Saturday, July 12, 2014

আবার চুরি হবে না তো আর্জেন্টিনার স্বপ্ন?

এদগার্দো কোডেসাল মেনদেজ—নামটি কি খুব চেনা চেনা ঠেকছে? যাঁরা ফুটবলের খবর রাখেন, ফুটবল দেখেন অনেক দিন ধরে, তাঁদের কাছে এই নামটা অজানা কিছু হওয়ার কথা নয়। আজ থেকে ২৪ বছর আগে, ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে এই কোডেসালই ছিলেন মাঠের হর্তাকর্তা-বিধাতা। আর্জেন্টিনা-জার্মানির মধ্যকার সেই ফাইনালের পর থেকে আর্জেন্টাইনদের কাছে তিনি চক্ষুশূল, বিশ্বের তাবত্ ফুটবলপ্রেমীর কাছে তিনি বিতর্কিত এক নাম। সেই কোডেসাল আজ কোথায়?

>>নব্বইয়ের ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনাও হলুদ কার্ড দেখেছিলেন কোডেসালের সঙ্গে তর্ক করে
সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে এই প্রজন্মের দর্শকদের জানিয়ে দেওয়া ভালো, এই কোডেসালের বাঁশির বিষেই ২৪ বছর আগের ফাইনালে স্বপ্ন পুড়েছিল আর্জেন্টিনার। ডিয়েগো ম্যারাডোনার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল অশ্রুধারা। আর এই কোডেসালই ফাইনালে দুই আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে লাল কার্ড দেখিয়ে ম্যাচ থেকে পুরোপুরিই ছিটকে দিয়েছিলেন তাদের।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কত রেফারিই তো এসেছেন, ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন, আবার প্রশংসিতও হয়েছেন, কিন্তু কোডেসাল এমন একজন বিরল চরিত্র যাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্ক কখনোই থেমে যায়নি। যেকোনো আড্ডায় নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রসঙ্গ এলেই মাঠের খেলার প্রসঙ্গ ছাপিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে কোডেসাল ও তাঁর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত-কেন্দ্রিক আলোচনা।
নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালের পরপরই ডিয়েগো ম্যারাডোনা কোডেসালকে অভিযুক্ত করেছিলেন আর্জেন্টিনার ‘স্বপ্ন চুরি’র ব্যাপারে। আর্জেন্টিনার তত্কালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো আর্জেন্টাইনদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘কোডেসালকে দেখলেই আইন নিজের হাতে তুলে নিন।’ আজ ২৪ বছর বাদে আর্জেন্টিনা-জার্মানির আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে সেই কোডেসাল আবারও নতুন করে আলোচনায় না এসে কি পারেন?
কোডেসালের বিপক্ষে আর্জেন্টাইনদের অভিযোগ মূলত জার্মানির জয়সূচক পেনাল্টিটি নিয়ে। পেদ্রো মনজন আর গুস্তাভো দেজোত্তির লাল কার্ড দুটিও অনেকের চোখেই ‘চরম বিতর্কিত’। একই সঙ্গে জার্মান অধিনায়ক লোথার ম্যাথাউজ ফাউল করে নিজেদের ডি-বক্সে আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল ক্যালদেরনকে ফেলে দিলেও কোডেসালের নির্লিপ্ত ভূমিকা আর্জেন্টিনার ক্ষোভ-অভিযোগকে রূপ দেয় জিঘাংসায়। সেই জিঘাংসা আজ ২৪ বছর পরেও মিইয়ে যায়নি এতটুকুও।
আজ এত বছর পরে ইউটিউব নামক ইন্টারনেট অনুষঙ্গটির কল্যাণে জার্মানির পক্ষে যাওয়া সেই পেনাল্টিটি এখন দর্শকদের গবেষণার বিষয়। ভিডিওটি বারবার দেখে বেশির ভাগ মানুষই নিশ্চিত সেদিন জার্মান ফরোয়ার্ড ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান ‘অভিনয়ে’ অনেক বাঘা বাঘা অভিনেতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে মনজনকে লাল কার্ড দেখানোর মুহূর্তটিতেও ক্লিন্সম্যানের ‘অভিনয়ে’ বাজেভাবেই প্রভাবিত হয়েছিলেন রেফারি কোডেসাল।
কোডেসাল এক মেক্সিকান রেফারি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি জন্মগতভাবে একজন উরুগুইয়ান। শৈশব-যৌবন প্রায় পুরোটাই উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে কাটানো কোডেসাল আশির দশকে স্থায়ীভাবে চলে আসেন মেক্সিকোয়। ১৯৯০ বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচ তিনি পরিচালনা করেন কনকাকাফ অঞ্চলের একজন রেফারি-প্রতিনিধি হিসেবে।
খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করার সুযোগ হয়নি কোডেসালের। নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর তিনি আর কোনো দিনই আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিচালনা করার সুযোগ পাননি। নব্বইয়ের ইতালি বিশ্বকাপে তিনি গ্রুপ পর্যায়ে ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচটিসহ কোয়ার্টার ফাইনালে ক্যামেরন-ইংল্যান্ড ম্যাচটি পরিচালনা করেন। সেই ম্যাচে অবশ্য তিনি ছিলেন দারুণ প্রশংসিত। ক্যামেরুনের পক্ষে একটি আর ইংল্যান্ডের পক্ষে দুটি পেনাল্টি দিয়ে তিনি সেই ম্যাচে প্রশংসিত হয়েছিলেন ম্যাচের গতি-প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিতে পারার জন্য। আর সে কারণেই সেবার ফাইনালের রেফারি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ফাইনাল যে তাঁকে এভাবে ‘ইতিহাসে ঠাঁই’ করে দেবে, সেটা কি সেদিন এক মুহূর্তের জন্যও ভেবেছিলেন এই কোডেসাল?
একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক। ঘটনাটা এই বাংলাদেশেরই। বাংলাদেশের মানুষ আর্জেন্টিনাকে কতটা ভালোবাসে সেই কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর বাঙালি ঘটিয়েছিল আবেগের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। কোডেসালের প্রতি ক্ষোভ রূপ নিয়েছিল জনগণের রোষে। বিক্ষোভ-মিছিল তো ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। পোস্টার ছাপানো হয়েছিল সারা দেশে। তাতে লেখা ছিল, ‘রেফারির কালো হাত জার্মানিকে জিতিয়ে দিল।’
কোডেসাল কতটা আলোচিত-সমালোচিত-বিতর্কিত, বাংলাদেশের এ ঘটনাটি দিয়েই বুঝে নিন না!

মধ্যস্থতা করতে চান ওবামা

শুক্রবারের সকালটিও ফিলিস্তিনের রাফাবাসীর শুরু হয়
বিভীষিকার মধ্য দিয়ে। সূর্য ওঠার আগেই হামলে পড়ে
ইসরায়েলি জঙ্গি বিমান। শহরবাসীর মাথার ওপর
পড়তে থাকে একটার পর একটা শক্তিশালী বোমা।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিমান হামলা চলছেই। বিমান থেকে বেপরোয়াভাবে ফেলা হচ্ছে বোমা। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত টানা চার দিন ধরে এ হামলায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হলেও তা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় হামলা বন্ধে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, তিনি গাজায় অস্ত্রবিরতিতে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির। গাজা উপত্যকায় ক্রমবর্ধমান সংঘাতের
প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেন। এ সময় ওবামা বলেন, অস্ত্রবিরতিতে মধ্যস্থতা করতে তাঁর সরকার রাজি। হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান সহিংসতা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ওবামা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বেসামরিক লোকের প্রাণহানি ঠেকাতে সব পক্ষকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র শত্রুতার অবসান ঘটাতে প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসের অস্ত্রবিরতিতে ফিরে যাওয়া। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও মিসরের মধ্যস্থতায় ২০১২ সালে ওই অস্ত্রবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর মাধ্যমে গাজার ইসলামপন্থী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আট দিনের বিমান হামলা বন্ধ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাতিসংঘও গাজা উপত্যকায় চলমান হানাহানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠকের পর বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অস্ত্রবিরতি ‘সবচেয়ে বেশি জরুরি’। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ফোন করে অবিলম্বে রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বেসামরিক লোক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে শিগগিরই বিমান হামলা বন্ধের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। নেতানিয়াহু বারবার বলছেন, অস্ত্রবিরতির বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে নেই।
গতকাল বিমান হামলা শুরু হয় ভোর থেকে। পাশাপাশি নৌ-হামলাও চালানো হয়। গাজা সিটির একটি বাড়িতে বিমান হামলায় একজন চিকিৎসক নিহত হন। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফার একটি তিনতলা বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান থেকে ফেলা বোমায় নিহত হয় আরও তিনজন। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বিমান হামলাতেই নারী ও শিশুসহ ৩০ জনের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ যায়। সব মিলিয়ে গত চার দিনে নিহত হয়েছে প্রায় ৯০ জন। ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে গাজা থেকে মাঝেমধ্যে রকেট ছোড়া হচ্ছে। তবে এতে এখন পর্যন্ত কেউ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। আংশিকভাবে মার্কিন অর্থায়নে নির্মিত ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম বেশির ভাগ রকেটই ভূপাতিত করেছে। অবশ্য, গতকাল ইসরায়েলের বন্দর শহর আসদদের একটি পেট্রোল স্টেশনে একটি রকেটের আঘাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। গাজা থেকে বেশির ভাগ রকেটই ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে। গতকালও তেল আবিবের আকাশ থেকে তিনটি রকেট ভূপাতিত করা হয়েছে বলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে। ইসরায়েরের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি তিন কিশোরকে অপহরণ ও হত্যার পর উত্তেজনা শুরু হয়। ইসরায়েল এ জন্য হামাসকে দায়ী করলেও তারা তা অস্বীকার করে। পরে ফিলিস্তিনি এক কিশোর একইভাবে অপহরণ ও হত্যার শিকার হওয়ার পর উত্তেজনা নতুন মোড় নেয়। গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে ইসরায়েল গত মঙ্গলবার ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামের অভিযান শুরু করে।

পুতিনের নিন্দা

ভ্লাদিমির পুতিন
সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে নেতাদের কথায় আড়ি পেতে পশ্চিমা দেশগুলো ‘ভণ্ডামি’ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পশ্চিমাদের এই অপকর্মের নিন্দা জানিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার বার্লিনে সিআইএ দপ্তরের প্রধানকে অপসারণের পর তিনি এসব কথা বলেন। রাশিয়ার ইতার-তাস বার্তা সংস্থা ও কিউবার প্রেনসা লাতিনা পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, এ ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।একটি দেশের নিজস্বতার ওপর হামলা। তিনি আরও বলেন, ‘যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক তথ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা প্রস্তুত।’

