলজেরিয়া ও সুদানের দুই স্বৈরশাসককে by অর্ণব সান্যাল

চলতি মাসে কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই স্বৈরাচারী একনায়কের পতন হয়েছে। তাঁরা হলেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকা ও সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। দুজনেই নিজের দেশে প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করে আসছিলেন। অথচ হুট করেই জনবিক্ষোভের মুখে ও সেনাবাহিনীর চাপে তাঁদের গদি হারাতে হলো। কিন্তু শুধু কি জনবিক্ষোভ ও সেনাবাহিনীই এসব স্বৈরাচারী শাসকের পতনের কারণ?
গবেষকেরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী একনায়কদের পতনের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় কারণ হিসেবে কাজ করে। ক্যু ও বিপ্লব—বিশ্বরাজনীতিতে এই দুটি বিষয় বেশ দুর্লভ। ক্যু ও বিপ্লব কখনোই বলেকয়ে আসে না, অকস্মাৎ ঘটে। তবে এগুলো ঘটার আশঙ্কা আঁচ করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ান আর্থ ফিউচার (ওইএফ) গবেষণা করে ক্যু সংঘটনের বা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ধারণাগত একটি মডেল তৈরি করেছে। এই মডেলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ক্যুকাস্ট’। এই মডেল অনুযায়ী ক্যু সংঘটনের কিছু অনুঘটক আছে। এগুলো হলো: ক্যুর ঝুঁকিতে থাকা কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, কোনো একনায়ক কত দিন ধরে শাসনক্ষমতায় আছেন, ওই দেশে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ক্যু হয়েছে কি না বা হলে কবে হয়েছে এবং সম্প্রতি ওই দেশ বন্যা বা দুর্ভিক্ষের মতো কোনো দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে কি না।
আলজেরিয়ায় প্রবল জনবিক্ষোভের মুখে সরে দাঁড়ান বুতেফ্লিকা। অন্যদিকে সুদানে সেনাবাহিনী সরিয়ে দিয়েছে ওমর আল-বশিরকে। ওই দুজনের বিরুদ্ধেই দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত পাঁচ বছর ধরে আলজেরিয়ার বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হলো ২ দশমিক ৮ শতাংশ। এই সময়ে পুরো পুরো আফ্রিকায় গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আর একই সময়ে সুদানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ শতাংশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস, ২০১৯ সালে সুদানের অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।
আলজেরিয়ায় তীব্র জনবিক্ষোভের মুখে গদি ছেড়েছেন আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকা। ছবি: এএফপি
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার মধ্যকার সম্পর্ক বেশ জটিল। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যে আরব বসন্ত সংঘটিত হয়েছিল, তার পেছনের কারণ শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়। ওই সময়ের আগ থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং এই উন্নতির হার বেশ ধারাবাহিক। এই দুই অঞ্চলে অতি দারিদ্র্য ও আয়–বৈষম্যও ক্রমান্বয়ে কমছে।
তাহলে ঘাপলা কোথায়? ২০০০ সালের পর হওয়া বিভিন্ন জরিপের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আরব অঞ্চলের অধিবাসীরা তাঁদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষের আয় বাড়ছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত ৪০ শতাংশ মানুষের জীবনমানের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। অর্থাৎ একটি শ্রেণির মানুষ লাভবান হলেও আরেকটি শ্রেণি বঞ্চিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষিত বেকারের উচ্চ হার। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় শিক্ষিত স্নাতকদের মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ ছিল বেকার। অথচ পুরো জনসংখ্যায় এর হার ছিল মোটে ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, বিক্ষোভ সৃষ্টির ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের চেয়ে সুযোগের অভাব বেশি ভূমিকা রাখে।
আবার ক্যু সংঘটনের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কোনো দেশে যত বেশি ক্যু সংঘটনের নজির আছে, সেই দেশে এমন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কাও বেশি থাকে। বেসরকারি সংস্থা ওয়ান আর্থ ফিউচারের (ওইএফ) তৈরি ‘ক্যুকাস্ট’ মডেল অনুযায়ী, যেসব রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী শাসন লম্বা সময় ধরে চলছে, সেসব দেশে ক্যু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আবার যেসব দেশে কিছুদিন হলো স্বৈরাচারী শাসন শুরু হয়েছে, সেসব দেশেও পাল্টা ক্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সদ্য প্রতিষ্ঠিত একনায়ক শাসকের সময় প্রয়োজন হয়। আবার বুতেফ্লিকা বা বশিরের মতো যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শাসনক্ষমতা দখল করে থাকেন, তাঁদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় বয়স। বয়স যত বাড়ে, জনমনে তাঁদের আবেদন তত কমতে থাকে।
