Friday, November 22, 2013

সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার তাগিদ : ফখরুলের কুশল জানলেও সংলাপের বিষয়ে কিছুই বললেন না প্রধানমন্ত্রী

রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে আরেকটি প্রত্যাশারও অপমৃত্যু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে কথা বললেও বহুকাঙ্ক্ষিত সংলাপ নিয়ে কিছুই বলেননি। কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেন তিনি।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপ শুরু করতে বলেছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমকে এ ধরনের তথ্য দেন।

গতকাল সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে সেনাকুঞ্জে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে মির্জা আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে শুধু কুশল বিনিময় করেছেন। মির্জা ফখরুল বলেন, আমি কেমন আছি এবং ম্যাডাম কেমন আছেন—এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন। তবে সংলাপের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা যোগ দেন। বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে তিনি যোগ দিতে পারেননি বলে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে সেনাকুঞ্জে দেখা হয় দুই নেত্রীর। ওই সময় কুশল বিনিময়ও হয় তাদের মধ্যে।
সশস্ত্রবাহিনী দিবসের এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ঢাকা সেনানিবাসের সশস্ত্রবাহিনী বিভাগে বীরশ্রেষ্ঠদের উত্তরাধিকারী, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, সাবেক প্রেসিডেন্টগণ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারগণ, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতগণ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যোগ দেন।
উল্লেখ্য, গত বছর সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তবে একই অনুষ্ঠানে দুই নেত্রী যোগ দিলেও তাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা কিংবা কুশল বিনিময় হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
সেনাকুঞ্জে সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী শুধু দেশে নয়, শান্তি মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘেরও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সেনাবাহিনী তাদের দক্ষতার সুনাম সারা বিশ্বে রেখেছে। তারা কাজের মাধ্যমে দেশের মানুষের বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে। শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করে শুধু দেশের ভাবমূর্তি নয়, জাতিসংঘের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করেছে। জাতিসংঘে সেনাবাহিনী যেন তাদের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পারে, সেজন্য শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের বিচারের রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, সব বাহিনীকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। সেনাবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরে তিনি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর উন্নয়নে তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন।
এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় সশস্ত্রবাহিনী দিবস। এ উপলক্ষে গতকাল ফজরের নামাজ শেষে সেনানিবাস, নৌঘাঁটি ও স্থাপনা এবং বিমানবাহিনীর ঘাঁটির মসজিদগুলোতে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
দিবসটির শুরুতে সকালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোত্সর্গকারী সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূইয়া, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব এবং বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষ থেকে শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
ঢাকা (সদরঘাট), নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালে বিশেষভাবে সজ্জিত নৌবাহিনীর জাহাজগুলো গতকাল বেলা ১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
এদিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থাকায় ঢাকা সেনানিবাসের সব রাস্তা (শহীদ জাহাঙ্গীর গেট থেকে স্টাফ রোড পর্যন্ত প্রধান সড়ক) যানজটমুক্ত রাখার লক্ষ্যে সেনানিবাসে অবস্থান করা ব্যক্তি এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের বহনকারী যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন গতকাল সকাল ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা এবং দুপুর দেড়টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত সেনানিবাস এলাকায় বন্ধ ছিল।

অদম্য দুই প্রতিবন্ধী- এগিয়ে চলেছে ওরা

একজনের দুই চোখের জ্যোতি নেই। অন্যজনের দুই হাত থাকলেও তা বাঁকা ও শক্তিহীন। এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিএসসি) দিচ্ছে অদম্য ওই দুজন। একজন পরীক্ষা দিচ্ছে শ্রুতিলেখকের সহায়তায়। অন্যজন দুই পায়ে কলম ধরে পরীক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা হলো ঠাকুরগাঁওয়ের অন্বেষা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কামরুজ্জামান মিঞা (১৮) ও কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা মাদ্রাসাসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাজমিন আক্তার (১১)। দুজনই শত কষ্ট সত্ত্বেও লেখাপড়া শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।
কামরুজ্জামান ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আরাজী মাটিগাড়া গ্রামের পান-সিগারেটের দোকানি মাহাতাব মিঞার ছেলে।
মাহাতাব জানান, তাঁর ছেলে কামরুজ্জামানের বয়স যখন সাড়ে তিন বছর, তখন টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়। ২০০৪ সালে শহরের অন্বেষা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কামরুজ্জামানকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে নেয়। শুরুতে অনিয়মিত থাকলেও গত চার বছর সে নিয়মিত পড়ালেখা করে এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওর পড়ালেখার সব খরচ বহন করে।
পরীক্ষা কেমন হলো? গতকাল বৃহস্পতিবার পরীক্ষা শেষে কামরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে হেসে বলে, ‘বেশ ভালো হয়েছে। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।’
কামরুজ্জামানের শ্রুতিলেখক চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া জিল্লুর রহমান বলে, ‘কামরুজ্জামান অনেক সময় প্রশ্নের উত্তর খুব দ্রুত বলে ফেলেন। তখন তাঁর কথার সঙ্গে তাল মেলাতে কষ্ট হয়। তবু ভাইয়ের হয়ে পরীক্ষায় লিখে দিতে পেরে ভালো লাগছে।’
পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে শারীরিক প্রতিবন্ধী নাজমিন আক্তার (ডানে)  ছবি: প্রথম আলো
অন্বেষা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের পরিচালক মনিরা আহমেদ বলেন, কামরুজ্জামান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও সে খুব সহজে পড়া আয়ত্ত করতে পারে। সে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা পাস করে উচ্চতর ক্লাসে ভর্তি হতে চায়।
আরেক অদম্য নাজমিন আক্তার উলিপুরের বজরা গ্রামের দিনমজুর নুরুন্নবী মিয়ার মেয়ে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সে সবার ছোট।
নুরুন্নবী বলেন, ‘জন্ম থেকে মেয়ের দুই হাত অচল। কিন্তু ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি ওর আগ্রহ দেখে বাধা দিইনি। অভাবের সংসারে বোঝা না হয়ে লেখাপড়া করে যদি স্বাবলম্বী হতে পারে তবেই পরিশ্রম সার্থক হবে।’
তিনি জানান, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নাজমিন প্রতিবন্ধী ভাতা ও স্কুল থেকে উপবৃত্তির টাকা পায়। ওই টাকা দিয়ে ওর লেখাপড়ার খরচ চলছে।
বজরা মাদ্রাসাসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খন্দকার সেলিনা পারভীন জানান, নাজমিন মেধাবী শিক্ষার্থী। সাহায্য-সহযোগিতা পেলে সে আরও ভালো করবে।
গতকাল বেলা ১১টায় বজরা এল কে আমিন স্কুল অ্যান্ড কলেজকেন্দ্রে গিয়ে নাজমিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। সে জানায়, ‘শুরুতে পা দিয়ে লিখতে কষ্ট হতো। কিন্তু নিরাশ হইনি। অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যেদিন লিখতে পেরেছি সেদিন ছিল সবচেয়ে আনন্দের।’

নির্বাচন- এ গ্যাঁড়াকল থেকে উত্তরণ কোন পথে? by বদিউল আলম মজুমদার

জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতি হিসেবে আমরা যেন মস্ত বড় গ্যাঁড়াকলের মধ্যে আটকে গেছি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের অধিকাংশ শরিক দল বলছে,

কালের পুরাণ- গণতন্ত্রে স্বৈরাচারের কালো ছায়া by সোহরাব হাসান

কয়েক দিন আগে কানাডা থেকে এক বন্ধু একটি মেইল পাঠিয়েছিলেন, যার সঙ্গে চিলির নির্বাচনসংক্রান্ত একটি ছোট্ট সংবাদ ছিল।

বিডিআর বিদ্রোহ- আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ by এম সাখাওয়াত হোসেন

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রক্তক্ষয়ী হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে তত্কালীন বিডিআরের (বাংলাদেশ রাইফেলস) বিদ্রোহের অতি প্রতীক্ষিত বিচারের রায় ঘোষণা করা হয়েছে ৫ নভেম্বর।

সুইডেনে কয়েদি না থাকায় কারাগার বন্ধ

কয়েদির অভাবে কারাগার বন্ধ একথা কি বিশ্বাস করা যায়? হ্যাঁ যায় কারন সুইডেনের কারাগারগুলোতে এমন ঘটনাই ঘটেছে। কোন কয়েদি নাই তাদের কারাগারে।

