Showing posts with label প্রকৃত্‌. Show all posts
Showing posts with label প্রকৃত্‌. Show all posts

Sunday, February 6, 2011

তোমাদের এই হাসিখেলায় by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

কিছুদিন আগে এক রাতে বকুলতলায় প্রথমবারের মতো গান শোনাতে গেলাম। লোকে লোকারণ্য। গ্রাম থেকে এসেছেন শত শত লোকশিল্পী। হাতে তাঁদের একতারা-দোতারা। খোদা বখ্স বাউলের ছেলে আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরল, বলল, গান শোনার আমন্ত্রণ কমে গেছে। তালের গান, বাজনার গান শুনতে চায় সবাই। শিখেছি সাধনার গান, অশ্রুর গান। মাইক হাতে নিয়ে বললাম, গান শোনাতে এসেছি বহুদিন পর। কাদের গান শোনাতে এসেছি জানেন? স্টেজের ১০০ গজের মধ্যে আমার গান শুনছেন কাজী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান। ছেলেমেয়েরা হইহই করে উঠল। বিদায় নিয়েছেন আবদুল আলীম, আবদুল লতিফ, বেদারউদ্দিন, শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব। বেঁচে আছি আমি। বুঝতে পারলাম, ওরা ভালোবাসে এই বিদায়ী শিল্পীকে। ডেইলি স্টার-এর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানে দুটোর জায়গায় গাইলাম চারটি।
বৈশাখী টিভিতে অনুষ্ঠান রাত অবধি, চট্টগ্রামের দুজন শিল্পী গাইছেন মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার গান। দুই বছর আগে একজন নামী লেখক এসেছিলেন মহেশখালীতে। গান শুনতে নয়, মহেশখালীর পান খেতেও নয়। জোহান হ্যারি এসেছিলেন ডুবন্ত বাংলাদেশকে নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে। গত শতাব্দীর শেষ ভাগে যে দেশটির জন্ম হয়েছিল রক্তের বন্যায়, সেটি ডুবে যাবে এই শতাব্দীর শেষে, এ কেমন কথা? হ্যারির এই রিপোর্ট এবং সেই সঙ্গে আরও ৫০টি রিপোর্ট পাঠ করলাম ১৫ দিন ধরে। কেন, তা পরে বলছি।
সাগর দ্রুত এগিয়ে আসছে। নদী কেড়ে নিলে ফিরিয়ে দেয়, সাগর তা দেয় না। হ্যারি বলছেন, মহেশখালীতে গিয়ে দেখা হলো রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে, বয়স ৩৪, অথচ দেখতে ৫০। বললেন, গত ৩০ বছরে দ্বীপটির দুই-তৃতীয়াংশ চলে গেছে পানির নিচে। ঘরবাড়ি, জমি—সবই সমুদ্রের নিচে। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন তাঁদের দুর্ভাগ্যের কথা বলার জন্য এগিয়ে এলেন। চৌধুরী দেখালেন ওই যে অনেক দূরে দেখতে পাচ্ছেন একটি সবুজ গাছের অল্প একটু, ওইটি ছিল আমার বাড়ি। হ্যারি খুঁজে পেল গাছটি। চৌধুরী বললেন, ২০০২ সালে ওইখানে আমি থাকতাম। ২০২৪-এ মহেশখালী বলে কোনো দ্বীপ মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দেখা আবদুল জব্বারের সঙ্গে, বয়স ৮০। বললেন, ১৯৬০ সাল থেকে দ্বীপটির ক্ষয়, ১৯৯১-এর পর তা হয়েছে প্রবলতর। সব গেছে আমার। ছেলে সৌদি আরবে চাকরি করে, সেই টাকাতেই এখন বেঁচে আছি।
আমার দেখা চিংড়িঘের, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যেখানেই গিয়েছি চিংড়িঘের, জিজ্ঞেস করাতে বললেন, এ জমিতে চাষ হবে না, লবণ সব খেয়ে ফেলেছে। আমাদের জন্য রেখেছে সামান্যই। যত দিন বেঁচে আছি চিংড়ি চাষ করে বাঁচতে হবে। গৃহবধূদের সঙ্গে কথা বলে না কেউ। মুন্সিগঞ্জের গৃহবধূ কথা বলেছেন হ্যারির সঙ্গে। আরতী রানী, পরনে নীল শাড়ি, অবয়ব দুঃখ দিয়ে মাখা। আর আমার সঙ্গে কথা বলেছেন তহরুননেছা, যৌবনেই শয্যাশায়িনী। আর্সেনিকের নীল দংশনে তাঁর দুটি পুত্রের অকালমৃত্যু। একমাত্র কারণ শুদ্ধ পানি না পাওয়া। গিয়েছিলাম আর্সেনিক নিরোধের এক কার্যক্রমে অংশ নিতে। মনে পড়ে গেল পিতার ফেলে যাওয়া গান: ‘ফোরাতের পানিতে নেমে ফাতেমা দুলাল কাঁদে, অঝোর নয়নে রে/ দুহাতে তুলিয়া পানি, ফেলিয়া দিলেন অমনি, পড়িল কি মনে রে।’ তহরুননেছার মতো হাজার নারী কাঁদছে শুধু পানির জন্য। শুধু ‘পানি পানি’র হাহাকার। এ কোন কারবালা! ২৩৪টি নদী, সবুজ এই দেশটির পানিতে বিষ, বাতাসে বিষ। কেন সাগরের আক্রোশ, ভাবতে ভাবতে আসি, ভোলায়। ভোলার সব খবরই খারাপ নয়। যেমন গেছে ইলিশা, শিবপুর, গাজীপুর, কাচিয়া, দৌলতখান এবং মূল ভোলা, তেমনি দক্ষিণে জেগে উঠছে চরফ্যাশন। ঘরবাড়ি, জায়গাজমি হারিয়ে এদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে নতুন জেগে ওঠা চরে।
একজন নতুন লেখক আমি। নতুন ফিকশন ‘কালজানির ঢেউ’ লিখতে গিয়ে পড়ে ফেলি জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবস্থান। ক্রুদ্ধ উপসাগরে পানির তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতিবছর, লবণাক্ততা গ্রাস করছে চাষের জমি, ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র পর আরও আশঙ্কায় দিন গোনেন সাগরপারের মাঝিরা। ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে মুছে যাবে পরিচয়, মেনে নিতে পারছি না।
কী হবে বকুলতলায় গান গেয়ে, কী হবে এ গানের স্বরলিপি, পায়ের তলার মাটি খুঁজে না পাই যদি। শহীদ মিনারের অল্প দূরে বসে রবিঠাকুর লিখেছিলেন এই গান: ‘তোমাদের এই হাসিখেলায়, জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়, এই কথাটি মনে রেখো’। গোধূলি প্রহরে যা অর্থবহ মনে হয়েছে, লিখেছি ‘ফিকশনে’।
মহাপ্লাবনের দিনে ডোবেনি নূহের কিশতি। বাঙালিদের ‘ময়ূরপঙ্খী’, ‘মন পবনের নাও’।
যাদের নৌকা আছে, তারা মরবে না।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সংগীত ব্যক্তিত্ব।
mabbasi@dhaka.net

