Tuesday, September 13, 2011

মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনঃ আদালতের মর্যাদা

দালত অবমাননার দুটো মামলায় সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দেশের আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চেরও অধিক সাজায় দণ্ডিত হওয়ার পর আদালত নিয়ে আবারও লেখার এই দুঃসাহসে আমার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে কেউ যদি সন্দিহান হয়ে পড়েন, তবে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। কিন্তু আমি নিরুপায়। ‘স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সেই যে খানিকটা অহংবোধ তাড়িত হয়ে লিখেছিলাম, ‘শুধু এটুকু আগাম বলে রাখছি, সত্য কথা প্রকাশের অপরাধে কারাগারে যেতে আমি বরং গৌরবই বোধ করব। কারাগার থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারলে আবার সত্য কথা বলব ও লিখব, প্রয়োজনে পুনর্বার কারাগারে যাব,’ সেটাই আমার কাল হয়েছে।
পেশায় রাজনীতিবিদ হলে বিপদ বুঝে কথা ঘুরিয়ে বলতে পারতাম—‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, পুনর্বার কারাগারে যাওয়ার খায়েশ আমার ২৯০ দিনেই মিটে গেছে।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং আমার একসময়ের বাড়িওয়ালা মো. ফজলুল করিমের দেয়া বিখ্যাত ‘চান্স সম্পাদক’ বিশেষণটাও আমার কাঁধে অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছে। ব্রাহ্মণ সম্পাদকরা যত সহজে মাফ চেয়ে পার পেয়ে যান, বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় চান্স সম্পাদকরা সেই কর্মটি কেন যেন তেমনভাবে করতে পারেন না।
পাকিস্তান আমলে হঠাত্ করে সাংবাদিকতায় এসে দূরদর্শী রাজনীতিবিদ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা তাঁর আপসহীনতার কারণে ইত্তেফাক পত্রিকাকে কেবল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের অন্যতম মুখপত্ররূপেই দাঁড় করাননি; অধিকন্তু, সাংবাদিকতার ইনস্টিটিউশন নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তিনি আইয়ুব, ইয়াহিয়া কোনো সামরিক স্বৈরশাসকের কাছেই মাথা নোয়াননি। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদ তত্কালীন প্রতিবাদী গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব অকুতোভয়ে পালন করে শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল সরকারের কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত হয়েছেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে কালজয়ী সম্পাদকে রূপান্তরিত হওয়া আবদুস সালাম একই ফ্যাসিবাদী সরকারের সমালোচনা করে সম্পাদকীয় লেখার অপরাধে চাকরিচ্যুত হয়েছেন।
সংবাদপত্র জগতের যে তিনজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলাম, তাঁরা কেউই রিপোর্টার, সাব-এডিটরের চাকরিতে ঢুকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে সম্পাদক হননি। অবশ্য কবি আল মাহমুদ এক সময় ইত্তেফাকে রিডিং সেকশনে চাকরী করেছেন। অথচ তাঁরা প্রত্যেকে প্রকাণ্ড শালবৃক্ষের মতো মাথা উঁচু করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে দাঁড়িয়ে আলো ছড়াচ্ছেন। আমি লেখালেখি করার সুবাদে সংবাদপত্র জগতে ঢুকেছি, এখনও নবিশ মাত্র। যাঁদের নাম বললাম, তাঁদের সঙ্গে আমার তুলনার কল্পনাটাও ধৃষ্টতা। তবে এঁদের সংগ্রামী জীবন আমাকে স্বাধীন ও সাহসী সাংবাদিকতার আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছে। অপরদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাম্প্রতিক সময়ের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকার নমস্য ‘সেক্যুলার’ পেশাদার সম্পাদক কত সহজে উল্টো মেরুর ‘মৌলবাদী’ খতিবের কাছে জোড়হস্তে ক্ষমা ভিক্ষা করে পারও পেয়ে যান আবার সমাজে বুক ফুলিয়ে বিচরণও করেন। হাজার হলেও সংবাদপত্রের ‘ব্রাহ্মণ’ বলে কথা। সেনাশাসনকে স্বাগত জানিয়ে ‘মাইনাস টু’-এর পক্ষে ওকালতি করে পরবর্তী সময়ে গণেশ ওল্টালে ভোল পাল্টে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না কাঁদতেও এই ‘মহান’ ব্যক্তিদের কোনো সমস্যাই হয় না। আমার যেহেতু ‘স্বভাব যায় না ম’লে’ তাই জনগুরুত্বের বিবেচনায় আদালত নিয়ে আবারও না লিখে উপায় নেই। গৌরচন্দ্রিকা অনেক হলো, এবার মূল বিষয়ে আসি।
বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে নানা বিতর্ক বাংলাদেশে আগে থেকে থাকলেও জেনারেল মইনের সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সরকার এই বিতর্ককে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়। ওই গণবিরোধী সরকারের আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আদালতে উপস্থিত থেকে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অপসংস্কৃতি অন্তত এদেশে ছিল না। অবশ্য স্বীকার করতে হবে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তি বসানো, বিচারকদের ভয় দেখানোর জন্য লাঠি মিছিল করা, প্রধান বিচারপতির এজলাসসহ সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে তাণ্ডব চালানোর অভিজ্ঞতা দুর্বিনীত রাজনীতিবিদ ও দলবাজ আইনজীবীদের কল্যাণে দেশবাসী আগেই অর্জন করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আজ সরকারপক্ষের যেসব আইনজীবী উচ্চ আদালতের মর্যাদা রক্ষার জন্য দিবারাত্র মায়াকান্না কাঁদছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই সেইসব তাণ্ডবে তখন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আমাদের মতো সমাজের সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণীর অধিকাংশই সময়-সুযোগমত নীতিকথা কপচাতে অভ্যস্ত। বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগের মর্যাদা কোন্ গহ্বরে নেমেছে, সেটা বোঝার জন্য ক’দিন আগে হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চের ঘটনাবলী স্মরণ করলেই চলবে। বিচারব্যবস্থার সার্বিক অবক্ষয়ে বেদনাহত হয়ে সাবেক শ্রদ্ধেয় প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল তাঁর চরিত্রগত নীরবতা ভেঙে প্রথম আলো’য় লিখেছেন, ‘সুপ্রিমকোর্ট একটি পরিশীলিত প্রতিষ্ঠান। বার এবং বেঞ্চ উভয়েরই উচিত এই স্থানকে রাজনীতির কলুষমুক্ত রাখা, সেখানে বার এবং বেঞ্চ কোনো পক্ষ থেকেই এমন প্রকাশ্য উচ্চারণ হওয়া উচিত নয় যে তারা বিশেষ একটা কিছু সহ্য করবেন না এবং এমন কথা বলবেন না যাতে আপনাদের অসহিষ্ণুতা বা বিচারকসুলভ সংযমের বিপরীতে ক্রুদ্ধতা বা আক্রোশের মনোভাব প্রকাশ পায়। ক্রমাগতভাবে এবং অতি দ্রুত সুপ্রিমকোর্টের এই অস্বাভাবিক অবস্থা আমার কাছে বড় বেদনাদায়ক।’
মাননীয় বিচারপতিদের অসহনীয় ক্রোধ ও ব্যক্তিগত আক্রোশের যে বহিঃপ্রকাশ আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, তার খানিকটা বর্ণনা আমার ধারাবাহিক ‘জেল থেকে জেলে’ লেখায় দেয়ার চেষ্টা করেছি।
আমার দেশ পত্রিকার পাঠকরা অবহিত আছেন যে, আমি দু’টি আদালত অবমাননার মামলায় দণ্ডিত হয়েছি। ‘স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা’ শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদন লেখার অপরাধে একটি মামলা রুজু হয়েছিল। ২০১০ সালে আমার গ্রেফতারের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ১০ মে উল্লিখিত মন্তব্য প্রতিবেদনের এক জায়গায় লিখেছিলাম, ‘একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে মাননীয় বিচারকদের সঙ্কীর্ণ দলীয় চিন্তাধারা অতিক্রম করে কেবল সংবিধান ও দেশের আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিচার বিভাগকে দলীয়করণের যে মন্দ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে, সেখান থেকে তারা নিবৃত্ত না হলে জাতি হিসেবে আমরা ক্রমেই অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব।’ শ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল অনেক পরিশীলিতভাবে এবং উচ্চমানের ভাষা প্রয়োগে আজ জাতিকে যা বলছেন, তার সঙ্গে আমার দুর্বল লেখার ভাবার্থগত তেমন কোনো তফাত্ না থাকলেও আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্নের দায়ে আমাকে দণ্ড প্রদান করা হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে প্রথম মামলার শুনানিকালীন একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। আপিল বিভাগে আত্মপক্ষ সমর্থনকালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এবং সুপ্রিমকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধান ড. শাহদীন মালিকের বক্তব্য তথ্য-প্রমাণ সহকারে উদ্ধৃত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলাম যে, তারাও বিচার বিভাগ নিয়ে আমার মতোই উদ্বিগ্ন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী তাদের সমালোচনার ভাষাও আমার চেয়ে অনেক তীব্র এবং সরাসরি ছিল। আমার ডিফেন্স ছিল, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। সুতরাং, কেবল আমাকে সাজা দেয়া হলে সেটা সংবিধানের লঙ্ঘন হবে। আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতি এমএ মতিন আমার যুক্তি আমলে না নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, দেশের দুই বিশিষ্ট নাগরিকের মন্তব্য নাকি ‘below contempt’। আমি আইনের ছাত্র নই বিধায় সেই ‘below contempt’-এর অর্থোদ্ধার আজ পর্যন্ত করতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি, বাংলাদেশের আইনের শাসনের সংজ্ঞায় একই অপরাধে সময় ও সরকারভেদে ভিন্ন ফল অসহায় নাগরিকদের মেনে নিতে হয়।
ভিন্ন ফলের একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ দেয়া যাক। হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চে অপ্রীতিকর ঘটনার রেশ ধরে ১৪ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে পুলিশ অধুনা তাদের বহুল ব্যবহৃত ‘কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার’ মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন চাওয়া হলে সেই আবেদন প্রথম দফায় নামঞ্জুর হয়। ওইদিন বিকালে অভিযুক্ত আইনজীবীরা পুলিশি হেফাজতেই বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বেঞ্চে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাদের বিরুদ্ধে আগে দায়েরকৃত আদালত অবমাননা মামলার রুলের নিষ্পত্তি হয় এবং আদালত তাদের ক্ষমা করে দেন। যেহেতু পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা প্রদান মামলায় তাদের সকালে নিম্ন আদালতে জামিন দেয়া হয়নি, কাজেই সবাইকে হাইকোর্ট থেকে কারাগারে যেতে হয়। দুই দিন কারাভোগের পর নাজিমউদ্দিন রোড থেকে নিম্ন আদালতে তাদের হাজির করে দ্বিতীয়বার জামিন প্রার্থনা করা হলে এবার ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের মন গলে! একজন অভিযুক্ত আইনজীবী এর আগেই পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে হাসপাতালে থাকায় তিনি ছাড়া বাদবাকি ১৩ আইনজীবী অবশেষে জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। একই মামলার জামিনের আবেদন আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে একই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই রকমভাবে নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে বিচার বিভাগের তথাকথিত স্বাধীনতার করুণচিত্র ফুটে উঠেছে।
এই ঘটনার প্রারম্ভে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের সমঝোতার অনুরোধ অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, আগে সবাইকে জেলে পাঠান, তারপর দেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের সব ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছে। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের জেলের ভাত খাইয়ে তারপরই কেবল অ্যাটর্নি জেনারেল তাদের মুক্তি এবং সনদ রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে যখন প্রধান বিচারপতির এজলাসে আওয়ামী আইনজীবী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণাধীন বারের নেতৃত্বে ভাংচুর চলছিল, সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের গাড়ি নিয়ে বহ্ন্যুত্সব করছিলেন, সেই সময় আজকের ‘নীতিবান’, দোর্দণ্ডপ্রতাপ অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতের উচ্চ মর্যাদা রক্ষার জন্য কোনো রকম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কিনা, সেটি জানতে চাইলে আশা করি নতুন করে আদালত অবমাননা মামলায় অভিযুক্ত হব না। এদেশের শাসকশ্রেণীর কপটতা এবং ভণ্ডামির বোধহয় কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বর্তমান বিতর্কিত অবস্থার জন্য যদি একজন ব্যক্তিকে সর্বাধিক দায়ী করতে হয়, তাহলে তিনি অবশ্যই সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। Judicial Activism-এর মোড়কে বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায় প্রদান করে তিনি বাংলাদেশকে চিরস্থায়ী বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এই ব্যক্তি প্রধান বিচারপতির আসনে বসে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে উপহাস করেছেন, তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে এক লহমায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আদালতে স্বাধীনতা সংগ্রামের নব ইতিহাস রচনা করেছেন, সর্বক্ষণ মুখে কোরআন-হাদিসের কথা বলে নির্দ্বিধায় সংবিধানের মূলনীতি থেকে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস বাতিল করেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টস্থ চার দশকের গৃহ ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা বাকশাল পুনরুজ্জীবনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