দেশ ও সমাজ- অসংগতি আর অসংগতি by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

পৃথিবীর এক-সহস্রাংশ ভূমির প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মানুষ এর ২৪-সহস্রাংশের থাকা-খাওয়া,

মূল্যায়ন- তারিক আলির সঙ্গে এক বিকেল by আবদুল মান্নান

আমাদের যৌবনকালের একজন নায়ক দীর্ঘ প্রায় ৪৩ বছর পর বাংলাদেশে ঘুরে গেলেন। এই নায়ক কোনো সিনেমার নায়ক নন, রাজনৈতিক অঙ্গনের নায়ক, পাকিস্তানের বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তারিক আলি।

গল্প- খোলস by রমেশ গুনেসেকেরা, অনুবাদ: ফাতেমা আবেদীন

আমাদের বাড়িতে আজ রাতে আনুরা পেরেরা আসছেন। আম্মা গতকাল আমাকে জানিয়েছেন। তাঁর আসার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত, সেটিও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন আমাকে।

গল্প- ছোট কামা by নুসরাত ফাতেমা

‘এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে! তুই আমার চটিজোড়া পায়ে দিয়েছিস কেন?’
‘বেশ করেছি। তুই আমার খাতার মলাট ছিঁড়েছিস কেন?’

সাক্ষাৎকার:এলিয়ট ওয়াইনবার্গার- ‘জানালাটা একটু খোলো...’ by রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

এলিয়ট ওয়াইনবার্গার—কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও অনুবাদক। সাহিত্যিক প্রবন্ধ ছাড়াও রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন মাঝেমধ্যে।

গণফোরামের সভায় ড. কামাল- এখন চলছে ‘নাটকীয় নির্বাচন’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সরকার সর্বদলীয়, নির্দলীয়, না অন্তর্বর্তীকালীন—তা বুঝতে পারছেন না বলে মন্তব্য করেছেন

শিল্পকর্মে ইস্ট ও ওয়েস্টের সার্থক ব্লেন্ডার মুর্তজা বশীর

বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর [জন্ম ১৯৩২] পেইন্টিং, ম্যুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার নানা ফর্মে কাজ করেছেন। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস।

‘জানালাটা একটু খোলো...’by রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

এলিয়ট ওয়াইনবার্গার, খালেদ সরকার
এলিয়ট ওয়াইনবার্গার—কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও অনুবাদক। সাহিত্যিক প্রবন্ধ ছাড়াও রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন মাঝেমধ্যে। নিজেকে নিউইয়র্কের মানুষ বলে পরিচয় দিতেই ভালোবাসেন। এবারের হে উৎসবে তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী
টরফিক উম মুনীর চৌধুরী: বাংলাদেশে স্বাগত। এবারের ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ উপলক্ষে এ দেশে এসে আপনার কেমন লাগল?
এলিয়ট ওয়াইনবার্গার: ভীষণ ভালো। এবারই প্রথম বাংলাদেশে আসা। যদিও খুব একটা কিছু দেখার সুযোগ হলো না এ যাত্রায়। ভেবেছিলাম, দুই সপ্তাহ থাকব, বেড়াব। কিন্তু আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় এবং এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনুকূলে নয় বিধায় আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমি আবার আসব। সেই ১৯৭০ সাল থেকেই তো ভারতে আসছি-যাচ্ছি। হিসাব করলে দেখা যাবে, সব মিলিয়ে প্রায় তিন বছরের মতো সময় পার করেছি ভারতবর্ষে।
রফিক: বিচিত্রমুখী বিষয় নিয়ে লিখেছেন আপনি, বিশেষ করে অন্য পাড়, অন্য দুনিয়াকে নিয়ে (পশ্চিমা জগতের বাইরের) আপনার লেখালেখি চোখে পড়ার মতো। এই অন্য দুনিয়ার প্রতি আপনার আকর্ষণ এত কেন?
এলিয়ট: ব্যক্তিগত প্রেরণা থেকেই এসব লেখালেখি। বলতে পারো, আমার স্বভাবটাই ও রকম, অন্য দুনিয়া আমাকে টানে। আমার ভেতরের কিছু একটা আমাকে ওদিকটায় নিয়ে যায়। সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধগুলো লিখি ঔৎসুক্য থেকে, নিয়মিতভাবে। রাজনৈতিক প্রবন্ধ খুব একটা লেখা হয় না, শুধু রেগে গেলেই সেগুলো লিখি, যেমনটা লিখেছিলাম ইরাকযুদ্ধের সময়।
রফিক: বিশ্বসাহিত্যের পাঠ ও অনুবাদের মধ্য দিয়ে আমাদের বাংলা সাহিত্য সঞ্জীবিত হবে—এমনটা বলা কতটা সঠিক?
এলিয়ট: পুরোপুরি ঠিক। যেকোনো জাতীয় সাহিত্যের প্রসঙ্গেই এটা নির্ভুলভাবে খাটে। আসলে কোনো জাতীয় সাহিত্যই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।
রফিক: তবে এ ক্ষেত্রে যোগাযোগের সেতুটা তো অনুবাদকই তৈরি করেন। একটি সাংস্কৃতিক পটভূমিকে ভিন্ন একটি সাংস্কৃতিক পটভূমিতে পৌঁছে দেওয়া সত্যিই কি এক বাস্তব প্রকল্প? এ বিষয়ে কী মনে হয় আপনার?
এলিয়ট: কেন নয়? আজকের বাস্তবতায় অনুবাদ বা তরজমাহীন বিশ্বের কথা ভাবিই বা কী করে। অনেকে বলেন, কবিতার তরজমা সম্ভব নয়। উদ্ভট ধারণা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এজরা পাউন্ড চীনা কবিতার তরজমা করেছিলেন ইংরেজিতে কিংবা প্রসঙ্গক্রমে নেরুদার কথাও বলা যায়, যিনি রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার অনুকরণে লিখেছিলেন ‘এন মি সিয়েলো এল ক্রেপুসকুলো’ শীর্ষক কবিতাটি (বাংলায় ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’)। নেরুদা কী সুন্দর করে মালা গাঁথলেন রবীন্দ্রনাথের ফুলস্তবক দিয়ে। কী অসম্ভব সহজতায় এস্পানিয়োলে মিশে গেল বাংলা। আমি বলব, সরাসরি এস্পানিয়োল থেকে বাংলায় যেকোনো অনুবাদ অনেক সহজ ও সুন্দর হবে অলংকার ও শৈলীগত কারণে। এস্পানিয়োল থেকে ইংরেজিতে এটা কিছুটা মুশকিল, ওই একই কারণে।
