Thursday, November 20, 2025

চীনের সাবমেরিন পাচ্ছে পাকিস্তান: ভারতের আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ

উত্তর ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় ভারতীয় নৌবাহিনী নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই প্রবণতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ভারতের বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির অধীনে আটটি অত্যাধুনিক হাঙ্গর শ্রেণির ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন পেতে যাচ্ছে। এই নতুন নৌবহর পাকিস্তানের সামুদ্রিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। একই সঙ্গে উত্তর ভারত মহাসাগরে ভারতের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হবে। এ খবর দিয়ে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য নির্ধারিত হাঙ্গর শ্রেণির (টাইপ ০৩৯এ ইউয়ান-ক্লাস) সাবমেরিনগুলো এয়ার-ইনডিপেনডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) প্রযুক্তি সমৃদ্ধ। পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের বিপরীতে ডিজেলচালিত সাবমেরিনগুলিকে নিয়মিতভাবে ভেসে উঠে ব্যাটারি রিচার্জ করতে হয়। কিন্তু হাঙ্গরের মতো এআইপি-সজ্জিত সাবমেরিনগুলো ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ পানির নিচে টানা অবস্থান করতে পারে। যা তাদের গোপনে চলাচল ও আন্ডারওয়াটার কমব্যাট সক্ষমতাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই সাবমেরিনগুলো পাকিস্তান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হলে ভারতের সামুদ্রিক আধিপত্য সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই এআইপি-সজ্জিত সাবমেরিনগুলো প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পারমাণবিক সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতেও সক্ষম। আধুনিক ডিজেল-ইলেকট্রিক আক্রমণ সাবমেরিনগুলো ৫৩৩ মিমি টর্পেডো টিউব অথবা উন্নত নকশায় যুক্ত অতিরিক্ত ভার্টিকাল লঞ্চ সেল থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন এই সক্ষমতা পূরণ করে এবং উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হলে দীর্ঘ পাল্লার হামলাতেও সক্ষম হতে পারে, যদিও এটি সফল ইন্টিগ্রেশনের ওপর নির্ভরশীল।

২০১৭ সালে পাকিস্তান বাবর-৩ নামের পারমাণবিক সক্ষম সাবমেরিন-লঞ্চড ক্রুজ মিসাইল (এসএলসিএম) পরীক্ষা করে। প্রযুক্তিগতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র হাঙ্গর সাবমেরিনে যুক্ত করা সম্ভব, যা পাকিস্তানের পারমাণবিক ত্রিমাত্রিক সক্ষমতার তৃতীয় ধাপটিও পূরণ করতে পারে। এখনো এটি অনুমান হলেও, হাঙ্গর সাবমেরিন হাতে আসার পর এ সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর এই রূপান্তর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে বাধ্য। উত্তর ভারত মহাসাগরে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাব এবার চাপে পড়তে পারে। ভারতীয় নৌবাহিনী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নৌ-আধুনিকায়নের জন্য বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রজেক্ট ৭৫-আই-এর অধীনে দেশীয়ভাবে আরও ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন নির্মাণ- মোট ছয়টি সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলোতে দেশেই বিকশিত এআইপি প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে, যা পানির নিচে দীর্ঘসময় থাকার সক্ষমতা দেবে।

২০১৯ সালে ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (ডিএসি) প্রজেক্ট ৭৫ অনুমোদন করে। সেখানে ভারতীয় সরকারি ও বেসরকারি শিপইয়ার্ড বিদেশি সাবমেরিন নির্মাতাদের সঙ্গে যৌথভাবে আধুনিক এআইপি-সজ্জিত সাবমেরিন বানাতে পারবে। তবে প্রকল্পটি নানা জটিলতা, বিদেশি যন্ত্রাংশ নির্মাতার অনীহা ও প্রযুক্তি-হস্তান্তর সমস্যায় ধীরগতির হয়েছে। বর্তমানে সরকারি মালিকানাধীন মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (এমএসএল) একমাত্র প্রতিযোগী, যারা জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমসের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণে আগ্রহী।

যদিও ভারত নিজস্ব এআইপি প্রযুক্তি তৈরি করেছে, কিন্তু আইএনএস খান্দেরি-তে এআইপি বসানোর সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে। সমুদ্র পরীক্ষা শুরু হতে পারে ২০২৭ সালের মার্চ বা এপ্রিলের আগে নয়, এবং পুরো সমুদ্র ট্রায়াল শেষ হয়ে কার্যকর হতে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের আগে সম্ভব নয়। আবারও দেরি হলে সময়সীমা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে ১৯টি সক্রিয় সাবমেরিন আছে। ১৬টি ডিজেলচালিত এবং ৩টি পারমাণবিক শক্তিচালিত। বেশিরভাগ ডিজেল সাবমেরিনই বার্ধক্যে প্রবেশ করেছে। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৪টি সাবমেরিন বানানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এখনো মাত্র ছয়টি স্করপিন-ক্লাস সাবমেরিন যুক্ত হয়েছে। তিনটি পারমাণবিক সাবমেরিন চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। এর একটি আবার রাশিয়া থেকে লিজ নেয়া। আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য ধরে রাখতে সাবমেরিন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো বৃহৎ নৌবহরের বিরুদ্ধে সাশ্রয়ী প্রতিরোধ তৈরি করে এবং কৌশলগত জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

