Showing posts with label গবেষণা. Show all posts
Showing posts with label গবেষণা. Show all posts

Tuesday, July 21, 2026

মানুষের দাঁত নতুন করে প্রাকৃতিকভাবে গজাবে

দাঁত গজাতে পুনরুৎপাদনশীল চিকিৎসার শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।

দাঁত পড়ে যাওয়ার পর বর্তমানে যেসব চিকিৎসা রয়েছে, সেগুলো সাময়িক এবং শতভাগ কার্যকর নয়। কিন্তু কেমন হতো, যদি কৃত্রিম ব্যবস্থার বদলে আমাদের দাঁত প্রাকৃতিকভাবেই আবার গজাত? বিভিন্ন জরিপ বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৭০ শতাংশেরই দন্তচিকিৎসকের কাছে যেতে একধরনের ভয় কাজ করে। দাঁতে ফিলিং করা বা ড্রিল করার প্রতি তাঁদের আতঙ্ক ও অনীহার কারণে অনেকেই নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার বা যত্ন নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

বায়োকেমিস্ট হ্যানেল রুওহোলা-বেকারের কাছে প্রায় প্রতিদিনই এমন সব মানুষের ই–মেইল আসে, যাঁরা দাঁতের সাধারণ চিকিৎসা বা ব্যথার চেয়েও জটিল কোনো ডেন্টাল এক্সপেরিমেন্টের মধ্য দিয়ে যেতেও রাজি। তাঁদের একটাই আকুতি—রুওহোলা-বেকার যেন তাঁদের দাঁত আবার গজাতে সাহায্য করেন।

রুওহোলা-বেকার বিশ্বজুড়ে এমন একদল বিজ্ঞানীর অন্তর্ভুক্ত, যাঁরা প্রথাগত ডেন্টাল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে রিজেনারেটিভ মেডিসিন বা পুনরুৎপাদনশীল চিকিৎসার শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। দাঁত হারানো এবং দাঁতের ব্যথায় ভোগা লাখ লাখ মানুষের জন্য এটি এক নতুন আশার আলো।

বিজ্ঞানীদের এই স্বপ্ন যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে কোনো একদিন দন্তচিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অর্থ হবে—সিনথেটিক উপাদান দিয়ে দাঁত মেরামত করা কিংবা তা টেনে উপড়ে ফেলার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু বা আস্ত একটি দাঁত প্রাকৃতিকভাবেই আবার গজিয়ে তোলা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিনের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর রুওহোলা-বেকার বলেন, ‘আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন একটি বিষয় আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—মানুষ দাঁতের চিকিৎসায় নতুন কিছুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’

দাঁত পড়ে যাওয়ার সঙ্গে মানুষের বেশি অসুস্থ হওয়া এবং দ্রুত মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। এটি মানুষের খাওয়া, চিবানো এবং হাসির ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, যা সামাজিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষতি করতে পারে—আর এই ক্ষতিকর চক্র শৈশব থেকেই শুরু হতে পারে।

রুওহোলা-বেকার এবং তাঁর দল কাজ করছেন একধরনের ‘লিভিং ফিলিং’ বা জীবন্ত ফিলিং নিয়ে। আক্কেল দাঁত নিয়ে গবেষণা করে এই বিজ্ঞানী দেখতে পান, এনামেল তৈরিকারক বিশেষ কোষ মানুষের দাঁত পুরোপুরি ওঠার পর মারা যায়। ফলে দাঁত একবার মাড়ি ভেদ করে বাইরে চলে এলে এই কোষগুলোকে আর উদ্দীপিত করা যায় না।

এর পরিবর্তে, গবেষক দলটি কিছু স্টেম সেলকে রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে অ্যামেলোব্লাস্টে রূপান্তরিত করেন। ল্যাবরেটরির পাত্রে এই উপাদানগুলো একত্রিত করার পর একটি ‘টুথ অর্গানয়েড’ তৈরি হয়, যা নিজে থেকেই এনামেল প্রোটিন নিঃসৃত করতে সক্ষম।

রুওহোলা-বেকার এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন, যেখানে এই এনামেল প্রোটিনগুলো ফিলিং তৈরিতে বা ফেটে যাওয়া দাঁতের ওপর প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তবে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ল্যাবরেটরিতে আস্ত একটি দাঁত তৈরি করা।

দন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে অনেকেই ভয় পান
দন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে অনেকেই ভয় পান। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, June 23, 2026

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কেন মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে by জাকারিয়া সুমন

একসময় ধারণা ছিল, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক চিরস্থায়ী। কিন্তু আজ ‘নো কন্ট্যাক্ট’ বা সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া অনেক পরিবারে বাস্তবতা। মা-বাবারা একে অকৃতজ্ঞতা বা বিশ্বাসঘাতকতা ভাবলেও বহু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কাছে এটি আত্মরক্ষার শেষ উপায়।

গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিচ্ছেদ হঠাৎ ঘটে না। এটি দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত, অবহেলা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও অপূর্ণ সম্পর্কের পরিণতি। সন্তান মনে করে, সে বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর মা-বাবা প্রায়ই সেই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেন বা তুচ্ছ করে দেখেন।

বেশ কয়েকজন পিএইচডি গবেষক এ বিষয়ের ওপর গবেষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির ক্রিসটেন কার, ক্রেইটন ইউনিভার্সিটির আমান্ডা হোলম্যান, কলেজ অব চার্লস্টনের পি এ জেনা স্টিফেনসন অ্যাবেটজ ও ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কার জোডি কোয়েনিগ কেলাস ‘গিভিং ভয়েস টু দ্য সাইলেন্স অব ফ্যামিলি এসট্রেঞ্জমেন্ট: কমপেয়ারিং রিজনস অব এসট্রেঞ্জড প্যারেন্টস অ্যান্ড অ্যাডাল্ট চিলড্রেন ইন আ ননম্যাচড স্যাম্পল’ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। এ গবেষণায় ৮৯৮ জন মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচ্ছিন্নতার কারণ সম্পর্কে মা-বাবা ও সন্তানের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। মা-বাবারা সাধারণত সন্তানের আপত্তিকর সম্পর্ক বা অতিরিক্ত অধিকারবোধকে বিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে।

মনের বন্ধুর হেড অব মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম এবং লিড সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর কাজী রুমানা হক বলেন, ‘মা-বাবা যখন পৃথিবীতে সন্তানকে নিয়ে আসেন, তখন মনে করেন যেহেতু আমার মাধ্যমে এসেছে, আমার মতো চলবে। কিন্তু একজন আলাদা মানুষ হিসেবে সন্তানেরও আলাদা মতামত থাকতে পারে। বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষা করা হয়। অভিভাবক হিসেবে মনে করেন, আমরা অনেক করেছি ওর জন্য। কিন্তু কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেন না, আমিও তো ব্যস্ততার কারণে বা কাজের কারণে সময় দিচ্ছি না। সন্তানের ওপর রেগে গিয়ে অনেকে গায়ে হাত তোলেন অথবা সাইলেন্স ট্রিটমেন্ট দেন। এটা খারাপ। বড় হওয়ার পরও সন্তান এটা মনে রাখে।’

রুমানা আরও বলেন, ‘সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, সন্তানের অর্জনকে ছোট করে দেখা। এটা সন্তানদের মনে ক্ষোভ তৈরি করে। অনেক সময় আমরা দেখেছি যে সন্তানেরা ছোটবেলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মা-বাবার মন ভরানো যায় না। পরীক্ষায় ৮০ বা ৯০ নম্বর পেলেও তাঁদের চাওয়া থাকে যেন ১০০ পাই। অর্জনগুলোকে অবহেলা করেন দেখে বন্ধন ভেঙে যায়।’

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, প্যারেন্টিং স্টাইলের ওপর নির্ভর করে সন্তানের সঙ্গে বন্ধন বাড়ে–কমে। যেই অভিভাবকের প্যারেন্টিং স্টাইলে এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব আছে, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটার প্রভাব পড়ে। সঠিকভাবে সন্তান পালন করা না হলে দুই সম্পর্কের বন্ধনেও নেতিবাচক প্রভাব পরে। যেটার ফলাফল দেখা যায় বড় হওয়ার পর।
সন্তান বিয়ে করলে বা দেশের বাইরে গেলে মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদজনিত উদ্বেগ কাজ করে। সন্তানের জীবনের এই পরিবর্তন অনেকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন না। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, নিজেরা যেটা করতে পারেননি, চান যে সন্তান সেটা পূরণ করুক। নিজেদের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে সন্তানেরা চাপে পড়ে যায়।

আঘাতের স্মৃতি: দুই পক্ষের দুই গল্প

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে প্রায়ই আবেগগত নির্যাতন, অতিরিক্ত সমালোচনা, অসম্মান, বিশ্বাসভঙ্গ বা শৈশবের গভীর মানসিক দূরত্বের কথা বলে। কখনো মা-বাবা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও আবেগগতভাবে অনুপস্থিত ছিলেন।
আবার অনেক পরিবারে ভালোবাসা ছিল শর্তসাপেক্ষ—সন্তান মা-বাবার ইচ্ছামতো চললে সে স্নেহ, প্রশংসা ও গ্রহণযোগ্যতা পেত; কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশ করলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে বা প্রত্যাশার বাইরে আচরণ করলে তাকে অবহেলা, সমালোচনা কিংবা দূরত্বের মুখোমুখি হতে হতো।
অন্যদিকে অনেক মা-বাবা মনে করেন, তাঁদের সন্তানকে কেউ প্রভাবিত করেছে—জীবনসঙ্গী, বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন। এতে তাঁরা নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সন্তান প্রথমবারের মতো এমন কারও কাছ থেকে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পায়, যা তাকে নিজের পারিবারিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

কেন অনেক মা-বাবা সমস্যাটি বুঝতে পারেন না

সমাজে মা-বাবার আচরণের সমালোচনা করাকে অনেক সময় অভদ্রতা, অবাধ্যতা বা অকৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সন্তান যখন নিজের কষ্ট, অপমান বা মানসিক আঘাতের কথা বলতে চায়, তখন অনেক মা-বাবা সেটিকে অভিযোগ হিসেবে নেন, অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়।
অনেকের ধারণা থাকে, ‘আমি তো সন্তানের জন্য এত কষ্ট করেছি, তাহলে সে কষ্ট পেল কীভাবে?’
অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন, লেখাপড়ার খরচ বহন বা সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়াকেই তাঁরা ভালো অভিভাবকত্বের প্রধান প্রমাণ মনে করেন। কিন্তু সন্তান প্রায়ই আবেগগত সমর্থন, সম্মান, বোঝাপড়া ও নিরাপদ সম্পর্কের অভাবের কথা বলে, যা মা-বাবার কাছে দৃশ্যমান না-ও হতে পারে।

ফলে সন্তান যখন তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে, তখন অনেক মা-বাবা সন্তানের ওপরই দোষ চাপান। কেউ বলেন, ‘আমরা তো তোমার ভালোর জন্যই করেছি।’ কেউ বলেন, ‘এত ছোট একটা বিষয় নিয়ে কষ্ট পাওয়ার কী আছে?’ এভাবে সন্তানের অনুভূতিগুলো বারবার অগ্রাহ্য হতে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তান বুঝতে পারে, তার কথা শোনা হচ্ছে না; তখন সে দূরে সরে যায়।
এ কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অনেক মা-বাবা সত্যিই বিস্মিত হন। তাঁরা প্রায়ই শেষ ঘটনাটিকে কারণ মনে করেন, অথচ বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আঘাত, অপূর্ণতা ও না-শোনা অনুভূতিগুলোই ছিল প্রকৃত কারণ। সন্তানের কথাগুলো তাঁদের কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু সেসবের গভীরতা উপলব্ধি করার মানসিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা অনেক সময় তৈরি হয়নি।

সম্পর্কচ্ছেদ শাস্তি নয়, আত্মরক্ষার সিদ্ধান্ত

গবেষণা বলছে, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ সাধারণত হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের আশা, হতাশা ও সম্পর্ক ঠিক করার অসংখ্য চেষ্টা। সন্তান বারবার নিজের কষ্টের কথা জানায়, বোঝাপড়ার আশা করে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু যখন সে দেখে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না, তখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পর্কচ্ছেদ প্রতিশোধ বা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; বরং নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও সুস্থতা রক্ষার জন্য নেওয়া একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।

সূত্র: মিডিয়াম

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, June 14, 2026

এই সাত ধরনের খাবার খেলে ৭০ বছর বয়সেও থাকবেন তরুণ by রাফিয়া আলম

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, উদ্ভিজ্জ খাবার খেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এমনকি দীর্ঘ আয়ু পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। কম বয়স থেকে তো বটেই, মধ্যবয়সে এসে এই অভ্যাস গড়ে তুললেও ফলাফল হয় দারুণ ইতিবাচক।

গত মার্চ মাসে ‘নেচার মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উদ্ভিজ্জ খাবার খেলে বয়সজনিত জটিলতার হার কমে। গবেষণাটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী সুস্থ ব্যক্তিদের। অর্থাৎ যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা নেই। ৩৯–৬৯ বছর বয়সী ১ লাখ ৫ হাজার ব্যক্তিকে ৩০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন গবেষকেরা। মধ্যবয়সে খাদ্যাভ্যাস কীভাবে তাঁদের পরবর্তী বছরগুলোর সুস্থতাকে প্রভাবিত করেছে, সেটিই দেখা হয়েছে সেই গবেষণায়।
সুস্থ থাকার সম্ভাবনা কতটা

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট স্কোর দেওয়া হয়েছে। এই স্কোর হার্ভার্ডের উদ্ভাবিত অল্টারনেটিভ হেলদি ইটিং ইনডেক্সের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’ অনুসারে, যাঁদের এই স্কোর সবচেয়ে বেশি ছিল, ৭০ বছর বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁদের সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে ৮৬ শতাংশ; ৭৫ বছর বয়সে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে ২ দশমিক ২ গুণ। বুঝতেই পারছেন, এই অল্টারনেটিভ হেলদি ইটিং ইনডেক্সই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
কী আছে হার্ভার্ডের এই খাদ্যভ্যাসে, যা দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখতে সহায়ক? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।

যে সাত ধরনের খাবার বেশি খেতে হবে

১. ফলমূল
২. সবজি
৩. গোটা শস্য, অর্থাৎ যা রিফাইনড (পরিশোধিত) নয়
৪. লেগিউম, অর্থাৎ শিম, মটর, ছোলা, চানা, মসুর ডাল প্রভৃতি
৫. নানান ধরনের বাদাম
৬. অসম্পৃক্ত স্নেহ পদার্থ, অর্থাৎ যা কক্ষতাপমাত্রায় তরল থাকে। যেমন স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ তেল, মাছের তেল
৭. লো ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার (পরিমিত পরিমাণে)

