Showing posts with label চট্টগ্রাম বন্দর. Show all posts
Showing posts with label চট্টগ্রাম বন্দর. Show all posts

Wednesday, December 3, 2025

বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া কি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়া সম্ভব by সুবাইল বিন আলম

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন আলোচনাকে বাস্তব সমাধানের দিকে নেওয়া।

কিছুদিন আগে একটা গোলটেবিল প্রোগ্রামের কি–নোট উপস্থাপন করি এবং আলোচনায় উপস্থিত সবাই মোটামুটি একমত যে, বাংলাদেশ যদি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যেতে চায়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ ও চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের বিলম্ব করার সুযোগ নেই; যদিও কিছু ব্যাপারে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে।

এখন এ কথা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ, বন্দর শুধু একটা অবকাঠামো নয়, বরং এটা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস, মুদ্রানীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু।

চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের ৯২ শতাংশ সমুদ্র–বাণিজ্য ও ৯৮ শতাংশ কনটেইনার কার্গো এখান দিয়ে ওঠানো নামানো হয়।

২০২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টিইইউ হ্যান্ডল করা হয়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির মধ্যেও বন্দরের কার্যকারিতা এক জায়গায় আটকে আছে।

সিঙ্গাপুর বন্দর বছরে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন টিইইউ হ্যান্ডল করে, কলম্বো ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টিইইউ। তার তুলনায় চট্টগ্রামের ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টিইইউ এখনো আঞ্চলিক মানের অনেক নিচে।

বিশ্বব্যাংকের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স অনুযায়ী চট্টগ্রামের অবস্থান ৩৩৭তম/৪০৫। টার্মিনালের ক্রেন উৎপাদনশীলতা মাত্র ১৮-২১ মুভ/ঘণ্টায়, যেখানে আন্তর্জাতিক মান ৩৫-৪৫।

বিশ্বব্যাংক তার অক্টোবরের প্রতিবেদনেও এ কথা তুলে ধরেছে। এনসিটিতে ব্যবহৃত বেশির ভাগ গ্যান্ট্রি ক্রেন ২০ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো।

প্রায়ই ব্রেকডাউন হয়, স্পেয়ার পার্টসের অভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অচল থাকে। একটি আধুনিক টার্মিনালে যেখানে ৯৫ শতাংশের বেশি আপটাইম থাকে, সেখানে এনসিটির আপটাইম ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।

এর মানে হলো, বিদ্যমান অবকাঠামোই আমাদের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়।

২০২৫ সালের আগস্টে এনসিটি একাই রেকর্ড ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৭ টিইইউ হ্যান্ডল করেছে (+ ২৮% আগের একই সময়ে বছরের তুলনায়)।

জুলাই-সেপ্টেম্বরে এনসিটির ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে। কিন্তু সিডিডিএলের মধ্যস্থতা সত্ত্বেও অপেক্ষার সময় এখনো ৭ দিনের ওপর।

ফলাফল একটাই—জাহাজকে বহির্নোঙরে ৭ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, প্রতিদিন অতিরিক্ত খরচ ১২ থেকে ২০ হাজার ডলার।

প্রতিবছর এ বিলম্বে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ১ দশমিক ৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ বহন করেন।

এ খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে, রপ্তানির সময়সীমায় এবং দেশের লজিস্টিক খরচে উঠে আসে। সোজা কথায়, বন্দর জ্যাম মানেই জাতীয় অর্থনীতির জ্যাম।

যাঁরা বন্দর পরিচালনা, মেশিনারি রক্ষণাবেক্ষণ, অটোমেশন কিংবা ডিজিটাল টিওএস বোঝেন, তাঁরা জানেন, একটা টার্মিনালের দক্ষতা বাড়ানো মানে শুধু নতুন ক্রেন বসানো নয়।

এটা হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত জনবল, ডিজিটালাইজেশন, গ্লোবাল শিপিং নেটওয়ার্কে প্রবেশ এবং দৃঢ় ম্যানেজমেন্ট শৃঙ্খলা।

সে জন্যই সরকার এনসিটি ও এলসিটিতে জিটুজি ও পিপিপি মডেলে বিদেশি অপারেটর আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

লালদিয়া টার্মিনালে এপিএম টার্মিনাল (মারসেক গ্রুপ) এবং নিউমুরিং টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে।

