Sunday, February 2, 2014

ব্যালটই যায়নি ১২ প্রদেশে

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গতকাল সরকারবিরোধী
একজন বিক্ষোভকারী প্রতিপক্ষের বিক্ষোভকারীদের
(ছবিতে নেই) দিকে পিস্তল তাক করে
এভাবে অবস্থান নেন। ছবি: এএফপি
থাইল্যান্ডে আজ রোববার নির্বাচন। বিতর্কিত এই নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানী ব্যাংককে সরকারবিরোধী ও সরকারপন্থীদের মধ্যে গতকাল শনিবার সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় গুলিতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। নির্বাচন ভন্ডুল করতে বিরোধীরা গতকাল থেকে ‘চূড়ান্ত’ বিক্ষোভ শুরু করেছেন। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে রাজধানী ব্যাংককের বেশ কয়েকটি এলাকা ছাড়াও কয়েকটি প্রদেশে ব্যালট পেপার পাঠানো সম্ভব হয়নি।
রাজধানীতে ব্যালট পেপার মজুদ ছিল—বিরোধীরা গতকাল এমন কয়েকটি ভবন ঘেরাও করলে সরকারপন্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার নেতৃত্বাধীন পুয়ে থাই পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাজধানীর লক্ষ্মী এলাকায় গতকাল ঘটে গুলির ঘটনা। তবে কারা গুলি চালিয়েছে ও কতজন আহত হয়েছেন—এ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কিছু জানা যায়নি। প্রধান বিরোধী ডেমোক্র্যাট পার্টি এই নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্বাচন বানচালের চূড়ান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। এই পরিস্থিতিতে ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা সত্ত্বেও সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড় রয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সংস্কারের স্বার্থে ইংলাকের পদত্যাগের দাবিতে চলা এই গণ-আন্দোলনের নেতা সুথেপ থাগসুবান শান্তিপূর্ণ উপায়ে সড়ক অবরোধের প্রতিশ্রুতি দেন। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা না দিতে অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানান। তবে গত রোববার আগাম ভোট গ্রহণের আগে সুথেপ একই ধরনের আহ্বান জানালেও তাঁর অনুসারীরা আমলে নেননি। বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে ব্যাংককের ৫০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। শুক্রবার রাতে সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী সুথেপ থাগসুবান বলেন, ‘জনগণ ভোট কেন্দ্র বন্ধ করে দেবে না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় রাস্তায় এ নির্বাচন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করবে।
কোনো সহিংসতা নয়, আমরা এমন কিছু করব না, যাতে লোকজন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন।’ এর পরদিনই ইংলাকপন্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। নির্বাচন কমিশনের সচিব পুছং নাত্রায়ং বলেন, মধ্য, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি প্রায় শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাজধানীর কিছু অংশ ও দক্ষিণ থাইল্যান্ডের ১২টি প্রদেশে ব্যালট পেপার পাঠানো সম্ভব হয়নি। কারণ, বিক্ষোভকারীরা এসব এলাকায় ব্যালট পেপার সরবরাহে বাধা দিচ্ছেন। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ভোট স্থগিতের সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে কমিশন। কমিশনের সচিব বলেন, ‘আমরা চাই না নির্বাচন ঘিরে রক্তপাত হোক। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের জন্য সব বাহিনী সহায়তা দেবে। এর পরও সহিংসতা দেখা দিলে, রক্তপাত হলে কী করব?’ তিনি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করি, কাল (আজ) কোনো হানাহানি না হোক, কোনো অভ্যুত্থান না ঘটুক।’ থাইল্যান্ডে বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও রাজতন্ত্রের সমর্থক জনগোষ্ঠী এবং ইংলাক ও তাঁর বড় ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থক দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী মুখোমুখি অবস্থানে। আজকের ভোটকে কেন্দ্র করে আরও সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিবিসি ও রয়টার্স।

টাইপরাইটারেই ভরসা

টাইপ করায় ব্যস্ত গর্ডন মার্টিন
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের কার্যালয়। প্যালেস অব ন্যাশনস নামের ওই ভবনের প্রেস রুম ওয়ানের এক প্রান্তে পর্দা দেওয়া একটি জায়গা থেকে ভেসে আসছে কাগজের ওপরে ধাতব বোতাম পড়ার ঠনঠন শব্দ। এ শব্দের সৃষ্টিকর্তা গর্ডন মার্টিন। তিনি ভ্যাটিকান রেডিওর জাতিসংঘ প্রতিনিধি। জেনেভায় সিরীয় সংঘাত বন্ধে চলা দ্বিতীয় শান্তি সম্মেলনের সর্বশেষ খবর লিখতে ব্যস্ত মার্টিন। এ কাজে ব্যবহার করছেন ৪০ বছরের পুরোনো একটি টাইপরাইটার। গত ২৫ বছর ধরে সেখানে সাংবাদিকতা করছেন ৮৬ বছর বয়সী গর্ডন। বর্তমানে যেখানে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও ডিজিটাল কূটনীতির জয়জয়কার, সেখানে মার্টিন এখনো রয়ে গেছেন দৃঢ়চেতা অ্যানালগ সাংবাদিক। ‘আমার কোনো মুঠোফোন নেই। আমি আধুনিক অনেক কলকবজার কিছু বুঝি না।’
তাঁর কথায় কিছুটা গর্বের সুর। মার্টিনের সাংবাদিকতায় আসা দৈবক্রমে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর কিছুদিন শিক্ষকতায় ছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি মদের ব্যবসায় ক্যারিয়ার গড়তে যাচ্ছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে তিনি মত পাল্টে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হন। ইতালিয়ান ভাষা জানায় তাঁকে রোমে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১০ বছর রয়টার্সে থাকার পর যোগ দেন বিবিসিতে; কাজ করেন বিভিন্ন দেশে গিয়ে। মার্টিন এখনো কাজ করছেন। তবে আর বেশি দিন হয়তো তাঁর টাইপরাইটারটি ঠনঠন আওয়াজ তুলবে না। মার্টিন বলেন, ‘আমার পায়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে...এ বছর কাজ করে হয়তো বিদায় নেব।’ সিরিয়া নিয়ে দ্বিতীয় জেনেভা সম্মেলন রুদ্ধদ্বার হলেও সিরিয়ার দুই পক্ষই ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে গণমাধ্যমে তাদের বার্তা পৌঁছায়। তবে তার মূল্য মার্টিনের কাছে সামান্যই। কেননা, তিনি ক্যারিয়ারের শেষ দিন পর্যন্ত নিজস্ব ঘরানায় সাংবাদিকতা করে যাবেন। বিবিসি।

দায়মুক্তি পাননি দেবযানী, মামলা চলবে: কৌঁসুলি

দেবযানী খোবরাগাড়ে
ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ভিসা জালিয়াতি ও গৃহপরিচারিকার মজুরির ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য উল্লেখের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পাননি। ফলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। গত শুক্রবার ম্যানহাটনের সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতে জমা দেওয়া নথিপত্রে এ কথা বলেন। মার্কিন সরকারি কৌঁসুলিরা বলেন, দেবযানী যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থান করায় এখন তিনি কূটনৈতিক দায়মুক্তির আওতাভুক্ত হবেন না। কূটনৈতিক মর্যাদা তাঁকে অভিযোগ থেকে রেহাই দেবে না। নিউইয়র্কে ডেপুটি কনসাল জেনারেলের পদমর্যাদায় কর্মরত দেবযানী মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশে ১৪ জানুয়ারি দেশে ফেরেন। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে মামলা হয়। তিনি গত ১২ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান। এপি ও রয়টার্স।

