Friday, September 12, 2014

ছড়া- পাবেন, আ. রশীদ ভাই by ধ্রুব এষ

আমি আমার বাবাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম
অনেক ছোট থাকতে একটা চিঠি লিখেছিলাম

বাবা একদিন টাউনে গেছেন কাজে
আমি তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি
সন্ধ্যা হলো, এমা! আটটা বাজে,
ঘুমের জুজু বলছে, তোকে ধরি?

কিন্তু আমার ঘুমিয়ে গেলে হবে
বাবা ফিরলে বাবাকে দেখব না?
আমি তো একটা ছোট মানুষ তবে,
ঘুম ধরলে ঘুমিয়ে পড়ব না?

ঘুমচোখে তাই সেলেটে পেনসিলে
লিখে রাখলাম ‘আ. রশীদ ভাই
ঘুম ধরেছে, তুমি কোথায় “ছিলেন”
টাউন থেকে “অখন”ও ফিরো নাই?’

বাবা আমার চিঠি পড়েছিলেন
টাউন থেকে ফিরেই সেলেট দেখে
ছেলেকে তাঁর জড়িয়ে ধরেছিলেন
মনে পড়ছে এখন স্মৃতি থেকে

আমি আমার বাবাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম
অনেক ছোট থাকতে একটা চিঠি লিখেছিলাম

জামালের আন্দোলনের বেগ চেপেছে by নেয়ামতউল্যাহ

বাংলা স্কুল মাঠ। শত শত মানুষ। মিছিল আসছে... আর আসছে। সকলের একই দাবি, ‘মেঘনার পাড়ে ব্লক ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করতে হবে!’ ভোলার বাঘা বাঘা রাজনৈতিক বক্তারা জ্বালাময়ী বক্তব্য দিচ্ছেন। মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী এসে এক্ষুনি মেঘনার পাড়ে ব্লক ফেলে দেবেন। মেঘনা পাড়ের মানুষের আর কোনো সমস্যা থাকবে না। আর কোনো মানুষ তাদের সাত পুরুষের শত স্মৃতিময় ভিটেঘর হারাবে না, হারাবে না প্রিয় মানুষের ভালোবাসা, হারাবে না একান্নবর্তী পরিবার, মানুষ আর উদ্বাস্তু হবে না। কেউ এ আন্দোলনকে সাধু-সাধু বলছে। কেউ করছে তিরস্কার! সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ বলছেন, ‘গুড়া কালেত্তোন দেহি মাইনষে ভাঙনে ব্যাক ক্ষুয়াইতেছে, সরকার সত্তুর বছরে কিছুই করতে পারে, নো, আর এইতেরা এ্যান করি কতা কো, মনে অয় নদী আর ভাইংতোনো, ভাঙগোন পোরতিরোদ চায়, আমার বাল হালাইন্যা হুরুষ হোলা হগল!’ বলতে বলতে গড-গড করে হাঁটছে। আলতাজের রহমান রোডের বাসিন্দা জামাল এসে উটের মতো গলা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলা স্কুলের মাঠের পাশে সৃষ্টিতলায়। এখানে ভোলার বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-সংস্কৃতিক কর্মীরা আড্ডা দেয়। জামালের শরীর মন কিছু ভালো নেই। সকাল থেকে কুকুরের মতো দৌড়োচ্ছে। দৌড়তে দৌড়তে পেট চো-চো করছে। গত দুদিন আগে ঘুম থেকে উঠেই দেখে, তার রিকশাটি নেই। খোঁজখবর নিয়ে যা বোঝা গেল, তার অর্থ ‘রিকশাটি আসলে চুরি হয়েছে’। শহরে চুরি-চামারি বেড়ে গেছে, দিনে-দুপুরে চুরি হচ্ছে, সাংবাদিকের, রাজনীতিবিদদের মোটরসাইকেল চুরি হচ্ছে, ঘরের বারান্দা থেকে চুরি হচ্ছে, আইন প্রয়োগকারীরা ইদানীং সালিশ-বিচারে নেমেছে- তারা চোর ডাকাত ধরা ছেড়ে দিয়েছে সাধারণের ধারণা। ‘এইসব চুরির লগে পুলিশরাই জড়িত’, আয়েশ করে চা খেতে খেতে বলল, চায়ের জটলা; যারা আসলে জনগণ-তারা প্রধানমন্ত্রীকেও গাল দেয়, ডিসিকেও গাল দেয়; ওদের দারুণ সুবিধা। পুলিশও তেমনি পাঠামো সব উত্তর দিচ্ছে। বলছে, ‘চুরি গেলে কি আর মাল ফেরত পাওয়া যায়, মামলা কইর‌্যা কি অইবো!’ এ কথা পুলিশ জামালকে বলেনি; সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদকে বলেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জামালকে বলেছে একটু অন্য ভাষায়। রিকশাটি খুঁজে দিতে জামাল যখন পুলিশের নিকট একটু শক্ত দাবি করছিল, তখন পুলিশ বলেছে, ‘হমুন্দির পোলা, আগে দ্যাশ না খুইজ্যা আইছো মোগো দারে, চোরে চুরি হইর‌্যা মোগো ধারে জামানত থুইয়্যা যায়, অ্যা, এমুন পিডান পিডামু বাপের নাম মোনে থাকবে না, বোজ্জো।’ জামালকে দু-চার ঘা লাগাতেও ছাড়েনি। সেই থেকে জামালের দৌড় শুরু হয়েছে।
বিকাল ৪টা। দুপুরে খাওয়া হয়নি জামালের। বাসায় যেতে ভয় করছে। বৌ ঘরে ঢুকতে দেবে না। মারধরও করতে পারে। গত ১০ বছর আগে বিয়েতে শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে রিকশাটি পেয়েছিল জামাল। তাই চালিয়ে কোন রকম চলছে; সংসারও চালাচ্ছে। চলছে বললে ভুল হবে, জামালকে চালানো হচ্ছে। জামালের বৌ সুন্দরী পুরুষ ধরনের মহিলা। জামালকে সে চালায়। সন্তানাদি কিছু হয়নি।
সৃষ্টিতলায় দাঁড়িয়ে নেতাদের লম্বা লম্বা বক্তৃতা শুনে, জামাল বুঝেছে, আন্দোলন করলে সব কিছু পাওয়া যায়। সে মহিউদ্দিনকে বলল, ‘বাইয়্যা আমার রিকশাডা পাইতাছি না, কাইল বেহান রাইতে চুরি অইয়্যা গেছে, পুলিশের দারে গেছিলাম, পাত্তা দেয়নো যে... উল্টা পিডাইছে, ও মহিউদ্দিন বাই! এই বিষয়ে এট্টু আন্দোলন করা যাইবো না যে...? ও মহিদ্দিন বাই! বৌ পিডাইবো, হুনতাছেন? এট্টু আন্দোলন...’ শেষ বাক্য শেষ করতে পারে না। মহিউদ্দিন খিঁচরে ওঠে, ‘এই কুত্তার ছাও এনে পোন দিতে আইছোস! যা, আন্দোলন কর, নাইলে তোর বোউরে খানকি বানা, আমারে জিগাছ ক্যা। যা... ভাগ।’ জামাল চুপ করে আবার বলে, ‘মহিউদ্দিন বাই খালি চেইত্তা যাও, এট্টা ভালা পরামিশ দিবো না, খালি চেইত্তা যায়। আমার বৌ পিডাইব, এট্টু আন্দোল’... এট্টু আন্দোলন! ‘ও মহিদ্দিন ভাই’।
মহিউদ্দিন বাংলা স্কুলের মোড়ে সৃষ্টি তলার চা বিক্রেতা। মিছিল-মিটিং আন্দোলন হলে মহিউদ্দিন ক্ষেপে যায়। কারণ নেতারা চা খেয়ে টাকা দেয় না, পরে! বলে সব সটকে পড়ে। মহিউদ্দিনও এক সময় রাজনীতি করত। রাজনীতি করতে গিয়ে বুঝেছে, গরীবের জন্য রাজনীতি নয়। সে এখন চা বিক্রেতা সঙ্গে কৃষক। জামালের উপর ক্ষেপে গাল-মন্দ করে নিজের মনে বলে, ‘পুরান পাগলে বাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানী’। আবার জোরে বলে, ‘এই বাড়ি কুডে? যা! বাড়িত যা’। জামালকে মহিউদ্দিনের পাগলই মনে হয়েছে। রিকশা চুরি হলে কেউ আন্দোলন করে?
আন্দোলন হয় নেতাদের সমস্যা নিয়ে; দেশের বৃহত্তর জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু রিকশা চুরি হলে তা নিয়ে কেউ আন্দোলন করে? মনকে এ প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে মহিউদ্দিনের মন থেকে উত্তর এলো, ‘হ, এইডা লইয়্যাও আন্দোলন অইতে পারে, রিকশা না থাকলে ওই ব্যাডা কামাই করবো কেমনে? খাইবো কি? ওই ব্যাডার সংসার চলবো কেমনে? ওই বেডার পোলাইন কি খাইয়্যা স্কুল যাইবো? স্কুল না গেলে জাতি শিক্ষিত অইয়্যা উঠবো ক্যামনে? মহিউদ্দিনের মনে আরও প্রশ্ন জাগান দিয়ে ওঠে। কিন্তু এরই মধ্যে এক নেতা এসে চা চায়। বলে, ‘মহিদ্দিন এট্টা নেবি সিগারেটও দিয়ো’!
মহিউদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘টিয়া কিন্তুক নগদ দেওন লাগবো, আইজ বাকি নাই।’ আবার নিজে মনে মনে বলে, ‘খাইয়্যা খালি দোর দেয়, কি ব্যস্ত নেতারে আমার, খালি টিয়া মারোনের মতলব!’
পাঁচ টাকার একটা কয়েন ফিঁকে দিয়ে নেতা বলে, ‘ওই মহিদ্দিন্না! টিয়া দিমনা কইছি, এই ল নগদ পাঁচ টিয়া।’
মহিদ্দিন চা ঘুটতে ঘুটতে বলে, ‘আরও তিন টিয়া লাগবো, চা-ই পাঁচ টিয়া’।
নেতা বলে, ‘কচ কি হালার পুত! দমে দমে চা’র দাম বারাছ, দেশটায় কি লাগলো?’ গাল-মন্দ মহিউদ্দিনের যায় আসে না। গা সওয়া হয়ে গেছে। সে এক হাতে নেতাকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে অন্য হাতে পাছা চুলকাতে চুলকাতে বলে, ‘দমে দমে ত্যালের দাম বাড়ান, মালের দাম বারবো না, মালকি নদী দিয়া ভাইস্যা আইয়্যে? ’
জামাল মাথা চুলকাতে চুলকাতে কোন কথা না বলে প্রতিবাদ সমাবেশের দিকে এগিয়ে যায়। এই মাত্র মাঠে আসা ধনিয়ার মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে কুতুব মিয়া ঘেমে গেছেন। শহীদ মিনারের পাশে আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গা মুছছেন। পাশে দাঁড়ানো কর্মীদের বলছেন, ‘ব্যাডা! আন্দোলন ছাড়া কিছু অয়? আর ব্যক্কের কতায় মানুষও আইয়্যেওনা, আমি না আইলে বাইন্যা কান্দিরতোন পাউচগাঁও আইতো না।’
জামাল কাচুমাচু করে কুতুব মিয়ার পাশে দাঁড়ায়; বলে, ‘মিয়া বাই, আমনে ঠিক কতা কইছেন! আন্দোলন ছাড়া কিছু অয় না, আমি এট্টা কতা কইতাম যে, আমার এট্টা রিকশা...।’
কুতুব মিয়া জামালের পুরো কথা না শুনে খেঁকিয়ে উঠে বলে, ‘ওই মিয়া কাম কইর‌্যা খাইতা পারো না, খরাত করতো আইছো, হালার মাইনষের কোন আক্কোল-জ্ঞান নাই, জোয়ান ব্যাডা খরাত করে, লাজ-শরমের মাতা খাইছে, যাও মিয়া ভাগো, তোমারে খরাত দিলে আল্লায় নারাজ অইবো! যাও!’
জামাল প্রতিবাদ সমাবেশে যার কাছেই গেছে, সেই তাকে ভিক্ষুক ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছে। অবজ্ঞা করেছে। হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। আবার লম্বা লম্বা ভাষণে বলছে, ‘আন্দোলন ছাড়া কিছু হয় না, এ সমস্যা সমাধানে কঠোর আন্দোলনে নামতে হবে।’
সকাল থেকে জামালের পেটে কিছু পড়েনি। লুঙ্গির ট্যাকে কিছু টাকা আছে। কিন্তু সেটি খরচ করতে মায়া লাগছে। শেষ হলে তো শেষ। সমাবেশ শেষে মানুষজন শহরে বিক্ষোভ নিয়ে বের হয়। সামনে থাকেন বড় নেতারা। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকের ছবি তোলা শেষ হলে নেতারা কেটে পড়েন। অনেক নেতা শুধু আন্দোলনের অভিনয় করেন, আর সাংবাদিকরা সে ছবি ফলাও করে পত্রিকায় ছাপেন। পরের দিন নেতা নিজের ছবি ৃপত্রিকার পাতায় দ্যাখেন আর হাসেন। পকেটে একটা থাবা দিয়ে মনে-মনে সাংবাদিকের মা-বোন তুলে গালাগাল দিয়ে ঠাট্টা করেন।
এক সময় বাংলা স্কুলের মাঠ আর ভোলা সদর রোডের ব্যস্ততা কমে যায়। জামাল শূন্য শহীদ মিনারের উপর বসে থাকে। শহরে যেমনি বেড়েছে ময়লা-আবর্জনা, তেমনি বেড়েছে মশা। মশার চেহারাও পাল্টে গেছে। বিদ্যুতের আলোয় হোক, ডিজিটাল কয়েলের ছোয়ায় হোক, মশাগুলোর চেহারায় একটা আভিজাত্য বেড়েছে। ঠিক মশা মশা মনে হয় না। শরীরে বসে রক্ত খাচ্ছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে না; রক্ত খাচ্ছে, খাচ্ছে; রক্ত খাওয়া হয়ে গেলে বোঝা যাচ্ছে, ‘খেয়ে গেলো! অনেকটা আধুনিক নেতাদের মতো। জোর নাই-জুলুম নাই, শুধু ফোনে ফোনে হেসে হেসে লুটপাট। অথচ জামালের পাতে ভাত নাই। জামাল ঘরে রাতে যে মশারি খাটিয়ে শোয়, তাতে শত তালি। মশারিতে তালি বেশি দিন টেকসই হয় না। সিনথেটিকের মশারি তো! তাই ওই ফাঁক গলে দু’একটা মশা ঢুকে পড়ে। সকালে দেখা যায়, মশারির ভাঁজে-ভাঁজে রক্ত ভরা পেট নিয়ে মশা সব আয়েশ করে ঘুমোচ্ছে।
মশার কামড় খেয়েই শহীদ মিনারে বসে বসে জামালের ক্লান্ত শরীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। অবসন্ন জাগ্রত দেহে যখন মশারা রক্ত খাচ্ছিল তখন বুঝতে পারছিল যে, মশা কামড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার পড়ে আর টের পায়নি।
জামাল রাতে স্বপ্ন দেখল। পুলিশ তাকে তাড়া করছে। তাকেই ‘রিকশা চোর’ বলে ভদ্র-শান্ত পুলিশ ধাওয়া করছে। পুলিশের পেছনে তার স্ত্রী। জামাল ঘুমের মধ্যে দৌড়তে পারেনা । তার ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ তার পেটে কামড় দিয়ে ওঠে। পায়খানার বেগ চেপেছে। কিন্তু কোথায় পায়খানা করবে। চারপাশে পাকা বিল্ডিং। পাকা বারান্দা। টয়লেটে তালা। শহীদ মিনারের পেছনে বসতে পারে। যদি কেউ দেখে ফেলে। নাইট গার্ড আছে। জামাল শহীদ মিনারের চারপাশ ঘোরে। এক সময় সেখান থেকে সরে আসে। টয়লেটের সামনে একটা আড়াল পায়, সেখানেই বসে পড়ে। কিন্তু বড্ড গন্ধ। সমাবেশে আসা হাজার হাজার লোক সব এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্যান্টের চেইন খুলে আর লুঙ্গি উঁচিয়ে বসে পড়েছে। পেট চিন চিন করে ওঠে, না বসে আর উপায় থাকে না। সারা দিন ভাত জোটেনি। তবুও খুদা মেটাতে ছাই-পাশ যা পেয়েছে, খেয়েছে। এখন চাপ দিয়েছে। জামাল লুঙ্গি খুলে নাক চেপে বসে পড়ে।
২.
বোর...র...রোৎ করে জামাল বিকট আওয়াজ তুলে বাংলা স্কুলের টয়লেটে যাওয়ার পথটির মাঝে গন্ধযুক্ত পায়খানায় তলিয়ে দেয়। টুস-টাস আওয়াজ করে। উ...হু...উম...আল্লা...! পেট চেপে ধরে। লুঙ্গিটা মাথায় পেঁচানো। পেটের ব্যথায় নাকের হাতটি পেটে চলে আসে। চেপে চেপে হাগু বের করে কুত কুত শব্দে। এক সময় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয় জামাল। ব্যথাটা কমে আসে পেটের। তার নাকে আর কোনো দুর্গন্ধ আসছে না। মনে হচ্ছে নিজের গুয়ের টক টক গন্ধ সত্যিই গ্রহণযোগ্য। হাতের কাছে পানি নেই। আশপাশে পাতা খুঁজতে থাকে পাছাটা মোছার জন্য। কিন্তু অন্ধকারে কিছু খুঁজে পায় না। উঠে দাঁড়ানোর পরে একটু গা ঘিন ঘিন লাগে। পা টপকে টপকে বের হয়। আকাশে মেঘের আলো-লুকোচুরি খেলা। সে আবছায়া আলোয় মাঠ পেরিয়ে জামাল চলে আসে পশ্চিমের পুকুর ঘাটে। এর নাম বাংলাস্কুল পুকুর। স্কুল মাঠের পাশে শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে জামালের মনে পড়ে প্রতিদিন ঘাটে বসা স্বপ্নবাজ, আড্ডাবাজ ভোলাইয়া পোলাগো কথা। তারা প্রতিদিন মেলা করে ওই ঘাটে বসে। বিকালে শীতল বাতাস খেতে খেতে তারা গল্পের ঝুড়ি, আর দেশ মাতৃকার সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর পুকুরের জলে ভেসে থাকা শাপলা কিংবা পদ্ম পাতা, নয়তো কাঠের টুকরোর উপরে খেলা করা ব্যাঙ-কচ্ছপের সাঁতার দেখে। জলজ প্রাণী জলে খাবার খায়, বিপদ সংকেতে ডুব সাঁতারে জলের ভেতর ধাঁয়। আড্ডাবাজগুলো বিকালের আকাশের পাখি দেখে। শত শত শাদা বক, পানকৌড়ি, চখাচখি। মাঝে-মাঝে এ পুকুরকে দখলদারের হাত থেকে বাঁচাতে আন্দোলন করে। কখনও মানববন্ধন, কখনও বিক্ষোভ, কখনওবা স্মারকলিপি পেশ। এসব আন্দোলনের সময় জামালের রিকশা সড়কের কিনারে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। জামালের মনে হয়, একটি পুকুরকে বাঁচাতে যদি আন্দোলন করা যায়, তাহলে তার রিকশাটি উদ্ধারে কেন আন্দোলন হবে না? জামাল এক পা, দু’পা করে যখন জলডোবা সিঁড়িতে পা দিয়েছে তখনই তার মনে হয়েছে আজ সারা দিন গোসল হয়নি। শরীর বড্ড পানির সান্নিধ্য চায়। সে আবার উঠে আসে। পরিধানের লুঙ্গি-গামছা আর গেঞ্জি শান বাঁধানো বসার বেঞ্চের উপর রাখে। তারপরে ন্যাংটো নেমে যায় জলের তলায়। আহ! পরম শান্তি। ঘষে ঘষে শরীর মাজে। জলে ভেসে বিদ্যুতের আলোয় জামাল দেখে, পুকুরটি চারপাশ থেকে দখল হয়ে গেছে, সেখানে বড় বড় আকাশছোঁয়া বিল্ডিং উঠেছে। কত বড় পুকুর দিনে দিনে ছোট হচ্ছে। হয়তো এক সময় এ পুকুর থাকবে না। জামালের এসব দেখে মনে প্রশ্ন হয়, যারা পুকুরটি বাঁচাবে তারা কেন পুকুরটি দখলমুক্ত করছে না? তাদের মনে হয় পুকুর-টুকুর পছন্দ না। কিছু ফালতু মানুষ অকারণেই আন্দোলনে নেমেছে। যেমন সে নিজেও ফালতু রিকশা খুঁজে পাওয়া আর পুলিশের আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে চাইছে।
জামালের লম্বা একটা ঘুম হয়েছে। সূর্যের আলো চোখে ও শরীরে পড়ে তাপ বিকিরণের পরই তার ঘুম ভেঙেছে। রাতে গোসল করে শহীদ মিনারে শুয়ে পড়লে ক্ষুধা আর মশার কামড়ে ঘুম আসছিল না। মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য সে কোমর থেকে লুঙ্গির বাঁধন আলগা করে, সমস্ত শরীর হাত-পা একত্র করে গুটি-শুটি মেরে লুঙ্গি দিয়ে ঢেকে দেয়। এতে খিদেও কিছুটা কম অনুভব হয়। পেট থেকে বের হয় রাজ্যের হাওয়া। শরীরটাকে মনে হয় নির্ভার। এলোমেলো চিন্তা আসে; তার স্ত্রী সুরমা, রিকশা, পুলিশ এবং আন্দোলনকে নিয়ে। রিকশা চালাতে গিয়ে মানুষের মন্দ-বকুনি জীবনে কম সহ্য করেনি। অনেকে কারণে-অকারণে শরীরে হাত পর্যন্ত তুলেছে। তার একটা সময় মনে হয়েছে পশুদের প্রকারভেদ আছে, মানুষের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে। কেউ কুকুর প্রজাতির, কেউ বাঘ, কেউ ছাগল, কেউ হায়না, কেউ শেয়াল প্রজাতির। আবার কেউ মানুষ প্রজাতিরও আছে। তারা প্রকৃত মানুষ। তবে দুঃখ হচ্ছে পশুদের চেহারা বাইরে থেকে ধরা যায় বলে সাবধানতা অবলম্বন করা যায়। কিন্তু মানুষের এক চেহারা হওয়ায় ধরা যায় না, পড়া যায় না। তাই সে পশুর চেয়ে ভয়ংকর। তাই তো জামাল এক সময় নিজেদের কুকুর বিড়াল প্রজাতি মনে করে বাঘ-শেয়ালের নির্যাতন মেনে নিয়েছে। কিন্তু আজ কেন মানতে পারছে না, আজ কেন মনে হচ্ছে তার একটা প্রতিবাদ করা দরকার, আন্দোলন করা দরকার। আজ একবার মানুষ হতে ইচ্ছে করছে। আর মানুষ হওয়ার বাসনায় জামালের শরীর কেঁপে উঠল। সে থর থর কাঁপতে শুরু করে। তার পরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই। সকালে উঠে দেখে শরীরের লুঙ্গি সরে গেছে, ইজ্জতের সঙ্গে কোমরে টাকা-পয়সাও আরেকটু হলে হারাতে বসেছিল।