যে পাঁচ ধরনের খাবার কম খেতে হবে কিংবা বাদ দিতে হবে

১. চিনিমিশ্রিত পানীয়
২. লাল মাংস
৩. ট্রান্স ফ্যাট, যেমন ফাস্টফুড বা বেক করা খাবারে ব্যবহৃত আংশিক হাইড্রোজিনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল, মার্জারিন
৪. বাড়তি লবণ, যেমন পাতে লবণ নেওয়া
৫. প্রক্রিয়াজাত মাংস

উদ্ভিজ্জ খাবারই সুস্থতার অন্যতম চাবিকাঠি। এ ধরনের খাবার খেলে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগ থেকে বাঁচবেন আপনি। সঙ্গে বুঝেশুনে যোগ করতে পারেন পরিমিত পরিমাণ প্রাণীজ খাদ্য। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস হতে চলেছে এটাই। এমনটাই জানিয়েছেন হার্ভার্ডের এই গবেষক দল।

সূত্র: সিএনবিসি

দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখা খাদ্যাভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে
দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখা খাদ্যাভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে। ছবি: প্রথম আলো

Friday, June 12, 2026

সাগরতলে তিমির ৫০ লাখ বছরের পুরোনো সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার, কী কী আছে এতে

চীনা বিজ্ঞানীরা ভারত মহাসাগরের তলদেশে তিমির বিশাল এক সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এটি বিশ্বে তিমির সবচেয়ে বড় সমাধিক্ষেত্র। সেখানে তাঁরা নতুন ও প্রাচীন—দুই ধরনেরই বিপুলসংখ্যক তিমির দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন। তিমির এ সমাধিক্ষেত্রটি গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী অসংখ্য জীবের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

গত বুধবার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত তিমির সমাধিক্ষেত্রগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গভীর ও প্রাচীন। এখানে পাওয়া কিছু জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫৩ লাখ বছর।

ছোট একটি ডুবোযান দিয়ে গবেষণা চালিয়ে চীনের গবেষকেরা তিমির দেহাবশেষের ওপর বসবাসকারী নানা ধরনের অদ্ভুত প্রাণী দেখতে পান। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব প্রাণীর অনেকগুলোই নতুন প্রজাতির। তারা তিমির দেহাবশেষকে খাদ্য ও আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে টিকে আছে।

ভারত মহাসাগরের তলদেশে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম পাশে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫০০টি তিমির কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে এলাকাটি বিস্তৃত। সাগরে তলদেশে কিছু জায়গা ৭ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীর।

এই কঙ্কালগুলোর মধ্যে একটি অজানা প্রজাতির তিমিও শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখন সে প্রজাতিটিও বিলুপ্ত।

গবেষণা প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক এবং চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস–এর বিজ্ঞানী শিয়াওতং পেং বলেন, এই আবিষ্কারের বিশালতা বুঝে গবেষকেরা ‘অবাক’ হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, তিমির এমন বড় পরিসরের সমাধিক্ষেত্র, এর গভীরতা এবং বয়স—সবকিছুই তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।

বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, তিমি মারা গেলে তাদের দেহ সমুদ্রের তলায় ডুবে যায়। এই ডুবে যাওয়া দেহকে ‘হোয়েল ফল’ বলা হয়। এ দেহ গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর খাবারের উৎস হয়।

তবে পেং বলেন, ‘তিমির এত বড় একটি সমাধিক্ষেত্র পাওয়াটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। এর বিস্তার, গভীরতা ও বয়সের পরিসর আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি।’

গবেষকদের মতে, এই এলাকায় এত বেশি তিমি মারা যাওয়ার কারণ হতে পারে এটি তিমিদের খাবার খোঁজার একটি প্রিয় অঞ্চল। পাশাপাশি, এখানে থাকা ‘ভি’ আকৃতির গভীর খাদ মৃতদেহগুলোকে সমুদ্রের তলায় জমা হতে সাহায্য করেছে।

‘অত্যন্ত অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা’

চীনা গবেষকেরা ২০২৩ সালে ফেনদৌঝে নামের একটি ডুবোযান দিয়ে এই গবেষণা শুরু করেন। এই ডুবোযানটি একসঙ্গে তিনজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে গভীর সমুদ্রে ৩২টি ডাইভ দেয়। পরে তাদের পাওয়া তথ্য নেচার সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়।

বিজ্ঞানীরা ডুবোযানের রোবোটিক হাত ব্যবহার করে সমুদ্রতল থেকে বিভিন্ন কঙ্কাল ও নমুনা সংগ্রহ করেন।

গবেষক ঝৌ বলেন, তিমির এই ‘সমাধিক্ষেত্র’ নিজের চোখে দেখাটা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, সেখানে যে জীবন্ত ও বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র দেখা গেছে, তা অন্ধকার ও ঠান্ডা সমুদ্রতল সম্পর্কে তাঁদের ধারণাই বদলে দিয়েছে। সেখানে জেলিফিশ, কৃমি, শামুক, ক্রাস্টেশিয়ান, ব্রিটল স্টার এবং বাইভালভ নামের মলাস্কসহ নানা প্রাণী এই মৃত তিমির দেহের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ‘ডায়মেন্টিনা জোন’ নামে চিহ্নিত এ অঞ্চলটিতে এক কোটির বেশি তিমির মৃতদেহ থাকতে পারে। বেশির ভাগই ছিল ‘বেকড হোয়েল’।

এই বিশালসংখ্যক মৃতদেহে থাকা চর্বি ও জৈব পদার্থ মিলিয়ে প্রায় ৬৭ লাখ টন কার্বন সমুদ্রের তলদেশে আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা, আইবেরীয় উপদ্বীপ এবং ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জের কাছেও এমন আরও সমাধিক্ষেত্র থাকতে পারে।

‘আরও চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যাবে’

হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী ক্রেইগ স্মিথ ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো তিমির মৃতদেহ ঘিরে তৈরি হওয়া বাস্তুতন্ত্র (হোয়েল ফল) আবিষ্কার করেছিলেন। নতুন এই গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন না। তবে তিনি এ আবিষ্কারকে ‘অত্যন্ত রোমাঞ্চকর’ বলে উল্লেখ করেছেন।

ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং তিমির মৃতদেহ–সংক্রান্ত গবেষক অ্যামি বাকো-টেলর বলেন, এই ‘অসাধারণ আবিষ্কার’ থেকে সম্ভবত অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাবে।

তবে টেলর মনে করেন, এত বেশিসংখ্যক তিমির ওই এলাকায় মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই অদ্ভুত। তিনি বলেন, ‘তিমির চেতনা বা আচরণ সম্পর্কে আমরা এখনো যথেষ্ট জানি না।’

যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্মবিদ স্টিফেন গডফ্রে অতীতের বড় সামুদ্রিক আবিষ্কারের সঙ্গে এই ‘অনন্য আবিষ্কার’-এর তুলনা করেছেন। যেমন ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সমুদ্রের তলদেশে প্রাণে ভরপুর হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আবিষ্কার করেছিলেন।

গডফ্রে ভবিষ্যতে আরও ডুবোযান অভিযান চালিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন তিমির সমাধিক্ষেত্র খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট একটি প্রবন্ধে গডফ্রে লিখেছেন, এই আবিষ্কার তাঁকে ‘একটি মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র সিরিজের প্রথম পর্বের ট্রেলারের’ কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

ভবিষ্যতে এমন আরও ‘চমকপ্রদ আবিষ্কার’ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন গডফ্রে।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তিমির এত বড় আকারের একটি সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার করাটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তিমির এত বড় আকারের একটি সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার করাটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। ছবি: এএফপি

Wednesday, June 10, 2026

চাঁদে অভিযানের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন মাস্ক ও বেজোস, চীনকে কি টেক্কা দিতে পারবেন

প্রকাশ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের দুই শীর্ষস্থানীয় ধনকুবের পাল্লা দিয়ে মহাকাশসংক্রান্ত গবেষণার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্স চাঁদে একটি চন্দ্রঘাঁটি তৈরি করার পরিকল্পনা করছে। আরেক ধনকুবের জেফ বেজোসের মালিকানাধীন সংস্থা ব্লু অরিজিন তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য জোরেশোরে তৎপরতা চালাচ্ছে।

২০৩০ সালে চীনের পরিকল্পিত চন্দ্রাভিযানের আগেই চাঁদে মানুষ পাঠানোর নিজস্ব লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে মার্কিন এই দুই মহাকাশ সংস্থা।

ইলন মাস্ক সাম্প্রতিক পডকাস্ট সাক্ষাৎকার ও কোম্পানির বৈঠকে বলেন, তিনি চাঁদে ‘মুনবেজ আলফা’ নামে একটি ঘাঁটি গড়তে চান।

পাশাপাশি চাঁদের পৃষ্ঠে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণযন্ত্র বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে ইলন মাস্কের। এই ঘাঁটি তাঁর পরিকল্পিত এআইভিত্তিক কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। ওই নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ ১০ লাখ পর্যন্ত স্যাটেলাইট যুক্ত থাকতে পারে।

চাঁদমুখী এই জোরালো পরিকল্পনা স্পেসএক্সের মঙ্গল গ্রহমুখী লক্ষ্য থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০০২ সালে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাস্ক নিয়মিতভাবে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্নের কথা বলে আসছিলেন। এমনকি গত গ্রীষ্মেও তিনি বলেছিলেন, মঙ্গলে মনুষ্যবিহীন একটি স্টারশিপ মহাকাশযান পাঠাতে চান।

অথচ ইলন মাস্ক এখন বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে চাইছেন, স্পেসএক্স মহাকাশ খাতে আধিপত্য বজায় রাখবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনও তাদের চন্দ্রাভিযানসংক্রান্ত কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা চলতি বছর চন্দ্রপৃষ্ঠে মনুষ্যবিহীন যান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

চলতি বছর ব্লু অরিজিন চাঁদে মনুষ্যবিহীন নভোযান পাঠানোর যে পরিকল্পনা করছে, সেটিকে ভবিষ্যতে নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির অংশ হিসেবে চাঁদে নভোচারী পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাসার ওই কর্মসূচি পরিচালনায় স্পেসএক্সের স্টারশিপ মহাকাশযানের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভর করা হচ্ছে। সিয়াটলভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের চন্দ্রযানটিকে গত সপ্তাহে জনসন মহাকাশ কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সেখানে উৎক্ষেপণের আগে চন্দ্রযানটি ঠিকঠাক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।

ব্লু অরিজিন ও স্পেসএক্স—দুটি প্রতিষ্ঠানই নাসার কোটি কোটি ডলারের অর্থায়নে চন্দ্রাভিযানের জন্য অবতরণ যান তৈরি করছে। নাসা এসব যান ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে চাঁদে নভোচারী পাঠাতে চায়, যার শুরু হবে স্পেসএক্সের স্টারশিপ দিয়ে।

প্রথম ১৯৬৯ সালে সফলভাবে চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল নাসা। এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তাদের ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে মোট ১২ মার্কিন নভোচারী চাঁদের মাটিতে হেঁটেছিলেন।

নাসা মনে করে, আবার চাঁদে অভিযান চালানোটা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করবে।

ইলন মাস্ক সম্প্রতি বলেন, তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে চাঁদে একটি অবস্থান কেন্দ্র গড়তে চান এবং সেখান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে চান।

মহাকাশবিষয়ক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান প্রোকিউরএএমের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু চানিন মনে করেন, চাঁদ যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথের সূচনা কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং স্পেসএক্স আগেভাগে সেখানে অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তবে সেই অবকাঠামো কীভাবে ব্যবহৃত হবে না হবে, তা ঠিক করতে তাদের অগ্রাধিকার থাকবে।

স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ যান স্টারশিপ রকেট এখনো কক্ষপথে কোনো কিছু স্থাপন করতে পারেনি। ২০২৩ সাল থেকে এটিকে ১১ বার উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আরেকটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি চলছে। রকেটটির ওপরের ধাপটি চাঁদে অবতরণ যান হিসেবে কাজ করবে। ২০২৮ সালে চাঁদে মনুষ্যবাহী নভোযান পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মহাকাশশিল্পে জড়িত অনেকের ধারণা, এই সময়সীমা পূরণ করা কঠিন হবে।

স্টারশিপকে চাঁদে অবতরণের যান হিসেবে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে স্পেসএক্সকে আরও অনেক ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—কক্ষপথে আরেকটি ‘ট্যাংকার’ স্টারশিপের মাধ্যমে জ্বালানি ভরার পদ্ধতি অনুশীলন এবং মানুষের যাত্রার আগে চাঁদের অসমতল পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণের সক্ষমতা প্রমাণ করা।

টেক্সাসে স্পেসএক্সের স্টারশিপ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তদারকের দায়িত্বে থাকা ক্যাথি লুয়েডারস বলেন, স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে চাঁদের দিকে মাস্কের মনোযোগের বিষয়টি নাসাকে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সাহায্য করছে।

একসময় নাসায় কাজ করা লুয়েডারস বর্তমানে একজন শিল্পবিষয়ক স্বাধীন পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন।

মাস্ক ও বেজোসের মধ্যকার প্রতিযোগিতার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের চন্দ্রাভিযানে জড়িত নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

লুনার আউটপোস্ট নামের কোম্পানির প্রধান নির্বাহী জাস্টিন সাইরাস বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে ২০ বিনিয়োগকারী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।’

সাইরাসের প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে চাঁদে অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে একটি রোভারকে চন্দ্রপৃষ্ঠে পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত দুই বছরে চাঁদকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আর ইলনের (মাস্ক) ঘোষণায় বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2F7tw6pvqc%2FMoon-1.jpg?rect=1%2C0%2C1119%2C746&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে আয়োজিত এক নৈশভোজে জেফ বেজোস, ইলন মাস্ক ও ইভাঙ্কা ট্রাম্প। ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Tuesday, June 9, 2026

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যয় রেকর্ড বেড়েছে: গবেষণা

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের মজুতাগার থেকে আরও বেশি ওয়ারহেড (ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র) সক্রিয় উৎক্ষেপণব্যবস্থায় স্থানান্তর করেছে। বিশেষজ্ঞরা আজ মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন।

পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপে কাজ করা আন্তর্জাতিক জোট ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার ওয়েপনস (আইক্যান) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রধারী ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে তাদের অস্ত্রাগারের পেছনে প্রায় ১১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।

আইক্যানের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, ‘আমরা এখন নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে আছি।’

গতকাল সোমবার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) পৃথক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাপক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়ছে। একই উদ্বেগ জানিয়েছে আইক্যানও।

উভয় গবেষণায় বলা হয়, বিভিন্ন দেশ তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিক করছে এবং আরও বেশি অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণেই ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

