Showing posts with label ক্রিকেট ও রাজনীতি. Show all posts
Showing posts with label ক্রিকেট ও রাজনীতি. Show all posts

Friday, January 16, 2026

ক্রিকেট নিয়ে ‘নাটক’ ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে

দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ যে দেশ ক্রিকেটকে শুধু খেলা নয়, বরং কূটনৈতিক ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবেও দেখে- সেই ভারতই আশ্চর্যজনকভাবে খেলাধুলা ও রাজনীতির সীমারেখা আলাদা রাখতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কলকাতা নাইট রাইডার্সের আইপিএল দলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে না নেয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কটি স্বাভাবিকভাবে একটি সাধারণ ক্রীড়া সিদ্ধান্ত হিসেবেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে দেশপ্রেম, পরিচয় ও জাতীয় আনুগত্য নিয়ে উচ্চকণ্ঠ গণভোটে।

এই বিচ্যুতি যতটা সামান্য মনে হয়, আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি পার্থক্য। জাতীয় দল একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি দল প্রতিনিধিত্ব করে একটি শহর, একটি ব্র্যান্ড এবং একটি ব্যবসায়িক মডেলকে।

যখন কোনো দেশ যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা কূটনৈতিক ভাঙনের পর অন্য দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় আচরণ সম্পর্কে একটি প্রতীকী বার্তা দেয়। কিন্তু যখন একটি বেসরকারি মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনৈতিক চাপের মুখে কোনো বিদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেয়, তখন বিষয়টি অনেক বেশি অস্পষ্ট ও সমস্যার হয়ে ওঠে। এতে একজন ব্যক্তিগত পেশাদার খেলোয়াড়কে গোটা একটি দেশের রাজনীতির প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়।

এটি বাংলাদেশের বিষয়ে বাস্তব উদ্বেগ অস্বীকার করার বিষয় নয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বৈরী রাজনৈতিক ভাষ্য, এবং ঢাকার সাম্প্রতিক কৌশলগত সংকেত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাস্তব ও যুক্তিসংগত। এসব গুরুতর বিষয় দৃঢ় কূটনৈতিক আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু যাদের হাতে কোনো নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা নেই, যারা কোনো উসকানি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ নন- এমন ক্রীড়াবিদদের নিশানা করে সেই উদ্বেগের সমাধান হয় না। বরং উল্টো, এতে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়; দেশটিকে নীতিনিষ্ঠ নয়, বরং আবেগতাড়িত ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াশীল বলে মনে হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট শুরু থেকেই সহাবস্থানের এক পরীক্ষাগার। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের খেলোয়াড়রা একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেন, একে অপরের সাফল্য উদযাপন করেন এবং এমন দর্শকদের সামনে খেলেন যারা জাতীয়তার চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এতে কখনোই ভারতের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়নি; বরং এটি ভারতকে একটি আত্মবিশ্বাসী, উন্মুক্ত ক্রীড়াসংস্কৃতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক প্রদর্শনীর জন্য সেই পরিসরকে দুর্বল করা কৌশলগত আত্মঘাতের শামিল। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রতিক্রিয়া আরেকটি অস্বস্তিকর প্রবণতাও উন্মোচন করেছে- পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য খেলাধুলাকে কত সহজে অস্ত্র বানানো হচ্ছে। যখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, আর খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করা হয় পারফরম্যান্স নয়, পাসপোর্ট দেখে- তখন নাগরিক গর্ব ও সাংস্কৃতিক অনিরাপত্তার মাঝের সীমারেখা ঝাঁপসা হয়ে যায়।

এটি জাতীয় শক্তির লক্ষণ নয়। এটি স্নায়ুবিক দুর্বলতার লক্ষণ।
একইভাবে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াও- সম্প্রচার সীমিত করা বা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার হুমকি, সংযম নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোর রাজনীতিকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশীরা প্রতীকী প্রতিশোধে লাভবান হয় না। তারা লাভবান হয় সংযম, যোগাযোগ এবং এই বোধ থেকে যে, প্রতিটি উসকানি জোরালো হওয়ার যোগ্য নয়।
এর একটি গভীরতর ক্ষতিও আছে। যখন প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা ক্রিকেট মাঠে গড়ায়, তখন খেলাধুলা তার অনন্য ভূমিকা, একটি নিরপেক্ষ মিলনস্থল হারাতে থাকে। তখন ক্রিকেটও হয়ে ওঠে অভিযোগের আরেকটি মঞ্চ, রাজনৈতিক পয়েন্ট স্কোরিংয়ের আরেকটি ক্ষেত্র। এই ক্ষতি আমরা বহন করতে পারি না।
ভারতের প্রকৃত শক্তি বরাবরই ছিল তার বৈপরীত্য ধারণ করার ক্ষমতা কঠোর কিন্তু ভঙ্গুর নয়, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু রূঢ় নয়, নীতিনিষ্ঠ কিন্তু দণ্ডনির্ভর নয়। যদি আমরা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সত্যিই সম্মান পেতে চাই, তবে আমাদের প্রমাণ করতে হবে- কখন সীমারেখা টানতে হয়, আর কখন তা না করাই শ্রেয়।
একজন ক্রীড়াবিদকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিতে পরিণত করা রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ নয়।
এটি নিছক নাটক।
দীর্ঘমেয়াদে, এই নাটক ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/198499_1620745538_1606617524_5fc309b4f2a13_mustafizur-rahman.jpg

Sunday, November 2, 2025

সাকিব আল হাসান: বাংলাদেশের ক্রিকেটনায়ক যেভাবে নিজের ক্যারিয়ার কবর দিলেন by মুবাশার হাসান

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধঃ একসময় সাকিব আল হাসান ছিলেন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। তিনি ছিলেন একজন নায়ক, যিনি লাখো মানুষের, বিশেষত তরুণদের, আশা-ভরসা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। কেনই বা হবেন না?

