Saturday, August 23, 2025

গাজা নগরে দুর্ভিক্ষ চলছে: জাতিসংঘ–সমর্থিত প্রতিবেদন

এএফপি ও বিবিসিঃ ফিলিস্তিনের গাজা নগরে দুর্ভিক্ষ চলছে বলে জাতিসংঘ-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উঠেছে। আজ শুক্রবার রোমভিত্তিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণবিষয়ক প্যানেল—আইপিসির প্রতিবেদনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এমন ঘটনা এটিই প্রথম।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গাজার পাঁচ লাখ মানুষ ভয়াবহ রকমের অনাহারে ভুগছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, এ দুর্ভিক্ষ পুরোপুরি ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের পরিকল্পিত বাধার কারণে ফিলিস্তিনি অঞ্চলটিতে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো যায়নি।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের দাবি, ‘গাজায় কোনো দুর্ভিক্ষ নেই।’

ইসরায়েল আইপিসি প্যানেলের প্রতিবেদনটির তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, একটি স্বার্থান্বেষী সংস্থার মাধ্যমে হামাসের প্রচার করা মিথ্যা তথ্যের ওপর ভর করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি অঞ্চলটির মানবিক পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে বলে কয়েক মাস ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে আসছিল।

আজ শুক্রবারের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে আইপিসি বলেছে, ১৫ আগস্ট নাগাদ গাজা উপত্যকার গাজা নগরে দুর্ভিক্ষ (আইপিসি ধাপ ৫) নিশ্চিত হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে যৌক্তিক প্রমাণ আছে। গাজা নগরী গাজা উপত্যকার প্রায় ২০ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত।

আইপিসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গাজা নগর এখন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সূচকে পঞ্চম ধাপে আছে। এটি এই সূচকের সবচেয়ে মারাত্মক ও সর্বোচ্চ স্তর।

আইপিসি তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, যখন পরিবারগুলো সব ধরনের চেষ্টা করেও খাবার বা অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারে না, তখনই আসে পঞ্চম ধাপ।

আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিস এলাকায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে আইপিসি। এতে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফিলিস্তিনি অঞ্চলের ওপর দুর্ভিক্ষের প্রভাব পড়বে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘২২ মাসের অবিরাম সংঘাতে গাজা উপত্যকার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এখন অনাহার, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর মতো ভয়াবহ সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।’

গত ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ভুক্তভোগী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজারে পৌঁছাবে। অর্থাৎ তখন গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ওপর এই দুর্ভিক্ষের প্রভাব পড়বে।

আইপিসি বলেছে, তারা গাজা উপত্যকায় অনাহারের পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা শুরুর পর থেকে গাজায় ক্ষুধার পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের মধ্যকার সংঘাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও পাল্টেছে। এ সংঘাতকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষ গৃহহীন হয়েছে। সে সঙ্গে গাজায় মানবিক কিংবা বাণিজ্যিক কোনোভাবেই খাবার সরবরাহ করা যায়নি।

মার্চের শুরুর দিকে গাজায় ত্রাণ সরবরাহ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে ইসরায়েল। এতে খাবার, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। মে মাসের শেষের দিকে সীমিত পরিমাণে সহায়তা পৌঁছানোর অনুমতি দেওয়া হলেও ঘাটতি থেকে গেছে।

আসন্ন সংকট নিয়ে সতর্ক করার জন্য জাতিসংঘ নিযুক্ত পর্যবেক্ষকদের একটি জোট হচ্ছে আইপিসি। তিনটি বিষয়ের ভিত্তিতে আইপিসি দুর্ভিক্ষকে সংজ্ঞায়িত করে থাকে।

প্রথমত, কমপক্ষে ২০ শতাংশ পরিবার, অর্থাৎ প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে একটি তীব্র খাদ্যঘাটতিতে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বা প্রতি ৩ শিশুর মধ্যে ১টি তীব্র অপুষ্টিতে ভুগবে।

তৃতীয়ত, প্রতিদিন ১০ হাজার মানুষের মধ্যে সরাসরি ক্ষুধায় বা অপুষ্টিতে বা রোগের কারণে কমপক্ষে দুজনের মৃত্যু হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-22%2Fffelharw%2FUN-Gaza.jpg?rect=78%2C0%2C645%2C430&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজা উপত্যকায় খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিদের অপেক্ষা। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

