Monday, February 10, 2014

মোদি-রাহুল বাগযুদ্ধ

রাহুল গান্ধী -নরেন্দ্র মোদি
নরেন্দ্র মোদি তাঁর খাসতালুকে রাহুল গান্ধীর তোলা প্রশ্নের উত্তর দিলেন কংগ্রেসের খাসতালুকে দাঁড়িয়ে। ভারতের সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রতিন্দ্বন্দ্বী দুই দলের রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ কী রকম হতে চলেছে, গতকাল শনিবার বিভিন্ন জনসভায় রাহুল ও মোদির ভাষণে তার একটা ঝলক দেখা গেল। নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটে গিয়ে কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী গতকাল সরাসরি প্রশ্ন তুললেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর সর্দার প্যাটেলের বন্দনার যৌক্তিকতা নিয়ে। আজীবন কংগ্রেস করা ‘লৌহপুরুষ’ সর্দার প্যাটেলের ৫৯৭ ফুট উঁচু মূর্তি তৈরি নিয়ে মোদি যেভাবে প্রচার শুরু করেছেন, তাতে বিস্ময় প্রকাশ করে রাহুল বলেন, মহাত্মা গান্ধী ও সর্দার প্যাটেল কংগ্রেস দলের আদর্শ ঠিক করে দিয়েছিলেন। বিজেপি সেই আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে দেশকে বিপথে পরিচালিত করছে। রাহুল বলেন, আরএসএস গান্ধীকে হত্যা করার পর সর্দার প্যাটেল ওই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন।
আদর্শহীন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী এখন সেই প্যাটেলের মূর্তি গড়ে ভাঁওতাবাজি করছেন। রাহুলের এই আক্রমণের জবাব মোদি দেন দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে আসামে। গুয়াহাটিতে তিনি বলেন, কংগ্রেসের মনটাই শুধু ছোট নয়, তাদের চিন্তাভাবনা, তাদের দৃষ্টিশক্তিও ছোট হয়ে গেছে। ৬০ বছরেও তারা প্যাটেলকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পারেনি। প্যাটেল আমাদের কাছে নিছক কোনো দলীয় নেতা নন, তিনি রাষ্ট্রনেতা। গুজরাটে লোকসভার আসনসংখ্যা ২৬, আসামসহ গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ২৫টি। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে এই ৫১টি আসনের মধ্যে ২৫টি পেয়েছিল কংগ্রেস, বিজেপি পেয়েছিল ১৯টি। গুজরাটে বিজেপি ও কংগ্রেসের ভাগে পড়েছিল যথাক্রমে ১৫ ও ১১টি আসন। এবার প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী গুজরাটে কংগ্রেসকে যেমন নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর, তেমনই আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দলের আসন বাড়াতে সচেষ্ট। উত্তর-পূর্বের আট রাজ্যের মধ্যে শুধু আসামে বিজেপির রয়েছে চারটি আসন। কংগ্রেসের ঝুলিতে আসামের সাতটির সঙ্গে রয়েছে অন্য রাজ্যের আরও সাতটি। প্রধান এই দুই দলের রাজনৈতিক লক্ষ্য তাই অন্যকে হীনবল করে যতটা সম্ভব আসন জিতে নেওয়া। সেই লক্ষ্যে শনিবার দুই প্রধান নেতা দুই দলকে আক্রমণ করেছেন তাঁদের নিজেদের ঢংয়ে।

তাঁর সঙ্গে চলে গেল ক্লাল্লাম ভাষাও!

