Saturday, April 16, 2011

সহজ জয় চায় অস্ট্রেলিয়া

ছোট দলগুলোকে বাদ দিয়ে পরবর্তী বিশ্বকাপ আয়োজনের আইসিসির সিদ্ধান্তকে বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই সমর্থন দিয়ে এসেছেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক রিকি পন্টিং। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের মহাকাব্যিক জয়, হল্যান্ডের বিপক্ষেও ইংল্যান্ডের ঘাম ঝরানো—এগুলোর কোনোটাই খুব বেশি দাগ কাটতে পারেনি পন্টিংয়ের মনে। তিনি খুব সোজাসুজিই বলেছেন, ‘ছোট দলগুলো যেভাবে একতরফাভাবে হেরে যাচ্ছে তাতে তারা এই বিশ্বকাপ থেকে কতটুকু শিখছে, সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের পরিসরটা যদি ছোট করে আনা হয়, তাহলেই সম্ভবত ভালো হবে।’
আজ নিজের কথার যথার্থতা প্রমাণের জন্য হলেও কানাডার বিপক্ষে একেবারেই সহজ জয় চান রিকি পন্টিং। কোনো ধরনের অঘটন, বিস্ময়ের সম্ভাবনা তিনি একেবারেই মনে আনছেন না। গতকাল তিনি খুব নিষ্ঠুরভাবেই বলেছেন, ‘আমি কোনো অঘটনের আশঙ্কা দেখছি না। আমরা খুবই অভিজ্ঞ ও দক্ষ একটা দল। আমরা কানাডার বিপক্ষে খুব অনায়াসেই জয় পাব।’
গ্রুপ পর্বের চারটা ম্যাচ পরেই কোয়ার্টার ফাইনালটা নিশ্চিতই করে ফেলেছে টানা তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা। তার পরও আজ কানাডার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে অসি ক্রিকেটারদের অনুশীলনটা ছিল চোখে পড়ার মতো। টানা তিনটা ঘণ্টা গনগনে সূর্যের নিচে আক্ষরিক অর্থেই ঘাম ঝরিয়েছেন পন্টিং-ক্লার্করা। পন্টিং ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘আমরা প্রতিটা ম্যাচের জন্যই সমানভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করি। কানাডার বিপক্ষেও আমরা অন্য সব ম্যাচের মতোই মাঠে নামব। আমরা প্রতিটা ম্যাচই সহজভাবে জিততে চাই।
কানাডা কি এখন রিকি পন্টিংয়ের এ নির্দয় মন্তব্যগুলোর পাল্টা কোনো জবাব দিতে পারবে? কানাডার অধিনায়ক আশিস বাগাই অবশ্য শুধু পন্টিংকে কোনো জবাব দেওয়ার কথাই ভাবছেন না। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শুধু পন্টিংয়ের কাছেই আমাদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে চাই না। এটা আমাদের নিজেদের জন্যও দরকার। আর চেষ্টা করব এমন কিছু করার, যেন আইসিসি তাদের সিদ্ধান্তটা নিয়ে আবার ভাবতে বাধ্য হয়।’ আশিষ বাগাই নিশ্চিতভাবেই তাঁর পেছনে অনেক সমর্থন পাবেন। এখন মাঠে এটা তারা কতখানি প্রমাণ করতে পারবেন, সেটাই দেখার বিষয়।

সেদিনের বন্ধুদের ভুলতে পারি না by সৈয়দ আবুল মকসুদ

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অন্য দেশের যাঁরা নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন অথবা অন্যভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের ঋণ আমরা কোনো দিন পরিশোধ করতে পারব না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বহির্বিশ্বের যাঁরা বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের ঋণও পরিশোধযোগ্য নয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে সিদ্ধান্ত নেয়, তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিশিষ্ট ও খ্যাতিমান, তাঁদের সম্মাননা দেবে। কাজটি বহু আগেই আমাদের করা উচিত ছিল।
পনেরো-বিশ বছর আগে আলহাজ মকবুল হোসেনের দৈনিক আল-আমীন-এর সঙ্গে কিছু সময় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যুক্ত ছিলেন। তখন অনুরুদ্ধ হয়ে আমি সেখানে দু-একটি লেখা লিখেছিলাম। বিশেষভাবে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ও কাজী জাফর আহমদের স্নেহভাজন আশরাফ গিরানীর তাগিদে। একটি প্রবন্ধে আমি দুটি বিষয়ে বলেছিলাম। এক. মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লিখতে হলে শুধু আমাদের নিজেদের বক্তব্যের প্রাধান্য দিলে হবে না, ভারতীয় ও পাকিস্তানি লেখক-রাজনীতিকদের ভাষ্যও বিচার-বিবেচনা ও পরীক্ষা করে তা ব্যবহার করতে হবে। দুই. বাংলাদেশের বাইরে যাঁরা, বিশেষ করে ভারতীয়, পাকিস্তানি, নেপালি, সোভিয়েত, ব্রিটিশ ও মার্কিনিদের যাঁরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁদের একটা স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের কর্তব্য। কিন্তু আমার মতো নগণ্য মানুষের কথা সরকারি কর্মকর্তারা শুনবেন না, তাও জানতাম।
আদৌ না হওয়ার চেয়ে ৪০ বছর পরে হলেও আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু ও হিতার্থীদের যে স্বীকৃতি ও সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা খুবই খুশির কথা। গত ১৩ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে সম্মাননা প্রাপকদের তালিকা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় ৪০০ বিদেশিকে সম্মাননা জানাবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁরা জীবিত তাঁদের সবাইকেই ঢাকায় নিয়ে আসা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মরণোত্তর সম্মাননা জানানো হবে। রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী এসব বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৫০ গ্রাম ওজনের একটি করে স্বর্ণপদক দেবেন। তাঁদের সম্মানসূচক বাংলাদেশের নাগরিকত্বও দেওয়া হবে।
তালিকায় ভারতের ২২৬ জন এবং পাকিস্তানের ৪০ জন রয়েছেন। বাকিরা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো হচ্ছে সুইস রেডক্রস, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন, সংবাদমাধ্যম বিবিসি, আকাশবাণী, জেনেভাভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস, আইসিআরসি, অক্সফাম জিবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন।
ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা সম্মাননা পাচ্ছেন, তাঁদের সবার নামের তালিকা দেখার সুযোগ হয়নি। দেখলেও তাঁদের সবাইকে চিনব না। তালিকাটি তৈরি করেছে পররাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কোনো বিশেষ অবদানের জন্য কাউকে মনোনয়ন বা নির্বাচন করা কঠিন কাজ। কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠায় আস্থা রেখেই বলছি, আমাদের দেশে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রাধান্য পাওয়া স্বাভাবিক। তালিকাটি যদি বিখ্যাত ২০-২৫ জনের হতো, তা হলে কথা ছিল না। দীর্ঘ বলেই কথাটা বলছি। উপযুক্ত কেউ যদি বাদ পড়েন, তা হবে বেদনাদায়ক।
আমরা কোনো ব্যাপারেই গভীর অনুসন্ধানের চেষ্টা করি না। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্মোহভাবে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছার অভ্যাস আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। কোনো ব্যাপারে যিনি মনোনীত বা নির্বাচিত হবেন, তাঁর অবদান খতিয়ে দেখা উচিত। তাঁর চেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তিনি বাদ পড়লেন কি না, তা মাথায় রাখা দরকার। যদি কোনো কারণে—ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েন, তা হবে বড় অবিচার। অর্থাৎ একজনকে সম্মান দিতে গিয়ে আরেকজনকে অসম্মান করা।
বাংলাদেশের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ সমর্থন দিয়েছেন। তাঁরা তা না দিলে আমরা অত তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা পেতাম না, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতিও পেতাম না। তাঁদের সবার নাম-পরিচয়-ঠিকানা আমাদের পক্ষে কোনো দিনই জানা সম্ভব হবে না। বিশিষ্ট ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কেই শুধু জানা যাবে।
গোটা আরব বিশ্বই ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। বাংলাদেশের মুসলমানরা যে হাজারে হাজারে মরছে, তা তাদের মধ্যে কোনো করুণার সৃষ্টি করেনি। সেদিন ব্যতিক্রম ছিল ইরাক। ইরাকের বাথ আরব সোস্যালিস্ট পার্টির নেতারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ১৯৭২-৭৩-এ দেখেছি, বঙ্গবন্ধু ইরাকি নেতাদের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ ছিলেন। তখন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ছিলেন না, কিন্তু সাদ্দাম হোসেনও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছেন।
দূরদেশের আরও কত যে মানুষ—কত দূরের সিন্ধুপারের কত বিদেশিনী আমাদের পাশে সেদিন দাঁড়িয়েছেন, তার খবর আমরা জানি না। রবীন্দ্রপ্রেয়সী ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো বাংলাদেশের জন্য শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁরই চাপে হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো মহান লেখকও এগিয়ে আসেন। তাঁরা আরও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুই মারিয়া দ্য পাবলো পার্দোর সঙ্গে দেখা করে স্মারকপত্র দেন। ভারতে চলে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য ত্রাণকাজে অংশ নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা কোনো আঞ্চলিক ব্যাপার নয়, ‘মানব জাতির ট্র্যাজেডি’ বলে তাঁরা মন্তব্য করেছিলেন। ওকাম্পো-বোর্হেসের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে ছিলেন এল সালভাদোর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফাদার ইসমায়েল কুইলেস। তাঁদের কারণে লাতিন আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি হয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ওপর গবেষণা করার সময় প্যারিসে তাঁর কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে পেয়েছিলাম আরও কিছু ফরাসি বুদ্ধিজীবীর সংবাদ, যাঁরা ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। সেদিন সামগ্রিকভাবে ফরাসি দেশ ছিল পাকিস্তান সরকারের পক্ষে, ব্যক্তিগতভাবে অনেক ফরাসি সমর্থন দিয়েছেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের। ওয়ালীউল্লাহ্র ভাষায়, ‘দ্য গল আর নেই; অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কিছু বলবে এমন লোক আর নেই। বরঞ্চ মার্কিনিদের দলে যোগ দিয়ে চুপিচুপি জাহাজভর্তি সামরিক মালরসদ পাঠাচ্ছে এহাইয়া খানের সাহায্যার্থে।’
সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন না। বরং ছিলেন কট্টর বিরোধী। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি মিসেস গান্ধীকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন ও এর উদ্যোগে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব বাংলাদেশ’। ভারতসহ ২৩টি দেশের প্রতিনিধিরা তাতে অংশ নেন। ফরাসি দেশ থেকে জাঁ-পল সার্ত্রে এবং সিমোন দ্য বুভোয়ারকে আনানোর ব্যাপারে ওয়ালীউল্লাহ্র সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওই কনফারেন্সের ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে জয়প্রকাশ নারায়ণের পক্ষে চিঠিতে ও ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন দিল্লি থেকে জর্জ ফার্নান্দেজ, রাধাকৃষ্ণ, এ সি সেন ও এম ভি রাও। রাও ছিলেন কো-অর্ডিনেটিং সেক্রেটারি।
জর্জ পাম্পিডুর সরকার বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেনি। কিন্তু অনেক ফরাসি বুদ্ধিজীবী এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে যাঁর কাছে আমাদের ঋণ সীমাহীন, তিনি হলেন আদ্রেঁ মালরো। তিনি ছিলেন একজন প্রধান ফরাসি লেখক এবং দ্য গল সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী। চীনা ও স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। একাত্তরে তিনি বৃদ্ধ। সেপ্টেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন-এ এক দীর্ঘ প্রতিবেদন বের হয় যে মালরো বাংলাদেশে যেতে চান এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে কাজ করতে চান ‘Under Bengali orders’। ‘বেঙ্গলি সিচুয়েশনস’ তিনি অব্যাহত নজরদারি করছিলেন। অন্য ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পিয়ের এসানুয়েল, লা আরে পিয়ের, প্রফেসর জি ফিলিরেয়ার, লঅ মঁদ-এর সম্পাদক প্রমুখ বাঙালির পক্ষে ছিলেন।
বাইরের মানুষের কথা যতই আমরা বলি, আসল সাহায্য পেয়েছি ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের মানুষের কাছ থেকে। বাংলাদেশের গণহত্যার জের তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি ও প্রত্যক্ষভাবে স্পর্শ করেছিল। প্রবাসী সরকারকে কাজ করতে হয়েছে কলকাতা থেকে। আমাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী প্রমুখ অধিকাংশই ছিলেন কলকাতায়। তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে দলমত-নির্বিশেষে সেখানকার মানুষ।
আমার বন্ধুদের কেউ কেউ কলকাতায় গিয়ে কাগজ বের করেছিলেন। তাঁদের বিজ্ঞাপন দিয়ে সাহায্য করেছেন কলকাতার ব্যবসায়ীরা। আর্থিক সাহায্যও করেছেন। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত হয় যে ‘জয় বাংলা’ নামে আওয়ামী লীগের এক সাপ্তাহিক মুখপত্র মুজিবনগর থেকে আত্মপ্রকাশ করছে। এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি আহমদ রফিক। জয় বাংলার জন্য মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত প্রতিবেদন, লেখা প্রভৃতি আহ্বান করা হয়েছে। যোগাযোগের ঠিকানা: ৯ সার্কাস এভিনিউ, কলকাতা।
অগ্রজপ্রতিম কবি, প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক আমার অতি ঘনিষ্ঠজন। তাঁর সঙ্গে ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র নাগরিক-এ আমি কাজ করেছি। তিনিই জয় বাংলার সম্পাদক, সাংঘাতিক খুশি হলাম। ভাবলাম, নিয়মিত লেখা যাবে, নামে না হলেও বেনামে। দ্রুত যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু কয়েক দিন পরে শাহাদৎ চৌধুরী, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুদের গ্রুপের একজন বললেন, টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের নেতা এম এন এ আবদুল মান্নান জয় বাংলার প্রকাশক-সম্পাদক, আহমদ রফিক তাঁর ছদ্মনাম। তা সত্ত্বেও জয় বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং লেখা পাঠাই।
মান্নান সাহেব ছিলেন চমৎকার মানুষ। বাহাত্তরেও জয় বাংলার সঙ্গে যুক্ত থাকি। পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, তিনি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কিন্তু সরকারের তীব্র সমালোচনা করে লিখলেও কিছু বলতেন না। ষোলোই ডিসেম্বরের পরপর জয় বাংলার একটি বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছিল। ওই সংখ্যার পরিচালনা সম্পাদক ছিলেন মো. জিল্লুর রহমান (বর্তমানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি), সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, এবনে গোলাম সামাদ প্রমুখ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। শুনেছিলাম, ওই সংখ্যা প্রকাশে আর্থিক অনুদান দিয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকা।
যে প্রসঙ্গে কথাটি বললাম তা হলো, একাত্তরে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডসহ কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনও দিয়েছে। তাদের কথা ভুললে আমাদের পক্ষে তা হবে দীনতার পরিচয়। ১৬ ডিসেম্বরের পর পূর্বাণী হোটেলে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে যে মিডিয়া সেন্টার খোলা হয়, তাতে যুক্ত থেকে দেখেছি, শুধু কলকাতার নয়, অন্যান্য প্রদেশের বহু সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের যাঁরা অসামান্য অবদান রাখেন, আমি তাঁদের একটি তালিকা তৈরির চেষ্টা করেছিলাম নব্বইয়ের দশকে। উৎসাহ শুধু নয়, সঙ্গী পেয়েছিলাম যাঁকে, তিনি মহিউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের কূটনীতিক, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেন। যোগ দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি ভোরে বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান, সেখানে যাঁরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান, মহিউদ্দিন ভাই তাঁদের একজন। প্রথম বিএনপি সরকার তাঁকে জোর করে অকাল অবসরে পাঠায়। তিনি আমার সোদরপ্রতিম। বাধ্যতামূলক অবসরে থাকায় তাঁর কাজকর্ম ছিল না, তাই জুটি বাঁধি তাঁর সঙ্গে।
একাত্তর পুনরাবিষ্কারে আমরা পশ্চিমবঙ্গে অভিযানে বের হই। যাত্রা বিমানে নয়, সড়কপথে। দুজনের কাঁধে দুই ব্যাগ। আমাদের কোনো গন্তব্য ছিল না, ছিল শুধু যাত্রা। যেখানে রাত সেখানেই কাত। সে এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার। সীমান্তের ওপারে বিখ্যাত যশোর রোডে বড় বড় রেইনট্রির ছায়ায় হাঁটতে গিয়ে আমাদের চোখে ভেসে উঠেছিল একাত্তরের শরণার্থীদের স্রোতের দৃশ্য। কলকাতায় আমাদের দুজনের সঙ্গে যোগ দেন আমার আরেক আপনজন—বেলাল মোহাম্মদ, তাঁর পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তখন কলকাতা উপ-হাইকমিশনে প্রেস কাউন্সিলর ছিলেন আমাদের অনুজপ্রতিম মোহাম্মদ আবু তৈয়ব। একাত্তর পুনরাবিষ্কার ও সেদিনের বন্ধুদের খুঁজে বের করতে তাঁর আন্তরিক সহায়তা পেয়েছি।
কাজের কাজ কিছু হোক বা না হোক, আমরা তিনজন কতবার কত সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা একসঙ্গে কাটিয়েছি। গড়ের মাঠ থেকে গঙ্গার তীরে বেলুড় মঠ। রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বোলপুর শান্তিনিকেতন। শুরুলে শ্রীনিকেতন। খোয়াই বা ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে পূর্ণিমা রাতের স্নিগ্ধ সন্ধ্যা। গিয়েছি কত জায়গায়। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অফিস কক্ষটি আমরা রক্ষা করতে পারিনি। ওটা শ্রী অরবিন্দের পৈতৃক বাড়ি।
সময়ের পলিতে চাপা পড়ে গেছে সেদিনের বহু ব্যক্তির বড় অবদানের কথাও। ১৫ বছর ধরে আমি খুঁজেছি তাঁদের। একাত্তরে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র ছিলেন শ্যামসুন্দর গুপ্ত। বাংলাদেশের পক্ষে অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। উদ্বাস্তুদের জন্য তিনি খুলেছিলেন মেয়রের ত্রাণ তহবিল—‘মেয়রস রিলিফ ফান্ড’। ডেপুটি মেয়র পান্নালাল দাসও ছিলেন তাঁর সঙ্গে। শরণার্থীদের জন্য একটি স্বাস্থ্য ও সেবাকেন্দ্র খোলা হয়। ‘বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া হোক’—এই দাবি নিয়ে মেয়রের নেতৃত্বে অলডারম্যান ও কাউন্সিলররা রাজভবনে শোভাযাত্রা করে যান। সেই ছবি আমার কাছে আছে। ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে’ শীর্ষক পৌরসভা থেকে একটি সাময়িকীও বের করা হয়েছিল। তাঁর নামটি কি সম্মাননা প্রাপকদের তালিকায় আছে?
সাহিত্য-সংস্কৃতি মাসিক চিত্রাঙ্গদার সম্পাদক অজিত মোহন গুপ্ত একেবারে শুরু থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। চিত্রাঙ্গদার ১০০ পৃষ্ঠার বাংলাদেশ সংখ্যাটি একটি অসামান্য দলিল। অজিত গুপ্ত তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন।
সেপ্টেম্বরে জয় বাংলা নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেন উমাপ্রসাদ মৈত্র, প্রযোজনা করেন ধীরেন দাশগুপ্ত। কাহিনি ও চিত্রনাট্য মিহির সেন। তাঁর একটি প্রিন্ট যদি আমাদের কাছে না থাকে, তা হবে বেদনাদায়ক। পশ্চিমবঙ্গে জনমত গঠনে এই ছবি বড় ভূমিকা রেখেছিল। সম্মাননা কি তাঁদের প্রাপ্য নয়?
বাঙালি কবি-লেখকদের আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি। কলকাতার খ্যাতিমান উর্দু কবি ও দৈনিক আফসার-এর সম্পাদক সালিক লাক্ষেৗভি দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর ‘জাগ্ ওঠা বাংলাদেশ’ (জেগে উঠেছে বাংলাদেশ) আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রথম স্তবকটি এ রকম:
জাগ্ ওঠা বাংলাদেশ
জুলুমকে হাত সে সাজ হায় রাইফেল,
আজ মজলুম সিনে সিপার বান গ্যায়ে,
হার সোহাগান কি আঁখো সে সোলে রাওয়া।