আইক্যানের কর্মসূচি পরিচালক ও সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক সুসি স্নাইডার বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের এ সম্প্রসারণ উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে গেলে, আমি আতঙ্কিত।’

ঝুঁকি ও উত্থান

সিপ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা কয়েক দশক ধরে কমছে। চলতি বছরের শুরুতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৮৭–তে। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে।

সিপ্রির পরিচালক করিম হাগাগ এএফপিকে বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমলেও পারমাণবিক বিপদ ও ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া ও পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা উদ্বেগের বড় কারণ।

সিপ্রির পূর্বাভাস, আগামী বছরগুলোয় বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আবারও বাড়তে পারে। কারণ, পুরোনো অস্ত্র ধ্বংস করার গতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের গতি বাড়ছে।

বর্তমানে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের প্রায় ৮৩ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। দুই দেশের কাছে ৫ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে।

সিপ্রির হিসাব অনুযায়ী, চীন অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণ করছে। বর্তমানে দেশটির কাছে প্রায় ৬২০টি ওয়ারহেড রয়েছে।

করিম হাগাগ বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চীনকে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করছে।’

আইক্যানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তান—সব পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ তাদের অস্ত্রভান্ডারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

গত বছর এ ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

আইক্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার বেশি।

ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরই রয়েছে চীন। দেশটি গত বছর প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এরপর রয়েছে ব্রিটেন, যার ব্যয় ১ হাজার ২৬০ কোটি ডলার। রাশিয়া ব্যয় করেছে প্রায় ৯৫০ কোটি ডলার।

গত পাঁচ বছরে এ ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের পেছনে ৪৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়বে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে তাকিয়ে আইক্যান বলেছে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র আগামী শতাব্দীতেও পারমাণবিক অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। অন্য দেশগুলোও দীর্ঘস্থায়ী নতুন অস্ত্রব্যবস্থা চালু করছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত নতুন ‘সেন্টিনেল’ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ২১০০ সালের পরও সক্রিয় থাকতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির প্লুটোনিয়াম উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বর্তমান ওয়ারহেডগুলো ২১২০ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখা সম্ভব হবে। এ জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।

গবেষকদের ধারণা, শুধু ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র খাতে ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, এমন এক সময়ে এ বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম তহবিল সংকটে ভুগছে। তাঁদের হিসাবে, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে এক দিনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে ২০ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

সুসি স্নাইডার বলেন, নিজেদের জনগণের জন্য সহায়তা বা স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ ব্যয় না করে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এমন অস্ত্রভান্ডারে বিনিয়োগ করছে, যা ব্যবহার করলে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হবে—এ কথা তারাও জানে।

ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে
ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, August 27, 2025

মিসরে সমুদ্রতলে প্রাচীন শহরের খোঁজ

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া উপকূলে সমুদ্রগর্ভে চাপা পড়ে থাকা এক প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলছেন, আবু কির উপসাগরের গভীরে ডুবে থাকা শহরটির গোড়াপত্তন দুই হাজার বছরের আগে। এটি হতে পারে প্রাচীন কানোপাস নগরীর সম্প্রসারিত অংশ।

দেশটির প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই শহরের বেশ কিছু নিদর্শন গত বৃহস্পতিবার ধাপে ধাপে পানির নিচ থেকে তুলে আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজরাজড়াদের মূর্তি, চুনাপাথরের তৈরি ভবনের ধ্বংসাবশেষ ও ডকইয়ার্ডের (জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের কারখানা) অংশবিশেষ।

প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলছেন, টলেমাইক রাজাদের প্রায় ৩০০ বছরের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল কানোপাস নগরী। তারই সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে এই শহর গড়ে ওঠে। পরে রোমান সাম্রাজ্যের আনুমানিক ৬০০ বছরের শাসনামলে সেটি আরও সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু ভূমিকম্প ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে তলিয়ে যায় শহরটি। হারিয়ে যায় কানোপাস ও পাশের বিখ্যাত বন্দরনগরী হেরাক্লিয়ন।

বৃহস্পতিবার উদ্ধার অভিযান চলাকালের কিছু ছবি ও ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বড় বড় ক্রেন দিয়ে ধীরে ধীরে পানির নিচ থেকে তুলে আনা হচ্ছে বেশ কয়েকটি মূর্তি ও চুনাপাথরের তৈরি ভবনের ধ্বংসাবশেষ। এ সময় সেখানে থাকা ডুবুরিরা হাততালির মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন।

মিসরের পর্যটন ও পুরাকীর্তি বিষয়ক মন্ত্রী শেরিফ ফাতহি বলেন, ‘সমুদ্র তলদেশে প্রাচীন এই শহরের স্থাপনাসহ আরও অনেক কিছু খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে সেসব স্থাপনার সামান্যই তুলে আনতে পেরেছি আমরা। বাকি সব রয়ে যাবে আমাদের ডুবে যাওয়া ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে।’

প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার অন্যতম একটি কেন্দ্র ছিল আলেকজান্দ্রিয়া। মানবসভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরও বর্তমানে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সমুদ্র–তীরবর্তী এই শহর প্রতিবছর গড়ে তিন মিলিমিটার করে দেবে যাচ্ছে। জাতিসংঘের গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যেই শহরটির এক–তৃতীয়াংশ ডুবে যেতে পারে নয়তো বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।

ক্রেন দিয়ে সমুদ্র তলদেশ থেকে তুলে আনা হচ্ছে মাথাবিহীন একটি মূর্তি। বৃহস্পতিবার মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়া উপকূলে
ক্রেন দিয়ে সমুদ্র তলদেশ থেকে তুলে আনা হচ্ছে মাথাবিহীন একটি মূর্তি। বৃহস্পতিবার মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়া উপকূলে। ছবি: এএফপি

Monday, August 25, 2025

দক্ষিণ ভারতে আড়াই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার গোপন রহস্য উন্মোচন

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন হলো। তামিলনাড়ুর মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আড়াই হাজার বছর পুরোনো দুটি মাথার খুলির ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছেন। যেগুলো তামিলনাড়ুর কিলাডি এলাকার একটি প্রাচীন সমাধিস্থল থেকে পাওয়া গেছে। গবেষকদের এই কাজ শুধু ইতিহাসের পাতায় নতুন তথ্য যোগ করছে না, বরং দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, বহুদিন ধরে ভারতের প্রাচীনতম নগর সভ্যতা হিসেবে সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতাকেই ধরা হতো। যার বিস্তার ছিল মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতে। কিন্তু কিলাডির প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রমাণ করেছে যে, প্রায় একই সময়ে দক্ষিণ ভারতেও একটি উন্নত ও স্বাধীন সভ্যতা ছিল। এই সভ্যতার মানুষজন ছিল শিক্ষিত, দক্ষ কারিগর। এছাড়া আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্যেও যুক্ত ছিল তারা। নতুন আবিস্কৃত সভ্যতার মানুষেরা ইটের তৈরি বাড়িতে বাস করতেন এবং মৃতদেহকে দৈনন্দিন সামগ্রীসহ মাটির পাত্রে সমাধিস্থ করতেন।

মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক জি কুমারাসন এবং তার দল এই খুলিগুলো নিয়ে গবেষণার জন্য লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির ফেস ল্যাবের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেন। ফেস ল্যাবের বিশেষজ্ঞরা খুলিগুলোর ত্রিমাত্রিক (থ্রি ডি) স্ক্যান তৈরি করে তাতে পেশি, মাংস ও ত্বক যোগ করেন, যা মানুষের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় অনুপাত মেনে করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিচ্ছবিগুলোতে রঙ যোগ করা। গবেষকরা স্থির করেন, তারা বর্তমানে তামিলনাড়ুতে বসবাসকারী মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রঙ ব্যবহার করবেন। এই ডিজিটাল প্রতিচ্ছবিগুলো প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ এটি ভারতের উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে বিদ্যমান পুরোনো জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজনকে সামনে নিয়ে আসে। এতদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে, আর্যরা (উত্তর ভারতের আদি বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত) এই দেশের ‘আসল নাগরিক’। কিন্তু দ্রাবিড়ীয় (দক্ষিণ ভারতের আদি বাসিন্দা) সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে নতুন গবেষণা সেই ধারণার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে।

অধ্যাপক কুমারাসন বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, আমরা যতটা ভাবি তার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ছিল ওই সভ্যতা। আমাদের ডিএনএ-তে এর প্রমাণ রয়েছে। খুলি দুটির মুখের গঠনে প্রাচীন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। পাশাপাশি এতে মধ্য-প্রাচ্য ইউরেশীয় এবং অস্ট্রো-এশীয় জনগোষ্ঠীর ছাপও দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে প্রাচীনকালে মানুষের মধ্যে বৈশ্বিক অভিবাসন ও সংমিশ্রণ ঘটেছে।

তবে কিলাডি নিয়ে গবেষণা এখানেই শেষ নয়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই স্থান থেকে প্রায় ৫০টি সমাধিপাত্র খনন করেছেন এবং মানব দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। যদিও হাড়গুলো খুবই জীর্ণ হওয়ায় ডিএনএ সংগ্রহ করা কঠিন, তবু গবেষকরা আশাবাদী। তারা মনে করেন, প্রাচীন ডিএনএ লাইব্রেরিগুলো অতীতের একটি দরজা খুলে দেয়, যা থেকে সেই সময়ের জীবনযাত্রা এবং আমাদের বর্তমানের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়।

এই গবেষণা শুধু অতীতের রহস্য উন্মোচন করছে না, বরং ভারতের বহুমুখী সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ওপর নতুন করে আলোকপাত করছে। এটি দেখায় যে, ভারত কোনো একক সংস্কৃতি বা জাতিগোষ্ঠীর দেশ নয়, বরং বিভিন্ন সভ্যতা ও মানুষের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ ভূমি। কিলাডির এই আবিষ্কার তাই শুধু তামিলনাড়ুর নয় বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

mzamin

Sunday, May 11, 2025

আবিষ্কার-উদ্ভাবনে আমরা কেন পিছিয়ে by রউফুল আলম

বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক (গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স) অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর হলো এশিয়ার সবচেয়ে ইনোভেটিভ (উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন) দেশ। কয়েক বছর ধরে সিঙ্গাপুর ধারাবাহিকভাবে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে।

২০২৪ সালের সূচকে, সুইজার‍ল‍্যান্ডের অবস্থান ছিল বিশ্বে প্রথম। দ্বিতীয় স্থানে সুইডেন। সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়া মহাদেশে প্রথম। ১৯ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৩টি দেশের মধ্যে ১০৬। আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া বস্তুত সব দেশই সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। শ্রীলঙ্কা (৮৯) কিংবা সেনেগালও (৯২) সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। সূচকে ভারতের অবস্থান ৩৮ এবং চীনের অবস্থান ১১। প্রতি মিলিয়ন (১০ লাখ) মানুষের মধ্যে কতজন গবেষক ও উদ্ভাবক আছে, সে বিবেচনায় ইউরোপের অনেক দেশ চীন থেকে এগিয়ে। যেমন সুইডেনে প্রতি মিলিয়নে প্রায় ৯ হাজার গবেষক ও বিজ্ঞানী পাওয়া যায়।

এশিয়ার মধ্যে সিঙ্গাপুর কী করে উদ্ভাবনে সেরা, সেটা বুঝতে হলে তাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু তথ‍্য দেওয়া দরকার। সিঙ্গাপুরের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ন‍্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বয়সে মাত্র ১৫ বছর পুরোনো। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক তালিকায় প্রথম ২০-৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে স্থান করে নেয়। এশিয়ার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান এটি। প্রতিবছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ শতাধিক পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হয়। প্রায় আড়াই হাজার পিএইচডি স্টুডেন্ট প্রতিনিয়ত কাজ করছেন। গবেষণা করছে। সেসব স্টুডেন্টদের বয়স ২৫-২৬ বছর। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শেষ করে, ২২-২৩ বছর বয়সেই বেশির ভাগ স্টুডেন্ট পিএইচডি শুরু করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও নিয়মটা এমনই।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইতে, প‍েসিফিক‍্যাম (PACIFICHEM) নামক একটা কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করি। কেমিস্টদের জন্য খুবই পরিচিত এই কনফারেন্স, প্রতি পাঁচ বছর পরপর হাওয়াইতেই অনুষ্ঠিত হয়। স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে আমি তখন সবে পিএইচডি শেষ করেছি। সে কনফারেন্সে সিঙ্গাপুরের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অধ্যাপক ও তরুণ গবেষকদের উপস্থিতি ছিল। যাঁদের সবাই রসায়নের বিভিন্ন শাখার গবেষক ছিলেন। কনফারেন্সের বাইরে, তাঁরা আলাদা করে কয়েকটা আড্ডার আয়োজন করেন। আমারও থাকার সুযোগ হয় সেসব আড্ডায়।

সিঙ্গাপুরের পিএইচডি স্টুডেন্টরা গল্প করছিলেন তাঁদের গবেষণাজীবন কত পরিশ্রমের। কত প্রতিযোগিতার। অধ্যাপকেরা তাঁদের ফান্ডিং নিয়ে গল্প করছিলেন। বলছিলেন, গবেষণার জন্য কালের সেরা সেরা প্রপোজাল না হলে ফান্ডিং পাওয়া কঠিন। তাঁদের সঙ্গে গল্প করে, সিঙ্গাপুরের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে আমার একটা চমৎকার ধারণা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের আদলে, সিঙ্গাপুরে আছে জাতীয় গবেষণা ফাউন্ডেশন (National Research Foundation), যেটা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীন পরিচালিত। এই ফাউন্ডেশনের খুবই শক্তিশালী একটা সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি বোর্ড আছে, যারা বস্তুত সারা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সিঙ্গাপুরকে বিজ্ঞান গবেষণা, আবিষ্কার-উদ্ভাবনে এগিয়ে নিতে সাহায‍্য করে। জাতীয় পলিসি তৈরিতে সাহায‍্য করে। সিঙ্গাপুর তাদের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ব্যয় করে শুধু গবেষণায়, যেটা জাতীয় শিক্ষার বাজেট থেকে আলাদা।

সিঙ্গাপুরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে অবশ্যই পিএইচডি এবং পোস্ট–ডক্টরাল গবেষণা থাকতেই হবে। শুধু তা–ই নয়, খুব ভালো মানের গবেষণাপত্র (পাবলিকেশন) থাকতে হবে। এমনকি বয়সও একটা বিবেচনার বিষয়। অ্যাসিসট‍্যান্ট প্রফেসর হতে গেলে বয়সে হতে হবে তরুণ। সাধারণত ৩৫-এর নিচে। এবং নিয়োগের পর, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (৫-৭ বছর) যদি কেউ খুব ভালো মানের পাবলিকেশন না করে, তাহলে তাঁর ফান্ডিং ও প্রমোশন অনিশ্চিত হয়ে যায়। শিক্ষকদের অবসরের কোনো সময় নেই। অযথা অযাচিত সময় নষ্ট করার সামান্যতম সুযোগ নেই। রাজনীতি করার তো প্রশ্নই আসে না। তাঁদের লক্ষ‍্যই হলো বিশ্বমানের গবেষণা করা। বিশ্বমানের আর্টিকেল পাবলিশ করা। শিক্ষকতা ও গবেষণা নিয়েই পুরো কর্মদিবস ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের।

অথচ দুঃখজনক হলো, আমাদের শতবর্ষ বয়সী বিশ্ববিদ‍্যালয়টি, আজও বৈশ্বিক তালিকায় ৫০০তম স্থান করে নিতে পারে না। ‘প্রাচ‍্যের অক্সফোর্ড’ বলে যে উপাধিটি আমরা ব‍্যবহার করি, সে উপাধি ব‍্যবহার করেও পৃথিবীর মানুষদের সে প্রতিষ্ঠান চেনাতে পারি না। সিঙ্গাপুর আয়তনে বাংলাদেশের ঢাকা জেলার চেয়েও ছোট। অথচ সে দেশের শুধু একটা বিশ্ববিদ‍্যালয়েই প্রায় আড়াই হাজার পিএইচডি স্টুডেন্ট আছে। অথচ আমাদের দেশের সবচেয়ে পুরোনো বিশ্ববিদ‍্যালয়ে, ২৫ বছর বয়সী ৫০ জন পিএইচডি স্টুডেন্ট নেই। তাহলে উদ্ভাবনে আমরা কী করে এগিয়ে থাকব?