লালদিয়া টার্মিনালের চুক্তি নিয়ে প্রথম আলোয় একটা বিশ্লেষণ আসার পর দেখা যায়, দেশের এখানে একটাই রিস্ক, সেটা হচ্ছে যদি হরতাল–অবরোধে পোর্ট বন্ধ থাকে, তাহলে দেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

রাজনীতিবিদেরা কি এ ব্যাপারে গ্যারান্টি দেবেন? আশার কথা, দেশের এত হরতাল–অবরোধে সাধারণত পোর্ট বন্ধ থাকে না।

দুই প্রকল্পে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, যেখানে সরকারের নিজেদের বাজেট থেকে কোনো খরচ লাগবে না। আমাদের আর্থিক চাপও আসবে না।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, তারা সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, জাহাজের অপেক্ষার সময় ৪০ শতাংশ কমাতে পারে, ডুয়েল টাইম কমিয়ে আনে এবং পুরো টার্মিনালকে তথ্যভিত্তিক করে তোলে।

এ ব্যাপারে ২০২৫ সালের ২৩ জুন প্রথম আলো অনলাইনে  প্রকাশিত আমার লেখা ‘যে কারণে চট্টগ্রামে বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার’ শীর্ষক কলামে বিস্তারিত বলা আছে।

বর্তমানে ভিয়েতনাম, ভারত, এমনকি শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোও দ্রুতগতিতে আধুনিক হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর যদি এখনই র‍্যাডিকেল সংস্কার না করে, তাহলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহশৃঙ্খলে আমরা মার্জিনালাইজড হয়ে পড়ব।

শিপিং লাইনগুলো সরাসরি কলম্বো বা ক্ল্যাংয়ে যাবে, সেখান থেকে ফিডার করে ছোট জাহাজে পণ্য বাংলাদেশে আসবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য সময় ও খরচ—দুটিই বাড়িয়ে দেবে।

বন্দরের দক্ষতা বাড়লে শুধু জাহাজ দ্রুত লোড-আনলোড হবে না; এর তরঙ্গের প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।

তৈরি পোশাক, কৃষি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং—সব খাতেই অপেক্ষার সময় কমে যাবে। লজিস্টিক খরচ জিডিপির শূন্য দশমিক ৮ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

আজ বাংলাদেশে রপ্তানিকারকদের লজিস্টিক খরচ ভিয়েতনাম ও ভারতের চেয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। এই অদক্ষতা যত দিন থাকবে, এফডিআই আসবে না।

দক্ষ বন্দর শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগতভাবেও টেকসই। জাহাজগুলো যদি ১০ দিনের বদলে ২ দিনে টার্ন অ্যারাউন্ড করতে পারে, তবে জ্বালানি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

এটি আমাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান লক্ষ্য (এনডিসি) অর্জনেও সহায়ক হবে।
সরকারি রাজস্ব বাড়বে। টিইইউ থ্রুপুট বাড়লে পোর্ট ফি, কাস্টমসের রেভিনিউ, অন্যান্য ডিউটি সবই বাড়ে।

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা, বিদেশি অপারেটর আসলে চাকরি কমবে; বরং টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়লে কাজ বাড়ে, আর শ্রমিকদের আরও দক্ষ করে তোলে।

স্বল্প মেয়াদে (১-২ বছর) জাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে, মধ্য মেয়াদে (৩-৫ বছর) থ্রুপুট ও রাজস্ব বাড়বে, আর দীর্ঘ মেয়াদে (৫-১০ বছর) রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও ক্রেডিট রেটিং উন্নত হবে।

পিপিপি বা জিটুজিতে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ, এতে বাণিজ্যিক গোপনীয়তা থাকে। কিন্তু কিছু তথ্য জনগণের জানার অধিকার আছে। যেমন দেশ কী পরিমাণ লাভ করবে?

স্থানীয় পেশাদারদের ভূমিকা কতটা নিশ্চিত? অপারেটরের কেপিআই কী? মোট বিনিয়োগ কত? চট্টগ্রাম পোর্টের সঙ্গে রেভিনিউ শেয়ার কী?