Monday, December 13, 2010

জলাভূমিবাসীদের দুনিয়ায় আবার... by ওলে সোয়িঙ্কা

অনেক দেরিতে হলেও ২০১০ সাল তেলবিষয়ক বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টির বছর। এ বছরটা মনে করিয়ে দিল, তেল ব্যবসার সঙ্গে আমার পরিচয় বেশ পুরোনো। শুরুটা নাইজেরিয়া স্বাধীন হওয়ারও আগে। তখন এক অখ্যাত গ্রামে তেল পাওয়ার একটা ছোট খবর আমার নজরে আসে, দৈবক্রমে। গ্রামটির নাম অলোইবিরি।
আমি ব্রিটেনে পড়তে গিয়েছিলাম। সে সময় ব্রিটিশরা পৃথিবীর নানা জায়গায়, বিশেষত সাবেক উপনিবেশগুলোয় প্রাকৃতিক সম্পদের সন্ধান চালাচ্ছিল। তবে ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানের সামান্যতম আবাসও আমি তখনো পাইনি। বিদেশিদের হাতে তেল তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এজাতীয় সম্পদ কবজা করার প্রতিযোগিতা শুরুর কী তাৎপর্য থাকতে পারে গরিব দেশগুলোর জন্য, তা তখন আমার উপলব্ধির আওতার বাইরের বিষয়।
সেই খবর আমাকেও নাড়া দিয়েছিল। তা একদমই শিল্প ও বাণিজ্যের জায়গা থেকে নয়। মৌলিক বাণিজ্য-পণ্য পাম তেলের জায়গায় অশোধিত তেল চলে আসার পর কোন ধরনের রূপান্তর আসন্ন, তা নিয়ে আমি গভীর ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম।
তখনো আমি একবারও নাইজার বদ্বীপে যাইনি। ১৯৫৪ সালে কলেজে পড়তে বিদেশে যাওয়ার আগে তো নয়ই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূগোল বই থেকে জেনেছিলাম নাইজারের কথা। বইয়ে পড়েছিলাম, এ জায়গাটি ঘন ম্যানগ্রোভপূর্ণ জলাভূমি। আর লোককাহিনির মামি ওয়াটাতে পরিপূর্ণ (এরা অর্ধমানব, অর্ধমৎস্য মনোমুগ্ধকর প্রাণী, আমাদের দিককার মৎস্যকন্যা)! সেখানকার প্রাচীন জীবনছন্দের মধ্যে কল্পনায় আমি নানা অনাত্মীয়কে সন্নিবেশ করলাম। প্রথমে এল যাজক, বণিক আর ঔপনিবেশিক শক্তি; আর এখন তেল অনুসন্ধান।
সেই কল্পনার পেছনে যে ভাবনা কাজ করছিল, তা আমার নাটক দ্য সোয়াম্প ডুয়েলারস-এর বিষয় নয়। সেখানে বিষয়টি আনা হয়নি। নাটকে উঠে এল প্রকৃতির সঙ্গে আমার অমোঘ আলাপচারিতা। নাটকটির পটভূমিতে আমাদের সম্পদ নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর হুড়াহুড়ির প্রভাব আর অর্থনৈতিক তাৎপর্যের এ ধরনের টিমটিমে উপস্থিতি ছিল শুধু।
আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে এসব কায়কারবারের পরিণতি বুঝতে আরও কয়েক দশকের প্রয়োজন ছিল। পৃথিবীর এক অখ্যাত কোণে সুযোগসন্ধানীদের করপোরেট দায়িত্বহীনতার মধ্যেও একভাবে তাদের উৎসভূমি শিল্পোন্নত দেশগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপার থাকে (যেমন ছড়ায় সমুদ্রবক্ষে জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেলের আস্তরণ)—এই ফয়সালায় পৌঁছাতে তখনো আরও কিছু সময় দরকার ছিল।
ব্রিটেন থেকে নাইজেরিয়ায় ফিরে আমি প্রচলিত রীতির নাটকের ওপর গবেষণা শুরু করি। এই গবেষণার অংশ হিসেবে আমি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াই। তখন তেলের আহরণ পর্যায় অর্থাৎ খননকাজ চলছিল। তার জ্বলন্ত সাক্ষী হিসেবে আকাশে দেখা যেত তেল জ্বলছে দপ দপ করে। এক সড়ক নির্মাণ কোম্পানির বদৌলতে আকাশপথে দক্ষিণ-পূর্বাংশের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তেলের আগুনের শিখা কোম্পানির মিশনের সংকেত বহন করত। সেই মিশন আসলে সেসব এলাকাকে শিল্পায়নের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। এই প্রক্রিয়াকেই শুধু সহজ করে তুলছিল খনিজ তেল।
তবে ধীরে ধীরে সংবাদ চুইয়ে চুইয়ে বেরোতে বেরোতে হঠাৎ বিপুল বেগে বেরিয়ে আসে, তেলের নতুন অবয়বে। জলাভূমিবাসীদের দুনিয়া দখল হয়ে যায়।
বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ, ভূমিদখল, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, পরিবেশ ক্ষয়, জীবন-জীবিকা ধ্বংস—তেলের শিখা আর আকাশের নির্বিষ লেখাজোকা নয়, বরং অপরিণামদর্শিতা আর নিস্পৃহতার আগুন।
এক্সন ভালদেজ বিপর্যয়ের (১৯৮৯) বহু আগেই ১৯৭৫ সালে ডাচ উপকূলের অদূরে কোলোকোট্রোনিস নামের আরেক তেলবাহী জাহাজের গায়ে ফাটল ধরে। এবার যে তেল নির্গমন হলো, তাকে সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য করা যেত। কোলোকোট্রোনিস নামের মাঝে আমি শুনলাম অলোইবিরির এক আজব প্রতিধ্বনি।
যখন থেকে নাইজার বদ্বীপের পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টি জানা যেতে থাকল, তখনই আমি কোলোকোট্রোনিস বিষয়ে আদালতের কার্যবিবরণীর একটি কপি সংগ্রহ করি। আদালতের রায় জাহাজ কোম্পানির বিরুদ্ধে গিয়েছিল। বিস্তারিত খুঁটিনাটি ঘাঁটতে গিয়ে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। জীবনে প্রথম দেখলাম, কোনো পাখি, কোনো পতঙ্গ কিংবা এক বর্গফুট চাষযোগ্য জমিও মূল্যায়িত হয় ডলারে, সেন্টে। উপলব্ধি করলাম, তেল নির্গমনের ক্ষেত্রে কত গাছগাছালি আর পশুপাখি মারা গেল, তার তালিকা করা শুধুই নৈমিত্তিক হিসাবরক্ষণ যজ্ঞ। তাতে মনে হয় যেন আফ্রিকা কিংবা তৃতীয় বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর কোনো প্রভাবই পড়েনি!
জলাভূমির দেশ থেকে এক প্রাণবন্ত বন্ধু ও লেখক এসে আমার দরজায় কড়া নাড়লেন, তাঁকে দেখে আমি যারপরনাই খুশি হলাম। তাঁর নাম কেন সারো উইওয়া। সঙ্গে নিয়ে এলেন সরকার ও তেল কোম্পানির উদ্দেশ্যে কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব। দক্ষিণ-পূর্ব নাইজেরিয়ার ওগোনির মানুষের হয়ে লড়াই করে শহীদ হলেন কেন সারো উইওয়া। সেই হূদয়বিদারক বিদায়ের আগেই তিনি বিশ্ববিবেকে নাড়া দি্রেয় গেলেন।
নাইজার বদ্বীপ সারা দেশের জন্য যেন এক পুষ্টিকর জলখাবার। তাই সব অঞ্চল থেকেই তাতে চামচ ডোবানো হলো। বদ্বীপের স্থানীয় মানুষের জীবিকা অর্জনের পুরোনো পথ ধ্বংস হয়ে গেল। কেন সারো উইওয়ার মধ্য দিয়ে পরিবেশের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল সারা দুনিয়ার আদিবাসী আর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরই প্রশ্ন। তারা তাদের জীবন ফেরত চাইল। আর চাইল যেন তাদের কণ্ঠও শোনা হয়।
কেন সারো উইওয়াকে আমি আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, তাঁর প্রতি সব সময় আমার সমর্থন থাকবে।
এরপর লম্বা সময় পেরিয়ে চলে আসি ২০১০ সালের ২০ এপ্রিলে। মেক্সিকো উপসাগরে বিপুল তেল নির্গমনের খবর এল। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা ক্ষুব্ধ হলেন। তাঁদের খাটো হাতাওয়ালা জামা পরিহিত প্রেসিডেন্ট ছুটে গেলেন ঘটনাস্থলে। কংগ্রেসের শুনানিতে জড়ো হলেন তেল কোম্পানির নির্বাহীরা। নানা অজুহাত খাড়া করতে চেষ্টা হলো। সারা দুনিয়ার গণমাধ্যমে বড় খবর হলো।
প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে জলাভূমিবাসীদের এলাকা ভিজেছিল যে পরিমাণ তেলে, এবার মেক্সিকো উপসাগরে তেল নির্গমন তার ভগ্নাংশ মাত্র। এ বিষয়টা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল। গণমাধ্যমও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিপির প্রধান নির্বাহীর অনুশোচনামূলক অভিব্যক্তি যখন শুনলাম, আমার মন সরে গেল কেন সারা-উইওয়াতে। ছোটখাটো সেই মানুষটা, যাঁর মুখে ধরা থাকত পাইপ, অপ্রজ্বলিত।
জলাভূমিবাসীদের সেই জমিন, সেই নাজুক বাস্তুসংস্থানেই তাঁর মন পড়ে থাকত সব সময়। নাইজেরিয়ার সরকার আর তেল কোম্পানিগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল। অবশেষে জনগণ জেগে উঠে রুখে দাঁড়াল—নয়জন মানুষের জান কোরবান করে। ওগোনির সেই নয় বীর। কেন সারো উইওয়ার হয়ে আমি যেমন একধরনের গৌরবের বোধ অনুভব করেছিলাম, তিনিও কি তা-ই বোধ করতেন? নাকি তাঁর পথ আলাদা হয়ে যেত?