হাজেল স্যাম্পসন
যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী ক্লাল্লাম ভাষা ছিল তাঁর মাতৃভাষা। এই ভাষায় কথা বলা শেষ মানুষও তিনি। গত মঙ্গলবার ১০৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ওই নারীর নাম হাজেল স্যাম্পসন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০০টি আদিবাসী ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সম্প্রতি সরকার দেশটির বিলুপ্তপ্রায় ক্লাল্লাম ভাষা রক্ষায় উদ্যোগ নেয়। এই ভাষা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী সালিশ ভাষা গোষ্ঠী থেকে। উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং প্রতিবেশী দক্ষিণ-পশ্চিম কানাডায় এই ভাষার চল আছে। চারটি আদিবাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা এই ভাষায় কথা বলে। ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি তারা এই ভাষা ব্যবহার করে। এসব গোষ্ঠী হলো—কানাডার বিচার বে ক্লাল্লাম, যুক্তরাষ্ট্রের জেমসটাউন এস’ ক্লাল্লাম,
পোর্ট গ্যামবল এস’ ক্লাল্লাম ও লোয়ার এলওয়া ক্লাল্লাম। শেষোক্ত তিনটি আদিবাসী গোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা প্রায় এক হাজার ৭০০। অবশ্য বেশির ভাগ মানুষই ইংরেজির পর এটাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবেও ব্যবহার করে না। লোয়ার এলওয়া ক্লাল্লাম গোষ্ঠীটির নারী হাজেল স্যাম্পসন ছিলেন ব্যতিক্রমী। ক্লাল্লামই ছিল তাঁর প্রধান ভাষা। ক্লাল্লামকে মাতৃভাষা হিসেবে গণ্য করা মানুষের মধ্যে স্যাম্পসনই ছিলেন শেষ। স্যাম্পসনের জন্ম ১৯১০ সালের ২৬ মে, সিয়াটল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে জেমসটাউনে। তিনি ছিলেন লর্ড জেমস বালচের নাতনি। এডওয়ার্ডের সি স্যাম্পসনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। জেমসটাউন এস’ ক্লাল্লাম উপজাতির চেয়ারম্যান রন অ্যালেন বলেন, ‘আমরা একজন প্রবীণ মানুষকে হারালাম, যিনি এস’ ক্লাল্লাম গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ভাষাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রেখেছিলেন।’ দ্য ইনডিপেনডেন্ট।

দুর্নীতির মামলায় আদালতে স্পেনের রাজকুমারী

প্রিন্সেস ক্রিস্টিনা
কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোসের ছোট মেয়ে রাজকুমারী ক্রিস্টিনার বিরুদ্ধে একটি মামলা চলছে। সেই মামলায় তিনি গতকাল শনিবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
১৯৭৫ সালে স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর পতন এবং স্পেনের রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর এই প্রথম রাজপরিবারের কাউকে কোনো অপরাধের ঘটনায় আদালতে হাজির হতে হলো। ক্রিস্টিনা ও তাঁর স্বামী ইনাকি উরদানগারিন যৌথভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা জনগণের ৬০ লাখ ইউরো আত্মসাৎ করেছেন। রয়টার্স।

দুই দশক পর বসনিয়া অশান্ত

দুই দশক আগে শেষ হওয়া যুদ্ধের পর এই প্রথমবারের মতো এতো বড় আকারের অস্থিতিশীলতার কবলে পড়ল বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। আর সরকার বিরোধী সেই অস্থিরতার আগুনে পুড়ছে অসংখ্য সরকারি ভবন আর নানা স্থাপনা। এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ এই বিক্ষোভ সামলাতে বসনিয়ার পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। মূলত কঠিন অর্থনৈতিক অবস্থা এবং বেকারত্বের প্রেক্ষাপটে জ্বলে ওঠা বিক্ষোভে আর হামলায় গত তিন দিনে শত শত মানুষ আহত হয়েছে। শুধু রাজধানী সারায়েভো নয়, বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে তুজলা, মোস্তার ও জেনিচা শহরেও। উত্তরের শহর তুজলায় বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় সরকারের ভবনগুলোতে আগুন দিয়েছে। তাদের বিক্ষোভের মুখে হতভম্ব হয়ে পড়ে সেখানকার পুলিশ। এই সপ্তাহের শুরুর দিকে তুজলায় বিক্ষোভ শুরু হয়।
মূলত স্থানীয় জনসাধারণের বড় কর্মক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন কারখানা বিক্রি ও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এখানকার মানুষ। সেই বিক্ষোভ বেশ দ্রুতই অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে বিক্ষোভকারীরা। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত যে যুদ্ধ এখানে হয়েছিল তারপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখ সরে গিয়েছিল বসনিয়ার ওপর থেকে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চাহিদাগুলোর দিক থেকে সরকারের চোখও সরে যায়। এখানকার প্রশাসনে সাম্প্রদায়িক বিভক্তি বেশ প্রকট এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বেশ চরমে। দেশটির আর্থিক অবস্থা এমনই খারাপ যে প্রতি দশজনে চারজন এখানে বেকার। বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় দুটি অংশ যার একদিকে রয়েছে বসনীয়-ক্রোয়াট ফেডারেশন অফ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং অন্যদিকে রয়েছে বসনীয় সার্ব রিপাবলিক বা রিপাবলিকা স স্পকা। দুই অংশের আলাদা প্রেসিডেন্ট, সরকার, সংসদ, পুলিশ এবং পৃথক কর্তৃপক্ষ রয়েছে। বেশ জটিল প্রশাসনিক কাঠামো এবং তীব্র বিভেদ একদিকে রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে, আর অপরদিকে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্নীতির মুখে ফেলেছে।