ভারতের সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। বর্তমানে ৫৪টি নৌযান বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নৌবহর ২০০ জাহাজ-সাবমেরিনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে এবং ‘বিল্ডারস নেভি’ হিসেবে নিজেকে রূপান্তর করতে চায় ভারত। কিন্তু ধীরগতির দেশীয় উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা এবং পুরোনো প্ল্যাটফর্মগুলো এসব পরিকল্পনাকে ব্যাহত করছে। পাকিস্তান যখন চীনের হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন পাচ্ছে, তখন ভারতের উত্তর ভারত মহাসাগরে নৌ-প্রাধান্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। অতীতেও ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে ভারতীয় নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটি শক্তিশালী পাকিস্তানি নৌবাহিনী ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও বদলে যাওয়া সামুদ্রিক হুমকির কারণে ভারতের এখন এমন সাবমেরিনে জোর দেয়া উচিত, যেগুলো দীর্ঘসময় পানির নিচে থাকতে পারে। সাবমেরিনের পাশাপাশি সি-ড্রোনও ভারতের জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে। উভয়ই বিমানবাহী রণতরী বা ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় সস্তা, দ্রুত তৈরি করা যায়। তবে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রতিরক্ষা মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সবচেয়ে কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।

mzamin

জনসেবকের ঢল নেমেছে পথে by মহিউদ্দিন আহমদ

সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখা যাচ্ছে কি? যাঁরা দেশ চালান, তাঁদের কথা শুনলে মনে হয়, সব ঠিকঠাক চলছে। পত্রিকার পাতা ওলটালে ভয়ংকর সব খবর পাই।

একদল হুমকি দিচ্ছে—তাদের কথামতো না চললে তারা দেশটা অচল করে দেবে। আরেক দল হম্বিতম্বি করছে—দেশটা তাদের; সুতরাং তাদের কথাই চূড়ান্ত। এদিকে অন্য একটি দল ঘোঁট পাকাচ্ছে—কিছুই হতে দেবে না। তারা গোলমাল পাকিয়ে সব গুবলেট করে দিতে চাচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশে তৈরি হয়েছে একটি অস্থির অবস্থা, একটি যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব।

আমাদের দেশের বয়স প্রায় ৫৫। প্রথম বছর গেল গোলার আওয়াজ আর বারুদের গন্ধে। তার পর থেকে সময়ের যে রেখাচিত্র দেখছি, তা কখনো সরলরেখায় চলেনি। কিছুদিন শান্তি তো তারপরই শুরু হয়ে যায় অশান্তি। মানুষ স্বস্তিতে ও নিরাপদে থাকতে চান। তাঁদের চাহিদা খুব অল্প; কিন্তু কিছু লোক সেটি কিছুতেই হতে দেবে না।

ফুটবল খেলায় দুই পক্ষে জোর লড়াই হয়। সেখানে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ডিঙিয়ে বল নিয়ে ছুটে যায় গোলমুখে। গোল দিতে দুই পক্ষই মরিয়া। ভালো খেলে বল প্রতিপক্ষের জালে ঢোকাতে না পারলে বা গোল থেকে নিজের জাল বাঁচাতে অনেক সময় প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয়। ফাউল খেলে। সেটি দেখভাল করার জন্য আছেন রেফারি। কেউ কেউ রেফারিকেও মানে না। উল্টো তর্জনগর্জন করে রেফারিকে ভয় দেখায়। এমনকি তার ওপর হামলা করতেও কসুর করে না। আমাদের রাজনীতির মাঠে এই ফাউল খেলা যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একেক সময় মনে হয়, খেলা না হলেই ভালো।

আমাদের দেশে একটি শব্দ বেশ মুখরোচক—গণতন্ত্র। আমরা সবাই এটা চাই। বইয়ে পড়েছি, গণতন্ত্রের জন্ম প্রাচীন গ্রিসে। সেখানে ছিল ছোট ছোট নগররাষ্ট্র। সেসব রাষ্ট্রে ছোট একটি অভিজাত শ্রেণি দরবার বসিয়ে সিদ্ধান্ত নিত। আধুনিক যুগে এটি আর সম্ভব নয়। এখন দেশে কোটি কোটি মানুষ। তাঁরা একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সেটি অসম্ভব। তাহলে উপায়?

এ থেকেই উদ্ভব হয়েছে প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেখানে জনপ্রতিনিধিরা মিলে একটি সরকার গঠন করেন। তাঁরা রাষ্ট্র চালান। অনুমান করে নেওয়া হয়, প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটে। এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, জন-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ও জনপ্রতিনিধিদের অঙ্গীকার।

ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার ফারাক আছে। সমাজের সব অংশের চাহিদা একরকম নয়। কিছু আছে পরিপূরক; কিছু আছে সাংঘর্ষিক। এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি সহজ নয়। এ কাজটি করতে হয় জনপ্রতিনিধিদের তথা সরকারকে। সরকারকে ভাবতে হয়—সবার সব চাহিদা পূরণ করা না গেলেও তাঁদের একটি অংশের ক্ষতি করে যেন অন্যরা লাভবান না হয়। এ কাজটি অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন বা যাঁদের চাওয়ার অনেকটাই পূরণ হয় না, তাঁরা সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন মানুষ তাঁদের প্রতিনিধি বদলান। একজনের জায়গায় আরেকজনকে আনেন। প্রতিনিধি মনোনয়ন এবং প্রয়োজনে বদলে ফেলার সবচেয়ে পরীক্ষিত পদ্ধতি হচ্ছে ‘নির্বাচন’। আমরা তাই নির্বাচনে আস্থা রাখতে চাই।

