Showing posts with label সাংসদ. Show all posts
Showing posts with label সাংসদ. Show all posts

Monday, March 21, 2011

সাংসদ বদির কাণ্ড -আইনপ্রণেতা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না



একজন জনপ্রতিনিধি বা সাংসদের কাজ কি যেকোনো ছলছুতায় সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর করা? ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর ওপর চড়াও হওয়া? ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিত করা? অন্যদের কথা জানি না, তবে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদি সেই কাজই করে আসছেন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে। কীর্তিমান এই সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। এবার খোদ নির্বাচন কমিশন নালিশ করেছে স্পিকারের কাছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ জানুয়ারি টেকনাফ পৌরসভায় প্রাক-নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে একজন ম্যাজিস্ট্রেট লাঞ্ছিত হয়েছেন সাংসদ বদি ও তাঁর সহযোগীদের হাতে। সাংসদের চাচা হাজি মো. ইসলামের পক্ষে পাঁচ শতাধিক লোকের জনসভা করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে আগত লোকদের তালিকা করছিলেন। কেননা এ ধরনের জনসভার ওপর নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা আছে। খবর পেয়ে সাংসদ বদি সমর্থকদের নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর চড়াও হন। পরিচয় দেওয়ার পরও তিনি তাঁদের রোষানল থেকে রেহাই পাননি। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় নির্বাহী কর্মকর্তা এগিয়ে এলে তাঁকেও মারধর করা হয়। সাংসদ বদির দাবি, ওই ম্যাজিস্ট্রেট গোপনে জনসভার ছবি তুলতে গেলে লোকজন তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয় এবং তিনি তাঁকে বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান। সাংসদের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রকাশ্য জনসভার ছবি গোপনে তুলতে হবে কেন? আর সেই ছবি তোলার জন্য লোকজন ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর চড়াওই বা কেন হবে?
এ ধরনের অপকর্ম সাংসদ বদি আগেও করেছেন। আবার বেকায়দায় পড়লে ক্ষমাও চেয়েছেন। এবারের বিষয়টি গুরুতর বলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের কাছে প্রতিকার চেয়ে চিঠি লিখেছেন। স্পিকার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’ প্রশ্ন হলো, তদন্তকাজটি কীভাবে হবে? যে সাংসদ ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর চড়াও হতে পারেন, সেই সাংসদ কি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নির্বিঘ্নে কাজ করতে দেবেন? আইনপ্রণেতা হয়ে তিনি কীভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিলেন?
আমরা ম্যাজিস্ট্রেট লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করছি। এটি যেমন আইনের শাসনের পরিপন্থী, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন আশা করি।

Saturday, January 15, 2011

সাংসদের ‘গাড়িবহর’ ও অস্ত্র উদ্ধার -নির্বাচনের ‘কাজে’ এই শক্তির ব্যবহার আর কত দিন!

কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য অস্ত্র ও অর্থের কী প্রয়োজন হয়, তা কারও অজানা নয়। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য সরকারি দলের সাংসদ যে ‘গাড়িবহর’ নিয়ে বেনাপোল যাচ্ছিলেন, সেই বহরের একটি গাড়িতে নির্বাচনী পোস্টারের পাশাপাশি পাওয়া গেছে বিদেশি পিস্তল, শাটারগান, গুলি ও ম্যাগাজিন এবং এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। যে গাড়িতে এসবের সন্ধান মিলেছে, সেটি শার্শা উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেনের। সরকারদলীয় সাংসদ শেখ আফিল উদ্দীন কাদের নিয়ে দলের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ‘কাজ’ করতে যাচ্ছেন, তা অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাজটি করার জন্য অস্ত্র, অর্থ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীদের তিনি ত্রাতা মেনেছেন কি না?
সরকারি দলের সাংসদ তাঁর গাড়িবহর থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের বিষয়টি মানেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমি তাদের (যুবলীগের আটক নেত-কর্মী) দেখিনি। তারা আমার সঙ্গে ছিল না। আমার কোনো বহর-টহরও ছিল না।’ তবে অস্ত্র, গুলি ও অর্থ উদ্ধারে অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাব-৬-এর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘সাংসদ শেখ আফিল উদ্দীনের গাড়িবহরে সাত-আটটি গাড়ি ছিল, আর শেষের গাড়িটি ছিল সোহরাব হোসেনের।’
তদন্ত ছাড়া এই ‘গাড়িবহর’ বিতর্কের সুরাহা করা কঠিন। তবে সাধারণভাবে আমরা দেখে আসছি যে সাংসদেরা যখন কোথাও যান, তখন তাঁদের সঙ্গী হন স্থানীয় দলীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, সাংসদও বেনাপোল গেছেন, আর তাঁর পেছনে যুবলীগের নেতার গাড়িও ছিল। এই গাড়িটি তাঁর গাড়িবহরে ছিল না—এই বক্তব্য দিয়ে সাংসদ দায় এড়াতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যাঁর গাড়ি থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়েছে, তিনি যুবলীগের নেতা এবং সাংসদ যে কাজে বেনাপোল গিয়েছিলেন, যুবলীগের এই নেতাও একই কাজে বেনাপোল যাচ্ছিলেন। নিজ দলের অঙ্গসংগঠনের নেতা অস্ত্রসহ আটক হয়েছেন—এই দায়টি তিনি এড়াবেন কীভাবে?
অস্ত্র ও অর্থের জোরে নির্বাচন করা এবং নির্বাচনে জিতে আসার ঘটনা এ দেশে কম ঘটেনি। তবে সে অবস্থান থেকে দেশ যে অনেকটা সরে এসেছে, তা হয়তো অনেকে এখনো মেনে নেননি। মনে করেন, নির্বাচনে ‘কাজ’ করা মানেই অস্ত্র ও অর্থের ব্যবহার। যুবলীগের নেতার গাড়ি থেকে অস্ত্র ও অর্থ উদ্ধারের ঘটনা এই মনোভাবেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আশার কথা, এবারের নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহারের ঘটনা এখনো আমাদের চোখে পড়েনি। বেনাপোলের পৌর নির্বাচনে অস্ত্র ও অর্থের শক্তি ব্যবহারের যে আশঙ্কা ছিল, যুবলীগের পাঁচ নেতা-কর্মী আটক হওয়ায় তা দূর করবে, সে আশা আমরা করতে পারি।

Monday, November 8, 2010

১৮ বছরের অপেক্ষা

আঠারো বছর পর সরকারের দরবারে দাবিনামা পেশ করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ। এই সময়ে শিল্প খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও শ্রমিকদের অবস্থার তেমন বদল ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই অবনতি হয়েছে। এসব বিষয়েই এক মাস আগে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীর কাছে আলোচনার সময় চেয়েছিলেন স্কপের নেতারা, কিন্তু সাড়া মেলেনি। বাংলাদেশের বৃহত্তম ও সর্বদলীয় শ্রমিক জোট হিসেবে স্কপ যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। সরকারের উচিত শ্রমিকনেতাদের কথা শোনা এবং বাস্তবভিত্তিক দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া।
সব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ নয়টি বিষয়ে আলোচনা করতে চায় স্কপ। পোশাকশিল্পে ইতিমধ্যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পজগতের অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও একই প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হচ্ছে। কেননা, গত ১৮ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক গুণ বেড়েছে এবং শিল্প-মানচিত্রেও অনেক ভাঙন-গঠন চলেছে। এসব বিষয় আমলে নিয়ে উৎপাদনী খাতের সমস্যা দূর করা জাতীয় স্বার্থেই দরকার।
স্কপ শ্রমিকদের জন্য সুস্থ ধারার ট্রেড ইউনিয়নের বিকাশ, ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা মজুরি, বন্ধ পাটকলগুলো চালু এবং পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ানো, চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় নয় দফা দাবি উত্থাপন করেছে। পাশাপাশি তারা শ্রম আইনকেও যুগোপযোগী করতে চায়। এদিক থেকে দেখলে, সব কটি শ্রমিক সংগঠনের এই জাতীয়ভিত্তিক দাবিদাওয়া অবশ্যই আলোচনার যোগ্য। উল্লেখ্য, সর্বশেষ ১৯৯২ সালে স্কপ তৎকালীন সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল। পরের প্রতিটি সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকনেতারা।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বর্তমানে কয়েকটি প্রেশার গ্রুপ বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কথা সরকারকে শুনতেও হয়। অথচ জনগণের বড় একটি অংশ শ্রমজীবী। অর্থনীতিতেও তাঁদের অবদান কম নয়। এ ছাড়া স্বাধীনতাসংগ্রামসহ গত ৪০ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামেও রয়েছে শ্রমিকদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধাও ছিল এই স্কপ। শ্রমমন্ত্রী তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিল্প খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়াসী হবেন বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