ওওইএফের কর্মকর্তা ক্লেটন বিসো বলেন, বিশ্বব্যাপী একনায়কেরা এখন নির্বাচন ঠেকিয়ে রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। নির্বাচনে জিতে তাঁরা নিজেদের ক্ষমতাকে বৈধ করার সুযোগ পান। কিন্তু নির্বাচনে হেরেও যখন তাঁরা জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান, তখনই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
একনায়কের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অন্যতম অস্ত্র হলো সেনাবাহিনী। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে ক্ষমতা দখলের উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে ঢের পাওয়া যায়। থাইল্যান্ডে ১৯৩২ সালে রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র শাসনের অবসানের পর আজ পর্যন্ত মোট ১৯টি ক্যু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। সর্বশেষ ২০১৪ সালে থাইল্যান্ডে ক্যু হয়। এখন সংবিধান বদলে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চাইছে থাই সেনাবাহিনী। মিয়ানমারে ২০১৫ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ক্ষমতা যায় বেসামরিক সরকারের হাতে। তবে সেখানকার সরকার কাঠামোতে এখনো সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পার্লামেন্টেও তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। বেসামরিক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ও নিয়ন্ত্রণ করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ওদিকে পাকিস্তানে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সরাসরি সামরিক শাসন বলবৎ ছিল। যদিও ইমরান খানের নেতৃত্বে এখন পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার কাজ করছে, কিন্তু বলা হয়ে থাকে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে সেনাবাহিনী। সরকারি কাজে জড়িত থাকার পাশাপাশি একই সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করে থাকে এসব দেশের সেনাবাহিনী।
সুদানে সেনাবাহিনী সরিয়ে দিয়েছে ওমর আল-বশিরকে। ছবি: এএফপি
সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘অর্থনৈতিক স্বার্থ’ তৈরি করা এবং তা টিকিয়ে রাখা একনায়কের অন্যতম কৌশল। এর মাধ্যমেই স্বৈরাচারী শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতার ভিত মজবুত রাখতে চান। ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার গবেষক জোনাথন পাওয়েল বলেন, সেনাবাহিনীর মধ্যে নগদ অর্থের বন্যা বইয়ে দিয়ে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে রাখতে চায় একনায়কেরা। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডও ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে ক্যু সংঘটনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানো না যায়।
তারপরও অবশ্য সেনাবাহিনীর চাপেই সরে যেতে হয়েছে সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে। কিন্তু বশির সরে যাওয়ার পরও রাস্তা থেকে বিক্ষোভরত মানুষ সরছে না। কারণ, বশিরের বিদায়ের পরও স্থিতিশীল হতে পারেনি সুদান। উল্টো একের পর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব একনায়ক মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে একেক ব্যক্তিকে সরকারের উচ্চাসনে বসান। এসবের মূলে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ ও নগদ অর্থ পাওয়ার লোভ। ফলে ক্যুর ফলে সৃষ্ট সংকটজনক পরিস্থিতিতে পুরো সরকার কাঠামোতেই ধস নামে। কিন্তু বিক্ষোভরত জনতা বশিরের মতো একনায়ককে বিদায় করতে পারলেও তাঁর তৈরি স্বৈরাচারী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারে না। ফলে, বুতেফ্লিকা বা বশিরেরা সরে গেলেও, ফের নতুন একনায়ক সৃষ্টি হয় এসব দেশে। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এসবের পেছনে সমর্থন জোগায় প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোও। যেমনটা সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত করছে ইয়েমেনে ও সুদানে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের একটি দুষ্টচক্র এসব দেশে চলতেই থাকে। এভাবেই তৈরি হতে থাকে একনায়ক। স্বৈরাচারী শাসনে থাকা এই দেশগুলোর জনগণ তখন ‘ফাঁদে’ আটকে পড়ে। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু...’ —এই প্রবাদ সেখানে অচল। কারণ, বিশ্বাস করে কারও হাতে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা তুলে দিয়ে স্বস্তি মেলে না তাদের।