জেনেভা সম্মেলন থেকে খালি হাতে ফিরল উভয় পক্ষ

খালি হাতে ফিরতে হয়েছে সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহীদের। সহিংসতা বন্ধের পথ খুঁজতে আয়োজিত জেনেভা শান্তি সম্মেলন বলার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে দুই পক্ষ সরাসরি আলোচনায় বসে চলমান সংকট সমাধানের যে প্রত্যাশা জাগিয়েছে, তাকেই একধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন জাতিসংঘের সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত লাখদার ব্রাহিমি। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে দামেস্ককে চাপ দিতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে জেনেভায় আলোচনায় বসেন সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিরা। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনা গত শুক্রবার শেষ হয়। কিন্তু বলার মতো অগ্রগতি হয়নি। এ জন্য দুই পক্ষই পরস্পরের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। লাখদার ব্রাহিমি গত শুক্রবার জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, জেনেভা আলোচনায় তিনি বেশ কিছু ইতিবাচক দিক দেখছেন। দুই পক্ষই অন্তত ১০টি বিষয়ে আগের চেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে এসেছে। ব্রাহিমি জানান, সিরিয়ার সরকারবিরোধী পক্ষ আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি আবারও আলোচনায় ফিরে আসার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। তবে সরকারি প্রতিনিধিরা দামেস্কের সঙ্গে কথা বলার পর আলোচনায় ফেরার বিষয়ে তাঁদের অবস্থানের কথা জানাতে চেয়েছেন। ব্রাহিমি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। তবে দুই পক্ষই ইতিবাচক মানসিকতা দেখিয়েছে।
ব্রাহিমি দুই পক্ষের কাছাকাছি আসার বিষয়টি উল্লেখ করলেও মূল বিষয়ে কেউ এক ইঞ্চিও ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি। সেটি হলো, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ভবিষ্যৎ। জেনেভায় সরকারের প্রতিনিধিরা বারবার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বাশার সাংবিধানিকভাবে তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ পূরণ করবেন। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তিনি। আর বিরোধীরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা ছাড়া সিরিয়ার চলমান সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এমনকি আলোচনায় কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের এক ফাঁকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের প্রক্রিয়ার ধীরগতির কথা তোলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জানানো হয়, সিরিয়ার রাসায়নিক উপাদান দ্রুত লাতাকিয়া বন্দরে পৌঁছে দিতে দামেস্ককে চাপ দিতে লাভরভের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জন কেরি। লাতাকিয়া বন্দর থেকে রাসায়নিক উপাদানগুলো জার্মানিতে নিয়ে ধ্বংস করার কথা। রুশ-মার্কিন মতৈক্যে প্রণীত রূপরেখা অনুযায়ী আগামী ৩০ জুনের মধ্যেই সিরিয়ার সব রাসায়নিক অস্ত্র ও উপাদান দেশটি থেকে নিয়ে ধ্বংস করার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সিরিয়া পর্যাপ্ত গতিতে কাজ করছে না। এ পর্যন্ত সিরিয়ার ঘোষিত রাসায়নিক অস্ত্রের মাত্র চার শতাংশ সরিয়ে নেওয়া বা ধ্বংস করা হয়েছে বলে করেছে ওয়াশিংটন। বিবিসি ও আল-জাজিরা।