সাকিব ছিলেন ক্রিকেটার, তাও আবার জাতীয় দলের অধিনায়ক। দারিদ্র্য, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত একটি দেশে সাকিব বাংলাদেশের জন্য গৌরব ও সম্মান বয়ে এনেছিলেন। এজন্যই তিনি ছিলেন মানুষের প্রিয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পর সাকিবই হয়তো সবচেয়ে পরিচিত বাংলাদেশি ছিলেন। কিন্তু ১৫ বছরেরও বেশি সময় দেশ শাসন করা স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর, অনেক বাংলাদেশির কাছেই সাকিব আর নায়ক নন।

ক্রিকেটার অবস্থায়ই সাকিব তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দেন ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। সেই নির্বাচনকে দেশ-বিদেশে একপক্ষীয় ও কারচুপিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। এখন হাজারো আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মতো সাকিবও নির্বাসিত জীবনে আছেন। বাংলাদেশের এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, সাকিব আর কখনো জাতীয় দলের জার্সি পরতে পারবেন না। বাংলাদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার উপরও তার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই সিদ্ধান্তের প্রতি জনগণের মধ্যেও সমর্থন আছে।

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাকিব, তার মা শিরিন আখতার এবং আরও ১৩ জনের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার কারসাজির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ তদন্ত করছে। সাকিবের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগগুলোর কিছু শেখ হাসিনার আমলেই উঠেছিল, তবে তখন তদন্ত হয়নি। সাংবাদিকরা আরও খুঁজে পেয়েছেন, সাকিবের পিতা ছাত্রনেতা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সব মিলিয়ে সাকিব ও তার পরিবার এখন গভীর বিপদে।

সাকিবের উত্থান ও পতনের গল্প এক অদ্ভুত মিশ্রণ- ক্রিকেট, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এক রঙিন কেলেইডোস্কোপ। ১৯৮৭ সালে মাগুরার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম সাকিবের। ২০০৪ সালে বিভাগীয় লিগে খেলা শুরু করেন এবং দ্রুত নিজের সুনাম গড়ে তোলেন। ২০০৬ সালে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে তার। প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি ৪৪৭টি ম্যাচ খেলেছেন। করেছেন ১৪,৭৩০ রান। নিয়েছেন ৭১২টি উইকেট। ইএসপিএন ক্রিকইনফো তাকে বর্ণনা করেছে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সহজভাবে সেরা ক্রিকেটার।’ ক্রিকেট মাঠের সাফল্য তাকে এনে দেয় খ্যাতি ও অর্থ। দেশি-বিদেশি বহু বিজ্ঞাপনে তিনি মুখপাত্র হন। ২০১৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তিনি ইউনিসেফের জাতীয় শুভেচ্ছা দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে বিতর্ক কখনোই সাকিব থেকে দূরে ছিল না। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং আইসিসির শাস্তির মুখে পড়েন। একবার গ্রাউন্ডসম্যানকে হুমকি দেয়ার জন্য, আবার একবার টেলিভিশনে অশোভন অঙ্গভঙ্গির কারণে তাকে শাস্তি পেতে হয়। ‘অশোভন আচরণ’-এর অভিযোগে বিসিবি তাকে ৮ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। ২০১৯ সালে আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট এক বুকির সঙ্গে গোপন যোগাযোগের জন্য তাকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে, যার এক বছর স্থগিত রাখা হয়। এই সময়েই সাকিব তার ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে থাকেন, যার মধ্যে স্বর্ণ ব্যবসাও ছিল। কিন্তু যখন সাকিব আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন দলটির সরকার ভোট কারচুপি, দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, গোপন কারাগার পরিচালনা এবং হাজার হাজার বিরোধী কর্মীকে বন্দি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচিত।

দেশের মানুষও জানতো ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনা কী ভয়ঙ্কর কৌশল নিয়েছেন। তবুও সাকিব সেই দলে যোগ দেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাকিব এক পক্ষ বেছে নেন। সেটা এমন এক পক্ষ, যেটি বহু বাংলাদেশির কাছে দমন, নির্যাতন ও হত্যার প্রতীক। জাতিসংঘ পর্যন্ত বলেছে, শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণবিক্ষোভে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে থাকতে পারে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সাকিব নিজের সামাজিক মাধ্যমে শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ছবি প্রকাশ করতেন। এমনকি ক্ষমতাচ্যুতির পরও তিনি সেই অভ্যাস ছাড়েননি- যা এখন তার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বর্তমানে সাকিব যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। সম্প্রতি তিনি শেখ হাসিনার জন্মদিনে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন- ‘শুভ জন্মদিন, আপা।’
এই পোস্টের কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, সাকিব আর কখনো বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারবেন না। একজন সত্যিকার প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের এক স্বৈরশাসকের সঙ্গে রাজনৈতিক আঁতাতে জড়ানোই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উজ্জ্বলতম ক্রিকেট নক্ষত্রের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছে। শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা জানানোয় সাকিব প্রকাশ করেছেন এক ধরনের নির্মম সংবেদনশীলতার অভাব। কারণ অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে হাসিনা মানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়ন, যা তাদের জীবন ও পরিবার ধ্বংস করেছে। নিজের রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য ও বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থতার কারণেই সাকিব নিজ হাতে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের কবর রচনা করেছেন।

(লেখক সিডনিভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক। তার এ লেখাটি অনলাইন দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ)

mzamin

Friday, April 11, 2025

‘আমি কষ্ট পাইনি তবে বিব্রত হয়েছি’ by সামন হোসেন

ঈদের ছুটির ঠিক আগের দিন কাজী রাজীব উদ্দীন আহমেদ চপলকে সাধারণ সম্পাদক করে আরচারি ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করেছিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। এরপর সার্চ কমিটির পদত্যাগের হুমকিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন এনে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক এই সংস্থা। ঈদের ছুটির মধ্যে কমিটি পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন দিয়ে নজির সৃষ্টি করে এনএসসি। এনএসসি’র দেওয়া অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক করা হয় তানভীর আহমেদকে। চপলকে করা হয় ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির এক নম্বর সদস্য। হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটলো যে মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে চপলকে সরিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন দিতে হলো? এ নিয়ে মানবজমিনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশের আরচারি পথিকৃৎ কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল। তার অংশ বিশেষ মানবজমিনের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

