Saturday, November 22, 2025

ট্রাম্পকে কংগ্রেসের আহ্বান: মিয়ানমারের জান্তার ভুয়া নির্বাচনের নিন্দা জানান

মার্কিন আইনপ্রণেতারা বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আসন্ন ভুয়া নির্বাচনকে প্রকাশ্যে নিন্দা জানাতে। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিতে মিয়ানমারের জন্য একজন বিশেষ প্রতিনিধি ও নীতি সমন্বয়কারী নিয়োগ করতে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য ইরাবতী।

বুধবারের এক কংগ্রেশনাল শুনানির পর এই আহ্বান জানানো হয়। সেখানে মিয়ানমারের চলমান সামরিক ও মানবিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন হাউস কমিটি অন ফরেন রিলেশনস পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া- এই দুই উপকমিটির যৌথ শুনানি আয়োজন করে। এর শিরোনাম: ‘নো এক্সিট স্ট্র্যাটেজি: মিয়ানমারের শেষহীন সংকট এবং আমেরিকার সীমিত বিকল্প।’ শুনানিতে দেশটির গভীরতর মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তুলে ধরা হয় এবং জান্তা তাদের দখল আরও শক্ত করার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে- এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানানো হয়।

ইস্ট এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক সাবকমিটির চেয়ারওম্যান ইয়াং কিম বলেন, সামরিক সরকার স্বৈরাচারী শাসনকে আড়াল করতে ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করছে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সংকট সরাসরি মার্কিন স্বার্থকে হুমকিতে ফেলছে। কারণ জান্তা-নিয়ন্ত্রিত প্রতারণা নেটওয়ার্কগুলো মার্কিন করদাতাদের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার লুট করছে।

নাগরিকদের সুরক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পুনর্বিবেচনার জন্য জরুরি কংগ্রেশনাল পদক্ষেপ প্রয়োজন। আইনপ্রণেতারা সতর্ক করেন যে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ না নিলে মিয়ানমার ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে আরও এগোবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের নতুন কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে। তারা আরও আহ্বান জানিয়েছেন বার্মা অ্যাক্ট কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের, যাতে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোকে সরাসরি শক্তিশালী, অপ্রাণঘাতী সহায়তা দেয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে শাসনব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং মুক্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রশাসন পরিচালনায় প্রযুক্তিগত সহায়তা।

https://mzamin.com/uploads/news/main/190504_boss.webp

বাংলাদেশের জন্য পিআর পদ্ধতির নির্বাচন কতটা যৌক্তিক by বুলবুল সিদ্দিকী

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারবিষয়ক আলাপ যখন শুরু হয়, তখন থেকেই এর সঙ্গে আরও একটি আলাপ আমরা দেখতে পাই, সেটি হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতির প্রচলন।

সাম্প্রতিক সময়ে এ আলাপ কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না; বরং বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই দাবিসহ আরও কিছু দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসে।

খুব সহজ করে বললে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ধারণা এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে সংসদে প্রার্থী বা সদস্য তাঁর দলের মোট ভোটের অনুপাতে নির্বাচিত হন।

অনেক সময় ভোটের অনুপাতের বাইরেও প্রথাগত ভোট, যা ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি) নামেও পরিচিত এবং সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ধারণার যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমেও নির্বাচন করা হয় কোনো কোনো দেশে। এর মধ্যে জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশ।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্য দিয়ে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের যথাযথ প্রতিফলন থাকে, যেখানে ভোটারের প্রতিটি ভোট প্রার্থী বা দল হেরে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে এফপিটিপি ব্যবস্থায় সেটি থাকে না। এ কারণেই ছোট দলগুলোর জন্য পিআর পদ্ধতি একটি কার্যকর ব্যবস্থা বলে মনে করা হয়। তবে এখানে প্রশ্ন হলো, এর বাস্তবায়নের জন্য যে রাষ্ট্রকাঠামো ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেই অবকাঠামো কি বাংলাদেশের আছে বা নিকট ভবিষ্যতে কি সেটি আমার অর্জন করতে পারব?

তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে মনে হবে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কার্যকর একটি পদ্ধতি। অনেক দেশেই এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এখানে আমাদের এ-ও মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতায় পিআর পদ্ধতি যথাযথভাবে কাজ করবে কি না, সে বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। তা না হলে হুট করে আবেগের বশবর্তী হয়ে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নামের একটি নতুন ব্যবস্থার প্রচলন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে আসতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেমন দুর্বল নির্বাচন কমিশন এবং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য একদমই সহায়ক নয়। যেখানে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে হঠাৎ এত স্বল্প সময়ের মধ্যে পিআরের মতো একটি নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক কাঠামো বাংলাদেশের সামনে নেই।

এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক সংস্কার। আমরা যদি গত এক বছরের অধিক সময়ের রাষ্ট্র পরিচালনার দিকে তাকাই, তাহলে সংস্কার নিয়ে আমাদের খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো ইঙ্গিত মেলে না। আবার রাজনৈতিকভাবে ঐকমত্য না এলে এ ধরনের একটি ব্যবস্থা আমাদের জন্য ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে না। পাশাপাশি এ বিষয়ে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, যা স্বল্প সময়ে তৈরি করা করাও অসম্ভব।

আমাদের আরও মনে রাখতে হবে, প্রথাগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে ভোট দিয়ে অভ্যস্ত, সেখানে আমরা দেখতে পাই যে তাঁরা তাঁদের পছন্দমতো প্রার্থীদের সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন বা করতে পছন্দ করেন। সেখানে পিআর পদ্ধতিতে একজন ভোটারের সেই স্বাধীনতা থাকে না।

এখানে ব্যক্তির পরিবর্তে দলকে ভোট দিতে হয়, যেখানে দল পরবর্তী সময়ে প্রার্থী নির্বাচন করার প্রক্রিয়ায় থাকে। যদিও কোনো কোনো দেশে একটি মিশ্র পদ্ধতির প্রচলন করে আসছে, যেখানে ব্যক্তি ও দল—উভয়কেই ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ধরনের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থীর সঙ্গে জনগণের যে প্রথাগত যোগাযোগ থাকে, সেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। এর মধ্য দিয়ে জনগণ রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।

আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। প্রস্তুতিহীন অবস্থায় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার প্রচলন সে প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ভোটারদের মধ্যে একধরনের আস্থার অভাব গড়ে উঠতে পারে।

বিগত সময়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করার যে অক্ষমতা আমরা বারবার দেখিয়েছি, সে অক্ষমতার কারণে নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে এখনো আস্থার অভাব রয়েছে। আমাদের সবার আগে সে আস্থার জায়গা অর্জন করতে হবে। নির্বাচন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যথাযথ সময় এখন নয়।

এর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটারদের মধ্যে পিআর-বিষয়ক সঠিক ধারণার অভাব। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য যেমন একটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এ বিষয়ে জনসাধারণের বোঝাপড়ার ইতিবাচক পরিবর্তন। যার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন, যা এ মুহূর্তে বাংলাদেশের নেই।

সে কারণেই অনেক গবেষক মনে করেন, একটি দুর্বল সাংবিধানিক কাঠামোতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি রাজনৈতিক দলগুলোকে যেমন বিভাজিত করবে, তেমনই দেশের জনগণকেও দ্বিধাবিভক্ত করে রাখবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অন্তরায়। এখানে আমাদের প্রধান যুক্তি হতে হবে এই পদ্ধতি কি দেশের জন্য কোনো ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে আসবে?

বিশ্বজুড়ে দুর্বল সাংবিধানিক কাঠামোযুক্ত দেশগুলোয় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ভালোভাবে কাজ করছে না। এর প্রচলন ধাপে ধাপে শুরু করতে হবে। এ জন্য একটি লম্বা সময়ের প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তিযুক্ত নয়।

গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক নীতির সঙ্গে আমাদের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির সম্ভাব্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক কী হতে পরে, সে বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হবে। বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো পদ্ধতি আসলে সমাধান নয়। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও চর্চার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ভবিষ্যতে একটি মিশ্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।

পাশাপাশি জনপরিসরে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলমান রাখতে হবে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, থিঙ্কট্যাংক, নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় আনা এবং তাদের মধ্যে সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, যা ভবিষ্যতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আলোচনাকে একটি জনভিত্তি দেবে।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য, একটি অস্থায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন জনমনে আরও বিভ্রান্তি তৈরি করবে, যা পরবর্তী সময়ে আমাদেরই বয়ে বেড়াতে হবে। তাই এ সিদ্ধান্ত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে নিতে হবে, যা একটি নির্বাচিত সরকারের অধীন হওয়া অধিক জরুরি। সেটি হতে হবে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যে প্রক্রিয়া থেকে বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘ সময় ধরে বঞ্চিত। তাই কিছু রাজনৈতিক দলের তুষ্টি লাভের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা একটি প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা হিসেবে রয়ে যায়।

* বুলবুল সিদ্দিকী, অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকের নিজস্ব
[ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা ‘পিআর বাংলাদেশের জন্য কতটা যৌক্তিক পদ্ধতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-24%2Fyyd8etsy%2F23.9.jpg?rect=0%2C50%2C2100%2C1400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

হোয়াইট হাউসে মামদানির সঙ্গে বৈঠক কি ট্রাম্পের একটি কৌশল

রাজনৈতিক দিক দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ঝামেলায় পড়েন, তখন একটি কৌশল খাটান তিনি। হয় তিনি কোনো লড়াইয়ে জড়ান বা প্রতিপক্ষ খুঁজে বের করেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে নানা ভুল সিদ্ধান্তের পর নজর ঘোরাতে আজ শুক্রবার এমনই এক কৌশল খাটিয়েছেন তিনি। তা হলো নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে বৈঠক।

