Sunday, July 28, 2013

অপরিকল্পিত নগরে ফুটপাতও দখলে! by ড.হারুন রশীদ

বাংলাদেশ একটি রাজনীতি প্রভাবিত দেশ। রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে অনেক জনহিতকর ইস্যুও চাপা পড়ে যায়। ফলে যুগের পর যুগ সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। মাঝেমধ্যে সমস্যা নিয়ে আলোচনার টেবিল গরম হলেও সে উত্তাপ ফুরিয়ে যায় সমস্যা সমাধানের আগেই। যানজট, গণপরিবহন সংকটের মতো সমস্যা নিয়ে দিন দিন হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীবাসী। কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে ছিল, রয়ে গেছে সেখানেই।
আসলে সমস্যা রয়েছে পরতে পরতে। ঢাকা দেশের রাজধানী, সবচেয়ে বড় নগরী এবং দেড় কোটির বেশি মানুষের বাস এখানে। এখানে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় ছাড়াও রয়েছে নানা অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল। এখানে অনেক বিদেশীও নানা কর্মসূত্রে আসছেন, অনেকে বসবাসও করছেন। সব মিলিয়ে মহাকর্মব্যস্ত এক নগরী ঢাকা। দুঃখজনক হলেও সত্যি ৪শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ঢাকা নগরী বেড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে। ফলে নাগরিক সুবিধার অনেকটাই এখানে অনুপস্থিত। আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি। পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু হলে প্রত্যেক নগরেই মানুষ শৃংখলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্বলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু নগর পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না। অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠার কারণে রাজধানীর মোট ২ হাজার ২৮৯ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার রাস্তার একটি বড় অংশ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের দখলে। বিশেষ করে ঢাকার ফুটপাতগুলো দখলে থাকায় যারপরনাই ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। আসন্ন ঈদ মৌসুমে ফুটপাতগুলো পরিণত হয়েছে হকার মার্কেটে। যানজটের নিগড়ে পিষ্ট মানুষের কাছে এ যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া। সাধারণত হকাররাই ফুটপাত দখল করে রাখে। ফুটপাতে হকারদের বসা, না বসা নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ বলছেন, ছিন্নমূল এসব মানুষজনকে যদি ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা হয়, সেটা হবে তাদের রুটি-রুজির ওপর হস্তক্ষেপ। তাই স্থায়ী পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ হবে সম্পূর্ণ অমানবিক। বাংলাদেশ ছিন্নমূল হকার সমিতির তথ্যানুসারে বর্তমানে ঢাকা শহরে ১ লাখ ৩০ হাজার হকার রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার স্থায়ী ও ৬০ হাজার অস্থায়ী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহায় সম্বলহীন এসব মানুষ ঢাকা শহরে কাজের সন্ধানে এসে হকার পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। সামান্য পুঁজিতেই ফুটপাতে বসে যে কোনো ধরনের ছোটখাটো ব্যবসা করা যায়। আর সরকারি দলের পাতি মাস্তান, পুলিশ, অন্যান্য চাঁদাবাজ গোষ্ঠীকে বখরা দিয়ে বাকি যে আয় থাকে, তাও নিছক কম নয়। ওই দিয়েই এক একজনের আয়ে ৩-৪ জনের একটি সংসার চলে।
প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাসের এই নগরী আসলে এক বিশাল বাজার। এ বাজারের অন্তত ২৫ শতাংশ অর্থনীতি পরিচালিত হয় বা নিয়ন্ত্রিত হয় এই হকারদের মাধ্যমেই। হকারদের কাছ থেকে সস্তায় জিনিসপত্র কেনা যায়। কারণ তাদের দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয় না বলে পণ্যের মূল্যের ওপর তার প্রভাব পড়ে না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিু-মধ্যবিত্তের লোকজন কেনাকাটার জন্য হকারদের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে হকার উচ্ছেদের ব্যাপারটি একপাক্ষিক নয়। তাদের উচ্ছেদ করলে কোথায় গিয়ে তারা দাঁড়াবে, এ বিষয়টিও অবশ্যই ভাবতে হবে। যানজট সৃষ্টির জন্য হকারদের দায়ী করা হলেও তারা আসলে এজন্য কতটা দায়ী সেটিও ভেবে দেখতে হবে। ঢাকার যানজটের প্রধান কারণ রাস্তা সংকট। ঢাকায় যে পরিমাণ জমি রয়েছে তার জন্য ২৫ ভাগ রাস্তা দরকার। সেখানে অলিগলিসহ আছে মাত্র ৭ ভাগ। মেইন রোড আছে ৩ ভাগ। এই ৩ ভাগের ৩০ ভাগ দখল করে অবৈধ দখলদাররা। যার মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে হকার। রাজধানীর ৭০ শতাংশ ফুটপাত প্রাইভেট গাড়ি দখল করে রেখেছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যে পুলিশ হকার উচ্ছেদ করে সেই পুলিশই রাজধানীর ফুটপাত ও রোড ডিভাইডারে দেড় শতাধিক পুলিশবক্স স্থাপন করেছে। যার সবই অবৈধ। সিটি কর্পোরেশন থেকে কোনো অনুমতি না নিয়েই তা করা হয়েছে। ফুটপাত ও রোড ডিভাইডারের ওপর এসব বক্সের কারণে লোকজনের চলাচলে মারাÍক অসুবিধা সৃষ্টি হলেও কারও কিছ– করার নেই। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন পুলিশের চাপের মুখে এসব অবৈধ বক্স উচ্ছেদ করতে পারছে না। আইন প্রয়োগকারীরাই যদি আইন না মানেন, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?