আপনার কী মনে হয়? কেন মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে সরকারি ছুটির মধ্যে প্রজ্ঞাপন দিয়ে আপনাকে সরিয়ে দেয়া হলো?
চপল: এটা আসলে আমার চেয়ে আপনারা ভালো বলতে পারবেন। আমি আসলে কিছুই জানি না। আমি কারো কাছে আমাকে রাখার জন্য যেমন তদবির করিনি, তেমনি কেন বাদ দেয়া হয়েছে তাও জানতে চাইনি। আমি তো আরচারি সেবক। এখন উনারা যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন। কে বা কারা বাইরে থেকে খেলছে, তা তো বলতো পারবো না। তবে আমি কাপুরুষ নই যে, সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বাদ দিয়েছে বলে ফেডারেশনেই আর থাকবো না। বড় পদে না থেকেও যে খেলাটি এগিয়ে নেওয়া যায় সেই চেষ্টা করে যাবো। সামনে দুটি প্রকল্প আছে। সেটা আগে এখন শেষ করতে হবে।

দায়িত্ব দেয়ার পর ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে সরিয়ে দেয়াতে আপনি কি কষ্ট পাননি?
চপল: সত্যি বলতে আমি একটুও কষ্ট পাইনি। তবে বিব্রত হয়েছি। 

আপনি বললেন কে বা কারা বাইরে থেকে খেলছে। তারা কারা? 
চপল: ক্রীড়াঙ্গনে আমার কোনো শত্রু নেই। যারা আছেন তারা সবাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি কারো ওপর দায় চাপাতে চাই না।

কিন্তু সার্চ কমিটি তো সরাসরি আপনার বিরোধিতা করেছে। আপনাকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি দেয়ার পর পদত্যাগের হুমকি দিয়েছে-
চপল: দেখুন সরকার ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কারে তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা হয়তো চিন্তা করেছে আমাকে দিয়ে আর হবে না। তাই আমাকে সরিয়ে দিয়েছে। এতে আমি বিন্দুমাত্র কষ্ট পাইনি। তাদের ওপরও আমার কোনো রাগ নেই। তারা সবাই আমার বন্ধু কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সর্ম্পক।
তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সর্ম্পক।

সুদীর্ঘ সময় আরচারির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার নেতৃত্বেই পরপর দুটি অলিম্পিকে দু’জন আরচার সরাসরি অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করেছে। ২০১৯ সালের এসএ গেমসে আরচারিতে দশটি সোনা জিতেছে বাংলাদেশ। আরচারি খেলাটিকে দেশের অন্যতম সেরা ফেডারেশনে পরিণত করেছেন। দীর্ঘ পথচলায় আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
চপল: আমি একজন দেশপ্রেমিক সংগঠক। আমি দেশকে ভালোবেসে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি খেলাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কতটুকু পেরেছি তার মূল্যায়ন আপনাদের মাধ্যমে দেশের জনগণ করবে। তবে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট না। কারণ কাজ করতে গিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। বারবার আমাকে টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। নানাভাগে খেলোয়াড়দের মাথাভারি করেছে একটা গ্রুপ। তাদের কারণেই রোমান সানার মতো খেলোয়াড় বিগড়ে গেছে। বার বার আমাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরেও আমি আমার চেষ্টা চালিয়ে গেছি।

অলিম্পিকে পরপর দু’বার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। কী এমন হলো সবশেষ কমিটিতে আপনাকে রাখাই হলো না?
চপল : এখানে অনেক বড় গল্প আছে। তা আমি এখন বলতে চাই না। আমি কারো বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। তবে এটুকু বলি,  অলিম্পিকে আমি যাদের খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম হয়তো তারা চায়নি আমি থাকি। তারা সেনা প্রধানের দোহাই দিয়ে আমাকে বাদ দিয়েছে। অথচ পরে সেনা প্রধান আমি কেন নাই সেটা জানতে চেয়েছেন।

শোনা যাচ্ছে আপনি অলিম্পিকের মহাসচিব পদে নির্বাচন করবেন। সার্চ কমিটির একজনের কথাও শোনা যাচ্ছে, এই পদে তিনিও আগ্রহী। গুঞ্জন আছে তিনি তার রাস্তা পরিষ্কার করতেই আপনাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে উপদেষ্টার দোহাই দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে-
চপল: আমার মনে হয় না আমাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রাখলে উপদেষ্টা কিছু বলতেন। যাইহোক এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার নিজের কোন ইচ্ছে নেই অলিম্পিকের মহাসচিব হওয়ার। তবে পরিস্থিতির কথা বলা যায় না। সার্চ কমিটির কারো অলিম্পিকে নির্বাচন করার বিষয়ে আমি এখনো কিছুই জানি না। 

এটাতো অ্যাডহক কমিটি। সামনে নির্বাচন হবে ফেডারেশনে। আপনি কি ফেডারেশনে নির্বাচন করবেন?
চপল: সেটা আসলে সময়ই বলে দেবে। আমার বয়স হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছি। ক্রীড়ালেখক সমিতির সেরা সংগঠক হয়েছি। অনেক পেয়েছি আরচারি থেকে। কমিটিতে না থাকলেও আরচারির সংগঠক হিসেবে থাকতে চাই। কারণ আরচারি আমার রক্তে। 