বাংলাদেশের তরুণেরা কি মেধাবী না? তাঁরা কি আবিষ্কার-উদ্ভাবন ও গবেষণায় বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন না? —অবশ্যই রাখেন। কিন্তু তাঁদের তো প্রশিক্ষণ দরকার। তাঁদের তো মেন্টর দরকার। সে মানের পরিবেশ তাঁদের দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো সেই আঙিনা। অথচ সেখানে কি সে প্রশিক্ষণ তাঁরা পাচ্ছেন? একটা দেশ আবিষ্কার-উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান শর্ত হলো, সে দেশের একাডেমিক গবেষণাকে শক্তিশালী করা।

দুনিয়ার কোনো ভালো বিশ্ববিদ‍্যালয়ে এখন পিএইচডি-পোস্টডক ছাড়া সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ হয় না। অথচ আমাদের দেশে এই নিয়মটাই এখনো জোরালোভাবে চালু হয়নি। নিয়ম চালু হলেই যে রাতারাতি এটা ব‍্যাপকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, তা কিন্তু নয়। তবে যদি ফোকাসটা থাকে এবং তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভালো গবেষকদের নিয়োগ দেওয়ার চর্চা শুরু হয়, তাহলে হয়তো ১০ বছর পর সেটা আরেও বিস্তৃত হবে। একজন শিক্ষক যদি বিশ্ববিদ‍্যালয়ে নিয়োগ পাওয়ার পরও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা জন্য ৭-৮ বছর সময় ব্যয় করেন, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেটা সমাজের জন্য মোটেও টেকসই কিছু বয়ে আনবে না। এই নিয়মগুলো ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনার লক্ষ‍্য থাকতে হবে।

দেশের একাডেমিক গবেষণার সংস্কৃতি উন্নত না হলে, আবিষ্কার-উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর দেশের একাডেমিক গবেষণার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো মানের পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করতেই হবে। তরুণেরা যেন দেশেই পিএইচডি-পোস্টডক করতে পারেন, সেই লক্ষ‍্য নিয়ে এগোতে হবে। আর সে জন‍্য চাই ভালো মানের প্রচুর মেন্টর।

একাডেমিক গবেষণার সংস্কৃতি শক্ত হলে, সেটার প্রভাব বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়বে। বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রমোশনে নেই শক্ত কোনো নিয়মনীতি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নেই আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন। এমনকি একটা ভালো মানের সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি বোর্ড ছাড়াই চলছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি বোর্ড থাকা খুব জরুরি। এবং সেই বোর্ড গঠিত হয় দেশি-বিদেশি মূল ধারার গবেষকদের দিয়ে। একাডেমিক গবেষণা উন্নত হলে, সেটার প্রভাব প্রাইভেট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়বে। দেশের বড় বড় শিল্পকারখানাতে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ উন্নত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর অনেক ভালো মানের পাবলিকেশন করতে হয়। বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইত‍্যাদি থেকে করতে হয় প‍্যাটেন্ট। পাবলিকেশন ও প‍েটেন্ট হলো গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সের একটা মাপকাঠি। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক পেটেন্ট হয় না বললেই চলে। আন্তর্জাতিক পেটেন্ট বলতে বোঝানো হয়, কোন উদ্ভাবনের পেটেন্ট আবেদন ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপারটি অর্গানাইজেশনের (WIPO) মাধ্যমে ফাইল করা। যেটাকে পিসিটি অ্যাপ্লিকেশনও (PCT Application) বলা হয়। এতে করে একটি আবেদনের মধ‍্য দিয়ে, প্রতিষ্ঠানটির সদস‍্যভুক্ত প্রতিটি দেশে আবেদন করার অধিকার অর্জন করা হয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পর আলাদা করে পৃথক পৃথক সদস‍্যদেশে আবার আবেদন ফাইল করতে হয়।

কোলাবোরেশন হলো উদ্ভাবন সংস্কৃতির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ও চর্চা। পৃথিবীর অন‍্যরা কী ভাবছে, কী করছে, কীভাবে ভাবছে, কীভাবে চ‍্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে ইত‍্যাদি বিষয় কোলাবোরেশনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সহজ হয়ে ওঠে। তরুণদের খুব কম বয়স থেকেই গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হলো আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা যখন স্নাতক পর্যায়ে থাকে, তখনই বিভিন্ন প্রজেক্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। সেসব কাজ তাঁদের ভিতকে অনেক শক্ত করে। তাঁদের ভাবনার জগৎ, সৃষ্টিশীলতার জগৎ প্রসারিত করে। দেশের বিশ্ববিদ‍্যালয়ে গবেষক শিক্ষার্থীদের ব‍্যাচলর করার সময়ই ভালো মানের গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।

আবিষ্কার-উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকলে সমাজের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এমনকি রপ্তানি আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সমাজ। অতিমাত্রায় বিদেশি পণ‍্য–নির্ভরতাও কমে না। সুতরাং আবিষ্কার-উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিমালা দরকার। এবং কয়েকটা পদক্ষেপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একাডেমিক গবেষণাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ ব্রেইন-ড্রেইন বন্ধ করতে পারবে না। তরুণেরা দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষিত হচ্ছেন, সেটা খারাপও না। তবে সেটার বিপরীত প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষিত করার বদলে, যথারীতি প্রশিক্ষিতদের মধ‍্য থেকে শিক্ষক নিয়োগকে প্রাধ‍্যান‍্য দিতে হবে। সে জন‍্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করতে হবে। সবাইকে গণহারে বয়সভিত্তিক অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ এবং পদোন্নতির নীতিমালা আধুনিক করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় উন্নত মানের সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি বোর্ড তৈরি করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণায় একটা নির্দিষ্ট বাজেট ব্যয় করার জন্য সরকারকে চাপ দিতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন সমাজের তরুণদের প্রশিক্ষণে অর্থ ব্যয় করে, সে বিষয়ে চাপ দিতে হবে। একাডেমিক ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণার দৃঢ় মেলবন্ধন তৈরি করতে হবে।

জাতীয়ভাবে গবেষকদের উদ্বুদ্ধ করতে আকর্ষণীয় পুরস্কার প্রণয়ন করতে হবে। পেটেন্ট ও ভালো পাবলিকেশনের জন্য গবেষকদের ভালো প্রণোদনা দিতে হবে। সর্বোপরি জিডিপির একটা বড় অংশ গবেষণায় ব্যয় করতে হবে এবং সে ব্যয় যেন সঠিক খাতে হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালে, আবিষ্কার উদ্ভাবনে উন্নত না হলে, দেশের বহু ক্ষেত্রের অগ্রযাত্রা শ্লথ হয়ে যাবে।

* ড. রউফুল আলম টেকসই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক লেখক

Rauful.alam15@gmail.com

আবিষ্কার-উদ্ভাবনে আমরা কেন পিছিয়ে

Friday, April 25, 2025

চুইংগাম চিবাতে ভালোবাসলে জেনে রাখুন কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন by রাফিয়া আলম

পরিবেশে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক অর্থাৎ প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। খাবার কিংবা পানীয়তে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকও হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক চুইংগামে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ছোট্ট একটা চুইংগাম মাইক্রোপ্লাস্টিকে ভরপুর থাকে। শিশুরা তো বটেই, বড়দের মধ্যেও অনেকে চুইংগাম পছন্দ করেন।

ঠিক কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন

কিছু চুইংগাম বানানো হয় প্রাকৃতিক উপকরণে, কিছু আবার কৃত্রিম উপকরণ দিয়েও তৈরি হয়। তবে যে উৎস থেকেই চুইংগাম তৈরি হোক না কেন, তা রাবারের মতো একটু আঠালো ধরনেরই হয়। এই দুই ধরনের চুইংগাম থেকেই সমান পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বলছিলেন ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. সাইফ হোসেন খান।

একটা চুইংগামের ওজন ২ থেকে ৬ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। মাত্র ১ গ্রাম চুইংগাম থেকেই গড়ে ১০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয়। এমনকি কিছু চুইংগামের প্রতি গ্রাম থেকে আসতে পারে ৬০০ মাইক্রোপ্লাস্টিকও। তার মানে একটা ছোট্ট চুইংগাম থেকেই শতসহস্র মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যেতে পারে আমাদের লালায়।

খাবার খাওয়ার পর তা যেমন পরিপাক হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক কিন্তু সেভাবে পরিপাক হয় না, রয়ে যায় অবিকৃত। লালায় মিশে যাওয়ার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়তে পারে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে। সেখান থেকে রক্তেও পৌঁছে যেতে পারে এই ছোট্ট কণা। আর রক্তের মাধ্যমে চলে যেতে দেহের পারে যেকোনো অংশেই। মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও জমা হতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

মাইক্রোপ্লাস্টিকে যেসব ক্ষতি হয়

দেহের যেকোনো অঙ্গে জমা হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়ে যেতে পারে। ধারণা করা হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিতে ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তা ছাড়া দেহের হরমোনের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো অঙ্গে অধিক পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হলে সেই অঙ্গের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে মস্তিষ্কের বিকাশ, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা এবং স্মৃতিধারণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই শিশুদের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

শেষ কথা

মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব বিষয়ে এখনো গবেষণা চলমান। তবে যতটা জানা গেছে, তা খুব একটা স্বস্তির নয়। দীর্ঘ মেয়াদে অনাকাঙ্ক্ষিত বহু সমস্যা এড়াতে আমাদের জীবনধারা এমনভাবে গড়ে তোলা ভালো, যাতে অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের দেহে প্রবেশ করতে না পারে। চুইংগামে যেহেতু অনেকটা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তাই যেকোনো বয়সেই চুইংগাম কম খাওয়া উত্তম।

চুইংগাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে
চুইংগাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, April 3, 2025

ঢাকার ছাদ রেস্তোরাঁয় তাপপ্রবাহের বিপদ by মো. মাইদুল ইসলাম

* রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদে স্থাপিত রেস্তোরাঁর ৯৯ শতাংশই অননুমোদিত, রাজউকের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

* ভবনের ছাদে বাগান থাকলে তা আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা কমাতে বড় ভূমিকা পালন করে।

পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা কিংবা নিরিবিলি সময় কাটাতে কয়েক বছর ধরে খোলামেলা পরিবেশে ছাদ রেস্তোরাঁকে বেছে নিচ্ছেন নগরের বাসিন্দারা। বদ্ধ রাজধানীতে বিনোদন ও মনোরঞ্জনে এ ধরনের রেস্তোরাঁকে অনন্য বলছেন অনেকেই।

তবে ঢাকায় বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দুই শর মতো ছাদ রেস্তোরাঁর কোনোটিরই অনুমোদন নেই। এসব রেস্তোরাঁ নিয়ে চিন্তিত পরিবেশবাদীরা, এমনকি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (রাজউক)। ছাদে উচ্চ তাপে রান্না এবং প্লাস্টিক–জাতীয় দাহ্যবস্তু ব্যবহার করে সাজানোর কারণে সংশ্লিষ্ট ভবন ও এর আশপাশের ভবনে আগুন লাগা এবং তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ঝুঁকি ও অবৈধতার প্রশ্নে কয়েকটি ছাদ রেস্তোরাঁ ভেঙেও দিয়েছে রাজউক। তারপরও নিয়মনীতি ও অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিমালিকানাধীন এ ধরনের রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে। বাদ যায়নি সরকারি ভবনের ছাদও।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঢাকা শহরে যে তীব্র তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, তা কমাতে ঢাকার বহুতল ভবনের ওপর ছাদবাগান হতে পারে অন্যতম বিকল্প। কিন্তু ছাদবাগানের পরিবর্তে ভবনের ছাদগুলো হয়ে উঠছে একেকটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। ফলে যে ছাদ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিরিক্ত তাপমাত্রা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারত, তা–ই বাড়িয়ে তুলছে তাপপ্রবাহ।

রাজউক বলছে, এসব রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে চাপের মুখে পড়েছে সংস্থাটি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভাষ্য, মেগা সিটি ঢাকায় বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ এখন গোদের ওপর বিষফোড়া।

অনুমোদন দেয়নি রাজউক

গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কজি কটেজে আগুন লাগে। এ ঘটনার পর ৫ মার্চ রাজউকের একটি মতবিনিময় সভা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে রাজউকের আওতাধীন ৮টি জোনের ২৪টি সাবজোনের কর্মকর্তাদের ২১ মার্চের মধ্যে অনুমোদিত নকশা অনুসারে ও নকশার ব্যত৵য় করে পরিচালিত রেস্তোরাঁর তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

নির্দেশনা অনুসারে গত বছরের মে পর্যন্ত রাজউকের মোট ২৪টির মধ্যে ১২টি সাবজোনের কর্মকর্তারা রাজউকের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ–১–এর পরিচালকের কাছে রেস্তোরাঁর তালিকা পাঠান। সেই তালিকা প্রথম আলোর কাছে এসেছে। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৮১৯টি রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করতে পেরেছেন কর্মকর্তারা। এগুলোর মধ্যে ছাদ রেস্তোরাঁ আছে ২৫টি। সব কটিই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে এগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন কর্মকর্তারা।

