Wednesday, June 16, 2010

অপারেশন খরচাখাতা by এম আর আলম

একরকম উচ্ছ্বাস মনের কোণে উঁকি দেয় রজনী সিংহানিয়ার। আবার তিনি মু্ক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন! কিন্তু তা আর হলো না। সবার মতো রজনীও এসেছিলেন সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্লাটফর্মে। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ট্রেনে উঠতে বারণ করে বরং তাঁকে তোলা হয় মিলিটারি জিপে। রজনীর বেঁচে যাওয়া ভাই আজও জানেন না, তাঁর আদরের সেই লক্ষ্মী বোনটি এখন কোথায়।
একাত্তরের ১৩ জুন এমনই ঘটনা ঘটেছিল। প্রতারক পাকিস্তানি বাহিনী সৈয়দপুরের হিন্দু মাড়োয়ারিদের নিরাপদ আবাস ভারতে পৌঁছে দেওয়ার নামে সৈয়দপুর স্টেশনে জড়ো করে। একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়। ট্রেনটি স্টেশনের প্লাটফর্মে দাঁড়ানো। সারি সারি মাড়োয়ারি হুড়মুড় করে উঠে বসছে ট্রেনে। এর আগে ২০ জন তরুণী আর নববধূকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায় বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। পরে জানা যায়, ওই তরুণীদের সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে অফিসারদের উপহার দেওয়া হয়।
শ্যামলাল আগরওয়ালা সে দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। শ্যামলাল বললেন, ২৩ মার্চ রাত থেকে সৈয়দপুরে বাঙালি নিধন শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর সৈয়দপুরের বিহারিরা রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠে। মহল্লায়-মহল্লায় ঢুকে নেতৃস্থানীয় বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এ অবস্থায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল শহরের মাড়োয়ারিপট্টির বাসিন্দারা।
২৪ মার্চ থেকে সৈয়দপুর শহরের বাঙালি পরিবারগুলো পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। যদিও এর আগে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর বিহারি-অধ্যুষিত এ শহরে অন্য রকম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। তিনি আরও বললেন, মাড়োয়ারিদের এমন অনেকেই ছিলেন যাঁরা সৈয়দপুরে সমাজসেবী হিসেবে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন জনগণের মনে। এখানকার মাড়োয়ারি সমাজসেবী তুলসীরাম আগরওয়ালা ১৯১১ সালে সৈয়দপুরে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ওই স্কুলের নামকরণ হয় তুলসীরাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। বাবু তুলসীরামসহ যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া, রামেশ্বর লাল আগরওয়ালাকে সৈয়দপুরের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে ১২ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাসের অদূরে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। মাড়োয়ারিপট্টিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিহারিরা মাড়োয়ারিদের বাসায় বাসায় চালায় লুটতরাজ।
তিনি বললেন, সৈয়দপুর শহরে বিপুলসংখ্যক মাড়োয়ারি বসবাস করতেন। আর ছিলেন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক, যাঁরা ’৪৭-এর দেশ বিভাগের বহু আগেই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুরে এসেছিলেন।
১৯৭১-এর ৫ জুন পাকিস্তানি বাহিনী মাইকে ঘোষণা শুরু করে। ওই ঘোষণায় বলা হয়, যাঁরা হিন্দু মাড়োয়ারি তাঁদের নিরাপদ স্থান ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই ট্রেনটি ১৩ জুন সকালে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে চিলাহাটি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের জলপাইগুড়িতে পৌঁছাবে। এ ঘোষণায় মাড়োয়ারিপট্টিতে স্বস্তি নেমে আসে। রজনীর মতো সবাই বাঁচার স্বপ্নে বিভোর হন। শুরু হয় লুটের পর বাদবাকি যা ছিল তা-ই নিয়ে গোছগাছ।
১৩ জুন রেলওয়ে স্টেশনে ঠিকই আসে বিশেষ ট্রেনটি। সৈয়দপুর রেল-কারখানা থেকে ট্রেন র‌্যাকটি সকাল আটটায় স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ায়। গাদাগাদি করে বসতে থাকেন বৃদ্ধ-যুবক, তরুণ-শিশু ও সকল পর্যায়ের নারীরা। ওই ট্রেন থেকে কমপক্ষে ২০ জন তরুণীকে নামিয়ে নেয় পাকিস্তানি বাহিনী। তাঁদের মিলিটারি জিপে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে।
১০টায় ট্রেন ছাড়ল। সেই ট্রেনে যাত্রী হয়েছিলেন সে সময়ের টগবগে যুবক তপন কুমার দাস কাল্ঠু। তিনি বললেন, ট্রেন ছাড়ার পর আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু ধপাধপ ট্রেনের সব জানালা-দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কারণ জানতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু এক ধরনের ভীতি সেই প্রশ্নটি করতে দেয়নি নিজের অজান্তেই।
বিনোদ আগরওয়ালা কিছু বলতে পারছিলেন না। কণ্ঠ তাঁর বাষ্পরুদ্ধ। তবু তাঁর কথার সারমর্ম থেকে বোঝা গেল, ট্রেনটা দুই মাইলের মতো পথ অতিক্রম করেছে। খুব ধীরে চলছিল ট্রেনটি। শহরের গোলাহাটের কাছে আসতেই থেমে গেল বিশেষ ট্রেনটি। এরপর কম্পার্টমেন্টের একটা দরজা খুলে গেল। ওই দরজা দিয়ে কম্পার্টমেন্টে ঢুকল কয়েকজন বিহারি, ওদের হাতে চকচকে রামদা। একইভাবে প্রতিটি কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়ে রামদা হাতে বিহারিরা। বাইরে উঁকি দিতেই দেখা গেল পাকিস্তানি বাহিনী গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছে, সবার হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। পালাবার পথ নেই। এ সময় বিহারিরা চিৎকার করে বলে উঠল, ‘মালাউনকা বাচ্চা! তুমলোগকো মারনে কি লিয়ে সারকারকা কিমতি গোলি কিউ খারচ্ কারু?’ অর্থাৎ বিধর্মীর বাচ্চা! তোদের মারার জন্য সরকারের মূল্যবান বুলেট কেন খরচ করব? এই বলে এলোপাতাড়ি রামদা দিয়ে কোপাতে থাকে ট্রেন থেকে একজন একজন করে বের করে। ওই হত্যাযজ্ঞের নাম দেওয়া হয় অপারেশন খরচাখাতা।
পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন খরচাখাতায় ৪৩৭ জন নিরীহ হিন্দু মাড়োয়ারিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাযজ্ঞ থেকে কোনোরকমে সেদিন প্রাণে বেঁচে যান প্রায় ১০ জন যুবক। তাঁরা ট্রেন থেকে নেমে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে দিনাজপুর হয়ে ভারতে পালিয়ে যান।
১৩ জুন ওই হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি ধরে রাখতে গোলাহাটে বধ্যভূমিতে আজও গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতির মিনার। তবু প্রজন্ম ’৭১ ও স্মরণিকা পরিষদ ওই বধ্যভূমিতে শহীদ স্মরণে অনুষ্ঠান করল সেদিন, জীবন উৎসর্গকারীদের শ্রদ্ধা জানাল তারা।
অঞ্জলি প্রদান ও পূজার মধ্য দিয়ে সৈয়দপুরের গোলাহাট বধ্যভূমিতে স্মরণ করা হলো শহীদদের।
প্রজন্ম ’৭১ ও স্মরণিকা পরিষদের আয়োজনে সেখানে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন স্বজন হারানো তপন কুমার দাস, রতন আগরওয়ালা, নিজু আগরওয়ালা, সুশীল আগরওয়ালা প্রমুখ।
পরে সেখানে গরিবদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়। স্মরণিকা পরিষদের সভাপতি সুমিত আগরওয়ালা বলেন, গোলাহাট বধ্যভূমি সংরক্ষণে সরকারিভাবে আজও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি ওই বধ্যভূমিতে জাতীয় মানের একটি স্মারকস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।

আমার মতন সুখী কে আছে by আনিসুল হক

সেদিন সকালবেলা বিবিসি বাংলা শুনছিলাম রেডিওতে। সেদিনের পত্রিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচকেরা কথা বলছিলেন ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শীর্ষক জরিপ নিয়ে। ওই জরিপে বলা হয়েছে, ৮৮ ভাগ তরুণ নিজেদের মনে করে সুখী বা খুব সুখী। আবার ৪১ শতাংশ তরুণ বিদেশে যেতে চায়। বিদেশে যেতে চাওয়ার কারণ, বিদেশে বেশি আয় বা শিক্ষার সুযোগ আছে আর তার বিপরীতে দেশে রয়েছে চাকরি-স্বল্পতা। আলোচকদের চিন্তা ছিল, সুখীই যদি হবে, তবে তারা বিদেশে যেতে চায় কেন?
সুখী মানুষেরা বিদেশে যেতে চাইতে পারবে না, সে কথা অবশ্য কোনো পুস্তকে লেখা আছে বলে আমার জানা নেই। বরং বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নটা হূদয়ে ধারণ করার সুযোগ থাকাটাও হয়তো ওই ৪১ ভাগের অনেকের সুখের কারণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিদেশে যেতে চায় না, এ রকম একটা বিরাট অংশও সুখী। অন্যদিকে ৫৯ ভাগ তরুণ তো বিদেশেও যেতে চায় না।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপের ফল সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। বাংলাদেশের তারুণ্যের ওপর পরিচালিত এই জরিপের ফল অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হলেও আমার কাছে মোটেও অভাবনীয় কিছু বলে মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, অনেক ইতিবাচক, দারুণ আশাপ্রদ।
প্রথম কথা, এই তরুণেরা অসুখী নয়। নিশ্চয়ই এই সুখের পেছনে কাজ করে বিরাট আশাবাদ যে, বাংলাদেশটার হবে। কিছুই হবে না, এটা বৃদ্ধদের মুখে শোনা যেতে পারে, তরুণেরা কেন এই রকম বলবে বা ভাববে? কিছুই হবে না, এই রকম পরিস্থিতিতে তারা বলবে, আপনাআপনিই কিছুই হবে না, না হোক, আমরা না-টাকে হ্যাঁ বানিয়ে ফেলব। এই কারণেই তো আমরা তরুণ।
আর এই আশাবাদ, এই ইতিবাচকতা যাদের মধ্যে আছে, তারা তো সুখীই হবে। ইতিবাচক মানুষ কেন অসুখী হবে? তারা অসন্তুষ্ট হতে পারে, বিক্ষুব্ধ হতে পারে, কিন্তু তারা অসুখী হয় না। পথে-প্রান্তরে মুক্তির সংগ্রামে স্টেনগানে হাতরাখা তরুণও অসুখী নয়, দাবি আদায়ের মিছিলে সোচ্চার মানুষটিও নিজেকে অসুখী ভাবে না।
এই জরিপ থেকেই দেখা যাচ্ছে, ৭০ ভাগ তরুণ মনে করে, দেশ ঠিক পথেই এগোচ্ছে। সার্বিক দিক থেকে দেখলে, দেশ অবশ্যই ঠিক পথে এগোচ্ছে। প্রথম কথা, বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক দেশ। নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের পথ থেকে এই দেশ সরে যায়নি। গণতন্ত্রের প্রতি এই দেশের মানুষের যে অঙ্গীকার, তা নানা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত। ৬৪ শতাংশ তরুণ মনে করে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মৌলবাদী রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমরাও মনে করি, অদূর ভবিষ্যতেও এই দেশের মৌলবাদী হয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ এই দেশের মানুষ মোটের ওপর মধ্যপন্থী, নরম প্রকৃতির, পরমতসহিষ্ণু। তারা সহজেই নতুনকে গ্রহণ করতে পারে। সহজে খাপ খাইয়েও নিতে পারে। জরিপ থেকে দেখছি, ৭৩ ভাগ তরুণ-তরুণীর হাতে মুঠোফোন আছে, আর ইন্টারনেট ব্যবহার করে ১৫ ভাগ। সাড়ে পাঁচ কোটির ১৫ ভাগ কিন্তু সংখ্যায় কম নয়। আমরা যদি আমাদের প্রতিদিনের ছোটখাটো রাজনৈতিক বাগিবতণ্ডা ভুলত্রুটির হিসাব না কষে বড় একটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে বাংলাদেশ অবশ্যই সঠিক পথেই আছে। থাকার মতো কতগুলো প্রাকৃতিক সুবিধাও আছে। আগেই বলেছি, এই দেশের মানুষ নরম, উদার, আধুনিক, সমন্বয়বাদী ও মুক্তমনা। সংকীর্ণতার মধ্যে তারা নেই, ডান বা বাম কোনো চরম পন্থার সঙ্গেই তারা নেই। গোষ্ঠীগত জাতিগত প্রদেশগত দাঙ্গাহাঙ্গামার অবকাশ এই দেশে নেই। আজকে মাওবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমস্যায় আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘুম হারাম, পাকিস্তানে রোজ বোমা ফুটছে। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা যেকোনো দেশের তুলনায়ই আমরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে ভালো আছি। সত্য বটে, তরুণদের ৬০ ভাগ মনে করে, আগামী পাঁচ বছরে দুর্নীতি আরও বাড়তে পারে। সেটা না মনে করার মতো কোনো কারণ তো ঘটেনি। এই জায়গায় সরকারের করণীয় আছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি তাই সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক যে জিনিসটা আমাদের সবচেয়ে অনুপ্রাণিত করে, তা হলো, ৯৮ ভাগ মনে করে তাদের সমাজসেবা করা উচিত। ৯৫ ভাগ তরুণ নিজের এলাকা আর স্থানীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কাজ করতে চায়। ৭৯ ভাগ তরুণ উন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহী। ৭৬.৫ ভাগ তরুণ মনে করে, স্থানীয় এলাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা আরও বড় হওয়া উচিত। তার মানে এই তরুণেরা একদম ঠিক লাইনে চিন্তা করছে। তারা ইতিবাচকভাবে ভাবছে, কাজে অংশ নিতে চাইছে। কিন্তু তাদের সামনে করণীয় কিছু নেই। ৯৪ ভাগ তরুণ-তরুণী বলছে, তরুণদের দ্বারা পরিচালিত বা তরুণদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের নাম তারা জানে না।
এই শূন্যতাটা যে আছে, সেটা আমরা বারবার বলছি। আমাদের তারুণ্যে যেন পাহাড় থেকে নেমে আসা এক অমিত বৈভবসম্পন্ন শক্তি। এই বাঁধভাঙা তারুণ্য সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে, আবার বহু অসাধ্য সাধন করতে পারে। বহু কিছু গড়ে তুলতে পারে। সেই স্বপ্নটা সেই কাজটা সেই সংগঠনটা তাদের দিতে হবে।
সরকারি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা যে টেন্ডারবাজি অস্ত্রবাজি চাঁদাবাজি করে, তার মূলেও আছে, তাদের সামনে বড় স্বপ্ন সৃষ্টি না করা। তাদের দেশ গঠনে সমাজ গঠনে বড় কোনো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে না পারা। তাদের কোনো কাজ নেই। কী করবে তারা? কাজেই অপকর্ম করে।
এই জায়গাতেই আমরা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা মুহম্মদ জাফর ইকবালদের মতো মানুষের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। একজন তরুণদের উদ্বুদ্ধ করছেন বই পড়তে, আরেকজন গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির পক্ষ থেকে অন্যদের সঙ্গে মিলে উদ্বুদ্ধ করছেন গণিত চর্চা করতে আর বড় স্বপ্ন দেখতে।
প্রথম আলো বন্ধুসভার মাধ্যমেও আমরা তরুণদের সামাজিক মানবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করে যাচ্ছি নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে একটা জাগরণ তৈরি করতে।
আমাদের তরুণদের স্বরূপ নির্ধারণ করছে কোন দুটো জিনিস? ছেলেরা বলেছে, জাতীয় ও পেশাগত ব্যাপার নিয়ে তারা ভাবিত। আর মেয়েরা বলেছে, তাদের স্বরূপ নির্ধারিত হয় পরিবার দিয়ে আর জাতীয়তা দিয়ে। তরুণ-তরুণী নির্বিশেষে তাদের ভাবনার মধ্যে একটা সাধারণ বিষয় রেখেছে, সেটা তার দেশ, তার জাতীয়তা।
রাজনীতি নিয়ে হ্যাঁ আর না-র পাল্লা দেখা যাচ্ছে সমানে সমান। ৩০.৫ শতাংশ মনে করে, তাদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া কিছুতেই উচিত নয়, ৩০.৫ শতাংশ মনে করে, তাদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া উচিত। এর ব্যাখ্যা কোনো কোনো কাগজে দেখলাম, বলা হচ্ছে তরুণেরা রাজনীতিবিমুখ। আমার মনে হয় না, ৩০ ভাগের বেশি মানুষের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার অবকাশ আছে। বরং ওই সংখ্যাটাও অনেক বড়। সবাই রাজনীতি করবে নাকি একটা দেশে? তবে ৭৪ ভাগ তরুণ রাজনীতিবিমুখ, এই তথ্যটাও উঠে আসছে জরিপে। খুব হতাশার কথা কি এটা? আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে এই প্রজন্মের এই পার্থক্যটা তো থাকবেই। ভাষা আন্দোলনের কাল, স্বাধীনতা সংগ্রামের কাল গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের কাল আমরা অতিক্রম করে এসেছি। এখন একটু থিতু তো হতে হবে, নাকি? কিন্তু দরকার হলে আজকের তারুণ্যও যে রাজপথে নেমে আসতে পারে, সে বিষয়ে যেন কারও মনে কোনো সন্দেহ না থাকে।
তবে হ্যাঁ, রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে হবে, মেধাবীদের, শিক্ষিতদের, সৎ ও সাহসীদের আসতে হবে রাজনীতিতে।
সবটা মিলিয়ে এই জরিপের ফল আমাদের তরুণদের সম্পর্কে আমাদের আশাবাদকে জোরদার করেছে। তারা লেখাপড়া করতে চায়, তারা বিদেশে যেতে চায়, তাদের প্রায় সবাই সমাজের কাজে লাগতে চায়। তাদের প্রায় সবাই মনে করে, তাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে তাদের জাতীয়তা। এ রকম একটা দেশপ্রেমিক কর্মোদ্যোগী তরুণ প্রজন্ম আগামী ১০ বছর পরে এই দেশটাকে চালাবে। তখন দেশটা নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর হবে, উন্নত হবে।
আমাদের তারুণ্যের সৃজনশীলতা এই জরিপের আওতায় ছিল না। কিন্তু কত কী করছে তারা। কত বিচিত্রমুখী উদ্যোগই না তারা গ্রহণ করছে। কিন্তু উদ্যোক্তা বলতে যা বোঝায়, সেটা কিন্তু এই জরিপই বলছে, আমাদের তরুণদের মধ্যে এখনো কম। শ্রমবাজারে মাত্র এক ভাগ তরুণ ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা। আমাদের উদ্যোক্তা দরকার। কেবল চাকরি খোঁজা তরুণ দিয়ে আর চলবে না। আমাদের অর্থনীতির একটা বড় শক্তি আমাদের প্রবাসী জনশক্তি। আমাদের তরুণেরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে, এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে এ থেকে জাতীয়ভাবে আমরা কীভাবে সর্বাধিক লাভবান হতে পারি, সে বিষয়ে সরকারের অতি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমাদের বহির্মুখী জনশক্তির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, অদক্ষ জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার বাস্তব উদ্যোগ চাই। সেই উদ্যোগের অভাবের কথাও এই জরিপে ফুটে উঠেছে।
আমাদের অপরাজেয় তারুণ্যকে আরেকবার সালাম দিই। এরাই বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে, এরাই অর্থনৈতিক বাধা প্রাকৃতিক বাধা অতিক্রম করে এভারেস্টে উঠেছে। বাংলাদেশের ব্যাপারে যে বৃদ্ধরা বা অকালবৃদ্ধরা ‘কিছুই হবে না’ বলে চোখের পানি ফেলছেন, তাঁদের এই তরুণেরা এই বলে কাছে ডাকতে পারে:
আমার মতন সুখী কে আছে। আয় সখী আয় আমার কাছে—
সুখী হূদয়ের সুখের গান শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ।
প্রতিদিন যদি কাঁদিবি কেবল একদিন নয় হাসিবি তোরা—
একদিন নয় বিষাদ ভুলিয়া সকলে মিলিয়া গাহিব মোরা\
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