বাজেটে বারানসির পোয়াবারো

ভারতে গত এপ্রিম-মে মাসে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রচারে বারানসি গিয়ে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি দুটো কথা বারবার বলেছিলেন।এক, ‘মা গঙ্গা’র মালিন্য ঘোচানো।দুই, বারানসির জগদ্বিখ্যাত বেনারসি শাড়ির গরিমা ও ব্যাপ্তি বাড়ানো। প্রথম বাজেটেই কথা রাখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের আলসে ও আয়েশি শহর বারানসির পরিচিতি তার গলিতে, তার মন্দিরে এবং বেনারসি শাড়িতে। এই শহরেই রয়েছে হিন্দুদের পবিত্র কাশী বিশ্বনাথ মন্দির।বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরের প্রায় কোল ঘেঁষে প্রবাহিত গঙ্গা। আর বিশ্বখ্যাত বেনারসি শাড়ি! কত বছর হবে কে জানে, বেনারসি সিল্কের শাড়ি ও ভারতীয় নারী অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে। সেই বারানসি ক্রমে ক্রমে বিপন্ন হয়ে দুয়োরানির সন্তানের মতো অযত্নে দিন যাপন করছিল। মোদির প্রাক-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে চনমনে হয়ে ওঠা সেই বারানসি আজ হিসাব মিলাতে ব্যস্ত। গত বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেটে বেনারসি শাড়ির গরিমা রক্ষা ও তার ব্যাপ্তি ঘটাতে বারানসিতে একটা বাণিজ্য কেন্দ্র গঠন করার প্রস্তাব রেখেছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি।এই বাণিজ্য কেন্দ্র বেনারসি শাড়ির বাণিজ্য-প্রসারে সহায়ক হবে।এত দিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেনারসি শাড়ি রপ্তানি হয়েছে। এবার পাবে প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য। গঙ্গার মালিন্য ঘোচাতে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য প্রথম থেকেই সচেষ্ট।
গঙ্গার পুনরুজ্জীবনে একটা মন্ত্রক তৈরি করেছেন। গত বৃহস্পতিবারের বাজেটে গঙ্গা-পরিকল্পনা আরও বিস্তার পেল। এলাহাবাদ থেকে বারানসি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া পর্যন্ত এক হাজার ৬২০ কিলোমিটার গঙ্গার পলি সরিয়ে এই জলপথকে বাণিজ্য বিস্তারে ব্যবহার করা হবে। ছয় বছরের জন্য এই প্রকল্পে খরচ ধার্য হয়েছে চার হাজার ২০০ কোটি রুপি। প্রকল্পের নাম ‘জলমার্গ বিকাশ’। গোটা বারানসির অর্থনীতিই দালালনির্ভর। মন্দিরের দালালি, শাড়ির দালালি, কার্পেটের দালালি বা ঘাটের দালালি এই শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কেদার থেকে শুরু করে হরিদ্বার, কানপুর, দিল্লি, এলাহাবাদ, বারানসি, পাটনা প্রভৃতি শহরের ঘাটের সংস্কার ও উন্নয়নে চলতি বাজেটে ১০০ কোটি রুপির সংস্থান রাখা হয়েছে। বারানসিকে হিসেবে রেখেই এবারের বাজেটে ‘নমনি গঙ্গা’ পরিকল্পনা করা হয়েছে। বারানসি থেকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি পর্যন্ত গঙ্গার সংস্কারে খরচ হবে দুই হাজার ৩৭ কোটি রুপি। আর বাড়তি পাওনা? বারানসিতেও অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (এইমস) ধাঁচে নতুন হাসপাতাল গড়া হবে। বাজেটে এযাবৎ অবহেলিত বারানসির পোয়াবারো।

পার্টিতে বুঁদ হতে পারেন ক্লোসে!

ফিটনেস নিয়ে খুব মাথাব্যথা তার। নিজের বাসায় আছে জিম। রুটিন জীবনের বাইরে এক পাও দিতে নারাজ। কিন্তু রোববার বিশ্বকাপ জিততে পারলে আনন্দে পার্টির মধ্যে সেধিয়ে যেতে পারেন। ভুলে যেতে পারেন ফিটনেসের কথা। উন্মাতাল পার্টিতে মনুষ্য পরিচয়ও ভুলে যেতে পারেন! বুদ হয়ে যেতে পারেন। মিরোস্লাভ ক্লোসে বলছেন এমনটাই। আসলে ‘পার্টি অ্যানিম্যাল’ হয়ে যাওয়ার হুমকি দিলেন এ জার্মান! ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার খুব মনে আছে ক্লোসের। জার্মানির এ দলটিতে সেই ফাইনালের অভিজ্ঞতা কেবল ক্লোসেরই আছে। সঙ্গে আছে কষ্ট। অবশ্য কষ্ট দূর করার এমন সুযোগ আর কোথায় পাবেন। এর মধ্যে বিশ্বকাপে নিজের ১৬তম রেকর্ড গোল করেছেন। ওটা ব্রাজিলের বিপক্ষে। যে ম্যাচে ইতিহাসের লজ্জা ব্রাজিলিয়ানদের উপহার দিয়েছে ৭-১ গোলে হারিয়ে। নিজের ১৩৭তম ম্যাচের অপেক্ষায় এখন ক্লোসে। রোববারের ফাইনাল আর আর্জেন্টিনায় সব মনোযোগ তার। জিতলে কি হবে না হবে তার নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না ক্লোসে, ‘কোনো কিছুর গ্যারান্টি দিতে পারছি না। তবে বিশ্বকাপ জিতলে আমি হয়তো খুব নির্ভার হয়ে যাব। এমনকি আমার ভেতর থেকে পার্টি জানোয়ারটাও বেরিয়ে আসতে পারে।’ ফিটনেস ট্রেনিংয়ে অনুরক্ত ক্লোসে। ক্যারিয়ারের দীর্ঘতার জন্য শরীরটাকে খুব যত্ন করেছেন সারা জীবন।
রোজকার ফিটনেস রুটিনে ফাঁকি দেননি কখনও। নিজের ঘরেই জিম। কিন্তু ইয়োকোহামার কষ্ট ভুলতে পারলে অস্বাভাবিক কিছুও করে বসতে পারেন ক্লোসে! এখন অবশ্য ফাইনাল ছাড়া আর কিছু ভাবার সময় নেই তার, ‘ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়টা উপভোগ করেছি। এর ২৪ ঘণ্টা পর কাজে নেমে পড়েছি। আগামী ম্যাচটায় আবারও আমাদের সামর্থ্যরে পুরোটা দিয়ে খেলতে হবে। ফাইনালে হারলে খুব দুঃখ হয়। সুতরাং, এটি জয়ের সময় এখন।’ ব্রাজিলে এসে ব্রাজিলিয়ান রোনালদোর ১৫ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। তারপর ভেঙে এখন নিজেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্কোরার। কিন্তু ফাইনাল জিততে না পারলে ষোলোআনাই বৃথা! ক্লোসের কথার সারমর্ম তাই, ‘হ্যাঁ, রোনালদোর রেকর্ডটা এখন আমার। কিন্তু ও নিয়ে ভাবার সময় এখন নেই। ফাইনাল হারলে আমার সর্বোচ্চ স্কোরারের আনন্দ হারিয়ে যাবে।’ ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল। দুই গোলই করেছিলেন ক্লোসে। এমন কিছু কি তার ভাবনায় আছে? সেই হারকে প্রেরণা হিসেবে নিতে নারাজ ক্লোসে দলগত সাফল্যের চেতনায় উজ্জীবিত, ‘প্রত্যেক ম্যাচই স্বতন্ত্র। বিশেষ করে ফাইনাল তো বটে। ১২ বছর আগে আমি অনেক তরুণ ছিলাম। এখন দুই ম্যাচে তুলনা চলে না। এ দলে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কমিটমেন্ট অন্যরকম। টিম স্পিরিট কোনো খেলো ব্যাপার নয়। আর এ দলে ২৫-২৬ বছরের খেলোয়াড়ের মধ্যেও পেশাদারিত্ব ও পরিণতভাব খুব।’ এ নিয়ে ষষ্ঠবার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হচ্ছে জার্মানি। তৃতীয়বার ফাইনালে। গেল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে ৪-০ গোলে হারিয়েছিল জার্মানি। ক্লোসে করেছিলেন দুই গোল। এএফপি।

তাঁরা দুজনায় by ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

একজন অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী, আরেকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটেনের খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী। কীভাবে এক হলেন তাঁরা দুজনে?
‘আপনাকে ধন্যবাদ। সুযোগ পেলে একদিন বাংলাদেশে আসবেন।’

>>অস্কার বিজয়ী ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েত বিনোশ ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নৃত্যশিল্পী আকরাম খান
ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েত বিনোশ প্রস্তাবটা শুনে হাসলেন। যাকে বলে রহস্যময় হাসি। কায়দা করে মাইক্রোফোনের খুব কাছে মুখ এনে বললেন, ‘কেন নয়...আমি...চিনি।’ এই বলে আবারও হাসলেন বিশ্ব সিনেমার প্রিয় মুখ জুলিয়েত বিনোশ। সেই হাসিতে এবার একচিলতে দুষ্টুমিও কি ঝিলিক দিয়ে গেল? কার কথা বললেন এই অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী? বাংলাদেশের কাকে চেনেন তিনি? সেই রহস্যের জট খোলার সুযোগ ঘটল না। সামনে বর্ষীয়ান কানাডিয়ান সাংবাদিক ততক্ষণে অস্থির হয়ে উঠেছেন জুলিয়েত বিনোশকে প্রশ্ন করার অপেক্ষায়।
মে, ২০১৪। ৬৭তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের শেষবেলায় এসে ফরাসি সৌরভে চারদিক মোহিত করে ফেলেছেন জুলিয়েত বিনোশ। ফরাসি সিনেমার অন্যতম দিকপাল জঁ লুক গদার থেকে শুরু করে ইরানি সিনেমা-গুরু আব্বাস কিয়ারোস্তামি—কে না মুগ্ধ হয়েছেন জুলিয়েতের অভিনয়গুণে? দ্য ইংলিশ পেশেন্ট ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে বহু আগেই ঘরে তুলেছেন অস্কার।
ফ্রান্সের নন্দিত এই অভিনেত্রীকে পর পর দুটো প্রশ্ন করার দুর্লভ সুযোগ ঘটে গেছে। এটুকুতেই খুশি ছিলাম। উত্তর শেষে তাঁকে বাংলাদেশে আসতে বলেছি স্রেফ বাংলাদেশের নামটা আরেকবার বলার জন্যই। তখনো জানি না জুলিয়েত বিনোশ বড় ধরনের চমক রেখেছিলেন আমার জন্য।
দেশে ফিরে নানা ব্যস্ততায় ভুলতেই বসেছিলাম। হপ্তা দুয়েক আগে সিলস মারিয়া ছবির সংবাদ সম্মেলনের সেদিনের ফুটেজ দেখতে দেখতে হঠাৎ তাজ্জব। একবার নয়, টানা তিনবার শোনার পর পরিষ্কার বোঝা গেল কথাটা। জুলিয়েন বলেছেন, ‘আই নো আকরাম খান।’
আকরাম খান? ঝট করে মন চলে গেল লন্ডনে। লন্ডনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার আকরাম খানের কথা জানি। জুলিয়েত কি তাঁর কথাই বলেছেন? তবে একজন ক্রিকেটার আকরাম খানও তো আছেন আমাদের।
ত্বরিত জুলিয়েত বিনোশের সঙ্গে সেই ঝটিকা আলাপের ভিডিও পাঠালাম লন্ডনে প্রতিবেদক উজ্জ্বল দাশের কাছে। আগেই জানি, আকরাম খানের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ তাঁর। পরদিন সকালে ঘুম ঘুম চোখে ফেসবুক ইনবক্স খুলতেই আরেক পশলা বিস্ময়। উজ্জ্বল দাশ মারফত বেশ কিছু ছবির লিঙ্ক পাঠিয়েছেন আকরাম খান। আর ছোট্ট বার্তায় লিখেছেন ‘জুলিয়েত বিনোশের সঙ্গে কয়েকটা কাজ করেছি আমি। ছবিগুলো দেখতে পারেন।’
ছবিতে মঞ্চে নাচছেন জুলিয়েত আর আকরাম খান একসঙ্গে! অভিনেত্রী জুলিয়েত বিনোশ নাচতেও পারেন। জানা ছিল না। আকরাম খানের নিজস্ব ওয়েবসাইট আর ইন্টারনেট ঘেঁটে যাবতীয় রহস্যের জবাব মিলল।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। সেবার লন্ডনে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল একটি পরিবেশনা। ন্যাশনাল থিয়েটারে সেবার নৃত্যশিল্পী হিসেবে অভিষেক হয় অভিনেত্রী জুলিয়েত বিনোশের। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নৃত্যশিল্পী আকরাম খান এবং ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েত বিনোশের সেই মিলিত পরিবেশনা সাড়া ফেলেছিল গার্ডিয়ান, সানডে টাইমসসহ বিলেতের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে। তাদের ‘ইন–আই’ শিরোনামের পরিবেশনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে মাতামাতি তো ছিলই।
আমাদের আকরাম খানের সঙ্গে জুলিয়েত বিনোশের পরিচয় ঘটে আকরাম খানের প্রযোজকের স্ত্রী সু মানের মাধ্যমে। তিনিই তাঁকে প্রথম প্রস্তাবটা দেন। এর পরই জুলিয়েত বিনোশ আকরামের অনুশীলন দেখতে যান। দুজনের পয়লা দেখাটা হয় লন্ডনের সাউথব্যাংকে।
‘আমার প্রথম ইচ্ছাটা ছিল নতুন কিছু করার। আর অনুশীলন ছিল আমার কাছে পাহাড়ে ওঠার মতো কষ্টকর।’ এই পরিবেশনা সম্পর্কে বলেছেন জুলিয়েত।
অন্যদিকে, আকরাম খানের জন্যও এটি ছিল আশ্চর্য এক অভিজ্ঞতা। তিনি বলেছেন, ‘তাঁর সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় ছিল অসাধারণ একটা ব্যাপার। শুধু শরীর দিয়ে নয়, মঞ্চে পায়ে তাল ঠোকার সঙ্গে কীভাবে আবেগ ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটা আমি শিখেছি জুলিয়েতের কাছ থেকে। আমরা চেষ্টা করেছি দুজনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নতুন কিছু করার।’
গার্ডিয়ান পত্রিকার জুডিথ ম্যাকরেল আকরাম–জুলিয়েতের নাচ সম্পর্কে লেখেন, ‘এটি ভালোবাসা, কামনা, আচ্ছন্নতা আর রোমাঞ্চের এক মিলিত প্রতিফলন। জুলিয়েত আকরামের মতোই প্রায় একই আত্মবিশ্বাসে নেচেছেন সমান তালে।’
‘ইন-আই’ নামের পরিবেশনাটি লন্ডনে প্রথমবার হয়েছিল। তারপর সেটি ঘুরেছে বিশ্বের বেশ কিছু জায়গায়। এর মধ্যে আকরাম আর জুলিয়েতের বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি।
হ্যাঁ, কান উৎসবে সেদিন অস্কার বিজয়ী ফরাসি অভিনেত্রী আসলে সত্যি কথাই বলেছিলেন। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আকরাম খানকে চেনেন। আর সেটা আদতে শুধু ‘চেনা’ থেকে বেশি কিছু। জুলিয়েতের সেই রহস্যময় হাসি। কায়দা করে বলা, ‘আই নো আকরাম খান’ সবকিছুর রহস্যই এখন পরিষ্কার!