হোয়াইট হাউসে মামদানিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেন, মামদানিই তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসে স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় এ বৈঠক হওয়ার কথা। বাংলাদেশের হিসাবে তখন সময় হয় দিবাগত রাত দুইটা। মেয়র নির্বাচনে মামদানির প্রতি ট্রাম্পের বারবার চড়াও হওয়ার কারণে এ বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আগ্রহ রয়েছে।

প্রথমে দেখে নেওয়া যাক সাম্প্রতিক দিনগুলোয় কী কী সংকটের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। তিনি হয়তো শুনেছেন যে এক দশক ধরে রিপাবলিকান পার্টির ওপর তাঁর প্রবল প্রভাব ফিকে হয়ে আসছে। কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন নিয়ে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। আর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সহানুভূতি দেখানোর চেষ্টা করে উল্টো হাস্যকর অবস্থার মুখে পড়েছেন।

তাই বোঝাই যাচ্ছিল—ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা ট্রাম্প নতুন কোনো সংঘাতের কৌশল খুঁজবেন। তিনি পেয়েও গেছেন। সম্প্রতি একটি ভিডিওতে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাকে সেনাসদস্যদের মনে করিয়ে দিতে দেখা যায় যে অবৈধ কোনো আদেশ মানার বাধ্যবাধকতা নেই তাঁদের। এ নিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ওই আইনপ্রণেতারা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক আচরণ করেছেন, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

এমন মন্তব্য নিয়ে এরই মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট শিবিরের সংঘাত শুরু হয়েছে। ওই ভিডিওতে থাকা ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ক্রিসি হলাহ্যান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা বলেছেন। আর তা তিনি বলেছেন শুধু এ জন্য যে আমি এবং আরও কয়েকজন একটি ভিডিওতে আইন মানার কথা বলেছি।’

এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প কেন এসব লড়াই পছন্দ করেন। স্বাভাবিক রাজনীতিতে এ ধরনের আচরণ একজনের রাজনৈতিক জীবন নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প উল্টো এসব থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের পক্ষে প্রচার শুরু করে। দলের রক্ষণশীল সমর্থকেরা তাঁর পক্ষে একত্র হয়। আর এটি সংকট থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে বড় সহায়তা করে।

ট্রাম্পের এই কৌশল নতুন নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী প্রচারণা, সিনেটর জন ম্যাককেইনের যুদ্ধের রেকর্ড নিয়ে উপহাস কিংবা ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ের মিথ্যা দাবি—এসব ট্রাম্পকে জনপ্রিয় থাকতে সাহায্য করেছে। তবে এখন প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র যখন অর্থনৈতিক দুর্বলতার মুখে এবং ট্রাম্পের সমর্থন হ্রাস পাচ্ছে, তখন এই কৌশল কতটা কাজে লাগবে।

আজ হোয়াইট হাউসে মামদানির সঙ্গে বৈঠক ট্রাম্পের আরেকটি কৌশল। নিজের নানা ভুল থেকে নজর ঘোরাতে মামদানিকে তিনি একহাত নেবেন, এমন আশঙ্কা রয়েছে। দুজনই নিউইয়র্কের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়েছে উঠেছেন। তবে ট্রাম্পের বয়স ৭৯। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শেষের দিকে। অপর দিকে মামদানির বয়স মাত্র ৩৪। তিনি তরুণদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

ট্রাম্প মামদানির মাধ্যমে সব ডেমোক্র্যাটকে ‘চরমপন্থী’ রূপে দেখাতে চাচ্ছেন—বিশেষ করে আগামী বছরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে। ট্রাম্প মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট মেয়র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যদিও মামদানি কমিউনিস্ট নন। তিনি নিজেকে প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মামদানির নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

আজকের বৈঠক মামদানির জন্য বড় একটি পরীক্ষা। অতীতেও হোয়াইট হাউসে ডেকে নিয়ে অতিথিদের সবার সামনে চরম অপমান করতে দেখা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। আজ মামদানির জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি ছিল এটা প্রমাণ করা যে তিনি ট্রাম্পের সামনে দাঁড়াতে সক্ষম এবং নিউইয়র্কের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংঘর্ষ মোকাবিলা করতে পারবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-07%2F6zmtcr26%2FTrump___Mamdani.jpg?rect=0%2C100%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্ক শহরের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি (ডানে) ছবি: এএফপি

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রায় ও আসন্ন গণভোটে দক্ষিণ এশিয়ায় পালাবদলের ইঙ্গিত by নাজাম লায়লা