নির্বাচন ও মহত্ত্ব by সৈয়দ আবুল মকসু

মানুষের মহত্ত্ব ও সুকুমার বৃত্তির প্রকাশ সব সময় ঘটে না। যখন-তখন তার হূদয় স্নেহ-মায়া-মমতা ও সৌজন্যে উদ্বেলিত হয় না। বিশেষ বিশেষ সময় তার অন্তর স্নেহ-ভালোবাসায় ভরে যায়। যখন কেউ কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হন, তখন ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাঁর মধ্যে থাকে পূর্ণ মাত্রায় মহত্ত্ব, নম্রতা ও সৌজন্যবোধ। যাঁকে পারলে বুকে ছুরি বসিয়ে দেন, তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। যাঁকে সম্ভব হলে গলা টিপে মারেন, তাঁর সঙ্গেও করেন গলাগলি।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ছাড়া সাধারণ সাংসারিক জীবনেও স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশের একটা সময় আছে, বিশেষ জায়গাও দরকার। বুদ্ধিমান মানুষ শাশুড়ির সামনেই শ্যালককে স্নেহ প্রদর্শন করে, আদর করে। শ্যালিকাকে আদর করতে হয় নিরিবিলি জায়গায়। বিশেষ করে স্ত্রীর আড়ালে। ডিজিটাল যুগে নির্বাচনের প্রচারাভিযানে স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশেরও মুহূর্ত আছে। ভোটারের কোলের নাতিটিকে আদর করতে হয় মিডিয়ার ক্যামেরার উপস্থিতিতে।
বস্তিতে ভোটভিক্ষা চাওয়ার সময়ও ক্যামেরা থাকা চাই। সেখানে গিয়ে প্রার্থী কোনো বুড়িকে জড়িয়ে ধরেন। বুড়িকে জড়িয়ে ধরে কোনো সুখ নাই, কিন্তু লাভ আছে। বুড়ির হাতটা টেনে নিজের মাথায় তুলে প্রার্থী বলেন, দোয়া করেন মা। আমার প্রথম কাজই হবে বস্তির আধুনিকায়ন প্রকল্প। বস্তিতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস দেওয়াই আমার পয়লা কাজ।
নির্বাচন নির্বাচনই। তা জাতীয় নির্বাচনই হোক বা মহানগরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হোক। নির্বাচন ব্যাপারটা চিরকাল ছিল না। যিশু খ্রিস্টের জন্মের তিন-চার হাজার বছর আগে হরপ্পার সভ্যতা-সংস্কৃতি নির্বাচন ছাড়াই সৃষ্টি হয়। হরপ্পার কোনো নির্বাচিত মেয়র ছিলেন বলে মনে হয় না। থাকলে নগর আরও ৫০০ বছর আগে ধ্বংস হতো। নগরের সবচেয়ে শিক্ষিত, যোগ্য ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষই নগর-শাসক মনোনীত হতেন। বাগদাদ, দামেস্ক, ইস্তাম্বুল, কর্ডোভা ও সেভিলে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেখানকার সেরা মানুষদের সমন্বিত চেষ্টায়। ওইসব নগরের বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবীরা রাত জেগে ভোট জোগাড়ের কসরত না করে মহৎ সভ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
ভোটের বাজারে বিচিত্র কৌশল অবলম্বন নতুন কিছু নয়। ১৯৩৭-এ উপমহাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রচারকাজ পুরোদমে চলছে। মুসলিম লীগ নেতারা দেখলেন মুহম্মদ আলী জিন্নাহর করোটির ভেতরে মগজ যথেষ্ট, কিন্তু মাথার ওপরটা খালি। জানুয়ারি মাসের উত্তর প্রদেশ। কনকনে শীত। কোনো এক বুদ্ধিমান একটা ভারীমতো টুপি শীর্ণ জিন্নাহর মাথায় এনে বসিয়ে দিলেন। তাতে কাজ হলো দুটো। জিন্নাহর মাথা শৈত্যপ্রবাহ থেকে বাঁচল এবং মুসলমান ভোটারদের বুকটা ভরল। তারা আর্জেন্টিনার সমর্থক দর্শকদের মতো আনন্দে লাফাতে লাগল। টুপিতে এইবার জিন্নাহকে মুসলমানের মতো দেখায়। ভোটাররা বুঝল, ইনিই আমাদের কায়দে আজম। জাতির নেতা। টুপির কারণে জিন্নাহর নতুন নাম হলো কায়দে আজম। ওদিকে অজ্ঞাত টুপিটি পেল নতুন নাম: জিন্নাহ ক্যাপ বা জিন্নাহ টুপি।
দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন ১৯৪৬-এ। সেখানে এক দলনেতা বললেন, লীগের প্রার্থীকে ভোট না দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে। কেউই অটোমেটিক স্ত্রী তালাকের ঝুঁকি নিতে চায়নি। হক সাহেব নির্বাচনী প্রচারণার সময় বহু গ্রামে গিয়ে অনেক মরহুমের কবরে ফাতেহা পাঠ করেছেন। চুয়ান্নর নির্বাচনের দিন একজন এসে হক সাহেবকে বলল, ভোটাররা সব লীগের প্রার্থীরে ভোট দিতেছে। শেরে বাংলা মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, তাড়াতাড়ি একটা লুঙ্গি আর গামছা আন। তিনি হাঁটু অবধি লুঙ্গি পরে কাঁধে গামছা রেখে ভোটকেন্দ্রে গেলেন নিজের ভোটটি দিতে। বাংলার কৃষক তাঁকে ভোট না দিয়ে যাবে কোথায়?
ভোটারের মন জোগানোটাই বড় কথা—তা সেটা যেভাবেই হোক। আগেও হতো, এখনো হয়। একদল তরুণী হয়তো কলেজে যাচ্ছে। প্রার্থী তাদের পথরোধ করলেন: তোমরা এবার নতুন ভোটার। আমি পাস করলে বখাটে পোলাপান তো দূরের কথা, ওগো বাপেরও সাধ্য নাই তোমাগো উত্ত্যক্ত করে। গার্লস স্কুল বা কলেজের সামনে পাঁচ বখাটাকে বিচিত্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওদের কাছেও মৃদু হেসে গিয়ে দাঁড়ান ভোটপ্রার্থী। যে ছোকরা দেখতে রণবীর কাপুরের মতো, তার পিঠে বাঁ-হাতটি রাখেন এবং ডান হাতে ওকে একটি ছোট খাম উপহার দেন। বলেন, বেহুদাই মানুষ তোমাগো বদনাম দেয়। এখনকার মেয়েগুলাই বদের বদ। বাবারা, তোমাগো প্রজন্মই দেশের ভবিষ্যৎ। ভোটের দিন পোলিং সেন্টারের আশপাশে থাইকো।
একালের ভোটপ্রার্থীরা হলেন সেই পূজারির মতো, যিনি যে দেবতা যে ফুলে সন্তুষ্ট তাঁকে সেই ফুল দিয়েই নৈবেদ্য নিবেদন করেন। বস্তির যে দরিদ্র দেবতা একটি লুঙ্গি ও শাড়িতে সন্তুষ্ট, তাঁকে তা-ই অর্ঘ্য হিসেবে দেওয়া হয়। যে যুবদেবতা একটি ছোট খামে খুশি—তাঁকে তা-ই। আর প্রতিশ্রুতি? যা দিতে কোনো খরচা নেই।
সাধারণ মানুষকে অবাস্তব ও মিথ্যা আশ্বাসে প্রলোভিত করতেও প্রচুর কর্মশক্তি ক্ষয় হয়। ওই শক্তি গঠনমূলক কাজে লাগালে এলাকার অনেকটাই উন্নয়ন সম্ভব। দোষটা গণতন্ত্রের নয়। নির্বাচনের রাজনীতিকে পঙ্কিল পথে টেনে নিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের অপচেষ্টা দোষের। কারণ, তাতে নির্বাচিতদের ওপর শুধু নয়—বেচারা গণতন্ত্রের ওপরেই মানুষের আস্থাটা নষ্ট হয়ে যায়।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

গাফিলতির দায়সরকারের by তানভিরুল হক

ঢাকার আবাসন ও নগরপরিকল্পনা নিয়ে সব সরকারের আমলেই অনেক বৈঠক হয়েছে। কিন্তু পূর্ত মন্ত্রণালয়ে সরকার, নগরবিশেষজ্ঞ ও রিহ্যাবের সদস্যদের সাম্প্রতিক বৈঠকে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা দুঃখজনক। এমনটি আগে কখনো দেখিনি।
সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে ঢাকা মহানগরের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ডিটেলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ চূড়ান্ত করা নিয়ে। পরিকল্পনায় সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে বড় সমস্যা সময়ের কাজ সময়ে না হওয়া। নিয়ম হলো আগে পরিকল্পনা প্রণীত হবে, পরে সে অনুযায়ী কাজ হবে। ড্যাপ তো বহু আগেই চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ বিষয়ে তোড়জোড় হয়; এবং বলা হয়, ২০০৮ সালেই কাজ শেষ হবে, কিন্তু হয়নি। ড্যাপ বাস্তবায়িত হলেও রিভিউ করার ক্ষমতা কি সরকারের আছে? সরকারের এসব গাফিলতির দায় কেন ব্যবসায়ীরা নেবেন? একটা সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরের নির্বাচন নিয়ে ভাবতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কোনো কিছু করার সময় ও মনোযোগ অনেক সময় তারা দিতে পারে না। এর জন্যই এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়।
পরিকল্পনাহীনতার মধ্যবর্তী সময়ে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন তো বন্ধ থাকেনি। এখন যেহেতু পরিকল্পনা চূড়ান্ত হচ্ছে, সরকারকে ডেভেলপারদের সঙ্গে বসে সমঝোতায় আসতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেখানে যার ক্ষতি, তাকে সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিতে হবে। এটা পারস্পরিক আলোচনার ব্যাপার। সব কাজ গায়ের জোরে হয় না এবং ডেভেলপারদের একচেটিয়াভাবে দোষারোপ করাও যৌক্তিক নয়।
আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনুমোদনের প্রশ্ন এখন আসছে। এটা হয়েছে ২০০৪ সালের পর, আগে তা লাগত না। তাই এর আগের প্রকল্পগুলোকে অনুমোদনহীনতার জন্য দোষারোপ করা যায় না। আজকে যদি ঠিক করি, এ বছর থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, পাঁচ বছর পর আবার রিভিউ করতে হবে এবং সময়ের প্রয়োজন মেটাতে হবে; তাহলে দৃঢ় হাতে সমস্ত শক্তি এক করে কাজ করতে হবে। সরকার-ডেভেলপারসহ বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। সরকার যদি মনে করে এখানে খাল থাকার কথা, কিন্তু ভবন তৈরি হয়েছে, তাহলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জমির বিনিময়ে জমি দিয়ে সেখানে খাল সৃষ্টি করতে পারে। প্রয়োজনে ডেভেলপারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তিরস্কার, শাস্তি বা অসহযোগিতার মাধ্যমে গঠনমূলক সমাধান হবে না।
দুর্নাম তো রাজউকেরও হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কিছু মানুষ দুর্ভোগের শিকার হয়। সেটা বেসরকারি ডেভেলপারদের বেলাতেও হয়। পরিকল্পনা না থাকার কারণেও হয়। চেষ্টা করতে হবে, যাতে ক্রেতা-ভোক্তার ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।
ড্যাপ প্রণয়ন করার সময় রিহ্যাবের সঙ্গে বসা হলেও তাদের সব কথা শোনা হয়নি। আমরা লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। ড্যাপ করেছে চারটি বড় বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। আমরা মতামত দিয়েছি, বৈঠক বৈঠকের মতো হয়েছে, কিন্তু তাকে অর্থপূর্ণ করা হয়নি। এখান থেকেই সরকারের সঙ্গে আবাসনশিল্পের উদ্যোক্তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়াতে সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথতা দরকার। সরকারকে ব্যবসায়ী, ক্রেতাসহ সবার দায়িত্ব নিতে হবে।
তানভিরুল হক: সাবেক সভাপতি, রিহ্যাব।

একটি গুগল পাওয়ার তরে হাজার গুগল গড়ো by মুনির হাসান

উদ্যম, বিনিয়োগ আর উদ্ভাবনে মনকে উদার করো,
একটি গুগল পাওয়ার তরে হাজার গুগল গড়ো।
ইন্টারনেট ব্যবহার করে কিন্তু গুগলের নাম শোনেনি, এমন মানুষ সম্ভবত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন (যেখান থেকে ইন্টারনেটে প্রাপ্য তথ্যের ঠিকানা বের করা যায়) গুগলের আগেও ছিল, তবে গুগলই প্রথম ব্যাপারটিতে সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ করেছে। সার্চ ইঞ্জিনের ব্যাপার এখন ইন্টারনেট-সংস্কৃতির মূল অনুষঙ্গ। ‘গুগল করো’, ‘গুগলে গিয়ে দেখে নিয়ো’ ইত্যাদি এখন খুবই সাধারণ কথা। ইংরেজিতে এমনকি ‘গুগলাইজেশন’ নামে একটি নতুন শব্দ গুগলের সর্বগ্রাসী রূপকে প্রকাশ করে। বলা হয়ে থাকে বর্তমানে ৭০ শতাংশেরও বেশি ওয়েবসাইটে লোকজন গুগল তথা সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে যায়! সাদামাটা দেখতে গুগলের প্রথম পাতাটিতে এর ব্যবসায়িক ব্যাপারটি সহজে দেখা যায় না, যদিও গুগল একটি মাল্টি বিলিয়ন কোম্পানি।
আইটি ক্ষেত্রের সূতিকাগার আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির বিকাশের পেছনে সবচেয়ে বড় উপাদান স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনের চর্চা, উদ্যমী প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীদের ‘আইডিয়ার পেছনে’ উদ্যমী বিনিয়োগকারীদের (ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট) অবস্থান এবং হাজার হাজার ‘সাকসেসফুলি ফেইলিউরের কেস’।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একজন শিক্ষার্থীর মানসপট তৈরি হয়। তার চিন্তাচেতনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের একটি স্বপ্নও সে এই সময় বোনে। নতুন কিছু গড়ে তোলার একটি আকাঙ্ক্ষাও হয় তীব্র। সিলিকন ভ্যালি তাদের সেই স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকে মূল্য দেয়। স্বপ্ন নির্মাণ ও বাস্তবায়নে দরকার সুযোগ এবং অর্থ। সিলিকন ভ্যালিতে রয়েছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি, যারা অর্থ নিয়ে দাঁড়ায় নতুন স্বপ্নচারীদের পাশে। আছে ব্যক্তি উদ্যমী বিনিয়োগকারীরা, যারা স্বপ্নের পেছনে অর্থ বিনিয়োগে পিছপা হয় না।
একজন শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপ হয়তো কাজ করছে কোনো নতুন ধারণা নিয়ে, সেটির পেছনের বিজ্ঞান আর ব্যবসাটাকে সাজাতে। দুটো জিনিসই দরকার। প্রথমত নতুন ভাবনাটি যে ফেলনা নয়, সেটি প্রমাণ করা। এ জন্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়। কখনো কখনো তারা খুঁজে পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই, যারা কাজ করছে বিভিন্ন কোম্পানিতে। এরপর সেটির ব্যবসায়িক দিকটি ভাবতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার কাজে কেউ দাতব্য প্রতিষ্ঠান খোলে না। কাজেই বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক মডেলটা ভালোভাবেই তৈরি করতে হয়। তারপর শুরু হয় বিনিয়োগকারী খোঁজার পালা। যেসব চিন্তা-ভাবনা, মডেল কাগজ আর কম্পিউটারে ছিল, সেগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। কেউ সফল হয়, কেউ হয় না!
গুগলের গল্পটাই বলা যাক। ১৯৯৬ সালে ল্যারি পেজ আর সের্গেই ব্রিন স্ট্যানফোর্ডে তাদের পিএইচডি রিসার্চ হিসেবে ওয়েবে একটি নতুন অনুসন্ধানী এলগারিদম(ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান নতুন একটি পথ) নিয়ে কাজ শুরু করে, সেই সময়কার সার্চ ইঞ্জিনগুলোর প্রচলিত পথ থেকে সরে এসে তারা ওয়েবপাতাগুলোকে একটি র‌্যাংকিংয়ের আওতায় নিয়ে আসে। পেজ আর ব্রিন তাদের মডেল সার্চ ইঞ্জিনের নাম দেয় ব্যাকরাব (Backrub)। তবে, পরে তারা গুগল (Google) শব্দটি বেছে নেয়। গুগল হলো ১-এর পর ১০০টি শূন্য দিলে যে সংখ্যাটি হয়, সেটি। সার্চ ইঞ্জিনটি কত বেশি তথ্য খুঁজবে, সেটা বোঝাতে এই শব্দটি নেওয়া হয়। শুরুতে এর ঠিকানা ছিল google.stanford.edu। পরে ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এটি হয় google.com। ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এক বন্ধুর গাড়ির গ্যারেজে, ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে গুগলের যাত্রা শুরু। দুই বন্ধুর টাকা ছাড়াও এই সময় তাদের পাশে দাঁড়ান সান মাইক্রোসিস্টেমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এন্ডি বেথটোশেইম। কোম্পানি হওয়ার আগেই তিনি পেজ আর ব্রিনকে এক লাখ ডলার দেন। পরের বছর জুন মাসে দুটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গুগলে আড়াই কোটি (২৫ মিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ করে। আর ২০০৪ সালে ৮৫ ডলারে গুগল শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ার ছেড়ে দুই হাজার ৩০০ কোটি ডলার জোগাড় করে! বিনিয়োগকারীরা যে ভুল করেনি, তার প্রমাণ হলো, মাত্র তিন বছরের মাথায় এর প্রতিটি শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় ৭০০ ডলারে!
যে সময়ে গুগলের এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা পায়, সে সময় কমপক্ষে কয়েক হাজার অনুরূপ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। একটি সাধারণ হিসাবে বলা হয়ে থাকে, গড়পড়তা একটি সফল গুগল পাওয়ার জন্য কমপক্ষে আড়াই হাজার উদ্যোগের প্রয়োজন!
কাজেই, সফল উদ্যোক্তা আর সফল উদ্যোগ পেতে হলে আমাদের চেষ্টাবান হাজার হাজার উদ্যোক্তা প্রয়োজন হবে। ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের প্রতি ভ্রু কুঁচকে তাকালে হবে না, তাদের নতুন উদ্যমে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আর সমাজের দায়িত্ব এখানে সুবিশাল। আমরা কেবল সফল গল্প খুঁজি। কিন্তু প্রতিটি সফল গল্প হওয়ার জন্য যে হাজারখানেক ‘সাকসেসফুলি ফেইলিওর’ কেস থাকা দরকার, সেটা বিশ্বাস করি না!
একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য এই ধারাটি আমাদের ভাঙতে হবে। আমাদের তরুণদের উদ্যমী, আত্মবিশ্বাসী এবং সফল হওয়ার জন্য তাদের বেশি বেশি সুযোগ দিতে হবে। তাদের অনেকে ব্যর্থ হবে, কিন্তু সুযোগ থাকলে তারা ঘুরে দাঁড়াবে। তাদের জন্য আমাদের এই কাজগুলো করতেই হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে তাদের শিক্ষার্থীরা নতুন চিন্তা করে, নতুন উদ্যম খুঁজে বেড়ায়। দৃষ্টান্ত তৈরির মতো বুয়েটের অধ্যাপক লুৎফুল কবীর স্যারের প্রি-পেইড মিটারকে গবেষণাগার থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে আসার যন্ত্রণা পোহাতে হবে। অন্যদিকে সমাজের বিত্তবান বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে নতুন নতুন ধারণাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও এই দিকে নজর দিতে হবে।
আর সরকার? সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজটা করবে, পথের বাধা সরিয়ে নেবে। যৌথ বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা দেবে, অভয় দেবে। দেশীয় উদ্যোগ যাতে বিদেশি জাত পণ্যের সঙ্গে লড়তে পারে তার ব্যবস্থা নেবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইনকিউবেটর, উদ্যোক্তা পরিচর্চাকেন্দ্র গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
কাজগুলো কঠিন নয়, আমাদের সবাইকে এখন থেকেই যার যার কাজ শুরু করতে হবে।
মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