পুনর্জন্ম উৎসব

কিউবার রাজধানী হাভানার নিকটবর্তী পাচেনঞ্চো গ্রামে ৫ ফ্রেব্রুয়ারি পালিত হয় ‘বোজি’ উৎসব। এ উৎসবটি ‘পাচেনঞ্চোর সমাধি’ নামে পরিচিত। ‘পুনর্জন্মের প্রতীক’ ১৯৮৪ সাল থেকে পাচেনঞ্চো গ্রামে এ অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। গ্রামবাসীরা এ দিনটিতে যন্ত্রানুষঙ্গিত বাজায়।
বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে জীবিত মানুষটিকে একটি কবরে সমাহিত করেন, তাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রথানুসারে আর সমাহিত স্বামীর পত্নীকেও বিধবার বেশ ধরতে হয়। এরপর মৃত (নকল) মানুষটির মুখে রাম (মদ) ঢেলে তাকে আবার বর্তমান জীবনে ফিরিয়ে আনেন। গ্রামবাসীদের মতে ‘টা চ্যালেঞ্জিং জীবনের প্রতি একটা সম্মান’

আফগানিস্তানে তালেবানের প্রভাব আর নেই

নাজেস আফরোজ
নাজেস আফরোজের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে, ১৯৫৮ সালে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর এক বছর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। ১৯৮১ সালে কলকাতার দৈনিক আজকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে বিবিসি বাংলা বিভাগে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ শুরু করেন প্রযোজক হিসেবে। ২০০৬ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ডের সাউথ এশিয়া ব্যুরোর এক্সিকিউটিভ এডিটর হন। ২০১১-১২-তে তিনি এডিটর ইন্টারন্যাশনাল অপারেশন্স-এর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন।
নাজেস আফরোজ একজন আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞ।
প্রথম আলো  আপনি তো দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তানে যাওয়া-আসা করেছেন এবং সাংবাদিক হিসেবে সে দেশের খোঁজখবর রাখেন। দেশটির অবস্থা এখন কেমন?
নাজেস আফরোজ  ২০০১ সালে তালেবানের পতনের পর আফগানিস্তানের যে চেহারা ছিল, এখন তার সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাত।
প্রথম আলো  ভালো না খারাপ?
নাজেস আফরোজ  অনেক ভালো। ২০০২ সালে গোটা কাবুল শহরের যে ভগ্নদশা ছিল, আজকে সেই জায়গাগুলো ঘুরেফিরে দেখলে শহরটাকে চেনাই যায় না। জমির দাম, বাড়িভাড়া অনেক বেড়েছে। অবশ্য এর একটা কারণ, অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও সেখানে কাজ করছে, প্রচুর বিদেশি লোক থাকে। এসব কারণে একটা ফলস ইকোনমি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটাকে যদি বাদও দিই, তবু কাবুলের অনেক উন্নতি হয়েছে। শুধু কাবুল নয়, আমি হেরাত, মাজারে শরিফ, জালালাবাদ, কান্দাহার—যেখানেই গেছি, সবখানেই অনেক উন্নতি চোখে পড়েছে।
কাবুল শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে একটা ছোট্ট গঞ্জমতো আছে চারিকার নামে। চারিকার মানে চৌরাস্তা, চারটি প্রধান সড়ক সেখানে মিলিত হয়েছে। ২০০৩ সালে সেই চারিকারে দেখেছিলাম খুব দীন দশা, দু-চারটি দোকানপাট ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। প্রায় ১০ বছর বাদে আমি আবার সেই চারিকারে গেলাম। দেখলাম, গমগম করছে প্রাণবন্ত একটা শহর। বোঝা গেল যে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দেখতে পাবেন। চাষবাস হচ্ছে।
প্রথম আলো  নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন?
নাজেস আফরোজ  নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, এ কারণে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সেটার প্রতিফলন একদমই চোখে পড়ে না। কারণ, তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী, জঙ্গিগোষ্ঠী আক্রমণ চালায় সরকারি লোকজন ও স্থাপনার ওপর এবং বিদেশিদের ওপর। সাধারণ মানুষ তাদের আক্রমণের শিকার হয় না। সেই কারণে নিরাপত্তার উদ্বেগটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান নয়।
প্রথম আলো  কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তানের যে চিত্র পাই, সেটা তো একেবারেই উল্টো।