নাজাম লায়লা যুক্তরাজ্যের চিন্তন প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের ডিজিটাল সোসাইটি প্রোগ্রামের অ্যাকাডেমি অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কর্মরত। তিনি বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারডিসিপ্লিনারি ইংলিশ লিটারেচারে স্নাতকোত্তর করেছেন। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে জেন্ডার, ডেভেলপমেন্ট ও গ্লোবালাইজেশনে স্নাতকোত্তর করেন। এ ছাড়া তিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে পলিটিকস ও ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে পিএইচডি করেছেন। তিনি গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে লিখেছেন। তাঁর এই লেখা সোমবার চ্যাথাম হাউসের ওয়েবসাইটে বিশেষজ্ঞ মন্তব্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে এ দণ্ড দেওয়া হয়। আদালত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ওপর চালানো সহিংস দমন-পীড়নের জন্য দায়ী। জাতিসংঘের হিসাবে, ওই ঘটনায় ‘প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন’ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ‘বর্ষা বিপ্লব’ নামে পরিচিত ওই জেন–জি বিক্ষোভে হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং তাঁকে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

এ রায় কেবলই একটি রাজনৈতিক পরিবারের পতনকেই সামনে আনেনি; বরং বাংলাদেশের আসন্ন গণভোট ও নির্বাচন মিলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির একটি ফাটলের ইঙ্গিত দেয় এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য আরও বহুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার দ্বার উন্মোচন করতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ ভারতের ওপর কম নির্ভরশীল থাকবে। পালাবদলের এ মুহূর্ত বাংলাদেশকে একটি প্রান্তিক শক্তি থেকে দ্বিধাবিভক্ত অঞ্চলটিতে স্থিতিশীল একটি শক্তি হিসেবে রূপান্তর করতে পারে।

নতুন কুশীলব, নতুন মেরুকরণ

‘বর্ষা বিপ্লব’ শুধু শেখ হাসিনার সরকারের পতনই ঘটায়নি; বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দল আওয়ামী লীগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যে কয়েক দশকের পুরোনো দ্বিদলীয় আধিপত্য ছিল, সেটাও ভেঙে দিয়েছে। বিপ্লবের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই সময়ে এ সরকার নেতৃত্ব দিচ্ছে।

এ পরিবর্তন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক কুশীলবদের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে ছাত্র-বিপ্লবীদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং শেখ হাসিনার সরকার আমলে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি শিবির নামে পরিচিত নিজেদের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ পুনরুত্থান উপভোগ করছে।

নিজেদের একটি মধ্যপন্থী ও বহুত্ববাদী শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা এনসিপি ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও একটি নতুন সংবিধানের দাবি জানিয়েছে। সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও দলটির যে জনপ্রিয়তা, তা মূলত পরিবারন্ত্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির প্রতি গণ–অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। জামায়াত নিজেদের একটি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে নতুন করে পরিচয় করাচ্ছে। দলটি অধ্যাপক ইউনূসের সংস্কার এজেন্ডাকে প্রভাবিত করতে এবং সংসদে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) জন্য চাপ তৈরিতে এনসিপির সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান নেয়।

সন্ত্রাস দমন আইনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। শেখ হাসিনা ও তাঁর দল তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। গত রোববার শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা বাংলাদেশে নির্বাচন রুখে দিতে চাইবে এবং নির্বাচনের আগে সহিংসতারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে দলের নেতাদের মধ্যে অনৈক্য এবং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, যদিও দলটি এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা)’ নীতির কথা বলে আসছে। কিছু বিশ্লেষণে বিএনপিকে নির্বাচনের সম্ভাব্য বিজয়ী দল হিসেবে দেখানো হলেও এখনই নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা বেশ কঠিন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিজয় জামায়াতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে, যদিও এই সাফল্য জাতীয় পর্যায়ে না–ও দেখা যেতে পারে।

জুলাই সনদ গণভোট

ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোটটি বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব করা সংস্কারের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। গত অক্টোবরে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল এতে স্বাক্ষর করে।

এটি বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে অভূতপূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একত্র করেছে। সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর জন্য মেয়াদসীমা, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব–ব্যবস্থা এবং ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এতে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সংসদীয় প্রভাব বা একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে।

গণভোটে অনুমোদন পেলে এসব পরিবর্তন দশকের পর দশকের বংশানুক্রমিক আধিপত্য ভেঙে দিয়ে বহুত্ববাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। তবে সংস্কারের সময়সূচি, পরিধি ও বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে, যার নিষ্পত্তি গণভোটের পরই হবে। উদাহরণস্বরূপ এনসিপি বলেছে, সরকার সংস্কারগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, তা স্পষ্ট করলেই কেবল তারা সনদে স্বাক্ষর করবে।

গণভোটে জোরালো জনসমর্থন পাওয়া গেলে ও সঠিক আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করে স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি এমন একটি ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে তুলতে পারে, যা শেখ হাসিনাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য নিশ্চিত করতে পারে। এতে বাংলাদেশ একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং আরও কার্যকরভাবে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে যদি বাংলাদেশিরা ‘না’ ভোট দেন, তাহলে নির্বাচনে যে–ই জিতুক না কেন, তাদের জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকতে হবে না। ফলে ঐক্যবদ্ধ সংস্কারের এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