রাজধানীর ভাসমান হকারদের পুনর্বাসনে গত ২৫ বছরে অন্তত দুই ডজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে ১৯৫২ সালে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৯ সালেও বাস্তবায়ন করা হয় দুটি প্রকল্প। ডিসিসির খাতাপত্রে এসব প্রকল্পের আওতায় সর্বমোট ১৮ হাজার হকারকে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। রাজধানীর হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তৎকালীন ঢাকা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নগরীর সদরঘাট এলাকায় প্রথম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ১৯৫২ সালে। সদরঘাট হকার্স মার্কেট নামের ওই প্রকল্পে পুনর্বাসন করা হয় সর্বমোট ৮১২ হকারকে। এরপর ১৯৭৯ সালে সদরঘাট এলাকাতেই হকার পুনর্বাসনের ২য় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। লেডিস পার্ক হকার্স মার্কেট নামের ওই প্রকল্পে ৬৪৫ হকার পুনর্বাসিত হয়। তারপর আশির দশকের শেষার্ধে হকার পুনর্বাসনের ব্যাপকভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এভাবেই গত ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৮ হাজার হকারকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু এত প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও নগরজুড়ে হকারের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, হকার পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার আদৌ কি কোনো শেষ আছে?
আসলে ফুটপাত দখলমুক্ত করার কথাই বলি আর হকার পুনর্বাসনের কথাই বলি- এ দুটি কাজ করতে হলে উভয়পক্ষ থেকেই দায়িত্বশীল কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে। স্রোতের মতো হকাররা আসতে থাকবে আর তারা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য করবে, তারপর পুনর্বাসনের দাবি তুলবে- এটি কখনও বাস্তবসম্মত নয়। এজন্য সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। একটি সুসমন্বিত পন্থায় এগিয়ে যেতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রসঙ্গত আমরা কলকাতা শহরের হকারদের পুনর্বাসনের নীতিটি পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। এই নীতিতে হকার পুনর্বাসনের ব্যাপারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয় পুরসভা। হকার নীতি নামে পরিচিত এই নতুন নীতিতে বলা হয়েছে- ১. পুরসভা হকারদের চিহ্নিত করে পরিচয়পত্র দেয়ার ব্যবস্থা করবে। ২. নতুন কোনো হকার ফুটপাত দখল করে বসে পড়ছে কি-না তা মাঝেমধ্যেই সমীক্ষা করে দেখা হবে। ৩. পুরসভা হকারদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রকল্প, রাষ্ট্রীয় বীমা যোজনা ইত্যাদিতে অন্তর্ভুক্ত করবে। ৪. অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা শিশু হকারদের পুনর্বাসন দিয়ে বিভিন্ন কর্মশিক্ষা, শিশু শিক্ষা প্রকল্প, জাতীয় শিশুশ্রম প্রকল্পে যুক্ত করা হবে। ৫. হকার সন্তানরা অবৈতনিক শিক্ষা এবং মিডডে মিল পাবে। ৬. ঋণ দেয়ার পাশাপাশি বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। ৭. খাবার ও আতশবাজি বিক্রি করে যারা, তাদের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিতে হবে। ৮. ন্যূনতম ১৫ বর্গফুট ও সর্বাধিক ৪০ বর্গফুট জায়গা একজন হকারের জন্য নির্দিষ্ট হবে। যেখানে সম্ভব ও প্রয়োজন, সেখানে নির্দিষ্ট অনুপাতে শহরের তফসিলি জাতি, উপজাতি, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী হকারদের জন্য বিক্রির জায়গা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। ৯. হকারদের বেঁধেছেদে রেখে যাওয়া দোকানের মালপত্র রাতে যাতে চুরি না যায় সেজন্য জিনিসপত্র সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হবে। ১০. কোথায় কে বসবে তা পরিচয়পত্র দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করে কাঠামোভিত্তিক ফি নির্ধারণ করা হবে। ১১. এছাড়া হকার নিয়ন্ত্রিত ফুটপাথে কঠিন বর্জ্য অপসারণ, শৌচাগার নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোজন ও পানীয় জল, বিক্রেতাদের জন্য ছাউনি এবং কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ফুটপাতেই প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে পুরসভা। ১২. হকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য পুরসভার নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। পথচারীদের জন্য হকারদের কিছু নির্দেশিকাও মানতে হবে। পথচারী চলাচলের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ফুটপাত খালি রাখতে হবে। এছাড়া বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরসভা কর্তৃপক্ষ যে কোনো জায়গায় হকারদের বসা, বিক্রি নিয়ন্ত্রণ ও নিষিদ্ধ রাখতে পারবে।
এটি যে একটি চমৎকার ও বাস্তবানু নীতি, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এর অনেক নীতিই সামঞ্জস্যপূর্ণ। হকারদের যদি পরিচয়পত্র দেয়া যায়, তাহলে তারা একটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। তাছাড়া যে কোনো সিদ্ধান্ত যেমন পুনর্বাসন বা অন্যান্য সেবা দেয়ার ক্ষেত্রেও হকারদের একটি সঠিক পরিসংখ্যান জানা থাকলে তা সহজ হবে। এছাড়া সার্বিকভাবে একটি শৃংখলাও প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক হবে নিঃসন্দেহে। এজন্য একটি হকার নীতিমালা করা গেলে বিষফোঁড়ার মতো এ সমস্যা থেকে বাঁচা যাবে।
ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক

সরকারি কর্মকমিশন কতটা স্বাধীন? by ইকতেদার আহমেদ

নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিমকোর্টের অনুরূপ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিমকোর্টের সাংবিধানিক পদধারীদের মতো পিএসসির সাংবিধানিক পদধারীরা শপথের অধীন। শপথ পাঠ ছাড়া উপরোক্ত কোনো পদধারীর নিয়োগ কার্যকর হয় না। প্রধান বিচারপতি ছাড়া উপরোক্ত সব সাংবিধানিক পদধারীর শপথ পাঠ অনুষ্ঠান প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পরিচালিত হয়। প্রধান বিচারপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠান রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পরিচালিত হয়।