Saturday, September 21, 2019

সুদান: কীভাবে গণ-বিক্ষোভে ধসে গেল ৩০ বছরের একনায়কতন্ত্র

আপডেট- ১৩ এপ্রিল ২০১৯: সুদানে যে গণবিক্ষোভে বৃহস্পতিবার ৩০ বছরের একনায়ক শাসনের অবসান হয়েছে তার নেতৃত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে নেই।
বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে সুদানিজ প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন (এসপিএ) নামে একটি পেশাজীবী সংগঠন।
প্রধানত চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী এবং আইনজীবীরা মিলে এই সংগঠনটি গড়ে তুলেছেন।

নারীরা ছিল ৭০ ভাগ

সুদানের এবারের গণ-বিক্ষোভে নারীদের যেরকম ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তার নজির বিরল।
বলা হচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের ৭০ শতাংশই নারী। সমাজের সব অংশ থেকেই নারীরা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। রাস্তায় যেমন তারা সোচ্চার, সোশাল মিডিয়াতেও একইভাবে তৎপর।
এই নারীদের বিরাট একটি অংশ যে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইছেন তা নয়, সুদানে শারিয়া আইনের বদল দাবি করছেন তারা। সুদানের রক্ষণশীল সমাজে নারীদের বিরুদ্ধে নানা বৈষম্যমুলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে স্লোগান তুলছেন তারা।
নতুন সেনা-শাসক লে. জে. বুরহান বিক্ষোভের নেতাদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন
সামাজিক সংস্কারের দাবিতে তোলা এক নারীর স্লোগানের ভিডিও টুইটারে এবং অন্যান্য সোশাল মিডিয়ায় লাখ লাখ বার শেয়ার হয়েছে। ঐ নারী এখন সুদানের গণ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তিনি "কানদাকা" বা "নুবিয়ান কুইন" খেতাব কুড়িয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের সিংহভাগই তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী। তবে বিভিন্ন বয়সের লোকজনও অংশ নিয়েছে।

বিক্ষোভ শুরু হলো কীভাবে?

ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ওমর আল বাশিরের সরকারের ওপর গত কয়েক বছর ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সুদানের অর্থনীতি প্রচণ্ড চাপে পড়েছে। তেল রপ্তানি থেকে আয় দিন দিন কমছে।
২০১৭ সালে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০১১ সালে সাউথ সুদান বিচ্ছিন্ন স্বাধীন হয়ে গেলে অধিকাংশ তেল-ক্ষেত্র হারায় সুদান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বেশ কিছু ব্যয় সঙ্কোচনের কর্মসূচি ঘোষণা করে সরকার। অনেক ভর্তুকি কমানো হয় বা প্রত্যাহার করা হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য সুদানের মুদ্রার বড় ধরণের অবমূল্যায়ন করা হয়।
কিন্তু সরকারের এই কর্মসূচিতে হিতে-বিপরীত হয়। রুটি এবং জ্বালানি তেলের ভর্তুকি ওঠানোর পরিণতিতে সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড চাপে পড়ে ।
প্রথম দেশের পূর্বে বিক্ষোভ-অসন্তোষ শুরু হয়। দ্রুত সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী খার্তুমে।

কীভাবে বিক্ষোভের দাবি বিস্তৃত হলো?

প্রথমে বিক্ষোভের প্রধান ইস্যু ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা - বাজারের দাম, জিনিসপত্র না পাওয়া।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বিক্ষোভের প্রধান দাবি হয়ে ওঠে প্রেসিডেন্ট বাশিরের পদত্যাগ, তার ৩০ বছরের শাসনের অবসান।
সুদানের গণ-বিক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছেন এক নারী। তাকে বলা হচ্ছে - নুবিয়ান কুইন
জনবিক্ষোভ চূড়ান্তে পৌঁছে ৬ এপ্রিল, যে দিনটি ছিল সুদানে আরেক স্বৈরাচারী শাসকের উৎখাতের বার্ষিকী। ১৯৮৫ সালে অহিংস এক গণ-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন একনায়ক শাসক জাফর নিমেরি।
কারফিউ অবজ্ঞা করে হাজার হাজার লোক জড়ো হয় সুদানের সেনা সদর দপ্তরের কাছে।

সেনা সরকারে কী মানুষ খুশী?

এক কথায় উত্তর - না।
বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ওমর আল বাশিরকে সরিয়ে ক্ষমতা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই সুদানিজ প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন (এসপিএ) কারফিউ ভেঙ্গে সেনা সদর দপ্তরের বাইরে অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়।
এসপিএ অভিযোগ করছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ কজন সেনা কর্মকর্তা সেনা অভ্যুত্থান করেছে। তাদের কথা- এই সেনা-শাসকরা থাকলে দেশে কোনো পরিবর্তনই হবেনা।

সেনা কম্যান্ডাররা কি বলছেন?

