Sunday, August 25, 2024

বিচারপতি মানিক, এ পরিণতি ছিল অবধারিত by ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বর্তমান অবস্থা দেখে সত্যিই করুণা হয়। কিন্তু এটাই ছিল তার পাওনা ও নিজ হাতের কামাই। ইতিহাস সাক্ষী এমন মানুষদের এমন পরিণতিই হয়। এটা ছিল অবধারিত। জান ও প্রাণের এতো ভয়! সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি ছিলেন, কিন্তু জান নিয়ে বর্ডার ক্রস করে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পালাতে হবে? এই হলো উনার সাহস ও দম্ভ!  এটা দেখে বারবার সিনেমার ঐ পরিচিত ডায়লগের কথা মনে পড়ে “এর আগে আমার মরণ হলো না কেন…?”।

কি-না করেছেন তিনি! পুরো বিচারবিভাগ ও বিচারবিভাগের সাথে জড়িত সবাইকে হেয় করছেন। অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছেন বাংলাদেশের আইনাঙ্গন ও বিচার বিভাগের। মানিক সাহেবের এই পরিণতিতে আছে সবার জন্য শিক্ষা।

কিন্তু তাকে এই দানবে পরিণত করেছিল কারা? তাদের কথা একটুও আলোচনায় আসবে না? আওয়ামী লীগ সরকার তার টার্মের শেষের দিকে ২০০১ সালে চরম এই দলকানা, high tempered ও উগ্র ব্যক্তিকে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। ঐ বছরই ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি দু’বছর পর ২০০৩ সালে যখন সময় আসলো তখন এই দলকানা ও উগ্র ব্যক্তিকে বিচারপতি হিসেবে তাকে কনফার্ম করেনি। ফলে বাদ পড়েন মানিক সাহেব হাইকোর্টের বিচারপতির পদ থেকে। ইতিহাস সাক্ষী বিএনপির এই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।

হাইকোর্ট থেকে বাদ পড়ে বিচারপতি মানিক লন্ডনে চলে আসেন। ২০০৭ সালের দিকে তৎকালীন হাইকোর্টের বিচারপতি এসকে সিনহা লন্ডনে বেড়াতে এসেছিলেন। তখন বিচারপতি মানিক ও বিচারপতি সিনহা ছিলেন অনেকটা এক শরীরের দুইপ্রাণ, জানের দোস্ত!  একসাথে লন্ডনে ঘুরাফেরা করেছেন, একসাথে খাওয়া দাওয়া করেছেন, একসাথে মিটিংয়ে যোগ দিয়েছেন। বিচারপতি মানিক বিচারপতি সিনহাকে নিয়ে সাউথ-এন্ড সী বীচে (সমুদ্র সৈকতে) বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার চোখে দেখা- সী বীচে বেড়িয়ে এসে আমার চেম্বারের সামনে কার পার্কে জড়ো হয়েছিলেন অন্য এক বিচারপতির সাথে অন্য এক জায়গায় যাওয়ার জন্য। বিচারপতি সিনহার পরামর্শেই মূলত: মানিক সাহেবসহ যাদেরকে বিএনপি সরকার দলীয় ও অযোগ্য বিবেচনায় বিচারপতি পদ থেকে বাদ দিয়েছিলে অর্থাৎ দুই বছর পর কনফার্ম করেনি তারা হাইকোর্টে রীট করলেন। এরপর তিনজন বিচারপতি নিয়ে বৃহত্তর একটি বেঞ্চ গঠিত হলো। বিচারপতি সিনহাও ঐ বেঞ্চে ছিলেন। রায় এলো মানিক সাহেবদের পক্ষে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগও আবার ক্ষমতায় আসলো। এ যেন ছিল মানিক সাহেবদের জন্য সোনায় সোহাগা! তারা ফিরে আসলেন হাইকোর্টে বিচারপতি হয়ে ভিন্ন এক স্বরুপে। শুধু ফিরেই আসলেন না, বরং ২০১৩ সালে ২১ জন বিচারপতিকে ডিঙ্গিয়ে বিচারপতি মানিককে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগে নেয়া হয়। বিচারপতি মানিককে পূনর্বাসিত করতে তাই বিচারপতি সিনহার দায় কম নয়।

পরবর্তীতে উভয়ই আপিল বিভাগে যাবার পর অন্য কারণে মানিক সাহেব ও সিনহা সাহেবের সম্পর্ক হয়ে গেল সাপে-নেউলে।

আওয়ামী ও জাতীয় পার্টির এমপিরা সংসদে মানিক সাহেবের কঠোর সমালোচনা ও গালিগালাজ করলেন এবং বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ নিজে সিটিং বিচারপতি মানিককে “সেডিস্ট” বলে আখ্যায়িত করলেন। সংসদ সদস্যরা ক্ষোভে ফেটে পড়ার পরও কিন্তু সংসদ অদৃশ্য ইঙ্গিতে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলো না। বিচারপতি মানিক হাইকোর্টে সিটিং বিচারপতি থাকা অবস্থায় প্রকাশ্যে ভরা কোর্টে তৎকালীন সিটিং স্পিকার আব্দুল হামিদকে “রাষ্ট্রদ্রোহী” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফলাও করে এসেছে। আশ্চর্যের বিষয় এই বিচারপতি মানিককেই আবার ছয় মাসের মাথায় স্পিকার আব্দুল হামিদ প্রেসিডেন্ট হয়ে আপিল বিভাগে নিয়োগ দিয়ে প্রমোশন দিলেন! এবার ভাবুন আব্দুল হামিদ কোন ধরনের ও কোন ব্যক্তিত্বের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিচারপতি মানিককে মাথায় তুলতে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের দ্বায় কম?

বিচারপতি মানিক ছিলেন স্পষ্টত ও দৃশ্যমান দলকানা, উগ্র, বদমেজাজী ও চরম প্রতিশোধপরায়ণ। এমন ব্যক্তি নিম্ন আদালতেরই বিচারক হওয়ার অযোগ্য, উচ্চ আদালতে নিয়োগ দেয়া তো দূরের কথা। আমি বহু ফোরামে বলেছি তার মতো ব্যক্তি বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়া মানে বাংলাদেশের উপর এক গজব নাজিল হওয়া। আর এই গজব নাজিলের প্রধান দ্বায় পতিত ও পলায়নকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

মানিক সাহেব বিচারিক জীবনে দম্ভ, অহংকার ও ক্ষমতা দেখিয়ে গেছেন। এটা থামেনি তার অবসরে যাবার পরও। বরং তা বেড়েছে। দু:খজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এমন ব্যক্তিকে বারবার সুযোগ দিয়েছে দানবে পরিণত হতে। প্রত্যেকটি টকশোতে মানহানিকর কথা বলা ও জীবিত এবং মৃত জাতীয় ব্যক্তিত্বদের গালিগালাজ করার পরও বিভিন্ন টকশোতে তাকে নিয়মিতভাবে ডাকা হতো! তাদের দায় কম?

সমাজ ও রাষ্ট্রের বহু নামী দামী মানুষকে আদালতে ডেকে নিয়ে চরম অপমান করেছেন। বর্তমান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, কবি ও প্রাবন্ধিক আবু মকসুদ, সাবেক খ্যাতিমান সিএসপি অফিসার সচিব আসাফুদ্দৌলা, বিমানের এমডিসহ বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিদের হাইকোর্টে ডেকে নিয়ে নাজেহাল করেছেন, দাঁড় করিয়ে রেখেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সরকার পতিত হওয়ার ক’দিন আগে টকশোর একজন সম্মানীত মহিলা উপস্থাপিকার সাথে অনলাইনে ও অফলাইনে যে ব্যবহার করেছেন তা রীতিমতো মানহানিকর ও ফৌজধারী অপরাধ। লন্ডনেও সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ তার ওপর ক্ষেপা, কেননা তাদের অনেককে বিভিন্নভাবে তিনি নাজেহাল করেছেন।

সুতরাং সব বিবেচনায় বিচারপতি হওয়ার অযোগ্য মানিক সাহেবের দেয়া রায়গুলো আজ সাংঘাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ফাঁসির রায় দিয়ে বারবার টকশো ও পাবলিক মিটিং -এ এভাবে কোনো বিচারপতি বলতে পারেন “আমি ওমুক ওমুককে ফাঁসি দিয়েছি”। এতে তার কুমতলব ও mala fide intention ফুটে উঠে। তাই তার দেয়া প্রত্যেকটি রায় পূনর্বিবেচনা করা আশু প্রয়োজন। আমার দেশ সম্পাদক সাহসী ব্যক্তিত্ব মাহমুদুর রহমান দেড় ডজনের উপরে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তৎকালীন প্রেসিডেন্টের কাছে দিয়েছেন। তখন এই অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নিলে মানিক সাহেব এমন দানবে পরিণত হতে পারতেন না। এখন সময় আসছে - ঐ অভিযোগগুলোর আলোকে তার বিরুদ্ধে ফৌজধারী আইনে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার দেশ ও ভবিষ্যতের স্বার্থে, বিশেষ করে আইন ও আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

বিচারপতি মানিক যতই স্পষ্টত ও দৃশ্যমান দলকানা, উগ্র, বদমেজাজী ও চরম প্রতিশোধপরায়ণ হোন না কেন তার সাথে আচরণ করতে হবে আইনানুগ। তাকে শাস্তি দিতে হবে due process -এর মাধ্যমে competent court - এর দ্বারা। মানিক সাহেবকে অবমাননাকর অবস্থায় বর্ডার ক্রসে ধরা হয়েছে। কোর্টে হাজিরার সময় তাকে নাজেহাল করা হয়েছে। এটা মোটেই কাম্য নয়। যত বড় অপরাধীই থাকুক না কেন, আইনের আশ্রয় নেয়ার ও যথাযথ বিচার পাবার তার অধিকার আছে। এটা তার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। আইনের শাসনের মূল কথাটিও এটি।

মানিক সাহেবের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও উপাদানসহ কোনো মামলা এখনও চোখে পড়েনি। অথচ তার বিরুদ্ধে মামলা করার বহু কারণ, তথ্য ও উপাদান আছে। তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত তথ্য ও প্রমাণসহ সঠিক আইনে মামলা না করে শুধু আবেগ ও ক্ষোভ জাড়লে শিগগিরই এসব ক্ষোভ ও আবেগ যখন প্রশমিত হবে তখন তিনি অনায়াসে জেল থেকে বেরিয়ে আসবেন। শাস্তি তো দূরের কথা, একটু সুযোগ পেলে লন্ডনে পালিয়ে আসবেন। তখন আপনাদের হয়তো পস্তাতে হবে।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

'এবারের কাশ্মীরের নির্বাচন সম্মান ও সমাধানের জন্য'

প্রায় এক দশক পরে আবার বিধানসভা ভোট হচ্ছে জম্মু ও কাশ্মীরে। সেপ্টেম্বরের ১৮, ২৫ এবং অক্টোবরের ১ তারিখ- মোট তিন দফায় ভোট হবে উপত্যকায়। তার আগে শনিবার সাংবাদিক বৈঠক ডেকে  নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেন পিপলস্‌ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রধান মেহবুবা মুফতি। সাংবাদিক বৈঠকে পিডিপি প্রধান বলেন, “আমার কাছে এ বারের নির্বাচন কেবল রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর দাবি বা আসন সমঝোতার জন্য নয়। আমাদের লক্ষ্য আরও বড়। আমরা সম্মান ও সমাধানের জন্য লড়াই করছি।”

এ বারের নির্বাচনী ইস্তাহারে পিডিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হবে। ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা এ বারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনিও জানিয়েছেন, ভোট মিটলেই বিধানসভায় ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পেশ করা হবে। ২০১৪ সালে যখন শেষবার সেখানে বিধানসভা ভোট হয়েছিল, মেহবুবার দল তখন জোট বেঁধেছিল বিজেপির সঙ্গে। তার পিতা প্রয়াত মুফতি মহম্মদ সৈয়দ তখন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে ২০১৬ সালে পিতার মৃত্যুর পর মুখ্যমন্ত্রী হন মেহবুবা এবং ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে জোট ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে প্রাথমিক টালবাহানার পর কাশ্মীরে বিজেপিকে রুখতে এক ছাতার তলায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে  কংগ্রেস এবং ন্যশনাল কনফারেন্সে। সূত্রের খবর, বুধবার রাতেই ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতাদের সঙ্গে একপ্রস্ত কথা হয়েছে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের। সেখানেই তাঁরা একসঙ্গে লড়ার ব্যাপারে সহমত হয়েছেন। আসন সমঝোতার প্রাথমিক সূত্র বলছে, কংগ্রেস কাশ্মীর উপত্যকায় ১২টি আসনে লড়তে চায়। বদলে ন্যাশনাল কনফারেন্সের জন্য জম্মুতে ১২ আসন ছাড়তে রাজি হাত শিবির। আসলে কাশ্মীরের দুই অংশে দুই দল শক্তিশালী। কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্সের ঘাঁটি, তুলনায় দুর্বল কংগ্রেস। আবার জম্মুতে শক্তিশালী হাত শিবির। তুলনায় দুর্বল ন্যাশনাল কনফারেন্স। দুই শিবির একসঙ্গে লড়লে বিজেপি তথা এনডিএ কড়া টক্কর দেওয়া যাবে।

সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া

মহাকাশে আটকে পড়া দুই নভোচারীকে উদ্ধারের সামর্থ্য নেই ভারতের!

