Sunday, May 5, 2019

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৮ মামলা : জামিন নিতে হবে আরো চারটিতে by হাবিবুর রহমান

কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং মানহানির দু’টি মামলায় জামিন নেয়া বাকি রয়েছে। এ ছাড়া অন্য সব মামলায় তিনি জামিনে আছেন। তবে মানহানির অভিযোগে দায়ের করা দু’টি মামলা জামিনযোগ্য হওয়ায় মূলত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলে তিনি কারামুক্তি পেতে পারেন বলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
গত ৩০ এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া সাজা বাতিল ও খালাস চেয়ে বেগম খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করে অর্থদণ্ড স্থগিত ও সম্পত্তি জব্দের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থার নির্দেশ দেন আদালত। তবে মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করেননি হাইকোর্ট। জামিনের আবেদনটি নথিভুক্ত করে দুই মাসের মধ্যে মামলার নথি তলব করা হয়। নথি পাওয়ার পর জামিন আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করবেন বলে জানান আদালত। জামিনের বিষয়ে আদালত বলেন, সাত বছরের সাজার মামলায় আমরা জামিন দেই না, তা না। যেহেতু অন্য একটি মামলায় উচ্চতর আদালত সাজা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ওই মামলায় জামিন না হলে তিনি মুক্তি পাবেন না। ফলে বিষয়টি জরুরি দেখছি না। মামলার নথি আসুক, তখন জামিনের আবেদনটি দেখা হবে। এ মামলায় রেকর্ড না দেখে বেইল (জামিন) দিচ্ছি না।
অন্য দিকে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন এবং একই সাথে তার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এই আপিল আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলায় নিম্ন আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। এরপর হাইকোর্ট খালাস চেয়ে খালেদা জিয়ার আপিল খারিজ করেন এবং দুদকের আপিল গ্রহণ করে খালেদা জিয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। এই রায় বাতিল ও খালাস চেয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন করেন।
আর বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্য করার পর দু’টি মানহানি মামলা করা হয়। এই মামলা দু’টি ঢাকা সিএমএম কোর্টে রয়েছে। এই মামলায় আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় ওয়ারেন্ট দেয়া হলেও এখনো তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। যেহেতু এই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি সেহেতু জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জামিন নিয়ে বের হয়ে তিনি এই মামলায় জামিন নিতে পারবেন বলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমি প্রথম থেকে বলে আসছি, বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়া হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। সেখানে সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল। আমরা যতই বলি না কেন আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি জামিনে মুক্ত হবেন এটা একটা অবাস্তব কথা। যে পর্যন্ত না সরকারের সদিচ্ছা হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় বর্তমানে আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থার যে অবস্থা। কারণ একটি মামলায় আমরা জামিন নেবো, তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দেয়া হবে। এইভাবে তার কারাজীবন দীর্ঘায়িত করা হবে। তাই আমরা আশা করছিÑ যেহেতু জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি, সাধারণত সাত বছরের সাজায় আপিল গ্রহণের তারিখে জামিন দেয়া হয়, বিশেষ করে এই মামলায় যে ধারায় সাজা হয়েছে সে ধারায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর অথবা জরিমানা, তাই তাকে সাজা না দিয়ে যদি ফাইন করা হতো, তা স্থগিত হতো। তারপরও তাকে জামিন দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি জামিন না দিলে কল ফর রেকর্ড বা নথি তলব করা হয়; কিন্তু কল ফর রেকর্ডের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময় দেয়া হয় না। আসামিপক্ষ চেষ্টা করলে সাত দিনের মধ্যে নথি আসতে পারে। এখানে দুই মাস নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো। তার অর্থ দুই মাসের মধ্যে আর আমরা জামিনের আবেদন করতে পারব না এবং এই দুই মাসের পর আর কত দিন লাগবে রেকর্ড আসতে সেটাও আমাদের দেখতে হবে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যে কেসে যেভাবে তাকে রাখা হয়েছে, আইনের বিধান মোতাবেক আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আসামি যদি মহিলা হয়, অসুস্থ হয়, বয়স্ক হয়, সেখানে জামিনের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা করা হয়; কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাও করা হয়নি। অর্থাৎ যে পর্যন্ত না সরকার ইচ্ছা করবেন যে তাকে মুক্তি দেয়া হবে তখনই তিনি মুক্তি পাবেন। আমি আবারো বলছি, সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি বের হতে পারবেন না। আমার আশা ছিল কয়েকজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য পার্লামেন্টে যোগ দিলেন। আমরা ভেবেছিলাম হয়তোবা ম্যাডামের জামিনের ব্যাপারে এবং বাংলাদেশে হাজার হাজার বিএনপি নেতাকর্মী যেভাবে মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় নির্যাতিত হচ্ছেন, কিছু জেলে আছেন, কিছু দিনের পর দিন কোর্টের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন সে ব্যাপারে হয়তোবা কিছু একটা হবে। কিন্তু ৩০ তারিখে বেগম খালেদা জিয়াকে যখন জামিন দেয়া হলো না; আমরা সে থেকে বিস্মিত হয়েছি। কী করে এটা সম্ভব হলো? তাই আবারো বলছি, প্রথম থেকে বলছি; যে যাই বলুক না কেন, যে পর্যন্ত না সরকারের সদিচ্ছা হবে, সরকার ইচ্ছা করবেন তাকে মুক্তি দিতে; তত দিন তিনি মুক্তি পাবেন না। কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি জেল থেকে বের হতে পারবেন না। কেন না আমাদের বিচারব্যবস্থা, একটা করুণ অবস্থা, সেখানে মুখ দেখে জামিন দেয়া হয় এবং অবস্থা বুঝে জামিন দেয়া হয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, বেগম খালেদা জিয়া তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৩৮ মামলার চারটি ছাড়া সব মামলায় জামিনে আছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে মানহানির দু’টি মামলায় জামিন আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এই দুই মামলায় জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করা হচ্ছে না। মানহানির এই দু’টি মামলা করেন জননেত্রী পরিষদের এ বি সিদ্দিকী। মামলা দু’টির আদেশের বিরুদ্ধে অচিরেই হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হবে। আশাকরি তিনি জামিন পাবেন।
এ বিষয়ে বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে ৩৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি ঢাকায় দু’টি মানহানি মামলা করা হয়েছে। এ দু’টি জামিনযোগ্য। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তার জামিন নিতে হবে। তিনি বলেন, জামিন পাওয়ার জন্য যে শর্তগুলো প্রয়োজন, খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সব শর্ত পূরণ হয়ে যায়। কারণ তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ৭৩ বছর বয়স্ক একজন অসুস্থ মহিলা। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। জামিনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, তারপরও উনাকে জামিন না দিয়ে অবিচার করা হচ্ছে। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আদালতের মাধ্যমেই তিনি জামিন পাবেন। মহামান্য আদালত বিষয়গুলো বিবেচনা করে উনার প্রতি ন্যায়বিচার করবেন। খালেদা জিয়া আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আশাকরি শিগগিরই তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।

প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কার হামলাকারীরা!