রাজউকের তালিকা ধরে গুগল ম্যাপ এবং রেস্টুরেন্ট লোকেটর ব্যবহার করে ঢাকা শহরে ২০০টির বেশি ছাদ রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া গেছে। তালিকা হাতে পাওয়ার পর উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, আগারগাঁও, গুলশান ও সাভার এলাকার অন্তত ১৫টি ছাদ রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের বহুতল ভবনের ছাদগুলোকে রেস্তোরাঁ স্থাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন মালিকেরা। ছাদগুলোর একাংশে রান্নার সরঞ্জাম বসিয়ে দিনের ১১–১২ ঘণ্টা উচ্চ তাপে বাংলা, থাই এবং চায়নিজ খাবার রান্না করা হচ্ছে। কোনো কোনো রেস্তোরাঁর এক পাশে টিন বা কৃত্রিম উপকরণ দিয়ে ছাউনি এবং কাচ দিয়ে ঘেরা ছোট কক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কয়েকজনের বসার ব্যবস্থা আছে। বাদবাকি ছাদে প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, কাঠ ও বাঁশের উপকরণ এবং টবে গাছ লাগিয়ে সাজানো হয়েছে। এসব রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনের রান্না হয়। ছুটির দিনগুলোতে রান্নার পরিমাণ বাড়ে দেড় থেকে তিন গুণ।

রাজউকের প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদে স্থাপিত রেস্তোরাঁর ৯৯ শতাংশই অননুমোদিত, রাজউকের পক্ষ থেকে এগুলোর কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। রেস্তোরাঁগুলো নিজেদের মতো করে তৈরি করা হয়েছে এবং সেভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। আমরা বেশ কয়েকটি রুফটপ রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়েছি, সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে বাকিগুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অবৈধ এসব রেস্তোরাঁর ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে গেলে নানামুখী চাপের মধ্যে পড়তে হয় উল্লেখ করে আশরাফুল ইসলাম বলেন, এসব রেস্তোরাঁ পরিচালিত হওয়ার পেছনে রেস্তোরাঁ ও ভবনমালিকের পাশাপাশি যাঁরা সেখানে যান, সবার দায় আছে।

বিধিমালায় নেই

বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবনের ছাদে বড় কোনো স্থাপনা নির্মাণের নিয়ম নেই। বিধিমালায় ছাদে পতিত বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং তা ব্যবহারের উপযুক্ত ব্যবস্থা ইমারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মূল ভবন ৫০০ বর্গমিটারের বেশি হলে ছাদে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি পুনর্ব্যবহার এবং পানি ভূগর্ভে পাঠানোর ব্যবস্থা অবশ্যই রাখতে হবে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডেও (বিএনবিসি) বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ নির্মাণের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে ভবন ব্যবহারের জন্য ব্যবহার বা বসবাসযোগ্যের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে।

এদিকে উন্মুক্ত স্থানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে ভবনের ছাদকে ব্যবহারের ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সরাসরি ছাদে পড়ার ব্যবস্থা, গাছ লাগানো বা ছাদবাগান, বসার স্থান, দোলনা, খোলা ছাউনির ব্যবস্থা করা হলে ১০ শতাংশ গৃহকর মওকুফ করার ব্যবস্থা করেছে ডিএনসিসি।

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা বলছেন, বহুতল ভবনের ছাদগুলোকে দুর্যোগ–আশ্রয় এলাকা (ডিজাস্টার রিফিউজ এরিয়া) হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সেখান থেকে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনোভাবে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা যায়। ফলে সেটি উন্মুক্ত রাখা কিংবা ছাদবাগান বানানোর জন্যই উপযুক্ত।

স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, ভবনে আগুন লাগলে বা ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে মানুষ ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে মই দিয়ে বা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা হয়। সেই ছাদে যদি রেস্তোরাঁ থাকে আর সেখানে চুলা থেকে আগুন ধরে, তাহলে ওই ভবনই শুধু নয়; আশপাশের ভবনগুলোর জন্যও বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বাড়ছে আগুন লাগার ঝুঁকি

কোনো ছাদ রেস্তোরাঁকে অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেয়নি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, কয়েক বছর আগে দু–তিনটি রেস্তোরাঁকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু ঝুঁকি বিবেচনায় সেগুলোরও নবায়ন আবেদন গ্রহণ করেনি ফায়ার সার্ভিস। বর্তমানে ছাদ রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেওয়া বন্ধ আছে।

ফলে এসব রেস্তোরাঁ আগুনের ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের ছাদ উন্মুক্ত রাখা খুব জরুরি। ঢাকার মতো জনবহুল শহরে খোলা ছাদ দুর্যোগের সময় মানুষকে আশ্রয় দেয়। সেখানে রেস্তোরাঁর মতো স্থাপনা নির্মাণে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছাদ রেস্তোরাঁয় আগুন লাগার ঘটনা অহরহই ঘটছে। গত বছরের ১৫ এপ্রিল ভারতের ইন্দোরে ‘মাচান’ নামের একটি ছাদ রেস্তোরাঁয় আগুন লেগে পুড়ে যায়। এর আগের বছরের ১৯ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ‘মাডপাইপ’ নামের একটি রেস্তোরাঁয় আগুন লাগে। ২০২২ সালে পুনেতে, তারও আগে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর মুম্বাইয়ের একটি ছাদ রেস্তোরাঁয় আগুন লেগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আর বাংলাদেশের রেস্তোরাঁগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা হারহামেশাই ঘটে থাকে।

বাংলাদেশের রেস্তোরাঁগুলোর রান্নাঘর মান্ধাতার আমলের বলে সেগুলোকে অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেওয়া হয় না উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহাম্মেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম ও আইন মেনে ছাদ রেস্তোরাঁগুলো নির্মিত হয় না বলে সেগুলোর ঝুঁকি বেশি। তবে আন্তর্জাতিক মান–কাঠামো অনুসরণ করে রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা যেতে পারে।

রেস্তোরাঁর সংখ্যা ২ শতাধিক

রাজধানীতে মোট কতটি ছাদ রেস্তোরাঁ আছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোনো সরকারি–বেসরকারি সংস্থার কাছে পাওয়া যায়নি। তবে রাজউকের তালিকাটি ধরে ‘গুগল ম্যাপ’ ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘রেস্টুরেন্ট লোকেটর’ ব্যবহার করে ২০০টি ছাদ রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতিও ছাদ রেস্তোরাঁর সংখ্যা ২০০টির বেশি নয় বলে জানিয়েছে। তবে নগরের বাসিন্দাদের চাহিদা থাকায় এ ধরনের রেস্তোরাঁর সংখ্যা আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছে সমিতি। সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান প্রথম আলোকে বলেন, সব ছাদ রেস্তোরাঁ তাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত নয়। কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারি ভবনেও ছাদ রেস্তোরাঁ

২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ছাদে রেস্তোরাঁ চালু হয়। সাড়ে ছয় হাজার বর্গফুটের রেস্তোরাঁটিতে একসঙ্গে ১৫০ জন মানুষ বসে খেতে পারেন। বুফে সিস্টেমে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের খাবারের বন্দোবস্ত আছে সেখানে।

অবশ্য পর্যটন করপোরেশন বলছে, তারা স্থাপত্য অধিদপ্তরের নকশা অনুসারেই ১৩ তলা ভবনটির ছাদে রেস্তোরাঁ নির্মাণ করেছে। করপোরেশনের পরিকল্পনা ও পূর্ত পরিচালক মাহমুদ কবির প্রথম আলোকে বলেন, এই রেস্তোরাঁটি পুরোপুরি খোলা ছাদে স্থাপন করা হয়নি। রেস্তোরাঁর বড় অংশই খোলা রাখা হয়েছে। সেখানে সব ধরনের নিরাপত্তা আছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাঁর দাবির সপক্ষে কাগজপত্র সরবরাহ করার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কয়েকবার তাগাদা দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ভেঙে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি

গত বছরের ৪ মার্চ বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ছাদ রেস্তোরাঁগুলোর পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। হাইকোর্ট বলেন, ‘যেভাবে একের পর এক রুফটপ রেস্টুরেন্ট হচ্ছে, তাতে আমরা অবাক হচ্ছি। এসব রেস্টুরেন্টে একটা ফ্যান লাগিয়ে চালু করে দিচ্ছে।’

ওই দিনই (৪ মার্চ) ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের গাউসিয়া টুইন পিক ভবনের ছাদের রেট্রো রুফটপ রেস্টুরেন্ট ভেঙে দেয় রাজউক। রাজউকের নকশায় ভবনটির ছাদ খোলামেলা দেখানো হলেও বাস্তবে রেস্তোরাঁ গড়ে তোলায় তা ভেঙে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সাতমসজিদ রোডের টুইন পিক ভবনের দুটিসহ ৪০টির বেশি রেস্তোরাঁ বন্ধ করার পাশাপাশি ভেঙে দিয়েছে রাজউক, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থা।

গবেষণা কী বলছে

২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের যেসব বহুতল ভবনের ছাদে বাগান আছে, সেসব ভবন এবং এর আশপাশের তাপমাত্রা কমাতে বড় ভূমিকা পালন করছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, যে ছাদে গাছ আছে সেটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কম থাকে। ফলে ছাদের বাগান আশপাশের পরিবেশকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এটি বাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়, যা বিদ্যুৎ খরচ কমাতে এবং মানুষের আরামদায়ক জীবনযাত্রায় সাহায্য করে।

এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা ঢাকা শহরের যেসব ছাদে বাগান করার সক্ষমতা আছে, সেখানে বাগান তৈরির ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ঢাকা শহরে যেভাবে তাপপ্রবাহ বাড়ছে সেটি মোকাবিলায় খোলা জায়গায় গ্রিন স্পেস (গাছপালা) ও ব্লু স্পেসের (জলাশয়) পাশাপাশি ছাদবাগানের বিকল্প নেই।

‘মিটিগেশন স্ট্রাটেজিস ফর দ্য আরবান মাইক্রোক্লাইমেট অব ঢাকা মেগাসিটি টু রিডিউস অ্যাডভার্স ক্লাইমেটিক চেঞ্জ ইমপ্যাক্ট’ বা ঢাকার শহুরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর মাইক্রোক্লাইমেট প্রশমন কৌশল শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেসের আশরাফ দেওয়ান। তাঁর সহযোগী ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রুহুল সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের তৌহিদা রশিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মাহফুজ কবির।

গবেষণাটিতে বলা হয়, ছাদে উদ্ভিদের উপস্থিতি বাইরে থেকে ভবনের ভেতরে তাপ প্রবেশে বাধা দেয়। তাই স্বল্প পরিমাণ তাপ ভবনে প্রবেশ করে। এ কারণে জ্বালানির (বিদ্যুৎ) ব্যবহার কমে এবং ভবনের বাসিন্দাদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়।

ছাদবাগান বাতাসের তাপমাত্রা কমাতেও কার্যকর বলে গবেষণাটিতে উঠে এসেছে। গবেষকেরা ভবনের ছাদের এক, দুই ও তিন মিটার উচ্চতায় গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতের বাগানবিহীন এবং বাগানসহ ছাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, শীতকালে এক মিটার উচ্চতায় বাগানসহ ছাদের তাপমাত্রা বাগানবিহীন ছাদের তুলনায় ৩ দশমিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। অবশ্য দুই ও তিন মিটার উচ্চতায় দিনের সময়ের ভিত্তিতে তাপমাত্রার তারতম্য হয়। যেমন দুই মিটার উচ্চতায় বাগানসহ ছাদের বাতাসের তাপমাত্রা কমানোর হার অনেক বেশি। একই ছাদে তিন মিটার উচ্চতায় ভোর এবং সন্ধ্যার তাপমাত্রা কমানোর হার বেশি।

‘নিরাপত্তার বিকল্প বিনোদন নয়’

নিরাপত্তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে নিছক বিনোদনের বিবেচনায় বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ নির্মাণ সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে মনে করছেন নগর–পরিকল্পনাবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বহুতল ভবনের ছাদে আগুন জ্বালানো কোনোভাবেই উচিত নয়। পাশাপাশি স্থাপনা নির্মাণ করে ছাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা ঢাকার মতো শহরে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ছাদ রেস্তোরাঁগুলোর ব্যাপারে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

Monday, March 31, 2025

পানির বোতল কত দিন পরপর পরিষ্কার করা উচিত

পানির বোতলে প্রতি চুমুক পানি খাওয়ার মানে হলো, প্রতিবারই বোতলের ভেতর ব্যাকটেরিয়া জমা করা। আর এভাবে সারা দিন চলতে থাকলে লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়া জমা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী, সে ব্যাপারে হয়েছে নানা গবেষণা।

তেমনই একটি গবেষণা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যনিরাপত্তা–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কার্ল বেহেনকে। নিজের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলটি কতটা পরিষ্কার, তা নিয়ে ভাবনা থেকেই গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। শুরুতে বোতলের ভেতরে কিছু টিস্যু পেপার ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখেছিলেন বেহেনকে। এরপর যা দেখলেন, তাতে তিনি হতভম্ব হয়ে যান।

বেহেনকে বলেন, টিস্যুগুলো বের করে আনার আগপর্যন্ত এগুলো সাদা ছিল। তিনি বুঝতে পারেন, বোতলের ভেতরের গায়ে যে পিচ্ছিল ভাব মনে হচ্ছিল, তা বোতলের ধরনের কারণে নয়, বরং সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর কারণে এমন হয়েছে।

এরপর গবেষণার পরিকল্পনা তৈরি করেন বেহেনকে। এর অংশ হিসেবে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি করিডরে পথচারীদের থামাতে থাকেন এবং তাঁদের কাছ থেকে পানির বোতলগুলো চেয়ে নেন। বোতলগুলো কতটা পরিষ্কার, সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য এগুলো সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায় যে বোতলগুলো ব্যাকটেরিয়ায় ভরপুর।

২০২৪ সালের হিসাব অনুসারে, বিশ্বব্যাপী পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলের বাজারের আকার প্রায় এক হাজার কোটি ডলার। ইতালীয় স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের অর্ধেকই পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল ব্যবহার করেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ৫০ থেকে ৮১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বোতল ব্যবহার করেন।

পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলে আসলে কী থাকে

যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক প্রিমরোজ ফ্রিস্টোন বলেন, রান্নাঘরের কল থেকে বোতলে পানি ভরে কয়েক দিন রেখে দিলে তাতে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। তিনি বলেন, ঘরের তাপমাত্রায় (প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) যতক্ষণ পর্যন্ত একটি পানিভর্তি বোতলকে ফেলে রাখা হবে, তত বেশি ব্যাকটেরিয়া জন্মাবে।

সিঙ্গাপুরে ফোটানো পানি নিয়েও একটি গবেষণা হয়েছিল। পানি ফোটানোর সময় বেশির ভাগ ব্যাকটেরিয়া মরে যাওয়ার কথা। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, দিনভর ব্যবহারের পর বোতলের ভেতর ফোটানো পানিতেও দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।

গবেষকেরা দেখেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বোতলের ভেতরের পানিতে সকালের দিকে গড়ে প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ৭৫ হাজার ব্যাকটেরিয়া ছিল, যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতি মিলিলিটারে ১০ থেকে ২০ লাখের বেশি হয়ে গেছে।

ফ্রিস্টোনের মতে, ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমানোর একটি উপায় হলো, বোতল থেকে পানি পানের মধ্যবর্তী বিরতিতে তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা। তবে এতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হবে না।

পানির বোতলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর পেছনে ওই পানির কিছু দায় থাকলেও বেশির ভাগ দূষণ তৈরি হয় ব্যবহারকারীর মাধ্যমেই। ফ্রিস্টোন বলেন, কর্মস্থলে, ব্যায়ামাগারে, এমনকি বাড়িতে যেখানেই পানির বোতল নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, বোতলের বাইরের অংশে অনেক জীবাণু থাকে। এসব জীবাণু সহজেই বোতলের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়। এ ছাড়া প্রতিবার চুমুক দিয়ে পানি পানের সময় ব্যবহারকারীর মুখ থেকে বোতলের পানিতে ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়।

পানির বোতল ব্যবহারকারীদের যাঁরা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করেন না, তাঁদের বোতলে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন এ বিশেষজ্ঞ।

ব্যাকটেরিয়া কী প্রভাব ফেলে?

