Saturday, February 14, 2015

জাতিসংঘের উদ্বেগ- উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটুক

বাংলাদেশে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে—এ খবর ইতিমধ্যে এ দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সহিংসতা বন্ধ হওয়া দূরের কথা, হতাহত মানুষের তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমে জানা গেল, এ দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক (সাবেক) সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বিবদমান দুই পক্ষের চরম বৈরিতাপূর্ণ অটল অবস্থানের ফলে যে হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের এসব তৎপরতার খবর নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
তবে আমাদের স্মরণ আছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘একতরফা’ নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে তারানকো বাংলাদেশে এসে দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনতে যে প্রয়াস নিয়েছিলেন, তা সফল হয়নি। সে জন্য কোন পক্ষের কতটা দায় ছিল, সে হিসাবে না গিয়ে নিঃসন্দেহে বলা যায়, তখন যদি একটা সমঝোতা হতো, তাহলে ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচন আমরা এড়াতে পারতাম এবং আজকের এই সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেত। কিন্তু তা হয়নি বলে একতরফাভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং তা প্রতিহত করার সহিংস প্রচেষ্টায় শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। আর চলমান সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ৮৭ পেরিয়েছে এবং সহিংসতা অব্যাহত আছে।
অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত: বৈরিতা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে কোনো পক্ষই উপকৃত হতে পারে না, ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা জাতি। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চার বিকল্প নেই; সংলাপ-আলোচনা, দর-কষাকষি ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে সব সংকটের সমাধানে পৌঁছা সম্ভব। দুই বিবদমান পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি করানোর ব্যাপারে জাতিসংঘসহ দেশি–বিদেশি সব উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটুক।

গরিবের চুড়ি চুরমার করে ‘এলাকা পরিষ্কার’ করল পুলিশ

চোখের সামনে পুঁজিপাট্টা শেষ হতে দেখে কান্না থামাতে
পারেননি এই নারী ব্যবসায়ী। ছবি: মানসুরা হোসাইন
অভিযানের পর লন্ডভন্ড চুড়ি গুছিয়ে নিচ্ছেন
এই নারী। ছবি: মানসুরা হোসাইন
চারুকলার সামনে উচ্ছেদ অভিযানে চুরমার চুড়ির ঝাঁকা। আজ
শনিবার বিকেলে তোলা। ছবি: মানসুরা হোসাইন
‘গরিবের লাইগ্যা কিছু নাই। দোকান বসতে দিব না, ভালো কথা। কিন্তু দোকান ভাঙল ক্যান? এখন হাতে একটা টাকাও নাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন প্রান্তিক পর্যায়ের চুড়ি ব্যবসায়ী সূর্যবান।
আজ শনিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তিনি রাজধানীর শাহবাগে চারুকলা ইনস্টিটিউটের বিপরীত পাশের ফুটপাতে তাঁর ভাঙা চুড়ির ঝাঁকার সামনে বসে কথাগুলো বলছিলেন।
কিছুক্ষণ আগেই শাহবাগ থানার পুলিশ ফুটপাত থেকে অবৈধ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের অংশ হিসেবে সূর্যবানসহ বেশ কয়েকজনের চুড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
সেখানে গিয়ে দেখা গেছে রেশমি চুড়ি, কাটিং, মান্তি, পুটিচুড়ি, খায়রুন, লারেলাপ্পা, সুতা চুড়িসহ হরেক রকমের চুড়ি ফুটপাতে গড়াচ্ছে। চুড়ি ব্যবসায়ী, তাঁদের ছেলেমেয়ে সবাই মিলে সেখান থেকে যেগুলো ভালো আছে তা বের করার চেষ্টা করছিল। তবে বেশির ভাগ চুড়ি কাচের হওয়ায় প্রায় সব চুড়িই ফেটে গেছে। এসব চুড়ি আর বিক্রি করা যাবে না।
আজ ছিল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আজ অনেক প্রেমিক, স্বামী তাঁদের প্রেমিকা ও স্ত্রীকে চুড়ি কিনে দিচ্ছিলেন। এ ছাড়া অনেক তরুণীও চুড়ি কিনছিলেন। বইমেলা উপলক্ষে লোকসমাগমও বাড়ছিল। এর মধ্যেই পুলিশ এসে সব শেষ করে দিয়েছে।
তবে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই চুড়ি ব্যবসায়ীদের বহুবার বলা হয়েছে। কথা শোনে না। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বলেছি। আজকেও উচ্ছেদের আগে বলা হয়েছে। এ ছাড়া আমার কাজ এলাকা পরিষ্কার করা। এলাকা পরিষ্কারের জন্য এ ধরনের কাজ করতেই হয়।’
সূর্যবান চোখের পানি মুছতে মুছতে জানালেন, ১০ বছর ধরে চুড়ির ব্যবসা করেন। চার মেয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। স্বামী মারা গেছেন। রাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফুটপাতেই ঘুমান। চকবাজার থেকে মালামাল কেনেন। দিনে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার চুড়ি বিক্রি হয়। লাভ থাকে ৫০ টাকার মতো।
ময়মনসিংহের মাসুমা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ঢাকায় আসেন। উদ্দেশ্য, বইমেলা উপলক্ষে বেচাবিক্রি ভালো হবে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘পাঁচ মিনিটও সময় দিল না পুলিশ। বাইড়াইয়া সব শেষ কইরা দিলো।’
জামালপুরের অবেদাও বইমেলাকে কেন্দ্র ঢাকায় এসেছিলেন। মহাজনের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মাল নিয়ে আসছেন বাকিতে। ব্যবসা করে টাকা শোধ দেওয়ার কথা ছিল। এখন তাঁর মাথায় হাত। অবেদার চার ছেলে, দুই মেয়ে। স্বামী নেই।
এই চুড়ি ব্যবসায়ীদের কান্নায় ফুটপাত দিয়ে যাঁরাই যাচ্ছিলেন তাঁরাই কিছুক্ষণ থামতে বাধ্য হন। চুড়ি ব্যবসায়ীরা যাকে সামনে পাচ্ছিলেন তাঁর কাছেই নালিশ দিচ্ছিলেন। একজন ব্যবসায়ী বললেন, ‘সরকার ভালোই দেখাচ্ছে। গরিবরে আরও মারতাছে।’
জামালপুরের মিঠু, হাফিজা, তালেব আলীসহ সবাই তাঁদের অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছিলেন। চারুকলার পাশের ফুটপাতে কিছু চুড়ি ব্যবসায়ী তখনও ব্যবসা করছিলেন। তবে তাঁরা জানালেন, তাঁরাও ভয়ে আছেন। যেকোনো সময়ই পুলিশ এসে সব ভেঙে দিতে পারে।

‘গায়ের জোরে সমস্যার সমাধান করা যায় না’ -মান্না

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, দিন দিন দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আরও একমাস ধরে এ অবস্থা চললে আর্থিক ক্ষতির পরিমান বাজেটের সমান হবে। আমরা সহিংসতা, নাশকতার বিরোধিতা করি। আমরা শান্তি চাই, গণতন্ত্র চাই। এজন্য সংলাপের বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণকে বর্তমান সঙ্কটের মূল কারণ হিসাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিলে সমস্যা এতদূর আসত না। এখন যারা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে তাদের পুলিশ সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি। সরকার যখন গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে তখনই তারা বিরোধী পক্ষকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে দমন করার চেষ্টা করে। মান্না আরও বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা গায়ের জোরে সমাধান করা যায় না। অহংকার করে, জেদ করে সমস্যার সমাধান করা যায় না। সরকারের দায়িত্ব সহিংসতা ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা। এজন্য জনগণকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশও থাকতে হবে। বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংলাপ ও সমঝোতার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাসদ (জেএসডি) সভাপতি আসম আবদুর রব, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

চতুর্থ দিনেও খালেদার কার্যালয়ে খাবার নিতে দেয়নি পুলিশ, - পুলিশের আইজি বলেছেন নিয়মিত খাবার যাচ্ছে

(গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য আনা খাবার নিয়ে আজ শনিবার দুপুরে দুই ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের বাধা দেন। ছবি: সাজিদ হোসেন) চতুর্থ দিনের মতো শনিবার দুপুরেও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার নিতে দেয়নি পুলিশ। দুপুর পৌনে ১ টার দিকে একটি সিএনজিতে করে বেগম জিয়ার গুলশানস্থ কার্যালয়ের সামনে খাবার নিয়ে আসা হয়। কিন্তু দায়িত্বরত গুলশান থানার পুলিশ খাবার সহ সিএনজিটি ফেরত পাঠায়।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং-এর সদস্য শায়রুল কবীর খান জানান, আমরা কৌশল বদলে সিএনজিতে করে দুপুরের খাবার এনেছিলাম। সিএনজিটি খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের দক্ষিণ দিকের সড়ক দিয়ে প্রবেশ করে কিন্তু কার্যালয়ের কাছে আসতে না আসতেই পুলিশ সিএনজিটি উত্তর দিকের রাস্তা দিয়ে ফেরত পাঠায়।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার রাত থেকে বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার নিতি বাধা দিচ্ছে পুলিশ। আজ চতুর্থ দিনে দুপুরের খাবার নিতেও বাধা দেয়া হলো। ফলে কার্যালয়ে অবস্থানরত প্রায় অর্ধশতাধিক নেতা-নেত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মানবেতর জীবন যাপন করছেন। শুকনো খাবার মুড়ি, বিস্কিট খেয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
খালেদার বাড়িতে নিয়মিত খাবার যাচ্ছে: আইজি
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়ার বাড়িতে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি খাবার পাচ্ছেন ও সুস্থ আছেন বলে তাঁদের কাছে খবর আছে।
আজ শনিবার রাজধানীতে পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আইজি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়।
‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইজি শহীদুল হক বলেন, এ বিষয়ে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এ বিষয়ে কাজ করছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঢালাও অভিযোগ করা হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি শেখ সেলিম বলেছেন, বোমাবাজদের ‘এনকাউন্টারে’ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে সাংবাদিকেরা মতামত জানতে চাইলে আইজি বলেন, ‘এ প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যতে দেওয়া হবে।’
দেশজুড়ে চলা সহিংসতা নিয়ে আইজি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। আগের তুলনায় যান চলাচল বেড়েছে। ঢাকার জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বোমাবাজদের গ্রেপ্তারের জন্য যা কিছু করা দরকার, তা করা হবে। তিনি বলেন, বোমাবাজির অভিযোগে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা ছাত্রদল, যুবদল, শিবির অথবা তাদের ভাড়া করা লোক। এরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
এ সময় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মৃত্যু ও ‘গণতন্ত্র’, দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ মৃত্যুর ককটেল আর অনিশ্চিত গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সংঘাত যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয়পক্ষের মনোভাবও কঠোর হচ্ছে। কোন পক্ষই সমঝোতার চেষ্টা করতে প্রস্তুত নয়। দুই নেত্রী তাদের লক্ষ্য অর্জন করুন বা না করুন, বহির্বিশ্বের দৃষ্টিতে তারা বাংলাদেশকে প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সম্পাদকীয়কে এসব কথা বলা হয়েছে। মৃত্যু ও ‘গণতন্ত্র’ শীর্ষক ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছে, আংশিক উগ্র ও তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মৌলিক ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ জুড়ে বিরোধীদের প্রতিবাদে যেমনটা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে হত্যার অভিযোগে উসকানিদাতাদের বিচার করতে সমানতালে দৃঢ় সংকল্প রয়েছে সরকারের। বস্তুত, উভয়পক্ষই জানুয়ারি থেকে ‘ওভারড্রাইভ’-এ চলে গেছে। প্রহসনের এক নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এক বছর পূর্ণ করার পর থেকে এ পরিস্থিতির সূত্রপাত। বিএনপির নির্বাচন বর্জনে তাদের সহজ জয়টা ছিল লক্ষণীয়। আজ দেশটি প্রাণঘাতী মৃত্যুর ককটেল আর অনিশ্চিত গণতন্ত্রের সাক্ষ্য বহন করছে; যা এ মাসের ২১ তারিখ মহান একুশে উদযাপনকেও নিশ্চিতভাবে বিষণ্ন্নতায় ঘিরে ফেলেছে। কলকাতা ও ঢাকার মধ্যকার মৈত্রী এঙপ্রেসের যাত্রীরা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চলমান প্রতীক- বিরোধীদের পেট্রলবোমা হামলার স্বীকার হয়েছিল। ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করা বাসগুলোর ওপর একই রকম বোমা হামলায় ইতিমধ্যে যথেষ্ট মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। একদিকে যেমন সহিংস বিশৃঙ্খলা বেড়ে চলেছে, অপরদিকে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয়পক্ষেরই মনোভাব কঠোর হয়েছে। কোন পক্ষই সমঝোতার চেষ্টা করতে প্রস্তুত নয়। চলমান সহিংসতার সব থেকে পীড়াদায়ক বিষয় হলো- শিশুসহ নিরপরাধ ব্যক্তিদের জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করার বিষয়ে বিএনপি’র কোন বিবেকের অস্বস্তিবোধ নেই। একইভাবে, ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগে আওয়ামী লীগের তাড়না প্রতিফলিত হয়েছে সপ্তাহান্তে। হাসিনা সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বেগম জিয়ার দল ইসলামপন্থিদের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে রয়েছে। গত দু’ দশকে দুই নেত্রীই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; মাঝে-মধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। এমনকি সর্বশেষ নির্বাচনও সেনা’র বন্দুকের ছায়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়া কিছু মাত্রায় ছলনার নির্বাচনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। কিন্তু এক বছরের ভঙ্গুর শান্তির পর কোন বিষয়গুলো এমন উত্তেজনা আর সহিংসতা উসকে দিলো তা নিয়ে না ভাবাটা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী এটা না জ্ঞাত হয়ে পারেন না যে, এ আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য হলো তার উচ্ছেদ... ফান্ডামেন্টাল কোন এজেন্ডা অবলম্বন নয়। অতএব, যখন তিনি সন্ত্রাস বিরোধী আইন আর সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন তখন তিনি কোন না কোনভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন আর ইসলামপন্থি সন্ত্রাসবাদের মধ্যকার গুরুতর পার্থক্য উপেক্ষা করছেন। উভয় নেত্রী তাদের নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যেটাকে ‘সাইকেল অব ভায়োলেন্স’ বলে আখ্যা দিয়েছে, উভয় নেত্রী তার সমাপ্তি টানার লক্ষ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে সামান্যই পদক্ষেপ নিয়েছেন। দুই নেত্রী তাদের লক্ষ্য অর্জন করুন বা না করুন, বহির্বিশ্বের দৃষ্টিতে তারা বাংলাদেশকে প্রায় ব্যর্থ এক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