শ্রীলঙ্কায় ২১ এপ্রিলের সিরিজ বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িতরা প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে গিয়েছিল। বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মহেশ সেনানায়েকে। তিনি বলেন, সম্ভবত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রশিক্ষণ নিতে হামলাকারীরা ভারতের কাশ্মির, কেরালা ও বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিল। তবে তাদের সেখানে যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে লঙ্কান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত নয়।
হামলার ব্যাপারে ভারতের গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও কেন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? বিবিসি-র এমন প্রশ্নের উত্তরে সেনাপ্রধান বলেন, শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে বোঝাপড়ায় হয়তো একটা ফাঁক ছিল। এটি এখন সবারই জানা বিষয়।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মহেশ সেনানায়েকে বলেন, শ্রীলঙ্কায় সবাই স্বাধীন। গত ১০ বছরে সেখানে বড় ধরনের কোনও হিংসা বা হানাহানির ঘটনা ঘটেনি। শান্তিপূর্ণ দেশ হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়েও মানুষের মধ্যে খুব একটা চিন্তা ছিল না।
২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ইস্টার সানডে উদযাপনকালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ও তার আশপাশের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলসহ আটটি স্থানে বিস্ফোরক দিয়ে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় নিহত হন ২৫৩ জন। ভারত ও শ্রীলঙ্কার সরকারি সূত্রের বরাত রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার মাত্র দুই ঘণ্টা আগেই লঙ্কান কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। এর আগে গত ৪ এপ্রিল ও ২০ এপ্রিল রাতেও দুই দফায় লঙ্কান গোয়েন্দাদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দিল্লি।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম এএফপি’র হাতে পাওয়া নথি অনুযায়ী, গির্জায় হামলার ব্যাপারে শ্রীলঙ্কার পুলিশকে আগেই সতর্ক করেছিল 'একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা'। ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল পুলিশ প্রধান পুজুথ জয়াসুনদারা দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এ সংক্রান্ত গোয়েন্দা সতর্কতা পাঠান। এতে বলা হয়, 'একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) প্রখ্যাত চার্চ এবং কলম্বোয় ভারতীয় হাইকমিশন লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে।' গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। এক পর্যায়ে সিরিসেনা জানান, পুলিশের কাছে আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টকে জানানো হয়নি। হামলার গোয়েন্দা তথ্য গোপন করায় প্রতিরক্ষা সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দো এবং পুলিশ প্রধান পুজিথ জয়াসুন্দরাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন সিরিসেনা।