সুশীল সমাজের প্রভাব আগের চেয়ে কমেছে

অধ্যাপক রেহমান সোবহান
অধ্যাপক রেহমান সোবহান
বাংলাদেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এরপর ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। তিনি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন এই স্বনামধন্য ও বরেণ্য অর্থনীতিবিদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম
প্রথম আলো : প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করেন?
রেহমান সোবহান : গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগের ৬৫ বছরের গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ সেই ১৯৪৯ সাল থেকে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং অবাধ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে সব সময় ক্ষমতায় এসেছে। তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি কতটা নষ্ট হয়েছে, সে সম্পর্কে ক্ষমতাসীন জোটের ১৫৩ জন সদস্যের চেয়ে বেশি আর কেউ সচেতন হতে পারেন না, যাঁরা একটিও ভোট না পেয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দশম জাতীয় সংসদের সদস্যের শপথ নিয়েছেন।
প্রথম আলো : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? এ রকম একটি নির্বাচন কি বৈধতা দাবি করতে পারে?
রেহমান সোবহান : ৩০০ জন সাংসদের মধ্যে ১৫৩ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দশম সংসদে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনের সদস্যরা ৪০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন। এসব সংখ্যার হিসাব এটাই প্রতিষ্ঠা করে যে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে আনুমানিক ১৮ শতাংশ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এ রকম একটি নির্বাচন ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে কোনো অংশেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ওই নির্বাচনে ২৬ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোট দিয়েছিলেন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়। ১৯৯৬ ও ২০১৪ উভয় নির্বাচনেই বাস্তবতার চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হয়। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যুক্তিসংগতভাবেই প্রশ্ন ওঠার কারণে বিএনপি সরকারের বৈধতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ওই সরকার তখন সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার প্রথম দিন থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল এবং শাসনকালের মেয়াদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তারা কোনো উৎসাহ পায়নি। দশম সংসদের সদস্যরা এবং তাঁদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারকে তাদের দুর্বল ম্যান্ডেট নিয়ে উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে না এবং মনে হচ্ছে তারা মনে করে যে বিরোধীদের যেকোনো চ্যালেঞ্জকে ব্যর্থ করে দিয়ে টিকে থাকতে পারবে। এ ধরনের মনোভঙ্গির মধ্যে আছে বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
প্রথম আলো : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতিকে কীভাবে নেয়? কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে কি?
রেহমান সোবহান : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ, যদিও সবাই নয়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার ব্যাপারে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ সচিবালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এ ধরনের ঘটনার অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। তারা গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনী পদ্ধতি প্রণয়নের লক্ষ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারত ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বার্তা এসেছে। পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে অভিনন্দন প্রাপ্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনো জোরালো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেবে বলে এখন পর্যন্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী ওই দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা বঙ্গভবনে ১২ জানুয়ারি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। কয়েকটি দেশের দূতেরা নির্বাচনের মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও নির্বাচিত নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সেই হতাশা বাংলাদেশে বিদেশি সহায়তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। অবশ্য আজকের বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কেবল অর্থনীতি নয়, লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে। আমাদের প্রধান দুটি বাজার হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ক্ষমতা রাখে, যাতে তাদের বাজারে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। তবে সে ধরনের আশঙ্কা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমরা একটি সার্বভৌম দেশ এবং যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্বাধীনতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো পদক্ষেপের চড়া মূল্য যদি সাধারণ জনগণকে দিতে হয়, তখন এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোরালো জনসমর্থন প্রাপ্তির ব্যাপারে সরকারকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।
প্রথম আলো : বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ভারত একটি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে?
রেহমান সোবহান : অংশগ্রহণবিহীন হলেও একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রক্ষার পথে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ভারত তুলনামূলক বেশি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে, এ রকম ভালো বন্ধুও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে কদাচিৎ নির্বিকার থাকতে পারে, যাদের এবারের নির্বাচনী ম্যান্ডেট ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে অর্জিত ম্যান্ডেটের একটি ভগ্নাংশমাত্র। তা ছাড়া, ভারতের বর্তমান সরকার নিজেই একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে এবং এ সরকার হয়তো আগামী তিন থেকে চার মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকবে না। এ ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেকোনো সরকার তাদের বৈদেশিক নীতিতে বড় কোনো ধরনের পরিবর্তনে আগ্রহী হয় না। তাই আমাদের এমনটা আশা করা উচিত হবে না যে আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনের পর নয়াদিল্লিতে নতুন একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগে বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত খুব একটা সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
প্রথম আলো : বিএনপি হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে কোনো সুফল পাবে কি?
রেহমান সোবহান : খালেদা জিয়া গত ১৫ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা হরতালের মতো কর্মসূচি বন্ধ রেখে শান্তিপূর্ণ বিকল্প উপায়ে রাজনৈতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাবেন বলে জানিয়েছেন। নীতি এবং প্রাজ্ঞ রাজনীতির বিবেচনায় এটি একটি সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। হরতাল হচ্ছে প্রতিবাদ করার একটি উপায়। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটি গত কয়েক বছরে সব ধরনের রাজনৈতিক তাৎপর্য হারিয়ে ফেলেছে। খুব সামান্য লোক আজকাল প্রতিবাদ জানানোর লক্ষ্যে হরতাল পালন করে। এখন যেভাবে হরতাল পালিত হয় তা কেবল সহিংসতার হুমকি দিয়ে লোকজনকে কাজে যেতে বাধা প্রদানের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিএনপির মিত্র জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহন লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে সাধারণ নাগরিকেরাই আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় হরতাল চলাকালে হতাহতের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। ঢাকার মতো পুলিশবেষ্টিত অঞ্চলে হরতালের প্রভাব সামান্য হলেও দূরতর পাল্লার আন্তনগর যানবাহন চলাচলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া বিপণন, যোগাযোগ ও গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল নাগরিকদের দূরপাল্লার যাতায়াত বিপর্যস্ত হচ্ছে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপির ভাবমূর্তি অনেকটাই নষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মৈত্রীর কারণে। দলটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলনের পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে রাস্তায় সহিংসতা বাড়ানোর কৌশল বেছে নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি জনগণের সমর্থন রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সহিংসতা তাই অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়েছে, যাতে করে বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
প্রথম আলো : সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে।
রেহমান সোবহান : সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবলম্বনের কাজটি অত্যন্ত জঘন্য এবং কাপুরুষোচিত। কারণ, জনগণের সবচেয়ে অরক্ষিত অংশটি এই সহিংসতার লক্ষ্যে পরিণত হয়, যাদের প্রতিরোধের সামর্থ্য সবচেয়ে কম। আর যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এ ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা হলে সেটা আরও নিন্দনীয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা নতুন নয় এবং রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে বেড়েই চলেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলার সব রকম সম্ভাবনা ছিল। কারণ, তারা চিরাচরিতভাবে আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে থাকে—এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অতএব, সম্ভাব্য হামলা এড়াতে নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে আরও ভালো সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, এ ধরনের হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু এটিই যথেষ্ট হবে না, যেহেতু আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। যেকোনো সরকারের আমলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রথম আলো : অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, করণীয় কী?
রেহমান সোবহান : সহিংসতা ও হরতালের কারণে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আরও ক্ষতি হতে পারে। যেসব দিনমজুর ও কৃষক তাঁদের ফসল বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। সব ব্যবসাই নির্ভরশীল পরিবহনব্যবস্থার ওপর। পণ্য সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থায় বিঘ্ন হলে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদি প্রভাব, অন্তত সামষ্টিক অর্থনীতিতে, জিডিপি ও রপ্তানি বৃদ্ধির ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়। এটিকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। অব্যাহত রাজনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়ায় আসলে অনিশ্চয়তার ওপরই জোর দিতে হয় এবং যা নতুন বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলে এবং আমাদের রপ্তানি বাজারকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। অর্থমন্ত্রীর প্রতি সুপরামর্শ, বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে স্বল্পমেয়াদি কিছু উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে স্টেকহোল্ডারদের-স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করতে হবে এবং তাতে বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ধরনের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিরোধী দল জনস্বার্থের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ
দিতে পারে।
প্রথম আলো : কোনো অর্থবহ সংলাপের সম্ভাবনা কি এখনো আছে?
রেহমান সোবহান: সংলাপ আয়োজন করা সব সময়ই সম্ভব কিন্তু এটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে মীমাংসায় পৌঁছানোর ব্যাপারে উভয় দলের সদিচ্ছার ওপর। ক্ষমতাসীন জোট যদি মনে করে যে নির্বাচনে ম্যান্ডেট অর্জনের মধ্য দিয়ে তারা সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে যত দিন পর্যন্ত বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন পরিচালনার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে সরকার সংলাপের ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই নেতিবাচক উদ্দীপনার প্রভাব বিরোধী দলের ওপরও পড়তে পারে, যারা বিক্ষোভ-আন্দোলন অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে সম্ভাব্য আগাম নির্বাচনে (একাদশ সংসদ) জয়লাভের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার বাধ্যতামূলক উপায় মনে করতে পারে। এ ধরনের আন্দোলন থেকে চাপের মাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিএনপিকে রাজপথে জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ডের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। সংলাপের মধ্য দিয়ে আরও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার লক্ষ্যে উভয় জোট যদি এ ধরনের বিকৃত কৌশল পরিহার না করে, তাহলে রাজপথে সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কবলে পড়ে বাংলাদেশকে আবার একটি বছরব্যাপী অনিশ্চয়তায় পড়তে হতে পারে।
প্রথম আলো : নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি কি গণতন্ত্রে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
রেহমান সোবহান : যেকোনো ধারণা, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ, গ্রহণযোগ্য হবে যদি সেটি গণতন্ত্রকে উন্নীত করে এবং প্রধান দলগুলোর সমর্থন অর্জন করে। গণতন্ত্রে চিরন্তন কোনো ধারণা নেই। আসলে এটি মূলত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যাতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে কোনো ধরনের ভয় বা জবরদস্তি বা সহিংসতার হুমকি ছাড়াই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিএনপি ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে প্রবর্তন করেছিল। এটি তৎকালীন বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের কাছে পরিপূর্ণভাবে অবশ্যই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ, ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছে। কেবল ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর পরই ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যটি আলোচনায় আসে এবং এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। নবম জাতীয় সংসদে প্রতিষ্ঠা করা হয় সংবিধান সংস্কারবিষয়ক সংসদীয় কমিটি। এটি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করে। এমনকি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করে তাঁর সংক্ষিপ্ত রায়ে পরামর্শ দিয়েছেন যে নতুন বিকল্প ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত সংসদ চাইলে আরও দুটি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রথম আলো : এ রকম নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সংকটের সমাধান অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে কি?
রেহমান সোবহান : অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত ক�

ক্ষতিপূরণ ও করণীয়

গত বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল রানা প্লাজা দুর্ঘটনা। বিশ্বে কোনো একক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যার বিচারে শুধু নয়, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও লোভের বিচারেও এটি ছিল অনন্য হূদয়বিদারক ঘটনা। সেদিন যে দুর্ভাগা শ্রমিকেরা কারখানায় কাজ করতে ঢুকেছিলেন, তাঁরা প্রথমে সেখানে ঢুকতে চাননি। কিন্তু ভবনের মালিক ও ভেতরে অবস্থিত চারটি কারখানার মালিকদের কাছে দ্রুত অর্ডারের সাপ্লাই নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান বিষয়। পরবর্তী সময়ে এ কথাও প্রকাশিত হয়েছে যে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ দুর্ঘটনার আগে এ ভবন পরিদর্শনে এসেছিল, কিন্তু প্রতিব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এ কারণেই আজ অনেকে মনে করেন, ‘এনাফ ইজ এনাফ’। এসব উদাসীন লোভী লোকের শাস্তি দিতে হবে এবং তাঁদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিতে হবে। প্রাণের বিনিময়ে মুনাফা উপার্জন চলবে না। কেউ কেউ বলতে পারেন, এই শিল্প বাংলাদেশে ৪৪ লাখ শ্রমিকের চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে, ২৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সৃষ্টি করছে। বিশ্বের তুলা উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারীর মর্যাদা অর্জন করেছে। সামনে রয়েছে অবারিত বিপুল সম্ভাবনা। সুতরাং এই মালিকেরা যদি নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ভয়ে বিনিয়োগই বন্ধ করে দেন, তাহলে কী হবে? এ আশঙ্কা কতটুকু সত্য?
আমরা জানি, বাংলাদেশের বিদ্যমান পোশাকশিল্পের ইতিহাস কমবেশি ৩০ কি ৩৫ বছরের। এই সময়ে একটি শিল্পের এ রকম উল্কাসদৃশ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে সস্তা শ্রমসহ কতগুলো বিশেষ সুবিধা এবং নিয়ন্ত্রণহীন বিকাশের সুযোগ থাকার জন্য। এ কথা ঠিক, যত নিরাপত্তা আইনবলয়ই আমরা তৈরি করি না কেন, যত নিয়মকানুনই তৈরি করি না কেন, তা ফাঁকি দেওয়ার স্বাভাবিক বিষয়গত একটি প্রবণতা পোশাকশিল্পের মালিকদের মধ্যে প্রথম দিকে হয়তো থাকবে। এ কথা সহজেই অনুমেয় যে এ ধরনের প্রথম প্রজন্মের পুঁজিপতিরা পুঁজির অভাবের কারণে একবারে বিপুল বিনিয়োগে সমর্থ নয়। সুতরাং বাস্তব সমাধানটা কী হতে পারে? যাতে লাঠিও ভাঙবে না কিন্তু সাপও মরবে! আমি প্রস্তাব করছি, সরকার বর্তমানে যে উৎস কর সংগ্রহ করে পোশাকশিল্প খাত থেকে, সেটার অংশবিশেষ সেই সব মালিকের ‘ম্যাচিং গ্রান্ট’ বা ‘বিনা সুদে ঋণ’ হিসেবে প্রদান করুক, যাঁরা শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল তৈরির লক্ষ্যে বিনিয়োগ করতে সম্মত ও প্রস্তুত রয়েছেন। রানা প্লাজার ঘটনাটি সম্পূর্ণ অদ্বিতীয় ঘটনা। কিন্তু এখানকার মালিকেরাও ছিলেন ছোট বা মাঝারি স্তরের মালিক। সাব-কনট্রাক্টের মাধ্যমে তাঁরা বড় কাজ হাতে নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা তাড়াহুড়ো করেছিলেন এবং লোভ সামলাতে সক্ষম হননি। সুতরাং সেখানে এবার যে ক্ষতিপূরণের মাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, সেটি শুধু এখানকার জন্যই প্রযোজ্য। এখানে কি কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে? বিশেষত, যদি তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থের (যার পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে!) সংকুলান না হলে কী হবে?
তার পরেও আমি বলব, ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রচুর অর্থ জমা হয়েছে। তা ছাড়া আমরা শুনতে পাচ্ছি, বিদেশি ক্রেতারা বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। এই দুই ধরনের অর্থ যোগ করলে ক্ষতিপূরণের যে হিসাব ক্ষতিপূরণ কমিটি নির্ধারণ করেছে, তা অনায়াসে বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে আমার মতে, যাঁরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তিও হওয়া উচিত। সেটা আর্থিক হোক বা অন্য কোনোভাবে হোক, তা হওয়া উচিত। তবে এটি নির্ধারণের দায়িত্ব ক্ষতিপূরণ কমিটির নয়, মহামান্য হাইকোর্টের। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি এটা দেখে যে বিজিএমইএর বর্তমান নেতারা এই ক্ষতিপূরণ প্রস্তাবের বিষয়ে অস্বাভাবিক তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছেন। যেহেতু তাঁদের কোনো ব্যয়ভার বহন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশঙ্কা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ভবিষ্যতে এ রকম দুর্ঘটনা যে ঘটবে না, তা হলফ করে বলা যায় না। ক্ষতিপূরণের এই বিধান যদি হাইকোর্ট একবার গ্রহণ করে ফেলেন, তখন সেই দৃষ্টান্ত দেখিয়ে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনাকবলিত কারখানার মালিকদের কাছ থেকে এই টাকা বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হবে—এটাই তাঁদের ভাবনা। সবিনয়ে তাঁদের বলতে চাই, প্রাণের মূল্য ১৫ লাখ টাকা মোটেও বেশি কিছু নয়। আপনারা প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী যেটা দিতে চাইছেন (মাত্র এক লাখ টাকা), তা বর্তমান বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য নয়। ২৪ বিলিয়ন ডলারের শিল্পের মালিকদের জন্য এই ক্ষতিপূরণের হার বিশ্ববাসী গ্রহণ করবে না। আপনাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি এতে মোটেও উজ্জ্বল হবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নের সঙ্গে এটা খাপ খায় না।
সক্ষমতা নেই, এ কথা সত্য হলেও ক্ষতিপূরণের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে বিজিএমইএর অবস্থান হওয়া উচিত ছিল ক্ষতিপূরণের উৎসগুলো নিয়ে বিকল্প প্রস্তাবের অবতারণা করা। শ্রম আইনের দোহাই দিয়ে একটি অযৌক্তিক ক্ষতিপূরণের জন্য চাপাচাপি করাটা মোটেই তাঁদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। বিকল্প প্রস্তাব কী হতে পারে, সে সম্পর্কে এই লেখার প্রথমেই আমি ইঙ্গিত দিয়েছি। তবে আবারও বলব, এই শিল্প এখন আর নাবালক শিল্প নয়। তাই স্যালাইন দিয়ে, ভর্তুকি দিয়ে তাকে উৎসাহিত করার পর্যায় আমরা অতিক্রম করেছি।এখনো যদি আমরা তাকে শিশু শিল্পের মতো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিই, তাহলে এটি কোনো দিন আর প্রাপ্তবয়স্ক হবে না। এ রকম কথা বাজারে শোনা যায়, রানা প্লাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে কোনো ব্যক্তির দোষে নয়, সেদিন হরতাল ছিল বলে হরতালকারীরা ভবন ধরে নাড়াচাড়া দেওয়ায় ওটা ঘটেছে! একজন আমাকে বলেছেন, কেউ কেউ চেয়েছিলেন যে আবহাওয়া দপ্তরকে দিয়ে একটি স্থানীয় ভূমিকম্পের গল্প ফাঁদতে। এসব প্রবণতা যখন সমাজে থাকে, খুন-হত্যা-জখম করে ক্ষমতাসীনেরা যখন টাকার জোরে পার পেয়ে যায়, তখন অসহায় শ্রমিকদের পাশে কে দাঁড়াবে? কেনই বা মানুষ ধনিকশ্রেণীকে বিশ্বাস করবে? কেনই বা মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখবে? আজ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে আমরা জনগণকে একটা নতুন বার্তা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সেই সুযোগ আমরা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আজ উজ্জ্বল করব। বিজিএমইএর ভাবমূর্তিও তাতেই উজ্জ্বল হবে, অন্য কোনোভাবে নয়।
ড. এম এম আকাশ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
akash92@hotmail.com

উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী বহুগুনার পদত্যাগ

ভারতের উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় রাজ্য সরকার যথেষ্ট তৎপর ছিল না বলে অভিযোগ ও কংগ্রেসের অন্দরে প্রবল চাপের ধারাবাহিকতায় পদত্যাগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বহুগুনা। শুক্রবার সকালে উত্তরাখণ্ডের রাজ্যপাল আজিজ খুরেশির কাছে বিজয় পদত্যাপত্র জমা দেন। খবর এনডিটিভির।
২০১৩ সালের জুন-জুলাই মাসে উত্তরাখণ্ডে ভয়াবহ বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু এই দুর্যোগে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকাণ্ডে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট ছিল না বলে বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নতারাও এ নিয়ে অসন্তুষ্ট মনোভাব প্রকাশ করেন।