নাজেস আফরোজ  আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করতে যাঁরা আফগানিস্তানে যান, তাঁদের বেশির ভাগই ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ। গায়ের রঙেই তাঁদের আলাদা করে চেনা যায়। তাঁদের যাতায়াতের ওপর অনেক বিধিনিষেধ থাকে, তাঁদের প্রতিষ্ঠানই সেটা তাঁদের নিরাপত্তার স্বার্থে করে। আমি নিজেও বিবিসিতে কাজ করার সময় সেটা দেখেছি। তাঁরা যদি রাস্তাঘাটে না বেরোন, গ্রামগঞ্জে না যান, তাহলে প্রকৃত চিত্রটা পাবেন কী করে? সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পড়ছে না, সেটা তো তাঁদের দেখতে হবে। বছর দেড়েক আগে আমি আমার আফগান বন্ধু-সহকর্মীর বাড়িতে গিয়ে থেকেছি—মাজারে শরিফে। সেখান থেকে একটা ছোট্ট ভাঙা গাড়িতে করে বাল্ক শহর পর্যন্ত গেছি, সেখানে রাস্তার মধ্যে ছবি তুলেছি। আমার সহকর্মীরা গাড়িতে করে মাজারে শরিফ চলে যায়, ১২ ঘণ্টা লাগে। অবশ্য কান্দাহারের সড়কটা নিরাপদ নয়; এ রকম আরও কিছু রাস্তা আছে, যেগুলো নিরাপদ নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে যাঁরা লেখেন, তাঁদের সিংহভাগই পশ্চিমা; সেখানে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কাটা খুব বেশি। সেই শঙ্কা তাঁদের লেখালেখিতে প্রতিফলিত হয়।
প্রথম আলো  আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোর সেনাবাহিনী এ বছর চলে গেলে দেশটিতে আবার তালেবান ফিরে আসতে পারে বলে উদ্বেগের খবর আমরা পাই। আপনার কী মনে হয়?
নাজেস আফরোজ  তিন ধরনের সম্ভাবনা আছে। একটা হচ্ছে, এই সরকারের পতন ঘটবে, তালেবান ক্ষমতা নিয়ে নেবে। দুই নম্বর হচ্ছে, আলোচনা হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিন নম্বর হচ্ছে, একটা মাঝামাঝি অবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, একটা সরকার থাকবে এবং মাঝারি থেকে নিম্ন মাত্রায় বিদ্রোহ চলতে থাকবে। আমার ধারণা, এই শেষের সম্ভাবনাটাই বেশি।
প্রথম আলো  সে অবস্থায় বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা কেমন হতে পারে? বিশেষত পাকিস্তানের?
নাজেস আফরোজ  আফগানরা মনে করে, পাকিস্তানের ভূমিকা নেতিবাচক; তাদের কাছে পাকিস্তানের প্রভাব, তাদের উপস্থিতি কাম্য নয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত পর্যন্ত, গোত্রনির্বিশেষে আফগানিস্তানের সব মানুষ এটা মনে করে। আর পাকিস্তান যে আফগানিস্তানে প্রভাব রাখতে চায়, সেটা খুব পরিষ্কার। পাকিস্তান খোলাখুলি সেটা বলেছেও। পাকিস্তানের আশঙ্কা হচ্ছে, আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব খুব বেশি। ভারত খুব বুদ্ধি করে সেখানে প্রভাব বাড়িয়েছে। ভারত আফগানিস্তানের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় দাতাদেশ। ভারত আফগানিস্তানকে দুই বিলিয়ন ডলার দিয়েছে; রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল বানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বানিয়ে দিচ্ছে, চিশত শহরের কাছে একটা বড় হাইড্রোইলেকট্রিক বাঁধ তৈরি করছে। আফগান পার্লামেন্টের নতুন ভবন তৈরির পুরো ব্যয় দিয়েছে ভারতীয় সরকার। এখন আফগান সরকার ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চাইছে। এটা পাকিস্তানকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। আর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে তার সেনাবাহিনী, যার অনেক বড় বড় অফিসার একাত্তর সালকে ভুলতে পারেননি। এমনিতেই পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা আছে, কাশ্মীর নিয়ে তারা কিছু করতে পারেনি। এর ওপর আফগানিস্তানে যদি ভারতের প্রভাব বাড়ে এবং সামরিক সহযোগিতাও যুক্ত হয়—এটা নিয়ে তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন।
প্রথম আলো  আমেরিকার ভূমিকাও তো নেতিবাচক হতে পারে। কারণ, আমরা দেখেছি, আফগান সরকারকে এড়িয়ে তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