বিশ্বশিল্পকলার নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশ by রফি হক

বাঙালি জাতির দীর্ঘ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। যা শুধু একটি দেশেরই জন্ম দেয়নি, সেইসঙ্গে নিশ্চিত করেছে একটি জাতিসত্তার গর্বিত উত্থানের। আমরা পেয়েছি সৃষ্টিশীল বিকাশের অনুপম পরিবেশ। আমাদের শিল্পে, সাহিত্যে, নাটকে, নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে অনিবার্যভাবেই এর প্রকাশ ঘটেছে। আর তেমনি একজন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। নিজ হাতে অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, অংশ নিয়েছেন সম্মুখ সমরে। তিনি ছিলেন প্লাটুন কমান্ডার। এবং স্বাধীনতার পর অস্ত্র ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছেন ক্ষিপ্র ব্রাশ। মুক্তিযুদ্ধের উন্মত্ততা, বিজয়ের উচ্ছ্বাস নিয়ে এঁকে চলেছেন নিরন্তর, বিরামহীন। চার দশকের দীর্ঘ প্রবাস জীবনে সংকট সংকুলকালেও তার ক্যানভাসের সব প্রান্তজুড়ে একমাত্র মুক্তিযুদ্ধই হয়েছে উপজীব্য বিষয়। তিনিই তাই বলতে পারেন, ‘একাত্তরে যুদ্ধ করেছি স্বাধীনতার জন্য। ...এখন যুদ্ধ করছি মানুষ হওয়ার জন্য।’
সম্প্র্রতি প্যারিসপ্রবাসী শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের সম্মানজনক নাইট উপাধি পেয়েছেন। ফ্রান্সের এ সর্বোচ্চ সম্মাননায় আমরা অত্যন্ত গর্বিত। এটি দেশ এবং জাতির জন্য অত্যন্ত সম্মানের। শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ আর্ট ম্যাগাজিন ‘শিল্পপ্রভা’র জন্য একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। মূল সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আমজাদ আকাশ। সেখানে তিনি শিল্পী হওয়ার জন্য তার একাগ্রতার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি বলেছেন শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা। ওই সাক্ষাৎকারের কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ যুগান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি। আমার ধারণা অনেক নবিস ও তরুণ শিল্পীরা এতে উপকৃত হবেন।
প্রবাসে থেকে শিল্পচর্চা করতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতালব্ধ অনুভূতি থেকে বলেছেন, ...ছবির জগৎটা অন্যরকম। বাইরে অনেকে যায়। অনেকে মোটামুটি নাম করেছে... অনেকে গিয়ে কিছুই করতে পারে না। দম রাখতে পারে না। আমাদের এখানে যে কিছু আর্টিস্ট আছে, তারা নদীই পার হতে পারে না। সুতরাং সমুদ্রে যাবে কী করে? এইটা আমাদের প্রবলেম। ভিত্তিটা আমাদের শক্ত নয়। শিল্প-সাহিত্যের ব্যাপারটা ম্যারাথনের মতো। সেখানে অনেক ধৈর্য ধরতে হয়।...
...যেমন ধরো মেসি ইউরোপে যতই ভালো খেলুক, দেখবা আর্জেন্টিনা দলে অত ভালো খেলতে পারে না। কারণ হল, তাকে সহযোগিতা করার মতো ওখানে তেমন কেউ নেই। ...দ্যাটস মিন দলটা ঠিক না। আমাদের দেশে আর্টের ব্যাপারটা ঠিক ওইরকম... ট্যালেন্ট আছে অনেক... কিন্তু দলটা ঠিক না। ...শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি অনেক কিছু দেখে মনে রাখে। প্রকাশ করে কাজের মাধ্যমে। আমি যে ছবি আঁকি, তা নিয়ে অনেকেই হয়তো অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কী ভেবে আমি ছবিটা এঁকেছি তা তো আমি জানি। আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই না? নিজে যদি নিজেকে ফাঁকি দেই, ইন দ্য লং রান কিছু হবে না। কাজ টিকে থাকবে না।...
...আমরা তো কোনো নতুন জিনিস করতে পারি না। একমাত্র বঙ্গবন্ধু চেষ্টা করেছিলেন। এজন্যই তাকে রক্ত দিতে হয়েছে। বাকি সব সিস্টেম তো ব্রিটিশের।...কিছু জিনিস চেঞ্জ করতে পারলেই তো পরিবর্তন হয়ে গেল বাংলাদেশ। এ পরিবর্তনের জন্য স্ট্রং পারসন দরকার। বঙ্গবন্ধুর মতোন...”
শিল্পী হওয়ার সংগ্রামমুখর দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে বলেছেন, ...একসময় মনে হয়েছিল, আর্ট কলেজের শিক্ষক হওয়া বোধ হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যখন প্যারিস চলে গেলাম, তখন ওইখানে গিয়ে দেখি, হায় হায়, এভাবে তো শিল্পী হওয়া যায় না। চারুকলা হোক আর যা-ই হোক, এটা একটা চাকরি তো। চাকরি করে কখনও শিল্পী হওয়া যায় না। চাকরি সব সময় খেয়ে ফেলে। আমি ওইখানে দেখি যে বড় বড় শিল্পীকে, তারা কিন্তু সারা দিন ছবি আঁকে। ... তুমি যত ট্যালেন্টই হও, এক দিন, দুই দিন, তিন দিন- এক সময় পিছে পড়ে যাবে। ...আর ট্যালেন্ট আছে বলে সপ্তাহে একদিন ছবি আঁকলে কাজ হবে না। নিজের মেধাকে সজীব রাখার জন্যই প্রতিদিন চর্চা করা। সাধনা করা। রঙ নিয়ে খেলা। এটাই আমার সাধনা। রঙ যখন ধরি, ক্যানভাস ধরি। ছবি না আঁকলেও আমি আঁকি...”
মডার্ন আর্ট নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘মডার্ন আর্ট মানে এই নয় যে অবাস্তব কিছু। মর্ডান আর্ট আর ক্লাসিক হচ্ছে গাড়ি আর রিকশার মতো। দুইটারই কিন্তু মূল্য আছে। গাড়িরও যেমন প্রয়োজন আবার রিকশারও। অনেকেই রিকশা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে, কারণ মেইনটেইন করতে পারছি না। কিন্তু আমাদের রিকশার একটা অরিজিন্যালিটি আছে। যেটা অন্য দেশে নেই। এ অরিজিন্যালিটিটা রেখে খেলা এইটা হচ্ছে মডার্ন। তার মানে এই নয় যে, রিকশা ফেলে দিয়ে মেশিন আনলেই মডার্ন হয়ে গেলাম।
এই যে আমার পেইন্টিংয়ে স্পিড অব টাইম আছে, সেটা আগের ক্লাসিক্যাল যুগের মতো নয়। তার মানে সময় নিয়ে করলেই পেইন্টিং ভালো হবে তার কোনো মানে নেই। কম সময়েও ভালো পেইন্টিং হতে পারে। অনেকে বলে শাহাবুদ্দিন ফটাফট এঁকে ফেলে। কিন্তু খেয়াল করল না আমার সারা জীবনের শ্রম সাধনা! এটা একদিনে হয়ে ওঠেনি।
আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম বলেই সমুদ্রে যাওয়া রেজিস্ট্রি করতে পেরেছি। অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক সমস্যায় পড়েছি। বিপদের শেষ ছিল না। কিন্তু দম ছাড়িনি।
বাংলাদেশের শিল্পকলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শাহাবুদ্দিন আহমেদ ভীষণরকমের আশাবাদী। তিনি বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের চিত্রকর্ম নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তার স্বপ্ন এবং বিশ্বাস বাংলাদেশের আজকের তরুণ শিল্পীরা বিশ্বশিল্পঅঙ্গন জয় করে নেবে। এবং একদিন বিশ্বশিল্পকলার নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশ।
সূত্র : আর্ট ম্যাগাজিন ‘শিল্পপ্রভা’র সঙ্গে শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, মূল সাক্ষাৎকার আমজাদ আকাশ। (শিল্পপ্রভা, প্রথমবর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ভাদ্র ১৪১৯)
আলোকচিত্রী রফি হক

অভিমানী সম্রাজ্ঞী by মুহম্মদ নূরুল হুদা

আমার দেখা নজরুল সঙ্গীতের সম্রাজ্ঞীর নাম অবশ্যই ফিরোজা বেগম। আমি নজরুল সঙ্গীতের কিংবদন্তির শিল্পী আঙুরবালা, ইন্দুবালা, যুথিকা রায়, কে মল্লিক, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্রসহ আরও অনেককে চাক্ষুষ দেখিনি, কিন্তু যাদের দেখেছি তাদের মধ্যে চলনে-বলনে-অর্জনে তাকেই সম্রাজ্ঞী বলে মেনে নিয়েছি। আর তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম দিন থেকেই বুঝেছি অন্য কারও মতো তিনি নন, তিনি কেবল নিজের মতো, আপন মুদ্রাগুণে আপনি মহীয়সী এক শিল্পী তিনি : আপসহীনা, তুলনাহীনা। সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, অভিমানী।
প্রথম সাক্ষাৎটি হয়েছিল যতদূর মনে পড়ে তার বাসাতেই। তারই আমন্ত্রণে আমি কালিন্দী অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। প্রস্তুতি ছিল গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার। কারণ লোকমুখে শুনেছি, তিনি দর্শনার্থীদের সঙ্গে একটু বিলম্বেই দেখা করতে আসেন। কারণ হয়তো তিনি বাসায় যে অবস্থায় থাকেন বা থাকতে পছন্দ করেন, সর্বজনসমক্ষে বা অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময়ের মুহূর্তে তিনি সে-রকম ইনফরমাল থাকতে পছন্দ করতেন না। এটি আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ-কারণে যে সচেতন শিল্পী বা স্রষ্টারা যা করেন, তার পেছনে বা অলক্ষে জীবনযাপনের একটি অন্যরকম দর্শন রেখায়িত থাকে। কেননা একই ব্যক্তির ভেতরে আটপৌরে মানুষ ও শিল্পী মানুষ দু’জন অবস্থান করলেও সবসময়ে অভিন্ন হয়ে থাকতে পারেন না। ব্যতিক্রম যে নেই এমন নয়, কিন্তু ব্যক্তিত্ববান ও সচেতন শিল্পীদের মধ্যে এ দুই সত্তার সযত্নে লালন একটি সহজাত প্রক্রিয়া। শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীতের এ-যাবৎকালে শ্রেষ্ঠ সাধক ফিরোজা বেগমের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এর ফলে বাংলা ভাষাভাষী সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় ও মনপ্রিয় শিল্পী হওয়া তার প্রকাশ্য বিচরণ বরাবরই সীমিত ছিল। আমি যতবার তার সঙ্গে কথা বলেছি, ততবার তার মধ্যে এক ধরনের অভিমান প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি মনে করতেন, নজরুলকে যেভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন, আমরা তার পুরোটা পারছি না। কিংবা লক্ষার্জনে সরকারি বা বেসরকারি মহলের উদ্যোগও পর্যাপ্ত নয়। ঠিক একই কথা ভাবতেন নিজের সম্পর্কে। এই উক্তি ও উপলব্ধিতে অবশ্যই সত্যতা আছে। কেননা যে কারণেই নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিসাধনার এ প্রত্যক্ষ সাক্ষীর কাছ থেকে যে-পরিমাণ সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণ করার কথা ছিল, আমরা তা পারিনি। এ দায় আমাদের প্রায় সবার, আমরা যারা নজরুলকে বাঙালির স্বাতন্ত্র্যসূচক স্বাধীন সত্তার প্রবক্তা বলে মনে করি।
কৈশোরেই তিনি শিল্পের তালিম নেন, আর তারপর পরই নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন। তারপর সেই তিরিশের দশক থেকে এ পর্যন্ত মূলত নজরুল সঙ্গীতের চর্চা, সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিশুদ্ধায়নে সমার্পিত ছিলেন। জানা যায়, প্রায় ১ হাজার ৬০০ নজরুল সঙ্গীত গেয়েছেন তিনি আর এর প্রায় সবগুলোই রেকর্ড আকারে সংরক্ষিত। অর্থাৎ নজরুল রচিত, সুরারোপিত ও গীত প্রায় সব গানই তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন এবং প্রামাণ্য রূপ দিয়েছেন। এদিক থেকে বিবেচনা করে আমরা তাকে নজরুল সঙ্গীতের জীবন্ত রেকর্ড বলে মনে করতাম। দেখা গেছে, গানের সুর বা বাণীর কোনো মতভেদ দেখা দিলে তিনিই ছিলেন গ্রাহ্য সমাধান। আর এ-কারণে নজরুল ইন্সটিটিউটে শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীত চর্চা ও প্রমিতকরণের জন্য সরকার নিযুক্ত যে কমিটি আছে, সুস্থ ও কর্মক্ষম অবস্থায় তিনিই ছিলেন তার সভানেত্রী। তার তিরোধানের ফলে এ-ক্ষেত্রে যে অপূর্ণতা সৃষ্টি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। নজরুল গান কেবল কাব্যগীতি নয়, রাগশাসিতও বটে। তার গান গাইতে হলে গানের বাণী, মর্মার্থ ও সুরের মধ্যে একটি ভারসাম্যময় যোগাযোগ প্রয়োজন। প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি। জানা যায়, কমল দাশগুপ্ত ও নজরুলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কোনো কোনো গান পূর্ণাঙ্গভাবে রপ্ত করে পরিবেশন করতে তিনি মাসাধিককাল সময়ও ব্যয় করেছেন। এই নিষ্ঠা ও সাধনা এ-কালে দুর্লক্ষ্য। তাই ফিরোজা বেগমকে নজরুলের অনুকরণীয় শিল্পী হিসেবে নমস্য মানবেন উত্তর প্রজন্মের শিল্পীরা। বলা যেতে পারে, নজরুল সঙ্গীত শিল্পীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা পথিকৃতের।
তার শিল্পীসত্তার আরেক উপাদান তার অনমনীয় ব্যক্তিত্ব। কোনো কিছুর সঙ্গে আপস করা তার স্বভাবজাত ছিল না। তাই নানা সময়ে তিনি ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন। কিন্তু ইতিবাচক দিকটি এই যে, সবকিছু সত্ত্বেও তিনি সর্বমহলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে তার ক্ষেত্রেই সর্বাগ্রে সর্বজনশ্রদ্ধেয় অভিধাটি প্রযোজ্য বলে মনে করি। তাকে সম্মান জানিয়ে তার স্মৃতিতে এমন একটি পুরস্কার প্রবর্তন করা যায়, যা হবে নজরুল সঙ্গীত চর্চার জন্য শ্রেষ্ঠ সম্মান ও স্বীকৃতি। একটি বিশদ ও সুসম্পাদিত স্মারকগ্রন্থে তার জীবন ও সাধনা দলিলায়িত করে রাখাও আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। প্রয়াত ফিরোজা বেগমকে ব্যবহার করে নিজেদের সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব তো আমাদেরই। ‘আমায় নহে গো, ভালোবাসো মোর গান’। না, আমরা অভিমানী সম্রাজ্ঞীর এ অভিমানকে মান্য করব না। আমরা ভালোবাসব তাকেও, তার গানকেও। আমরা বলব, তোমার শ্রেষ্ঠ কীর্তি তোমার গান; আর তুমি যথার্থই তোমার কীর্তির সমান। উত্তর প্রজন্মের নজরুল-সাধকদের পক্ষ থেকে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