ইন্দো-আমেরিকান মহাকাশচারী সুনিতা উইলিয়ামস এবং তার সঙ্গী বুচ উইলমোরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) আটকে পড়েছেন। নাসা এবং বোয়িং তাদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু স্টারলাইনার মহাকাশযানের সমস্যার কারণে তাদের পৃথিবীতে ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা ইসরো কি তাদের সাহায্য করতে পারবে? এরই স্পষ্ট জবাব দিয়েছেন ইসরো প্রধান।

এ বছরের ৫ই জুন নাসার মহাকাশচারী সুনিতা উইলিয়ামস এবং বুচ উইলমোর ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে বোয়িং-এর স্টারলাইনারে চড়ে মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। ৬ জুন তারা দুজনেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) পৌঁছান। এই মিশন ছিল মাত্র আট দিনের। কিন্তু তারা দুজনই আজ পর্যন্ত মহাকাশে আটকে আছেন। স্টারলাইনারে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই তাদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। নাসা এবং বোয়িংয়ের বিজ্ঞানীরা তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য ক্রমাগত চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি।
সুনিতা উইলিয়ামস ইন্দো-আমেরিকান মহাকাশচারী। দীর্ঘতম স্পেসওয়াকের রেকর্ডও রয়েছে তার দখলে। নাসা এবং বোয়িং এর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, ভারত কী কোনো ভাবে সুনিতা উইলিয়ামসকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারবে? সম্প্রতি, ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (ইসরো) প্রধান এস সোমনাথকে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, সুনিতা উইলিয়ামসকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরাসরি কোনোভাবেই সাহায্য করতে পারে না। দুই মহাকাশচারীকে ফিরিয়ে আনতে পারে একমাত্র আমেরিকা বা রাশিয়া।
ইসরো গত কয়েক দশকে মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। চন্দ্রযান এবং মঙ্গলযানের মতো সফল অভিযান ভারতকে মহাকাশে অভিযানের তালিকায় প্রথম দিকে স্থান দিয়েছে । এমন পরিস্থিতিতে, যখন সুনিতা উইলিয়ামস এবং তার সঙ্গী বুচ উইলমোর আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) আটকে পড়েছেন, তখন কেন ইসরো তাদের সাহায্য করতে পারছে না?
ইসরো প্রধান এস সোমনাথ বলেন, আমাদের কাছে এমন কোনও মহাকাশযান নেই যা সেখানে গিয়ে তাদের বাঁচাতে পারে। এটা সম্ভব নয়। এটা একমাত্র আমেরিকা বা রাশিয়া করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন মহাকাশযান রয়েছে এবং রাশিয়ার কাছে সয়ুজ নভোযান রয়েছে যা উইলিয়ামস এবং উইলমোরকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। এমন নয় যে মহাকাশে মানুষ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা ভারতের নেই। এই বছরের শেষে ইসরো মহাকাশে মানুষ পাঠানোর পরীক্ষা পরিচালনা করবে।
ভারতের মানব মহাকাশ মিশন কর্মসূচির নাম ‘গগনযান’। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এর পরীক্ষা শুরু হতে পারে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর ইসরো তার মহাকাশচারীদের মহাকাশে পাঠাবে, এই মিশনটির নাম এ-২। ইসরো জানিয়েছে, সুনিতা উইলিয়ামসের পরিস্থিতি গগনযান মিশনের জন্য একটি শিক্ষা হবে গগনযান মিশনের জন্য অপ্রত্যাশিত প্রযুক্তিগত সমস্যার জন্য প্রস্তুত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই মিশনটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফল হয়। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) বলেছে যে আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা মহাকাশচারী সুনিতা উইলিয়ামস যে চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয়েছে তা দেশের গগনযান মিশনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ। উইলিয়ামস এবং আরেক মহাকাশচারী বুচ উইলমোর দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশে আটকে আছেন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

শামীম ওসমান ও তার সঙ্গীদের গুলি ছোড়ার ভিডিও ভাইরাল

নারায়ণগঞ্জে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার সহযোগীদের গুলি ছোঁড়ার ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল (শনিবার) এ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।

২৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায় শামীম ওসমান ও তার কয়েক শতাধিক অনুসারী আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে শহরের চাষাঢ়া এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কে শহরের ২ নম্বর রেলগেইট এলাকার দিকে ধাওয়া করে।

সেখানে শামীম ওসমানের শ্যালক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক তানভীর আহমেদকে (টিটু) গুলি ছুড়তে যায়। ভিডিওতে শামীম ওসমানের ছেলে (অয়ন) এর শ্বশুর ফয়েজ উদ্দিন (লাভলু) ও তার ছেলে মিনহাজুল ইসলাম ও শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ শীতল পরিবহণ বাসের পরিচালক অনুপ কুমার সাহা, ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নিয়াজুল ইসলাম (২০১৮ সালে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে আলোচিত) প্রমুখকে দেখা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৯শে জুলাই বিকেলে শহরের চাষাঢ়া বঙ্গবন্ধু সড়কে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা–কর্মীরা মিছিল বের করেন। এসময় একটি উঁচু ভবনের ওপর থেকে মুঠোফোনে ভিডিওটি ধারণ করা হয়।

এছাড়া ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায় ডিবিসি নিউজ ও যুগান্তর পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদকে। পরে পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে গতকাল রাজকেু বরখাস্ত করা হয়েছে।

এদিকে ১৯ জুলাই শহরের নয়ামাটি এলাকায় চারতলার বাড়ির ছাদে খেলার সময় ৬ বছরের শিশু রিয়া গোপ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অভিযোগ উঠেছে, শামীম ওসমান ও তার সহযোগীদের গুলিতে রিয়া গোপের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শামীম ও তাঁর ছেলে অয়ন ও তাদের অনুসারী শাহ নিজামের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আমির খসরু বলেন, ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। লাইসেন্সকৃত বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিশু রিয়া গোপের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন ওই এলাকা কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। কার গুলিতে রিয়া গোপের মৃত্যু হয়েছে, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়াদের তালিকা প্রকাশের দাবি মেজর হাফিজের

গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের সময় সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়াদের তালিকা প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। রোববার শেরে বাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এই দাবি জানান। এরআগে মেজর হাফিজ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানান। এসময়ে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীনসহ মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন,  এই সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমি বলতে চাই, বাহিনীকে এমনভাবে রাখবেন, এমনভাবে তাদের আচরণ হওয়া উচিত যাতে মনে না হয় যে, তারা জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে যে ৪৮৭ জন এখানে (সেনানিবাসে) আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের তালিকা প্রকাশ করুন। তালিকা প্রকাশে ভয়ের কি আছে?

তিনি বলেন, আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, বিপ্লবের কয়েকদিন পরে একটি প্রতিবিপ্লব সংঘটিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে মদদ দিয়েছে কয়েকজন বিচারপতি এবং গোপালগঞ্জে কিছু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মদদপুষ্ঠ সন্ত্রাসী দল। কিভাবে তারা এই সাহস দেখায়? তারা সেনাবাহিনীর গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, সেনাবাহিনীকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চাই, আমরা এই বিপ্লবের সফল পরিণতি দেখতে চাই। সেনাবাহিনীর উদ্দেশে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করেন এবং কখনও ভুলে যাবেন না আপনারা কেউ জনগণের প্রভু নন। আপনাদের আচরণের বিনয় থাকতে হবে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিপ্লবের লক্ষ্য পূরণের জন্য আমরা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সাহায্য সহযোগিতা দেব। কিন্তু তাদেরকে বিপ্লবের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে হবে। যারা বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছে তাদেরকে নিয়ে আপনারা সরকার পরিচালনা করুন।”

মেজর হাফিজ বলেন, অবিলম্বে বিতর্কিত ব্যক্তিদেরকে সরিয়ে প্রয়োজন হলে উপদেষ্টা পরিষদে আরও ছাত্রদেরকে নেন। যারা বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছে তাদেরকে নেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের প্রয়োজন নেই, যারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, দুঃসময়ে চুপ থাকে আর বিজয়ের পরে এসে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়, ওই ধরনের বুদ্ধিজীবীদের আমাদের প্রয়োজন নেই। সুতরাং এই অবস্থার অবসান চাই। প্রকৃত বিপ্লবীদেরকে নিয়ে এই সরকার গঠিত হোক, সেটাই আমরা কামনা করি।

অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে তিনি বলেন, ২০ দিন অতিবাহিত হয়েছে, এখন পর্যন্ত মনে হয় না বিপ্লবীদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেবলমাত্র আসিফ নজরুল ছাড়া এই বিপ্লবে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে কাউকে দেখিনি। এখানে আমার সঙ্গে আজকে উপস্থিত ইশতিয়াক আজিজ উলফাতসহ মুক্তিযোদ্ধারা যারা আছেন, তারা ৫ আগস্টের আগে এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন, শহীদ মিনারে, জনতার কাতারে গিয়ে শামিল হয়েছেন। আমি সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এটি কোনো এনজিও সরকার নয়, বাংলাদেশের জনগণের সরকার। যারা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

যারা শেখ হাসিনাকে এতদিন ধরে শক্তিশালী করেছে, তাদের কেউ যদি উপদেষ্টা পরিষদে থেকে থাকে তাহলে তাদের সরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হাফিজ। বলেন, আপনারা কেউ ভাববেন না যে, বিজয় অর্জিত হয়ে গিয়েছে। পাশের দেশে বসে শেখ হাসিনা অনেক ষড়যন্ত্র করবে। সুতরাং আপনারা সজাগ থাকবেন।

শেখ হাসিনা কীভাবে চূড়ান্ত স্বৈরাচার হয়ে উঠলেন -নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন

তীব্র আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলেন বজ্রকঠিন হাতে দেশ চালানো শেখ হাসিনা। এমনকি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে ওই দিন ছাত্র-জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ে। গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় উদ্‌যাপন করেন তাঁরা। সেই সঙ্গে অবসান ঘটে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের নারী সরকারপ্রধানের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনেরও।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হাসিনার শেষ ২৪ ঘণ্টা ছিল ঘটনাবহুল; যা স্মরণে রাখার মতো। এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে প্রথম আলো, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ অন্যান্য গণমাধ্যম।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভ প্রশমনে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় দেশজুড়ে কারফিউ জারি করেন শেখ হাসিনা। ওই দিন রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে অনলাইনে একটি বৈঠক করেন। কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসা বেসামরিক লোকজনের ওপর গুলি না চালাতে বৈঠকে নির্দেশনা দেন তিনি।

পরদিন ৫ আগস্ট ভোরে শেখ হাসিনা কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বিক্ষোভকারীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর জন্য দায়ী পুলিশ বাহিনীও হাসিনাকে জানিয়ে দেয়, তারা পরিস্থিতির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হাসিনাকে পদত্যাগ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

পরে ওই কর্মকর্তা ‘অবাধ্য’ হাসিনাকে পদত্যাগে রাজি করাতে তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে অনুরোধ জানান, কিন্তু কাজ হয়নি। এরপর হাসিনার যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁকে ফোন করেন। শেষমেশ পদত্যাগ করেন তিনি। এ সময় ভারতে ঢুকতে সাময়িক অনুমতির জন্য তড়িঘড়ি আবেদনও করেন হাসিনা।

অবস্থা বেগতিক দেখে হাসিনা ও তাঁর বোন রেহানা সামরিক হেলিকপ্টারে করে গণভবন ত্যাগ করেন। দুপুর আড়াইটায় ভারতের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তাঁরা। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা চালানো হাসিনার জীবন ছিল ঝড়ঝঞ্জাপূর্ণ।

১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। বাবা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নায়ক। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার চার বছর পর কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে সপরিবার নিহত হন তিনি। তবে হাসিনা ও রেহানা ওই সময় জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। কয়েক বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তাঁরা।

হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসেন ও আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। ১৯৯০-এ দেশে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হলে ১৯৯১-এর সাধারণ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন হাসিনা। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির কাছে তাঁর দল অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যায়।

পাঁচ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হন হাসিনা। প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীও হন তিনি। পরবর্তী সময়ে প্রধান এ দুই দল পর্যায়ক্রমে নির্বাচনে জেতে। যাহোক, ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জেতার পর হাসিনা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। শুরু করেন বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন। সেই সঙ্গে ক্ষমতাও দীর্ঘায়িত করতে থাকেন তিনি।

দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে দেখা গেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক খাতের মতো শ্রমঘন কিছু শিল্প। তবে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ছিল উচ্চ বেকারত্ব। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তাঁরা এর বিলুপ্তি দাবি করেন।

এদিকে বিএনপির মতো বিরোধী দলগুলো বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে বলে দাবি করেন শেখ হাসিনা। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যখন আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বংশধরদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে বক্তব্য দেন তিনি।