ছেলেবেলায় উঠতাম ভোরে কিন্তু পড়তাম না : ওবামা

ছেলেবেলায় পড়াশোনা করতে মোটেও ভালো লাগত না, একেবারেই মন বসত না! সরল স্বীকারোক্তি মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। ‘ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। কিন্তু ভোরে উঠেই ওই গৎবাঁধা পড়তে বসার রুটিনটা অসহ্য মনে হতো আমার।’ বৃহস্পতিবার টেনিসি অঙ্গরাজ্যে শিক্ষানীতিবিষয়ক এক বক্তৃতা দেয়ার সময় তিনি শিক্ষার্থীদের তার শৈশবের গল্প শোনান। ওবামা জানান, ছোটবেলায় প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে তিনি বিছানা ছাড়তেন। তবে অবশ্যই ইচ্ছা করে নয়, মায়ের বকুনিতে বিছানা ছাড়তেন ওবামা। তিনি বলেন, ‘শৈশবের কিছু সময় আমার ইন্দোনেশিয়ায় কেটেছে। সে সময় আমার মায়ের ভয় ছিল, দেশের বাইরে থাকার কারণে আমি পিছিয়ে পড়তে পারি। তাই প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি আমাকে ঘুম থেকে তুলে দিতেন। তিনি চাইতেন সেখানকার পড়াশোনার পাশাপাশি আমি যেন যুক্তরাষ্ট্রের পড়াশোনাটার পদ্ধতিও সমানভাবে অনুসরণ করি।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ওবামা বলেন, ‘তোমাদের বয়স যদি সাত কিংবা আট হয়, তবে রোজ ভোর সাড়ে চারটা বা পাঁচটায় উঠতে কখনও ভালো লাগবে না। আমারও ভালো লাগত না। এ জন্য প্রায়ই অভিযোগ করতাম আমি।’
মা রাগতস্বরে বলতেন, ‘আমরা এখানে পিকনিক করতে আসিনি।’ তিনি মনে করতেন, ‘ছেলেমেয়েরা যদি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয় তবেই কেবল পৃথিবীর দুর্গম পথগুলো তাদের জন্য সহজগম্য হবে।’ জিনিউজ, পিটি আই। ওবামা আরও বলেন, ‘আমার মা নানা-নানির সাহায্য নিয়ে আমাকে এককভাবে লালন-পালন করেছেন। আমাদের খুব বেশি টাকা-পয়সা ছিল না। দুটো সন্তানকে বড় করতে ও নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে আমার মাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। আমাদের যদিও খুব একটা টাকা ছিল না, তবে আমি বেশ কয়েকটি নামকরা কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি আর আমার স্ত্রী মিশেল এমন অনেক কিছু অর্জন করেছি, যা আমাদের অভিভাবকরা কল্পনাই করতে পারতেন না। এখন আমার সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নামকরা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। আমি চাই, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শিশু-কিশোর যেন সেই সুযোগ পায়।’

ভারতের দুর্নীতিবাজ নেতাদের তালিকা প্রকাশ করলেন কেজরিওয়াল

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল শুক্রবার ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজদের তালিকা প্রকাশ করেছেন। তার এ তালিকায় সব ধরনের রাজনৈতিক নেতা এবং মন্ত্রীদের নাম রয়েছে। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করার সময় তিনি এ তালিকা প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি এসব দুর্নীতিবাজ নেতাদের ভোট না দেয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান। এ তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন- সুরেশ কলমাদি, নিতিন গাদকারী, সুশীল কুমার সিন্ধে, বিএস ইয়েদদুরাপ্পা, কপিল সিবাল, মুলায়েম সিং যাদব, কমল নাথ, বিরাপ্পা ময়লে, অনন্ত কুমার, অনুরাগ ঠাকুর, শারদ পাওয়ার, প্রফুল্ল প্যাটেল, পি চিদাম্বর, আলাগরি, কানিমোজি, এ রাজা, তরুণ গোগি, মায়াবতী, নবীন জিন্দাল প্রমুখ।
এদিন সমর্থকদের হট্টগোলের মুখে তিনি কংগ্রেস দলের তরুণ নেতা রাহুল গান্ধীকেও দুর্নীতিবাজ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি তার তালিকা সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হল দুর্নীতিবাজ একজন নেতাও যেন পার্লামেন্টে যেতে না পারেন। তিনি আমাদের কারও পরিবারের সদস্য হলেও আমরা তার বিরোধিতা করব।’ এদিকে আম আদমি পার্টির (আপ) মুখপাত্র সঞ্জয় সিং বলেছেন, আমাদের টার্গেট ১৬২টি পাখির চোখ। আর এ পাখির চোখ হচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্ত ১৬২ এমপি। এই ১৬২ আসনে টার্গেট রয়েছে আপের। যদিও লোকসভা নির্বাচনে মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩৫০টি আসনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এএপি। দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাজের বিরোধিতা করেই ১৬২টি আসনকে টার্গেট করেছে এএফি। এই ১৬২টি আসনের এমপিদের বিরুদ্ধেই রয়েছে নানা রকম দুর্নীতির অভিযোগ।

বাড়ি ফিরে যেতে পারলেই বাঁচে ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডের ইনিংসে ১৮ সংখ্যার ছড়াছড়ি। চারজন ব্যাটসম্যান এই রান করেছেন। সর্বোচ্চ ২২। সাকুল্যে ১৩০। টি ২০ মশলাযুক্ত ক্রিকেটে এই সংগ্রহ যে মোটেও নিরাপদ নয়, সেটি গোটা সফরে ‘মার’ খাওয়া ইংল্যান্ডকে বুঝিয়ে দিতে ভুল করেনি অস্ট্রেলিয়া। একেবারে হেসেখেলে দ্বিতীয় টি ২০ জিতলেন জর্জ বেইলিরা। আট উইকেটের বিশাল ব্যবধানে। প্রতিপক্ষের ১৩০ স্বাগতিকরা টপকে যায় ৩১ বল বাকি থাকতে। জয়টা এমনই বিশাল যে, প্রায় ছয় বছর পর নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা ব্র্যাড হজ ব্যাট করার সুযোগই পাননি। এই পরাজয়ে ইংল্যান্ড এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে তৃতীয় সিরিজ হারল। দীর্ঘদিন পর অস্ট্রেলিয়ায় ইংল্যান্ডের এমন ভরাডুবি। পাঁচ টেস্টের অ্যাশেজ সিরিজে ৫-০ তে ধবল ধোলাই হওয়ার পর ওয়ানডে সিরিজে হার ৪-১ এ। এবার তিন ম্যাচের টি ২০ সিরিজও সফরকারীরা হারল। এক ম্যাচ বাকি থাকতে ২-০ তে সিরিজ জিতে নিল অস্ট্রেলিয়া। ‘যাহা বাহান্ন তাহাই ছাপান্ন’র মতো কুক ও ব্রড একই নৌকার যাত্রী। পরাজয়ের পর পরাজয়ে ক্ষতবিক্ষত।’ কুড়ি-বিশের ম্যাচে ১৩১ করে জেতা ডাল-ভাত। সেটা বুঝিয়ে দিলেন ক্যামেরন হোয়াইট ও অসি অধিনায়ক জর্জ বেইলি। প্রথমজন ৪৫ বলে ৫৮। দ্বিতীয় জন মাত্র ২৮ বলে ৬০। দু’জনই শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন। তাদের ব্যাটিং দেখে ইংল্যান্ডের নিশ্চয় মনে হয়েছে, ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’। ইংলিশ বোলার ডার্নব্যাখ তিন ওভারে ৪২ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। ৩৭ রান দিয়ে মাত্র একটি উইকেট পান জেমস ট্রেডওয়েল। সেখানে অসি বোলার হ্যাজলউড ৩০ রানে চার উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা।
ইংল্যান্ড ১৩০/৯, ২০ ওভারে (লাম্ব ১৮, রুট ১৮, বাটলার ২২, ব্রেসনান ১৮, ব্রড ১৮*। হ্যাজলউড ৪/৩০)। অস্ট্রেলিয়া ১৩১/২, ১৪.৫ ওভারে (হোয়াইট ৫৮*, জর্জ বেইলি ৬০*। ব্রেসনান ১/১১, ট্রেডওয়েল ১/৩৭)। ফল : অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ : হ্যাজলউড (অস্ট্রেলিয়া)। ক্রিকইনফো।

