Friday, February 14, 2025

সৌদি আরব যেভাবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে by ডেভিড হার্স্ট

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সৌদি আরবের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন বলে দাবি করেছিলেন। বহু বছর ধরে গড়া সম্পর্ক মাত্র কয়েক দিনে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। সৌদি রাজতন্ত্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠেনি, বরং ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) একসময় রাজপরিবারের শক্তিশালী সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে ছিলেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে ক্ষমতার পথ সুগম করতে হলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেতে হবে। ২০১৭ সালে তিনি গোপনে ইসরায়েল সফর করে প্রভাবশালী ইহুদি গোষ্ঠীর মন জয়ের চেষ্টা চালান। ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রকাশ্য অবজ্ঞা দেখিয়ে তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে আকর্ষণ করেন।

এর এক বছর পর, তিনি ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, ফিলিস্তিনিদের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করা, নতুবা ‘চুপ করে থাকা’। হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলা চালানোর আগপর্যন্ত এমবিএস ক্রমেই আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করার কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। আব্রাহাম চুক্তি হচ্ছে ইসরায়েল এবং বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য চুক্তি। এমনকি হামলার পরও সৌদি আরব তাদের স্বাভাবিক নীতিতেই অটল ছিল। টানা ১৫ মাস ধরে সৌদি আরবে কোনো ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মক্কায় হাজিদেরও ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো বা গাজার জন্য প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ ছিল।

সৌদি যুবরাজ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে অপমানও সহ্য করেছেন। প্রেসিডেন্ট হয়ে ট্রাম্প প্রথমে কোন দেশে সফর করবেন, এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, প্রথমে সৌদি আরব ভ্রমণ করলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করতে হবে। এমবিএস তা মেনে ট্রাম্পকে ফোনকল করে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ট্রাম্প দাবি আরও বাড়িয়ে চুক্তির পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নিয়ে যান।

ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দিয়ে গাজাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। আর জানান যে গাজা পুনর্গঠনের খরচ বহন করবে উপসাগরীয় দেশগুলো, অর্থাৎ মূলত সৌদি আরব। এই দাবি সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে অপমানজনক ছিল। এ ছাড়া ট্রাম্প দম্ভের সঙ্গে বলেন যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবি ছাড়াই সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। কিন্তু এই বক্তব্যের ৪৫ মিনিটের মধ্যেই সৌদি আরব এর জবাব দেয়। এতে স্পষ্ট জানানো হয়, সৌদি আরব নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে, যাতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ছাড়া সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে না।

এর জবাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চ্যানেল ফোরটিঙ্কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যেন বিদ্রূপ করেই বলেন, সৌদিরা চাইলে সৌদি আরবেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে, ওদের কাছে অনেক জমি আছে! সপ্তাহের দ্বিতীয় বিবৃতিতে, রিয়াদ আরও কঠোর ভাষায় জানায়, ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজ ভূমির মালিক। তারা কোনো অনুপ্রবেশকারী বা অভিবাসী নয় যে ইসরায়েলি দখলদারেরা ইচ্ছেমতো তাদের উচ্ছেদ করবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান ও মরক্কোকে তারা চাপের মুখে ফেলে আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়েছিল। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু একদম স্পষ্ট করেই বলেছেন, এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে দেওয়া। এত দিন তিনি সৌদি যুবরাজ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করছিলেন যে ইসরায়েল তাদের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করবে। কিন্তু এখন তিনি বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল নিজের শর্তেই ‘শান্তি’ চাপিয়ে দেবে আর আরব বিশ্ব ইসরায়েলের সামনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি পররাষ্ট্রনীতির মোড় ঘুরে গেছে। সে এখন পাঁচ দশক আগের রাজা ফয়সালের আরব জাতীয়তাবাদী অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে। ১৫ মাসের নীরবতার পর এখন ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব দেশগুলোর একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গত রোববার গভীর রাতে মিসর ঘোষণা করেছে যে ২৭ ফেব্রুয়ারি তারা এক জরুরি আরব সম্মেলনের আয়োজন করবে। সম্মেলনের উদ্দেশ্য হবে ট্রাম্পের ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে উচ্ছেদ করে পুনর্বাসনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা।

এই নাটকীয় পরিবর্তনের কারণ কী? কারণ হলো, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতিতে গণহারে ফিলিস্তিনি জনগণকে স্থানান্তরের বিষয়টি যুক্ত হওয়া। গাজার প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোর করে বিতাড়িত করলে তা প্রতিটি আরব দেশকে প্রভাবিত করবে। বিশেষত সৌদি আরবের ওপর এর গভীর প্রভাব পড়বে। ইসরায়েলের আগ্রাসীভাবে এই ভূখণ্ড দখল সমগ্র অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে। আর তা হয়তো এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। এর ভয়াবহ পরিণতি সৌদি আরবের জন্যও বিপজ্জনক হবে।

২০১৭ সালে উপসাগরীয় দেশগুলো যে কারণে ফিলিস্তিন সংকটে নীরবতা বজায় রাখতে বাধ্য হয়েছিল, সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। অন্যদিকে, সিরিয়ায় অবস্থান হারানোর পর এবং হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ইরানের প্রতিরোধ জোট দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে রাজি নয় সৌদি আরব। নতুন ইরানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক এখন উষ্ণ। সৌদি যুবরাজ এমবিএস চান এই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে।

এমবিএস নিজেও এখন দেশের ভেতর শক্ত ও দৃঢ় পরিস্থিতিতে আছেন। তাঁর ক্ষমতা এখন দৃঢ়। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আধুনিক ও সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে জনপ্রিয়। এমবিএসের ক্ষমতার শুরুর দিকে সৌদি আরব মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এখন আর তেমনটা নেই। সব মিলিয়ে ট্রাম্প ও ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখার ঝুঁকি সৌদি আরব নিতে পারে। তাহলে তারা নিজেদের নৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আবারও আরব ও মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রে নিয়ে আসার সুযোগ পাবে।

-ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আই-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক

-মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া ইংরেজির সংক্ষেপিত অনুবাদ জাভেদ হুসেন

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

নিভৃতপল্লির নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে বিদেশে by রহিদুল মিয়া

আরজিনা খাতুন, লিপি বেগম, সুলতানা আক্তার, আয়েশা বেগমকে এখন আর না খেয়ে থাকতে হয় না। শুনতে হয় না স্বামীর গালমন্দও। কারণ, এখন সংসারে অর্থ জোগান দিচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের মতো রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের হাজারো নারী ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডে জুতা তৈরি করে দারিদ্র্যকে জয় করেছে। সংসারে এসেছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। তাঁদের হাতে তৈরি জুতা ইউরোপ–আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের শুরুটা হয় কারও হাত ধরেই। তারাগঞ্জের সেই শুরুটা করেছিলেন দুই সহোদর মো. হাসানুজ্জামান ও মো. সেলিম। নীলফামারী সদরের বাবুপাড়া গ্রামে তাঁদের বাড়ি। তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে ঘনিরামপুর গ্রামে সাড়ে ৯ একর জমির ওপর ওই জুতা কারখানা গড়ে তোলেন তাঁরা।

হাসানুজ্জামান বলেন, আশির দশকে তাঁরা দুই ভাই বিদেশে পাড়ি জমান। আমেরিকায় শুরু করেন আবাসন ব্যবসা। সেখানে ব্যবসায় সফলতা আসে। এরপর দেশরে মাটিতে বিনিয়োগের চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই ২০০৯ সালে নীলফামারীতে ও ২০১২ সালে মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষকদের জন্য বীজ ও আলু সংরক্ষণরে জন্য হিমাগার স্থাপন করেন।

ব্লিং লেদার নামের জুতা কারখানা তারাগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালে। এখানকার জুতা এখন ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষের। ২০২৩ সালে বড় ভাই মো. সেলিম মারা যান। হাসানুজ্জামান বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়্যারম্যান।

আজ শুক্রবার ওই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ইউনিটের উদ্বোধন করা হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম ফিতা কেটে এই ইউনিটের উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক খাজা রেহান বখ্ত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৩০০ শ্রমিকের থাকার জন্য আবাসিক ভবন রয়েছে এ কারখানায়। তাইওয়ান থেকে আনা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কারখানার ভেতরে জুতা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের ১০ ভাগ পুরুষ ও ৯০ ভাগ নারী। ভবনটির চারদিকে শোভাবর্ধনের জন্য লাগানো হয়েছে ফুলের গাছ।

কারখানার অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেও তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো আয়ের পথ ছিল না। বছরের অর্ধেক সময় কাজের খোঁজে গ্রামের বাইরে থাকতে হতো পুরুষদের। কাজের অভাবে উঠতি বয়সের তরুণ ও নারীরা অলস সময় কাটাত। কারখানা গড়ে ওঠায় গ্রামবাসীর কর্মহীনতা ঘুচেছে। উপার্জন বেড়েছে, বেড়েছে জীবনযাত্রার মান।

ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মার্জিনা খাতুন (৩১) জানান, ভিটামাটি ছাড়া কিছু ছিল না। এখন টিনের ঘর ও নিজের ৪ শতাংশ জমি আছে। গাছগাছালি ঘেরা বাড়িতে হাস-মুরগি, ছাগল ও গাভি পালন করছেন। জুতা তৈরির কাজ করে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। সন্তানেরা স্কুলে যাচ্ছে সংসারে তাঁর (মর্জিনা) মতামতও এখন গুরুত্ব পায়।

কথা হয়, কারখানায় কর্মরত হাজীরহাট গ্রামের নারী শ্রমিক সীতা রানীর সঙ্গে (২৫)। তিনি বলেন, ‘স্বামী ছেড়ে গেছে তিন বছর আগে। খুব সমস্যায় ছিলাম। পরে ব্লিং লেদারে এসে প্রশিক্ষণ নেই। তারপর এখানে চাকরিও করছি। এখন আর কোনো চিন্তা নেই। মাস গেলেই টাকা পাচ্ছি ভালো আছি।’

প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘দেশে নারীদের র্কমসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বড় ভাই সেলিমের উদ্যোগে নিভৃতপল্লীতে কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। কারখানাটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পাচ্ছি। গ্রামীণ নারীদের ছোঁয়ায় ৩০০ জোড়া থেকে এখন ১০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন হচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষে দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের ইচ্ছে আছে। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’

জুতা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার রংপুরের তারাগঞ্জের ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডে
জুতা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার রংপুরের তারাগঞ্জের ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডে। প্রথম আলো

‘আল্লায় আমার কতা হোনছেন, আমি আমার জাদুর লাশ খুঁইজ্জা পাইছি’ by নেয়ামতউল্যাহ

গত বছরের ৬ আগস্ট ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখে বাবা-মা জানতে পারেন, তাঁদের সন্তান হাসান (১৮) গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। খোঁজ না পেয়ে রাজধানী ঢাকায় ছুটে যান। সেখানে সব হাসপাতাল খুঁজেও ছেলের সন্তান পাননি তাঁরা। পরে নানাভাবে প্রচার চালিয়ে জানুয়ারি মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এক তরুণের লাশের খবর পান। প্রাথমিকভাবে সেটিকে হাসানের বলে দাবি করেন তাঁরা। অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএনএ প্রতিবেদন পেয়ে নিশ্চিত হন লাশটি নিজেদের ছেলের।

আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে হাসানের মরদেহের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল শনিবার সকাল ১০টায় ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের সাহমাদার গ্রামে দ্বিতীয় জানাজার পর হাসানের দাফন করার কথা আছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসানের বাবা মো. মনির হোসেন (৪৮) ও ভগ্নিপতি মো. ইসমাঈল (২৯) জানান, আজ (শুক্রবার) থেকে এক মাস আগে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে হাসানের লাশ শনাক্ত করেন। তারপর সিআইডি ডিএনএ পরীক্ষা শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