খেয়াল বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনা মুক্তাকণা by শামসুদ্দোহা চৌধুরী ও আল আমিন তুষার

সময় দ্বিপ্রহর। শত বছরের প্রাচীন পানামের বিদ্যাপীঠ ‘সোনারগাঁও জি আর ইন্সটিটিউশন’। অনিবার্য কারণে বিদ্যালয়ের দাফতরিক রুমে কয়েকটি প্রাচীন আলমিরায় পুরনো কাগজের জঞ্জাল সাফ করার বিরক্তিকর প্রচেষ্টা চলছিল। কিছু পোকায় খাওয়া কাগজের জঞ্জালের মাঝে তেলাপোকার বিশ্রামহীন দৌড়াদৌড়ি আমাদের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করলেও সবার চোখ এক স্থানে এসে স্থির হয়ে যায়। কিছু সময় পরেই কাগজে মোড়ানো হাতে লেখা একটি পরিপূর্ণ পাণ্ডুলিপি দেখে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। সুন্দর হস্তাক্ষরে খাগের কলমে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাঁশের কঞ্চির কলমে লেখা নবম শ্রেণীর বিদ্যার্থীদের সাহিত্য স্মরণিকা ‘খেয়াল’ অতীতের স্মৃতি নিয়ে আমাদের সামনে দীপ্যমান হয়ে ওঠে। প্রকাশনাটির প্রকাশকাল-১৩৪৬ সন ২ আশ্বিন। কাল এবং সময় অনুসারে সোনারগাঁও জিআর ইন্সটিটিউশনের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সাহিত্যচর্চা প্রচেষ্টা- ৭৫ বছর আগের সেই ইতিহাস আমাদের কতটা আলোড়িত করেছে, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এ ব্যতিক্রমী প্রাপ্তি আমাদের কতটা কর্তব্য-সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করবে। পানামের মতো একটি সমৃদ্ধশালী নগরীতে সাহিত্য সংস্কৃতিচর্চা যে ছিল তা তো বলার অবকাশ রাখে না। ব্রিটিশ পিরিয়ডের শেষের দিকে পানামে ছিল ‘ললিত মোহন স্মৃতিগ্রন্থ পাঠাগারের’ মতো একটি বিশাল পাঠাগার। সরূপ চন্দ্র রায়ের ‘সুবর্ণ গ্রামের ইতিহাসের’ প্রকাশক ছিলেন ললিত মোহন বাবু। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পানামে যে শিক্ষিত এলিট ধনাঢ্য শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল এবং তারা যে শিক্ষার এবং সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। পানামের সুরম্য অট্টালিকার বৈঠকী ঘরে নাটক, সাহিত্যের যে সমৃদ্ধ চর্চা ছিল পানামের সুরম্য ইমারত দর্শনে এখনও তা বোঝা যায়। পঁচাত্তর বছর আগের বাঁশের কঞ্চিতে লিখিত খেয়াল পত্রিকাটি সম্ভবত ধারাবাহিকভাবেই হাতে লিখে প্রকাশ হতো। ১৩৪৬ সনের ২ আশ্বিন প্রকাশিত স্মরণিকাটি ‘খেয়ালের’ ২য় সংখ্যা। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে লেখাপড়ার মান যে অনেক উন্নত ছিল এবং তা স্পষ্ট হয় সে সময়ের সাহিত্যপ্রেমিকদের লিখন এবং জ্ঞানের পরিধি দেখলে। স্মরণিকার প্রথম ছয় পৃষ্ঠাতেই ছাত্রদের উল্লিখিত কবিতার চারটি পঙ্ক্তিমালা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন ‘শিল্পকলা শিখবো কেউ, গ্রন্থমালা লিখবো কেউ, কেউবা হবো ব্যবসাজীবী কেউবা টাটা কার্নানি। সবার আগে চলবো মোরা আরকি কভু হার মানি’ ইংরেজির পদ্যের চারটি স্তবক হল- ‘We are the literature makers, We are the dreamers of dreams.
We are the movers sand shakers of all the world, it seems’
এ স্মরণিকার এসো, আত্মশাসন, প্রার্থনা, ভারতগাঁথা, শেষচরণ, শ্রাবণমাস, মোহনবেনু, দুর্গাপূজা, সান্ধ্য আইন নামে ৯টি কবিতা আছে। কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ভূপেন দে, শিব প্রসাদ ভট্টাচার্য। প্রবন্ধ, গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, রসরচনা মিলে প্রায় বেশকটি লেখা স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে দু’জন মুসলিম লেখক আছেন। তারা হলেন ‘প্রেমের সরূপ’ নিবন্ধের লেখক আবদুল হক মোল্লা এবং ‘হারাধন সুমতির’ গল্পের লেখক জিয়াউদ্দীন আহাম্মদ।
খেয়ালের নবীন লেখকরা যা লিখেছেন
‘খেয়ালের’ লেখকরা বয়সে নবীন। সাহিত্য রসে সিক্ত মন-প্রাণ। খাগের অথবা বাঁশের সুতীক্ষ্ণ কঞ্চির কলমে লিখিত হস্তলিপি সুন্দর। ভাষা প্রাঞ্জল। লেখার গতি আবেগবর্জিত নয় বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুরধার। ৭৫ বছর আগের হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসবের বর্ণনায় যেমন এসেছে তেমনি সম্রাট বাবরের ‘আত্মকাহিনী’ নবম শ্রেণীর বিদ্যার্থীদের নাড়া দিয়েছে, বাবরের আত্মশক্তি প্রেরণা জুগিয়েছে। ‘খেয়ালে’ চিত্রশিল্পীর আঁকা জননী সন্তানের ভালোবাসা, পল্লী দৃশ্য ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে। পেনসিল স্কেচের সেই শিল্পী। এখনও জীবিত আছে কিনা, কর্মজীবনে সে কি চিত্রশিল্পী হয়েছে কিনা তা জানা সম্ভব হয়নি। স্মরণিকায় আছে কয়েকটি গল্প। পল্লীর সুখ-দুঃখ, বিরহ-ব্যথা কৃষক পরিবারের ব্যঞ্জনাময় স্মৃতির বর্ণনায় অতিরঞ্জন নেই। সমুদ্রে সূর্যাস্তের বর্ণনা আছে। বিস্মিত হতে হয় স্যার ওয়াল্টার স্কটের ‘দ্যা লে অব দ্যা মিনিস্টার’ কবিতার ছায়া অনুসারে লেখা কবিতাও স্থান পেয়েছে। জমিদার নির্মল রায়ের গাঁয়ে ফেরা এবং পল্লীর মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে বিলীন করে দেয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আছে স্মরণিকার একটি উপন্যাসে। মাস্টার দা সূর্য সেনের ১৯৩১ সালের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় যে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছিল, সে সান্ধ্য আইনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে যে আতংকের সৃষ্টি হয়েছিল তার বর্ণনাও স্মরণিকায় বাদ যায়নি। ১৬৬ পৃষ্ঠার হাতে লেখা স্মরণিকায় ব্রিটিশদের সঙ্গে পানামের জমিদার শ্রেণীর সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।
পানাম সোনারগাঁওয়ের বাবু কালচার প্রসঙ্গ
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া যখন বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হয় কলকাতা। অবশ্য তার আগে মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময়ে বাংলার জমিদারি হিন্দু রায়তদের কাছে বণ্টন করা হয়। মুর্শিদাবাদের নবাব মুসলিম জমিদারদের কাছ থেকে জমিদারি ছিনিয়ে নিয়ে হিন্দু জমিদারের কাছে পত্তনি দেয়া হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া শাসনামলে মূলত হিন্দুরা পানাম সোনারগাঁওয়ে অর্থ, সম্পদে প্রাচুর্যশীল হয়ে ওঠে, সোনারগাঁওয়ে মুসলমান পতন ত্বরান্বিত হয়। মুসলমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মসলিন বস্ত্র ব্যবসা, হিন্দু এবং ইংরেজ বেনিয়াদের কাছে চলে যায়। সে সময় মসলিন তাঁতীদের অর্থের জোগানদাতা ব্যাংকার রূপে আবির্ভূত হয় পানামের নব্য জমিদাররা। পানামের ব্রিটিশ পিরিয়ডের যে ইমারতরাজী এখনও দৃশ্যমান সেসব ইমারতের মালিক ছিলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যেমন- নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল থেকে আগত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শ্রেণী। মূলত ব্যবসাপ্রধান এবং টাকা লগ্নি, সুদের ব্যবসা থেকে মোটা অর্থ আদায় করা এসব হিন্দু নব্যজমিদারদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল। এ ছাড়াও ব্রিটিশদের তাঁবেদারি করে প্রাচীন বনেদি মুসলিম জমিদার পরিবারগুলো থেকে ছলেবলে কৌশলে জমিদারি ছিনিয়ে নিয়ে বিশাল সম্পদের মালিক হয়ে যাওয়ার পর পানাম সোনারগাঁওয়ে একটি নব্য এলিট শ্রেণী গড়ে ওঠে। কলকাতার সঙ্গে পাট, কাপড়, চালের ব্যবসা করে হিন্দু ধনাঢ্য শ্রেণী কালক্রমে পানাম সোনারগাঁওয়ের বিশাল স্থাবর সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়। পানামের বিখ্যাত সর্দার বাড়ি, পোদ্দার বাড়ি, পাল বাড়ি, রায় বাড়ি, হাসি সেনের ব্যবসা ছিল মূলত মহাজনি ব্যবসা। জমিদারি থেকে আয় হওয়ার পরও মহাজনি ব্যবসায় পানাম নগরের হিন্দুদের ধন-সম্পদ ফুলেফেঁপে ওঠে। রাজধানী কলকাতা এবং ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের কারণে এসব হিন্দু ধনপতিদের মাঝে ব্রিটিশ শাসিত প্রশাসনের সংস্কৃতি, কৃষ্টির একটি গোপন ধারা পানামের হিন্দু নব্যশিক্ষিত তরুণের মাঝে প্রবাহিত হয়। প্রাচীনত্বের ধ্যান-ধারণাকে পেছনে ফেলে দিয়ে সেসময় কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশও দেখা যায় সোনারগাঁও পানামে। নব্য এলিট শ্রেণীর মাঝে শিক্ষিত নারীরাও উপনিবেশিক সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পানামের অদূরে বারদীর শিক্ষিত নাগ জমিদারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পানাম নগরে সাহিত্য সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের বিকাশ ঘটে। গড়ে ওঠে সুরম্য দালানকোঠার মাঝে জমকালো জলসাঘর, নাচ ঘর, বৈঠকি ঘর। পুজোপার্বণের পাশাপাশি হিন্দু জমিদাররা কিছু জনহিতকর কাজেও আত্মনিয়োগ করে। সে সময় সোনারগাঁওয়ের পানামের মুসলমান সমাজের অবস্থা ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। জমিদারি এবং সম্পদ হারিয়ে মুসলমানরা ইংরেজ এবং হিন্দুদের ক্রীড়নক হয়ে পড়ে। এ ধারা চলে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান-ভারত দেশ ভাগ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে পানামের হাসি সেন জমিদার পরিবারের লোকেরা গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে শরিক হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় কিছু শিক্ষিত তরুণ সে সময় উদ্বুদ্ধ হয়। গান্ধীজীর স্বদেশী চিন্তায় মূর্ত হয়ে এ স্থানের কিছু শিক্ষিত তরুণ ব্রিটিশ কাপড়ের পরিবর্তে এ দেশীয় খদ্দরের কাপড় পরিধান করার কথাও শোনা যায়। কলকাতার, ঢাকার বিখ্যাত সঙ্গীতবিদদের এখানে আনিয়ে পানামের নব্য এলিট শ্রেণীর মধ্যে সঙ্গীত প্রতিযোগিতা হতো। বিত্তশালীরা পঙ্খিরাজ নৌকায় চড়ে পানামের পঙ্খিরাজ খালে প্রমোদ নৌবিহারের কথাও শোনা যায়। ব্রিটিশ রাজত্বের শেষ দিকে ‘ললিত মোহন স্মৃতি গ্রন্থাগারের’ মতো সমৃদ্ধ একটি পাঠাগারও এখানে গড়ে ওঠে। তবে আশরাফ আতরাফ গোষ্ঠীর বিশেষ করে তীব্র ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষের দুষ্ট চক্রও বিরাজমান ছিল হিন্দু অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে। বিশেষ করে মুসলিম প্রজাদের বাবুদের বাড়িতে ঢোকা এবং জুতা পায়ে হেঁটে যাওয়াও হিন্দু জমিদারদের কাছে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। হিন্দুদের এ প্রবল প্রতাপশালী ঔদ্ধত্যের অবসান ঘটে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত সরকারি আইনের ফলে। এ সময় সরদার বাড়ির রাধিকা মোহন সর্দার, আনন্দ পোদ্দার, সুরেশ পাল, হাসি সেন, অমিয় সেনের এবং আরও ছোটখাটো জমিদারির পতন ঘটে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের আগেই প্রভাবশালী হিন্দুরা চলে যায় কলকাতায়। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর অবশিষ্ট হিন্দুরাও ভারতগামী হয়। সে সময় গুটিকয়েক মুসলিম পরিবার ছাড়া ধনাঢ্য মুসলিম শিক্ষিত পরিবারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত সোনারগাঁও জিআর ইন্সটিটিউশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ছাত্রদের সঙ্গে নিগৃহীত দু-চার জন মুসলিম ছাত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। বর্তমানে সে সময়ের অধিকাংশ লোকই ইন্তেকাল করেছেন। শতাব্দীর নিঃসঙ্গ রহস্য নগরী হিসেবে পানাম সাক্ষী হয়ে আছে ইতিহাসের ঝরা পাতায়। বির্পযস্ত ঐতিহ্যের কালের সাক্ষী হিসেবে সোনারগাঁও পানাম ঘুমিয়ে পড়ে উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই। ১৯৭৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের’ মাধ্যমে সোনারগাঁওয়ের লুপ্ত লোক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
‘খেয়াল’ স্মরণিকায় প্রকাশিত
এক লেখক জীবনবৃত্তান্ত
১৯২৬ সালের ডিসেম্বরের ২ তারিখে আবদুল হক মোল্লা সোনারগাঁওয়ের অর্জুন্দি গ্রামের মোল্লা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ডের অধীনে সোনারগাঁও জিআর ইন্সটিটিউশন থেকে ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিকুলেশন, ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিটি কলেজ কলকাতা থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বিকম পাস করেন। কর্মজীবনে ১৯৪৫ সালে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া রেলওয়ে বিভাগে অডিট অফিসার, ১৯৪৭ সালে ইবি রেলওয়েতে অডিট অফিসার, ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের করাচিতে কমার্শিয়াল অডিট অফিসার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে পূর্ত, পানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে অডিট কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে অডিট অ্যাকাউন্ট অফিসার থাকা অবস্থায় তিনি অবসর গ্রহণ করেন। আবদুল হক মোল্লা ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট ইন্তেকাল করেন। তার উত্তরসূরিদের অধিকাংশই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। ‘খেয়ালের’ লেখক নির্মল কুমার রায় পানামের নিকটবর্তী জয়রামপুর গ্রামের অধিবাসী। ১৯৪১ সালে সোনারগাঁও জিআর ইন্সটিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। দলিল লেখক হিসেবে তার বিশেষ পরিচিতি ছিল। নির্মল কুমার রায় ইহধাম ত্যাগ করেছেন দীর্ঘদিন আগেই। যে পরিবেশে খেয়ালের নবীন কর্মীরা সাহিত্যচর্চার চেষ্টা করেছে এমন পরিবেশে সচরাচর এ ধরনের বড় প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় না। খেয়ালের কর্মীরা এ অনুপ্রেরণা কোথায় পেল এবং খেয়ালের কর্মীদের উদ্যম পরবর্তীতে এলাকার তরুণদের কীভাবে প্রভাবিত করেছে- এ বিষয় গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি।

‘টাকা দিয়ে দল চালাই, চোখ তুলে নেবো’

দ্বন্দ্বে টালমাটাল সংসদের বিরোধী দলজাতীয় পার্টি। পাল্টাপাল্টি বক্তৃতা-বিবৃতি দেয়ার পর এবার হাতাহাতিতে জড়ালেন দলটির সিনিয়র নেতারা। দলের প্রেসিডিয়াম থেকে প্রভাবশালী দুই নেতাকে অব্যাহতি দেয়াকে কেন্দ্র করে গতকাল জাতীয় সংসদের লবিতে এমন ঘটনা ঘটে। এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু চোখ তুলে নেয়ার হুমকি দেন। এ ঘটনার পর রাতে সংসদ ভবনে সিনিয়র কয়েকজন নেতাকে নিয়ে বৈঠক করেন এরশাদ। দলীয় সূত্র জানায় জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের চিফ হুইপের পদ থেকে তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে অব্যাহতি দেয়া ও মশিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এ বৈঠকে। গতকাল সংসদে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর এক নম্বর লবিতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর সঙ্গে সদ্য প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, কথাকাটাকাটি, অকথ্য গালিগালাজের এক পর্যায়ে হাতাহাতি ঘটে। পরে অন্য নেতাদের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। এর আগে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ, পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সঙ্গে মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু এর কিছুক্ষণ পর প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে অব্যাহতি পাওয়া তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মশিউর রহমান রাঙ্গাও তাদের পেছনের সারিতে নিজেদের আসনে বসেন। তবে রাঙ্গা ও তাজুলের সঙ্গে এরশাদের কোন কথা হয়নি, কেউ কারও দিকে তাকানওনি। মাগরিবের নামাজের বিরতির সময় বিরোধী দলের লবিতে (১ নম্বর) জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে রাঙ্গা-তাজুলের মধ্যে ওই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সেখানে উপস্থিত থাকা জাপার একাধিক নেতা জানান, বিরতির সময় এইচ এম এরশাদ ও ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ লবিতে ছিলেন না। এ সময় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুকে উদ্দেশ্য করে প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গা বলেন, ‘আপনি তো এখন অনেক বড় নেতা হয়ে গেছেন, উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। যখন তখন যে কাউকে দল থেকে বের করে দিচ্ছেন, অব্যাহতি দিচ্ছেন। আপনি আমার এলাকার কমিটি ভেঙে দিলেন, এগুলো করছেন কেন?’ জবাবে বাবলু বলেন ‘আমি কিছু জানি না।’ রাঙ্গা বলেন ‘আপনিই তো সব কিছুু করছেন।’ এ সময় উত্তেজিত কণ্ঠে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মশিউর রহমান রাঙ্গা গালিগালাজ করেন। বলেন- রংপুরে আমি দল চালাই, আমার টাকায় দল চলে, আর সেখানে নাকি আমার ছবি পোড়ানো হচ্ছে। আমিও এরশাদের এক শ’ ছবি পোড়াবো। আমার ওপর খবরদারি, চোখ তুলে ফেলবো!