আঞ্চলিক প্রভাব

নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাবের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের ভারতনির্ভরতা—যা হাসিনা যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—কমাতে কাজ করছে এবং বৈদেশিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। কারণ, দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ উপেক্ষা করেছে। এই পরিবর্তন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরও চলতে পারে। কারণ, নির্বাচনে যেসব দল মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকবে, সেগুলোর প্রায় সব দলই ভারতের সমালোচক, যা জনমতের মধ্যে বিরাজমান একধরনের ভারতবিরোধী মনোভাবকে প্রতিফলিত করে। এর পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে হাসিনা সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের সমর্থন। নয়াদিল্লি বলেছে, তারা বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং এ লক্ষ্য অর্জনে সব সময় গঠনমূলকভাবে সব অংশীজনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ককে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য—এ তিন ক্ষেত্রেই চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা ও চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। গত মার্চ মাসে অধ্যাপক ইউনূস বেইজিংয়ের সঙ্গে বড় ধরনের সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে রেলপথ, ডিজিটাল অবকাঠামোসহ ৩০টির বেশি বড় প্রকল্পে ছড়িয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ডেনমার্কের বৈশ্বিক টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালস থেকে রেকর্ড ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ পেতে যাচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক ইউরোপীয় বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে বর্ষা বিপ্লবের পর এক বছরে বাংলাদেশের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসিয়ানেও যোগ দিতে চাইছে এবং সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে পাকিস্তানের সঙ্গে সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়েও কথা বলেছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাতে জর্জরিত দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য এসব পদক্ষেপ বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্পর্ক ও বহুপক্ষীয়তার একটি শক্তিশালী মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।

পরিবর্তনের মুহূর্ত

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর হাসিনাপরবর্তী যুগে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের উত্তরাধিকার ধরে রাখা, যা বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক পর্যায়ে অন্যের খেলায় ব্যবহৃত শক্তি থেকে আঞ্চলিক খেলোয়াড়ে উন্নীত করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জুলাই সনদে একত্র হওয়া এ লক্ষ্য অর্জনকে আরও বাস্তবসম্মত করেছে। তবে রাজনৈতিক বিভাজন এখনো তীব্র রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা যদি বাংলাদেশের এই নতুন যুগকে গ্রহণ করতে রাজি না হয়, তবে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।

বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াত—তিন দলেরই নিজস্ব দুর্বলতা আছে, যাতে তারা কেউ এককভাবে ক্ষমতায় গেলে কার্যকরভাবে শাসন করতে হিমশিম খাবে। তাই বর্তমানের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট নির্বাচনী ব্যবস্থা (যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পায়, সে-ই সরাসরি বিজয়ী হয়) সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব–ব্যবস্থায় (প্রোপোর্শনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা পিআর) পরিবর্তন করা উচিত, যা জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও মতাদর্শসম্পন্ন দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে—এ মুহূর্ত কি সম্মিলিত সংস্কারের সূচনা করবে, নাকি নতুন বিভাজনের সূত্রপাত করবে? ফেব্রুয়ারির গণভোট শুধু সংবিধান সংশোধনের ভোট নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও অঞ্চল নিয়ে আকাঙ্ক্ষার ওপর একটি রায়ও।

প্রশ্নটি স্পষ্ট—বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনের মুহূর্তকে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য ব্যবহার করবে, নাকি আরেকটি সংকটের চক্রে ফিরে যাবে? যদি ঢাকা সফল হয়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দৃষ্টান্তমূলক প্রভাব রাখতে পারবে—অঞ্চলকে বহুত্ববাদ, সংযুক্তি ও সহযোগিতামূলক নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখাতে পারে।

* নাজাম লায়লা, একাডেমি অ্যাসোসিয়েট, ডিজিটাল সোসাইটি প্রোগ্রাম, চ্যাথাম হাউস

কোন দলের কারা কারা জুলাই সনদে সই করল, তা দেখাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গত ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়
কোন দলের কারা কারা জুলাই সনদে সই করল, তা দেখাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গত ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

যে যুদ্ধে ইসরায়েল হেরে যাচ্ছে by আতিফা ইকরাম খান

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বাইডেন প্রশাসন এক বিল পাস করেছিল, যা চীনা কোম্পানি বাইটড্যান্সকে (টিকটকের মূল মালিক) বাধ্য করেছিল এক বছরের মধ্যে তাদের শেয়ার বিক্রি করতে; তা না হলে এই অ্যাপটি যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছিল।

যে টিকটককে এক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, সেটিকেই এখন তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মরিয়া হয়ে দখল করতে চাইছেন। এটি কেবল অনুমান নয়, হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টায় ইসরায়েলের প্রচারযন্ত্র এখন সরে যাচ্ছে সেই সব প্ল্যাটফর্মের দিকে, যেগুলোকে তারা একসময় তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করেছিল।