প্রচারপ্রিয় সাবেক এই প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে টাকা প্রাপ্তির ঘটনা গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর থেকে অবশ্য তিনি জনসমক্ষে আর আসছেন না। আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক ত্রাণ তহবিলের বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চাইলে একসময়ের ‘অসীম সাহসী’ এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের মতানুসারে শতাব্দীর সেরা বিচারপতি অনেকটা অনুনয়-বিনয় করেই বলেছেন— ‘Please, leave me alone’। উচ্চ আদালতকে চরমভাবে বিতর্কিত করে ও দেশকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়ে এখন তার এই নিভৃতচারী জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে কিনা, তার জবাব মহাকালের হাতে।
আদালতের মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে সমাজে কোনো দ্বিমত নেই। উচ্চ আদালতের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কোনো নাগরিকের কাম্য হতে পারে না। কিন্তু, অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সমস্যা জিইয়ে রেখে আদালত অবমাননা আইনের ঘন ঘন প্রয়োগের মাধ্যমে এই মর্যাদা রক্ষিত তো হবেই না, বরং আদালতের অধিকতর বিতর্কিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। চরম ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এমনিতেই হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এর সঙ্গে আদালত অবমাননার খাঁড়া যুক্ত হলে স্বাধীন গণমাধ্যমের পক্ষে দায়িত্ব পালন করা কোনোক্রমেই সম্ভব হবে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৭(ক) এবং ৭(খ) অনুচ্ছেদ আনয়ন করে জনগণের অধিকার হরণের বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করা হয়েছে। যে সংবিধান জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হওয়া উচিত, সেই সংবিধানের কোনোরূপ সমালোচনাকারীকে রাষ্ট্রদ্রোহী বিশেষণে আখ্যায়িত করে ফাঁসিতে ঝোলানোর ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। মানবাধিকারের এত বড় লঙ্ঘনকে কোনো স্বাধীনচেতা নাগরিক মেনে নিতে পারে না। অথচ একই সংবিধানের তৃতীয় ভাগ অর্থাত্ মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত বিধানাবলীর ২৬(১) এবং ২৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,
২৬। (১) এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।
(২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।
মৌলিক অধিকারের অন্যতম, ‘চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার’ সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ৭(ক) এবং ৭(খ) অনুচ্ছেদ সংবিধান থেকে কেন বাতিল হবে না এই প্রশ্নে দেশের নাগরিককে সমালোচনার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করার প্রয়াস যারা নিচ্ছেন, তাদেরকে ফ্যাসিবাদের দোসররূপে চিহ্নিত না করার কোনো কারণ নেই। স্ববিরোধী সংবিধান প্রণয়নের জন্য কোনো নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সংসদ সদস্যরা যে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নের কারণে সেই পুরস্কারের একমাত্র দাবিদার হতেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মোদ্দা কথা হলো, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বর্তমান শাসকশ্রেণী বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে যেভাবে জুলুম করে চলেছে, তার অবসান হওয়া জরুরি। যে দেশে নাগরিকের ন্যূনতম মর্যাদা নেই, সেই দেশে আদালত কেন, কারও মর্যাদা রক্ষা করাই সম্ভব নয়। একমাত্র পারস্পরিক মর্যাদাবোধই আমাদের এই দেশটিকে আসন্ন সর্বনাশ থেকে উদ্ধার করতে পারে। জনগণ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে একপ্রকার অলিখিত চুক্তির মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদগ্র নেশায় লুটেরা শাসকশ্রেণী যখন সেই চুক্তি একতরফাভাবে ভাঙতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রেরও বিনাশ আরম্ভ হয়। বাংলাদেশে আজ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের নগ্ন থাবায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। আদালতও দলীয়করণের সর্বগ্রাসী বিস্তার থেকে বাঁচতে পারেনি।
এই রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকতে হলে দলমত নির্বিশেষে সম্মিলিতভাবে সব শ্রেণী-পেশার জনগণকে প্রয়াস নিতে হবে, যাতে আদালত প্রাঙ্গণকে দলীয়করণের কলুষমুক্ত করে সেখানে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা যায়। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন মাননীয় বিচারকগণ এবং আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। বিচারপতিগণ যাতে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, সেই লক্ষ্য পূরণেই ২০০০ সালের ৭ মে সংবিধানের ৯৬(৪)(ক) নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে তত্কালীন প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি বিমলেন্দু বিকাশ রায় চৌধুরী এবং বিচারপতি এএম মাহমুদুর রহমান উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিদের জন্য আচরণবিধিমালা (Code of Conduct) প্রণয়ন করেন। সেই আচরণবিধির ৩(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘A judge should be patient, dignified, respectful, and courteous to litigants, lawyers and others with whom the judge deals in an official capacity.’
(একজন বিচারক মোকদ্দমাকারী, আইনজীবী এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যাদের সঙ্গে তিনি দাফতরিক দায়িত্ব পালনজনিত সম্পর্ক বজায় রাখছেন তাদের প্রতি ধৈর্যশীল, মর্যাদাপূর্ণ, সশ্রদ্ধ এবং ভদ্র আচরণ করবেন)
সাবেক সচিব মো. আসাফউদ্দৌলাহ্, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ অথবা আমার মামলার শুনানিকালে মাননীয় বিচারপতিগণ সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রণীত এই আচরণবিধি পালন করেননি। একই আচরণবিধির ৬ এবং ১৩নং ধারায় লেখা আছে,
6. A judge must not enter into public debate or express his views in public on political matters or on matters that are pending or are likely to arise for judicial determination before him.
(একজন বিচারক কোনো অবস্থাতেই প্রকাশ্য বিতর্কে জড়াবেন না কিংবা রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মতামত ব্যক্ত করবেন না কিংবা তার বিচারাধীন কোনো মামলার বিষয়ে মন্তব্য করবেন না।)
13. A judge should not engage in any political activities, whatsoever in the country and abroad.
(একজন বিচারক দেশে কিংবা বিদেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন না।)
উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এই আচরণবিধির প্রেক্ষিতে ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি স্টারের একটি সংবাদের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ২০১০ সালের ২৬ নভেম্বর পত্রিকাটিতে প্রকাশিত সংবাদের অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করছি,
‘Justice AHM Shamsuddin Chowdhury Manik, a sitting judge of the High Court, said Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman formed BAKSAL in 1975 to unite the nation for the welfare of the people, and even Ziaur Rahman was a member of the party.
He told at a function at Dhaka Reporters Unity (DRU) yesterday on the occasion of launching of a website on the Bangabandhu murder case.’
(বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, হাইকোর্টের একজন দায়িত্ব পালনরত জজ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের কল্যাণার্থে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করেন এবং এমনকি জিয়াউর রহমানও দলটির একজন সদস্য ছিলেন।
গতকাল বঙ্গবন্ধু হত্যামামলা সংক্রান্ত একটি ওয়েবসাইট উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এসব কথা বলেন।)
ডেইলি স্টারে বর্ণিত ওই অনুষ্ঠানে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক মরহুম জিয়াউর রহমান সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এর আগে ২০১০ সালের ৫ এপ্রিল দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় একই বিচারপতির লন্ডনে আওয়ামী লীগ ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি লন্ডনে গিয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, আওয়ামী লীগ নেতা এবং আওয়ামী ঘরানার আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনা সভায় যোগদানের ঘটনায় লন্ডনে তোলপাড় চলছে। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) লন্ডন সফরে গিয়ে গত ১ এপ্রিল রাতে পূর্ব লন্ডনের ডকল্যান্ড মেমসাব রেস্টুরেন্টে এই বৈঠক করেন। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান মিনারের সভাপতিত্বে ব্যানার টাঙিয়ে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ নানা প্রসঙ্গ স্থান পায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাংবাদিক গাফফার চৌধুরী, মুখ্য আলোচক ছিলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিশেষ অতিথি ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির।’
অধিকন্তু ইসলামী ঐক্যজোটের এক অংশের আমির মুফতি ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বাদী ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তার সঙ্গে লন্ডনের রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সূত্র ধরে রীতি অনুযায়ী বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) ওই মামলার শুনানিতে বিব্রত বোধ করতে পারতেন কি না, এই প্রশ্ন করার অধিকার বাংলাদেশের নাগরিকদের রয়েছে। মাননীয় বিচারপতিদের Code of conduct-এর ১১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘Every judge must at all times be conscious that he is under public gaze and there should be no act or omission by him which is unbecoming of his office.’
(প্রত্যেক বিচারপতিকে সর্বক্ষণ স্মরণে রাখতে হবে যে তারা জনগণের প্রখর দৃষ্টির মধ্যে রয়েছেন এবং এমন কোনো কাজ কিংবা ত্রুটি করা যাবে না যা বিচারপতি পদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।)
সভ্য রাষ্ট্রগুলোর বিচারব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রকার Convention আইনের মতোই অবশ্যপালনীয়।
উভয় ঘটনাতেই মাননীয় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সুস্পষ্টভাবে ২০০০ সালে প্রণীত উচ্চ আদালতের বিচারকদের আচরণবিধির ৬ এবং ১৩ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করেছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আচরণবিধি মেনে চলা উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জন্য আদৌ বাধ্যতামূলক কিনা, কিংবা ওই আচরণবিধি এখনও বলবত্ আছে কিনা। বিচারাঙ্গনের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষায় এসব প্রশ্নের জবাব মাননীয় প্রধান বিচারপতি জাতিকে জানাবেন বলেই আমরা প্রত্যাশা করি। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের আদালতে সংঘটিত একটি অপ্রীতিকর ঘটনার জের ধরে হাইকোর্টের আইনজীবী এবং সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমইউ আহমেদ পুলিশ হেফাজতে নির্যাতিত হয়ে আজ দুই সপ্তাহের অধিককাল ধরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আগের রীতি অনুসরণ করে তাকে উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন দেয়া হলে ফ্যাসিবাদী সরকারের পেটোয়া পুলিশ তার ওপর বর্বর নির্যাতন করার সুযোগ পেত না। মৃত্যুপথযাত্রী অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কোনো ক্ষতিসাধন হয়ে গেলে তার দায়ভার কে বহন করবেন, সে সম্পর্কেও চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ শিরোনামের একটি লেখা গত বছর ডিসেম্বরের সাত তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখা থেকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পর্কিত একটি অংশ উদ্ধৃত করেই আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদনের ইতি টানব। শেখ হাসিনা লিখেছেন,
‘সবসময় একটা চাপ যেন আদালতে রয়েছে। আমার শুধু মনে হয়, এই বিচার হচ্ছে? এত প্রহসন, বিচারের নামে প্রহসন চলছে। বিচারকেরা কি তাঁদের বিবেক, চিন্তা, জ্ঞান ও বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে বিচার করতে পারেন? বিচারকেরা তো সংবিধান মোতাবেক শপথ নিয়ে থাকেন, সেই শপথ কি রক্ষা করতে পারেন?
হাইকোর্টের একজন বিচারপতি তো প্রকাশ্যে বলেই দিলেন, শপথ মোতাবেক কাজ করতে পারছেন না। উচ্চ আদালতের যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে নিম্ন আদালতের কী অবস্থা হতে পারে, তা অনুধাবন করা যায়। খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে বিচার বিভাগ স্বাধীন করা হলো, কিন্তু তা মুখের কথায় ও কাগজে-কলমেই। বিচারকদের ওপর গোয়েন্দাদের চাপ অব্যাহতভাবে রয়েছে, তা দেখাই যায়। হাইকোর্ট রায় দিলেই তা যদি পক্ষে যায়, সুপ্রীম কোর্ট স্থগিত করে দেন। শেষ পর্যন্ত কোর্টও বদলে যায়। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে সরকারের বিশেষ দূত নিজেই নাকি আমাকে জামিন দিতে নিষেধ করেছিলেন। সুপ্রীম কোর্টকেই যদি নির্দেশ শুনতে হয়, সর্বোচ্চ আদালত যদি স্বাধীন না হন, তাহলে নিম্ন আদালতের অবস্থা কী, তা তো অনুধাবন করা যায়।
মামলার রায় কী হবে, তার ‘ওহি নাজেল’ হয়, যা নির্দেশ দেওয়া হবে, তা-ই রায় দেবে। ১ নভেম্বর ২০০৭ বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন, ১ নভেম্বরের আগে বিচার বিভাগের অবস্থা ও পরে অর্থাত্ বর্তমানের অবস্থা তুলনা করলেই বের হয়ে যাবে বিচার বিভাগ কতটুকু স্বাধীনতা পেয়েছে। মানুষের সঙ্গে এ প্রহসন কেন?’
এই লেখায় আদালতের মর্যাদার কোনো হানিসাধন হয়েছে কিনা, সে বিচারের ভার পাঠকের হাতে অর্পণ করলাম।

মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনঃ ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ফায়দা নাই

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিজ দীপু মনি এবং এ দেশের ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল (?) শ্রেণীর হালের প্রিয় শব্দ কানেক্টিভিটি। ইংরেজি connectivity শব্দটি connect থেকে এসেছে। কানেক্ট-এর বাংলা আভিধানিক অর্থ সংযুক্ত করা বা সম্বন্ধ স্থাপন করা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিটের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্যের যোগাযোগের ব্যবস্থা বা পড়হহবপঃ করা আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রটির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা।
সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান যেমন ভৌগোলিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল, সাত রাজ্যের সঙ্গে দিল্লির অবস্থাটা সেরকম বিপজ্জনক না হলেও নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিবেচনায় যোগাযোগের একটা বড় সমস্যা তাদেরও জন্মাবধি রয়েছে। বর্তমান অবস্থায় শিলিগুড়ির কথিত চিকেন নেক (chicken neck) অংশটি কোনো কারণে কাটা পড়লে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাত রাজ্য দিল্লি থেকে সাবেক পাকিস্তানের দুই অংশের মতোই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাছাড়া বর্তমান অবস্থাতেও বিদ্রোহকবলিত সাত রাজ্যের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যয়বহুল, বিপজ্জনক এবং সামরিক কৌশলগত বিবেচনায় সর্বদাই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে দুটো আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারতের শাসকশ্রেণী তাদের গুরুতর এই সমস্যার সমাধানে নানারকম কৌশল প্রয়োগ করে চলেছে। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় উপমহাদেশে বাংলাদেশ নামক তৃতীয় স্বাধীন ভূখণ্ডের অভ্যুদয় তাদের দীর্ঘদিনের মাথা ব্যথা নিরাময়ের এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।
পাকিস্তানি পরাজিত দখলদার বাহিনী ভারত ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে। আমাদের বিজয়ের সাড়ে ছয় মাসের মাথায় ভারত তত্কালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বন্যাকবলিত কাছাড় জেলায় জরুরি পণ্য পরিবহনের জন্য সর্বপ্রথম নৌ-ট্রানজিট সুবিধাটি আদায় করে নেয়। সেই সময় আসামে ভয়াবহ বন্যার ফলে কাছাড়ের সঙ্গে রাজ্যের বাকি অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখে ভারত সরকার নৌ-ট্রানজিট সংক্রান্ত নিম্নোক্ত প্রেসনোট জারি করে :
"Press note issued by the Government of India declaring that essential supplies to Cachar district will be allowed through Bangladesh waterways.
New Delhi, July 1, 1972
Transit facilities to Indian steamers from Calcutta or Gauhati to Cachar district in Assam through Bangladesh waterways have been made available following clearance by the Government of Bangladesh. The Union Ministry of Shipping and Transport has directed the Central Inland Water Transport Corporation Ltd., a public sector undertaking, to arrange movement of essential supplies to the region. The Government of India have greatly appreciated the gesture of the Bangladesh Government.
It may be recalled that surface communications between Cachar district and the rest of the country have been virtually cut off due to the devastating floods caused by the Brahmaputra and Barak rivers in Assam. The use of Bangladesh waterways will facilitate the movement of essential supplies to the flood-affected region."
(কাছাড় জেলায় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনের নিমিত্ত বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহারের সম্মতি লাভের বিষয়ে ভারত সরকারের প্রেসনোট।
নয়াদিল্লি, জুলাই ১, ১৯৭২
বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়ায় ভারতীয় জাহাজ কলকাতা অথবা গৌহাটি থেকে আসামের কাছাড় জেলায় চলাচলের জন্য বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহারের ট্রানজিট সুবিধা লাভ করেছে। কেন্দ্রীয় শিপিং ও ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রণালয় সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন লিমিটেডকে ওই এলাকায় অত্যাবশকীয় পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। এই পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।
এখানে উল্লেখ্য, ব্রহ্মপুত্র এবং বরাক নদীর ভয়াবহ বন্যার ফলে কাছাড় জেলার সঙ্গে দেশের বাকি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের নৌপথের এই ব্যবহার বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পরিবহনে সহায়তা করবে।)
একই বছর নভেম্বরের ১ তারিখে ঢাকায় চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে অন্যান্য রুটে তাদের পণ্য চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ ট্রানজিট প্রদান করা হয়। 'Protocol between the Government of India and the Government of Bangladesh on Inland Water Transit and Trade' শিরোনামের চুক্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন দুই দেশের তত্কালীন নৌ মন্ত্রণালয় সচিব যথাক্রমে এস জেড খান (S. Z. Khan) এবং এমজি পিম্পুটকার (M. G. Pimputkar)। নৌ ট্রানজিট চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যকার ১৯৭২ সালের ২৯ মার্চ তারিখে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫-এর উল্লেখের বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী। নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত 'Trade Agreement between the Government of India and the Government of Bangladesh' শিরোনামের সেই চুক্তির Article 5 অর্থাত্ ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—
'The two Governments agree to make mutually beneficial arrangements for the use of their waterways, railways and roadways for commerce between the two countries and for passage of goods between two places in one country through the territory of the other.'
অনুচ্ছেদ -৫
(দুই সরকার এই মর্মে সম্মত হচ্ছে যে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে সহায়তা প্রদান এবং একটি দেশের এক অংশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের ভেতর দিয়ে সেই দেশের অপর অংশে পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যে উভয় সরকার পারস্পরিক লাভালাভের ভিত্তিতে যার যার দেশের নৌপথ, রেলপথ এবং সড়কপথ ব্যবহারোপযোগী করবে।)
ভারতের একতরফা স্বার্থপূরণে প্রণীত উপরিউক্ত চুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের দুই তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এল. এন. মিশ্র (L. N. Misra) ও এম আর সিদ্দিকী (M. R. Siddiqui) স্বাক্ষর করেছিলেন। বাংলাদেশের এক অংশ থেকে অপর অংশে ভারতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কোনোরকম ভৌগোলিক প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণকে ধোঁকা দিয়ে কেবল ভারতের স্বার্থ মেটানোর জন্যই বাণিজ্য চুক্তিতে এই উদ্ভট অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়। পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, ১৯৭২ সালে প্রণীত তিনটি উল্লিখিত চুক্তির কোনোটিতেই কানেক্টিভিটি শব্দটি কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। এই শব্দটি ভারতের বাংলাদেশীয় দালালদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার। আমার কাছে এসব চুক্তির যে কাগজপত্র রয়েছে, সেখানে তারিখ সংক্রান্ত একটি বিভ্রান্তিও আমি খুঁজে পেয়েছি, যার উল্লেখ সঠিক ইতিহাস রচনার স্বার্থেই প্রয়োজন বিবেচনা করছি। নভেম্বরের নৌ-ট্রানজিট চুক্তিতে আগের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ২৯ মার্চ, ১৯৭২ উল্লেখ থাকলেও দিল্লিতে সেই চুক্তি প্রকৃতপক্ষে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২৮ মার্চ। ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী ললিত নারায়ণ মিশ্র ২৯ মার্চ ভারতীয় লোকসভায় বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের আগের দিনের চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে বিবৃতি প্রদান করেছিলেন মাত্র। আমার ধারণা, নৌ-ট্রানজিট চুক্তির খসড়া প্রণয়নকারীরা পরবর্তীকালে তারিখ গুলিয়ে ফেলেছিলেন।
একবার আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদিত হয়ে গেলে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল দেশের পক্ষে তাকে রদ করা যে আর সম্ভব হয় না, তার উত্কৃষ্ট প্রমাণ ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে প্রণীত বাণিজ্য চুক্তি এবং নৌ-ট্রানজিট চুক্তি। ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ তারিখে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদের সুযোগ নিয়ে পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারত একে একে তার সব ট্রানজিট চাহিদা পূরণ করে নিয়েছে। চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরবর্তী দীর্ঘ ৩৯ বছরে আওয়ামী লীগ ছাড়া জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং জেনারেল মইনের সরকার দেশ শাসন করলেও কোনো সরকারের পক্ষেই ওই চুক্তি কিংবা আর্টিকেল পাঁচ রদ বা পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। বরং ২০০৭-০৮ সময়কালে মইনের জরুরি সরকার দেশবাসীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বেআইনিভাবে ভারতকে আকাশপথে ট্রানজিটও দিয়ে দিয়েছে। ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের এই ধরনের চুক্তি করার কোনো সাংবিধানিক অধিকার না থাকলেও মার্কিন-ভারতের সহায়তায় কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তত্কালীন শাসকরা দেশের স্বার্থ অকাতরে বিকিয়ে দিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে যোগসাজশের মাধ্যমে একটি ভারতবান্ধব সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে পিঠ বাঁচাতে দল বেঁধে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সেই সময় নয়া দিগন্ত পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে একাধিক কলাম লিখলেও এসব দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে জেনারেল মইন ও ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে নিবৃত্ত করতে পারিনি। বাংলাদেশের জনগণও নেশাগ্রস্তের মতো চোখ বুজে কেবল আপন সংসারধর্ম পালনের মধ্যে ব্যাপৃত থেকেছেন। এত আত্মকেন্দ্রিকতায় বিভোর থেকে একটি দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না।
তত্কালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর একটি দম্ভোক্তির কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি দাবি করেছিলেন, তত্ত্বাবধায়কের ছদ্মাবরণে সামরিক সরকার ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যার পরিবর্তন সাধন করা পরবর্তী কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হবে না। চারদলীয় জোট সরকারের সময়কার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং পরবর্তীকালে এক-এগারোর সহযোগী ড. ইফতেখারের কথা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। মইন-মাসুদ-মশহুদ-ফখরুদ্দীন গং দেশের চূড়ান্ত সর্বনাশটি সাধন করেই ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন।
১৯৭২ সালে নৌ-ট্রানজিট সুবিধা লাভের মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ তাদের প্রথম লক্ষ্য পূরণ করে। স্মরণে রাখতে হবে যে, সর্বদাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সড়কপথে ট্রানজিটপ্রাপ্তি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বাণিজ্য চুক্তির পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদে সম্মত হয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে মূলত ভারতের একটি ‘ট্রানজিট রাষ্ট্রে’ পরিণত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ট্রানজিটের দেশ। আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারে আমি বিশ্বাসী। আগে ভুটান ও নেপাল সরাসরি আলোচনায় আসেনি। এখন ভারত বলে দেয়ার পর ভুটান ও নেপাল লিংক হয়েছে।’ আমাদের মাতৃভূমি সম্পর্কে আওয়ামী মানসিকতা বোঝার জন্য অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যই যথেষ্ট। বাংলাদেশের পরজীবী সুশীল (?) সমাজের চিন্তা-চেতনাও আওয়ামী লীগ থেকে ভিন্নতর কিছু নয়। তাই এ দেশের জনগণের নাকের সামনে উন্নত বিশ্বের প্রাচুর্যের কল্পিত মুলা ঝুলিয়ে ট্রানজিটের ইস্যুতে তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য ভারত গত প্রায় দুই দশক ধরে এই সুশীল (?) সমাজকেই ব্যবহার করেছে। ঢাকা শহরের পাঁচতারা সব হোটেলে সেমিনার করে বায়বীয় পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, ভারতকে ট্রানজিট দিলে প্রতি বছর আমরা কমপক্ষে বিলিয়ন ডলার নিট আয় করব, এক ট্রানজিটের ভাড়ায় বাংলাদেশের জাতীয় আয় সিঙ্গাপুরের সমপরিমাণে উন্নীত হবে, একবার কানেক্টিভিটি হয়ে গেলে আমরা সড়কপথে জাপান পর্যন্ত যেতে পারব, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সিপিডি, বিলিয়া, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট ইত্যাকার সুশীল (?) সংগঠন বিদেশি আনুকূল্যে পালা করে দিনের পর দিন এসব সেমিনারের আয়োজন করেছে। প্রফেসর রেহমান সোবহান, ড. রহমতউল্লাহ, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ওয়ালিউর রহমান, ফারুক সোবহান, মোঃ জমির এবং অন্যান্য ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবী-আমলা একজোট হয়ে তাদের লেখায় ও বক্তব্যে ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ‘বেশুমার’ লাভ আবিষ্কার করেছেন। বাংলাদেশের তাবত্ সুশীল (?) ও ভারত সমর্থক মিডিয়ায় দিনের পর দিন ট্রানজিটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর ফলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যকার একটা বৃহত্ অংশ নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হয়েছে। এদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মগজ ধোলাইয়ের কাজ মোটামুটি সম্পন্ন হওয়ার পর এখন একই ব্যক্তিদের কণ্ঠে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে।
গত তিন মাসে এদের দেয়া বক্তব্য স্মরণ করা যাক। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ফতোয়া দিয়েছেন, আমরা নাকি ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের কাছে ভাড়া দাবি করলে একটি অসভ্য জাতিতে পরিণত হব। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর থিওরি হচ্ছে, ট্রানজিটের ভাড়া থেকে তেমন একটা অর্থপ্রাপ্তি না হলেও ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভারদের জন্য হোটেল, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি নির্মাণ করা হলে সেই সেবা খাত থেকে আমাদের প্রচুর আয় হবে। সেইসব ট্রাক ড্রাইভারের মনোরঞ্জনের জন্য লাভজনক আদিম ব্যবসার ব্যবস্থা করা হবে কি-না সে সম্পর্কে অবশ্য তিনি কিছু বলেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি এসব অর্থনীতির ঝুট-ঝামেলায় না গিয়ে দাবি করেছেন, ভারতকে ট্রানজিট না দিলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি isolated country তে রূপান্তরিত হবে। তিনি ফতোয়া দিচ্ছেন, ভারতীয় জুজুর ভয় না দেখিয়ে কানেক্টিভিটির স্বার্থে সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করা উচিত। মাঝখান থেকে কী উদ্দেশ্য সাধনে জানি না, অনেকটা হঠাত্ করেই তার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে দৃশ্যত খানিকটা সরে এসে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ বিশদভাবে দেখার জন্য সরকারকে নসিহত করছেন। ব্যাপারটা আমার কাছে অন্তত বাংলাদেশের সর্বনাশ নিশ্চিত হওয়ার পর এক পাল সুশীল (?) কে সঙ্গে নিয়ে দুই দশকব্যাপী উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালানোর দায়িত্ব এখন এড়ানোর নিষম্ফল প্রচেষ্টার মতোই মনে হচ্ছে। ভারতের চরণতলে মাতৃভূমির স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার দুই দশকের প্রক্রিয়ায় কার কতখানি রাষ্ট্রদ্রোহী ভূমিকা ছিল, সেটি ইতিহাস অবশ্যই একদিন নির্মোহভাবে বিচার করবে।
ট্রানজিট ইস্যুতে ক্ষমতাসীন মহাজোট, ভারত সরকার এবং এদেশের সুশীল (?) বুদ্ধিজীবীদের কাজ-কারবার দেখার পর আমাদের কথিত উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকারও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ভারত সরকার তাদের দেশের স্বার্থে যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের বুক চিরে ট্রানজিট পেতে চাইবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সরকারি দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায় বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এসক্যাপের (ESCAP) এর মতো বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। পুঁজিবাদ সহায়ক এসব প্রতিষ্ঠান যে মূলত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটা আমাদের সবার জানা। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোও এসব অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সহায়তা নিয়ে থাকে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রায় প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ে অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় এদের সর্বদা ভারতের প্রতি অধিকতর নমনীয় দেখতে পেয়েছি।
এর পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থানকে ঠেকানোর জন্য যে কৌশল গ্রহণ করেছে, সেখানে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আধিপত্যবাদী ভারত যেহেতু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্যতম মিত্রে পরিণত হয়েছে, সেজন্য বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার কোনো প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অনুভব করছে না। চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারতকে ব্যবহারের বিনিময় মূল্য স্বরূপ দক্ষিণ এশিয়ার মৌরশি পাট্টা আমাদের বৃহত্ প্রতিবেশীকে এক রকম বিনা প্রশ্নে দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত বিপুল জনসংখ্যার ভারতে শিক্ষার মান উন্নত হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এসক্যাপ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় নাগরিক এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা নীতিনির্ধারণী পদে বেশি সংখ্যায় কাজ করছে। সুতরাং, সেদিক দিয়েও বাংলাদেশসহ অন্য দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলো অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ছদ্মাবরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের সম্মতিতে ভারতের ইচ্ছাই একে একে বাস্তবায়িত হচ্ছে। জেনারেল মইনের আমলে ঢাকা-কলকাতা ট্রেন যোগাযোগ উদ্বোধনের দিনে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে বিচিত্র পোশাক পরিহিত তত্কালীন এডিবি প্রতিনিধি মিজ হুয়া দু এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর গান-বাজনার স্মৃতি আশা করি ভুলো বাঙালি মুসলমান এখনও ভুলে যায়নি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার প্রসঙ্গ না তুললে আমার রচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড শুরু করলে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। দীর্ঘ নয় মাস ধরে ভারতের জনগণ এবং সে দেশের সরকার শরণার্থীদের বাসস্থান এবং খাদ্যের ব্যবস্থা করে আমাদের অবশ্যই গভীর কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। অধিকন্তু, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহেও ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এগুলো সবই ইতিহাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় ভারতও কি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক দিয়ে লাভবান হয়নি? জন্মাবধি পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে চরম বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান না থাকলে ১৯৭১ সালে আমরা কি ভারতের কাছ থেকে একই ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করতাম? প্রকৃত ঘটনা হলো, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা কোনোভাবেই একতরফা দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো বিষয় ছিল না। স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করার জন্য আমরা যেমন ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ, একইভাবে নেহরু ডকট্রিনের আলোকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য পূরণে ১৯৭১ সালে আমাদের ভূমিকার জন্যও ভারতের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। চল্লিশ বছর আগে এক মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা প্রদান কোনো অবস্থাতেই ভারতকে আমাদের বিরুদ্ধে পানি আগ্রাসন চালানো, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে বাংলাদেশী নাগরিককে বিভিন্ন উপায়ে হত্যা, আমাদের জমি দখল, বাংলাদেশের চারদিকে অবমাননাকর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, বাংলাদেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সীমান্ত ঘেঁষে মাদকের কারখানা নির্মাণ এবং আমাদের মাতৃভূমির বুক চিরে তাদের পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ট্রানজিটের জন্য রাস্তা নির্মাণের নামে পুরো দেশটিকেই টুকরো টুকরো করার বৈধতা প্রদান করে না। সত্য কথা হলো, একমাত্র ভারতের প্রয়োজন মেটাতেই ট্রানজিট, বাংলাদেশের এখানে কোনোরকম ফায়দা নেই। ভারতের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার করে আমরা যে রাস্তা নির্মাণ করব, তার ওপর দিয়ে প্রধানত ভারতীয় যানবাহন সেদেশের পণ্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে চলাচল করবে। ওই রাস্তা দিয়ে আমাদের কোনো পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করবে না। একমাত্র ভুটান এবং নেপাল ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গেও ট্রানজিটের রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশের কোনো কানেক্টিভিটিও তৈরি হচ্ছে না। ভারতের মধ্য দিয়ে আমরা সড়কপথে চীন, পাকিস্তান যেতে পারলে তবেই তাকে প্রকৃত আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বলার সুযোগ ছিল। উপরন্তু ট্রানজিট দেয়া হলে বাংলাদেশ ক্রমেই ফিলিস্তিনিকরণ প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হবে। দেশের জনগণকে নির্বোধ বিবেচনা করার উন্নাসিকতা শাসকশ্রেণী যত তাড়াতাড়ি পরিহার করতে পারেন ততই তাদের জন্য মঙ্গল। যারা বাংলাদেশকে ‘ট্রানজিটের দেশ’ নামকরণ করে হেয় করেন কিংবা কানেক্টিভিটির বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ফেরি করে ভারতের ট্রানজিট জায়েজ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন, ইতিহাস তাদের একদিন নির্ভেজাল রাষ্ট্রদ্রোহী রূপেই বিবেচনা করবে। বাংলাদেশকে অধিকৃত ফিলিস্তিনের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি থেকে রক্ষা করতে হলে এই ট্রানজিটের বিরুদ্ধে একাত্ম হয়ে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হয়ে গেলে সেটি রদ করা দুর্বল দেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব প্রয়াস। ১৯৭২ সালে সম্পাদিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য চুক্তির অশুভ পরিণতি দেখার পরও আমরা যদি নির্বিকার ঘরে বসে থাকি, তাহলে একটি quasi-independent রাষ্ট্রের প্রায়মুখাপেক্ষি নাগরিক হওয়াই এদেশের জনগণের চূড়ান্ত বিধিলিপি।
ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগেই ভারতীয় শাসকশ্রেণী সিলেট থেকে খুলনা পর্যন্ত দখল করে নেয়ার যে হুমকি উচ্চারণ করেছে, তার মাধ্যমে আমার আশঙ্কার সারবত্তা প্রমাণিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য জনগণের ট্যাক্সে প্রতিপালিত বিশেষ বাহিনীর দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো ফায়দা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান এবং কবি ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহারের গণপ্রতিরক্ষা তত্ত্ব বাস্তবে রূপ দেয়ার আজ সময় এসেছে।

মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনঃ সুশাসন নির্বাসনে

ছর দশেক আগে সুশাসন বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত শব্দে পরিণত হয়েছিল। হেন দিন ছিল না যেদিন দেশের কোনো না কোনো স্থানে good governance অর্থাত্ বাংলায় সুশাসন নিয়ে একটা সেমিনারের আয়োজন না হতো। এ-জাতীয় ওয়ার্কশপ আয়োজনে বিদেশি অর্থসাহায্য পাওয়াও তখন সহজ ছিল। সুশাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা কেন জানি না শেখ হাসিনার এবারের শাসনামলে লাপাত্তা হয়ে আছেন। সেসব ‘ডাকসাইটে’ সেমিনারজীবীর মধ্যে অনেকে অবশ্য ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের দু’বছর জরুরি সরকারে যোগ দিয়ে জেনারেল মইনের হুকুম অকাতরে তামিল করেছেন। তাদের সম্ভবত ধারণা হয়েছিল, মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আজব প্রকৃতির মিশ্র সরকারই কেবল পেছন থেকে সেনা সমর্থনের জোরে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাদের বিবেচনায় হয়তো শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে! অতএব উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার পর তারা নীরবতাকেই শ্রেয় মনে করছেন।
যাকগে পুরনো সব কথা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দিনবদলের সরকারের আমলে ‘বাঙালি’ সুশাসনের চেহারাটা বরঞ্চ খানিক দেখার চেষ্টা করা যাক। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এই বিষয়ের পণ্ডিতরা good governance-এর বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। আমি পণ্ডিতদের বিতর্কে না জড়িয়ে জাতিসংঘের সংজ্ঞাটিকে গ্রহণ করে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করব। UN বলছে, good governance-এর নিম্নোক্ত আটটি উপাদান রয়েছে :
* Consensus Oriented (ঐকমত্য সম্পর্কিত)
* Participatory (অংশীদারিত্বভিত্তিক)
* Rule of Law (আইনের শাসন)
* Effective and efficient (ফলপ্রসূ ও দক্ষ)
* Accountable (দায়বদ্ধ)
* Transparent (স্বচ্ছ)
* Responsive (দায়িত্বপূর্ণ)
* Equitable and inclusive (নিরপেক্ষ এবং সর্বব্যাপী)
উপরিউক্ত সংজ্ঞার আলোকে সুশাসনকে সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে বলা যেতে পারে, এটি আইনের শাসনভিত্তিক, দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত, দায়বদ্ধ এবং সর্বতোভাবে দলীয়করণমুক্ত একটি শাসনব্যবস্থা। বর্ণিত পাঁচটি উপাদানের মধ্যেই আমার আজকের লেখাটি সীমিত রাখার চেষ্টা করব।
বর্তমান বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুরবস্থা বোঝার জন্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। এ মাসেরই ১১ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত কলামে তিনি লিখেছেন, “বিরাজমান পরিস্থিতি আমার কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে হয়। কী মূল্যস্ফীতি, কী আইনশৃঙ্খলা, কী প্রশাসন, কী অর্থনীতি, কী পররাষ্ট্রনীতি, কী দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের পরিস্থিতি—সর্বত্রই একটা ক্রমাবনতিশীল চেহারা প্রতিদিন অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে। দেশের এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ-আশঙ্কা ব্যক্ত না করে আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। দেশের এই অধঃগতিতে এমন একটা লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে আমাকে আশ্বাসের সুরে বলতে পারবে যে আমি যা দেখছি তা সব ভুল এবং আমার যে উদ্বেগ, এটার কোনো ভিত্তিই নেই।... আমাদের চিত্তের উন্মত্ততা, আমাদের কর্মের নিষ্ঠুরতা ও আমাদের বিচারবুদ্ধির দেউলিয়াপনা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইতিপূর্বে আমি আমার দেশে এই চরম মত্তাবস্থা কোনো দিন দেখিনি।”
বিচারপতি মোস্তফা কামাল তাঁর অবসর জীবনে পাদপ্রদীপ থেকে দূরে থাকতেই অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দেশের সার্বিক অবস্থা কতখানি রসাতলে গেলে বিবেকের তাড়নায় সেই নিভৃতচারী মানুষটি কলম ধরেছেন, তা সহজেই অনুমেয়। আইনের শাসনের তিন অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, যথাক্রমে বিধিনিয়ম দ্বারা আবদ্ধ প্রশাসন, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতা এবং নিরপেক্ষ বিচারিক পুনরীক্ষণ বাংলাদেশে নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনযাপনের বাস্তবতায় আজ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
সরকারের দক্ষতা প্রমাণের জন্যে মাত্র একবার বাসে চড়ে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত যাওয়ার চেষ্টা করলেই চলবে। এই রাস্তার ধারেই মাওনার কাছাকাছি এক স্থানে আমার একটি রফতানিমুখী সিরামিক কারখানা ছিল। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের জুনের ১ তারিখে গ্রেফতার হওয়ার আগপর্যন্ত সেই কারখানায় নিয়মিত যাতায়াত করেছি। গুলশানের বাসগৃহ থেকে মাওনা পৌঁছাতে কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া সচরাচর দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় হয়নি। জেলে বন্দি থাকতেই বৈরী সরকারের নানা প্রকার অসহযোগিতার কারণে কারখানাটি বিক্রি করে দেয়ায় সৌভাগ্যবশত এখন আর আমাকে ওই পথে যেতে হয় না। আমার দেশ পত্রিকার স্থানীয় সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, মাওনা পর্যন্ত যাওয়ার দুঃসাহসী প্রচেষ্টা গ্রহণ করলে রাস্তার বিশাল বিশাল সব গর্তে পড়ে গাড়ি না ভাঙলে একই পথ পার হতে বর্তমানে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। খানাখন্দকে পূর্ণ মহাসড়কটি (?) ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিগত এক সপ্তাহ ধরে বাস মালিকরা ওই রাস্তায় বাস চালাচ্ছেন না।
কাছের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অবস্থাও তথৈবচ। রাস্তা সংস্কারের দাবিতে মিনিবাস মালিক সমিতি ওই রুটেও তাদের বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যেও যে কোনো সময় একই কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। পোশাকশিল্প অধ্যুষিত গাজীপুর, মাওনা, শ্রীপুরের রফতানিকারকরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। তাদের পক্ষে কাঁচামাল এবং তৈরি পোশাক পরিবহন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ভদ্রলোক আমার সিরামিক কারখানাটি কিনেছেন, তার জন্য আন্তরিক সহানুভূতি বোধ করছি।
ক’দিন পরেই বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যকার ৮৭ শতাংশ মুসলমান ধর্মাবলম্বীর সবচেয়ে আনন্দের উত্সব ঈদুল ফিতর আসছে। সে সময় বিপুল সংখ্যক জনগণ প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ কাটানোর জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া-আসা করবেন। দেশের রাস্তা-ঘাটের বর্তমান দুরবস্থায় তাদেরকে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যে পড়তে হবে বলেই ধারণা করছি। নদী-নালায় পানি থাকলেও না হয় আওয়ামী লীগের প্রিয় বাহন নৌকা ব্যবহার করার চেষ্টা করা যেত। কিন্তু বন্ধু রাষ্ট্রের উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহারের বদান্যতায় সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত একটি পত্রিকায় মাস দুয়েক আগেই লাল হরফে চার কলামব্যাপী শিরোনাম দেখেছিলাম, ‘আধা ঘণ্টায় গাজীপুর থেকে সদরঘাট’। আগামী দিনের রূপকথার এক কল্পকাহিনী ফাঁদা হয়েছিল সেই শীর্ষ সংবাদে। গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল মার্কা গল্পের মতো করে জনগণকে স্বপ্ন দেখিয়ে বলা হয়েছে, সরকার হাজার কোটি টাকার এমন এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে যেটি বাস্তবায়ন হলে নাকি মাত্র তিরিশ মিনিটে গাজীপুর থেকে বাসে চেপে সদরঘাট পৌঁছানো যাবে। আরে বাবা, ভিক্ষা চাই না, দয়া করে কুকুর সামলান। বাংলাদেশকে আর সিঙ্গাপুর বানানোর দরকার নেই। দয়া করে মহাসড়কগুলো পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিন। ডিজিটাল থেকে আমাদের রক্ষা করুন, আমরা এনালগ দিয়েই কাজ চালিয়ে নেব। এ ধরনের সরকার তোষণকারী সংবাদপত্র বাংলাদেশের জনগণের অসহায়ত্ব নিয়ে তামাশা করে একপ্রকার বিকৃত আনন্দ বোধ করে থাকে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকারের সাফল্যও চমত্কৃত হওয়ার মতো। গত আড়াই বছরে দাম অন্তত দ্বিগুণ হয়নি এমন কোনো পণ্য বাজারে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। কিন্তু তাতে কী! আমাদের দক্ষ অর্থমন্ত্রী জনগণকে সপ্তাহে একদিন বাজারে না যাওয়ার প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন। তিনি সম্ভবত সপ্তাহের সাত দিনই বাজারে গিয়ে কেনা-কাটায় অভ্যস্ত। অধিকতর দক্ষ এবং বাংলাদেশের অন্যতম বিত্তবান বাণিজ্যমন্ত্রী একধাপ এগিয়ে দরিদ্র মানুষদের আরও কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বহুদিন আগে দেখা সত্যজিত্ রায়ের রূপকধর্মী চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’র কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো এত দক্ষ মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর চারদিকে থাকতে সরকারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে সাধ্য কার?
প্রশাসনে দুর্নীতির ভয়াবহ ও লাজলজ্জাহীন বিস্তার নিয়ে কোনো কিছু লেখার কথা কল্পনায় আনলেও এখন এদেশে যে কোনো সাংবাদিকের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক বহুল আলোচিত দুর্নীতির অভিযোগের সংবাদ ছাপিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার এবং সার্বিকভাবে আমার পত্রিকার কী হাল হয়েছে, তার খবর দেশবাসী তো বটেই, 'The Economist'-এর কল্যাণে বিশ্ববাসী পর্যন্ত জেনে গেছে। শীর্ষ নিউজে সরকারের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার পর সম্পাদক একরামুল হককে কিঞ্চিত্ রিমান্ড থেরাপি প্রয়োগের মাধ্যমে সাপ্তাহিক ও অন-লাইন পত্রিকাটিকে সংবাদ প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে। আমার দেশ পত্রিকা যেহেতু সাহসের সঙ্গে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা করে চলেছে, তাই কারও হুমকির পরোয়া না করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতির তথ্যভিত্তিক সংবাদ এত নির্যাতন সত্ত্বেও আগের মতোই প্রকাশ করছে। লন্ডনের ‘দি ইকোনমিস্ট’ বর্তমান সরকারের আমলের দুর্নীতির সর্বব্যাপী বিস্তারকে astonishing বা তাক লাগানো বলে অভিহিত করেছে। ইকোনমিস্ট লিখেছে : 'Corruption flourishes at levels astonishing even by South Asian standards.' (দুর্নীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা দক্ষিণ এশিয়ার মাপকাঠিতেও তাক লাগানো।) আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের পক্ষে বোধহয় ইকোনমিস্টের এডিটর Daniel Franklin (দানিয়েল ফ্রাঙ্কলিন)-কে ধরে এনে ক্যান্টনমেন্ট থানা, ডিবি অথবা টিএফআই সেলে নিয়ে আমার এবং একরামুল হকের মতো দাওয়াই প্রয়োগ সম্ভব হবে না। তবে ক্রোধান্বিত কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী লন্ডনের ইকোনমিস্ট জঙ্গিবাদ, মাদক ও অস্ত্র বিক্রির অর্থায়নে পরিচালিত—এই তাক লাগানো অভিযোগ করে স্বভাবসুলভ হুঙ্কার সহকারে দাবি করেছেন, ‘টুডে আর টুমরো’ তারা ক্ষমা চাইবে। বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ইকোনমিস্টের সম্পাদক বিশ্বের সাত নম্বর ক্ষমতাধর নারী, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোড়হস্তে ক্ষমা চাইছেন, এমন দৃশ্য দেখতে পেলে এদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে অবশ্যই গর্বে আমার বুক ফুলে উঠবে।
দায়বদ্ধতার প্রশ্নে অবশ্য বর্তমান সরকারকে একশ’র মধ্যে একশ’ নম্বর না দিলে আমি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে পড়ব। ২০০৮ সালে যারা টাকার থলে দিয়ে নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল, গত আড়াই বছরে তাদের সব দায়-দেনা সুদসহ মিটিয়ে দিয়েছে সকৃতজ্ঞ মহাজোট সরকার। উদাহরণস্বরূপ ট্রানজিটের নামে দেশকে টুকরো টুকরো করে প্রতিবেশীকে করিডোর দেয়া হচ্ছে, ভৌগোলিকভাবে অতি ক্ষুদ্র বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার জমি কেটে নিয়ে এমনভাবে অকাতরে বৃহত্ ভারতকে দান করা হচ্ছে, যাতে মনে হতে পারে ষোল কোটি মানুষের এই দেশ কোনো বিশেষ ব্যক্তির পৈতৃক জমিদারি, সীমান্তে পরাক্রমশালী আঞ্চলিক পরাশক্তি যাতে বিনা প্রতিরোধে আমাদের অসহায়, দরিদ্র নাগরিকদের যথেচ্ছ হত্যা করতে পারে, সেই লক্ষ্য পূরণে ঐতিহ্যবাহী, শক্তিশালী বিডিআর ভেঙে দুর্বল বিজিবি গঠন করা হয়েছে, ভারতের পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশস্তি করে বলা হচ্ছে, ভারত মুখ ফুটে চাইবার আগেই বাংলাদেশ সবকিছু উজাড় করে দিচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এতকিছুর পর সুশাসনের অন্যতম উপাদান দায়বদ্ধতা নিয়ে আমার অন্তত আর কোনো মন্তব্য নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের কাছে স্নেহের সুরে আমার পুলিশ বাহিনী বলে উল্লেখ করে থাকেন। সেই পুলিশ বিভাগ দিয়েই প্রশাসনে দলীয়করণের চিত্রটি দেখার চেষ্টা করা যাক।
রাজধানীর থানাগুলোতে ওসিসহ পুলিশ বিভাগের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে শুধু আওয়ামীপন্থী হলেই এখন চলছে না, তার সঙ্গে একটি বা দু’টি বিশেষ জেলার অধিবাসী হওয়াটাও অত্যাবশ্যক। তার ফলে জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় পালিত অথচ সরকারদলীয় ক্যাডারের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের ধৃষ্টতা এতখানি বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তারা বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে প্রকাশ্য দিবালোকে, কয়েক ডজন টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কিল, ঘুষি, লাথি মেরে ও লাঠিপেটা করে অজ্ঞান করার পর সদম্ভে বলতে পারে, পুলিশের লাঠি চুমু খাওয়ার জন্য দেয়া হয়নি।
প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগের অবস্থাও পুলিশের মতোই। এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জেনেছি, সরকারি ব্যাংকে একটা সামান্য চাকরি পেতেও নাকি আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। এই সুযোগে প্রত্যয়নপত্রের বিনিময়ে ‘বঙ্গবন্ধু’র আদর্শের সৈনিকদের আয়-রোজগারের অবশ্য একটা বন্দোবস্ত হয়েছে। ঘরে ঘরে চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারলেও সরকার আওয়ামী পরিবারের জন্য চাঁদাবাজির নিত্য-নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে চলেছে। সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদগুলোতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সব সরকারের আমলেই রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। তবে এতদিন পর্যন্ত মেজর, লেফটেন্যান্ট-কর্নেল ইত্যাদি পদে পদোন্নতি বিবেচনায় কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা এবং সততাই মুখ্য ছিল। দলীয়করণ এতটা নিম্নপর্যায়ে এতদিন প্রবেশ করেনি। কিন্তু দিনবদলের সরকার এই তুলনামূলক নিম্নপদগুলোতেও রাজনীতি আমদানি করে আমাদের সেনাবাহিনীর সার্বিক পেশাদারিত্ব ও দক্ষতাকেই আজ প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। কোনো কর্মকর্তার দূর সম্পর্কের কোনো তুতো-ভাই বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার চাকরির বারোটা বেজে যেতে পারে।
সর্বশেষ আলোচনা বিচার বিভাগের দলীয়করণ নিয়ে। বিচার বিভাগে দলীয়করণের মাত্রা দেশে এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, এ বিষয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ মন্তব্য-প্রতিবেদন লেখা আবশ্যক। সে কাজটি আগামী বুধবারের জন্যে তুলে রাখলাম। তবে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আজ শুধু ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি। দেশের এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় আইনজীবী, যার একাধিক ছাত্র প্রধান বিচারপতির পদ অলঙ্কৃত করেছেন, তিনি আগস্টের ১০ তারিখে ‘সাপ্তাহিক বুধবার’ পত্রিকায় এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘আদালতে গেলে শোনা যায় আওয়ামী লীগ বেঞ্চ, বিএনপি বেঞ্চ, জামায়াত বেঞ্চ, এগুলো কি শুনতে ভালো লাগে? এভাবেই আমাদের বিচার বিভাগ চলছে।’
২০০৮ সালের নির্বাচনপূর্ব ঢাকঢোল পেটানো আওয়ামী লীগের জমকালো ইশতেহারে সুশাসন সম্পর্কে নিম্নোক্ত প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল :
“আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে মানবাধিকার সংরক্ষণ করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করা হবে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ভিত্তি হবে মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, সততা ও দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে প্রজাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে প্রশাসনকে ব্যবহার বন্ধ নিশ্চিত করা হবে।” দশ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর মতো সুশাসন প্রতিষ্ঠার গালভরা প্রতিশ্রুতিও সরকারের অর্ধেক মেয়াদের মধ্যেই শূন্যে মিলিয়ে গেছে।
জনগণকে প্রতারণাপূর্বক প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসিয়ে ক্ষমতালাভ করে বর্তমান সরকার সুশাসনকে পুরোপুরি নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। মানুষের জীবনযাপনের জন্য ন্যূনতম চাহিদা পূরণ তো দূরের কথা, কারও জীবনেরই যেন এদেশে কোনো মূল্য নেই। বছরের পর বছর ধরে কমিশন সংগ্রহ ও লুটপাটে ব্যস্ত যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অবহেলায় সংস্কারবিহীন সড়কে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ অবনতিদৃষ্টে মনে হয় না দেশে আদৌ কোনো সরকার আছে। খোদ রাজধানীতে সন্ধ্যারাতে শত শত মানুষের চোখের সামনে বন্দুকযুদ্ধের নামে নিরাপত্তা বাহিনী অবলীলাক্রমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। অপরদিকে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ নাগরিকের সন্ধ্যা নামলে রিকশা-সিএনজিতে চলাচল করাই বিপজ্জনক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশের সহযোগিতায় যে হারে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা চলছে, তাতে করে বহির্বিশ্বে আমাদের একটি বিকারগ্রস্ত জাতি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। এভাবে একটি সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা বিকশিত হতে পারে না।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মানবতাবাদী লেখক, বুদ্ধিজীবী টমাস পেইন (Thomas Paine) তার 'Rights of Man' গ্রন্থে বলেছেন, একজন নাগরিক তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (liberty) রাষ্ট্রপ্রদত্ত নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে সরকারের কাছে গচ্ছিত রাখে। পেইন আরও বলছেন, সরকার যদি জনগণের গচ্ছিত সেই বিশ্বাসের (trust) সঙ্গে তঞ্চকতা করে, তাহলে সেই সরকার পরিবর্তনের সার্বভৌম ক্ষমতা (sovereign power) জনগণ অবশ্যই প্রয়োগ করতে পারে। টমাস পেইনের সঙ্গে সহমত পোষণকারী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে বিষয়টি জনগণ ও সরকারের মধ্যকার এক ধরনের সামাজিক চুক্তি (social contract)। একই শতকের ব্রিটিশ উদারনীতিক দার্শনিক জন লক (John Locke) আরও একটু এগিয়ে 'Two Treaties of Government' গ্রন্থে জনগণ কর্তৃক সরকারকে প্রদত্ত ক্ষমতাকে শর্তাধীন (conditional) এবং অস্থায়ী (temporary) রূপে অভিহিত করেছেন। তিনি লিখেছেন :
''...have set limits to the duration of their legislative, and made this supreme power in any person or assembly only temporary, if it is forfeited; upon the forfeiture of their rules, or at the determination of the time set, it reverts to the society, and the people have the right to act as supreme, and continue the legislative in themselves or place it in a new form, or new hands, as they think good.'' (...আইনপ্রণেতাদের মেয়াদকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, এবং কোনো ব্যক্তি অথবা আইনসভাকে প্রদত্ত এই ক্ষমতা অস্থায়ীমাত্র; প্রদত্ত ক্ষমতা প্রত্যাহৃত হলে; বিধি-বিধান প্রত্যাহার অথবা মেয়াদপূর্ণ হলে, সেই ক্ষমতা সমাজের কাছেই ফিরে আসে, এবং সে পরিস্থিতিতে জনগণের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে তাদের সুবিবেচনা প্রয়োগ করে আইনসভার দায়িত্ব নিজেরা গ্রহণ করা অথবা নতুন পদ্ধতি নির্মাণ করা অথবা নতুন হাতে ক্ষমতা অর্পণ করার।)
বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যেখানে ন্যূনতম আইনের শাসনের কোথাও কোনো অস্তিত্ব নেই, সেক্ষেত্রে সুশাসন খুঁজে বেড়ানো অর্থহীন। অতএব, টমাস পেইন এবং জন লকের তত্ত্ব অনুযায়ী সার্বভৌম জনগণ ক্ষমতাসীনদের একতরফা চুক্তি ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করে বিকল্প শাসন ব্যবস্থার দায়িত্ব নিজেরা গ্রহণ করবে কিনা, সেটাই জিজ্ঞাসা।

মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশে আক্রান্ত ইসলাম

’দিন আগে অন্য একটি পত্রিকায় কর্মরত এক সিনিয়র রিপোর্টারের কাছ থেকে বাংলাদেশে ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়ায় প্রচারণার এক বিস্ময়কর গল্প শুনেছি। একদিন পত্রিকাটির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নীতিনির্ধারক সেই রিপোর্টারকে ডেকে এদেশে ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ পুনরুত্থানের ওপর জরুরি ভিত্তিতে একটা স্টোরি লিখতে নির্দেশ দিলেন। সাংবাদিকটি দেশের কোন জায়গায় নতুন করে এই জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, সেই তথ্য জানতে চাইলে সম্পাদক মহোদয় অগ্নিশর্মা হয়ে তাকে বললেন, জঙ্গি আছে কী নেই সেটা বিষয় নয়, স্টোরি লিখতে বলেছি, লিখে আনেন। বেচারা সিনিয়র রিপোর্টার বুঝতে পারলেন পেশাদার, ‘স্বাধীন’ সম্পাদক মহাশয় মালিকের নির্দেশ পালন করছেন মাত্র। পত্রিকার মালিকও হয়তো সরকারের ওপর মহল কর্তৃক বিশেষ উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রচারণা চালানোর জন্য নির্দেশিত হয়েছেন।
আমার পত্রিকা অফিসে বসে সেই সিনিয়র রিপোর্টার যেদিন এই ঘটনাটি বলছিলেন, তার আগের দিনেই চরম মুসলমানবিদ্বেষী এক মৌলবাদী খ্রিস্টান যুবক নরওয়ের রাজধানী অসলোতে গুলি চালিয়ে এবং বোমা ফাটিয়ে প্রায় একশ’ স্বদেশীকে হত্যা করেছে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সে নাকি ইউরোপকে মুসলিম অধিগ্রহণ থেকে রক্ষা করার ‘মহান’ উদ্দেশ্যেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এই সন্ত্রাসী কাণ্ডের পর ‘সব মুসলমান সন্ত্রাসী নয়, তবে সব সন্ত্রাসী মুসলমান’, ভারত ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং আমাদের সুশীল (?)দের একাংশের এই প্রিয় তত্ত্বের কী হাল হবে, সেটি তারাই বিবেচনা করুক।
ইউরোপে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে ইউরোপোল-২০০৯ প্রতিবেদন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-২০০৮ সময়কালে ইউরোপে যতগুলো সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ০.৪ শতাংশ মুসলিম উগ্রবাদী কর্তৃক পরিচালিত হয়। ২০০৬ সালে ৪৯৮টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে, ২০০৭ সালে ৫৮৩টি ঘটনার মধ্যে ৪টিতে এবং ২০০৮ সালে ৫১৫টির মধ্যে শূন্যটিতে ইসলামিস্টরা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯৯.৬ শতাংশ সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য অমুসলিমরাই দায়ী।
আমার আজকের লেখার মূল বিষয়বস্তু বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিধায় পাশ্চাত্য নিয়ে কথা আর না বাড়িয়ে স্বদেশের দিকে দৃষ্টিপাত করছি। বর্তমান সেক্যুলার সরকারের আড়াই বছরে বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চরম নিন্দনীয় যে কাজ-কর্মগুলো করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে কয়েকটির দিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছি।
১. ২০০৯ সালের ২৮ মার্চ ‘সন্ত্রাস নিরসনে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেছেন, পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রয়েছে, তার সবই ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে (!)। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়।
২. ২০০৯ সালের ১ এপ্রিল এদেশের আওয়ামীপন্থী শিল্পপতিদের অর্থে পরিচালিত সুশীল (?) থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে বক্তৃতায় বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছিলেন, কওমি মাদরাসাগুলো এখন জঙ্গিদের প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কওমি মাদরাসাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। এসব কওমি মাদরাসায় যে শিক্ষা দেয়া হয়, তা কূপমণ্ডূকতার সৃষ্টি করছে। ’৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সংশোধনী এনে ’৭২-এর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে নস্যাত্ করার ফলেই এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে।
৩. ২০০৯ সালের ২৩ এপ্রিল বরিশালের নিউ সার্কুলার রোডের এক বাড়িতে র্যাব হানা দিয়ে বোরকা পরে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য জড়ো হওয়ার অপরাধে ২১ নারীকে গ্রেফতার করে। র্যাব সাংবাদিকদের কাছে তাদের অভিযানের সংবাদ জানালে তা ফলাও করে ছাপা হয়। দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য না পেয়ে ২১ পরহেজগার নারীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ ২ মাস পর ২৩ জুন আদালত তাদের বেকসুর খালাস দেন।
৪. ২০০৯ সালের ১৯ জুন রাজশাহীতে জঙ্গি সন্দেহে ১৫ নারী ও শিশুকে গ্রেফতার করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওইদিন বিকালেই মুচলেকা দিয়ে তাদের মুক্ত ঘোষণার পর আবার ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের সম্পর্কে ব্যাপক তদন্ত করেও জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পায়নি। শেষ পর্যন্ত আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিলে জুলাই মাসের ১ তারিখে ১১ দিন কারাবাস শেষে ১৫ জন নিরপরাধ নাগরিক মুক্তি পান।
৫. বোরকা পরার অপরাধে ২০০৯ সালের ৩ জুলাই পিরোজপুর জেলার জিয়ানগরে ছাত্রলীগের বখাটে কর্মীদের প্ররোচনায় পুলিশ জঙ্গি সন্দেহে তিন তরুণীকে গ্রেফতার করে। তারপর পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে তিন তরুণীকে ঢাকায় টিএফআই সেলে নিয়ে আসা হয়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত তরুণীদের বিরুদ্ধে মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন অমর সিংহ। এ সময় তাদের বোরকা খুলতে বাধ্য করে মহাজোট সরকারের দিনবদলের পুলিশ। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদেও কোনো জঙ্গি সংযোগের কাহিনী বানাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফাইনাল রিপোর্ট দিতে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি থেকে অবশেষে তিন অসহায়, নিরপরাধ তরুণী মুক্তি পান।
৬. ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয় যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. একেএম শফিউল ইসলাম তার ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি ক্লাসে ‘মধ্যযুগীয় পোশাক বোরকা’ পরা যাবে না এবং এটি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কোনো পোশাক হতে পারে না বলে ফতোয়া জারি করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটি বিভাগীয় কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে আমার ক্লাসে কোনো ছাত্রীকে আমি বোরকা পরতে দেব না।
৭. ২০১০ সালের ১ আগস্ট বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট পরিচয়দানকারী জনৈক দেবনারায়ণ মহেশ্বর পবিত্র কোরআন শরিফের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। রিট আবেদনে তিনি দাবি করেন, হজরত ইবরাহিম (আ.) তার বড় ছেলে ইসমাইল (আ.)কে কোরবানির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন বলে যে আয়াত পবিত্র কোরআন শরিফে রয়েছে, তা সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, হজরত ইবরাহিম তার ছোট ছেলে হজরত ইসহাক (আ.)কে কোরবানি করতে নিয়ে যান। এ বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা ও কোরআনের আয়াত শুদ্ধ করার জন্য দেবনারায়ণ মহেশ্বর আদালতের কাছে প্রার্থনা করেন। আদালত রিট খারিজ করে দেয়ার পর দেবনারায়ণের এই চরম হঠকারী ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পুলিশ দেবনারায়ণ মহেশ্বরকে কর্ডন সহকারে এজলাস থেকে বের করে তাদের ভ্যানে প্রটেকশন দিয়ে আদালত এলাকার বাইরে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যায়।
৮. বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের দ্বৈত বেঞ্চ ২০১০ সালের ২২ আগস্ট স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) আদেশ প্রদান করেন যে, দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে বোরকা পরতে বাধ্য করা যাবে না। ‘নাটোরের সরকারী রাণী ভবানী মহিলা কলেজে বোরকা না পরলে আসতে মানা’ শিরোনামে ২২ আগস্ট একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয় বোরকা পরিধানের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো এই রায় দেন।
৯. ২০১১ সালের ২ জুন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অন্যতম নেতা মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ দাবি করেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি—এ তিনটির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ওইদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের মতবিনিময় সভা থেকে ঘোষণা করা হয় যে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম থাকলে হরতাল দেয়া হবে।
১০. ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী গ্রহণ করে আমাদের সংবিধানের মূল নীতি থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপন করা হয়।
১১. ২০১১ সালের ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতৃভূমি টুঙ্গিপাড়া উপজেলার জিটি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস দশম শ্রেণীর ক্লাসে দাড়ি রাখা নিয়ে সমালোচনাকালে হজরত মোহাম্মদ (সা.)কে ছাগলের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে ওই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে পুরো এলাকায় সাধারণ জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে শঙ্কর বিশ্বাস টুঙ্গিপাড়া থেকে পালিয়ে যান।
১২. ২০১১ সালের ২৬ জুলাই ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মদন মোহন দাস মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র হজ নিয়ে কটূক্তি করেন। সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে এক সভায় তিনি মন্তব্য করেন, ‘এক লোক সুন্দরী মহিলা দেখলেই বিয়ে করে। এভাবে বিয়ে করতে করতে ১৫/১৬টি বিয়ে করে। মুহাম্মদও ১৫/১৬টি বিয়ে করেছে। তাহলে মুসলমানদের মুহাম্মদের হজ করা স্থান মক্কায় গিয়ে হজ না করে ওই ১৫/১৬টি বিয়ে করা লোকের বাড়িতে গিয়ে হজ করলেই তো হয়।’
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ৮৫ শতাংশ যে জন্মসূত্রে মুসলমান এ নিয়ে সম্ভবত বিতর্ক নেই। সেই দেশে আড়াই বছর ধরে অব্যাহতভাবে ইসলাম, কোরআন, হাদিস এবং মহানবী (সা.)কে কটাক্ষ করার অভ্যাস চর্চার ফলে ইসলামবিদ্বেষ এখন সরকারের সর্বত্র প্রায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যাধির ভাইরাস ক্ষমতাসীন মহলের সব পর্যায়ের লোকজন অকাতরে বিতরণ করে চলেছেন। ইউরোপে অসুস্থ ইসলামবিদ্বেষ সর্বব্যাপী হয়ে ওঠার বিষক্রিয়াতেই নরওয়েতে অ্যানডার্স বেরিং ব্রেইভিক (Anders Behring Breivik) নামক খ্রিস্টান মৌলবাদী ঘাতকের উত্থান ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে ইসলাম, মুসলমান এবং আমাদের মহানবী (সা.)কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চর্চা চলছে। ডেনমার্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে সাম্প্রদায়িক কার্টুন ছাপা এবং বাকপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে পাশ্চাত্যের জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের এই অতীব নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডকে সমর্থনের ফলে জন্মলাভ করা বিষবৃক্ষের স্বাদ তারাই আজ আস্বাদন করছে।
নরওয়ের সুবুদ্ধিপূর্ণ রাজনীতিবিদরা অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, এই ঘৃণ্য মানসিকতার আশু চিকিত্সা করা না হলে পশ্চিমের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপে এ-জাতীয় অন্ধ ধর্মীয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ বিকশিত হওয়ার ফলেই তখন সেখানে যাজকদের নির্দেশে ডাইনি আখ্যা দিয়ে নারীদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপের দেশে দেশে চরমপন্থী খ্রিস্টানদের হাতে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা নিগৃহীত, অত্যাচারিত হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মতো করেই আজ পূর্ব ইউরোপে ইহুদি বিদ্বেষ এবং পশ্চিম ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। অসলো হত্যাকাণ্ডের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসলামবিদ্বেষী পশ্চিমা মিডিয়া কর্তৃক এর দায়ভার কথিত ইসলামী জঙ্গির ঘাড়ে চাপানোর দুর্ভাগ্যজনক অপচেষ্টাও আমরা লক্ষ্য করেছি। ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটিতে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় শত শত মার্কিন নাগরিক নিহত হলে সেখানেও প্রাথমিকভাবে মৌলবাদী মুসলমানদের দায়ী করা হয়েছিল। তার ক’দিনের মধ্যেই প্রকৃত ঘাতক মৌলবাদী খ্রিস্টান টিমোথি ম্যাকভেই (Timothy McVeigh)-এর নাম বিশ্ববাসী জেনে ফেলে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত সুশীল (?) বাংলা দৈনিকে মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিকে কটাক্ষ করে ইউরোপের অনুরূপ ছড়া এবং কার্টুন ছাপা হলে দেশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেনারেল মইনের তত্কালীন জরুরি সরকারের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব উবায়দুল হকের কাছে উপস্থিত হয়ে পত্রিকাটির প্রখ্যাত ‘সেক্যুলার’ সম্পাদকের জোড় হস্তে ক্ষমাপ্রার্থনার ফলে সেই সময় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ক্ষোভ খানিকটা প্রশমিত করা সম্ভব হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত নরওয়ের ব্রেইভিকের সমতুল্য ইসলামবিদ্বেষ সময়-সুযোগমত জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা প্রচার করলেও অন্তরে এদের অধিকাংশই চরমভাবে সাম্প্রদায়িক। এদের সাম্প্রদায়িকতা অবশ্য মূলত ইসলাম ধর্মবিরোধী। ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্মমতের প্রতিই তাদের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের দাবি অনুযায়ী ডিজিএফআই’র কারসাজিতে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশে চিহ্নিত ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীর এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্মের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত আক্রমণ চালানোর সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। গত আড়াই বছরে ইসলাম ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর প্রাথমিক কিছু নমুনা আমরা দেখতে পেয়েছি।
বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক যে বর্তমান সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সেটি সম্ভবত নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়। গত এক বছরের স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সবক’টি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে যে কোনো নিরপেক্ষ বিশ্লেষক নিশ্চিতভাবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, মহাজোট সরকারের পায়ের তলায় আর মাটি নেই। জনসমর্থনহীন শাসকশ্রেণী যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বাভাবিকভাবেই ক্রমেই অতিমাত্রায় বিদেশনির্ভর হয়ে পড়ছে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে ভারতের সব অন্যায্য চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর একমাত্র বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মিত্রে পরিণত হতে পেরেছেন। সুতরাং ধরে নেয়া যেতে পারে যে, ভারতীয় শাসককুল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসীন রাখার জন্য যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালাবে।
লন্ডনের ‘ইকোনমিস্টে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও ভারত মহাজোটকে টাকার থলি এবং এন্তার পরামর্শ দিয়ে নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় একমাত্র ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশের জনমতের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় টিকে থাকা যে সম্ভব নয়, সেটা শেখ হাসিনার মতো ঝানু রাজনীতিবিদ অবশ্যই বোঝেন। ২০০৮-এর পরিস্থিতির মতো ভারতের সমর্থনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন যুক্ত হলে দেশের জনগণকে তখন মহাজোটের আর তোয়াক্কা না করলেও চলবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অব্যাহত ইসলামবিরোধিতা সম্ভবত সেই সমর্থন আদায়েরই কৌশল।
বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিল শেখ হাসিনারই আগের শাসনামলে। সেই দুর্ভাগ্যজনক ও চরম নিন্দনীয় জঙ্গিবাদও মাথাচাড়া দিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই। আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েট দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে কিছু বাংলাদেশী নাগরিকও যোগদান করেছিল। তারাই এদেশে মূলত জঙ্গিবাদের বীজ বহন করে নিয়ে এসেছে। এখানে উল্লেখ্য, সে সময় আফগানিস্তানের রণাঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো তাদের আদর্শগত সোভিয়েটবিরোধিতার কারণে মুজাহিদদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। ফলে আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা আফগানিস্তানে সোভিয়েট দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তাতে সায় দিয়েছিল। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে বিজয় লাভের ঠিক আগে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা বিশ্বরাজনীতির হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। বিশ্বব্যাপী জোরেশোরে কথিত ইসলামী জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা শুরু হলে বাংলাদেশও তার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে বাংলাদেশে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইয়ের রাষ্ট্র ও ধর্মবিরোধী জঙ্গি কর্মকাণ্ড এবং তাদের উত্থানের প্রাথমিক পর্যায়ে তত্কালীন সরকারের মধ্যকার এক ধরনের নির্লিপ্ততা পশ্চিমের সঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দূরত্ব সৃষ্টি করে। শেষপর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেই উভয় জঙ্গি নেতার গ্রেফতার ও তাদের বিচার সম্পন্ন হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারকরা তাতেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। যে কোনো বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের মতোই শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট বুশের কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (war against terror)'র সঙ্গে প্রকাশ্যে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সেই থেকে মার্কিন সমর্থন ধরে রাখার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা তার ইসলামী জঙ্গি কার্ড অবিরাম খেলে চলেছেন। ফলে বাংলাদেশ আজ এমন একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসলামবিরোধী নগ্ন প্রচারণা কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। যে সংবাদপত্রের ঘটনা দিয়ে আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদন শুরু করেছি, তারাও সরকারের হুকুম তামিল করে চলেছেন মাত্র। উত্তরার র্যাব-১ হেডকোয়ার্টারে অবস্থিত টিএফআই সেলে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আমি নিজ চোখে শ্মশ্রুমণ্ডিত তরুণ এবং মধ্যবয়সীদের সেখানে আটক দেখতে পেয়েছি। তাদের গোঙানির শব্দ থেকে নির্যাতনের মাত্রাটাও খানিক আন্দাজ করতে পেরেছি। ক’দিন পরপর টেলিভিশনের পর্দায় ইসলামী জঙ্গি নাম দিয়ে যাদের আটক দেখানো হয়, তাদেরও হয়তো উপরের নির্দেশে প্রয়োজনমাফিক টিএফআই সেল মার্কা নির্যাতনকেন্দ্রগুলো থেকেই সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গি দমনে তার অপরিহার্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসকে সরকার চরমভাবে অপমানিত করায় সরকারের সঙ্গে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, নিয়মিতভাবে জঙ্গিনাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকরা সেই দূরত্ব কমানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য সম্ভাব্য গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে আগামী ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনের আন্তর্জাতিক বৈধতা লাভ। ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে দেশে ফেরার সময় শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তত্কালীন বুশ প্রশাসনকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনে ফায়দা লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। বাংলাদেশে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। সেই নির্বাচনে যিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হোন না কেন, এখানে শেখ হাসিনা তার গতবারের সফল ইসলামী জঙ্গি কার্ডই যে ব্যবহার করবেন, সেটা নিশ্চিত।
সাম্য ও শান্তির ধর্ম ইসলামে জঙ্গিবাদ যে সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য, এ নিয়ে ইসলামের প্রকৃত আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই বলেই আমার ধারণা। কিন্তু একই সঙ্গে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোও একজন ঈমানদার মুসলমানের কর্তব্য। বাংলাদেশে কল্পিত ইসলামী জঙ্গিতত্ত্ব বিদেশে ফেরি করে যারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ হয়েই মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতায় বিমোহিত হয়ে যারা আমাদের সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সরিয়ে ফেলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন, তাদের নরেন্দ্র মোদীর গুজরাটের দিকে দৃষ্টিপাত করতে অনুরোধ জানাই। বাংলাদেশে আড়াই বছর ধরে যা ঘটে চলেছে, তার উল্টোটি গুজরাটে ঘটলে সেখানে অসহায় সংখ্যালঘুদের ভাগ্যে কী হতো, তার নমুনা ২০০২ সালে দেখা গেছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেই যে জনগণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হয় না, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ প্রতিবেশী ভারত। অপরদিকে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস লিপিবদ্ধ থাকলেই যে দেশের নাগরিকরা সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়েন না, তার উজ্জ্বল উদাহরণ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলে-মিশে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্য। আশা করি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীনরা ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবেন না।

বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতা-বিতর্ক by মিজানুর রহমান খান

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে গত ১২ বছরে ২৮ বিচারপতির চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের খবর সাধারণ মানুষের মনে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বিস্মিত তাঁরা কি করে ত্রাণ নিতে পারলেন? তবে যাঁরা ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ নিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা সম্ভবত চার-পাঁচজনের বেশি নয়। এর মধ্যে তিনজনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র আমাদের নিশ্চিত করেছে। প্রধান বিচারপতি হিসেবে এ বি এম খায়রুল হকই শুধু তাঁর স্ত্রীর চিকি ৎ সার জন্য ত্রাণ নিয়েছেন। আর নিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এস কে সিনহা। আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে এই দুজনই ত্রাণ নেন। ২০০৪ সালে নিয়েছিলেন বিচারপতি মো. ফজলুল করিম (পরে প্রধান বিচারপতি)। এই তথ্য সত্য হলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুমুখো নীতিই ধরা পড়বে। তাঁদের ব্যাখ্যা দিতে হবে যে, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোন বিবেচনায় একজন কর্মরত বিচারপতিকে ত্রাণ দিয়েছিলেন। প্রশ্নটি নীতিগত। সংখ্যা বা টাকার অঙ্কে কোনো পক্ষের অবস্থানই বিচার্য নয়।
এখন আমরা দেখব ত্রাণ ব্যতিরেকে অন্যদের চিকি ৎ সা-ব্যয় মেটাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হওয়ার দরকারটা পড়ল কেন? চলতি অর্থবছরে বিচারপতিদের জন্য এযাব ৎ কালের সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা (সুপ্রিম কোর্টের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সাড়ে ১১ লাখ টাকা) চিকি ৎ সাভাতা নির্দিষ্ট করা আছে। এর পুরো তহবিল শুধু প্রধান বিচারপতির অনুমোদনেই খরচযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাভের কোনো দরকার নেই। তিনি তা নেবেনও না। তাহলে প্রশ্ন, ওই দুই কোটি টাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সই লাগল কেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, বিচারপতিদের জন্য প্রযোজ্য প্রিভিলেজেস অ্যাক্ট ও ১৯৫০ সালের স্পেশাল মেডিকেল অ্যাটেন্ডান্স রুলস বিচারকদের বিদেশে চিকি ৎ সা গ্রহণের বিষয়ে নীরব। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মের আদলে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় একটি রেওয়াজ গড়ে তুলেছে। বিচারকদের দেশে চিকি ৎ সার খরচ প্রধান বিচারপতির সইয়ে চুকে যায়। কিন্তু আইনে না থাকার কারণে বিদেশে চিকি ৎ সা খরচ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। খরচটা কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বাজেট থেকেই মেটানো হয়। সুতরাং ওই দুই কোটি টাকার সবটাই ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে মিটেছে, সেটা সত্য নয়। সংসদ এমনিতে কোনো বিচারকের আচরণগত আলোচনার জায়গা নয়। হঠা ৎ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উদ্যোগটি ব্যক্তিবিশেষের ভাবমূর্তি রক্ষার সঙ্গে জড়িত বলেই প্রতীয়মান হতে পারে।
সংসদীয় কমিটি, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সরকারি যন্ত্র একমত যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ যাঁরাই ত্রাণ নিয়েছেন, সবটাই বিধিসম্মত। জনমনে এ রকম একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা দুঃখজনক। আইন ও বিচারমন্ত্রী ১০ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিচারকরা বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থের জন্য আবেদন করতে পারেন। এই বিধান সরকারের অন্যান্য বিভাগের জন্যও প্রযোজ্য। এবং এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা অবগত রয়েছেন।’
আইনমন্ত্রীর ওই উক্তিতে স্পষ্ট যে তিনি বিচারকদের সরকারের অন্যদের সঙ্গে এক কাতারে ফেলেছেন। কিন্তু সারা পৃথিবীতে এটাই স্বীকৃত যে বিচারপতিদের সাধারণতন্ত্রের অন্য কোনো বিভাগের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে কতিপয় সাংবিধানিক পদাধিকারীর পারিশ্রমিক প্রভৃতি বিষয়ে একটি বিশেষ রক্ষাকবচ সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা তাঁদের কার্যভারকালে ‘তাঁদের পারিশ্রমিক, বিশেষ-অধিকার ও কর্মের অন্যান্য শর্তের এমন তারতম্য করা যাবে না, যা তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনক হতে পারে।’ এঁরা হলেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার ও সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য। ভারতীয় সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদটি শুধু বিচারক-সংশ্লিষ্ট। এতে বলা আছে, ‘কোনো বিচারপতির বিশেষাধিকার বা ভাতা অথবা অনুপস্থিতি-অবকাশ বা পেনশন-সম্পর্কিত অধিকার তাঁর নিয়োগের পর তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনকভাবে পরিবর্তিত হবে না।’ বিচারকদের বেতনকাঠামো ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিলে নির্দিষ্ট আছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিচারকেরা যে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের কারও সঙ্গে তুলনীয় নন, তার মর্যাদা যে সুমহান ও সুউচ্চ, সেটা নিশ্চিত করা।
মার্কিন সংবিধানও বলেছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা তাঁদের সার্ভিস বা সেবার জন্য কমপেনসেশন বা সম্মানী পাবেন। যা তাঁরা কর্মরত থাকাকালে তাঁদের জন্য অসুবিধাজনকভাবে কমানো যাবে না।’ ব্রিটেনে হাউস অব কমন্স সব পারে, কিন্তু কর্মরত বিচারকের বেতন কমিয়ে আইন করতে পারে না বা করে না। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার বিচারকদের বেতন কর্তন করেছিল। সে সিদ্ধান্ত টেকেনি। কানাডায় একবার বিচারকদের বেতন কমালে সুপ্রিম কোর্ট তাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন।
বিশ্বের দেশে দেশে কেন এমন রক্ষাকবচ? আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট ১৯২০ সালে ‘ইভান্স বনাম গোর’ মামলায় বলেছেন, বিচারিক কর্মে উত্তম এবং যোগ্য লোককে আকৃষ্ট করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উ ৎ কর্ষ বৃদ্ধি ও বিচারকেরা যেন আইনের রক্ষক হতে পারেন, সে জন্যই এমন বিধান।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জিম্বাবুয়ের প্রধান বিচারপতি অ্যান্থনি গাবের বরাত দিয়ে বলেন, ‘বিচার বিভাগের কাছে অর্থকড়ির ক্ষমতা নেই। বিচার বিভাগ যদি সরকারের মন জুগিয়ে না চলে তাহলে নির্বাহী বিভাগ তার হাত মোচড়াতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের যদি আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’
বিদেশে বিচারকদের চিকি ৎ সা-ব্যয় মেটানো নিয়ে আমাদের সরকার যেন একটি ফাঁদ তৈরি করেছে এবং সুপ্রিম কোর্ট সেটা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় মেনে নিয়েছেন। সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া আজ যে তহবিলের অর্থ গ্রহণকে ‘ঘুষ’ আখ্যা দিয়েছেন তার পক্ষে তিনিও। আইনমন্ত্রী প্রকারন্তরে সেটাই তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সংসদীয় কমিটির বক্তব্যে বিরোধী দলের নেতার তপ্ত উক্তির ভঙ্গুরত্ব প্রমাণ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতার সপক্ষে পদক্ষেপ গ্রহণ সংক্রান্ত কিছু লক্ষ করলাম না।
বিচারপতি মোস্তাফা কামাল মাসদার হোসেন মামলায় লিখেছিলেন, The dependent of the Supreme Court on the executive branch for resources is another factor which impairs its independence. এর অর্থ হচ্ছে, আর্থিক সুবিধার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত করার আরেকটি বিষয়। এই রায় অনুযায়ী আমরা কি বলতে পারি না যে ১২ বছর ধরে দুটি দলীয় সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা আদালতের স্বাধীনতার ক্ষতি করেছেন। চিকি ৎ সাভাতার জন্য নির্বাহী বিভাগনির্ভরতা কি আপিল বিভাগের ওই রায়বিরুদ্ধ নয়?
আমলাতান্ত্রিক এই রাষ্ট্র বিচার বিভাগ পৃথক্করণে চঞ্চলা হরিণীর মতো ভীত ও সন্ত্রস্ত। ওই একই কারণে তারা বিচারপতিদের নিয়োগে উ ৎ কর্ষ এবং সে জন্য বিচারকদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলেছে। দুই দলই এখানে ঐক্যবদ্ধ। চিকি ৎ সাভাতা নিয়ে চটকদার মন্তব্য চলছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করতলগত রাখার মতো মৌলিক বিষয়ে এরা এককাট্টা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বেতনকাঠামো বৃদ্ধির যে প্রস্তাব সম্প্রতি পেশ করেছিলেন, সরকার তা অমর্যাদাকরভাবে পাশ কাটিয়েছে। বিএনপি তার সমালোচনা করেনি।
যত দূর জানি, বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতার প্রশ্নে বিদ্যমান নিয়মনীতি অস্পষ্ট, অসংগতিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। বিধিতে শুধু বলা আছে, বিচারপতি ও তাঁর পোষ্যরা চিকি ৎ সাভাতা পাবেন। কর্মরত ও অবসরকালীন চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের মধ্যে কোনো তারতম্য নেই। বিচারক আমৃত্যু চিকি ৎ সাভাতা পাবেন। একজন বিচারক ও তাঁর পরিবারের সদস্যের এককালীন চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কোনো সীমা নেই। বিদেশে চিকি ৎ সায় যেতে হলে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাতে স্বচ্ছতার অভাব আছে। আমরা ধারণা পেয়েছি যে, কোনো কোনো বিচারক ও তাঁর পরিবারের সদস্য মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ ছাড়াও বিদেশে চিকি ৎ সা নিয়েছেন এবং ফিরে এসে তাঁর বিল জমা দিয়েছেন।
ত্রাণের দিকে নজর দেওয়া যায়—এ রকমের চিন্তাভাবনা সাম্প্রতিক। এই রাষ্ট্রকে সুবিচার পেতে হলে অবশ্যই তার যথামূল্য শোধ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টকে প্রলয়মুক্ত করার পাশাপাশি বিচারপতিদের জন্য অবিলম্বে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের বেতন বাড়াতে সচিবালয়ের কোটারি আমলাদের স্পর্শকাতরতা কিংবা চোখ রাঙানি উপেক্ষা করতে হবে।
সরকারের মন্ত্রী ও তাঁদের মিত্রদের যদি চলতি চিকি ৎ সাভাতা বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ প্রদানের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, তাঁরা বলবেন, সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারকদের জন্য এই টাকা কোনো টাকাই নয়। এই বিচারকেরা যদি ওকালতি করতেন তাহলে তাঁরা মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা আয় করতে পারতেন। হক কথা। কিন্তু এটা তাঁদের স ৎ বিবৃতি নয়, কৌশলগত ও দায়ঠেকা। শাসকগোষ্ঠী বকশিশ দিতেই উদ্গ্রীব, হিসাবের পাওনা দিতে অনিচ্ছুক। সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব কেন অগ্রাহ্য হলো? বিচারকদের বেতন কেন বাড়ানো হলো না? অধস্তন আদালতের পে-কমিশন কেন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হলো?—এসব প্রশ্ন তুললেই তারা (আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপিও) বিরক্তি বোধ করবে। আমরা মনে করি, বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে বা তাঁর ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়ার অনৈতিক রীতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
রোববার টেলিফোনে কথা হলো বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক (১৯৯৬-২০০৩) বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সঙ্গে। হাইকোর্ট থেকে তিনি অবসর নিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০০৫ সালের দিকে তিনি গিয়েছিলেন আমেরিকায়। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সেখানে চিকি ৎ সা নেন। মাত্র লাখ দেড়েক টাকার বিল হয়। তখনকার আইনসচিব আলাউদ্দিন তাঁকে বলেন, ‘স্যার, টাকাটা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নিতে হবে।’
বিচারপতি বদরুজ্জামানের কথায়, ‘এটা শুনে আমি ভাবলাম, আমি তো জাকাতের টাকা দিই, আমি জাকাতের অর্থ নেব না।’
জওহরলাল নেহরুর আহ্বানে ১৯৪৮ সালে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর রিলিফ ফান্ড খোলা হয়েছিল। সে দেশে সেই তহবিল থেকে আজও দুস্থের চিকি ৎ সা খরচ মেটে। কিন্তু কখনো কোনো বিচারক নিয়েছেন বলে জানি না।
বিচারকদের চিকি ৎ সাভাতা-সংক্রান্ত বিধিবিধান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেক জেলা জজও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে চিকি ৎ সার জন্য অর্থ নিয়েছেন। নিতে পারেন। তবে যাঁরাই নেবেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পদের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। বিচারকদের ত্রাণের অর্থ গ্রহণের খবরে জনমনে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। বিচারকদের তালিকা দেখেছি। এখন আমরা মন্ত্রী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য শ্রেণীর গ্রহীতাদের ব্যাপারেও জানতে চাই। তাহলে বোঝা যাবে ধনিক শ্রেণীর রাষ্ট্রব্যবস্থা দুস্থদের জন্য গঠিত ত্রাণ তহবিল থেকে কীভাবে ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা উভয়ে অনৈতিক বিধিবহির্ভূত ও অসাংবিধানিক কাজকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বিদেশে চিকি ৎ সা গ্রহণসংক্রান্ত অনুমোদন দেওয়ার অধিকার শুধু প্রধান বিচারপতিরই থাকা উচিত। সংসদীয় কমিটিকে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