নাজেস আফরোজ  আমার ধারণা, আমেরিকানরা খুব ভেবেচিন্তে তালেবানের সঙ্গে কথা বলেছে, তা নয়। আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধ আমেরিকার জনগণের কাছে ভীষণ অজনপ্রিয় হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো অত সেনা মারা না গেলেও গত ১২ বছরে চার-পাঁচ হাজার সেনা মারা গেছে, আট-দশ হাজার আহত হয়েছে, প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৮ সাল থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। ফলে, এ প্রশ্ন আমেরিকার ভেতরেই উঠছে যে আমরা ওখানে কী করছি? আবার সব ছেড়েছুড়ে চলেও যেতে পারছে না, কারণ তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আফগানিস্তানে তারা একটা স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করে দিয়ে যাবে। সে জন্য তারা সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে একটা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সম্প্রতি তারা কাতারে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আমেরিকানরা আশা করেছিল, তালেবান অন্তত তিনটি জিনিস করবে: আফগানিস্তানে যে সংবিধান তৈরি করা হয়েছে, সেটি মেনে নেবে, হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে স্বীকৃতি দেবে এবং তালেবান বলবে যে আফগানিস্তানের ভূমিতে তারা কোনো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে জায়গা দেবে না। কিন্তু তালেবান এই তিনটির কোনোটিতেই রাজি হয়নি। সে জন্য আমেরিকার সঙ্গে তালেবানের আলোচনা ভেঙে গেছে।
প্রথম আলো  সামাজিক দিক থেকে আফগানিস্তানে গত ১০-১২ বছরে আপনি কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?
নাজেস আফরোজ  পরিবর্তন হচ্ছে খুব ধীরে। কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। যারা লেখাপড়া করছে, তাদের মধ্যে নতুন ভাবনাচিন্তা আছে। প্রায় ৫০ লাখ আফগান বহু বছর শরণার্থী হিসেবে অন্যান্য দেশে বাস করেছে, তারা এখন ফিরে আসছে। কিছু নতুন ভাবনা তারাও নিয়ে আসছে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে, তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মেয়ে। হেরাত খুবই ছোট শহর, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মেয়ে। আফগানিস্তানে আট-দশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে বেশ কয়েকটা। কাবুল শহরে কারদান ইউনিভার্সিটি নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাদের অনেকে পেশাজীবী; সারা দিন কাজ করে, রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করে। ফলে, সামাজিক দিক থেকেও পরিবর্তন আসছে।
প্রথম আলো  সমাজে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তালেবানের প্রভাব কেমন?
নাজেস আফরোজ  ১৯৯৪ সালের দিকে তালেবান যখন আসে, যখন জনগণ তাদের সমর্থন করেছিল। কিন্তু আজকে তাদের প্রতি সমর্থন ১ শতাংশও নেই। যেসব জায়গা তারা এখনো নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোতে তাদের অস্ত্র হচ্ছে ভীতি। ১৯৯৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান জনসাধারণের ওপর যে অকথ্য অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, সেটা মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। এ কারণে একটা আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু তালেবানের প্রভাব তেমন নেই। মানুষের মন থেকে ভীতিটা কেটে গেলে তালেবানের মিথ ভেঙে যাবে। গণতন্ত্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হলে তালেবানের ভীতিটা দূর হবে। গজনি শহর ও উত্তরের কয়েকটা জায়গায় স্থানীয় জনগণ তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে; মেরে বের করে দিয়েছে। আফগানিস্তানের লোকসংখ্যা তিন কোটি, এর ১ শতাংশও যদি তালেবানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তালেবানের কিছু করার থাকবে না।
প্রথম আলো  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নাজেস আফরোজ  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