রফিক: অনুবাদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এলিয়ট: অনুবাদের কল্যাণেই আজ তুমি অন্য দেশ, অন্য ভুবন, অন্য সংস্কৃতির আলো, হাওয়া, জল ও মাটির স্পর্শের ও ঘ্রাণের স্বাদ পেতে পারো। নিজেকে নিজের ঘরে আটকে রাখবে কেন? জানালাটা একটু খোলো, ভিনদেশের হাওয়া আসুক, তোমার জানার, শোনার দিগন্ত বিস্তৃত হোক। আমার মনে হয়, অনুবাদ এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
রফিক: বিশ্বস্ত অনুবাদ বলতে কী বোঝায়? ইমেজ, ছন্দ, অনুরণন, উচ্চারণ, ধ্বনি—কবিতার শরীরের এ বিষয়গুলোকে ভাষাগত সীমানা অতিক্রম করে লক্ষ্য-ভাষায় উপস্থিত করা যায় কি?
এলিয়ট: অনুবাদকে ঘিরে অনেক আজেবাজে, ক্লিশে বক্তব্য আমরা হরহামেশাই শুনি। অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক—এ-জাতীয় কথাবার্তায় আমার আগ্রহ নেই। মূল টেক্সটের অর্থটি ঠিকটাক বজায় রেখে লক্ষ্য-ভাষায় টেক্সটিকে পাঠযোগ্য করে তোলাই অনুবাদকের প্রধান কাজ। কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, এটি কবিতা হয়ে উঠল কি না। এ ক্ষেত্রে অনুবাদকের পাঠের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে সংযোজন-বিয়োজন হতেই পারে, তাতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু মূল কবি যেন উপস্থিত থাকেন, অনুবাদক নিজেই প্রবল হয়ে উঠলে সেটা অনুবাদের জন্য ক্ষতিকর।
রফিক: কবিতার অনুবাদে যা হারিয়ে যায়, তা কবিতাই—এ রকম বলেছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট। বিষয়টি নিয়ে আপনার অভিমত...
এলিয়ট: না। কবিতা থেকে যায়, হারায় না; বরং আমরা কিছু পাই। অনুবাদ কোনো ক্লোন নয়। মূল ভাষার কবিতার এক ভিন্ন পাঠ হলো অনুবাদ। কবিতার জন্য প্রয়োজন পাঠকের। এক ভাষার কবিতা অনুবাদের মধ্য দিয়ে পৌঁছায় ভিন্ন ভাষার হাজার হাজার পাঠকের কাছে। সে রকম না হলে তো রবীন্দ্রনাথ থেকে যেতেন শুধু বাঙালি পাঠকের কাছেই আর নেরুদা থেকে যেতেন শুধুই এস্পানিয়োল-ভাষীদের কাছে। অনুবাদ মানেই একটি নতুন টেক্সট, ভিন্ন ভাষায় একটি সৃষ্টিকর্ম।
রফিক: আপনি অনুবাদকর্মে আগ্রহী হলেন কেন?
এলিয়ট: আমি হাইস্কুলের পর আর লেখাপড়া করিনি। কবিতা লিখব বলেই কবিতার অনুবাদে আমার হাতেখড়ি হয়। অনুবাদ আমায় অনেক কিছু শিখিয়েছে, দিয়েছে। আমার জীবন অনুবাদের ফসল। অনুবাদ করতে করতেই আমি লিখতে শিখেছি, লেখক হয়েছি, হয়েছি কবি।
রফিক: একালের অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি ও গদ্যকার শঙ্খ ঘোষ কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘পোয়েট্রি ইজ অ্যা স্টেট অব মাইন্ড’—এ কথার সূত্র ধরে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।
এলিয়ট: আমি বলব, ‘পোয়েট্রি ইজ অ্যান এক্সপ্রেশন অব অ্যা স্টেট অব মাইন্ড।’
রফিক: আপনি ওক্তাবিয়ো পাসের কাব্যসমগ্র ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তাঁর কবিতার অনুবাদ কবে, কীভাবে শুরু করলেন? কেনই বা উদ্বুদ্ধ হলেন তাঁর কবিতার অনুবাদে?
এলিয়ট: আমার বয়স তখন ১৩। আমি প্রত্নতত্ত্ববিদ হতে চেয়েছিলাম। মেসো-আমেরিকার মাইয়া, আজতেক সভ্যতার প্রতি দুর্মর আকর্ষণ ছিল আমার। একটি পাঠাগারে কনকোয়েস্ট অব মেহিকো শিরোনামের একটি বই পড়তে গিয়ে একটি প্যামফ্লেটে ওক্তাবিয়োর ‘পিয়েদ্রা দে সোল’ (‘সূর্যশিলা’) কবিতাটি পাই এবং তৎক্ষনাৎ পড়ে ফেলি। আমার জীবনকে আমূল বদলে দেয় এ কবিতা। হাইস্কুলে পড়ার সময়েই ওক্তাবিয়োর কবিতা অনুবাদ করতে শুরু করি। ১৮ বছর বয়সে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি ওক্তাবিয়োকে চিনতেন। তাঁর সূত্রে ওক্তাবিয়োর কাছে আমার অনুবাদ করা কয়েকটি কবিতা গিয়ে পৌঁছায়। শুরুটা এ রকম। তাঁর গদ্যকবিতার সংকলন আগিলা ও সোল? (ইগল কিংবা সূর্য?) আমার করা প্রথম অনুবাদগ্রন্থ, যা বেরোয় ১৯৬৭ সালে।
রফিক: বোর্হেসের প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন আপনি। কখনো কি তাঁর গল্প বা কবিতা অনুবাদ করেছেন?
এলিয়ট: না। আমার কাছে তাঁর প্রবন্ধই সবচেয়ে ভালো লাগে। আমি তাঁর কবিতার ভক্ত নই।
রফিক: আপনার প্রিয় কবি কে?
এলিয়ট: এজরা পাউন্ড, যিনি চীনা কবিতার অনুবাদের মাধ্যমে ইংরেজি সাহিত্যকে সঞ্জীবিত করেছেন।
রফিক: বর্তমানে কী কাজ করছেন?
এলিয়ট: সমসময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি পেই তাওয়ের সঙ্গে কাজ করছি। চীনা একটি দুরূহ ভাষা, যা আমি শিখেছিলাম ৩০ বছর বয়সে। এখন পেই তাওয়ের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে চীনা ভাষার অন্দর-বাহির বোঝার চেষ্টা করছি।
রফিক: বাংলাদেশের কোনো সাহিত্য পড়েছেন কি?
এলিয়ট: না। বেঙ্গল লাইটস থেকে সদ্য প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের থ্রি স্টোরিজ উপহার হিসেবে পেলাম। এবার পড়ার পালা। এ উৎসবে ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টারের যাত্রা শুরু হলো। ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আরও সাহিত্য পড়তে পারব, সে আশা রাখি।