৩ পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বেশি by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। সীমান্তবর্তী, পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত হওয়ায় এখানে ম্যালেরিয়ার আক্রান্তের সংখ্যা অধিক। আয়তনের দিক থেকে বড় জেলা রাঙ্গামাটিতে ম্যালেরিয়া রোগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু মৃত্যুহার বাঙালিদের মধ্যে বেশি। আক্রান্তের দিক থেকে নারীদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া অধিক পরিমাণ ম্যালেরিয়ার ওষুধ (অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক) গ্রহণের ফলে রোগীরা সুস্থ হওয়ার পর হালকা করে হলেও মানসিক বিকৃতিসহ অন্যান্য রোগ দেখা দেয়। গত ১৯ ও ২০শে এপ্রিল রাঙ্গামাটি সদর ও কাপ্তাই উপজেলায় সরজমিন বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও এনজিও কর্মীদের উপস্থিতিতে ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত অ্যাডভোকেসি সভায় এসব তথ্য জানান সংশিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এ সভার আয়োজন করে।
ম্যালেরিয়ায় রাঙ্গামাটির পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন রাঙ্গামাটির ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. এন্ড্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, সবচেয়ে ম্যালেরিয়াপ্রবণ জেলা রাঙ্গামাটিতে গত ৩ বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ২০০২ সালে এই জেলায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৪৩ জন মৃত্যুবরণ করে। ১০ বছর পর ২০১২ সালে মৃত্যু হয় এক জনের। ২০১৩ সালে ২ জন ও ২০১৬ সালে ১ জনের মৃত্যু হলেও ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কোনো মৃতের ঘটনা ঘটেনি।  ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলার ১০টি উপজেলায় ২০১৮ সালে ৩ হাজার ১৪ আক্রান্ত হন। এর মধ্যে বিলাইছড়ি উপজেলায় ৯২৬ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ৩১ শতাংশ বিলাইছড়িতে। এরপর বাঘাইছড়িতে ২৭ শতাংশ, জুরাছড়িতে ১৭ শতাংশ এবং বরকলে ৯ শতাংশ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়।
যেখানে ২০১৭ সালে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজার ২৮৭জন। অন্যদিকে ২০১৮ সালে আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে কম রয়েছে সদর উপজেলা। এখানে মাত্র ২৫ জন ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩ জনে। আক্রান্তের দিক থেকে নারীদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। ২০১৭ সালে রাঙামাটিতে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল ৪ হাজার ৯৫০ জন পুরুষ। একই সময়ে নারী আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৩৭। এছাড়া বয়সের দিক থেকে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বদের আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে এ বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছিল ৪ হাজার ৫৯৩ জন। ২০১৮ সালে ১ হাজার ৮৭৯ জন। রাঙামাটি জেলায় ১ বছরের নিচে শিশুদের আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম। ২০১৭ সালে আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র ১৬ জন। ২০১৮ সালে ১৪ জনে নেমে এসেছিলো। ২০১৮ সালে পুরুষ আক্রান্ত হয় এক হাজার ৮৮০ জন, নারী আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১১৩ জন। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার ১০টি উপজেলার ৪৯টি ইউনিয়নে এক হাজার ৫৫৫টি গ্রামে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার ক্রমান্বয়ে কমছে।
কাপ্তাই উপজেলার চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন নিজের ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, আগে ম্যালেরিয়ার ওষুধ জনমনে একটা আতঙ্কের বিষয় ছিল। কেননা ৪টা ইনজেকশন শেষ করে আবার ২১টা ট্যাবলেট খাওয়া লাগতো। যা খেতে অনেক তেতো ছিল এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ছিল। তাই জ্বর আসলেও চিকিৎসা নিতে চাইতো না। এমনকি মানুষ ম্যালেরিয়ার ফলে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে মারা যেত। বর্তমানে যে ওষুধটা আছে সেটার তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া না থাকলেও অনেকবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবার কারণে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।
তিনি নিজেও  কমপক্ষে ১০ বার ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। এখানে ম্যালেরিয়া হয়নি এমন লোক পাওয়া খুব দুষ্কর। ওষুধের ফলে মানুষের মস্তিষ্ক আগের মতো কাজ করে না। তাছাড়া আরো অন্যান্য রোগেও ভুগতে দেখা যায় তাদের। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে এটাকে নির্মূল করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হওয়ার কারণে তাদের ম্যালেরিয়া কম হয় উল্লেখ করে দিলদার হোসেন বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের শারীরিক গঠন অনুসারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম বেশি শক্তিশালী। তাই তাদের ম্যালেরিয়া কম হয়। তারা পাহাড়ে থেকে অভ্যস্ত অনেক আগে থেকে। তাছাড়া পাহাড়ের উপরে পানি জমে থাকার সুযোগ কম। তাই মশার উৎপাদন সুযোগ কম। আবার তাদের খাবারের অভ্যাসটাও অনেক স্বাস্থ্যকর বা তারা মসলা কম খান। এদিকে বাঙালিরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে সমতল এলাকায় বসবাস করেন। যেখানে পানি জমার সুযোগ বেশি ও মশা বেশি। মূলত এসব কারণেই ম্যালেরিয়ায় বাঙালিরা বেশি আক্রান্ত হন।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যমতে, দেশে ২০১৬ সালে মোট ১৭ জন রোগী ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে ৫ জন পাহাড়ি ও ১২ জন বাঙালি। এরপর ২০১৭ সালে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। যার মধ্যে মাত্র ১ পাহাড়ি ছিল, বাকি ১২ জন বাঙালি।
এদিকে,বাংলাদেশে এখনো ম্যালেরিয়ার রেজিস্ট্যান্স (প্রতিরোধক) উৎপন্ন হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। যদিও ইতিমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারে এ রোগের রেজিস্ট্যান্স উৎপন্ন হয়েছে। গত ১৯ই এপ্রিল রাঙামাটির পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সে এক মত বিনিময় সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমরা গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালনার লক্ষ্যে একসঙ্গে ৯০ জন করে এ পর্যন্ত ২৭০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছি। বিভিন্ন ধাপে মোট ২৮ দিন এসব রোগীকে মনিটরিং করা হয়। এ ধরনের একটি ট্রায়াল শেষ করতে কমপক্ষে ৬ থেকে ৭ মাস সময় লাগে। সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সহযোগি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এসব গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টিও গবেষণার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ মশারি দেয়া হয়েছে। ম্যালেরিয়া বাহক মশা প্রতিরোধে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। বিশেষ পদ্ধতিতে বাহক মশা প্রতিরোধে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এমনকি যে এলাকাগুলোতে ম্যালেরিয়া নেই সেখানেও পর্যবেক্ষণ চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রমের এপিডেমিওলজিস্ট ডা. মশিউর রহমান বিটুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটির ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. নিহার রঞ্জন নন্দী এবং কাপ্তাই উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অ্যাডভোকেসি সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আখতারুজ্জামান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষিত চৌধুরী, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ মো. নজরুল ইসলাম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এম কে হাসান মোরশেদ প্রমুখ।

বাংলাদেশে ভয়াল যত ঝড়

অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ঘনীভূত হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। গত শুক্রবার (৩ মে) সন্ধ্যা নাগাদ ঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গত ১০ বছরের মধ্যে শক্তিশালী ঝড় হবে এই ফণী। বর্তমানে এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার। তবে ভারতের ওপর দিয়ে আসার কারণে ও নিজেদের প্রস্তুতি থাকায় বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতি কম হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফণীর আগে আরও বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ঝড় বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ১৯৭০ সালের গোর্কি ও ১৯৯১ সালের ম্যারিএন ঝড় অন্যতম। এই দুটি ঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল অনেক।
গোর্কি: ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) দক্ষিণাঞ্চলে গোর্কি আঘাত হানে। এ পর্যন্ত হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে গোর্কির ভয়াবহতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ঝড়ের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এদের বেশিরভাগই জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যান। সিম্পসন স্কেলে ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি ৩’। ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২২ কিলোমিটার এবং জলোচ্ছ্বাসের সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল প্রায় ৩০ ফুট। ঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তজুমদ্দিন উপজেলা। সেখানকার এক লাখ ৬৭ হাজার অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ৭৭ হাজারই প্রাণ হারায়। ঝড়ে সম্পদ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১০ লাখের বেশি গবাদিপশু প্রাণ হারায়। চার লাখ ঘরবাড়ি ও সাড়ে তিন হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়: ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশ আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়টি ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। এই ঝড়ের ফলে দেশে যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বন্যা হিসেবে পরিচিত। ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০৮ জন প্রাণ হারান। ঝড়ে উপকূল এলাকায় প্রচুর অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বাংলাদেশের প্রায় ৭০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যায়, এর পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার টন। ঝড়ে ৬৫ হাজার গবাদিপশু মারা যায়। এছাড়া ১৫ হাজার হরিণ ও ৯টি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মৃত্যু হয়। ৯৪১ কোটি টাকা সমমূল্যের ফসল নষ্ট হয়।
ম্যারিএন: নিহতের সংখ্যা বিচারে এ ঘূর্ণিঝড়টিও খুবই ভয়াবহ। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে এটি আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়। এর ফলে প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। প্রায় ১ কোটি মানুষ সর্বস্ব হারায়। সিম্পসন স্কেলে ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি-৫’। ঝড়ে সন্দ্বীপ, মহেশখালী, হাতিয়াসহ অন্য দ্বীপগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল শিশু ও বৃদ্ধ। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর অনেক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হলেও সচেতনতা ও অজ্ঞতার কারণে অনেকেই সেখানে আশ্রয় না নেওয়ায় এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ঝড়ে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের (১৯৯১ মার্কিন ডলার) ক্ষতি হয়। বন্দরে নোঙর করা বিভিন্ন ছোটবড় জাহাজ, লঞ্চ ও অন্যান্য জলযান নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১০ লাখ ঘড়বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে ১ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে।
সিডর: ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ২৬০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের সঙ্গে ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। শ্রীলঙ্কান শব্দ সিডর বা ‘চোখ’-এর নামে ঝড়ের নামকরণ করা হয়। সিম্পসন স্কেল অনুযায়ী এ ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি-৫’। সরকারি তথ্যমতে ঝড়ে দুই হাজার ২১৭ জন প্রাণ হারান। পানির চাপে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের পাড়ের বেড়িবাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ৬৮ হাজার ৩৭৯টি ঘরবাড়ি। পানিতে তলিয়ে বিনষ্ট হয়ে যায় ৩৭ হাজার ৬৪ একর জমির ফসল।
আইলা: ২০০৯ সালে ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে। মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা এর নামকরণ করেন। এর অর্থ হলো ডলফিন বা শুশুকজাতীয় জলচর প্রাণী। ঝড়টির ব্যাস ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডরের থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। সিডরের মতোই আইলা প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূল অতিক্রম করে। ঝড়ে ১৯৩ জনের মৃত্যু ও সাত হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দুই লাখ গবাদিপশু মারা যায়। উপকূলের ১১ জেলায় প্রায় ছয় লাখ ঘরবাড়ি ও আট হাজার ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা বিধ্বস্ত হয়। খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার ৭১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় দেড় লাখ একর জমি লবণাক্ত পানিতে তলিয়ে যায়। এর ফলে এ দু’টি জেলার প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে এবং প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ অস্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া

