Showing posts with label সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম. Show all posts

Friday, February 6, 2026

আমরা এগোব আত্মবিশ্বাস নিয়ে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

চলে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। অনুপ্রেরণার খোঁজে আমরা তাঁর দ্বারস্থ হতাম। করোনার ধাক্কায় পুরো পৃথিবী যখন বিপর্যস্ত, তখনও প্রথম আলোর অনুরোধে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লিখেছিলেন তিনি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি আবার প্রকাশ করা হলো।

কোভিড মহামারি আমাদের বিপর্যস্ত করেছে। অর্থনীতি থেকে নিয়ে জনজীবন, সবখানেই পড়েছে এর আঘাতের চিহ্ন। কিন্তু মহামারি অন্তে ঘুরে দাঁড়াতে অর্থনীতির খুব একটা সময় লাগবে না, সমাজজীবনও গতিশীল হতে শুরু করলে ক্ষতগুলো দ্রুতই সারবে। শুধু সময় লাগবে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে। শুধু মহামারির কারণে যেসব ক্ষতি হলো—দেড়টা বছর হারিয়ে গেল, ডিজিটাল বৈষম্য প্রকট হলো, অসংখ্য শিক্ষার্থী ঝরে পড়ল, আরও বহু শিক্ষার্থী মানসিক অবসাদে ভুগল অথবা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলল—তা নয়, এসবের বাইরেও এই সময়ের শিক্ষা যা দাবি করে, সেগুলো মেটানোতে আমাদের অপারগতাকে একই সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা করতে হবে।

কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এ দেশের মানুষ সারা ইতিহাসজুড়ে দুর্যোগের সঙ্গে ঘর করেছে। প্রাকৃতিক হোক, মানুষের সৃষ্ট হোক—যেকোনো দুর্যোগের ঝাপটা কীভাবে সামাল দিতে হয়, মানুষ তা জানে। এ দেশের প্রকৃতিও জানে। ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়ে দক্ষিণের উপকূল ছিন্নভিন্ন হলো, সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চলল। দুই বছর পর দেখা গেল জীবন চলছে আগের মতোই। সুন্দরবন তার শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। আরও যেন সুন্দর হলো।

ক্ষতি এবং ক্ষত অবশ্য ভুলে যাওয়ার নয়। চলে যাওয়া মানুষ ফিরে আসে না। কিন্তু তাদের জন্য শোকটা কোথায় যেন শক্তি জোগায়।

মহামারিও একদিন আমরা জয় করব। শিক্ষার ক্ষতিটা পুষিয়ে নেব। আগামীর জন্যও তৈরি হব। সবাই এই উঠে দাঁড়ানোতে শামিল হতে পারবে না, সে জন্য তাদের কথা ভেবেও আমাদের এগোতে হবে।

কীভাবে এগোব? এগোব আত্মবিশ্বাস নিয়ে, আন্তরিকতা নিয়ে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে সঙ্গে করে।

কোভিড মহামারি ব্যাপক হওয়ার সময় আমার মনে হয়েছিল, মানুষকে এই দুর্যোগ হয় আরও স্বার্থপর করবে—যেহেতু সবাই আপন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, প্রতিবেশীর দিকে নজর দেওয়া হবে না; অথবা মানুষ আরও মানবিক হবে। এখন দেখতে পাচ্ছি স্বার্থপরতাটা পশ্চিমেই বেশি দেখা গেছে। সেখানে যুক্তিতর্কও কুসংস্কার ও বিদ্বেষী রাজনীতির কাছে মার খাচ্ছে। সে তুলনায় স্বার্থপরতার প্রকাশ পুবে কম। আমরা যে খুব মানবিক হয়েছি তা নয়, কিন্তু ভয়ানক অমানবিকও হয়ে যাইনি। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি হতে দেয়নি। আমার ভরসার জায়গাটা এ দেশের তারুণ্য। তরুণেরা দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছে, বিপন্নদের সহায়তা দিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই তরুণ, অথবা কৈশোর-তারুণ্যে শিগগিরই বেড়ে ওঠার পথে। আত্মবিশ্বাসটা হবে সক্ষমতা নিয়ে। মাত্র কিছুদিন হলো স্কুল–কলেজ খুলেছে, সবাই এখনো যদিও ক্লাস শুরু করতে পারেনি। কিন্তু কজন শিক্ষক আমাকে বললেন, শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস উঁচু। শুধু শহর নয়, গ্রামেও। ১৯৭১ সালে সারা বছর পড়ালেখা হয়নি। স্বাধীনতার পর এক বছরে আমরা ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠলাম। তার পেছনে ছিল আত্মবিশ্বাস—আমরা পারব।

আন্তরিকতার অর্থ খোলা মন নিয়ে কাজের সামনাসামনি হওয়া। নিজের প্রতি সৎ হওয়া। একজনের ঘাটতি আরেকজন মাপতে পারে না—সেটি দূর করতে সাহায্য যদিও করতে পারে। যদি আমরা নিজেদের সঙ্গে, একে অপরের সঙ্গে, শিক্ষকদের সঙ্গে আন্তরিক হই, তাহলে কোথায় ঘাটতি এবং কীভাবে সেগুলো মেটানো যায়, সেই ধারণাটা পরিষ্কার হবে। একজন আরেকজনকে করতে পারব।

যাঁদের সামর্থ্যের অভাব আছে, তাঁদের ডিজিটাল দুনিয়ায় পা রাখা বা চলাফেরাটা সম্ভব হয়নি। সেই বৈষম্য কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। একজন যে কম্পিউটারে পারদর্শী, সে যদি বৈষম্যের শিকার বন্ধুকে সাহায্য করে, তাহলে শুধু বন্ধুটির যে উপকার হবে তা নয়, নিজেকে সে আরেকটু উঁচুতে তুলে নিতে পারবে। মনে রাখতে হবে, এই উঁচুতে না উঠতে পারলে পৃথিবীর মাপে আমরা পিছিয়ে থাকব।

ডিজিটাল জ্ঞানটা খুব জরুরি, কিন্তু ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বা মোবাইলের ডেটা যেন আমরা ফেসবুক ঘুরে বেড়িয়ে বা গেম খেলে নষ্ট না করি। এ হবে ঘোরতর অপচয়, অন্যায়ও।

অধ্যবসায় আর পরিশ্রমের তো কোনো বিকল্প নেই। এখন তিন দিনের পড়া এক দিন পড়তে হবে। না, শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য নয়। বরং নিজেকে গোটা পৃথিবীর সক্ষমদের কাতারে দাঁড় করানোর জন্য।

আমরা পারব। কষ্ট হবে, কিন্তু পারব। কেউ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখে, তা বাস্তবে নামিয়ে আনতে একটা শক্তিও পায় নিজের মধ্যে। আমরা ক্লাসে ফিরে যাব এবং ভাবব—বা একটা বাস্তব স্বপ্ন দেখব—ভবিষ্যতের এ রকম কোনো মহা দুর্যোগে পথ দেখাবে বাংলাদেশ। দুর্যোগের রকম অনুযায়ী প্রতিরোধ তৈরি করে, বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে, মেধার স্বাক্ষর রেখে, অধ্যবসায় এবং পরিশ্রমের প্রয়োগ ঘটিয়ে।

আমার শিক্ষকতাজীবন বাংলাদেশের প্রায় সমান বয়সী। আমি তরুণদের কাছে থেকে দেখেছি, এখনো দেখছি। আমি জানি তারা চাইলে অসাধ্যসাধন করতে পারে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

Saturday, February 5, 2022

এক সিলেটির হাসির (?) গল্প by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

‘অন্য আলো’ থেকে আমাকে বলা হয়েছে আমার জীবনের ঘটে যাওয়া একটি মজার গল্প নিয়ে লিখতে। আমি একটি নয়, তিনটি নিয়ে লিখব, যেহেতু ঈদের মৌসুম চলছে। মেয়াদ শেষ হওয়া খেজুরের প্যাকেট যে রকম একটি কিনলে এখন অনেক দোকানি র​্যাবের ভয়ে দুটি ফ্রি গছিয়ে দেয়, অনেকটা সে রকম। কে হায় গুদাম খুঁড়ে র​্যাবকে জাগাতে ভালোবাসে!

আপনার যদি মনে হয় গল্পগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, র​্যাবকে খবর দিন। তবে এগুলো ভেজাল নয়, এ-ই রক্ষা।

প্রথম দুটি গল্প স্কুল-কলেজে পড়ার সময়। আমি দেখেছি, এই সময়টাতেই কেন জানি জীবনের মজার গল্পগুলো সব ঘটে যায়। হয়তো এ সময়টা অপাপবিদ্ধতার, মন খুলে হাসতে পারার, এ জন্য। বয়সটা আপনি পেয়ে গেলে (অর্থাৎ ‘প্রাপ্ত’বয়স্ক হলে) বালসুলভ অনুভূতিগুলো সব উবে যায়, জগতের পাপ আপনার ‘মতি’কে কঠোর করে ফেলে (আপনি আর কোমলমতি থাকেন না, পাপ-তোবয়স্ক হয়ে যান), তখন হাসাটাও মানা হয়ে যায়। সে যা–ই হোক, স্কুলের দশম শ্রেণিতে যখন পড়ি, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হলো। রেডিওতে ঘন ঘন এলান দেওয়া হতো, ভারতীয় চর থেকে সাবধান! চর বলে কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দিন। আমার এক বন্ধু, সাইফুলের মামা লন্ডন থেকে সিলেট এলেন (সিলেটিদের কাছে লন্ডন-সিলেটের দূরত্বটা বরাবর ঢাকা-আশুলিয়ার মতো)। তিনি পরদিন যাবেন তাহিরপুর, তাঁর বাড়ি। একটা হোটেলে জিনিসপত্র রেখে তিনি বেরোলেন বোনের বাড়ির খোঁজে। কিন্তু খুঁজবেন যে, ঠিকানাটা গেছেন ভুলে। তাঁর ধারণা ছিল মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে বাড়ি পেয়ে যাবেন। ভুল! তিনি আধা ঘণ্টা শুধু শুধু ঘুরে বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের পাড়ার কাকুর চায়ের দোকানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিলেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, মানুষের ওপর নির্ভর করে হাতিরপুলের কোনো ঠিকানা খুঁজতে গেলেও একসময় আপনি হয়তো গাবতলি পৌঁছে যাবেন। সাইফুলের মামার হাতে একটা প্যাকেট। তাতে লন্ডনের কোনো দোকান থেকে বোন ও তাঁর পরিবারের জন্য কেনা কিছু গিফট ছিল। প্যাকেটে ‘ইন্ডিয়া’ কথাটা ছিল। বড় করে লেখা দোকানটার নামে। এক খদ্দের তা দেখল। অল্প বিদ্যা সব সময় ভয়ংকরী।

সে লোক কাকুর দোকান থেকে বেরিয়ে যাকে সামনে পেল, বলতে লাগল, ‘স্ফাই’, অর্থাৎ স্পাই। সাইফুলের মামা উঁচু-লম্বা মানুষ, চোখে সোনার রিমের চশমা। পরনে ভালো কাপড়চোপড়। তিনি কিছু বোঝার আগেই দোকানের সামনে ভিড় জমে গেল। আমরা মাঠে ছিলাম। স্ফাই পাওয়া গেছে শুনে আমরাও দৌড় লাগালাম। ততক্ষণে মামা দোকান থেকে বেরিয়েছেন এবং বলছেন, ‘আমি স্ফাই নায়।’ কিন্তু তাঁর কথা কে শোনে। কয়েকজন থানায় দৌড়াল। পুলিশকে খবর দিতে হবে। তীব্র উত্তেজনা। একসময় তিনি গলা চড়িয়ে, কাতর কণ্ঠেই বললেন, তিনি লন্ডনি; এবং সাইফুলের বাবার নামটা বলে জানালেন, তিনি তাঁর বাড়িতে যাওয়ার জন্য এসেছেন।

সাইফুল একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। সে দৌড়ে এল, ‘মনা মামা নি!’ সে চিৎকার করে বলল, ‘আফনে স্ফাই নি’!

সৌম্যদর্শন মনা মামা রেগে গিয়ে সাইফুলের কানটা ডলে দিলেন, ‘তরে কইছে। আয়, দেখাই দিমু আমি কিতা,’ তিনি বললেন এবং দুহাতে মানুষ ঠেলে সাইফুলের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।

ভয়ে আমরা সেদিন সাইফুলের বাড়ির দিকে যাইনি।

দ্বিতীয় গল্পটি কলেজে প্রথম বর্ষের। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে মাঝেমধ্যে ট্রেনে এদিক-সেদিক বেড়াতে যেতাম। সাইকেলে চেপে জাফলংয়েও যেতাম। একবার তিন বন্ধু গিয়েছি ছাতক। আমাদের এক বন্ধুর মামা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বড় কর্তা। আমাদের দুটি উদ্দেশ্য, ফ্যাক্টরিটা দেখা এবং সম্ভব হলে ছাতক-ভোলাগঞ্জ রেলওয়েতে চড়া। রেলওয়েটা তখন প্রায় শেষ। আমরা ফ্যাক্টরির গেটে পৌঁছে গেটটা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়লাম। দুই উর্দি পরা লোক হইহই করে আমাদের ওপর হামলে পড়ল। উদুর্ভাষী সান্ত্রী। তারা উদুর্তেই চিৎকার করতে শুরু করল। উর্দুর কারণে কিনা আমাদের রাগটা জাগল, কিন্তু সিলেটিতে—বাংলায়—ইংরেজিতে আমরা যা–ই বলি, দুই সান্ত্রী চোটপাটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। একসময় আমাদের ঠেলে গেটের বাইরে বের করে দিল। গায়ে হাত দেওয়ায় আমাদের মেজাজের পারদ উঠল। একটা মারামারির অবস্থা। এক লোক কমলার একটা ঝুড়ি নিয়ে ঢুকছিল। সে এগিয়ে এসে গন্ডগোলে শামিল হলো। লোকটা বাঙালি। তাকে বললাম, আমরা ভেতরে যাব, আমরা বেড়াতে এসেছি। আমাদের কথা শুনে সে-ও চোটপাটে নাম লিখল। এক সান্ত্রী পুলিশ আনতে গেল। একসময় বাঙালি লোকটিকে আমার বন্ধু তার মামার নাম বলল। মামার নাম শুনে লোকটার চোখমুখ সাদা হয়ে গেল। হাতের ঝুড়ি দেখিয়ে সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, উনি আমার স্যার, আপনাদের জন্যই কমলা কিনতে পাঠিয়েছিলেন।

মামা বদমেজাজি মানুষ। সেই লোক এবং দুই সান্ত্রীর এরপর কী হয়েছিল, তা না বলাই ভালো। তবে কমলাগুলো ছিল স্বর্গীয়। ছাতকের কমলা বলে কথা।

শেষ গল্পটা লন্ডনের, ১৯৭৬ সালের। আমি তখন প্রাপ্তবয়স্ক শুধু না, বিবাহিত। পিএইচডি করার জন্য কানাডা যাওয়ার পথে দুদিন সাউদাম্পটন থেকে লন্ডনে ফিরেছি। সন্ধ্যায় গেছি আমার এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে, তিনি আমাকে ডিনার খাওয়াবেন। রেস্টুরেন্টের শেফ মঝর মিয়া, বয়স ষাটের মতো, হাসিখুশি, দয়ালু। বাড়ি মৌলভীবাজার। আমার নানাবাড়ি কমলগঞ্জ শুনে তিনি অশেষ প্রীত হলেন। বললেন, ‘ঠাকুর, হুনছি তুমি বিয়া করছ।’

‘জি’, আমি বললাম।

‘বউমা আইছইননা নি?’

‘জি না, ও তিনমাস পর আসবে।’

‘বালা। তা ঠাকুর, বউর বাড়ি কই? ছিলটর কুনখানো?’

আমি চুপ করে রইলাম। কী করে বলি আমি ছিলটি বিয়ে করিনি, করেছি বেঙ্গলি!

‘ও বুঝছি’, তিনি বললেন, ‘অবিগঞ্জ।’

‘জি না, হবিগঞ্জ না।’

‘তে কুনখানো? ভাটিত নি?’

ভাটিতে মানে অষ্টগ্রামে, মিটামইনে।

‘জি না।’

‘বাম্মনবারিয়া?’ তার গলা বিমর্ষ।

আমি চুপ করে রইলাম। মঝর মিয়া এবার যেন একটা কিনারা পেয়েছেন। হেসে বললেন, ‘ঢাকাত নি?’

‘জি না’, আমি বললাম।

তিনি হাল ছেড়ে দিলেন। বললেন, ‘কছাইন ঠাকুর, বউমার বাড়ি ঠিক কুনখানো?’

‘মালদা’, আমি বললাম এবং ভুগোলটা বুঝিয়ে দিলাম।

মালদা যেতে কত দিন লাগে, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি বললাম, তা প্রায় দু-তিন দিন।

এবার হতাশ মনে হলো মঝর মিয়াকে। তিনি দুহাত তুলে বললেন, ‘ঠাকুর, তুমি তো লন্ডন বিয়া করলেই ফারতায়। আইতে যাইতে দশ ঘণ্টা লাগে।’

মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করেছি। কিন্তু মঝর মিয়ার মুখ দেখে মনে হলো, একজন মানুষকে বিয়েটা অনেক কষ্ট দিয়েছে।

কী আর করা, ঠাকুর।
তিন সাহিত্যিকের তিনটি মজার ঘটনার অলংকরণ করেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রী

Saturday, August 15, 2020

বঙ্গবন্ধুর একটা ইন্টারভিউ তো নিতে পারতাম by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আজ ১৫ই আগস্ট, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী। এই মহান নেতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, বিশিষ্ট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়—বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শৈশব কিংবা কৈশোরের স্মৃতি।
১৯৬৬ সালের পর আমি প্রথম বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছি যখন উনি ছয় দফা’র সমর্থনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ কিংবা মিটিং করেছেন, ঠিক সেই সময়েই। তিনি গিয়েছিলেন সিলেটে। সিলেটে সেই রেজিস্ট্রি—রেজিস্ট্রি বলতে যেখানে আইনের কিছু বিষয় থাকে। সেই রেজিস্ট্রার মাঠে তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই প্রথম তাঁর বাগ্মিতার সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হলো। আমরা মাঠ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। ঐ সময়ে বঙ্গবন্ধু চাইতেন না যে, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা, বিশেষ করে ছাত্ররা এতে অংশগ্রহণ করুক। এখন যে রকম পাড়ায় পাড়ায় মন্ত্রিরা গেলে স্কুল-কলেজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, বঙ্গবন্ধু তা একেবারেই পছন্দ করতেন না। ছাত্ররা গেলে তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। তাঁর কথা ছিল যে, এ বয়সে ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে থাকবে, পড়ালেখা করবে। আর যারা ছাত্র রাজনীতি করে তারা কিছুটা বয়স হলে তারপর আসতে পারে। এজন্য একটু ভয়ে ভয়ে আমরা একটু দূরেই ছিলাম এবং আমাদের বলেই দেয়া হয়েছিল যে, আমরা যেন একেবারে সামনে না যাই। তাই আমরা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তখন এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছি। তখন আমার মনে হয়েছিল, অসাধারণ একটি বক্তৃতা শুনলাম। সেখানে তিনি হাস্য-রসেরও কিছু জোগান দিয়েছিলেন। কিছুটা কৌতুক, সরস কথাবার্তা কিন্তু মূল বক্তব্যটা খুবই প্রায়োগিক ছিল। তাঁর একটি কথা এখনও আমার কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন—‘সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে, আঙ্গুল ত্যাড়া করতে হয়’। এই কথায় আমরা খুবই আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন। আমার মনে আছে, জোরে জোরে হাততালিও দিয়েছিলাম। তারপর বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছি কয়েকটি। কিন্তু আমার কানে লেগে থাকা এবং আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ শোনা ভাষণ হলো ৭ই মার্চের ভাষণ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসেই সেই ভাষণ শুনেছিলাম। বিদেশি এক রেডিওর সাংবাদিক এসেছিল। তিনি একজন দো-ভাষী খুঁজছিলেন। তার সঙ্গেই আমি গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সাংবাদিকদের যেহেতু আলাদা একটা বসার জায়গা ছিলো, আমাকে তাই সেখানে নিয়েই তিনি বসালেন। বলতে গেলে অনেকটা সামনেই ছিলাম। সেখান থেকেই আমি শুনেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সেই কাব্যিক ভাষণ। সেই সাংবাদিক একটা রেডিও বোধহয় মঞ্চে রেখে এসেছিলেন রেকর্ড করার জন্য। খাতা ছিল আমার কাছে। তিনি আমাকে বললেন, তুমি শুধু অনুবাদটা করো আমার জন্য। দুই মিনিট পর বললেন, ‘তুমি শুধু ‘কি ওয়ার্ড’ লিখে রাখো’। আমি শুধু ওই ‘কি ওয়ার্ডগুলো’ লিখে রেখেছি। প্রত্যেকটি কথা মন দিয়ে শুনেছি। কিন্তু আমার শুধু মনে হচ্ছিলো এমন একটি ভাষণ আমি সারা পৃথিবীতে শুনিনি। আসলে ওই সময়টায় একটা জাদু ছিল বাতাসে। আমরা যা চাচ্ছিলাম তাই তিনি বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, আমরা যা আশা করছিলাম আর প্রতিফলন ছিল সেই ভাষণে। এবং আমরা পরে বুঝেছি, কেন তিনি সেদিন একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। এতো বড় দায়িত্ব নিয়ে এতো বড় বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন। যা হোক, তারপর আবার যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে এলেন। ওইদিনও আমি ঢাকাতেই ছিলাম। কিন্তু একটু দেরি করে যাওয়ার ফলে পুরো বক্তৃতাটি শুনতে পারি নি। তবে যেটুকু শুনেছিলাম, তাতে মনে হয়েছে, ভাষণটি ৭ই মার্চের ভাষণ এর ধারে কাছে আসতে পারে। এটি মূলত তাঁর একটি দিক নির্দেশনামূলক বক্তৃতা ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আর উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা তো আলাদা জিনিস। তারপর বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর দালানের উপর। আবার, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে যখন আলোচনা চলছে তখন আমরা শেরাটন হোটেলের আশেপাশে গিয়ে দাঁড়াতাম। কারণ তিনি মূলত এই রাস্তা ধরেই তাঁকে চলাফেরা করতে দেখতাম—৭২, ৭৩ কিংবা ৭০ সালের আগেও দেখতাম। বঙ্গবন্ধু যখন জননেতা ছিলেন, যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো পদে বহাল ছিলেন না তখন তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়াটা সহজ ছিল। তাঁর ৩২ নম্বর বাসার সামনে গেলে এবং ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে তাঁকে দেখা যেতো। কারণ তিনি বাসায় থাকলে বারান্দায় আসতেন অথবা যখন তিনি বের হতেন তখন মানুষের মাথায় হাত দিতেন। এক কথায় ভয়ানকভাবে মানুষকে ভালোবাসতেন। তাঁর চেহারার মধ্যেই একটি অন্য রকমের আকর্ষণ ছিল—গম্ভীর একজন গলার মানুষ এবং যাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই প্রখর। মানুষের জন্য তাঁর অসীম ভালোবাসা ছিলো। অনেকের নাম মনে রাখতেন। আমার খুব কষ্ট লাগে যে, আমার সমবয়সী অনেকের নাম বঙ্গবন্ধু জানতেন। কিন্তু আমি তো কখনো সামনে যাইনি তাই হয়তো আমার নাম তিনি জানতেন না। সেই অর্থে বঙ্গবন্ধুর সাথে সামনে থেকে কথাবার্তা বলার সুযোগ আমার হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাঁর সামনে গিয়েছি, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে কিন্তু আমার সঙ্গে হয়নি। এখন ঐ বন্ধুরা যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের স্মৃতিকথা লেখেন তখন আমার খুবই মন খারাপ হয়। মনে মনে আক্ষেপ করে বলি, বঙ্গবন্ধু’র একটা ইন্টারভিউ তো নিতে পারতাম!