বেহাল দলীয় রাজনীতি

দেশের দুই প্রধান দল বৈধতা ও অবৈধতার বিতর্কে লিপ্ত থাকলেও উভয় দল যথারীতি একমত যে তারা তাদের দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের প্রশ্ন অমীমাংসিত রাখবে। সে কারণে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অচলাবস্থা আরও গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলটির মত প্রকাশের স্বাধীনতা সরকারব্যবস্থার মধ্যে বহু ক্ষেত্রে বিলীন হয়ে গেছে। সরকার ও আওয়ামী লীগকে দিনকে দিন আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে ক্ষমতায় থাকার কারণে গণতন্ত্রের ঘাটতিজনিত ক্ষতি সহজে হয়তো চোখে পড়বে না। কিন্তু সাত বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা ইদানীং সহজেই চোখে পড়ছে। খোদ রাজধানীর কমিটি গঠনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র অনুশীলন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। প্রহসনমূলক যে দলের এত বড় বিপর্যয়ের পরও দলটি তার শীর্ষ পদগুলো পুনর্বিন্যাসের ঝুঁকি নিতে পারছে না। দলের শুভাকাঙ্ক্ষীরাও বড় গলায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের আওয়াজ তোলেন না। কারণ, তাঁরা জানেন, এ নিয়ে সরব হওয়াটা আদৌ অর্থ বহন নাও করতে পারে। কিন্তু দেশের দুই প্রধান দলের অব্যাহত গণতন্ত্রবিমুখতা এবং একই সঙ্গে নানা ধরনের বুজরুকিচর্চা দেশকে বিশ্বের দরবারে হেয় করে চলেছে। ক্ষমতাসীন দল কথায় কথায় সংবিধানের ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে থাকে। আর এতে কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রশাসনের সব স্তর পরিচালনার কথা বলা আছে। দলে গণতন্ত্রচর্চা বন্ধ রাখা এই অনুচ্ছেদগুলোর চেতনাবিরুদ্ধ।
তারা দলের কর্মী ‘জনগণ’ ও ভোটার ‘জনগণকে’ পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। দুই বড় দল আগে পাঁচ বছর অন্তর সুষ্ঠু নির্বাচনে একমত ছিল। ২০০৬ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪ সালে এসে সে ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। এরশাদের পতনের পর দুই দল নিয়মিত কাউন্সিল করা এবং সময়ে সময়ে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দলের কমিটিগুলো পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু দুই দলই বর্তমানে সেসব নীতি বিসর্জন দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কার কত পকেট কমিটি আছে, তা নিয়ে দুই দলে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এর ফলে দেশশাসনের মান ও জবাবদিহি উভয়ই কমছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কার্যক্রমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকা জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন অব্যাহতভাবে গণতন্ত্রচর্চা। তা নিশ্চিত না করার ফলে গত এক দশকে দলের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বহু ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা চুলোয় গেছে। বিভিন্ন ধরনের নির্বাচন এলেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবারের উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উভয় দলেই বিদ্রোহী প্রার্থী সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি দল এবং বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে না। মনে হয় যেন সবকিছুই অদৃশ্য হাতের কারসাজি। হুটহাট সিদ্ধান্ত আকাশ থেকে টুপ করে পড়ে; যা গণতান্ত্রিক রীতি ও শাসনের পরিপন্থী।

সড়কে ‘মৃত্যুফাঁদ’