এ সরকারের সময় যেহেতু তিন মাসেরও কম, তাদের তাই প্রধান রাজনৈতিক দল ও স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া দরকার।

এখন যতগুলো আলোচনা হচ্ছে, এর মধ্যে চুক্তির স্বচ্ছতায় আসলে একমাত্র প্রশ্ন—যার উত্তর সরকারে দেওয়া উচিত। কারণ, দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার তখনই সফল হয়, যখন বিষয়টি কারও এজেন্ডা না হয়ে সবাই সহরাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়।

যদিও হাইকোর্টে এনসিটি হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে পিটিশন চলছে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে কোর্টের রায় ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

এটা প্রমাণ করে যে প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার দিকে এগোচ্ছে, জনগণের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হচ্ছে না।

আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, চুক্তির মালিকানা ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ শতভাগ সিপিএ ও নৌবাহিনীর হাতেই থাকবে। বিদেশি অপারেটরের এখতিয়ার শুধুই ‘টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট’।

বন্দর বা রাষ্ট্রের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না। এটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা যে সার্বভৌমত্ব মানে শুধু শতভাগ মালিকানা নয়, বরং নিজের সম্পদ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছি, সেটাও।

অদক্ষ, লোকসানি বন্দরের মালিকানা রাখার চেয়ে একটি দক্ষ, আয়বর্ধক বন্দরে অংশীদারি গ্রহণ করা অনেক বেশি সার্বভৌমত্ববান সিদ্ধান্ত।

গ্লোবালাইজেশনের যুগে ‘মালিকানা’ নয়, ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘মূল্য সৃষ্টির ক্ষমতা’ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জমি, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে থেকে গেলে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।

আরেকটি নিরাপত্তার জামানত হলো, বাংলাদেশ আলাদা দেশের অপারেটর নিচ্ছে। এক দেশের ওপর নির্ভরতা নেই, প্রতিযোগিতা থাকবে, বেস্ট প্র্যাকটিস আসবে। এই দেশগুলা নিজেদের স্বার্থেই নিরাপত্তা দেবে।

সমস্যা শুধু কনটেইনার হ্যান্ডলিং নয়, সমস্যা পুরো লজিস্টিকস ইকোসিস্টেমে। যদি শুধুই ক্রেনের স্পিড বাড়ানো হয় আর কাস্টমস, আইসিডি গেট, সড়ক লাইন, কনটেইনার বহির্গমনের জন্য রাস্তা যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে বন্দরের উন্নতির অর্ধেকই অপচয় হবে।

চট্টগ্রামের ড্রাফট কম, তাই বড় জাহাজ ঢোকে না। সারা দেশের রাস্তার অবস্থাই খারাপ, তাই বন্দরের কনটেইনার বের হতে দেরি হয়।

বে টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে ৬ থেকে ৮ হাজার টিইইউ জাহাজ কখনোই চট্টগ্রামে আসতে পারবে না, লজিস্টিক খরচ কমার পথও আটকে যাবে। বে টার্মিনাল ছাড়া চট্টগ্রাম কখনোই মাদার ভেসেলভিত্তিক বন্দর হতে পারবে না।

আমাদের কাস্টমস আধুনিক তো নয়, বরং ধীর এবং অনেক অনৈতিক কাজের অভিযোগ আছে। বাংলাদেশে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা লাগে, সেখানে ভিয়েতনামে লাগে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা।

এই ব্যবধান কমানো ছাড়া বন্দর যতই উন্নত হোক, পুরো সাপ্লাই চেইনে গতি আসবে না। ফলে ডুয়েল টাইম বাড়ে। অর্থাৎ বন্দর উন্নয়ন মানে শুধু বন্দর উন্নয়ন নয়, পুরো সাপ্লাই চেইনের আধুনিকায়ন।

তবে বিশ্লেষকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো ‘পায়রা সিনড্রোম’। সবার চিন্তা একটাই, যেন পায়রা বন্দরের মতো দুর্নীতি না হয়। একটা বড় অবকাঠামো বানিয়ে রেখে যদি তা ব্যবহারই না হয়, তাহলে সেটা ‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্প ছাড়া আর কিছুই হবে না।

তাই বাস্তব চাহিদা, ড্রাফট ডেপথ ও শিপিং গতিশীলতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পায়রা বন্দরের শিক্ষা হলো, ‘যদি বানাও, তারা আসবে না’, যদি না সঠিক অপারেটর, সঠিক ড্রাফট ও সঠিক মার্কেট কানেকটিভিটি থাকে। এলসিটি ও এনসিটির জন্য প্রস্তাবিত অপারেটররা তাদের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক থেকে শিপিং লাইন নিয়ে আসবে।