জেগে উঠেছে বাংলাদেশ,
অত্যাচারীর হাতে আজ আছে রাইফেল,
আজ মজলুমের বক্ষ হয়ে গেছে ঢাল,
নব-পরিণীতারা আজ হাসে না—
তাদের চোখে আগুনের শিখা।
সালিক লাক্ষেৗভি সম্মাননা পাবেন কি না, জানি না। একাত্তরে জনমত গঠনে নজরুলের জ্যেষ্ঠপুত্র কাজী সব্যসাচী অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর সম্মোহনী আবৃত্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বের করা মিছিলে কলকাতার রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠত। স্বীকৃতি তাঁরও প্রাপ্য।
সীমাহীন রক্তপাতের ভেতর দিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে অন্য দেশের যাঁরা সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থন দেন, তাঁদের কাছে জাতি চিরকৃতজ্ঞ। উপকারীর উপকার স্বীকার করার নামই কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ থাকা ভালো। এই যে এত দিন পর দুঃসময়ের বন্ধুদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আমাদের কৃতজ্ঞতার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ ঘটল। তবে কোনো কারণে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁরাও যেন পরে কখনো সম্মাননা পান—সেই আবেদন করি।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

চট্টগ্রামগামী ট্রেনে বসে লেখা by আনিসুল হক

চট্টগ্রাম যাচ্ছি। ট্রেনের নাম তূর্ণা নিশীথা। রাত ১১টার ট্রেন ছেড়েছে ১২টায়। তবুও যে ছেড়েছে। এখন সকাল সাতটা। পুবের দিকে দরজাটা খুলতেই ভোরের আলো। আজ ১৪ মার্চ। নতুন দিনের শুরু। আজকের সূর্য বাংলাদেশকে নতুন আলোয় রাঙিয়ে দেবে, এই আশায় আমরা চলেছি চট্টগ্রামে, জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উদ্দেশে। আজ যেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জয় হয়!

২.
আমাদের যোগাযোগব্যবস্থায় রেলকে ১ নম্বর গুরুত্ব দেওয়া হোক। রেল আর নৌপথকে। নইলে আমরা চলতে পারব না। আমাদের ছোট দেশে মানুষ বেশি। যত রাস্তাই বানানো হোক না কেন, যানজট লেগে থাকবেই। তাতে খরচ বেশি, পরিবেশদূষণ বেশি, শ্রমঘণ্টার অপচয়। এই তো ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে ঈশ্বরদী যাব বলে ভোর পাঁচটায় উঠেছি ঘুম থেকে। ছয়টায় বেরিয়েছি বাসা থেকে। কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছেছি সাড়ে ছয়টায়। ট্রেন ছাড়ার কথা সাতটায়। সেই ট্রেন ছাড়ল ১১টায়। রেল যেন সতিনের ছেলে। কর্তৃপক্ষ বিমাতা। বাংলাদেশে রেল ভালো চলুক, এটা নাকি চান না বাস-ট্রাকের মালিকেরা। আর যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান থেকে বাস-ট্রাক আমদানি করা হয়, তাদেরও নাকি যোগসাজশ থাকে। কথাটা কি ঠিক?

৩.
আহমদ ছফা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যখন জেতে, তখন আওয়ামী লীগ একা জেতে। আর যখন হারে, তখন পরাজিত হয় সমস্ত বাংলাদেশ। আর হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যার প্রতিদ্বন্দ্বী, তাকে জেতার জন্য কিছুই করতে হয় না। বর্তমান সরকারের ক্রিয়াকর্ম দেখে তা-ই কি মনে হচ্ছে না?
নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে জিতিয়েছে গত নির্বাচনে। কারণ, তারা দেখেছে, এই দল আধুনিকতার কথা বলে, অসাম্প্রদায়িকতার পথে চলতে চায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চায় এবং গড়তে চায় ডিজিটাল বাংলাদেশ। মানুষ দলে দলে গেছে ভোটকেন্দ্রে, ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগকে। কিন্তু বিজয়ের পর এই বিজয় আর জনগণের থাকেনি, হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের একার বিজয়। সবকিছু আওয়ামী লীগ একা করছে। আওয়ামী লীগ একা করছে, নাকি সবই হচ্ছে ক্ষমতার একটা মাত্র কেন্দ্র থেকে। শেখ হাসিনা কি নিঃসঙ্গ নন? ক্ষমতা মানুষকে নিঃসঙ্গ করে। এটা এর আগে মনোবিজ্ঞানী-সমাজবিজ্ঞানীর লেখা থেকে উদ্ধৃত করে পাঠকদের জানিয়েছিলাম।

৪.
ওয়েটিং রুমে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম সেদিন। একজন প্রবীণ লোক আমার পাশের আসনে বসলেন। তারপর আমার মুখটা নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘ছোট ভাই, আপনি না লেখক। পেপারে লেখেন?’
‘জি।’
‘আপনি কি নেত্রীকে একটা কথা বলতে পারবেন? আমি ১৯৭৫ সালের পর প্রতিবছর ১৫ আগস্টে মিলাদের আয়োজন করি নিজের গ্রামে। একবার তো তখনকার সরকারের লোকজন আমার খিচুড়ির হাঁড়িপাতিল সব উল্টায়া দিছিল। কত জুলুম-অত্যাচার সহ্য করছি। বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙাতে পারি নাই বলে বঙ্গবন্ধুর ছবিওয়ালা টাকা রাখছিলাম। নেত্রীকে বলবেন, ওনাকে মিনতি করি, উনি যেন আরেকবার ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন।’
আমি হেসে বলি, ‘এটা আপনাকে মিনতি করতে হবে কেন? উনি তো নিজেই চাইবেন আরেকবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে!’
ভদ্রলোক বললেন, ‘আরে না। উনি মনে হয় চান না, আরেকবার উনি ভোটে জেতেন, সেইটা চাইলে কেউ এত উল্টাপাল্টা কাজ করতে পারে? ওনার এক নম্বর শত্রু জামাত, পাকিস্তানি চক্র। এক নম্বর প্রতিপক্ষ বিএনপি। ওনার শত্রু তারা, যারা তাঁকে মারার জন্য বোমা পাতছিল। বোমা মারছিল। বাকিরা তো ওনার শত্রু না। বড়জোর সমালোচক। উনি শত্রুদের ঘায়েল না করে সমালোচকদের পিছনে সময় নষ্ট করতেছেন কেন? উনি কেন বন্ধুদের শত্রু বানাচ্ছেন? শত্রুর সংখ্যা বাড়ায়া ফেলছেন? তার মানে কী, জানেন? উনি আরেকবার ভোটে জিততে চান না। উনাকে বলেন, প্লিজ, উনি যেন আরেকবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। আর সেটা ইলেকশনে জিতে। মানুষের ভোট পেয়ে।’
আমি ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকাই। তাঁর চোখে পানি ছলছল করছে। তিনি আকুল স্বরে বলেন, ‘আপা কেন আরেকবার ক্ষমতায় আসতে চাইতেছেন না? আমার ট্রেন এসে গেছে, আমি যাই।’ বলে তিনি ওয়েটিং রুম ত্যাগ করেন।

৫.
আওয়ামী লীগ যখন জেতে, আওয়ামী লীগ একা জেতে। যখন হারে, তখন পরাজিত হয় সমস্ত বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম যখন হারে, তখন সাকিব আল হাসান বাহিনী একা হারে। যখন জেতে, তখন জেতে পুরোটা বাংলাদেশ।
হেরে গেলে? আরে বাংলাদেশ তো! কত দূর আর পারবে? কিচ্ছু হবে না! না। এই দলকে দিয়েই হবে। এই দেশকে দিয়েই হবে।
জিতলে অবশ্য পুরস্কারের বন্যাও বয়ে যায়। আমাদের যে সবটাতেই বাড়াবাড়ি। হারলে যেমন তিরস্কারের সুনামি আঘাত হানতে থাকে।
আচ্ছা সবাই তো পুরস্কার ঘোষণা করেন। আমিও না হয় একটা করি। আমি হিসাব কষে দেখলাম, আমি কলাম লিখছি ২২ বছর ধরে, আর সংবাদপত্রে লিখছি ২৫ বছর। মানে আমার লেখকজীবনের বয়স সাকিব আল হাসানের বয়সের চেয়েও বেশি। আচ্ছা, বাংলাদেশ যদি কোয়ার্টার ফাইনালে যায়, তাহলে আমি সাকিব আল হাসানসহ নবীন কলামলেখকদের কলাম লেখাবিষয়ক একটা কর্মশালায় বিনে পয়সায় লেকচার দেব! হা হা হা। আমার মনে হয়, সেটা বাড়াবাড়ি হবে না। কারণ, ওই কাজটাই আমি ২২ বছর ধরে করে আসছি। কিন্তু সাকিব আল হাসান যদি এসে বলেন, ‘কীভাবে কলাম লিখতে হয়, আপনাকে আমি শেখাব,’ আমি নিশ্চয়ই আমোদ পাব, কিন্তু পাত্তা দেব না। তাহলে আমরা কলামলেখকেরা যখন ক্রিকেটারদের, দলের থিম ট্যাংককে শেখাতে চাই ক্রিকেটটা কীভাবে খেলতে হবে, তখন যে সেটা একটা কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়, সেটা কি আমরা জানি?
একজন গায়ক নাকি সুরে গান করেন। তিনি একবার বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারকে বলেছিলেন, ‘আপনারা তো ভালোই খেলেন, কিন্তু আপনাদের পা চলে না কেন? ফুটওয়ার্ক নেই কেন?’
ক্রিকেটার জবাব দিয়েছিলেন, ‘আপনি তো ভালোই গান করেন, কিন্তু মুখ থাকতে নাক দিয়ে গান করেন কেন?’
পাদটীকা: লেখাটা লিখতে পারলাম, কারণ ছয়টার ট্রেন আটটায় পৌঁছাল। ল্যাপটপে সেরে ফেললাম। ট্রেনে বসেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয় হোক।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