এতে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট সরকারি চাকরি থেকে কোটাব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি তুলে দেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অনেকে প্রাণ হারান।

বিক্ষোভকারীদের ওপর নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালানোর খেসারত দিতে হয়েছে হাসিনাকে। এটা বিস্ময়কর যে ৪৩ বছর আগে স্বাধীনতার নায়কের কন্যা হিসেবে দেশবাসী যাঁকে বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে, এখন তাঁকেই আবার নির্বাসনে যেতে হয়েছে।

বড় প্রশ্ন হলো, হাসিনা যেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার আশা করছিলেন, সেই তিনিই কেন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হয়ে দাঁড়ালেন।

মায়ুমি মুরায়ামা জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকোনমিসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে হাসিনা প্রথম যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তাঁকে একজন কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিক হিসেবে প্রাথমিকভাবে আমার মনে হয়নি।’ দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল শেষে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর তিনি কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন বলে ইঙ্গিত দেন মায়ুমি।

ক্ষমতায় ফিরে হাসিনা সংবিধান সংশোধন করেন। অবসান ঘটান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার। অথচ বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি এ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিলেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অনুপস্থিতি দেশে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাঁর কর্তৃত্ববাদী আচরণ বাধাহীনভাবে অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দেয়।

একপর্যায়ে শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি করেন। তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুর্বল হয় বিএনপি। তবু হাসিনার কর্তৃত্ববাদী আচরণ বিরোধীদের দমন করা থেকে এতটুকু দমায়নি তাঁকে। তিনি তাঁর বাবাকে ‘দেবতাতুল্য’ করে তোলার চেষ্টা ত্বরান্বিত করেন এবং এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে সরকারের সমালোচনা সহ্য করা হয় না।

গণমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর খড়্গহস্ত হন হাসিনা। আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রশাসনের সমালোচকদের হয়রানি করা হয়। চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে বিক্ষোভ ছিল হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের প্রাথমিক সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগকে সমর্থনকারী ছাত্রদের (ছাত্রলীগ) বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

হাসিনা তাঁর নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও একসময় নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেন। ভারতের সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর কথায়, ‘হাসিনা ক্রমেই তাঁর সেরা উপদেষ্টাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।’ পরিশেষে, শুধু বোন রেহানাকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারেন বলে মনে করেন।

মায়ুমি মুরায়ামার পর্যবেক্ষণ হলো, ‘আজ্ঞাবহ ব্যক্তিপরিবেষ্টিত হয়ে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের যুক্তিগুলো ও সত্যিকারের উপলব্ধি হয়তো অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন এই প্রধানমন্ত্রী (ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা)।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন আর দ্বিদলীয় রাজনীতিকে মানতে পারছেন না; যা এত দিন ধরে চলে এসেছে। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তৃতীয় কোনো দলের উঠে আসা ও জনগণের কাঙ্ক্ষিত বিকল্প হয়ে ওঠাও কঠিন হবে।’

স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি সামরিক বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনমুক্ত একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশ হয়ে উঠতে সক্ষম হবে? এ দেশ কি পারবে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিতে?

জাকিরের ঘুষের হাট by পিয়াস সরকার

এলাকার নেতা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষার দায়িত্বে। ২০২০ সালের কথা, টাইম স্কেল উন্নীত করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন কুড়িগ্রাম জেলাসহ আশপাশের এলাকার মানুষ। এভাবেই বলছিলেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, অবসরে যাওয়ার আগে পেন্ডিং টাইমস্কেল পাওয়ার আশা করছিলাম। যদিও এটা আমার অধিকার কিন্তু মিলছিল আর কই। এরপর প্রতিমন্ত্রীর আস্থাভাজন সহযোগী কল্লোলের কাছে শিক্ষক নেতাদের মাধ্যমে সবাই মিলে প্রায় তিন লাখ টাকা দেই। কিন্তু মন্ত্রীর দায়িত্ব চলে যাবার পর কোনো লাভ হয়নি। মন্ত্রীর বাড়িতে টাকা চাওয়ায় পেটানোর খবর শোনার পর টাকা চাওয়ার সাহসটাও করেনি কেউ। শেরপুর জেলার এক শিক্ষক নেতা বলেন, আমাদের এই আন্দোলন তো ২০১৪ সাল থেকেই চলছে। নতুন প্রতিমন্ত্রী আসার পর আমরা যোগাযোগ করি। জাকির হোসেন শুধুমাত্র দাবি উত্থাপনের জন্য আমাদের কাছে টাকা দাবি করে বসেন। এরপর আমরা প্রতিটি স্কুল থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা তুলি। যেটা প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হয়। আমরা এই টাকা তুলে প্রতিমন্ত্রীর হাতে দেই শুধুমাত্র সংসদে ও সংশ্লিষ্ট মহলে আমাদের দাবি তুলে ধরার জন্য।

অনেকটা অপ্রত্যাশীতভাবেই ২০১৮ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান জাকির হোসেন। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে যেন আলাদীনের চেরাগে ঘষা লাগে হাত। হয়ে ওঠেন দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত। গড়েছেন অর্থসম্পদের হাজার কোটি টাকার পাহাড়। এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে মিন্টো রোডের বাড়িতে গেলেই কাজ হয়ে যেত। আর শিক্ষার দায়িত্ব পালন করলেও এতটাই অজ্ঞ ছিলেন যে সচিব ছাড়া কোনো কথা কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। দায়িত্ব হারানোর পর ঘুষের টাকা চাইতে গেলে নিজে হাতে পিটিয়েছেন। জানাজানি হবার পর ঘুষের টাকা ফেরতও দিয়েছেন। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর দুর্বৃত্তরা হামলা করে জাকির হোসেনের বাড়িতে। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর স্বজনরা দাবি করেন শুধু বাড়ি থেকেই খোঁয়া গেছে নগদ ২৫ কোটি টাকা ও কয়েকশ’ ভরি স্বর্ণ।

২০১৫ সাল থেকে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাকির হোসেন ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেইসঙ্গে পান গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এটিই ছিল অত্র এলাকার প্রথম মন্ত্রী।

২০১৮ সালে প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই গড়েন সিন্ডিকেট। তার দায়িত্বকালে অনলাইনের বাইরে বদলি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু টাকা হলেই বদলি হওয়া যায়। এরজন্য ২০২০ সালের পূর্বের কোনো তারিখ দেখিয়ে আদেশ জারি করতেন। একেকটি বদলির জন্য তিনি নিতেন ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। রাজধানী বা বড় শহরে বদলির জন্য ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিতেন তিনি। এমনকি এসব বদলি কার্যক্রমের আপডেট অনলাইনে দেবার নিয়ম থাকলেও মানতেন না তা। সাজিদুল হাকিম নামে এক শিক্ষক বলেন, আমি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থেকে পীরগঞ্জ জেলায় যাবার জন্য আবেদন করি। অনলাইনে ফাঁকা দেখালেও পরে জানতে পারি ইতিমধ্যে এই স্থানে অন্য আরেকজন শিক্ষক যোগ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এই উপজেলার আরেকটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে চাইলে শিমুল নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তিনি জানান এটা প্রতিমন্ত্রী নিজে করে দেবেন এজন্য ৩ লাখ টাকা লাগবে।
তিনি জানান, এই শিমুল শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এর বেশি কোনো তথ্য বা মোবাইল নম্বর দিতে পারেননি তিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তৎকালীন সচিব ফরিদ আহাম্মদ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একটি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এসব বদলির আদেশ সংশোধিত বদলির নির্দেশিকা জারির আগেই অনুমোদন করানো ছিল। পরে বদলির আদেশ জারি হয়েছে।

এর বাইরে জাকির হোসেনের ছিল সরকারি চাকরিতে সুপারিশ ও ডিও লেটার পাঠানোর বাণিজ্য। তিনি এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে ও চাকরির জন্য সুপারিশ করতেন। অনেকেরই চাকরি হতো। প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে নমিনেশন না পাওয়ার পর বিক্ষোভ করেন ৪৮ জন চাকরিপ্রত্যাশী। তারা জানান তাদের কাছ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেবার জন্য প্রায় ৬ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। এই অর্থ ফেরত চাওয়ায় জাকির হোসেন সরকারি বাসভবনে নির্মম মারধরের শিকার হয়েছেন পুলিশ সদস্যসহ তিন ব্যক্তি। এ ঘটনার পর উল্টো থানায় লিখিতভাবে প্রতিমন্ত্রীর বাসায় চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়। হামলার শিকার একজন আবু সুফিয়ান বিশ্বাস বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক। তিনি বলেন, অগ্রিম টাকা দেয়ার পরও চাকরি না হওয়ায় প্রতিমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে দেখা করি। এ সময় প্রতিমন্ত্রী তাদের টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা ফেরত মেলেনি। এরপর আমরা ৪৮ জনের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করি। এরপর ৭ই ডিসেম্বর ২০২৩ সালে তার মিন্টো রোডের বাসায় ডাকেন।

তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী কল্লোলের কক্ষে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে আসেন জাকির হোসেন। এ সময় কর্মচারী ও বাসার নিরাপত্তায় থাকা সাত-আটজন ওই কক্ষে প্রবেশ করে দরজা আটকে তিনজনকে পেটাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা নাছির ও জাহিদ প্রধান ফটক দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। আমি পাশের দেয়াল টপকে ডিবি কার্যালয়ে ঢুকে পড়ি।

তিনি এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে এরপর অফিস সহায়ক মো. মমিনকে দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। এরপর এই ঘটনা জানাজানি হলে ঘুষের টাকা ফেরতও দেন তিনি। ঘুষের টাকা ফেরত দেবার মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ মেলার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়রাও নিয়োগের জন্য টাকা হাতিয়ে নিতেন। তার এক আত্মীয় ছিলেন নাম লিটন। উনি নিয়োগের কথা বলে অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। রংপুর জেলার ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক নেতার আত্মীয় আবু সায়েম। তিনি বলেন, আমার চাচাতো ভাই ছাত্রলীগের নেতা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার বের হবার পর আমার ভাই লিটনের কাছে নিয়ে যায় কুড়িগ্রাম জেলায়। আমাদের রাত ৯টার দিকে তার বাড়িতে আসতে বলেন। সেখানে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আরও চার থেকে পাঁচজন প্রার্থী ছিলেন। এরপর আমাদের ডেকে নেয়া হয় তার ব্যক্তিগত কক্ষে। যাবার সময় ফোন বাইরে রেখে যেতে হয়। তিনি বলেন, সবার কাছে ৬ লাখ করে টাকা নিচ্ছি। তোমার ভাইয়ের জন্য ১ লাখ টাকা ছাড় দিলাম। এখন ১ লাখ। পরীক্ষার আগে ১ লাখ আর চাকরি হবার পর বাকি ৩ লাখ দিতে হবে। আমি তার কথামতো ২ লাখ টাকা দেই।

শুধু তাই নয়, জাকির হোসেনকে ভাগ দিয়েই কাজ করতে হতো ঠিকাদারদের। তারা অভিযোগ করেন এসব কাজের জন্য কাজের ধরন ও পরিমাণভেদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ভাগ দিতে হতো। আর যেকোনো কাজের জন্য তার ভাগ ছিল ৫ শতাংশ। আবার শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনকে খুশি করে বেশ কয়েকটি কাজ কাগজে কলমে দেখিয়েও বাগিয়ে নিতেন টাকা।
বেশ কয়েকবার কয়েকটি বিষয়ে ভাইরালও হয়েছিলেন জাকির হোসেন। ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষক সমাবেশে রাজীবপুরে সোনার নৌকা উপহার নেন। এই নৌকা দিতে প্রধান শিক্ষকদের দিতে হয় ১ হাজার ও সহকারী শিক্ষকদের ৫০০ টাকা করে। আবার তার পুত্র সাফায়াত বিন জাকিরের (সৌরভ) বৌভাতের দাওয়াত পালনের জন্য রৌমারী, রাজীবপুর ও চিলমারী উপজেলার ২৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। এবারও শিক্ষকদের উপহার দিতে ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। শিক্ষকদের প্রায় ৬ লাখ টাকা চাঁদায় বর-বধূকে উপহার দেয়া হয়। কুড়িগ্রাম জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পিটিআই) থাকার পরও নিজ উপজেলা রৌমারীতে আরেকটি পিটিআই করতে উদ্যোগ নেন। যেখানে জমি দেন তার আত্মীয়স্বজনরা। চার একর জমির উপর হওয়া এই প্রকল্পের মূল্য ধরা হয় ৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এই প্রকল্প নিজ উপজেলায় হওয়ায় সকল কার্যক্রম নিজে দেখাশোনা করতেন। তৎকালীন সময়ে ঠিকাদাররা বলেছিলেন এই প্রকল্পের মূল্য ২৫ থেকে ২৮ কোটি টাকার বেশি হবার কথা নয়।