এ সময় রাঙ্গার সমর্থনে উচ্চস্বরে কথা বলেন বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীও। তিনি জিয়াউদ্দিন বাবলুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি আজ প্রেস কনফারেন্সে আমাকে যুদ্ধাপরাধী বলেছেন। আমি সাতবার এমপি, কেউ কখনও এ অভিযোগ করতে পারেনি। আপনি এসব মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন কেন? বিরোধী দলের উপনেতা হতে না পেরে আপনি এসব করছেন, উপনেতা হতে চাইলে আপনি আমাদেরকে বলতেন, আপনি তো বলেননি। উপস্থিত নিরাপত্তাকর্মী ও জাপার একাধিক এমপি জানান, তীব্র উত্তেজনার মধ্যে জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে রাঙ্গা-তাজুলের হাতাহাতি হলে দলের কয়েকজন সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে এ নিয়ে এরশাদ তার সংসদ ভবন অফিসে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন বাবলুসহ কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন। একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বৈঠকে তাজুল-রাঙ্গাকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে প্রতিমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় হুইপের পদ হারতে পারেন মশিউর রহমান রাঙ্গা ও তাজুল ইসলাম চৌধুরী।
এরশাদকে হুমকি: পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে দলের প্রেসিডিয়াম থেকে অব্যাহতি পাওয়া তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। একই সঙ্গে সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের পদ থেকে তাকে সরানোর ক্ষমতা এরশাদের নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল বিকালে রওশন এরশাদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ হুঁশিয়ারি দেন তাজুল। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তাজুল বলেন, আমি সংসদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত চিফ হুইপ। এরশাদের কোন ক্ষমতা নেই আমাকে এ পদ থেকে সরানোর।
ফের ভাঙনের আওয়াজ: নেতায় নেতায় দ্বন্দ্বে ফের ভাঙনের মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি। যে কোন মুহূর্তে আরেক দফা ভাঙনের কবলে পড়তে পারে দলটি। বুধবার বিরোধীদলীয় হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাকে প্রেসিডিয়াম পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর তারা এমনই আওয়াজ দিয়েছেন। তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান দলটি ছোট করে ফেলতে চাইছেন। এরশাদ নিজেই দল ভাঙছেন। দলটির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন, যে পরিস্থিতি তাতে যে কোন সময় ভেঙে যেতে পারে জাতীয় পার্টি। যাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে তারা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন। জাপার ওই প্রেসিডিয়াম সদস্য আরও বলেন, এ অবস্থার জন্য শুধু চেয়ারম্যানই দায়ী নন। তাকে বা রওশন এরশাদকে  প্রভাবিত করে দলের ভেতর থেকে একটি সুবিধাবাদী চক্র এসব করছে। গতকাল জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেছেন, দলে কোন বিভক্তি নেই। যে নদীর গর্জন বেশি, সে নদীর ঢেউ তো উপচে পড়বেই। এমন বক্তব্য দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংসদ লবিতে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন সিনিয়র নেতারা। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পর গত বছর ১২ই ডিসেম্বর রাতে এরশাদকে সিএমএইচ-এ নেয়ার পর  জিএম কাদের ও রহুল আমীন হাওলাদারকে দলের মুখপাত্র করা হয়। ববি হাজ্জাজকে এরশাদ সিএমএইচ থেকে দলের মুখপাত্র করেন। কয়েকদিন এরশাদের পক্ষে বক্তব্য দেয়ার পর তাকে জোরপূর্বক লণ্ডনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরশাদ সিএমএইচ এ থাকাকালে  জিএম কাদের ও রুহুল আমীন হাওলাদার তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তবে ভাইয়ের নির্দেশে লালমনিরহাট সদর আসন থেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান  জিএম কাদের। এরশাদ রংপুর-৩ আসন থেকে এমপি হিসেবে  শপথ নিলেও জিএম কাদের এমপি হতে পারেননি। শুধু এমপি নন তিনি  প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতও হয়েছেন। নির্বাচন বর্জন করলেও  ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ও পরে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ৪০ জন এমপি হয়েছেন। ছিটকে পড়েছেন মহাসচিব পদ থেকে এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার। জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মহাসচিব হওয়ার পর দলে মূল্যায়ন না পাওয়ায় অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন জিএম কাদের। তাকে বাবলুর কারণে শোকজ নোটিশ দিয়েছিলেন এরশাদ। এছাড়া বিরোধীদলীয় উপনেতা হওয়ার দ্বন্দ্বে ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি পদ হারিয়েছেন কাজী ফিরোজ রশীদ। রওশনপন্থিরা মনে করেন, বাবলু  বিরোধীদলীয় উপনেতা হতে চান বলেই ঢাকা দক্ষিণের  সভাপতি পদ হারিয়েছেন ফিরোজ রশীদ। কারণ এরশাদের  ওই পদে পছন্দ বাবলুকে। ওদিকে এরশাদের  পক্ষে অবস্থান নেয়ারা এখন দলে কোণঠাসা। মহাসচিবকে চ্যালেঞ্জ করায় চট্টগ্রামের সোলায়মান আলম শেঠকে প্রেসিডিয়ামের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। জাপা নেতাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাসে ৭/৮টি জেলা কমিটি ভেঙে সেখানে যারা দল করেন না তাদেরকে বসানো হয়েছে। এ অবস্থায় তৃণমূলে জাপার অবস্থা নাজুক। এছাড়া জাতীয় পার্টির এরশাদ গ্রুপ ছেড়ে কাজী জাফর গ্রুপে যোগ দিয়েছেন প্রভাবশালী নেতা আহসান হাবিব লিংকন, অতিকুর রহমান অতিক।
দশম সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি নির্বাচনকালে সরকারে যোগ দিলে দল থেকে বেরিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে টিআইএম ফজলে রাব্বি, মোস্তফা জামাল হায়দার, এসএম আলম, নবাব আলী আব্বাসসহ ৮জন প্রেসিডিয়াম সদস্য। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন এরশাদের প্রেসিডিয়াম থেকে অব্যাহতি পাওয়া গোলাম মসীহ। তারা আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন। পরে অবশ্য গোলাম মসীহ জাফর গ্রুপ থেকে বের হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব হন।
রাঙ্গা-তাজুলের ব্যাপারে এরশাদ ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নন: এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা এবং তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে জাতীয় পার্টি থেকে অব্যাহতি দেয়ার ব্যাপারে পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নন বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। গতকাল বনানী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় এরশাদ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত না থাকলেও তার কক্ষে ছিলেন। মহাসচিব বলেন, তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়নি, অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া কারও বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি বলেন, রাঙ্গা ও তাজুলকে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাজুল একজন বিতর্কিত লোক। এটা সবাই জানেন। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আমরা শুনেছি। জাতীয় পার্টি ছেড়ে তিনি পিডিপি করেছেন। ২০০৮ সালে বিএনপির নমিনেশন নিয়ে পার্টি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে হেরেছেন। তারপরও স্যার তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন। এছাড়া এটা দল পুনর্গঠনেরই অংশ। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে যে কোন সময় যে কাউকে দল থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন চেয়ারম্যান। জাতীয় পার্টি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল হচ্ছে শ্যাডো গভর্নমেন্ট। আর প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সংসদ  নেতা। তিনি বিরোধী দলেরও নেতা। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা তো বলতেই হবে। কিন্তু কেউ নালিশ করতে যাননি। কোন ভাঙন বা বিভক্তি দেখা দেবে কিনা- এমন প্রশ্নে মহাসচিব বলেছেন, দলে কোন বিভক্তি নেই। আপনি বিরোধীদলীয় উপনেতা হতে চান বলে জাপায় নতুন সঙ্কট- এমন, প্রশ্নে বাবলু বলেন, আমার কোন আগ্রহ নেই।

মর্মান্তিক -ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত ৪

রাজধানীর কাওরানবাজারে ট্রেনের ধাক্কায় ও কাটা পড়ে নিহত হয়েছেন চার জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে দু’টি ট্রেন আসা-যাওয়া করলে রেললাইনে জড়ো হওয়া লোকজন বিভ্রান্ত হয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হন। তবে দুর্ঘটনার জন্য রেললাইনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা মাছের বাজার কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন নিহতের স্বজনরা। দুর্ঘটনার সময় রেললাইনের উপরে মাছের বাজারে উপচেপড়া ভিড় ছিল ক্রেতা-বিক্রেতাদের। এই দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রায় সবাই সেখানে মাছ কেনার জন্য যান। কেউ বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করতে রেললাইনের উপরে বসেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন মাছ বাজারে এলে লোকজন সরে পাশের লাইনে দাঁড়ান। ওই ট্রেনটি বাজার অতিক্রম করার মুহূর্তের মধ্যেই বিপরীত দিক থেকে কমলাপুরগামী একটি ট্রেন জড়ো হওয়া লোকজনের লাইন দিয়ে এলে ‘ট্রেন ট্রেন’ বলে চিৎকার করতে থাকেন আশপাশের মানুষ। কেউ দূরে দাঁড়িয়ে ‘আল্লারে আল্লারে’ বলে চিৎকার করছিলেন। এর মধ্যেই ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে নিহত হন রেললাইনের বাজারের কলা বিক্রেতা নুর মোহাম্মদ (৪০)। তার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার তীরবোলা গ্রামের মকবুল হোসেনের পুত্র। দীর্ঘদিন থেকে ঢাকার খিলগাঁওয়ের মৌলভীরটেকে ভাড়া বাসায় থাকতেন। দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আট জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয় লোকজন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মো. আবদুল মালেক (৬০)। তিনি খামারবাড়িস্থ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (অর্থকরী ফসল)। দুই ছেলে ও দুই কন্যার জনক আবদুল মালেক পরিবার নিয়ে ৪০, পশ্চিম তেজতুরি বাজার, তেজগাঁও এলাকার একটি বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতের পুত্র মোর্শেদ আলম জানান, তার পিতা প্রতিদিন সকালে হাঁটার জন্য বের হন এবং  ফেরার সময় রেললাইনের বাজার থেকে কেনাকাটা করেন। তার সঙ্গে কোন ফোন ছিল না। বিকালে তার স্বজনরা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে তার লাশ শনাক্ত করেন। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মনোয়ারা বেগম (৫৫) বিকাল চারটায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দুই পুত্র-কন্যার জননী মনোয়ারা বেগম স্বামী কাওসার হাওলাদারকে নিয়ে থাকতেন ৬৬ ইস্কাটন রোডস্থ বাংলামোটর এলাকায়। মনোয়ারা বেগমের স্বামী কাওসার হাওলাদার জানান, তার স্ত্রী প্রতিদিনের মতো মাছ বাজার করতে কাওরানবাজারে গিয়েছিলেন। নিহত চার জনের মধ্যে এক নারীর পরিচয় জানা যায়নি। নিহত নারীর আনুমানিক বয়স ২২ বছর। সালোয়ার কামিজ পরা ওই নারীর গায়ে গোলাপি রঙের বোরকা ছিল। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মনসুর আহমেদ জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আট জনের মধ্যে তিন জন মারা গেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্রোপচার ও রক্ত সরবরাহ করে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাধীন পাঁচ জনের মধ্যে সৈয়দ হোসেন (৪৫)-এর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি কোহিনুর ক্যামিকেল কোম্পানির একজন কর্মচারী। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে তেজগাঁও এলাকায় বসবাস করেন। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলবে। সৈয়দ হোসেনের আত্মীয় রিমা জানান, তিনি রেললাইনের বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। আহত অন্যরা হচ্ছেন- শরিয়তপুরের জাজিরার সালমা বেগম (৪৫)। তিনি হাতিরঝিল সংলগ্ন একটি বাসায় বসবাস করেন। তার স্বামী মোতালেব হোসেন জানান, মাছ কেনার জন্য তিনি রেললাইনের বাজারে গিয়েছিলেন। একই ভাবে সকালে বাজার করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন পারুল বেগম (৬০)। তিনি ৪৬/১, কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা। রেললাইনের বাজারে কলা বিক্রি করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ফজলু খান (৪২) ও তার ভাইপো রাকিব খান (২০)। তারা খিলগাঁওয়ের ২৫৬ নবীনবাগের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুরে।
 