অর্থাৎ তাদের নিজস্ব কার্গো ফ্লো নিশ্চিত থাকে। এটি পায়রা মডেল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যেখানে বন্দরটি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বস্ত অপারেটর বা নিশ্চিত কার্গো ফ্লো ছাড়া।

দেশ যদি আগে হয়, তবে সিদ্ধান্তও হতে হবে দেশের স্বার্থকে কেন্দ্র করে। সরকারের হাতে এখন একটি শক্ত কার্ড রয়েছে। এলসিটি ও এনসিটি উভয়ই উচ্চমূল্যের সম্পদ।

এটি আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ায়। আমরা সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারি, যদি আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকে।

আমরা যদি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে অবশ্যই আমাদের আরব আমিরাতের ভিসা–সংক্রান্ত জটিলতা দূর করিয়ে নিতে হবে।

আল জাবেল বন্দর ব্যবহার করে আমরা যাতে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারি, সে সুযোগও নিতে হবে। এখন সময় সস্তা রাজনীতির নয়, বরং দূরদর্শী অর্থনৈতিক নীতির।

চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটা বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা যদি এফডিআই-জিডিপি অনুপাতকে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে না নিতে পারি, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি স্বপ্ন হিসেবেই থাকবে।

আমরা কি তথ্যকে ভিত্তি করে এগোব, নাকি শোরগোলকে? তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, শোরগোল নয়। ডেটাই হবে নীতির ভিত্তি।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই রূপান্তর কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি মহা অভিযান। তথ্য-উপাত্তের আলোকে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে এগিয়ে গেলেই কেবল আমরা এ লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হব এবং এই বিদেশি অংশীদারত্ব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে বহুদূর এগিয়ে নিতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর সংস্কার মানে শুধু বন্দর নয়, পুরো অর্থনীতির রূপান্তর।

* সুবাইল বিন আলম, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট।
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-30%2Fz95l455t%2FScreenshot-2025-11-30-131646.jpg?rect=25%2C0%2C1082%2C721&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, October 16, 2024

বন্দর ঘিরে নেয়া মেগা প্রকল্প, পর্যালোচনা হচ্ছে

চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে নেয়া মেগা প্রকল্পের বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। যেসব প্রকল্প রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নেয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়ন করবে না অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এমনকি এসব প্রকল্প যাতে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সরকারও  বাস্তবায়ন  না করে সে সম্পর্কিত সুপারিশ রেখে যেতে পারে সরকার। প্রয়োজন ও সুবিধা বিবেচনায় জাপানি অর্থায়নে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একনেক। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলে আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া বে-টার্মিনাল প্রকল্পটি নিয়ে এখন পর্যালোচনা চলছে। দায়িত্ব নেয়ার পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করে এসেছেন।

এর মধ্যে বে-টার্মিনাল এলাকাও তিনি পরিদর্শন করেন। মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এক্ষেত্রে কম ব্যয় এবং সরকারি বেসরকারি বে-টার্মিনালগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে পরবর্তী চিন্তা করা হবে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বে-টার্মিনাল প্রয়োজন হলেও যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা অনেকটা বিলাসী। গভীর সমুদ্র বন্দর বাস্তবায়ন হলে এই বিশাল এবং বিলাসী প্রকল্পের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর তলদেশ দিয়ে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু টানেলের উদাহরণ দিয়ে অনেকে বলছেন, এটি একটি বিলাসী প্রকল্প। এই প্রকল্পে এখন প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে হওয়ার কথা। প্রকল্প এলাকায় চারটি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনের বিষয়টি যাচাই না করে একসঙ্গে চারটি টার্মিনালের কাজ হাতে নেয়াও যৌক্তিক নয়। সূত্রের দাবি, বিগত সরকারের সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা ও পরামর্শক এই প্রকল্প বাস্তবায়নে উৎসাহী ছিলেন। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সরকারি এবং বেসরকারি জেটিগুলোর প্রায় অর্ধেক অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সেগুলো ব্যবহার না করে বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে বে-টার্মিনাল নির্মাণের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বর্তমানে যে জেটিগুলো কার্যকর ও নির্মাণাধীন আছে সেগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক এ সংকটের সময় বড় প্রকল্প হাতে নেয়ার প্রয়োজন হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন জেটি সংখ্যা ১৭টি, যার মধ্যে ১১টি কনটেইনার জেটি, বাকি ছয়টি বাল্ক কার্গো জেটি। এ ছাড়াও সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত জেটির মধ্যে চালু আছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, ডলফিন ওয়েল জেটি, গ্রেইন সাইলো জেটি, সিমেন্ট ক্লিংকার জেটি, টিএসপি জেটি ও সিইউএফএল জেটি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী ড্রাইডকের দুটি জেটিও চালু আছে।  এই প্রকল্পের জন্য বড় ঝুঁকি হলো বিশাল জায়গা জুড়ে দ্রুত পলি পড়ার কারণে যতই ড্রেজিং করা হোক না কেন, দীর্ঘ  মেয়াদে নাব্যতা সংকট দূর করা প্রায় অসম্ভব। এই প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে বিভিন্ন সমীক্ষায় এসব তথ্য আসলেও উৎসাহী কর্মকর্তারা তা আমলে নেননি।