কিন্তু আমাদের আস্থায় চিড় ধরেছে। কারণ, প্রতিনিধিত্বের প্রতিযোগিতায় অনেকেই ফাউল খেলেন। তাঁরা জবরদস্তি করে প্রতিনিধি হতে চান। নির্বাচনব্যবস্থাকে তাঁরা তাঁদের সুবিধা অনুযায়ী সাজান কিংবা তাতে হস্তক্ষেপ করেন। এখানে জনমত নয়, কিছু লোকের ব্যক্তিগত অভিলাষই মুখ্য।

সরকারব্যবস্থাটি এমন যে সেখানে আছে ক্ষমতা। কাজ করতে গেলে তো ক্ষমতা লাগবেই। এখানে কাজের ব্যাপারে দায়িত্ববোধ গৌণ হয়ে যায়। মুখ্য হয়ে পড়ে ক্ষমতার চর্চা। এই ক্ষমতালিপ্সার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। একশ্রেণির লোকের লাগামহীন ক্ষমতাচর্চা আমাদের এক অন্ধকার গুহার ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে মানুষের সামনে হাজির হন। মানুষ খুব ক্ষুধার্ত। একটি সুন্দর জীবনের জন্য যে উপকরণগুলো লাগে, সেটি হাতের নাগালে না থাকায় মানুষ মুখরোচক প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়েন। তাঁরা ভুল লোককে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। একসময় এসে তাঁদের মনে হয়, তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। মুশকিল হলো, পরের নির্বাচনে প্রতিনিধি বদল করতে গিয়ে তাঁরা দেখেন—যিনি বিকল্প, তিনিও এর আগে ঠকিয়েছেন। মানুষ যাবে কোথায়?

আমরা এমন একটি ফাঁদে পড়েছি। বের হতে পারছি না। যতই ছোটাছুটি করি, ফাঁদের গেরো ততই শক্ত হয়। প্রশ্ন হলো, এমনটাই কি চলতে থাকবে? কত দিন চলবে?

তাহলে কি ভালো মানুষ নেই? আছে; কিন্তু তাঁদের ‘জনসেবক’ হওয়ার গুণ নেই। সেবক হতে হলে অনেক টাকা লাগে, অনেক ক্ষমতা লাগে। একটি দিয়ে আরেকটি হয়। সাধারণ মানুষ পারতপক্ষে অন্যের কাছে সেবা চাইতে যান না। তাঁরা চান তাঁদের জীবনযাপনের মধ্যে অন্য কেউ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়; কিন্তু সেটি হচ্ছে না। ‘জনসেবকেরা’ পণ করেছেন, তাঁরা সেবা দেবেনই। এখানে সাধারণ মানুষের কোনো সম্মতির দরকার নেই।

জনসেবকদের মধ্যে আবার আড়াআড়ি আছে। সবাইকে এক ছাতার তলায় আনা যায় না। তাই আলাদা আলাদা ছাতা, আলাদা আলাদা গোষ্ঠী। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা এগুলোকে বলি রাজনৈতিক দল। জনসেবকদের মধ্যে দলাদলি আছে। তাঁরা সবাই সেবা দিতে চান। নিজেদের মধ্যে হুড়াহুড়ি করেন। দরকার হলে দাঙ্গা বাধিয়ে দেন।

মানুষ কেন এসব দলের ফাঁদে পড়েন? আসলে এসব দলের জনসেবকেরা তো আসমান থেকে টুপ করে পড়েননি! তাঁরা এ দেশের মানুষের মধ্য থেকেই গজিয়েছেন। এ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই তাঁরা জন্মেছেন। যেদিন তাঁরা জনসেবক হওয়ার দীক্ষা নিয়েছেন, সেদিন থেকেই তাঁরা হয়ে উঠেছেন বিশিষ্ট। তাঁদের পেশি ফুলে উঠেছে, কণ্ঠস্বর চড়া হয়েছে, গর্দান পুরু হয়েছে, মধ্যপ্রদেশ স্ফীত হয়েছে, চামড়া হয়েছে মোটা। পকেট হয়েছে ভারী।

জনসেবক চেনার কয়েকটি সহজ উপায় আছে। তাঁদের পোশাক আলাদা। তাঁরা গায়ে–গতরে একটা কিছু চাপিয়ে নিজেদের ‘ভিনগ্রহের বাসিন্দা’ হিসেবে দেখেন। তাঁরা ভাবেন, দেশের মানুষ অজ্ঞ, বোকা, নিজের ভালো বোঝে না। তাদের সচেতন করতে হবে। জনসেবকেরা বেশি জানেন, বেশি বোঝেন, মানুষকে হেদায়েত করার নৈতিক দায় তাঁদের ওপর বর্তেছে। এটা তাঁরা দায়িত্ব মনে করেন। এই দায়িত্ব মানুষ তাঁদের না দিলে কী হবে, তাঁরা তো তাঁদের দায়িত্বে অবহেলা করতে পারেন না!