পিএসসির সাংবিধানিক পদধারী বলতে কমিশনের সভাপতি (চেয়ারম্যান) ও সদস্যদের (মেম্বার) বোঝায়। অনুরূপ সুপ্রিমকোর্টের সাংবিধানিক পদধারী বলতে প্রধান বিচারপতি এবং আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের বোঝায়। একইভাবে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক পদধারীদের বলতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের বোঝায়।
পিএসসির সভাপতি ও সদস্যরা শপথ গ্রহণের সময় সুপ্রিমকোর্টের বিচারক এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের মতো অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্ত করেন যে, তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের সম্পর্কে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, এ সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনে স্বাধীন থাকবেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে এবং কেবল এ সংবিধান ও আইনের অধীন হবে। যদিও পিএসসির সভাপতি ও সদস্যদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংবিধানে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক ও নির্বাচন কমিশনের অনুরূপ সুস্পষ্টভাবে কিছুই ব্যক্ত করা হয়নি, কিন্তু তাদের স্বপঠিত শপথ দৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে তাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ কতজন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত হবে এ বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও পঞ্চদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী কিছু বলা ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক ৪ জন কমিশনারকে নিয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। পিএসসির গঠন বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন অধ্যাদেশ, ১৯৭৭-এ বলা হয়েছে, একটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে, যা বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন নামে অভিহিত হবে। চেয়ারম্যানসহ সর্বনিু ৬ অথবা সর্বোচ্চ ১৫ জন সদস্য সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। সংবিধানে এক বা একাধিক কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন অধ্যাদেশ, ১৯৭৭ (অধ্যাদেশ নম্বর ঠওওও, ১৯৭৭)-এর মাধ্যমে দুটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালের খঠওও নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে আগের অধ্যাদেশটি বাতিল করে একটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান প্রণয়ন করে সদস্য সংখ্যা সর্বনিু ও সর্বোচ্চের ক্ষেত্রে সীমিত করে দেয়া হয়।
পিএসসির সভাপতি ও সদস্যদের মেয়াদ বিষয়ে সংবিধানে বলা আছে, দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে ৫ বছর বা বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া- এ দুটির মধ্যে যা অগ্রে ঘটে সেকাল পর্যন্ত সভাপতি বা একজন সদস্য স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। তাদের অপসারণ বিষয়ে সংবিধানে বলা আছে, সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত সরকারি কর্মকমিশনের সভাপতি বা কোনো সদস্যকে অপসারণ করা যাবে না।
উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারক গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে অথবা শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তী কর্মে প্রবীণ দুজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্তপূর্বক যে প্রতিবেদন দাখিল করে, রাষ্ট্রপতি তার ভিত্তিতে অপসারণের আদেশ প্রদান করেন।
পিএসসির সভাপতি ও সদস্যদের অপসারণ পদ্ধতি সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অনুরূপ হওয়ায় প্রতীয়মান হয়, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের রক্ষাকবচ।
পিএসসিকে সাংবিধানিকভাবে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা হল- (ক) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপয্ক্তু ব্যক্তিদের মনোনয়নের উদ্দেশে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা; (খ) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হলে কিংবা কমিশনের দায়িত্ব সংক্রান্ত কোনো বিষয় কমিশনের কাছে প্রেরণ করা হলে সে সমন্ধে রাষ্ট্রপতিকে উপদেশ দান এবং (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন।
আইন ও বিধিবিধানের অধীনে কমিশনকে সরকারের বিভিন্ন ক্যাডার পদে এবং অধস্তন বিচার বিভাগ ছাড়া অপরাপর বেসামরিক বিভাগ ও কতিপয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদের পরীক্ষা পরিচালনা ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কমিশন প্রার্থী বাছাইপূর্বক সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে থাকে। কমিশনের সুপারিশ প্রদান পরবর্তী পুলিশের গোয়েন্দা শাখা কর্তৃক গোপনীয় প্রতিবেদনে বিরূপ কোনো কিছু না থাকলে রাষ্ট্রপতি বা ক্ষেত্রবিশেষে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ আদেশ প্রদান করে থাকেন। এ পর্যন্ত এভাবেই নিয়োগ আদেশ দেয়া হয়ে আসছিল। কমিশন কর্তৃক নিয়োগ সংক্রান্ত সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর রাষ্ট্রপতি বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশ প্রদান করে থাকলে এ নিয়োগ বিষয়ে কোনো মহল থেকে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ সীমিত। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন কোনো ব্যক্তি যদি এমন কিছু বলেন, যা কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এ কথাটি বলার অবকাশ আছে কি?
সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার অবসান বা পুনর্বিন্যাসের দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলনে নেমে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে সরকারের শীর্ষ নির্বাহী তার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এক সভায় বলেন, আন্দোলনের নামে যারা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ চাকরি পাবে না। ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে, অযোগ্য ঘোষণা করা হবে।
সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর মুখ থেকে এ কথাটি উচ্চারিত হওয়ার পর দেশের সচেতন মানুষের মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য ও অকৃতকার্য বিষয়ে পিএসসি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে নাকি কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে করে থাকে? সরকারি কর্মকমিশনের সাবেক একাধিক সাংবিধানিক পদধারীর সঙ্গে আলাপ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কমিশন সুপারিশ প্রদান-পরবর্তী কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থীর বিষয়ে পুলিশের গোপন শাখা থেকে নেতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সে প্রার্থীর নিয়োগ কার্যকর করা হয় না এবং এ পর্বটি সব সময় কমিশন কর্তৃক মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্নের পর বাছাই সংক্রান্ত প্রতিবেদন সরকারের বরাবরে পেশ করার পর ঘটে থাকে। তাদের অভিমত, সরকারের শীর্ষ নির্বাহী যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, আন্দোলনকারীদের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর বক্তব্য অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার সময় পিএসসি যদি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেবে, সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর দল ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তার দলের ছাত্র সংগঠনের যেসব নেতাকর্মী অগ্নিকাণ্ড, ভাংচুর, লুটতরাজ, হত্যা প্রভৃতিতে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে? এ বিষয়ে কিছু না বলা প্রচ্ছন্নভাবে নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের এ ধরনের ঘটনা সংগঠনে উৎসাহিত করার নামান্তর নয় কি?
দেশবাসী অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে, ১৯৯০-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে পিএসসির সভাপতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে কতিপয় সদস্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগের মাধ্যমে কমিশনের ভাবমূর্তির ওপর কুঠারাঘাত করেছেন। যদিও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত সভাপতি ও সদস্যরা নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে কমিশনের হƒত গৌরব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু তাদের বিদায়ের পর অতীতের ধারাবাহিকতার পদধ্বনিই শোনা যায়।
ইতিমধ্যে সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর বক্তব্যের জবাবে সরকারের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী ঘোষণা করেছেন, কথিতভাবে যাদের মৌখিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য করানো হবে, তার দল ক্ষমতায় গেলে তাদের সবার চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের সাবেক শীর্ষ নির্বাহীর এ ঘোষণা আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করেছে এবং অনুমিত হয় বিপুল জনগোষ্ঠীর এ আন্দোলন আগামী নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারকের বিচারিক দায়িত্ব পালন এবং নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন বাইরের কোনো মহলের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই, ঠিক তেমন প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন ক্যাডার পদে এবং বিচার বিভাগ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদের পরীক্ষা পরিচালনা ও প্রার্থী বাছাই সাংবিধানিকভাবে পিএসসির একক এখতিয়ারের বিষয়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সরকারের শীর্ষ নির্বাহীসহ পদস্থ কেউ যদি কোনো ধরনের বক্তব্য প্রদান করেন, তা হবে কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের শামিল। আর এ ধরনের হস্তক্ষেপ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও ভাবমূর্তির ভিত্তিমূলে আঘাত হানে। তাই সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর পক্ষ থেকে বক্তব্যটি দেয়ার পর দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল, কমিশন হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি প্রদান করে তার অবস্থান বিষয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করবে। কিন্তু এ বিষয়ে কমিশনের নীরবতা জনমানুষের মধ্যে এমন বিশ্বাসের জš§ দিয়েছে যে, কমিশন সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করছে। আর এভাবে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে কমিশনকে স্বাধীন না বলে অধীন বলাই বোধ করি সমীচীন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জেলা জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিমকোর্ট

ইহকালের শান্তি ও পরকালের সুখ- দুইটাই বিনষ্ট হয়... by মোকাম্মেল হোসেন

আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলে আন্ধাগোন্ধা দৌড় বলে একটা কথা আছে। এর অর্থ হল, বেদিশা হয়ে দৌড়ানো। ইফতারের সময় হয়ে যাওয়ায় বাস থেকে নেমেই একটা হোটেল লক্ষ্য করে আন্ধাগোন্ধা দৌড় দিলাম। হোটেলের লোকজন প্লেটে ইফতার সাজিয়েই রেখেছিল। অজু করে চেয়ারে বসতেই তা পরিবেশন করা হল। খাবারগুলোর দিকে একবার নজর বুলিয়ে সময় দেখার জন্য পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলাম, আর ঠিক তখনই এটি নেচে-গেয়ে উঠল। কল রিসিভ করে বললাম-
: আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। জনাব, আপনে কি আজও রাস্তায় ইফতার করবাইন!