নির্মাণ হচ্ছে আরেকটি টুইন 'রানা প্লাজা' by অমিতোষ পাল

এ যেন টুইন রানা প্লাজা! দুটি ১৫ তলাবিশিষ্ট মার্কেটের মধ্যে একটির চতুর্থ ও আরেকটির পঞ্চমতলা পর্যন্ত উঠে যাওয়ার পর ধরা পড়েছে ভবন দুটির নির্মাণকাজ খুবই নিম্নমানের। এভাবে তৈরি হলে ভবিষ্যতে সাভারের রানা প্লাজার মতো আরেকটি ভয়াবহ ভবনধস হতে পারে। নিম্নমান ধরা পড়ার পর ভবন দুটির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। পরে নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। বুয়েটের রিপোর্টে উঠে আসে নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও সামগ্রী ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র। কলামে কংক্রিট প্রয়োজনের চেয়ে প্রায় ৭৯ শতাংশ পিএসআই কম। পিএসআই বলতে বোঝায় কংক্রিটের শক্তির একক বা পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি। যেখানে কলামে কংক্রিট নূ্যনতম ৩ হাজার ৬২৫ পিএসআই থাকার কথা, সেখানে আছে মাত্র ৭৯০। এই মানের কলামে কোনোভাবেই কোনো বহুতল ভবন টিকে থাকতে পারে না। ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া অংশটুকুও রাখা যাবে কি-না তা নিশ্চিত হতে ভবনের নিচের মাটি খুঁড়ে ফাউন্ডেশনের পুরুত্ব পরীক্ষার সুপারিশ করেছে বুয়েট। এ ন্যক্কারজনক ও মানহীন নির্মাণকাজ হয়েছে ডিএসসিসির ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের 'এ' ও 'বি' বহুতল শপিং কমপ্লেক্সে। সাভারের রানা প্লাজা ভবন নির্মাণেও এরকম ত্রুটি ছিল। খুবই নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে ভবনটি ধসে মারা যান সহস্রাধিক মানুষ। এর আগে সূত্রাপুরের দয়াগঞ্জে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) পরিচ্ছন্ন কর্মীদের বাসস্থানের জন্য নির্মিত ছয়তলা একটি ভবনে বসবাস শুরুর আগেই ২০০৭ সালের ২৫ মে তা ধসে পড়ে। নির্মাণকাজ ও নির্মাণসামগ্রীর মানহীনতাই ছিল ভবনটি ধসে পড়ার প্রধান কারণ। কিন্তু ওই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দয়াগঞ্জের চেয়ে আরও নিম্নমানের কাজ হচ্ছিল ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের এ দুটি ভবন নির্মাণে।কয়েক বছর আগে ডিএসসিসির ফুলবাড়িয়া নগর ভবনের দক্ষিণ পাশে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-০২ প্রকল্পের অধীনে দুটি ১৫ তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে করপোরেশন। ভবন দুটির প্রত্যেকটি তলার আয়তন ধরা হয় ৩৫ হাজার বর্গফুট। দোকান বানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে এবং উন্মুক্তভাবে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী দুটি ভবনের বিপরীতে প্রায় দুই হাজার দোকান বরাদ্দও সম্পন্ন হয়েছে। নিচতলা ও দোতলায় কিছু দোকানি ব্যবসাও চালু করেছেন। দেলোয়ার হোসেন দেলু নামে এক ঠিকাদার ভবন দুটির নির্মাণকাজ করছিলেন। গত ২৮ জানুয়ারি ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান কয়েকজন প্রকৌশলী নিয়ে নির্মাণকাজ দেখতে যান। ঢালাই ও কলাম দেখে তার সন্দেহ হয়, এই সব কলাম কোনোভাবেই ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের ভার বহনে সক্ষম হবে না। ২৯ জানুয়ারি তিনি কোর কাটার দিয়ে দুই ভবনের সাতটি কলামের নমুনা সংগ্রহ করে বুয়েটে পাঠান। গত ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি বুয়েট নমুনা ও ভবনের কলামগুলোর চাপ শক্তি পরীক্ষা (কমপ্রেসিভ স্ট্রেন্থ টেস্ট) করে। এতে দেখা যায়, 'এ' নম্বর ভবনে কলাম-১-এর কংক্রিটের পিএসআই ৮৩০, যেখানে থাকার কথা নূ্যনতম ৩ হাজার ৬২৫। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ৭৭ দশমিক ১০ শতাংশ কম। একইভাবে কলাম-২-এর কংক্রিটে আছে ১ হাজার ৩৪০ পিএসআই। কলাম-৩-এ ২ হাজার ২০০ পিএসআই। 'বি' নম্বর ভবনের কলাম-১-এ আছে ১ হাজার ৪০ পিএসআই। কলাম-২-এ ৭৯০, কলাম-৩-এ ২ হাজার ১১০ ও কলাম-৪-এ ৩ হাজার ৩৭০ পিএসআই। কোনো কলামের কংক্রিটেই প্রয়োজনীয় ৩ হাজার ৬২৫ পিএসআই নেই।বুয়েটের প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় কংক্রিটের কমপ্রেসিভ স্ট্রেন্থ অনেক কম এবং কংক্রিট অনেক নিম্নমানের। এসব কলামের ওপর ভবন দুটি ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করলে রানা প্লাজার চেয়েও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
নিম্নমানের নির্মাণকাজ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবন দুটির কাজে আলাদা করে কোনো সুপারভিশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ঠিকাদারের তরফ থেকে কোনো দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার নেই। ঢালাইয়ের সময় সিমেন্ট-বালু-পাথরকুচির অনুপাত ঠিক রাখা হয়নি। স্লাম্প টেস্ট করা হয়নি। কংক্রিটে বেশি পানি ঢেলে ঢালাই করা হয়েছে। শাটারিংয়ের ছিদ্র দিয়ে সিমেন্ট-পানি বের হয়ে যাওয়ায় হানিকম্ব তৈরি হয়েছে। ঢালাইয়ে সিলেট স্যান্ডস বা মোটা বালি ব্যবহার করা হয়নি। ঢালাইয়ের পর কলামগুলো চট দিয়ে ঢেকে পানি দেওয়া হয়নি। স্লাব সমান হলো কি-না তা লেভেল মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করা হয়নি। সাইটে কোনো সাইট অর্ডার বই নেই। ফাউন্ডেশন করার আগে সয়েল টেস্ট (মাটি পরীক্ষা) করা হয়নি। সুপারভিশনের জন্য ডিএসসিসির প্রয়োজনীয় জনবল ছিল না। নির্মাণকাজ চলাকালে ডিএসসিসির জনবল দিয়ে সার্বক্ষণিক যে তদারকি করার কথা ছিল, তা করা হয়নি।প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, মাটি খুঁড়ে কোর কাটার দিয়ে ভবন দুটির ফাউন্ডেশনের নমুনা সংগ্রহ করে এর মান পরীক্ষা করতে হবে। দেখতে হবে ফাউন্ডেশনের পুরুত্ব যা আছে তা কত তলার ভার বহন করতে পারবে। ভবনগুলোর পাশের দুই-তিনটি পয়েন্টের মাটি পরীক্ষা করতে হবে। নিয়োগ দিতে হবে দক্ষ প্রকৌশলী। এসব পরীক্ষার পর রিপোর্টের ভিত্তিতে ভবন দুটির রেট্রোফিটিং বা সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ভবন দুটির নির্মাণের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম রয়েছে। যে কারণে এই কাজের জন্য কোনো দরপত্র আহ্বান না করে দেলোয়ার হোসেন দেলুকে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। প্রকৌশল বিভাগের পরিবর্তে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ ও প্রশাসকের দপ্তর থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলে এখন নিম্নমানের কাজের দায়িত্ব প্রকৌশল বিভাগ নিতে চাইছে না। তারা প্রকাশ্যে এ নিয়ে কোনো মন্তব্যও করতে চাইছে না। তবে প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, 'এটা নিয়ে এখনও কথা বলার সময় আসেনি। এর আগেও অনেক লোক এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা কেউ এখানে হাত দেননি। আমি ধরতে পারার পর অনেক চাপ আসছে। বেশি কথা বললে হয়তো দেখা যাবে আমার চাকরিই নেই।'
এ প্রসঙ্গে ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেন দেলুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে জানা যায়, তিনি এখন দেশের বাইরে। সরেজমিন দেখা যায়, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন জাকের মার্কেটের পশ্চিমে হানিফ ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশঘেঁষে প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর পাশাপাশি ভবন দুটির অবস্থান। পূর্ব পাশে 'এ' নম্বর ভবন। পশ্চিমে 'বি' নম্বর ভবন। 'এ' নম্বর ভবনের চারতলা পর্যন্ত উঠেছে তার ওপরে আরও কয়েকটি কলামের কিছু অংশ তৈরি করে রাখা হয়েছে। 'বি' নম্বর ভবনের পাঁচতলা পর্যন্ত ওঠার পরও একটি স্লাবের রড ও কলামের খাঁচা তৈরি করে রাখা হয়েছে। আর নিচতলায় মার্কেটের বিভিন্ন দোকান চালু হয়ে গেছে।

