Sunday, June 15, 2025

এক দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, দর্শক মুসলিম দেশগুলো by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

মোসাদ। ইসরাইলের একটি দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা। এ সময়ে ইরানে যে হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল, তার বড় অংশে ভূমিকা আছে এই গোয়েন্দা সংস্থার। ১৩ই জুন শুক্রবার শেষ রাতে ইরানে আগ্রাসী হামলা চালায় ইসরাইল। এতে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সঙ্গে যুক্ত হয় মোসাদ এজেন্টরা। তারা রাজধানী তেহরানেই বছরের পর বছর গোপন ঘাঁটি স্থাপন করে চোরাই পথে অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলে সেখানে। এছাড়া ইরানের প্রশাসন, সামরিক, পারমাণবিক প্রতিটি ক্ষেত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে তাদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম। বিষয়টি স্পষ্ট হয় ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কথা। তিনি ২০২৪ সালে জানিয়েছেন, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থায় মোসাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সব তথ্য পাচার করে দিচ্ছে। তা ঠেকাতে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ইউনিটের প্রধান নিজেই মোসাদের গুপ্তচর ছিলেন। ২০২১ সালে ফাঁস হয় তার পরিচয়। আহমাদিনেজাদ আরও দাবি করেন, ইরানের অন্তত ২০ জন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন এবং তারা গোপনে ইসরাইলকে তথ্য সরবরাহ করতেন। এর পর আর কি বলার থাকতে পারে।

১৯৩৯ সালে শুরু হয়ে ১৯৪৫ সালে শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে স্বাধীন হয় ইসরাইল। তার আগে আরব-ইসরাইল সংকটের ফলে ইসরাইল বুঝে যায় তাকে টিকে থাকতে হলে ভিন্ন কৌশলে এগুতে হবে। ফলে ১৯৪৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের পরামর্শে মোসাদ গঠিত হয়। তাদেরকে ছড়িয়ে দেয়া হয় সারাবিশ্বে। দেশে দেশে তারা কার্যক্রম চালাতে থাকে। ক্রমশ পরিপক্ব হয়ে ওঠে। দুর্ধর্ষ সব অভিযান চালায় তারা। মোসাদ গঠন করে বিশ্বজুড়ে যখন দম্ভের সঙ্গে ইসরাইল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তারা আত্মতুষ্টিতে মেতে থাকেনি। ক্রমশ ধারালো হয়েছে তাদের কৌশল। এ জন্যই তারা আর্জেন্টিনা সহ বিভিন্ন দেশে ছদ্মবেশ ধারণ করে অভিযান চালিয়েছে নির্বিঘ্নে। এর মধ্য দিয়ে তারা যখন তীব্রতর এক সংগঠনে পরিণত হয়েছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ বেড়েছে। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, স্বীয় স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব তাদের প্রকট হয়েছে। অন্যদিকে ইহুদি ইসরাইল ক্রমশ বিশ্বে তাদের সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করেছে।

বলা হয়, মুসলিম জাতি একটি মানবশরীরের মতো। তার কোথাও মশা বসলে পুরো দেহ যেমন সাড়া পায়, তেমনি একজন মুসলিম আক্রান্ত হলে পুরো মুসলিম জাতির মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিন্তু তা হয়নি। ক্রমশ মুসলিমরা বিভক্ত হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও তা বর্তমানে স্বাভাবিক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে করা আব্রাহাম অ্যাকর্ডের অধীনে বাহরাইন সহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ শুধু নিজের স্বার্থে সেই চুক্তির অধীনে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধে খেলা হয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে যখন নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তখন প্রতিবেশী কুয়েতে সামরিক ঘাঁটি বসাতে অনুমতি দেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। সেখান থেকেই ইরাক যুদ্ধ পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র।

মুসলিম দেশগুলো এভাবেই নিজেদের একক স্বার্থ এবং অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত থাকার ফলে সুবিধা নিয়েছে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা দেশগুলো। গাজায় যখন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করছে যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস, তখনও মুসলিম দেশগুলো মুখ বন্ধ করে বসে আছে। অথচ অন্য কোনো দেশ যদি ইসরাইলে কোনো একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা চালায় তাহলে প্রতিক্রিয়া কি হবে? পশ্চিমা বিশ্ব তথা ইসরাইলের মিত্ররা কি এখনকার আরব রাষ্ট্রগুলো, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মতো মুখ বন্ধ করে বসে থাকবে? নিশ্চয়ই নয়। কারণ, তাদের মধ্যে জাতিগত স্বার্থে একতা আছে, ঐক্য আছে। বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তার বিন্দুমাত্রও উপস্থিত নেই।

এই লেখাটি শেষ করতে চাই মোসাদের হাজারো কর্মকাণ্ডের সামান্য কিছু তথ্য শেয়ার করে। মোসাদ ইসরাইলের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই সংস্থাটি মূলত গুপ্তচরবৃত্তি, গোপন অভিযান এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। এটি ইসরাইলি গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের তিনটি মূল শাখার একটি। অন্য দুটি হলো আমান (সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ) এবং শিন বেত (আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা)। মোসাদের প্রধান সরাসরি এবং কেবলমাত্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহি করেন। তাদের বার্ষিক বাজেট প্রায় ১০ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ২.৭৩ বিলিয়ন ডলার)। এতে আনুমানিক ৭০০০ কর্মী কাজ করে। যা একে বিশ্বের বৃহত্তম গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। সংস্থাটি বহু আলোচিত ও বিতর্কিত গোপন হত্যাকাণ্ড ও অপারেশনে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ (আমান), অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা (শিন বেত) এবং রাজনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। ১৯৫১ সালে এটি পুনর্গঠিত হয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে চলে যায়। মোসাদকে ইসরাইলি সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যান বর্ণনা করেছেন একটি ‘ডীপ স্টেট’ হিসেবে। কারণ এটি পার্লামেন্ট তথা নেসেটের প্রতি নয়, বরং কেবল প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দায়বদ্ধ। ১৯৯০-এর দশকে আলিজা ম্যাগেন-হালেভি মোসাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত নারী উপ-পরিচালক ছিলেন।  ২০১৬ সালে ইসরাইলের ৬৮তম স্বাধীনতা দিবসে মোসাদ প্রথমবারের মতো একটি গোপন ধাঁচের সাইবার রিক্রুটমেন্ট বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এতে গাণিতিক ও সাংকেতিক ধাঁধার মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া চালানো হয়। তাতে অংশ নেয় ২৫০০০ মানুষ। উত্তীর্ণ হন মাত্র কয়েক ডজন। ২০১২ সালের একটি বিরল সাক্ষাৎকারে মোসাদের সদস্যরা তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, পারিবারিক জীবনের সাথে পেশাগত দায়িত্বের সামঞ্জস্য, দলে কাজ করা, আবেগ সম্পন্ন বুদ্ধিমত্তা ও আত্মপ্রকাশ না করার বিষয়ে কথা বলেন। ২০২৪ সালে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাতে, হিজবুল্লাহ একটি ‘কাদের ১’ ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের একটি মোসাদ ঘাঁটির দিকে ছুড়ে মারে বলে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট আসে।

১৯৬০ সালে মোসাদ জানতে পারে কুখ্যাত নাৎসি নেতা অ্যাডলফ আইখমান আর্জেন্টিনায় অবস্থান করছেন। শিমন বেন আহারনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি মোসাদ দল গোপনে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করে এবং নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে, আইখমান সেখানে রিকার্ডো ক্লেমেন্ট ছদ্মনামে বসবাস করছেন। ১৯৬০ সালের ১১ মে তাকে অপহরণ করে একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যায় তারা। এরপর তাকে গোপনে ইসরাইলে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ঘটনায় আর্জেন্টিনা তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে প্রতিবাদ জানায় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে উল্লেখ করে যে, এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূলনীতির পরিপন্থী হবে, যা নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এটা হবে শান্তি রক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে একইসঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদ স্বীকার করে যে- আইখমানের বিরুদ্ধে যে ঘৃণ্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, তার যথাযথ বিচার হওয়া উচিত। এই প্রস্তাবনা যেন কোনোভাবেই ওই অপরাধগুলোর প্রতি সহানুভূতি বা প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থে বিবেচিত না হয়। মোসাদ পরে জোসেফ মেনগেলে নামক আরেক নাৎসি অপরাধীকে ধরার জন্য দ্বিতীয় একটি অভিযান শুরু করেছিল, তবে পরে সেই অভিযান বাতিল করা হয়।

ইরানে মোসাদের কার্যকলাপ হলো গুপ্তচরবৃত্তি, হত্যা ও পারমাণবিক তথ্য চুরি করা। এই লক্ষ্য নিয়ে তারা ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের (১৯৭৮-৭৯) আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় ইরানের সিক্রেট পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক গঠিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নিরাপত্তা সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়লে মোসাদ ইরানে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা সাভাক সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং বিভিন্ন যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। ২০০৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইরানি জেনারেল আলি রেজা আসকারি তুরস্ক থেকে নিখোঁজ হন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, মোসাদই তার পালানোর পেছনে কারণ ছিল। যদিও ইসরাইলের মুখপাত্র মার্ক রেগেভ এ দাবি অস্বীকার করেন। রিপোর্টে বলা হয়, আসকারি ২০০৩ সাল থেকেই মোসাদের গোপন এজেন্ট ছিলেন এবং তার পরিচয় ফাঁস হওয়ার আগেই তিনি পালিয়ে যান।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা ফিগারো দাবি করে, ২০১১ সালের ১২ অক্টোবর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের ইমাম আলী সামরিক ঘাঁটিতে হওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণের পেছনে মোসাদ থাকতে পারে। ওই ঘটনায় ১৮ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল হাসান তেহরানি মোগাদ্দাম। তিনি ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রধান ছিলেন। এই ঘাঁটিতে শাহাব-৩ সহ অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ছিল বলে মনে করা হয়। মোসাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানী-মাসউদ আলিমোহাম্মাদি, আর্দেশির হোসেইনপুর, মাজিদ শাহরিয়ারি, দারিউশ রেজায়িনেজাদ এবং মোস্তফা আহমাদি-রোশনকে হত্যা করেছে। মোসাদের  সাবেক প্রধান মেইর দাগান এসব হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার না করলেও, এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, এই ‘গুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্কদের’ সরিয়ে দেওয়া ইরানের বিজ্ঞানীদের ভয় পাইয়ে দিয়েছে এবং অনেকেই পারমাণবিক প্রকল্প থেকে সরে এসে বেসামরিক কাজে যোগ দিয়েছেন।

২০১৮ সালে মোসাদ এজেন্টরা তেহরানে অবস্থিত ইরানের গোপন পারমাণবিক আর্কাইভে হানা দেয় এবং সেখান থেকে ১ লাখের বেশি নথি ও কম্পিউটার ফাইল চুরি করে ইসরাইলে নিয়ে যায়। এসব নথিতে ‘আমাদ প্রকল্প’ নামে একটি গোপন পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসরাইল পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে এসব তথ্য শেয়ার করে।

সর্বশেষ খবর হলো, শনিবার দিবাগত রাতে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এর আগে শুক্রবার তারা ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করে। মাত্র একটি অভিযানে এতগুলো শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু নিশ্চয় ইরানকে সামরিক দিক দিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছে। এভাবে একটি দেশের প্রতিরক্ষা খাতকে ধ্বংস করে দিলে তার আর বাকি থাকে কি? দৃশ্যত সেখানকার নেতাদের মধ্যে শুধু কথার জোরই এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান। যখন প্রতিবেশী দেশকে কোনো কারণ ছাড়া এভাবে হামলা চালিয়ে শেষ করে দেয়া হচ্ছে, তখন চারপাশের মুসলিম দেশগুলো যেন ফুটবল মাঠের দর্শক! 

mzamin

তুমুল যুদ্ধ, ইসরাইলে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ৮, ইরানে জ্বলছে তেলের ডিপো

ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। গত রাতে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এর মধ্যে হাইফা ও তেল আবিব শহর অন্যতম। এর ফলে ইসরাইলে কমপক্ষে ৮ জন নিহত হয়েছে। ইসরাইলে নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া। সেখান থেকে প্রকৃত চিত্র পাওয়া খুব দুরূহ। এমনিতেই যুদ্ধকালীন কোনো প্রকৃত তথ্য পাওয়া কঠিন। কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তা নিরপেক্ষ সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও কিছু মিডিয়া যে খবর দিচ্ছে, তাতে ইরানের পাশাপাশি ইসরাইলেরও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিবিসি সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরাইলের অনেক ভবনের ছবি প্রকাশ হয়েছে। সেসব মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ভয়াবহতার মাত্রা কী পরিমাণ তা ওইসব ছবিই স্পষ্ট করে বলে দেয়। তেল আবিব মেট্রোপলিটন এলাকায় বাট ইয়াম শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র একটি ভববে আঘাত করেছে। সরাসরি আঘাতে ওই ভবনটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।

ইসরাইলের ইমার্জেন্সি সার্ভিস এমডিএ নিশ্চিত করেছে সেখানে কমপক্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১০০ মানুষ। পক্ষান্তরে ইরানের বেসামরিক লোকজন, তেলক্ষেত্র ও পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এর ফলে রাজধানী তেহরানে শাহরান তেলের ডিপোতে আগুন ধরে যায়। সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল।

ইসরাইলের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ক প্রকল্পগুলোকে টার্গেট করেছে। এতে এখন পর্যন্ত ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) প্রধান হোসেইন সালামি, সেনাপ্রধান সহ শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হয়েছেন। গত দু’দিনে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৮০। আহত হয়েছেন ৮০০ মানুষ। এর মধ্যে আছে ২০টি শিশু।

এমন এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধের মীমাংসা করতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এবং পুতিন একমত হয়েছেন যে, এই যুদ্ধের ইতি ঘটতেই হবে।

ওদিকে আজ রোববার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ষষ্ঠ দফা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান তা বাতিল করে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইসরাইলের অব্যাহত হামলার মধ্যে কোনো সমঝোতার যৌক্তিকতা নেই। 

ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদরদপ্তরে ইসরাইলের হামলা

ইসরাইল নিশ্চিত করেছে তারা ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদরদপ্তরে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই হামলার খবর দেয়। ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তেহরানের একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।

আইডিএফ বিবৃতিতে বলেছে, লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল ইরানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদরদপ্তর, এসপিএনডি পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় এবং আরও কিছু স্থান, যেখানে ইরানি সরকার তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গোপনে পারমাণবিক আর্কাইভ লুকিয়ে রেখেছিল।

উল্লেখ্য, ইরান যদিও তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে, তবুও তারা বারবার দাবি করে এসেছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, হামলায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশাসনিক ভবনে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ওই একই এলাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা অর্গানাইজেশন অব ডিফেন্স ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্সের একটি দপ্তরেও আরেকটি হামলা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং সিএনএনের জিওলোকেট করা কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার পরপরই ওইসব এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে।

mzamin

ইসরায়েলে বড় হামলা শুরু করেছে ইরান

কিছুক্ষণ আগেই ইরান জানিয়েছিল ইসরায়েলে বড় হামলা চালাতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় হামলাটি যে ‘বড়সর ও ধ্বংসাত্মক’ হবে তারও একটা আঁচ দিয়েছিল তারা। যেই কথা সেই কাজ। ইসরায়েলের মাটিতে নিজেদের শক্তির আরেকবার জানান দিল তেহরান। আবারো হামলা চালালো ইসরায়েলে।

স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টায় ইসরায়েলে নতুন করে হামলা শুরু করে ইরান। এ হামলা ড্রোনের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তারা। কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে শুক্রবার (১৩ জুন) রাতে তেল আবিবে ইরান শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে চারজন নিহত ও অনেক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গতকাল শুক্রবার (১৩ জুন) ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়।

এ ছাড়া আবাসিক স্থানেও হামলা চালায় তেল আবিব। হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ একাধিক কমান্ডারসহ ৮০ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ২০ জন শিশু রয়েছে।

এদিকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতে নিজেদের সেনাদলে আহত হওয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

শনিবার (১৪ জুন) দেশটির সেনাবাহিনীর দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, মধ্য ইসরায়েলে গভীর রাতে এই হামলা হয়, যা ছিল তাদের ওপর ইরানের পাল্টা আক্রমণের অংশ।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলোর আঘাতে অন্তত ৭ সেনা আহত হন। তাদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসার পর সবাইকে হাসপাতাল থেকে ছাড়াও দেওয়া হয়েছে। 

ইসরায়েলে হামলা। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলে হামলা। ছবি : সংগৃহীত

ইরান–ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা রূপ নিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে

ইরান–ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। একই হুমকি দিয়েছে ইসরায়েলও। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলতে থাকলে তেহরানকে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