চলচ্চিত্রের সুদিনেই ফিরেছি

*চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?
**এখন ‘প্রেম করব তোমার সাথে’ নামের একটি ছবির শুটিং নিয়ে ব্যস্ত আছি। এ ছবিতে আমার সঙ্গে জায়েদ খান অভিনয় করছেন।
*দীর্ঘদিন পর চলচ্চিত্রে ফেরার অনুভূতি কেমন?
**আসলে বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করার ইচ্ছা অনেক দিন ধরেই। চলচ্চিত্রে আসব আসব করেও আসা হয়ে ওঠেনি। সম্প্রতি প্রেম করব তোমার সাথে ছবির পরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার কাছে ছবির পাণ্ডুলিপি বেশ ভালো লেগেছে। এতদিন বড় পর্দার বাইরে থেকে এ জায়গাটিকে খুব মিস করেছি। আর এখানে কাজ করার মজাটাই আলাদা।
*টিভি পর্দা কিংবা চলচ্চিত্রে কোনটিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
**দুটোর কাজ দুই রকম। আমি ছোট পর্দায় বেশি কাজ করেছি। একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে পোক্ত করে নেয়ার আদর্শ জায়গার কথা যদি বলি তাহলে বলব, ছোটপর্দা। এটা একজন শিল্পীর জন্য উপযুক্ত জায়গা। এখানে কেউ যদি ভালো করে কাজ শিখে নিতে পারেন তবেই চলচ্চিত্রে গিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন। আমি মনে করি সেটা আমার হয়েছে।
*ছোটপর্দার কাজ কি ছেড়ে দিচ্ছেন?
**কাজ ছেড়ে দিচ্ছি না। ছোটপর্দাতে আমার ক্যারিয়ার শুরু। এ জায়গা ছেড়ে আমি যাব কী করে? এটাতো আমার প্রথম ভালোবাসা। আর বড়পর্দা-ছোটপর্দা দুটো মিলিয়েই কাজ করব। সবকিছু নির্ভর করছে
সময়ের ওপর।
*এখনকার চলচ্চিত্র নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
**আমি শতভাগ আশাবাদী। এখন আগের চেয়ে চলচ্চিত্রের মান অনেক ভালো হয়েছে। ডিজিটালও হয়েছে। সবমিলিয়ে বলতে পারি বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিনেই আমি ফিরেছি। এমন একটি সময়ে নিজে ভালো কিছু করার ব্যাপারেও আমি বেশ আশাবাদী।
মারুফ কিবরিয়া

মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও মেধাবী তরুণদের কথা

কোটা প্রথার বিরুদ্ধে মেধাবী তরুণদের প্রতিবাদ
গত পাঁচ বছরে শেখ হাসিনার সরকার জনপ্রশাসনে স্বাধীনতাবিরোধী কিংবা জামায়াত-বিএনপির সমর্থক কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে এমন দাবি দুর্মুখেরাও করবেন না। বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে দূরতম যোগসূত্র আছে, এ রকম আভাস-ইঙ্গিত যাঁর সম্পর্কে পাওয়া গেছে, তাঁকেই হয় ওএসডি করে রাখা হয়েছে বা ২৫ বছরের চাকরির বয়স হয়েছে—এই অজুহাত দেখিয়ে পত্রপাঠ বিদায় দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে মনের দুঃখে চাকরি ছেড়েও দিয়েছেন। স্বাধীনতার চেতনাধারী এ রকম জনপ্রশাসনে যদি মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে, সেই দায় সরকার এড়াতে পারে না। কেবল অভিযোগ নয়, সরকারের কাছে এটাই প্রতীয়মান হয়েছে যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনেক সরকারি কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা সনদ ভাগিয়ে নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক স্বীকার করেছেন, ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আমাদের কাছে প্রতিদিন সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন অভিযোগ আসছে। এ ছাড়া পত্রপত্রিকায়ও বিষয়টি এসেছে। আমরা নিজেরাও খবর নিয়ে জানতে পেরেছি, অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। গত তিন বছরে যাঁরা সনদ নিয়েছেন এবং যাঁদের বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সনদের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রথমে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ বাতিল করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেখিয়ে কেউ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকলে তা ফেরত নেওয়া হবে।’ বাস্তব চিত্রটি কী? আওয়ামী লীগের আমলে গত পাঁচ বছরে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার মোট ১১ হাজার ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। আবেদন করেছিলেন ১৭ হাজারেরও বেশি।
এর মধ্যে বাকিদের আবেদন গৃহীত হয়নি। ভালো কথা। কিন্তু এই যে ১১ হাজার ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কতজন খাঁটি আর কতজন ভেজাল, সেটি কি খতিয়ে দেখেছে সরকার। দেখলে পাঁচ বছর পর এসে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ যাঁরা নিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক নন; কেউ পাকিস্তান থেকেও সনদ নিতে আসেননি। তাঁরা এই সরকারের সমর্থক সরকারি কর্মকর্তা এবং যেকোনো মাননীয়ের সুপারিশে সনদটি ভাগিয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন। এরপর সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিলেও মুক্তিযোদ্ধা নাম নিয়ে ব্যবসা করতে অসুবিধা হবে না। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এত দিন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সরকারের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়ার এবং তালিকা প্রণয়নের অভিযোগ করে আসছেন। এখন তাঁরা কী বলবেন? পাঁচ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যেসব কাজ করেছে, তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি কতটুকু ছিল? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম ‘আমি দায়িত্ব পালনকালে আগের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করেছি’ বলে সাফাই গাইছেন। কিন্তু তাঁর আমলেই কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে গেলেন, তার জবাব নেই। অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার মধ্যেও তাঁরা পড়েননি। স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে, প্রতিটি সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আছে।
সরকারকে বলতে হবে, এই ১১ হাজার সনদপ্রাপ্তের মধ্যে কতজন আসল, কতজন ভুয়া। একাত্তরে এ দেশের যে বীর সন্তানেরা পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে পঙ্গু হয়ে পড়ে আছেন, তাঁদের নাম করে এহেন জালিয়াতি শুধু আইনের চোখেই অন্যায় নয়, রাষ্ট্রদ্রোহেরও শামিল। এঁরা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ উভয়কে অপমান করেছেন। এঁদের চাকরি থাকা তো দূরের কথা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৩ বছর। মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে এখনো যাঁরা চাকরি করছেন, ১৯৭১ সালে তাঁদের বয়স হওয়ার কথা ১৫-১৬ বছর। এরপর তাঁরা কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছেন, বছর বছর পদোন্নতি পেয়েছেন, কিন্তু এত দিনেও তাঁদের সনদ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ল না। প্রয়োজন পড়ল সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়স দুই বছর বাড়াল। সে সময় সাধারণ কর্মকর্তারা ৫৭ বছর পর্যন্ত চাকরি করতে পারতেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুই বছরের বাড়তি সুবিধা পেলেন, পরবর্তী সময়ে সরকার চাকরির বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ বছর করে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সমান হয়ে গেলেন। সাম্য ও ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করা মানুষেরা এই সমতা মানতে পারেননি। অতএব তাঁদের আরও দুই বছর বাড়তি সময় দেওয়া হলো এবং সেই বাড়তি সময় নিয়েই সনদ জালিয়াতি চলতে থাকল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা নিশ্চয়ই এসব দেখার জন্য যুদ্ধ করেননি,
তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা, অসহায় এবং দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানো আর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চয়ই এক কথা নয়। ১৯৭২ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাঁদেরই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, যাঁরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। নিরস্ত্রদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকার করে নিলে কতিপয় গাদ্দার ও দেশদ্রোহী ছাড়া সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাহলে কেন এই সনদ ব্যবসা? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কতটা ভঙ্গুর ও নিষ্প্রভ, তার প্রমাণ পাওয়া গেল সম্প্রতি হাইকোর্টের রায়ে। কেন বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না, সেটি আদালত জানতে চেয়েছেন নির্বাহী বিভাগের কাছে। গত ৪৩ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী কিংবা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার দল একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদা দেয়নি কেউ। গত পাঁচ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তে সরকার কত বছর লাগাবে, বলা যায় না। কেননা আমাদের দেশে প্রশাসনিক কোনো তদন্তের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না। প্রকাশিত হলেও দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তি পাবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। কেননা যাঁরা অভিযোগ তদন্ত করবেন আর যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁরা একই গোত্রের লোক। পুলিশ বিভাগের চুরি-দুর্নীতি তদন্তের একই পরিণতি।
মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানো যেমন অনৈতিক, তেমনি এর সঙ্গে হাজার হাজার মেধাবী তরুণের ভাগ্য-বিপর্যয়ও জড়িত। সরকার সরকারি চাকুরেদের মেয়াদ বাড়িয়েছে, তার পক্ষে যুক্তি আছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, তাঁদের কর্মক্ষমতা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে তরুণদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু ভুয়া সনদধারী একজন সরকারি কর্মকর্তা এক বছর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিলে এক বছর সেই পদটিতে কেউ আসার সুযোগ পাবেন না। ফলে চাকরিপ্রার্থী মেধাবী তরুণকে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। এমনিতেই সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের প্রবেশের সুযোগ কমে গেছে। বর্তমানে পিএসসির কোটা প্রথায় ৫৫ শতাংশ নেওয়া হয় কোটার ভিত্তিতে, যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পোষ্যদের কোটা ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ এবং আদিবাসী কোটা ৫ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ। এদের মধ্যে নারী ও আদিবাসী কোটার বাইরে অন্যান্য কোটা রাখার যুক্তি আছে বলে মনে করি না। ঘরোয়া আলাপে সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও এই সত্য স্বীকার করেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন না। বর্তমানে জনপ্রশাসনে যে মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তাদের আকাল পড়েছে, তার অন্যতম কারণ এই কোটাপদ্ধতি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কোটাপদ্ধতি সংস্কারের জন্য একটি কমিটি হয়েছিল, তারা সুপারিশও করেছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই সুপারিশ আজও আলোর মুখ দেখেনি। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে, সেই সম্ভাবনাও নেই।
ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার বলে দাবি করে। মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনা হলো সাম্য ও সমতা। রাষ্ট্র কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না। কোটাপদ্ধতির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের প্রতিই চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করছে, যারা মেধাবী, যারা লেখাপড়ায় ভালো করেছে। রাষ্ট্র তাদের সুযোগ না দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের সুযোগ দেওয়ার জন্যই হরেক কিসিমের কোটাপদ্ধতি চালিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশের গৌরব। তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হোক, সেটা আমরাও চাই। তাই বলে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ভাঙিয়ে অসাধু ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার পথ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে যাঁরা চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে যে মহাবাণিজ্য হয়েছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এই বাণিজ্য বন্ধ হোক। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি করলে আসল সত্য জানা যাবে না। তাই বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক। দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক। তাতে শহীদ ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পাবে। সেটি করতে পারলে কেউ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম নিয়ে অসাধু ব্যবসা করতে পারবে না। সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদে আছে,
‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ সরকার নানাভাবে এই সমতার ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। সরকারি কর্মকমিশনে কোটা প্রথা চালু নিশ্চয়ই এই সমতার ব্যত্যয়। পিএসসি যেই যুক্তিতে ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোটাপদ্ধতি চালু করেছে, সেই যুক্তিতে কোটা বাতিল বা খর্ব হওয়া উচিত। যদি বিশেষ কোটায় যোগ্য প্রার্থীই পাওয়া না যায়, সেখানে কোটা রাখার কী যুক্তি থাকতে পারে? পিএসসিকে বুঝতে হবে, বৈষম্যমূলক সমাজে কোটাব্যবস্থা থাকে বৈষম্য কমাতে, বাড়াতে নয়, কিংবা অমেধাবীদের পুনর্বাসন করতেও নয়। মেধা প্রথা পুরো হয়তো বাতিল করা যাবে না কিন্তু এর ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। যেই কোটাপদ্ধতিতে পাস করার মতো প্রার্থী পাওয়া যায় না, সেই পদ্ধতির সংস্কার জরুরি। তারও আগে সংস্কার প্রয়োজন পিএসসি নামের প্রতিষ্ঠানটির। তাহলে মেধাবীশিক্ষার্থীরা ভরসা পাবে, জনপ্রশাসনও মেধার দুর্ভিক্ষ থেকে রেহাই পাবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়