>> দুর্ঘটনায় আহত কলা ব্যবসায়ী রাকিবের পাশে নির্বাক স্ত্রী রায়মুনা -ছবি: শাহীন কাওসার
দুর্ঘটনা সম্পর্কে রেলওয়ের সহকারী পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইদুল ইসলাম জানান, জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা যমুনা এক্সপ্রেস কাওরানবাজার এলাকায় পৌঁছলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় একই সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া কর্ণফুলি এক্সপ্রেস পাশের লাইন দিয়ে যাচ্ছিল। সকাল থেকে ওই রেললাইনে বাজার বসেছিল বলে জানান তিনি। এ কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করে রেললাইন সংলগ্ন ক্ষুদে ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান জানান, ওই সময়ে কর্ণফুলি হর্ন বাজিয়ে চলে যাওয়ার পরপর যমুনা এক্সপ্রেস আসে। কিন্তু যমুনা কোন হর্ন বাজায়নি। যে কারণে লোকজন বুঝতে পারেনি যে, এই রেলপথ দিয়ে আরেকটি ট্রেন আসছে। কমলাপুর জিআরপি (রেলওয়ে) থানার ওসি আবদুল মজিদ জানান, রেল দুর্ঘটনায় নিহত চার জনের মধ্যে একজনের পরিচয় জানা যায়নি। বাকি তিন জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দশ হাজার কোটি নিউরন by ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সপ্তাহ দুয়েক আগে একজন লিখে জানিয়েছে চারপাশের সবকিছু দেখে তার খুব মন খারাপ– আমি কি এমন কিছু লিখতে পারি যেটা পড়ে তার মন ভালো হয়ে যাবে। চিঠিটি পড়ে আমি একটু দুভার্বনায় পড়ে গেলাম; কারণ ঠিক তখন এই দেশের লেখাপড়া নিয়ে আমি খুব দুঃখের একটা ‘গল্প’ লিখেছি। সেটা লিখেছি রেগে-মেগে, লেখা শেষ করে পড়ে আমার নিজেরই মন খারাপ হয়ে গেছে। আমার নিজের জন্যেই এমন কিছু একটা লেখা দরকার যেটা আমাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করবে।
সেটা করার জন্যে আমি সব সময়েই এই দেশের ছেলেমেয়েদের কাছে ফিরে যাই। আমাদের দেশের লেখকরা ছেলেমেয়েদের জন্যে লিখতে চান না, আমি লিখি। আমার খুব সৌভাগ্য এই দেশের ছেলেমেয়েরা আমার ছোটখাট লেখালেখি অনেক বড়সড় ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করেছে। আমার জন্যে এই ভালোবাসা প্রকাশ করতে তারা কার্পণ্য করে না।
যখন বিজ্ঞান কংগ্রেস, গণিত বা পদার্থ বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে যাই, আমাকে যখন স্টেজে তুলে দেওয়া হয়, সেই স্টেজে বসে আমি যখন সামনে বসে থাকা শিশু-কিশোরদের বড় বড় উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি, মুহূর্তে আমার মনের ভেতরকার সব দুর্ভাবনা দূর হয়ে যায়। আমাদের কী সৌভাগ্য আমাদের দেশে এত চমৎকার একটা নূতন প্রজন্ম বড় হচ্ছে।
আমাদের দেশে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি– কিংবা কে জানে হয়তো আরও বেশি হতে পারে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে ছেলে-বুড়ো সব মিলিয়েও তিন কোটি দূরে থাকুক, এক কোটি মানুষও নেই। আমাদের এই তিন কোটি ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ছে, তারা যদি শুধু ঠিক করে লেখাপড়া করে তাহলে এই দেশে কী সাংঘাতিক একটা ব্যাপার ঘটে যাবে কেউ কল্পনা করতে পারবে?
এই সহস্রাব্দের শুরুতে পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা সম্পদের একটা নূতন সংজ্ঞা তৈরি করেছেন, তারা বলেছেন জ্ঞান হল সম্পদ। তার অর্থ একটা বাচ্চা যখন ঘরের মাঝে হ্যারিকেনের আলো জ্বালিয়ে একটা অংক করে তখন আমার দেশের সম্পদ একটুখানি বেড়ে যায়। যখন একটি কিশোর বসে বসে এক পাতা ইংরেজি অনুবাদ করে, আমার দেশের সম্পদ বেড়ে যায়। যখন একজন কিশোরী রাতের আঁধারে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদটা কেমন করে বড় হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করে তখন আমার দেশের সম্পদ বেড়ে যায়।
মাটির নিচে খনিজ সম্পদ তৈরি হতে কোটি কোাটি বছর লাগে, কলকারখানায় শিল্প-সম্পদ তৈরি করতে যুগ যুগ লেগে যায়। কিন্তু লেখাপড়া করে জ্ঞানের সম্পদ তৈরি হয় মূহূর্তে মূহূর্তে।
আমাদের দেশের লেখাপড়া নিয়ে আমার অভিযোগের শেষ নেই সেটা এখন সবাই জানে, কিন্তু আজকে আমি অভিযোগ করব না। আজকে আমি শুধু সবাইকে মনে করিয়ে দেব এই দেশের তিন কোটি বাচ্চা প্রতি বছর নূতন বই হাতে নিয়ে লেখাপড়া করতে শুরু করে– শুধুমাত্র এই বিষয়টি চিন্তা করেই আমাদের সবার মনের সব দুশ্চিন্তা, সব দুর্ভাবনা দূর হয়ে যাবার কথা।
লেখাপড়া বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে কোনো একটি শিশু বই সামনে নিয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে সুর করে পড়ছে। শুধু তাই নয়, ‘পড়া মুখস্ত’ করা বলে একটা কথা মোটামুটি সবাই গ্রহণ করেই নিয়েছে। কিন্তু মুখস্ত করাই যে লেখাপড়া নয়, বোঝা, ব্যবহার করা কিংবা নিজের মত বিশ্লেষণ করাও যে লেখাপড়া করার একটা অংশ, সেটা মাত্র অল্প কয়দিন হল আমরা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। যে জিনিসটা এখনও আমরা কাউকে বোঝাতে শুরু করিনি কিংবা বোঝাতে পারিনি সেটা হচ্ছে, শুধুমাত্র জিপিএ ফাইভ পাওয়া মোটেই লেখাপড়া নয়।
আমাদের অনেক ধরনের বুদ্ধিমত্তা আছে, আমরা শুধু এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মাথা ঘামাই, সেটা হচ্ছে ক্লাসরুমের লেখাপড়া করে পরীক্ষার হলে সেটা উগড়ে দেওয়ার বুদ্ধিমত্তা! কিন্তু আমরা সবাই জানি, লেখাপড়ার বাইরে যে বুদ্ধিমত্তাগুলো আছে সেগুলো কিন্তু লেখাপড়ার মতোই, এমনকি অনেক সময় লেখাপড়ার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যারা শিক্ষকতা করি তারা সবাই দেখেছি আমাদের ক্লাসে যে ছেলেটি বা মেয়েটি সবচেয়ে তুখোড়, সবচেয়ে বুদ্ধিমান সে কিন্তু অনেক সময়েই পরীক্ষায় সে রকম ভালো করতে পারে না। দোষটি মোটেও তার নয়, দোষ আমাদের, আমরা ঠিক করে পরীক্ষা নিতে পারি না। সারা পৃথিবীতেই মনে হয় এই সমস্যাটা আছে, একজনের বুদ্ধিমত্তা যাচাই করার পদ্ধতি মনে হয় এখনও ঠিক করে আবিষ্কার করা যায়নি।
যখন আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বাইরের বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে চায় তখন আমাদের তাদের সম্পর্কে লিখতে হয়। আমি দেখেছি সেই ফর্মগুলোতে প্রায় সব সময়েই আমাদের একটা প্রশ্ন করা হয়, “এই ছেলেটির পরীক্ষার ফলাফল কি তার সঠিক সেবা যাচাই করতে পেরেছে?” আমাকে প্রায় সময়েই লিখতে হয়, ‘‘না, পারেনি। পরীক্ষার ফলাফল দেখলে মনে হবে সে বুঝি খুবই সাধারণ– কিন্তু বিশ্বাস কর, এই ছেলেছি বা মেয়েটি আসলে কিন্তু অসাধারণ!’’
বুদ্ধিমত্তা অনেক পরের ব্যাপার, আমরা কিন্তু জিপিএ ফাইভ নামের একটা কানাগলি থেকেই বের হতে পারিনি! আমরা ধরেই নিয়েছি, যে কোনো মূল্যে আমাদের ছেলেমেয়েদের জিপিএ ফাইভ পেতে হবে– দরকার হলে প্রশ্ন ফাঁস করেও। কিন্তু যে ছেলেটি বা মেয়েটি প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাবার পরও সেই প্রশ্ন না দেখে পরীক্ষা দিয়ে ভালো করেছে সে কি অন্য সবার থেকে আলাদা নয়? তার বুদ্ধিমত্তাটা কি আমরা আলাদাভাবে ধরতে পেরেছি? পারিনি! কিংবা যে ছেলেটি বা মেয়েটি ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখার সুযোগ পেয়েও দেখেনি– সে জন্যে পরীক্ষা তত ভালো হয়নি– তার ভেতরে যে এক ধরনের অন্যরকম শক্তি রয়েছে আমরা কি কখনও সেটা যাচাই করে দেখেছি? সেটাও দেখিনি।
প্রতন্ত গ্রামের দরিদ্র একটা পরিবারের একটা মেয়ে যখন সারাদিন তার ছোট ভাইকে কোলে করে মানুষ করে, তার ফাঁকে ফাঁকে লেখাপড়া করে পরীক্ষায় টেনেটুনে পাশ করেছে, আমরা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব মেয়েটির বুদ্ধিমত্তা কম? শহরের স্বচ্ছল পরিবারের একটি মেয়ে যে গাড়ি করে স্কুলে যায়, ফেসবুক ইন্টারনেট করে সময় কাটায়, সুন্দর করে ইংরেজি বলে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে– আমরা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব তার বুদ্ধিমত্তা গ্রামের মেয়েটির থেকে বেশি?
আসলে সেটি পারব না। কাজেই আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে, শুধুমাত্র পরীক্ষার রেজাল্ট কিংবা জিপিএ ফাইভ দেখে একজন ছেলে বা মেয়ের বুদ্ধিমত্তা যাচাই করাটা নেহায়েতই বোকামি। আমাদের চোখ কান খোলা রেখে দেখতে হবে একটা শিশুর মাঝে আর কোন কোন দিকে তার বিচিত্র বুদ্ধিমত্তা আছে। আমাদের নিজেদের ভেতর যদি বিন্দুমাত্র বুদ্ধিমত্তা থাকে তাহলে আমরা কখনও-ই শুধুমাত্র পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে একটা ছেলে বা মেয়েকে যাচাই করে ফেলার চেষ্টা করব না!
আমার সেই সব ছেলেমেয়েদের জন্যে খুব মায়া হয় যাদের বাবা মায়েরা শুধুমাত্র পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পাওয়ানোর প্রতিযোগিতায় নিজেদের সন্তানদের ঠেলে দিয়ে তাদের শৈশবের সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছেন। তাদের থেকে বড় দুর্ভাগা মনে হয় আর কেউ নেই!
২.
মাও সে তুংয়ের একটা খুব বিখ্যাত উক্তি আছে। উক্তিটি হচ্ছে এ রকম, প্রত্যেকটা মানুষ একটা মুখ নিয়ে জন্মায় কিন্তু সেই মুখে অন্ন জোগানোর জন্যে তার রয়েছে দুই দুইটি হাত! যার অর্থ, এই পৃথিবীতে কোনো মানুষই অসহায় নয়– খেটে খাওয়ার জন্যে সবারই দুটি হাত রয়েছে, কাস্তে কিংবা কুঠার ধরে সেই হাত তার মুখে অন্ন জোগাবে।
আমি মাও সে তুং নই, তাই আমার উক্তিকে কেউ গুরুত্ব দেবে না, কিন্তু আমাকে সুযোগ দিলে আমি মাও সে তুংয়ের উক্তিটাকে অন্য রকম করে বলতাম। আমার উক্তিটি হত এ রকম– প্রত্যেকটা মানুষ একটি মুখ আর মাত্র দুটি হাত নিয়ে জন্মায়। কিন্তু ভয় পাবার কিছু নেই, কারণ সব মানুষের মাথার মাঝে রয়েছে দশ হাজার কোটি নিউরন!
যতই দিন যাচ্ছে আমি আমাদের মস্তিকের দশ হাজার কোটি নিউরনকে তত বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করেছি। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি তোমার শিক্ষকতা জীবনের কোন অভিজ্ঞতাটুকুকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে কর– আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলব, সেটি হচ্ছে একজন মানুষের মাথার ভেতরকার সোয়া কেজি ওজনের মস্তিক নামের রহস্যময় জিনিসটির অসাধারণ ক্ষমতা!
প্রায় সময়েই আমি অনেক ছেলেমেয়েকে হতাশ হয়ে বলতে শুনি, “আমি আসলে গাধা, আমার মেধা বলতে কিছু নেই”। তাদের অনেকের কথার সত্যতা আছে, পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পাওয়ার চেষ্টা করতে করতে এবং পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পেতে পেতে তাদের অনেকই আসলে খানিকটা ‘গাধা’ হয়ে গেছে। কিন্তু সত্য কথাটি হচ্ছে, কাউকেই কিন্তু সেটা মেনে নিতে হবে না। আমি এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেছি যে, কেউ যদি সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে চেষ্টা করে তাহলে কত দ্রুত সে নূতন মানুষ হয়ে যেতে পারে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তিপরীক্ষা নামে একটা ভয়ংকর অমানবিক প্রক্রিয়া ঘটানো হয়, সেই প্রক্রিয়া দিয়ে আমরা ‘মেধাবী’ সিল দিয়ে কিছু ছেলেমেয়েকে ভর্তি করি। তার মাঝেও আবার জনপ্রিয় আর অজনপ্রিয় বিভাগ আছে। যারা জনপ্রিয় বিভাগে ঢুকতে পারে সবাই তাদের দিকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাকায়। যারা ঢুকতে পারে না তারা গভীর দুঃখে লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা মায়ের গালাগাল শুনে।
অথচ মজার বিষয় হল, আমি খুব পরিষ্কার এবং স্পষ্টভাবে জানি, এই পুরো বিভাজনটি আসলে অর্থহীন। বিজ্ঞানের জন্যে গভীর ভালোবাসা, কিন্তু বাবা মা জোর করে ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার বানানোর জন্যে তাদের সন্তানদের একটা কষ্টের জীবনে ঠেলে দেন। আবার উল্টোটাও সত্যি, যে ছেলেটি অসাধারণ একজন ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার হতে পারত, ভর্তিপরীক্ষায় টিকতে না পেরে সে হয়তো জোর করে অপছন্দের একটা বিভাগে ভর্তি হয়ে অপছন্দের কিছু বিষয় পড়ে সময়টা অকারণে নষ্ট করছে।
এই মুহূর্তে কম্পিউটার সায়েন্স খুব জনপ্রিয় একটা বিষয়। চাকরি পাবার জন্যে এটা সবসময়েই একটা জনপ্রিয় বিষয় হিসেবে থাকবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগ থেকে পাশ করে ছেলেমেয়েরা অনেকেই নিজেদের সফটওয়ার ফার্ম খুলেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, এই সফটওয়ার ফার্মে কিন্তু শুধু কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছেলেমেয়েরা নয়, অন্যান্য অনেক বিভাগের ছেলেমেয়েরাও আছে সমানভাবে। তারা কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের পাশ করা ছেলেমেয়ে থেকে কোনো অংশে কম নয়– তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। যার অর্থ পছন্দের বিভাগে ভর্তি হতে না পারলেই একজনের জীবন অর্থহীন হয়ে গেছে মনে করার কোনো কারণ নেই।
ছেলেমেয়েদের আগ্রহ এবং দেশ কিংবা পৃথিবীর প্রয়োজনের কথা মনে রেখে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অন্যান্য বিভাগের ছেলেমেয়েদের জন্যে দ্বিতীয় মেজর (ঝবপড়হফ গধলড়ৎ) হিসেবে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সুযোগ করে দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, সব বিভাগেই দ্বিতীয় মেজর নেওয়ার সুযোগ আছে। আমার ধারণা, সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে পড়ালেখা কেমন করে হয় এটি তার একটা চমৎকার উদাহরণ। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের সব পড়ার পাশাপাশি শুধুমাত্র আগ্রহের জন্যে বাড়তি পড়াশোনা করছে– বিষয়টি দেখলেই এক ধরনের আনন্দ হয়।
একটা সময় ছিল যখন আমি মেধাবী শব্দটা ব্যবহার করতাম। আমার চারপাশে অনেক ‘মেধাবী’ হয়ে জন্মায়, অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা সত্যিই বুঝি কিছু মানুষকে বেশি মেধা দিয়ে পাঠান। সেই ছাত্রজীবনেই আবিষ্কার করেছিলাম যে, আসলে বাড়তি মেধা বলে কিছু নেই, চারপাশের অনেক মেধাবী মানুষই জীবনযুদ্ধে ঝরে পড়েছে। আবার যাদেরকে নেহায়েতই সাধারণ একজন বলে ভেবেছিলাম, অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি, তারা উৎসাহ, আগ্রহ আর পরিশ্রম করে ‘মেধাবী’ দের পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে।
সেগুলো দেখে দেখে আজকাল আমার নিজের ডিকশনারি থেকে ‘মেধাবী’ শব্দটা তুলে দিয়ে সেখানে ‘উৎসাহী’ শব্দটা ঢুকিয়েছি। আমি দেখেছি, উৎসাহ থাকলে সবই সম্ভব। সত্যি কথা বলতে কী, আমি আমার পরিচিত জগতের সব মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছি। এক ভাগ হচ্ছে যারা উৎসাহী; অন্য ভাগ হচ্ছে যাদের কিছুতেই উৎসাহ নেই, যাদেরকে ঠেলাঠেলি করে নিয়ে যেতে হয়। উৎসাহীরা পৃথিবীটাকে চালায়, বাকিরা তার সমালোচনা করে!
আমার চারপাশে অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে একজন ছেলে বা মেয়ে শুধুমাত্র নিজের উৎসাহটুকু দিয়ে এগিয়ে গেছে। এ রকম মানুষের সাথে কাজ করাতেও আনন্দ। উৎসাহ বিষয়টা ছোঁয়াচেও বটে– একজনের থেকে আরেকজনের মাঝেও সেটা সঞ্চারিত হয়ে যায়।
আমি পৃথিবীর অনেক বড় বড় স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি দেখেছি। তাদের সুযোগ সুবিধে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি– আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের কিছুই দিতে পারি না, মাঝে মাঝে শুধু একটুখানি উৎসাহ দিই। সেই উৎসাহ ভরসা করেই তারা কত কী করে ফেলে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।
তাই আজকাল সুযোগ পেলেই আমি ছেলেমেয়েদেরকে বলি, তোমরা যেটুকু প্রতিভা বা মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছ সেটুকুতে সন্তুষ্ট থাকার কোনো কারণ নেই। তুমি ইচ্ছে করলেই সেটাকে শতগুণে বাড়িয়ে ফেলতে পারবে। কাজেই আমি মনে করি পৃথিবীতে আসলে প্রতিভাবান বা মেধাবী বলে আলাদা কিছু নেই, যাদের ভেতরে উৎসাহ বেশি আর যারা পরিশ্রম করতে রাজি আছে তারাই হচ্ছে প্রতিভাবান, তারাই হচ্ছে মেধাবী।
সে জন্যে আমি মাও সে তুংয়ের উক্তিটিতে ‘হাত’ থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিই মস্তিস্কের দশ হাজার কোটি নিউরনকে। দুটি হাত দিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই, কিন্তু মস্তিস্কের দশ হাজার কোটি নিউরন দিয়ে অচিন্ত্যনীয় ম্যাজিক করে ফেলা সম্ভব। দুটি হাত দিয়ে খুব বেশি হলে এক দুইজন মানুষের মুখে অন্ন জোগানো সম্ভব। দশ হাজার কোটি নিউরন দিয়ে লক্ষ মানুষের মুখেও অন্ন জোগানো যেতে পারে!
৪.
আমি জানি আমাদের সমস্যার শেষ নেই। আমি জানি সব সমস্যার সমাধানও চট করে হয়ে যাবে না– আমাদের দীর্ঘদিন এই সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু সেটি নিয়ে হতাশ হবার কিছু নেই, কারণ বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে নিজের পায়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।
আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের শক্ত দুটি হাত দিয়ে এই দেশকে ধরে রেখেছে। এই দেশের নূতন প্রজন্মকে তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে দশ হাজার কোটি নিউরন নিয়ে!
জিপিএ ফাইভের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং, গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য– কোনো কিছুই এই দশ হাজার কোটি নিউরনকে পরাজিত করতে পারবে না।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

জেদই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সাফল্যের স্বর্ণশিখরে by মোশাররফ রুমী

শৈশবে একেবারেই এক অন্তর্মুখী মানুষ ছিলেন ফিরোজা বেগম। নিজের জগতেই ছিল তার বসবাস। পড়ালেখা, খেলাধুলা, গান, অভিনয়, আঁকাআঁকি, নাচ সবকিছুই করছেন। বাদ ছিল না কিছুই। সব কিছুতেই তিনি ছিলেন প্রথম। অথচ তাকে যে কেউ কিছু শেখাচ্ছিলেন তাও নয়। নিজেই শিখেছেন। ভুল হলে নিজেই শুধরে নিতেন। নিজেই যেন নিজের শিক্ষক ছিলেন। খুব জেদি ছিলেন তিনি। যা করার জেদ তার মনে তৈরি হতো তা তিনি করতেনই। আর এ জেদই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। যে সাফল্য এ উপমহাদেশে নজরুলের গানকে সংগীতপ্রেমী মানুষদের হৃদয়ে শক্ত এবং প্রিয় আসনে আসীন করার। সিংহ রাশির জাতিকা ছিলেন ফিরোজা বেগম। ছোটবেলায় সব কিছুর মধ্যেও গান শোনার এক অদ্ভুত নেশা তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। রক্ষণশীল বাড়ি না হলেও গানের চর্চা ছিল না তাদের বাড়িতে। সেই সময়ে মেয়েদের পড়াশোনা, স্কুলে যাওয়ার চলই ছিল না। তেমন পরিবেশে গান শেখার অবকাশ না থাকলেও বাবা-মায়ের সংগীতপ্রীতি যে ছিল তা বলাই বাহুল্য। এটাই ছোট্ট মেয়েটির সংগীত আগ্রহে অনুঘটক হয়েছে। তাদের বাড়ির ভাঁড়ারঘরে ছিল বেশকিছু পুরনো রেকর্ড। ছিল বেশ পুরনো একটি কলের  গানও। সেটার পিনটাও ঠিক ছিল না, অথচ তা দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতেন সংগীতপাগল মেয়েটি। একাকী নিবিষ্টচিত্তে তিনি গান শুনতেন। কেউ তাকে বিরক্ত করতেন না। ফলে গানের ভুবনে হারিয়ে যেতে তার মানাও ছিল না। এমনি একদিন গান শুনতে শুনতে তিনি এতটাই আনমনা ছিলেন যে, কাজের লোকেরা কখন ভাঁড়ারঘর তালাবন্ধ করে দিয়েছিল সেই খেয়ালও করেননি। পরে বুঝতে পারলেও তাতে তার কোন চিন্তা হয়নি বরং ভেবেছেন, মন্দ কি? একা একা গান তো শোনা হবে! এদিকে সন্ধ্যায় সবাই পড়তে বসেছে। কেবল তিনি নেই। অভ্যাসবশত প্রতিদিনের মতো চোখ বোলাতে গিয়ে ঠিকই মা দেখেছেন একটা চেয়ার খালি। অন্যদের জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু কেউই বলতে পারল না তিনি কোথায়। অবশেষে তাকে সেই গানের ঘরেই খুঁজে পাওয়া গেল। এভাবেই সব সময় গানের নিশি তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। ভেতরে ভেতরে ভাল গান শেখার প্রবল ইচ্ছায় অস্থির থাকতেন তিনি। আর এ অস্থিরতাই তাকে সংগীতে ব্যাপক পারদর্শী করে তোলে। ১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ইসলামী গান নিয়ে তার প্রথম রেকর্ড বের হয়েছিল। এতে চিত্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে ছোট্ট ফিরোজা গেয়েছিলেন ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’। সাহেব রেকর্ডিস্ট, তাই দুরু দুরু বুকে গেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতেই বাজিমাৎ। বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে হু হু করে সব রেকর্ড বিক্রি হয়ে যায়। সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে সুরের আকাশের এই তারার সেটাই প্রথম পরিচয়। ছোট্ট মেয়েটির গায়কী সংগীতবোদ্ধা এবং সাধারণ শ্রোতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ড বের করার জন্য যেখানে বড় সব শিল্পী হা-পিত্যেশ করে থাকেন, সেখানে এই একরত্তি মেয়ের একের পর এক রেকর্ড বেরিয়ে যাচ্ছিল। পর পর চারটি রেকর্ড বেরিয়ে যায় অল্পদিনের মধ্যেই। গুণীজনদের সাহচর্য এবং স্নেহ পেয়েই তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। তাছাড়া তার চাই যতসব জটিল সুরের সমাধান। সবার ছিল একই জিজ্ঞাসা, কেন তুমি এত কঠিন গান শিখতে চাও? সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এজন্য সবাই আমাকে নিয়ে মজা করতো। আসলে আমি তো আমার সংগীত শিক্ষা নিয়ে খুশি নই। সব সময় আরও ভাল গান শেখার ইচ্ছেটা আকুলি বিকুলি করতো। তাই নিজেই একদিন চিত্ত রায়কে বলে বসলাম, গান শিখতে চাই আমি। শুনে তো অবাক চিত্ত রায়। কি বলে এই মেয়ে? সেই থেকে শুরু হলো শিক্ষা। একদিকে চিত্ত রায় অন্যদিকে কমল দাশগুপ্ত। এই দু’জনের কাছেই আমি ঋণী। বিশেষত কমল দাশগুপ্তের কাছে। তার কাছে আমি সব ধরনের গান শিখেছি। আমার জীবনের মূল শিক্ষাটাই পেয়েছি ওর কাছে। তখন রেডিওতে তিনি সমান্তরালে নানা ধরনের গান গেয়ে যাচ্ছিলেন। ততদিনে তিনি সংগীতে বিখ্যাত। দু-দুইবার আধুনিক গানের ক্ষেত্রে মাসের সেরা শিল্পী হয়েছিলেন। একবার তার গলায় রবীন্দ্রসংগীত শুনে তাকে গান শেখানোর জন্য পঙ্কজ মল্লিকের মতো শিল্পী ফিরোজা বেগমের কলকাতার বাড়িতে চলে এসেছেন। গুণী শিল্পীরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অন্যদিকে তিনি আব্বাসউদ্দিন এবং পল্লীকবি জসীমউদদীনের কাছে অল ইন্ডিয়া রেডিওর জন্য মাঝে মাঝে লোকগীতির তালিম নিতেন। রেডিওর পাশাপাশি স্টুডিওতে গান গাইতেন তিনি। আর এভাবেই গানের জগতে বিরামহীন ডুবে থেকে এগিয়ে চলে তার সাফল্যে ভরপুর পথচলা। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭- টানা ১৩ বছর তিনি ছিলেন কলকাতায়। এ সময়টাকে তিনি নির্বাসন হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। এই সময়েই ১৯৫৬ সালে বরেণ্য সুরকার কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজের জেদকেই তিনি সব সময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কলকাতাতেই জন্মেছে তার তিন সন্তান- তাহসিন, হামিন ও শাফিন। ওই সময়ে স্বর্ণযুগ স্বর্ণকণ্ঠী ফিরোজার। অথচ টানা পাঁচ বছর স্বামী-সন্তান-সংসার সামলাতে গিয়ে গান গাইতে পারেননি তিনি। এগিয়ে চলা সময়ের সঙ্গে তাদের দুর্ভাগ্যও এগিয়ে এসেছিল একসময়। অসুস্থ হয়ে পড়লেন কমল দাশগুপ্ত। শেষ পর্যন্ত বাচ্চাদের কথা, স্বামীর চিকিৎসার কথা ভেবে ’৬৭-তে দেশে ফেরেন। আসতে না আসতেই পড়েছিলেন দুর্বিপাকে। তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডি থেকে এসেছিল উপর্যুপরি টেলিগ্রাম। দুঃসহ সেসব স্মৃতি তাকে শেষ বয়সেও কষ্ট দিত। ১৯৭৪ সালের ২০শে জুলাই মারা যান কমল দাশগুপ্ত। যতি পড়ে মাত্র ১৮ বছরের সুরময় দাম্পত্যের। বিভিন্ন সময়ে নানা সম্মাননা পেয়েছেন ফিরোজা বেগম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ টিভি শিল্পী পুরস্কার (পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, স্যার সলিমুল্লাহ স্বর্ণপদক, দীননাথ সেন স্বর্ণপদক, সত্যজিৎ রায় স্বর্ণপদক, বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, সিকোয়েন্স পুরস্কার এবং সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ও চ্যানেল আই নজরুল মেলায় আজীবন সম্মাননা। তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতেন বাংলা ১৪০০ সালে কলকাতার সাহিত্যিক-শিল্পীদের দেয়া সংবর্ধনা। সেবার একই বৃন্তে দুটি কুসুম শিরোনামে দুই অসামান্য কণ্ঠমাধুর্যের অধিকারী নজরুল সংগীতে ফিরোজা বেগম এবং রবীন্দ্রসংগীতে সুচিত্রা মিত্রকে সম্মান জানানো হয়। সংগীত ভুবনের এই সম্রাজ্ঞীর জীবন কখনোই কুসুম বিছানো ছিল না। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হয়েছে তাকে। ভারত আর পাকিস্তান মিলিয়ে যেখানে এই কিংবদন্তির রেকর্ডসংখ্যা ১৬০০, সেখানে বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র।