মাটি, বায়ু বা দেহ—আমাদের চারপাশেই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি। তবে বেশির ভাগ ব্যাকটেরিয়াই ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী। যে পানিতে ই. কোলাই–এর মতো ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে, তা পান করলে ডায়রিয়া বা বমি হতে পারে। তবে সব সময়ই যে এমনটা ঘটবে, তা নয়। ই. কোলাই হলো এমন এক ব্যাকটেরিয়া, যা প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশে বিরাজমান। তবে মানুষের অন্ত্রেও এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে। এটি কেবল তখনই ঘটে, যখন ব্যাকটেরিয়া রোগজীবাণুতে পরিণত হয়।

ফ্রিস্টোন বলেন, বেশির ভাগ অণুজীবই মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। এ ছাড়া পেটে জীবাণুর সংক্রমণের কারণে অসুস্থ হলে কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হতে পারে। তবে ফ্রিস্টোন মনে করেন যে পানির বোতলে থাকা ব্যাকটেরিয়া থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া হলে শরীরে কখনোই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না।

এ ছাড়া যেসব মানুষ সম্প্রতি অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছেন এবং যা তাদের পেটের অণুজীবের ওপর প্রভাব ফেলেছে, তাদের শরীরেও বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তারা অন্য সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কীভাবে বোতল পরিষ্কার করতে হবে

পানি পানের সঙ্গে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া শরীরে যেন প্রবেশ না করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত ও যথাযথভাবে বোতল পরিষ্কার করতে হবে।

ফ্রিস্টোন মনে করেন, ঠান্ডা পানি দিয়ে বোতল ধোয়াটা যথেষ্ট নয়। কারণ, এতে বোতলের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া দূর হয় না।

পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতলগুলো গরম পানি (৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) দিয়ে পরিষ্কার করার সুপারিশ করেছেন ফ্রিস্টোন। তাঁর মতে, বোতলগুলো তরল ডিশওয়াশার দিয়ে নাড়াচাড়া করে ১০ মিনিট রেখে দিতে হবে। এরপর গরম পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর বোতলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানো ঠেকাতে এটিকে বাতাসে শুকিয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো। কারণ, অণুজীবগুলো আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে।

ফ্রিস্টোন মনে করেন, প্রতিবার ব্যবহারের পরই এ প্রক্রিয়ায় বোতল পরিষ্কার করা উচিত। অন্ততপক্ষে সপ্তাহে কয়েকবার বোতল পরিষ্কার করতে হবে। বোতল থেকে দুর্গন্ধ বের না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ বিশেষজ্ঞের মতে, বোতল থেকে দুর্গন্ধ বেরোতে শুরু করার মানে হলো, এটি ফেলে দেওয়ার সময় এসে গেছে।

বোতল ধোয়া হলে এটি ধরার আগে হাত পরিষ্কার করার বিষয়টিও মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পানির বোতল ব্যবহারকারীদের যাঁরা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করেন না, তাঁদের বোতলে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
পানির বোতল ব্যবহারকারীদের যাঁরা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করেন না, তাঁদের বোতলে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Friday, February 21, 2025

১০০ বছরেরও বেশি সময় পর মিশরে আবিষ্কৃত হলো ফারাওয়ের সমাধি

১০৩ বছর আগে এক বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার খুলে দিয়েছিলেন মিশরের কিশোর ফারাও তুতেনখামেনের সমাধির দরজা। তার সঙ্গেই উন্মোচিত হয়েছিল কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন পৃথিবীর বহু অজানা রহস্য। কিং তুতেনখামেনের ঘুম ভাঙানোর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে মনে করিয়ে দিল ২০২৫ সালে তাঁরই পূর্বপুরুষ ফারাও দ্বিতীয় থাতমোসের সমাধি আবিষ্কার।ফারাওদের কয়েক শতাব্দীব্যাপী রাজত্বে দ্বিতীয় থাতমোসের সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৯৩ থেকে ১৪৭৯ পর্যন্ত। বছর চারেক আগে থিবসের ভ্যালি অফ দ্য কিংসের কাছে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া একটি  সিঁড়ি । দুটো পাহাড়ের মাঝখানে অনন্ত গহ্বরের মধ্যে সিঁড়িটা দেখেই সন্দেহ হয়েছিল সেটা কোনও প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছবে।

বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ডক্টর পিয়ার্স লিদারল্যান্ডের আশা ছিল কোনও ফারাওয়ের রানি বা বংশধরের সমাধিতে পৌঁছেছে ওই পাথুরে সিঁড়ি। দীর্ঘ খননকার্যের পর সেই সমাধিতে পৌঁছনোর পর পাওয়া যায় এক টুকরো ভাঙা পাথর। নীল রং মাখানো সেই পাথরে হলদে তারার মোটিফগুলো দেখেই লিদারল্যান্ড বুঝতে পারেন এটা যার তার সমাধি নয়। কোনও ফারাওকে সমাহিত করা হয়েছিল এখানে। কারণ সোনালি তারায় ভরা নীল আকাশের নীচে ঘুমিয়ে থাকার অধিকার ছিল একমাত্র ফারাওদেরই। ১৯২২ সালে রাজা তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসে এটিকেই সবচেয়ে বড় আবিষ্কার বলে একবাক্যে মেনে নিচ্ছেন সকলে। গবেষকরা দ্বিতীয় থাতমোসের সমাধিতে শেষকৃত্যের আসবাবপত্রের টুকরো, নীল শিলালিপি, হলুদ তারা এবং ধর্মীয় লেখা সম্বলিত মর্টারের টুকরোও খুঁজে পেয়েছেন ।

তবে, ফারাও-এর  মৃত্যুর পরপরই বন্যার কারণে, সমাধিটি সাধারণত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি । এর বেশিরভাগ সামগ্রী স্থানান্তরিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং সেগুলি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। তবে দ্বিতীয় থাতমোসের চেয়েও তাঁর রানি হাটশেপসুটকে মনে রেখেছে ইতিহাস। সম্পর্কে সৎ বোন হাটশেপসুটকে বিয়ে করে প্রধান রানি করেছিলেন দ্বিতীয় থাতমোস । তাঁর মৃত্যুর পর মিশরের ইতিহাসে একমাত্র নারী ফারাও হিসেবে সিংহাসনে বসেন হাটশেপসুট।

সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

mzamin

Tuesday, February 18, 2025

বিকেলের ঘুম আপনার মুশকিল আসান করে

একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে দুপুরের ঘুম বা ন্যাপ মস্তিষ্কের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা অ্যানালজিকাল সমস্যা সমাধান পরীক্ষা করেছেন। সেখানে দেখা গেছে  বিকেলের এই ছোট ঘুম মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। 

গবেষকরা তাদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রে লিখেছেন, 'বর্তমান ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয় যে যখন কোনও সমস্যা সমাধানযোগ্য বলে মনে হয় না, তখন ঘুমিয়ে পড়ুন। এটি আপনাকে কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যদি ঘুমের মধ্যে REM ( rapid eye movement ) থাকে। ঘুমের এই পর্যায়টি আমাদের জীবনে সহজেই স্পষ্ট নয় এমন সম্পর্ক স্থাপন এবং অতীতের অভিজ্ঞতাগুলোকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এই গবেষণায় ৫৮ জনকে অংশগ্রহণ করতে বলা হয়েছিল। তাদের বিভিন্ন সমস্যার একটি সিরিজ দেখানো হয়েছিল এবং সেই সমস্যার সমাধানগুলো দেখানো হয়। এরপর, তাদের একই ধরনের সমস্যার আরেকটি সেট দেয়া হয়েছিল। এই দ্বিতীয় সেটের সাথে, কোনও সমাধান সংযুক্ত ছিল না। তবে সমস্যাগুলো একই মানসিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সমাধানযোগ্য। এরপর দুই ঘণ্টার ব্যবধান ছিল, এই সময়কালে ২৮ জন স্বেচ্ছাসেবককে ১১০ মিনিটের ঘুমের সময় দেওয়া হয়েছিল, বাকি ৩০ জনকে জেগে থাকতে বলা হয়েছিল। ঘুমন্ত দলটি ঘুমানোর সময় EEG হেডসেট ব্যবহার করে তাদের REM সময় পরিমাপ করেছিল।

বিরতির পর, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের দ্বিতীয় সেট থেকে সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়া সমস্যাগুলো আবার দেখার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। যারা ঘুমিয়েছিলেন তারা প্রথমবারের মতো যেসব সমস্যার সমাধান করতে পারেননি, ঘুম থেকে উঠে সেগুলো সমাধানে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তাদের REM এই সমস্যাগুলো সমাধানের সম্ভাবনার সাথে সম্পর্কিত ছিল। প্রথম এবং দ্বিতীয় সেটে সমস্যাগুলোর মধ্যে মিল লক্ষ্য করার ক্ষেত্রে ন্যাপাররা জেগে থাকা দলের চেয়ে ভালো ফল করেছিল। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর স্লিপ রিসার্চ, লস এঞ্জেলেসের গবেষক জেরোম সিগেল বলেছেন, 'যারা রাতের বেলা পর্যাপ্ত সময় ঘুমাতে পারে না তাদের জন্য দিনের ঘুম মনোসংযোগ এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এ বিষয়ে সবাই একমত যে, আপনি যদি ঘুম থেকে বঞ্চিত হন তবে খুব ভালোভাবে শিখতে, কাজ করতে বা চিন্তা করতে পারবেন না।'

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেলের  ঘুম স্মৃতিশক্তি ও শিখন ক্ষমতা বাড়ায়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং মেজাজ ভালো রাখে। গবেষণাটি জার্নাল অফ স্লিপ রিসার্চে প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র : সায়েন্স এলার্ট

mzamin

Friday, October 13, 2023

আপনার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে? তার স্বাস্থ্য বৃদ্ধির জন্য আপনি যা খাওয়াবেন

বাংলাদেশের মা ও শিশু
কলা, ছোলা আর চিনাবাদাম দিয়ে তৈরি খাবার অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে বলে এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে চালানো এক মার্কিন গবেষণায় জানা যাচ্ছে, এসব খাদ্য শিশুদের পাকস্থলীতে স্বাস্থ্যবর্ধক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
শিশুর হাড়, মস্তিষ্ক এবং শারীরিক বিকাশে এই খাবারগুলো খুবই কার্যকর বলে গবেষকরা জানতে পেরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিবিআর-এর বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণা চালান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সারা বিশ্বে ১৫ কোটি শিশু এখন অপুষ্টিতে ভুগছে।
এসব শিশু যেমন শারীরিকভাবে দুর্বল হয়, আকারে ছোট হয়, তেমনি এদের পাকস্থলীতে যে স্বাস্থ্যবর্ধক 'ভাল' ব্যাকটেরিয়া থাকে তাদের সংখ্যাও থাকে কম।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, দেহের দুর্বলতার জন্যও এসব ব্যাকটেরিয়ার অভাব অনেকাংশে দায়ী।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের সুস্থ শিশুদের পাকস্থালীতে যেসব প্রধান ব্যাকটেরিয়া থাকে তার পরীক্ষা করেন।
এরপর ইঁদুর এবং শূকরের ওপর পরীক্ষা করে দেখেন যে কোন্ ধরনের খাবার দিলে এসব ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
এরপর এক মাসব্যাপী এক পরীক্ষায় অপুষ্টিতে ভোগা ৬৮টি বাংলাদেশী শিশুকে বিভিন্ন ধরনের ডায়েট খেতে দেন।
শিশুদের অপুষ্টি কেটে গেলে তারা দেখেন এক ধরনের ডায়েট তাদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী।
আর তা হলো কলা, সয়া, চিনাবাদামের গুড়া আর ছোলার গুড়ান তৈরি বিশেষ মিশ্রণ।
এই খাদ্য ব্যবহারে শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বেড়ে যায় বলে গবেষণার ফলাফলে জানা যায়।
পাকস্থলীর ভাল ব্যাকটেরিয়াগুলিকে মাইক্রোবাইওম নামে ডাকা হয়।

Wednesday, April 20, 2022

১৮৭২ সালে ‘বেগম’ বন্দি হয় লন্ডনে

আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে বুনো পরিবেশে পাঁচ প্রজাতির গন্ডারের বাস। যার দু’টি ছিল আফ্রিকায় ও তিনটি ছিল এশিয়ায়। এশিয়ার তিনটি গন্ডার প্রজাতির সবই ছিল বাংলাদেশে। কালের বিবর্তনে বসতি হারিয়ে, শিকারির শিকার হয়ে সব গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
অতীত নথিপত্র, জেলাভিত্তিক গেজেটিয়ার, ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের উত্তরে তিস্তা অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতি। সর্বশেষ জীবিত গন্ডারটিকে অর্থের লোভে তৎকালীন বৃটিশ সরকার পাঁচ হাজার পাউন্ডে লন্ডন চিড়িয়াখানায় বিক্রি করে দেয় ১৮৭২ সালে।
গন্ডার একপ্রকার স্তন্যপায়ী তৃণভোজী প্রাণী। এটি রাইনোসেরোটিডি পরিবারের অন্তর্গত। বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতির বিস্তৃতি ছিল যথাক্রমে: একশিঙ্গি বড় গন্ডার নেপাল সিকিম থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত। সুন্দরবন, যশোর থেকে বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত। সুন্দরবন ও যশোর থেকে শিকার করা এমন ১১টি একশিঙ্গি ছোট গন্ডার কলকাতা, বার্লিন ও লন্ডন জাদুঘরে তখন নিয়ে যাওয়া হয়। দুইশিঙ্গি গন্ডারের আবাস কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত ছিল।