প্রেসিডেন্ট বাশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরপরই সামরিক কাউন্সিলের প্রধান হন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লে. জেনারেল আওয়াদ ইবনে আউফ। তিনি ঘোষণা দেন, তিন মাস সুদানে জরুরী অবস্থা থাকবে। তারপর, দু বছর পর সাধারণ নির্বাচন দেওয়া হবে।
কিন্তু বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শুক্রবার সামরিক কাউন্সিলের প্রধানের পদ থেকে জেনারেল আওয়াদ ইবন আউফ পদত্যাগ করেন।
জে. ইবনে আউফের পদত্যাগের ঘোষণায় খার্তুমে উল্লাস
সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আবদেলরাহমান বুরহানকে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিক্ষোভ প্রশমিত করতে সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন, দু বছর নয়, পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে, এক মাসের মধ্যেই বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া যেতে পারে।
সুদান সামরিক কাউন্সিলের রাজনৈতিক শাখার প্রধান লে. জেনারেলর ওমর জাইন আল-আবিদিন বলেছেন, "যারা বিক্ষোভ করছেন, তারাই সমাধানের রাস্তা বাতলে দেবেন। জনগণই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমাধানের রাস্তা দেখাবে।"

ওমর আল বাশিরের কী হবে?

সেনাবাহিনী বলছে, মি. বাশির তাদের হাতে বন্দী। অভ্যুত্থানের পর থেকে তাকে দেখা যায়নি।
দারফুরে গণহত্যার অভিযোগে অনেক আগেই আন্তর্জাতিক আদালতে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তবে সেনাবাহিনী বলছে তাকে সুদানেই বিচার করা হবে।