বিশ্বকাপের দিনগুলোতে প্রেম by আনিসুল হক

‘বিশ্বকাপে ফুটবলের পাশাপাশি প্রেমের খেলা।’ বিবিসি বাংলার একটা প্রতিবেদনের শিরোনাম। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বেশ কিছু তরুণ-তরুণীর জীবনে দেখা দিয়েছে নতুন স্বপ্ন। যেমন প্রেম হয়েছে আর্জেন্টিনার ফ্রেডেরিকো আস্তরগার (২৭) সঙ্গে ব্রাজিলের বিয়াত্রিজ গ্লক্সোর (২৫)। বিশ্বকাপের শুরুর দিকেই ব্রাজিলে এসেছিলেন ফ্রেড। সাও পাওলো যাওয়ার পথে বিয়াত্রিজের সঙ্গে দেখা হয় কুরিচিবায়। ১২ জুন, তা কেবল বিশ্বকাপ শুরুর দিনই ছিল না, ব্রাজিলে ছিল ভালোবাসারও দিন। ফ্রেডেরিকো পথের নির্দেশ জানতে চেয়েছিলেন এই ব্রাজিলীয় তরুণীর কাছে। কপালকুণ্ডলার মতো বিয়াত্রিজ কী বলেছিলেন, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ সেই পরিচয় বিশ্বকাপের এই এক মাসে গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে, রূপ নিয়েছে নাছোড় প্রেমের। এ রকম আরও নানা প্রেমিক জুটির উল্লেখ করে বিবিসি বলছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে অনলাইনেও প্রেম-পরিচয়-বন্ধুত্ব বেড়ে গেছে ৫০ ভাগ, সূত্র টিন্ডার নামের এক অনলাইন অ্যাপ।
আমি বসে আছি ব্রাজিলের বেলো হরিজন্তে শহরে।হরিজন মানুষ, হরিজন্তেই থাকব, সন্দেহ কী! বসে বসে বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। এক ঘণ্টা ধরে নেইমারের সংবাদ সম্মেলন দেখাল স্পোর্টস চ্যানেলে। লাইভ। একবিন্দু পর্তুগিজ বুঝি না। তবু দেখলাম। দুটো প্রশ্ন শুধু বুঝেছি, একজন চীনা সাংবাদিক করলেন। ‘নেইমার, তুমি কি মনে করো, ব্রাজিলের স্বাভাবিক খেলার দিন শেষ হয়ে গেছে? তুমি কি মনে করো, কৌশলের দিক থেকেও ব্রাজিল হেরে গেছে?’ ইংরেজিতে ছিল প্রশ্ন দুটো, তাই বুঝতে পারলাম। উত্তর এল পর্তুগিজে, তাই বুঝলাম না। এক ঘণ্টা বেশ শান্ত স্বরে কথা বললেন নেইমার। একটা সময়ে কেঁদে ফেললেন। চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করলেন। হাসি আসছিল না। কান্না, হাসি, অশ্রু—এসব অনুবাদ করে দিতে হয় না। তাই নেইমারের কান্নাটা বাংলায় অনুবাদ করে না দিলেও বুঝতে পারলাম। তার আগে টিভিতেই দেখাল, নেইমার ব্রাজিলের অনুশীলন দেখতে গেছেন। সবাইকে জড়িয়ে ধরলেন। সিলভাকে অনেকক্ষণ। স্কলারিকে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলেন।একটু খুঁড়িয়েই হাঁটলেন নেইমার। গায়ে জ্যাকেট। মাথার ক্যাপে লেখা এনজেআর। নেইমার জুনিয়র।
কিন্তু শুধু ব্রাজিলের পরিস্থিতি জানলে তো হবে না। আর্জেন্টিনার কী খবর?
জানার জন্য ই-মেইল করলাম পলা অলইক্সারাককে।পলা আর্জেন্টিনার একজন বিখ্যাত তরুণ লেখিকা, বুয়েনস এইরেস রিভিউ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদিকা। গ্রান্টা ম্যাগাজিনে স্প্যানিশ ভাষার সেরা তরুণ লেখকদের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন। আমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ-পরিচয় ২০১০-এ, আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখক কর্মশালায়।
আর্জেন্টিনার কাউকে পেলেই আমরা, বাঙালি লেখকেরা, দুটো কথার পর তিন নম্বর কথা যেটা বলি, আমিও প্রথম দেখাতেই ওকে তাই বলেছিলাম। শোনো, আমি বাংলা ভাষার লেখক, আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তোমাদের ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর যে মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, জানো তো।
কে না জানে। পলা অবশ্যই জানে। ব্যাস, একধরনের বন্ধুত্বই হয়ে গেল পলার সঙ্গে।
১০ জুলাই ই-মেইলে ওকে জিগ্যেস করলাম, পলা, বুয়েনস এইরেসের পরিস্থিতি কী?
পলা লিখেছে, একস্ট্যাটিক। উত্তেজনাকর। সে রাতে, বিজয়ের পর, বুয়েনস এইরেসের সমস্ত রাস্তাঘাট প্রতিটা কোণ ছেয়ে গেল মানুষে আর মানুষে। মানুষ উল্লাস করছে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। লড়াই হবে এক ধ্রুপদি প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে, যার নাম জার্মানি আর লড়াইটা হবে ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিদ্বন্দ্বীর দেশে, ব্রাজিলে।
ব্রাজিলকে ভাই বলে ডাকা! শুনে কানটা আরামই পেল। ১০ জুলাই কয়েকজন ব্রাজিলিয়ানও বলল, আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছে, এ তো ভালোই। আমাদের প্রতিবেশী আর বন্ধু দেশই তো।
পলা লেখিকা। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর দেশের লেখিকা। বলতে ভুলে গেছি, ব্রাসিলিয়াতে ওই সেভেনে পড়া আর্জেন্টিনার বালকটিকেও বলেছিলাম ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কথা, ও ওর বাবাকে জিগ্যেস করে জবাব দিল, ওকাম্পোর বাড়ি এখন জাদুঘর।
‘পলা, তোমার কাছে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার এত দূর আসাটাকে কেমন লাগছে?’ জিগ্যেস করি।
পলা বিশ্বকাপটাকে একটা পার্টি হিসেবে বর্ণনা করল।
বলল, ‘আমি আসলেই চেয়েছিলাম ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ফাইনাল হোক। বিশ্বকাপ হচ্ছে একটা বিশাল ব্যয়বহুল জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি। আসলে কিন্তু দুজন গোপন প্রেমিক-প্রেমিকার অভিসারের একটা উপলক্ষ। পার্টি ফুরিয়ে আসে। সব মেহমান একে একে চলে যেতে থাকে। দুজন শুধু থেকে যায়। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল থেকে যাবে, এই তো ছিল আশা, তারা তাদের প্রণয়বেদনা নিয়ে মিলিত হবে। কিন্তু পথে হানা দিল এক জার্মান রোবট। প্রেমের গল্পটা ভেঙে গেল, কারণ তারা মাঝপথে হেনস্তা হলো কতগুলো রোবটের হাতে। তাদের এত দিনের প্রণয়াকাঙ্ক্ষা পরিণতি পেতে ব্যর্থ হলো।’
পলা লিখেছে, ‘জার্মানদের কাছে ব্রাজিল হেরে গেছে, আমার খুবই খারাপ লাগছে। দেখো কী রকম, ৫-০ গোলে এগিয়ে থেকেও জার্মানরা হলুদ কার্ড চায় আর অস্কারের গোল মিস হয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুর কসাইগিরির কাছে, একে তুমি অপছন্দ না করে পারবে?’
আমি বলি, ‘পলা, চলে এসো রিওতে। বুয়েনস এইরেস থেকে তো আর বেশি দূরে নয় রিও।’
‘দেখি যদি টিকেট পাই। চেষ্টা করছি টিকিট জোগাড় করার।’
‘আমিও চেষ্টা করছি টিকিট জোগাড় করার, ব্রাসিলিয়া থেকে রিও-র।’
বিমানের টিকিটটাই এখন মহার্ঘ্য।
বিশ্বকাপ শুরুর সময়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে উদ্ধৃত করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম—
‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।।’
ওই গানের মধ্যে একটা চমৎকার কথা আছে, ‘গোপনে প্রেম রয় না ঘরে, আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে— সবার তুমি আনন্দধন হে প্রিয়, আনন্দ সেই আমারও।’
খুব অন্য রকম অর্থে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু বিশ্বসাথে যোগের একটা উপলক্ষ কি বিশ্বকাপও দেয় না? আর আমাদের প্রেমগুলো ... মেসির জন্য, নেইমারের জন্য, মুলারের জন্য, রোবেনের জন্য, বিয়াত্রিজ আর ফ্রেডের প্রেমকাহিনির জন্য ... কি আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে না?
ইউটিউবে এখন তাই এই গানটাই শুনি—
‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।।’