এবার বলুন কমিটি কেমন হলো? এরা কি পারবে কমিটিকে ঠিক ঠাকমতো চালিয়ে নিতে?
চপল : খুবই ভালো কমিটি হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক তানভীর খুবই ভালো ছেলে। ও বিদেশে থাকতে কমিটি ঘোষণা হয়েছে। দেশে ফিরেই ও আমার সঙ্গে বাড়িতে এসে দেখা করেছে। আমি ওকে যুগ্ম সম্পাদক আলমগীরকে ফুল দিয়ে মিষ্টি খাইয়ে বরণ করেছি। এমনিতে আরচারি সঠিক পথেই আছে। সিটি গ্রুপের মতো একটি প্রতিষ্ঠান আরচারির সাথে আছে। এবার স্কয়ার সাঈদ সাহেব কমিটিতে আসছেন। ফান্ডে প্রায় নয় কোটি টাকা আছে। পাইপ লাইনে যথেষ্ট খেলোয়াড় আছে। সবকিছু মিলিয়ে আরচারি চালিয়ে নিতে নতুন কমিটির সমস্যা হওয়ার কথা না। 
mzamin

Saturday, October 19, 2024

‘কেউ অনুতপ্ত হলে তাকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত’, সাকিব ইস্যুতে সালাউদ্দিন

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলতে চেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু রাজনৈতিক ইস্যুতে সাকিবের প্রতি ক্ষুব্ধ জনতা। এ কারণে নিরাপত্তা ইস্যুতে আগামী ২১শে অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া টেস্টে খেলা হচ্ছে না তার। সরকার ও বিসিবির পরামর্শে আপাতত দেশেই ফেরা হচ্ছে না সাকিবের। এই বিষয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ ঝেড়েছেন দেশের জনপ্রিয় কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।

সাকিবের ‘মেন্টর’ হিসেবেও দেশের ক্রিকেটে সালাউদ্দিনের পরিচিতি আছে। তবে শুধু সাকিব নয়, ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে তামিম ইকবাল ও মাশরাফি বিন মুর্তজার নামও নিয়েছেন তিনি। এদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের নিয়ে ক্ষোভ, হতাশা, কষ্ট ও অভিমান প্রকাশের সঙ্গে পালটা প্রশ্নও ছোড়েন এই কোচ।

তার লেখায় সাকিবের পাশাপাশি আছে মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তামিম ইকবালের নামও। ঘরোয়া ক্রিকেটের সফল এই কোচের লেখায় মিশে আছে দেশের মানুষের প্রতি । কিছু প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

স্ট্যাটাসে সালাউদ্দিন লেখেন, ‘দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি কখনই এত রাগ বা কষ্ট লাগে নাই, আজ কেন যেন লাগছে, আমরা মানুষ কি কখনও নিজেরা ভুল করি না? কেউ অনুতপ্ত হলে তাকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি মানুষ হিসেবে, দয়ামায়া জিনিসটা আমাদের মধ্যে থেকে উঠে গেছে।’

বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সময় সরব না থাকায় মূলত ক্ষোভের মুখে পড়েন সাকিব। তবে কয়েকদিন আগে এ বিষয়ে লম্বা স্ট্যাটাসে পুরো বিষয়ের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। রাজনীতিতে জড়ানোর কারণও ব্যাখা করেন টাইগারদের সাবেক অধিনায়ক। এদিকে আগামী বিপিএলে সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে মাশরাফির খেলা নিয়ে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা। এ প্রসঙ্গে দেশের ক্রিকেটের প্রতি, সমাজের প্রতি সাকিব-মাশরাফিদের অবদানের কথা তুলে ধরেন সালাউদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘একটা মানুষ দেশের জন্য ১৭টা বছর কিছু না কিছু করেছে, আজ ক্রিকেটবিশ্ব আমাদের একটু সন্মান করে কাদের জন্য? তারা ক্রিকেট মাঠে নামতে পারবে না, এই কান্না তো সবাই দেখবে না। রাজনীতি করেছে বলে এরা খুনি ??? এদের সাথে মিশেছেন? এরা কত মানুষের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, জানেন আপনি? এরা কত অসহায় মানুষের চিকিৎসা করিয়েছে, সেটা কি জানেন?’

মানুষের মূলত ক্ষোভ আন্দোলনের সময় সাকিব-মাশরাফি স্ট্যাটাস না দেওয়াতে। তবে সালাউদ্দিন মাঠের ক্রিকেটে তাদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘তারা স্ট্যাটাস না দেওয়ার কারণে আজ শত্রু। যখন মাশরাফি ৫টা অপারেশন করে দেশের জন্য লড়াই করেছে, তা কি দেখেছেন? সাকিব যে আঙুলে চিড় নিয়ে বোলিং করে গেছে, তামিম এক হাতে ব্যাটিং করে গেছে, কাদের জন্য? দেশকে সবাই কম-বেশি ভালোবাসে। এদের ভালোবাসাটা হয়তো দেখা যায়ও না। এদেরকে কাছ থেকে দেখেছি। এরা মানুষের উপকার ছাড়া কারও ক্ষতি করেনি, এরা খুনি না।’

মাঠ থেকে দেশের ক্রিকেটের নায়কদের বিদায় দেখতে না পারায় আক্ষেপও করেন সালাউদ্দিন, ‘খুব কষ্ট পাচ্ছি মাঠ থেকে এদের বিদায় দেখতে পাব না। মানুষকে মাফ করুন। আল্লাহ আমাদের অনেক অপরাধ মাফ করে দেবেন। আমরা সবাই কম-বেশি অপরাধী। সম্মান কাউকে দিলে আপনিও সন্মানিত হবেন।’