জনসেবকেরা যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান, তাঁর আশপাশে ও পেছনে থাকেন গুচ্ছের লোক। তাঁরা অনেকেই দেখতে বেশ নাদুসনুদুস। অনেক দিন দুধ-ঘি খেয়ে শরীরে জেল্লা এসেছে। তাঁরা মুখে মুখে ছড়া আউড়ে যান, ‘অমুক ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সঙ্গে।’ তো সেই ‘ভাই’ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন, তিনি অনুগত-অনুসারীদের সম্বোধন করে বলেন—বন্ধুগণ! আসলে তিনি তাঁদের বন্ধু নন, চাকরবাকর মনে করেন। কারণ, তিনি জানেন, ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না।

এখন দিন পাল্টেছে, ভাই-বেরাদররা আর ভাতে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের দিতে হয় মোটা ভাতা, সঙ্গে নিদেনপক্ষে একটি মোটরবাইক। নেতা যখন হুডখোলা গাড়িতে রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে চলেন, তাঁর আগেপিছে সারি সারি মোটরবাইকে চলে বরকন্দাজের দল। যার মোটরবাইকের বহর যত বড়, তাঁর জোর তত বেশি, নেতৃত্বের সিঁড়িতে তাঁর অবস্থান তত উঁচুতে। সাধারণ মানুষ থেকে উঠে আসা নেতা তখন হয়ে ওঠেন অসাধারণ। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে মোটরসাইকেলের বিক্রি বেড়ে যায়।

শুনতে পাচ্ছি, শিগগিরই নাকি একটি নির্বাচন হবে। সময় আছে ১০ সপ্তাহের মতো। এর মধ্যেই জনসেবকের ঢল নেমেছে পথে।

* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জনসেবকের ঢল নেমেছে পথে

নাইজেরিয়ায় যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বিপজ্জনক জুয়া by লিওন হাডার

আবার শুরু। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাইজেরিয়ায় সামরিক শক্তি মোতায়েন করার সর্বশেষ হুমকি ওয়াশিংটনের চিরন্তন বিভ্রান্তির আরেকটি অধ্যায় উপস্থাপন করছে। সেটা হলো আমেরিকান শক্তি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা একটি জটিল সমাজকেও পুনর্গঠন করতে পারে।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, মার্কিন স্বার্থ রক্ষা বা গণতন্ত্রের বিকাশ—যে যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, সেটি অতিপরিচিত চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি মাত্র। আমরা সেটি ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে আগেও দেখেছি। এসব গল্পের মূল জমিনটা কখনোই বদলায় না। প্রথমে সামরিক সাফল্য, এরপর সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অনিচ্ছাকৃত পরিণতি এবং শেষমেশ বিশৃঙ্খলভাবে মার্কিনদের পিছু হটা।

নাইজেরিয়ার জনসংখ্যা ২২ কোটি। এটি আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সবচেয়ে জনবহুল দেশ। মুসলিম–অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চল এবং খ্রিষ্টান–অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চল জাতিগত উত্তেজনায় গভীরভাবে বিভক্ত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইসলামপন্থী বিদ্রোহ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেশটিতে রয়েছে। সারা দেশে দুর্নীতি মহামারির রূপ নিয়েছে। এই জটিল ও অস্থিতিশীল একটি দেশে ট্রাম্প মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব করেছেন। তাঁর এ প্রস্তাব ঠিকঠাক বলেই মনে হচ্ছে?

বাস্তবসম্মত মূল্যায়নটা এখানে স্পষ্ট—নাইজেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি কোনো হুমকি নয়। সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার মতো নাইজেরিয়ায় যেসব সমস্যা ওয়াশিংটন অনুভব করছে, তার কোনোটিই সামরিক হস্তক্ষেপকে যৌক্তিক করে না। বোকো হারাম বিদ্রোহ, যতই ট্র্যাজিক হোক না কেন, সেটা একটি আঞ্চলিক সমস্যা, মার্কিন সমস্যা নয়।

এ ছাড়া বাস্তব বাধাগুলোও অত্যন্ত জটিল। নাইজেরিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও রাজনৈতিক জটিলতা—সব মিলিয়ে দেশটি ইরাক বা আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো আঞ্চলিক শক্তিও এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করবে। আফ্রিকান ইউনিয়নও নিন্দা করবে। তাহলে আর কোন কৌশলগত লাভটা এখানে থেকে থাকতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ যুক্তি হতে পারে, আমরা যদি না করি, তাহলে অন্য কেউ কেউ শূন্যস্থান পূরণ করবে। সম্ভবত চীন বা রাশিয়া। এই জিরো সাম চিন্তাপদ্ধতি এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে যে প্রতিটি বৈশ্বিক সমস্যায় মার্কিন সমাধান প্রয়োজন নয়। নাইজেরিয়ার চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে হবে আফ্রিকার আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমর্থনে নাইজেরিয়ানদের নিজস্ব উপায়ে।

আমেরিকা যখন নিজস্ব আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নাইজেরিয়ায় সামরিক শক্তি মোতায়েনের অর্থনৈতিক ব্যয়ও ভয়াবহ হবে। যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া—দুই দেশের মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও হবে অসীম। আর রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আফ্রিকা ও বৈশ্বিক দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি ক্ষয় পাবে। কয়েক দশকের দ্বিচারিতার কারণে এমনিতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ভাবমূর্তি এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ট্রাম্পের এই হুমকি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিদলীয় অবাস্তব চিন্তার ধারাবাহিকতারই বহিঃপ্রকাশ। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—কেউই এটা বুঝতে, শিখতে সক্ষম নয় যে সামরিক শক্তি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কোনো একটি দেশ নির্মাণের প্রকল্প কখনো কাজ করে না, যখন সেই দেশ নিজেই চায় না যে বিদেশিরা সেটা গড়ে তুলুক।

পরিহাসটা কিন্তু গভীর। একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি ‘অনন্ত যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন, এখন তিনি পশ্চিম আফ্রিকায় নতুন যুদ্ধের কথা ভাবছেন। ট্রাম্পের এই হুমকির পেছনে নাইজেরিয়া যতটা তার চেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মঞ্চে শক্তি প্রদর্শন করা, দেশের সমস্যা থেকে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরানো এবং সমর্থকগোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করা।

যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে নাইজেরিয়ার যা দরকার, সেটা সামরিক হস্তক্ষেপ নয়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও এমন কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, যা দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ওয়াশিংটনের উচিত আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করা, আফ্রিকানদের নেতৃত্বে পরিচালিত সমাধানগুলোকে সমর্থন দেওয়া এবং মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা।

ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে সেরা কাজটা হবে নাইজেরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ব৵র্থ সামরিক অভিযানে যুক্ত করার প্রলোভন থেকে সরে আসা। কিন্তু এর জন্য দরকার প্রজ্ঞা, সংযম এবং মার্কিন স্বার্থ ও সামর্থ্যের বাস্তব মূল্যায়ন। এই গুণগুলো ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের মধ্যে বরাবরই অনুপস্থিত।

বাস্তবসম্মত অবস্থান এখানে স্পষ্ট, সেটা হলো দূরে থাকুন। নাইজেরিয়ার সমস্যার সমাধান নাইজেরিয়ার নাগরিকদের করতে দিন। মার্কিন সম্পদকে প্রকৃত নিরাপত্তা-হুমকির মোকাবিলায় ব্যয় করুন। এই বিভ্রান্তি ত্যাগ করুন যে বিশ্বের প্রতিটি সংকটেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।

লিওন হাডার, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধে আর্থিক সংকটে এয়ার ইন্ডিয়া: চীনের আকাশসীমা ব্যবহার করতে সরকারের কাছে লবিং

ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য পাকিস্তান তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ায় বাড়তি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এয়ার ইন্ডিয়া। এই অবস্থায় রুট ছোট করার লক্ষ্যে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের সংবেদনশীল সামরিক আকাশসীমা ব্যবহার করার অনুমতি আদায় করতে ভারত সরকারকে চাপ দিচ্ছে এয়ারলাইনটি। কোম্পানির একটি নথিকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এয়ার ইন্ডিয়া তার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন ও ইমেজ উদ্ধার করার চেষ্টা করছে। কারণ গত জুনে গুজরাটে লন্ডনগামী একটি বোয়িং ড্রিমলাইনার বিধ্বস্ত হয়ে ২৬০ জন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে গিয়ে কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে বাতিল করতেও হয়। কিন্তু তাতে জটিলতা বেড়ে যায় পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে।

গত এপ্রিলের শেষ দিকে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার পর পাকিস্তান ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশপথ বন্ধ করে দেয়। রয়টার্স পর্যালোচনা করা অক্টোবরে ভারতীয় কর্মকর্তাদের দেয়া নথিতে দেখা গেছে, পাকিস্তানের আকাশপথ বন্ধ থাকায় এয়ার ইন্ডিয়ার জ্বালানি ব্যয় কিছু রুটে ২৯ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে গেছে এবং যাত্রাসময় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য ভারত সরকার চীনকে অনুরোধ জানাক, যাতে এয়ার ইন্ডিয়া শিনজিয়াংয়ের হোটান, কাশগর ও উরুমচি দিয়ে বিকল্প রুট এবং জরুরি বিচ্যুতির ক্ষেত্রে বিমানবন্দর ব্যবহারের অনুমতি পেতে পারে।

নথিতে আরও বলা হয়, এয়ার ইন্ডিয়ার লং-হল নেটওয়ার্ক কঠিন অপারেশনাল ও আর্থিক চাপে রয়েছে। হোটান রুট নিশ্চিত করা একটি কৌশলগত বিকল্প হবে। টাটা গ্রুপ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়া অনুমান করেছে যে, পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে বার্ষিক কর-পূর্ব লাভে ৪৫৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের মোট ক্ষতি ছিল ৪৩৯ মিলিয়ন ডলার। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে কিছু জানে না এবং প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া ও ভারত, চীন ও পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ- কেউই রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। এয়ার ইন্ডিয়া চীনের যে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চাইছে, সেই অঞ্চলটি ২০,০০০ ফুট (৬,১০০ মিটার) উঁচু পর্বতমালায় ঘেরা। ডিকমপ্রেশন ঘটলে জরুরি অবতরণের সুযোগ কম থাকায় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো সাধারণত এ পথ এড়িয়ে চলে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আকাশসীমা চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটার কম্যান্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন। সেখানে রয়েছে ব্যাপক মিসাইল, ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এখানকার কিছু বিমানবন্দর বেসামরিক ও সামরিক উভয় ব্যবহারের জন্য যৌথভাবে পরিচালিত হয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (পেন্টাগন)-এর ডিসেম্বরের রিপোর্টে বলা হয়, এই কম্যান্ডের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ভারত-চীন সংঘাত হলে সে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। এছাড়া উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক ড্যামিয়েন সাইমন জানান, সম্প্রতি চীন হোটান বিমানঘাঁটি আরও সম্প্রসারণ করেছে।

mzamin

নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলেই গ্রেপ্তার হবে: মামদানি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক সফরে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছেন শহরটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মামদানি এ ঘোষণা দিয়েছেন।

এমন সময় মামদানি এ মন্তব্য করলেন, যখন ইসরায়েল সফররত নিউইয়র্কের বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুকে মামদানির শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এরিক অ্যাডামসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এবিসি৭-এ সরাসরি সম্প্রচার অনুষ্ঠানে যোগ দেন মামদানি। এ সময় তিনি নিউইয়র্ক শহরকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের শহর’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখানে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল থাকবে। ওই পরোয়ানায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে গাজার বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা এবং যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ক্ষুধাকে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি যে আমি বিশ্বাস করি, এটি আন্তর্জাতিক আইনের শহর। আন্তর্জাতিক আইনের শহর হওয়ার মানে সেই আইনকে রক্ষা করা। আর তার মানে হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রাখা। সেটি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য হোক কিংবা ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য।’