এই সংঘাতের শুরু বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ইরানে ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামের অভিযানের মধ্য দিয়ে। ওই রাতে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। বৃহস্পতিবার রাতের হামলার পর শুক্র ও শনিবারও ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে নিহত হন ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, পরমাণুবিজ্ঞানীসহ ৭৮ জন। শনিবার রাতেও ইরানের বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলের হামলা চলছে।

ইসরায়েলের হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা। এরপর শুক্রবার রাতে ইসরায়েলের তেল আবিব ও জেরুজালেমে ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট হামলা চালায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এ হামলায় বিধ্বস্ত হয় বেশ কয়েকটি ভবন। নিহত হন তিন ইসরায়েলি। আহত হন অন্তত ৩৪ জন।

ইসরায়েলে ‘ট্রু প্রমিজ–৩’ নামে অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের কর্মকর্তারা। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক ইরানি কর্মকর্তা শনিবার দেশটির বার্তা সংস্থা ফারস নিউজকে বলেন, গত রাতে ইরানের চালানো সীমিত হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলকে মোকাবিলা শেষ হবে না। হামলা চলবে। আগ্রাসনকারীদের জন্য তা হবে খুবই পীড়াদায়ক। নিজেদের কাজের জন্য তারা অনুতপ্ত হবে।

ইসরায়েলের পাশাপাশি দেশটির মিত্রদেরও হুমকি দিয়েছে ইরান। শুক্রবার রাতে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি এবং যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। ইসরায়েলের মিত্র এই দেশগুলো চলমান সংঘাতে হস্তক্ষেপ করলে তাদেরও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইরান সরকার।

তেহরানকে ‘জ্বালিয়ে দেওয়ার’ হুমকি

ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে গেলে তেহরানকে ‘জ্বালিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উদ্দেশে বলেছেন, খামেনি ইরানের নাগরিকদের জিম্মি করছেন। ইসরায়েলের জনগণের ক্ষতি হলে ইরানকে চড়া মূল্য দিতে হবে। খামেনি যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে থাকেন, তাহলে তেহরান ‘জ্বলবে’।

পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা আয়াতুল্লাহ সরকারের প্রতিটি স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানব। (ইসরায়েলের হামলা) থেকে এত দিন তারা যা টের পেয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে যে হামলা চালানো হবে, তার তুলনায় কিছুই নয়।’ বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা ধ্বংস করছে বলে জানান তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিবিসির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদদাতা হুগো বাচেগা। তিনি বলেন, ইরানে চালানো হামলাকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সূচনা বলে ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছেন ইসরায়েলের কর্মকর্তারা। এর অর্থ হলো তাঁরা ইরানে আরও লম্বা সময় ধরে হামলা চালাতে চান।

‘সবকিছু কাঁপছিল’

শুক্রবার রাতে ইসরায়েলে চালানো ইরানের হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রু প্রমিজ–৩’। এদিন রাতভর তেল আবিব ও জেরুজালেম লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস গতকাল জানিয়েছে, এই হামলায় এক নারীসহ তিন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ৩৪ জন।

তেল আবিবে ইরানের হামলা শুরুর পর বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান। এমনই একজন চেন গাবিজোন। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার কয়েক মিনিট পর বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। সবকিছু কাঁপছিল। চারদিক ধোঁয়া ও ধুলায় ঢেকে যায়।’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ–এর খবরে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় তেল আবিবের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি বহুতল ভবনের নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া শহরের উপকণ্ঠে আরও নয়টি ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। জেরুজালেমেও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যায়।

শুক্রবার রাতে ইরান দেড় শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্রের বেশির ভাগই আকাশে থাকতে প্রতিহত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধির শঙ্কায় লেবানন ও জর্ডান সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। আর পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত দেশটির বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

তেহরানের এক ভবনেই নিহত ৬০

বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় তেহরান থেকে ২২৫ কিলোমিটার দূরে নাতাঞ্জ পরমাণু প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে শুক্রবার ও শনিবার ইরানের ফোর্ডো ও ইসপাহান পরমাণুকেন্দ্রে হামলা চালায় ইসরায়েল। তবে হামলার পর এসব পরমাণুকেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণ বৃদ্ধি পায়নি বলে জানিয়েছে বৈশ্বিক পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ)।

বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছিল বলে জানায় ইসরায়েল। শুক্র ও শনিবারের হামলায়ও কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান অংশ নেয় বলে জানিয়েছে তারা। ইরানের বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানায় হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে যুদ্ধবিমান রাখার স্থানেও হামলা হয়েছে। বোমাবর্ষণ করা হয়েছে জানজান শহরের একটি সেনাঘাঁটিতে।

পরে শনিবার রাতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর প্রদেশে সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল বোমা হামলা চালায়। এতে গ্যাসক্ষেত্রটিতে আগুন ধরে যায়। পরে ইরান জানায়, তাদের দুটি গ্যাসক্ষেত্রে হামলা হয়েছে। শনিবার রাতে দেশটির বন্দর আব্বাসেও হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে আল–জাজিরা।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে শনিবার জানানো হয়েছে, হামলা শুরুর পর থেকে ইরানের মোট ২০ জন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে তারা। এর মধ্যে দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল বাঘেরি ও আইআরজিসির প্রধান হোসেইন সালামি রয়েছেন। এ ছাড়া ৯ জন পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করা হয়েছে।

জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সায়েদি শুক্রবার জানিয়েছেন, ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ৭৮ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন ৩২০ জনের বেশি। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই বেসামরিক লোকজন। এর মধ্যে তেহরানের একটি বহুতল আবাসিক ভবনে হামলায় ২০টি শিশুসহ প্রায় ৬০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল।

পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে শনিবার ইসরায়েলের তিনটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে তেহরান। এসব যুদ্ধবিমানের দুই পাইলটকে আটক করা হয়েছে বলে ইরানের সেনাবাহিনীর বরাতে জানিয়েছে তেহরান টাইমস।

ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর খবরে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার আগে ইসরায়েলকে গোপনে প্রায় ৩০০টি অত্যাধুনিক ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে ইরানে ইসরায়েলের হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে আগে থেকেই জানত যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও ইসরায়েলের হামলার বিষয়টি আগে থেকে জানার কথা রয়টার্স, ফক্স নিউজসহ একাধিক গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ হামলায় মার্কিন বাহিনী ভূমিকা রাখেনি বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। তবে ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র যে ইসরায়েলে বিপুল হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, সে খবর এত দিন প্রকাশ করা হয়নি।

হেলফায়ার হলো লেজারনিয়ন্ত্রিত আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্র উপযুক্ত নয়। তবে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানার জন্য এটি বেশ কার্যকর। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, হেলফায়ার ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় ও ক্ষেত্র আছে। এগুলো ইসরায়েলের জন্য বেশ কার্যকর।

ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে রোববার তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনায় বসার কথা ছিল। ইসরায়েলের হামলার পর তা স্থগিত করেছে ইরান। এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেছেন, ‘একদিকে আপনি আলোচনার দাবি করবেন, অন্যদিকে জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীকে ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালাতে দেবেন, তা হতে পারে না।’

‘ইরানে শাসক পরিবর্তনের আশায় ইসরায়েল’

ইরান-ইসরায়েলের শত্রুতা বহু পুরোনো। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের সময় দেশটির পশ্চিমাপন্থী নেতা মোহাম্মদ রেজা শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। তিনি ইসরায়েলকে তেহরানের বন্ধু মনে করতেন। তবে এরপর ক্ষমতায় আসা শাসকেরা ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় সর্বশেষ সংঘাত শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানে হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল নিজেদের একটি উদ্দেশ্য পূরণের আশা করছে বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতির অধ্যাপক শাহরাম আকবারজাদেহ। সেটি হলো ইরানের শাসক পরিবর্তন। তিনি বলেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হলে ইসরায়েলকে নিরাপত্তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সুযোগই কাজে লাগাতে চাইছেন। তিনি চাইছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং ইরানে শাসনব্যবস্থায় কোনো ধরনের পরিবর্তন আসে।

তবে ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত যেন আরও ভয়াবহ দিকে মোড় না নেয়, সে জন্য দুই পক্ষকেই সংযত থাকতে বলেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ। গত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকেও দুই দেশকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল পোপ চতুর্দশ লিও একই আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কারও কখনোই অন্যের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলা উচিত নয়।

এমন পরিস্থিতিতে ইরান–ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা নিয়ে ফোনালাপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মধ্যপ্রাচ্যে এ উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে ফোনালাপে একমত হয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও। আর সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনালাপে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইসরায়েল সবচেয়ে বড় হুমকি।

গণ–অভ্যুত্থানে আহত: ‘ভয়ে’ সরকারি তালিকায় নাম না তোলা ইমরান চলে গেলেন নীরবে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ময়মনসিংহের নান্দাইলের ইমরান হোসেনের (২৬) বুক, পিঠ, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছিল। গতকাল শুক্রবার তিনি অনেকটা নীরবেই চলে গেলেন। আজ শনিবার তাঁকে দাফন করা হয় নিজ গ্রামে।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আওয়ামী লীগ কখনো ফিরে এলে সমস্যা হবে—এমন আশঙ্কায় সরকারিভাবে কোনো চিকিৎসা নেননি কিংবা সরকারি তালিকাভুক্তও হননি ইমরান।

ইমরানের মারা যাওয়ার খবর পেয়ে শনিবার গ্রামের বাড়িতে যান এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আশিকিন আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইমরান জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেখে আমরা নিশ্চিত হয়েছি; কিন্তু সরকারি কোনো তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আন্দোলনে আহত হওয়ার বিষয়টিও ইমরান কাউকে বলেননি। এখন আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।’

ইমরান হোসেনের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুশলী ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামে। স্বজনেরা জানান, স্ত্রী ও ১৮ মাসের সন্তান নিয়ে গাজীপুরের তারগাছ এলাকায় বসবাস করতেন ইমরান। প্রায় সাত বছর ধরে তিনি পাশের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ২৮ জুলাই গাজীপুরের তারগাছ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। পরে তাঁকে উদ্ধার করে পাশের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গোপনে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়ে শরীর থেকে বেশ কিছু ছররাগুলি বের করলেও যন্ত্রণা কমছিল না। গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে গাজীপুরের ভাড়া বাসায় বুকে ব্যথা অনুভব করলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

ইমরানের স্ত্রী রিতা আক্তার জানান, জুলাই আন্দোলনে তাঁর স্বামী আহত হলেও ভয়ে সরকারি তালিকায় নাম তোলেননি। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করানো যায়নি। তাঁর সঙ্গে যাঁরা আহত ও নিহত হয়েছিলেন, তাঁরা সবাই তালিকাভুক্ত হওয়া ছাড়াও সরকারের সব ধরনের অর্থ বরাদ্দ পেয়েছেন; কিন্তু তাঁর স্বামীর কেউ খবর নেয়নি।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়জুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইমরান কোথাও তালিকাভুক্ত হননি।  তবে তাঁর চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেখে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি তিনি আন্দোলনে আহত। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আমাদের পক্ষে থেকে পরিবারটিকে যে ধরনের সহযোগিতা করা দরকার তা করা হবে।’  

ইমরানকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে পোস্ট করেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ময়মনসিংহ জেলা শাখার সদস্যসচিব মো. আলী হোসেন বলেন, ‘ইমরান আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন সে ছবি আমাদের কাছে রয়েছে। অনেকটা নীরবে বিনা চিকিৎসায় একজন জুলাইযোদ্ধা আজ মারা গেছেন; কিন্তু সরকারি কোনো তালিকায় তাঁর নাম নেই।’

ইমরান হোসেন
ইমরান হোসেন

ইসরায়েল ঠিক এখনই কেন ইরানে হামলা করল by আলুফ বেন

শুক্রবারের শুরুতেই ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগারে বড় ধরনের হামলা চালায় এবং ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানে। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান শুক্রবার গভীর রাতে তেল আবিব ও জেরুজালেমের দিকে ডজন ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত হামলা যত দিন প্রয়োজন, তত দিন চলবে।’ এর প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের হামলার প্রতি জোরালো সমর্থন জানান। তিনি সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে নতুন করে পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি দারুণ হয়েছে। আমরা (ইরানিদের) সুযোগ দিয়েছিলাম, তারা সেটি নেয়নি। তারা বড় আঘাত পেয়েছে, খুব বড় আঘাত...এবং আরও আসছে।’

নেতানিয়াহুর এই হামলার পেছনের উদ্দেশ্য, কীভাবে তিনি ট্রাম্পকে কাজে লাগিয়ে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন এবং এই হামলার ফলে অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

হামলাটি ঠিক এখনই কেন হলো? প্রথমত, প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েল ইরানের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’–এর সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে আসছে। এই ২০ বছরের বেশির ভাগ জায়গায় নেতানিয়াহুই ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু সামরিক নেতারা অনেক আগে থেকেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের কথা ভাবছিলেন। ১৯৮১ সালে ইরাকে এবং ২০০৭ সালে সিরিয়ায় পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করা হয়েছিল। দুই ক্ষেত্রেই ওই পারমাণবিক কর্মসূচিগুলো ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য ছিল আগেভাগে হামলা করে সেই হুমকি দূর করা।

ইরানে হামলার চিন্তাভাবনা ২০১২ সালে নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাকের সময় তুঙ্গে পৌঁছেছিল। কিন্তু তখন ওবামা প্রশাসন তাঁদের থামিয়ে দেয়। পরে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি হয়। তখন কিছু ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাপ্রধান মনে করেছিলেন যে ইসরায়েলকে একাই হামলা করা উচিত নয়।

আমেরিকার সম্মতি আর আগে থেকে জানিয়ে রাখা জরুরি। ১৯৮১ সালে মেনাখেম বেগিন আমেরিকাকে না জানিয়ে ইরাকের চুল্লিতে হামলা চালান। ফলে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে এহুদ ওলমার্ট ২০০৭ সালে জর্জ বুশকে সিরিয়ার গোপন চুল্লি সম্পর্কে জানান। তখন বুশ প্রথমে নিজে হামলার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে তা ধ্বংস করতে দেন। প্রায় এক দশক ইসরায়েল সেই হামলার দায় স্বীকার করেনি।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এই হামলা ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে গত বছরের দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলার পর হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে দামেস্কে এক ইরানি জেনারেল নিহত হলে ইরান ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। কিন্তু সেটি ব্যর্থ হয়। কারণ, ইসরায়েল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সমর্থন পেয়েছিল।

অক্টোবর মাসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরায়েল পাল্টা আঘাত করে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দেয়। এরপর লেবাননে হিজবুল্লাহ ভেঙে পড়ে। সিরিয়ায় আসাদের শাসনও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার দিকে আঘাত হানার পথ সুগম হয়। কিন্তু তারা ট্রাম্পের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ছিল।

কিছু ইসরায়েলি মনে করছিলেন, ট্রাম্প হয়তো এই হামলার অনুমতি দেবেন না। কারণ, তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। আসলে কি সময় আর ট্রাম্পের উপস্থিতিই তাহলে মূল পার্থক্য তৈরি করল?