Saturday, September 4, 2010

সাংসদদের গাড়িবিলাস

সাংসদদের আজকাল চলতি মডেলের দামি বিদেশি গাড়ি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। সম্প্রতি সাংসদদের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানির সুযোগ আবার অবারিত করা হয়েছে। তিন কোটি টাকা দামের গাড়ি এখন তাঁরা ৫০ লাখ টাকায়ই কিনতে পারবেন। তাঁদের জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে, গাড়ি ব্যবসায়ীরা পত্রিকায় গাড়ির বিজ্ঞাপন ছাপছেন আর বিদেশি গাড়ির সচিত্র বিবরণ তাঁদের বাড়িতেও পৌঁছে দিচ্ছেন। নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে সরকারি ও বিরোধী দলের সাংসদেরা একযোগে শুল্কমুক্ত গাড়ি পেতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছেন। জনগণের করের টাকার প্রতিদানে সরকারি সেবা নিশ্চিত করা এবং জনগণের পক্ষে আইন তৈরি করাই যাঁদের দায়িত্ব, তাঁরা যখন আপন স্বার্থে বিধি প্রণয়নে দ্বিধা করেন না, তখন সাধারণ মানুষের হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় কী?
সাংসদদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা চালু হয় জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের সময়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তা রদ করা হলেও বর্তমানে আবার শুল্কমুক্ত গাড়ি আনার আইনি বাধা অপসারণ করা হয়।
বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন চক্ষুলজ্জাহীন সুবিধা গ্রহণের নজির নেই। ব্রিটেনে এমপিরা সরকারি গাড়ির পুল থেকে প্রয়োজনমাফিক গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পান। ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মন্ত্রী থাকা অবস্থায় সরকারি ট্রেনে যাতায়াত করতেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি মন্ত্রীদের শোফার (চালক) রাখার নিয়মও বাতিল করে দিয়েছেন। ব্রিটেনের আদালত, এমনকি কয়েকজন সাংসদের বিধিবহির্ভূত ব্যয় সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন। ভারতেও একইভাবে সাংসদদের জন্য সরকারি পুল থেকে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। বিপরীত দৃষ্টান্তেরও অভাব নেই। বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম জিম্বাবুয়ের সরকার এমপিদের জন্য বিলাসবহুল দামি গাড়ি সরবরাহ করেছে। যদিও দেশটি চরম আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। সেখানকার গোত্রপ্রধানেরাও একই রকম গাড়ি দাবি করেছেন এ যুক্তিতে যে নইলে জনগণের সামনে তাঁদের সম্মান থাকে না। আমাদের সাংসদেরাও বলতে পারেন, ব্যবসায়ীদের অনেকেই যেখানে বিলাসবহুল দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন, সেখানে তাঁদের সম্মান থাকে কী করে?
মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ। এখনো এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের জন্য চলনসই পরিবহনব্যবস্থা সরকার গড়ে তুলতে পারেনি। এখনো রাজধানীর কোটি মানুষ বাদুড়ঝোলা অবস্থায় বাসে চলাচল করে, আর যানজটে আটকে থেকে গরমে সেদ্ধ হয়। এ রকম একটি দেশের জনপ্রতিনিধিদের দু-তিন কোটি টাকা দামের গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধায় ৪০-৫০ লাখ টাকায় কিনতে চাওয়া অনৈতিক। দ্বিতীয়ত যাঁরা এসব গাড়ি কেনার অভিলাষ করেছেন, এরই মধ্যে তাঁদের ৯০ শতাংশেরই একাধিক দামি গাড়ি রয়েছে। তাঁরা যে ১৬৫০ থেকে ৪৫০০ সিসির ভারী গাড়ি চাইছেন, তা কি একজন জনপ্রতিনিধির খুবই প্রয়োজন? এসব গাড়ি দুর্গম এলাকায় জনসংযোগের জন্য, এমন দাবিও হাস্যকর।
সাংসদদের এমন অভিলাষ সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁদের মর্যাদা ও নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে অন্যরাও স্বার্থপর ভোগ ও দুর্নীতিতে উত্সাহিত হয়। তাঁদের মনে রাখতে হবে, জনগণ তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছে জনস্বার্থ দেখার জন্য, আপন স্বার্থে সুবিধাবাদী আইন প্রণয়নের জন্য নয়।