দাপটের ইসরায়েল, মুক্তির ফিলিস্তিন by ফারুক ওয়াসিফ

এক গ্রাম্য ইহুদি তরুণের যুদ্ধের ডাক এসেছে। বিদায় দেওয়ার সময় মা তাঁকে বলছে, ‘বাবা, বেশি পরিশ্রম করবি না। একটা করে তুর্কি মারবি আর জিরিয়ে নিবি।’ তখন ছেলেটা বলছে, ‘কিন্তু তুর্কিরা যদি আমাকে মারে?’ মা তো অবাক, ‘তোকে মারবে কেন, তুই তাদের কী ক্ষতি করেছিস?’ এই হলো সাধারণ ইসরায়েলি মনস্তত্ত্ব। জবরদখলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই প্রতিবেশীর প্রতি ঘৃণা তাদের চালিকাশক্তি। ইসরায়েলের যা ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ আর আমেরিকার তা-ই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র অধিকার। ইসরায়েলের পুঁজি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি গণহত্যার প্রতি সহানুভূতি আর আমেরিকার পুঁজি ৯/১১-এর ঘটনার অজুহাত। তাদের এই আগ্রাসী ‘অধিকারের’ বলি অন্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের জীবন। ইসরায়েলের জনসংখ্যার পনের শতাংশ আরব এবং তারা সেখানকার দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। ফিলিস্তিনের ৬০ ভাগ এলাকা, মিসরের গোলান উপত্যকা এবং জর্ডানের ভূখণ্ড দখল করে এবং লাগাতারভাবে আরব হত্যা চালিয়েও ইসরায়েল হলো ‘শান্তির নায়ক’! শুধু ইহুদিদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি ইহুদিবাদ যা কার্যত বর্ণবাদ। তা সত্ত্বেও ইসরায়েল গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার আর হামাস-হিজবুল্লাহ-ইরান মৌলবাদী! কী বিচিত্র এই দুনিয়ার নিয়ম।
গাধা যখন মোট বয় তখনও যেমন গাধা, যখন বোঝা নামিয়ে রাখে তখনও সে গাধা। ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধ ও শান্তির অর্থ একই: দাপট জারি রাখা। মিডিয়ায় কুৎসা রটানো, তারপর অবরোধ এবং শেষে আগ্রাসন, এই হলো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা। এভাবেই গত ৬২ বছরে ফিলিস্তিনী অঞ্চলকে টুকরো টুকরো করে গ্রাস করা হয়েছে। আজকের ফিলিস্তিন যেন দেয়াল দিয়ে ঘিরে বানানো এক বিরাট ছাদখোলা কারাগার। ২০০৭ সাল থেকে গাজাকে অবরুদ্ধ করে ভাতে-পানিতে মারার কাজ চলছে। তাতেও হার না মানায় রাসায়নিক বোমায় দেড় হাজার মানুষ হত্যাসহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় সেখানকার অধিকাংশ ভবন। বেছে বেছে চলছে ‘টার্গেটেড কিলিং’। বিদেশের মাটিতে গুপ্তঘাতক লেলিয়ে ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যাও বন্ধ নেই। প্রতিটি ঘটনায় জাতিসংঘের ভূমিকা হয়েছে যাত্রার বিবেকের মতো— ঘটনার পরে তিনি আসেন এবং কিছু নীতিকথা শুনিয়ে নীরব হয়ে যান। আজ অবধি জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবই ইসরায়েল মানেনি।
যখন আরব সরকারগুলো ব্যর্থ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতী, তখন বিভিন্ন দেশের শান্তিবাদী কর্মীরাই প্রতিবাদের নৈতিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। ২০০৭ সালে থেকে চলছে ‘বয়কট ইসরায়েল’ আন্দোলন। অজস্র মানুষ ইসরায়েলি পণ্য কেনা বন্ধ করে সর্বাত্মক বর্জনের ডাক দিয়েছে। ফিলিস্তিনের সংহতির বিস্তার তাই আশার লক্ষণ। গাজামুখী ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ বা ‘মুক্তির নৌ-কাফেলা’ এই অহিংস আন্দোলনেরই ফসল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু মানবাধিকারকর্মী, লেখক-সাহিত্যিক ও নোবেলজয়ী এতে সামিল হন। এর মাধ্যমে তাঁরা ইসরায়েলি অমানবিকতার দিকে বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে চেয়েছিলেন। নয়জনের আত্মদানের মাধ্যমে মুক্তির সেই কাফেলা শতভাগ সফল হলো। ফ্রিডম ফ্লোটিলার আয়োজকরা জানিয়েছে, অচিরেই আরও বড় জাহাজবহর নিয়ে আবার তারা গাজার দিকে রওনা হবে।
অহিংস প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিকেই ইসরায়েলের বেশি ভয়। এসব ক্ষেত্রে ইসরায়েলের নীতি হলো সামরিক আক্রোশে এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাতে ভবিষ্যতে কেউ চ্যালেঞ্জ করার সাহস না পায়। অথচ ফ্রিডম ফ্লোটিলায় সন্ত্রাসী ছিল না, হামাস সদস্য ছিল না; তাঁরা ছিলেন বিভিন্ন দেশের শান্তিবাদী নাগরিক। তাঁরা গাজার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাবার, শিশুদের জন্য দুধ, ওষুধ আর আশ্রয়হীনের জন্য বাড়ি বানানোর সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছিলেন। তারপরও ৭০০ শান্তিবাদী কর্মীর সাতটি জাহাজের বহরকে গাজা উপকূল থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাধা দেওয়া হয়। কমান্ডোরা হেলিকপ্টার থেকে জাহাজে নেমে নির্বিচার গুলি চালিয়ে নয়জনকে হত্যা করে। এই খবরে দুনিয়ায় শোরগোল ওঠে। যেসব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সমর্থনে ইসরায়েল বিশ্ব জনমতকে ধোঁকা দিচ্ছিল, তারাও চক্ষুলজ্জায় নিন্দায় শামিল হয়। লন্ডনে ১০ হাজার মানুষ প্রতিবাদ করে। খোদ ইসরায়েলের রাজধানীতে রাস্তায় নামে পাঁচ হাজার শান্তিবাদী। খেয়াল করার বিষয়, প্রতিবাদের দিক থেকে আরবের স্বৈরশাহীগুলোর থেকে বেশি সোচ্চার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ইউরোপীয় নাগরিক সংগঠনগুলো। তুরস্ক একে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলে অভিযুক্ত করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনে। বিশ্বব্যাপী আওয়াজ ওঠে, গাজা অবরোধ তুলে নাও। নিহত নয় তুর্কি হয়ে ওঠেন কোটি মানুষের বীর, পান শহীদি মর্যাদা। ।
আন্তর্জাতিক আইনে এটা জলদস্যুতা, যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। এই কাজ সোমালীয়রা করলে বলা হতো জলদস্যুতা, ভেনেজুয়েলা বা ইরান করলে হতো ‘অসভ্যতা’। প্রতিকারে ন্যাটোর হামলা ছিল অনিবার্য। অথচ পরিহাস হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদ কেবল একটি ‘নিরপেক্ষ তদন্তের’ প্রস্তাব করেছে এবং যথারীতি ইসরায়েল তা নাকচ করে দিয়েছে। ন্যাটো চুক্তির মূল কথাই হচ্ছে, সদস্য কোনো রাষ্ট্র আক্রান্ত হওয়া মানে সবাই আক্রান্ত হওয়া। তুরস্ক ন্যাটোভুক্ত হয়েও সুবিচার না পাওয়ায় আমেরিকার সঙ্গে তার সম্পর্কেরও অপূরণীয় ক্ষতি হলো। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০০৮ সালে বলেছিলেন, তাঁদের চার শত্রু হলো ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ আর ইরান ও সিরিয়া। এখন সেই তালিকায় তুরস্কও যোগ হলো। ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বাতিল করেছে। ইসরায়েল বহুকাল এমন বেকায়দায় পড়েনি।
ইসরায়েল হলো এক হাতলহীন তলোয়ার। শত্রু ও মিত্র উভয়ের জন্যই তা একারণে বিপজ্জনক। দাপট ছাড়া অন্য কোনো উপায় তার জানা নেই। ফ্রিডম ফ্লোটিলায় হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন মহাবিব্রত। ইরান আক্রমণের সাজানো ছকটা এতে কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেল। বারাক ওবামা এই বেয়াড়াপনাকে সহজভাবে নেবেন না। এর আগে নিষেধ সত্ত্বেও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ওবামা অপমানিত বোধ করেন। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সফররত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে রীতিমতো অপদস্থও করা হয়। কিন্তু সামনেই কংগ্রেস নির্বাচন। এ সময়ে প্রভাবশালী ইহুদি লবিকে তিনি চটাবেন না। আশাবাদীদের ধারণা, কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়া মাত্রই ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াবেন ওবামা। ওবামার দোলাচল হলো, ইসরায়েলকে চাপ দিলে দেশের ভেতর থেকে তাঁর ওপর চাপ বাড়ে আর না করলে বাকি দুনিয়ায়, বিশেষ করে আরব ও মুসলিমরা ক্ষিপ্ত হয়।
ইহুদিদের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন হলোকস্ট। পরের বিপর্যয় হলো ১৯৪৮ সালে উগ্র ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা। প্রতিবেশীদের দাবিয়ে রেখে শত্রুপরিবৃত অবস্থায় ইসরায়েল আখেরে টিকতে পারবে না। তার উচিত ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ব্রিটেনের স্বার্থের পাহারাদারি না করে আরবদের সঙ্গে নিজেদের ভাগ্যকে মিলিয়ে নেওয়া। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আঠারো বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পরামর্শই তৎকালীন ইহুদিবাদী নেতাদের দিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘লন্ডনে বসে ব্রিটিশ সরকার আর ইহুদিবাদী নেতাদের কোনো সমঝোতাই ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান আনবে না। ইহুদিদের সাফল্য সম্পূর্ণত আরব-ইহুদি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। ... ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী নেতারা যদি ইহুদিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরবদের থেকে আলাদা করে ফেলে, তাহলে পবিত্র ভূমিতে কুৎসিত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে।’ (ইংরেজি থেকে অনুবাদ লেখকের, সূত্র: Writtings of Rabindranath Tagore: A miscellany, Sahitta Akademi)
কবির ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। দুর্ভাগ্য ইহুদিদের, কারও সুপরামর্শেই তারা কান পাতেনি। আজ তারা এমন এক রাষ্ট্রের নাগরিক, যে রাষ্ট্রটি হিটলারের জার্মানির মতো আপাদমস্তক দম্ভ আর ঘৃণায় আসক্ত। ফিলিস্তিনিদের দুর্ভাগ্য ততোধিক। পাশ্চাত্য ইহুদিদের তাড়িয়ে-পুড়িয়ে চালান করে আরবভূমিকে অশান্তি আর বঞ্চনার বৈশ্বিক মঞ্চ বানিয়ে ছেড়েছে। ফিলিস্তিনিরা যেন একসময়কার নির্যাতিত ইহুদি আর ইসরায়েল হলো একসময়কার ইহুদি নিধনকারী হিটলারি রাষ্ট্রের ভূত।
ইউরোপ থেকে অভিবাসী হওয়া ইহুদিরা নয়, ফিলিস্তিনের সত্যিকার মালিক ফিলিস্তিনিরাই। হাজার হাজার বছর যাবত তারা সেখানে বাস করে আসছে। সম্প্রতি এক ইসরায়েলি অধ্যাপক প্রমাণ করেছেন, ইসরায়েলের ইহুদিরা আদতে এক জাতি নয় এবং বাইবেলের যুগে ফিলিস্তিন থেকে ইহুদিদের নির্বাসিত হওয়ার মিথটিরও কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এই ইহুদিদের বেশির ভাগই পূর্ব ইউরোপের খাজারীয় জাতি থেকে আসা আশকেনাজি জনগোষ্ঠীর লোক। (সূত্র: Sholmo Sand: The Invention of Jewish People) তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ সোলমো স্যান্ড দাবি করেছেন, বর্তমানের ফিলিস্তিনিরাই আদি সেমেটীয় হিব্রুভাষীদের উত্তরাধিকারি। এই ইতিহাস ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অস্তিত্বের ন্যায্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইসরায়েলের ভবিষ্যত আরবের জনগণের সঙ্গে শান্তি ও সহযোগিতার মধ্যেই নিহিত। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের ন্যায্য ভূমিবণ্টনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শুধু আরবের নয়, বিশ্বশান্তিরও শর্ত। তা যতদিন না আসবে, ততদিন ফিলিস্তিন হয়ে থাকবে বৈশ্বিক অশান্তির স্নায়ুকেন্দ্র।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ -সুস্থ মা ও শিশুই সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে পারে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ চার মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে সবাই স্বাগত জানাবে। এ ঘোষণা নারীসমাজের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ বলেই ধারণা করি। প্রথমে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছিল তিন মাস। অনেক দেনদরবারের পর তা চার মাস করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময়টি যে যথেষ্ট নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথিবীর বহু দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মা ও নবজাতকের জন্য কিছুটা হলেও সুসংবাদ বয়ে আনবে। যত দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা কার্যকর হবে, ততই মঙ্গল। সুস্থ মা ও শিশুই একটি সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে পারে।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, যেসব মা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, কেবল তাঁরাই এ সুযোগ পাবেন। যাঁরা গৃহ বা অনানুষ্ঠানিক কাজকর্মে নিয়োজিত, তাঁদের জীবনে কোনো ছুটি নেই। অতএব আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় সুস্থ মা ও নবজাতকের জন্য ছুটিই একমাত্র সমাধান নয়। একজন মায়ের সুস্থ থাকা এবং নবজাতকের পরিচর্যার জন্য যেমন সুষম খাদ্য প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবা। দেশের অধিকাংশ মা ও শিশু সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ খুবই সীমিত। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ৫৪ ও প্রসূতি মৃত্যুহার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা উন্নত দেশগুলোতে চিন্তাও করা যায় না।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় ২০২১ সাল নাগাদ শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ১৫ এবং প্রসূতিমৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫-এ নামিয়ে আনার কথা বলেছেন। এ ঘোষণা আমাদের আশাবাদী করে তুললেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় আছে। স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এক সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের কর্মসূচি পাল্টে দেওয়ার ঘটনাও কম নয়। আগের আওয়ামী লীগ সরকার তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিএনপি সরকার এসে বিকল্প ব্যবস্থা না করেই তা বাতিল করে দিলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। কোনো প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়ম হলে তা দূর করতে হবে। তাই বলে মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার কোনো যুক্তি নেই। আবার প্রকল্প বাস্তবায়নেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী ১৩ হাজার নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের যে ঘোষণা দিয়েছেন, দেশবাসী দ্রুতই তার বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে। তবে এ ক্ষেত্রেও দলীয়করণ ও আত্মীয়করণে পথ পরিহার করে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করা হবে, সেটাই প্রত্যাশিত।

সচিবালয় বৈঠকে অপ্রীতিকর ঘটনা -জলাশয় দখল চিরকালের জন্য অবৈধ

রাজউকের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) যাতে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়, সে লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরের নাগরিক ও সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, অসহনীয় যানজট, সেই সঙ্গে নিমতলী ও বেগুনবাড়ির মতো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সবাইকে সংকীর্ণ স্বার্থ পরিহার করতে হবে। সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
এই মহানগরকে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে দেরিতে হলেও সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাকে সর্বতোভাবে সফল করে তুলতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই যে আজকের ‘ভূমিদস্যু’দের বাড়বাড়ন্ত রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। এরা সমাজের নানা শক্তির কাঁধে ভর করে এখন নিজেরাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। তবে তাঁরাও এই সমাজের বাসিন্দা। এই নগর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়লে ভালো-মন্দনির্বিশেষ সবার অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ নগরের অন্যতম। এ জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার পরিকল্পিত নগরায়ণ। দুর্ভাগ্যবশত রাজউক ও পূর্ত মন্ত্রণালয় অতীতে বিভিন্ন সময়ে নানা চাপ, তদবির ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়েছে। এর ফলে নগরে আমরা নানা ধরনের বৈষম্য দেখতে পাচ্ছি। কোথাও কেউ জলাশয়, খালবিল, ভরাট করেও হয়তো পার পাচ্ছে। কোথাও রাজউক বা কর্তৃপক্ষ তা ঠেকিয়ে দিচ্ছে।
পরিকল্পিত রাজধানী একটি জাতির বড় গৌরবের জায়গা। কিন্তু আমাদের রাজধানী ঢাকায় যেখানে যেভাবে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার কথা সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এই পটভূমিতে সরকার এবং সামাজিক শক্তিগুলো যথার্থই উপলব্ধিতে নিয়েছে যে এভাবে চলতে পারে না। সে কারণেই বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে অনুমোদিত ঢাকার মাস্টারপ্ল্যানের দ্রুত বাস্তবায়ন আজ সময়ের দাবি।
গত ১৩ জুন এ বিষয়ে রিহ্যাব ও বিএলডিএর সঙ্গে একটি সভার বিবরণ গতকাল গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা এটা জেনে বিস্মিত যে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের সর্বোচ্চ কেন্দ্রে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সভায় সৌজন্য ও শিষ্টাচারের ঘাটতি পড়েছিল। গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে এবং তাঁদের প্রতি অসৌজন্য প্রকাশ করার এমন ঘটনা বিরল। মন্ত্রিসভার সদস্যপদ প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাংবিধানিক পদ। প্রকাশ্যে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার কোনো চেষ্টা অনভিপ্রেত। এ ধরনের ঘটনা সামগ্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কর্তৃত্ব ও ভাবমূর্তিকে ম্লান করে।
আমরা আশা করব, পূর্ত মন্ত্রণালয় কোনোক্রমেই অন্যায্য চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। রোববার যে সংলাপের সূচনা হলো তা যেন স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে। মনে রাখতে হবে, পরিকল্পিত নগরায়ণ বিশেষ করে বেআইনিভাবে দখল কিংবা ভরাট করে নেওয়া নদীনালা, খালবিল, জলাশয় ইত্যাদি পুনরুদ্ধার সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। পদে পদে বাধা আসবে। এ কাজে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে আমরা বিরোধী দলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই। আমরা একই সঙ্গে এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে একটি সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পানিপথ পুনরুদ্ধারে একটি সামাজিক আন্দোলনেরও বিকল্প নেই। আবাসন ব্যবসায়ী, রাজউক, পূর্ত মন্ত্রণালয় বা বিচার বিভাগসহ সকল মহলকে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে পানিপ্রবাহ, নদী ও বায়ু প্রকৃতির দান। রাষ্ট্র এর হেফাজতকারী মাত্র। রাষ্ট্র এ ধরনের সম্পদ কারও কাছে কখনো বিক্রি করতে পারে না।