ভারতে নতুন ফাঁদে ‘বাংলা ভাষা’, মুক্তির পথ কী? by ঈশিতা দস্তিদার

ভাষা বলতে সাধারণত মানুষে মানুষে যোগাযোগের একটি মাধ্যমকে বুঝি আমরা। কিন্তু এ যুগে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমে সীমিত নয়; বরং ভাষার ব্যবহার ক্ষমতার কাঠামো ও সামাজিক পরিচয়কে প্রভাবিত করে। নব্য উদারনীতিবাদের যুগে ভাষা রাজনীতির এমন এক জটিল আবর্তে ঘুরছে, যেখানে বাণিজ্যিকীকরণ, বিশ্বায়ন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও ভাষার অধিকারের বিষয়গুলো সম্পর্কিত, যা আদতে ভাষার মাধ্যমে ক্ষমতা ও শ্রেণি আধিপত্যের রাজনীতিটাকেই বলবৎ করে। নির্ধারণ করে দেয় কোন ভাষাগুলো প্রভাব বিস্তার করবে, আর কোন ভাষার গুরুত্ব হারিয়ে যাবে বা সেটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।ভাষা জাতিগত ঘৃণারও হাতিয়ার হচ্ছে।

ভাষা নিয়ে এতসব তাত্ত্বিক কথা বলার কারণ, সম্প্রতি ভারতে বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীদের নিয়ে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং তার মোকাবিলায় বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীদের বিভক্ত হয়ে পড়ার ঘটনাগুলো।

ভাষা নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দুই বাংলার ভাষার মধ্যে বিভাজনের রেখা টেনে বলেছেন, বাংলাদেশের বই আর পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যবই পড়লেই নাকি বুঝতে পারা যাবে, কোন বই সুবোধ সরকার লিখেছেন; আর কোন বই বাংলাদেশের শফিকুল ইসলাম লিখেছেন।

অথচ এটা কি সত্য নয় যে ভারতীয় বাঙালি ও বাংলাদেশের বাঙালি—উভয়ের মাতৃভাষা বাংলা। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী সব সংবিধান স্বীকৃত ভারতীয় ভাষা ভারতের রাষ্ট্রভাষা—হিন্দি রাষ্ট্রভাষা নয়। তাহলে বাংলাভাষীদের এত বিড়ম্বনা কেন সেখানে?

ভারতবর্ষে আরএসএস–বিজেপি মিলিতভাবে ভাষা নিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল তৈরির চেষ্টা করছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে হিন্দুধর্মের (হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানি) সঙ্গে হিন্দি ভাষার তথাকথিত অনিবার্যতা দেখিয়ে উত্তর ভারতীয় ফ্যাসিবাদী ক্ষমতাকাঠামোকে শক্তিশালী করা।

এ প্রকল্প দক্ষিণ ভারতে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হলেও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের দুর্বলতায় এখানে বাংলার বিরুদ্ধে বাংলাকেই দাঁড় করানো হচ্ছে। এ কাজে বাংলা ভাষার বিবিধ আঞ্চলিক বাচনভঙ্গির (লিখিত ও কথ্য উভয়ই) ফাঁদে ফেলে ‘বাংলাদেশ’ ও ‘বিদেশি’ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারতীয় সীমান্তে ভারতীয় নাগরিকদের একাধিক পুশ ইনের ঘটনা দেখেছি আমরা। অনেক ভারতীয় বাংলাভাষীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুশ ইন করতে ভাষাকে অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।