সত্তর বছর বয়সে পুনমের এই সাধ কেন? by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সিনেমায় তাঁর নাম ছিল কোমল। কিন্তু সেই নাম আজ বহু বছর অতীত। এখনকার নাম যা, যে নামটা তাঁর আসল, সেই নামেও তিনি একহাঁকে পরিচিত নন। কিন্তু যে–ই বলা হবে পুনম হলেন শত্রুঘ্ন সিনহার স্ত্রী, এবারের লোকসভা ভোটে লক্ষ্ণৌ থেকে রাজনাথ সিংয়ের চ্যালেঞ্জার তিনি, তখন অবধারিত প্রশ্ন উঠবে—তিনি আবার ভোটে দাঁড়াতে গেলেন কেন? এই সত্তর বছর বয়সে হঠাৎ এই সাধ তাঁর কেনই–বা জাগল?
পুনমকে ঠিক এই প্রশ্নটাই শুনতে হলো গতকাল মঙ্গলবার রাতে, লক্ষ্ণৌয়ে তাঁর সাময়িক ডেরায়। ভোটের জন্য এক বহুতলে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন আজ কিছুদিন হলো। দিনভর টইটই ঘুরেও ক্লান্তির ছাপ নেই চেহারায়। বেমক্কা এই প্রশ্ন শুনেও ঠোঁটের আড়াল হতে দিলেন না হাসিকে। বললেন, ‘স্বপ্নটা আমার বহু বছরের। সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়, নতুন দিল্লি আসন থেকে রাজেশ খান্নার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শত্রুঘ্ন সিনহা যেবার হেরে গেলেন, সেবারই মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, একদিন না একদিন ভোটে আমায় দাঁড়াতেই হবে।’
পুনমের সেই স্বপ্ন সত্য হলো এই সত্তর বছর বয়সে পা দেওয়ার পর। কিন্তু তার আগে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি পালন করে গেছেন রাজনীতিক স্বামীর ভোটে জেতার যাবতীয় দায় ও দায়িত্ব।
বিহারের পাটনা সাহিব আসন থেকে বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে দুবার সাংসদ হয়েছেন শত্রুঘ্ন। তাঁর ভোট-ম্যানেজার ছিলেন পুনমই। স্বামী এবার দল পাল্টে পুরোনো আসনে কংগ্রেসের হয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন রবিশঙ্কর প্রসাদকে। পুনমও পাল্লা দিচ্ছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে। স্পষ্টই বললেন, ‘জেতার জন্যই লড়ছি।’
লড়াই অবশ্য কঠিন। সে কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই পুনমের। কোমল নাম নিয়ে ষাটের দশকের মাঝামাঝি হিন্দি সিনেমার নায়িকা হিসেবে যাঁর আত্মপ্রকাশ, জিতেন্দ্রর সঙ্গে ‘জিগরি দোস্ত’ ও ধর্মেন্দ্র-সায়রা বানুর সঙ্গে ‘আদমি ঔর ইনসান’ করে যাঁর পরিচিতি, হায়দরাবাদের সিন্ধি পরিবারের সেই সুন্দরী পুনম স্পষ্ট বললেন, ‘প্রচার শুরু ইস্তক দেখছি দেশের মানুষ পরিবর্তন চাইছে। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যখন দাঁড়ানোর কথা বললেন, তখন মনে হলো, সুপ্ত বাসনা সাকার হওয়ার এই সময়। আমি “হ্যাঁ” বলে দিলাম।’
কিন্তু স্বামীর দলে নয় কেন? প্রশ্নটা পুনমকে শুনতে হলোই। তবে জবাবটাও যেন তৈরিই ছিল। বললেন, ‘কংগ্রেসের মতো সমাজবাদী দলেরও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিজেপি। তা ছাড়া, মায়াবতীও আজ আমার হয়ে জনতাকে বলে দিলেন, বিহারে মহাজোট থাকলে আমি ওঁর দলের প্রার্থী হতে পারতাম।’
দলের সহযোদ্ধা জয়া বচ্চন গতকাল গোটা দিন পুনমের সঙ্গে কাটালেন। পুনমের কাছে জয়া সর্বার্থেই বড় বোন। রাজনীতিতে অনেক বছর কাটিয়ে দেওয়া জয়া আগলে রাখছেন পুনমকে। পুনমের কথায়, ‘ওঁর অভিজ্ঞতা কত বেশি।’
মাকে আগলে রাখছেন যমজ ছেলের ছোটটিও। কুশ এই লক্ষ্ণৌয়ে মায়ের ভোট ম্যানেজার। সামান্য কয়েক মুহূর্তের বড় ভাই লব দেখছেন বাবা শত্রুঘ্নের আসন পাটনা সাহিব। কংগ্রেসি শত্রুঘ্ন স্ত্রীর হয়ে রোড শো করে গেছেন লক্ষ্ণৌয়ে। দু–এক দিনের মধ্যেই আসছেন অভিনেত্রী কন্যা সোনাক্ষী। গোটা পরিবারই এই মুহূর্তে রাজনীতির রঙে চুবনো। সে কথা শুনে হাসতে হাসতে পুনম বললেন, ‘ছেলেমেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতির শখ মেটাতে হাতে এখন অঢেল সময়।’
তা অবশ্যই। কিন্তু লক্ষ্ণৌয়ের মানুষ ঠারেঠোরে জানতে চাইছে, রাজনাথ সিংয়ের কাছে হেরে গেলে রাজনীতিকে বাই বাই করবেন না তো পুনম সিনহা?