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা দুইই বেড়ে গেল। সুতরাং আগের মতো সহজেই তাঁকে পাওয়া বা দেখা যেতো না। বাড়ির সামনে গেলেই পুলিশ সরিয়ে দিতো। আর তখন মানুষের মধ্যে উৎসাহও অনেকটা কমে গিয়েছিল। কারণ স্বাধীন তো হয়েই গেছি আর বঙ্গবন্ধু তো আছেন-ই। ১০ই জানুয়ারির পর তাঁর আর কোনো বক্তৃতা আমার শোনা হয়নি। এর আগে যখন ’৬৯-এ তিনি আগরতলা মামলা থেকে বেরিয়ে আসলেন  তখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছিলাম। অনেক ভিড় ছিল। আর আমি একটু ভিড়-টিড় এড়িয়ে চলি তো! ঠ্যেলে ঠ্যেলে সামনে যাওয়ার মানুষ আমি না। যারা সামনে গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে এবং তারা যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছে এবং হাত মিলিয়েছে সে কথাও আমি শুনেছি পরে। এই তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার স্মৃতি। বঙ্গবন্ধু সবসময় আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। এটাই ছিলো আমাদের দেশের মানুষের জন্য বিশাল একটা পাওয়া বা প্রেরণা। এমনকি ’৭১ সালে তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন, তখনও আমি দেখেছি মুক্তিযোদ্ধরা তাঁর নামে যুদ্ধ করেছেন, আমাদের সবারই মনে হয়েছে তিনি আমাদের মাঝে আছেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব অনুপ্রেরণাদায়ী একজন মানুষ; যাঁর গলার স্বর থেকে হাতের আঙ্গুল বা হাত উত্তোলনের ভঙ্গি সবই তাঁর নিজস্ব। এসব কিছুই খুবই আকর্ষণীয় ছিল। আমি এ জীবনে যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেখছি, তারা কেউই তার মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী নন। তিনি একেবারে সবার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। এসব কারণে তাঁর জন্য আমাদের হৃদয়ে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো। আমি মনে করি তিনি একজন ব্যক্তিত্বসম্পূর্ণ নেতা ছিলেন, মানুষ ছিলেন। সব সময় মাথাটা উঁচু করে চলতেন। যখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছি—বিশেষ করে ’৭০-এর শেষের দিকে কিংবা ’৭১-এর মার্চে, তিনি মানুষের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়েছেন। প্রায় সবসময়ই মানুষ তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো তাঁকে দেখার জন্য। আর সবার আশা ছিল বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে পারলে হয়তো কিছু দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে। তখন তো এই মোবাইল একেবারেই ছিল না। বলতে গেলে এই রেডিও, টেলিভিশন সবই ছিল পাকিস্তানিদের দখলে। আর পত্র-পত্রিকায় যেগুলো বের হতো, এই ব্রেকিং নিউজ বলতে কিছুই ছিল না। খবর জোগাড় করতে হতো। আর আমাদের সুবিধা ছিল, হলে থাকার ফলে অনেকের কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যেত। বঙ্গবন্ধু কোথায় যাচ্ছেন, যখন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে মিটিং তখন আমরা হল থেকে বের হতাম। মনে হয় পনেরো-কুড়ি মিনিট হাঁটলেই সেখানে চলে যেতে পারতাম। সেইজন্য সুযোগগুলো আমরা বাদ দেইনি। যখন বঙ্গবন্ধু ভিতরে আলোচনা করছেন, আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছি— মনে হচ্ছে আমরা আছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। এই অনুভূতিটা ঠিক বোঝানো মুশকিল। এখন কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথে ছাত্ররা এভাবে থাকে, এরকম দাবি করতে পারবেন বলে মনে হয় না আমার।

যা হোক, এই হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার স্মৃতি।

তবে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে আমার কিছুটা দূরের মানুষ মনে হয়েছে। সেটা সবসময়ই হয়। কারণ একজন মাঠের মানুষ যখন ঘরের মধ্যে (গণভবনে) চলে গেলেন তখন মনে হলো যে, এখন তো আর সেই বঙ্গবন্ধুকে পাবো না, কারণ তিনি এখন সরকার পরিচালনা করছেন, তবে তখন দেশ নিয়ে আমাদের বিশেষ কোনো দুশ্চিন্তা ছিলো না, কারণ দেশের ভার তিনি গ্রহণ করেছেন। এরপর যখন তাঁকে হত্যা করা হলো তখন যে শূন্যতা অনুভব করেছিলাম তার কোনো তুলনা নেই। একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার মতো, বিমূঢ় হয়ে যাওয়ার মতো। ওইদিনটা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। যা হোক, আনন্দ এখানে যে, তাঁকে যে একসময় অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার যে চেষ্টা করা হচ্ছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। আমি আগে থেকেই জানতাম যে, সেটা কখনই সম্ভব নয়। এখন তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে চিনছে, তাঁর আদর্শকে ধারণ করার চেষ্টা করছে, আমার কাছে এগুলো খুবই ভালো লাগছে। আর আরেকটা আনন্দের ব্যাপার হলো, তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বেরিয়েছে, আমি মনে করি এটা জাতিকে বিভিন্ন অপ্রকাশিত ঘটনা জানাবে এবং দিক নির্দেশনা দেবে। পুনর্মুদ্রণ

>>>শ্রুতিগ্রহণ ও শ্রুতিলিখন : আমিনুল ইসলাম
>>বাংলা ট্রিবিউন, আগস্ট ১৫ , ২০১৯ থেকে