শিক্ষা -কী তৈরি করছি—শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষার্থী? by আবুল মোমেন

শিক্ষামন্ত্রীর নিরহংকার নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অগ্রযাত্রা আমাদের দেশে ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ছাত্রকে ৩২ কোটি বই শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই পৌঁছে দেওয়ার মতো বিস্ময় যেমন আছে, তেমনি আছে সর্বমহলের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে রীতিমতো বাস্তবায়ন শুরু করার মতো অর্জন। শিক্ষামন্ত্রীর সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সে ভরসায় শিক্ষা নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের বিবেকের ওপর চেপে বসতে থাকা একটি দুর্ভাবনা ও উদ্বেগ তুলে ধরার কথা ভাবছি।

একেবারে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পুরো শিক্ষাকে যে আমরা পরীক্ষার মধ্যে সিলবদ্ধ করে ফেললাম, কাজটা কি ঠিক হলো? প্রশ্নটা তোলা জরুরি। কারণ, এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য—জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিক তৈরি—বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঘাটতি রেখে শিক্ষার অপর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য মানবসম্পদ তৈরি কতটা হতে পারে, তাও বিচার্য বিষয়। এ দুটি বিষয়ের পরিপূরকতা বাধাগ্রস্ত হলে কাজ হবে না। কারণ, দক্ষ কর্মী তৈরি হবে জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিকের ভিত্তিভূমির ওপর।
পরীক্ষা হলো শিক্ষার্থীর সিলেবাসভিত্তিক অর্জিত শিক্ষার মান যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। আমাদের দেশে যে পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের পাঠ দেওয়া এবং তার ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে বিভিন্ন স্তরের সম্পূর্ণ অর্জন লক্ষ্য পূরণ ও পরিমাপ কোনোটাই সম্ভব নয়। নিচের পর্যায় থেকে অসম্পূর্ণ শিক্ষা এবং তার আবার পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার ফল কেমন, তা আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিত সমাজের গড় আচরণ ও ভূমিকা থেকেই বোঝা উচিত।
অসম্পূর্ণ শিক্ষার প্রভাবে নানা অসম্পূর্ণতা নিয়েই সমাজ গড়ে উঠছে। বরং এই নব্যশিক্ষিতদের দাপটে আমাদের সনাতন ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ও নৈতিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সমাজ আজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শূন্যতায় বিপথগামী হয়ে পড়েছে।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার নগদ লক্ষ্য হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফল এবং তা এত উগ্রভাবে প্রধান হয়ে উঠেছে যে বাকি লক্ষ্যগুলো বাকিই থেকে যাচ্ছে, আর তাতে প্রত্যেক ছাত্রের জীবনে মানবিক শিক্ষার বকেয়ার পাহাড় জমছে। ছাত্র যেমন তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিচারও হয় একমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। পরীক্ষা সর্বগ্রাসী হয়ে রীতিমতো স্কুল ও সবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই অকেজো করে দিয়েছে। কারণ, পরীক্ষায় ভালো করা আদতে এমন একটি দক্ষতা, যার জন্য স্কুলে ব্যয়িত সময়কে রীতিমতো অপব্যয় বলে মনে হচ্ছে অনেকেরই, বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার ও টিউটরের পাঠ। লক্ষ্য যদি একমাত্র পরীক্ষাই হয়, তবে সে বিচারে এটাই বেশি ফলপ্রসূ।
ছাত্র-অভিভাবকদের চাহিদা এবং সরকারের চাপের মধ্যে পড়ে শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের কাজ করছেন এবং স্কুল নয়, বস্তুত পরীক্ষার্থী তৈরির কারখানায় খাটছেন (কোচিং সেন্টার সম্পর্কে এ কথা আরও বেশি খাটে)। তবে তাঁরা খুশিমনেই খাটছেন। কারণ, এটি আর্থিকভাবে লাভজনক। শিক্ষার্থীকে নিছক পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের এ অন্যায় দীর্ঘদিন চলতে থাকায় বর্তমানে শিক্ষক-অভিভাবক সবাই পরীক্ষাকেই ধ্যানজ্ঞান এবং শিক্ষা বলে ভুল—না, অন্যায়—করছেন। ফলে শিক্ষা প্রশাসন-শিক্ষকসমাজ-অভিভাবক এবং এর ভিকটিম ছাত্র মিলে বিপথগামিতার ও অধোগতির রমরমা চলছে অবাধে। সোনালি পাঁচ-তারকা পরীক্ষার্থীদের, সহাস্য ছবির আড়ালে এ অবক্ষয় ঢাকা যাচ্ছে না।
মুশকিল হলো, এ আনন্দ প্রায়ই দেখা যাচ্ছে স্বল্পস্থায়ী। কারণ, প্রাপ্ত শিক্ষা যে টেকসই নয়, তা প্রথমে পরবর্তী ধাপের ভর্তি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়ে যায়, তাতে অধিকাংশের ফলাফলের হাল দেখে। কিন্তু তার আরও স্থায়ী অর্থাৎ টেকসই কুফল দেখা যায় সমাজে—‘শিক্ষিত’ মানুষদের দক্ষতার মান এবং দুর্নীতি-অনৈতিকতার নৈরাজ্য দেখে। এ ছাড়া একজন শিক্ষিত মানুষের ন্যূনতম অর্জনের চিত্রও ভয়াবহ। দু-একটি নমুনা দেওয়া যাক।
প্রাথমিকের মোদ্দা কয়েকটি অর্জন লক্ষ্য হলো পড়া-লেখা-বলা-শোনা (শুনে বোঝা) এবং গণিতে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন। গোটা ছাত্রজীবনেই এসব অর্জনের অগ্রগতি চলবে।
বাস্তবে কী ঘটছে? প্রাথমিক স্তর নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ শিশু উপরোল্লিখিত দক্ষতাগুলো নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী অর্জনে ব্যর্থ থেকেই প্রাথমিক পর্যায় সমাপ্ত করে, যাদের অনেকেই জিপিএ–৫-ও পেয়ে থাকে। তাদের কথা ছেড়ে দিন, আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্তদের সামনে শরৎচন্দ্র বা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের পাতা খুলে পড়ে শোনাতে বলেন, তাহলে অভিজ্ঞতাটা কেমন হবে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, দু-চারজন ছাড়া কেউই ভাব ও অর্থ ফুটিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে গড়গড় করে পড়তে পারে না। পদে পদে হোঁচট খায় এবং পাঠ ও রস উভয়ই ব্যাহত হয়।
চার বছর (বা ছয় বছর) বয়স থেকে ১৮ বছর (অনেক ক্ষেত্রে তা আরও প্রলম্বিত হচ্ছে) একটানা পড়াশোনার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সবারই জ্ঞানভিত্তিক স্মৃতি অত্যন্ত দুর্বল। অর্থাৎ এত বছরে তারা যেসব বিষয় পড়েছে (বা তাদের পড়ার কথা) যেমন— বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা শাখা, মানবিক ও অন্যান্য বিদ্যা—তার পুঞ্জীভূত যে সঞ্চয় তাদের থাকার কথা, তা গড়ে উঠছে না।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কেবল সঞ্চয় থাকলেও হবে না, কারণ তা স্তূপাকার হয়ে জঞ্জালে পরিণত হবে, যদি না এ দিয়ে ভাবনা, চিন্তা, দর্শনসহ মনন ও উপভোগের নানা রসদ তৈরির প্রক্রিয়া চালু থাকে। এ কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে কেবল নির্ধারিত কিছু পাঠ্যবই পড়িয়ে প্রকৃত শিক্ষিত জাতি তৈরি করা যায় না। আর আমাদের দেশে পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত ছাত্র অযথা পুরো পাঠ্যবই বা কেন পড়বে? শিক্ষক-টিউটরের সহযোগিতায় তারা আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরগুলোই শুধু শেখে, প্রায় ক্ষেত্রে মুখস্থ করে। এভাবে কোনো বিষয় পূর্ণাঙ্গভাবে জানা হয় না, যেটুকু জানা হয় তার কোনো মননশীল চর্চার সুযোগ নেই। এই কাটছাঁট করা শিক্ষার উপমা হতে পারে পাখা ছেঁটে দেওয়া পাখি, যে আর উড়তে পারে না।
এভাবে শিক্ষাটা অর্থাৎ জানা-বোঝা ইত্যাদি হয় ভাসা-ভাসা। যা সে পড়ে বা তার পড়ার কথা, সেসব কখনো তার ভাবনার বিষয় হয় না, বস্তুত এভাবে কারও সমৃদ্ধ চিন্তাজগৎ তৈরি হয় না। এ কারণে আমরা দেখি সংসদে সুস্থ তর্ক হয় না, ঝগড়া হয়। জাতীয় জীবনে কোনো ইস্যুতে সারগর্ভ আলোচনা হয় না একতরফা গোঁয়ার্তুমির প্রকাশ ঘটে।
পরীক্ষার এই দোর্দণ্ড প্রতাপে জ্ঞানার্জন ও সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠার রসদগুলো অধিকাংশের অনায়ত্ত থেকে যাচ্ছে। এর চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, বাংলা সম্মানের পাঠ শেষ করে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি ভিন্ন কোনো বইয়ের নাম বলতে পারে না এমন তরুণ প্রচুর এবং মূল টেক্সট না পড়ে ইংরেজি সাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন এ দেশেই সম্ভব। এ কথাও বলা যায়, উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার পরও অধিকাংশের সাহিত্যবোধ, সমাজচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা ইত্যাদি অবিকশিত থেকে যায়। পরীক্ষার রিলে রেসে আবদ্ধ ছাত্রজীবন কাটিয়ে অধুনা অধিকাংশ শিক্ষিতজনের স্কুলজীবনে নাটকে, অভিনয়ে, গানে, আবৃত্তিতে, বিতর্কে কি স্কাউটিং, ক্যাম্পিং, ক্রীড়ার অভিজ্ঞতা থাকছে না; স্কুল, সহপাঠী, শিক্ষককে নিয়ে এমন বৈভবময় অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছে না, যা ভবিষ্যৎ জীবনে বারবার ফিরে ফিরে আসবে মধুর উদ্দীপক স্মৃতিচারণা হয়ে।
সঞ্চয়হীন মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে অবশ্যই দরিদ্র থাকবে আর স্মৃতিহীন মানুষের মানবিক খুঁটিগুলো তৈরি হবে না। বেপরোয়া কাজে কি বখাটেপনায় লিপ্ত হতে তার অন্তর থেকে রুচির বাধা তৈরি হবে না। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাদের পক্ষেÿ সম্ভব। এই রিক্ততার বড় খেসারত হচ্ছে আমাদের শিক্ষিতজনদের প্রকৃত দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম গড়ে উঠছে না—পেশা বা জীবিকার সত্তার বাইরে মনুষ্যসত্তার মান খুবই খারাপ হচ্ছে।
পরীক্ষাই সব হয়ে ওঠায় একে ঘিরে শিক্ষার প্রতিকূল, অবাঞ্ছিত, এমনকি বেআইনি কাজ ও দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। এটাই স্বাভাবিক পরিণতি হওয়ার কথা। অন্ধবিশ্বাস যেমন ধর্মকে ঘিরে অসাধু ব্যক্তিদের ব্যবসার সুযোগ করে দেয় এ ‘শিক্ষাও’ তার উপজাত হিসেবে নোটবই, টেস্ট পেপার, মেডইজি, কোচিং সেন্টার, টিউশনি এবং অবশ্যই প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষাকে জড়িয়ে রাখছে। ৩২ সেট প্রশ্ন তৈরি করেও এটা বন্ধ করা যাবে না।
শিক্ষার একমাত্র আরাধ্য দেবতা যদি হয় পরীক্ষা, তো তাঁকে তুষ্ট করার জন্য পুণ্যলোভী—এ ক্ষেত্রে অ + লোভী—শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবক, তেমন পুরোহিতই খুঁজবেন, যিনি যেকোনো মূল্যে—অর্থাৎ অবৈধ পথে হলেও—মোক্ষ লাভে সহায় হবেন। শিক্ষকের মধ্যে তেমন যোগ্য ও সাহসী মানুষের অভাব ঘটাই স্বাভাবিক। তাতে কেউ দমবেন না। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা, কেরানি, প্রেসকর্মী, দপ্তরি, মায় দারোয়ান ইত্যাদি যেকোনো স্তর থেকে কাঙ্ক্ষিত ‘সাহসী যোগ্য’ পুরুষ এগিয়ে আসবেনই। হয়তো দর চড়বে, প্রণামি বাড়বে—এই যা।
২.
এটি আদতে শৈশবেই শিশুদের অসুস্থভাবে বেড়ে ওঠার গল্প। ঘরের নামে ওদের খাঁচায় বন্দী রাখা হয়, শিক্ষাজীবন কাটে কারাগারে, পরীক্ষার নামে খাটতে খাটতে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো শিক্ষা নয়, এরা ভোগেই সবাই প্রলুব্ধ হয়, এমনকি এতে আনন্দ পেতে থাকে, তার জন্য নানা প্রলোভনও মজুত থাকছে। ফলে মানবজীবনের প্রস্তুতিকাল, পুরো কৈশোর ও প্রথম তারুণ্য, পরীক্ষার শৃঙ্খলে বাঁধা থাকছে।
তাদের মাঠের, মুক্ত হাওয়ার, আলোর, আকাশের, গাছের, মাটির, জলের, সমবয়সীর সঙ্গের, বড়দের স্নেহ-মমতার এবং গল্পের, সুরের, রঙের, আঁকার, ভাঙার, গড়ার, চড়ার, লাফানোর, দৌড়ানোর যে অপরিমেয় ÿক্ষুধা-চাহিদা, তা কি পূরণ করেছি আমরা? তার প্রকৃত আনন্দ, তার মনের বিকাশ কিসে, সেসব ভাবনা কি আমাদের শিক্ষা আর সমাজের ভাবনায় আছে?
কোন ব্যবস্থায় একজন নিউটন জীবনসায়াহ্নে বলতে পারেন, ‘আমি মাত্র জ্ঞানসমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছি’ তা আমরা ভাবি না। আর ভাবি না বলেই জীবনপ্রভাতেই শিক্ষার্থীর গায়ে পরীক্ষার্থীর যুদ্ধ চড়িয়ে দিচ্ছি।
আমরা কেন এভাবে একটি—আসলে কোটি কোটি—বিয়োগান্ত গল্প রচনা করে চলেছি? এটা আফসোসের কথা। কারণ, এ পরিণাম ঠেকানো সম্ভব—সহজেই এর পরিণতি মিলনাত্মক করা যেত।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

‘ভাঙাগড়ার জীবন আমাদের’ by কুন্তল রায়

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল আটটা। কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ের ঘণ্টি বেজে চলেছে। নামতে শুরু করল একটার পর একটা রেলগেটের প্রতিবন্ধক বার। গেটের দুধারে জমে থাকা বাস, পিকআপ ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর সামনে দিয়ে ধুলা উড়িয়ে চলে গেল কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী।
প্রতিবন্ধক সরে যাওয়ার পর রেললাইন ধরে কারওয়ান বাজার মাছের আড়তের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন মো. শাজাহান (৪০)। গায়ে হাফহাতা শার্ট, পরনে লুঙ্গি। আড়তসংলগ্ন রেললাইনের কাছে গিয়ে দেখতে পান লাঠি হাতে কয়েকজন যুবককে। রেললাইনের ওপর জোরে জোরে লাঠির বাড়ি দিয়ে তাঁরা জানান দিচ্ছেন, ‘কেউ ডালা নিয়ে ঢুকবি না, কেউ লাইনের ওপর বসবি না। বসবি তো মার খায়া মইরা যাবি।’

অন্যদিনের মতো এখানে নিয়ম ভেঙে রেললাইনের ওপর মাছের বাজার নেই, দরদাম নিয়ে হই-হট্টগোল নেই। পাশেই আড়তে মাছ বেচা-কেনা, দরদাম হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কোনোকিছুই যেন অন্যদিনের মতো নয়। আগের দিন এই রেলপথের ওপর দিয়ে মুহূর্তের যে বিভীষিকা ঘটে গেছে, তা কেউ ভুলতে পারছেন না।