মেয়র নির্বাচনে জয়ের আগে গত অক্টোবর মাসে ফক্স নিউজের দ্য স্টোরি অনুষ্ঠানে মার্থা ম্যাককালামের সঙ্গে আলাপচারিতায় মামদানি বলেছিলেন, আইনগত অনুমতি থাকলে তিনি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করবেন। তিনি বলেন, নিউইয়র্ক এ ধরনের ‘নীতিকে সমুন্নত ও সংরক্ষণ করতে চায়’।

মামদানি বলেন, নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে তিনি কোনো নতুন আইনের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এ সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নই। আমি এমন একজন, যে বিদ্যমান আইনের মধ্যেই থাকতে চায়। তাই আমি নিজে থেকে কোনো আইন বানাব না। বরং বিদ্যমান আইনের ভেতরে থেকে সব ধরনের আইনগত সম্ভাবনা খুঁজে দেখব।’ উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়।

এদিকে সিবিএসের খবরে বলা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের সময় ‘ট্রানজিশন’ দলের খরচের জন্য সমর্থকদের কাছে অনুদান চেয়েছেন মামদানি। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি এ অনুদান চান। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত তাঁর প্রচারণা দল খরচের জন্য ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ করতে পেরেছে। তবে তাদের আরও ৪০ লাখ ডলার প্রয়োজন।

নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: এএফপি

মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হাসিনা

ডনের সম্পাদকীয়ঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ একসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। গত বছর গণবিক্ষোভের সময় তার সরকারের কর্তৃত্বমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডন এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলেছে। এতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের বাইরে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি রায়ের বিষয়ে বলেছেন, এটি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘প্রস্তুতিপ্রসূত ট্রাইব্যুনালের’ সিদ্ধান্ত। কঠোর রায় দেয়া ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার শাসনামলে এই আদালত তার বেশ কিছু প্রতিপক্ষকে, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ ও বিএনপি’র নেতা ও কর্মীদের, ১৯৭১ সালের সহিংসতায় জড়িত থাকার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তখন অনেকেই এই বিচার প্রক্রিয়াকে অনৈতিক ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করেছিলেন। এখন শেখ হাসিনা নিজেই সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিকার হয়ে গেছেন।

যদিও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু এ বিষয়ে বিতর্ক কম যে, শেখ হাসিনার শাসন ক্রমবর্ধমানভাবে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল। তার আশেপাশের নিকটজনদের সমৃদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিপক্ষদের করা হয়েছে হেনস্থা। গণতান্ত্রিক নীতিমালা উপেক্ষিত হয়ে, শেখ হাসিনা, তার পিতা শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের চারপাশে একটি ব্যক্তিগত রাজনীতি গড়ে তোলেন।

শেখ হাসিনার কঠোর শাসন গত বছরের গণরোষে বিস্ফোরিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতন এবং ভারতের স্বেচ্ছানির্বাসে পাথেয় হয়। স্পষ্ট যে, ২০২৪ সালের অস্থিরতায় তার সরকার প্রতিবাদকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে; নিজে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমরা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি।’ এ বছরের শুরুতে তার দলও নিষিদ্ধ হয়, আর তার প্রয়াত পিতা, যিনি একসময় ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে সম্মানিত ছিলেন, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ের পরও, দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। শেখ হাসিনার শাসনের সময় যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, তা প্রতিবাদ দমন এবং বিরোধী দলের ওপর অব্যাহত আক্রমণে প্রতিহত হয়েছে। আজ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মুখোমুখি। আগামী বছর নির্বাচন হবে, এবং অস্থায়ী কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃস্থাপন করতে হবে। নির্বাচন যাতে বিশ্বাসযোগ্য হয়, সেজন্য আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়ার বিষয় ভাবতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের নির্বাচন, যা বিরোধীরা বয়কট করেছিল, যা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল, তা নিরপেক্ষ বিবেচিত হয়নি। এটি তার সরকারের পতনের মূল কারণগুলির একটি। তাই পরবর্তী নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন, যাতে প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে।

যারা অপরাধে দায়ী তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে প্রক্রিয়া যদি প্রতিশোধমূলক হয়, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তি দিয়ে, তাহলে তা কেবল অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। পরিপক্ব রাষ্ট্রগুলো বিচারের দাবি এবং পুনর্মিলনের প্রয়োজনের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রক্ষা করে।

ন্যায্যবিচার ও ক্ষতিপূরণ অপরিহার্য
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টঃ বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘বাংলাদেশে হাসিনার কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ক্ষোভ ও বেদনা রয়েছে। তবে সব আইনগত প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হতে হবে। হাসিনার শাসনামলে যারা ভয়ঙ্কর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদেরকে ন্যায্য ও স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে দায়ী করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনার সরকারের অধীনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের জন্য স্বচ্ছ, স্বাধীন ও ন্যায্য বিচার ও ক্ষতিপূরণ অপরিহার্য। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আসামিদের অধিকার রক্ষা করা উচিত। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের তিন সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ ও দমন কর্মকাণ্ডে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন। যারা নির্যাতনের জন্য দায়ী তাদের দায়ী করা উচিত। কিন্তু প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোপুরি আসামিপক্ষের প্রতিনিধিত্ব উপস্থাপনের সুযোগ না দেয়া, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসা করার অধিকার এবং নিজের নির্বাচিত আইনজীবী দ্বারা প্রতিনিধিত্বের অধিকার।