সংলাপ শব্দটিকেও বির্তকিত করার অপচেষ্টা চলছে -ড. কামাল

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সংস্কারের মতো সংলাপ শব্দটিকেও এখন বির্তকিত করার অপচেষ্টা চলছে। ২০০৭ সালে সংস্কার শব্দকে বির্তকিত করা হয়েছিলো। বলা হতো ওরা সংস্কারপন্থী ওদের পিটাও। কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য সংস্কার আর শান্তির জন্য সংলাপ প্রয়োজন। শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগকির ঐক্য আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘সন্ত্রাস চাই না, শান্তি ও গনতন্ত্র চাই, জাতীয় সংলাপের বিকল্প নেই’- এই দাবিতে নাগরিক ঐক্যের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দুই ঘন্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সংগঠনটির আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এতে সভাপতিত্ব করেন।
কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন- জেএসডি সভাপতি আসম আব্দুর রব, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক, জেএসডির সাধারণ সম্পদক আব্দুল মালেক রতন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহম্মেদ, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মেদ এবং ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল।
চলমান সংকট থেকে উত্তরনের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানে সংলাপের প্রয়োজন উল্লেখ করে ড. কামাল বলেন, এটা শুধু দুই দলের মধ্যে হলে চলবে না। জাতীয় সংলাপে বসতে হবে। দেশের মালিক হচ্ছে ১৬ কোটি জনগণ। কোনো দল, ব্যক্তি বা পরিবারের নয়। দেশের জনগণ শান্তি চায়, সুশাসন চায়, কার্যকর গণতন্ত্র চায়। এ জন্য জনগণের কথা শুনতে হবে।
ড. কামাল হোসেন আরো বলেন, সরকারকে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের কথা শুনতে হবে। যারা সংবিধানকে বিশ্বাস করেন তাদের বক্তব্য শুনতে হবে। তিনি বলেন, প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় সংলাপ-সমাঝোতার জন্য কাজ করবো। এ জন্য সবার সহযোগীতা চাই। কারণ দেশের মধ্যে আজ একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আসম আবদুর রব বলেন, সন্ত্রাস-সহিংসতা বোমাবাজি চাই না। এসবের উৎস খুজে বের করতে হবে। একপক্ষ বলছেন, সংলাপ বসবেন না তাহলে সমস্যা সমাধাণ করবেন কিভাবে? আমাদের কি আবার মুক্তিযুদ্ধের মতো হাতিয়ার হাতে নিতে হবে? তিনি বলেন, দেশের সংকট সমাধানে দেশের মুরব্বীদের কথা শুনছেন না। বিদেশীদের নাক গলানো শুরু হয়ে গেছে, এটা ভাল না। দেশের মুরব্বীদের কথা শুনুন। তাদের দেখে নেয়ার হুমকির পরিণতি ভাল হবে না। তাতে দেশ ভয়াবহ হুমকির মধ্যে পড়বে।
সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের মধ্যে আজ এমন পরিবেশ তৈরি হতো না, যদি সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ না করতো। গায়ের জোরে কোনো সমস্যাই সমাধাণ করা যায় না। বিএনপিকে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে এখন জঙ্গি বানানোর চেষ্টা করা হচেছ। আমরা সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে। যারা রাজনীতির নামে মানুষ হত্যা করছে তারা রাজনীতি বোঝে না। সরকারের দায়িত্ব এসব বন্ধ করা। তবে এ জন্য বিচার বহিভুত হত্যাকান্ড করা যাবে না। সন্ত্রাস চাই না। শান্তি চাই। প্রয়োজন সংলাপের।

পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ- ধরে এনে টাকা আদায় by নজরুল ইসলাম ও কাজী আনিছ

পুলিশি নির্যাতনের শিকার প্রথম আলোর তিন ফটোসাংবাদিক।
মেরে আবার গর্ব করে পুলিশ বলেছে সাংবাদিক পিটালে কিছু হয়না।
'বুবু আমারে বাঁচাও। পাঁচ লাখ টাকা না দিলে আমারে মাইরা ফালাইব।
বুবু আমারে বাঁচা।'-এই আর্তনাদ ২৩ বছরের যুবক নাহিদের।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা নাহিদ প্রাণে বাঁচতে পুলিশি বেষ্টনীর ভিতর
থেকে আকুতি জানিয়েছিল তার বোন শিলার কাছে। কিন্তু নাহিদকে বাঁচাতে
সেই পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারেনি শিলা। ৫০ হাজার টাকা নিয়ে
হাজির হয়েছিল পুলিশের কাছে। কিন্তু সেই টাকা মুখের ওপর ছুড়ে মেরে
পুলিশ বলে, হবে না। এক দাম পাঁচ লাখ! এক টাকা কম হলেও চলবে না।
চার দিন পর নাহিদকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু জীবিত নয়।
গুলিবিদ্ধ লাশ হয়ে পড়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে।
রাজধানীর দারুসসালাম থানার দক্ষিণ বিশিলে রাস্তায় বন্ধুর সঙ্গে আলাপকালে গত ১১ জানুয়ারি সৌদিপ্রবাসী বাদল খানকে আটক করেন ওই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মশিউর রহমান। বাদল প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, আটকের পর এসআই মশিউর তাঁর কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ইয়াবা এবং মানি লন্ডারিং মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখান। পরে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সেখানে থাকা আড়াই হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন। এসআই মশিউর প্রথমে এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও গতকাল রাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তিনি এ বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রস্তুত আছেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে আটক করে টাকা আদায় এবং হয়রানির অভিযোগ পুরোনো। তবে ২০-দলীয় জোটের অবরোধ শুরুর পর আটক-বাণিজ্যের পাশাপাশি হয়রানির অভিযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। রাজধানীর নয়টি থানা এলাকা থেকে পাওয়া অভিযোগ নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে এর সত্যতা মেলে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও এ ধরনের অভিযোগ আসছে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন বিভিন্ন থানায় গিয়ে ৩৫ জন ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিনা কারণে তাঁদের রাস্তা থেকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কাউকে কাউকে বলা হচ্ছে বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের কর্মী। হরতাল-অবরোধে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। যাঁরা চাহিদামতো টাকা দিতে পারছেন না তাঁদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালতে জামিন না পেলে যেতে হচ্ছে কারাগারে। দাবিমতো টাকা না পেয়ে আটক এক যুবককে হত্যার অভিযোগও উঠেছে পল্লবী থানার তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী অনেকে হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি।
গত ৬ জানুয়ারি অবরোধ শুরুর পর থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন। সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৩ হাজার ৪২। এঁদের একটি অংশ এই আটক-বাণিজ্যের শিকার বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে আটক-বাণিজ্য ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানান, পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তিনি পাননি। ঢালাও অভিযোগ তিনি মানতে চান না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ঘটনাস্থল, তারিখ-সময় ও অভিযুক্ত পুলিশের নাম উল্লেখ করে তাঁর কাছে অভিযোগ করতে বলেন তিনি। তিনি জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এএসএম শাহজাহান প্রথম আলোকে জানান, যখন এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কর্মকর্তাদের উচিত পুলিশ প্রবিধান অনুসারে যেভাবে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে, সেটা কড়াকড়ি করা এবং কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো।
কয়েকটি ঘটনা: ৫ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা থেকে এক ব্যবসায়ীকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁর পরিবার ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে নির্দোষ দাবি করে ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানায়। ডিবির এক কর্মকর্তা ছাড়ার জন্য দুই লাখ টাকা দাবি করে বলেন, টাকা না দিলে নাশকতার মামলায় দেওয়া হবে। নিরুপায় হয়ে পরিবারটি একজনের মাধ্যমে ঘটনাটি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। ওই কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে টাকা দেওয়া থেকে বাঁচলেও ওই ব্যক্তি ছাড়া পাননি। দুই দিন আটক রাখার পর তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁর এক স্বজন বলেন, ‘আমরা ২০ হাজার টাকা দিতেও রাজি হয়েছিলাম।’
৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টায় বনশ্রীতে দুই যুবককে আটক করে খিলগাঁও থানার পুলিশ। তাঁদের পরিচিত সংবাদকর্মী মাহফুজুল্লাহ তখন পুলিশকে বলেন, ‘এঁরা ভালো ছেলে।’ এতে পুলিশ তাঁকেও গাড়িতে তোলে। পুলিশের এক সোর্স (তথ্যদাতা) মাহফুজুল্লাহকে জানান, ২০ হাজার টাকা না দিলে তাঁদের পেট্রলবোমাসহ আটক দেখানো হবে। সারা রাত তাঁদের গাড়িতে নিয়ে টহল দিয়ে ভোরে নেওয়া হয় থানায়। সোর্স থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে জানান, পেট্রলবোমাসহ তাঁদের আটক করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তাকে মাহফুজুল্লাহ তাঁর পরিচয় দেন ও ঘটনা জানান। এরপর ওই কর্মকর্তা সোর্সকে থাপড় দিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেন।
পরে মাহফুজুল্লাহ ঘটনাটি প্রথম আলোকে জানান। ওই রাতে সেখানে দায়িত্বে থাকা খিলগাঁও থানার এসআই আবু জাফর হাওলাদার জানান, আসলে পুরস্কার ঘোষণার পর সোর্সরা বিভিন্ন ভুল তথ্য দিচ্ছেন। ওই তিনজন নির্দোষ হওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুর থানার মণিপুরে সমাজকল্যাণ কমপ্লেক্সের পাঁচটি ভবনে অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁরা কারাগারে আছেন। তাঁদের একজন শেওড়াপাড়ায় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তাঁর বিষয়ে খোঁজ নিতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয় ওই থানার সামনে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, ওই কর্মচারী নিরীহ, রাজনীতি করেন না।
৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ চারজন চালককে আটক করে ডিবি। তাঁদের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ছেড়ে দিতে প্রত্যেকের কাছে ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন এক কর্মকর্তা। দর-কষাকষির পর ২০ হাজার টাকায় রফা হয়। পরে ডিবির কনস্টেবল নজরুলকে টাকা নিয়ে একটি অটোরিকশা ছাড়া হলেও তিনটি আটকে রাখা হয়। চারজন চালককে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবারও হয়রানির আশঙ্কায় চালকেরা নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। যোগাযোগ করা হলে কনস্টেবল নজরুল প্রথম আলোকে জানান, এটা ভুল হয়ে গেছে। টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রায়েরবাগ থেকে হাবিবুর রহমান নামের একজনকে আটক করে কদমতলী থানার পুলিশ। স্বজনেরা জানান, তাঁকে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখালে তাঁরা ৩০ হাজার টাকা দেন। পরে পুলিশ তাঁকে ডিএমপি আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। পরদিন তিনি জামিনে মুক্তি পান। ৪ ফেব্রুয়ারি একই থানার পুলিশ কদমতলী থেকে তিনজনকে আটক করে। তাঁদেরও নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ডিএমপি আইনে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁরাও জামিন পেয়েছেন।
৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার কুতুবখালীতে ছাত্র পড়িয়ে ফেরার পথে আটক হন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা এক যুবক। তাঁকে পেট্রলবোমা হামলা মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৩৫ হাজার টাকা নেন এসআই মোক্তার। তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি জামিন পান। অবশ্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই মোক্তার জানান, জনতা ওই যুবককে ধরে পুলিশে দিয়েছিল।
৭ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ তালতলা থেকে এক কলেজছাত্রকে আটক করে। তাঁকে ছাড়াতে মা ও বড় ভাই থানায় গেলে ভাইকেও আটক করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা এবং পরে মিরপুর থানার পুলিশ রিমান্ডে নেয়। বৃহস্পতিবার মিরপুর থানার সামনে তাঁদের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর ছেলেরা রাজনীতি করেন না। গ্রেপ্তারের খবরে তাঁদের বাবা এখন শয্যাশায়ী।
৬ জানুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে স্বামীবাগের মুন্সিরটেক থেকে এক মুদি দোকানিকে আটক করেন গেন্ডারিয়া থানার এসআই শাহজাহান ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সুজন। ওই মুদি দোকানি জানান, তাঁকে গাড়ি পোড়ানোর মামলার ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আধা ঘণ্টা পর রাস্তাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ।
দয়াগঞ্জ, মীরহাজিরবাগ ও আশপাশের এলাকা, ধোলাইখালে টহল পুলিশের বিরুদ্ধে পথচলতি মানুষকে হয়রানির অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনের। সন্ধ্যার পর এই হয়রানি বাড়ে।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ জানান, এমন দু-একটি ঘটনা ঘটলেও তা পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে করেছেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যাঁদের আটক করা হয়, যাচাই শেষে তাঁদের কাউকে কাউকে ছেড়েও দেওয়া হয়।
কারওয়ান বাজারে পথচলতি কিশোর ও যুবকদের তল্লাশির নামে হয়রানি এবং পুলিশের গাড়িতে তোলার দৃশ্য প্রতিদিনের। কখনো কখনো পণ্যবাহী ট্রাক এসে থামলে পুলিশ চালকের পকেটে হাত দিয়ে টাকা নিচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন ট্রাকচালকেরা।
আটকের পর দাবিমতো টাকা না পেয়ে পল্লবী থানার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জি এম নাহিদকে (২২) হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার বরাবর তাঁর পরিবারের করা অভিযোগ অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের প্রশিকা ভবনের সামনে থেকে এসআই তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে নাহিদকে তুলে নেয় পুলিশ। পরে পরিবারকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরিবার থানায় গেলে তাঁকে ছাড়তে পুলিশ পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। প্রথমে ২০ হাজার ও পরে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি। ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে তাঁর লাশ শনাক্ত করে পরিবার।
নাহিদের লাশ বেশ কয়েকটি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভাষানটেকের বালুর মাঠ থেকে উদ্ধারের পর পাঁচ দিন শনাক্তহীন অবস্থায় মর্গে পড়ে ছিল।
নাহিদকে পুলিশ আটক করেছে, এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার নিশারুল আরিফ। নাহিদের পরিবার তাঁকে তুলে নেওয়া গাড়ির নম্বরও দিয়েছে। ওই নম্বরের গাড়ি পল্লবী থানার সিভিল টিমের বলে উপকমিশনার জানান।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক নূর খান প্রথম আলোকে জানান, রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বিভিন্ন মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এ ছাড়া থানায় তদন্তাধীন মামলাও থাকে। ফলে দেখা যায়, গ্রেপ্তার অভিযানে অনেক নিরীহ মানুষ যখন ধরা পড়েন তখন তাঁদের ওসব মামলায় ফাঁসানো হয়। অথবা টাকায় রফা হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ শারীরিক-মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
আটক ও হয়রানির পাশাপাশি রাজধানীতে আবার শুরু হয়েছে ডিবি কিংবা পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই। ৪ ফেব্রুয়ারি আসাদগেটে একটি ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা তোলেন এজাজ আহমেদ। সঙ্গে তাঁর অফিসের এক কর্মচারী ছিলেন। টাকা নিয়ে কিছুদূর যেতেই ‘ডিবি’ লেখা কাগজ সাঁটানো একটি মাইক্রোবাসে থাকা কয়েকজন যুবক নিজেদের ডিবি পরিচয় দিয়ে তাঁদের মাইক্রোবাসে তোলে। ‘ক্রসফায়ারের’ ভয় দেখিয়ে ও মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের নামিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী এজাজ এ ঘটনায় ডিএমপি কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।