অবশ্যই। অক্টোবরের হামলার পর ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ভেঙে যাওয়া, রাশিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম না দেওয়া, হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ধ্বংস, আসাদের পতন—সব মিলিয়ে বড় হামলার সুযোগ তৈরি হয়। সম্প্রতি জানা গিয়েছিল যে ইসরায়েল সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নেতানিয়াহু হামলার জন্য চাপও দিচ্ছিলেন। ট্রাম্প কয়েক দিন আগেও প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেছিলেন। বাস্তবে নেতানিয়াহু তাঁকে আগেই জানিয়েছিলেন। আর এখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের সমর্থনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে ইসরায়েলকে সেন্টকমের অংশ করা হয়। ফলে ইসরায়েল এখন মার্কিন আঞ্চলিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করছে। এতে মার্কিন সেনা বা বিমান নয়, গোয়েন্দা তথ্যও ভাগাভাগি হচ্ছে।

সেই সঙ্গে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝার ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ বলেই মনে হয়। ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তির কথা বললেও বা গাজার যুদ্ধবিরতির কথা বললেও তিনি আসলে ইসরায়েলকে কোনো রকম চাপ দিতে চান না। ফলে ইসরায়েল নিজের মতো কাজ করে যাচ্ছে।

গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও আমেরিকা প্রায়ই ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক বিষয়ে শেষ কথা সব সময় আমেরিকার। ট্রাম্প চুক্তি চেয়েছিলেন। ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চললে হামলা হতো না। কিন্তু তারা সুযোগ নেয়নি। হিজবুল্লাহও যুদ্ধ থামাতে পারত। কিন্তু তারা তা চায়নি।

এখন একটা প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কি এখন গাজায় হামলা থামিয়ে দেবে? নাকি এই আক্রমণ শেষ করে গাজায় নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে? এটা সময়ই বলবে। নেতানিয়াহু এখনো গাজায় হামাস ধ্বংস ও ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের পরিকল্পনায় অটল। ট্রাম্প পরিকল্পনা মেনে সেই এলাকায় অবকাশযাপনকেন্দ্র ও বসতি গড়ার নীতিই এখনো ইসরায়েলের নীতি।

ইরান আক্রমণে ইসরায়েলে প্রায় সর্বসম্মত সমর্থন আছে। গাজার যুদ্ধ ও ইরান আক্রমণ নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তাই বাড়িয়েছে। তাঁর কৌশল হলো, কোনো অজনপ্রিয় কাজ করতে গেলে যুক্তি দেখান যে বড় কোনো শক্তির চাপে পড়ে এমনটা করতে হচ্ছে।

নেতানিয়াহুর এই হামলা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ছিল, মার্কিন সমন্বয় ও ব্যর্থতার ঝুঁকি নিয়ে। কিন্তু এখন সমন্বয় হয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু সন্দেহ রয়ে গেছে। তবু এটি বহু বছরের প্রস্তুতির ফল।

ইরানের পারমাণবিক হুমকি সত্যিই বেড়েছে। গত ডিসেম্বর ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের এক ধাপ কাছে চলে যায়। এই তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা। সব মিলিয়ে ইরানের এই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ, ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি এবং ট্রাম্পের সমর্থন—এই তিনের সমন্বয়েই এই হামলা হয়েছে।

* আলুফ বেন, হারেৎজ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক
- দ্য নিউ ইয়র্কার থেকে নেওয়া ইংরেজির সংক্ষেপিত অনুবাদ

ইসরায়েলের হামলার পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস ও সাধারণ জনগণ। তেহরান, ১৩ জুন
ইসরায়েলের হামলার পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস ও সাধারণ জনগণ। তেহরান, ১৩ জুন। ছবি: এএফপি

নারীবাদের ছদ্মবেশে ভারত যখন যুদ্ধ চালায় by অমৃতা দত্ত ও অরণি বসু

ভারতের সেনাবাহিনীর যে দুই নারী অফিসার ‘অপারেশন সিঁদুর’ ঘোষণা করেছিলেন, তাঁদের একজন হিন্দু ও একজন মুসলমান। তাঁদের দিয়ে অভিযানের ঘোষণা দেওয়ানোর ঘটনাকে ভারত জাতীয় কর্মযজ্ঞে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে।

খাকি পোশাক পরা এই দুই নারী যখন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন থেকে সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলছিলেন; যখন তাঁরা ভারতের ২৬ জন সাধারণ পুরুষ মানুষকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলছিলেন এবং যখন তাঁরা প্রতীকীভাবে বিধবাদের সিঁদুরের সম্মান রক্ষার বার্তা দিচ্ছিলেন, তখন অনেকেই এই দৃশ্যকে দেশের সেবায় নিয়োজিত একটি নারীবাদী চিত্র বলে প্রশংসা করেছিলেন।

দুই নারী অফিসারের ঘোষণাপর্ব শেষ হওয়ার পর ভারত সরকার এটিকে নারী ক্ষমতায়নের এক বিরাট উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করল। তাঁদের ছবি সবখানে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই বলল, ‘দেখো, নারীরাও আজ সম্মুখসমরে লড়াই করছে!’

এই ঘটনা ইতিহাসের আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেটি হলো, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যখন ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হয়েছিল, তখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অনেকেই হিন্দুদের যুদ্ধদেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। দুর্গা দেবীকে নারী শক্তি ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দুর্গার সঙ্গে ইন্দিরার তুলনা দেওয়া হয়েছিল কারণ, ইন্দিরা সে সময় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। দুর্গার সঙ্গে ইন্দিরার এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, ভারতে রাজনীতি অনেক সময়ই নারীর পরিচয় ও ধর্মীয় কল্পনার সঙ্গে মিশিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি ধর্মীয় প্রতীকের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

কিন্তু কোনো নারী যুদ্ধের নেতৃত্ব দিলেই কি সেটিকে নারীবাদের অগ্রগতি বলা যায়?

অনেক দিন ধরেই নারীবাদী গবেষকেরা বলে আসছেন, ‘নেশন বিল্ডিং’ বা ‘দেশ গড়ার’ মতো বড় কাজ আসলে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই চলে। সেখানে নারী-পুরুষকে সমানভাবে দেখা হয় না। বরং, নারীদের এমন সব ভূমিকা দেওয়া হয়, যেখানে তারা দেশের জন্য কিছু ত্যাগ করে। যেমন নারী মা হিসেবে সন্তান উৎসর্গ করে, বিধবা হিসেবে শোক করে—ইত্যাদি।

নীরা ইউভাল-ডেভিস নামের একজন গবেষক বলছেন, নারীদের অনেক সময় দেশের সম্মান আর সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের হাতে খুব কমই থাকে।

সামিতা সেন ও মৈত্রেয়ী চৌধুরীর মতো কয়েকজন ভারতীয় গবেষক বলছেন, ‘আমাদের দেশে নারীরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নিলেও তাঁদের সেই অংশগ্রহণ সর্বার্থে স্বাধীন থাকে না। বরং সমাজের নিয়মকানুন, মানে পুরুষদের বানানো নিয়ম মেনে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।’

তাই শুধু নারীরা সামনে এসেছে মানেই সব ঠিক হয়ে গেছে, এমন ভাবাটা ঠিক হবে না। আমাদের দেখতে হবে নারীদের সত্যিকার অর্থে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, নাকি শুধু লোকদেখানোর জন্য দেখানো হচ্ছে যে তাঁরাও অংশ নিচ্ছেন।

আজকের যেসব নারী যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করছেন বা সামরিক বাহিনীতে সামনে আসছেন, সেটিকে অনেক সময় একধরনের নারীবাদ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মধ্য দিয়ে নারীদের এমনভাবে তুলে ধরা হয় যেন তাঁরা ‘পুরুষদের মতো’ হতে পারছেন। অথচ সামরিক বাহিনীর যে পুরুষতান্ত্রিক মূল কাঠামো, সেটিকে কিন্তু আগের মতোই রেখে দেওয়া হয়।

এই বিষয়টি আমরা পরিষ্কারভাবে অপারেশন সিঁদুরের মধ্যে দেখতে পেয়েছি। এখানে ইউনিফর্ম পরা দুই নারী অফিসারকে সামনে এনে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এটি নারীদের অগ্রগতির একটি ছবি। কিন্তু তাঁরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তার পুরোটাই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার ওপর তৈরি। এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় নারীদের দেশের জন্য লড়াই করে এবং পুরুষদের মতো জাতীয়তাবাদ দেখিয়ে নিজেদের ‘বীরত্ব’ প্রমাণ করতে হয়।

এই ধরনের নারীবাদের ছবিগুলো ভারতের এক বিশেষ আদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। সেটি হলো আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) চিন্তাধারা। ১৯২৫ সালে গঠিত এই সংগঠন হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করে। সংগঠনটি ভারতের শাসক দল বিজেপির আদর্শগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

আরএসএস মনে করে, ভারতের একটি হিন্দুরাষ্ট্র হওয়া উচিত, যেখানে হিন্দুধর্মের রীতিনীতিই থাকবে সবার ওপরে। গবেষক ক্রিস্টোফ জ্যাফরেলো বলছেন, এই সংগঠন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের প্রাধান্য দেয় এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে দুর্বল করে।

আরএসএসের যে কাঠামো, সেখানে নিয়মশৃঙ্খলা আর জাতীয়তাবাদের ওপর অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে পুরুষদের নেতৃত্বকেই বেশি জায়গা দেওয়া হয়। তাই এটা আসলে সমাজের ভেতরে পুরুষের আধিপত্য আর স্তরভিত্তিক বৈষম্যকে আরও পোক্ত করে।

আরএসএসের নারী শাখা (যেমন ‘রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি’ ও ‘দুর্গা বাহিনী’) আসলে পুরুষতান্ত্রিক ভাবনারই প্রতিফলন। এই সংগঠনগুলো অনেক বছর ধরে নারীদের মার্শাল আর্ট শেখাচ্ছে আর আদর্শগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিন্তু এসব নারীর মুক্তির জন্য করা হচ্ছে না, করা হচ্ছে ‘হিন্দুরাষ্ট্রকে রক্ষা করার’ জন্য।

অপারেশন সিঁদুরের চেহারাও এই ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। গেরুয়া রঙের ছাপ, যুদ্ধজয়ী নারীর চেহারা আর সাজানো-গোছানো সাহসিকতার প্রদর্শন—এর সবই এই পুরোনো চিন্তার ধারাবাহিকতা।

দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধ ও লিঙ্গবিষয়ক প্রখ্যাত গবেষক বিনা ডি’কস্টা দেখিয়েছেন, কীভাবে নারীর দেহকে অনেক সময় জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এই অপারেশন সিঁদুরের মধ্যে এক মুসলমান নারী অফিসারকে রাখা হয়েছে। এটি দেখে মনে হতে পারে, এটি ধর্মনিরপেক্ষতার ইঙ্গিত। কিন্তু ডি’কস্টা বলছেন, এটি আসলে একধরনের ওপর-চালাকি। কারণ, এই একজন মুসলমান নারীকে দেখিয়ে বলা হয়, ‘দেখো, আমরা সবাইকে সুযোগ দিচ্ছি।’ অথচ বাস্তবে ভারতে অনেক মুসলমানের প্রতি বৈষম্য দেখানো হচ্ছে, অনেককে অপমান করা হচ্ছে বা ভয় দেখানো হচ্ছে।

এই একজন মুসলমান নারীকে সামনে আনা হচ্ছে যেন এটা প্রমাণ করতে যে সবাইকেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের চিন্তাভাবনাকেই আরও পোক্ত করা হচ্ছে আর মুসলমানদের বঞ্চনাকে ঢেকে রাখা হচ্ছে।

সিঁদুর হিন্দু বিবাহিত নারীরা মাথার মাঝখানে সিঁথিতে লাগান। এটি সাধারণভাবে বিবাহিত অবস্থার চিহ্ন, স্বামীর প্রতি ভক্তি এবং ‘ভালো স্ত্রী’ হওয়ার প্রতীক। সিঁদুরের সঙ্গে দেবী দুর্গার ভাবনাও জড়িয়ে থাকে।

ইতিহাসবিদ তনিকা সরকার তাঁর ‘হিন্দু ওয়াইফ, হিন্দু নেশন’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে জাতীয়তাবাদী কথা বা ভাবনা স্ত্রীর পবিত্রতা আর মাতৃভূমির পবিত্রতাকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

অপারেশন সিঁদুর নামটাই সিঁদুরের প্রতীককে একধরনের অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। এই নামের মধ্য দিয়ে বলা হয়েছে পাকিস্তানের ওপর সামরিক হামলার মাধ্যমে বিধবাদের ভেঙে যাওয়া বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতিশোধ নেওয়া হবে, তার মধ্য দিয়ে হিন্দু বিধবাদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

এই পুরো অপারেশন একধরনের ছবি তৈরি করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে কিছু নারী বিধবা হয়ে গেছেন (মানে তাঁরা সিঁথির সিঁদুর হারিয়েছেন) আর তাঁদের কষ্টকে প্রতিশোধের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নারীবাদী ইতিহাসবিদ উর্বশী বুতালিয়া বলেছেন, যুদ্ধের সময় নারীর দেহ, অনুভূতি আর প্রতীকগুলোকে (যেমন সিঁদুর, শোক, মাতৃত্ব ইত্যাদি) ‘যুদ্ধের চিহ্ন’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধ যখন হয়, তখন তা কেবল গোলাবারুদ দিয়ে হয় না। তার জন্য একটি ‘গল্প’ বা ‘ব্যাখ্যা’ দাঁড় করানো হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারে কেন যুদ্ধটা জরুরি। সেই গল্প বানাতে নারীদের দুঃখ, কষ্ট, চোখের জল—এসব ব্যবহার করা হয়।

যখন কোনো নারীর স্বামী মারা যান, তাঁকে বলা হয় বিধবা। তখন তাঁর মাথা থেকে সিঁদুর মুছে যায়। এই বিধবার কান্না, তাঁর হারানো সিঁদুর, তাঁর দুঃখ এসব অনুষঙ্গ ব্যবহার করে বলা হয়, ‘দেখো, কত কষ্ট। এর প্রতিশোধ নেওয়া দরকার।’

অর্থাৎ, নারীর কষ্টকে একটা জাতীয়তাবাদী অনুভূতির জ্বালানি বানিয়ে ফেলা হয় যেন দেশের জন্য যুদ্ধ করাটা ন্যায্য প্রমাণিত হয়।

উর্বশী বুতালিয়া বলছেন, অপারেশন সিঁদুরের সিঁদুর আসলে নারীদের কাছে এখন আর কোনো ভালো কিছুর প্রতীক নয়; এটি সেই কষ্টের স্মৃতি, যা তাঁরা হারিয়েছেন। সিঁদুর বলতে এখানে সম্মান হারানো, সামাজিক মর্যাদা হারানো ও নিরাপত্তা হারানোকে বোঝানো হয়েছে। বুতালিয়া মনে করেন, নারীর দুঃখকে সম্মান দিতেই তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে, তাঁর দুঃখকে ব্যবহার করতে নয়।

এই দুই নারী অফিসারকে এখানে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং এক কল্পনার ‘মাতৃভূমির’ সৈনিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁদের দেখানো হয়েছে সেই পুরোনো চিন্তার ধারাবাহিকতায়, যেখানে নারীদের মূলত ঘর আর পূজার আসনের মধ্যেই আটকে রাখা হতো।

এখানে আসলে যেটা উদ্‌যাপন করা হচ্ছে, সেটা নারীদের মুক্তি নয়। বরং তাদের এমন একটি ভূমিকার মধ্যে নিয়ে আসার বিষয়কে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে, যা কিনা পুরুষদের মতো যুদ্ধকেন্দ্রিক এবং আক্রমণাত্মক।

নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন তারা যুদ্ধ করতে পারে, অস্ত্র ধরতে পারে এবং সেটাকেই নারীর অগ্রগতি বলে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এর মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধ ও সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, নারীবাদকে নয়।

এই প্রতীকগুলো (যেমন নারী অফিসার, সিঁদুর, যুদ্ধ) আসলে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে। তাই আমাদের দরকার এই প্রতীকগুলোর মানে নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এসবের মাধ্যমে সরকার কী বোঝাতে চায়, কাকে সুবিধা দিতে চায়, সেই প্রশ্ন তোলা দরকার।

প্রশ্ন হচ্ছে যখন নারী অফিসাররা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন, তখন মানুষ কী উদ্‌যাপন করে? যুদ্ধকে? নাকি মানুষ কেবল এই কারণে খুশি হয় যে নারীরাও এতে অংশ নিচ্ছে?