মৃত্যুদণ্ডের কারণে বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, জোরপূর্বক নিখোঁজ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনসহ হাসিনার সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

mzamin

যুদ্ধবিরতির এক মাস পরও গাজার সুড়ঙ্গগুলোয় কেন আটকে আছেন হামাস যোদ্ধারা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে এ উপত্যকার দক্ষিণের শহর রাফাহর ‘ধ্বংসস্তূপের’ নিচে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।

যুদ্ধবিরতির প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রাফাহর বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে আছেন অনেক হামাস যোদ্ধা। সুড়ঙ্গের ভেতরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা কক্ষে অবস্থান করছেন তাঁরা।

কোনোভাবেই যাতে গাজা যুদ্ধবিরতি ভেঙে না পড়ে, সে জন্য একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন মধ্যস্থতাকারীরা। কিন্তু সুড়ঙ্গে আটকা পড়া হামাস যোদ্ধাদের বিষয়টি এ প্রচেষ্টাকে জটিলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

যুদ্ধবিরতির পর গাজা মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সদস্যদের প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত সীমারেখা ‘ইয়েলো লাইন’–এর পূর্ব দিকের এলাকাগুলো এখনো ইসরায়েলের দখলে। রাফাহও এ অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। আর পশ্চিমে হামাস আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।

গাজার ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অংশে আটকে থাকা প্রায় ২০০ হামাস যোদ্ধার ভবিষ্যৎ কী হবে—এ প্রশ্ন এখন আর শুধু সামরিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সংকটে। এর সুস্পষ্ট কোনো সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাস পরও সুড়ঙ্গের ছোট ছোট কক্ষের সঠিক সংখ্যা বা অবস্থান নির্ধারণ করা যায়নি। এ সময়ে হামাস যোদ্ধারা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো নিজেদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত করেছেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি সুড়ঙ্গগুলো থেকে হামাস যোদ্ধাদের বের হওয়ার কিংবা হামাস–নিয়ন্ত্রিত গাজায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেবেন না। অন্যদিকে হামাস বলেছে, তাদের যোদ্ধারা কখনো আত্মসমর্পণ করবেন না কিংবা অস্ত্রও জমা দেবেন না।

দুই ইসরায়েলি সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে কার্যকর সমাধানের দিকে এগোতে চাপ দিচ্ছে। মার্কিন দূত ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও চলতি সপ্তাহে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটি সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের দিকে এগোতে চায়।

যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী গঠন, হামাসকে নিরস্ত্র করা ও আরও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বিষয়েই একাধিক দেশের সঙ্গে বড় পরিসরে আলোচনা করা প্রয়োজন। গাজার সুড়ঙ্গে বেশ কিছু হামাস যোদ্ধার আটকে থাকার বিষয়টি এ জটিল কূটনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আরেকটি সূত্র বলেছে, একপর্যায়ে এ যোদ্ধাদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এমনটা ঘটেনি।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় রাফাহর ‘বন্দী’দের মুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন খবর বারবার অস্বীকার করেছে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে বন্দী মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেননি। এ–সংক্রান্ত কোনো সমঝোতাও হয়নি।’

এর আগে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গাজা বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ শেহাদা বলেছিলেন, কোনো সমাধান না হওয়ায় সুড়ঙ্গের এ কক্ষগুলো বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে। হামাস যোদ্ধাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার ও পানি নেই। ফলে তাঁদের জন্য মাত্র দুটি পথ খোলা আছে। হয় লড়াই করা, নয়তো আত্মসমর্পণ। হামাস যোদ্ধারা নিজেরাই জানেন না, সুড়ঙ্গগুলোয় এখন কতজন জীবিত আছেন।

বিষয়টি যুদ্ধবিরতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হামাসের কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এ সুড়ঙ্গ কক্ষগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার জন্য দায়ী। প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল পাল্টা হামলা করেছে। ফলে দুবার যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।

রাফাহতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর গত ১৯ অক্টোবর ইসরায়েল সেখানে ভয়াবহ হামলা চালায়। এ হামলায় কমপক্ষে ৪৪ ফিলিস্তিনি নিহত হন। প্রায় এক সপ্তাহ পর ওই এলাকায় আরও এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। ইসরায়েল পাল্টা হামলা চালায়। নিহত হন শতাধিক ফিলিস্তিনি।

গাজা যুদ্ধবিরতির প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের মাঝামাঝি এসে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ইসরায়েল বা হামাস—কেউই নিজেদের অবস্থান বদলাতে রাজি নয়।

গতকাল রোববার হামাসের সামরিক শাখা আল কাসাম ব্রিগেড এক বিবৃতিতে বলেছে, শত্রুর কাছে ঘেরাও হওয়া বা আত্মসমর্পণ বলে কোনো শব্দ তাদের কাছে নেই। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্থতাকারীদেরই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

এরই মধ্যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূগর্ভস্থ এসব কক্ষে অভিযান চালাচ্ছে। গত বুধবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুবার আইডিএফ জানায়, তারা ‘ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ধ্বংসের’ অভিযানে গিয়ে ইসরায়েল-অধিকৃত এলাকায় ‘চারজন সশস্ত্র যোদ্ধাকে’ শনাক্ত করে ও গুলি চালায়।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, এসব অভিযান যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। চুক্তিতে গাজার সামরিক ও সুড়ঙ্গ অবকাঠামো ধ্বংসের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু হামাসের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