সম্প্রতি মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। এতে জাপান বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। বিদায়ী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় কম গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প নেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরই সেগুলো কাটছাঁটের তালিকা তৈরি শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা রাজনৈতিক প্রকল্প বাদ দেয়া হচ্ছে। কমানো হচ্ছে অন্যান্য প্রকল্পের পরিধি। পরিস্থিতি ও বিবেচনায় বে-টার্মিনাল নির্মাণ নিয়েও গভীর পর্যালোচনা হচ্ছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটির পরিচালক (ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) মো. আলী আজম আল আজাদ এ বিষয়ে বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের প্রকল্পে সরকারকে কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না। তবে যে কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে দেশের এবং স্থানীয় অংশীজনের স্বার্থ দেখা হয়ে থাকে। বে-টার্মিনাল নির্মাণ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে নির্দেশনা দেবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক  বলেন, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা পরিদর্শন করে গেছেন। এই প্রকল্পের অর্থায়ন কারা করবে তাও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সরকার  যে সিদ্ধান্ত নেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাই বাস্তবায়ন করবে।

Friday, January 4, 2019

চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা ৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে

বর্তমানে সাত নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা। যেখানে নোঙর করা জাহাজ থেকে রাজস্ব আদায় করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে জাহাজ নোঙর করা হলেও রাজস্ব পাচ্ছে না অর্থনীতির চাকা খ্যাত দেশের প্রধান এই সমুদ্র বন্দরটি।
ফলে রাজস্ব আয় বাড়াতে এবং ক্রমবর্ধমান পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের চাপ সামলানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাত নটিক্যাল মাইল থেকে ৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত জলসীমা বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক।
ওমর ফারুক জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান জলসীমা সাত নটিক্যাল মাইল। ২০১১ সালে আলফা, ব্রেভো এবং চার্লি নামে তিনটি অ্যাংকারেজে বিভক্ত করে বন্দরের এই সীমানা বাড়ানো হয়। প্রায় ৪০০ বছর আগে ৫ নটিক্যাল মাইল জলসীমা নিয়ে বন্দরটির যাত্রা শুরু হয়।
কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদা, মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বৃদ্ধির কারনে এই সমুদ্র বন্দরের জলসীমা আবারও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওমর ফারুক জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের জলসীমা সাত নটিক্যাল মাইল থেকে বাড়িয়ে ৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত করার একটি প্রস্তাব গত অক্টোবর মাসের শেষের দিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর গেজেট হবে। আর এটি অনুমোদন পেলে বন্দরের জলসীমা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকূলের উত্তরে কাট্টলী থেকে সীতাকুন্ড এবং দক্ষিণে আনোয়ারার গহিরা থেকে মহেশখালীর সোনাদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাতে চট্টগ্রাম বন্দরের দৈনিক রাজস্ব আয় অন্ত:ত এক কোটি টাকা বাড়বে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের জন্য বর্তমানে বছরে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি জাহাজ আসে। এরমধ্যে বন্দরের প্রধান ১৬টি জেটিতে ভিড়তে পারে সীমিত সংখ্যক জাহাজ। অনেক জাহাজকে নোঙর করতে হয় বর্হিনোঙরে।
কারণ নাব্যতা সংকটের কারণে সাড়ে নয় মিটার গভীরতা ও ১৯০ মিটার দীর্ঘ জাহাজই কেবল চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ঢোকার অনুমতি পায়। এর বড় জাহাজগুলো কুতুবদিয়া কিংবা বর্হিনোঙরে এসে অপেক্ষায় থাকতে হয়। এরচেয়ে বড় জাহাজ কুতুবদিয়ায় আসার পর লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে কিছু পণ্য খালাস করে সেটিকে হালকা করে তারপর বন্দর সীমানায় আসার অনুমতি মেলে।
এ অবস্থায় বন্দর সীমানার বাইরে কুতুবদিয়া হয়ে মহেশখালী পর্যন্ত সাগরে শত শত জাহাজের অবস্থান করলেও তাদের কোন মাশুল দিতে হয় না। কিন্তু পুরো এলাকা বন্দরের সীমানায় এলে বছরে তিনশ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সীমানায় অবস্থানকারী জাহাজগুলোকে প্রতি জিআরটি (গ্রস টন) হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে দশমিক ২৪ ডলার হারে মাশুল পরিশোধ করতে হয়। প্রতিটি জাহাজকে ৮০০ থেকে ১ হাজার জিআরটি পরিমাপ ধরা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আবু জাফর বলেন, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি ঘিরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে প্রচুর জাহাজ আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে। আর এমনিতে পণ্যবাহী জাহাজ আসার পরিমাণ তো বাড়ছেই। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা বাড়ানোর বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে। এ কারনে বন্দরের জলসীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