আলোড়ন সৃষ্টিকারী ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান ও আটকের মামলার রায়ে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত অভিযুক্ত ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম, আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াও রয়েছেন। অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩৮ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালত তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আসামিরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে যেসব সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাতে এ ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তাঁরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এ অস্ত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত হন এবং এর সঙ্গে একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকারও প্রমাণ পাওয়া যায়। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী প্রতিটি দেশেরই অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার কথা এবং ভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে নিজের ভূমি ব্যবহার করতে না দেওয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সিইউএফএল ঘাট থেকে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক করা হয়। এসব অস্ত্র আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ উলফার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
সেই ঘাটে দায়িত্বরত পুলিশের দুজন সদস্য অস্ত্রের চালানটি আটক করেন। এ কারণে তাঁদের গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হতে হয়, যা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুর্ভাগ্যজনক। আদালতের এই রায়ে বেরিয়ে আসা এই সত্য আমাদের উদ্বিগ্ন করে আরও এ কারণে যে, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে যাঁরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁরাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিপক্ষে কাজ করেছেন। তাঁরা পরস্পরের যোগসাজশে দেশকে ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিতে যাচ্ছিলেন। তবে মামলার বিবরণীতে এটিও স্পষ্ট যে ঘটনার সঙ্গে আসামিদের সম্পৃক্ততার দুটি পর্ব আছে। প্রথমত, অস্ত্রের চোরাচালানে সহায়তা করা আর দ্বিতীয়টি হলো অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করা। আইনের দৃষ্টিতে দুটিই অপরাধ হলেও মাত্রায় নিশ্চয়ই তারতম্য আছে। বিচারের ক্ষেত্রে দুই অপরাধকে একই পাল্লায় মাপা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক উঠকে পারে। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বড় শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে কেউ যাতে বাংলাদেশকে অন্য কারও ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার বা ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে সবারই সর্বোচ্চ সজাগ ও সতর্ক থাকা জরুরি। আমরাও যেমন অন্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হব না, তেমনি চাইব না অন্য কোনো দেশ এমন কিছু করুক, যা আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।