অপহরণের ১২ বছর পর দুই পুলিশ কর্মকর্তা উদ্ধার

কলম্বিয়ায় অপহরণের ১২ বছর পর দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাসদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করেন। বামপন্থী ফার্ক গেরিলারা তাদের আটক করে রেখেছিল। রোববার কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলভারো ইউরাইব এ কথা জানান। খবর পিটিআইয়ের।
পূর্বাঞ্চলীয় কুইবদোতে ভাষণ দেওয়ার সময় ইউরাইব বলেন, দুই পুলিশ কর্মকর্তাই এখন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে। তিনি জানান, কলম্বীয় সেনারা এখন গুয়াভিয়েরের জঙ্গলে গেরিলাদের বিরুদ্ধে লড়ছে।
কখন বা কীভাবে এই জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়, এ ব্যাপারে ইউরাইব কিছুই জানাননি। তবে তিনি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ওসকারো নারানজোকে ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সুখবর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইরাকে নির্বাচনের তিন মাস পর পার্লামেন্ট অধিবেশন

ইরাকে সাধারণ নির্বাচনের তিন মাসের বেশি সময় পরে গতকাল সোমবার পার্লামেন্টের অধিবেশন বসেছে। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযানে একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের পর সে দেশে এটি দ্বিতীয় পার্লামেন্ট। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সকালে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়।
গত ৭ মার্চের নির্বাচনে কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সাবেক ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আইয়াদ আলাবির নেতৃত্বাধীন ইরাকিয়া জোট সবচেয়ে বেশি আসন পায়। তার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির নেতৃত্বাধীন স্টেট অব ল জোট। ইরাকের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনের এই ফলের বৈধতা ঘোষণা করার পর পার্লামেন্টের এই অধিবেশন বসেছে।
এই পার্লামেন্ট অধিবেশনটি অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য। এই অধিবেশনে নির্বাচিত আইনপ্রণেতারা (এমপি) একসঙ্গে শপথ নেবেন। অধিবেশন শুরু হওয়ার একটু আগে আলাবি ও মালিকি হাত মেলান। শনিবার এই দুই নেতা একটি দীর্ঘ বৈঠক করেন।
নির্বাচনে পার্লামেন্টের ৩২৫টি আসনের মধ্যে ইরাকিয়া জোট ৯১টি, স্টেট অব ল জোট ৮৯টি, ইরাকি ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (আইএনএ) ৭০টি ও কুর্দি দলগুলোর জোট ৫৯টি আসন পেয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে স্টেট অব ল ও আইএনএ জানায়, তারা জোট করার ব্যাপারে রাজি হয়েছে। কিন্তু এর পরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৬৩টি আসনের চেয়ে চারটি আসন কম থাকছে তাদের। সরকার গঠনে দেরি হলে নতুন পার্লামেন্টের স্পিকার এবং দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী নূরদিনের গাড়িচালকের শাস্তি

ইন্দোনেশিয়ায় প্রয়াত শীর্ষ সন্ত্রাসী নূরদিন মোহাম্মদের গাড়িচালক আমির আবদিল্লাহকে (৩৪) আট বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন একটি আদালত। সন্ত্রাসে সহযোগিতা ও প্রেসিডেন্টকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে গতকাল সোমবার এই দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
আদালত সূত্র জানায়, মালয়েশীয় বংশোদ্ভূত ইসলামি জঙ্গি নেতা নূরদিন সম্পর্কে তথ্য গোপন করার অভিযোগে এবং ইন্দোনেশীয় প্রেসিডেন্ট সুসিলো বামবাং ইউধোইয়োনোর গাড়িবহরে বোমা হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে আমিরকে অভিযুক্ত করা হয়।
সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁর ১০ বছরের কারাদণ্ডের চেষ্টা চালান। কিন্তু পুলিশকে সহযোগিতা ও কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করায় তাঁর শাস্তি কম হয়।
গত বছরের জুলাই মাসে জাকার্তায় একটি বিলাসবহুল হোটেলে দুটি আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনার পর আমিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পুলিশের অভিযানে নূরদিন নিহত হন।

পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিতে অনড় সিউল

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে গৃহীত কঠোর নীতি থেকে সরে না আসার কথা জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। গতকাল সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি মিউং-বাক এক ভাষণে এ কথা জানান। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজডুবির ঘটনায় দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
লি মিউং-বাক বলেন, তাঁর দেশ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হয়তো ছাড় দিতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে আমরা উত্তর কোরিয়ার অপরাধকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় চেওনান ডুবির ঘটনা ঘটতে পারে।’
গত মাসে একটি বহুজাতিক তদন্তদলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত মার্চে উত্তর কোরিয়ার ডুবোজাহাজ থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে দক্ষিণ কোরীয় যুদ্ধজাহাজ চেওনান ডুবে যায়। ওই ঘটনায় জাহাজের ৪৬ জন নাবিক নিহত হন। এর প্রতিবাদে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিতসহ বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দক্ষিণ কোরিয়া। জবাবে ওই তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দেয়।
দুই দেশের সীমান্তে উত্তর কোরিয়াবিরোধী প্রচারণা চালানোর জন্য লাউডস্পিকার স্থাপন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। গত শনিবার উত্তর কোরিয়া ওই সব লাউডস্পিকার উড়িয়ে দেওয়ার এবং সিউলকে অগ্নিসমুদ্রে পরিণত করার হুমকি দিয়েছে।
সউলে দক্ষিণ কোরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় গতকাল বেলা তিনটায় দুই কোরিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করার কথা। প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল সম্পর্কে পরিষদের সদস্যদের অবহিত করবে। এরপর উত্তর কোরীয় প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। এ ঘটনায় সিউলের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। কিন্তু রাশিয়া ও চীন এখনো পরিষ্কারভাবে তাদের অবস্থান জানায়নি।

তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ইসরায়েল

গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহরে হামলার ঘটনায় নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ইসরায়েল। গতকাল সোমবার সে দেশের সরকারি এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ইয়াকভ তিরকেল। কমিটির বাকি দুই সদস্য পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন। তাঁরা হলেন ১৯৯৮ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী আইরিশ ডেভিড ট্রিম্বল এবং কানাডার সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা কেন ওয়াটকিন।
গত ৩১ মে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ত্রাণবাহী ছয়টি জাহাজের একটি বহরে হামলা চালায় ইসরায়েলি কমান্ডোরা। এতে নয়জন ত্রাণকর্মী নিহত হন। আহত হয় অর্ধশতের বেশি। নিহত ত্রাণকর্মীদের সবাই তুর্কি। একজনের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও ছিল। হামলার পর ইসরায়েল জাহাজ ও ত্রাণকর্মীদের আটক করে। পরে ত্রাণকর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয় এবং একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয় জাতিসংঘ। কিন্তু ইসরায়েল ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অভ্যন্তরীণভাবে এই হামলার তদন্তের ঘোষণা দেয়।
ইসরায়েল সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, এই ‘স্বাধীন গণ-কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। এই কমিশন গাজা উপকূলে নৌবহর পৌঁছাতে ইসরায়েল সরকারের বাধা দেওয়ার পদক্ষেপের কার্যকারণের বিষয়ে তদন্ত করবে। তিন সদস্যের এই কমিশনের দুই পর্যবেক্ষক শুনানি ও পরবর্তী আলোচনায় উপস্থিত থাকবেন। তবে তারা তদন্তের ফলাফলের ব্যাপারে কোনো ভোট দিতে পারবেন না।
ইসরায়েলের এই তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইসরায়েলের এই কমিশন ও সামরিক বাহিনীর তদন্ত দ্রুত শেষ হবে। আমরা আরও আশা করছি, তদন্ত শেষ হওয়ার পর তদন্তের ফল প্রকাশ করা হবে এবং তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
গাজা অবরোধ বেআইনি: আইসিআরসি
ইসরায়েলের গাজা অবরোধ জেনেভা সনদ ভঙ্গ করেছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রস (আইসিআরসি)। সংস্থাটি দ্রুত এই অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল আইসিআরসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গাজার সব বেসামরিক নাগরিককে এমন কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যার দায়দায়িত্ব তাদের নয়। তাই গাজার ওপর এই অবরোধ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিষ্কার বরখেলাপ।’ ১৯৪৯ সালে গৃহীত জেনেভা সনদে কোনো একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সমন্বিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসরায়েল ওই সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। আইসিআরসি বলছে, গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বন্ধ করার এ ধরনের অবরোধ অনৈতিক। তিন বছর ধরে গাজা অবরোধ করে রেখেছে ইসরায়েল।

তালেবান নেতাদের সঙ্গে জারদারির কোনো বৈঠক হয়নি: পাকিস্তান

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি গোপনে তালেবান নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তা অস্বীকার করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, এ প্রতিবেদন ভিত্তিহীন ও পুরোপুরি ভুল। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্সও (আইএসআই) এ প্রতিবেদন নাকচ করে দিয়ে বলেছে, এটি একটি ‘বাজে’ প্রতিবেদন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও এ প্রতিবেদনের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র ফরহাতউল্লাহ বাবর বলেছেন, ‘তালেবান নেতাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট জারদারির গোপনে কোনো যোগাযোগ বা বৈঠক হয়নি। এমনটি হলে তা হবে আমাদের সন্ত্রাসবিরোধী নীতির পরিপন্থী।’
ব্রিটেনের শীর্ষ স্থানীয় শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের (এলএসই) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জবাবে পাকিস্তান এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। রোববার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট জারদারি গত মার্চের শেষের দিকে এবং এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের একটি গোপন কারাগারে বন্দী ৫০ জন তালেবান নেতার সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় জারদারি তালেবান নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা আমাদেরই লোক, আমরা তোমাদের বন্ধু। মুক্তির পর তোমাদের কর্মকাণ্ডে আমরা অবশ্যই সমর্থন দেব।’ এ ঘটনার তিন দিন পর কারাগার থেকে ১২ জন তালেবান নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়। জঙ্গিদের এই মুক্তির বিষয়টি পাকিস্তানের বেসামরিক সরকারের উচ্চপর্যায়ে অনুমোদন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা অক্সফামের সাবেক কর্মকর্তা ম্যাট ওয়াডম্যান এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। বেশ কয়েকজন তালেবান কমান্ডার এবং পশ্চিমা ও আফগান নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আফগানিস্তানে সক্রিয় তালেবান যোদ্ধাদের শুধু অর্থ, প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ আশ্রয়ই জোগায় না, সংগঠনটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদেও সংস্থাটির প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আইএসআই তালেবানের কর্মকাণ্ডকে এভাবেই গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
আইএসআই এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রতিবেদনটি আবর্জনায় ভরা। এটি সম্পূর্ণ ধারণা প্রসূত এবং পুরোদস্তুর মিথ্যা একটি প্রতিবেদন। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি-সাপেক্ষে এসব কথা বলেছেন।
তালেবানের পক্ষে আহমেদ রশিদ বলেন, ‘এ প্রতিবেদনটি আমার কাছে কিছুই মনে হয়নি। কেন না তালেবান যে ব্যক্তিকে সর্বশেষ দেখে নিতে চায়, তিনি আর কেউই নন, তিনি হলেন জারদারি।’
পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডনের সম্পাদকীয় লেখক সাইরিল আলমিদা বলেন, ‘জারদারির সঙ্গে আইএসআইয়ের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। এমনকি তাঁরা দূর থেকেও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন না। আমি নিশ্চিত, জঙ্গিদের সঙ্গে সরকারের গোপন যোগাযোগ আছে। তবে প্রেসিডেন্ট জারদারিই যে এ কাজটি করছেন, তা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।’
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার তাদের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র বিষয়গুলোর দায়িত্ব গত বছর থেকে সামরিক বাহিনীর হাতে ছেড়ে দিয়েছে। প্রতিবেদক এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ব্যর্থ হয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও সামরিক বিশেষজ্ঞ তালাত মাসুদ বলেন, ‘তালেবানসহ প্রত্যেকেই এটা জানেন যে, পাকিস্তানের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে জারদারির এখন আর ক্ষমতা নেই।’
প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্ক ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদক ওয়াডম্যান বলেছেন, যাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে তারা তালেবান নেতাদের সঙ্গে জারদারির ওই বৈঠক সরাসরি দেখেননি। তবে তাঁরা পুরো বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং খুবই বিশ্বস্ত।

অ্যান্ডারসনকে ভারতে পাঠাতে ওবামার কাছে ক্ষতিগ্রস্তদের চিঠি

ইউনিয়ন কার্বাইডের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে ভারতে পাঠাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে চিঠি লেখা হয়েছে। ভোপাল গ্যাস ভিকটিম উইমেন ফোরামের পক্ষ থেকে এ চিঠি লেখা হয়।
ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইডের রাসায়নিক কারখানায় ১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বর দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আশপাশের এলাকায় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। বেসরকারি হিসাবে এতে ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ছয় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভোপাল গ্যাস ভিকটিম উইমেন ফোরামের আহ্বায়ক আবদুল জব্বার বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা চায় অ্যান্ডারসনকে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। এ ব্যাপারে সহায়তা চেয়ে আমরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি লিখেছি।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র পিজে ক্রাউলি বলেন, ‘ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এমন অনুরোধ করা হলে হোয়াইট হাউস বিষয়টি মূল্যায়ন করে দেখবে।’ এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভোপাল দুর্ঘটনাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করে এ ব্যাপারে কোনো অবস্থান নেওয়ার কথা নাকচ করে দিয়েছিল।
ভারতের একটি আদালত গত ৭ জুন ভোপাল দুর্ঘটনার মামলার রায় ঘোষণা করেন। এতে ইউনিয়ন কার্বাইডের ভারতীয় আট কর্মকর্তাকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও এক লাখ রুপি করে জরিমানা করা হয়। কিন্তু রায়ে ওয়ারেন অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মার্কিন নাগরিক অ্যান্ডারসন এখন নিউইয়র্কে বাস করছেন। দুর্ঘটনার তিন দিন পর অ্যান্ডারসন ভারতে গিয়েছিলেন। ওই সময় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তবে ওইদিনই অ্যান্ডারসনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

তাঁর সিটবেল্ট না বাঁধলেও চলে

সিটবেল্ট ছাড়াই তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তবে এড়াতে পারেননি লোকচক্ষু। ঠিকই ধরা ধরেছেন। এবং...। কী ভাবছেন পাঠক, তাঁকে জরিমানা করা হয়েছে? মোটেই না। এমনকি কখনো করাও হবে না। কেন না তিনি আর কেউই নন। তিনি হলেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
উইন্ডসরে পোলো খেলা দেখে জাগুয়ার গাড়িতে করে রাজপ্রাসাদে ফিরছিলেন রানি। ডেইলি মেইল-এর ক্যামেরায় দেখা গেছে, সিটবেল্ট না বেঁধেই তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন।
অবশ্য জনসাধারণের ব্যবহূত কোনো রাস্তায় (পাবলিক রোড) গাড়ি চালাননি রানি। তবে চালালেও জরিমানা করা হতো না। কেন না, রানিকে দোষী সাব্যস্ত করার এখতিয়ার কোনো ব্রিটিশ আদালতের নেই। ব্রিটেনে সিটবেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালানো অবশ্যই অপরাধ। তবে রানিকে এ অপরাধে অপরাধী করা যাবে না।
ব্রিটেনে রানিই হলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সিটবেল্ট না লাগিয়েও গাড়ি চালাতে পারেন। এমনকি তাঁর ক্ষেত্রে গাড়িতে নিবন্ধন প্লেট লাগানোরও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
ব্রিটেনে সিটবেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালালে ৬০ পাউন্ড জরিমানা করার বিধান রয়েছে। গত বছর এ জরিমানা ছিল ৩০ পাউন্ড। স্বরাষ্ট্র দপ্তর তখন বলেছিল, এ অপরাধের জন্য ৩০ পাউন্ড জরিমানা যথেষ্ট নয়।

আফগানিস্তানে এক লাখ কোটি ডলারের খনিজ সম্পদের সন্ধান

আফগানিস্তানে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। অকল্পনীয় এই খনিজ সম্পদের মূল্য হতে পারে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলার। পেন্টাগন ও মার্কিন ভূতত্ত্ববিদদের একটি দল ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে আফগানিস্তানে এ খনিজ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। গত শনিবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
খনিজ সম্পদের মধ্যে সোনা, লোহা, তামা, কোবাল্ট ও লিথিয়াম রয়েছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব খনিজ সম্পদ আফগানিস্তানকে বিশ্বের সবচেয়ে লোভনীয় একটি দেশে পরিণত করতে পারে। এতে পাল্টে যেতে পারে সে দেশের অর্থনীতি ও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে লিথিয়ামকে এখন মহামূল্যবান ধাতু মনে করা হয়। আফগানিস্তানে যে পরিমাণ লিথিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেছে, এতে দেশটি অচিরেই বিশ্বের খনিজ সম্পদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। মার্কিন কেন্দ্রীয় সামরিক দপ্তর পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান লিথিয়ামের খনিতে পরিণত হতে পারে। ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয় লিথিয়াম। লিথিয়ামসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ পাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইকে সম্প্রতি জানানো হয়।
মার্কিন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আফগানিস্তানে শিল্প হিসেবে খনিজ পদার্থ উত্তোলনের বেশ আগে থেকেই অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হতে পারে। শিল্পোন্নত দেশগুলো বড় ধরনের বিনিয়োগে নামবে, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষেত্র শুরু হবে। এই খনিজ সম্পদের বিপ্লবের ফলে দেশটির টানা যুদ্ধেরও অবসান ঘটতে পারে।
আফগান রণাঙ্গনে মার্কিন সামরিক অধিনায়ক ডেভিড পেট্রাউস শনিবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আফগানিস্তানের সম্ভাবনা বেশ কিছু ‘যদি’র ওপর নির্ভর করছে। খনিজ সম্পদ প্রাপ্তির বিষয়টিকে তিনি বেশ আশাব্যঞ্জক বলে মন্তব্য করেন।
আফগানিস্তানে জাতীয় উৎপাদন এখন মাত্র এক হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। দেশটির অর্থনীতি পপি চাষ ও মাদক চোরাচালানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন কারজাই সরকারের সঙ্গে খনিজ সম্পদ আহরণ নিয়ে এর মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র মনে করে পুরো দেশে হামিদ কারজাইয়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেই। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ খোদ সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তালেবান দমনে মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসী পদক্ষেপে যুদ্ধ পরিস্থিতির নাটকীয় কোনো উন্নতি ঘটেনি।
মার্কিন বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত আফগানিস্তানে যে পরিমাণ লোহা ও তামার মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে, তা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম খনিজ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করবে।
মার্কিন ভূতত্ত্ববিদ জ্যাক মেডলিন বলেন, আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের খবর খুব আশাপ্রদ ও বিস্ময়কর। তবে, খনিজ সম্পদের অর্থনৈতিক বিস্ফোরণের জন্য আফগানিস্তানের মতো দেশের অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে।
পেন্টাগনের কর্মকর্তা পল এ ব্রিনকলি বলেন, আফগানিস্তানের মতো শিল্পে অনভিজ্ঞ দেশে খনিজ সম্পদ নিয়ে দায়িত্বশীল অভিযাত্রা শুরু করতে হবে। ক্ষেত্র প্রস্তুত করে আগামী বছরের মধ্যেই এ অভিযাত্রা শুরু হতে পারে।