মনির হোসেন আরও জানান, দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীর সংসারে হাসানের উপার্জনের অনেকটা নির্ভর করতে হতো। নদীভাঙনে সব হারিয়ে কাচিয়া ইউনিয়ন পরিষদ–সংলগ্ন অন্যের বাড়িতে ঘর তুলে বসবাস করছেন। দিনমজুরের কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালান। সংসারে অভাবের কারণে হাসান আট বছর আগে রাজধানীর গুলিস্তানে কাপ্তানবাজার এলাকায় একটি ইলেকট্রনিকসের দোকানে কাজ নেন। সেখানে কাজ করে নিজের খরচ চালিয়ে মাসে মাসে কিছু টাকা সংসারের জন্য পাঠাতেন। আর থাকতেন যাত্রাবাড়ীর বালুর মাঠের কাছে ধলপুর এলাকায় ভগ্নিপতি ইসমাইলের বাসায়।

এ পর্যায়ে কান্নারত অবস্থায় মনির জানান, হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়েছে ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে। বিকেলে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। ঢাকায় আত্মীয়স্বজনও হাসানের খবর পাননি। ইসমাইলের কাছে জানতে পারেন, যাত্রাবাড়ী এলাকায় গত ৫ আগস্ট দুপুরের পর কয়েক দফায় গোলাগুলি হয়েছে। হাসান তখন গোলাগুলির মধ্যে পড়েন। ওই সময় তাঁর কাছে দুটি মুঠোফোন ছিল। সেগুলো নিয়ে যায় কেউ। পরদিন গত ৬ আগস্ট ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখে হাসানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন।

হাসানের খোঁজ চেয়ে ঢাকা ও ভোলার বিভিন্ন স্থানে তাঁর নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তির পোস্টার সেঁটে দেন। দুই শহরেই মাইকিং, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাঁর পরিবার সরকারের কাছে দাবি করেন, জীবিত বা মৃত হোক, তাঁর ছেলেকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পোস্টারে হাসানের নাম-ঠিকানা ও যোগাযোগের মুঠোফোন নম্বর দেন। একপর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে এক তরুণের লাশের খোঁজ পেয়ে আবার ছুটে যান। গত মাসের শুরুর দিকে সেখানে মরদেহটি হাসানের বলে শনাক্ত করেন তাঁর বাবা-মা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গতকাল মরদেহটি বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন হাসানের মা গোলনূর বেগম। আরও ভেঙে পড়েন তাঁর লাশের খোঁজ না পেয়ে। তবে ছেলের লাশ পাওয়াকেই এখন তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা বলে মনে করে তিনি বলেন, ‘আল্লার কাছে আবেদন করছিলাম, আমার পুতেরে আমার কোলে ফিরাইয়া দেন। যদি বাইচ্চা থাহে, তাও খুঁইজ্জা দেন। আর যদি মোইররা যায়, তা–ও লাশ খুঁইজ্জা দেন। আল্লায় আমার কতা হোনছেন, আমি আমার জাদুর লাশ খুঁইজ্জা পাইছি।’

গণ–অভ্যুত্থানের ছয় মাস পর ছেলের লাশ পেয়ে কান্না থামছে না মায়ের

গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন (গত ৫ আগস্ট) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে প্রাণ হারান মো. হাসান (১৯)। এরপর পাঁচ মাসের বেশি সময় তাঁর মরদেহ পড়ে ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে। গত ১২ জানুয়ারি তাঁর মরদেহ শনাক্ত করে পরিবার। ডিএনএ পরীক্ষায় গত বুধবার হাসানের পরিচয় নিশ্চিত হয়। এরপর থেকে তাঁর মা গোলেনুর বেগমের কান্না যেন থামছেই না।

আজ শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে হাসানের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে তুলে দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সন্তানের মরদেহ পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসানের মা গোলেনুর বেগম। এ সময় পাশেই ছিলেন তাঁর বাবা মো. মনির হোসেন। অশ্রুজড়িত কণ্ঠে ছেলে হত্যার বিচার চাইলেন তিনি।

মনির হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে ৫ আগস্ট হারিয়ে যায়। পরে তাকে আমরা প্রায় সব হাসপাতাল, ক্লিনিক, কবরস্থান, আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামসহ আমাদের পক্ষ যত জায়গায় যাওয়া সম্ভব, সবখানে খুঁজেছি কিন্তু কোথাও তাকে পাইনি। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে যাই এবং কাপড়চোপড় দেখে ছেলেকে শনাক্ত করি।’

ছেলে হত্যার বিচার দাবি করে মনির হোসেন আরও বলেন, ‘আমি চাই আমার মতো কোনো বাবাকে যেন এভাবে তার সন্তান না হারাতে হয়। আমি সরকারের কাছে আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’ হাসানের খালা মোছা. শাহিনুর বলেন, ‘ড. ইউনূসের সরকারের কাছে ভাগনে হত্যার বিচার চাই। তাদের পরিবারের সে ছিল আয়ের অন্যতম উৎস। তাকে ছাড়া তার বাবা–মা কীভাবে বেঁচে থাকবে?’

হাসান রাজধানীর কাপ্তানবাজারে একটি দোকানে কাজ করতেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলায়। তাঁর বাবা জানালেন, শনিবার সকালে দ্বিতীয় জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম জানাজা পড়ে শহীদ হাসানের কফিন নিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে ‘কফিনমিছিল’ বের করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা–কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
 মো. হাসান
মো. হাসান। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে 'ইসলামিক সন্ত্রাস' রুখতে যৌথভাবে কাজ করবে ভারত-আমেরিকা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ২৬/১১ মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার অভিযুক্ত তাহাব্বুর রানাকে ভারতে প্রত্যর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। হোয়াইট হাউসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ঘোষণা দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আনন্দের সাথে ঘোষণা করছি যে আমার প্রশাসন ২০০৮ সালের ভয়াবহ মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত বিশ্বের অন্যতম অপরাধীকে  (তাহাব্বুর রানা) ভারতে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য প্রত্যার্পণের অনুমোদন দিয়েছে। তিনি ভারতে ফিরে যাচ্ছেন।’

২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এবং বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি কারাগারে বন্দী রানাকে ভারত প্রত্যর্পণের জন্য অনেকদিন ধরেই চাপ দিচ্ছে। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক রানা পাকিস্তানি-আমেরিকান সন্ত্রাসী ডেভিড কোলম্যান হেডলির সাথে যুক্ত, যিনি ‘দাউদ গিলানি’ নামেও পরিচিত। হেডলি মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রানার বিরুদ্ধে হেডলি এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) কে এই হামলা চালানোর জন্য সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, বিশ্বজুড়ে উগ্র ইসলামিক সন্ত্রাসের হুমকি মোকাবেলায় ভারত ও আমেরিকা একসাথে কাজ করবে।

ইন্ডিয়া টুডে-র পররাষ্ট্র বিষয়ক সম্পাদক গীতা মোহনের এক প্রশ্নের জবাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বিরুদ্ধে কাজ করা ব্যক্তিদের, বিশেষ করে খালিস্তানিপন্থীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট  বলেন, ‘এ বিষয়ে আরও কিছু করার আছে। আমার মনে হয় না বাইডেন প্রশাসনের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো ছিল... ভারত এবং বাইডেন প্রশাসনের মধ্যে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যা উপযুক্ত ছিল না। আমরা একজন অত্যন্ত হিংস্র ব্যক্তিকে (তাহাব্বুর রানা) অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে। তাই, আমরা অপরাধ মোকাবেলায় ভারতের সাথে কাজ করতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রত্যার্পণ অনুমোদনের জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। মোদি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা সহযোগিতা করব। সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ২৬/১১ সন্ত্রাসী তাহাব্বুর রানাকে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমাদের আদালত তাকে বিচারের আওতায় আনবে।’

অন্যান্য প্রত্যার্পণ অনুরোধের ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে অনুরোধ করা রয়েছে, কিন্তু মিশ্রি কারোর নাম উল্লেখ করেননি। ইতিমধ্যে, দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে

mzamin

আমেরিকার মিত্ররা প্রায়শই শত্রুর চেয়েও খারাপ: ট্রাম্প

শুল্ক নিয়ে বড় ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পারস্পরিক শুল্ক আরোপের কথা স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যে সব দেশ মার্কিন পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করবে, সেই সব দেশের পণ্যের উপরেও পাল্টা কর চাপাবে আমেরিকা।

নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘তিনটি দুর্দান্ত সপ্তাহ কাটল। বোধহয় এই সপ্তাহ তিনটি সর্বকালের সেরা। কিন্তু আজ বড় একটা দিন। পারস্পরিক শুল্ক আরোপ! মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন।’

এরপরেই  ট্রাম্প ওভালে নিজের অফিসে বসে ঘোষণা করেন পারস্পরিক শুল্ক আরোপের। সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন যে, ‘মার্কিন মিত্ররা প্রায়শই বাণিজ্য ইস্যুতে আমাদের শত্রুদের চেয়েও খারাপ’।

প্রতিটি মার্কিন বাণিজ্য অংশীদারের উপর নির্ভর করে শুল্ক নির্ধারণ করা হবে এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হবে।

ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে বিস্তৃত পরিসরের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তি দিয়েছেন যে এই পদক্ষেপ অন্যায্য অনুশীলন মোকাবেলায় সহায়তা করবে এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রেসিডেন্ট শুল্ককে রাজস্ব বৃদ্ধি, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণ এবং মার্কিন উদ্বেগের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশগুলোকে চাপ দেয়ার একটি উপায় হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

ওয়াশিংটনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্পের এই ঘোষণা আসে। শুল্ক আরোপ করা হলে ঠিক কখন থেকে তা কার্যকর হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পারস্পরিক শুল্কের ফলে ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো উদীয়মান বাজার অর্থনীতিতে ব্যাপক শুল্ক বৃদ্ধি হতে পারে, কারণ এই দেশগুলোতে মার্কিন পণ্যের উপর কার্যকর শুল্ক হার বেশি থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, তারা এই পদক্ষেপের জেরে বিশেষ সমস্যার মুখে পড়বে  না।

ট্রাম্পের নীতি বিষয়ক ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলার পূর্বে বলেছিলেন, দেশগুলো অন্যায্য বাণিজ্য সুবিধা পেতে ভ্যাট ব্যবহার করে, যদিও বিশ্লেষকরা এটিকে  চ্যালেঞ্জ করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, চোখের বিনিময়ে চোখ, শুল্কের বিনিময়ে শুল্ক, একই বিষয়।

উদাহরণস্বরূপ, যদি ভারত মার্কিন গাড়ির উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, তাহলে ওয়াশিংটন ভারত থেকে গাড়ি আমদানির উপরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। এশীয় অর্থনীতির মধ্যে, ভারতের মার্কিন রপ্তানির উপর ৯.৫ শতাংশ কার্যকর শুল্ক রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানির উপর হার তিন শতাংশ।

নোমুরা রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন পণ্যের উপর থাইল্যান্ডের হার ৬.২ শতাংশ এবং চীনের হার ৭.১ শতাংশ। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের স্কট লিন্সিকোম এর আগে সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেছিলেন, দরিদ্র দেশগুলো প্রায়শই উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, যারা রাজস্ব এবং সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে এগুলো ব্যবহার করে কারণ তাদের কাছে অ-শুল্ক বাধা আরোপের জন্য কম সম্পদ রয়েছে।

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

গল্প- অচিন উইলো ও ঘুমন্ত বালিকা by হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : রাফিক হারিরি। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই বাতাসের ঘ্রাণ আমার ওপর আছড়ে পড়ল। মে মাসের বাতাস শুষ্ক রুক্ষ চামড়ার ফল যেন অনেকগুলো বীজ নিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। আমার হাতের ওপর বীজগুলো ছিটকে পড়ে ব্যথার একটা অনুভূতি তৈরি করে দিয়েছে।

‘কয়টা বাজে?’ আমার চাচাতো ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করল। সে আমার চেয়ে লম্বায় আট ইঞ্চি ছোট, আমার সঙ্গে কথা বলার সময় ওপরের দিকে মুখ তুলে কথা বলতে হয় তাকে।

আমি ঘড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে বললাম, ‘দশটা বিশ।’

‘ঘড়িটা কি ঠিকমতো সময় দেয়?’