মানবজমিন কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী প্রতিনিধি জানান, জাকির হোসেন রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী এলাকায় অবৈধ বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারবাজি, জমি দখল, হাটবাজার ইজারা নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, থানায় মামলা নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন। নামে- বেনামে তার ঢাকায় একাধিক বাড়ি, রংপুরে বাড়ি, কুড়িগ্রাম জেলা শহরে বহুতল বাড়ি, রৌমারীতে দুটি বাড়ি এবং রাজিবপুর উপজেলায়ও রয়েছে একটি বাড়ি। চারটি মার্কেট, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে ৫টি স্থানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। মিল, চাতাল, খামারবাড়ি-সবই আছে তার। যার মূল্য কয়েক শ কোটি টাকা।
এখানেই শেষ নয়, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সব বরাদ্দে মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটকে কমিশন না দিলে মেলে না সুবিধা। ভিজিডি, ভিজিএফ, সরকারের ঘর বরাদ্দ, টিআর, কাবিখা, কাবিটাসহ সব কর্মসূচির বখরা যায় নেতাদের পকেটে।
স্থানীয়রা বলছেন, আওয়ামী লীগের সরকারের আগের মেয়াদে মন্ত্রীর এবং পরিবারের নামে ও বেনামে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ। মন্ত্রীর বাড়ি রৌমারীর মণ্ডলপাড়া রূপ নিয়েছে মন্ত্রীপাড়ায়। তার আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটের অন্তত ১১ জনের বহুতল বাড়ি রয়েছে।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা জানান, ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ও তার আশীর্বাদপুষ্টরা অনেক ভূমি ও সম্পদ দখলের ঘটনায় জড়িয়েছেন। রৌমারী সদর ইউনিয়নের তুরা রোডে সড়ক ও জনপথের (সওজ) ৭০ শতাংশসহ ব্যক্তিমালিকানার কিছু জমি অবৈধভাবে দখল করে ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে এই দখলের কয়েক মাস পর রাতের আঁধারে সেই সাইনবোর্ড উধাও হয়ে যায়।

এলাকাবাসী আরও জানান, দায়িত্বে থাকাবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের নামে রৌমারীর চরশৌলমারী ইউনিয়নের ঈদগাহ মাঠ নামক স্থানে প্রায় আড়াই একর জায়গা অধিগ্রহণের জন্য নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সেই জায়গা দখল করে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের প্রায় ২ কোটি টাকার জায়গা এখন মন্ত্রীর দখলে। একইভাবে তুরা রোডের গুচ্ছগ্রামে ১৫ শতাংশ, পাশে ২১ শতাংশ ও অপর একস্থানে ৫০ শতাংশসহ প্রায় ২ একর জায়গা দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

সদর ইউনিয়নের জন্তিরকান্দা নামক স্থানে সরকারি এক একর জায়গা দখল করে প্রতিমন্ত্রী ‘শিরি অটোরাইস মিল’ নামে শিল্পকারখানা নির্মাণ করেন। এ জমির মূল্য ৩ কোটি টাকা। কর্তিমারী বাজারের সোনালী ব্যাংক সংলগ্ন ১নং খাস খতিয়ানের ৪ কোটি টাকা মূল্যের ৩২ শতক জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে মার্কেট। রাজিবপুর উপজেলার শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম সংলগ্ন ২ কোটি টাকার সরকারি পুকুরের ২০ শতাংশ জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানঘর।

এ ছাড়াও বন্দবেড় ইউনিয়নের কুটিরচরে এক একর, দইখাওয়া এলাকায় ৫ একর, উপজেলার দাঁতভাঙ্গা বাজার এলাকায় ১ একর সরকারি জায়গা দখল এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভরাট করে ‘আরব আলী বাবার মাজার’ নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। ইছাকুড়ি মহিলা মাদ্রাসা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোসহ জায়গা দখল করে মন্ত্রী গড়ে তোলেন ‘জাকির হোসেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কার, মাটিভরাটসহ বিভিন্ন কাজের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ৩০ শতাংশ হারে ভাগ নিতেন প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। সবমিলে গত ৫ বছরে জাকির হোসেন অবৈধ ভূমি দখলসহ কামিয়েছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা।

তার বিরুদ্ধে রয়েছে পুরো এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। এ ছাড়াও ২০২০ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক মাইক্রোবাসে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার সময় ইয়াবাসহ গাড়িচালক রফিকুল ইসলামকে আটক করে র‌্যাব-১৪’র একটি দল। জাকির হোসেনের সঙ্গী সেকেন্দার বাবলুও গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এদিকে আওয়ামী লীগ সকারের পতনের পর উত্তেজিত জনতা কর্তৃক ভাঙচুরের ঘটনায় রৌমারী জাকির হোসেনের বাড়িতে বিপুল অর্থ ও ত্রাণ উদ্ধার হয়। বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কোটি নগদ টাকা ও কয়েক’শ ভরি স্বর্ণের গহনা লুট হওয়ার খবর জানিয়েছে মন্ত্রীর স্বজনরা। এ ছাড়াও আসবাবপত্র, ডজনখানেক টিভি-ফ্রিজ, ৮টি মোটরসাইকেল, ৩টি ট্রাক, ৮ কোটি টাকা মূল্যের ১টি ল্যান্ডক্রুজার জেটএক্স গাড়ি ও ১টি মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অপরদিকে মেলে সরকারি ত্রাণের কম্বল, ত্রাণের কয়েক’শ বান্ডেল ঢেউটিন, করোনার স্যানিটাইজার সামগ্রী ফুটবলসহ খেলার উপকরণ ও মাস্ক।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ও তার সহযোগী কল্লোলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ৪১ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার মধ্যে রয়েছে জাকির হোসেনের নাম।

মামলাগুলো ছাত্র আন্দোলনের ফসলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে: সারা হোসেন

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা মামলা হচ্ছে। এসব মামলা প্রসঙ্গে আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, এগুলো টিকবে না এবং প্রথম ধাপ পার হতে পারবে না। ছাত্র আন্দোলনের ফসলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে মামলাগুলো।

আজ শনিবার ‘সিভিল রিফর্ম গ্রুপ-বাংলাদেশ ২.০’–এর উদ্যোগে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে সারা হোসেন এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) কার্যালয়ে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে নানা ধরনের মামলা দেখা যাচ্ছে। কোনোটিতে ৩০, ৪০ ও ৫০ জনের বেশি করে আসামি। অনেকের রাগ ও ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু এ ধরনের মামলা লিখলে কাজ হবে না, টিকবে না। প্রথম ধাপই পার হতে পারবে না। মামলাগুলো আন্দোলন ও আন্দোলনের ফসলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটা বন্ধ করতে হবে।

সারা হোসেন বলেন, ‘এই মামলা কি পুলিশ করছে? সৎভাবে করছে? বুঝে করছে?’ তিনি বলেন, মামলার এজাহার ক্ষোভ ঝাড়ার জায়গা নয়।

ব্রিটিশ আমলের মানহানি আইনে এখনো মামলা হচ্ছে এবং কিছুদিন ধরে তা আবার দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, নতুন স্বাধীনতায় ব্রিটিশ আমলের আইন টেনে আনা হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।

মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের রিমান্ডে নিয়ে কী হচ্ছে, কে কী বলছে—সেসব বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে। এ প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, ১৫ বছর ধরে রিমান্ডে কী কথা হয়েছে, তা সূত্র দিয়ে গণমাধ্যমে আসছে। রিমান্ডে কী বলা হয়েছে বা না হয়েছে, তা কিন্তু কেউ জানে না। কিন্তু গণমাধ্যমে তা প্রকাশ হচ্ছে। এটার জন্য কাউকে জবাবদিহি করা হয়নি। রিমান্ডের বক্তব্য এভাবে প্রকাশ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনকে নিজের মতো চলতে দিন। অনেক ক্ষোভ, রাগ আছে। আপনারা এটা ফেস (মুখোমুখি হওয়া) করেছেন বলে অন্য কাউকে এটার মধ্য দিয়ে নেবেন না।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অন্তত ৮০ শিশু নিহত হয়েছে জানিয়ে সারা হোসেন বলেন, এই শিশুদের নিহত হওয়ার ভিডিও ফুটেজ যদি কারও কাছে থাকে, সেগুলো সংগ্রহ করে মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে এগোতে হবে। আদালতকে সুযোগ দিতে হবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য। পাশাপাশি দ্রুত বিচার আইন ছাড়া এ অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের বিচারের মামলা কার্যক্রম যেন সঙ্গে সঙ্গে পরিচালনার জন্য আদালত থেকে নির্দেশ আসতে হবে। তাহলে নিশ্বাস ফেলা যাবে এবং দেশ গঠনের কাজে নামা যাবে।

পুত্র ও ভাই মিলে এডিপি’র কোটি টাকা তছরুপ করেন সাবেক এমপি by প্রতীক ওমর

সাবেক এমপি সাহাদারা মান্নান। আসন সারিয়াকান্দি-সোনাতলা। আপন ভাই সোনাতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। পুত্র সারিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। একজন প্রকৌশলীর সহযোগিতা নিয়ে এডিপি’র কোটি টাকা কারসাজি করে পকেটস্থ করেছে। লুটপাটের রাস্তা পরিষ্কার করতে ভোট ডাকাতির মধ্যদিয়ে নিজের পুত্র ও ভাইকে সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন সংসদ সদস্য সাহাদারা। পুত্র ও ভাই নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণের পর থেকেই তিনজনে মাঠে নেমে পড়ে বিভিন্ন অনিয়মে। এর মধ্যে নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিকাদারি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টাকা উত্তোলনসহ একক আধিপত্য বিস্তার উল্লেখযোগ্য। বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় এমন কর্মকাণ্ডের তথ্য মিলেছে মানবজমিনের অনুন্ধানে। কাগজে কলমে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র।

অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্থানে কাজ দেখিয়ে ও বিতরণকৃত মালামাল ক্রয়ের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা চেয়ারম্যান। এসব নানামুখী অনিয়ম করে ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়। অন্যদিকে নিজ দলের নেতা কর্মীদের বিপদে ফেলে ইতিমধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন এসব অনিয়মের মাস্টারমাইন্ড বগুড়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহাদারা মান্নান শিল্পী ও সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট মিনহাদুজ্জামন লিটন। এতে করে এই ‘এডিপি’ প্রকল্পের বেশকিছু কাজ ঝুলে আছে। তবে কাজ ঝুলে থাকলেও এসব নির্মাণে সমুদয় অর্থ অনেক আগেই উত্তোলন করা হয়েছে।
এনুয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রোগাম (এডিপি)। বেশকিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করে এই প্রকল্পের কাজ করতে হয়। কী ধরনের কাজ করা যাবে আর কী ধরনের কাজ করা যাবে না তাও উল্লেখ করা আছে এই প্রকল্পের নির্দেশিকা বইটিতে। তবে এসব নিয়ম নীতির তোয়াক্কা কখনোই করা হয়নি বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায়। দীর্ঘদিনের আওয়ামী শাসনামলে সবকিছুই নিজেদের একান্ত করে নিয়েছিলেন সাহাদারা মান্নান। তার নানা ধরনের কৌশলে লুটপাট গত কয়েক বছরে লুটপাট হয়েছে কোটি কোটি টাকা। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকারি খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য (এডিপি) অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সোনাতলায় করা হয়েছে তার উল্টো। এই প্রকল্পের সমুদয় অর্থ ব্যয় করা হয়েছে দলীয় কর্মকাণ্ড ও নিজেদের পকেট ভারী করতে।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরের বরাদ্দে যে কাজগুলো করা হয়েছে সরজমিন এসব দেখে চোখ কপালে ওঠার মতো। আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে বালুয়া ইউনিয়নের জুয়েলের বাড়ির তিন মাথা মোড় হতে শাহিদুলের বাড়ি পর্যন্ত যে রাস্তার বর্ণনা দেয়া আছে সেখানে মাত্র ৯০ ফিট রাস্তা সিসি ঢালাই করা হয়েছে। যাতে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ৬০-৭০ হাজার টাকা। ১ লাখ ব্যয়ে শিহিপুরের রাস্তা, ২ লাখ ব্যয়ে গণসারপাড়ায় ইটের সোলিং, ১ লাখ ব্যয়ে গড়চৈতণ্যপুর কমারবাড়িতে সিসি ঢালাইকরণ, ১ লাখ ব্যয়ে দিগদাইড় উত্তরপাড়া মসজিদের নিকটে সিসিকরণ, আড়াই লাখ ব্যয়ে রংরারপাড়া দুলুর বাড়ির মোড়ে প্যালাসাইডিংকরণ, উত্তর আটকরিয়ায় আড়াই লাখ ব্যয়ে সিসিকরণ, আড়াই লাখ ব্যয়ে মহিচরণ বুলবুলের ‘ছ’ মিলের পাশে সিসিকরণ, ১ লাখ ব্যয়ে হড়িখালি টেকনিক্যাল কলেজ রোডে সিসিকরণ, দেড় লাখ ব্যয়ে ফুলবাড়িয়ায় ফাইদুলের বাড়ির মোড়ে সিসিকরণ, আড়াই লাখ ব্যয়ে পূর্ব তেকানী বড় মসজিদের পাশে প্যালাইডিং আড়াই লাখ ব্যয়ে পাকুল্লায় এনামুল বাড়ি টুটুলের পুকুর পাড়ে প্যালাসাইডিং করা হয়েছে। এসব কাজে ৩ ভাগের একভাগ অর্থও ব্যয় হয়নি। এ ছাড়া ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সোনাতলা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ সংস্কারের নামে পুরোটাই পকেটে তোলা হয়েছে। ৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যয়ে উপজেলা পরিষদের ভেতরে জয় বাংলা ফোয়ারা নির্মাণ কাজটি কিছুটা হয়ে আটকে আছে। আড়াই লাখ ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু চত্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিটি একটু কাৎ হয়ে আটকে আছে।
সাড়ে ৪ লাখ ব্যয়ে আব্দুল মান্নান বাস্কেট বল গ্রাউন্ড নির্মাণের নামে কিছু ইট বিছানো হয়েছে। পাকুল্লা উত্তরপাড়া ব্রিজের পাশে ২ লাখ ব্যয়ে আরসিসিকরণের নামে নামমাত্র সিসিকরণ, শিহিপুর সরকার পাড়া মসজিদের কাছে সিসিকরণ উক্ত কাজগুলোর নামে লাখ লাখ টাকা পকেটে তুলেছেন উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা চেয়ারম্যান। এ ছাড়া গরিব দুস্থদের মাঝে সেলাই মেশিন, নলকুপ, প্লাস্টিকের চেয়ার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেঞ্চ বিতরণের নামেও করা হয়েছে হরিলুট।
প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে স্প্রে মেশিন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্টিলের আলমারি, গরু খামারিদের মাঝে গামবুট, বিভিন্ন ক্লাবে ক্রীড়াসামগ্রী, ডেস্কটপ কম্পিউটার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মারকার পেন, কলম, মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রেস্ট বিতরণসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ দেখানোর শতকরা ৮০ ভাগই ভুয়া। তবে যেটুকু বিতরণ হয়েছে এসব সামগ্রীগুলোর উপরে স্টিকার সাঁটিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে লেখা রয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কিংবা, নৌকায় ভোট দিন অথবা সাহাদারা মান্নান শিল্পীর পক্ষ থেকে। আবার বিভিন্ন সভা সমাবেশে কিংবা বিতরণকালে এনাউন্স করা হয়েছে যে, উপজেলা চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে এসব দেয়া হচ্ছে।
উক্ত প্রকল্পগুলোর জন্য যেসব কমিটি করা হয়েছে। সেগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া। কারণ যাদেরকে কমিটিতে রাখা হয়েছে তারা জানেই না যে এডিপি প্রকল্পের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সদস্য তারা। এই কমিটিগুলোর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বললে তারা যেন আকাশ থেকে পড়েন। কারণ এসবের তারা কিছুই জানেন না। উক্ত প্রকল্পের সদস্যরা দাবি তোলেন আমাদের নাম ভাঙিয়ে যারা লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হোক।
উপজেলা আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী বলেন, আমরা সারাজীবন দল করে কিছুই পাইনি। বরং এমপির পরিবারতন্ত্রের কাছে জুলুম, অত্যাচার-নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছি। আজ এই বিপদের সময়ে তারা আত্মগোপনে চলে গেছে।
এ বিষয়ে সোনাতলা উপজেলা প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, বোঝেনি তো বাধ্য হয়ে এসব অনিয়মে সায় দিতে হয়েছে। এমপি উপজেলা চেয়ারম্যান যেসব করতে চাইছে আমাকেও তাই করতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন অসম্পূর্ণ যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো করতে ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করে পকেটে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এসবে যে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে। যেসব কাজ এখনো শেষ হয়নি সেগুলোর বিল কীভাবে উত্তোলন করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন কী আর বলার আছে, বোঝেনি তো সব কেন করতে হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান শিল্পী ও উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট মিনহাদুজ্জামান লিটন আত্মগোপনে থাকার কারণে তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

নজরদারি ও আড়িপাতা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি

ভিন্নমত দমন ও নাগরিক অধিকার দমনের জন্য দেশে গত কয়েক বছর কী কী ধরনের সফ্‌টওয়্যার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে তার শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি করা হয়েছে   নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। গতকাল রাজধানীর বেসিস সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠানে এই দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গত ১০ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অত্যাধুনিক সফ্‌টওয়্যার ও প্রযুক্তি আড়িপাতার জন্য কেনা হয়েছে। ইসরাইল ও অন্যান্য দেশ থেকেও করদাতাদের অর্থে কেনা এই সফ্‌টওয়্যার কোন বিবেচনায় ক্রয় করা হলো, কোন পদ্ধতিতে হলো এবং এগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সে ব্যাপারে নাগরিকদের জানার অধিকার আছে। বক্তারা বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে এ সব দামি সফ্‌টওয়্যার কেনা হলেও তা মূলত ব্যবহার হয়েছে রাজনৈতিক কারণে ও ভিন্নমত দমানোর জন্য। বেসিসের প্রাক্তন সভাপতি ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ‘আড়িপাতা, গোপনীয়তার অধিকার ও বাক-স্বাধীনতা’- শীর্ষক এই নাগরিক সংলাপে উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। আলোচকরা বলেন, দেশের সংবিধানে ৪৩ ধারায় প্রতিটি নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু তা সত্ত্ব্বেও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক টেলিযোগাযোগ আইনের কিছু ধারা ব্যবহার করে। গত বেশকয়েক বছর টেলিকম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে সাধারণ নাগরিকদের ফোন ট্যাপ করা হয়েছে। এটি করা হয়েছে কোনো ধরনের বিধি না মেনে কিছু ব্যক্তি বিশেষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী।

আলোচনার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এনটিএমসি ও ডিওটি’র মতো সরকারি যে সব অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছর এই আড়িপাতার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের সংস্কার করা বা নতুন লোক বসিয়ে কোনো সমাধান হবে না। এই দুই প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করতে হবে এখনই। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আড়িপাতার প্রয়োজনীয়তা থাকলে সেটির জন্য আলাদা কমিশন করে নতুন বিধিবিধান তৈরি করতে হবে। মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, আদালতের ঘাড়ে বন্দুক ব্যবহার করে গত কয়েক বছর অনেক মানবাধিকার হরণের ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও আগের মতো অপ্রাসঙ্গিক ও দুর্বল মামলা এবং রিমান্ডে বিভিন্ন আসামির বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশের প্রতিবাদ জানান। তিনি গত কয়েক বছর মিডিয়াতে বিভিন্ন ব্যক্তির কল রেকর্ড ফাঁসের ঘটনায় মিডিয়ার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য-প্রযুক্তি অধ্যাপক মইনুল হোসেন বলেন, দেশের কোনো আইন যদি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা মানের সঙ্গে না হয়, তাহলে তার পরিবর্তন করতে হবে। সাংবাদিক গোলাম মুর্তজা বলেন, পেগাসাসসহ যে সব ইসরাইলি পণ্য কেনা হয়েছে এবং কেনার সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে যেসব বেআইনি কাজ করা হয়েছে, এই কাজগুলো কার নির্দেশে হয়েছে, কোন প্রক্রিয়াতে হয়েছে, টাকা কীভাবে পরিশোধ করা হয়েছে, এটা বর্তমান সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট হিসেবে জানতে চাই। এনটিএমসিতে বসে মানুষের ফোন কল যে রেকর্ড করা হচ্ছে, এটি দিয়ে কার নিরাপত্তা রক্ষা করা হয়েছে? হাছান মাহমুদ মাঝে-মধ্যেই হুমকি দিতেন। বলতেন, আমাদের কাছে সব তথ্য আছে ফাঁস করে দেবো। আমার কথা রেকর্ড করার অধিকার তাকে কে দিয়েছিল। কোন সংবিধান দিয়েছিল।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আল-জাজিরা খ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সামি জানান, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও কাছের মানুষের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য, কল রেকর্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে। যা এনটিএমসি ও অন্যান্য এজেন্সির মাধ্যমে জোগাড় ও সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।  এগুলো দিয়ে তাদেরকে নিয়মিতভাবে ব্ল্যাকমেইল করা হতো বিশেষ প্রয়োজনে। তিনি বলেন, গোপনীয়তা ভঙ্গকারী রাষ্ট্রের এই এজেন্সিগুলো শুধুমাত্র সাধারণ নাগরিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নজরদারি করতেই ব্যবহার হতো না, নিজেদের লোকজনের কার্যক্রমও মনিটর করতে ব্যবহার হতো। অবিলম্বে সকল ব্যক্তিগত ও গোপনীয় রেকর্ড ধ্বংস করার দাবি জানান তিনি। মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিন্তু তা হতে হবে অবশ্যই আদালতের নির্দেশক্রমে। এনটিএমসি যা করেছে তার সম্পূর্ণভাবে সংবিধান এবং আইন-বহির্ভূত। বিটিআরসি’র চেয়ারম্যানের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য সোর্স মানি অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে তাও তদন্ত করা দরকার। বিদেশে যেহেতু অধিদপ্তর এ রূপান্তর করা হয়েছে তাই ডট এর প্রয়োজন নেই। ডট কে বিটিআরসি’র সঙ্গে একীভূত করা প্রয়োজন। আমরা ১০-১১ বছর কেন ঘুমিয়ে থাকলাম? ইন্ডাস্ট্রি গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন কথা বলতে দেখলাম না আমরা এতদিন? বিভিন্ন টেলিভিশন এবং ডিজিটাল বিন্যাসে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ হলো দিনের পর দিন কিন্তু কেউ প্রশ্ন করল না এই ভিডিও রেকর্ড বা কল রেকর্ড তারা কোথায় পেলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান, সাংবাদিক গোলাম মুর্তজা, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, রাজনীতিবিদ জুনায়েদ সাকি, এবি পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার ফুয়াদ, সাইবার বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির, মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, প্রাইভেসি বিশেষজ্ঞ সাবহানাজ রশিদ দিয়া, আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা, তথ্য-প্রযুক্তি সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা জাকারিয়া স্বপন, রাষ্ট্র চিন্তার দিদার ভূঁইয়া, উন্নয়ন গবেষক আহমেদ ওমর তৈয়ব প্রমুখ।

জুতা-ডিম নিক্ষেপ: যেভাবে ধরা পড়েন বিচারপতি মানিক by ওয়েছ খছরু ও মুফিজুর রহমান

গহীন অরণ্য কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত। চোরাচালানের নিরাপদ রুটও। ৫ই আগস্ট হাসিনা সরকার পদত্যাগের পর থেকেই সিলেটে বহুল আলোচনায় এই সীমান্ত। প্রতি রাতেই ডোনা থেকে খবর আসছিল। আওয়ামী লীগের নেতাদের দীর্ঘ সারি ডোনাতে। এ নিয়ে সরব ফেসবুক। আর এ সীমান্তেই জনতার হাতে ধরা পড়লেন দেশের আলোচিত-সমালোচিত সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তার খবরই শুধু নয়, আলোচনায় আছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মইনুল হোসেন খান নিখিল ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। তারা দু’জনও সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার পাইপ লাইনে রয়েছেন। মানিককে আটকের পর এখন কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের সীমান্ত জুড়ে স্থানীয় জনতার নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

পাহারায় রয়েছে ছাত্র-জনতাও। শামসুদ্দিন মানিককে নিয়ে যে ক্ষোভের শেষ ছিল না সেটি আটকের পর তার নিজ মুখের বয়ানেই স্পষ্ট হয়েছে। পটপরিবর্তনের পর তার ভয় বর্তমান প্রশাসনকে নিয়ে। এ কারণে তিনি সিলেট হয়ে ভারতে পালাতে চেয়েছিলেন। সিলেট সীমান্তে অবস্থান নিয়েছিলেন দু’দিন আগেই। পথ খুঁজছিলেন পালাবার। ডোনার দালালদের হাত ধরলেন। সঙ্গে ছিল ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বৃটিশ পাসপোর্টও। ডোনা মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি বস্তি। ওপার ডোনা আর এপার বাংলাদেশের মিকড়িপাড়া। সীমান্তঘেঁষা এক গ্রাম। বাংলাদেশের সীমানাঘেঁষা বাড়ি আলোচিত চোরাকারবারি ও দালাল সাদ্দামের। তার বাড়ি থেকে ৫০ ফুট দূরে সীমানা। বিকাল থেকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টের কাছে কলাপাতাকে বিছানা করে শুয়ে ছিলেন শামসুদ্দিন মানিক। এ দৃশ্য চোখ এড়ায়নি স্থানীয়দের।