mzamin

Friday, October 18, 2024

নিরাপত্তা সংকট সাকিব ঢাকায় আসলেন না by ইশতিয়াক পারভেজ

অবশেষে শঙ্কাই সত্যি হলো। বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে দেশে ফিরলেন না সাকিব আল হাসান। অথচ তাকে রেখেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টের জন্য দল ঘোষণা করা হয়। তখন মনে হয়েছিল, সাকিবের দেশে আসতে আর বাধা নেই। কিন্তু বুধবার রাত ১১টায় একটি সূত্রে জানা যায় সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফিরতে বারণ করা হয়েছে। লস অ্যানজেলেস থেকে দুবাই এসেই তিনি এই বার্তা পান। তাকে জানানো হয় তিনি এলে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে না। গতকাল সকালে তিনি কয়েকটি গণমাধ্যমে তা স্বীকারও করে নেন যে তার হয়তো দেশে আসা হচ্ছে না। দুপুরে সরকারি একটি সূত্র থেকে জানা যায় শঙ্কা কেটে গেছে। দেশে ফিরবেন সাকিব। তবে সন্ধ্যার আগেই জানা যায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তাকে দেশে না ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, দেশে সাকিবের নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট শঙ্কা। এরপর ক্রিকেট ভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোকে সাকিব বলেন, ‘কোথায় (দুবাই) যাবো জানি না। তবে দেশে ফিরছি না।’ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে চলছে নানা-আলোচনা সমালোচনা। পতিত সরকারের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। গণআন্দোলনের সময় যখন গুলিতে নিহত হচ্ছিলেন ছাত্র-জনতা- তখন তিনি ছিলেন নীরব। এ কারণেই ক্ষুব্ধ দেশের মানুষ। গতকালও তার দেশে  আসার বিরোধিতা করে ছাত্র-জনতা মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সামনে স্লোগান দেন- ‘আমার ভাই কবরে সাকিব কেন বাহিরে।’ বলার অপেক্ষা রাখে না আন্দোলনকারীদের অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত সরকার সাকিবকে দেশে আসতে বারণ করে দেন।

গতকাল দুপুর থেকে মিরপুর শেরেবাংলা মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার অনুশীলনকে কেন্দ্র করে নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু সেখানে হাজির হয় অন্দোলনকারীরা। অবস্থান নেন মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে। তাদের দাবি সাকিবকে বাদ দেয়া হোক জাতীয় দল থেকে, তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে দেশে ফিরলে যেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিসিবি বলছে- তারা মাঠের বাইরে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সরকার বলছে- সাকিব দেশে এলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। একজন ক্রিকেটার হিসেবে নিরাপত্তা দেয়া হবে। সাকিব বলছেন- নিরাপত্তার ইস্যুতে তিনি দেশে ফিরবেন না। আর ছাত্র-জনতা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। সব মিলিয়ে সাকিবকে নিয়ে গতকাল সারাদিন চলে জমজমাট নাটক। বলাবলি হচ্ছিল দেশে তার বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ তাতে মাঠে খেলার সময় এমনকি বাইরে চলাচলের সময় সাকিব হতে পারেন আক্রমণের শিকার। এমনকি শুরুতে সরকারকে গোয়েন্দারাও যে রিপোর্ট দিয়েছিল তাতে উল্লেখ ছিল সাকিব দেশে এলে তাকে ঘিরে করা হতে পারে ষড়যন্ত্র। সুবিধাবাদী পক্ষ হামলা করে তার দায় চাপাতে পারে সরকারের ওপর।

সরকার পতনের পর সাকিবের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় হত্যা মামলা। সেই সময় সাকিব দেশে না ফিরলেও খেলেন পাকিস্তান ও ভারতের মাটিতে টেস্ট সিরিজ। সবশেষ কানপুরে সিরিজের শেষ ম্যাচের আগে তিনি টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। তবে তিনি সেখানে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি দেশের মাটিতে খেলে অবসরে যেতে চান। ২১শে অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচ শুরু হচ্ছে মিরপুরে। সেখানেই তিনি অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তবে দেশে ফিরতে তিনি বিসিবি’র কাছে নিরাপত্তা চান। শুরুতেই বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ জানিয়ে দেন তাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে না। এরপর ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও জানান, সাকিবকে ক্রিকেটার হিসেবে নিরাপত্তা সরকার দিলেও জনরোষ তিনি ঠেকাতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, সাকিব যে দেশে ফিরে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে না- সেটিরও নিশ্চয়তা দেয়নি সরকার। তবে সাকিব আল হাসানের গুরু নাজমুল আবেদিন ফাহিম হাল ছাড়েননি। বিসিবি’র নয়া পরিচালক তিনি, তাই প্রিয় শিষ্য ও দেশের অন্যতম ক্রিকেটারের জন্য শুরু করেন দৌড়ঝাঁপ। শেষ পর্যন্ত দুবাইয়ে নারী বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে গিয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টা সাকিব দেশে ফিরলে কোনো সমস্যা হবে না বলেই ঘোষণা দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একজন ক্রিকেটার (দেশে এসে) খেলবেন এবং তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। দেশে আসার ক্ষেত্রে আমি কোনো বাধা দেখি না। তবে যে দেয়াল লিখন হয়েছে, এটা আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি। এটা ইমোশনের ব্যাপার, গণতান্ত্রিক দেশে তাদের যেকোনো ধরনের মুভমেন্ট (আন্দোলন ও দাবি) করার অধিকার আছে।’ তবে প্রশ্ন ছিল সাকিব দেশে ফিরলেও তার ফিরে যাওয়া নিয়ে। মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হবেন কিনা তা নিয়ে ছিল আলোচনা। যদি তাকে আটক করা না হয় তাহলে সেটিও অন্যপক্ষ আদালতে রেফারেন্স হিসেবে নিতে পারে বলেই অনুমান করা হয়।
অন্যদিকে সাকিব নিজের ফেসবুকে ক্ষমা চেয়ে বিদায় বেলা দেশের জনগণকে পাশে থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু তাতে আন্দোলনকারীদের মন ভেজাতে পারেননি। যদিও বিসিবি এক প্রকার নিশ্চিত ছিল সাকিব দেশে ফিরবেন। যেকারণে তাকে রাখা হয় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের (বিপিএল) প্লেয়ার্স ড্রাফটের তালিকায়। সেখান থেকে ১৪ই অক্টোবর নিলাম অনুষ্ঠানের আগেই সাকিবকে সরাসরি দলে ভেড়ায় বিপিএলের ১১তম আসরের নয়া দল চট্টগ্রাম কিংস। এরপর বুধবার তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রেখে দল ঘোষণা করে বিসিবি। গতকাল রাতেই সাকিবের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার আর ফেরা হচ্ছে না। কেউ বলছেন দুবাই থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে চলে যাবেন। আর সাকিব বলেছেন, যেখানেই যাই না কেন দেশে ফিরছি না। তিনি বুঝতে পেরেছেন দেশে তার জন্য রয়েছে প্রচণ্ড নিরাপত্তার হুমকি!