‘যারা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে তারা পাকিস্তানের এজেন্ট’ -সজীব ওয়াজেদ জয়

প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তাঁর তথ্য, যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ‘যারা “জয় বাংলা” না বলে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” বলে তারা পাকিস্তানের এজেন্ট’।

>>রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। ছবি: ফোকাস বাংলা
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন আয়োজিত সেমিনারে জয় এ মন্তব্য করেন। সেমিনারে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আওয়ামী ঘরানার ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘তাদের (বিএনপি) বিরোধী দল বলব না, কারণ তারা সংসদে নেই। তারা “জয় বাংলা” বলে না, বলে “জিন্দাবাদ”। যেটা উর্দু শব্দ। বাংলা ভাষায় “জিন্দাবাদ” বলে কোনো শব্দ নেই। ভাষা আন্দোলনে আমরা উর্দুর বিরোধিতা করেছিলাম। এখনো তারা সেটাই ব্যবহার করে। যারা “জিন্দাবাদ” বলে, তারা বাঙালি নয়, পাকিস্তানের এজেন্ট। তারা দেশ থেকে চলে যায় না কেন? যারা এ দেশে থেকে “জিন্দাবাদ” বলে, তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত।’
১৯৮০ সালের বাংলাদেশের মানচিত্রে তালপট্টি দ্বীপ ছিল না, দাবি করে জয় বলেন, ‘আমি পরীক্ষা করে এসেছি ১৯৮০ সালের বাংলাদেশের যে মানচিত্র করা হয় সেখানে তালপট্টি দ্বীপ ভারতের অংশ দেখানো হয়। ওই সময় কোন সরকার ক্ষমতায় ছিল? এখন আপনারা তালপট্টি দ্বীপে গিয়ে আন্দোলন করেন। পারবেন না, তবে হ্যাঁ, সাঁতার কাটতে পারবেন।’
এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে শিক্ষার অভাব আছে, মন্তব্য করে জয় বলেন, ‘২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে আমরা ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার পেয়েছি। কে বিজয়ী হয়েছে? সেই সামান্য অঙ্কটুকুও কি তারা পারেন না। আসলে তাদের মধ্যে শিক্ষার অভাব রয়েছে।’
মানুষ খারাপ কাজ করতে ও শুনতে ভালোবাসে মন্তব্য করে সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘মিডিয়াতে সংবাদ সেনশনাল করতে সত্য-মিথ্যা মেশানো হয়। কারণ আমরা নোংরা কিছু পছন্দ করি না। তবে কানে নিই। ’৭৫-এ আমরা শুনে গেছি মিথ্যা প্রচার। মিথ্যা প্রচার করে কিছুদিন চালানো যায়, চিরদিন নয়।’

আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সংগঠিত করতে আপনার পরিকল্পনা আছে কি না, একজন অংশগ্রহণকারীর এমন প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘আমার পরিকল্পনা আগামী সাড়ে চার বছর সারা দেশ ট্যুর করার। এর মাধ্যমে দলকে সংগঠিত করব। আগামীকাল শনিবার আমি রংপুরের পীরগঞ্জে যাচ্ছি।’ অপর  এক প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা এখন দেশের কাজে মনোযোগী হয়েছেন। তাঁরা দলকে সময় না দিতে পারলেও কীভাবে দলকে আরও শক্তিশালী করা যায়, সেটা নিয়ে আমি কাজ করছি। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬ লাখ সদস্যের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ (উপাত্তভিত্তি) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি।’

একজন অংশগ্রহণকারী প্রশ্ন করেন, ‘অনেকে টক শোতে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সজীব ওয়াজেদ জয়কে সমান্তরাল করে দেখেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ জবাবে জয় বলেন, ‘আমি তাদের মূর্খ মনে করি। তাঁদের প্রতি অনুরোধ, একদম বকলম হয়ে কথা বলবেন না।’

অনলাইনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কীভাবে অপপ্রচার বন্ধ করা যায়, এমন প্রশ্নের জবাব জয় বলেন, ‘অনলাইন বিশাল জায়গা। সেখানে কন্ট্রোল করা যায় না। তারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে না, আমার ফেসবুক পেজেও বাজে কথা লেখে। আমি সেগুলো ডিলিট করে দিই।’

আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্কে দূরত্ব হয়ে গেছে, মন্তব্য করে অনুষ্ঠানে সমকাল-এর সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘সমুদ্র জয়ের পর ডেইলি স্টার শিরোনাম করে “Cheer Bangladesh”। তার পরও বলা হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অমুক পত্রিকা প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এটা ঠিক না। আমরা মিডিয়ার সেন্সরশিপ চাই না, নীতিমালা চাই।’ উল্লেখ্য, সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি স্টার-এর কোনো প্রতিবেদককে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি ও আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন) এ কে আজাদ চৌধুরী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশীদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ এ আরাফাত।

মা কারাগারে, কী দোষ শিশুদের? by গাজী ফিরোজ

ওরা ৪৪ জন।সবার বয়স তিন মাস থেকে আট বছরের মধ্যে। আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার বয়সে ওদের মায়ের অপরাধের কারণে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকতে হচ্ছে। ওদের খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ আর শৈশবের মানসিক বিকাশের জন্য কারাগারে নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। নেই কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার।
কারাগারে এসব শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে বাধা ও সামাজিকভাবে অসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে বলে অভিমত প্রকাশ করে তাদের আলাদাভাবে সুন্দর পরিবেশে গড়ে তোলার ওপর পরামর্শ দিয়েছেন সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুর রশিদ বলেন, কারাগারে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার থাকলে শিশুদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম হতো।
কারা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কারাগারে গাদাগাদি করে মায়েদের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে শিশুদের। চিৎকার, চেঁচামেচি ও খিস্তিখেউর শুনছে সারাক্ষণ এ শিশুরা। জমিলা খাতুন নামের এক নারী চার কন্যা ও এক শিশুপুত্র নিয়ে কারাগারে আছেন এক বছর ধরে। তিন কন্যাশিশু নিয়ে তাহেরা বেগম আছেন ছয় মাস ধরে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জেসমিন আক্তার চার মাস আগে এক কন্যা প্রসব করেন কারাগারে। হত্যা, মাদক ও চোরাচালান মামলার আসামি তাদের মায়ের সঙ্গে কারাগারে বিরূপ পরিবেশে বেড়ে উঠছে ৪৪ শিশু।
চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. ছগির মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বন্দী মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে কারাগারে। ডে-কেয়ার সেন্টার তৈরির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা আটকে আছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সমাজবিজ্ঞানী ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পরিবার ও সমাজের পরিবেশটা শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে।কারাগারে বন্দী মায়েদের সঙ্গে শিশুরা থাকলে তাদের সুস্থ সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আফজাল হোসেন জানান, একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন তার পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে গড়ে ওঠে। মাদক মামলার সাজাপ্রাপ্ত বন্দী মায়েদের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার না পাওয়া এবং আক্ষেপের গল্প শুনবে শিশুরা। এতে ওদের সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সমাজের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সঞ্চিত হবে। তা ছাড়া কারাগারের বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বড় হওয়ায় শিশুদের আবেগের পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটছে না। শৈশবের আবেগ প্রকাশিত না হলে আক্রমণাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি হতে পারে তাদের। কারাবিধি অনুযায়ী, বন্দী মায়েদের সঙ্গে চার বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা কারাগারে থাকতে পারে। এরপর কারা তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত রাখার নিয়ম রয়েছে।

জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সমস্যা বলতে না দিলে সমাধান আসবে কী করে?

তিন দিনের জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনটি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরিধি বাড়ানোর বাইরে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হয়নি, যদিও জেলা প্রশাসকেরা তিন শতাধিক সমস্যা চিহ্নিত করেছিলেন। এ ধরনের সম্মেলনের লক্ষ্য হলো, সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কী কী সমস্যায় পড়েন, তা তাঁরা খোলাখুলি বলবেন এবং সেই আলোকে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। পত্রিকান্তরের খবর অনুযায়ী এবারের সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের খোলাখুলি কথা বলতেই দেওয়া হয়নি। এমনকি যাঁরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁদের ওপরও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। জেলা প্রশাসকেরা নিশ্চয়ই কেউ রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি; সমস্যার কথা জানিয়েছেন। রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সেই সমস্যা এলে সেটি বলতে না দেওয়ার কী কারণ থাকতে পারে?
সংবিধানে জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা আছে। নিজ নিজ সীমার মধ্যে দায়িত্ব পালন করলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা যখন মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে দিয়ে অন্যায্য ও বেআইনি কাজ করিয়ে নেন, তখন সরকারি কর্মকর্তারাও অসাধু পথ বেছে নিতে বাধ্য বা প্ররোচিত হন। বর্তমানে জনপ্রশাসনের এই জ্বলন্ত সমস্যাটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কেন আমলে নিচ্ছে না, সেটাই প্রশ্ন। সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মনীতি অনুযায়ী জনগণকে সেবা দিতে বলেছেন। সেটি তখনই নিশ্চিত হতে পারে যখন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা প্রশাসনের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখবেন।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসনের দু-একজন অতি উৎসাহী কর্মকর্তার কথা বলা প্রয়োজন, যাঁরা সরকারকে অসৎ পরামর্শ দিতেও দ্বিধা করেন না। সম্মেলনের আগে আলোচ্যসূচিতে ঢাকার সাবেক জেলা প্রশাসক ১৯৭৩ সালে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইনের বাতিল হওয়া কালো ধারাটি পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা নিয়ে আলোচনাই হয়নি। এ জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় ধন্যবাদ পেতে পারে। এ ধরনের কর্মকর্তাদের থেকে সরকারকে সাবধান থাকতে হবে।

গাজা উপত্যকায় বেপরোয়া বোমাবর্ষণ চলছেই -মধ্যস্থতা করতে চান ওবামা

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিমান হামলা চলছেই। বিমান থেকে বেপরোয়াভাবে ফেলা হচ্ছে বোমা। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত টানা চার দিন ধরে এ হামলায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হলেও তা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় হামলা বন্ধে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, তিনি গাজায় অস্ত্রবিরতিতে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির।
গাজা উপত্যকায় ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেন। এ সময় ওবামা বলেন, অস্ত্রবিরতিতে মধ্যস্থতা করতে তাঁর সরকার রাজি।

হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান সহিংসতা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ওবামা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বেসামরিক লোকের প্রাণহানি ঠেকাতে সব পক্ষকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র শত্রুতার অবসান ঘটাতে প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসের অস্ত্রবিরতিতে ফিরে যাওয়া। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও মিসরের মধ্যস্থতায় ২০১২ সালে ওই অস্ত্রবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর মাধ্যমে গাজার ইসলামপন্থী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আট দিনের বিমান হামলা বন্ধ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাতিসংঘও গাজা উপত্যকায় চলমান হানাহানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠকের পর বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অস্ত্রবিরতি ‘সবচেয়ে বেশি জরুরি’। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ফোন করে অবিলম্বে রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বেসামরিক লোক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তবে শিগগিরই বিমান হামলা বন্ধের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। নেতানিয়াহু বারবার বলছেন, অস্ত্রবিরতির বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে নেই।
গতকাল বিমান হামলা শুরু হয় ভোর থেকে। পাশাপাশি নৌ-হামলাও চালানো হয়। গাজা সিটির একটি বাড়িতে বিমান হামলায় একজন চিকিৎসক নিহত হন। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফার একটি তিনতলা বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান থেকে ফেলা বোমায় নিহত হয় আরও তিনজন। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বিমান হামলাতেই নারী ও শিশুসহ ৩০ জনের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ যায়। সব মিলিয়ে গত চার দিনে নিহত হয়েছে প্রায় ৯০ জন।
ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে গাজা থেকে মাঝেমধ্যে রকেট ছোড়া হচ্ছে। তবে এতে এখন পর্যন্ত কেউ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। আংশিকভাবে মার্কিন অর্থায়নে নির্মিত ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম বেশির ভাগ রকেটই ভূপাতিত করেছে। অবশ্য, গতকাল ইসরায়েলের বন্দর শহর আসদদের একটি পেট্রোল স্টেশনে একটি রকেটের আঘাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।