জামিন পেয়েই আসামির হুমকি

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর হত্যা মামলার আসামিদের জামিনে মুক্তির ঘটনাটি আইনি বিষয় হলেও তাঁদের সংবর্ধনা রাজনৈতিক এবং সেই অনুষ্ঠান থেকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি বেআইনি। স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, আদালত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাইকোর্ট এ ব্যাপারে রুল জারি করেছেন।
সানাউল্লাহ নূর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১১ আসামির সবাই জামিনে মুক্তি পান গত বৃহস্পতিবার। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নাটোরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের সন্তুষ্টিসাপেক্ষে আসামিদের ছয় মাসের জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর নাটোরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে জামিননামা দাখিলের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। হাইকোর্টের আদেশে এটাও বলা হয়েছে, জামিনের কোনো ধরনের অপব্যবহার হলে আদালতের (বিচারিক) জামিন বাতিলের স্বাধীনতা রয়েছে। এসবই আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু সন্ধ্যা সাতটায় কারাগার থেকে বের হওয়ার পরই সরকারি দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা তাঁদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। এই আসামিদের নিয়ে হয়েছে মোটর শোভাযাত্রা, এরপর দেওয়া হয়েছে সংবর্ধনা। এ সময় সানাউল্লাহ নূর হত্যা মামলার প্রধান আসামি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জাকির হোসেন এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণে বনপাড়া বাজারের ব্যবসায়ীদের সাত দিনের সময় দিয়ে বলেন, ‘নইলে আমরা ব্যবসায়ীদের বিচার করব।’ বনপাড়ার ব্যবসায়ীদের ‘অপরাধ’, তাঁরা নূর হত্যাকাণ্ডের পর দোকান বন্ধ রেখে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন।
এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে জাকির হোসেন স্পষ্টতই প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়েছেন এবং ব্যবসায়ীদের বিচার করার কথা বলে তিনি কার্যত আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। এটি উদ্বেগজনক। আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। হত্যা মামলার আসামিরা অপরাধী বা নির্দোষ কি না, সেটা আদালতে প্রমাণিত হবে। এর দায়িত্ব কোনোভাবেই বনপাড়ার ব্যবসায়ীরা নিতে পারেন না। কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে বিক্ষোভ বা মানববন্ধন করা অপরাধ হতে পারে না।
প্রথম আলোয় এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর হাইকোর্টের যে বেঞ্চ জামিন মঞ্জুর করেছিলেন, ওই একই বেঞ্চ জামিন কেন বাতিল হবে না, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি রুল জারি করেছেন। রুলের ওপর শুনানির দিনও ধার্য হয়েছে আগামী ২৮ মার্চ।
আমরা চাই, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক। আইনি বিষয়গুলো আইনিভাবেই সুরাহা হোক। কিন্তু কোনো আসামি জামিন পেয়ে প্রতিপক্ষকে হুমকি দেবেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেবেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই আসামিদের শক্তির উৎস কোথায়, তা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যে আসামিদের সরকারি দলের সদস্যরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন, দলের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তাঁরা যখন হুমকি দেন, তখন উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বামফ্রন্টে অর্ধেকের বেশি নতুন মুখ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট ১৪৯ জন নতুন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রার্থীও বাড়ানো হয়েছে।
গত রোববার বিকেলে কলকাতায় সিপিএমের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু এই প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন। বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। তালিকায় নতুন মুখ এসেছে ১৪৯টি। এর মধ্যে সিপিএম এনেছে ১১৪টি নতুন মুখ। এ ছাড়া ৪৬ জন নারী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ৫৭ জনকে প্রার্থী করা হয়েছে।
আগামী ১৮ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচন শুরু হবে। ছয় দফার এই নির্বাচন শেষ হবে ১০ মে। ১৩ মে ফলাফল প্রকাশিত হবে।
কংগ্রেসে যোগদান: প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির বড় ছেলে অভিজিৎ মুখার্জি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।

বাহরাইনে সামরিক আইন জারির আহ্বান

বাহরাইনে চলমান বিক্ষোভ দমনে সরকারকে সামরিক আইন জারি করার আহ্বান জানিয়েছে দেশটির আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ। দেশটিতে এক মাস ধরে বিক্ষোভ চলে আসছে। সুন্নি-শাসিত বাহরাইনে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে এই বিক্ষোভ করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার এ আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে গতকাল সোমবার সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা বিক্ষোভ দমনে বাহরাইন সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য গত রোববার সহস্রাধিক সৈন্য পাঠিয়েছেন।

চীনে রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জিয়াবাওয়ের

চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও সে দেশে রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ছাড়া গত ৩০ বছরের অর্থনৈতিক অর্জন হারিয়ে যেতে পারে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে চীন। সংবাদ সম্মেলনে এ কথা উল্লেখ করেন জিয়াবাও। তবে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আকস্মিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন চীনের সরকারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, এমন কথা তিনি অস্বীকার করেন।
সংবাদ সম্মেলনে চীনা প্রধানমন্ত্রী খোলাসা করে বলেননি যে ঠিক কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তবে পর্যায়ক্রমে এই সংস্কারের কথা জানানো হবে বলে তিনি জানান।
রাজনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে জিয়াবাও বলেন, ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন ছাড়া সফল হওয়া যাবে না। অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন না করা হলে, এ পর্যন্ত আমরা যা অর্জন করেছি, তা হারিয়ে যেতে পারে।’ তিনি বলেন, এই পরিবর্তন হতে হবে ধাপে ধাপে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে। সে দেশে ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে।
জিয়াবাওয়ের এই বক্তব্যের সঙ্গে চীনের অপর জ্যেষ্ঠ নেতা উ বাঙ্গুর বক্তব্যের বেশ অমিল রয়েছে। গত সপ্তাহে বাঙ্গু চীনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার বিষয়টি নাকচ করেন।

ধ্বংসস্তূপে এখনো আটকে আছে অনেক মানুষ

জাপানে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প ও সুনামির ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ে আছে এখনো অনেক মানুষ। তাদের উদ্ধারে তল্লাশি চালানো হলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেখানে হয়তো কেউ বেঁচে নেই।
নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও উদ্ধার তৎপরতা জোরেশোরে চলছে। উদ্ধারকারীদের একটি দল গতকাল সোমবার দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় নাতোরি শহরের বিধ্বস্ত এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এদিকে বিভিন্ন এলাকায় টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে গতকাল উত্তরাঞ্চলীয় জরুরি সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
মিয়াগি উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সুনামির টানে ভেসে যাওয়া মৃতদেহ আবারও কূলে ভিড়তে শুরু করেছে। পুলিশ এ রকম অন্তত ৭০০ লাশ উদ্ধার করেছে। মৎস্যবন্দর মিনামিসানরিকুর পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সেখানের অধিকাংশ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর কাদার স্তর পড়ে এই বন্দর এলাকার কত মানুষ যে সুনামির সময় সাগরে ভেসে গেছে, তার সঠিক হিসাব কারও জানা নেই। ধারণা করা হচ্ছে, এ সংখ্যা ১০ হাজারের কম নয়।
উপকূলীয় মিয়াগি ও সেন্দাই শহরে জরুরি সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে গতকাল স্বজনহারাদের ভিড় ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেখানে সমুদ্রসৈকতে ইতিমধ্যে অন্তত দুই হাজার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার এসব এলাকায় অন্তত ৩৩ ফুট উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ে। ৫০০ কিলোমিটার বেগে সুনামি বয়ে যায়। এ সময় পথে যা পায় সবই গুঁড়িয়ে দিয়ে যায়।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, জাপানের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অন্তত ২৬ লাখ ঘরবাড়ি গতকাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। গ্যাস-সুবিধাবঞ্চিত রয়েছে ৩২ লাখ মানুষ।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ক্রাউলির পদত্যাগ

প্রশাসনের সমালোচনা করার জেরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র পি জে ক্রাউলি পদত্যাগ করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন গত রোববার বিকেলে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছেন।
তথ্য ফাঁসের সাড়া জাগানো প্রতিষ্ঠান উইকিলিকসের কারণেই পি জে ক্রাউলিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। উইকিলিকসের কাছে গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ব্রাডলি ম্যানিংকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোপন সামরিক তথ্য পাচারের জন্য ম্যানিংয়ের বিচারও শুরু হয়েছে। ম্যানিংয়ের আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, তাঁর মক্কেলকে গ্রেপ্তারের পর পেন্টাগন কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে ম্যানিংকে দিনের পর দিন পুরোপুরি নগ্ন করে রাখা হয়েছে। এসব অভিযোগের পর মার্কিন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মার্কিন উদারনৈতিক মহল থেকেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে ওবামা প্রশাসনের সমালোচনা শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা জোরদার

জাপানের ভূমিকম্প ও সুনামি-বিধ্বস্ত শহরগুলোতে উদ্ধার-তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার শহরগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকর্মীরা।
সংহতির নিদর্শন হিসেবে ইতিমধ্যে প্রায় ৭০টি দেশ জাপানকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। শুধু মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীন থেকেও সহায়তা এসেছে। সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তান থেকেও।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জে কারনি বলেন, যে সহায়তার প্রয়োজন হোক না কেন, তাঁরা জাপানকে সেই সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি জানান, সুনামিতে বিধ্বস্ত বাড়িঘরে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধারে দুটি অনুসন্ধান ও উদ্ধার দল গতকাল সোমবার ভোরের আলো ফোটার পর থেকে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ওই দল দুটিতে রয়েছেন ১৪৪ জন উদ্ধারকর্মী। দল দুটিতে ১২টি কুকুরও রয়েছে।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ১৫ সদস্যের চীনা উদ্ধার দল কাজ শুরু করেছে। গত রোববার বিশেষ বিমানে করে তাঁরা টোকিও গিয়ে পৌঁছান।
দক্ষিণ কোরিয়া জানায়, বিমানবাহিনীর তিনটি সি-১৩০ হেলিকপ্টারযোগে ১০২ সদস্যের একটি উদ্ধার দল জাপানের উদ্দেশে কোরিয়া ত্যাগ করেছে। দেশটির একটি অগ্রগামী দল গত শনিবার থেকে জাপানে অবস্থান করছে। ওই দলে রয়েছেন পাঁচজন উদ্ধারকর্মী। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে দুটি তল্লাশি কুকুর।
ইন্দোনেশিয়া বলেছে, তারা জাপানে সহায়তা পাঠানোর ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কুসুমা হাবির বলেন, ‘আমরা সাহায্যের জন্য প্রস্তুত। এই মুহূর্তে জাপানের কী দরকার এবং তা কীভাবে পাঠানো যায়, সে সম্পর্কে আলোচনা করছি।’
আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, জাপানের ‘ভাই ও বোনদের’ জন্য ৫০ হাজার ডলার সহায়তা দেওয়া হবে।
ব্রিটেন ফায়ার ব্রিগেডের তল্লাশি ও উদ্ধার বিশেষজ্ঞদের পাঠিয়েছে। ভারী বস্তু উত্তোলন ও কাটার যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি পাঠিয়েছে দেশটি। ব্রিটেন বলেছে, অনুরোধ করা হলে তারা জাপানে পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানী পাঠাবে।
রাশিয়ার জরুরি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য গত রোববার সুনামি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৭৫ জন উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয়েছে।
ডক্টর উইদাউট বর্ডাসের কয়েকটি দল ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। সংস্থাটি বলেছে, চিকিৎসা-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তাদের কাছে মনে হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সামান্য। সেখানে পানির সরবরাহ নেই। লোকজনের খাবার, কম্বল ও পানির দরকার।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রায় ২০ লাখ বাড়িতে এখন বিদ্যুৎ নেই।

লিবিয়ায় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে

লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি বাহিনীর বেপরোয়া বিমান হামলায় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো একের পর এক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সেখানে দ্রুত নো ফ্লাই জোন আরোপের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি।
গাদ্দাফি বাহিনীর বেপরোয়া বিমান হামলা থেকে নিরীহ মানুষকে রক্ষায় দেশটির ওপর নো ফ্লাই জোন আরোপে মতৈক্যে পৌঁছাতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। নো ফ্লাই জোন আরোপে জাতিসংঘের একটি খসড়া প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে ফ্র্যান্স ও ব্রিটেন তোড়জোড় শুরু করলেও তাতে তেমন সায় দিচ্ছে না ইতালি ও জার্মানি।
জার্মানি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, উত্তর আফ্রিকার গৃহযদ্ধে তারা নিজেদের জড়াতে চায় না। বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ারও মনোমালিন্য দেখা দিয়েছে।
প্যারিসে জি-৮ নেতারা গতকাল লিবিয়া নিয়ে যে বৈঠক শুরু করেছেন, তাতে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের একটা বিরোধ দেখা দিয়েছে। রাশিয়া শিগগিরই সেখানে নো ফ্লাই জোন আরোপের ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
এদিকে ঘরে-বাইরে চাপ থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে লিবিয়ার এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গতকাল সোমবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস যাওয়ার কথা রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের। দুই দিনের এ সফরে হিলারি লিবিয়ার সরকারবিরোধীদের সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি হারম্যান ভন রমপাই বলেছেন, ‘আমরা লিবিয়ায় কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ চাই না। কেননা, আমরা এখন ঔপনিবেশিক যুগে বাস করি না যে যা খুশি তাই করব।’
এদিকে লিবিয়ায় যেকোনো সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছে ইউরোপীয় কাউন্সিল। দেশটির চলমান সংকট নিরসনে সহায়তার জন্য আফ্রিকান ইউনিয়ন একটি প্যানেল গঠনের যে ঘোষণা দিয়েছে, লিবিয়া কর্তৃপক্ষ সেটাকে স্বাগত জানিয়েছে। নো ফ্লাই জোন আরোপে আরব লিগের আহ্বানেরও নিন্দা করেছে দেশটি।
লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে সরকারি বাহিনীর ধরপাকড় ও গুম করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
লিবিয়ায় গাদ্দাফির অনুগত বাহিনীর বেপরোয়া বিমান হামলায় রণাঙ্গনে টিকে থাকতে পারছে না বিদ্রোহীরা। একের পর এক পতন ঘটছে তাদের নিয়ন্ত্রিত শহরগুলো। গত রোববার ব্যাপক বোমা বর্ষণের পর অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে সরকারি সেনারা ব্রেগা শহরটি দখল করে নিয়েছে।
বিদ্রোহীরা ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই বিমানবিধ্বংসী কামান ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আজদাবিয়া শহরে চলে গেছে। এ শহরটিকে বলা হয় বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি বেনগাজির প্রবেশদ্বার। এর আগে সরকারি সেনারা তেলসমৃদ্ধ রাস লানুফসহ কয়েকটি শহর দখল করে নেয়।
রাজধানী ত্রিপোলিতে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মিলাদ হোসাইন বলেছেন, তাঁদের অভিযানের মুখে বিদ্রোহীরা এখন পালিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা জাবিয়া, উজালা, রাস লানুফ ও ব্রেগা মুক্ত করেছেন। সেনাবাহিনী এখন অবশিষ্ট এলাকা মুক্ত করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। আরেক খবরে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত মিসরাত শহরটি গাদ্দাফি বাহিনী ঘিরে রেখেছে।