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
ওলে সোয়িঙ্কা: নাইজেরীয় ঔপন্যাসিক, কবি ও নাট্যকার। ১৯৮৬ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী।

Thursday, September 9, 2010

শকুনের জন্য শোক -প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সব প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ‘শকুন’ গল্পে গ্রামের ছেলেরা পিটিয়ে শকুন মেরে উল্লাস করে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের আবহে সেই শকুনটি যেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান এবং সেনাশাসনের তাঁবেদার ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ মাতবরদের প্রতীক হিসেবে এসেছিল। গল্পের শকুনটির মৃত্যু যেন শোষকদের পরাজয়েরই প্রতীক। কিন্তু এখন দেশের ৯৮ শতাংশ শকুন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সংবাদে খুশি না হয়ে দুঃখ ও উদ্বেগই জাগছে। সম্প্রতি ঢাকায় এক সেমিনারে দেশের পাখিপ্রেমিক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা সেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বাঙালি সংস্কৃতিতে শকুন কোনো দিন আদর বা প্রীতি পায়নি। পাখিটির রূপহীনতা আর মৃত পশু ভক্ষণের স্বভাবই এর জন্য দায়ী। তা হলেও প্রকৃতির কাছে শকুনের মূল্য অসামান্য। আর সব পাখির মতো শকুনও প্রাণিজগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এরও গুরুত্ব রয়েছে। শকুন প্রকৃতির ‘ক্লিনার’ হিসেবে মৃত প্রাণী ভক্ষণ করে বলেই মৃত প্রাণীর দেহের জীবাণু অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করতে পারে না। কিন্তু দেশময় গবাদিপশুকে ডাইক্লোফেনাকসহ বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ানোয় এসব পশু মরে গেলে তার মাংস খেয়ে দলে দলে শকুনের মৃত্যু হচ্ছে। শকুনের দোয়ায় গরু না মরলেও গরুর দেহের বিষে শকুন মরছে। বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, শকুন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে গবাদিপশুর অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা ও খুরা রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের কয়েকটি এলাকায় গরুর অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগে মৃত্যু এবং মানুষের মধ্যে তার সংক্রমণের পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে ‘লাল হুঁশিয়ারি’ জারি হয়েছে। এ ঘটনায় যদি শকুনের গুরুত্ব সবাই উপলব্ধি করে, তবে শকুনও বাঁচে, মানুষও বাঁচে।
প্রথম আলোর সংবাদে বিশেষজ্ঞরা শকুন রক্ষায় গবাদিপশুর ব্যথানাশক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ও ক্লিটোফেনাক নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন। আশা করি, সরকার দ্রুতই তা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য ক্ষতিকর এমন অনেক ওষুধ ও রাসায়নিকের দেদার ব্যবহূত হয়ে চলেছে, যা চিহ্নিত ও নিষিদ্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু দেখা যায়, মৃত্যু, বিপর্যয় ও মহামারি না হওয়া পর্যন্ত কারও টনক নড়ে না।
অনেক সময় দেখা যায়, এ ধরনের পরিস্থিতি একশ্রেণীর ওষুধ কোম্পানির জন্য পোয়াবারো হয়ে ওঠে। তাই সরকারকে সঠিকভাবে রোগের কারণ চিহ্নিত করা, প্রতিকারের যথাযথ উপায় খুঁজে বের করা এবং বাণিজ্যিক অভিলাষ প্রতিরোধেও সজাগ থাকতে হবে।