Monday, October 19, 2009

বন্দরের বাধা

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কাজকর্ম বাধাগ্রস্ত হলে তা অর্থনীতির জন্যও বিশাল ধাক্কা। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে এবং বন্দর নিয়ে রাজনীতিও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। নানা শ্রমিক সংগঠন ও তাদের নানা রকম আন্দোলনে প্রায়ই চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
সমুদ্রবন্দর নাকি কখনো ঘুমায় না। কিন্তু আমাদের সমুদ্রবন্দরগুলো ‘ঘুমায়’ না বলে ‘ঘুমিয়ে রাখা হয়’ বলাটাই যুক্তিসংগত। বন্দরকে অবলম্বন করে স্বার্থ আদায় ও বন্দর-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নীতিহীন কার্যকলাপ অবাধে চলে।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বন্দরের কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানাই।
নয়ন, পান্থপথ, ঢাকা।

Saturday, October 17, 2009

চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক সংগঠন -শ্রমিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণহীন চলতে পারে না

সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের অভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে অপ্রয়োজনীয় শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করা তিনটি শ্রমিক সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর আবারও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ বন্দরে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৫টি। নতুন তিনটি সংগঠনের মধ্যে একটি আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ এম আবদুল লতিফ এবং অপরটি চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থনপুষ্ট। এতগুলো শ্রমিক সংগঠনের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সংগঠন থেকে বিক্ষিপ্তভাবে নানামুখী দাবিদাওয়া উত্থাপিত হয়েছে, যার ফলে শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার চেয়ে বিশৃঙ্খলাই হয়েছে বেশি; বাধাগ্রস্ত হয়েছে বন্দরের কর্মকাণ্ড।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা দুটিতে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল, বিশৃঙ্খলা কমিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গত বছরের ৪ মে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার অনুমোদন না দেওয়ায় অধ্যাদেশটি আর কার্যকর নেই। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। এ বন্দরে কর্মরত প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর স্বার্থে শ্রমিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা স্বীকার করি। তবে তা কোনোভাবেই লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে না।
শ্রমিক সংগঠনের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা বা কল্যাণসাধন। অতীতে সব সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের স্বার্থে তল্পিবাহক নতুন নতুন শ্রমিক সংগঠন তৈরি করেছেন। ফলে ফিবছর শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়েই চলে, যেগুলো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখেনি।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বন্দর। জলপথে দেশের বেশির ভাগ আমদানি-রপ্তানির পণ্য ওঠানো-নামানো হয় এ বন্দরে। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কোনো মহল যেন বন্দরকে জিম্মি করে কোনো সংকীর্ণ মতলব হাসিল করতে না পারে, সেটা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরকে গতিশীল করতে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা কমিয়ে আনতে ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। আমরা সুস্থ একটি ট্রেড ইউনিয়ন দেখতে চাই, যেটি সর্বতোভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়েই কাজ করবে।