Sunday, February 10, 2019

‘নূরজাহান’ : সময়কে ছাড়িয়ে যায় যে গল্প by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সিলেটের মৌলভীবাজারের ছাতকছড়ায় একটি মেয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। সেই ‘অপরাধে’ তাকে শাস্তি দিয়ে ফতোয়া দিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম। মেয়েটিকে বুক পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর ছোড়া হলো। পাথর তার মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করে দিল, কিন্তু তার থেকে বেশি ক্ষতবিক্ষত করল তার আত্মসম্মানবোধকে, মানুষ হিসেবে তার পরিচিতিকে এবং সমাজ, মানুষ ও ধর্মের ওপর তার বিশ্বাসকে। এক বিশাল অবিশ্বাস এবং অপমানের ভার সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করল।
আমাদের সকলের মতো ইমদাদুল হক মিলনের মনেও ঘটনাটি গভীর দাগ কাটল। মেয়েটির জন্য তাঁর গভীর মমতা হলো; যে ইমামের ফতোয়া মেয়েটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল, তার প্রতি তাঁর ঘৃণা জাগল। কিন্তু মেয়েটিকে তাঁর সহানুভূতি, তাঁর ভালোবাসা যে জানাবেন, তার কোনো উপায় নেই। মসজিদের ওই ইমামকে তিনি হয়তো তাঁর ঘৃণার কথা জানাতে পারতেন, কিন্তু তাতে তার কোনো বিকার হতো, তার বিবেক আর অপরাধবোধ জাগত—তেমন সম্ভাবনা ছিল না। মিলন সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি একটি উপন্যাসে মেয়েটিকে আঁকবেন, পাঠকের মনে চিরকালের জন্য একটা জায়গা তাকে করে দেবেন। আর নিষ্ঠুর ইমামকে তিনি পাঠকের আদালতে হাজির করবেন দিনের পর দিন, তারা তাকে শাস্তি দেবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ যা, আমাদের চারদিকে প্রচুর বিপন্নতা নিয়ে বেঁচে থাকা বাস্তব জীবনের এ রকম মেয়েগুলোকে পাঠকরা সুরক্ষা দেবে, বাস্তবের বিবেকহীন হন্তারকগুলোকে তারা প্রতিরোধ করবে। একটি উপন্যাসের অনেক শক্তি, অনেক দূর সে যেতে পারে। পাঠককে জাগাতে পারে। তাকে শুদ্ধ করতে পারে।
মিলন তাঁর লেখার শক্তিতে বিশ্বাসী, সে জন্য তাঁর লেখা পাঠককে স্পর্শ করে। যেমন তাঁর ‘পরাধীনতা’ আমাকে স্পর্শ করেছিল, এবং আমি স্পর্শিত হওয়ার কথাটা লিখে বর্ণনা করেছিলাম। তাঁর ‘নূরজাহান’ও আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অনেক দিন পর এ বইটি নিয়ে লিখছি, যদিও মিলনের অনেক উপন্যাস আমি পড়েছি, নানা মাত্রায় সেগুলোর অভিঘাত আমি উপলব্ধি করেছি; কিন্তু ‘নূরজাহান’ এগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, যার প্রধান কারণ এর এপিক বিস্তার। তবে উপন্যাসটির প্রায় ১১০০ পৃষ্ঠার কলেবর এই বিস্তার তৈরি করেনি, করেছে মিলনের কল্পনার বিশালতা—এক সামান্য গ্রামের অসামান্য এক জীবনচিত্রকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সচল রাখার তাঁর ক্ষমতা; এক বিশাল ক্যানভাসে অসংখ্য চরিত্রকে তাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত আর সামষ্টিক জীবন নিয়ে হাজির করা, ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তের দিকে গল্পরেখাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া আর মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি আর ঋতুবদলের ভেতরের রসায়নগুলোকে সম্পৃক্ত করার তাঁর দক্ষতা। মিলন সংবেদী লেখক, তিনি একটা কোমল হাত রাখেন তাঁর অকিঞ্চিৎকর সব চরিত্রের পিঠে, তাদের আনন্দে হাসেন, তাদের দুঃখে কাঁদেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় এর প্রকাশ্য ছায়াপাত ঘটাতে দেন না। তিনি অনেক ঘটনায় নিজেকেও বিনিয়োগ করেন, তাঁর পক্ষপাতিত্ব আমরা টের পাই, তাঁর ক্রোধ অথবা পুলক আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু সেগুলো গল্পের একটা গভীরেই শুধু সক্রিয় হয়। গল্প বলায় তিনি একটা বস্তুনিষ্ঠতা মেনে চলেন। ফলে পাঠক একটি ঘটনার অনিবার্যতাকে যেমন বাস্তবের কার্যকারণ সূত্রে ফেলে মাপতে পারেন, তেমনি এর পেছনে লেখকের পক্ষগ্রহণের বিষয়টিও অনুধাবন করেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, উদাহরণটি ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের শেষ দিক থেকে নেওয়া (শুরুর থেকে উদাহরণ দিলে হয়তো যথাযথ হতো, কিন্তু শেষ দিকের উদাহরণটি এমনই প্রাসঙ্গিক আমার ওপরের বক্তব্যের সঙ্গে যে তা দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না)।
নূরজাহানকে ফতোয়া দিয়ে দুজন শাগরেদ লাগিয়ে তাকে একটা গর্তে পুরে মসজিদ বানানোর খোয়া—সুরকি ছুড়ে মাওলানা মান্নান তার প্রতিহিংসা মেটাল। নূরজাহানের মুখ ও মাথা রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হলো, সে একসময় টলতে টলতে উঠে বাড়ি গিয়ে অ্যানড্রিন খেল, এবং তার মারা যাওয়ার পর মেদিনীমণ্ডলের দৃশ্যপট বদলে গেল। পুলিশ এলো এবং মাওলানা মান্নানকে ধরে নিয়ে গেল কোমরে দড়ি দিয়ে, যে রকম দড়ি দিয়ে নিষ্পাপ মাকুন্দা কাশেমকে সে চোর সাজিয়ে গ্রাম থেকে বিদেয় করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের এক কর্তা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এবার রাজাকার মাওলানাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পিছু পিছু তাড়া করে আসা বাদলা নাদের হামেদ আলালদ্দি বারেকের মতো কিশোর তরুণরা পাষণ্ড মাওলানাকে যখন ঢিল ছুড়ে মারছে, সে কিছুই বলল না। মাওলানার মুখে-মাথায় ঢিল পড়তে দিল। মিলন এরপর লেখেন, “আর কথা নাই। হালটের পাশ থেকে তুমুল ক্রোধে বৃষ্টির মতন চাকা পড়তে লাগলো মান্নান মাওলানার মুখে। হাত তুইলা, মুখ নিচা কইরা, চিৎকার চেঁচামেচি কইরা নানানভাবে পোলাপানের চাকার হাত থেকে নিজেরে রক্ষা করতে চাইলো, পারলো না।” এই বর্ণনা কি কোনো চরিত্র দিচ্ছে? না, দিচ্ছেন লেখক। কিন্তু তিনিই তো এর অনেক আগে মান্নান মাওলানা আর তার ছেলে আতাহারের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার মাকুন্দা কাশেমের ভয়ার্ত আর্তনাদ এবং সেই আর্তনাদে তার শেষ হতে যাওয়া আয়ু কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখার নিষ্ফল চেষ্টার পর লিখেছিলেন, “মাকুন্দা কাশেমের বুকফাটা আর্তনাদে তখন স্তব্ধ হয়েছিল জেগে ওঠা মানুষ, ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল শীতরাত্রির নিস্তব্ধতা।” এই ভাষিক পরিবর্তন কেন? কিশোর-তরুণদের হাতে মান্নান মাওলানার শাস্তি পাবার দৃশ্যে কেন তিনি চলে গেলেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ভাষায়, ক্ষণিক ছুটি নিলেন সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর অবস্থান থেকে, হয়ে গেলেন বাদলা নাদের হামেদদের একজন?
উদাহরণটি আমি দিয়েছি লেখকের পক্ষগ্রহণের প্রসঙ্গে। রাজনীতিতে যেমন শেষ বিচারে নিরপেক্ষতা বলে কেউ নেই—যিনি একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যান না, তিনিও একটি পক্ষ নেন, হয়তো নির্বাচনের অসারতার বিপক্ষেই—লেখালেখিতেও নিরপেক্ষতা একটি আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। যাঁরা সমাজ নিয়ে লেখেন, সমাজের অসংগতি-অবিচার আর স্খলন-পতন নিয়ে লেখেন, তাঁরা ক্ষমতার আর বিত্তের বিপরীতে থাকা মানুষগুলোরই পক্ষ নেন। এই পক্ষগ্রহণ বেশির ভাগই প্রচ্ছন্ন; প্রায়ই তার আয়োজন থাকে না, উত্তেজনাও থাকে না। মিলনও অনেক উপন্যাসে এই পক্ষপাত প্রচ্ছন্নই রাখেন, কিন্তু ‘পরাধীনতা’ ও ‘নূরজাহান’-এ এটি অনেকটাই স্পষ্ট। ‘পরাধীনতা’য় দুই পক্ষ ছিল, অথবা দুটি পক্ষের অনেক রূপ ছিলÑদেশ-বিদেশ, মুক্তি-অন্তরিনতা, বস্তুর নিগড়-কল্পনার উড়াল, যন্ত্র-মানুষ। ‘নূরজাহান’-এ মিলন নিজে আছেন, এবং তাঁর যে সত্তার আড়ালে বর্ণনাকারী তার গল্প বুনে যায়, নিঃশব্দে জাল বুনে যাওয়া কোনো মাকড়সার মতো, সে নিজেই তো রক্তাক্ত। রূঢ় বাস্তব, বাস্তবের কল্পনা আর কল্পনার বাস্তব এমন অনিবার্যভাবে মিলে যায় এই উপন্যাসে যে, কোনো ঘটনাকেই আর কল্পিত মনে হয় না।
‘নূরজাহান’-এর গল্প জীবন পায় মিলনের চেনা অন্তরঙ্গ ভ‚গোলে, তাঁর নিজের উঠানে। এই উঠানে তাঁর অধিকার ষোলো আনা। এর চরিত্ররা তাঁর চেনা, এর গাছপালা বিছিয়ে থাকে তার করতলে। এই উঠানে যখন কোনো অপচ্ছায়া পড়ে, একটি দুরন্ত কিশোরীকে বেঁধে ফেলে তার অপরিষ্কার শেকলে, তখন তিনিও জেগে ওঠেন। ‘নূরজাহান’ এ জন্য এত টানে আমাদের। আধুনিক সাহিত্যের তাত্ত্বিকরা বলবেন, ওই পক্ষগ্রহণ গল্পের জন্য ক্ষতিকর; উত্তরাধুনিক তত্তের প্রবক্তারা বলবেন, এতে কোনো দোষ নেই—বস্তুত গল্পকে তা মানবিক করে। মিলন উত্তরাধুনিক লেখক নন, কিন্তু তিনি গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। সেই ঐতিহ্যে পক্ষগ্রহণ একটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বিষয়টা আরো গভীর—এবং তা হচ্ছে, পক্ষগ্রহণে গল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না!
মিলন দেখান, ক্ষতি নয়, তাতে লাভ হয়। একটা বিশাল ক্যানভাসের কাজ একটা জায়গা খুঁজে পায়। নূরজাহানের পুনজন্ম হয়, পাঠকের চেতনায়। পৃথিবীর সব মান্নান মাওলানা একজোট হয়েও তাকে আর মারতে পারে না।
‘নূরজাহান’-এর শেষ অংশটি আমার বিস্ময় জাগিয়েছে। মিলন যেভাবে ঋতু ধরে ধরে অগ্রসর হয়ে মেদিনীমণ্ডল গ্রামটির একটি চালচিত্র মেলে ধরেছেন, তাতে মান্নান মাওলানার চরিত্রটি অপ্রতিরোধ্য মনে হয়েছে। মাকুন্দা কাশেমকে পিটিয়ে মৃতপ্রায় করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পর তার অবস্থান আরো পোক্ত হয়েছে। এই উপন্যাসের খল চরিত্রগুলো প্রায় সবাই একটা অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে চলে যায়। আতাহার, সড়কের কন্ট্রাক্টর আলী আমজাদ এবং আতাহারের সাঙ্গোপাঙ্গকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে তেমন মনে হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের পরাজিত হওয়া তো দূরের কথা, তাদের কেউ বিপদে ফেলতে পারে, সে রকম ভাবারও কথা নয়। কিন্তু সবাই তারা হেরে যায়। মান্নান মাওলানার মুখে যেদিন নূরজাহান থুতু ছিটিয়ে দিল, সেদিন থেকেই তার সেই পরাজয়। ধূর্ত ও নিষ্ঠুর এই মাওলানা এরপর প্রতিশোধ নিতে নামল। তার পরিকল্পনা ধরে সে এগোল। দেলোয়ারার ভালোমানুষি এবং এনামুলের বদান্যতায় সে একটি মসজিদের ইমাম হলো। এর আগে সে নূরজাহানকে স্ত্রী হিসেবে অধিকারের চেষ্টা করে বিফল হলেও প্রতিশোধটা সে ঠিকই নিল। তার বিরুদ্ধে একটা ফতোয়া দিয়ে নিজেই বসল বিচারে। এইখানে এসে মিলনের জন্য দুটি পথ খোলা ছিল—তিনি বাস্তবকে মেনে নিয়ে মান্নান মাওলানাকে তার বিজয়মুহূর্তে ছেড়ে দিতে পারতেন, এবং নূরজাহানকে এক হতভাগ্য ও ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে তার করুণ পরিণতির কাছে সমর্পণ করতে পারতেন, যা পাঠককে একসময় একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলতে বাধ্য করত, “এ আর এমন কী, বাংলাদেশের নূরজাহানদের কপালে এই তো লেখা থাকে, আর বাংলাদেশের মান্নান মাওলানাদের এমনই তরক্কি হয়”; অথবা মান্নান মাওলানার পরাজয়টা দেখাতে পারতেন। তিনি দ্বিতীয় পথটা শুধু বেছে নেননি, এই পরাজয়কে একটা প্রতীকী মাত্রায় বাংলাদেশের জেগে ওঠা হিসেবেও দেখিয়েছেন। মাকুন্দা কাশেমের মৃত্যুর সময় জেগে ওঠা মানুষ স্তব্ধ হয়ে ছিল, মান্নান মাওলানার শাস্তি নিশ্চিত করার সময় জেগে থাকা মানুষ স্তব্ধতা ভেঙে সক্রিয় হয়েছে। সক্রিয় হয়েছে কিছু কিশোর—নতুন প্রজন্ম যারা, এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও, তবে সবচেয়ে বড় কথা, সক্রিয় হয়েছে মানুষের বিবেক, এমনকি প্রকৃতিও। সত্য যে, এই শাস্তি দেওয়াটা একটা রূপকথার আদল দিয়েছে গল্পটাকে, কিন্তু এটি জেগে ওঠা মানুষের রূপকথা, মিলন যার রূপকার। ‘নূরজাহান’-এর শেষে এসে সরাসরি পক্ষ নিয়েছেন মিলন, কিন্তু এই পক্ষ নেওয়ায় গল্পের আড়ালে জেগে থাকা ইতিহাসটা স্বস্তি পেয়েছে, সত্য জেগে উঠেছে।
ছাতকছড়ায় যে নূরজাহান ছিল, সেও মরেছিল ফতোয়ার আঘাতে। মেদিনীমণ্ডলের নূরজাহানও। মিলন একবার পক্ষ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিশ্রম করেছেন তাঁর অবস্থানটি সত্য, ন্যায় ও ধর্মের আলোকে উপস্থাপন করতে। এ জন্য ফতোয়াকে তিনি ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে পড়েছেন। অসংখ্য বই পড়েছেন। রীতিমতো গবেষণা করেছেন—যেন তিনি উপন্যাস নয়, একটি অভিসন্দর্ভ লিখেছেন। কত অভিনিবেশ নিয়ে তিনি ইসলামের নীতি ও বাণীগুলো খুঁটিয়ে পড়েছেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনী ও হাদিস পড়েছেন, ধর্মের ব্যাখ্যা এবং ইসলামে নারীর অধিকার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন। ধর্মের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল, কারণ তিনি সেই লোকজ ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছেন, যা ধর্মের সত্যিকার সারটুকু গ্রহণ করে, এবং করে সমৃদ্ধ হয়। তাঁর এই উপন্যাসে মান্নান মাওলানার এক বিপরীত চরিত্র আছেন, মাওলানা মহিউদ্দিন, যিনি ইসলামের মূল্যবোধগুলো ধারণ করে এক শীতল ছায়া মেলে ধরেন প্রতিটি মানুষের মাথায়। মান্নান মাওলানা গ্রামের ছনু বুড়ি মারা গেলে তার জানাজা পড়াতে অস্বীকার করল, যেহেতু ছনু বুড়ি টুকটাক চুরি করে, যদিও পেটের দায়ে। মাওলানা মহিউদ্দিন তার জানাজা পড়ালেন, তার ছেলেকে সান্ত্বনা দিলেন। তাঁকে দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।
মাওলানা মহিউদ্দিনের চরিত্র কি তাহলে একটা ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস, এ কথা প্রমাণ করতে যে মান্নান মাওলানারা ব্যতিক্রম, মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবরাই নিয়ম। না, এর কোনোটিই না। মিলন কোনো শ্রেণি নয়, মানুষ ধরে ধরে এগোন। তাঁর প্রতিটি মানুষই আলাদা। মাওলানা মহিউদ্দিন তেমনই এক মানুষ। প্রথমত তিনি মানুষ, ভালো মানুষ, যেমন দবির গাছি ভালো মানুষ, মরণি ভালো মানুষ, ফুলমতি ভালো মানুষ। তারপর তাঁর কিছু দায়িত্ব আছে, তিনি মসজিদের ইমাম। সেই দায়িত্ব তিনি সুচারুভাবে পালন করেন। দবিরও তার দায়িত্ব পালন করে, মরণিও। মানুষের অবস্থানেই এরা মর্মস্পর্শী।
একই কারণে মান্নান মাওলানার পরাজয়টা বাস্তবকে পাশ কাটিয়ে রূপকথার অঞ্চলে চলে গেলেও এক হিসাবে এই পরাজয়ের কারণটা তার মানুষ হিসেবে অকৃতকার্য হওয়ার জন্য। আতাহারও শক্তিশালী ছিল, কপট ও ভণ্ড ছিল; সে মদ খায়, বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গী করে সন্তানও উৎপাদন করে, এবং স্বার্থপরতার প্রয়োজনে বাবার কুকর্মকে সমর্থন করে। কিন্তু যেদিন তার মা তার মিথ্যাবাদিতার প্রমাণ পেয়ে (এবং একই সঙ্গে স্বামীর মিথ্যাবাদিতার নতুন কিস্তির সন্ধান পেয়ে) অবিশ্বাস ও ঘৃণা নিয়ে হৃদপিণ্ডের দুর্বলতায় মারা গেলেন, সেদিন আতাহারের মনুষ্যত্বের কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না। মাওলানাবাড়ির বঞ্চনায় পোড়া অতৃপ্ত পারুকে অনেক দিন আতাহার তার অধিকারে রেখে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে তার সঙ্গে। কিন্তু বাবার বাড়ি ফেরত যাওয়া পারু তাকে পথ দেখিয়ে দিল। তার শত অনুনয়েও পারুর মন গলল না, বরং আতাহার ও তার বাবাকে ‘গুয়ের পোকা’ অভিধা দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। আতাহার কাঁদল, কপাল চাপড়াল, কিন্তু পারুর অবস্থানের উনিশ-বিশ হলো না। গুয়ের পোকাই বটে, মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটা না থাকলে এ রকমই তো হওয়ার কথা।
ঠিকই পরাজিত হলো আলী আমজাদও। উপন্যাসের শুরুতে সেও ছিল অপ্রতিরোধ্য। নূরজাহান তাকে চিনেছিল, কিন্তু কিশোরী নূরজাহান তখনো তার জগৎটাকে দেখছে মাওয়া সড়কের মতো এক বিস্ময় হিসেবে—যেন দূরের জগতের সঙ্গে এক বিস্ময়কর যোগাযোগ অপেক্ষা করছে তার জন্যও। আমজাদেরও কুদৃষ্টি পড়েছিল নূরজাহানের ওপর, কিন্তু ভাগ্য মেয়েটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তবে আমজাদের নিষ্ঠুরতার বলি হতে হয়েছে বদর ও হেকমতকে এবং এক দুর্ঘটনায় তারই সড়ক নির্মাণের শ্রমিকদের ফেলা মাটিতে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মজনুর বাবা আদিলদ্দিকে। আদিল নামাজ পড়তে ঢালের দিকে বসেছিল। একসময় আমজাদের বাড়তে থাকা পাপ তাকে কাবু করেছে। সেও পরাজিত হয়েছে, নিজের লোভ ও ক্ষমতার নির্মমতার কাছে।
ইংরেজিতে যাকে ‘ক্যামিও’ বলে, সে রকম একঝলক দেখা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে আরেক অমানুষ, রিকশাচালক রুস্তম। গ্রামের পাগলি মেয়ে তছিকে সে ফুসলিয়ে রিকশায় চড়িয়ে নিয়ে গেছে এক বাজারে মুরলিভাজা কিনে দেওয়ার জন্য। সেখানে সে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে অরক্ষিত ওই মেয়েটিকে। কিন্তু তছি সাধারণ মানুষ নয়, তার অতিমানুষি কিছু শক্তি আছে, অমানুষ হতে থাকা একটি পাষণ্ডের জন্য যা ভয়ংকর। রুস্তম পরাজিত হয় তার লালসার কাছে, তছি হয় তার শাস্তির নিমিত্ত। তবে তছির জীবনও তারপর পাল্টে যায়। পাগল হোক যা-ই হোক, জীবনবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর একটি-দুটি অন্তত সে বুঝতে পারে, বাস্তবের আইন আর অপরাধ-শাস্তির দু-এক ধারা সম্পর্কেও তার ধারণা আছে। তবে আমার শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, তছি পুলিশের হাতে পড়বে না। কারণ তছি পুলিশের চালাক পৃথিবী আর আইনের ছোট-লম্বা হাতের মাপের বাইরের এক অস্তিত্বের নাম।
অবাক, নানা বয়সের নারীরাই এই উপন্যাসের মনুষ্যত্বকে জাগায়, প্রখর করে, তার বিপন্নতাকে নিজেদের জীবনের বিনিময়েও রক্ষা করে। নূরজাহান যখন থুতু ফেলল মান্নান মাওলানার মুখে, সে তার নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাকে ত্বরান্বিত করল। সেই মনুষ্যত্ব আমরা দেখলাম বাদলা নাদের এবং অন্যান্য কিশোরের মধ্যে। তছি স্বাভাবিক মানুষ নয়, তবু সে ওই অসমাপ্ত মানুষিতা দিয়েও মনুষ্যত্বকে ওপরে নিয়ে গেল। আর পারুর নিজের জীবনে ছিল এত অসম্পূর্ণতা, অনেক স্খলনও। তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোটাও একটু কঠিন। কিন্তু সেও এক অমানুষকে অরক্ষিত করে দিয়ে মনুষ্যত্বকেই জাগাল।
মনুষ্যত্ব ছিল মরণির, ফিরোজার, নূরজাহানের মা হামিদার, কিছুটা দেলোয়ারার, এমনকি মান্নান মাওলানার স্ত্রীরÑনিজের নিজের মতো মাপে। সন্দেহ নেই মিলনের নারী চরিত্রদের গভীরতা প্রচুর, তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যও অনেক। কে ভেবেছে নূরজাহানকে দুদণ্ড শান্তি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া রব্বানের প্রথম স্ত্রীও অনুশোচনা করবে নূরজাহানের জন্য, তার মনটা খারাপ হবে? বাস্তবের এই চরিত্রগুলোর হাত-পা এমনি বাঁধা, তারা প্রথা ও প্রচলের দাস হয়েই জীবন যাপন করে, পুত্রবধূ-শাশুড়ি সম্পর্কটা সমস্যাসংকুল, একান্নবর্তী বাড়িতে সংসারের জীবনটা তো আরো। আর এইসব সমস্যা ও অসুখ তৈরি করে পিতৃতান্ত্রিকতা। কিন্তু মিলনের কৃতিত্বটা এই—তাঁর নারীরা এসব সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেই একটা-দুটা মহিমার অবস্থানে চলে যায়, যাকে অন্যভাবে বললে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাও বলা যায়। ছনু বুড়ির পুত্রবধূ যে বানেছা—যার কাজ ছিল শাশুড়ির জীবনটা ভাজা ভাজা করা—একসময় সেও শাশুড়ির দুঃখে কাতর হয়, মেয়েকে বলে, শাশুড়ির সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করে সে অপরাধ করেছে।
‘নূরজাহান’-কে ঘনিষ্ঠভাবে পড়লে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, প্রথমত মিলন এটিকে একটি এপিকধর্মী ব্যাপ্তি দিতে চেষ্টা করেছেন। তিন খণ্ডে—এবং খণ্ডগুলোর মধ্যে সময়ের অনেক দূরত্ব—লিখলেও উপন্যাসটির ভেতর একটি ব্যাপক ঐক্য আছে, বিশালতা আছে। আমার মনে হয়েছে, এপিকধর্মী যেকোনো কাজের মতোই এ উপন্যাসটিকে তিনি একটি সুচারু চিন্তা, নীতিবোধ অথবা শ্রেয়বোধের একটি কাঠামোর ভেতর স্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। এ জন্য পাপ-নিষ্পাপতা, নীতি-নীতিহীনতা, পাশবিকতা-মনুষ্যত্ব, সংকীর্ণতা-উদারতার একটা ডায়ালেকটিক বা দ্বন্দ্বমানতা সক্রিয় থাকে পুরো উপন্যাসে। কিন্তু এই দ্বন্দ্বমানতা উপন্যাসটির কোনো সরল পাঠ উপহার দেয় না, যেহেতু এপিকধর্মী লেখার মতো এ উপন্যাসেও চরিত্রগুলো তাদের জীবনকে ছাপিয়ে ওঠে। পশ্চিমা এপিকধর্মী লেখায় সাধারণত ‘সাধারণ’—অর্থাৎ আটপৌরে, প্রান্তিক—মানুষজনের ভূমিকাটা থাকে সীমিত, কিন্তু মিলন এদেরকেই উপজীব্য করেন। এক এনামুল ছাড়া কেউই প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক নয়। তবে এনামুলের টাকা থাকলেও আভিজাত্য নেই, সে কুলীন শ্রেণিতেও পড়ে না। মেদিনীমণ্ডলের সামান্য সামাজিক ভূগোলে স্থাপিত মানুষগুলো যখন জীবনকে ছাড়িয়ে বড় হতে থাকে, তখন বুঝতে হয় এর পেছনে আছে কল্পনার ব্যাপ্তি। প্রকাশের শক্তি আর গল্প-কাঠামোকে টান টান রেখে পাঠককে ধরে রাখার লেখকের দক্ষতা।
তবে এর বাইরে যা আছে, যা উপন্যাসটিকে গতিশীল, পরিব্যাপ্ত করে, বাবুই পাখির বাসার মতো এক আশ্চর্য কাঠামো নিয়ে আমাদের মনে জেগে থাকে, তা হচ্ছে এর পেছনে মিলনের বিনিয়োগ। মিলনকে অমনোযোগী লেখক কেউ বলবে না, যদিও তাঁর দু-একটি উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে নিজেকে যথেষ্ট সময় দেননি, যেটুকু যত্নবান তিনি ভাষার প্রতি, চরিত্র সৃষ্টির প্রতি, ততটা যত্নবান হননি। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এ নিজেকে শতভাগ দিয়েছেন তিনি। আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস লিখেছিলেন, প্রতিটি লেখায় তিনি নিজেকেই পুনর্নির্মাণ করেন। ‘নূরজাহান’-এর ক্যানভাসজুড়ে আছে মিলনের সংবেদী সত্তা, কিন্তু এতে তিনি একটি গল্প শুধু নির্মাণ করেননি, করেছেন নিজের জানা পৃথিবীটাকেও, নতুন করে, এবং পুনর্নির্মাণ করেছেন নিজেকেও। উপন্যাসের শেষে ‘লেখকের বক্তব্য’ অংশে তিনি প্রকারান্তরে এটি স্বীকারও করে নিয়েছেন। নূরজাহান মেয়েটি তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, তৃতীয় খণ্ডে এসে তার হাত থেকে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা, কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি দেখতে পান, মেয়েটি তাঁর অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে। এ এক অপূর্ব রাসায়নিক সংবদল। লেখক যখন চরিত্রকে এতটা অন্তস্থিত করেন, চরিত্র তাঁকেও বদলে দেয়। নূরজাহানকে মিলন দেখেন বাইরে থেকেও, তাঁর সচল ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার অস্থির ছুটে চলা, তার নিষ্পাপ আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। ভেতরের আর বাইরের নূরজাহানের যোগফল এক অসাধারণ চরিত্র সৃষ্টি করে, যার বড় একটা শখ হচ্ছে ছুটে বেড়ানো। সেই নূরজাহানই শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ পড়ে থাকে, মানুষের আর অ্যানড্রিনের বিষে নীল, মিলন এ উপন্যাসে নিজেকে বিনিয়োগ করেছেন বলে এর বোধগুলো শুদ্ধ। বোধের প্রকাশগুলো শুদ্ধ। ভাষাটিও শুদ্ধ, মাটির কাছে। ‘নূরজাহান’-এর আগে একই উপন্যাসে কোনো বর্ণনাকারী তাঁর আখ্যানের জন্য একই সঙ্গে প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, তেমন নজির আমার স্মৃতিতে নেই।
মিলন বিনিয়োগ করেছেন মেদিনীমণ্ডলের ভ‚গোলে, সমাজে, এর নিত্যদিনের জীবনে। ফলে যত ভূদৃশ্য তিনি বর্ণনা করেন, শীত-বসন্ত-বর্ষার পালাবদলের চিত্র আঁকেন, তার প্রধান পরিচয় হয় বিশ্বস্ততা। সামাজিক সম্পর্ক, আচার এবং প্রতিদিনের কাজকর্ম ও পেশার বর্ণনাতেও থাকে বস্তুনিষ্ঠতা। তবে সবচেয়ে যা টানে পাঠককে, তা অত্যন্ত সামান্য, সীমাবদ্ধ ও সাদামাটা জীবন নিয়েও চরিত্রগুলোর জীবন্ত হয়ে ওঠা। এক গ্রাম চরিত্র আছে উপন্যাসটিতে, এবং তারা সবাই খুব সাধারণ। দবির গাছি অথবা আজিজ গাওয়ালি, কুট্টি অথবা আলফু, রাবি অথবা মোতালেব—এদের কী দাবি আছে সাহিত্যের কাছে, জীবনের কাছে? ছায়ার মানুষ তারা—এ রকম এক শজন আমাদের ঘিরে রাখলেও কি তাদের চোখে পড়ে আমাদের? কিন্তু মিলন শুধু তাদের দেখেনইনি, তাদের স্থান দিয়েছেন সাহিত্যের শুদ্ধ কল্পনায়।
-------২-------
‘নূরজাহান’ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে, জয়নুলের বড়মাপের স্ক্রলচিত্রের মতো, তা শুধু এর ব্যাপ্তি নয়, এর গভীরতার জন্যও। ধরা যাক কুট্টি ও আলফুর কথা। দরিদ্র কাজের মেয়ে কুট্টি, কাজের লোক আলফু। তাদের চোখে পড়ারই কথা নয় কারো। কিন্তু তাদের প্রেম হয়, প্রেমটাও একটু জটিল, যেহেতু আলফুর স্ত্রী-সন্তান আছে। মিলন এই প্রেমের বর্ণনা দেন এক প্রসন্ন রোমান্টিকতায়, যেন তারা কত কুলীন মানুষ, যেন তাদের জীবনে কত সংস্কৃতি আর শিক্ষা আছে, শুদ্ধ ভাষা চর্চা আছে! অথচ কত সীমাবদ্ধ তারা, এই গ্রামের বাইরের জগৎটা কুট্টির হয়তো দেখা হয়নি। যখন এ রকম দুই মানুষের প্রেমকে বর্ণনায়-বিশ্লেষণে নিয়ে আসেন মিলন, তাতে একটা গভীরতা আসে, যে গভীরতা অনুভবের, অন্তর্দৃষ্টির। দ্বিতীয় একটি কারণ হচ্ছে ‘নূরজাহান’-এর কাহিনী, কাঠামো এবং দর্শনগত ঐক্য। শুনতে অবাক লাগার মতো হলেও বলা দরকার, উপন্যাসটির একটি দর্শন আছে, নান্দনিকতার উদ্ভাস আছে, এবং তা জীবনকে ঘিরেই। নূরজাহানের অপমৃত্যু হয়, কিন্তু মৃত্যুতে সে শেষ হয়ে যায় না, বলা যায় পাঠকের চেতনায় তার পুনর্জন্ম হয়। মেয়েটিকে ঘিরে উপন্যাস, তার জীবনের এক সকালবেলা থেকে এর শুরু, এক অকালসন্ধ্যায় তার শেষ। নূরজাহানের জীবনটা যে রকম চলতে চলতে বদলে যায়, তাকেই মিলন সাক্ষী মানেন, আমাদের বলেন, জীবনের স্থায়িত্ব নেই, সুন্দরের আছে, সত্যের আছে। আর যে জীবন সুন্দরের, সত্যের, তার স্থায়িত্ব মহাজীবনের।
নূরজাহানের জীবনের সৌন্দর্য ও সত্যগুলোকে উদ্ঘাটন করেছেন, বর্ণনা করেছেন, সাজিয়েছেন মিলন। এ জন্য নূরজাহান এ রকম এক মোহ-ধরানো চরিত্র পাঠকের জন্য। তার খুব কাছে আসতে পেরেছিল মজনু নামের ছেলেটি, যাকে মেয়েটি ভালোবেসেও ছিল। কিন্তু মজনুর শক্তি নেই কোনো কিছু করার, কোনো কিছু বদলে দেওয়ার। সে গ্রামে থাকে না, যদিও শহরে থাকার সময় গ্রামটা থাকে তার ভেতরে। মজনুর সঙ্গে যে নূরজাহানের সম্পর্ক হবে না, বিয়েও হবে না, সেটি মনোযোগী পাঠক বুঝতে পারেন। এই গ্রামে মজনু থাকবে না, তার পেশা ও ভবিষ্যৎ শহরে, নূরজাহানও গ্রাম ছেড়ে বাইরে যেতে পারবে না। টমাস হার্ডির কয়েকটি উপন্যাসের পটভ‚মি ইংল্যান্ডের ওয়েসেক্স অঞ্চল, যা চরিত্রদের ধরে রাখে নিয়তির মতো। ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য নেটিভ’ উপন্যাসের ইউস্টাসিয়া ভাই নামের মেয়েটি পালাতে চায় এই জায়গা থেকে, যেখানে আশা বা ভবিষ্যৎ নেই। প্রেমিকের হাত ধরে পালায়ও সে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না, ওয়েসেক্স অঞ্চলেই সে অঘোরে মারা পড়ে। মেদিনীমণ্ডলও নূরজাহানের নিয়তি, যে নিয়তির সুতা ধরে টান দেয় মান্নান মাওলানার মতো লোকেরা। হার্ডির মতো ট্র্যাজিক বোধ মিলন জাগান ‘নূরজাহান’-এ। দেখান সময়, স্থান আর ইতিহাস কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। নূরজাহান সংগ্রাম করে তার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, কিন্তু পরাজিত হয়। মাওয়া সড়কটি তাকে টানে, কিন্তু সেও হয়তো জানে, এই সড়কটি তার জন্য নয়। এই সড়ক গিলে নেয় ছেলের জন্য কাতর আদিলদ্দিকে। আদিলদ্দিরও পথ শেষ হয় মেদিনীমণ্ডলে। এবং, মান্নান মাওলানারও।
‘নূরজাহান’-এর এক বড় শক্তি এর আকর্ষণীয় দৈনন্দিনতা। মিলন একে বর্ণনা করেন অনেক দৃশ্য-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শে; প্রতিদিনের গৃহস্থালি চর্চা থেকে নিয়ে টুকটাক আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী অথবা পেশার বিবরণে কোথাও আরোপিত কিছু নেই, কষ্টকল্পিত কিছু নেই। যেন কেউ নির্মোহ এক চলমান ক্যামেরায় ধরে রাখছে প্রতিদিনের জীবন। মিলন বর্ণনাও করেন খণ্ডে খণ্ডে। চার পৃষ্ঠা বানেছার গল্প তো তিন পৃষ্ঠা নিখিলের কথা। কিন্তু টুকরো টুকরো এসব গল্প এক অবাক মোজাইক শিল্পের মতো পাশাপাশি জোড়া লেগে তুলে ধরে একটি গ্রামের অসামান্য কিছু ছবি। একটি বা একজনের ঘটনা থেকে অন্য বা আরেকজনের ঘটনায় মিলন যান অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে। একটা সুবিধা অবশ্য তিনি আদায় করে নেন তাঁর গতিশীলতার গুণে : কোথাও ছন্দপতন হয় না, কার্যকারণ সূত্রে ছেদ পড়ে না, যেন একটাই গল্প তিনি বলছেন, এক টানে।
মিলন না জানালে আমাদের কাছে এই রহস্যটা অজানা রয়ে যেত যে তিনটি খণ্ড তিনি সমাপ্ত করেছেন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। শেষ খণ্ডটি তিনি নিজেকে নিয়ে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এর কাহিনীরেখাটি এতটাই টান টান যে এই যুদ্ধের কোনো ছায়া সেখানে পড়ে না।
--------৩-------
মিলনকে দু-একবার বলেছি ‘নূরজাহান’ নিয়ে লিখব। কিন্তু লিখতে গিয়ে এতটা উত্তেজনা আর আনন্দ অনুভব করব, ভাবতে পারিনি। এটি সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া একটি উপন্যাস, অথচ কী সাধারণ এর গল্প—প্রতিদিনের, অতিচেনা। এই চেনা গল্পটিই মিলন লিখেছেন এতটা দরদ, শক্তি আর অধিকার নিয়ে যে শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক অলডাস হাক্সলির কথাটাই উপন্যাসটি প্রমাণ করে ছাড়ে : জীবনে যা সাধারণ, তাকেই অসাধারণ করে তোলা সাহিত্যের কাজ। সব সাহিত্যিক তা পারেন না, কয়েকজন পারেন।
মিলন সেই কয়েকজনের একজন।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