বয়সের কাছে হারতে বসেছে বিজেএমসির ২৬ পাটকল by জিয়াউল হক মিজান

বয়সের ভারে ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসেছে সরকারি পাটকলগুলো। বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন এসব কারখানার বয়স অর্ধশতাব্দীর বেশি। এদের কোনো কোনোটি প্রতিষ্ঠার ৬৭ বছরই কাটিয়ে দিয়েছে কেবল চটের বস্তা বানিয়ে। পুরনো হতে হতে উৎপাদন ক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে। আর্থিক কারণে এসব কারখানা ভারসাম্যতা, আধুনিকীকরণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণ (বিএমআরই) করার উদ্যোগ নিয়েও বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে স্বাধীনতার ৪৭ বছরের ৪৫ বছরই লোকসান দিয়েছে বিজেএমসি। ঋণের ভারে জর্জরিত এসব কারখানা শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারে না। পরিশোধ করতে পারে না কৃষকের বকেয়া। এসব কারণে কথা উঠেছে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে থাকা এসব পাটকলের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিজেএমসির অধীন সরকারি ২৬টি পাটকলের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো খুলনার খালিশপুর জুট মিল ও ক্রিসেন্ট জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে। এরপর ১৯৫৩ সালে ঢাকার ডেমরায় প্রতিষ্ঠিত হয় লতিফ বাওয়ানি জুট মিলস লিমিটেড। ১৯৫৪ সালে ডেমরায় করিম জুট মিলস লিমিটেড, চট্টগ্রামের আমিন জুট মিলস এবং খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া খুলনার খালিশপুরে স্টার জুট মিলস ১৯৫৬ সালে, সিরাজগঞ্জের রায়পুরে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড, ১৯৬২ সালে নরসিংদীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউএমসি জুট মিল ও বাংলাদেশ জুট মিল, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় গুল আহমেদ জুট মিলস লিমিটেড। অন্যগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় দেশ স্বাধীনের দু-এক বছর আগে ও পরে।
জানা যায়, বেশির ভাগ মেশিনারিজ পুরনো হয়ে যাওয়ায় সরকারি পাটকলগুলোর উৎপাদন কমে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নেমেছে। ফলে লোকসানের কবল থেকে বের হতে পারছে না বিজেএমসির পাটকলগুলো। স্বাধীনতার ৪৭ বছরের মধ্যে মাত্র দুই বছর লাভের মুখ দেখে বিজেএমসি। বাকি ৪৫ বছরই লোকসান গুনেছে সরকারি পাটকলগুলো। অথচ বেসরকারি মিলগুলো ৯০ শতাংশ উৎপাদনে সক্ষম এবং প্রতিনিয়ত লাভ করছে।
এ দিকে পাটকলগুলোর মেশিনারিজ পুরনো হয়ে যাওয়ায় তার সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৪ সালে। সিদ্ধান্ত হয় কারখানাগুলো ভারসাম্যতা, আধুনিকীকরণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণ (বিএমআরই) করার। ২৪টি মিল বিএমআরই করতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা খরচ ধরা হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে গত পাঁচ বছরে সে কার্যক্রম শুরুই করা যায়নি। আশার কথা, কারখানা বিএমআরই করার বিষয়ে আবারও নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামের আমিন জুট মিল, ঢাকার করিম জুট মিল ও খুলনার প্লাটিনাম জুট মিল আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে নতুন করে। এ লক্ষ্যে চীন সরকারের মালিকানাধীন ‘চায়না টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশন ফর ফরেন ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশনের সাথে চুক্তি করেছে বিজেএমসি।
বিজেএমসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিজেএমসি প্রতিষ্ঠাকালে এর অধীন জাতীয়করণকৃত পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৬টি। বর্তমানে ২৬টি পাটকল এর অধীন। এর মধ্যে নন-জুট কারখানা রয়েছে তিনটি। লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, বিজেএমসি বর্তমানে পাট উৎপাদিত এলাকাগুলোতে সর্বমোট ১৬০টি পাটক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করছে। বৃহত্তম পাটপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিজেএমসি প্রধানত হেসিয়ান কাপড়, ব্যাগ, বস্তার কাপড়, বস্তা, সুতা, জিও-জুট, কম্বল, মোটা কাপড়, সিবিসি ইত্যাদি প্রস্তুত করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক তন্তুজাত। বিজেএমসির বিক্রয় বিভাগ এসব পণ্য দেশী ও বিদেশী ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে থাকে। এভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিজেএমসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জনবলের দিক থেকে বিজেএমসি বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ সংস্থায় প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক এবং সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি নিযুক্ত রয়েছেন। পরোক্ষভাবে তাদের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ কৃষি পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ দেশের পাঁচ কোটিরও অধিক মানুষ পাট ও পাটশিল্পের ওপর নির্ভরশীল বলে দাবি বিজেএমসির।
এ দিকে সোনালি আঁশখ্যাত পাটের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে সময়ের উপযোগী বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থতায় এ শিল্পের আশানুরূপ সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি পাটকলগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তারা। তারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের পাটপণ্যের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে হবে। গত ছয় বছরে ভারতের চেয়ে আমাদের পাটপণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, এ অগ্রগতিগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে বাজারমূল্য ঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিজেএমসিকে লাভজনক করতে হলে এর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। ৬০ থেকে ৭০ বছরের পুরনো মেশিনারিজ দিয়ে এখন আর মিল চলতে পারে না। তা ছাড়া সরকারি মিলগুলো এখনো তাদের উৎপাদন চটের বস্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বেসরকারি মিলমালিকরা যেখানে এসব বহুমুখী পাটপণ্য রফতানি করে কুলাতে পারছেন না, সেখানে সরকারি মিলে এসব পণ্য উৎপাদনের কোনো উদ্যোগ নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।