এই দৃশ্যপটের ভেতরে যে বার্তাটি সূক্ষ্মভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেটি হলো নারীরা ‘পুরুষদের মতো’ না হলে তাঁদের যোগ্যতা প্রমাণিত হয় না। তাঁরা পুরুষের মতো শক্তিশালী না হলে তাঁদের নেতৃত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

এই দুই নারী অফিসারকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্র আসলে নারী নেতৃত্বকে ব্যবহার করছে, যেন যুদ্ধ ও সহিংসতাকে আরও জোরালোভাবে বৈধতা দেওয়া যায়। কিন্তু যে কাঠামো নারীদের প্রতি সহিংসতা চালায়, সেটাকে ভাঙার কোনো চেষ্টাই এখানে নেই।

প্রকৃত নারীবাদ চায় নারীরা নিজেরা ঠিক করুক তাঁরা কোথায়, কীভাবে অংশ নেবেন। কিন্তু এখানে সেই সিদ্ধান্তও নারীদের নয়। বরং এখানে আরএসএসের মতো পুরুষতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ ঠিক করে দিচ্ছে তাঁদের ভূমিকা কী হবে।

এই দুই অফিসার আসলে পুরোনো সেই চিত্রনাট্যে অভিনয় করেছেন, যেখানে নারী মানেই দেশের জন্য স্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল হওয়া।

এখানে একজন মুসলমান নারী অফিসারকেও রাখা হয়েছে। এটা ইচ্ছাকৃত; যেন বলা যায়, ‘আমরা সবাইকে সমান সুযোগ দিচ্ছি।’ কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দুর্গা বাহিনীর চিন্তাধারা ফুটে উঠেছে। সেই চিন্তাধারা হলো হিন্দু পরিবারকে রক্ষা করতে চাইলে ‘অহিন্দু’ নারীদেরও ব্যবহার করা যায়।

শুধু এই কারণেই একজন মুসলমান নারীকে সামনে আনা হয়েছে। এটি লোকদেখানো বহুত্ববাদ। বাস্তবে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য ও অবহেলা সমাজে ঠিকই চলছে।

নারীবাদী আন্দোলন শুধু দেখে না যে কারা যুদ্ধ করছে, বরং যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, কারণ এবং পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তোলে। যদি আমরা মেনে নিই দেশ গড়ার পুরো কাজটাই পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে চলে, তাহলে শুধু নারীদের সেই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর ঢুকিয়ে দিলেই সমাধান হয় না। বরং আমাদের সেই চিন্তাকেই বদলাতে হবে, যেখানে নারীর সম্মান শুধু স্ত্রীসুলভ আচরণ বা যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মোৎসর্গের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়।

নারীর সত্যিকারের নেতৃত্ব হওয়া উচিত শান্তি প্রতিষ্ঠা, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং নীতিনির্ধারণের জায়গায়—যেখানে সিঁদুর বা বাহাদুরি দিয়ে নারীর মূল্য যাচাই করা হয় না। নারী যুদ্ধ করছেন কি না তার ওপর তাঁর মর্যাদা নির্ভর করে না; বরং তিনি নিজের শর্তে সমাজে কীভাবে অবদান রাখছেন, তার ওপর তাঁর মর্যাদা নির্ভর করে।

সত্যিকারের লিঙ্গসমতা মানে হলো সেই নারীদের মূল্য দেওয়া, যাঁরা পুরুষতান্ত্রিক প্রতীকের ভেতরে ঢুকতে চান না। সত্যিকারের লিঙ্গসমতা মানে হলো সেই নারীদের মূল্য দেওয়া, যাঁরা যুদ্ধের বদলে শান্তির পক্ষে কথা বলেন, যাঁরা বিধবাদের পাশে থাকেন এবং যাঁরা মনে করেন, ‘স্ত্রী’ বা ‘সিঁদুর’ দিয়ে নারীর সম্মান মাপা উচিত নয়।

* অমৃতা দত্ত, বিলফেল্ড ইউনিভার্সিটির বিলফেল্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল ইন হিস্ট্রি অ্যান্ড সোশিওলজির প্রভাষক
* অরণি বসু, হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির হাইডেলবার্গ সেন্টার ফর ট্রান্সকালচারাল স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

অপারেশন সিঁদুরের তথ্য জানাতে মিডিয়ার সামনে আসেন দুই নারী কর্মকর্তা
অপারেশন সিঁদুরের তথ্য জানাতে মিডিয়ার সামনে আসেন দুই নারী কর্মকর্তা। ছবি: রয়টার্স

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইসরায়েলিদের কণ্ঠে আতঙ্ক-ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা

ইসরায়েলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে ইরানের নিক্ষেপ করা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির কেন্দ্রস্থলে আঘাত হানে। এতে ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং তিনজনের প্রাণহানি ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। শুক্রবার রাতে এ হামলার সময় ইসরায়েলের বাসিন্দাদের মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা, হতবিহ্বলতা ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল, তার বিবরণ দিয়েছেন কয়েকজন।

শুক্রবার ভোরে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলা চালায় ইসরায়েল। এর জবাবে শুক্রবার রাতে কয়েক দফায় ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। এ হামলার মুখে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সতর্কবার্তা জানিয়ে সাইরেন বাজালে লাখ লাখ মানুষ দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের নিক্ষেপ করা বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট করার কথা জানিয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিব, রামাত গান ও রিশন এলাকায় ঘরবাড়িতে আঘাত হানে।

তেল আবিবের একটি বহুতল ভবনে আঘাত হানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। ওই ভবনের বাসিন্দা টালি হোরেশ ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটনিউজকে বলেন, ‘আমরা ঘরের দরজা বন্ধ করে কম্পিউটারে খবর দেখছিলাম। হঠাৎ এত বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটল যে পুরো ভবন কেঁপে উঠল।’ তিনি বলেন, ‘কয়েক মিনিটের মধ্যে স্মোক ডিটেক্টর বেজে উঠলে আমরা দরজা খুলি। পুরো “লিভিং রুম” ধোঁয়ায় ভরে যায় এবং আমরা আবার নিরাপদ কক্ষে ফিরে যাই।’

উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর আগপর্যন্ত দুই ঘণ্টা হোরেশ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওই কক্ষে ছিলেন বলে ওয়াইনেট জানায়। হোরেশ জানান, ভবনের নিচের মেঝেগুলোয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়।

সেনাসদস্য, অগ্নিনির্বাপণকর্মী, পুলিশ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রকৌশলীসহ উদ্ধারকর্মীরা কয়েক ঘণ্টা সেখানে তৎপরতা চালান। ভবনের মধ্যে আর কেউ আটকা নেই, সেটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) হোম ফ্রন্টের নেতৃত্ব দেন কর্নেল (অব.) মাইকেল ডেভিড। তিনি ওয়াইনেটকে বলেন, ‘এটা এত বড় মাত্রার ঘটনা, যা আমরা অতীতে দেখিনি।’

মাইকেল ডেভিড জানান, তাঁরা ভবনের এক বাসিন্দার ছবি পেয়েছেন, তিনি আটকা পড়েছেন কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ কাজে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়, যখন কয়েক শ ভাড়াটে থাকেন, এমন ভবনের ঘটনা ঘটে। কোনো বাসিন্দা বিপদে নেই, এমনটা নিশ্চিত না হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পারেন না।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেল আবিবের কাছের শহর রামাত গানেও ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ হামলায় ৬৩ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে একজন নারী ছিলেন গুরুতর আহত, যিনি পরে মারা গেছেন।

শনিবার ভোররাতের দিকে ইরানের আরেক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেল আবিবের কাছের আরেক শহর রিশনের আবাসিক এলাকা আক্রান্ত হয়। এ হামলায় ইসরায়েল আলোনি (৭৩) ও আরেক নারী নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে তিন মাস বয়সী এক শিশুও রয়েছে।

ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিসের ক্যাপ্টেন ইদান চেন ওয়ালা নিউজ সাইটকে বলেন, ‘আমি তাকে আমার বাহুর মধ্যে তুলে নিই এবং প্রথম যে পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখি তাঁর কাছে দিয়ে দিই। তার পরিবারের অন্য সদস্যদের বের করা শুরু করি।’

ইদান চেন ওয়ালা বলেন, ‘আমরা যখন এই কাজ করছিলাম, সে সময় ওপরের ঘর ও সামনের ঘরেও লোকজন আটকা পড়েছিল। আর এর উল্টো দিকে আগুন জ্বলছিল। পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে আমি পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করি।’

রাতের পরিস্থিতি নিয়ে ওই এলাকার বাসিন্দা অভি গাতেনিও চ্যানেল ১২–কে বলেছেন, ‘আমার স্ত্রী বিদেশে আছে, আমি সন্তানদের নিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। সাইরেন বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিচে নেমে নিরাপদ কক্ষে চলে যাই। এর পাঁচ মিনিট পর আমরা বিরাট বিস্ফোরণের শব্দ শুনি।’ এরপর বাইরে বেরিয়ে দেখেন তাঁর এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে গেছে এবং তিনি এক প্রবীণ দম্পতিকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের হতে সহযোগিতা করেন।

এর পরপরই আবার দৌড়ে সন্তানদের কাছে যান জানিয়ে গাতেনিও বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাদের কিছু হয়নি। একটি আঁচড়ও আমাদের লাগেনি।’ নিচে পড়ে থাকা একটি কাচের টুকরা দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এ রকম কাচ বাচ্চাদের লেগে তাদের মৃত্যুও হতে পারে।’

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংসস্তূপে রূপ নিয়ে বহুতল ভবন। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার তৎপরতায় ইসরায়েলি এক সেনাসদস্য। রিশন এলাকা, ইসরায়েল, ১৪ জুন, ২০২৫
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংসস্তূপে রূপ নিয়ে বহুতল ভবন। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার তৎপরতায় ইসরায়েলি এক সেনাসদস্য। রিশন এলাকা, ইসরায়েল, ১৪ জুন, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

গল্প- তুমি মরো আমি বাঁচি by মঞ্জু সরকার

জীবনের শেষ কথাটি বলার জন্য তিনবার দমফাটা হিক্কা তুলে, উড়ে যাওয়ার আগে প্রাণপাখি চোখে চরম সতর্কবার্তা পাঠালে বৃদ্ধা ঘরে উপস্থিত একমাত্র জীবিত প্রাণী ছোটবউয়ের দিকে কাতর-ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকায়, তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ড মাত্র। চোখের আলো নিভে গেলে দৃষ্টি স্থির ও শরীর যখন নিস্পন্দ, রহিমা জিজ্ঞেস করে, ‘ও আম্মাজান, কী হইল!’

এতো কাছে থেকে মানুষকে আগে মরতে দেখেনি রহিমা। শাশুড়ি সাড়া না দেওয়ায় গায়ে হাত দেয়, নাকের ওপর হাত রেখে নিশ্চিত হয়, বুড়ির প্রাণপাখি এইমাত্র তার চোখের সামনেই উড়ে গেল! আর এমন এক সময়ে শাশুড়ির অন্তরাত্মা দেহছাড়া হলো, বাড়িতে যখন সে ছাড়া উপস্থিত নেই কেউ। এখন তার কী করা উচিত? রহিমা মৃতার চোখদুটি বুজিয়ে দেয় আলতো স্পর্শে।

বড়বাড়ির মুরবিব মরবে, বয়স হয়েছে, রোগে-দুর্ভোগে বিছানায় পড়ে থাকার বদলে এখন মরলেই তার শান্তি। সবাই জানত এবং এরকম বলাবলি করত। কিন্তু আজ সকালেও তো লাঠি ঠুকঠাক করে উঠানে হেঁটে বেড়িয়েছে মানুষটা। বাথরুমেও গেছে একা। রহিমা যথারীতি তার ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। মিষ্টিকুমড়ার ঘ্যাঁটে স্বাদ বাড়াতে কয়েক টুকরা বাসি মাংস দিয়েছিল সে। বেছে বেছে বুড়ির জন্য এক টুকরা হাড় দিয়েছিল আজ । দাঁতে অসমর্থ মানুষটাকে শক্ত হাড্ডি দেওয়ার সময় ফোকলা মুখে-গলায় হাড় আটকে তার মরণ কামনাও মনে উঁকি দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু রহিমার মনে শুধু হিংসের বিষ নয়, হাড্ডিটা পেঁচিয়ে এক পোঁচ মাংসও ছিল এবং দেখেশুনেই দিয়েছে রহিমা, বুড়ি যাতে খেতে পারে। জোহরের নামাজ পড়ে ভাতও খেয়েছে বুড়ি। খাওয়ার পর বিছানায় যেমন গড়ায়, আজো শুয়ে ছিল।

শাশুড়ির এঁটো থালাবাটি আনার জন্য ঘরে ঢুকে রহিমা হিক্কার আওয়াজ শুনে তার বিছানার দিকে এগিয়ে এসেছে, শেষ কথাটি শোনার জন্য তার মুখের ওপর ঝুঁকেও ছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজগুবি মরে গেল মানুষটা! চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মরণ দেখে বুকের ভেতরে নিজের আত্মাটাও ধকধক করছে। এখন রহিমা কী করবে? নির্জন বাড়িতে শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী হতে চায় না সে। লোকে বলবে, ছোটবউ খোঁজখবর নেয়নি, যত্নআত্তি করেনি ঠিকমতো। খাবারে বিষ মিশিয়ে হাড়-জ্বালানি শাশুড়িকে মারার চিন্তা যেহেতু তার মনেও এসেছিল, সন্দেহটা জাগতে পারে বুড়ির সন্তানদের মনেও। শকুনিবুড়ির জান নিতে আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার ফরিয়াদ জানিয়েছিল রহিমা। তার নীরব প্রার্থনা আল্লাহ না শুনুক, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বুড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের কানে না যাক, মনের খবর বুড়ির ছোট ছেলে তথা রহিমার গুণধর স্বামী ঠিকই জানে এবং সমর্থনও করেছে অনেক সময়, বউয়ের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সুখ নিষ্কণ্টক রাখার গরজে। কিন্তু এখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেলে স্বামী আজ খুশি হওয়ার বদলে নির্ঘাৎ অভিযোগ করবে, মায়ের শরীর খারাপ তো আমাকে ফোন দাওনি কেন?

রহিমা এক ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্বামীর নম্বর টেপে। সাধারণত স্বামীকে প্রতিটি ফোনকলে কানে পাওয়ার সময় শহরে তার অবস্থান নিয়ে মনে নানারকম সন্দেহ জাগে; কিন্তু আজ ফোন ধরতে বিলম্বের মুহূর্তগুলোতে মোটরসাইকেলে স্বামীর কোমরজড়ানো সন্দেহজনক নারীকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পায় এবং ভয়কাঁপা কণ্ঠে খবরটা জানায় সে, ‘আম্মাজান কেমন যেন করছে! একজন ডাক্তার নিয়া জলদি আসো বাড়িতে।’

‘মা কেমন মানে কী করছে? আমি তো সকালেও ভালো দেখে আসলাম। শবরি কলা আর গ্যাসের ঔষধ নিতে কইছে, রাতে নিয়া যাবখন।’

মায়ের কলা খাওয়ার দিন শেষ হওয়ার খবরটা চেপে রাখায়, অব্যক্ত সত্যের ভারে স্বামীকে দেওয়া ধমকটাও এবার ভারি হয়ে ওঠে, ‘যা বললাম তাই করো আগে, আমি দেখি এদিকে।’

বজ্রপাতের মতো খবরটা গোপন রেখে নির্জন বাড়িতে একা স্বাভাবিক থাকতে পারে না রহিমা। মৃত্যুর অসহ্য চাপ এড়াতে জীবন্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে বালকপুত্রকে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও রুম্মান, বাবা রুম্মান! খেলতে কোথায় মরতে গেছিস হারামজাদা?’ রুম্মানকে খুঁজতে খুঁজতে রহিমা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার দিকে যায়। ছেলের বদলে রাস্তায় বুড়ির সেবায় নিযুক্ত কাজের মেয়ে পড়শি জামেনাকে দেখতে পায়। জামেনা রোজ তিন-চার বেলা আসে এ-বাড়িতে। আজ সকালেও এসেছিল, বুড়ির গোসলের পানি রেডি করে দিয়েছে, কাপড় কেচে দিয়ে পানসুপারিও পিষে দিয়ে গেছে।

‘ও জামেনা, জলদি আয় তো বাড়িতে। আম্মাজানের কী হইল, দেখ তো আসি।’

‘খানিক আগেই না বুড়ির জন্য পানসুপারি পিষে দিয়া গেইনু চাচি!’

হামানদিস্তায় বুড়ির পানসুপারি বেটে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে জামেনার নিজেরও পানটা খাওয়া চলে। কিন্তু আজ একটাও সুপারি অবশিষ্ট ছিল না বলে বুড়ির পেশা সুপারি একটু মুখে দিয়েছে। বুড়ো মানুষের পেশা সুপারি খেয়ে মোটেও তৃপ্তি হয় না। এখন সাবান কেনার পয়সার সঙ্গে একটা পান খাওয়ারও মতলব নিয়ে দোকানের দিকে যাচ্ছিল সে, বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছাতেও বড়বাড়িতে ঢোকে আবার।

বুড়ির ঘরে ঢোকার আগেই, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে জামেনা, ‘ও দাদি, গুয়াপান খায়া মন ভরে নাই? তোর লাঠির ঠুকঠকানি আর উড়ুনগাইনের ঢকঢকানি না শুনলে ছোটবউয়ের খালি মরার চিন্তা আইসে।’

অতঃপর ঘরে ঢুকে বিছানায় মৃতাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে পানের গন্ধও পায় জামেনা, মুখের কোণে রক্ত-পিত্তের মতো লোল গড়িয়েছে, ওই দুর্গন্ধ রসটুকু ছাড়া বুড়ির শরীরে প্রাণের কোনো সাড়া না পেয়ে জামেনাই প্রথম বিস্ময়কাঁপা গলায় ঘোষণা করে, ‘ও আল্লা রে, বুড়ি না মরি গেইছে! মুখ থাকি এলাও মোর পেশা গুয়ার গন্ধ বারায়! হায় আল্লা, কোনবেলা কেমনে মরল চাচি? ও আল্লা রে!’

টেবিলের ওপর ভাতের পেস্নটবাটি দেখে জামেনা আবারো মৃতার জ্যান্ত দশা সম্পর্কে আগ্রহ দেখায়, ‘ভাত খায় নাই এলাও?’