Wednesday, September 11, 2019

যেভাবে নিজের পতন ডেকে আনেন সুদান শাসক ওমর হাসান আল বশির

প্রায় ৩০ বছর ধরে সুদান শাসন করেছেন ওমর হাসান আল বশির। এই তিন দশকে বহু অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঠেকিয়ে টিকে ছিলেন তিনি। অবশেষে গত মাসেই তার পতন ঘটলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, আঞ্চলিক রাজনীতি বুঝতে না পারা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েই নিজের পতন ডেকে এনেছেন বশির। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ঠিক কীভাবে তার এই দীর্ঘ শাসনের ইতি ঘটলো। মানবজমিন-এর পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।
১০ই এপ্রিল রাতে সুদানের গোয়েন্দা প্রধান সালাহ গোশ প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান আল বশিরের সঙ্গে তার প্রাসাদে গিয়ে দেখা করেন। ওই বৈঠকে গোশ প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেন যে, চলমান গণবিক্ষোভ তার শাসনের প্রতি কোনো হুমকিই নয়।
অথচ, ৪ মাস ধরে রাজপথে বশিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে হাজার হাজার সুদানি। তারা গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক দুর্দশা অবসানের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। আন্দোলনকারীরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরেও তাঁবু স্থাপন করেছিলেন।
গোশ ও বশিরের মধ্যে ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা সহ মোট চারটি সূত্র জানান, গোশ তখন বলেছিলেন যে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রতিবাদকারীদের জটলা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে অথবা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
গোশের কথায় আশ্বস্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে যান বশির। ৪ ঘণ্টা পর ঘুম থেকে জেগে উঠে বশির বুঝে যান যে, সালাহ গোশ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। প্রাসাদ রক্ষীরা সব চলে গেছেন। তাদের স্থলে প্রাসাদে অবস্থান নিয়েছে নিয়মিত সৈন্যরা। বশিরের বুঝতে আর বাকি রইলো না যে, তার ৩০ বছরের শাসনের ইতি ঘটেছে।
এই চূড়ান্ত সময়ে বশিরের সঙ্গে অল্প যে কয়েকজন ব্যক্তি কথা বলেছেন, তাদের একজন জানান, এই অবস্থা দেখে প্রেসিডেন্ট নামাজ পড়তে চলে যান। তার ভাষ্য, ‘নামাজ পড়া পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করে সেনা কর্মকর্তারা।’ কর্মকর্তারা বশিরকে জানান যে, সুদানের হাই সিকিউরিটি কমিটি (যার সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনা, গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রধান) তাকে ক্ষমতাচ্যুত করছে। কমিটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, দেশের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই।
প্রাসাদ থেকে বশিরকে রাজধানী খার্তুমের কোবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ঠিক এই কারাগারেই তিনি নিজের হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পুরেছিলেন। তিনি এখনও ওই কারাগারেই রয়েছেন। ৩০ বছর ধরে যে বশির শক্ত হাতে বহু বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান চেষ্টা ঠেকিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েছেন, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়েছেন, সেই বশিরের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান যেন অত্যন্ত নিখুঁত ও মসৃণ ছিল। সবকিছু ঘটে যাওয়ার আগে বশির টেরই পাননি।
একজন সাবেক মন্ত্রী, বশিরের অন্দরমহলের একজন সদস্য ও অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সরাসরি জড়িত একজন ব্যক্তি সহ মোট ৩টি সূত্র বশিরের পতনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে: বশির হয়তো সুদানের অভ্যন্তরীণ ইসলামিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও সামরিক অংশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে ভীষণ দক্ষ ছিলেন, কিন্তু পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যে তিনি একাকী হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বর্ণনা করেন কীভাবে বশির সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে নিজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছেন। অথচ, ইতিপূর্বে আরব আমিরাতই সুদানের রাজকোষে কয়েক বিলিয়ন ডলার ঢেলেছিল। বশির অবশ্য ইয়েমেনে আমিরাতের স্বার্থ ঠিকঠাক মতোই রক্ষা করেছিলেন (ইয়েমেনে ইরানের বিরুদ্ধে প্রক্সি লড়াই চলছে আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের)। কিন্তু ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ যখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করে, পাশাপাশি রাজপথ দখলে নেয় বিক্ষোভকারীরা, বশির দেখতে পেলেন তার পাশে আর নেই ক্ষমতাধর, সম্পদশালী মিত্র আমিরাত।
সূত্রগুলো আরও জানায়, সামরিক জেনারেলরা বশিরের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সালাহ গোশ কারাবন্দি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাদের সমর্থন চান। অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগে, গোশ অন্তত একবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আগেভাগেই জানিয়ে দেন কী ঘটতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সরকার কোনো প্রশ্নের জবাব না দিলেও, জুনে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগাশ টুইটারে বশিরের পতনের পর লিখেছিলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সুদানের সকল বিরোধী পক্ষ ও সামরিক পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। গারগাশ আরও বলেন, বশিরের দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র ও মুসলিম ব্রাদারহুডের পর এখন সংবেদনশীল সময় চলছে সুদানে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গত, মুসলিম ব্রাদারহুড বশিরের মিত্র ছিল।