লোরকার স্মৃতিময় বাড়িতে by সাজ্জাদ শরিফ

হোটেলের আজকের রিসেপশনিস্টটি দিব্যি হাসিখুশি। আগের কয়টা দিন যে ডিউটিতে ছিল, তার মতো রোবট নয়। ওর মুখে হাসি বলতে তো কিছু ছিলই না, অভিব্যক্তি পর্যন্ত না।

খোলস by রমেশ গুনেসেকেরা

আমাদের বাড়িতে আজ রাতে আনুরা পেরেরা আসছেন। আম্মা গতকাল আমাকে জানিয়েছেন। তাঁর আসার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত, সেটিও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন আমাকে। আমি নিজে থেকেই বিজয়কে কথাগুলো জানাতে এসেছি। বিজয় সব শুনে বলল, ‘তো?’ বিজয়কে সবকিছু খুলে বলতে হয়। আনুরা আমাকে দেখতে আসছেন, বিয়ে করার উদ্দেশ্যেই এখানে আসবেন তিনি। ভদ্রলোক অস্ট্রেলিয়া-প্রবাসী। সব শুনে বিজয় বরাবরের মতো ঠোঁট উল্টিয়ে হাসল এবং কিছুই বলল না। এটাই তার স্বভাব। আমি নিজ থেকেই তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘তুমি জানো, আনুরা পেরেরা কে?’ ‘না’, সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল। তারপর হেসে জানতে চাইল, ‘ভদ্রলোক তাহলে লঙ্কার মেয়ে খুঁজছেন বিয়ের জন্য?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ!’ আনুরার লাখ ডলারের চাকরি, সিডনিতে বাড়ি, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব আছে।’ ‘তোমার কী মত?’ প্রশ্নটা আমাকে জিজ্ঞাসা করেই হাসল বিজয়। ‘বিদেশি চাকরিওয়ালা ছেলেকে বিয়ে করছ, আর সেটাই আমাকে বলতে এসেছ?’
বিজয়কে আমি যা বলতে এসেছি, সেটি এমন কোনো কথা নয়। আমি অন্য কিছু বলতে চেয়েছিলাম তাকে, কিন্তু পারিনি। ওর থেকে কিছু শুনতেও চেয়েছিলাম। বিজয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল নিউ ডিস্কোতে, আমার বান্ধবী লক্ষ্মীর এক বন্ধুর জন্মদিন ছিল। সেই জন্মদিনে আমরা প্রায় বিশজন গিয়েছিলাম। লক্ষ্মীই নিমন্ত্রণ করেছিল আমাকে। সেখানে যারা এসেছিল, তাদের অধিকাংশকে আমি চিনতামও না। কিন্তু নতুন চালু হওয়া ডিস্কোতে যাওয়ার জন্য আমরা এতটাই আগ্রহী ছিলাম যে অপরিচিত এক দলের সঙ্গে যেতেও কোনো দ্বিধা ছিল না। এই নিউ ডিস্কো চালু হওয়ার পর সবাই অনেক গল্প করেছে। তবে সেখানে যাওয়ার পর আশাভঙ্গ হয়নি আমার। ডিস্কোর ড্যান্স ফ্লোরটি খুবই চমৎকার—এক কথায় অনবদ্য। গোল সেই এক টুকরো জমিনের নিচে ফ্ল্যাশলাইট লাগানো, ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে উঠছিল সেটি। পুরো ডিস্কোর সাজসজ্জাও ছিল মুগ্ধ করার মতো। এমন এক মনোরম পরিবেশেই আমি প্রথম বিজয়কে দেখি। আমার কাছে এসে বলল, ‘এক ঝলক নাচ হয়ে যাক?’ চিৎকার, শোরগোল আর সংগীতের আবহের মধ্যে আমি তার গলা একেবারেই শুনতে পাইনি। তার মুখ অন্ধকারে ছিল। কিন্তু ঘুরে চলা ফ্ল্যাশলাইটের আলো যখন তার মুখে পড়ল, দেখলাম, আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে, দৃষ্টি স্থির। সেই চাহনিতে রয়েছে আমার সঙ্গে নাচার প্রবল আগ্রহ—আমার সঙ্গেই সে নাচতে চায়। আমরা সেদিন সারা রাত নেচেছিলাম। বিজয় আমাকে রাম আর কোক কিনে দিয়েছিল। একসঙ্গে সিগারেটও ফুঁকেছি আমরা। বাড়ি ফেরার আগে জিজ্ঞাসা করল, ‘আবার কবে দেখা হবে?’ এক দিন পরেই আমাদের দেখা হলো।
সে সমুদ্রসৈকতের কিনারে ‘বিচ হাট’ নামের খাবারের দোকানের বাবুর্চি। আমি নিজেই তাকে আবিষ্কার করলাম। আমার চেয়ে বয়সে বড়। গড়নে বেশ লম্বা আর মুখে সারাক্ষণ হাসি। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। অনেক শুকনো। নিজে জীবনেও খায় না। তার রান্না করা খাবার অন্যকে খেতে দেখেই সে সুখী। ক্রেতা, বন্ধুরা নিয়মিত তার রান্না খেয়ে মোটা হচ্ছে, আর সেটাই দেখে চলছে সে। তার মতে, সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কড়াইভর্তি স্কুইড ভাজার চেয়ে আনন্দ নাকি আর কিছুতেই নেই! বিজয় চৌকো মুখের পুরুষ। মুখ দেখলেই মনে হয়, হাড়ের বাক্সের ওপর কেউ চামড়া লাগিয়ে দিয়েছে এবং ওর পুরুষ্ট ঠোঁট দুটো ৩২ দাঁত আটকে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। যেন সব সময় হাসিতে ফেটে পড়ার জন্য অপেক্ষা করছে। সে যখন হেসে ওঠে, সমুদ্রও ফেনিয়ে ওঠে তখন—সমুদ্র যেন তারই জন্য। আর এ জায়গা ছাড়া সেও বেমানান। আজ আমি যখন তার কাছে এসেছি, তখনো সেই দাঁত বের করা হাসি দিয়ে বলল, ‘হ্যালো’। বসতে বলল পাশে। হাতের কাজ শেষ করতে নাকি বেশিক্ষণ লাগবে না। তার কোলের ওপর রাখা গামলাভর্তি চিংড়ি। পায়ের কাছে থাকা একটা পত্রিকার ওপর চিংড়ির ছাড়ানো খোসা রাখছে সে। প্রতিটি চিংড়ির খোসা ছাড়ানোর পর ভেতরের নীল শিরা বের করে আনছে দক্ষ হাতে। একটা শিরা হাতে নিয়ে আমায় বলল, ‘দেখ, সমুদ্রের বিষ।’ আজ আমি আনুরা পেরেরা সম্পর্কে কিছু বলতে এখানে আসিনি। কিন্তু মনে পড়ছে আম্মার সব সময়ের উপদেশ, সাবধানবাণী। আম্মা বলেন, সব সময় সেরাটা বেছে নেবে। আর আমি নিজেই জানি, আনুরা আসবেন বিশাল এক মিটসুবিশি গাড়িতে চড়ে, চোখে থাকবে দামি সানগ্লাস,
স্টেরিওতে বাজতে থাকবে মোহনীয় কোনো গান। এসব আমি বিজয়কে বলতে চেয়েছি, আবার হয়তো চাইওনি। আসলে আমার জন্য বিজয়ের অনুভূতি জানতেই এসব বলা। চিংড়ির খোসা ছাড়ানো হয়ে গেলে হাত ধুয়ে কফি আনল বিজয়। জানতে চাইলাম, ‘আমরা কী করব, তুমি সত্যি কী চাও?’ ‘কী নিয়ে কী চাইব?’ বিজয়ের পাল্টা প্রশ্ন। ‘আমাদের সম্পর্কে কী ভাবছ? আমরা কী করব এখন?’ সে বলল, ‘ম্যাজেস্টিকে একটা ভালো আমেরিকান ফিল্ম এসেছে, আমরা সেটি দেখতে যাব।’ বিজয়ের জন্য এ রকম বলা আর ভাবা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। পৃথিবীতে যেন কোথাও কোনো সমস্যা নেই। এখানকার আর পাঁচটা পুরুষের মতো সে নয়—যা মনে আসে, তা-ই করে। কিন্তু আমি মন থেকে আনুরার চিন্তা দূর করতে পারছি না। বিজয় ঝুঁকে এসে আমার হাত ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী জানতে চাও তুমি?’ বিজয়ের সেই নেশা ধরানো স্পর্শ। ওর নখগুলো যেন হালকা গোলাপি রঙের ঝিনুক। তার ওপর অর্ধেক বাঁকা চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। যখন সে তার আঙুল দিয়ে আমাকে স্পর্শ করে, আমার দেহে অদ্ভুত শিহরণ জাগে। চিরজীবনের জন্য এই স্পর্শের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে ইচ্ছা হয়। আমরা সমুদ্র দেখতে দেখতে কফি পান করছি। আমি তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে বললাম, যাতে আমার সমস্যার সমাধান হয়। সিনেমায় গেলে নিশ্চয় আনুরার সমস্যার সমাধান হবে না। ‘কিন্তু তুমি সিনেমা ভালোবাসো,’ সে বলে উঠল। অবশ্য বিজয়ের কাছ থেকে এর বেশি আশাও করা যায় না। গত কয়েক মাসে আমূল বদলে গেছে আমার জীবন—এত দিন যা ঘটেনি, তা-ই ঘটে চলেছে একটার পর একটা। হঠাৎ করে বিজয় এল আমার জীবনে।