দুই রাষ্ট্র সমাধানের বিকল্প নেই: ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত

জাতিসংঘে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—এই দুই রাষ্ট্র গঠনের কোনো বিকল্প নেই। জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ‘দুই রাষ্ট্র সমাধানের’ পক্ষে স্পষ্ট রায় দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রদূত মনসুর নিউইয়র্কে প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে এই কথা বলেন।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার বলেছেন ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ নামে পরিচিত ফর্মুলা মৃত। এই ফর্মুলা অনুসরণ করে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রতিষ্ঠার যতগুলো উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, কুশনারে মতে তার সবই ব্যর্থ হয়েছে।
এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে রাষ্ট্রদূত মনসুর বলেন, ‘কুশনার ঠিক কী চায়, তা আমরা জানি না। হোয়াইট হাউস থেকে নানা সময় নানা কথা শোনা গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে একবার দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্য সময় বলেছেন, উভয় পক্ষ যে সমাধানে সম্মত হবে, তাতেই তিনি সম্মতি দেবেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে এখনো স্পষ্ট কিছু শুনতে পাইনি।’
গত মাসে নিউইয়র্কে টাইম ম্যাগাজিন আয়োজিত এক ফোরামে কুশনার বলেন, তিনি যে শান্তি প্রস্তাব চূড়ান্ত করছেন, তা মূলত উন্নয়নমুখী। ফিলিস্তিনি জনগণকে উন্নততর জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান তাঁর এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। একে একটি ‘বিজনেস প্ল্যান’ উল্লেখ করে কুশনার বলেন, তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উভয় দেশের জনগণের জীবনেরই গুণগত মান উন্নীত হবে। ফোরামে অংশগ্রহণকারী একজন সাংবাদিক একে ‘অর্থনৈতিক শান্তি পরিকল্পনা’ নামে অভিহিত করলে কুশনার তাতে সম্মতি দেন।
এই পরিকল্পনার বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত মনসুর বলেন, ‘ইসরায়েল ও আমেরিকার প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে এ কথা মোটেই মনে হয় না যে তারা ফিলিস্তিনি জনগণের জীবনের মানোন্নয়নে উৎসাহী। বরং উল্টো, তারা একের পর এক এমন সব ব্যবস্থা নিয়েছে, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি জনগণকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। বস্তুত আমরা এখন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রয়েছি।’
সম্প্রতি ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে তাদের উপার্জিত কর হস্তান্তর করতে অস্বীকার করায় সেখানে অর্থনৈতিক সংকট চরমে পৌঁছেছে। এই অর্থের একটা অংশ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলে অন্তরীণ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দীদের পরিবারের মধ্যে বণ্টন করে থাকে। ইসরায়েলের তাতে আপত্তি করেছে। তারা বন্দী ফিলিস্তিনিদের পরিচর্যায় ব্যয় করা অর্থ বাদ দিয়ে উপার্জিত করের অবশিষ্টাংশ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, তিনি এই প্রস্তাবে সম্মত নন। তাদের উপার্জিত করের পুরোটাই ফেরত দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেছেন।
রিয়াদ মনসুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফিলিস্তিনি জনগণের কল্যাণ চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে এই অর্থের পুরোটা ফিরিয়ে দিতে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তিনি মন্তব্য করেন, এ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন যা করেছে, তার একটাই লক্ষ্য, আর তা হলো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকারকে সমর্থন করে যাওয়া।
রিয়াদ মনসুরের কথা, এই সরকারের জন্য উপহার হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের সংযুক্তি মেনে নিয়েছে। নেতানিয়াহু বলেছেন, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতিসমূহ তিনি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন। সেটির স্বীকৃতি হবে ইসরায়েলের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আরেক উপহার।
রাষ্ট্রদূত মনসুর জানান, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বীকৃতির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো অর্থপূর্ণ যোগাযোগ নেই। এই অচলাবস্থা এই মুহূর্তে পরিবর্তিত হবে না বলেই তিনি মনে করেন।
রিয়াদ মনসুর বলেন, ‘আমরা সবাই এখন ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছি।’

সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না: আইনজীবী

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যতই আশাবাদ সৃষ্টি হোক না কেন, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া তা কার্যকর হবে না। এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী লন্ডনে আবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই বেগম জিয়াকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেছেন, কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণেই বেগম জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।
তবে দুদকের আইনজীবী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক কারণে নয় আইনি প্রক্রিয়াতেই আটকে আছে বেগম জিয়ার জামিন।
এ প্রসঙ্গে বেগম জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, সরকারের বাধার কারণেই বেগম জিয়া তার জামিন পাওয়ার আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারপক্ষ বেগম জিয়ার জামিনের বিরোধিতা করছে।
মানবাধিকার আইনজীবী মঞ্জিল মোরশেদ মনে করেন, হাইকোর্টে বেগম জিয়ার জামিনের পর  এর বিরুদ্ধে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেলের আপিল করার ফলে সরকারপক্ষ যে এ মামলায় হস্তক্ষেপ করছে না- সে বক্তব্য দুর্বল হয়ে যায়। 
এ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং মানহানির দু’টি মামলায় জামিন নেয়া বাকি রয়েছে। এ ছাড়া বাকী ৩২টি মামলায় তিনি জামিনে আছেন।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্য করার কারণে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পর দু’টি মানহানি মামলা করা হয়। এই মামলা দু’টি ঢাকা সিএমএম কোর্টে রয়েছে। এই মামলায় আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় ওয়ারেন্ট দেয়া হলেও এখনো তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। এই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর পর তিনি জামিনের আবেদন করতে পারবেন। 
গত ৩০ এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া সাজা বাতিল ও খালাস চেয়ে বেগম খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করে অর্থদণ্ড স্থগিত ও সম্পত্তি জব্দের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থার নির্দেশ দেয় আদালত।
তবে মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করেনি হাইকোর্ট। জামিনের আবেদনটি নথিভুক্ত করে দুই মাসের মধ্যে মামলার নথি তলব করা হয়। নথি পাওয়ার পর জামিন আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করবে বলে জানান আদালত। জামিনের বিষয়ে আদালত বলেন, সাত বছরের সাজার মামলায় আমরা জামিন দেই না, তা না। যেহেতু অন্য একটি মামলায় উচ্চতর আদালত সাজা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ওই মামলায় জামিন না হলে তিনি মুক্তি পাবেন না। ফলে বিষয়টি জরুরি দেখছি না। মামলার নথি আসুক, তখন জামিনের আবেদনটি দেখা হবে।
অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন এবং একই সাথে তার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এই আপিল আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলায় নিম্ন আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। এরপর হাইকোর্ট খালাস চেয়ে খালেদা জিয়ার আপিল খারিজ করেন এবং দুদকের আপিল গ্রহণ করে খালেদা জিয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। এই রায় বাতিল ও খালাস চেয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন করেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়া হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। সেখানে সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল। আমরা যতই বলি না কেন আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি জামিনে মুক্ত হবেন- এটা একটা অবাস্তব কথা; যে পর্যন্ত না সরকারের সদিচ্ছা হবে।  কারণ একটি মামলায় আমরা জামিন নেব, তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দেয়া হবে। এইভাবে তার কারাজীবন দীর্ঘায়িত করা হবে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যে কেসে যেভাবে তাকে রাখা হয়েছে, আইনের বিধান মোতাবেক আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আসামি যদি মহিলা হয়, অসুস্থ হয়, বয়স্ক হয়, সেখানে জামিনের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা করা হয়; কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাও করা হয়নি। অর্থাৎ যে পর্যন্ত না সরকার ইচ্ছা করবেন যে তাকে মুক্তি দেয়া হবে তখনই তিনি মুক্তি পাবেন। আমি আবারো বলছি, সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি বের হতে পারবেন না।
এ দিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আজ প্রতীকী অনশন পালন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল।
শনিবার নয়া পল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করেন নেতাকর্মীরা।