Monday, March 22, 2010

শেখর, তুই কি শুনতে পাচ্ছিস by খালেদা নেওয়াজ

কী উত্তর দেব শেখরের কাছে? নিম্ন আদালতে আসামিদের জামিন নামঞ্জুর হলেও হাইকোর্ট থেকে একজন আসামির জামিন মঞ্জুর হয়েছে। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা আপিল আজ চেম্বার জজের আদালতে শুনানি হবে। হাইকোর্টে স্বপন শেখের জামিন মঞ্জুর হওয়ায় আরেক আসামি হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেছে। প্রচণ্ড শঙ্কা কাজ করছে। আজ যদি ওদের জামিন হয়ে যায়, কোনো দিন আর জানতে পারব না ভাইটি শেষ মুহূর্তে বাঁচার জন্য কীভাবে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে ছিল। চেম্বার জজের আদালতে যে আসামির শুনানি হবে, সে-ই প্রথম ছিনতাইকারী তাজুল ওরফে তাজুর কাছ থেকে শেখরের মোবাইলটি ক্রয় করে। তাজুল ওরফে তাজুর জামিনের শুনানিও আজ হাইকোর্টে হবে।
শেখর গত বছরের ১৬ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে রাত ১১টায় উত্তরায় ওর শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। পরের দিন ১৭ নভেম্বর সকালে গাজীপুরের শালনা ফ্লাইওভার থেকে পুলিশ শেখরের লাশ উদ্ধার করে। হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদনকারী আসামি তাজুল ১৭ নভেম্বর দিবাগত রাত দেড়টায় শালনা ফ্লাইওভার থেকে দুই মাইল উত্তরে গিয়ে স্বপন শেখের কাছে ফোন করে জানায়, একটি মোবাইল আছে, সে কিনবে কি না। পরে মোবাইল ট্রাকিং করে দেখা যায়, স্বপন শেখ ও তাজুল শেখরের মোবাইল থেকে প্রচুর কথা বলেছে। স্বপন শেখের দেওয়া তথ্যানুযায়ী যে মাইক্রোতে করে শেখরকে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা, সেই কালো কাচ দেওয়া মাইক্রোবাসের ড্রাইভার ও তাজুলকে আটক করা হয়। ১৬ নভেম্বর শেখরকে হত্যা করে শালনা ব্রিজে ফেলে দেওয়ার পর তারা একই মাইক্রোবাস নিয়ে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত ছিনতাই করেছে বলে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেছে।
শেখর, তোর জন্য কিছুই করতে পারছি না। অশ্রু ফেলে ফেলে দুচোখ যদি অন্ধ হয়ে যায়, অথবা তোর মতো করে গলাটিপে আমাদেরও ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবেই কি এ অপরাধী চক্র থেকে মুক্তি ঘটবে? যে সমাজ প্রতিনিয়ত অপরাধী দানব তৈরি করছে, সে সমাজে বেঁচে থাকাটাই পরম বিস্ময়ের ব্যাপার। যে ছেলেটি শ্রমিকের ঘাম গায়ে মেখে বৈষম্যহীন সমাজের কল্পনা করে রাস্তায় ঠেলাগাড়িওয়ালার কষ্ট দেখে ঠেলাগাড়ি ঠেলছিল, সেই ছেলেটিকে গলাটিপে হত্যা করল ছিনতাইকারী নামক সন্ত্রাসীরা।
প্রতিদিন অসংখ্য খবর আসে পত্রিকার পাতায়। মনে হতো, এগুলো শুধুই খবর। এ খবর আমাদের জীবনে ঘটবে না। ধামরাই ব্রিজে পড়ে থাকা লাশ, মহাখালীতে ছুরিকাঘাতে একজনের অপমৃত্যু—এ ধরনের খবর আর কত পড়তে হবে? মাইক্রোবাসের কালো কাচের আড়ালে ওরা শেখরের গলাটাও টিপে ধরল। প্রতিবাদী শেখর মায়ের দেওয়া মোবাইল ফোনটি ছিনতাইকারীদের দিতে চায়নি। একটি মৃত্যু, একটি সাজানো সংসারের অপমৃত্যু। শেখরের ছেলে মিথ রাতের আকাশে তারার মধ্যে ওর বাবাকে খুঁজে ফিরে। মা-বাবা, ভাই-বোনদের আর্তচিত্কার দেখে দেখে ভোঁতা হয়ে গেছে যেখানে অনুভূতিযন্ত্র, সেখানে আমার ভাইটির মৃত্যু বুঝিয়ে দিল আর সবার বুকে কেমন করে বাজে এ যন্ত্রণা। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ শেখর জন্মেছিল। ফুলের মতো ফুটফুটে ভাইটি সবার কোলেই ফুল হয়ে ফুটে থাকত। পড়াশোনা শেষ করে কম্পিউটার সায়েন্সে। ছাত্রমৈত্রী করার সূত্রে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের মেয়ের জামাই সফিক ভাইয়ের সঙ্গে শেখরের পরিচয় ছিল। হাল ধরল ফ্যাশন হাউস চিলেকোঠার। হয়ে উঠল চিলেকোঠার একজন অন্যতম কর্ণধার। চিলেকোঠা নিয়ে যখন অসংখ্য কল্পনা ডানা মেলছিল, তখনই জীবনটাকে ছিনিয়ে নিল ছিনতাইকারীরা। গলাটিপে ফেলে দিয়ে এল শালনা ব্রিজে।
মা এখনো নাশতা নিয়ে শেখরের জন্য অপেক্ষা করে। কীভাবে সান্ত্বনার দেব তাঁকে। ওর ছোট্ট ছেলে মিথ এখনো পথ চেয়ে থাকে, কখন বাবা আসবে? ছোট্ট শেখরকে কোলে নিয়ে যখন বলতাম, ‘ঘুমিয়ে পড়। শেখর সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মী ছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়ত।’ এখন ওর কবরে গিয়ে চিত্কার করে ডাকি, ‘আর ঘুমাসনে ভাই। এবার উঠে পড়।’ জীবনের কাছে এত অসহায় কখনো হইনি। বাবা একজন নামকরা আইনজীবী। আমি নিজেও আইন পেশায় নিয়োজিত। তবু জানি না ভাই হত্যার বিচার পাব কি না। আদৌ সব হত্যাকারী ধরা পড়বে কি না। আবার ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলে যদি বেরিয়ে যায়, সেই আশঙ্কা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাইবোনেরা পাথর হয়ে গেছে। আড়ালে চোখের পানি মুছতে মুছতে রুমালটা এখন পর্যন্ত শুকানোর সময় পায় না। কবে এমন সময় আসবে, যখন আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না? ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানের চিত্কারে পৃথিবী কেঁদে উঠবে না। সত্যিকারের সামাজিক ন্যায়বিচার পেতে আর কত দিন সময় লাগবে? মাকে বলতাম, মা আমরা তোমার পাঁচ আঙুলে ফুটে থাকা পাঁচটি তারা। একটি তারা নিভে গেছে। সেই যন্ত্রণায় মা কুঁকুড়ে ওঠে। ২৬ মার্চ শেখরের জন্মদিন। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আজ সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে থাকা শেখরের রক্তাক্ত মুখ।
শেখর, তুই কি শুনতে পাচ্ছিস? তোর অসহায় বোন তোকে খুঁজছে। তোকে যারা হত্যা করল, তোদের মতো ছেলেদের যারা হত্যা করে, তারা কি এভাবেই আমাদের সারাজীবন অসহায় করে রাখবে? বিচার কি হবে না ওদের?