নিউইয়র্কে ইসরায়েলি কনস্যুলেট জেনারেলে মার্কিন প্রভাবশালীদের সঙ্গে এক বৈঠকে নেতানিয়াহুকে বলতে শোনা যায়: ‘আমাদের এমন অস্ত্র দিয়েই লড়তে হবে, যা সেই যুদ্ধক্ষেত্রের উপযোগী, যেখানে আমরা লিপ্ত আছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে। আর বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টিকটক। নাম্বার ওয়ান। নাম্বার ওয়ান।’

তার এই মন্তব্য প্রকাশ করে এক রাষ্ট্রের গভীর হতাশা—যে রাষ্ট্র মরিয়া হয়ে নিজের বয়ানের আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। ওয়াশিংটন যেটিকে নিরাপত্তা-হুমকি হিসেবে দেখেছিল, তেলআবিব সেটিকেই এখন প্রোপাগান্ডার সুযোগ হিসেবে দেখছে।

মার্কিন সিনেটর মিট রমনি এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে বলেছিলেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র টিকটকের প্রতি কঠোর হচ্ছে। কারণ, এটি ফিলিস্তিনি কণ্ঠের এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি টিকটকের পোস্টিং দেখেন এবং অন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের তুলনায় ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেখেন, তা বিপুল পরিমাণে বেশি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই দৃশ্যমানতাই প্ল্যাটফর্মটিকে প্রেসিডেন্টের জন্য বাস্তব আগ্রহের বিষয় করে তুলেছে, যাতে তিনি এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেন।’

রিপাবলিকানদের মন্তব্যে স্পষ্ট, ‘নিরাপত্তার আড়ালে প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো নিয়ন্ত্রণ। ‘নো লেবেলস’ ওয়েবিনারে প্রতিনিধি মাইক ললার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিক্ষোভই আসলে টিকটক-বিল অন্তর্ভুক্ত করার কারণ। তাঁর মতে, ‘ছাত্ররা প্রভাবিত হচ্ছে... ঘৃণা ছড়াতে... শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে।’

যে কেউ ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডায় অনুপ্রাণিত না হলে সে ‘প্রভাবিত’ হয়েছে—এই অভিযোগ এখন ইসরায়েল ও তার মিত্রদের মুখস্থ বুলি। প্রচলিত মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে রাখা, লবি ও থিঙ্কট্যাঙ্ক মোতায়েন করা, অনলাইন ভাড়াটে ট্রল বাহিনী চালানো, মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করা, ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রতি পোস্টে ৭,০০০ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করা, গুগলের সঙ্গে ৪৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে ফিলিস্তিনপন্থী কনটেন্ট দমন ও ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়া, সাংবাদিক হত্যার বৈধতা প্রচারে ‘লেজিটিমাইজেশন সেল’ নামে সেনা ইউনিট চালানো, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-ইউটিউব-এক্সে অ্যালগরিদমিক দমন—সব মিলিয়েও ইসরায়েলের প্রচারযন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে।

ব্যর্থ হয়েছে ঠিক এই কারণেই যে, সেটি ‘সফল’ হয়েছিল। কারণ, সেটি বাস্তব সময়ে বিশ্বের সামনে নিষ্ঠুরতার রূপ দেখিয়েছে। তারা সফল হয়েছিল ঘরবাড়ি উচ্ছেদে, সাহায্য বন্ধ করতে, বেসামরিকদের অনাহারে ফেলতে, সাংবাদিক ও শিশু হত্যা করতে, হাসপাতাল বোমায় উড়িয়ে দিতে, পাড়া-মহল্লা নিশ্চিহ্ন করতে, একের পর এক যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করতে।

এটি ইতিহাসের প্রথম গণহত্যা যা লাইভস্ট্রিম হয়েছে—ভুক্তভোগীরা নথিবদ্ধ করেছে, কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে আর হত্যাকারীরা তা একই সঙ্গে অস্বীকার করেছে। তবু বিশ্ব যখন নগ্ন চোখে এই নৃশংসতা দেখেছে, তখনও ইসরায়েল সাহস দেখিয়েছে নিজের কাজের সাফাই গাইতে, নিজেকে ভুক্তভোগী দেখাতে আর সব দোষ হামাসের ওপর চাপাতে।

ইসরায়েলের এই মরিয়া চেষ্টা—প্রতিটি মাধ্যমকে নিজের দখলে নেওয়া—প্রকাশ করে আরও গভীর এক সত্য: রাষ্ট্রগুলো, বড় টেক কোম্পানির সঙ্গে মিলে, নাগরিকদের মন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