একজন লোক শুয়ে আছেন সীমান্তে। প্রথমে কেউ পাত্তা দেননি। কিন্তু সময় যত গড়ায় স্থানীয়দের মুখে মুখে রটে এ খবর। এলাকার কয়েকজন যুবক কৌতূহলবশত যান সেখানে। কথা বলেন তার সঙ্গে। সন্ধ্যার একটু আগে সাবেক এই বিতর্কিত বিচারপতি নিজেই বিচারপতি মানিক বলে পরিচয় দেন। একইসঙ্গে তিনি স্থানীয় যুবকদের কাছে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা চান। দিতেও চান টাকা। পরে স্থানীয় যুবকদের ধারণ করা ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় শুরু হয়। নিশ্চিত হওয়া যায় তিনি সাবেক বিতর্কিত বিচারপতি। যাকে নিয়ে গোটা দেশেই আলোচনা। বিচার বিভাগও তার হাত ধরে বিতর্কিত হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে যুবকরা তাকে ঘিরে রাখে। খবর দেয়া হয় স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিনকে। তার কাছেও পাঠানো হয় ভিডিও। তিনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভিডিওটি নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেন। খবর দেন বিজিবি’র স্থানীয় বিওপি’র সদস্যদের। দুর্গম পথ। ক্যাম্প থেকে যেতে সময় লাগে একঘণ্টা। বিজিবি’র সদস্যরা সাড়া দিলেও ঘটনাস্থলে যেতে যেতে সময় লাগে অনেক। স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার  মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ জানান, বিজিবি গিয়ে কলাপাতায় শোয়া অবস্থায় তাকে আটক করে। এ সময় অবশ্য এলাকার মানুষ ওখানে ছিল। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আটক করেন। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি নিজেও নিজের পরিচয় দেন। এরপর তাকে ডোনা বিজিবি ক্যাম্পে এনে রাখা হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, মিকড়িপাড়া গ্রামের সাদ্দামসহ কয়েকজন দালাল তাকে ভারতে পাঠাতে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। পরে তারা কলাপাতার উপর রেখে চলে যায়। আমার ম্যাসেজে বিজিবি আটক করে। তিনি জানান, ডোনা সীমান্তে দালালরা অনেককেই পাচার করে। এর ধারাবাহিকতায় তারা সাবেক এই বিচারপতিকে ভারত পাঠাতে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু স্থানীয় জনতা ধরে ফেলায় তারা পালিয়ে যায়। তবে, জনতার হাতে আটকের পর শামসুদ্দিন মানিক জানিয়েছেন, স্থানীয় কয়েকজন দালাল তাকে ভারতে পাঠাতে এখানে নিয়ে আসে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তারা ডোনা সীমান্ত দিয়ে ভেতরে গহীন অরণ্য এলাকায় নিয়ে যায়। ওখানে যাওয়ার পর তাকে মারধর করে সঙ্গে থাকা ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে, ওই যুবকদের তিনি চিনেন না বলে জানান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৫ই আগস্টের পর ওই সীমান্ত দিয়ে অনেককে ভারতে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করা হয়েছে। দালালদের এই চক্রের মূলহোতা হচ্ছে সাদ্দাম হোসেন। তার বাড়ি মিকড়িপাড়া জিরোপয়েন্টে। সঙ্গে সাবেক মেম্বর মজির, রহিম ও রাজুসহ কয়েকজন ছিল। তারা শামসুদ্দিন মানিককে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে প্রায় ৭০ লাখ টাকা, বৃটিশ পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। মোবাইল ফোন নেয়ার পর শামসুদ্দিন মানিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এদিকে ভোররাতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর একটি টিম গিয়ে  শামসুদ্দিন মানিককে সিলেটে নিয়ে আসেন বলে জানিয়েছেন কানাইঘাট থানার ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন সর্দার। তিনি জানান, বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা দায়ের না করায় গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর হোসেনের আদালতে ৫৪ ধারায় হাজির করা হয়। সিলেট জেলা কোর্ট ইন্সপেক্টর জামসেদ আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আদালত শুনানি শেষে বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিককে কারাগারে আটকে রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে  দেশের বিভিন্ন জেলায় তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সেগুলোর অনুসন্ধানপূর্বক ব্যবস্থা  নেয়ার কথাও বলেছেন। শুনানি শেষে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানান কোর্ট ইন্সপেক্টর।

আদালতে বিক্ষোভ, ডিম নিক্ষেপ: শনিবার সকাল থেকে সিলেটে আদালতপাড়া ছিল সরগরম। স্থানীয় জনতার ভিড় ছিল। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষার পর মামলা না হওয়ায় বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শামসুদ্দিন মানিককে আদালতে আনা হয়। এ সময় শ’ শ’ জনতা আদালত এলাকায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কেউ তার ওপর জুতা, কেউ ডিম ছুড়ে মারেন। কেউ কেউ কিল-ঘুষি  দেয়ার চেষ্টা করেন। তবে, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় কড়া পাহারায় পুলিশ তাকে আদালতে তুলেন পরে বেরও করেন। এ সময় উপস্থিত থাকা সিলেট জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু বলেন, শামসুদ্দিন মানিক অতীতে যে কর্মকাণ্ড করেছে সেজন্য মানুষ ক্ষোভ দেখিয়েছে। সে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করেছিল। রাজাকার রাজাকার বলেও স্লোগান দিয়েছে। অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের এই ঘৃণা তার প্রাপ্তি বলে জানান তিনি।

গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় দুই ঘণ্টা পড়েছিল মনসুর by শরিফ রুবেল

সেদিন মনসুরের পুরো শরীর রক্তে ভেজা ছিল। রক্ত গড়িয়ে রাস্তার দুই ফুট জায়গা জুড়ে লাল হয়ে যায়। পরদিন পর্যন্ত রাস্তায় ছোপ ছোপ রক্ত জমে ছিল। ওরা একটা না, আমার ভাইকে দু’টি গুলি করেছে। গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়ার পরও বেধড়ক পিটিয়েছে। তলপেটে গুলি ঢুকে পেছনে আটকে যায়। ভাইটা আমার গুলি খেয়ে ২ ঘণ্টা রাস্তায় পড়ে ছিল। কাউকে আসতে দেয়া হয়নি। অনেক সময় মাটিতে পড়ে ছটফট করেছে। দুইবার উঠে দাঁড়াতে গেছে। পারেনি, মাটিতে পড়ে গেছে। ওরে উদ্ধার করতে র‌্যাব সেদিন কাউকেই এগিয়ে আসতে দেয়নি। তারা মুহুর্মুহু গুলি ছুড়েছে। গুলির ভয়ে কেউ মনসুরের কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি। মনসুর বছিলা ব্রিজের নিচেই পড়ে ছিল। আমরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মনসুরের নিথর দেহ রাস্তা থেকে তুলে হাসপাতালে রওনা হই। হাসপাতালে যাওয়ার পথে পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। বছিলা ৪০ ফিট এলাকায় পুলিশ আমাদের মারধর করে। পুলিশ তখন বলে, সোজা বাসায় যা, হাসপাতালে যেতে দেবো না। আন্দোলনে আসবি, গুলি খাবি না, তাতো হবে না। গুলিই তোদের জন্য উচিত শিক্ষা। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই আমরা মনসুরকে কাঁধে করে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত যাই। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে বেড়িবাঁধ হয়ে ঢাকা মেডিকেলে যাই। মেডিকেলে নিতে নিতে আমার ভাইয়ের শরীরের সব রক্ত পড়ে গেছে। রক্তে আমার পুরো শরীরের সব কাপড় ভিজে যায়। মনে হয়, হাসপাতালে নিতে নিতেই আমার ভাই মারা গেছিল। ওরা আমার ভাইকে বাঁচতে দেয়নি। সময়মতো হাসপাতালে নিতে পারলে, হয়তো ভাইটাকে বাঁচাতে পারতাম। আমার ভাই কোনো রাজনীতি করতো না। একটি তেলের পাম্পে চাকরি করতো। কাজ শেষে ফেরার পথে তাকে গুলি করা হয়। সঠিক বিচার চাই। হত্যাকারীদের শাস্তি দেখতে চাই। তাহলে আমার মনটা শান্তি পাবে।

মানবজমিন-এর কাছে এমনভাবেই ছোটভাই হত্যার স্মৃতিচারণ করছিলেন নিহত মনসুর মিয়ার বড়ভাই আয়নাল হক। আয়নাল হক মানবজমিনকে বলেন, মনসুরের একটি ১০ বছরের ছেলে আছে। নাম রিমন। ও এখনো বুঝতে পারেনি যে, কী হারিয়েছে। তবে  যেদিন মনসুর দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে, সেদিন থেকেই রিমন আমার ছেলে। আমি ওর বাবা। বাকি জীবনে ওরে বাবা হারানোর দুঃখ বুঝতে দিবো না ইনশাআল্লাহ্‌।

১৯শে জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মোহাম্মদপুর। আল্লাহ্‌ করিম বাসস্ট্যান্ড থেকে বছিলা ব্রিজ পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন ও এসবি’র সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় আন্দোলনকারীদের। পুলিশ, র‌্যাব সেদিন নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও আগ্নয়াস্ত্র নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই এলাকায় র‌্যাব’র হেলিকপ্টার থেকে অতর্কিত গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে অনেকেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ওইদিন মোহাম্মদপুর এলাকায় দুপুর ২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে। এতে অন্তত ১১ জন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। নিহত মনসুরের পরিবারের অভিযোগ, সেদিন র‌্যাব’র গুলিতেই মারা যায় মনসুর। র‌্যাব তাদের কার্যালয় থেকে বের হয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে লোকজনকে ধাওয়া দেয়। ব্রিজের ঢালের আশপাশের অলি-গলিতে র‌্যাব নির্বিচারে গুলি ছুড়েছে। ওই গুলিতেই আমার ভাই মাটিতে পড়ে যান। গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই হামাগুড়ি দিয়ে কাঠপট্টি ব্রিজের নিচ পর্যন্ত যায়। পরে ওখানেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আর আগাতে পারেনি। মনসুর বাসার দিকে যেতে চেয়েছিল। সেদিন গুলিতে অনেকে হতাহত হয়েছে। অনেকে মারা গেছেন বলে শুনেছি। অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলেন। আশপাশের বিল্ডিংয়ের ছাদেও গুলি ছোড়া হয়েছিল। ১৯শে জুলাই ভয়ঙ্কর একদিন দেখেছে বছিলাবাসী।

পারিবারিক সূত্র বলছে, নিহত  মো. মনসুর মিয়া একজন তেলের পাম্পকর্মী ছিল। বয়স ৪২ বছর। এক সন্তানের পিতা। ছেলে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ৪র্থ  শ্রেণির ছাত্র। বাড়ি মোহাম্মদপুরের বছিলা উত্তরপাড় মোল্লা মার্কেট এলাকায়। গত ১৯শে জুলাই বছিলা র‌্যাব-২, সদরদপ্তরের পাশে বছিলা ব্রিজের ঢালে কাঁচাবাজার গলিতে গুলিবিদ্ধ হন মনসুর। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে গভীর রাতে মনসুরের লাশ রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মানুষ মানুষের জন্য

ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে ১১ জেলা। ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লায় পরিস্থিতি খুবই নাজুক। বানের পানিতে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ায় মানুষের বাঁচার আকুতি। খাদ্য ও পানির হাহাকার। এমন অবস্থায় সারা দেশ থেকে ত্রাণ আর উদ্ধারের সহযোগিতা নিয়ে দুর্গত এলাকায় ছুটে যাচ্ছে মানুষ। দেশ জুড়ে চলছে ত্রাণ সংগ্রহের কার্যক্রম। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা রাত-দিন একাকার করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ত্রাণ কার্যক্রমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখান থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দানা বেঁধেছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে গণ ত্রাণ কার্যক্রমের সদরদপ্তর। হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ নিয়ে আসছেন। নগদ অর্থ নিয়ে আসছেন কেউ কেউ।

শিশুরা আসছে মাটি বা প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমানো টাকা নিয়ে। এতিমখানার শিশুরা তাদের খাবারের টাকা বাঁচিয়ে নিয়ে আসছে টিএসসিতে।  পেশাজীবীরা যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়েই হাজির হচ্ছেন। ত্রাণ সংগ্রহ প্যাকেট করা এবং তা দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দিতে নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। শুধু কি টিএসসি। পুরো রাজধানী জুড়ে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। পাড়ায় পাড়ায় করা হয়েছে ত্রাণ সংগ্রহের কমিটি। যে যা পারছেন তা দিয়েই শরিক হচ্ছেন। খাদ্য, টাকা, জামা জমা হচ্ছে ত্রাণের ভাণ্ডারে। দলবদ্ধভাবে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দুর্গত এলাকার মানুষদের জন্য। সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুর্গত এলাকায়। এ যেন এক অন্য বাংলাদেশ।

টিএসসিতে তিনদিনে জমা পড়লো তিন কোটির বেশি অর্থ
বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে গত তিনদিন এক অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়েছে। বন্যায় বিপর্যস্ত জেলাগুলোর সহায়তায় যেন সেখানে এক হয়েছে পুরো রাজধানীবাসী। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তারা এগিয়ে এসেছিলেন ক্ষতিগ্রস্তদের সেবায়। দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ত্রাণ হিসেবে আসা সব সামগ্রী সুশৃঙ্খলভাবে বুঝে নিচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। মধুর কোলাহলে, ঐক্যে, ভ্রাতৃত্বে, মানবিকতায় আর দেশপ্রেমে টিএসসি যেন হয়ে ওঠে নতুন বাংলাদেশের এক খণ্ড চিত্র।