গাজা থেকে বেশির ভাগ রকেটই ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে। গতকালও তেল আবিবের আকাশ থেকে তিনটি রকেট ভূপাতিত করা হয়েছে বলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে। ইসরায়েরের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলি তিন কিশোরকে অপহরণ ও হত্যার পর উত্তেজনা শুরু হয়। ইসরায়েল এ জন্য হামাসকে দায়ী করলেও তারা তা অস্বীকার করে। পরে ফিলিস্তিনি এক কিশোর একইভাবে অপহরণ ও হত্যার শিকার হওয়ার পর উত্তেজনা নতুন মোড় নেয়। গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে ইসরায়েল গত মঙ্গলবার ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামের অভিযান শুরু করে।

ইংরেজি ভাষার জ্ঞান! by আতাউর রহমান

গত শতাব্দীর শেষ দশকের প্রারম্ভে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত আমাদের দূতাবাসে আমি লেবার কাউন্সেলর পদে কর্মরত ছিলাম। ইংরেজি ভাষায় জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা হেতু অনেককে ‘কাউন্সেলর’-এর পরিবর্তে ‘কাউন্সিলর’ উচ্চারণ করতে আমি স্বকর্ণে শুনেছি। অথচ ‘কাউন্সেলর’ ও ‘কাউন্সিলর’ সম্পূর্ণ ভিন্নার্থক শব্দ—‘কাউন্সেলর’ হচ্ছে পরামর্শদাতা আর ‘কাউন্সিলর’ মানে পরিষদ সদস্য, যিনি সাধারণত ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকেন।
সে যা হোক, সৌদি আরবে অবস্থানকালে আমি নিয়মিত সেখানকার সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক আরব নিউজ পড়তাম। তো একবার ওই পত্রিকায় ইংরেজি ভাষায় ব্যুৎপত্তিজনিত একটি সরস গল্প বেরিয়েছিল: রিয়াদের এক হাসপাতালে ডাক্তার সৌদি ও নার্স ইংরেজ। পাঁচ মিনিট আগে ডাক্তার দেখে গেছেন জনৈক রোগী কোমায়, একেবারেই চলনশক্তিরহিত। পাঁচ মিনিট পর নার্স দৌড়ে এসে তাঁকে জানালেন, ‘ডক্টর, ডক্টর, দ্য পেশেন্ট হ্যাজ কিকড দ্য ককেট।’ ‘কিক দ্য ককেট’—ইংরেজি একটি বাগ্ধারা, সেটা বাংলায় ‘পটোল তোলা’ তথা মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার সমতুল্য; এটা সৌদি ডাক্তারের জানা ছিল না। তাই তিনি কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে সবিস্ময়ে নার্সকে ইংরেজিতে যা বললেন, সেটা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে দাঁড়ায়, ‘পাঁচ মিনিট পূর্বে আমি রোগীকে মুমূর্ষু অবস্থায় রেখে এলাম। এই সামান্য সময়ের মধ্যে সে শরীরে এত শক্তি কোত্থেকে পেল যে বালতিকে লাথি মেরে ফেলে দিল?’
আর আরবি ভাষা খুব প্রাচীন ও প্রাচুর্যময়; অথচ আরবিতে বাংলা ‘প’ ও ইংরেজি ‘পি’র উচ্চারণ নেই। এ কারণে আরবদের উচ্চারণে ‘পাকিস্তান’ হয়ে যায় ‘বাকিস্তান’, ‘পার্কিং’ হয়ে যায় ‘বার্কিং’। তো এ নিয়েও একটি মজার গল্প আছে: জনৈক আরব পরিব্রাজক বিলেতে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে কর্তব্যরত পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্যান আই বার্ক হিয়ার (আমি কি এখানে পার্ক করতে পারি)?’ বিলেতের পুলিশও রসিকতায় কম যায় না, সে একগাল হেসে জবাব দিল, ‘ইউ ক্যান বার্ক, এজ লং এজ ইউ লাইক, বাট ইউ কান্ট পার্ক হিয়ার।’ অর্থাৎ ‘আপনি, যতক্ষণ খুশি এখানে ঘেউ ঘেউ করতে পারেন, তবে এখানে পার্ক করতে পারবেন না।’
মাত্র ১৯ মাইল প্রশস্ত ইংলিশ চ্যানেলের দুই পাশে অবস্থিত দুই দেশ—ব্রিটেন ও ফ্রান্স। অথচ দুই দেশের ভাষায় বিস্তর ফারাক। তো এক ফ্রেঞ্চম্যান বিলেতে বেড়াতে গেছে। যথারীতি ইংরেজি ভাষায় তার দখল খুবই সীমিত। তার ইংরেজ বন্ধু তার সম্মানার্থে একটি নৈশভোজের আয়োজন করে তাকে বলল, তুমি তো জানো, ভোজ-উত্তর দাঁড়িয়ে কিছু বলা নিয়ম। তুমি শুধু বলবে ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফ্রম দ্য হার্ট অব মাই বটম’ অর্থাৎ ‘আপনাদের আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ।’ কিন্তু যথাসময়ে সে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যা বলল, তাতে উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। সে বলে বসল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফ্রম দ্য হার্ট অব মাই বটর্ম, যেটার অর্থ দাঁড়ায় ‘আপনাদের আমার পায়ুপথ থেকে ধন্যবাদ।’
একই ব্যাপার জাপানিদের বেলায়ও প্রযোজ্য। জাপানিদের ইংরেজি ভাষায় ব্যুৎপত্তিও খুবই সীমিত। তো জনৈক জাপানি গিয়েছিল আমেরিকায়। যাওয়ার আগে সে শুনে গেছে, আটলান্টিক মহাসাগরে টাইটানিক জাহাজ ডুবে সহস্রাধিক যাত্রী মারা যাওয়ার জন্য দায়ী ছিল একটি আইসবার্গ।তাই আমেরিকায় গিয়ে জনৈক মি. গোল্ডবার্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটতেই সে বলে বসল, ‘ও, তাহলে আপনার কাজিন মি. আইসবার্গই বুঝি টাইটানিক জাহাজ ডুবিয়েছিল।’
ফিরে আসি নিজের দেশের কথায়। আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গিয়েছিল’, এই বাক্যের ইংরেজি কী? প্রত্যুত্তরে ছেলেটি নাকি বলেছিল, ‘ইংরেজি কী, তা জানি না; তবে বাক্যটির আরবি জানি—‘আরবি হচ্ছে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’
ছেলেটিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের দেশের এক প্রয়াত সিভিল সার্ভেন্ট নাকি সরকারি সফরে বিলেতে গিয়ে রাতে ডিনারের টেবিলে পাশে উপবিষ্ট মধ্যবয়সী ইংরেজ মহিলাকে আমাদের দেশীয় স্টাইলে ‘আপনার শইলটা কেমন’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, হাউ ইজ ইওর বডি টু-নাইট?’ আর সাম্প্রতিককালে জনৈক সচিব একটি জেলা পরিদর্শনে গেলে জেলা প্রশাসক তাঁকে সার্কিট হাউসে রেখে খাতির-যত্ন তো করলেনই, বিদায়লগ্নে বলে বসলেন, ‘স্যার, আপনাকে ভালোমতো হসপিটালাইজ করতে পারলাম না বলে দুঃখিত।’ সচিব সাহেব তদুত্তরে কী বলেছিলেন, সেটা জানা যায়নি; তবে জেলা প্রশাসক মহোদয় যে ইংরেজি ‘হসপিটালিটি’ (আতিথেয়তা) ও ‘হসপিটালাইজ’ (হাসপাতালে ভর্তি)—এ দুটো শব্দের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন, সেটা সহজেই অনুমেয়।
‘সিভিল সার্ভেন্ট’ বলতে মনে পড়ে গেল, সেবারে মালদ্বীপে গিয়ে শুনেছিলাম ‘সার্ভেন্ট’ ও ‘সার্পেন্ট’ নিয়ে বিভ্রান্তির গল্প: ইংরেজ টুরিস্ট প্রাচ্যের সাপের ভয়ে ভীত। কাজেই হোটেল রুমে প্রবিষ্ট হয়েই তিনি সামনে দাঁড়ানো বেল-বয়কে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে সার্পেন্ট আছে?’ উত্তর এল, ‘হ্যাঁ।’ এবারে প্রশ্ন, হোটেলের কামরায় আসে? উত্তর ‘হ্যাঁ’ আসে। আবারও প্রশ্ন, ‘কীভাবে আসে?’ উত্তর এল, ‘কলবেল টিপলেই আসে।’ এভাবে খানিকক্ষণ প্রশ্নোত্তরের পর বোঝা গেল, তিনি বোঝাচ্ছিলেন ‘সার্পেন্ট’ তথা সাপ; অপরদিকে বেল-বয় বুঝেছিল ‘সার্ভেন্ট’ তথা সেবক।
আর এবারে মালয়েশিয়ায় গিয়ে শুনলাম হোটেল ম্যানেজারের ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের গল্প। হোটেলের লবিতে ইংরেজিতে নোটিশ টাঙানো, ‘দ্য ওয়াটার অব দিস হোটেল ইজ হানড্রেড পারসেন্ট পিওর। ইট হ্যাজ অল বিন পাসড বাই দ্য ম্যানেজার অব দ্য হোটেল।’
বলা বাহুল্য, ইংরেজি ভাষায় যথাযথ জ্ঞানের অভাবে ‘সার্টিফায়েড’-এর পরিবর্তে ‘পাসড’ শব্দটি লেখায় বোঝাচ্ছিল, হোটেলটির পানি ম্যানেজার মহোদয়ের প্রস্তাব বৈ আর কিছুই নয়।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

মীমাংসিত সমুদ্রসীমানা ও গ্যাস অনুসন্ধান by বদরূল ইমাম

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সমুদ্রসীমানা বিরোধ মীমাংসার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার সমুদ্রবক্ষ নিষ্কণ্টকভাবে পেতে সক্ষম হলো।ইতিপূর্বে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানা বিরোধ মীমাংসা হয় অন্য আন্তর্জাতিক আদালত ইটলসের প্রদত্ত রায়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে তার প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নিয়ে যে বিরোধ থেকে যায়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে কখনো বা রাজনৈতিক কলাকৌশলে আবার কখনো বা খোলা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মহড়ায়। বিশেষ করে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে এ তিনটি দেশই বঙ্গোপসাগরকে তাদের মোক্ষম এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় একে অন্যের সীমানায় বিরোধপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থানে এসে পড়ে। বছর কয়েক আগে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানার ভেতরে মিয়ানমারের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ বা তারও বহু আগে ১৯৭৪ সালে ভারতের সমুদ্রসীমানাসংলগ্ন বাংলাদেশ সমুদ্র ব্লকে নিয়োজিত মার্কিন তেল কোম্পানিকে ভারতের বাধা ও কাজ করতে না দেওয়ার ঘটনাগুলো কেবল কিছু উদাহরণ মাত্র।