যদ্দুর জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে শিল্প–কলকারখানার আকাল, কৃষিতে অলাভজনক অবস্থা, ধুঁকতে থাকা চা–বাগান, কটন, জুট মিলসহ অন্যান্য শ্রমক্ষেত্র থেকে অনেক মানুষ অন্য রাজ্যে বা অন্য দেশে যাচ্ছে কাজের খোঁজে। তাদের অনেকে কলকাতার প্রমিত শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে না, ফলে তাদের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ধরে এনে ‘বাংলাদেশি’ বলে পুশ ইন করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ভাষাকে এখানে শ্রেণি নিপীড়নের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার উপযোগিতা কমানো হচ্ছে অনেক আগে থেকে। বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি কাজগুলো ইংরেজি ভাষার ব্যবহার সমস্যায় ফেলে বাংলাভাষী সাধারণ মানুষদের। যারা সংখ্যায় ইংরেজি জানা মানুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে দাপ্তরিক নানান কাজে সাধারণের সঙ্গে দপ্তরের ঔপনিবেশিক দূরত্ব আছে আজও। অনেকটা প্রভু–ভৃত্য সম্পর্কের অনুরূপ। আবার গ্রামগঞ্জে মানুষ বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে সব কাজে, সেটা চাষাবাদের কাজ হোক বা পালাপার্বণ, অমাবস্যা-পূর্ণিমার খবরাখবরের জন্যও হতে পারে। বহু কাজে বাংলা ক্যালেন্ডার তার ভরসা। ব্যবহারিক উপযোগিতার পাশাপাশি ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির এই বন্ধনে ধর্মীয় বিভেদ গৌণ হয়ে পড়ে।

এই আলোচনার মাঝে ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের কবিতার কয়েকটি লাইনও মনে পড়ছে:

বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে

শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যনে

কীসের গরব? কীসের আশা? আর চলে না বাংলা ভাষা

কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না? জানেন দাদা,

আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

(বাংলাটা ঠিক আসে না)

এসবই হলো আমাদের জটিল ঔপনিবেশিক মননের শহুরে বিবিধ প্রকাশ। বাংলা ভাষা ভালোভাবে লিখতে, পড়তে না পারা অনেকের কাছে গর্বের বিষয়। ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ না হওয়া যতটা অদক্ষতা ও সংকোচের, বাংলার ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। ইংরেজি না জানলে চাকরিতে অগ্রাধিকার নেই—এটা যতটা অবলীলায় বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়, বাংলা না জানলে কোনো সমস্যা হবে বলে শোনা যায় না।

অথচ বাংলা ভাষার জন্য এ অঞ্চলের রয়েছে তিনটা মহান আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। বর্তমানে বিহার-ঝাড়খন্ডে ভাগ হয়ে থাকা মানভূম জেলায় হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল বাংলাভাষীদের প্রথম ভাষা আন্দোলন। ১৯১২ সাল থেকে ওই আন্দোলন শুরু হলেও তীব্রতর হয় প্রায় ৩৬ বছর পরে, ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মাঝে।

অধুনা পুরুলিয়া জেলা বা তৎকালীন মানভূম ছিল ঐতিহাসিকভাবে বাংলাভাষী অধ্যুষিত। মাতৃভাষা বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য এ সুদীর্ঘ লড়াইয়ে মানভূমের গণমানুষের আত্মনিবেদন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেই আন্দোলনের অংশ হিসেবে টুসু সত্যাগ্রহ, টুসু গানের কথা ভুলে যাই কীভাবে!

পরবর্তী সময় বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ভাষা আন্দোলন যেমন বিশ্ব ইতিহাসে ভাষার লড়াই হিসেবে মাইলফলক হয়ে থাকবে, তেমনি স্মরণীয় আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষীদের রক্তস্নাত আত্মদানও। ১৯ মে ১৯৬১, আসামজুড়ে অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনকালে কাছাড়ের শিলচরে একজন নারীসহ ১১ জন বাংলাভাষী শহীদ হন। সেই লড়াইয়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল আসামের বাংলা ভাষাভাষীদের অন্যতম প্রেরণা।

এসব আন্দোলন, লড়াই, রক্ত আর জীবনের বিনিময়েও বাংলা ভাষার একটা সমন্বিত চেহারা দাঁড় করানো যায়নি। বাংলাভাষী মানুষ ঔপনিবেশিকতার রাজনীতি ও হালের দক্ষিণপন্থার উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বারবার কেবল বিভক্ত হচ্ছে। কখনো ধর্মীয়ভাবে, কখনো আঞ্চলিকতার সূত্র ধরে। কখনো সীমান্তের হিসাবে। কেউ দেশে বসে ভাগাভাগিতে আছে। কেউ কেউ বিদেশে বসেও বিভেদ উসকে তুলছে।

সে কারণেই সন্দেহ হয়, করাচি, উত্তর ভারত, আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশজুড়ে বসবাসরত বাংলাভাষী মানুষেরা যার যার সীমান্তে থেকেই একটা সাংস্কৃতিক ঐক্যে পৌঁছাতে পারবে কি কোনো দিন আদৌ?