ভারত বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ

চীনকে পেছনে ফেলে ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। সুইডেনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।
স্টকহোম পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৬-২০১০ সালে ভারত বিশ্বের মোট রপ্তানির ৯ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করেছে। এ সময় চীন আমদানি করে বিশ্বের মোট রপ্তানির ৬ শতাংশ অস্ত্র। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুসারে, বিশ্বে এখনো অস্ত্র রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে যক্তরাষ্ট্র। এর পরই রাশিয়া ও জার্মানির অবস্থান। সুইডেনের ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ভারত যে শুধু বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর অস্ত্র আমদানিকারক দেশ তা নয়, ভবিষ্যতেও দেশটির এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেটের পরিমাণ তিন হাজার ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এ অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশই দেশটি ব্যয় করে অস্ত্র আমদানি খাতে।
ভারত তার সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার খরচ করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে ১২৬টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চীনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী পাকিস্তানের কারণে ভারত নানাভাবে উদ্বিগ্ন। আর সে কারণেই ভারত অস্ত্র আমদানিকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রাহুল বেদী মনে করছেন, ভারতের ইচ্ছা হচ্ছে, প্রথমে মহাদেশভিত্তিক এবং পরে অঞ্চলভিত্তিক মহাশক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। তাঁর মতে, ‘বিগ বয়’ হতে হলে শক্তি অর্জন করতেই হবে। আরেকজন বিশ্লেষক সিমন ওয়েজিম্যান মনে করছেন, ভারত যেসব অস্ত্রের ফরমায়েশ দিয়ে রেখেছে, তাতে দেশটি আগামী কয়েক বছরেও বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে বহাল থাকবে।
গত বছর ভারত ঘোষণা দেয়, তারা আগামী ১০ বছরে রাশিয়া থেকে পঞ্চম প্রজন্মের ২৫০ থেকে ৩০০টি স্টিলথ জঙ্গি বিমান কিনবে। এ জন্য দেশটির খরচ হবে তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এ ছাড়া ফ্রান্সের কাছ থেকে আধুনিক মিরেজ জঙ্গি বিমান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিমানবাহী রণতরী, ৬০০টি আধুনিক হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী কেনার পরিকল্পনা আছে ভারতের।

দেশীয় চিকিৎসাসেবা খাতকে সুরক্ষার দাবি

ওষুধের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়ে দেশীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা খাতকে সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
চিকিৎসা খাতে ব্যবহূত যন্ত্রপাতিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি হিসেবে বিবেচনায় এর ওপর আমদানি শুল্ক ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপরীতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জন্য আমদানিকৃত আসবাবে শুল্ক বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত চলমান প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব দাবি জানানো হয়েছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই) প্রতিনিধি ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালের পরিচালক এম এ মালেক চৌধুরী, হোমিওপ্যাথিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এস এ রহিম, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আমির হোসেন, ট্যারিফ কমিশনের প্রতিনিধি মোহসীনা বেগম প্রমুখ। এনবিআরের সম্মেলনকক্ষে এই আলোচনা সভা অনষ্ঠিত হয়।
এম এ মালেক চৌধুরী জানান, ইনসুলিন ও ক্যানসার প্রতিরোধক প্রস্তুতকৃত ওষুধ আমদানিতে কোনো কর নেই। দেশীয় শিল্পকে রক্ষায় এসব ওষুধের কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক ও হারবাল চিকিৎসাসেবায় বিদ্যমান কর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার দাবি জানান এই খাতের উদ্যোক্তারা।
হোমিওপ্যাথিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এস এ রহিম জানান, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবায় ওষুধ ধারণের জন্য ব্যবহূত বোতল ও ড্রপার আমদানির ওপর সব মিলিয়ে ১৫১ শতাংশ কর রয়েছে, যা কমানো উচিত।
আমির হোসেন বলেন, অস্ত্রোপচারে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি দেশে তৈরি হয় না। তাই এসব যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য শুল্ক কমানো উচিত।
আলোচনায় আরও বলা হয়, স্থানীয় খাতকে সুবিধা দিতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ব্যবহূত আসবাব আমদানিতে কর বাড়ানো দরকার। বর্তমানে এসব আসবাবে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। এই হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করা উচিত।
এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ জানান, চিকিৎসা খাতে ব্যবহূত কোন কোন যন্ত্রপাতি ও আসবাব স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় এবং সামগ্রিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম—এই বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে শিগগিরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবে এনবিআর। কর ছাড়ের ইতিবাচক প্রভাব যেন সংশ্লিষ্ট খাতে পড়ে, এনবিআর তা নিশ্চিত করতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এক দিন পর আবার ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজার

রোববার দরপতনের পর গতকাল সোমবার আবার দেশের পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়। এদিন দুই স্টক এক্সচেঞ্জে বেশির ভাগ শেয়ারের দাম বাড়ায় মূল্যসূচকও বাড়ে। তবে লেনদেন কিছুটা কমে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের অনিশ্চয়তার একটি সংবাদ গতকাল বাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। তবে ওই তহবিল গঠনে অনিশ্চয়তা নেই বলে আইসিবির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। এর প্রভাবে বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল দিন শেষে সূচক ২৭৮ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট বেড়ে ছয় হাজার ৪৫৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৫৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৩৯টির দাম বাড়ে, কমে ১২টির এবং অপরিবর্তিত থাকে একটি প্রতিষ্ঠানের দাম।
ডিএসইতে গতকাল এক হাজার ৫৯ কোটি টাকার লেনদেন হয় যা রোববারের চেয়ে ২০৭ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইতে এক হাজার ২৬৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়।
অন্যদিকে গতকাল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৭৯৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বেড়ে ১৮ হাজার ১৯০ দশমিক শূন্য ৩৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মোট ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে বেড়েছে ১৭৩টির এবং কমেছে ১৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে গতকাল মোট ১১৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

প্রথমার্ধে বাজেট-ব্যয় মাত্র ৩১.৪%

চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাজেটের মোট বরাদ্দের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। তবে সার্বিক ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ।
এ সময় অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আর উন্নয়ন বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে ব্যয় হয়েছে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
চলতি বাজেটের দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত বাস্তবায়ন, অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকাকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এডিপি বাস্তবায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এ খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।
চলতি অর্থবছর অনুন্নয়ন-ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৩১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময় ব্যয় হয়েছিল ২৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে অনুন্নয়ন-ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এ বছর জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময় ব্যয় হয়েছিল আট হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এডিপির সিংহভাগই ব্যয় হয় ১০টি বৃহৎ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে। চলতি বছর তাদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট এডিপির ৭৫ শতাংশ। অথচ ছয় মাসে এ মন্ত্রণালয়গুলো মোট বরাদ্দের ২২ শতাংশ এবং এডিপির ২৬ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
১০ বৃহৎ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাজেট-ব্যয়ের চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নয় হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার মধ্যে চার হাজার ৮৮২ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৮ হাজার ৬২ কোটি টাকার মধ্যে ছয় মাসে ব্যয় করতে পেরেছে তিন হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।
একইভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগ মোট বরাদ্দ নয় হাজার ৬২২ কোটি টাকার ২২ দশমিক ১ শতাংশ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আট হাজার ১২৯ কোটি টাকার ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, কৃষি মন্ত্রণালয় ছয় হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার ২৩ দশমিক ২ শতাংশ, সড়ক ও রেলপথ বিভাগ ছয় হাজার ১৬৩ কোটি টাকার ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগ পাঁচ হাজার কোটি টাকার ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় দুই হাজার ৪৯ কোটি টাকার ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সেতু বিভাগ এক হাজার ২৭৭ কোটি টাকার ১৫ শতাংশ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক হাজার ১১৪ কোটি টাকার ২১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
উল্লিখিত ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের হার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে এই হার ব্যয় বরাদ্দের ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রকল্প সাহায্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের সার্বিক গড় অগ্রগতির হার ১৮ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ কম।
গতকাল জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বক্তব্যে এডিপি বাস্তবায়নে নিম্নহারের দায় স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘এডিপি বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। এরই অংশ হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়নে আগাম পরিকল্পনা প্রণয়ন, একনেক সভায় এডিপি বাস্তবায়নে অগ্রগতি পর্যালোচনা, এডিপি বাস্তবায়নে পরিবীক্ষণ নিবিড় করতে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এডিপি বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত গতি সঞ্চার করতে পারিনি।’
তবে সম্মিলিত এ কর্মতৎপরতার সুফল অচিরেই দেখা যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও বলেছেন, ‘মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো আলাদা বাজেট ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ বা অধিশাখা সৃষ্টি করেছে। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় নবদিগন্তের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে।’

এক দিন পর আবার ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজার

রোববার দরপতনের পর গতকাল সোমবার আবার দেশের পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়। এদিন দুই স্টক এক্সচেঞ্জে বেশির ভাগ শেয়ারের দাম বাড়ায় মূল্যসূচকও বাড়ে। তবে লেনদেন কিছুটা কমে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের অনিশ্চয়তার একটি সংবাদ গতকাল বাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। তবে ওই তহবিল গঠনে অনিশ্চয়তা নেই বলে আইসিবির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। এর প্রভাবে বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল দিন শেষে সূচক ২৭৮ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট বেড়ে ছয় হাজার ৪৫৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৫৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৩৯টির দাম বাড়ে, কমে ১২টির এবং অপরিবর্তিত থাকে একটি প্রতিষ্ঠানের দাম।
ডিএসইতে গতকাল এক হাজার ৫৯ কোটি টাকার লেনদেন হয় যা রোববারের চেয়ে ২০৭ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইতে এক হাজার ২৬৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়।
অন্যদিকে গতকাল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৭৯৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বেড়ে ১৮ হাজার ১৯০ দশমিক শূন্য ৩৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মোট ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে বেড়েছে ১৭৩টির এবং কমেছে ১৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে গতকাল মোট ১১৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

নির্দেশক মূল্যের সীমারেখা থাকবে

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাথমিক শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের নিয়মে বেশ কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এখন থেকে এ পদ্ধতিতে বাজারে আসা কোনো কোম্পানির শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের জন্য শেয়ারের মূল্য-আয় (পিই) অনুপাত এবং শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদ-মূল্য (এনএভি) বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পিই ১৫ অথবা এনএভির পাঁচ গুণ—এ দুইয়ের মধ্যে যেটি কম, নির্দেশক মূল্য তার বেশি হতে পারবে না।
আবার এর পরিমাণ শেয়ারপ্রতি এনএভির কমও প্রস্তাব করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে পিই গণনা করতে হবে কোম্পানির পূর্ববর্তী তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে উল্লিখিত শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসের গড়ের ভিত্তিতে।
যেমন, ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের (ফেস ভ্যালু) কোনো কোম্পানির ইপিএস পাঁচ টাকা হলে বেঁধে দেওয়া পিই অনুযায়ী সর্বোচ্চ নির্দেশক দাম হতে পারবে ৭৫ টাকা। আর এনএনভি ২০ টাকা হলে নির্দেশক দাম ১০০ টাকা হতে পারবে।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত দাম ৭৫ টাকার মধ্যেই থাকতে হবে। কেননা পিই অনুযায়ী নির্দেশক দাম এনএভি অনুযায়ী নির্দেশক দামের চেয়ে কম। একই সঙ্গে তা ২০ টাকার নিচেও নামতে পারবে না। কেননা, এখানে এনএভি হলো ২০ টাকা।
বর্তমান নিয়মে নির্দেশক মূল্যের জন্য কোনো ধরনের সীমারেখা টানা নেই।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সম্প্রতি বুক বিল্ডিং আইনের সংশোধনের সুপারিশের খসড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে প্রেরণ করেছে।
দেশের শেয়ারবাজারে ধসের পর বুক বিল্ডিং পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ করা হয়, এ পদ্ধতির অপব্যবহারের মাধ্যমে অনেক কোম্পানি মৌলভিত্তির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। তাই কোম্পানিগুলোর শেয়ার প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বাজারে আসার আগেই অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পড়ছেন আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে।
এ অবস্থায় গত ২০ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত করে আইনে সংশোধনীর খসড়া তৈরি করে এসইসি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
সংশোধনীর খসড়ায় আইপিওতে আসতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর এসইসির কাছে জমা দেওয়া নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করা হবে। কোম্পানির সঙ্গে কোনো ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নেই, এমন ব্যক্তিরাই কেবল কমিটির সদস্য হতে পারবেন। এসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান কমিটিতে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন।
বর্তমানে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিপরীতে বরাদ্দ করা শেয়ার লেনদেন শুরুর ১৫ দিন পর্যন্ত বিক্রি বা হস্তান্তর নিষিদ্ধ (লকইন) থাকে। এ সময় বাড়িয়ে ৬০ দিন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া চূড়ান্ত দরপত্রের পর আইপিওর চাঁদা গ্রহণ (সাবস্ক্রিপশন) ২৫ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিনের মধ্যে শুরু করতে হবে। দরপত্রের সময় ৭২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৪৮ ঘণ্টা করার কথা বলা হয়েছে। আর দরপত্র গ্রহণ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি ও ইস্যু ব্যবস্থাপককে আইপিওর জন্য শেয়ারের প্রস্তাবিত মূল্যসহ (কাট অব প্রাইস) চূড়ান্ত খসড়া প্রসপেক্টাস এসইসিতে জমা দিতে হবে।
এর আগে মুদ্রিত প্রাথমিক খসড়া প্রসপেক্টাস মনোনীত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সমিতির কাছে রোড শো আয়োজনের অন্তত পাঁচদিন পূর্বে প্রেরণ করতে হবে। এতে শেয়ারের নির্দেশক মূল্য উল্লেখ করা যাবে না।
যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে খসড়া প্রসপেক্টাস পাঠাতে হবে সেগুলো হলো: মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, ডিএসই, সিএসই, ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএলএফসিএ) ও বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন।
নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, কোম্পানিটির কোনো সহযোগী বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অথবা পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না।