এখন আনুরা পেরেরা। আম্মা যখন আনুরার কথা বলছিলেন, চোখের সামনে এক নতুন পৃথিবী দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। আমার মনে হয় না, বিজয় সেই পৃথিবীর এক কানাকড়িও কল্পনা করতে পারবে। সে পারে শুধু হাসতে। আজ সকালে আম্মা একটা নতুন শাড়ি কেনার কথা বলছিলেন, তখনই টনিও সুজে আসা নতুন ডিজাইনের জুতাটার কথা মনে পড়ল। দারুণ সেই জুতাগুলো। আমার কল্পনা উড়ে চলছে...উড়তে উড়তে একেবারে সিঙ্গাপুর! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কিন্তু সারা জীবন এমন সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্নই তো দেখে এসেছি আমি। কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। তবে এ কথাও ঠিক, বিজয় পাশে থাকলে এসব ভুলে যাই আমি। বিজয় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে? কী যায়-আসে?’ একটা সিগারেট ধরিয়ে আনমনে চেয়ারে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে। মুখটা মাছের খাবি খাওয়ার মতো খোলা। মাঝেমধ্যে ওর আচরণ ক্যাবলার মতো। এত রাগ লাগে তখন! কিন্তু এটাই স্বাভাবিক—সে এমনই থাকবে। ‘আমরা নিশ্চয় এমন করেই দিন কাটাব না? তুমি নিশ্চয় সারা জীবন বিচ হাটের বাবুর্চির কাজ করবে না? সমুদ্রের ধারে এই দোকানও নিশ্চয় আজীবনের নয়? এই বাঁশ, নারকেল একদিন নষ্ট হয়ে যাবে। জানালার কপাটগুলো তো এখনই খুলে আসছে।’ বেশ জোর দিয়ে বললাম আমি। দরজার দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল ওপাশের বিশাল সবুজাভ সমুদ্র। বালুতটে আছড়ে পড়ছে নীল জলরাশি। এত কোমলতার ভেতরে কঠোর হয়েই কথাগুলো বললাম, ‘তুমি নিশ্চয় সারা জীবন বিচে রান্না করবে না; নাকি তুমি এমনটাই চাও?’ হড়বড় করে বললাম কথাগুলো। আমার এ কথা তাকে আহত করার জন্য নয়, শুধু চাইছি সে আমাকে একটা সিদ্ধান্ত দিক। সে শুধু আমার দিকে তাকাল। চাহনি এত শান্ত,
দেখে মনে হয় আমরা সমুদ্রযাত্রা করেছি। এর মধ্যে আমি তো ভেসেই যাচ্ছি, তড়িতাহতের মতো। দোকানের সামনে ভিড় বাড়ছে। রুটি ও বিয়ারের খদ্দেররা দোকানে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। আমার এখন যাওয়া উচিত। চলে আসার সময় ওকে সন্ধ্যার আগেই আমাকে ফোন দিতে বললাম। বললাম যে বিষয়টা জরুরি। সে যেন মনে রাখে। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল বিজয়। বাড়ি ফিরে সবাইকে খুব ব্যস্ত দেখলাম। নিজের ঘরে চলে এলাম আমি। একা থাকতে ইচ্ছা করছে। এই ব্যস্ততায় আমার যোগ না দিলেও চলে। পাঁচটা পর্যন্ত ঘরে বসে রইলাম, একা একা। বের হয়ে আমি তো অবাক! পুরো বাড়ি পরিপাটি করে সাজানো। ঝকঝক করছে বসার ঘরের মেঝে। টেলিফোনের পাশে সবুজ ফুলদানিতে ফুল রাখা হয়েছে। শামুক, ঝিনুকে সাজানো ঘর। আম্মা স্যান্ডউইচ, প্যাটিস বানিয়েছেন। সঙ্গে রয়েছে আম্মার স্পেশাল লাল মরিচ দিয়ে ভাজা কাজু বাদাম। সেগুলোকে রাখা হয়েছে বিশেষ রুপালি পাত্রে পরিবেশনের জন্য। নিজের বাড়িকে খুব অচেনা মনে হচ্ছে। আম্মাকে দেখে মনে হচ্ছে হাত-পা কাঁপছে তাঁর। সবকিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে তিনি দৌড়ে বেড়াচ্ছেন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। উত্তেজনায় তাঁর বুক কাঁপছে। চোখেমুখে উদ্বেগের ছায়া স্পষ্ট। যেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। আমি নিশ্চিত, এর মধ্যে আম্মা তাঁর জ্যোতিষীর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। তিনি আমার বিয়ের ব্যাপারে আর কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নন। জ্যোতিষী সম্ভবত আজকের দিনকেই মাসের পয়মন্ত দিন বলেছেন।
তাই এদিনেই সব আয়োজন করেছেন আম্মা। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে, এত আয়োজনের বাইরেও আমার বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না। কিন্তু বেছে নেওয়াটাও যে আমার অপছন্দের—আমি বেছে নিতে চাই না। সবাই কেমন উন্মাদের মতো খুশি। আমি নিজেও বুঝতে চেষ্টা করছি, অস্ট্রেলিয়া বিষয়টা কী? সবাই সেখানে কেন যেতে চায়? আমার তো এখানে কোনো সমস্যা নেই। আমি এখানকার সমুদ্র ভালোবাসি। সড়ক, আমার বাড়ির দেয়ালের বোগেনভ্যালিয়া, রেললাইন, ডিস্কো, তিন চাকার অটো—সবই ভালোবাসি আমি। নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, সিডনি অপেরা হাউসের পাশের বাংলোর কী এমন মহত্ত? বিজয় হয়তো বলতে পারবে। সবকিছু যদি বিজয়ের সঙ্গেই হতো! আম্মার মুখটা মনে পড়তেই চিমসে গেলাম। আম্মা মরে যাবেন যদি ওর সম্পর্কে জানতে পারেন—সৈকতের রেস্তোরাঁর বাবুর্চি শুনে নির্ঘাৎ আমার দিকে জুতা ছুড়ে মারবেন। তিনি খুব শান্ত মন নিয়ে আজ সন্ধ্যায় বলতে চাইছেন, ‘শুভসন্ধ্যা মিস্টার পেরেরা, আপনাদের আগমনে আমি খুব খুশি। আসুন আর আমার মেয়েকে নিয়ে যান। আপনার মেধা আর ব্যাংকে থাকা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে পালটে দিন তার জগৎ। তাকে গাড়ি, বাড়ি, দামি জামা-জুতা কিনে দিন। এত বেশি পরিমাণে কিনে দিন, যেন প্রতিটি পার্টি শেষে সে সেগুলো ছুড়ে ফেলতে পারে। আশা করি আপনার সব ভালো হবে। আমার মেয়ে আপনার জন্য বিশাল অর্জন হবে, আপনার মুকুটের মধ্যমণি হবে। দয়া করে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যান,
মিস্টার পেরেরা। তবে অবশ্যই তার মাকে ভুলবেন না।’ হ্যাঁ, এমনটাই তার বলার কথা। অথচ আমি রয়েছি বিজয়ের ফোনের অপেক্ষায়। আসলে আমি নিজেই জানি না, তার মুখ থেকে কী শুনতে চাই শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমি কিছু খুঁজছি এবং খুঁজে পাব। মাত্র কয়েকটা শব্দ শুনতে চাই তার কাছে। অবশেষে টেলিফোন বাজল। আম্মা গোসলখানায়, যথারীতি ফোন ধরলাম আমি। আমার খুব নার্ভাস লাগছে। মনে হচ্ছে কথা বলতে পারব না। বিজয় আমার গলা শুনেই বলল, ‘আজ রাতে কি বাইরে খেতে আসতে পারবে? সেই বড় চিংড়িগুলো দিয়ে একটা চমৎকার খাবার বানিয়েছি।’ টেলিফোনের ওপার থেকে সমুদ্রের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি—মুখভরা হাসি নিয়ে সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে খোলা বুকে হাত বোলাতে বোলাতে কথা বলছে সে। বাতিওয়ালা গাছের নিচেই সে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, ‘আমি এখন কথা বলতে পারব না। কাপড় ইস্ত্রি করছি। ইস্ত্রি গরম। আমি আমার পান্না-সবুজ শাড়ি ইস্ত্রি করছি। এটা আজই আম্মা আমার জন্য কিনে এনেছেন। এখন কথা বলতে পারব না। ফোন রাখতে হবে।’ এসব কথা বলে রেখে দিলাম ফোন। সে আর ফোন করল না। সে জানে, তার নম্বর আমার মুখস্থ: মাউন্ট লাভানিয়া ৯২৬৯৭৯, ৯২৬৯৭৯।
 অনুবাদ: ফাতেমা আবেদীন