ভুলতে পারছেন না শাজাহানও। ৮-১০ বছর ধরে আড়ত থেকে মাছ কিনে ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি। রেললাইনের পাশেই একটি ছিন্নবিচ্ছিন্ন ব্যানার দেখিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দ্যাখেন, কিছু পড়তে পারেন?’ দেখা গেল, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া আর কিছুই পড়া যাচ্ছে না। শাজাহান বলে চলেন, ‘মানুষ মইরা আমাগো খরচ বাড়ায়া দিছে, আইজক্যা মাছ নিয়া বইতে পারুম না, তাই মাছ কিনি নাই। আগে ১০০-১৫০ টাকা নিত, এইবার তো ২০০ টাকা চাইব। ঠিক এই জাগায় মানুষগুলো মরছে...মনডা ভালা না।’

বোঝা গেল, বৃহস্পতিবার সকালে এখানেই ময়মনসিংহ থেকে ঢাকামুখী যমুনা এক্সপ্রেস ও চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের মাঝে আটকা পড়ে ও ট্রেনের ধাক্কায় চারজন মারা গেছেন। গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও পাঁচজন। হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ।

খরচ কীভাবে বাড়ল—এ প্রশ্নের জবাবে শাজাহানের ভাষ্য, লাইনের ওপর ব্যবসা করতে গেলে টাকা দিতে হয়। কাকে দিতে হয়—প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘যারে-তারে। পুলিশ, রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী, নাইটগার্ড, আড়তদার, শ্রমিক নেতা—যে য্যামনে পারে টাকা নেয়।’

রেললাইন ধরে আরেকটু সামনে এগোতেই দেখা গেল জটলা করে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। সবাই মাছ ব্যবসায়ী। আড়ত থেকে মাছ কিনে ফেরি করে বিক্রি করেন। আজ লাইনের ওপর কাউকে বসতে দিচ্ছে না, তাই তাঁদেরও ব্যবসা বন্ধ। তাঁদের মুখেও একই কথা, ‘মানুষ মইরা খরচ বাড়ল।’ মৃধা নামের এক ব্যবসায়ীর বক্তব্য, ‘এইখানে যার য্যামুন ক্ষেমতা, সে সেইভাবে টাকা নেয়।’

সকাল আটটা ২৫ মিনিট। হঠাৎ শোরগোল শুরু হলো। রেললাইনের ওপর দিয়ে বড় প্লাস্টিকের ব্যারেল গড়াতে গড়াতে নিয়ে যাচ্ছিল ১৪-১৫ বছরের একটি ছেলে। লাঠি হাতে এক ব্যক্তি গিয়ে ধাম-ধাম করে দুটি বাড়ি দিয়ে ব্যারেলটিকে লাইনের একপাশে নিয়ে ফেললেন, আর ছেলেটির উদ্দেশে গালি ছুড়ে দিলেন। ধীরগতিতে ঢাকা ছেড়ে গেল ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস।

রেললাইন ধরে আরও ভেতরের দিকে গেলে পূর্ব পাশে একটি টং দোকান। আজ চা বানাচ্ছেন না, শুধু সিগারেট বিক্রি করছেন দোকানদার রহমান। বেঞ্চে বসা হলুদ শার্ট পরা এক বৃদ্ধ শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, পাশে আরেক বৃদ্ধ সিগারেট ফুঁকছেন। হলুদ শার্ট পরা বৃদ্ধ হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ওই যে বুড়া লোকটা এখানে কলা নিয়ে বসত, হ্যায় মারা গেছে।’ দোকানদার বলেন, ‘ওই যে মাঝে-মইদ্যে পেয়ারা, আবার আমও বিক্রি করত, ওই লোকটা? হ্যাঁ হ্যাঁ চিনছি, আমাদেরও পেয়ারাটা-কলাডা দিত? ইশ...রে, ইন্না লিল্লাহি...।’

বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনায় রেললাইনের ওপর থাকা নারীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেই জীবন দেন কলাবিক্রেতা ময়মনসিংহের নূর মোহাম্মদ। আরও মারা যান দুজন নারী, একজন পুরুষ।

আটটা ৪০, আটটা ৫০ ও নয়টা পাঁচ মিনিটে আরও তিনটি ট্রেন কারওয়ান বাজার রেলক্রসিং পার হয়। আর লাইনের দুধারে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষ এক দিন আগের দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণা করতে থাকেন।

নয়টা ৪০ মিনিটে মাথায় লাল কাপড় বাঁধা রেল কর্তৃপক্ষের নিয়োগ করা ২০-২৫ জন শ্রমিক হাতে দা-শাবল নিয়ে লাইনের দুপাশে বস্তিঘর ও টং দোকানের বেড়া এবং বাইরে থাকা মালপত্র ভাঙতে শুরু করেন। নিমেষে এসব ঘর-দোকানের মালিকেরা মালপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। দু-তিন মিনিট পার হতেই উচ্চ শব্দে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে হাজির হয় তিতাস কমিউটার ট্রেন। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, জটলা তখনো লাইনের ওপর। হুড়মুড় করে সবাই লাইনের ওপর থেকে নেমে আসে, কোনোমতে ট্রেনটি পার হয়ে যায়। বস্তিঘরগুলো লাইনের সঙ্গে এতটাই লাগোয়া যে সহজে নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পুলিশের সংখ্যা। তেজগাঁও থানার পুলিশ, রেলপুলিশ, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সকাল ১০টার দিকে আসে বুলডোজার। কারওয়ান বাজার ক্রসিংয়ের পূর্ব পাশ থেকে শুরু হয় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান। বুলডোজারের ধাক্কায় হুড়মুড়িয়ে ভাঙতে থাকে টং দোকান, বস্তিঘর। আরেকটু দূরে যেসব ঘর এখনো ভাঙা হয়নি, সেগুলোর টিন-বেড়া-মালপত্র খুলে নিয়ে দৌড়াতে থাকে মানুষ।

১০টা ২৮ মিনিটে দিনাজপুরগামী একতা এক্সপ্রেসের জন্য উচ্ছেদ কাজ মিনিট খানেক বন্ধ থাকে। ট্রেন পার হয়ে গেলে আবার উচ্ছেদ শুরু হয়। উচ্ছেদকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা নুরুননবী কবীর। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, আজ কারওয়ান বাজার ক্রসিং থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত উচ্ছেদ করা হবে। উচ্ছেদ অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। তিনি দাবি করেন, রেললাইনের দুধারে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ সব সময় চলে।

বেলা ১১টা। হুড়মুড়িয়ে চলছে উচ্ছেদ অভিযান। সঙ্গে মালপত্র নিয়ে দোকানমালিক ও বস্তিঘর বাসিন্দাদের দৌড়াদৌড়ি। আবার দেখা হয় শাজাহানের সঙ্গে। কারওয়ান বাজার কাঠপট্টিসংলগ্ন লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে। এই প্রতিবেদককে দেখে বলেন, ‘কত বার যে এই লাইনে উচ্ছেদ হইল! ভাঙে, সাত দিনের মইধ্যে আবার ঘর উঠে। আর মাইনষ্যের কাছ থিকা টাকা নেয়। এইভাবেই চলব। আপনে আবার সাত দিন পর আইয়া দেইখেন, কথাডা ঠিক কইলাম কি না।’ স্মিত হেসে শাজাহান শেষ করেন, ‘বুঝলেন, ভাঙাগড়ার জীবন আমাদের!’

কমবয়সী নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের নারীরা বিপরীত

পুরুষরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক এর উল্টো। নিজের বয়স যা-ই হোক, সঙ্গী হিসেবে একেবারে তরুণীদেরই বেশি পছন্দ পুরুষের। নতুন এক গবেষণায় উদ্ধৃত করে এমন তথ্যই দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। গ্রাফ ভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, নারীরা নিজেদের বয়সের কাছাকাছি বা তার চেয়ে একটু বেশি বয়সী পুরুষের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। তবে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কিছুটা কমবয়সী পুরুষকেও পছন্দ করেন তারা। অপরদিকে পুরুষরা যত বয়সীই হোন না কেন, পছন্দ করেন ২০ বা কাছাকাছি বয়সের নারীদের। ২২ বছরের পর নারীরা মারাত্মকভাবে আকর্ষণ হারান পুরুষদের কাছে। ওকেকুপিড নামের একটি সংস্থার উদ্যোগে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। সংস্থাটির প্রধান ক্রিশ্চিয়ান রাডার বলেন, ধরা যাক কোন নারীর বয়স ২৮ বছর। তাহলে দেখা গেছে, তিনি ২৮ বছর বা সামান্য বেশি বয়সী পুরুষকেই পছন্দ করেন। অপরদিকে নারীরা ২০-২২ বছরের পর পুরুষের কাছে আকর্ষণ হারাতে শুরু করেন। রাডারের ভাষায়, এটা ভয়াবহ! যখন আপনার বয়স ২২ বছর হয়ে যাবে, তখন তুমি থেকে আপনি সম্বোধন বয়সী নারীর কাছে কম আকর্ষণীয়। তবে এটা আসলে মানুষের মতামত। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় নারী হলো ২০ বছর বয়সী যুবতী। সর্বোচ্চ ২৪ বছর বয়সী নারীকে আকর্ষণীয় লাগে ৪৬ বছর বয়সী পুরুষের কাছে। ৫০ বছর বয়সী পুরুষের কাছেও সর্বাধিক আকর্ষণীয় হলেন ২০ বছর বয়সী যুবতী। অপরদিকে নারীদের কাছে প্রথম প্রথম নিজেদের চেয়ে ৩-৪ বছর বেশি বয়সী পুরুষ পছন্দনীয় হলেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে নিজেদের চেয়েও কম বয়সী পুরুষকে ভাল লাগে তাদের কাছে। যেমন ৪৬ থেকে ৪৮ বছর বয়সী নারীরা নিজেদের চেয়ে প্রায় ৮ বছর কমবয়সী পুরুষকে পছন্দ করেন।

উনিশের আগেই ভয়ংকর যৌন নির্যাতন

১৩ বছর বয়সে লক্ষ্মীর (ছদ্মনাম) হেসেখেলে বেড়ানোর কথা। কিন্তু ওই বয়সে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। বৃদ্ধ ওই স্বামী বিয়ের রাতে তাকে ধর্ষণ করেন। কৈশোরের আলোকিত জীবনে পা দিতে না দিতেই লক্ষ্মী ডুবে যেতে থাকে অন্ধকারে।

তবে বেশি দিন এ দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি লক্ষ্মীকে। ইউনিসেফের সহায়তায় এই দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পায় সে। সংস্থাটির নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগ লক্ষ্মীকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দুই বছর ধরে চিকিৎসা চলে তার।
এই গল্প ভারতের বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা লক্ষ্মীর একার নয়, তার মতো আরও হাজারো কিশোরীর। ইউনিসেফ বলছে, ভারতে প্রতি ৫০ জনে একজন মেয়েশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। ১০ বছর বয়স হতে না হতেই মেয়ে শিশুদের এ ধরনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। কৈশোর পার হতে না হতেই ৪২ শতাংশ মেয়েশিশু স্বামী, আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, অপরিচিত এমন​কি বাবা অথবা সৎ বাবার মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনে প্রকাশিত ইউনিসেফের প্রতিবেদন ‘হিডেন ইন প্লেইন সাইট’-এ ভারতে মেয়েশিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ভারতের মেয়েশিশুদের ওপর জনসংখ্যা তাত্ত্বিক ও স্বাস্থ্য বিষয়ে জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ওই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ভারতের ১০ থেকে ১৪ বছরের ১০ শতাংশ মেয়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৩০ শতাংশ মেয়ের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কৈশোর পার হওয়ার আগেই ভারতের ৪২ শতাংশ মেয়েশিশুকে যৌন নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়।

ওই জরিপে উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর সব তথ্য। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৭৭ শতাংশ কিশোরী জানায়, স্বামীরা তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন। ৬ শতাংশ মেয়েশিশু জানায়, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অনেকে তাদের যৌন নির্যাতন করেছে। কমপক্ষে ৪ শতাংশ মেয়েশিশু জানিয়েছে, বন্ধুরা যৌন নির্যাতন করেছে। ৩ শতাংশ মেয়েশিশু জানায়, অপরিচিত কোনো ব্যক্তি তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছে। আর শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বলেছে, বাবা অথবা সৎ বাবারা যৌন নির্যাতন চালিয়েছে তাদের ওপর। অর্থাৎ পরিচিত, অপরিচিত, আত্মীয়, বন্ধু কোনো পুরুষের কাছেই মেয়েরা নিরাপদ নয়।

ইউনিসেফের সাবেক পরামর্শক সুচিত্রা রাওয়ের ভাষ্য, এ ধরনের যৌন হয়রানির কথা মেয়েরা বেশির ভাগ গোপন করে যায়। যখন কেউ সাহস করে পুলিশকে জানায় অথবা আদালতের শরণাপন্ন হয়, তখনই যৌন নিপীড়ন বা নির্যাতনের খবর জানা যায়।

তবে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের পূর্বাঞ্চল, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় ভারতের মেয়েদের কিছুটা নিরাপদ বলে মনে করা হয়।

ভারত-চীন সম্পর্ক -সীমান্তে চীনের যুদ্ধংদেহী অবস্থান by ব্রহ্ম চেলানি

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) দেশটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তির বদৌলতে বহু বিতর্কিত হিমালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে দেশটির সীমান্তবাহিনীকে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার উসকানি দিচ্ছে। ফলে তারা ভারতের সঙ্গে একধরনের দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। পিএলএর এরূপ সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন ভারত সফরে কালো ছায়া ফেলবে, দেশ দুটির ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও এর প্রভাব অনুভূত হবে।
দেখা গেছে, চীনা নেতাদের ভারত সফরের আগে এরূপ উসকানির ঘটনা বরাবরই ঘটেছে। ২০০৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের ভারত সফরের আগে চীন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের ওপর তার দাবি পুনরায় উত্থাপন করে। একইভাবে, ২০১০ সালে চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের ভারত সফরের আগে কাশ্মীরের চীনা ভিসা প্রত্যাশী লোকজনের পাসপোর্টে একটি আলগা কাগজ স্টেপলার দিয়ে লাগিয়ে তাতে ভিসার সিল লাগিয়ে দেয় চীন। এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জের শামিল ছিল। ভারতের অধিকৃত কাশ্মীর ও চীনের অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যকার এক হাজার ৫৯৭ কিলোমিটার সীমান্তরেখা চীন একসময় মেনে নিলেও তারা হঠাৎ করে তা লঙ্ঘন করে বসে। আর গত মে মাসে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াংয়ের সফরের পর পিএলএ ভারতের লাদাখ প্রদেশের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়ে।
চীন এখন আবারও সেটা শুরু করেছে। চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তে তাদের আনাগোনা বেড়েছে। এই জায়গাতেই পিএলএর সীমা লঙ্ঘনের কারণে গত বছর তিন সপ্তাহের জন্য অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তার মানে, চীনা নেতাদের সফরের উদ্দেশ্য কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো নয়, বরং চীনের স্বার্থ সংহত করা। আর এটা শুরু হয় ভূমির অধিকার দাবির মধ্য দিয়ে। এমনকি ভারতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও চীন এই ভূমির দাবি থেকে সরে আসছে না।
ভারতের মনোভাব কিন্তু এর ঠিক বিপরীত। সেই জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে ভারতের সব প্রধানমন্ত্রীই চীন সফরে শুভকামনা নিয়ে গেছেন, কৌশলগত কিছু ছাড় তাঁরা দিয়েছেন, যেগুলো অনেকটা উপহারের পর্যায়েই পড়ে। ফলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে যে ভারত মার খেয়েছে, সেটা কোনো আশ্চর্যের ব্যাপার নয়।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ২০০৩ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ির তিব্বত-সংক্রান্ত আত্মসমর্পণ দেশ দুটির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক কুখ্যাত নজির হয়েই থাকবে। বাজপেয়ি এত দূর গিয়েছিলেন যে প্রথমবারের মতো তিনি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অংশ হিসেবে’ তিব্বত অটোনোমাস রিজিয়নের (টিএআর) ‘স্বীকৃতি’ দেন। এর ফলে চীন ‘দক্ষিণ তিব্বত’ হিসেবে অরুণাচল প্রদেশ দাবি করে বসে (যা তাইওয়ানের তিন গুণ), একই সঙ্গে চীনের ভূমিসংক্রান্ত দাবিও জোরালো হয়। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে যায় যে চীন কোনো ভূমি দখল করলেই সেটা তাদের এবং তারা কোনো ভূমি দাবি করলেই সেটা ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে’ মীমাংসা করতে হবে।
এর আগে নেহরু ১৯৫৪ সালে এক মহা ভুল করেছিলেন, বাজপেয়ি সেটাকে আরও পোক্ত করেছেন। নেহরু সে সময় চীনের তিব্বত অধিগ্রহণ মেনে নেন, যেটাকে বলা হতো পঞ্চশীল চুক্তি। অথচ সে সময় ভারত-তিব্বত সীমান্ত থাকলেও ভারত এর স্বীকৃতির জন্য কিছু করেনি। ব্রিটিশ উপনিবেশের উত্তরাধিকার হিসেবে ভারত তিব্বতে যে রাষ্ট্রবহির্ভূত অধিকার ও সুবিধা ভোগ করত, সেটা হারিয়ে ফেলে।
চুক্তির শর্ত হিসেবে ভারত তিব্বত থেকে ‘সামরিক পাহারা’ উঠিয়ে নেয় আর চীনা সরকারকে ‘যুক্তিসংগত মূল্যে’ ডাক, টেলিগ্রাফ ও গণটেলিফোনসেবা প্রদান করে। এদিকে চীন বারবার আট বছরের চুক্তি ভঙ্গ করেছে, যা শেষমেশ ১৯৬২ সালের যুদ্ধে মোড় নেয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, চীন এই পঞ্চশীল চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে বোকা বানিয়েছে, অবমাননা করেছে। তার পরও এই গ্রীষ্মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভাইস প্রেসিডেন্ট হামিদ আনসারিকে এই চুক্তির ৬০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বেইজিংয়ে পাঠান। সেই সফরে আনসারি একা যাননি, তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী নির্মলা সিথারমনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী সেখানে একটি ঐকমত্যে স্বাক্ষর করেছেন, তার শর্ত অনুযায়ী চীন ভারতকে কোনো সুবিধা দেওয়া ছাড়াই ভারতে একটি শিল্পপার্ক স্থাপন করবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। চীন বর্তমানে ভারত থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার তিন গুণ দেশটিতে রপ্তানি করে। চীনের রপ্তানি করা এসব পণ্যের মধ্যে একটি বড় অংশ হচ্ছে কাঁচামাল। ফলে ভারত নানা রকম কৌশলগত চাপে পড়ে যাচ্ছে এবং চীনের সমকক্ষ হিসেবে তার উত্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আসলে তিব্বতের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কারণেই চীন অরুণাচল প্রদেশ নিজেদের দাবি করার সাহস করেছে। এটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, তিব্বতের মর্যাদার বিষয়টি নয়। অর্থাৎ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে চীনের মাতব্বরিই মুখ্য। আর তিব্বত থেকে আসা নদীর পানিতে ভারতের হিস্যা থাকায় ভারতকে বড় খেসারত দিতে হবে।
চীন ক্রমাগতই সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু এটাকে লজ্জাকর মনে করেন, এ বছর ২১৬ দিনে ৩৩৪ বার এরূপ লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ভারত সম্প্রতি একটি ভুয়া পার্থক্য নিরূপণ করেছে। চীনাদের অনুপ্রবেশের ঘটনাকে তারা দুই ভাগে বিভক্ত করেছে: তারা একটাকে বলছে ‘ভুল করে প্রবেশ’, আরেকটিকে বলছে ‘অনাহূত প্রবেশ’। ফলে চীনাদের সব লঙ্ঘনের ঘটনাই তারা ‘ভুল করে প্রবেশের’ কাতারে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই কথার খেলা থেকে ভারত কিছুই অর্জন করতে পারবে না।
জুলাই মাসের ব্রিকস সম্মেলনেও এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। সেখানেও দেখা গেল, ব্রিকস ব্যাংক (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) গঠনেও চীন ভারতের চেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ব্রিকস নামক এই নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের সদর দপ্তর হবে চীনের সাংহাই শহরে, নয়াদিল্লিতে নয়। একজন ভারতীয় ব্যাংকটির প্রথম প্রেসিডেন্ট হবেন, এটাই ভারতের সান্ত্বনা পুরস্কার।
নাছোড়বান্দা ও প্রতিশোধপরায়ণ চীনের চাপে ভারতের উচিত হবে সতর্কতার সঙ্গে একটি দূরদর্শী ও পাল্টা কৌশল প্রণয়ন। শুরুতেই ভারত তিব্বতে চীনের সার্বভৌমত্বের যে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেটা ফিরিয়ে নিতে পারে। বাণিজ্যের মাধ্যমে চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে, চীন ঠিক যেটা করেছিল জাপান ও ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে—এই দেশ দুটিও চীনের কিছু ভূমি নিজেদের দাবি করেছিল। পানি, ভূমি ও রাজনৈতিক বিবাদে চীনকে প্যাঁচে ফেলে ভারত চীনের অগ্রগামী অবস্থানের রাশ টেনে ধরতে পারে।
তার পরও চীনের এই অকস্মাৎ আক্রমণ রুখে দিতে ভারতের উচিত হবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও চীনের অধিকৃত ভূমিতে সেনা পাঠানো। এতে কিছু প্রাণহানি হলেও চীন কিছুটা পিছিয়ে আসবে।
শেষমেশ এই ব্রিকস ও বাণিজ্যের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে ভারতের যে অংশীদারি গড়ে উঠছে, সেটা আসলে একধরনের ভণ্ডামি, যতক্ষণ একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে না উঠছে। কারণ, এর ফলে ফেঁপে ওঠা বাণিজ্য ও ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়া সত্ত্বেও ভারত চীনের এই বলপ্রয়োগ থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ব্রহ্ম চেলানি: নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের অধ্যাপক।