Sunday, January 17, 2010

কিশোরগঞ্জে ছড়ার মেলা -চারদিক by সাইফুল হক মোল্লা

২০০৫ সালে এ স্লোগান ধারণ করে শুরু হয়েছিল কিশোরগঞ্জ ছড়া উত্সব। পরে ২০০৬ সালে ‘মানবিক শুভতার লক্ষ্যে, ছড়া হোক মানুষের পক্ষে’। ২০০৭ সালে ‘বিবেকের মুক্তির জন্য, ছড়া হোক হাতিয়ারে গণ্য’। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘ছড়া দিয়ে রুখবোই যত ষড়যন্ত্র, জয় হোক মানুষের, জয় গণতন্ত্র’। ২০০৯ সালে ‘দিনবদলের অঙ্গীকারে, জাগবে ছড়া বারেবারে’। আর সর্বশেষ, ২০১০ সালে ‘উত্সবের অঙ্গীকার, যুদ্ধাপরাধীর বিচার’ স্লোগান ব্যক্ত করে কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাব মুক্তমঞ্চে ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জ ছড়া উত্সব।
৯ জানুয়ারি প্রেসক্লাব মুক্তমঞ্চে ছড়া উত্সবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা বসেছিল।
পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় এবার ভিন্ন রকম আমেজে দিনব্যাপী ‘ষষ্ঠ কিশোরগঞ্জ ছড়া উত্সব’ উদ্যাপিত হয়েছে। উত্সব কেন্দ্র করে সর্বস্তরের ছড়াকার, কবি ও সাহিত্যপ্রেমীদের উত্সাহ-উদ্দীপনা ছিল দেখার মতো। সাহিত্যাঙ্গনে তা সৃষ্টি করে অভূতপূর্ব প্রাণের স্পন্দন। এই মহতী উত্সবকে কেন্দ্র করে ছড়াকার-কবি-সাহিত্যিকেরা যেন এক মঞ্চে এককাট্টা হয়েছিলেন।
সকালে ছিল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি প্রেসক্লাব মুক্তমঞ্চ থেকে বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে পুনরায় প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বেলুন উড়িয়ে ছড়া উত্সবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফজলুল হক।
‘আব্বে হালায় কয় কি হুনেন, রাজাকারের পোলা/চাপার জোরে সাদা পানি, করবার চায় ঘোলা/আমরা মাগার জিন্দা আছি/না খায়া-না পিন্দা আছি/তব্বু হালায় তোগোর লগে/নাইকা আপস-মিল/আমরা মাগার মুক্তিসেনা/সাহস ভরা দিল্।’ ‘ধর, রাজাকার ধর, ছালার ভেতর ভর।’ ‘রাজাকার, দেশ ছাড়, হবে তোর বিচার।’ এ রকম অসংখ্য তেজি ছড়া একঝাঁক শিশুর সম্মিলিত সুরে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ছড়া উত্সবের পর্দা ওঠে।
পরে ছড়া উত্সব পরিচালনা পর্ষদের আহ্বায়ক আহমেদ উল্লাহর সভাপতিত্বে প্রথম পর্বের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফজলুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নূরে আলম সিদ্দিকী, এম এ আফজল, শাহ আজিজুল হক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আসাদ উল্লাহ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ প্রমুখ।
প্রধান অতিথি তাঁর আলোচনায় ছড়াকে প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে জনমত তীব্রতর করার জন্য ছড়াকারদের আরও ঝাঁঝালো ভাষায় নতুন নতুন ছড়া লেখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘ছড়াকে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্ব না দেওয়ার একটি প্রবণতা অনেক দিন ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু আধুনিক ছড়াকারেরা তাঁদের লেখনীর জোরে প্রমাণ করে দিয়েছেন, ছড়া কোনো হেলাফেলা বা তাচ্ছিল্যের বিষয় নয়।’ তিনি ছড়াকারদের সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী কলমযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘এই কলমযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জে প্রতিবছর ছড়া উত্সব করে নিজেদের সেই ঐক্য ও শক্তিমত্তার প্রমাণ রাখছেন।’ তিনি উত্সবকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত ছড়ার বই ও ছড়ার কাগজের সবগুলো ছড়াকে পশ্চিমবঙ্গের ছড়ার সঙ্গে তুলনা করে একটি গ্রন্থে দুই বাংলার সব ছড়াকে মলাটবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দ্বিতীয় পর্বে অধ্যাপক প্রাণেশ কুমার চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব শাফিক আলম মেহেদী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. শাহ কামাল, বাংলাদেশ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক ছড়াকার আলম তালুকদার, ছড়াকার ফারুক নওয়াজ, আহমেদ জসীম, সিরাজুল ফরিদ, অধ্যক্ষ গোলসান আরা বেগম, অধ্যক্ষ শরীফ সাদী প্রমুখ।
এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন উত্সব পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসচিব ছড়াকার জাহাঙ্গীর আলম জাহান। তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জে ছড়া উত্সবকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যে যাত্রার সূচনা করেছিলাম, সবার সম্মিলিত প্রয়াসে তা ক্রমান্বয়ে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; যা আগামী দিনে ছড়াকারদের জাতীয় ঐক্যকে নিশ্চিত করবে।’
উত্সবকে কেন্দ্র করে ছয়টি বই প্রকাশিত হয়। উত্সবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়াত ছড়াকার শাহ সোহরাব উদ্দিনের গীতিকাব্য ভাণ্ডারীয় শাহী গীতি, মাজহার মান্নার কাব্যগ্রন্থ নিঃসঙ্গ লাটাই, আমিনুল ইসলাম সেলিমের ছড়াগ্রন্থ চিচিংফাঁকের দেশ, সাহিত্যের কাগজ বুনন, ছড়ার কাগজ আড়াঙ্গি ও খামচার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
পরে উত্সবের অন্যতম আকর্ষণ সুকুমার রায় সাহিত্য পদক ও বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয় কবি অজামিল বণিককে তাঁর কেউ কেউ দেখে কাব্যের জন্য এবং ছড়াকার মো. নবী হোসেনকে তাঁর টাট্টুঘোড়ার ডিম ছড়াগ্রন্থের জন্য।
তৃতীয় পর্বে কিশোরগঞ্জ জেলাসহ অন্যান্য জেলা থেকে আগত কবি, ছড়াকার ও সাহিত্যিকদের কণ্ঠে উন্মুক্ত ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করা হয়। এতে প্রায় দুই শতাধিক কবি-ছড়াকার অংশ নেন। পরে শিশু-কিশোর-তরুণদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ও ছড়ালিখন প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অধিকারীদের মধ্যে পুরস্কার ও সনদ বিতরণ করা হয়।
ছড়ায় ছড়ায় কিশোরগঞ্জ মাতিয়ে গেলেন ছড়াকারেরা। যৌবনের দীপ্তি যেন প্রকাশ পাচ্ছিল তাঁদের উপস্থিতিতে।