ভাষার আধিপত্য তৈরির জন্য নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস রক্ষায় বাংলার পাশাপাশি আরও যেসব ভাষা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের শিকার হচ্ছে, তাদের জন্যও আশাব্যঞ্জক হতে পারে বাংলাভাষীদের ঐকতান। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার সার্বক্ষণিক উন্মাদনা পেরিয়ে তেমন ঐকতান তৈরি করবে কে?

‘বাজারে’র বিবেচনাতেও এই ঐক্য সবার জন্য সুবিধাজনক হতে পারত। বই-গান-সিনেমা ইত্যাদি সংস্কৃতিও বড় এক পণ্য একালে। ত্রিশ কোটি বাংলাভাষী ঢিলেঢালা একটা সাংস্কৃতিক যোগাযোগে থেকেও তার যাবতীয় ভাষা-সংস্কৃতির বাজারকে একটি একক চেহারা দিতে পারে, যা তার মানুষদের আত্মবিশ্বাস বাড়াত এবং অপদস্থ না হওয়ার জন্য একটা সাহসী রক্ষাকবচ হতে পারত।

* ঈশিতা দস্তিদার: নৃবিজ্ঞানী

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2Futif4zhf%2FScreenshot-2025-08-21-215451.jpg?rect=52%2C0%2C536%2C357&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শিয়ালদহে হিন্দি না বলায় ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মারধর করে হিন্দিভাষী ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের আক্রমণাত্মক হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে ট্রাম্পের ইঙ্গিত

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের আক্রমণাত্মক হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনার গতি মন্থর হয়ে আসার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘একেবারে অসম্ভব না হলেও আক্রমণকারী কোনো দেশের ভেতর পাল্টা আক্রমণ না চালিয়ে যুদ্ধে জেতাটা খুবই কঠিন। বিষয়টা অনেকটা এমন—খেলায় দুর্দান্ত রক্ষণভাগ থাকা দারুণ একটি দলকে আক্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাহলে জেতার কোনো সুযোগই থাকে না!  ইউক্রেন আর রাশিয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমনই।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও লেখেন, ‘কুটিল ও চরম অযোগ্য জো বাইডেন ইউক্রেনকে পাল্টা আক্রমণ করতে দেননি। শুধু আত্মরক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর ফল কী হলো? যাহোক, আমি প্রেসিডেন্ট থাকলে কখনোই এ যুদ্ধ হতো না—কোনো সুযোগই ছিল না। সামনে রোমঞ্চকর সময় আসছে!’

ট্রাম্পের এমন মন্তব্য মস্কোকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। কারণ, রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের বাহিনীর আক্রমণের বিষয়ে যেকোনো সমর্থনকে রাশিয়া ‘চূড়ান্ত সীমালঙ্ঘন’ বলে বিবেচনা করে।

বাইডেনের আমলে মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল, রাশিয়ার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালাতে পারবে না ইউক্রেন। তবে গত বছরের নভেম্বরে মিত্রদের চাপের মুখে নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়।

এরপর রাশিয়া নিজেদের পারমাণবিক নীতিমালা হালনাগাদ করে। জানানো হয়, পারমাণবিক শক্তিধর কোনো দেশের সহায়তায় কেউ রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালালে সেটাকে যৌথ হামলা বলে বিবেচনা করা হবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গত ১৫ আগস্ট আলাস্কায় বৈঠক করেন ট্রাম্প। এরপর ট্রাম্প গত ১৯ আগস্ট ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে বৈঠকে বসেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক হয় ইউরোপীয় নেতাদেরও। তবে পুতিন–জেলেনস্কির মধ্যে একটি শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার সম্ভাবনা এখনো অধরা রয়ে গেছে। পুতিন এখনো এতে রাজি হননি।

রুশ বাহিনী গত বুধবার রাতেও ইউক্রেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি উৎপাদন সংস্থাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সেখানে কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন।

ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে এমন মন্তব্য করার কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে তাঁর সঙ্গে পুতিনকে দেখা যাচ্ছে। দুই নেতার ঠিক পেছনে দেয়ালে ঝুলছে ১৯৫৯ সালে তোলা একটি ছবি। ওই ছবিতে তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ রয়েছেন। ছবিটি তখনকার সময়ে সোভিয়েত যুগের চাপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2Fdowj4n1x%2FTrump-and-Putin.avif?rect=0%2C0%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায়, ১৫ আগস্ট ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

হামাস আমাদের সঙ্গে একমত না হলে গাজা শহর ধ্বংস করা হবে: ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলেছেন, হামাস যদি আমাদের শর্তাবলি না মেনে নেয় তাহলে গাজা শহর ধ্বংস করা হবে। এর আগে গাজা শহরে আক্রমণের অনুমতি দেয় ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা। যদিও তা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই ওই মন্তব্য করলেন ইসরাইল কাৎজ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়েছে, সোমবার কাতারের মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে হামাস। এর পরিপ্রেক্ষিতে গাজায় বন্দি বাকি জিম্মিদের মুক্তির দেয়া হবে। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছেন। বলেছেন, ইসরাইলের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হবে এমন প্রস্তাবেই তারা রাজি হবে। তার ধারণা, ২২ মাসের যুদ্ধে ৫০ জনের মধ্যে ২০ জন জিম্মি জীবিত আছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ইসরাইলে অবস্থিত গাজা ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার পরিদর্শনের সময় নেতানিয়াহু বলেন, বাকি জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিতে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, আমি গাজা শহর দখলের আইডিএফের পরিকল্পনা অনুমোদন দিতে এখানে এসেছি। বলেন, দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এক, হামাসকে পরাজিত করা এবং বাকি জিম্মিদের মুক্ত করা। তবে পরবর্তী পর্যায়ে কী নিয়ে আলোচনা করা হবে এ নিয়ে তিনি কিছু বলেননি। নেতানিয়াহুর বার্তাকে আরও জোর দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ বলেছেন, হামাস যদি যুদ্ধ বন্ধ ও জিম্মি মুক্তির বিষয়ে ইসরাইলের প্রস্তাবে সাড়া না দেয় তাহলে দ্রুতই তাদের জন্য নরকের দরজা খোলা হবে। গাজার চিকিৎসা বিষয়ক কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে গাজা শহরের সব মানুষকে দক্ষিণে সরিয়ে ফেলার জন্য সতর্কতা জারি করেছে আইডিএফ। তারা যদি সম্মত না হয় গাজার অবস্থাও রাফাহ ও বেইত হানুনের মতো হবে। ইসরাইলের সামরিক অভিযানের পর দুটি শহরই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এমন যেকোনো প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছে। 

mzamin

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে ৫৮ শতাংশ মার্কিনি : রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিক চান ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও জরিপ সংস্থা ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনিদের ৫৮ শতাংশ মনে করেন, জাতিসংঘের সব দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন এবং ৯ শতাংশ কোনো মত দেননি।

ছয় দিন ধরে পরিচালিত এ জরিপটি শেষ হয় গত সোমবার (১৮ আগস্ট)। এর কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ—কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গাজায় যখন অনাহার ও মানবিক বিপর্যয় মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ও মানবিক সহায়তা

জরিপ চলাকালেই আশা করা হচ্ছিল, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারে। তাতে বন্দিবিনিময় ও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সহজ হতো। মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) ইসরায়েলের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা হামাসের দেওয়া প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন। ওই প্রস্তাবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দিদের অর্ধেক মুক্তির বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে

গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ জানিয়েছে, গাজায় মানবিক সংকট ‘অকল্পনীয় মাত্রায়’ পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, গাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ও অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ঢুকতে দিচ্ছে না, ফলে সাধারণ মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তবে ইসরায়েল এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, হামাসই ত্রাণ আত্মসাৎ করছে। হামাস অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

মার্কিনিদের সহানুভূতি গাজার মানুষের প্রতি

জরিপে আরও উঠে এসেছে, মার্কিনিদের ৬৫ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গাজার ক্ষুধার্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করা। ২৮ শতাংশ এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। যারা সহায়তার বিরোধিতা করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ—প্রায় ৪১ শতাংশ—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের সমর্থক।