আমরা নির্দোষ, যারা মরেছে তারা ‘কেয়ারলেস’ by ফারুক ওয়াসিফ

রেলপথে মুহূর্তের বিভীষিকা -কারওয়ান বাজারে দুই ট্রেনের মাঝে পড়ে নিহত ৪
>>প্রতিদিনের মতো গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও নিয়ম ভেঙেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে রেললাইনের ওপর বসেছিল মাছের বাজার। যথারীতি ভিড় ছিল ক্রেতা-বিক্রেতার। মাছের দরদাম নিয়ে হইচই, হট্টগোলের মধ্যেই হঠাৎ দুপাশের দুটি লাইন দিয়ে আসা দুটি ট্রেনের অতিক্রম (ক্রসিং) স্তব্ধ করে দেয় সব কোলাহল। তখন সকাল আটটা ৪০। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনগামী যমুনা এক্সপ্রেস কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তসংলগ্ন এলাকা পার হচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে এই রেললাইনের ওপরে থাকা ক্রেতা-বিক্রেতারা হুড়মুড় করে পাশে দুই লাইনের মাঝের অংশে নেমে পড়েন। কিন্তু একই সময়ে অপর লাইন দিয়ে কমলাপুর থেকে চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনটি এখানে এসে পড়ে। দুই ট্রেনের মাঝে আটকে পড়া লোকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও ট্রেনের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই একজন মারা যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরও তিনজন। নিহতদের দুজন নারী। গুরুতর আহত আছেন আরও পাঁচজন। নিহত ব্যক্তিদের তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন কৃষি অর্থকরী ফসল বিভাগের সাবেক পরিচালক আবদুল মালেক (৬০), গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম (৫০) এবং ঘটনাস্থলেই নিহত কলা বিক্রেতা নূর মোহাম্মদ। তাঁর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের কোতোয়ালিতে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া নিহত অন্য নারীর পরনে গোলাপি রঙের বোরকা ছিল। তিনজনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
গুরুতর আহত পাঁচজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁরা হলেন তিব্বত গ্রুপের কর্মচারী সৈয়দ হোসেন (৫০), ফল বিক্রেতা ফজলু খান (৪০), তাঁর ভাতিজা রাকিব খান (১৭), গৃহবধূ পারুল বেগম (৪০) ও গৃহকর্মী সালমা বেগম (৪৫)। দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান (মাছের আড়তসংলগ্ন) ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আবু আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আড়তসংলগ্ন লাইন দিয়ে আসছিল কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামমুখী কর্ণফুলী ট্রেন। আর উল্টো দিকের লাইন দিয়ে আসছিল কমলাপুর স্টেশনমুখী ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেন। রেললাইনের ওপর মাছের বাজার বসায় অনেক মানুষের ভিড় ছিল। তিনি বলেন, দ্রুত দুটি ট্রেন দুই দিক থেকে আসায় সব মানুষ সরে যেতে পারেনি। আর আড়তের উল্টো দিকে রেললাইনের পাশে খালি জায়গা না থাকায় যমুনা ট্রেনের ধাক্কায় বেশ কয়েকজন ছিটকে পড়ে। ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর লোকজন আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। গেটম্যান আবু আহমেদ বলেন, মাছের বাজার বসার কারণে এখানে প্রায়ই সমস্যা হয়। দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী নাসিমা আক্তারের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনাস্থলে তিনি ১০ থেকে ১১ জনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন নারীও ছিলেন। সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের ওপর ও পাশে ছোপ ছোপ রক্ত পড়ে আছে। রেললাইনের ওপর কলাভর্তি একটি ঝুড়ি পড়ে আছে। এ সময় ঘটনাস্থলে নিহত নূর মোহাম্মদের লাশ বস্তায় পেঁচিয়ে বাঁশ বেঁধে নিতে দেখা যায় দুজনকে। জানা গেছে, এঁরা রেলওয়ে পুলিশের অস্থায়ী ডোম। সরেজমিনে দেখা যায়, রেললাইন ঘেঁষে বস্তিঘরে অসংখ্য মানুষের বসবাস। আছে ছোটখাটো দোকানপাট। স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি বলেন, বাজার ও বস্তি না সরালে এখানে দুর্ঘটনা ঘটবেই। রুবেল মিয়া নামে কারওরান বাজার এলাকার আরেকজন গেটম্যান বলেন, প্রতিদিন ভোরে রেললাইনের ওপর মাছের অস্থায়ী বাজার বসে। এ কারণে বারবার দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় সাধারণ লোকজনকে। এর আগেও এখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে।<<

>>>জীবনের প্রয়োজনে যিনি ছুটছিলেন দিনরাত, মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ চরম অমর্যাদায় বস্তায় ভরে ছুটছেন রেল পুলিশের ভাড়া করা বাহকেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুই ট্রেনের মাঝে পড়ে মারা যাওয়া চারজনের একজনকে এভাবেই সরিয়ে নেওয়া হয় ঘটনাস্থল থেকে। রেলপথে প্রাণ হারানো মানুষের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার সম্মানজনক কোনো রীতি কি রেল কর্তৃপক্ষের নেই? l ছবি: প্রথম আলো
কিশোরী আর গণঘাতকেরা নরম মনের প্রাণী। কিশোরীরা নিষ্পাপ স্বভাববশতই নম্র। গণঘাতকেরা চাতুরী করে নিরীহ ভাব ধরে থাকে। কোথায় তাদের কারণে কত মানুষ মারা গেল, তা জানার ঠেকা তাদের নেই। অবশ্য যেচে পড়ে জানালে দুঃখিত হয়। তারপর আবার নিরীহ-নির্বোধ মুখে সমাজ-সংসারে রাজত্ব করে। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিরপরাধের মৃত্যুর দায় নিতে কাউকে দেখিনি।

>>>কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছেন এই ট্রেনটির যাত্রীরা। পাশেই পড়ে থাকা এই কলার ঝাঁপির মালিকও মারা গেছেন দুর্ঘটনায়। গতকাল সকাল সোয়া নয়টায় কারওয়ান বাজার রেললাইন থেকে তোলা ছবি l মো. শাহীদুজ্জামান
তৃতীয় দুনিয়ার এক আদর্শ উদাহরণ হলো কারওয়ান বাজার। আলিশান ঝাঁ চকচকে ভবনের নিচেই ভূতপ্রেতের বাসস্থান। তারা আবর্জনার বাক্সমতো বেড়ার তলে ঘুমায়, রাস্তায় রান্না করে। প্রাকৃতিক কর্ম করার প্রয়োজন বোধ হয় তাদের হয় না। হলেও সেই ঘটনার স্থানটা অদৃশ্য। এর মধ্য দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। সেই রেলে কাটা পড়ল ১০-১২ জন। তাদের চারজন বিনা টিকিটে ইতিমধ্যে পরপারে পৌঁছে গেছে। নাহ, কেউ দুঃখ প্রকাশ করেনি, দায়িত্ব নেয়নি, মাফ চায়নি। রেললাইনের ওপর বসা অবৈধ বাজারের ফেরিওয়ালা, দোকানি, খরিদ্দার—সবাই তো অবৈধই! তাদের জন্য ‘বৈধ’ মহলের জবাবদিহি চাইবে জাতির কোন বিবেক? বিবেকের পাট তো যাত্রাপালার সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছে এই দেশ থেকে। অতএব, আইনত ‘কেউ দায়ী নয়’! বাদবাকি যা, তার সবই আহা, উহু, ছি ছি, মানবিক মানবিক!
সাবেক কালে নদী বা সড়কের কোনো জায়গায় নিয়মিতভাবে অপঘাত হলে বিশ্বাস করা হতো, জায়গাটা অপয়া। অদৃশ্য জগতের দেও-দানোরা সেখানে ঘাপটি মেরে বসে ‘মানুষ খায়’। কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ে নিয়মিতভাবে মানুষ কাটা পড়ে। কোনো প্রতিকার নেই, জীবন রক্ষার ব্যবস্থা নেই। রেল কর্তৃপক্ষ মায় সরকার হয়তো বিশ্বাস করে, সবই দেও-দানোর কাজ।
তো দেখতে গিয়েছিলাম সেই দৈত্যপুরী। কালচে হয়ে আসা রক্তের ছোপ। কয়েকটি থেঁতলানো কলা। কলার ঝুড়িটি ঠিকঠাক পড়ে আছে এক পাশে। এর মালিক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা তৎক্ষণাৎ নিহত। সাত বছর ধরে তিনি এখানে কলা বেচেন। সাত বছর ধরে ট্রেন এলে ঝুড়ি-টুকরি নিয়ে দৌড়ে সরে যান। এবার আর পারেননি। গরুর দুধ বেচেন আবদুল বাসেত। বুড়ো লোকটার সঙ্গে প্রতিদিন কথা হতো: বেচাকেনা কেমন, লাভটাভ কিছু হয় কি না ইত্যাদি। বললাম, ক্যামনে চেনেন ওনারে? বলেন, ‘পথের পরিচয়’।
রেললাইনে সওদা নিয়ে বসা বেশির ভাগ মানুষই পথের পরিচিত। মৃতদের মধ্যে গরিব ক্রেতারাও আছেন। আজ সকালে সেখানে যখন আবার বাজার বসবে, তখন সেই পরিচিতদের কয়েকজন থাকবেন না। হয়তো নিহতদের বসবার জায়গাটা ফাঁকা থাকবে দু–এক দিন। আবারও ট্রেন আসবে জানান না দিয়ে। একইভাবে ভেঁপু বাজবে না। একইভাবে আবারও হয়তো সরে যেতে গিয়ে পড়ে যাবেন কেউ কেউ। তাঁদের ওপর দিয়ে চলে যাবে ট্রেন। পেছনে পড়ে থাকবে থেঁতলানো দেহ, কাটা হাত-পা-মাথা। দৃশ্যে থাকবে থেঁতলানো সবজি বা মাছ। খাদ্য ও খাদকের একই হাল হবে। অনিয়মের ট্রেন চলতে থাকবে।
তুমুল রোদ আর পচা মাছের গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে আবারও দেখব: তেজগাঁওয়ের দিক থেকে একদল লোক আসছে। একটি ১৬-১৭ বছরের ছেলেকে ধরে আছে কয়েকজন, আরও কয়েকজন আনছে বেহুঁশপ্রায় এক নারীকে। ওরা যাচ্ছে কমলাপুরে রেলওয়ের নিজস্ব ডোমঘরে। ময়নাতদন্তের ছুরিতে কাটাফাটা দেহগুলো আরও ছেঁড়াবেড়া অবস্থায় সেখানে পড়ে আছে। মনিরুল যাচ্ছে তার বাবা নূর মোহাম্মদকে আনতে। ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে এক আহাম্মক সাংবাদিক তাদের থামতে বলবে, তার ফুটেজ প্রয়োজন। কিন্তু তারা শুনবে না। ব্যস্ততম রেলক্রসিং পেরিয়ে, সোনারগাঁও হোটেল-বিজিএমইএ ভবনের শানশওকত ঘেঁষে, এফডিসির রঙিন হাতছানি পেরিয়ে মৃতের আত্মীয়রা মিছিল করে যেতে থাকবে। কিন্তু কোনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা-রিকশা পাবে না।
বেশি দূর যাওয়া হয় না তাদের সঙ্গে। আবার ফিরে আসি সেই কলার টুকরির কাছে। কলার কাঁদি কাটার ছুরিটা পর্যন্ত গোছানো। কেবল শরীরটা গুছিয়ে সরে যেতে পারেনি মানুষটা। মৃত্যুর দায় কেউ না নিক, কিন্তু কলাগুলোর কী হবে? মেছো বাজারের কামলা কয়জন সেটা ঘিরে জটলা করছে। বুড়ো কলাওয়ালার কোনো ওয়ারিশ অথবা মোবাইল ফোন মেলেনি তখনো। লাশ অথবা এক টুকরি কলার কী হবে, সেই নিয়ে তারা থতমত।
উল্টা দিকে এফডিসির দেয়াল ঘেঁষে এক সারি সর্বহারা ভাতের হোটেল। তারই একটির বাসনকোসন ধোয়ার জায়গায় গালে হাত দিয়ে বসে একজন। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার কেউ কি...’। চোখ তুলে বলেন সেই নারী, ‘আমারে জিগায়েন না, আমারেও মাইরালান।’ অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিন দিন আগে, এখানেই এক হোটেলমালিকের ভাই রেললাইনের ওপর গোসল করছিলেন। হয়তো তার চোখ-কানে পানির পর্দা পড়েছিল। তিনি দেখেনওনি, শোনেনওনি। ট্রেন এসে মেরে দিল। এখন তিনি হাসপাতালে।
সামনে দিয়েই হুইসেল বাজিয়ে গেল আরেকটি ট্রেন। ঘণ্টা বাজল, চালক মহাশয় হুইসেলও দিলেন ক্রসিংয়ের ঠিক আগে। কিন্তু তেজগাঁও আর বিজিএমইএর মাঝখানে ধনুকের মতো যে বাঁক; হুইসেল না দিলে সেখানকার কেউই টের পাবে না ঘাড়ের কাছেই ট্রেন। ঠিক এটা ঘটেছে তখন। হাজার হাজার মানুষের বাজার। এক দিকে ট্রেন দেখে তারা আরেক দিকে লাফ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেদিকেও তো আরেকটি ট্রেন। এ অবস্থায় সুপারম্যান না হলে বাঁচা কঠিন। বাঁচেওনি।
রেলের বসদের কর্তব্য ছিল। রেল পুলিশই যেখানে অবৈধ বাজারের বখরা খায়, সেখানে কাকে কী বলবেন? ভাঙারি দোকানের এক মজুর জানালেন, রেলবাজার থেকে প্রতিদিন টাকা তোলেন সিরাজ কমান্ডার নামের এক লোক। এফডিসির দেয়ালঘেঁষা ৪০টি দোকান; এসবের ভাড়াও তিনিই গোনেন। কিন্তু টাকাটা যায় কোথায়? খবরের সুতা ধরে ধরে হাজির হলাম তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে হাজি মকবুল আহমেদের দপ্তরে। তিনি এফবিসিসিআইয়ের সদস্য, ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি সমিতির সভাপতি; বিরাট পরিবহন ব্যবসায়ী। তাঁর লন্ডনফেরত ছেলে জানালেন, ফিশ মার্কেটে কিছু জায়গার ইজারা আছে তাঁদের। তবে রেললাইনের বাজারের কথা তিনি জানেন না। জোহরের নামাজ থেকে ফিরে হাজি মকবুল আহমেদ জানালেন, তাঁরা ৪০ জন মিলে রেললাইনের পাশের জায়গা ভরাট করে ৪০টি দোকান তুলেছেন। বছরে দুই লাখ টাকায় ইজারা। তবে তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে চার-পাঁচ বছর আগে। রেলের বাজারের ভাড়া পান? জবাবে ভোরে আসতে বললেন বাজারে। প্রশ্ন জাগে, যে সিরাজ কমান্ডার তাঁর দোকানের ভাড়া তোলেন, তিনিই কেন খোলাবাজারেরও ভাড়ার ঠিকাদার হন? যদি রেলের বাজারের হিস্যা তাঁর না-ই থাকবে, তাহলে ফিশ মার্কেটের ওই জায়গার ভাড়া কেন নেন তিনি? মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পুত্রের প্রথম প্রতিক্রিয়া ‘বাজারের লোকজন অ্যাজ আ পারসন কেয়ারলেস’। আমার চাপাচাপিতে পরে অবশ্য তিনি দুঃখিত হন!
হাজি মকবুল, সিরাজ কমান্ডার, রেল পুলিশ, রেলওয়ে কল্যাণ ট্রাস্ট, দেলু সর্দারসহ বৈধ অনেকেই এই ‘অবৈধ’ বাজার থেকে টাকা পান বটে, তবে মৃত্যুগুলো ‘কেয়ারলেস’ হওয়ার শাস্তিও বটে। আর ক্ষমতাবাজির টাকা-ব্যবসা-মুনাফা? সব নিদায় নিরীহ নিষ্পাপ।
রেল কর্তৃপক্ষ নীরব। রেলওয়ের হাতেই দেশের সবচেয়ে বেশি জমি। যদি বৈধভাবেও ইজারা দেওয়া হতো, যদি জীবন ও সম্পদের ব্যাপারে তারা যত্নবান হতো, তাহলে রেলও লোকসান দিত না, সময়ে সময়ে এত মানুষও কাটা পড়ত না। রেলের কালো বিড়াল কেবল দুর্নীতিই করে না, মানুষও মারে। কাকে দোষ দেব তাহলে? যারা মরেছে তাদের? নাকি সেই অদৃশ্য কালো বিড়ালদের?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।