কৌতুকের ছলে, কথা যাই বলে আনিসুল হক

‘আমি আমার দাদার মতো শান্তিতে ঘুমের মধ্যে মরতে চাই। তার গাড়ির যাত্রীদের মতো চি ৎ কার চেঁচামেচি করে মরতে চাই না।’
গাড়িচালক যদি গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর মৃত্যুটা হয়তো শান্তিরই হয়, যাত্রীদের মৃত্যুটা শান্তির হয় না।
পশ্চিমে এই কৌতুকটা খুব প্রচলিত। একজন পাদরি, আরেকজন বাস ড্রাইভার। তাঁরা স্বর্গ পাবেন নাকি নরক পাবেন, এই হিসাব চলছে। পাদরিকে স্বর্গের একটা মধ্য মানের কক্ষ বরাদ্দ করা হলো। আর চালকের জন্য বরাদ্দ হলো ফার্স্ট ক্লাস কক্ষ। পাদরি বললেন, ‘আমি সারা জীবন ঈশ্বরের জন্য কাজ করলাম, কত উপদেশ দিলাম মানুষকে, আর আমার চেয়ে একজন বাসচালক স্বর্গে উচ্চ স্থান লাভ করল? তা কী করে হয়?’
উত্তর এল, ‘তুমি যখন উপদেশ দিতে, তখন শ্রোতারা প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ত। আর বাসচালক যখন বাস চালাত, তখন সবার ঘুম ছুটে যেত, সব যাত্রীই ঈশ্বরকে ডাকত।’
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম সম্প্রতি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে এলেন। সেখানে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁকে বাংলাদেশের এক ড্রাইভারের সম্পর্কে একটা অতি আশ্চর্য তথ্য দিয়েছেন। একজন চালক গাড়ি চালাচ্ছে রাস্তার মাঝখান দিয়ে, ঠিক মধ্যিখানে যে দাগটা আঁকা, তার ওপর দিয়ে। তাকে বলা হলো, তুমি তোমার লেন দিয়ে গাড়ি চালাও। বাঁ দিক দিয়ে গাড়ি না চালিয়ে রাস্তার মধ্যিখান দিয়ে চালাচ্ছ কেন? ড্রাইভার বলল, দাগের ওপর দিয়া গাড়ি চালাইলে গাড়িটা সোজা চালানো যায়।
সর্বনাশ! এরা কি লেন বিভাজক দাগটাকে গাড়ি সোজা চালানোর দাগ বলে ভাবে নাকি?
এই জন্যই বলছি, আমাদের চালকদের প্রশিক্ষণ দিন। তাঁদের গাড়ি চালানোর ব্যাপারে দক্ষ হতে হবে, সব ট্রাফিক আইন জানতে ও মানতে পারতে হবে এবং তাঁদের মূল্যবোধ থাকতে হবে, তাঁরা যেন জানেন ও বোঝেন যে জীবন মূল্যবান। আর দেখতে হবে, তাঁরা যেন অতিরিক্ত পরিশ্রম না করেন, তাঁরা যেন সুস্থ থাকেন।
সেবার ঢাকা শহরে মেয়র নির্বাচন হচ্ছিল। মোহাম্মদ হানিফ আর মির্জা আব্বাস ভোটে দাঁড়িয়েছেন। মির্জা আব্বাস তখনো মেয়রের দায়িত্বই পালন করছেন। আমি একজন স্কুটারচালককে প্রশ্ন করলাম, কাকে ভোট দেবেন। তিনি বললেন, হানিফ সাহেবকে। কেন?
আর বলবেন না, আমাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে বড় ঝামেলা করছে। হাজার টাকা দিয়ে লাইসেন্স কিনেছি। পুলিশ বলে, লাইসেন্স দুই নম্বর।
আমি বললাম, আপনি বিআরটিএতে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসল লাইসেন্স বের করুন।
তিনি বললেন, স্যার, বিআরটিএর পরীক্ষা খুবই কঠিন। লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। প্র্যাকটিক্যালটা স্যার আমরা পারি। কিন্তু লিখিত পরীক্ষা পারি না। ম্যাট্রিক পাস ছাড়া ওই পরীক্ষায় কেউ পাস করতে পারব না। স্যার, দেশ চালাইতে কোনো পাস লাগে না, আর বেবিট্যাক্সি চালাইতে লাগব ম্যাট্রিক পাস?
ভারী যান চালাতে দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষারও নিশ্চয়ই দরকার আছে। কিন্তু বাস্তব হলো, যাঁরা গাড়ি চালাচ্ছেন, তাঁদের আমরা এক দিনে বসিয়ে দিতে পারব না। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা নয়। মানুষ নানাভাবে শিখতে পারে। বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র। বহু উচ্চ শিক্ষিত মানুষের মূল্যবোধ নেই, অনেক তথাকথিত কম শিক্ষিত মানুষও উচ্চায়ত আদর্শ, উচ্চতর মূল্যবোধ দিয়ে চালিত হন। কাজেই আমার পরামর্শ হলো, আমাদের চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার শর্ত হবে, ওই ট্রেনিংটা সম্পূর্ণ করা। সেই ট্রেনিংয়ে ট্রাফিক আইন সব শিখিয়ে দেওয়া হবে। সিগন্যাল চেনানো হবে। আর বারবার করে বলা হবে, জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই।
আবার কৌতুক।
‘তুমি কীভাবে অ্যাকসিডেন্ট করেছ?’
‘আমি গাড়ি চালাচ্ছি। দেখলাম একটা বাস আসছে, সাইড দিলাম। তারপর দেখি একটা ট্রাক আসছে। সাইড দিলাম। তারপর দেখি একটা ব্রিজ আসছে। সেইটাকে যেই সাইড দিয়েছি...’
আরেকজন ড্রাইভার কীভাবে অ্যাকসিডেন্ট করলেন, সেটা শুনুন। ‘রাতের বেলা গাড়ি চালাচ্ছি। দেখি, একটা মোটরসাইকেল ডান দিক দিয়ে আসছে। আমি বাঁয়ে সরে গেলাম। এরপর দেখি আরেকটা হেডলাইট। এটা আসছে বাঁ দিক থেকেই। আমি ডানে সরে গেলাম। এরপর দেখি দুইটা হেডলাইট, মানে দুইটা মোটরসাইকেল, ডান দিকে আর বাঁ দিকে। আমি কী করব বুঝতে না পেরে মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালাতে চাইলাম। তখনই...’
একজন লোক গাড়ি চালাচ্ছেন। তাঁর কাছে ফোন এল। শোন, শুনতে পেলাম তোদের ওই রুটে একজন রাস্তার উল্টো লেন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তুই সাবধানে যা। লোকটা উত্তর দিল, ‘না রে। একটা গাড়ি না। আমি দেখছি শত শত গাড়ি উল্টো লেন দিয়ে আসছে।’
আমাদের দেশে রাস্তাঘাট খারাপ। মহাসড়ক বলতে কিছু নেই। মহাসড়কে গরুগাড়ি চলে, হাটবাজার বসে। গাড়ি লক্কড়ঝক্কড় মার্কা। ট্রাফিক নিয়ম বলতেও কিছু নেই। আর গাড়িগুলো ট্রাফিক সিগন্যাল মানছে কি না, তা দেখারও কেউ নেই। বিআরটিএ দুর্নীতির আখড়া। একে তো গরিব দেশ, তার ওপর আবার দুর্নীতিগ্রস্ত। এই দেশে আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা দৈবা ৎ ই বেঁচে আছি।
আপনারা আবার ভাববেন না, আমার অ্যাকসিডেন্ট হয়নি বলে আমি এত কথা বলছি। তা নয়। আমি দুইবার বড় অ্যাকসিডেন্টে পড়েছি। একবার বন্ধুসভার অনুষ্ঠান করে মাইক্রোবাসে নোয়াখালী থেকে ফেরার পথে কুমিল্লা পেরিয়ে আমাদের মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় পড়ে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বন্ধুসভার কর্মী মেজবা আযাদ। ভাঙা কাচের টুকরায় তিনি রক্তাক্ত হন। অক্ষত ছিলেন ফারুক আহমেদ। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? অ্যাকসিডেন্ট। শোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি জ্ঞান হারান।
একটু পর আমার কাছে প্রথম আলোর রংপুর প্রতিনিধি আরিফুল হকের ফোন আসে। ‘শুনলাম, তুমি মারা গেছ। তাই তোমাকেই ফোন করে জানতে চাচ্ছি, তুমি ঠিক আছ কি না?’
এরপরের দুর্ঘটনাটা ঘটে ঢাকার শেরাটন হোটেলের সামনে। আমি যাচ্ছি সিএনজিচালিত ত্রিচক্রযানে। সামনে একটা মিনিবাস দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বেবিট্যাক্সি তার পেছনে দাঁড়াল। পেছন দিক থেকে এসে একটা মিনিবাস আমাদের ওই বেবিট্যাক্সিকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলতে লাগল। দুই মিনিবাসের চিপায় পড়ে আমি আর আমার বেবিট্যাক্সিচালক স্যান্ডউইচ হয়ে গেলাম। আমি বলি, ডাবল চিজ স্যান্ডউইচ।
রক্তাক্ত শরীর নিয়ে অতিকষ্টে ভাঙা ট্যাক্সি থেকে বেরিয়ে আমি চি ৎ কার করে উঠেছিলাম, ‘আমার নাম আনিসুল হক, আমাকে একটু কেউ হাসপাতালে নিয়ে যান।’ সে বিরাট গল্প। শুধু আমি নিজেকে বলি, দ্য গ্রেট সারভাইভার অব এ মিনি বেবি অ্যাকসিডেন্ট। বেঁচে আছি বলে এই নিয়ে রসিকতা করতে পারি। বলি, মরলে ভারি দুর্নাম হতো। মিনি বেবি অ্যাকসিডেন্টে কেউ মরে? দুটো ডাবল ডেকারের মাঝখানে পড়লে না নাম হতো!
না, দুর্ঘটনা কোনো কৌতুকের বিষয় নয়। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এদের প্রত্যেকের কাহিনি পড়লে আমাদের চোখে জল আসে। পৃথিবী স্থির হয়ে যায়। আমরা চাই না আর একজন মানুষও অপঘাতে মারা যাক। সবাই মিলে সেই চেষ্টাই আমাদের করতে হবে। আমরা চাইছি সবাইকে সজাগ করতে। গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়া যেমন বিপজ্জনক, দেশ চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়াও তেমনি ভয়াবহ। আমাদের জেগে থাকতে হবে এবং জাগিয়ে তুলতে হবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ফ্রান্সের পরমাণু কেন্দ্রে বিস্ফোরণ একজন নিহত