দুই ভিনদেশীর অন্যরকম ভালবাসা by হাফিজ উদ্দিন ও একে আজাদ

ভিনদেশী দুজন মানুষ। ভাষাও ভিন্ন। কিন্তু মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থেকেই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এ দুজনই। সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের মানুষের সেবায়। মাতৃভূমি ও মাতৃত্বের বন্ধন ছেড়ে থিতু হয়েছেন এই দেশে। একজন ভেলরি টেইলর। সাভারে গড়ে তুলেছেন পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি)। যেখানে সেবা শুশ্রূষায় মানুষ ভুলে যায় তাদের অসহায়ত্ব। পঙ্গুত্ব নিয়েও বাঁচার লড়াইয়ে এগিয়ে যায় জীবনযুদ্ধে। অন্যজন ফাদার মারিনো রিগন। যিনি এসেছিলেন খুলনা অঞ্চলে ধর্মপ্রচারে। কিন্তু একাত্তরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবায় নিজেকে সঁপেছিলেন। একে একে গড়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অসহায় ও দুস্থ নারীদের কর্মসংস্থানে কল্যাণমূলক অনেক প্রতিষ্ঠান। ভেলরি ও রিগনের ভালবাসা আজ বিশ্বস্বীকৃত। দেয়া ও নেয়ার কালস্রোতে এরা বাংলাদেশের মানুষকে শুধু দিয়েই গেলেন। চিরন্তন ভালবাসার এক অনন্য প্রতীক।
পক্ষাঘাতগ্রস্তদের কাছের মানুষ: ভিনদেশী এক মহীয়সী নারী। যিনি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের সেবায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। এদেশের মানুষের প্রতি ভালবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন মানুষের সেবায়। মাতৃভূমি ও মাতৃত্বের বন্ধন ত্যাগ করে চলে এসেছেন বাংলাদেশে। আত্মোৎসর্গ করেছেন নিজেকে। তিনি মিস ভেলরি এন টেইলর। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী, পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও মানুষের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেছেন হাসপাতাল, পুনর্বাসন কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজধানীর সন্নিকটে সাভারে প্রতিষ্ঠা করেছেন পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি)। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করেছেন চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পরামর্শ কেন্দ্র। ভেলরির জন্ম ৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রুকলিনে। তার বাবা উইলিয়াম টেইলর ছিলেন গির্জার পুরোহিত। মা মেরি টেইলর ছিলেন গৃহিণী। তিন বোনের মধ্যে ভেলরি দ্বিতীয়। তিনি ১৯৬৯ সালে ভলান্টারি সার্ভিস ওভারসিজ (ভিএসও) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান: বাংলাদেশ) আসেন। উদ্দেশ্য ছিল ফিজিওথেরাপি প্রদান। তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কাছে চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টান হাসপাতালে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে চলে যান নিজ জন্মভূমিতে। যুদ্ধোত্তর এদেশে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় পুনরায় ১৯৭২ সালে ফিরে আসেন। ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডা. আরজে গাস্টের সঙ্গে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে রোগীদের সেবা দিতে শুরু করেন। রোগীদের সেবার পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করেন। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে রোগ মুক্ত হয়ে সুস্থ জীবনযাপন করা যায় একথা জানত না আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়েছেন। মানুষকে বুঝিয়েছেন ফিজিওথেরাপির কথা। একপর্যায়ে ১৯৭৯ সালের ১১ই ডিসেম্বর এই মহীয়সী নারী সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের একটি পরিত্যক্ত গোডাউনে মাত্র চারজন রোগী নিয়ে সিআরপির কাজ শুরু করেন। মানুষের সচেতনতা ও রোগীর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৮১ সালে ধানমন্ডির শঙ্করে বাড়ি ভাড়া করে সিআরপির কাজ চালানো হয়। একপর্যায়ে ফার্মগেটের একটি ভাড়া বাড়িতেও কিছুদিন সিআরপির কাজ চলে।
অবশেষে ১৯৯০ সালে সাভারে ১৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় সিআরপির প্রধান কার্যালয়। ক্রমান্বয়ে সিআরপির কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে ঢাকার মিরপুর, সাভারের গণকবাড়ি, মানিকগঞ্জ এ ছাড়া পুরানো ঢাকার একটি পাইলট প্রজেক্টসহ ৮টি জেলার ৬১টি উপজেলায় সিআরপির সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু রয়েছে। সর্বস্তরের স্থানীয় প্রতিবন্ধীদের সহযোগিতার লক্ষ্যে সমাজ সেবা অধিদফতরের সহযোগিতায় ১৩ জেলায় ১১৫টি উপজেলায় কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। ড. মিস ভেলরি এন টেইলরের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগতিতিক্ষার বিনিময়ে সিআরপি আজ এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। মানবসেবার এক বিশেষ মাইলফলক সিআরপি। সমাজের অগণিত প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জীবন সাজাতে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছে দুঃখী মানুষের এই প্রতিষ্ঠানটি। সিআরপির রয়েছে এক বিশাল দেশী-বিদেশী কর্মী বাহিনী। তাদের মেধা, শ্রম ও আন্তরিকতার ফলে প্রতিদিন সুস্থ হয়ে নিজ ঘরে ফিরছে মানুষ।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ১০ শতাংশ মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সড়ক দুর্ঘটনা, গাছ থেকে পড়ে যাওয়া, জন্মগত ত্রুটি, মাথা বা ঘাড়ে বোঝা নিয়ে পড়ে যাওয়া, গরুতে আঘাতপ্রাপ্ত, শিল্প কারখানার দুর্ঘটনা, স্পাইনাল কর্ডের আঘাত প্রভৃতি কারণে প্রতিদিনই অসুস্থ হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হচ্ছে অনেক মানুষ। হারিয়ে ফেলছে নিজ জীবন-জীবিকা। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে পরিবার, পরিজন ও সমাজ থেকে। সিআরপি এ ধরনের মানুষদের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকে। ফিজিওথেরাপি সেন্টারের মহররম, কম্পিউটার শাখার জ্যোতি, রুমা, বজলু, হোসনে আরাসহ এরকম ২০ জন প্রতিবন্ধী কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে এখানে। যারা সুস্থ মানুষের চেয়েও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বাহ্যিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
সিআরপির প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে আউটডোর চিকিৎসা সুবিধা। এখানে প্রতিমাসে গড়ে পাঁচ হাজার রোগী ফিজিওথেরাপি এবং এক হাজার রোগী অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা নিয়ে থাকে। মেরুদ-ে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের জন্য রয়েছে একশ’ সংখ্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রয়েছে একটি শিশু ইউনিট। মা ও শিশুদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। প্রতিবন্ধী শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কর্মকা-ের সহায়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয় এখানে। আছে একটি স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি ইউনিট। বিভিন্ন প্রকার স্নায়ুবিক সমস্যা স্ট্র্রোক, মস্তিষ্কের আঘাত, প্যারালাইসিস ও ব্যথার জন্য এখানে রয়েছে বিশ্বমানের ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির চিকিৎসা।
এখানে আছে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত অপারেশন থিয়েটার, প্রতিবন্ধী সুইমিংপুল, প্যাথলজি, রেডিওলজি, টেলিমেডিসিন লিংক সার্ভিস। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে রয়েছে ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। যেসব রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয় না তারা যাতে বাড়ি ফিরে নিজের কাজ নিজে করতে পারে তাই চিকিৎসা শেষে তাদের হাফওয়ে হোস্টেলে রাখা হয় কয়েক সপ্তাহ। সঙ্গে থাকতে পারেন স্ত্রী ও সন্তান। বাড়ি গিয়ে কিভাবে চলাফেরা করবে এবং কি কাজ করবে এসব কিছু জানার জন্য রাখা হয় এই হোস্টেলে। এখানে শ্রেণী বিভাজন অনুযায়ী রয়েছে থাকার ঘর ও সিট। অনেকেই এখানে চিকিৎসা শেষে আবার কেউ কেউ দূর-দূরান্ত থেকে আসেন প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য। তারা তখন এখানকার ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে উঠেন। এখানে শেখানো হয় কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক্স মেরামত, টেইলারিং, এমব্রয়ডারি, সপ ম্যানেজমেন্ট, নার্সারি, পোলট্রি ও সেলুনের কাজসহ নানা কিছু। লেখাপড়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্পেশাল নিডস স্কুল। রয়েছে সব ধরনের খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা।
সিআরপির রোগীদের চিকিৎসা সেবা, পুনর্বাসনে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় তার বেশির ভাগই আসে বৈদেশিক সাহায্য থেকে। তবে রোগীদের আর্থিক অবস্থা বুঝে আনুপাতিক হারে চিকিৎসার জন্য অর্থ আদায় করা হয়।