সরজমিন টিএসসি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিনব্যাপী সেখানে ভিড় লেগে আছে ত্রাণ দিতে আসা লোকজনের। কিশোর থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ বয়স্করাও এসেছিলেন মহৎ এই কাজে অংশ নিতে। কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি, কেউ ভ্যানে করে, কেউ আবার ছোট ট্রাকে করে ত্রাণ নিয়ে আসছিলেন। ত্রাণ দিতে আসা লোকজনের ভিড় ও গাড়ি টিএসসি এলাকা ছাপিয়ে আশেপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছিল।

টিএসসি’র প্রধান ফটকে বুথ স্থাপন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে থাকা শিক্ষার্থীরা গত তিনদিন ত্রাণ সংগ্রহ করেন। বুথে থাকা শিক্ষার্থীরা দাতার নাম ও পণ্যের বিবরণ লিখে রাখেন খাতায়। পাশাপাশি অনেকে নগদ অর্থ দিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান। সেই অনুদানের অঙ্কও শিক্ষার্থীরা খাতায় লিখে রাখেন। গত তিন দিনে নগদ অর্থ উঠেছে তিন কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে শুক্রবার কর্মসূচির দ্বিতীয়দিনেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই উদ্যোগে ১ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৬ টাকা জমা পড়েছিল।

বৃহস্পতিবার গণত্রাণের এই কর্মসূচি শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেদিন নগদ অর্থ এসেছিল ২৯ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৩ টাকা। আর গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত উঠেছিল সোয়া কোটি  টাকার বেশি নগদ অর্থের পাশাপাশি সর্বসাধারণের দেয়া নানা ত্রাণসামগ্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে টিএসসি’র বিশাল বিশাল সব কক্ষ। টিএসসি’র অভ্যন্তরীণ ক্রীড়াকক্ষ ও ক্যাফেটেরিয়ায় পূর্ণ হয়ে মাঠও ভর্তি হয়ে গিয়েছিল ত্রাণসামগ্রীতে। শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত পরিশ্রমের পরেও ত্রাণের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল স্বেচ্ছাসেবীদের। ত্রাণ নিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমে টিএসসি এলাকা গত তিনদিন সকাল-সন্ধ্যা ছিল লোকারণ্য।
ত্রাণ বুথে লিপিবদ্ধ হওয়ার পর সেটি স্বেচ্ছাসেবকদের হাত ঘুরে টিএসসি’র ভেতরে যাচ্ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহায়তায় সেখানে চলে প্যাকেজিং এর বিশাল যজ্ঞ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, প্রায় ৪০০ জন স্বেচ্ছাসেবক এই গণত্রাণ কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করছেন। জমা দেয়া ত্রাণের মধ্যে নগদ অর্থ, শুকনো খাবার ছাড়াও আছে- স্যালাইন, স্যানিটারি প্যাড, জরুরি ওষুধ, মোম, দিয়াশলাই, গুড়, নানারকম পোশাক এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা নগদ অর্থ ও শুকনো কাপড় সংগ্রহ করছেন। শিক্ষার্থীদের অনেকগুলো দল ইতিমধ্যে ফেনী ও নোয়াখালীতে উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণ করতে  গেছে।  
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব ত্রাণসামগ্রী প্যাকেজিংয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের সামনে থেকে একের পর এক ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে বন্যাদুর্গত এলাকায়।

ত্রাণের জন্য অপেক্ষা

দেখা মিলেছে সূর্যের। ধীরে ধীরে নামছে পানি। দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এলাকা। সন্ধান মিলছে স্বজনের। একদিকে যখন এমন স্বস্তি, অন্যদিকে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ফেনীর ছয় উপজেলার চারটি থেকে পানি নামছে। যে পানি অন্য দুই উপজেলা হয়ে পড়ছে  সাগরে। আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। অন্যদিকে খাদ্য সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সঙ্গে সুপেয় পানি ও শিশু খাদ্যের তীব্র সংকট।

সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ পৌঁছানো  হলেও চাহিদার তুলনায় সেটি অপ্রতূল। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার মানুষের খাদ্যের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা পানিতে গত কয়েকদিনে প্লাবিত ফেনীসহ দেশের ১২ জেলা। পানিবন্দি অর্ধকোটির বেশি মানুষ। মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে। একের পর এক তলিয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকা। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ফসলি ভূমি, সড়ক সবই নিমজ্জিত বন্যার পানিতে। ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষ। বিদ্যুৎ নেই অধিকাংশ দুর্গত এলাকায়। পানি ও বিদ্যুতের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে অসংখ্য মোবাইল টাওয়ার। যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গত এলাকার মানুষ।

গতকাল ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরশুরাম ও ফুলগাজীরও বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন গত পরশু থেকে পানি কমছে ধীরে ধীরে। স্বস্তি ফিরছে নাগরিকদের মধ্যে। তবে খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সুপেয় পানির এখনো অভাব রয়েছে। তাই অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে শিশু খাদ্যেরও অভাব তীব্র। সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও রেড ক্রিসেন্টসহ বেসরকারিভাবে অনেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পরশু রাতে পরশুরামের স্থানীয় বাসিন্দা সাদ বিন কাদের জানিয়েছেন, পানি কমছে ধীরে ধীরে। তবে এলাকায় খাদ্য সংকট রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষ খাদ্যের জন্য অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে শিশু খাদ্যের অভাব প্রকট। অনেক শিশু সুপেয় পানি ও খাদ্যের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ইকরাম হোসাইন নামে পরশুরামের স্থানীয় আরেক বাসিন্দা গতকাল দুপুরে জানান, তিনি শহর থেকে পরশুরামে যেতে চেয়েও পারেননি। রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সবাইকে যেতে দিচ্ছে না। তারা সকলকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

অন্যদিকে ছাগলনাইয়া ও সদরেও পানি কমতে শুরু করেছে। সেলিনা আক্তার নামে শহরের শান্তিধারা এলাকার এক গৃহিণী বলেন, শহরে পানি কমতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতির দিকে। আশা করছি এভাবে আর দুই একদিন থাকলে শহরের মানুষের দুরবস্থা দূর হবে। তবে সদরের কিছু কিছু এলাকায় এখনো বানভাসিরা কষ্টে আছে। পানিবন্দি অনেক মানুষ নিজেদের বর্তমান অবস্থানকে সংকাপন্ন হিসেবে বিবেচিত করছেন। এ ছাড়াও এসব এলাকার মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছেন। বিশেষ করে সুপেয় পানির অভাববোধ করছেন বেশি। আতাউর রহমান নামে একজন জানান, তারা খাদ্য সংকটে রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও বাসা-বাড়িগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণের প্রয়োজন। অন্যদিকে চার উপজেলায় যখন স্বস্তি তখন অন্য দুই উপজেলায় পানি বাড়ছে। ডুবে যাচ্ছে একের পর এক বসতঘর। আতঙ্কে দিন পার করছেন বাসিন্দারা। মূলত এসব এলাকা দিয়েই সাগরে পড়ছে পানি। আলাউদ্দিন নামে একজন জানান, তাদের এলাকায় সব ডুবে গেছে। সেখানে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। আব্দুল্লাহ আল নোমান নামে আরেক বাসিন্দা জানান, উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঝুঁকিতে রয়েছেন। সুপেয় পানি ও খাদ্যেরও সংকট এখানে। এ ছাড়া দাগনভূঞা উপজেলায়ও বাড়ছে পানি। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাদ্যের হাহাকারও দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত অনেক এলাকায় পৌঁছেনি খাবার। যার কারণে কষ্টে আছেন সেখানকার মানুষ। মোমিন নামে একজন বলেন, তাদের এলাকায় কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। তিনি তার এলাকার জন্য ত্রাণ সহায়তা চেয়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের গতকালও আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে হয়েছে। উপজেলা শহরের বিভিন্ন মার্কেটের মেঝেতে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়াও দাগনভূঞা বাজারে অসংখ্য মানুষ ট্রাকে ট্রাকে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন।

এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় শুক্রবার রাত ১০টায় কর্ণফুলী জল-বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৬টি স্পিলওয়ের গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেয়া হয়েছে। এ জন্য ভাটি অঞ্চলকে দিনব্যাপী সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। দুপুরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ম্যানেজার এটিএম আব্দুজ্জাহের বলেন, কাপ্তাই লেকে ১০৮ ফুট এমএসএল পর্যন্ত পানি উঠলে বিপদসীমার অবস্থা সৃষ্টি হয়। শনিবার ২টা পর্যন্ত পানি ১০৭ দশমিক ৬৩ ফুট পর্যন্ত উঠেছে। সন্ধ্যার মধ্যে পানি ১০৮ ফুটে উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় ১৬টি গেটের ৬ ইঞ্চি করে ছেড়ে দেয়া হবে। সবাই সাবধানে থাকুন। অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবর্ষণের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। এ ছাড়া বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১৯ জন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব কামরুল হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের ১১টি জেলায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৮টি পরিবারের ৪৯ লাখ ৩৮ হাজার ১৫৯ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত বন্যায় ১৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ৪ জন, ফেনীতে ১ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, নোয়াখালীতে ৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ জন, লক্ষ্মীপুরে ১ জন এবং কক্সবাজারে ৩ জন মারা গেছেন।

লক্ষ্মীপুরে বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। শুক্রবারের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুটের বেশি পানিবৃদ্ধি পেয়েছে। ৫টি উপজেলা, চারটি পৌরসভা ও উপকূলের ৪০টি এলাকায় এখনো পানিবন্দি ৭ লাখ মানুষ। পাশাপাশি শুক্রবার বিকাল থেকে জেলার অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগবালাই। এখন পর্যন্ত জেলায় বিভিন্ন আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত আজাদ হোসেন ও হোসেন আহম্মদ  জানান, কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছি। পানি ওঠার কারণে ঘরে রান্না জুটছে না। খাওয়া-ধাওয়া করা যাচ্ছে না। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি। খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছি। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, ডাকাতি ও রহমতখালী নদীসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেয়ায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দেয়। গত দুইদিনে প্রায় দুইশ’র বেশি বাঁধ কেটে দেয়া হয়েছে। ফলে পানি নামতে শুরু করেছে।

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ডুবেছে কুমিল্লার ১৪ উপজেলা। কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নামা ঢলে জেলার অন্তত ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহতা ছুঁয়েছে বুড়িচং উপজেলাকে। গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পানিতে তলিয়ে যায় বুড়িচং উপজেলা। উপজেলার সবগুলো ইউনিয়ন বানের পানিতে সয়লাব। পানিবন্দি হয়েছেন ২ লাখ মানুষ। ইতিমধ্যে বেশকিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে দুর্যোগের কঠোর ভোগান্তির সর্বোচ্চ শিখরে আছেন এসব এলাকার বানভাসি মানুষ। এসব মানুষদের অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। তবে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত বুড়িচংয়ের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বাকি সব মানুষ আছেন খোলা আকাশের নিচে। ৫০ হাজার পানিবন্দি পরিবারের অপেক্ষা কেবল বন্যা শেষ হয়ে গেলে পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার। ইছাপুরা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, আমার জীবনে এত পানি কখনো দেখিনি। আমাদের সবকিছু তলিয়ে গেছে। আজমীর হোসেন নামে খাড়াতাইয়া এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মুহূর্তের মধ্যে এত পানি কোথা থেকে এলো বুঝি না। যে ক্ষতিটা আমাদের হয়েছে, জানি না কী দিয়ে পোষাবো। শনিবার সকালেও ঝলমলে রোদ দেখা গেছে কুমিল্লার আকাশ জুড়ে। বৃষ্টি না থাকলেও পানি কমছে খুবই কম আকারে। অন্যদিকে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বুড়িচং উপজেলা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট না থাকায় পরিবারের সদস্যদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে ও ভেঙে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বন্যার প্রভাবে দুইদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। শনিবার এক বৈঠকের পর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহবুব।

নোয়াখালীর মুছাপুর ক্লোজারে ২৩টি স্লুইসগেট খুলে দেয়ায় পানি নামতে শুরু করেছে। জেলায় ২০ লাখ ৩৬ হাজার পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ৮২৬টি আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ। গত দুদিনে বন্যাদুর্গত এলাকায় সাপের দংশনে আহত হয়ে ৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল শনিবার দুপুরে বেগমগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. শিউর রহমান নাদিম চৌমুহনী পৌর পার্ক দীঘিতে গোসল করতে নেমে সাপের দংশনে মৃত্যুবরণ করে। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। শনিবার বিকালের দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার।
চট্টগ্রামে গত বৃহস্পতিবার থেকে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা  উন্নতি হয়েছে। বৃষ্টি পড়া বন্ধ হওয়ায় কয়েকটি   এলাকায় রাস্তা থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। তবে এখনো সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অনেক এলাকা। অব্যাহত রয়েছে ত্রাণ তৎপরতা। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে  ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বন্যার পানিতে ডুবে রুষা চাকমা (১১) নামে এক শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। নিহত শিক্ষার্থী কাবুল্যা কার্বারীপাড়া এলাকার পল্টু চাকমার মেয়ে। সে মেরুংয়ের চংড়াছড়ি এসডিপি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শনিবার দুপুরে উপজেলার ১নং মেরুং ইউনিয়নের ৮ নাম্বার ওর্য়াডের জয়ন্ত কারবারিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান সরজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সংলাপ চান ফখরুল