রয়টার্স/ইপসোস পরিচালিত অনলাইন জরিপে মোট ৪ হাজার ৪৪৬ জন মার্কিনি প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপের ফলাফলে সর্বোচ্চ ±২ শতাংশ পর্যন্ত ভিন্নতা থাকতে পারে।

ফিলিস্তিনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। ছবি: সংগৃহীত


দনবাস ছাড়, ন্যাটোতে যাওয়া যাবে না, পশ্চিমা সেনাও চলবে না: ইউক্রেনকে পুতিনের শর্ত

রয়টার্স এক্সক্লুসিভঃ ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান বন্ধে তিনটি শর্ত দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শর্তগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে, ইউক্রেনকে পুরো দনবাস অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হবে। এ ছাড়া পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না ইউক্রেন। পাশাপাশি যুদ্ধপরবর্তী ইউক্রেনে পশ্চিমা সেনাদের মোতায়েন করা যাবে না। ক্রেমলিনের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে জানাশোনা আছে, এমন তিনটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। আজ শুক্রবার এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন পুতিন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সূত্র জানিয়েছে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সমঝোতা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে বৈঠকে আলাপ করেছিলেন দুই নেতা। বৈঠক শেষে পুতিন বলেছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ওই বৈঠক ইউক্রেনে শান্তি ফেরানোর পথ খুলে দেবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল, সে বিষয়ে তাঁদের কেউই সুস্পষ্টভাবে কিছু জানাননি।

ওই বৈঠকে পুতিন কী প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে রুশ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুনে ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে পুতিন যে দাবি করেছিলেন, তাতে এখন কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। তখন রুশ প্রেসিডেন্টের দাবি ছিল, ইউক্রেনের চার প্রদেশের পুরোটাই রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হবে। এর মধ্যে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক প্রদেশ ছিল। এই দুই প্রদেশ নিয়ে দনবাস গঠিত। বাকি দুটি প্রদেশ হলো দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া। তখন এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল কিয়েভ।

তবে বর্তমানে পুতিন চান, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে দনবাসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হবে ইউক্রেনকে। এর বিনিময়ে খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়ায় সম্মুখসারি বরাবর যুদ্ধ বন্ধ করবে রুশ বাহিনী। এ ছাড়া ইউক্রেনের খারকিভ, সুমি ও নিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে নিজেদের দখলে থাকা ছোট ছোট এলাকাগুলো ছেড়ে দেবে মস্কো। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দনবাসের ৮৮ শতাংশ এলাকা এবং জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনের ৭৩ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার দখলে রয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভূখণ্ড হাতবদলে শর্তের পাশাপাশি পুতিন চান, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আশা ত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া ন্যাটো যেন তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পূর্বদিকে আর সম্প্রসারণ না করে। এ দুই দাবিই যুদ্ধ শুরুর বহু আগে থেকে করে আসছিলেন পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্ট আরও চান, ইউক্রেন বাহিনীর ওপর যেন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয় এবং যুদ্ধ শেষে দেশটিতে শান্তিরক্ষী বাহিনীর অংশ হিসেবে যেন কোনো পশ্চিমা সেনা মোতায়েন না করা হয়।

‘কিয়েভ ছাড় না দিলে যুদ্ধ চলবে’

সূত্র বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর আলাস্কা বৈঠকের মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে। কারণ, পুতিন শান্তির জন্য প্রস্তুত আছেন। ছাড় দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। এই বার্তা ট্রাম্পের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে কিয়েভ শেষ পর্যন্ত দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই মস্কোর। আর কিয়েভ এই ছাড় না দিলে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলগুলোর স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্র দেবে কি না, সে বিষয়টিও এখনো পরিষ্কার নয়।

পুতিনের এসব শর্তের বিষয়ে তাৎক্ষিণভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট বরাবরই বলে এসেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইউক্রেনের কোনো ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। গত বৃহস্পতিবার কিয়েভে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পূর্বাঞ্চল থেকে যদি সাধারণভাবে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়, তাহলে তা আমরা করব না। এটি আমাদের দেশের টিকে থাকার বিষয়। এর সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষার বিষয় জড়িত।’