মিস ভেলরি এন টেইলরের বৈদেশিক যোগাযোগের কারণে সিআরপির ফান্ড পেতেও তেমন অসুবিধা হয় না। দেশী-বিদেশী নানা সংস্থা, ব্যক্তি প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। সেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোগিতাও রয়েছে অনেক। তাছাড়া সিআরপির মিরপুর শাখাটি সম্পূর্ণই আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করছে। সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্যে যারা টাকা দিয়ে চিকিৎসা করতে সক্ষম তাদের জন্য এখানে আছে মেডিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড কনসালট্যান্সি, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, ডায়াগনস্টিক সার্ভিসেস, শিশু বিভাগ ও স্ট্রোক রিহ্যাবিলিটেশন ইউনিট।
সিআরপির লক্ষ্য সম্পর্কে ড. ভেলরি এন টেইলর জানান, শারীরিক ভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষকে সুচিকিৎসার মাধ্যমে কর্মক্ষম করে তুলাই সিআরপি’র মূল লক্ষ্য এবং এ লক্ষ্য নিয়ে সিআরপি এখন সমগ্র বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার একটি সুপরিচিত নাম।
দুঃস্থ্য, দুর্গত মানুষের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে বৃটেনের রাণী তাকে বিশেষ খেতাব ‘অর্ডার অব দ্যা বৃটিশ এম্পেয়ার’এ (ওবিই) ভূষিত করেন। এছাড়াও দেশের মানব কল্যাণের জন্য তিনি ১৯৯৬ সালে হল্যান্ডের ওয়ার্ল্ড অর্থোপেডিক কনসার্ন-এর দেয়া ‘আর্থার আয়ার ব্রাক’ স্বর্ণপদক লাভ করেন। ভেলরি ২০০০ সালে বাংলাদেশে জাতীয় সমাজসেবা পদক, ২০০১ সালে ডা. এমআর খান ও আনোয়ার ট্রাস্ট স্বর্ণপদক এবং হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ পুরস্কার, ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার এবং ২০০৫ সালে রোকেয়া শাইনিং পারসোনালিটি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এ ছাড়াও বেসরকারি হাউজিং প্রতিষ্ঠান শেলটেক (প্রা.) লিমিটেড কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১৯৯৮ সাল থেকে প্রবর্তিত শেলটেক পদক, মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় সিআরপি’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্টের দি ওয়ান প্রজেক্ট কর্তৃক তাকে এক লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়।
জীবন বিলানো এক ফাদার
বাংলা, বাঙালি আর বাংলাদেশকে ভালবেসে যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, যার রক্তের কণায় কণায় বাঙালির ঐতিহ্য, হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে বাংলাদেশের মানুষের কথা বলে, নারী মোহ নয়, রয়েছে অবহেলিত নারীদের মুক্তির সংগ্রাম, যার ভালবাসায় সিক্ত মংলার মানুষ, তিনি হচ্ছেন ফাদার মারিনো রিগন। ভিনদেশী এ মহান পুরুষ সেবক, শিক্ষক, ধর্মগুরু ও মুক্তিযোদ্ধা। তার অবদান বাংলাদেশের পতাকায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ধূলিকণায়। যৌবনকাল বাংলাদেশে কাটালেও জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি অবস্থান করছেন নিজ জন্মভূমি ইতালিতে। ১৯২৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি ইতালির ভিসেনছা প্রভিন্সের ভিলন্ডাভেরলা গ্রামে ফাদার মারিনো রিগনের জন্ম। বাবা রিকার্দো রিগন ছিলেন একজন কৃষক, অভিনেতা ও গায়ক। মা মনিকা রিগন ছিলেন স্কুলের শিক্ষিকা। আট ভাই-বোনের মধ্যে মারিনো সবার বড়। মাত্র ৫-৬ বছর বয়স থেকেই মারিনো ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। ওই বয়সেই তিনি স্বপ্ন দেখেন পুরোহিত হওয়ার। মারিনো ছাত্র সময় থেকেই গ্রিক, ফ্রেঞ্চ, লাতিন ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। মারিনো রিগনের বয়স তখন মাত্র ২৮ বছর। ধর্মের দীক্ষা নেয়া এক টগবগে যুবক। ধর্মগুরুরা নির্দেশ দিলেন তোমাকে বাংলাদেশে যেতে হবে ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারক হিসেবে। মারিনো রাজি হলেন। ১৯৫৩ সালর ৭ই জানুয়ারি তিনি প্রথম যশোরের মাটিতে পা রাখেন। এরপর স্টিমারযোগে ঢাকায়। মারিনো ঢাকার আর্য বিশপ মিশনে থাকেন চার মাস। ওখানে বসেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ এবং সংস্কৃতি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা অর্জন করেন। চার মাস পর মারিনোকে পাঠিয়ে দেয়া হয় কুষ্টিয়ার মুজিবনগরের ভবেরপাড়া ক্যাথলিক মিশনে। এর পর ১৯৫৪ সালে তিনি মংলার মালগাজি মিশনে আসেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কাজ করেন খুলনার ক্যাথলিক মিশনে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার দায়িত্ব ছিল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বানিয়াচর মিশনে। সেখানে তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিতেন। এর পর ১৯৭৯ সালে তিনি আবার মংলায় এসে শেলাবুনিয়ার সেন্টপলস ক্যাথলিক মিশনে যোগ দেন। ২০১৪ সালে ইতালিতে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকেন। তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন শেলাবুনিয়ার ক্যাথলিক মিশন। গড়েছেন একাধিক হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অসহায়, দুস্থ ও নারীদের কর্মসংস্থানসহ নানা কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৪ সালে মংলায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাগেরহাট জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয়। শুরুর দিকে তিনি ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ফাদার রিগন খুলনার ফাতেমা উচ্চ বিদ্যালয়সহ যশোর, বাগেরহাট ও মংলার বিভিন্ন স্থানে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েছেন। অসহায় ও দুস্থ নারীদের জন্য মংলার শেলাবুনিয়ায় তিনি ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নকশিকাঁথা সেলাইকেন্দ্র। শতাধিক নারী এখানে কাজ করছেন। এখানকার নকশিকাঁথা দিয়ে ১৯৮৬ সালের ২ থেকে ১০ই সেপ্টেম্বর ইতালির ভিসেনজা শহরের মনতে ডি পিয়েত্রা হলে, ১৯৯১ সালে ভেনিসে এবং ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে রোমে প্রদর্শনীরও আয়োজন হয়েছে। বাংলা সাহিত্যচর্চা করেছেন ফাদার মারিনো রিগন। শোনেন লালনের গান। এসব সাহিত্য ও গান ইতালির ভাষায় অনুবাদও করেছেন। তার অনূদিত গীতাঞ্জলি ১৯৬৪ সালে ইতালিতে প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত তিনি রবীন্দ্রনাথের ৪০টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ অনুবাদ করেন। তার অনুবাদ করা জসীমউদদীনের বইয়ের মধ্যে আছে নকশিকাঁথার মাঠ, জসীমউদদীনের নির্বাচিত কবিতা, সোজন বাদিয়ার ঘাট, সূচয়নী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ, প-িত মশাই, সুকান্ত ভট্টাচার্যের সুকান্ত সমগ্র, লালন ফকিরের ৪০০টি লালনগীতি, লালন ফকির ও অন্যান্য বাউল গানের সংকলন, বাংলার বাউল ও বাউল গান। এ ছাড়া তিনি শেলাবুনিয়ার রূপকথা নামে একটি বই এবং ইতালিয়ান ভাষায় মৌলিক গবেষণাধর্মী ৯টি বইও লিখেছেন। ১৯৮৬ সালের ২৩শে নভেম্বর ইতালিতে আন্তর্জাতিক শিশু সংগীত প্রতিযোগিতায় রিগনের উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে শিশুশিল্পী অরিণ হক অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান অধিকার করে। ১৯৮৭ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর থেকে ২রা অক্টোবর রিগন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির একটি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে ইতালি সফর করেন। তারা সেখানকার ফ্লোরেন্স, ফায়েঞ্জা, চেরনুসকো, মিলান, ভেনিস ও ভিসেঞ্জাতে জসীমউদদীনের নকশিকাঁথার মাঠ অবলম্বনে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেন। এ ছাড়া ১৯৯১ সালে শামীম আরা নিপা, অপি করিমসহ নাচের দল নিয়ে রিগন ইতালি এবং ভ্যাটিকান সিটিতে সাংস্কৃতিক সফরে যান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সমাজসেবা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৮ সালে ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। ফাদার মারিনো রিগন শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তার জন্মদিন উপলক্ষে মংলার হলদি বুনিয়া গ্রামে কয়েক বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে রিগন মেলা। ফাদার রিগনের ঘনিষ্ঠ সহচর মংলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সুনীল কুমার বিশ্বাস জানান, জীবন সায়াহ্নে সুদূর ইতালি বসেও ফাদার রিগন স্মরণ করছেন বাংলাদেশের মানুষের কথা। তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, শেষ নিঃশ্বাসটুকু তিনি ফেলতে চান শেলাবুনিয়ার মাটিতে। চির শায়িত হতে চান মংলার কাদা মাটির কবরে।