Friday, July 30, 2010

সাংসদদের ‘বিশেষ অধিকার’ সীমাহীন হতে পারে না by বদিউল আলম মজুমদার

বিগত কয়েক সপ্তাহে সংবাদপত্রের কয়েকটি শিরোনাম নাগরিক হিসেবে আমাদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। প্রথম শিরোনামটি হলো ‘রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে সংসদীয় কমিটি’ (আমাদের সময়, ৬ জুলাই ২০১০)।
পরদিন ‘নূরুল হুদাকে শোকজ করবে সংসদীয় কমিটি’ এই শিরোনামে আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হয় (কালের কণ্ঠ, ৭ জুলাই ২০১০)। সংবাদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ৬ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সাংসদদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় রাজউকের চেয়ারম্যান নূরুল হুদাকে কমিটির পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হবে। জনাব হুদার কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং জবাবে কমিটি সন্তুষ্ট না হলে তাঁকে অপসারণের দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে ড্যাপ সম্পর্কে কোনো সভা-সেমিনারে তাঁকে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে কমিটি।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকের শুরুতেই কমিটির সদস্যরা অভিযোগ তোলেন, ‘সাংসদদের ব্যাপারে ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করার সাহস রাজউক চেয়ারম্যান কোত্থেকে পেলেন? এর জবাব তাঁর কাছ থেকে নিতে হবে। ড্যাপ নিয়ে রাজউকসহ একটি মহলের আগ্রহ দেখে মনে হচ্ছে, তাদের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, যার সঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যানও জড়িত।’
অপর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা করতে অনুমতি লাগবে’ (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই ২০১০)। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর বিরুদ্ধে এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে মারধর করার অভিযোগে মামলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ একজন সাংসদ। তাঁর বিরুদ্ধে মামলার আগে যেমন চিন্তা করা উচিত ছিল, তেমনি মামলা নেওয়ার সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিষয়টি অবহিত করা উচিত ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাংসদদের ছোটখাটো ভুলের বিষয়ে মামলা করার আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, অনুমতি নিতে হবে। উল্লেখ্য, এ ঘটনার জন্য পরবর্তীকালে পুলিশের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয় এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য আইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, তদন্তের পর যদি সার্জেন্ট কিংবা ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা হবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর সমতুল্য।
এ তিনটি খবরই ‘পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজ’ বা সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি-সম্পর্কিত। অর্থাৎ অভিযোগ, নূরুল হুদা তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে সাংসদদের মর্যাদাহানি এবং সংসদের অবমাননা করেছেন।
আমাদের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি-সম্পর্কিত। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘(১) সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। (২) সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি এই সকল ক্ষমতাপ্রয়োগ-সম্পর্কিত কোন ব্যাপারে কোনো আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না। (৩) সংসদে বা সংসদের কোন কমিটিতে কিছু বলা বা ভোট দানের জন্য কোন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে কোন আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৪) সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোন রিপোর্ট, কাগজপত্র, ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৫) এ অনুচ্ছেদ-সাপেক্ষে সংসদের আইন-দ্বারা সংসদের, সংসদের কমিটিসমূহের এবং সংসদ-সদস্যদের বিশেষ-অধিকার নির্ধারণ করা যাইতে পারিবে।’ এ ছাড়া সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদও সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যপরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রেও আইনের দ্বারা এ ক্ষমতা কার্যকর করার কথা।
সংবিধানের এ দুটি ধারাকে কার্যকরতা দেওয়ার জন্য আমাদের দেশে অদ্যাবধি কোনো আইন প্রণীত হয়নি। সংসদ ও সাংসদদের অধিকার ক্ষুণ্নের অভিযোগে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। বস্তুত গত বছর ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে গঠিত সংসদীয় কমিটি সাবেক স্পিকার ও বর্তমান সাংসদ জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলেও এ-সম্পর্কিত আইন ও দৃষ্টান্তের অভাবে তাঁর বিরুদ্ধে সংসদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিশেষ অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতি বলা আছে, কিন্তু এতে বিশেষ অধিকার সংজ্ঞায়িত এবং এর পরিধিও নির্ধারণ করা হয়নি। আর এ জন্যই আইনের প্রয়োজন।