বাইব্যাকের পর দুই বছর মূলধন বৃদ্ধির ওপর বিধি-নিষেধ

কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাইব্যাক করার পর ওই প্রতিষ্ঠানের মূলধন বৃদ্ধির ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করার বিধান রাখা হচ্ছে প্রস্তাবিত বাইব্যাক আইনে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের অতিরিক্ত মূলধন অথবা সিকিউরিটির প্রিমিয়াম হিসাব ব্যবহারের মাধ্যমে শেয়ার বাইব্যাক করার প্রস্তাব রাখার সুপারিশ করা হবে। এ ছাড়া বাইব্যাক সম্পন্ন করার পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কোম্পানির ক্রয় করা সিকিউরিটিজ বাতিল এবং ধ্বংসের বিধান রাখা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) আয়োজিত পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে এসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সভাপতি শাকিল রিজভী, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রেসিডেন্ট ফকর উদ্দিন আলী আহমেদ ও বাংলাদেশ পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সালমান এফ রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এসইসি সূত্রে যায়, প্রস্তাবিত আইনে বাইব্যাক সম্পন্ন করার পরবর্তী দুই বছর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধির ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। বাইব্যাক আইন লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডের বিধান বাতিল করে আর্থিক দণ্ড দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ওই কোম্পানিকে সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাইব্যাক সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী ২৪ মাসের মধ্যে বোনাস শেয়ার ব্যতীত অন্য কোনো ধরনের লভ্যাংশ ইস্যু করতে পারবে না।
এই সুপারিশ শিগগিরই এসইসি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই শেষে কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাইব্যাক প্রথা চালু করার জন্য একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পাবলিকলি লিস্টেড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সালমান এফ রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কোনো কোম্পানি মূলধন কমাতে চাইলে সে সুবিধা দেওয়ার জন্য এই আইন করা প্রয়োজন। তবে কোম্পানির অতিরিক্ত মূলধন না থাকলে সে কোম্পানিকে বাইব্যাকের সুযোগ দেওয়া উচিত নয় বলে জানান তিনি। এ ছাড়া বাইব্যাকের পর কোম্পানির বোনাস ইস্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিনিয়োগকারীরা নগদ লভ্যাংশ চায় না। এ জন্য আমরা বাইব্যাকের পর কোম্পানি যাতে বোনাস ইস্যু করতে পারে সে জন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে।’

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের লভ্যাংশ ঘোষণা

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ৪৫ শতাংশ নগদ এবং পাঁচ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়া অর্থবছরের জন্য এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আজ মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ৭ মে সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ২৮ মার্চ।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে কর-পরবর্তী মুনাফা ৪৬,৪২,৩০,০০০ টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় ১০.০৫ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ৩২.০৮ টাকা ও নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৫২.৮১ টাকা।

রিয়ালকে কাছে আনল বার্সা

শুরুর দিকে গায়ে গা ঘেঁষেই ছিল দুই দল। লিগে প্রথম এল ক্লাসিকোর পর একটু দূরে সরে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। কিছুদিন আগে দূরত্ব বেড়ে বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধান হয় ৭ পয়েন্টের। পরশু দূরে থাকা রিয়ালকে কাছে নিয়ে এল বার্সেলোনা। প্রথমে এগিয়ে গিয়েও সেভিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে কাতালানরা। এই ড্রয়ে রিয়ালের সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধান কমে হয়েছে ৫। ২৮ ম্যাচে ৭৫ পয়েন্ট শীর্ষে থাকা বার্সার। সমান ম্যাচে রিয়ালের পয়েন্ট ৭০।
সেভিয়ার মাঠে বার্সেলোনাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন বোজান কিরকিচ। কিন্তু ৪৯ মিনিটে সেভিয়া সমতায় ফেরে জেসাস নাভাসের গোলে।
তবে ম্যাচের ৪ মিনিটে মেসির ফ্রি-কিক জালে ঢুকে যাওয়ার পরও গোল বাতিল না করলে এবং ন্যায্য পেনাল্টি থেকে বোজানকে বঞ্চিত না করলে ফলটা অন্য রকমই হতে পারত। ধারাভাষ্যকারসহ আরও অনেকেই এ নিয়ে সমালোচনাও করেছেন। যদিও বার্সা কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছেন, ‘রেফারি নিয়ে কথা বলতে চাই না আমি।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ সাবধানীও

‘বঙ্গীয় সাহস বটিকা’ খাওয়া উচিত ওটিস গিবসনের। কোথায় ম্যাচের আগে, মাঠের লড়াইয়ের আগে শুরু করে দেবেন কথার লড়াই, ‘হ্যান কারেঙ্গা, ত্যান কারেঙ্গা’ বলে কাঁপিয়ে দেবেন ইংলিশদের; তা না, উল্টো বলছেন, সামনে নাকি কঠিন পরীক্ষা!
তা বটে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডের বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া ম্যাচটি বাদে বাকি চারটিতেই হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিশ্বকাপেও মুখোমুখি লড়াইয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ইংল্যান্ড। গত চার ম্যাচেই তারা জিতেছে। বিশ্বকাপে ইংলিশদের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একমাত্র জয়টি সেই ১৯৭৯ সালের। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে মুখোমুখি হলেও পরিসংখ্যান বলে ইংল্যান্ডই বলীয়ান। ১৭ ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে তারা।
কিন্তু পরিসংখ্যানই কি সব? যদি তাও হয়, দুই দলের সর্বমোট লড়াইয়ের হিসাবে এখনো তো ক্ষয়িষ্ণু ক্যারিবীয়দের দিকেই পাল্লা ভারী (৮২ ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতেছে ৩৭টি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪১টি)। মুখোমুখি লড়াইয়ের গত পাঁচ ম্যাচের চারটি ইংল্যান্ড জিতেছে বটে, তার আগের পাঁচটির চারটি তো জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজই।
পরিসংখ্যান সব নয়। বাংলাদেশ তো বলবে, পরিসংখ্যান নিরেট গর্দভ। গত ম্যাচেই তো ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিল শক্তি ব্যবধানে বিস্তর পিছিয়ে থাকার পরও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ প্রেরণা নিতে পারেন সেখান থেকেও। গিবসন অবশ্য সাবধানী সুরের মধ্যেও খানিকটা চ্যালেঞ্জ মিশিয়ে দিলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। ম্যাচটা খুবই কঠিন হবে। আমরা জিতেই জয়ের ধারা ধরে রাখতে চাই। আমরা এই ম্যাচ জিতে হিসাব-নিকাশ বাকিদের জন্য ফেলে রাখতে চাই।’
‘বি’ গ্রুপের সব দলই আসলে আছে অস্বস্তিতে। সবচেয়ে অস্বস্তিতে আছে ইংল্যান্ড। ৫ ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলে তাদের অবস্থান পাঁচে। আগামী পরশু ম্যাচটা হেরে গেলেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায়। সেটিও প্রথম রাউন্ডে! ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তিমান গিবসন এর পরই শোনালেন সমধুর বাণী, ‘আমরা এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের জন্য কাজটা আরও কঠিন করে দেব।’
ইংল্যান্ড এখন কোণঠাসা। গিবসন মনে করেন, এটা তাঁদের জন্য সুবিধার দিক যেমন, তেমনি ভয়েরও, ‘এ মুহূর্তে ইংল্যান্ডের ফর্ম একটু অন্য রকম। কিন্তু ওরা যথেষ্ট প্রতিভাবান একটি দল, ভয়ংকরও। ওদের বিপক্ষে আমরা জিতবই এই নিশ্চয়তা নেই।’
‘এ’ গ্রুপের চারটি দলই মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু ‘বি’ গ্রুপ থেকে কারোই কোয়ার্টার ফাইনাল এখনো নিশ্চিত নয়। বৃহস্পতিবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে গেলেও তাদের হাতে অবশ্য একটি ম্যাচ থাকবে। ২০ তারিখ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে স্বাগতিক ভারতের। তবে গিবসন জানালেন, তাঁরা ধরে নিচ্ছেন, এটাই তাঁদের শেষ ম্যাচ। ভারত তাঁদের মাথাতেই নেই।

বায়ার্নের প্রতিশোধের ম্যাচ

ইউরোপের ফুটবলে আজ আবার চ্যাম্পিয়নস লিগের রাত। শেষ ষোলোর দ্বিতীয় লেগের লড়াইয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইন্টার মিলানের পাশাপাশি মাঠে নামছে সাবেক তিন চ্যাম্পিয়ন। তিনবারের ইউরোপ-সেরা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যাচ্ছে ’৯৩ চ্যাম্পিয়ন মার্শেইয়ের মাঠে। চারবারের সেরা বর্তমান রানার্সআপ বায়ার্ন মিউনিখ নিজেদের মাঠে খেলবে ইন্টারের বিপক্ষে।
ইন্টারের বিপক্ষে ম্যাচটি বায়ার্নের জন্য প্রতিশোধের। গত মৌসুমে ফাইনালে ইতালির এ দলটির কাছে হেরেই শিরোপা-স্বপ্ন বিসর্জন গিয়েছিল বায়ার্নের। সেই প্রতিশোধ সান সিরোতে প্রথম লেগে ১-০ গোলে জিতে নিয়ে এলেও কি মনের জ্বালা জুড়িয়েছে জার্মানির সেরা ক্লাবটির! যতটুকু বাকি আছে, সেটুকু মনে হয় এবার মেটাতে চাইবে তারা। হিসাব বলছে, কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার পথে এগিয়েও আছে বায়ার্নই। নিজেদের মাঠে ড্র করলেও যে শেষ আটে জায়গা হয়ে যাবে।
মার্শেইয়ের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছে বলে হিসাব-টিসাব তেমন কিছু নেই ম্যানইউর। অবশ্য এবার খেলাটা ম্যানইউর মাঠে হওয়ায় ন্যূনতম ১-১ গোলের ড্র করতে পারলেও অ্যাওয়ে গোলের হিসাবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাবে মার্শেই।

ইমরুলের গ্রামে উচ্ছ্বাস

কদিন ধরেই মেহেরপুর যেন ‘উৎসবপুর’। যেন উৎসব-উচ্ছ্বাসের মেলা বসেছে পুরো জেলায়। এই মেহেরপুরের সন্তান ইমরুল কায়েস যে টানা দুই ম্যাচে হলেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। মেহেরপুরবাসীর গর্বের তাই শেষ নেই। এই বাঁহাতি ওপেনারের নিজের গ্রাম উজলপুরে প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে আনন্দ মিছিল।
গতকালও খেলা শেষের পরপরই মেহেরপুরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে আনন্দ মিছিল বের হয়। মিছিলের স্লোগান ছিল ‘শাবাশ বাংলাদেশ’, ‘শাবাশ ইমরুল কায়েস’। শুধু সাধারণ সমর্থকেরাই নয়; এই আনন্দ মিছিলে নেমে পড়েছিলেন শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও।
পুরো জেলার মধ্যে উজলপুরেই যে উৎসবটা উছলে পড়া, সেটি না বললেও চলে। কাল ইমরুলের ছবি, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল এখানকার মানুষ। অনেকেই ইমরুলের গ্রামের বাড়িতে ভিড় করে। তাঁর মা-বাবা ও দাদিকে অভিনন্দন জানানো হয়। এই সময় আবেগাপ্লুত হয়ে ইমরুলের মা-বাবা ও দাদি কেঁদে ফেলেন। ইমরুলের ডাকনামে গড়া ‘সাগর ক্রিকেট ক্লাবের’ সদস্যদেরও আনন্দের সীমা ছিল না।