Tuesday, December 25, 2018

২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি হলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে -সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

২০১৪ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হলে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন না হলে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটা থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।
এবার ভোট কারচুপি করা অতোটা সহজ হবে না উল্লেখ করে প্রখ্যাত এই ছোটগল্পকার বলেন, ৯০ শতাংশ সুষ্ঠু হলে সেটাকে আমি সুষ্ঠু নির্বাচন বলে ধরে নিবো। ড. কামাল হোসেন ইতোমধ্যে বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে আপনারা (জনগণ) সতর্ক থাকবেন। আমি মনে করি এবার ভোট কেন্দ্রের আশপাশে অনেক বেশি সমর্থকরা থাকবেন। পরবর্তীতে নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ হেরে যায় তাহলে তাদের পক্ষে জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচিতে যাওয়া সম্ভব হবে না। তারা তো অনেক আগেই বলে দিয়েছে এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে না।
তিনি বলেন, এখন মানুষ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চায় না। এখন সরকারি দল হরতাল ডাকলেও হরতাল হবে না।
এরকম একটি পরিস্থিতিতে মানুষ চলে এসেছে। এখন মানুষ অর্থনীতির মানুষ হয়ে গেছে। রাজনীতির মানুষ নেই। রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করলেও মাঠে কর্মী-সমর্থকদের সংখ্যা খুব কম। তারা আয়-উপার্জন ও সংসার ধর্ম পালনে ব্যস্ত। ফলে আমার মনে হয় না নির্বাচনের পরে পরিস্থিতির কোন নাটকীয় পরিবর্তন হবে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন দেখছেন? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী অবস্থানে আসতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশন বলছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। আরেকজন কমিশন বলছে নেই। কাজেই আমার মনে হয় নির্বাচনী মাঠ মোটেই সমান নয়। সিইসির উচিত ছিল বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা। তাহলেই বুঝতে পারতেন যে আওয়ামী লীগ সবখানে যে সুযোগ পাচ্ছে বিএনপি তা পাচ্ছে না। এটা যদি হয় তাহলে নির্বাচনী প্রচারণা সুষ্ঠুভাবে হবে না। এবং প্রার্থীরা তাদের প্রার্থীতা সফল করতে পারবে না। এটা একটি প্রশ্ন থেকে যায়।
সেনাবাহিনী মাঠে নামলে অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ২৪ তারিখের পর ভালো থাকবে। কারণ সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে এবং যারা নির্বাচনে তষ্করবৃত্তি (ভোটচুরি) ও সংঘর্ষ করবে তাদের প্রতিহত করা হবে। এর আগে কম বেশি সংঘর্ষ হচ্ছে। সে সংঘর্ষে বিএনপি ঠিকভাবে প্রচারণা করতে পারছে না। তাদের বাধা দেয়া হচ্ছে। বিরোধীদলের কারো পান থেকে চুন খসলে সেখানে সমস্যা সৃষ্টি হয়। অথচ আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগের এক মন্ত্রী প্রচারণার কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে আচরণবিধী লঙ্ঘন করেছেন।

Tuesday, February 2, 2016

ভাষা নিয়ে কিছু সেকেলে ভাবনা by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হলে ভাষা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনাও যেন ১১ মাসের ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। একটি মাস ভাষা থাকে আমাদের মনোভূমিতে, পতাকা উড়িয়ে। ফেব্রুয়ারি শেষ হলে সেই পতাকা আবার আমরা নামিয়েও ফেলি, আমাদের মনোযোগ দখল করে নেয় অন্য সব জাগতিক বিষয়। ভাষা নিয়ে এই এক মাসের সক্রিয়তাকে অনেকে বর্ণনা করেন আনুষ্ঠানিক অথবা আচারধর্মী হিসেবে। কিন্তু আমি মনে করি, এরও আবশ্যকতা আছে। আচারের পেছনে একটা প্রস্তুতি থাকে, কাল গণনা থাকে, তাগিদও থাকে (তাগিদটা প্রচল থেকে ছিটকে না পড়ার।) আচার যাঁরা পালন করেন, তাঁদের অন্তত একটি অংশ আচারের পেছনের উদ্দেশ্য এবং নিষ্ঠাকে জানতে চায়, বুঝতে চায়।
ফেব্রুয়ারিতে ভাষা নিয়ে যত কথা হয়, তার পেছনেও নিষ্ঠা থাকে, আবেগ থাকে, উদ্দেশ্য থাকে। একটা উদ্দেশ্য বাংলা ভাষাকে আরও কত স্বাস্থ্যবান, বেগবান করা যায়, উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত মাধ্যম করা যায়, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শন-বিজ্ঞানচিন্তার আরও গতিশীল বাহন করা যায়, তার পথ খোঁজা। কারও উদ্দেশ্য থাকে বাংলা ভাষার ইতিহাসটা জানার, এর শ্রেষ্ঠ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার। কারও উদ্দেশ্য থাকে এর শুদ্ধতাকে দৃশ্যমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, সস্তা বিনোদনের কেন্দ্রীয় ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তৈরি নানা বিকৃতি থেকে বাঁচানো। আবার কারও উদ্দেশ্য থাকে এটি প্রমাণ করা যে এই বিকৃতি আসলে বিকৃতি নয়, এটি ভাষার বহমানতার একটি পরিচয় এবং একে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে নেওয়া উচিত। আমি মনে করি, এই শেষ উদ্দেশ্যটিকেও (যার সঙ্গে প্রথম তিনটি উদ্দেশ্যেরই আপাত একটা বিরোধ আছে) খোলা মন নিয়ে দেখতে হবে, যেহেতু এতে যে বিতর্ক তৈরি হবে, তা শেষ পর্যন্ত ভাষার শক্তিটাই তুলে ধরবে। মৃত ভাষা, মৃতপ্রায় ভাষা নিয়ে কোনো বিতর্ক হয় না। বিতর্ক পক্ষ-বিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা এবং যুক্তি-অযুক্তিগুলোই প্রমাণ করে। অনেকে এ রকম ভাবেন যে উত্তরাধুনিক যুগে শুদ্ধ-পবিত্র-সুন্দর এসব বিষয়কে আর এককবিশিষ্ট ও ধ্রুব বলে ধরা যায় না। আমিও কিছুটা তা-ই মনে করি। শুদ্ধ অথবা সুন্দর বলতে যা বোঝায়, তা কোন অথবা কার সংজ্ঞা থেকে? সেই সংজ্ঞা কি তৈরি করছে ক্ষমতা? ক্ষমতার কোনো প্রতিষ্ঠান? প্রাচ্যবাদ দেখিয়েছে, পশ্চিমের তৈরি ‘মান’ পুবকে মানহীন প্রমাণ করে তার ওপর সাংস্কৃতিক উপনিবেশ চাপিয়ে দিয়েছে। কেন? না, পুব অসভ্য, তাকে সভ্য করতে হবে। পশ্চিমের মান ছুঁতে পারলে পুব সভ্য হবে।
তারপরও উত্তরাধুনিকতার সূত্র ধরেই বৈশ্বিক, সর্বজনীন কোনো মানের বিপরীতে স্থানীয়, লোকজ মানের কাছে গেলেও কিছু বিষয়ে (কিছু বিশ্বাসে) একটা মতৈক্য দেখা যায়। লোকজ বিশ্বাস মাটি থেকে উঠে আসে, ওপর থেকে কেউ তা চাপিয়ে দিতে পারে না। ফলে সেই বিশ্বাসে সুন্দর ও সত্যের যে বিষয়গুলো থাকে, সেগুলোর প্রতিফলন থাকে মানুষের প্রতিদিনের কৃত্যে, চর্চায় ও চিন্তায়। এ জন্য কেউ যদি ভাষার শুদ্ধতা খুঁজতে যায় এ রকম একটি বিশ্বাস থেকে যে সেই শুদ্ধতার দেখা মিলবে মায়ের ভাষার ভেতরের সৌন্দর্যে, তাহলে তাকে সেকেলে বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
আমি নিজেকে সেই সেকেলেদের দলে আবিষ্কার করি। কারণ, আমি জানি এবং আমার অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত আছে ভাষার এই সৌন্দর্যের বিষয়টি। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি ভাষার ভেতরে একটা গান আছে, যে গানটি বাজাতে পারেন এর উৎকৃষ্ট চর্চাকারীরা। অনেক বছর আগে একবার পদ্মায় নৌকায় যেতে যেতে আমার হাত থেকে রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র নিয়ে এক বন্ধু এর কিছু অংশ পড়ে শুনিয়েছিল। না, সেই গান পদ্মা অথবা প্রকৃতি তৈরি করেনি, আমার বন্ধুও কোনো কাজী সব্যসাচী ছিল না, সেই গান ছিল ভাষার। রবীন্দ্রনাথ তা বাজিয়েছেন। এই গান বাজিয়েছেন নজরুল-জীবনানন্দ-শামসুর রাহমান-সৈয়দ হক। ভাষার সবচেয়ে ভালো প্রকাশ সাহিত্যে, তবে এই প্রকাশ আমি দেখেছি জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান লেখাতেও, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের চিঠিপত্রেও। আমাদের সময়ে আমরা যে বাংলা ভাষা ব্যবহার করি, তাতে আর সেই গান বাজে না। এটি বাজার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা এখন শুধু বিশেষ্য নয়, বিশেষণ নয়, ক্রিয়াপদও বিসর্জন দিচ্ছে ইংরেজি-হিন্দির কাছে। এখন বাংলা ভাষা এক ভয়ানক শঙ্কার ভাষা। অনেকে বলেন, এটিই স্বাভাবিক। হতে পারে। কিন্তু আমার ভয় এই ‘স্বাভাবিক’ ভাষা তার একটি মৌল স্বভাব ইতিমধ্যেই হারিয়েছে, এবং তা ভেতরের গানটাকে বাজতে না দিয়ে, সেই সম্ভাবনা নষ্ট করে ফেলে। এখন এই স্বাভাবিক, এফএম ভাষা, দুর্দান্ত বাংলিশ ভাষা কী সাহিত্য রচনা করে, তা দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করি।
অথচ আমি যখন কোনো ইংরেজকে, কোনো ইতালীয়কে, কোনো আরব বা ইরানিকে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে শুনি, তখন তার ভেতরে যে একটা গান আছে, তা বুঝতে পারি। একবার ইরানে গিয়ে আমি এক চা-খানায় দুই ঘণ্টা বসে অনেকের কথা শুনে টের পেলাম, এরা নিখাদ মাতৃভাষা চর্চা করছে। পরদিন এক অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন ইংরেজি ও অন্য ভাষার শব্দ আছে, তবে প্রায় সবই বিশেষ্য, কিন্তু ইরানিরা তাদের আত্তীকৃত করে নিয়েছে। আমরাও হাজার হাজার বিদেশি শব্দ নিয়েছি, কিন্তু বাংলার জলহাওয়ায় তাদের ধুয়ে শুকিয়ে নিজের করে নিয়েছি। কিন্তু এখন যে ক্রিয়াপদ ধার করছি ইংরেজি থেকে, হিন্দি থেকে, সেগুলোকে কি পারব আমাদের জলহাওয়ায় ওই রকম প্রক্রিয়াজাত করতে? কে জানে। তবে ক্রিয়াপদ হচ্ছে ভাষার পা। পা হারালে ভাষা কীভাবে চলে?
২. আমার সেকেলে চিন্তার আরেকটি হচ্ছে, কোনো জাতির ভাষায় শৃঙ্খলা না থাকলে তার চিন্তাভাবনাতেও শৃঙ্খলা থাকে না। আমি দেখি, আমাদের তরুণদের এক বড় অংশ মনের কথাটা বুঝিয়ে বলতে পারে না। বিশ্বাস না হয়, টেলিভিশনে ‘তাহাদের কথা’ ধরনের অনুষ্ঠান দেখুন, যেখানে উপস্থাপক একটি চলতি বিষয়ের ওপর পথচারীদের বক্তব্য নেন। খুব কমই সঠিকভাবে একটা পূর্ণ বাক্য বলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক দলে নাম লেখাতে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যেও দেখি বাক্য শেষ করতে না পারার দুর্বলতা। ইংরেজি নয়, বাংলাতে, নিজের মাতৃভাষাতেও গুছিয়ে, সঠিকভাবে বলতে যদি ১৮-১৯ বছরের একজন শিক্ষার্থী অপারগ হয়, তাহলে বিস্ময়টা আর বিস্ময় থাকে না, ভীতিতে রূপান্তরিত হয়। এই ভাষা চর্চাকারীরা তাহলে কোন ভাষা শিখেছে? বাংলা ভাষা, নাকি ‘স্বাভাবিক’ বাংলা ভাষা?
ভাষার অনেক রূপ, সে আমরা জানি। ভাষার আঞ্চলিক রূপ থাকে, বৈঠকি রূপ থাকে; বন্ধুদের ভেতর একধরনের ভাষা চলে, পরিবারের ভেতরও। আবার ভাষার একটা প্রমিত রূপ থাকে, যা সাজিয়ে-গুছিয়ে আমাদের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানচিন্তার কথাগুলো প্রকাশ করে। এখন দেখি প্রমিত শুনলেই অনেকে লাফিয়ে পড়েন। প্রশ্ন তোলেন, প্রমিত আবার কী? আমি বলি, প্রমিত বলে কিছু নেই ধরে নিলেও প্রতিদিনের ‘স্বাভাবিক’ ভাষা দিয়ে আমরা কত দূর যেতে পারি, কতটা গুছিয়ে সব প্রকাশ করতে পারি? ইংরেজ-আরব-জাপানি-চেক, সবাই তো দেখি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে, তারা যাকে প্রমিত বলে, সেই ভাষায়। ইংরেজি, আরবিরও অনেক রূপ। কিন্তু একটা রূপকে তারা বেছে নেয় তাদের শ্রেষ্ঠ চিন্তাগুলোর বাহন হিসেবে।
একসময় আমরাও নিয়েছিলাম। তখন আমরা অঞ্চলে বলতাম আঞ্চলিক ভাষা, বন্ধুদের সঙ্গে ইয়ার দোস্তির ভাষা; কিন্তু শ্রেণিকক্ষে সাহিত্য-দর্শন আলোচনায় চলত একটা প্রমিত ভাষা। সেটি পশ্চিমবঙ্গের নয়, সেটি একান্ত আমাদের। সেটি বুর্জোয়া ভাষাও নয়, যে-কেউই তা আয়ত্তে নিতে পারত। ভাষার সব রূপে যে বিরাজ করতে পারে সমান দক্ষতায়, এই ফেব্রুয়ারিতে তাকে আমার সালাম। যার কথা শুনলে ভাষার গানটা শুনতে পাই, তাকে সালাম।
৩. এখন বৈশ্বিক পুঁজির দিন। পুঁজি চায় ব্যবসা বাড়াতে। পণ্যের, সামগ্রীর, সেবার। সে জন্য চাই বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য প্রকৃত-মেকি চাহিদা সৃষ্টি করা। এবং সে জন্য চাই চমক। আর চাই একটা দেশের সব মানুষ যাতে একইভাবে পণ্যের দিকে আকৃষ্ট হয়, সে জন্য একটি সাধারণ পণ্য-ভাষা তৈরি করা, যাতে অঞ্চল, শহর-গ্রাম ইত্যাদির কোনো প্রভেদ থাকবে না।
আমাদের ‘স্বাভাবিক’ বাংলা ভাষার এখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একই রূপ। এতে পণ্য ঠাকুরদের দারুণ সুবিধা। এই ভাষা দিয়ে পশ্চিমের সব পণ্য সবখানে বিক্রি করা যাবে। লোকে ডাবের পানি ছেড়ে কোক খাবে, পিঠা ছেড়ে খাবে বার্গার।
বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। যত ভাবব, তত ভাষাকে সুন্দর করার জন্য আমরা পথ খুঁজে পাব।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Wednesday, November 11, 2015