Friday, January 15, 2010

নাম তাঁর ‘কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী’ by কেয়া চৌধুরী

স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা শৌর্য-বীর্যে বীরত্বে দেশপ্রেমের অনন্য স্বাক্ষর বহন করে স্মরণে বরেণ্য হয়ে আছেন, স্বাধীনতার সূর্যসৈনিক, কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী তাঁদেরই একজন। একাত্তরের ২৫ মার্চ পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নিষ্ঠুরতম দিন। সেদিন বর্বর ইয়াহিয়া বাংলার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা করেছিল। কিন্তু ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার যে দিকনির্দেশনা ছিল, তাতে বাংলার দেশপ্রেমিক সন্তানেরা সঠিকভাবেই দেশাত্মবোধে জাগ্রত হয়ে নিজ নিজ কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে মোটেও পিছপা হয়নি। এমন হাজারো বীরের গল্প আমাদের অজানা নয়। তেমনি একজন বীর কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে হবিগঞ্জ মহকুমায় যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের সংস্পর্শে থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীর স্কুলছাত্র মানিক ব্রিটিশ হঠাও আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলো। এর এক দিন পর হবিগঞ্জ মহকুমায় খবর এল আর মানিক চৌধুরী সরকারি বৃন্দাবন কলেজের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে হবিগঞ্জ মহকুমায় বিক্ষোভ মিছিলসহ সভা-সমাবেশে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপর আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়, তাতে তিনি সক্রিয় অংশ নেন।
’৭০-এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বাহুবল-চুনারুঘাট-শ্রীমঙ্গল নির্বাচনী এলাকা থেকে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা শুরু হওয়ার পর মানিক চৌধুরী সত্যিকার অর্থেই তাঁর নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে গাছ কেটে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন এবং স্থানীয় ও চা-বাগানের পাঁচ হাজার শ্রমিক নিয়ে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন, যাঁদের হাতিয়ার ছিল তীর ও ধনুক। এভাবেই তিনি ব্যারিকেড তৈরি করেন, যাতে শত্রুসেনা হবিগঞ্জ মহকুমায় প্রবেশ করতে না পারে। আরও জানা যায়, মাধবপুর থানার তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুসলিম উদ্দিন, সার্কেল অফিসার মমতাজ উদ্দিন মানিক চৌধুরীর কাছে ১২টি রাইফেলসহ ১২ জন কনস্টেবল নিয়ে প্রথমবারের মতো আত্মসমর্পণ করে এবং এভাবেই মানিক বাহিনীর কাছে প্রথম অস্ত্র হাতে আসে। পরবর্তী সময় ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ হবিগঞ্জ ট্রেজারি থেকে ৫৫০টি রাইফেল এবং ২২ হাজার গুলি ছিনিয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন মানিক চৌধুরী। অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র লুণ্ঠনে যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তাতে তিনি মুক্তিফৌজের কাছে নায়ক হয়ে উঠলেন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে একটি গ্রাম উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা প্রস্তুতক্রমে কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী মুজিবনগর সরকারের কাছে পেশ করেন, যা তত্কালীন সব দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশ পায় (১২-০১-৭২, বাংলাদেশ অবজারভার )। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর এ প্রস্তাবগুলো পুস্তিকাকারে বঙ্গবন্ধুর কাছে উপস্থাপন করেন মানিক চৌধুরী। কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী প্রস্তাবিত গ্রাম উন্নয়নের মহাপরিকল্পনায় যা ছিল তা হলো, গ্রামের চিরবঞ্চিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে গ্রাম পঞ্চায়েত সভা, থানা কাউন্সিল, জেলা কাউন্সিল, জনশাসন এবং উন্নয়নের বিভিন্ন প্রস্তাব। প্রস্তাবিত থানা কাউন্সিলগুলো ছিল স্বায়ত্তশাসিত ও সমবায়ভিত্তিক কাঠামোর আদলে গড়া। পরবর্তী সময় বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ আদর্শে বিশ্বাসী মানিক চৌধুরী বঙ্গবন্ধুরই নির্দেশে ১৯৭৪-৭৫ সালে এ গ্রাম উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটান তাঁর নির্বাচনী এলাকার মাধবপুরে।
যুদ্ধবিজয়ের পর বিধ্বস্ত দেশে চরম অব্যবস্থা বিরাজ করছিল, চুরি-ডাকাতিসহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তখন তুঙ্গে। অপরদিকে বন্যায় যখন সাধারণ মানুষের সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে একেবারে নিঃস্ব জরাজীর্ণ করে তুলল, তখন মানিক চৌধুরী তাঁর কৃষিবিপ্লবের এক পরিকল্পনার কথা সবাইকে অবহিত করলেন। প্রকল্পের নাম দিলেন ‘ক্ষেতে পানি শ্যামল প্রকল্প’। তিনি ঘোষণা দিলেন কৃষির উন্নয়ন ব্যতীত সমাজের উন্নয়ন হবে না। গ্রাম বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। ‘চল চল গ্রামে চল, গ্রাম-বাংলা গড়ে তোল’ রব তুললেন। প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা হলেন মানিক চৌধুরী। শ্রমশক্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে স্বনির্ভর অর্থনীতি এবং নিরাপদ সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রামে মাধবপুরের নারী-পুরুষ ও মানিক চৌধুরী একাত্ম হয়ে এক সবুজ বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর এ প্রকল্প দেখতে মাধবপুরে আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ছিলেন। এ ছাড়া আতাউল গণি ওসমানী, দেওয়ান ফরিদ গাজীসহ সালে নরওয়ের যুবরাজও এ এলাকা পরিদর্শনে আসেন।
আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, তা হলো কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী বরাবরই তাঁর বিভিন্ন লেখায় ও বক্তব্যে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সুশাসনের প্রতি বিশেষ তাগিদ দিতেন। তিনি বলেন, যেহেতু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জনশাসন-পদ্ধতি গ্রামের মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ, আর গ্রাম বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। ‘কেননা, গ্রামই হচ্ছে দেশের প্রাণ।’
এমনই এক অতিসাধারণ মানুষ ছিলেন মানিক চৌধুরী। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
nhk6903@hotmail.com