বাস্তবায়নের নির্দেশনা জারি



বিশ্বমন্দা মোকাবিলায় রপ্তানি খাতের জন্য সরকার যে প্রণোদনা গুচ্ছ ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রণোদনা গুচ্ছের আওতায় বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত যেভাবে যেসব সুবিধা পাবে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সপ্তাহে এক সার্কুলারে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে।
এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা বাদে অন্য যেকোনো বাজারে বস্ত্র ও পোশাকসামগ্রী এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য কারখানায় উৎপাদিত প্রত্যক্ষ সুতা রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে এই গুচ্ছ সুবিধা ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কালে জাহাজীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানির বিপরীতে চলতি অর্থবছরের জন্য পাঁচ শতাংশ হারে, আগামী অর্থবছরে চার শতাংশ হারে এবং তার পরের বা ২০১১-১২ অর্থবছরে দুই শতাংশ হারে সুবিধা প্রদান করা হবে।
রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসনের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে নগদ সহায়তার জন্য আবেদন করতে হবে। আর ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি আবেদনপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।
দ্বিতীয় প্রণোদনা গুচ্ছের সুবিধা পেতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্যও পৃথক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
গত অর্থবছর যেসব উৎপাদক-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ৩৫ লাখ ডলার পর্যন্ত পণ্য (বস্ত্র বা বস্ত্রজাত) রপ্তানি করেছে এবং যারা কোনো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নয়, তারাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হিসেবে বিবেচিত হবে।
এখন এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যারা গত অর্থবছর রপ্তানির বিপরীতে পাঁচ শতাংশ নগদ সহায়তা পেয়েছে অথবা যাদের আবেদন বিবেচনাধীন, তাদের গত অর্থবছরের রপ্তানির বিপরীতে প্রদত্ত বা প্রদেয় পাঁচ শতাংশের অতিরিক্ত আরও পাঁচ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠান যে কোনো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নয়, সে সম্পর্কে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) অথবা বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র আনতে হবে।
যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় করা হবে।
এ ছাড়া বস্ত্র খাতের যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্যাপটিভ জেনারেটর ব্যবহার করে না, তারা চলতি অর্থবছর পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের ওপর ১০ শতাংশ হারে অনুদান পাবে।
এই অনুদান পেতে পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের দাবি সত্যায়িত অনুলিপিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগে দাখিল করতে হবে।
এ ছাড়া এসব উৎপাদক-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের যে কোনো জেনারেটর নেই, তা বিজিএমইএ বা বিকেএমইএকে প্রত্যয়ন করতে হবে।

সিটিসেলের ফোনে ঢাকা ওয়াসার বিল দেওয়া যাবে

সিটিসেলের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিল পরিশোধ করতে পারবেন ঢাকা ওয়াসার গ্রাহকেরা।
এ ব্যাপারে সিটিসেল ও ঢাকা ওয়াসার মধ্যে গতকাল সোমবার একটি চুক্তি হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান এবং সিটিসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহবুব চৌধুরী নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সিটিসেলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ডেভিড লি, প্রধান বিপণন কর্মকর্তা কাফিল এইচ এস মুঈদ, বিক্রয় ও বিপণন প্রধান মাহবুব হোসেন, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক ইনিসিয়েটিভসের মহাব্যবস্থাপক আহমেদ আরমান সিদ্দিকী ও মার্কেটিং কমিউনিকেশন্সের প্রধান তাসলিম আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
অন্য দিকে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাহবুবুর রহমান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) সাঈদ গোলাম আহম্মদ ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লিয়াকত আলীসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব জুয়েনা আজিজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

পোল্যান্ডের হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ

গতকাল শনিবার বিমান দুর্ঘটনায় নিহত সে দেশের প্রেসিডেন্ট লেস কাচজিনস্কিসহ অন্যদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়। জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এ দিন তাঁদের মরদেহ ওয়ারশর পিলসুদস্কি স্কয়ারে রাখা হয়। লেস কাচজিনস্কির শেষকৃত্য আজ রোববার ক্র্যাকাউয়ে হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্বের অনেক নেতার এ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু আইসল্যান্ডে আগ্নেয়গিরির অগু্ন্যৎপাতের কারণে তাঁদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। খবর এএফপি।
শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ছোট শহর থেকে আসা জান সজিলবোরস্কি জানান, জাতির এই দুঃখময় মুহূর্তে আমাদের এখানে আসা প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, আমরা দেখিয়েছি কোন বিষয় আমাদের জন্য মূল্যবান। আর সেটা হলো আমাদের দেশপ্রেম। এ কারণে অনুষ্ঠানে আমরা এসেছি। আরেক শোকার্ত রিজসার্ড রোগালা বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য প্রেসিডেন্ট প্যালেসে গিয়েছিলাম এবং আজও এ অনুষ্ঠানে আছি। কারণ, তিনি আমাদের প্রেসিডেন্ট ও তিনি দেশপ্রেমিক ছিলেন।
এ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কর্তৃপক্ষ বিনা মূল্যে যানবাহনের ব্যবস্থা করেছিল। এ ছাড়া জাতীয় রেল কোম্পানিও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন আনার জন্য বাড়তি ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিল।
এ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ ধরে লোকজন শহরে এসেছে এবং তারা এ দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের প্রেসিডেন্টের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কাচজিনস্কি ও তাঁর স্ত্রীর শেষকৃত্য আজই রোববার ক্র্যাকাউয়ে হবে। এতে বিশ্বের প্রায় ৮০ জন প্রতিনিধির যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্সের ৩০ শতাংশ বোনাস শেয়ার অনুমোদন

রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ২০০৯ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩০ শতাংশ বোনাস শেয়ার অনুমোদন করেছে।
ঢাকার শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গত শনিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির ২২তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এই লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কোম্পানির চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমান।
বার্ষিক সাধারণ সভায় পাবলিক শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে রুমানা রউফ চৌধুরী ও ইফতেখার আরশাদ হোসেন কোম্পানির পরিচালক নির্বাচিত হন।
এদিকে এজিএম-পরবর্তী এক সভায় পরিচালকমণ্ডলী আবদুর রউফ চৌধুরী ও রাজীব প্রসাদ সাহাকে যথাক্রমে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন।
রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অন্য পরিচালকেরা হলেন নাজমুল আসাদ, খলিলুর রহমান চৌধুরী, আনোয়ারুল হক, হাবিবুল্লাহ খান, লতিফুর রহমান, রোকেয়া আফজাল রহমান, শামছুর রহমান, আমানুল্লাহ চৌধুরী, ইয়াসমিন খান ও আতিকুর রহমান। এ ছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালক হচ্ছেন আহ্মদ শফি চৌধুরী। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন আখতার আহেমদ খান।

সংসদে ১১,৯৮৭ কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট অনুমোদন

২০০৯-১০ অর্থবছরে ১১ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮০ লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পূরক বাজেট বা অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় সংসদ। ৩৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে এই অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন করা হয়।
স্পিকার আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার সম্পূরক বাজেট অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা গতকালও সংসদে যোগ দেননি।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্পূরক বাজেট সম্পর্কিত নির্দিষ্টকরণ বিলটি উত্থাপন করেন। দুপুর পৌনে একটায় বিল পাসের পর সংসদের বৈঠক আজ মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
এর আগে জাতীয় সংসদে বেলা সোয়া ১১টায় অধিবেশন শুরু হয়। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, সাংসদ ফজলে রাব্বী, সৈয়দ আলী আশরাফ। সাংসদেরা অতিরিক্ত ব্যয় যৌক্তিক কারণে করতে হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন। তাঁরা চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে সাফল্যের জন্য সরকার ও অর্থমন্ত্রীর প্রশংসা করেন।
এ পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগামী তিন বছরের মধ্যে সরকারি ব্যয় জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ২০ শতাংশে উন্নীত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, ২০১০-১১ অর্থবছরের জন্য এক লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার যে ব্যয় প্রস্তাব বাজেটে করা হয়েছে, তা জিডিপির ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকারি ব্যয় অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ের। গতবার আমরা তা বাড়িয়েছি, এবারও বাড়াচ্ছি। আগামী তিন বছরের মধ্যে আমাদের ব্যয় জিডিপির ২০ শতাংশে পৌঁছাবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেটে চিনির ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবে ইতিমধ্যে চিনির দাম বাড়তে শুরু করেছে। এ ছাড়া চালসহ আরও কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বাজেটের পর বেড়েছে। বাজেট প্রস্তাবের পরই দাম বাড়ানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বাজেট বাস্তবায়ন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী সংসদকে বলেন, ‘আমাদের বাস্তবায়ন ক্ষমতা দুর্বল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আমরা সক্ষমতা আহরণ করছি।’
চলতি অর্থবছরের বাজেটের সংশোধিত এডিপি ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খুব কাছাকাছি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্পূরক বাজেটে সর্বাধিক অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহের অনুমোদন পায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলে চার হাজার ৮৯৪ কোটি ১৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকার অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহের অনুমোদন দেয় জাতীয় সংসদ। তারপর রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ খাতে এক হাজার ৫৫৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে তৃতীয় অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন করে জাতীয় সংসদ। এ খাতে অতিরিক্ত ৮২৩ কোটি ১৫ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার ব্যয় করা হচ্ছে।
সবচেয়ে কম অতিরিক্ত ব্যয় করা হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন খাতে। এখানে অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন করা হয়েছে ৬৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
উল্লেখ্য, চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে ৩৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে ১১ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ১৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ১৫ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয় করা যায়নি বা হ্রাস পেয়েছে। এতে সার্বিকভাবে তিন হাজার ২৯৬ কোটি টাকা কম খরচ হয়।
ফলে সংশোধিত বাজেটের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৬ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও অনুন্নয়ন ব্যয় ৮২ হাজার ২৩ কোটি টাকা।
মূল বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অনুন্নয়ন ব্যয় ৮৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা।

মূলধনি মুনাফার ওপর কর কমাতে বিকল্প প্রস্তাব



আগামী ২০১০-১১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মূলধনি মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নের স্বার্থে এ প্রস্তাব সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) নেতারা।
তাঁরা বলেছেন, শুরুতেই এত উচ্চ হারে কর নেওয়া হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবে। এতে বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই প্রস্তাবিত করহারের পরিবর্তে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। প্রস্তাব দুটিতে বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান এক বছরের কম সময়ের জন্য বিনিয়োগ করবে, তাদের লভ্যাংশের ওপর ৫ শতাংশ এবং এক বছরের বেশি সময়ের বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের ওপর ৩ শতাংশ হারে কর আরোপ করা যেতে পারে।
রাজধানীর মতিঝিলে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কার্যালয়ে গতকাল সোমবার আয়োজিত বাজেট-উত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএমবিএর নেতারা এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিএমবিএর সভাপতি আরিফ খান। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ, সদস্য মোহাম্মদ এ হাফিজ ও আহসান উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
আরিফ খান বলেন, পুঁজিবাজারের সুষুম অবস্থা বজায় রাখতে মার্চেন্ট ব্যাংকের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বাজেটে মূলধনি মুনাফার ওপর যে হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। এতে বাজারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, সরকার তাঁদের বিকল্প প্রস্তাব গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়বে। এর ফলে বাজারের অস্থিতিশীলতাও কমবে।
বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউসে এক লাখ টাকা লেনদেনের ওপর ২৫ টাকা বা ০.০২৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর নেওয়া হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে তা চার গুণ বাড়িয়ে লাখে ১০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে আরিফ খান বলেন, বিষয়টি বহাল থাকলে বাজারের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে উৎসে করের হার সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কোম্পানির শেয়ারের অভিহিত মূল্যের অতিরিক্ত বা প্রিমিয়ামের ওপর ৩ শতাংশ হারে কর আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়, এর ফলে নতুন কোম্পানি বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হবে। কারণ, প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানির মুনাফা নয়, মূলধনের অংশ। আর মূলধনের ওপর করারোপ করা যায় না।

উৎসে কর হার অপরিবর্তিত রাখার দাবি জানিয়েছে বিকেএমইএ

২০১০-১১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সব ধরনের রপ্তানির ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটের বর্ধিত এই উৎসে করের প্রস্তাব রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, নিট পোশাকসহ দেশের সমগ্র রপ্তানি খাতের জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) গতকাল সোমবার এ অভিমত ব্যক্ত করেছে। সমিতির মতে, বিশ্বব্যাপী মন্দার কারণে এমনিতেই রপ্তানি আয় কমছে। এ অবস্থায় উৎসে আয়কর চারগুণ বাড়ানো অযৌক্তিক। উৎসে আয়কর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বিকেএমইএ অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
গতকাল সোমবার বিকেএমইএর ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি মো. ফজলুল হক। এ সময় সমিতির সভাপতি আবদুর রাশেদ, এম এ বাসেত, এ কে এম জাহিদুল হক ভুঁইয়া এবং এম এ রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘প্রস্তাবিত ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট সামগ্রিকভাবে ভালো হয়েছে। বাজেটের আকার উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবায়নযোগ্য। বাজেটে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ছয় শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত হারে প্রবৃদ্ধি না হলে দেশের উন্নতি হবে কী করে?’
ফজলুল হক বলেন, বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৮০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তা ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পথ নকশা দেওয়া হয়েছে। এটি এই খাতের উন্নয়নে বড় ধরনের সহায়তা করবে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মোট বরাদ্দ বাজেটের মাত্র পাঁচ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে কম।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) সম্পর্কে ফজলুল হক বলেন, চলতি বছরে পিপিপির অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলেও ভবিষ্যতে এ খাতে বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংখ্যা বাড়বে।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি তিনি মধ্যমেয়াদি ও স্বলমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করেন। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুতের সংকট মেটাতে বাড়তি ব্যয় সমর্থন করে ফজলুল হক বলেন, এই বাড়তি ব্যয় যেন সাধারণ জনগণের ওপর খুব বেশি না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
নিট খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো খাতকে নির্দিষ্ট না করে প্রস্তাবিত বাজেটে দুই হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ সমগ্র রপ্তানি খাতের সুরক্ষা হিসেবে রাখা হয়েছে, যেন বিশ্বমন্দায় দেশের রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে রপ্তানির জন্য নতুন নতুন বাজার বাড়াতে ও বাজার অনুসন্ধানে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত।
রপ্তানি আয় সম্পর্কে ফজলুল হক বলেন, চলতি অর্থবছরে এখনো পর্যন্ত রপ্তানি আয় তিন শতাংশ ঋণাত্মক রয়েছে। তার ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) উৎসে আয়কর চারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই হার বহাল থাকলে রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব হবে না। কারণ মন্দার সময় দুই থেকে পাঁচ সেন্ট দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যায়। এ অবস্থায় উৎসে আয়কর বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মো. ফজলুল হক বলেন, নিট পোশাক শিল্পে ৩০ লাখ জনবল কর্মরত থাকলেও প্রশিক্ষণের জন্য এই খাতের বরাদ্দ নেই। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে বাজেটে এই খাতের প্রশিক্ষণে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল।

ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনে উৎসে কর না বাড়ানোর দাবি

ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনের ওপর কর বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় বাড়বে না। বরং কর হার অপরিবর্তিত রেখে লেনদেন বাড়ানোর সুযোগ দিলে এ খাত থেকে অনেক বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারবে সরকার। তাই ব্রোকারেজ লেনদেনের ওপর উৎসে কর না বাড়িয়ে আগের হারই বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) নেতারা।
রাজধানীর দিলকুশায় সিএসইর ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নেতারা গতকাল রোববার এ দাবি জানান। তাঁরা বলেন, লেনদেনের ওপর করের হার বাড়ালে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়বে। আর এর চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর। ফলে শেয়ারের লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন বর্ধিত হারে করারোপের পরও এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে সরকার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিএসইর সভাপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমদ। এ সময় সংস্থাটির সহসভাপতি আল মারুফ খান, এ কিউ এ চৌধুরী, তারেক কামাল, সাবেক সভাপতি এম কে এম মহিউদ্দিন, পরিচালক বিজন চক্রবর্তী, আবু সৈয়দ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন, সিদ্দিকুর রহমান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মামুন উপস্থিত ছিলেন।
ফখরুদ্দিন আলী আহমদ সামগ্রিক বিবেচনায় বাজেটকে স্বাগত জানালেও পুঁজিবাজার-সম্পর্কিত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গত বাজেটে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের ওপর উৎসে কর ৬৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আগামী বছর থেকে তা ৩০০ শতাংশ বাড়ানো হলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ওপর আরোপিত কর হার ১০ শতাংশের পরিবর্তে তিন শতাংশ নির্ধারণের কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নিবন্ধিত কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের মূলধনি আয়ের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে করারোপের সিদ্ধান্ত পরিচালকদের বেনামে শেয়ার ব্যবসায় উৎসাহিত করতে পারে।
সিএসইর নেতারা শেয়ারের অভিহিত মূল্যের অতিরিক্ত মূল্য বা প্রিমিয়ামের ওপর আরোপিত করেরও বিরোধিতা করেন। তাঁদের মতে, প্রিমিয়াম কোনো মুনাফা বা আয় নয়। এটি কোম্পানির মূলধন। আর মূলধনের ওপর কখনো কর ধার্য হতে পারে না। এটা করা হলে ভবিষ্যতে ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারে আনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীল উন্নয়নের স্বার্থে সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানান সিএসইর নেতারা। এ ক্ষেত্রে তাঁরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার সুপারিশ করেন।