সংসদীয় বিশেষ অধিকার এবং দায়মুক্তির সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এরেসকাইন মে, ‘সংসদের বিশেষ অধিকার হলো কতগুলো স্বাতন্ত্র্য অধিকারের সমষ্টি, যা প্রত্যেক সাংসদ ব্যক্তিগতভাবে এবং সংসদের উভয় পক্ষই উপভোগ করে। এগুলো অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভোগ করা অধিকারের চেয়ে অতিরিক্ত অধিকার এবং এগুলো ছাড়া সংসদ ও সাংসদেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। তাই যদিও বিশেষ অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনের অংশ, তবু এগুলোর মাধ্যমে অনেকটা সাধারণ আইনের আওতা থেকে তাঁদের রেহাই দেওয়া হয়।’ আমাদের দেশে অবশ্য উচ্চকক্ষ নেই। তাই উচ্চকক্ষের কথা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যও নয়।
সংসদীয় বিশেষ অধিকারগুলোকে দুভাবে বিভাজন করা যায়: কতগুলো এককভাবে সাংসদদের জন্য প্রযোজ্য এবং অন্যগুলো পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যক্তি সাংসদদের বেলায় প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির ক্ষেত্রগুলো হলো: ক. বাকস্বাধীনতা, খ. দেওয়ানি মামলায় গ্রেপ্তার থেকে অব্যাহতি, গ. জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি, এবং ঘ. সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি। এগুলো মূলত দায়মুক্তি-সম্পর্কিত অধিকার এবং এগুলোর ফলে ব্যক্তি সাংসদদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭২-১৭৬ ধারায় এসব বিষয়সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও ক্ষমতাগুলো হলো: ক. শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অধিকার। কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার বা সংসদ অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদান, যার মধ্যে দুর্নীতি, অপকর্ম ও অসদাচরণের জন্য সাংসদকে বহিষ্কার এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। সংসদের এ ধরনের অধিকারকে শাস্তিমূলক ক্ষমতা বলা হয়। খ. সংসদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ব্যবস্থাপনা বা কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণসম্পর্কিত ক্ষমতা। গ. সাংসদদের উপস্থিতি ও কার্যকরতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা। ঘ. তদন্ত করার, সাক্ষী ও রেকর্ডপত্র তলব করার ক্ষমতা। আমাদের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২০১-২০৩ ধারায় এ-সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। ঙ. সাক্ষীদের শপথ প্রদানের ক্ষমতা। আমাদের কার্যপ্রণালি বিধির ২০৪-২০৫ ধারা এ বিষয়সম্পর্কিত। চ. মানহানিকর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন কাগজপত্র প্রকাশ করার ক্ষমতা।
বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ অধিকার (privileges), ক্ষমতা (powers) ও দায়মুক্তির (immunities) মধ্যে বিভাজন করা আবশ্যক, যদিও তা অনেক সময় করা হয় না। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সরকারের মতে, ‘নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে “বিশেষ অধিকার” হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন বা অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সংসদে যেকোনো কিছু বলার জন্য কোনো সাংসদ দায়ী না হওয়ার অধিকারই “দায়মুক্তি”।’ [বিশেষ রেফারেন্স অনুচ্ছেদ ১৪৩, এআইআর (১৯৬৫, এসসি ৭৪৫)]
রাজউকের চেয়ারম্যানকে দুটি সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে একই অভিযোগে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত একটি অভাবনীয় ঘটনা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। এ ছাড়া বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত সাংবিধানিক বিধানের কার্যকরতা প্রদানের জন্য কোনো আইনও নেই। তাই এ অধিকার প্রয়োগ করে তাঁকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত সংসদীয় কমিটিদ্বয়ের এখতিয়ারবহির্ভূত বলেই আমাদের ধারণা। আইন ও দৃষ্টান্ত নেই বলে জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না যায়, তাহলে জনাব হুদাকে কোন অধিকারে কারণ দর্শাতে বলা হবে? তাই অনেকের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংসদীয় বিশেষ অধিকারের অপব্যবহার বৈ কিছু নয়। এ ছাড়া আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান...।’ আমরা আশা করি, স্পিকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় রুলিং দেবেন, যা তিনি করেছিলেন গত অক্টোবর মাসে তাঁর সহকর্মী ব্যারিস্টার সরকারের ক্ষেত্রে।
জনাব নূরুল হুদা কী বলেছিলেন, যার জন্য আমাদের অনেক সাংসদ তাঁর বিরুদ্ধে এককাট্টা এবং এত ক্ষিপ্ত? তিনি কি মিথ্যা কিছু বলেছিলেন? তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে কি তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেছেন?