: করমু কী- অলরেডি ইফতার সামনে লইয়া বইসা গেছি...
- মানে?
হোটেলে ইফতার করার কথা শুনে লবণ বেগম ক্ষেপে গেল। বলল,
: তোমার কি বৌ-পোলাপান নাই?
- আছে। একাধিক।
: কী!
- ঘাবড়াইও না। একাধিক বৌয়ের কথা বলি নাই; পোলাপানের কথা বলছি।
: তাসিনের আব্বা!
- জ্বে।
: সারাদিন রোজা রাইখ্যা মাথা কিন্তু হট হইয়া রইছে!
- এই তো আর মাত্র চার-পাঁচ মিনিট। তারপরেই আজান দিবে...
: কথা সেইটা না।
- কী কথা!
: ছেলেরা তোমার অপেক্ষায় পথ চাইয়া রইছে!
- তুমি চাইয়া রইছ না?
: আমার অত ঠেকা পড়ে নাই...
এটা হচ্ছে অভিমানের কথা। আমি জানি, লবণ বেগম অধীর আগ্রহে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু উপায় কী? রাস্তার লালবাতি-সবুজবাতি নিয়ন্ত্রণের ভার যাদের হাতে ন্যস্ত, তাদের কাছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি মূল্যহীন। ফলে কোনোদিন বাসায়, কোনোদিন রাস্তায় ইফতার করার মধ্য দিয়েই রমজান অতিবাহিত হচ্ছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পানির গ্লাসের দিকে তাকাতেই মসজিদ থেকে আজান ভেসে এলো। ইফতার শেষ করে হোটেল থেকে বের হওয়ার পর ওয়াক্কেস সাহেবের সঙ্গে দেখা। তার হাতে একটা পোটলা দেখে জিজ্ঞেস করলাম,
: ঈদের কেনাকাটা শুরু কইরা দিছেন নাকি?
- আরে না!
: তাইলে পোটলার মধ্যে কী?
- লুঙ্গি।
: আপনের তো দেখতেছি বেজায় সাহস! শাড়ি না কিইন্যা আগে লুঙ্গি কিনছেন- ভাবি আপনেরে ছেঁচা দিব না?
- এইটার ইতিহাস ভিন্ন।
: কী রকম?
- আর বলবেন না! বাসের জন্য ফুটপাতে দাঁড়াইয়া রইছি- এক লোক আইসা বলল, স্যার, ঈদ উপলক্ষে আমার আব্বার জন্য দুইটা লুঙ্গি কিনছিলাম। হঠাৎ নগদ টাকার প্রয়োজন হওয়ায় এইগুলা বিক্রি করতে হইতেছে। আপনে যদি নেন, তাইলে অর্ধেক দামে দিয়া দিব।
লোকটার কথা শুনে জিজ্ঞেস করলাম-
: কত নিবা?
লোকটা তখন বলল-
: স্যার, লুঙ্গি দুইটার দাম হইল সাড়ে ছয়শ’ টাকা। আপনে আমারে তিনশ’ টাকা দেন।
কথাবার্তার মাঝখানে সেখানে আরও কয়েকজন লোক আইসা দাঁড়াইতেই সুযোগ হাতছাড়া হইতে পারে ভাইব্যা আমি আর বিলম্ব করলাম না। লোকটার হাতে তিনশ’ টাকা দিয়া দিলাম। এই হইল পোটলার ইতিহাস...
বর্তমান বাজারে তিনশ’ টাকায় এক জোড়া লুঙ্গি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি লুঙ্গিগুলো দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে বললাম-
: দেখি, কোন কোম্পানির লুঙ্গি!
পোটলা থেকে লুঙ্গি দুটো বের করে ভাঁজ খুলতেই আমাদের দু’জনের চোখ কপালে উঠে গেল। হায় আল্লাহ! ছেঁড়াফাটা পুরনো লুঙ্গি মাড় দিয়ে কড়কড়া করার পর ইস্ত্রি করে কী সুন্দর করে প্যাকেট করা হয়েছে! প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে ওয়াক্কেস সাহেব হায়-হায় করে উঠলেন।
ওয়াক্কাস সাহেবকে প্রতারিত হতে দেখে আমার ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। এটা অনেকটা গল্পের মতো। আমাদের পাশের গ্রামের নজু বেপারি রাতে একা হাট থেকে বাড়ি ফিরছিল। গোরস্তানের সামনে আসার পর সেখানে চট পরিহিত এক লোককে দেখে দাঁড়িয়ে পড়তেই লোকটা তাকে বলল-
: ডরাইস না। কাছে আয়।
নজু বেপারি কাছে যেতেই লোকটা জিজ্ঞেস করল-
: তর নাম কী?
- নজু বেপারি।
: বাড়ি কই?
- সেনেরচর।
নজু বেপারি সাহস অর্জন করে জিজ্ঞেস করল-
: হুজুর, আপনে গোরস্তানে কী করেন!