স্বচ্ছতার জন্য মেয়র যা করলেন

তুরস্কের তুনজেলি নগরের নতুন মেয়র ফাতিহ মেকোগলু। গত ৩১ মার্চের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি আনাতোলিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তুনজেলির মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র হিসেবে করা তাঁর প্রথম কাজ দেশজুড়ে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি তাঁর মেয়র কার্যালয়ের বাইরের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলেছেন। মেয়র হিসেবে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিনি এ ব্যবস্থা নেন।
শুধু এটাই নয়; আরও কিছু কাজের জন্যও আলোচনায় আছেন ৫০ বছর বয়সী মেয়র ফাতিহ মেকোগলু। তিনি তাঁর জন্য বরাদ্দ সরকারি গাড়ি নেননি। জনগণের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা যেন জনগণ দেখতে পান, সে জন্য তিনি মেয়র কার্যালয়ের সামনের ভবনে ব্যানারে অর্থনৈতিক খতিয়ান টাঙিয়ে রেখেছেন। তিনি তুরস্কের একমাত্র কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব তুর্কির (টিকেপি) মেয়র। তাঁর এসব কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মন কেড়ে নিলেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন একেপি পার্টির লোকজনের মধ্যে। ১৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটির নেতা-কর্মীরা নতুন মেয়রের কর্মকাণ্ডকে ভালোভাবে দেখছেন না।
ফাতিহ মেকোগলু তাঁর কার্যালয়ে বসে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, কী হচ্ছে—জনগণকে জানানোর চেয়ে স্বাভাবিক আর কিছু হতে পারে না। এটা অন্যের জন্য অপমান বা অভিশাপের বিষয় না। তবে মেয়র হিসেবে এটা তাঁর প্রথম মেয়াদ নয়। এর আগে ২০১৪ সালে তিনি ওভাসিক শহরের মেয়র ছিলেন। এটি তুনজেলি প্রদেশের একটি শহর। সে সময় তিনি কৃষিকে অগ্রাধিকার ও বিনা মূল্যে জনপরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করাসহ নানা জনপ্রিয় উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হন। এসব কারণে লোকে তাঁকে ‘কমিউনিস্ট মেয়র’ বলে থাকেন।
তবে দুই সন্তানের বাবা ফাতিহ মেকোগলু নিজেকে ‘কমিউনিস্ট মেয়র’ মনে করেন না। তাঁর ভাষায়, ‘আমি সমাজতন্ত্রী। যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি সমাজতন্ত্রী? আপনি কি সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখেন? আমি বলব যে অবশ্যই আমি তা। তবে একই সঙ্গে পুঁজিবাদ যখন উন্মত্ত হয়ে পড়ে, তখন কমিউনিস্ট হওয়া বা কমিউনিস্ট শহরের মতো দেখার বিষয়টি বাড়াবাড়িই বলতে হবে।’
তুনজেলি এমনিতে কুর্দি–অধ্যুষিত এলাকা, যা বেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও বাম ঘরানার হিসেবে পরিচিত। ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্কের যাত্রা। আধুনিক তুরস্কের এই ধারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে কুর্দিদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চালায় রাষ্ট্র। ১৯৩৮ সালে তুরস্কের সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে বোমা ফেলে হামলা চালিয়ে কুর্দিদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ নেয়। ওই ঘটনায় ১৩ হাজারের বেশি কুর্দি নিহত হন। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ওই ঘটনার জন্য প্রথমবারের মতো দুঃখ প্রকাশ করেন। এর আগে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ধরনের দুঃখ প্রকাশের ঘটনা ঘটেনি।
আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক নিজে তুনজেলি নামটি রাখলেও এখানকার বেশির ভাগ মানুষ এটাকে দারসিম নামে ডাকে। জাতীয়তাবাদীরা অবশ্য বাসিন্দাদের এমন আচরণকে তুরস্কের প্রতি অবমাননা বলে মনে করেন। মেয়র ফাতিহ মেকোগলু তাঁর কার্যালয়ে দারসিম নামটি লিখে রেখেছেন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র ফাতিহ বলেন, ‘সমালোচনা হয়তো আছে, এরপরও এ বিষয়ে তুরস্কের অনেক মানুষের সমবেদনা আছে।’
জাতীয় পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব তুর্কি খুবই ছোট দল। পার্লামেন্টে তাদের কোনো আইনপ্রণেতা নেই। ছোট দলের একজন নেতার এমন বড় ধরনের ভালো উদ্যোগ ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে। মেয়র ফাতিহ চান তাঁর এই মডেল সারা তুরস্কে ছড়িয়ে দিতে।
মেতিন কাহরামান নামের একজন গায়ক ও গবেষক বলেন, মেয়র ফাতিহ মেকোগলু একটি ইতিবাচক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি তুরস্কের অন্যত্রও অনুসরণ করা হবে বলে তিনি মনে করেন।
মধ্য আশির দশক থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছেন ফাতিহ মেকোগলু। তিনি জানালেন, খুব বড় স্বপ্ন তাঁর নেই। যা করতে চান, সেটার জন্য তিনি কাজটা অব্যাহত রাখতে চান। তিনি ক্ষমতাসীন এরদোয়ান বা বিরোধী নেতাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। শুধু বললেন, ‘পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা কি সঠিক পথে থাকতে পারে? আমি মনে করি, পারে না।’