তিনটি দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুসুলভ হলেও অমীমাংসিত সমুদ্রসীমানা নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থে উপরিউক্ত নেতিবাচক মনোভাব ও তার বহিঃপ্রকাশ যে ঘটে চলত, তা বলাই বাহুল্য। এ বিরোধ দিনে দিনে আরও বড় হয়ে দেখা দিত এই কারণে যে বঙ্গোপসাগরে ইতিমধ্যে উন্মোচিত গ্যাস-তেল সম্পদ সবার মধ্যেই এর প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে। ভারত আেগ থেকেই তার অংশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দেশি ও বিদেশি অনুসন্ধানী কোম্পানির মাধ্যমে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। সম্প্রতি মিয়ানমার তার সমুদ্রবক্ষে প্রথমবারের মতো বিরাট পরিসরে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে চুক্তি স্বাক্ষরে উৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ তার সমুদ্রবক্ষে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানী কোম্পানিগুলোকে অনুসন্ধান চালাতে আগ্রহী করতে পারেনি। বাংলাদেশের সমুদ্রবক্ষে অনুসন্ধানকাজ চালানোর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে বারবার আমন্ত্রণ জানিয়ে কেন আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানী কোম্পানিকে আনতে পারছে না, সেটি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন। এর কয়েকটি কারণের মধ্যে একটি হলো, বাংলাদেশের গ্যাস ব্লকগুলো নিষ্কণ্টক ছিল না। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানার পূর্ব অংশে সব ব্লকের ওপর মিয়ানমারের দাবি ও পশ্চিম দিকে ভারত-সীমান্তবর্তী সব ব্লকে ভারতের দাবি—এসব সমুদ্র ব্লককে আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছে বিতর্কিত ও বিনিয়োগে ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছিল। তাই বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমুদ্রসীমানা বিরোধ মীমাংসা ছিল অত্যাবশ্যকীয়, যতটা না তা ছিল প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের জন্য।
বাংলাদেশ ২০০৮ সালে তার অগভীর ও গভীর সমুদ্র অঞ্চলে ১০টি অগভীর ও ২০টি গভীর সমুদ্র ব্লক ঘোষণা করে এবং সেগুলোয় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে। প্রথমত, এ আহ্বানে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় পুনর্বার ঘোষণা দেয় ও দরপত্র জমা দেওয়ার তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে। কিন্তু তাতেও আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে বাংলাদেশ বিদেশি কোম্পানির জন্য শর্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করে। কিন্তু তাতেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায় না। ইতিমধ্যে ২০১২ সালের মার্চ মাসে জার্মানিতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক কোর্টে (ইটলস) বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি রায় দেওয়া হয়। এ রায়ে বাংলাদেশ তার মিয়ানমার সমুদ্রসীমানাসংলগ্ন প্রায় সব গ্যাস ব্লক হারায় এবং আন্তর্জাতিক আদালত সেগুলোকে মিয়ানমারের সীমানার ভেতর যুক্ত করে। যেসব গ্যাস ব্লক বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে হারায়, সেগুলো নিম্নরূপ: গভীর সমুদ্র ব্লক ১৩, ১৮, ২২, ২৩, ২৬, ২৭ ও ২৮। সম্মিলিতভাবে এই ব্লকগুলোর আয়তন প্রায় ২১ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় পাওয়ার পর বাংলাদেশে সরকারি মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশব্যাপী যে সমুদ্র বিজয় উৎসব করা হয়েছিল, তার আড়ম্বরে উপরিউক্ত ব্লকগুলো হারানোর বিষয়টি ঢাকা পড়ে যায়। তবে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যে এতগুলো ব্লক কীভাবে বাংলাদেশ হারাল।
উপরিউক্ত প্রশ্ন ও বিষয়টির ওপর বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধির উত্তর ছিল স্পষ্ট। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ২০০৮ সালে নতুন করে তার সমুদ্র ব্লকগুলো প্রতিষ্ঠা ও ঘোষণা দেওয়ার আগে কোনো আইনি পরামর্শ বা কারিগরি মতামত গ্রহণ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই আন্তর্জাতিক বাজারে এ ঘোষণা দেয়। এক অর্থে তা ছিল আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা ও একপ্রকার উন্নাসিকতা। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে সাধারণ মনে প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাংলাদেশ ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত সময়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আইন ভঙ্গকারী হিসেবে নিজেকে দৃশ্যমান রাখল কোন যুক্তিতে।
এদিকে ৭ জুলাই ২০১৪ তারিখে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অন্য আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক ভারত–বাংলাদেশ সমুদ্রসীমানা বিরোধ মীমাংসার রায় প্রদান করা হয় ও তার পরদিন তা প্রকাশ করা হয়। এই রায়ে বাংলাদেশ সম্যকভাবে লাভবান হয়। এ ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী গ্যাস ব্লকগুলোর প্রায় সবগুলোই বাংলাদেশের পক্ষে অটুট থাকে, কেবল পশ্চিম অংশে সামান্য অংশ ভারতের দিকে কাটা পড়ে। ভারতের দাবি ছিল বাংলাদেশের ঘোষিত ১৮০ ডিগ্রি (আজুমাথ) লাইনের পরিবর্তে ১৬২ ডিগ্রি লাইনকে দুই দেশের সীমানা হিসেবে চিহ্নিত করা হোক, যাতে লাইনটি অনেকটা পূর্ব দিকে হেলে পড়ে। সে ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশ থেকে অনেক অংশ সমুদ্র পেয়ে যাবে। কিন্তু আদালত তা গ্রহণযোগ্য মনে না করে ১৭৭ ডিগ্রি লাইনকে সীমানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা কিনা বাংলাদেশের দাবি করা ১৮০ ডিগ্রি লাইন থেকে মাত্র ৩ ডিগ্রি ব্যবধানে অবস্থিত। ফলে ভারত সীমানাসংলগ্ন বাংলাদেশের সমুদ্র ব্লকগুলো (অগভীর সমুদ্রে ১, ৫ এবং গভীর সমুদ্রে ৯, ১৪, ১৯) যাদের ওপর ভারতের দাবি বহুদিনের তা বাংলাদেশেরই থেকে যায়। উল্লেখ্য, আদালত সীমানা লাইন টানার ব্যাপারে ভারতের দাবি অনুযায়ী সমদূরত্বের নীতি অনুসরণ না করে বরং ন্যায্যতার নীতি অবলম্বন করে। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমানা বিরোধ রায় ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সীমানা বিরোধ রায় দুটি তুলনা করলে বলা যায় যে এই শেষোক্ত রায়টি বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি লাভ বয়ে নিয়ে আসে।
ভারত বাংলাদেশ সমুদ্রসীমানা বরাবর ব্লকগুলোয় ইতিপূর্বে অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি সান্তোসকে নিয়োগ করে কিন্তু বিরোধের কারণে অনুসন্ধানকাজ এগোতে পারেনি বলে জানা যায়। তদুপরি ভারতের জাতীয় তেল-গ্যাস প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি এই এলাকায় কাজ করে সাফল্য পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এই অংশে ভারতের বিশেষ আকর্ষণ থাকার কারণ হলো এর পশ্চিম দিকে মহানদী বেসিন এলাকায় আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো। আর এ সম্ভাবনা এখন বাংলাদেশের হাতে। একইভাবে মিয়ানমারের আরাকান সমুদ্র উপকূলে যে সিউ-ফিউ-মিয়া গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, তা মিয়ানমারসংলগ্ন বাংলাদেশি ব্লকগুলোর জন্য ইতিবাচক সংকেতই বহন করে।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে যে বিষয়টির সমাপ্তি ঘটেছে, তা হলো অমীমাংসিত বিরোধ। এই রায় বাধ্যতামূলক ও এর বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই। ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—যে যা-ই পেয়ে থাকুক না কেন, প্রতিটি দেশ নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় এই রায়ের বদৌলতে নিষ্কণ্টক। সুখের কথা এই যে ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—সবাই এই রায়গুলোকে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক হতে দেখা যায়, যার কোনো কোনোটি যৌক্তিক আবার কোনো কোনোটি নেহাতই অযৌক্তিক। অধুনা সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়া তালপট্টি দ্বীপ স্থানটি ভারতের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের সমূহ স্বার্থ বিসর্জিত হয়েছে—বিএনপির এই বক্তব্য যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনই আওয়ামী লীগের কোনো কোনো ব্যক্তি তালপট্টির অস্তিত্ব কখনোই ছিল না বা তা চিরতরে বিলুপ্ত বলে যে দাবি করেন, তা নেহাতই অবৈজ্ঞানিক ও অপরিপক্ব রাজনীতি।
একটি কথা অনস্বীকার্য যে ভারত ও মিয়ানমার উভয়ই বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যে অনমনীয় ও অনড় অবস্থান নিয়ে বসে ছিল, তা কখনোই বাংলাদেশে জন্য শুভকর ফল বয়ে আনত না। বরং এই অনমনীয় অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পথ থেকে সরে এসে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ উভয় দেশকেই আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যায়। সামরিক ও কূটনৈতিক চালে অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাধর ভারতকে আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ যে বিজয় অর্জন করেছে, বিশ্বের অনেক দেশেই তা প্রশংসা কুড়াবে।
বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি তার উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য কী সম্পদ লুকিয়ে রেখেছে, তা কেবল একনিষ্ঠভাবে বিজ্ঞান ও কারিগরিনির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করে নিয়ে আসাই এই জনপদের অন্যতম কাজ। বাংলাদেশ অনাদিকাল থেকে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সমুদ্র বাংলাদেশের এক বিশাল সম্ভাবনার জায়গা। বঙ্গোপসাগরের এই বিশাল অঞ্চলকে নতুনভাবে আলিঙ্গন করে বাংলাদেশ তার শক্তি ও সম্মান বৃদ্ধি করবে, এ আশা আমাদের সবার।
ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সড়ক–মহাসড়কে জোড়াতালির মেরামত হচ্ছে -বেহাল সড়কের কথা স্বীকার করলেন মন্ত্রী

সারা দেশের বেহাল সড়ক-মহাসড়কের কথা অবশেষে স্বীকার করল সরকার। ঈদে ঘরমুখী মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এসব সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে ইট-বালু-সুরকি দিয়ে খানাখন্দ ভরাট করায় এই মেরামত হবে জোড়াতালির।