ডিজিটাল অবকাঠামো, যা গড়ে উঠেছে কোটি কোটি করদাতার অর্থে, আসলে মানুষের জীবনকে বশে আনা ও মতকে সমরুপ করার হাতিয়ার। প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নয়। যিনি সরঞ্জাম বানান, সেটি তার অভিপ্রায়ের প্রতিফলন। পুঁজিপতি ও রাষ্ট্র উভয়ই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে দৃষ্টিভঙ্গি বিকৃত করতে ও অর্থ নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ‘ফর ইউ’ পেজ আসলে তোমার জন্য নয়—এটি আনুগত্যের জন্য।

ইসরায়েলের লক্ষ্য পরিষ্কার। তারা যতই ‘বিশ্ব বয়ান হারানো’ নিয়ে আক্ষেপ করুক, হত্যাযজ্ঞ থেকে এক চুলও পিছায় না। যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের সহায়তায় ভরপুর হয়ে তারা দাবি করে তাদের হামলা নাকি কেবল হামাসের বিরুদ্ধে। বাস্তবে, তারা ফিলিস্তিনে তৈরি করেছে এক মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যেখানে সাধারণ মানুষ ধ্বংসস্তূপের মাঝে অনাহারে মরছে। তাদের তথাকথিত ‘স্বদেশ-স্বপ্ন’ গঠিত হয়েছে ফিলিস্তিনিদের দুঃস্বপ্নের ওপর। তাদের প্রাচীন স্লোগান ‘এক ভূমি যেখানে মানুষ নেই, সেই ভূমি সেই জাতির জন্য, যার ভূমি নেই’—প্রকাশ করেছিল তাদের গণহত্যার নকশা।

ফিলিস্তিনের জাতিগত নিধন কোনো অতীতের ঘটনা নয়; এটি এক চলমান প্রকল্প। মানচিত্র থেকে জীবন মুছে ফেলতেও তারা (ইসরায়েল) ভয় পায় সেই আয়নাকে, যা সত্যের প্রতিবিম্ব দেখায়—ডিজিটাল জনতার সেই আয়নাকে। তারা চায় শুধু ফিলিস্তিনিদেরই নয়, তাদের কষ্টের সাক্ষীকেও নীরব করতে।

তবু সত্য থামে না। তৃণমূল গণমাধ্যম, নাগরিক সাংবাদিকতা ও বৈশ্বিক ডিজিটাল প্রতিরোধের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা সীমিত সম্পদ, বারবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও অকল্পনীয় ক্ষতি সত্ত্বেও সত্যের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে আর বিশ্বের বিবেক সেই আলোয় দগ্ধ হয়েছে। তারা তাদের ধ্বংসের মুখে নিজেদের অভিজ্ঞতা বলেছে, অবশিষ্ট যা ছিল তা দিয়ে সব নথিবদ্ধ করেছে, ক্ষমতার পালিশ করা মিথ্যাকে বিশ্লেষণ ও যাচাই করে উন্মোচন করেছে। তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্পগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা পাল্টে দিয়েছে বিশ্বজনমতের দৃষ্টিভঙ্গি—ফিলিস্তিন ও হামাস উভয়ের প্রতিই।

ধ্বংসস্তূপ ও মোবাইল ফোন থেকে উঠে আসা এই গল্পগুলো গড়ে তুলেছে নতুন বৈশ্বিক উপলব্ধি, সীমান্তের ওপারে জাগিয়েছে সহানুভূতি ও সংহতি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এখন ৫৯ শতাংশ আমেরিকান ইসরায়েলি সরকারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, যেখানে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ। সাংবাদিক ক্রিস হেজেস লিখেছেন, ‘এই গণহত্যা এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার পূর্বাভাস দিচ্ছে—যেখানে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রক্সি ইসরায়েল পরিত্যক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’

এই পরিবর্তন স্পষ্ট। রাস্তায় বিক্ষোভ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক বিবৃতিতে—বিশ্ব আর ইসরায়েলের গল্প বিনা প্রশ্নে কিনছে না। এখান থেকে আর ফেরার পথ নেই। ইসরায়েল নতুন প্ল্যাটফর্ম কিনে বা আরেকটি মাধ্যমে মিথ্যা ছড়িয়ে যা-ই করুক, তা ব্যর্থ হবে। মানুষ সত্য দেখে ফেলেছে এবং একবার দেখা সত্য আর অদেখা করা যায় না।

ইসরায়েল সব সময় নিজের অসংখ্য মিথ্যার বহুমাত্রিকতা উদ্‌যাপন করেছে আর ফিলিস্তিনের একক সত্যকে ঘৃণা করেছে। সত্যের প্রতি তাদের সহনশীলতা শূন্য—তথ্য দিয়ে নয়; বরং সহিংসতা দিয়ে তারা প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রতিটি নতুন হামলায়, যা আগের চেয়ে আরও নিষ্ঠুর, তারা প্রমাণ করেছে—তারা সত্যের সঙ্গে সহাবস্থান নয়, সত্যবাহকদের বিনাশ চায়।