প্রোটিয়ারা আজ সাকিবদের মিত্র

অদ্ভুত এক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়েছে বিশ্বকাপ। এখানে কে কার শত্রু, কে কার মিত্র; তার কিছু সুনির্দিষ্ট নয়। বাংলাদেশকে লজ্জায় ডুবিয়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও যেমন এখন ভাবা হচ্ছে মিত্র। শেষ ম্যাচে যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ; অন্তত পরের ম্যাচের জন্য মিত্র তারাও!
আজ বাংলাদেশ যেমন প্রার্থনা করবে আয়ারল্যান্ড যেন কোনো অঘটন না ঘটায়। দক্ষিণ আফ্রিকাকে আইরিশরা হারিয়ে দিলে আবারও জট পাকিয়ে যাবে। আয়ারল্যান্ডের পয়েন্ট হয়ে যাবে ৪। সে ক্ষেত্রে ১৮ মার্চ হল্যান্ডের বিপক্ষে জিতলে তাদের পয়েন্টও হবে ৬। বাংলাদেশের তখন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জিততেই হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিলেও বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হবে না।
আজ ১৬ কোটি বাংলাদেশির প্রার্থনার সঙ্গে তাই মিলে যাক পশ্চিমবঙ্গের ৯ কোটির সুর। ২৫ কোটির সম্মিলিত প্রার্থনা হোক, আইরিশরা যেন আজ কোনো রূপকথার জন্ম দিতে না পারে। আজকের ম্যাচটা যে ইডেন গার্ডেনে। এ ম্যাচ দিয়েই কলকাতায় বিশ্বকাপ ফিরল।
এই ইডেনে ম্যাচ হওয়া না-হওয়া নিয়ে কত নাটক। ভারত-ইংল্যান্ড ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল এখানেই। স্টেডিয়ামটি সময়মতো প্রস্তুত না হওয়ায় সেটি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বেঙ্গালুরুতে। যে ম্যাচটা নাটকীয় উত্তেজনায় শেষ হয় টাই-এ। ইডেনের এটি নিয়ে মোট তিনটি ম্যাচ আছে। কিন্তু একটিতেও ভারত নেই। ফলে ৯০ হাজার থেকে আসনসংখ্যা কমে ৬৫ হাজারে নেমে এলেও গ্যালারি খাঁ খাঁ করারই কথা। আইরিশ অধিনায়ক উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড অবশ্য বলছেন, তাঁর কাছে লর্ডসে খেলার মতোই রোমাঞ্চ জাগাচ্ছে।
এই রোমাঞ্চ নিয়েই মাঠে নামবে আয়ারল্যান্ড। টুর্নামেন্টের ছোট দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো খেলছে আইরিশরাই। বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দেওয়া, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়, ভারতের ঘাম ছোটানোর পর গত ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও স্বস্তি না দেওয়া। পোর্টারফিল্ড বলছেন, ‘আমাদের হারানোর কিছুই নেই। ফলে আমরা খেলব চাপমুক্ত হয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা তো শিরোপারই দাবিদার। গত ম্যাচে ওরা ভারতকেও হারিয়েছে। আমরা তাই নির্ভার হয়ে খেলতে পারব।’
নির্ভার হয়ে খেলতে পারবে দক্ষিণ আফ্রিকাও। আসলেই ভারতের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস জয়টি চাপ সরিয়ে দিয়েছে তাদের ওপর থেকে। প্রোটিয়া অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ ভারতেরই এক পত্রিকায় তাঁর কলামে লিখেছেন, ‘শনিবারের জয়টি আমাদের জন্য আত্মবিশ্বাসের দিক দিয়ে বড় একটা ধাপ পেরিয়ে যাওয়া। এখন আমরা একটু নির্ভার হয়ে খেলতে পারব। তবে তার মানে এই নয়, আমরা ধরেই নিচ্ছি মঙ্গলবার আয়ারল্যান্ডকে এমনিতেই হারিয়ে দেব। আয়ারল্যান্ডের অনেকেই কাউন্টিতে খেলে। পুরো দল হিসেবে তারা বিচক্ষণ। যেকোনো সময় ওরা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তাই ওদের হালকা করে নেওয়ার সুযোগ নেই।’
নেই বলেই পুরো শক্তির দলও খেলার কথা ভাবছে দক্ষিণ আফ্রিকা। অবশ্য দারুণ ফর্মে থাকা এবি ডি ভিলিয়ার্স নাও খেলতে পারেন। ভারতের ম্যাচেই চোট পাওয়া ডি ভিলিয়ার্সের বাঁ ঊরুতে স্ক্যান করানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে পারেন চার ম্যাচে ১০৬ গড়ে ৩১৮ রান করা এই ডানহাতি। চোটের কারণে গত ম্যাচ না খেলা ইমরান তাহিরও ফিরবেন কি না, নিশ্চিত নয়। চোট আছে আইরিশ শিবিরেও। ট্রেন্ট জনস্টন আর আন্দ্রে বোথাকে আজ হয়তো পাবে না আয়ারল্যান্ড।

পাকিস্তানও শেষ আটে

পাল্লেকেলেতে কাল কত খেলা যে হলো! প্রথমে খেললেন শহীদ আফ্রিদি। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট বললেন, উমর আকমল ফিট, দলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও নেই। দল ঘোষণার পর দেখা গেল, সেই উমর তো নেই-ই, সঙ্গে শোয়েব আখতারও নেই। বলেছিলেন ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন আনবেন না। কিন্তু রান তাড়ার সময় নিজেই উঠে এলেন চারে। ২৫তম জন্মদিনে টস জিতে জুয়া খেললেন এলটন চিগুম্বুরা। গোমড়া আকাশের নিচে পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া জুয়া নয় তো কী!
আসল খেলাটা খেলল প্রকৃতি। দুই দফা বৃষ্টি, জিম্বাবুয়ে ইনিংসের ২৭.২ ওভার পর প্রথমবার। খেলা বন্ধ থাকল পৌনে দুই ঘণ্টা। ৪৩ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে বৃষ্টিতে আরেক দফা বন্ধ ৩৯.৪ ওভার পর। জিম্বাবুয়ের রান তখন ৭ উইকেটে ১৫১। এবার বন্ধ থাকল এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট, অনেক দিন পর ব্যাটের হাতটা খুঁজে পাওয়া চিগুম্বুরা আর ব্যাটিংয়েই নামতে পারলেন না। এই বিশ্বকাপে তাই প্রথমবার প্রয়োজন হলো ডাকওয়ার্থ-লুইস সাহেবদের আইনটার। লক্ষ্য ৩৮ ওভারে ১৬২, পাকিস্তান জিতেছে ৭ উইকেটে। নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার পর ‘এ’ গ্রুপ থেকে পাকিস্তানও নিশ্চিত করেছে কোয়ার্টার ফাইনাল। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম পার হলো গ্রুপ পর্ব।
সপ্তম ওয়ানডেতে এসে শিঙ্গিরাই মাসাকাদজার প্রথম মেডেন ওভার দিয়ে শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের রান তাড়া। দারুণ দুটো চারের পর আহমেদ শেহজাদের হঠাৎ খেয়াল হলো বলকে পাল্লেকেলে থেকে ক্যান্ডি শহরে পাঠানোর। চোখ-মুখ বুজে খেলা শট ব্যাটেই লাগল না, স্টাম্পিং। সম্ভাব্য শেষ সুযোগটাও হয়তো হারালেন শেহজাদ। আসাদ শফিক যেমন খেললেন, ছোটো আকমল ফিরলে শেহজাদের বাদ পড়া অনেকটা নিশ্চিতই বলা যায়। হাফিজের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে শফিকের ৮২ রানের জুটিতেই দূর হয়ে যায় অঘটনের শঙ্কা। হাফিজ ১ রানের জন্য না পারলেও বিশ্বকাপ অভিষেকে ফিফটি তুলে নিয়েছেন শফিক। ইউনুস খানকে নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন দলের জয়কে সঙ্গী করেই।
এক ম্যাচের ‘রেহমান-পরীক্ষা’ শেষে কাল আবার নতুন বল পেয়ে বিপজ্জনক ব্রেন্ডন টেলকে প্রথম ওভারে ফিরিয়েছেন রাজ্জাক। উমর গুলের সুইং-বাউন্সে থিতু হওয়ার সুযোগ পাননি রেজিস চাকাভা ও শন উইলিয়ামসের চোটের সুযোগে দলে আসা ভুসিমুজি সিবান্দা। ৩ উইকেটে ১৩—চিগুম্বুরার চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ার আশা ওখানেই শেষ।
লড়াইটা করতে পারলেন আসলে দুজন—ক্রেইগ আরভিন আর চিগুম্বুরা নিজে। বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন ড্রাইভ খেলে আরভিন তুলে নিয়েছেন বিশ্বকাপে দ্বিতীয় ফিফটি। তবে সতীর্থদের অনুসরণ করেই দৃষ্টিকটুভাবে আউট হলেন ফিফটি করেই। সাবেক অধিনায়ক প্রসপার উতসেয়াকে নিয়ে এরপর ইনিংসটাকে ধরে রেখেছিলেন চিগুম্বুরা। উতসেয়াকে আউট করে গুল এই জুটি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টি, জিম্বাবুয়ে ইনিংসও শেষ। ৩২ রানে অপরাজিত ছিলেন চিগুম্বুরা, ৩০ রানের একটা ইনিংস সর্বশেষ খেলেছিলেন ১১ ইনিংস আগে!

দুহাত ভরিয়ে দিল চট্টগ্রাম

৯৯ দিনের দুঃসহ জিম্মি দশা থেকে মুক্তির পর পরই বেলা সাড়ে ১২টার দিকে জাহান মণির কনিষ্ঠতম নাবিক ক্যাডেট শাহরিয়ার রাব্বির ফোন আসে মায়ের কাছে। বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন রাব্বি জানতে চান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খবর। মা বিলকিস রহমান তাঁকে আশ্বস্ত করেন, চট্টগ্রামে হল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ জিততে চলেছে। রাব্বি রাতেই হয়তো জেনে গেছেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাকিবও তাঁদের মুক্তিতে স্বস্তি পেয়েছেন।
চট্টগ্রামে হল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর সাকিব বলেন, ‘জাহান মণির ২৬ নাবিকের মুক্তি দারুণ একটা খবর।’
অসম্ভব এক সমীকরণ নিয়ে চট্টগ্রামে আসা সাকিব বাহিনী শতভাগ সাফল্য নিয়ে আজ ঢাকায় ফিরবেন। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ফিরবেন জাহান মণির মুক্ত নাবিকেরাও। নাবিক সদস্যদের পরিবারের মতো সাকিবও এখন অনেকটা নির্ভার ও স্বস্তিতে।
ঢাকায় ৫৮-র দুঃস্বপ্নের পর চট্টগ্রামে উষ্ণ সংবর্ধনা কিংবা মেয়রের দেওয়া নগরের চাবিটাই হয়তো তাঁদের অন্য রকম প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
ঢাকার তিন ম্যাচে জয় যেখানে মাত্র একটি, সেখানে চট্টগ্রামে সাফল্য শতভাগ। অথচ এই মাঠে বিশ্বকাপের ম্যাচ না-ও হতে পারত। বিশ্বকাপ সূচি হওয়ার আগে শোনা গিয়েছিল চট্টগ্রাম ম্যাচ না-ও পেতে পারে। তারপর শুরু হলো চাটগাঁবাসীর আন্দোলন, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
অভিষেক ম্যাচটি ছিল ক্রিকেট পরাশক্তি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সে ম্যাচে ২ উইকেটে জয়ের পর সাকিবরা ফিরে পেলেন নিজেদের। কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া সেই সমর্থকেরাই জানাল ফুলেল সম্ভাষণ।
গতকাল এই ভেন্যুর শেষ ম্যাচটি শেষ হওয়ার ঘণ্টা খানেক আগেই স্টেডিয়ামে সমর্থকদের মিছিল চলল, ‘জিতিব রে জিতিব বাংলাদেশ জিতিব, জয় বাংলা’ ইত্যাদি। জয় শেষে সেই মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো। খেলা দেখে বেরিয়ে যাওয়ার পথে কলেজছাত্রী শারমিন বললেন, ‘চট্টগ্রাম আসলেই লাকি গ্রাউন্ড। আমরা দুটি জয় উপহার দিলাম।’ শুধু দুটিই বা কেন, এখানে ১২ ফেব্রুয়ারি কানাডার সঙ্গে অনুশীলন ম্যাচেও জিতেছে বাংলাদেশ!
টুর্নামেন্টে চট্টগ্রামের উপহার দেওয়া এই দুটি জয়েই বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল সম্ভাবনাটা পেয়েছে বাস্তবভিত্তি।
আরেকটু পেছনে তাকান। ২০০৫ সালে এই চট্টগ্রামে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় নুরুল আবেদীন নোবেল সেই স্মৃতির জের টেনে বললেন, ‘চট্টগ্রাম বাংলাদেশ দলের জন্য সৌভাগ্যই বয়ে এনেছে। আমার মনে হয়, এখান থেকে জয়ের ধারায় ফিরেই কোয়ার্টার ফাইনালে যাবে তারা।’
যে চট্টগ্রাম বাংলাদেশ দলকে দুহাত ভরিয়ে দিল, কাল শেষ বিকেল থেকেই সেখানে একধরনের শূন্যতা এসে ভিড় করেছে। সহ-আয়োজক বলে দেশে বিশ্বকাপের বাঁশি বাজবে ২ এপ্রিল ফাইনাল পর্যন্ত। সরাসরি উৎসবের রেশ থাকবে ২৫ মার্চ তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত। কিন্তু সেই উৎসব তো হবে ঢাকায়। তাই চট্টগ্রামে বিশ্বকাপের মেলা ভেঙে গেল কাল বিকেলেই।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সতর্ক দক্ষিণ আফ্রিকা

এবারের বিশ্বকাপের মূল উত্তাপটা ছড়াচ্ছে মূলত ‘বি’ গ্রুপ থেকেই। ইতিমধ্যেই শ্বাসরুদ্ধকর বেশ কয়েকটি ম্যাচ উপহার দিয়ে ফেলেছে এই গ্রুপের দলগুলো। আর গ্রুপ পর্বের শেষ কয়েক দিনে অনেক জটিল হয়ে উঠেছে শেষ আটে যাওয়ার হিসাব-নিকাশ। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর বাংলাদেশের মধ্যে। ছেড়ে কথা বলছে না আয়ারল্যান্ডও। একমাত্র হল্যান্ড ছাড়া এ মুহূর্তে বাকি ছয়টা দলেরই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ভালোভাবেই। অন্তত কাগজে-কলমে তো বটেই।
আয়ারল্যান্ডকে অবশ্য এ মুহূর্তে হিসেবের বাইরেই রাখতে চাইবেন অনেকে। কিন্তু আইরিশদের সাম্প্রতিক পারফরমেন্স বিচারে কিন্তু কোনো ধরনের অঘটনের আশঙ্কাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আজ কলকাতার ইডেন গার্ডেনে তারা মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার। ফেভারিট ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্ন কেভিন ও’ব্রায়েনরা যেভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছেন তাতে আরেকটা অঘটনের স্বপ্ন তো আইরিশরা দেখতেই পারে। তার ওপরে আজ তারা হয়তো পাশে পাবে ইডেনের হাজার হাজার সমর্থককে। কারণ, প্রোটিয়াদের কাছে ভারতের শেষ মুহূর্তের হারের প্রতিশোধটা হয়তো ভারতের মানুষ আয়ারল্যান্ডকে সমর্থন জুগিয়েই নিতে চাইবে। সব মিলিয়ে আয়ারল্যান্ডকে একেবারেই হিসেবের বাইরে রাখাটা হয়তো খুব বেশি যুক্তিসংগত না-ও হতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ কুরি ভন জিলও কোনো ধরনের অঘটনের আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না। সে জন্য তিনি আজ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বেশ সতর্কই থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন গ্রায়েম স্মিথদের। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত তাদের পারফরমেন্স খুবই ভালো। তারা শুধু আমাদেরই না, সবাইকেই নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবিয়েছে। তাই আমরা জানি কাল আমাদের লড়াইটা মোটেই সহজ হবে না।’
আজ মাঠে নামার আগে দুই শিবিরেই ভর করেছে ইনজুরি দুশ্চিন্তা। দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিন ভরসা ইমরান তাহির বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলে চোট পেয়ে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারেননি। আজ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও তিনি খেলবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত না। প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্সও কলকাতায় নেমেই ছুটে গিয়েছিলেন চিকিত্সকের কাছে। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির আশঙ্কায় ভুগছেন এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড বোলিং আক্রমণের দুই প্রধান অস্ত্র আন্দ্রে বোথা ও ট্রেন্ট জন্সটনেরও আছে ইনজুরি সমস্যা। তবে এতে কোনো দলই খুব বেশি চাপের মধ্যে নেই বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