নেতানিয়াহু এরই মধ্যে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে রয়েছেন। কেউ চাইছেন না এমন কোনো চুক্তি হোক, যা সুড়ঙ্গে থাকা হামাস যোদ্ধাদের নিরাপদে হামাস–নিয়ন্ত্রিত গাজায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেবে।

ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান বলেছেন, ‘যারা যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি সেনাদের হত্যা করেছেন, তাঁদের জন্য দুটি পথই খোলা আছে—আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যাওয়া অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া।’

এমন রাজনৈতিক চাপের ফলে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার বাস্তবসম্মত পথ নেতানিয়াহুর জন্য সীমিত হয়ে যাচ্ছে। কারণ, কিছুটা ছাড় দিলেই তিনি সমালোচনার মুখে পড়বেন। বলা হতে পারে যে তিনি হামাসের কাছে নতি স্বীকার করেছেন।

মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাসের এসব যোদ্ধা অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলে তাঁদের সাধারণ ক্ষমা করা যেতে পারে।

সুড়ঙ্গে অবস্থানরত হামাস যোদ্ধাদের বিষয়টি হয়তো পুরো যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেবে না। তবে মধ্যস্থতাকারীদের জন্য এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ বাধা অতিক্রম করেই তাদের যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে হবে।

হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালে গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে ইউরোপীয় হাসপাতালের নিচ দিয়ে তৈরি করা একটি সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসছেন ইসরায়েলি সেনারা। ৮ জুন, ২০২৫
হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালে গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে ইউরোপীয় হাসপাতালের নিচ দিয়ে তৈরি করা একটি সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসছেন ইসরায়েলি সেনারা। ৮ জুন, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরদের কাজ কি শুধু ভাইভা নেওয়া by তাসনিম ফারিহা

দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে, হবে শোনাও যাচ্ছে। তবে কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার। যেমন ডেপুটি গভর্নরদের যোগ্যতা, কাজের পরিধি, জবাবদিহি ইত্যাদি।

অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরদের মুখ্য কাজ হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এন্ট্রি লেভেলের পদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া। সেটি ক্যাশ অফিসার, অফিসার ও সিনিয়র অফিসার—যে পদেরই ভাইভা হোক, সে ভাইভা বোর্ডে তাঁদের থাকা চাই–ই চাই। ডেপুটি গভর্নরের নিচের পদের কারও সভাপতিত্বে ভাইভাগুলো নিতে চাইলে তাঁরা বিরাগভাজন হন।

সকাল-বিকেল প্রতি বেলা ভাইভার জন্য একটা সম্মানী থাকে। সেটির সুবিধাভোগী তাঁরা হন। এ ছাড়া ভাইভায় নম্বর দেওয়া, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও কেউ কেউ প্রভাব খাটান বলে অভিযোগ শোনা যায়।

বিশ্বের আর একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখান, যাঁদের দ্বিতীয় প্রধান নির্বাহী বছরের বেশির ভাগ দিনের একটা বড় অংশ ভাইভা নিয়ে কাটান, তা–ও এন্ট্রি লেভেলের পদের। এ মুহূর্তে ২০২২ সালভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারসহ আরও কিছু পদের ভাইভা চলছে। চলবে সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে এবং বেলা ৩টা থেকে দুই বেলা করে। প্রতি বেলায় চলবে অন্তত ৩–৪ ঘণ্টা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির আওতায় সারা বছর এমন কোনো না কোনো পদের ভাইভা চলতেই থাকে। কখনো একসঙ্গে দুই–তিনটা–ও চলে। প্রতিটি ভাইভা বোর্ড হয় ডেপুটি গভর্নরের সভাপতিত্বে। একাধিক ভাইভা চলমান থাকলে তাঁরা বন্ধের দিন, অফিস সময়ের আগে ও পরে এমনকি রাত পর্যন্তও ভাইভা নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকে দৈনন্দিন রুটিন কাজের অংশ হিসেবে এমন অনেক কিছু বিভাগীয় প্রধান (পরিচালক) এমনকি নির্বাহী পরিচালকের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে, যা শুধু ডেপুটি গভর্নর অনুমোদন করতে পারেন। আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি তো আছেই, সামান্য একটা সভার নাশতা, প্রিন্টার কেনা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদোন্নতি, বদলি সবকিছুই তাঁদের অধীনে। কিন্তু তাঁরা ব্যস্ত থাকেন ভাইভা নিয়ে।

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, এ সময়কালে দেশের অর্থনীতির জন্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কেস, ফাইলও দিনের পর দিন তাঁদের টেবিলে পড়ে থাকে; কারণ, তাঁরা ভাইভায় ব্যস্ত। এ কারণে আজকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ, হাই প্রোফাইল বিষয়াদি সন্ধ্যার পর পাস হবে, এটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। সারা দিন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে অনেক কাজ আটকে থাকে। সন্ধ্যার পর শুরু হয় ছোটাছুটি।

নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাইভা বোর্ডে ডেপুটি গভর্নরদের এই একচ্ছত্র প্রভাবের অবসান হোক।

* তাসনিম ফারিহা, ব্যাংকার; মিরপুর, ঢাকা
- মতামত লেখকের নিজস্ব

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরদের কাজ কি শুধু ভাইভা নেওয়া