ছোটবউয়ের রান্না খাওয়ার পরই ভালো মানুষটা আজ মরে গেল কেন? এমন প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রহিমা দিশেহারা শোকের মাঝেও অনুভব করে জামেনার ওপর পালটা অভিযোগ চাপায়, ‘তোর জর্দা  দেওয়া পানসুপারি মুখে নিয়া আম্মাজান আইজ মরি গেল ক্যানে?’

শোকের আবেগে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো স্বামীর কানে খবরটা কোনোমতে ছুড়ে দেয় সে, ‘আম্মাজান আর নাই!’

স্বামীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা উঠানে ছুড়ে দেয় রহিমা, তারপর শাশুড়ির আত্মা যে আসমানে উড়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে, ‘ও আল্লাহ রে! বড়বাড়ি ধুয়া করিয়া হামার আম্মাজান মরি গেল রে!’

এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এটাই রহিমার প্রত্যাশিত প্রথম মৃত্যুশোক যাপন। এখন তার অনেক কাঁদা উচিত, গলা ছেড়ে কাঁদতে না পারলেও শোকের আবেগে দাঁতকপাটি লেগে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত। স্বজনপড়শি সবাই দেখার জন্য ছুটে আসতে শুরু করবে। রহিমার আগে তার মোবাইল ফোনটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মনে হয়, খবরটা অন্তত বড় ননদকে তারই জানানো উচিত। মায়ের খবর নিয়মিত নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনটা ননদই তাকে গিফট দিয়েছে। বুড়ি ফোন চালাতে পারত না, তার ওপর কানেও শোনে কম, এ-কারণে ফোনের সঙ্গে মায়ের পক্ষে মোবাইল-অপারেটরের চাকরিটাও দিয়েছিল ননদ। গরিব পড়শি জামেনাকেও টাকা দিয়ে মায়ের সেবায় নিযুক্ত করেছে সে-ই। জামেনা ননদকে ফোন করার আগে তারই ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে শরীর-উথলানো কান্নাসহ বড় ননদকে কোনোমতে জানায় শুধু, ‘ও আপা, আম্মাজান আর নাই।’ খবরটা দিয়েই সে ফোন হাতে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবার।

ততক্ষণে জামেনাও গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে এবং প্রতিবেশীরাও সরব কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবাই জানে এবং জামেনাও সেদিন ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘বুড়ি মরলে বড়বাড়ির আসল রানি হইবে ছোটচাচি। মাথার উপরে খ্যাচম্যাচ করার জন্য কেউ থাকপে না, ছোটবউয়ের হুকুমেই চলবে সব।’ শোকের মাঝেও এসব কথা মনে করে রহিমার শোকের আবেগ দ্বিগুণ বেগে উথলে ওঠে।

-----দুই-----

মানুষের মরণ যতই নীরবে-নিভৃতে ঘটুক, টাটকা মৃত্যুকে নিয়ে জীবিতদের প্রতিক্রিয়া জীবন্ত হয় তৎক্ষণাৎ। জনবহুল এ-গ্রামটাতে সব বাড়ির নবজাতকের ক্ষীণকণ্ঠের কান্না সবার কানে যায় না, গর্ভবতী মেয়েরা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখে পেটের খবর, কিন্তু কোনো বাড়িতে কেউ মরে গেলে স্বজনদের মড়াকান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গাঁয়ের বাতাস। দিশেহারা গ্রামবাসীও নিজেদের অন্তিম গন্তব্য স্মরণে এলে বিহবল হয়, পরিচিত একজন সেই গন্তব্যে যাত্রা করেছে শুনলেই ছুটে আসে দেখতে।

মড়াকান্না ছাড়াও গ্রামসমাজকে নাড়া দিয়ে ইদানীং ভিড় তৈরির দায়িত্ব পালন করে গাঁয়ের মসজিদের মাইকটি। ঘড়ির টাইম মেনে রোজ পাঁচবার আজান শুনেও শোনে না বে-নামাজিরা, বড়জোর বেলা সম্পর্কে সচেতন হয়; কিন্তু সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করে মাইকটি কারো মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করলেই কান খাড়া করে সবাই। চেনা মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে দেশি ভাষায় মৃতের পরিচয় জেনে মাইকের ইন্নালিল্লাহি রাজিউন দোয়ার সঙ্গেও কণ্ঠ মেলায়।

আজান ছাড়াও মাইকে গ্রামবাসীর ইমেত্মকাল-সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব পালন করে যে মুয়াজ্জিন হামিদুল, সে আসরের আজান দিতে মসজিদে যাওয়ার মুখে বড়বাড়িতে ক্রন্দনরোল শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। বড়বাড়ির বড় অভিভাবক ও গাঁয়ের মুরবিব বৃদ্ধার মৃত্যু-আশঙ্কাটি মনে আসতেই জীবিত বেশে সামনে দাঁড়ায় সে। আজ সকালেও হামিদুল এ-বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ি হাতের লাঠি উঁচিয়ে তাকে ডেকেছিল, ‘আল্লাহর ঘরে আজান দিস, একটা সত্য কথা বল তো আমাকে। এ-বাড়ির সয়-সম্পত্তি উড়িয়া যায় কোথায় রে?’

বুড়ি আসলে মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া জায়গা-জমির বেহাল দশা ও বখাটে ছেলে কাফির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল, ‘শুনলাম, তোর বেটার কাছেও নাকি কাফি ভুঁই বন্ধক থুইয়া দুই লাখ টাকা নিছে, কথা কি সত্য?’

হামিদুল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সমস্যায় পড়েছিল। কারণ টাকা নেওয়ার সময় কাফি সতর্ক করেছে খবরটা মাকে না জানাতে। অথচ গ্রামবাসী সবাই জানে, বড়ভাইদের অনুপস্থিতি এবং বুড়ি মায়ের পক্ষপাতের সুযোগ নিয়ে কাফি একাই পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি যাচ্ছেতাই ভোগ করছে। চাষাবাদ করে বড়বাড়ির গোলাঘর ভরলে কারো কিছু বলার ছিল না, কাফি একের পর এক জমি বন্ধক রেখে নিজের ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড় করেছে। মোটরসাইকেল দাবড়ে রোজ শহরে যায়। শহরে সে কি ব্যবসা করে, নাকি নেশাফুর্তি করে টাকা ওড়ায়, সঠিক কেউ জানে না। তবে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, টাউনে সম্প্রতি সে আরেকটা বিয়েও করেছে, তার মোটরসাইকেলের পেছনে সে-বউকে দেখেছে গাঁয়েরই দুজন শহরবাসী।

বাঁকা কোমর নিয়ে লাঠিভর মেয়েমানুষের পক্ষে বখাটে ছেলের কা-কীর্তি কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তবে কালা কানেও সব খবর বাজে। শাসন করার জন্য ছেলেকে হাতের নাগালে না পেয়ে বউয়ের সঙ্গেও গজগজ করে সারাদিন। হামিদুল সত্যি বললে কাফি রেগে যাবে, আবার মিথ্যে বললে তার বন্ধকের টাকা মার যাওয়ার ভয়। উভয় সংকটে পড়ে জবাব দিয়েছিল সে, ‘আম্মা, এই বয়সে জায়গাজমির খোঁজ নিয়া আর কী করেন। চোখ বুজলে তো বেটারাই খাইবে সব।’

‘হ্যাঁ, বুড়ি চোখ মুদলে ভূঁইয়ার জায়গাজমিও কাগজের মতো বাতাসে উড়ি যাবে রে। বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চোখে দেখবি তোরা, কয়া রাখলাম কথাটা, দেখিস।’

সকালে বুড়িকে দেখার জীবন্ত স্মৃতি মাথায় নিয়ে হামিদুল আজ বড়বাড়ির ভেতরে ঢোকে, আঙিনায় কাফির বউ ও জামেনাসহ পড়শি মেয়েদের কান্নার প্রতিযোগিতা দেখে বৃদ্ধার ঘরেও যায়। বিছানায় শায়িত কাঁথা-মোড়ানো লাশ দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ইন্নালিল্লাহি দোয়া পড়ে হামিদুল, তারপর ছুটে যায় মসজিদে। আজ দেড় মিনিট বিলম্বে আসরের আজানটা দেয়, এবং আজান শেষ হলে মাইকের সুইচ অফ করার আগেই সে দুটি ফুঁ দিয়ে একটি শোকসংবাদ ঘোষণা করতে থাকে : ‘ভূঁইয়া বাড়ির মুরবিব, মরহুম নাসির ভূঁইয়ার স্ত্রী ও কাফি ভূঁইয়ার মাতা এইমাত্র ইমেত্মকাল ফরমাইলেন।’ ইন্নালিল্লাহি পড়ার পর মনে হয়, গ্রামের অনেকেই তার কণ্ঠে খবরটা জানছে ঠিক, কিন্তু বুড়ির প্রবাসী ও শহরবাসী ছেলেমেয়েরা খবর পায়নি এখনো। ছেলেরা সবাই বাড়িতে না এলে মৃতার জানাজা ও কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ জানানো সম্ভব নয়। শুধু শোকসংবাদটি আবারো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করে সে নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত ছয় মুসলিস্নর কাতারে শরিক হয়।

মুয়াজ্জিনের মৃত্যুঘোষণার রেশ এবং মৃতাকে ঘিরে বড়বাড়ির সাড়ম্বর স্মৃতি মাথায় নিয়ে গাঁয়ের নামাজি লোক কয়েকটি আজ আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছে। যেহেতু বড়বাড়ি মসজিদের নিটকবর্তী বাড়ি এবং মেয়েমানুষরা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর জন্য কান্নার আওয়াজ সপ্তমে তুলতে পারে বটে, নামাজে দাঁড়িয়েও বড়বাড়ির মড়াকান্নার আওয়াজ শুনতে পায় মুসলিস্নরা এবং হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও আজ আকুল ও একাগ্র করে তুলতে সচেষ্ট হয়।

মোনাজাতশেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মুসলিস্নরা সবাই আজ বড়বাড়ির দিকে হাঁটে। গাঁয়ের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই ছুটে আসছে বড়বাড়িতে। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম মুখর করে তুলেছে মূলত গাঁয়ের মেয়েরাই। উৎসবের আনন্দে পালাপার্বণে গীত গাওয়ার সুযোগ পায় না তারা, কিন্তু আত্মীয়স্বজনকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়ার সময় কেউ কারো চেয়ে কম কাঁদে না, কান্নাও সুরেলা গীত হয়ে ওঠে অনেকের কণ্ঠে। বাড়িতে মৃতার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির অনুপস্থিতিও পড়শিদের শোক ও কান্নার দায়িত্ব খানিকটা বাড়িয়ে তোলে বটে।

শোকের ঝড়ে সমবেত গাঁয়ের পুরুষরা মেয়েদের মতো কাঁদতে পারে না, ক্রন্দনরত মেয়েদের এড়িয়ে তারা আলাদা ভিড় তৈরি করে। পাথারের ক্ষেতের কাজ ফেলেও ছুটে এসেছে কয়েকজন কামলা। মৃত্যুকে ঘিরে গ্রামসমাজ ত্বরিত সংঘবদ্ধ হওয়ার মূলে মৃত্যুকে ঠেকানোর এবং শোক-সহানুভূতি প্রকাশের আদিম প্রবৃত্তি তো আছেই, সেইসঙ্গে বড়বাড়িতে চটজলদি গ্রামবাসীর ছুটে আসার মূলে তাদের কৌতূহলও কম দায়ী নয়। গ্রামবাসী জানে, নিজের এক ইঞ্চি আবাদি জমি নেই, এমন চাষিমজুরের সংখ্যা গ্রামদেশে নেহায়েত কম নয়। নিজেরা চাষবাস না করেও বড়বাড়ির ভূঁইয়াদের অন্তত পাঁচ হালের জমি এখনো। এমন নিয়ম আইনে টিকলেও আল্লাহর ন্যায়বিচারে টিকবে? স্বয়ং ভূঁইয়ার বিধবা স্ত্রীও বড়বাড়ির সম্পত্তি কাগজের মতো আসমানে উড়ে যাওয়ার কথা বলে গেছে। বুড়ি মরলেই বড়বাড়ি ভেঙে অন্তত বারো টুকরা হবে। নদীতে ভাঙবে না, বানে ডুববে না; কিন্তু এ-বাড়ির সমস্ত জমি গিলে খাবে ওয়ারিশরাই। ছোটছেলে কাফির কা-কীর্তিও যে গ্রামসমাজে নানা গল্প ও প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল, মৃতাকে ঘিরে নানারকম মন্তব্যের মধ্যেও তা ধরা পড়ে।

‘আহা রে, স্বামী মরি যাওয়ার পরও এতকাল লাঠি ঠুকঠুক করিয়া সবাইকে শাসন করছে। বুড়িমা ছিল বলিয়াই এই বাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা হইছে। কিন্তু এখন কে রক্ষা করবে? রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা বুড়িমায়ের সেবাযত্ন দূরে থাউক, খোঁজটাও নেয় নাই ঠিকমতো। আর একজন তো বাড়িতে থাকিয়াও মৃত্যুকালে মায়ের মুখ দেখতে পাইল না! মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়িতে আসতে কতক্ষণ লাগে?’

কাফি ও তার বড়ভাইদের সঙ্গে যাদের ফোন-যোগাযোগ হওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আছে, তারা আগাম সহানুভূতি জানাতে মোবাইল বের করে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর মুয়াজ্জিন হামিদুল সকালে বুড়ির সাক্ষাতের স্মৃতি স্মরণ করে তার শেষ কথাটি সবাইকে শোনায় – ‘আজ সকালেই লাঠি হাঁকে ডাকল মোকে, কানের মধ্যে এলাও বাজে তার গলা, হামদুরে আল্লাহর ঘরে আজান দিস, তোকেও কয়া গেনু শেষ কথাটা। মুই মরতে না মরতে বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চক্ষক্ষ দেখপেন সগাই।’

বৃদ্ধার শেষ কথার সমর্থনে উপস্থিত মানুষগুলো যুক্তি দেওয়ার আগে, মেয়েদের ভিড় থেকে ছুটে আসা এক বালক পুরুষ ভিড়ে উপস্থিত তার বাবাকে খবর জানায়, ‘রুম্মানের মা কাঁদতে কাঁদতে নিজেও মনে হয় মরি গেইছে।’

রুম্মানের মা তথা কাফির বউকে দেখতে পুরুষ ভিড়ের অনেকেই উঠানে কান্নাকুল মেয়েদের দিকে এগোয়।

আঙিনায় রহিমার কান্নায় ততক্ষণে শরিক হয়েছে অন্তত পনেরোজন মহিলা ও শিশু। কান্নার চেয়ে কিছু শিশুর কৌতূহলই প্রবল। তারা ঘরে ঢুকে মৃতাকে দেখে, মৃতাকে ঘিরে একটা মাছি উড়তে দেখেও ভয় পায়। আরেকটি বালক ক্রন্দসী ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে সহাস্য মন্তব্য করে, ‘কাঁদতে কাঁদতে কাঁয়বা পাদি ফেলাইছে রে।’

অন্যরা গলা ছেড়ে কাঁদছে বলে রহিমাকে চেঁচিয়ে কাঁদতে হয় না আর। নিজের কান্নাবিকৃত শরীর আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে, মাটিতে মুখ লুকিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভাবারও সুযোগ পায়। মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেলেই তাকে আবার কান্না শুরু করতে হবে, শোকের তীব্রতায় আবারো দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাতে হবে। কান্না ছাড়া আগামী তিনদিন তার কাজ নেই। গাঁয়ের নিয়মে মৃতের বাড়িতে তিনদিন চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনই রান্না করা খাবার দিয়ে যাবে। বুড়ি কবরে ঢুকতে না ঢুকতে একে একে তার রক্তসম্পর্কের স্বজনরা বাড়িতে আসবে। বড় ননদ হয়তো ফোনে এতক্ষণে সবাইকে জানিয়েছে খবরটা। কিন্তু বুড়ি কবরে আড়াল হলেই কি বড়বাড়ির মাটির ওপরে খাড়া হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন সংসার ফিরে পাবে রহিমা?