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে ব্লাস্টের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড: বাস্তবায়ন এবং করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, পরিকল্পিত পরিবেশ ও বাসোপযোগী ঢাকা চাইলে ড্যাপ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্যক্তিগত স্বার্থে এর বিরোধিতা করছে। দু-চারটা সংবাদপত্রও ড্যাপ ও রাজউকের সমালোচনা করছে। তারা ড্যাপ চায় না; রাজউককেও তুলে দিতে চাইছে। তাদের ইচ্ছা বাস্তবায়িত হলে কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। এই শহর কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হবে। তিনি আরও বলেন, যেসব সাংসদ আবাসনব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সংসদে ড্যাপের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘এ দেশে কে কী করবে? একজন সাংসদ গুলশান এলাকায় ছয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ১৬ তলা করেছেন’ (প্রথম আলো, ১ জুলাই ২০১০)।
উপরিউক্ত প্রতিবেদন থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, জনাব হুদা মিথ্যা কিছু বলেননি। এসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিরোধিতার মুখে ড্যাপ বাস্তবায়ন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তার সঙ্গে সঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যানের সত্যকথন অনেক নাগরিককেই আশ্বস্ত করেছে।
জনাব হুদা মিথ্যাচার করেননি কিংবা আইনও অমান্য করেননি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ আইন ভঙ্গ করেছেন। যিনি ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১৬ তলা ইমারত নির্মাণ করেছেন, তিনি অবশ্যই আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গলি প্রদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে আইন ভঙ্গ করেছেন আমাদের সেসব সাংসদ, যাঁরা আবাসনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েও গৃহায়ণ ও গণপূর্তসম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। কার্যপ্রণালি বিধির ১৮৮(২) অনুযায়ী, ‘এমন কোন সদস্য (সংসদীয়) কমিটিতে নিযুক্ত হইবেন না, যাহার ব্যক্তিগত, আর্থিক ও পরোক্ষ স্বার্থ কমিটিতে বিবেচিত হইতে পারে এমন বিষয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট আছে।’ উল্লেখ্য, কার্যপ্রণালি বিধি সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং আইনের সমতুল্য। তাই সাংসদদের এককাট্টা হয়ে জনাব হুদার বিরুদ্ধে চড়াও হওয়া দুই বিঘা জমির ‘আমি আজ চোর বটে...’ বিখ্যাত লাইনটির কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রসঙ্গত, শুধু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত কমিটিতেই নয়, স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে এমন সাংসদেরা আরও অনেক সংসদীয় কমিটিতেও রয়েছেন, যার বিরুদ্ধে আমরা বহুদিন থেকেই সোচ্চার (সমকাল, ১ জুলাই ২০১০)। আমরা আনন্দিত যে প্রধানমন্ত্রী অন্তত ১৪ জন সাংসদের রদবদলের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন, যার জন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ (সমকাল, ১৭ জুলাই ২০১০)।
সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে আসা যাক। সাংসদেরা যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে তাঁদের বাকস্বাধীনতাসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দায়মুক্ত করা হয়। কিন্তু কোনো দেশেই ফৌজদারি অপরাধ থেকে সাংসদদের দায়মুক্ত করার উদাহরণ আমাদের জানা নেই। এ ছাড়া আইনপ্রণেতারা কি আইনের ঊর্ধ্বে? তা হবে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগতিপূর্ণ। সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা সংসদীয় বিশেষ অধিকারের পরিধিকে সীমাহীন, বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং যার পরিণতিও অশুভ হতে বাধ্য।
এ ছাড়া আমাদের বর্তমান সংসদে কিছু সদস্য আছেন, যাঁরা তাঁদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের (যেমন, সরকারি কর্মকর্তাদের মারধর) মাধ্যমে মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদাহানি করেছেন। ১৮ জন সাংসদ মিথ্যা হলফনামা দিয়ে রাজউকের প্লটের জন্য আবেদন করেছেন, যা নৈতিক স্খলনজনিত গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এ পর্যন্ত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, এ ব্যাপারে কাউকে উচ্চবাচ্য করতেও আমরা শুনিনি।
পরিশেষে, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে, সংসদকে কার্যকর ও কলুষমুক্ত করতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন সাংসদদের আইন ও বিধিবিধান মেনে চলা এবং নৈতিকতাবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়া। একই সঙ্গে প্রয়োজন যেসব সাংসদ জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন এবং অন্যায় কাজে বা অসদাচরণে লিপ্ত হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া প্রয়োজন সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিষয়টি নির্ধারণ করার লক্ষ্যে দ্রুততার সঙ্গে একটি আইন প্রণয়ন। সাংসদেরা যাতে তাঁদের সংসদীয় পদ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে জরুরি প্রয়োজন তাঁদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা। আরও প্রয়োজন সব ক্ষমতাধরের সম্পদের হিসাব প্রদান। স্মরণ করা যেতে পারে, আচরণবিধি প্রণয়ন এবং বার্ষিকভাবে সম্পদের হিসাব প্রদান ও প্রকাশ ‘দিনবদলের সনদে’র অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয়ের প্রতি আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