‘আমার তো তাই মনে হয়।’

আমার চাচাতো ভাই আমার কব্জিটাকে শক্ত করে ধরে ঘড়িটা দেখল। তার চিকন পাতলা শুকনা আঙুলগুলোতে দারুণ জোর।

‘এই ঘড়িটা কি অনেক দামি?’

‘নাহ। বেশ সস্তা এটা।’ আমি ঘড়িটার দিকে আবারো তাকিয়ে বললাম।

সে কোনো উত্তর দিলো না।

আমার চাচাতো ভাইয়ের চোখেমুখে কেমন একটা বিভ্রান্তির দৃষ্টি।

‘ঘড়িটা আসলেই সস্তা।’ আমার ভাইয়ের ডান পাশে সাবধান চোখ রেখে আবারো বললাম। ‘ঘড়িটা সস্তা কিন্তু খুব ভালো সময় দেয়।’

আমার চাচাতো ভাই মৃদু মাথা নাড়ল।

চাচাতো ভাই তার ডান কানে ভালো শুনতে পায় না। প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় তার ডান কানে বেস বলের আঘাত লাগে। তারপর থেকেই ডান পাশ দিয়ে শোনার বারোটা বেজে গেছে। সেটা এখন আর ভালো কাজ করে না। ক্লাসে সে সবসময় সামনের সারিতে বসত আর ডান পাশে থাকত। যাতে করে তার বাম কানটা শিক্ষকদের দিকে ভালোভাবে রেখে সব কথা শোনা যায়। তার পরীক্ষার ফলাফলও খারাপ ছিল না। তবে বছরে একবার কি দুবার তার দুই কান দিয়েই সে কোনো কিছু শুনতে পেত না। এই রকম যখন ঘটত তখন তার জীবন যেন জানালা দিয়ে পালাত। সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিত। ডাক্তাররা তার এই সমস্যা নিয়ে বেশ বিপদে ছিলেন। কারণ তারা কখনোই কানের এই রকম কোনো সমস্যার কথা শোনেননি। ফলে তাদের কিছুই করার ছিল না।

‘ঘড়ি দামি হলেই যে সেটা ভালো সময় দেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।’ আমার চাচাতো ভাই আমাকে খুশি করার জন্য বলল। ‘আমি খুব দামি একটা ঘড়ি একসময় ব্যবহার করতাম। কিন্তু সেটা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকত। ঘড়িটা পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই আমি সেটা হারিয়ে ফেললাম। তারপর আমি আর ঘড়ি ব্যবহার করিনি। আমাকে ঘড়ি কিনে দেওয়া হয়নি।’

‘ঘড়ি ছাড়া চলাটা মুশকিল’ আমি বললাম।

‘কী?’ সে জিজ্ঞেস করল।’

‘একটা ঘড়ি ছাড়া চলতে বেশ অসুবিধা, ঠিক না?’ তার ডান পাশে তাকিয়ে আমি কথাটা আবারো বললাম।

‘না মোটেও সেরকম না। আমি কোনো পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা দুর্গম এলাকায় বসবাস করছি না। ঘড়ির সময় জানতে চাইলে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই হবে।’ সে মাথা নেড়ে বলল।

‘সত্য কথা।’ আমি বললাম।

কিছুক্ষণের জন্য আমরা আবারো চুপ হয়ে গেলাম।

আমি জানতাম হাসপাতালে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমার ভাইটিকে একটু শান্ত রাখতে, তার প্রতি একটু ভালোবাসা প্রকাশ করতে আমাকে আরো বেশি কিছু বলতে হবে।

আমার ভাইটিকে আমি সর্বশেষ দেখেছিলাম পাঁচ বছর আগে। এর মধ্যে সে নয় থেকে চৌদ্দ বছরে উন্নীত হয়েছে আর আমি বিশ থেকে পঁচিশ বছরে পড়লাম। কিন্তু বয়স আমাদের মাঝে ছোট একটা বাধা তৈরি করে দিয়েছে। ফলে আমি যখনই ভাইটিকে কিছু বলতে যাই আমার গলা শুকিয়ে আসে, ঢোক গিলতে হয়।

‘এখন কয়টা বাজে?’ সে আবারো জিজ্ঞেস করল।

‘দশটা ঊনত্রিশ।’ আমি বললাম।

ঠিক দশটা বত্রিশে বাসের দেখা মিলল।

যে-বাসটা এলো সেটা একেবারেই নতুন ধরনের। আমি স্কুলে যেতে যে-বাস ব্যবহার করতাম এটা দেখতে মোটেও সেরকম না। চালকের সামনের কাচটা বেশ বড়, আর বাসটাতে আমার ধারণার চাইতেও বেশি ভিড় ছিল। কেউ দাঁড়িয়ে ছিল না, কিন্তু তারপরও আমরা বসতে পারিনি। আমরা খুব বেশি দূর যাব না। তাই বাসের ঠিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঠিক এই সময়টাতেই কেন বাসটাতে এত ভিড় সেটা একটা রহস্য। কারণ বাসটা কোনো পর্যটক এলাকার ভেতর দিয়ে আসে না। আর যে-এলাকার ভেতর দিয়ে আসে সেখানে এত ভিড় হওয়ার কথা না।

গাড়িটা একদম নতুন ছিল। সরাসরি ফ্যাক্টরি থেকে চলে এসেছে। গাড়ির দেয়ালগুলো এত মসৃণ ছিল যে, সেখানে তোমার চেহারার প্রতিফলন দেখা যাবে।

গাড়িটা নতুন কিন্তু গাড়ির ভেতর অপ্রত্যাশিত ভিড় আমাকে চুপসে দিয়েছে। সম্ভবত আমি সর্বশেষ এই বাস দিয়ে যাতায়াত করার পর বাসের রাস্তা বদলেছে। বাসটি এখন নতুন রুটে চলাচল করে। আমি সাবধানে বাসের ভেতর আর তার চারপাশটা মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম। নাহ, ঠিকই আছে। বাইরে সেই পরিচিত আবাসিক এলাকা। আমার মনে পড়ছে।

‘আমরা তো ঠিক বাসেই উঠেছি?’ আমার চাচাতো ভাই কিছুটা শঙ্কা নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমরা যখনই বাইরে কোথাও গিয়েছি তখনই আমার চেহারায় একটা শঙ্কার ভাব ছিলই।

‘ভয় পেয়ো না।’ আমার ভাইকে আর নিজেকে কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বললাম। ‘এই রুটে কেবলমাত্র একটা বাসই চলাফেরা করে। সেটা হলো এই বাস।’

‘তুমি যখন হাইস্কুলে পড়তে তখন কি এই বাসটা দিয়েই যাতায়াত করতে?’ আমার ভাই জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ।’

‘স্কুল তোমার ভালো লাগত?’

‘তেমন ভালো না। তবে সেখানে আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতো। ফলে এই যাত্রাটা খুব লম্বা মনে হতো না।’ আমি বললাম।

‘তাদের সঙ্গে কি তোমার এখনো দেখা হয়?’

‘না দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে দেখা হয় না।’ আমি খুব সাবধানে বললাম।

‘কেন দেখা হয় না? কেন তুমি তাদের সঙ্গে দেখা করো না?’

‘কারণ আমরা একে অপর থেকে অনেক দূরে থাকি।’ এটা আসলে মূল কারণ ছিল না। কিন্তু আমি বিষয়টাকে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করার অন্য কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

আমার ডান পাশেই বুড়োদের একটা দল বসেছিল। একটু পরেই আমি বুঝতে পারলাম এই জন্যই বাসটা আজ খুব বেশি ভিড় মনে হচ্ছে। সব মানুষই পাহাড়ে ওঠার অদ্ভুত পোশাক পরে আছে। তাদের দেখতে যে কী অদ্ভুত লাগছিল। কিন্তু যে-বিষয়টা আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে সেটা হলো বাসের এই রুটে তো কোনো পাহাড়ে চড়ার কিছু নেই। আশপাশে কোনো পাহাড় নেই যেখানে অভিযানপ্রিয় মানুষগুলো উঠতে পারে। তাহলে এই লোকগুলো পৃথিবীর কোথায় যাচ্ছে?

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমি বিষয়টা ভাবছিলাম। কিন্তু আমার মাথায় ভালো কোনো ব্যাখ্যা এলো না।

‘চিকিৎসায় যদি এই মুহূর্তে আঘাত আরো বেশি হয় তাহলে আমি অবাক হব।’ আমার চাচাতো ভাই বলল।

‘আমি জানি না। আমি বিস্তারিত কিছুই শুনিনি এ-বিষয়ে।’ আমি বললাম।

‘তুমি কি কখনো কানের ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?’

উত্তরে আমি মাথা নাড়লাম। আমি জীবনে একবারের জন্যও কানের ডাক্তারের কাছে যাইনি।

‘এটা কি আগেও কোনো কষ্ট দিয়েছিল?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘না তেমন কষ্ট দেয়নি। আসলে এটাতে তেমন কোনো ব্যথা বোধ নেই। মাঝে মাঝে একটু-আধটু ব্যথা লাগে। তবে সেটা তেমন ভয়ংকর কিছু না।’

‘আশা করি আজকেও সেই একইরকম হবে। তোমার মা বলেছে যে তারা স্বাভাবিকের বাইরে ব্যতিক্রম কিছুই করবে না।’

‘কিন্তু তারা যদি সব সময় একই কাজ করে তাহলে সেটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে?’

‘তুমি জানো না। কারণ অনেক সময় অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে।’

‘তুমি কি বলতে চাও যেভাবে একটা বল এসে কানে আঘাত করে, এরকম কিছু?’

আমি ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম আমার ভাইয়ের কথায় কোনো ঠাট্টা বা শ্লেষ আছে কিনা। তবে সেরকম কিছুই দেখলাম না।

‘নতুন একজন ডাক্তারের কাছে গেলে বিষয়টা ভিন্ন রকমও হতে পারে। একটু পরিবর্তন হয়তো পুরো প্রক্রিয়াটায় নতুন কোনো ফলাফল আনতে পারে। আমি এত সহজে হারতে চাই না।’ আমি বললাম।

‘আমিও হারতে চাই না।’ আমার চাচাতো ভাই বলল। ‘তবে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি কিছুটা বিরক্ত। ভয় কোনো বিপজ্জনক কিছু না। তবে আমি যে ব্যথার কল্পনা করছি সেটা মূল ব্যথার চেয়েও অধিক বেদনাদায়ক। তুমি বুঝতে পারছ আমি কি বলতে চাই?’