গণতন্ত্রে স্বৈরাচারের কালো ছায়া

কয়েক দিন আগে কানাডা থেকে এক বন্ধু একটি মেইল পাঠিয়েছিলেন, যার সঙ্গে চিলির নির্বাচনসংক্রান্ত একটি ছোট্ট সংবাদ ছিল। চিলিতে এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে দুজন প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের পরিবার কোনো না-কোনোভাবে স্বৈরশাসক জেনারেল অগাস্তো পিনোশের সঙ্গে জড়িত ছিল। একজনের বাবা ছিলেন ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থানে পিনোশের সহযোগী এবং অন্যজনের বাবা পিনোশের শাসনের সমর্থক। প্রবাসী বন্ধু চিলির অবস্থা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।  বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা দেখলে তিনি চিলির কথা ভেবে স্বস্তিবোধ করতেন যে, চিলিতে পিনোশের সহযোগীর সন্তানেরা ক্ষমতায় আসছেন আর বাংলাদেশের পিনোশে স্বয়ং রাষ্ট্র পরিচালনায় ভাগ বসিয়েছেন। ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার ২২ বছর পরও তিনি কিংমেকার। বিষয়টি বিচলিত হওয়ার মতো। যে স্বৈরশাসক এরশাদকে এ দেশের ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, যে স্বৈরশাসককে হটাতে নূর হোসেন-মিলন-তাজুলেরা জীবন দিয়েছেন, শিল্পী কামরুল হাসান যাঁকে নিয়ে ‘বিশ্ব বেহায়া’ কার্টুন এঁকেছিলেন, নব্বইয়ের পর যাঁর বিচারের দাবিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সোচ্চার ছিল, সেই স্বৈরশাসক কীভাবে এখনো রাজনীতিতে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন? এরশাদ একাধিকবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন সত্য; কিন্তু তাই বলে তাঁর গায়ে লেগে থাকা স্বৈরশাসকের কালি এতটুকু মুছে যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে যতগুলো দুর্নীতির মামলা ছিল, সবগুলোর বিচার হলে তাঁর কারাদণ্ডের মেয়াদ গোলাম আযমের চেয়ে কম হতো না। আইন নিজস্ব গতিতে চলেনি বলেই একদা স্বৈরশাসক এখন গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক দল ও নেতা-নেত্রীদের ডিকটেট করতে পারছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বিচারপতি খায়রুল হকের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে গদগদ। তাঁরা অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলের জন্য মৃত জিয়াউর রহমানের ‘বিচার’ চাইলেও জীবিত এরশাদকে জামাই আদরেই রেখেছেন। নব্বইয়ের পর জাসদের নেতা ও বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেছিলেন। সেই মামলার খবর কী? গত দুই দশক দুই নেত্রী পালা করে স্বৈরাচার ও রাজাকারের হাত ধরে ক্ষমতায় টিকে আছেন। তাঁরা জোট ছাড়া ক্ষমতায় আসতে পারেননি। সে কারণেই এরশাদ একবার আওয়ামী লীগ, আরেকবার বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছেন।
২. বছর খানেক ধরেই এরশাদ মহাজোটের বিরুদ্ধে বুলন্দ আওয়াজ তুলে আসছিলেন যে এ সরকার দুর্নীতিবাজ ও দেশ শাসনে ব্যর্থ। অতএব এ সরকারের সঙ্গে তাঁরা কোনো রকম আপস করবেন না। তিনি বহুবার মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেভাবে মহাজোট ছেড়েছেন, সেটি নাটক নয়, প্রহসনের অংশ। জাতীয় পার্টিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থীদের রশি টানাটানি চলছিল। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগপন্থীরা জয়ী হয়েছেন। বিনিময়ে বাগিয়ে নিয়েছেন তিনটি পূর্ণ, দুটি অর্ধমন্ত্রী এবং একটি উপদেষ্টার পদ। বিএনপি তাঁকে ৩০টি আসন দিতে চেয়েছিল, আওয়ামী লীগ ৬০টি দেবে (বিএনপি নির্বাচনে এলে এরশাদ মহাজোটে থেকেই নির্বাচন করবেন)। ক্ষমতাত্যাগের আগে এরশাদ ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এখনো ষড়যন্ত্রে আছেন। তিনি নিজেকে যতই সাচ্চা বলে দাবি করুন না কেন সেই সময়ের দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকাগুলো তাঁর অপরিমেয় দুর্নীতিরই সাক্ষী হয়ে আছে। একাধিক মামলায় তিনি দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হলেও অনেক মামলায় খালাস পেয়েছেন, অনেক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।
লন্ডনভিত্তিক পাকিস্তানি ব্যাংক বিসিসিআইয়ের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি সালেহ নাকভি আমেরিকার ফেডারেল কারাগারে আইনজ্ঞদের সামনে এক হলফনামায় যে তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, তা থেকে আমরা বিদেশে এরশাদের অর্থ পাচারের বড় প্রমাণ পাই। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘বিসিসিআিইয়ের লুক্সেমবার্গ শাখায় এরশাদের এক কোটি ১০ লাখ ডলারের অ্যাকাউন্ট আছে।  ১৯৮৮ সালে বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আগা হাসান আলী নাকভিকে নির্দেশ দেন কেইমেন দ্বীপে বিসিসিআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইসিআইসি ওভারসিজে এরশাদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে। ওই অ্যাকাউন্টে রওশন এরশাদের নামও ছিল। স্থানান্তরিত অ্যাকাউন্টে এরশাদের অর্থ তখন সুদসহ বেড়ে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। এ অ্যাকাউন্ট থেকেই এরশাদের স্ত্রী বলে কথিত মেরি মমতাজকে দুই কিস্তিতে এক কোটি ডলার দেওয়া হয়েছিল। (সূত্র: পৃষ্ঠা ২৮৮, কার রাজনীতি, কীসের রাজনীতি, মতিউর রহমান, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৪।) ১৯৮৬ সালে লন্ডন অবজারভার সংবাদ প্রকাশ করে, ‘বিশ্বের দরিদ্রতম দেশে প্রেম ও ছলচাতুরী’ শিরোনামে। আন্তর্জাতিক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান ফেয়ারফ্যাক্সের প্রেসিডেন্ট হার্শম্যানের দাবি, ‘বৈদেশিক অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’ এ নিয়ে মামলাও হয়েছিল। (সূত্র: স্বৈরাচারের নয় বছর, রফিকুল ইসলাম পিএসসি, ইউনিভার্সিটি প্রেস, ঢাকা) এরশাদের আমলে যিনি টেন পারসেন্ট নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি এখন শেখ হাসিনার সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। এরশাদ আমলের দুর্নীতি কী পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত মুক্তমনা ওয়েবসাইট থেকে এখানে তুলে ধরছি।
১. ১৯৮৩ সালের ২৪ মে শুল্ক কর্তৃপক্ষ প্রতিরক্ষা বিভাগের আমদানি করা এক কোটি টাকা মূল্যের ১৭ হাজার ছয়টি ঘড়ি আটক করে। সেনা গোয়েন্দারা সংশ্লিষ্ট শুল্ক কর্মকর্তা আবদুর রউফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যান। এরপর রউফ রহস্যজনকভাবে মারা যান। তাঁকে অবশ্যই নির্যাতন করা হয়েছিল। সরকারের মুখপাত্র সব সংবাদপত্রকে সরকারের দেওয়া প্রেস রিলিজ ছাপার নির্দেশ দেন। রউফের স্ত্রীকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
২. ১৯৮৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সে বছর দেওয়া শিল্পঋণের ৫০ ভাগই ২২ জন ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করা হয়, যাঁরা এরশাদের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এরশাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন অনেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। তাঁর অনুগ্রহভাজন অনেক আমলাও দুই দলে ভাগ হয়ে আছেন।
৩. ১৯৮৫ সালে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির এক কোটি টন গমের এক-তৃতীয়াংশ এরশাদের রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মাধ্যমে তছরুপ করা হয়।
৪. নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এরশাদ পীরদের ব্যবহার করেছেন। আগের রাতে স্বপ্ন দেখে শুক্রবার বিভিন্ন মসজিদে যেতেন বলে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছেন। তিনি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল চরিত্রই বদলে দিয়েছেন।
৫. গত ১২ জুলাই ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর খবরে বলা হয়, গতকাল (১১ জুলাই) তদন্ত কর্মকর্তা মঞ্জুর আহমেদ (দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক) ঢাকার একটি আদালতকে জানান, তিনি আশির দশকে রাডার কেনায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও অপর তিনজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন। ওই কর্মকর্তা তাঁর রিপোর্টে আরও জানান, এরশাদ নিজের স্বার্থে এ অবৈধ কাজ করায় রাষ্ট্রের ৬৬.০৪ কোটি টাকা লোকসান করেছেন। ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই এ মামলার কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত বিচারকাজ শেষ হয়নি। এরশাদের মন্ত্রীদের মধ্যে মমতা ওহাব (রওশন এরশাদের বড় বোন), রুহুল আমিন হাওলাদার, কোরবান আলী, মাহমুদুল হাসান, কাজী ফিরোজ রশীদ, কাজী জাফর আহমদ, এ কে এম মাইদুল ইসলাম, মেজর জেনারেল আবদুস সালাম, মিজানুর রহমান চৌধুরী, নাজিউর রহমান মঞ্জুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও এ পর্যন্ত কেউ দণ্ডিত হননি। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা সবাই নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী। আমাদের সমাজে যে নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধ রয়েছে, তার কিছুই এরশাদ ধার ধারতেন না। তিনি অনেক নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে খ্যাত মরিয়ম মমতাজকে নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য করেছেন। জিনাত হোসেনের সঙ্গে তাঁর কেমন সম্পর্ক ছিল, তাঁরা বিদেশে কীভাবে সময় কাটাতেন, তার কিছু বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর সামরিক সচিব মনজুর রশীদ খানের বইয়ে (এরশাদের পতন ও সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী শাসন: কাছ থেকে দেখা, অঙ্কুর প্রকাশনী, ঢাকা)। তাঁর তৃতীয় স্ত্রী বিদিশা এরশাদের প্রেমকাহিনির যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আরব্য উপন্যাসকেও হার মানায়। মহাজোট সরকারে থেকে এরশাদ কিছু পাননি বলে প্রচার করলেও ব্যাংক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক কিছু হাতিয়ে নিয়েছেন।
এরশাদ সম্পর্কে তাঁরই একসময়ের প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান লিখেছিলেন: ‘আমার সরল বিশ্বাসের সুযোগে সামরিক প্রশাসক কীভাবে তাহার প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া স্বৈরতন্ত্র চিরস্থায়ী করিবার সমস্ত কৌশল নিয়োগ করিয়াছে এবং অন্যান্য স্বার্থবাদী মহল ও জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে তাহার অনুকূলে সমর্থন জোগাইয়াছে তাহারই একটি চিত্র এই বইয়ে আঁকিবার চেষ্টা করিয়াছি।’ (পৃষ্ঠা ৮, প্রধানমন্ত্রিত্বের নয় মাস, নওরোজ কিতাবিস্তান।) এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে যে স্বৈরশাসকের সঙ্গে সহাস্যবদনে শুভেচ্ছাবিনিময় করেছেন, যাঁকে গণভবনে ডেকে আপ্যায়ন করেছেন, সেই শেখ হাসিনাই ১৯৯১ সালে বিরোধী দলের নেত্রী থাকতে তাঁকে অবিলম্বে জেলখানায় পাঠানোর দাবি জানিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল এরূপ: ‘মাননীয় স্পিকার, সংসদ নেত্রী (খালেদা জিয়া) নির্বাচনের পূর্বে সাত দিনের মধ্যে এরশাদের বিচার এবং ফাঁসির দাবি করেছিলেন। গত ২০ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি ২০ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কতটুকু এগিয়েছেন সেটাই প্রশ্ন। আজ আইনের কথা আসছে। আজকে আমরাও বলতে চাই তিনি এখনো কেন এরশাদকে কারাগারে প্রেরণ করতে পারেন নাই।’ (জনগণের কথা বলতে এসেছি, জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা ১৯৮৭-১৯৯৪, পান্না কায়সার সম্পাদিত, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা) শেখ হাসিনা এরশাদের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা নেননি বলে দাবি করেছেন। কিন্তু বিএনপি আমলে যাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জেলখানায় পাঠানো এবং বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন, তাঁর দুই মেয়াদের পুরো সময়টাই তাঁকে কারাগারের বাইরে রেখেছেন। যদিও খালেদার প্রথম শাসনামলের পুরো সময়টাই তিনি জেলে ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে এরশাদ বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জোট করার পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সব চোর এক হয়েছে। এখন সেই ‘সব চোরের’ পালের গোদাকে তিনিই সসম্মানে বরণ করে নিলেন। তাঁর দল থেকে ছয়জন মন্ত্রী এবং একজন উপদেষ্টাকে নিয়োগ দিলেন। নূর হোসেন-তাজুলদের আত্মা আমাদের ক্ষমা করবে কি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ!