Wednesday, February 17, 2010

মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব -ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে

আগামী জুনের মধ্যে মন্ত্রী ও সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দেওয়া হবে বলে আবারও আশার বাণী শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর এ বক্তব্য দেশবাসীকে কতটা আশ্বস্ত করবে, তা নির্ভর করছে এর বাস্তবায়নের ওপর। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই মন্ত্রী ও সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তারপর এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য নেই। মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দেওয়া অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার।
এর অবশ্য পটভূমিও আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে চারবার ও পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগের আমলে একবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহু রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির মামলা হয়েছিল, তাও ভিত্তিহীন বলা যাবে না। যদিও আইনগত ত্রুটি ও সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া পেয়ে গেছেন। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। জনগণও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার গঠনের পরপরই মন্ত্রী-সাংসদেরা সম্পত্তির হিসাব দেবেন এবং জনসমক্ষে তা প্রকাশ করবেন। তাতে বোঝা যেত, ক্ষমতায় আসার আগে কার কী সম্পত্তি ছিল এবং গত এক বছরে সেই সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে, না কমেছে।
মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দিতে দেরি করার সমর্থনে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনের আগে অধিকাংশ প্রার্থী কমিশনের হলফনামায় যে তথ্য দিয়েছেন, এর সত্যতা প্রশ্নাতীত নয়। কোটিপতি প্রার্থীও বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকা বলে চালিয়ে দিতে দ্বিধা করেন না। নির্বাচন কমিশনে তাঁদের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দেওয়া হিসাবের যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। আবার অনেক কিছু রাজস্ব বোর্ডের হিসাবেও গোপন রাখা হয়। সম্প্রতি প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী ও সাংসদ সম্পত্তির হিসাব গোপন করে রাজউকের প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। এটি কেবল অনৈতিক নয়, বেআইনিও। জনগণ আইন প্রণয়নের জন্য যাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন, তাঁরাই যদি বেআইনি কাজ করেন, এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না।
নির্বাচনী অঙ্গীকার সত্ত্বেও শুরুতেই কেন তাঁরা সম্পত্তির হিসাব দিলেন না, সেটাই প্রশ্ন। দেরিতে হলেও অর্থমন্ত্রী আগামী জুনের মধ্যে মন্ত্রী ও সাংসদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জনগণ তার বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে। আর শুধু মন্ত্রী-সাংসদদের নয়, তাদের পোষ্যদের সম্পত্তির হিসাবও প্রকাশ করতে হবে। প্রতিবছর তা দিতে হবে, এতে জনগণ জানতে পারবে বছর বছর তাদের সম্পত্তি কী হারে বাড়ছে বা কমছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে ও দুর্নীতি ঠেকাতে এটা করতে হবে। ফলে যদি নিছক লোক-দেখানো ও নিয়ম রক্ষার জন্য সম্পত্তির হিসাব দেওয়া হয়, তবে তা কোনো কাজে আসবে না। মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাবের নামে কোনো ধরনের চালাকি জনগণের কাছে গহণযোগ্য হবে। হিসাবটি অবশ্যই জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। সরকারের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে, যাতে তারা তা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারে। কেউ যদি মিথ্যা তথ্য দেন, তবে কী শাস্তি তিনি পাবেন, সেটাও পরিষ্কার করা জরুরি।

Monday, January 18, 2010

সংবর্ধনার বিকল্প পদ্ধতি বের করুন -জনভোগান্তিমূলক কর্মসূচি আর নয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর শেষে দেশে ফেরার দিনে সরকারি দল যে এমন ব্যাপক মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করবে—এ তথ্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর জানা ছিল কি না, সে বিষয়ে আমরা সন্দিহান। সরকারি দলের নেতাদের উচিত ছিল এমন পন্থায় প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানানোর ব্যবস্থা করা, যাতে জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে। প্রধানমন্ত্রী ফিরেছেন সন্ধ্যায়, দুপুর থেকে রাস্তাঘাটে যানজট সৃষ্টি করে মিছিল বের করার কী প্রয়োজন ছিল, তা বোধগম্য নয়। সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানানো যেত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে সরকারি দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা দুপুর থেকে মিছিল নিয়ে বের হন শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে। আর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরাটন হোটেল পর্যন্ত মহাসড়কজুড়ে মিছিলের কারণে যানবাহন চলাচলে ব্যাপক বাধার সৃষ্টি হয়। এই সড়কের বেশ কিছু অংশে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ রকম বৃহত্ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তার প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে পড়ে মহানগরের অন্য সড়কগুলোতেও। মহানগরজুড়ে যান চলাচলে অচলাবস্থার সচিত্র বিবরণ পরদিন বৃহস্পতিবারের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয়েছে, যা থেকে জনসাধারণের ভোগান্তির মাত্রা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়, অতীতেও জনগণের চলাচলের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা না করে রাজনৈতিক দলগুলো এমন কর্মসূচি দিয়েছে। কিন্তু এখন একটি পরিবর্তনকামী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন সময়ে ভিআইপিদের চলাচলের সময় যাতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বাধাবিঘ্নের সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে কথা বলেছিলেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফিরে আসার দিনেই বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর কর্মী-সমর্থকদের দীর্ঘ মোটর শোভাযাত্রা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এবং আবদুল মোমিন তালুকদারের কর্মী-সমর্থকদের মোটরসাইকেল-মাইক্রোবাসের শোভাযাত্রা বগুড়া-সান্তাহার সড়কে যানজটের সৃষ্টি হলে ওসব পথে চলাচলকারী হাজার হাজার মানুষের চরম ভোগান্তি হয়। বিরোধী দলগুলোর মিছিল-সমাবেশের ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ তাদের বিবেচনায় থাকে না, বরং হরতালের মতো কর্মসূচিগুলোতে তারা জনদুর্ভোগকেই পুঁজি করতে চায়। সরকারি দলও যদি এমনভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করে, যা জনসাধারণের দুর্ভোগের কারণ হয়, তাহলে তো বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো পার্থক্য থাকে না। কিন্তু সরকারি দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর কাছে জনসাধারণ অধিকতর দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করে।