এই মেরামতের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঈদের ছুটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, ঈদ উপলক্ষে যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ঈদের আগে তিন দিন এবং পরের দুই দিন পচনশীল ও জরুরি রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ রাখা, মহাসড়কে চলতে না দেওয়া, যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এমন উন্নয়নমূলক কাজ সাময়িক বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অবশ্য ঈদ উপলক্ষে এর আগেও মহাসড়কে ট্রাক, নছিমন-করিমন চলাচল বন্ধ ছিল, কর্মকর্তাদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছিল।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে বেহাল সড়ক-মহাসড়কের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নিয়ে সওজের কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রাস্তার সঠিক চিত্র আমাকে দেওয়া হয় না। মহাসড়কের সবকিছু ঠিক, এটা সত্য না। ইট-সুরকি-খোয়ার মেরামত বৃষ্টি হলে উঠে যাচ্ছে। পথে বাস আটকে যাচ্ছে। ভিতর থেকে ফোন আসে আমার কাছে। শিশুর কান্না, নারীর কান্না আমকে শুনতে হয়।’
বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন জেলার প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরাও সড়কের দুরবস্থা জানিয়ে ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাতায়াত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। সভায় ২০ জুলাইয়ের মধ্যে সব সড়ক চলাচলের উপযোগী করার সিদ্ধান্ত হয়।
সারা দেশের বেহাল সড়ক নিয়ে এই বৈঠক হয় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। এতে চারজন মন্ত্রী, একাধিক সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রথম আলোতে গত মঙ্গলবার বেহাল সড়ক-মহাসড়ক নিয়ে একাধিক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরদিন সড়ক বিভাগ থেকে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়ে বলা হয়, বৃষ্টির কারণে সড়ক বেহাল হলেও তা ঠিক করে ফেলা হয়েছে। অথচ বৃহস্পতিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খানাখন্দ ঠিক না হলে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় পরিবহন মালিক সমিতি।
সওজের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) করা সর্বশেষ সমীক্ষায় এসেছে, সারা দেশের ৪১ শতাংশ সড়ক-মহাসড়কেরই অবস্থা খারাপ। এর মধ্যে ১২ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক খুবই বেহাল, খানাখন্দে ভরা। বাকি ৫৯ শতাংশের মধ্যে ২০ শতাংশ ভালো। ৩৯ শতাংশ মোটামুটি কাজ চালানোর মতো ভালো।
প্রথম আলোর বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা জাতীয় মহাসড়কগুলোতে সরেজমিনে খানাখন্দ দেখতে পান। ঢাকার সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী অন্তত ছয়টি মহাসড়কের প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ একেবারেই বেহাল ও ভগ্নদশা।
গতকাল আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বৈঠকে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে ছয় ঘণ্টার যাত্রা ১৬ ঘণ্টা লাগছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। এই সড়ক যে কত ভয়াবহ, কেউ না দেখলে বুঝতে পারবে না। তিন-চার ঘণ্টার যাত্রায় আট-নয় ঘণ্টা লাগছে। তিনি মন্ত্রী-কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা কত ঘণ্টায় গন্তব্যে যেতে পারব, আপনারা বলে দেন। আর কত জ্বালানি পুড়ব, গাড়ি নষ্ট করব।’
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর দিয়ে ২২টি রুটের যান চলে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনাতে ব্যাপক সমস্যা। ঈদে তা প্রকট হবে। তখন তা দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক কাঁচা রাস্তার মতো হয়ে গেছে। একদিকে জোড়াতালির মেরামত হচ্ছে, অন্যদিকে বৃষ্টি হলে তা উঠে যাচ্ছে। ইট-বালু-খোয়ার বাইরে অন্য কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, তা ভেবে দেখতে হবে।
এসব বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিছু কিছু সড়ক শুধু খারাপ নয়, খুবই বেহাল। তিনি জানান, আজ শনিবার পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পরিদর্শনে যাবেন। সড়ক বিভাগের সচিব একই ধরনের দল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং একজন অতিরিক্ত সচিব ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক পরিদর্শনে যাবেন। এতে সরকারের অন্য বিভাগের কর্মকর্তাদেরও সহায়তা চান তিনি।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন করার কাজের একাংশের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গাজীপুরের মাওনার বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেনের বক্তব্য জানতে চান যোগাযোগমন্ত্রী। জবাবে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, রাস্তা মেরামত হচ্ছে। নিয়মিত মেরামত না হলে চলাচল বন্ধ হয়ে যেত।
এ সময় মাওনা উড়ালসড়কের কাজ ঈদে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, চার লেন প্রকল্পে নতুন রাস্তা ভালোভাবেই হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যমান সড়ক কেউ মেরামত করতে চায় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো মেরামত করেনি। বিকল্প ব্যবস্থায় সরকার সেই কাজ করছে।
হাইওয়ে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আছাদুজ্জামান মিয়া ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ, ওভারটেকিং প্রতিরোধ ও নছিমন-করিমন-ভটভটি বন্ধে নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা জানান। সড়কের দুরবস্থার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বালু-ইট-খোয়ার মেরামত বৃষ্টি হলেই ধুয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে রেলক্রসিংয়ে গর্তে গাড়ি আটকে বিকল হয়ে যাচ্ছে। রেল ও সওজ কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না।টাঙ্গাইলে একটি বেইলি সেতু অকেজো হয়ে আছে। মাওনাতেও সড়কে নির্মাণকাজ চলায় যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী সওজের প্রধান প্রকৌশলী মফিজুল ইসলামের জবাব চান। মফিজুল ইসলাম বলেন, বেইলি সেতু সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। সড়ক মেরামতে কাজ চলছে। তখন তাঁর উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আপনি জানবেন কীভাবে? আপনি তো অফিস থেকে বের হন না। আমি নিজে দেখেছি, বেইলি ব্রিজের মাঝখানের অংশ নেই। এটা এক সপ্তাহ আগে মেরামতের কথা ছিল। এটা কোথায় গেছে?’
এরপর রেলওয়ের মহাপরিচালক তাফাজ্জল হোসেন পদুয়ার বাজারের রেলক্রসিংয়ের গর্ত মেরামতের আশ্বাস দেন। তিনি জানান, রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, আগের দিন সড়ক মেরামতের পর বৃষ্টিতে পরের দিনই ভেসে যায়। তিনি রাস্তা মেরামতের বাড়তি মালামাল সব সময় মজুত রাখার পরামর্শ দেন।
ঢাকার ভেতর ও প্রবেশমুখেও সমস্যা: বৈঠকের শুরুতেই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে বিভিন্ন সড়কের বেহাল দশা ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ঢাকার প্রবেশমুখ ও বের হওয়ার পথগুলো মসৃণ না করতে পারলে ভোগান্তির সীমা থাকবে না।
তখন ওবায়দুল কাদের বলেন, অনেক রাস্তার অবস্থা বেহাল।সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে না। সত্যকে চাপা দিলে মানুষ কষ্ট পাবে। তিনি বলেন, টুকটাক সমস্যা না। রাজধানীর রাস্তাগুলো ভোগান্তির আখড়া হয়ে গেছে।
সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান বলেন, পত্রিকায় দেখা গেছে, এক নারী রিকশা থেকে ছিটকে গর্তে পড়ে গেছেন। এর দায় নেবে কে, বলেন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা ২০ জুলাইয়ের মধ্যে সড়ক ঠিক করার কথা বলেন।
পরে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেন, ২০ তারিখের পর বৃষ্টি হলে সড়ক ভাঙবে। তখন কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে?
এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। শাজাহান খানের পরিবারের বাস কোম্পানি রয়েছে। তবে তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। মশিউর রহমান বাস মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি। নাগরিক সমাজের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামছুল হক, চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রমুখ।
বৈঠকে পরিবহন খাতের শ্রমিক-মালিক প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেওয়ার সময় যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘আমার দুই পাশে আপনাদের দুই মন্ত্রী আছেন।’
একপর্যায়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, পত্রপত্রিকায় বাসের বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ সড়কের দুরবস্থার জন্য পথে পথে বাড়তি জ্বালানি পুড়তে হয়। এটা কেউ দেখে না।
এরপর নৌমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা স্বাভাবিক সময়ে সরকার-নির্ধারিত ভাড়াটা নিতে পারেন না, কম নেন। ঈদের সময় পুরো ভাড়াটাই নেন। এটাকেই অনেকে না বুঝে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ তোলে। লঞ্চেও এই ঘটনা ঘটে।’ মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের কপাল খারাপ, কী করবেন? একটা বাসে বেশি ভাড়া নিলে সবার নাম হয়।’

সরকার আর কী কী করবে না? by সোহরাব হাসান

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাফ কথার মানুষ। তিনি সব সময় সোজাসাপটা কথা বলেন। এ জন্য দলের ভেতরেও অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন; বিশেষ করে যারা গোঁজামিলের রাজনীতি চালিয়ে যেতে অভ্যস্ত। ২০১৩ সালের ৫ মের রাতে যখন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির জঙ্গি কর্মীরা রাজধানীজুড়ে তাণ্ডব চালান, তখন সৈয়দ আশরাফ সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর এই শক্ত ভাষা দলের শীর্ষ নেতৃত্বও নাকি পছন্দ করেননি।