অথচ, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেও বশির ও আরব আমিরাতের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ ছিল। সেবার বশির আমিরাতে গিয়ে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে আবুধাবিতে সাক্ষাত করেন। অপরদিকে ইয়েমেনে সৌদি-আমিরাত নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশ নেয় ১৪ হাজার সুদানি সেনা।
তবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ (সংক্ষেপে যাকে এমবিজেড ডাকা হয়) অন্য আরেক ক্ষেত্রেও বশিরের সহযোগিতা চাইছিলেন। আর তা ছিল, ইসলামিস্ট বা ব্রাদারহুডকে দমন করতে হবে। সুদানি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ কথা জানান।
রাজনৈতিক ইসলাম, অর্থাৎ ব্রাদারহুডকে ঠেকাতে আঞ্চলিক তৎপরতার নেতৃত্বে ছিল আমিরাত। সৌদি ও আমিরাত মনে করে, তাদের রাজতন্ত্রী শাসন ও এই অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি ব্রাদারহুড। ২০১১ সাল থেকে এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয় সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের। কারণ সেই বছরই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে বয়ে যায় আরব বসন্ত, যার সবচেয়ে বেশি লাভ ঘরে তোলে মুসলিম ব্রাদারহুড। সৌদি ও আমিরাত ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ব্রাদারহুডের দাবি তারা শান্তিপূর্ণ।
২০১২ সালে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। মাত্র ১ বছর পরই তাকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী। পরবর্তী ১৮ মাসে সেনা শাসনাধীন মিশরকে সাহায্য হিসেবে ২৩০০ কোটি ডলার পাঠায় সৌদি আরব, আমিরাত ও কুয়েত। সুদানে ইসলামিস্টদের প্রভাব মিশরের চেয়েও বেশি। বশির নিজেও একটি ইসলামিস্ট জান্তার প্রধান হিসেবে ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা দখল করেন। দেশটির সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী ও প্রধান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেও ইসলামিস্টরা। ওই বৈঠকে বশির ও এমবিজেড ঐক্যমত্যে পৌঁছেন যে, বশির ইসলামিস্টদের উৎখাত করবেন, বিনিময়ে সুদানকে আর্থিক সহায়তা দেবে আমিরাত। কিন্তু বশির বলেননি কীভাবে তিনি ইসলামিস্টদের দমন করবেন।
আবুধাবির সেই আলোচনার পর সুদানে কয়েক বিলিয়ন ডলার পাঠায় আরব আমিরাত। ২০১৮ সালের মার্চে আমিরাতি সরকারী বার্তা সংস্থা জানায়, সুদানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সহায়তার অংশ হিসেবে এবং বেসরকারী ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অংশ হিসেবে ৭৬০০ কোটি ডলার দিয়েছে আমিরাত।
বশিরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন ছিলেন তার কার্যালয়ের পরিচালক তাহা ওসমান আল হোসেন। তাকেই ইউএই’র সঙ্গে সম্পর্ক দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাহা ওসমান হোসেন একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। সহকর্মীরা জানান, তিনি ভীষণ উচ্চাবিলাশী ও দক্ষ একজন কর্মকর্তা। তার প্রভাব এত বেশি ছিল যে খোদ মন্ত্রীরাও তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। হোসেনকে এড়িয়ে বশিরের সঙ্গে মন্ত্রীরাও দেখা করতে পারতেন না। তাদের অভিযোগ ছিল, হোসেন নিজেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। একবার তিনি সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও সৌদি আরবের একটি সংবাদ সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেন।
বশিরের জাতীয় কংগ্রেস পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা গামার হাবানি বলেন, ‘বশিরের মনের ওপর জাদুকরি প্রভাব ছিল হোসেনের।’ তবে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান ও নেতৃত্বস্থানীয় রাজনীতিকরা। তারা প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তোলেন। গোয়েন্দা সংস্থা অভিযোগ করে, দুবাইয়ে হোসেনের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০৯ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে সৌদি আরব ও ইউএই। হোসেন অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
কিন্তু ২০১৭ সালের জুলাইয়ে জানাজানি হয়ে যায় যে, হোসেন সৌদি আরবের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। তখন তাকে বহিষ্কার করেন বশির। এরপর হোসেন রিয়াদে চলে যান ও সেখান থেকেই সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন।
হাবানি বলেন, ‘তাহা হোসেনের ঘটনা বশিরের মনে বিরাট দাগ কেটে যায়।’ আবার তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
দুই বছর আগে হঠাৎ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরব সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে প্রতিবেশী দেশ কাতারের সঙ্গে। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের অব্যাহত সমর্থন নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। এই পরিস্থিতিতে বেশ জটিল অবস্থায় পড়ে যান সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির। সুদানের অর্থনীতি বাঁচাতে ইউএই’র মতো কাতারও কয়েক বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। বশিরের ইসলামবাদী ঘরোয়া রাজনৈতিক মিত্ররা তাকে চাপ দেন, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা যাবে না। সুতরাং, এই সংকটে কোনো পক্ষে যেন বশির না যান। সাবেক উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার মতে, এই মিত্রদের বার্তা ছিল স্পষ্ট।
কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে।