ফ্রান্সের একটি পরমাণুকেন্দ্রে বিস্ফোরণে গতকাল সোমবার অন্তত একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। তবে বিস্ফোরণের কারণে সেখান থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে সরকার।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, দক্ষিণ ফ্রান্সের রহোন উপত্যকার কোডোলেটে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে সেন্ট্রাকো পরমাণু বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন নিহত এবং অপর চারজন আহত হন। তবে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি।
ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার সেফটি অথরিটি (এএসএন) জানায়, প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে, পরমাণুকেন্দ্রটির অত্যন্ত নিম্ন মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য মিশ্রণের জন্য ব্যবহূত একটি চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর কোনো ভয় নেই।
দমকলকর্মীরা জানান, বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রটির চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর আশঙ্কা না থাকায় দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা থেকে কাউকেই সরিয়ে নেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনায় হতাহতদের দেহেও তেজস্ক্রিয় পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শুধু বিস্ফোরণের কারণেই তাঁরা হতাহত হয়েছেন।

মমতাকে একহাত নিলেন কংগ্রেস নেত্রী দীপা দাসমুন্সী

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বয়স চার মাস হতে না হতেই কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। কংগ্রেসের স্থানীয় সাংসদ দীপা দাসমুন্সী গত রোববার এক সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একহাত নিয়েছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মতভেদের পথ ধরে মমতা ঢাকা সফর বাতিল করার পর থেকে দ্বন্দ্বের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মমতার বিরোধিতার কারণেই ওই চুক্তি সম্পাদিত হয়নি।
উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদে রোববার কংগ্রেসের এক সমাবেশে সাংসদ দীপা দাসমুন্সী বলেন, কংগ্রেসকে শেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। কিন্তু কংগ্রেসকে শেষ করা যাবে না। কংগ্রেসের সঙ্গে না থাকলে আগামী দিনে তৃণমূলের কোথায় জায়গা হবে, সেটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রমাণ করে দেবে।
সাংসদ বলেন, মমতা এখন বৈষম্যের রাজনীতি করছেন। এখানে এইমসের ধাঁচে একটি হাসপাতাল গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা নিয়ে টালবাহানা করছেন তিনি। এ নিয়ে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন দাসমুন্সী।

স্ত্রস-কানকে জেরা করেছে ফ্রান্সের পুলিশ

২০০৩ সালে প্যারিসে এক নারী সাংবাদিককে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান দমিনিক স্ত্রস-কানকে জেরা করেছে ফ্রান্সের পুলিশ। গতকাল সোমবার তাঁর আইনজীবীরা এ কথা জানিয়েছেন।
নিউইয়র্কে হোটেল-কর্মী নাফিসাতৌ দিয়ালোকে ধর্ষণের অভিযোগে কানের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর গত জুন মাসে ট্রিসটেন ব্যানন নামের প্যারিসের একজন সাংবাদিক ও লেখক ওই ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তোলেন।
ব্যানন বলেন, কান ২০০৩ সালে প্যারিসের একটি বাসায় তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন।
কানের আইনজীবী ফ্রেডরিক বলিউ ও হেনরি লেকলার্ক বলেন, নিউইয়র্কে হোটেল-কর্মী ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের পর ৪ সেপ্টেম্বর প্যারিসে পৌঁছান কান।
সাংবাদিক ধর্ষণের অভিযোগটির প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে এর মধ্যে ফ্রান্সের সোশ্যালিস্ট পার্টির সাবেক নেতা ফ্রাঙ্কোয়েস হোল্যান্ডসহ অনেকের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের পর বিচারকেরা এটিকে ফৌজদারি মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা বা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

ধর্মীয় সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ!

পাকিস্তানে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে ধর্মভিত্তিক সংগঠন দাওয়াত-ই-ইসলামির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ওই সংগঠনটির প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধির পরিণতি মারাত্মক হতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করে দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিল।
দাওয়াত-ই-ইসলামি এমনিতে ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত। সহিংসতা-বর্জিত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সংগঠনটির ওপর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এ পর্যন্ত কখনো কড়া নজরদারি করেনি।
তবে মুমতাজ হোসেন কাদরি নামের এক পুলিশ-সদস্যের গুলিতে গত জানুয়ারিতে পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর সালমান তাসির নিহত হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মুমতাজ হোসেন কাদরি দাওয়াত-ই-ইসলামির একজন সদস্য। বিতর্কিত ব্লাসফেমি আইনের বিরোধিতা করায় তিনি সালমান তাসিরকে গুলি করে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

জয়ললিতাকে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ

সম্পদের অসংগতি-সংক্রান্ত একটি মামলায় ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতাকে আগামী ২০ অক্টোবর সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। বিচারক দলবীর ভান্ডারি ও দীপক ভার্মার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন।
জয়ললিতা এর আগে নিরাপত্তার অজুহাতে ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোডের ৩১৩(৫) ধারায় সশরীরে হাজির থেকে অব্যাহতি পেতে আবেদন করেছিলেন। তবে ৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ বলেন, এর মাধ্যমে তিনি বিচার-প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন।
১৯৯১-৯৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ৬৬ কোটি রুপির সমপরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত করার অভিযোগে জয়ললিতার বিরুদ্ধে ওই মামলা করা হয়।

সিরিয়ায় এ পর্যন্ত নিহত ২৬০০

সিরিয়ায় গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এই পর্যন্ত দুই হাজার ৬০০ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘে মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নভি পিল্লাই গতকাল সোমবার এ তথ্য জানান। খবর এএফপির।
নভি পিল্লাই বলেন, সিরিয়া থেকে বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, গত মধ্য মার্চ থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতায় নিহতের সংখ্যা অন্তত দুই হাজার ৬০০ জনে পৌঁছেছে।
নভি পিল্লাইয়ের গতকালের তথ্য নাকচ করে দিয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অন্যতম সহযোগী ও তাঁর গণমাধ্যম উপদেষ্টা বাওথাইনা শাবান। গতকাল তিনি রাশিয়ার মস্কো সফরে গিয়ে বলেন, সিরিয়ার সহিংসতায় এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭০০ জন হলেন সেনা ও পুলিশ-সদস্য। অন্য ৭০০ জন বিদ্রোহী।

কেনিয়ায় আগুনে ১২০ জনের মৃত্যু

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির একটি বস্তি এলাকায় আগুনে পুড়ে ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার পুলিশ এ কথা জানায়।
নাইরোবির লুঙ্গা লুঙ্গা শিল্প এলাকায় একটি তেলের পাইপলাইনে বিস্ফোরণের মাধ্যমে এ আগুন ছড়ায়। এ সময় আগুন নিকটবর্তী সিনাই বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই এলাকার পুলিশ কামান্ডার টমাস আটুটি বলেন, ‘এ পর্যন্ত শতাধিক লাশ পাওয়া গেছে। এসব লাশ সরিয়ে নিতে বিশেষ ব্যাগের জন্য অপেক্ষা করছি।’
জোসেফ এমওয়েগো নামের এক এলাকাবাসী বলেন, পাইপলাইনের ছিদ্রের মাধ্যমে স্থানীয় একটি ডিপো থেকে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা সংগ্রহে নেমে পড়ে বস্তিবাসী। এ সময় বিকট এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুন লেগে যায়। সিগারেট থেকে এ আগুন লাগে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে অনেক বস্তিবাসী দগ্ধ হয়।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর মিসর সফর শুরু

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান গতকাল সোমবার থেকে মিসর সফর শুরু করেছেন। সফরকালে এরদোয়ানের মিসরের ক্ষমতাসীন মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ হোসেন তানতাওয়ির সঙ্গে বৈঠক করার কথা। মিসরের প্রধানমন্ত্রী এসাম শারাফের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
মিসরকে দীর্ঘদিন আরব বিশ্বের নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা গেছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিজেদের দৃঢ়নীতির কারণে আরব বিশ্বে তুরস্কের প্রভাব অনেক জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রতি কঠোর মনোভাবের কারণে তুরস্ক কয়েকটি আরব দেশের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কায়রোর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ফিউচার অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান আদেল সোলিমান বলেন, ‘আঞ্চলিক ভূমিকার ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই দেশ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে এই মুহূর্তে মিসর এ ধরনের ভূমিকা পালনের মতো অবস্থায় নেই। কাজেই এরদোয়ান এ সুযোগটি নেওয়ার চেষ্টা করছেন।’
গত বছর গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী জাহাজ ফ্রিডম ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের অভিযানে তুরস্কের নয় কর্মী নিহত হন। এ ঘটনার জের ধরে আঙ্কারা ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে।
এ ছাড়া মিসরের পাঁচ সীমান্তরক্ষীকে ইসরায়েল হত্যা করার পর গত মাসে তেলআবিব থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেয় মিসর। তবে সীমান্তরক্ষী হত্যার ঘটনায় মিসরের সামরিক শাসক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনতাকে দমাতে ব্যর্থ হয় এবং বিক্ষুব্ধ জনতা গত শুক্রবার হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি দূতাবাস তছনছ করে।

কোনো রুশকে যুক্তরাজ্যের কাছে হস্তান্তর সম্ভব নয়

২০০৬ সালে লন্ডনে ক্রেমলিনের সমালোচক আলেকসান্দার লিদভিনেনকোর হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজনকে ব্রিটেনের কাছে হস্তান্তর করবে না রাশিয়া।
গতকাল সোমবার রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ মস্কো সফররত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। এর আগে অপর এক অনুষ্ঠানে ক্যামেরন বলেন, লিদভিনেনকোর হত্যাকারীকে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা ছেড়ে দেবে না যুক্তরাজ্য।
যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের অবসান ঘটাতে গতকাল রাশিয়া সফরে যান ক্যামেরন। ২০০৬ সালে লন্ডনে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সাবেক এজেন্ট আলেকসান্দার লিদভিনেনকোর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু। ২০০৫ সালে ব্লেয়ারের পর এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মস্কো সফরে গেলেন।
লিদভিনেনকোর মৃত্যুর ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সাবেক কেজিবি এজেন্ট আন্দ্রে লুগোভয়কে ব্রিটেনে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে রাশিয়া।
মেদভেদেভ বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া বা তদন্তের জন্য কোনো রুশ নাগরিককে ফেরত পাঠানো বা অন্য কোনো দেশের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, ‘এটা সম্ভব নয়।’
এর আগে ক্রেমলিনের অরনেট হলে বৈঠকের শুরুতে মেদভেদেভ ক্যামেরনকে বলেন, ‘আমি আশা করছি এ সফর ফলপ্রসূ হবে।’ তিনি বলেন, ক্যামেরনের এ সফর ‘দীর্ঘ প্রতীক্ষিত’। রুশ প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেন, ‘বছর কয়েক ধরে’ শীর্ষ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের এ ধরনের উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ ছিল না।
বৈঠকে লিদভিনেনকোর বিষয়টি উত্থাপনের জন্য দেশে দারুণ চাপের মধ্যে ছিলেন ক্যামেরন। গতকালই রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা। লিদভিনেনকোর মৃত্যুর সময় তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
ক্যামেরন তাঁর সফরে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার ও রাশিয়ায় ব্যবসা করা ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করবেন।
গতকাল রুশ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ক্যামেরন বলেন, ব্রিটিশ ও রুশ কর্মকর্তারা বেশ কয়েকটি চুক্তিতে সই করবেন।
ক্যামেরন বলেন, আলেকসান্দার লিদভিনেনকোর হত্যাকারীকে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা ছেড়ে দেবে না ব্রিটেন। তবে তিনি বলেন, লিদভিনেনকোর মৃত্যুর ঘটনায় সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই সরকারকে ‘ইটের বদলে পাটকেল সংস্কৃতির’ অবসান ও একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া ভাষণে ক্যামেরন সরাসরি লিদভিনেনকের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘কয়েকটি জটিল বিষয় আছে, যেগুলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ তিনি বলেন, ‘লিদভিনেনকোর ঘটনা নিয়ে আমরা এখনো আপনাদের সঙ্গে একমত নই।’
ক্যামেরন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সাদামাটা ও নীতিনিষ্ঠ—যখন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, সেটি আদালতের বিষয়।’

আফগান পুলিশ ভক্ষকে পরিণত হয়েছে

মার্কিন সহায়তাপুষ্ট আফগান স্থানীয় পুলিশ (এএলপি) ও বিভিন্ন বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জনগণের জানমালের রক্ষকের পরিবর্তে ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। তারা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পরিবর্তে জনসাধারণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করছে। নিরাপত্তারক্ষীদের এসব কর্মকাণ্ডে জঙ্গিরাই উপকৃত হচ্ছে। গতকাল সোমবার মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
‘জাস্ট ডোন্ট কল ইট এ মিলিশিয়া’ শিরোনামের ওই ১০২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা খুন, রাহাজানি, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।
আফগানিস্তানে ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে এসব বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করা হয়। এর মধ্যে ন্যাটোর অর্থায়নে গঠিত এএলপিকে গত বছরের আগস্টে অনুমোদন দেয় প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সরকার। যে অঞ্চলে আফগান সেনা ও নিয়মিত পুলিশের কর্মত ৎ পরতা সীমিত, সেসব এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে এই বাহিনী। তবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, দায়িত্বে অবহেলা ও কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির অভাবের কারণে বাহিনীগুলোর কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নয় সাধারণ জনগণ।
মানবাধিকার সংগঠনটি মোট সাতটি প্রদেশে তাদের অনুসন্ধান চালিয়েছে। এর মধ্যে বাগলান, হেরাত ও উরুজগান প্রদেশ তিনটিতে হত্যা, ধর্ষণ এবং বিনা অপরাধে আটকের সঙ্গে এএলপির সদস্যদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে তারা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশীয় পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অক্ষম এসব বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীকে কাবুল ও ওয়াশিংটনকে পরিষ্কারভাবেই অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সরকারি অধিভুক্ত বাহিনীর সদস্যরা অপরাধ করার পরও শাস্তির সম্মুখীন না হওয়া—এসবই জঙ্গিবাদের চালিকাশক্তি।
২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারকে সামনে রেখে মার্কিন অর্থায়নে আফগানিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী মিলে দেশটিতে তিন লাখেরও বেশি নিরাপত্তা সদস্য রয়েছে।

বাংলাদেশের বাজে শুরু

গরমকে ভয় ছিল। সেই গরমেই কাবু হয়ে গেল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের ফুটবলাররা। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে কাল ইরাকের ডহুক স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ইরাকের কাছে তারা হেরেছে ৭-০ গোলে। প্রথমার্ধে ছয় গোল খাওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য তুলনামূলক ভালো খেলেছে বাংলাদেশের যুবারা। তার পরও এক গোল হজম করতে হয়েছে। বাংলাদেশ দলের পরের ম্যাচ ১৬ সেপ্টেম্বর, প্রতিপক্ষ ফিলিস্তিন।