বাইরের দুনিয়ার কাছে বাংলাদেশ বুঝি ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তা অবশ্য একধরনের লেনদেনের আকর্ষণ। এ লেনদেনে প্রকৃত প্রাপ্তির নিক্তিতে বাংলাদেশ বঞ্চিতই হয়। বিশ্বের কিছু উন্নত দেশের পাশাপাশি অপরিচিত কোনো কোনো দেশের সঙ্গে এ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কিছু মানুষ। এসব মানুষ বেশ ধনী ও সম্পদশালী। তাঁরা তাঁদের অর্জিত কোটি কোটি টাকার ধনসম্পদ নিরাপদে রাখার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ আক্ষরিকভাবেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। তাঁদের জন্য বাইরে নিয়ে যাওয়ার তাড়াটা অনেক বেশি। আবার অনেকে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী-শিল্পপতি। তাঁরাও চান, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা অর্থবিত্তের একটা বড় অংশ যদি অন্যত্র নিরাপদে রাখা যায়, মন্দ কী? এভাবে বাংলাদেশের কিছু মানুষের কাছে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আছে এবং তাঁরা যে তা দেশে রাখতে সাহস পান না, স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, সেটা আমরা যতটা জানি, তার চেয়েও বেশি জানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। সে কারণেই এসব দেশে সম্পদ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয়, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ থেকেই অর্থসম্পদ নিয়ে যাওয়ার জন্য ধনী দেশগুলো সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। অর্থসম্পদ নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে ওই সব দেশে সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে নাগরিকত্বও। কিছুদিন আগেই দুবাইতে জমি-বাড়ি কেনার সুযোগ দিতে ঢাকায় এক অভিজাত হোটেলে রীতিমতো মেলা বসেছিল। দুটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে প্রায় এক পাতাজুড়ে একাধিক দিন রঙিন বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয় সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে। তবে একটি দৈনিক পুরো বিষয়টির অবৈধ দিক তুলে ধরে শীর্ষ প্রতিবেদন করে।
তাতে টনক নড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বাড়ি-জমি কিনতে অর্থ নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই, সেহেতু এ ধরনের বিজ্ঞাপন ও মেলা সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরই বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়, আয়োজকেরা মেলা গুটিয়ে ফেলে। কিন্তু এ ঘটনা সুস্পষ্টভাবে এটাই নির্দেশ করে যে দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বাইরে অর্থসম্পদ নিয়ে যেতে আগ্রহী এবং প্রচুর মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো অর্থসম্পদ আছে। অবশ্যই তা বৈধ পথে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাই বলে বিদেশে টাকা নিয়ে যাওয়া থেমে নেই। নানা কৌশলে অবৈধ পথে অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সোজা কথায়, টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে ডলার। ধনী বাংলাদেশিরা টাকা নিয়ে যাচ্ছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মরিশাসে। এর বাইরে এমন কিছু দেশের নাম এখন পাওয়া যাচ্ছে, যা আগে কখনো সেভাবে জানা যায়নি। লাটভিয়া, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের সেইন্ট ক্রিস্টোফার (কিটস নামেও পরিচিত) ও নেভিস ফেডারেশন, বাহামা এবং ডমিনিকায় টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বিনিময়ে এসব দেশে স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের সুবিধা প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে দেশের একাধিক বহুল প্রচারিত পত্রিকায় এসব দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে সেখানে স্থায়ী আবাসন বা নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগসংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। দুবাইতে সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য বিশালাকারে রঙিন বিজ্ঞাপন নয়, সাদা-কালো ও ছোট আকারের বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে একাধিক দেশের সরকারি ওয়েবসাইট ঘেঁটে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে দেশগুলো সত্যিই এ ধরনের সুযোগ দিচ্ছে। লাটভিয়ার কথাই ধরা যাক।
আগামী বছর থেকে দেশটি প্রবেশ করতে যাচ্ছে ইউরো অঞ্চলে। অর্থাত্, বর্তমানে ইউরোপের ১৭টি দেশ যে অভিন্ন মুদ্রা হিসেবে ইউরো ব্যবহার করছে, লাটভিয়া আগামী বছর থেকে তাতে যুক্ত হবে। ফলে, দেশটির নিজস্ব মুদ্রা বলতে কিছু থাকবে না। লাটভিয়ায় রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতে বাংলাদেশি কেউ যদি দেড় লাখ ইউরো বা দেড় কোটি টাকার কিছু বেশি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন, তাহলে তিনি দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবিধা পেতে পারেন। লাটভিয়াকে এখন ইউরোপের নতুন করের স্বর্গ (ট্যাক্স হেভেন) হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। কিংবা ধরা যাক দ্বীপদেশগুলোর কথা। সেইন্ট কিটস ও নেভিসে জমি-বাড়ি তথা সম্পত্তি কিনতে চার লাখ ডলার (প্রায় তিন কোটি সাত লাখ টাকা) বিনিয়োগ করলে কিংবা দেশটির চিনিশিল্প বৈচিত্র্যকরণ ফাউন্ডেশনে নগদ দুই লাখ ৫০ হাজার ডলার (এক কোটি ৯২ লাখ টাকা) অনুদান দিলে ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেখানকার নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট মিলবে। ডমিনিকায় সরকারি তহবিলে এক লাখ ৭৫ হাজার ডলার অনুদান দিলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়া যাবে। বাহামা ও মরিশাসের আবাসন খাতে পাঁচ লাখ ডলার (তিন কোটি ৮৪ লাখ টাকা) বিনিয়োগ করলে দেওয়া হবে একই ধরনের সুবিধা। এ পথ দেখাচ্ছে বড় উন্নত কয়েকটি দেশ। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের পল্লি এলাকায় নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলে এবং এর মাধ্যমে ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলে প্রাথমিকভাবে দুই বছরের ও পরে স্থায়ী আবাসন-সুবিধা (গ্রিন কার্ড) দেওয়া হয়। এটি ইবিএ-৫ অভিবাসন কর্মসূচি নামে পরিচিত।
কানাডার কুইবেক অঙ্গরাজ্যে ন্যূনতম আট লাখ কানাডীয় ডলার (তিন কোটি ৬৬ লাখ টাকা) পাঁচ বছর সুদমুক্তভাবে ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা হলে স্থায়ী আবাসনের সুযোগ দেওয়া হয়। সরকার এ ঋণের নিশ্চয়তা দেয়। অস্ট্রেলিয়ায় ৫০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ৩৬ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করলে অভিবাসনপ্রাপ্তির পথ প্রশস্ত হয়। এসব দেশের কাছে মুখ্য বিবেচনা হলো ধনসম্পদ। কীভাবে তা অর্জিত, সেটা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আর কীভাবে অন্য দেশ থেকে তাদের দেশে এ অর্থ পাঠানো হচ্ছে, সেটা নিয়েও বিশেষ কোনো উদ্বেগ নেই। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ একেবারে শর্তহীন নয়। ছোটখাটো আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যা অবশ্যপালনীয়। সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকানুন ও রীতিনীতি মেনে চলার অঙ্গীকারনামাসহ বাংলাদেশে কোনো অপরাধে যুক্ত না থাকার প্রত্যয়ন এর মধ্যে অন্যতম। আর এটা তো সবারই জানা যে বাংলাদেশের ধনাঢ্য-প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষে পুলিশি ছাড়পত্র পাওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। একইভাবে বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র তৈরি করারও ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে সেগুলো সত্যায়নের ব্যবস্থা। আসলে বিশ্বজুড়েই এখন পুঁজি পাচারের বা পুঁজি স্থানান্তরের বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে, যার বৈধতা দিচ্ছে বিভিন্ন উন্নত দেশ। এ ক্ষেত্রে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ ধারাতেই বাংলাদেশও হয়ে উঠেছে অন্যতম বড় আকর্ষণ। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পুঁজিপতি ও কোটিপতির সংখ্যা। বাড়ছে রাজনৈতিক প্রভাব আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শক্তিশালী গোষ্ঠী। এরাই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছে বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আর বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখছে।
আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক
asjadulk@gmail.com