‘হ্যাঁ। আমি জানি।’ আমি বললাম।

সেই বসন্তে অনেক কিছুই ঘটে গেল।

একটা নতুন পরিস্থিতির কারণে আমি ছোট্ট যে বিজ্ঞাপনী সংস্থাটিতে গত দুবছর ধরে কাজ করতাম সেখানকার চাকরিটা আমি ছেড়ে দিলাম। একই সময়ে আমার কলেজজীবনের সঙ্গী প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে গেল। তারও এক মাস পর আমার দাদি মারা গেল। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম ছোট্ট একটা সুটকেস হাতে নিয়ে আমি এই শহরে ঢুকলাম। আমার পুরনো ঘরটা আমি যেভাবে রেখে এসেছিলাম সেভাবেই আছে। বুক-সেলফের বইগুলো সেই আগের মতোই গোছানো, সাউন্ড রেকর্ডগুলোও আছে। তবে সবকিছু একেবারে শুকনা খটখটে, ধুলায় আচ্ছন্ন। অনেক আগেই এদের গন্ধ আর রং হারিয়ে গেছে। সময় শুধু সেখানে একা দাঁড়িয়ে আছে।

দাদির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হওয়ার দুইদিন পর আমি আবারো টোকিওতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা কাজ বাগাতে হবে। ভাবলাম দৃশ্যপট পাল্টানোর জন্য নতুন একটা ফ্ল্যাটে উঠব। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না। আমার পুরনো ঘরে পুরনো রেকর্ড শুনে আর পুরনো বইগুলো পড়েই আমার সময় কাটতে লাগল। বাগানের আগাছা পরিষ্কারের কাজে নেমে গেলাম। কারো সঙ্গেই আমার দেখা হলো না। তবে কয়েকদিন পর আমার পরিবারেরই একজন সদস্যের সঙ্গে কথা হলো। আমার চাচি এসে বলল আমি যেন আমার চাচাতো ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তাঁর নিজেরই নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল কিন্তু একটা কাজের জন্য তিনি সেটা করতে পারছেন না। আমারও কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। তাই আমি প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করলাম না। হাসপাতালটা আমার পুরনো স্কুলের কাছেই ছিল। চাচি একটা খামে করে কিছু টাকা দিলেন আমাদের দুপুরের খাবারের জন্য।

হাসপাতাল পাল্টানোর কারণ হলো পুরনো হাসপাতালের চিকিৎসায় আমার চাচাতো ভাইয়ের তেমন কোনো উপকার হচ্ছিল না। চাচি হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে ডাক্তার বলল সমস্যাটার চিকিৎসা হাসপাতাল থেকে বাড়ির ভেতরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করছে বেশি। আমার চাচাতো ভাই কাছেই থাকত। কিন্তু আমি ছিলাম তার চেয়েও দশ বছরের বড়। ফলে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু কোন একটা কারণে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন এমনটা হলো। আমি লক্ষ করলাম সে আমার কথা শোনার জন্য যখনই বাম কানটা ঘুরাত তখন বিষয়টা আমার কাছে খুব স্পর্শকাতর মনে হতো।

আমাদের বাসটা সাত থেকে আটটা স্টপেজ পার হওয়ার পর আমার চাচাতো ভাই উদ্বিগ্ন চোখে আমার দিকে তাকাল।

‘হাসপাতালটা কি আরো দূরে?’ সে বলল।

‘হ্যাঁ। আরো কিছু পথ বাকি আছে। এটা খুব বড় হাসপাতাল, আমাদের চোখ এড়াবে না।’

জানালা দিয়ে আসা বাতাসে বাসের ভেতর যে বৃদ্ধরা বসে ছিল তাদের মাথার টুপির ফিতাগুলো বারবার উড়ছিল। আমি ভাবছিলাম এই বৃদ্ধগুলো কোথায় যাচ্ছে?

‘হেই তুমি কি আমার বাবার কোম্পানিতে কাজ করবা?’ আমার ভাই জিজ্ঞেস করল।

আমার চাচার অনেক বড় একটা ছাপাখানার অফিস আছে। এই ধারণাটা আমাকে কেউ এর আগে বলেনি।

‘কই আমাকে তো কেউ এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তুমি কেন এটা জিজ্ঞেস করলে?’ আমি বললাম।

আমার ভাই একটু হেসে বলল, ‘আমি ধারণা করেছিলাম তুমি সেখানে কাজ করবে। কিন্তু কেন তুমি সেটা করছ না? এখান থেকে তোমার চলে যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি থাকো। সবাই খুশি হবে।’

বাসের রেকর্ড মেসেজে পরবর্তী স্টপেজের ঘোষণা দিচ্ছিল। কিন্তু কাউকে সেখানে নামার তেমন তোড়জোড় দেখা গেল না।

‘টোকিওতে আমার কাজ আছে। আমাকে ফিরে যেতে হবে।’ আমি বললাম।

আমি জানতাম সেখানে আমার কোনো কাজ ছিল না। তারপরও এখানে কোনোভাবেই আমি থাকতে পারছি না।

বাসটা যখন পাহাড়ে উঠছিল, আমি লক্ষ করলাম আশপাশের ঘরবাড়ির সংখ্যা কমে আসছে।

কয়েকটা অদ্ভুত ডিজাইনের বাড়ি আমরা দেখলাম। বাসটা যখনই পাহাড়ের বাঁকে উঠছিল তখনই আমরা অনেক দূরে নিচে সমুদ্রের দৃশ্যটা দেখছিলাম। আবার মুহূর্তেই সেটা মিলিয়ে যাচ্ছে।

অবশেষে হাসপাতালের সামনে বাসটা থামলে আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেই দৃশ্য দেখলাম।

‘যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে সেটা আমি একাই সামলাতে পারব। ভয় নেই। তুমি অন্য কোথাও গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করো।’ আমার চাচাতো ভাই বলল।

ডাক্তার আসার পর আমি ঘর থেকে বের হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে হাঁটা দিলাম।

সকালে খুব হালকা নাশতা করেছিলাম। তাই টের পেলাম আমি বেশ ক্ষুধার্ত। কিন্তু মেনুতে ক্ষুধা দূর করার মতো তেমন খাবার পেলাম না। এক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে চুপচাপ বসে থাকলাম।

সপ্তাহের ছুটির দিন ছিল এটা। ক্যাফেতে শুধুমাত্র ছোট্ট একটা পরিবার আর আমি ছিলাম। পরিবারের বাবার বয়স চল্লিশ হবে, নীল রঙের একটা শার্ট পরা, সঙ্গে প্যান্ট, পায়ে হালকা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। মার সঙ্গে যমজ মেয়ে, তারা দুজনেই সাদা পোশাক পরা। মেয়েদুটোর চেহারায় খুব সিরিয়াস একটা ভাব। তারা কমলার জুস খাচ্ছে। নিচে বেশ বড় খোলামেলা জায়গা। সবুজে ঢাকা। গ্রীষ্মের বাতাস বইছে সবুজ ঘাসগুলোর ওপর দিয়ে। পাশেই একটা টেনিস কোর্ট। অনেক দূরে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। আমার মনে হলো এই দৃশ্যটা আমি আগেও একবার দেখেছি। কমলার জুস খাওয়া দুটি মেয়ে আমার পাশে বসে আছে, নিচে বিশাল সমুদ্র। এটা নিশ্চয় আমার মনের কল্পনা ছাড়া আর কিছু না। কারণ আমি এই হাসপাতালে আগে কখনোই আসিনি।

ক্যাফেটেরিয়ার চেয়ারে লম্বা করে আমার পা বিছিয়ে দিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিলাম। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের মাঝে স্মৃতির একটু আলোর ঝলকানি দেখা গেল। আস্তে আস্তে সে-আলোটা বিস্তৃত হতে থাকল। নানা আকৃতি দেখা গেল। বিভিন্ন রকমের স্মৃতির চরিত্ররা ফুটে উঠতে থাকল।

আট বছর আগে আমি অন্য আরেকটি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সমুদ্রের পারে ছোট্ট একটা হাসপাতাল। খুব পুরনো, আর হাসপাতালটার মধ্যে কেমন বৃষ্টির ঘ্রাণ। আমার বন্ধুর প্রেমিকার বুকের অপারেশন হয়েছিল। আমরা দুজন তাকে দেখতে গিয়েছিলাম সেই হাসপাতালে। ওর অপারেশনটা তেমন মেজর কিছু ছিল না। খুব অল্প সময়েই মেয়েটার অপারেশন শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ডাক্তার কোনো ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তাই আমার বন্ধুর প্রেমিকাকে হাসপাতালে দশ দিন থাকতে হয়েছিল। আমি আর আমার বন্ধু বাইক হাঁকিয়ে সেখানে গেলাম। রাস্তার মাঝখানে সে একটা দোকান থেকে কিছু চকোলেট আর খাবার কিনল। আমি পেছনে বসেছিলাম। গ্রীষ্মের গরম। দুজনেই ঘেমে উঠছিলাম আবার সেই ঘাম বাতাসে শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমার বন্ধুর ঘামের গন্ধ আমি পাচ্ছিলাম। তবে সে মারা যাওয়ার পর খুব বেশিদিন গন্ধটা আমার মাথায় ছিল না।

বন্ধুর প্রেমিকা আমি আর বন্ধু আমরা তিনজন ক্যাফেটেরিয়াতে বসলাম। সিগারেট খেলাম। বন্ধুর প্রেমিকা ক্ষুধার্ত ছিল। সে একটা হটডগ খেল, কোক খেল, আইসক্রিম খেল।

আমার বন্ধু তার প্রেমিকাকে বলল, ‘হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর তোমাকে ভালো কোথাও যেতে হবে সুস্থতার জন্য।’

‘ভয় নেই আমি সুস্থ হয়ে উঠব।’ প্রেমিকা বলল।

তারা যখন কথা বলছিল তখন আমি বাইরে জানালা দিয়ে অনেক দূরে তাকিয়ে থাকলাম। ক্যাফেটেরিয়ায় হাসপাতালের গন্ধ ছিল। এমনকি খাবারেও।

আমরা এভাবে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আমার বন্ধুটি যৌনতা নিয়ে কথা বলা শুরু করল। সে সত্যিকার অর্থেই গল্প বলতে জানে। এমনভাবে সে যৌন গল্পগুলো বলা শুরু করল যে, তার বান্ধবী গলা ফাটিয়ে হাসতে শুরু করল।

‘দয়া করে আমাকে এভাবে হাসিও না। জোরে হাসলে আমার বুক ব্যথা করে।’ বান্ধবী বলল।

‘ঠিক কোথায় ব্যথা করে?’ আমার বন্ধু জিজ্ঞেস করল।

মেয়েটা তার জামার ওপর বাঁ-বুকের ঠিক ডানপাশটা দেখাল।

আমার বন্ধু এটা নিয়েও মজার কিছু বলল। তার বান্ধবী তখন আবারো হেসে উঠল।

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। এগারোটা পঁয়তাল্লিশ বাজে। আমার চাচাতো ভাইটা এখনো ফিরে আসেনি।

দুপুরের খাবার সময় হয়ে যাচ্ছে। ক্যাফেটেরিয়াতে লোকজনের ভিড় আস্তে আস্তে বাড়ছে। নানা ধরনের শব্দের পাশাপাশি সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্যাফেটা আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। আমি আবারো সেই পুরনো স্মৃতির ভেতর ডুব দিলাম।

আমার মনে পড়ছে আমার বন্ধুর প্রেমিকার বুক পকেটে একটা সোনালি রঙের কলম ছিল। আমার এখন মনে পড়ছে সে এই কলমটা দিয়ে ন্যাপকিন পেপারের ওপর কিছু একটা লিখেছিল। খুব সম্ভবত সে একটা ছবি এঁকেছিল। ন্যাপকিনটা এত নরম ছিল যে কলমের খোঁচায় সেটা বারবার কুঁচকে উঠেছিল। এর মধ্যেই সে খুব সাবধানে একটা পাহাড়ের ছবি অাঁকল, পাহাড়ের ওপর ছোট্ট একটা ঘরের ছবি। সেই ঘরে একটা মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। বাড়ির চারপাশে অদ্ভুত দর্শনের উইলো গাছ। সেই উইলো গাছের ছায়ায় আর বাতাসে মেয়েটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

‘এটা আবার কেমন উইলো গাছ?’ আমার বন্ধুটি বলল।

‘এইরকম একটা গাছ আছে।’

‘আমি কখনোই এমন গাছের কথা শুনিনি।’

‘সেজন্যই এটা আমি তৈরি করেছি।’ আমার বন্ধুর প্রেমিকা বলল। ‘এই অচিন উইলো গাছের ফুলের পরাগ অনেক বেশি। পাতাগুলো খুব সরু। ফুলের গন্ধ আর বাতাস মেয়েটাকে আরামে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।’

বন্ধুর প্রেমিকা আবার নতুন আরেকটা পেপার নিয়ে সেখানে অচিন উইলো গাছের ছবি অাঁকল।

‘এই অচিন উইলো গাছটি ওপরে দেখতে ছোট হলেও মাটির নিচে এর শেকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই গাছটা বড় অদ্ভুত। গাছটার ফুলগুলোর অনেক পরাগরেণু। আর ঘরের মেয়েটি এই গাছের ছায়াতেই ঘুমিয়ে আছে। গাছটার পরাগগুলোতে অনেক অনেক শুয়োপোকা। সেই পোকাগুলো ঘুমন্ত মেয়েটাকেও চাদরের মতো ঢেকে রেখেছে। তারপর পোকাগুলো মেয়েটাকে আস্তে আস্তে খেয়ে নিচ্ছে।’

আমার মনে পড়ে সেই গ্রীষ্মে আমার বন্ধুর বান্ধবী কেবল অচিন উইলো গাছ নিয়ে দীর্ঘ একটা কবিতা লিখেছিল। এটাই ছিল তার সামারের অ্যাসাইনমেন্ট। মেয়েটা আরো অনেক চিন্তাভাবনা করে নানা রকম কল্পনার ভেতর দিয়ে একটা গল্প দাঁড় করিয়েছিল। একজন তরুণ সেই পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে অচিন উইলো গাছটি তার শাখা-প্রশাখা দিয়ে যে মেয়েটাকে আটকে রেখে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল তাকে উদ্ধার করার জন্য উঠল।

‘তাহলে সেই ছেলেটা নিশ্চয় আমি ছিলাম।’ আমার বন্ধু আবারো মজা করার চেষ্টা করল।

‘না সেটা তুমি না।’ বান্ধবী বলল।

‘তুমি নিশ্চিত?’

‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত। তুমি কি রাগ করলে? রাগ করো না।’

‘তুমি বাজি ধরো সেই ছেলেটা আমি।’ আমার বন্ধু ভ্রু কুঁচকে রসিকতার ছলে বলল।

আমার বন্ধুর বান্ধবী তখন তার ছবির গল্পটা আবারো বলা শুরু করল। তো সেই যুবকটাই প্রথমবারের মতো অচিন উইলো গাছগুলোর সব বাধা উপেক্ষা করে তার চারপাশে গুনগুন করা প্রজাপতি আর মাছিগুলোকে তাড়িয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে গেল মেয়েটিকে লম্বা ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য।

‘কিন্তু ছেলেটা সেখানে পৌঁছার আগেই মেয়েটাকে পোকাগুলো খেয়ে ফেলে ঠিক না?’ আমার বন্ধু বলল।

তার বান্ধবী কোনো কিছু না বলে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কী মনে করো এই গল্পের বিষয়ে।’

‘দেখে মনে হচ্ছে এটা একটা দুঃখের কাহিনি।’ আমি বললাম।

বারোটা বিশে আমার চাচাতো ভাই ফিরে এলো। আমার ছোট ভাইয়ের হাতে একটা ওষুধের ব্যাগ। তার চোখেমুখে অন্যরকম কিছু একটা আছে। সে ক্যাফেতে ঢুকে আমাকে খুঁজে বের করতে তার বেগ পেতে হলো। যখন আমাকে দেখল তখন দুলতে দুলতে আমার কাছে এলো। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না।

আমার কাছে এসে লম্বা করে একটা শ্বাস নিল।

‘সব কিছু ঠিকমতো হয়েছে তো?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘ইমম।’ আর কিছুই বলল না।

আমি অপেক্ষা করছিলাম সে আর কিছু বলবে। কিন্তু কিছুই বলল না।

‘তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে মৃদু মাথা নাড়ল।

‘তুমি কি এখানেই খাবে নাকি বাস ধরে শহরে গিয়ে খাবে?’

আমার ছোট্ট চাচাতো ভাই খুব অনিশ্চিতভাবে তার চারপাশে তাকিয়ে বলল, ‘এখানেই ভালো।’

আমি খাবারের টিকিট নিয়ে এলাম। খাবার আসার আগ পর্যন্ত আমার ভাই আমার মতো করেই একদম চুপ হয়ে বাইরের যে-দৃশ্যগুলো আমি দেখছিলাম সেদিকে তাকিয়ে দূর-সমুদ্রের দৃশ্য দেখতে থাকল।

আমাদের টেবিলের পাশেই মধ্যবয়স্ক একজোড়া দম্পতি তাদের এক বন্ধুর বিষয়ে আলোচনা করছিল, যার পাকস্থলীর ক্যান্সার হয়েছে। আমাদের খাবারের মেনু খুব সামান্যই ছিল। ভাজা সাদা মাছ, সবজি, সালাদ আর রোল। আমরা দুই ভাই পাশাপাশি বসে চুপচাপ খেতে লাগলাম। আমাদের পাশেই সেই দম্পতি তখনো ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা করছে। স্ত্রী প্রশ্ণ করছে আর স্বামী উত্তর দিচ্ছে।

‘সব জায়গায় তুমি একই বিষয়ই দেখবে। সেই গৎবাঁধা পরীক্ষা-নিরীক্ষা।’ আমার ভাই তার হাতের দিকে নীরবে তাকিয়ে বলল।

হাসপাতালের সামনে একটা বেঞ্চে বসে আমরা বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যখনই বাতাস আসছে তখনই আমাদের মাথার ওপর সবুজ পাতাগুলো ঝরঝরিয়ে উঠছে।

‘কখনো কি এমন হয় যে তুমি কিছুই শুনতে পাও না?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। তখন আমি কিছুই শুনতে পাই না।’ চাচাতো ভাই বলল।

‘আসলে সেটার অনুভূতিটা কি রকম?’

মাথাটাকে সে একদিকে ঝুঁকিয়ে একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘হঠাৎ করেই এমন হয় যে আমি কিছুই শুনতে পাই না। তবে কখনো কখনো সেটা উপলব্ধি করা যায় যে তুমি একটু পরেই আর কিছু শুনতে পাবে না। এটা এমন যে, কানের দুই পাশে তুমি ইয়ার প্লাগ লাগিয়ে সমুদ্রের গভীর তলদেশে শুয়ে আছো।’

‘এটা কি বিরক্তিকর?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে তার মাথাটা নেড়ে বলল, ‘আমি জানি না কেন, তবে সত্য কথা বলতে কী এটা আমাকে তেমন বিরক্ত করে না।’

বিষয়টা আমি ভাবার চেষ্টা করলাম। তবে কল্পনা করে তেমন কোনো চিত্র অাঁকতে পারলাম না।

‘তুমি কি কখনো জন ফোরডের ফোর্ট এপাচি মুভিটা দেখেছ?’ আমার চাচাতো ভাই জিজ্ঞেস করল।

‘অনেক আগে দেখেছি।’ আমি বললাম।

‘টিভিতে কয়েকদিন আগে দেখাল। মুভিটা আসলেই খুব ভালো।’

‘হুম।’ আমি সম্মতি দিলাম।

আমার ভাইটা কিছুক্ষণ সেভাবে বসে থাকল। তারপর আবার বলল, ‘তুমি কি আমার কানের ভেতরটা একটু দেখবে?’

‘তোমার কানের ভেতর?’ আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

‘বাইরে থেকে কেবল কানের ভেতরটা দেখবে আর কিছু না।’

‘ঠিক আছে। কিন্তু কেন তুমি আমাকে এটা করতে বলছ?’

‘আমি জানি না। আমি কেবলমাত্র চাচ্ছিলাম যে, তুমি দেখো তারা আমার কানের ভেতর কী দেখেছে।’

‘ঠিক আছে আমি দেখব।’

আমার চাচাতো ভাই ঘুরে বসল। তার কানের আকৃতি আসলেই ভালো। আমি এর আগে কারো কানই এত মনোযোগ দিয়ে দেখিনি। আসলে কানের ভেতরে তাকালে এর গঠনটা সত্যিকার অর্থেই রহস্যময় মনে হবে। কানের ভেতরে তাকালে মনে হবে যে অন্ধকার কোনো গুহার ভেতর আস্তে  আস্তে নেমে যাচ্ছে।

তখন আমার সেই বন্ধুর প্রেমিকার কথা মনে পড়ল। আমি যেন দেখতে পাচ্ছিলাম ছোট ছোট শুয়োপোকা বন্ধুর প্রেমিকার কানের ভেতর আস্তে আস্তে বাসা বাঁধছে। ছয় পা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের ভেতর বাসা বানিয়ে সেখানকার সব তরল খেয়ে তার ভেতর ডিম পারছে।

‘ঠিক আছে এতেই চলবে।’ আমার ভাই বলল। ‘তুমি কি কানের ভেতর উল্টাপাল্টা কিছু দেখছ?’

‘বাইরে থেকে আমি যা দেখলাম ভেতরটা তেমন স্বাভাবিকই মনে হলো।’

‘তেমন কিছু দেখো নি? কোনো অনুভূতি কিংবা অন্য কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা?’

‘তোমার কান আমার কাছে বেশ স্বাভাবিকই মনে হলো।’

আমার চাচাতো ভাইকে এই উত্তরে বেশ বিমর্ষ দেখাল। মনে হয় আমি সঠিক কথাটা বলতে পারিনি।

‘ডাক্তার কি তোমাকে চিকিৎসা করতে গিয়ে কষ্ট দিয়েছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘না। সবকিছু আগের মতোই হয়েছে।’

‘ওইতো ২৮ নাম্বার। ওটা নিশ্চয় আমাদের বাস?’ আমার চাচাতো ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল।

আমি কিছু একটা চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলাম। যে-বাসটা আসছিল সেটার সামনে ২৮ নাম্বার থাকলেও সেটাই কি আমাদের বাস ছিল কিনা? আমি কিছুতেই বসার বেঞ্চ থেকে উঠতে পারছিলাম না। চোখের সামনে আমার বন্ধুর প্রেমিকার কথা মনে হচ্ছিল। মেয়েটাকে অচিন উইলো গাছের শাখা আটকে রেখেছিল।

আমার চাচাতো ভাই বেশ জোরেশোরে আমার কাঁধ ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘তুমি ঠিক আছো? কোনো সমস্যা হয়নি তো?’

আমি আবার সেই সময় বাস্তবে ফিরে এলাম। এক ঝটকায় আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলাম। এবার আমার দাঁড়াতে কোনো সমস্যা হলো না। আমি আবারো আমার ত্বকে মে মাসের মিষ্টি বাতাসের স্পর্শ টের পেলাম। আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবারো সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়ালাম। আমি যা দেখছিলাম এখন সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। আমাদের ২৮ নাম্বার সঠিক বাসটা চলে এলো।

দুজনেই বাসের ভেতর উঠে ভালো একটা জায়গায় চলে গেলাম।

আমার চাচাতো ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে আমি তাকে বললাম, ‘আমি ঠিক আছি। ভয় নাই।’

---------

হারুকি মুরাকামি : জাপানিজ ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হারুকি মুরাকামি গত কয়েক বছর ধরেই নোবেল তালিকায় মনোনীতদের শীর্ষে ছিলেন। তবে নোবেল তাঁর ভাগ্যে এলো না। ‘অচিন উইলো ও ঘুমন্ত বালিকা’ গল্পটি হারুকি মুরাকামির সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইমেন গ্রন্থের। এই গ্রন্থের গল্পগুলো ১৯৮১ থেকে ২০০৫-এর মধ্যে লেখা। ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইমেন গল্পগ্রন্থটি লিখে হারুকি মুরাকামি বলেন, ‘উপন্যাস লেখা আমার কাছে সব সময়ই চ্যালেঞ্জ। সে-তুলনায় গল্প খুব স্বচ্ছন্দে লেখা যায়। কারণ উপন্যাস লেখা হলো বিশাল একটা বন তৈরি করা আর গল্প হলো ছোট্ট শৌখিন বাগান তৈরির মতো।’ জাপানিজ ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯-এ জাপানের কোয়েটায়। তাঁর অন্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে নরওয়েজিয়ান উড, কাফকা অন দ্য শোর, হিয়ার দ্য উইন্ড সং, অ্যা ওয়াইল্ড শিপ চেজ উল্লেখযোগ্য।

খনিজ সম্পদের দখল নিতে ইউক্রেন ধ্বংসের অপেক্ষা করছিল যুক্তরাষ্ট্র?