ফ্যাবিয়ানোর বড় স্বপ্ন

একজন বিশ্বের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারদের দলে। ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক তিনি, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের মালিকও। তিনি রোনালদো লুইস নাজারিও ডি লিমা, ‘দ্য ফেনোমেনোন’। আরেকজন লুইস ফ্যাবিয়ানো। অনেকেই আদর করে ডাকেন ‘দ্য ফ্যাবুলাস ওয়ান’।
রোনালদোর দিন শেষ। ফ্যাবিয়ানোর বলতে গেলে কেবলই শুরু। বলতে পারেন রোনালদোর শূন্য জায়গাটাই পূরণ করার দায় তাঁর ওপর। ‘দ্য ফ্যাবুলাস ওয়ান’ থেকে তাঁকে উত্তরিত হতে হবে ‘দ্য ফেনোমেনোনে’। সেই মিশন শুরু হচ্ছে এই বিশ্বকাপ দিয়েই। ফ্যাবিয়ানো পারবেন? নাকি রোনালদোর শূন্যতা পূরণ করার চাপ বোঝা হয়ে জেঁকে বসেছে তাঁর কাঁধে!
রোনালদো থাকতে থাকতেই ব্রাজিল দলে ফ্যাবিয়ানোর আবির্ভাব। ২০০৪-এর কোপা আমেরিকা দলে রোনালদো খেলেননি। সেই দলে আদ্রিয়ানোর সঙ্গে জুটি বেঁধে ২টি গোলও করেছিলেন ফ্যাবিয়ানো। কিন্তু রোনালদো-আদ্রিয়ানো-রোনালদিনহো সমৃদ্ধ ব্রাজিল দলে জায়গাটা তখন পাকা করতে পারেননি। কার্লোস দুঙ্গার ব্রাজিল দলে তাঁর জায়গা হয়েছে এবং নিজের যোগ্যতার প্রমাণ সেই থেকেই দিয়ে যাচ্ছেন ফ্যাবিয়ানো।
ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে ৩৭ ম্যাচ খেলে ২৫ গোল তাঁর। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে করেছেন ৯ গোল। গত বছরের কনফেডারেশনস কাপে ৫ গোল করে হয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সব মিলিয়ে ধারাবাহিকতার প্রতিমূর্তিই হয়ে দাঁড়িয়েছেন যেন। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। বিশ্বকাপ যখন দুয়ারে এসে দাঁড়াল, ফ্যাবিয়ানোও যেন কেমন হয়ে গেলেন। গত ৫ ম্যাচে একটিও গোল নেই তাঁর। পত্রপত্রিকায় বড় বড় শিরোনাম—ফ্যাবিয়ানো গোল-খরায় ভুগছেন!
রোনালদোর ৯ নম্বর জার্সির চাপটা কি তাহলে অনুভব করতে শুরু করেছেন ফ্যাবিয়ানো? চাপ যে একটু থাকবেই, সেটা স্বীকার করে নিয়ে ফ্যাবিয়ানো বলছেন, সেই চাপ অনুভবের কারণ শুধু ৯ নম্বর জার্সিই নয়, ‘আমার কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব। এটা শুধু ৯ নম্বর জার্সির কারণেই নয়, এই চাপটা আসলে উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছে। ব্রাজিলের জার্সি পরলেই সেটা অনুভূত হয়।’
তবে গোল-খরা নাকি তাঁকে একদমই ভাবাচ্ছে না, ‘আমি একদমই ভয় পাচ্ছি না। এর মধ্যে আমি যে ম্যাচগুলো খেলেছি, সেগুলো অন্য পর্যায়ের। আসলে ওই ম্যাচগুলোয় কোচ আমার ফিটনেসই শুধু দেখে নিয়েছেন। আমি এখানে গোল না করতে পারা নিয়ে মোটেই ভাবছি না। এটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। স্ট্রাইকারদের ক্ষেত্রে এমন হতেই পারে। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং একটা সময় বল জালে পাঠাতে পারবই।’
রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার চাপ আছে, আছে গোল-খরা। এত কিছুর পরও দুটি লক্ষ্য নিয়েই আজ উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছেন ফ্যাবিয়ানো। সেই লক্ষ্যের কথা শুনুন ফ্যাবিয়ানোর কণ্ঠেই, ‘আমার দুটি আশা এই বিশ্বকাপ ঘিরে—প্রথমত বিশ্বকাপ জেতা এবং দ্বিতীয়ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া।

দুই দলের দুই গোল, জিতল তবু হল্যান্ড

ক্যামেরাটা সব সময় তাঁকে ধরতে পারেনি। কিন্তু তিনি, ডাচ ফুটবলের ‘ভাগ্যবিড়ম্বিত’ রাজপুত্র ইয়োহান ক্রুইফ ধূসর রঙের স্যুট পরে মাঝেমধ্যেই উঠে পড়ছিলেন ভিআইপি গ্যালারির আসন থেকে। ১৯৭৪ সালে জার্মান আর ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টাইনরা ডাচদের শিরোপা-স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার পর থেকেই তাঁর মধ্যে এই ছটফটানি। বয়ে বেড়ান একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা।
হল্যান্ড দলকে খেলতে দেখলে, তাদের খেলায় কোনো খামতি চোখে পড়লে সেই যন্ত্রণা যেন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এবার দেখা গেল তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত বাতাসে ছুড়ে দিলেন। আর ঠিক সেই সময়েই জয়ের রাস্তাটা পেয়ে গেল ডাচ দল। সেটি অবশ্য আত্মঘাতী গোলে।
বাঁ প্রান্ত থেকে ডাচ দলের আসা একটি ক্রস রুখতে গিয়ে সিমন পোলসেন হেড করলেন, সেটিই বরং বিপদ বাড়াল। ঢুকে গেল জালে। দায় শুধু তাঁর একার নয়। তাঁর হেড গিয়ে লেগেছিল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সতীর্থ ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল অ্যাগারের পেছন দিকে। তাতে বদলে গিয়েছিল বলের গতিপথ। আর এই আত্মঘাতী গোলেই বিরতির ঠিক পরপরই, ৪৬ মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পেয়ে গেল হল্যান্ড। গ্যালারির কমলা রঙের সমুদ্রে তখন উথালপাথাল ঢেউ। আর তাতে অদৃশ্যভাবে দুই ফোঁটা অশ্রু মিশে গেল পোলসেনের।
এর পর থেকেই ডেনমার্কের কাছ থেকে খেলাটা চলে যেতে থাকে হল্যান্ডের পায়ে। মাঝমাঠে মার্ক ফন বোমেল আর তাঁর ওপরে ওয়েসলি স্নাইডারের কল্যাণে মাঝেমধ্যেই তীরের ফলার মতো আক্রমণ হানছিল ডাচরা। কিন্তু সেগুলো গোলে রূপান্তরিত হচ্ছিল না। পালের্মোর সিমন কায়ের ও লিভারপুলের ড্যানিয়েল অ্যাগার—এই দুই ডিফেন্ডারের গড়ে তোলা দেয়ালে প্রতিহত হয়ে ফিরছিল। এর মধ্যে রাফায়েল ফন ডার ভার্টকে অবশ্য গোলবঞ্চিত করলেন ড্যানিশ গোলকিপার টমাস সোরেনসেন। রবিন ফন পার্সির পাসে যে দুর্দান্ত শটটি নেন রিয়াল মিডফিল্ডার, সেটি বাতাসে ঝাঁপিয়ে বের করে দেন তিনি।
এ পর্যন্ত খেলাটি ছিল অনেকটা ঘুমপাড়ানিয়া। জোহানেসবার্গের শীতের সঙ্গে সেটি বেশ মানিয়ে যাচ্ছিল। ৬৭ মিনিটে ফন ডার ভার্টের বদলি হিসেবে নেমে এলজেরো ইলিয়া এসেই খেলাটা পাল্টে দিলেন। গতি আনলেন। রিয়াল থেকে বয়ে আনা ভন ডার ভার্টের বিষণ্নতা কাটিয়ে দিলেন। লিভারপুল ফরোয়ার্ড ডির্ক কিউটের পা থেকে আসা ৮৫ মিনিটের গোলটি তাঁর নামের পাশেও বসতে পারত। আগুয়ান গোলরক্ষক সোরেনসেনকে কাটিয়ে মাটিঘেঁষা যে শট নিয়েছিলেন ইলিয়া, সেটি পোস্টে লেগে ফিরে আসে। কিন্তু ড্যানিশ ডিফেন্ডাররা বলের কাছে পৌঁছানোর আগেই আসল কাজটা করে ফেলেন ডির্ক কিউট। ছোট্ট টোকায় পাঠিয়ে দেন জালে (২-০)।
নিগেল ডি জংয়ের বদলি নেমেই ডেমি ডে জিউ ব্যবধান ৩-০ প্রায় করেই ফেলেছিলেন। তাঁর প্লেসিং শট বাঁচিয়ে আত্মঘাতী গোলের পাপস্খলন করেছেন পোলসেন।
বাছাইপর্বে ডেনমার্ক পর্তুগালের গ্রুপ থেকে সবার আগে টিকিট পেয়েছিল বিশ্বকাপের। হল্যান্ড ৮ ম্যাচের সব কটিতে জিতে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ওরা লাল, এরা কমলা। দুই ‘ভাইকিংয়ের’ লড়াইটা জমবে বলে ধরে নিয়েছিল প্রায় সাড়ে ৮৩ হাজার দর্শক। কিন্তু সে রকম কিছুই হলো না। না দেখা গেল ডাচদের সেই শিল্পিত ফুটবল, না পাওয়া গেল ধীরস্থির শান্ত স্বভাবের ড্যানিশদের ‘মনের আনন্দে’ খেলা ফুটবল।
ড্যানিশরা প্রথমার্ধের সামান্য নড়াচড়ার পর শেষে একেবারে সেধিয়ে গেল খোলসের মধ্যে। তাদের আশা ছিল, আর্সেনালের বেন্টনার। কিছুই করতে পারলেন না তিনি।
খেলা শেষে ড্যানিশ কোচ মর্টেন ওলসেন বললেন প্রথমার্ধের খেলার কথা, ‘প্রথমার্ধে আমাদের খেলাটা ভালো হয়েছে। ওই সময়ই গোল করে ফেলা উচিত ছিল আমাদের।’ যে কাজটা উচিত ছিল, সেটা তো হয়ইনি, উল্টো হলো আত্মঘাতী গোল। পোলসেন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ড্যানিশ কোচ নীরব হয়ে গেলেন। খানিক পর বললেন, ‘কোনো মন্তব্য নয়।’ তবে এখনই সব শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন না ওলসেন।
ওড়ার আকাশটা এখনো তাঁর জন্য খোলা রইল। তবে স্বীকার করে গেলেন ক্যামেরুন আর জাপানের বিপক্ষে জিততে হবে। জয়টা খুব সহজ অবশ্য নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার এই উঁচু ভূমির মতোই তা কঠিন।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ স্নাইডারও সকার সিটির গ্যালারির মতো নিজেদের খেলায় নিজেই তৃপ্ত হতে পারেননি। তিনি নিজে ইন্টার মিলানে যা দেখিয়েছেন এ মৌসুমে, তার কিছু মেলে ধরেছেন। কিন্তু কোথায় সেই ডাচ ফুটবল? কোথায় গতি, কোথায় আক্রমণের ঢেউ?
‘হ্যাঁ, আমরা ভালো খেলতে পারিনি। প্রথমার্ধটা কঠিন ছিল। তবে প্রথম ম্যাচে জেতাটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জয় নিয়ে ফিরেছি। তবে দেখি, সামনের ম্যাচগুলোয় কী করতে পারি আমরা’—স্নাইডার কথাগুলো বললেন বটে, তবে মনে হলো জোর করে বলা। সুন্দর ফুটবল এখনো সোনার হরিণ হয়েই থাকল এ পর্যন্ত। সামনে কি ধরা দেবে সেই হরিণ?
ইতিহাসের কমলা রঙের পাতায় দাগ দিতে পারবে হল্যান্ড?

বিশ্বকাপ কুইজে বিজয়ী যারা

বিশ্বকাপজুড়ে প্রথম আলো পাঠকদের জন্য নানা মাত্রিক কুইজের আয়োজন করছে। যে দিন খেলা, সে দিনই পুরস্কার জেতার সুযোগ থাকছে ২৮ জেলার প্রথম আলোর কার্যালয়ে। সাত বিভাগীয় শহরেও আছে প্রতিদিনকার আলাদা আয়োজন। সারা দেশের পাঠকেরা অংশ নিতে পারেন এসএমএস কুইজে। থাকছে সাপ্তাহিক, পর্বভিত্তিক ও অনলাইন কুইজ। মাসজুড়ে ১২টি কুইজে অংশ নিয়ে বিশ্বকাপ শেষে থাকছে মেগা পুরস্কার জিতে নেওয়ার সুযোগ। প্রথম আলোর এই কুইজ আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের কুইজের ফলাফল ছাপা হলো আজ।

এসার-প্রথম আলো বিশ্বকাপ এসএমএস কুইজ
এসার-প্রথম আলো বিশ্বকাপ কুইজে প্রতিদিনের ল্যাপটপ পুরস্কারের দ্বিতীয় দিনের বিজয়ী চট্টগ্রামের সুধীর পালিত। তিনি চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার বিপণন বিভাগে কর্মরত। ১৩ জুন প্রথম আলোর ঢাকা কার্যালয়ে ১২ জুনের কুপনের ড্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক। তিনি নিজে ফোন করে বিজয়ীকে লটারি জেতার সুখবরটি জানান।

নাভানা ইন্টারলিঙ্কস-প্রথম আলো ফুটবল কুইজ
নাভানা ইন্টারলিঙ্কস-প্রথম আলো ফুটবল কুইজে এসএমএস করে লটারির মাধ্যমে এবারকার বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ফুটবল ‘জাবুলানি ফুটবল’ জিতে নিয়েছেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরের এ কে মাহফুজুর রহমান সিদ্দিকী। ১২ জুনের এসএমএস লটারি বিজয়ী মাহফুজুর ঢাকার পান্থপথের আইএসটিটিতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করছেন।

ট্রান্সটেক-প্রথম আলো বিশ্বকাপ কুইজ
গত ১২ জুনের কুপনগুলোর ড্র হয় ১৩ জুন। সেদিনের বিজয়ীদের তালিকা ও সাত বিভাগীয় শহরে প্রথম আলো কার্যালয়ে ড্র অনুষ্ঠানের খবর নিচে দেওয়া হলো। আজ বিকেল চারটা ৩০ মিনিটে প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পুরস্কার হিসেবে বিজয়ী পাবেন একটি ইস্ত্রি ও দুটি এনার্জি সেভিং লাইট। এই তালিকার সব বিজয়ীকে পুরস্কার সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
ঢাকা: রিয়া হক, খিলগাঁও, ঢাকা।
চট্টগ্রাম: খুলশীর মো. ইমরান চৌধুরী।
খুলনা: শরিফুল আলম, কবরস্থান কলোনি, খুলনা।
বরিশাল: শামরী রহমান, কালীবাড়ি প্রথম গলি, বরিশাল।
রাজশাহী: সিমা, ভাটাপাড়া, রাজশাহী।
সিলেট: জাবেদ আহমেদ মিঠু, শফিক লজ, পাঠানটোলা, সিলেট
রংপুর: মারশেদ উদ্দিন মৃদুল, ধাপ, লালকুঠি লেন, রংপুর।