সুশাসনের স্বার্থেই আপস নয়: বিশ্বব্যাংক

উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থাগুলো থেকে সহায়তার অর্থ ছাড় করায় বিলম্ব হওয়ায় সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে সুশাসনের স্বার্থেই এই বিলম্বে বিশ্বব্যাংক চিন্তিত নয়। কেননা, বিশ্বব্যাংক করদাতাদের অর্থের সুরক্ষা চায়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানও সুদৃঢ়।
গতকাল রোববার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ কর্মকাণ্ডের ফলাফল পর্যালোচনাবিষয়ক অনুষ্ঠানে এই পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। বিশ্বব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
এতে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেন, করদাতাদের অর্থের মাধ্যমে সহযোগী দেশগুলোতে যে তহবিল ও সম্পদের সৃষ্টি হয়, বিশ্বব্যাংক চায় না তা দুর্নীতির মাধ্যমে লুট হয়ে যাক। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক একদমই আপস করবে না। আর তাই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রলম্বিত হলে বা পিছিয়ে পড়লেও সুশাসনের স্বার্থে বিশ্বব্যাংক চিন্তিত নয়।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের ২০১১-১৪ সময়কালের সহায়তা কৌশলের (কান্ট্রি অ্যাসিসট্যান্স স্ট্র্যাটেজি-ক্যাস) ওপর গতকাল ছয়টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন।
‘সিএএসের বাস্তবায়ন অগ্রগতি’ শীর্ষক প্রথম অধিবেশনে চেয়ারম্যান ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান। অ্যালেন গোল্ডস্টেইন এ সময় সিএএসের সার্বিক ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১১-১৪ সময়ে বাংলাদেশকে ১২০ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে এক বছরের সিএএস পর্যালোচনা অনুযায়ী অবকাঠামো, শিক্ষা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবা দেওয়া সম্পর্কিত প্রকল্পে বাংলাদেশ ভালো ফলাফল অর্জন করেছে। খারাপ করেছে সরকারি বিনিয়োগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্য খাতে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের ৩৫৭ কোটি ১০ লাখ ডলারের অর্থায়নে ২৭টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে ২১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার এখনো ছাড় করা হয়নি বলে প্রথম অধিবেশনে জানানো হয়।
দ্বিতীয় অধিবেশনে পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার, তৃতীয়টিতে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আব্দুস শহীদ, চতুর্থ অধিবেশনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পঞ্চমটিতে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং সমাপনী অধিবেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান।
প্রতিটি অধিবেশনের শুরুতেই বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি করে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবেরা তার ওপর আলোচনা করেন। উন্নয়ন-সহযোগীদের অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও সে তুলনায় প্রকৃত ছাড় নিয়ে কথা বলেন সচিবেরা।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের প্রধান আরও বলেন, বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক হতে চায় বিশ্বব্যাংক। তবে এ জন্য বাংলাদেশের দিক থেকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল—উভয় পর্যায়েই সুশাসনের নিশ্চয়তা দরকার। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে কোনো বাজেট সহায়তা দেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে চারটিকে সমস্যাকবলিত চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান গোল্ডস্টেইন। আর অর্থ ছাড়ে বিশ্বব্যাংকের শ্লথগতির কথাও স্বীকার করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আরও বলেন, সহযোগী দেশগুলোর প্রতি বিশ্বব্যাংকের জবাবদিহি রয়েছে। দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ধরনটাই এমন যে, একে অপরের প্রতি দায় রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহায়তা দেওয়ার ধরন অনেক পাল্টেছে। ১৯৭০ সালের দিকে যে রকম ছিল, বর্তমানে সম্পূর্ণ অন্য রকম।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নে বেশি জোর দিতে হবে এবং অবশ্যই তা উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সমানভাবে। আর এ জন্য পরিকল্পনা কমিশনের কাঠামো পরিবর্তনও জরুরি বলে অর্থমন্ত্রী মনে করেন।
তবে প্রকল্পের দুর্বল বাস্তবায়ন হারের জন্য উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থাগুলোর অর্থ ছাড়ের ঢিলেমিকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান। অভিযোগ এবং অভিযোগের তদন্তের জন্যও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রলম্বিত হয় বলে তিনি মনে করেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অর্থ ছাড়ের সঙ্গেও বাস্তবায়নের একটি সম্পর্ক রয়েছে। আবার যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে অসমাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে যায়, প্রকল্পজট তৈরি হয়। এতে জনগণ উপকৃত হয় না।
মসিউর রহমান বলেন, প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়াতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। তবে এও ঠিক যে, বাস্তবায়ন দক্ষতা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অর্জন করা কঠিন।
ইআরডি সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, প্রকল্প চলাকালীন অনেক ভুয়া অভিযোগও আসে। কিন্তু বোঝার উপায় থাকে না কোনগুলো ভুয়া। ঠিক অভিযোগ বোঝার জন্য বিশ্বব্যাংক একটি উপায় বাতলে দিতে পারে।
অর্থ ছাড়ে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে অবিশ্বাসের কোনো বিষয় আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘না, সে রকম কোনো ব্যাপার নেই।’
অধিবেশনগুলোতে সচিবদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ, ইআরডি সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বিদ্যুৎসচিব আবুল কালাম আজাদ, সেতু বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁঞা, পরিকল্পনাসচিব মনজুর হোসেন, পানিসম্পদ বিভাগের সচিব শেখ মো. ওয়াহিদউজ্জামান, কৃষিসচিব সি কিউ কে মুশতাক আহমেদ, স্বাস্থ্যসচিব হুমায়ুন কবীর, স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার, আইএমইডি সচিব হাবিব উল্যাহ মজুমদার প্রমুখ।

পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিলে অনিশ্চয়তা নেই

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ‘বাংলাদেশ ফান্ড’ গঠনে অনিশ্চয়তার কোনো অবকাশ নেই।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফায়েকুজ্জামান গতকাল রোববার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
একটি ওয়েবভিত্তিক সংবাদ সংস্থা গত শনিবার ‘পাঁচ হাজার কোটি টাকার ফান্ড গঠনে অনিশ্চয়তা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারবাজারের গতকালের বড় ধরনের দরপতনের পেছনে এ খবরটির একটি ভূমিকা রয়েছে।
এ ব্যাপারে প্রস্তাবিত তহবিলটির মূল উদ্যোক্তা হিসেবে আইসিবির অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফায়েকুজ্জামান বলেন, ‘ফান্ড গঠনের অনিশ্চতার যে খবরটি বাজারে ছিল, তা আদৌ সঠিক নয়। এটা বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তিনি বলেন, ফান্ডটি গঠনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
ফায়েকুজ্জামান জানান, ৯ মার্চ আইসিবির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ফান্ডটি অনুমোদন করা হয়েছে, যা সহ-উদ্যোক্তাদের ইতিমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সহ-উদ্যোক্তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সম্মতির পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) পাঠানো হবে। এসইসির অনুমোদনের পরপরই ফান্ডটি বাজারে আসবে।
তহবিলটি কার্যকর হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ না করে আইসিবির এমডি বলেন, সব আইনি ধাপ সম্পন্ন করে যত দূর সম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে এটি বাজারে নিয়ে আসা হবে।’
ফায়েকুজ্জামান আরও বলেন, সহ-উদ্যোক্তাদের অনেকেই আইসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। তাঁরা সবাই ফান্ডটি গঠনের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়ে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই।
আইসিবির এমডি বলেন, ‘আমরা ফান্ডটি উন্মুক্ত রেখেছি যাতে পরবর্তী সময়ে এখানে যে কেউ আসতে পারে।’
তহবিলটির মূল উদ্যোক্তা আইসিবি। সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছে সরকারি চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক (সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)।
তবে বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলে এ তহবিলে অংশ নিতে পারবে। এসইসির অনুমোদন পাওয়ার পরই এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে তহবিলে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হবে। এরই মধ্যে বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তহবিলটিতে ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাজার পরিস্থিতি: এক দিন আগেও যেখানে বিক্রেতাশূন্য ছিল, সেখানে গতকাল ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে দেশের শেয়ারবাজার। এতে একপর্যায়ে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন এক রকম বন্ধ হয়ে যায়।
টানা ছয় দিন ধরে বাড়ার পর গতকাল দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ৪৫৯ পয়েন্ট বা প্রায় ৭ শতাংশ কমে ছয় হাজার ১৭৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক এক হাজার ৩০০ পয়েন্ট কমে ১৭ হাজার ৩৯৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিন অব্যাহতভাবে দর বাড়ার কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে এমনিতেই মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। এতে অন্য দিনগুলোর চেয়ে বাজারে কিছুটা বিক্রির চাপ বেশি থাকা স্বাভাবিক। আর বাংলাদেশ ফান্ড গঠনের অনিশ্চয়তার খবরটি দরপতনকে ত্বরান্বিত করেছে।

শেষ আটে উঠে গেল নিউজিল্যান্ড

৪-০, ৫-০ ও ৩-২—বিশ্বকাপে আসার আগে তিনটি সিরিজে নিউজিল্যান্ডের হারের খতিয়ান। পরাজয় তিনটি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে। এই নিউজিল্যান্ডই বিশ্বকাপে এসে বদলে গেছে। কাল কানাডাকে ৯৭ রানে হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপ থেকে শ্রীলঙ্কার পর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে কিউইরা।
কানাডার বিপক্ষে নিউজিল্যান্ড জিতবে এবং সেটা বড় ব্যবধানে, এটাই ছিল অনুমিত। ম্যাচের আগে কানাডা অধিনায়ক আশিস বাগাই অবশ্য হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, নিউজিল্যান্ডের বাজে ফর্মের সুযোগ নেবেন। সুযোগ-টুযোগ তাঁরা নিতে পারেননি। বরং যাঁর ফর্ম নিয়ে নিউজিল্যান্ড শিবিরে সবচেয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, সেই ব্রেন্ডন ম্যাককালাম রানে ফিরেছেন।
বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডের মতোই লেজেগোবরে অবস্থা ছিল দলের অন্যতম ভরসা ব্রেন্ডন ম্যাককালামের। গত বছর অক্টোবরে ঢাকায় বাংলাদেশের বিপক্ষে ফিফটি করার পরের ১০টি ইনিংসে তাঁর সর্বোচ্চ রান ছিল ৪২। বিশ্বকাপের শুরুতেও ফিরে পাননি ছন্দ। প্রথম দুই ম্যাচে করেছেন ৪২ রান। আহমেদাবাদে তৃতীয় ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ৭৬ রান করলেও পরের ম্যাচে আবার পাকিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ৬।
তবে কাল তাঁর ব্যাট হাসল। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি করে দলকে তুলেছেন রানের পাহাড়ে। কানাডাকে ভুগিয়েছেন পাকিস্তানকে ডোবানো রস টেলরও। ড্যানিয়েল ভেট্টোরি না থাকায় এই ম্যাচের নেতৃত্ব দিয়েছেন টেলর। কাল ৩০তম ওভারে নেমে ৪১তম ওভারে বালাজি রাওয়ের লেগ স্পিনে আউট হয়েছেন। এর আগে ৪৪ বলে খেলেছেন ৭৪ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংস। ম্যাককালাম-টেলরদের কল্যাণেই ৬ উইকেটে ৩৫৮ রান তুলতে পারে নিউজিল্যান্ড।
কানাডার ইনিংস শুরুর আগে আলোচনা ছিল একটাই—নিউজিল্য্যান্ডের রানের পাহাড়ে চাপা পড়তে যাচ্ছে বাগাই-বাহিনী! ৯৭ রানের পরাজয়কে বড়ই বলতে হবে। তবে অনেকেই যে এর চেয়েও বেশি ভেবেছিল! সেটা হয়নি, বরং ৯ উইকেটে ২৬১ রান করে কানাডা গড়ে বিশ্বকাপে নিজেদের সবচেয়ে বড় রানের ইনিংস।
শুরুটা অবশ্য অশনিসংকেতই দিচ্ছিল। ৪ রানে পড়ে গিয়েছিল ২ উইকেট। তবে বাগাই আর জিমি হান্সরা তৃতীয় উইকেটে ১২৫ রান তুলে বিপর্যয় রোখেন। ৮৭ বলে ৮৪ রানের ইনিংস খেলেছেন বাগাই। আর হান্সরা অপরাজিত থেকে যান ৭০ রানে। বোলিংয়েও একটি প্রাপ্তি আছে নিউজিল্যান্ডের। ভালো বোলিং করেছেন জ্যাকব ওরাম। ছন্দ ফিরে পাওয়া ওরাম ১০ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট।

বন্ধু তুমি, শত্রু তুমি

আজ সাকিব আল হাসানের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হতে পারে। বিশ্বকাপে এই প্রথম হয়তো কোনো ‘সতীর্থে’র বিপক্ষে বল করবেন। না, বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান নয়; সাকিবের বলের মুখোমুখি হতে পারেন অ্যালেক্সি কারভেজি। ২১ বছর বয়সী এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান সাকিবের ইংলিশ কাউন্টি উস্টারশায়ারের সতীর্থ।
সাকিবকে এ ম্যাচেই মুখোমুখি হতে হবে আগামী আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে যাওয়া ডাচ দলের সবচেয়ে বড় তারকা রায়ান টেন ডেসকাটেরও। কারভেজির সঙ্গে অবশ্য ৮টি কাউন্টি ম্যাচ খেলেছেন সাকিব। উস্টারশায়ারকে কাউন্টির প্রথম বিভাগে ওঠাতে ব্যাট হাতে কারভেজি যেমন, তেমননি ভূমিকা রেখেছিলেন অলরাউন্ডার সাকিবও। কারভেজি ৩০ ইনিংসে ১১৯০ রান করেছিলেন ৪৪.০৭ গড়ে, যার মধ্যে ছিল ৩টি সেঞ্চুরি ও ৬টি ফিফটি।
বাংলাদেশ দলের হয়ে যুক্তরাজ্য সফর শেষে উস্টারের যোগ দেওয়া সাকিব ৮টি কাউন্টি ম্যাচে ২৫.৫৭ গড়ে ৩৫৮ রান করেছেন, উইকেট নিয়েছেন ৩৫টি। সাকিব ও কারভেজির একসঙ্গে খেলা আট ম্যাচের তিনটিতেই জিতেছিল উস্টার। সারের বিপক্ষে ২৩৮ রানে জেতা ম্যাচটিতে ৬২ ও ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে ৫৮ রানের জুটিও গড়েছিলেন তাঁরা।
আজ যিনি সাকিবদের সঙ্গে আছেন, সেই ইয়ান পন্ট গত বিশ্বকাপে ছিলেন হল্যান্ডের বোলিং কোচ। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কাউন্টিতে খেলতে আসা কারভেজির মধ্যে গ্রায়েম হিকের ছায়া দেখেছিলেন এই পন্টই। মাত্র ২১ বছর বয়সেই দুটি বিশ্বকাপ খেলে ফেলা কারভেজির স্বপ্ন ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা। আগামী নভেম্বরে ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলার আইনি যোগ্যতা অর্জন করবেন। গত জুলাইয়ে গ্লাসগোতে বাংলাদেশকে হারানো ম্যাচটির পুনরাবৃত্তির স্বপ্ন দেখা কারভেজি বিশ্বকাপে ডাচ দলের লক্ষ্য সম্পর্কে ‘ক্রিকইনফো’কে বলেছিলেন, ‘আমরা পরবর্তী পর্বে যেতে চাই। এটা খুবই সম্ভব, আমাদের আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে জিততে হবে, বাংলাদেশকে আবারও হারাতে হবে ও অন্য যেকোনো বড় দলের বিপক্ষে ঘটাতে হবে অঘটন।’
বিশ্বকাপে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। সাকিবের কাছে তাই মাঠে কোনো বন্ধুত্বের দাবি থাকবে না কারভেজির।