তিন বছর পূর্ণ হতে চলেছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। এরই মধ্যে দু-পক্ষের বহু সেনা নিহত হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ। ইউক্রেনের একটি বড় অঞ্চল দখল করে নিয়েছে রাশিয়া এবং রুশ সেনাদের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির সাজানো গোছানো শহরগুলো।

বলা হয়ে থাকে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। এমনকি এই যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে সেটাও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের কারণেই। বিগত তিন বছরে ইউক্রেনকে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র জোগান দিয়েছে ওয়াশিংটন।

জো বাইডেন প্রশাসনের আমলে এই অস্ত্রের জোগানকে বন্ধু রাষ্ট্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হিসেবে দেখানো হলেও ডেনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের বাসিন্দা হওয়ার পর সেই খোলস এখন উন্মোচিত। ট্রাম্প ইউক্রেনকে দেওয়া অস্ত্রের মূল্য হাজার হাজার কোটি ডলার ফেরত চাইছেন। তিনি ইউক্রেনকে তার খনিজ সম্পদের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্প তার অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে কিয়েভে পাঠিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে এ সংক্রান্ত বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। বেসেন্ট বুধবার ইউক্রেনে পৌঁছৈছেন। ট্রাম্প বলেছেন, বেসেন্টকে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার চুক্তি স্বাক্ষরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করার পর থেকে বিগত তিন বছরে বাইডেন প্রশাসন কিয়েভকে অন্তত ৩০ হাজার কোটি ডলারে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে। ট্রাম্প এখন বলছেন, ইউক্রেনকে ৫০ হাজার কোটি ডলার ফেরত দিতে হবে; যদিও সাহায্য দেওয়ার সময় এমন কোনো শর্ত দেয়নি বিগত বাইডেন প্রশাসন।

ট্রাম্প গতকাল (বুধবার) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং এ সময় তার ক্ষতিপূরণের দাবি মেনে নিতে কিয়েভ রাজি হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, জেলেনস্কির কাছ থেকে অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট এ সংক্রান্ত লিখিত ডক্যুমেন্ট নিয়ে আসবেন বলে তিনি আশা করছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তার প্রশাসন যদি ইউক্রেনের কাছ থেকে অর্থ ফেরত আনার জন্য লিখিত চুক্তি না করে তাহলে তা বোকামি হিসেবে বিবেচিত হবে। বাইডেন প্রশাসন সে বোকামি করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ট্রাম্প বলেন, বাইডেন প্রশাসন কিয়েভকে ঋণ চুক্তি করে অর্থ বা অস্ত্র দেয়নি। ইউক্রেন থেকে যে কেউ ওয়াশিংটনে এসেছে তার হাতেই অর্থ তুলে দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তারা ইউক্রেনকে আহম্মকের মতো অর্থ সরবরাহ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ইউক্রেন যখন ধ্বংসপ্রায়, যুদ্ধবিরতি বা শান্তি এখনও দৃষ্টিসীমার বাইরে, ইউক্রেনের যখন পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন বন্ধু রাষ্ট্রের সাহায্য ঠিক তখন তার খনিজ সম্পদের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি খনিজ সম্পদ দখল করতেই ইউক্রেন ধ্বংসের অপেক্ষা করছিল যুক্তরাষ্ট্র? 

ছবি : সংগৃহীত

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ‘ধোঁকা’, প্রত্যাখ্যান আরব নেতাদের by হাসান ফেরদৌস

হোয়াইট হাউসে পাশাপাশি চেয়ারে বসে গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। বেশির ভাগ কথা ট্রাম্পই বলছিলেন, পাশে বিরস বদনে বসে বাদশাহ।

ট্রাম্পের ভাষ্য ছিল এমন, ‘গাজা আমাদের হবে। এলাকাটা তো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেব, তা ধরে রাখব, খুব যত্ন নেব।’

ঠিক কোন অধিকারে ট্রাম্প গাজার দখল নেবেন, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তোলা হলে তিনি জানান, ‘আমেরিকার নিজস্ব অধিকারে’। গাজায় কীভাবে আমেরিকার ‘নিজস্ব অধিকার’ বা ‘অথরিটি’ থাকে, তা বোঝা দুষ্কর। গাজার প্রায় ২৫ লাখ ফিলিস্তিনি কোথায় যাবে, তার উত্তর ট্রাম্প আগেই দিয়েছেন। তারা জর্ডান ও মিসরে যাবে, দরকার হলে অন্যান্য আরব দেশে চলে যাবে। যেখানেই যাক, তারা স্থায়ীভাবে চলে যাবে। তাদের জন্য চমৎকার আবাসনের ব্যবস্থা হবে। এত চমৎকার ব্যবস্থা হবে যে তাদের ফিরে আসার কোনো প্রয়োজনই হবে না।

ট্রাম্প কি কথাটা ভেবেচিন্তে বলছেন, না সবাইকে ‘ধোঁকা’ দিচ্ছেন?

মার্কিন থিঙ্কট্যাংক কার্নেগি এন্ডাউমেন্টের অন্যতম ভাষ্যকার এন্ড্রু লবের সৌদি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এটি আসলে ধোঁকা, যার উদ্দেশ্য ইসরায়েলের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা আদায় করে নেওয়া। যুক্তরাজ্যের থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউসও একই কথা বলেছে। তবে এই সংস্থার ভাষ্যকার আহম্মদ আবুদুহর মন্তব্য, ট্রাম্পের প্রস্তাব আলাপ-আলোচনার একটি কৌশল হোক বা না হোক, তা ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রশ্নে বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলেছে।

ট্রাম্পের মুখের ওপর বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ অবশ্য কোনো কঠিন কথা বলেননি। পরে সাংবাদিকদের নিজের অবস্থা খোলাসা করে জানান, জর্ডানের পক্ষে নতুন করে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু গ্রহণ সম্ভব নয়। গাজাবাসীকে নিজ বাসভূমে রেখেই তা পুনর্নির্মাণের একটি পরিকল্পনা তাঁদের রয়েছে।

ইসরায়েল অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের জর্ডানে ঠেলে দেওয়ার পক্ষে। ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের একটা বড় অংশ সে দেশে এসে আশ্রয় নেয়। তারা এখন জর্ডানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিকভাবে তারা এতটাই শক্তিশালী যে চাইলে শুধু ফিলিস্তিনি সমর্থন নিয়েই তারা সরকার গঠনে সক্ষম। বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ নিজ অস্তিত্বের স্বার্থেই তাঁর দেশে আর নতুন কোনো ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু চান না। ২০২৩ সালে তিনি বলেছিলেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের জর্ডানে ঠেলে পাঠানো কোনোভাবেই মানা হবে না। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য প্রকৃত “রেড লাইন’’।’ প্রভাবশালী পত্রিকা মিডল ইস্ট আই বলেছে, এই প্রশ্নে প্রয়োজনে যুদ্ধে যেতেও প্রস্তুত জর্ডান।

দীর্ঘদিন থেকেই জর্ডান মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে আমেরিকার কাছ থেকে দেশটি বার্ষিক দেড় বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য পেয়ে থাকে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশটির পক্ষে এই মার্কিন সাহায্য ছাড়া টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। মিসরকেও যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সমপরিমাণ সাহায্য দিয়ে থাকে। সে কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প দুদিন আগে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ না করলে সে সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া হবে। মঙ্গলবার অবশ্য মাথা নেড়ে বললেন, না তেমন কিছু হবে না। তিনি বলেন, ‘এমন করা আমাদের স্বভাবে নেই।’

অধিকাংশ দায়িত্বশীল মহলের মতে, গাজার ২৫ লাখ মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা অসম্ভব। জোরপূর্বক সে চেষ্টা হবে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত বিনাশ। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, এটি হবে সব আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

যতই হাস্যকর হোক, কথাটা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তাঁকে উপেক্ষা করা সহজ নয়। সবাই এখন তাকিয়ে আছে সৌদি যুবরাজ সালমান বিন মোহাম্মদ ট্রাম্পের প্রস্তাবে কী বলেন তা শোনার জন্য। সালমান নিজে মুখে তেমন কিছু না বললেও সে দেশের সরকার এককথায় ট্রাম্পের প্রস্তাব নাকচ করেছে। সৌদি শুরার অন্যতম সদস্য ইউসেফ বিন আল-সাআদুন ঠাট্টা করে বলেছেন, ট্রাম্প যদি চান তো সব ইসরায়েলিকে আলাস্কা বা চাইকি গ্রিনল্যান্ডেও পাঠাতে পারেন। সেটি হবে সবচেয়ে উত্তম সমাধান।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ও অনুগত দু-চারজন রিপাবলিকান নেতা ছাড়া ট্রাম্পের গাজা দখল নেওয়ার প্রস্তাব কেউ সমর্থন করেননি। গাজায় মার্কিন সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব তো কিছুতেই নয়। লন্ডনের টাইমস পত্রিকা জানিয়েছে, একজন ইসরায়েলি শিক্ষাবিদের প্রস্তাবের কথা জানার পর ট্রাম্প গাজা দখলের আজগুবি প্রস্তাব করেছেন। তবে ট্রাম্পের ভেতর মহলের কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প আসলে পুরোনো ধ্যানধারণার বদলে নতুন কিছু করতে চান। ৭০ বছর ধরে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে, কাজ হয়নি। তিনি এখন সবাইকে একটু ঝাঁকি দেওয়ার জন্য এমন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।

গাজা পুনর্গঠনে কি হবে

এই তথাকথিত ‘ঝাঁকি’ দিতে গিয়ে ট্রাম্প একটি সম্পূর্ণ বিপরীত ফল পেতে পারেন। কোনো কোনো পর্যবেক্ষক বলছেন, গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা আরব বিশ্বে প্রবল বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। এখন কোনো আরব সরকারই এমন কিছু করবে না, যা ফিলিস্তিনি স্বার্থের বিপক্ষে যায়। আম্মানভিত্তিক সাংবাদিক মোহাম্মদ বিন আল-আরাবিয়াত নিউ লাইনস ম্যাগাজিনে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে আরব দেশগুলো নতুন মূল্যায়ন শুরু করেছে। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। ট্রাম্পের গাজা প্রস্তাবের পর তিনি যুবরাজ সালমানসহ অন্য আরব নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে এক অভিন্ন আরব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা এই মতবিনিময়ের উদ্দেশ্য।

ওয়াশিংটনে বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে গাজা পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা তাঁরা তৈরি করেছেন। গাজাবাসীকে না সরিয়েই দু-তিন বছরের মধ্যে সেখানকার ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন নির্মাণ সম্পন্ন করা সম্ভব। গাজার উত্তরে এখন কার্যত কোনো ফিলিস্তিনি নেই, ফলে সেখান থেকে পুনর্গঠন শুরু হবে।

ভাষ্যকার আল-আরাবিয়াত বলেছেন, বছর দশেক আগে ‘আরব বসন্তের’ সংকটকালে এই অঞ্চলের আরব নেতারা একে অপরের ওপর সহযোগিতার মাধ্যমে সে সংকট থেকে উদ্ধার পান। এখন ইসরায়েলি হামলার মুখে ও বিরূপ মার্কিন নেতৃত্বের কারণে তাঁদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব নতুন করে গড়ে উঠেছে। এই সহযোগিতার একটি প্রকাশ দেখা যাচ্ছে আসাদ-উত্তর সিরিয়ায়। মিসরের আমন্ত্রণে ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ আরব দেশগুলোর একটি শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন চলছে, যেখানে সিরিয়ার নতুন নেতা আহমদ আল-শারার যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৈঠকের একটা লক্ষ্য হবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানের মুখে একটি পাল্টা কিন্তু অভিন্ন আরব অবস্থান প্রশ্নে মতৈক্য প্রতিষ্ঠা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