পেট্রলবোমা ক্রসফায়ার সংলাপ by সৈয়দ আবদাল আহমদ

পেট্রলবোমা, ক্রসফায়ার, সংলাপ। এই তিনটি শব্দ এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত, আলোড়িত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনীতিক, কূটনীতিক, সরকারি আমলা, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী এমনকি সাধারণ মানুষÑ সবার মধ্যে এ নিয়েই যত মাথাব্যথা, এ নিয়েই যত আলোচনা।
বর্তমানে দেশ একটি চরম সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা গোটা জাতিকে গ্রাস করছে। গত বছরের ৫ জানুয়ারির ভোটহীন, ভোটারহীন ও প্রার্থীহীন প্রহসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্কটটি দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আর এই সঙ্কট থেকেই এসেছে পেট্রলবোমা, ক্রসফায়ার ও সংলাপ।
৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে জাতিসঙ্ঘের সহায়তায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ হয়েছিল। সংলাপে মধ্যস্থতা করতে এসেছিলেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত মি. তারানকো। সেই সংলাপে তখন সঙ্কটের মীমাংসা হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার জবরদস্তির মাধ্যমেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যায়। জাতিসঙ্ঘের আহ্বান ও আন্দোলনের মুখে সরকার ওই নির্বাচনকে একটি নিয়ম রক্ষা ও নিতান্ত সংবিধান রক্ষার নির্বাচন উল্লেখ করে। সবার আশা ছিল সরকার তাদের কথা অনুযায়ী অচিরেই সংলাপের মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যা সমাধান করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি ‘ইনকুসিভ’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় ঐক্যজোটও একটি বছর অপেক্ষা করে। তারা আন্দোলনের কোনো কর্মসূচিও দেয়নি। কিন্তু সরকার বলতে থাকে তারা পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে এবং ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না।
এমন একটি পরিস্থিতিতে আবারো রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনটিকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দেয়। জোটনেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে জাতির সামনে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন। সরকার তার এ দাবিকে অগ্রাহ্য করে আবারো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ অবস্থায় দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ডাক দেয় ২০ দলীয় জোট।  জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে দেশব্যাপী শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। অবরোধের মাঝে আবার বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় চলতে থাকে হরতাল। ১৩ ফেব্রুয়ারি অবরোধের ৩৯ দিন অতিবাহিত হচ্ছে। সরকার চলমান এই আন্দোলনকে প্রচণ্ড দমন-পীড়ন চালিয়ে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে গোটা দেশে সৃষ্টি হয়েছে এক সহিংস পরিস্থিতি। এক দিকে চলছে পেট্রলবোমা হামলা, অন্য দিকে ক্রসফায়ারে হত্যা। এ অবস্থায় জনজীবনের শান্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত। সারা দেশের পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ স্থবিরতা। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘দেশের পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। ঢাকার বাইরে জেলাগুলোর অবস্থা মারাত্মক’। রাতে মহাসড়কে বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এ পর্যন্ত সহিংসতায় ৮৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ক্রসফায়ারে ১৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
চলমান এই পরিস্থিতিতে জাতিসঙ্ঘসহ সর্বমহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে চরম বৈরী অবস্থান থেকে সরে এসে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে উভয়পক্ষকে সঙ্কট নিরসনে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হয়। এসব বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলা হয়, একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই চলমান সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। সরকার যদি মনে করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে এবং বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ করে এই সঙ্কট থেকে বের হওয়া যাবে তাহলে তারা বিরাট ভুল করবে।
কিন্তু দেশের নিরীহ জনগণ গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেন যে, উভয়পক্ষই অনড় অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলের হরতাল অবরোধ চলছে। অন্য দিকে সরকারও বল প্রয়োগ করে যাচ্ছে। দিন দিনই পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। সরকার ২০ দলীয় জোটের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে বিএনপি-জামায়াত জঙ্গি সংগঠন। তাদের সাথে কোনো আলোচনা নয়।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগ এনে সরকারের মন্ত্রীরা তাকে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার কপালে দুঃখ আছে। ইতোমধ্যে  দেখা গেছে, খালেদা জিয়াকে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কৌশল নেয়া হয়েছে। তার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন ১৯ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। ১০ দিন পর বিচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করলেও ডিশলাইন ও ইন্টারনেট এখনো বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে খাবার প্রবেশেও বাধা দেয়া হয়। অফিসের প্রধান ফটকের সামনে পুলিশ রেজিস্টার খাতা খুলে নাম-ঠিকানা রেকর্ড করে রাখছে। একইভাবে শ্রমিক লীগ, প্রজন্ম লীগ ও সৈনিক লীগকে দিয়ে গুলশান অফিসের সামনে মিছিল ও অবস্থান করানো হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের স্কুল থেকে জোর করে এনে মানববন্ধনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। নৌমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিক-জনতা নিয়ে তিনি গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়াকে ঘেরাও করবেন। এর আগে দেখা গেছে, ডজনখানেক ইট ও বালুর ট্রাক বসিয়ে এ কার্যালয়েই খালেদা জিয়াকে দু’সপ্তাহ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। প্রধান গেট পুলিশ তালা মেরে বন্ধ রাখে। তাকে লক্ষ্য করে পেপার স্প্রে বা মরিচের গুঁড়া নিক্ষেপ করা হয়। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেত্রী এবং তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী এভাবেই নানা আচরণের শিকার হচ্ছেন। 
কী নির্দয়ভাবে চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করা হচ্ছে তার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যাবে। গণমাধ্যমে গত কয়েক দিনে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রধান ও কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আন্দোলন দমনে কঠিন ব্যবস্থা নিন, সব দায়িত্ব আমার’। এর পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিজিবি প্রধান সরাসরি গুলি চালানোর হুমকি দেন। র‌্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদ ২৫ জানুয়ারি খুলনায় বলেন, ‘সরকার গুলি চালাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্র দিয়েছে, হা-ডু-ডু খেলার জন্য নয়’। তিনি রংপুরে গিয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো বক্তব্য দেন। বলেন, ‘২০১৯ সালেই নির্বাচন হবে’। একইভাবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, ‘শুধু গুলি করা নয়, সহিংসতায় জড়িতদের বংশধর পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয়া হবে। অস্ত্র দেয়া হয়েছে নিরাপত্তার জন্য। আমরা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষব’। ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি  শফিকুল ইসলাম কুমিল্লায় বলেন, ‘একটি লাশ পড়লে দু’টি লাশ ফেলে দেয়ার ক্ষমতা পুলিশের আছে’। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এম হাফিজ আক্তার ১৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বলেন, কেউ সহিংসতা ঘটালে সাথে সাথে পুলিশ গুলি করবে। একইভাবে সরকারের সহযোগী জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদল ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে পায়ে গুলি করবে, কাজ না করলে বুকে গুলি করবে’। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবুল আলম এই মিলনায়তনে দাঁড়িয়ে বলেন, যদি দেখা যায় গাড়িতে কেউ বোমা মারছে, সাথে সাথে গুলি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে  সজীব ওয়াজেদ জয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা তোমাদের ধরবই। সেটি জ্যান্ত হোক বা যেভাবেই হোক’।
এ অবস্থায় ‘ক্রসফায়ার’ ও বন্দুকযুদ্ধের নামে নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানোর লাইসেন্স পেয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভিন্নমত পোষণ করার কারণে নাগরিকদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলা হচ্ছে। পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। ক্রসফায়ারে হত্যা করে বলা হচ্ছে যে, তিনি বিপথগামী মানুষ। দৈনিক প্রথম আলো ৬ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্রসফায়ারে ১৯ জনের হত্যার তথ্য প্রকাশ করেছে। দৈনিক মানবজমিনে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম ছিল সাত দিনে ১২ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ১ ফেব্রুয়ারি রিপোর্ট প্রকাশ করে জানিয়েছে, শুধু জানুয়ারি মাসেই দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৭ জন। বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ ও বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার দলীয় নেতাকর্মীদের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ,  র‌্যাব ও বিজিবি এবং সাদা পোশাকে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের হাতে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সংখ্যা ৪৩ জন। ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নামে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নোয়াখালী, কুড়িগ্রাম, যশোর, সাতক্ষীরা, ঢাকার আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, বরিশালের উজিরপুর ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, শামসুজ্জামান দুদুসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করে কয়েক দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন স্তরের ১৮ হাজার দলীয় নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার আসামির সংখ্যা সাত লাখ। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও ট্রাকের নিচে ফেলে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পায়ে গুলি করে অনেক নেতাকর্মীকে পঙ্গুও করা হয়েছে। মাসের পর মাস বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, মহানগর কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। কোনো মিছিল, কোনো সভা সমাবেশ কিংবা অফিসে বসার কোনো সুযোগই দেয়া হচ্ছে না। এক কথায় কোনো রাজনৈতিক অধিকার চর্চাই করতে দেয়া হচ্ছে না। 
চলমান পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেছে তার আরো একটি জঘন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের বাসভবন লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তদের গুলিবর্ষণের ঘটনা। এর আগে প্রখ্যাত কূটনীতিক সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ ও তার গাড়ি বোমা মেরে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সরকার ভিন্নমতের গণমাধ্যমগুলো আগেই বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে যেসব গণমাধ্যম চালু আছে, সেখানে ছিটেফোঁটা সমালোচনাও সহ্য করা হচ্ছে না। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সরকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঞ্চালনায় বাংলাভিশনের জনপ্রিয় টকশো ফ্রন্টলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। এরশাদ আমলের মতো অলিখিত ‘প্রেস অ্যাডভাইস’ জারি করে খবর সেন্সর করা হচ্ছে।  টকশো নিয়ন্ত্রণ তো অনেক আগে থেকেই করা হচ্ছে। মেধাবী সাংবাদিক শওকত মাহমুদের নামে পেট্রলবোমা ও যানবাহনে আগুন দেয়ার ছয়টি মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। মামলা দেয়া হয়েছে পেশাজীবী নেতা সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। এনটিভির চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী, ইটিভি চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে গ্রেফতার করে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে।
দেশে আজ যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার মূলে ৫ জানুয়ারির ভুয়া নির্বাচন। ওই নির্বাচনটি ছিল দেশ-বিদেশে একটি চরম প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। দেশের জনগণের ভোটের অধিকারকে এ নির্বাচনে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। বাকি ১৪৬টি আসনে গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি। ৫৯টি কেন্দ্রে একজন ভোটারও যায়নি। সেদিন নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে কুকুর বিড়াল ঘুমিয়ে থাকার ছবি প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়। নির্বাচনের দিনেই ১৯ জন প্রাণ হারায়। আর নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত সহিংসতায় নিহত হয় ১২৩ জন। জনগণ কোনোভাবেই সেই ভোটহীন, ভোটারহীন ও প্রার্থীহীন সহিংস নির্বাচন মেনে নেয়নি। দেশ-বিদেশে এ নির্বাচন কোনো বৈধতা পায়নি। চরম বিতর্কিত এ নির্বাচনে সংসদে একটি কৃত্রিম ও গৃহপালিত বিরোধী দল সাজানো হয়েছে। আবার ওই বিরোধী দল থেকেই কয়েকজনকে মন্ত্রীও করা হয়েছে। রওশন এরশাদকে করা হয়েছে বিচিত্র এই বিরোধী দলের নেতা। জেনারেল এরশাদকে করা হয়েছে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এর কোনোটাই গণতন্ত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর কারণেই আজ জাতি সঙ্কটে পড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সঙ্কট হলেও সরকার তা মানছে না। একে আইনশৃঙ্খলাজনিত সঙ্কট প্রচার করে বলপ্রয়োগ করে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক এ সঙ্কটকে রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের জন্য দেশের নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সমাজ সভা, সমাবেশ বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাষ্ট্র এবং জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সঙ্কট নিরসনে সরকার ও রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কয়েক দিন আগে সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তন থেকে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবীরা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি ঐকমত্যের সরকার গঠনে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম মতিঝিলে তার অফিসের সামনের ফুটপাথে আজ ১৫ দিন ধরে অবস্থান করে দুই নেত্রীর মধ্যে, দুই জোটের মধ্যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ করার দাবি জানাচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন এবং এ দাবিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অবস্থান কর্মসূচিতে যাচ্ছেন।  ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, ড. বদিউল আলম মজুমদার ও ড. শাহদীন মালিক নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে বিশিষ্ট নাগরিকদের অংশগ্রহণে একটি গোলটেবিল আয়োজন করে সংলাপের আহবান জানিয়েছেন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বরাবর চিঠি পাঠিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংলাপ অনুষ্ঠান ও একটি জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের অনুরোধ জানিয়েছেন। এ সবই শুভ উদ্যোগ। দেশের সঙ্কটকালে যারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সফল হলে উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন না। দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।  আর তাতে অংশ নেবেন রাজনৈতিক নেতারাই। উদ্যোক্তাদের সন্তুষ্টি এতটুকুই হবে যে, দেশ সঙ্কটমুক্ত হবে এবং জনগণের মধ্যে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসবে।
তবে দেশ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও সরকার এখনো সংলাপের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নাগরিক সমাজের চিঠির পরদিনই বলে দেন এ প্রস্তাব অবাস্তব এবং সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো সংলাপ নয়। সংলাপের উদ্যোক্তাদের এক-এগারোর কুশীলব বলেও আখ্যায়িত করা হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শনে গিয়ে নাগরিক সমাজের আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কার সাথে আলোচনা করব, খুনির সাথে? একই দিন সংসদে প্রশ্নোত্তরে তিনি বিএনপিকে জঙ্গি সংগঠন উল্লেখ করে নিষিদ্ধ করাও হুমকি দেন। তারপরও নিরাশ হলে চলবে না। সবার অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনই জাতিকে বর্তমান মহাসঙ্কট থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গঠনমূলক সংলাপই জাতির আকাক্সা।
সবার আশা সরকার বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সম্ভাব্য আরো ভয়াবহ পরিণামের কথা অনুধাবন করে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করবে এবং দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা করবে। বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েই সমাধান করতে হবে, বল প্রয়োগে নয়। একতরফা নির্বাচন থেকে উদ্ভূত সঙ্কট কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সুরাহা সম্ভব। কথা না বলার সংস্কৃতি গণতন্ত্রে অচল। একই সাথে এ ধরনের সঙ্কট আর যাতে সৃষ্টি হতে না পারে এবং দেশে যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি চলছে তা চিরতরে বন্ধ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কতগুলো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছে একটি জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করাও জরুরি। এমন উদ্যোগ যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে তার উদাহরণ ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখা স্বাক্ষর। এমন উদাহরণ দেখা গেছে পাকিস্তানেও। 
কয়েক বছর আগে লন্ডনে বেনজির ভুট্টো, নওয়াজ শরিফসহ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ‘চার্টার অব ডেমোক্র্যাসি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর ফলে পিপিপির পাঁচ বছরের শাসনামলে পাকিস্তানে বিরোধী দলের একজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীকেও জেলে যেতে হয়নি। বিরোধী দলও সরকারের কাজে বাধা দেয়নি। তেমনি বর্তমান নওয়াজ শরিফ সরকারও একইভাবে তা অনুসরণ করে যাচ্ছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে যদি এ ধরনের একটি জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয় এবং এ জন্য হরতাল-অবরোধ, সংসদ বর্জন, জ্বালাও-পোড়াও, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ হয়, তাহলে সেটাই হবে দেশের জন্য মঙ্গল। এর ফলে দেশের রুগ্ণ ও অসুস্থ রাজনীতিরও অবসান হবে।  দেশের মানুষ এমন একটি শুভদিনের প্রত্যাশা করছে। 
লেখক : জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক

‘নাগরিক সমাজের উদ্যোগ ব্যর্থ হলে পরিণতি ভয়াবহ হবে’ -এম সাখাওয়াত হোসেন

নাগরিক সমাজের উদ্যোগ ব্যর্থ হলে দেশের স্বাধীনতা সাবভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন। বলেছেন, নাগরিক সমাজ এগিয়ে এসে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা ব্যর্থ হলে পরিণত ভয়াবহ হবে। সকালে রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় যাদুঘরের সামনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এ উদ্বেগের কথা জানান। ‘শান্তি-সম্প্রতি ও সমঝোতার’ দাবিতে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে সুজন।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাজনীতিবিদরা যখন সমস্যা সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই নাগরিক সমাজ এগিয়ে এসে  উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার ও বিএনপির উচিত এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একটি সমঝোতায় আসা। না হয় দেশের স্বাধীনতা সাবভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে। পরিণতি ভয়াবহ হবে।
তিনি বলেন, রাজনীতি ক্রমেই রাজনীতিবিদদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অবস্থা চলছে থাকলে অচিরেই পুরোপুরি রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। যা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।
সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সারাদেশে রাজনীতির নামে মৃত্যুর কাফেলা চলছে। আর এই মৃত কাফেলায় দগ্ধ হয়ে মরছে সাধারণ মানুষ। যাদের রাজনীতির সঙ্গে কোন সম্পৃক্ততা নেই। আমরা এই অচলাবস্থায় দ্রুত সমাধান চাই। এর সমাধানের জন্য জরুরি একটি সংলাপ প্রয়োজন। এই সংলাপকে ফলপ্রসু করতে দু’দলকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, সুজনের নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন, সুজনের সহ-সম্পাদক জাকির হোসেন, কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার প্রমুখ।