পরের বছর ২০১৮ সালের মার্চে লোহিত সাগরবর্তী সুয়াকিন বন্দর উন্নয়নে কাতারের সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করে সুদান। তার আগে অবশ্য বশির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ইউএই ও সৌদি আরবের পক্ষে তিনি যাবেন না। অবশ্য তাদের বিরুদ্ধেও তিনি যাননি। কিন্তু ইউএই’র প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদকে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ইসলামপন্থীদের দমন করবেন, সেখান থেকেও তিনি সরে আসেন। জ্যেষ্ঠ ঐ সরকারী কর্মকর্তার মতে, দেশের শক্তিধর ইসলামপন্থী ব্যক্তিত্বদের শত্রু বানাতে ভয় কাজ করছিল বশিরের মনে। এই ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন আলি ওসমান তাহা, যিনি সাবেক প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তার উত্তরসূরি বাকরি হাসান সালেহ। এই দু’জনই বশিরকে ক্ষমতায় আনা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন।
২০১৮ সালের অক্টোবর নাগাদ, সুদান ফের অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়। দেশে খাদ্য, জ্বালানি ও মুদ্রা সংকট দেখা দেয়। বশিরের নিজ দল ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির বৈঠকে, দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য গামার হাবানি তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন ইউএই ও সৌদি আরব আর সাহায্য করছে না সুদানকে। বশির জবাবে বলেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা চায়, আমি তোমাদের অর্থাৎ ইসলামিস্টদের ত্যাগ করি।’ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের দিকে, ইউএই সুদানে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। বশির দেশে ইসলামিস্টদের প্রভাব ক্ষুণœ না করায় স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ ছিল ইউএই। হাবানি বলেন, ‘যেহেতু বশির ইসলামিস্টদের পরিত্যাগ করতে ও কাতারের বিরুদ্ধে যেতে রাজি হননি, সেহেতু সৌদি আরব ও আমিরাত আর আর্থিক সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সুদান কোনো পক্ষ নেবে না, সেটাই তারা মানতে রাজি নয়।’
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বশির দৃশ্যত নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করে ফেলেন। তখন দেশে ইতিমধ্যেই খাবারের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ওই সময় শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত সূরা কাউন্সিলের এক বৈঠকে বশির বলে ওঠেন, ‘আমরা সবাই ইসলামিস্ট! ইসলামিস্ট হতে পেরে আমরা গর্বিত।’ জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তার মতে, এই কথা বলার পর আর পেছন ফেরার কোনো উপায় ছিল না। এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে বশির ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না।
ততদিনে অর্থের জন্য হন্যে হয়ে ওঠেন বশির। তিনি চলে যান কাতারে। সাক্ষাত করেন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে। বশিরের ঘনিষ্ঠরা বলেন, ওই বৈঠকের আগে কাতারি আমির তাকে এক বিলিয়ন ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সফর শেষে খালি হাতেই ফিরতে হয় তাকে। কেননা, আমির ওই বৈঠকে তাকে জানান ‘কিছু পক্ষে’র চাপে তিনি পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমির জানাননি কারা তাকে চাপ দিচ্ছিল। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা অবশ্য বলেন, সুদানের প্রতি কাতারের সমর্থন দেশের জনগণের সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, সুদানের প্রতি সাহায্য বন্ধে তৃতীয় কেউ কাতারকে চাপ দেয়নি। বরং, সুদানে কাতারের অর্থায়নে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এদিকে পর্দার আড়ালে বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনায়ও গতি পেতে শুরু করেছে। খার্তুমের কোবার কারাগারে (যেখানে এখন বশিরকে আটক রাখা হয়েছে) বন্দী থাকা এক বিরোধী নেতা বর্ণনা দেন কীভাবে গোয়েন্দা প্রধান গোশ অপ্রত্যাশিতভাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারির দিকে তার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। শুধু তিনি নন, কারাগারে বন্দী মোট ৮ জন বিরোধী নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করেন গোশ।
গোশ তাদের বলেন, তিনি আবুধাবি গিয়েছিলেন। ইউএই তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জ্বালানি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া হবে। তিনি সুদানের নতুন একটি রাজনৈতিক কাঠামো সৃষ্টির জন্য বিরোধী নেতৃবৃন্দের সহায়তা চান। গোশের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক সূত্র এই ঘটনা নিশ্চিত করেছে।
গোশ ১০ দিন পর আবারও কারাগারে যান। এবার তিনি ২৬টি কক্ষে যান। ওই বিরোধী নেতা বলেন, ‘ওই বৈঠকের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়। আমাদেরকে বিনামূল্যে সিগারেট দেওয়া হয়। কক্ষে টিবি দেওয়া হয়। তামাক দেওয়া হয়। আমরা খুব বিস্মিত হয়ে যাই এই ভেবে যে গোয়েন্দা প্রধান বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করছেন! কিন্তু যখন অভ্যুত্থান ঘটে, আমি বুঝে যাই কেন তিনি তা করেছিলেন।’
খার্তুমে কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক, বশিরের ও গোশের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি জানান, মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বশিরের জন্য মর্যাদাবান প্রস্থানের প্রস্তাব দেয় ইউএই ও গোশ। ওই পরিকল্পনা মোতাবেক, দেশে নির্বাচন হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বশিরই থাকবেন।
২২শে ফেব্রুয়ারি গোশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বশির নিজ দল ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির নেতার পদ থেকে সরে যাবেন এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে লড়বেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর এক টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে বশির পদত্যাগের ব্যাপারে কোনো শব্দই উচ্চারণ করেননি। তিনি পরে দলীয় কর্মীদের বলেন, গোশ বিষয়টি বাড়িয়ে বলেছে। এরপর বশিরের বিরুদ্ধে কার্যক্রমে আরও গতি পায়।