গত বছরের অক্টোবরের এক শনিবারের সন্ধ্যা। রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে ক্যাথরিন মাসুদ যখন কথা বলতে উঠলেন, তখন অনুষ্ঠান একেবারে শেষের দিকে। তারেক মাসুদের মৃত্যুর দুই বছরেও বেশি হয়ে গেছে। সময়ের আবহে শোকের তীব্রতা হয়তো কিছুটা কমে এসেছে। তার পরেও সেটা গোপন থাকে না কথার ফাঁকে ফাঁকে ফেলা ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাসে। ক্যাথরিন কথা বলছিলেন মৃত্যুফাঁদ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে। এই প্রামাণ্যচিত্রটিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আমাদের সনাতন ধারণার বাইরের এক অজানা বিস্ময়কর চিত্র। তারেক মাসুদ বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার বলি লাখ লাখ মানুষের মধ্যে একজন। তাঁর মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে একটি আলোড়ন তৈরি হয়। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আন্দোলন, সেমিনার, লেখালেখি অনেক কিছু হয়। গত দুই বছরেরও বেশি সময় সেটা অনেকখানিই স্তিমিত হয়ে এসেছে। কিন্তু যেটা থামেনি সেটা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিয়মিত নিহতের সংখ্যা। দুর্ঘটনা বাংলাদেশে আসলে কোনো দৈব ব্যাপার নয়। যে দেশে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে ‘সাবধান, সামনে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা’, তখন দুর্ঘটনা হয়ে যায় একটি অতি প্রত্যাশিত ঘটনা। মৃত্যুফাঁদ নামক প্রামাণ্যচিত্রটি এটাই দেখিয়েছে যে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার বেশির ভাগ আসলে আমাদের অজ্ঞতা, অবহেলা আর অপরিণামদর্শী আচরণের কারণে তৈরি এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পুলিশের যে রিপোর্ট হয় সেখান থেকে দেখা যায় যে প্রতিবছর কমপক্ষে তিন হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। পুলিশি রিপোর্ট যে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার হাজার হতে পারে। তার মানে আমাদের দেশে প্রতিবছর দিনে গড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ জন। এই মৃত্যু উপত্যকার প্রধান কারবারি হিসেবে অবশ্যম্ভাবী হিসেবে প্রথমেই ‘ঘাতক’ চালকের প্রসঙ্গ চলে আসে। আমাদের মাঝে গাড়িচালকদের সম্বন্ধে একটা চিত্র আছে। সেটা হলো যে বাস আর ট্রাকচালক হলেন এমন এক ক্রিমিনাল প্রজাতি, যাঁরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শতভাগ দায়ী। তাঁরা উল্টাপাল্টা চালান, কেউ কেউ মদ খেয়ে গাড়ি চালান, উল্কাগতিতে গাড়ি চালান আর দুর্ঘটনা ঘটিয়ে, মানুষ মেরে সটকে পড়েন। এটা যে পুরোপুরি অমূলক, তা-ও কিন্তু নয়। মৃত্যুফাঁদ-এ রয়েছে সেই পরিবারের কাহিনি, যেখানে বাবা তাঁর সন্তানকে হারিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। সেই বাবাই আবার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। রয়েছে সেই মায়ের কাহিনি, যার একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পৃথিবী শূন্য হয়ে গেছে। এই পরিবারগুলোর স্বাভাবিকভাবেই চালকশ্রেণীর মানুষের ওপর একটা অসম্ভব রকমের ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু ভিলেনের তকমা পাওয়া চালকদেরও যে সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপারে অন্য একটি চিত্র রয়েছে, সেটি এই প্রথম উঠে এসেছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। মৃত্যুফাঁদ-এ রয়েছে সেই চালকের কথা, যাঁর বাঁ হাঁটু পাঁচ টুকরা হয়ে যায় যাত্রীদের বাঁচাতে গিয়ে। পরিণামে তাঁর এখন বাকি জীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এ তো গেল একজন চালক, যে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তার পরও তিনি বেঁচে রয়েছেন, পরিবার কোনোমতে চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু যে চালক গাড়ি চালাতে গিয়ে একেবারে মরেই গেলেন, তাঁর পরিবারের কী হতে পারে? চালকদের কথা হচ্ছে, তাঁদের ঘাতক বলা হবে কেন? দুর্ঘটনা তো তাঁরা চিন্তাভাবনা করে করেন না।