সঙ্কট সমাধানে কাজ শুরু করেছেন তারানকো by কাউসার মুমিন

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় জাতিসংঘ। সঙ্কটের সমাধানে সরকার ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সংস্থাটির সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
এদিকে, জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজছে বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানে পৌঁছতে হবে। বৃহস্পতিবার এই প্রতিনিধির এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মুখপাত্র এ মন্তব্য করেন। বুধবার জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে বসেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। গত বৃহস্পতিবার বিকালে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রের কাছে মানবজমিনের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, তারানকো-দেশাই বৈঠকে বাংলাদেশ বিষয়ে ঠিক কি কি আলাপ হয়েছে, বা আদৌ বাংলাদেশ পরিস্থিতি আলোচনা হয়েছে কি না? এই প্রশ্নের লিখিত জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মুখপাত্র উপরোক্ত মন্তব্য করেন। এই প্রতিনিধির কাছে প্রেরিত লিখিত জবাবে মুখপাত্র বলেন, সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবেই করা হয়ে থাকে। ওই মুখপাত্র বলেন, এরই অংশ হিসেবে বিগত ১১ই ফেব্রুয়ারি সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের সঙ্গে জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়াসহ ওই অঞ্চলের বৃহত্তর বিষয়াবলী আলোচনায় স্থান পায়।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মুখপাত্র ওই লিখিত প্রতিক্রিয়ায় আরও বলেন, ওই বৈঠকে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল তারানকো ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিসওয়াল বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর সঙ্গে বাংলাদেশ বিষয়াবলী নিয়েও আলোচনা করেন। মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সঙ্কট সমাধানের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ একযোগে কাজ করছে এবং তা চলমান থাকবে। মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ সঙ্কটের একটি সম্ভাব্য সমাধানের উপায় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’ এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে তারানকো-দেশাই বৈঠকে বাংলাদেশ বিষয়ে কি আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে জাতিসংঘের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মুখপাত্র ম্যাথিয়াস গিলম্যাড এই প্রতিনিধিকে টেলিফোনে বলেন, এটি একটি নিয়মিত বৈঠক ছিল, তবে বাংলাদেশ বিষয়ে ঠিক কি আলোচনা হয়েছে সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমার হাতে কিছু নেই।’
পরবর্তীকালে ওই দিন অপরাহ্নে জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক প্রেস ব্রিফিং শুরুর আগে দিনের নিয়মিত ঘোষণায় স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ তোলেন। মুখপাত্র ওই ঘোষণায় বলেন, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে নিশা দেশাই বিসওয়াল এবং অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনটি প্রশ্ন করা হয়। বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার প্রবেশে বাধা দেয়ার প্রসঙ্গও উঠে আসে। প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রশ্নোত্তরের অংশটি তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বাংলাদেশে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়নি। মনে হচ্ছে সঙ্কটের কোন সমাধান নেই। কেননা,  বিরোধীরা অব্যাহতভাবে গ্রেপ্তার আর কারারুদ্ধ হওয়ার চাপে রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব দেশটিতে বিশেষ প্রতিনিধি পাঠানোর কোন চিন্তাভাবনা করছেন কিনা ?
উত্তর: আগের দিন যা বলেছিলাম আপনি হয়তো তার কিছু অংশ মিস করেছেন। সেটা হলো,  শান্তিরক্ষী অফিসের প্রধান অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে জাতিসংঘ মহাসচিব ঠিক ওই ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশ সরকার ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার দায়িত্ব দিয়েছেন। তার কাজের অংশ হিসেবে সেটা তিনি করছেন। আর মহাসচিব স্পষ্টত বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর আমরা প্রাণহানি প্রসঙ্গে অব্যাহতভাবে নিন্দা জানাচ্ছি। আমি মনে করি, গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটা হলো-  চলমান সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান।
প্রশ্ন: বুধবার ওয়াশিংটনে সহকারী মহাসচিব মি. তারানকো এবং মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিস  নিশা বিসওয়ালের বৈঠকের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে কি ওই বৈঠকের ফলাফল সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবেন?
উত্তর: না।
প্রশ্ন: এবং...
উত্তর: আমি মনে করি এ বৈঠকগুলো জাতিসংঘের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যকার নিয়মিত যোগাযোগের অংশ। এটা একটা চলমান আলোচনা প্রক্রিয়া। ওই প্রসঙ্গে আপনার সঙ্গে শেয়ার করার মতো কোন বক্তব্য নেই। আমার মনে হয় আপনার উত্তর পেয়েছেন।
প্রশ্ন: আরেকটি প্রসঙ্গ হলো প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চেয়ারপারসন যিনি তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এখন অবরুদ্ধ রয়েছেন। আর ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ গতকাল ও পরশু থেকে সেখানে এমনকি কোন খাবারও পাঠাতে দিচ্ছে না। সেখানের কর্মচারীরা কিছু শুকনো খাবার খাচ্ছে এমন দৃশ্য নিউজ মিডিয়াতে এসেছে। কাজেই, এসব অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?
উত্তর: জাতিসংঘ মহাসচিব নিশ্চিতভাবে এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা যে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করছি তিনি তার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছেন। আর তার সহকারী মহাসচিব মি. তারানকো নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

জর্জ ডাব্লিউ হাসিনা by জাফর সোবহান

আমরা এমনটা এর আগেও শুনেছি। বর্তমান সরকার আর সরকারপন্থী গণমাধ্যমের ভাষাগত সাদৃশ্য আমাদের নাইন/ইলেভেনের সময়কার মার্কিন বুশ প্রশাসন আর ফক্স নিউজের কথা মনে করিয়ে দেয়।
একই রকম বুকে ধাক্কা মারার মতন মারমুখী আচরণ, ব্যাঙ্গাত্মক বাহাস, নৈতিকতার বাছবিচার আর উভয় বিরোধী পক্ষের মধ্যে সমানতালে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতি আপোষহীন অবস্থান এবং তা দিয়ে পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে এ দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে।
একই রকমভাবে বর্তমান সংকট সম্পর্কে সাদা-কালো আর ভালো-মন্দের সোজাসাপটা বয়ানের বাইরে গিয়ে কেউ কথা বললে অথবা সরকারের অন্তর্মুখিতার দিকে ইঙ্গিত করলে, কিংবা সংলাপ বা সমঝোতার পরামর্শ দিলেই কলঙ্ক লেপন করা হচ্ছে তাদের গায়ে।
আমাদের বলা হচ্ছে, তারা সন্ত্রাসীদের মতই ভয়ঙ্কর খারাপ। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, আমি সন্ত্রাসবাদ ও নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারার পুরোপুরি বিপক্ষে। এই ধরনের নাশকতাকে কোনও যুক্তিতেই ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।
সুতরাং, এখানে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, কিছু বলার আগে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে চরম অভিশাপ বর্ষণ না করলে সহিংসতায় যোগদানকারী বা প্ররোচক না হলেও, আমাকে নাশকতাকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখা হতে পারে।
আমি আবারও বলছি, বাস পোড়ানো আর নিরীহ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার পুরোপুরি বিপক্ষে আমার অবস্থান। এ বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনও অবকাশ নেই।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশের সরকারের দেওয়া বুশ প্রশাসনের মত হয় আপনি আমাদের পক্ষে নয়তো আপনি সন্ত্রাসীদের পক্ষের মত যুক্তিও কারও কারও কাছে গ্রহণযোগ্যও হচ্ছে।
অথচ বুশ যখন এহেন যুক্তি দিয়েছিলে, খুব কম মানুষের কাছেই তা গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। এক অর্থে বেশিরভাগ বাংলাদেশিই ছিলেন এই যুক্তির বিপক্ষে।
আওয়ামী লীগ যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তাকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই বলা যেতে পারে। যেমনটা ২০০১ সালে মোকাবেলা করেছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু তার যুক্তি মুসলিম বিশ্বের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারেনি। বাংলাদেশের মত দেশেও, সরাসরি ব্যাঙ্গ না করলেও, সন্দেহের চোখেই দেখা হয়েছে তার বক্তব্যকে।
প্রথমত, আমরা জানি সন্ত্রাসভীতি কী করে শত্রুর বিরুদ্ধে উইচ হান্টের (মধ্যযুগের ইউরোপে ডাইনি নাম দিয়ে পুড়িয়ে মারার প্রবণতা) মতো বিধ্বংসী কার্যকলাপকেও প্রতি-সন্ত্রাসবাদ নাম দিয়ে জায়েজ করতে পারে।
আমরা এও জানি যারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে এবং যারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে তাদের মধ্যে নৈতিক পার্থক্য ততটা বিস্তর ও সোজাসাপটা নয়, যতটা ক্ষমতাসীনরা আমাদের দিয়ে বিশ্বাস করাতে চান। সব সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এজেন্ডাই যে শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে, তার মতই অশুভ।
আমরা সবাই অবগত আছি, নিরীহ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মত নির্বোধ কার্যকলাপ অতীত বা বর্তমানের কোনও অন্যায়কে যৌক্তিকতা দেয় না। সহিংসতার মূল কারণটা বুঝতে চায় না।
দালানের মধ্যে দিয়ে বিমান চালিয়ে দিয়ে ৩ হাজার নিরপরাধ মানুষকে মেরে ফেলাও কেউ সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণকারীদের উদ্ভাবিত এই যুক্তি পশ্চিমের বিশেষজ্ঞদের মত বাংলাদেশের মানুষও জানে।
তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের মানবাধিকার লঙ্ঘনও কেউ সমর্থন করে না। সবাই জানে, যারা এই নিন্দনীয় কাজগুলো করে। তারা ছাড়াও এগুলোর পেছনে অন্য কারো হাত আছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আইএস যে জর্জ বুশের ভুলের ফলাফল তা সবাই জানে।
তিনি ইরাক আক্রমণ না করলে দেশটি আজ এই অবস্থানে থাকতো না। এই সত্য স্বীকার করেও বলা যায়, তাতে আইএসের জঙ্গি কর্মকাণ্ড ও সহিংসতার দায় কিছুমাত্র কমে যায় না। তবে তা নিজেদের কৌশল ও তার পরিণতি অনুমান করার মত প্রয়োজনীয় দূরদৃষ্টি যোগান দেওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
তার মানে এই নয়, জর্জ বুশ আইএসের আবু বকর আল-বাগদাদির মতই অপরাধী। বরং এই যে, তিনি পুরোপুরি নির্দোষও নন।
যুদ্ধ আর সন্ত্রাসকে আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সরকারের জানা প্রয়োজন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ধরনের যুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে ভুলিয়ে রাখা যাবে না। তারা এ সম্পর্কে উদাসীন ও সন্দেহপ্রবণ। তাই বলে সরকার যদি ধরে নেয় দেশের জনগণ সন্ত্রাসের পক্ষে তাহলেও ভুল করবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সংকটকালে মানুষের সহ্য ক্ষমতাকে নৈতিকতার অভাব বা সমস্যার কারণ হিসেবে দেখাটা সরকারের ভাষ্যে বা কৌশলে উঠে আসলে তা খুব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
যে যুক্তি বহু আগেই বাংলাদেশের মানুষ নিন্দা করেছে, খারিজ করেছে, তা দিয়েই তাদের মন জয় করা যাবে না।
লেখক: সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সহিংসতা বন্ধ ও সংলাপের সমান্তরাল দাবি