অপর দিকে ন্যাটোতে যোগদানকে নিজেদের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হিসেবে দেখে কিয়েভ। ন্যাটো নিয়ে পুতিনের শর্তের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি হোয়াইট হাউস। ন্যাটো থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে সম্প্রতি হোয়াইট হাউস সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না। কিন্ত দেশটির নিরাপত্তার জন্য ন্যাটোর বিধানের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো ভাষা ব্যবহার করা যাবে, এমন শর্তে রাজি হয়েছেন পুতিন। অনুচ্ছেদ–৫–এ বলা হয়েছে, ন্যাটোর কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা এগিয়ে আসতে পারবে।

তবে রাশিয়া এই যুদ্ধ শেষ করতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। গতকাল তিনি বলেন, শান্তি নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেও ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। ইউক্রেনের মুকাচেভো শহরে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের স্থাপনায়ও হামলা হয়েছে। এ ছাড়া লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ডসহ ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়া অনিচ্ছাকৃতভাবে এসব করছে না, বরং এর মাধ্যমে দুঃসাহস দেখাচ্ছে দেশটি।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: এএফপি

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসরাইলি অস্ত্রের সফল ব্যবহার করেছে ভারত: নেতানিয়াহু

ভারতের সাম্প্রতিক সীমান্তপারের সামরিক অভিযান অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসরাইলি অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই। যা এতদিন স্বীকার করেনি নয়াদিল্লি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। এতে বলা হয়, ভারতের পক্ষ থেকে প্রমাণ ছাড়াই কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের উপর হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করার হয়। যা চার দিনব্যাপী এই সংঘাতের সূচনা করে। অভিযানের অংশ হিসেবে ভারত ড্রোন হামলা, বিমান হামলা এবং কামান হামলার মাধ্যমে পাকিস্তানের একাধিক স্থাপনায় আঘাত হানে।

এর জবাবে পাকিস্তান ‘অপারেশন বুনিয়ান-উম-মারসুস’ নামে বড় পরিসরের পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। এতে একাধিক ভারতীয় সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। তিনটি রাফালেসহ ভারতের ছয়টি যুদ্ধবিমান ও ডজন খানে ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে পাকিস্তান। ৮৭ ঘণ্টা স্থায়ী এই সংঘর্ষ শেষ হয় ১০ মে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষই এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু জানান, তিনি ইসরাইলে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত জেপি সিং-এর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি ভারতের শীর্ষ সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, নেতানিয়াহু স্বীকার করেন যে, ইসরাইলি অস্ত্র ব্যবস্থা- যেমন বারাক-৮ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল এবং হারপি ড্রোন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

নেতানিয়াহু বলেন, আমরা যে প্রযুক্তি আগে সরবরাহ করেছিলাম, তা মাঠে খুব ভালো কাজ করেছে। আমরা আমাদের অস্ত্র বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে উন্নয়ন ও পরীক্ষা করি। তিনি আরও জানান, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধে ভারত বারাক-৮ মিসাইল সিস্টেম ও হারপি ড্রোন মোতায়েন করে। এছাড়াও ব্যবহৃত হয় রাশিয়ান এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র। হারপি ড্রোন শত্রুপক্ষের রাডার ধ্বংসে ব্যবহৃত হয় এবং এটি নিজে নিজেই লক্ষ্য শনাক্ত করে আঘাত হানতে সক্ষম। বারাক-৮ ব্যবস্থা ৩৬০ ডিগ্রি কভারেজ এবং ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্যভেদে সক্ষম।

ভারতের প্রতি ইসরাইলের সমর্থন ছিল স্পষ্ট। মুম্বাইয়ে ইসরাইলের কনসাল জেনারেল কোবি শোশানি অপারেশন সিঁদুরকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে বলেন, আমি এই অভিযানে খুবই গর্বিত। গত এক দশকে ইসরাইল ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে। এই সময়ে দেশটি ভারতকে প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে রাডার, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। গাজায় চলমান যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও, ভারতকে অস্ত্র সরবরাহে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি বলে জানিয়েছে ইসরাইল। ভারতের অন্যান্য প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট।

mzamin