বিধ্বস্ত দেহে চোখ বুজে চুপচাপ এসব কথাই ভাবছিল রহিমা। হঠাৎ চেনা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এবং সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জন্য মনকে ভাবনাশূন্য করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে সে।

------তিন-----

বুড়ির দাফন হওয়ার পরও তার কাঁচা কবর ঘিরে বড়বাড়িতে শোকপালন যেন অনেকটা উৎসবে রূপ নেয়। একে একে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়ে। ছোট কাফি ছাড়া বড় চার ভাইয়ের দুজন ঢাকায়, একজন নীলফামারীতে এবং অস্ট্রেলিয়াতেও আছে একজন। মেয়েরাও নানা ঠিকানায় নিজ নিজ স্বামী-সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সপরিবার এসেছে সবাই। দাফন হয়ে যাওয়ার পরও এসেছে এক মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে একা এসেছে কুলখানির দিনে। বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি মাকে না দেখে ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে সবাই, অন্য ভাইবোনরাও শরিক হয়েছে সেই কান্নায়; কিন্তু কান্না ও শোকের পরিবেশ জমাট বাঁধতে দেয় না তাদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই। মৃত্যুশোকে শরিক হয়েও দাদুবাড়ি কি নানাবাড়িতে বেড়াতে আসার মজা লুটতে ছোটাছুটি, খেলাধুলা ও হাসিতামাশাও করে তারা। তিনদিন রান্নাঘর থেকে মুক্ত থাকার কথা ভাবলেও আতিথেয়তার দায় মেটাতে রহিমাকে শাশুড়ির দাফনের পরপরই চুলা জ্বেলে রান্নাঘরেই অনেকটা সময় কাটাতে হয়।

তিনদিন পর মায়ের কুলখানিতে একটি গরু ও চারটি খাসি জবাই করা হয়। পেশাদার মৌলবি-সংকটে বিশজন মাদ্রাসাছাত্র এসে কোরান খতম দেয়। মিলাদ, কবর জিয়ারত ও দোয়া-খায়েরে শরিক হয় গাঁয়ের বয়স্ক সব পুরুষ মানুষ। ভোজনপর্বে শরিক হয় আরো বেশি সংখ্যক। মড়ার বাড়ির মজলিসি খাওয়া-দাওয়ার ভিড় কোলাহল থেমে যাওয়ার পরও বাড়িটির দিকে গ্রামবাসীর মনোযোগ ও কৌতূহল কমে না। কারণ মরে গিয়ে বুড়ি তার ছেলেমেয়েদের বাড়িতে জড়ো করেছে, তার উদ্দেশ্যটা বেঁচে থাকতেই ছোটবউ-ছেলেকে ঝগড়া করে অনেকবার জানিয়ে রেখেছে, সবাই এলে এবার বিষয়-সম্পত্তির ভাগাভাগি হবে অবশ্যই।

মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে যে-ঝগড়াটা অনিবার্য ছিল, ভূসম্পত্তি ঘিরে স্বাভাবিক ঝগড়াঝাঁটি দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল যারা, তাদের অনেকটা হতাশ করে দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঝগড়াটা শুরু হয় আসলে ভাইবোনের পুনর্মিলনীর আদলে। বড়ভাইয়ের আহবানে মায়ের ঘরে জড়ো হয় সব ভাইবোন। বিছানায় ও চেয়ার টেনে বসে সবাই। পরকালযাত্রার শোক ও মাথায় টুপি রেখেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে বড়ভাই, ‘মা নাই। কিন্তু আমরা রক্তসম্পর্কের ভাইবোনরা আছি, এই বাড়ি ও পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। স্বয়ং আল্লাহ এ-বিষয়ে কোরানে আইন করে দিয়েছে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর এক যুগের মধ্যেও আমরা ভাগাভাগির ওপর জোর দেইনি। কারণ মা বেঁচে ছিল এবং ছোট কাফি তেমন লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করেনি। তাকে বিয়েও করানো হয়েছে গ্রামের ঘরগেরস্থালি দেখার উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে। আমরা চেয়েছি বড়বাড়ির সংসার ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করে কাফি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিক। কিন্তু সে দশ বছরে কী করেছে, কমবেশি তোমরা সবাই শুনেছো, গ্রামবাসীও সবাই জানে।’ কাফিই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে শোকসভায় প্রতিবাদ করে, ‘কী করেছি আমি? তোমাদের ভাগের জমি গিলে খেয়েছি, নাকি নিজের নামে করে নিয়েছি?’

বড়বোন শাসনের গলায় বলে, ‘মা বেঁচে থাকতে তুই আর তোর বউয়ের কীর্তিকলাপের খবর আমাদের জানিয়েছে। এত বছর বাড়ি থেকে যে আয়-উন্নতি হয়েছে, তার ভাগ কি তুই আমাদের দিয়েছিস?’

কাফির সব যুক্তি তো জমাট ক্ষোভ হয়ে ছিল, বিস্ফোরণ ঘটলে তা আর থামতে চায় না, ‘আমি চাকরের মতো তোমাদের বাড়িসম্পত্তি পাহারা দিয়েছি। বড়বাড়ির চাষাড়ি কাজ করাতে আমাকে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছো, আমার বউ দাসিবাঁদির মতো খেটেছে। মা আমার সংসারেই ছিল দশ বছর, কিন্তু তোমাদের সবার এতো সচ্ছল অবস্থা, আমার জন্য কি কেউ এক কানাকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছো? বরং আমি যাতে মানুষ হতে না পারি, এজমালি জায়গাজমিতে সারাজীবন খেটে মরি, সেটাই চেয়েছো সবাই।’

এক ভাই জানতে চায়, ‘মানুষ হওয়া মানে কি মোটরসাইকেল দাবড়ে প্রতিদিন শহরে যাওয়া, ব্যবসায়ের নামে বদনেশা করে টাকা অপচয় করা? রোজ কী করিস তুই টাউনে গিয়ে?’

মেজোভাই জানতে চায়, ‘সংসারের কৃষিকাজ থেকে যে-আয় হয়েছে, তার ভাগ কেউ চায়নি, চাইবেও না। কিন্তু ভাগাভাগির আগে তুই বহু জমি বন্ধক রেখে কেউ বলে বিশ লাখ, কেউ বলে ত্রিশ লাখ, এতো টাকা নিয়ে টাউনে কী ব্যবসা ফেঁদেছিস? ব্যবসা করবি ভালো কথা, কিন্তু বন্ধক খুলবে কে?’

কাফি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, ‘সময়মতো আমি খুলে দেব। ভাগাভাগি করে দাও, আমার ভাগ বেচে দিয়ে বউ নিয়ে শহরে আলাদা বাসা করে স্থায়ীভাবে থাকব আমি। তোমাদের বারোয়ারি সম্পত্তি পাহারা দেওয়া আমার কাজ না। তোমরা যেভাবে ভাগাভাগি করো আমার আপত্তি নেই। আমি এখন চলি, চারদিন আমার ব্যবসা দেখিনি, জরুরি ফোন এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।’

বড়দের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কাফিই প্রথম সভাস্থল ত্যাগ করে। উঠানে নেমেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয় সে, একাধিক ভাইবোনের ধমক ও স্নেহমেশানো হাঁকডাকও তাকে আর ফেরাতে পারে না। কাফির মোটরসাইকেলের গর্জন মিলিয়ে যাওয়ার পরও বড়বাড়ির পারিবারিক সভার উত্তাপ-উত্তেজনা থেমে যায় না। বড়ভাইদের অনুপস্থিতিতে কাফি রক্ষক হয়ে শুধু ভক্ষক নয়, দুর্বৃত্ত-দস্যুর মতো আচরণ করেছে, তার প্রমাণ দিতে থাকে। মাকে কীরকম মানসিক কষ্ট দিয়েছে, সে-কথাও জোর গলায় বলে কেউ কেউ। কিন্তু কাফির বউ রহিমা কী ভূমিকা রেখেছে?

কাফিকে না পেয়ে তার স্ত্রী তথা রুম্মানের মা তথা রহিমাকেই ডাকে সবাই।

শাশুড়ির দাফন হওয়ার পরও বাড়িতে মেহমান হয়ে আসা স্বামীর ভাইবোনদের সেবায় এতটা ব্যস্ত যে, রহিমা দম ফেলারও সময় পায় না। ঘরে সভা বসলে রান্নাঘরে সবার জন্য চা করছিল সে। জামেনার কাছে সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে ভাসুর-ননদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে আসে এবং দাঁড়িয়েই থাকে।

বড়ভাইয়েরা তার কাছে জানতে চায়, কত জমি বন্ধক রেখেছে কাফি? কীভাবে ল-ভ- করেছে সংসার? রহিমা কি জানত না? স্বামীকে শাসন করার চেষ্টা করেনি? শহরে কিসের দোকান দিয়েছে? কী ব্যবসা করে? অনেকে বলেছে টাউনে যায়, সেখানে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে সে?

ভাসুর-ননদের নানারকম প্রশ্নের মুখে রহিমা নতমুখে একই জবাব দেয়, ‘আমি কিছুই জানি না। আমাকে তো টাউনে নিয়ে গিয়ে কিছুই দেখায়নি।’

বড়ভাই এবার সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আমি মাকেও কথা দিয়েছিলাম, রিটায়ার করার পর বাড়িতেই পাকাপোক্ত থাকব। আর মোটে বছরখানেক বাকি। রফিকও রিটায়ারমেন্টের পর বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকবে বলছে। এবারে তো সম্ভব হবে না, তোমরা একটা ডেট ঠিক করে আসো, যার যেটা পাওনা, শান্তিপূর্ণ এবং আইনসংগতভাবে বাটোয়ারা করে দেব আমি। এলাকার চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উকিল সবাইকে ডাকব। ভাগের পর তোমরা যদি কেউ নিজেদের ভাগ কাফিলকে দিয়ে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’

এক বোন প্রতিবাদ করে, ‘ওকে দেবো কেন? এ-বাড়িতে আমাদের অধিকার নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?’

রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘আমি আপনাদের জন্য চা করছি, নিয়ে আসি।’

-----চার-----

মায়ের পারলৌকিক শান্তি এবং নিজেদের ইহকালীন স্বার্থ রক্ষায় ভাগবাটোয়ারার বিষয়টা পাকা করে ওয়ারিশগণ একে একে চলে যায়। বড়বাড়ি হঠাৎ বেশ ফাঁকা এবং অচেনা লাগে রহিমার কাছে। আগে দিনভর শাশুড়ির খ্যানখ্যানে গলা ও লাঠি-ঠুকঠুক মাতবরি অসহ্য লাগত, এখন তার বদলে নানারকম ভুতুড়ে ভয়। শাশুড়ি মরলে রহিমা বড়বাড়ির মালিক হবে বলেছিল যারা, তারা এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো রহিমাকে দেখে মজা পায়। ওয়ারিশরাই ব্যবস্থা করে গেছে, মৃতা মায়ের ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে জামেনাও। জামেনা তার মেয়েকে নিয়ে রাতে এখন বড়বাড়িতে থাকে। এছাড়া যে বাঁধা কামলা করমালি চাষাড়ি কাজকাম তত্ত্বাবধান করে, সেও যেন বড়বাড়ির মালিক হয়ে উঠেছে একজন। জোরগলায় হাসিমুখে রহিমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ও ছোটভাবি, বড়ভাই অর্ডার দিছে, ভাগাভাগির পর তার ভাগের জমি হামাকেই দেখাশুনা করা লাগবে। মেজোভাই তার ভাগ আধি দেবে মনে হয় হাকিমুদ্দিকে। আর তোমার জন তো টাউনে বাসা করার কথা ডিক্লেয়ার দিছে। আমি এখন কোন দিকে যাই, কন দেখি কী জ্বালা!’

এসব জ্বালার কথা বলার সময় করমালির মুখে হাসি ধরে না। শাশুড়ি মরতে না মরতেই শহরে রহিমার সতিনের সংসার কল্পনা করে কিংবা বড়বাড়িতে তার আসন্ন ফকিরনি দশা জানতেও সম্ভবত, লোকজন তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। রহিমা কোনো জবাব দেয় না। বিয়ের আগে থেকেই জানত সে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে বড়বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হবেই। এ শুধু হিংসুক গ্রামবাসীর কামনা নয়, শাশুড়িও রহিমাকে প্রায় রোজই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছে।

রহিমাও তো গাঁয়ের গেরস্তঘরের মেয়ে, জমির মায়া যে কী সাংঘাতিক জিনিস, নিজের বাপ-চাচার ঝগড়া দেখে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে। সেই বাবা মেয়েকে বড়বাড়ির বউ করে পাঠানোর সময় বেকার ও নেশাখোর জামাইকেও মেনে নিয়েছিল তাদের বিস্তর জায়গাজমি দেখেই। ভাইয়েরা সবাই দেশ-বিদেশে চাকরি করে, বাড়ির আবাদি ফসলের ভাগ নেওয়া দূরে থাক, নিজেদের জমিটাও পর্যন্ত চেনে না। বাড়ির কৃষি থেকে ম্যালা আয় হয় বলেই ছোটছেলে চাকরিতে ঢোকেনি। এই সুযোগে রহিমা যদি নিজের সংসার গুছিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো অভাব থাকবে না তার। বিয়ের পর থেকে রহিমা সেই চেষ্টাই করে গেছে। শহরবাসী ভাসুর-ননদের মতো নিজেও শহরে ঝামেলামুক্ত সংসার গড়ে ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নপূরণের পথে শাশুড়ি ছিল বড় বাধা, শাশুড়ি মরে যেতে না যেতেই অচেনা সতিন মস্ত বাধা হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি সে।

বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পরও কাফি ব্যবসায়ের কাজের দোহাই দিয়ে টানা তিনদিন বাড়িতে ফেরেনি। ফোনে রহিমাকে জানিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে ঢাকায় যাবে। ভাগ নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গেও প্রাইভেট কথা বলবে। মা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন রাতে বাড়িতে ফিরত না সে। মাত্র এক ঘণ্টায় মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরা যায়, কিন্তু তারপরও কী এমন কাজের ব্যস্ততা যে রাতেও স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার গরজ থাকে না। সন্দেহ অবশ্য আগেও জেগেছিল, রাতে বাড়িতে ফিরলেও স্বামীর ভালোবাসার উত্তাপ খুঁজে পায়নি। তারপরও শহরে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নটা আঁকড়ে রেখেছিল রহিমা। কাফি ভাইদের কাছে শহরে বাসা নিয়ে থাকার ঘোষণা দিলে স্বপ্নপূরণের আশাও জেগেছিল।

তিনদিন পর রাতে বাড়িতে ফেরে কাফি। দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করে রহিমা। স্বামীকে রাতের খাবার দিয়ে সরাসরি কথা তোলে, ‘আম্মাজানের মৃত্যুর পর এ-বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। রুম্মানকে টাউনের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তুমি এ-মাসেই আমাদের নিয়ে টাউনের বাসায় উঠবে।’

যুদ্ধ করার জন্য কাফির প্রস্ত্ততি তো দীর্ঘদিনের, জবাব দেয় সে, ‘আমার রক্তসম্পর্কের শত্র‍ুরা, গ্রামের হিংসুক শয়তানরা তোমাকে জানায় নাই, টাউনে আর একটা বিয়া করব আমি?’