মনন ও সৃজনশীলতায় অনন্য তিনি by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে আমি কখনো শিক্ষক হিসেবে পাইনি, যেহেতু তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু তাঁকে আমি সব সময় শিক্ষক হিসেবেই জেনেছি। তাঁকে দেখে শিখেছি সাহিত্যের রুচি কীভাবে তৈরি করতে হয়, ভাষার ভেতরের শক্তি আর সংগীতকে কীভাবে আবিষ্কার করতে হয়, আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে কাজকে কীভাবে মেলাতে হয়। শিখেছি বলাটা অবশ্য ঠিক হলো না, যেহেতু তাঁর থেকে শুধু পাঠ নিয়েছি, পাঠ নিতে উৎসাহী হয়েছি, কিন্তু অর্জনের রাস্তায় যেতে পেরেছি সামান্যই।
আমাদের এমএ পরীক্ষার মৌখিক অংশের বহিস্থ পরীক্ষক হয়ে ১৯৭৩ সালে ঢাকা এসেছিলেন অধ্যাপক সিদ্দিকী—সেই প্রথম তাঁকে দেখা, তাঁর কথা শোনা এবং একজন সত্যিকার বিদগ্ধ মানুষকে আবিষ্কার করা। এরপর থেকে যত তাঁকে জেনেছি, তত তাঁর চিন্তাভাবনা ও সক্রিয়তার বহুমাত্রিকতাকে বুঝতে পেরেছি। তাঁর চিন্তায় গভীরতা ছিল, তাঁর বৈদগ্ধ্য তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ের সঙ্গে এক আশ্চর্য সখ্য গড়েছিল। কথা বলতেন ভেবেচিন্তে, এবং প্রতিটি কথার পেছনে ওজন থাকত। অথচ মাঝেমধ্যে সহজ-সরল অন্তরঙ্গতা তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিতেন, তাঁর ভেতর একজন মানুষ আছেন, যিনি আনন্দ-হাসিকে উপভোগ করেন।
তাঁকে শুরুতে চিনতাম একজন অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে, পূর্বমেঘ-এর একজন সম্পাদক হিসেবে; তারপর ১৯৭৫-এ তাঁর হৃদয়ে জনপদে বেরোলে তাঁকে চিনলাম একজন শক্তিমান কবি হিসেবে। এরপর তিনি আবির্ভূত হলেন এক সফল অনুবাদকের ভূমিকায়, তাঁর অনূদিত শেক্সপিয়ারের সনেট ঘুরতে লাগল সবার হাতে হাতে। একজন কবি আরেকজন কবির ভাষান্তর ঘটালে স্বভাবতই তাতে শব্দ, শব্দ-প্রতিমা এবং কল্পনার একটা আলাদা মাত্রা পড়ে। এ গ্রন্থেও তা-ই হলো। কিন্তু এরপর যখন তিনি মিল্টনের অ্যারিওপ্যাজিটিকা নিয়ে উপস্থিত হলেন, অবাক হয়ে দেখলাম এই খটমটে, ল্যাটিনের প্রভাবে কঠিন হয়ে যাওয়া ইংরেজি গদ্যের কত কুশলী অনুবাদ তিনি করেছেন।
অধ্যাপক সিদ্দিকীর সঙ্গে স্বল্পদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধান প্রকল্পে। ওই প্রকল্পের প্রধান, অর্থাৎ প্রস্তাবিত অভিধানের সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক সিদ্দিকী। মাস দুয়েক ছিলাম ওই প্রকল্পে, কিন্তু পরিশ্রমের ধরন দেখে পিঠটান দিই। ওই দুই মাস তাঁকে দেখেছি, প্রচণ্ড নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে কাজে নেমেছেন আমাদের দেশে অভিধানবিদ্যায় এক নতুন অধ্যায় সংযোজন করতে। তাঁর অভিনিবেশ ছিল অকল্পনীয়। তিনি ভাষার একেবারে ভেতরে ঢুকে প্রতিটি শব্দের সম্ভাব্য অর্থকে আবিষ্কারের চেষ্টা করতেন। তিনি খুব যোগ্য কয়েকজন সহকর্মী পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বহুভাষাবিদ ড. জাহাঙ্গীর তারেক ছিলেন অন্যতম। একদিন ড. তারেক আমাকে জানালেন, অধ্যাপক সিদ্দিকীর সঙ্গে কাজ করতে করতে তাঁর মনে হয়েছে ড. স্যামুয়েল জনসনের মতো উচ্চতাতেই যেন তাঁর অধিষ্ঠান।
কথাটা বাড়িয়ে বলেননি ড. তারেক। ড. জনসনও বিখ্যাত ছিলেন অভিধানবিদ ও রচয়িতা হিসেবে, তাঁরও পাণ্ডিত্য ছিল গভীর। আমার এখন মনে হয়, দুজনের মধ্যে আরেকটি মিলও ছিল—ড. জনসনের জীবনীকার বসওয়েল বলেছিলেন, ড. জনসন তাঁর জীবনকালেই তাঁর সমসাময়িকদের থেকে সেই প্রশংসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন, যা মেধাবী মানুষ শুধু পরবর্তী প্রজন্মগুলো থেকে পান। অধ্যাপক সিদ্দিকীর প্রশংসা শুনতাম তাঁর বন্ধুদের মুখে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠী কবি শামসুর রাহমান ও সাংবাদিক এস এম আলী। তাঁদের কাছে অধ্যাপক সিদ্দিকীর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, তাঁকে তাঁরা পছন্দ করতেন তাঁর চরিত্রের সমুন্নতির জন্য, স্বচ্ছ জীবনদৃষ্টির জন্য এবং অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা এবং শ্রেয়বোধের প্রতি তাঁর সুদৃঢ় অঙ্গীকারের জন্য।
অধ্যাপক সিদ্দিকী শিক্ষাবিদ ছিলেন, শিক্ষা নিয়ে ভাবতেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ইংরেজিতে একটি বইও লিখেছিলেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিপদ নিয়ে বাংলায় লেখা তাঁর বইটি বেরোয় ১৯৮৯ সালে, যখন অনেকের কাছে এগুলো বিপদের গুরুত্ব নিয়ে আসেনি। তাঁর যে দূরদৃষ্টি ছিল, এবং তার আলোকে যে তিনি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজকে পড়তে পারতেন, তা তাঁর লেখালেখিতে, বক্তৃতায়-ভাষণে প্রকাশ পেত। জাতির নানান সংকটের সময় তিনি একজন সচেতকের ভূমিকা পালন করতেন, তাঁর লেখনীর শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়তেন, মানুষের শুভবুদ্ধিকে জাগাতেন।
এক বছর আগে এই দিনে অধ্যাপক সিদ্দিকী আমাদের থেকে বিদায় নেন। ৮৬ বছরের দীর্ঘ জীবন তিনি কাটিয়েছেন জ্ঞান সাধনায়, সাহিত্যচর্চায়, অধ্যাপনায় ও লেখালেখিতে। যত দিন তিনি ছিলেন, তাঁর উপস্থিতি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল আমাদের কাছে। তিনি চলে যাওয়ার পর তাঁর অভাবটা তীব্রভাবেই অনুভব করছি আমরা। সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির চর্চার একটা সংযোগ তিনি ঘটিয়েছিলেন, দেশজ চিন্তার সঙ্গে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা সম্পর্কও তিনি তৈরি করেছিলেন। তাঁর থেকে অনেক কিছু আমরা পেয়েছি। আমাদের থেকে কতটা তিনি নিতে পেরেছিলেন, তা আমাদের কোনো দিন জানা হবে না, কিন্তু এটুকু বলা যায়, তাঁর জন্য তোলা থাকবে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Sunday, June 28, 2015

তরুণদের আছে কাটার by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ক্ষমতা কেন ভয় পাবে তাদের?
কারণ তাদেরও আছে মুস্তাফিজের মতো কাটার
একটা জাতিকে যদি জাগতে হয়, যদি আকাশ ছোঁয়ার বাসনায় হাতটা বাড়াতে হয়, তখন সবাইকে এই জাগরণে-উদ্যোগে শামিল হতে হয়। যদি একটি বা দুটি জনগোষ্ঠীও তাতে যোগ দিতে না পারে, যদি সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, আদিবাসী, শহুরে দরিদ্র অথবা খেতমজুরদের অংশগ্রহণ না থাকে, তাহলে জাগরণ থাকবে অসমাপ্ত, আকাশ ছোঁয়াটা থাকবে কল্পনার অঞ্চলে। অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে, ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে দেশটি, মাথাপিছু আয় বেড়ে সাড়ে তেরো শ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই অর্জনের ফল কি সবাই সমানভাবে ভোগ করছে? একজন মানুষকে তখনই স্বাস্থ্যবান বলব আমরা, যখন সেই স্বাস্থ্যের চিহ্ন ধারণ করবে তার সব অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ। দুই বাহু বলশালী মানুষটার বুকের ছাতিও স্ফীত, শরীরটাও পেটানো, কিন্তু একটি পা অচল। তাহলে ওই একটি পা-ই তাকে পেছনে টেনে রাখবে।
আর যদি মানুষটার অস্বাস্থ্য থাকে শরীরের গভীরে-হৃদ্যন্ত্রে, ফুসফুসে, তাহলে তার ঠিকানা কাজের ভূগোলে নয়, ক্লিনিক-হাসপাতালের বিছানায়, বারান্দায়।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সমীহ জাগানো একটি নাম। অমর্ত্য সেন অনেক দিন থেকেই পৃথিবীকে জানাচ্ছেন এ দেশের অনন্য সব অর্জনের কথা। তাঁর বিস্ময় উৎপাদন করেছে সামাজিক ও মানব উন্নয়নের নানা সূচকে আমাদের অগ্রগতি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় মডেল; দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য হ্রাসে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে আমাদের সফলতা এবং বিশ্বমন্দার কালে আমাদের অর্থনীতির চাকা সবলে ঘোরার কারণে বিশ্ব এখন আমাদের প্রশংসা করে।
এত সব অর্জনের পেছনে আছে জাতি হিসেবে আমাদের প্রত্যয়: আমরাও পারি।
এর শেষতম উদাহরণ জুনের ২১ তারিখ রাতের মিরপুর। আমি বসে টিভিতে দেখছি ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় দাপট এবং ভাবছি, এটি কী করে সম্ভব? খেলা দেখছি, কিন্তু মোবাইল ফোনে কিছুক্ষণ পর পর যে মেসেজ আসছে, সেদিকেও চোখ রাখছি, দ্রুত উত্তরও দিচ্ছি এবং কোথায় যেন একটা সুর শুনছি আরও বড় জাগরণের। মেসেজ পাঠাচ্ছে আমার ছাত্রছাত্রীরা। মুস্তাফিজ একটা উইকেট নিল, একজন লিখে পাঠাল, ‘এনাদার ওয়ান বাইটস দ্য ডাস্ট’। তার আগে সৌম্য ছয় মারলে একজন লিখল, ‘বলটা সাতক্ষীরায় পাঠিয়ে দিল, স্যার।’ এই তরুণ ক্রিকেট দল ২১ তারিখে দেখাল, তারা শুধু জাগেনি, এখন আকাশটাও ছুঁতে জানে।
এই জাগরণটা যে শুধু আমরা দেখছি তা নয়, বিশ্বও দেখছে। নেটে কলকাতার কাগজগুলো পড়লাম। দেখলাম, উচ্ছ্বাস তাদেরও। ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ লিখেছে এক কাগজ; ‘সোনার বাংলার জয়গাথা’ লিখেছে আরেকটি। আনন্দবাজার পত্রিকার শিরোনাম, ‘এগারো বাঙালি হারাল ভারতকে’। ‘বাঙালি’ কথাটায় কোথায় জানি একটা তুষ্টির ছোঁয়া। আমার খুব ভালো লাগল, যখন কাঠমান্ডু থেকে এক বন্ধু ফোনে অভিনন্দন জানাল। বলল, নেপালের দর্শক বাংলাদেশের পক্ষে। আমি জানি কেন তারা ভারত ছেড়ে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে, এখন বাংলাদেশ অর্জনের এক উদাহরণ তাদের সামনে। বাংলাদেশ পারলে নেপালও পারবে। শুধু ক্রিকেটে নয়, অর্থনীতি-সমাজ-শিক্ষা—সব ক্ষেত্রে।
আমি এই কথাটা জোরের সঙ্গে বলি: বাংলাদেশকে শুধু নিজের দিকে তাকালে চলবে না; এটি ভাবলে শেষ ভাবাটা হয়ে যাবে না যে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা অথবা পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ, যার উন্নতি হবে নিজের ভূগোলের ভেতরে। বাংলাদেশ একটি দেশ বটে, কিন্তু ভারতের মতোই এর বাইরেও কিছু। ভারত এখন এশিয়ার অর্থনীতির পরাশক্তি। বাংলাদেশকেও হতে হবে আঞ্চলিক একটি শক্তি, যার উন্নতি স্পর্শ করবে এবং যার দিকে পথ দেখানোর জন্য তাকিয়ে থাকবে নেপাল, ভুটানসহ ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো। কিছুদিন আগে ত্রিপুরা ও মিজোরামের দুই সমাজকর্মীর সঙ্গে আমার দেখা দিল্লিতে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের কাছে দিল্লি সত্যি সত্যি দূরের। বাংলাদেশের সঙ্গে বরং অর্থনৈতিক সম্পর্কটা হতে পারে অনেক কাছের। চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর হলে ভাগ্য বদলাতে পারে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের। ত্রিপুরা তো তার উন্নয়নে আমাদের সহায়তা দাবিই করতে পারে—একাত্তরে ত্রিপুরা যেভাবে দাঁড়িয়েছিল আমাদের পাশে, তার কোনো তুলনা হয় না।
বাংলাদেশকে বিশ্ব সমীহ করছে। বাংলাদেশের গত নির্বাচন নিয়ে অখুশি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। কিন্তু কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশংসা করেছে উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্যকে। নির্বাচন সর্বদলীয় না হওয়াটা আমাদের গণতন্ত্রের একটি ব্যর্থতা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা এবং কাজ-অকাজ গণতন্ত্রের জন্য দুঃসংবাদ। একইভাবে স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক তোলা, স্বাধীনতার স্থপতিকে খাটো করে দেখা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলোকে অবজ্ঞা-অমান্য করা গণতন্ত্রের সুস্থতার লক্ষণ হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, সাম্য, মুক্তি এবং দেশের ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন—এই আদর্শ ধরে কেউ কি এগোচ্ছে?
তারপরও মানুষ হাল ছেড়ে দেয়নি, নিজেদের মতো কাজে নেমে পড়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলো সামান্য উপার্জন করে সন্তানকে এবং কন্যাসন্তানকেও স্কুলে পাঠিয়েছে। তরুণেরা দেশে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিদেশে উপার্জনের একটা রাস্তা খুঁজে নিয়েছে। গ্রামের মেয়েটি শহরের মধ্য-উচ্চবিত্তের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ না নিয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি খুঁজে নিয়েছে। কৃষক তাঁর পরিশ্রমে উদ্ভাবনী শক্তিতে নিরন্তর সোনা ফলিয়েছেন মাঠে, প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক স্বল্প বেতনে, পেটেভাতে মানুষ গড়ার সংগ্রামে নেমে পড়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তা সামান্য পুঁজি সঞ্চয় করে ব্যবসা-বাণিজ্য-উৎপাদনে ব্রতী হয়েছেন। যোগাযোগপ্রযুক্তি যখন এল, মোবাইল ফোন কিছুটা সহজলভ্য হলো, তরুণেরা এর দেশীয় রূপান্তর ঘটালেন, বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করলেন। আমার এক অর্থনীতিবিদ বন্ধু বললেন, গ্রামের যে মধ্যস্বত্বভোগী—মাঝের মানুষ—দালাল ছিল, তাদের দাপট কমিয়ে দিল মোবাইল ফোন। না, আইন না, পুলিশ না; প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে অনেক তরুণ; উগ্রতা, আগ্রাসী অন্ধকার ছড়াচ্ছে, নানা অপকর্ম করছে। কিন্তু নতুন নতুন অসুখের ওষুধটাকেও হতে হয় নতুন। ওষুধ তৈরি হচ্ছে, তরুণেরাই করছে। ফলে প্রযুক্তি-রোগও একদিন নির্মূল হবে, সন্দেহ নেই।
অর্থনীতিবিদ-সমাজবিদেরা অনেক ভালো ভালো কথা বলেছেন। যা ঘটেছে, ঘটছে তা নিয়ে, যা ঘটতে পারে তা নিয়ে। এখন সময় দেশটা বদলাবার এবং এ জন্য কিছু মন্ত্রের জন্য আমাদের যেতে হবে দুই কবির কাছে। কবিরা ত্রিকালদর্শী হন, তাঁদের তৃতীয় একটা চোখ থাকে, যা দিয়ে তাঁরা অসম্ভবকে দেখেন। কাজী নজরুল দেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন, ইউরো-শিক্ষিত পরিবারের সন্তান ছিলেন, কিন্তু তাঁর বিশ্বদর্শনের কেন্দ্রে ছিল গ্রাম। গ্রাম জাগলে দেশ জাগবে, তিনি বলতেন। আরও বলতেন আত্মশক্তির কথা। নজরুলের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল সাম্যের প্রতিষ্ঠা দেখা। তিনি মানুষের ইতিহাসের একটি সত্যকে তুলে ধরে বলেছিলেন। জগতের যা কিছু সুন্দর ও কল্যাণকর, তার অর্ধেক করেছে নারী। আমরা যদি এ দুই কবিকে মাথায় রাখি, তাহলে আত্মশক্তিতে আমরা জাগব; গ্রাম জাগবে, সাম্য প্রতিষ্ঠা পাবে; মানুষ থাকবে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে; নারীদের কাজের আর অবদানের ক্ষেত্রটা হবে উন্মুক্ত, বাধাহীন; এবং তারুণ্যের ওপর থাকবে আমাদের ভরসা।
এই লক্ষ্যে যে আমরা যাচ্ছি না তা নয়, যাচ্ছি। কিন্তু যাত্রার গতি বাড়াতে হবে, সবাইকে শামিল করতে হবে সেই যাত্রায়। যদি সুবিধাবঞ্চিতরা সমান সুযোগ না পায়, যদি মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না পায়, যদি প্রান্তিক অধিবাসী এবং অন্যান্য উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর পায়ে শক্তি না জোগানো যায়, আমরা চলব খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
গ্রাম জাগছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট-ফুটবল দলের কথাই ধরি। ছেলেগুলোর অনেকে এসেছে গ্রাম থেকে, অথচ তাদের চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। একটি মেয়ে, সাবিনা, মালদ্বীপে গিয়ে তাক লাগানো ফুটবল খেলল। শুনলাম, সে-ও সাতক্ষীরার। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী আসছে গ্রাম থেকে। এটি যুগ পরিবর্তনের লক্ষণ। এরা গ্রাম-শহরের ব্যবধান ঘোচাবে। দীর্ঘদিন গ্রাম অবহেলিত ছিল, এখন গ্রাম নিজে থেকেই সেই অবহেলার জবাব দিচ্ছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন শিক্ষার—প্রকৃত, সাংস্কৃতিক, মননশীল, সৃজনশীল—শিক্ষার প্রসার। দারিদ্র্য নির্মূল করা। স্বাস্থ্য ও পুষ্টিচিত্রের উন্নতি। আরও অনেক কিছু। এর জন্য কাজে নামতে হবে তারুণ্যকে।
আমাদের দুই কবি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের উন্নতিতে খুশি হতেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দুঃখ পেতেন আত্মশক্তি বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো আমাদের রাজনীতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখে। তিনি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্জ করা শেখায়, উৎপাদন করা নয়। অবস্থাটা কি বদলেছে? নজরুল ব্যথিত হতেন তারুণ্যের অপচয় দেখে। তরুণদের জন্য কী উদাহরণ আমরা রাখছি? আমাদের রাজনীতি তাদের শেখাচ্ছে ক্ষমতার মারামারি, সহিংসতা, টেন্ডার-বাণিজ্যের মতো অসৎ উপায়। তাদের শেখাচ্ছে ঔদ্ধত্য, অসহিষ্ণুতা। তারুণ্যকে ধ্বংস করার জন্য চলছে মাদকের ব্যবসা। এই মাদকসম্রাটদের তো নামেই চেনে দেশের মানুষ, কিন্তু তাদের কেউ স্পর্শ করে না। কাগজে দেখলাম, ইয়াবা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন পুলিশের কিছু কর্মকর্তাও! একদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্য উদ্যাপন করছি আমরা, অন্যদিকে মাদকের অবসাদে নিষ্প্রাণ পড়ে আছে তরুণদের এক বড় অংশ। এই বিপরীত চিত্র কি দেখেই যাব আমরা?
আবার ভরসা তরুণদের ওপর। মাঝে মাঝেই দেখি, প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবি নিয়ে, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংস যৌন অপরাধের প্রতিবাদে, বাজেটে শিক্ষার অবনমনের বিরুদ্ধে কিছু তরুণ রাজপথে মিছিল করে। এবং অবাক, পুলিশ তাদের দেখলেই পেটায়। আমার তো মনে হয়, পুলিশের কনস্টেবলদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে পথে নামলেও পুলিশ তাদের পেটাবে। এটা ক্ষমতার একটি অভ্যাস। তবে এ-ও বদলাবে, মিছিলে ছেলেগুলোকে দেখি আমাদের মুস্তাফিজের মতোই লিকলিকে। তাহলে ক্ষমতা কেন ভয় পাবে তাদের? কারণ তাদেরও আছে মুস্তাফিজের মতো কাটার। অফ, লেগ—সব ধরনের কাটার।
যত বেশি তরুণ এই কাটার নিয়ে বেরোবে রাস্তায়, মাঠে, গ্রামে, শহরে, দেশে, বিশ্বে; ততই জায়গা ছেড়ে দেওয়ার দৌড়টা শুরু হবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, April 14, 2015