mzamin

Thursday, October 10, 2024

অনুতপ্ত সাকিব বিদায় বেলায় দেশবাসীকে পাশে চাইলেন

কোটাসংষ্কার আন্দোলনে যখন একের পর এক ছাত্র পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছিলো তখন নীরব ছিলেন সাকিব আল হাসান। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের  সংসদ সদস্য। কিন্তু দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারের কাছে কেউ এমন প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা আশা করেননি! ধীরে ধীরে সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলো গণমানুষ। শেষ পর্যন্ত  সংঘটিত হয় বিল্পব।  সরকারের পতন ঘটে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সংসদ বিলুপ্ত হয় আর এমপি পদও হারান সাকিব। এরপরই তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় এক রিক্সাচালক হত্যার মামলা দায়ের হয়। সেই আন্দোলনের সময় সাকিব ছিলেন দেশের বাইরে।  সেখানেই তার ছুটির ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। তবে তাকে জায়গা করে দেয়া হয় পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে। এমনকি খেলেন ভারতের বিপক্ষে টেস্টেও। অবশেষে কানপুরে সাকিব টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর ঘোষণা করেন। সেখানে অবশ্য তিনি দেশে ফিরে আসর ইচ্ছার  কথা জানান। এমনকি নিরাপত্তাও চান। তিনি বলেন দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলে তিনি বিদায় নিতে চান। কিন্তু শুরুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন তাকে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারবেনা বিসিবি। পরে  অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া তার দেশে ফেরা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তবে অবশ্য বরফ গলতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে সাকিব তার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমা চেয়েছেন। আর তার বিদায় বেলাতে দেশবাসীকে পাশে চান বলেও জানান।

তার ফেসবুকে দেয়া সেই বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
আসসালামু আলাইকুম, আমার দেশের প্রতিটি মানুষের ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা।
আমার প্রতি আপনাদের দোয়া ও ভালবাসা আমাকে আজকের এই সাকিব আল হাসান হিসেবে বিশ্ব দরবারে সমাদৃত করেছে।
শুরুতেই আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সে সকল আত্মত্যাগকারী ছাত্রদের, যারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে  শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন। তাদের প্রতি এবং তাদের পরিবারের প্রতি আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা এবং সমবেদনা। যদিও স্বজন হারা একটি পরিবারের ত্যাগকে কোন কিছুর বিনিময়ে পূরণ করা সম্ভব না। সন্তান হারানো কিংবা ভাই হারানোর বেদনা কোন কিছুতেই পূরণযোগ্য নয়।
এই সংকটকালীন সময়টাতে আমার সরব উপস্থিতি না থাকায় আপনারা যারা ব্যথিত হয়েছেন বা কষ্ট পেয়েছেন তাদের অনুভূতির জায়গাটার প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং এজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আপনাদের জায়গায় আমি থাকলে হয়তো এভাবে মনঃক্ষুণ্ন  হতাম।
আমি খুবই স্বল্প সময়ের জন্য মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলাম। আমার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়াটা ছিল মূলত আমার জন্মস্থান অর্থাৎ আমার মাগুরার মানুষের উন্নয়নের জন্য সুযোগ পাওয়া। আপনারা জানেন যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট কোন দায়িত্ব ছাড়া নিজের এলাকার উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখাটা একটু কঠিন। আর আমার এই এলাকার উন্নয়ন করতে চাওয়া আমাকে সংসদ সদস্য হতে আগ্রহী করে। যাইহোক দিনশেষে আমার পরিচয় আমি একজন বাংলাদেশের ক্রিকেটার। আমি যখন যেখানে যে অবস্থাতেই থেকেছি অন্তর থেকে ক্রিকেটাকেই ধারণ করেছি।
এই ক্রিকেটকে ধারণ করে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের সম্মান অর্জন করার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন -আপনারা । আপনাদের ভালোবাসা এবং সমর্থন আমাকে আজকের সাকিব আল হাসান বানিয়েছে। আমি যখন দেশের জন্য ক্রিকেটের মাঠে ব্যাট ধরেছি তখন আমার সাথে ব্যাট ধরেছেন আপনারা সবাই। গ্যালারি থেকে আপনাদের চিৎকার, আপনাদের সমর্থন আমাকে ভালো খেলার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ক্রিকেট ম্যাচের দিন চায়ের দোকানে টেলিভিশনের সামনে উপচেপড়া ভিড় -আমাকে শক্তি যুগিয়েছে।
আমি জিতলে, আপনারা সবাই জিতেছেন। আমি হেরে গেলে, হেরে গেছেন আপনারা সবাই!
আপনারা জানেন, খুব শীঘ্রই আমি আমার শেষ ম্যাচটি খেলতে যাচ্ছি। আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরু থেকে আজকের সাকিব আল হাসান হয়ে ওঠা পর্যন্ত এই পুরো জার্নিটাকে ড্রাইভ করেছেন আপনারা।
এই ক্রিকেটের এই গোটা গল্পটা আপনাদের হাতেই লেখা! তাই আমার শেষ ম্যাচে, এই গল্পের শেষ অধ্যায়ে, আমি আপনাদেরকে পাশে চাই। আমি আপনাদের সবাইকে সাথে নিয়ে বিদায় নিতে চাই। বিদায়বেলায়, সেই মানুষগুলোর হাতে হাত রাখতে চাই, যাদের হাতের তালি আমার ভালো খেলতে বাধ্য করেছে। বিদায়বেলায়, সেই মানুষগুলোর চোখে চোখ রাখতে চাই, আমার ভালো খেলায় যাদের চোখ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছে। আবার আমার খারাপ খেলায় যাদের চোখ ছলছল করেছে।
আমি আশা করি, শুধু আশা না বিশ্বাস করি –এই বিদায় বেলায় আপনারা সবাই আমার সাথে থাকবেন। সবাই সাথে থেকে সেই গল্পের ইতি টানবেন, যে গল্পের নায়ক –আমি নই, আপনারা!