- আর বলিস না! এই গোরস্তানে আগমন করার পর নেকির অভাবে যেসব মুর্দা কবরে আজাবের সম্মুখীন হয়- আমি আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি কইরা তাদের নেকি ডাবল কইরা দেই। এর ফলে তাদের আর কবরের আজাব সহ্য করতে হয় না...
ডাবল হুজুরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নজু বেপারির সাহস বেড়ে গেল। একইসঙ্গে তার মনের কোণে লোভও উঁকি দিল। এক পর্যায়ে ডাবল হুজুরকে নজু বেপারি বলল-
: হুজুর, শুধু নেকিই ডাবল করেন? আর কিছু ডাবল করতে পারেন না!
- পারি। বউ ডাবল করতে পারি। তর কি ডাবল বৌ দরকার?
: না-না! একটা লইয়াই বেকায়দা অবস্থায় আছি। বৌ ডাবল দরকার নাই। তবে...
- তবে কী?
: ধনদৌলত ডাবল করতে পারলে মন্দ হইত না!
- ধনদৌলত ডাবল করার কাম আগে করতাম। এখন আর করি না। এই কাম করতে গিয়া দেখছি- মানুষ যত ধনসম্পদ পায়- তত তার লোভ বাইড়া যায়। লোভের কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। টাকা-পয়সা, সোনাদানা একবার ডাবল কইরা দেওয়ার পর আবার ডাবল কইরা দিতে বলে। দ্বিতীয়বার ডাবল কইরা দেওয়ার পর আবার ডাবল কইরা দিতে বলে। তারপর আবার। আমারে একেবারে বেহুঁশ বানাইয়া ফেলে। সেইজন্য অই জায়গা থেইক্যা সইরা আসছি।
: আমার লোভ অত পাতলা না!
- পাতলা, না ঘন- ফিল্ডে না নামলে বোঝার উপায় নাই।
: তাইলে মেহেরবানী কইরা একবার ফিল্ডে নাইম্যা দেখেন।
- দুনিয়াদারি কারবার- অনেক ঝামেলার! সেইজন্যই মরা মানুষ লইয়া পইড়া থাকি। আইচ্ছা, তুই যখন বলতেছস, দেখি...
: দেখি না, কখন আমার বাড়িতে যাবাইন- কইন!
- শুধু গেলেই তো হইব না পাগল! তর ঘরে নগদ টাকা-পয়সা, সোনাদানা কেমন আছে?
: সোনাদানা সামান্য পরিমাণ আছে। তবে নগদ টাকা-পয়সা তো নাই।
- আমার কেরামতির ফল পাইতে হইলে প্রচুর নগদ টাকা-পয়সা আর সোনাদানা লাগব। পারবি জোগাড় করতে?
: পারমু।
- ঠিক আছে। টাকা-পয়সা যোগাড় করার আগে তুই শহর থেইক্যা বড় দেইখ্যা দুইটা পিতলের কলসি কিইন্যা আনবি। কলসি দুইটা তর শোয়ার ঘরে গলা পর্যন্ত পুইত্যা রাখবি। এরপর একটা কলসির মধ্যে যতটা সম্ভব নগদ টাকা-পয়সা ও সোনাদানা জমাবি। আমি আগামী অমাবস্যার রাতে তর ঘরে যাইয়া ওই কলসিতে যে পরিমাণ টাকা-পয়সা ও সোনাদানা থাকবে- তা দ্বিগুণ বানাইয়া অপর কলসিতে ঢুকাইয়া দিব।
ডাবল হুজুরের কথামতো নজু বেপারি পরদিন শহর থেকে বড় আকারের দুটি পিতলের কলসি কিনে আনল। তারপর টাকা-পয়সা জোগাড়ের দিকে মন দিতেই তার স্ত্রী জবেদন নেছা ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল-
: আপনে এইসব কী শুরু করছুইন?
- কী শুরু করছি?
: গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি সব বেইচ্যা অহন জমি বেচা শুরু করছুইন!
- বেচনের দেখছস কী? আমার তো ইচ্ছা করতাছে বাড়ি ভিটা বেইচ্যা দিয়া সেই টাকাগুলাও কলসিতে রাখি...