বগুড়া উপ-নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে কে হবেন প্রার্থী? by সালমান তারেক শাকিল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আসন শূন্য ঘোষণার পর ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে এই আসনের উপ-নির্বাচন হওয়ার কথা জুনের মাঝামাঝি। কিন্তু এই উপ-নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। 
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, বগুড়া-৬ আসনে উপ-নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা এখনও কম। কারাবন্দি খালেদা জিয়া এই আসন থেকে দলের নিয়মিত প্রার্থী ছিলেন। খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী হন। এই আসন থেকে তিনি জিতেও আসেন। কিন্তু বিএনপির ছয় বিজয়ীর মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল ১ জন ও ২৯ এপ্রিল ৪ জন শপথ নিলেও মির্জা ফখরুল নেননি। বিষয়টি নিয়ে মির্জা ফখরুল জানিয়ে আসছেন, দলের সিদ্ধান্তে কৌশলগত কারণেই তিনি শপথগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছেন।
এ ক্ষেত্রে বগুড়া উপ-নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, এমন প্রশ্ন ছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের কাছে। তিনি বললেন, ‘যদি আমরা উপ-নির্বাচনে যাই, তাহলে তো মির্জা ফখরুলই প্রার্থী হবেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শনিবার (৪ মে) গুলশানে দলটির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়মিত বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেটি বাতিল করা হয়েছে। আগামী শনিবার (১১ মে) এই বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে আলোচনা হবে, বিএনপি বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না।’
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আরও বলেন, ‘উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো কি না, এ সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে দলকে। এরপরই বলা যাবে কে প্রার্থী হবেন।’
স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য যদিও এ বিষয়টিতে মন্তব্যই করতে নারাজ। তাদের ভাষ্য, ‘উপ-নির্বাচন বা যেকোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করা হবে। গত ২৯ এপ্রিল সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার পক্ষ থেকে আসায় দলীয় নীতি-নির্ধারণী যেকোনও বিষয়ে এখন তাদের অনীহা তৈরি হয়েছে।’
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে বিএনপি। এ বছরে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনেও অংশ নেয়নি বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট। এ অবস্থান থেকে উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করারই কথা।
বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা মনে করেন, মির্জা ফখরুলের শপথ গ্রহণ না করাটা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি যে ‘সরকারের প্রভাবে’ আটকে আছে, এ অভিযোগ বিএনপি গত দেড় বছর ধরেই করে আসছে। এ কারণে বিএনপির ৫ বিজয়ী শপথ নিলেও মির্জা ফখরুল শপথ নেননি।
বিএনপির একজন প্রভাবশালী ভাইস-চেয়ারম্যান বলেন, সরকার শেষ গোলে বিএনপির কাছে হেরে গেছে। মির্জা ফখরুল শপথ গ্রহণ না করায় সরকারের উচ্চপর্যায়েও স্বস্তি নেই।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রভাবশালী একজন সদস্য নিজের মতপ্রকাশ করেন এভাবে, ‘আমি তো মির্জা ফখরুলকে সরাসরি জিজ্ঞেস করিনি। জানতে চাইলে তিনি বিব্রত হবেন। প্রেসক্লাবের প্রোগ্রামে তিনি বলেছেন, দলের কৌশলেই শপথগ্রহণ করেননি। এছাড়া শপথ নিয়ে অন্য নেতাদের প্রশ্ন করা হলে তারা যে সত্যিই বলবেন বা সত্যিটাই জানেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।’
রাজনৈতিক একাধিকসূত্র জানায়, বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা করার আলোচনা চললেও বিএনপির সিনিয়র-পর্যায়ের একাধিক আইনজীবী মনে করেন, তা অনেক কঠিন। আইনত, খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় সাজা ভোগ করছেন। এখন তিনি জামিন পেলেও তার সাজা মিথ্যে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতার পথ খুলতে পারে সাজা মওকুফের মাধ্যমে। তা সম্ভব একমাত্র রাষ্ট্রপতির কাছে ‘মার্সি’ করার মাধ্যমে।
প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার মনোনয়নকে নির্বাচন কমিশন অবৈধ ঘোষণা করলে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর বিভক্ত আদেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী। ওই আপিল এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন  তার প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করলে আমরা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। ওই রিট পিটিশনে হাইকোর্ট ডিভিশন নামঞ্জুর করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে আমরা সুপ্রিম কোর্টেও গেছি। সে আবেদন এখনও পেন্ডিং আছে। বিষয়টা হচ্ছে, হাইকোর্টের বিভক্ত আদেশ আছে।’
উদাহরণ দিয়ে আমিনুল ইসলাম জানান, ‘এর আগে হাইকোর্টে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মহিউদ্দিন খান আলমগীরসহ অনেকেই কনভিক্টেট হওয়ার পরও নির্বাচনে প্রার্থিতা করেছেন। হাইকোর্ট ডিভিশন তাদের অ্যালাউ করেছেন। এমনকি লুৎফুজ্জামান বাবরও কনভিক্টেটেড হয়েছিলেন, তিনিও নির্বাচন করেছেন।’
অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইস্যু যেহেতু একই, তাই আপিল বিভাগে  চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আদালতের আদেশ লাগবে। যেটি আপিল বিভাগে পেন্ডিং আছে, সেটি নিষ্পত্তি হতে হবে তার পক্ষে। তাহলেই তিনি যেকোনও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। আমরাও মনে করি, যেহেতু তার সাজা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি, সেহেতু তিনি যেকোনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।’
উল্লেখ্য, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুটি দুর্নীতি মামলার একটিতে ১০ বছর ও অন্যটিতে ৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।