বিশ্বে স্বৈরাচার সরকারের যত গোপন বন্দিশালা

বিশ্বে অপরাধীদের আটকে রাখতে কারাগারের ব্যবস্থা থাকলেও অনেক দেশের সরকার, বিশেষ করে স্বৈরাচার সরকার গোপনে কিছু বন্দিশালা পরিচালনা করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে এমন গোপন বন্দিশালার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। এসব বন্দিশালায় ভিন্নমতের মানুষকে বিনা বিচারে আটকে রেখে নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। এমনকি বন্দীদের হত্যার ঘটনাও ঘটে। বিশ্বের এমন কয়েকটি গোপন বন্দিশালা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

আর্জেন্টিনার ইএসএমএ বন্দিশালা

১৯৭৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসাবেলা পেরন ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় স্বৈরশাসন চলেছে। আর এই সময়ের মধ্যে আর্জেন্টিনায় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ভিন্ন মতাবলম্বী, অধিকারকর্মী এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী মানুষের ওপর দমন–পীড়ন চলেছে। স্বৈরশাসনের একেবারে শুরুর দিকে বুয়েনস এইরেসে নেভি স্কুল অব মেকানিকস (ইএসএমএ) নামের একটি স্কুলকে গোপন বন্দিশালায় পরিণত করা হয়।

কুখ্যাত এই বন্দিশালায় বন্দীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হতো। অনেক বন্দীকে উড়োজাহাজে করে নিয়ে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। বন্দীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীরাও ছিলেন। বন্দিশালার ভেতরে একটি মাতৃত্বকালীন ওয়ার্ড ছিল। সেখানে বন্দী নারীরা সন্তান জন্ম দেওয়ামাত্রই নবজাতকদের তাঁদের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলা হতো। বন্দী মায়েদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। স্বৈরশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারগুলো এসব শিশুকে দত্তক নিত।

স্বৈরশাসন চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক নেতারা ওই বন্দিশালার নির্যাতন–নিপীড়নের তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করতেন। যেমন ১৯৭৯ সালে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা সেখানে পরিদর্শনে গেলে বন্দিশালার কর্মীরা সেখানকার বেজমেন্টের সিঁড়ি আড়াল করে ফেলেন। সিঁড়ির অস্তিত্ব আড়াল করতে তাঁরা একটি দেয়াল তৈরি করে দেন। ওই বেজমেন্টে বেশির ভাগ নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটত।

এই বন্দিশালায় পাঁচ হাজার মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের বেশির ভাগেরই আর হদিস পাওয়া যায়নি। মাত্র ২০০ জন জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছিলেন।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহতার স্মারক হিসেবে ২০০৭ সালে নির্যাতন কেন্দ্রটিকে জাদুঘর ঘোষণা করা হয়। সেখানে নির্যাতনের বিভিন্ন আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সিরিয়ার সেদনায়া কারাগার

গত বছরের ডিসেম্বরে সিরিয়ার সরকারবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো অভিযান চালিয়ে রাজধানী দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিদ্রোহীদের মাত্র ১২ দিনের অভিযানে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটে। তিনি দেশ ছেড়ে পালান। বিদ্রোহীদের এই অভিযানে নেতৃত্ব দেয় হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)। এরপর বাশার আল-আসাদের আমলে নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজে সিরীয় নাগরিকেরা দেশটির বিভিন্ন কারাগারে ভিড় জমাতে থাকেন। এর মধ্যে একটি কুখ্যাত কারাগার হলো সেদনায়া। কারাগারটি দামেস্কের উত্তরে অবস্থিত। বাশার আল-আসাদ সরকারের নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে আছে সেদনায়া।

আসাদ সরকারের পতনের পর বিদ্রোহীরা কারাগারটি থেকে বন্দীদের মুক্ত করেন। মাটির নিচেও কুখ্যাত বন্দিশালার পাঁচটি তলা তৈরি করা হয়েছিল। ছবিতে দেখা গেছে, কারাগারের বিভিন্ন কক্ষে বন্দীদের গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। ওই কারাগার থেকে বেশ কিছু মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসব মরদেহেও নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য বলছে, শুধু ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ হাজারের মতো বন্দীকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

চিলির বন্দিশালা

চিলির একনায়ক অগাস্তো পিনোশের শাসনামলে রাজনৈতিক বন্দীদের নৌবাহিনীর জাহাজ ও স্টেডিয়াম, বিভিন্ন কার্যালয় ভবন এবং থানায় আটক রাখা হতো। শুধু তা–ই নয়, সামরিক ঘাঁটি, বাজেয়াপ্ত বাড়ি এবং অবকাশযাপন কেন্দ্র—সবকিছুকেই আটক ও নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সব মিলে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পিনোশের শাসনামলে চিলিতে ১ হাজার ১৩০টির বেশি গোপন বন্দিশালা ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল। পিনোশের পর চিলির সরকার এসব বন্দিশালার কিছু কিছুকে স্মারক ও জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করে।

পিনোশের শাসনামলে কিছু বন্দিশালা গোপনে পরিচালিত হতো। বিভিন্ন অভিযানে আটক হওয়া মানুষকে এসব গোপন স্থানে রাখা হতো। আর এসব স্থানে মানুষকে চিরতরে গুম করে দেওয়ার কাজটি ছিল খুবই সহজ। পরবর্তী সময়ে এসব গোপন বন্দিশালা উন্মোচিত হতে থাকে। ২০০৪ সালে তৎকালীন চিলি সরকারের গঠিত কমিশন সাবেক বন্দীদের কাছ থেকে জবানবন্দি নেয়। নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবিত অবস্থায় বেঁচে ফেরা প্রায় ২৮ হাজার বন্দীর তথ্য তখন নিবন্ধন করা হয়েছিল। এরও কয়েক বছর আগে চিলির আরেক সরকার জানিয়েছিল, সামরিক শাসনামলে প্রায় তিন হাজার মানুষ হয় মারা গেছেন, নয়তো গুম হয়েছেন।

মিয়ানমারের সামরিক জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র

২০২১ সালে এক সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। জান্তা সরকার শুরু থেকেই ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রগুলোতে আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়। এসব নিপীড়নের মধ্যে আছে বৈদ্যুতিক শক, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে ফেলা, ভুক্তভোগীদের মুখে ফুটন্ত তরল বা রাসায়নিক দ্রবণ ঢেলে দেওয়া এবং গ্রেপ্তার হওয়া নারীদের ধর্ষণ করা।

ইরাবতীর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে যদিও এ ধরনের তথ্য বহির্বিশ্বের সামনে এসেছে।

সাদ্দামের বন্দিশালা

ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রে ইরাকি মিশনে একটি গোপন বন্দিশালা ছিল। ২০১৬ সালে দুই ইরাকি কর্মকর্তার বরাতে নিউইয়র্ক পোস্ট খবরটি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ভবনের বেজমেন্টে একটি বন্দিশালা গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে নির্যাতনের সরঞ্জাম রাখা ছিল। সাদ্দামের সহযোগীরা সে দেশে থাকা ভিন্ন মতের ইরাকিদের গোপন বন্দিশালায় ১৫ দিন পর্যন্ত আটক রাখতেন। কখনো কখনো বন্দীদের হত্যা করে শুল্কমুক্ত পণ্যের প্যাকেটে ভরে জাহাজে করে মরদেহ দেশে পাঠিয়ে দিতেন। সাদ্দামের এসব সহযোগী মুখবারাত নামে পরিচিত ছিলেন। বন্দিশালায় তামার তার, রাবারের পাইপ এবং কাঠের তক্তা ব্যবহার করে বিভিন্ন নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হতো। এ ছাড়া বন্দীদের নখ তুলে ফেলা হতো এবং বেধড়ক পেটানো হতো।

নিউইয়র্ক পোস্টকে সাক্ষাৎকার দেওয়া ওই দুই ইরাকি কর্মকর্তা বলেছিলেন, তাঁদের ধারণা, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলায় সাদ্দামের নাটকীয় পতনের পর ফেডারেল তদন্তকারীরা মিশনে তল্লাশি চালানোর সময় এ ধরনের নির্যাতনের সব প্রমাণ নষ্ট করে ফেলেছিলেন।

নিউইয়র্ক পোস্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বাঞ্চলীয় ইউরোপ ও আরব দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরাকি দূতাবাসে যেমন বন্দিশালা ছিল, তেমন বন্দিশালাই ছিল এটি।

সিরিয়ার সেদনায়া কারাগার
সিরিয়ার সেদনায়া কারাগার। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

অস্বাভাবিক বায়ুদূষণ থেকে বাঁচতে কী করবেন by আনিকা তায়্যিবা

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকেই ঢাকার বায়ুর মান ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে। ডিসেম্বরেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ বছরের জানুয়ারিতে বায়ুদূষণ আরও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়, যা আগের বারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি।

রাজধানীর পরিবেশকল্যাণবিষয়ক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দূষিত শহরের মধ্যে ছিল।

তবে এই পরিস্থিতেও বাইরে বের না হয়ে উপায় নেই। ব্যস্ত জীবনে কাজের সূত্রে বা কোনো প্রয়োজনে নিত্যদিন যদি আপনাকে ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে হয়, কিছু আগাম সতর্কতা মানতে ভুলবেন না। বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত সংস্থা আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশন কিছু সহজ ও কার্যকর উপায় বাতলে দিয়েছে। জেনে নিন সেসব।

১. প্রতিদিনের বায়ুদূষণের পূর্বাভাস দেখুন


বাইরে বের হওয়ার আগে আপনার এলাকায় দৈনিক বায়ুদূষণের পূর্বাভাস দেখে নিন। আইকিউএয়ারের ওয়েবসাইট থেকে সহজে তা দেখে নিতে পারবেন। পূর্বাভাস আপনাকে জানিয়ে দেবে বাতাস কখন স্বাস্থ্যকর নয়। এ ছাড়া বায়ুর মান সম্পর্কে তথ্য পেতে পত্রিকা, রেডিও ও টিভির আবহাওয়া প্রতিবেদনেও চোখ রাখতে পারেন।

২. দূষণ বেশি থাকলে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন

যখন বাতাসের মান অত্যধিক খারাপ থাকে, তখন বাইরে যাওয়া পারতপক্ষে এড়িয়ে চলুন। যদি জিমে যাওয়ার থাকে বা শপিং করার দরকার হয়, চেষ্টা করুন বাড়িতে বসে করা যায় কি না বা অনলাইনে কাজটি সারা যায় কি না। বিশেষ করে শিশুদেরও দূষিত বাতাসে বাইরে খেলাধুলা বা ঘুরতে দেওয়া থেকে বিরত রাখা উচিত। একান্ত যেতেই হলে মুখে মাস্ক পরুন।

৩. জ্বালানিচালিত যানবাহন ব্যবহার সীমিত করুন

নাগরিক হিসেবে যার যার জায়গা থেকে সচেতন থাকার চেষ্টা করুন। বায়ুদূষণ কমাতে হলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তাই এ সময় যতটা সম্ভব গাড়ির ব্যবহার সীমিত করুন। গণপরিবহন, যেমন বাস, রেল, মেট্রোরেল ব্যবহার করুন।

৪. কাঠ বা আবর্জনা পোড়ানো এড়িয়ে চলুন

জ্বালানির জন্য কাঠ বা আবর্জনা পোড়ানো অনেক অঞ্চলে বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি। শীতকালে আমাদের দেশে কাঠ পুড়িয়ে আগুন পোহানো হয়। এটি বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ বাড়ায়, যা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই যথাসম্ভব এটিও এড়িয়ে চলুন।