Wednesday, August 5, 2009

অশান্ত বন্দর প্রশান্ত মেয়র -নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার দৃষ্টান্ত

ঘন ঘন কর্মবিরতি, মানববন্ধন, ধর্মঘট বা এর হুমকি এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নামে দাবিদাওয়া আদায়ে নানা তৎপরতায় চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠছে। গত এক মাসে তুচ্ছ ঘটনায় ছয় দফায় অন্তত তিন দিনের বেশি সময় বন্দরের কাজকর্ম ব্যাহত হয়। দেশের প্রধান যে সমুদ্রবন্দর দিয়ে ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে, সেখানে এ রকম বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা কেন ও কীভাবে চলছে, তা নিয়ে সংগতভাবেই প্রশ্ন তোলা যায়।
বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, তাঁরা ‘চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে’ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম ডক-বন্দর শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের আহ্বায়কের এ বক্তব্য সম্পর্কে মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্পষ্ট বক্তব্য থাকা উচিৎ। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে আন্দোলনের ‘নির্দেশ’ দিয়েছেন কি না? এমন কোনো আন্দোলন, যা বন্দরের কাজকর্ম স্থবির করে দিতে পারে, সে রকম নির্দেশনা তাঁর আছে কি না? সোজা বাংলায় জনগণকে জানতে দেওয়া উচিৎ, তাঁর উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’। যদি তিনি না বলে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম ভাঙিয়ে যে অপতৎপরতা চলছে, সেটা বন্ধ করতে কার্যকর উদ্যোগ তাঁকেই নিতে হবে। আর যদি তিনি সত্যি অমন কথা বলে থাকেন, তাহলে সরকারকে ভেবে দেখতে হবে, এভাবে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে তারা রাজি আছে কি না। কারণ, আলোচ্য শ্রমিক সংগঠনটি ও মেয়র উভয়েই সরকারদলীয়।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বন্দরের ৩২টি সংগঠনের স্থলে মাত্র দুটি কার্যকর রাখা হয়। এতে বন্দরের কাজ সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকে। বন্দরের জাহাজ অবস্থানের গড় সময় (টার্ন রাউন্ড টাইম) ১৩-১৪ দিন থেকে মাত্র দু-আড়াই দিনে নেমে আসে। দেশ-বিদেশে বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। কিন্তু নির্বাচিত সরকার আসার পর থেকেই আবার বিভিন্ন নামে পুরোনো সংগঠনগুলো তৎপরতা শুরু করে। তারা ১৫ হাজার ডক-শ্রমিকের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করছে। অন্যদিকে শ্রমিক নিয়োগকারী সংস্থা বার্থ অপারেটরদের প্রতিনিধি বলছেন, যে শ্রমিকেরা তাদের সব ধরনের দেনা-পাওনা বুঝে নিয়ে স্বেচ্ছায় চলে গেছে, তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি অযৌক্তিক। সুতরাং এ ধরনের দাবির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত উপায় হলো পারস্পরিক সমঝোতার পরিবেশে আলোচনা এবং আলোচনা। এর বাইরে ধর্মঘটের উদ্যোগ শুধুই বন্দরের ক্ষতি করবে; কাজের কাজ কিছুই হবে না।
বিশ্বের কোনো দেশেই সমুদ্রবন্দর মুহূর্তের জন্য বন্ধ থাকে না বা বন্ধ রাখতে দেওয়া হয় না। চট্টগ্রাম বন্দরে বাধা সৃষ্টি হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রাণপ্রবাহ বন্ধের আশঙ্কা থাকে। কোনোক্রমেই এ ধরনের আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম বন্দর অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর সম্পৃক্তির অভিযোগ দুর্ভাগ্যজনক। বন্দরের কার্যক্রম গতিশীল ও নির্বিঘ্ন রাখা মেয়র মহোদয়ের দায়িত্বের মধ্যেই গণ্য হওয়া উচিৎ। অথচ বন্দরের শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে প্রথম আলোর সাংবাদিকের কাছে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। অশান্ত বন্দরের ব্যাপারে মেয়রের প্রশান্তি তথা উত্থাপিত অভিযোগের ব্যাপারে নির্লিপ্ততা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বন্দরসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার সমাধান একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে; কোনো অজুহাতেই বন্দরের কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। এ প্রশ্নে কোনো আপস চলে না।