মানতে হবে, সব সম্পর্কই রাজনৈতিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগে জেন্ডার কোর্সের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ক্লাসে নারী শিক্ষার্থীরা নারী-পুরুষের সামাজিক নির্মাণ-প্রক্রিয়ার বাইরে আর কী কী উপায়ে আবিষ্কার করতে পেরেছিল, তারা নারী। কিছুক্ষণ চুপ থাকল ক্লাসের সবাই। মেয়েরা কেউ কেউ কানাকানি করল। দু-একজন হাত দিয়ে অন্যজনকে নিষেধ করল বলতে। কিন্তু একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার প্রতি আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা কোনো কোনো পুরুষ আত্মীয়ের আচরণের মাধ্যমে, পরে যাদেরকে আমাদের বাসায় দেখলে আমি ভয়ে দৌড়ে বাসার সবচেয়ে আড়ালের রুমটিতে যেতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাসায় কাউকে বলিনি, কিংবা কখনো বললেও তারা গুরুত্ব দেয়নি।’ হ্যাঁ। পারিবারিক পরিবেশেই পুরুষ-আত্মীয়দের কারও কারও মাধ্যমে প্রথম আবিষ্কার করতে পেরেছিল, সে মেয়ে এবং ঘরেও সে নিরাপদ নয়। বাইরে যেমন তাকে বখাটেদের ভয়ে দৌড়াতে হয়, ঘরেও। আমরা শুধু ভয়কেন্দ্রিক শারীরিক দৌড় দেখি, মনের দৌড়, ধুকপুকানি দেখি না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশে প্রথমবারের মতো নারী নির্যাতন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ চালিয়েছে। ২৩ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়।
সে প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন ৮৭ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। এর মধ্যে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক, ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ অর্থনৈতিক, ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ যৌন আর ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেন। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরা অর্থনৈতিক যৌতুকের বিষয়টি দরিদ্রের দিকে ঠেলে দিলেও সাংস্কৃতিক যৌতুককে একান্ত করে রেখেছে। সুন্দরী, শিক্ষিত, সমমর্যাদার এবং বেশ কিছুটা অনুচ্চারিতভাবে থাকা ‘সতীত্ব’—এই চার বিষয় মোড়কে বন্দী করেছে এই সাংস্কৃতিক যৌতুকের বিষয়টি। আর এই প্যাকেজকে সযত্নে চকচকে রাখে নারীর দুই আপন পরিবার—বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। নারী তাঁর স্বামী কর্তৃক কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, এটি কেউ ভাবতে পারেন না, যেখানে যৌনতাকে দাম্পত্য জীবনের শর্ত মনে করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই বিয়ের প্রথম রাতেই অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হন স্বামী দ্বারা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিবিএসের এ জরিপ বলেছে, শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারীদের মাত্র অর্ধেক চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান। এক-তৃতীয়াংশ নারীই স্বামীর ভয়ে বা স্বামী সম্মতি না দেওয়ায় চিকিৎসকের কাছ পর্যন্ত যেতেই পারেননি। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ নারী ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে শারীরিক মিলনের সময় আহত হয়েছেন। আর ৩০ শতাংশ স্বামীর ভয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শারীরিক মিলনে বাধ্য হন।
পৃথিবীর মাত্র ১৩টি দেশে ম্যারিট্যাল রেপ নিয়ে আইন থাকলেও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু নেপালে এ নিয়ে আইন আছে। প্রায় ৮৮ শতাংশ নারী বলেছেন, তাঁরা স্বামীর সংসারে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, ৮৬ শতাংশ হন মানসিক নির্যাতনের শিকার আর যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৫৫ শতাংশ। সাহস রেখে বলতে পেরেছেন নির্যাতিত হওয়ার কথাটি। অন্যকে এসব নির্যাতন নিয়ে কথা বলার পরিসরটি তৈরি করেছেন। পারিবারিক নির্যাতন শারীরিক, মানসিক কিংবা যৌনই হোক না কেন, এগুলো কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বিষয় নয়। পষ্টাপষ্টিভাবে বলতে পারা, বিয়ে সম্পর্ক একটা রাজনৈতিক সম্পর্ক, তাই সব নির্যাতনের রাজনৈতিক মোকাবিলা জরুরি। জরিপে আরও কিছু বিষয় উঠে এসেছে, কর্মক্ষেত্রে এবং পাবলিক পরিসরে নারীর ওপর নির্যাতনের চিত্রও। ১৬ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন, ২৬ শতাংশ মানসিক নির্যাতন আর ২৯ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হন। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে সংখ্যক নারী শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষ করে বের হন এবং শ্রমবাজারে দেখে আমরা উচ্ছ্বসিত হই, কিন্তু তাঁদের অনেককেই পারিবারিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়া আমাদের শ্রমবাজারে নারীর প্রতিকূল পরিবেশের চিত্রই হাজির করায়। মজুরিবৈষম্য, যৌন হয়রানি,
অনিরাপত্তা, নির্যাতন, নারীর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল মনোভাব অনেক নারীকেই শ্রমবাজারে টিকতে দেয় না। রোজগেরে নারী হলেও সংসারের বিভিন্ন বিষয়ে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা কিংবা রাজনৈতিকভাবে মত প্রকাশের সুযোগ অনেকটাই কম। জরিপটি থেকে আরও জানা যায়, ১৯ দশমিক ১ শতাংশের নিজের ইচ্ছায় ভোট দিতে পারেন না। আমার বাসায় কাজ করতে আসা খালার সঙ্গে কাটানো আমার অর্ধযুগের যাপিত জীবনে দেখেছি, মাসের শেষে খালার স্বামীটি এসে হাজির হতেন খালার বেতনের টাকাটি নেওয়ার জন্য। শুধু অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র নারীই নয়, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত অনেক নারীর সঙ্গে জীবনভাগে জেনেছি, রোজগার করলেও, সেই টাকা তিনি কখনো নিজের পছন্দে খরচ করতে পারেন না। সব টাকা তুলে দেন স্বামীর হাতে। অর্থনৈতিক মুক্তি কখনো মানুষ হিসেবে নারীর মনের দাম দিতে পারেনি। ‘মন খারাপ করো না, প্রথম সন্তান মেয়ে হলে বাবার ভাগ্য ভালো হয়’ এভাবেই এখনো সামাজিক চাহিদার ক্ষতে মলম লাগানোর মধ্য দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় একটি নারীকে। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলব না। নিশ্চয়ই আছে। তারপর সেই মেয়েটি যখন আস্তে আস্তে বড় হয়, তখন সমাজ-সংসারের চোখে ঘুম নেই, মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না কেন? তারপর বিয়ে যখন, তার পরের প্রশ্ন। আবার ঘুমহীন সমাজ। বাচ্চা হচ্ছে না কেন? বাচ্চা হলো, আবারও ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত সমাজ। ছেলে নেই? কিংবা মাত্র একটা বাচ্চা? ছেলে হলো তো... কিন্তু সমাজ সজাগ, সংসার সজাগ, ছেলে মানুষ হচ্ছে না কেন? মা কী করে? এই এত্ত এত্ত ‘কেন’-এর লাঠি নারীর প্রতি পড়তে থাকে জীবনজুড়েই
 আর এই এটিকে সঙ্গে নিয়েই প্রতিনিয়তই কখনো শারীরিক নির্যাতন, কখনো মানসিক নির্যাতন থেকে রেহাই কিংবা এগুলো গ্রহণ করেই নারী মন নিয়ে নয়, মেনে নিয়ে, মানিয়ে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করেন। তার পরও কি মুক্তি মেলে? না, মেলে না। মেলার কথা নয়। বিপদ ঘনিয়েই আসে, কেননা নারী যে বলছেন রোকে ডাল্টনের মতো করে, ‘যৌনতা হচ্ছে রাজনৈতিক শর্ত’। আর তাই সব নির্যাতনের রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানো আগে জরুরি। কার সঙ্গে মেলাব এই সমীকরণ? আমরা যে বাবা-মাকে সবচেয়ে আপন ভাবি, সময় এলেই নারী বুঝতে পারি, তাঁদের সঙ্গেই রয়েছে মেয়েটির সবচেয়ে ভয়ের সম্পর্ক। মেয়েটি যখন তার নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বাবা-মাকে বলে, তখন তাঁদের অধিকাংশই বলেন, এত মেয়ে থাকতে তোমাকে কেন? নিশ্চয়ই তুমি কিছু করেছ। মেয়েটি আরও ভয় পেয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন একজন জ্যেষ্ঠ পুরুষ শিক্ষক আমাদের একজন নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানিমূলক মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, তখন আমরা সেই সহকর্মীকে প্রতিবাদ করার সাহস জোগাচ্ছিলাম। কিন্তু এগোনো যায়নি, সহকর্মী সেই মেসেজগুলো মুছে ফেলেছেন। কারণ হিসেবে জানালেন, তাঁর স্বামী তাঁর মোবাইল চেক করেন এবং এই মেসেজগুলো দেখলে বলবেন, ‘তোমাকেই কেন? অন্য কাউকে না কেন? নিশ্চয়ই তোমার সমস্যা আছে।’ বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের ভয়ের সম্পর্ক, ভয়ের সম্পর্ক পুরো জীবন কাটানোর স্বপ্ন নিয়ে আমরা যার সঙ্গে একসঙ্গে থাকি, তার সঙ্গেও। তাই যত দিন সম্পর্ক ভয়ের থাকবে, অবুঝ থাকবে, তত দিনই আসলে অসম সম্পর্কের ক্ষমতার ধারালো ঝাঁজ নারীকে মুক্ত নয়, অসুস্থই করে তুলবে।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য।
zobaidanasreen@gmail.com