সুদানের বিরোধী দলগুলো ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইউএই। তখন ‘বশির-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আমিরাত। এ কথা জানান এক বিদ্রোহী নেতা ও উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী এক ব্যক্তি।
৬ই এপ্রিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশে প্রতিবাদের তাঁবু স্থাপন করে প্রতিবাদকারীরা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বশিরের বাসা থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু সেদিন বশিরের জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা ওই বিক্ষোভকারীদের থামানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। হাবানি বলেন, ‘তখনই আমরা বুঝতে পারি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলে নিতে যাচ্ছে।’ গোশ এই ফাঁকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সেনা প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা একমত হন যে, বশিরের শাসনের ইতি ঘটানোর সময় এসেছে। গোশের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানায়, এদের প্রত্যেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ‘বশিরের দিন শেষ হয়ে এসেছে!’ বর্তমানে ক্ষমতাসীন ট্রাঞ্জিশনাল মিলিটারি কাউন্সিলের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেন যে, গোশ এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন।
এই পুরো পরিকল্পনায় সবার শেষে যোগ দেন মিলিশিয়া নেতা জেনারেল মোহাম্মেদ হামদান দাগালো। তিনি বশিরের দীর্ঘদিনের মিত্র। দাগালোকে বেশিরভাগ মানুষ হেমেদি হিসেবে চেনে। তিনি সুদানের আতঙ্ক জাগানিয়া বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর প্রধান। ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এই প্যারামিলিটারি বাহিনীর সদস্য সংখ্যা হাজার হাজার। এই বাহিনীর হাতেই খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ। দাগালোও পরিকল্পনায় অংশ নিলে, আর কিছুই বাকি রইলো না বশিরের পক্ষে। ১১ই এপ্রিল বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
কয়েকদিন পর ইউএই ও সৌদি আরবের সঙ্গে বশিরের সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বে থাকা হোসেন ফিরে আসান সুদানে। তিনি সেখানে সৌদি ও ইউএই প্রতিনিধিদলের অংশ ছিলেন। এই প্রতিনিধি দল সুদানের নতুন সামরিক শাসকদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। ২১শে এপ্রিল ইউএই ও সৌদি আরব জানায়, সুদানের জন্য ৩০০ কোটি ডলারের সাহায্য পাঠাবে তারা। জেনারেল হেমেদি পরবর্তীতে ঘোষণা দেন, সুদানের বাহিনী ইয়েমেনে থাকবে।
প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিরোধী ও বিদ্রোহী বিভিন্ন গোষ্ঠী আবুধাবিতে আমিরাতি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করছিল। দারফুরের জাস্টিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট নামে একটি বিদ্রোহী দলের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তুগোদও সেই বৈঠকে ছিলেন। তিনি জানান, ওই বৈঠকে দেশে ঐক্যমত্য ও স্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের মতামত জানতে চায় ইউএই। তুগোদ বলেন, আমরা শান্তি প্রক্রিয়া ও যুদ্ধক্ষেত্রের সংঘাত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি।
বৃটিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ম্যানচেস্টার সিটির মালিক ও আমিরাতি রাজপরিবারের সদস্য শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মূলত বিদ্রোহী ও আমিরাতের মধ্যকার যোগাযোগের বিষয়টি দেখভাল করেন। এ কথা জানান তুগোদ ও একজন মধ্যস্থতাকারী। এদিকে খার্তুমে আলোচনার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠাতে চেয়েছিল কাতার। কিন্তু কাতারের সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
বশিরের পতনের পর তার পুরোনো মিত্র জেনারেল হেমেদি এখন সুদানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি ক্ষমতাসীন ট্রাঞ্জিশনাল মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান। সাবেক এই পশু ব্যবসায়ী ২০০৩ সালের দারফুর যুদ্ধে সবচেয়ে নৃশংস মিলিশিয়া কমান্ডার হিসেবে আন্তর্জাতিক কুখ্যাতি অর্জন করেন। তার মিলিশিয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও ধর্ষণের মতো নৃশংসতা সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তবে বশির সরকারের মতো হেমেদি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে ১৩ই এপ্রিল ট্রাঞ্জিশনাল মিলিটারি কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন গোশ। এই গোয়েন্দা প্রধানকে প্রতিবাদকারীরা রীতিমতো ঘৃণা করে। তাদের চাপেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। গোশ এখন কোথায় তা জানা যায়নি। তবে খার্তুমে তার বাসভবনের পাশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেছে।
এদিকে ৩রা জুন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রতিবাদকারীদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেয় হেমেদির বাহিনী। প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলিও ছুড়ে তারা। বিরোধী দলের ডাক্তাররা বলছেন, ১০০ জনেরও অধিক নিহত হয়েছেন। সুদানি কর্তৃপক্ষ বলছে, ৬২ জন নিহত হয়েছেন। এরপর সৈন্যরা সেখান থেকে বিভিন্ন প্ল্যকার্ড ও ব্যানার সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এসব প্ল্যাকার্ডে বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল। কিছু স্লোগানে লেখা ছিল, ‘আমরা মিশরের মতো হতে চাই না।’, ‘আরব আমিরাত ও সৌদি আরব, সুদানে হস্তক্ষেপ করা বন্ধ কর।’
(রয়টার্স অবলম্বনে।)