সুন্দরবনে আদি সভ্যতার প্রত্নস্থলের আবিষ্কারক ইসমে আজম ঋজু গন্ডারের বিলুপ্তি এবং তার সর্বশেষ বসবাসের অবস্থান নিয়ে জাগো নিউজকে জানান, ১৮৭৬ সালে কুমিল্লায় একটি দুইশিঙ্গি গন্ডার গুলি করে মারা হয়। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি গন্ডার ধরা হয়। যেটি ছিল দুইশিঙ্গি গন্ডার। এটি বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার ‘বেগম’। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের দক্ষিণের কোন একস্থানে এটি মানুষের হাতে বন্দি হয়। চোরাবালিতে আটকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল গন্ডারটি। স্থানীয় লোকজন গন্ডারটিকে চোরাবালি থেকে তুলে আটকে রেখে প্রশাসনকে জানায়। ব্রিটিশ সরকারের ক্যাপ্টেন হুড ও মি. উইকস আটটি হাতি নিয়ে ১৬ ঘণ্টা কঠোর চেষ্টার পর এটিকে বন্দি করে। অর্থের লোভ সামলাতে পারেনি ব্রিটিশ কর্মকর্তা। ১৮৭২ সালে বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারটিকে ৫ হাজার পাউন্ডে কিনে লন্ডন চিড়িয়াখানা বিক্রি করেন। নিজ বসতভিটা ছেড়ে বেগম বন্দি হলো লন্ডনের খাঁচায়। এই গন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে আমাদের গন্ডার প্রজাতি।
গবেষক ইসমে আজম ঋজু আফসোস করে বলেন, ‘এত বড় বাংলায় আমরা ‘বেগমের’ জন্য একটু জায়গা করে দিতে পারিনি। আমাদের লোভ, প্রভুদের খেতাব পাওয়ার আশা হয়তো সেদিন ভিজেছিল ‘বেগমের’ চোখের পানিতে। আজও সে লোভ-নিষ্ঠুরতা ভিজে ধুয়ে যেতে পারেনি হাজারও বন্যপ্রাণীর চোখের পানিতে।’
লন্ডন চিড়িয়াখানায় তার নাম দেওয়া হল ‘বেগম’। লন্ডনে মি. কিউলমান নামের এক আঁকিয়ে আঁকলেন মানুষের নজরে আসা বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারের ছবিটি।

‘বেগম’কে বাংলাদেশের শেষ গন্ডার উল্লেখ করলেও গবেষক ইসমে আজম ঋজু সুন্দরবনে গবেষণা করে পেয়েছেন আরও কিছু তথ্য। সেই তথ্য অনুসারে, ১৮৬৮ সালের দিকে বাংলাদেশের শেষ গন্ডারের কথা বলা হলেও সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮০০ সালের শেষ দিকে বা ১৯০০ সালের প্রথম দিকে সুন্দরবনের নলিয়ান থেকে একটি গন্ডার শিকার করের কালাচাঁদ নামের এক শিকারি। খুলনার রায়সাহেব নলিনীকান্ত রায়চৌধুরী শেষ ১৮৮৫ সালে সুন্দরবনে গন্ডারের পায়ের চিহ্ন দেখেছিলেন। তারপর সুন্দরবনে বা বাংলাদেশের কোথাও গন্ডারের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমের সুবাদে সমগ্র সুন্দরবন ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি কয়েকবার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫-১৬ সালে বাঘবিষয়ক একটি গবেষণা কার্যক্রমের অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। মাঠপর্যায়ের সেই গবেষণাকালে আমার দলের নাম দিয়েছিলাম টিম রাইন (গন্ডারের দল)। এই নামের উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবন থেকে গন্ডারের মতো প্রাণীর বিলুপ্তির কথা মনে রেখে বাঘ সংরক্ষণে এগিয়ে চলা। সেইসঙ্গে এত বড় একটি বনে বাঘের স্থান হলেও গন্ডারের বিলুপ্তির কারণ যাচাই করা। বনভূমি ও ইতিহাস অনুসন্ধানে বুঝেছিলাম, সম্ভবত সুন্দরবনে তৃণাঞ্চলের ঘাটতি ও অবাধ শিকারই গন্ডার বিলুপ্তির কারণ।
ইতিহাস ও সদ্য আবিষ্কৃত প্রত্নস্থল ঘেঁটে তার সত্যতাও পেয়েছিলাম। একসময় সুন্দরবনে চামড়া, শিং ও মাংসের জন্য ব্যাপক আকারে গন্ডার শিকার করা হতো। প্রাচীনকালে সুন্দরবন অঞ্চলের আদিবাসীরা গন্ডারের মাংস খেত। সুন্দরবনের প্রাচীন প্রত্নস্থলে তারই নমুনাস্বরূপ একটি গন্ডারের দাঁতের জীবাশ্ম-প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অবশ্য অন্যান্য প্রাণীর হাড়ের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। অন্য আরেক প্রত্নস্থলে পাওয়া যায় পায়ের হাড়, যা দেখে অনুমান করা যায় হাড়ের ভেতরের মজ্জা বের করার জন্য ভাঙা হয়েছিল হাড়টি।
সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সেকেন্দার ডাক্তার তাঁর জীবদ্দশায় একটি পুকুর খননের সময় মাটির গভীরে দুটি গন্ডারের কঙ্কাল পান। এছাড়া সুন্দরবনসংলগ্ন হরিণগড় গ্রামে এফাজতুল্লা সরদার পুকুর খননের সময় একটি গন্ডারের কঙ্কাল, ধূমঘাট দিঘি খননের সময় ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল ও ঈশ্বরীপুর মাখন লাল অধিকারীর বাড়িতে ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক এ এফ এম আবদুল জলিল ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল দেখেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রায় একশত বৎসর পূর্বে বৃদ্ধ লোকেরা শ্রীফলাকাঠি ও খেগড়াঘাটের জঙ্গলে স্বচক্ষে গন্ডার দেখিয়াছেন।’
সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসরত ঢালী পদবির লোকজন সুন্দরবনে গন্ডার শিকার করে তার চামড়া দিয়ে যুদ্ধের জন্য ঢাল প্রস্তুত করত। ঢাল থেকে পেশাগত কারণে ঢালী পদবির উৎপত্তি। এই ঢালীরা মহারাজ প্রতাপাদিত্যর হয়ে যুদ্ধ করত। পরবর্তী যুগে এসে ইংরেজ শিকারিদের ব্যাপক শিকারের ফলে অবশিষ্ট গন্ডার সুন্দরবন থেকে বিলীন হয়ে যায়।

Thursday, October 14, 2021

যেভাবে ডাইনোসরের সমাধি খুঁজে পেলো এক মেষপালক

এই গল্পটি এক মেষপালকের। তবে এতে আরও আছেন একজন ভূগোল শিক্ষক এবং পেনশনের টাকায় নিজের খরচা চালানো আরেকজন প্রৌঢ়।
মেষ পালকের নাম ডুমাঙ্গে তৈয়বেকা। মূলত তিনিই সন্ধান দিয়েছেন ২০০ মিলিয়ন বা দুই হাজার বছরের পুরনো সেই ডাইনোসরের কঙ্কালের।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের ক্ষেমেগা গ্রামে ঘটেছে এই ঘটনা।
ডাইনোসরের সমাধি আবিষ্কারের পর থেকে নিজের লোকালয়ে রীতিমতো 'নায়ক' বনে গেছেন ৫৪ বছর বয়সী তৈয়বেকা।
তার মুখেই শোনা যাক সেই সমাধি খুঁজে পাবার ঘটনাটা।
"আমার বংশের পূর্ব পুরুষ অর্থাৎ আমার দাদা'র বাবা ও মায়ের কবর ছিল এখানটায়। আর আমার উপরে ছিল সেগুলো দেখ-ভাল করার ভার।"
একদিন কবর রক্ষণা-বেক্ষণের কাজ করার সময় হঠাৎ নজরে এলো বিরাটকার একটা হাড়। "এরকম হাড় আমি জীবনের দেখিনি।"

আমাদের গ্রাম নিয়ে একদিন বই লেখা হবে

"শৈশবে আমরা ডাইনোসরের গল্প শুনেছি। কিন্তু তখন আমরা জানতাম যে, ডাইনোসরের গল্প হচ্ছে এক ধরনের রূপকথা," বলছিলেন জেমস রেলেন।
"তবে, ১৯৮২ সালে কিছু বই পড়ার পর আমার মনে হল, ডাইনোসর আসলে কল্পকাহিনী নয়, এটি বাস্তব। সেই থেকেই ডাইনোসরের অস্তিত্বের সন্ধান করেছি আমি," জানাচ্ছিলেন জেমস রেলেন।
মি. রেলেন হলেন ডাইনোসরের সমাধি আবিষ্কার গল্পের দ্বিতীয় চরিত্র এবং পেনশনের টাকার উপরেই যার জীবিকা নির্ভরশীল।
রেলেন বলছিলেন যে, "এই আবিষ্কারের অংশ হতে পেরে আমার যে কী আনন্দ হয়েছে তা আর বলে বোঝানো যাবে না।"
"এই ক্ষুদ্র গ্রাম নিয়ে একদিন বই লেখা হবে। আর সারা দুনিয়া তখন জানবে আমাদের।"
এমনকি এখানকার স্থানীয় উন্নয়নেও এটি বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন জেমস রেলেন।
ডাইনোসরের ফসিল বা জীবাশ্ম খুঁজে বের করা এই তিনজনের আরেকজন হলেন থেম্বা জিকাজিকা। তিনি পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূগোল শিক্ষক।
জিকাজিকা বলছিলেন, "কঙ্কালটা পেয়ে তারা সেটি আমার কাছে নিয়ে আসে। তখন সেটিকে আমি জানাই যে, এটি একটি ফসিল।"

সবখানে ছড়ানো ছিল ডাইনোসর

২০১৮ এর শুরুর দিকে এই গ্রামে এক দল প্রত্ম-জীবাশ্মবিদ কয়েক সপ্তাহ ধরে ডাইনোসরের সমাধিতে খনন কাজে অংশ নিয়েছে। 
ইস্টার্ন কেইপ প্রদেশে এই ফসিলগুলোর সন্ধান মেলে।
এই দলটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক জোনাহ কোইনিয়ের।
তিনি বলছিলেন, "আমরা যখন প্রথম ওই জায়গাটা দেখতে যাই, সেটি ছিল দারুণ ব্যাপার। মনে হচ্ছিলো সবখানেই ছড়ানো ছিল ডাইনোসর।"
সামনের বছর আবার তারা এই গ্রামে আসবেন এবং এই কঙ্কাল ও হাড়গুলোকে জোহানসবার্গে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবেন বলেও জানান তিনি।

বারো জাতের উদ্ভিদ-খেকো প্রজাতি

যেখানে এই কঙ্কাল মিলেছে সেই জায়গাটি একেবারে পতিত ভূমি। কোনও গাছপালা কিছুই নেই সেখানকার প্রায় ১২ মাইলের মধ্যে।
ধারণা করা হচ্ছে যে, শতশত প্রত্ন-জীবাশ্ম সেখানে রয়েছে। আর এগুলো এসেছে অন্তত ১২ জাতের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ-খেকো সরোপোডোমর্ফ ডাইনোসর থেকে।
যে হাড়টা পাওয়া গেছে তা দেখে অনুমান করা হচ্ছে যে, প্রাণীটি অন্তত ২৬ ফিট লম্বা আর এক টন ওজন ছিল।
আজ থেকে প্রায় ১,৪৫০ বছর থেকে ২,০০০ বছর আগে জুরাসিক যুগে লম্বা গলার, দীর্ঘ শরীরের এই ডাইনোসরগুলো পাওয়া যেতো।
গবেষণায় এই জায়গা থেকে আরও দারুণ তথ্য আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, গবেষণা সম্পন্ন করতে হয়তো সময় লাগতে পারে বছরের পর বছর।
কিন্তু ইতোমধ্যেই এই প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত নবীন গবেষক চেবিসা ম্ডেকাজি।

পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু

নদীর শুকনো রেখা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনজন স্থানীয় পুরুষ বলছিল, এই জায়গাটিকে ঘিরে তাদের বিরাট স্বপ্নের কথা।
তারা চায়, এই স্থানটিকে ইউনেস্কো ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হোক। যদি তা করা হয় তাহলে গবেষক ও পর্যটকেরা এখানে আসবে।
এর ফলে চাঙ্গা হয়ে উঠবে এখানকার স্থানীয় অর্থনীতি।
আর মেষপালক মিস্টার তৈয়বেকা মনে করেন, এই স্থান এখানকার তরুণ প্রজন্মের জীবনটাই পাল্টে দিতে পারে।
তিনি বলছিলেন, "আমার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু এই ডাইনোসরগুলো পাওয়ায় আমাদের সন্তানেরা বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ায় আগ্রহী হবে।"
ডাইনোসরের ফসিলের সন্ধানে খোড়াখুড়ি চলছে।

Tuesday, August 10, 2021

শিশুকে কত পকেট খরচ দেওয়া উচিত?