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অতি দ্রুত সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ভাসানী অনুসারী পরিষদের উদ্যোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের নবম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। আমরা মনে করি তারা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন। এই সরকারের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে, জনগণের আস্থা রয়েছে, সকলেরই আস্থা আছে। কিন্তু অবশ্যই সেটা সীমিত সময়ের মধ্যেই করতে হবে, একটা সময়ের মধ্যে করতে হবে, যৌক্তিক সময়ের মধ্যেই করতে হবে। তা না হলে যে উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন সেই উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যাহত হবে। আমি আবার রিপিট করতে চাই যে, অবশ্যই অতি দ্রুত জনগণের যে চাহিদা, সেই চাহিদাকে পূরণ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে একটা নির্বাচন দ্রুত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা যায়- সেজন্য এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ করবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

তিনি বলেন, আমি নির্বাচন কথাটার ওপর জোর দিতে চাই। এই যে সংস্কারের বিষয়টা এসেছে, সব সময় আসছে- সেই সংস্কারের জন্য নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেটা কীভাবে আসবে? সেটা আসবে একটা নির্বাচিত পার্লামেন্টের মধ্যদিয়ে, তাদের মাধ্যমে সেটা আসতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং কয়েকজন ব্যক্তি একটা সংস্কার করে দিলেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি, জনগণের অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে তাদের মাধ্যমে সেই সংস্কার আসতে হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এখন যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কাজ করছেন, তারা সবাই আন্তরিক, যোগ্য মানুষ। কিন্তু আমরা এটাকে আরও দৃশ্যমান দেখতে চাই। আমরা দেখতে চাই যে, প্রধান উপদেষ্টা তিনি অতি দ্রুত জনগণের সামনে তিনি কি করতে চান তা উপস্থাপন করবেন। একটা রোডম্যাপ দেবেন যে, কীভাবে তিনি অতি দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন, কীভাবে তিনি প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো ঘটিয়ে তারা জনগণকে স্বস্তি দিয়ে সামনের দিকে এগুবেন নির্বাচন করার জন্য।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এখন পর্যন্ত এই সরকারের সত্যিকার অর্থে কোনো এজেন্ডা ভিত্তিক কোনো আলোচনা হয়নি। রাজনীতি ছাড়া তো এটা হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত তো নিতে হবে। রাজনীতি এই জায়গাটাই রাজনীতি, যে জায়গায় তারা বসে আছেন ইন্টারিয়াম গভর্মেন্টের এটাই হচ্ছে রাজনীতির জায়গা। কারণ এখান থেকে তো দেশের সবকিছু অফিসিয়ালি চালিত হবে। সুতরাং যারা রাজনীতি করছেন তাদের সঙ্গে অবশ্যই মতবিনিময় করতে হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, ছাত্র নেতৃবৃন্দ যারা আজকে সহযোগিতা করছেন তাদের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, এই বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে এই বিপ্লবকে যেন সুসংহত করা যায়, প্রতিবিপ্লব যেন না ঘটে। ইতিমধ্যে যে চক্রান্তের কথাবার্তা উঠে আসছে আমাদের মধ্যে সেগুলোকে যেন প্রতিহত করা যায়, সেইগুলোতে পরাজিত করে বিপ্লবের চেতনাকে যেন আমরা সমুন্নত রেখে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, সেই বিষয়ে তাদের সজাগ থাকতে হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দেখতে চাই না যে সমস্ত ব্যক্তিরা হাসিনার পাশে থেকে, তার সঙ্গে থেকে, তার দোসর হয়ে মানুষের ওপরে নির্যাতন-নিপীড়ন করেছেন, লুটপাট করেছেন, বিদেশে টাকা পাচার করেছেন তাদেরকে আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আশপাশে দেখতে চাই না। পত্রিকায় যখন ছবি দেখি যে, এই সমস্ত লোকেরা আবার সংযুক্ত হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করছেন তখন আমরা উদ্বিগ্ন হই। আমরা খুব চিন্তিত হই যে, আজকে ১৬/১৭ দিন হয়েছে, এখন পর্যন্ত যে সমস্ত সেক্রেটারিরা ওই সরকারকে এতদিন ধরে চালিয়েছে, তাদের সমস্ত কুবুদ্ধিগুলো দিয়েছে, তারা এখনো এই সরকারের সচিবের দায়িত্ব পালন করছে- এটা আমরা দেখতে চাই না। আমরা দেখতে চাই যে, অবিলম্বে যারা জনগণের সঙ্গে সস্পৃক্ত আছেন, সেই আইন মেনে তাদেরকে এই সরকারের পাশে দেখতে চাই। একথাগুলো আমরা বলতাম না। বলতে বাধ্য হচ্ছি এজন্য যে, আমরা সেগুলো দেখতে পারছি না।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দেয়া হয়নি। অথচ আগের ভাইস চ্যান্সেলরগুলো রিজাইন করেছেন। আমরা দেখতে চাই যে, ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দেয়া হচ্ছে যাদের সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে। আমরা দেখতে চাই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সচেতন। এ ব্যাপারে তাদেরকে সর্বাত্মক সহেযোগিতা দিয়েছি, দেবো।
ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব আবু ইউসুফ সেলিমের সঞ্চালনায় সভায় জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডি’র সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, বিএনপি’র জহির উদ্দিন স্বপন, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বাংলাদেশে ছাত্রনেতাদের সামনে পরীক্ষা -টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয়

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ এবং নির্বাসনে পাঠানোর মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত জয় পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিবাদী ছাত্ররা। এখন তারা তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যত কী হবে তা নিয়ে আলোচনা করছেন। বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তারকারী দুটি দল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিএনপি। এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের কথা বিবেচনা করছেন ছাত্ররা। মৌলিকভাবে গণতন্ত্র হলো রাজনৈতিক পছন্দ বেছে নেয়ার সুযোগ। সুতরাং বাংলাদেশি জনগণের যেকোনো সুযোগকে, যেমন ছাত্রদের পরিচালিত পার্টিকে স্বাগত জানানো উচিত।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যদি ছাত্ররা দেশে একটি অর্থপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে টেকসই, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রচারণায় বিকশিত হতে চান, তাহলে উদ্দেশ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে তাদেরকে পরিবর্তনে সফলতা আনতে হবে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন যা, তাদের তাৎক্ষণিক  দাবির পাশাপাশি তাদের পলিসিগত লক্ষ্য পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তোলে, যেন তারা ভোটারদের সমর্থন চাইতে পারেন। এখন পর্যন্ত ভবিষ্যতের এসব রূপরেখা, যা তারা জাতির জন্য পরিকল্পনা করে- তা তুলে ধরেননি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রে অতীত যদি পথপ্রদর্শক হয়, তাহলে এই কাজ বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

ছাত্র আন্দোলনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের এ অঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ভারতে বিরোধীদের সঙ্গে ছাত্রদের আন্দোলনে ১৯৭৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পতন হয়েছিল।

লালু প্রসাদ যাদব, নীতিশ কুমারসহ ওই আন্দোলনের অনেক ছাত্রনেতা তারপর থেকে দীর্ঘ ও সফল রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়েছেন। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কথিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। এর ফলে ১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি হয়। তারাই অসম গণপরিষদের ভিত্তি রচনা করে। এই দলটি ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যটি শাসন করেছে। এরপর ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে।

অতি সম্প্রতি চিলিতে ছাত্র আন্দোলন থেকে নতুন রাজনৈতিক নেতাদের একটি প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বোরিক। চিলিতে রোবিকের সরকার সমর্থিত একটি প্রগতিশীল নতুন সংবিধানের প্রচারণা পরাজিত হয় অথবা আসামে অসম গণপরিষদ তাদের মূল সংশ্লিষ্টতা থেকে হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিবিদদেরকে নির্বাচনী গণতন্ত্রের পরীক্ষায় পাস করতে হবে। ভোটাররা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এটাও তাদের জন্য একটি পরীক্ষা। 

৮ দিনের জন্য মহাকাশে গিয়েছিলেন, ৮০ দিন পরেও ফেরা হলো না

চলতি বছরে ৫ জুন নাসার তরফে আমেরিকার ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস স্টেশন থেকে মহাকাশযান বোয়িং সিএসটি-১০০ স্টারলাইনার ক্যাপস্যুলে চড়ে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের উদ্দেশে রওনা দেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামস ও তাঁর সঙ্গী বুচ উইলমোর। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আনন্দে হাততালি দিতে দিতে  স্পেস স্টেশনে ঢুকছেন তিনি। তার পর থেকে ৮০ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও স্পেস স্টেশনে আটকে রয়েছেন   সুনীতা এবং  তাঁর সহ-অভিযাত্রী উইলমোর। তাঁদের মহাকাশযান বোয়িং স্টারলাইনারকে ঘিরেই ঘনিয়েছে বিতর্ক। পৃথিবীতে কবে ফিরবেন তাঁরা তা এখনও অনিশ্চিত। তাই খানিকটা উদ্বেগেই রয়েছে মহাকাশচারী মহল। উদ্বেগের কারণও রয়েছে যথেষ্ট। কারণ স্টারলাইনার ক্যাপস্যুলে সর্বাধিক ৯০ দিন পর্যন্ত মহাকাশচারীরা স্পেস স্টেশনে থাকতে পারেন বলে জানিয়েছিল নাসা। তারপর শেষ হয়ে যায় ব্যাটারি।

হিসাব মতো নাসার হাতে দিন সংখ্যা ক্রমশই ফুরিয়ে আসছে। যদিও নাসার তরফে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে নিরাপদেই আছেন সুনীতারা। আজ এজেন্সি পর্যায়ে একটি রিভিউ মিটিং হবে নাসায়। তারপরই জানা যাবে সুনীতাদের পৃথিবীতে ফেরা নিয়ে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

স্টারলাইনার স্পেসক্র্যাফ্টে হিলিয়াম লিক করছে বলে ইঞ্জিনিয়াররা জানান। স্টারলাইনারের এই সমস্যাগুলি সুনীতা-বুচের পৃথিবীতে ফেরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত স্টারলাইনারের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতিতে কাজ করছে নাসা। এটিই ছিল বোয়িং-এর প্রথম মহাকাশচারী নিয়ে যাত্রা। তাছাড়া, সাধারণ মানুষ যাতে বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভাবে মহাকাশে বেড়াতে যেতে পারে, সেই পরিকল্পনারও প্রথম ধাপ এই বোয়িং। অভিযোগ,  স্টারলাইনার ওড়ার আগেও রকেটে হিলিয়াম লিকেজের সমস্যা ধরা পড়েছিল। তখনই কেন মহাকাশযানটিকে ত্রুটিমুক্ত করা হয়নি, কেন স্থগিত করা হয়নি এই উড়ান, সে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বজুড়ে। নাসা জানিয়েছে, স্টারলাইনার তথা সুনীতাদের কীভাবে ফেরানো যেতে পারে তার জন্য ইতিমধ্যে ১ লক্ষেরও বেশি মডেল-টেস্ট করেছে নাসা। তবে কোনও ভাবেই কোনও সুরাহা মিলছে না।

জানা গেছে, ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেস এক্স-এর সঙ্গে যৌথভাবে একটি মহাকাশযান তৈরি করছে নাসা। সেটাই মহাকাশে পাঠিয়ে সুনীতাদের উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।  নাসা এবং স্পেস এক্স-এর যৌথ এই মিশনটির নাম দেওয়া হয়েছে ক্র-৯। চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে ওই যানে দুজনকে মহাকাশে পাঠানো হবে। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন থেকে সুনীতাদের নিয়ে সেটি আবার পৃথিবীর দিকে ফিরবে। এই মিশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হতে পারে। এই আবহে, মহাকাশে দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশচারীরা আটকে থাকায় তাঁদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, নির্ধারিত সময়ের বেশি দিন মহাকাশে থাকার দরুন সুনীতা ও বুচের হাড়ের ক্ষয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। মহাকাশে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর বিকিরণের সংস্পর্শে আসেন মহাকাশচারীরা। ফলে দীর্ঘদিন পর পৃথিবীতে ফিরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁরা। প্রায়শই জ্ঞান হারান, মাথা ঘোরে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি শূন্য জায়গায় দীর্ঘদিন থাকার ফলে হাড়গুলির কর্মক্ষমতাও হারায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পেশিও।  সবমিলিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে মহাকাশচারী মহলে।

সূত্র: এনডিটিভি