mzamin

Saturday, April 9, 2011

ক্রিকেট ও রাজনীতি by হাসান ফেরদৌস



২৩ মার্চ, ‘পাকিস্তান ডে’ উপলক্ষে নিউইয়র্কে সে দেশের মিশনে দাওয়াত ছিল। সিকিউরিটি চেক সেরে, শীতের কোট জমা দিয়ে এক পা বাড়িয়েছি মাত্র, অমনি আধচেনা এক পাকিস্তানি ভদ্রলোক আমাকে সোল্লাসে জড়িয়ে ধরলেন। ‘থ্যাঙ্কু, থ্যাঙ্কু,’ বলে প্রায় চুমু খান আর কি। আমি তাঁর ‘ভালুক আলিঙ্গন’ সামলে জিজ্ঞেস করলাম, কী এমন মহান কারণে এই উদ্বাহু সংবর্ধনা? তিনি দুচোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বল কী, শোননি, ঢাকায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে গোহারা হারিয়েছে পাকিস্তান! তোমরা পাশে না থাকলে এমন সহজ বিজয় অসাধ্য ছিল।’ ইংরেজিতে বললেন, ‘ইউ মেড থিংস ইজি ফর আস।’
২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে ঢাকায় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল হবে, তা নির্ঘাত কেউ আগে থেকে অঙ্ক কষে রাখেনি! ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে কাকতালীয়, কিন্তু কাকের তালতলায় যাওয়ার ঘটনাটি একদম উপেক্ষা করার মতো ব্যাপার নয়। ১৯৪০ সালের এই দিনে লাহোরে মুসলিম লিগের এক সম্মেলনে প্রস্তাব করা হয়, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হোক। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক সেই প্রস্তাব পাঠ করেছিলেন, ফলে অনেকে তাঁকেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা বলে বিবেচনা করে থাকে। কথাটা অবশ্য ঠিক নয়।
তো, সে ঘটনার ৭১ বছর পর, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা ঢাকায় হলো পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে। এর দিন কয়েক আগে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতেই গোহারা হেরে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল। দল হিসেবে আজকের ওয়েস্ট ইন্ডিজ আগের সেই সোবার্স-কানহাইয়ের দল নয়, তাতে ওয়েসলি হল বা গ্রিফিথের মতো খেলোয়াড়ের ছায়া মাত্রও নেই। সে তুলনায় পাকিস্তান বরং অনেক দক্ষ, অনেক পাকা দল। ফলে তারা যে জিতবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হয়েছিলও তা-ই। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, সেই খেলার সময় এবং পরে পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশের দর্শকদের অমন আদেখলাপনা। খেলা শেষে ইএসপিএনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একদঙ্গল বাঙালি ছেলেমেয়ে যে রকম হুল্লোড় শুরু করে দিল, তা দেখে কিছুটা ভড়কে গিয়েছিলাম। বিস্মিত পাকিস্তানিরাও কম কিছু হয়নি। তাদের অনেকের ধারণা, মিরপুর স্টেডিয়ামে তাদের দলের খেলোয়াড়েরা বিদেশের মাটিতে নয়, যেন নিজের দেশে খেলছে। আর সেটাই তাদের বিজয়ের অন্যতম কারণ। নামজাদা সাংবাদিক আদিল নাজাম তো তাঁর নিয়মিত ব্লগে লিখেই বসলেন, ধন্যবাদ বাংলাদেশ। পাকিস্তানি মিশনের কূটনীতিক ভদ্রলোক সেই স্পিরিট থেকেই আমাকে অমন জাপ্টে ধরেছিলেন।
যে কয়েক হাজার দর্শক সেদিন মিরপুর স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছিল, তাদের কজন বাংলাদেশের, কজন পাকিস্তানের, তা আমি জানি না, টিভিতে দেখে বলা মুশকিল। তবে প্রায় সবাই যেভাবে তারস্বরে পাকিস্তানের পক্ষে মাতম করছিল, তাতে সবাইকেই পাকিস্তানি ভাবতে হয়। আমার কথা বলছি না, মাঠে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রতিবেদন থেকে জেনেছি, পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশিদের এমন চমৎকার মনোভাব দেখে তাঁরা রীতিমতো থ হয়ে গেছেন। তাঁর ধারণা, পাকিস্তানের পক্ষে এমন শাণদার, এমন বুকখোলা সাপোর্ট দেখানোর কারণ, দেশটা তো একসময় পাকিস্তানের অংশ ছিল। পুরোনো আনুগত্য বাঙালিরা এখনো ভোলেনি। সালেহা রিয়াজ নামের এই পাকিস্তানি সাংবাদিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন পত্রিকায় লিখেছেন, ‘ঢাকায় যে আমরা এত সহজে জিতে গেলাম, আমাদের জন্য সেটা সবচেয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা ছিল না। পাকিস্তানের পতাকা আঁকা আমাদের মুখ বারবার টিভির পর্দায় দেখা যাচ্ছিল, সেটাও বড় কথা নয়। পাকিস্তান ডেতে এই জিত হলো, সেটাও নয়। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশি দর্শকদের আমাদের প্রতি বিরামহীন সমর্থন। জামাহীন যুবকেরা তাদের কপালে বাংলাদেশি পতাকা এঁকে নিয়েছিল, বুকে লেখা ছিল “বুম বুম আফ্রিদি”, আর বুকের ওপর আঁকা ছিল পাকিস্তানের পতাকা। অনেকেই পাকিস্তানি পতাকা কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছিল, কেউ কেউ চন্দরপল কীভাবে দাঁড়ায়, তা নিয়ে ব্যঙ্গ করছিল। সব দেখে ভুলেই যাচ্ছিলাম যে আমি পাকিস্তানে নেই।’