সাংসদদের আচরণবিধি -তাঁদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে

সাংসদদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে যে বেসরকারি বিলটি উত্থাপিত হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিলের শিরোনাম হলো ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন-২০১০’। বিলটির উত্থাপক সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, সাংসদেরা যাতে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অবিচল থেকে তাঁদের কার্যক্রম ও আচরণ অনুযায়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটাতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এটি উত্থাপন করা হয়েছে।
বিলটির উদ্দেশ্য মহত্। এতে যেসব বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: সাংসদেরা কার্যপ্রণালীবিধি অনুযায়ী চলবেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে কোনো সুপারিশ করতে পারবেন না। নিজের বা পরিবারের সদস্যরা আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবেন না। তাঁরা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না, যাতে তাঁদের সংসদীয় দায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বহু দেশে সাংসদ ও মন্ত্রীদের জন্য আচরণবিধি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিলটি ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে। এতে যেসব নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, তা যেকোনো দেশের সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। সাংসদদের দায়িত্ব হলো জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে আইন প্রণয়ন করা এবং নির্বাহী বিভাগ যথাযথভাবে সে আইন পালন করছে কি না, তা তদারক করা। সেখানে সাংসদেরা যদি নির্বাহী বিভাগ থেকে কোনো সুবিধা নেন, কিংবা সুবিধা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন, তাহলে তাঁদের পক্ষে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমাদের সংবিধান নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে এক পক্ষের কাজে অন্য পক্ষের হস্তক্ষেপ মোটেই কাম্য নয়।
সাবের হোসেন চৌধুরী যখন এই বিল উত্থাপন করেছেন, তখন বিরোধী দল সংসদ বর্জন করে চলেছে। এ রকম একটি বিলের ব্যাপারে সব দলের উপস্থিতিতে এবং বিস্তারিত আলোচনার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে বিলটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলেই আমরা মনে করি। একই সঙ্গে এই আশঙ্কাও থেকে যায়, বিলটি যেহেতু সাংসদদের আচরণবিধি সম্পর্কে, সেহেতু এটি যেন ফাইলবন্দী হয়ে না যায়। গুরুত্ব দিয়ে এটি সরকারি বিল হিসেবেও সংসদে উত্থাপন করা যেতে পারে। বেসরকারি বিলের আরেকটি সমস্যা হলো, এটি পাস হলেও বাধ্যবাধকতা থাকে না। কেউ এ আইন ভঙ্গ করলে তাঁকে শাস্তি দেওয়া যায় না।
বিলে সাংসদদের আচরণবিধি পালনে যে নৈতিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাও সমর্থনযোগ্য। জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের সীমার মধ্যে কাজ করবেন, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দেবেন—এটাই প্রত্যাশিত। সাংসদদের এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে প্রশাসনে অন্যায় ও দুর্নীতি প্রশ্রয় পায়। বরং তাঁরা চারিত্রিক গুণাবলি দিয়ে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যা প্রশাসন তথা দেশ ও জাতির জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। আলোচ্য বিলে সাংসদদের যেসব নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে সাংসদদের মর্যাদা যেমন বাড়বে, তেমনি সংসদীয় গণতন্ত্রও সুদৃঢ় হবে।