‘আমি বিশ্বাস করি নাই।’

‘অবিশ্বাস করার কী আছে? আমার বাপ ও দাদারও ছিল দুই পরিবার। মুসলমানের ছেলে আমি, চারটা না হোক, প্রয়োজনে দুই বউ রাখা আমার আইনি অধিকার। বড়বাড়ির গেরস্থালি কাম সামলানোর জন্য তুমি এ-বাড়িতে এসেছ, তুমি সেই কাজই করবে।’

খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে কাফি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সান্তবনা দেয়, ‘ভাগাভাগির পর রুম্মানকে নিয়ে এ-বাড়িতেই থাকবে তুমি। এ-বাড়ির গেরস্তি কামকাজ করলে ভাতের অভাব হবে না তোমার।’

বুড়ি শাশুড়ি মরে যাওয়ার পর রহিমা কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে গ্রামের মানুষ জড়ো করেছিল, কিন্তু নিজের জীবনের এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখেও টুঁ-শব্দটি করতে পারে না আজ। মনে হয় স্বামী সর্বশক্তি দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেছে দমবন্ধ করে মারার জন্য।

বউকে সারারাত নির্ঘুম, পাথরের মতো স্তব্ধ এবং একা রেখে, সকালে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে কাফি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

বাপের মতো ছেলে রুম্মানও যথারীতি খেলার নেশায় বাড়ির বাইরে ছুটে বেড়ায় দিনমান। বাড়িতে একা হয়েও কোনো কাজেই মন বসে না রহিমার। বিয়ের পর থেকে কাজই তো করে গেছে রহিমা। নিজের হবে না জেনেও বাড়ির উঠান ঘরদুয়ার ঝাঁট দিয়েছে। শাশুড়ির সেবাযত্ন ছাড়াও তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রান্নাবাড়া করে খাইয়েছে। গোলায় ধান তোলা, ধান উঠানো, রোদে শুকানো এবং ভিটায় মাচান বেঁধে এন্তার লাউ-শিম-কুমড়া ফলানো – এসব করে চাষিবাপের নাম ফাটিয়েছে। পোষা গাইটি ও মুরগিগুলোর তত্ত্বতালাশ করেছে। এতো কাজের পরও এ-সংসারে স্বামীর প্রাপ্য গালমন্দ মুখ বুজে হজম করেছে নিজের সুখের সংসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা মরলেই আলাদা হয়ে শহরের বাসায় ভালো চলবে তাদের, স্বামীও আশ্বাস দিয়েছিল এরকম।

শাশুড়ির মৃত্যুতে বাড়িতে লোকদেখানো এত কান্নাকাটির পরও, শাশুড়ির কথা ভেবে রহিমার সত্যি কান্না পায় আজ। বেঁচে থাকলে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনলে বুড়ি আজ রহিমার পক্ষে থাকত অবশ্যই। ছেলেবউয়ের সঙ্গে যতই খ্যাচম্যাচ করুক, চোখের সামনে একমাত্র নাতি রুম্মান ছিল বলে তার ওপর টানটাও ছিল বেশি বুড়ির। রুম্মান দাদির হাতের লাঠি নিয়েও খেলত। মরার দুদিন আগেও খেলার জন্য দাদিকে কানা বুড়ি সাজিয়েছিল। অন্ধ সেজে বুড়ি লাঠি ধরলে, অন্য প্রান্ত ধরে রুম্মান উঠানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চেয়েছিল, ‘কানা ফকিরকে ভিক্ষা দেন মা-সকল।’ এই দৃশ্য দেখে হাসি লুকাতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়েছিল রহিমা। সেই হাসির কথা স্মরণ করেও আজ চোখের জল ফেলে। শহরে ব্যবসা করার নামে কাফি পিরিতের সংসার ফেঁদেছে জানলে লম্পট ছেলেকে বাড়িছাড়া করে, বুড়ি নিশ্চয় ছোটছেলের প্রাপ্য ভাগের জমি ছোটবউ ও নাতির নামে দেওয়ার সুপারিশ করত বড়ছেলেদের কাছে। করত নাকি?

রহিমা এখন শাশুড়ির ফোনটা থেকে ভাসুর-ননদকে কল দিয়ে জরুরি কথা বলতে চাইলে, শুনবে তারা। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে? প্রতারক ভাইয়ের বদমায়েশি ও শহরে ব্যবসায়ের নামে দ্বিতীয় সংসার ফাঁদার খবরটা তারা রহিমার আগেই জেনেছে। কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বামীকে কৃষিকাজে ধরে রাখতে পারেনি রহিমা, উলটো নিজেও শহরে সংসার ফাঁদার স্বপ্ন দেখেছে। ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড়ে স্বামীকে এজমালি জমি বন্ধক রাখতে এবং গোলার ধান ও ভিটার গাছপালা বেচতেও উৎসাহ দিয়েছে। যার জন্য এত করেছে রহিমা, সে-ই হয়তো ভাইদের কাছে ছোটলোক বউয়ের হাজারটা গিবত গেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিও জোগাড় করেছে ভাইদের কাছে। রহিমা বিয়ের পর শহরে এক ননদের বাসায় বেড়াতে গেলে সে তার কাজের বুয়ার কাছে পরিচয় দিয়েছিল, আমাদের গ্রামের বাড়ির সব কাজ এই মেয়ে একাই সামলায়। তার মানে কী? রহিমাও তাদের কাছে তুচ্ছ কাজের লোক ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও বড় ননদের কাছে ফোন করে শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা হওয়ার কান্না নিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা জানায় রহিমা। ননদ সহানুভূতি দেখাবে কী, উলটো রহিমাকেই ধমক দিয়ে বলে, ‘কেমন মেয়ে রে তুই, স্বামী শহরে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়, আর তুই এতদিন মুখ বুজে ছিলি! থাক, তুই বড়বাড়ির কাজকর্ম নিয়েই থাক।’ ননদের কথার প্রতিবাদে এই মুহূর্তেই এ-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে রহিমা। কিন্তু গরিব বাপ জমি বেচে বড়ঘরের জামাইকে মোটরসাইকেল যৌতুক দিয়েছিল। সংসার-ভাঙা মেয়েকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সংগতি নেই তার। রহিমার ভাইয়েরাও বলে দিয়েছে, ভাগাভাগিতে পৈতৃক জমির কড়াক্রান্তিও পাবে না সে। না, বাপের বাড়িতে ফিরবে না রহিমা। তারচেয়ে বিষ খেয়েই বড়বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ঘুচাবে। রহিমার আপন খালাতো বোন প্রেমিককে বিয়ে করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়বাড়ির কৃষিতেও কীটনাশকের ব্যবহার দেখলে কথাটা মনে পড়ত রহিমার। নিজে লাউ-শিমের মাচায় স্প্রে করার জন্য করমালিকে দিয়ে বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনিয়ে ছিল, সেই বিষ দেখেও মনে পড়েছিল আত্মঘাতী বোনটির কথা। তাই বলে নিজে তার অনুগামী হওয়ার কথা বিয়ের আগে বা পরে কোনোদিন ভাবেনি রহিমা। নির্দোষ বোনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী প্রেমিক ছেলেটির কোনো শাস্তি হয়নি, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করছে এখন। রহিমাও বিষ খেয়ে মরলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে স্বামীর সুখের সংসার আরো নিষ্কণ্টক হবে। বিষ হাতে নিয়েও রহিমা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা কল্পিত যুবতীকে স্বামীর আলিঙ্গনে সুখের হাসি হাসতে দেখে। সতিনের সুখ দেখে রহিমা যদি আজই মরে, তার অনাথ সন্তান কোথায় ঘুরে বেড়াবে? আপাতত বিষ রেখে রুম্মানকে খোঁজার জন্য রহিমা বাড়ির বাইরে বেরোয়।

নিজের মৃত্যুকামনা নিয়ে রহিমা অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীর মৃত্যুর কথাও ভাবে। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। আবারো যদি সেরকম কোনো দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয় দয়াময় আল্লাহ, স্বামীশোকে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না রহিমা। স্বামী মরলেই বরং বড়বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে রুম্মান এবং স্ত্রী হিসেবে রহিমাও পাবে দুই আনা অংশ। স্বামীর ভাগ পেলে বড়বাড়িতেও নিজের আলাদা সংসার এবং পিতৃহারা ছেলের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিতে পারবে সে একাই। বিধবা শাশুড়ি যেমন বড়বাড়িকে একান্ত নিজের ভেবে দেখেশুনে রেখেছে আজীবন, নিজে বিধবা হলে রহিমাও স্বামীর সম্পদ আরো ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু স্বামী বেঁচে থাকলে নিজের ভাগ বেচে দিয়ে শহরে সতিনের সংসারে ঢালবে অবশ্যই। তালাক দিয়ে রহিমাকে বড়বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মিনিটও সময় লাগবে না তার। তখন কোথায় যাবে রহিমা? অসহায় এক নারীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আল্লাহ যদি নেশাখোর দুশ্চরিত্র এক পুরুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সেটা কি অবিচার হবে? সুবিচার পাওয়ার জন্য রহিমা গোপনে চোখের জলের সঙ্গে আল্লাহর কাছে জরুরি আবেদন-নিবেদন জানাতেই থাকে।

মরা-বাঁচার সংকটে তার স্বামী অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুমানোর সময়ে রাতে বাড়িতে ফেরে আজ। বাড়িতে এসেও অকারণে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজায়। সাধারণত বাড়িতে ফিরলে এরকম রাতেই ফেরে সে, কিন্তু আসবে না মনে করে রহিমা তার জন্য ভাত রাখেনি। কী মনে করে কে জানে ছেলের জন্য আজ একটা খেলনা কার এনেছে কাফি। খেলনা কার পেয়ে রুম্মান মহাখুশি, ঘুমানো স্থগিত রেখে বিছানাতেও কার চালায়। আর রহিমাকে ধমকের গলায় হুকুম দেয় কাফি, ‘ভাত দে। খিদে লেগেছে।’

রহিমা বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে যায়। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজের তরকারি ও ভাত গরম করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেয়। স্বামীর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে বিছানায় ছেলের পাশে গিয়ে শোয় আবার। মানুষটা খাচ্ছে খাক, রহিমা ঘুমন্ত ছেলের পাশে মৃতা শাশুড়ির মতো অসাড় পড়ে থাকে।

আরো আধঘণ্টা পরে স্বামীর বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার শুনে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হয় রহিমা। যন্ত্রণাবিকৃত গলায় চেঁচিয়ে বলছে মানুষটা, ‘হারামজাদি খাবারের মধ্যে বিষ মিশায় দিছিস নাকি? আমার এতো বুক জ্বলে কেন? এতো পেট জ্বলে কেন?’

আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ার মতো স্বামী ফোনটা হাতে নিয়ে যন্ত্রণায় মৃত মাকে ডেকে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকলে রহিমা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে এবার আল্লাহকেই ডাকে, ‘হায় আল্লা! রুম্মানের আববার কী হইল? টাউন থাকি কী বিষ খায়া আসছে আজ? বিছানায় গড়াগড়ি দেয় ক্যানে? ও জামেনা, ও উমেদভাই, আমার কপালে ফের কী আগুন লাগল!’

মধ্যরাতে বড়বাড়িতে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে একজন-দুজন করে প্রতিবেশী ছুটে আসতে থাকে। পাড়ার দোকানে টিভি দেখছিল যারা, তাদের কয়েকজনও টিভি দেখা বাদ দিয়ে ছুটে আসে বড়বাড়িতে। অসুস্থ কাফির আর তখন কথা বলারও শক্তি নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে শারীরিক যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উঠানে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে রহিমা।

কান্না কোলাহলের মাঝেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার জন্য কাফিই তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল। কাফিকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। এদিকে আঙিনায় গড়াগড়ি দিতে থাকা রহিমার কান্নার আওয়াজ তীব্রতর হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার চিরে ছুটে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সখানা লাল আলো চটকে আর পোঁ-পোঁ সাইরেন বাজিয়ে কার মরণ কামনা করে, রহিমা বুঝতেও পারে না।

হামলায় কাঁপছে ইরান-ইসরাইল

ইসরাইলি হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান। শুক্রবার দিবাগত রাতে এ হামলা শুরু করেছে দেশটি। এই হামলা অব্যাহত থাকতে পারে। কেননা এখনও হামলা বন্ধের কোনো ঘোষণা দেয়নি ইরান।  রেডিও তেহরানের এক খবরে বলা হয়েছে, ইরান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘ট্রু প্রমিজ-থ্রি’। যার ছদ্মনাম ‘আলী ইব্‌নে আবি তালিব’। পক্ষান্তরে ইসরাইল তাদের অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’। গোটা ইসরাইলে ইরানের হামলার প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তেল আবিবে সরাসরি আঘাত হেনেছে। স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলের খবরে বলা হয়েছে, তেল আবিবে অবস্থিত যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভবন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। এছাড়া বহুতল বেশ কিছু ভবনেও আঘাত হেনেছে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র। এতে ৩ জন নিহত এবং কয়েকডজন আহত হয়েছেন। এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত মোট পাঁচ ধাপে হামলা চালিয়েছে ইরান। পঞ্চম ধাপে টাইবেরিয়াস, অধিকৃত গোলান এবং লোয়ার গ্যালিলিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। ইসরাইলি মিডিয়া জানিয়েছে, তেল আবিবে ইরানের পঞ্চম ধাপের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে ছয়টি ভবন সম্পূণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া ইসরাইলের তিনটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। পাশাপাশি দু’জন ইসরাইলি পাইলটকে আটক করারও দাবি করা হয়েছে। ইসরাইলও ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দেশটির এক্স অ্যাকাউন্টে এক ঘোষণায় ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলতে পারবে না। এ ঘোষণার পর বৈশ্বিক তেলের বাজারে আগুন জ্বলে উঠেছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসরাইলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইরানকেও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসরাইল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইরান যদি নতুন করে হামলা চালায় তাহলে গোটা তেহরান জ্বলবে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইরানে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ জনে। আহতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৩২০ জনে। যদিও নিরপেক্ষ কোনো সূত্রের মাধ্যমে এসব খবরের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। এছাড়া ইসরাইলের বাস্তব পরিস্থিতির খুব কমই জানা গিয়েছে। কেননা সংঘাতের খবর প্রচারে দেশের গণমাধ্যমগুলোর ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলের পক্ষ নিলে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের ঘাঁটি ও জাহাজে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন অথবা ফ্রান্স যদি কোনো হস্তক্ষেপ করে তাহলে দেশগুলোর আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি ও নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে তেহরান।

পক্ষান্তরে ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি বিমানবন্দরে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপি একজন সাংবাদিকের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে বলছে, মেহরাবাদ বিমানবন্দরে এই আগুন লেগেছে। সেখান থেকে গাঢ় ধোঁয়া আকাশে উঠে যাচ্ছিল। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা মেহর বলেছে, বিমানবন্দর এলাকায় একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। তাতে সেখানকার ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়ার ছবি শেয়ার করা হয়। তবে কীভাবে এই আগুন লেগেছে, সে বিষয়টি জানা যায়নি। এর মধ্য দিয়ে ক্রমশ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে এই ‘যুদ্ধ’। এ অবস্থায় উভয়পক্ষকে উত্তেজনা বৃদ্ধির পথ পরিত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের এখনই সময়। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন- ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায়। তেল আবিবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। যথেষ্ট হয়েছে। এখন থামার সময়। শান্তি ও কূটনীতি জয়ী হোক। ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন জানান, তিনি ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট ইসহাক হারজকের সঙ্গে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন- আমি আবারো ইসরাইলের আত্মরক্ষা ও জনগণকে রক্ষার অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন।

ওদিকে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জনগণকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলেছে।  জেরুজালেম থেকে বিবিসি’র সাংবাদিক আয়ন ওয়েলস বলছেন, জেরুজালেমে বিস্ফোরণ হয়েছে। আকাশে ড্রোন উড়তে দেখা গেছে। তিনি লিখেছেন- কিছুক্ষণ আগে জেরুজালেমে আবারো কয়েক মিনিটের জন্য সাইরেন বেজে ওঠে। এখন স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১টা ৩০ মিনিট। ঠিক প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগে আগের রাতে প্রথম সাইরেন বেজেছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি আকাশে একাধিক ড্রোন উড়তে দেখেছি। কাছাকাছি বেশ জোরালো ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। বিস্ফোরণের তীব্রতায় জানালার কাঁচ কেঁপে উঠেছিল। ইসরাইলে বহুল ব্যবহৃত একটি সাইরেন অ্যাপে এখন পুরো দেশজুড়ে ‘রেড অ্যালার্ট’- দেখাচ্ছে। আমরা আগেও জানিয়েছি, এই শব্দগুলো ইরানের পাল্টা হামলার অংশ নাকি ইসরাইলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ছোড়া প্রতিরোধমূলক হামলা- তা নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না। ইসরাইল আগে জানিয়েছিল, ইরানের ছোড়া অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই পড়ে গেছে বা প্রতিহত করা হয়েছে। ইসরাইল ও ইরান- উভয় দেশই শুক্রবার দিবাগত রাতের ইসরাইলি হামলার পর থেকে একচুলও পিছু হটছে না। তারা একে একটি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। উভয়পক্ষ থেকেই আরও হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুক্রবার রাতে অর্থাৎ শনিবার ভোরে ইসরাইলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে ইসরাইলে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে তিনজন। বিভিন্ন স্থানে ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দিনের আলো ফোটার পর এসব দৃশ্য স্পষ্ট হয়েছে। এসব ধ্বংসযজ্ঞের কিছু ছবি প্রকাশ করেছে অনলাইন বিবিসি। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসরাইলে ইরানের হামলার তীব্রতা কী ভয়াবহ ছিল। ইসরাইলের তেল আবিবের পূর্বে রামাত জান শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে নিহত হয়েছেন দুইজন। একটি ভবন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন দুইজন। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তা পরিষ্কার জানা যায়নি। ইসরাইলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেখানকার মানুষ এখন দিশাহারা। বাইরে বিকট শব্দ। বিস্ফোরণের শব্দ। সরকার নিয়ন্ত্রিত ইসরাইলি মিডিয়াগুলো বলছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য আঘাতে সৃষ্ট বিস্ফোরণের শব্দ এসব। কিন্তু নিরপেক্ষ সূত্র থেকে প্রকৃত পরিস্থিতি জানা সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ধারকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে জীবিতদের সন্ধান করছে।