গাছ উজাড় -দস্যুদের পাকড়াও করতে হবে

গাছ কাটার বিরুদ্ধে আইন করা হবে বলে পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা যে বনদস্যুদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে পারেনি, চট্টগ্রামের চকরিয়া ও বগুড়ার ধুনটের ঘটনাই তার প্রমাণ। চকরিয়ার বিভিন্ন সড়কের পাশের গাছ নির্বিচারে কেটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
গত দুই মাসে কয়েক শ গাছ কাটার ঘটনা ঘটেছে। আট থেকে দশ বছর আগে বন বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সড়কের দুই পাশে ও বেড়িবাঁধের কয়েক কিলোমিটারে গাছের চারা রোপণ করে। গাছগুলো এখন বেশ বড়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যা নামলেই দুর্বৃত্তরা গাছ কাটার অভিযানে নামে। তাদের সঙ্গে এলাকার জনপ্রতিনিধির ছেলে ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। সরকারি জমিতে লাগানো গাছ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের। তারা সে দায়িত্ব পালন করলে দুর্বৃত্তরা এভাবে গাছ কাটতে পারত না। কয়েকটি সড়কের পাশের গাছ দুর্বৃত্তরা সাবাড় করে দিলেও মামলা হয়েছে মাত্র একটি সড়কের পাশের গাছ কাটা নিয়ে। সেই মামলার ফলও শূন্য। গাছদস্যুরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তারা আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
অন্যদিকে ধুনটে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই নাটাবাড়ী দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের শতবর্ষী বটবৃক্ষটি বিক্রি করে দিয়েছেন কমিটির সভাপতি। তাঁর খুঁটির জোর কোথায়? তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপিরও সভাপতি। আর গাছটির ক্রেতা হচ্ছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি।
জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই মেরুতে অবস্থান করলেও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে এক। অন্য কারও কাছে গাছটি বিক্রি করলে বিএনপির নেতা বিরোধিতার মুখোমুখি হতেন। আওয়ামী লীগ নেতার মুখ বন্ধ করে দিলেন তাঁকে সুবিধার বখরা দিয়ে। এ রকম ভাগ-বাটোয়ারার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে অবৈধ কাজ বৈধ করে নিচ্ছেন। কমিটির সভাপতি হলেই তিনি বিদ্যালয়ের সম্পত্তিকে নিজের ভাবতে পারেন না।
চকরিয়ার গাছদস্যুদের ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তা যা বলেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রেপ্তারের চেষ্টা কি অনন্তকাল চলবে? আমরা কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। অবিলম্বে দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করতে হবে। বন বিভাগকে পাহারা জোরদার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ গাছ চুরি করতে না পারে।

Thursday, December 3, 2009

সীতাকুণ্ডে গাছ কাটা -এই অপকর্মের পেছনের শক্তিকে শাস্তি দিতে হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিচ্ছে, তখন সীতাকুণ্ডের সমুদ্রতীরে উপর্যুপরি গাছ কাটার ঘটনা কেবল দুঃখজনক নয়, উদ্বেগজনকও। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার রাতের আঁধারে উপজেলার পাক্কা মসজিদ ও জোড় আমতলের মধ্যবর্তী স্থানের দুই হাজার গাছ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে গত ৩ জুলাইও সোনাইছড়িতে ২০ হাজার গাছ কেটে নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় এ নিয়ে যথেষ্ট হইচই হওয়ার পরও যখন আবার একই ঘটনা ঘটল তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এর পেছনে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা কতটা শক্তিশালী।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলকে রক্ষার জন্যই সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের। কিন্তু রাতের আঁধারে তিন-চার শ লোকের হামলা বন বিভাগের গুটিকয়েক কর্মীর পক্ষে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। তাঁরা পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েও পাননি। অবশেষে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পুলিশ সেখানে গিয়ে দেখতে পায় বৃক্ষহীন বিরান প্রান্তর। আমাদের কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ সদস্যরা বরাবর এভাবেই তাঁদের দায়িত্ব সমাধা করেন। আরও অবাক করা বিষয় হলো, পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এসব গাছ কাটার সঙ্গে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে সাংসদেরাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সারা দেশে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার সম্পর্ক অহিনকুল হলেও বৃক্ষ কর্তন কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে জাহাজভাঙা শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে তারা হরিহর আত্মা। সীতাকুণ্ডের বৃক্ষ কর্তনে স্থানীয় সাংসদ ও বিএনপি নেতার জড়িত থাকার বিষয়টিও অস্বাভাবিক নয়।
গত রোববারের বৃক্ষ কর্তনের দায়ে কয়েকজন শ্রমিকের আটক হওয়ার খবর মোটেই আশা জাগায় না। তাঁরা শক্তিশালী ও স্বার্থান্বেষী মহলের ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন মাত্র। যে ব্যবসায়ী-রাজনীতিকদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাঁরা গাছ কাটতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। জাহাজশিল্প গড়ার নামে সমুদ্র উপকূলে বৃক্ষ উজাড় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এঁদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না করতে পারলে প্রকৃতি ও পরিবেশ কোনোটাই রক্ষা করা যাবে না।