মনে রাখা ভালো, সেই খেলার দুই দিন পর ছিল ২৫ মার্চ। গণহত্যার ভয়াল কালরাত। সালেহা রিয়াজের কথাগুলো পড়ে মনটা খারাপই হলো। একটা বমি বমি ভাবও এল। সে অবশ্য অল্প সময়ের জন্য। নিজেকে বুঝ দিলাম, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় আমরা তো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সমর্থন করতে পারি না। এরাই না সপ্তাহ খানেক আগে আমাদের নাকের জল চোখের জল এক করে ছেড়েছে! রেগেমেগে ওদের বাসে আমরাই না ঢিল ছুড়েছি! হেরেছে, বেশ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে বুকে পাকিস্তানি পতাকা এঁকে স্টেডিয়াম মাতিয়ে বেড়াব? সে প্রশ্নেরও জবাব পেলাম। ইএসপিএনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েগুলো বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে যা বলল, তার মোদ্দাকথা হলো, খেলা খেলাই, এর সঙ্গে রাজনীতি না মেশানোই ভালো।
যে ছেলেমেয়েগুলো হড়হড় করে ক্যামেরার সামনে এই কথাগুলো বলছিল, আমার বিশ্বাস, তারা কেউ বানানো কথা বলেনি। পাকিস্তান জিতেছে, এতে তারা সত্যি সত্যি খুশি হয়েছে। আমিও খুশি হতাম, যদি জানতাম, এই ব্যাপারটায় সত্যি সত্যি রাজনৈতিক কিছু নেই। কিন্তু আসলেই কি তাই?
পাকিস্তানিদের কাছে বিশ্বকাপের এই প্রতিযোগিতা শুধু খেলা নয়, রীতিমতো ধর্মযুদ্ধ। সে কথা বোঝা গেল পাকিস্তানি অধিনায়ক আফ্রিদির একটা মন্তব্য থেকে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ভালো খেলেও হেরেছে। দেশে ফিরে সাংবাদিকদের কাছে আফ্রিদি বলেছেন, ‘আমাদের মুসলমানদের যত বড় হূদয়, ভারতীয়দের তা নেই। আল্লাহ আমাদের অর্থাৎ মুসলমান ও পাকিস্তানিদের যেমন বৃহৎ ও পরিষ্কার হূদয় দিয়েছেন, ওদের (অর্থাৎ হিন্দুদের) তা দেননি।’ আফ্রিদি সাহেব আরও জানালেন, ‘ওদের সঙ্গে আমরা শান্তিতে থাকতে পারব না, ওদের সঙ্গে শান্তিতে থাকা সম্ভব নয়। শান্তির তো কম চেষ্টা হলো না, কী লাভ হলো!’
খেলা হলো দুই দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে, অথচ আফ্রিদি আবিষ্কার করলেন, সেই খেলা হয়েছে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে। তিনি হয়তো লক্ষ করেননি যে হিন্দু দলটির ভেতর জহির খান নামের একজন মুসলমান খেলোয়াড়ও ছিলেন, যদিও তিনি পাঠান খেলোয়াড়, কখনো তাঁর ধর্মের পরিচয়টি সবার আগে তুলে ধরেননি। পাকিস্তানিরা—তা তারা ক্রিকেটার হোক বা জেনারেল, বরাবর সবকিছুর ভেতর সবার আগে ধর্ম খোঁজে। খেলোয়াড়ের ভেতর তারা খেলোয়াড় দেখে না, মানুষের ভেতর মানুষ দেখে না। ভারতের সঙ্গে খেলার আগের দিন পুরো পাকিস্তানি দল খেলার মাঠে সারি বেঁধে নামাজ পড়েছে, একবার নয়, দুই দুবার। তাবৎ ক্যামেরা তাদের দিকে তাক করা। যে দলের সেরা খেলোয়াড়েরা খেলা নিয়ে জুয়া খেলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছে, তাদের আর যাই হোক, ধার্মিক সাজা মানায় না।
পাঠক বলবেন, ক্রিকেটের কথা বলতে গিয়ে আমি রাজনীতির কপচানি করছি। কিন্তু এই কপচানি করার প্রয়োজন হয়তো পড়ত না, যদি আমাদের দেশের ছেলেরা বুকে পাকিস্তানি পতাকা এঁকে দৌড়ঝাঁপ করছে, সে কথা পাকিস্তানি পত্রিকার পাতায় পড়তে না হতো। অথবা পাকিস্তানের কথা বলতে গিয়ে যদি তাদের অমন গলে যেতে না দেখতাম। ভিন্ন প্রজন্মের বলেই কি আমার পক্ষে তাদের নির্দোষ আনন্দ পুরোপুরি বোঝা কঠিন?
আরও একটা ব্যাপার আমার মনে কাটার মতো বিঁধেছিল। পাকিস্তানি মিশনে যে কর্তাব্যক্তি আমাকে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেছিলেন, তাঁর গলায় আমি কোনো কটাক্ষ দেখিনি, কিন্তু শ্লাঘার আভাস অবশ্যই পেয়েছিলাম। সালেহা রিয়াজের লেখায়ও সেই শ্লাঘা। ভদ্রমহিলা তাঁর প্রতিবেদনে আরও লিখেছেন: ‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তান একসময় যে বৈরী মনোভাব দেখায়, তা থেকে মনে হতে পারে, বাংলাদেশিরা বুঝি আমাদের ওপর রুষ্ট। কিন্তু না, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে বৈরিতা আছে, বাংলাদেশিদের মধ্যে তার এক-দশমাংশও আমি দেখিনি। আমাদের প্রতি তাদের ভালোবাসা নিখাদ মনে হয়েছে। যখন খেলার শুরুতে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজছিল, আমি ও আমার ভাই কিছুটা চেঁচিয়ে, কিছুটা সুরে তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলাম। আমার পাশে বসা এক বাংলাদেশি তরুণ বলল, এই গানের শব্দ আমরাও জানি। একসময় এই গান আমাদের জাতীয় সংগীত ছিল।’
পাকিস্তানি সাংবাদিককে নয়, ওই বাংলাদেশি তরুণটির কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে, পাকিস্তানি জাতীয় সংগীত জানো, খুব ভালো কথা, কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তোমাদের জানা আছে তো?
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।