৫. ঘরের বাতাসের গুণগত মান নিশ্চিত করুন

শুধু বাইরেই নয়, ঘরের ভেতরের বায়ুমানও সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে বিভিন্ন বায়ু পরিশোধনকারী ইনডোর প্ল্যান্ট রাখতে পারেন। যেমন স্নেক প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট ইত্যাদি।

৬. সর্বোপরি সচেতনতা বৃদ্ধি করুন


দূষণ কমাতে ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সবারই দায়িত্ব আছে। সরকারের সব স্তরের নীতিনির্ধারক যেন এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়, তার জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে নিরাপদ পরিবেশ ও পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্র: আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশন

এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দূষিত শহরের মধ্যে ছিল
প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। তবে এ বছরের দূষণের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ধরনের বায়ুদূষণের রেকর্ড হয়েছে এবার। এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দূষিত শহরের মধ্যে ছিল। ছবি: আশরাফুল আলম

২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক সাংবাদিক হত্যা করেছে ইসরাইল

২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক  সাংবাদিক হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নিহত হয়েছেন ইসরাইলের হাতে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) বার্ষিক রিপোর্টে এ তথ্য জানানো হয়। বুধবার সিপিজে জানায়, গত বছর ১৮টি দেশে কমপক্ষে ১২৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, তিন দশকেরও বেশি সময় আগে থেকে এ বিষয়ে রেকর্ড রাখা শুরু করে তারা। তার পর থেকে  গত বছরই ছিলো সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক বছর। এর আগে সবচেয়ে মারাত্মক বছর ছিলো ২০০৭ সাল। ওই বছর ১১৩ জন সাংবাদিক হত্যা করা হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ নিহত হন ইরাকের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।  সিপিজের প্রধান জোডি গিন্সবার্গ বলেন, সিপিজের ইতিহাসে বর্তমান সময় সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। সিপিজের রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৪ সালে অন্তত ৮৫ জন সাংবাদিক ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮২ জনই ছিলেন ফিলিস্তিনি। এদিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ওই সকল হত্যা তদন্তে বাধা দেয়ার অভিযোগ করেছে সিপিজে। সাংবাদিকদের মৃত্যুতে তাদেরকেই দোষারোপ করা ও নিজেদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এতগুলো সংবাদকর্মী হত্যার দায়ে কোনো প্রকার পদক্ষেপ না নেয়ার মতো অভিযোগ এনেছে। সিপিজের ওই রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে আছে সুদান ও পাকিস্তান। দুটি দেশেই ৬ জন করে সাংবাদিক হত্যা করা হয়েছে।

ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২৪ জন সাংবাদিককে তাদের কাজের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ওই ২৪ সাংবাদিকের মধ্যে ১০ জন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হাতে গাজা ও লেবাননে নিহত হয়েছেন। বাকি ১৪ জন হাইতি, মেক্সিকো, মোজাম্বিক, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ইরাক, ইরান, সুদান ও ভারতে হত্যার শিকার হয়েছেন। ৪৩ জন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। যা গত বছরের মোট হিসাব থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৩১ জনই ফিলিস্তিনি। তারা গাজা থেকে রিপোর্ট করতেন। উল্লেখ্য, গাজায় আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে বার বার বাধাগ্রস্ত করে এসেছে ইসরাইলি বাহিনী। ফলশ্রুতিতে ফিলিস্তিনিরাই সেখান থেকে রিপোর্টিং করেন। ২০২৫ সালেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চলমান আছে। খান ইউনিসে  এ বছর ৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে ইসরাইল। এর মধ্যে আহমেদ আল-শায়াহ অন্যতম।

mzamin

ভালোবাসার গল্প

বিভিন্ন সময়ই নিখাদ ভালোবাসার গল্প আমরা শুনতে পাই। এমন কিছু ভালোবাসার গল্প রয়েছে আমাদের শোবিজেও। আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে ক’জন তারকার সেই ভালোবাসার গল্পই তুলে ধরা হলো।

ওমর সানী-মৌসুমী: ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা দম্পতি ওমর সানী ও মৌসুমী। সিনেমা করতে গিয়ে তাদের পরিচয় ও প্রেম। জুটি বেঁধে অনেক ছবিতে কাজ করেছেন তারা। ১৯৯৬ সালে বিয়ের পর্বটা সারেন তারা। তাদের ভালোবাসার ঘরে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের বিয়ে দিয়ে এরইমধ্যে শ্বশুর-শাশুড়িও হয়েছেন সানী-মৌসুমী।
জাহিদ হাসান-সাদিয়া ইসলাম মৌ: জাহিদ হাসান ও সাদিয়া ইসলাম মৌ একে-অন্যের কাজ খুব পছন্দ করতেন। একবার বিটিভি’র জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে দু’জনে একসঙ্গে প্রথমবার পারফর্ম করেন। অনুষ্ঠানটি প্রচারের পর আলোচিত হন জাহিদ ও মৌ। এক সময় একে-অপরের প্রতি ভালোবাসার জন্ম নেয়। সেই ভালোবাসা রূপ নেয় সুখের সংসারে। আজ সেই সংসারে রয়েছে দুই সন্তান।
তৌকীর আহমেদ-বিপাশা হায়াত: বিপাশা হায়াত তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদে পড়েন। তৌকীর আহমেদ তখন বুয়েটের শিক্ষার্থী। ঢাকার মঞ্চে চুটিয়ে অভিনয়ও করছিলেন। একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার এক বন্ধুর আমন্ত্রণে তিনি বেড়াতে যান। সেখানেই বিপাশার ছবি আঁকা দেখে মুগ্ধ হন। তখন পরিচয় ও পরবর্তীতে কয়েকবার দেখা হয়। ‘রূপনগর’ নাটকে কাজ করতে গিয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে তাদের। তৌকীরই প্রথম তার ভালোবাসার কথা জানান বিপাশাকে। গ্রহণ করেন বিপাশা। ১৯৯৯ সালের ২০শে জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার বিপাশা-তৌকীর দম্পতির।
মোশাররফ করিম-জুঁই করিম: অভিনেতা মোশাররফ করিম ও অভিনেত্রী জুঁই করিমের মধ্যে বিয়ে হয় ২০০৪ সালের ৭ই অক্টোবর। বিয়ের চার বছর আগে থেকে দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক। ঢাকার মালিবাগের চৌধুরীপাড়ায় মোশাররফের এক বন্ধুর একটি কোচিং সেন্টার ছিল। সেখানেই মূলত মোশাররফের সঙ্গে জুঁইয়ের প্রথম পরিচয়। এরপর ধীরে ধীরে একটা সময় মোশাররফ জুঁইকে জানান তার ভালো লাগার কথা। বর্তমানে এক ছেলে নিয়ে তাদের সুখের সংসার।

mzamin

নির্বাচনইস্যু: বিএনপি জামায়াত দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে

নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে এক সময়ের রাজনৈতিক দুই মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব আরও প্রকাশ্যে এসেছে। বিএনপি দ্রুত নির্বাচন আয়োজনে সরকারকে চাপ দিয়ে আসলেও জামায়াত এগোচ্ছে ভিন্ন কৌশলে। দলটি প্রয়োজনীয় ও অতি জরুরি সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে নির্বাচন চায়। এজন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে চায় সরকারকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও জামায়াত বিএনপি’র বিপরীত অবস্থানে। জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি কোনোভাবেই স্থানীয় নির্বাচন চায় না। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন হলে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া সংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে আসন নির্ধারণের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে দলটি। বিএনপি এই ব্যবস্থার বিপক্ষে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে গত রোববার বৈঠক করে বিএনপি। বৈঠকে ইসির নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান বিএনপি নেতারা। ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে ইসি কাজ করছে বলে বিএনপি নেতাদের জানানো হয়। বৈঠকের চারদিন পর জামায়াতের একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।  বৈঠকে প্রয়োজনীয় জাতীয় নির্বাচন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে তারা নির্বাচন চান। এ ছাড়া জনগণের আকাঙ্ক্ষা হলো  জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের আগে স্থানীয় নির্বাচন। জামায়াত এই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করে।

ওদিকে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, যত দ্রুত নির্বাচন ততই রাজনীতি সহজ হবে। বাংলাদেশ স্থিতিশীল হয়ে আসবে। ইসি’র সঙ্গে সাক্ষাতে জামায়াত সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন চেয়েছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ফখরুল বলেন, এটা (সংখ্যানুপাতিক ভোট) আমরা পুরোপুরি বিরোধী, একেবারে জোরালোভাবে বিরোধী। আনুপাতিকভাবে নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থাকে আমরা সমর্থন করবো না। কারণ এখানকার মানুষ এটাতে অভ্যস্ত না। এরকম ভোটের প্রশ্নই উঠতে পারে না।

স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থানের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান, এটাতেও আমরা একেবারেই একমত নই। এটা তো সমস্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশকে আরও ভঙ্গুর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছু না।

জাতীয় নির্বাচন কেন এখন জরুরি তার ব্যাখ্যাও দেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, নির্বাচনটা হওয়ার প্রধানত দুইটা কারণ। একটি হচ্ছে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে নিয়ে আসা আরেকটা হলো সুশাসন চালু করা। এখন তো সুশাসনের খুব সমস্যা হচ্ছে, এটি কার্যকর করলেই তখন দেখবেন অর্থনীতি ভালো হয়ে আসবে। একটা নির্বাচিত সরকার না হলে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন তো।

জরুরি সংস্কারের পর ভোট চায় জামায়াত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে জরুরি সংস্কারের পর ভোট, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি চালু এবং আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।  বৈঠক শেষে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই তথ্য জানিয়ে বলেন, নো ইলেকশন উইদাউট রিফর্মস। অন্তত নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান জড়িত সেগুলোর সংস্কার করেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। তা না হলে নির্বাচন নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। পূর্বের ৩টি নির্বাচনে জনগণ যে ভোট দিতে পারেনি, আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে; দুই হাজার ছাত্র-জনতার জীবন এবং ৩০ হাজার আহত ছাত্র-জনতার রক্ত বৃথা যাবে। এ জন্য আমরা বলেছি শুধু নির্বাচনপ্রক্রিয়া সুষ্ঠু করতে যেসব সংস্কার প্রয়োজন- করতে হবে, আমরা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের সংস্কারের কথা বলিনি। এখানে অনেকে ভুল বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, সংস্কার করতে গেলে সময় লাগে, এটা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করা। সেজন্য যে সংস্কারটুকু ন্যূনতম প্রয়োজন, তার জন্য যতটুকু সময় যৌক্তিক প্রয়োজন, জমায়াতে ইসলামী সে সময় দিতে প্রস্তুত। কোনো দিন, মাস, ক্ষণ বেঁধে দেয়নি জামায়াত।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হোক। আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন এবং সম্মান ব্যক্ত করছি। তিনি বলেন, ৩০০ আসনে নির্বাচন করার সক্ষমতা জামায়াত ইসলামীর আছে। আমরা প্রার্থী প্রস্তুত করে ফেলেছি। প্রাথমিকভাবে প্রার্থীও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর); আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হারের নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছি। বিশ্বের ৬০টি দেশে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পেশী শক্তির প্রভাবমুক্ত রেখে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই পদ্ধতিটি উপযোগী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে ৯১ (এ) অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবিও করা হযেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নিবন্ধন আইনে কঠিন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এ কঠিন শর্ত পূরণ করে (নিবন্ধন করা) রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এ আইনটা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা বাতিল করতে হবে। দল ও রাজনীতি করার অধিকার সবার।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে জামায়াতের প্রতিনিধিদলে ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ, প্রকাশনা ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট জসিমউদ্দিন সরকার, মজলিশে শূরার সদস্য এডভোকেট ইউসূফ আলী, মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট কামাল উদ্দিন। অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন, চার নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবদুর রহমানেল মাসুদ, তাহমিদা আহমদ ও আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং ইসি সচিব আখতার আহমেদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

mzamin