বোরেন-ডেসকাটদের অন্য লড়াই

হল্যান্ডের বিশ্বকাপটা তাহলে আজই শুরু হচ্ছে! ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডের গ্রুপ থেকে শেষ আটে যাওয়ার চিন্তা করা তাদের জন্য ছিল বিলাসিতা। বিশ্বকাপে ডাচদের লক্ষ্য তাই সুযোগসন্ধানী হয়ে বসে থাকা। ঝোপ বুঝে কোপ মেরে যদি একটি-দুটি জয় তুলে নেওয়া যায়!
অঘটন ঘটতেই পারে, তবে বাস্তবতা চিন্তা করলে গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচই তাদের জন্য হতে পারে ঝোপ বুঝে কোপ মারার সেরা সুযোগ। চট্টগ্রামে আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা, এরপর ১৮ মার্চ কলকাতায় আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। গ্রুপের অন্য দলগুলোর চেয়ে এই দুই দলের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখাটাই বেশি বাস্তবসম্মত ডাচদের জন্য।
তা ডাচরা সে স্বপ্ন দেখছেও। অধিনায়ক পিটার বোরেন কাল সংবাদ সম্মেলনে শোনালেন সেই আশার কথাই, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আমরা ভালো খেলেছি এবং আমার মনে হয় ভারতের বিপক্ষেও খারাপ খেলিনি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পারফরম্যান্সটা ছিল হতাশাজনক। এখন শেষ দুটি ম্যাচ জিততে পারলেই খুশি হব।’
আজকের ম্যাচে ডাচদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে চট্টগ্রামের উইকেট। এমন কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা যে দলটার নেই বললেই চলে! টেলিভিশনে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচটা দেখলেও কালকের ম্যাচের আগে বোরেনও মানছেন চ্যালেঞ্জটা, ‘বাংলাদেশের বিপক্ষে আমরা একটা ম্যাচই খেলেছি। গত বছর গ্লাসগোতে সেই ম্যাচে জিতেছিও আমরা। তবে এখানকার কন্ডিশন একদমই ভিন্ন। মন্থর উইকেটে স্পিনারদের খেলার যে অনুশীলনটা এতদিন করে আসছি আমরা, কাল (আজ) সেটারই চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে।’
ডাচ অলরাউন্ডার রায়ান টেন ডেসকাটের জন্যও আজকের ম্যাচ একটা পরীক্ষা। কন্ডিশন জয় করার চ্যালেঞ্জ তো আছেই, আছে ছোট দলের বড় খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদও। ‘প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি করার পর দু-তিন ম্যাচে বাজেভাবে উইকেট দিয়ে এসেছি। তবে এই ম্যাচে ভালো করার ব্যাপারে আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী’—বলেছেন আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর বর্ষসেরা ক্রিকেটার ডেসকাট। প্রতিপক্ষ হিসেবে বড় মানলেও বাংলাদেশের অধারাবাহিক পারফরম্যান্সকে পুঁজি করতে চান তিনি, ‘ভালো দল হলেও তাদের সময়টা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের জেতার সুযোগ আছে।’
ডেসকাট যদি ছোট দলের বড় ক্রিকেটার হন, বাস জুইডারেন্ট অনভিজ্ঞ হল্যান্ডের অভিজ্ঞতম ক্রিকেটার। এ নিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছেন, হল্যান্ডের পক্ষে অর্ধশতাধিক (৫৭টি) ওয়ানডে খেলা একমাত্র ক্রিকেটারও এই জুইডারেন্ট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা সত্ত্ব্বেও একটা আফসোস আছে এই মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যানের। আফসোসের সঙ্গে মিশে আছে বিশ্বকাপে হল্যান্ডের হতাশাও, ‘বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণ, আমরা বড় দলগুলোর সঙ্গে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাই না। পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের বিপক্ষে আমরা সর্বশেষ ম্যাচটা খেলেছি গত বছর এই বাংলাদেশের বিপক্ষেই। তার আগের ম্যাচটা খেলেছি সম্ভবত আরও দুই বছর আগে।’
হল্যান্ডের মতো দলগুলোর জন্য আরও বড় দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে আইসিসির ছোট দলগুলোকে বিশ্বকাপের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত। জুইডারেন্ট প্রতিবাদই করলেন এমন সিদ্ধান্তের, ‘এটা খুবই লজ্জাজনক। সব দেশের মতো আমরাও বিশ্বকাপে খেলতে চাই। একসময় বাংলাদেশকেও বিশ্বকাপে খেলার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। আইসিসি যদি আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আফগানিস্তানের মতো দলগুলোকে বিশ্বকাপে খেলতে না দেয়, সেটা হবে হতাশাজনক।’
শুধু মুখে বলে নয়, বাংলাদেশকে হারিয়ে মাঠেও আইসিসির সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় হল্যান্ড। অধিনায়ক বোরেন আজকের ম্যাচে সেটা করে দেখানোর খুব ভালো সম্ভাবনা দেখছেন। ডেসকাটের মতো তিনিও মনে করেন, বাংলাদেশের অধারাবাহিক পারফরম্যান্সটাই প্লাস পয়েন্ট তাদের জন্য, ‘বাংলাদেশকে হারাতে পারলে সেটা হবে আপসেট। আয়ারল্যান্ডের কথা জানি না, তবে বাংলাদেশ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা অবশ্যই চাইব তাদের উৎসব মাটি করতে।’
ফুটবল আর হকির দেশ হল্যান্ডে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা নেই বললেই চলে। বিশ্বকাপ থেকে ভালো কিছু নিয়ে ফিরতে পারলে হয়তো কিছু মানুষ ফিরে তাকাবে ক্রিকেটের দিকে। ক্রুইফ-ফন বাস্তেনদের মতো বিশ্বতারকা না হতে পারেন, দেশের মানুষ তো অন্তত চিনবে তাঁদের!

পুরস্কার পেলেন ওরিয়ন-প্রথম আলো কুইজের বিজয়ীরা

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের উন্মাদনার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রথম আলো কুইজ প্রতিযোগিতা। আজ সোমবার ওরিয়ন-প্রথম আলো বিশ্বকাপ কুইজের প্রথম পর্বের পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে নকিয়া মোবাইল ফোনসেট ও স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব তুলে দেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার ও ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম।
অনুষ্ঠানে হাবিবুল বাশার বলেন, ‘বিশ্বকাপের শুরুর সময় অনেকেই শুধু হল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলেন। যে কারণে ওয়েস্ট উইন্ডিজের কাছে হারার পর আমাদের ক্রিকেটারদের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি, আমাদের সামর্থ্য আরও অনেক বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার জন্য প্রার্থনা করব যেন ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারে। কিন্তু বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাবে এই আশাও ছাড়ছি না।’
ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম প্রথম আলোর এই কুইজ আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘ক্রিকেট আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় স্পোর্টিং ইভেন্ট। আমরা এই বিশ্বকাপ কুইজ আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে খুবই খুশি।’ ভবিষ্যতেও প্রথম আলোর এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর যুগ্ম বার্তা সম্পাদক সেলিম খান।

পা মাটিতেই রাখছেন সিডন্স

ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে যদি ইংল্যান্ড জিতে যায়? কিংবা বাংলাদেশ যদি আজ হল্যান্ডকে হারিয়ে ১৯ মার্চ হারিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকাকেও! কাল্পনিক সমীকরণ মিলিয়ে বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার স্বপ্ন দেখাই যায়। তবে জেমি সিডন্স এসব হিসাবের ফাঁদে পড়তে চান না। ইংল্যান্ডকে হারানোর পর হল্যান্ডকে সামনে পেয়েও মাটিতেই পা রাখছেন বাংলাদেশের কোচ।
কাল সংবাদ সম্মেলনে প্রথম প্রশ্নটাই হলো বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল সম্ভাবনা নিয়ে। সিডন্স কোনো স্বপ্নই দেখালেন না, ‘ইংল্যান্ড যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারে...সে অনেক পরের কথা। আবার ইংল্যান্ড যদি জেতে আমাদের শুধু কালকের (আজ) ম্যাচ জিতলেই হবে না, বাকি ম্যাচটাও জিততে হবে। নয়তো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া।’ পরশু ভারতকে হারানো দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ জেতাটাও মোটেই সহজ মনে করছেন না কোচ, ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো কঠিন। আমি এখানে বসেই বলে দিতে পারি না যে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আমরা জিতব। পরের ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতলে আমাদের শুধু হল্যান্ডের বিপক্ষেই জিতলে হবে না, শেষ ম্যাচটাও জিততে হবে।’
পরিস্থিতি যখন এই, আগে থেকে বড় কোনো স্বপ্ন না দেখিয়ে কোচ হাঁটতে চান পুরোনো পথে, ম্যাচ ধরে ধরে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের আত্মতৃপ্তিতে তিনি বুঁদ নন। তাঁর চোখে এখন কেবলই আজকের ম্যাচ। বিশ্বকাপটাকে কোচের দৃষ্টিতে দেখারই চেষ্টা করছে দলের সব খেলোয়াড়ই। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান আগেই বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কী করতে হবে সেটা পরের কথা, আগে জিততে হবে হল্যান্ড ম্যাচ।
কথা ঠিক। কিন্তু ইংল্যান্ড ম্যাচটা কি চাইলেই ভুলে থাকা যায়? বিশেষ করে ওই ম্যাচের জয়টা যখন হতে পারে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সবচেয়ে বড় টনিক! ব্যাটসম্যানদের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কোচ নিজেও তো বলছেন, ‘আমাদের বোলাররা ভালো করছে। ব্যাটসম্যানরাও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী একটা দলের বিপক্ষে জয়ে বড় ভূমিকা রাখল। ভুলে গেলে হবে না, ইংল্যান্ডের এই দলটাই ভারতের সঙ্গে টাই করেছে, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে আর আমরা হারিয়েছি তাদের। এই জয় আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।’ তা ছাড়া ‘ক্লোজ’ ম্যাচগুলোতেও যে বাংলাদেশ এখন স্নায়ুর যুদ্ধে জিততে পারছে, সেটির ধারাবাহিকতাও তো ধরে রাখা গেল ইংল্যান্ড ম্যাচে! সিডন্স তো বলছেন, এটা বাংলাদেশ দলের চরিত্রেরই অংশ হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
হল্যান্ড ছোট দল হলেও আজকের ম্যাচের আগে অন্তত পরিসংখ্যানের পাতায় তারাই এগিয়ে। বাংলাদেশ-হল্যান্ড আন্তর্জাতিক ওয়ানডে এর আগে হয়েছে একটাই এবং তাতে জিতেছিল হল্যান্ড। গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য সফরের অংশ হিসেবে গ্লাসগোতে হওয়া দুই দলের একমাত্র ম্যাচে ৬ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। সেই স্মৃতি থেকেই কাল হল্যান্ডকে ‘বিপজ্জনক’ দল বললেন সিডন্স, ‘সর্বশেষ ম্যাচে ওরা আমাদের হারিয়ে দিয়েছিল। দলটা বিপজ্জনক। তবে ওই ম্যাচের দৈর্ঘ্য অনেক কমিয়ে (৩০ ওভার) আনা হয়েছিল। আমরা ২০০ (১৯৯) রান করেছিলাম, তারা সম্ভবত শেষ ওভারে ম্যাচ জিতেছিল। দলটা আসলেই বিপজ্জনক। তাদের সমীহ করতে হবে, হারাতে হলে ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে।’
হল্যান্ড ম্যাচের প্রস্তুতি সাকিবের দল মাঠে যেমন নিয়েছে, নিয়েছে মাঠের বাইরেও। অনুশীলনের বাইরে অনেকটা সময়ই কেটেছে ডাচ খেলোয়াড়দের ভিডিও ফুটেজ দেখে। তার পরও যদি কোনো কিছু বাদ থেকে যায় সেই ভয়ে কাল বিকেলে টিম হোটেলে আরেকবার বসা হয়েছিল টেলিভিশনের সামনে। ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ দল থেকে যে দু-একজন ‘টার্গেট প্লেয়ার’ খুঁজে বের করা হয়, এবার সেটিও করা হচ্ছে মূলত ভিডিও ফুটেজ দেখেই। আজকের ম্যাচে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা যেমন সাবধানী হয়ে খেলবেন বাঁহাতি স্পিনার পিটার সিলারের বল, বোলাররা আটকে রাখতে চাইবেন টম কুপার ও রায়ান টেন ডেসকাটকে।
ক্রিকেটে চাপ-টাপ জাতীয় জিনিসগুলো বড় দলের চেয়ে ছোট দলের বিপক্ষেই বেশি থাকে। তবে এই চাপটাকে উড়িয়ে দিতে সিডন্স উল্টো দেখালেন পরিসংখ্যানের পাতা, ‘জেতার প্রত্যাশা থাকলে চাপটা সব সময়ই বেশি থাকে। সহযোগী দেশগুলোর বিপক্ষে খেলার সময় এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ছোট দলগুলোর বিপক্ষে আমাদের রেকর্ড খুব ভালো। আমরা আয়ারল্যান্ডকে হারিয়েছি এবং মাত্রই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ একটা ম্যাচ জিতলাম। এ ম্যাচ জেতার ব্যাপারেও আমরা আত্মবিশ্বাসী।’
ম্যাচের আগে কোচের মুখে আশা-জাগানিয়া কথাই থাকে। তবে হল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে অন্তত বাংলাদেশের কোচ এসব কথা বিশ্বাস করেই বলবেন নিশ্চয়ই। পরিসংখ্যানে ডাচরা যতই এগিয়ে থাকুক, আজকের ছোটদের ম্যাচটার বড় দল তো বাংলাদেশই!