Saturday, November 21, 2009

তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ -চারদিক by মানস গোস্বামী

জয়দেবপুর রেলক্রসিং থেকে সোজা রাজবাড়ীর দিকের রাস্তাটার বিটুমিনের কালো আস্তরণের নিচে এই দুই দশক আগেও ছিল লাল সুড়কি বিছানো পথ আর দুই ধারে শতবর্ষী বিশাল বিশাল দেবদারু বৃক্ষের সারি। পথের শেষ মাথায় আমাদের রানী বিলাসমণি হাইস্কুল। আজ অবশ্য সভ্যতা আর উন্নয়নের ছোঁয়ায় সেই দেবদারুর একটিও অবশিষ্ট নেই। তবে শতবর্ষের স্মৃতি আর ঐতিহ্য বুকে নিয়ে চুন-সুড়কি আর কড়িকাঠের স্কুলটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এক বছর আগে ১৯ নভেম্বর খসে পড়ল সেই স্কুলের একটি স্তম্ভ; চলে গেলেন আমাদের জালাল স্যার। সবাই চেনেন জালাল বিটি নামে। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, ভীষণ ব্যক্তিসম্পন্ন চেহারা, চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা—সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি। মৃদু এবং স্বল্পভাষী। অঙ্কের শিক্ষক, নিচের ক্লাসে পড়ান না; শুধু নবম-দশম। তই ক্লাস সিক্স থেকে এইট পর্যন্ত স্যারের ক্লাস পাইনি। স্কুলের বড়দের কাছে শুনেছিলাম, স্যার নাকি ভিষণ রাগী। ক্লাস নাইনে প্রথম জালাল স্যারের ক্লাস। স্পষ্ট মনে আছে, ঘণ্টা পড়তেই স্যারের অপেক্ষায় ভয়ে কুঁকড়ে ছিলাম সবাই। যথাসময়ে স্যার ক্লাসে এলেন এবং কোনো রকমের ভূমিকা ছাড়াই বললেন, ‘আজ পাটিগণিত করাব। এত দিন তোমরা যা শিখেছ সব ভুলে যাও। এখন থেকে নতুনভাবে শুরু হবে। ...প্রশ্নমালা খোলো, প্রশ্নটা দেখো।’ তারপর আরেক দিন স্যার এলেন অনেকগুলো কাঠের কম্পাস, স্কেল, ত্রিভুজ নিয়ে। বললেন, ‘আজ জ্যামিতি।’ এভাবেই শুরু হলো স্যারের হাত ধরে আমাদের গণিতের পথে যাত্রা। পরে ক্লাস নাইন থেকে টেন—এই দুই বছরে সরল, ঐকিক থেকে শুরু করে ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি, সম্পাদ্য, উপপাদ্য একে একে সব বাধা পেরোল। ক্লাসে স্যারকে কোনো দিন রাগ করতে হয়নি। এমন সমীহ আদায় করা ব্যক্তিত্ব ছিল যে স্যারের আদেশ অবশ্যই পালনীয় হতো। স্যার ছিলেন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের মানুষ। পরে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক। ওই স্কুলে একমাত্র আমাদের জালাল স্যারই ছিলেন বিএসসিবিটি—এই নিয়ে সেই ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ই আমার গর্বের অন্ত ছিল না। স্যারের কথায় গফরগাঁওয়ের একটা আঞ্চলিকতার টান ছিল, কিন্তু স্যার যখন ডেকে কথা বলতেন, তখন মনে হতো, কত আপন। স্কুলের ছাত্রাবাসের উঠোনের ঢাল পেরিয়ে একটু সামনেই স্যারের বাসা—বাসা বলতে একটি উঠোন ঘিরে মাটির মেঝের কয়েকটি টিনের ঘর। তারই একটি বৈঠকখানা। পাশেই একটা গোলাপ বাগান। ঘরটি চেয়ার টেবিল, টুল আর চৌকি দিয়ে ঠাসা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষার প্রতিদিনই স্কুলের পরে ঘরটিতে লেগে থাকত উপচে পড়া ভিড়। কোনো সংখ্যার হিসাবে নয়, একটু বসা বা দাঁড়ানোর জায়গা পেলেই হতো। মাঝখানের চেয়ারে স্যার বসে একে একে সবাইকে তাদের সমস্যা বুঝিয়ে দিতেন। শুধু গণিত নয়, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ইত্যাদিরও চর্চা হতো। এই ঘরটিই পরে হয়ে উঠেছিল আমাদের তীর্থস্থান। এখান থেকেই তৈরি হয়েছে জয়দেবপুরের তাবত্ প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আইনবিদ, চিকিত্সক, শিক্ষক ইত্যাদি পেশার মানুষ। এখানেই আমরা স্যারকে নিবিড়ভাবে পেতাম। শিক্ষাদানে স্যার ছিলেন যেমন অক্লান্ত তেমনি আন্তরিক। অঙ্ক শিখিয়ে স্যার যে কী আনন্দ পেতেন, তা স্যারের কাছে না পড়লে বোঝা যেত না। একটা অঙ্ককে তিনি বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন মেধার ছাত্রদের জন্য বোধগম্য করে তুলতেন, আর কোনোরকমে পাঠ্য বইয়ের একটা কঠিন অঙ্ক পেয়ে বসলেই হতো, স্যার ভেতর বাড়ির ট্রাংকে থাকা পুরোনো বাদামি পাতার একটা মোটা বই এনে খুলে দিতেন, ‘এটা করো দেখি।’ স্যারের এই আন্তরিকতার ছোঁয়া পেয়েছি বলেই স্কুলজীবনটা এত মধুময় কেটেছে। তখন যেকোনো সমস্যায় স্যারের শরণাপন্ন হতাম। স্যার যথাসাধ্য পরামর্শ দিয়ে বাহুপাশে রাখতেন। মনে আছে, পরবর্তীকালে ঢাকার একটি নামীদামি কলেজে পড়ার সময় জালাল স্যারের অভাববোধ করেছিলাম এবং একদিন আমি আনমনে স্যারের কথা মনে করে কলেজের কাঠবাদামের গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। বরাবরই আমি অঙ্কে কাঁচা ছিলাম কিন্তু কেন যেন স্যার আমাকেই বেশি ভালোবাসতেন। স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলের টেস্ট পরীক্ষার ঠিক আগে আগে একদিন স্যার আমাকে আড়ালে ঢেকে বললেন, ‘শুধুই স্কুলে এসে সময় নষ্ট করিস কেন, কাল থেকে স্কুলে না এসে আমার বাসায় চলে আসবি, সারা দিন পড়বি, যেটা বুঝবি না, সন্ধ্যায় আমার কাছে বুঝে যাবি।’ স্যারের এত ভালোবাসার যোগ্যই আমি ছিলাম না। আর এর প্রতিদানও কোনো দিন দেওয়া সম্ভব না।
স্যার প্রকৃত অর্থেই একজন বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক মানুষ ছিলেন। প্রতিটি বিষয় তিনি গ্রহণ করতেন যুক্তিগ্রাহ্য হলে। কয়েক বছর আগে স্যারের অসুস্থতার খবর পেয়ে দেখা করতে গেছি—কথা প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে গ্রেডিং সিস্টেম চালুর প্রসঙ্গটি আসে। তখন দেশজুড়ে এ পদ্ধতির ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। স্যারের গ্রেডিং পদ্ধতির প্রতি সমর্থন আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কত পুরোনো দিনের মানুষ হয়েও আধুনিকতাকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করতে পারতেন। সে অর্থে স্যার ছিলেন প্রকৃতপক্ষেই স্মার্ট। প্রখর ধীশক্তিসম্পন্ন বিজ্ঞানমনস্ক এই মানুষটিকে আমি ছেলেবেলা থেকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমার জীবনের পথপ্রদর্শক। শুধু আমি নই, আমার বিশ্বাস, এই অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেক মানুষকে গড়ার কারিগর ছিলেন স্যার।
জীবদ্দশায় স্যারকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিইনি আমরা। এই তো গেল ২০০৫ সালে আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে স্যারকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। এই নিয়ে অবশ্য স্যারের কোনো আক্ষেপ ছিল না। এই মানুষটি সারাটি জীবন শিক্ষাদানে আনন্দ পেয়েছেন—প্রাপ্তি তাঁর শত শত শিক্ষিত ছাত্র। অন্য কিছু আশা করেননি কখনো।
স্যারের সঙ্গে শেষ দেখা হয় গত বছরের শবেবরাতের রাতে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত শয্যাশায়ী ক্ষীণদৃষ্টি কিন্তু স্মৃতিভ্রম হয়নি একটুও। অনেকক্ষণ থাকার পর বিদায়বেলা পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই স্যার আমার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বললেন, ‘আমার চোখটা একটু দেখে যেয়ো।’ কিন্তু আমি চোখের ডাক্তার হয়েও স্যারের চোখ আর দেখে দিতে পারিনি। তার আগেই স্যার চলে গেলেন। এই কষ্ট শুধু আমারই; কাউকে বোঝানো যাবে না।