একটা দুর্ঘটনায় তাঁর মরে যাওয়ার আশঙ্কা যাত্রীদের চেয়ে কোনো অংশে কম না। বরং বেশি। তাহলে কেন তিনি খামাকা এই ঝুঁকি নিতে চাইবেন? তাঁর নিজের ভালোমন্দের কথা না ভাবলেও নিদেনপক্ষে পরিবারের কথা চিন্তা করেও তো তাঁর এই ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা। এর একটি বাস্তবসম্মত উত্তর উঠে এসেছে মৃত্যুফাঁদ-এর মধ্যে চিত্রিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে। চালকদের পেশাগত পরিস্থিতি বাংলাদেশে এমন একপর্যায়ে যে বাস বা ট্রাকের চালকেরা আসলে সতর্ক থাকার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থার মধ্যেই থাকেন না। আমরা কতজন নিজেরা কখনো গাড়ি চালিয়ে দেখেছি? দেশের বাইরে আমার লম্বা পথ গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। আর সেখানকার রাস্তায় কোনো ঝামেলা নেই, গরু, ছাগল, ভেড়া, মুরগি, নছিমন, করিমন, ভটভটির বিচিত্র সমাহার সেখানে নেই। তার পরও দু-তিন ঘণ্টা একটানা গাড়ি চালালেই একটা অবসাদ চলে আসে। আর বাংলাদেশের রাস্তায় যদি আপনি চার-পাঁচ ঘণ্টা চালান, তাহলেই তো মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা। আর সেখানে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে আমাদের চালকেরা কখনো টানা ২৪ ঘণ্টাও গাড়ি চালান। মালিকের কাছে এই চালকেরা শুধু টাকা বানানোর আরেকটা উপাদান মাত্র। আর দুর্ঘটনা ঘটলে তো মালিকের কোনো দায় নেই। চালকদের চাকরি কোনো মাসিক বেতনের নয়। এখানে কোনো নিয়োগপত্র নেই। নেই পেনশন বা চাকরির নিরাপত্তা। এখানে টাকা ট্রিপ অনুযায়ী। যে যত ট্রিপ মারতে পারেন, তত টাকা। এই ট্রিপ পদ্ধতি চালু করে চালকদের বানিয়ে ফেলা হয়েছে এক যান্ত্রিক গাড়ি চালানোর মেশিনে। চালকদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ, তাঁরা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালান। এ নিয়ে মৃত্যুফাঁদ-এ রয়েছে বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) অফিসে লাইসেন্স নিতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে যাওয়া একাধিক চালকের সাক্ষাৎকার।
তিনি সৌদি আরব, কাতার এসব জায়গায় ড্রাইভিং করেছেন। সেখানে এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেছেন। অথচ ড্রাইভিংয়ের এত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বাংলাদেশে এক বছর ধরে ঘুরছেন কিন্তু লাইসেন্স পাচ্ছেন না। ঘুষ দিলে অবশ্য এটা কোনো ব্যাপারই নয়। চালকদের শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ভালো চালকদের সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত হওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। আর আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেটা কিন্তু অনেকখানিই অযৌক্তিক। আমাদের দেশের বাস্তবতায় যেটি দরকার সেটি হলো একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া, যেটার মাধ্যমে চালকেরা লাইসেন্স পেতে পারেন। কিন্তু বিআরটিএর সেই ধরনের কোনো ইচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। তারা চায় একটা অবৈধ পন্থা বজায় রাখতে। কারণ, তাহলে উপরি আয়ের সুযোগ সব সময় থেকেই যায়। সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি নিয়ামক হলো সড়কের ওপর অত্যধিক চাপ। আর সেটি হয়েছে বছরের পর বছর রেলপথ আর জলপথকে যোগাযোগের মাধ্যম থেকে অবহেলা করার জন্য। মৃত্যুফাঁদ-এ আমরা দেখি এই ভয়াবহ চিত্র কী করে এই দুটো যোগাযোগ মাধ্যমকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার মাধ্যমে সড়কের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে বেশ কিছু মতবাদ আছে। আছে গাড়ি-বাস মালিকদের স্বার্থ, যাদের অনেকেই দেশের নীতিনির্ধারণে যুক্ত। থাকতে পারে বিদেশি দাতা রাষ্ট্রের স্বার্থ, যেখানে বৈদেশিক সাহায্য আর বিনিয়োগ সব সড়ক আর সেতু নির্মাণে, যাতে গাড়ি আমদানি বৃদ্ধি পায়।
ড. রুশাদ ফরিদী: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাগরীর একজন সদস্য।
rushad@econdu.ac.bd