বিবদমান সঙ্কট দূর করতে আবারও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। জাতীয় সংলাপ উদ্যোগ নেয়ার জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছেন, সংলাপ না চাইলে এর বিকল্প কি তাও বলতে হবে। সংলাপ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদাকে আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘উদ্বিগ্ন’ নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে চলমান পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন এটিএম শামসুল হুদা। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজ মনে করে সহিংসতা বন্ধ ও সংলাপ আয়োজন সমান্তরালে হতে হবে। সংলাপ আয়োজনে যে কোন সহায়তা দিতে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা প্রস্তুত আছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, এম হাফিজউদ্দিন খান, এ এস এম শাজাহান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সিএম শফি সামি, রাশেদা কে চৌধুরী, এমসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোকেয়া আফজাল রহমান, সাংবাদিক ও কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, বিজিএমইএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ, অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ড. শামসুল হুদা বলেন, যারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন তাদের কাউকে কমিটিতে রাখা হয়নি। এখানকার সবাই পেশাদার। কমিটির কোন নাম দেয়া হয়নি। সদস্য সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দেশের চলমান সঙ্কটে নাগরিক সমাজের পক্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করে এটিএম শামসুল হুদা বলেন, আজ (শুক্রবার) ৩৯ দিন চলছে অবরোধের। প্রায় ৯০ জন নিহত হয়েছেন। আগুনে পুড়িয়ে মারা হৃদয়বিদারক, অমানবিক। যারা বেঁচে যাচ্ছেন তারা কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। মানুষ মারার আন্দোলন আমরা চাই না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এ পরিস্থিতি চলতে পারে না। সংলাপের মাধ্যমে সমাধান না করলে বিকল্প কি আছে আমাদের বলতে হবে। আমাদের কথা পছন্দ না হলে আপনারা বলেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাস ও সহিংসতা বন্ধ করে দেশে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলেই সংলাপ শুরু করা যাবে। দুটো প্রক্রিয়া সমান্তরালে চলতে হবে। না হলে দুই পক্ষের মধ্যে কোন আস্থার সৃষ্টি হবে না। নাগরিক সমাজের ভাবনা দুটিই। এই সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ করতে হবে এবং আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের অভিভাবক ও রক্ষক হিসেবে প্রেসিডেন্টকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনকে নাগরিক সমাজের দেয়া চিঠি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, চিঠির সঙ্গে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তা নিয়ে কেউ সমালোচনা করেনি। অনেক গণমাধ্যমে এটা প্রকাশ করা হয়নি। শুধু চিঠির সমালোচনা করা হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এখানে কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। কোন দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কেউ আসেনি। এ অবস্থায় তাদের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
সংলাপ আয়োজনে নাগরিক সমাজ কোন উদ্যোগ নেবে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা কিভাবে আসবেন সেটা ওনাদের ঠিক করতে হবে। আমরা কিছু বলতে চাই না। তবে রাজনীতিবিদদের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। আমাদের সবার চিন্তাভাবনা আছে। সুযোগ সৃষ্টি হলে আমরা ভূমিকা রাখবো। কমিটির কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, কমিটির কাজ হচ্ছে মাঝেমধ্যে খোঁজ নেয়া। সংলাপের জন্য কোন পরামর্শ চাইলে আমরা পরামর্শ দেবো। আমরা জানান দিলাম যে কোন সহায়তার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। স্ব-উদ্যোগে কারও কাছে যাবো না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটা টেকসই সমাধানে পৌঁছানো। দ্রুত কিছু আশা করছি না। আলোচনা শুরু হলে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তখন দেখবো আমরা কোন ভূমিকা রাখতে পারি কিনা।
নাগরিক সমাজের তৎপরতা নিয়ে সরকারের সমালোচনাকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে মনে হয় কাজ হচ্ছে। কারণ তারা আমাদের গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা উপেক্ষা করছে না। রাজনীতিবিদরা সংলাপ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। আমরা কেউ আশা করিনি প্রস্তাব দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা সংলাপ করবেন। বরং এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমরা আশাবাদী এবং লক্ষ্য ছিল একটাই শান্তি ফিরিয়ে আনা।
৭ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার গোলটেবিল আলোচনার পর রাজনীতিবিদদের সরে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ওই সভা ছিল রাজনীতিবিদদের পূর্বনির্ধারিত। আমরা তাদের কথা শুনতে গিয়েছিলাম। সেখানে তারা কিছু প্রস্তাব রেখেছে। তা থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু আমরা গ্রহণ করেছি। তাদের সঙ্গে ঐকমত্য ছিলাম। পৃথকভাবে ওনারা ওনাদের কাজ করুক। বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রে এমন বিভাজন হয়ে গেছে যেসব সেক্টরে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে। ওনাদের বাদ দেয়ার এখতিয়ার বা অধিকার নাই। গোলটেবিল বৈঠকে আমরা আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম।
জামায়াতের সঙ্গে সংলাপ করবে কিনা সেটা সরকারের বিষয় উল্লেখ করে সাবেক সিইসি বলেন, সব সক্রিয় রাজনৈতিক দলকে সংলাপের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জামায়াতের সঙ্গে সরকার সংলাপ করবে কিনা সেটা তাদের বিষয়। যেহেতু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটো জোটের প্রতিনিধিত্ব করে, সেহেতু তাদের মধ্যে এটা ঠিক করে নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিদেশ থেকে মাঝেমধ্যে সমঝোতার জন্য লোকজন আসেন এটা শুভকর না। আমাদের নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। এটাই মঙ্গলজনক।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, সি এম শফি সামি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, আহসান মনসুর প্রমুখ।
এর আগে গত ৯ই ফেব্রুয়ারি সংলাপের উদ্যোগ নিতে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায় নাগরিক সমাজ। এর আগে ৭ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বক্তব্যের আলোকে ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়।

পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্ঘাতের নতুন ক্ষেত্র by শাহ্ আব্দুল হান্নান

কয়েক বছর আগে ইউরোপের কোনো কোনো দেশে মহানবী সা:-এর মানহানিকর কার্টুন ছাপার মাধ্যমে পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সঙ্ঘাতের এক নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্সের কার্টুন পত্রিকা শার্লি এবদু কয়েকবার রাসূল সা:-এর মানহানিকর কার্টুন ছাপে। এরই প্রতিক্রিয়ায় শার্লি পত্রিকায় হামলা হয় এবং আক্রমণকারীরা ও পত্রিকার কয়েকজন ব্যক্তি নিহত হয়, যা নিয়ে দুনিয়াজোড়া প্রতিক্রিয়া হয়। সারা বিশ্ব এবং মুসলিম বিশ্ব এর নিন্দা জানায়। মুসলিম বিশ্বের বক্তব্য হচ্ছেÑ এসব ঘটনার প্রতিকার আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া নয়। এ ধরনের ঘটনা মুসলিম বিশ্বে ঘটলে তা কোর্টের মাধ্যমে নিরসন করতে হবে। রাসূলের অবমাননাকে ফিকাহর পরিভাষায় সাব্বুর রাসূল (রাসূলের অবমাননা) বলে। এর শাস্তি হচ্ছে বেশির ভাগ ফিকাহবিদের মতে মৃত্যুদণ্ড। তবে ড. হাশিম কামালীসহ কিছুসংখ্যক ফিকাহবিদ মনে করেন, শাস্তি অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী জেল থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে (দ্রষ্টব্য ড. হাশিম কামালী, ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম অবমাননা অধ্যায়, বিআইআইটি প্রকাশিত, মূল ইংরেজি বইয়ের নাম Freedom of Expression in Islam)।
এ ধরনের ঘটনা অমুসলিম বিশ্বে বা পাশ্চাত্যে ঘটলে আইনের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া উচিত। সে দেশের ইসলামি সংগঠনের উচিত কোর্টের মাধ্যমে সুরাহা করা। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ করা, মুসলিম বিশ্বের সরকারগুলোকে বলা, ওই দেশের সরকারের সাথে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেয়া, প্রয়োজনে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া। কোনো অবস্থাতেই আইন হাতে নেয়া উচিত নয়। আইন হাতে নিলে মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলে অভিযুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং ইসলামের মর্যাদা নষ্ট হয় হয়, ইসলাম প্রসারের সুযোগ কমে আসে। তাই সার্বিক বিবেচনায় সন্ত্রাস কোনো সমাধান নয়।
যা হোক, এর পরের ঘটনা হচ্ছে শার্লি পত্রিকাটি আবার রাসূল সা:-এর কার্টুন ছাপে, যাতে রাসূল সা:কে ক্রন্দনরত দেখানো হয়। এর বিরুদ্ধে মুসিলম বিশ্বে এবং সব মুসলিম সংগঠনে প্রতিক্রিয়া হয়। জনগণ বিক্ষোভ মিছিল করে। সংগঠনগুলো বিবৃতি দেয়। ফরাসি সরকারকে আইন করে এসব বন্ধ করার দাবি জানায়। পাশ্চাত্যের জনমতের একটি বিরাট অংশও এ রকম চায় না। খ্রিষ্টানদের নেতা পোপ ফ্রান্সিস এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং সব ধর্ম অবমাননা, নবী-রাসূলদের অবমাননা বা ধর্ম প্রবর্তকদের অবমাননা বন্ধ করার দাবি জানান।
কিন্তু পাশ্চাত্যের একটি অংশ বুঝতে চাচ্ছে না। তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাতে এ ধরনের কার্টুন আইন করে বন্ধ করা ঠিক হবে না মনে করে। এটা নেহাত বাড়াবাড়ি। কোনো স্বাধীনতাই শর্তহীন হতে পারে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অন্যান্য স্বাধীনতা আইন ও নৈতিকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলা হয়েছে। তাই আইন থাকা জরুরি, যেন কেউ মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে যিশুখৃষ্ট বা মুহাম্মদ সা: বা অন্যান্য ধর্ম প্রবর্তকের অবমাননা করতে না পারে। মুসলিম বিশ্ব, খ্রিষ্টান চার্চ ও ইসলামি সহযোগিতা সংগঠনের (OIC) এ ব্যাপারে মূল ভূমিকা নেয়া উচিত।
যদি এ তথাকথিত স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত না করা হয়, তাহলে পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বে সঙ্ঘাতের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। আগেও ক্রুসেডের মাধ্যমে, উপনিবেশবাদের মাধ্যমে পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাষ্ট্র দখল করে পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সঙ্ঘাত সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব সঙ্ঘাত কয়েক শ’ বছর চলেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের দখলদারিত্ব শেষ হলে এসব সঙ্ঘাত কমে আসবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কার্টুনের নামে বা রাসূল সা:-এর অবমাননা করে নতুন সঙ্ঘাত সৃষ্টি করা একেবারেই উচিত হবে না।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন মনীষ

ভারতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি শপথ নেবেন আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার পেতে চলেছেন কেজরিওয়াল ঘনিষ্ঠ মনীষ সিসোদিয়া। অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবার মন্ত্রীদের নতুন দল নিয়ে এগোতে চাচ্ছেন। তার সম্ভাব্য মন্ত্রিসভায় এ পর্যন্ত যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন- ইমরান হুসেন, জিতেন্দ্র তোমর, সত্যেন্দ্র জৈন, কপিল মিশ্র এবং সন্দ্বীপ কুমার। এছাড়া আসীম আহমেদ খানও মন্ত্রী হতে পারেন। স্পিকার হচ্ছেন রাম নিবাস গোয়েল। ডেপুটি স্পিকার হতে চলেছেন বন্দনা কুমারী। বৃহস্পতিবার দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জংয়ের কাছে মন্ত্রীদের নামের সূচি পাঠানো হয়। উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যার নাম সামনে এসেছে সেই মনীষ সিসোদিয়া ২০১৩-র এএপি মন্ত্রিসভায় শিক্ষা ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পতপড়গঞ্জ বিধানসভা ক্ষেত্র থেকে এ নিয়ে পরপর দু’বার বিধায়ক নির্বাচিত হলেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে দিল্লিতে ত্রিশঙ্কু ফল হয়।
সে সময় বিজেপি ৩২টি, এএপি ২৮টি, কংগ্রেস ৮টি এবং অন্যরা ২টি আসনে জয়ী হয়। সেসময় এএপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে জোট করে সরকার গড়েন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ৪৯ দিন সরকার চালানোর পরে ইস্তফা দেন তিনি। তারপর থেকে প্রেসিডেন্টের শাসন জারি হয় সেখানে। ৭ ফেব্রুয়ারি নতুন করে বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে আম আদমি পার্টি। ফের দিল্লিতে সরকার গড়তে চলেছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মন্ত্রিসভায় কোনো নারী স্থান পাচ্ছেন না। সাবেক ছয় মন্ত্রীর দু’জন বহাল রাখা হচ্ছে। গত আমলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন এবারও মন্ত্রিসভায় থাকছেন। আন্না হাজারের আন্দোলনের সময় থেকে কেজরিওয়ালের সঙ্গে আছেন তিনি। ছয় মন্ত্রী অন্য যারা থাকতে পারেন- অসীম আহমেদ (মতিয়া মহল) জিতেন্দ্র তমার (ত্রিনগর), গোপাল রায় (বাবরপুর) ও সন্দীপ কুমার (সুলতানপুর) সাবেক মন্ত্রী সোমনাথ ভার্তি, রাখি বিরলা, গিরীশ শনি ও সৌরভ ভাদ্রজ এবার বাইরে থাকছেন।