ওদিকে ইরানি কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিনটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দু’জন পাইলটকেও আটক করা হয়েছে। তবে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদ্রায়ি বলেছেন- ইরানি ভুয়া সংবাদমাধ্যম। ইরানি মিডিয়ায় যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পক্ষান্তরে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলেছেন, ইরান শুক্রবার বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে রেডলাইন বা সীমা অতিক্রম করেছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরান বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে রেডলাইন অতিক্রম করেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা ইসরাইলের নাগরিকদের রক্ষা করতে থাকবো। নিশ্চিত করবো যে, আয়াতুল্লাহ খামেনির শাসন ব্যবস্থাকে এই জঘন্য কাজের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। এর আগে ইরানের রেভুল্যুশনারি গার্ড জানায়, তারা ইসরাইলে ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তু, সামরিক ঘাঁটি এবং বিমানঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে।

এদিকে ইসরাইলি জনগণকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সুরক্ষিত আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির প্রধান প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ। তারা জানিয়েছে, ইরান থেকে ইসরাইলের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলো প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়-  স্বল্প সময় আগে ইরান থেকে ইসরাইলের ভূখণ্ডের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে আইডিএফ। কেবলমাত্র স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়ার পরই আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগ করা যাবে। সাধারণ মানুষকে আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেই পরিস্থিতি উন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাতে ইসরাইলের তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় বাংকারে অবস্থান নেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। ইসরায়েলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। ওই কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরুর পরপর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু একটি বাংকারে ঢুকে যান। সঙ্গী হন প্রতিরক্ষামন্ত্রীও। তারা সেখানে বসে সামগ্রিক পরিস্থিতির জরুরি মূল্যায়ন করেন। এর আগে শুক্রবার ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা খবরে বলে, নেতানিয়াহু অজানা আস্তানায় চলে গিয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন তা কেউ বলতে পারছেন না। ওই রিপোর্টে বলা হয়, তিনি হয়তো দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন। তবে দেশের বাইরে যাওয়ার তথ্য নিরপেক্ষ কোনো মাধ্যম থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওদিকে সিএনএন আরও জানায়, বেশ কয়েকজন ইসরাইলি মন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি আলোচনায় অংশ নেন।

ইরানে ইসরাইলের হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে চীন। এ হামলাকে ইরানের ‘সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে দেশটির জাতিসংঘ প্রতিনিধি ফু কং। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির ফলে ইরানের পারমাণবিক আলোচনার উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে ‘চীন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তিনি ইসরাইলকে সকল সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানান, যাতে উত্তেজনা আরও না বাড়ে। ফু আরও বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকারকে পূর্ণভাবে সম্মান জানাতে হবে। উল্লেখ্য, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন, বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদারের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। যে কোনো দেশ ইসরাইলকে রক্ষার চেষ্টা করলে, তাদের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। শুক্রবার সিএনএনকে এক শীর্ষস্থানীয় ইরানি কর্মকর্তা এ কথা বলেন।  তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ইরান এই দখলদার শাসনের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যে কোনো দেশ যদি ইসরাইলি শাসনকে ইরানের অভিযানের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করে, তবে তাদের আঞ্চলিক ঘাঁটি ও অবস্থানগুলো ইরানের পরবর্তী টার্গেটে পরিণত হবে। এর আগে মার্কিন ও ইসরাইলি সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইসরাইলকে সহায়তা করেছে। একজন ইসরাইলি সূত্র আরও জানান, ওই অঞ্চলের আরও কিছু দেশও ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহায়তা করেছে। পাশাপশি ইসরাইলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি যুদ্ধজাহাজও যোগ দিয়েছে বলে জানিয়েছে ফক্স নিউজ। 

mzamin

যে ‘ধর্মীয় অনুপ্রেরণায়’ ইরানে হামলা চালাল ইসরায়েল

ইসরায়েল আবারও ইরানে বড় রকমের হামলা করেছে। হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। হামলা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও আবাসিক এলাকায়। একদিন পর পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এতে কয়েকজন ইসরায়েলি নিহত হয়। ধ্বংস হয় তেলআবিবের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

ইসরায়েল তার ইরানবিরোধী এ হামলার নাম দিয়েছে ‘রাইজিং লায়ন’। এ নাম রাখা হয়েছে হিব্রু বাইবেলের একটি চরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। যে নাম ইসরায়েলের একটি শক্তিশালী ও বিজয়দীপ্ত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয়।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র উপাসনাস্থল জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালের একটি ফাটলে হাতে লেখা একটি চিরকুট রেখে আসার সময় ছবি তোলেন। এটি ছিল মূলত ইরানে ইসরায়েলের হামলার ইঙ্গিত।

শুক্রবার তার অফিস থেকে সেই চিরকুটে একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। সেখানে লেখা ছিল: ‘জনগণ সিংহের মতো উঠে দাঁড়াবে।’

এই বাক্যাংশটি হিব্রু বাইবেলের গ্রন্থ বুক অব নাম্বারস (গণনা পুস্তক) ২৩:২৪ পদ থেকে এসেছে। যেখানে বলা হয়েছে: ‘দেখো, এই জাতি একটি মহান সিংহের মতো উঠে দাঁড়াবে এবং একটি তরুণ সিংহের মতো নিজেকে উদ্দীপ্ত করবে; সে শিকার না খাওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেবে না এবং নিহতদের রক্ত না পান করা পর্যন্ত থামবে না।’

এই চরণটি হিব্রু বাইবেলের অ-ইসরায়েলীয় একজন নবী ও ভবিষ্যদ্বক্তা বালামের প্রথম ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ। সেখানে তিনি ইসরায়েলের শক্তি ও ক্ষমতার কথা বলেন। তাদের এমন এক সিংহের সঙ্গে তুলনা করেন যে নিজের ক্ষুধা না মেটানো পর্যন্ত বিশ্রামে যায় না।

অনেকেই মনে করেন, এই অভিযানের নাম ইরানের শেষ শাহ-এর পুত্রের প্রতি ইঙ্গিত হতে পারে। কারণ পারস্য রাজপরিবারের প্রতীক হিসেবেও সিংহ ব্যবহৃত হতো।

ইসরায়েলের ঐশ্বরিক অধিকারের দাবি

ইসরায়েল প্রায়শই তার সামরিক অভিযানের নাম হিব্রু বাইবেল বা ওল্ড টেস্টেমেন্ট থেকে নেয় বা ধর্মীয় অনুপ্রেরণা থেকে গ্রহণ করে। ফিলিস্তিনি ভূমির উপর ইহুদিদের তথাকথিত ঐশ্বরিক অধিকারের দাবি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে ইসরায়েল এসব ধর্মীয় বিষয় ব্যবহৃত করে বলে অনেকে মনে করে থাকেন।

উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সিরিয়ার সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো এক অভিযানের নাম দিয়েছিল, ‘অ্যারো অব বাশান।’ ‘বাশান’ শব্দটি ইসরায়েলিদের ধর্মগ্রন্থ ওল্ড টেস্টামেন্টে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি দিয়ে মূলত সিরিয়ার দক্ষিণ ও জর্ডান নদীর পূর্বে অবস্থিত একটি অঞ্চলকে নির্দেশ করা হয়। বাশানের রাজাকে পরাজিত করে ইসরায়েলিরা সেই অঞ্চলকে দখল করেছিল।

গাজা উপত্যকার ওপর হামলা চালাতেও অস্ত্র ও অভিযানের জন্য হিব্রু বাইবেলীয় প্রতীক বা অনুষঙ্গ ব্যবহার করছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু অন্তত তিনবার গাজায় আক্রমণের জন্য হিব্রু বাইবেলীয় আমালেক কাহিনি ব্যবহার করেছেন।

২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু হিব্রু বাইবেল ও ওল্ড টেস্টামেন্টের গ্রন্থ ‘বুক অব ডিউটেরনমি’(২৫:১৭) এর থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন:

‘আমালেক তোমার সঙ্গে যা করেছিল তা মনে রেখো, আমরা মনে রাখি এবং আমরা যুদ্ধ করি।’

এর মধ্য দিয়ে গাজাবাসীদের উপর পূর্ণাঙ্গ হামলা করা উচিত বলে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত করেন। কারণ ডিউটেরনমির এই উদ্ধৃতি বাইবেলের স্যামুয়েল গ্রন্থে বর্ণিত আমালেকীয়দের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ধ্বংসের আহ্বান হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাইবেলের এ কাহিনিতে ইসরায়েলিদের ওপর আক্রমণকারীদের সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার আহ্বান জানানো হয়েছে। গাজার গোটা জনসংখ্যাকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে বাইবেলের এ কাহিনিকে হাজির করেছেন নেতানিয়াহু।

গণহত্যার মামলায় নেতানিয়াহুর বক্তব্য

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) প্রথম শুনানিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষের আইনজীবী হিব্রু বাইবেলের উদ্ধৃতির মাধ্যমে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যকে গাজার জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যায় প্ররোচনা হিসেবে তুলে ধরেন।

আইনজীবী আরও জানান, নেতানিয়াহু ৩ নভেম্বর সেনাদের উদ্দেশ্যে লেখা আরেকটি চিঠিতে একই আমালেকীয় গল্প পুনরাবৃত্তি করেন।

ধর্মীয় নাম ব্যবহার করে সামরিক প্রযুক্তি

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি গাজায় বোমাবর্ষণে সহায়তা করছে, তাদের নাম ‘ল্যাভেন্ডার’ এবং ‘দ্য গসপেল’, যা উভয়ই হিব্রু বাইবেলীয় ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বিশ্লেষক রাভালে মহিদিনের মতে, প্রায়ই ধর্মীয় ধর্মগ্রন্থ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসরায়েলের অস্ত্রের নামকরণ করা হয়। যেমন, স্যামসন রিমোট কন্ট্রোলড ওয়েপন স্টেশন।

জেরিকো ব্যালিস্টিক মিসাইল-এর নাম রাখা হয়েছে জেরিকো শহরের নামে। হিব্রু বাইবেল ও ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি গ্রন্থ ‘বুক অব যশুয়া’ অনুসারে ইসরায়েলিরা এই শহর ফিলিস্তিনিদের কাছ দখল করেছিল।

ডেভিড’স স্লিং নামক আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার নাম রাখা হয়েছে বাইবেলের মেষপালক ডেভিড ও বিশাল যোদ্ধা গোলিয়াথের মধ্যকার বিখ্যাত সেই লড়াইয়ের স্মরণে, যেখানে ডেভিডের বিজয় হয়েছিল। এই কাহিনী আছে হিব্রু বাইবেল ও ওল্ট টেস্টামেন্টের একটি গ্রন্থ ‘বুক অব স্যামুয়েল’-এ।

* দ্য নিউ আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বিশ্লেষক ও হার্ভার্ডের গবেষক রাভালে মহিদিনের একটি লেখার অবলম্বনে দ্য নিউ আরব এ বিশ্লেষণটি প্রকাশ করেছে।
- ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন: রাফসান গালিব

ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের সামনে ইরানের কয়েকজন নাগরিক
ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের সামনে ইরানের কয়েকজন নাগরিক। ছবি: রয়টার্স

আমার পড়াশোনার জন্য বাবা জমি বিক্রি করেছেন, হালের গরু বিক্রি করেছেন, ঋণ নিয়েছেন, তবু আমাকে হারতে দেননি by নাদিম মাহমুদ

নওগাঁর বদলগাছীর প্রত্যন্ত এক গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা। বাবা আফজাল হোসেন পুরোদস্তুর একজন প্রান্তিক কৃষক। আমার জীবনেরও বড় একটি সময় বাবার সঙ্গে কৃষি কাজ করে কেটেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাঠে কাজ করতাম, এরপর বাড়ি ফিরে রেডি হয়ে স্কুলে যেতাম। স্কুল থেকে ফিরেও বাবাকে সাহায্য করতে মাঠে যেতাম। গরু না থাকলে বাবা আর ছেলে মিলে মই দেওয়া, মাটি কেটে উল্টে দেওয়া—সবই করতাম। ধানখেতে নিড়ানি দিতে দিতে বাবার কাছ থেকে তাঁর ছেলেবেলার গল্প শুনতাম। কাজ করতে করতে যখন স্কুলের সময় হয়ে যেত, তখন তিনি নিজেই বলতেন, ‘যাও স্কুলে। আমি জীবনে যে সুযোগটি পাইনি, তোমরা সেটা হারিয়ে ফেল না।’

বাবার বয়স যখন ১০ কি ১১ বছর, তখন তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। এরপর তাঁর কাঁধে চাপে সংসারের ভার। তাই স্কুলের আঙিনায় আর কোনো দিন পা মারাতে পারেননি। তবে সব সময় মনে হতো আমার পড়াশোনা না জানা বাবা চিন্তা ও চেতনায় কোনো শিক্ষিত মানুষের চেয়ে কম নন।

বাবাকে বুঝেছি বলেই তাঁর কথা কখনোই ফেলতাম না। একদিন এসএসসি পাস করলাম। স্কুলের সর্বোচ্চ ফলাফল আমার ঝুড়িতে থাকলেও কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে সংকট দেখা দিল। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ভর্তির টাকা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে যে খরচ হবে তার সংকুলান করা কঠিন। গ্রামের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বাবাকে বুঝিয়েছিলেন, চাকরির পাশাপাশি জমিজমা থাকার পরও তাঁরা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমার বাবার না আছে চাকরি, না তেমন জমিজমা। তাহলে কীভাবে তিনি আমাকে কলেজে পড়াবেন। এর চেয়ে ভালো হয়, রাজশাহীতে আমাকে প্যারামেডিকসে ভর্তি করালে দুই-তিন বছরে পাস করে গ্রামে ওষুধের দোকান দিয়ে দিব্যি চলতে পারব।

আমরা তিন ভাই-বোন কাছাকাছি বয়সী। সবাইকে পড়াশোনা করাতে হিমশিম খাচ্ছেন মা-বাবা। অনেকের পরামর্শে একদিন আমাকে রাজশাহী শহরে নিয়ে গেলেন। বাবা–ছেলে সেবারই প্রথম রাজশাহী শহর দেখলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া গ্রামের একজনের ছাত্রাবাসে গিয়ে উঠলাম। কথা ছিল পরের দিন কলেজ থেকে ফরম তুলে ভর্তির প্রস্তুতি নেব। কিন্তু ওই দিন সন্ধ্যায় রাজশাহী প্যারামেডিকেল কলেজ ঘুরে আসার পর কিছুতেই আমার মন সায় দিল না। আমি কিছুটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবাকে বললাম, ‘আমি এখানে ভর্তি হব না, সাধারণ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হব।’

বাবার সীমাবদ্ধতা আমি জানতাম, কিন্তু পড়াশোনার খরচ জোগানো যে কঠিন, তা বাবা বুঝতে দিতে চাইতেন না। আমার শক্ত অবস্থান দেখে পরদিন বাসায় ফেরার পথে বাবা আমাকে একটি গল্প শোনালেন, ‘কেউ যদি ঢাকায় যেতে চায়, তাহলে তাকে হয় বাসস্ট্যান্ড অথবা ট্রেনস্টেশনে যেতে হবে। এখন তুমি যদি সেখানে পৌঁছাতে না পারো, তাহলে কীভাবে যাত্রা করবে?’

রাজশাহী থেকে নওগাঁয় পৌঁছার পর তিনি সাহস করে পকেট থেকে ২০ টাকা বের করে দিয়ে বললেন, ‘যাও কলেজের ভর্তি ফরম কিনি নিয়ে আসো। তোমার পড়াশোনার জন্য বসতভিটা বিক্রি করতে আমার সমস্যা হবে না।’

এই যে সাহসটুকু নিয়ে বাবা আমাকে এগিয়ে দিয়েছেন, সেই এগিয়ে যাওয়া আর কেউ থামাতে পারেনি। আমার পড়াশোনার জন্য বাবা খেতের জমি বিক্রি করেছেন, গাছ বিক্রি করেছেন, হালের গরু বিক্রি করেছেন, ঋণ নিয়েছেন, তবু আমাকে হারতে দেননি। আর হারতে দেননি বলেই কৃষক বাবার সন্তান পরিচয় দিতে সব সময় গর্ববোধ করেছি। সেই গর্ব নিয়েই এইচএসসি পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। অক্ষরজ্ঞানহীন বাবাটাকে জীবনে না পেলে হয়তো সায়েন্টিস্টই হতে পারতাম না!

বাবার আদর্শে আমার ছোট ভাই-বোনও বড় হয়েছে। আমার মতো ভাইটাও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছে আর বোনটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। আমাদের জীবনের যাবতীয় অর্জনে মিশে আছে আমার কৃষক বাবার আদর্শ।

* নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

বাবা আফজাল হোসেনের সঙ্গে ছেলে নাদিম মাহমুদ
বাবা আফজাল হোসেনের সঙ্গে ছেলে নাদিম মাহমুদ। ছবি: লেখকের সৌজন্যে