অনেক বাবা-মা রয়েছেন যারা বাচ্চাদের পকেট খরচ দিলেও তাদের হাতে নগদ টাকা দেয়াকে সমর্থন করেন না।
এক গবেষণা বলছে, ৮৪ ভাগ ব্রিটিশ বাবা-মায়েরা সন্তানদের পকেট খরচ হিসেবে নোট এবং কয়েন দিয়ে থাকেন। হাত খরচ হিসেবে যার পরিমাণ অনেক সময় সপ্তাহে ৭ পাউন্ডও হয়।
যাইহোক, ২০২৮ সাল নাগাদ ব্রিটিশ বাবা-মায়েরা সন্তানের জন্য কোন উপহার কেনার ক্ষেত্রে প্রতি ১০টি উৎসবের মাত্র একটিতে নগদ অর্থ ব্যবহার করবেন। বাকিগুলো কেনা হবে কার্ড কিংবা ডিজিটাল দাম পরিশোধের মাধ্যমে।
তাহলে ব্রিটিশ শিশুদের উপর এই অবস্থা কতটা প্রভাব ফেলবে? আজকের প্রজন্মের শিশুরা কি বিলুপ্তির পথে থাকা নগদ অর্থ ব্যবহার শিখবে? নাকি পকেট খরচ দেয়ার ক্ষেত্রে বাবা-মায়েদেরকে নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে? নাকি তাদেরকে আসলে পকেট খরচ দেয়া নিয়েই চিন্তা করতে হবে না?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের হাতে মাঝে মাঝে নগদ অর্থ দেয়ার অভ্যাস করলে তাদের মধ্যে অর্থ এবং বাজেট করার শিক্ষা বাড়ে।
এমনকি শিশুরা বলেছে যে, বিভিন্ন কাজের বিনিময়ে যদি তাদেরকে অর্থ দেয়া হয় তাহলে সেই শিক্ষা আরও ভালো হয়।
নয় বছর বয়সী ইউসুফ জানায়, "কাজের বিনিময়ে টাকা পেলে মনে হয় যে, বড় হলে চাকরি বা কাজ করার বিনিময়ে উপার্জন করতে পারবো আমরা।"
"এখন যেমন দিনে মাত্র ৫০ পেন্স পাই, তখন অবশ্যই আরো বেশি পাবো," সে বলে।
পকেট খরচ নিয়ে করা বিভিন্ন পরিসংখ্যান কখনোই শিশুদের দেয়া পকেট খরচের পরিমাণের বিষয়ে একমত হয় না।
লিয়ডস ব্যাংকিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান দ্য হ্যালিফ্যাক্স ১৯৮৭ সাল থেকে এ ধরণের একটা গবেষণা পরিচালনা করছে। যা এরইমধ্যে বেশ ভালো ভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
এই গবেষণাটির সর্বশেষ উপাত্ত বলছে, ব্রিটেনের বিভিন্ন অংশে পকেট খরচ দেয়ার হারে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
অন্যরা মনে করে যে, হ্যালিফ্যাক্সের গবেষণায় পাওয়া সাপ্তাহিক পকেট খরচের হারটা একটু বেশি। তবে সবাই একমত যে, পকেট খরচ হিসেবে এখনো নগদ অর্থই দিতেই বেশি পছন্দ করেন বেশিরভাগ বাবা-মা।
গবেষকরা বলেন যে, অর্থ জমানোর অভ্যাস সাত বছর বয়স থেকেই শুরু হয়ে যায়। শিক্ষক এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের করা এক বৈঠকে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই শিশুদের বাণিজ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা আহ্বান জানিয়েছেন।
যাই হোক, স্কুলে শিশুদের যাই শিক্ষা দেয়া হোক না কেন, বাসায় কম পরিমাণে নগদ অর্থ দেয়ার অভ্যাস অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। একথা বলেছেন সরকার সমর্থিত কিন্তু স্ব-পরিচালিত মানি এন্ড পেনশন সার্ভিসের কর্মকর্তা সারাহ পোরেটা।
বাবা-মায়ের প্রতি তার উপদেশ:
•যত কম বয়সে সম্ভব শিশুদের নগদ অর্থ দেয়া শুরু করা উচিত
•কত সময় পর পর কিংবা কী পরিমাণ অর্থ দিতে হবে তা নিয়ে চিন্তিত না হওয়া
•যেসব বাবা-মায়ের অর্থ দেয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের উচিত সপ্তাহ শেষে অর্থনৈতিক কাজ সম্পর্কে শিশুদের সাথে আলোচনা করা
আর যেসব বাবা-মায়েরা আর নগদ অর্থ বহন বা ব্যবহার করেন না, বরং অর্থ পরিশোধের কাজে কার্ড বা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন তাদের উদ্দেশ্যে দুই পরামর্শ হল- শুধু শিশুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য হলেও কিছু নগদ অর্থ রাখা উচিত।
"অর্থ দিয়ে আপনি আসলে কি করেন সে বিষয়ে সন্তানদের সাথে কথা বলুন। আপনি যদি কার্ড কিংবা ফোনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন তাহলে সেটি নিয়েও শিশুর সাথে আলোচনা করুন এবং এর সাথে টাকার সম্পর্কটা তাদের কাছে পরিষ্কার করে তুলে ধরুন," দুই সন্তানের একজন মা বলেন।
তবে পকেট খরচ জমানোর একটি জনপ্রিয় স্মার্ট ফোন অ্যাপস অবশ্য আলাদা পরামর্শ দিয়েছে।
"আমরা অর্থ যেভাবে ব্যবহার করি তা আগের তুলনায় বদলে গেছে। পকেট খরচের ধরণও বদলে যাচ্ছে। এখন আমরা একটা বোতাম টিপেই দ্রব্যাদির দাম পরিশোধ করতে পারি," স্মার্ট ফোন অ্যাপস রুস্টার মানির প্রধান নির্বাহী এবং দুই সন্তানের পিতা উইল কারমাইকেল এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, "আগে পকেট মানি একটি পাত্রে জমা হতো এবং ঘরেই থাকতো। আমরা নিয়মিত কয়েন ফেলে সেটাকে বাড়তে দেখতাম। আর একদিন মিষ্টির দোকানে নিয়ে সেগুলো খরচ করতাম। তবে সেদিন আর নেই।"
"এখন এই পকেট খরচ দিয়ে কেউ চাইলে ভিডিও গেম খেলতে পারে। কিংবা কোন অনলাইন শপ থেকে তার পছন্দের দ্রব্য বা সেবা নিতে পারে।"
"পকেট খরচকে আমরা অনলাইনে নিয়ে এসেছি এবং একে আরো বেশি ব্যবহার উপযোগী করছি," তিনি বলেন।
একটি অনলাইন রিওয়ার্ড চার্টের মাধ্যমে এই অ্যাপটি চার বছর বয়স থেকে শুরু করে কিশোররাও ব্যবহার করতে পারবে। এটা ব্যবহারকারীদের অর্থ জমানোর লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। অ্যাপটি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে লেগো, ফোন কিংবা অবসর যাপনের খরচ জমানোর লক্ষ্য।
একইভাবে, এর সাহায্যে প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে খরচ করারও সুযোগ রয়েছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, এই পকেট খরচের অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় মিষ্টি এবং বই কেনায়। এছাড়া এর ব্যবহারকারীরা চাইলে দাতব্য প্রতিষ্ঠানেও অর্থ দান করতে পারেন।

প্রাথমিক ব্যাংকিং

এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে ব্যাংকে হিসাব খোলা। সাত বছর বয়স থেকে সেভিংস অ্যাকাউন্ট এবং ১১ বছর বয়স থেকে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে।
"শিশুদের ব্যাংকিং দুনিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার একটি বড় উপায় এটি। যার মাধ্যমে এটিএম বুথ ব্যবহার করে নগদ উত্তোলন করার প্রক্রিয়াও শিখতে পারে তারা।"
"এছাড়া চুক্তিপত্র ছাড়া পেমেন্ট, কিংবা স্মার্ট ফোন থাকলে মোবাইল পেমেন্ট করাও শেখার সুযোগ পাবে তারা," বলেন ডিফ্যাকটোর ডেটা বিশ্লেষক ব্রিয়ান ব্রাউন।
তিনি বলেন, "এরফলে শিশুদের অর্থ দেয়া আরো সহজ হয়। কিছু কিছু অ্যাকাউন্ট আবার সুদও দিয়ে থাকে। যদিও খুব কম হারে। যার কারণে ছোট বয়স থেকেই সঞ্চয়ের প্রতি ঝুঁকে শিশু-কিশোররা।"
ইউসুফ বলে, পকেট খরচের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক সময়ের শিক্ষা লাভ করা যায়

Wednesday, March 24, 2021

পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত: কেন আর কীভাবে করা হয়?

অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর কারণ জানার যে চেষ্টা করা হয়, তাকেই পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত বলা হয়।
পোস্টমর্টেম শব্দটি অটোপসি, নিক্রোপসি ইত্যাদি দ্বারাও বোঝানো হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েকশো ময়না তদন্ত হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে আলাদা আলাদাভাবে সেটি হওয়ায় এর মোট সংখ্যাটি কারো জানা নেই।

পোস্টমর্টেম কেন করা হয়?

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: মমতাজ আরা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, 'মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করা হয়।
''কোন ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে বা তার মৃত্যু নিয়ে কোন সন্দেহ তৈরি হলে, মৃত্যুর সঠিক কারণটি জানার জন্য মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হয়, ঠিক কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।''
তিনি বলছেন, অনেক সময় শরীরের ভেতরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখা হয়। যেমন ধর্ষণের অভিযোগে সিমেন সংগ্রহ করে ডিএনএ ম্যাচ করা হতে পারে। আবার আত্মহত্যার মতো অভিযোগে ভিসেরা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বোঝা যায় যে বিষপ্রয়োগের কোন ঘটনা ঘটেছে কীনা।
অনেক সময় কোন ব্যক্তি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করার পরেও যদি ওই মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তখন যে পোস্টমর্টেম করা হয়, তাকে বলা হয় ক্লিনিক্যাল পোস্টমর্টেম।

ময়নাতদন্ত নাম কীভাবে এলো?

অটোপসি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ অটোপসিয়া থেকে। যার অর্থ মৃতদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা।
ডা: মমতাজ আরা বলছেন, ময়না শব্দটি ফার্সি বা উর্দু থেকে এসেছে, যার অর্থ ভালো করে খোঁজা বা অনুসন্ধান করা। ফলে ময়না তদন্ত মানে হলো ভালো করে তদন্ত করে দেখা।
যেহেতু মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা এই কাজটি করে থাকেন, এ কারণেই এর নাম হয়েছে ময়না তদন্ত।

কীভাবে ময়না তদন্ত করা হয়

হত্যা, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনার মতো যেকোনো অপমৃত্যু বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত করা হয়ে থাকে।
এ ধরনের ঘটনায় প্রথমেই পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ মৃতদেহ কী অবস্থায় পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর মৃত্যু সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য ময়না তদন্ত করতে পাঠানো হয়।
মর্গে ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকরা সেই সুরতহাল প্রতিবেদন দেখে, প্রথমে মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেন। সেখানে কোন আঘাত বা ক্ষত আছে কিনা, ত্বক ও জিহ্বার রঙ ইত্যাদি দেখে প্রথম প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
এরপরে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভারসহ শরীরের ভেতরটা যাচাই করে দেখা হয়। ফলে শরীরের ভেতরে কোন আঘাত থাকলে, রক্তক্ষরণ বা বিষক্রিয়া থাকলে, সেটি চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন। কোথাও আঘাতের চিহ্ন থাকলে সেটি কীভাবে হয়েছে, তা ভালো করে যাচাই করা হয়।
এই কাজটি করতে গিয়ে মৃতদেহের নানা অংশ কেটে দেখতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। এ সময় শরীরের নানা প্রত্যঙ্গও সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।
ময়না তদন্ত শেষে মৃতদেহ আবার সেলাই করে আগের মতো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন কোন অংশ কেটে আরো পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হতে পারে।

ময়না তদন্ত থেকে কী জানা যায়?

ময়না তদন্তে বেশ কয়েকটি বিষয় জানার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বিষয় হলো মৃত্যু কীভাবে হয়েছে এবং কখন মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা, আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে কিনা, বিষ খাওয়ানো হয়েছে কিনা, রক্তক্ষরণের কোন ঘটনা আছে কিনা- ইত্যাদি বিষয়ও ময়না তদন্তে বেরিয়ে আসে।

কোন মৃত্যুর ময়না তদন্ত করা হয়?

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, কোন মৃত্যুর ঘটনাগুলোয় ময়না তদন্ত করা হবে।
''হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, বিষপানে মৃত্যু, শরীরের যদি কোন আঘাতের দাগ থাকে, অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলে সন্দেহের অবকাশ থাকলেই সেখানে মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম করতে হবে।''
এ ধরনের ঘটনায় প্রথমে পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ পুলিশ কর্মকর্তা কী অবস্থায় মৃতদেহটি দেখেছেন, মৃতদেহের বিস্তারিত বর্ণনা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়রির পরে পুলিশ মৃতদেহটি ময়না তদন্ত করার জন্য পাঠিয়ে থাকে।
তবে পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হলে একজন ম্যাজিস্ট্রেট সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। এরপর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

ময়না তদন্ত কোথায় হয়?

বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজে মর্গ রয়েছে। সেখানে ময়না তদন্তের জন্য বিশেষ স্থান থাকে। সেখানে ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা ময়না তদন্ত করে থাকেন।
এর বাইরে যেসব জেলা শহরে আড়াইশো শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে ময়না তদন্ত করা হয়ে থাকে। মেডিকেল কলেজগুলোয় ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপকরা ময়না তদন্ত করলেও, জেলা শহরে সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে আবাসিক সার্জনরা সেটা করে থাকেন।
অধ্যাপক ডা. মমতাজ আরা বলছেন, যত দ্রুত ময়না তদন্ত করা যাবে, তত ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
তবে অনেক সময় মৃত্যুর অনেক পরেও, দাফন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পরেও পুনরায় ময়না তদন্তের উদাহরণ রয়েছে।

ময়না তদন্তের প্রকারভেদ

মৃত্যুর কারণ জানার জন্য মূলত ময়না তদন্ত করা হলেও এর আরো কয়েকটি ভাগ রয়েছে। যেমন:
মেডিকেল: অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানতে এই ময়না তদন্ত করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
একাডেমিক: চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা হয়ে থাকে।
ক্লিনিক্যাল: অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর পরেও কারো মৃত্যু নিয়ে যদি বিতর্ক তৈরি হয়, তখন ক্লিনিক্যাল পোস্টমর্টেম করা হয়।

ময়না তদন্তের ব্যতিক্রম

অনেক সময় অস্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পরিবারের স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়না তদন্ত ছাড়াও মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে।
পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদুর রহমান বলছেন, ''বাস দুর্ঘটনার মতো অনেক অস্বাভাবিক মৃত্যুর মতো ঘটনায় যখন মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকে না, তখন পরিবারের অনুরোধে ময়না তদন্ত ছাড়াই মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। কারণ পরিবারের সদস্যরা চান না, তাদের স্বজনদের মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করা হোক। তখন ম্যাজিস্টেটের অনুমতি নিয়ে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হতে পারে।''
কিন্তু মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে অবশ্যই ময়না তদন্ত করা হবে, তিনি বলছেন।

ময়না তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

সম্প্রতি পুলিশ বেশ কয়েকটি হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ময়না তদন্তের ভুল দেখতে পেয়েছে।
এ বিষয়ে ডা: মমতাজ আরা বলছেন, '' আমার বিশ্বাস, কোন চিকিৎসক পক্ষাবলম্বনের জন্য ভুল প্রতিবেদন তৈরি করেন না। হয়তো অনেকদিন পরে মৃতদেহের ময়না তদন্ত করা হয়েছে, ফলে সঠিক চিত্রটি বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু ইচ্ছা করে কেউ এটা করেছেন বলে আমি মনে করি না।''

ময়না তদন্তের ইতিহাস

সহকারী অধ্যাপক ডা: মমতাজ আরা বলছেন, সতেরশো শতক থেকেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পোস্টমর্টেমের রীতি চালু রয়েছে।
তবে তখনকার তুলনায় এখন অনেক আধুনিকভাবে ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে।
অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত করা হয়ে থাকে