কিন্তু মিথ্যা কখনো সত্যকে পরাজিত করতে পারে না। ইসরায়েল নিজেই নিজের প্রচারণাযুদ্ধে নিজের পতন ডেকে এনেছে। যখন জায়নিস্টরা জিজ্ঞেস করে কীভাবে তাদের ভাবমূর্তি উন্নত করা যায়, উত্তর সহজ—শিশু হত্যা বন্ধ করো, জীবন মুছে ফেলা বন্ধ করো, গণহত্যা বন্ধ করো। কৌশলগত গল্প বলার বা অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণের কোনো যাদু এক রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব নৈতিক গহ্বর থেকে উদ্ধার করতে পারে না।

আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি কীভাবে ক্ষুদ্র গল্পগুলো বৈশ্বিক চেতনা বদলে দিতে পারে। এখন পরবর্তী ধাপ হলো সচেতনতাকে কর্মে রূপ দেওয়া তা যত ছোটই হোক। ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলতে থাকা। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা। বর্জন করা, এমন ভাষায় লেখা যা দমনকারীর ধার করা নয়। দখলদার যে প্রশ্ন করে, তা না মেনে নিজেই প্রতিরোধে পরিণত হওয়া—সত্যের স্বার্থে।

কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—সত্য মিথ্যাকে অস্বীকার করে। কোনো সাম্রাজ্য, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো প্রোপাগান্ডা বাজেটই তাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

* আতিফা ইকরাম খান, ভারতের একজন স্বাধীন গবেষক। মিডিয়া উপনিবেশবাদ তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-02%2F99f4cf00-fad4-4084-a172-19fa2b1da817%2Fnetaniyahu_reuters.JPG?rect=73%2C0%2C453%2C302&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি

তুরস্কের নতুন প্রজন্মের আকাশ প্রতিরক্ষার সফল পরীক্ষা

নতুন প্রজন্মের আকাশ প্রতিরক্ষার সফল পরীক্ষা চালিয়েছে তুরস্ক। এ পরীক্ষায় বিভিন্ন ধরনের ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত ও ধ্বংস করেছে তোলগা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

রোববার (১৬ নভেম্বর) ডেইলি সাবাহর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমকেই তাদের নতুন প্রজন্মের অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘তোলগান’ সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। পরীক্ষায় বিভিন্ন ধরনের ড্রোন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে নিরস্ত্র ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে সিস্টেমটি।

কনিয়ার কারাপিনার ফায়ারিং টেস্ট অ্যান্ড ইভ্যুয়ালুয়েশন গ্রুপ কমান্ডে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তুরস্কের স্থানীয়ভাবে নির্মিত তোলগা সিস্টেমটি মিনি ও মাইক্রো ড্রোন, ট্যাকটিকাল ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল এবং স্মার্ট মুনিশন থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। এতে কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার, রাডার, টারেট-ভিত্তিক অস্ত্র, ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থা এবং বিশেষভাবে তৈরি অ্যান্টি-ড্রোন গোলাবারুদ রয়েছে। এগুলো একাধিক স্তরে সমন্বিত প্রতিরক্ষা দেয়।

আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফট-কিল পরীক্ষায় প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরের একটি শত্রু ড্রোন প্রথমে রাডারে শনাক্ত হয়। এরপর এটি ইলেক্ট্রো-অপটিকস দিয়ে শনাক্তকরণ নিশ্চিত করার পর ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে অকার্যকর করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় দুটি স্থির ১২.৭ মিমি গান, একটি যানবাহনে স্থাপিত রোটারি ১২.৭ মিমি গান এবং ২০ মিমি অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে নিচু উচ্চতায় নিকটবর্তী আক্রমণ চালানো ড্রোনগুলো ধ্বংস করা হয়।

এমকেই-এর মহাব্যবস্থাপক ইলহামি কেলেস জানান, পরীক্ষায় বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির অনুরূপ পরিবেশ ব্যবহার করা হয় এবং ড্রোনগুলোর ধরনও রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।

তিনি বলেন, তুরকিয়ের ঘোষিত স্টিল ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিচের স্তর—অর্থাৎ ৩,০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষার পুরো ভিত্তি তোলগা সিস্টেম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কেলেস জানান, তোলগা সিস্টেম এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, বেশিরভাগ লক্ষ্য মাত্র ৩–৪ রাউন্ডেই ধ্বংস করা গেছে—যা আমাদের বড় আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

এমকেই জানিয়েছে, গণউৎপাদনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ উভয়াংশের বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন শুরু করতে প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ডেইলি সাবাহ জানিয়েছে, তোলগা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থির ও মোবাইল—উভয় ধরনের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের উপযোগী। এটি হুমকির দূরত্ব অনুযায়ী প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া সামঞ্জস্য করতে পারে। সিস্টেমটি সর্বোচ্চ ৩,০০০ মিটার পর্যন্ত কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। 

তুরস্কের তোলগা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ছবি : সংগৃহীত