পুরনোর পাওয়া ও নতুনের কাছে চাওয়া by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গ্রামবাংলায় নববর্ষ উদ্যাপনে খুব আড়ম্বরতা কখনও ছিল না। অনেকটা বলে বয়ে আসা আত্মীয়ের মতো ছিল দিনটি, দীর্ঘদিন। তাকে বরণ করে নেয়া হতো, কিন্তু আচার, কিছু কৃত্য পালন করা হতো, কিন্তু উচ্ছ্বাসের প্রাবল্য ছিল না। বরং তাতে আন্তরিকতা, আনন্দ আর নমিত কিছু আবেগের প্রকাশ দেখা যেত। ছোটবেলায় যে দু-একবার নববর্ষের দিনে গ্রামে গিয়েছি, চোখে পড়ত দিনটিকে আলাদা করে রাখার আয়োজনগুলো। কিন্তু তাতে উচ্ছ্বাসের আতিশয্য থাকত না, থাকত ব্যতিক্রমী উদ্যাপনের আনন্দ।
ব্যতিক্রম তো বটেই। সারা বছর যেত মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামে, শোকে-দুঃখে, প্রত্যাশায়-প্রাপ্তিতে। দুই ঈদে অথবা পূজা-পার্বণে দু-এক দিনের ছেদ পড়ত সেই নিত্যদীনতায়। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবে সবাই তো শামিল হতে পারত না। যারা ঈদ করছে, তারা পূজা-পার্বণে হয়তো জীবন-সংগ্রামে মাঠে, গঞ্জে অথবা অন্যত্র। নববর্ষ ছিল সবার জন্য একটা অভিন্ন উদ্যাপন। এদিনে সবাই যে কাজ থেকে হাত গুটিয়ে রাখতেন তা নয়। কিন্তু সব সম্প্রদায় মিলে ওই একটা দিনেই একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতে পারতেন। ওই একটা দিনে হিন্দু-মুসলমান একই সঙ্গে উৎসবের রং গায়ে মাখতেন। বাংলার কৃষক বরাবরই ছিলেন শোষণের শিকার, বাংলার মেহনতি মানুষও পুঁজির কাছে, ক্ষমতার কাছে ছিলেন পরাভূত। নববর্ষে ওই সব মানুষ কষ্ট ভুলে, গ্লানি ভুলে একটা অভিন্ন উদ্যাপনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। আয়োজন ছিল খুব সামান্যই- একটুখানি ভালো খাওয়া, সন্তানদের জন্য, সম্ভব হলে নতুন জামা (যা অসম্ভবের পর্যায়ে থেকে যেত অনেকের জন্য), মেলা-উৎসবে সবাইকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া, একটুখানি কেনাকাটা করা- তাও যদি গাঁটে কিছু পয়সা থাকত। নববর্ষের মেলা ছিল এদের জন্য একটা সান্ত্বনার মতো। নববর্ষের মেলায় বিকিকিনিটা বড় ছিল না, ছিল অংশগ্রহণটা। যত মানুষ যেসব মেলায় যেত, তার একটা বড় অংশেরই হয়তো কিছু কেনার পয়সা থাকত না। তারপরও মেলা হতো সপ্রাণ। মেলায় থাকত আনন্দ, কোলাহল। নিত্যদিনের সংগ্রাম ভুলে থাকার কিছু উপলক্ষ।
নববর্ষের কাছে মানুষের চাওয়া ছিল কয়েকটি- প্রথমত. জীবনের কঠিন সংগ্রাম ভুলে কিছুটা আনন্দ, কিছুটা রং আর উদ্যাপনের বৈচিত্র্য তারা আশা করত। দ্বিতীয়ত. সব সম্প্রদায়ের সমান অংশগ্রহণ যেহেতু ছিল দিনটিতে, একটা বড় চাওয়া ছিল সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব। আর তৃতীয় একটি চাওয়া ছিল নিজেদের গণ্ডি ভেঙে সবার এক হয়ে যাওয়া, যেখানে সন্তানরা, প্রতিবেশীরা সবাই শামিল হবে। নববর্ষের মেলা ছিল উচ্চ-নীচের, নিকট-দূরের, ধনী-দরিদ্রের দেয়াল ভাঙার একটা প্রতীক। মেলা কখনও পুঁজির শাসনে পড়েনি। মেলা ছিল একটা-দুটো মুদ্রার বিনিময়ে বিমলানন্দ খুঁজে পাওয়া। মেলা ছিল নববর্ষের একটা বড় চাওয়া, যেহেতু মেলাতে টুকটাক কেনাকাটার আনন্দটা কখনও টাকার হিসাবে দেখা হতো না, হতো প্রাপ্তির তৃপ্তির হিসেবে।
নববর্ষে গঞ্জের বাজারে হালখাতা লেখা হতো। হালখাতায়- এক বছরের হিসাব নেয়া হতো। লাভ হলে লাভ, ক্ষতি হলে ক্ষতি- কিন্তু গঞ্জের ব্যবসায়ী এ লাভ-ক্ষতির আলোয় সব দেখতেন না। তার দোকানে বাতাসা-মিষ্টি থাকত, আগন্তুক সবাই তাতে ভাগ বসাত। হালখাতা ছিল সামাজিক একটি অনুষ্ঠান। ছোট-বড় ব্যবসায়ীকে তা নিজের কর্মফলের সামনাসামনি করত। হালখাতার হিসাবটা ছিল একই সঙ্গে ব্যবসা-দর্শন এবং আত্মদর্শন। কালু শাহের একটা গাছ আছে এই রকম, বছরে একবার দেখরে ভিতরে চাইয়া, মনটা আছে কিনা বিষয়ে ছাইয়া। বিষয় যদি মন ছেয়ে রাখে, তাহলে লোভ বাড়ে। আর লোভ বাড়লে কোনো নৈতিকতা কাজে আসে না।
হালখাতা লাল কাপড়ে মোড়া থাকত। তা জীবনকে, জীবনের চলমানতাকে ঘোষণা করত; জীবনহীন, শুকনো অঙ্কের হিসাবকে নয়। এ জন্য হালখাতা উৎসব হতো, মিষ্টি বিতরণ হতো, মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়াত।
২...
নববর্ষের রূপ পাল্টেছে। এখন শহরের নববর্ষ গ্রামের নববর্ষকে প্রভাবিত করছে। এখন নববর্ষ পোশাকপ্রধান, আচারপ্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এ কথাটাও তো ঠিক যে, এখন নববর্ষ প্রবল উচ্ছ্বাস, হাসি-আনন্দ ও কোলাহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে নববর্ষের মূল চাওয়াটা মোটেও চাপা পড়েনি।
একটিই সমস্যা এই নতুন নববর্ষে- এটিকে একটা প্রচারের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিডিয়া বলতে ছাপা এবং (প্রধানত) ইলেকট্রনিক মাধ্যমের যে সমন্বয়কে আমরা জানি, তা-ই এখন দায়িত্ব নিয়েছে প্রচারের এবং মিডিয়ার পিঠে হাত রেখেছে বড় পুঁজি অর্থাৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলো। তাতে আয়োজনটা ব্যাপক হয়, চাকচিক্য প্রবল হয়। কিন্তু প্রাণটাও থাকে। এ এক অদ্ভুত যোগ। এত চমক, কিন্তু প্রাণটা স্পন্দিত। তার কারণ ওই চাওয়া- নববর্ষের কাছে মানুষ নিত্যদীনতার জাঁতাকল থেকে মুক্তি চায়, উদ্যাপন চায়, সবার সঙ্গে প্রাণ মেলাতে চায়।
অর্থাৎ আয়োজনের উদ্যাপনের ব্যাপ্তি বেড়েছে, কিন্তু চাওয়াটা একই রয়ে গেছে।
আরেকটা চাওয়া হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ। এখন সারা দেশে- শহরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে যে নববর্ষ পালন হয়, তাতে এ চেতনার বলিষ্ঠ এবং প্রত্যয়দীপ্ত একটি স্ফুরণ দেখা যায়। এখনও হালখাতা হয় এবং এখনও, আশ্চর্য, লাভ-ক্ষতির থেকেও সামাজিক দায়বদ্ধতাটা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই বাঙালিয়ানার শক্তি। একটি দিন, একটি উপলক্ষ- কিন্তু ইতিহাসের বিবর্তনে এর মহিমায় কোনো ছায়া পড়ে না। কর্পোরেট অংশগ্রহণেও না। বরং মহিমাটা আরও বাড়ে।
৩...
বাংলাদেশ এখন বিভাজিত একটা দেশ। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বিত্তগত বিভাজন এখন তীব্র। উগ্রবাদের বিস্তার হচ্ছে, বহুমতের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা। পুঁজির শাসন বেড়েছে।
এরকম দেশে নববর্ষ একটা বাণী নিয়ে আসে। বাণীটা এই কায়মনে বাঙালি হও, বিভেদ ভোল, বাংলার উদার আকাশের নিচে এক কাতারে দাঁড়াও- উদারতা শেখো ওই আকাশ থেকে। নিঃসর্গ থেকে।
এবারের চাওয়াও আমাদের যুগযুগের সেই চাওয়া- একতা চাই। আমরা বিভাজন চাই না। ভিন্নমত থাকবেই। কিন্তু তা যেন উগ্র না হয়। প্রাণঘাতী না হয়।
নববর্ষ হচ্ছে প্রাণের মেলার এক সমাবেশ। এ সমাবেশ আরও ব্যাপক হোক। আমরা চাই, নববর্ষের রং যেন সবাই মনের ভেতরে মেখে নেয়। তাহলে সারা বছর শুধু প্রাপ্তিতেই যাবে।
নববর্ষে কঠোরে-কোমলে কী সুন্দর এক উদ্যাপনকে দেখি আমরা। প্রকৃতি কঠোর আবার কোমল তার সৌন্দর্য। বাঙালি কঠোর হোক অশুভের বিরুদ্ধে, কিন্তু কোমল হোক সবার প্রতি।
নববর্ষ যেন আমাদের সবাইকে সারা বছরের জন্য রাঙিয়ে দিয়ে যায়।

Thursday, March 26, 2015

রক্তের অক্ষরে লেখা জয়ের পতাকা by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

একাত্তরের মার্চ মাসজুড়ে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা বড় জায়গা অধিকার করে রেখেছিল বাংলাদেশ। প্রতিদিনই বাংলাদেশ নিয়ে সংবাদ হতো, বাংলাদেশ পরিস্থিতির বিশ্লেষণ হতো বিশ্বের প্রথম সারির সব সংবাদপত্রে। টেলিভিশন সংবাদও ব্যতিক্রম ছিল না। ১ মার্চের পর থেকেই প্রতিটি দিন ছিল ঘটনাবহুল। ঢাকায় বহু বিদেশি কাগজের প্রতিনিধি জড়ো হয়েছিলেন। ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে তাঁরা গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইংল্যান্ডের এক রেডিও সাংবাদিকও ছিলেন। আমি তাঁকে সঙ্গ দিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বগণমাধ্যমের উৎসাহ এবং উদ্বেগের কথা প্রথম তাঁর কাছেই শুনেছিলাম। আরও দু-এক সাংবাদিকের সঙ্গে আমার টুকটাক কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তাঁদের থেকেও জেনেছি মার্চের ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে বিদেশের কাগজে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে।
এর বছর পাঁচেক পর আমার সুযোগ হয় একাত্তরের মার্চে বেরোনো বেশ কটি কাগজ পড়ার। কানাডার একটি গ্রন্থাগারে মাইক্রোফিল্মে সংরক্ষিত এসব পুরোনো সংখ্যা পড়ার সুযোগ পেয়ে তা ভালোই কাজে লাগিয়েছিলাম। এর আগে আমার ধারণা ছিল পশ্চিমের নামী সংবাদপত্রগুলো একটা নৈতিক মান মেনে চলে, সংবাদ পরিবেশনায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখে, ডানে-বাঁয়ে যেদিকেই তারা হেলে পড়ুক না কেন। কিন্তু ডানপন্থী কয়েকটি মার্কিন সংবাদপত্র পড়ে আমার সে ভুল ভেঙেছিল। নিউইয়র্ক পোস্ট-এর মতো কয়েকটি কাগজে বাংলাদেশের সংবাদ তেমন গুরুত্ব পায়নি। বঙ্গবন্ধু বাম ঘরানার মানুষ, তাঁর নেতৃত্বে যে সংগ্রাম হচ্ছে, তা নিয়ে ভেবেচিন্তে যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এ রকমই একটা ইঙ্গিত এসব কাগজ দিয়ে যাচ্ছিল। ২৫ মার্চের পর এসব কাগজই পাকিস্তানকে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। যেমন দিয়েছে মার্কিন সরকার। তবে পত্রপত্রিকার একটি বড় অংশ পাকিস্তানি বীভৎসতার বিবরণ দিয়েছে, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়গুলোয় এটি প্রতিফলিত হয়েছে।
পশ্চিমের কাগজগুলো পড়তে পড়তে ২৫ মার্চ নিয়ে আমার একটি চিন্তা জেগেছিল। চিন্তাটি ছিল এই: যদি বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার একপক্ষীয় ঘোষণা দিয়ে দিতেন এবং সারা দেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হতো, তাহলে বাংলাদেশ কি ওই নৈতিক সমর্থনটা পেত? আর যদি পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চ রাতে তাদের অপারেশন সার্চলাইট না শুরু করত, তাহলে কি সমর্থনটা ধীরে ধীরে এতটা প্রবল হতো? আমার মনে হয়েছিল, ২৫ মার্চের শহীদেরা তাঁদের রক্ত ঝরিয়ে আমাদের স্বাধীনতাকে অবধারিত ঘটনায় পরিণত করেছিলেন। আর ওই রাতে পাকিস্তানিরা পাশবিকতা চালিয়ে তাদের পরাজয়ের পথটাই তৈরি করে দিয়েছিল। এই বৈপরীত্যটি একদিকে দেশের জন্য প্রশ্নহীন আত্মদান, অন্যদিকে গণহত্যার মতো অপরাধ কাঁধে নিয়ে পাকিস্তানিদের একাত্তর-যাত্রা—একই সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতার দাবিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধকে বিশেষ মহিমা দিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু একপক্ষীয় ঘোষণা না দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি তাঁর আস্থার কথাটি ঘোষণা করেছিলেন, যদিও তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে কারও মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধটি অনিবার্য হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত মানুষের মনে একটি প্রশ্নই ছিল: কখন? যুদ্ধ শুরু হবে অথবা হয়ে গেছে, কিন্তু কখন শুরু হবে অস্ত্র নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা, রণক্ষেত্রের কামান গর্জন? একাত্তরের মার্চের অনেক আগেই মুক্তিযুদ্ধ ‘কেন’—এ প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। শুধু ‘কখন’টা বাকি ছিল। ২৫ মার্চ রাত জানিয়ে দিল, সেই প্রশ্নেরও উত্তর মিলে গেল। ৭ থেকে ২৫ মার্চ বিশ্ব জানল, বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। কিন্তু ২৫ মার্চের গণহত্যা বিশ্বকে জানিয়ে দিল পাকিস্তানি বর্বরতার উত্তরে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামকেই বাঙালি বেছে নিয়েছে, গ্রেপ্তারের আগে যার নির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন।
পশ্চিমের কাগজগুলো বঙ্গবন্ধুর এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছে। পশ্চিমের অনেক সরকার বাংলাদেশ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে এই বিবেচনাটি মাথায় রেখেছে। এই অবস্থানটি বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞাকে প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে এটি ছিল বাঙালির শিক্ষা ও সভ্যতার একটি পরিমাপক। পশ্চিমে কিছু কাগজ এভাবেই এটিকে দেখেছে।
একাত্তরে বিশ্বের দুটি পরাশক্তির মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, নতুন জেগে ওঠা শক্তি চীনও তা-ই করেছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য-সহায়তা-চুক্তি-সমঝোতার নানা বেড়াজালে বাঁধা ছিল অনেক দেশ। একাত্তরের মার্চের কাগজ পড়ে আমার মনে হয়েছে, যদি বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা না থাকত, যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে একটা তাড়াহুড়া হতো এবং আমরা যে আগ বাড়িয়ে মারি না, কিন্তু কেউ মারতে এলে তাকে উচিত শিক্ষা দিতে পারি—এই সত্য ও প্রত্যয়টি আমরা জগতের কাছে তুলে না ধরতে পারতাম, তাহলে আমাদের শুধু পাকিস্তান নয়, প্রতিকূল বিশ্বমতের বিরুদ্ধেও লড়তে হতো। আর বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর সহযোগীরা, বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম যে পারদর্শিতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছিলেন এবং ১৭ এপ্রিল থেকে প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাতে বিশ্ব আমাদের সঙ্গে থাকার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা অনুভব করেছে।
দুই.
২৫ মার্চ রাতের শহীদেরা তাঁদের রক্ত ঝরিয়েছিলেন বলে আমরা নিজেদের ভেতর সেই রক্তের ঋণ শোধ করার একটি প্রবল তাড়না অনুভব করেছি এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারির ভাষাশহীদেরা রক্ত ঝরিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ভাষা নিয়ে তাঁদের স্বপ্নকে আমরা বাস্তবে রূপ দেব। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ একটি ঘটনাবহুল পথপরিক্রমা, সংগ্রামমুখর দুটি দশক। কিন্তু সাফল্য আমাদের করতলে ধরা দিয়েছে। সেই সাফল্য দেশগঠনে আমাদের যতটা উজ্জীবিত করার কথা ছিল, তা করতে পারেনি। বাইরের কেউ নয়, আমরা নিজেরাই নিজেদের পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এখনো নতুন করে শুরু করলে মুক্তি অর্জনেও আমরা সফল হব। না হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশক পার হয়েছে, এই সময়টাও ছিল ঘটনাবহুল। গণতন্ত্র নিরুদ্দেশ হয়েছে, গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, আবার আসেওনি। মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়নি। ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার হয়েছে। সমাজ বিভাজিত হয়েছে। কিন্তু বিপরীত চিত্রও তো অনেক দেখছি আমরা—অর্থনীতি গতি পেয়েছে, নারীরা কর্মক্ষেত্রে ঢুকেছেন ব্যাপক হারে। শিক্ষার বিস্তার হয়েছে, স্বাস্থ্যচিত্রেও সামাজিক নানা সূচকে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। সমাজ গতিশীল হয়েছে। এই দেশটা সংকল্প নিয়েছে, অনুন্নয়নের রাস্তা থেকে উন্নয়নের রাস্তায় উঠে একটা দৌড় লাগাবে। তা-ই লাগিয়েছেও। এই দৌড়ে আমাদের সাফল্য কেন আসবে, এ রকম প্রশ্ন করলে বলা যাবে, যেহেতু দৌড়াচ্ছেন তরুণেরাই। প্রত্যয়ী তরুণেরাই। খুব কম দেশেই এত পরিবর্তনকামী তরুণ এতটা প্রত্যয় নিয়ে দৌড়ান।
সবচেয়ে বড় কথা, এই তরুণেরা কারও মুখের দিকে তাকিয়ে বসে নেই। তাঁরা একাত্তরকে সেই দিকনির্দেশনার জন্য, অনুপ্রেরণার জন্য বেছে নিয়েছেন। মাঝখানে একাত্তর নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল। এখনো এক বড়সংখ্যক তরুণের কাছে একাত্তরকে তুলে ধরা হচ্ছে নেতিবাচকভাবে। তাঁদের অন্ধ করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু একদিন তাঁদের চোখেও আলো পৌঁছাবে, যেদিন তাঁরা দেখবেন, উন্নয়নের রাস্তায় যে দৌড়ের উৎসব চলছে, তাতে যোগ না দিলে তাঁরা ছিটকে পড়বেন।
আমাদের রাজনীতি, বিভাজিত সমাজ, স্বার্থান্ধ নানা গোষ্ঠী, বিভ্রান্তি ছড়ানো নানা মতবাদ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুক্তির নতুন সংগ্রামের। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা বলেছিলেন। স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, কিন্তু মুক্তি এখনো নয়। এই মুক্তি আসবে শিক্ষার হাত ধরে, দারিদ্র্য বিদায়ে, নারীর স্বাধীনতায়, সুস্বাস্থ্যে, সবুজ জীবনধারণে, অর্থনীতির ক্রমাগত অগ্রযাত্রায় এবং সংস্কৃতির ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয়ে। চিরমুক্তির সাধনায়, আরও নানা উপায়ে। এ জন্য আয়োজনটাকে হতে হবে ব্যাপক, প্রস্তুতি হতে হবে বিশাল, প্রত্যয় থাকতে হবে দৃঢ়। এগুলোর সমন্বয় কারা করবেন?
করবেন তরুণেরা, নিজেরাই। করতে যে শুরু করেছেন, তার প্রমাণ আমার চোখে পড়ে। সবার চোখেও নিশ্চয়, যদি তা দেখার জন্য আমরা তাকাই। আমার একটা বিশ্বাস, যত তরুণ একাত্তরে ফিরে গেছেন, ২৫ মার্চ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন, তত তাঁদের প্রত্যয়টা দৃঢ় হচ্ছে: একাত্তরের শহীদদের ঋণ আমরা শোধ করব। সাড়ে চার দশকে নিজেরাই আমরা মুক্তির পথে নানা বাধার দেয়াল তৈরি করেছি, কিন্তু আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, বাধার দেয়ালগুলো ভাঙার জন্য মানুষ পথে নেমেছে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো এই আয়োজন আর প্রত্যয়কে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করছে, নানা স্বার্থের জালে রাজনীতিকে আটকে রেখেছে। কিন্তু তরুণেরাই এই নেতৃত্বকে একদিন তাঁদের সহযাত্রী হতে বাধ্য করবেন।
আমাদের রাজনীতির একটা বড় ব্যর্থতা, উন্নয়নের আয়োজনে শামিল হতে এটি নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, অথচ উন্নয়নের সবটুকু কৃতিত্ব দাবি করে। এই অভ্যাসের পরিবর্তন প্রয়োজন। সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া এগিয়েছে প্রো-অ্যাকটিভ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য। সেটি বাংলাদেশেও হবে। এটি হবে সময়ের প্রয়োজনে, তরুণদের অংশগ্রহণে এবং এ জন্য পথ দেখাবে একাত্তর।
তিন.
২৫ মার্চ রাতটি বিষাদের। মার্চজুড়ে বাঙালি সারা দেশের অনেক শহরে-গ্রামে রক্ত দিয়েছে। ওই রক্ত এবং ২৫ মার্চ রাতে যে রক্ত ঝরল, তাতে ফুটল স্বাধীনতার কলি। সেই কলিকে কুসুমে পরিণত করল একাত্তরে ঝরে যাওয়া রক্ত। এত দিনে বিষাদকে আমরা এমন একটা স্তরে নিয়ে গেছি, যা আমাদের আর স্তব্ধ করে রাখে না, শহীদদের স্মৃতি ও স্বপ্ন উদ্যাপনে বরং উদ্বুদ্ধ করে। অনেক দিন থেকেই এটি ঘটছে।
এই ২৫ মার্চ আমি দৃঢ়ভাবে অনুভব করছি, অসংখ্য তরুণ, যাঁদের পিতা-মাতাও হয়তো মাত্র স্কুলে পড়তেন একাত্তরে, তাঁরা এই রাতটির সঙ্গে নিজেদের কল্পনা মেলাতে চান। এই রাত থেকে অনুপ্রেরণা চান। যত বেশি তরুণ একাত্তরে ফিরবেন, তত উচ্চতায় উড়বে জয়ের পতাকা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Sunday, February 22, 2015

বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আর ২৫ থেকে ৫০ বছর পর বাংলা ভাষা কেমন হবে—এ নিয়ে শিক্ষিতজনের মনে নানা উদ্বেগ। এই উদ্বেগের পেছনে আছে পড়ার সংস্কৃতির অবক্ষয় এবং ভাষার মানে টান পড়া। একসময় বই পড়াটা ছিল অনেকের কাছেই অভ্যাসের বিষয়। পরিবারগুলোর সংগ্রহে থাকত বই, বন্ধুবান্ধব-সহপাঠীদের মধ্যে আদান-প্রদান হতো বই। অনেক স্কুলেই গ্রন্থাগার ছিল, শিক্ষাক্রম ছিল বইবান্ধব। এখন বই পড়াটা চলে গেছে টিভি দেখা, ইন্টারনেট ঘাঁটা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর চর্চার পেছনে। যারা বই পড়ছে, তাদের একটা বড় অংশ পড়ছে জনপ্রিয় সাহিত্যের ফাঁদে। জনপ্রিয় সাহিত্যের চমক আছে, স্থায়িত্ব নেই; মনকে তা আনন্দ দেয়, চিন্তাকে খোরাক দেয় না। শিক্ষিতজনের উদ্বেগের তালিকায় বড় জায়গা নিয়ে আছে ভাষার ক্ষেত্রে নানা শৈথিল্য, যা এর মানটাকে কিছুতেই প্রতিষ্ঠা দেয় না। একসময় শিক্ষিতজনেরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা ভাষার ক্ষেত্রে একমত হয়েছিলেন, যা তাঁদের চিন্তাভাবনাকে পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন করবে। এর কথ্য ও লিখিত, দুই রূপের ব্যাপারেও মতৈক্য ছিল। এটিকে কেউ বলেছেন প্রমিত, কেউ মানভাষা। এটি ছিল আমাদের মননশীলতার এবং আনুষ্ঠানিক ভাব ও চিন্তা প্রকাশের একটি সম্মত রূপ। একসময় এটিকে কর্তৃত্ববাদী, এলিটধর্মী ও প্রাতিষ্ঠানিক বলে প্রশ্ন করা শুরু হলো। এখন ‘মান’ বা ‘প্রমিত’ শব্দ দুটি সন্দেহজনক একটি চরিত্র নিয়েছে। এখন কেউ যদি বলে, আমাদের একটি মানভাষার প্রয়োজন আছে, তাকে নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করবে; অনেকে বলবে, লোকটা সেকেলে অথবা মতলববাজ। ভাষাকে এখন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে পণ্যবিশ্বের হাতে, দৃশ্যমাধ্যমের ঠাকুরদের হাতে; ভাষার ব্যাপারে আমরা খুব স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছি। ভাষার মান নিয়ে কোনো কথা তুললে একটা হইচই পড়ে যায়। না, হইচইটা মানটাকে ওপরে তোলার পক্ষে নয়, হইচইটা ভাষা নিয়ে রক্ষণশীলতা দেখানোর অভিযোগে।
মান যে পড়ছে, তা তো বোঝা যায় বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখে। অনেক শিক্ষিতজনের বাংলা এখন শিথিল—তা ব্যাকরণ মানে না, শুরু ও শেষের যৌক্তিক সম্পর্কটি মানে না। ভাষার অনেক রূপের নিজস্বতা মানে না (এগুলোর সংমিশ্রণ যদিও মানে), ঋণ-শব্দের কার্যকরণ মানে না। কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, বাংলা ভাষায় বিদেশি (ইংরেজি, হিন্দি) শব্দের অকারণ অনুপ্রবেশ ঘটছে, ভাষা সে জন্য দূষিত হচ্ছে, তাকে একেবারে উনিশ শতকের ভাষা-সংস্কৃতিকে পাঠিয়ে দিয়ে এ কথা প্রমাণ করার চেষ্টা চলবে, তরুণেরা যদি এ রকম মিশ্র ভাষা ব্যবহার করে, তাহলে সেটিই বাংলা ভাষার অবধারিত ও নিয়তি নির্দিষ্ট রূপ। এটিই সময় ও সংস্কৃতির পরিক্রমায় হয়ে ওঠা বাংলা ভাষা।
কথ্য বাংলার মান নেমে যাওয়ার প্রশ্নটি না হয় বোঝা গেল— প্রতিদিনের চর্চায় এর কাঠামোগত, উচ্চারণগত এবং নান্দনিক বিচ্যুতিগুলো এখন অনস্বীকার্য (যদিও কারও কারও মতে, এখানে মান থেকেও বেশি বিবেচ্য ভাষার বিবর্তন এবং নতুন রূপে এর উদ্ভবের পেছনে সক্রিয় ঐতিহাসিক অনিবার্যতা)। কিন্তু লিখিত বাংলার? কল্পনার দিগন্তটা ছোঁয়া যায়, প্রকাশের পথগুলো ঘুরে আসা যায় যে বাংলায়, তা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছি আমরা? তা কি আয়ত্তে আসছে তাদের? লিখিত বাংলা কি ক্রমাগত একটা উৎকর্ষের দিকে যাচ্ছে?
ভাষা নিয়ে বিতর্কটা জরুরি। ভালো বিতর্ক একটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়কেও নতুন মাত্রায় তুলে ধরতে পারে, নতুন আলো ফেলতে পারে অবহেলিত কোনো অঞ্চলে। কয়েক বছর ধরে ভাষা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন অনেকেই। পক্ষে-বিপক্ষের এসব ভাবনা-আলোচনা বাংলা ভাষাকে আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। এটি একটি শুভলক্ষণ।
ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু করেছিলাম। এক বা দুই প্রজন্ম পর বাংলা ভাষা কি টিকে থাকতে পারবে ইংরেজির সঙ্গে যুদ্ধ করে? এ রকম একটি প্রশ্ন অনেকেই আমাকে করেন। তাঁরা আমাকে বলেন দেশে ইংরেজি মাধ্যমের/ভার্সনের শিক্ষার্থী বাড়ছে; প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বেশি শিক্ষার্থী পাচ্ছে (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলে)। এদের পাঠ্যক্রমের ও পাঠদানের ভাষা ইংরেজি। একটি কাগজে একটি গবেষণা প্রতিবেদন বেরিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা বাংলা বই কেনেন খুব কম—৭ থেকে ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু মোটামুটি বাংলা বই কেনেন। ইংরেজি মাধ্যমের স্থলে এটি ১ থেকে ২ শতাংশ। আমি আরও শুনি, ভাষার মান কমে যাওয়ায় ধ্রুপদি সাহিত্যের বই পড়ে এখন অনেকেই আনন্দ পাচ্ছে না। বই এখন উপহারের তালিকায় নেই। পরিবারগুলো বই পড়াকে এখন আর গুরুত্বপূর্ণ ভাবে না।
এক তরুণ আমাকে বললেন, বইমেলায় প্রচুর বই বিক্রি হয়। তা ঠিক। প্রতিবছর বই বিক্রির সংখ্যা বাড়ছে, এটিও ঠিক। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশে একুশের বইমেলায় প্রতিবছর আগের বছরের তুলনায় এক কোটি টাকার বেশি বই বিক্রি হওয়া মানে মাথাপিছু ছয় পয়সা বৃদ্ধি। এর থেকে অনেক বেশি বৃদ্ধি তো সিগারেট বিক্রিতে হয়, বল সাবান অথবা রিকশার টায়ার বিক্রিতে হয়। তা ছাড়া, বেশি বিক্রি হওয়া বই কোন শ্রেণির, তার একটা হিসাব নিলে খুব আশাবাদী হওয়া কি যায়?
আমি স্বীকার করি, ১৭ কোটি মানুষের দেশে বই বিক্রির পরিসংখ্যান হতাশাজনক, ভাষার মানে টান পড়াটা কষ্টকর, ভাষার দূষণ ও বিকৃতি দুঃখজনক। কিন্তু এক বা দুই প্রজন্ম অর্থাৎ ২৫ থেকে নিয়ে ৫০ বছর পর বাংলা ভাষার অবস্থান বা প্রকৃতি নিয়ে আমার খুব একটা দুশ্চিন্তা নেই। আমি বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী, বাংলা বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তাহীন। আমি বর্তমানের বিচ্যুতি, অসংগতি, শৈথিল্য ইত্যাদি নিয়ে ভাবি বটে, কিন্তু জানি এসব দীর্ঘস্থায়ী নয়। একটা গুণগত পরিবর্তন যে আসবে, ভাষা জেগে উঠবে তার সব মহিমা নিয়ে, এটি ইতিহাসই আমাদের বলে দেয়।
আমার আশাবাদের ভিত্তি হচ্ছে বাংলা ভাষার অন্তর্গত শক্তি, বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্রমোন্নতি, বাংলা ভাষার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি ও ‘শিক্ষিত’-এর সংজ্ঞার পরিবর্তন। বাংলা ভাষা বিশ্বের আর দশটা ভাষার মতো নয়, এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য তরুণেরা রক্ত দিয়েছে। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা—এ রকম একটি দেশই আছে পৃথিবীতে, এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২৮ কোটি। এর একটি সমৃদ্ধ এবং পুরোনো সাহিত্য ঐতিহ্য আছে। পৌনে দুই শ বছর ইংরেজ ও ২৪ বছর পাকিস্তানি উপনিবেশে কাটিয়েও এ ভাষা হারিয়ে যায়নি। আর দুই প্রজন্ম পর এই শক্তির জায়গাটি ছোট হওয়া তো দূরে থাক, বড়ই বরং হবে।
পশ্চিম বা চীন-জাপানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, একটা ভাষার বিকাশের ও প্রসারের পেছনে অর্থনীতি কত বড় ভূমিকা রাখে। বাংলা ভাষার রাজধানী এখন ঢাকাতেই, দীর্ঘদিন তা কলকাতায় থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি মজবুত হচ্ছে, জীবনমান উন্নত হচ্ছে। আগামী ২৫ বছরে এই উন্নতি হবে চোখে পড়ার মতো। ভারতের তুলনায় আমরা যেখানে এগিয়ে, তা হচ্ছে এই উন্নতি গ্রামকে বদলে দিচ্ছে, যেহেতু উন্নয়নের পেছনের কারিগরেরা বেশির ভাগ এসেছেন গ্রাম থেকে। এখন মানুষ আর রাজনীতির মানুষ নয়, এখন মানুষ অর্থনীতির। অর্থনীতি মজবুত হলে যোগাযোগ বাড়ে। যোগাযোগের মাধ্যম সক্রিয়তা পায়। বাঙালি সচ্ছল হলে ইংরেজির দিকে যাবে। তবে অনেক বেশি যাবে বাংলার দিকে। অর্থনৈতিক উন্নতি পণ্যবিশ্বকে টগবগে করে দেয়। পণ্যের উদ্দেশ্য বিক্রি হওয়া, পণ্যবিশ্ব ভয়ানক গতিশীল এবং পণ্যবিশ্ব নিজের প্রয়োজনে এর প্রবাহ মাধ্যমগুলোতে সক্রিয় করে। ভাষা হচ্ছে পণ্যবিশ্বের এক নিতান্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ। নিজের প্রয়োজনেই তাই ভাষাকে তা সমর্থন দেবে, গায়ে-গতরে একে বাড়াবে। দেশের ভেতরে পণ্যবিশ্বের দূতিয়ালি করার জন্য বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করাটা তাই নির্বিকল্প হয়ে দাঁড়াবে।
পণ্যের স্পর্শে যা হয়, নিশ্চয়, বাংলা বিকৃত হবে, শুরুতে, বিজ্ঞাপনের বাংলা এখন যেমন। কিন্তু পণ্যের পেছনে অর্থশক্তি যত বাড়বে, ভাষাও তত শক্তি পাবে। আপন শক্তিতেই তখন ভাষা খুঁজে পাবে নিজেকে সুরক্ষার পথ ও আস্থা।
এখন বাংলা সাহিত্যের দুর্দিন যাচ্ছে বলে যাঁরা দুঃখ করেন, তাঁদের বলি, সব যুগেই বলা হয়েছে সাহিত্যের দুর্দিন যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতি যখন উন্নত হবে, বই বিক্রি বাড়বে (পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই তা হয়েছে)। অনেক লেখক যখন শুধু লেখালেখি থেকেই জীবিকা অর্জন করতে পারবেন, তখন সাহিত্যের দৃশ্যপট পাল্টাবেই। দুর্দিন যাচ্ছে কথাটা অনেকেই অবশ্য বলবেন, তবে সেটি অভ্যাসের একটি কথার মতোই শোনাবে। ধরা যাক, বই বিক্রি এখন বছরে ৫০ লাখ, যেদিন তা পাঁচ কোটিতে দাঁড়াবে (অর্থনীতির সূত্র বলে, সেটি হতে পারে এবং এই সংখ্যায় ই-বুক, ভার্চুয়াল বুক—সবই ধরা হলেও) সেদিন পাঠক-লেখকের মিথস্ক্রিয়াটাও পাল্টে যাবে। এবং এর সঙ্গে যোগ করুন নতুন করে অক্ষরজ্ঞান পাওয়া মানুষ। আমাদের দেশে এখনো ৪০ শতাংশ মানুষ লিখতে-পড়তে জানেন না। এই সংখ্যা যেদিন শূন্যে নামবে, সেদিন?
২৫ বছর সামনে তাকালে আমি যে ছবি দেখতে পাই: একটি সমৃদ্ধ, গতিশীল এবং আত্মবিশ্বাসী দেশ। তার শিক্ষাচিত্র ঈর্ষণীয়। মানুষ স্বাবলম্বী, নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম, দৃশ্যমাধ্যমের প্রথাগত প্রকাশগুলো বদলে গেছে, মানুষ ফিরে পাচ্ছে বইয়ের স্পর্শ ও আনন্দ। মানুষ শিক্ষিত ও সচ্ছল, ফলে তার ভাষায়ও এসেছে শক্তি। তার ভাষা আর শিথিল নয়। যে ভাষা ব্যবহার করছে মানুষ, তা পরিশীলিত, তাতে ইংরেজির মিশেল থাকলেও তা ভয়াবহ নয় (তার কারণ, প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার মান বাড়তে থাকায়, ভাষাশিক্ষার মান বাড়তে থাকায়)।
২৫ বছর পরের বাঙালি তরুণ হবে আত্মবিশ্বাসী। সে প্রতিযোগিতা করবে বিশ্বের সঙ্গে। সে দেখবে ফরাসিরা, জাপানিরা, ওলন্দাজরা কী যত্নে, কী নিষ্ঠায় ব্যবহার করে, চর্চা করে তাদের মাতৃভাষা। এই তরুণেরাও বাংলাকে সেই নিষ্ঠায় ও ভালোবাসায় ব্যবহার করবে।
তাদের আরও আত্মপ্রত্যয়ী ও নিষ্ঠাবান করার জন্য প্রতিবছর ফিরে আসবে অমর একুশে। ২৫ বছর পর একুশ এবং একাত্তর নিয়ে কোনো বিভ্রম থাকবে না ওই তরুণদের। তখন একুশ এবং একাত্তর হবে জেগে ওঠার নিরন্তর অনুপ্রেরণার নাম।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Thursday, February 19, 2015

এক কৃতিমান মানুষকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল
ইসলামের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের
৩০ বছর পূর্তি উৎসব উপলক্ষে ২৭ অক্টোবর ২০১৪ সোমবার আরসি মজুমদার
আর্টস মিলনায়তনে কেন্দ্রের প্রাক্তন সভাপতি ও পরিচালকদের সম্মাননা প্রদান
করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। ছবিতে এমিরিটাস অধ্যাপক
আনিসুজ্জামানকে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে।
আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। তার ছাত্র না হয়েও আমি তাকে শিক্ষক হিসেবে মান্য করি। তিনি সার্বিক অর্থেই একজন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। তিনি জ্ঞান সাধনা করেছেন সারা জীবন। প্রজ্ঞার সঙ্গে নীতি-নিষ্ঠার একটি সংযোগ ঘটিয়েছেন। তিনি সজ্জন ও রুচিশীল মানুষ, স্নিগ্ধ তার ব্যক্তিত্ব। তিনি বন্ধু ও ছাত্রবৎসল এবং তার আছে রসবোধ। পরিবারের প্রতি তিনি দায়বদ্ধ এবং দেশের প্রতিও।
আমাদের দীর্ঘদিনের জাতিগত সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে ড. আনিসুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শুরু হয়, তাতে তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে। তার কণ্ঠে জাতির বিবেকের কণ্ঠই শুনতে পাই। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে তার যে ব্যাপক পরিচিতি দেশে ও বিদেশে- তার মূলে আছে তার নিষ্ঠা ও নিরন্তর চর্চা। তার লেখালেখিকে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি- গবেষণা ও সৃজনশীলধর্মী। গবেষণা কাজে তার বিষয়বস্তু ভাষার ইতিহাস ছাড়িয়ে সংস্কৃতি-পঠন পর্যন্ত বিস্তৃত।
মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন ও বই লিখেছেন। পুরনো বাংলা গদ্য নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ আছে, সে রকম আরেক গ্রন্থ আছে সাহিত্য ও সমাজে বাঙালি নারীর অবস্থান নিয়ে। ২০১২ সালে প্রকাশিত তার ‘ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য’ নামের গ্রন্থটি আমার বিবেচনায় তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। ইংরেজিতেও তিনি লিখেছেন এবং বই সম্পাদনা করেছেন। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ নিয়ে তার যে গ্রন্থটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়, তা তাকে আমাদের দেশে সংস্কৃতি-পঠনের ক্ষেত্রে একজন পথিকৃতের মর্যাদা দিয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থ, প্রবন্ধ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি বিদ্বৎসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন, সভা-সেমিনারে আলোচনা করেছেন, যার বিষয়বস্তু সাহিত্য থেকে সংস্কৃতি ও ইতিহাস পর্যন্ত বিস্তৃত। এসবের অনেকই লিপিবদ্ধ হয়নি, যদি হতো তাহলে জাতি এসব বিষয়ে আরও প্রজ্ঞাবান পর্যবেক্ষণের উদাহরণ পেত।
তার সৃজনশীল লেখালেখির মধ্যে প্রধান হচ্ছে তার আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘কাল নিরবধি’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’। তার স্মৃতিশক্তি এতটাই প্রখর যে, দিনপঞ্জি না লিখেও দীর্ঘদিন আগে ঘটা কোনো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অথবা কোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতার নিখুঁত বর্ণনা তিনি উল্লিখিত দুই লেখায় দিয়েছেন, যাতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের এবং তার পরের বাংলাদেশের সমাজ চিত্রের একটা বিশ্বস্ত প্রতিফলন আমরা পাই।
ড. আনিসুজ্জামান তার সব লেখায় বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে পারদর্শিতার সঙ্গে ভাষার কুশলী প্রকাশের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ফলে তার লেখা একদিকে যেমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি মনোগ্রাহী। তার পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি প্রখর, ইতিহাস ও জীবনের সত্যের প্রতি তার নিষ্ঠা অবিচল।
তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন, কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সর্বশেষ ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেছে। এর মাধ্যমে তার প্রতি যেমন সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তেমনি সম্মান জানানো হয়েছে আমাদের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকে। আজ তার ৭৮তম জন্মবার্ষিকী। আমরা প্রার্থনা করি তিনি সুস্থ থাকবেন এবং দীর্ঘজীবী হবেন। যাতে তিনি জাতির পদপ্রদর্শকের ভূমিকায় দীর্ঘদিন থাকতে পারেন।
ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : লেখক; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Sunday, February 15, 2015