এসকেএফ-প্রথম আলো প্রতিদিনের কুইজ
গত ১২ জুনের কুপনগুলোর ড্র হয় ১৩ জুন। সেদিনের বিজয়ীদের তালিকা ও ২৮ জেলা শহরে প্রথম আলো কার্যালয়ে ড্র অনুষ্ঠানের খবর নিচে দেওয়া হলো। আজ বিকেল চারটা ৩০ মিনিটে প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। এই তালিকার সব বিজয়ীকে পুরস্কার সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
ঢাকা: প্রথম: গোলাম সারোয়ার, ১৬৯ লালবাগ রোড, আজিমপুর, ঢাকা; দ্বিতীয়: ইবাদ, বাড়ি-৫, লেন-৪, এভিনিউ-৫, মিরপুর; তৃতীয়: সুবর্ণা রব, জিগাতলা, ঢাকা।
চট্টগ্রাম: প্রথম: মিজান, দেওয়ানবাজার; দ্বিতীয়: রাহুল সেন, রাজাপুকুর লেন এবং তৃতীয়: আবদুল গনি, চেরাগী পাহাড়। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সভাপতি তপন দত্ত।
খুলনা: প্রথম: অন্তর্জিতা মহলী, ১১৯/১, পশ্চিম টুটপাড়া; দ্বিতীয়: মো. সরোয়ার হোসেন, ৩২ শামসুর রহমান রোড এবং তৃতীয়: সুব্রত মজুমদার, ৫৯ নং যশোর রোড। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সংগঠক ও সহকারী অধ্যাপক আহমেদুল কবির।
বরিশাল: প্রথম: দিপাশ্রী বড়াল তমা, জনতা ব্যাংক লি., বিভাগীয় কার্যালয়; দ্বিতীয়: মনি আক্তার, আগরপুর রোড এবং তৃতীয়: শামরী রহমান, কালীবাড়ি রোড। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরিশালের ক্রীড়া সংগঠক বরিশাল জেলা খেলোয়ার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ শামীম।
রাজশাহী: প্রথম: গৌতম রায়, নিউমার্কেট কলোনি, রাজশাহী; দ্বিতীয়: শামীম, মহিষবাথান এবং তৃতীয়: ওবায়দুল ইসলাম, কাদিরগঞ্জ। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কোচ মাহমুদ আলম।
সিলেট: প্রথম: মো. নুরুল আলম, কুমারপাড়া; দ্বিতীয়: মাফরুহা খানম সাথী, শেখঘাট এবং তৃতীয়: লিটন চন্দ্র দেব, চালিবন্দর। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি শুভেন্দু ইমাম।
রংপুর: প্রথম: মো. বদরুল আলম, ধাপ চেকপোস্ট; দ্বিতীয়: মনিরুজ্জামান মিঠু, গুড়াতিপাড়া এবং তৃতীয়: তানজিনা তানীন নিশি, মুন্সিপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রংপুরের সাবেক কৃতী খেলোয়াড় ও কালেক্টরেট স্কুল ও কলেজের শিক্ষক রফিকুল হক।
দিনাজপুর: প্রথম: মো. হায়দার আলী, ঘাসিপাড়া; দ্বিতীয়: মো. মাইন উদ্দিন সোহাগ, উত্তর বালুয়াডাঙ্গা। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুরের বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ সাবেক ওয়েট লিফটার বিশ্বনাথ গুপ্ত আগরওয়াল, দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য গোলাম নবী দুলাল এবং বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকেরা।
ময়মনসিংহ: প্রথম: মো. শিহাব উদ্দিন সবুজ, আউটার স্টেডিয়াম; দ্বিতীয়: উচ্ছ্বাস দত্ত, সি কে ঘোষ রোড এবং তৃতীয়: রনি, সি কে ঘোষ রোড। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট পরিষদের সম্পাদক কাজী আজাদ জাহান শামীম।
যশোর: প্রথম: সাগর হোসেন, এম এম আলী সড়ক; দ্বিতীয়: আমিনুর রহমান, খড়কি এবং তৃতীয়: মধুসূদন রাহা, মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যশোরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তারাপদ দাস।
ফরিদপুর: প্রথম: অভিজির‌্যা রায়, উত্তর কালীবাড়ি; দ্বিতীয়: মো. আরিফুর রহমান, দক্ষিণ আলীপুর এবং তৃতীয়: নাঈম হোসেন, চানমারী। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক এস এম এ আহসান।
কুমিল্লা: প্রথম: মো. মামুনুল ইসলাম মামুন, রেল কলোনি; দ্বিতীয়: মাহফুজুর রহমান, ডুমুরিয়া চাঁদপুর ভূঁইয়া বাড়ি এবং তৃতীয়: রফিক আহমেদ, ফুলতলী হাউস, সুজানগর। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সংগঠক ও সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার আহ্বায়ক বদরুল হুদা জেনু।
পাবনা: প্রথম: মো. শফিকুল ইসলাম, দক্ষিণ রাঘবপুর; দ্বিতীয়: উর‌্যাসব, দিলালপুর এবং তৃতীয়: গৌতম কুমার গোরা, সোনাপট্টি। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও সমাজসেবক ক্যাপ্টেন (অব.) সরোয়ার জাহান ফয়েজ।
বগুড়া: প্রথম: আব্দুল আলীম, চকলোকমান; দ্বিতীয়: মাশকুয়া তোয়া হারুন, সুলতানগঞ্জপাড়া এবং তৃতীয়: সোনালী, নিশিন্দারা মধ্যপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বগুড়ার সাবেক খেলোয়াড় নুরুল আলম টুটুল।
কক্সবাজার: প্রথম: ফাহিম, গাড়ির মাঠ; দ্বিতীয়: নুরুল আবছার, খবর বিতান, এবং তৃতীয়: কায়সারুল হক, বিমানবন্দর সড়ক। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী।
রাঙামাটি: প্রথম: রিপন চাকমা, বনরূপা; দ্বিতীয়: অনেক চাকমা, খাদ্যগুদাম এলাকা এবং তৃতীয়: করণময় চাকমা, চক্রপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি মিহির বরণ চাকমা।
নোয়াখালী: প্রথম: ফখরুল ইসলাম, ফকিরপুর; দ্বিতীয়: মো. আকতারুজ্জামান, কবিরহাট মডেল জুনিয়র হাইস্কুল এবং তৃতীয়: তাজুল ইসলাম, রুবেল এন্টারপ্রাইজ, মাইজদী। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. হানিফ, ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নুরুল হুদা সুফল, বন্ধুসভার উপদেষ্টা ফরহাদ কিসলু, লক্ষ্মীপুরের ডেল্টা কলেজের প্রভাষক দিলীপ কুমার।
ফেনী: প্রথম: মাহতাব মুন্না, এস এস কে রোড; দ্বিতীয়: ফিরোজ আলম, কদলগাজী রোড এবং তৃতীয়: নাজমুল হক শামীম, সাপ্তাহিক জহুর। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফেনী জেলা স্কাউটসের সম্পাদক ও ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মোমেনুল হক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ নূর উদ্দিন চৌধুরী।
কুষ্টিয়া: প্রথম: হাবিব, কথাকলি ছাত্রাবাস; দ্বিতীয়: গৌর চন্দ্র পাল, হেম চন্দ্র লাহিড়ী লেন এবং তৃতীয়: নাজ, সৌরভিলা। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজানুর রহমান খান চৌধুরী।
কিশোরগঞ্জ: প্রথম: মো. ওমর ফারুক; দ্বিতীয়: সুমন মোদক এবং তৃতীয়: সজীব রায়। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জের ক্রীড়া সংগঠক গুরুদয়ার সরকারি কলেজের রোভার স্কাউট দলনেতা মো. জুলহাস উদ্দিন সরকার।
কুড়িগ্রাম: প্রথম: শুক্লা করঞ্জাই, পুরাতন বাজার পাড়া; দ্বিতীয়: নাসিদ হাসান, পুরাতন থানাপাড়া এবং তৃতীয়: দীনেশ দেবনাথ নাথ, কাঁঠালবাড়ী। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাজিউর রহমান নাজু, সহিদুর রহমান সাজ।
সিরাজগঞ্জ: প্রথম: মোহাম্মদ আলী, সিরাজী সড়ক; দ্বিতীয়: রুবেল, সিরাজী সড়ক এবং তৃতীয়: রাজু আহসান, মোক্তার পাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ফজলুল মতিন মুকাতা।
বরগুনা: প্রথম: এনায়েত হোসেন; দ্বিতীয়: এ এইচ ইসলাম বাবু এবং তৃতীয়: লিমন। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দাস।
ভৈরব: প্রথম: সিরাজুল ইসলাম, কমলপুর মোড়; দ্বিতীয়: রোমান, কালিপুর দক্ষিণ পাড়া এবং তৃতীয়: আল আমিন, রাজ কাচারী রোড । ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইসলাম মহিলা কলেজের প্রভাষক এনামুল হক ও নিরাপদ সড়ক চাই-এর সাধারণ সম্পাদক আলাল উদ্দিন।
পটুয়াখালী: প্রথম: নির্জনা, পুরান বাজার; দ্বিতীয়: কনক, পিটিআই রোড এবং তৃতীয়: এনামুল হক, নতুনবাজার। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এ কে এম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক অশোক দাস, দৈনিক গণদাবী পত্রিকার সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া, সাংবাদিক জিতেন্দ্র নাথ রায় ও নিয়াজ মোর্শেদ।
টাঙ্গাইল: প্রথম: আবুল খায়ের, আকুরটাকুর পাড়া; দ্বিতীয়: মীর মেহেদী, আদালতপাড়া এবং তৃতীয়: আকাশ, মেইন রোড। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিবেকানন্দ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনন্দ মোহন দে।
সাতক্ষীরা: প্রথম: রফিয়া জান্নাত, রুমি ছাত্রীনিবাস; দ্বিতীয়: শেখ নিয়াজ হাসান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং তৃতীয়: এস এম হাবিবুল হাসান, কাছারিপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক ইয়ারব হোসেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: প্রথম: মো. মাসুদ রানা, দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক; দ্বিতীয়: গোলাম আরিফ, হরিমোহন ছাত্রাবাস এবং তৃতীয়: তারভীর রহমান প্রিন্স, কালিতলা দ্বিতীয় গলি। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নঈমুল বারী, ক্রীড়া সাংবাদিক শহীদুল হক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক সমাজসেবী শফিকুল আলম।

সোনালি প্রজন্ম? ধের‌্যা

নব্বইয়ের দশকে উঠে আসা ইংল্যান্ড ফুটবলারদের উদ্দেশ করে ইংলিশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক প্রধান নির্বাহী অ্যাডাম ক্রোজিয়ার প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন শব্দটা—সোনালি প্রজন্ম। সেই থেকেই ইংল্যান্ড ফুটবল দলের সঙ্গে ‘সোনালি প্রজন্ম’ শব্দটি আষ্টেপৃষ্ঠে গাঁথা। বিশ্বকাপ, ইউরো—প্রতিটি বড় টুর্নামেন্ট আসতেই ইংলিশরা আশায় বুক বাঁধে ‘সোনালি প্রজন্মের’ হাত ধরে ঘরে উঠবে শিরোপা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
রুনি-টেরি-জেরার্ড-ল্যাম্পার্ড, ফ্যাবিও ক্যাপেলোর এই ‘সোনালি প্রজন্ম’কে ঘিরে ইংলিশদের উচ্চাশা, ৪৪ বছর পর এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে ইংল্যান্ড। সবাই যখন রুনি-টেরিদের এই ইংল্যান্ডকে ‘সোনালি প্রজন্ম’ বলতে অজ্ঞান, তখন গ্যারি নেভিল হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছেন দাবিটিকে। তাঁর বিশ্বাস, এই ইংল্যান্ড কোনোভাবেই সোনালি প্রজন্ম হতে পারে না! তাঁর কথা, যারা কোনো শিরোপাই জিততে পারল না, তারা আবার কিসের সোনালি প্রজন্ম!
১৯৯৫ সালে অভিষেকের পর নেভিল রাইটব্যাক হিসেবে খেলেছেন ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ৮৫টি ম্যাচ। যার শেষটি ২০০৭ সালে। ইনজুরি আর ফর্মহীনতার সঙ্গে বয়সের ভার মিলিয়ে সেই থেকে দলের বাইরে থাকা নেভিল বলেছেন, ‘১০ বছর ধরে কারণে-অকারণে ব্যবহার করে “সোনালি প্রজন্ম” শব্দটিকেই মেরে ফেলা হয়েছে। যাও একটু ছিল, অনেক নতুন খেলোয়াড় যোগ হওয়ায় সেটাও আর নেই।’ টাইমস মাল্টাকে রোববার তিনি আরও বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, “সোনালি প্রজন্ম” তখন থেকেই খুব স্বর্ণোজ্জ্বল নয় যখন আমি দলে ছিলাম। আমরা কোনো ট্রফি জিততে পারিনি কিংবা নিজেদের যোগ্যতা বিচার করতে পারিনি। সোনালি প্রজন্ম তখনই বলা যাবে, যখন আপনি শিরোপা জিতবেন।’
নেভিলের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো করতে হলে ইংল্যান্ডকে অবশ্যই অতীতের পেনাল্টি দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে, ‘আমি অংশ নিয়েছি এ রকম চার-পাঁচটি টুর্নামেন্টেই আমরা পেনাল্টিতে বাদ পড়েছি। কাজেই এটা বলতেই হবে, পেনাল্টি শটে আমাদের সমস্যা আছে। আর ভালো কিছু করতে হলে ইংল্যান্ডকে অবশ্যই এটা নিয়ে ভাবতে হবে। এখন দলে এমন একজন কোচ আছেন যিনি মানসিকভাবে শক্তিশালী। আশা করি, খেলোয়াড়েরা পেনাল্টি শট নেওয়ার সময় স্নায়ুচাপটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’

ক্রীড়া পুরস্কার ঘোষণা

সরকার ২০০৯ সালের জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার ঘোষণা করেছে কাল। পুরস্কার পেয়েছেন—সফিউল আরেফিন টুটুল (ফুটবল এবং সংগঠক), বাদল রায় (ফুটবল), নাঈমুর রহমান দুর্জয় (ক্রিকেট), সামছুল আলম মঞ্জু (ফুটবল), অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু (সংগঠক), সাহেদ আজগর চৌধুরী (সংগঠক), হামিদা বেগম (অ্যাথলেটিকস ও সংগঠক), শামীম আরা টলি (অ্যাথলেটিকস), মোহাম্মদ মহসিন (হকি), মোস্তাফা কামাল (ভলিবল)।

ভুভুজেলায় বিরক্ত মেসি-রোনালদো

ভুভুজেলা—ফুট তিনেক লম্বা এই প্লাস্টিকের বাঁশি নিয়ে স্টেডিয়ামের দর্শক-সমর্থকেরা খুব আহ্লাদিত। উল্টো চরম বিরক্ত খেলোয়াড় ও টেলিভিশন দর্শকেরা। খেলোয়াড়, কোচদের তরফ থেকে বারবার অভিযোগ আসছে মারাত্মক শব্দ সৃষ্টিকারী এই যন্ত্র নিয়ে।
এবার ভুভুজেলা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হলেন বর্তমান সময়ের দুই বিশ্বসেরা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। রোনালদোর অভিযোগ, এই বাঁশি খেলোয়াড়ের কান ঝালাপালা করে মনঃসংযোগ নষ্ট করে দেয়। তবে রোনালদো ভালো করেই জানেন, বাঁশি নিষিদ্ধ হবে না, ‘অনেক খেলোয়াড়ই এই বাঁশিবাদকদের কাজ-কারবারে নাখোশ। কিন্তু যারা বাঁশি বাজানোর তারা বাজাবেই, এতে খেলোয়াড়দের অভ্যস্ত হতে হবে।’
ওদিকে লিওনেল মেসি বলছেন, ভুভুজেলার শব্দে খেলোয়াড়েরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারছিলেন না। তাঁর কাছে নাকি নিজেকে বধির বলে মনে হচ্ছিল, ‘এই অবস্থায় পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা অসম্ভব। মনে হচ্ছিল, বধির হয়ে গেছি।’
ভুভুজেলাকে নিজেদের গোলশূন্য ড্রয়ের জন্য দায়ী করেছেন ফরাসি মিডফিল্ডার ইয়োন জুরকাফ। কিন্তু সবকিছুর পরও এই বাঁশির বিপক্ষে কথা বলতে নারাজ ফ্রান্সেরই অধিনায়ক প্যাট্রিক এভরা, ‘এই বাঁশিটা তো দেশটার ঐতিহ্য। এখন এটার বিপক্ষে সমালোচনা করা ঠিক হবে না।

টেস্টেও দুর্বার দক্ষিণ আফ্রিকা

ওয়ানডে সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই সাফল্য টেস্ট সিরিজেও টেনে এনেছে সফরকারীরা। পোর্ট অব স্পেনে তিন টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে গ্রায়েম স্মিথের দল জিতেছে ১৬৩ রানে।
প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা তোলে ৩৫২ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ১০২ রানেই। প্রতিপক্ষকে ফলোঅন না করিয়ে ২৫০ রানের লিডটাকে ৪৫৬ তে নিয়ে স্মিথ দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করেন ২০৬/৪ রানে। ৪৫৭ রানের জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেইলদের হাতে সময় ছিল প্রায় দুই দিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯৩ রান করে চতুর্থ দিনেই অলআউট।
৩ ও ২ উইকেট নিয়ে প্রথম ইনিংসের মতো এবারও স্বাগতিকদের সর্বনাশের কারণ ডেল স্টেইন ও মরনে মরকেল। গেইল ৭৩, ব্রাভো ৪৯, অভিষিক্ত শিলিংফোর্ড ২৭ ও সুলেমান বেন ৪২ রান করেন। ম্যান অব দ্য ম্যাচ স্টেইন। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটি শুরু হবে ১৮ জুন, সেন্ট কিটসে।

জার্মানি-আর্জেন্টিনায় মুগ্ধ দেল বস্ক

খোদ জার্মানরাই ছিল শঙ্কিত। তারুণ্যের ঘোড়ায় চেপে কোচ জোয়াকিম লো দলকে কেমন প্রস্তুত করেছেন, সেটাই ছিল দেখার। তবে পরশু রাতে অস্ট্রেলিয়াকে ৪-০ ব্যবধানে হারানো ম্যাচে ক্লোসা, পোডলস্কি, লামদের খেলা জার্মান সমর্থকদের মনে দাগ না কেটে পারেই না।
শুধু জার্মান সমর্থকেরা কেন? এ সময় সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলছে যারা, সেই স্পেনও মুগ্ধ জার্মান তরুণ-তুর্কিদের এই দুর্দান্ত খেলা দেখে। স্প্যানিশ কোচ ভিসেন্তে দেল বস্কের অবশ্য মনে ধরেছে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় দিয়ে শুরু করা মেসি-ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার মাঠের নৈপুণ্যও। কোচ জোয়াকিম লোর নতুন নির্দেশনা আর চমর‌্যাকার কৌশলই তরুণ দলটিকে সংগঠিত করেছে বলে মনে করছেন বস্ক, ‘দল হিসেবে জার্মানির তরুণ এই দল নতুন নির্দেশনা পেয়েছে। তারা ভালো কলাকৌশলও রপ্ত করেছে। এই দলটির দারুণ সম্ভাবনা দেখছি।’ আর্জেন্টিনার প্রতিও তাঁর একই রকম শ্রদ্ধা, ‘দল হিসেবে আর্জেন্টিনা খুবই মানসম্পন্ন এবং তাদের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারটাও সমৃদ্ধ।’
দেল বস্কের দল নিয়ে এবার বিশ্ববাসীর কৌতূহলটা ঊর্ধ্বমুখী। আগামীকাল সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্পেন শুরু করবে বিশ্বকাপ-যাত্রা। তার আগে নিজ দল নিয়ে বস্ক অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, ‘খুব ভালো একটি দল আছে আমাদের। দলের সবাই খুব পেশাদার। প্রচুর আত্মবিশ্বাসও আছে। কিন্তু প্রতিযোগিতায় এই আস্থাটাই সবকিছু না। আমাদের প্রকৃত সামর্থ্য যা, তার চেয়ে বেশি কিছুতে বিশ্বাস নেই আমাদের। আর এই পথেই যত দূর সম্ভব এগিয়ে যাব।’
কোচ ভিসেন্তের জন্য সুখবর, চোট থেকে সেরে উঠে বুধবার প্রথম ম্যাচেই মাঠে নামতে প্রস্তুত সেস ফ্যাবিগ্রাস। ফ্যাবিগ্রাস নিজেই বলেছেন, তিনি ভালো বোধ করছেন এবং শতভাগ সুস্থ। সংশয় কাটাতে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাও মনোনিবেশ করেছেন অনুশীলনে। এই দুই সুখবরের ভেতর একটা দুঃখের সংবাদ, স্ট্রাইকার ফার্নান্দো তোরেসের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামা অনিশ্চিত। বস্ক নিজেই বলেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না, তোরেস প্রথম ম্যাচে খেলবে কি না। তবে সে বাতিলের খাতায় নেই।’

গোল আসবেই নিশ্চিত রোনালদো

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত স্প্যানিশ লিগে জালে বল পাঠিয়েছেন ২৬ বার। কিন্তু পর্তুগালের হয়ে খেলার সময় যে কী হয়! নিজের শেষ গোলটি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো করেছিলেন সেই ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। এরপর একে একে ১৬ মাস কেটে গেছে, গোল পাননি পর্তুগিজ অধিনায়ক। বিশ্বকাপে অবশ্য এ নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন রোনালদো। একবার গোল আসা শুরু করলে ঝাঁকানো বোতল থেকে বেরিয়ে আসা সসের মতোই নাকি আসতে থাকবে তা! আজ আইভরিকোস্টের বিপক্ষে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করার আগে গোল করা নিয়ে তাই মোটেই চিন্তিত নন রোনালদো।
গোলের খরা যাচ্ছে, কিন্তু রোনালদোর মুখের হাসিতে সেটার ছায়া নেই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন ফুটবল কিংবদন্তি একবার আমাকে বলেছিলেন—গোল হচ্ছে সসের মতো! কিছু কিছু সময় অনেক চেষ্টা-চরিত্র করেও তা বের করা যায় না। কিন্তু যখন তা বের হতে শুরু করে, বের হতেই থাকে, হতেই থাকে।’
ভক্তরাও নিশ্চয়ই রোনালদোর কাছ থেকে অবিরাম গোল দেখার আশায় আছেন। সেই ভক্তদের আশ্বস্ত করতেই রোনালদো বলেছেন, ‘যথাসাধ্য কঠোর পরিশ্রম করে যাব আমি। তবে এরপর সবকিছু ঈশ্বরের হাতে। তিনিই জানেন, কে কেমন কাজ করবে আর কেইবা ভালো ফল পাবে। এই ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিরুদ্বিগ্ন। তবে ভালো কিছু করতে চাই এবার।’ ভালো বলতে কতটুকু ভালো, সর্বোচ্চ গোলদাতা? রোনালদো বলছেন, ‘না, আমি আমার সেরাটাই দেব এবং তাতে গোল আসবেই। কিন্তু সেরা গোলদাতা বা সেরা খেলোয়াড়—এ রকম কোনো স্থির লক্ষ্য বেঁধে দিতে চাই না।’
বিশ্বকাপ নিয়ে আলাদা লক্ষ্য না থাকলেও একটা লক্ষ্য তাঁর আছে। সেটা হলো পর্তুগালকে শীর্ষে দেখা, ‘আমি চাই বিশ্বকাপই হবে আমাদের সেরা টুর্নামেন্ট। কে জানে আমরাও হয়তো সেরা হতে পারি। আমি সেই লক্ষ্যেই লড়াই চালিয়ে যাব। আর আমার সব সময়ের লক্ষ্য—সেরা হওয়া।’
কিন্তু এই লক্ষ্যের পথে যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইনজুরি! এরই মধ্যে দল থেকে ছিটকে পড়েছেন নানি ও হোসে বসিংওয়ার মতো সতীর্থ। তবে তাঁদের হারিয়েও রোনালদো খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন, ‘তাদের আমরা হারিয়েছি ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের বিকল্প সমাধানও আছে।’ আইভরিকোস্টের দিদিয়ের দ্রগবার ব্যাপারেও তেমন উদ্বিগ্ন নন রোনালদো, ‘দ্রগবা সম্পর্কে আমরা সবই জানি, বড় ফুটবলার সে। তাই বলে তাকে নিয়ে বেশি ভাবার সুযোগ নেই। দল, কৌশল এবং আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সব মনোযোগ দিতে হবে। এবং এটাই জয়ের একমাত্র পথ।’