অমাবস্যার রাতে নজু বেপারির বাড়িতে ডাবল হুজুর তশরিফ রাখলেন। তার সামনে গলা পর্যন্ত পুঁতে রাখা পাশাপাশি দুটি পিতলের কলসি। এর একটার মধ্যে টাকা-পয়সা ও অলংকার। অন্যটি খালি। লাল সালু কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা কলসি দুটি সামনে রেখে ডাবল হুজুর জিকির শুরু করলেন। জিকির করার ফাঁকে হুজুর একবার টাকা-পয়সা ও অলংকার রাখা কলসিতে ফুঁ দেন, আবার খালি কলসিতে ফুঁ দেন। নজু বেপারি একটু দূরে বসে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছিল। রাত গভীর হওয়ার পর ইশারায় নজু বেপারিকে কাছে ডাকলেন ডাবল হুজুর। হুজুরের কাছে যাওয়ার পর নাকের কাছে একটা রুমাল ধরতেই নজু বেপারি ত্যানার মতো নেতিয়ে পড়ল। পরদিন জ্ঞান ফেরার পর নজু বেপারি দেখল, ডাবল হুজুর নেই; টাকা-পয়সা ও অলংকারের কলসিও নেই।
ওয়াক্কেস সাহেবকে সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশে বললাম-
: ভাই, এই দেশে প্রতারকের অভাব নাই। প্রতারকরা কেউ লুঙ্গি-গামছা লইয়া, কেউ খাবার ও ওষুধ লইয়া, কেউ বাড়ি-গাড়ি-জমি লইয়া, কেউ চাকরি-ব্যবসা ও বিবাহ লইয়া, আবার কেউ সমবায় সমিতি-ব্যংক-বীমা ও শেয়ারবাজার লইয়া মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেছে। যারা এদের প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন থাকে, তারা কোনো ভেজালে পড়ে না। কিন্তু সচেতন না থাকলেই বিপদ। ইহকালের শান্তি ও পরকালের সুখ- দুইটাই বিনষ্ট হয়...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের অধীনতামূলক সম্পর্ক by বদরুদ্দীন উমর

ভারতের পক্ষ থেকে যত না, তার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের কথা বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অহরহ ভারতকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করে পারস্পরিক বন্ধুত্বের গৌরব প্রচার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই প্রচার সত্ত্বেও দু’দেশের এই বন্ধুত্ব কতখানি বাস্তব ও কার্যকর তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, ভারত এমন কোনো কাজ করবে না যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মর্মার্থ, ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদের আছে কিন্তু মহানুভবতার কারণে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি তারা করবে না! টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে যখনই বাংলাদেশের সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন থেকে আপত্তি জানানো হয়, তখন তারা বিশেষ করে এসব কথা বলে থাকেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফরের সময়েও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে সে কথাই বলেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে নিয়ে অন্য মন্ত্রীর দল এবং সব ধরনের আমলা-ফায়লা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রায়ই বিদেশ সফর করে থাকেন, যার অধিকাংশই নিষ্প্রয়োজন এবং আনন্দ ভ্রমণ ছাড়া আর কিছু নয়। মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের বোনঝির বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য ৪২ জন সরকারি লোক ও আÍীয়স্বজন নিয়ে সরকারি খরচে লন্ডন গিয়ে বিলাসবহুল হোটেলে থেকে দেশের জনগণের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসেছেন। এটাকে তারা চরম দুর্নীতি মনে করেন না। আসলে বাংলাদেশে চুরি, ঘুষখোরি, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, এসবই পরিণত হয়েছে স্বাভাবিক ব্যাপারে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য যে মন্ত্রীরা কারণে-অকারণে বিদেশ সফর করেন, তাদের মধ্যে বিদেশমন্ত্রী শীর্ষস্থানীয়। বিদেশ সফরের বিষয়ে তার কোনো নীতিজ্ঞান, কাণ্ডজ্ঞান অথবা প্রয়োজনের বোধ আছে বলে মনে হয় না। কাজেই যে কোনো ছুঁতো ধরে বা ছুঁতো তৈরি করে বিদেশ সফরের তাড়নায় তিনি অস্থির থাকেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে যে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, সেই লুটপাটের ঐতিহ্য এ ধরনের সফরের মাধ্যমেও রক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী এখন ভারতে গেছেন সেখানকার প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় ভূমি সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে আলোচনার জন্য। অবধারিতভাবে বিদেশমন্ত্রীর এই সফর ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এদের কাছে সফর ব্যর্থ বা সফল হওয়া আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার হল সফর করা। যে বিষয়ে মন্ত্রী ভারত সফরে গেছেন তা নিয়ে অসংখ্যবার আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ভারত তার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে। কাজেই এ মুহূর্তে ওই সফর বাংলাদেশের জন্য নিষ্প্রয়োজন। তিস্তা চুক্তি সম্পর্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফররত বাংলাদেশী বিদেশমন্ত্রীকে যা বলেছেন, তার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। নতুনত্ব যে থাকার কথা নয় এটাও জানা কথা। ভারত-বাংলাদেশ ভূমি সীমান্ত চুক্তি কার্যকর শুধু সরকারি প্রভাব ও সিদ্ধান্তের ব্যাপার নয়। তার জন্য প্রয়োজন ভারতের সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। যেহেতু বিজেপি এবং অন্য কয়েকটি দল এর বিরোধী, সে কারণে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। কাজেই এই চুক্তি বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত একটি বাংলাদেশ ঠকানো ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজেপি এই চুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছে, এই চুক্তি হলে ভারতের অধিকৃত ভূমির পরিমাণ কম হবে। এটা ঠিক। কারণ ভারত ইতিপূর্বেই বাংলাদেশের ভূমির অনেকটা অংশ দখল করে রেখেছে। চুক্তির মাধ্যমে সেই দখল ছাড়ার বিষয়টি তাদের কাছে ‘ভারতের ভূমি হারানোর’ ব্যাপার! এই পরিস্থিতিতে কোনো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই ভারত-বাংলাদেশ ভূমি সীমান্ত চুক্তি সম্পাদনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সে সম্ভাবনা একেবারেই না থাকা সত্ত্বেও এ নিয়ে বিদেশ সফরে বিদেশমন্ত্রীর উৎসাহের কোনো অভাব নেই!!
ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বিষয় নিয়ে প্রথমে কথা শুরু করেছিলাম। এ দুই দেশের বন্ধুত্ব বলতে কী বোঝায় সেটা প্রচার মাধ্যমের ক্ষেত্রে যা ঘটছে তার দিকে তাকালে যত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এমন আর কোনোভাবে বোঝা যায় না। এদিক দিয়ে টেলিভিশনের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ভারতের অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেলের দরজা বাংলাদেশের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। এদিক দিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদারতার শেষ নেই। ভারতের সরকারি চ্যানেল ডিডি বাংলা থেকে নিয়ে অসংখ্য ভারতীয় টিভি চ্যানেল এখন বাংলাদেশে অবাধে তাদের প্রোগ্রাম প্রচারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলের প্রবেশাধিকার ভারতে নেই! এই হল বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পরম বন্ধুত্বের নিদর্শন!! এটা যে কোনো তথাকথিত দুই ‘বন্ধু দেশ’ ছাড়াও কোনো দুই দেশের সাধারণ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভব, এটা চিন্তা করাই যায় না। সম্ভবত ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের অসম সম্পর্ক দেখা যায় না। বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্যমন্ত্রী অনেক লম্বা-চওড়া গালভরা কথা বলে থাকেন, কিন্তু ভারতের সঙ্গে প্রচার মাধ্যমের এই অসম ও হীন সম্পর্কের বিষয়ে তাদের মুখ থেকে কোনো কথা শোনা যায় না। তারা এ নিয়ে ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি তো দূরের কথা, কোনো কথাবার্তা বলেন- এমন কিছু শোনাও যায় না। দু’দেশের এই সম্পর্ক যে বন্ধুত্বের সম্পর্কের পরিবর্তে দাস ও প্রভুর সম্পর্ক- এ কথা বললে কি সত্যের অপলাপ হয়? অনেক সময় দেখা যায় এখানকার কোনো কোনো সংবাদপত্র সম্পাদক বা কলাম লেখককে ভারতের কোনো কোনো টিভি চ্যানেলের প্রোগ্রাম সম্পর্কে গদগদ ভাষায় লিখতে। কিন্তু ভারতের জনগণ যে বাংলাদেশের কোনো টিভির কিছুই দেখতে-শুনতে পান না, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই! ভারতের জনগণের মধ্যেও বাংলাদেশের টিভি প্রোগ্রাম না দেখা নিয়ে অসন্তোষ আছে। তারা এখানকার প্রোগ্রাম শুনতে চান, কিন্তু ভারত সরকার তাদের ইচ্ছাকে পাত্তা দেয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের জনগণ কিছু জানুক, এটা তাদের অভিপ্রেত নয়! এসব দেখে মনে হয় যে, প্রকৃতপক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, শত্র“তামূলক। ভারত নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটি গুরুতর বিষয়ে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে শত্র“তামূলক আচরণ করে থাকে। শুধু কেন্দ্রীয় সরকারই নয়, পশ্চিমবঙ্গের সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রী যে বাংলাদেশের কোনো ধরনের বন্ধু নয়, এটা তিস্তা চুক্তির বিরোধিতার ক্ষেত্রে তারা যে অবস্থানে আছে, তার থেকে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? বাংলাদেশ সরকারের এই ভারতনীতি পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই যতদিন বর্তমান শাসক শ্রেণী এবং তার যে কোনো রাজনৈতিক দল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে বন্ধুত্বপূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন উভয় দেশেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠা। এই গণতান্ত্রিক সরকারের অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের জোরে গঠিত সরকার নয়। এর অর্থ এমন সরকার, যারা ধাপ্পাবাজির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট অর্জনের থেকে জনগণের মৌলিক সমস্যার প্রতি বেশি যতœবান হবে এবং সেই হিসেবে শুধু নিজেদের দেশের জনগণের জন্যই নয়, অন্য দেশের জনগণের স্বার্থও কোনোভাবে যাতে ক্ষুণœ না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

চূড়ান্ত প্রার্থীদুজন

পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন (ইসিপি) গতকাল শনিবার আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে। চূড়ান্ত প্রার্থীরা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএল-এন) মামনুন হুসাইন ও ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ওয়াজিহউদ্দিন আহমেদ। ৩০ জুলাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নির্বাচন কমিশনে মোট ২৪ জন প্রার্থী ৩৩টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। কমিশন গত শুক্রবার তিনজনের মনোনয়নপত্র অনুমোদন করে। তাঁরা হলেন পিএমএল-এনের মামনুন হুসাইন ও ইকবাল জাফর এবং পিটিআইয়ের ওয়াজিহউদ্দিন আহমেদ। এর আগে শুক্রবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির দল পিপিপিসহ তিনটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। কোনো প্রকার ‘পরামর্শ করা ছাড়াই’ তারিখ পরিবর্তনের প্রতিবাদে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ নির্বাচনের পূর্বনির্ধারিত তারিখ ছিল ৬ আগস্ট। এদিকে পিপিপি পরাজয়ের ভয়েই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পিএমএল-এন মনোনীত প্রার্থী মামনুন হুসাইন। পিটিআই শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সংবাদ সম্মেলনে ইমরান খান বলেন, ক্ষমতাসীন দল পিএমএল-এনের প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। ডন।