দরজার বাইরে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

দরজার কড়া নাড়ার পর কিছুটা সময় যায়, ঘড়ির কাঁটায় হয়তো এক-দুই মিনিট, কিন্তু রাশেদের কাছে একটা গোটা প্রহর। মিথিলা দরজা খোলে, মিষ্টি করে হাসে, একটু সরে দাঁড়ায়। রাশেদের হাত থেকে বই থাকলে বই, বাজার থাকলে বাজার নিজের হাতে নেয়, তারপর রাশেদ ঢুকলে, এবং দরজা বন্ধ হলে সেগুলো দরজার পাশের টেবিলটাতে নামিয়ে রাখে। তারপর গলায় কিছুটা অভিমান ঢেলে বলে, 'এত দেরি হলো'?
দেরি? রাশেদ অবাক হয়, আবার হয়ও না। ঘড়ির কাঁটায় হয়তো ঘণ্টা দুয়েক; অথবা অফিসের সময়টা হিসাবে নিলে একটা আধা দিন, কিন্তু মিথিলার কাছে একটা পুরো মাস। অথবা, কে জানে, গোটা একটা বছর।
দু'জনের সময়ের হিসাবটা অবশ্য এরপর একটা বিন্দুতে এসে মিলে যায়। 'খুব দেরি হয়ে গেল?' রাশেদ বলে এবং দু'হাতে মিথিলাকে জড়িয়ে ধরে। খুব যে শক্ত করে, তা নয়, ইচ্ছা করলেই মিথিলা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। কিন্তু নেওয়ার ইচ্ছার কথাটা তার মনে আসে না। মিথিলা বরং নিজেকে রাশেদের দুই হাতে সঁপে দেয়, তারপর একটা তরল আনন্দ তাকে দোলা দিতে থাকে। এক সময়_ এবং এই সময়ের হিসাবটা কারও মাথাতে আসে না_ রাশেদের ঠোঁট নেমে আসে মিথিলার ঠোঁটে।
দিনে একবার অথবা দু'বার। নাহ্, রাশেদ সেই হিসাবেও যায় না। তার বরং মনে পড়ে এক অবাক সন্ধ্যার আলো-অন্ধকারের নক্সা-কাটা আকাশটাকে, যার নিচে বসে একটা ঝোপের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে প্রথম মিথিলার ঠোঁটে সে ঠোঁট রেখেছিল।
মিথিলার শরীর কাঁপছিল। তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছিল। রাশেদের মনে হয়েছিল, যেন আকাশের দরজা খুলে ভেতরের জমানো সুখ ঝরে পড়ছিল। একটা মুহূর্ত এতটা সুগন্ধ ধরে রাখতে পারে, সে ভাবতে পারেনি।
রাশেদ মাত্র চাকরিতে ঢুকেছে তখন, মিথিলা পড়ছে ইডেনে। সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যেত। অফিসের ফাইলে মিথিলার ছবি, দেয়ালে মিথিলার ছবি, বড় সাহেবের মাথার ওপর টাঙানো প্রধানমন্ত্রীর ছবির ওপরও লেপ্টে বসত মিথিলার ছবি।
রাশেদ জিজ্ঞেস করত মিথিলাকে, 'একটা আস্ত দিন আমাকে ছাড়া পার করে দাও কীভাবে, মিথি?'
'পার করতে পারি কই?' ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে মিথিলা বলত। রাশেদের উড়ূক্কু ভাব আর উদাসীনতায় বিরক্ত বস তাকে টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দেয় কয়েক দিন আগে।
অনেক চেষ্টা করেও টাঙ্গাইল যাওয়া আটকাতে পারেনি রাশেদ। আকুর টাকুরপাড়ায় দুই কামরার এই ঘরটা ভাড়া নিতে হয়েছিল। বাড়িওয়ালার হাত-পা ধরাটা বাকি ছিল। বলেছিল, এক মাসের মধ্যে বউকে নিয়ে আসবে।
সেই এক মাস গিয়ে তিন মাসে ঠেকেছিল।
মিথিলার পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো, তার মামার সামনে দাঁড়িয়ে, অনেক ঘাম, ভয় আর তোতলামি মেশানো একটা বিকেলে সে বলেছিল, মিথিলাকে সে তার জীবনে চায়।
মিথিলার বাবা থাকেন মানামাতে। মা-ও। মানামা কোথায় রাশেদ মোটামুটি জানে। কিন্তু মামা যখন বলেছেন, পরীক্ষার পর মিথিলার মানামা যাওয়ার কথা, বিয়ের প্রশ্নই তাই ওঠে না, রাশেদের মনে হয়েছে, মানামা বোধ হয় চাঁদ অথবা নেপচুনের দূরত্বের কোনো শহর, যেখানে গেলে মিথিলা আর ফিরে আসবে না।
ফলে যা করার তা-ই তাদের করতে হয়েছে।
২. দরজার দিকে যেতে যেতে মিথিলা নিজের সঙ্গে একটা খেলা খেলত। রাশেদকে আজ বিরাট এক অপরাধী বানাতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে তিন মাসের এই সংসারে প্রথম দিনটার মতো এখন সে আর তাকে সময় দিচ্ছে না। মিথিলাকে সে ভুলে যাচ্ছে। অফিসটাকে সে মিথিলার ওপরে জায়গা দিতে শুরু করেছে। টাঙ্গাইলের ভূগোল রাঙিয়ে রাখে যে মিথিলা, তার চোখের আলোটা যেন তার কাছে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। ইত্যাদি।
প্রতিদিন সে নতুন একটা অভিযোগ খাড়া করত। মিথিলা জানত, অভিযোগটা যত গুরুতর হবে, রাশেদের কাছে তা পেঁৗছাবে অনেক অভিমানের মোড়কে জড়িয়ে। এবং মোড়ক খুলতে খুলতে অভিযোগটা কী, তা বোঝার আগেই রাশেদ তাকে পেঁৗছে দেবে একটা বিন্দুতে। অপার্থিব একটা বিন্দুতে।
সারা ঘরজুড়ে সেই অবাক সন্ধ্যার জাফরি কাটা আকাশটা তখন বিছিয়ে থাকবে। মিথিলার মনে পড়ে, সেই সন্ধ্যায় রাশেদের গাল থেকে একটা অদ্ভুত সুগন্ধ এসে লাগছিল তার নাকে। নাকি তার নিঃশ্বাস থেকে? জিহ্বা থেকে? এমনি ঘোর লাগানো সেই সুগন্ধ, মিথিলা সুযোগ পেলেই তাতে ডুবে গেছে।
দরজা খুললে কোন রাশেদকে সে দেখবে, তারও একটা আন্দাজ সে করত, বিশেষ করে তার মামা যেদিন এসে জানিয়ে গেলেন, মিথিলার বাবা বিয়েটা মেনে নেননি তার পর থেকে। বাবা মেনে নেননি, তাতে কী, মিথিলা নিজেকে বুঝিয়েছে। কিন্তু রাশেদের চোখে একটা কষ্টের ছায়া যে জমেছে, কিছুটা দুর্ভাবনারও, সেটি টের পেয়ে তার অভিযোগের তালিকাটা সে লম্বা করেছে আর হেসেছে। যতই চোখে ছায়া জমুক রাশেদের, দরজা খুললে বেশিক্ষণ সেগুলো ধরে রাখতে পারত না সে। একটা বিন্দুতে এসে যখন দু'জনের সময়ের হিসাবটা মিলে যেত, তখন রাশেদের উদ্বিগ্নতা, তার ভয় অথবা কষ্ট তরল হয়ে মিলিয়ে যেত।
৩. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেকে উদ্বিগ্নই লাগছিল রাশেদের। তার মনে পড়ল, মামাবাড়ি থেকে বেরিয়ে মিথিলা চোখে জাদু ঢেলে তাকে বলেছিল, 'চল, কোর্টে চল।'
জাদুই বটে। তাদের প্রথম দেখাটা ছিল একটা জাদু, দ্বিতীয় দেখাটাও এবং অবাক, এরপর প্রতিটি দেখাও। রাশেদ অবাক হয়েছে, বাবার সিদ্ধান্তের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে, মামাকে একটা কথাও না বলে, মিথিলা যখন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখনও জাদুটা তার চোখ থেকে যায়নি।
কোর্ট থেকে বেরিয়ে রাশেদের হাতে একটা হাত রেখে সে আস্তে করে বলেছে, 'এখন টাঙ্গাইল চল। আমাদের সংসার অপেক্ষা করে আছে।'
মিথিলার মামা যেদিন টাঙ্গাইল আসেন, সংসারটায় সেদিন প্রথম কাঁপন ধরল। তিনি মিথিলাকে বলেছেন, কাজটা মোটেও ভালো হয়নি। এখন সে যদি বাবাকে ফোন করে মাফ-টাফ চেয়ে নেয়, তাহলে হয়তো বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা থাকবে।
মিথিলা জানত, তার বাবা একটা পাত্র ঠিক করে রেখেছেন তার জন্য। পাত্র সেই মানামাতেই থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। তিনি কথাও দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাবার অবাধ্য হওয়া আর তার সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানাটা একই জিনিস, এটি সে বিশ্বাস করতে পারেনি।
সে শুধু আস্তে করে বলেছে, 'ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় মামা। প্রশ্নই তো ওঠে না।'
মামা জানিয়ে দিলেন, কোর্টের বিয়ের কোনো মূল্য নেই। এখন ঢাকা ফিরে গেলে মানামা যাওয়ার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। ইঞ্জিনিয়ার পাত্র তার পাগলামির কথা কিছুই জানে না। ফলে সমস্যা হবে না।
মিথিলা হেসেছে। আবার বলেছে, 'সম্ভব নয়।' মামা এরপর উঠেছেন।
৪. দরজার দিকে যেতে যেতে মিথিলা একটা খেলার কথা ভাবত। কেমন হয়, যদি রাশেদের মনে একটু ঈর্ষা জাগানো যায়? তাকে বলা যায়, ভাবছি, ঢাকায় যাব, তারপর মানামাতে। একটা হ্যান্ডসাম পাত্র বসে আছে আমার জন্য।
একদিন দরজা খুলতে গিয়ে এটি ভাবতে ভাবতে সে জোরে হেসে উঠেছে। রাশেদ অবাক চোখে তাকালে সে লজ্জা পেয়েছে। তাতে ঈর্ষা জাগানোর খেলার কথাটা তার মন থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।
কিন্তু মিথিলার হাসিটা একদিন বন্ধ করে দিতে স্বয়ং তার বাবা এসেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। হিসাব বোঝেন। সাধ্য বোঝেন। তিনি বাড়িতে ঢুকেই নাক সিটকে বলেছেন, 'এই বস্তির ঘরে তুই উঠেছিস?'
মিথিলার রেগে যাওয়ার কথা ছিল। বাবাকে দুটো কথা শুনিয়ে দেওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সে রাগ ভুলে গেল। কেঁদেই ফেলল বরং। অনেক দিন পর সে বাবাকে দেখল। বাবার বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে। চুল শুধু মাথার ছাদটাকে ঢেকে রেখেছে। গোঁফ সাদা হয়েছে। কপালে অনেকগুলো ভাঁজ জমেছে।
'তোমার শরীর কি ভালো নেই, বাবা?'
'কী করে থাকে বল, মা?' বাবা বললেন, সেই ছোটবেলা যেমন বলতেন, তার সঙ্গে রাজা আর রাজকন্যার খেলাটা যখন খেলতেন।
মিথিলার চোখে বাষ্প জমে যেন একটা মেঘলা দিন নিয়ে এলো। চোখের মেঘ সরিয়ে সে বাবাকে দেখল, বাবা দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছেন। 'আয় মা,' তিনি বলছেন, 'এই বস্তির ঘর ছেড়ে আয়।'
মিথিলার মনে পড়ল, ভাইয়াটার বয়স যখন নয়, এবং তার সাত, তখন নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমে ভাইয়াটা আর উঠে এলো না, এমনি করে হাত বাড়িয়ে বাবা বলেছিলেন, 'আয় মা, এই নরকে আর এক মুহূর্তও না।'
এরপর বাবা আর নানাবাড়ি যাননি। মিথিলাও না। অনেকক্ষণ পর, ঢাকা থেকে ভাড়া করা মাইক্রোবাসে উঠে বসতে গিয়ে বাবা বললেন, 'হামীমটাকে হারালাম। তোকে হারাতে পারি না।'
৫. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ খুব অস্বস্তি হয় রাশেদের। এমন কী হলো যে একটা অনন্তকাল পার করে দিয়ে দরজাটা খুলতে হবে? হঠাৎ কেন দু'জনের হিসাব একটা বিন্দুতে এসে মিশে যাচ্ছে না? এই বাড়িটাতে যে নক্সা-কাটা আকাশ নামত প্রতি সন্ধ্যায়, সেটি হঠাৎ অনেক উঁচুতে উঠে কি হারিয়ে গেছে? মিথিলা কী আজ বলবে, যেমন সে একদিন কোনো কিছু না ভেবেই বলেছিল, 'একটা বড় বাসা দেখলে হয় না?'
'বড় বাসা? কার জন্য?' রাশেদ জিজ্ঞেস করেছিল, যেন সে অবাক হওয়ার সুযোগটাও পায়নি।
'কেন, আমাদের জন্য?'
'আমাদের জন্য?'
মিথিলা আর কথা বাড়ায়নি।
তার মনে পড়ে, মিথিলার বাবা মানামা ফিরে গেলে তার হাসিটাও যেন বিদায় নিয়েছিল। একদিন অনেকটা সময় নিয়ে সে হামীমের শেষ দিনটি নিয়ে কথা বলল। তাকে নিয়ে দু-এক কথার বেশি কোনো দিন কিছু বলেনি মিথিলা। অথচ আকুর টাকুরপাড়ার জাদুর ভূগোলে একটা কালো ছায়া বিছিয়ে মিথিলা তাকে বলতে থাকল, পুকুরে নামার আগে হামীম কী করেছিল, কী বলেছিল। ইত্যাদি।
আরেক দিন মিথিলা জানাল, তারপর থেকে বাবা তাকে কীভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। 'বাবা আমার দিকে দুটি হাত বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। তার চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন' ইত্যাদি।
তারপর গল্পটা সেইখানে ফেলে রেখে সে উঠে বিছানায় গেছে।
৬. দরজার দিকে যেতে যেতে একদিন মিথিলার মনে হয়েছিল, আজ তার অভিযোগের তালিকায় তিনটি নতুন বিষয় সে ঢুকিয়ে দেবে। আঙুলে এক দুই তিন হিসাব করতে গিয়ে সে দেখল, তার আঙ্গুল শক্ত হয়ে আছে, হাত শক্ত হয়ে গেছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে অবাক হলো, অথবা হলো না, কারণ তার অভিযোগগুলো স্পষ্ট। রাশেদ কেন তার একটা কথাও রাখছে না, এই বাড়িটা ছেড়ে একটা ভদ্র, বড় বাড়ি কেন নিচ্ছে না? কেন সে ঢাকায় একটা বড় চাকরি খুঁজছে না, এবং কিছু দিনের জন্য সে যে মানামায় বাবা-মার সঙ্গে থেকে আসতে চাইছে_ সেজন্য কিছু টাকার জোগাড় কেন রাশেদ করছে না?
অভিযোগগুলোর ভেতর দিয়ে আরেকবার যেতে গিয়ে সে দেখল, রাশেদ যদি এসব শুনে চুপ করে না থাকত, যদি তার চোখে গম্ভীর কিছু কষ্টের ছায়া জমে তাকে হতবাক করে না দিত এবং সে একটুখানি হেসে শুধু বলত, আমি চেষ্টা করছি, মিথি, খুবই চেষ্টা করছি, তাহলে এই অভিযোগের খেলাটা একটা বিন্দুতে গিয়ে মিশে যেত, তরল হয়ে যেত।
৭. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হলো, একটা দুই কামরার ভাড়া বাড়িতে তার এক জীবনের সব বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার কোনো মানে হয়নি। সে নিজেকে প্রশ্ন করল, একবারও কেন সে মিথিলাকে বলেনি, চল, একটা বাড়ি তুমি আমি মিলেই বরং দেখি? কেন সে চুপ থেকে বরং এ রকমটি বুঝিয়েছে মিথিলাকে, এই বাড়িটা তার অনন্ত বাসর ঘর, তার সারা জীবনের ঠিকানা, যেখানে একটা পা রাখলেই সে অবাক করা সন্ধ্যার নক্সা-কাটা আলো-অন্ধকারে ঢুকে যাবে, আর তার চোখে জমবে একটার পর একটা স্বপ্ন?
৮. দরজাটা শেষ পর্যন্ত খুলল। একটা মুহূর্ত, রাশেদ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'আমার নাম রাশেদ আহমেদ' ইত্যাদি। 'দুই বছর আগে এই বাড়িটাতে আমি ছিলাম, বাড়িটা আমার জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।' ইত্যাদি।
যার সঙ্গে রাশেদ কথা বলছিল, মিথিলার থেকে তার বয়স বছর পাঁচেকের বেশি হবে না। শুক্রবার সকালের কাজ তার সারা হাতে, চেহারায়, শাড়িতে। খুব বিরক্ত হওয়ার কথা, কিন্তু মুখে একটা হাসি মাখিয়ে তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, ভেতরে আসুন।'
তারপর তিনি বললেন, তার নাম লায়লা।
ভেতরে একটা পা রাখতেই রাশেদের মনে হলো, মাত্র একবারের মতো, একটুক্ষণের জন্য কেউ তাকে সুযোগ করে দিয়েছে, তার সেই অবাক-সন্ধ্যার জীবনটা একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য। মাত্র একবার, তারপরই তার হাতটা গুটিয়ে নিতে হবে। এক ফালি একটা বারান্দা, একদিকে বসার ঘর, অন্যদিকে রান্নাঘর। বসার ঘরটা পার হয়ে শোবার ঘর। ব্যস। রান্নাঘরের পাশে আধখানা একটা ঘর অবশ্য আছে, যাতে রাশেদ তার পড়ার টেবিলটা রেখেছিল। বইয়ের একটা শেলফও ছিল। চোখ বুজে সে বাড়িটাকে অনুভব করল। চোখ বুজে, যেহেতু চোখ খুললেই তাকে আঘাত পেতে হবে, যেহেতু খোলসটা ছাড়া সব পাল্টে গেছে বাড়িটার। সবই অচেনা। একবার তার ইচ্ছা হলো দৌড়ে শোবার ঘরটা দেখে আসবে। কিন্তু ভাবল, দরজা-দেয়াল ছাড়া সবই তো অচেনা দেখতে হবে; তার ভয় হলো, মধুমাখা দুপুর-বিকেল-রাতগুলো তাহলে হারিয়ে যাবে, এমনকি স্মৃতি থেকেও। সে চুপ করে বসার ঘরের একটা বেতের সোফায় বসে থাকল। এবং নিজের অজান্তে লায়লাকে বলেই ফেলল, যে কথাগুলো এখনও কাউকে বলতে পারেনি সে।
লায়লা তাকে বললেন, 'একটু চা দেই?'
'জি না,' অস্থির হয়ে বলল রাশেদ। 'আমি এখন যাব।'
'যাবেন?' তিনি বললেন, তারপর নিজেই যেন উত্তর দিলেন, 'যাওয়াই ভালো, শুধু কষ্ট বাড়বে।'
রাশেদ ভেজা চোখে তাকাল।
'এই আকুর টাকুরপাড়ায় আমরাও প্রথম সংসার পেতেছিলাম,' একটুখানি দীর্ঘশ্বাস যেন তিনি ফেললেন। 'পাঁচটা বছর কেটেছে সেই বাড়িটাতে। পাঁচটা বছর। যেন স্বপ্ন দিয়ে বোনা। সেই স্বপ্নের মাঝখান থেকে অমিত এলো ... '
লায়লার আশপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকা বছর চারেকের ছেলেটির নাম তাহলে অমিত।
'অমিত আসার পর আস্তে আস্তে সব যেন বদলে গেল। মনে হলো ওর বাবা যেন একটু একটু করে অন্য একটা মানুষ হয়ে গেলেন। চিরদিনের চেনা, কিন্তু কেমন করে যেন অচেনাও। বাসাটার পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি, একবার ফিরেও তাকায়নি। কিন্তু এক রাতে হঠাৎ আমাকে হাত ধরে টেনে সে বলল, চল বাড়িটা একবার দেখে আসি।
সেদিন মনে হলো সবকিছুই আসলে ভেতরের ব্যাপার। কী বলেন?'
রাশেদ একটুখানি অপ্রস্তুত হলো। 'উনি কোথায়?' সে জিজ্ঞেস করল।
'চুল কাটতে গেছে। এক্ষুনি ফিরবে,' তিনি বললেন, তারপর গলায় আর্দ্রতা মাখিয়ে বললেন, 'চলেই গেলেন শেষ পর্যন্ত?'
রাশেদ মাথা নাড়ল। 'মানামা না কোথায় যেন বললেন, একেবারে সেইখানে?'
'হ্যাঁ' রাশেদ বলল, তারপর দরজার দিকে পা বাড়াল। পা বাড়াতে বাড়াতে সে শুনল, দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। কড়া নাড়ার শব্দে লায়লার চোখে নিত্যদিন আবার ফিরে এলো। 'ও এসেছে,' আস্তে করে তিনি বললেন।
৯. দরজার ভেতরে পা রেখেই চমকে গেলেন গৃহকর্তা। চোখে প্রথমে ভয় জমেছিল, পরে কৌতূহল, তারপর বিরক্তি। কী চাই? তিনি জানতে চাইলেন।
'বাড়িটা দেখতে এসেছিলেন,' লায়লা বললেন।
'বাড়ি তো আমি ছাড়ছি না যে ভাড়া হবে,' তার চোখের দৃষ্টিতে এবার সন্দেহ।
'এই বাড়িতে থাকতেন এক সময়, সেজন্য দেখতে এসেছেন।'
'আচ্ছা? তাহলে আমাকে এখন জাদুঘরের লোকজনের মতো ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখাতে হবে?'
'আহ্, এ রকম করে বলতে হয় না,' লায়লার ক্ষতি-মেরামতির চেষ্টা।
'তা ছাড়া আর কী,' ভদ্রলোকের মেরামতির কোনো চেষ্টা নেই। 'গত শনিবার বাড়ি দেখার আবদার নিয়ে হাজির এক মহিলা। আজ ইনি।'
'আচ্ছা?' অবাক হয়ে লায়লা জিজ্ঞেস করলেন।
'তুমি অমিতকে নিয়ে ছোট আপুর বাসায় গিয়েছিলে। তুমি ছিলে না বলে আমি ঢুকতে দেইনি।' ভদ্রলোক বললেন। তারপর যেন কিছুটা দয়া দেখা দিল তার ভেতর। তিনি রাশেদকে বললেন, 'দেখতে চাইলে আসুন।'
রাশেদের ভেতরে একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। 'যে মহিলা এসেছিলেন, দয়া করে তিনি কী রকম দেখতে একটু বলবেন?'
ভদ্রলোক এবার বিরক্ত হলেন। 'একজন মহিলার চেহারা কী করে মনে করে বসে থাকি, বলেন? তবে তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন। একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে। হাঃ।'
কেন জানি রাশেদের চোখ পড়ল লায়লার চোখে। সেখানে কি একটুখানি হাসি দেখল রাশেদ, নাকি আকুর টাকুরপাড়ার ভূগোলটা আবার মায়াময় হয়ে ছায়া ফেলল তার চোখে?
দুটি সিঁড়ি টপকে রাস্তায় নামতে নামতে সে দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনল। মায়াময় সেই শব্দে যেন দরজাটা কিছু একটা বলতে চেয়েছে রাশেদকে।