সেই আশরাফুল ইসলাম সাহেব গত বুধবার জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন থেকে বেরিয়ে এসে যখন সাংবাদিকদের জানিয়ে দিলেন, সরকার জেলা পরিষদ নির্বাচন করার কথা ভাবছে না, তখন সেটি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ার কারণ দেখি না। তিনি এও বলেছেন যে স্থানীয় সরকার ভালো, কিন্তু বেশি সরকার থাকা ভালো নয়। এ কারণেই কি স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় চারটি স্তরকে তিনটিতে নামিয়ে আনার কথা ভাবছে সরকার?
আসলে ভাবনার কারণ অন্য। ৫ জানুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচন ও তীব্র প্রতিযোগিতামূলক উপজেলা নির্বাচনের পর সম্ভবত সব পর্যায়েই নির্বাচনে যেতে ভয় পাচ্ছে।
সরকার এখন জেলা পরিষদ বাতিলের চিন্তা করলেও আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার উপশিরোনামে বলেছিল, ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণ করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা হবে। জেলা পরিষদকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও সব প্রকার উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ (নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইশতেহার-২০০৮, দিনবদলের সনদ)।
বিগত পাঁচ বছরে সরকার জেলা পরিষদের নির্বাচন না করে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি বাদে ৬১টি জেলা পরিষদে দলীয় লোককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যাঁরা এখনো দায়িত্বে আছেন। সে সময় জেলা পরিষদে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন করার কথাও বলা হয়েছিল। এখন সরকার বলছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনই করবে না। নির্বাচিত সরকার ও নির্বাচনমুখী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে এত ভয় পাচ্ছে কেন?
একই ঘটনা ঘটেছে সোয়া কোটি লোকের বাসস্থান ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও। সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০০২ সালে। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের কয়েক মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মেয়র পদে প্রার্থীই দেয়নি। ফলে বিএনপির সাদেক হোসেন খোকা অনেকটা ওয়াক ওভার পেয়ে যান (যদিও কমিশনার পদগুলোতে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন)।
নির্বাচিত হওয়ার পর সাদেক হোসেন খোকা বিএনপি শাসনামলের চার বছর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ও আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন বছর মেয়র পদে বহাল ছিলেন। খোকার মেয়াদ ২০০৭ সালে শেষ হলেও অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঢাকা সিটির নির্বাচন সামাল দিতে পারবে না, এই ভয়ে করেনি। আর নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন করেনি তাঁকে মোকাবিলা করার মতো নেতা আওয়ামী লীগে খুঁজে পায়নি বলে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মূল সমস্যাই হলো বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হলে কেউ নির্বাচনই দিতে চান না। চাইলেও নির্বাচনের আগেই ফল নিজের পক্ষে আনার নানা কারসাজি চালাতে থাকে।
এরপর একদিন সুবহে সাদিকে সরকারের মনে হলো, নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করে ফেলা দরকার। আর ঐশ্বরিক আদেশে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে দুই ভাগ হয়ে গেল। যাদের নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন, সেই ঢাকার বাসিন্দাদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনই তারা উপলব্ধি করল না। সে সময় সরকারের হিসাব ছিল, বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সহজ হবে। তার পরও আওয়ামী লীগ দুজন জুতসই প্রার্থী খুঁজে না পেয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াটিই থামিয়ে দিল আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার পর পৌনে দুই বছর পার হয়ে গেছে। ঢাকাবাসী এখন ধরেই নিয়েছে যে আওয়ামী লীগ যত দিন ক্ষমতায় আছে, তত দিন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হচ্ছে না। অর্থাৎ, সরকার নির্বাচনটি করবে না। আলোচিত পাঁচ সিটি করপোরেশন (রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, গাজীপুর ও খুলনা) নির্বাচন দিয়ে যে ভুল করেছে, তার পুনরাবৃত্তি করবে না। আগামী এক বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। সরকার তখন কী করবে? জুতসই প্রার্থী না পেলে কি সেই নির্বাচনও নানা ছলছুতায় ঠেকিয়ে রাখবে সরকার?
আইনি একটি বিচ্যুতির কারণেই সরকার স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারছে। মেয়াদ শেষে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এখতিয়ার এককভাবে নির্বাচন কমিশনের হলেও স্থানীয় সরকার সংস্থার ক্ষেত্রে তারা সেটি করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ জরুরি। তদুপরি আছে সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা। উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এখতিয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকলেও সরকার সেটি কেড়ে নিয়েছে। এখন সরকার চাইলে নির্বাচন হবে, না চাইলে হবে না।
সরকার আপাতত আরও কী কী করছে না, কী কী করবে না, তার একটি সম্ভাব্য তালিকা দেওয়া যেতে পারে। ১. কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা, ২. দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর করা, ৩. প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করা, ৪. বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করা, ৫. রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, ৬. প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস জনসমক্ষে প্রকাশ করা, ৭. রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা, ৮. চাঁদাবাজি বন্ধ করা, ৯. পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা এবং ১০. শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস ও দলীয়করণমুক্ত করা।
আমি যে ১০টি বিষয় এখানে তুলে ধরছি, প্রথমটি বাদে অন্য সব কটি আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহার থেকে নেওয়া।অর্থাৎ এসব করতে তারা জনগণের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল আছে কি না, সেটি দেশবাসী ভালো জানে।
আর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ বলেই মনে করি। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতন পর্যন্ত মোটামুটি সব সরকারের আমলেই দেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হতো। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এসেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেয়। বিএনপির পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল। তারাও বিএনপির পদাঙ্ক অনুসরণ করল। আবার আওয়ামী লীগের পর বিএনপি এসে একই রাস্তায় হাঁটল। আবার বিএনপির পর আওয়ামী লীগ। সেই একই পথ ও একই নীতি। কোনোভাবেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা যাবে না। দেশে ছাত্ররাজনীতি আছে, অথচ ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া হবে না। এই অদ্ভুত ও উদ্ভট ব্যবস্থাই চলে আসছে দুই যুগ ধরে। কে বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কোনো মিল নেই?
সরকার ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন করছে না। অথচ সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই ছাত্রজীবনে বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি বা জিএস ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইডেন কলেজের (ইন্টারমিডিয়েট শাখা) ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ডাকসুর জিএস ছিলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ডাকসুর ভিপি ছিলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ডাকসুর ভিপি ছিলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান ইউকসুর ভিপি ছিলেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যুক্তরাজ্যে অধ্যয়নকালে এশীয় ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন করেছেন। অথচ তাঁরাই নতুন ছাত্র নেতৃত্ব নির্বাচন করতে দিচ্ছেন না।
সরকারের এই না করার তালিকায় আরও যোগ হতে পারে, পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জাতীয় নির্বাচন না করা। অথচ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে নেতা-নেত্রীরা বলেছিলেন, সংবিধান রক্ষার জন্য এই নির্বাচনটি করা জরুরি। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হতে পারে। এ ব্যাপারে একটি বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আপনাদের বিরোধিতা ও বর্জন সত্ত্বেও ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারিও কিন্তু একটি নির্বাচনের সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। সেটি কী কারণে হয়নি, আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি কীভাবে হয়েছে, তা নিশ্চয়ই আপনাদের জানা। ৫ জানুয়ারির সঙ্গে ২২ জানুয়ারির ফারাক খুব বেশি নয়। ২২ জানুয়ারির নির্বাচনটি হয়ে গেলেও যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতো না, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি হওয়ার পরও দেশে গণতন্ত্র কায়েম হয়ে গেছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। বিএনপির ভুলের কাফফারা তারা দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে। আপনাদের ভুলের খতিয়ান বাড়ছে বৈ কমছে না।
সরকারের ডাকসাইটে মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতারা ইতিমধ্যে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে তাঁরা কোনো সংলাপে যাবেন না। পাঁচ বছরের আগে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বিএনপি নেত্রী গণতন্ত্রের ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেছেন। এখন আর গণতন্ত্রের ক্লাবে তাঁর ঢোকার সুযোগ নেই। সেই সুযোগ না থাকুক, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দিয়ে সরকার আরেকবার প্রমাণ নিতে পারে, কে কে গণতন্ত্রের ক্লাবে আছেন, আর কে নেই।
মাননীয় মন্ত্রীকে বলব, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা পাল্টে গেলেও গণতন্ত্রের সর্বজনীন যে সংজ্ঞা আছে, অর্থাৎ জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন, সেটি কেউ বদলাতে পারে না।
গণতন্ত্রের ক্লাব থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিএনপির ভয়ে মহাজোট ওরফে ১৪–দলীয় সরকার ঢাকা সিটির নির্বাচন সাড়ে পাঁচ বছর ঠেকিয়ে রেখেছে, আর কত দিন তারা ঠেকিয়ে রাখবে, সরকারের মুখপাত্র হিসেবে তথ্যমন্ত্রী জানালে কৃতার্থ হব।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

সুইস ব্যাংক তো নস্যি ২ লাখ কোটি টাকার কি হবে by আলী ইদ্‌রিস

বাংলাদেশের অর্থ পাচারকারীরা এবার জাতে উঠেছে অথবা বলা যায় কালো টাকা নিয়ে অভিজাত শ্রেণীর কাতারে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড ভিয়েতনামের পর পৃথিবীর বড় বড় ধনীদের সঙ্গে কালো টাকা সুইস ব্যাংকের ভল্টে জমা পড়েছে। মিডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে ২০১২ সাল পর্যন্ত সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের আমানত ১,৯০৮ কোটি টাকা ছিল। ২০১৩ সালে সে অর্থ ৩,১৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ অর্থ পাচারকৃত মোট অর্থের ১.৫ শতাংশ। স্বাধীনতার পর গত চার দশকে ২ লাখ কোটিরও অধিক অর্থ পাচার হয়েছে। এসব অর্থ পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত এবং বাকিটা বিদেশে বাড়ি, গাড়ি, শিল্প-কারখানা ইত্যাদিতে বিনিয়োগ হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশী আমানতকারীরা বড় ব্যাংক বেছে নেয়নি, ছোট ছোট ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রেখেছে। বড় দুই ব্যাংক ইউবিএস ও ক্রেডিট সুইসে মাত্র ১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার আমানত আছে। ইউএনডিপির এক প্রতিবেদন মতে, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হওয়া দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে আইভরি কোস্ট। অর্থ পাচার একটি অবৈধ বা অনৈতিক কাজ হলেও কোন নির্দিষ্ট দেশে পাচারকারী নেই এমন গ্যারান্টি দেয়া অসম্ভব। বিনা কারণে, উৎসুক্য বশত বা হবি হিসাবেও কেউ কেউ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখে। কিন্তু বদনাম সুইস ব্যাংকের হলেও অন্যান্য দেশে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া- এসব দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকল্পে বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্ক্রিমের আওতায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আহ্বান করা হয়। ওই সব দেশে প্রবাসী ও অভিবাসী ছাড়াও অসংখ্য বাংলাদেশীর বাড়ি, গাড়ি, শেয়ার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়ে গেছে। কেউ বাড়ি কিনেছেন নিজে বা ছেলে মেয়ে থাকার জন্য, কেউ কিনেছেন ভাড়া দিয়ে আয় করার জন্য। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়তো কম লোকেরই আছে। বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে তারা এই লাখ লাখ ডলার কিভাবে বিদেশে বিনিয়োগ করলেন বা ব্যাংকে জমা করলেন সেটা অনুসন্ধানের বিষয়। ব্যাংকের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী বিদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ সীমিত, তাই হুন্ডি বা অন্য চ্যানেলে এসব অর্থ পাচার হয়েছে যা মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ। বড় বড় দেশে অর্থ পাচার বিগত ৪০ বছর যাবৎ চলছে। পাশের দেশ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম স্কিমে হাজার হাজার বাংলাদেশী লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করছেন অথচ মালয়েশিয়া মাত্র সেদিন এই ‘সেকেন্ড হোম’ সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং প্রকাশ্যে এ দেশের পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন প্রচার করে আসছে। এরই মধ্যে লাখ লাখ ডলার পাচার হয়ে গেছে। একইভাবে স্বাধীনতার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশে অভিবাসন ও ব্যবসা স্কিমে হাজার হাজার বাংলাদেশী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সুবিধাগুলো নিয়েছেন। ওই টাকা আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে গেল না পাচার হলো, মানি লন্ডারিং আইন এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, সবই খতিয়ে দেখার বিষয়। ইউএনডিপির প্রতিবেদন অনুযায়ী গত চার দশকে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, অংকটি ক্ষুদ্র বলে মনে হয়। পাচারকৃত অর্থ আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত। নৈতিকতার ব্যাপারটা বাদ দিলে অর্থ পাচারের কারণ হলো: দুর্নীতি, আত্মসাৎ, ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক অর্থ বিদেশে রেখে দেয়ার প্রবণতা, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্রের অভাব, সুশাসনের অভাব বা আইন শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ইত্যাদি। উপরোক্ত যে কোন কারণেই হোক, পাচারকারীদের এ অর্থ এক সময়ে দেশে ফেরত আনা উচিত। কিন্তু এখানেই সমস্যা। পাচারকৃত অর্থ খুব কম ক্ষেত্রেই দেশে ফেরত আসে। কারণ পাচার করতে যেমন ঝুঁকি নিতে হয়, ফেরত আনাও তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পাচারকারীরা দু’বার ঝুঁকি নিতে চায় না। তাছাড়া দেশপ্রেমের অভাব বা দেশের আয়কর আইন, মানি লন্ডারিং আইনের জরিমানা বা শাস্তির ভয়ে কেউ ওই টাকা ফেরত আনতে চায় না। অন্যদিকে এ টাকা উদ্ধার করাও সহজ নয়। বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক জোট ‘এগমন্ট’ গ্রুপের সদস্য হওয়ায় সুইস ব্যাংক এবং অন্যান্য দেশ থেকে তথ্য পেতে সহায়ক হবে। তথাপি পুরোপুরি তথ্য কথনও পাওয়া যাবে না। তবে আইনি যুদ্ধ চালিয়ে কৃতকার্য হওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। তাই পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে ওই টাকা যাতে সহজে দেশে ফেরত আসতে পারে সে উদ্দেশ্যে অন্যান্য দেশের মতো কিছু স্কিম বা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া উচিত। কালো টাকা সাদা করার মতো পাচারকৃত টাকা জরিমানা দিয়ে নির্দিষ্ট শিল্পে বা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। পাচার যাতে না হয় তার প্রতিকার করা যেমন সরকারের দয়িত্ব, তেমনি কালো টাকার মতো পাচারকৃত টাকারও সৎকার করা সরকারের কর্তব্য। আমাদের হৃদয়ে নৈতিক উন্নতি ও দেশপ্রেম জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত অর্থ পাচার হবেই, কিন্তু কৌশলে সে অর্থ ফিরিয়ে আনাই কৃতিত্ব। তাই শুধু সুইস ব্যাংকের ১.৫% পাচারকৃত অর্থের জন্য সাময়িকভাবে হৈ চৈ না করে সামষ্টিকভাবে বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে পুরো পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা উচিত।