সমঝোতার সুযোগ আর রইল না

জাতীয় সংসদে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে গেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কিংবা তার নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের দাবি অনুযায়ী আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর আর সুযোগ রইল না। নবম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশন গতকালই সমাপ্ত হয়েছে। তার মানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দুই প্রধান দল বা জোটের মধ্যে সংসদে কোনো আলোচনার আর সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী সংসদে তাঁর ভাষণে বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছেন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিতে। আর রাষ্ট্রপতি তাঁকে অনুরোধ করেছেন নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করার জন্য। ইতিমধ্যে তিনি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের জন্য কয়েকজন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা নিয়োগ, আগের মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগপত্র নিয়ে রাখা প্রভৃতি প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে রেখেছেন।
যতদূর শোনা গেছে, তাতে বৃহস্পতিবারই নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার গেজেট প্রকাশিত হবে এবং বৃহস্পতিবার থেকেই সরকার নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে কাজ শুরু করবে। কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করবে। দেশের সব কার্যক্রম হয়ে পড়বে নির্বাচনমুখী। এর মধ্যে বিএনপি সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে যে দাবিগুলো গত মঙ্গলবার উত্থাপন করেছে, সেগুলো আর পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। এমনিতেই দেশের সংবিধান অনুযায়ী, বিএনপির দাবি পূরণে রাষ্ট্রপতির বিশেষ কিছু করার ক্ষমতাই নেই। তবে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক। সে হিসেবে নৈতিক ক্ষমতা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো কিছু করার সময় আর নেই। তার আগেই সবকিছু নির্ধারিত হয়ে গেছে। বিএনপির সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। এক. যা কিছু হয়েছে তার সব মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। দুই. আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচন স্থগিত করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে সরকারকে বাধ্য করা, যা তারা প্রায়শ বলেও থাকে।  ব্যারিস্টার রফিক-উল হক: বিশিষ্ট আইনজীবী।

মমতা ঘোষণা দিলেন মডেল মহার্ঘ ভাতার

আসছে জানুয়ারিতেই সরকারি কর্মীদের নতুন বিধিতে ৬ শতাংশ মহার্ঘভাতার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বুধবার বিধানসভায় মমতার এ ঘোষণার পর পশ্চিমবঙ্গ মডেল মহার্ঘভাতার নতুন মডেল চালু করতে চলেছে রাজ্য সরকার। যে মডেলে কেন্দ্রের হারে নয়, রাজ্যের কর্মীদের মহার্ঘভাতা ঠিক করবে রাজ্য সরকারই। অর্থাৎ রাজ্য সরকারি কর্মীরা বকেয়া ৩৮ শতাংশ মহার্ঘভাতা আর পাবেন না। তার বদলে জানুয়ারি মাসে ৬ শতাংশ মহার্ঘভাতা দেয়া হবে তাদের। রাজ্য সরকারি কর্মীরা ঠিক কত মহার্ঘভাতা পাবেন, তা নিয়ে দু’দিন ধরেই হৈচৈ চলছে বিধানসভায়। মঙ্গলবার বিধানসভায় এক লিখিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র জানান, সেপ্টেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত রাজ্যের কর্মীদের কোনো মহার্ঘভাতা বাকি নেই।
যদিও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের মহার্ঘভাতা রাজ্যের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি। এই বিবৃতির পরই ক্ষোভ শুরু হয় রাজ্য সরকারি কর্মীদের মধ্যে। কারণ অমিত মিত্রের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে যায় রাজ্য সরকার বকেয়া ৩৮ শতাংশ ডিএ দেবে না। বুধবার অমিত মিত্রের বক্তব্যেই সিলমোহর দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, রাজ্যের যে কর আদায় হয়, তার বেশিরভাগটাই চলে যায় কেন্দ্রীয় কোষাগারে। রাজ্যের কাছে প্রায় কিছুই থাকে না। কেন্দ্র যে হারে মহার্ঘভাতা দেয় সেই হারেই রাজ্যকেও মহার্ঘভাতা দিতে হবে, এমন কোনো আইন নেই। রাজ্যের ঘাড়ে এ ধরনের দায় চাপাতে পারে না কেন্দ্র। রাজ্য সরকার নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী নিজের কর্মীদের মহার্ঘভাতা দেবে। এরপরই মমতা ঘোষণা করেন জানুয়ারি মাসে রাজ্য তার কর্মীদের ৬ শতাংশ ডিএ দেবেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন বিরোধীরা। প্রশ্ন ওঠে, কেন রাজ্য সরকারি কর্মীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সরকারি কর্মীদের মহার্ঘভাতা ঠিক হয় বাজার দর বৃদ্ধির সূচকের ওপরে। প্রশ্ন, তাহলে কেন রাজ্য সরকারি কর্মীরা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের থেকে কম মহার্ঘভাতা পাবেন? টাইমস অব ইন্ডিয়া।

হামলার শিকার অভিনেত্রী শ্রুতি হাসান!

একই সঙ্গে অভিনেত্রী, সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী অভিনেতা কমল হাসানের কন্যা শ্রুতি হাসান এবার  নিজ  ফ্লাটের মধ্যেই অজ্ঞাত এক ব্যক্তির হামলার শিকার হলেন! গতকাল মঙ্গলবার সকালে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকার মাউন্ট মেরি চার্চের কাছে শ্রুতির সাত তলার অ্যাপার্টমেন্টে এই হামলার ঘটনা ঘটে।ঘটনা এমন যে, সকালে বাসার বেল বাজলে শ্রুতি হাসান  নিজেই দরজা খুলতে যান।দরজা খোলার সাথে সাথেই  ওই অজ্ঞাত শ্রুতির গলা টিপে ধরে তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই সময় শ্রুতি নিজের উপস্থিত বুদ্ধির জোরে   কোনো রকম নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর অবশ্যই ওই ব্যক্তিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।দারনা করা হয়  শ্রুতিকে এই হামলাকারী ‘রামাইয়া ভাস্তাভাইয়া’ ছবির শ্যুটিং চলাকালীন সময় থেকেই নজরে রাখছিলেন বলে শ্রুতির ধারণা।