জিততে পারল না ক্যামেরুনও

সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করতে দামি উপহার কিনে দিয়েছেন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে। এরপর ‘ক্যামেরুন বিশ্বসেরা দল, এবার চ্যাম্পিয়নও হবে’ ম্যাচের আগে এমনই দুঃসাহসিক সব মন্তব্যও করেছেন। কিন্তু অধিনায়ক স্যামুয়েল ইতো দলকে জাগিয়ে তুলতে পারেননি। কাল নিজেদের প্রথম ম্যাচে তারা ১-০ গোলে হেরে গেছে জাপানের কাছে।
৩৯ মিনিটে একমাত্র গোলটি করেছেন কেইসুকে হোন্ডা। মিডফিল্ডার হলেও স্ট্রাইকারের মতো গোলের জন্য ছোঁক ছোঁক করেন। কালও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন সিএসকেএ মস্কোর মতো দল তাঁকে কিনতে এবার ৭০ লাখ ইউরো খরচ করেছে। দাইসুকে মাতসুইয়ের ক্রস উড়ে এসেছিল ডান দিক থেকে। বল ঠিকমতো ক্লিয়ার করতে পারেননি ক্যামেরুনের ডিফেন্ডাররা। সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন হোন্ডা। পরশু ছিল তাঁর ২৪তম জন্মদিন। নিশ্চয়ই অনেক শুভেচ্ছা পেয়েছেন, পেয়েছেন অনেক উপহারও। তবে নিজের জন্মদিনে সবচেয়ে বড় উপহারটা নিজেই নিজেকে দিলেন।
শেষদিকে ক্যামেরুন খেলায় ফিরে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল। স্টেফানে এমবিয়ার একটা শট বারে লেগে ফিরেও এসেছে তাদের। স্নায়ুক্ষরা শেষ কয়েক মিনিট শেষ পর্যন্ত ভালোমতোই সামাল দিয়েছে জাপান। দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার যে লক্ষ্য স্থির করেছেন কোচ তাকেশি ওকাদা, এই জয়ে সেটি একটু উজ্জ্বল হলো। ২০০২ বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়েছিল এশিয়ার দেশটি।
ওকাদা তাঁর খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে খুব খুশি, ‘আজ (গতকাল) আমার খেলোয়াড়েরা খুব ভালো করেছে। বিদেশের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ জয় পেলাম আমরা। তবে পরের ম্যাচটিতে আমাদের আরও ভালো খেলতে হবে। কারণ ম্যাচটি হল্যান্ডের বিপক্ষে।’
ক্যামেরুন ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে আফ্রিকার ছয় দেশের পাঁচটিই এরই মধ্যে খেলে ফেলল একটি করে ম্যাচ। জয় পেয়েছে কেবল ঘানা। আফ্রিকাকে দ্বিতীয় জয়ের আনন্দে ভাসাতে না পেরে হতাশ ক্যামেরুন কোচ পল লে গুয়েন, ‘আমার দুঃখ হচ্ছে খেলোয়াড়েরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারেনি। আমার মনে হয় ওরা প্রথমার্ধে খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। সহজ সহজ অনেক বল হারিয়েছি আমরা।’

অনুশীলনে নেই রুনি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড্রয়ের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে আরেকটি দুঃসংবাদ ইংল্যান্ড শিবিরে। কালকের অনুশীলনে ছিলেন না দলের তিন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ওয়েইন রুনি, অ্যাশলি কোল আর লেডলি কিং। দ্য সান-এর খবর, বিশ্বকাপে আর খেলা হচ্ছে না কিংয়ের! ইংল্যান্ড দলের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, তিনজনের কারোরই চোট গুরুতর কিছু নয়। বাড়তি সতর্কতার জন্য অনুশীলন করানো হয়নি তাঁদের।
এদিকে ক্যাপেলোর ব্যাপারে মনে হচ্ছে ইংলিশ মিডিয়ার মোহ কেটে গেছে। এরই মধ্যে তাঁর নানান সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে পত্রপত্রিকায়। এখন বলা হচ্ছে, কিংকে ২৩ জনের দলে রেখে ক্যাপেলো নাকি জুয়াই খেলেছিলেন। কিং ছিটকে পড়া মানে তো সেই জুয়ায় ক্যাপেলোর পরাজয়।

জমে উঠতে পারে এই ম্যাচও

আগেই জেনে গেছেন সেরা একাদশে নেই। বিশ্বকাপে দেশের অভিষেক ম্যাচে খেলা হবে না, স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে বাসেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের এক তরুণ ডিফেন্ডার। পরের দুটো ম্যাচে অবশ্য খেলেছেন, কিন্তু জঘন্যভাবে হেরে স্বপ্নের বিশ্বকাপ শেষ হলো দুঃস্বপ্নে। তবে বিশ্বকাপ-স্বপ্ন মরেনি। সেদিনের ২১ বছরের রিকি হার্বার্ট ২৮ বছর পর এবার কোচ হিসেবে দেশকে বিশ্বকাপে নিয়ে গেছেন।
নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রথম ধাপটা পূরণ হয়েছে, দ্বিতীয় ধাপ পূরণে নিউজিল্যান্ড কোচের সবচেয়ে বড় ম্যাচ আজ। গ্রুপের অন্য দুই দল ইতালি ও প্যারাগুয়ে। জয়টা পেতে হবে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে আসা স্লোভাকিয়ার বিপক্ষেই। তবে সহজ হবে না এটাও, কাগজে-কলমে এটা স্লোভাকিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ। তবে বিশ্বকাপে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল আটবার! যে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্লোভাকিয়ার জন্ম, সেই চেকোস্লোভাকিয়া শুধু আটবার বিশ্বকাপই খেলেনি, রানার্সআপও হয়েছে দুবার। স্লোভাকিয়ার কোচ ভ্লাদিমির ভেইসও খেলেছেন বিশ্বকাপ, ছিলেন ১৯৯০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা দলে। বিশ্বকাপের অন্দরমহল তাই ভালোই চেনাজানা ভেইসের। তা ছাড়া নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখতে স্লোভাকিয়াও তো লক্ষ্য বানিয়েছে নিউজিল্যান্ডকেই!
মধ্য ইউরোপের প্রথাগত ধাঁচেই খেলবে স্লোভাকিয়া, সবচেয়ে বড় তারকা মার্টিন স্কার্টেল ডিফেন্ডার হলেও দলের সবচেয়ে বড় শক্তি মাঝমাঠ। নিউজিল্যান্ডের শক্তির জায়গা ডিফেন্স আর দলীয় শৃঙ্খলা। এমনিতে এটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে অনাকর্ষক ম্যাচগুলোর একটি, তবে এই ম্যাচটিই জমিয়ে তুলতে পারে দুই দলের জয়ের এই তীব্র ইচ্ছা।

নিউজিল্যান্ড-স্লোভাকিয়া
ক্রিস কিলেন
ম্যানসিটির যুব একাডেমির দীক্ষা নেওয়া কিলেন খেলেন মিডলসবোরোতে। অধিনায়ক ও এভারটন ডিফেন্ডার রায়ান নেলসন ছাড়া নিউজিল্যান্ডের কেবল তিনিই খেলেন শীর্ষস্থানীয় কোনো লিগে। ১০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ৩১টি। তবে গত বছর ইতালির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দুই গোল করে জানিয়ে দিয়েছেন নিজের সামর্থ্য।

মারেক হামসিক
১৭ বছর বয়সেই তাঁকে দলে নিয়েছিল সিরি ‘আ’-এর ক্লাব ব্রেসিয়া, এখন খেলছেন নাপোলিতে। এই ২২ বছর বয়সেই মারেক হামসিক স্লোভাকিয়ার অধিনায়ক। সাবেক চেক তারকা পাভেল নেদভেদের অন্ধভক্ত হামসিক নেদভেদের মতোই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, বল বানিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষ গোল

এ ফ্রান্সকে পছন্দ হচ্ছে না জিজুর

বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া গেছে প্লে-অফ খেলে। প্রস্তুতি ম্যাচেও যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স। সব মিলিয়ে দারুণ সমালোচনার মুখে ফরাসি কোচ রেমন্ড ডমেনেখ। এমনকি ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানও শেষ পর্যন্ত মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। ওয়েবসাইট।
২০০৬ বিশ্বকাপে এই ডমেনেখই ছিলেন জিদান-অঁরিদের কোচ। খেলোয়াড়ি জীবনের ‘গুরু’ সম্পর্কে জিদান বলেছেন, ‘ডমেনেখ কোনো কোচই নয়!’ ফ্রান্স দল সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা ফ্রান্সের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের নায়কের, ‘দলের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই।’ নিজেদের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে ফ্রান্স। ক্যানাল প্লাস টেলিভিশনের সঙ্গে কথা বলার সময় ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের প্রতি তাই জেগে ওঠার আহ্বান জানালেন জিদান, ‘অবশ্যই তাদের দায়িত্ববান হতে হবে এবং ব্যক্তিগত অহমিকা সরিয়ে রেখে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে খেলতে হবে।’
ফ্রান্সের পরের ম্যাচ বৃহস্পতিবার, মেক্সিকোর বিপক্ষে পোলকওয়েনে।

‘আত্মঘাতী’ পোলসেনকে কোচের সান্ত্বনা

১৯৬৭ সালের পর ১৯৯২। ফুটবলে হল্যান্ডের বিপক্ষে ডেনমার্কের সুখস্মৃতি বলতে এই দুটি বছরই। ১৯৬৭ সালে হল্যান্ডকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে হারিয়েছিল ড্যানিশরা। আর ’৯২-এ টাইব্রেকারে জিতেছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে। কাল বিশ্বকাপের ম্যাচে নতুন কোনো সুখস্মৃতি আর যোগ করতে পারেনি তারা। হেরে গেছে দুই গোলে। তবে এর একটি গোল আত্মঘাতী বলে দুঃখটা আরও বেড়েছে।
আত্মঘাতী গোলটি যিনি করেছেন, সেই সিমন পোলসেন হল্যান্ডেরই এজেড আলকমার ক্লাবে খেলেন। গোল বাঁচাতে হেড করেছিলেন পোলসেন। তবে সতীর্থ ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল অ্যাগারের পিঠে লেগে বল ঢুকে যায় নিজেদের জালে। ঘটনাটি তাঁকে যেন একটু বোকাই বানিয়ে দিয়েছিল। অবিশ্বাসের একটা হাসিও কি খেলে গেল পোলসেনের ঠোঁটে? ম্যাচের পর কোচ তাঁকে শুনিয়েছেন সান্ত্বনার বাণী, ‘সিমন পোলসেন আসলে আমাদের সেরা খেলোয়াড়। এটা যেকোনো খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। আমি ওকে ম্যাচ শেষে বলেছি, এ নিয়ে আর না ভেবে সামনের কথা ভাবতে। কারণ ও তো ভালো খেলেছে।’ সান্ত্বনার বাণী শোনালেও ব্যাপারটিতে হতাশ কোচ মর্টেন ওলসেন, ‘তবে এটি প্র্যাকটিসে ঘটতে পারে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নয়।’
তাহলে কি বলা যায় আত্মঘাতী গোলটিই হারিয়ে দিয়েছে ডেনমার্ককে! ড্যানিশ কোচ অবশ্য তা মানলেন না। হল্যান্ডের দুর্দান্ত গতিময় ফুটবলের কাছেই ড্যানিশদের পরাজয় হয়েছে, বললেন তিনি, ‘ওই গোলের পর তো আরও ৪৫ মিনিট সময় ছিল। আসলে শারীরিক ও মানসিকভাবে যে দলটি বলের দখল নিজেদের কাছে রাখে, সেই দলের বিপক্ষে খেলা কঠিন।’ কালকের ম্যাচের পর হল্যান্ডকে সম্ভাব্য শিরোপাজয়ীও মনে হয়েছে ওলসেনের কাছে, ‘ডাচরা সম্ভবত ফেবারিট নয়। তবে ফেবারিট তালিকার বাইরে থেকে এসে শিরোপা জিততে পারে তারাও। রবিন ফন পার্সি, রাফায়েল ফন ডার ভার্ট, ওয়েসলি স্নাইডারের মতো দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় আছে তাদের।’
প্রতিপক্ষ কোচ এমন প্রশংসা করেছেন। হল্যান্ডের খেলোয়াড়দের তো আনন্দে ভাসারই কথা। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। পা তাঁদের মাটিতেই রাখতে হচ্ছে। কোচ বার্ট ফন মারউইক যে উদ্ধত না হতে সতর্ক করে দিয়েছেন শিষ্যদের, ‘আমি কম করে হলেও এক লাখবার বলেছি, কখনো কখনো আমরা উদ্ধত হয়ে যাই। আর এটাই বুমেরাং হয় আমাদের জন্য। আমি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই খেলোয়াড়দের বলে এসেছি, আমরা যেন ফাঁদে পা না দিই।

অচিরেই কাটবে গোলের খরা

বিশ্বকাপ ফুটবলের চলন্ত আসরের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় খেলাটি এইমাত্র শেষ হয়েছে। আমার একদা-প্রিয় দল রাশিয়াকে প্লে-অফ ম্যাচে হারিয়ে এবারের বিশ্বকাপে উঠে আসা সার্বিয়াকে ১-০ গোলে পরাজিত করে আফ্রিকার অন্যতম আশার প্রদীপ আমার কবিবন্ধু ওকাইয়ের ঘানা (দ্র: আফ্রিকার চিঠি/দূর হ দুঃশাসন) তার বিজয়পথের প্রথম বাধাটি অতিক্রম করল। প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে পাওয়া পেনাল্টি কিক বা জরিমানাশট থেকে দিনের একমাত্র গোলটি সুসম্পন্ন করেছেন মিস্টার Asamoy Gyan। প্রতিপক্ষের মরণজালে বল ছোঁয়াতে পারার কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বখ্যাতি অর্জনকারী ওই তরুণের নামটির বাংলা উচ্চারণ ঠিক কী হবে, বলতে পারছি না। অসোময় জ্ঞান? নাকি অসময় জিয়ান—? উপাধিটা মনে হচ্ছে জ্ঞান-ই হবে। তা আমার মতো অগুণী মানুষের নামের শেষে যদি গুণ থাকতে পারে, তো বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জনকারী একজন ফুটবলারের নামের শেষে জ্ঞান শব্দটা তো যুক্ত হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শব্দটির উর‌্যাস নিয়ে। ওই সংস্কৃত শব্দটি ঘানায় গেল কীভাবে? ভারতের স্পিনার প্রজ্ঞান ওঝার নামটি মনে পড়ছে। প্রজ্ঞান স্বীকৃত জ্ঞানীও নন, সাপে কাটা মানুষের চিকির‌্যাসা করার বৈদ্যও তিনি নন। অথচ একই সঙ্গে তিনি জ্ঞানী ও কৃত্তিবাস ওঝার মতো ওঝাও বটে। পৃথিবীতে কত রকমের নাম আর কত রকমের পদবি যে আছে মানুষের! বিশ্বকাপের খেলা যত সামনে গড়াবে, এ রকম আরও কত অদ্ভুত নামের সঙ্গে যে আমাদের পরিচয় ঘটবে! গর্জনশীল ৩২ দলের প্রথম রাউন্ড শেষেই আমরা সেই চমর‌্যাকার নামের তালিকাটি পাব।
ঘানাকে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই জয়ের আনন্দ উপহার দেওয়া ওই তরুণ জ্ঞানী তো বটেই। ফ্রান্সের বিশ্বকাঁপানো স্ট্রাইকার প্লাতিনিকেও আমি পেনাল্টি মিস করতে দেখেছি। সেখানে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপের মধ্যেও এতটুকু বিচলিত না হয়ে ঘানার ‘অসোমান জ্ঞানী’ [ওসমান গনি নয়তো?] মহাশয় সার্বিয়ার গোলরক্ষককে যেভাবে বোকা বানালেন, ওর লম্বা চুল আর কটা হলুদরঙের জার্সির দম্ভকে যেভাবে পরাভূত করলেন, তার অকুণ্ঠ প্রশংসা না করে উপায় কী? এমন দৃপ্ত পায়ে ওই শটটা তিনি নিলেন, আই-কন্টাক্টের মধ্যে এমনই ছলনা ছিল তার যে কামানের গোলার মতো ধেয়ে আসা বলটির গতিমুখের বিপরীত দিকে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া সার্বিয়ান গোলরক্ষকটির আর কিছুই করার ছিল না।
তৃতীয় দিনের প্রথম ম্যাচটিতে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে সম্পাদিত স্লোভেনিয়ার একমাত্র গোলটিকে যদি গোল বলে মানি, তাহলে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকার পাওয়া গোলটিকেও আমলে নিতে হয়। ওই দুটো গোল নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো। শুধু প্রার্থনা করব, এ রকম না চাহিতে পাওয়া গোল দিয়ে যেন বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্তপর্বের কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেলার সমাপ্তি না ঘটে।
চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলে গোলের খরা তৃতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে। তিন দিনের সাত খেলায় এ পর্যন্ত মোট গোল হয়েছে নয়টি। শুধু এক গোলের ন্যূনতম ব্যবধানে নয়, একাধিক গোলের ব্যবধানে জয় বলেও যে একটা কথা আছে, এশিয়ার মাটির প্রদীপ দক্ষিণ কোরিয়া দক্ষিণ-আফ্রিকায় অনুপস্থিত থাকলে, জানি না, আমাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দিত কে?
এই লেখা যখন শেষ করে এনেছি, তখন আমার টিভিতে অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির মধ্যকার দিনের শেষ-খেলার প্রথমার্ধ শেষ হয়েছে। গত বিশ্বকাপখ্যাত পোডলস্কি আর ক্লোসার দেওয়া জোড়া গোলের সুবাদে জার্মানি অস্ট্রেলিয়াকে দৃপ্ত পায়ে মাড়িয়ে চলেছে। প্রথমার্ধের খেলা দেখে মনে হলো, মাইকেল বালাককে দলের বাইরে রাখার দুর্বলতা জার্মানি কাটিয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় ভিন্ন কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না। মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফুটবলে গোলের খরাও অচিরেই কাটবে।
সর্বশেষ তথ্য: বিশ্বকাপের আট নম্বর ম্যাচটিকে প্র্যাকটিস ম্যাচে পরিণত করে জার্মানি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়েছে।
এই লেখাটি আমি উর‌্যাসর্গ করছি আমার অকালপ্রয়াত দুই বন্ধু—চলচ্চিত্রকার বাদল রহমান (৬২) এবং ক্যাপ্টেন (অব.) জিয়াউদ্দিনের (৬০) স্মৃতির উদ্দেশে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আমি আমার এই দুজন ক্রীড়াপাগল বন্ধুজনকে হারিয়েছি।